একটি কাগজে লেখা ভাগ্য

শহরের সবচেয়ে পরিচিত পরিবারগুলোর একটি ছিল রহমান পরিবার। বিশাল দোতলা বাড়ি, সামনে বাগান, পেছনে পুকুর আর শহরের মাঝখানে তাদের বড় ব্যবসা। পরিবারের কর্তা সাইফ রহমান ছিলেন কঠোর স্বভাবের মানুষ। তাঁর কথা পুরো পরিবারে শেষ কথা হিসেবে ধরা হতো।

তাঁর একমাত্র ছেলে জিহান রহমান।

জিহানের বয়স ছাব্বিশ। দেখতে সুদর্শন, পড়াশোনায় ভালো এবং বাবার ব্যবসায় কাজ করত। কিন্তু বাবার মতো গম্ভীর ছিল না সে। বরং বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করতে ভালোবাসত। তার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল—সে নিজের জীবন নিয়ে বাবার তৈরি নিয়ম মানতে চাইত না।

সেদিন বিকেলে জিহান গাড়ি নিয়ে শহরের বাইরে যাচ্ছিল। হঠাৎ রাস্তার পাশে একটা ছোট চায়ের দোকানের সামনে তার গাড়ি থামাতে হলো। সামনে কয়েকজন মানুষ জড়ো হয়ে ছিল।

জিহান গাড়ি থেকে নেমে দেখল, একটা মেয়ে মাটিতে পড়ে থাকা কিছু কাগজ কুড়াচ্ছে। তার পাশে একটা পুরোনো ব্যাগ। মেয়েটা এক হাতে কাগজগুলো সামলাচ্ছিল, অন্য হাতে চুল সরাচ্ছিল।

জিহান একটু দূর থেকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল।

মেয়েটার পোশাক খুব সাধারণ। হালকা নীল সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে সাদা ওড়না। চেহারায় কোনো বাড়তি সাজ নেই। অথচ অদ্ভুত শান্ত একটা সৌন্দর্য ছিল।

হঠাৎ একটা কাগজ বাতাসে উড়ে জিহানের পায়ের কাছে এসে পড়ল।

সে কাগজটা তুলে নিল।

মেয়েটা দৌড়ে এসে বলল,

—“ওটা আমার।”

জিহান কাগজটা এগিয়ে দিয়ে হেসে বলল,

—“নিন।”

মেয়েটা কাগজটা নিয়ে বলল,

—“ধন্যবাদ।”

জিহান মজা করে বলল,

—“এত তাড়াহুড়ো করে কাগজগুলো নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?”

মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

—“আপনাকে সেটা বলতে হবে?”

জিহান একটু অবাক হলো। সাধারণত মেয়েরা তার সঙ্গে কথা বললে একটু লজ্জা পেত। কিন্তু এই মেয়েটা একদম স্বাভাবিক।

সে হেসে বলল,

—“না, বলতে হবে না। শুধু জানতে ইচ্ছা করছিল।”

মেয়েটা আর কিছু না বলে চলে গেল।

জিহান কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর নিজের অজান্তেই হাসল।

—“মেয়েটা বেশ অদ্ভুত!”

সেদিনের সেই ছোট্ট ঘটনাটা জিহান খুব একটা গুরুত্ব দিল না।

কিন্তু সে জানত না, এই অচেনা মেয়েটাই খুব শিগগির তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে।

পরদিন সকালে রহমান বাড়িতে একটা অপ্রত্যাশিত অতিথি এলেন।

সাইফ রহমানের বহু বছরের বন্ধু করিম সাহেব বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। বহু বছর পর বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে তিনি স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে রহমান বাড়িতে এসেছেন।

সাইফ রহমান বন্ধুকে দেখে খুব খুশি হলেন।

—“করিম! এত বছর পর তোকে সামনে দেখে বিশ্বাসই হচ্ছে না!”

করিম সাহেব হেসে বললেন,

—“ব্যবসা আর বিদেশের জীবন আমাকে আটকে রেখেছিল। এবার ঠিক করেছি, নিজের শহরে কিছুদিন থাকব।”

তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি চুপচাপ চারপাশ দেখছিল।

সাইফ রহমান বললেন,

—“আর এ নিশ্চয়ই তোমার মেয়ে?”

করিম সাহেব গর্ব করে বললেন,

—“হ্যাঁ। আমার মেয়ে রিয়া।”

রিয়া ভদ্রভাবে সালাম দিল।

সাইফ রহমান মুচকি হেসে বললেন,

—“জিহান কোথায়? জিহান!”

উপরতলা থেকে জিহান নিচে নেমে এল।

কিন্তু সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে সে থমকে গেল।

তার চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ল রিয়ার মুখে।

এই সেই মেয়ে!

গতকাল রাস্তার পাশে যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।

জিহান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

রিয়াও তাকে দেখে চিনতে পারল।

তার চোখে মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল।

করিম সাহেব বললেন,

—“জিহান, এ আমার মেয়ে রিয়া।”

জিহান হালকা হেসে বলল,

—“আমাদের পরিচয় আছে।”

সাইফ রহমান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

—“পরিচয়?”

জিহান বলল,

—“গতকাল রাস্তায় দেখা হয়েছিল।”

রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—“হ্যাঁ। উনি আমার একটা কাগজ তুলে দিয়েছিলেন।”

সাইফ রহমান হেসে উঠলেন।

—“দেখেছিস! পৃথিবীটা ছোট।”

জিহান চুপ করে রিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল।

রিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।

সেদিন দুপুরে সবাই একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসেছিল। জিহান লক্ষ্য করল, রিয়া খুব বেশি কথা বলছে না। কিন্তু যখনই কেউ তার সঙ্গে কথা বলছে, সে সুন্দর করে উত্তর দিচ্ছে।

করিম সাহেব বললেন,

—“রিয়া এখানে কিছুদিন থাকবে। ওর পড়াশোনার কাজ আছে। ভাবলাম, পুরোনো বন্ধুর বাড়িতে থাকলে ওরও ভালো লাগবে।”

সাইফ রহমান খুশি হয়ে বললেন,

—“এ বাড়ি তো তোমাদেরই বাড়ি। যতদিন ইচ্ছা থাকো।”

জিহানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা আনন্দ হলো।

সে নিজেও বুঝতে পারল না কেন।

খাওয়ার পর রিয়া বাগানে চলে গেল। জিহান কিছুক্ষণ পর অকারণে সেদিকেই গেল।

রিয়া একটা বেঞ্চে বসে বই পড়ছিল।

জিহান দূর থেকে বলল,

—“আপনি সবসময় বই পড়েন?”

রিয়া বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,

—“আপনি সবসময় অকারণে প্রশ্ন করেন?”

জিহান হেসে ফেলল।

—“আপনি কিন্তু আমাকে ভয় পান না।”

রিয়া এবার তাকাল।

—“ভয় পাওয়ার মতো কী করেছেন?”

—“কিছুই না।”

—“তাহলে ভয় পাব কেন?”

জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“আপনাকে প্রথম দেখার সময় মনে হয়েছিল আপনি খুব শান্ত মেয়ে।”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“আর এখন?”

—“এখন মনে হচ্ছে, আপনি শান্ত নন। আপনি শুধু প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না।”

রিয়া এবার হাসল।

সেই হাসিটা দেখে জিহান কয়েক সেকেন্ডের জন্য কথা হারিয়ে ফেলল।

রিয়া বই বন্ধ করে বলল,

—“আপনার সঙ্গে একটা কথা বলব?”

—“বলুন।”

—“আমাকে আপনি না বলে তুমি বলতে পারেন।”

জিহান অবাক হয়ে তাকাল।

—“সত্যি?”

—“হ্যাঁ।”

জিহান মুচকি হেসে বলল,

—“তাহলে তুমিও আমাকে তুমি বলবে।”

রিয়া মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

দুজনের মধ্যে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।

বাগানের গাছের পাতায় হালকা বাতাস লাগছিল।

জিহান জানত না কেন, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল—এই মেয়েটার সঙ্গে তার পরিচয়টা সাধারণ কোনো পরিচয় নয়।

আর রিয়াও হয়তো তখনও জানত না, রহমান বাড়িতে কাটানো এই কয়েকটি দিন তার জীবনকে এমন এক পথে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সহজ হবে না।

সন্ধ্যায় জিহান নিজের ঘরে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ হাসল।

নিজেকেই প্রশ্ন করল,

—“আমি কি মেয়েটাকে পছন্দ করতে শুরু করেছি?”

কোনো উত্তর পেল না।

রহমান বাড়িতে রিয়া আসার পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে।

এই এক সপ্তাহে বাড়িটার পরিবেশ যেন বদলে গেছে। আগে যেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু কাজের ব্যস্ততা থাকত, সেখানে এখন প্রায়ই হাসির শব্দ শোনা যায়।

আর সেই হাসির সবচেয়ে বড় কারণ ছিল জিহান।

রিয়ার সঙ্গে দেখা হলেই কোনো না কোনো অজুহাতে কথা শুরু করত সে।

কখনো বাগানে ফুল নিয়ে কথা, কখনো রিয়ার পড়াশোনা নিয়ে প্রশ্ন, আবার কখনো একেবারে অকারণে জিজ্ঞেস করত,

—“আজ এত চুপচাপ কেন?”

রিয়া প্রতিবারই বিরক্ত হওয়ার ভান করত।

কিন্তু সত্যি বলতে, জিহানকে দেখলে তার নিজেরও ভালো লাগত।

তবে সে সেটা প্রকাশ করত না।

সেদিন সকালে রিয়া বারান্দায় বসে বই পড়ছিল। হঠাৎ তার সামনে একটা কাপ রাখা হলো।

সে মুখ তুলে দেখল, জিহান দাঁড়িয়ে আছে।

—“চা।”

রিয়া কাপটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আমি তো চাইনি।”

—“জানি।”

—“তাহলে?”

—“তবু নিয়ে এলাম।”

রিয়া হেসে ফেলল।

—“তুমি সবসময় নিজের ইচ্ছামতো কাজ করো?”

জিহান চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,

—“সবসময় না। তবে তোমার ব্যাপারে একটু বেশি করি।”

রিয়া চুপ করে গেল।

জিহানও বুঝতে পারল, কথাটা একটু বেশি হয়ে গেছে।

সে দ্রুত প্রসঙ্গ বদলে বলল,

—“আজ কোথাও যাবে?”

—“না।”

—“তাহলে চল।”

—“কোথায়?”

—“শহরের পুরোনো নদীর ঘাটে।”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“না, আমি যাব না।”

—“কেন?”

—“তোমার সঙ্গে একা বাইরে গেলে সবাই কথা বলবে।”

জিহান হেসে বলল,

—“তুমি কি সবার কথা নিয়ে এত ভাবো?”

