ব্যস্ত শহরটা সেদিনও নিজের নিয়মে ছুটছিল। রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ সারি, ফুটপাতে মানুষের ভিড়, দোকানের সামনে ক্রেতাদের আনাগোনা—সব মিলিয়ে চারপাশে যেন এক মুহূর্তের জন্যও থামার সময় নেই।
আকাশ অবশ্য এসবের কিছুই খেয়াল করছিল না।
বন্ধু রাফির সঙ্গে সে একটা শপিং মলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। রাফি কোনো একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছিল, কিন্তু আকাশের মন পড়ে ছিল অন্যদিকে। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল মলের প্রবেশপথের দিকে।
একটা মেয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকছিল।
সাদা-নীল পোশাক, কাঁধে ছোট একটা ব্যাগ, হাতে কয়েকটা বই। মেয়েটা কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল। কথা বলতে বলতে একবার হেসে উঠল।
সেই হাসিটা আকাশকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামিয়ে দিল।
রাফি কথা বলতে বলতে হঠাৎ চুপ করে গেল।
—“কী হলো?”
আকাশ কোনো উত্তর দিল না।
রাফি আকাশের দৃষ্টি অনুসরণ করে মেয়েটার দিকে তাকাল। তারপর মুচকি হেসে বলল,
—“ওহ! ব্যাপারটা তাহলে এই।”
আকাশ এবার চোখ সরিয়ে নিল।
—“কী ব্যাপার?”
—“যে মানুষটা পাঁচ মিনিট ধরে আমার একটা কথাও শুনছে না, তার ব্যাপার।”
—“চুপ কর।”
—“মেয়েটাকে চেনিস?”
আকাশ মাথা নাড়ল।
—“না।”
—“তাহলে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?”
আকাশ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
—“জানি না।”
রাফি হেসে ফেলল।
—“জীবনে প্রথমবার ‘জানি না’ বললি।”
আকাশ আর কথা বাড়াল না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার চোখ বারবার মলের দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল।
মেয়েটা আর বের হলো না।
প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও যখন তাকে দেখা গেল না, আকাশ নিজেই বুঝতে পারল—সে অকারণে অপেক্ষা করছে।
রাফি বলল,
—“চল, বাসায় যাই। যার জন্য অপেক্ষা করছিস, সে তো জানেই না তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস।”
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—“চল।”
দুজন গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু গাড়িতে বসেও আকাশের মনটা অদ্ভুত হয়ে রইল।
সে জানত না মেয়েটার নাম কী।
জানত না কোথায় থাকে।
জানত না আবার কখনো তাকে দেখতে পাবে কি না।
শুধু জানত, অল্প কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্যটা তার মাথা থেকে কিছুতেই যাচ্ছে না।
পরদিন সকালেও আকাশের মনে সেই মেয়েটার কথা ছিল।
নিজের ওপরই বিরক্ত লাগছিল তার।
এমন তো নয় যে জীবনে এর আগে কোনো মেয়েকে দেখেনি। কিন্তু এই মেয়েটার মধ্যে এমন কী ছিল, যার কারণে একটা ছোট্ট হাসি এতটা মনে জায়গা করে নিল?
আকাশ নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল।
কয়েকদিন কেটে গেল।
এর মধ্যে সে অনেকবার সেই শপিং মলের সামনে দিয়ে গেল। প্রতিবারই নিজের অজান্তে চোখ চলে যেত সেই জায়গাটার দিকে।
কিন্তু বৃষ্টিকে আর দেখা গেল না।
একদিন রাফি মজা করে বলল,
—“তোর ওই অচেনা মেয়ের খোঁজ কী হলো?”
আকাশ হেসে বলল,
—“কোনো খোঁজ নেই।”
—“নামও জানিস না?”
—“না।”
—“তাহলে ভুলে যা।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“হয়তো ভুলেই যাব।”
কিন্তু সে জানত, কথাটা সত্যি নয়।
অন্যদিকে বৃষ্টি তখন নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত।
তার পরিবার ছিল বেশ রক্ষণশীল। বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তই তার কাছে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বৃষ্টি পড়াশোনা শেষ করে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছিল।
তবে তার জীবনে তখন একটা বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে।
এক সন্ধ্যায় বাবা তাকে ডেকে বললেন,
—“বৃষ্টি, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।”
বৃষ্টি বই বন্ধ করে বাবার দিকে তাকাল।
—“কী বাবা?”
—“তোমার জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে।”
বৃষ্টি কিছু বলল না।
বাবা ধীরে ধীরে বললেন,
—“ছেলেটা ভালো। পরিবারও ভালো। আমরা চাই তুমি বিষয়টা ভেবে দেখো।”
বৃষ্টি মাথা নিচু করল।
তার নিজের জীবনের এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে সে কী বলবে, বুঝতে পারছিল না।
—“এখনই কি সিদ্ধান্ত নিতে হবে?”
—“না। তুমি সময় নিয়ে ভাবো। কিন্তু আমরা মনে করি ছেলেটা তোমার জন্য ভালো হবে।”
বৃষ্টি কোনো উত্তর দিল না।
সেদিন রাতে জানালার পাশে বসে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল সে।
শহরের আলো জ্বলছিল।
মানুষ ছুটছিল।
কেউ জানত না, তার নিজের জীবনে কত বড় একটা সিদ্ধান্ত সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কয়েক সপ্তাহ পর এক আত্মীয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য বৃষ্টি আবার সেই একই শপিং মলে এল।
তার সঙ্গে ছিল ছোট বোন মিতু।
মিতু কিছু কেনাকাটা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বৃষ্টি মলের একপাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল।
ঠিক তখনই দূর থেকে আকাশ তাকে দেখতে পেল।
আকাশ যেন হঠাৎ থেমে গেল।
সেই একই মুখ।
সেই একই হাসি।
কয়েক সপ্তাহ ধরে যাকে শুধু স্মৃতির মধ্যে দেখেছে, সে আজ সত্যিই তার সামনে দাঁড়িয়ে।
আকাশের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা আনন্দ হলো।
রাফি পাশে ছিল।
সে আকাশের মুখ দেখে বুঝে গেল সবকিছু।
—“এই তো! তোর সেই মেয়েটা!”
আকাশ ফিসফিস করে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“নাম জানিস?”
আকাশ মাথা নাড়ল।
—“আজ জানব।”
সে কয়েক পা এগিয়ে গেল।
কিন্তু ঠিক তখনই বৃষ্টি ফোন রেখে মিতুর সঙ্গে অন্যদিকে চলে গেল।
আকাশ দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
—“এক্সকিউজ মি!”
বৃষ্টি শুনতে পেল না।
আকাশ আবার ডাকল,
—“শুনছেন?”
বৃষ্টি এবার ফিরে তাকাল।
দুজনের চোখ প্রথমবার সরাসরি মিলল।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না।
আকাশ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
—“আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?”
বৃষ্টি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
—“আমার সঙ্গে?”
আকাশ হেসে বলল,
—“হ্যাঁ।”
বৃষ্টি কিছুটা দ্বিধায় পড়ল।
তারপর মৃদু গলায় বলল,
—“বলুন।”
আকাশের মনে হলো, এতদিন ধরে যে কথাটা বলতে চেয়েছিল, সেটাই যেন হঠাৎ ভুলে গেছে।
সে শুধু বলল,
—“আপনার নামটা জানতে পারি?”
বৃষ্টি কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—“বৃষ্টি।”
আকাশের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—“বৃষ্টি…”
নামটা যেন তার কাছে অদ্ভুত সুন্দর লাগল।
বৃষ্টি এবার জিজ্ঞেস করল,
—“আপনার নাম?”
—“আকাশ।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আকাশ হালকা হেসে বলল,
—“আকাশ আর বৃষ্টি… নাম দুটো বেশ অদ্ভুতভাবে মিলে যায়, তাই না?”
বৃষ্টি কথাটা শুনে একটু হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই মিতু দূর থেকে ডাকল,
—“আপু! চলো!”
বৃষ্টি ঘুরে দাঁড়াল।
যাওয়ার আগে একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমাকে যেতে হবে।”
আকাশ মাথা নাড়ল।
—“ঠিক আছে।”
বৃষ্টি চলে গেল।
আকাশ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু এবার অন্তত একটা জিনিস সে জানে।
মেয়েটার নাম বৃষ্টি।
আর সে জানে না কেন, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল—এই পরিচয় হয়তো এখানেই শেষ হবে না।
অন্যদিকে বৃষ্টিও গাড়িতে ওঠার পর অজান্তেই একবার পেছনের দিকে তাকাল।
দূরে আকাশ তখনও দাঁড়িয়ে ছিল।
বৃষ্টি দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল।
সেদিন শপিং মল থেকে বাড়ি ফেরার পরও বৃষ্টির মাথা থেকে আকাশের কথাগুলো যাচ্ছিল না।
একজন অচেনা মানুষ।
মাত্র কয়েক মিনিটের পরিচয়।
তবু কেন যেন তার কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
বিশেষ করে একটা কথা—
“আকাশ আর বৃষ্টি… নাম দুটো বেশ অদ্ভুতভাবে মিলে যায়।”
বৃষ্টি নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
মিতু পাশের ঘর থেকে সেটা দেখে বলল,
—“আপু, একা একা হাসছ কেন?”
বৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে ফেলল।
—“আমি হাসছি?”
—“হ্যাঁ। অনেকক্ষণ ধরে দেখছি।”
—“তুই বেশি কথা বলিস।”
মিতু কাছে এসে বিছানায় বসে বলল,
—“মলের ওই ছেলেটা কে?”
বৃষ্টি একটু চমকে গেল।
—“কোন ছেলে?”
—“যে তোমার সঙ্গে কথা বলছিল।”
—“চিনি না।”
—“চেনো না, অথচ এতক্ষণ কথা বললে?”
বৃষ্টি একটু থেমে বলল,
—“আজই পরিচয় হয়েছে।”
মিতু চোখ বড় বড় করে বলল,
—“ওহ! তাহলে ব্যাপার আছে।”
—“কোনো ব্যাপার নেই।”
—“নাম কী?”
বৃষ্টি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আকাশ।”
মিতু সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠল।
—“আকাশ আর বৃষ্টি!”
বৃষ্টি বালিশ তুলে মিতুর দিকে ছুড়ে দিল।
—“চুপ কর!”
মিতু হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু বৃষ্টির মুখের হাসিটা আর গেল না।
অন্যদিকে আকাশের অবস্থা আরও খারাপ।
সেদিন রাতে সে বারবার ফোন হাতে নিচ্ছিল।
কিন্তু ফোনে বৃষ্টির কোনো নম্বর নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুঁজে দেখার কথাও মাথায় এলো। কিন্তু নাম ছাড়া কাউকে কীভাবে খুঁজবে?
রাফিকে ফোন করল সে।
—“হ্যালো?”
—“রাফি, একটা কাজ আছে।”
—“বল।”
—“বৃষ্টিকে খুঁজে বের করতে হবে।”
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর রাফি হেসে বলল,
—“আমি জানতাম তুই একদিন এই কথা বলবি।”
—“মজা করিস না। সত্যি বলছি।”
—“ঠিক আছে। কিন্তু কীভাবে খুঁজব?”
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“জানি না।”
—“ঠিকানা জানিস?”
—“না।”
—“কোথায় পড়ে?”
—“জানি না।”
—“কোথায় থাকে?”
—“জানি না।”
রাফি এবার হেসে বলল,
—“তুই মেয়েটার নাম জানিস। এটুকুই?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে আপাতত এতটুকুই থাক।”
আকাশ ফোন রেখে দিল।
কিন্তু মনটা মানল না।
পরদিন সে আবার সেই শপিং মলে গেল।
মলের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল।
এক ঘণ্টা।
দুই ঘণ্টা।
বৃষ্টি এল না।
তৃতীয় দিনও না।
চতুর্থ দিনও না।
ধীরে ধীরে আকাশ বুঝতে পারল, শুধু অপেক্ষা করে বৃষ্টিকে পাওয়া যাবে না।
তারপর হঠাৎ একদিন একটা সুযোগ এল।
সেদিন আকাশ তার এক বন্ধুর সঙ্গে একটা রেস্টুরেন্টে বসেছিল। হঠাৎ পাশের টেবিল থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।
সে ঘুরে তাকাল।
বৃষ্টি!
তার সঙ্গে মিতু।
আকাশের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
বন্ধু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকাশ উঠে দাঁড়াল।
—“বৃষ্টি?”
বৃষ্টি অবাক হয়ে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড পর তার মুখেও হাসি ফুটে উঠল।
—“আপনি?”
আকাশ বলল,
—“হ্যাঁ। আপনাকে অনেকদিন ধরে খুঁজছিলাম।”
বৃষ্টি একটু অবাক হলো।
—“আমাকে খুঁজছিলেন?”
আকাশ বুঝতে পারল কথাটা একটু বেশি সরাসরি হয়ে গেছে।
সে হেসে বলল,
—“মানে… সেদিনের পর আর দেখা হচ্ছিল না।”
বৃষ্টি নিচু গলায় বলল,
—“আমিও ভাবছিলাম, আপনি হয়তো আর আসবেন না।”
আকাশের চোখে আনন্দ ফুটে উঠল।
—“তাহলে আপনিও আমাকে মনে রেখেছেন?”
বৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল।
—“এমন কিছু না।”
মিতু পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
সে হঠাৎ বলল,
—“আপু, আপনি তো বলেছিলেন উনাকে চেনেন না।”
বৃষ্টি লজ্জা পেয়ে বলল,
—“মিতু, তুমি একটু চুপ করবে?”
আকাশ হেসে ফেলল।
মিতু মজা করে বলল,
—“আপনার নাম আকাশ, তাই তো?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে আপুর নাম বৃষ্টি। আপনাদের নাম সত্যিই সুন্দর।”
বৃষ্টি এবার মিতুর হাত ধরে টেনে বলল,
—“চলো।”
আকাশ বলল,
—“এক মিনিট।”
বৃষ্টি থামল।
আকাশ কিছুটা সাহস করে বলল,
—“আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?”
বৃষ্টি এবার আর আপত্তি করল না।
মিতু একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল।
আকাশ বলল,
—“আপনি কি সবসময় এত তাড়াতাড়ি চলে যান?”
বৃষ্টি মৃদু হেসে বলল,
—“সবসময় না।”
—“তাহলে আজ?”
—“আজও হয়তো যাব না।”
কথাটা শুনে আকাশ হেসে ফেলল।
তাদের কথাবার্তা ধীরে ধীরে সহজ হয়ে গেল।
বৃষ্টি জানাল সে পড়াশোনা শেষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আকাশ নিজের কাজের কথা বলল।
দুজনের জীবন আলাদা হলেও কথাগুলো যেন অদ্ভুতভাবে মিলছিল।
সময় কখন যে চলে গেল, কেউ বুঝতেই পারল না।
শেষে বৃষ্টি বলল,
—“আমাদের যেতে হবে।”
আকাশ এবার বলল,
—“আপনার ফোন নম্বরটা কি পাওয়া যাবে?”
বৃষ্টি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—“কেন?”
—“কথা বলার জন্য।”
বৃষ্টি হেসে বলল,
—“এত তাড়াতাড়ি?”
আকাশ মৃদু গলায় বলল,
—“আপনাকে আবার হারিয়ে ফেলতে চাই না।”
কথাটা শুনে বৃষ্টি আর কিছু বলল না।
নিজের নম্বরটা দিয়ে দিল।
সেদিন রাতে প্রথম ফোনটা করেছিল আকাশই।
বৃষ্টি ফোনের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধা করল।
তারপর কল ধরল।
—“হ্যালো?”
—“আমি আকাশ।”
—“জানি।”
—“তাহলে ফোন ধরলেন কেন?”
—“জানি না।”
আকাশ হেসে বলল,
—“আমিও জানি না কেন ফোন করেছি।”
বৃষ্টি একটু হাসল।
—“তাহলে ফোন রাখুন।”
—“না, একটু কথা বলি।”
সেই রাতের কথাবার্তা খুব বেশি ছিল না।
কিন্তু এরপর প্রায় প্রতিদিনই তাদের কথা হতে লাগল।
কখনো পাঁচ মিনিট।
কখনো আধা ঘণ্টা।
কখনো কোনো কারণ ছাড়াই।
আকাশ বৃষ্টির হাসির গল্প শুনত।
বৃষ্টি আকাশের ছোটবেলার দুষ্টুমির কথা শুনত।
দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য দূরত্ব ধীরে ধীরে কমতে লাগল।
একদিন বৃষ্টি ফোনে বলল,
—“আকাশ, আপনাকে একটা কথা বলব?”
—“বলুন।”
—“আমার পরিবার আমার জন্য একটা সম্বন্ধ দেখছে।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
—“আপনি কী চান?”
বৃষ্টি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—“আমি জানি না।”
—“আপনি কি ছেলেটাকে পছন্দ করেন?”
—“আমি তো তাকে চিনি না।”
আকাশের বুকের ভেতর চাপা একটা স্বস্তি হলো।
কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করল না।
—“তাহলে আমাকে একটা কথা বলুন।”
—“কী?”
—“আপনার মন কী বলছে?”
বৃষ্টি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—“আমার মন… এখন অন্য একটা মানুষের কথা ভাবছে।”
আকাশের হৃদস্পন্দন যেন হঠাৎ বেড়ে গেল।
—“সে মানুষটা কে?”
বৃষ্টি কোনো উত্তর দিল না।
শুধু বলল,
—“আপনি তো অনেক বুদ্ধিমান। নিজেই বুঝে নিন।”
কল কেটে গেল।
আকাশ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল।
বৃষ্টির সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে আকাশের দিনগুলো যেন বদলে গিয়েছিল।
আগে সকাল মানেই কাজ, দুপুর মানেই ব্যস্ততা, আর রাত মানেই নিজের মতো কিছুটা সময়। এখন সবকিছুর মাঝখানে একটা মানুষ এসে জায়গা করে নিয়েছে।
বৃষ্টি।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আকাশ প্রথমেই ফোনটা দেখত। বৃষ্টির কোনো মেসেজ এসেছে কি না। রাতে ঘুমানোর আগে শেষ কথাটাও প্রায়ই হতো বৃষ্টির সঙ্গে।
বৃষ্টির অবস্থাও খুব একটা আলাদা ছিল না।
তবে সে নিজের অনুভূতিটাকে মেনে নিতে ভয় পাচ্ছিল।
কারণ আকাশকে যতটা কাছে আসতে দিচ্ছিল, ততটাই মনে হচ্ছিল সামনে একটা বড় বাধা দাঁড়িয়ে আছে।
তার পরিবার।
এক সন্ধ্যায় বৃষ্টি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে ফোন। আকাশের সঙ্গে কথা হচ্ছিল।
—“আজ সারাদিন এত চুপচাপ কেন?” আকাশ জিজ্ঞেস করল।
—“এমনিই।”
—“আমার সঙ্গে মিথ্যা বলবেন না।”
বৃষ্টি একটু হাসল।
—“আপনি সব বুঝে ফেলেন কীভাবে?”
—“আপনার গলার স্বর শুনলেই বুঝি।”
বৃষ্টি কিছু বলল না।
আকাশ আবার বলল,
—“কী হয়েছে?”
বৃষ্টি ধীরে ধীরে বলল,
—“বাবা আমার বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন।”
আকাশের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—“কবে?”
—“খুব শিগগির।”
কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপ।
আকাশ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
—“আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চান?”
বৃষ্টি চোখ বন্ধ করল।
অনেকদিন ধরে বুকের মধ্যে জমে থাকা কথাটা আজ বলতে ইচ্ছে করছিল।
কিন্তু ভয়ও হচ্ছিল।
—“আকাশ…”
—“হুম?”
—“আপনি যদি… আমার জীবনে না আসতেন, তাহলে হয়তো সবকিছু অনেক সহজ হতো।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আর আমি যদি আপনার জীবনে এসেই থাকি?”
বৃষ্টির চোখ ভিজে উঠল।
—“তাহলে সবকিছু কঠিন হয়ে গেছে।”
—“কঠিন হলেই কি ছেড়ে দিতে হয়?”
বৃষ্টি কোনো উত্তর দিল না।
আকাশ এবার শান্ত গলায় বলল,
—“আমি আপনাকে কোনো সিদ্ধান্তের জন্য চাপ দেব না। শুধু একটা কথা বলব—আপনার মন যদি সত্যিই আমাকে চায়, তাহলে অন্তত নিজের মনের কথাটা একবার পরিবারের সামনে বলবেন।”
বৃষ্টি ধীরে বলল,
—“আপনি কি আমার জন্য লড়বেন?”
আকাশের উত্তর ছিল খুব সহজ।
—“আপনি পাশে থাকলে, অবশ্যই।”
পরদিন সকালে বৃষ্টির বাবা তাকে বসার ঘরে ডাকলেন।
সেখানে তার মা-ও ছিলেন।
বৃষ্টি এসে বসতেই বাবা বললেন,
—“আমরা অনেক ভেবে তোমার জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
বৃষ্টি চুপ করে রইল।
—“ছেলেটার নাম নাবিল। ভালো পরিবার। নিজের ব্যবসা আছে। আমরা মনে করি তোমার ভবিষ্যৎ ভালো হবে।”
বৃষ্টির বুক ধক করে উঠল।
সে সাহস করে বলল,
—“বাবা, আমি কি ওনাকে একবার দেখেছি?”
—“না।”
—“তাহলে এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কেন?”
বাবা একটু কঠিন গলায় বললেন,
—“সব সিদ্ধান্ত শুধু ভালো লাগার ওপর নেওয়া যায় না। জীবনটা বাস্তব।”
বৃষ্টি মাথা নিচু করল।
তারপর ধীরে বলল,
—“আমি কাউকে পছন্দ করি।”
ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মা অবাক হয়ে তাকালেন।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলেন,
—“কে?”
বৃষ্টি সাহস করে বলল,
—“আকাশ।”
—“কে এই আকাশ?”
—“আমি কিছুদিন আগে ওর সঙ্গে পরিচিত হয়েছি।”
বাবার মুখ কঠিন হয়ে গেল।
—“কতদিনের পরিচয়?”
বৃষ্টি চুপ।
—“আমি জিজ্ঞেস করছি, কতদিনের?”
—“কয়েক সপ্তাহ।”
বাবা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
—“কয়েক সপ্তাহের পরিচয়ের ওপর তুমি তোমার জীবন ঠিক করে ফেলেছ?”
—“আমি জানি না বাবা। কিন্তু আমি ওকে পছন্দ করি।”
—“পছন্দ?”
বাবা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।
—“এই বয়সে মানুষ অনেককেই পছন্দ করে। কিন্তু সংসার করতে হলে শুধু পছন্দ যথেষ্ট নয়।”
বৃষ্টি চোখের পানি ধরে বলল,
—“তাহলে আমাকে একটু সময় দিন।”
—“সময় দেব। কিন্তু ওই ছেলের সঙ্গে আর যোগাযোগ করবে না।”
বৃষ্টি চমকে উঠল।
—“বাবা!”
—“আমি যা বলেছি, সেটাই শেষ কথা।”
বৃষ্টি আর কিছু বলতে পারল না।
সেদিন রাতে আকাশ ফোন করলেও বৃষ্টি ধরল না।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
তারপর একটা মেসেজ এল।
“সব ঠিক আছে?”
বৃষ্টি মেসেজটা পড়ল।
উত্তর দিতে গিয়ে বারবার থেমে গেল।
শেষে লিখল,
“বাবা আমাদের ব্যাপারে জেনে গেছেন।”
কিছুক্ষণ পর আকাশের উত্তর এল।
“তারপর?”
বৃষ্টি লিখল,
“তিনি আমাদের সম্পর্ক মেনে নিচ্ছেন না।”
আকাশ কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিল না।
তারপর ফোন করল।
বৃষ্টি ফোন ধরল।
—“আপনি ঠিক আছেন?”
বৃষ্টির গলা কাঁপছিল।
—“না।”
আকাশ নরম গলায় বলল,
—“কাঁদছেন?”
বৃষ্টি কোনো উত্তর দিল না।
—“বৃষ্টি, আমার কথা শুনুন। ভয় পাবেন না।”
—“আপনি বুঝতে পারছেন না, আকাশ। বাবা খুব রাগ করেছেন।”
—“আমি বুঝতে পারছি।”
—“না, আপনি বুঝতে পারছেন না। আমি চাই না আমার জন্য বাবা-মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ হোক।”
—“আমি কখনো চাইব না আপনি পরিবারকে হারান।”
বৃষ্টি চুপ করে রইল।
আকাশ বলল,
—“কিন্তু নিজের জীবনটাকেও তো মিথ্যা করে কাটাতে পারবেন না।”
বৃষ্টির চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—“আমি কী করব?”
আকাশ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—“আপনি শুধু সত্যিটা ধরে রাখুন। বাকিটা আমি সামলাব।”
—“কীভাবে?”
—“আমি আপনার বাবার সঙ্গে কথা বলব।”
বৃষ্টি ভয় পেয়ে বলল,
—“না! এখনই না।”
—“কেন?”
—“তিনি আরও রেগে যাবেন।”
—“তাহলে?”
—“আমাকে একটু সময় দিন।”
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“ঠিক আছে।”
পরের কয়েকদিন বৃষ্টির সঙ্গে আকাশের যোগাযোগ খুব কমে গেল।
বাড়িতে সবসময় নজরদারি।
বৃষ্টি ফোন হাতে নিলেই মা জিজ্ঞেস করতেন কার সঙ্গে কথা বলছে।
বাবা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, নাবিলের পরিবারের সঙ্গে কথা এগোবে।
একদিন বিকেলে বৃষ্টির হাতে একটা ছবি তুলে দেওয়া হলো।
নাবিলের ছবি।
বৃষ্টি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ছবিটা টেবিলে রেখে দিল।
মা বললেন,
—“ছেলেটা খারাপ না।”
বৃষ্টি মৃদু গলায় বলল,
—“আমি জানি।”
—“তাহলে?”
বৃষ্টি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“খারাপ না হলেই তো ভালোবাসা হয়ে যায় না, মা।”
মা কিছু বলতে পারলেন না।
অন্যদিকে আকাশও বসে থাকেনি।
সে নিজের পরিবারকে সবকিছু জানাল।
তার মা মন দিয়ে ছেলের কথা শুনলেন।
—“তুই কি মেয়েটাকে সত্যিই ভালোবাসিস?”
আকাশ মাথা নিচু করে বলল,
—“হ্যাঁ মা।”
—“মেয়ের পরিবার?”
—“আমাদের সম্পর্ক মেনে নিতে চাইছে না।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“তুই কি মেয়েটার দায়িত্ব নিতে পারবি?”
