হিমেল খুব সাধারণ পরিবারের ছেলে। বাবা ছোট একটা কাপড়ের দোকান চালাতেন। মা সংসার সামলাতেন। হিমেল কলেজে পড়ার পাশাপাশি বাবাকে দোকানের কাজে সাহায্য করত।
হিমেলের জীবনে খুব বেশি চাওয়া ছিল না। ভালো একটা চাকরি করবে, বাবা-মাকে নিয়ে শান্তিতে থাকবে—এই ছিল তার স্বপ্ন।
কিন্তু একটা মানুষ তার সেই সাধারণ জীবনে অন্যরকম একটা রঙ এনে দিয়েছিল।
তার নাম কবিতা।
কবিতার সঙ্গে হিমেলের পরিচয় হয়েছিল স্কুলজীবনে। একই স্কুলে পড়ত তারা। প্রথমে শুধু পরিচিত ছিল। পরে বন্ধুত্ব হলো। আর হিমেল কখন যে বন্ধুত্বের আড়ালে কবিতাকে ভালোবেসে ফেলেছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
কবিতা ছিল শান্ত স্বভাবের মেয়ে। খুব বেশি কথা বলত না। কিন্তু হাসলে তার পুরো মুখ বদলে যেত।
হিমেল সেই হাসিটা খুব পছন্দ করত।
একদিন স্কুল ছুটির পর প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল। সবাই দৌড়ে বাড়ি চলে গেল। কবিতা স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
হিমেল নিজের ছাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
—তুমি এটা নিয়ে যাও।
কবিতা অবাক হয়ে তাকাল।
—আর তুমি?
—আমি দৌড়ে চলে যাব।
—বৃষ্টি তো অনেক।
—আমি বৃষ্টিতে ভিজতে পারি।
কবিতা মৃদু হেসে বলেছিল,
—তুমি খুব অদ্ভুত।
সেদিন কবিতা ছাতা নিয়ে চলে গিয়েছিল। হিমেল সত্যিই বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরেছিল।
সেই ছোট্ট ঘটনাটাই হিমেলের কাছে অনেক বড় স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল।
সময় এগিয়ে গেল।
স্কুল শেষ হলো। তারা একই কলেজে ভর্তি হলো না। হিমেল শহরের কলেজেই রয়ে গেল, আর কবিতা ঢাকার একটি ভালো কলেজে ভর্তি হলো।
কবিতা চলে যাওয়ার দিন বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে হিমেলের বুকটা অদ্ভুতভাবে ভারী হয়ে গিয়েছিল।
কবিতা বলেছিল,
—মাঝে মাঝে ফোন করব।
হিমেল হাসতে হাসতে বলেছিল,
—মাঝে মাঝে কেন? প্রতিদিন করবে।
কবিতা মাথা নাড়িয়ে বলেছিল,
—দেখা যাক।
বাস চলে গেল।
হিমেল অনেকক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
সেদিন সে প্রথম বুঝেছিল, কাউকে খুব কাছে থেকে হারানোর ভয় কেমন।
এরপর কবিতা ঢাকায় পড়াশোনা শুরু করল। প্রথম কয়েক মাস নিয়মিত কথা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে কথাবার্তা কমতে লাগল।
হিমেল বুঝতে পারত না কেন।
এক রাতে সে ফোন করেছিল।
—কী করছ?
—পড়ছি।
—অনেক ব্যস্ত?
—হ্যাঁ। নতুন জায়গা, নতুন বন্ধু, ক্লাস... সব মিলিয়ে অনেক কিছু।
হিমেল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—আমাকে ভুলে যেও না।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর কবিতা হেসে বলেছিল,
—তুমি আবার এসব বলছ কেন?
হিমেল উত্তর দেয়নি।
কারণ সে জানত, তার কথার মধ্যে বন্ধুত্বের চেয়ে অনেক বেশি কিছু লুকিয়ে আছে।
কিন্তু কবিতা সেটা বুঝেছিল কি না, হিমেল জানত না।
কয়েক মাস পর কবিতা ছুটিতে বাড়ি এল।
হিমেল তাকে দেখতে গেল।
নদীর পাড়ে বসে দুজন অনেকক্ষণ কথা বলল।
হিমেল বারবার একটা কথা বলতে চেয়েও বলতে পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত সাহস করে বলল,
—কবিতা, তোমাকে একটা কথা বলব?
—বলো।
—তুমি কি কখনো ভেবেছ... আমরা শুধু বন্ধু নই?
কবিতা চুপ করে গেল।
হিমেলের বুক ধক করে উঠল।
সে বলল,
—আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে ভালোবাসি।
কবিতা নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর ধীরে বলল,
—হিমেল, তুমি আমার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু...
হিমেল বুঝে গেল।
—কিন্তু তুমি আমাকে সেভাবে দেখো না?
কবিতা মাথা নিচু করে বলল,
—না।
সেদিন নদীর পানি খুব শান্ত ছিল।
কিন্তু হিমেলের ভেতরে যেন সবকিছু ভেঙে পড়েছিল।
তবুও সে হাসল।
—ঠিক আছে। তোমার সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান করি।
কবিতা বলল,
—তুমি রাগ করেছ?
—না।
—কষ্ট পেয়েছ?
হিমেল নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
—কিছু কষ্ট কাউকে বলা যায় না।
কবিতা আর কিছু বলল না।
সেদিন বাড়ি ফেরার সময় হিমেল একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
সে কবিতাকে হারাবে না।
যদিও কবিতা তাকে ভালোবাসে না, তবুও সে একদিন কবিতাকে নিজের করে নেবে—এই বিশ্বাস তার মনে গেঁথে গেল।
কবিতা আবার ঢাকায় ফিরে গেল।
হিমেল নিজের পড়াশোনা আর বাবার দোকানের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু কবিতাকে ভুলতে পারল না।
সে নিয়মিত কবিতাকে ফোন করত।
কবিতা কখনো কথা বলত, কখনো ব্যস্ততার অজুহাতে ফোন কেটে দিত।
একদিন কবিতা নিজেই ফোন করল।
—হিমেল, একটা খবর আছে।
—কী খবর?
