হারানোর ভয়ে দূরে সরে যাওয়া

ছোটবেলা থেকেই রোহান বিশ্বাস করত, জীবনে কিছু পেতে হলে নিজের চেষ্টাতেই পেতে হবে।

স্বভাবের দিক থেকে রোহান ছিল একটু জেদি। কাউকে খুব সহজে নিজের কাছাকাছি আসতে দিত না। তবে যাকে আপন করে নিত, তার জন্য সবকিছু করতে পারত।

অন্যদিকে প্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

একটি স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিল। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে অভ্যস্ত প্রিয়া। গান শুনতে ভালোবাসত, বই পড়ত, আর সুযোগ পেলেই শহরের বাইরে ঘুরতে যেত।

রোহানের সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়েছিল এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে।

সেদিন অফিসের একটি কাজ শেষ করে রোহান গাড়ি নিয়ে ফিরছিল। হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো। রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করছিল।

ঠিক তখনই দেখতে পেল, একটি মেয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে। হাতে ছাতা নেই। গাড়িও পাচ্ছে না।

রোহান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গাড়ির জানালা নামিয়ে বলল,

—আপনি কোথায় যাবেন?

প্রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—কেন?

—বৃষ্টি অনেক বেশি। গাড়ি পাচ্ছেন না মনে হচ্ছে।

প্রিয়া একটু ইতস্তত করে বলল,

—ধানমন্ডি যাব।

—আমি ওই দিকেই যাচ্ছি। চাইলে উঠতে পারেন।

প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। অপরিচিত একজন মানুষের গাড়িতে ওঠা ঠিক হবে কি না, সেটা ভাবছিল।

রোহান হেসে বলল,

—চিন্তা করবেন না। আপনি চাইলে আমার অফিসের লোকেশনটা আগে দেখে নিতে পারেন।

প্রিয়ার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।

—আপনি সবসময় এত কথা বলেন?

—না। আজকে বৃষ্টি বেশি বলে কথা বেশি হচ্ছে।

প্রিয়া শেষ পর্যন্ত গাড়িতে উঠল।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

প্রথম কয়েক মিনিট দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না। বাইরে বৃষ্টির শব্দ, কাঁচে জমে থাকা পানির ফোঁটা আর রাস্তার আলো মিলেমিশে একটা অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছিল।

হঠাৎ প্রিয়া বলল,

—আপনি কি সব অপরিচিত মানুষকে এভাবে লিফট দেন?

রোহান হেসে বলল,

—না। সবাইকে না।

—তাহলে আমাকে কেন?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আপনাকে দেখে মনে হলো আপনি অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।

প্রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—অদ্ভুত মানুষ আপনি।

—এটা প্রশংসা নাকি অভিযোগ?

—এখনো ঠিক করিনি।

সেদিনের সেই ছোট্ট যাত্রাটাই তাদের সম্পর্কের শুরু হয়ে গেল।

পরের দিন প্রিয়া অফিসে যাওয়ার পথে একটি ক্যাফেতে বসে কফি খাচ্ছিল। হঠাৎ দরজা দিয়ে রোহানকে ঢুকতে দেখে সে অবাক হয়ে গেল।

রোহানও তাকে দেখে থেমে গেল।

—আপনি এখানে?

প্রিয়া হেসে বলল,

—এই শহরে শুধু আপনারই আসা-যাওয়া আছে নাকি?

রোহান হাসল।

—না, তবে আপনাকে আবার দেখব ভাবিনি।

সেদিন তারা একই টেবিলে বসে কফি খেল।

তারপর শুরু হলো নিয়মিত দেখা হওয়া।

কখনো কফির দোকানে, কখনো বইয়ের দোকানে, কখনো শহরের কোনো শান্ত জায়গায়।

প্রিয়া ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, রোহানের রাগী স্বভাবের আড়ালে একজন খুব যত্নশীল মানুষ লুকিয়ে আছে। আর রোহান বুঝতে পারল, প্রিয়া শুধু সুন্দরী নয়, নিজের মতামত নিয়ে দৃঢ় একজন মানুষ।

একদিন সন্ধ্যায় প্রিয়া বলল,

—তুমি কি কখনো কাউকে সত্যি ভালোবেসেছ?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—না।

—কেন?

—কারণ কাউকে ভালোবাসলে তাকে হারানোর ভয় থাকে।

প্রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—ভালোবাসার সঙ্গে ভয় থাকবেই।

রোহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোমাকে হারানোর ভয়টা আমার আগে থেকেই হচ্ছে।

প্রিয়া কিছু বলল না।

শুধু চোখ নামিয়ে ফেলল।

সেদিন থেকেই তাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্বের সীমা পেরিয়ে গেল।

কয়েক মাস পর রোহান প্রিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিল।

প্রিয়া জানত, তাদের পরিবারে এই সম্পর্ক সহজে মেনে নেওয়া হবে না। রোহানের পরিবার সাধারণ মধ্যবিত্ত। আর প্রিয়ার পরিবার অনেক বেশি স্বচ্ছল এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত।

প্রিয়ার বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন,

—রোহান খারাপ ছেলে নয়। কিন্তু তোমাদের জীবনযাপন এক নয়। বিয়ের পর সমস্যা হবে।

প্রিয়া শান্তভাবে বলল,

—সমস্যা হলে আমরা দুজন মিলে সমাধান করব।

—ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে না, প্রিয়া।

প্রিয়া বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

—ভালোবাসা ছাড়া সংসারও তো চলে না।

অনেক আলোচনা, কান্না আর পারিবারিক চাপের পরও প্রিয়া নিজের সিদ্ধান্ত বদলাল না।

শেষ পর্যন্ত রোহান ও প্রিয়ার বিয়ে হলো।

বিয়ের দিন রোহান প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,

—আমি তোমাকে খুব ভালো জীবন দিতে পারব কি না জানি না। কিন্তু একটা কথা দিতে পারি, তোমাকে কখনো একা হতে দেব না।

প্রিয়া মৃদু হেসে বলেছিল,

—আমারও বেশি কিছু চাই না। শুধু আমাকে বুঝতে চেষ্টা করবে।

রোহান তার হাত ধরে বলেছিল,

—চেষ্টা করব।

তাদের নতুন জীবন শুরু হলো।

প্রথম কয়েকটা মাস যেন স্বপ্নের মতো কেটে গেল।

সকালে একসঙ্গে নাশতা, রাতে গল্প করা, ছুটির দিনে বাইরে যাওয়া—সবকিছুই সুন্দর ছিল।

কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তব জীবন তাদের সামনে নিজের কঠিন রূপ দেখাতে শুরু করল।

রোহানের ব্যবসায় হঠাৎ বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিল। একের পর এক কাজের চাপ বাড়তে লাগল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হতো তাকে।

প্রিয়া প্রথম দিকে বিষয়টা বুঝতে চেষ্টা করত।

কিন্তু একদিন রাতে ঘড়িতে প্রায় এগারোটা বাজলেও রোহান বাড়ি ফিরল না।

প্রিয়া বারবার ফোন করছিল।

অবশেষে রাত সাড়ে এগারোটার দিকে দরজা খুলে রোহান ঢুকল।

প্রিয়া চুপচাপ বসে ছিল।

রোহান ক্লান্ত গলায় বলল,

—খেয়েছ?

