শালবনপুর ছিল নদী আর সবুজে ঘেরা এক শান্ত শহর। শহরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল এক পুরোনো জমিদারবাড়ি। বাড়িটির নাম ছিল রায়বাড়ি।
বহু বছরের পুরোনো বাড়ি হলেও তার জৌলুস এখনো কমেনি। সামনে বিশাল বাগান, পেছনে পুকুর, আর চারপাশে নানা রকম পুরোনো গাছ। বাড়ির মালিক ছিলেন রায়বাহাদুর অমরেশ রায়। তিনি ছিলেন এলাকার সবচেয়ে সম্মানিত মানুষদের একজন।
অমরেশ রায়ের একমাত্র মেয়ে তুলি।
তুলি ছিল শান্ত স্বভাবের মেয়ে। বই পড়তে ভালোবাসত, ছবি আঁকত, আর বাড়ির পুরোনো জিনিসপত্র নিয়ে তার ভীষণ আগ্রহ ছিল। তার মা অনেক বছর আগে মারা যাওয়ার পর বাবাই ছিল তার সবচেয়ে কাছের মানুষ।
তবে তুলির একটা অভ্যাস ছিল—বাড়ির পুরোনো ঘরগুলো ঘুরে দেখা।
একদিন দুপুরে সে বাবার লাইব্রেরিতে বসে একটা পুরোনো বই পড়ছিল। হঠাৎ তার বাবা ঘরে ঢুকে বললেন,
—তুলি, আজ বিকেলে কয়েকজন অতিথি আসবে।
তুলি বই থেকে মুখ তুলে বলল,
—কারা?
—কলকাতা থেকে কয়েকজন প্রত্নতত্ত্ববিদ এসেছে। আমাদের বাড়ির পুরোনো কিছু জিনিস নিয়ে গবেষণা করবে।
তুলির চোখ চকচক করে উঠল।
—সত্যি? তারা কি আমাদের পুরোনো মন্দিরটার ব্যাপারেও দেখবে?
বাবা হেসে বললেন,
—হ্যাঁ। আর তাদের মধ্যে একজন নাকি বেশ দক্ষ। নাম আকাশ সেন।
নামটা তুলির মনে গেঁথে গেল।
বিকেলে রায়বাড়ির সামনে একটা পুরোনো মডেলের গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে তিনজন লোক নামল।
তাদের মধ্যে একজন ছিল লম্বা, শান্ত চেহারার যুবক।
তার পরনে সাদা পাঞ্জাবি, গাঢ় রঙের প্যান্ট। হাতে কিছু নকশা আর পুরোনো কাগজপত্র।
সে চারপাশে তাকাল।
তার চোখে কৌতূহল, কিন্তু মুখে অদ্ভুত একটা গম্ভীরতা।
লোকটি এগিয়ে এসে অমরেশ রায়কে নমস্কার করল।
—আমি আকাশ সেন।
অমরেশ রায় হাসিমুখে তাকে স্বাগত জানালেন।
—এসো বাবা। তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
তুলি দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
আকাশ হঠাৎ তার দিকে তাকাল।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
কিন্তু তুলির মনে হলো, সময় যেন একটু থেমে গেল।
সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
অমরেশ রায় মেয়েকে ডাকলেন,
—তুলি, এদিকে আয়। আকাশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।
তুলি এগিয়ে এল।
—এ আমার মেয়ে তুলি।
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।
তুলি আস্তে বলল,
—আমারও।
প্রথম দেখায় কথাটা খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু সেই রাতেই তুলি বুঝতে পারল, আকাশের উপস্থিতি তার মনে অদ্ভুত একটা কৌতূহল তৈরি করেছে।
পরদিন সকাল থেকে আকাশ আর তার দল বাড়ির পুরোনো অংশগুলো পরীক্ষা করতে শুরু করল।
তুলি দূর থেকে তাদের কাজ দেখছিল।
আকাশ একটা পুরোনো ঘরের দেয়াল পরীক্ষা করছিল। হঠাৎ তুলি বলল,
—ওই জায়গাটা দেখেছেন?
আকাশ ঘুরে তাকাল।
—কোনটা?
তুলি দেয়ালের একটা অংশ দেখিয়ে বলল,
—ওখানে আগে একটা দরজা ছিল। পরে ইট দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে।
আকাশ অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
—আপনি কীভাবে জানলেন?
—ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে এখানে খেলতাম। তখন দরজাটা দেখেছিলাম।
আকাশ দেয়ালের কাছে গিয়ে ভালোভাবে পরীক্ষা করল।
—আপনার স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো।
তুলি হাসল।
—আপনার কাজটা আমার ভালো লাগছে।
—কাজ?
—পুরোনো জিনিস খুঁজে বের করা।
আকাশ বলল,
—পুরোনো জিনিসের মধ্যে অনেক গল্প লুকিয়ে থাকে।
তুলি জিজ্ঞেস করল,
—আর মানুষ?
আকাশ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—মানুষের মধ্যেও।
তুলির মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
সেদিন থেকেই তাদের মধ্যে কথা বাড়তে শুরু করল।
তুলি প্রায়ই আকাশের কাজ দেখতে যেত।
আকাশ তাকে পুরোনো মুদ্রা, মাটির তৈরি জিনিস আর পুরোনো নকশা দেখাত।
একদিন বিকেলে বাগানের পাশে বসে তুলি বলল,
—আপনি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন কেন?
আকাশ বলল,
—সব কথা সবাইকে বলা যায় না।
—আমাকে বলা যায়?
আকাশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—হয়তো।
—হয়তো কেন?
—কারণ আপনাকে দেখে মনে হয়, আপনি কথা শুনে বিচার করেন না।
তুলি মৃদু হেসে বলল,
—আমি কাউকে এত সহজে বিচার করি না।
আকাশও হাসল।
সেদিন প্রথমবার তুলির মনে হলো, এই মানুষটার ভেতরে অনেক না-বলা কথা আছে।
দিনগুলো এগিয়ে যেতে লাগল।
আকাশ রায়বাড়ির পুরোনো ইতিহাস নিয়ে কাজ করছিল। আর তুলি অজান্তেই তার সঙ্গে সময় কাটানোর অজুহাত খুঁজত।
কখনো লাইব্রেরিতে বই দিতে যেত।
কখনো বাগানে গিয়ে জিজ্ঞেস করত,
—আজ কী পেলেন?
আকাশও যেন তার অপেক্ষা করত।
এক সন্ধ্যায় হঠাৎ বৃষ্টি নামল।
তুলি বাগানের পেছনে আটকে গেল।
আকাশ ছুটে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
—আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
—বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছি।
আকাশ নিজের ছাতাটা তার দিকে এগিয়ে দিল।
—চলুন।
—আপনি?
—আমি ভিজতে পারি।
তুলি ছাতাটা নিল না।
—দুজন একসঙ্গে গেলে তো দুজনেই ভিজব।
আকাশ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর ছাতাটা দুজনের মাথার ওপর ধরল।
তারা পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
বৃষ্টির শব্দের মধ্যে তুলি আস্তে বলল,
—আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
—করুন।
—আপনি কি সত্যিই শুধু পুরোনো জিনিস নিয়ে গবেষণা করতে এসেছেন?
আকাশের পা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
তারপর সে আবার হাঁটতে শুরু করল।
—কেন এমন মনে হলো?
—জানি না।
—তাহলে?
তুলি হাসল।
—মনে হলো আপনার আসার পেছনে আরও কিছু আছে।
আকাশ তার দিকে তাকাল।
চোখে এক মুহূর্তের জন্য অস্বস্তি ফুটে উঠল।
কিন্তু সে দ্রুত সেটা লুকিয়ে ফেলল।
—হয়তো আছে।
—কী?
—সময় হলে বলব।
তুলি আর প্রশ্ন করল না।
কিন্তু সে জানত না, আকাশের সেই উত্তর সত্যিই ছিল।
কারণ রায়বাড়িতে আসার পেছনে তার অন্য একটি উদ্দেশ্য ছিল।
রাত গভীর হলে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর আকাশ চুপচাপ বাড়ির পুরোনো অংশে গেল।
তার হাতে ছিল একটা ছোট নকশা।
সে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে নকশাটা মিলিয়ে দেখল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
—এখানেই আছে।
কিছুক্ষণ পর সে একটা পুরোনো কাঠের বাক্স খুঁজে পেল।
বাক্সটা খুলতেই ভেতরে দেখা গেল কয়েকটি পুরোনো নথি।
আকাশ সেগুলো হাতে তুলে নিল।
তার চোখে সন্তুষ্টির ছাপ ফুটে উঠল।
কিন্তু ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
—এত রাতে এখানে কী করছেন?
আকাশ চমকে ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার কাছে তুলি দাঁড়িয়ে।
তার হাতে একটা বাতি।
আকাশ কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারল না।
তুলি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
—আপনি তো বলেছিলেন, সবাই ঘুমানোর পর পুরোনো ঘরে কাজ করেন না।
আকাশ নথিগুলো দ্রুত লুকিয়ে ফেলল।
—ঘুম আসছিল না।
তুলি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি কি আমাকে কিছু লুকাচ্ছেন?
আকাশ মৃদু হাসল।
—সবাই কিছু না কিছু লুকায়।
—আপনিও?
—হ্যাঁ।
তুলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আপনার চোখ কিন্তু মিথ্যা বলতে পারে না।
আকাশের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
তুলি বুঝতে পারছিল না, কেন এই মানুষটাকে নিয়ে তার এত কৌতূহল।
আর আকাশ বুঝতে পারছিল না, কেন তার পরিকল্পনার চেয়ে এই মেয়েটার চোখ তাকে বেশি অস্থির করে তুলছে।
সে ধীরে বলল,
—তুলি, আপনি আমার ওপর বিশ্বাস করেন?
তুলি একটু ভেবে বলল,
—এখনো জানি না।
আকাশ মাথা নিচু করল।
—ভালোই করেছেন।
—কেন?
