প্রায় তিন বছর পর ফিরে এসেছে আরিয়ান।
বয়স আটাশ। কাজের সূত্রে দেশের বাইরে থাকার কারণে নিজের শহর, পরিবার আর পুরোনো পরিচিত মানুষদের থেকে অনেকটাই দূরে ছিল সে। বাইরে থেকে দেখলে আরিয়ানের জীবন বেশ গোছানো। ভালো চাকরি, নিজের মতো চলার স্বাধীনতা, পরিচিতদের কাছে সফল একজন তরুণ।
কিন্তু নিজের কাছে?
আরিয়ান জানত, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায় এখনও অসম্পূর্ণ।
সেই অধ্যায়ের নাম—মায়া।
তিন বছর আগে মায়ার সঙ্গে তার সম্পর্কটা যেভাবে শেষ হয়েছিল, সেটা আজও আরিয়ান ভুলতে পারেনি। কোনো বড় ঝগড়া হয়নি, কোনো বিশ্বাসঘাতকতাও ছিল না। শুধু দুজনের পরিবারের কিছু পুরোনো বিরোধ আর ভুল বোঝাবুঝি ধীরে ধীরে তাদের আলাদা করে দিয়েছিল।
আরিয়ান চলে গিয়েছিল বিদেশে।
মায়া থেকে গিয়েছিল এই শহরেই।
তিন বছর ধরে তাদের আর দেখা হয়নি।
আরিয়ান নিজেকে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে অতীতকে অতীতেই রেখে দিতে হয়। কিন্তু কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে শেষ হয় না। শুধু নীরব হয়ে যায়।
সেদিন সন্ধ্যায় আরিয়ান তার পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে বের হয়েছিল। শহরের একটি ব্যস্ত ক্যাফেতে ঢোকার সময় হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল সামনের টেবিলে বসা এক তরুণীর দিকে।
সাদা-নীল পোশাক।
চুলগুলো কাঁধ ছাড়িয়ে নেমে এসেছে।
হাতে একটা বই।
মুখটা পুরোপুরি দেখা যাচ্ছিল না।
তবু কেন যেন আরিয়ানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ থেমে গেল।
সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর মেয়েটি মুখ তুলে তাকাতেই আরিয়ান স্থির হয়ে গেল।
মায়া।
তিন বছর পরেও মানুষটা খুব একটা বদলায়নি।
শুধু চোখের ভেতরের আগের সরলতার জায়গায় এখন এক ধরনের শান্ত দৃঢ়তা এসেছে।
মায়াও আরিয়ানকে দেখে চমকে উঠল।
কয়েক মুহূর্ত দুজনের কেউ কোনো কথা বলল না।
ক্যাফের চারপাশে তখন মানুষের কোলাহল। অথচ তাদের কাছে যেন সব শব্দ হঠাৎ দূরে সরে গেছে।
মায়া ধীরে বইটা বন্ধ করল।
— “তুমি?”
আরিয়ান হালকা হাসল।
— “হ্যাঁ। আমি।”
মায়ার মুখে কোনো হাসি এল না।
— “কবে ফিরেছ?”
— “আজই।”
— “স্থায়ীভাবে?”
আরিয়ান একটু থেমে বলল,
— “জানি না।”
মায়া চোখ নামিয়ে নিল।
তিন বছর আগে শেষবার যখন তারা কথা বলেছিল, তখনও এমনই একটা সন্ধ্যা ছিল।
তখন মায়া বলেছিল,
“কিছু সম্পর্ককে ধরে রাখার জন্য শুধু দুজন মানুষ যথেষ্ট নয়।”
আরিয়ান সেদিন কোনো উত্তর দিতে পারেনি।
আজও সেই কথাটা তার মনে আছে।
মায়া চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
— “আমাকে যেতে হবে।”
আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,
— “এত তাড়াতাড়ি?”
মায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
— “তোমার সঙ্গে দেখা হবে, এটা ভাবিনি।”
— “আমিও না।”
— “তাহলে হয়তো এটাই ভালো।”
মায়া চলে যেতে উদ্যত হলে আরিয়ান হঠাৎ বলল,
— “মায়া।”
মায়া থেমে গেল।
— “তুমি কি আমাকে একবারও মনে করোনি?”
প্রশ্নটা শুনে মায়ার চোখে এক মুহূর্তের জন্য পুরোনো কষ্ট ভেসে উঠল।
কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
— “মনে করার মতো কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না।”
এই কথাটা বলেই সে বেরিয়ে গেল।
আরিয়ান অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, তিন বছর আগে যে গল্পটা শেষ হয়েছিল বলে সে ভেবেছিল, সেটার শেষ হয়তো আসলে হয়নি।
পরদিন সকালেই আরিয়ান তার নতুন অফিসে যোগ দিল।
প্রথম দিন থেকেই কাজের চাপ ছিল অনেক। নতুন প্রজেক্ট, নতুন সহকর্মী, অসংখ্য মিটিং—সবকিছু মিলিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে ডুবে থাকার সুযোগ পেল সে।
দুপুরের দিকে অফিসের ম্যানেজার এসে জানালেন,
— “আরিয়ান, নতুন প্রজেক্টের ক্রিয়েটিভ টিমের সঙ্গে আপনার একটা মিটিং আছে।”
— “কারা আছে টিমে?”
ম্যানেজার ফাইলটা দেখে বললেন,
— “মায়া রহমান। ওদের টিমের লিড।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস করার মতো মানুষ সে কখনো ছিল না।
কিন্তু গত চব্বিশ ঘণ্টায় ভাগ্য যেন বারবার তাকে একই মানুষের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
মিটিং রুমে ঢুকতেই মায়াকে দেখা গেল।
আজ তার পরনে হালকা ধূসর পোশাক। সামনে ল্যাপটপ খোলা। পাশে কয়েকটি ফাইল।
আরিয়ান ঢুকতেই মায়া তাকাল।
দুজনের চোখ আবারও মিলল।
কিন্তু এবার মায়া নিজেকে সামলে নিল।
— “বসুন। আমরা কাজ শুরু করি।”
কথাগুলো ছিল একদম পেশাদার।
আরিয়ানও চুপচাপ চেয়ার টেনে বসল।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তারা কাজের বিষয়েই কথা বলল। পুরোনো সম্পর্কের কোনো উল্লেখ নেই।
মিটিং শেষ হওয়ার পর সবাই বেরিয়ে গেল।
ঘরে শুধু আরিয়ান আর মায়া রয়ে গেল।
আরিয়ান ধীরে বলল,
— “তুমি বদলে গেছ।”
মায়া ফাইল গুছাতে গুছাতে বলল,
— “মানুষ বদলায়।”
— “তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ?”
মায়ার হাত থেমে গেল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল,
— “ক্ষমা করার মতো ভুল তুমি একা করোনি, আরিয়ান।”
আরিয়ান চুপ করে গেল।
মায়া এবার তার দিকে তাকাল।
— “আমাদের দুজনের পরিবারই তখন নিজেদের অহংকারকে আমাদের সম্পর্কের চেয়ে বড় করে দেখেছিল।”
— “আমি যদি তখন চলে না যেতাম?”
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— “তাহলে হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতো।”
— “এখনও কি অন্যরকম হতে পারে?”
মায়া কোনো উত্তর দিল না।
শুধু ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজার কাছে গিয়ে থেমে বলল,
— “কাজের জায়গায় পুরোনো কথা না বলাই ভালো।”
আরিয়ান বলল,
— “কিন্তু কাজের বাইরে?”
মায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— “সেটা সময় বলবে।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
আরিয়ান একা দাঁড়িয়ে রইল।
তার ঠোঁটে অল্প একটা হাসি ফুটে উঠল।
তিন বছর আগে মায়া তার জীবন থেকে চলে গিয়েছিল।
আজ আবার ফিরে এসেছে।
তবে এবার আরিয়ান জানত, শুধু পুরোনো অনুভূতি ফিরে পাওয়া যথেষ্ট নয়।
যে কারণে তাদের আলাদা হতে হয়েছিল, সেই কারণের মুখোমুখি না হলে এই গল্প আবারও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
আর ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
“আরিয়ান, তোমার সঙ্গে আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। আজ সন্ধ্যায় দেখা করবে?”
মেসেজটি পাঠিয়েছে মায়া।
আরিয়ান কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর উত্তর দিল—
“অবশ্যই।”
সন্ধ্যা নামার পর শহরের ব্যস্ততা আরও বেড়ে গেল। অফিস ছুটির সময় হওয়ায় রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ সারি। চারপাশে মানুষের ভিড়, দোকানের আলো, রিকশার ঘণ্টা—সব মিলিয়ে শহরটা যেন নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে গেছে।
কিন্তু আরিয়ানের মনে তখন অন্যরকম অস্থিরতা।
মায়া তাকে দেখা করতে বলেছে।
তিন বছর পর প্রথমবার নিজের ইচ্ছায়।
আরিয়ান গাড়ি নিয়ে শহরের একটি শান্ত ক্যাফের সামনে এসে দাঁড়াল। জায়গাটা খুব পরিচিত নয়। সম্ভবত মায়াই জায়গাটা বেছে নিয়েছে, কারণ এখানে ভিড় কম।
ভেতরে ঢুকেই সে মায়াকে দেখতে পেল।
জানালার পাশে বসে আছে মেয়েটি। সামনে কফির কাপ। হাতে ফোন। বাইরে তাকিয়ে আছে।
আরিয়ান এগিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে বসল।
— “অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছ?”
মায়া মাথা নাড়ল।
— “না। আমিও একটু আগেই এসেছি।”
কথা থেমে গেল।
দুজনের মাঝখানে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।
এই নীরবতা অস্বস্তিকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আশ্চর্যভাবে দুজনের কাছেই পরিচিত লাগছিল।
আরিয়ান ধীরে বলল,
— “তুমি আমাকে কী বলতে চেয়েছিলে?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “তুমি কেন ফিরে এসেছ?”
আরিয়ান একটু অবাক হলো।
— “কাজের জন্য।”
— “শুধু কাজের জন্য?”
প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু তার ভেতরে অন্য অর্থ লুকিয়ে ছিল।
আরিয়ান মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তুমি কী ভাবছ?”
মায়া চোখ নামিয়ে বলল,
— “আমি কিছু ভাবতে চাই না।”
— “কিন্তু তুমি আমাকে এখানে ডেকেছ।”
— “কারণ তোমাকে একটা কথা জানানো দরকার।”
মায়া ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল।
খামটা টেবিলের ওপর রেখে বলল,
— “এটা তোমার।”
আরিয়ান খামটা হাতে নিল।
খামটা পুরোনো। কোণাগুলো কিছুটা ভাঁজ হয়ে গেছে।
সে খুলে দেখল ভেতরে কয়েকটি কাগজ।
তার পুরোনো চিঠি।
তিন বছর আগে মায়াকে লেখা চিঠিগুলো।
আরিয়ান বিস্মিত হয়ে তাকাল।
— “এগুলো তোমার কাছে ছিল?”