প্রিয়া উত্তর দিল,

—না।

—খেয়ে নাও।

প্রিয়া এবার তার দিকে তাকাল।

—তুমি কি একবারও ভাবোনি যে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি?

রোহান বিরক্ত হয়ে বলল,

—আমি কি ইচ্ছা করে দেরি করছি?

—আমি সেটা বলিনি।

—তাহলে?

—তুমি আগের মতো নেই।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—সংসার করার পর দায়িত্বও থাকে, প্রিয়া। সবসময় তোমার পাশে বসে থাকা সম্ভব নয়।

প্রিয়ার চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।

—আমি তোমাকে সারাদিন পাশে চাই না, রোহান। শুধু চাই, তুমি যেন আমাকে তোমার জীবনের অংশ মনে করো।

রোহান কোনো উত্তর দিল না।

সেদিন রাতে তারা একই ঘরে থেকেও আলাদা হয়ে গেল।

কেউ কারও সঙ্গে কথা বলল না।

বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস রোহান আর প্রিয়ার জীবনটা বেশ সুন্দরই চলছিল। কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, তাদের মধ্যে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে মতের অমিল বাড়তে শুরু করল।

রোহানের ব্যবসায় তখন অনেক চাপ। নতুন একটি বড় কাজ পাওয়ার পর তাকে প্রায় প্রতিদিনই অফিসে দীর্ঘ সময় থাকতে হতো। সকাল আটটায় বের হলে অনেক দিন রাত দশটার আগে বাড়ি ফিরতে পারত না।

প্রথমদিকে প্রিয়া বিষয়টা মেনে নিয়েছিল।

কিন্তু একটা সময় তার মনে হতে লাগল, রোহানের জীবনে তার জায়গাটা যেন ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে।

এক সন্ধ্যায় প্রিয়া ফোন করেছিল।

—আজ কখন ফিরবে?

রোহান তখন অফিসের মিটিংয়ে ব্যস্ত।

—জানি না। একটু দেরি হবে।

—কতটা দেরি?

—প্রিয়া, এখন মিটিংয়ে আছি। পরে কথা বলি।

ফোনটা কেটে গেল।

প্রিয়া কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজেকে বোঝাল, রোহানের কাজ আছে। তাকে বুঝতে হবে।

কিন্তু মানুষ যতই নিজেকে বোঝাক, একাকিত্বকে সবসময় বোঝানো যায় না।

সেদিন রাতে রোহান বাড়ি ফিরল প্রায় সাড়ে দশটায়।

দরজা খুলে দেখল, প্রিয়া ডাইনিং টেবিলে বসে আছে।

টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া।

রোহান জুতা খুলতে খুলতে বলল,

—তুমি এখনো খাওনি?

—তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

—আমার জন্য অপেক্ষা করার দরকার ছিল না।

প্রিয়া চুপ করে রইল।

রোহান খাবার নিতে বসে বলল,

—তুমি কেন বুঝতে চাও না যে আমি ব্যস্ত?

প্রিয়া শান্ত গলায় বলল,

—আমি বুঝি।

—তাহলে সমস্যা কোথায়?

—সমস্যা ব্যস্ততায় না, রোহান। সমস্যা হলো তুমি আমাকে কিছু বলো না।

রোহান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

—কী বলব?

—তোমার কী হচ্ছে, কী নিয়ে চিন্তা করছ, অফিসে কী সমস্যা হচ্ছে—এসব কিছুই তো আমাকে বলো না।

—এসব নিয়ে তোমাকে চিন্তায় ফেলতে চাই না।

প্রিয়া একটু হেসে বলল,

—আমি তোমার স্ত্রী। তোমার চিন্তার অংশ হতে চাই। শুধু ভালো সময়ের সঙ্গী হয়ে থাকতে চাই না।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—ঠিক আছে। চেষ্টা করব।

কথাটা সেখানেই শেষ হয়ে গেল।

কিন্তু সমস্যা শেষ হলো না।

বরং নতুন একটা সমস্যা শুরু হলো।

প্রিয়া তার নিজের চাকরিটা চালিয়ে যেতে চেয়েছিল। বিয়ের আগেই সে রোহানকে বলেছিল, নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে তার কিছু স্বপ্ন আছে।

রোহান তখন বলেছিল,

—তুমি যা করতে চাও করো। আমি কখনো বাধা দেব না।

কিন্তু বিয়ের পর পরিস্থিতি বদলে গেল।

প্রিয়ার অফিসে নতুন একটি প্রজেক্ট শুরু হলো। প্রজেক্টের কারণে তাকে প্রায়ই অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে বাইরে মিটিং করতে হতো।

একদিন রাত আটটার দিকে প্রিয়া অফিস থেকে বের হচ্ছিল। তার সঙ্গে ছিল সহকর্মী অয়ন।

অয়ন বলল,

—তোমাকে বাসার সামনে নামিয়ে দেব?

প্রিয়া বলল,

—না, দরকার নেই। আমি গাড়ি নেব।

ঠিক তখনই দূর থেকে রোহানের গাড়ি এসে থামল।

প্রিয়া অবাক হয়ে গেল।

রোহান গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি তাদের দিকে এগিয়ে এল।

—চলো।

প্রিয়া বলল,

—তুমি এখানে?

—তোমাকে নিতে এসেছি।

অয়ন সৌজন্যবশত বলল,

—আমি তাহলে যাই।

রোহান শুধু মাথা নেড়ে উত্তর দিল।

গাড়িতে ওঠার পর বেশ কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

প্রিয়া অবশেষে বলল,

—তুমি এত চুপ করে আছ কেন?

—কিছু না।

—রোহান।

—বললাম তো কিছু না।

প্রিয়া জানত, কিছু একটা হয়েছে।

বাড়িতে পৌঁছানোর পর রোহান আর চুপ থাকতে পারল না।

—লোকটা কে?

প্রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—কোন লোক?

—যার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলে।

—ও অয়ন। আমার অফিসের সহকর্মী।

—তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে চাইছিল কেন?

প্রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,

—কারণ রাত হয়ে গিয়েছিল।

—তোমার নিজের গাড়ি নেই?

