শব্দহীন রাতে দুজনের আশা

শহরের এক প্রান্তে ছোট্ট একটা পুরোনো বাড়ি ছিল। বাড়িটার দেয়ালে সময়ের ছাপ, বারান্দায় কয়েকটি টব আর জানালার পাশে ঝুলে থাকা পুরোনো ঘণ্টা—সব মিলিয়ে বাড়িটাকে দেখলেই মনে হতো, এখানে অনেক গল্প জমে আছে।

সেই বাড়িতেই থাকত রুহি।

রুহির বয়স বাইশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি গান গাওয়াই ছিল তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। ছোটবেলা থেকেই গান তার জীবনের অংশ। তবে রুহির গান শেখার গল্পটা অন্য সবার মতো ছিল না।

তার বাবা-মা দুজনেই জন্ম থেকেই শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী।

তারা কথা বলতে পারতেন না, শুনতেও পারতেন না। নিজেদের মধ্যে ইশারার ভাষাতেই যোগাযোগ করতেন। কিন্তু মেয়ের প্রতি তাদের ভালোবাসার কোনো ভাষার প্রয়োজন ছিল না।

রুহি যখন ছোট ছিল, তখন সে বাবার সামনে বসে গান গাইত। বাবা কিছু শুনতে না পেলেও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতেন। গান শেষ হলে হাততালি দেওয়ার মতো করে দুই হাত নেড়ে মেয়েকে উৎসাহ দিতেন।

রুহি তখন বুঝত না, তার বাবা গান শুনতে পান না।

সে শুধু জানত, বাবা তার গান পছন্দ করেন।

মা-ও মেয়ের গানের সময় পাশে বসে থাকতেন। রুহি গাইত, মা তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। গানের কথা বুঝতে না পারলেও মেয়ের চোখের আনন্দটা তিনি বুঝতেন।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রুহি বুঝতে শিখেছিল তাদের সীমাবদ্ধতা। কিন্তু তাদের ভালোবাসার গভীরতাও তখন আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিল।

রুহির স্বপ্ন ছিল বড় কোনো মঞ্চে গান গাওয়া।

কিন্তু তার বাবা চাইতেন মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে একটা স্থির চাকরি করুক।

বাবা প্রায়ই কাগজে লিখে দিতেন—

“গান শখ হিসেবে রাখো। ভবিষ্যতের জন্য একটা ভালো চাকরি দরকার।”

রুহি প্রতিবারই হেসে বাবাকে লিখত—

“একদিন গান দিয়েই আমি নিজের ভবিষ্যৎ বানাব।”

বাবা তখন মুখ শক্ত করে ফেলতেন।

কিন্তু রুহি জানত, মেয়ের ওপর রাগ করে বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না তিনি।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রুহি গান গাইছিল। অনুষ্ঠান শেষে তার বান্ধবীরা তাকে ঘিরে ধরল।

“রুহি, তুই এত ভালো গান করিস! অডিশন দিবি না?”

রুহি হেসে বলল, “দিতে তো চাই। কিন্তু বাসায় সমস্যা হবে।”

“তোর বাবা আবার রাজি হবে না?”

রুহি মাথা নিচু করল।

“হয়তো না।”

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল।

“তুমি যদি ভালো গাও, তাহলে শুধু কারও অনুমতির জন্য থেমে যাওয়া উচিত না।”

রুহি ঘুরে তাকাল।

একজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।

সাদা শার্ট, হাতে গিটার, চোখে শান্ত একটা দৃষ্টি।

“আপনি?”

ছেলেটা হেসে বলল, “সিয়াম। অনুষ্ঠানে গিটার বাজিয়েছি।”

রুহি কিছু বলল না।

সিয়াম আবার বলল, “তোমার গানটা ভালো লেগেছে।”

“ধন্যবাদ।”

“তুমি নিয়মিত গান শেখো?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে অডিশন দাও।”

রুহি হেসে বলল, “সবাই এত সহজ করে বলে!”

সিয়াম মৃদু হেসে বলল, “স্বপ্ন সহজ না। কিন্তু শুরু করাটাই সবচেয়ে কঠিন।”

সেদিনের পর থেকে সিয়ামের সঙ্গে রুহির পরিচয় বাড়তে লাগল।

সিয়াম নিজেও গান করত। তবে পেশাদার হওয়ার স্বপ্ন ছিল না। সে শুধু গানকে ভালোবাসত।

দুজনের মধ্যে গান নিয়ে কথা হতে লাগল।

কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে বসে, কখনো ক্যাম্পাসের ছোট্ট চায়ের দোকানে।

সিয়াম বুঝতে পারল, রুহি শুধু গান গাইতে চায় না। গান তার কাছে বেঁচে থাকার মতো।

আর রুহি বুঝতে পারল, সিয়াম তার স্বপ্নকে নিয়ে হাসে না।

একদিন সিয়াম জিজ্ঞেস করল, “তোমার বাবা-মা কি তোমার গান শুনতে পারেন?”

রুহি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল, “না।”

সিয়াম একটু থেমে গেল।

“তাহলে তুমি গান গাইলে তারা কীভাবে বোঝেন তুমি ভালো গাইছ?”

রুহির মুখে মায়াবী হাসি ফুটল।

“তারা আমার মুখ দেখে বোঝে আমি খুশি কিনা।”

সিয়াম আর কিছু বলল না।

সেদিন প্রথমবার সে বুঝতে পারল, রুহির পরিবারের গল্পটা অন্যরকম।

কয়েক সপ্তাহ পর সিয়াম রুহিকে একটি বড় সংগীত প্রতিযোগিতার অডিশনের খবর দিল।

“রুহি, এটা তোমার সুযোগ।”

রুহি পোস্টারটার দিকে তাকিয়ে রইল।

“আমি গেলে বাবা খুব রাগ করবে।”

“তুমি কি নিজের স্বপ্নের জন্য একবার চেষ্টা করতে পারো না?”

রুহি ধীরে বলল, “আমি পারি। কিন্তু আমার বাবা-মাকে কষ্ট দিয়ে আমি জিততে চাই না।”

সিয়াম বলল, “তোমার বাবা-মা তোমাকে আটকে রাখতে চান না। তারা শুধু ভয় পান।”

“কিসের ভয়?”