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— “ফেলে দিতে পারিনি।”
আরিয়ানের চোখ কিছুক্ষণ কাগজগুলোর ওপর স্থির রইল।
তখনকার লেখা।
তখনকার কথা।
তখনকার স্বপ্ন।
সবকিছু যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠল।
একটি চিঠিতে লেখা ছিল—একদিন তারা দুজন নিজেদের মতো করে একটা ছোট্ট জীবন গড়ে তুলবে।
কোনো বড় বাড়ি নয়।
কোনো অঢেল টাকা নয়।
শুধু শান্ত একটা ঘর, দুজন মানুষ আর একে অপরের পাশে থাকার নিশ্চয়তা।
আরিয়ান চিঠিটা ধীরে ভাঁজ করে রাখল।
— “তুমি এগুলো রেখে দিয়েছ কেন?”
মায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “কারণ তখনও মনে হতো, হয়তো একদিন তুমি ফিরে আসবে।”
আরিয়ানের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল।
— “আর এখন?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
— “এখন জানি না।”
আরিয়ান এবার একটু সামনে ঝুঁকে বলল,
— “আমি ফিরে এসেছি, মায়া।”
মায়া তার দিকে তাকাল।
— “ফিরে আসা আর থেকে যাওয়া এক জিনিস নয়।”
কথাটা আরিয়ানকে থামিয়ে দিল।
মায়া আবার বলল,
— “তুমি তিন বছর আগে চলে গিয়েছিলে। আমি তোমাকে আটকাইনি। কারণ তখন বুঝেছিলাম, তুমি তোমার পরিবারের সঙ্গে লড়াই করার মতো অবস্থায় ছিলে না।”
— “আমি কাপুরুষ ছিলাম।”
— “না।”
মায়া মাথা নাড়ল।
— “তুমি তখন খুব একা ছিলে।”
আরিয়ান কিছু বলল না।
মায়া ধীরে বলল,
— “আমাদের পরিবারের শত্রুতা তোমাকে যেমন কষ্ট দিয়েছে, আমাকেও দিয়েছে। কিন্তু আমি সবসময় ভেবেছি, তুমি একদিন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেবে।”
— “আর এখন?”
— “এখন তুমি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছ, সেটা জানতে চাই।”
আরিয়ান মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আমি পালিয়ে যেতে চাই না।”
মায়ার মুখে অল্প বিস্ময় ফুটে উঠল।
— “মানে?”
— “তিন বছর আগে আমি ভেবেছিলাম দূরে চলে গেলেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু শেষ হয়নি। তুমি আমার জীবনে নেই, তবুও প্রতিদিন কোথাও না কোথাও তোমার কথা মনে পড়েছে।”
মায়া নীরবে শুনছিল।
আরিয়ান বলল,
— “আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। কিন্তু এবার আমি ভয় পেয়ে সরে যাব না।”
মায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর ধীরে বলল,
— “তুমি জানো না, আমাদের পরিবার এখনও আগের মতোই আছে।”
— “জানি।”
— “তাহলে বিষয়টা এত সহজ নয়।”
— “আমি সহজ বলছি না।”
আরিয়ান একটু থেমে বলল,
— “শুধু বলছি, এবার অন্তত চেষ্টা করতে চাই।”
মায়া চোখ নামিয়ে ফেলল।
তার মুখে আগের কঠিন ভাবটা আর নেই।
তবে সে কিছু বলল না।
সেদিন ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি শুরু হলো।
মায়া ছাতা আনেনি।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল।
আরিয়ান নিজের ছাতাটা খুলে তার পাশে দাঁড়াল।
— “চলো, গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিই।”
মায়া প্রথমে না বলতে চেয়েছিল।
কিন্তু বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত মাথা নাড়ল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
একসময় মায়ার পা সামান্য পিছলে গেল।
আরিয়ান দ্রুত তার হাত ধরে সামলে দিল।
কয়েক সেকেন্ড দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
তারপর মায়া ধীরে হাত সরিয়ে নিল।
— “ধন্যবাদ।”
আরিয়ান হেসে বলল,
— “তিন বছর পরও তুমি আগের মতোই অসাবধান।”
মায়া হালকা বিরক্তির ভান করে বলল,
— “তুমি এখনও আগের মতোই বেশি কথা বলো।”
দুজনেই অল্প হেসে ফেলল।
এই ছোট্ট হাসিটা যেন তিন বছরের দূরত্বকে কয়েক মুহূর্তের জন্য মুছে দিল।
গাড়ির কাছে এসে মায়া থামল।
— “আরিয়ান।”
— “হুম?”
— “আজ যা বললে, সেটা যেন শুধু আজকের আবেগ না হয়।”
আরিয়ান গম্ভীর হয়ে বলল,
— “হবে না।”
মায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে গাড়িতে উঠে চলে গেল।
আরিয়ান রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গাড়িটা দূরে মিলিয়ে যেতে দেখল।
তার মনে হলো, মায়া হয়তো এখনও তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না।
কিন্তু দরজাটা পুরোপুরি বন্ধও করেনি।
পরদিন অফিসে তাদের দেখা হলো।
মায়া আগের মতোই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
কাজের বিষয়ে কথা বলল, ফাইল দিল, মিটিং করল।
কিন্তু আরিয়ান বুঝতে পারছিল—গত রাতের কথাগুলো দুজনের মনেই আছে।
দুপুরে অফিসের করিডোরে মায়া একা দাঁড়িয়ে ছিল।
আরিয়ান কাছে গিয়ে বলল,
— “আজ এত চুপচাপ কেন?”
— “কাজ করছি।”
— “কাজের সময়ও এত সিরিয়াস থাকতে হয়?”
মায়া তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— “তুমি কি সবসময় এমন?”
— “কেমন?”
— “সবকিছু হালকা করে দেখার চেষ্টা করো।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
— “হয়তো। কারণ কিছু বিষয় বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখলে কষ্ট হয়।”
মায়ার হাসি মিলিয়ে গেল।
— “তুমি এখনও কষ্ট পাও?”
— “কিছু মানুষকে হারানোর কষ্ট সময়ের সঙ্গে কমে না। শুধু মানুষ সেটা লুকাতে শিখে।”
মায়া কোনো উত্তর দিল না।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মায়ার মুখ হঠাৎ বদলে গেল।
আরিয়ান লক্ষ্য করল।
— “কী হয়েছে?”
মায়া ফোনটা বন্ধ করে বলল,
— “বাড়ি থেকে ফোন।”
— “সব ঠিক আছে?”
মায়া কিছু বলল না।
কয়েক মুহূর্ত পর ধীরে বলল,
— “আমার বাবা তোমার ফিরে আসার কথা জেনে গেছেন।”
আরিয়ান স্থির হয়ে গেল।
— “তারপর?”
মায়া নিচু স্বরে বলল,
— “তিনি বলেছেন, তোমার সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক রাখা চলবে না।”
চারপাশের ব্যস্ত অফিস যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ মনে হলো।
আরিয়ান ধীরে বলল,
— “আর তুমি?”
মায়া তার দিকে তাকাল।
চোখে দ্বিধা, ভয় আর পুরোনো অনুভূতির মিশ্র ছায়া।
— “আমি এখনও জানি না।”
এই কথার পর মায়া চলে গেল।
আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল।
সে বুঝতে পারল, তাদের নতুন করে শুরু হওয়া সম্পর্কের সামনে প্রথম বাধাটা এসে গেছে।
কিন্তু এবার সে পিছিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল না।
কারণ তিন বছর আগে সে হার মেনে চলে গিয়েছিল।
এবার সে জানতে চায়—
মায়ার হৃদয়ে তার জন্য সত্যিই কি এখনও কোনো জায়গা আছে?
পরদিন সকাল থেকেই মায়ার মনটা অস্থির ছিল।
বাবার কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
“আরিয়ানের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখা চলবে না।”
কথাটা নতুন কিছু ছিল না। তিন বছর আগেও দুই পরিবারের সম্পর্কের কারণে একই নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু তখন মায়া ভেবেছিল, আরিয়ান হয়তো সত্যিই তার জীবন থেকে চলে গেছে।
এখন সে ফিরে এসেছে।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, মায়া বুঝতে পারছে—আরিয়ানকে দেখে তার ভেতরের পুরোনো অনুভূতিগুলো একটুও মরে যায়নি।
সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, মানুষ বদলায়। সময় বদলায়। জীবন এগিয়ে যায়।
কিন্তু হৃদয়কে যুক্তি দিয়ে সবসময় বোঝানো যায় না।
অফিসে ঢুকেই মায়া আরিয়ানকে দেখতে পেল।
সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। মায়াকে দেখেই ফোনটা রেখে দিল।
— “সুপ্রভাত।”
মায়া স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
— “সুপ্রভাত।”
আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— “তুমি ঠিক আছ?”
— “হ্যাঁ।”
— “মিথ্যা বলছ।”
মায়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— “সবসময় মানুষের মুখ দেখে এত কিছু বুঝে ফেলো কীভাবে?”
আরিয়ান হেসে বলল,
— “তোমার ক্ষেত্রে একটু সহজ।”
মায়া কিছু বলল না।
সে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসে পড়ল।
কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করেও পারল না।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান একটি ফাইল নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
— “এই অংশটা একবার দেখবে?”
মায়া ফাইলটা হাতে নিল।
— “এখানে একটা পরিবর্তন দরকার।”
— “কী পরিবর্তন?”
মায়া ব্যাখ্যা করতে শুরু করল।
কাজের কথা বলতে বলতে দুজনের মধ্যে আবার আগের স্বাভাবিকতা ফিরে আসছিল। যেন তারা তিন বছর আলাদা ছিলই না।
মায়া সেটা বুঝতে পেরে হঠাৎ থেমে গেল।
— “আমাদের এভাবে স্বাভাবিক হওয়া উচিত না।”
আরিয়ান শান্তভাবে বলল,
— “কেন?”
— “কারণ আমাদের পরিবার এটা মেনে নেবে না।”
— “আমরা কি সারাজীবন পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাঁচব?”
মায়া উত্তর দিল না।
আরিয়ান এবার নরম গলায় বলল,
— “আমি তোমাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বলছি না। শুধু সত্যিটা অস্বীকার করো না।”
— “কোন সত্য?”