—আমার একটা নতুন বন্ধু হয়েছে।
হিমেল হেসে বলল,
—ছেলে না মেয়ে?
—ছেলে।
হিমেলের মুখের হাসি একটু থেমে গেল।
—নাম কী?
—জিশান।
নামটা হিমেলের মনে গেঁথে গেল।
কবিতা বলল,
—ও খুব ভালো ছেলে। আমাদের একই বিভাগে পড়ে। অনেক সাহায্য করে।
হিমেল স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
—ভালো তো।
—তুমি ওকে নিয়ে এমন চুপ হয়ে গেলে কেন?
—না, কিছু না।
কিন্তু সেদিন রাতে হিমেলের ঘুম হলো না।
সে বারবার ভাবতে লাগল, জিশান কেমন দেখতে? কবিতার সঙ্গে কতটা কথা বলে? কবিতা কি তাকে পছন্দ করে?
কয়েক সপ্তাহ পর কবিতা বাড়িতে এল।
হিমেল তাকে দেখতে গিয়ে প্রথমবার জিশানকে দেখল।
জিশান কবিতার সঙ্গে এসেছিল।
ছেলেটা শান্ত, ভদ্র এবং আত্মবিশ্বাসী। সবার সঙ্গে সহজভাবে কথা বলছিল।
কবিতার বাবা-মাও তাকে পছন্দ করলেন।
হিমেল দূর থেকে সব দেখছিল।
একসময় জিশান হিমেলের কাছে এসে বলল,
—আপনিই হিমেল?
হিমেল অবাক হলো।
—হ্যাঁ।
জিশান হাত বাড়িয়ে বলল,
—কবিতার মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি।
হিমেল হাত মিলিয়ে বলল,
—আমিও আপনার কথা শুনেছি।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
সেই মুহূর্তে হিমেলের মনে অদ্ভুত একটা ভয় জন্ম নিল।
জিশান শুধু কবিতার বন্ধু নয়—হিমেল সেটা বুঝতে পারছিল।
সন্ধ্যায় কবিতা নদীর পাড়ে গেল। হিমেলও সেখানে ছিল।
কবিতা বলল,
—তুমি জিশানকে পছন্দ করোনি, তাই না?
—কেন?
—তোমার মুখ দেখেই বোঝা যায়।
হিমেল হেসে বলল,
—ও ভালো ছেলে।
—তাহলে সমস্যা কী?
—কোনো সমস্যা নেই।
কবিতা চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—জিশান আমাকে বিয়ের কথা বলেছে।
হিমেল যেন কথাটা শুনে জমে গেল।
—তুমি কী বলেছ?
—আমি কিছু বলিনি।
—তুমি কি ওকে ভালোবাসো?
কবিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—জানি না। তবে ওকে আমার ভালো লাগে।
হিমেলের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে বলল,
—তাহলে ভেবে দেখো।
কবিতা অবাক হয়ে তাকাল।
—তুমি এত সহজে বলছ?
হিমেল বলল,
—তুমি যাকে ভালোবাসবে, আমি চাই সে তোমাকে ভালো রাখুক।
কবিতা মৃদু হেসে বলল,
—তুমি সত্যিই ভালো বন্ধু।
হিমেলও হাসল।
কিন্তু কবিতা চলে যাওয়ার পর সে নদীর পাড়ে একা বসে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, সে কবিতাকে হারাচ্ছে।
এবার সত্যিই হারাচ্ছে।
পরদিন থেকেই হিমেলের আচরণ বদলে গেল।
সে কবিতাকে বোঝাতে শুরু করল যে জিশান তাকে সুখী করতে পারবে না।
কবিতা বলল,
—তুমি কেন এসব বলছ?
—কারণ আমি তোমাকে চিনি।
—আর জিশানকে?
—আমি ওকেও চিনেছি।
কবিতা বিরক্ত হয়ে বলল,
—তুমি কি আমার ভালো চাও, নাকি আমাকে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে চাও?
হিমেল চুপ হয়ে গেল।
কবিতার কথাটা তার মনে লাগল।
তবুও সে থামল না।
একদিন সে জিশানের সঙ্গে দেখা করল।
—তুমি কবিতাকে সত্যিই ভালোবাসো?
জিশান বলল,
—হ্যাঁ।
—তাহলে একটা কথা মনে রেখো। কবিতা খুব সহজে বিশ্বাস করে। ওকে কষ্ট দিও না।
জিশান শান্তভাবে বলল,
—আমি ওকে কষ্ট দিতে চাই না। আর একটা কথা আপনাকেও বলি—কবিতার সিদ্ধান্তকে সম্মান করবেন।
হিমেল কোনো উত্তর দিল না।
জিশান চলে যাওয়ার পর হিমেলের মনে হলো, সে যেন নিজের জায়গাটা হারিয়ে ফেলছে।
কবিতা এখন জিশানের সঙ্গে কথা বললে হাসে।
হিমেলের সঙ্গে কথা বললে শুধু বন্ধুত্বের কথা বলে।
এক রাতে হিমেল কবিতাকে ফোন করল।
—তুমি কি জিশানকে বিয়ে করবে?
কবিতা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—সম্ভবত।
হিমেল চোখ বন্ধ করল।
তারপর বলল,
—তাহলে আমি কী করব?
কবিতা নরম গলায় বলল,
—তুমি নিজের জীবনটা বাঁচবে।
হিমেল হাসল।
—তোমাকে ছাড়া?