—আছে। কিন্তু তাই বলে সহকর্মী একটা কথা বললেই এত সমস্যা কেন?

রোহান গম্ভীর হয়ে বলল,

—আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছি।

—না, তুমি জিজ্ঞেস করোনি। তুমি সন্দেহ করেছ।

রোহান চুপ করে গেল।

প্রিয়া নিজের ঘরে চলে গেল।

পরের দিন সকালে দুজনের মধ্যে তেমন কথা হলো না।

কিন্তু রোহানের মনে একটা অস্বস্তি তৈরি হলো।

সে নিজেও বুঝতে পারছিল না কেন অয়নকে দেখে তার এত খারাপ লেগেছে।

হয়তো সে প্রিয়াকে হারানোর ভয় পাচ্ছিল।

কিন্তু সেই ভয়টা ভালোবাসার ভাষায় প্রকাশ করতে না পেরে সন্দেহের ভাষায় প্রকাশ করছিল।

কয়েক দিন পর প্রিয়ার অফিসে একটি অনুষ্ঠান ছিল। রোহানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

প্রিয়া অনেক আশা নিয়ে বলেছিল,

—তুমি আসবে তো?

রোহান বলেছিল,

—চেষ্টা করব।

প্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল,

—চেষ্টা না। আসবে।

রোহান হেসে বলেছিল,

—ঠিক আছে, আসব।

সেদিন সন্ধ্যায় প্রিয়া সাজগোজ করে অপেক্ষা করছিল।

অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল।

এক ঘণ্টা পার হলো।

রোহান এল না।

প্রিয়া বারবার ফোন করল।

ফোন বন্ধ।

শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও রোহানের কোনো খবর পাওয়া গেল না।

রাতে বাড়ি ফিরে প্রিয়া দেখল, রোহান সোফায় বসে আছে।

সে দরজা বন্ধ করে বলল,

—ফোন বন্ধ ছিল কেন?

—ব্যাটারি শেষ হয়ে গিয়েছিল।

—তুমি আসবে বলেছিলে।

—অফিসে জরুরি কাজ ছিল।

প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—তুমি আসবে বলেছিলে বলেই আমি সবার সামনে তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি।

রোহান বিরক্ত হয়ে বলল,

—সবকিছু এত বড় করে দেখো কেন?

প্রিয়া এবার কষ্ট পেয়ে বলল,

—কারণ তোমার কাছে হয়তো এগুলো ছোট বিষয়। কিন্তু আমার কাছে ছোট না।

—তুমি কি চাও আমি ব্যবসা ছেড়ে সারাদিন তোমার সঙ্গে থাকি?

—আমি সেটা চাই না!

প্রিয়ার গলা কেঁপে উঠল।

—আমি শুধু চাই তুমি তোমার জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমাকে একবার মনে করো।

রোহান চুপ করে থাকল।

প্রিয়া চোখ মুছে বলল,

—বিয়ের আগে তুমি বলেছিলে, আমাকে বুঝবে।

—আমি চেষ্টা করছি।

—কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, তুমি আদৌ চেষ্টা করছ কি না।

এই কথাটা রোহানের মনে গভীরভাবে আঘাত করল।

সে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সেদিন রাতটা দুজনের জন্যই খুব দীর্ঘ ছিল।

পরদিন সকালে প্রিয়া তার মায়ের কাছে গেল।

মা বুঝতে পারলেন, মেয়ের মন ভালো নেই।

—কী হয়েছে?

প্রিয়া প্রথমে কিছু বলতে চাইল না।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলল,

—আমাদের মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে না।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—আমি তো আগেই বলেছিলাম, সংসার করা সহজ নয়।

প্রিয়া মাথা নিচু করে বলল,

—আমি জানি।

—তুমি কি ওকে ভালোবাসো?

প্রিয়া কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল,

—অনেক।

—তাহলে একটু সময় দাও।

প্রিয়া মায়ের দিকে তাকাল।

—কিন্তু যদি ও আমাকে আর বুঝতে না চায়?

মা বললেন,

—মানুষ সবসময় বুঝতে পারে না। কখনো কখনো বুঝিয়ে বলতে হয়।

অন্যদিকে রোহানও নিজের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছিল।

বন্ধু সজীব বলল,

—তুই আসলে কী নিয়ে এত রাগ করছিস?

রোহান বলল,

—প্রিয়া আমাকে বুঝতে চায় না।

সজীব হেসে বলল,

—নাকি তুই প্রিয়াকে বুঝতে চাইছিস না?

রোহান চুপ হয়ে গেল।

সজীব আবার বলল,

—তুই ওকে ভালোবাসিস, সেটা বোঝা যায়। কিন্তু ভালোবাসা আর অধিকারবোধ এক জিনিস না।

রোহান কিছু বলল না।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে সে প্রিয়ার সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল।

কিন্তু ঘরে ঢুকেই দেখল, প্রিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।

রোহান ধীরে বলল,

—প্রিয়া।

প্রিয়া ফিরে তাকাল।

—হুম?

—আমরা কি একটু কথা বলতে পারি?

প্রিয়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

—কী নিয়ে?

—আমাদের নিয়ে।

প্রিয়া চুপ করে রইল।

রোহান তার কাছে গিয়ে বলল,

—আমি হয়তো অনেক ভুল করছি।

প্রিয়ার চোখে পানি জমে উঠল।

—হয়তো?

রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—হ্যাঁ। অনেক ভুল করছি।

প্রিয়া ধীরে বলল,

—তাহলে বদলাবে?

রোহান উত্তর দেওয়ার আগেই তার ফোন বেজে উঠল।

অফিস থেকে জরুরি ফোন।

রোহান ফোনটা ধরল।

কথা শেষ করে সে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমাকে এখনই অফিসে যেতে হবে।

প্রিয়ার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।

সে শুধু বলল,

—যাও।

রোহান দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু বের হওয়ার আগে একবার ফিরে তাকাল।

প্রিয়া তখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে।

দুজনের মাঝখানে ছিল মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব।

তবু সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, তারা যেন অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

রোহান সেদিন রাতে অফিসে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ প্রিয়ার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি। অফিসে সত্যিই বড় একটি সমস্যা হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি নিয়ে ক্লায়েন্টের সঙ্গে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, আর সেই সমস্যার সমাধান না হলে রোহানের ব্যবসায় বড় ক্ষতি হতে পারত।

কিন্তু প্রিয়া এসব কিছু জানত না।

তার কাছে শুধু মনে হচ্ছিল, রোহান আবারও তাকে একা রেখে চলে গেছে।

রাত প্রায় দুইটার দিকে রোহান বাড়ি ফিরল।

দরজা খুলে দেখল, পুরো বাড়ি অন্ধকার। প্রিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে।