— “তুমি এখনও আমাকে ভালোবাসো।”
মায়া যেন কথাটা শুনে স্থির হয়ে গেল।
তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য সবকিছু স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তারপর সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
— “এই কথাটা আর বলবে না।”
— “কেন?”
— “কারণ শুনলে আমি দুর্বল হয়ে যাই।”
আরিয়ান চুপ করে গেল।
মায়া ধীরে বলল,
— “আমি অনেক কষ্ট করে নিজেকে সামলেছি। তোমাকে ছাড়া একটা জীবন গুছিয়েছি। তুমি ফিরে এসে আবার সবকিছু এলোমেলো করে দিও না।”
আরিয়ানের গলা ভারী হয়ে গেল।
— “আমি যদি এবার সবকিছু ঠিক করতে চাই?”
মায়া চোখ তুলে তাকাল।
— “তাহলে তোমাকে শুধু আমাকে নয়, আমাদের দুই পরিবারকেও বোঝাতে হবে।”
— “আমি প্রস্তুত।”
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— “তুমি এখনও জানো না, কীসের জন্য প্রস্তুত হচ্ছ।”
সেদিন বিকেলে অফিস শেষ হওয়ার পর মায়া একা বের হচ্ছিল।
অফিসের সামনে এসে সে দেখল আরিয়ান গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
— “তুমি এখানে?”
— “তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।”
— “কাজের কথা?”
— “না।”
মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “আরিয়ান, আজ বাড়িতে অনেক সমস্যা হয়েছে। আমি আর নতুন কোনো সমস্যা চাই না।”
— “তাহলে আমাকে একটা সুযোগ দাও।”
— “কিসের?”
— “তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলার।”
মায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
— “অসম্ভব।”
— “কেন?”
— “কারণ তিনি তোমার কথা শুনবেন না।”
— “তবু চেষ্টা করতে চাই।”
— “আর যদি অপমান করেন?”
— “সহ্য করব।”
— “যদি তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন?”
— “তবুও যাব।”
মায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
এই মানুষটার মধ্যে একটা জিনিস সে কখনো বদলাতে দেখেনি—একবার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সহজে পিছিয়ে যায় না।
তবু মায়ার ভয় হচ্ছিল।
— “তুমি বুঝতে পারছ না, বিষয়টা কতটা গভীর।”
— “তুমি বুঝিয়ে বলো।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “আমার বাবা বিশ্বাস করেন, তোমাদের পরিবার আমাদের পরিবারের সর্বনাশ করেছে। তোমার বাবার কারণেই আমাদের পরিবার অনেক কিছু হারিয়েছে।”
আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে গেল।
সে জানত দুই পরিবারের মধ্যে শত্রুতা আছে। কিন্তু সবকিছুর বিস্তারিত কখনো জানত না।
— “কী হয়েছিল?”
মায়া বলল,
— “আমি সব জানি না। বাবা কখনো পুরো ঘটনা বলেননি।”
— “তাহলে তুমি কীভাবে নিশ্চিত যে আমাদের পরিবার দোষী?”
— “আমি নিশ্চিত নই।”
এই কথাটা শুনে আরিয়ান চমকে গেল।
মায়া বলল,
— “এটাই আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমি বাবাকে বিশ্বাস করি। আবার তোমাকেও বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু সত্যিটা আমি জানি না।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “তাহলে সত্যিটা খুঁজে বের করি।”
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
— “কীভাবে?”
— “পুরোনো ঘটনা খুঁজে। কার দোষ ছিল, কী হয়েছিল—সব।”
— “আর যদি সত্যিটা আমাদের বিরুদ্ধে যায়?”
— “তাহলে মেনে নেব।”
— “আর যদি তোমাদের পরিবার নির্দোষ হয়?”
আরিয়ান মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তাহলে কি তুমি আমার পাশে দাঁড়াবে?”
মায়া উত্তর দিল না।
কিন্তু তার চোখের নীরবতা যেন অনেক কিছু বলে দিল।
সেদিন রাতে মায়া বাড়িতে ফিরে দেখল বাবা ডাইনিং টেবিলে বসে আছেন।
মায়াকে দেখেই তিনি বললেন,
— “আজও কি তার সঙ্গে দেখা হয়েছে?”
মায়া থেমে গেল।
— “কার কথা বলছেন?”
— “অভিনয় করো না। আরিয়ান।”
মায়া চুপ করে রইল।
তার বাবা গম্ভীর গলায় বললেন,
— “আমি তোমাকে আগেই সতর্ক করেছি।”
— “বাবা, আমি শুধু অফিসের কাজে—”
— “আমি সব জানি।”
মায়া এবার সাহস করে বলল,
— “আপনি কি জানেন আসলে তিন বছর আগে কী হয়েছিল?”
তার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
— “তুমি এসব জানতে চাইছ কেন?”
— “কারণ আমি জানতে চাই সত্যিটা কী।”
— “সত্যি তোমার জানার দরকার নেই।”
— “কিন্তু আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সত্যিটা জানার অধিকার আমার আছে।”
বাবার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
— “এই পরিবারে আমার সিদ্ধান্তই শেষ কথা।”
মায়ার চোখে পানি চলে এল।
তবু সে নিজেকে সামলে বলল,
— “আমি আপনার মেয়ে। আপনার শত্রু নই। কিন্তু আমার জীবনটা শুধু আপনার সিদ্ধান্তে চলতে পারে না।”
এই প্রথম মায়া বাবার সামনে এত দৃঢ়ভাবে কথা বলল।
তিনি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর উঠে চলে গেলেন।
মায়া নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করল।
চোখের পানি মুছে ফোন হাতে নিল।
কিছুক্ষণ দ্বিধা করার পর আরিয়ানকে একটি মেসেজ পাঠাল—
“আমি সত্যিটা জানতে চাই। তুমি কি আমার সঙ্গে থাকবে?”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উত্তর এল—
“শেষ পর্যন্ত।”
মায়া ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।
পরদিন সকালে আরিয়ান তার বাবার পুরোনো স্টাডি রুমে ঢুকল।
বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি কাঠের আলমারি খুলতে গিয়ে সে পুরোনো কিছু নথি দেখতে পেল।
একটি ফাইলে লেখা—
“রহমান পরিবার — ২০১৯”
আরিয়ান ফাইলটা হাতে নিয়ে থেমে গেল।
তার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হলো।
সে প্রথম পৃষ্ঠা খুলতেই একটি পুরোনো চিঠি চোখে পড়ল।
চিঠির নিচে স্বাক্ষর—
মায়ার বাবা।
আর চিঠির শেষ লাইনে এমন একটি কথা লেখা ছিল, যা পড়ে আরিয়ান সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল।
তাদের পরিবারের মধ্যে যে শত্রুতার জন্য তিন বছর আগে তার আর মায়ার সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল—
সেই ঘটনার আসল সত্যি হয়তো তারা কেউই জানে না।
আরিয়ান চিঠিটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
সকালের আলো তখনও পুরোপুরি ঘর ভরেনি।
আরিয়ান তার বাবার স্টাডি রুমে দাঁড়িয়ে পুরোনো চিঠিটা হাতে নিয়ে বারবার পড়ছিল। চিঠির প্রতিটি শব্দ যেন তার মাথার ভেতর নতুন প্রশ্ন তৈরি করছিল।
তিন বছর ধরে সে ভেবেছে, দুই পরিবারের শত্রুতাই তার আর মায়ার বিচ্ছেদের একমাত্র কারণ।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সেই শত্রুতার পেছনে আরও বড় কোনো ঘটনা লুকিয়ে আছে।
চিঠিটা মায়ার বাবার লেখা।
তাতে তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ঠিকই, কিন্তু শেষের কয়েকটি লাইন এমন ছিল যেন তিনি নিজেও কোনো একসময় সত্যিটা জানতে চেয়েছিলেন।
আরিয়ান চিঠিটা আবার ভাঁজ করে পকেটে রাখল।
ঠিক তখনই তার বাবা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
— “ওটা কোথায় পেয়েছ?”
আরিয়ান চমকে তাকাল।
বাবার চোখে অস্বাভাবিক কঠোরতা।
— “এই আলমারিতে ছিল।”
— “তোমাকে এই ঘরে আসতে কে বলেছে?”
— “কেউ না।”
আরিয়ান চিঠিটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
— “আমি জানতে চাই, তিন বছর আগে আসলে কী হয়েছিল।”
তার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
— “পুরোনো কথা ভুলে যাও।”
— “আমি ভুলতে পারছি না।”
— “কারণ তুমি আবার ওই মেয়েটার কাছে ফিরে গেছ।”
আরিয়ান এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
— “মায়াকে এই ব্যাপারের জন্য দোষ দেবেন না।”
বাবা ধীরে ধীরে চেয়ারে বসলেন।
— “তুমি জানো না, ওদের পরিবার আমাদের সঙ্গে কী করেছে।”
— “তাহলে আমাকে বলুন।”
— “জানলে কী করবে?”
— “সত্যি হলে মেনে নেব। মিথ্যা হলে প্রশ্ন করব।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর বললেন,
— “তোমার আর মায়ার সম্পর্ক যখন শুরু হয়েছিল, তখন আমি জানতাম।”
আরিয়ান অবাক হলো।
— “আপনি জানতেন?”
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে আমাকে কখনো বলেননি কেন?”
— “কারণ আমি জানতাম, এই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত তোমাকে কষ্ট দেবে।”
— “কিন্তু কেন?”
বাবা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “কারণ মায়ার বাবা আর আমার মধ্যে শুধু ব্যবসার বিরোধ ছিল না। বহু বছর আগে একটা বড় ঘটনা ঘটেছিল।”
— “কী ঘটনা?”
বাবা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
— “সময় হলে সব জানবে।”
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
— “আমি আর অপেক্ষা করতে চাই না।”
বাবা এবার তার দিকে তাকালেন।
— “তুমি যদি সত্যিই মায়াকে জীবনে ফিরিয়ে আনতে চাও, তাহলে প্রস্তুত থেকো। সত্যিটা হয়তো তোমার ধারণার মতো সুন্দর হবে না।”
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
— “সত্যি যত কঠিনই হোক, মিথ্যার ওপর সম্পর্ক গড়তে চাই না।”
বাবা আর কিছু বললেন না।
অন্যদিকে মায়ার সকালটাও শান্ত ছিল না।
আগের রাতের কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছিল।
বাবার মুখে এত বছরের রাগ সে দেখেছে।
কিন্তু প্রথমবার তার মনে হলো, বাবার রাগের আড়ালে হয়তো কোনো ভয়ও আছে।
মায়া নাশতার টেবিলে বসে ছিল।
তার বাবা খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
হঠাৎ তিনি বললেন,
— “তুমি কি আরিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছ?”
