ঢাকার ব্যস্ত শহরের এক অভিজাত এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা তিনতলা বাড়িটা দূর থেকেই নজরে পড়ে। বড় লোহার গেট, সামনে ছোট্ট বাগান আর বারান্দায় ঝুলতে থাকা নানা রঙের ফুলের টব—সব মিলিয়ে বাড়িটা বেশ সুন্দর।
এই বাড়িতেই থাকত রাহুল।
বয়স ছাব্বিশ। একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করত। নিজের কাজ নিয়ে সে ভীষণ সিরিয়াস হলেও ব্যক্তিগত জীবনে ছিল একেবারে উল্টো। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, হঠাৎ কোথাও ঘুরতে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে মজা করা—এসবেই তার বেশি আনন্দ।
তবে একটা ব্যাপারে রাহুলের বদনাম ছিল।
সে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী।
নিজের সিদ্ধান্তকে সে প্রায় সব সময় সঠিক মনে করত। আর কেউ তার সঙ্গে তর্ক করলে সহজে ছেড়ে দেওয়ার মানুষ সে ছিল না।
সেদিন সকালে নাশতার টেবিলে বসে রাহুল ফোন দেখছিল।
তার মা বললেন,
—“রাহুল, আজ অফিস থেকে ফেরার সময় কিন্তু তোর মামার বাসায় যেতে হবে।”
রাহুল ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল,
—“আজ সম্ভব না মা। অফিসে কাজ আছে।”
—“প্রতিদিনই কাজ থাকে। কাল থেকে শুনছি যাবি, যাচ্ছিস না।”
—“আচ্ছা, চেষ্টা করব।”
মা বিরক্ত হয়ে বললেন,
—“তোর এই ‘চেষ্টা করব’ কথাটার মানে আমরা সবাই জানি।”
রাহুল হেসে ফেলল।
—“ঠিক আছে, আজ সত্যিই যাব।”
কথাটা বলেই সে উঠে পড়ল।
সেদিন অফিসে যাওয়ার পথে একটা ছোট দুর্ঘটনাই তার জীবনের গল্পটাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল।
অফিসের কাছাকাছি একটা ক্যাফের সামনে গাড়ি থামিয়ে রাহুল নামল। একজন বন্ধুর জন্য কফি নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
ক্যাফের দরজার কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ একজন মেয়ে দ্রুত বেরিয়ে এসে তার সঙ্গে ধাক্কা খেল।
মেয়েটার হাতে থাকা কফির কাপটা কাত হয়ে রাহুলের শার্টে পড়ল।
রাহুল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে নিজের শার্টের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—“এক্সকিউজ মি!”
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“সরি।”
কিন্তু তার গলায় এমন একটা ভঙ্গি ছিল, যেন ব্যাপারটা খুব বড় কিছু নয়।
রাহুল ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“শুধু সরি বললেই হবে?”
মেয়েটা এবার তার দিকে তাকাল।
মেয়েটার নাম রিয়া।
চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস। সাধারণ পোশাক, হাতে একটা ফাইল, চুলগুলো পেছনে বাঁধা। দেখতে শান্ত হলেও কথাবার্তায় বোঝা যায়, নিজের কথা বলতে সে একটুও ভয় পায় না।
রিয়া বলল,
—“আপনিও তো আমাকে ধাক্কা দিয়েছেন।”
রাহুল অবাক।
—“আমি আপনাকে ধাক্কা দিয়েছি?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনি দৌড়ে বের হয়ে এসে আমার সঙ্গে ধাক্কা খেলেন, আর দোষ আমার?”
রিয়া ঠান্ডা গলায় বলল,
—“আপনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।”
—“তাহলে?”
—“তাহলে একটু পাশে দাঁড়ালে পারতেন।”
রাহুল কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটা যে সহজে হার মানবে না, সেটা সে বুঝে গেল।
—“আপনার সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই।”
রিয়া হেসে বলল,
—“সেটা আমিও বুঝেছি।”
বলেই সে চলে গেল।
রাহুল দাঁড়িয়ে রইল।
মেয়েটার কথাটা তার একদম ভালো লাগেনি।
তবু অদ্ভুতভাবে তার মুখটা বারবার মনে পড়তে লাগল।
দুপুরে অফিসে বসে রাহুল কাজ করছিল। এমন সময় তার বন্ধু সজীব এসে বলল,
—“দোস্ত, আজ সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় আসবি?”
—“কেন?”
—“আমার বোনের বান্ধবী এসেছে। একটা ছোট গেট-টুগেদার।”
রাহুল মাথা নাড়ল।
—“আজ পারব না।”
সজীব বলল,
—“পারতেই হবে। তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
—“কী সারপ্রাইজ?”
—“বললে তো সারপ্রাইজ থাকবে না।”
রাহুল হাসল।
—“ঠিক আছে, যাব।”
সন্ধ্যায় সজীবের বাসায় গিয়ে রাহুল দেখল, বেশ কিছু মানুষ এসেছে। সবাই গল্প করছে।
সে সজীবকে খুঁজতে খুঁজতে ড্রয়িংরুমের একপাশে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ শুনতে পেল।
—“আপনি এখানে?”
রাহুল ঘুরে তাকাল।
তার চোখ বড় হয়ে গেল।
রিয়া।
রিয়াও অবাক।
—“আপনি সজীবকে চেনেন?”
—“হ্যাঁ। আর আপনি?”
—“সজীব আমার মামাতো ভাই।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর রিয়া বলল,
—“তাহলে আজকের দিনটা বোধহয় আমার জন্য ভালো না।”
রাহুল মুচকি হেসে বলল,
—“কেন?”
—“সকালে আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছে। আবার এখনো।”
—“আপনিও কিন্তু কম যান না।”
রিয়া চোখ সরিয়ে নিল।
—“আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে আসিনি।”
—“আমিও না।”
দুজনেই বিপরীত দিকে চলে গেল।
কিন্তু তাদের এই ছোট্ট কথোপকথনটা সজীবের চোখ এড়াল না।
সে এসে রাহুলের কাঁধে হাত রাখল।
—“কী ব্যাপার?”
—“কী?”
—“রিয়ার সঙ্গে তোর আগে পরিচয় আছে?”
—“না। আজকেই প্রথম দেখা।”
সজীব হেসে বলল,
—“প্রথম দেখাতেই এত ঝগড়া?”
রাহুল বিরক্ত হয়ে বলল,
—“ও মেয়েটা অসম্ভব জেদি।”
সজীব বলল,
—“আর তুই?”
রাহুল চুপ করে গেল।
সজীব হেসে চলে গেল।
রাত বাড়তে থাকল।
রিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ পাশে এসে দাঁড়াল রাহুল।
—“আপনি এখানে একা?”
রিয়া তাকাল।
—“কিছু বলবেন?”
—“না। এমনি।”
—“তাহলে?”
—“সকালের ব্যাপারটা নিয়ে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
রিয়া ভ্রু তুলল।
—“কী কথা?”
রাহুল একটু থেমে বলল,
—“আপনি আসলে পুরোপুরি ভুল ছিলেন না।”
রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
—“মানে?”
—“আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। তাই আপনাকে ধাক্কা লাগতে পারে।”
রিয়ার মুখে হালকা হাসি ফুটল।
—“আপনি তাহলে ভুল স্বীকার করতে পারেন?”
রাহুল বলল,
—“সব সময় না।”
—“আজ করলেন কেন?”
—“জানি না।”
দুজনেই হাসল।
সেই প্রথম তাদের ঝগড়ার মাঝখানে একটু নরম মুহূর্ত তৈরি হলো।
কিন্তু কেউই তখন জানত না, এই সামান্য পরিচয় একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে উঠবে।
রিয়া ভেতরে চলে যাওয়ার পর রাহুল কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই বলল,
—“মেয়েটা আসলেই অদ্ভুত।”
ভেতর থেকে রিয়ার কণ্ঠ ভেসে এল,
—“আমি কিন্তু শুনতে পাচ্ছি!”
রাহুল চমকে গেল।
রিয়া দরজার পাশে দাঁড়িয়ে হাসছিল।
—“আপনি সব সময় এত জোরে কথা বলেন?”
রাহুল হেসে বলল,
—“আপনি সব সময় এত কথা শোনেন?”
রিয়া বলল,
—“প্রয়োজন হলে শুনি।”
তারপর দুজনেই আবার হাসল।
পরদিন সকাল থেকেই রাহুলের মনটা অদ্ভুত রকম ভালো ছিল।
কেন ভালো, সেটা সে নিজেও জানত না।
অফিসে যাওয়ার সময় গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ তার মনে পড়ল আগের রাতের কথা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রিয়ার হাসি, তার কথার ভঙ্গি—সবকিছুই যেন অকারণে মাথায় ঘুরছিল।
রাহুল নিজের মনেই বলল,
—“মেয়েটাকে নিয়ে এত ভাবছি কেন?”
কয়েক সেকেন্ড পর নিজেই উত্তর দিল,
—“কারণ ও ভীষণ বিরক্তিকর।”
কথাটা বলেই সে হেসে ফেলল।
অফিসে পৌঁছে কাজ শুরু করলেও মনটা পুরোপুরি কাজে বসছিল না।
দুপুরের দিকে সজীব ফোন করল।
—“কী করছিস?”
—“অফিসে আছি।”
—“আজ সন্ধ্যায় ফ্রি?”
—“কেন?”
—“রিয়াও আসবে।”
রাহুল কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।
সজীব হাসতে হাসতে বলল,
—“কী হলো? নাম শুনেই চুপ?”
—“না। আসলে আজ কাজ আছে।”
—“কালও তো বলেছিলি কাজ আছে।”
—“আজ সত্যিই আছে।”
—“ঠিক আছে। তাহলে রিয়াকে বলব, রাহুল আসছে না।”
রাহুল দ্রুত বলল,
—“আমি কখন বললাম আসব না?”
ওপাশে সজীব হেসে উঠল।
—“এই তো! বুঝেছি।”
—“কী বুঝেছিস?”
—“কিছু না। সন্ধ্যায় দেখা হবে।”
ফোন কেটে গেল।
রাহুল কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল।
সন্ধ্যায় সজীবদের বাসায় আবার সবাই জড়ো হলো।
রাহুল ঢুকতেই প্রথমে সজীবের দিকে তাকাল।
—“কোথায়?”
সজীব ভান করে বলল,
—“কে?”
—“যে আসবে বলেছিলি।”
—“আরে, রিয়ার কথা বলছিস?”
রাহুল বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আমি শুধু জানতে চাইলাম।”
—“ও ছাদে।”
রাহুল কিছু না বলে সিঁড়ির দিকে হাঁটল।
ছাদে উঠে দেখল, রিয়া একটা চেয়ারে বসে বই পড়ছে।
রাহুল কিছুক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
—“আপনি সব জায়গায় বই নিয়ে বসে থাকেন?”
রিয়া বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,
—“আর আপনি সব জায়গায় বিরক্ত করতে আসেন?”
—“আমি তো শুধু প্রশ্ন করলাম।”
—“আপনার প্রশ্নেরও একটা সমস্যা আছে।”
—“কী সমস্যা?”
রিয়া এবার বই বন্ধ করে তাকাল।
—“আপনি এমনভাবে প্রশ্ন করেন, যেন উত্তরটা আপনাকে দিতেই হবে।”
রাহুল হেসে বলল,
—“আপনি এমনভাবে উত্তর দেন, যেন প্রশ্ন করাটাই অপরাধ।”
রিয়া মুচকি হাসল।
—“আপনি তর্কে ভালো।”
—“আপনিও।”
—“আমি তর্ক করতে পছন্দ করি না।”
—“তাহলে এতক্ষণ করলেন কেন?”
