ঢাকার ব্যস্ত শহরে সকালটা অন্য সব দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। রাস্তায় গাড়ির ভিড়, মানুষের ছুটে চলা, দোকানের সামনে জমে থাকা আড্ডা—সব মিলিয়ে চারপাশে ছিল চেনা ব্যস্ততা।
কিন্তু এই ব্যস্ত শহরের মাঝেও জিহানের জীবনটা ছিল নিজের মতো।
জিহানের বয়স ছাব্বিশ। দেখতে ভালো, কথা বলতে জানে, আর সবচেয়ে বড় কথা—কোনো কিছুতেই খুব বেশি চিন্তা করতে চায় না। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, বাইক নিয়ে ঘোরাঘুরি, হঠাৎ কোথাও চলে যাওয়া—এসবই তার কাছে জীবনের আনন্দ।
তার বাবা রাশেদ সাহেব শহরের পরিচিত ব্যবসায়ী। পরিবারের সবাই চায় জিহান একদিন বাবার ব্যবসায়ের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু জিহানের এসব নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই।
সেদিন সকালেও নাশতার টেবিলে বসে বাবা তাকে বললেন,
—“জিহান, আজ অফিসে আমার সঙ্গে যাবে।”
জিহান চায়ের কাপ নামিয়ে বলল,
—“আজ না বাবা। আজ আমার অন্য কাজ আছে।”
—“কী কাজ?”
জিহান একটু ভেবে বলল,
—“খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ।”
মা হাসতে হাসতে বললেন,
—“তোর গুরুত্বপূর্ণ কাজ মানে আবার বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি?”
জিহান হেসে ফেলল।
—“মা, জীবনটা উপভোগ করার জন্যই তো।”
রাশেদ সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন,
—“জীবন শুধু উপভোগ করার জন্য নয়। দায়িত্বও নিতে হয়।”
জিহান আর কিছু বলল না। চুপচাপ উঠে নিজের ঘরে চলে গেল।
সে জানত, বাবার সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই।
কিন্তু সে জানত না, সেদিনই তার জীবনে এমন একজন মানুষ আসতে চলেছে, যে তার এতদিনের সাজানো-গোছানো স্বাধীন জীবনটাকে পুরোপুরি বদলে দেবে।
অন্যদিকে ইরা।
ইরা ছিল একেবারেই অন্য ধরনের মেয়ে। শান্ত, ভদ্র, নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। অযথা কারও সঙ্গে কথা বলা বা নিজের বিষয় নিয়ে বেশি আলোচনা করা তার স্বভাব ছিল না।
তবে ইরা খুব আত্মসম্মানী। কেউ তাকে অন্যায়ভাবে কিছু বললে সে চুপ করে থাকার মেয়ে নয়।
সেদিন সকালে ইরা তার খালার বাসায় যাচ্ছিল। হাতে কিছু কাগজপত্র ছিল। রাস্তা পার হওয়ার সময় হঠাৎ একটি বাইক তার একেবারে সামনে এসে থামল।
ইরা ভয় পেয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
বাইকের চালক হেলমেট খুলতেই দেখা গেল, সে জিহান।
জিহান হাসতে হাসতে বলল,
—“সরি! একটু তাড়াহুড়ো হয়ে গেছে।”
ইরা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
—“তাড়াহুড়ো হলে মানুষকে ধাক্কা দিতে হয়?”
জিহান একটু অবাক হলো।
সাধারণত তার সঙ্গে এমনভাবে কেউ কথা বলত না।
—“আমি তো ধাক্কা দিইনি।”
—“দেননি, কারণ আমি সরে গিয়েছিলাম।”
জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“ঠিক আছে। ভুল হয়েছে।”
ইরা আর কথা না বাড়িয়ে চলে যেতে লাগল।
জিহান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই হেসে বলল,
—“মেয়েটা তো বেশ রাগী!”
ইরা পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,
—“শুনতে পাচ্ছি।”
জিহান একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
—“ওহ!”
ইরা আর কিছু না বলে চলে গেল।
জিহান অনেকক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের মনে বলল,
—“অদ্ভুত মেয়ে!”
কয়েকদিন পর আবার তাদের দেখা হলো।
জিহানের এক বন্ধুর বোনের জন্মদিন ছিল। শহরের একটি রেস্টুরেন্টে ছোট্ট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।
জিহান সেখানে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল দরজার দিকে।
ইরা ঢুকেছে।
জিহান প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না।
—“এই মেয়েটা এখানে?”
তার বন্ধু রাফি জিজ্ঞেস করল,
—“কাকে দেখছিস?”
জিহান তাড়াতাড়ি অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
—“কাউকে না।”
রাফি সন্দেহের চোখে তাকাল।
—“তুই কাউকে দেখে এতক্ষণ চুপ করে থাকিস না। ব্যাপার কী?”
জিহান হেসে বলল,
—“চুপ কর।”
কিন্তু তার চোখ বারবার ইরার দিকে চলে যাচ্ছিল।
ইরাও একসময় জিহানকে দেখতে পেল।
তাদের চোখাচোখি হলো।
ইরা সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল।
জিহান হালকা হাসল।
কিছুক্ষণ পর সে ইরার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
—“আপনি আমাকে চিনেছেন?”
ইরা ঠান্ডা গলায় বলল,
—“চিনেছি।”
—“ভেবেছিলাম ভুলে গেছেন।”
—“এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়ার মতো ঘটনা ছিল না।”
জিহান হেসে বলল,
—“তাহলে এখনো রাগ করে আছেন?”
ইরা বলল,
—“রাগ না। সাবধান আছি।”
—“আমাকে দেখে সাবধান?”
—“হ্যাঁ।”
জিহান এবার হেসে ফেলল।
—“আপনি সবসময় এমন?”
—“কেমন?”
—“এত গম্ভীর।”
ইরা বলল,
—“আর আপনি সবসময় এত কথা বলেন?”
—“প্রয়োজন হলে।”
—“এখন তো প্রয়োজন নেই।”
কথাটা বলে ইরা চলে গেল।
জিহান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর মনে মনে বলল,
—“এই মেয়েটার সঙ্গে কথা বলা সত্যিই কঠিন।”
কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার ভালো লাগছিল।
অনুষ্ঠান শেষে ইরা যখন বাইরে বের হলো, তখন হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
সে ব্যাগ থেকে ছাতা বের করতে গিয়ে বুঝল, ছাতাটা বাসায় রেখে এসেছে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে জিহানের কণ্ঠ শোনা গেল।
—“ছাতা নেই?”
ইরা ঘুরে তাকাল।
জিহানের হাতে একটা ছাতা।
—“নেই।”
—“তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
—“গাড়ি আসবে।”
জিহান ছাতাটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
—“নিন।”
ইরা অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি?”
—“আমি বৃষ্টিতে ভিজতে পারি।”
—“দরকার নেই।”
—“আপনি নিন। আমি আরেকটা ব্যবস্থা করছি।”
ইরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ছাতাটা নিল।
—“ধন্যবাদ।”
জিহান হাসল।
—“আজ প্রথমবার ধন্যবাদ দিলেন।”
ইরা মৃদু হেসে বলল,
—“আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়ার মতো কাজ এবার করেছেন।”
এই প্রথম জিহান ইরার মুখে হাসি দেখল।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের সেই হাসিটা তার মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি তৈরি করল।
ইরা চলে গেল।
জিহান বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল।
রাফি পাশে এসে বলল,
—“কী রে? কী ভাবছিস?”
জিহান দূরে চলে যাওয়া ইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“কিছু না।”
রাফি হেসে বলল,
—“তোর ‘কিছু না’ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।”
জিহান কিছু বলল না।
ইরার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কয়েকদিন কেটে গেল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, জিহান যতই নিজের কাজে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছিল, ততই ইরার কথা তার মনে পড়ছিল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিলেই মনে হতো, ইরা হয়তো কোনো মেসেজ দিয়েছে।
কিন্তু ইরার নম্বরই তো তার কাছে নেই।
নিজের এই অদ্ভুত চিন্তায় নিজেই বিরক্ত হয়ে যেত জিহান।
একদিন রাফির সঙ্গে বসে চা খেতে খেতে জিহান হঠাৎ বলল,
—“একটা মেয়ের সঙ্গে যদি পরিচয় করতে চাস, তাহলে কীভাবে করবি?”
রাফি চায়ের কাপ নামিয়ে তাকাল।
—“তুই?”
—“আমি কী?”
—“তুই কোনো মেয়েকে নিয়ে প্রশ্ন করছিস?”
জিহান বিরক্ত হয়ে বলল,
—“সাধারণ একটা প্রশ্ন করলাম।”
রাফি হাসল।
—“মেয়েটার নাম কী?”
জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“ইরা।”
রাফি এবার জোরে হেসে উঠল।
—“আমি জানতাম!”
—“কী জানতিস?”
—“তুই প্রেমে পড়েছিস।”
জিহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“চুপ কর! মাত্র দুইবার দেখা হয়েছে।”
—“তাহলে এত চিন্তা কেন?”
জিহান উত্তর দিল না।
কারণ সে নিজেও জানত না।
ইরার দিক থেকেও ব্যাপারটা খুব একটা আলাদা ছিল না।
সে অবশ্য নিজের কাছে স্বীকার করছিল না যে জিহানকে নিয়ে তারও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
জিহানের আচরণ তাকে বিরক্ত করত। আবার সেই একই মানুষ যখন হঠাৎ কোনো ভালো কাজ করত, তখন ইরার মনে অদ্ভুত একটা ভালো লাগা তৈরি হতো।
সেদিন বৃষ্টিতে ছাতা দেওয়ার কথাটা বারবার মনে পড়ছিল।
ইরা জানালার পাশে বসে বই পড়ছিল। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
হঠাৎ তার মনে হলো—
জিহান এখন কী করছে?
ভাবনাটা আসতেই সে নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হলো।
—“আমি আবার ওর কথা ভাবছি কেন?”
সে বইয়ের দিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু কিছুতেই মন বসছিল না।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
খালার ফোন।
—“ইরা, কালকে আমাদের বাসায় আসবি তো?”
—“হ্যাঁ, আসব।”
—“একটা কাজ আছে। তুই এসে আমাকে একটু সাহায্য করিস।”
—“ঠিক আছে।”
ফোন রেখে ইরা আবার বই খুলল।
সে জানত না, পরদিনই আবার জিহানের সঙ্গে তার দেখা হবে।
পরদিন বিকেলে ইরা খালার বাসায় গেল।
বাসায় ঢুকেই সে অবাক হয়ে গেল।
অনেক মানুষ এসেছে।
খালার মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে ছোটখাটো আয়োজন করা হয়েছে।
ইরা রান্নাঘরে খালাকে সাহায্য করছিল।
হঠাৎ বাইরে থেকে জিহানের কণ্ঠ ভেসে এলো।
—“আন্টি, আমি এসে গেছি!”
ইরার হাত থেমে গেল।
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর নিজের মনেই বলল,
—“এখানে ও কী করছে?”
খালা বললেন,
—“ইরা, তুই ওদের জন্য চা নিয়ে যা।”
ইরা ট্রে হাতে নিয়ে বাইরে এল।
সামনেই জিহান দাঁড়িয়ে।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
জিহান প্রথমে একটু অবাক, তারপর মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—“আবার দেখা হয়ে গেল!”
ইরা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,
—“মনে হচ্ছে শহরটা অনেক ছোট।”
জিহান বলল,
—“আমার কাছে কিন্তু ভালোই লাগছে।”
ইরা কিছু বলল না।
চা দিয়ে চলে যেতে চাইছিল।
জিহান আস্তে করে বলল,
—“আপনি কি সবসময় আমাকে এড়িয়ে চলেন?”
ইরা থেমে গেল।
—“আমি আপনাকে এড়াই না।”
—“তাহলে?”
—“আপনার সঙ্গে কথা বলার মতো কোনো বিষয় নেই।”
জিহান হেসে বলল,
—“বিষয় তৈরি করা যায়।”
ইরা এবার তাকিয়ে বলল,
—“আপনি সবকিছুকে এত সহজ ভাবেন কীভাবে?”
জিহান একটু চুপ করে গেল।
—“সবকিছু সহজ না। কিন্তু কঠিন করে দেখলে জীবনটা আরও কঠিন হয়ে যায়।”
ইরা তার কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—“আপনি যতটা বোকা মনে হয়েছেন, ততটা নন।”
জিহান অবাক হয়ে বলল,
—“এটা কি প্রশংসা?”
