সিয়াম আর প্রভার সম্পর্কটা খুব বেশি দিনের ছিল না। প্রায় এক বছর ধরে তারা একে অপরকে চিনত। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে বন্ধুত্বে, আর বন্ধুত্ব একসময় গভীর সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল।
তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল—তারা একে অপরের সঙ্গে খুব সহজভাবে কথা বলতে পারত।
সিয়াম চাকরি করত একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে। কাজের চাপ ছিল, কিন্তু দিনের শেষে প্রভার সঙ্গে অন্তত আধঘণ্টা কথা না বললে তার দিনটা যেন অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
অন্যদিকে প্রভা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। মেয়েটা শান্ত স্বভাবের হলেও নিজের মতামতের ব্যাপারে বেশ দৃঢ় ছিল। কোনো কিছু ভালো না লাগলে সরাসরি বলে দিত।
তাদের মধ্যে ঝগড়াও হতো।
কখনো সিয়াম ফোন ধরতে দেরি করত বলে।
কখনো প্রভা কোনো মেসেজের উত্তর না দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যস্ত থাকত বলে।
আবার কখনো খুব ছোট কোনো বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে অভিমান জমে থাকত।
তবে দিনের শেষে একজনই আরেকজনকে ফোন করত।
“রাগ করে আছ?”
“না।”
“মিথ্যা বলছ।”
“হ্যাঁ, রাগ করে আছি।”
“কেন?”
“তুমি জানো।”
“আমি জানি না। বলো।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর প্রভা হেসে ফেলত।
এভাবেই চলছিল তাদের সম্পর্ক।
তারা দুজনেই জানত, একদিন বিয়ে করবে।
কিন্তু বিয়ের কথা দুই পরিবারের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ওঠেনি।
সিয়াম এক সন্ধ্যায় প্রভাকে ফোন করে বলল,
“প্রভা, বাসায় আজ তোমার কথা বলেছি।”
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
“তারপর?”
“মা তোমাকে দেখতে চায়।”
প্রভার গলায় হালকা হাসি।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“তোমার বাবা?”
“বাবা খুব বেশি কিছু বলেনি।”
“মানে?”
“মানে, তোমাকে পছন্দ না হলে তো বিয়ে করবে না। কিন্তু আমার পছন্দটা নাকি আগে দেখতে হবে।”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“তুমি কি সত্যিই আমাকে বিয়ে করতে চাও?”
সিয়াম অবাক হয়ে বলল,
“এই প্রশ্নটা আবার কেন?”
“জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি আমাকে পছন্দ করো, কিন্তু বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে তুমি খুব একটা সিরিয়াস না।”
সিয়াম হেসে বলল,
“আমি তোমাকে এক বছর ধরে সহ্য করছি। এটাও কম সিরিয়াস ব্যাপার না।”
“বেশি কথা বললে কিন্তু বিয়ে বাতিল।”
“ঠিক আছে, ম্যাডাম।”
প্রভা হেসে ফেলল।
দুজনের কথার মধ্যে তখনও কোনো অশান্তির আভাস ছিল না।
কিন্তু পরদিনই সবকিছু বদলে গেল।
শুক্রবার বিকেলে সিয়াম প্রভার বাসায় গেল।
প্রভার বাবা মাহবুব সাহেব তাকে আগে থেকেই চিনতেন। তবে তিনি কখনো সিয়ামের সঙ্গে খুব বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেননি।
চা খাওয়ার পর তিনি সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি প্রভাকে বিয়ে করতে চাও?”
“জি, চাই।”
“তোমার পরিবার রাজি?”
“জি।”
“প্রভাও রাজি?”
সিয়াম একটু হেসে বলল,
“জি।”
মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
“আমি তোমাদের বিয়েতে আপত্তি করছি না।”
সিয়াম যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু পরের কথাটাই তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
“তবে আমার একটা শর্ত আছে।”
“কী শর্ত?”