রিয়া কিছু বলল না।
রাহুল পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
নিচে থেকে মানুষের হাসির শব্দ আসছিল। দূরে শহরের আলো জ্বলছিল।
রাহুল হঠাৎ বলল,
—“আপনি কী করেন?”
—“কলেজে পড়াই।”
—“ওহ।”
—“আপনি?”
—“সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।”
রিয়া মাথা নাড়ল।
—“তাই বুঝি সবকিছু নিজের মতো করে সাজাতে চান?”
—“মানে?”
—“কোডে ভুল হলে ঠিক করে ফেলেন। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে সবকিছু ঠিক করা যায় না।”
রাহুল একটু অবাক হলো।
—“আপনি বেশ গভীর কথা বলেন।”
—“সব সময় না।”
—“আজ বলছেন।”
—“আজ আপনার সঙ্গে কথা হচ্ছে বলে।”
কথাটা বলে রিয়া নিজেই একটু থেমে গেল।
রাহুলের মুখে হালকা হাসি ফুটল।
—“তাহলে আমার সঙ্গে কথা বলা এত খারাপ না?”
রিয়া দ্রুত বলল,
—“আমি সেটা বলিনি।”
—“কিন্তু কথাটা শুনে তো তাই মনে হলো।”
—“আপনি বেশি কিছু মনে করেন।”
রাহুল হেসে ফেলল।
সেদিন প্রথমবার তাদের কথোপকথনে ঝগড়ার চেয়ে স্বাভাবিকতা বেশি ছিল।
এরপর থেকে অদ্ভুতভাবে তাদের দেখা হতে লাগল।
কখনো সজীবের বাসায়, কখনো বন্ধুবান্ধবের আড্ডায়, কখনো কোনো অনুষ্ঠানে।
প্রতিবারই শুরু হতো ঝগড়া দিয়ে।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ঝগড়ার মধ্যেই একটা পরিচিতি তৈরি হয়ে গেল।
রাহুল বুঝতে শুরু করল, রিয়া রেগে গেলে কথা একটু দ্রুত বলে।
রিয়া বুঝে গেল, রাহুল কোনো বিষয়ে জেদ করলে তার ভ্রু দুটো কুঁচকে যায়।
রাহুল বুঝল, রিয়া চা খুব কম চিনি দিয়ে খায়।
রিয়া বুঝল, রাহুল কফি ছাড়া সকাল শুরু করতে পারে না।
এমনকি একদিন রাহুল অফিস থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো।
গাড়ির দিকে যেতে যেতে সে দেখল রিয়া রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাতে ছাতা নেই।
রাহুল গাড়ি থামিয়ে জানালা নামিয়ে বলল,
—“উঠুন।”
রিয়া অবাক।
—“কোথায়?”
—“যেখানে যাবেন। অন্তত এই বৃষ্টি থেকে বাঁচবেন।”
—“আমি বাসে যাব।”
—“এই বৃষ্টিতে?”
—“হ্যাঁ।”
রাহুল বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আপনার জেদটা আসলেই অনেক।”
রিয়া বলল,
—“আপনারও।”
রাহুল কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গাড়ির দরজা খুলে দিল।
—“ঠিক আছে। জিতলেন। কিন্তু অন্তত বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত চলুন।”
রিয়া একটু দ্বিধা করে গাড়িতে উঠল।
গাড়ির ভেতর কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ।
রাহুল বলল,
—“আপনি সব সময় এত জেদ করেন?”
—“সব সময় না।”
—“তাহলে?”
—“যখন মনে হয় আমি ঠিক, তখন।”
—“আর যদি ভুল হন?”
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তখন স্বীকার করি।”
রাহুল হেসে বলল,
—“আমি কিন্তু আপনাকে ভুল স্বীকার করতে খুব কম দেখেছি।”
—“আপনাকে তো মাত্র কয়েকদিন হলো চিনি।”
—“তবু বুঝে গেছেন?”
—“কিছু মানুষকে বুঝতে বেশি সময় লাগে না।”
রাহুল আর কিছু বলল না।
কথাটা তার মনে থেকে গেল।
কয়েকদিন পর রিয়ার কলেজে একটা অনুষ্ঠান ছিল।
সজীবের কাছ থেকে খবর পেয়ে রাহুলও সেখানে গেল।
অনুষ্ঠান শেষে রিয়া তাকে দেখে অবাক হলো।
—“আপনি এখানে?”
—“এসেছি।”
—“কেন?”
—“সজীব বলেছে অনুষ্ঠান ভালো হবে।”
রিয়া চোখ ছোট করে বলল,
—“শুধু অনুষ্ঠানের জন্য?”
রাহুল একটু থেমে বলল,
—“হ্যাঁ।”
রিয়া মুচকি হাসল।
—“ঠিক আছে।”
কিন্তু তার চোখের সেই হাসি দেখে রাহুল বুঝল, সে পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি।
সেদিন অনুষ্ঠান শেষে রিয়া তার কিছু বই নিয়ে বের হচ্ছিল। হঠাৎ একটা বই হাত থেকে পড়ে গেল।
রাহুল নিচু হয়ে বইটা তুলে দিল।
বইটা দিতে গিয়ে দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল।
কেউ কিছু বলল না।
তারপর রিয়া আস্তে করে বলল,
—“ধন্যবাদ।”
রাহুলও শান্ত গলায় বলল,
—“স্বাগতম।”
এতদিনের পরিচয়ে এই প্রথম তাদের মধ্যে কোনো তর্ক হলো না।
শুধু একটা নীরব মুহূর্ত।
আর সেই মুহূর্তের পর থেকেই দুজনের আচরণে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন শুরু হলো।
রাহুল আর রিয়াকে শুধু “বিরক্তিকর মেয়ে” বলে ভাবতে পারছিল না।
আর রিয়াও বুঝতে পারছিল, রাহুলকে দেখলে তার মনটা কেন অকারণে ভালো হয়ে যায়।
তবু কেউই নিজের অনুভূতির নাম দিতে রাজি নয়।
কারণ দুজনেরই মনে হচ্ছিল—
এটা হয়তো শুধু বন্ধুত্ব।
রাহুল আর রিয়ার সম্পর্কটা তখন এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেটাকে ঠিক বন্ধুত্ব বলা যায় না, আবার অন্য কোনো নাম দেওয়ার সাহসও দুজনের কারও নেই।
তারা নিয়মিত কথা বলে।
কখনো কোনো দরকারে, কখনো একেবারেই অকারণে।
রাহুল অফিসে বসে কাজ করতে করতে হঠাৎ রিয়াকে মেসেজ করে—
—“আজ কলেজ কেমন হলো?”
রিয়া উত্তর দেয়—
—“ভালো।”
কিছুক্ষণ পর আবার মেসেজ আসে—
—“শুধু ভালো?”
—“হ্যাঁ।”
—“আমার সঙ্গে কথা বললে কি দিনটা ভালো হতো?”
রিয়া উত্তর না দিয়ে ফোনটা পাশে রেখে দেয়।
কিন্তু কয়েক মিনিট পর আবার ফোন হাতে নিয়ে হেসে ফেলে।
এই ছোট ছোট কথাগুলোই দুজনের দিনের একটা স্বাভাবিক অংশ হয়ে গিয়েছিল।
এক শুক্রবার বিকেলে রিয়া তার এক বান্ধবীর সঙ্গে শপিং মলে গিয়েছিল। সেখানেই হঠাৎ রাহুলের সঙ্গে দেখা।
রাহুলের সঙ্গে ছিল তার অফিসের কয়েকজন সহকর্মী।
রিয়াকে দেখেই রাহুল এগিয়ে এল।
—“আপনি এখানে?”
রিয়া বলল,
—“শপিং করতে এসেছি। আপনি?”
—“আমিও একই কারণে।”
রিয়া হেসে বলল,
—“আপনাকে শপিং করতে দেখে অবাক লাগছে।”
—“কেন?”
—“আপনাকে দেখে মনে হয়, দোকানে গিয়ে যা পছন্দ হয় সেটাই কিনে ফেলেন।”
রাহুল বলল,
—“সেটাই করি।”
—“দাম দেখেন না?”
—“সব সময় না।”
—“বাহ! বেশ বড়লোকি ভাব।”
রাহুল হেসে বলল,
—“আপনার জন্য কিছু কিনে দিতে পারি।”
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
—“দরকার নেই।”
—“আমি তো শুধু বললাম।”
—“আমি জানি।”
দূর থেকে রাহুলের এক সহকর্মী ডাক দিল।
রাহুল বলল,
—“আমি যাই। পরে কথা হবে।”
রিয়া মাথা নাড়ল।
কিন্তু রাহুল চলে যাওয়ার পর তার বান্ধবী বলল,
—“তোমাদের মধ্যে কিছু একটা আছে।”
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—“কী আছে?”
—“যেটা তুমি মুখে স্বীকার করছ না।”
রিয়া হেসে উড়িয়ে দিল।
—“কিছুই নেই।”
—“তাহলে ওকে দেখলে তোমার মুখে হাসি আসে কেন?”
রিয়া উত্তর দিল না।
অন্যদিকে রাহুলের বন্ধুরাও তাকে ছাড়ল না।
গাড়িতে ওঠার পর সজীব বলল,
—“তুই রিয়াকে পছন্দ করিস?”
রাহুল সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“না।”
—“এত দ্রুত উত্তর?”
—“কারণ প্রশ্নটাই অদ্ভুত।”
—“তাহলে ওকে দেখলে এত খুশি হোস কেন?”
—“আমি সবাইকে দেখলেই খুশি হই।”
সজীব হেসে বলল,
—“মিথ্যা কথা বললে তোর গলার স্বর বদলে যায়।”
রাহুল চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
—“ও ভালো মেয়ে।”
—“শুধু ভালো মেয়ে?”
—“হ্যাঁ।”
—“আর কিছু না?”
রাহুল জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—“আমি এখন এসব নিয়ে ভাবছি না।”
সজীব আর কিছু বলল না।
কিন্তু সে বুঝতে পারছিল, রাহুল যত বেশি অস্বীকার করছে, ততই তার ভেতরে কিছু একটা তৈরি হচ্ছে।
কয়েকদিন পর রিয়ার কলেজে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল।
রাহুল সেদিন অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিল। তাই যেতে পারবে না বলে রিয়াকে আগেই জানিয়েছিল।
রিয়া শুধু লিখেছিল—
—“ঠিক আছে।”
কিন্তু তার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
সে নিজেও বুঝতে পারল না কেন।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সবাই যখন ছবি তুলছিল, তখন রিয়ার ফোনে একটা মেসেজ এল।
রাহুল: “অনুষ্ঠান কেমন হলো?”
রিয়া কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল,
—“ভালো।”
রাহুল আবার লিখল,
—“তুমি খুশি?”
রিয়া অবাক হলো।
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে ঠিক আছে।”
রিয়া কয়েক সেকেন্ড পর লিখল,
—“আপনি আসেননি কেন?”
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর—
—“কাজ ছিল।”
রিয়া ফোনটা বন্ধ করে দিল।
তার মনে হলো, সে কেন প্রশ্নটা করল?
রাহুলের আসা না-আসায় তার কী এসে যায়?