ইরা হেসে চলে গেল।
জিহান তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
সন্ধ্যার দিকে সবাই ছাদে বসেছিল।
জিহান এক পাশে দাঁড়িয়ে ফোন দেখছিল। ইরা ছাদের অন্য পাশে গাছগুলোতে পানি দিচ্ছিল।
হঠাৎ বাতাসে ইরার চুল মুখের সামনে চলে এল।
সে হাত দিয়ে চুল সরাতে চেষ্টা করছিল।
জিহান দূর থেকে দেখে বলল,
—“একটু দাঁড়ান।”
ইরা অবাক হয়ে তাকাল।
জিহান কাছে এসে তার হাতে থাকা পানির জগটা নিয়ে বলল,
—“আপনি এটা ধরুন। আমি গাছগুলোতে পানি দিচ্ছি।”
—“কেন?”
—“আপনার চুল বারবার মুখে আসছে।”
ইরা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—“আমি পারব।”
—“জানি।”
—“তাহলে?”
জিহান হেসে বলল,
—“তবু সাহায্য করতে ইচ্ছে করছে।”
ইরা আর কিছু বলল না।
জিহান গাছগুলোতে পানি দিতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর ইরা বলল,
—“আপনি কি সবার সঙ্গেই এমন?”
—“কেমন?”
—“অযথা সাহায্য করেন।”
জিহান একটু ভেবে বলল,
—“না। সবাইকে না।”
ইরা বুঝতে পারল কথাটার মধ্যে অন্য কিছু আছে।
সে আর প্রশ্ন করল না।
কয়েকদিন পর জিহান জানতে পারল ইরা কাছের একটি কোচিং সেন্টারে নিয়মিত যায়।
সেদিন ইরা ক্লাস শেষ করে বের হচ্ছিল।
বাইরে এসে দেখল, জিহান বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ইরা অবাক।
—“আপনি এখানে?”
—“একজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম।”
ইরা সন্দেহের চোখে তাকাল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনার বন্ধু কোথায়?”
জিহান এক মুহূর্ত থেমে বলল,
—“সে চলে গেছে।”
ইরা হেসে ফেলল।
—“আপনার গল্পগুলো খুব সুন্দর।”
জিহানও হাসল।
—“ঠিক আছে, সত্যি বলছি। আপনাকে নিতে এসেছিলাম।”
ইরা অবাক হয়ে গেল।
—“আমাকে?”
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
—“বৃষ্টি আসছে।”
আকাশের দিকে তাকিয়ে ইরা দেখল কালো মেঘ জমেছে।
সে বলল,
—“আমার গাড়ি আসবে।”
—“অপেক্ষা করুন।”
কিছুক্ষণ পর সত্যিই বৃষ্টি শুরু হলো।
ইরার গাড়ি তখনও এল না।
জিহান বাইকটা এক পাশে রেখে বলল,
—“আপনি চাইলে আমার গাড়িতে যেতে পারেন। আমি ড্রাইভ করব।”
ইরা কিছুক্ষণ দ্বিধা করল।
তারপর বলল,
—“ঠিক আছে।”
গাড়িতে বসার পর দুজনের মধ্যে অদ্ভুত নীরবতা তৈরি হলো।
জিহান রেডিও চালু করল।
মৃদু গান বাজতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর জিহান বলল,
—“আপনি আমাকে এতটা অপছন্দ করেন?”
ইরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—“আমি আপনাকে অপছন্দ করি না।”
—“তাহলে?”
—“আমি আপনাকে বুঝতে পারি না।”
জিহান হেসে বলল,
—“আমিও নিজেকে সবসময় বুঝি না।”
ইরা এবার তার দিকে তাকাল।
জিহান গাড়ি চালাচ্ছিল।
তার মুখে আগের মতো দুষ্টু হাসি নেই। বরং একটা শান্ত ভাব।
ইরার মনে হলো, এই মানুষটাকে সে যতটা ভেবেছিল, হয়তো সে ততটা হালকা মনের নয়।
গাড়ি ইরাদের বাসার সামনে এসে থামল।
ইরা নামার আগে বলল,
—“ধন্যবাদ।”
জিহান বলল,
—“আবার ধন্যবাদ!”
ইরা মৃদু হেসে দরজা খুলল।
কিন্তু নামার আগে থেমে বলল,
—“জিহান?”
—“হুম?”
—“আজ আপনাকে একটু ভালো লাগল।”
কথাটা বলেই ইরা দ্রুত নেমে গেল।
জিহান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
ইরার মুখে সেদিনের কথাটা শোনার পর থেকে জিহানের আচরণে একটা পরিবর্তন এসেছিল।
“আজ আপনাকে একটু ভালো লাগল।”
মাত্র কয়েকটি শব্দ।
কিন্তু জিহানের কাছে সেই কথাগুলো যেন অনেক বড় কিছু ছিল।
সেদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বারবার কথাটা মনে পড়ছিল।
সে ফোন হাতে নিয়ে ইরার নম্বর খুঁজতে গিয়ে থেমে গেল।
তার কাছে ইরার নম্বর নেই।
কিছুক্ষণ ভেবে সে রাফিকে ফোন করল।
—“রাফি, একটা কাজ আছে।”
—“কী কাজ?”
—“ইরার নম্বরটা জোগাড় করে দে।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর রাফি হেসে বলল,
—“শেষ পর্যন্ত তুই স্বীকার করলি!”
—“কী স্বীকার করলাম?”
—“তুই ইরাকে পছন্দ করিস।”
জিহান বিরক্ত হয়ে বলল,
—“নম্বর দিবি, নাকি বক্তৃতা দিবি?”
—“দিচ্ছি। তবে একটা কথা মনে রাখিস—মেয়েটা তোকে পাত্তা না দিলে কিন্তু আমার কাছে এসে কান্নাকাটি করবি না।”
—“আমি আর কান্না?”
—“দেখা যাবে।”
পরদিন বিকেলেই জিহানের ফোনে ইরার নম্বর চলে এল।
নম্বরটা হাতে নিয়ে সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
মেসেজ লিখল—
“হাই।”
আবার মুছে দিল।
লিখল—
“কেমন আছেন?”
আবার মুছে দিল।
শেষে কিছুই পাঠাতে পারল না।
নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে ফোনটা টেবিলে রেখে দিল।
ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ এল।
ইরা: “আপনি কি কিছু বলতে চেয়েছিলেন?”
জিহান অবাক হয়ে গেল।
সে তো কিছু পাঠায়ইনি!
কয়েক সেকেন্ড পর বুঝল, রাফি হয়তো ইরাকে আগেই বলে দিয়েছে।
জিহান লিখল,
—“আপনি আমার নম্বর পেলেন কীভাবে?”
ইরা উত্তর দিল,
—“আপনার বন্ধু দিয়েছে।”
—“ও আচ্ছা।”
—“আপনি কি আমাকে মেসেজ করতে চেয়েছিলেন?”
জিহান এবার সাহস করে লিখল,
—“হ্যাঁ।”
—“কেন করেননি?”
—“ভাবছিলাম আপনি বিরক্ত হবেন।”
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর ইরা লিখল,
—“সবকিছু নিয়ে এত ভাবেন কেন?”
জিহান হেসে ফেলল।
—“আপনার ব্যাপারে একটু বেশি ভাবি।”
মেসেজটা পাঠানোর পরই তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
ইরা উত্তর দিল না।
দশ মিনিট।
বিশ মিনিট।
এক ঘণ্টা।
জিহান বারবার ফোন দেখছিল।
অবশেষে রাতের দিকে ইরার মেসেজ এল।
—“এত তাড়াতাড়ি বেশি ভাবা ঠিক না।”
জিহান লিখল,
—“তাহলে ধীরে ধীরে ভাবব।”
ইরা শুধু একটা হাসির ইমোজি পাঠাল।
সেই ছোট্ট ইমোজিটাই জিহানের রাতটা ভালো করে দিল।
এরপর থেকে তাদের নিয়মিত কথা হতে লাগল।
প্রথমে অল্প।
তারপর একটু বেশি।
কখনো পড়াশোনা নিয়ে, কখনো কাজ নিয়ে, কখনো একেবারে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে।
জিহান ইরাকে হাসানোর জন্য ইচ্ছা করেই নানা কথা বলত।
ইরা প্রথমে বিরক্ত হলেও ধীরে ধীরে তার সঙ্গে কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে গেল।
একদিন জিহান জিজ্ঞেস করল,
—“আপনার প্রিয় জায়গা কোনটা?”
—“কেন?”
—“জানতে ইচ্ছে করছে।”
—“বাড়ির ছাদ।”
জিহান বলল,
—“এত সাধারণ?”
—“শান্ত লাগে।”
—“আর কোথাও?”
ইরা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—“সমুদ্র।”
জিহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“তাহলে একদিন সমুদ্রে যাবেন?”
ইরা অবাক হয়ে বলল,
—“কার সঙ্গে?”
—“আমার সঙ্গে।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ইরা লিখল,
—“আপনি খুব দ্রুত এগোচ্ছেন।”
জিহান হাসল।
—“আমি তো শুধু ঘুরতে বললাম।”
—“আপনাকে বিশ্বাস করা কঠিন।”
—“তাহলে আমাকে বিশ্বাস করার সুযোগ দিন।”
ইরা আর উত্তর দিল না।
কয়েকদিন পর জিহান জানতে পারল, ইরার জন্মদিন সামনে।
সে কাউকে কিছু না বলে একটা ছোট্ট উপহার কিনল।
খুব দামি কিছু নয়।
একটা সুন্দর ডায়েরি।
কারণ ইরা মাঝে মাঝে নিজের ভাবনা লিখে রাখত।
জিহান ডায়েরির প্রথম পাতায় ছোট করে লিখল—
“যেসব কথা মুখে বলা যায় না, সেগুলো এখানে লিখে রাখবেন।”
জন্মদিনের দিন ইরাকে দেখা করতে বলল।
ইরা প্রথমে রাজি হচ্ছিল না।
—“এভাবে দেখা করা ঠিক হবে?”
জিহান বলল,
—“কেন ঠিক হবে না?”
—“মানুষ অনেক কথা বলবে।”
—“মানুষ তো সবকিছু নিয়েই কথা বলে।”
শেষ পর্যন্ত ইরা রাজি হলো।
তারা শহরের একটি শান্ত ক্যাফেতে দেখা করল।
জিহান উপহারটা ইরার হাতে দিল।
ইরা অবাক হয়ে বলল,
—“আমার জন্য?”
—“না, পাশের টেবিলের জন্য।”
ইরা হেসে বলল,
—“আপনি কখনো সিরিয়াস হতে পারেন না?”
—“পারি।”
—“কখন?”
জিহান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—“যখন আপনার ব্যাপার আসে।”
ইরা চুপ করে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে উপহারটা খুলল।
ডায়েরিটা দেখে তার চোখে আনন্দ ফুটে উঠল।
—“খুব সুন্দর।”
—“পছন্দ হয়েছে?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে আমি সফল।”
ইরা ডায়েরির প্রথম পাতাটা খুলে লেখাটা পড়ল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আপনি এত কিছু লক্ষ্য করেন?”
জিহান বলল,
—“আপনাকে নিয়ে হলে করি।”
ইরা এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।
তার গাল হালকা লাল হয়ে উঠেছিল।
ক্যাফে থেকে বের হওয়ার পর তারা কিছুক্ষণ হাঁটল।
রাস্তার পাশে ফুচকার দোকান দেখে জিহান বলল,
—“ফুচকা খাবেন?”
ইরা হেসে বলল,
—“আপনি সবসময় খাওয়ার কথা ভাবেন?”
—“না। আপনার সঙ্গে থাকলে মাঝে মাঝে মনে পড়ে।”
—“আপনার কথাগুলো খুব অদ্ভুত।”
—“কিন্তু আপনার হাসি বের করতে পারছি।”
ইরা কিছু বলল না।
দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল।
হঠাৎ জিহান থেমে গেল।
—“ইরা।”
—“হুম?”
—“একটা কথা বলব?”
—“বলুন।”
—“আপনি কি আমাকে একটু একটু করে পছন্দ করতে শুরু করেছেন?”
ইরা চুপ।
জিহান আবার বলল,
—“উত্তর দিতে হবে না।”
ইরা তার দিকে তাকাল।
—“আপনি কি সব প্রশ্নের উত্তর এত তাড়াতাড়ি চান?”