রোহান কিছুক্ষণ তার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকল। মনে হলো, প্রিয়াকে জাগিয়ে কথা বলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে কিছু না বলেই নিজের ঘরে চলে গেল।

পরদিন সকালে প্রিয়া ঘুম থেকে উঠে দেখল, রোহান ইতিমধ্যেই বেরিয়ে গেছে।

টেবিলের ওপর একটা ছোট কাগজ পড়ে ছিল।

“অফিসে যাচ্ছি। রাতে ফিরব।”

মাত্র পাঁচটি শব্দ।

প্রিয়া কাগজটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

বিয়ের আগে যে মানুষটা তার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত, এখন তার সঙ্গে কথা বলার জন্য কয়েকটা মিনিটও যেন পাওয়া যায় না।

এদিকে রোহানেরও মন ভালো ছিল না।

সে বুঝতে পারছিল, প্রিয়ার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে। কিন্তু কীভাবে সেটা কমাবে, সে বুঝতে পারছিল না।

ব্যবসার সমস্যা কিছুটা সামলে নেওয়ার পর একদিন রোহান সিদ্ধান্ত নিল, প্রিয়াকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাবে।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে বলল,

—আগামী শুক্রবার তোমার কোনো কাজ আছে?

প্রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—কেন?

—আমরা দুজন কোথাও যেতে পারি।

প্রিয়ার মুখে অনেক দিন পর হাসি ফুটল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—কোথায়?

—তুমি যেখানে যেতে চাও।

প্রিয়া একটু ভেবে বলল,

—সমুদ্র দেখতে চাই।

রোহান হেসে বলল,

—তাহলে সমুদ্রই দেখা হবে।

প্রিয়া মনে মনে খুব খুশি হলো।

সে ভাবল, হয়তো সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে।

কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।

শুক্রবারের আগের দিন রোহান জানতে পারল, ব্যবসার কাজে তাকে চট্টগ্রামে যেতে হবে। একই সময়ে প্রিয়ার অফিসেও একটি জরুরি মিটিং পড়ে গেল।

রোহান বলল,

—ট্রিপটা আর হবে না।

প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তুমি আগে বললেই পারতে।

—আমিও তো এখন জানলাম।

—তোমার সবসময়ই এমন হয়।

রোহান বিরক্ত হলো।

—কী এমন হয়?

—তুমি একটা কথা বলো, পরে সেটা রাখতে পারো না।

—আমি কি ইচ্ছা করে করছি?

—না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কষ্টটা তো আমারই হয়।

রোহান চুপ করে গেল।

প্রিয়া নিজের ঘরে চলে গেল।

সেদিন রাতে রোহান অনেকক্ষণ ভেবেছিল। সত্যিই কি সে প্রিয়াকে বারবার হতাশ করছে?

অন্যদিকে প্রিয়াও নিজের আচরণ নিয়ে ভাবছিল।

সে জানত, রোহান ইচ্ছা করে কিছু করছে না। কিন্তু তার মনও তো চায়, স্বামী তাকে একটু গুরুত্ব দিক।

এর মধ্যেই অয়ন আবার প্রিয়ার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।

অফিসের নতুন প্রজেক্টের দায়িত্ব ছিল প্রিয়া ও অয়নের ওপর। প্রায় প্রতিদিন তাদের একসঙ্গে কাজ করতে হচ্ছিল।

অয়ন ছিল প্রিয়ার পুরোনো বন্ধু। বিয়ের আগে তাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব ছিল। রোহান সেটা জানত না।

একদিন অফিসে প্রিয়ার জন্মদিন ছিল।

সহকর্মীরা ছোট্ট একটা আয়োজন করেছিল।

অয়ন প্রিয়াকে একটি বই উপহার দিল।

বইয়ের প্রথম পাতায় লিখেছিল—

“পুরোনো বন্ধুত্ব যেন কখনো হারিয়ে না যায়।”

প্রিয়া হাসিমুখে বইটা নিল।

সেই সময় রোহান তাকে ফোন করেছিল।

—কোথায় তুমি?

—অফিসে।

—আজ কখন ফিরবে?

—একটু দেরি হবে। একটা ছোট অনুষ্ঠান আছে।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—অয়নও আছে?

প্রিয়া বুঝতে পারল, আবার সেই একই বিষয়।

—হ্যাঁ, আছে। সবাই আছে।

রোহানের গলা ঠান্ডা হয়ে গেল।

—ঠিক আছে।

ফোন কেটে গেল।

প্রিয়া বিরক্ত হয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

রাতে বাড়ি ফিরে সে দেখল, রোহান চুপচাপ বসে আছে।

প্রিয়া ব্যাগ রেখে বলল,

—কী হয়েছে?

রোহান কোনো উত্তর দিল না।

প্রিয়া আবার বলল,

—আমার ওপর রাগ করেছ?

—না।

—তাহলে কথা বলছ না কেন?

রোহান এবার বলল,

—তোমার জন্মদিনে অয়ন তোমাকে কী দিয়েছে?

প্রিয়া অবাক হয়ে গেল।

—একটা বই।

—আর কিছু?

—না।

—বইয়ের মধ্যে কী লিখেছে?

প্রিয়া থমকে গেল।

—তুমি কীভাবে জানো?

—তুমি বইটা টেবিলে রেখেছিলে।

প্রিয়া বইটা হাতে নিয়ে বলল,

—এটা নিয়ে তোমার সমস্যা কী?

রোহান বলল,

—আমি শুধু জানতে চেয়েছি।

প্রিয়া এবার রেগে গেল।

—না, তুমি জানতে চাওনি। তুমি আমাকে সন্দেহ করছ।

—আমি তোমাকে সন্দেহ করছি না।

—তাহলে বারবার অয়নের কথা কেন বলছ?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—কারণ আমি তোমাকে হারাতে চাই না।

প্রিয়ার রাগ কিছুটা কমে গেল।

কিন্তু সে বলল,

—আমাকে হারানোর ভয় থাকলে আমাকে বিশ্বাস করো।

রোহান মাথা নিচু করল।

—আমি চেষ্টা করছি।

প্রিয়া ধীরে বলল,

—বিশ্বাস না থাকলে কোনো সম্পর্ক টেকে না।

সেদিন তাদের কথা সেখানেই শেষ হয়েছিল।

কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো কয়েক দিন পর।

রোহান হঠাৎ প্রিয়ার অফিসে গেল। সে ভেবেছিল, প্রিয়াকে নিয়ে বাইরে দুপুরের খাবার খাবে।

কিন্তু অফিসে গিয়ে জানতে পারল, প্রিয়া একটি ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে বাইরে গেছে।

রোহান ফোন করল।

প্রিয়া ফোন ধরল না।

এক ঘণ্টা পর ফোন করে বলল,

—দুঃখিত, মিটিংয়ে ছিলাম।

রোহান জিজ্ঞেস করল,

—কোথায়?