আকাশ দৃঢ় গলায় বলল,
—“পারব।”
—“শুধু ভালোবাসিস বললেই হবে না। মেয়েটাকে সম্মান দিতে হবে। তার পরিবারকেও সম্মান করতে হবে।”
আকাশ মাথা নাড়ল।
—“আমি সেটাই চাই।”
তার মা মৃদু হাসলেন।
—“তাহলে তাড়াহুড়ো করিস না। সময় নিয়ে এগো।”
আকাশ বুঝল, সামনে পথটা সহজ নয়।
কিন্তু সে এবার পিছিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিল না।
কয়েকদিন পর বৃষ্টির বিয়ের দিন-তারিখও প্রায় ঠিক হয়ে গেল।
বৃষ্টি খবরটা আকাশকে জানাতে পারছিল না।
অবশেষে এক রাতে অনেক কষ্টে ফোন করল।
আকাশ ফোন ধরতেই বৃষ্টি কিছু বলতে পারল না।
—“বৃষ্টি?”
ওপাশে কান্নার শব্দ।
আকাশের বুকটা কেঁপে উঠল।
—“কী হয়েছে?”
বৃষ্টি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।”
আকাশ চোখ বন্ধ করল।
কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বের হলো না।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
—“কবে?”
বৃষ্টি তারিখটা বলল।
আকাশ ধীরে বলল,
—“তার মানে আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই।”
—“আমি জানি।”
—“আপনি কী চান?”
বৃষ্টি এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“আমি আপনাকে হারাতে চাই না।”
আকাশের চোখও ভিজে উঠল।
সে বলল,
—“তাহলে এবার আমাদের সত্যিই কিছু করতে হবে।”
বৃষ্টি ফিসফিস করে বলল,
—“কিন্তু বাবা…”
আকাশ উত্তর দিল,
—“আমি আপনার বাবার সামনে দাঁড়াব।”
—“যদি তিনি আপনাকে অপমান করেন?”
—“সহ্য করব।”
—“যদি আপনাকে ফিরিয়ে দেন?”
—“আবার আসব।”
বৃষ্টি চুপ করে রইল।
আকাশ শেষবার বলল,
—“কারণ এবার আমি শুধু আপনাকে ভালোবাসি বলব না। আমি প্রমাণ করব যে আপনাকে পাওয়ার জন্য আমি দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।”
ফোনের ওপাশে বৃষ্টি কিছু বলল না।
শুধু নিঃশব্দে কাঁদতে থাকল।
বিয়ের তারিখ যত এগিয়ে আসছিল, বৃষ্টির বাড়িতে ততই ব্যস্ততা বাড়ছিল।
ঘরের একপাশে বিয়ের কাপড়, অন্যপাশে আত্মীয়দের তালিকা। মা আর খালারা কেনাকাটা নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝেই কেউ এসে বৃষ্টিকে জিজ্ঞেস করছে কোন শাড়িটা ভালো হবে, কোন গয়না পরবে, বিয়ের দিন কীভাবে সাজবে।
সবাই আনন্দে ব্যস্ত।
শুধু বৃষ্টির ভেতরটা যেন ধীরে ধীরে ভারী হয়ে যাচ্ছিল।
তার চোখের সামনে বারবার আকাশের মুখ ভেসে উঠছিল।
সেই প্রথম দেখা।
সেই অদ্ভুত হাসি।
প্রথম ফোন।
রাত জেগে গল্প করা।
আর সেই কথাটা—
“আপনি পাশে থাকলে, অবশ্যই।”
বৃষ্টি জানত, আকাশ শুধু কথা বলার মানুষ নয়। সে সত্যিই তার জন্য কিছু করতে চায়।
কিন্তু বাবা?
বাবার সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়ানোর সাহস বৃষ্টির একা হচ্ছিল না।
সেদিন বিকেলে আকাশ বৃষ্টিকে ফোন করল।
বৃষ্টি ফোন ধরতেই আকাশ বলল,
—“আপনি কোথায়?”
—“বাসায়।”
—“আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
বৃষ্টি একটু চুপ করে বলল,
—“এখন সম্ভব না।”
—“কেন?”
—“বাড়িতে সবাই আছে।”
—“তাহলে আপনার বাবার সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করুন।”
বৃষ্টি ভয় পেয়ে গেল।
—“আকাশ, আমি খুব ভয় পাচ্ছি।”
—“ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
—“আপনি বুঝছেন না। বাবা খুব কঠিন মানুষ।”
—“আমি ঝগড়া করতে যাচ্ছি না। শুধু নিজের কথাটা বলতে যাচ্ছি।”
বৃষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“যদি বাবা আপনাকে না মানেন?”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“তাহলে অন্তত উনি জানবেন আমি আপনাকে নিয়ে খেলতে আসিনি।”
বৃষ্টির চোখ ভিজে উঠল।
—“আপনি সত্যিই আসবেন?”
—“হ্যাঁ।”
দুদিন পর আকাশ বৃষ্টির বাবার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেল।
বৃষ্টি নিজে কিছু বলেনি। তার মা-ই শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিলেন মেয়ের মনটা কোথায়।
তিনি স্বামীকে বলেছিলেন,
—“ছেলেটার সঙ্গে একবার কথা বলে দেখো।”
প্রথমে তিনি রাজি হননি।
কিন্তু পরে বললেন,
—“ঠিক আছে। আসতে বলো।”
বৃষ্টির বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
আকাশ সময়মতো তাদের বাড়িতে পৌঁছাল।
সাদামাটা পোশাক।
হাতে কোনো দামি উপহার নেই।
শুধু নিজের কথাগুলো পরিষ্কারভাবে বলার সাহস নিয়ে সে দরজার সামনে দাঁড়াল।
বৃষ্টি দূর থেকে তাকে দেখছিল।
আকাশ একবার তার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
সেই হাসি যেন বৃষ্টিকে সাহস দিল।
বৃষ্টির বাবা বসার ঘরে বসে ছিলেন।
আকাশ গিয়ে সালাম দিল।
—“আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।”
—“ওয়ালাইকুম সালাম। বসো।”
আকাশ বসে পড়ল।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর বৃষ্টির বাবা সরাসরি বললেন,
—“তুমি আমার মেয়েকে কতদিন ধরে চেনো?”
—“কিছুদিন।”
—“কতদিন?”
—“কয়েক মাসের মতো।”
—“এই কয়েক মাসেই তুমি বুঝে গেছ, তোমরা সারাজীবন একসঙ্গে থাকতে পারবে?”
আকাশ শান্তভাবে বলল,
—“সত্যি বলতে, মানুষকে বুঝতে সবসময় অনেক বছর লাগে না। তবে আমি এটাও জানি, শুধু অনুভূতি দিয়ে সংসার চলে না।”
বৃষ্টির বাবা একটু অবাক হয়ে তাকালেন।
আকাশ বলল,
—“আমি আপনার মেয়েকে সম্মান করি। তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। আর যদি আপনি আমাকে সুযোগ দেন, আমি আপনাকেও সম্মান করে এই সম্পর্কটা এগিয়ে নিতে চাই।”
বাবা কঠিন গলায় বললেন,
—“তোমার পরিবার কী করে?”
আকাশ নিজের পরিবার, কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলল।
সব শুনে বৃষ্টির বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“তুমি হয়তো খারাপ ছেলে নও। কিন্তু আমার আপত্তি অন্য জায়গায়।”
আকাশ তাকিয়ে রইল।
—“বৃষ্টি আমার একমাত্র মেয়ে। আমি তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ঝুঁকি নিতে চাই না।”
—“আমি বুঝতে পারছি।”
—“তোমরা একে অপরকে পছন্দ করো। কিন্তু কয়েক মাসের পরিচয় দিয়ে জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া যায় না।”
আকাশ ধীরে বলল,
—“আপনি চাইলে আমাদের আরও সময় দিতে পারেন।”
—“না।”
উত্তরটা খুব দ্রুত এল।
—“আমি বৃষ্টির বিয়ে নাবিলের সঙ্গে ঠিক করেছি।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“আপনি কি বৃষ্টির মতামত জানতে চেয়েছেন?”
বৃষ্টির বাবা মুখ শক্ত করে বললেন,
—“আমি আমার মেয়েকে চিনি।”
—“কিন্তু আপনার মেয়ে কী চায়, সেটা জানা কি জরুরি নয়?”
এই কথায় ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে গেল।
বাবা রাগ সামলে বললেন,
—“তুমি এখন আমাকে শেখাবে কীভাবে মেয়ের ভবিষ্যৎ ঠিক করতে হয়?”
আকাশ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করল।
—“না আঙ্কেল। আমি আপনাকে কিছু শেখাতে আসিনি।”
তারপর শান্ত গলায় বলল,
—“শুধু একটা অনুরোধ করতে এসেছি। বৃষ্টিকে একবার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিন।”
বৃষ্টির বাবা উঠে দাঁড়ালেন।
—“তোমার সঙ্গে আর কোনো কথা নেই।”
আকাশও উঠে দাঁড়াল।
—“ঠিক আছে।”
দরজার কাছে গিয়ে সে থামল।
—“তবে একটা কথা বলেই যাই। আমি আপনার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যেতে আসিনি। আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে তার হাত চাইতে এসেছি।”
বৃষ্টির বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।
আকাশ বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর বৃষ্টি নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে কাঁদতে লাগল।
রাতে বৃষ্টির মা তার ঘরে এলেন।
মেয়ের পাশে বসে মাথায় হাত রাখলেন।
—“তুই কি ছেলেটাকে সত্যিই ভালোবাসিস?”
বৃষ্টি চোখ মুছে মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ।”
—“নাবিলকে বিয়ে করতে পারবি?”
বৃষ্টি অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আমি চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু মন থেকে পারব না।”
মায়ের চোখেও পানি এসে গেল।
—“তোর বাবা বুঝতে পারছে না।”
—“আমি বাবাকে কষ্ট দিতে চাই না।”
—“তুই কি আকাশকে ছেড়ে দিতে পারবি?”
বৃষ্টি চোখ বন্ধ করল।
—“না।”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“তাহলে তোর বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা কর।”
সেদিন রাতেই বৃষ্টি বাবার ঘরে গেল।
বাবা তখন কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন।
বৃষ্টি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
—“বাবা?”
—“কী?”
—“আমি একটু কথা বলতে চাই।”
বাবা তাকালেন।
—“বলো।”
বৃষ্টি ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—“আমি জানি আপনি আমার ভালো চান।”
—“অবশ্যই চাই।”
—“তাহলে আমার কথাটাও একবার শুনুন।”
বাবা চুপ করে রইলেন।
বৃষ্টি বলল,
—“আমি আকাশকে পছন্দ করি। শুধু পছন্দ না… আমি ওর সঙ্গে আমার ভবিষ্যৎ ভাবতে পারি।”
বাবা কিছু বললেন না।
—“আপনি চাইলে ওর পরিবারকে ডাকুন। ওর সম্পর্কে খোঁজ নিন। ওর কাজ, পরিবার—সবকিছু যাচাই করুন। কিন্তু শুধু এই কারণে আমাকে অন্য কাউকে বিয়ে করতে বলবেন না যে আপনি তাকে আগে থেকে ঠিক করেছেন।”
বাবা কঠিন গলায় বললেন,
—“তুই কি বুঝিস সংসার কী?”
বৃষ্টি চোখের পানি মুছে বলল,
—“পুরোপুরি বুঝি না। কিন্তু আমি জানি, যাকে বিয়ে করব তাকে মন থেকে গ্রহণ করতে হবে।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“তুই আমাকে খুব কঠিন অবস্থায় ফেলেছিস।”
—“আমি আপনাকে হারাতে চাই না, বাবা।”
এই কথাটা শুনে বাবার মুখটা কিছুটা নরম হয়ে গেল।
তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“আমি তোকে সময় দিচ্ছি।”
বৃষ্টির চোখে আশার আলো ফুটল।
—“কতদিন?”
—“কয়েকদিন। এর মধ্যে আমি ছেলেটার সম্পর্কে খোঁজ নেব।”
বৃষ্টি বাবার হাত ধরে বলল,
—“ধন্যবাদ।”
কিন্তু বাবা সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন,
—“তবে একটা কথা মনে রাখিস। যদি ছেলেটার ব্যাপারে এমন কিছু জানতে পারি যা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে এই সম্পর্কের কথা আর শুনব না।”
বৃষ্টি মাথা নাড়ল।
—“ঠিক আছে।”
পরদিন আকাশকে সবকিছু জানাল বৃষ্টি।
ফোনের ওপাশে আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“আপনার বাবা অন্তত আমাকে একটা সুযোগ দিয়েছেন।”
—“হ্যাঁ।”
—“এটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় সুযোগ।”
বৃষ্টি মৃদু হেসে বলল,
—“আপনি কি পারবেন?”
—“আমি চেষ্টা করব।”
—“শুধু চেষ্টা?”
আকাশ হেসে বলল,
—“না। এবার সফল হওয়ার চেষ্টা করব।”
বৃষ্টি অনেকদিন পর একটু স্বস্তি পেল।
বৃষ্টির বাবা কথা দিয়েছিলেন, তিনি আকাশের সম্পর্কে খোঁজ নেবেন।
কথাটা শুনে বৃষ্টি কিছুটা আশ্বস্ত হলেও আকাশ জানত, সামনে কঠিন সময়।
কারণ ভালোবাসা যত সহজে শুরু হয়েছিল, এখন সেটাকে সত্যি প্রমাণ করাটাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।
আকাশ নিজের কাজ, পরিবার আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বৃষ্টির বাবার সামনে পরিষ্কারভাবে দাঁড়াতে চেয়েছিল।
কিন্তু তার আগেই একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে গেল।
এক সকালে আকাশ অফিসে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিল।
ঠিক তখনই তার বাবা ফোন করলেন।
—“আজ সন্ধ্যায় বাসায় আসিস। কিছু কথা আছে।”
আকাশ অবাক হলো।
—“কী কথা?”