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
—কারণ একদিন সত্যিটা জানলে হয়তো এই বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে।
তুলি কথাটার অর্থ বুঝতে পারল না।
সে শুধু দেখল, আকাশের চোখে প্রথমবার একটা অদ্ভুত অপরাধবোধ।
সকালের আলো রায়বাড়ির পুরোনো জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছিল। তুলি জানালার পাশে বসে চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে ছিল।
গত রাতের কথা তার মাথা থেকে যাচ্ছিল না।
আকাশের সেই কথাটা বারবার মনে পড়ছিল—
“একদিন সত্যিটা জানলে হয়তো এই বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে।”
তুলি বুঝতে পারছিল না, একজন মানুষকে মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়ে নিয়ে এত ভাবছে কেন।
আকাশকে নিয়ে তার কৌতূহল দিন দিন বাড়ছিল।
কিন্তু তার চেয়েও বেশি বাড়ছিল অদ্ভুত একটা টান।
সেদিন সকালে নাশতার টেবিলে অমরেশ রায় বললেন,
—তুলি, আজ আকাশরা পুরোনো মন্দিরের দিকে যাবে। তুই চাইলে ওদের সঙ্গে যেতে পারিস।
তুলির মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
—সত্যি?
বাবা হেসে বললেন,
—তুই তো এমনিতেই সারাদিন ওদের পেছনে ঘুরিস।
তুলি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।
কিছুক্ষণ পর আকাশ বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে পুরোনো নকশা দেখছিল।
তুলি কাছে গিয়ে বলল,
—চলবেন?
আকাশ তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—আপনি যাবেন?
—বাবা বলেছেন।
—তাহলে যেতে পারেন।
তুলি ভ্রু কুঁচকে বলল,
—আপনি কি চান না আমি যাই?
—আমি তা বলিনি।
—তাহলে এমন করছেন কেন?
আকাশ একটু হেসে বলল,
—আপনি থাকলে আমার কাজে মনোযোগ কমে যায়।
তুলি অবাক হয়ে তাকাল।
আকাশ যেন নিজের কথাতেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
—মানে... আপনি অনেক প্রশ্ন করেন।
তুলি হেসে বলল,
—আমি ভেবেছিলাম অন্য কিছু বলতে যাচ্ছিলেন।
আকাশ আর কিছু বলল না।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
পুরোনো মন্দিরটা রায়বাড়ি থেকে প্রায় আধঘণ্টা দূরে। চারপাশে গাছপালা, শুকনো পাতা আর ছোট ছোট পাথরের পথ।
হাঁটতে হাঁটতে তুলি বলল,
—আপনি কোথায় থাকেন?
—কলকাতায়।
—পরিবার?
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—কেউ নেই।
তুলি থেমে গেল।
—কেউ নেই মানে?
—আমার মা-বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন।
তুলির মুখটা মলিন হয়ে গেল।
—দুঃখিত। আমি জানতাম না।
—জানার কথা নয়।
তুলি কিছুক্ষণ চুপ করে হাঁটল।
তারপর বলল,
—তাই কি আপনি এত একা?
আকাশ হেসে বলল,
—আপনি কি আমার ওপর গবেষণা করছেন?
—হয়তো।
—তাহলে সাবধান। সব সত্যি জানা ভালো নয়।
তুলি বলল,
—আপনার সব কথা শুনলে মনে হয় আপনি একটা বই।
আকাশ তাকাল।
—কী ধরনের বই?
—যেটা পড়তে গেলে প্রতিটি পাতার পর আরও কৌতূহল হয়।
আকাশ হেসে ফেলল।
—আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলতে পারেন।
তুলি একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—আপনিও।
মন্দিরে পৌঁছে আকাশ কাজ শুরু করল।
তুলি পাশে বসে তাকে দেখছিল।
একসময় আকাশ একটা পুরোনো পাথরের ফলক খুঁজে পেল।
সে খুব যত্ন করে সেটা পরিষ্কার করতে লাগল।
তুলি জিজ্ঞেস করল,
—আপনি এত আগ্রহ নিয়ে এগুলো করেন কেন?
আকাশ বলল,
—কারণ পুরোনো জিনিস মিথ্যা বলে না।
তুলি তাকিয়ে রইল।
—মানুষ বলে?
আকাশের হাত থেমে গেল।
—মানুষ কখনো কখনো সত্যি লুকায়।
তুলি বুঝতে পারল, কথাটা শুধু সাধারণ কথা নয়।
সে ধীরে বলল,
—আপনি কি কাউকে বিশ্বাস করেন?
আকাশ তুলির দিকে তাকাল।
—একজনকে করতে শুরু করেছি।
তুলির বুক ধক করে উঠল।
—কে?
আকাশ উত্তর দিল না।
শুধু মৃদু হেসে আবার কাজ করতে লাগল।
তুলি মুখ ফিরিয়ে নিল।
তার গাল গরম হয়ে উঠেছিল।
সেদিন বিকেলে ফেরার সময় হঠাৎ তুলির পা পিছলে গেল।
আকাশ সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে ফেলল।
তুলি ভারসাম্য ফিরে পেলেও আকাশের হাত ছাড়ল না।
দুজন কিছুক্ষণ একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইল।
আকাশ ধীরে বলল,
—সাবধানে হাঁটুন।
তুলি নিচু গলায় বলল,
—আপনি হাত না ধরলে পড়ে যেতাম।
—তাই তো ধরেছি।
—সবসময় ধরবেন?
প্রশ্নটা মুখ থেকে বের হওয়ার পর তুলি নিজেই লজ্জা পেল।
আকাশ তার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
—যদি আপনি চান।
তুলির বুকের ভেতর কেমন একটা ঢেউ উঠল।
সে ধীরে হাতটা সরিয়ে নিল।
—চলুন।
আকাশ হাসল।
কিন্তু তার চোখে তখন আর হাসি ছিল না।
সেখানে ছিল গভীর এক দ্বিধা।
কারণ সে জানত, তুলি যত কাছে আসছে, তার পরিকল্পনা তত কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
সেই রাতে আকাশ তার ঘরে বসে পুরোনো নথিগুলো দেখছিল।
নথিতে রায়বাড়ির একটি মূল্যবান প্রাচীন মূর্তির কথা লেখা ছিল। বহু বছর ধরে মূর্তিটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আকাশের আসল উদ্দেশ্য ছিল সেই মূর্তিটি খুঁজে বের করা।
কিন্তু এখন তার সমস্যা অন্য জায়গায়।
তুলি।
সে জানত, কাজ শেষ হলে তাকে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে।
তুলির মুখ মনে পড়তেই আকাশ চোখ বন্ধ করল।
নিজেকে বলল,
—এটা শুধু একটা কাজ। অনুভূতির জায়গা এখানে নেই।
ঠিক তখন দরজায় শব্দ হলো।
আকাশ দ্রুত নথিগুলো সরিয়ে ফেলল।
দরজা খুলে তুলি দাঁড়িয়ে।
—ঘুমাননি?
—না।
—আমারও ঘুম আসছে না।
—কেন?
তুলি একটু হাসল।
—আপনার কথা ভাবছিলাম।
আকাশ স্তব্ধ হয়ে গেল।
তুলি নিজেই অবাক হয়ে বুঝতে পারল সে কী বলে ফেলেছে।
—মানে... আপনি আজ যা বলছিলেন...
আকাশ ধীরে কাছে এসে বলল,
—তুলি।
—হুম?
—আমার কথা এত ভাববেন না।
—কেন?
—কারণ হয়তো একদিন আমি থাকব না।
তুলির চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
—আপনি বারবার এমন কথা বলেন কেন?
আকাশ চুপ।
তুলি বলল,
—আপনি কি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন?
—চেষ্টা করছি।
—কেন?
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কারণ আপনি যত কাছে আসছেন, আমি তত বেশি ভয় পাচ্ছি।
তুলি ফিসফিস করে বলল,
—আমাকে?
—না।
—তাহলে?
আকাশের কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল।
—নিজেকে।
তুলি কিছু বলতে পারল না।
আকাশ ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
—তুমি আমার জীবনে এমন একটা জায়গা করে ফেলেছ, যেখানে তোমাকে রাখার অধিকার আমার নেই।
তুলি চোখে চোখ রেখে বলল,
—অধিকার কে দিয়েছে?
আকাশ থেমে গেল।
তুলি আস্তে বলল,
—আমি।
দুজনের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
আকাশ হাত বাড়িয়ে তুলির মুখের পাশে এসে থামল। কিন্তু তাকে ছুঁল না।
তুলি চোখ বন্ধ করল না।
শুধু অপেক্ষা করল।
আকাশ শেষ পর্যন্ত হাত নামিয়ে নিল।
—আজ নয়।
তুলি মৃদু কণ্ঠে বলল,
—কেন?
—কারণ আজ যদি তোমাকে ছুঁই, কাল তোমার কাছ থেকে দূরে যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে যাবে।
তুলির চোখ ভিজে উঠল।
—তাহলে দূরে যাবেন না।
আকাশের মুখে অসহায় হাসি ফুটল।
—তুমি জানো না, আমি কীসের মধ্যে জড়িয়ে আছি।
তুলি বলল,
—তাহলে আমাকে সত্যিটা বলুন।
আকাশ মাথা নাড়ল।
—সময় হলে বলব।
তুলি চলে যাওয়ার আগে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
—আমি অপেক্ষা করব।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
আকাশ বিছানায় বসে চোখ বন্ধ করল।
তারপর নিজের মনে বলল,
—আমি তোমাকে যতটা কাছে চাই, তার চেয়েও বেশি চাই তোমাকে নিরাপদ রাখতে।
কিন্তু সে জানত না, সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
কারণ পরদিন রাতে তার সঙ্গীরা তাকে জানাল—
রায়বাড়ির পুরোনো মূর্তির সন্ধান পাওয়া গেছে।
আর সেই মূর্তিটা রাখা হয়েছে এমন এক ঘরে, যার চাবি সবসময় তুলির কাছেই থাকে।
আকাশের সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত—
সে কি নিজের কাজ শেষ করবে, নাকি তুলির বিশ্বাসের কাছে হেরে যাবে?