মায়া মাথা তুলল।
— “হ্যাঁ।”
— “আমি নিষেধ করেছিলাম।”
— “আমি জানি।”
— “তাহলে?”
মায়া শান্তভাবে বলল,
— “আমি সত্যিটা জানতে চাই।”
বাবা খবরের কাগজটা ভাঁজ করে রাখলেন।
— “তুমি কি তাকে বিশ্বাস করো?”
— “হ্যাঁ।”
— “এত সহজে?”
মায়া একটু থেমে বলল,
— “তিন বছর ধরে তাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি। পারিনি। এখন অন্তত সত্যিটা জেনে সিদ্ধান্ত নিতে চাই।”
বাবার চোখে কষ্টের ছাপ ফুটে উঠল।
— “তুমি জানো না, সে তোমার জন্য কী বিপদ ডেকে আনতে পারে।”
— “আর যদি সে বিপদ না হয়?”
বাবা চুপ করে গেলেন।
মায়া বুঝতে পারল, এই প্রশ্নের উত্তর তার বাবার কাছেও নেই।
সেদিন অফিস শেষে আরিয়ান মায়াকে ফোন করল।
— “তুমি কোথায়?”
— “অফিসেই আছি।”
— “বের হতে পারবে?”
— “কেন?”
— “একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাই।”
মায়া একটু দ্বিধা করে বলল,
— “কোথায়?”
— “আমাদের পুরোনো বাড়ির কাছে।”
মায়ার বুক ধক করে উঠল।
— “তোমার বাড়ি?”
— “হ্যাঁ।”
— “আরিয়ান, আমি সেখানে যেতে পারব না।”
— “কেন?”
— “আমাদের পরিবার জানলে সমস্যা হবে।”
— “তাহলে আমরা এমন একটা জায়গায় দেখা করি যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “ঠিক আছে।”
শহরের এক পুরোনো পার্কে তাদের দেখা হলো।
সন্ধ্যার বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছিল। চারপাশে কিছু মানুষ হাঁটছিল। জায়গাটা শান্ত।
আরিয়ান হাতে একটা ফাইল নিয়ে মায়ার সামনে দাঁড়াল।
— “এটা দেখো।”
মায়া ফাইলটা খুলে দেখল।
ভেতরে পুরোনো কিছু কাগজ, ব্যবসায়িক নথি আর কয়েকটি চিঠি।
— “এসব কী?”
— “তিন বছর আগের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু কাগজ।”
মায়া একের পর এক কাগজ দেখতে লাগল।
তারপর হঠাৎ একটি নাম দেখে থেমে গেল।
— “এই মানুষটাকে আমি চিনি।”
আরিয়ান তাকাল।
— “কে?”
— “রাকিব চৌধুরী। বাবা একসময় তার সঙ্গে কাজ করতেন।”
আরিয়ান বলল,
— “আমার বাবার কাছেও এই নাম এসেছে।”
দুজনেই চুপ করে গেল।
তাহলে তাদের দুই পরিবারের মাঝখানে যে মানুষটা এতদিন অদৃশ্য ছিল, সে হয়তো এই রাকিব।
মায়া ধীরে বলল,
— “কিন্তু উনি তো অনেক বছর আগে বিদেশে চলে গেছেন।”
— “আমার মনে হয়, তিনি যাওয়ার আগে এমন কিছু করেছিলেন যার ফল আমরা এখনও ভোগ করছি।”
মায়া আরিয়ানের দিকে তাকাল।
— “তুমি কি সত্যিই সবকিছু খুঁজে বের করবে?”
— “হ্যাঁ।”
— “আমার জন্য?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
— “শুধু তোমার জন্য নয়।”
— “তাহলে?”
— “আমাদের জন্য।”
মায়ার চোখ নরম হয়ে গেল।
সে ধীরে বলল,
— “এই একটা কথার জন্যই হয়তো তোমাকে এতদিন অপেক্ষা করেছি।”
আরিয়ান কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মায়ার ফোন বেজে উঠল।
বাবা ফোন করেছেন।
মায়া ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কঠিন গলা শোনা গেল—
— “তুমি এখন কোথায়?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “বাইরে।”
— “আরিয়ানের সঙ্গে?”
মায়া উত্তর দিল না।
ওপাশ থেকে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর বাবা বললেন,
— “তাহলে আজ রাতে বাড়ি ফিরে আমার সঙ্গে কথা বলবে।”
ফোন কেটে গেল।
মায়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আরিয়ান বলল,
— “ভয় পেয়ো না।”
— “আমি ভয় পাচ্ছি না।”
— “তাহলে?”
মায়া ধীরে বলল,
— “আমি বুঝতে পারছি, এবার বিষয়টা আরও বড় হবে।”
রাতে মায়া বাড়ি ফিরতেই তার বাবা বসার ঘরে অপেক্ষা করছিলেন।
টেবিলের ওপর একটি পুরোনো ছবি রাখা।
মায়া ছবিটা হাতে তুলে নিল।
ছবিতে তার বাবা, আরিয়ানের বাবা এবং আরেকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
মায়া তৃতীয় মানুষটিকে দেখে চমকে গেল।
— “এটা তো রাকিব চৌধুরী!”
তার বাবা ধীরে বললেন,
— “হ্যাঁ।”
— “কিন্তু উনি আপনাদের সঙ্গে ছিলেন?”
— “ছিলেন।”
— “তাহলে এতদিন আমাকে বলেননি কেন?”
বাবা গভীর শ্বাস নিলেন।
— “কারণ তোমাকে একটা সত্যি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলাম।”
— “কী সত্যি?”
বাবা ছবিটা হাতে নিয়ে বললেন,
— “তোমার আরিয়ানের বিচ্ছেদের জন্য শুধু আমাদের শত্রুতা দায়ী নয়।”
মায়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
— “তাহলে?”
তার বাবা ধীরে ধীরে বললেন,
— “তিন বছর আগে যে চিঠিটা তুমি আরিয়ানের কাছে পাঠিয়েছিলে… সেটা তার কাছে কখনো পৌঁছায়নি।”
মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
— “কী?”
— “আরিয়ানের কাছে তোমার লেখা কোনো চিঠি পৌঁছায়নি। তোমাকে যে উত্তরগুলো সে দিয়েছে বলে তুমি ভেবেছিলে, সেগুলোও…”
বাবা থেমে গেলেন।
মায়ার গলা শুকিয়ে গেল।
— “তার মানে?”
— “কেউ তোমাদের দুজনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করেছিল।”
মায়ার হাত থেকে ছবিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তিন বছর আগে সে ভেবেছিল, আরিয়ান তাকে ছেড়ে চলে গেছে।
আরিয়ান ভেবেছিল, মায়া তাকে আর চায় না।
তাহলে তাদের বিচ্ছেদের পেছনে কি সত্যিই অন্য কারও হাত ছিল?
মায়ার চোখে পানি চলে এল।
— “কে করেছিল?”
তার বাবা উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
— “এই সত্যিটা জানলে তোমার আরিয়ানের প্রতি রাগ থাকবে না। কিন্তু হয়তো এমন একজনের প্রতি ঘৃণা জন্মাবে, যাকে তুমি কখনো সন্দেহও করোনি।”
মায়া স্তব্ধ হয়ে গেল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার ফোনে আরিয়ানের মেসেজ এল—
“আমি একটা পুরোনো রেকর্ড পেয়েছি। কাল তোমাকে সব দেখাব।”
মায়া স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল—
তাদের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের গল্পে এবার সত্যিই নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।
সারারাত মায়ার চোখে ঘুম এল না।
বাবার বলা কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
তিন বছর আগে যে চিঠিগুলো সে আরিয়ানকে লিখেছিল, সেগুলো নাকি তার কাছে পৌঁছায়নি।
তাহলে এতদিন সে যে বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে ছিল—আরিয়ান তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল—সেটা কি ভুল?
আরিয়ানও কি একই ভুল বিশ্বাস নিয়ে এত বছর কাটিয়েছে?
মায়া বিছানায় বসে পুরোনো একটা ডায়েরি খুলল।
পাতার পর পাতা জুড়ে আরিয়ানের স্মৃতি।
প্রথম দেখা।
প্রথম ঝগড়া।
প্রথম একসঙ্গে বৃষ্টিতে হাঁটা।
প্রথমবার আরিয়ান তাকে বলেছিল, “তোমার সঙ্গে কথা বললে সময়টা দ্রুত চলে যায়।”
মায়া অজান্তেই হেসে ফেলল।
তারপর চোখে পানি চলে এল।
সে ডায়েরিটা বন্ধ করে জানালার পাশে দাঁড়াল।
তিন বছর আগে যদি একটা চিঠিও ঠিকমতো পৌঁছাত, তাহলে হয়তো তাদের গল্প এতটা দূরে গড়াত না।
পরদিন সকালেই আরিয়ান মায়াকে ফোন করল।
— “তুমি কি আজ বিকেলে সময় পাবে?”
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে বিকেলে পুরোনো লাইব্রেরির সামনে এসো।”
— “কী পেয়েছ?”
আরিয়ান একটু থেমে বলল,
— “ফোনে বলা যাবে না।”
মায়ার বুকের ভেতর আবার অস্থিরতা তৈরি হলো।
বিকেলে মায়া পুরোনো লাইব্রেরির সামনে এসে দেখল আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাতে একটি বাদামি রঙের ফাইল।
মায়া কাছে যেতেই আরিয়ান বলল,
— “আমি গতকাল রাতে বাবার পুরোনো নথিগুলো দেখেছি।”
— “কী পেয়েছ?”
আরিয়ান ফাইল খুলল।
— “এইগুলো।”
ভেতরে কয়েকটি পুরোনো চিঠির কপি।
মায়া প্রথম চিঠিটা হাতে নিতেই তার চোখ বড় হয়ে গেল।
এটা তার নিজের লেখা।
তিন বছর আগে আরিয়ানকে পাঠানো চিঠি।
চিঠির তারিখ দেখে মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
— “এটা তো আমি লিখেছিলাম।”
— “হ্যাঁ।”
— “কিন্তু এটা তোমার কাছে কীভাবে এল?”
— “আমার বাবার পুরোনো ফাইলের মধ্যে ছিল।”
মায়া চিঠিটা পড়তে শুরু করল।
তার চোখ দিয়ে ধীরে ধীরে পানি গড়িয়ে পড়ল।
চিঠিতে সে লিখেছিল, সে আরিয়ানকে ভুলতে পারেনি। পরিবারের চাপ যতই থাকুক, সে অপেক্ষা করবে।
কিন্তু চিঠিটা কখনো আরিয়ানের হাতে পৌঁছায়নি।
মায়া কাঁপা গলায় বলল,
— “তুমি এটা আগে দেখোনি?”