কিন্তু উত্তরটা সে নিজের কাছেই দিতে পারল না।
সেই রাতেই রাহুলের ফোনে রিয়ার একটা ছবি এল।
কলেজের অনুষ্ঠানের ছবি।
ছবিতে রিয়া হাসছিল।
রাহুল ছবিটা বেশ কিছুক্ষণ দেখল।
তারপর ফোনটা টেবিলে রেখে আবার তুলে নিল।
মেসেজ লিখল—
—“তোমাকে আজ বেশ ভালো লাগছে।”
কিন্তু পাঠানোর আগে মুছে দিল।
আবার লিখল—
—“অনুষ্ঠান ভালো হয়েছে।”
সেটা পাঠিয়ে দিল।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—
—“শুধু অনুষ্ঠান?”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর লিখল—
—“তোমাকেও ভালো লাগছে।”
মেসেজ পাঠানোর পর তার নিজেরই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
রিয়া মেসেজটা পড়ে দীর্ঘক্ষণ কোনো উত্তর দিল না।
তারপর শুধু লিখল—
—“ধন্যবাদ।”
কিন্তু সেই একটি শব্দের পেছনে যে কত কথা লুকিয়ে ছিল, সেটা দুজনেই বুঝতে পারছিল।
এর কয়েকদিন পর একটা সমস্যা হলো।
রাহুলের অফিসে নতুন একজন সহকর্মী যোগ দিল—মেহরিন।
মেহরিন বেশ বন্ধুসুলভ ছিল। অফিসের কাজের কারণে রাহুলের সঙ্গে প্রায়ই কথা বলত।
একদিন রিয়া সজীবের সঙ্গে দেখা করতে অফিসে এসেছিল।
সেখানে দূর থেকে সে রাহুলকে মেহরিনের সঙ্গে হাসতে হাসতে কথা বলতে দেখল।
রিয়ার মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
সজীব সেটা লক্ষ্য করল।
—“কী হলো?”
—“কিছু না।”
—“তুই চুপ হয়ে গেলি কেন?”
—“আমি তো চুপই আছি।”
রিয়া আর দাঁড়াল না।
সে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর রাহুল তাকে দেখতে পেয়ে বলল,
—“রিয়া! তুমি এসেছিলে?”
রিয়া থেমে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“আমার সঙ্গে দেখা না করেই চলে যাচ্ছিলে?”
—“আপনি ব্যস্ত ছিলেন।”
—“কোথায়?”
রিয়া মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আপনার সঙ্গে যে কথা বলছিল।”
রাহুল বুঝতে পারল।
—“ও আমার সহকর্মী।”
—“আমি কিছু বলিনি।”
—“তোমার মুখ বলছে।”
রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আপনি সবকিছু নিয়ে এত প্রশ্ন করেন কেন?”
—“কারণ তুমি হঠাৎ বদলে গেলে।”
—“আমি বদলাইনি।”
—“তাহলে রাগ করছ কেন?”
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আমি আপনার কে যে আপনার ওপর রাগ করব?”
কথাটা বলে সে চলে গেল।
রাহুল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“আমি আপনার কে?”
এই কথাটাই বারবার তার মাথায় ঘুরতে লাগল।
সেদিন রাতে রাহুল ঘুমাতে পারল না।
সে প্রথমবার নিজের কাছে সত্যি করে প্রশ্ন করল—
রিয়ার রাগে আমার এতটা খারাপ লাগছে কেন?
উত্তরটা ধীরে ধীরে তার সামনে পরিষ্কার হয়ে আসছিল।
সে রিয়াকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখে না।
কিন্তু সেটা স্বীকার করার সাহসও তার হচ্ছে না।
অন্যদিকে রিয়াও নিজের ঘরে বসে ভাবছিল—
রাহুল অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বললে আমার এত খারাপ লাগে কেন?
দুজনের মনেই একই প্রশ্ন।
রিয়ার সঙ্গে সেই দিনের কথার পর রাহুল বুঝতে পারছিল, তাদের মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে।
আগে রিয়া রাগ করলে তাকে হাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। কোনো কথা নিয়ে তর্ক হলে আবার কিছুক্ষণ পর নিজেই মেসেজ করত।
কিন্তু এবার সে একেবারে চুপ।
রাহুল দু-তিনবার মেসেজ করেও কোনো উত্তর পেল না।
শেষে লিখল—
—“তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?”
কোনো উত্তর নেই।
আরেকটা মেসেজ পাঠাল—
—“সেদিন যা বলেছিলাম, সেটা নিয়ে যদি খারাপ লেগে থাকে, সরি।”
তবুও কোনো উত্তর নেই।
রাহুল ফোনটা টেবিলে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
সজীব পাশে বসে সব দেখছিল।
—“কী হয়েছে?”
—“রিয়া রাগ করেছে।”
—“কেন?”
—“জানি না।”
সজীব হেসে বলল,
—“জানিস।”
রাহুল বিরক্ত হয়ে তাকাল।
—“কী?”
—“মেহরিন।”
—“ও তো আমার সহকর্মী।”
—“রিয়া সেটা জানে।”
—“তাহলে?”
সজীব এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
—“সবকিছু জানলেই তো অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।”
রাহুল চুপ করে গেল।
কথাটা তার মনে গেঁথে গেল।
পরদিন রিয়া কলেজে ক্লাস নিচ্ছিল। কিন্তু তার মন পড়ায় ছিল না।
একজন ছাত্রী প্রশ্ন করতেই সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
—“ম্যাম?”
রিয়া চমকে উঠল।
—“হ্যাঁ, বলো।”
ক্লাস শেষ হওয়ার পর সে স্টাফরুমে বসে ফোন বের করল।
রাহুলের কোনো নতুন মেসেজ নেই।
সে নিজেই অবাক হলো—কেন সে একটা মেসেজের অপেক্ষা করছে?
নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করল,
—“আমি তো ওর ওপর রাগ করেছি। তাহলে আগে মেসেজ কেন দেব?”
কিন্তু কয়েক মিনিট পর আবার ফোনটা হাতে নিল।
কিছু লিখতে গিয়েও থেমে গেল।
শেষ পর্যন্ত ফোনটা বন্ধ করে দিল।
সন্ধ্যায় সজীব রাহুলকে বলল,
—“আজ রাতে সবাই রেস্টুরেন্টে যাচ্ছে। তুই যাবি?”
রাহুল বলল,
—“রিয়া আসবে?”
সজীব হেসে বলল,
—“তুই এখন সরাসরি জিজ্ঞেস করিস!”
রাহুল একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—“না, এমনি।”
—“আসবে।”
রাহুল সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“তাহলে যাব।”
সজীব মাথা নাড়ল।
—“তুই শেষ।”
—“চুপ কর।”
রেস্টুরেন্টে সবাই একসঙ্গে বসেছিল।
রিয়া এসে প্রথমে কাউকে কিছু না বলে একপাশে বসে পড়ল।
রাহুল একটু দূরে বসেছিল।
দুজনের চোখ একবার মিলল।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল।
রাহুলও কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর খাবার পরিবেশন করা হলো।
সজীব ইচ্ছে করেই রাহুল আর রিয়াকে পাশাপাশি বসিয়ে দিল।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আমি ওখানে বসব।”
সজীব বলল,
—“ওখানে জায়গা নেই।”
রাহুল বলল,
—“আপনি চাইলে আমি অন্যদিকে যাই।”
রিয়া বলল,
—“দরকার নেই।”
তারপর বসে পড়ল।
দুজনের মাঝে কয়েক মিনিট কোনো কথা হলো না।
হঠাৎ রাহুল বলল,
—“আপনি কি এখনো রাগ করে আছেন?”
রিয়া খাবারের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“না।”
—“নিশ্চিত?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে আমার সঙ্গে কথা বলছেন না কেন?”
রিয়া এবার তার দিকে তাকাল।
—“সব কথা বলতেই হবে?”
রাহুল শান্ত গলায় বলল,
—“না। কিন্তু আপনি যখন হঠাৎ দূরে চলে যান, তখন কারণটা জানতে ইচ্ছে করে।”
রিয়া কিছু বলল না।
রাহুল আবার বলল,
—“মেহরিনকে নিয়ে যদি আপনার কোনো ভুল ধারণা হয়ে থাকে, সেটা পরিষ্কার করে বলতে পারি।”
রিয়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আমি তো কিছু জিজ্ঞেস করিনি।”
—“কিন্তু আপনার আচরণটা অন্য কথা বলছে।”
—“আপনি আমার আচরণ নিয়ে এত ভাবেন কেন?”
প্রশ্নটা শুনে রাহুল থেমে গেল।
তারপর ধীরে বলল,
—“কারণ আপনি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
রিয়া স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।
এই প্রথম রাহুল এত সরাসরি কিছু বলল।
কয়েক সেকেন্ড দুজনেই চুপ।
তারপর রিয়া নিচু গলায় বলল,
—“কতটা গুরুত্বপূর্ণ?”
রাহুল উত্তর দিতে পারল না।
সে নিজেই জানত না কীভাবে সেই অনুভূতিটাকে শব্দে প্রকাশ করবে।
রিয়া আর কিছু না বলে খাবারের দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই রাতের পর তাদের সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করল।
তবে এবার একটা পার্থক্য ছিল।
তারা দুজনেই বুঝতে শুরু করেছিল, তাদের মধ্যে শুধু বন্ধুত্ব নেই।
রাহুল রিয়ার প্রতি আরও যত্নশীল হয়ে উঠল।
রিয়া অসুস্থ হলে ওষুধ খেয়েছে কি না জানতে চাইত।
রিয়ার কোনো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান থাকলে আগে থেকেই শুভকামনা জানাত।
রিয়া কখনো মন খারাপ করে থাকলে রাহুল সেটা বুঝে ফেলত।
একদিন রিয়া বলল,
—“আপনি কীভাবে বুঝলেন আমার মন খারাপ?”
রাহুল বলল,
—“আপনি হাসলে চোখও হাসে। আজ শুধু মুখ হাসছিল।”
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—“আপনি আমাকে এত ভালো করে লক্ষ্য করেন?”
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—“হয়তো।”
রিয়ার মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু ঠিক তখনই সমস্যা শুরু হলো।
রিয়ার পরিবার থেকে তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করল।
রিয়ার বাবা এক সন্ধ্যায় বললেন,
—“একটা ভালো ছেলে আছে। পরিবার ভালো, চাকরি ভালো। আমরা চাই তুমি একবার দেখা করো।”
রিয়া চুপ করে রইল।
—“কী হলো?”
—“আমি এখন বিয়ে নিয়ে ভাবছি না।”
—“তুমি তো সব সময় বলো, ভালো ছেলে হলে আপত্তি নেই।”
রিয়া কোনো উত্তর দিল না।
তার মাথায় তখন শুধু একজনের কথা।
রাহুল।
কিন্তু রাহুল কি তাকে একইভাবে দেখে?
সে কখনো স্পষ্ট করে কিছু বলেনি।
রিয়া ভাবল, হয়তো তার ধারণাটাই ভুল।
হয়তো রাহুল তাকে শুধু একজন ভালো বন্ধু হিসেবেই দেখে।
পরদিন রাহুলের সঙ্গে দেখা হলে রিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।
রাহুল জিজ্ঞেস করল,
—“কী হয়েছে?”
—“কিছু না।”
—“তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু হয়েছে।”
রিয়া একটু থেমে বলল,
—“আমার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।”
রাহুলের মুখের হাসি মুহূর্তেই থেমে গেল।
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
—“ওহ।”
রিয়া তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আপনি কিছু বলবেন না?”
রাহুল ধীরে বলল,
—“তোমার পরিবার নিশ্চয়ই ভালো ভেবেই বলেছে।”
রিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
সে ভেবেছিল রাহুল হয়তো কিছু বলবে।
হয়তো বলবে, “না, তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবে না।”
কিন্তু রাহুল কিছুই বলল না।
রিয়া শান্ত গলায় বলল,
—“ঠিক আছে।”
তারপর চলে গেল।
রাহুল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, সে একটা সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু কী সুযোগ?
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার?