—“বাসায় এসে বলব।”
সন্ধ্যায় আকাশ বাড়ি ফিরতেই দেখল, বাবা-মা দুজনেই বসে আছেন।
মায়ের মুখে চিন্তার ছাপ।
আকাশ বসে বলল,
—“কী হয়েছে?”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“বৃষ্টির পরিবার থেকে কেউ আমাদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছে।”
আকাশ একটু চমকে গেল।
—“এটা তো ভালো খবর।”
—“হ্যাঁ। কিন্তু তাদের কিছু প্রশ্ন আছে।”
—“কী প্রশ্ন?”
বাবা বললেন,
—“তোমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? তুমি কোথায় থাকতে চাও? বিয়ের পর বৃষ্টিকে কীভাবে রাখবে? তার পড়াশোনা চালাতে দেবে কি না—এসব।”
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—“এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার কোনো সমস্যা নেই।”
তার মা বললেন,
—“তুই কি সত্যিই বৃষ্টিকে তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দিবি?”
আকাশ অবাক হয়ে তাকাল।
—“অবশ্যই। ওর স্বপ্নকে আমি কেন থামাব?”
মা হাসলেন।
—“তাহলে সেটাই বলবি।”
আকাশ মাথা নাড়ল।
অন্যদিকে বৃষ্টির বাবা আকাশের ব্যাপারে খোঁজ নিতে শুরু করেছেন।
তিনি জানতে পারলেন, আকাশ নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। পরিবারও সম্মানজনক। ছেলেটার কোনো বড় সমস্যা নেই।
কিন্তু একটা বিষয় তার মনে সন্দেহ তৈরি করল।
আকাশের ব্যবসা এখনও পুরোপুরি স্থির নয়।
সে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
বৃষ্টির বাবা মনে মনে ভাবলেন,
“এই ছেলেটা কি সত্যিই আমার মেয়ের দায়িত্ব নিতে পারবে?”
তার কাছে নিরাপত্তা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নাবিলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত।
অন্যদিকে আকাশ এখনও নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে।
এই তুলনাটা তার বাবার মনে আবার দ্বিধা তৈরি করল।
সেদিন রাতে বৃষ্টি বাবার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—“আপনি আকাশের সম্পর্কে কী জানতে পেরেছেন?”
বাবা বললেন,
—“ছেলেটা ভালো।”
বৃষ্টির মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ এখনো পুরোপুরি স্থির না।”
বৃষ্টি বলল,
—“সব মানুষের জীবনই তো কোনো না কোনো সময় শুরু হয়।”
—“তুই বুঝতে পারছিস না।”
—“আমি বুঝতে পারছি বাবা।”
বৃষ্টি শান্তভাবে বলল,
—“আমি এমন একজন মানুষ চাই, যে আমাকে সম্মান করবে। শুধু অনেক টাকা আছে এমন কাউকে নয়।”
বাবা চুপ করে গেলেন।
পরদিন আকাশ আর বৃষ্টির দেখা হলো।
একটা ছোট ক্যাফেতে বসেছিল তারা।
বৃষ্টি বলল,
—“বাবা আপনার সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন।”
আকাশ হেসে বলল,
—“জানি।”
—“কী বলেছে আপনার পরিবার?”
—“ভালো কিছুই।”
বৃষ্টি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আমার মনে হচ্ছে বাবা এখনো পুরোপুরি রাজি নন।”
আকাশ বলল,
—“সময় লাগবে।”
—“কিন্তু বিয়ের তারিখ তো সামনে।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আমি একটা কথা ভেবেছি।”
—“কী?”
—“আপনার বাবাকে আমি আমার পরিকল্পনা দেখাব। শুধু ভালোবাসি বললে তো উনি বিশ্বাস করবেন না। আমি কীভাবে আপনার ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে চাই, সেটা দেখাব।”
বৃষ্টি মৃদু হেসে বলল,
—“আপনি এত কিছু ভাবেন?”
—“আপনাকে নিয়ে হলে ভাবি।”
বৃষ্টি চোখ নামিয়ে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
—“আকাশ…”
—“হুম?”
—“যদি সবকিছু ঠিক হয়ে যায়?”
—“তাহলে?”
বৃষ্টি একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—“তাহলে?”
আকাশ হেসে বলল,
—“তাহলে আমি আপনার বাবার কাছ থেকে আপনার হাত চাইব।”
বৃষ্টি মৃদু হাসল।
দুজনের চোখে তখন ভবিষ্যতের একটা ছোট্ট স্বপ্ন।
কিন্তু সেই স্বপ্ন বেশিক্ষণ শান্ত থাকল না।
ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি নিজের ফোনটা টেবিলে রেখে দিয়েছিল।
আকাশ সেটা হাতে নিয়ে বলল,
—“আপনার ফোন।”
বৃষ্টি ফোনটা নিল।
ঠিক তখন একটা মেসেজ স্ক্রিনে ভেসে উঠল।
নাবিল: “আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। আজ দেখা করতে চাই।”
বৃষ্টির মুখের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।
আকাশও মেসেজটা দেখে ফেলেছিল।
সে কিছু বলল না।
বৃষ্টি দ্রুত ফোনটা বন্ধ করে বলল,
—“আমি ওকে কোনো উত্তর দিইনি।”
আকাশ শান্ত গলায় বলল,
—“আপনাকে আমাকে কিছু বোঝাতে হবে না।”
—“কিন্তু আপনি ভুল বুঝবেন।”
—“আমি আপনাকে বিশ্বাস করি।”
কথাটা শুনে বৃষ্টি একটু স্বস্তি পেল।
কিন্তু আকাশের মনে একটা প্রশ্ন জন্ম নিল।
নাবিল কেন দেখা করতে চাইছে?
সেদিন রাতে বৃষ্টি নাবিলের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হলো।
কারণ সে সরাসরি জানাতে চেয়েছিল, তার মন অন্য কারও জন্য।
একটা রেস্টুরেন্টে বসে নাবিল বলল,
—“আপনার সঙ্গে আমার বিয়ের কথা চলছে। কিন্তু আপনি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন।”
বৃষ্টি শান্তভাবে বলল,
—“কারণ আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না।”
নাবিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—“আপনি কি কাউকে ভালোবাসেন?”
বৃষ্টি মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ।”
—“আকাশ?”
বৃষ্টি অবাক হয়ে তাকাল।
—“আপনি ওর নাম জানেন?”
নাবিল হালকা হেসে বলল,
—“আপনার পরিবার থেকে শুনেছি।”
বৃষ্টি বলল,
—“তাহলে আপনি বুঝতেই পারছেন।”
নাবিল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আমি আপনাকে জোর করব না।”
বৃষ্টি অবাক হলো।
—“তাহলে?”
—“আমি শুধু একটা কথা বলব। আপনি আকাশকে খুব কম সময় ধরে চেনেন। মানুষকে বুঝতে সময় লাগে।”
বৃষ্টি বলল,
—“আমি জানি।”
—“আমি চাই না আপনি পরে আফসোস করেন।”
বৃষ্টি উঠে দাঁড়াল।
—“আফসোস হলে সেটা আমার সিদ্ধান্তের ফল হবে।”
নাবিল আর কিছু বলল না।
বৃষ্টি চলে গেল।
কিন্তু এই সাক্ষাতের কথা আকাশ জানত না।
আর ঠিক সেখানেই শুরু হলো ভুল বোঝাবুঝি।
কারণ রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় বৃষ্টির একটা ছবি দূর থেকে তুলেছিল নাবিলের পরিচিত একজন।
ছবিটা কোনোভাবে বৃষ্টির বাবার কাছেও পৌঁছে গেল।
তিনি ভাবলেন, বৃষ্টি হয়তো এখনও নাবিলের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
রাগে তিনি মেয়েকে ডেকে বললেন,
—“তুই আমাকে কী বলেছিলি?”
বৃষ্টি অবাক হয়ে বলল,
—“কী?”
বাবা ফোনটা সামনে ধরলেন।
ছবিটা দেখে বৃষ্টি থমকে গেল।
—“বাবা, আমি শুধু ওকে জানাতে গিয়েছিলাম যে আমি ওকে বিয়ে করতে চাই না।”
—“আমাকে না জানিয়ে?”
—“আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
বাবা কঠিন গলায় বললেন,
—“তুই আকাশের জন্য আমাকে মিথ্যা বলছিস?”
—“না বাবা!”
—“তাহলে এত কিছু লুকাচ্ছিস কেন?”
বৃষ্টি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“আমি কাউকে লুকাতে চাইনি।”
বাবা বললেন,
—“আজ থেকে আকাশের সঙ্গে তোর সব যোগাযোগ বন্ধ।”
বৃষ্টি কেঁপে উঠল।
—“বাবা, না!”
—“এটাই আমার সিদ্ধান্ত।”
সেদিন রাতে বৃষ্টি আকাশকে ফোন করল।
কিন্তু ফোন বন্ধ।
আকাশ তখন নিজের বাবার সঙ্গে বাইরে ছিল।
বৃষ্টি বারবার কল করল।
কোনো উত্তর পেল না।
সে একটা মেসেজ লিখল—
“আমার সঙ্গে কথা বলুন। খুব দরকার।”
মেসেজ গেল।
কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
পরদিনও না।
আকাশও ভাবছিল, বৃষ্টি হয়তো পরিবারের চাপে দূরে সরে যাচ্ছে।
কারণ তার ফোনে বৃষ্টির কলের খবর সে পরে দেখলেও, কথা বলার সুযোগ হয়নি।
অবশেষে তৃতীয় দিন সে বৃষ্টির বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
কিন্তু বৃষ্টি বাইরে এল না।
তার বাবা দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
—“তুমি এখানে কেন?”
আকাশ বলল,
—“বৃষ্টির সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
—“সে তোমার সঙ্গে আর কথা বলবে না।”
আকাশ হতবাক।
—“কেন?”
বৃষ্টির বাবা বললেন,
—“কারণ আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
আকাশ কিছু বলতে পারল না।
ঠিক তখন ওপরের বারান্দায় বৃষ্টি এসে দাঁড়াল।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
বৃষ্টি কাঁদছিল।
আকাশও বুঝতে পারল—এটা বৃষ্টির সিদ্ধান্ত নয়।
সে শুধু দূর থেকে বলল,
—“বৃষ্টি, আমি আছি।”
বৃষ্টি চোখ মুছে মাথা নাড়ল।
কিন্তু তার বাবা তাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
আকাশ ধীরে ধীরে সেখান থেকে ফিরে এল।
তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন—
এই সম্পর্ক কি সত্যিই এত সহজে শেষ হয়ে যাবে?
আর বৃষ্টির মনে তখন একটাই ভয়—
যদি তার বাবা সত্যিই তাদের আলাদা করে দেন?
বৃষ্টির বাড়ির সামনে থেকে ফিরে আসার পর আকাশ অনেকক্ষণ গাড়িতে বসে ছিল।
গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ।
চারপাশে মানুষের চলাচল।
কেউ জানে না, একটা মানুষ ঠিক কতটা অস্থির হয়ে একটা জায়গায় বসে আছে।
আকাশের চোখের সামনে বারবার বৃষ্টির মুখ ভেসে উঠছিল।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মুখ।
চোখের পানি।
আর যাওয়ার আগে তার দিকে তাকানো সেই দৃষ্টি।
ওটা কোনো বিদায়ের দৃষ্টি ছিল না।
বরং সাহায্যের জন্য চিৎকার করা একটা নীরব চোখের ভাষা।
আকাশ বুঝে গিয়েছিল—বৃষ্টি নিজে থেকে তাকে ছেড়ে যায়নি।
কেউ তাকে বাধ্য করছে।
কিন্তু কীভাবে সব ঠিক করবে, সেটা সে জানত না।
সেদিন রাতে আকাশ তার মাকে সব বলল।
মা মন দিয়ে শুনলেন।
তারপর বললেন,
—“তুই কি মেয়েটাকে বিশ্বাস করিস?”
আকাশ কোনো দ্বিধা না করে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে ভয় পাচ্ছিস কেন?”
—“ওর বাবাকে কীভাবে বোঝাব, সেটাই বুঝতে পারছি না।”
মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“মানুষকে জোর করে পাওয়া যায় না। কিন্তু সত্যিটা বোঝানো যায়।”
আকাশ তাকিয়ে রইল।
—“আমি কী করব?”
—“তুই বৃষ্টির বাবার সঙ্গে আবার কথা বল। তবে এবার শুধু নিজের কথা বলবি না। বৃষ্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে তোর কী পরিকল্পনা, সেটা বলবি।”
আকাশ মাথা নাড়ল।
—“ঠিক আছে।”
পরদিন সকালে আকাশ বৃষ্টির বাবার কাছে ফোন করল।
অনেকবার রিং হওয়ার পর ফোন ধরলেন তিনি।
—“হ্যালো?”
—“আঙ্কেল, আমি আকাশ।”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
—“কী চাও?”