রিয়া ধীরে বলল,

—“সবাইকে নিয়ে ভাবি না। কিন্তু নিজের সম্মান নিয়ে ভাবি।”

জিহান এবার গম্ভীর হয়ে গেল।

—“তুমি ঠিক বলেছ।”

রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

জিহান বলল,

—“তোমাকে কখনো এমন কোনো পরিস্থিতিতে ফেলব না, যেখানে তোমার সম্মান নিয়ে কেউ প্রশ্ন করতে পারে।”

রিয়ার চোখে অদ্ভুত একটা কোমলতা ফুটে উঠল।

সে কিছু বলল না।

দুপুরের দিকে করিম সাহেবের ফোন এলো। তিনি জরুরি কাজে ঢাকায় যেতে বাধ্য হয়েছেন। রিয়াকে কয়েকদিনের জন্য রহমান বাড়িতেই থাকতে হবে।

সাইফ রহমান এতে খুশি হলেন।

—“রিয়া এখানে থাকলে আমাদেরও ভালো লাগবে। জিহানেরও একজন কথা বলার মানুষ থাকবে।”

জিহান পাশ থেকে বলল,

—“আমার তো অনেক বন্ধু আছে।”

রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—“হ্যাঁ, তুমি খুব জনপ্রিয়।”

জিহান ভ্রু তুলে বলল,

—“তুমি কি ঈর্ষা করছ?”

রিয়া হেসে বলল,

—“স্বপ্ন দেখো।”

কথাটা বলে সে চলে গেল।

জিহান তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—“একদিন কিন্তু এই কথার উত্তর তোমাকেই দিতে হবে।”

পরদিন বিকেলে রিয়া বাগানে হাঁটছিল। হঠাৎ তার পা একটা ভাঙা ইটের ওপর পড়ে গেল। সে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই জিহান দৌড়ে এসে তার হাত ধরে ফেলল।

রিয়া থেমে গেল।

জিহানের হাত তখনও তার হাত ধরে আছে।

দুজনেই কয়েক মুহূর্ত চুপ।

জিহান ধীরে বলল,

—“সাবধানে হাঁটতে পারো না?”

রিয়া হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,

—“আমি ঠিক ছিলাম।”

—“হ্যাঁ, খুবই ঠিক ছিলে। আর দুই সেকেন্ড হলে মাটিতে বসে থাকতে।”

রিয়া হেসে ফেলল।

জিহান তার পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“লেগেছে?”

—“না।”

—“নিশ্চিত?”

—“হ্যাঁ।”

জিহান এবার একটু স্বস্তি পেল।

তারপর বলল,

—“তুমি জানো, তোমার একটা সমস্যা আছে।”

—“কী?”

—“তুমি নিজের যত্ন নিতে জানো না।”

রিয়া মৃদু স্বরে বলল,

—“আর তোমার সমস্যা?”

—“অনেক।”

—“একটা বলো।”

জিহান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—“তোমাকে নিয়ে বেশি চিন্তা করি।”

রিয়ার মুখের হাসি থেমে গেল।

জিহানও আর কিছু বলল না।

দুজনেই অন্যদিকে তাকাল।

সেদিন রাতে রিয়া ঘুমাতে পারছিল না।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

জিহানের কথাটা বারবার মনে পড়ছিল।

“তোমাকে নিয়ে বেশি চিন্তা করি।”

এটা কি শুধুই বন্ধুত্ব?

নাকি এর মধ্যে অন্য কিছু আছে?

রিয়া নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করল—

“জিহান সবার সঙ্গেই ভালো ব্যবহার করে। আমাকে নিয়ে আলাদা করে ভাবছে না।”

কিন্তু তার মন কথাটা মানল না।

অন্যদিকে জিহানও নিজের ঘরে বসে ছিল।

তার হাতে একটা বই, কিন্তু গত আধা ঘণ্টায় সে এক পৃষ্ঠাও পড়েনি।

তার মনে শুধু রিয়ার কথা।

শেষ পর্যন্ত সে নিজের কাছেই স্বীকার করল,

“আমি রিয়াকে ভালোবেসে ফেলছি।”

কথাটা ভাবতেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

কারণ ঠিক তখনই তার বাবা ঘরে ঢুকলেন।

—“জিহান, তোমার সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”

জিহান বইটা বন্ধ করে বলল,

—“কী কথা?”

সাইফ রহমান কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“তোমার জন্য একটা সম্পর্কের কথা এসেছে।”

জিহান অবাক।

—“সম্পর্ক?”

—“হ্যাঁ। খুব ভালো পরিবার। মেয়েটাও শিক্ষিত, ভদ্র। আমি চাই তুমি বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে দেখো।”

জিহানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

—“বাবা, আমি এখন বিয়ের কথা ভাবছি না।”

সাইফ রহমান কঠোর গলায় বললেন,

—“তোমার ভাবার দরকার নেই। আমি যা বলছি, সেটা ভেবে দেখো।”

জিহান শান্ত গলায় বলল,

—“কিন্তু আমার নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত তো আমারও থাকা উচিত।”

সাইফ রহমান বিরক্ত হলেন।

—“তুমি এখনো বুঝতে পারছ না, জীবন শুধু নিজের ইচ্ছেমতো চলে না।”

জিহান কিছু বলল না।

তার বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

জিহান জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

নিচের বাগানে তখন রিয়া দাঁড়িয়ে ছিল।

চাঁদের আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

জিহানের বুকের ভেতর হঠাৎ একটা ভয় ঢুকে গেল।

সে বুঝতে পারল, সামনে শুধু ভালোবাসার গল্প নয়—একটা বড় লড়াইও অপেক্ষা করছে।

পরদিন সকালে রিয়া জিহানকে অস্বাভাবিক চুপচাপ দেখতে পেল।

সে কাছে এসে বলল,

—“কী হয়েছে?”

—“কিছু না।”

—“তুমি মিথ্যা বলছ।”

জিহান তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—“তুমি এত তাড়াতাড়ি বুঝে ফেলো কীভাবে?”

রিয়া বলল,

—“তোমাকে দেখলেই বোঝা যায়।”

জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“রিয়া, যদি কোনোদিন তোমাকে হারানোর ভয় হয়, তখন কী করা উচিত?”

রিয়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

—“যাকে হারাতে চাও না, তাকে ধরে রাখতে হয়।”

জিহান ধীরে বলল,

—“যদি পুরো পৃথিবী তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়?”

রিয়া মৃদু হেসে উত্তর দিল,

—“তাহলে যে সত্যি তাকে ভালোবাসে, সে পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।”

জিহান কিছু বলল না।

শুধু রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, সে তার উত্তর পেয়ে গেছে।

জিহানের বাবার সঙ্গে সেই রাতের কথোপকথনের পর থেকেই তার মনটা অস্থির হয়ে ছিল।

বিয়ের জন্য মেয়ের পরিবার থেকে প্রস্তাব এসেছে—এই কথাটা সে রিয়াকে বলতে পারছিল না। আবার লুকিয়েও রাখতে চাইছিল না।

রিয়ার প্রতি তার অনুভূতিটা এখন আর শুধু ভালো লাগার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রিয়া তার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে মানুষটার কথা মনে পড়ে, সে রিয়া। রাতে ঘুমানোর আগে যার কথা মনে পড়ে, সেও রিয়া।

কিন্তু জিহান জানত, তার বাবা বিষয়টা সহজভাবে নেবেন না।

সাইফ রহমান সবসময় চাইতেন, তার ছেলে এমন পরিবারে বিয়ে করুক, যাদের সামাজিক অবস্থান তাদের সমান। অথচ রিয়ার পরিবার ভালো হলেও তাদের আর্থিক অবস্থান রহমান পরিবারের মতো ছিল না।

পরদিন বিকেলে জিহান বাগানে বসে ছিল।

রিয়া হাতে একটা বই নিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল।

—“একা একা বসে আছ কেন?”

জিহান তাকিয়ে বলল,

—“এমনিই।”

—“তোমার ‘এমনিই’ কথাটা এখন বিশ্বাস হয় না।”

—“কেন?”

—“তুমি যখন সত্যি ভালো থাকো, তখন এত চুপ করে থাকো না।”

জিহান মৃদু হাসল।

—“তুমি আমাকে খুব ভালো বুঝে ফেলেছ।”

রিয়া পাশে বসে বলল,

—“কয়েকদিন ধরে তোমাকে দেখছি। একটু তো বুঝবই।”

জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“রিয়া, একটা কথা বলব?”

—“বল।”

—“তুমি কি মনে করো, দুজন মানুষ একে অপরকে পছন্দ করলে শুধু সেই কারণে তাদের একসঙ্গে থাকা উচিত?”

রিয়া একটু ভেবে বলল,

—“শুধু পছন্দ করলেই হয় না। বিশ্বাস থাকতে হয়। সম্মান থাকতে হয়। আর দুজনের পরিবারকেও বোঝার চেষ্টা করতে হয়।”

—“আর যদি পরিবার না মানে?”

রিয়া এবার তার দিকে তাকাল।

—“তাহলে অনেক কঠিন হয়ে যায়।”

—“তুমি কি পরিবারের বিরুদ্ধে যেতে পারবে?”

রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“আমি পরিবারকে কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু নিজের জীবন নিয়েও তো মিথ্যা বাঁচতে পারব না।”

জিহানের বুকটা কেমন করে উঠল।

সে ধীরে বলল,

—“যদি আমি তোমাকে একটা কথা বলি?”

—“কী কথা?”

জিহান তার চোখের দিকে তাকাল।

—“আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”

রিয়া স্থির হয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না।

তারপর রিয়া খুব আস্তে বলল,

—“তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?”

প্রশ্নটা শুনে জিহানের মুখে হালকা হাসি ফুটল।

সে উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল।

তারপর বলল,

—“হ্যাঁ।”

রিয়ার চোখ নেমে গেল।

জিহান আবার বলল,

—“অনেকদিন ধরে বুঝতে পারছিলাম না। ভাবতাম, তোমাকে শুধু ভালো লাগে। তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে, তোমাকে দেখলে ভালো লাগে। কিন্তু এখন বুঝেছি, তুমি পাশে না থাকলে আমার দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে।”

রিয়া চুপ করে শুনছিল।

জিহান ধীরে বলল,

—“আমি তোমাকে ভালোবাসি, রিয়া।”

রিয়ার চোখে পানি জমে উঠল।

তবে সেটা দুঃখের পানি নয়।

সে মৃদু হেসে বলল,

—“আমিও।”

জিহান যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিশ্বাসই করতে পারল না।

—“সত্যি?”

রিয়া হেসে মাথা নেড়ে বলল,

—“হ্যাঁ।”

জিহানের মুখে শিশুর মতো আনন্দ ফুটে উঠল।

সে বলল,

—“তাহলে এতদিন আমাকে এত কষ্ট দিয়েছ কেন?”

রিয়া হেসে বলল,

—“তুমি তো নিজেই কিছু বলোনি।”

—“ভয় করছিল।”

—“কিসের?”

—“তুমি যদি না বলো?”

