ভাঙা জীবনে বসন্ত এলো

গ্রামের নাম চরবাড়িয়া। পদ্মার পাড়ে ছোট্ট একটা গ্রাম। ভোর হলে চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে যায়। বিকেল নামলে নদীর দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস আসে। নদীর পাড়ে কাশফুল দোলে, আর সন্ধ্যা হলেই দূরের মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসে।

এই চরবাড়িয়াতেই ছিল আনোয়ারা সেবা কেন্দ্র। আজ সেই সেবা কেন্দ্রের উদ্বোধনের দিন।

আনোয়ারা বেগম মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি স্বামী আবদুল করিম সাহেবকে বলেছিলেন,

“আমার পরে যেন এই গ্রামের কোনো মানুষ টাকার অভাবে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যায়। তুমি একটা হাসপাতাল বানিয়ো।”

স্ত্রীর সেই কথাটা আবদুল করিম সাহেব কোনোদিন ভুলতে পারেননি।

নিজের অনেক জমিজমা বিক্রি করে অবশেষে তিনি গ্রামের মানুষের জন্য একটা চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি করলেন। নাম দিলেন—আনোয়ারা সেবা কেন্দ্র।

উদ্বোধনের দিন সকাল থেকেই গ্রামের মানুষজন সেখানে ভিড় করেছে। কেউ এসেছে নতুন হাসপাতাল দেখতে, কেউ এসেছে আনোয়ারা বেগমের কথা মনে করে।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবদুল করিম সাহেব। তার পাশে তিন ছেলে—বড় ছেলে করিম, মেজো ছেলে আরিফ আর ছোট ছেলে রাফি।

রাফি আনোয়ারা বেগমের দত্তক ছেলে। ছোটবেলায় গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিল সে। তার বাবা-মায়ের অবস্থা ভালো ছিল না। আনোয়ারা বেগম তাকে নিজের ছেলের মতো করে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।

নিজের দুই ছেলের সঙ্গে রাফির কোনো পার্থক্য করেননি তিনি।

আজ সেই রাফিই ঢাকার একটি নামকরা হাসপাতালের নিউরোসার্জন।

উদ্বোধনের শেষে আবদুল করিম সাহেব সবার সামনে হাসপাতালের চাবিটা রাফির হাতে তুলে দিলেন।

“তোর মায়ের স্বপ্ন ছিল এটা। তুই এই জায়গাটার দায়িত্ব নে, বাবা।”

রাফি চাবিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার চোখের সামনে মায়ের মুখ ভেসে উঠল।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সবাই বাড়িতে ফিরে চা-নাশতা করতে বসেছে। কিন্তু আরিফ একা বাড়ির পেছনের বাগানে গিয়ে দাঁড়াল।

বাগানের এক পাশে এখনো মায়ের লাগানো গোলাপের গাছগুলো আছে।

আরিফ একটা গোলাপের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,

“মা থাকলে আজ কত খুশি হতে!”

পেছন থেকে রাফির গলা শোনা গেল,

“ভাইয়া, এখানে একা দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

আরিফ ঘুরে তাকাল।

“কিছু না। মায়ের কথা মনে পড়ছিল।”

রাফি এসে তার পাশে দাঁড়াল।

“মা নেই, কিন্তু তার স্বপ্ন তো আছে।”

আরিফ চুপ করে রইল।

রাফি আবার বলল,

“এই হাসপাতালের প্রতিটা মানুষের দোয়ার মধ্যে মা বেঁচে থাকবে।”

দুই ভাই কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

কয়েকদিন পর এক সকালে নাশতার টেবিলে আবদুল করিম সাহেব বড় ছেলে করিমকে বললেন,

“করিম, তোর বয়স তো কম হলো না। এবার তোর বিয়ের কথা ভাবতে চাই।”

করিম শান্ত স্বভাবের ছেলে। বাবার কথা কখনো অমান্য করে না।

সে মাথা নিচু করে বলল,

“আপনি যেটা ভালো মনে করেন, আব্বা।”

আবদুল করিম সাহেব বললেন,

“পাশের উপজেলায় একটা ভালো পরিবার আছে। মেয়েটা শিক্ষিত, ভদ্র। একদিন সবাই মিলে দেখে আসি।”

কয়েকদিন পর করিম, আরিফ, রাফি আর ফাতেমা খালা মিলে মেয়ের বাড়িতে গেল।

মেয়ের নাম সুমাইয়া।

শান্ত স্বভাবের মেয়ে। পড়াশোনাও করেছে। পরিবারের সবার সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলল।

প্রথম দেখাতেই করিমের পরিবারের সবাই সুমাইয়াকে পছন্দ করে ফেলল।

কিন্তু সুমাইয়ার ছোট বোন নীলা ছিল একেবারেই অন্যরকম।

বয়স বিশ বছর। সবসময় মুখে হাসি, কথায় দুষ্টুমি।

বাড়িতে সে থাকলে কোনো না কোনোভাবে সবাইকে হাসিয়ে রাখে।

সেদিনও সে সুযোগ পেল।

করিমকে দেখে নীলা গম্ভীর মুখে বলল,

“ভাইয়া, আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?”

