আরিয়ান রহমানের জীবনটা ছিল একটা বড়লোকি স্বপ্নের মতো। ঢাকার গুলশানের তিনতলা বাড়ি, সামনে ফোয়ারা, পেছনে বাগান, ভেতরে ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝে, চাকর-বাকরের সারি। তার বাবা নাসির রহমান ছিলেন টেক্সটাইল ব্যবসার বড় কর্তা। মা ফারিহা রহমান সমাজসেবা আর ক্লাবের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আরিয়ান নিজে পড়াশোনায় মেধাবী ছিল। স্কুলে সবার আগে, কলেজেও টপার। তারপর আমেরিকার এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ। ফিরে এসে বাবার ব্যবসায় যোগ দিয়ে কয়েক বছরের মধ্যেই নিজের নামে দুটো কোম্পানি দাঁড় করিয়েছিল। টাকা-পয়সায় অভাব ছিল না। কিন্তু চরিত্রে একটা শক্ত স্তর জমেছিল। রগচটা, অহংকারী, আর সবসময় নিজেকে সবার চেয়ে উঁচু ভাবা। কেউ তার কথায় কথার জবাব দিলে চোখ লাল করে তাকাত। চাকররা তার সামনে কাঁপত। বন্ধুরাও অনেক সময় দূরে সরে থাকত।
অন্যদিকে নূপুর আক্তারের জীবন ছিল একেবারে উল্টো। পুরান ঢাকার সরু গলির এক পুরনো বাড়িতে বাস করত তারা। বাবা রফিকুল ইসলাম একটা ছোট মুদি দোকান চালাতেন। মা সালমা বেগম সারাদিন ঘরের কাজে ব্যস্ত। নূপুর এসএসসি পাস করেই থেমে গিয়েছিল। টাকার অভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। সে মাকে সাহায্য করত রান্নায়, কাপড় কাচায়, আর মাঝে মাঝে বাবার দোকানেও বসত। স্বপ্ন ছিল অনেক। কখনো ভাবত একদিন চাকরি করবে, কখনো ভাবত ভালো কোনো ঘরে বিয়ে হবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। প্রতিদিনের খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হতো পরিবারকে।
বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল হঠাৎ করেই। আরিয়ানের বাবা একদিন ব্যবসার সূত্রে নূপুরের বাবার দোকানে গিয়েছিলেন। সেখানে নূপুরকে দেখেছিলেন। মেয়েটা শান্ত, নম্র, কাজের প্রতি মনোযোগী। পরে জেনেছিলেন মেয়ের পড়াশোনা কম, কিন্তু চরিত্র ভালো। নাসির রহমান ছেলের জন্য এমন মেয়েই চাইছিলেন, যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, যারা অহংকার করে না। তিনি নিজে গিয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। নূপুরের বাবা প্রথমে রাজি হননি। বলেছিলেন, “আমরা সাধারণ মানুষ। ওদের সঙ্গে মেলানো সম্ভব না। মেয়েকে নিয়ে কষ্ট হবে।” কিন্তু নাসির রহমান জোর করেছিলেন। উপহার পাঠিয়েছিলেন, কথা দিয়েছিলেন যে মেয়ের কোনো অভাব হবে না। শেষ পর্যন্ত পরিবার রাজি হয়ে গিয়েছিল। নূপুরের মা কেঁদেছিলেন। বলেছিলেন, “মেয়ে, যা কিছু হোক, ধৈর্য রাখিস। স্বামীর ঘর মানেই তো একটু-আধটু সহ্য করতে হয়।”
বিয়ের আগে আরিয়ান নূপুরকে একবারই দেখেছিল। আত্মীয়দের বাড়িতে। নূপুর লাল শাড়ি পরে বসেছিল। চোখ নিচু করে। আরিয়ান তাকিয়েছিল ঠান্ডা চোখে। মনে মনে ভেবেছিল, “এসএসসি পাস। কী জানে জীবন সম্পর্কে? আমাকেই সব শেখাতে হবে।” কোনো কথা হয়নি তাদের মধ্যে। শুধু একটা নীরব তাকানো।