—একটা রেস্টুরেন্টে।

—কার সঙ্গে?

প্রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,

—অয়ন আর ক্লায়েন্টদের সঙ্গে।

রোহানের বুকের ভেতর অস্বস্তি তৈরি হলো।

—অয়ন ছাড়া কি তুমি কোনো কাজ করতে পারো না?

প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তুমি যদি আমাকে বিশ্বাস না করো, তাহলে আমার কিছু বলার নেই।

ফোন কেটে গেল।

সেদিন রাতে প্রিয়া বাড়ি ফিরে খুব শান্ত ছিল।

রোহান বুঝতে পারছিল, সে কষ্ট পেয়েছে।

সে কাছে গিয়ে বলল,

—প্রিয়া।

—হুম।

—আজ আমি হয়তো বেশি বলে ফেলেছি।

প্রিয়া বলল,

—শুধু আজ না।

রোহান থমকে গেল।

—মানে?

প্রিয়া ধীরে ধীরে বলল,

—প্রতিদিন তুমি আমাকে এমনভাবে প্রশ্ন করো, যেন আমি তোমার কাছে অপরাধী।

—আমি তো শুধু—

—শুধু কী? শুধু জানতে চাও?

প্রিয়ার চোখে পানি চলে এল।

—তুমি জানো, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় কী?

রোহান চুপ করে তাকিয়ে রইল।

—তুমি আমাকে ভালোবাসো, এটা আমি জানি। কিন্তু তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না।

রোহান কিছু বলতে পারল না।

প্রিয়া বলল,

—আমি তোমার স্ত্রী, রোহান। তোমার কাছে আমার নিজের একটা জীবন থাকবে, নিজের বন্ধু থাকবে, নিজের কাজ থাকবে। তার মানে এই নয় যে আমি তোমাকে ভালোবাসি না।

রোহান মাথা নিচু করে বলল,

—আমি শুধু ভয় পাই।

—কিসের ভয়?

—তোমাকে হারানোর।

প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আমাকে ধরে রাখতে চাইলে আমার চারপাশে দেয়াল তুলো না। বরং আমার পাশে দাঁড়াও।

এই কথাটা রোহানের মনে গেঁথে গেল।

কিন্তু সমস্যার এখানেই শেষ ছিল না।

কয়েক দিন পর প্রিয়ার বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। প্রিয়া ছুটে গেল বাবার কাছে।

রোহানও যেতে চেয়েছিল। কিন্তু সেদিন তার ব্যবসায় বড় একটি সমস্যা তৈরি হওয়ায় সে যেতে পারেনি।

প্রিয়া সারারাত হাসপাতালে ছিল।

রোহান কয়েকবার ফোন করেছিল।

প্রিয়া ফোন ধরেনি।

সকালে রোহান হাসপাতালে গিয়ে দেখল, প্রিয়া বাবার পাশে বসে আছে।

রোহান কাছে গিয়ে বলল,

—কেমন আছেন?

প্রিয়া শুধু মাথা নেড়ে বলল,

—এখন একটু ভালো।

রোহান বলল,

—আমি আসতে চেয়েছিলাম।

প্রিয়া শান্ত গলায় বলল,

—আমি জানি।

—তুমি রাগ করেছ?

—না।

কিন্তু তার কণ্ঠে এমন একটা দূরত্ব ছিল, যা রোহানকে অস্বস্তিতে ফেলল।

হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে প্রিয়া বলল,

—রোহান, আমাদের একটু সময় দরকার।

রোহান গাড়ি থামিয়ে তার দিকে তাকাল।

—কী বলতে চাইছ?

প্রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—আমরা দুজনেই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি।

রোহানের বুক কেঁপে উঠল।

—তুমি কি আমাকে ছেড়ে যেতে চাও?

প্রিয়া চোখ বন্ধ করল।

—আমি জানি না।

এই তিনটি শব্দ রোহানের কাছে বজ্রপাতের মতো মনে হলো।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তুমি যদি চলে যাও, আমি কী করব?

প্রিয়া এবার তার দিকে তাকাল।

—আমি জানি না, রোহান। কিন্তু এভাবে চলতেও তো পারছি না।

গাড়ির ভেতর নীরবতা নেমে এল।

দুজনেই জানত, তাদের সম্পর্ক এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে হয় তারা সব ভুল বোঝাবুঝি সরিয়ে নতুনভাবে শুরু করবে, নয়তো সত্যিই আলাদা হয়ে যাবে।

আর ঠিক সেই সময় রোহানের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে একটি ছবি এল।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, প্রিয়া আর অয়ন একটি রেস্টুরেন্টে পাশাপাশি বসে আছে।

ছবির নিচে শুধু একটি বাক্য লেখা—

“যাকে এত বিশ্বাস করো, তাকে কি সত্যিই চেনো?”

রোহানের চোখ স্থির হয়ে গেল।

সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা বন্ধ করে দিল।

রোহানের ফোনে আসা ছবিটা সে বারবার দেখছিল।

ছবিতে প্রিয়া আর অয়ন একটি রেস্টুরেন্টে বসে কথা বলছে। ছবিটা দেখে বাইরে থেকে মনে হতে পারে, তাদের মধ্যে বিশেষ কোনো সম্পর্ক আছে। কিন্তু রোহান জানত না ছবিটা কখন তোলা হয়েছে, কেন তোলা হয়েছে, কিংবা ছবির পেছনের সত্যিটা কী।

তারপরও সন্দেহ মানুষের মনকে যুক্তি দিয়ে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

রোহান সারা রাত ঘুমাতে পারল না।

প্রিয়া তখন বাবার অসুস্থতার কারণে মায়ের বাসায় ছিল। রোহান তাকে ফোন করতে চেয়েও করল না।

তার মনে হচ্ছিল, আগে সত্যিটা জানতে হবে।

পরদিন সকালে সে অয়নকে ফোন করল।

—তোমার সঙ্গে আমার একটু কথা আছে।

অয়ন কিছুটা অবাক হয়ে বলল,

—জি, বলুন।

—প্রিয়ার সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা কী?

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর অয়ন বলল,

—প্রিয়া আমার বন্ধু। আর অফিসের সহকর্মী।

—শুধু বন্ধু?

—হ্যাঁ।

রোহানের গলা কঠিন হয়ে গেল।

—তাহলে ওই ছবিটা কেন?

অয়ন বুঝতে পারল না।

—কোন ছবি?