মাহবুব সাহেব টেবিলের ওপর রাখা নিজের চশমাটা ঠিক করে বললেন,
“তোমরা দুজন একে অপরের ফোন একদিনের জন্য বদলাবে।”
সিয়াম প্রথমে ভেবেছিল তিনি মজা করছেন।
“মানে?”
“তোমার ফোন থাকবে প্রভার কাছে। আর প্রভার ফোন থাকবে তোমার কাছে। পুরো চব্বিশ ঘণ্টা।”
সিয়াম এবার একেবারে চুপ হয়ে গেল।
মাহবুব সাহেব শান্তভাবে বললেন,
“আমি তোমাদের ফোনের ভেতরের ব্যক্তিগত বিষয় দেখতে চাই না। কিন্তু তোমরা একে অপরকে কতটা বিশ্বাস করো, সেটা তোমরাই বুঝবে।”
প্রভা পাশের ঘর থেকে সব শুনছিল।
সে দ্রুত এসে বলল,
“বাবা, এটা কী ধরনের শর্ত?”
“অস্বাভাবিক?”
“অবশ্যই।”
“তাহলে সমস্যা কোথায়?”
প্রভা কিছু বলতে পারল না।
মাহবুব সাহেব এবার সিয়ামের দিকে তাকালেন।
“তোমরা যদি সত্যিই একে অপরকে বিয়ে করতে চাও, তাহলে একদিন ফোন বদলাতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।”
সিয়াম চুপ করে রইল।
প্রভাও তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
সিয়াম বুঝতে পারল, প্রভাও অস্বস্তিতে আছে।
সে ধীরে বলল,
“আচ্ছা। করব।”
প্রভা সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
“সিয়াম!”
“কী হয়েছে?”
“তুমি রাজি হয়ে গেলে?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি জানো এতে কী হতে পারে?”
সিয়াম হেসে বলল,
“আমার ফোনে এমন কিছু নেই, যা তোমার দেখার মতো না।”
প্রভা একটু থেমে বলল,
“আমার ফোনেও নেই।”
“তাহলে ভয় কী?”
প্রভা এবার আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার মুখের ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছিল, ব্যাপারটা তার ভালো লাগেনি।
সেদিন রাতে ফোনে কথা বলার সময় প্রভা বলল,
“তুমি কি সত্যিই আমার ফোন দেখতে চাও?”
সিয়াম বলল,
“না।”
“তাহলে?”
“তোমার বাবার শর্ত।”
“তুমি চাইলে না বলতে পারতে।”
“তাহলে উনি ভাবতেন আমরা কিছু লুকাচ্ছি।”
প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“সব মানুষের কিছু ব্যক্তিগত বিষয় থাকে, সিয়াম।”
“জানি।”
“তাহলে?”
“আমিও তোমার ব্যক্তিগত বিষয় দেখতে চাই না।”
“কিন্তু ফোনটা যখন তোমার কাছে থাকবে?”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
“তুমি চাইলে আমি তোমার কোনো ব্যক্তিগত জিনিস খুলব না।”
প্রভা একটু নরম হলো।
“সত্যি?”
“সত্যি।”
“আর তুমি?”
“আমার ফোন তুমি যত খুশি দেখো।”
“তোমার এত আত্মবিশ্বাস কেন?”
সিয়াম হেসে বলল,
“কারণ আমি নির্দোষ।”
প্রভা হেসে ফেলল।
“সবাই নিজেকে নির্দোষই ভাবে।”
“তুমি আমাকে সন্দেহ করছ?”
“না।”
“তাহলে?”