—হিমেল...
—ঠিক আছে। আর কিছু বলব না।
ফোন কেটে দিল সে।
হিমেল ঠিক করল, সে কবিতা আর জিশানের সম্পর্ক ভেঙে দেবে।
প্রথমে সে শুধু ছোট ছোট সন্দেহ তৈরি করতে লাগল।
কবিতাকে বলল,
—জিশানকে আজ একটা মেয়ের সঙ্গে দেখেছি।
কবিতা বলল,
—কোন মেয়ের সঙ্গে?
—জানি না।
—তাহলে আমাকে বলছ কেন?
—তোমার সাবধান থাকা উচিত।
কবিতা কিছু বলল না।
পরদিন জিশানকে বলল,
—তুমি কি কারও সঙ্গে দেখা করেছিলে?
জিশান বুঝতে পারল, হিমেল কিছু বলেছে।
সে কবিতাকে সত্যিটা জানাল।
—ওটা আমার এক সহপাঠী ছিল। একটা প্রজেক্টের কাজ ছিল।
কবিতা বিষয়টা মেনে নিল।
হিমেল আরও চেষ্টা করল।
কখনো জিশানের পরিবারের ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি করল, কখনো তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় দেখাল।
কিন্তু জিশান আর কবিতার সম্পর্ক তত সহজে ভাঙল না।
বরং একদিন কবিতা হিমেলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—তুমি কেন এসব করছ?
হিমেল বলল,
—আমি তোমার ভালো চাই।
—না। তুমি আমাকে নিজের মতো করে চাইছ।
—আমি তোমাকে ভালোবাসি।
—কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি না।
হিমেল চুপ।
কবিতা বলল,
—তুমি আমার না পাওয়াটাকে মেনে নিতে পারছ না।
হিমেল রাগ করে বলল,
—আমি এত বছর ধরে তোমার জন্য ছিলাম। আর তুমি একজন নতুন মানুষকে বিশ্বাস করে আমাকে ভুলে গেলে?
কবিতার চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
—আমি তোমাকে কখনো ভুলে যাইনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোমাকে আমার জীবনসঙ্গী হতে হবে।
হিমেল কোনো উত্তর দিল না।
কবিতা চলে গেল।
সেদিন রাতে হিমেল নিজের কাজের কথা ভাবল।
সে বুঝতে পারল, সে ভুল করছে।
কিন্তু তার অহংকার তাকে থামতে দিল না।
কিছুদিন পর জিশান ও কবিতার বিয়ের কথা প্রায় ঠিক হয়ে গেল।
হিমেল খবরটা শুনে ভেঙে পড়ল।
সে কবিতার বাবার সঙ্গে দেখা করল।
—চাচা, আপনি কি নিশ্চিত জিশান কবিতার জন্য ঠিক ছেলে?
কবিতার বাবা অবাক হয়ে বললেন,
—তুমি কেন এসব বলছ?
হিমেল কিছু কথা বলল জিশানের বিরুদ্ধে।
কিন্তু কবিতার বাবা তাকে থামিয়ে দিলেন।
—হিমেল, তুমি কবিতাকে ভালোবাসো, সেটা আমি জানি। কিন্তু ভালোবাসার নামে অন্য কারও বিরুদ্ধে কথা বলা ঠিক নয়।
হিমেল মাথা নিচু করল।
—আমি শুধু ওকে হারাতে চাই না।
—কাউকে ধরে রাখার জন্য নিজের ভালোবাসাকে প্রমাণ করতে হয় না। বরং কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়াটাই সত্যিকারের ভালোবাসা।
হিমেল কিছু বলল না।
বাড়ি ফেরার পথে তার মনে হলো, সবাই তাকে ভুল বুঝছে।
সে তো শুধু কবিতাকে চেয়েছে।
তবে কি এত চাওয়াটাই ভুল?
অন্যদিকে জিশানও সবকিছু বুঝতে পারছিল।
সে একদিন হিমেলের সঙ্গে দেখা করল।
—আপনি আমাকে অপছন্দ করেন?
হিমেল বলল,
—হ্যাঁ।
—কারণ আমি কবিতাকে ভালোবাসি?
—হ্যাঁ।
জিশান শান্তভাবে বলল,
—আমি আপনার জায়গাটা বুঝতে পারি।
হিমেল অবাক হলো।
—কীভাবে?
—আপনি অনেকদিন ধরে কবিতাকে ভালোবাসেন। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, কবিতা কোনো পুরস্কার নয় যে কে আগে ভালোবেসেছে সে পাবে।
হিমেল রেগে গেল।
—আপনি আমাকে শিক্ষা দিতে এসেছেন?
—না। শুধু চাই, কবিতাকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন।
হিমেল চলে গেল।
কিন্তু জিশানের কথাগুলো তার মাথায় ঘুরতে থাকল।
সেদিন রাতে হিমেল প্রথমবার নিজের কাছে স্বীকার করল—
সে কবিতাকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু তার ভালোবাসার মধ্যে নিজের অধিকারবোধও মিশে গেছে।
তবুও সে পুরোপুরি বদলাতে পারল না।
কারণ কবিতার বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, তার ভয় তত বাড়ছিল।
একদিন সে জানতে পারল, জিশানকে নিয়ে কবিতা ঢাকায় ফিরে যাচ্ছে।
হিমেল তখন একটা শেষ সিদ্ধান্ত নিল।
সে কবিতাকে শেষবারের মতো নিজের মনের কথা বলবে।
সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে কবিতাকে একা পেল হিমেল।
কবিতা অবাক হয়ে বলল,
—তুমি এখানে?
হিমেল বলল,
—তোমার সঙ্গে কথা আছে।
—বলো।
হিমেল অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তুমি কি সত্যিই জিশানকে বিয়ে করতে চাও?
