বন্ধুত্বের জায়গায় বিয়ের সিদ্ধান্ত

শহরটা তখনও পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়েনি।

রাত সাড়ে দশটা। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তার গাড়িগুলো একে একে কমে এসেছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল আরিয়ান। হাতে ফোন, অথচ স্ক্রিনে কোনো নতুন মেসেজ নেই।

তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—

“আমি কি সত্যিই ভুল মানুষকে বিয়ে করতে যাচ্ছি?”

কয়েক ঘণ্টা পরই তার বিয়ে।

আর যার সঙ্গে বিয়ে, সে আর কেউ নয়—তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু মেহরিন।

মেহরিনকে সে চেনে প্রায় দশ বছর ধরে।

স্কুলের প্রথম দিন থেকে।

তখন মেহরিন ছিল অসম্ভব চঞ্চল একটা মেয়ে। ক্লাসে শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর না জেনেও হাত তুলে বসে থাকত। আরিয়ান পাশ থেকে ফিসফিস করে উত্তর বলে দিত।

সেখান থেকেই শুরু।

তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্বটা এত গভীর হয়েছিল যে দুজনের জীবনে আলাদা করে আর কাউকে প্রয়োজনই মনে হতো না।

আরিয়ান কোনো সমস্যায় পড়লে প্রথম ফোন করত মেহরিনকে।

মেহরিন মন খারাপ করলে সবার আগে খুঁজত আরিয়ানকে।

পরীক্ষার আগের রাতে একসঙ্গে পড়া, জন্মদিনে প্রথম শুভেচ্ছা, ঝগড়া করে কয়েক ঘণ্টা কথা না বলা, আবার নিজেরাই হাসতে হাসতে সব ঠিক করে ফেলা—সবকিছুতেই তারা ছিল একসঙ্গে।

একসময় দুই পরিবারের মানুষও ধরে নিয়েছিল, এই বন্ধুত্ব একদিন বিয়েতে গড়াবে।

মেহরিনও হয়তো সেটা চেয়েছিল।

কিন্তু আরিয়ান?

সে কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেনি।

কারণ মেহরিনকে হারানোর ভয় তার ছিল না।

সে ভাবত, মেহরিন তো তার জীবনেই আছে।

তাই তাকে ভালোবাসে কি না—এই প্রশ্নটাই কখনো মাথায় আসেনি।

বিয়ের আগের রাতে মেহরিন ফোন করেছিল।

“ঘুমাচ্ছ?”

“না।”

“ভয় লাগছে?”

আরিয়ান একটু চুপ করে বলল,

“জানি না।”

ওপাশ থেকে মেহরিন হেসে ফেলল।

“আমারও লাগছে।”

“তুমি ভয় পাচ্ছ?”

“হ্যাঁ। এত বছরের বন্ধুত্বটা কাল থেকে অন্যরকম হয়ে যাবে না?”

আরিয়ান জানালার বাইরে তাকাল।

“হয়তো হবে।”

“আর যদি সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়?”

প্রশ্নটা শুনে আরিয়ান থেমে গেল।

মেহরিন আবার বলল,

“আমাদের বন্ধুত্বটা কিন্তু আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।”

আরিয়ান ধীরে বলল,

“আমার কাছেও।”

কথাটা বলার পরও তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি রয়ে গেল।

পরদিন বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হলো।

সবাই হাসছে।

ছবি তুলছে।

আত্মীয়রা শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।

মেহরিনও হাসছে।

কিন্তু আরিয়ান লক্ষ্য করল, মেয়েটার চোখে আনন্দের সঙ্গে একটা অজানা ভয়ও আছে।

রাতের দিকে যখন দুজন একা হলো, মেহরিন চুপচাপ বসে রইল।

আরিয়ান বলল,

“কী ভাবছ?”

“ভাবছি…”

“কী?”

মেহরিন মৃদু হেসে বলল,

“আজ থেকে তোমাকে আর শুধু বন্ধু বলে ডাকতে পারব না।”

আরিয়ানও হেসে ফেলল।

“তাহলে কী ডাকবে?”

মেহরিন একটু লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বলল,

“জানি না।”

দুজনেই হেসে উঠল।

কিন্তু হাসির পর আবার নীরবতা।

কারণ দুজনেই বুঝতে পারছিল—বন্ধুত্বের জায়গা থেকে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের দিকে যাওয়া এত সহজ নয়।

মেহরিন ধীরে বলল,

“আরিয়ান?”

“হুম?”

“তুমি কি আমাকে সত্যিই বিয়ে করতে চেয়েছিলে?”

প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল।

কিন্তু উত্তরটা আরিয়ানের কাছে ভয়ংকর কঠিন।

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“আমি… জানি না।”

মেহরিনের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

“জানো না?”

আরিয়ান মাথা নিচু করল।

“আমি তোমাকে হারাতে চাইনি। সবাই যখন বলল আমাদের বিয়ে করা উচিত, তখন মনে হলো… হয়তো এটাই স্বাভাবিক।”

মেহরিন অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না।

তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,

“কাউকে হারানোর ভয় আর কাউকে নিজের করে পাওয়ার ইচ্ছা—দুটো এক জিনিস নয়, আরিয়ান।”

আরিয়ান তাকাল তার দিকে।

সেই প্রথমবার সে মেহরিনকে শুধু তার পুরোনো বন্ধু হিসেবে দেখল না।

একজন মানুষ হিসেবে দেখল।

একজন মেয়ের চোখে জমে থাকা কষ্ট হিসেবে দেখল।

কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

কারণ পরদিন থেকেই তাদের নতুন জীবন শুরু হওয়ার কথা।

আর সেই জীবন শুরু হওয়ার আগেই তাদের সম্পর্কের ভিতরে একটা প্রশ্ন জন্ম নিয়েছিল—

তারা কি সত্যিই একে অপরের জন্য তৈরি, নাকি এত বছরের বন্ধুত্ব তাদের এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে, যেটা তাদের নেওয়া উচিত ছিল না?

আরিয়ান তখনও জানত না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তার জীবনে এমন একজন মানুষ আসবে, যে তাকে প্রথমবার শেখাবে—

কাউকে ভালো লাগা আর কাউকে নিজের জীবনে বেছে নেওয়া এক নয়।

আর সেই মানুষটির নাম—

নীরা।

বিয়ের পর কেটে গেছে প্রায় তিন মাস।

আরিয়ান আর মেহরিনের সংসার বাইরে থেকে দেখলে একদম স্বাভাবিক মনে হতো।

সকালে একসঙ্গে নাশতা, রাতে একই ঘরে বসে গল্প, ছুটির দিনে কোথাও ঘুরতে যাওয়া—সবই ছিল।

শুধু একটা জিনিস ছিল না।

দুজনের সম্পর্কের মধ্যে সেই স্বামী-স্ত্রীর টানটা ছিল না।

মেহরিন চেষ্টা করত।

আরিয়ানও চেষ্টা করত।

কিন্তু চেষ্টা করে কি অনুভূতি তৈরি করা যায়?

মেহরিন মাঝে মাঝে আরিয়ানের পাশে বসে গল্প করত। আরিয়ান মন দিয়ে শুনত, হাসত, উত্তর দিত। কিন্তু মেহরিন যখন একটু কাছে আসত, তখন আরিয়ানের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হতো।

সে বুঝতে পারত না, কেন এমন হচ্ছে।

এক রাতে মেহরিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

আরিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল,

“এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

“ঘুম আসছে না।”

“কিছু হয়েছে?”

মেহরিন মাথা নাড়ল।

“না।”

“তাহলে?”

মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“তুমি কি সুখী?”

আরিয়ান থমকে গেল।

“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

“হঠাৎ না। অনেকদিন ধরে মনে হচ্ছে।”

আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না।

মেহরিন ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।

“তুমি আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো। আমার যত্ন নাও। আমি অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখাও। বাইরে গেলে আমার জন্য কিছু নিয়ে আসো। কিন্তু…”

সে থেমে গেল।

“কিন্তু?”

“তোমার চোখে আমাকে দেখে সেই অনুভূতিটা দেখি না, যেটা একটা মেয়ের তার স্বামীর চোখে দেখার কথা।”

আরিয়ান মাথা নিচু করল।

কথাটা সত্যি।

কিন্তু সত্যিটা স্বীকার করার সাহস তার ছিল না।

মেহরিন হালকা হেসে বলল,

“তোমাকে আমি কোনোদিন জোর করব না।”

“মেহরিন…”

“শুধু একটা কথা মনে রেখো, আরিয়ান। বন্ধুত্বের জায়গা থেকে বিয়ে করা যায়, কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু দায়িত্ব দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না।”

মেহরিন চলে গেল।

আরিয়ান অনেকক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল।

পরদিন অফিসে যাওয়ার পথে প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো।

গাড়ির সামনে কিছুই ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না।

একটা ক্যাফের সামনে গাড়ি থামিয়ে আরিয়ান ভেতরে ঢুকে পড়ল।

ক্যাফেটা খুব বড় নয়।

কোণের একটা টেবিলে বসে ল্যাপটপ খুলল সে।

কিছুক্ষণ পর পাশের টেবিল থেকে একটা মেয়ের বিরক্ত কণ্ঠ ভেসে এল।

“আপনি যদি এখনই না যান, আমি কিন্তু সত্যিই রাগ করব।”

আরিয়ান না তাকিয়েই শুনছিল।

তারপর মেয়েটা বলল,

“না, আমি আপনার সঙ্গে ডেট করছি না। আমি আমার বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি।”

আরিয়ান এবার তাকাল।

মেয়েটা একা বসে আছে।

সামনে একটা কফির কাপ।

চোখে বিরক্তি।

চুলগুলো বৃষ্টিতে সামান্য ভিজে কপালের পাশে লেগে আছে।

হঠাৎ মেয়েটার চোখ আরিয়ানের সঙ্গে মিলে গেল।

সে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

আরিয়ান দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।

কিছুক্ষণ পর মেয়েটা উঠে কাউন্টারের দিকে গেল।

কফি নিয়ে ফেরার সময় হঠাৎ তার হাত থেকে একটা ফাইল পড়ে গেল।

কাগজগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে গেল।

আরিয়ান উঠে সাহায্য করল।

“থ্যাঙ্ক ইউ।”

“সমস্যা নেই।”

মেয়েটা কাগজগুলো গুছাতে গুছাতে বলল,

“আপনাকে আগে দেখেছি মনে হচ্ছে।”

আরিয়ান একটু অবাক হলো।

“আমাকে?”