করিম একটু অবাক হয়ে বলল,

“জি, করুন।”

“আপনি কি রাগী?”

করিম হেসে বলল,

“না, খুব একটা না।”

“বিয়ের পর স্ত্রী যদি আপনার সঙ্গে তর্ক করে?”

“তখন আগে শুনব, কেন তর্ক করছে।”

নীলা এবার একটু অবাক হলো।

“বাহ! আপনি তো বেশ শান্ত মানুষ।”

পাশ থেকে সুমাইয়া লজ্জা পেয়ে বলল,

“নীলা, তুই আবার শুরু করেছিস?”

সবাই হেসে উঠল।

আরিফ দূর থেকে নীলার দিকে তাকিয়ে ছিল।

হঠাৎ তাদের চোখাচোখি হলো।

নীলা সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল।

আরিফের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

বাড়ি ফেরার পথে ফাতেমা খালা বললেন,

“ওই মেয়েটার নাম নীলা। সারাক্ষণ দুষ্টুমি করে। তবে মনটা খুব ভালো।”

আরিফ মৃদু হেসে বলল,

“বুঝতেই পারছি।”

কয়েকদিনের মধ্যেই করিম আর সুমাইয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।

বিয়েটা বেশ ধুমধাম করে হলো।

চরবাড়িয়ার মানুষজন সবাই বিয়েতে এল। বাড়ির উঠানে আলো লাগানো হলো। আত্মীয়স্বজনের ভিড়ে পুরো বাড়ি জমজমাট হয়ে উঠল।

নীলা সেদিন সারাক্ষণ দৌড়াদৌড়ি করছিল।

কখনো বোনের ওড়না ঠিক করছে, কখনো অতিথিদের পানি দিচ্ছে, আবার কখনো বান্ধবীদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করছে।

আরিফ দূর থেকে তাকে দেখছিল।

কেন যেন মেয়েটার হাসিটা তার চোখে বারবার আটকে যাচ্ছিল।

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল।

সবাই যখন ব্যস্ত, তখন একবার নীলার সঙ্গে আরিফের চোখাচোখি হলো।

নীলা মুচকি হেসে অন্যদিকে চলে গেল।

আরিফ বুঝতে পারল, তার মনের ভেতর কিছু একটা বদলে গেছে।

বিয়ের তিন মাস পর গরমের ছুটি পড়ল।

সুমাইয়া শ্বশুরবাড়িতে একা একা থাকত। একদিন ফোন করে ছোট বোনকে বলল,

“নীলা, তুই আর রুমানা কয়েকদিনের জন্য চলে আয় না। বাড়িটা একদম খালি লাগে।”

নীলা আর তার কাজিন রুমানা পরদিনই চরবাড়িয়ায় চলে এল।

আরিফ তখন বাড়িতেই ছিল।

নীলাকে দেখে তার মনটা ভালো হয়ে গেল।

নীলা বাড়িতে এসেই সবার কাজে হাত লাগাল।

কখনো ফাতেমা খালার সঙ্গে রান্নাঘরে গল্প করছে, কখনো সুমাইয়ার সঙ্গে গল্প করছে, কখনো বাগানে ফুল তুলছে।

বিকেলে নদীর পাড়ে হাঁটতে যাওয়ার সময়ও সবার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করে।

আরিফ দূর থেকে সব দেখত।

একদিন বিকেলে নীলা বাগানে ফুল তুলছিল।

আরিফ সেখানে গিয়ে দাঁড়াল।

“এত ফুল দিয়ে কী করবে?”

নীলা না তাকিয়েই বলল,

“ভাবছি বাড়িটা সাজাব।”

“একা একা?”

“না। আপুর সঙ্গে।”

আরিফ বলল,

“তোমার বাড়ি ফেরার দিন কবে?”

নীলা বলল,

“আর দুই দিন পর।”

আরিফের মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।

“এত তাড়াতাড়ি?”