সকালের সূর্য উঠলেও আকাশের মনে যেন রাতের অন্ধকারই রয়ে গেল।
গত রাতের কথা বারবার মনে পড়ছিল।
তুলির সেই কথাটা—
“আমি অপেক্ষা করব।”
আকাশ জানত, এই অপেক্ষার কোনো অধিকার তার নেই। কারণ সে যে পরিচয়ে রায়বাড়িতে এসেছে, সেটা পুরোপুরি সত্যি নয়।
তার আসল উদ্দেশ্য ছিল বহু বছর ধরে নিখোঁজ থাকা একটি মূল্যবান প্রাচীন মূর্তি উদ্ধার করা। সেই কাজ শেষ হলেই তাকে চলে যেতে হবে।
কিন্তু এখন সবকিছু বদলে গেছে।
কারণ তার মনে তুলি জায়গা করে নিয়েছে।
সকালে আকাশকে দেখে তুলি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। কিন্তু দুজনের চোখে চোখ পড়তেই গত রাতের কথাগুলো যেন আবার ফিরে এল।
তুলি মৃদু হেসে বলল,
—সুপ্রভাত।
—সুপ্রভাত।
—আজ কোথায় যাবেন?
—পুরোনো দক্ষিণ দিকের ঘরটা দেখতে হবে।
তুলি বলল,
—আমি যাব।
আকাশ একটু থেমে বলল,
—আজ না গেলেই ভালো।
তুলির মুখটা সঙ্গে সঙ্গে মলিন হয়ে গেল।
—কেন?
—কাজটা একটু কঠিন।
—আমি কি আপনার কাজে বাধা দিই?
আকাশ কিছু বলতে পারল না।
তুলি ধীরে বলল,
—নাকি আপনি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন?
আকাশ তার দিকে তাকাল।
—আমি শুধু চাই না তুমি কোনো বিপদে পড়ো।
তুলি মৃদু হেসে বলল,
—আপনি যখন প্রথম দিন এসেছিলেন, তখন তো আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করেননি।
আকাশের মুখে বিষণ্ণতা ফুটে উঠল।
—তখন তোমাকে চিনতাম না।
—এখন?
—এখন খুব বেশি চিনি।
তুলি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—তাহলে আমাকে বিশ্বাস করুন।
আকাশ আর বাধা দিল না।
দুজন দক্ষিণের পুরোনো অংশের দিকে হাঁটতে লাগল।
রায়বাড়ির এই অংশ বহু বছর ধরে বন্ধ ছিল। দেয়ালের রং উঠে গেছে, মেঝেতে ধুলো জমে আছে।
আকাশ নকশা বের করল।
তুলি জিজ্ঞেস করল,
—কী খুঁজছেন?
—একটা পুরোনো ঘর।
—কেন?
—ইতিহাসের জন্য।
তুলি হেসে বলল,
—আপনি সব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান।
আকাশও মৃদু হাসল।
—আর তুমি সব উত্তর জানতে চাও।
তারা একটা ভারী কাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
তুলি পকেট থেকে চাবি বের করল।
—এই ঘরের চাবি আমার কাছে থাকে।
আকাশের চোখ এক মুহূর্তের জন্য চাবির দিকে আটকে গেল।
তারপর সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
তুলি সেটা লক্ষ্য করল।
—আপনি চাবিটার দিকে এমনভাবে তাকালেন কেন?
—কিছু না।
দরজা খুলে গেল।
ভেতরে পুরোনো আসবাব, বাক্স আর কাপড়ে ঢাকা কিছু জিনিস।
আকাশের চোখ হঠাৎ একটা কাঠের আলমারিতে গিয়ে থামল।
তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
এই জায়গাটাই সে খুঁজছিল।
কিন্তু তুলির সামনে কিছু প্রকাশ করল না।
সে ধীরে ধীরে ঘরটা পরীক্ষা করতে লাগল।
তুলি বলল,
—আপনি কি সত্যিই কোনো গুপ্তধন খুঁজছেন?
আকাশ হেসে বলল,
—হয়তো।
—পেলে আমাকে দেবেন?
—যদি খুব মূল্যবান হয়?
—তাহলে?
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তাহলে তোমার জন্য একটা জিনিস কিনব।
—কী?
—তুমি যা চাইবে।
তুলি কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—আমি কিছু চাই না।
—কিছুই না?
—শুধু...
—শুধু?
তুলি মৃদু হেসে বলল,
—আপনি থাকবেন।
আকাশের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে বুঝল, তুলি যা চাইছে তা তার পক্ষে সবচেয়ে কঠিন জিনিস।
কারণ সে জানে, একদিন তাকে চলে যেতেই হবে।
হঠাৎ বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আকাশ দ্রুত তুলিকে নিজের কাছে টেনে নিল।
—চুপ।
তুলি তার খুব কাছে এসে দাঁড়াল।
দুজনের মধ্যে প্রায় কোনো দূরত্ব নেই।
তুলির বুক দ্রুত উঠানামা করছিল।
আকাশ নিচু গলায় বলল,
—কেউ আসছে।
পায়ের শব্দটা দরজার কাছে এসে থেমে গেল।
কিছুক্ষণ পর আবার দূরে চলে গেল।
তুলি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু আকাশ তখনও তার হাত ধরে ছিল।
তুলি ধীরে বলল,
—এখন তো কেউ নেই।
আকাশ যেন নিজের ভুল বুঝতে পেরে হাত ছেড়ে দিল।
—দুঃখিত।
তুলি হেসে বলল,
—আপনি সবসময় দুঃখিত বলেন কেন?
—কারণ তোমার কাছে বারবার ভুল করে ফেলি।
—সব ভুল কি খারাপ?
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তুলি ধীরে বলল,
—কিছু ভুল হয়তো মানুষকে সুখী করে।
আকাশ আর কিছু বলল না।
সেদিন সন্ধ্যায় তারা বাগানে বসেছিল।
তুলি একটা বই পড়ছিল।
আকাশ তাকে দেখছিল।
হঠাৎ তুলি বই বন্ধ করে বলল,
—আপনি আমাকে দেখছেন কেন?
—এমনিই।
—আমি কি এত মজার?
—তুমি যখন বই পড়ো, তখন তোমাকে খুব শান্ত লাগে।
—আর এখন?
আকাশ হেসে বলল,
—এখন তুমি আমাকে প্রশ্ন করে বিরক্ত করছ।
তুলি মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—ঠিক আছে, আর কথা বলব না।
সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
আকাশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
—রাগ করেছ?
—না।
—মিথ্যা।
তুলি তাকাল না।
আকাশ ধীরে তার পাশে বসে বলল,
—তুলি।
—হুম?
—আমার ওপর রাগ করে থেকো না।
তুলি বলল,
—আপনি আমাকে বুঝতে দেন না আপনি কী চান।
আকাশ চুপ।
—কখনো কাছে আসেন, কখনো দূরে সরে যান।
আকাশ নিচু গলায় বলল,
—কারণ আমি জানি না, তোমাকে কাছে রাখার অধিকার আমার আছে কি না।
তুলি তার দিকে তাকাল।
—ভালোবাসতে কি অধিকার লাগে?
প্রশ্নটা শুনে আকাশ স্থির হয়ে গেল।
তুলি আস্তে বলল,
—আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?
আকাশ অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ধীরে বলল,
—হ্যাঁ।
তুলির চোখে জল এসে গেল।
—তাহলে এতদিন বললেন না কেন?
—কারণ আমি জানি, আমার সঙ্গে ভালোবাসা মানে শুধু সুখ নয়। অনেক কষ্টও আছে।
তুলি তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
—কষ্ট ভাগ করে নেওয়া যায়।
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে তুলির হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল।
—তুমি যদি জানতে আমি কে...
—আমি তবুও শুনতাম।
—যদি আমার সত্যি তোমাকে কষ্ট দেয়?
—তাহলেও শুনতাম।
আকাশের চোখ ভিজে উঠল।
সে খুব আস্তে বলল,
—আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
তুলি মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে আমাকে হারানোর মতো কিছু করবেন না।
কথাটা শুনে আকাশের বুক কেঁপে উঠল।
কারণ সে জানত, খুব শিগগিরই তাকে এমন একটা কাজ করতে হবে, যার পর তুলি হয়তো তাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না।
রাত গভীর হলো।
সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর আকাশ আবার দক্ষিণের ঘরে গেল।
সে আলমারির পেছনে একটা গোপন জায়গা খুঁজে পেল।
সেখানে একটা ছোট কাঠের বাক্স।
বাক্স খুলতেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
ভেতরে সেই বহুদিনের খোঁজা প্রাচীন মূর্তি।
আকাশ সেটা হাতে নিল।
তার কাজ শেষ।
কিন্তু তার বুকের ভেতর আনন্দ হলো না।
বরং মনে হলো, সে যেন নিজের হৃদয়টাই হাতে তুলে নিয়েছে।
ঠিক তখন পেছনে একটা শব্দ হলো।
আকাশ ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার কাছে তুলি।
তার চোখ সরাসরি মূর্তির ওপর।
তারপর ধীরে ধীরে আকাশের দিকে।
তুলির মুখে অবিশ্বাস।
—এটা... আপনি কী করছেন?
আকাশ কোনো উত্তর দিতে পারল না।
তুলির চোখে জল চলে এল।
—আপনি কি আমাদের বাড়ি থেকে এটা চুরি করতে এসেছিলেন?
আকাশের ঠোঁট কাঁপল।
—তুলি, আমি সব বুঝিয়ে বলব।
—কী বুঝাবেন?
—আমি...
—আপনি আমাকে মিথ্যা বলেছেন।
আকাশ এগিয়ে আসতে চাইলে তুলি পিছিয়ে গেল।
—আমার কাছে আসবেন না।
—তুলি, আমাকে একবার কথা বলতে দাও।
—আমি আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম।
আকাশ চোখ বন্ধ করল।
—আমি জানি।
—তাহলে কেন?