—হ্যাঁ।
—আমাকে একবারও ভাবোনি?
কবিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—ভাবিনি বললে মিথ্যা হবে। তুমি আমার জীবনের অনেক পুরোনো মানুষ। তোমার জায়গা আলাদা।
—তাহলে আমাকে একটা সুযোগ দাও।
—কীসের সুযোগ?
—তোমাকে সুখী করার।
কবিতা মাথা নাড়ল।
—হিমেল, আমি তোমাকে সেইভাবে দেখি না।
—কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি।
—আমি জানি।
—তাহলে?
কবিতা ধীরে বলল,
—সব ভালোবাসার উত্তর ভালোবাসা হয় না।
হিমেল চুপ করে গেল।
কবিতা বলল,
—তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আমার সিদ্ধান্তটা মেনে নাও।
হিমেল নদীর দিকে তাকাল।
তার চোখে পানি এসে গিয়েছিল।
কবিতা সেটা দেখে বলল,
—তুমি কাঁদছ?
হিমেল হেসে বলল,
—না। চোখে পানি ঢুকেছে।
কবিতা কিছু বলল না।
হিমেল চলে গেল।
কিন্তু সে তখনও নিজের ভেতরের জেদটাকে পুরোপুরি হারাতে পারেনি।
পরদিন সে জিশানের সঙ্গে দেখা করল।
—তুমি কবিতাকে বিয়ে করছ?
—হ্যাঁ।
—তাহলে ওকে একটা কথা বলবে?
—কী?
—যদি কখনো ওকে কষ্ট দাও, আমি চুপ থাকব না।
জিশান বলল,
—আমি সেটা বুঝতে পারছি।
হিমেল বলল,
—আমি সিরিয়াস।
জিশান হেসে বলল,
—আমিও।
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর জিশান বলল,
—হিমেল ভাই, একটা কথা বলি?
—বলো।
—কবিতার প্রতি আপনার ভালোবাসা সত্যি। কিন্তু নিজের জীবনটাকেও একটু ভালোবাসুন।
হিমেল উত্তর দিল না।
জিশান চলে গেল।
কয়েকদিন পর বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো।
হিমেল বাড়িতে বসে সব খবর শুনছিল।
সে কাউকে কিছু বলত না।
তার মা বুঝতে পারছিলেন ছেলের ভেতরে কিছু একটা চলছে।
এক রাতে মা বললেন,
—কবিতার কথা ভাবছ?
হিমেল চমকে তাকাল।
—তুমি জানলে কীভাবে?
—মা হলে অনেক কিছু বুঝতে হয় না, অনুভব করতে হয়।
হিমেল মাথা নিচু করল।
মা বললেন,
—কাউকে ভালোবাসলে তাকে সুখী দেখতে হয়।
—যদি আমার সঙ্গে সুখী না হয়?
—তাহলে তাকে যে মানুষটা সুখী করতে পারে, তার জন্য দোয়া করতে হয়।
হিমেলের চোখ ভিজে গেল।
সে বলল,
—মা, এত সহজ?
—না। খুব কঠিন।
সেদিন রাতে হিমেল অনেকক্ষণ জেগে রইল।
সকালে সে সিদ্ধান্ত নিল, কবিতার বিয়েতে যাবে।
কিন্তু তার মনে তখনও একটা আশা ছিল।
হয়তো শেষ মুহূর্তে কিছু বদলে যাবে।
হয়তো কবিতা তাকে বেছে নেবে।
বিয়ের দিন কবিতাকে খুব সুন্দর লাগছিল।
বাড়িতে আলো, মানুষের ভিড়, হাসি-আনন্দ—সবকিছুর মাঝেও হিমেলের কাছে যেন সব শব্দ দূরে চলে গিয়েছিল।
সে এক কোণে দাঁড়িয়ে কবিতাকে দেখছিল।
কবিতা জিশানের সঙ্গে কথা বলছিল।
তার মুখে শান্ত হাসি।
হিমেলের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।
সে ভাবল, এই হাসিটা যদি তার জন্য হতো!
ঠিক তখন জিশান হিমেলের কাছে এল।
—আপনি এসেছেন, ভালো লাগল।
হিমেল বলল,
—তোমাকে একটা কথা বলব?
—বলো।
—ওকে ভালো রেখো।
জিশান বলল,
—চেষ্টা করব না। আমি ওকে ভালো রাখার জন্যই বিয়ে করছি।
হিমেল মৃদু হাসল।
—তুমি ভাগ্যবান।
জিশান কিছু বলল না।
বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই হঠাৎ একটা সমস্যা হলো।
কবিতার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করল।
ডাক্তার এসে বললেন, চিন্তার কিছু নেই, তবে তাকে বিশ্রাম দিতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে বিয়ের অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়ার কথা উঠল।
জিশান বলল,
—কবিতার বাবার শরীর ঠিক না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে হবে না।
কিন্তু কবিতার আত্মীয়রা বলল, এত আয়োজনের পর অনুষ্ঠান বাতিল করা ঠিক হবে না।
শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান সেদিনই হলো।
হিমেল সবকিছু দূর থেকে দেখল।
তার মনে হচ্ছিল, তার জীবনের একটা অধ্যায় তার চোখের সামনে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু বিয়ের পর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
জিশান হিমেলকে একপাশে ডেকে বলল,
—আমি কবিতাকে নিয়ে কিছুদিনের জন্য ঢাকায় যাচ্ছি। আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন।
হিমেল অবাক হলো।
—আমার খেয়াল রাখার কী আছে?
জিশান বলল,
—আপনি কবিতার খুব কাছের মানুষ ছিলেন। আমি চাই না আমার কারণে আপনার সঙ্গে ওর সম্পর্ক নষ্ট হোক।
হিমেল কিছু বলল না।
কবিতা এসে দাঁড়াল।
—হিমেল...