—“না।”
—“তাহলে এই প্রশ্নেরও উত্তর সময় হলে পাবেন।”
জিহান মৃদু হেসে বলল,
—“আমি অপেক্ষা করতে পারব।”
কিন্তু তাদের এই সুন্দর সময় বেশিদিন বাধাহীন থাকল না।
এক সন্ধ্যায় ইরা বাড়িতে বসে ছিল। তার বাবা-মা কিছু নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
ইরার বাবা বললেন,
—“ইরা, আগামী সপ্তাহে আমাদের কিছু আত্মীয় আসবে।”
—“কেন?”
মা একটু ইতস্তত করে বললেন,
—“তোমার জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে।”
ইরা অবাক হয়ে গেল।
—“আমার জন্য?”
—“হ্যাঁ।”
ইরা কিছু বলল না।
তার মনে প্রথমেই জিহানের কথা এল।
কিন্তু সে নিজেও জানত না, জিহানের সঙ্গে তার সম্পর্কটা আসলে কী।
তারা কি শুধু বন্ধু?
নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু?
অন্যদিকে সেই রাতেই জিহান তার বাবার কাছ থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনল।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“জিহান, তোমার বিয়ের ব্যাপারে আমরা ভাবছি।”
জিহান অবাক হয়ে বলল,
—“আমার বিয়ে?”
—“হ্যাঁ। একটা ভালো পরিবার থেকে প্রস্তাব এসেছে।”
জিহান হাসতে চেষ্টা করল।
—“বাবা, এসব এখন কেন?”
রাশেদ সাহেব গম্ভীরভাবে বললেন,
—“সবকিছুর একটা সময় আছে। এবার তোমাকেও কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
জিহান আর হাসতে পারল না।
তার মনে শুধু একটাই নাম ঘুরছিল—
ইরা।
জিহানের জীবনে প্রথমবার এমন একটা রাত এল, যখন তার চোখে ঘুম ছিল না।
বাবার কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
“তোমার বিয়ের ব্যাপারে আমরা ভাবছি।”
সাধারণ সময় হলে জিহান হয়তো কথাটা হেসে উড়িয়ে দিত। কিন্তু এবার পারল না।
কারণ তার মনে এখন একজন মানুষ আছে।
ইরা।
কিন্তু ইরার কাছে সে আসলে কী?
বন্ধু?
পরিচিত?
নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু?
এই প্রশ্নের উত্তর জিহান নিজেও জানত না।
সে ফোন হাতে নিয়ে ইরার চ্যাট খুলল।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর লিখল,
—“জেগে আছেন?”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল,
—“হ্যাঁ। আপনি?”
—“আমিও।”
—“কী হয়েছে?”
জিহান অনেকক্ষণ ভেবে লিখল,
—“কিছু কথা বলতে চাই।”
ইরা উত্তর দিল,
—“বলুন।”
জিহান সরাসরি বলতে পারল না।
শেষে লিখল,
—“আপনার পরিবার কি আপনার বিয়ের কথা ভাবছে?”
ওপাশে কিছুক্ষণ কোনো উত্তর নেই।
তারপর ইরা লিখল,
—“আপনি কীভাবে জানলেন?”
জিহানের বুকটা কেমন করে উঠল।
—“মানে সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনি কী বললেন?”
ইরা দীর্ঘ সময় পর উত্তর দিল,
—“আমি কিছু বলিনি।”
জিহান লিখল,
—“কেন?”
ইরা বলল,
—“কারণ আমার নিজের কাছেই সবকিছু পরিষ্কার না।”
জিহান বুঝতে পারল, সে আসলে কী বলতে চাইছে।
সে লিখল,
—“আমারও একই অবস্থা।”
ইরা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল,
—“আপনার পরিবারও কি আপনার জন্য কাউকে দেখছে?”
জিহান উত্তর দিল,
—“হ্যাঁ।”
ইরা আর কিছু লিখল না।
কথোপকথন সেখানেই থেমে গেল।
কিন্তু দুজনের মনেই একটা অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি হলো।
পরদিন সকাল থেকেই জিহান চুপচাপ।
রাফি তাকে দেখে বলল,
—“কী হয়েছে?”
—“কিছু না।”
—“ইরার ব্যাপার?”
জিহান তাকাল।
—“তুই সব বুঝিস কীভাবে?”
রাফি হেসে বলল,
—“তোর মুখ দেখলেই বোঝা যায়।”
জিহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“ওর পরিবার ওর জন্য বিয়ের কথা ভাবছে।”
রাফি বলল,
—“তুই ওকে বলিস না কেন যে তুই ওকে পছন্দ করিস?”
জিহান চুপ করে গেল।
—“ভয় লাগছে?”
—“ভয় না।”
—“তাহলে?”
—“আমি নিশ্চিত না ও আমাকে একইভাবে দেখে কি না।”
রাফি বলল,
—“কখনো কখনো উত্তর পাওয়ার জন্য প্রশ্ন করতে হয়।”
কথাটা জিহানের মনে গেঁথে গেল।
সেদিন বিকেলে জিহান ইরাকে দেখা করতে বলল।
ইরা প্রথমে রাজি হচ্ছিল না।
শেষ পর্যন্ত দুজন একটা পার্কে দেখা করল।
ইরা বেঞ্চে বসে ছিল।
জিহান এসে পাশে বসে বলল,
—“আপনি মন খারাপ করে আছেন?”
—“না।”
—“মিথ্যা বলছেন।”
ইরা মৃদু হাসল।
—“আপনি এখন অনেক কিছু বুঝে ফেলেন।”
—“আপনাকে নিয়ে একটু চেষ্টা করি।”
ইরা চুপ করে রইল।
জিহান কিছুক্ষণ পর বলল,
—“বাড়িতে যে সম্বন্ধ এসেছে, সেটা কি আপনার পছন্দ?”
ইরা মাথা নাড়ল।
—“আমি ছেলেটাকে দেখিনি।”
—“দেখবেন?”
—“জানি না।”
জিহান নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আপনি যদি আমাকে একটা কথা বলেন, আমি হয়তো নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারব।”
ইরা তাকাল।
—“কী কথা?”
জিহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আপনার জীবনে কি আমার কোনো জায়গা আছে?”
ইরা প্রশ্নটা শুনে থমকে গেল।
তার চোখে দ্বিধা।
—“জিহান…”
—“হ্যাঁ?”
—“আমি জানি না।”
জিহান কিছু বলল না।
ইরা ধীরে ধীরে বলল,
—“আপনার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগে। আপনার সঙ্গে থাকলে ভালো লাগে। কিন্তু…”
—“কিন্তু?”
—“আমি জানি না এটা ভালো লাগা, নাকি তার চেয়ে বেশি কিছু।”
জিহান মৃদু হেসে বলল,
—“আমি বুঝেছি।”
কিন্তু তার হাসির মধ্যে কষ্ট লুকানো ছিল।
ইরা সেটা বুঝতে পারল।
—“আপনি কি রাগ করেছেন?”
—“না।”
—“কষ্ট পেয়েছেন?”
জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“হয়তো।”
ইরা নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
সেদিন রাতে জিহান অনেক ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নিল।
সে ইরাকে কোনো চাপ দেবে না।
নিজের অনুভূতি জোর করে বোঝাতে চাইবে না।
কিন্তু তার মন তখন অন্য কথা বলছিল।
সে ইরাকে সত্যিই হারাতে চাইছিল না।
অন্যদিকে ইরাও সেই রাতটা শান্তিতে কাটাতে পারল না।
জিহানের মুখটা বারবার মনে পড়ছিল।
বিশেষ করে তার সেই কথাটা—
“আপনার জীবনে কি আমার কোনো জায়গা আছে?”
ইরা বুঝতে পারছিল, জিহান তার কাছে শুধু একজন বন্ধু নয়।
তার উপস্থিতি ইরার দিনগুলোকে বদলে দিয়েছে।
জিহানের মেসেজ না এলে তার ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করত।
জিহান কথা না বললে মন খারাপ হতো।
জিহানের সঙ্গে দেখা হলে অকারণে হাসি পেত।
এগুলো কি শুধু বন্ধুত্ব?
ইরা উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না।
কয়েকদিন পর ইরার পরিবার সেই ছেলেটির সঙ্গে দেখা করার দিন ঠিক করল।
ইরা বাধ্য হয়ে রাজি হলো।
তার মা বললেন,
—“ছেলেটা ভালো। পরিবারও ভালো।”
ইরা চুপ করে রইল।
—“তুই অন্তত একবার দেখা করে কথা বল।”
ইরা মাথা নাড়ল।
কিন্তু তার মনে তখন শুধু জিহান।
সে ফোন হাতে নিয়ে জিহানের চ্যাট খুলল।
অনেকক্ষণ লিখতে গিয়েও কিছু লিখতে পারল না।
অবশেষে একটা ছোট মেসেজ পাঠাল।
—“আপনি কি ব্যস্ত?”
জিহান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
—“না। বলুন।”
ইরা লিখল,
—“আমার বাসায় যেদিন ছেলেটা আসবে, সেদিন…”
তারপর আর লিখতে পারল না।
জিহান অপেক্ষা করছিল।
—“সেদিন কী?”
ইরা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল,
—“কিছু না।”
জিহান বুঝল, ইরা কিছু একটা বলতে চেয়েছিল।
কিন্তু সে আর চাপ দিল না।
অন্যদিকে জিহানের পরিবারও তাকে একটি মেয়ের ছবি দেখাল।
মেয়েটির নাম তানিয়া।
শান্ত, শিক্ষিত, ভালো পরিবারের মেয়ে।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“একবার দেখা কর। তারপর যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নে।”
জিহান ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তার মনে ইরার মুখ ভেসে উঠল।
সে ধীরে বলল,
—“আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।”
বাবা গম্ভীর হয়ে বললেন,
—“কেন?”
—“আমার কিছু পরিকল্পনা আছে।”
—“কী পরিকল্পনা?”
জিহান কোনো উত্তর দিল না।
রাশেদ সাহেব বুঝতে পারলেন, ছেলের মনে কিছু একটা চলছে।
—“জিহান, যদি কারও সঙ্গে সম্পর্ক থাকে, তাহলে আমাকে বল।”
জিহান বাবার দিকে তাকাল।
মুখ খুলল।
কিন্তু ইরার নাম বলতে পারল না।
সে শুধু বলল,
—“এখনো কিছু নিশ্চিত না।”
বাবা বললেন,
—“তাহলে অনিশ্চিত সম্পর্কের জন্য নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করিস না।”
কথাটা জিহানের মনে আঘাত করল।
সেই রাতে জিহান ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
ফোনে ইরার নাম জ্বলছিল।
সে কল করবে কি না ভাবছিল।
ঠিক তখন ফোন বেজে উঠল।
ইরার কল।
জিহান সঙ্গে সঙ্গে ধরল।
—“হ্যালো?”
ওপাশে ইরার কণ্ঠ কাঁপছিল।
—“জিহান…”
—“হ্যাঁ?”
—“কাল আমার সঙ্গে একটা ছেলে দেখা করতে আসবে।”
জিহান চোখ বন্ধ করল।
—“জানি।”
—“আপনি কিছু বলবেন না?”
—“কী বলব?”
—“আমি জানি না।”
জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“ইরা, সিদ্ধান্তটা আপনার।”
—“আপনি কি আমাকে আটকাবেন না?”
প্রশ্নটা শুনে জিহানের বুক কেঁপে উঠল।
সে ধীরে বলল,
—“আপনি যদি আমাকে চান, তাহলে আমি নিজে থেকে কখনো দূরে যাব না।”
ইরা চুপ।
জিহান আবার বলল,
—“কিন্তু আপনি যদি আমাকে না চান, তাহলে আমি আপনাকে কোনোদিন জোর করব না।”
ইরার চোখে পানি এসে গেল।
সে কিছু বলতে পারল না।
কয়েক সেকেন্ড পর শুধু বলল,
—“কাল দেখা হবে।”
ফোন কেটে গেল।
জিহান আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন সকালটা ইরার কাছে অন্য সব দিনের চেয়ে অনেক বেশি ভারী মনে হচ্ছিল।
বাড়ির সবাই ব্যস্ত। বসার ঘর গোছানো হচ্ছে, রান্নাঘরে নানা রকম খাবার তৈরি হচ্ছে। আত্মীয়স্বজনও আসতে শুরু করেছে।
ইরা নিজের ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
আজ যে ছেলেটা তাকে দেখতে আসছে, তাকে নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই।
তার মাথায় শুধু একজন মানুষ।
জিহান।
গত রাতের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
“আপনি যদি আমাকে চান, তাহলে আমি নিজে থেকে কখনো দূরে যাব না।”
কথাটা মনে পড়তেই ইরার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
সে বুঝতে পারছিল, জিহানকে হারানোর কথা ভাবলেই তার ভয় লাগছে।
কিন্তু নিজের অনুভূতিটা এতদিন সে কেন বুঝতে পারেনি?