—“আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।”
—“আমাদের আর কিছু বলার নেই।”
—“আপনি যদি আমাকে শেষবারের মতো সুযোগ দেন, আমি শুধু পাঁচ মিনিট কথা বলব।”
দীর্ঘ নীরবতার পর উত্তর এল,
—“আগামীকাল বিকেলে এসো।”
আকাশ ফোন রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
অন্যদিকে বৃষ্টি তখন নিজের ঘরে বসে ছিল।
কয়েকদিন ধরে তার সঙ্গে আকাশের কোনো কথা হয়নি।
ফোনও প্রায় তার কাছ থেকে দূরে রাখা হচ্ছে।
তারপরও সে প্রতিদিন রাতে জানালার পাশে বসে অপেক্ষা করত।
হয়তো কোনোভাবে আকাশের একটা ফোন আসবে।
কিংবা কোনো খবর।
কিন্তু কিছুই আসত না।
বৃষ্টির মা একদিন ঘরে এসে মেয়ের পাশে বসলেন।
—“তুই খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করছিস না।”
বৃষ্টি মৃদু গলায় বলল,
—“খেতে ইচ্ছে করে না।”
মা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
—“তোর বাবা রাগ করেছে। কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।”
বৃষ্টি মায়ের দিকে তাকাল।
—“আপনি কি মনে করেন বাবা রাজি হবে?”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“আমি জানি না। তবে তোর বাবা তোকে খুব ভালোবাসে। হয়তো সেই কারণেই ভয় পাচ্ছে।”
বৃষ্টি বলল,
—“আমি বাবাকে হারাতে চাই না।”
—“তাহলে বাবাকে বুঝতে চেষ্টা কর।”
—“আর আকাশ?”
মা মৃদু হেসে বললেন,
—“যদি আকাশ সত্যিই তোকে ভালোবাসে, সে পালিয়ে যাবে না।”
বৃষ্টির চোখে আবার পানি চলে এল।
পরদিন বিকেলে আকাশ বৃষ্টির বাবার সামনে বসে ছিল।
আজ তার হাতে কোনো যুক্তির তালিকা নেই।
শুধু কিছু কাগজ।
তার কাজের পরিকল্পনা।
নিজের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
বৃষ্টির পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা।
সবকিছু।
বৃষ্টির বাবা কাগজগুলোর দিকে তাকালেন।
—“এসব কী?”
—“আমার পরিকল্পনা।”
—“কীসের?”
—“বিয়ের পর আমি কোথায় থাকব, কীভাবে কাজটা আরও বড় করব, বৃষ্টির পড়াশোনা কীভাবে চলবে—সবকিছুর।”
বাবা চুপ করে শুনলেন।
আকাশ বলল,
—“আমি জানি, আপনি আপনার মেয়েকে নিরাপদ রাখতে চান। আমিও চাই।”
—“কিন্তু তুমি এখনও প্রতিষ্ঠিত নও।”
—“আমি সেটা জানি।”
—“তাহলে?”
আকাশ শান্ত গলায় বলল,
—“আমি আপনাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না। আমি বলব না যে আমার জীবনে কোনো সমস্যা থাকবে না। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, বৃষ্টিকে কখনো একা সমস্যার সামনে দাঁড় করাব না।”
বৃষ্টির বাবা তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আকাশ আরও বলল,
—“আপনি যদি মনে করেন আমি যোগ্য নই, আমাকে আরও সময় দিন। আমি নিজেকে প্রমাণ করব।”
—“আর যদি আমি বলি বৃষ্টির বিয়ে নাবিলের সঙ্গেই হবে?”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“তাহলে আমি আপনার সিদ্ধান্তকে অসম্মান করব না। কিন্তু বৃষ্টির সিদ্ধান্তটাও যেন একবার শোনা হয়, এই অনুরোধ করব।”
বাবার মুখ কিছুটা নরম হলো।
তিনি বললেন,
—“তুমি কি আমার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে?”
আকাশ মাথা নাড়ল।
—“না।”
—“কেন?”
—“কারণ বৃষ্টিকে পেতে গিয়ে আমি তার বাবাকে হারাতে চাই না।”
এই কথায় ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
বৃষ্টির বাবা প্রথমবারের মতো আকাশের দিকে অন্য চোখে তাকালেন।
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে বৃষ্টির মা এসে দাঁড়ালেন।
তিনি বললেন,
—“ওকে একটা সুযোগ দেওয়া যায়।”
বৃষ্টির বাবা বললেন,
—“তুমি কি বুঝতে পারছ কী বলছ?”
—“হ্যাঁ।”
—“তুইও কি বৃষ্টির মতো এই ছেলেটার পক্ষ নিচ্ছিস?”
মা শান্তভাবে বললেন,
—“আমি কারও পক্ষ নিচ্ছি না। আমি শুধু বলছি, মেয়ের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মেয়ের কথাটা শোনা উচিত।”
বাবা চুপ করে গেলেন।
আকাশ উঠে দাঁড়াল।
—“আমি আজ শুধু এতটুকুই চাই। বৃষ্টির সঙ্গে একবার আপনার সামনে বসে কথা বলার সুযোগ।”
বাবা কিছুক্ষণ ভাবলেন।
তারপর বললেন,
—“ঠিক আছে।”
আকাশ অবাক হয়ে তাকাল।
—“সত্যি?”
—“তবে আমার সামনে।”
—“আমি রাজি।”
কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি ঘরে এল।
আকাশের সঙ্গে তার চোখাচোখি হতেই বৃষ্টির চোখ ভিজে উঠল।
কয়েকদিন পর সে আকাশকে দেখছে।
কিন্তু বাবার সামনে বলে কিছু বলতে পারছিল না।
বাবা বললেন,
—“বসো।”
বৃষ্টি বসে পড়ল।
তিনি বললেন,
—“তোমরা দুজন একে অপরকে কী বলতে চাও, বলো।”
আকাশ প্রথমে চুপ ছিল।
তারপর বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুমি কি আমাকে সত্যিই তোমার জীবনে চাও?”
বৃষ্টি এক মুহূর্তও দেরি করল না।
—“হ্যাঁ।”
আকাশের চোখে স্বস্তি ফুটে উঠল।
বাবা এবার বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তুই কি নিশ্চিত?”
বৃষ্টি মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ বাবা।”
—“এই ছেলেটার সঙ্গে জীবন কাটাতে গিয়ে যদি কষ্ট হয়?”
বৃষ্টি চোখের পানি মুছে বলল,
—“জীবনে কষ্ট তো থাকবেই। কিন্তু আমি চাই, যার সঙ্গে থাকব, তার সঙ্গে সত্যি করে থাকব।”
বাবা চুপ করে রইলেন।
আকাশ বলল,
—“আমি বৃষ্টিকে আপনার কাছ থেকে দূরে নিতে চাই না। আমি চাই, আপনার মেয়েকে নিয়ে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে সংসার শুরু করতে।”
বৃষ্টির বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“তোমরা দুজনই আমাকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছ।”
বৃষ্টি ধীরে বলল,
—“আমরা আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না।”
বাবা উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থেকে বললেন,
—“আমি তোমাদের একটা সুযোগ দেব।”
বৃষ্টি অবাক হয়ে উঠল।
—“বাবা?”
—“কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
আকাশ বলল,
—“কী শর্ত?”
—“তোমাকে তোমার কাজ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাকে প্রমাণ করতে হবে যে তুমি বৃষ্টির দায়িত্ব নিতে পারবে।”
আকাশ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আমি রাজি।”
—“আর বৃষ্টি, তোর পড়াশোনা বন্ধ হবে না।”
বৃষ্টির চোখ ভিজে উঠল।
—“ধন্যবাদ বাবা।”
বাবা তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
—“আমি এখনো পুরোপুরি রাজি হইনি। কিন্তু দরজা বন্ধও করলাম না।”
আকাশ উঠে সালাম করল।
—“এই সুযোগটার জন্য ধন্যবাদ।”
সেদিন সন্ধ্যায় আকাশ বাড়ি ফেরার সময় বৃষ্টির সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল।
বৃষ্টি হাসতে হাসতে বলল,
—“আজ আমি অনেকদিন পর ভালো লাগছে।”
আকাশ বলল,
—“আমিও।”
—“আপনি কি ভাবছেন?”
—“ভাবছি, এতদিনে প্রথমবার মনে হচ্ছে আমাদের গল্পটার একটা ভবিষ্যৎ আছে।”
বৃষ্টি চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“আকাশ?”
—“হুম?”
—“একটা কথা বলব?”
—“বল।”
—“আমি আপনাকে খুব মিস করেছি।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আমিও।”
দুজনেই হাসল।
বৃষ্টির বাবা শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি রাজি না হলেও আকাশ আর বৃষ্টিকে একটা সুযোগ দিয়েছিলেন।
এই ছোট্ট সুযোগটাই তাদের কাছে অনেক বড় ছিল।
আকাশ নিজের কাজ আরও মন দিয়ে শুরু করল। সে জানত, শুধু কথায় হবে না। বৃষ্টির বাবাকে দেখাতে হবে যে সে সত্যিই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
বৃষ্টিও আবার স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা শুরু করল।
কয়েকদিন পর তাদের মধ্যে আগের মতো কথা হতে লাগল।
সকালের ছোট্ট মেসেজ থেকে শুরু করে রাতের দীর্ঘ ফোনালাপ—সবকিছু ধীরে ধীরে আগের জায়গায় ফিরছিল।
একদিন আকাশ ফোনে বলল,
—“আজ তোমার কণ্ঠটা অনেক ভালো লাগছে।”
বৃষ্টি হেসে বলল,
—“আগে কি খারাপ লাগত?”
—“না। তবে এখন শুনলে মনে হয় তুমি আর ভয় পাচ্ছ না।”
বৃষ্টি কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—“বাবা এখনো পুরোপুরি রাজি হননি। কিন্তু অন্তত আমার কথা শুনছেন।”
—“এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।”
—“আপনি আপনার কাজের ব্যাপারে কী করছেন?”
—“অনেক কিছু।”
—“বাবাকে দেখানোর জন্য?”
—“তোমার জন্যও।”
বৃষ্টি মৃদু হেসে বলল,
—“আমার জন্য এত কিছু করার দরকার নেই।”
আকাশ বলল,
—“তুমি আমার জীবনের অংশ হতে চলেছ। তাহলে তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবব না?”
বৃষ্টি আর কিছু বলল না।
তার মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু এই শান্তি বেশি দিন থাকল না।
এক সন্ধ্যায় বৃষ্টির বাবা বাড়িতে ফিরে খুব গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন।
মা জিজ্ঞেস করলেন,
—“কী হয়েছে?”
তিনি বললেন,
—“নাবিলের বাবা ফোন করেছিলেন।”
বৃষ্টি পাশের ঘর থেকে কথাটা শুনে থেমে গেল।
মা বললেন,
—“কী বলেছেন?”
—“ওরা বলছে, আমরা বিয়ের ব্যাপারে কথা দিয়েছি। এখন পিছিয়ে আসাটা তাদের জন্য অপমানজনক।”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“কিন্তু মেয়ের মতামত?”
বাবা চুপ করে গেলেন।
তারপর বললেন,
—“আমি জানি। কিন্তু ব্যাপারটা এখন শুধু আমাদের পরিবারের মধ্যে নেই।”
সেদিন রাতেই বৃষ্টির বাবা তাকে ডাকলেন।
—“বৃষ্টি, বস।”
বৃষ্টি এসে বসল।
বাবা বললেন,
—“নাবিলের পরিবার আবার কথা বলেছে।”
বৃষ্টি মাথা নিচু করল।
—“আমি জানি।”
—“ওরা খুব অসন্তুষ্ট।”
বৃষ্টি শান্ত গলায় বলল,
—“আমি কাউকে অসম্মান করতে চাইনি।”
—“আমি জানি।”
বাবার গলা এবার আগের চেয়ে নরম।
—“কিন্তু একটা সম্পর্ক ভেঙে গেলে অনেক মানুষের মন খারাপ হয়।”
বৃষ্টি বলল,
—“আমার জীবনটা কি শুধু অন্যদের মন ভালো রাখার জন্য?”
বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।
বৃষ্টি ধীরে বলল,
—“আমি নাবিলকে অপমান করিনি। আমি শুধু বলেছি, আমি তাকে বিয়ে করতে পারব না।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“আমি বুঝি।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“তুই কি আকাশকে নিয়ে এতটাই নিশ্চিত?”
বৃষ্টি এবার বাবার চোখের দিকে তাকাল।
—“হ্যাঁ।”
পরদিন নাবিল নিজেই আকাশের সঙ্গে দেখা করতে চাইল।
আকাশ প্রথমে যেতে চাইছিল না।
কিন্তু নাবিল বলেছিল,
—“আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে। একবার দেখা করলে ভালো হয়।”
আকাশ শেষ পর্যন্ত রাজি হলো।
দুজন একটা নিরিবিলি জায়গায় বসেছিল।
নাবিল সরাসরি বলল,
—“আপনি কি বৃষ্টিকে সত্যিই ভালোবাসেন?”
আকাশ বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“আর বৃষ্টি?”
—“ওও আমাকে ভালোবাসে।”
নাবিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“আমি সেটা বুঝেছি।”
আকাশ অবাক হলো।
—“তাহলে?”
—“তাহলে আমার কিছু বলার নেই।”
আকাশ নীরব।
নাবিল বলল,
—“আমি শুধু চাই, আপনি ওকে সুখী রাখুন।”
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—“আপনি এত সহজে মেনে নিচ্ছেন?”