রিয়া মৃদু স্বরে বলল,

—“তাহলে আজও তুমি জানতেই না।”

দুজনেই হেসে উঠল।

সন্ধ্যার নরম আলোয় তাদের নতুন সম্পর্কের শুরু হলো।

কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন গোপন রইল না।

রহমান বাড়ির পুরোনো কাজের লোক কাদের দূর থেকে জিহান ও রিয়াকে কথা বলতে দেখেছিল।

সে বিষয়টি গিয়ে সাইফ রহমানকে জানাল।

সাইফ রহমান প্রথমে বিশ্বাস করতে চাননি।

—“তুমি নিশ্চিত?”

—“জি সাহেব। অনেকক্ষণ ধরে দুজনকে একসঙ্গে দেখেছি।”

সাইফ রহমানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

তিনি জানতেন, করিম সাহেব তার পুরোনো বন্ধু। কিন্তু বন্ধুত্ব এক জিনিস, আর ছেলের বিয়ে আরেক জিনিস।

তিনি সেদিন রাতেই জিহানকে নিজের ঘরে ডাকলেন।

জিহান ঢুকতেই বাবা বললেন,

—“রিয়ার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী?”

জিহান বুঝতে পারল, আর লুকানোর সুযোগ নেই।

সে শান্তভাবে বলল,

—“আমি রিয়াকে ভালোবাসি।”

সাইফ রহমানের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।

—“এই সম্পর্ক এখানেই শেষ করো।”

জিহান অবাক হয়ে বলল,

—“কিন্তু কেন?”

—“কারণ আমি এই বিয়ে মেনে নেব না।”

—“আপনি রিয়ার পরিবারকে চেনেন।”

—“চিনি বলেই জানি। করিম ভালো মানুষ। কিন্তু তার মেয়েকে আমি আমার ছেলের স্ত্রী হিসেবে চাই না।”

জিহানের গলা ভারী হয়ে গেল।

—“আপনি কি শুধু ওদের আর্থিক অবস্থার জন্য এমন বলছেন?”

সাইফ রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“তুমি এখন আবেগ দিয়ে কথা বলছ। বিয়ে আবেগ দিয়ে চলে না।”

—“বিয়ে যদি শুধু টাকা আর সামাজিক অবস্থান দিয়ে চলে, তাহলে সেখানে সুখ থাকে কোথায়?”

সাইফ রহমান রাগে উঠে দাঁড়ালেন।

—“তুমি আমাকে শেখাবে সংসার কীভাবে চলে?”

জিহানও এবার শান্ত থাকতে পারল না।

—“আমি শুধু নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার চাই।”

—“তোমার এই সম্পর্ক আমি কখনো মেনে নেব না।”

—“আপনি না মানলেও আমি রিয়াকে ছেড়ে দেব না।”

কথাটা বলেই জিহান ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

দরজার বাইরে এসে সে থমকে দাঁড়াল।

কারণ করিডোরের অন্য পাশে রিয়া দাঁড়িয়ে ছিল।

সে সব শুনেছে।

জিহান এগিয়ে গিয়ে বলল,

—“রিয়া…”

রিয়া চোখের পানি মুছে ফেলল।

—“তোমার বাবা আমাকে পছন্দ করেন না।”

—“তুমি এসব নিয়ে চিন্তা করো না।”

—“কীভাবে চিন্তা করব না? উনি তোমার বাবা।”

জিহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আর তুমি আমার জীবনের মানুষ।”

রিয়া মাথা নিচু করে বলল,

—“আমি চাই না আমার জন্য তুমি তোমার বাবার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করো।”

—“তুমি আমার জন্য কোনো সমস্যা নও।”

—“কিন্তু…”

জিহান থামিয়ে দিল।

—“শোনো, আমি তোমাকে বেছে নিয়েছি। এখন আমাকে এই সিদ্ধান্তের দায়িত্বও নিতে হবে।”

রিয়া তার দিকে তাকাল।

তার চোখে ভয় ছিল, কিন্তু সেই ভয়কে ছাপিয়ে ছিল জিহানের প্রতি বিশ্বাস।

পরদিন করিম সাহেব রহমান বাড়িতে ফিরে এলেন।

সাইফ রহমান তাকে একান্তে ডেকে সব কথা বললেন।

করিম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—“জিহান আর রিয়া একে অপরকে ভালোবাসে?”

—“হ্যাঁ।”

করিম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“আমি জানতাম না।”

—“আমি চাই না এই সম্পর্ক আরও এগোক।”

করিম সাহেব বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তুমি কি রিয়ার সঙ্গে কথা বলেছ?”

—“না।”

—“তাহলে আগে মেয়েটার কথা শোনো।”

সাইফ রহমান উত্তর দিলেন না।

অন্যদিকে রিয়া তার বাবার সামনে বসে ছিল।

করিম সাহেব মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, কিছু একটা হয়েছে।

—“তুমি কি জিহানকে ভালোবাসো?”

রিয়া চোখ নামিয়ে বলল,

—“হ্যাঁ, বাবা।”

করিম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“তুমি কি জানো, এই সম্পর্ক সহজ হবে না?”

—“জানি।”

—“তবু?”

রিয়া ধীরে বলল,

—“আমি ওকে ছেড়ে যেতে চাই না। কিন্তু আপনার সম্মতি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তও নিতে চাই না।”

করিম সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

—“তুমি আমার মেয়ে। তোমার সুখ আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

রিয়ার চোখ ভিজে গেল।

কিন্তু করিম সাহেবের পরের কথায় সে চমকে উঠল।

—“তবে একটা শর্ত আছে।”

—“কী?”

—“জিহানকে প্রমাণ করতে হবে, সে সত্যিই তোমার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। শুধু বাবার বাড়ির ছেলে হয়ে তোমাকে ভালোবাসা সহজ। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তোমাকে সম্মান দিয়ে জীবন কাটানো—সেটাই আসল পরীক্ষা।”

রিয়া চুপ করে রইল।

সেই রাতে জিহান যখন রিয়ার সঙ্গে দেখা করতে এল, রিয়া তাকে সব কথা জানাল।

জিহান কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বলল,

—“তাহলে এটাই হবে আমার পরীক্ষা।”

রিয়া বলল,

—“তুমি কি পারবে?”

জিহান তার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,

—“তোমাকে পাওয়ার জন্য নয়, তোমার যোগ্য হওয়ার জন্য আমি লড়ব।”

রিয়ার চোখে পানি চলে এল।

সে আস্তে করে বলল,

—“আমি অপেক্ষা করব।”

দুজনের সামনে তখন পথটা কঠিন হয়ে উঠেছে।

পরদিন সকাল থেকেই জিহানের জীবন যেন বদলে গেল।

আগে সকাল মানেই ছিল ঘুম থেকে উঠে নাশতা করা, বাবার অফিসে যাওয়া, ব্যবসার কাজ দেখা আর সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো। এখন তার প্রতিটি মুহূর্তে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—

সে কি সত্যিই নিজের যোগ্যতায় রিয়াকে জীবনে রাখতে পারবে?

রিয়ার বাবা কোনো অসম্ভব শর্ত দেননি। তিনি শুধু চেয়েছেন, জিহান যেন প্রমাণ করে যে সে বাবার টাকার ওপর নির্ভরশীল নয় এবং নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারে।

কিন্তু জিহানের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল তার নিজের বাবা।

সাইফ রহমান সেদিন সকালের নাশতার টেবিলে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“আজ অফিসে আমার সঙ্গে যাবে।”

জিহান শান্তভাবে বলল,

—“না বাবা।”

সাইফ রহমান ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

—“কী বললে?”

—“আমি আজ থেকে নিজের একটা কাজ শুরু করতে চাই।”

—“কী কাজ?”

—“আমি যে ডিজাইন আর সফটওয়্যার নিয়ে পড়াশোনা করেছি, সেই কাজটা করতে চাই। নিজের একটা ছোট প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাব।”

সাইফ রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“আমার ব্যবসা ছেড়ে তুমি এসব করবে?”

—“আমি আপনার ব্যবসা অপছন্দ করি না। কিন্তু আমি নিজের পরিচয় তৈরি করতে চাই।”

—“এইসব কথা রিয়ার জন্য বলছ?”

জিহান বাবার চোখের দিকে তাকাল।

—“হ্যাঁ। ওর জন্যও। কিন্তু শুধু ওর জন্য নয়। নিজের জন্যও।”

সাইফ রহমান রাগে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

—“তুমি জানো না জীবন কত কঠিন।”

জিহান শান্ত গলায় বলল,

—“তাই তো শিখতে চাই।”

সাইফ রহমান আর কিছু বললেন না।

তবে তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি সন্তুষ্ট নন।

জিহান সেদিনই শহরের একটা ছোট অফিসঘর দেখতে গেল।

ঘরটা খুব বড় নয়। একটা টেবিল, তিনটা চেয়ার আর একটা পুরোনো কম্পিউটার রাখার মতো জায়গা। দেয়ালে পুরোনো রং, জানালার কাঁচে ধুলো।

জিহানের বন্ধু রাফি সঙ্গে ছিল।

রাফি চারপাশ দেখে বলল,

—“তুই সত্যিই এখানে অফিস করবি?”

জিহান হেসে বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“তোর বাবা চাইলে তোকে বিশাল অফিস দিতে পারেন।”

—“সেটাই তো চাই না।”

রাফি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—“তুই সত্যিই রিয়াকে এতটা ভালোবাসিস?”

জিহান জানালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—“হ্যাঁ।”

—“যদি শেষ পর্যন্ত বিয়ে না হয়?”

জিহান এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—“আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। কিন্তু আমি চাই না কোনোদিন রিয়া মনে করুক, আমি শুধু বাবার টাকার জোরে তাকে ভালোবাসার কথা বলেছিলাম।”

রাফি তার বন্ধুর কাঁধে হাত রাখল।

—“তাহলে শুরু কর।”

সেদিন থেকেই জিহানের নতুন পথচলা শুরু হলো।

অন্যদিকে রিয়া তার বাবার সঙ্গে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

করিম সাহেব বলেছিলেন, কয়েকদিনের জন্য তাকে ঢাকায় থাকতে হবে।

রিয়া জানত, দূরে চলে গেলে জিহানের সঙ্গে দেখা করা কঠিন হবে।

সন্ধ্যায় সে বাগানে এসে দাঁড়াল।

জিহান সেখানে আগেই অপেক্ষা করছিল।

রিয়াকে দেখেই সে বলল,

—“তুমি চলে যাচ্ছ?”

—“কয়েকদিনের জন্য।”

—“কতদিন?”

—“জানি না।”

জিহানের মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“এত মন খারাপ করছ কেন?”

—“তুমি থাকলে বাড়িটা অন্যরকম লাগে।”

—“আমি তো আবার আসব।”

—“তার আগে?”

রিয়া একটু কাছে এসে বলল,

—“ফোন তো আছে।”

জিহান হেসে বলল,

—“ফোনে কি তোমার হাসি দেখা যায়?”

রিয়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।

—“তুমি খুব বেশি কথা বলতে শিখে গেছ।”

—“তোমার জন্য।”

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর জিহান পকেট থেকে একটা ছোট্ট কলম বের করল।

—“এটা রাখো।”

রিয়া অবাক হয়ে বলল,

—“কেন?”