“হ্যাঁ।”

“কোথায়?”

মেয়েটা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

“মনে করতে পারছি না।”

তারপর হাসল।

“থাক। হয়তো ভুল।”

আরিয়ানও হেসে ফেলল।

“হতে পারে।”

“আমি নীরা।”

“আরিয়ান।”

নীরা হাত বাড়িয়ে দিল।

আরিয়ান হাত মেলাল।

খুব সাধারণ একটা পরিচয়।

কিন্তু সে জানত না, এই ছোট্ট পরিচয়টাই তার জীবনকে ধীরে ধীরে অন্যদিকে নিয়ে যাবে।

সেদিনের পর অদ্ভুতভাবে নীরার সঙ্গে তার দেখা হতে থাকল।

কখনো অফিসের সামনে।

কখনো সেই ক্যাফেতে।

কখনো রাস্তায়।

প্রথমে তারা শুধু পরিচিত ছিল।

তারপর কথা বলতে শুরু করল।

নীরা খুব সহজে কথা বলত।

তার মধ্যে কোনো ভান ছিল না।

একদিন নীরা বলল,

“আপনি সবসময় এত চুপচাপ কেন?”

আরিয়ান হেসে বলল,

“আমি কি চুপচাপ?”

“হুম।”

“আপনি এত কথা বলেন বলে হয়তো আমাকে চুপচাপ মনে হয়।”

নীরা হেসে ফেলল।

“সেটাও হতে পারে।”

একদিন কফির কাপ হাতে নীরা বলল,

“আপনি কি কখনো এমন কাউকে বিয়ে করেছেন, যাকে আপনি খুব ভালো বন্ধু মনে করেন?”

আরিয়ান চমকে তাকাল।

“কেন?”

“এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।”

“না।”

“তাহলে বুঝবেন না।”

আরিয়ান কিছু বলল না।

নীরা তাকিয়ে বলল,

“কী হলো?”

“কিছু না।”

“আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে অনেক কিছু।”

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

“কখনো কখনো সবচেয়ে কাছের মানুষটাকেও আমরা ঠিকভাবে চিনতে পারি না।”

নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

“হয়তো। আবার কখনো অচেনা একজন মানুষও এমন কিছু বুঝে ফেলে, যেটা কাছের মানুষরা বুঝতে পারে না।”

আরিয়ানের বুকের ভেতর কথাটা অদ্ভুতভাবে আটকে গেল।

সেদিন রাতে বাসায় ফিরে মেহরিনকে বারান্দায় পেল সে।

মেহরিন বই পড়ছিল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

“মেহরিন?”

“হুম?”

“তোমার কি মনে হয় মানুষ জীবনে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে?”

মেহরিন বই বন্ধ করল।

“অবশ্যই পারে।”

“আর সেই ভুল ঠিক করার সুযোগ পাওয়া উচিত?”

মেহরিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর শান্তভাবে বলল,

“সুযোগ পাওয়া আর সেই সুযোগ নেওয়ার সাহস—দুটো আলাদা ব্যাপার।”

আরিয়ান অবাক হয়ে গেল।

মেহরিন আবার বই খুলে ফেলল।

“কেন? এমন কিছু হয়েছে?”

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

“না।”

কিন্তু মেহরিন বুঝে গিয়েছিল।

কিছু একটা বদলাচ্ছে।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—

সে জানত না, সেই পরিবর্তনের মধ্যে তার জন্য জায়গাটা কতটুকু থাকবে।

অন্যদিকে আরিয়ানও বুঝতে শুরু করছিল—

নীরার সঙ্গে কথা বললে তার ভেতর যে অদ্ভুত শান্তি তৈরি হয়, সেটা শুধু বন্ধুত্ব নয়।

কিন্তু সে এখনও নিজের কাছে সেই সত্যিটা স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল না।

কারণ তার সামনে ছিল একটা সম্পর্ক।

আর পেছনে ছিল দশ বছরের বন্ধুত্ব।

আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল—

এক অচেনা মেয়ের চোখে দেখা নিজের নতুন এক রূপ।

নীরার সঙ্গে পরিচয়ের পর প্রায় এক মাস কেটে গেছে।

এই এক মাসে আরিয়ানের জীবনে খুব বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। অথচ তার ভেতরে যেন অনেক কিছু বদলে গেছে।

আগে অফিস থেকে বের হওয়ার পর তার মাথায় শুধু বাসায় ফেরার কথা থাকত।

এখন কখনো কখনো সে অজান্তেই সেই ক্যাফেটার সামনে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যেত।

কখনো নীরার সঙ্গে দেখা হতো।

কখনো হতো না।

আর দেখা না হলে নিজের কাছেই অদ্ভুত একটা অস্বস্তি লাগত।

একদিন বিকেলে নীরা ফোন করল।

“আপনি কোথায়?”

আরিয়ান অবাক হলো।

“অফিসে।”

“একটু সময় হবে?”

“কেন?”

“আমার একটা জরুরি কাজ আছে।”

“কী কাজ?”

“সেটা দেখা হলে বলব।”

আরিয়ান হেসে ফেলল।

“আপনি সবকিছু এত রহস্য করে বলেন কেন?”

“কারণ আপনি বেশি প্রশ্ন করেন।”

“ঠিক আছে। কোথায় আসব?”

নীরা একটা ঠিকানা দিল।

সেখানে গিয়ে আরিয়ান দেখল, নীরা একটা ছোট বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কয়েকটা বই।

আরিয়ান গাড়ি থেকে নেমে বলল,

“এগুলোই আপনার জরুরি কাজ?”

“হ্যাঁ।”

“আমাকে বই কিনতে ডেকেছেন?”

“না। বইগুলো বহন করার জন্য ডেকেছি।”

আরিয়ান হেসে মাথা নাড়ল।

“আপনি সত্যিই অদ্ভুত।”

নীরা একটা বই তার হাতে দিয়ে বলল,

“এই বইটা কিন্তু সাবধানে রাখবেন।”

“কেন?”

“আমার খুব প্রিয়।”

আরিয়ান বইটার দিকে তাকাল।

“আপনার এত প্রিয়?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আমাকে দিলেন কেন?”

নীরা মৃদু হেসে বলল,

“কারণ মনে হলো আপনি পড়লে বুঝবেন।”

আরিয়ান বইটা হাতে নিয়ে বলল,

“আমি যদি না বুঝি?”

“তাহলে আবার কথা হবে।”

কথাটা খুব সাধারণ।

কিন্তু আরিয়ানের মনে হলো, নীরা যেন কথার আড়ালে আরও কিছু বলল।

সেদিন তারা বইয়ের দোকানের পাশের ছোট্ট কফিশপে বসেছিল।

নীরা জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে বলল,

“আপনি কি কখনো নিজের জন্য কিছু করেছেন?”

“মানে?”

“সবসময় অন্যদের কথা ভেবে চলেন। কখনো নিজের ইচ্ছেটা শুনেছেন?”

আরিয়ান একটু চুপ করে রইল।

“জানি না।”

“আপনি সব প্রশ্নের উত্তর ‘জানি না’ দিয়ে দেন।”

“সবকিছুর উত্তর জানা থাকে না।”

নীরা তার দিকে তাকাল।

“কিছু উত্তর জানতে হয়।”

“কীভাবে?”

“নিজের কাছ থেকে।”

আরিয়ান হেসে বলল,

“আপনি খুব দার্শনিক হয়ে যাচ্ছেন।”

“আপনি খুব পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।”

হাসিটা থেমে গেল আরিয়ানের।

নীরা এবার নরম গলায় বলল,

“আপনার চোখে মাঝে মাঝে এমন একটা ক্লান্তি দেখি, যেটা আপনার হাসির সঙ্গে মেলে না।”

আরিয়ান কিছু বলল না।

নীরা আর জিজ্ঞেস করল না।

এই একটা ব্যাপারই আরিয়ানের ভালো লাগত।

নীরা তাকে প্রশ্ন করত, কিন্তু জোর করত না।

তার নীরবতাকেও যেন সম্মান করত।

সেদিন রাতে বাসায় ফিরে আরিয়ান দেখল মেহরিন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে।

“খাবে?”

“হুম।”

টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে মেহরিন বলল,

“আজ তোমাকে বেশ হাসিখুশি লাগছে।”

আরিয়ান থেমে গেল।

“তাই?”

“হ্যাঁ।”

“অফিসে ভালো একটা খবর পেয়েছি।”

মেহরিন মৃদু হাসল।

“ভালো।”

তারপর দুজন চুপচাপ খেতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর মেহরিন বলল,

“আরিয়ান?”

“হুম?”

“তোমার কি কারও সঙ্গে দেখা হচ্ছে?”

চামচটা থেমে গেল আরিয়ানের হাতে।

“মানে?”

“তুমি বুঝতে পারছ আমি কী বলতে চাইছি।”

আরিয়ান চোখ তুলল।

মেহরিনের চোখে রাগ ছিল না।

ছিল শুধু ভয়।

“না,” আরিয়ান বলল।

মেহরিন ধীরে মাথা নাড়ল।

“ঠিক আছে।”

কিন্তু কথাটা বলার পরও তার মুখের চিন্তা দূর হলো না।

পরদিন সন্ধ্যায় নীরা আরিয়ানকে ফোন করল না।

পরদিনও না।

তৃতীয় দিনেও না।

আরিয়ান প্রথমে বিষয়টা গুরুত্ব দিল না।

কিন্তু চতুর্থ দিন সে নিজেই ফোন করল।

“কোথায়?”

ওপাশে নীরার কণ্ঠ শান্ত।

“বাসায়।”

“কী হয়েছে?”

“কিছু হয়নি।”

“তাহলে ফোন ধরছিলেন না কেন?”

“ব্যস্ত ছিলাম।”

আরিয়ান বুঝতে পারল, কিছু একটা হয়েছে।

“নীরা, সত্যি বলুন।”

কিছুক্ষণ নীরবতার পর নীরা বলল,

“আপনার স্ত্রীকে আমি দেখেছি।”

আরিয়ানের বুক ধক করে উঠল।

“কোথায়?”

“সেদিন আপনার সঙ্গে ছিলাম যখন, তখন আপনার ফোনে একটা ছবি দেখেছিলাম। পরে বুঝেছি উনিই আপনার স্ত্রী।”

আরিয়ান চুপ।

নীরা ধীরে বলল,

“আপনি আমাকে কখনো বলেননি।”

“আমি বলতে চেয়েছিলাম।”

“কিন্তু বলেননি।”

“আমি সুযোগ পাইনি।”

“নাকি সাহস পাননি?”