রোহান ছবিটা পাঠিয়ে দিল।

ছবিটা দেখে অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—এই ছবি নিয়ে আপনি ভুল বুঝছেন।

—তাহলে সত্যিটা কী?

—প্রিয়ার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নেই। ওই দিন আমরা একজন ক্লায়েন্টের সঙ্গে মিটিং করছিলাম।

রোহান বলল,

—ছবিতে তো শুধু তোমাদের দুজনকেই দেখা যাচ্ছে।

—ক্লায়েন্ট একটু আগে চলে গিয়েছিল। আমরা প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলছিলাম।

রোহান আর কিছু বলল না।

অয়ন বলল,

—আপনি যদি প্রিয়াকে ভালোবাসেন, তাহলে ওকে জিজ্ঞেস করুন। আমার ওপর সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই।

ফোন কেটে গেল।

রোহান অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

সে জানত, প্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা উচিত।

কিন্তু তার ভেতরে জমে থাকা অভিমান তাকে থামিয়ে রাখছিল।

এদিকে প্রিয়া মায়ের বাসায় বসে বাবার চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। রোহানের সঙ্গে তার সম্পর্কের সমস্যার কথা সে মাকে পুরোপুরি বলেনি।

মা শুধু বুঝতে পারছিলেন, মেয়েটা ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে।

এক রাতে মা বললেন,

—রোহানের সঙ্গে কথা বলেছ?

প্রিয়া মাথা নেড়ে বলল,

—না।

—কেন?

—কী বলব?

—যা মনে হচ্ছে, সেটাই বলো।

প্রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—মা, আমি ওকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু ও আমাকে বিশ্বাস করে না।

—তুমি কি ওকে বিশ্বাস করো?

প্রিয়া একটু চুপ করে বলল,

—হ্যাঁ।

—তাহলে সম্পর্কটা শেষ করার কথা ভাবছ কেন?

প্রিয়ার চোখে পানি চলে এল।

—কারণ শুধু ভালোবাসা দিয়ে সবসময় একটা সম্পর্ক বাঁচানো যায় না।

মা তার হাত ধরে বললেন,

—ভালোবাসা যদি থাকে, তাহলে চেষ্টা শেষ হওয়ার আগেই হাল ছেড়ো না।

সেই রাতে প্রিয়া রোহানকে ফোন করার সিদ্ধান্ত নিল।

কিন্তু ফোন করার আগেই তার ফোনে একটি ছবি এল।

ছবিটা দেখে সে স্তব্ধ হয়ে গেল।

এবার ছবিতে রোহানকে দেখা যাচ্ছে এক তরুণীর সঙ্গে একটি ক্যাফেতে বসে থাকতে।

ছবির নিচে লেখা—

“নিজের স্বামীকেও কি তুমি বিশ্বাস করো?”

প্রিয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে জানত না ছবিটা কখন তোলা।

কিন্তু ছবিটা দেখে তার মনে হলো, রোহানও হয়তো তার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছে।

প্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে রোহানকে ফোন করল।

রোহান ফোন ধরতেই প্রিয়া বলল,

—তুমি কোথায়?

—অফিসে।

—আমার সঙ্গে একটা কথা বলবে?

—হ্যাঁ।

প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তুমি কি আমাকে কিছু লুকাচ্ছ?

রোহান অবাক হলো।

—কী?

—একজন মেয়ের সঙ্গে তোমার ছবি আমার কাছে এসেছে।

রোহান হতভম্ব হয়ে গেল।

—কোন ছবি?

প্রিয়া ছবিটা পাঠিয়ে দিল।

ছবিটা দেখে রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—এই মেয়েটা আমার ক্লায়েন্টের মেয়ে। ওদের সঙ্গে একটা ব্যবসায়িক মিটিং ছিল।

প্রিয়া বলল,

—তুমি আমাকে বলোনি কেন?

—প্রতিটা মিটিংয়ের কথা কি তোমাকে বলতে হবে?

—না। কিন্তু তুমি আমাকে যদি কিছু না বলো, তাহলে আমি কীভাবে বিশ্বাস করব?

রোহান এবার বুঝতে পারল, তারা দুজনই একই সমস্যার মধ্যে আটকে গেছে।

দুজনেই একে অপরকে ভালোবাসে।

কিন্তু দুজনেই একে অপরের কাছ থেকে কিছু লুকানো হচ্ছে বলে মনে করছে।

রোহান ধীরে বলল,

—প্রিয়া, তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?

ওপাশে অনেকক্ষণ নীরবতা।

তারপর প্রিয়া বলল,

—আমি করতে চাই।

এই কথাটার মধ্যে কতটা কষ্ট ছিল, রোহান বুঝতে পারল।

সে বলল,

—তাহলে কাল আমার সঙ্গে দেখা করো।

—কোথায়?

—যেখানে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।

প্রিয়া কিছু বলল না।

রোহান আবার বলল,

—একবার শেষবারের মতো আমাদের সম্পর্কটা নিয়ে কথা বলতে চাই।

পরদিন বিকেলে তারা সেই পুরোনো ক্যাফেতে দেখা করল।

যে জায়গায় প্রথমবার একসঙ্গে বসে কফি খেয়েছিল।

প্রিয়া এসে চুপচাপ বসে রইল।

রোহান তার সামনে বসে বলল,

—মনে আছে, এখানে প্রথমবার তুমি আমাকে বলেছিলে আমি অদ্ভুত মানুষ?

প্রিয়ার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল।

—মনে আছে।

—আর তুমি বলেছিলে, এখনো ঠিক করোনি সেটা প্রশংসা নাকি অভিযোগ।

প্রিয়া বলল,

—অনেক কিছুই বদলে গেছে।

রোহান মাথা নিচু করল।

—হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে বলল,

—আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।

প্রিয়া তাকাল।

—আমি তোমাকে হারানোর ভয় থেকে অনেক ভুল করেছি। তোমার বন্ধুদের নিয়ে প্রশ্ন করেছি, তোমার কাজ নিয়ে সন্দেহ করেছি। আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে যত বেশি কাছে রাখব, তুমি তত বেশি আমার থাকবে।

প্রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

রোহান বলল,

—কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি, মানুষকে কাছে রাখার জন্য তাকে বিশ্বাস করতে হয়।

প্রিয়া ধীরে বলল,

—আমিও ভুল করেছি।

—তুমি?

—হ্যাঁ। তোমার ব্যস্ততাকে আমি অনেক সময় তোমার অবহেলা ভেবেছি। তুমি যখন কথা বলতে চেয়েছ, তখনও আমি অভিমান করে চুপ থেকেছি।

রোহান তার দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রিয়া বলল,

—আমরা দুজনেই কথা না বলে নিজের নিজের মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তাহলে কি আমরা আবার শুরু করতে পারি?