হয়তো।
সেদিন রাতে রাহুল প্রথমবার নিজের কাছে স্বীকার করল—
সে রিয়াকে হারাতে চায় না।
রিয়ার বিয়ের প্রস্তাবের কথা জানার পর থেকে রাহুলের আচরণ বদলে গেল।
আগে সে প্রতিদিন রিয়ার সঙ্গে কথা বলার কোনো না কোনো কারণ খুঁজে বের করত। এখন ফোন হাতে নিয়ে বসে থেকেও মেসেজ লিখতে পারত না।
অনেকবার লিখেছে—
“তুমি কি সত্যিই ওই ছেলেটাকে বিয়ে করবে?”
তারপর আবার মুছে দিয়েছে।
আবার লিখেছে—
“আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।”
সেটাও মুছে দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত শুধু ফোনটা পাশে রেখে দিয়েছে।
রাহুলের এই পরিবর্তন সজীবের চোখ এড়াল না।
একদিন অফিস শেষে সজীব বলল,
—“তুই কি সত্যিই চুপ করে থাকবি?”
রাহুল জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—“কী করব?”
—“যেটা মনে আছে, সেটা বল।”
—“যদি ও আমাকে সেভাবে না দেখে?”
—“তাহলে অন্তত সত্যিটা জানবি।”
রাহুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“আমি ভয় পাচ্ছি।”
সজীব অবাক হয়ে তাকাল।
—“তুই? ভয়?”
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—“কাউকে হারানোর ভয় হলে মানুষ সাহসী থাকতে পারে না।”
অন্যদিকে রিয়াও ভালো ছিল না।
বিয়ের প্রস্তাব আসার পর পরিবার তাকে বারবার ছেলেটির সঙ্গে দেখা করার কথা বলছিল।
ছেলেটির নাম আরমান। ভালো চাকরি করে, পরিবারও শিক্ষিত।
সব দিক থেকেই প্রস্তাবটা খারাপ নয়।
কিন্তু রিয়ার মন অন্য কোথাও আটকে আছে।
তার মা একদিন বললেন,
—“তুই এত চুপচাপ কেন?”
—“কিছু না।”
—“ছেলেটাকে পছন্দ হয়নি?”
রিয়া একটু থেমে বলল,
—“জানি না।”
মা তার পাশে বসে বললেন,
—“জীবনের সিদ্ধান্ত শুধু পরিবারের পছন্দে নেওয়া যায় না। তোরও তো মত থাকতে হবে।”
রিয়া মাথা নিচু করল।
তার মনে হলো, যদি সত্যিই নিজের মতের কথা বলতে হয়, তাহলে তাকে রাহুলের কথা বলতে হবে।
কিন্তু রাহুল তো কিছুই বলেনি।
কয়েকদিন রাহুল আর রিয়ার মধ্যে তেমন কথা হলো না।
এক রাতে রাহুল ফোন করল।
রিয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ পর ধরল।
—“হ্যালো?”
—“কী করছ?”
—“বসে আছি।”
—“ব্যস্ত?”
—“না।”
দুজনেই চুপ।
রাহুল কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু কথাগুলো মুখে আসছিল না।
শেষে বলল,
—“তোমার সঙ্গে একটু দেখা করতে পারি?”
রিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—“কেন?”
—“কথা আছে।”
—“কী কথা?”
—“সামনাসামনি বলব।”
রিয়া রাজি হলো।
পরদিন বিকেলে তারা একটা শান্ত ক্যাফেতে দেখা করল।
রাহুল আগে থেকেই বসে ছিল।
রিয়া এসে চেয়ারে বসতেই রাহুল বলল,
—“তুমি কি ওই বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছ?”
রিয়া বলল,
—“না।”
—“কেন?”
—“কারণ আমি চাই না।”
রাহুলের বুকের ভেতরটা হঠাৎ হালকা হয়ে গেল।
কিন্তু সে নিজেকে সামলে বলল,
—“কেন চাও না?”
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“সব প্রশ্নের উত্তর কি আমাকে দিতে হবে?”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—“হয়তো না।”
রিয়া উঠে যাওয়ার মতো করছিল।
ঠিক তখন রাহুল বলল,
—“আমি চাই না তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করো।”
রিয়া থেমে গেল।
তার চোখ ধীরে ধীরে রাহুলের দিকে উঠল।
—“কেন?”
রাহুলের গলা শুকিয়ে গেল।
এটাই সেই মুহূর্ত, যার জন্য সে এতদিন অপেক্ষা করছিল।
কিন্তু মুখে আসা কথাগুলো যেন আটকে গেল।
শেষ পর্যন্ত বলল,
—“কারণ... তুমি আমার খুব কাছের একজন।”
রিয়ার চোখে হতাশা ফুটে উঠল।
সে আস্তে করে বলল,
—“শুধু কাছের একজন?”
রাহুল চুপ।
রিয়া উঠে দাঁড়াল।
—“তাহলে আমার যাওয়া উচিত।”
রাহুল তাকে থামাল না।
রিয়া বেরিয়ে গেল।
ক্যাফের কাঁচের দরজা দিয়ে তাকে চলে যেতে দেখে রাহুল নিজের ওপরই রাগ করল।
সে জানত, সে কী বলতে চেয়েছিল।
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
কিন্তু সে বলতে পারেনি।
সেই রাতে রিয়া বাড়ির ছাদে একা দাঁড়িয়ে ছিল।
তার ফোনে রাহুলের নামটা খুলে রেখেছিল।
অনেকক্ষণ পর সে একটা মেসেজ লিখল—
“আপনি কি কখনো আমাকে নিয়ে সিরিয়াসভাবে ভেবেছেন?”
মেসেজটা পাঠিয়ে দিল।
রাহুল তখন নিজের ঘরে বসে ছিল।
মেসেজটা পড়ে তার বুক কেঁপে উঠল।
এবার আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সে লিখল—
“হ্যাঁ।”
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—
“কতটা?”
রাহুল অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল—
“যতটা ভাবলে তোমাকে অন্য কারও সঙ্গে দেখতে কষ্ট হয়।”
রিয়া মেসেজটা পড়ে চুপ করে বসে রইল।
তার চোখে পানি চলে এল।
কিন্তু সে উত্তর দিল না।
পরদিন সকালে রিয়া রাহুলকে ফোন করল।
—“আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চান?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে আজ বিকেলে দেখা করুন।”
—“কোথায়?”
—“যেখানে প্রথমবার আমরা ঠিকমতো কথা বলেছিলাম।”
রাহুল বুঝতে পারল।
সজীবদের বাসার সেই ছাদ।
বিকেলে রাহুল সেখানে পৌঁছে দেখল, রিয়া আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর রাহুল বলল,
—“আমি অনেকদিন ধরে একটা কথা বলতে চাইছি।”
রিয়া ধীরে বলল,
—“আজ বলুন।”
রাহুল তার দিকে তাকাল।
—“প্রথম দিন তোমাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, তুমি অসম্ভব জেদি।”
রিয়া মৃদু হাসল।
—“এখনও তাই মনে হয়?”
—“হ্যাঁ।”
রিয়া ভ্রু কুঁচকাল।
রাহুল হেসে বলল,
—“কিন্তু সেই জেদটাই এখন আমার সবচেয়ে পরিচিত জিনিস।”
রিয়া চুপ করে রইল।
রাহুল এবার গম্ভীর হলো।
—“আমি জানি না কখন থেকে তুমি আমার জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ একজন হয়ে গেলে। তোমার সঙ্গে কথা না বললে দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে। তুমি রাগ করলে আমার খারাপ লাগে। তুমি অন্য কারও সঙ্গে ভবিষ্যৎ ভাবছ শুনলে আমার ভয় হয়।”
সে একটু থামল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
—“রিয়া, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
কয়েক মুহূর্ত সে কোনো কথা বলতে পারল না।
তারপর আস্তে করে বলল,
—“এতদিন লাগল বলতে?”
রাহুল হেসে ফেলল।
—“ভয় পেয়েছিলাম।”
রিয়া চোখ মুছে বলল,
—“আমিও।”
—“তুমি?”
—“হ্যাঁ। ভাবতাম, তুমি হয়তো আমাকে শুধু বন্ধু মনে করো।”
রাহুল বলল,
—“আমি নিজেও অনেকদিন সেটা ভাবার চেষ্টা করেছি।”
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—“কিন্তু পারোনি।”
—“না।”
দুজনের মধ্যে দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল।
তারপর রিয়া বলল,
—“আমি ওই বিয়েতে রাজি নই।”
রাহুলের চোখে স্বস্তি ফুটে উঠল।
কিন্তু সেই মুহূর্তেই নিচ থেকে সজীবের কণ্ঠ শোনা গেল—
—“রাহুল! তাড়াতাড়ি নিচে আয়। তোমার বাবা তোমাকে খুঁজছেন!”
রাহুল আর রিয়া একে অপরের দিকে তাকাল।
তাদের মনে হলো, সত্যিটা বলা হয়ে গেছে।
কিন্তু তারা জানত না, সামনে আরও বড় বাধা অপেক্ষা করছে।
রাহুল যখন নিচে নামল, তার বাবা তাকে একপাশে ডেকে বললেন,
—“তোমার সঙ্গে খুব জরুরি একটা কথা আছে।”
রাহুল বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, বিষয়টা সাধারণ নয়।
রাহুল বাবার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“তোমার জন্য একটা প্রস্তাব এসেছে।”
রাহুল অবাক হয়ে বলল,
—“আমার জন্য?”
—“হ্যাঁ। অনেকদিন ধরেই আমরা ভাবছি। মেয়েটার পরিবার ভালো, মেয়েটাও শিক্ষিত। আগামী সপ্তাহে ওদের সঙ্গে দেখা করার কথা ঠিক করেছি।”
রাহুল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তার মাথায় তখন শুধু রিয়ার কথা।
আজই তো সে নিজের অনুভূতির কথা বলেছে।
আজই তো মনে হয়েছে, এতদিনের দ্বিধার অবসান হয়েছে।
আর ঠিক সেই দিনই পরিবারের পক্ষ থেকে অন্য কারও সঙ্গে বিয়ের কথা উঠল।
রাহুল শান্ত গলায় বলল,
—“বাবা, আমি কাউকে বিয়ে করতে চাই না।”
তার বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।
—“কেন?”
—“কারণ আমি একজনকে পছন্দ করি।”
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
তার মা-ও কাছে এসে দাঁড়ালেন।
—“কে?”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“রিয়া।”
তার বাবা ভ্রু কুঁচকে বললেন,
—“রিয়া কে?”
—“সজীবের আত্মীয়।”
—“ওদের পরিবার সম্পর্কে আমরা কতটা জানি?”
—“খুব বেশি না। কিন্তু আমি ওকে চিনি।”
বাবা একটু কঠিন গলায় বললেন,
—“শুধু চেনা আর বিয়ে করা এক জিনিস নয়।”
রাহুল বলল,
—“আমি জানি।”
—“তাহলে?”
—“আমি চাই আপনারা ওদের সঙ্গে কথা বলুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—“তুমি কি নিশ্চিত?”
রাহুল দৃঢ় গলায় বলল,
—“হ্যাঁ।”
অন্যদিকে রিয়াও নিজের পরিবারকে সবকিছু জানিয়ে দিল।
রাতে খাবারের টেবিলে বসে সে বলল,
—“আমি একজনকে পছন্দ করি।”
তার বাবা-মা দুজনেই অবাক।
—“কে?”
রিয়া বলল,
—“রাহুল।”
মা জিজ্ঞেস করলেন,
—“কী করে পরিচয়?”
রিয়া সবকিছু খুলে বলল।
কথা শেষ হলে বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“ছেলেটা কী করে?”