নাবিল মৃদু হাসল।
—“ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না।”
আকাশের মুখে স্বস্তি ফুটে উঠল।
কিন্তু নাবিল চলে যাওয়ার আগে একটা কথা বলল,
—“তবে একটা বিষয় মনে রাখবেন।”
—“কী?”
—“বৃষ্টির পরিবারকে কখনো এমন অবস্থায় ফেলবেন না, যাতে তারা মনে করে আপনাকে বেছে নিয়ে সে ভুল করেছে।”
আকাশ মাথা নেড়ে বলল,
—“আমি সেটা হতে দেব না।”
দুজন হাত মেলাল।
আকাশের মনে হলো, হয়তো বড় একটা বাধা সরে গেল।
কিন্তু সে জানত না, আসল সমস্যাটা অন্য জায়গায়।
কয়েকদিন পর আকাশের ব্যবসায় বড় একটা সমস্যা দেখা দিল।
যে কাজটার ওপর সে অনেকটা নির্ভর করছিল, সেটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
একসঙ্গে বেশ কিছু টাকা আটকে গেল।
আকাশ কাউকে কিছু বলল না।
বৃষ্টিকেও না।
সে জানত, এই খবর বৃষ্টির বাবার কানে গেলে তার ওপর আবার সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
দিনের পর দিন সে দৌড়াতে লাগল।
ব্যাংক।
অফিস।
ক্লায়েন্ট।
আইনি কাগজপত্র।
সবকিছু সামলাতে গিয়ে তার সময়ের অভাব হতে লাগল।
বৃষ্টির ফোনও ঠিকমতো ধরতে পারছিল না।
প্রথম দিন বৃষ্টি ভেবেছিল আকাশ ব্যস্ত।
দ্বিতীয় দিনও।
তৃতীয় দিন সে ফোন করে বলল,
—“আপনি আমার ফোন ধরছেন না কেন?”
আকাশ ক্লান্ত গলায় বলল,
—“কাজের একটু সমস্যা হয়েছে।”
—“কী সমস্যা?”
—“কিছু না।”
—“আপনি আমাকে বলছেন না কেন?”
—“সব ঠিক হয়ে যাবে।”
বৃষ্টি চুপ করে গেল।
—“আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করেন না?”
আকাশ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“এমন কথা বলো না।”
—“তাহলে সবকিছু লুকাচ্ছেন কেন?”
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“আমি চাই না তোমাকে এসব নিয়ে চিন্তা করতে হোক।”
বৃষ্টি ধীরে বলল,
—“আমি যদি তোমার জীবনের মানুষ হতে চাই, তাহলে শুধু ভালো সময়ের কথা শুনব কেন?”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
বৃষ্টির কথাটা তার মনে গভীরভাবে লাগল।
—“ঠিক আছে। সব বলব।”
সেদিন রাতে সে সবকিছু বৃষ্টিকে জানাল।
বৃষ্টি মন দিয়ে শুনল।
তারপর বলল,
—“আপনি একা কেন সব সামলাচ্ছেন?”
—“কারণ আমাকে পারতেই হবে।”
—“আমি তো আছি।”
আকাশের গলা নরম হয়ে গেল।
—“জানি।”
—“তাহলে ভয় পাবেন না।”
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—“তোমার এই একটা কথাই অনেক।”
কিন্তু আকাশের সমস্যার খবর কোনোভাবে বৃষ্টির বাবার কাছেও পৌঁছে গেল।
তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
তার মনে আবার পুরোনো প্রশ্ন ফিরে এল—
“এই ছেলেটা কি সত্যিই বৃষ্টির দায়িত্ব নিতে পারবে?”
তিনি আকাশকে ডেকে পাঠালেন।
আকাশ এসে বসতেই বাবা বললেন,
—“তোমার ব্যবসায় সমস্যা হয়েছে?”
আকাশ মাথা নিচু করল।
—“হ্যাঁ।”
—“কতটা বড়?”
আকাশ সব খুলে বলল।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“আমি তোমাকে খারাপ ছেলে মনে করি না। কিন্তু আমি আমার মেয়েকে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিতে চাই না।”
আকাশ বলল,
—“আমি বুঝতে পারছি।”
—“তাহলে তুমি কী করতে চাও?”
—“সমস্যাটা সমাধান করব।”
—“কতদিন লাগবে?”
—“জানি না।”
বাবা বললেন,
—“বৃষ্টির বিয়ে নিয়ে আমাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
আকাশের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—“আপনি কি আবার নাবিলের কথা ভাবছেন?”
বাবা সরাসরি উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
—“আমি একজন বাবা। আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাকে ভাবতেই হবে।”
আকাশ উঠে দাঁড়াল।
—“আপনার ভাবার অধিকার আছে। কিন্তু বৃষ্টির সিদ্ধান্তটাও যেন হারিয়ে না যায়।”
বাবা বললেন,
—“আমি তোমাকে আরও কিছুদিন সময় দিচ্ছি।”
আকাশ মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।
সেদিন রাতে বৃষ্টি বাবার সঙ্গে কথা বলল।
—“আপনি কি আবার নাবিলের কথা ভাবছেন?”
বাবা চুপ করে ছিলেন।
বৃষ্টি বুঝে গেল।
তার চোখে পানি চলে এল।
—“বাবা, আপনি তো আমাকে সময় দিয়েছিলেন।”
—“আমি সময় দিয়েছি।”
—“তাহলে?”
—“আকাশের সমস্যা হয়েছে।”
—“সমস্যা হয়েছে মানেই সে খারাপ হয়ে যায়নি।”
বাবা বললেন,
—“সংসার শুধু ভালোবাসা দিয়ে চলে না।”
বৃষ্টি শান্ত গলায় বলল,
—“আমি জানি। তাই তো আমি এমন একজন মানুষ চাই, যে সমস্যার সময় পালিয়ে যাবে না।”
বাবা কিছু বললেন না।
বৃষ্টি উঠে চলে গেল।
সেই রাতে আকাশের ফোনে একটা মেসেজ এল।
বৃষ্টি লিখেছে—
“যাই হোক না কেন, আমি তোমার পাশে আছি।”
আকাশ অনেকক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর উত্তর দিল—
“তাহলে আমিও শেষ পর্যন্ত লড়ব।”
এক মাস।
মাত্র ত্রিশটা দিন।
এই ত্রিশ দিনের মধ্যেই আকাশকে নিজের কাজের সমস্যা সমাধান করতে হবে। শুধু তাই নয়, বৃষ্টির বাবাকে বোঝাতে হবে যে সে সত্যিই বৃষ্টির ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত।
সময়টা আকাশের কাছে হঠাৎ খুব ছোট মনে হলো।
আগে যে কাজগুলো ধীরে করত, এখন সেগুলো দ্রুত শেষ করতে হচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিসে ছুটছে সে। কখনো ক্লায়েন্টের সঙ্গে দেখা, কখনো ব্যাংকে কাজ, কখনো নতুন পরিকল্পনা।
বৃষ্টি সবকিছু জানত।
তবু সে আকাশকে বাড়তি চাপ দিতে চাইত না।
প্রতিদিন রাতে শুধু একটা ফোন করত।
—“আজ কেমন গেল?”
আকাশ ক্লান্ত গলায় বলত,
—“ভালো।”
—“সত্যি?”
—“হুম।”
—“মিথ্যা বলছেন না তো?”
আকাশ হেসে বলত,
—“না। তবে আজও পুরোপুরি সমাধান হয়নি।”
বৃষ্টি বলত,
—“হবে।”
—“তুমি এত নিশ্চিত কীভাবে?”
—“কারণ আপনি চেষ্টা করছেন।”
এই কথাটা আকাশকে প্রতিদিন নতুন করে শক্তি দিত।
দিনগুলো দ্রুত চলে যাচ্ছিল।
প্রথম সপ্তাহে আকাশ একটা নতুন ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ শুরু করল।
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল।
কিন্তু হঠাৎ সেই কাজটাও আটকে গেল।
আকাশ বুঝতে পারল, শুধু ভাগ্যের ওপর বসে থাকলে হবে না।
সে নিজের ব্যবসার পদ্ধতি বদলানোর সিদ্ধান্ত নিল।
নতুন একজন অংশীদারের সঙ্গে কথা বলল।
নিজের পুরোনো পরিচিতদের সাহায্য নিল।
যে কাজগুলো আগে অন্যদের ওপর ছেড়ে দিত, এবার নিজেই সবকিছু দেখল।
এক রাতে প্রায় বারোটা পর্যন্ত অফিসে বসে ছিল।
রাফি পাশে বসে বলল,
—“তুই এত কষ্ট করছিস কেন?”
আকাশ চুপ করে কাজ করতে করতে বলল,
—“কারণ এবার শুধু আমার ভবিষ্যৎ না।”
রাফি বুঝতে পারল।
—“বৃষ্টি?”
আকাশ মৃদু হাসল।
—“হ্যাঁ।”
অন্যদিকে বৃষ্টির বাড়িতেও চাপ বাড়ছিল।
বিয়ের ব্যাপারে নাবিলের পরিবার আবার যোগাযোগ করছিল।
বৃষ্টির বাবা কোনো উত্তর দিচ্ছিলেন না।
কিন্তু বৃষ্টি বুঝতে পারছিল, বাবার মন এখনও দ্বিধায়।
একদিন মা এসে বললেন,
—“তোর বাবা খুব চিন্তায় আছে।”
বৃষ্টি বলল,
—“আমি জানি।”
—“তুই কি আকাশের ব্যাপারে নিশ্চিত?”
বৃষ্টি মায়ের হাত ধরে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“যদি ওর কাজের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান না হয়?”
বৃষ্টি একটু থেমে বলল,
—“তাহলে আমরা একসঙ্গে সমাধান করব।”
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
—“তুই সত্যিই বড় হয়ে গেছিস।”
বৃষ্টি মাথা নিচু করে হাসল।
দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষে আকাশ একটা বড় সুযোগ পেল।
একটা প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি তার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কাজ করতে রাজি হলো।
তবে শর্ত ছিল—আগের সমস্যাগুলো পুরোপুরি সমাধান করতে হবে।
আকাশ দিনরাত পরিশ্রম করতে লাগল।
রাফি বলল,
—“এই কাজটা হয়ে গেলে তোর অনেক সমস্যা মিটে যাবে।”
আকাশ বলল,
—“শুধু আমার না। আরও একটা মানুষেরও।”
রাফি হেসে বলল,
—“তুই সত্যিই বদলে গেছিস।”
আকাশ বলল,
—“হয়তো।”
তৃতীয় সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও কঠিন হলো।
হঠাৎ আকাশের পুরোনো একটা দেনা সামনে এল।
টাকার অঙ্কটা ছোট ছিল না।
আকাশের হাতে তখন পর্যাপ্ত টাকা নেই।
সে বাড়িতে কিছু বলতে চাইল না।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার বাবা জানতে পারলেন।
—“তুই আমাকে বলিসনি কেন?”
আকাশ মাথা নিচু করে বলল,
—“ভাবছিলাম নিজেই সামলাব।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“সবকিছু একা সামলাতে হয় না।”
আকাশ চুপ করে রইল।
বাবা বললেন,
—“তুই যদি সত্যিই নিজের জীবন গড়তে চাস, সাহায্য নিতে লজ্জা পাবি না।”
আকাশ বাবার দিকে তাকাল।
—“আপনি আমাকে সাহায্য করবেন?”
—“আমি তোকে সাহায্য করব। কিন্তু মনে রাখিস, তোর পথটা তোকে নিজেকেই হাঁটতে হবে।”
আকাশ বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
অনেকদিন পর তার মনে হলো, সে একা নয়।
এর মধ্যে বৃষ্টির সঙ্গে আকাশের দেখা করার সুযোগ হলো।
দুজন একটা পার্কের বেঞ্চে বসেছিল।
বৃষ্টি আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আপনি অনেক ক্লান্ত।”
আকাশ হেসে বলল,
—“কাজ করছি তো।”
—“শুধু কাজ?”
আকাশ বৃষ্টির দিকে তাকাল।
—“আর তোমাকে পাওয়ার চেষ্টা করছি।”
বৃষ্টি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—“আপনি যদি আমাকে না-ও পান?”
আকাশ অবাক হয়ে বলল,
—“এই কথা কেন বলছ?”
—“ভয় লাগে।”
আকাশ ধীরে বলল,
—“আমারও ভয় লাগে।”
বৃষ্টি তার দিকে তাকাল।
—“আপনার?”
—“হ্যাঁ। কিন্তু ভয় পেলেই কি থেমে যাব?”
বৃষ্টি মাথা নাড়ল।
—“না।”
আকাশ বলল,
—“তুমিও থামবে না।”
বৃষ্টি মৃদু হাসল।
দুজন কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল।
তাদের মধ্যে কোনো বড় কথা হচ্ছিল না।
তবু দুজনেই বুঝতে পারছিল—এই নীরবতাটাও অনেক কিছু বলছে।
চতুর্থ সপ্তাহ শুরু হলো।
আকাশের কাজ প্রায় ঠিক হয়ে এসেছে।
কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির শেষ কিছু কাগজপত্র বাকি।
পুরোনো দেনাটাও মিটিয়ে ফেলেছে সে।
এবার শুধু চূড়ান্ত অনুমোদন।
কিন্তু ঠিক তখনই একটা সমস্যা হলো।
কোম্পানির প্রধান ব্যক্তি বিদেশে চলে গেলেন।
চুক্তি সই পিছিয়ে গেল।
আকাশের হাতে সময় মাত্র কয়েকদিন।
বৃষ্টির বাবা এর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
আকাশ রীতিমতো ভেঙে পড়েছিল।
সে অফিসের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
রাফি এসে বলল,
—“হাল ছাড়বি?”