—“তুমি সবসময় লিখতে ভালোবাসো। এটা তোমার জন্য।”

রিয়া কলমটা হাতে নিয়ে বলল,

—“তুমি এটা এত যত্ন করে রেখেছিলে?”

—“হ্যাঁ।”

—“কেন?”

জিহান হেসে বলল,

—“জানি না। মনে হয়েছিল একদিন তোমাকে দেব।”

রিয়া কলমটা বুকের কাছে ধরে রাখল।

—“আমি এটা হারাব না।”

জিহান বলল,

—“আমাকেও হারাবে না।”

রিয়া তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—“চেষ্টা করব।”

ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পর জিহান আর রিয়ার নিয়মিত কথা হতে লাগল।

সকালে একটা ফোন।

দুপুরে ছোট্ট একটা মেসেজ।

রাতে দীর্ঘ কথোপকথন।

তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে আরও গভীর হতে লাগল।

কিন্তু জিহানের নতুন কাজ সহজ ছিল না।

প্রথম কয়েক সপ্তাহ কোনো ক্লায়েন্ট পেল না সে।

অফিসের ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, অন্যান্য খরচ—সব মিলিয়ে তার সঞ্চয়ের টাকা দ্রুত কমতে লাগল।

একদিন রাতে রাফি বলল,

—“তুই চাইলে বাবার কাছ থেকে টাকা নিতে পারিস।”

জিহান মাথা নাড়ল।

—“না।”

—“কিন্তু ব্যবসা চালাতে টাকা লাগবে।”

—“আমি চেষ্টা করব।”

—“আর যদি না পারিস?”

জিহান জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—“তাহলে আবার চেষ্টা করব।”

সে জানত না, তার এই লড়াই দূর থেকে একজন মানুষ প্রতিদিন দেখছে।

সাইফ রহমান।

তিনি গোপনে ছেলের কাজের খোঁজ নিচ্ছিলেন।

জিহান টাকা চাইছে না।

কোনো সাহায্য চাইছে না।

বরং নিজের মতো করে কাজ করার চেষ্টা করছে।

তবু বাবার মন নরম হলো না।

একদিন জিহান জানতে পারল, তার প্রথম বড় ক্লায়েন্টের কাজটা বাতিল হয়ে গেছে।

অফিসে বসে সে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।

রাতে রিয়ার ফোন এলো।

—“আজ সারাদিন তোমাকে ফোনে পাচ্ছি না।”

—“কাজ ছিল।”

—“মিথ্যা।”

জিহান হেসে ফেলল।

—“তুমি আবার কীভাবে বুঝলে?”

—“তোমার কণ্ঠ শুনলেই বুঝি।”

জিহান কিছু বলল না।

রিয়া বলল,

—“কী হয়েছে?”

—“আমার একটা কাজ বাতিল হয়েছে।”

—“তাতে কী?”

—“অনেক টাকা আটকে গেছে।”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—“তুমি কি হাল ছেড়ে দেবে?”

—“না।”

—“তাহলে সমস্যা কোথায়?”

জিহান মৃদু হেসে বলল,

—“তুমি এত সহজ করে সবকিছু বলো কীভাবে?”

—“কারণ আমি তোমাকে চিনি।”

—“তুমি জানো, আমি কেন এত চেষ্টা করছি?”

—“জানি।”

—“কেন?”

রিয়া ধীরে বলল,

—“আমার জন্য।”

জিহানের গলা নরম হয়ে গেল।

—“শুধু তোমার জন্য নয়। তোমাকে যেন কোনোদিন কেউ বলতে না পারে, ‘জিহান তোমাকে তার বাবার টাকার জোরে পেয়েছে।’”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“আমি তোমার টাকা চাই না, জিহান।”

—“জানি।”

—“আমি শুধু চাই, তুমি আমার পাশে থাকো।”

জিহান চোখ বন্ধ করল।

—“আমি থাকব।”

কয়েক সপ্তাহ পর অবশেষে জিহানের পরিশ্রমের ফল আসতে শুরু করল।

একটা বড় প্রতিষ্ঠান তার কাজ পছন্দ করল এবং নতুন একটা প্রজেক্ট দিল।

জিহান দিন-রাত পরিশ্রম করতে লাগল।

প্রথমবার নিজের উপার্জনের টাকা হাতে পাওয়ার দিন সে কোনো দামি জিনিস কিনল না।

সোজা একটা ছোট্ট ফুলের দোকানে গেল।

রিয়ার জন্য একগুচ্ছ সাদা ফুল কিনল।

ঢাকায় গিয়ে সে রিয়ার হাতে ফুলগুলো তুলে দিয়ে বলল,

—“এগুলো আমার প্রথম উপার্জনের টাকা দিয়ে কেনা।”

রিয়া ফুলের দিকে তাকিয়ে চোখ ভিজে গেল।

—“এত সুন্দর কেন?”

—“কারণ প্রথম উপার্জনের আনন্দটা তোমার সঙ্গে ভাগ করতে চেয়েছিলাম।”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“আমি তোমার ওপর গর্বিত।”

এই একটা বাক্যই যেন জিহানের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিল।

কিন্তু ঠিক সেই সময় সাইফ রহমান একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন।

তিনি বুঝলেন, জিহানকে থামাতে হলে শুধু নিষেধ করে লাভ হবে না।

তাই তিনি করিম সাহেবকে ফোন করলেন।

—“করিম, আমাদের দুজনেরই উচিত এই সম্পর্কটা এখানেই শেষ করা।”

করিম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“তুমি কী করতে চাও?”

সাইফ রহমান বললেন,

—“আমি রিয়াকে নিয়ে তোমাকে একটা প্রস্তাব দিতে চাই।”

করিম সাহেব চুপ হয়ে গেলেন।

সাইফ রহমানের ফোন পাওয়ার পর করিম সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন।

বন্ধুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বহু বছরের। কিন্তু এবার যে বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছে, সেটা শুধু দুই বন্ধুর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর একমাত্র মেয়ে রিয়ার ভবিষ্যৎ।

সাইফ রহমান বলেছিলেন,

—“করিম, আমি চাই তুমি রিয়াকে কিছুদিনের জন্য আমাদের শহর থেকে দূরে নিয়ে যাও।”

করিম সাহেব অবাক হয়ে বললেন,

—“কেন?”

—“জিহানের সঙ্গে ওর যোগাযোগ যতদিন থাকবে, ততদিন ওর মন বদলানো কঠিন হবে।”

—“তুমি কি মনে করো দূরে পাঠিয়ে দিলেই ও জিহানকে ভুলে যাবে?”

—“সময় অনেক কিছু বদলে দেয়।”

করিম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“আর যদি না বদলায়?”

সাইফ রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“তাহলে জিহানকে নিজের সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হবে।”

করিম সাহেব বন্ধুর কথার গভীরতা বুঝতে পারলেন।

কিন্তু তিনি তখনও জানতেন না, সাইফ রহমান আরও একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সেদিন সন্ধ্যায় রিয়া তার বাবার সঙ্গে বসে ছিল।

করিম সাহেব বললেন,

—“রিয়া, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।”

রিয়া বাবার মুখের দিকে তাকাল।

—“কী কথা?”

—“তুমি কি জিহানকে নিয়ে সত্যিই এতটা নিশ্চিত?”

রিয়া বিনা দ্বিধায় বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“তুমি জানো, ওর পরিবার তোমাকে সহজে মেনে নেবে না?”

—“জানি।”

—“ওর বাবাও চায় না তোমাদের সম্পর্কটা থাকুক।”

রিয়ার চোখে সামান্য কষ্ট ফুটে উঠল।

—“জিহান চেষ্টা করছে।”

—“চেষ্টা করছে, সেটা আমি দেখছি। কিন্তু জীবন শুধু চেষ্টা দিয়ে চলে না। অনেক সময় পরিস্থিতিও মানুষের সিদ্ধান্ত বদলে দেয়।”

রিয়া চুপ করে রইল।

করিম সাহেব মেয়ের হাত ধরে বললেন,

—“আমি তোমার বিরুদ্ধে নই। কিন্তু আমি চাই না তুমি শুধু আবেগের কারণে কোনো সিদ্ধান্ত নাও।”

রিয়া ধীরে বলল,

—“বাবা, আমি জিহানের সঙ্গে থাকলে হয়তো অনেক সমস্যা আসবে। কিন্তু আমি জানি, ও আমাকে সম্মান করে। আমার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়। আমার কাছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

করিম সাহেব মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তিনি বুঝলেন, মেয়েটা সত্যিই জিহানকে ভালোবেসেছে।

এদিকে জিহান তার ছোট অফিসে বসে কাজ করছিল।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অফিসের সবাই চলে গেছে। শুধু সে একা।

হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।

রিয়া।

জিহান সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরল।

—“হ্যালো।”

ওপাশ থেকে রিয়ার গলা এল,

—“কী করছ?”

—“কাজ।”

—“এখনও?”

—“হ্যাঁ। কাল একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রেজেন্টেশন আছে।”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“তুমি কখনো বিশ্রাম নাও?”

—“তুমি পাশে থাকলে নিতাম।”

—“আমি তো আছি।”

জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—“সত্যি?”

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে একটা কথা বলো।”

—“কী?”

—“যদি সবকিছু আমাদের বিপক্ষে চলে যায়?”

রিয়া উত্তর দিতে একটু সময় নিল।

—“তাহলে আমরা দুজন মিলে সবকিছু ঠিক করার চেষ্টা করব।”

জিহান হাসল।

—“তুমি আমার সাহস।”

—“আর তুমি আমার জেদ।”

দুজনেই হেসে উঠল।

কিন্তু সেই হাসির আড়ালে দুজনেই জানত, সামনে কঠিন সময় আসছে।

পরদিন সকালে সাইফ রহমান জিহানকে ডেকে পাঠালেন।

জিহান বাবার ঘরে ঢুকতেই তিনি বললেন,

—“তোমার ব্যবসার খবর আমি পেয়েছি।”

জিহান চুপ করে রইল।

—“কাজ ভালো চলছে।”

—“ধন্যবাদ।”

—“কিন্তু তুমি একটা জিনিস ভুলে যাচ্ছ।”

—“কী?”

—“তোমার এই ব্যবসা দাঁড় করাতে সময় লাগবে। আর তুমি যতই চেষ্টা করো, তোমার জীবন এখনো আমার পরিবারের নামের সঙ্গে জড়িত।”

জিহান শান্তভাবে বলল,

—“আমি সেটা অস্বীকার করছি না।”

—“তাহলে রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কটা শেষ করো।”

জিহান মাথা নাড়ল।

—“পারব না।”

সাইফ রহমান টেবিল থেকে একটা কাগজ তুলে তার সামনে রাখলেন।

—“এটা কী জানো?”