—“সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।”
—“পরিবার?”
—“ভালো।”
—“ওর পরিবার কি জানে?”
রিয়া একটু থেমে বলল,
—“আজ জানিয়েছে।”
বাবা গভীরভাবে তাকালেন।
—“তাহলে আগে তাদের সঙ্গে দেখা করি।”
রিয়ার বুকের ভেতরটা হালকা হয়ে গেল।
কিন্তু সে জানত, সবকিছু এত সহজ হবে না।
দুই পরিবার প্রথমবার দেখা করল এক বিকেলে।
রাহুল আর রিয়া দুজনেই আলাদা ঘরে বসে ছিল।
বড়রা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন।
রাহুলের বাবা বললেন,
—“আমাদের ছেলে ওকে পছন্দ করে। তবে আমরা চাই সবকিছু বুঝে-শুনে হোক।”
রিয়ার বাবা বললেন,
—“আমরাও তাই চাই।”
কথাবার্তা মোটামুটি ভালোভাবেই এগোচ্ছিল।
কিন্তু হঠাৎ রাহুলের চাচা একটা প্রশ্ন তুললেন।
—“মেয়েটা বিয়ের পর চাকরি করবে?”
রিয়ার বাবা বললেন,
—“ও এখন কলেজে পড়ায়। ওর কাজটা ওর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
রাহুলের চাচা বললেন,
—“বিয়ের পর সংসার সামলানোও তো গুরুত্বপূর্ণ।”
রিয়ার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
রাহুল সেটা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“রিয়া চাকরি করবে। আমি সেটা চাই।”
তার বাবা রাহুলের দিকে তাকালেন।
—“তুমি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছ?”
রাহুল শান্তভাবে বলল,
—“ওর নিজের একটা পরিচয় আছে। সেটা কেন বদলাতে হবে?”
রিয়ার চোখে মৃদু স্বস্তি ফুটে উঠল।
তার বাবা রাহুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“এই কথাটা ভালো লাগল।”
কিন্তু সবার মন পুরোপুরি গলেনি।
কয়েকদিন পর সমস্যা শুরু হলো অন্য জায়গা থেকে।
রাহুলের এক আত্মীয় জানতে পারল, রিয়া আগে থেকেই বিয়ের একটি প্রস্তাব পেয়েছিল।
সে বিষয়টাকে অন্যভাবে পরিবারে বলতে শুরু করল।
—“মেয়েটা তো অন্য কোথাও বিয়ে করতে যাচ্ছিল।”
—“হয়তো রাহুলকে পাওয়ার পর মত বদলেছে।”
—“এমন সম্পর্ক কতটা স্থায়ী হবে কে জানে?”
কথাগুলো ধীরে ধীরে রাহুলের বাবার কানেও পৌঁছাল।
এক রাতে তিনি রাহুলকে ডাকলেন।
—“রিয়ার আগের বিয়ের প্রস্তাবের ব্যাপারটা সত্যি?”
রাহুল বলল,
—“হ্যাঁ। কিন্তু সে রাজি ছিল না।”
—“তুমি কীভাবে নিশ্চিত?”
—“কারণ ও নিজে আমাকে বলেছে।”
বাবা বললেন,
—“তুমি ওকে খুব বিশ্বাস করো?”
—“হ্যাঁ।”
—“আমরা তো এতদিন ধরে ওকে চিনি না।”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আপনারা সময় নিন। কিন্তু শুধু অন্যের কথা শুনে ওকে বিচার করবেন না।”
বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।
এদিকে রিয়ার পরিবারেও চাপ তৈরি হলো।
রিয়ার মা বললেন,
—“তোর বাবার একটু চিন্তা হচ্ছে।”
—“কেন?”
—“রাহুলের পরিবার আমাদের পুরোপুরি গ্রহণ করবে কি না, সেটা নিয়ে।”
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“রাহুল আমাকে ছেড়ে দেবে না।”
মা মৃদু হেসে বললেন,
—“তুই এতটা নিশ্চিত কীভাবে?”
রিয়া শান্ত গলায় বলল,
—“কারণ ও প্রথমবার নিজের অনুভূতির কথা বলার সময় ভয় পেয়েও পিছিয়ে যায়নি।”
মা তার মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
একদিন বিকেলে রাহুল আর রিয়া নদীর ধারের একটা শান্ত জায়গায় বসেছিল।
রিয়া বলল,
—“তোমার পরিবার কি আমাকে পছন্দ করেছে?”
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—“সবাই না।”
রিয়ার মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।
—“তাহলে?”
—“আমি তো আছি।”
—“শুধু তুমি থাকলেই হবে?”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“না। আমি চাই দুই পরিবারই থাকুক।”
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“যদি তোমার পরিবার আমাকে মেনে না নেয়?”
রাহুল বলল,
—“তাহলে আমি তাদের বোঝাব।”
—“আর যদি না বোঝে?”
রাহুল এবার তার দিকে সরাসরি তাকাল।
—“তাহলেও আমি তোমার হাত ছাড়ব না।”
রিয়ার চোখে পানি এসে গেল।
সে মুখ ফিরিয়ে নিল।
রাহুল বলল,
—“কাঁদছ?”
—“না।”
—“মিথ্যা বলছ।”
রিয়া হেসে চোখ মুছে বলল,
—“তোমার জন্যই।”
রাহুলও হেসে ফেলল।
তাদের সম্পর্ক তখন আগের চেয়ে অনেক শক্ত।
কিন্তু ঠিক তখনই একটা ফোন এল।
রাহুল ফোন ধরতেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
ওপাশ থেকে তার মা বলছিলেন,
—“বাবা, তোমার বাবার শরীরটা ভালো নেই। আর একটা কথা হয়েছে... তুমি এখনই বাসায় এসো।”
রাহুল উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে দাঁড়াল।
রিয়া জিজ্ঞেস করল,
—“কী হয়েছে?”
রাহুল শুধু বলল,
—“জানি না। বাসায় যেতে হবে।”
সে দ্রুত চলে গেল।
রিয়া দূরে দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর রাহুলের আবার ফোন এল।
এবার তার কণ্ঠে উদ্বেগ স্পষ্ট।
—“রিয়া, আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা হয়তো আর হবে না।”
রিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল।
—“কেন?”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“বাবা তোমার পরিবার সম্পর্কে একটা কথা শুনেছেন... আর তিনি খুব রেগে গেছেন।”
রিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল।
—“কী কথা?”
রাহুল উত্তর দিল না।
শুধু বলল,
—“আমি তোমাকে পরে সব বলব।”
ফোন কেটে গেল।
রিয়া স্থির হয়ে বসে রইল।
রাহুলের ফোন কেটে যাওয়ার পর রিয়া অনেকক্ষণ একই জায়গায় বসে রইল।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
“আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা হয়তো আর হবে না।”
কিছুদিন আগেও সবকিছু কত সহজ মনে হচ্ছিল।
রাহুল নিজের অনুভূতির কথা বলেছে। দুই পরিবারও বিষয়টা জানে। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুজনেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল।
কিন্তু হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল।
রিয়া বারবার রাহুলকে ফোন করল।
কোনো উত্তর পেল না।
অবশেষে একটা মেসেজ এল।
—“এখন ফোন করতে পারছি না। পরে কথা বলব।”
রিয়া মেসেজটা পড়ে ফোনটা পাশে রেখে দিল।
সে বুঝতে পারছিল, নিশ্চয়ই বড় কোনো সমস্যা হয়েছে।
কিন্তু সমস্যাটা কী, সেটা না জানার কষ্টটাই সবচেয়ে বেশি।
রাহুলের বাড়িতে তখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত।
তার বাবা কঠিন মুখে বসে ছিলেন।
—“আমি এই বিয়েতে রাজি নই।”
রাহুল শান্তভাবে বলল,
—“কিন্তু কারণটা কী?”
বাবা একটা কাগজ তার সামনে রেখে বললেন,
—“তুমি আগে এটা দেখো।”
রাহুল কাগজটা হাতে নিয়ে দেখল, রিয়ার আগের বিয়ের প্রস্তাব সম্পর্কে কিছু তথ্য লেখা।
সেখানে এমনভাবে বিষয়টা তুলে ধরা হয়েছে, যেন রিয়া এবং তার পরিবার নাকি রাহুলকে পাওয়ার পর আগের সম্পর্কটা ভেঙে দিয়েছে।
রাহুল অবাক হয়ে বলল,
—“এগুলো সত্যি না।”
—“তুমি কীভাবে জানো?”
—“কারণ রিয়া আমাকে সব বলেছে।”
—“তুমি ওর কথা বিশ্বাস করছ, কিন্তু নিজের পরিবারের কথা করছ না?”
রাহুল চুপ করে গেল।
বাবা বললেন,
—“আমরা চাই না আমাদের ছেলে এমন একটা সম্পর্কে জড়াক, যেখানে শুরু থেকেই এত প্রশ্ন আছে।”
রাহুল দৃঢ় গলায় বলল,
—“প্রশ্ন থাকলে উত্তর খুঁজব। কিন্তু শুধু গুজবের ওপর সিদ্ধান্ত নেব না।”
তার বাবা রাগ করে বললেন,
—“তুমি কি আমাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাবে?”
রাহুল শান্তভাবে উত্তর দিল,
—“আমি আপনাদের বিরুদ্ধে যেতে চাই না। আমি শুধু চাই আপনারা সত্যিটা জানুন।”
অন্যদিকে রিয়া জানত না, তার সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে।
সে শুধু জানত, রাহুলের পরিবার তাকে নিয়ে সন্দেহ করছে।
পরদিন সকালে রিয়ার বাবা বললেন,
—“রাহুলের পরিবার থেকে আপাতত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।”
রিয়া চুপ করে রইল।
—“তুমি চাইলে আমরা বিষয়টা এখানেই থামিয়ে দিতে পারি।”
রিয়া মাথা নাড়ল।
—“না।”
—“তুই নিশ্চিত?”
—“হ্যাঁ।”
তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“তাহলে অপেক্ষা করি।”
রিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল।
তার মনে একটা কথাই—
রাহুল কি সত্যিই তার পাশে থাকবে?
তিন দিন কেটে গেল।
রাহুলের সঙ্গে রিয়ার খুব কম কথা হলো।
রাহুল ইচ্ছে করেই একটু দূরে থাকছিল। কারণ সে চেয়েছিল আগে পরিবারের সমস্যাটা সমাধান করতে।
কিন্তু রিয়া সেটা অন্যভাবে নিল।
সে ভাবল, হয়তো রাহুলও ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে।
চতুর্থ দিন রাতে রাহুল ফোন করল।
রিয়া ফোন ধরল না।
আবার ফোন।
তবুও না।
শেষে রাহুল মেসেজ করল—
—“আমার সঙ্গে একবার কথা বলো। খুব দরকার।”
রিয়া উত্তর দিল,
—“কী নিয়ে?”
—“তোমাকে সব বলতে চাই।”
—“আপনার পরিবার যদি আমাকে না চায়, তাহলে আমাকে আর বোঝানোর দরকার নেই।”
রাহুল মেসেজটা পড়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর লিখল—
—“আমি তোমাকে চাই।”
রিয়া উত্তর দিল না।
রাহুল আবার লিখল—
—“কিন্তু আমি চাই না আমাদের সম্পর্কটা কারও বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তৈরি হোক। আমি চাই সবাই বুঝে আমাদের পাশে দাঁড়াক।”
রিয়া এবার উত্তর দিল—
—“তাহলে আগে আপনার পরিবারকে বোঝান।”
রাহুল লিখল—
—“আমি চেষ্টা করছি।”
—“কতদিন?”
এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর ছিল না।
রাহুল শুধু লিখল—
—“যতদিন লাগে।”
পরদিন রাহুল সরাসরি সজীবের কাছে গেল।
—“রিয়ার আগের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যে কথা ছড়িয়েছে, সেটা কে বলেছে?”
সজীব অবাক হয়ে গেল।
—“কী কথা?”
রাহুল সব বলল।
সজীব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আমার মনে হয়, এটা ভুলভাবে বলা হয়েছে।”
—“মানে?”
—“রিয়া ওই প্রস্তাবে রাজিই ছিল না। বরং ওর পরিবার ওকে শুধু দেখার জন্য বলেছিল। আর রিয়া তোমাকে পছন্দ করার পর বিষয়টা পরিষ্কার করে দিয়েছিল।”
রাহুল বলল,
—“আমি সেটাই জানি।”
সজীব মাথা নাড়ল।
—“কিন্তু এই তথ্যটা কে বদলে বলল?”
দুজনেই চিন্তায় পড়ে গেল।
সজীব বলল,
—“আমি খোঁজ নিচ্ছি।”
দুদিন পর সজীব সত্যিটা জানতে পারল।
রাহুলের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় রিয়ার আগের বিয়ের প্রস্তাবের বিষয়টা অন্যভাবে শুনে পরিবারে বলে দিয়েছিল।
কোনো যাচাই না করেই কথাটা বড় হয়ে গিয়েছিল।
রাহুল সঙ্গে সঙ্গে বাবার কাছে গেল।
—“বাবা, আমি সব জানতে পেরেছি।”
সে পুরো ঘটনা খুলে বলল।
তার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—“তাহলে কথাটা ভুল ছিল?”
—“হ্যাঁ।”
—“তুমি নিশ্চিত?”
—“রিয়ার বাবার সঙ্গে আপনি নিজে কথা বলতে পারেন।”
রাহুলের বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“আমি হয়তো তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি।”
রাহুল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
বাবা বললেন,
—“তুমি ওকে সত্যিই ভালোবাসো?”
রাহুলের চোখে দৃঢ়তা।
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে ওদের সঙ্গে আবার কথা বলব।”
রাহুলের মুখে প্রথমবার স্বস্তির হাসি ফুটল।
সেদিন বিকেলে রাহুল রিয়ার কলেজের সামনে গেল।
রিয়া বেরিয়ে এসে তাকে দেখে থেমে গেল।
—“আপনি এখানে?”
রাহুল বলল,
—“তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।”
—“সব ঠিক হয়েছে?”
—“পুরোপুরি না। কিন্তু বাবা সত্যিটা জেনেছেন।”
রিয়ার চোখে আশার আলো ফুটল।
—“তারপর?”
—“তিনি তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে চান।”
রিয়া কিছু বলল না।
রাহুল কাছে এসে বলল,
—“তুমি কি এখনও আমার ওপর রাগ করে আছ?”
রিয়া নিচু গলায় বলল,
—“রাগ করেছিলাম।”
—“এখন?”
—“জানি না।”
রাহুল হেসে বলল,
—“আমি কিন্তু এখনও তোমার ওপর রাগ করতে পারি না।”
রিয়ার মুখে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
—“আপনি সব কথা এত সহজে বলেন কীভাবে?”
—“সব কথা সহজে বলতে পারি না। তোমাকে ভালোবাসি—এই কথাটা বলতেও তো অনেক সময় লেগেছিল।”
রিয়া এবার হেসে ফেলল।
তারপর বলল,
—“আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে।”
রাহুল গম্ভীর হয়ে বলল,
—“আমি তোমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য এতটা পথ আসিনি।”
রিয়া কিছু বলল না।
শুধু ধীরে মাথা নাড়ল।
কয়েকদিন পর দুই পরিবার আবার বসলো।
এবার আগের চেয়ে পরিবেশ অনেক শান্ত।
রাহুলের বাবা রিয়ার বাবার কাছে নিজের ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন।
—“আমরা পুরো সত্যিটা না জেনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেটা আমাদের ভুল।”
রিয়ার বাবা বললেন,
—“ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটা ঠিক করার চেষ্টা করা।”
কথাবার্তা আবার এগোতে লাগল।
রাহুল আর রিয়া দূর থেকে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
মনে হলো, এতদিনের অস্থিরতার পর অবশেষে সবকিছু ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু ঠিক তখনই রাহুলের ফোন বেজে উঠল।
সে ফোন ধরতেই তার মুখের ভাব বদলে গেল।
ওপাশ থেকে একজন বলল,
—“রাহুল, তোমার অফিসে জরুরি একটা সমস্যা হয়েছে। তোমাকে এখনই আসতে হবে।”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর রিয়ার দিকে তাকাল।
রিয়ার চোখে প্রশ্ন।
রাহুল শুধু বলল,
—“আমাকে যেতে হবে।”
অফিস থেকে আসা ফোনটা পাওয়ার পর রাহুল দ্রুত বেরিয়ে গেল।
রিয়া তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
এতক্ষণ দুই পরিবারের মধ্যে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার একটা আশার আলো দেখা দিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ রাহুলের মুখের পরিবর্তন দেখে তার বুকের ভেতর অস্বস্তি তৈরি হলো।
রাহুল গাড়িতে উঠেই সজীবকে ফোন করল।
—“অফিসে কী হয়েছে?”
সজীব বলল,
—“কোম্পানির একটা বড় প্রজেক্টে সমস্যা হয়েছে। ক্লায়েন্ট কাজ বাতিল করার কথা ভাবছে।”
—“কতটা সিরিয়াস?”
—“অনেক। তোর টিমের ওপর পুরো বিষয়টা নির্ভর করছে।”
রাহুল আর কিছু না বলে অফিসের দিকে রওনা দিল।
পরের কয়েকদিন রাহুলের জীবন পুরোপুরি বদলে গেল।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিস।
মিটিং।
কোড ঠিক করা।
ক্লায়েন্টের সঙ্গে কথা বলা।
টিমের ভুল খুঁজে বের করা।
কখনো রাত দুইটায় বাড়ি ফিরছে, কখনো অফিসেই থেকে যাচ্ছে।
রিয়া প্রথমদিকে সব বুঝতে পারছিল।
সে নিজেই রাহুলকে মেসেজ করত—
—“খেয়েছ?”
—“হ্যাঁ।”
—“কখন?”
—“মনে নেই।”
—“ঠিকমতো খাও।”
রাহুল ছোট করে উত্তর দিত—
—“ঠিক আছে।”
কয়েকদিন পর রিয়া ফোন করল।
—“আজ কি একটু কথা বলতে পারবে?”
—“আজ অনেক কাজ।”
—“কতক্ষণ লাগবে?”
—“জানি না।”
—“তাহলে পরে ফোন করবে?”
—“হ্যাঁ।”
রিয়া অপেক্ষা করল।
রাত বাড়ল।
রাহুল ফোন করল না।
পরদিনও না।
এক সপ্তাহ এভাবেই কেটে গেল।
রিয়া বুঝতে পারছিল, রাহুল ইচ্ছে করে দূরে সরে যাচ্ছে না।
কিন্তু তবুও একটা শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল।
আগে দিনের ছোট ছোট ঘটনা সে রাহুলকে বলত।
ক্লাসে কোনো মজার ঘটনা ঘটলে ফোন করত।
বৃষ্টি হলে ছবি পাঠাত।
কোনো নতুন বই কিনলে জানাত।
এখন এসবের কিছুই হচ্ছে না।
একদিন রিয়া ফোন করে বলল,
—“তুমি কি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ?”
রাহুল চমকে গেল।
—“না! এমন ভাবছ কেন?”
—“আগের মতো কথা বলো না।”
—“অফিসের কাজ খুব বেড়ে গেছে।”
—“আমি জানি।”
—“তাহলে?”
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—“জানি না। মনে হয় তোমার জীবনে আমার জন্য সময় নেই।”
রাহুল ক্লান্ত গলায় বলল,
—“রিয়া, এখন আমাকে একটু সময় দাও। সব ঠিক হয়ে গেলে আমি তোমার সঙ্গে আগের মতো কথা বলব।”
রিয়া আর কিছু বলল না।
—“ঠিক আছে।”
ফোন কেটে গেল।
রাহুল বুঝতে পারল, তার কথায় রিয়া কষ্ট পেয়েছে।
কিন্তু সে এই মুহূর্তে কী করবে, সেটাও জানত না।
এদিকে রিয়ার পরিবারে আবার বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা শুরু হলো।
রিয়ার মা বললেন,
—“রাহুলের পরিবার তো মোটামুটি রাজি হয়েছে। এখন শুধু ওদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দিন-তারিখ ঠিক করার কথা।”
রিয়া বলল,
—“ওর অফিসের সমস্যা চলছে।”
—“সেটা তো বুঝি।”
—“তাই একটু সময় লাগবে।”
মা বললেন,
—“তুই কি ওর ওপর বিশ্বাস রাখিস?”
রিয়া এক মুহূর্তও না ভেবে বলল,
—“হ্যাঁ।”
কিন্তু নিজের ঘরে ফিরে তার মনে হলো—
বিশ্বাস রাখা আর অপেক্ষা করা—দুটো সব সময় সহজ নয়।
একদিন রাতে রাহুল অফিস থেকে বের হওয়ার সময় দেখল, রিয়া বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
সে অবাক হয়ে গাড়ি থামাল।
—“তুমি এখানে?”
রিয়া বলল,
—“সজীবের কাছ থেকে জানলাম তুমি এখনো অফিসে।”
—“তুমি এত রাতে এখানে কেন?”
—“তোমার সঙ্গে দেখা করতে।”
রাহুল গাড়ি থেকে নেমে তার সামনে দাঁড়াল।
রিয়া বলল,
—“তুমি কেমন আছ?”
রাহুল মৃদু হাসল।
—“ক্লান্ত।”
—“খেয়েছ?”
—“না।”
রিয়া একটা খাবারের প্যাকেট এগিয়ে দিল।
—“খাও।”
রাহুল প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে রইল।
—“তুমি এটা নিয়ে এসেছ?”
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
রিয়া বলল,
—“কারণ তুমি নিজের যত্ন নিতে ভুলে যাচ্ছ।”
রাহুল কিছু বলল না।
সে বুঝতে পারছিল, এত ব্যস্ততার মধ্যেও রিয়া তাকে নিয়ে ভাবছে।
রাহুল ধীরে বলল,
—“সরি।”
—“কিসের জন্য?”
—“তোমাকে সময় দিতে পারিনি।”
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—“তুমি সময় দিতে না পারলেও আমি বুঝি। কিন্তু একেবারে চুপ হয়ে যেও না।”
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমি চেষ্টা করব।”
রিয়া বলল,
—“শুধু চেষ্টা না। কথা দাও।”
রাহুল হেসে বলল,
—“কথা দিলাম।”
সেদিনের পর তাদের যোগাযোগ কিছুটা স্বাভাবিক হলো।
রাহুল যত ব্যস্তই থাকুক, দিনে অন্তত একবার রিয়াকে ফোন করত।
কখনো মাত্র পাঁচ মিনিট।
কখনো দশ মিনিট।
কিন্তু সেই কয়েক মিনিটেই দুজনের মন ভালো হয়ে যেত।
অবশেষে প্রজেক্টের সমস্যাটাও ধীরে ধীরে ঠিক হতে শুরু করল।
ক্লায়েন্ট আবার কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
রাহুলের টিম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
অফিস থেকে বের হওয়ার সময় রাহুল প্রথমেই রিয়াকে ফোন করল।
—“আজ আমি ফ্রি।”
রিয়া হেসে বলল,
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে দেখা করো।”
—“কোথায়?”