“তোমাকে হারানোর।”

রুহি অবাক হয়ে সিয়ামের দিকে তাকাল।

সিয়াম মৃদু হেসে বলল, “যারা ভালোবাসে, তারা অনেক সময় ভয় থেকেই বেশি কঠিন হয়ে যায়।”

রুহি সেদিন অডিশনের ফর্মটা হাতে নিল।

কিন্তু সে জানত না, এই ছোট্ট সিদ্ধান্তটাই তার জীবনে এমন এক ঝড় আনবে, যার পর তার পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না।

সেদিন রাতে রুহি ঘরে বসে গান অনুশীলন করছিল।

বাইরে তার বাবা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

তিনি কিছু শুনতে পাচ্ছিলেন না।

তবু মেয়ের ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে বুঝতে পারছিলেন—রুহি খুব খুশি।

তিনি টেবিল থেকে একটা কাগজ তুলে লিখলেন—

“তুমি কি কোনো নতুন স্বপ্ন দেখছ?”

রুহি কাগজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বাবার হাত ধরে মাথা রাখল তার কাঁধে।

সে কিছু বলল না।

শুধু মনে মনে বলল—

“বাবা, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না। কিন্তু আমার গানটাকেও ছেড়ে দিতে পারি না।”

আর সেই রাতেই রুহি অডিশনের ফর্ম পূরণ করল।

তার জীবনের প্রথম বড় স্বপ্নের পথে প্রথম পদক্ষেপটি নেওয়া হয়ে গেল।

অডিশনের দিন যত এগিয়ে আসছিল, রুহির ভয় তত বাড়ছিল।

সে প্রতিদিন গান অনুশীলন করত। সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ, রাতে পড়াশোনা শেষ করে আরও কিছুক্ষণ।

সিয়াম প্রায়ই তার অনুশীলন শুনত।

“এই জায়গাটায় একটু ধীরে গাও,” সিয়াম বলত।

রুহি বিরক্ত হয়ে বলত, “তুমি আবার গানের শিক্ষক হয়ে গেলে কবে?”

“আমি শিক্ষক না। শ্রোতা।”

“শ্রোতা এত কথা বলে?”

“যে শ্রোতা সত্যি মন দিয়ে শোনে, সে একটু কথা বলতেই পারে।”

রুহি হেসে ফেলত।

তাদের বন্ধুত্বের মধ্যে কখন যে অন্যরকম একটা টান তৈরি হচ্ছিল, দুজনের কেউই সেটা মুখে বলছিল না।

তবে রুহির মা বিষয়টা বুঝতে পেরেছিলেন।

একদিন সিয়াম বাড়িতে এসেছিল রুহির গানের কিছু রেকর্ডিং দিতে।

রুহির মা দরজা খুলে সিয়ামের দিকে তাকালেন।

সিয়াম ভদ্রভাবে মাথা নোয়াল।

মা হাসলেন।

রুহি ইশারায় বলল, “এটা সিয়াম। আমার বন্ধু।”

মা সিয়ামের দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে বুকের ওপর হাত রাখলেন, তারপর রুহির দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

রুহি লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।

সিয়াম কিছু বুঝতে না পারলেও পরিবেশটা বুঝে গেল।

সেদিন যাওয়ার সময় রুহির মা তাকে একটা ছোট্ট কাগজ দিলেন।

সেখানে লেখা—

“আমার মেয়েকে হাসতে দেখলে তাকে আরও হাসিও।”

সিয়াম কাগজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল, “আমি চেষ্টা করব।”

রুহি দূর থেকে তাকিয়ে ছিল।

তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল।

অডিশনের আগের রাত।

রুহি বাবার সামনে দাঁড়িয়ে ইশারায় কিছু বলতে চাইল।

তারপর সাহস করে একটা কাগজে লিখল—

“আমি কাল একটা গানের অডিশন দিতে যাচ্ছি।”

বাবা কাগজটা পড়ে স্থির হয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর তিনি লিখলেন—

“তুমি কি সিদ্ধান্ত নিয়েছ?”

“হ্যাঁ।”

“আমি না বললেও?”

রুহির চোখে পানি চলে এল।

সে লিখল—

“আমি তোমার বিরুদ্ধে যেতে চাই না। কিন্তু গানটা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

বাবা অনেকক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

তারপর কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দিলেন।

তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।

রুহি সেই নীরবতাকে অনুমতি হিসেবে নিল না। বরং ভয় হিসেবে নিল।

পরদিন সকালে অডিশনে যাওয়ার সময় তার বাবা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

রুহি থেমে গেল।

বাবা পকেট থেকে একটা ছোট্ট কলম বের করে মেয়ের হাতে দিলেন।

তারপর নিজের হাতের ইশারায় বললেন—যাও।

রুহির চোখ ভিজে উঠল।

সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

সিয়াম বাইরে অপেক্ষা করছিল।

রুহি বেরিয়ে আসতেই সিয়াম বলল, “সব ঠিক?”

রুহি চোখ মুছে হাসল।

“হ্যাঁ।”

“তাহলে চলো।”

অডিশন হলে অনেক মানুষ।

কারও হাতে গিটার, কারও হাতে হারমোনিয়াম, কেউ নিজের গান লিখে এনেছে।

রুহির বুক কাঁপছিল।

সিয়াম বলল, “ভয় পেও না।”

“যদি না পারি?”

“তাহলে আবার চেষ্টা করবে।”

“আর যদি সবাই হাসে?”

“তাহলে তাদের হাসতে দাও। তুমি গান গাও।”

রুহি মঞ্চে উঠল।

কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকল।

তারপর গান শুরু করল।

প্রথম কয়েক লাইনেই হলঘর শান্ত হয়ে গেল।

রুহির কণ্ঠে এমন একটা আবেগ ছিল, যা শুধু গানের সুরে ছিল না। সেখানে ছিল তার শৈশব, তার বাবা-মা, তার অসমাপ্ত স্বপ্ন—সবকিছু।

গান শেষ হলে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর হাততালি।

রুহির চোখে পানি এসে গেল।

সে মঞ্চ থেকে নামতেই সিয়াম এগিয়ে এল।

“দেখেছ?”