নীলা এবার তার দিকে তাকাল।

“কেন? আমাকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে বলছেন?”

“না।”

“তাহলে?”

আরিফ হেসে বলল,

“কিছু না।”

সেদিন রাতে আরিফ বুঝতে পারল, সে নীলাকে আর শুধু পছন্দ করে না।

সে সত্যিই মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছে।

কিন্তু নীলার মনের কথা সে জানত না।

তাই একদিন সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে দুজন একসঙ্গে হাঁটতে গেলে আরিফ সাহস করে বলল,

“নীলা, তোমাকে একটা কথা বলব?”

“বলুন।”

“তুমি যদি কোনোদিন অন্য কোথাও বিয়ে করে চলে যাও, তখন কি আমাকে মনে থাকবে?”

নীলা হঠাৎ থেমে গেল।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আপনি এমন কথা কেন বলছেন?”

আরিফ মৃদু গলায় বলল,

“কারণ তোমাকে চলে যেতে দেখলে আমার ভালো লাগে না।”

নীলা মাথা নিচু করে ফেলল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

“আমারও।”

আরিফ অবাক হয়ে তাকাল।

“কী?”

নীলা সাহস করে তার দিকে তাকাল।

“আপনি চলে গেলে আমারও ভালো লাগে না।”

আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

“নীলা, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

নীলার চোখে পানি চলে এল।

“আমি জানি।”

“কীভাবে?”

“আপনার চোখে লেখা থাকে।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

সেদিন নদীর পাড়ের বাতাসে যেন তাদের জীবনের নতুন একটা অধ্যায় শুরু হলো।

কিন্তু সুখের দিনগুলো বেশি দিন স্থায়ী হলো না।

এক সকালে হঠাৎ আরিফের প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হলো।

সে কিছুক্ষণ পরেই অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল।

বাড়িতে হইচই পড়ে গেল।

রাফি দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রাফির মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

সে বাবাকে আলাদা করে বলল,

“আব্বা, আরিফের মস্তিষ্কে একটা টিউমার আছে।”

আবদুল করিম সাহেবের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“টিউমার?”

“হ্যাঁ। ছোটবেলায় মাথায় একটা গুরুতর আঘাত পেয়েছিল ও। হয়তো সেই সমস্যাটাই এতদিন ধীরে ধীরে বড় হয়েছে।”

“ও কি ভালো হবে?”

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,

“চেষ্টা করলে ইনশাআল্লাহ ভালো হওয়ার আশা আছে। তবে অপারেশনটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ।”

আবদুল করিম সাহেব দেয়ালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন।

করিম বাইরে গিয়ে চোখ মুছতে লাগল।

ফাতেমা খালা কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

আরিফ যখন জ্ঞান ফিরে পেল, তখন সে নিজের অসুস্থতার কথা জানতে পারল।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সে সুমাইয়াকে ডাকল।

“আপু, নীলাকে একটা কথা বলবে?”

সুমাইয়া চোখ মুছতে মুছতে বলল,

“কী কথা?”

“ও যেন আমাকে ভুলে যায়।”

“কেন?”

“আমি জানি না আমি কতদিন বাঁচব। ওর জীবন আমি নষ্ট করতে চাই না।”

সুমাইয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“তুই নিজে ওকে ভালোবাসিস, আবার ওকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিস?”

আরিফ চোখ বন্ধ করে বলল,

“আমি চাই ও সুখী হোক।”

সুমাইয়া আর কিছু বলতে পারল না।

কিন্তু নীলাকে সব জানাতে হলো।

খবরটা শুনেই নীলা সেদিন রাতেই চরবাড়িয়ায় চলে এল।

বাড়িতে ঢুকেই সে সোজা আরিফের ঘরে গেল।

আরিফ বিছানায় শুয়ে ছিল।

নীলা তার পাশে বসে বলল,

“আপনি আমাকে ভুলে যেতে বলেছেন?”

আরিফ মুখ ফিরিয়ে নিল।

“হ্যাঁ।”

“আমি ভুলব না।”

“নীলা, তুমি বুঝতে পারছ না। আমার অবস্থা ভালো না।”

“আমি সব বুঝি।”

“অপারেশনে যদি কিছু হয়ে যায়?”

নীলা শান্ত গলায় বলল,

“তাহলে যা হওয়ার হবে। কিন্তু আপনি বেঁচে থাকা পর্যন্ত আমি আপনার পাশে থাকব।”

আরিফ রাগ করে বলল,

“তুমি পাগল হয়ে গেছ?”