আকাশ মাথা নাড়ল।
—“না।”
—“তাহলে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
আকাশ বলল,
—“ভাবছি।”
—“কী?”
—“যদি সময়মতো না হয়?”
রাফি বলল,
—“তুই যতদূর এসেছিস, সেটা ভুলে যাচ্ছিস?”
আকাশ কিছু বলল না।
রাফি তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
—“তুই একটা সম্পর্কের জন্য নিজের জীবনটা বদলে ফেলেছিস। এবার শেষটাও তোর মতো কর।”
আকাশ উঠে দাঁড়াল।
—“ঠিক বলেছিস।”
সেদিন রাতেই আকাশ বৃষ্টিকে ফোন করল।
—“ঘুমাচ্ছ?”
—“না।”
—“আমি হয়তো আগামী দুই দিনের মধ্যে সব ঠিক করতে পারব।”
বৃষ্টির গলায় আনন্দ।
—“সত্যি?”
—“চেষ্টা করছি।”
—“আমি জানতাম পারবেন।”
আকাশ হেসে বলল,
—“তুমি এত বিশ্বাস করো কেন আমাকে?”
বৃষ্টি ধীরে বলল,
—“কারণ আপনি আমাকে কখনো মিথ্যা আশা দেননি।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“বৃষ্টি?”
—“হুম?”
—“যদি সব ঠিক হয়ে যায়, আমি তোমার বাবার কাছে আবার যাব।”
—“এইবার কী বলবেন?”
—“বলব, আমি প্রস্তুত।”
বৃষ্টি হাসল।
—“আর আমি বাবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকব।”
পরদিন আকাশের কাছে খবর এল—
চুক্তি সই হবে।
তার সব সমস্যা ধীরে ধীরে মিটে যাচ্ছে।
সে সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিকে ফোন করল।
—“বৃষ্টি!”
—“কী হয়েছে?”
—“হয়ে গেছে।”
—“কী?”
—“চুক্তি হয়ে গেছে।”
বৃষ্টি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর আনন্দে বলল,
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
বৃষ্টির চোখে পানি এসে গেল।
—“আমি জানতাম।”
আকাশ হেসে বলল,
—“এবার তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলার পালা।”
সেদিন সন্ধ্যায় আকাশ বৃষ্টির বাবার সামনে আবার দাঁড়াল।
বাবা সব শুনলেন।
কাজের চুক্তি।
পুরোনো দেনা পরিশোধ।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
সবকিছু।
তারপর আকাশ বলল,
—“আমি জানি, এক মাসে মানুষ পুরোপুরি বদলে যায় না। কিন্তু আপনি আমাকে একটা সুযোগ দিয়েছিলেন। আমি চেষ্টা করেছি সেই সুযোগের মর্যাদা রাখতে।”
বৃষ্টির বাবা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“তুমি আমার মেয়েকে সুখী রাখতে পারবে?”
আকাশ বলল,
—“আমি চেষ্টা করব। আর ওকে কখনো একা সিদ্ধান্তের বাইরে রাখব না।”
বাবা ধীরে মাথা নাড়লেন।
—“আমি তোমার ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না এখনও।”
আকাশের মুখ কিছুটা ম্লান হলো।
কিন্তু পরের কথাটা শুনে সে অবাক হয়ে গেল।
—“তবে আমি তোমাদের বিয়েতে আর বাধা দেব না।”
আকাশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।
তারপর মাথা নিচু করে বলল,
—“ধন্যবাদ।”
বৃষ্টির বাবা মৃদু গলায় বললেন,
—“একটা কথা মনে রেখো। আমার মেয়েকে শুধু ভালোবাসবে না। সম্মান করবে।”
আকাশ বলল,
—“আমি কথা দিচ্ছি।”
বৃষ্টিকে খবরটা দেওয়া হলো।
সে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।
—“ধন্যবাদ বাবা।”
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—“তুই সুখী হোস।”
বৃষ্টি চোখের পানি মুছে হাসল।
তারপর ফোন হাতে নিয়ে আকাশকে কল করল।
ফোন ধরতেই সে কিছু বলতে পারল না।
আকাশ হাসতে হাসতে বলল,
—“কাঁদছ?”
বৃষ্টি বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
—“বাবা রাজি হয়েছে।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“তাহলে এবার সত্যিই তুমি আমার জীবনের মানুষ হতে চলেছ।”
বৃষ্টি মৃদু হেসে বলল,
—“আমি তো অনেক আগেই হয়ে গেছি।”
আকাশের মুখে বড় একটা হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু তাদের বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হওয়ার আগেই আরেকটা অপ্রত্যাশিত খবর এলো।
বৃষ্টির বাবা জানালেন—
বিয়েটা যত দ্রুত সম্ভব করতে হবে।
কারণ তিনি চান না, নতুন কোনো ঝামেলা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকুক।
বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, বৃষ্টির বাড়িতে ততই ব্যস্ততা বাড়ছিল।
কয়েক সপ্তাহ আগেও যে বাড়িতে দুশ্চিন্তার পরিবেশ ছিল, এখন সেখানে আনন্দের ব্যস্ততা।
ঘরের সামনে আলো লাগানো হয়েছে।
আত্মীয়রা আসতে শুরু করেছে।
মা আর খালারা বিয়ের শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা নিয়ে ব্যস্ত।
মিতু সারাক্ষণ বৃষ্টির ঘরে ঢুকছে আর বের হচ্ছে।
কিন্তু এত আনন্দের মাঝেও বৃষ্টি বারবার একটা কথাই ভাবছিল—
সত্যিই কি এত বাধার পর শেষ পর্যন্ত আকাশকে পাওয়া সম্ভব হলো?
সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
মিতু এসে পেছন থেকে বলল,
—“আপু!”
বৃষ্টি চমকে ফিরে তাকাল।
—“কী?”
—“কাল তোমার বিয়ে।”
বৃষ্টি মৃদু হেসে বলল,
—“জানি।”
—“তোমার ভয় করছে?”
বৃষ্টি কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—“একটু।”
—“কেন?”
—“জীবন বদলে যাচ্ছে।”
মিতু হেসে বলল,
—“যার সঙ্গে এতদিন কথা বলেছ, তার সঙ্গেই তো যাচ্ছ।”
বৃষ্টি মাথা নিচু করে হাসল।
—“সেটাই তো ভাবছি।”
অন্যদিকে আকাশও নিজের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
তার মা বারবার জামাকাপড় দেখছেন।
কোনটা পরবে, কীভাবে যাবে—সবকিছু নিয়ে আলোচনা।
রাফি এসে বলল,
—“ভাই, কাল কিন্তু তোর বিয়ে!”
আকাশ হেসে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“বিশ্বাস হচ্ছে?”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“না।”
রাফি হেসে বলল,
—“যে মেয়েকে প্রথম দেখার পর নামও জানতিস না, আজ তাকে বিয়ে করতে যাচ্ছিস।”
আকাশও হেসে ফেলল।
—“জীবন কখন কী করে, কেউ জানে না।”
রাফি বলল,
—“প্রথম দিন তোকে দেখে মনে হয়েছিল তুই শুধু একটা মেয়েকে দেখেছিস। এখন বুঝছি, তুই নিজের ভবিষ্যৎ দেখেছিলি।”
আকাশ মাথা নাড়ল।
—“হয়তো।”
সন্ধ্যায় আকাশ আর বৃষ্টির ফোনে কথা হলো।
বৃষ্টি বলল,
—“কাল দেখা হবে।”
আকাশ হেসে বলল,
—“কাল তো সারাদিনই তোমাকে দেখতে পাব।”
—“তবুও।”
—“তবুও কী?”
বৃষ্টি একটু চুপ করে বলল,
—“আজ শেষবারের মতো আমি বাবার বাড়িতে একা ঘুমাব।”
আকাশের গলা নরম হয়ে গেল।
—“ভয় লাগছে?”
—“হ্যাঁ।”
—“আমারও।”
বৃষ্টি অবাক হয়ে বলল,
—“আপনারও?”
—“হ্যাঁ। এতদিন তোমাকে পাওয়ার জন্য লড়েছি। এখন মনে হচ্ছে, তোমাকে ভালো রাখার দায়িত্বটা আরও বড়।”
বৃষ্টি ধীরে বলল,
—“আপনি পারবেন।”
—“তুমি পাশে থাকলে পারব।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
তারপর বৃষ্টি বলল,
—“আকাশ?”
—“হুম?”
—“প্রথম দিন আমাকে দেখার পর সত্যিই কি আমার কথা মনে ছিল?”
আকাশ হেসে বলল,
—“শুধু মনে ছিল না। তোমাকে খুঁজেছি।”
—“এতটা?”
—“হ্যাঁ।”
বৃষ্টি মৃদু হেসে বলল,
—“আমি কিন্তু সেদিন আপনাকে এতটা মনে রাখিনি।”
আকাশ ভান করে কষ্ট পাওয়ার গলায় বলল,
—“বাহ!”
বৃষ্টি হেসে ফেলল।
—“তবে দ্বিতীয়বার যখন দেখেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল আপনাকে আগে কোথাও দেখেছি।”
—“তারপর?”
—“তারপর আপনার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করেছিল।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—“আমার জন্য সেটাই যথেষ্ট।”
কিন্তু ঠিক সেই রাতেই একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল।
বৃষ্টির বাবা একটা ফোন পেলেন।
ফোনটা করেছিলেন নাবিলের বাবা।
বৃষ্টির বাবা কিছুক্ষণ কথা বলার পর ফোন রেখে দিলেন।
তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
মা জিজ্ঞেস করলেন,
—“কী হয়েছে?”
তিনি বললেন,
—“ওরা আবার একটা কথা বলেছে।”
—“কী?”
—“ওরা বলছে, বৃষ্টির সঙ্গে নাবিলের বিয়ের কথা আগে ঠিক হয়েছিল। এখন যদি বৃষ্টি অন্য কাউকে বিয়ে করে, তাহলে তারা সামাজিকভাবে বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।”
মা বললেন,
—“এখনও এসব?”
বাবা কিছু বললেন না।
তিনি বুঝতে পারছিলেন, নাবিলের পরিবার বিষয়টা সহজে ছেড়ে দিতে চাইছে না।
পরদিন সকাল।
বৃষ্টির গায়ে হলুদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
বাড়িতে হাসি-আনন্দ।
বৃষ্টি হলুদ শাড়ি পরে ঘরে বসে আছে।
সবাই তাকে ঘিরে ব্যস্ত।
কেউ ছবি তুলছে।
কেউ হাসছে।
কেউ গান গাইছে।
কিন্তু বৃষ্টির চোখ বারবার ফোনের দিকে।
আকাশের একটা মেসেজ এসেছে।
“আজ তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।”
বৃষ্টি উত্তর দিল,
“আর কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করুন।”
আকাশ লিখল,
“এই কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে লম্বা মনে হচ্ছে।”
বৃষ্টি ফোনটা বুকে চেপে ধরে মৃদু হাসল।
দুপুরের দিকে আকাশের বাড়িতে বরযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হলো।
আকাশের মা ছেলের কপালে হাত রেখে বললেন,
—“খুব ভালো থাকিস।”
আকাশ মায়ের হাত ধরে বলল,
—“আপনি বৃষ্টিকে নিজের মেয়ের মতো রাখবেন তো?”
মা মৃদু হেসে বললেন,
—“তুই চিন্তা করিস না।”
আকাশের চোখ ভিজে উঠল।
বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টির বাবা তাকে নিজের ঘরে ডাকলেন।
বৃষ্টি গিয়ে দাঁড়াল।
বাবা কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“তুই কি সুখী?”
বৃষ্টি অবাক হয়ে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“নিশ্চিত?”
—“হ্যাঁ বাবা।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“আমি হয়তো শুরুতে ভুল বুঝেছিলাম।”
বৃষ্টি বাবার কাছে গিয়ে বসে পড়ল।
—“আপনি শুধু আমার ভালো চেয়েছেন।”
বাবা বললেন,
—“কিন্তু কখনো কখনো সন্তানকে নিরাপদ রাখতে গিয়ে আমরা তার নিজের কথাটা শুনতে ভুলে যাই।”
বৃষ্টির চোখে পানি এসে গেল।
—“আমি আপনাকে কখনো দোষ দিইনি।”
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
—“আকাশ ভালো ছেলে। আমি এখন সেটা বুঝেছি।”
বৃষ্টি হাসল।
—“আপনি আজ এই কথাটা বললেন, এটাই আমার সবচেয়ে বড় উপহার।”
বাবা বললেন,
—“তুই সুখী হোস।”
সন্ধ্যায় বরযাত্রা রওনা হলো।
আকাশ গাড়িতে বসে ছিল।
তার হাতের মুঠোয় একটা ছোট্ট কাগজ।
সেখানে বৃষ্টির জন্য কয়েকটা কথা লিখেছিল।
রাফি পাশে বসে বলল,
—“কী লিখেছিস?”
—“ওকে দেব।”
—“আমাদের সামনে পড়তে হবে।”
—“কখনো না।”
রাফি হাসল।
বৃষ্টির বাড়িতে তখন সবাই বরযাত্রার অপেক্ষায়।
হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
মিতু দৌড়ে এসে বলল,
—“আপু! ওরা এসেছে!”