বিয়ের দিন এল। গুলশানের এক বড় কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজন। নূপুরকে লাল বেনারসি শাড়ি পরিয়ে সাজানো হলো। চুলে ফুল, কপালে সিঁদুর, হাতে আলতা। মা তার চুল আঁচড়ে দিয়ে কেঁদেছিলেন। “মেয়ে, ভালো থেকো। কোনো কষ্ট হলে আমাদের জানিও।” নূপুর মাথা নেড়েছিল। চোখে জল। বাবা দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলেন। মুখে কোনো হাসি নেই।
আরিয়ান এসেছিল কালো শেরওয়ানি পরে। মুখ গম্ভীর। কোনো উত্তেজনা নেই। বন্ধুরা মজা করছিল, কিন্তু সে হাসছিল না। মঞ্চে বসার সময় নূপুরের দিকে একবার তাকিয়েছিল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হলো। রাতের দিকে গাড়িতে করে নূপুরকে নিয়ে যাওয়া হলো গুলশানের বাড়িতে। বাড়ির সামনে এসে নূপুরের চোখ বড় হয়ে গেল। এত বড় বাড়ি সে কখনো দেখেনি। ভেতরে ঢুকে আরও অবাক। চাকর-বাকর এসে সালাম করল। আরিয়ানের মা ফারিহা এসে নূপুরকে জড়িয়ে ধরলেন। “বউমা, স্বাগতম।” কিন্তু আরিয়ান কিছু বলল না। শুধু ঘরে গিয়ে বদলাতে লাগল।
প্রথম রাতে নূপুর বিছানায় বসেছিল। হাতে গয়না, গায়ে লাল শাড়ি। আরিয়ান ঘরে ঢুকে বলল, “তুমি শুয়ে পড়ো। আমার কাজ আছে।” নূপুর কিছু বলতে পারল না। শুধু বিছানায় শুয়ে রইল। রাতভর ঘুম এল না। জানালার বাইরে গাড়ির আওয়াজ, দূরে কোনো কুকুরের ডাক। মনে পড়ছিল মায়ের কথা, বাবার চোখের জল। সকালে উঠে সে নাশতা তৈরি করল। ডিম ভাজা, রুটি, চা। আরিয়ান টেবিলে বসে খেতে খেতে বলল, “এ কী রান্না করেছ? লবণ কম। রুটিগুলোও পুড়ে গেছে। তোমার কি কোনোদিন রান্না শেখা হয়নি?”
নূপুর মাথা নিচু করে বলল, “আমি চেষ্টা করেছি… বাড়িতে মা শিখিয়েছিলেন।”
আরিয়ান হেসে উঠল। ব্যঙ্গের হাসি। “চেষ্টা! তোমার মতো এসএসসি পাস মেয়েরা আর কী চেষ্টা করবে? আমার মা তো অনার্স পাস। তিনি চাকরি করতেন, ঘরও সামলাতেন। তুমি কি জানো আমি কত পড়াশোনা করেছি? আমেরিকায় রাত জেগে পড়েছি। আর তুমি? এসএসসি পাস করেই থেমে গেছ। কী জানো তুমি জীবন সম্পর্কে?”
নূপুর চুপ করে রইল। চোখে জল এসে গেল, কিন্তু চেপে রাখল। আরিয়ান চামচ ফেলে দিয়ে উঠে গেল। “আজ থেকে রান্নায় মন দাও। না হলে চাকরদের দিয়ে করাব। তোমার দরকার নেই।”
এভাবেই শুরু হলো তাদের দাম্পত্য জীবন। প্রতিদিন কোনো না কোনো সমালোচনা। কখনো রান্নার ভুল। “এ তরকারিতে মসলা কম। তুমি কি জানো সঠিক পরিমাণ কত?” কখনো পোশাকের কথা। “এ শাড়ি পরছ কেন? সস্তা দেখাচ্ছে। আমার স্ত্রী হয়ে এমন পোশাক পরবে?” কখনো পড়াশোনার কথা। “তুমি তো কোনোদিন ইংরেজি বই পড়োনি। আমি যখন বিদেশে পড়তাম, তখন তোমার মতো মেয়েরা গ্রামে বাঁশঝাড়ে থাকত। এখানে এসে কী করবে?”