— “না।”
— “তাহলে তুমি কেন ভেবেছিলে আমি তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি?”
আরিয়ান নিচু স্বরে বলল,
— “কারণ আমি তোমার কাছ থেকে কোনো উত্তর পাইনি।”
— “আমি তো অনেকবার লিখেছিলাম।”
— “আমি কোনো চিঠি পাইনি।”
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
তিন বছরের ভুল বোঝাবুঝি যেন কয়েক মুহূর্তে সামনে দাঁড়িয়ে গেল।
মায়া ধীরে বলল,
— “আমরা দুজনেই অপেক্ষা করেছিলাম।”
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে মাঝখানে কে ছিল?”
আরিয়ান আরেকটা কাগজ বের করল।
— “এই নামটা দেখো।”
মায়া নামটা পড়তেই থেমে গেল।
রাকিব চৌধুরী।
— “উনি?”
— “আমার বাবার পুরোনো ব্যবসায়িক অংশীদার।”
— “কিন্তু কেন তিনি আমাদের আলাদা করতে চাইবেন?”
— “সেটাই জানতে হবে।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— “বাবা বলেছে, রাকিব চৌধুরী নাকি অনেক বছর আগে বিদেশে চলে গেছেন।”
— “আমার কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, তিনি এখনও দেশে আসা-যাওয়া করেন।”
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
— “তাহলে তিনি কোথায়?”
— “জানি না।”
— “তুমি কী করবে?”
আরিয়ান মৃদু হাসল।
— “খুঁজব।”
সেদিন তারা অনেকক্ষণ একসঙ্গে বসে পুরোনো ঘটনাগুলো মিলিয়ে দেখল।
একটা একটা তথ্য জোড়া লাগাতে গিয়ে তারা বুঝতে পারল, তিন বছর আগে ঠিক একই সময়ে দুই পরিবারে কয়েকটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল।
আরিয়ানের বাবার ব্যবসায় বড় ক্ষতি হয়েছিল।
মায়ার বাবার বিরুদ্ধে একটি আর্থিক অভিযোগ উঠেছিল।
দুই পরিবার একে অপরকে দায়ী করেছিল।
আর ঠিক সেই সময়েই আরিয়ান ও মায়ার সম্পর্কের খবর দুই পরিবারে ছড়িয়ে পড়েছিল।
পরিবারের চাপ বাড়তে থাকে।
তারপর আরিয়ান বিদেশে চলে যায়।
মায়া ভেবেছিল, সে তাকে ছেড়ে দিয়েছে।
আরিয়ান ভেবেছিল, মায়া তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায় না।
দুটো ভুল ধারণা একসঙ্গে তাদের আলাদা করে দিয়েছিল।
মায়া ধীরে বলল,
— “কেউ খুব হিসেব করে সবকিছু করেছিল।”
আরিয়ান বলল,
— “হ্যাঁ।”
— “কিন্তু কেন?”
— “সম্ভবত ব্যবসার জন্য।”
মায়া মাথা নাড়ল।
— “আমাদের সম্পর্কের জন্য কেউ এত বড় ঝুঁকি নেবে?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “যদি আমাদের পরিবার একসঙ্গে থাকত, তাহলে হয়তো কারও পরিকল্পনা সফল হতো না।”
মায়া তার দিকে তাকাল।
কথাটা সত্যি হতে পারে।
সন্ধ্যা হয়ে এলে তারা লাইব্রেরি থেকে বের হলো।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মায়া বলল,
— “আরিয়ান।”
— “হুম?”
— “তুমি কি এখনও আমাকে আগের মতোই চাও?”
প্রশ্নটা খুব সরাসরি।
আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— “আগের মতো না।”
মায়ার মুখ একটু মলিন হয়ে গেল।
আরিয়ান হাসল।
— “এখন আরও বেশি।”
মায়া চোখ নামিয়ে ফেলল।
তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
— “তুমি একদম বদলাওনি।”
— “তুমিও না।”
— “আমি অনেক বদলেছি।”
— “বাইরে থেকে।”
মায়া তাকাল।
আরিয়ান ধীরে বলল,
— “ভেতরে তুমি এখনও সেই মেয়েটাই, যে বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসত, কিন্তু ভিজে গেলে পরে ঠান্ডা লাগবে বলে নিজেই ভয় পেত।”
মায়া হেসে ফেলল।
— “তুমি এসব এখনও মনে রেখেছ?”
— “সব।”
এই একটি শব্দে মায়ার চোখ আবার ভিজে উঠল।
সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কাঁদছ?”
— “না।”
— “তাহলে?”
— “বৃষ্টি পড়ছে।”
আকাশের দিকে তাকিয়ে আরিয়ান বুঝল, সত্যিই হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
সে হেসে বলল,
— “তুমি এখনও মিথ্যা বলতে পারো না।”
দুজনেই হেসে ফেলল।
পরের কয়েকদিন তাদের সম্পর্কটা ধীরে ধীরে আগের মতো হয়ে উঠতে লাগল।
কাজের ফাঁকে কথা।
একসঙ্গে চা খাওয়া।
ছোট ছোট বিষয় নিয়ে হাসাহাসি।
মাঝে মাঝে পুরোনো স্মৃতি মনে করে চুপ হয়ে যাওয়া।
মায়া বুঝতে পারছিল, সে আবার আরিয়ানের প্রতি আগের মতোই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
কিন্তু এবার সে শুধু আবেগের ওপর ভরসা করতে চায় না।
সত্যিটাও জানতে চায়।
এক সন্ধ্যায় আরিয়ান তাকে শহরের একটি শান্ত রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
— “আজ হঠাৎ?”
— “আজ তোমার সঙ্গে একটা কথা বলতে চাই।”
— “কী কথা?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “আমার পরিবারকে আমি আমাদের সম্পর্কের কথা জানিয়েছি।”
মায়া থমকে গেল।
— “কী বলেছে তোমার বাবা?”
— “তিনি রাজি নন।”
মায়ার বুকটা ধক করে উঠল।
— “তাহলে?”
— “আমি তাকে বলেছি, এবার আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নেব।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— “তোমার পরিবার তোমাকে মেনে নেবে না।”
— “হয়তো সময় লাগবে।”
— “আর যদি না মানে?”
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তাহলে আমি তবুও তোমাকে ছেড়ে যাব না।”
মায়ার চোখে পানি চলে এল।
সে ধীরে বলল,
— “তুমি জানো, আমি তোমাকে হারানোর ভয় এখনও পাই?”
— “জানি।”
— “তাহলে আবার আমাকে হারিয়ে দিও না।”
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
— “এবার না।”
তাদের কথার মাঝেই হঠাৎ মায়ার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
সে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠ বলল,
— “তোমরা পুরোনো বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি বন্ধ করো।”
মায়া চমকে উঠল।
— “আপনি কে?”
কণ্ঠটা ঠান্ডা।
— “যে মানুষটা তোমাদের তিন বছর আগে আলাদা করেছিল।”
মায়ার হাত কেঁপে উঠল।
— “রাকিব চৌধুরী?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর ওপাশ থেকে উত্তর এল—
— “নামটা এখনও মনে আছে দেখছি।”
কল কেটে গেল।
মায়া স্থির হয়ে বসে রইল।
আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “কে ছিল?”
মায়া ধীরে তার দিকে তাকাল।
— “রাকিব চৌধুরী।”
আরিয়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
তারপর ফোনটা আবার বেজে উঠল।
এবার আরিয়ানের ফোনে।
স্ক্রিনে অচেনা নম্বর।
সে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একই কণ্ঠ—
— “তোমরা যদি সত্যিটা জানতে চাও, তাহলে পুরোনো গুদামঘরে এসো।”
আরিয়ান বলল,
— “কখন?”
উত্তর এল—
— “আগামীকাল রাত।”
তারপর কল কেটে গেল।
মায়া আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।
আরিয়ান ধীরে বলল,
— “আমাদের গল্পের সবচেয়ে কঠিন অংশটা এখন শুরু হতে যাচ্ছে।”
মায়া তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
— “যাই হোক, এবার একসঙ্গে থাকব।”
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তিন বছর আগে তারা আলাদা হয়ে গিয়েছিল ভুল বোঝাবুঝির কারণে।
এবার সত্যিটা যত ভয়ংকরই হোক—
তারা একসঙ্গে তার মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
পরদিন সকালটা যেন অন্য সব দিনের চেয়ে ধীর মনে হচ্ছিল।
আরিয়ান ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই রাতের ফোনকলটার কথা ভাবছিল।
“পুরোনো গুদামঘরে এসো।”
রাকিব চৌধুরী সত্যিই কি তাদের তিন বছর আগের বিচ্ছেদের পেছনে ছিল?
আর যদি থাকে, তাহলে কেন?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আজ রাতে সেখানে গিয়ে তারা আসলে কী জানতে পারবে?
মায়াও একই অস্থিরতার মধ্যে ছিল।
সকাল থেকে সে বারবার ফোন হাতে নিচ্ছিল। আরিয়ানের কোনো মেসেজ এসেছে কি না দেখছিল।
অবশেষে দুপুরের দিকে মেসেজ এল।
“ভয় পেয়ো না। আজ যা-ই হোক, আমি তোমার পাশে থাকব।”
মায়া মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ছোট করে উত্তর দিল—
“আমিও।”
রাত সাড়ে আটটার দিকে তারা শহরের পুরোনো শিল্প এলাকার কাছে পৌঁছাল।
জায়গাটা এখন প্রায় পরিত্যক্ত। একসময় এখানে অনেক গুদাম আর ছোট কারখানা ছিল। এখন বেশিরভাগ জায়গাই অন্ধকার।
মায়া গাড়ি থেকে নামতেই চারপাশে তাকাল।
— “তুমি নিশ্চিত আমরা ঠিক জায়গায় এসেছি?”
আরিয়ান হাতে থাকা ঠিকানাটা দেখে বলল,
— “হ্যাঁ।”
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে একটা পুরোনো লোহার গেটের সামনে এসে দাঁড়াল।
গেটটা অল্প খোলা।
ভেতর থেকে মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে।
মায়া অজান্তেই আরিয়ানের হাতটা ধরে ফেলল।
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “ভয় লাগছে?”
মায়া মাথা নাড়ল।
— “একটু।”
— “আমি আছি।”
মায়া হাত ছাড়ল না।
দুজন ভেতরে ঢুকল।
গুদামের মাঝখানে একটা পুরোনো টেবিল। তার ওপর কিছু ফাইল আর একটি ছোট রেকর্ডার রাখা।
কিন্তু ঘরে কেউ নেই।
আরিয়ান চারপাশে তাকাল।
— “রাকিব চৌধুরী কোথায়?”