—হুম?
—ভালো থেকো।
এই দুই শব্দ হিমেলের কাছে শেষ বিদায়ের মতো মনে হলো।
সে হাসল।
—তুমিও।
জিশান আর কবিতা চলে গেল।
হিমেল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গাড়িটা দূরে মিলিয়ে যেতে দেখল।
তারপর সে বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে দিল।
সেদিন প্রথমবার সে বুঝল, ভালোবাসা শুধু কাউকে পাওয়ার নাম নয়।
কখনো কখনো ভালোবাসা মানে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে অন্য কারও সঙ্গে সুখী হতে দেখা।
পরদিন হিমেল বাবার দোকানে বসে গেল।
আগের চেয়ে বেশি কাজ করতে শুরু করল।
সে নিজের জীবন নতুন করে গুছানোর চেষ্টা করল।
কয়েক মাস কেটে গেল।
হিমেল ধীরে ধীরে বদলে গেল।
আগের মতো কবিতাকে ফোন করত না।
তার ছবি দেখত না।
তার খবর নেওয়ার জন্য অন্যদের কাছে প্রশ্ন করত না।
সে নিজের ব্যবসা বাড়ানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু একদিন রাতে হঠাৎ কবিতার ফোন এল।
হিমেল অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধরল।
—হ্যালো?
ওপাশে কবিতার কণ্ঠ কাঁপছিল।
—হিমেল, তুমি কি একটু কথা বলতে পারবে?
—হ্যাঁ।
—আমার তোমার সঙ্গে দেখা করা দরকার।
হিমেলের বুক ধক করে উঠল।
—কেন?
কবিতা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—জিশান আর আমি... সমস্যায় পড়েছি।
হিমেল চোখ বন্ধ করল।
তার পুরোনো অনুভূতিগুলো আবার ফিরে আসতে শুরু করল।
পরদিন কবিতা শহরে ফিরে এল।
হিমেলের সঙ্গে নদীর পাড়ে দেখা করল।
কবিতাকে আগের মতো লাগছিল না। তার চোখে ক্লান্তি।
হিমেল জিজ্ঞেস করল,
—কী হয়েছে?
কবিতা বলল,
—জিশান বদলে গেছে।
—কীভাবে?
—ওর রাজনৈতিক কাজ নিয়ে অনেক সমস্যা হয়েছে। সবসময় বাইরে থাকে। অনেক ঝামেলার মধ্যে থাকে। আমাদের মধ্যে কথাও কমে গেছে।
হিমেল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—তুমি কি ওকে এখনও ভালোবাসো?
কবিতা মাথা নিচু করল।
—জানি না।
হিমেল বলল,
—তাহলে আগে সেটা বুঝতে চেষ্টা করো।
কবিতা অবাক হয়ে তাকাল।
—তুমি আমাকে কোনো পরামর্শ দেবে না?
—দেব। কিন্তু তোমাকে জিশানের বিরুদ্ধে কিছু বলব না।
কবিতার চোখে বিস্ময়।
—তুমি বদলে গেছ।
হিমেল মৃদু হেসে বলল,
—মানুষকে বদলাতে সময় লাগে।
কবিতা বলল,
—আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।
—তুমি না।
—তাহলে কে?
—আমি নিজেই।
কবিতা চুপ করে গেল।
হিমেল বলল,
—তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি অনেক ভুল করেছি। তোমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করিনি। জিশানকে নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছি। এখন বুঝি, সেগুলো ভালোবাসা ছিল না, ভয় ছিল।
—কিসের ভয়?
—তোমাকে হারানোর ভয়।
কবিতার চোখে পানি চলে এল।
—তুমি কি আমাকে এখনও ভালোবাসো?
হিমেল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—ভালোবাসা সবসময় একই রকম থাকে না। কখনো মানুষকে কাছে পেতে চায়, কখনো দূর থেকে তার ভালো চায়।
কবিতা বলল,
—তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ?
—তোমার ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই।
সেদিন কবিতা অনেকক্ষণ হিমেলের সঙ্গে কথা বলল।
তারপর বাড়ি ফিরে গেল।
কিন্তু হিমেলের মনে একটা ভয় জন্ম নিল।
সে কি আবার কবিতাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করছে?
কয়েকদিন পর জিশান শহরে এল।
সে সরাসরি হিমেলের সঙ্গে দেখা করল।
—কবিতার সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে?
—হ্যাঁ।
জিশান বলল,
—ও অনেক কষ্ট পেয়েছে।
হিমেল বলল,
—তুমি কি ওকে ভালোবাসো?
জিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—হ্যাঁ। কিন্তু আমার জীবনটা এমন হয়ে গেছে যে ওকে সময় দিতে পারছি না।
—তাহলে কী করবে?
—জানি না।
হিমেল বলল,
—তাহলে কবিতাকে সত্যিটা বলো। ওকে আটকে রেখো না।
জিশান হিমেলের দিকে তাকাল।
—আপনি কি ওকে আবার ফিরে পেতে চান?
হিমেল কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—একসময় চাইতাম।
—এখন?
—এখন চাই, ও নিজের জন্য যেটা ভালো মনে করে সেটা করুক।
জিশান ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—আপনি সত্যিই বদলে গেছেন।
হিমেল মৃদু হাসল।
—দেরিতে।
কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ হলো না।
জিশানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বড় ধরনের ঝামেলা তৈরি হলো। তাকে কিছুদিন আত্মগোপনে থাকতে হলো।
কবিতা একা হয়ে গেল।
হিমেল তার পাশে দাঁড়াল।
সে কবিতাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিল না।
শুধু বলল,
—ভয় পেও না। তুমি একা নও।
এই সময়েই কবিতা বুঝতে শুরু করল, হিমেলের ভালোবাসা বদলে গেছে।
আগের সেই জেদ নেই।
কোনো দাবি নেই।
শুধু নিঃশব্দ যত্ন।
কিন্তু এই উপলব্ধি কবিতার নিজের মনেও নতুন একটা প্রশ্ন তৈরি করল।
সে কি এতদিন ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিল?