হয়তো সে ভয় পেয়েছিল।
হয়তো জিহানকে নিজের জীবনে খুব বেশি জায়গা দিয়ে ফেলেছে বলেই সেটা স্বীকার করতে চাইছিল না।
ঠিক তখন দরজায় নক হলো।
ইরার মা বললেন,
—“ইরা, তৈরি হয়ে নে। ওরা কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে।”
ইরা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
নিজেকে দেখে তার মনে হলো, আজ সে যেন নিজের জীবন নিয়ে একটা বড় সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
অন্যদিকে জিহানের সকালটাও শান্ত ছিল না।
সে বারবার ফোন দেখছিল।
ইরার কোনো মেসেজ নেই।
রাফি ফোন করে জিজ্ঞেস করল,
—“আজ কী খবর?”
জিহান বলল,
—“ওদের বাসায় ছেলে দেখতে যাচ্ছে।”
—“আর তুই?”
—“আমি কী করব?”
রাফি একটু চুপ করে বলল,
—“যা করার আজই কর।”
জিহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“আমি ওকে কোনো চাপ দিতে চাই না।”
—“চাপ দেওয়া আর নিজের অনুভূতি জানানো এক জিনিস না।”
কথাটা জিহানের মনে দাগ কাটল।
সে ঠিক করল, আজ সে ইরাকে নিজের মনের কথা পরিষ্কার করে বলবে।
কিন্তু তার আগে ইরার সিদ্ধান্ত জানা দরকার।
দুপুরের দিকে ইরাদের বাসায় অতিথিরা এল।
ছেলেটার নাম সায়ান।
সে ভদ্র, শান্ত স্বভাবের। ইরার সঙ্গে বসে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিল।
সায়ান বলল,
—“আপনি কী করতে পছন্দ করেন?”
ইরা সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিল,
—“বই পড়তে।”
—“ভালো লাগে?”
—“হ্যাঁ।”
সায়ান হাসল।
—“আমিও পড়ি। বিশেষ করে ভ্রমণের বই।”
ইরা ভদ্রতা করে হাসল।
কথাবার্তা খারাপ হচ্ছিল না।
সায়ান খারাপ ছেলে নয়।
বরং যথেষ্ট ভালো।
কিন্তু ইরার মন তার কথায় ছিল না।
তার মনে হচ্ছিল, সে যেন অন্য কারও সঙ্গে বসে থেকেও অন্য একজনের অপেক্ষা করছে।
সায়ান একসময় বলল,
—“আপনি কি এই বিয়েতে রাজি?”
প্রশ্নটা শুনে ইরা থেমে গেল।
সে সত্যি কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল।
—“আমি এখনো জানি না।”
সায়ান শান্তভাবে বলল,
—“কোনো অন্য কারণ আছে?”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“আপনার জীবনে কি কেউ আছে?”
ইরা মাথা নিচু করল।
তারপর ধীরে বলল,
—“হয়তো আছে।”
সায়ান মৃদু হাসল।
—“তাহলে আমার মনে হয় আপনার আগে নিজের মনটা পরিষ্কার করা উচিত।”
ইরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
সায়ান বলল,
—“বিয়ে শুধু পরিবার পছন্দ করলেই হয় না। দুজন মানুষের ইচ্ছাটাও গুরুত্বপূর্ণ।”
ইরা প্রথমবার একটু স্বস্তি পেল।
সে বলল,
—“ধন্যবাদ।”
অতিথিরা চলে যাওয়ার পর ইরা নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করল।
তারপর ফোন হাতে নিল।
জিহানের নামের ওপর আঙুল রাখল।
কল করবে?
কয়েক সেকেন্ড পর কল করেই ফেলল।
জিহান সঙ্গে সঙ্গে ধরল।
—“হ্যালো?”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ।
—“ইরা?”
—“ওরা চলে গেছে।”
জিহানের গলায় চাপা উত্তেজনা।
—“তারপর?”
—“ছেলেটা ভালো।”
জিহানের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
সে ধীরে বলল,
—“তাহলে?”
ইরা বলল,
—“আমি রাজি হইনি।”
জিহান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
—“কেন?”
ইরা চোখ বন্ধ করে বলল,
—“কারণ আমি অন্য একজনকে পছন্দ করি।”
জিহানের শ্বাস যেন আটকে গেল।
—“কে?”
ইরা মৃদু হেসে বলল,
—“আপনি জানেন।”
জিহান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকার পর বলল,
—“ইরা…”
—“হুম?”
—“আমি আজ তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
ইরা প্রথমবার তার সঙ্গে ‘আপনি’ না বলে চুপ করে গেল।
তারপর ধীরে বলল,
—“এসো।”
জিহান ফোনটা নামিয়ে ফেলল।
তার মুখে এমন হাসি ফুটল, যা অনেকদিন দেখা যায়নি।
সন্ধ্যায় তারা আগের সেই পার্কে দেখা করল।
ইরা বেঞ্চে বসে ছিল।
জিহান এসে কিছুক্ষণ তার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
দুজনেই চুপ।
শেষে জিহান বলল,
—“তুমি আমাকে পছন্দ করো?”
ইরা মাথা নিচু করে বলল,
—“হ্যাঁ।”
জিহানের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—“কতদিন ধরে?”
ইরা হেসে বলল,
—“জানি না।”
—“কবে বুঝলে?”
—“যেদিন তুমি বলেছিলে, ‘আপনার জীবনে কি আমার কোনো জায়গা আছে?’”
জিহান চুপ করে গেল।
ইরা বলল,
—“সেদিন বুঝেছিলাম, তোমাকে হারানোর চিন্তাটা আমার ভালো লাগছে না।”
জিহান ধীরে তার পাশে বসল।
—“আমি তোমাকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করি।”
ইরা বলল,
—“আমি জানতাম।”
—“কীভাবে?”
—“তুমি খুব ভালো অভিনয় করতে পারো না।”
জিহান হেসে ফেলল।
দুজনের মধ্যে থাকা এতদিনের অস্বস্তি যেন এক মুহূর্তে দূর হয়ে গেল।
কিন্তু ঠিক তখনই জিহানের ফোন বেজে উঠল।
বাবার ফোন।
সে কল ধরল।
—“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে রাশেদ সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠ।
—“আজ রাতে বাসায় আসবি। জরুরি কথা আছে।”
জিহান বলল,
—“কী হয়েছে?”
—“বাসায় এসে কথা বলব।”
কল কেটে গেল।
জিহানের মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
ইরা জিজ্ঞেস করল,
—“কী হয়েছে?”
—“বাবা ডাকছে।”
—“গুরুত্বপূর্ণ কিছু?”
—“মনে হচ্ছে।”
ইরা বলল,
—“তুমি যাও।”
জিহান উঠে দাঁড়াল।
তারপর ইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“একটা কথা।”
—“কী?”
—“আজ থেকে তুমি আমাকে আর ‘আপনি’ বলবে না।”
ইরা মৃদু হেসে বলল,
—“তাহলে কী বলব?”
—“জিহান।”
ইরা হেসে বলল,
—“ঠিক আছে, জিহান।”
নিজের নামটা ইরার মুখে শুনে জিহানের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল।
রাতে বাসায় ফিরতেই জিহান বুঝল, পরিবেশটা অস্বাভাবিক।
বাবা, মা—দুজনেই বসার ঘরে বসে আছেন।
রাশেদ সাহেব টেবিলের ওপর একটা ছবি রাখলেন।
—“এটা তানিয়ার ছবি।”
জিহান ছবির দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
—“আমি আগেই বলেছি, আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।”
বাবা শান্ত গলায় বললেন,
—“তুই চাইছিস না, নাকি অন্য কাউকে পছন্দ করিস?”
জিহান চুপ।
রাশেদ সাহেব আবার বললেন,
—“সত্যি কথা বল।”
জিহান এবার আর লুকাল না।
—“হ্যাঁ। আমি একজনকে পছন্দ করি।”
মা অবাক হয়ে তাকালেন।
—“কে?”
জিহান বলল,
—“ইরা।”
বাবার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—“ইরার পরিবার সম্পর্কে তুই কী জানিস?”
—“সবকিছু জানি না। কিন্তু ও ভালো মানুষ।”
—“শুধু ভালো মানুষ হলেই বিয়ে হয় না।”
জিহান কিছু বলল না।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“আমি ওই পরিবারের ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি।”
জিহান অবাক হয়ে তাকাল।
—“আপনি খোঁজ নিয়েছেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“কারণ তুই যদি সত্যিই ওকে বিয়ে করতে চাস, তাহলে আমাদেরও অনেক কিছু ভাবতে হবে।”
জিহানের মনে আশার আলো জ্বলে উঠল।
কিন্তু পরের কথাটা শুনে সেই আশা আবার থেমে গেল।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“ওদের পরিবার সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য আছে, যা আমাদের পরিবারের জন্য সহজ হবে না।”
জিহান ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“কী তথ্য?”
বাবা সরাসরি উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
—“আগে সবকিছু জেনে নে। তারপর সিদ্ধান্ত নিস।”
জিহানের বুকের ভেতর আবার অস্বস্তি তৈরি হলো।
জিহান সেদিন রাতে বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে এসে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
বাবার কথাটা তার মাথা থেকে কিছুতেই যাচ্ছিল না।
“ওদের পরিবার সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য আছে, যা আমাদের পরিবারের জন্য সহজ হবে না।”
কী এমন তথ্য?
ইরার পরিবারে কী আছে?
আর তার সঙ্গে তাদের পরিবারের সম্পর্কই বা কী?
সবচেয়ে বড় কথা, বাবা কেন আগে থেকেই ইরার পরিবারের ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন?
জিহানের মাথায় একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছিল।
সে ফোন হাতে নিয়ে ইরাকে কল করল।
ইরা সঙ্গে সঙ্গে ধরল।
—“হ্যালো, জিহান?”
—“ঘুমাওনি?”
—“না। তোমার কথা ভাবছিলাম।”
জিহানের মুখে অল্প হাসি ফুটল।
—“আমিও তোমার কথা ভাবছিলাম।”
—“তাহলে এত রাতে ফোন কেন?”
জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“তোমার পরিবারের ব্যাপারে একটা কথা জানতে চাই।”
ইরা একটু অবাক হলো।
—“কী কথা?”
—“তোমার বাবা কি আগে কোনো ব্যবসা করতেন?”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—“হ্যাঁ। কিন্তু অনেক বছর আগে।”
—“কী ব্যবসা?”
—“বাবা একজন ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে কাজ করতেন। পরে তাদের মধ্যে সমস্যা হয়। এরপর বাবা ব্যবসা ছেড়ে দেন।”
জিহান মন দিয়ে শুনছিল।
—“অংশীদারের নাম কী ছিল?”
ইরা বলল,
—“মাহবুব হাসান।”
জিহানের বুক ধক করে উঠল।
সে নামটা খুব পরিচিত।
তার নিজের বাবা রাশেদ সাহেবের পুরোনো ব্যবসায়িক অংশীদারের নামও ছিল মাহবুব হাসান।
কিন্তু এটা কি শুধু কাকতালীয়?
জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
ইরা জিজ্ঞেস করল,
—“কী হলো?”
—“কিছু না।”
—“তুমি হঠাৎ এসব জানতে চাইছ কেন?”
জিহান সত্যিটা তখনই বলতে পারল না।
—“বাবা তোমাদের পরিবার নিয়ে কিছু বলেছে।”
ইরা চিন্তিত হয়ে বলল,
—“কী বলেছে?”
—“এখনো পুরোপুরি জানি না।”
—“তাহলে?”
—“আগে আমি নিশ্চিত হতে চাই।”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“জিহান, আমাদের সম্পর্কের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে আমাকে আগে বলবে।”
—“অবশ্যই।”
—“কিছু লুকাবে না?”
জিহান ধীরে বলল,
—“না।”
কিন্তু সে জানত, এই মুহূর্তে সে পুরো সত্যিটা ইরাকে বলছে না।
পরদিন সকালে জিহান সরাসরি বাবার অফিসে গেল।
রাশেদ সাহেব তখন কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলছিলেন।
জিহান অপেক্ষা করল।
সবাই চলে গেলে সে বলল,
—“বাবা, মাহবুব হাসান কে?”