জিহান কাগজটা হাতে নিল।

তার চোখ বড় হয়ে গেল।

এটা ছিল জিহানের ব্যবসার জন্য ব্যাংক ঋণের কাগজ।

সাইফ রহমান বললেন,

—“তোমার ব্যবসার কিছু আর্থিক দায় এখনো আমার পরিচয়ের কারণে অনুমোদন হয়েছে। তুমি যদি আমার বিরুদ্ধে যাও, আমি চাইলে এগুলো বন্ধ করে দিতে পারি।”

জিহান কিছুক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—“আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”

—“আমি তোমাকে বাস্তবতা বোঝাচ্ছি।”

—“আপনি আমার ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারেন। কিন্তু আমার অনুভূতি বন্ধ করতে পারবেন না।”

সাইফ রহমানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

—“তুমি বুঝতে পারছ না তুমি কী হারাতে পারো।”

জিহান উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—“হয়তো অনেক কিছু হারাব। কিন্তু নিজের সত্যিটাকে হারাতে চাই না।”

সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

কয়েকদিনের মধ্যে জিহানের ব্যবসায় সত্যিই সমস্যা শুরু হলো।

দুটি বড় ক্লায়েন্ট চুক্তি বাতিল করল।

ব্যাংক থেকেও নতুন ঋণ সুবিধা আটকে গেল।

অফিসের কর্মচারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল।

রাফি বলল,

—“তুই চাইলে এখনো বাবার কাছে ফিরে যেতে পারিস।”

জিহান জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—“না।”

—“কিন্তু সবকিছু ভেঙে যাচ্ছে।”

—“ভেঙে গেলে আবার গড়ব।”

—“তুই কি শুধু রিয়ার জন্য এত কিছু করছিস?”

জিহান মৃদু হেসে বলল,

—“রিয়ার জন্য শুরু করেছিলাম। এখন নিজের আত্মসম্মানের জন্যও করছি।”

অন্যদিকে রিয়া বুঝতে পারছিল, জিহান কিছু একটা লুকাচ্ছে।

প্রতিদিন ফোনে তার কণ্ঠে ক্লান্তি।

আগের মতো হাসি নেই।

রিয়া একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করল,

—“তোমার কী হয়েছে?”

—“কিছু না।”

—“আবার মিথ্যা বলছ।”

—“ব্যবসায় একটু সমস্যা।”

—“কতটা?”

জিহান চুপ করে রইল।

রিয়া বুঝে গেল, ব্যাপারটা গুরুতর।

—“তুমি কি আমার জন্য এসব সহ্য করছ?”

জিহান বলল,

—“তোমার জন্য আমি কিছু করছি না। আমি আমার সিদ্ধান্তের জন্য দাঁড়িয়ে আছি।”

রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

—“আমি চাই না তুমি সব হারাও।”

—“তোমাকে হারানোই যদি সবকিছু পাওয়ার দাম হয়, তাহলে সেই পাওয়া আমার দরকার নেই।”

রিয়া কিছু বলতে পারল না।

এর মধ্যেই একদিন করিম সাহেব রিয়াকে জানালেন,

—“আমরা কিছুদিনের জন্য বিদেশে যাচ্ছি।”

রিয়া চমকে উঠল।

—“কোথায়?”

—“কানাডায়। তোমার পড়াশোনার জন্য একটা সুযোগ এসেছে।”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“কতদিন?”

—“সম্ভবত এক বছর।”

রিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

এক বছর!

জিহানের কাছ থেকে এত দূরে?

সে সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—“আমি যাব না।”

করিম সাহেব শান্তভাবে বললেন,

—“আমি তোমাকে বাধ্য করছি না। কিন্তু তোমার ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হবে।”

রিয়া নিজের ঘরে চলে গেল।

সেদিন রাতে সে জিহানকে ফোন করল।

অনেকক্ষণ পর জিহান ফোন ধরল।

—“হ্যালো?”

রিয়ার কণ্ঠ কাঁপছিল।

—“জিহান, বাবা আমাকে বিদেশে নিয়ে যেতে চান।”

জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—“কতদিন?”

—“এক বছর।”

ওপাশে নীরবতা।

রিয়া বলল,

—“তুমি কিছু বলছ না কেন?”

জিহান গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,

—“তুমি কি যেতে চাও?”

—“আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না।”

—“আমি জিজ্ঞেস করেছি, তুমি যেতে চাও কি না।”

রিয়া চোখ মুছে বলল,

—“না।”

জিহান ধীরে বলল,

—“তাহলে যেও না।”

—“কিন্তু বাবা?”

—“আমি তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলব।”

রিয়া ভয় পেয়ে বলল,

—“না! আবার কোনো ঝামেলা কোরো না।”

—“আমি ঝামেলা করতে যাচ্ছি না। আমি শুধু তোমার বাবাকে বোঝাতে চাই।”

পরদিন জিহান করিম সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গেল।

করিম সাহেব তাকে বসতে বললেন।

জিহান সম্মান দিয়ে বলল,

—“চাচা, আমি জানি আপনি রিয়ার ভালো চান।”

—“অবশ্যই।”

—“আপনি যদি মনে করেন আমি রিয়ার জন্য যথেষ্ট নই, আমাকে একটা সুযোগ দিন।”

করিম সাহেব কিছু বললেন না।

জিহান বলল,

—“আমি এখনো অনেক কিছু অর্জন করতে পারিনি। কিন্তু আমি চেষ্টা করছি। আমি আপনার মেয়েকে কোনোদিন তার পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাই না।”

করিম সাহেব গভীরভাবে তাকিয়ে বললেন,

—“তুমি কি জানো, তোমার বাবা এই সম্পর্কের বিরুদ্ধে?”

—“জানি।”

—“তবুও?”

—“তবুও।”

—“তুমি কি রিয়ার দায়িত্ব নিতে পারবে?”

জিহান দৃঢ় গলায় বলল,

—“আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমি ওকে কখনো একা ফেলে যাব না।”

করিম সাহেব মৃদু হাসলেন।

—“প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, জিহান। সময়ই প্রমাণ করবে।”

জিহান উঠে দাঁড়াল।

—“আমি সময়কে সুযোগ দিতে প্রস্তুত।”

কিন্তু জিহান জানত না, তার বাবা তখন এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছেন যা সবকিছুকে আরও জটিল করে তুলবে।

সাইফ রহমান ইতিমধ্যে সেই মেয়েটির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, যার সঙ্গে জিহানের বিয়ের কথা বলেছিলেন।

আর তিনি ঠিক করেছেন—

জিহানের অমতে হলেও তিনি সেই বিয়ে এগিয়ে নেবেন।

খবরটা যখন জিহানের কানে পৌঁছাল, তখন সে বুঝল—

রিয়াকে ভালোবাসা ছিল শুধু শুরু।

সাইফ রহমান যে জিহানের অমতে অন্য একটি বিয়ের কথা এগিয়ে নিচ্ছেন, খবরটা জানার পর জিহানের মাথা যেন কিছুতেই ঠিকমতো কাজ করছিল না।

সে অনেকক্ষণ নিজের অফিসে বসে রইল।

সামনে কম্পিউটারের পর্দা জ্বলছিল, কিন্তু কোনো কাজেই মন বসছিল না। বারবার বাবার কথাগুলো মনে পড়ছিল।

“আমি চাইলে এই বিয়েটা ঠিক করে দিতে পারি।”

জিহান জানত, তার বাবা শুধু কথা বলছেন না। তিনি সত্যিই কাজটা করতে পারেন।

কিছুক্ষণ পর রাফি অফিসে ঢুকল।

—“কী হয়েছে?”

জিহান চুপ করে রইল।

রাফি আবার বলল,

—“তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে খারাপ কিছু হয়েছে।”

জিহান ধীরে বলল,

—“বাবা আমার বিয়ের কথা পাকা করতে যাচ্ছেন।”

রাফি অবাক হয়ে বলল,

—“কী?”

—“আমি না বলেছি। তবুও।”

—“তুই কী করবি?”

জিহান জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—“যা করার, এবার সরাসরি করতে হবে।”

—“মানে?”

—“আমি বাবার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলব। শান্তভাবে। কিন্তু এবার নিজের সিদ্ধান্ত পরিষ্কার করে জানাব।”

সন্ধ্যায় জিহান রহমান বাড়িতে ফিরে বাবার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

সাইফ রহমান তখন কিছু কাগজ দেখছিলেন।

ছেলেকে দেখে তিনি বললেন,

—“এসো।”

জিহান সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

—“বাবা, আমার সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে কথা হচ্ছে?”

সাইফ রহমান কাগজ থেকে চোখ না তুলে বললেন,

—“হ্যাঁ।”

—“আমি তো বলেছি, আমি এই বিয়েতে রাজি নই।”

—“তোমার মতামত আমি শুনেছি।”

—“তাহলে?”

সাইফ রহমান এবার মাথা তুললেন।

—“তোমার বয়স হয়েছে। তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আমার।”

জিহান শান্ত গলায় বলল,

—“আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমারও কিছু বলার আছে।”

—“তুমি এখন রিয়ার কারণে আবেগপ্রবণ।”

—“আমি রিয়াকে ভালোবাসি।”

—“ভালোবাসা কয়েক বছরের মধ্যে বদলে যায়।”

—“হতে পারে। কিন্তু আমি সেই ঝুঁকি নিজের জীবনে নিতে চাই।”

সাইফ রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“তুমি কি জানো, রিয়ার পরিবার তোমার পরিবারের সমান নয়?”

জিহান উত্তর দিল,

—“আমি মানুষকে পরিবারের সম্পদ দিয়ে বিচার করি না।”

—“তুমি খুব বড় বড় কথা শিখেছ।”

—“জীবন আমাকে শিখিয়েছে।”

সাইফ রহমানের কণ্ঠ কঠিন হয়ে গেল।

—“তাহলে শোনো। তুমি যদি রিয়াকে বিয়ে করতে চাও, আমার কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাবে না।”

জিহান কয়েক সেকেন্ড বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর শান্তভাবে বলল,

—“আমি সাহায্য চাইও না।”

এই কথায় সাইফ রহমান একটু থমকে গেলেন।

জিহান আরও বলল,

—“আমি আপনার ছেলে। আপনার ভালোবাসা আমার দরকার। কিন্তু আমার জীবনের সিদ্ধান্তের বিনিময়ে সেই ভালোবাসা নিতে পারব না।”

সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সাইফ রহমান একা বসে রইলেন।

ছেলের এই দৃঢ়তা তাঁর ভালো লাগেনি।

তবু কোথাও একটা অদ্ভুত গর্বও জন্ম নিল।

পরদিন রিয়ার বাবা-মা বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

রিয়া নিজের ঘরে বসে জিহানের দেওয়া কলমটা হাতে নিয়ে ছিল।

কলমটা হাতে নিলেই তার মনে হচ্ছিল, জিহান যেন পাশে আছে।

সে ফোন করল।

জিহান সঙ্গে সঙ্গে ধরল।

—“হ্যালো, রিয়া।”

—“তুমি কোথায়?”

—“অফিসে।”

—“আজ বাবার সঙ্গে কথা বলেছ?”

—“হ্যাঁ।”

—“কী হয়েছে?”

জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“উনি আমার বিয়ের কথা এগিয়ে নিচ্ছেন।”

রিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল।

—“তুমি কী বলেছ?”

—“আমি না করেছি।”

—“উনি?”

—“উনি বলেছেন, আমি যদি তোমাকে বিয়ে করি, তাহলে উনার কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাব না।”

রিয়ার চোখে পানি এসে গেল।

—“তাহলে তুমি কী করবে?”

জিহান মৃদু হেসে বলল,

—“যেটা এতদিন ধরে করছি। নিজের পায়ে দাঁড়াব।”

—“জিহান…”

—“হুম?”

—“আমি ভয় পাচ্ছি।”

জিহানের কণ্ঠ নরম হয়ে গেল।

—“কিসের ভয়?”

—“যদি সবকিছু আমাদের হাতের বাইরে চলে যায়?”

—“তাহলে আমরা দুজন মিলে আবার শুরু করব।”

—“যদি তোমার বাবা তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যান?”

—“তাহলেও আমি তোমাকে খুঁজে নেব।”

রিয়া চোখ বন্ধ করল।

তারপর ধীরে বলল,

—“আমি তোমার ওপর বিশ্বাস করি।”

জিহান মৃদু স্বরে বলল,

—“এই বিশ্বাসটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।”

কয়েকদিন পর জিহানের ব্যবসায় বড় একটি সুযোগ এল।

ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রস্তাব পেল সে। তবে শর্ত ছিল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বড় একটি প্রজেক্ট শেষ করতে হবে।

জিহান সুযোগটা গ্রহণ করল।

দিন-রাত কাজ শুরু হলো।

একদিকে ব্যবসা, অন্যদিকে রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক, আর তার ওপর বাবার চাপ—সব মিলিয়ে জীবন কঠিন হয়ে উঠেছিল।

তবু জিহান ভেঙে পড়েনি।

প্রতিদিন রাতে কাজ শেষ করে রিয়াকে ফোন করত।

এক রাতে রিয়া বলল,

—“তুমি ক্লান্ত।”

—“হ্যাঁ।”

—“আজ কথা না বললেও হবে।”

—“না। তোমার সঙ্গে কথা না বললে ক্লান্তিটা আরও বেশি লাগে।”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“তুমি জানো, তোমার একটা বদঅভ্যাস হয়েছে?”

—“কী?”

—“সব কথা এত সুন্দর করে বলো যে রাগ করে থাকা যায় না।”

জিহান হেসে বলল,

—“তাহলে রাগ করো না।”

—“আমি কি তোমার ওপর রাগ করেছি?”

—“করোনি?”

—“না।”

—“তাহলে আমি ভাগ্যবান।”

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর রিয়া বলল,

—“জিহান?”

—“হুম?”

—“যদি কোনোদিন তোমার মনে হয় আমার জন্য তুমি অনেক কিছু হারিয়েছ…”

—“তখন?”

—“তখন যেন আমাকে দোষ দিও না।”

জিহানের গলা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

—“রিয়া, তুমি আমার জীবনে এসে কিছু কেড়ে নাওনি। বরং আমি প্রথমবার বুঝেছি, নিজের জন্য কিছু অর্জন করার মানে কী।”

রিয়া চোখ মুছে ফেলল।

এর মধ্যে সাইফ রহমানের ঠিক করা বিয়ের পরিবার রহমান বাড়িতে আসার দিন ঠিক করল।

সাইফ রহমান জিহানকে জানালেন,

—“আগামী শুক্রবার ওরা আসবে।”

জিহান বলল,

—“আমি থাকব না।”

—“তুমি থাকবে।”

—“না।”

—“আমি তোমার বাবা।”

জিহান শান্তভাবে বলল,

—“আর আমি আপনার ছেলে। তাই আপনার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, আমি এই বিয়েতে রাজি নই।”

সাইফ রহমান রাগে বললেন,

—“তুমি কি আমাকে অপমান করবে?”

—“না। কিন্তু নিজের জীবনকেও অপমান করতে পারব না।”

সাইফ রহমান আর কোনো কথা বললেন না।

শুক্রবার দুপুরে সেই পরিবার রহমান বাড়িতে এল।

জিহান ইচ্ছা করেই অফিসে চলে গিয়েছিল।

সাইফ রহমান তার ছেলেকে ফোন করলেন।

—“এখনই বাড়িতে আসো।”

—“আমি আসতে পারব না।”

—“তোমার জন্য অতিথিরা বসে আছে।”

—“বাবা, আমি আগেই বলেছি—আমি এই বিয়েতে রাজি নই।”

সাইফ রহমান রাগ করে ফোন কেটে দিলেন।

অতিথিদের সামনে তিনি বিষয়টা সামলানোর চেষ্টা করলেন।

কিন্তু হঠাৎ এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা পরিস্থিতি বদলে দিল।

জিহানের মা শায়লা রহমান এতদিন চুপ ছিলেন।

তিনি সবার সামনে বললেন,

—“আমার ছেলে যদি কাউকে ভালোবাসে, তাহলে তার মতামত না নিয়ে আমি কোনো সিদ্ধান্তে রাজি নই।”

সাইফ রহমান স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তুমিও?”

শায়লা শান্তভাবে বললেন,

—“আমি শুধু মায়ের জায়গা থেকে কথা বলছি। জিহানকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। ও জেদি হতে পারে, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে কখনো হালকা ভাবে না।”

অতিথিরা অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন।

শেষ পর্যন্ত তারা চলে গেলেন।

সাইফ রহমান স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বললেন,

—“তুমি আমার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গেলে?”

শায়লা বললেন,

—“আমি তোমার বিরুদ্ধে যাইনি। আমি শুধু চাইছি, তুমি ছেলের কথা একবার মন দিয়ে শোনো।”

সাইফ রহমান কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

সেদিন রাতে জিহান বাড়িতে ফিরে জানতে পারল, তার মা তার পাশে দাঁড়িয়েছেন।

সে মায়ের কাছে গিয়ে বলল,

—“মা, তুমি কেন এত কিছু করলে?”

শায়লা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“কারণ আমি তোমার চোখে সুখ দেখি, জিহান।”

জিহানের চোখ ভিজে উঠল।

—“মা, আমি রিয়াকে সত্যিই ভালোবাসি।”

—“আমি জানি।”

—“কিন্তু বাবা?”

শায়লা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“তোমার বাবা কঠিন মানুষ। তবে তিনি তোমাকে ভালোবাসেন। শুধু নিজের ভয় আর অহংকারের আড়ালে সেটা দেখাতে পারেন না।”

জিহান চুপ করে রইল।

শায়লা বললেন,

—“তুমি তোমার বাবার সঙ্গে যুদ্ধ কোরো না। তাকে বোঝাও।”

—“যদি উনি না বোঝেন?”

—“তাহলে সময়কে সুযোগ দাও।”

পরদিন সকালে জিহান রিয়াকে সব বলল।

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“তোমার মা তোমার পাশে দাঁড়িয়েছেন?”

—“হ্যাঁ।”

রিয়ার মুখে হাসি ফুটল।

—“তাহলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।”

জিহান বলল,

—“আমি জানি না।”

—“আমি জানি।”

—“কীভাবে?”

রিয়া বলল,

—“কারণ তুমি হাল ছাড়োনি।”

জিহান মৃদু হেসে বলল,

—“তুমিও না।”

—“আমি তো তোমার অপেক্ষায় আছি।”

এই কথাটা শুনে জিহানের বুকটা ভরে গেল।

কিন্তু ঠিক তখনই রিয়ার বাবা এসে তাকে জানালেন—

পরদিন সকালেই তারা বিদেশের উদ্দেশে রওনা হবে।

রিয়া ফোনটা শক্ত করে ধরে রইল।

জিহানও কিছু বলতে পারল না।

দুজনেই বুঝল, তাদের সামনে এখন নতুন এক পরীক্ষা।

একদিকে দূরত্ব।

অন্যদিকে পরিবারের বিরোধিতা।

আর তাদের মাঝখানে শুধু একটি জিনিস—

একজন আরেকজনের প্রতি বিশ্বাস।

সেই রাতে জিহান সিদ্ধান্ত নিল, রিয়া বিদেশে যাওয়ার আগে সে শেষবারের মতো তার বাবার সঙ্গে কথা বলবে।

এবার কোনো ঝগড়া নয়।

কোনো জেদ নয়।

শুধু নিজের সত্যিটা বলবে।

ভোর হওয়ার আগেই রিয়ার ঘুম ভেঙে গেল।

ঘরের চারপাশে লাগেজ ছড়িয়ে আছে। কয়েকদিন ধরে যে ব্যাগটা গোছানো হচ্ছিল, সেটাই আজ সত্যি সত্যি বাড়ির দরজার পাশে রাখা।

রিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল।

আকাশ তখনও পুরোপুরি আলো হয়নি।

তার মনে হচ্ছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সবকিছু বদলে যাবে।

সে এই শহর ছেড়ে যাবে।

আর জিহান?

জিহান থাকবে এখানে।

দুজনের মাঝে হাজার মাইলের দূরত্ব তৈরি হবে।

রিয়া নিজের চোখ মুছে ফোন হাতে নিল।

জিহানকে ফোন করল।

কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোন ধরল সে।

—“রিয়া?”

ঘুমজড়ানো কণ্ঠ।

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“ঘুমাচ্ছিলে?”

—“হ্যাঁ। কিন্তু তোমার ফোনে ঘুম ভেঙে গেল।”

—“আজ আমরা চলে যাচ্ছি।”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

জিহান ধীরে বলল,

—“জানি।”

—“তুমি আসবে?”

—“অবশ্যই।”

রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

—“আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব।”

—“আর আমি তোমার জন্য লড়াই করব।”

সকাল আটটার দিকে করিম সাহেবের গাড়ি রহমান বাড়ির সামনে থামল।

রিয়া গাড়িতে ওঠার আগে শেষবারের মতো বাড়িটার দিকে তাকাল।

এই বাড়ির প্রতিটি কোণে তার স্মৃতি।

বাগানের সেই বেঞ্চ।

বারান্দায় বসে চা খাওয়া।

জিহানের সঙ্গে প্রথম হাসি।

প্রথম স্বীকারোক্তি।

সবকিছু যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।

ঠিক তখনই দূর থেকে একটা গাড়ি এসে থামল।

জিহান নেমে এল।

সে দ্রুত রিয়ার দিকে এগিয়ে গেল।

করিম সাহেব কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন।

জিহান রিয়ার সামনে এসে বলল,

—“তুমি সত্যিই চলে যাচ্ছ?”

রিয়া হেসে বলল,

—“কিছুদিনের জন্য।”

—“এক বছর।”

—“সময় কেটে যাবে।”

—“তোমার জন্য সহজ হবে?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“না।”

জিহান ধীরে বলল,

—“আমারও না।”

রিয়া চোখ নামিয়ে বলল,

—“তাহলে?”