রুহি হাসল।

“আমি পারলাম।”

“আমি জানতাম।”

কয়েকদিন পর ফল প্রকাশ হলো।

রুহি নির্বাচিত হয়েছে।

তারপর শুরু হলো প্রশিক্ষণ।

রুহি ধীরে ধীরে পরিচিত হতে লাগল। তার গান সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল।

কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাও শুরু হলো।

একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের লোক রুহিকে বলল—

“তোমার পরিবার নিয়ে গল্পটা মানুষের আবেগ ছুঁতে পারে। আমরা সেটা প্রচারণায় ব্যবহার করতে চাই।”

রুহি সঙ্গে সঙ্গে না করে দিল।

“আমার বাবা-মায়ের কষ্ট কোনো প্রচারণার বিষয় না।”

সিয়ামও তাকে সমর্থন করল।

কিন্তু বিষয়টা সেখানেই শেষ হলো না।

রুহির বাবা মেয়ের জনপ্রিয়তা দেখে আরও চিন্তিত হয়ে উঠলেন।

তিনি কাগজে লিখলেন—

“এখনই থেমে যাও।”

রুহি অবাক হয়ে গেল।

“কেন?”

তিনি লিখলেন—

“তোমার জীবন বদলে যাচ্ছে।”

রুহি কাঁদতে কাঁদতে লিখল—

“আমি তো তোমাদের জন্যই এগোতে চাই।”

বাবা মাথা নাড়লেন।

তিনি লিখলেন—

“আমরা তোমার সাফল্য চাই না। আমরা তোমাকে চাই।”

এই কথাটা রুহির বুক ভেঙে দিল।

কারণ সে প্রথমবার বুঝল—তার বাবা তার স্বপ্নের বিরোধী নন।

তিনি শুধু ভয় পাচ্ছেন, মেয়েটা একদিন তাকে আর প্রয়োজন মনে করবে না।

সিয়াম সেদিন রুহিকে বলল—

“তোমার বাবাকে বোঝাতে হবে যে তুমি দূরে যাচ্ছ না।”

রুহি বলল, “কিন্তু কীভাবে?”

সিয়াম উত্তর দিল—

“তোমার গান দিয়ে।”

রুহি তাকিয়ে রইল।

“কীভাবে?”

“একটা গান লেখো। তোমার বাবা-মাকে নিয়ে।”

রুহি গান লিখতে বসেছিল, কিন্তু কোনো শব্দই আসছিল না।

টেবিলের ওপর খাতা খোলা।

কলম হাতে।

তবু পাতা সাদা।

সিয়াম পাশে বসে বলল, “শব্দ খুঁজছ কেন?”

“গান লিখব।”

“তোমার গল্প লিখো।”

রুহি তাকাল।

“আমার গল্প তো অনেক বড়।”

“তাহলে প্রথম লাইনটা ছোট করো।”

রুহি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে লিখল—

‘যে কথা কোনোদিন শুনিনি, সেই কথাই সবচেয়ে বেশি বুঝেছি।’

সিয়াম লাইনটা পড়ে চুপ করে গেল।

তারপর বলল, “এটাই তোমার গান।”

পরবর্তী কয়েকদিন রুহি তার বাবা-মাকে নিয়ে গান লিখল।

তার শৈশব।

বাবার হাততালি।

মায়ের হাসি।

কথা না বলতে পারলেও চোখ দিয়ে কথা বলা।

সবকিছু।

গানটির নাম দিল—“নীরবতার ওপারে”।

গানটি প্রথমবার রেকর্ড করার সময় রুহির চোখ ভিজে যাচ্ছিল।

সিয়াম পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

রেকর্ডিং শেষ হলে সিয়াম বলল, “এটা শুধু গান না।”

“তাহলে?”

“এটা তোমার বাবার জন্য একটা উত্তর।”

রুহি কিছু বলল না।

গানটি প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক মানুষ শুনতে শুরু করল।

মানুষ মন্তব্য করতে লাগল।

কেউ বলল গানটি মায়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।

কেউ বলল, বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কটা নতুন করে ভাবতে শিখেছে।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রুহির বাবার প্রতিক্রিয়া।

রুহি ফোনে গানটি চালিয়ে তার সামনে বসে রইল।

বাবা কিছু শুনতে পারলেন না।

তবু রুহি তার হাত নিজের গলার কাছে রাখল।

তারপর নিজের বুকে হাত রাখল।

ইশারায় বোঝাল—

“এটা তোমার জন্য।”

বাবা মেয়ের চোখের দিকে তাকালেন।

তিনি কিছুক্ষণ স্থির থাকলেন।

তারপর কাগজে লিখলেন—

“তুমি কি সুখী?”

রুহি মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

বাবা লিখলেন—

“তাহলে গান গাও।”

রুহি কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

সেদিন থেকে তার বাবা আর তাকে আটকাননি।

বরং রুহি যখন মঞ্চে উঠত, বাবা প্রথম সারিতে বসে থাকতেন।

তিনি গান শুনতে পেতেন না।

কিন্তু মেয়ের মুখ দেখতেন।

গান শেষ হলে তিনি সবার আগে হাততালি দিতেন।

সিয়াম দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখত।

তার মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শ্রোতা হয়তো সেই মানুষ, যে শব্দ শুনতে পায় না কিন্তু ভালোবাসার সুর বুঝতে পারে।

এদিকে রুহি ও সিয়ামের সম্পর্কও গভীর হচ্ছিল।

একদিন বৃষ্টির মধ্যে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।

সিয়াম বলল, “রুহি।”

“হুম?”

“তোমার জীবনে গান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?”

রুহি বলল, “হ্যাঁ।”

“তারপর?”

রুহি তাকিয়ে রইল।

“তারপর পরিবার।”

সিয়াম মৃদু হেসে বলল, “আমি?”

রুহি চুপ করে গেল।

সিয়ামও আর কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর রুহি ধীরে বলল—

“তুমি এমন একজন, যার সামনে আমি নিজের কথা না বলেও অনেক কিছু বলতে পারি।”

সিয়াম বুঝে গেল।

সে আর কোনো প্রশ্ন করল না।

তাদের সম্পর্ক কোনো ঘোষণা ছাড়াই তৈরি হয়ে গেল।

কিন্তু সমস্যাটা এবার অন্য জায়গায়।

রুহি একটি বড় মিউজিক প্রজেক্টের প্রস্তাব পেল।

শর্ত ছিল তাকে কয়েক মাস দেশের বাইরে থাকতে হবে।

রুহি দ্বিধায় পড়ে গেল।

কারণ তার বাবা-মাকে একা রেখে এতদিন বাইরে থাকা তার পক্ষে কঠিন।

সিয়াম বলল, “তুমি চাইলে আমি তোমার বাবা-মায়ের খেয়াল রাখব।”

রুহি মাথা নাড়ল।

“না। এটা তোমার দায়িত্ব না।”

“তোমার দায়িত্ব মানেই কি তোমাকে একাই নিতে হবে?”