—“যেখানে তুমি প্রথমবার বলেছিলে আমাকে হারাতে চাও না।”
রাহুল হেসে ফেলল।
—“ছাদে?”
—“হ্যাঁ।”
সন্ধ্যায় তারা ছাদে দেখা করল।
আকাশে মেঘ ছিল। বাতাসে হালকা শীতলতা।
রাহুল বলল,
—“অবশেষে সব ঠিক হলো।”
রিয়া বলল,
—“সব?”
—“অফিসের সমস্যা শেষ। পরিবারও রাজি।”
রিয়া হাসল।
—“তাহলে এবার?”
রাহুল বলল,
—“এবার তোমাকে নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবব।”
রিয়া মজা করে বলল,
—“শুধু ভাববে?”
—“না। কাজও করব।”
দুজনেই হাসল।
রাহুল বলল,
—“তোমাকে একটা জিনিস দিতে চাই।”
সে পকেট থেকে ছোট একটা বাক্স বের করল।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—“এটা কী?”
—“খুলো।”
রিয়া বাক্স খুলে দেখল, ভেতরে একটা ছোট্ট রুপালি লকেট।
লকেটের ওপর ছোট করে লেখা—
“Always.”
রিয়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
—“এটা কেন?”
রাহুল বলল,
—“তুমি যখন ভাববে আমি তোমার পাশে নেই, তখন এটা দেখবে।”
রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
সে বলল,
—“আমি কখনো ভাবতে চাই না তুমি পাশে নেই।”
রাহুল শান্ত গলায় বলল,
—“তাহলে আমিও তোমাকে এমন কোনো কারণ দেব না।”
কয়েকদিন পর দুই পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের দিন ঠিক করল।
বাড়িতে আনন্দ শুরু হলো।
রিয়ার মা শাড়ি, গয়না আর অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত।
রাহুলের মা আত্মীয়দের ফোন করছেন।
সজীব তো রাহুলকে নিয়ে মজা করেই চলেছে।
সবকিছু যেন অবশেষে ঠিক হয়ে গেছে।
কিন্তু সুখের এই সময়েই একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল।
রাহুলের অফিসে তাকে জানানো হলো, তাকে কয়েক মাসের জন্য দেশের বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টে যেতে হবে।
রাহুল স্তব্ধ হয়ে গেল।
যাত্রার সময় বিয়ের ঠিক আগের সময়ের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
সে রিয়াকে কীভাবে বলবে?
রাহুল জানত, এই সুযোগ তার ক্যারিয়ারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু একই সঙ্গে এটাও জানত—
রিয়া হয়তো ভাবতে পারে, বিয়ের ঠিক আগে সে আবার দূরে সরে যাচ্ছে।
সেই রাতেই রাহুল রিয়াকে ফোন করল।
—“তোমার সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
রিয়া হাসতে হাসতে বলল,
—“আমিও তোমাকে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
—“আগে তুমি বলো।”
রিয়া বলল,
—“আমাদের বিয়ের দিনটা নিয়ে আমি খুব খুশি।”
রাহুলের বুকটা ভার হয়ে গেল।
সে ধীরে বলল,
—“রিয়া... আমার কিছুদিনের জন্য দেশের বাইরে যেতে হতে পারে।”
ওপাশে নীরবতা।
রিয়ার হাসি মিলিয়ে গেল।
—“কতদিন?”
রাহুল উত্তর দিল,
—“তিন মাস।”
কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা হলো না।
তারপর রিয়া শুধু বলল,
—“বিয়ের আগে?”
—“হ্যাঁ।”
—“তুমি কি যাবে?”
রাহুল চুপ করে রইল।
রাহুলের কথা শুনে রিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
—“তিন মাস?”
—“হ্যাঁ।”
—“আর যাওয়ার সময়টা?”
—“বিয়ের ঠিক আগেই।”
রিয়া ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“এই প্রজেক্টটা কি তোমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ?”
—“হ্যাঁ। ক্যারিয়ারের জন্য অনেক বড় সুযোগ।”
—“তাহলে যাও।”
রাহুল অবাক হয়ে বলল,
—“তুমি এত সহজে বললে?”
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“তোমার স্বপ্নের পথে আমি বাধা হতে চাই না।”
—“কিন্তু আমাদের বিয়ে?”
—“বিয়ে তো তিন মাস পরও হতে পারে।”
রাহুল বুঝতে পারছিল, কথাগুলো সহজভাবে বললেও রিয়ার কণ্ঠে কষ্ট লুকিয়ে আছে।
—“তুমি কি সত্যিই এটা চাও?”
রিয়া একটু থেমে বলল,
—“আমি চাই তুমি তোমার কাজটা শেষ করো। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো।”
—“কী?”
—“দূরত্ব যেন আমাদের মধ্যে না আসে।”
রাহুল শান্ত গলায় বলল,
—“আসবে না।”
—“প্রতিশ্রুতি?”
—“প্রতিশ্রুতি।”
পরের কয়েকদিনে দুই পরিবারে নতুন করে আলোচনা শুরু হলো।
রাহুলের বাবা বললেন,
—“প্রজেক্টটা যদি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে যেতে দাও। বিয়ে পিছিয়ে দেওয়া যাবে।”
রিয়ার বাবা-মাও রাজি হলেন।
তবে রিয়ার মা মেয়েকে আলাদা করে বললেন,
—“তুই কি ঠিক আছিস?”
রিয়া হাসল।
—“হ্যাঁ।”
মা বুঝতে পারলেন, মেয়েটা পুরোপুরি ঠিক নেই।
—“কষ্ট হচ্ছে?”
রিয়া ধীরে বলল,
—“হচ্ছে। কিন্তু ওর জন্য আমি খুশি হতে চাই।”
মা তার মাথায় হাত রাখলেন।
—“সম্পর্কে শুধু একসঙ্গে থাকা নয়, একে অপরের স্বপ্নকেও সম্মান করা লাগে।”
রিয়া মৃদু হাসল।
—“আমি সেটাই করছি।”
বিদেশে যাওয়ার দিন যত এগিয়ে আসছিল, রাহুলের মন তত ভারী হয়ে উঠছিল।
আগে সে সুযোগটা নিয়ে খুব উত্তেজিত ছিল।
এখন মনে হচ্ছে, তিন মাস অনেক দীর্ঘ সময়।
এক সন্ধ্যায় তারা দুজন একটা পার্কে বসেছিল।
রিয়া বলল,
—“তুমি ওখানে গিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে যাবে?”
—“হয়তো।”
—“তাহলে একটা নিয়ম করি।”
—“কী নিয়ম?”
—“প্রতিদিন অন্তত একবার কথা বলতে হবে।”
রাহুল বলল,
—“একবার?”
—“হ্যাঁ। বেশি হলে ভালো।”
—“আমি দিনে তিনবার ফোন করব।”
রিয়া হেসে বলল,
—“দেখা যাবে।”
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুমি কি আমাকে মিস করবে?”
রিয়া ভান করে বলল,
—“হয়তো না।”
—“মিথ্যা।”
—“কীভাবে বুঝলে?”
—“কারণ তুমি এখন থেকেই মন খারাপ করে বসে আছ।”
রিয়া হাসতে গিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল।
রাহুল বলল,
—“আমি তোমাকে খুব মিস করব।”
রিয়া আস্তে করে বলল,
—“আমিও।”
বিদেশে যাওয়ার আগের দিন রাহুল রিয়াকে একটা চিঠি দিল।
—“এটা কখনো মন খারাপ হলে পড়বে।”
রিয়া বলল,
—“চিঠি কেন?”
—“সব কথা ফোনে বলা যায় না।”
রিয়া চিঠিটা ব্যাগে রেখে দিল।
—“আমি এটাকে খুব যত্ন করে রাখব।”
পরদিন বিমানবন্দরে দুই পরিবার উপস্থিত ছিল।
বিদায়ের সময় রাহুলের মা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—“নিজের যত্ন নিস।”
রাহুল মাথা নাড়ল।
তারপর রিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।
রাহুল বলল,
—“তিন মাস।”
রিয়া বলল,
—“আমি গুনব না।”
—“কেন?”
—“গুনলে সময় বেশি মনে হবে।”
রাহুল মৃদু হাসল।
—“আমি ফিরে এসে প্রথমে তোমার সঙ্গে দেখা করব।”
রিয়া বলল,
—“আমি অপেক্ষা করব।”
রাহুল চলে গেল।
রিয়া দূর থেকে তাকে দেখতে দেখতে দাঁড়িয়ে রইল।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ বেশ ভালোই কাটল।
প্রতিদিন ভিডিও কলে কথা হতো।
রাহুল অফিসের গল্প বলত।
রিয়া কলেজের গল্প বলত।
কখনো দুজনেই একসঙ্গে অনলাইনে সিনেমা দেখত।
কখনো শুধু নীরবে ফোনে থাকত।
দূরত্ব থাকলেও সম্পর্কটা যেন আগের চেয়ে আরও গভীর হয়ে উঠল।
কিন্তু এক মাস পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল।
রাহুলের কাজ বেড়ে গেল।
অনেক রাত পর্যন্ত মিটিং চলত।
রিয়ারও কলেজে পরীক্ষা আর নতুন দায়িত্ব শুরু হলো।
কথা কমতে লাগল।
একদিন রিয়া তিনবার ফোন করেও রাহুলকে পেল না।
রাতে একটা মেসেজ এল—
—“সরি, আজ অনেক ব্যস্ত ছিলাম।”
রিয়া লিখল,
—“ঠিক আছে।”
কিন্তু তার মন ভালো হলো না।
পরদিনও একই ঘটনা।
তারপরের দিনও।
ধীরে ধীরে রিয়ার মনে সন্দেহ তৈরি হলো।
সে জানত, রাহুল ব্যস্ত।
তবুও মনে হচ্ছিল, আগের মতো সে আর তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
এক রাতে রাহুল ফোন করলে রিয়া বলল,
—“তুমি কি বদলে গেছ?”
—“কেন?”
—“আগে তুমি ব্যস্ত থাকলেও একটা মেসেজ করতে।”
—“আমি এখন সত্যিই খুব ব্যস্ত।”
—“আমি বুঝি।”
—“তাহলে?”
—“কিছু না।”
রাহুল ক্লান্ত ছিল।
সে বলল,
—“রিয়া, এখন এসব নিয়ে ঝগড়া করতে পারব না।”
রিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল।
—“আমি ঝগড়া করছি?”
—“আমি সেটা বলিনি।”
—“তোমার কথায় তাই মনে হচ্ছে।”
রাহুল কিছু বলল না।
রিয়া ফোন কেটে দিল।
সেদিন রাতে দুজনের কেউই ভালো ঘুমাতে পারল না।
পরদিন রাহুল তার ব্যাগ খুলতে গিয়ে রিয়ার দেওয়া একটা ছোট্ট ছবি পেল।
ছবির পেছনে লেখা—
“দূরত্ব যতই হোক, বিশ্বাসটা যেন না বদলায়।”
রাহুল অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার নিজের আচরণ মনে পড়ল।
সে বুঝল, রিয়া আসলে তার কাছ থেকে বেশি কিছু চায়নি।
শুধু একটু সময়, একটু নিশ্চয়তা।
সেদিনই রাহুল কাজ শেষ করে রিয়াকে ফোন করল।
অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর রিয়া ফোন ধরল।
—“হ্যালো।”
রাহুল বলল,
—“সরি।”
রিয়া চুপ।
—“আমি তোমাকে অবহেলা করতে চাইনি।”
—“আমি জানি।”
—“না, তুমি জানো না। আমি কাজের মধ্যে এতটাই ডুবে গিয়েছিলাম যে বুঝতেই পারিনি তুমি কতটা একা হয়ে যাচ্ছ।”
রিয়ার গলা নরম হয়ে গেল।
—“আমিও হয়তো বেশি ভাবছিলাম।”
—“না। তোমার ভাবাটা স্বাভাবিক।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর রাহুল বলল,
—“আর মাত্র এক মাস।”
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—“তুমি গুনছ?”