নীলা চোখের পানি মুছে বলল,

“হ্যাঁ, আপনার জন্য পাগল হয়ে গেছি।”

আরিফ চুপ করে গেল।

ঘরের বাইরে তখন আবদুল করিম সাহেব, করিম, রাফি, সুমাইয়া আর ফাতেমা খালা দাঁড়িয়ে ছিলেন।

আবদুল করিম সাহেব ধীরে ধীরে বললেন,

“মা, তুই ভেবে সিদ্ধান্ত নে। সামনে অনেক কঠিন সময়।”

নীলা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“চাচা, আমি সব বুঝে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আরিফকে ভালোবাসি। ওকে ছেড়ে যাওয়ার কথা আমি ভাবতেও পারি না।”

আরিফ অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর নীলার দিকে তাকাল।

তার চোখে তখন পানি।

সে ধীরে বলল,

“তুমি সত্যিই আমার পাশে থাকবে?”

নীলা মাথা নেড়ে বলল,

“শেষ পর্যন্ত।”

পরিবারের সম্মতিতে সেদিনই তাদের কাবিন পড়ানো হলো।

কাজি সাহেব এসে কাবিননামা পড়ালেন। দেনমোহর ঠিক হলো। আরিফ ও নীলা দুজনেই কবুল বলল।

দুজনের হাতে আংটি পরিয়ে দেওয়া হলো।

সেদিন বড় কোনো আয়োজন হয়নি।

কিন্তু সবার চোখে ছিল অশ্রু।

অপারেশনের দিন ঠিক হলো।

রাফি নিজেই অপারেশন করবেন।

অপারেশনের ঝুঁকি অনেক বেশি।

ডাক্তারদের আশঙ্কা ছিল, অপারেশন সফল না হলে বড় বিপদ হতে পারে।

অপারেশনের আগের রাতে আরিফ নীলার হাত ধরে বলল,

“যদি আমি না ফিরি—”

নীলা সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে হাত রেখে বলল,

“এই কথা আর বলবেন না।”

“কিন্তু—”

“আপনি ফিরবেন।”

“এত নিশ্চিত কীভাবে?”

নীলা মৃদু হেসে বলল,

“কারণ আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করব।”

পরদিন সকালে হাসপাতালে দুই পরিবারের সবাই এসে জড়ো হলো।

নীলার বাবা-মাও এসেছেন।

নীলার মা কাঁদতে কাঁদতে আবদুল করিম সাহেবের হাত ধরে বললেন,

“ভাই, আমার মেয়েটার জীবনটা যেন অন্ধকার হয়ে না যায়। আরিফকে বাঁচানোর জন্য যা করার করেন।”

আবদুল করিম সাহেব চোখ মুছে বললেন,

“ভাবি, আমরা সবাই চেষ্টা করছি। আল্লাহ ভরসা।”

অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে রাফি নীলার কাছে এসে বলল,

“আপা, আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”

নীলা হাত জোড় করে বলল,

“ভাইয়া, শুধু ওকে ফিরিয়ে দিন।”

রাফি মাথা নেড়ে ভেতরে চলে গেল।

এক ঘণ্টা গেল।

দুই ঘণ্টা।

তিন ঘণ্টা।

হাসপাতালের করিডোরে সবাই উৎকণ্ঠায় বসে রইল।

প্রায় চার ঘণ্টা পর অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলল।

রাফি বেরিয়ে এল।

চোখেমুখে ক্লান্তি।

সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

রাফি ধীরে ধীরে বলল,

“আলহামদুলিল্লাহ। অপারেশন সফল হয়েছে। আরিফ এখন বিপদমুক্ত।”

নীলা সেখানেই বসে পড়ে কাঁদতে লাগল।

আবদুল করিম সাহেব দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন।

করিম রাফিকে জড়িয়ে ধরল।

সেদিন হাসপাতালের করিডোরে সবার চোখেই ছিল আনন্দের পানি।

আরিফ পুরোপুরি সুস্থ হতে প্রায় দুই মাস সময় নিল।

এই সময়টায় নীলা প্রতিদিন তার পাশে থাকত।

সময়মতো ওষুধ খাওয়াত, খাবার খাওয়াত, ডাক্তারদের নির্দেশ মেনে চলতে বলত।

কখনো আরিফ বেশি কথা বললে বকত।

“ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলেছেন। এত কথা বলছেন কেন?”

আরিফ হেসে বলত,

“তুমি আমার স্ত্রী, না নার্স?”