রুহি চুপ করে গেল।

সিয়াম বলল, “আমি তোমাকে তোমার পরিবার থেকে দূরে নিতে চাই না। আমি চাই তুমি তোমার পরিবারকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাও।”

রুহি তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল, “তুমি জানো, তুমি মাঝে মাঝে খুব ভালো কথা বলো?”

“মাঝে মাঝে?”

“হ্যাঁ।”

“বাকি সময়?”

“বিরক্তিকর।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ভবিষ্যতের ভয় লুকিয়ে ছিল।

কারণ রুহিকে এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

নিজের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের জন্য কি সে কয়েক মাস পরিবার থেকে দূরে যাবে?

নাকি বাবা-মায়ের পাশে থাকার জন্য নিজের সুযোগ ছেড়ে দেবে?

সেই রাতেই রুহি বাবার সামনে প্রস্তাবের কাগজ রাখল।

বাবা পড়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।

তারপর লিখলেন—

“যাও।”

রুহি মাথা নাড়ল।

“আমি তোমাদের ছেড়ে যেতে চাই না।”

বাবা লিখলেন—

“তুমি যদি না যাও, তাহলে একদিন নিজেকেই দোষ দেবে।”

রুহির চোখ ভিজে উঠল।

বাবা আবার লিখলেন—

“তোমার স্বপ্ন আমাদেরও স্বপ্ন।”

রুহি বাবার হাত ধরে কাঁদতে লাগল।

রুহি দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

সবাই খুশি হলেও তার নিজের মনটা অদ্ভুত ভারী।

মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।”

মা হাসলেন।

তিনি মেয়ের গালে হাত রাখলেন।

বাবা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তিনি কাগজে লিখলেন—

“ভয় পেয়ো না।”

রুহি বলল, “আমি ভয় পাচ্ছি না।”

বাবা আবার লিখলেন—

“তাহলে চোখে পানি কেন?”

রুহি হেসে ফেলল।

“তোমাদের ছেড়ে যেতে মন চাইছে না।”

বাবা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

তারপর ইশারায় বললেন—যাও।

সিয়াম বিমানবন্দরে তাকে পৌঁছে দিতে গেল।

রুহি বলল, “তুমি আমার বাবা-মায়ের খেয়াল রাখবে?”

“আমি তো আগেই বলেছি।”

“আর বাবা যদি বেশি রাগ করে?”

“আমি ওনার সঙ্গে লিখে লিখে ঝগড়া করব।”

রুহি হেসে ফেলল।

“মা যদি তোমাকে বেশি খাওয়ায়?”

“তাহলে আমি না বলতে পারব না।”

“তুমি আসলেই সমস্যা।”

সিয়াম বলল, “তুমি ফিরে এলে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।”

রুহি কিছু বলল না।

শুধু সিয়ামের দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর চলে গেল।

বিদেশে গিয়ে রুহির জীবন বদলে গেল।

প্রশিক্ষণ, রেকর্ডিং, অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে ব্যস্ত সময়।

তার গান আরও জনপ্রিয় হতে লাগল।

কিন্তু প্রতিদিন রাতে সে বাবা-মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে থাকত।

তারা কথা বলতে পারত না।

তবু রুহি তাদের মুখ দেখলেই শান্তি পেত।

সিয়ামও প্রায় প্রতিদিন খবর দিত।

“আজ তোমার বাবা আমার ওপর রাগ করেছে।”

রুহি হেসে বলত, “কেন?”

“আমি ওনার চশমা কোথায় রেখেছি ভুলে গিয়েছিলাম।”

“তারপর?”

“দুই ঘণ্টা কথা বলেননি।”

“উনি তো কথাই বলেন না!”

“তবু নীরব থাকার আলাদা একটা মাত্রা আছে।”

রুহি হেসে ফেলত।

কিন্তু একদিন সিয়ামের ফোন এল না।

পরদিনও না।

তৃতীয় দিন রুহি ফোন করল।

ফোন বন্ধ।

রুহির বুক ধক করে উঠল।

সে বাড়িতে ফোন করল।

কেউ ধরল না।

অবশেষে পাশের এক আত্মীয় ফোন ধরলেন।

তার কণ্ঠে আতঙ্ক।

“রুহি, তুমি শক্ত হও।”

রুহির হাত কাঁপতে লাগল।

“কী হয়েছে?”

“তোমার বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে।”

রুহির পৃথিবী যেন থেমে গেল।

সে পরদিনই দেশে ফিরে এল।

হাসপাতালে গিয়ে দেখল বাবা বিছানায় শুয়ে আছেন।

মা পাশে বসে আছেন।

রুহি বাবার হাত ধরল।

বাবা চোখ খুললেন।

মেয়েকে দেখে তার চোখ ভিজে উঠল।

রুহি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি চলে এসেছি।”

বাবা কাগজ চাইলেন।

কাঁপা হাতে লিখলেন—

“তুমি কাজ বন্ধ করেছ?”

রুহি মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

বাবা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন।

তিনি লিখলেন—

“না।”

রুহি বলল, “আমি তোমাকে রেখে কোথাও যাব না।”

বাবা লিখলেন—

“আমাকে নিয়ে তোমার স্বপ্ন থামাবে না।”

রুহি কাগজটা বুকে চেপে ধরল।

“তুমি আমার স্বপ্নের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে লিখলেন—

“তাই তো তোমাকে যেতে বলছি।”

রুহি কিছু বলতে পারল না।

সেই রাতে হাসপাতালের করিডোরে সিয়াম এসে দাঁড়াল।

রুহি তাকে দেখে ছুটে গেল।

“তুমি আমাকে বলোনি কেন?”

সিয়াম বলল, “তোমার কাজ নষ্ট হোক চাইনি।”

“আমি কি শুধু কাজ নিয়ে ভাবি?”