রাশেদ সাহেবের মুখ সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“এই নামটা তুই কোথায় শুনেছিস?”
—“ইরার কাছ থেকে।”
রাশেদ সাহেব চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন।
—“তুই ইরাকে এসব বলেছিস?”
—“না।”
—“ভালো করেছিস।”
জিহান বিরক্ত হয়ে বলল,
—“কিন্তু আমাকে সত্যিটা বলুন।”
রাশেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“অনেক বছর আগে আমি আর মাহবুব একসঙ্গে ব্যবসা করতাম। আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম।”
—“তারপর?”
—“একটা বড় আর্থিক সমস্যা হয়। কোম্পানির অনেক টাকা হঠাৎ গায়েব হয়ে যায়।”
জিহান অবাক হয়ে বলল,
—“কে নিয়েছিল?”
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“সব প্রমাণ মাহবুবের দিকে ছিল।”
—“তাহলে?”
—“সে বলেছিল, সে কিছু করেনি।”
জিহান চুপ করে শুনছিল।
—“কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যবসা ভেঙে যায়। আমি অনেক টাকা হারাই। মাহবুবও সব হারিয়ে অন্য শহরে চলে যায়।”
—“আপনি কি নিশ্চিত ছিলেন যে সে টাকা নিয়েছিল?”
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—“তখন আমি নিশ্চিত ছিলাম।”
—“আর এখন?”
বাবা উত্তর দিলেন না।
জিহান বুঝতে পারল, এই গল্পে এমন কিছু আছে যা সে এখনো জানে না।
সেদিন বিকেলে জিহান ইরার সঙ্গে দেখা করল।
ইরা তার মুখ দেখেই বুঝল কিছু একটা হয়েছে।
—“তুমি চুপ করে আছ কেন?”
জিহান বলল,
—“তোমার বাবা আর আমার বাবার মধ্যে আগে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল।”
ইরা অবাক হয়ে গেল।
—“কি?”
—“হ্যাঁ।”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—“আমি জানতাম না।”
—“আমিও জানতাম না।”
—“তাহলে বাবা কেন আমাকে কখনো বলেনি?”
—“হয়তো পুরোনো বিষয়।”
ইরা চিন্তিত হয়ে বলল,
—“কিন্তু সমস্যা কী?”
জিহান বলল,
—“তাদের ব্যবসা ভেঙে গিয়েছিল। অনেক টাকা নিয়ে সমস্যা হয়েছিল।”
ইরা মাথা নিচু করল।
—“আমার বাবা কখনো এমন কিছু বলেনি।”
জিহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তোমার বাবা কি সত্যিই কোনো টাকা নিয়েছিলেন?”
ইরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“না। আমি বিশ্বাস করি না।”
জিহান বলল,
—“আমিও এখনো বিশ্বাস করি না।”
ইরা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—“তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?”
জিহান এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
—“তোমাকে আমি বিশ্বাস করি।”
ইরার চোখে স্বস্তি ফুটে উঠল।
কিন্তু সমস্যাটা এখানেই শেষ হলো না।
সেদিন রাতে ইরা তার বাবার সঙ্গে কথা বলল।
—“বাবা, আপনার সঙ্গে রাশেদ সাহেবের আগে ব্যবসা ছিল?”
মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“কে বলেছে?”
—“জিহানের বাবা।”
মাহবুব সাহেবের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—“তুই জিহানের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলেছিস?”
—“হ্যাঁ।”
—“ইরা, ওই পরিবারের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয়।”
ইরা অবাক হয়ে বলল,
—“কেন?”
—“কারণ তারা আমাদের সঙ্গে অন্যায় করেছে।”
—“কী অন্যায়?”
মাহবুব সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“অনেক বছর আগে তারা আমাকে এমন একটা অপরাধের দায় দিয়েছিল, যা আমি করিনি।”
ইরা স্তব্ধ হয়ে গেল।
—“আপনি টাকা নেননি?”
—“না।”
—“তাহলে?”
—“আমার কথা কেউ বিশ্বাস করেনি।”
ইরা ধীরে বলল,
—“তাহলে আপনি জিহানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক মেনে নেবেন না?”
মাহবুব সাহেব কঠিন গলায় বললেন,
—“না।”
ইরার চোখে পানি চলে এল।
—“কিন্তু জিহান তো কোনো দোষ করেনি।”
—“দোষ না করলেও সে সেই পরিবারের ছেলে।”
ইরা কিছু বলল না।
মাহবুব সাহেব বললেন,
—“আমি চাই না তুই ওই ছেলেটার সঙ্গে আর দেখা করিস।”
ইরা চোখ মুছে বলল,
—“আমি পারব না।”
বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।
ইরা এবার প্রথমবার নিজের কথা স্পষ্ট করে বলল,
—“আমি জিহানকে পছন্দ করি। আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। কিন্তু শুধু পুরোনো একটা ঘটনার জন্য তাকে ছেড়ে দিতে পারব না।”
মাহবুব সাহেব কঠিন মুখে বললেন,
—“তাহলে তুই আমাকে বেছে নেবি, নাকি তাকে?”
প্রশ্নটা শুনে ইরা ভেঙে পড়ল।
অন্যদিকে জিহানও বাবার সঙ্গে আবার কথা বলল।
—“বাবা, আমি ইরাকে ছেড়ে দেব না।”
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“তুই সব জানিস না।”
—“তাহলে আমাকে সব বলুন।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা পুরোনো ফাইল বের করলেন।
—“এই ফাইলটা অনেক বছর ধরে আমি রেখে দিয়েছি।”
জিহান ফাইল খুলল।
পুরোনো কাগজপত্র, হিসাবের কাগজ, কিছু চিঠি।
একটা কাগজের নিচে মাহবুব হাসানের স্বাক্ষর।
কিন্তু জিহানের চোখ আটকে গেল অন্য একটি জায়গায়।
একটি হিসাবের পাতায় দেখা যাচ্ছে, যে টাকা নিয়ে এত বছর ধরে সন্দেহ ছিল, সেই টাকা মাহবুবের অ্যাকাউন্টে যায়নি।
বরং অন্য একটি অ্যাকাউন্টে গেছে।
জিহান অবাক হয়ে বলল,
—“বাবা, এটা তো মাহবুব চাচার অ্যাকাউন্ট না।”
রাশেদ সাহেব চুপ করে রইলেন।
—“তাহলে টাকা কে নিয়েছিল?”
বাবা ধীরে বললেন,
—“সেটাই আমি আজও জানি না।”
জিহান বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
—“তাহলে এত বছর ধরে আপনি মাহবুব চাচাকে দোষী ভাবলেন কেন?”
রাশেদ সাহেবের চোখে অনুশোচনা ফুটে উঠল।
—“কারণ তখন সব প্রমাণ তার বিরুদ্ধে মনে হয়েছিল।”
জিহান ফাইলটা বন্ধ করল।
এবার সে বুঝতে পারল—
ইরা আর তার সম্পর্কের সামনে যে বাধা দাঁড়িয়েছে, সেটা শুধু পরিবারের অহংকার নয়।
এর পেছনে আছে বহু বছরের পুরোনো এক রহস্য।
আর সেই রহস্যের সত্যিটা বের না করলে তাদের সম্পর্ক কখনোই শান্তি পাবে না।
সেই রাতে জিহান ইরাকে ফোন করল।
—“ইরা।”
—“হুম?”
—“আমাদের একটা কাজ করতে হবে।”
—“কী?”
—“আমাদের বাবাদের পুরোনো ঘটনার সত্যিটা খুঁজে বের করতে হবে।”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আমি তোমার সঙ্গে আছি।”
জিহান বলল,
—“যাই হোক না কেন, আমরা সত্যিটা বের করব।”
ইরা ধীরে বলল,
—“আর যদি সত্যিটা আমাদের সম্পর্কের বিরুদ্ধে যায়?”
জিহান উত্তর দিল,
—“তাহলে সত্যিটা মেনে নেব। কিন্তু সত্যি জানার আগেই আমরা একে অপরকে হারাব না।”
ইরা চোখ বন্ধ করে বলল,
—“ঠিক আছে।”
পরদিন সকাল থেকেই জিহানের মাথায় একটাই চিন্তা ছিল—পুরোনো সেই ব্যবসায়িক ঘটনার সত্যিটা কী?
সে জানত, ইরার বাবাকে এত বছর ধরে দোষী মনে করা হয়েছে। কিন্তু বাবার পুরোনো ফাইল দেখে তার নিজেরও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
যে টাকা নিয়ে এত বড় সমস্যা হয়েছিল, সেটা যদি সত্যিই মাহবুব সাহেব না নিয়ে থাকেন, তাহলে টাকা গেল কোথায়?
আর কে সেই টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত জিহান শান্তি পাবে না।
সকালে সে বাবার অফিসে গিয়ে আবার পুরোনো ফাইলগুলো দেখতে শুরু করল।
রাশেদ সাহেব প্রথমে বাধা দিতে চাইলেন।
—“জিহান, এসব পুরোনো বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে লাভ নেই।”
জিহান বলল,
—“লাভ না থাকলেও সত্যিটা জানা দরকার।”
বাবা কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
—“ঠিক আছে। তবে সাবধানে করিস।”
জিহান একে একে সব কাগজ দেখতে লাগল।
হিসাবের খাতা, ব্যাংকের কাগজ, পুরোনো চিঠি—সবকিছু।
একটা জায়গায় এসে তার চোখ আটকে গেল।
টাকার যে লেনদেন নিয়ে সমস্যা হয়েছিল, সেটার তারিখ ছিল শুক্রবার।
কিন্তু সেই দিনের অফিসের হিসাবের খাতায় মাহবুব সাহেবের কোনো সই নেই।
জিহান অবাক হলো।
—“বাবা, ওই দিন চাচা অফিসে ছিলেন?”
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“আমার যতদূর মনে আছে, না। সে দিন মাহবুব বাইরে ছিল।”
জিহান বলল,
—“তাহলে তার স্বাক্ষর ছাড়া এই লেনদেন কীভাবে হলো?”
রাশেদ সাহেব চুপ করে গেলেন।
এবার তিনিও বিষয়টা নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন।
জিহান পুরোনো হিসাবরক্ষক করিম চাচার সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল।
করিম চাচা এখন অবসর নিয়ে গ্রামের বাড়িতে থাকেন।
জিহান তাকে ফোন করে বলল,
—“চাচা, আমি পুরোনো ব্যবসার একটা ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
করিম চাচা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“কোন ব্যাপার?”
—“মাহবুব চাচার সময়কার হিসাব।”
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর করিম চাচা বললেন,
—“অনেক বছর হয়ে গেছে বাবা। এসব পুরোনো কথা তুলে কী হবে?”
—“চাচা, একটা পরিবারের জীবন এর সঙ্গে জড়িত।”
করিম চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“তুই কবে আসবি?”
জিহান সেদিনই তার কাছে চলে গেল।
করিম চাচা পুরোনো দিনের অনেক কথা বললেন।
তিনি জানালেন, রাশেদ সাহেব আর মাহবুব সাহেব তখন খুব ভালো বন্ধু ছিলেন।
দুজনের ব্যবসাও ভালো চলছিল।
কিন্তু একদিন হঠাৎ বড় অঙ্কের টাকা কম পাওয়া যায়।
সবাই প্রথমে ভেবেছিল মাহবুব সাহেব টাকা নিয়েছেন।
কারণ হিসাবের কিছু কাগজে তার নাম ছিল।
কিন্তু করিম চাচা একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন।
—“আমি তখন সন্দেহ করেছিলাম, হিসাবের কাগজ কেউ বদলেছে।”
জিহান অবাক হয়ে বলল,
—“কেন?”
—“কারণ কিছু হিসাবের পাতার কালি আর লেখার ধরন আলাদা ছিল।”
—“আপনি বাবাকে বলেছিলেন?”
—“বলেছিলাম।”
—“তারপর?”
করিম চাচা মাথা নিচু করে বললেন,
—“তখন কেউ আমার কথা গুরুত্ব দেয়নি।”
জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর জিজ্ঞেস করল,
—“আপনার কাছে কি সেই পুরোনো হিসাবের কপি আছে?”