—“তবু আমরা পারব।”

রিয়া তার দিকে তাকাল।

জিহান বলল,

—“তুমি তোমার পড়াশোনা শেষ করবে। নিজের স্বপ্ন পূরণ করবে। আর আমি এখানে আমার কাজ দাঁড় করাব।”

—“তারপর?”

—“তারপর আমি তোমার বাবার সামনে গিয়ে বলব—আমি আপনার মেয়েকে সম্মানের সঙ্গে আমার জীবনে চাই।”

রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

সে মৃদু হেসে বলল,

—“আমি অপেক্ষা করব।”

জিহান বলল,

—“আমিও।”

রিয়া গাড়িতে উঠে বসে জানালা দিয়ে হাত নাড়ল।

গাড়ি ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল।

জিহান রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

যতক্ষণ গাড়িটা চোখের আড়াল না হলো, সে সেখান থেকে সরল না।

রিয়া বিদেশে পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ খুব কঠিন ছিল।

নতুন দেশ।

নতুন পরিবেশ।

নতুন মানুষ।

সবকিছুর মাঝেও জিহান ছিল তার প্রতিদিনের সবচেয়ে পরিচিত মানুষ।

ভিডিও কলে কথা বলত তারা।

কখনো রিয়ার রাত, জিহানের সকাল।

কখনো জিহানের গভীর রাত, রিয়ার বিকেল।

সময়ের পার্থক্য তাদের কথাগুলোকে ছোট করে দিতে পারেনি।

এক রাতে রিয়া বলল,

—“আজ তোমার দিন কেমন গেল?”

জিহান হেসে বলল,

—“ভালো।”

—“সত্যি?”

—“হ্যাঁ।”

—“তোমার মুখটা অন্য কথা বলছে।”

জিহান একটু চুপ করে বলল,

—“আজ একটা বড় ক্লায়েন্ট পেয়েছি।”

রিয়ার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

—“সত্যি?”

—“হ্যাঁ।”

—“আমি জানতাম তুমি পারবে।”

জিহান হেসে বলল,

—“তুমি না থাকলে হয়তো এতটা চেষ্টা করতাম না।”

রিয়া বলল,

—“আমি শুধু তোমাকে মনে করিয়ে দিয়েছি, তুমি পারো।”

সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল।

ছয় মাস কেটে গেল।

জিহানের ব্যবসা এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো চলছে।

ছোট অফিসটা বড় হয়েছে।

নতুন কর্মচারী এসেছে।

কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে।

জিহান এখন নিজের উপার্জনে স্বচ্ছন্দভাবে চলতে পারে।

সে বাবার কোনো সাহায্য নেয়নি।

অন্যদিকে রিয়াও নিজের পড়াশোনায় ভালো করছে।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে রিয়া পুরস্কার পেল।

সে সঙ্গে সঙ্গে জিহানকে ফোন করল।

—“জিহান!”

—“কী হয়েছে?”

—“আমি পুরস্কার পেয়েছি!”

জিহান সত্যিই খুশি হয়ে গেল।

—“আমি জানতাম তুমি পারবে।”

—“তুমি যদি পাশে না থাকতে…”

—“আমি তো দূর থেকেও পাশে ছিলাম।”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“তুমি কখনো দূরে ছিলে না।”

জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“রিয়া?”

—“হুম?”

—“আর ছয় মাস।”

—“কিসের?”

—“তুমি দেশে ফিরবে।”

রিয়া হেসে বলল,

—“তুমি দিন গুনছ?”

—“প্রতিদিন।”

কিন্তু রহমান বাড়িতে পরিস্থিতি ততটা শান্ত ছিল না।

সাইফ রহমান বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকলেও ছেলের পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলেন।

জিহান এখন নিয়মিত কাজ করছে।

নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে।

কোনো সাহায্য চাইছে না।

নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে যায়নি।

একদিন শায়লা রহমান স্বামীকে বললেন,

—“তুমি কি এখনও জিহানের সঙ্গে কথা বলবে না?”

সাইফ রহমান বললেন,

—“কথা বলি তো।”

—“কিন্তু রিয়ার ব্যাপারে?”

তিনি চুপ করে রইলেন।

শায়লা ধীরে বললেন,

—“তুমি কি কখনো ভেবে দেখেছ, জিহান কেন এতটা বদলে গেল?”

—“সে দায়িত্বশীল হয়েছে।”

—“কেন?”

সাইফ রহমান উত্তর দিলেন না।

শায়লা বললেন,

—“হয়তো রিয়া ওর জীবনে আসার পর ও প্রথমবার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিরিয়াস হয়েছে।”

সাইফ রহমান জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

কিছুক্ষণ পর বললেন,

—“আমি ভয় পাই।”

শায়লা অবাক হলেন।

—“কিসের ভয়?”

—“যদি ও ভুল করে?”

—“তাহলে ওকে নিজের ভুল থেকে শিখতে দাও।”

সাইফ রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“আমি চাই না আমার ছেলে কষ্ট পাক।”

শায়লা মৃদু হেসে বললেন,

—“তাহলে তাকে সুখী হওয়ার সুযোগ দাও।”

সাইফ রহমান কোনো উত্তর দিলেন না।

তবে তার মনে প্রথমবারের মতো প্রশ্ন জাগল—

হয়তো তিনি এতদিন ভুলভাবে জিহানকে রক্ষা করতে চেয়েছেন।

রিয়া দেশে ফেরার দিন অবশেষে চলে এল।

জিহান বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য সকাল থেকেই প্রস্তুত।

তার হাতে একটা ছোট বাক্স।

রিয়া বেরিয়ে আসতেই দূর থেকে জিহানকে দেখতে পেল।

তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

জিহানও হাসল।

দুজন কয়েক মুহূর্ত শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর রিয়া এগিয়ে এসে বলল,

—“অনেক বদলে গেছ।”

জিহান হেসে বলল,

—“তুমিও।”

—“কীভাবে?”

—“আগের চেয়ে আত্মবিশ্বাসী।”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“তুমিও আগের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল।”

জিহান বলল,

—“তোমার জন্য।”

রিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।

বাড়ি ফেরার পর রিয়া তার বাবার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলল।

করিম সাহেব মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন,

—“জিহান কেমন আছে?”

রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—“ভালো।”

—“ওর কাজ কেমন চলছে?”

—“খুব ভালো।”

করিম সাহেব মৃদু হাসলেন।

—“শুনেছি ও নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।”

রিয়া কিছু বলল না।

করিম সাহেব বললেন,

—“তুমি কি এখনও ওকে ভালোবাসো?”

রিয়া বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলল,

—“হ্যাঁ।”

করিম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“তাহলে এবার হয়তো আমারও কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।”

কয়েকদিন পর জিহান করিম সাহেবের বাড়িতে গেল।

করিম সাহেব তাকে বসিয়ে বললেন,

—“তোমার ব্যবসা সম্পর্কে আমি অনেক কিছু শুনেছি।”

—“জি।”

—“তুমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছ।”

জিহান চুপ করে রইল।

—“তুমি কি এখনও রিয়াকে বিয়ে করতে চাও?”

জিহান দৃঢ়ভাবে বলল,

—“হ্যাঁ।”

করিম সাহেব মৃদু হাসলেন।

—“তাহলে আমার কাছে তোমার একটা শেষ পরীক্ষা আছে।”

জিহান অবাক।

—“কী পরীক্ষা?”

করিম সাহেব বললেন,

—“তুমি কি শুধু রিয়াকে পেতে চাও, নাকি ওর পরিবারকেও সম্মান করতে পারবে?”

জিহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—“আমি রিয়ার পরিবারকে নিজের পরিবার হিসেবেই সম্মান করব।”

করিম সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,

—“তাহলে এবার তোমার বাবার সঙ্গে আমার কথা বলতে হবে।”

জিহানের চোখে বিস্ময়।

—“আপনি?”

—“হ্যাঁ। এতদিন দুই বাবা-মায়ের মধ্যে দূরত্ব ছিল। এবার সেটা শেষ করার চেষ্টা করব।”

সেদিন সন্ধ্যায় করিম সাহেব রহমান বাড়িতে গেলেন।

সাইফ রহমান তাকে দেখে অবাক হলেন।

—“করিম?”

—“হ্যাঁ। অনেকদিন পর বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এলাম।”

দুজন মুখোমুখি বসে রইলেন।

কিছুক্ষণ পর করিম সাহেব বললেন,

—“সাইফ, আমরা কি আমাদের সন্তানদের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেদের অহংকার দিয়ে নেব?”

সাইফ রহমান চুপ করে রইলেন।

—“তুই কি জানিস, জিহান গত এক বছরে কী করেছে?”

—“জানি।”

—“নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।”

সাইফ রহমান ধীরে বললেন,

—“জানি।”

—“আর রিয়াও নিজের পড়াশোনায় সফল হয়েছে।”

সাইফ রহমান এবার মাথা তুললেন।

করিম সাহেব বললেন,

—“তাহলে আর কী চাই?”

সাইফ রহমানের চোখে দ্বিধা।

—“আমি শুধু চাই, ওরা সুখী হোক।”

করিম সাহেব মৃদু হেসে বললেন,

—“তাহলে ওদের সুখের পথে দাঁড়াস না।”

সাইফ রহমান দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

অবশেষে বললেন,

—“আমি জিহানের সঙ্গে কথা বলতে চাই।”

রাতে জিহান বাবার ঘরে ঢুকল।

সাইফ রহমান কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“তুমি এখনও রিয়াকে ভালোবাসো?”

জিহান শান্ত গলায় বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“তুমি কি মনে করো, তুমি ওর দায়িত্ব নিতে পারবে?”

—“আমি চেষ্টা করব না, বাবা। আমি দায়িত্ব নেব।”

সাইফ রহমানের মুখে হালকা হাসি ফুটল।

তিনি ধীরে বললেন,

—“তাহলে রিয়াকে একদিন আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসো।”

জিহান বিশ্বাস করতে পারছিল না।

—“বাবা…?”

—“আমি এখনও সবকিছু পুরোপুরি বুঝে উঠিনি। কিন্তু তোমার চোখে আমি বুঝেছি, তুমি এবার সত্যিই বড় হয়েছ।”

জিহানের চোখ ভিজে উঠল।

সে বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

সাইফ রহমান ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।

—“তবে একটা কথা।”

—“কী?”

—“তোমার ভালোবাসার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে।”

জিহান মৃদু হেসে বলল,

—“আমি প্রস্তুত।”

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে শায়লা রহমান চোখের পানি মুছে হাসছিলেন।

পরদিন সকালটা রহমান বাড়িতে অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা ছিল।

জিহান ঘুম থেকে উঠেই বাবার কথাগুলো মনে করল।

“রিয়াকে একদিন আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসো।”

কথাটা খুব সাধারণ হলেও জিহানের কাছে এর অর্থ ছিল অনেক বড়।

এক বছর ধরে যে সম্পর্কের জন্য তাকে লড়তে হয়েছে, যে ভালোবাসার জন্য নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়েছে, আজ সেই ভালোবাসাকে পরিবারের সামনে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ এসেছে।

জিহান প্রথমেই রিয়াকে ফোন করল।

রিয়া ফোন ধরতেই বলল,

—“এত সকালে ফোন?”