আরিয়ান উত্তর দিতে পারল না।

নীরা বলল,

“আমি আপনার জীবনে কোনো সমস্যা তৈরি করতে চাই না।”

“আপনি সমস্যা নন।”

“তাহলে?”

আরিয়ান জানত না কী বলবে।

নীরা শেষ পর্যন্ত বলল,

“আপনার জীবনে আগে থেকেই একটা মানুষ আছে। সেই মানুষটার প্রতি আপনার দায়িত্ব আছে। আপনার নিজের অনুভূতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলা ঠিক হবে না।”

ফোন কেটে গেল।

আরিয়ান অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

সেদিন রাতে ঘুম এল না।

নীরার কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।

“আপনার নিজের অনুভূতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত…”

সে কি সত্যিই নীরাকে নিয়ে ভাবছে?

নাকি নিজের অসুখী জীবনের কারণে একজন নতুন মানুষের উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই।

কিন্তু একটা ব্যাপার সে বুঝতে পারল—

মেহরিনকে বিয়ে করার পর এতদিন সে শুধু একটা সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু নিজের মনকে কখনো জিজ্ঞেস করেনি—

সে আসলে কী চায়?

পরদিন সকালে মেহরিন তাকে একটা চিঠি দিল।

“এটা তোমার জন্য।”

আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,

“চিঠি?”

“হ্যাঁ। এখন পড়ো না। সময় হলে পড়বে।”

“কী আছে?”

মেহরিন হালকা হাসল।

“তোমার একটা প্রশ্নের উত্তর।”

আরিয়ান চিঠিটা হাতে নিল।

মেহরিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

কাঁপা হাতে খামটা খুলতে গিয়ে আরিয়ানের বুকের ভেতর অজানা একটা ভয় তৈরি হলো।

চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল আরিয়ান।

খামটা খুব সাধারণ। সাদা কাগজের ওপর শুধু তার নাম লেখা—

“আরিয়ান।”

মেহরিনের হাতের লেখা।

চিঠিটা খুলতে তার অদ্ভুত ভয় লাগছিল।

অবশেষে ধীরে ধীরে কাগজটা বের করল।

ভেতরে মাত্র কয়েক পৃষ্ঠা।

প্রথম লাইনটা পড়েই আরিয়ানের বুক ভার হয়ে গেল।

“তোমাকে এই চিঠি লিখছি কারণ সামনে বসে কথাগুলো বলতে গেলে হয়তো আমি কেঁদে ফেলব।”

আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।

তারপর পড়তে শুরু করল।

মেহরিন লিখেছিল—

বিয়ের আগে সে জানত আরিয়ান তাকে ভালোবাসে কি না, সেটা নিশ্চিত নয়।

তবু সে ভেবেছিল, এত বছরের বন্ধুত্ব হয়তো একদিন অন্যরকম অনুভূতিতে বদলে যাবে।

বিয়ের পর সে অপেক্ষা করেছিল।

আরিয়ান হয়তো একদিন তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে অনুভব করবে।

তার পাশে বসলে হয়তো নিজের থেকেই একটু কাছে আসবে।

তার সঙ্গে কথা বলার সময় হয়তো চোখে অন্যরকম একটা মায়া থাকবে।

কিন্তু মাসের পর মাস কেটে গেল।

কিছুই বদলাল না।

বরং মেহরিন বুঝতে পারল, আরিয়ান তাকে যত্ন করে ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরে একটা দেয়াল আছে।

চিঠির শেষের দিকে লেখা—

“আমি তোমাকে হারাতে চাই না। কিন্তু তোমার জীবনে এমন একজন মানুষ হয়ে থাকতে চাই না, যাকে তুমি শুধু দায়িত্ববোধ থেকে পাশে রাখবে।”

আরিয়ান চিঠিটা নামিয়ে রাখল।

তার চোখ জ্বালা করছিল।

সে বুঝতে পারছিল, মেহরিন তাকে কোনো অভিযোগ করছে না।

বরং তাকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে।

সন্ধ্যায় মেহরিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

আরিয়ান গিয়ে তার পাশে দাঁড়াল।

“চিঠিটা পড়েছি।”

মেহরিন চুপ করে রইল।

“তুমি এতদিন এসব একা সহ্য করেছ?”

“কী করতাম?”

“আমাকে বলতে পারতে।”

“বললে কী বদলাত?”

আরিয়ান কোনো উত্তর দিতে পারল না।

মেহরিন ধীরে বলল,

“আরিয়ান, আমি তোমাকে খুব ভালো করে চিনি। তুমি কাউকে কষ্ট দিতে পারো না। তাই নিজের কষ্টটাও লুকিয়ে রাখো।”

“আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।”

“জানি।”

“তাহলে?”

মেহরিন তার দিকে তাকাল।

“কিন্তু কাউকে কষ্ট দিতে না চেয়ে তার সঙ্গে এমন একটা সম্পর্ক ধরে রাখা, যেখানে দুজনের একজন প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যায়—এটাও তো ঠিক নয়।”

আরিয়ান মাথা নিচু করল।

“তুমি কি আমাকে ছেড়ে যেতে চাও?”

মেহরিনের চোখে পানি এসে গেল।

কিন্তু সে হাসল।

“আমি চাই তুমি সত্যিটা স্বীকার করো।”

“কী সত্যি?”

“তুমি কি আমাকে স্ত্রী হিসেবে ভালোবাসো?”

আরিয়ান চুপ।

মেহরিন চোখ নামিয়ে বলল,

“তোমার এই নীরবতাই উত্তর।”

সেই রাতেই আরিয়ান নীরাকে ফোন করল।

অনেকবার ফোন বাজল।

শেষে নীরা ধরল।

“হ্যালো?”

“কথা বলবে?”

“হ্যাঁ।”

“আমি মেহরিনের সঙ্গে কথা বলেছি।”

ওপাশে নীরবতা।

“তারপর?”

“সে সব জানে।”

“কী জানে?”

“আমি তোমার সঙ্গে কথা বলি। তোমাকে নিয়ে ভাবি।”

নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আরিয়ান…”

“আমি জানি এটা ঠিক হয়নি।”

“তাহলে?”

“আমি শুধু তোমাকে হারাতে চাই না।”

নীরা এবার একটু কঠিন গলায় বলল,

“আপনি এখনও একই ভুল করছেন।”

“কোন ভুল?”

“আপনি একজনকে হারানোর ভয় থেকে আরেকজনকে ধরে রাখতে চাইছেন।”

আরিয়ান থেমে গেল।

নীরা বলল,

“আপনার আগে নিজের জীবনটা ঠিক করতে হবে।”

“যদি আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলি?”

“তাহলে সেটা আমার সিদ্ধান্ত নয়। আপনার সিদ্ধান্তের ফল হবে।”

কথাটা শুনে আরিয়ানের বুকটা কেমন খালি হয়ে গেল।

কিন্তু নীরার কথার মধ্যে একটা সত্যি ছিল।

সে এতদিন ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে পালিয়ে এসেছে।

পরদিন আরিয়ান মেহরিনকে বলল,

“আমাদের কিছুদিন আলাদা থাকা উচিত।”

মেহরিন অবাক হলো না।

“আমি জানতাম তুমি এটা বলবে।”

“আমি চাই না আমরা রাগ করে আলাদা হই।”

“আমিও না।”

“আমি চাই তুমি নিজের মতো করে থাকো। আমিও নিজের সঙ্গে কথা বলি।”

মেহরিন মাথা নাড়ল।

“ঠিক আছে।”

কথাটা বলা যত সহজ ছিল, করা ততটা নয়।

সেদিন রাতে মেহরিন নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে মায়ের বাসায় চলে গেল।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আরিয়ান শুধু বলল,

“নিজের যত্ন নিও।”

মেহরিন হেসে বলল,

“তুমিও।”

দুজনেই জানত, এই বিদায়টা সাময়িকও হতে পারে, আবার চিরদিনেরও।

দরজা বন্ধ হওয়ার পর পুরো ফ্ল্যাটটা অস্বাভাবিক নীরব হয়ে গেল।

আরিয়ান সোফায় বসে রইল।

এই ঘরে মেহরিনের হাসি ছিল।

তার বই ছিল।

তার কাপড় ছিল।

তার ছোট ছোট অভ্যাস ছিল।

হঠাৎ বুঝতে পারল—

কাউকে ভালোবাসা আর কাউকে হারানোর ভয়—দুটোর মধ্যে পার্থক্য সে এতদিন বুঝতেই পারেনি।

কয়েকদিন পর নীরার সঙ্গে তার দেখা হলো।

নীরা একটা পার্কের বেঞ্চে বসেছিল।

আরিয়ান পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

“কেমন আছ?”

“ভালো।”

“আমাকে দেখে খুশি হওনি?”

নীরা হেসে বলল,

“হয়েছি।”

“তাহলে হাসছ না কেন?”

“কারণ আপনার সঙ্গে দেখা হলেই হাসতে নেই।”

“কেন?”

“আপনি আবার বেশি ভাবতে শুরু করবেন।”

আরিয়ানও হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ দুজন চুপচাপ বসে রইল।

তারপর আরিয়ান বলল,

“আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।”

“বলুন।”

“তোমার সঙ্গে কথা বললে আমার মনে হয়, আমি নিজের মতো হতে পারি।”

নীরা তার দিকে তাকাল।

আরিয়ান ধীরে বলল,

“তোমার সামনে আমাকে কিছু প্রমাণ করতে হয় না।”

নীরার চোখ নরম হয়ে এল।

“আরিয়ান…”

“আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। কিন্তু আমি এবার কোনো তাড়াহুড়ো করতে চাই না।”

নীরা মৃদু হাসল।

“এটাই প্রথম সঠিক কথা বললেন।”

“মানে?”

“মানে এবার আপনি আমাকে পাওয়ার জন্য নয়, নিজেকে বোঝার জন্য এগোচ্ছেন।”

আরিয়ান চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

সেই মুহূর্তে নীরা তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।

খুব অল্প সময়ের জন্য।

কোনো প্রতিশ্রুতি নয়।

কোনো বড় কথা নয়।

শুধু একটা নীরব আশ্বাস—

সে একা নয়।

আরিয়ানের বুকের ভেতর অদ্ভুত শান্তি নেমে এল।

কিন্তু ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে মেহরিনের নাম।

আরিয়ান ফোনটা হাতে নিয়ে থমকে গেল।

ওপাশ থেকে মেহরিনের কাঁপা কণ্ঠ ভেসে এল—

“আরিয়ান… তোমার সঙ্গে খুব জরুরি কথা আছে।”

“কী হয়েছে?”