আকাশের হাতে তখনও মূর্তিটা।
তুলি চোখের জল মুছে বলল,
—আপনি আমাকে ভালোবাসার কথা বলেছিলেন। সবটাই কি মিথ্যা ছিল?
আকাশ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না!
তার কণ্ঠে এতটা সত্যি ছিল যে তুলি থেমে গেল।
আকাশ ধীরে বলল,
—আমার তোমার প্রতি অনুভূতিটা কখনো মিথ্যা ছিল না।
তুলি কাঁপা গলায় বলল,
—কিন্তু আপনার আসা ছিল মিথ্যা।
আকাশের চোখে জল।
—হ্যাঁ।
তুলি আর কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আকাশ একা দাঁড়িয়ে রইল।
তার হাতে ছিল সেই মূল্যবান মূর্তি।
তুলি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আকাশ অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
তার হাতে তখনও সেই পুরোনো মূর্তি।
যে মূর্তির জন্য সে এতদিন পরিকল্পনা করেছে, এত ঝুঁকি নিয়েছে, রায়বাড়িতে মিথ্যা পরিচয়ে এসেছে—আজ সেই মূর্তিটাই তার কাছে সবচেয়ে মূল্যহীন মনে হচ্ছিল।
কারণ তুলির চোখের কষ্টটা তার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধছিল।
তুলি তাকে বিশ্বাস করেছিল।
আর সেই বিশ্বাসটাই আকাশ ভেঙে দিয়েছে।
আকাশ ধীরে মূর্তিটা বাক্সে রেখে দিল।
ঠিক তখন পেছনের দরজা দিয়ে তার সঙ্গী রাকিব ঢুকল।
—সব পেয়েছিস?
আকাশ কোনো উত্তর দিল না।
রাকিব আবার বলল,
—বস, আমাদের লোকজন বাইরে অপেক্ষা করছে। আজ রাতেই মূর্তিটা নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে।
আকাশ ধীরে ঘুরে তাকাল।
—কেউ কোথাও যাবে না।
রাকিব অবাক।
—কী বলছিস?
—মূর্তিটা এখানেই থাকবে।
—কিন্তু বস...
আকাশ কঠিন গলায় বলল,
—আমি বলেছি, এটা এখানেই থাকবে।
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তুই কি তুলির জন্য সব ছেড়ে দিচ্ছিস?
আকাশ তার দিকে তাকাল।
—তুলির নাম মুখে আনবি না।
রাকিব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তুই বদলে গেছিস, আকাশ।
আকাশ নিচু গলায় বলল,
—হয়তো।
রাকিব চলে গেল।
কিন্তু আকাশ জানত, এখন আর সত্যিটা লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই।
তুলি নিজের ঘরে বসে কাঁদছিল।
তার মনে হচ্ছিল, গত কয়েক সপ্তাহের প্রতিটি মুহূর্ত যেন মিথ্যা।
আকাশের হাসি।
তার সঙ্গে হাঁটা।
বৃষ্টির মধ্যে ছাতা ভাগ করে নেওয়া।
তার হাত ধরে বলা—
“আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”
সবকিছু কি অভিনয় ছিল?
তুলি চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল।
ঠিক তখন দরজায় টোকা পড়ল।
বাড়ির পুরোনো কর্মচারী রহিম চাচা দাঁড়িয়ে।
—মা, আপনাকে বাবু ডাকছেন।
তুলি বাবার ঘরে গেল।
অমরেশ রায় মেয়ের মুখ দেখে বুঝতে পারলেন কিছু একটা হয়েছে।
—কী হয়েছে?
তুলি কিছু বলতে পারল না।
অমরেশ ধীরে বললেন,
—আকাশের ব্যাপার?
তুলি অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
—আপনি জানতেন?
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—সবটা জানতাম না। তবে ছেলেটার পরিচয় নিয়ে আমারও সন্দেহ ছিল।
তুলি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—ও আমাকে ব্যবহার করেছে।
—তুই ওকে ভালোবেসে ফেলেছিস?
তুলি উত্তর দিল না।
তার চোখের জলই উত্তর হয়ে গেল।
অমরেশ মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
—সব মানুষকে বিশ্বাস করা যায় না, মা। কিন্তু সবাইকে অবিশ্বাসও করা যায় না।
তুলি বলল,
—কিন্তু বাবা, ও একটা চোর।
অমরেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—চোরেরও কি কোনো গল্প থাকতে পারে না?
তুলি অবাক।
—আপনি কী বলতে চাইছেন?
—আমি জানি না। তবে ওর চোখে আমি শুধু অপরাধ দেখিনি। অনেক কষ্টও দেখেছি।
অন্যদিকে আকাশ রায়বাড়ির পেছনের পুরোনো বাগানে একা দাঁড়িয়ে ছিল।
তার ফোন বেজে উঠল।
ওপাশ থেকে কর্কশ কণ্ঠ—
—আকাশ, কাজ শেষ হয়েছে?
আকাশ বলল,
—হ্যাঁ।
—মূর্তি পেয়েছিস?
—পেয়েছি।
—তাহলে নিয়ে বেরিয়ে আয়।
আকাশ চুপ করে রইল।
ওপাশের লোকটি আবার বলল,
—কী হলো?
আকাশ শান্ত গলায় বলল,
—আমি আর এই কাজ করব না।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ভয়ংকর কণ্ঠ শোনা গেল,
—তুই কি ভুলে গেছিস, তুই কে?
আকাশ বলল,
—না। আমি সব মনে রেখেছি।
—তাহলে শুন। তুই আমাদের দলের নেতা। তোর কথায় এই দল চলে। তুই যদি সরে দাঁড়াস, শুধু তুই নয়, তোর কাছের মানুষগুলোর জীবনও বিপদে পড়বে।
আকাশের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—তুলির কোনো ক্ষতি হলে...
—তাহলে কী করবি?
আকাশ দাঁত চেপে বলল,
—তোদের কাউকেই ছাড়ব না।
ফোন কেটে গেল।
আকাশ বুঝতে পারল, বিপদ এখন শুধু তার জন্য নয়।
তুলিও তার শত্রুদের লক্ষ্য হয়ে গেছে।
রাতের দিকে আকাশ তুলির সঙ্গে দেখা করতে গেল।
তুলি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
আকাশ দরজার সামনে এসে থামল।
—তুলি।
তুলি ঘুরে তাকাল।
তার চোখে অভিমান।
—কী চান?
—তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই।
—আমার আর কিছু শোনার নেই।
—তবু আমাকে শুনতে হবে।
তুলি চুপ করে রইল।
আকাশ ধীরে বলল,
—তুমি যা দেখেছ, সেটা সত্যি। আমি মিথ্যা পরিচয়ে এখানে এসেছিলাম।
—কেন?
—একটা জিনিস চুরি করতে।
তুলি চোখ বন্ধ করল।
—আমি জানতাম।
আকাশ বলল,
—কিন্তু তুমি যেটা জানো না, সেটা হলো আমি শুধু একজন চোর নই।
তুলি তাকাল।
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—আমি একটা ডাকাত দলের নেতা।
তুলির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আকাশ ধীরে ধীরে বলতে লাগল,
—বছরের পর বছর আমি একটা দলের সঙ্গে কাজ করেছি। বড় বড় চুরি, লুট, অবৈধ ব্যবসা—সবকিছুর সঙ্গে আমরা জড়িত ছিলাম। আমি সেই দলের নেতা। আমার নির্দেশেই সবকিছু হতো।
তুলি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
—আপনি... নেতা?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমার সঙ্গে পরিচয়?
—পরিকল্পনার অংশ ছিল।
তুলির চোখে জল জমে উঠল।
—আর আপনার ভালোবাসা?
আকাশ এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
—সেটা পরিকল্পনার অংশ ছিল না।
তুলি কাঁপা গলায় বলল,
—আমি কীভাবে বিশ্বাস করব?
আকাশ তার দিকে এগিয়ে এল, কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখল।
—বিশ্বাস করতে হবে না।
—তাহলে?
—শুধু আমাকে একবার সত্যি বলার সুযোগ দাও।
তুলি চুপ।
আকাশ বলল,
—প্রথম দিন যখন তোমাকে দেখেছিলাম, তখন তুমি আমার কাছে শুধু এই বাড়ির মালিকের মেয়ে ছিলে। কিন্তু কয়েকদিন পর তুমি আমার কাছে তার চেয়েও অনেক বেশি হয়ে গেলে।
তুলির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
—তুমি যখন হাসতে, আমি আমার পুরোনো জীবন ভুলে যেতাম। তুমি যখন আমার ওপর বিশ্বাস করতে, তখন নিজের ওপর ঘৃণা হতো।
—তবুও আমাকে মিথ্যা বললেন।
—হ্যাঁ।
—কেন সত্যি বলেননি?
আকাশ ধীরে বলল,
—কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।
—কিসের?
—তোমাকে হারানোর।
তুলি চোখ নামিয়ে ফেলল।
আকাশ বলল,
—আজ আমি চাইলে মূর্তিটা নিয়ে চলে যেতে পারি। আমার দলও প্রস্তুত। কিন্তু আমি সেটা করছি না।
—কেন?
—কারণ তোমাকে পাওয়ার পর বুঝেছি, সারাজীবন যা করেছি সেটা কোনো বিজয় নয়।
তুলি চুপ করে রইল।
আকাশ বলল,
—আমি আমার অতীত বদলাতে পারব না। কিন্তু ভবিষ্যৎ বদলাতে পারি।
তুলি ধীরে জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি সত্যিই এই জীবন ছেড়ে দেবেন?
আকাশ উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে হঠাৎ গাড়ির শব্দ হলো।
আকাশ জানালার দিকে তাকাল।
তার মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।
—ওরা এসেছে।
তুলি ভয় পেয়ে বলল,
—কারা?
আকাশ তার দিকে তাকাল।
—আমার দল।
—তারা এখানে কেন?
—আমাকে ফিরিয়ে নিতে।
আকাশ দরজা খুলে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল।
তুলি তার হাত ধরে ফেলল।
—আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
—ওদের থামাতে।
—একাই?