“না।”

“তাহলে আমাকে দূরে রেখেছিলে কেন?”

সিয়াম চুপ করে গেল।

রুহি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুমি জানো আমি তোমাদের কাউকেই হারাতে চাই না।”

সিয়াম বলল, “তুমি কাউকে হারাবে না।”

“তুমি কীভাবে এত নিশ্চিত?”

“কারণ আমি তোমার সঙ্গে আছি।”

রুহি তাকিয়ে রইল।

সিয়াম বলল, “তুমি তোমার বাবার জন্য গান গাইবে। তোমার মায়ের জন্য গান গাইবে। আর নিজের জন্যও।”

রুহি তার চোখের পানি মুছে ফেলল।

পরদিন সকালে ডাক্তার জানালেন, বাবার অবস্থা এখন স্থিতিশীল।

কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে।

রুহি সিদ্ধান্ত নিল, সে আর বাইরে যাবে না।

সে প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিতে চাইল।

কিন্তু সিয়াম তাকে থামাল।

“তুমি যাবে।”

“না।”

“তুমি যাবে। কারণ তোমার বাবা তোমাকে যেতে বলেছেন।”

“আমি পারব না।”

সিয়াম বলল, “তাহলে তোমার বাবা যে স্বপ্নটা তোমার হাতে তুলে দিয়েছেন, সেটা তুমি নিজেই ভেঙে দেবে।”

রুহি চুপ হয়ে গেল।

সে জানত, সিয়াম ঠিক বলছে।

রুহি আবার বিদেশে ফিরে গেল।

এবার তার সঙ্গে ছিল অন্যরকম একটা শক্তি।

বাবার বিশ্বাস।

মায়ের হাসি।

আর সিয়ামের প্রতিশ্রুতি।

রুহি দিন-রাত কাজ করল।

তার গান একটি বড় মঞ্চে নির্বাচিত হলো।

সিয়াম দূর থেকে সবকিছু দেখছিল।

কিন্তু সেই সময়েই সিয়ামের নিজের জীবনে সমস্যা শুরু হলো।

তার বাবা চেয়েছিলেন ছেলে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিক।

সিয়াম গানকে পেশা হিসেবে নিতে চাইলে তিনি রাজি ছিলেন না।

একদিন বাবা বললেন—

“গান দিয়ে জীবন চলে না।”

সিয়াম উত্তর দিল, “সবাইকে শিল্পী হতে হবে না। কিন্তু নিজের ভালো লাগাটাকে মেরে ফেলেও তো জীবন চলে না।”

বাবা রেগে গেলেন।

“তুমি রুহির মতো হয়ে যাচ্ছ।”

সিয়াম অবাক হলো।

“রুহির মতো মানে?”

“নিজের স্বপ্নকে সবকিছুর ওপরে রাখছ।”

সিয়াম শান্তভাবে বলল, “না। ও আমাকে শিখিয়েছে স্বপ্ন আর দায়িত্ব একসঙ্গে রাখা যায়।”

এদিকে রুহির ক্যারিয়ার দ্রুত এগোচ্ছিল।

তার গান পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলো।

কিন্তু অনুষ্ঠানের দিন সে জানতে পারল, তার বাবা আবার অসুস্থ হয়েছেন।

রুহির সামনে দুটো পথ।

পুরস্কারের অনুষ্ঠান।

অথবা বাড়ি ফেরা।

সে কোনো দ্বিধা ছাড়াই বাড়ি ফিরতে চাইল।

সিয়াম ফোনে বলল, “তুমি এখন ফিরলে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় মুহূর্তটা মিস করবে।”

রুহি বলল, “বাবার পাশে না থাকলে সেই পুরস্কার আমার কাছে কোনো মূল্য রাখবে না।”

সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—

“তাহলে তুমি ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছ।”

কিন্তু অনুষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানাল, রুহি না গেলে তার মনোনয়ন বাতিল হবে।

রুহি তবু ফিরল।

হাসপাতালে পৌঁছে বাবার হাত ধরল।

বাবা চোখ খুলে মেয়ের দিকে তাকালেন।

রুহি কাঁদতে কাঁদতে বলল—

“আমি তোমার জন্য পুরস্কারটা ছেড়ে দিয়েছি।”

বাবা কাগজে লিখলেন—

“কেন?”

“কারণ তুমি আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

বাবা মাথা নাড়লেন।

তারপর লিখলেন—

“তুমি ভুল করেছ।”

রুহি অবাক।

বাবা লিখলেন—

“আমি তোমাকে নিজের জন্য বড় হতে বলিনি। আমি চাই তুমি নিজের জন্যও বাঁচো।”

রুহি কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

বাবা আবার লিখলেন—

“একদিন আমি থাকব না। তখন তোমার গান থেমে গেলে আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাব।”

রুহির চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

বাবা তার মাথায় হাত রাখলেন।

কয়েকদিন পর বাবা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেন।

রুহি তার পাশে থেকে কাজ করার নতুন পরিকল্পনা করল।

দেশেই রেকর্ডিং করবে।

বাইরে গেলে বাবা-মাকেও সঙ্গে নেবে।

সিয়াম বলল, “এবার ঠিক হয়েছে।”

রুহি হেসে বলল, “তুমি সবসময় এত বুদ্ধিমান ছিলে?”

“না। তোমার সঙ্গে থাকতে থাকতে হয়েছি।”

রুহি চোখ ছোট করে তাকাল।

“বেশি কথা বলো।”

“তুমি শুনছ তো?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে ঠিক আছে।”

এক সন্ধ্যায় সিয়াম রুহির বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়াল।

তার হাতে একটা ছোট্ট কাগজ।

সে লিখল—

“আমি রুহিকে খুব ভালোবাসি।”

রুহির চোখ বড় হয়ে গেল।

“সিয়াম!”

সিয়াম বলল, “সত্যিটা তো বলতেই হবে।”

রুহির বাবা কাগজটা পড়লেন।

তিনি সিয়ামের দিকে তাকালেন।

তারপর আরেকটি কাগজে লিখলেন—

“তুমি কি আমার মেয়েকে তার স্বপ্ন থেকে দূরে রাখবে?”

সিয়াম মাথা নাড়ল।

“কখনো না।”

“তুমি কি তাকে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাবে?”

“না।”

“তাহলে তুমি কী করবে?”