কিছুক্ষণ নীরবতার পর মেহরিন বলল,

“তুমি কি কাল আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে?”

পরদিন বিকেলে মেহরিনের সঙ্গে দেখা করতে গেল আরিয়ান।

যে ক্যাফেতে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, সেখানেই বসে ছিল মেহরিন।

আরিয়ান ঢুকতেই সে হাত তুলে ডাকল।

“এদিকে।”

আরিয়ান গিয়ে সামনে বসল।

কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।

একসময় মেহরিন বলল,

“তুমি কেমন আছ?”

“ভালো।”

“মিথ্যা বলছ।”

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

“তুমি এখনও আমাকে খুব ভালো চেনো।”

“হয়তো।”

মেহরিনের গলায় আগের সেই স্বাভাবিক উষ্ণতা ছিল না। তবুও তাদের কথার মধ্যে দশ বছরের পরিচয়ের একটা অদৃশ্য টান রয়ে গেছে।

ওয়েটার কফি রেখে গেলে মেহরিন কাপটা হাতে নিল।

“তোমার কি মনে আছে, আমরা প্রথম এখানে এসেছিলাম?”

আরিয়ান তাকাল।

“এই ক্যাফেতে?”

“হুম। তখন আমরা কলেজে পড়ি।”

আরিয়ান হেসে ফেলল।

“তুমি সেদিন আমার পুরো কফি খেয়ে ফেলেছিলে।”

“কারণ তুমি বলেছিলে তোমার কফি ভালো।”

“তুমি তো বলেছিলে তোমার ভালো লাগেনি।”

“আমি মিথ্যা বলেছিলাম।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

হাসির মুহূর্তটা খুব ছোট ছিল।

কিন্তু তারপরই দুজনের মুখে আবার নীরবতা নেমে এল।

মেহরিন ধীরে বলল,

“এই কারণেই তোমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম।”

আরিয়ান চুপ করে রইল।

“তোমার সঙ্গে আমার এত স্মৃতি। এত কথা। এত বছর। আমি ভেবেছিলাম, এগুলোই হয়তো একটা সুন্দর সংসারের জন্য যথেষ্ট।”

সে কফির কাপের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।”

আরিয়ানের বুক ভার হয়ে গেল।

“মেহরিন…”

“না, আমাকে বলতে দাও।”

সে গভীর শ্বাস নিল।

“আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। হয়তো এখনও ভালোবাসি। কিন্তু সেই ভালোবাসার মধ্যে একটা ভুল ছিল। আমি ভেবেছিলাম, তুমি একদিন আমাকে সেইভাবে ভালোবাসবে যেভাবে আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

আরিয়ান মাথা নিচু করল।

“আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি।”

“হ্যাঁ।”

মেহরিন এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।

“কিন্তু তোমাকে দোষ দিই না।”

“কেন?”

“কারণ অনুভূতি জোর করে তৈরি করা যায় না।”

কথাগুলো শুনে আরিয়ানের মনে হলো, মেহরিনকে সে এতদিনে প্রথমবার সত্যি বুঝতে পারছে।

সে বলল,

“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?”

মেহরিন হেসে বলল,

“ক্ষমা করার মতো অপরাধ তুমি করোনি।”

“তাহলে?”

“তুমি শুধু ভুল মানুষকে বিয়ে করেছিলে।”

আরিয়ান চুপ করে গেল।

মেহরিন ধীরে বলল,

“তুমি নীরাকে ভালোবাসো?”

প্রশ্নটা শুনে আরিয়ানের বুক কেঁপে উঠল।

সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।

মেহরিন অপেক্ষা করল।

অবশেষে আরিয়ান বলল,

“আমি জানি না।”

মেহরিন মৃদু হেসে বলল,

“এবারও ‘জানি না’?”

“আমি ভয় পাই।”

“কিসের?”

“যদি এটাও ভুল হয়?”

মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“তাহলে এবার তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না।”

সেদিন সন্ধ্যায় আরিয়ান বাসায় ফেরার পথে নীরাকে ফোন করল।

“দেখা করবে?”

“এখন?”

“হ্যাঁ।”

“কোথায়?”

“তোমার পছন্দের জায়গায়।”

কিছুক্ষণ পর নীরা বলল,

“লেকের পাশে আসুন।”

নীরা সেখানে পৌঁছানোর আগেই আরিয়ান বেঞ্চে বসে ছিল।

কিছুক্ষণ পর নীরা এসে পাশে বসল।

“মেহরিনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”

“হ্যাঁ।”

“কী বলেছে?”

“আমাদের সম্পর্কটা শেষ করে দিতে চায়।”

নীরা চুপ করে রইল।

“আর?”

“সে বলেছে, আমি যেন এবার নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিই।”

নীরা ধীরে মাথা নাড়ল।

“ঠিক বলেছে।”

আরিয়ান তাকাল তার দিকে।

“তুমি কি আমাকে ভয় পাও?”

“কেন?”

“যদি আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবেসে ফেলি?”

নীরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

“ভালোবাসা ভয় পাওয়ার বিষয় নয়।”

“তাহলে?”

“ভালোবাসার সঙ্গে দায়িত্ব থাকে।”

আরিয়ান ধীরে বলল,

“আমি এবার দায়িত্ব থেকে পালাতে চাই না।”

নীরা তার দিকে তাকিয়ে রইল।

দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ নীরবতা।

হালকা বাতাসে নীরার চুল মুখের সামনে এসে পড়েছিল।

সে হাত দিয়ে চুল সরিয়ে নিল।

আরিয়ান হঠাৎ বলল,

“তুমি জানো, তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার পর থেকেই একটা ব্যাপার আমাকে অবাক করেছে?”

“কী?”

“তুমি কখনো আমাকে বদলাতে বলোনি।”

নীরা হেসে বলল,

“কারণ আমি তোমাকে বদলাতে চাই না।”

“তাহলে?”

“আমি শুধু চাই তুমি নিজের সত্যিটা নিজের কাছে লুকিয়ে রেখো না।”

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

“তুমি সবসময় এত কঠিন কথা বলো কেন?”

“কারণ আপনি সহজ কথা শুনে আবার পালিয়ে যান।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

হঠাৎ নীরা উঠে দাঁড়াল।

“চলুন।”

“কোথায়?”

“হাঁটতে।”

আরিয়ানও উঠে দাঁড়াল।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

কখনো তাদের হাত কাছাকাছি চলে আসছিল, আবার দূরে সরে যাচ্ছিল।

শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায় নীরা থেমে গেল।

আরিয়ানও থামল।

“কী হলো?”

“কিছু না।”

নীরা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“আজ আপনাকে প্রথমবার খুব হালকা লাগছে।”

আরিয়ান বলল,

“কারণ আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে, আমাকে কোনো সিদ্ধান্ত লুকিয়ে রাখতে হচ্ছে না।”

নীরা ধীরে বলল,

“তাহলে একটা সিদ্ধান্ত নিন।”

“কী?”

“আগামী কিছুদিন শুধু নিজের সঙ্গে থাকুন। আমাকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।”

আরিয়ান অবাক হলো।

“কেন?”

“কারণ আমি চাই না আপনি আমাকে হারানোর ভয় থেকে আমাকে বেছে নিন।”

আরিয়ান কিছু বলল না।

নীরা এবার একটু কাছে এসে দাঁড়াল।

“যেদিন সত্যিই বুঝবেন আমাকে চান, সেদিন নিজে থেকে আসবেন।”

আরিয়ান তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।

সেই চোখে কোনো দাবি নেই।

শুধু অপেক্ষা।

হঠাৎ আরিয়ান বলল,

“তুমি যদি তখন আমাকে গ্রহণ না করো?”

নীরা মৃদু হেসে বলল,

“তাহলে অন্তত আপনি সত্যি কথা বলার সাহসটা পেয়েছেন—সেটাই বড় কথা।”

কথাটা বলে নীরা চলে গেল।

আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, জীবনে প্রথমবার কেউ তাকে নিজের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।

আরিয়ান একা থাকতে শিখতে শুরু করল।

মেহরিনের সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো না।

নীরার সঙ্গেও না।

সে নিজের কাজ, পুরোনো বন্ধু, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে লাগল।

ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল—

নীরাকে সে শুধু তার সঙ্গে কথা বলার জন্য মিস করে না।

তার হাসি মনে পড়ে।

তার ছোট ছোট অভ্যাস মনে পড়ে।

কোনো নতুন জায়গায় গেলে মনে হয়, নীরাকে দেখালে জায়গাটা তারও ভালো লাগত।

কোনো ভালো খবর পেলে প্রথমে ফোনটা হাতে নিয়ে থেমে যায়—

“নীরাকে বললে কেমন হতো?”

সেই মুহূর্তেই আরিয়ান বুঝল।

এটা একাকীত্ব নয়।

এটা অভ্যাসও নয়।

তার অনুভূতিটা সত্যি।

কিন্তু ঠিক তখনই তার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল—

“নীরার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা আছে। দেখা করতে চাই।”

আরিয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল।

সে নম্বরটা চিনতে পারল না।

অচেনা নম্বরের মেসেজটা পাওয়ার পর থেকেই আরিয়ানের মনে অস্বস্তি তৈরি হলো।

“নীরার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা আছে। দেখা করতে চাই।”

সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।

প্রথমে নীরাকে ফোন করার কথা ভাবল।

তারপর থেমে গেল।

নীরা নিজে থেকে কিছু বলতে চাইলে বলবে—এই বিশ্বাসটা তার ছিল।

পরদিন দুপুরে আবার সেই নম্বর থেকে মেসেজ এল।

“আজ বিকেল পাঁচটায় ধানমন্ডির একটা ক্যাফেতে আসবেন। নীরাকে কিছু বলবেন না।”

আরিয়ান কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

শেষ পর্যন্ত গেল।

ক্যাফের ভেতরে ঢুকে সে দেখল, প্রায় ত্রিশ বছরের একজন যুবক জানালার পাশে বসে আছে।

আরিয়ান গিয়ে সামনে বসল।

“আপনি কে?”

লোকটা শান্তভাবে বলল,

“আমার নাম রাফি।”

“নীরাকে চেনেন?”