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—এইবার আর আমি পালাব না।
সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
তুলি পেছন থেকে বলল,
—আকাশ!
আকাশ থামল।
তুলি কাঁপা গলায় বলল,
—আপনি যদি সত্যিই বদলাতে চান...
আকাশ ফিরে তাকাল।
—হ্যাঁ?
তুলি চোখের জল মুছে বলল,
—তাহলে ফিরে আসবেন।
আকাশ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—ফিরে আসব।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
তুলি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখল, আকাশ একা অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছে।
রাত তখন অনেক গভীর।
রায়বাড়ির চারপাশে নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতার আড়ালে বড় একটা ঝড় তৈরি হচ্ছিল।
আকাশ বাড়ির পেছনের পুরোনো আমবাগানের দিকে এগিয়ে গেল। দূরে তিনটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়ির পাশে কয়েকজন লোক।
তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল দলের দ্বিতীয় নেতা রাকিব।
আকাশ কাছে যেতেই রাকিব বলল,
—শেষ পর্যন্ত এলি।
আকাশ শান্ত গলায় বলল,
—তোমরা এখানে কেন এসেছ?
রাকিব হেসে বলল,
—তুই জানিস কেন।
—মূর্তিটা আমি দেব না।
রাকিবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—তুই কি সত্যিই সবকিছু ভুলে গেছিস? এই দল তোকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এসেছে, মনে আছে?
আকাশ বলল,
—মনে আছে।
—তাহলে আজ এত বদলে গেলি কেন?
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—কারণ আমি বুঝেছি, সবকিছু টাকা দিয়ে কেনা যায় না।
রাকিব তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
—তুলির জন্য?
আকাশের চোখ কঠিন হয়ে গেল।
—তার নাম মুখে আনবি না।
—তুই একজন ডাকাত, আকাশ। তোর জীবনে ভালোবাসার জায়গা নেই।
আকাশ ধীরে বলল,
—ছিল না। এখন হয়েছে।
রাকিব মাথা নাড়ল।
—তাহলে তুই নিজের মৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছিস।
আকাশ উত্তর দিল না।
ঠিক তখনই রাকিবের ফোন বেজে উঠল।
কথা বলার পর সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—মূর্তিটা কোথায় রেখেছিস?
—রায়বাড়িতে।
—আর তুলি?
আকাশ এবার বুঝতে পারল, আসল বিপদ কোথায়।
—তুলির কী হয়েছে?
রাকিব ঠান্ডা গলায় বলল,
—তাকে আমরা এখনো কিছু করিনি।
আকাশ এক পা এগিয়ে গেল।
—“এখনো” মানে?
—তুই যদি মূর্তি না দিস, তখন কী হবে সেটা তুই ঠিক করবি।
আকাশের চোখে রাগ জ্বলে উঠল।
—তুলির কাছে কেউ যাবে না।
রাকিব বলল,
—তাহলে মূর্তিটা নিয়ে আয়।
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তোমরা একটা কথা ভুলে গেছ।
—কী?
—আমি শুধু তোমাদের নেতা নই। এত বছর ধরে তোমাদের সবকিছু আমি জানি।
রাকিবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
আকাশ বলল,
—কার কাছে কত টাকা আছে, কোথায় কী লুকানো আছে, কার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ আছে—সব আমার জানা।
রাকিব এবার সতর্ক হয়ে গেল।
—আমাদের ভয় দেখাচ্ছিস?
—না। শেষবারের মতো সতর্ক করছি।
—আর যদি না শুনি?
আকাশ বলল,
—তাহলে তোমাদের বিরুদ্ধে সব প্রমাণ পুলিশের হাতে যাবে।
রাকিব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হেসে উঠল।
—তুই সত্যিই তুলির জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত।
আকাশ বলল,
—হ্যাঁ।
রাকিব চলে যাওয়ার আগে বলল,
—তাহলে অপেক্ষা কর। তোর ভালোবাসার মানুষটার জন্যই হয়তো তোর শেষ লড়াই শুরু হবে।
এদিকে রায়বাড়িতে তুলি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
আকাশের কথা তার মাথায় ঘুরছিল।
“আমি একটা ডাকাত দলের নেতা।”
কথাটা মেনে নেওয়া কঠিন।
যে মানুষটাকে সে এতদিন একজন শান্ত, শিক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক ভেবেছে, সেই মানুষই এত বড় একটা দলের নেতা!
তবুও তার মনে হচ্ছিল, আকাশের কথার মধ্যে একটা সত্যি ছিল।
সে সত্যিই বদলাতে চাইছে।
হঠাৎ জানালার বাইরে একটা ছায়া দেখতে পেল তুলি।
সে চমকে উঠল।
—কে?
কোনো উত্তর নেই।
তুলি দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিল।
ঠিক তখন তার ফোনে মেসেজ এল।
“আকাশকে বাঁচাতে চাইলে বাড়ির পেছনের পুরোনো গুদামে এসো।”
তুলির বুক ধক করে উঠল।
সে সঙ্গে সঙ্গে বাবার ঘরে গেল।
—বাবা!
অমরেশ রায় ঘুম থেকে উঠে বললেন,
—কী হয়েছে?
তুলি ফোনটা দেখাল।
বাবা মেসেজ পড়ে বললেন,
—তুই কোথাও যাবি না।
—কিন্তু আকাশ বিপদে।
—এটা ফাঁদ হতে পারে।
তুলি চোখে জল নিয়ে বলল,
—আমি জানি। কিন্তু যদি সত্যিই ও বিপদে থাকে?
বাবা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, তাকে আটকানো কঠিন।
—আমি লোক পাঠাচ্ছি।
—না বাবা। ওরা যদি আমাকে অনুসরণ করে তাহলে আকাশের ক্ষতি হতে পারে।
অমরেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—তুই একা যাবি না।
—আমি সাবধানে থাকব।
তুলি বেরিয়ে গেল।
পুরোনো গুদামের ভেতর ঢুকতেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল।
তুলি ধীরে বলল,
—আকাশ?
কেউ উত্তর দিল না।
হঠাৎ পেছনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
তুলি ঘুরে দাঁড়াল।
সামনে রাকিব।
—তুমি!
রাকিব মৃদু হেসে বলল,
—আকাশকে খুব ভালোবাসো?
তুলি ভয় পেলেও নিজেকে সামলে নিল।
—ও কোথায়?
—তোমার জন্যই তো এই আয়োজন।
—আপনারা কী চান?
—মূর্তি।
—আমার কাছে নেই।
—জানি।
রাকিব ধীরে কাছে এসে বলল,
—কিন্তু আকাশের কাছে আছে।
তুলি বুঝতে পারল, তাকে ব্যবহার করে আকাশকে বাধ্য করাই তাদের উদ্দেশ্য।
সে বলল,
—আপনারা আকাশকে কেন ছাড়ছেন না?
রাকিব বলল,
—কারণ সে আমাদের অনেক কিছু জানে।
—সে আপনাদের বিরুদ্ধে যাবে?
—ইতিমধ্যে গেছে।
তুলি চুপ করে গেল।
রাকিব বলল,
—ওকে একটা সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পুরোনো জীবনে ফিরে আসতে। সে রাজি হয়নি।
—কারণ সে বদলাতে চায়।
রাকিব হাসল।
—মানুষ এত সহজে বদলায় না।
তুলি দৃঢ় গলায় বলল,
—আকাশ বদলেছে।
ঠিক তখন গুদামের বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।
রাকিব চমকে তাকাল।
পরের মুহূর্তেই দরজা খুলে আকাশ ঢুকে পড়ল।
—তুলিকে ছেড়ে দাও।
রাকিব বলল,
—মূর্তি কোথায়?
আকাশ বলল,
—আমার কাছে নেই।
—মিথ্যা বলছিস।
—না।
রাকিব রাগে বলল,
—তাহলে আজ তোর সবচেয়ে কাছের মানুষটার জন্য তোকে মূল্য দিতে হবে।
আকাশ সামনে এগিয়ে গেল।
—তুলিকে ছেড়ে দে। যা চাইছিস, আমি দেব।
তুলি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না, আকাশ!
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—তুমি চুপ করো।
—আপনি ওদের কিছু দেবেন না।
—তুলি, আমার ওপর বিশ্বাস রাখো।
রাকিব হেসে বলল,
—আবার বিশ্বাস!
আকাশ বলল,
—হ্যাঁ। কারণ এই মেয়েটা আমাকে এমন একটা জিনিস দিয়েছে, যেটা তোমরা কেউ কোনোদিন দিতে পারোনি।
—কী?
—নিজেকে বদলানোর কারণ।
রাকিব কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর আকাশের দিকে এগিয়ে এল।
—তাহলে আজ দেখা যাক, তোর ভালোবাসা কতটা শক্তিশালী।
পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠল।
আকাশ সুযোগ বুঝে তুলিকে নিজের কাছে নিয়ে এল।
—দৌড়াও!
তুলি বলল,
—আপনি?
—আমি পেছনে আসছি।
—না, এবার একসঙ্গে।
আকাশ তার হাত ধরে ফেলল।
দুজন একসঙ্গে গুদামের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি।
তারা দৌড়াতে দৌড়াতে একটা পুরোনো ছাউনির নিচে আশ্রয় নিল।
তুলি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—আপনি ঠিক আছেন?
—হ্যাঁ।
—আপনি আমাকে নিয়ে এত ঝুঁকি নিলেন কেন?
আকাশ তার দিকে তাকাল।
—কারণ তুমি আমার কাছে শুধু একজন মানুষ নও।
তুলি চোখ নামিয়ে বলল,
—তাহলে কী?
আকাশ ধীরে তার হাত ধরল।
—আমার ফিরে আসার কারণ।
তুলির চোখ ভিজে উঠল।
—আপনি কি সত্যিই সব ছেড়ে দেবেন?
আকাশ বলল,
—হ্যাঁ।
—ডাকাতির জীবন?
—হ্যাঁ।
—আপনার দল?