হঠাৎ রেকর্ডারটা চালু হয়ে গেল।
একটা রেকর্ড করা কণ্ঠ ভেসে এল।
— “তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ, আমি সামনে এসে কথা বলব।”
মায়া চমকে উঠল।
কণ্ঠটা রাকিবের।
— “কিন্তু কিছু সত্যি সামনে থেকে বলা যায় না। কারণ সত্যি জানার পর মানুষ অনেক সময় নিজের কাছের মানুষকেই আর বিশ্বাস করতে পারে না।”
আরিয়ান টেবিলের ফাইল খুলল।
প্রথম ফাইলে ছিল পুরোনো ব্যবসায়িক চুক্তির কপি।
দ্বিতীয় ফাইলে কিছু ব্যাংক লেনদেনের নথি।
আর তৃতীয় ফাইলে ছিল কিছু ই-মেইলের প্রিন্ট কপি।
আরিয়ান দ্রুত কাগজগুলো দেখতে লাগল।
হঠাৎ তার চোখ থেমে গেল।
একটি নথিতে তার বাবার স্বাক্ষর।
কিন্তু তারিখটা এমন একটি দিনের, যেদিন তার বাবা শহরের বাইরে ছিলেন।
— “এটা কীভাবে সম্ভব?”
মায়া কাগজটা হাতে নিল।
— “স্বাক্ষরটা তোমার বাবার মতোই।”
— “কিন্তু এটা তিনি করেননি।”
রেকর্ডার থেকে আবার রাকিবের কণ্ঠ শোনা গেল।
— “তোমার বাবা জানতেন না যে তার নামে কিছু নথি তৈরি হচ্ছে।”
আরিয়ান চমকে গেল।
— “মানে?”
— “কেউ তার স্বাক্ষর নকল করেছিল।”
মায়া ধীরে বলল,
— “কিন্তু কে?”
রেকর্ডার কিছুক্ষণ নীরব রইল।
তারপর উত্তর এল—
— “যার ওপর তোমাদের দুই পরিবারই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করত।”
মায়া আরিয়ান দুজনেই একে অপরের দিকে তাকাল।
তাদের মনে একই প্রশ্ন।
কে?
ঠিক তখনই গুদামের পেছনের দরজা খুলে গেল।
একজন বয়স্ক মানুষ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন।
চুলে পাক ধরেছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ।
মায়া তাকে দেখে চিনতে পারল না।
আরিয়ানও না।
লোকটি টেবিলের কাছে এসে বললেন,
— “তোমরা সত্যিটা জানতে এসেছ?”
আরিয়ান সতর্ক হয়ে বলল,
— “আপনি কে?”
লোকটি বললেন,
— “আমি হাবিব। তোমাদের দুই পরিবারের ব্যবসায় অনেক বছর কাজ করেছি।”
মায়া অবাক হয়ে বলল,
— “আপনিই কি সবকিছু জানেন?”
হাবিব মাথা নিচু করলেন।
— “অনেক কিছু জানি।”
— “তাহলে রাকিব কোথায়?”
— “বিদেশে।”
আরিয়ান বলল,
— “তাহলে সে আমাদের এখানে ডাকল কেন?”
হাবিব মৃদু হাসলেন।
— “কারণ সে চায় তোমরা সত্যিটা জানো। কিন্তু সে নিজে সামনে আসতে ভয় পায়।”
— “কিসের ভয়?”
— “যে মানুষটাকে সে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, সে এখনও তোমাদের কাছেই আছে।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মায়ার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
— “আপনি কাকে বলছেন?”
হাবিব সরাসরি উত্তর দিলেন না।
তিনি একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।
ছবিতে দুই পরিবারের সবাই ছিল।
আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন পরিচিত মুখ।
মায়া ছবিটা দেখে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— “এটা তো…”
আরিয়ানও ছবির দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ।
ছবির মানুষটি তাদের দুজনের পরিবারের অত্যন্ত কাছের একজন।
যাকে তারা ছোটবেলা থেকে বিশ্বাস করে এসেছে।
হাবিব বললেন,
— “তিন বছর আগে দুই পরিবারের মধ্যে যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে এই মানুষটির হাত ছিল।”
মায়া ধীরে বলল,
— “কিন্তু কেন?”
হাবিব বললেন,
— “ব্যবসা দখল করার জন্য।”
আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।
এতদিন যে শত্রুতাকে সে পারিবারিক অহংকার বলে ভেবেছে, তার পেছনে ছিল অর্থ আর ক্ষমতার লোভ।
হাবিব আরও বললেন,
— “সে এমনভাবে নথি তৈরি করেছিল যাতে দুই পরিবারই একে অপরকে দোষী মনে করে। তারপর তোমাদের সম্পর্কের কথাও সে জানত।”
মায়ার চোখে পানি এসে গেল।
— “তাহলে আমাদের চিঠিগুলো?”
— “সেগুলোও সে আটকে দিয়েছিল।”
আরিয়ান মুঠি শক্ত করে ফেলল।
— “কেন?”
— “কারণ সে জানত, তোমরা যদি একসঙ্গে থাকো, তাহলে দুই পরিবার আবার এক হয়ে যাবে।”
মায়া ধীরে বসে পড়ল।
তিন বছর।
তিন বছর ধরে তারা একে অপরকে ভুল বুঝেছে।
তিন বছর ধরে দুজনেই ভেবেছে অন্যজন তাকে ছেড়ে গেছে।
অথচ তাদের মাঝখানে ছিল একজন মানুষ, যে ইচ্ছে করেই সবকিছু ভেঙে দিয়েছিল।
হাবিব টেবিলের ওপর আরেকটি খাম রাখলেন।
— “এটা তোমার জন্য।”
আরিয়ান খাম খুলল।
ভেতরে একটি ছোট্ট চিঠি।
তার বাবার লেখা।
চিঠিতে লেখা ছিল, তিনি তিন বছর আগে আরিয়ানকে বিদেশে পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন কারণ তিনি ভয় পেয়েছিলেন—এই শত্রুতা একদিন তাদের সন্তানদের জন্য বিপদ তৈরি করবে।
আরিয়ান চিঠিটা পড়ে চোখ নামিয়ে ফেলল।
মায়া তার পাশে এসে দাঁড়াল।
— “তুমি ঠিক আছ?”
আরিয়ান ধীরে মাথা নাড়ল।
— “আমি এত বছর বাবার ওপর রাগ করে ছিলাম।”
— “তিনি তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন।”
— “হ্যাঁ।”
মায়া কিছু বলল না।
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তোমার ওপরও রাগ করেছিলাম।”
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— “আমিও।”
দুজনেই কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আরিয়ান ধীরে বলল,
— “আমরা কি তাহলে এতদিন ভুল মানুষকে দোষ দিয়েছি?”
মায়া বলল,
— “হয়তো।”
— “আর এখন?”
মায়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “এখন আমি কাউকে হারাতে চাই না।”
আরিয়ানের চোখে আবেগ ফুটে উঠল।
সে ধীরে মায়ার হাত ধরল।
এইবার মায়া হাত সরিয়ে নিল না।
গুদাম থেকে বের হওয়ার সময় রাত অনেক হয়ে গেছে।
আকাশ পরিষ্কার। দূরে কয়েকটি তারা দেখা যাচ্ছে।
গাড়ির কাছে এসে মায়া থামল।
— “আরিয়ান।”
— “হুম?”
— “আমাদের সামনে এখন কী আছে?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “সত্যিটা আছে। পরিবার আছে। অনেক প্রশ্ন আছে।”
— “আর আমরা?”
আরিয়ান তার দিকে তাকাল।
— “আমরা আছি।”
মায়া হেসে ফেলল।
— “এই উত্তরটাই কি যথেষ্ট?”
— “আমার জন্য যথেষ্ট।”
মায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— “তাহলে এবার একটা কথা আমিও বলি।”
— “বল।”
— “আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি।”
আরিয়ান যেন কয়েক মুহূর্ত কোনো শব্দ খুঁজে পেল না।
তিন বছর ধরে যে কথাটা সে শুনতে চেয়েছে, আজ সেটা আবার শুনল।
সে শুধু বলল,
— “আমিও।”
মায়ার চোখে পানি জমল।
আরিয়ান তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
কিন্তু তাদের এই মুহূর্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
মায়ার ফোনে হঠাৎ একটি মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
মেসেজে শুধু একটি লাইন—
“সত্যিটা জেনেছ। এবার দেখো, তোমাদের পরিবার সেই সত্যি মেনে নেয় কি না।”
মায়া স্ক্রিনটা আরিয়ানের সামনে ধরল।
আরিয়ান মেসেজটা পড়ে বুঝল—
তাদের লড়াই এখনও শেষ হয়নি।
রাতের সেই মেসেজের পর থেকে মায়ার মনটা আর শান্ত হলো না।
“সত্যিটা জেনেছ। এবার দেখো, তোমাদের পরিবার সেই সত্যি মেনে নেয় কি না।”
একটা ছোট্ট বাক্য।
কিন্তু এর মধ্যেই যেন অনেক বড় একটা সতর্কতা লুকিয়ে ছিল।
আরিয়ান গাড়ি চালাচ্ছিল। পাশে বসে মায়া চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান বলল,
— “তুমি ভয় পাচ্ছ?”
মায়া ধীরে মাথা নাড়ল।
— “নিজের জন্য না।”
— “তাহলে?”
— “আমাদের জন্য।”
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
— “এবার আর কিছু আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
মায়া তার দিকে তাকাল।
— “এতটা নিশ্চিত কীভাবে?”
— “কারণ এবার আমরা দুজনেই জানি, আসলে কী হয়েছিল।”
মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “সত্যিটা জানা আর সবাইকে সেটা বিশ্বাস করানো এক নয়।”
আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না।
সে জানত, মায়া ঠিকই বলছে।
তিন বছর ধরে দুই পরিবারের মধ্যে জমে থাকা রাগ একদিনে শেষ হবে না।
পরদিন সকালে আরিয়ান প্রথমে নিজের বাবার সঙ্গে কথা বলল।
স্টাডি রুমে ঢুকতেই বাবা বুঝতে পারলেন, ছেলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে এসেছে।
— “সব জেনেছ?”
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ।”
— “হাবিবের সঙ্গে দেখা হয়েছে?”
— “হ্যাঁ।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “আমি চাইনি তুমি এসব জানো।”
— “কিন্তু জানাটা দরকার ছিল।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “আমি মায়াকে বিয়ে করতে চাই।”
বাবা মাথা তুলে তাকালেন।
কয়েক মুহূর্ত ঘরে নীরবতা।
— “আমি জানতাম তুমি একদিন এই কথাটা বলবে।”
— “আপনি কি আমার পাশে থাকবেন?”