“খুব ভালোভাবে।”

আরিয়ানের চোখে সতর্কতা চলে এল।

“আপনি কী বলতে চান?”

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“নীরা খুব সহজে কাউকে নিজের জীবনে ঢুকতে দেয় না।”

“জানি।”

“কিন্তু আপনি জানেন না, কেন।”

আরিয়ান কিছু বলল না।

রাফি ধীরে বলল,

“কয়েক বছর আগে নীরা এমন একটা সম্পর্কের মধ্যে ছিল, যেটা শেষ হওয়ার পর সে অনেকদিন কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনি।”

আরিয়ান অবাক হলো।

“কী হয়েছিল?”

“ছেলেটা নীরাকে বিয়ে করার কথা দিয়েছিল। পরে পরিবার আর নিজের সুবিধার জন্য সরে যায়।”

আরিয়ান চুপ করে শুনছিল।

রাফি বলল,

“নীরা তখন খুব ভেঙে পড়েছিল।”

“এখন?”

“এখন সে অনেক শক্ত।”

“তাহলে আমাকে এসব বলছেন কেন?”

রাফি তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“কারণ আপনি যেন বুঝে এগোন।”

আরিয়ান কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

“আমি নীরাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি।”

“ভালো।”

“কিন্তু আমি তাকে নিয়ে সিরিয়াস।”

রাফি মৃদু হাসল।

“তাহলে একটা কথা মনে রাখবেন—নীরা দ্বিতীয়বার কাউকে বিশ্বাস করলে সহজে সেটা ভাঙতে পারবে না।”

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

“আমি বুঝেছি।”

ক্যাফে থেকে বের হয়ে আরিয়ান সরাসরি নীরার কাছে গেল।

নীরা তাকে দেখে অবাক হলো।

“আপনি এখানে?”

“তোমার সঙ্গে কথা আছে।”

“কী হয়েছে?”

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“তোমার অতীত সম্পর্কে কিছু শুনেছি।”

নীরার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“কার কাছ থেকে?”

“রাফি।”

নীরা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

“ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“সে আমাকে ডেকেছিল।”

নীরা চোখ নামিয়ে বলল,

“তোমাকে কী বলেছে?”

“তোমার পুরোনো সম্পর্কের কথা।”

নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম।”

“কিন্তু বলোনি।”

“কারণ আমি চাইনি তুমি আমাকে করুণা করো।”

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“আমি তোমাকে করুণা করি না।”

নীরা তার দিকে তাকাল।

“তাহলে?”

“আমি শুধু বুঝতে চাই।”

“কী বুঝতে?”

“তুমি এত সহজে কাউকে বিশ্বাস করো না কেন।”

নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর ধীরে বলল,

“কারণ একবার বিশ্বাস করে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।”

আরিয়ান কিছু বলল না।

নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

“তখন মনে হয়েছিল, মানুষকে বিশ্বাস করাটাই ভুল।”

“এখন?”

“এখন মনে হয়, ভুল মানুষকে বিশ্বাস করেছিলাম।”

আরিয়ান মৃদু স্বরে বলল,

“আমাকেও কি ভুল মানুষ মনে হচ্ছে?”

নীরা তাকাল।

“না।”

“তাহলে ভয় পাচ্ছ?”

নীরা একটু হাসল।

“হ্যাঁ।”

“আমাকে?”

“তোমাকে নয়। আবার বিশ্বাস করতে।”

আরিয়ান ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

“আমি তোমাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে আসিনি।”

নীরা অবাক হয়ে তাকাল।

“আমি শুধু একটা কথা বলতে এসেছি।”

“কী?”

“আমি যদি কোনোদিন তোমাকে বেছে নিই, সেটা যেন তোমাকে পাওয়ার তাড়াহুড়ো থেকে না হয়। আমি চাই সেটা ভেবে, বুঝে, নিজের ইচ্ছায় হোক।”

নীরার চোখ নরম হয়ে গেল।

“আর যদি আমি তোমাকে সময় দিই?”

“তাহলে আমি সেই সময়ের মূল্য দেব।”

নীরা কিছু বলল না।

কিন্তু তার চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি দেখা গেল।

সেদিন সন্ধ্যায় তারা অনেকক্ষণ হাঁটল।

কথা হলো নানা বিষয়ে।

শৈশবের স্মৃতি।

পছন্দের বই।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

নীরা বলল, সে একদিন নিজের একটা ছোট বইয়ের দোকান করতে চায়।

আরিয়ান বলল, সে একদিন এমন একটা বাড়ি বানাতে চায় যেখানে কাজের চাপ থাকবে না, সন্ধ্যায় সবাই একসঙ্গে বসবে।

নীরা হেসে বলল,

“আপনার স্বপ্নটা বেশ সাধারণ।”

“সাধারণ জিনিসই তো সবচেয়ে কঠিন।”

“কেন?”

“কারণ শান্তি কিনে পাওয়া যায় না।”

নীরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

“আপনি বদলে গেছেন।”

“কীভাবে?”

“আগে আপনি সবকিছু নিয়ে দ্বিধায় থাকতেন।”

“এখন?”

“এখনও থাকেন। তবে অন্তত নিজের ভয়টা স্বীকার করেন।”

আরিয়ান হেসে ফেলল।

“আপনার কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়া কঠিন।”

“আমি প্রশংসা করলাম?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে লিখে রাখুন।”

দুজনেই হেসে উঠল।

কিন্তু সেই রাতেই একটা নতুন সমস্যা তৈরি হলো।

আরিয়ান বাসায় ফিরে দেখল, মেহরিন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

“তুমি এখানে?”

“তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।”

“কী হয়েছে?”

মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আমাদের ডিভোর্সের কাগজ আমি তৈরি করেছি।”

আরিয়ান থমকে গেল।

“এত তাড়াতাড়ি?”

“আর কতদিন অপেক্ষা করব?”

আরিয়ান চুপ।

মেহরিন একটা ফাইল তার হাতে দিল।

“সই করার আগে ভালো করে পড়ে নিও।”

“মেহরিন…”

“না, এবার আমাকে থামিও না।”

তার চোখে পানি ছিল।

“তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি—এই সত্যিটা মেনে নিতে আমার অনেক সময় লেগেছে। কিন্তু এখন আমি সেটা মেনে নিয়েছি।”

আরিয়ান কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

মেহরিন ধীরে বলল,

“আমি চাই না তুমি অপরাধবোধ থেকে আমার সঙ্গে থাকো।”

তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

যাওয়ার আগে থেমে বলল,

“একটা কথা।”

আরিয়ান তাকাল।

“নীরাকে যদি সত্যিই ভালোবাসো, তাহলে এবার তাকে অর্ধেক সত্যি নিয়ে কাছে যেও না।”

আরিয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

মেহরিন বলল,

“তাকে পুরোপুরি বেছে নিও।”

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

আরিয়ান ফাইলটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার সামনে এখন দুইটা পথ।

একটা পরিচিত—

আরেকটা অচেনা।

কিন্তু এবার সিদ্ধান্তটা তাকে নিতেই হবে।

সে জানত না, ডিভোর্সের কাগজে সই করার পর তার জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

ডিভোর্সের কাগজগুলো টেবিলের ওপর পড়ে ছিল।

আরিয়ান অনেকক্ষণ সেগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

কাগজে কয়েকটা স্বাক্ষর।

কয়েকটা আনুষ্ঠানিকতা।

কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছিল, ওই পাতাগুলোর মধ্যে আটকে আছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় একটা অধ্যায়।

সে মেহরিনকে ঘৃণা করে না।

বরং এত বছর পরও মেয়েটার প্রতি তার ভীষণ মায়া আছে।

কিন্তু মায়া আর ভালোবাসা এক নয়।

এই সত্যিটা বুঝতে তার অনেক দেরি হয়েছে।

পরদিন সকালে সে কাগজগুলো নিয়ে আইনজীবীর কাছে গেল।

সবকিছু পড়ে, বুঝে, শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষর করল।

কলমটা নামিয়ে রাখার সময় বুকের ভেতরটা ভার হয়ে গেল।

সে জানত, একটা সম্পর্ক শেষ হলো।

কিন্তু একই সঙ্গে সে জানত—

মিথ্যা একটা সম্পর্ক ধরে রাখার চেয়ে সত্যি মেনে নেওয়া অনেক বেশি সৎ।

কয়েকদিন পর মেহরিনের সঙ্গে শেষবার দেখা হলো।

দুজনেই একটা পার্কে বসেছিল।

মেহরিন আগের চেয়ে অনেক শান্ত।

“সব হয়ে গেছে?” সে জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ।”

“কেমন লাগছে?”

আরিয়ান একটু ভেবে বলল,

“খালি।”

মেহরিন হেসে ফেলল।

“খালি লাগবেই।”

“তোমার?”

“আমারও।”

কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে রইল।

তারপর মেহরিন বলল,

“আমাদের বন্ধুত্বটা কি থাকবে?”

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

“আমি চাই।”

“তাহলে একটা শর্ত।”

“কী?”

“এবার থেকে আমাকে কোনো অপরাধবোধ নিয়ে মনে করবে না।”

আরিয়ান মৃদু হাসল।

“চেষ্টা করব।”

“চেষ্টা না। প্রতিশ্রুতি দাও।”

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

“প্রতিশ্রুতি দিলাম।”

মেহরিন হাত বাড়িয়ে দিল।

আরিয়ান তার হাত ধরল।

দশ বছরের বন্ধুত্বের মতোই।

কিন্তু এবার সেই হাতের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর দাবি নেই।

শুধু সম্মান, কৃতজ্ঞতা আর অনেক পুরোনো স্মৃতি।

মেহরিন উঠে দাঁড়াল।

“এবার যাও।”

“কোথায়?”

“যার কাছে যেতে এতদিন ভয় পেয়েছ, তার কাছে।”

আরিয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

মেহরিন হেসে বলল,

“নীরা অপেক্ষা করছে কি না জানি না। কিন্তু তুমি অন্তত এবার নিজের মনটা পরিষ্কার করে তার সামনে দাঁড়াও।”

সেদিন সন্ধ্যায় আরিয়ান নীরার বইয়ের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

নীরা তখন শেলফে বই সাজাচ্ছিল।

আরিয়ান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেই নীরা তাকে দেখে থমকে গেল।

“আপনি?”

আরিয়ান হেসে বলল,

“হ্যাঁ।”

“এখানে কেন?”