—“প্রতিদিন।”
রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
—“আমিও।”
অবশেষে তিন মাস শেষ হলো।
রাহুল দেশে ফেরার দিন রিয়া বিমানবন্দরে গেল।
দূর থেকে রাহুলকে দেখতে পেয়ে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
রাহুলও তাকে দেখে থেমে গেল।
তিন মাসের দূরত্ব যেন এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল।
তারা কিছুক্ষণ শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
রাহুল বলল,
—“কেমন আছ?”
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—“এখন ভালো।”
—“আমিও।”
তারপর রাহুল বলল,
—“চলো। এবার আর কোনো দূরত্ব নয়।”
রিয়া বলল,
—“বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে?”
রাহুল হেসে বলল,
—“আগামী মাসে।”
রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
—“এত তাড়াতাড়ি?”
—“তিন মাস অপেক্ষা করেছি। আর কত?”
দুজনেই হেসে ফেলল।
রাহুল দেশে ফেরার পর যেন সবকিছু নতুন করে শুরু হলো।
তিন মাসের দূরত্বের পর রিয়া আর রাহুল একে অপরকে আরও ভালোভাবে বুঝতে শিখেছিল। আগে যেখানে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অভিমান হতো, এখন সেখানে কথা বলে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করত দুজনেই।
বিয়ের প্রস্তুতিও দ্রুত এগিয়ে চলছিল।
রাহুলের বাড়িতে আত্মীয়দের আনাগোনা শুরু হয়েছে। রিয়ার বাড়িতেও ব্যস্ততা কম নয়।
একদিন সন্ধ্যায় রাহুল রিয়াকে ফোন করে বলল,
—“তোমার সব প্রস্তুতি শেষ?”
রিয়া বলল,
—“না।”
—“কী বাকি?”
—“অনেক কিছু।”
—“বল, আমি সাহায্য করি।”
রিয়া হেসে বলল,
—“তুমি শুধু সময়মতো বিয়ের অনুষ্ঠানে আসবে। সেটাই যথেষ্ট।”
রাহুল বলল,
—“আমি কিন্তু তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দেব।”
—“কী সারপ্রাইজ?”
—“বলব না।”
—“আমি এখনই জানতে চাই।”
—“তাহলে সারপ্রাইজ থাকবে না।”
রিয়া হেসে বলল,
—“ঠিক আছে। দেখি কী দাও।”
বিয়ের আগের দিন রাহুলের বাড়িতে হঠাৎ একটা সমস্যা হলো।
রাহুলের বাবা জানতে পারলেন, রাহুলের বিদেশের প্রজেক্টে তাকে আবার কয়েক মাসের জন্য যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
কোম্পানি চেয়েছিল, সে চাইলে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে পারে।
বাবা তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
—“তুমি কি আবার যেতে চাও?”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“কাজটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এবার আমি একা সিদ্ধান্ত নেব না।”
বাবা অবাক হয়ে বললেন,
—“মানে?”
—“রিয়ার সঙ্গে কথা বলব।”
রাহুল সঙ্গে সঙ্গে রিয়াকে ফোন করল।
—“তোমাকে একটা কথা বলতে হবে।”
রিয়া বলল,
—“কী হয়েছে?”
—“আমাকে আবার বিদেশে কাজের সুযোগ দিয়েছে।”
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ।
—“কতদিনের?”
—“ছয় মাস।”
—“বিয়ের পর?”
—“হ্যাঁ।”
রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“তুমি কী চাও?”
রাহুল বলল,
—“আমি চাই তুমি যা চাও, সেটাই হোক।”
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আমি তোমার স্বপ্নের পথে বাধা হতে চাই না। কিন্তু এবার একটা শর্ত আছে।”
—“কী?”
—“যদি যাও, তাহলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।”
রাহুল অবাক হয়ে হেসে ফেলল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
—“তুমি যাবে?”
—“তুমি যেখানে থাকবে, সেখানে নতুন জীবন শুরু করতে আমার আপত্তি নেই।”
রাহুলের মুখে বড় একটা হাসি ফুটে উঠল।
—“তাহলে ঠিক আছে।”
—“কী ঠিক?”
—“আমি যাব। তবে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে।”
রিয়া বলল,
—“এবার কিন্তু আমাকে একা রেখে যাবে না।”
রাহুল শান্ত গলায় বলল,
—“কখনো না।”
পরদিন বিয়ের অনুষ্ঠান।
সকাল থেকেই বাড়িতে উৎসবের পরিবেশ।
রাহুলকে বন্ধুরা সাজিয়ে দিচ্ছিল।
সজীব বলল,
—“দোস্ত, শেষ সুযোগ। পালিয়ে যাবি?”
রাহুল হেসে বলল,
—“না।”
—“নিশ্চিত?”
—“শতভাগ।”
সজীব বলল,
—“তাহলে বুঝলাম, তোর অবস্থা খারাপ।”
রাহুল হেসে বলল,
—“তুই বুঝবি না।”
অন্যদিকে রিয়াও বিয়ের সাজে প্রস্তুত হচ্ছিল।
আয়নার সামনে বসে সে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার মনে পড়ছিল প্রথম দেখা দিনের কথা।
ক্যাফের সামনে কফি পড়ে যাওয়া।
প্রথম ঝগড়া।
বারান্দায় প্রথম দীর্ঘ কথা।
অভিমান।
মেহরিনকে নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি।
পরিবারের বাধা।
রাহুলের বিদেশে চলে যাওয়া।
দূরত্ব।
অপেক্ষা।
সবকিছু যেন একসঙ্গে চোখের সামনে ভেসে উঠল।
তার মা পাশে এসে বললেন,
—“কী ভাবছিস?”
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—“ভাবছি, এত ঝগড়া করে শেষ পর্যন্ত এই মানুষটার সঙ্গেই বিয়ে হচ্ছে।”
মা হেসে বললেন,
—“কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করা মানুষটাই সবচেয়ে বেশি আপন হয়ে যায়।”
রিয়া কিছু বলল না।
শুধু হাসল।
বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হলো।
রাহুল যখন মঞ্চে এসে বসলো, কিছুক্ষণ পর রিয়াকেও নিয়ে আসা হলো।
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।
রাহুল মুচকি হাসল।
রিয়া চোখ নামিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ পর তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো।
চারপাশে সবাই আনন্দ করছে।
সজীব দূর থেকে চিৎকার করে বলল,
—“রাহুল! অবশেষে তুই হেরে গেলি!”
রাহুল হেসে বলল,
—“এই হারটাই আমার সবচেয়ে বড় জয়।”
রিয়া কথাটা শুনে তার দিকে তাকাল।
দুজনের চোখে একই সঙ্গে আনন্দ আর শান্তি।
বিয়ের পর রাতে তারা কিছুক্ষণ একসঙ্গে বসে কথা বলছিল।
রিয়া বলল,
—“আমাদের গল্পটা খুব অদ্ভুত।”
রাহুল বলল,
—“কেন?”
—“প্রথম দিন তোমাকে একদম পছন্দ হয়নি।”
—“আমারও।”
—“তারপর?”
—“তারপর তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে গেলে।”
রিয়া হেসে বলল,
—“তুমি জানো, আমি প্রথম থেকেই তোমাকে একটু অন্যরকম মনে করতাম।”
—“কিন্তু বলোনি।”
—“তুমিও তো বলোনি।”
রাহুল বলল,
—“ভয় পেয়েছিলাম।”
—“এখন?”
—“এখন আর ভয় পাই না।”
রিয়া মৃদু গলায় বলল,
—“কেন?”
রাহুল বলল,
—“কারণ এখন জানি, তুমি আমার পাশে আছ।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
তারপর রিয়া বলল,
—“একটা কথা বলব?”
—“বলো।”
—“আমাদের জীবনে যত সমস্যা এসেছে, তার বেশিরভাগই হয়েছে আমরা কথা না বলায়।”
রাহুল মাথা নাড়ল।
—“ঠিক বলেছ।”
—“তাহলে একটা নিয়ম করি।”
—“কী?”
—“কখনো কোনো সমস্যা হলে চুপ থাকব না। যত বড় ভুল বোঝাবুঝিই হোক, কথা বলে সমাধান করব।”
রাহুল বলল,
—“কথা দিলাম।”
রিয়া মুচকি হেসে বলল,
—“শতভাগ?”
রাহুল হাসল।
—“শতভাগ।”
কয়েক মাস পর।
ঢাকার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটটায় তাদের নতুন সংসার গড়ে উঠেছে।
রাহুল অফিসের কাজ করছে।
রিয়া কলেজ থেকে ফিরে চা বানাচ্ছে।
বাইরে আবার বৃষ্টি পড়ছে।
জানালার কাঁচে বৃষ্টির শব্দ।
রাহুল ল্যাপটপ বন্ধ করে বলল,
—“চা হয়েছে?”
রিয়া রান্নাঘর থেকে বলল,
—“হ্যাঁ। কিন্তু এবার নিজে নিয়ে আসো।”
রাহুল হেসে উঠে গেল।
চা নিয়ে এসে দুজন পাশাপাশি বসে জানালার বাইরে তাকাল।
রাহুল বলল,
—“মনে আছে? আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল বৃষ্টির দিনে।”
রিয়া বলল,
—“আর তুমি তখন আমার ওপর রাগ করেছিলে।”
—“তুমিও কম করনি।”
—“আমি তো এখনো জিতেছি।”
রাহুল হেসে বলল,
—“কীভাবে?”
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুমি তো শেষ পর্যন্ত আমার কাছেই এসেছ।”
রাহুল মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ। কারণ তোমার কাছে হারতে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
রিয়া হাসল।
জানালার বাইরে বৃষ্টি আরও জোরে নামছিল।
তাদের গল্পে ঝগড়া ছিল, অভিমান ছিল, ভুল বোঝাবুঝি ছিল, দূরত্ব ছিল।
কিন্তু প্রতিবার তারা ফিরে এসেছে একে অপরের কাছে।
কারণ তারা বুঝেছিল—
সম্পর্ক শুধু সুন্দর মুহূর্তের নাম নয়।
কখনো কখনো ভুল বোঝাবুঝির পরও পাশে থাকা, অভিমানের পর কথা বলা, দূরত্বের পর ফিরে আসা এবং একে অপরের স্বপ্নকে সম্মান করাই সম্পর্ককে সত্যিকারের শক্ত করে।
রাহুল রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“একটা কথা বলি?”
—“বলো।”
—“তোমাকে প্রথম দেখার দিন যদি জানতাম, এই জেদি মেয়েটাই একদিন আমার জীবন হয়ে যাবে...”
রিয়া হেসে বলল,
—“তাহলে?”
—“তাহলে সেদিনই তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতাম।”
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—“কেন?”
রাহুল মৃদু হেসে উত্তর দিল,
—“কারণ আমাদের গল্পটা তো ঝগড়া দিয়েই শুরু হয়েছিল।”
দুজনেই হেসে উঠল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।
আর জানালার পাশে বসে থাকা দুজন মানুষ জানত—
তাদের গল্পের আসল সৌন্দর্য কোনো নিখুঁত শুরুতে ছিল না।
ছিল বারবার একে অপরকে বেছে নেওয়ার মধ্যে।
সেই কারণেই তাদের গল্পটা ছিল—শতভাগ অনুভূতি।
....