কয়েক সপ্তাহ পর জিশান ফিরে এল।
সে কবিতার সঙ্গে দেখা করল।
দুজন অনেকক্ষণ কথা বলল।
জিশান বলল,
—আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু আমার জীবন এমন পথে চলে গেছে, যেখানে তোমাকে নিরাপদ আর শান্ত জীবন দিতে পারছি না।
কবিতা বলল,
—আমি তোমার পাশে থাকতে চাই।
জিশান মাথা নাড়ল।
—কিন্তু আমি চাই না আমার কারণে তোমার জীবন নষ্ট হোক।
কবিতা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—তুমি কি আমাকে ছেড়ে দিচ্ছ?
—না। আমি তোমাকে মুক্তি দিচ্ছি।
এই কথাটা শুনে কবিতার মনে হলো, সে যেন নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
জিশান চলে গেল।
কবিতা হিমেলের কাছে এল।
—আমি কী করব?
হিমেল বলল,
—তুমি নিজের মনকে জিজ্ঞেস করো।
—আমার মন কিছুই বুঝতে পারছে না।
—তাহলে সময় নাও।
—তুমি কি আমাকে গ্রহণ করবে?
হিমেল চুপ করে গেল।
কবিতা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
হিমেল বলল,
—কবিতা, তুমি এখন দুর্বল। এই সময়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না।
—তুমি আমাকে ভালোবাসো না?
—ভালোবাসি।
—তাহলে?
—তোমার কষ্টের সময়টাকে আমার সুযোগ বানাতে চাই না।
কবিতার চোখ ভিজে গেল।
সে বলল,
—তুমি আগে এমন ছিলে না।
হিমেল মৃদু হেসে বলল,
—আগে আমি তোমাকে পেতে চেয়েছিলাম। এখন চাই তুমি নিজের মতো করে বাঁচো।
কবিতা চলে গেল।
সেই রাতে হিমেল নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিল।
সে কবিতাকে বলবে, তাকে বিয়ে করার জন্য অপেক্ষা না করতে।
পরদিন কবিতার সঙ্গে দেখা করে বলল,
—তুমি ঢাকায় ফিরে যাও। পড়াশোনা শেষ করো। নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করো।
কবিতা বলল,
—তুমি কি আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছ?
—না। আমি চাই তুমি নিজের পরিচয় তৈরি করো।
—আর তুমি?
—আমি থাকব।
—কোথায়?
—তোমার জীবনে না থাকলেও পৃথিবীতে থাকব।
কবিতা কাঁদতে লাগল।
হিমেল তাকে সান্ত্বনা দিতে গেল না।
কারণ সে জানত, কিছু দূরত্বই মানুষকে নিজের সত্যিটা বুঝতে সাহায্য করে।
কবিতা ঢাকায় ফিরে গেল।
হিমেল নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
কয়েক মাস পর তার ব্যবসা ভালো চলতে শুরু করল।
সে একটা ছোট পোশাকের কারখানা খুলল। কয়েকজন মানুষকে চাকরি দিল।
তার জীবন ধীরে ধীরে নিজের গতিতে ফিরতে লাগল।
কিন্তু কবিতা তাকে ভুলে যায়নি।
বরং দূরে গিয়ে সে প্রথমবার বুঝতে পারল, হিমেলের প্রতি তার অনুভূতিটা কী।
সে জিশানকে ভালোবেসেছিল।
সেই ভালোবাসা সত্যি ছিল।
কিন্তু হিমেল তার জীবনের অন্যরকম একজন মানুষ।
যে তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য লড়েছিল, আবার একসময় তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগও দিয়েছিল।
কবিতা বুঝতে পারল, সে হিমেলকে হারাতে চায় না।
এক বছর পর কবিতা শহরে ফিরল।
হিমেলের দোকানে গিয়ে দাঁড়াল।
হিমেল প্রথমে তাকে চিনতে পারল না।
কবিতা হেসে বলল,
—এত বদলে গেছ?
হিমেল তাকিয়ে বলল,
—তুমিও।
—আমি কি অনেক বদলেছি?
—হ্যাঁ।
—ভালো না খারাপ?
—ভালো।
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
কবিতা বলল,
—জিশানের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে।
হিমেল মাথা নাড়ল।
—ভালো।
—ও এখন নিজের জীবন নিয়ে অন্য শহরে আছে।
—তুমি কেমন আছ?
—ভালো থাকার চেষ্টা করছি।
হিমেল হাসল।
—চেষ্টা করলেই মানুষ ভালো থাকতে পারে না। নিজের কাছে সত্যি থাকলে পারে।
কবিতা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি তোমার সঙ্গে একটা কথা বলতে এসেছি।
—বলো।
—আমি তোমাকে অনেক দেরিতে বুঝেছি।
হিমেল চুপ করে রইল।
—তুমি যখন আমাকে ভালোবাসতে, আমি তোমাকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখেছি। তখন তোমার কষ্ট বুঝিনি। পরে যখন তোমাকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম, তখন বুঝেছি তোমার জায়গাটা আমার জীবনে কত বড়।
হিমেল কিছু বলল না।
কবিতা বলল,
—আমি তোমাকে ভালোবাসি কি না, সেটা বুঝতে আমার এত সময় লেগেছে কেন জানো?
—কেন?
—কারণ তোমাকে আমি সবসময় আমার জীবনের অংশ হিসেবেই দেখেছি। তোমাকে হারানোর কথা কখনো ভাবিনি।
হিমেল ধীরে বলল,
—কবিতা...