“তোমার সঙ্গে দেখা করতে।”

নীরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“কিছু হয়েছে?”

“হ্যাঁ।”

নীরা চিন্তিত হলো।

“কী?”

আরিয়ান ধীরে বলল,

“আমি এখন মুক্ত।”

নীরা চুপ করে গেল।

“মেহরিনের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা শেষ হয়েছে।”

নীরা চোখ নামিয়ে ফেলল।

“আমি জানতাম একদিন এটা হবে।”

“তুমি ভয় পাচ্ছ?”

“হ্যাঁ।”

“আমাকে?”

“না।”

“তাহলে?”

নীরা ধীরে বলল,

“যদি তুমি এখন আমাকে বেছে নাও শুধু কারণ তোমার জীবনে আর কেউ নেই?”

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

“তুমি ভুল ভাবছ।”

“কীভাবে?”

“কারণ তুমি আমার জীবনে আসার আগেই আমি বুঝেছিলাম, আমার বিয়েটা ভুল ছিল।”

নীরা তাকাল।

“আর তুমি চলে যাওয়ার পরও আমি তোমাকে মিস করেছি।”

নীরার চোখে বিস্ময়।

আরিয়ান এগিয়ে এসে বলল,

“আমি তোমাকে চাই কারণ তুমি আমার একাকীত্বের সমাধান নও। তুমি আমার কাছে এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে আমি নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করি।”

নীরা কিছু বলল না।

“আমি তোমার হাসি মিস করি। তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তোমার মতামত জানতে ইচ্ছে করে। ভালো কিছু হলে তোমাকে বলতে ইচ্ছে করে।”

তার গলা ধীরে নরম হয়ে গেল।

“এগুলো যদি ভালোবাসা না হয়, তাহলে আমি জানি না ভালোবাসা কী।”

নীরা চোখ নামিয়ে হাসল।

অনেকক্ষণ পর বলল,

“তুমি অনেক দেরি করেছ।”

“জানি।”

“আমাকে অনেক অপেক্ষা করিয়েছ।”

“জানি।”

“আর আমি খুব সহজে তোমাকে ক্ষমা করব না।”

আরিয়ান হেসে বলল,

“ক্ষমা পেতে কতদিন লাগবে?”

নীরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“জানি না।”

“তাহলে অপেক্ষা করব।”

নীরা ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

দুজনের মধ্যে খুব অল্প দূরত্ব।

নীরা বলল,

“একটা কথা বলব?”

“হুম।”

“তোমাকে প্রথম দেখার দিন থেকেই আমি বুঝেছিলাম তুমি খুব ভালো মানুষ।”

“তাহলে?”

“ভালো মানুষ হওয়া আর ভালো সঙ্গী হওয়া এক জিনিস নয়।”

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

“আমি জানি।”

“কিন্তু আজ মনে হচ্ছে…”

সে থেমে গেল।

“কী?”

“হয়তো তুমি এবার সত্যিই প্রস্তুত।”

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

“তাহলে?”

নীরা হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরল।

“তাহলে শুরু করা যাক।”

আরিয়ানের চোখে আনন্দ ফুটে উঠল।

সে নীরার হাতটা শক্ত করে ধরল না।

শুধু ধরে রাখল।

যেন বুঝতে পারছে—এই হাতটা পাওয়ার চেয়ে এই বিশ্বাসটা ধরে রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সেদিন তারা বইয়ের দোকান বন্ধ করে বাইরে বের হলো।

রাস্তার বাতিগুলো জ্বলছিল।

নীরা হাঁটছিল আরিয়ান-এর পাশে।

একসময় নীরা বলল,

“আমাদের গল্পটা কিন্তু সহজ হবে না।”

“কেন?”

“কারণ আমরা দুজনেই অনেক কিছু হারিয়ে এখানে এসেছি।”

আরিয়ান বলল,

“তাহলে এবার কিছু তৈরি করব।”

নীরা তাকিয়ে হাসল।

“কী?”

“আমাদের নিজেদের একটা গল্প।”

নীরা মৃদু হেসে বলল,

“শর্ত আছে।”

“আবার?”

“হ্যাঁ।”

“কী?”

“কোনো মিথ্যা নয়।”

“কখনো না।”

“কোনো লুকানো কথা নয়।”

“ঠিক আছে।”

“আর ভয় পেলেও পালানো যাবে না।”

আরিয়ান একটু থেমে বলল,

“এই শর্তটা সবচেয়ে কঠিন।”

নীরা তার হাতটা একটু শক্ত করে ধরে বলল,

“তবু মানতে হবে।”

আরিয়ান হাসল।

“মানলাম।”

তারা পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

দুজনেই জানত না ভবিষ্যৎ কী নিয়ে আসবে।

কিন্তু বহুদিন পর আরিয়ান প্রথমবার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাচ্ছিল না।

কারণ এবার সে নিজের জীবনের সিদ্ধান্তটা অন্য কারও কথায় নেয়নি।

নিজের ইচ্ছায় নিয়েছে।

কিন্তু গল্পের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা তখনও বাকি।

কারণ মেহরিনের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হলেও, তাদের অতীত পুরোপুরি শেষ হয়নি।

নীরার সঙ্গে সম্পর্কটা শুরু হওয়ার পর প্রায় দুই মাস কেটে গেছে।

এই দুই মাসে আরিয়ানের জীবন যেন ধীরে ধীরে নতুন রঙ পেয়েছে।

তারা প্রতিদিন দেখা করত না। বরং দুজনেই নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। কিন্তু দিনের শেষে একটা ফোন, কিছুক্ষণ কথা, কিংবা হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া—এসবের মধ্যেই একটা গভীর টান তৈরি হয়েছিল।

নীরা এখন আরিয়ানের সামনে আগের মতো সাবধানী থাকত না।

আরিয়ানও তার অনুভূতিগুলো লুকাত না।

একদিন নীরা বইয়ের দোকান বন্ধ করে বাইরে বের হওয়ার সময় দেখল, আরিয়ান রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

“এত রাতে এখানে?”

“তোমাকে নিতে এসেছি।”

“কোথায়?”

“খেতে যাব।”

নীরা হাসল।

“আগে থেকে বললে আমি প্রস্তুত হতাম।”

“তুমি এমনিতেই সুন্দর।”

কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার পর আরিয়ান নিজেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

নীরা ভ্রু তুলে বলল,

“আজকাল কথা বলতে শিখে গেছেন দেখছি।”

“তোমার কাছ থেকেই শিখছি।”

নীরা হেসে ফেলল।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

হাঁটতে হাঁটতে নীরা বলল,

“তুমি জানো, আগে তোমাকে নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় ভয় কী ছিল?”

“কী?”

“তুমি হয়তো আমাকে পছন্দ করো, কিন্তু তোমার অতীত থেকে বের হতে পারবে না।”

আরিয়ান থেমে গেল।

“এখন?”

নীরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“এখন মনে হয়, তুমি অতীতকে সম্মান করো, কিন্তু সেখানে বাস করো না।”

আরিয়ান মৃদু হাসল।

“কারণ আমার বর্তমানটা তোমার সঙ্গে।”

নীরা কিছু বলল না।

শুধু পাশে হাঁটতে থাকল।

কিন্তু সেই সুখের সময়টা বেশিদিন শান্ত থাকল না।

এক বিকেলে নীরা দোকানে বসে ছিল।

একজন মহিলা এসে তার সামনে একটা খাম রেখে বলল,

“এটা আপনার জন্য।”

“আমার জন্য?”

“হ্যাঁ।”

“কে দিয়েছে?”

“একজন লোক।”

“নাম?”

মহিলা মাথা নাড়িয়ে চলে গেল।

নীরা খামটা খুলল।

ভেতরে কয়েকটা ছবি।

ছবিগুলো দেখে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

ছবিতে আরিয়ান আর মেহরিন।

একসঙ্গে।

বিয়ের দিনের ছবি।

আরও কিছু পুরোনো ছবি।

কিছু ছবিতে দুজন খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে।

নীরা জানত এগুলো পুরোনো।

তবু ছবিগুলো দেখার পর বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ব্যথা হলো।

কারণ ছবির মানুষ দুজনের মধ্যে এমন একটা ইতিহাস ছিল, যেটার অংশ সে কখনো ছিল না।

খামের ভেতর একটা চিঠিও ছিল।

“আরিয়ানের অতীত যতটা সহজ মনে হচ্ছে, ততটা নয়।”

নীরা চিঠিটা আবার ভাঁজ করে রাখল।

সেদিন আরিয়ানকে ফোন করল না।

রাত হয়ে গেল।

আরিয়ান বারবার ফোন করছিল।

নীরা ধরছিল না।

শেষে আরিয়ান নিজেই বইয়ের দোকানে গেল।

দরজা বন্ধ।

সে বাইরে দাঁড়িয়ে ফোন করল।

কিছুক্ষণ পর নীরা দরজা খুলল।

“কী হয়েছে?”

আরিয়ান চিন্তিত হয়ে বলল,

“তুমি ফোন ধরছ না কেন?”

নীরা কিছু বলল না।

“নীরা?”

সে খামটা আরিয়ানের হাতে দিল।

আরিয়ান ছবি দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।

“এগুলো কে পাঠিয়েছে?”

“জানি না।”

“চিঠিটা?”

নীরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“এগুলো কি সব সত্যি?”

“পুরোনো ছবি। হ্যাঁ।”

“তাহলে?”

“তাহলে কী?”

“তুমি কি এখনও মেহরিনকে নিয়ে কিছু অনুভব করো?”

প্রশ্নটা শুনে আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“মেহরিন আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ।”

নীরার মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“আমি জানতাম।”

“কিন্তু—”

“কিন্তু তুমি তাকে ভালোবাসো না?”

“না।”

“একটুও না?”

আরিয়ান গভীরভাবে তার দিকে তাকাল।

“ভালোবাসা যদি মানে হয় তার সঙ্গে জীবন কাটানোর ইচ্ছা, তাহলে না।”

নীরা চুপ করে রইল।

আরিয়ান ধীরে বলল,

“কিন্তু তার জন্য আমার সম্মান আছে। কৃতজ্ঞতা আছে। দশ বছরের বন্ধুত্বের স্মৃতি আছে।”

নীরা চোখ নামিয়ে বলল,

“আমি সেটা বুঝি।”

“তাহলে?”

“কিন্তু কখনো কখনো অতীতের ছায়া বর্তমানকে ভয় পাইয়ে দেয়।”

আরিয়ান ধীরে তার কাছে গেল।

“তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?”