প্রিয়া উত্তর দিল না।

সে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর বলল,

—আমি চেষ্টা করতে পারি।

রোহানের চোখে আশার আলো ফুটল।

—সত্যি?

প্রিয়া বলল,

—কিন্তু একটা শর্ত আছে।

—কী?

—আমাদের মধ্যে আর কোনো গোপন কথা থাকবে না।

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

—ঠিক আছে।

—আর তুমি আমাকে সন্দেহ করলে সরাসরি আমাকে জিজ্ঞেস করবে। অন্য কারও কথা শুনে সিদ্ধান্ত নেবে না।

—ঠিক আছে।

—আর আমিও তোমার সঙ্গে অভিমান করে চুপ থাকব না।

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে আমাদের বিয়ে বোধহয় আবার নতুন করে শুরু হবে।

প্রিয়া হেসে ফেলল।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে রোহানের ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

রোহান ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একটি গম্ভীর কণ্ঠ বলল,

—আপনারা দুজন যতই একে অপরকে বিশ্বাস করার চেষ্টা করুন, সত্যিটা জানলে হয়তো আবার সব বদলে যাবে।

রোহান উঠে দাঁড়াল।

—আপনি কে?

ওপাশ থেকে উত্তর এল,

—যে মানুষটা আপনাদের দুজনের সম্পর্ক ভেঙে যেতে দেখছে।

ফোন কেটে গেল।

প্রিয়া আতঙ্কিত চোখে রোহানের দিকে তাকাল।

—কে ছিল?

রোহান কোনো উত্তর দিল না।

সে শুধু ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর একই নম্বর থেকে একটি মেসেজ এল।

সঙ্গে ছিল কয়েকটি ছবি।

প্রথম ছবিতে ছিল রোহান ও সেই তরুণী।

দ্বিতীয় ছবিতে ছিল প্রিয়া ও অয়ন।

তৃতীয় ছবিটা দেখে দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেল।

ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, রোহানের ব্যবসার অফিস থেকে একটি বড় অঙ্কের টাকা অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে।

রোহান ছবিটা দেখে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—এটা অসম্ভব...

প্রিয়া জিজ্ঞেস করল,

—কী হয়েছে?

রোহান ধীরে বলল,

—এই টাকা আমি পাঠাইনি।

প্রিয়া তাকিয়ে রইল।

—তাহলে কে পাঠিয়েছে?

রোহান কোনো উত্তর দিতে পারল না।

কারণ সেই মুহূর্তে সে বুঝতে পারল, তাদের সম্পর্কের সমস্যার পেছনে শুধু ভুল বোঝাবুঝি নেই।

কেউ একজন ইচ্ছা করে তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করছে।

আর সেই মানুষটা কে—তা এখনো তারা জানে না।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পরও রোহান আর প্রিয়ার মাথা থেকে সেই ছবিগুলো সরছিল না।

কেউ একজন পরিকল্পনা করে তাদের দুজনের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করছিল। কিন্তু কেন?

রোহান নিজের ব্যবসার হিসাবপত্র নিয়ে সন্দেহে পড়ে গেল। পরদিন সকালেই সে অফিসে গিয়ে সব লেনদেন পরীক্ষা করতে শুরু করল।

কয়েক ঘণ্টা পর তার হিসাবরক্ষক জানাল,

—স্যার, এই টাকা আপনার কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকেই ট্রান্সফার হয়েছে। কিন্তু আপনার অনুমোদনের রেকর্ড নেই।

রোহান ভ্রু কুঁচকে বলল,

—মানে?

—কেউ আপনার ডিজিটাল অনুমোদনের তথ্য ব্যবহার করেছে।

রোহান বুঝতে পারল, ব্যাপারটা সাধারণ নয়।

সে সঙ্গে সঙ্গে অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করল। দেখা গেল, কয়েক দিন আগে তার এক পুরোনো কর্মচারী রাতে অফিসে ঢুকেছিল।

লোকটির নাম ছিল সুমন।

সুমন প্রায় দুই বছর আগে রোহানের অফিসে কাজ করত। পরে হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল।

রোহান তাকে ফোন করল।

সুমন প্রথমে ফোন ধরল না।

কিছুক্ষণ পর অচেনা নম্বর থেকে একটি মেসেজ এল—

“সবকিছু জানার দরকার নেই। আপনার স্ত্রীকে নিয়ে নিজের সংসার সামলান।”

রোহান এবার নিশ্চিত হলো, কেউ ইচ্ছা করেই তাকে ভয় দেখাচ্ছে।

কিন্তু প্রিয়ার কাছে বিষয়টা আরও জটিল ছিল।

সে ভাবছিল, এতদিন ধরে রোহানকে নিয়ে যে সন্দেহগুলো তার মনে জন্মেছিল, সেগুলোর কতটা সত্যি আর কতটা মিথ্যা।

সেদিন সন্ধ্যায় রোহান নিজেই প্রিয়ার কাছে গেল।

প্রিয়া দরজা খুলে তাকে দেখে কিছু বলল না।

রোহান বলল,

—তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।

—ভেতরে আসো।

রোহান ঘরে ঢুকে বসে বলল,

—আমি সবকিছু খুঁজে দেখছি। যে ছবিগুলো এসেছে, সেগুলো সত্যি হলেও ছবির অর্থ সত্যি নয়।

প্রিয়া চুপ করে শুনছিল।

—অয়নকে আমি কথা বলেছি। সে পরিষ্কার বলেছে, তোমাদের সম্পর্ক শুধু বন্ধুত্বের। আর আমার যে ছবিটা তোমার কাছে এসেছে, সেই মেয়েটা আমার ব্যবসার ক্লায়েন্টের মেয়ে।

প্রিয়া ধীরে বলল,

—আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।

রোহান অবাক হয়ে তাকাল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ। কারণ এবার আমি অন্য কারও পাঠানো ছবি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।

রোহানের চোখে স্বস্তি ফুটে উঠল।

সে বলল,

—আমিও তোমাকে বিশ্বাস করি।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।

তারপর প্রিয়া বলল,

—রোহান, আমরা একটা ভুল করেছি।

—কী?