—আমি তোমাকে কোনো উত্তর দিতে বলছি না।
—তাহলে?
—শুধু সত্যিটা জানাতে এসেছি।
হিমেল অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তুমি কি জিশানকে ভুলে গেছ?
কবিতা মাথা নাড়ল।
—কাউকে ভুলে যাওয়া মানে তার অস্তিত্ব মুছে ফেলা নয়। জিশান আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আমি তাকে সম্মান করি।
হিমেল বলল,
—আর আমি?
কবিতা মৃদু হাসল।
—তুমি আমার অসমাপ্ত গল্প।
হিমেলের চোখ ভিজে গেল।
কিন্তু সে এবার তাড়াহুড়ো করল না।
বলল,
—তুমি এখন কী চাও?
—তোমার সঙ্গে নতুন করে শুরু করতে চাই।
হিমেল মাথা নিচু করল।
—তুমি নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
—আমার পুরোনো ভুলগুলো মনে আছে?
—সব।
—তবুও?
—তবুও।
হিমেল বলল,
—আমি আর আগের হিমেল নেই।
—আমিও আগের কবিতা নেই।
দুজনের চোখে পানি এসে গেল।
কিন্তু তাদের গল্প এখানেই শেষ হয়নি।
কারণ ঠিক তখনই জিশানের কাছ থেকে একটা চিঠি এল।
চিঠিতে লেখা ছিল, সে নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে এবং কবিতার জন্য শুভকামনা জানাচ্ছে।
কবিতা চিঠিটা হিমেলকে দেখাল।
হিমেল বলল,
—তোমাদের সম্পর্কটা সত্যি ছিল।
—হ্যাঁ।
—তাহলে তাকে অসম্মান কোরো না।
—কখনো না।
সেদিন সন্ধ্যায় কবিতা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
হিমেল পাশে এসে দাঁড়াল।
কবিতা বলল,
—আমরা কি আবার শুরু করতে পারি?
হিমেল বলল,
—শুরু করা যায়।
—কিন্তু?
—এবার কোনো জেদ থাকবে না।
কবিতা হেসে বলল,
—থাকবে না।
—কোনো অধিকারবোধও না।
—ঠিক আছে।
—আর যদি কোনোদিন তুমি মনে করো আমি তোমার জন্য ঠিক মানুষ নই—
কবিতা তার কথা থামিয়ে দিল।
—তাহলে আমি তোমাকে বলব।
হিমেল হাসল।
—এইটুকুই চাই।
হিমেল আর কবিতা ধীরে ধীরে নতুন করে একে অপরকে চিনতে শুরু করল।
আগের মতো নয়।
এবার তাদের সম্পর্কের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল, সম্মান ছিল, বোঝাপড়া ছিল।
কিন্তু সবাই তাদের সম্পর্ক সহজভাবে মেনে নিল না।
কবিতার মা বললেন,
—হিমেল ভালো ছেলে, কিন্তু তোমাদের এত পুরোনো জটিলতা আছে। তুমি কি নিশ্চিত?
কবিতা বলল,
—এবার আমি নিশ্চিত।
অন্যদিকে হিমেলের মা বললেন,
—তুই কি আবার কষ্ট পাবি না?
হিমেল বলল,
—কষ্ট এড়ানোর জন্য মানুষ ভালোবাসা বন্ধ করে দিতে পারে না।
বিয়ের কথা ঠিক হলো।
কিন্তু বিয়ের কয়েকদিন আগে জিশান শহরে এল।
হিমেল তাকে দেখে অবাক হলো।
জিশান বলল,
—আমি শুধু বিদায় জানাতে এসেছি।
হিমেল বলল,
—বিদায় কেন?
—আমার বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কিছুদিনের জন্য চলে যাব।
হিমেল হাসল।
—ভালো থেকো।
জিশান বলল,
—আপনিও।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—কবিতা সুখী হবে তো?
হিমেল বলল,
—আমি চেষ্টা করব।
জিশান মাথা নাড়ল।
—চেষ্টা নয়। ওকে নিজের মতো থাকতে দেবেন। তাহলেই সুখী হবে।
হিমেল মৃদু হাসল।
—এই শিক্ষা আমি অনেক দেরিতে পেয়েছি।
জিশানও হাসল।
—আমিও।
দুজন হাত মেলাল।
জিশান চলে গেল।
কিন্তু যাওয়ার আগে কবিতার সঙ্গে দেখা করল।
কবিতা বলল,
—তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ?
জিশান বলল,
—তোমাকে ক্ষমা করার মতো কিছুই হয়নি।
—তবুও...
—তুমি তোমার জীবন বেছে নিয়েছ। আমিও আমারটা বেছে নিয়েছি।
কবিতার চোখ ভিজে গেল।
জিশান বলল,
—হিমেল তোমাকে অনেকদিন ধরে ভালোবাসে। এবার তুমি ওকে সেই শান্তিটা দিও, যেটা সে এতদিন পায়নি।
কবিতা মাথা নাড়ল।
—দেব।
জিশান চলে গেল।
বিয়ের দিন হিমেল খুব সাধারণভাবে সাজল।
কবিতা লাল শাড়ি পরেছিল।
বিয়ের আসরে বসে হিমেলের দিকে তাকিয়ে তার মনে হচ্ছিল, কত বছর পেরিয়ে গেছে!
একসময় এই মানুষটা তাকে পাওয়ার জন্য নিজের সবকিছু ভুলে গিয়েছিল।
আজ সেই মানুষটাই তার সামনে শান্তভাবে বসে আছে।
কোনো জেদ নেই।
কোনো দাবি নেই।
শুধু অপেক্ষা।
বিয়ে শেষ হওয়ার পর রাতে কবিতা হিমেলকে বলল,
—তুমি কি খুশি?