করিম চাচা বললেন,
—“হয়তো আছে।”
অনেক খোঁজার পর তিনি একটা পুরোনো ফাইল বের করলেন।
জিহান ফাইল খুলে দেখল, কিছু হিসাবের কপি সেখানে আছে।
একটা পাতায় একটা নাম লেখা।
নাসির।
জিহান নামটা দেখে থমকে গেল।
—“নাসির কে?”
করিম চাচা বললেন,
—“তখন অফিসের হিসাবের দায়িত্বে ছিল।”
—“এখন কোথায়?”
—“জানি না।”
জিহানের মাথায় নতুন প্রশ্ন তৈরি হলো।
অন্যদিকে ইরা বাড়িতে বাবার সঙ্গে কথা বলছিল।
—“বাবা, আপনি কি সত্যিই ওই টাকা নেননি?”
মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“না।”
—“তাহলে আপনি এত বছর চুপ ছিলেন কেন?”
মাহবুব সাহেব জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
—“কারণ তখন আমার কাছে প্রমাণ ছিল না।”
—“আপনি কি কখনো সত্যিটা খুঁজে দেখেননি?”
—“চেষ্টা করেছিলাম।”
—“তারপর?”
—“যাদের বিশ্বাস করতাম, তারা কেউ আমার পাশে দাঁড়ায়নি।”
ইরার চোখ ভিজে গেল।
—“আপনি কি রাশেদ সাহেবকে কখনো ক্ষমা করেছেন?”
মাহবুব সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“মানুষকে ক্ষমা করা সহজ। কিন্তু ভাঙা বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা কঠিন।”
ইরা বাবার হাত ধরে বলল,
—“জিহান তার বাবার মতো না।”
মাহবুব সাহেব বললেন,
—“আমি জানি। কিন্তু তবু ভয় হয়।”
—“কিসের?”
—“যদি আবার একই ঘটনা ঘটে?”
ইরা কিছু বলল না।
সে বুঝতে পারছিল, তার বাবা জিহানকে ঘৃণা করেন না।
তিনি শুধু অতীতের আঘাতকে ভুলতে পারেননি।
সন্ধ্যায় জিহান ইরার সঙ্গে দেখা করল।
তার হাতে সেই পুরোনো ফাইল।
ইরা অবাক হয়ে বলল,
—“এগুলো কী?”
—“আমাদের বাবাদের পুরোনো ব্যবসার কাগজ।”
ইরা ফাইল খুলে দেখল।
জিহান বলল,
—“আমি করিম চাচার সঙ্গে দেখা করেছি।”
—“কী বললেন?”
—“তিনি বললেন, হিসাবের কিছু কাগজ বদলানো হয়েছিল।”
ইরা অবাক হয়ে গেল।
—“তাহলে?”
—“আমরা হয়তো সত্যিটা খুঁজে পেতে পারি।”
ইরা একটু আশাবাদী হলো।
—“নাসির কে?”
জিহান বলল,
—“তখন অফিসের হিসাবের দায়িত্বে ছিল। তার নাম অনেক কাগজে আছে।”
—“এখন কোথায়?”
—“জানি না।”
ইরা বলল,
—“তাহলে তাকে খুঁজতে হবে।”
জিহান মৃদু হেসে বলল,
—“আমি জানতাম তুমি এটাই বলবে।”
ইরা বলল,
—“আমাদের জন্য তো করতে হবে।”
জিহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুমি জানো, তুমি পাশে থাকলে সবকিছু সহজ লাগে?”
ইরা মৃদু হেসে বলল,
—“আর তুমি জানো, তুমি সবকিছু কঠিন করে ফেলো?”
জিহান হেসে উঠল।
অনেকদিন পর তাদের মধ্যে আবার স্বাভাবিক হাসি ফিরল।
কিন্তু তাদের এই অনুসন্ধান খুব সহজ ছিল না।
নাসিরের পুরোনো ঠিকানা খুঁজে বের করতে কয়েকদিন লেগে গেল।
অবশেষে তারা জানতে পারল, নাসির এখন শহরের বাইরে একটি ছোট ব্যবসা করেন।
জিহান একদিন একাই সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
কিন্তু ইরা বলল,
—“আমি তোমার সঙ্গে যাব।”
—“তুমি গেলে তোমার বাবা জানতে পারেন।”
—“জানলেও আমি সত্যিটা জানতে চাই।”
জিহান আর বাধা দিল না।
দুজন একসঙ্গে নাসিরের দোকানে পৌঁছাল।
নাসির তাদের দেখে প্রথমে চমকে গেল।
—“আপনারা কারা?”
জিহান বলল,
—“আমি জিহান। রাশেদ সাহেবের ছেলে।”
নাসিরের মুখের ভাব বদলে গেল।
ইরা বলল,
—“আর আমি মাহবুব সাহেবের মেয়ে।”
নাসির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“আপনারা এখানে কেন?”
জিহান বলল,
—“অনেক বছর আগের একটা হিসাবের ব্যাপারে জানতে এসেছি।”
নাসির বলল,
—“আমি কিছু জানি না।”
—“আপনি তখন হিসাবের দায়িত্বে ছিলেন।”
—“অনেক বছর হয়ে গেছে।”
—“তবু আপনি জানেন।”
নাসির বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আমি কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না।”
জিহান বলল,
—“আমরা কাউকে দোষ দিতে আসিনি। শুধু সত্যিটা জানতে চাই।”
নাসির কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর ধীরে বলল,
—“সত্যিটা জানতে চাইলে একটা কথা মনে রাখবেন—সবকিছু আপনারা যেভাবে শুনেছেন, সেভাবে ঘটেনি।”
জিহান আর ইরা একে অপরের দিকে তাকাল।
—“তাহলে কী ঘটেছিল?”
নাসির চারপাশে তাকিয়ে দরজা বন্ধ করল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
—“মাহবুব সাহেব টাকা নেননি।”
ইরার চোখে পানি চলে এল।
জিহান জিজ্ঞেস করল,
—“তাহলে কে নিয়েছিল?”
নাসির উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে কারও পায়ের শব্দ হলো।
নাসির হঠাৎ চুপ করে গেল।
তার মুখে ভয় ফুটে উঠল।
জিহান বলল,
—“কী হয়েছে?”
নাসির ফিসফিস করে বলল,
—“আপনারা এখনই চলে যান।”
—“কেন?”
—“কারণ মনে হচ্ছে কেউ আমাদের কথা শুনছে।”
ইরা দরজার দিকে তাকাল।
বাইরে সত্যিই কারও ছায়া দেখা যাচ্ছিল।
জিহান দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু করিডোর তখন খালি।
শুধু মেঝেতে পড়ে ছিল একটা পুরোনো খাম।
জিহান খামটা তুলে নিল।
খামের ওপর লেখা ছিল—
“রাশেদ সাহেবের জন্য।”
জিহান অবাক হয়ে ইরার দিকে তাকাল।
নাসির দরজার ভেতর থেকে ফ্যাকাশে মুখে বলল,
—“ওটা খুলবেন না।”
জিহান খামটা শক্ত করে ধরে বলল,
—“কেন?”
নাসির ধীরে বলল,
—“কারণ ওই খামের ভেতরেই আছে সেই সত্যি, যার জন্য দুই পরিবার এত বছর ধরে একে অপরকে ভুল বুঝে এসেছে।”
জিহান খামটার দিকে তাকিয়ে রইল।
নাসিরের দোকান থেকে বেরিয়ে আসার পরও জিহানের হাতে সেই খামটা শক্ত করে ধরা ছিল।
খামের ওপর লেখা ছিল—
“রাশেদ সাহেবের জন্য।”
ইরা বারবার খামটার দিকে তাকাচ্ছিল।
—“এটা কি এখন খুলবে?”
জিহান মাথা নাড়ল।
—“নাসির চাচা বলেছে খুলতে না।”
—“কিন্তু যদি এর ভেতরেই সব সত্যি থাকে?”
জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—“তাহলে আমাদের জানতে হবে।”
ইরা বলল,
—“তুমি কি ভয় পাচ্ছ?”
জিহান মৃদু হেসে বলল,
—“সত্যিটাকে না। সত্যিটা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, সেটা নিয়ে একটু ভয় হচ্ছে।”
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে হাঁটল।
অবশেষে জিহান বলল,
—“খামটা আমি বাবার সামনে খুলব।”
ইরা মাথা নাড়ল।
—“আমিও থাকব।”
সন্ধ্যায় তারা জিহানের বাড়িতে গেল।
রাশেদ সাহেব অফিস থেকে ফিরেছেন মাত্র।
জিহান তার সামনে খামটা রাখতেই তিনি অবাক হয়ে গেলেন।
—“এটা কোথায় পেলি?”
—“নাসিরের কাছ থেকে।”
বাবার মুখের রং বদলে গেল।
—“নাসির?”
—“হ্যাঁ।”
রাশেদ সাহেব খামটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
—“তুই এটা খুলেছিস?”
—“না।”
—“কেন?”
—“আপনার সামনে খুলতে চেয়েছি।”
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“ঠিক আছে।”
জিহান খামটা খুলল।
ভেতরে ছিল কয়েকটি পুরোনো কাগজ এবং একটি চিঠি।
চিঠিটা পড়তে শুরু করল জিহান।
চিঠিতে লেখা ছিল, ব্যবসার হিসাবের টাকা যে দিন সরানো হয়েছিল, সেদিন মাহবুব সাহেব অফিসে ছিলেন না।
আরও লেখা ছিল—
অফিসের একজন কর্মচারী ভুয়া কাগজ তৈরি করে টাকা অন্য একটি অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছিল।
জিহান থেমে গেল।
—“বাবা, এখানে অ্যাকাউন্ট নম্বর আছে।”
রাশেদ সাহেব কাগজটা হাতে নিলেন।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—“এই অ্যাকাউন্ট…”
জিহান জিজ্ঞেস করল,
—“কার?”
রাশেদ সাহেব উত্তর দিতে পারছিলেন না।
ইরা এগিয়ে এসে বলল,
—“কী হয়েছে?”
রাশেদ সাহেব ধীরে বললেন,
—“এই অ্যাকাউন্টটা আমাদের কোম্পানির একজন পুরোনো কর্মচারীর।”
জিহান বলল,
—“নাসির?”
রাশেদ সাহেব মাথা নাড়লেন।
—“না।”
তারপর তিনি কাগজের নিচের নামটা দেখালেন।
সেলিম।
জিহান অবাক হয়ে বলল,
—“সেলিম কে?”
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“আমাদের তখনকার ম্যানেজার।”
ইরা চুপ করে রইল।
রাশেদ সাহেব চিঠিটা পড়ে বুঝলেন, এত বছর ধরে তিনি ভুল মানুষকে দোষ দিয়েছেন।
তার চোখে অনুশোচনা ফুটে উঠল।
—“আমি মাহবুবের সঙ্গে অন্যায় করেছি।”
জিহান বলল,
—“কিন্তু আপনি তখন জানতেন না।”
—“জানতাম না, কিন্তু যাচাইও করিনি।”
কথাটা বলতে বলতে রাশেদ সাহেবের গলা ভারী হয়ে গেল।
—“আমি যদি তখন একটু বিশ্বাস করতাম, তাহলে এত বছর আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হতো না।”
ইরা কিছু বলল না।
তার চোখেও পানি এসে গেছে।
পরদিন সকালে জিহান আর ইরা সেলিমকে খুঁজতে শুরু করল।
পুরোনো অফিসের কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পারল, সেলিম অনেক বছর আগেই দেশ ছেড়ে চলে গেছে।
কিন্তু তার ছোট ভাই এখনো শহরে থাকে।
তার কাছ থেকে তারা জানতে পারল, সেলিম কয়েক বছর আগে একটি চিঠি রেখে গিয়েছিল।
চিঠিটা তার পরিবারের কাছে ছিল।
অনেক অনুরোধের পর তারা সেই চিঠিটা পেল।
চিঠিতে সেলিম স্বীকার করেছিল যে সে কোম্পানির টাকা সরিয়েছিল।
কিন্তু সে একা ছিল না।
তার সঙ্গে আরও একজন ছিল।
জিহান চিঠিটা পড়ে থমকে গেল।
—“আরও একজন?”
ইরা বলল,
—“কে?”
চিঠির শেষ অংশে একটা নাম ছিল।
রাশেদের ছোট ভাই কামাল।
জিহান স্তব্ধ হয়ে গেল।
—“চাচা?”