সিয়াম উত্তর দিল—

“আমি ওর পাশে থাকব।”

রুহির বাবা দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর প্রথমবার সিয়ামের হাত নিজের হাতে নিলেন।

রুহির চোখে পানি চলে এল।

সেদিন কোনো বড় ঘোষণা হয়নি।

কোনো আয়োজন হয়নি।

শুধু দুটি পরিবারের মধ্যে একটি নীরব সম্মতি তৈরি হলো।

কিন্তু ঠিক তখনই রুহির জীবনে এল নতুন প্রস্তাব—

দেশের সবচেয়ে বড় সংগীত প্রতিযোগিতার ফাইনাল।

সেখানে তাকে নিজের লেখা গান গাইতে হবে।

ফাইনালের প্রস্তুতি শুরু হলো।

রুহি সিদ্ধান্ত নিল, সে আবার “নীরবতার ওপারে” গানটি গাইবে।

সিয়াম বলল, “নতুন গান লিখছ না?”

রুহি মাথা নাড়ল।

“না। এই গানটা এখনো শেষ হয়নি।”

“কেন?”

“কারণ গল্পটা এখনো শেষ হয়নি।”

সিয়াম মৃদু হেসে বলল, “তাহলে শেষটা কী?”

রুহি বলল, “জানি না।”

“তাহলে মঞ্চে উঠে খুঁজে নিও।”

রুহি বাবার সঙ্গে প্রতিদিন অনুশীলনের কিছু সময় কাটাত।

বাবা শুনতে পারতেন না, কিন্তু তার সামনে বসে থাকতেন।

রুহি গাইত।

বাবা তার মুখ দেখতেন।

একদিন রুহি হঠাৎ গান থামিয়ে বলল—

“বাবা, তুমি কি সত্যি আমার গান শুনতে পাও না?”

বাবা হাসলেন।

তারপর কাগজে লিখলেন—

“কান দিয়ে না।”

রুহি প্রশ্ন করল—

“তাহলে?”

বাবা লিখলেন—

“তোমার চোখ দিয়ে।”

রুহি বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

সেই রাতেই রুহি নতুন কয়েকটি লাইন লিখল।

গানের শেষে সে যোগ করল—

“শব্দ হারিয়ে গেলেও সম্পর্ক হারায় না।”

সিয়াম গানটি শুনে বলল—

“এবার শেষ হয়েছে।”

ফাইনালের দিন পুরো হল ভরে গেল।

রুহির বাবা-মা প্রথম সারিতে বসে ছিলেন।

সিয়ামও সেখানে।

রুহির নাম ঘোষণা হলো।

সে মঞ্চে উঠল।

আলো নিভে গেল।

শুধু তার ওপর একটা আলো।

রুহি চোখ বন্ধ করল।

তারপর গান শুরু করল।

প্রথম অংশে ছিল শৈশব।

দ্বিতীয় অংশে ছিল বাবা-মায়ের কথা।

তৃতীয় অংশে ছিল তার নিজের স্বপ্ন।

আর শেষ অংশে ছিল সিয়াম।

সে গাইতে গাইতে একবার বাবা-মায়ের দিকে তাকাল।

বাবা তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

মা চোখ মুছলেন।

সিয়াম মাথা নিচু করে হাসছিল।

গান শেষ হলো।

কিছুক্ষণ পুরো হল নীরব।

তারপর বজ্রধ্বনির মতো হাততালি।

রুহির চোখে পানি।

ফল ঘোষণার সময় সবাই অপেক্ষা করছিল।

রুহি প্রথম হলো।

পুরো হল দাঁড়িয়ে গেল।

রুহি মঞ্চে পুরস্কার নিতে গেল।

কিন্তু পুরস্কার হাতে নিয়ে সে সরাসরি বাবা-মায়ের কাছে গেল।

বাবার হাতে পুরস্কারটি দিয়ে বলল—

“এটা তোমাদের।”

বাবা মাথা নাড়লেন।

তিনি পুরস্কারটি আবার মেয়ের হাতে ফিরিয়ে দিলেন।

কাগজে লিখলেন—

“এটা তোমার।”

রুহি বলল—

“না। এটা আমাদের।”

বাবা কিছু লিখলেন না।

শুধু মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

সেই মুহূর্তের ছবি ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র।

মানুষ রুহির গান নয়, তার পরিবারের গল্প নিয়ে কথা বলতে শুরু করল।

অনেকেই বলল, রুহি প্রমাণ করেছে—স্বপ্ন আর পরিবারের মধ্যে বেছে নিতে হয় না।

সঠিক মানুষ পাশে থাকলে দুটোই ধরে রাখা যায়।

কিন্তু সাফল্যের সেই রাতেই রুহির বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

হাসপাতালে নেওয়া হলো।

রুহি ভেঙে পড়ল।

সিয়াম তার পাশে ছিল।

ডাক্তার বললেন, অবস্থা গুরুতর নয়, তবে বিশ্রাম দরকার।

রুহি বাবার হাত ধরে বসে থাকল।

বাবা চোখ খুলে মেয়ের দিকে তাকালেন।

তিনি লিখলেন—

“কাঁদছ কেন?”

রুহি বলল, “ভয় পেয়েছি।”

বাবা লিখলেন—

“আমি আছি।”

রুহি বাবার হাত শক্ত করে ধরল।

সিয়াম দূর থেকে তাকিয়ে ছিল।

সে বুঝতে পারছিল, রুহির সবচেয়ে বড় ভয় সাফল্য হারানো নয়।

তার সবচেয়ে বড় ভয়—প্রিয় মানুষগুলোকে হারানো।

সেই রাতে রুহি সিয়ামকে বলল—

“তুমি কি কখনো ভাবো, আমাদের জীবন খুব কঠিন?”

সিয়াম বলল, “হ্যাঁ।”

“তবু থাকবে?”

“কোথায় যাব?”