হিমেল বলল,
—হ্যাঁ।
—সত্যি?
—এই প্রথমবার তোমাকে নিয়ে কোনো ভয় নেই।
—কেন?
—কারণ এবার তুমি আমার সঙ্গে আছ নিজের ইচ্ছায়।
কবিতা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—আর তুমি?
—আমি?
—তুমি কি আমাকে নিজের ইচ্ছায় গ্রহণ করেছ?
হিমেল কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—আমি তোমাকে অনেক আগেই গ্রহণ করেছিলাম। শুধু তখন বুঝিনি, গ্রহণ করা আর অধিকার করা এক জিনিস নয়।
কবিতার চোখে পানি এসে গেল।
সে বলল,
—আমাদের গল্পটা খুব কঠিন ছিল।
হিমেল হাসল।
—কিন্তু শেষটা সুন্দর হতে পারে।
কবিতা বলল,
—শেষ নয়। এটা তো শুরু।
হিমেল মৃদু হেসে বলল,
—ঠিক বলেছ।
বিয়ের পর কয়েক মাস কেটে গেল।
হিমেল আর কবিতার জীবন খুব সাধারণভাবেই চলতে লাগল।
তাদের মধ্যে মাঝে মাঝে ঝগড়া হতো।
কখনো ভুল বোঝাবুঝি হতো।
কিন্তু এবার তারা কোনো সমস্যাকে জেদ দিয়ে বড় করত না।
কবিতা তার চাকরি শুরু করল।
হিমেল নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকত।
সন্ধ্যায় দুজন নদীর পাড়ে হাঁটতে যেত।
একদিন কবিতা বলল,
—মনে আছে, তুমি একসময় বলেছিলে আমাকে ছাড়া বাঁচবে না?
হিমেল হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—এখন?
—এখন বুঝি, মানুষ কাউকে ছাড়া বাঁচতে পারে। কিন্তু কাউকে সঙ্গে নিয়ে ভালোভাবে বাঁচা অনেক সুন্দর।
কবিতা মৃদু হাসল।
—তুমি অনেক বদলে গেছ।
—তুমিও।
—আমার জন্য এত কষ্ট পেয়েছিলে কেন?
হিমেল নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
—কারণ তখন আমি ভাবতাম, ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের করে পাওয়া।
—আর এখন?
—এখন জানি, ভালোবাসা মানে তার সিদ্ধান্ত, স্বাধীনতা আর সুখকেও সম্মান করা।
কবিতা তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
—তাহলে জিশানের জন্য তোমার কোনো রাগ নেই?
হিমেল মাথা নাড়ল।
—না।
—কখনোই?
—একসময় ছিল। কিন্তু এখন বুঝি, সে তোমাকে ভালোবেসেছিল। আমিও ভালোবেসেছিলাম। শুধু আমাদের ভালোবাসার পথ আলাদা ছিল।
কবিতা বলল,
—তুমি কি মনে করো, যদি জিশান আমার জীবনে না আসত, তাহলে আমি তোমাকে ভালোবাসতাম?
হিমেল কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—হয়তো না।
কবিতা অবাক হলো।
—এত সহজে বললে?
—কারণ কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে আমাদের কিছু শেখাতে। জিশান তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়নি। বরং তোমাকে বুঝতে সাহায্য করেছে, তুমি কী চাও।
কবিতা হিমেলের দিকে তাকিয়ে হাসল।
—তাহলে তুমি জিশানকে ধন্যবাদ দেবে?
—হ্যাঁ।
—সত্যি?
—সত্যি।
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে কবিতা হিমেলের হাত ধরে বলল,
—আমি একটা কথা বলব?
—বলো।
—আমি যদি আবার তোমাকে হারিয়ে ফেলি?
হিমেল থেমে গেল।
তারপর বলল,
—তাহলে আমাকে আবার খুঁজে নিও।
—কোথায়?
—যেখানে আমাদের গল্প শুরু হয়েছিল।
কবিতা হেসে বলল,
—নদীর পাড়ে?
—হ্যাঁ।
দুজন আবার হাঁটতে শুরু করল।
নদীর পানি তখন ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছিল।
হিমেলের মনে পড়ল সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা।
স্কুলের বারান্দা।
বৃষ্টির দিন।
একটা ছাতা।
কবিতার হাসি।
প্রথম ভালোবাসার কথা।
প্রত্যাখ্যান।
জিশানের আগমন।
অসংখ্য ভুল।
কষ্ট।
অপেক্ষা।
আর শেষে—একটা নতুন শুরু।
হিমেল বুঝতে পারল, জীবনের কিছু গল্প সরল পথে এগোয় না।
কিছু গল্পে মানুষ ভুল করে।
কেউ কাউকে হারায়।
কেউ ফিরে আসে।
কেউ দূরে চলে যায়।
কেউ নিজের ভুল বুঝতে সময় নেয়।
কিন্তু সত্যিকারের সম্পর্ক তখনই টিকে থাকে, যখন ভালোবাসার সঙ্গে সম্মানও থাকে।
কবিতা হঠাৎ বলল,
—কী ভাবছ?
হিমেল হাসল।
—ভাবছি, এত বছর ধরে যাকে পাওয়ার জন্য ছুটেছি, সে শেষ পর্যন্ত আমার পাশেই হাঁটছে।
কবিতা বলল,
—তাহলে এখন আর দৌড়াতে হবে না।
হিমেল মাথা নাড়ল।
—না।
—কেন?
—কারণ এবার আমরা দুজনেই একই পথে হাঁটছি।
কবিতা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
নদীর ওপারে তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছিল।
আকাশে শেষ আলোটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল।
হিমেল জানত, তাদের গল্পের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলো পেছনে পড়ে গেছে।
....