বাবা জানালার বাইরে তাকালেন।
— “তোমার সুখ আমি চাই।”
আরিয়ান একটু আশাবাদী হয়ে বলল,
— “তাহলে?”
— “কিন্তু রহমান পরিবার কি রাজি হবে?”
— “আমরা চেষ্টা করব।”
বাবা ধীরে বললেন,
— “তুমি যদি সত্যিই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকো, আমি তোমাকে থামাব না।”
আরিয়ানের চোখে স্বস্তি ফুটে উঠল।
— “ধন্যবাদ।”
বাবা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “তবে একটা কথা মনে রেখো। ভালোবাসা শুধু দুজন মানুষের ব্যাপার নয় যখন দুই পরিবার জড়িয়ে থাকে। অনেক পুরোনো ক্ষতও তখন সামনে আসে।”
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
— “আমি জানি।”
সেদিন বিকেলে মায়াও বাবার সঙ্গে কথা বলতে গেল।
বাবা জানালার পাশে বসে ছিলেন।
মায়া ধীরে বলল,
— “বাবা, আমি একটা কথা বলতে এসেছি।”
— “বলো।”
— “আমি আরিয়ানের সঙ্গে থাকতে চাই।”
বাবার মুখ কঠিন হয়ে গেল।
— “আমি তোকে নিষেধ করেছি।”
— “আমি জানি।”
— “তবুও?”
— “হ্যাঁ।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
— “তুই কি সত্যিটা জানিস?”
— “হ্যাঁ।”
— “সবটা?”
— “যতটা এখন পর্যন্ত জানা গেছে।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “তবুও তুই তাকে বিশ্বাস করিস?”
মায়া শান্তভাবে বলল,
— “হ্যাঁ।”
— “কেন?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “কারণ তিন বছর আগে আমরা দুজনেই ভুল বুঝেছিলাম। কিন্তু এই তিন বছরে সে কখনো আমার নামে খারাপ কথা বলেনি। কখনো অন্য কারও সামনে আমাকে ছোট করেনি। আর ফিরে এসে সে পালিয়ে যাওয়ার বদলে সত্যিটা খুঁজেছে।”
বাবার চোখ নরম হয়ে এল।
মায়া এগিয়ে এসে বলল,
— “আপনি আমাকে সবসময় নিজের সিদ্ধান্ত নিতে শিখিয়েছেন। আজ যদি নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে চাই, তাহলে আমাকে আটকাবেন না।”
বাবা মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
কিছুক্ষণ পর ধীরে বললেন,
— “আমি তাকে ক্ষমা করতে পারব কি না জানি না।”
মায়া বলল,
— “আপনাকে আজই ক্ষমা করতে হবে না।”
— “তাহলে?”
— “শুধু তাকে একবার নিজের সামনে বসিয়ে কথা বলুন।”
বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।
মায়া ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দুই দিন পর দুই পরিবারকে একসঙ্গে বসানোর সিদ্ধান্ত হলো।
স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হলো মায়াদের বাড়ির পুরোনো ড্রয়িংরুম।
ঘরে সবাই বসে আছে।
এক পাশে মায়ার বাবা।
অন্য পাশে আরিয়ানের বাবা।
মাঝখানে আরিয়ান আর মায়া।
পরিবেশ এতটাই ভারী যে কেউ প্রথমে কথা বলতে পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত আরিয়ানের বাবা বললেন,
— “অনেক বছর ধরে আমরা একে অপরকে দোষ দিয়ে এসেছি।”
মায়ার বাবা কঠিন গলায় বললেন,
— “কারণ আমাদের কাছে প্রমাণ ছিল।”
আরিয়ানের বাবা বললেন,
— “প্রমাণ ছিল, কিন্তু সত্যি ছিল না।”
মায়ার বাবা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তখন আরিয়ান টেবিলের ওপর নথিগুলো রাখল।
— “এই কাগজগুলো দেখুন।”
সবাই একে একে কাগজগুলো দেখতে লাগল।
হাবিবের দেওয়া তথ্য, পুরোনো লেনদেন, নকল স্বাক্ষরের প্রমাণ—সবকিছু সামনে রাখা হলো।
মায়ার বাবা নথিগুলো পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেলেন।
তিনি একটি কাগজ হাতে নিয়ে বললেন,
— “এই স্বাক্ষরটা নকল।”
আরিয়ানের বাবা মাথা নাড়লেন।
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে এত বছর…”
তার গলা থেমে গেল।
মায়া বাবার দিকে তাকাল।
— “বাবা?”
তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
— “আমরা ভুল করেছি।”
ঘরে থাকা সবাই নিস্তব্ধ।
আরিয়ানের বাবা ধীরে বললেন,
— “শুধু আপনাদের ভুল নয়। আমিও ভুল করেছি। রাগের মাথায় অনেক কথা বলেছি।”
মায়ার বাবা এবার তার দিকে তাকালেন।
দুই বৃদ্ধ মানুষের চোখে বহু বছরের কষ্ট।
কিছুক্ষণ পর মায়ার বাবা উঠে দাঁড়ালেন।
— “আমরা কি এত বছর শুধু একটা মিথ্যার জন্য একে অপরকে ঘৃণা করেছি?”
আরিয়ানের বাবা বললেন,
— “হয়তো।”
মায়ার বাবা চেয়ারটায় বসে পড়লেন।
তারপর আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “তুমি কি সত্যিই আমার মেয়েকে সুখী রাখতে পারবে?”
আরিয়ান কোনো বড় প্রতিশ্রুতি দিল না।
শুধু বলল,
— “আমি চেষ্টা করব। প্রতিদিন।”
মায়ার বাবা বললেন,
— “শুধু চেষ্টা?”
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
— “কারণ আমি জানি, সুখী রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ। কিন্তু পাশে থাকার দায়িত্ব পালন করাটাই আসল।”
মায়ার চোখ ভিজে উঠল।
তার বাবা কিছুক্ষণ ছেলের মতো তাকিয়ে রইলেন আরিয়ানের দিকে।
তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “তুই কি ওকেই চাস?”
মায়া ধীরে মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ।”
— “তিন বছর পরেও?”
— “তিন বছর পরেও।”
ঘরের পরিবেশ বদলে গেল।
মায়ার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— “তাহলে আমি আর বাধা হব না।”
মায়া যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
— “সত্যি?”
বাবা মৃদু হেসে বললেন,
— “তুই যদি এতদিন ধরে তাকে মনে রাখতে পারিস, তাহলে হয়তো আমাকেও আমার পুরোনো রাগটা ছেড়ে দিতে হবে।”
মায়া উঠে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
তার চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল।
আরিয়ান নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার বাবা এগিয়ে এসে ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।
— “অবশেষে।”
আরিয়ান হেসে ফেলল।
সেদিন সন্ধ্যায় দুই পরিবার একসঙ্গে বসে অনেকক্ষণ কথা বলল।
পুরোনো ভুল নিয়ে আলোচনা হলো।
কে কোথায় ভুল করেছে, কীভাবে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল—সবকিছু ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো।
মায়া আরিয়ানকে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
শহরের আকাশে তখন সন্ধ্যার শেষ আলো।
মায়া বলল,
— “বিশ্বাস হচ্ছে না।”
— “কী?”
— “এতদিন মনে হয়েছিল আমাদের গল্পের শেষ হয়ে গেছে।”
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
— “গল্প শেষ হয়নি।”
— “তাহলে?”
— “আমাদের আসল গল্প তো এখন শুরু।”
মায়া হেসে বলল,
— “তুমি এখনও অনেক কথা বলো।”
— “আর তুমি এখনও শুনে ফেলো।”
মায়া মাথা নিচু করে হাসল।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান বলল,
— “একটা কথা বলব?”
— “বল।”
— “তিন বছর আগে যদি তুমি আমাকে একটা সুযোগ দিতে…”
মায়া থামিয়ে দিল।
— “তাহলে হয়তো আজকের দিনটা এত সুন্দর হতো না।”
আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল।
মায়া বলল,
— “কারণ এতদিন তোমাকে হারিয়ে বুঝেছি, তোমাকে কতটা চাই।”
আরিয়ান কিছু বলল না।
শুধু তার হাতটা ধরে রাখল।
তাদের সামনে এবার কোনো পরিবারগত বাধা নেই।
কিন্তু তারা জানত না—
যে মানুষ এত বছর তাদের আলাদা করে রেখেছিল, সে এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
সেদিন রাতে হাবিব আরিয়ানকে একটি ফোন করলেন।
— “একটা খবর আছে।”
— “কী?”
— “রাকিব দেশে ফিরেছে।”
আরিয়ান থমকে গেল।
— “কোথায়?”
হাবিব ধীরে বললেন,
— “সে তোমাদের বিয়ের খবর পেয়েছে।”
আরিয়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— “তারপর?”
— “সে বলেছে, বিয়েটা সে হতে দেবে না।”
ফোন কেটে গেল।
আরিয়ান বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার শহরের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক মুহূর্ত পর মায়া এসে বলল,
— “কী হয়েছে?”
আরিয়ান তার দিকে তাকাল।
সবকিছু বলতে একটু সময় নিল।
তারপর বলল,
— “আমাদের সামনে শেষ একটা বাধা আছে।”
মায়া শান্তভাবে বলল,
— “তাহলে সেটাও একসঙ্গে পার হব।”
আরিয়ান তার হাত ধরল।
এবার তাদের চোখে ভয় ছিল না।
ছিল শুধু একে অপরের প্রতি বিশ্বাস।
কারণ তিন বছর আগে তারা হারিয়েছিল সম্পর্ককে।
এবার তারা কোনোভাবেই হারাতে রাজি নয়।
রাকিব দেশে ফিরেছে—এই খবরটা জানার পরও মায়া ভয় পেল না।
তিন বছর আগে হলে হয়তো সে ভেঙে পড়ত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আলাদা।
এবার সত্যিটা তাদের জানা।
দুই পরিবারও জানে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, আরিয়ান আর মায়া দুজনেই জানে তারা কী চায়।
তবুও আরিয়ান চিন্তিত ছিল।
কারণ রাকিব এত বছর পর ফিরে এসেছে শুধু পুরোনো হিসাব মেটাতে নয়। তার হাতে হয়তো এখনও এমন কিছু তথ্য আছে, যা আবার দুই পরিবারের মধ্যে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
পরদিন সকালে আরিয়ান হাবিবকে ফোন করল।
— “রাকিব কোথায় আছে?”
হাবিব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— “পুরোনো অফিসে।”
— “একাই?”