রুহি হেসে ফেলল।

“আমি সিরিয়াস।”

সিয়াম বলল—

“আমিও।”

রুহি তার দিকে তাকিয়ে রইল।

সিয়াম বলল—

“তোমার জীবনে যত নীরবতা আছে, আমি তার পাশে শব্দ হয়ে দাঁড়াতে চাই না। আমি শুধু পাশে বসে থাকতে চাই।”

রুহির চোখ ভিজে উঠল।

সে বুঝল, ভালোবাসা সবসময় বড় বড় কথা নয়।

কখনো কখনো পাশে বসে থাকা মানুষটাই সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।

কয়েক সপ্তাহ পর রুহির বাবা অনেকটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

সবাই স্বস্তি পেল।

সিয়াম খুব সাধারণভাবে রুহিকে বিয়ের কথা বলল।

কোনো বড় আয়োজন নেই।

কোনো দামি উপহার নেই।

শুধু একটা ছোট্ট কাগজ।

রুহি কাগজ খুলে দেখল—

“তোমার জীবনের প্রতিটি গান শুনতে না পারলেও, প্রতিটি গল্পের পাশে থাকতে চাই। তুমি কি আমাকে সেই সুযোগ দেবে?”

রুহির চোখে পানি চলে এল।

সে হাসল।

“তুমি জানো, আমি না বলতে পারব না।”

সিয়াম বলল, “তাহলে হ্যাঁ?”

রুহি মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

এরপর তারা রুহির বাবা-মায়ের কাছে গেল।

সিয়াম বাবার সামনে দাঁড়িয়ে কাগজে লিখল—

“আমি রুহিকে বিয়ে করতে চাই।”

বাবা কাগজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

রুহির বুক ধকধক করছিল।

বাবা সিয়ামের দিকে তাকালেন।

তারপর লিখলেন—

“বিয়ের পরও কি সে গান গাইবে?”

সিয়াম উত্তর দিল—

“আগের চেয়েও বেশি।”

বাবা লিখলেন—

“আমাদের কি সঙ্গে রাখবে?”

“অবশ্যই।”

“রুহিকে কি কোনোদিন বলবে—গান বন্ধ করো?”

“কখনো না।”

বাবা এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তারপর লিখলেন—

“তাহলে আমার আপত্তি নেই।”

রুহি বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

মা চোখ মুছতে মুছতে সিয়ামের হাত ধরলেন।

সিয়াম মাথা নত করল।

বিয়েটা খুব ছোট করে করার সিদ্ধান্ত হলো।

রুহি চেয়েছিল তার বাবা-মা সামনে থাকুক।

সিয়ামও বলল, “তোমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলো ছাড়া এই বিয়ে অসম্পূর্ণ।”

বিয়ের দিন রুহির বাবা-মা খুব খুশি ছিলেন।

বাবা নতুন পাঞ্জাবি পরেছিলেন।

মা রুহির জন্য নিজ হাতে শাড়ি ঠিক করে দিলেন।

রুহি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

মা পেছন থেকে তার চুল ঠিক করছিলেন।

রুহি মায়ের হাত ধরে বলল—

“তুমি কি খুশি?”

মা মাথা নাড়লেন।

তারপর মেয়ের কপালে চুমু দিলেন।

বিয়ের পর রুহি সিয়ামের সঙ্গে নতুন বাড়িতে গেলেও বাবা-মাকে একা রাখল না।

তারা কাছেই একটি বাড়িতে থাকল।

সিয়াম নিজের কাজের পাশাপাশি রুহির গানেও সাহায্য করতে লাগল।

দুজন মিলে একটি ছোট সংগীত স্টুডিও খুলল।

স্টুডিওটির নাম রাখা হলো—

“নীরবতার ওপারে”।

এখানে বিশেষভাবে এমন শিল্পীদের গান রেকর্ড করা হতো, যারা কোনো না কোনো কারণে নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পায়নি।

রুহির বাবা প্রায়ই স্টুডিওতে বসে থাকতেন।

তিনি গান শুনতে পেতেন না।

তবু শিল্পীদের মুখের আনন্দ দেখতেন।

একদিন রুহি বাবার পাশে বসে বলল—

“বাবা, তোমার জন্য একটা কাজ আছে।”

বাবা প্রশ্নের দৃষ্টিতে তাকালেন।

রুহি একটা খাতা দিল।

সেখানে লেখা—

“নতুন শিল্পীদের জন্য তুমি আশীর্বাদ লিখবে।”

বাবা হেসে ফেললেন।

তারপর প্রতিটি শিল্পীর জন্য ছোট ছোট বার্তা লিখতে শুরু করলেন।

কেউ গান গাইতে এলে তিনি লিখতেন—

“ভয় পেয়ো না।”

কেউ ব্যর্থ হলে—

“আবার চেষ্টা করো।”

কেউ সফল হলে—

“নিজেকে ভুলে যেও না।”

ধীরে ধীরে সেই স্টুডিও পরিচিত হয়ে উঠল।

রুহির গানও আরও জনপ্রিয় হলো।

কিন্তু সে কখনো নিজের শিকড় ভুলল না।

এক রাতে সিয়াম বলল—

“তুমি কি জানো, তোমার সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনটা?”

রুহি বলল, “জাতীয় পুরস্কার?”

“না।”

“স্টুডিও?”

“না।”

“তাহলে?”

সিয়াম তার বাবা-মায়ের দিকে তাকাল।

“ওই দুজন মানুষকে তুমি বিশ্বাস করিয়েছ যে তাদের নীরবতার মধ্যেও একটা পৃথিবী আছে।”

রুহি কিছু বলল না।

তার চোখ ভিজে উঠল।

ঠিক তখনই বাবা দূর থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

তিনি কিছু শুনতে পেলেন না।

তবু যেন সব বুঝতে পারলেন।

রুহি উঠে বাবার কাছে গেল।

বাবা কাগজে লিখলেন—

“তুমি সুখী?”

রুহি লিখল—

“খুব।”

বাবা আবার লিখলেন—

“তাহলে আমার কাজ শেষ।”

রুহি ভয় পেয়ে গেল।

“এমন কথা বলো না।”

বাবা হাসলেন।

“আমি আছি।”

কিন্তু রুহির মনে অদ্ভুত একটা ভয় ঢুকে গেল।

সে বুঝতে পারছিল না, কেন বাবার কথাগুলো আজ এত বিদায়ের মতো শোনাচ্ছে।

সময় অনেকটা পেরিয়ে গেছে।

রুহি এখন দেশের পরিচিত একজন গায়িকা।

সিয়াম তার সবচেয়ে কাছের মানুষ।

তাদের ছোট্ট স্টুডিও এখন বড় হয়েছে।

অনেক নতুন শিল্পী সেখানে গান রেকর্ড করে।

কিন্তু রুহির জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলো এখনো একই।

তার মা।

তার বাবা।

আর সিয়াম।

বয়সের কারণে রুহির বাবা আগের মতো শক্তিশালী ছিলেন না।

তবু প্রতিদিন স্টুডিওতে আসতেন।

একদিন রুহি বাবার জন্য একটা বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করল।

নতুন শিল্পীরা গান করবে।

শেষে রুহি নিজে গান গাইবে।

অনুষ্ঠানের নাম—

“নীরবতার ওপারে—একটি সন্ধ্যা”।

হল ভরে গেল।

রুহির বাবা প্রথম সারিতে বসে ছিলেন।

মা তার পাশে।

সিয়াম রুহির হাত ধরে বলল—

“আজ কী গান গাইবে?”