জিহান হেসে বলল,

—“আজ তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাই।”

—“কোথায়?”

—“রহমান বাড়িতে।”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর রিয়ার কণ্ঠে অবাক ভাব,

—“তোমার বাবা কি…?”

—“হ্যাঁ।”

রিয়ার চোখে পানি চলে এল।

—“সত্যি?”

—“সত্যি।”

—“আমি কী বলব?”

জিহান হেসে বলল,

—“কিছু বলতে হবে না। শুধু তুমি যেমন, তেমনই থাকবে।”

রিয়া ধীরে বলল,

—“আমি ভয় পাচ্ছি।”

—“কিসের ভয়?”

—“যদি শেষ মুহূর্তে কিছু বদলে যায়?”

জিহান শান্ত গলায় বলল,

—“এবার আমি তোমার হাত ছেড়ে দেব না।”

দুপুরে রিয়া তার বাবার সঙ্গে রহমান বাড়িতে এল।

গাড়ি থেকে নামার আগে রিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে রইল।

করিম সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“ভয় পাচ্ছ?”

রিয়া মৃদু হাসল।

—“একটু।”

—“যে মেয়েটা এত বড় একটা বছর পার করে এসেছে, সে কি এখন ভয় পাবে?”

রিয়া বাবার দিকে তাকাল।

করিম সাহেব বললেন,

—“যাও। তোমার নিজের জায়গায় যাও।”

রিয়া গাড়ি থেকে নামল।

সামনের দরজায় জিহান দাঁড়িয়ে ছিল।

তাকে দেখেই জিহানের মুখে এমন একটা হাসি ফুটে উঠল, যা রিয়া গত এক বছরে অসংখ্যবার ফোনের পর্দায় দেখেছে।

আজ সেই হাসি তার সামনে।

জিহান এগিয়ে এসে বলল,

—“এসো।”

রিয়া ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।

জিহান ফিসফিস করে বলল,

—“সব ঠিক হবে।”

রিয়া মাথা নেড়ে বলল,

—“তোমার ওপর বিশ্বাস আছে।”

ড্রয়িংরুমে সবাই বসেছিল।

শায়লা রহমান উঠে এসে রিয়াকে জড়িয়ে ধরলেন।

—“কেমন আছো মা?”

রিয়া একটু অবাক হয়ে বলল,

—“ভালো আছি।”

শায়লা তার হাত ধরে বললেন,

—“অনেকদিন পর তোমাকে বাড়িতে পেলাম।”

রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

সাইফ রহমান কিছুটা দূরে বসেছিলেন।

তিনি রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“এসো, বসো।”

রিয়া ভদ্রভাবে বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ সবাই চুপ।

তারপর সাইফ রহমান বললেন,

—“রিয়া, তোমার কাছে আমি একটা কথা স্বীকার করতে চাই।”

রিয়া চুপ করে শুনছিল।

—“আমি তোমাকে কখনো ঠিকভাবে জানার চেষ্টা করিনি।”

রিয়ার চোখে বিস্ময়।

সাইফ রহমান বললেন,

—“আমি ভেবেছিলাম, তোমার আর জিহানের সম্পর্কটা শুধু আবেগের ব্যাপার।”

জিহান কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বাবা হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।

—“আজ আমি বুঝতে পারছি, তোমাদের সম্পর্কটা শুধু আবেগ নয়। গত এক বছরে তোমরা দুজন নিজেদের প্রমাণ করেছ।”

তিনি জিহানের দিকে তাকালেন।

—“তুমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছ।”

তারপর রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“আর তুমি আমার ছেলেকে তার কঠিন সময়েও সাহস দিয়েছ।”

রিয়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

সাইফ রহমান ধীরে বললেন,

—“আমি আর তোমাদের মাঝে বাধা হতে চাই না।”

জিহান উঠে দাঁড়াল।

—“বাবা…”

সাইফ রহমান ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—“তবে একটা শর্ত আছে।”

জিহান হেসে বলল,

—“আবার শর্ত?”

সবাই হেসে ফেলল।

সাইফ রহমান বললেন,

—“তোমরা দুজন যেন কখনো একে অপরকে সম্মান করা বন্ধ না করো।”

জিহান মাথা নেড়ে বলল,

—“আমি কথা দিচ্ছি।”

রিয়াও বলল,

—“আমিও।”

কিছুদিন পর দুই পরিবার বসে বিয়ের তারিখ ঠিক করল।

বাড়িতে ব্যস্ততা শুরু হলো।

শায়লা রহমান রিয়ার জন্য শাড়ি দেখতে গেলেন।

করিম সাহেব জিহানের সঙ্গে বসে বিয়ের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেন।

রাফি জিহানকে নিয়ে সারাক্ষণ মজা করতে লাগল।

—“ভাই, এতদিন যে মানুষটা প্রেমের কথা বলত না, এখন বিয়ের বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত!”

জিহান হেসে বলল,

—“চুপ কর।”

—“কী হলো? রিয়া ভাবি শুনে ফেলবে?”

—“তুই খুব বেশি কথা বলিস।”

—“বিয়ের পর কিন্তু তোর এই রাগ দেখার সুযোগ পাব না।”

জিহান হেসে বন্ধুকে ধাক্কা দিল।

বিয়ের আগের দিন বিকেলে জিহান আর রিয়া দেখা করতে গেল সেই পুরোনো নদীর ঘাটে।

যেখানে তাদের সম্পর্কের শুরুতে জিহান রিয়াকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।

সেদিন রিয়া যেতে পারেনি।

আজ তারা দুজন পাশাপাশি নদীর ধারে বসে ছিল।

সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে।

রিয়া বলল,

—“মনে আছে, প্রথমবার তুমি আমাকে এখানে আসতে বলেছিলে?”

জিহান হেসে বলল,

—“তুমি আসোনি।”

—“তখন তো তোমাকে এতটা চিনতাম না।”

—“এখন?”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“এখন মনে হয়, তোমাকে অনেক আগে থেকেই চিনতাম।”

জিহান কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর বলল,

—“তুমি জানো, তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি কতটা বদলেছি?”

—“জানি।”

—“কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি।”

—“কী?”

—“তোমাকে প্রথম দেখার পর যে অনুভূতিটা হয়েছিল।”

রিয়া হেসে বলল,

—“কী অনুভূতি?”

জিহান মৃদু স্বরে বলল,

—“মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা আমার জীবনে একটা গল্প নিয়ে এসেছে।”

রিয়া চোখ নামিয়ে বলল,

—“আর সেই গল্পের শেষ?”

জিহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“শেষ নয়। শুরু।”

পরদিন বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হলো।

রহমান বাড়ি আলোয় সাজানো।

বাগানের প্রতিটি গাছে ছোট ছোট বাতি।

বাড়ির সামনে ফুলের সাজ।

পরিবারের সবাই ব্যস্ত।

রিয়া লাল শাড়ি পরে যখন বিয়ের মঞ্চে এল, জিহানের চোখ যেন তার ওপর আটকে গেল।

জিহান মৃদু হেসে বলল,

—“তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে।”

রিয়া লজ্জা পেয়ে বলল,

—“তুমিও।”

—“শুধু আজ?”

—“সবসময়।”

জিহান হেসে ফেলল।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।

দুই পরিবার পাশাপাশি বসে ছিল।

সাইফ রহমান ও করিম সাহেব একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

কত ভুল বোঝাবুঝি, কত ভয়, কত অভিমান পেরিয়ে আজ তারা একসঙ্গে বসেছেন।

বিয়ের পর রিয়া যখন রহমান বাড়ির নতুন বউ হয়ে প্রবেশ করল, শায়লা রহমান তাকে দরজায় বরণ করে নিলেন।

সাইফ রহমান একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

রিয়া তার সামনে এসে সালাম করল।

সাইফ রহমান তাকে উঠিয়ে বললেন,

—“আজ থেকে তুমি শুধু জিহানের স্ত্রী নও। তুমি এই পরিবারেরও একজন।”

রিয়ার চোখ ভিজে গেল।

জিহান পাশে দাঁড়িয়ে বাবার দিকে তাকাল।

সাইফ রহমান ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“খুশি তো?”

জিহান হেসে বলল,

—“অনেক।”

রাতে সবাই চলে যাওয়ার পর জিহান আর রিয়া বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

চারপাশ শান্ত।

দূরে নদীর বাতাস।

রিয়া বলল,

—“আমাদের গল্পটা খুব কঠিন ছিল।”

জিহান বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“কখনো মনে হয়েছিল সব শেষ হয়ে যাবে?”

—“অনেকবার।”

—“তবু তুমি থামোনি।”

জিহান মৃদু হেসে বলল,

—“কারণ তুমি আমার পাশে ছিলে।”

রিয়া বলল,

—“আর তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছ।”

জিহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“একটা কথা বলব?”

—“বল।”

—“তোমাকে প্রথম দিন যখন দেখেছিলাম, তখন ভাবিনি তুমি আমার জীবনটা এতটা বদলে দেবে।”

রিয়া হেসে বলল,

—“আমিও ভাবিনি, একটা কাগজ কুড়িয়ে দেওয়া ছেলেটাই একদিন আমার স্বামী হবে।”

দুজনেই হেসে উঠল।

জিহান বলল,

—“তাহলে একটা কথা ঠিক হলো।”

—“কী?”

—“আমাদের গল্পের শুরুটা ছিল একটা উড়ে যাওয়া কাগজ দিয়ে।”

রিয়া বলল,

—“আর শেষটা?”

জিহান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—“শেষ নয়। আমাদের গল্প তো এখন শুরু।”

রিয়া মাথা নেড়ে বলল,

—“হ্যাঁ। এবার থেকে পাশাপাশি।”

নদীর ওপার থেকে হালকা বাতাস এসে তাদের ছুঁয়ে গেল।

জিহান আর রিয়া পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।

তাদের ভালোবাসার পথটা সহজ ছিল না।

তাদের পরিবার, দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তাদের যেতে হয়েছে।

কিন্তু তারা একটা জিনিস শিখেছিল—

সত্যিকারের সম্পর্ক শুধু একে অপরকে ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। সেখানে বিশ্বাস, সম্মান, ধৈর্য আর একে অপরের স্বপ্নের পাশে দাঁড়ানোর সাহসও লাগে।

জিহান নিজের পরিচয় তৈরি করেছিল।

রিয়া নিজের স্বপ্ন পূরণ করেছিল।

আর শেষ পর্যন্ত তাদের পরিবারও বুঝেছিল—

ভালোবাসাকে আটকানো যায়, কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসার ইচ্ছাকে চিরদিন থামিয়ে রাখা যায় না।

সেই রাতের নীরবতায় জিহান রিয়ার দিকে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই বলল,

—“তোমাকে বেছে নেওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল।”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“আর সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তও।”

জিহান হেসে উত্তর দিল,

—“হ্যাঁ।”

....
👁 67