নূপুর প্রতিবার চুপ করে থাকত। কান্না চেপে রাখত। মায়ের কথা মনে পড়ত—“ধৈর্য রাখিস।” সে সারাদিন ঘর সামলাত। রান্না করত, কাপড় কাচত, আরিয়ানের শার্ট ইস্ত্রি করত। রাতে বিছানায় শুয়ে পিঠ করে থাকত। আরিয়ানও কথা বলত না। শুধু মোবাইলে ব্যস্ত থাকত, অথবা বই পড়ত।
এক মাস পর একদিন সন্ধ্যাবেলা আরিয়ান অফিস থেকে এসে দেখল নূপুর টিভি দেখছে। একটা নাটক চলছিল। সে রেগে গিয়ে রিমোট নিয়ে টিভি বন্ধ করে দিল। “এখানে সময় নষ্ট করার কিছু নেই। যাও, রান্নাঘরে গিয়ে কাজ করো। তোমার মতো মেয়েরা শুধু সিরিয়াল দেখে আর ঘর নষ্ট করে। পড়াশোনা নেই, তাই সময় কাটানোর উপায় এটা।”
নূপুর উঠে দাঁড়াল। চোখে জল। “আমি সারাদিন ঘর সামলাচ্ছি। একটু বসেছিলাম শুধু… ক্লান্ত লাগছিল।”
আরিয়ান তার কথা কেটে দিয়ে বলল, “ক্লান্ত? তুমি কী জানো ক্লান্তি মানে? আমি সারাদিন অফিসে কাজ করি। তুমি শুধু ঘরে বসে থাকো। আর তোমার পড়াশোনা? এসএসসি পাস। আর কী পারবে তুমি?”
নূপুরের ভেতর থেকে কষ্টটা ফেটে বেরিয়ে এল। সে প্রথমবার প্রতিবাদ করল। গলা কাঁপছিল। “আপনি কেন সবসময় আমার পড়াশোনা নিয়ে কথা বলেন? আমি দোষী নই যে পরিবারের অবস্থা ভালো ছিল না। আমি চেষ্টা করেছি ভালো করতে। আপনি কেন আমাকে এভাবে অপমান করেন প্রতিদিন? আমি কি মানুষ না?”
আরিয়ানের মুখ লাল হয়ে গেল। চোখ কুঁচকে গেল। “তুমি আমাকে কথা শেখাচ্ছ? তুমি? এসএসসি পাস মেয়ে হয়ে?” সে হাত তুলে চড় মারল নূপুরের গালে। জোরে। শব্দটা ঘরে বাজল। নূপুর পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালে ধাক্কা খেল। গালে হাত দিয়ে সে বসে পড়ল মেঝেতে। কান্না আটকাতে পারল না। ফোঁপ করে কেঁদে উঠল। কাঁধ কাঁপছিল।
আরিয়ান তাকিয়ে রইল। তার হাত কাঁপছিল। এক মুহূর্তের জন্য যেন কিছু বলতে গেল, কিন্তু বলল না। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজা জোরে বন্ধ করে দিল। নূপুর মেঝেতে বসে কেঁদে চলল। গাল জ্বলছিল। মনে পড়ছিল মায়ের কথা, বাবার চোখ। রাতভর সে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে উঠে আয়নায় নিজের গাল দেখল—লাল দাগ, একটু ফোলা। চোখ ফোলা। কিন্তু সে চুপ করে কাজ শুরু করল। রান্না করল, ঘর মুছল, আরিয়ানের কাপড় ইস্ত্রি করল। কোনো কথা বলল না। নাশতা টেবিলে রেখে দিল।
আরিয়ান সেদিনও কিছু বলল না। অফিসে গেল, সন্ধ্যায় এসে খেল, ঘুমাল। কিন্তু তার মনে একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। নূপুরের কান্নার শব্দ তার কানে বাজছিল। সে নিজেকে বোঝাল—“ওকে শেখানো দরকার ছিল। না হলে আরও বাড়বে। আমি ভুল করিনি।” তবুও রাতে ঘুম এল না। নূপুরের ফোলা চোখ মনে পড়ছিল।
এভাবে দিন চলতে লাগল। নূপুর আর কখনো প্রতিবাদ করল না। শুধু চুপচাপ সহ্য করল। আরিয়ানও আগের মতোই সমালোচনা করত মাঝে মাঝে, কিন্তু চড় আর মারল না। একটা অদ্ভুত নীরবতা তৈরি হয়েছিল তাদের মধ্যে। রাতে এক বিছানায় শুয়েও তারা একে অপরের দিকে পিঠ করে থাকত। নূপুর কখনো কখনো জানালার পাশে বসে বাইরের রাস্তা দেখত। মনে মনে ভাবত, “এভাবেই কি জীবন কাটবে? মা বলেছিলেন ধৈর্য রাখতে। কিন্তু কতদিন?”