“কিছু না।”
কথাটা খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু সেদিন রাতেই দুজনের সম্পর্কের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটা অদৃশ্য অস্বস্তি ঢুকে গেল।
পরদিন দুপুরে তারা দেখা করল।
দুজনেই নিজেদের ফোন হাতে নিয়ে বসে ছিল।
সিয়াম তার ফোনটা প্রভার দিকে এগিয়ে দিল।
“নাও।”
প্রভা নিজের ফোনটা তার হাতে দিয়ে বলল,
“তুমিও নাও।”
দুজন ফোন হাতে নিল।
প্রথম কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না।
তারপর সিয়াম হেসে বলল,
“চলো, চুক্তি শুরু।”
প্রভাও হেসে বলল,
“হ্যাঁ। চব্বিশ ঘণ্টা।”
কিন্তু হাসিটা খুব স্বাভাবিক ছিল না।
সিয়াম নিজের হাতে প্রভার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
স্ক্রিনে কয়েকটি নোটিফিকেশন ভেসে উঠল।
একটি মেসেজ।
একটি মিসড কল।
আর একটি নাম—
“রাফি।”
সিয়াম নামটা দেখে থেমে গেল।
প্রভা সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের দিকে তাকাল।
“কী হয়েছে?”
সিয়াম ফোনটা নামিয়ে রাখল।
“কিছু না।”
“রাফিকে চেনো?”
“না।”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“ও আমার পুরোনো বন্ধু।”
সিয়াম মাথা নাড়ল।
“আচ্ছা।”
তার গলায় কোনো রাগ ছিল না।
কিন্তু প্রভা বুঝতে পারল, সিয়ামের মুখের হাসিটা আর আগের মতো নেই।
অন্যদিকে প্রভা সিয়ামের ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিন অন করল।
সেখানেও কয়েকটি নোটিফিকেশন।
একটি মেসেজের নাম দেখে প্রভার চোখ থেমে গেল—
“মেহরিন।”
প্রভা ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
সিয়াম তার দিকে তাকাল।
“কী হলো?”
প্রভা শান্ত গলায় বলল,
“কিছু না।”
দুজনেই একই কথা বলল।
“কিছু না।”
কিন্তু দুজনের মনেই তখন একই প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে—
যে মানুষটাকে আমি এতটা চিনি বলে ভাবতাম, তার ফোনে আসলে আর কী কী লুকিয়ে আছে?
সিয়াম আর প্রভা দুজনেই ফোন হাতে নিয়ে বসে ছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল, খুব সাধারণ একটা বিকেল। কিন্তু তাদের দুজনের মাথার ভেতর তখন অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরছিল।
প্রভার হাতে সিয়ামের ফোন।
সিয়ামের হাতে প্রভার ফোন।
চব্বিশ ঘণ্টার জন্য।
প্রথম কয়েক মিনিট কেউই ফোনের ভেতরে ঢুকল না।
সিয়াম চুপচাপ বসে ছিল। প্রভাও নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
শেষ পর্যন্ত প্রভাই বলল,
“তুমি কিছু দেখছ না কেন?”
সিয়াম বলল,
“তুমিও তো দেখছ না।”
“আমি আগে দেখতে চাই না।”
“কেন?”
“জানি না।”
সিয়াম হালকা হেসে বলল,
“তাহলে দুজনেই ফোন রেখে দিই।”
প্রভা কিছু বলল না।
ঠিক তখনই তার হাতে থাকা সিয়ামের ফোনে একটা মেসেজ এল।
স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠল—
মেহরিন।
প্রভার চোখ কয়েক সেকেন্ড সেই নামের ওপর আটকে রইল।
সে মেসেজটা খুলল না।
শুধু ফোনটা সিয়ামের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“মেহরিন কে?”
সিয়াম একটু থেমে বলল,
“একজন সহকর্মী।”
“শুধু সহকর্মী?”
“হ্যাঁ।”
প্রভা আবার ফোনটা নিজের হাতে নিল।
“তোমাদের নিয়মিত কথা হয়?”
“কাজের ব্যাপারে হয়।”
“এখনও?”
সিয়াম বুঝতে পারল প্রশ্নটা আসলে শুধু মেহরিনকে নিয়ে নয়।
সে শান্তভাবে বলল,
“হ্যাঁ, অফিসের কাজ নিয়ে কথা হয়। এর বেশি কিছু না।”
প্রভা আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার মুখের ভাব বদলে গেল।
সিয়াম এবার প্রভার ফোনের দিকে তাকাল।
“রাফি?”