রাশেদ সাহেবের ছোট ভাই কামাল সাহেব।
তিনি এখনো পরিবারের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখেন।
জিহানের মাথা ঘুরে গেল।
এত বছর ধরে যে মানুষটাকে সে নিজের চাচা হিসেবে সম্মান করেছে, তার নামই এবার এই ঘটনায় উঠে এসেছে।
সেদিন বিকেলে জিহান বাবার সঙ্গে কথা বলল।
—“বাবা, কামাল চাচা কি তখন কোম্পানিতে ছিলেন?”
রাশেদ সাহেব চুপ করে গেলেন।
—“হ্যাঁ।”
—“তার কি হিসাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল?”
—“ছিল।”
—“তাহলে?”
রাশেদ সাহেব বুঝতে পারলেন, বিষয়টা এখন আর লুকানোর সুযোগ নেই।
তিনি বললেন,
—“কামাল তখন আমার সঙ্গে ব্যবসা নিয়ে কিছুটা অসন্তুষ্ট ছিল।”
জিহান বলল,
—“আপনি কি জানতেন?”
—“না।”
—“তাহলে এত বছর ধরে মাহবুব চাচাকে দোষ দেওয়া হলো কেন?”
রাশেদ সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।
—“সম্ভবত কামাল আর সেলিম এমনভাবে সব প্রমাণ সাজিয়েছিল, যাতে সন্দেহটা মাহবুবের ওপর যায়।”
জিহান চুপ করে গেল।
ইরা তার বাবাকে সব জানাল।
মাহবুব সাহেব প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
—“তুই নিশ্চিত?”
ইরা বলল,
—“হ্যাঁ। প্রমাণ আছে।”
মাহবুব সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তার চোখে কষ্ট আর স্বস্তি—দুটোই ছিল।
—“তাহলে এত বছর আমি যে অপমান সহ্য করেছি…”
তিনি বাকিটা বলতে পারলেন না।
ইরা বাবার হাত ধরল।
—“বাবা, সত্যিটা বের হয়েছে।”
মাহবুব সাহেব ধীরে বললেন,
—“রাশেদ কি জানে?”
—“জানে।”
—“সে কি আমাকে ক্ষমা চাইতে আসবে?”
ইরা কিছু বলল না।
কয়েকদিন পর রাশেদ সাহেব নিজেই মাহবুব সাহেবের বাড়িতে গেলেন।
দরজা খুলে মাহবুব সাহেব তাকে দেখে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইলেন।
দুজনের চোখে বহু বছরের পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠল।
রাশেদ সাহেব ধীরে বললেন,
—“মাহবুব, আমি ভুল করেছি।”
মাহবুব সাহেব কিছু বললেন না।
—“আমি তোমাকে বিশ্বাস করিনি।”
মাহবুব সাহেবের চোখ ভিজে উঠল।
—“আমি অনেকবার বলেছিলাম, আমি টাকা নিইনি।”
—“জানি।”
—“তবু তুমি বিশ্বাস করোনি।”
রাশেদ সাহেব মাথা নিচু করলেন।
—“আমাকে ক্ষমা কর।”
দুজনের মধ্যে অনেকক্ষণ নীরবতা।
অবশেষে মাহবুব সাহেব বললেন,
—“আমি তোমাকে অনেক বছর ধরে ক্ষমা করে দিয়েছি। কিন্তু সেই দিনের কষ্টটা ভুলতে পারিনি।”
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“আমি জানি।”
তারপর দুজন হাত মিলিয়ে নিলেন।
একটা পুরোনো সম্পর্কের ভাঙা অংশ যেন আবার জোড়া লাগল।
কিন্তু সব সমস্যা এখনো শেষ হয়নি।
কারণ কামাল তখনও বিষয়টা জানত না যে সত্যিটা প্রকাশ হয়ে গেছে।
সেই রাতে জিহান বাড়িতে ফিরে দেখল, কামাল চাচা বসে আছেন।
তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিলেন।
—“কী খবর জিহান?”
জিহান শান্তভাবে বলল,
—“ভালো।”
কামাল সাহেব হাসলেন।
—“তোমার বিয়ের কথা শুনছি।”
জিহান বলল,
—“হ্যাঁ। তবে এখনো কিছু ঠিক হয়নি।”
কামাল বললেন,
—“ওই মেয়েটার সঙ্গে বিয়ে করতে চাচ্ছ?”
জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—“হ্যাঁ।”
কামাল সাহেবের মুখে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল।
—“ভেবে করো। পুরোনো শত্রুতার গল্প আবার যেন নতুন করে শুরু না হয়।”
জিহান তার কথার ভেতরের অর্থ বুঝতে পারল।
সে শান্ত গলায় বলল,
—“পুরোনো সত্যি এখন সবাই জানে, চাচা।”
কামাল সাহেবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—“কী বলতে চাস?”
—“সেলিমের চিঠি আমরা পেয়েছি।”
কামাল সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর উঠে দাঁড়ালেন।
—“আমার এখন কাজ আছে।”
তিনি দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।
জিহান তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার সন্দেহ আর রইল না।
রাতে জিহান ইরাকে ফোন করল।
—“সব শেষ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।”
ইরা বলল,
—“হ্যাঁ। আমাদের বাবারা আবার কথা বলেছে।”
জিহান হাসল।
—“তাহলে এবার আমাদের?”
ইরা মৃদু হেসে বলল,
—“আমাদের কী?”
—“আমাদের সম্পর্ক নিয়ে এবার কোনো বাধা থাকবে না?”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আমি চাই না আর কোনো বাধা থাকুক।”
জিহান বলল,
—“তাহলে একটা কথা বলি?”
—“বলো।”
—“আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”
ইরার মুখে লাজুক হাসি ফুটল।
সে ধীরে বলল,
—“আমিও।”
জিহান ভেবেছিল, পুরোনো রহস্যের সত্যিটা বের হয়ে যাওয়ার পর সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।
কিন্তু বাস্তবতা এতটা সহজ ছিল না।
কামাল চাচা হঠাৎ বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফোনও ধরছেন না। রাশেদ সাহেব কয়েকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কোনো উত্তর পাননি।
জিহানের মনে সন্দেহ তৈরি হলো।
সে বাবাকে বলল,
—“চাচা কোথায়?”
রাশেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—“জানি না।”
—“আপনি কি মনে করেন উনি সত্যিই ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন?”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“আমি কাউকে প্রমাণ ছাড়া দোষ দিতে চাই না।”
জিহান মাথা নাড়ল।
—“ঠিক বলেছেন।”
কিন্তু তার মনে অস্বস্তি থেকেই গেল।
অন্যদিকে ইরার পরিবারে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে।
মাহবুব সাহেব আর আগের মতো জিহানের বিরোধিতা করছেন না।
এক সন্ধ্যায় তিনি ইরাকে ডাকলেন।
—“ইরা।”
—“জি, বাবা?”
—“জিহানকে কি তুই সত্যিই বিশ্বাস করিস?”
ইরা এক মুহূর্ত দেরি না করে বলল,
—“হ্যাঁ।”
মাহবুব সাহেব মৃদু হাসলেন।
—“তাহলে আমার আর আপত্তি নেই।”
ইরা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ। আমি বুঝেছি, অতীতের ভুলের জন্য তোমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা ঠিক হবে না।”
ইরার চোখে পানি এসে গেল।
সে বাবাকে জড়িয়ে ধরতে এগিয়ে গেল।
মাহবুব সাহেব বললেন,
—“তবে একটা কথা।”
—“কী?”
—“জীবন শুধু ভালো লাগা দিয়ে চলে না। দুজনকে একে অপরকে সম্মান করতে হয়, বিশ্বাস করতে হয়।”
ইরা মাথা নাড়ল।
—“আমি জানি।”
—“জিহানকে বলিস, সে যেন তোকে সবসময় সম্মান করে।”
ইরা হেসে বলল,
—“ও আমাকে খুব সম্মান করে।”
মাহবুব সাহেব মজা করে বললেন,
—“এত ভালো করে জানিস কীভাবে?”
ইরা লজ্জা পেয়ে বলল,
—“জানি।”
বাবা মেয়ের মুখের হাসি দেখে বুঝলেন, ইরা সত্যিই সুখী।
সেই রাতেই ইরা জিহানকে ফোন করল।
—“জিহান?”
—“হুম?”
—“বাবা রাজি।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর জিহান আনন্দে বলল,
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
—“আমি এখনই তোমাদের বাসায় আসব?”
ইরা হেসে বলল,
—“এখন না। রাত অনেক।”
—“ঠিক আছে। কাল সকালে যাব।”
—“এত তাড়া কেন?”
—“এতদিন অপেক্ষা করেছি। আর কত?”
ইরা হাসতে হাসতে বলল,
—“তুমি একদম বদলাওনি।”
—“তোমার জন্যই তো বদলেছি।”
কথাটা শুনে ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“জিহান?”
—“হুম?”
—“আমি খুব খুশি।”
—“আমিও।”
পরদিন দুই পরিবার বসে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলল।
সবকিছু বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছিল।
তারিখ ঠিক করার কথা হচ্ছে, সবাই ব্যস্ত।
ঠিক তখন রাশেদ সাহেবের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
তিনি কল ধরতেই ওপাশ থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠ বলল,
—“সেলিমের চিঠিটা আপনার কাছে আছে?”
রাশেদ সাহেব চমকে উঠলেন।
—“কে বলছেন?”
—“যে সত্যিটা আপনি এত বছর ধরে খুঁজে পাননি, সেটা পুরোপুরি এখনো জানেন না।”
—“আপনি কে?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল না।
শুধু বলা হলো,
—“কামালকে আপনি যতটা জানেন, সে ততটা সহজ মানুষ নয়।”
তারপর ফোন কেটে গেল।
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকলেন।
জিহান পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
—“বাবা, কী হয়েছে?”
রাশেদ সাহেব সব বললেন।
জিহানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—“চাচার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করতে হবে।”
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা জানতে পারল, কামাল শহরের বাইরে নিজের পুরোনো বাড়িতে আছেন।
জিহান বাবাকে নিয়ে সেখানে গেল।
বাড়িতে ঢুকতেই দেখল, কামাল একা বসে আছেন।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“কামাল, আমাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
কামাল কোনো উত্তর দিলেন না।
জিহান সামনে এগিয়ে বলল,
—“চাচা, সেলিমের চিঠিতে আপনার নাম কেন?”
কামাল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“কারণ আমি ভুল করেছিলাম।”
রাশেদ সাহেব স্তব্ধ।
—“কী বলছিস?”
কামাল ধীরে ধীরে সব বলতে শুরু করলেন।
তখন ব্যবসায় প্রচুর টাকা আসছিল। তিনি নিজের অংশ নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, রাশেদ তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
সেলিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল।
একসময় তারা মিলে কোম্পানির টাকা সরানোর পরিকল্পনা করে।
কিন্তু পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
কামাল বললেন,
—“আমি ভেবেছিলাম কিছুদিন পর টাকা ফেরত দিয়ে দেব। কিন্তু পারিনি।”
রাশেদ সাহেব কষ্টভরা গলায় বললেন,
—“আর মাহবুব?”
কামাল মাথা নিচু করলেন।
—“সন্দেহটা তার ওপর পড়বে, সেটা আমি জানতাম।”
—“তুই জানতিস?”
—“হ্যাঁ।”
জিহান রাগে চুপ করে রইল।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“তুই আমার ভাই হয়ে আমার সঙ্গে এমন করলি?”
কামাল চোখ নামিয়ে বললেন,
—“আমি ভুল করেছি।”
—“শুধু ভুল?”
কামালের চোখে অনুশোচনা ফুটে উঠল।
—“আমি জানি, আমার জন্য দুই বন্ধুর সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। একটা পরিবার অপমান সহ্য করেছে। আর এত বছর তোমরা একে অপরকে ভুল বুঝেছ।”
জিহান বলল,
—“তাহলে এতদিন সত্যিটা বলোনি কেন?”
কামাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“ভয় পেয়েছিলাম।”
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“কিসের ভয়?”
—“সব হারানোর।”
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
জিহান বুঝতে পারছিল, সত্যিটা শুনে তার চাচার প্রতি রাগ হচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে এত বছরের একটা রহস্যের সমাধান হওয়ায় স্বস্তিও লাগছে।
কামাল পরে মাহবুব সাহেবের কাছেও ক্ষমা চাইলেন।
মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
—“তুমি জানো, তোমার জন্য আমার জীবন কতটা বদলে গিয়েছিল?”