দুই মাস পর একদিন সকালে আরিয়ানের শরীর খারাপ লাগল। মাথা ব্যথা, গা ব্যথা। সে উঠে বসতে গিয়ে টলল। নূপুর এসে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
আরিয়ান রুক্ষ গলায় বলল, “কিছু না। যাও। আমার দরকার নেই।”
কিন্তু দুপুরের দিকে জ্বর বেড়ে গেল। শরীর কাঁপতে লাগল। নূপুর ভয় পেয়ে গেল। সে নিজে গিয়ে ডাক্তার ডাকল। ডাক্তার এসে দেখে বললেন, “জ্বর অনেক বেশি। একটু ভাইরাল মনে হচ্ছে। বিশ্রাম নিতে হবে। ওষুধ খাবেন। প্রচুর পানি খাবেন।”
নূপুর সেদিন থেকে আরিয়ানের পাশে বসে রইল। ওষুধ খাওয়াল সময়মতো, ভেজা কাপড় দিয়ে কপাল মুছল বারবার, হালকা স্যুপ বানিয়ে খাওয়াল। আরিয়ান প্রথমে আপত্তি করল। “দরকার নেই। আমি নিজে পারব। তুমি যাও।” কিন্তু শরীর এত দুর্বল যে সে উঠতে পারল না। হাত কাঁপছিল ওষুধের বোতল ধরতে গিয়ে। নূপুর চুপচাপ সাহায্য করল।
বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নূপুর পাশেই থাকল। আরিয়ান কখনো কখনো চোখ মেলে তাকাত। নূপুরকে দেখত। মেয়েটা ক্লান্ত, চোখে ঘুম, কিন্তু পাশে বসে আছে। একবার আরিয়ান বলল, “তুমি শুয়ে পড়ো। আমার কিছু হবে না।”
নূপুর মাথা নাড়ল। “না। আপনার জ্বর আছে। আমি এখানেই থাকব।”
রাত গভীর হলো। বাইরে ঢাকার আকাশ মেঘে ঢাকা। হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার কাঁচে পানির শব্দ। আরিয়ানের জ্বর এখনো নামেনি। শরীর গরম। নূপুর তার মাথার কাছে চেয়ারে বসে ভেজা কাপড় বদলাতে বদলাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। চোখ ভারী হয়ে আসছিল। সে কয়েকবার মাথা ঝাঁকাল, পানি খেল, কিন্তু ঘুম আটকাতে পারল না। শেষ পর্যন্ত চেয়ারেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। তার এক হাত আরিয়ানের বিছানার ওপর ছিল, আরেক হাত কোলে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর পড়েছিল।
আরিয়ান মাঝরাতে জেগে উঠল। জ্বর একটু কমেছে মনে হলো। গা কম কাঁপছে। সে চোখ মেলে দেখল—নূপুর তার মাথার কাছে ঘুমিয়ে আছে। চেয়ারে মাথা রেখে। মুখটা ক্লান্ত, চোখের নিচে কালো দাগ, ঠোঁট শুকনো। তার গালে এখনো হালকা দাগ আছে সেই চড়ের। আরিয়ান তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। মনে পড়ল সেই দিনের কথা—নূপুরের প্রতিবাদ, তার নিজের হাতের চড়, নূপুরের কান্না। মনে পড়ল প্রতিদিনের সমালোচনা। “এসএসসি পাস… তোমার মতো মেয়েরা…” কথাগুলো এখন তার কানে বাজছিল অন্যভাবে।
সে আস্তে করে উঠে বসল। মাথা ঘুরছিল একটু। হাত বাড়িয়ে নূপুরের চুলগুলো সরিয়ে দিল কপাল থেকে। আঙুল দিয়ে আলতো করে স্পর্শ করল। নূপুরের চুল নরম, একটু লম্বা, সুগন্ধি। আরিয়ানের বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি জাগল। রাগ নেই, অহংকার নেই—শুধু একটা নরম, অজানা অনুভূতি। সে ফিসফিস করে বলল, “তুমি কেন এত কষ্ট করছ আমার জন্য? আমি তোমাকে এত কষ্ট দিয়েছি…”