—আমরা একে অপরকে হারানোর ভয় পেয়ে একে অপরের কাছ থেকেই দূরে সরে গিয়েছিলাম।

রোহান মাথা নিচু করল।

—আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।

—আমিও।

—আমি তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছি।

—আর আমি অভিমান করে তোমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেছি।

দুজনেই হেসে ফেলল।

অনেক দিন পর সেই হাসিটা ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু তাদের সামনে তখনও একটা বড় সমস্যা ছিল—রোহানের ব্যবসার টাকা।

পরদিন রোহান পুলিশের সাহায্য না নিয়ে প্রথমে তার ব্যাংক ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করল। তদন্ত করে জানা গেল, তার সাবেক কর্মচারী সুমন একটি পুরোনো পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে কোম্পানির সিস্টেমে ঢুকেছিল।

কিন্তু সে একা কাজ করেনি।

তার সঙ্গে ছিল রোহানের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী কামাল।

কামাল অনেক দিন ধরেই রোহানের ব্যবসা নষ্ট করার সুযোগ খুঁজছিল। সে জানত, রোহান ও প্রিয়ার সম্পর্কের দুর্বল জায়গাটা কোথায়।

সে প্রথমে অয়নের সঙ্গে প্রিয়ার ছবিগুলো সংগ্রহ করে রোহানের কাছে পাঠায়।

তারপর রোহানের সঙ্গে অন্য এক নারীর ছবি তুলে প্রিয়ার কাছে পাঠায়।

উদ্দেশ্য ছিল একটাই—

তাদের মধ্যে বিশ্বাস নষ্ট করা।

সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর সব সত্যি বেরিয়ে এল।

রোহান জানতে পারল, টাকা চুরি করার পাশাপাশি কামাল তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক জালিয়াতির প্রমাণ তৈরি করার চেষ্টা করছিল।

রোহান এবার আইনি ব্যবস্থা নিল।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেল।

কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা রোহান ও প্রিয়ার জন্য ছিল তাদের নিজেদের সম্পর্ক।

এক সন্ধ্যায় তারা সেই সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, যেখানে অনেক দিন আগে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু যেতে পারেনি।

ঢেউ এসে পায়ের কাছে ভেঙে পড়ছিল।

প্রিয়া বলল,

—মনে আছে? এখানে আসার কথা ছিল অনেক আগে।

রোহান হেসে বলল,

—তখন আমাদের সময় হয়নি।

—এখন হয়েছে?

—এখন সময় বের করতে শিখেছি।

প্রিয়া তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

রোহান বলল,

—আমি একটা কথা বুঝেছি।

—কী?

—সংসার মানে শুধু ভালোবাসা না। প্রতিদিন একজন আরেকজনকে বেছে নেওয়া।

প্রিয়া চুপ করে শুনছিল।

—আর একটা কথা বুঝেছি, কাউকে ভালোবাসলে তাকে নিজের মতো করে রাখতে হয় না। তার নিজের একটা পৃথিবী থাকবে। সেই পৃথিবীর পাশে দাঁড়াতে হয়।

প্রিয়ার চোখে পানি জমে উঠল।

সে বলল,

—আমিও একটা কথা বুঝেছি।

—কী?

—অভিমান জমিয়ে রাখলে ভালোবাসা বড় হয় না। বরং দূরত্ব বড় হয়।

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে আমরা দুজনেই অনেক কিছু শিখেছি।

প্রিয়া বলল,

—হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ পর রোহান তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

—আবার শুরু করব?

প্রিয়া তার হাত ধরল।

—আবার।

সেই মুহূর্তে তাদের সম্পর্কটা আগের জায়গায় ফিরে গেল না।

বরং নতুন একটা জায়গা থেকে শুরু হলো।

এবার সেখানে শুধু আবেগ ছিল না।

ছিল বোঝাপড়া।

ছিল বিশ্বাস।

ছিল নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস।

ঢাকায় ফিরে রোহান নিজের কাজের সময় কিছুটা বদলে ফেলল। সে বুঝতে পারল, ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিবারকে সময় দেওয়াও তার দায়িত্ব।

প্রিয়াও নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। রোহান তার সিদ্ধান্তগুলোকে সম্মান করতে শুরু করল।

তাদের মধ্যে মতবিরোধ এখনো হতো।

কখনো রোহান রেগে যেত।

কখনো প্রিয়া অভিমান করত।

কিন্তু এবার তারা একটা নিয়ম করেছিল—

কোনো সমস্যা হলে সেই রাতেই কথা বলবে।

চুপ করে থাকবে না।

আর কোনো তৃতীয় ব্যক্তির কথা শুনে একে অপরকে বিচার করবে না।

কয়েক মাস পর তাদের বিবাহবার্ষিকীর দিন রোহান প্রিয়াকে সেই একই ক্যাফেতে নিয়ে গেল, যেখানে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।

প্রিয়া অবাক হয়ে বলল,

—এখানে কেন?

রোহান বলল,

—আমাদের গল্পটা এখান থেকেই শুরু হয়েছিল।

—তারপর কত কিছু হয়ে গেল।

—হ্যাঁ।

—কখনো মনে হয়, আমরা যদি সেদিন বিয়েটা না করতাম?

রোহান কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—তাহলে হয়তো এত কিছু শিখতাম না।

প্রিয়া হেসে বলল,

—সবকিছু কি আবার করতে চাইবে?

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

—না।

প্রিয়া অবাক হলো।

—কেন?

—কারণ তোমাকে হারানোর ভয়টা আর একবার পেতে চাই না।

প্রিয়া হেসে বলল,

—তাহলে এখন কী চাও?

রোহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—প্রতিদিন তোমার সঙ্গে নতুন করে জীবনটা শুরু করতে চাই।

প্রিয়া কিছু বলল না।

শুধু মৃদু হাসল।

ক্যাফের জানালার বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছিল।

ঠিক সেই প্রথম দিনের মতো।

রোহান জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—মনে আছে, প্রথম দিন বৃষ্টিতে তোমাকে গাড়িতে তুলে দিয়েছিলাম?

প্রিয়া হেসে বলল,

—মনে আছে। তখনই বুঝেছিলাম, তুমি একটু অদ্ভুত।

—আর এখন?

প্রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—এখন বুঝেছি, অদ্ভুত মানুষটার সঙ্গে জীবনটা খারাপ না।

দুজনেই হেসে উঠল।

বৃষ্টির শব্দের মধ্যে তাদের গল্পটা যেন নতুন করে শুরু হলো।

তাদের জীবনে আর কোনো সমস্যা আসবে না—এমন নয়।

সংসারে মতের অমিল থাকবে, ব্যস্ততা থাকবে, রাগ-অভিমান থাকবে।

কিন্তু তারা শিখে গিয়েছিল, সম্পর্ক ভাঙে শুধু বড় কোনো ঘটনার কারণে নয়।

অনেক সময় ছোট ছোট না বলা কথা, অকারণ সন্দেহ আর জমে থাকা অভিমানই দুজন মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়।

আর সম্পর্ক টিকে থাকে তখনই, যখন দুজন মানুষ একে অপরকে বদলানোর চেষ্টা না করে বুঝতে শেখে।

....
👁 48