নীলা গম্ভীর মুখে বলত,

“দুটোই।”

আরিফ হেসে ফেলত।

দুই মাস পর আরিফ যখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল, তখন দুই পরিবার মিলে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান বড় করে করার সিদ্ধান্ত নিল।

এবার আর কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

আত্মীয়স্বজন সবাই এল।

চরবাড়িয়ার মানুষজনও আনন্দ করে অংশ নিল।

বাড়ির উঠানে আবার আলো ঝুলল।

হাসি-আনন্দে ভরে উঠল পুরো বাড়ি।

বিয়ের দিন নীলাকে দেখে আরিফের চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল।

অনুষ্ঠান শেষে রাতে দুজন যখন কিছুক্ষণ একা কথা বলছিল, আরিফ বলল,

“তুমি সেদিন না এলে হয়তো আমি লড়াই করার সাহসই পেতাম না।”

নীলা মুচকি হেসে বলল,

“আমি তো বলেছিলাম, আপনাকে একা ছাড়ব না।”

“তুমি সত্যিই অনেক জেদি।”

“আপনার জন্য হলে আরও জেদি হব।”

আরিফ হেসে নীলার দিকে তাকাল।

বাইরে তখন পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে।

পদ্মার দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে।

মনে হচ্ছিল, তাদের জীবনটা যেন নতুন করে শুরু হয়েছে।

এরপরের দিনগুলো ধীরে ধীরে আনন্দে ভরে উঠল।

করিম আর সুমাইয়ার একটি ছেলে হলো।

আবদুল করিম সাহেব এখন নাতিকে নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকেন।

রাফি ঢাকায় চাকরি করলেও মাসে অন্তত একবার চরবাড়িয়ায় আসে। আনোয়ারা সেবা কেন্দ্রের কাজও নিয়মিত দেখে।

ফাতেমা খালা এখনো পুরো বাড়িটা নিজের হাতে সামলান।

আরিফ আবার কৃষি গবেষণার কাজে ফিরেছে।

তবে আগের মতো একা নেই।

নীলা সবসময় তার পাশে।

মাঝে মাঝে বিকেলে দুজন নদীর পাড়ে হাঁটতে যায়।

একদিন সূর্য ডোবার সময় নীলা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

“জানেন, আমাদের জীবনে কত কিছু বদলে গেল।”

আরিফ হেসে বলল,

“হ্যাঁ। তবে একটা জিনিস বদলায়নি।”

“কী?”

“তুমি এখনো আগের মতোই ঝগড়াটে।”

নীলা রাগ দেখিয়ে বলল,

“আপনিই বেশি কথা বলেন।”

দুজনেই হেসে উঠল।

দূরে তখন সূর্য ডুবছিল।

আকাশ লাল হয়ে উঠেছিল।

পদ্মার পানিতে শেষ বিকেলের আলো ঝিলমিল করছিল।

আরিফ কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

“মা থাকলে আজ খুব খুশি হতো।”

নীলা ধীরে বলল,

“আপনার মা নেই, কিন্তু তার স্বপ্ন তো আছে।”

আরিফ মাথা নাড়ল।

দূরে আনোয়ারা সেবা কেন্দ্রের সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছিল।

সেখানে প্রতিদিন অসহায় মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে।

কেউ টাকা দিতে পারে, কেউ পারে না।

কিন্তু কারও চিকিৎসা বন্ধ হয় না।

কারণ আনোয়ারা বেগম মৃত্যুর আগে যে স্বপ্ন রেখে গিয়েছিলেন, তার পরিবার সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

চরবাড়িয়ার মানুষ আজও তাকে মনে করে।

কেউ তাকে মা বলে, কেউ আপা বলে, কেউ আবার শুধু আনোয়ারা বলে।

আর পদ্মার বাতাস যখন বিকেলে গোলাপের গাছগুলো ছুঁয়ে যায়, তখন আবদুল করিম সাহেবের মনে হয়—

আনোয়ারা হয়তো কোথাও হারিয়ে যাননি।

তিনি আছেন।

তার পরিবারের ভালোবাসায়, মানুষের দোয়ায় আর সেই সেবা কেন্দ্রের প্রতিটি দেয়ালে।

চরবাড়িয়ার আকাশে তখন সন্ধ্যার আলো নেমে আসে।

দূরের মসজিদ থেকে আবার আজানের সুর ভেসে আসে।

আরিফ নীলার হাত ধরে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।

তাদের সামনে পড়ে থাকে নতুন জীবনের দীর্ঘ পথ।

....
👁 60