নূপুর ঘুম থেকে জেগে উঠল। চোখ মেলে আরিয়ানকে দেখে চমকে গেল। সোজা হয়ে বসল। “আপনি জেগেছেন? জ্বর কেমন? ওষুধ খাবেন?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “একটু ভালো। তুমি শুয়ে পড়ো। সারা রাত জেগে আছ। তোমার চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে।”
নূপুর মাথা নাড়ল। “না, আমি এখানেই থাকব। আপনার জ্বর আছে। যদি আবার বেড়ে যায়…”
আরিয়ান তার হাত ধরল। প্রথমবার এভাবে। নূপুরের হাত ঠান্ডা, একটু রুক্ষ কাজের কারণে। সে আলতো করে চেপে ধরল। “নূপুর… সেদিন… আমি ভুল করেছিলাম।”
নূপুরের চোখ জলে ভরে গেল। সে মুখ ফিরিয়ে নিল। “কিছু মনে করবেন না। আমি ভুলে গেছি। আপনি অসুস্থ, সেসব কথা এখন না।”
আরিয়ান তার চিবুক ধরে আলতো করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। চোখের দিকে তাকাল। “না, ভুলো না। আমি মারছিলাম তোমাকে। অপমান করছিলাম প্রতিদিন। তোমার পড়াশোনা নিয়ে, তোমার পরিবার নিয়ে, তোমার রান্না নিয়ে। আমি ভাবতাম আমি বড়, তুমি ছোট। আমি উচ্চশিক্ষিত, তুমি এসএসসি পাস। কিন্তু তুমি… তুমি আমার চেয়ে অনেক বড়। সারা রাত জেগে আমার সেবা করছ। আমি কখনো এমন করিনি কারো জন্য।”
নূপুর কেঁদে ফেলল। কাঁধ কাঁপছিল। আরিয়ান তাকে আলতো করে বুকে টেনে নিল। প্রথমবার আলিঙ্গন। নূপুরের শরীর কাঁপছিল। আরিয়ান তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। “আমি দুঃখিত। সত্যি দুঃখিত। আমি জানি কথা দিয়ে শোধ হয় না। কিন্তু আমি চেষ্টা করব। আর কখনো তোমাকে এভাবে কষ্ট দেব না।”
সে রাতটা এভাবেই কেটে গেল। আরিয়ানের মাথা নূপুরের কোলে। নূপুর তার কপাল মুছতে মুছতে নিজেও ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে জ্বর অনেকটা কমে গেল। আরিয়ান উঠে বসে নূপুরকে দেখল। সে এখনো ঘুমাচ্ছে চেয়ারে। আরিয়ান নিজে ধীরে ধীরে উঠল। পা কাঁপছিল একটু। সে রান্নাঘরে গিয়ে নাশতা বানাল। ডিম ভাজা, পাউরুটি, চা। প্রথমবার নিজে করে। নূপুর জেগে উঠে অবাক হয়ে গেল।
“আপনি… কী করছেন? আপনি তো অসুস্থ…”
আরিয়ান হেসে বলল। হাসিটা আগের মতো ব্যঙ্গের নয়। নরম। “আমিও পারি। তুমি শুয়ে থাকো। সারা রাত জেগেছ।”
সেদিন থেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হলো। আরিয়ান আর আগের মতো সমালোচনা করত না। কখনো কখনো রান্নায় সাহায্য করত। সন্ধ্যায় নূপুরের সঙ্গে বসে গল্প করত। নূপুরও আস্তে আস্তে খুলে যেতে লাগল। সে তার ছোটবেলার কথা বলত। বাবার দোকানের কথা, যেখানে সে বসে হিসাব রাখত। মায়ের কষ্টের কথা, যখন টাকার অভাবে ওষুধ কিনতে পারতেন না। আরিয়ান শুনত মন দিয়ে। কখনো কখনো তার চোখে জল এসে যেত। সে ভাবত, “আমি কত অন্ধ ছিলাম। টাকা-পয়সা আর ডিগ্রি নিয়ে গর্ব করতাম। অথচ এ মেয়েটা এত কষ্ট সয়েছে চুপচাপ।”
একদিন সন্ধ্যায় আরিয়ান নূপুরকে বলল, “তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে পড়াশোনা করাব। কলেজে ভর্তি করব। যা খুশি পড়বে। আমি সাপোর্ট করব।”
নূপুর অবাক হয়ে তাকাল। চোখ বড়। “সত্যি? আপনি কি মজা করছেন?”
আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল, “সত্যি। আমি আর তোমাকে ছোট করে দেখতে চাই না। তুমি আমার স্ত্রী। আমার সমান। তোমার স্বপ্ন থাকুক। আমি চাই তুমি সেগুলো পূরণ করো।”
নূপুরের চোখে আনন্দ আর জল মিলেমিশে গেল। সে আরিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল। “ধন্যবাদ… ধন্যবাদ। আমি… আমি ভাবতে পারিনি।”
আরিয়ান তার কপালে চুমু খেল। প্রথমবার। নূপুরের হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হলো। রাগ, অভিমান, কষ্ট—সব মিলিয়ে এখন শুধু একটা নরম অনুভূতি। ভালোবাসা। তারা একে অপরকে আরও কাছে পেল। রাতে আরিয়ান নূপুরের চুলে হাত বুলিয়ে বলত, “তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। আমি যদি সেদিন তোমাকে হারাতাম, তাহলে কী হতো জানি না।”
নূপুর হেসে বলত, “আর আপনি আমার। আমি ভয় পেতাম আপনাকে। এখন আর পাই না।”
দিন যেতে লাগল। আরিয়ানের রাগ কমে গেল অনেকটা। ব্যবসায় ব্যস্ত থাকলেও সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি ফিরত। নূপুরের সঙ্গে খেত, গল্প করত। কখনো কখনো তাকে অফিসে নিয়ে যেত। নূপুর আস্তে আস্তে ইংরেজি শিখতে শুরু করল। আরিয়ান নিজে পড়াত সন্ধ্যায়। হাসত যখন নূপুর ভুল উচ্চারণ করত। “আবার বলো। এভাবে।” নূপুরও হাসত। আগের সেই ভয় আর ছিল না।
একদিন নূপুরের বাবা-মা এলেন বাড়িতে। আরিয়ান নিজে গিয়ে দরজা খুলল। রফিকুল ইসলাম একটু ইতস্তত করছিলেন। আরিয়ান হাত বাড়িয়ে বলল, “আসুন। আপনারা আমার পরিবার।” নূপুরের মা সালমা কেঁদে ফেললেন মেয়েকে দেখে। নূপুরও কেঁদেছিল। পরে আরিয়ান আলাদা করে নূপুরের বাবাকে বলল, “আমি আপনার মেয়েকে কষ্ট দিয়েছিলাম। ক্ষমা করবেন। এখন আর দেব না।” রফিকুল ইসলামের চোখে জল এসে গেল। তিনি শুধু মাথা নেড়েছিলেন।
বাংলাদেশের এই শহরে, এই বাড়িতে, দুইজন মানুষের মধ্যে যে দূরত্ব ছিল, তা আস্তে আস্তে কমে গেল। আরিয়ানের অহংকার ভাঙল, নূপুরের কষ্ট মিলিয়ে গেল। তাদের প্রেম হলো ধীরে ধীরে, কষ্টের ভেতর দিয়ে, অভিমানের ভেতর দিয়ে, রাতজাগা সেবার ভেতর দিয়ে। আর সেই প্রেমটাই তাদের জীবনকে নতুন করে গড়ে দিল। একদিন সকালে আরিয়ান নূপুরকে বলল, “চলো, একসঙ্গে ঘুরতে যাই। কক্সবাজার। শুধু আমরা দুজন।” নূপুর হেসে রাজি হলো। গাড়িতে বসে আরিয়ান তার হাত ধরল। বাইরে ঢাকার রাস্তা, রিকশা, বাস, মানুষের ভিড়। আর ভেতরে দুজন মানুষ, যারা একসময় একে অপরের থেকে অনেক দূরে ছিল, এখন হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলেছে।
তাদের গল্প এখানে শেষ হয় না। জীবন চলতেই থাকে। কখনো ছোটখাটো বোঝাপড়া, কখনো হাসি, কখনো আগের কষ্টের ছায়া। কিন্তু মূলটা বদলে গেছে। আরিয়ান আর সেই রগচটা মানুষ নেই। নূপুর আর সেই ভয়পাওয়া মেয়ে নেই। তারা একে অপরের পরিপূরক।