—তাদের বিরুদ্ধেও দাঁড়াব।
তুলি তার হাত শক্ত করে ধরল।
—তাহলে আমি আপনার পাশে থাকব।
আকাশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব নরম গলায় বলল,
—তুমি জানো না, এই কথাটা আমার কাছে কতটা মূল্যবান।
বৃষ্টির শব্দের মধ্যে দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।
তুলি ধীরে মাথা রাখল আকাশের কাঁধে।
আকাশও তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
কিছুক্ষণ পর তুলি বলল,
—আপনি আমাকে একটা কথা সত্যি করে বলবেন?
—কী?
—প্রথম দিন থেকেই কি আমাকে ভালো লেগেছিল?
আকাশ হেসে বলল,
—প্রথম দিন তোমাকে দেখে শুধু মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা অনেক প্রশ্ন করে।
তুলি হেসে ফেলল।
—তারপর?
—তারপর বুঝলাম, তোমার প্রশ্নগুলো আমার মনের দরজা খুলে দিচ্ছে।
তুলি মুখ তুলে তাকাল।
আকাশ বলল,
—আর একসময় বুঝলাম, তোমাকে ছাড়া সেই দরজাটা আবার বন্ধ করতে পারব না।
তুলির চোখে জল চিকচিক করছিল।
সে ধীরে বলল,
—তাহলে আর বন্ধ করবেন না।
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—কখনো না।
কিন্তু তাদের অজান্তেই দূরে একটা গাড়ি থেমে ছিল।
গাড়ির ভেতর বসে রাকিব তাদের দেখছিল।
তার হাতে ছিল একটা ফোন।
সে কারও সঙ্গে কথা বলল।
—ওরা একসঙ্গে আছে।
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
—তাহলে এবার পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু করো।
রাকিব মুচকি হাসল।
—ঠিক আছে।
বৃষ্টিভেজা রাতটা শেষ হলেও আকাশ আর তুলির জীবনে শান্তি ফিরল না।
ভোরের দিকে তারা রায়বাড়িতে ফিরে এল। তুলি সারা পথ আকাশের হাত ধরে ছিল। কিন্তু বাড়ির কাছে এসে হঠাৎ সে থেমে গেল।
আকাশ তাকাল।
—কী হলো?
তুলি ধীরে বলল,
—আপনি এখনো আমার কাছে পুরোপুরি সত্যি বলেননি।
আকাশ চুপ করে রইল।
—আপনার দল কেন আমাদের পেছনে লেগেছে? শুধু ওই মূর্তির জন্য?
আকাশ কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—না।
—তাহলে?
—ওই মূর্তির সঙ্গে একটা পুরোনো রহস্য জড়িয়ে আছে।
তুলি বলল,
—কী রহস্য?
আকাশ উত্তর দেওয়ার আগেই অমরেশ রায় দ্রুত তাদের দিকে এগিয়ে এলেন।
তার মুখ চিন্তিত।
—তুলি, তুমি কোথায় ছিলে?
তুলি বলল,
—বাবা, আমি ঠিক আছি।
অমরেশ আকাশের দিকে তাকালেন।
—আর তুমি?
আকাশ মাথা নত করল।
—আমার জন্যই তুলি বিপদে পড়েছে। আমি দুঃখিত।
অমরেশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—ভেতরে এসো। তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
আকাশ বুঝতে পারল, এবার হয়তো আর কিছু লুকিয়ে রাখা যাবে না।
তিনজন লাইব্রেরিতে গিয়ে বসল।
অমরেশ দরজা বন্ধ করে বললেন,
—আকাশ, তুমি যে শুধু একজন প্রত্নতাত্ত্বিক নও, সেটা আমি জানি।
তুলি বাবার দিকে তাকাল।
—আপনি জানতেন?
অমরেশ বললেন,
—পুরোটা না। কিন্তু সন্দেহ ছিল।
আকাশ শান্ত গলায় বলল,
—আমি আপনাকে সত্যিটা বলতে চাই।
অমরেশ মাথা নাড়লেন।
আকাশ বলতে শুরু করল,
—আমি যে দলের নেতা, সেটা সত্যি। কিন্তু আমাদের দলের কাজ শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে। তখন আমি এই দলে ছিলাম না। আমার বাবার মৃত্যুর পর আমি একটা কঠিন সময়ের মধ্যে পড়ে যাই। তখন একজন মানুষ আমাকে আশ্রয় দেয়।
—কে?
—এই দলের আগের নেতা।
অমরেশ জিজ্ঞেস করলেন,
—তারপর?
—ধীরে ধীরে আমি দলের অংশ হয়ে যাই। পরে নেতা হই।
তুলি চুপ করে শুনছিল।
আকাশ বলল,
—কিন্তু কয়েক বছর আগে আমি জানতে পারি, আমাদের অনেক কাজের পেছনে শুধু চুরি নয়, আরও বড় একটা চক্র আছে। পুরোনো ঐতিহাসিক সম্পদ বিদেশে পাচার করা হয়। তখন থেকেই আমি বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম।
অমরেশ বললেন,
—তাহলে রায়বাড়িতে কেন এলে?
আকাশ নিচু গলায় বলল,
—এই মূর্তিটা পাচারকারীদের কাছে যাওয়ার কথা ছিল। আমি সেটা খুঁজে বের করে তাদের হাত থেকে সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম।
তুলি অবাক হয়ে তাকাল।
—কিন্তু আপনি তো চুরি করতে এসেছিলেন।
আকাশ তার দিকে তাকাল।
—হ্যাঁ। আমার পদ্ধতি ভুল ছিল। কিন্তু একটা সময় পর্যন্ত আমি ভেবেছিলাম, এটাই আমার একমাত্র পথ।
তুলি কিছু বলল না।
অমরেশ হঠাৎ একটা পুরোনো বাক্স বের করলেন।
—তুমি কি এটা দেখেছ?
আকাশ বাক্সটার দিকে তাকিয়ে চমকে গেল।
—এটা কোথায় পেলেন?
—তোমার আসার আগেই পেয়েছিলাম।
বাক্স খুলে অমরেশ একটা পুরোনো চিঠি বের করলেন।
আকাশ চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল।
কয়েক লাইন পড়েই তার মুখ বদলে গেল।
তুলি জিজ্ঞেস করল,
—কী আছে?
আকাশ উত্তর দেওয়ার আগেই অমরেশ বললেন,
—এই চিঠিটা তোমার বাবার লেখা।
আকাশ থমকে গেল।
—আমার বাবা?
—হ্যাঁ।
আকাশের বাবা বহু বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ইতিহাস গবেষক। মৃত্যুর আগে তিনি কিছু প্রাচীন নিদর্শন পাচারের ব্যাপারে তদন্ত করছিলেন।
চিঠিতে লেখা ছিল, রায়বাড়ির মূর্তিটা শুধু একটা মূল্যবান প্রত্নবস্তু নয়।
এর সঙ্গে একটা পুরোনো পাচারচক্রের প্রমাণ জড়িত।
আর সেই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষ।
আকাশ ধীরে বলল,
—তাহলে আমার বাবা...
অমরেশ বললেন,
—তোমার বাবা সত্যিটা জানতে পেরেছিলেন।
—তাকে কে মেরেছিল?
অমরেশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—নিশ্চিত করে বলা যায় না।
তুলি আকাশের হাত ধরল।
আকাশ চিঠিটা শক্ত করে ধরে বলল,
—আমি এত বছর ধরে ভুল মানুষদের সঙ্গে লড়েছি।
তুলি বলল,
—এখন সত্যিটা জানবেন।
আকাশ তার দিকে তাকাল।
—তুমি কি এখনও আমার ওপর বিশ্বাস করো?
তুলি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—পুরোপুরি না।
আকাশের চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
তুলি তার হাত শক্ত করে ধরল।
—কিন্তু বিশ্বাস করতে চাই।
আকাশ মৃদু হাসল।
—আমার জন্য এতটাই যথেষ্ট।
ঠিক তখন বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।
অমরেশ জানালার কাছে গিয়ে দেখলেন, রাস্তায় একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে।
আকাশ সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল।
—ওরা এসেছে।
অমরেশ বললেন,
—এবার কী করবে?
আকাশ কিছুক্ষণ ভাবল।
—তুলিকে নিরাপদ জায়গায় পাঠাতে হবে।
তুলি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না।
—তুলি...
—আপনি যেখানে যাবেন, আমিও যাব।
—এটা কোনো সিনেমা নয়। সত্যিই বিপদ আছে।
তুলি শান্ত গলায় বলল,
—আমি জানি।
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি ভয় পাচ্ছ?
তুলি বলল,
—হ্যাঁ।
—তবুও যাবে?
—হ্যাঁ।
আকাশ কিছু বলতে পারল না।
অমরেশ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, তাকে আটকানো সম্ভব নয়।
তিনি বললেন,
—তোমরা দুজনই সাবধানে থাকবে।
আকাশ বলল,
—আমি তুলিকে কিছু হতে দেব না।
তুলি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমাকে শুধু রক্ষা করবেন না। আমাকে আপনার পাশে থাকতে দেবেন।
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—ঠিক আছে।
রাত নামার আগেই তারা রায়বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
গাড়িতে তুলি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল,
—আপনি কি কখনো ভাবেননি, আপনার জীবন বদলাবে?
আকাশ বলল,
—না।
—এখন?
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এখন প্রতিদিন ভাবি।
—কেন?
—কারণ আমার জীবনে তুমি এসেছ।
তুলি মৃদু হেসে বলল,
—আপনি জানেন, আপনি অনেক কথা বলেন যখন ভয় পান?
আকাশ হেসে বলল,
—আমি ভয় পাই?
—হ্যাঁ।
—কিসের?
তুলি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমাকে হারানোর।
আকাশ কিছু বলল না।
তারপর ধীরে গাড়ি থামিয়ে দিল।
তুলি অবাক হয়ে বলল,
—কী হলো?
আকাশ তার দিকে তাকাল।
—তুমি ঠিক বলেছ।
—কী?
—আমি ভয় পাই।
—কিসের?