প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ও আমার স্কুলের বন্ধু।”
“এখনও কথা হয়?”
“মাঝে মাঝে।”
“কী নিয়ে?”
“সবকিছু নিয়ে কথা বলতে হবে?”
সিয়াম চুপ হয়ে গেল।
প্রভাও বুঝতে পারল, কথাটা একটু বেশি কঠিন হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর সে নরম গলায় বলল,
“রাফি আমার খুব পুরোনো বন্ধু। ওর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”
সিয়াম মাথা নাড়ল।
“আমি তো কিছু বলিনি।”
“তোমার মুখ বলছে।”
“তোমার মুখও অনেক কিছু বলছে।”
দুজনেই চুপ।
কিছুক্ষণ পর তারা একটা ক্যাফেতে বসেছিল।
প্রভা চা খাচ্ছিল। সিয়াম কফি।
দুজনের ফোন টেবিলের ওপর রাখা।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কেউই ঠিকমতো একে অপরের সঙ্গে কথা বলছিল না।
সিয়াম হঠাৎ বলল,
“তোমার ফোনে একটা চ্যাট আছে।”
প্রভা তাকাল।
“কার?”
“রাফির।”
প্রভা একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,
“খুলেছ?”
“না।”
“কেন?”
“কারণ আমি তোমার ব্যক্তিগত কথা পড়তে চাই না।”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
“কিন্তু তুমি চাইলে পড়তে পারো।”
সিয়াম মাথা নাড়ল।
“না।”
“তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?”
সিয়াম এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।
“বিশ্বাস করি।”
“তাহলে আমার এত চিন্তা হচ্ছে কেন?”
সিয়াম উত্তর দিল না।
কারণ তার নিজের মনেও একই প্রশ্ন।
সে প্রভাকে বিশ্বাস করে।
তবু অন্য একজন ছেলের নাম তার মনে অস্বস্তি তৈরি করছে।
আর প্রভার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে।
মেহরিনের নামটা বারবার তার মাথায় ঘুরছে।
বিকেলের দিকে প্রভা সিয়ামের ফোনের গ্যালারি খুলল।
সে আসলে কোনো ছবি দেখতে চায়নি। শুধু ভুল করে গ্যালারিতে চলে গিয়েছিল।
সামনের স্ক্রিনে অনেক ছবি।
অফিসের ছবি।
বন্ধুদের ছবি।
পরিবারের ছবি।
পুরোনো ভ্রমণের ছবি।
হঠাৎ একটা ছবিতে তার চোখ আটকে গেল।
ছবিতে সিয়ামের পাশে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে।
মেয়েটার নাম সে জানে না।
প্রভা ছবিটা কয়েক সেকেন্ড দেখল।
তারপর সিয়ামকে ডাকল।
“এই মেয়েটা কে?”
সিয়াম ফোনটা নিয়ে ছবির দিকে তাকাল।
“ও? তানিয়া।”
“কে?”
“আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু।”
“তোমার সঙ্গে এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে কেন?”
সিয়াম অবাক হয়ে বলল,
“কাছাকাছি?”
“হ্যাঁ।”
“ছবিটা অনেক পুরোনো।”
“কত পুরোনো?”
“প্রায় চার বছর।”
প্রভা কিছু বলল না।
সিয়াম বুঝতে পারল, আবার একই সমস্যা।
পুরোনো একটা ছবি।
কিন্তু বর্তমানের সম্পর্কের মধ্যে তার প্রভাব পড়ছে।
সে বলল,
“প্রভা, ওই ছবির সঙ্গে আমার বর্তমানের কোনো সম্পর্ক নেই।”
“আমি তো বলিনি আছে।”
“তাহলে?”