নীরা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।

“করতে চাই।”

“শুধু করতে চাও?”

“বিশ্বাস করতে আমার সময় লাগে।”

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

“আমি অপেক্ষা করব।”

ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

নীরা জানালার দিকে তাকিয়ে দেখল—

মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে।

আরিয়ানের মুখেও বিস্ময়।

“তুমি এখানে?”

মেহরিন ধীরে ভেতরে ঢুকল।

তার চোখ সরাসরি নীরার দিকে।

“আমার কিছু বলার আছে।”

নীরা একটু সরে দাঁড়াল।

“বলুন।”

মেহরিন বলল,

“এই ছবিগুলো আমি পাঠাইনি।”

নীরা অবাক হলো।

“আমি তো বলিনি আপনি পাঠিয়েছেন।”

“তবুও বলছি।”

মেহরিন একটা ফোন বের করল।

“আমার কয়েকদিন আগে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছিল।”

সে ফোনটা নীরার সামনে ধরল।

মেসেজে লেখা—

“আরিয়ান আর নীরার সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইলে কিছু ছবি পাঠানো হবে।”

নীরা স্তব্ধ।

“কে?”

মেহরিন মাথা নাড়ল।

“জানি না।”

আরিয়ান বলল,

“তুমি আমাকে বলোনি কেন?”

“কারণ তখনও নিশ্চিত ছিলাম না।”

নীরা ধীরে বলল,

“কেউ আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইছে?”

মেহরিন বলল,

“সম্ভবত।”

কিছুক্ষণ তিনজনই চুপ।

হঠাৎ নীরা বলল,

“কিন্তু কেন?”

মেহরিন আরিয়ানের দিকে তাকাল।

“হয়তো কারণ তোমাদের সম্পর্কটা কারও পছন্দ নয়।”

আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কিন্তু কে?”

কেউ উত্তর দিতে পারল না।

সেদিন রাতে নীরা একা দোকানে বসে ছিল।

আরিয়ান তাকে ফোন করল।

“বাড়ি পৌঁছেছ?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি ঠিক আছ?”

“হুম।”

“আজকের ব্যাপারটা নিয়ে বেশি ভাবো না।”

নীরা মৃদু হেসে বলল,

“চেষ্টা করছি।”

“আমি আছি।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর নীরা বলল,

“আরিয়ান?”

“হুম?”

“তুমি কি কখনো আমার ওপর বিরক্ত হবে?”

“কেন?”

“আমি যদি বারবার ভয় পাই?”

“তাহলে বারবার তোমাকে বোঝাব।”

“যদি আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে সময় নিই?”

“অপেক্ষা করব।”

“যদি কোনোদিন মনে হয় তুমি আমাকে হারাতে পারো?”

আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,

“তাহলে তোমাকে ধরে রাখার চেষ্টা করব না।”

নীরা অবাক হলো।

“কেন?”

“কারণ ভালোবাসা মানে কাউকে আটকে রাখা নয়। আমি চাই তুমি নিজের ইচ্ছায় আমার পাশে থাকো।”

ওপাশে নীরবতা।

তারপর নীরার কণ্ঠ খুব নরম হয়ে এল।

“তাহলে আমি নিজের ইচ্ছায়ই থাকব।”

আরিয়ান হেসে ফেলল।

“সত্যি?”

“হুম।”

“তাহলে কাল দেখা হবে?”

“হবে।”

“কোথায়?”

“যেখানে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।”

আরিয়ান বুঝতে পারল—

নীরা তাকে শুধু একটা জায়গায় ডাকছে না।

সে তাদের সম্পর্কের শুরুটাকে আবার মনে করিয়ে দিতে চাইছে।

পরদিন সেই ক্যাফেতে গিয়ে আরিয়ান দেখল, নীরা আগেই বসে আছে।

দুজনের চোখে চোখ পড়তেই নীরা হাসল।

“দেরি করেছ।”

“দুঃখিত।”

“বসো।”

আরিয়ান বসল।

নীরা তার সামনে একটা ছোট বই রাখল।

“এটা কী?”

“তোমার জন্য।”

“কেন?”

“কারণ আমাদের গল্পটা একটা নতুন অধ্যায়ে ঢুকেছে।”

আরিয়ান বইটা হাতে নিল।

প্রথম পাতায় নীরা লিখেছে—

“কিছু সম্পর্ক প্রথমবারে ঠিক হয় না।
কিছু সম্পর্ককে সত্যি হতে দ্বিতীয় সুযোগ লাগে।”

আরিয়ান লেখাটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

তারপর নীরার দিকে তাকাল।

এই মুহূর্তে তার মনে হলো—

জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ সত্যিই আসে।

কিন্তু সেই সুযোগকে সুন্দর করে তোলার দায়িত্ব মানুষের নিজের।

আর ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল।

অচেনা নম্বর।

মাত্র তিনটি শব্দ—

“সবটা এখনও জানো না।”

আরিয়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

কারণ সে বুঝতে পারল—

অতীতের ছায়া এখনও পুরোপুরি সরে যায়নি।

অচেনা নম্বরের মেসেজটা দেখার পর আরিয়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

নীরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল।

“কী হয়েছে?”

আরিয়ান ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।

নীরা মেসেজটা পড়ল।

“সবটা এখনও জানো না।”

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।

নীরা ধীরে বলল,

“তুমি কি ভয় পাচ্ছ?”

“তোমাকে হারানোর ভয় হচ্ছে।”

নীরা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

“তাহলে এবার পালাবে না তো?”

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

“না।”

সেদিন বিকেলেই তারা মেহরিনের সঙ্গে দেখা করল।

মেহরিন সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

“আমার মনে হয়, আমাদের বিয়ের সময় থেকেই কেউ একটা বিষয় নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিল।”

“কে?” আরিয়ান জিজ্ঞেস করল।

মেহরিন বলল,

“আমার মামাতো ভাই রিদওয়ান।”

আরিয়ান অবাক হলো।

“রিদওয়ান?”

“হ্যাঁ। সে সবসময় মনে করত তুমি আমাকে বিয়ে করেছ শুধু পরিবারের চাপে। আর বিয়ের পর যখন আমাদের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করল, তখন সে তোমাকে দোষ দিত।”

নীরা বলল,

“কিন্তু সে কেন আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইবে?”

মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“কারণ সে মনে করে, আমাদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার জন্য তুমিই দায়ী।”

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

“কিন্তু এত কিছু করার কারণ?”

মেহরিন বলল,

“হয়তো প্রতিশোধ।”

সেদিন রাতে আরিয়ান রিদওয়ানকে ফোন করল।

প্রথমে ফোন ধরল না।

দ্বিতীয়বারও না।

তৃতীয়বারে ফোন ধরল।

“হ্যালো?”

আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,

“তুমি কি আমাকে আর নীরাকে নিয়ে মেসেজ পাঠাচ্ছ?”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর রিদওয়ান হেসে বলল,

“অবশেষে বুঝলে?”

নীরার মুখ শক্ত হয়ে গেল।

আরিয়ান বলল,

“কেন?”

“কারণ তুমি মেহরিনকে ছেড়ে দিয়েছ।”

“আমাদের সম্পর্কটা ঠিক ছিল না।”

“তবুও সে তোমাকে বিশ্বাস করেছিল।”

আরিয়ান ধীরে বলল,

“সে নিজেই জানে আমাদের সম্পর্কটা ভুল ছিল।”

“তুমি সবকিছুর ব্যাখ্যা দিতে পারবে না।”

“আমি তোমার কাছে ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য নই।”

রিদওয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“তুমি নীরাকে নিয়ে সুখী হতে পারবে না।”

“সেটা আমার সিদ্ধান্ত।”

“দেখা যাবে।”

ফোন কেটে গেল।

নীরা ধীরে বলল,

“তুমি কি ভয় পাচ্ছ?”

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“না।”

“সত্যি?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

“কারণ এবার আমি কাউকে হারানোর ভয় থেকে সম্পর্ক করছি না।”

কয়েকদিন পর বিষয়টা মিটে গেল।

রিদওয়ান শেষ পর্যন্ত স্বীকার করল, সে ছবিগুলো পাঠিয়েছিল এবং মেসেজও দিয়েছিল।

মেহরিন তাকে কঠোরভাবে বুঝিয়ে দিল।

নীরাও জানল, আরিয়ানের অতীতে লুকিয়ে থাকা কোনো বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না।

ছিল শুধু একটা ভুল বিয়ে।

একটা অসম্পূর্ণ সম্পর্ক।

আর সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সাহস।

কিন্তু নীরার ভেতরের ভয় পুরোপুরি তখনও কাটেনি।

এক সন্ধ্যায় তারা ছাদে বসেছিল।

আকাশে মেঘ।

হালকা বাতাস।

নীরা বলল,

“তুমি জানো, তোমাকে বিশ্বাস করতে আমার এত সময় কেন লেগেছে?”

“কেন?”

“কারণ আমি ভাবতাম, মানুষ একবার কাছে এলে একদিন না একদিন চলে যাবে।”

আরিয়ান চুপ করে শুনছিল।

“তাই যখন তুমি আমার কাছে এলে, তখন তোমাকে যতটা পছন্দ করতাম, তার চেয়েও বেশি ভয় পেতাম।”

আরিয়ান ধীরে বলল,

“এখন?”

নীরা তার দিকে তাকাল।

“এখনও ভয় পাই।”

“তাহলে?”

“তবে এবার ভয় পেলেও তোমার হাত ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে না।”

আরিয়ানের চোখ নরম হয়ে গেল।

সে নীরার হাত ধরল।

“আমি তোমাকে একটা কথা বলব?”

“হুম।”

“আমি তোমাকে কখনো নিখুঁত জীবন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেব না।”

নীরা মৃদু হাসল।

“আমিও চাই না।”

“কিন্তু একটা জিনিস দিতে পারি।”

“কী?”

“সত্যি।”

নীরা তার হাতটা একটু শক্ত করে ধরল।

“তাহলে সেটাই যথেষ্ট।”

কিছুদিন পর আরিয়ান নীরাকে সেই জায়গায় নিয়ে গেল যেখানে তাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল।

সেই ছোট্ট ক্যাফে।

জানালার পাশে একই টেবিল।

নীরা বসে বলল,

“সবকিছু যেন আবার শুরু হচ্ছে।”

আরিয়ান বলল,

“না।”

“কেন?”