কামাল মাথা নিচু করে বললেন,
—“জানি।”
—“আমি সব হারিয়েছিলাম।”
—“আমি দুঃখিত।”
মাহবুব সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“তোমাকে ক্ষমা করা সহজ নয়।”
কামাল কিছু বললেন না।
—“তবে তোমার ভুলের জন্য আর কাউকে শাস্তি দিতে চাই না।”
তিনি জিহানের দিকে তাকালেন।
—“ইরা আর জিহানের ভবিষ্যৎ যেন আর এই পুরোনো বিষয়ের কারণে নষ্ট না হয়।”
কামালের চোখ ভিজে উঠল।
কয়েকদিন পর দুই পরিবার আবার একসঙ্গে বসল।
এবার কোনো গোপন কথা নেই।
কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই।
কোনো পুরোনো অভিযোগ নেই।
রাশেদ সাহেব মাহবুব সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“আমাদের বন্ধুত্বের অনেক বছর নষ্ট হয়েছে।”
মাহবুব সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
—“সব বছর তো আর ফেরত পাওয়া যাবে না।”
—“কিন্তু বাকি সময়টা তো ভালোভাবে কাটানো যায়।”
মাহবুব সাহেব হাত বাড়িয়ে দিলেন।
রাশেদ সাহেব সেই হাত ধরে নিলেন।
দুজনের চোখে তখন বহু বছরের কষ্টের পর শান্তি।
সন্ধ্যায় জিহান আর ইরা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
জিহান বলল,
—“শেষ পর্যন্ত সব ঠিক হলো।”
ইরা বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“তুমি কি কখনো ভেবেছিলে আমাদের এত ঝামেলা হবে?”
ইরা হেসে বলল,
—“না।”
—“আমি ভেবেছিলাম শুধু তোমাকে রাজি করাতে হবে।”
ইরা মজা করে বলল,
—“আমাকে রাজি করানোই তো সবচেয়ে কঠিন ছিল।”
জিহান হেসে বলল,
—“সত্যি।”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“জিহান?”
—“হুম?”
—“আমাদের প্রথম দেখা মনে আছে?”
—“কীভাবে ভুলব?”
—“তুমি আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়েছিলে।”
—“আমি তো বলেছি, ইচ্ছা করে করিনি।”
—“তারপরও তুমি আমাকে রাগী বলেছিলে।”
—“তুমি সত্যিই রাগী ছিলে।”
ইরা হেসে ফেলল।
জিহান বলল,
—“কিন্তু সেই রাগী মেয়েটাকেই আমি আজ আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মনে করি।”
ইরা কিছু বলল না।
জিহান আর ইরার বিয়ের দিন ঠিক হওয়ার পর থেকেই দুই পরিবারে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল।
অনেকদিন পর দুই পরিবারকে এত কাছাকাছি দেখা যাচ্ছিল।
রাশেদ সাহেব নিজে মাহবুব সাহেবের সঙ্গে বসে বিয়ের সব আয়োজন নিয়ে কথা বলছিলেন। দুজনের মধ্যে এখন আর আগের কোনো দূরত্ব নেই।
একদিন রাশেদ সাহেব হেসে বললেন,
—“মাহবুব, আমাদের ছেলেমেয়েরা যা করল, আমরা এত বছরেও সেটা করতে পারিনি।”
মাহবুব সাহেবও হেসে বললেন,
—“ওরা আমাদের পুরোনো ভুলটা ঠিক করে দিল।”
কথাটা শুনে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর রাশেদ সাহেব বললেন,
—“আমাদের বন্ধুত্বটা এত বছর নষ্ট না হলে ভালো হতো।”
—“হয়তো কিছু গল্পের শেষটা ভালো করার জন্য একটু দেরি লাগে।”
দুজন আবার হেসে উঠলেন।
ইরার বিয়ের কেনাকাটা শুরু হলো।
মা, খালা আর পরিবারের সবাই মিলে তাকে নিয়ে দোকানে গেল।
ইরা একের পর এক শাড়ি দেখছিল, কিন্তু কোনোটা পছন্দ হচ্ছিল না।
খালা হেসে বললেন,
—“কী হলো? এতদিন ধরে যে মেয়েটা নিজের পছন্দ নিয়ে এত কথা বলত, আজ সে চুপ কেন?”
ইরা মৃদু হেসে বলল,
—“সবকিছুই ভালো লাগছে।”
মা বললেন,
—“তাহলে এইটিই নে।”
ইরা শাড়িটা হাতে নিল।
তার মনে হলো, সত্যিই জীবনটা কত দ্রুত বদলে গেছে।
কয়েক মাস আগেও সে ভাবেনি, জিহান নামের একজন মানুষ তার জীবনের এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রথম দেখা মনে পড়তেই তার হাসি পেল।
সেই রাস্তায় বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা।
প্রথম কথাতেই যার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল।
তারপর বৃষ্টি।
একটা ছাতা।
কিছু ছোট ছোট কথা।
তারপর ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটা সম্পর্ক।
ইরা বুঝতে পারল, বড় ভালোবাসা অনেক সময় হঠাৎ আসে না।
ছোট ছোট মুহূর্ত জমতে জমতেই একদিন সেটা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে জিহানও বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত।
বন্ধুরা তাকে নিয়ে মজা করছে।
রাফি বলল,
—“দেখ, যে ছেলে বলত বিয়ে করবে না, সেই এখন বিয়ের পাঞ্জাবি বেছে বেড়াচ্ছে।”
জিহান হেসে বলল,
—“সব মানুষের জীবনে একটা সময় আসে।”
রাফি বলল,
—“না, সবার জীবনে ইরা আসে না।”
জিহান মুচকি হাসল।
—“ঠিক বলেছিস।”
তারপর একটু চুপ করে বলল,
—“জানিস, আমি আগে ভাবতাম জীবন মানে নিজের মতো করে চলা।”
—“এখন?”
—“এখন মনে হয়, জীবনে এমন একজন মানুষ থাকা দরকার, যার কথা ভেবে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে ইচ্ছে করে।”
রাফি বলল,
—“তুই সত্যিই বদলে গেছিস।”
জিহান হেসে বলল,
—“ইরার জন্য।”
বিয়ের কয়েকদিন আগে জিহান আর ইরার দেখা হলো।
দুজন একটা শান্ত জায়গায় বসেছিল।
জিহান বলল,
—“সবকিছু বিশ্বাস হচ্ছে না।”
ইরা হেসে বলল,
—“কী?”
—“কয়েক মাস আগে তোমাকে চিনতাম না। এখন তোমাকে ছাড়া ভবিষ্যৎ ভাবতে পারি না।”
ইরা মৃদু হেসে বলল,
—“আমারও একই অবস্থা।”
জিহান বলল,
—“তুমি কি কখনো আমাদের প্রথম দিনের কথা মনে করো?”
—“প্রায়ই।”
—“তখন তো আমাকে খুব অপছন্দ করতে।”
ইরা মাথা নাড়ল।
—“তখন মনে হয়েছিল তুমি খুব বিরক্তিকর।”
—“এখন?”
ইরা একটু ভেবে বলল,
—“এখনও মাঝে মাঝে বিরক্তিকর।”
জিহান হেসে ফেলল।
—“আমি জানতাম!”
ইরা হাসতে হাসতে বলল,
—“কিন্তু তোমাকে ছাড়া থাকতে চাই না।”
জিহান চুপ করে গেল।
তারপর বলল,
—“এই একটা কথাই আমার জন্য যথেষ্ট।”
বিয়ের দিন অবশেষে চলে এল।
বাড়ি আলোয় সাজানো।
আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, পরিচিত মানুষ—সবাই ব্যস্ত।
জিহান পাঞ্জাবি পরে যখন আয়নার সামনে দাঁড়াল, তখন তার নিজের কাছেই মনে হলো, সে যেন আগের সেই জিহান নেই।
যে ছেলে কোনো কিছু নিয়ে সিরিয়াস হতে চাইত না, আজ সে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।
রাফি এসে বলল,
—“কী রে, নার্ভাস?”
জিহান বলল,
—“একটু।”
—“কেন?”
—“কারণ আজ থেকে জীবনটা বদলে যাবে।”
রাফি হাসল।
—“ভালো দিকেই বদলাবে।”
জিহান মাথা নাড়ল।
—“আশা করি।”
ইরার সাজ শেষ হতে অনেক সময় লাগল।
মা তার দিকে তাকিয়ে আবেগে চোখ মুছলেন।
—“মনে হচ্ছে আমার মেয়েটা আজ বড় হয়ে গেল।”
ইরা মায়ের হাত ধরে বলল,
—“মা, আমি তো এখানেই থাকব।”
মা হেসে বললেন,
—“মেয়েরা বিয়ের পরও মায়ের মেয়ে থাকে। শুধু ঠিকানাটা বদলে যায়।”
ইরার চোখেও পানি এসে গেল।
সে নিজের ঘরে শেষবারের মতো চারপাশে তাকাল।
এই ঘরেই কত রাত সে জিহানের কথা ভেবেছে।
কতবার ফোন হাতে নিয়ে তার মেসেজের অপেক্ষা করেছে।
আজ সেই মানুষটিই তার জীবনের সঙ্গী হতে যাচ্ছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে দুই পরিবার পাশাপাশি বসেছিল।
মাহবুব সাহেব আর রাশেদ সাহেব একসঙ্গে অতিথিদের দেখাশোনা করছিলেন।
কামালও এসেছিলেন।
তিনি চুপচাপ এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
রাশেদ সাহেব নিজে গিয়ে তাকে পাশে বসালেন।
—“একা দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
কামাল অবাক হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালেন।
রাশেদ বললেন,
—“আজ পুরোনো কথা মনে রাখার দিন না।”
কামালের চোখ ভিজে উঠল।
—“তুই আমাকে এখনো ভাই বলে ডাকিস?”
রাশেদ মৃদু হেসে বললেন,
—“রক্তের সম্পর্ক ভুলে যাওয়া যায় না। ভুলের শাস্তি হয়, কিন্তু মানুষকে চিরদিন একা করে রাখা যায় না।”
কামাল মাথা নিচু করলেন।
—“ধন্যবাদ।”
অবশেষে জিহান আর ইরার বিয়ে সম্পন্ন হলো।
সব আনুষ্ঠানিকতার পর যখন তারা পাশাপাশি বসে ছিল, ইরা আস্তে করে বলল,
—“জিহান।”
—“হুম?”
—“আমাদের গল্পটা কত অদ্ভুত ছিল, তাই না?”
জিহান হেসে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“প্রথমে ঝগড়া।”
—“তারপর বৃষ্টি।”
—“তারপর বন্ধুত্ব।”
—“তারপর ভালো লাগা।”
—“তারপর এত ঝামেলা।”
জিহান বলল,
—“আর শেষে তুমি।”
ইরা হেসে বলল,
—“শেষে আমি?”
—“হ্যাঁ। আমার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশ।”
ইরা কিছু বলল না।
শুধু মৃদু হেসে তার পাশে বসে রইল।
কয়েক মাস পর।
এক বিকেলে জিহান আর ইরা ছাদে বসে চা খাচ্ছিল।
ইরা বলল,
—“মনে আছে, একদিন তুমি বলেছিলে জীবনকে কঠিন করে দেখলে জীবন আরও কঠিন হয়ে যায়?”
জিহান বলল,
—“মনে আছে।”
—“তখন আমি তোমার কথাটা পুরোপুরি বুঝিনি।”
—“এখন?”
ইরা মৃদু হেসে বলল,
—“এখন বুঝি।”
—“কী বুঝো?”
—“জীবনে সমস্যা আসবেই। ভুল বোঝাবুঝি হবে, ঝগড়া হবে, কখনো দূরত্বও তৈরি হবে। কিন্তু পাশে যদি এমন একজন মানুষ থাকে, যে সত্যিটা জানার আগে হাল ছেড়ে দেয় না, তাহলে অনেক কঠিন পথও সহজ হয়ে যায়।”
জিহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“তাহলে আমাদের গল্পের শিক্ষা কী?”
ইরা হেসে বলল,
—“ভালোবাসা শুধু একে অপরকে পছন্দ করা নয়। ভালোবাসা মানে বিশ্বাস করা, সত্যিটা খুঁজে বের করা আর কঠিন সময়ে পাশে থাকা।”
জিহান মৃদু হেসে বলল,
—“আর?”
ইরা বলল,
—“আর প্রথম দেখায় কাউকে রাগী ভেবে নিয়ে ভুল করা যাবে না।”
জিহান হেসে উঠল।
—“এই কথাটা তুমি এখনো ভুলোনি?”
—“কখনো না।”
দুজনের হাসিতে ছাদটা ভরে গেল।
....