আকাশ তার হাত ধরল।
—তোমাকে হারানোর।
তুলি কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে মাথা রাখল আকাশের কাঁধে।
আকাশও তার হাত ধরে রইল।
কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
শুধু দুজন মানুষের নীরব অনুভূতি।
কিছুক্ষণ পর তুলি বলল,
—আপনি যদি সত্যিই এই জীবন ছেড়ে দেন?
—তাহলে?
—তাহলে আমি আপনার সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করব।
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—তুমি জানো না, এই কথাটা আমার কতটা দরকার ছিল।
তুলি বলল,
—আমি জানি।
হঠাৎ আকাশের ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
সে ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠ বলল,
—আকাশ, তুই যদি সত্যিটা জানতে চাস, তাহলে পুরোনো নদীর ঘাটে আয়।
আকাশ বলল,
—কে?
—যে মানুষটা তোর বাবার শেষ রাতটা নিজের চোখে দেখেছিল।
ফোন কেটে গেল।
আকাশ স্থির হয়ে বসে রইল।
তুলি জিজ্ঞেস করল,
—কে ছিল?
আকাশ বলল,
—আমার বাবার মৃত্যুর সাক্ষী।
তুলি বলল,
—তাহলে আমাদের সেখানে যেতে হবে।
আকাশ মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল।
রাত তখন প্রায় বারোটা।
নদীর ঘাটটা একেবারে নির্জন। দূরে কয়েকটা নৌকা বাঁধা, বাতাসে পানির গন্ধ। চারপাশে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ আর নদীর ঢেউ।
আকাশ গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ চারদিকে তাকাল।
তুলি ধীরে বলল,
—লোকটা কোথায়?
—জানি না।
—আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—আজকাল তুমি আমার সবকিছু বুঝে ফেলো।
তুলি বলল,
—আপনার চোখে লেখা থাকে।
আকাশ তার দিকে তাকাল।
—আর তোমার চোখে?
তুলি একটু হেসে বলল,
—সেটা আপনাকেই পড়তে হবে।
আকাশ কিছু বলল না। শুধু তার হাতটা ধরে গাড়ি থেকে নামল।
দুজন নদীর ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল।
হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল,
—আকাশ?
আকাশ থেমে গেল।
একজন মধ্যবয়সী মানুষ ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল।
তার মুখে বয়সের ছাপ, চোখে ভয়।
আকাশ বলল,
—আপনি কি আমাকে ফোন করেছিলেন?
লোকটি মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তোমার বাবার শেষ রাত আমি নিজের চোখে দেখেছি।
আকাশের বুক কেঁপে উঠল।
—কী হয়েছিল?
লোকটি চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—এখানে বেশি সময় থাকা যাবে না।
—তাহলে বলুন।
লোকটি ধীরে বলল,
—তোমার বাবা বুঝতে পেরেছিলেন, পুরোনো প্রত্নবস্তু পাচারের পেছনে কারা আছে। তিনি প্রমাণ জোগাড় করেছিলেন।
আকাশ বলল,
—তারপর?
—তাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
তুলি নিঃশব্দে আকাশের হাত চেপে ধরল।
লোকটি বলল,
—কিন্তু তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগে একটা জিনিস আমাকে দিয়েছিলেন।
সে পকেট থেকে ছোট একটা ধাতব বাক্স বের করল।
আকাশ বাক্সটা হাতে নিল।
—এর ভেতরে কী?
—সব উত্তর।
আকাশ বাক্স খুলল।
ভেতরে ছিল কয়েকটা পুরোনো ছবি, কিছু কাগজ আর একটা ছোট পেনড্রাইভ।
আকাশ ছবিগুলো দেখতে শুরু করল।
একটা ছবিতে তার বাবা কয়েকজন মানুষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।
আর তাদের একজনকে দেখে আকাশের চোখ স্থির হয়ে গেল।
—এটা...
তুলি ছবির দিকে তাকাল।
—কে?
আকাশ ধীরে বলল,
—মাহবুব সাহেব।
তুলি অবাক হয়ে গেল।
মাহবুব সাহেব ছিলেন এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। বহু বছর ধরে রায়বাড়ির সঙ্গে তার পরিচয়।
আকাশ বলল,
—তাহলে তিনিই সবকিছুর পেছনে?
লোকটি বলল,
—শুধু তিনি নন।
আকাশ তাকাল।
—আর কে?
লোকটি কিছু বলার আগেই দূর থেকে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—ওরা আমাকে অনুসরণ করেছে!
আকাশ সঙ্গে সঙ্গে তুলিকে নিজের পেছনে নিল।
—তুমি পেছনে থাকবে।
তুলি বলল,
—না, এবার একসঙ্গে থাকব।
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
—ঠিক আছে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কয়েকজন লোক ঘাটে এসে দাঁড়াল।
তাদের সামনে রাকিব।
রাকিব হেসে বলল,
—আমি জানতাম, তুই এখানে আসবি।
আকাশ বলল,
—তুই আমাকে অনুসরণ করেছিস?
—তোর অভ্যাসগুলো আমি তোর চেয়েও ভালো জানি।
আকাশ বলল,
—এবার সব শেষ।
রাকিব বলল,
—শেষ? এখনও তো শুরু হয়নি।
সে লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল,
—ওকে আমাদের হাতে তুলে দে।
আকাশ বলল,
—না।
—তাহলে তোর সঙ্গে তুলিকেও নিয়ে যাব।
তুলি এবার সামনে এসে বলল,
—আপনারা যা করছেন, তার প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
আকাশ বুঝতে পারল, সে কথাটা শুনে রাকিব সত্যিই চিন্তিত হয়েছে।
সে পেনড্রাইভটা পকেটে রেখে বলল,
—সব প্রমাণ ইতিমধ্যে নিরাপদ জায়গায় পাঠানো হয়েছে।
রাকিব এগিয়ে এল।
—তুই সত্যিই আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেছিস।
আকাশ শান্ত গলায় বলল,
—হ্যাঁ।
—এই মেয়েটার জন্য?
আকাশ তুলির দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
—শুধু ওর জন্য নয়। নিজের জন্যও।
রাকিব কিছু বলার আগেই পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।
সবাই চমকে উঠল।
রাকিব আকাশের দিকে তাকাল।
—তুই পুলিশকে খবর দিয়েছিস?
আকাশ বলল,
—হ্যাঁ।
রাকিব পালানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু পুলিশ চারদিক ঘিরে ফেলেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাকিব ও তার সঙ্গে থাকা লোকজন গ্রেপ্তার হলো।
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তুলি তার পাশে এসে দাঁড়াল।
—সব শেষ?
আকাশ মাথা নাড়ল।
—না। সবচেয়ে বড় সত্যিটা এখনো বাকি।
সে পেনড্রাইভটা পুলিশের হাতে তুলে দিল।
পরের কয়েকদিনে তদন্ত শুরু হলো।
পুরোনো নথি, ছবি আর পেনড্রাইভের তথ্য মিলিয়ে একটা ভয়ংকর সত্যি সামনে এল।
মাহবুব সাহেব বহু বছর ধরে ঐতিহাসিক নিদর্শন পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
আকাশের বাবা বিষয়টি জানতে পেরে প্রমাণ সংগ্রহ করছিলেন।
আর সেই সময়ই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু আরও বড় সত্যি ছিল—
আকাশের বাবাকে সরানোর পর আকাশকে নিজের দলে টেনে নিয়েছিল মাহবুবের লোকেরাই।
তারা আকাশের দুর্বল সময়কে কাজে লাগিয়ে তাকে অপরাধের জগতে নিয়ে যায়।
অর্থাৎ আকাশ যে জীবনে এত বছর কাটিয়েছে, তার পেছনেও ছিল সেই একই চক্র।
আকাশ খবরটা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তুলি পাশে এসে বসে বলল,
—আপনি ঠিক আছেন?
আকাশ ধীরে বলল,
—আমি এত বছর ভেবেছি, আমার জীবনটা আমার নিজের সিদ্ধান্ত।
তুলি তার হাত ধরল।
—কিন্তু আপনি এখন নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
আকাশ তার দিকে তাকাল।
—তুমি কি জানো, তুমি আমার জীবনে কী করেছ?
তুলি মৃদু হাসল।
—কী?
—তুমি আমাকে প্রথমবার বুঝিয়েছ, আমি আমার অতীত নই।
তুলির চোখে জল চলে এল।
—আপনি চাইলে নতুন করে শুরু করতে পারেন।
আকাশ তার হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,
—আমি একটা কথা প্রতিশ্রুতি দিতে চাই।
—কী?
—আর কখনো তোমার কাছে কিছু লুকাব না।
তুলি বলল,
—আমিও একটা কথা বলব।
—কী?
—আপনি যদি সত্যিই বদলে যান, তাহলে আপনার অতীত নিয়ে আমি আর আপনাকে বিচার করব না।
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে কি আমাকে ক্ষমা করেছ?
তুলি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—পুরোপুরি না।
আকাশের মুখ একটু মলিন হলো।
তুলি হেসে বলল,
—বাকি জীবনটা পাশে থাকলে হয়তো করে দেব।
আকাশও হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে রইল।
তারপর তুলি ধীরে বলল,
—আকাশ?
—হুম?
—আপনি কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসেন?
আকাশ তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোমাকে ভালোবাসি বললে কম বলা হবে।
—তাহলে?