“কারণ এবার আমরা আগের মানুষ নেই।”

নীরা মৃদু হাসল।

“সেটা ঠিক।”

“তখন আমি জানতাম না আমি কী চাই।”

“এখন?”

আরিয়ান সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।

“এখন জানি।”

“কী চাও?”

আরিয়ান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,

“তোমার সঙ্গে একটা জীবন।”

নীরার চোখে পানি এসে গেল।

“এতদিনে বুঝলে?”

“দেরি হয়েছে।”

“অনেক।”

“তবু এসেছি।”

নীরা হাসতে হাসতে চোখ মুছে বলল,

“তাহলে এবার আর দেরি করা যাবে না।”

আরিয়ানও হেসে ফেলল।

কয়েক মাস পর তাদের বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো।

মেহরিনও এল।

নীরা প্রথমে একটু অস্বস্তি বোধ করছিল।

কিন্তু মেহরিন নিজেই তার হাত ধরে বলল,

“ভয় পেও না।”

নীরা অবাক হয়ে তাকাল।

“কী?”

“আরিয়ানকে আমি তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি না। সে নিজেই তোমাকে বেছে নিয়েছে।”

নীরা হেসে ফেলল।

“আপনি খুব ভালো মানুষ।”

মেহরিন বলল,

“আমাকে আপু বলবে।”

নীরা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

“ঠিক আছে, আপু।”

দূর থেকে আরিয়ান দুজনকে দেখে হাসছিল।

তার মনে হলো—

জীবন কখনো কখনো অদ্ভুতভাবে হিসাব মেলায়।

যে মানুষটার সঙ্গে সে ভেবেছিল সারাজীবন কাটাবে, সে আজ তার সবচেয়ে সুন্দর সিদ্ধান্তের সাক্ষী।

আর যে মেয়েটাকে সে প্রথমে অচেনা মনে করেছিল, সে আজ তার ভবিষ্যৎ।

বিয়ের আগের রাতে আরিয়ান একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

নীরা ফোন করল।

“ঘুমাওনি?”

“না।”

“ভয় লাগছে?”

আরিয়ান হেসে বলল,

“হ্যাঁ।”

“আমারও।”

“কিন্তু এবার ভয়টা অন্যরকম।”

“কেমন?”

“এইবার মনে হচ্ছে, সামনে যা আছে সেটা হারানোর নয়—পাওয়ার।”

নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

“আরিয়ান?”

“হুম?”

“ধন্যবাদ।”

“কিসের জন্য?”

“আমাকে দ্বিতীয়বার বিশ্বাস করতে শেখানোর জন্য।”

আরিয়ান মৃদু স্বরে বলল,

“আমাকেও দ্বিতীয়বার সত্যি করে বাঁচতে শেখানোর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।”

ফোনের ওপাশে নীরার হাসি শোনা গেল।

দুজনেই জানত—

আগামীকাল তাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হবে।

সকালের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকছিল।

আরিয়ানের ঘুম ভাঙার পর প্রথম যে কথাটা মনে হলো—

আজ তার বিয়ে।

কিন্তু আজকের অনুভূতিটা আগের বিয়ের দিনের মতো নয়।

সেদিন বুকের ভেতর ছিল অজানা ভয়।

আজ আছে শান্ত একটা আনন্দ।

কারণ আজ সে কাউকে বিয়ে করছে না পরিবারের সিদ্ধান্তে, বন্ধুত্বের অভ্যাসে কিংবা কাউকে হারানোর ভয় থেকে।

আজ সে বিয়ে করছে নিজের ইচ্ছায়।

নীরাকে।

বিয়ের অনুষ্ঠান খুব বড় করে করা হয়নি।

দুই পরিবারের কাছের মানুষজন, কয়েকজন বন্ধু আর মেহরিন।

নীরা যখন সাজঘর থেকে বের হলো, আরিয়ানের চোখ কিছুক্ষণ তার ওপর স্থির হয়ে রইল।

নীরা কাছে এসে মৃদু স্বরে বলল,

“এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?”

আরিয়ান হেসে বলল,

“ভাবছি, প্রথম দিন তোমাকে দেখে এত কিছু বুঝতে পারিনি।”

“কী বুঝতে পারোনি?”

“তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে যাবে।”

নীরা চোখ নামিয়ে হাসল।

“তখন তো আমি শুধু তোমার কফির টেবিলের পাশের অচেনা মেয়ে ছিলাম।”

“আর এখন?”

“এখন?”

আরিয়ান ধীরে বলল,

“এখন তুমি আমার বাড়ি ফেরার কারণ।”

নীরা কিছু বলল না।

শুধু মৃদু হেসে তার পাশে এসে দাঁড়াল।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর সবাই যখন ছবি তুলছিল, মেহরিন একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

আরিয়ান তার কাছে গিয়ে বলল,

“তুমি এসেছ বলে ভালো লাগছে।”

মেহরিন হেসে বলল,

“তোমার বিয়েতে না এসে কি পারতাম?”

“তুমি ঠিক আছ?”

“হ্যাঁ।”

“সত্যি?”

মেহরিন একটু ভেবে বলল,

“হ্যাঁ। কারণ আজ তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি সত্যিই সুখী।”

আরিয়ান কিছু বলতে পারল না।

মেহরিন বলল,

“একটা কথা মনে আছে?”

“কী?”

“আমি একবার বলেছিলাম, কাউকে হারানোর ভয় আর কাউকে নিজের করে পাওয়ার ইচ্ছা এক নয়।”

“মনে আছে।”

“আজ তুমি বুঝেছ।”

আরিয়ান মৃদু হাসল।

“হ্যাঁ।”

মেহরিন বলল,

“তাহলে আমার কাজ শেষ।”

আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল।

“কী কাজ?”

“তোমাকে নিজের সত্যিটা বুঝিয়ে দেওয়া।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

তারপর মেহরিন নীরার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

“ওকে সামলানো কিন্তু সহজ হবে না।”

নীরা হেসে বলল,

“জানি।”

“তবে একটা ভালো দিক আছে।”

“কী?”

“ও এখন নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখেছে।”

দুজনেই আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে হাসল।

রাতে সবাই চলে যাওয়ার পর আরিয়ান আর নীরা বারান্দায় দাঁড়াল।

চারপাশ শান্ত।

নীরা বলল,

“আজকের দিনটা বিশ্বাস হচ্ছে না।”

“আমারও না।”

“কত কিছু হয়ে গেল আমাদের মধ্যে।”

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

“কখনো মনে হয়, যদি সেদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা না হতো?”

আরিয়ান একটু ভেবে বলল,

“তাহলে হয়তো আমি এখনও নিজের জীবনের ভুলটাকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করতাম।”

নীরা বলল,

“আর আমি হয়তো এখনও মানুষকে বিশ্বাস করতে ভয় পেতাম।”

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

“তুমি কি এখনও ভয় পাও?”

নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“একটু।”

“কেন?”

“কারণ সুখ হারানোর ভয়ও তো থাকে।”

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

“তাহলে একটা কাজ করি।”

“কী?”

“আজ থেকে আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় না পেয়ে আজকের দিনটা ভালোভাবে বাঁচব।”

নীরা হেসে বলল,

“চুক্তি।”

কিছুদিন পর তাদের জীবন আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।

আরিয়ান কাজে ব্যস্ত।

নীরা তার বইয়ের দোকান নিয়ে ব্যস্ত।

তাদের মধ্যে ছোটখাটো ঝগড়াও হতো।

কখনো কে আগে ফোন করবে সেটা নিয়ে অভিমান।

কখনো নীরা আরিয়ানের অগোছালো টেবিল দেখে বিরক্ত হতো।

কখনো আরিয়ান অভিযোগ করত, নীরা বই কিনতে কিনতে ঘর ভর্তি করে ফেলছে।

কিন্তু এই ছোট ছোট ঝগড়ার মধ্যেও একটা পার্থক্য ছিল।

এবার তারা কথা না বলে দূরে সরে যেত না।

কেউ কষ্ট পেলে সেটা বলত।

ভুল হলে ক্ষমা চাইত।

ভয় পেলে সেটা স্বীকার করত।

কারণ তারা দুজনেই শিখেছিল—

সম্পর্ক টিকে থাকে শুধু ভালো সময়ে নয়, কঠিন সময়েও সত্যি কথা বলার সাহসে।

এক সন্ধ্যায় নীরা দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছিল।

দরজার বাইরে আরিয়ান দাঁড়িয়ে ছিল।

“আবার এসেছ?”

“হুম।”

“কেন?”

“তোমাকে নিতে।”

“আজ তো আমি নিজেই যেতে পারতাম।”

“জানি।”

“তাহলে?”

আরিয়ান হেসে বলল,

“তোমাকে নিতে আসার কোনো কারণ লাগে না।”

নীরা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

“চলো।”

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

কিছুদূর যাওয়ার পর নীরা হঠাৎ বলল,

“আরিয়ান?”

“হুম?”

“আমাদের যদি দ্বিতীয় সুযোগ না আসত?”

আরিয়ান একটু থেমে বলল,

“তাহলে হয়তো আমাদের গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেত।”

“আর এখন?”

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

“এখন বুঝেছি, দ্বিতীয় সুযোগ সবসময় সময়কে পিছনে নিয়ে যায় না।”

“তাহলে?”

“কখনো কখনো দ্বিতীয় সুযোগ মানে হলো—আগের ভুল থেকে শিখে নতুন করে শুরু করা।”

নীরা হাসল।

“আর আমাদের দ্বিতীয় সুযোগ?”

আরিয়ান তার হাতটা ধরে বলল,

“আমাদের দ্বিতীয় সুযোগই আমাদের প্রথম সত্যিকারের শুরু।”

নীরা কিছু বলল না।

শুধু তার পাশে হাঁটতে থাকল।

রাস্তার আলো ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যাচ্ছিল।

সামনে ছিল লম্বা পথ।

নতুন জীবন।

নতুন স্বপ্ন।

নতুন ভুল।

নতুন করে ক্ষমা চাওয়া।

নতুন করে একে অপরকে বোঝা।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

প্রতিদিন নতুন করে একে অপরকে বেছে নেওয়া।

আরিয়ান একবার নীরার দিকে তাকাল।

নীরা হাসছিল।

সে বুঝল, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক হয়তো সেই সম্পর্ক নয় যেখানে কখনো ভুল হয় না।

বরং সেই সম্পর্ক—

যেখানে ভুলের পরও দুজন মানুষ ফিরে এসে বলে,

“চলো, আবার শুরু করি।”

....
👁 54