— “হ্যাঁ।”
— “আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
হাবিব সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— “সাবধানে যেও।”
— “আমি একা যাচ্ছি না।”
আরিয়ান ফোন রেখে মায়ার দিকে তাকাল।
মায়া তখন পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
— “আমি তোমার সঙ্গে যাব।”
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
— “না। এবার তুমি বাড়িতে থাকবে।”
— “কেন?”
— “কারণ এটা আমার পরিবারের ব্যাপার।”
মায়া শান্তভাবে বলল,
— “না। এটা আমাদের ব্যাপার।”
আরিয়ান কিছু বলতে পারল না।
শেষ পর্যন্ত দুজন একসঙ্গে বের হলো।
পুরোনো অফিসটা শহরের এক নিরিবিলি এলাকায়।
বহু বছর আগে এখানে তাদের দুই পরিবারের ব্যবসার কাজ হতো। এখন জায়গাটা প্রায় ফাঁকা।
ভেতরে ঢুকতেই তারা রাকিবকে দেখতে পেল।
বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে ক্লান্তির ছাপ। আগের মতো আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে না।
রাকিব তাদের দেখে মৃদু হাসল।
— “অবশেষে এসেছ।”
আরিয়ান গম্ভীর গলায় বলল,
— “আপনি আমাদের জীবন নষ্ট করেছেন।”
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
— “হ্যাঁ।”
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
— “আপনি স্বীকার করছেন?”
— “অস্বীকার করার আর কিছু নেই।”
আরিয়ান বলল,
— “কেন করেছিলেন?”
রাকিব জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
— “লোভ।”
একটা শব্দ।
কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল বহু বছরের অপরাধবোধ।
— “আমি তোমাদের দুই পরিবারের ব্যবসার দায়িত্বে ছিলাম। আমি জানতাম, তোমাদের দুই পরিবার একসঙ্গে থাকলে ব্যবসাটা অনেক বড় হবে। কিন্তু তখন আমি চেয়েছিলাম সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে।”
মায়া বলল,
— “তাই আমাদের পরিবারকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন?”
— “হ্যাঁ।”
— “আর আমাদের চিঠিগুলো?”
রাকিব চোখ নামিয়ে বললেন,
— “সেগুলোও আমি আটকে দিয়েছিলাম।”
মায়ার চোখে পানি চলে এল।
— “আপনি জানেন, আমরা কত বছর কষ্ট পেয়েছি?”
রাকিব মাথা নিচু করলেন।
— “জানি।”
আরিয়ান রাগ সামলাতে না পেরে বলল,
— “আপনার জন্য আমরা তিন বছর একে অপরকে হারিয়ে রেখেছিলাম।”
রাকিব কোনো উত্তর দিলেন না।
কিছুক্ষণ পর বললেন,
— “আমি ভেবেছিলাম টাকা আর ক্ষমতা পেলে সবকিছু পাওয়া যায়।”
তিনি মায়ার দিকে তাকালেন।
— “কিন্তু পরে বুঝেছি, মানুষের বিশ্বাস হারালে কোনো কিছুই পাওয়া যায় না।”
আরিয়ান বলল,
— “এখন আপনি কী চান?”
— “ক্ষমা।”
মায়া চোখ মুছে বলল,
— “ক্ষমা করা সহজ নয়।”
— “আমি জানি।”
— “তবু কেন আমাদের সামনে এলেন?”
রাকিব ধীরে বললেন,
— “কারণ আমি চাই না আমার ভুলের কারণে তোমাদের জীবন আবার নষ্ট হোক।”
তিনি একটি ফাইল এগিয়ে দিলেন।
— “এখানে সব প্রমাণ আছে। কীভাবে আমি নথি বদলেছি, চিঠি আটকে দিয়েছি, দুই পরিবারকে ভুল বুঝিয়েছি—সব।”
আরিয়ান ফাইলটা হাতে নিল।
— “এগুলো দিয়ে কী হবে?”
— “তোমাদের পরিবারের কাছে সত্যিটা পুরোপুরি পরিষ্কার হবে।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “আপনাকে আমি ক্ষমা করতে পারছি না।”
রাকিব মাথা নত করলেন।
— “আমি সেটা আশা করিনি।”
— “কিন্তু…”
মায়া একটু থেমে বলল,
— “আপনি যদি সত্যিই নিজের ভুল স্বীকার করে থাকেন, তাহলে আর কখনো কোনো মানুষের জীবনকে নিজের স্বার্থের জন্য নষ্ট করবেন না।”
রাকিব ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,
— “করব না।”
রাকিবের কাছ থেকে পাওয়া প্রমাণ দুই পরিবারের সামনে রাখা হলো।
সব সন্দেহ দূর হলো।
বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা রাগ ধীরে ধীরে নরম হয়ে গেল।
মায়ার বাবা আরিয়ানের বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
— “আমরা দুজনেই ভুল মানুষকে বিশ্বাস করেছিলাম।”
আরিয়ানের বাবা বললেন,
— “আর ভুল বোঝাবুঝিকে সত্যি ভেবেছিলাম।”
দুজন মানুষ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
মায়া দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিল।
তার চোখে পানি।
আরিয়ান পাশে এসে দাঁড়াল।
— “কাঁদছ?”
মায়া হেসে বলল,
— “আজ আনন্দের কান্না।”
আরিয়ানও হেসে ফেলল।
কয়েক সপ্তাহ পর।
দুই পরিবারে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল।
মায়াদের বাড়িতে ব্যস্ততা।
কেউ কাপড় কিনছে, কেউ অতিথির তালিকা করছে, কেউ সাজসজ্জা নিয়ে আলোচনা করছে।
আরিয়ানের বাড়িতেও একই অবস্থা।
তিন বছর আগে যে দুই পরিবার একে অপরের নাম শুনলেই রাগে ভরে উঠত, আজ তারা একই বিয়ের আয়োজন করছে।
এক সন্ধ্যায় মায়া নিজের ঘরে বসে পুরোনো ডায়েরিটা খুলল।
তিন বছর আগে লেখা শেষ পাতাটা সে পড়ল।
সেখানে লেখা ছিল—
“যদি কোনোদিন আরিয়ান ফিরে আসে, আমি জানি না কী করব।”
মায়া হেসে ফেলল।
আজ সে জানে কী করবে।
সে ডায়েরিটা বন্ধ করে জানালার পাশে দাঁড়াল।
ফোনে আরিয়ানের কল এল।
— “কী করছ?”
— “তোমার কথা ভাবছিলাম।”
— “সত্যি?”
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে আমি জিতে গেলাম।”
মায়া হেসে বলল,
— “কীসে?”
— “তোমার মনে থাকার প্রতিযোগিতায়।”
— “তুমি এখনও বাচ্চা।”
— “আর তুমি এখনও আমার সঙ্গে তর্ক করো।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
তারপর মায়া বলল,
— “আরিয়ান।”
— “হুম?”
— “তিন বছর আগে যদি আমরা আলাদা না হতাম, তাহলে কি আজকের সম্পর্কটা এতটা গভীর হতো?”
আরিয়ান একটু ভেবে বলল,
— “হয়তো না।”
— “কেন?”
— “কারণ হারানোর ভয় আমাদের শিখিয়েছে, একে অপরকে কতটা মূল্য দিতে হয়।”
মায়া মৃদু গলায় বলল,
— “আমি তোমাকে আর হারাতে চাই না।”
— “হারাবে না।”
বিয়ের দিন।
সকাল থেকেই বাড়িতে উৎসবের পরিবেশ।
আত্মীয়স্বজন, হাসি, গল্প, ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে বাড়িটা প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
মায়া সাজঘরে বসে আয়নার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার চোখে উত্তেজনা, আনন্দ আর অল্প নার্ভাসনেস।
একসময় তার মা এসে বললেন,
— “কী ভাবছিস?”
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— “ভাবছি, এত কিছু পেরিয়ে সত্যিই আজকের দিনটা এসেছে।”
মা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
— “কিছু সম্পর্কের পরীক্ষা একটু বেশি হয়।”
মায়া নিচু স্বরে বলল,
— “কিন্তু শেষটা সুন্দর হলে অপেক্ষাটা সার্থক।”
অন্যদিকে আরিয়ানও প্রস্তুত।
বিয়ের আসরে বসে তার চোখ বারবার দরজার দিকে যাচ্ছিল।
অবশেষে মায়া এল।
আরিয়ান কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল।
তিন বছর আগে যে মেয়েটাকে সে হারিয়েছিল, আজ সেই মেয়েটাই তার সামনে নতুন জীবনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মায়া তার পাশে এসে বসতেই আরিয়ান ধীরে বলল,
— “আজও বিশ্বাস হচ্ছে না।”
মায়া হেসে বলল,
— “আমারও না।”
অনুষ্ঠান এগিয়ে গেল।
দুই পরিবারের মানুষ তাদের পাশে দাঁড়াল।
কোনো পুরোনো রাগ নেই।
কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই।
শুধু শান্ত একটা অনুভূতি—
অবশেষে সব ঠিক হয়েছে।
অনুষ্ঠান শেষে রাতে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল আরিয়ান আর মায়া।
শহরের আলো দূরে ঝিলমিল করছে।
মায়া বলল,
— “আমাদের গল্পটা অদ্ভুত।”
— “খুব।”
— “তিন বছর আলাদা থেকেও আমরা একে অপরকে ভুলতে পারিনি।”
— “কারণ কিছু মানুষকে দূরে রাখা যায়, মন থেকে সরানো যায় না।”
মায়া তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
— “এখন?”
আরিয়ান বলল,
— “এখন কোনো দূরত্ব নেই।”
মায়া ধীরে বলল,
— “তাহলে একটা প্রতিশ্রুতি দাও।”
— “কী?”
— “কখনো কোনো ভুল বোঝাবুঝি হলে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না।”
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “প্রতিশ্রুতি।”
মায়া হেসে বলল,
— “আর আমি?”
— “তুমিও।”
— “প্রতিশ্রুতি।”
দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।
তাদের গল্পে ছিল বিচ্ছেদ।
ছিল ভুল বোঝাবুঝি।
ছিল পারিবারিক শত্রুতা।
ছিল হারিয়ে যাওয়া চিঠি।
ছিল তিন বছরের অপেক্ষা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা বুঝেছিল—
সত্যিকারের সম্পর্ককে সময় দূরে রাখতে পারে, কিন্তু মুছে ফেলতে পারে না।
আর তাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশ ছিল এই যে, তারা শুধু একে অপরকে ফিরে পায়নি—
তারা নিজেদের পরিবারকেও আবার এক করে তুলেছিল।
সেদিন রাতের আকাশের নিচে মায়া আর আরিয়ান নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে গেল।
এবার কোনো ভয় ছাড়াই।
এবার কোনো ভুল বোঝাবুঝি ছাড়াই।
এবার সত্যিই—
একসঙ্গে।
....