—তুমি আমার সেই মানুষ, যার কাছে ফিরে আসতে চাই। প্রতিদিন। যতদিন বেঁচে থাকি।
তুলি মাথা নিচু করে হাসল।
আকাশ তার হাত ধরে বলল,
—তুলি, আমার জীবনে অনেক অন্ধকার ছিল। কিন্তু তুমি আমাকে আলো দেখতে শিখিয়েছ।
তুলি ধীরে বলল,
—আর আপনি আমাকে শিখিয়েছেন, মানুষ ভুল করলেও বদলাতে পারে।
দুজনের চোখে তখন শান্তি।
কিন্তু গল্পের শেষ সত্যিটা তখনও পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি।
মাহবুব সাহেব গ্রেপ্তার হওয়ার আগে পুলিশকে একটা কথা বলেছিলেন—
“আকাশের গল্প তোমরা অর্ধেকই জানো।”
মাহবুব সাহেব গ্রেপ্তার হওয়ার পর কয়েকদিন কেটে গেছে।
তবুও আকাশের মনে শান্তি আসছিল না।
পুলিশের তদন্তে অনেক সত্যি সামনে এসেছে। পুরোনো প্রত্নবস্তু পাচারের বিশাল চক্র ধরা পড়েছে। রাকিবসহ দলের বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে।
কিন্তু মাহবুব সাহেবের শেষ কথাটা আকাশের মাথা থেকে যাচ্ছিল না—
“আকাশের গল্প তোমরা অর্ধেকই জানো।”
এক সন্ধ্যায় আকাশ রায়বাড়ির বাগানে একা বসে ছিল।
তুলি ধীরে ধীরে এসে তার পাশে বসল।
—এত চুপ করে আছেন কেন?
আকাশ মৃদু হাসল।
—ভাবছি।
—কী?
—বাবার কথা।
তুলি কিছু বলল না।
আকাশ পকেট থেকে সেই পুরোনো চিঠিটা বের করল।
—আমার বাবা মৃত্যুর আগে এই চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু মনে হচ্ছে, তিনি আরও কিছু রেখে গিয়েছিলেন।
তুলি বলল,
—আপনি কি খুঁজতে চান?
—হ্যাঁ।
—তাহলে খুঁজব।
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—তুমি সবসময় আমার সঙ্গে থাকবে?
তুলি বলল,
—আপনি যদি আবার আমাকে বাদ দিয়ে একা সবকিছু করতে যান, তাহলে কিন্তু রাগ করব।
আকাশ হেসে ফেলল।
—ঠিক আছে।
দুজন মিলে চিঠিটা আবার পড়তে শুরু করল।
চিঠির একদম শেষ লাইনে লেখা ছিল—
“যদি কখনো আমার সত্যি জানতে চাও, সেই জায়গায় ফিরে যেও যেখানে আমি তোমাকে প্রথমবার নিয়ে গিয়েছিলাম।”
আকাশ হঠাৎ থেমে গেল।
—প্রথমবার...
তুলি বলল,
—আপনার বাবার সঙ্গে?
—হ্যাঁ।
কিছুক্ষণ পর আকাশের মনে পড়ল।
ছোটবেলায় তার বাবা তাকে একটা পুরোনো পাহাড়ি বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। জায়গাটা বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত।
পরদিন সকালেই আকাশ ও তুলি সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
পাহাড়ের ছোট্ট শহরটায় পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল।
চারদিকে সবুজ পাহাড়, সরু রাস্তা আর ঠান্ডা বাতাস।
পুরোনো বাড়িটা পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে ছিল।
আকাশ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার চোখে শৈশবের স্মৃতি ভেসে উঠল।
—আমি ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে এখানে এসেছিলাম।
তুলি বলল,
—আপনার কি কিছু মনে পড়ছে?
—অনেক কিছু।
আকাশ ধীরে ঘরের ভেতর ঢুকল।
পুরোনো আসবাবপত্র এখনো সেখানে পড়ে আছে।
একটা কাঠের টেবিল দেখে আকাশ থেমে গেল।
—বাবা এখানে বসে কাজ করতেন।
সে টেবিলের ড্রয়ার খুলতে শুরু করল।
প্রথম দুটো ড্রয়ার খালি।
তৃতীয়টায় কিছু পুরোনো কাগজ।
আর শেষ ড্রয়ারে একটা ছোট বাক্স।
আকাশ বাক্সটা খুলল।
ভেতরে একটা ছবি।
ছবিতে ছোট্ট আকাশ তার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে।
তুলির মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—আপনি তখন অনেক ছোট ছিলেন।
আকাশও হাসল।
—হ্যাঁ।
ছবির পেছনে কিছু লেখা ছিল।
আকাশ পড়ে বলল,
—“আমার ছেলে যেন কখনো আমার মতো একা না হয়।”
তার চোখ ভিজে উঠল।
তুলি চুপ করে তার পাশে দাঁড়াল।
আকাশ বলল,
—আমি বাবাকে এতদিন ভুল বুঝেছি।
তুলি বলল,
—আপনি তাকে হারিয়েছেন। তাই হয়তো রাগ ছিল।
আকাশ মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
তারপর বাক্সের নিচে আরেকটা কাগজ পাওয়া গেল।
সেখানে লেখা ছিল—
“আকাশ, যদি তুমি এই চিঠি পাও, তাহলে জেনে রেখো—তোমাকে আমি কখনো অপরাধীর জীবন বেছে নিতে চাইনি। যারা তোমাকে আমার মৃত্যুর পর নিজেদের দলে টানবে, তাদের বিশ্বাস করো না। তুমি তাদের চেয়ে অনেক ভালো জীবন পাওয়ার যোগ্য।”
আকাশ চোখ বন্ধ করল।
তার চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
তুলি তার পাশে এসে দাঁড়াল।
আকাশ ধীরে বলল,
—বাবা আমাকে শেষবারও বিশ্বাস করেছিলেন।
তুলি বলল,
—আর এখন আপনাকেও নিজেকে বিশ্বাস করতে হবে।
আকাশ তার দিকে তাকাল।
—তুমি কীভাবে এত শক্ত হও?
তুলি মৃদু হেসে বলল,
—আপনার জন্য।
আকাশ ধীরে তার হাত ধরল।
—আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।
—কী?
—আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাটা হলো তোমার সঙ্গে দেখা হওয়া।
তুলি লজ্জায় চোখ নামিয়ে বলল,
—আমারও।
আকাশ বলল,
—আমি জানি, তোমার বিশ্বাস একদিনে পুরোপুরি ফিরে আসবে না।
—হয়তো।
—তবুও আমি অপেক্ষা করব।
তুলি তার দিকে তাকাল।
—কতদিন?
আকাশ মৃদু হাসল।
—যতদিন লাগে।
তুলি ধীরে তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
—তাহলে আপনাকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হবে না।
আকাশ অবাক হয়ে তাকাল।
তুলি হাসল।
—কারণ আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।
আকাশ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
তারপর আবেগে তুলিকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল।
তুলি তার কাঁধে মাথা রাখল।
কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না।
শুধু দীর্ঘদিনের কষ্টের পর দুজন মানুষের কাছে ফিরে আসা।
আকাশ আস্তে বলল,
—তুমি জানো, আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম তোমাকে হারানোর?
তুলি বলল,
—এখন আর ভয় পাবেন না।
—কেন?
—কারণ এবার আমি নিজে থেকে আপনার পাশে আছি।
আকাশ মৃদু হাসল।
—সারাজীবন?
তুলি চোখ তুলে তাকাল।
—সারাজীবন।
কয়েক মাস পরে সবকিছু বদলে গেল।
মাহবুবের চক্রের বিরুদ্ধে মামলা চলতে লাগল।
আকাশ পুলিশের কাছে নিজের অতীতের সব তথ্য দিয়ে তদন্তে সাহায্য করল। তার অপরাধের জন্যও তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হলো। তবে তার সহযোগিতার কারণে অনেক পুরোনো অপরাধের রহস্য উদঘাটন হলো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল—আকাশ আর অপরাধের জীবন বেছে নিল না।
সে নিজের বাবার অসমাপ্ত কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিল।
একটি ঐতিহাসিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করল।
তুলি নিজের পড়াশোনা শেষ করে পুরোনো স্থাপত্য ও ইতিহাস নিয়ে কাজ শুরু করল।
তাদের জীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠল।
একদিন রায়বাড়ির বাগানে বসে তুলি বলল,
—মনে আছে, প্রথম দিন আপনি বলেছিলেন, পুরোনো জিনিসের মধ্যে অনেক গল্প লুকিয়ে থাকে?
আকাশ হেসে বলল,
—মনে আছে।
—আমাদের গল্পটাও তো পুরোনো হয়ে যাচ্ছে।
—তাহলে নতুন গল্প শুরু করি।
তুলি তাকাল।
আকাশ বলল,
—যেখানে কোনো মিথ্যা থাকবে না। কোনো ভয় থাকবে না। শুধু আমরা দুজন।
তুলি মৃদু হেসে বলল,
—শর্ত আছে।
—কী?
—আপনি আর কখনো আমাকে কিছু লুকাবেন না।
—কখনো না।
—আর?
—আর কী?
তুলি বলল,
—যদি কখনো আমি রাগ করি, আমাকে হাসাবেন।
আকাশ হেসে বলল,
—এটা তো সহজ।
তুলি বলল,
—আর যদি আমি কাঁদি?
আকাশ একটু নরম হয়ে বলল,
—তাহলে তোমার চোখের জল শুকানো পর্যন্ত পাশে থাকব।
তুলি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে বাগানের ওপর ছড়িয়ে পড়ছিল।
আকাশ তুলির হাত ধরল।
একসময় যে হাত ছিল অপরাধের জীবনের অংশীদার, সেই হাত এখন একজন মানুষের বিশ্বাস ধরে রেখেছে।
আকাশ ধীরে বলল,
—তুলি, আমার জীবনে অনেক অন্ধকার ছিল।
তুলি বলল,
—কিন্তু এখন?
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এখন আমার ভোর হয়েছে।
তুলি মাথা রাখল তার কাঁধে।
দূরে পাখিরা বাসায় ফিরছিল।
রায়বাড়ির পুরোনো দেয়ালে শেষ সূর্যের আলো পড়ছিল।
আর সেই আলোয় আকাশ বুঝতে পারল—
জীবনে মানুষ যত ভুলই করুক, সত্যিকারের অনুতাপ আর নতুন করে বাঁচার সাহস থাকলে পথ বদলানো সম্ভব।
তুলি তার পাশে ছিল।
আর এইবার আকাশ কোথাও যাচ্ছিল না।
কারণ তার দীর্ঘ অন্ধকার জীবনের শেষে সে খুঁজে পেয়েছিল নিজের ঘর—তুলির কাছে।
....