রুহি বলল—

“আমাদের প্রথম গান।”

“নীরবতার ওপারে?”

“হ্যাঁ।”

রুহি মঞ্চে উঠল।

আলো জ্বলে উঠল।

সে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে কিছু বলল—

“এই গানটা সেই মানুষ দুজনের জন্য, যারা আমার কোনো গান শুনতে পারেননি, কিন্তু আমার জীবনের প্রতিটি সুর বুঝেছেন।”

হল নিস্তব্ধ।

রুহির বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

রুহি গান শুরু করল।

তার কণ্ঠে আগের চেয়ে আরও বেশি পরিণত আবেগ।

গানের মাঝখানে সে বাবার দিকে তাকাল।

বাবা দুই হাত তুলে ইশারায় বললেন—

“চালিয়ে যাও।”

রুহির চোখে পানি চলে এল।

সে গান শেষ করল।

পুরো হল দাঁড়িয়ে গেল।

মা কাঁদছিলেন।

সিয়াম হাততালি দিচ্ছিল।

বাবা হাসছিলেন।

অনুষ্ঠান শেষে রুহি বাবার কাছে গেল।

বাবা কাগজ চাইলেন।

তিনি লিখলেন—

“আজ তোমার গান সবচেয়ে ভালো হয়েছে।”

রুহি হেসে বলল—

“তুমি তো শুনতেই পাও না!”

বাবা লিখলেন—

“আজও শুনিনি।”

রুহি অবাক হয়ে তাকাল।

বাবা পরের লাইনটি লিখলেন—

“তবে আজ তোমার গান আমার হৃদয়ে খুব জোরে বাজছে।”

রুহি বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।

কয়েক মাস পর বাবা আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

রুহি তার পাশে থাকল।

সিয়ামও।

মা সবসময় পাশে।

এক রাতে বাবা রুহিকে কাছে ডাকলেন।

তিনি খুব ধীরে লিখলেন—

“তোমার জীবন থামাবে না।”

রুহি কাঁদতে কাঁদতে বলল—

“তুমি ভালো হয়ে যাবে।”

বাবা মৃদু হাসলেন।

তিনি লিখলেন—

“আমি তোমার মধ্যে থাকব।”

রুহি মাথা নাড়ল।

“আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না।”

বাবা তার মাথায় হাত রাখলেন।

তারপর লিখলেন—

“গান গাইবে।”

রুহি কাঁদতে কাঁদতে বলল—

“হ্যাঁ।”

“হাসবে।”

“হ্যাঁ।”

“সিয়ামের হাত ছাড়বে না।”

রুহি সিয়ামের দিকে তাকাল।

সিয়ামের চোখও ভেজা।

রুহি বাবার হাত ধরে বলল—

“কখনো না।”

বাবা চোখ বন্ধ করলেন।

সেদিন রাতটা খুব দীর্ঘ ছিল।

পরদিন ভোরে রুহির বাবা আর জেগে উঠলেন না।

রুহির পৃথিবী নিঃশব্দ হয়ে গেল।

সে গান বন্ধ করে দিল।

স্টুডিও বন্ধ করে দিল।

কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইত না।

মা মেয়ের পাশে বসে থাকতেন।

সিয়াম দূর থেকে সব দেখত।

একদিন সিয়াম রুহির সামনে বাবার পুরোনো খাতাটা রাখল।

রুহি খাতা খুলে দেখল, শেষ পাতায় বাবার লেখা—

“রুহি, তুমি যখন গান গাও, তখন আমি শুনতে পাই না। কিন্তু তুমি যখন গান বন্ধ করে দাও, তখন তোমার নীরবতা আমি বুঝতে পারি।”

রুহি খাতাটা বুকে চেপে ধরল।

সিয়াম বলল—

“তোমার বাবা তোমাকে থামতে বলেননি।”

রুহি কাঁদতে কাঁদতে বলল—

“আমি পারছি না।”

“তাহলে আজ গান গেও না।”

রুহি তাকাল।

সিয়াম বলল—

“কাল গাইবে।”

“যদি কালও না পারি?”

“পরশু।”

“যদি পরশুও না পারি?”

“যেদিন পারবে, সেদিন।”

রুহি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

স্টুডিওর দরজা খুলল।

মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল।

কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করল।

তারপর গান শুরু করল।

কণ্ঠ কাঁপছিল।

চোখে পানি ছিল।

কিন্তু গান থামেনি।

সিয়াম বাইরে দাঁড়িয়ে শুনছিল।

রুহির মা চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন।

রুহি গান শেষ করে আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে হলো, বাবা হয়তো কোথাও বসে আছেন।

হয়তো এবারও গান শুনতে পাচ্ছেন না।

তবু হাসছেন।

রুহি মৃদু হেসে বলল—

“বাবা, আমি গান থামাইনি।”

সিয়াম তার পাশে এসে দাঁড়াল।

রুহি তার হাত ধরল।

“তুমি থাকবে তো?”

সিয়াম বলল—

“যতদিন তুমি গান গাইবে।”

রুহি মাথা রাখল তার কাঁধে।

বাইরে তখন সকাল হয়ে গেছে।

নতুন সূর্যের আলো জানালা দিয়ে স্টুডিওর ভেতরে ঢুকছিল।

রুহি জানত, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের ভালোবাসা কখনো চলে যায় না।

কিছু কণ্ঠ কোনোদিন শোনা যায় না।

তবু সেই কণ্ঠ সারাজীবন হৃদয়ের ভেতর বাজতে থাকে।

....
👁 191