বৃষ্টির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—“আকাশ…”
বরযাত্রা বাড়িতে ঢুকল।
আকাশ গাড়ি থেকে নামল।
চারপাশে আলো, মানুষ, হাসি।
কিন্তু এত মানুষের মাঝেও তার চোখ শুধু একজনকেই খুঁজছিল।
বৃষ্টি।
কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি সবার সঙ্গে ঘরে এল।
আকাশের চোখ তার ওপর গিয়ে থেমে গেল।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
কয়েক মাসের অপেক্ষা, ভয়, কান্না, ঝগড়া, ভুল বোঝাবুঝি—সব যেন সেই এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।
আকাশ মৃদু হাসল।
বৃষ্টিও হাসল।
কিন্তু ঠিক তখনই বাইরে একটা গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নাবিলের বাবা নামলেন।
বৃষ্টির বাবা তাকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন।
তিনি এগিয়ে গিয়ে বললেন,
—“আপনি এখানে কেন?”
নাবিলের বাবা শান্ত গলায় বললেন,
—“একটা শেষ কথা বলতে এসেছি।”
বৃষ্টির বাবা গম্ভীর হয়ে গেলেন।
—“কী কথা?”
—“আপনার মেয়ের বিয়ের আগে একটা সত্যি জানা দরকার।”
আকাশও দূর থেকে বিষয়টা লক্ষ্য করছিল।
নাবিলের বাবা একটা খাম বের করলেন।
—“এই কাগজগুলো দেখুন।”
বৃষ্টির বাবা খামটা হাতে নিলেন।
কাগজগুলো খুলে তার মুখের ভাব বদলে গেল।
আকাশ কিছু বুঝতে পারছিল না।
বৃষ্টি দূর থেকে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পর বাবা ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকালেন।
তার চোখে আবার সেই পুরোনো কঠোরতা ফিরে এসেছে।
আকাশের বুক কেঁপে উঠল।
বৃষ্টি বুঝতে পারল—
বিয়ের ঠিক আগের মুহূর্তে আবারও তাদের সামনে নতুন কোনো বিপদ এসে দাঁড়িয়েছে।
নাবিলের বাবা যে খামটা বৃষ্টির বাবার হাতে দিয়েছিলেন, সেটার ভেতরের কাগজগুলো দেখে ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল।
কিছুক্ষণ আগেও যেখানে বিয়ের আনন্দ, হাসি আর মানুষের কোলাহল ছিল, সেখানে হঠাৎ একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল।
বৃষ্টির বাবা একের পর এক কাগজ দেখছিলেন।
আকাশ দূর থেকে সবকিছু দেখছিল।
তার কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।
অবশেষে সে এগিয়ে এসে বলল,
—“আঙ্কেল, কী হয়েছে?”
বৃষ্টির বাবা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।
নাবিলের বাবা বললেন,
—“আপনার মেয়েকে বিয়ে করার আগে ছেলেটার সম্পর্কে পুরো সত্যিটা জানা দরকার।”
আকাশ অবাক হয়ে তাকাল।
—“কোন সত্যি?”
নাবিলের বাবা একটা কাগজ সামনে ধরলেন।
—“তোমার ব্যবসার পুরোনো দেনার কাগজ।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“এগুলো পুরোনো কাগজ। সব দেনা আমি পরিশোধ করেছি।”
নাবিলের বাবা বললেন,
—“সব?”
—“হ্যাঁ।”
বৃষ্টির বাবা এবার আকাশের দিকে তাকালেন।
—“তুমি আমাকে এটা বলোনি।”
আকাশ মাথা নিচু করল।
—“আমি বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সবকিছু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আপনাকে চিন্তায় ফেলতে চাইনি।”
নাবিলের বাবা বললেন,
—“আর একটা বিষয় আছে।”
তিনি আরও কিছু কাগজ বের করলেন।
—“তোমার ব্যবসার একটা চুক্তি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।”
আকাশ শান্তভাবে বলল,
—“চুক্তির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। বাকি অংশও ঠিক হয়ে যাবে।”
—“মানে এখনো নিশ্চিত না।”
আকাশ বলল,
—“না, পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কিন্তু আমি কাজটা এগিয়ে নিচ্ছি।”
বৃষ্টির বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তারপর বললেন,
—“আমি তোমার ওপর বিশ্বাস করেছিলাম।”
আকাশের বুকটা ভারী হয়ে গেল।
—“আপনি চাইলে আমি সব কাগজ দেখাতে পারি।”
—“আমি এখন আর কাগজ দেখতে চাই না।”
বৃষ্টি এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে এবার বাবার কাছে গিয়ে বলল,
—“বাবা, আপনি কি আবার আমাকে আকাশের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেবেন?”
বাবা মেয়ের দিকে তাকালেন।
তার চোখেও দ্বিধা।
—“আমি তোকে কষ্ট দিতে চাই না।”
বৃষ্টি বলল,
—“তাহলে আমাকে আমার সিদ্ধান্ত নিতে দিন।”
নাবিলের বাবা বললেন,
—“আপনি আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।”
বৃষ্টি এবার প্রথমবারের মতো তার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
—“আমি আবেগ দিয়ে নয়, অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
ঘরে থাকা সবাই চুপ করে গেল।
আকাশ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুমি চাইলে এখনো পিছিয়ে যেতে পারো।”
বৃষ্টি অবাক হয়ে তাকাল।
—“আপনি কী বলছেন?”
—“তোমার বাবার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক যেন নষ্ট না হয়। আমি চাই না তুমি আমার জন্য পরিবার হারাও।”
বৃষ্টির চোখে পানি চলে এল।
—“আপনি কি মনে করেন এতদিন আমি শুধু আপনার জন্য লড়েছি?”
আকাশ চুপ করে রইল।
বৃষ্টি বলল,
—“আমি নিজের জন্যও লড়েছি। কারণ আমি জানি, আমি কাকে আমার জীবনের মানুষ হিসেবে চাই।”
আকাশ কিছু বলতে পারল না।
বৃষ্টি বাবার দিকে ফিরে বলল,
—“আপনি আমাকে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছেন, সত্যি কথা বলতে। আজ আমি সত্যিটাই বলছি। আমি আকাশকে বিয়ে করতে চাই।”
বাবার চোখ ভিজে উঠল।
নাবিলের বাবা আবার বললেন,
—“আপনি চাইলে এখনো সময় আছে।”
বৃষ্টির বাবা এবার তার দিকে তাকালেন।
—“না।”
সবাই অবাক হয়ে গেল।
তিনি ধীরে বললেন,
—“আমি আমার মেয়ের সিদ্ধান্তকে সম্মান করব।”
নাবিলের বাবা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন।
বৃষ্টির বাবা হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।
—“আপনাদের সঙ্গে যে সম্পর্কের কথা হয়েছিল, সেটা আমার ভুল ছিল। তখন আমি ভেবেছিলাম মেয়ের জন্য নিরাপদ একটা ভবিষ্যৎ বেছে নিচ্ছি। কিন্তু এখন বুঝেছি, নিরাপত্তা আর সুখ সবসময় একই জিনিস নয়।”
বৃষ্টি বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
বাবা এবার আকাশের দিকে তাকালেন।
—“তবে তোমার জন্যও একটা কথা আছে।”
আকাশ এগিয়ে এল।
—“জি।”
—“আমি তোমাকে বিশ্বাস করছি। কিন্তু আমার মেয়েকে শুধু ভালোবাসলেই হবে না। তোমাকে প্রতিদিন এই বিশ্বাসটা ধরে রাখতে হবে।”
আকাশ মাথা নত করে বলল,
—“আমি কথা দিচ্ছি।”
বাবা বললেন,
—“তাহলে যাও। বিয়ের আয়োজন শুরু হয়েছে, আর সবাই তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”
বৃষ্টির চোখ দিয়ে আনন্দের পানি গড়িয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হলো।
চারপাশে আলো।
আত্মীয়দের হাসি।
বিয়ের আয়োজন।
কিন্তু আকাশ আর বৃষ্টির কাছে সবকিছু যেন ধীরে ধীরে ঘটছিল।
তারা এতদিন যে মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করেছে, সেটা সত্যিই এসে গেছে।
বৃষ্টি যখন বিয়ের আসনে এসে বসল, তার চোখে একটু ভয় ছিল।
আকাশ সেটা লক্ষ্য করল।
মৃদু গলায় বলল,
—“ভয় পাচ্ছ?”
বৃষ্টি খুব আস্তে বলল,
—“একটু।”
—“আমি আছি।”
বৃষ্টি তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—“জানি।”
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো।
দুজন নতুন জীবনের পথে পা রাখল।
বিদায়ের সময় বৃষ্টি বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল।
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—“সুখী হোস।”
বৃষ্টি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“আপনি আমার ওপর রাগ করবেন না তো?”
বাবা হেসে বললেন,
—“তুই তো আমার মেয়েই থাকবি।”
আকাশ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
বৃষ্টির বাবা তাকে কাছে ডাকলেন।
—“আকাশ।”
—“জি।”
—“আমার মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছ। একটা কথা মনে রেখো।”
—“বলুন।”
—“ও হাসলে আমিও হাসব। ও কাঁদলে আমি শান্তিতে থাকতে পারব না।”
আকাশ মাথা নেড়ে বলল,
—“আমি ওকে হাসানোর চেষ্টা করব।”
বাবা তার কাঁধে হাত রাখলেন।
—“তাহলে যাও।”
গাড়ি চলতে শুরু করল।
বৃষ্টি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
বাবার বাড়ি ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল।
আকাশ তার পাশে বসে ছিল।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর আকাশ বলল,
—“কী ভাবছ?”
বৃষ্টি বলল,
—“ভাবছি, আমাদের গল্পটা কতবার শেষ হয়ে যেতে বসেছিল।”
আকাশ হেসে বলল,
—“কিন্তু শেষ হয়নি।”
—“হয়নি।”
—“কারণ?”
বৃষ্টি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—“কারণ আমরা দুজনেই ছেড়ে দিইনি।”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“তুমি জানো, প্রথম দিন তোমাকে দেখার পর আমি শুধু তোমার নামটা জানতে চেয়েছিলাম।”
—“আর এখন?”
আকাশ হাসল।
—“এখন তোমার পুরো জীবনটা জানতে চাই।”
বৃষ্টি হেসে ফেলল।
—“আমার জীবন তো এখন আপনার সঙ্গেই।”
আকাশ বলল,
—“আর তোমার জীবনটা ভালো রাখার দায়িত্ব আমার।”
বৃষ্টি মাথা নেড়ে বলল,
—“একটা কথা মনে রাখবেন।”
—“কী?”
—“দায়িত্ব শুধু আপনার না। আমিও আপনার পাশে থাকব।”
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কয়েক মাস পর।
বৃষ্টির পড়াশোনা আবার শুরু হয়েছে।
আকাশের কাজও ধীরে ধীরে ভালো অবস্থায় এসেছে।
দুজনের জীবনে ছোটখাটো ঝগড়া হয়।
কখনো ভুল বোঝাবুঝি হয়।
কখনো একজন আরেকজনের ওপর রাগ করে।
কিন্তু তারা কথা বলা বন্ধ করে না।
কারণ তারা জানে, সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু ভালোবাসা নয়—
একসঙ্গে সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা।
এক সন্ধ্যায় বৃষ্টি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের জন্য অপেক্ষা করছিল।
আকাশ দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই বৃষ্টি বলল,
—“এত দেরি হলো কেন?”
আকাশ বলল,
—“কাজ ছিল।”
বৃষ্টি ভান করে রাগ দেখাল।
—“সবসময় কাজ।”
আকাশ কাছে এসে হেসে বলল,
—“আজ কিন্তু তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।”
—“কী?”
আকাশ একটা ছোট বাক্স এগিয়ে দিল।
বৃষ্টি খুলে দেখল, ভেতরে একটা ছোট্ট নীল পাথরের লকেট।
—“এটা কেন?”
আকাশ বলল,
—“মনে আছে, প্রথম দিন তোমাকে দেখে কী বলেছিলাম?”
বৃষ্টি হেসে বলল,
—“আকাশ আর বৃষ্টি।”
—“হ্যাঁ।”
বৃষ্টি লকেটটা হাতে নিয়ে বলল,
—“আমাদের গল্পটা সত্যিই অদ্ভুত।”
আকাশ বলল,
—“অদ্ভুত না। সুন্দর।”
বৃষ্টি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল হঠাৎ।”
—“হ্যাঁ।”
—“তারপর হারিয়ে গিয়েছিলাম।”
—“আবার খুঁজে পেয়েছি।”
—“তারপর কত বাধা।”
—“সব পেরিয়েছি।”
বৃষ্টি মৃদু হেসে বলল,
—“তাহলে আমাদের গল্পের নাম কী হবে?”
আকাশ কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—“যে গল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেটা যদি শেষ না হয়?”
বৃষ্টি হেসে বলল,
—“তাহলে?”
আকাশ বলল,
—“তাহলে সেটাই তো সত্যিকারের গল্প।”
বৃষ্টি জানালার বাইরে তাকাল।
আকাশ পাশে এসে দাঁড়াল।
শহরের আলো তখন একে একে জ্বলছিল।
দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল।
কোনো বড় প্রতিশ্রুতি নেই।
কোনো নাটকীয় কথা নেই।
শুধু একে অপরের পাশে থাকার নিশ্চয়তা।
....