“কিছু না।”
সিয়াম এবার একটু বিরক্ত হলো।
“তুমি বারবার ‘কিছু না’ বলছ কেন?”
প্রভা চুপ।
সিয়াম আবার বলল,
“তুমি যদি কিছু জানতে চাও, সরাসরি জিজ্ঞেস করো।”
প্রভা ধীরে বলল,
“আমি শুধু বুঝতে চাই, তোমার জীবনে আমার আগে যারা ছিল, তাদের জায়গাটা কোথায়।”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
“তাদের জায়গা অতীতে।”
“আর আমি?”
“তুমি বর্তমানে।”
প্রভা আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার চোখের অস্বস্তি পুরোপুরি দূর হলো না।
সন্ধ্যায় তারা আলাদা হয়ে গেল।
বাড়ি ফেরার পরও ফোন দুটো তাদের কাছেই রইল।
প্রভা নিজের ঘরে বসে সিয়ামের ফোনের নোটিফিকেশন দেখছিল।
হঠাৎ একটা মেসেজ এল।
মেহরিন: “আজকে কি তুমি একটু সময় পাবে? একটা জরুরি কথা ছিল।”
প্রভা মেসেজটা দেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।
তার মনে হলো, মেসেজটা সাধারণ নয়।
সে চাইলেই খুলে পড়তে পারে।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর ফোনটা টেবিলে রেখে দিল।
তারপর নিজেকেই বলল,
“না। আমি পড়ব না।”
অন্যদিকে সিয়ামও প্রভার ফোনে একটা মেসেজ পেল।
রাফি: “তোমার সঙ্গে কালকের ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলা দরকার।”
সিয়াম মেসেজটা দেখে ভ্রু কুঁচকাল।
“কালকের ব্যাপার?”
কী ব্যাপার?
সে জানে না।
কিন্তু চাইলে এখনই মেসেজটা খুলে সব জানতে পারে।
তার আঙুল স্ক্রিনের ওপর থেমে গেল।
শেষ পর্যন্ত সে মেসেজ খুলল না।
কিন্তু সেই অজানা কথাটা তার মাথায় ঘুরতে থাকল।
রাত সাড়ে দশটার দিকে প্রভা সিয়ামকে ফোন করল।
অবশ্য ফোনটা তার নিজের কাছে নেই।
তাই সিয়ামের ফোন থেকেই নিজের নম্বরে কল করল।
সিয়াম ফোন ধরতেই প্রভা বলল,
“ঘুমাচ্ছ?”
“না।”
“আজ কেমন লাগছে?”
“খারাপ।”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“আমারও।”
“তুমি কি আমার ফোনে কিছু দেখেছ?”
“না।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
সিয়ামও বলল,
“আমিও তোমার ফোনে তেমন কিছু দেখিনি।”
প্রভা একটু হেসে বলল,
“তেমন কিছু মানে?”
“মানে...”
“তুমি রাফির মেসেজ দেখেছ?”
সিয়াম চুপ।
প্রভা বুঝে গেল।
“দেখেছ।”
“হ্যাঁ।”
“কী ভাবছ?”
“কিছু না।”
প্রভা এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
“তুমি-ও শুরু করলে?”
সিয়াম হেসে ফেলল।
“আচ্ছা, বলো।”
“রাফির সঙ্গে কালকের কী ব্যাপার?”
“আমি জানি না।”
“তুমি মেসেজ পড়োনি?”
“না।”
“কেন?”
“কারণ তুমি যদি নিজে না বলো, তাহলে তোমার ব্যক্তিগত মেসেজ পড়ে জেনে নেওয়ার দরকার কী?”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
“কাল ওর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল।”
সিয়াম চুপ হয়ে গেল।
“কেন?”
“ওর কিছু সমস্যা হয়েছে। চাকরি নিয়ে। আমাকে কিছু পরামর্শ চাইছিল।”
“তুমি আমাকে বলোনি?”
“বলার মতো কিছু মনে হয়নি।”
“কিন্তু তুমি জানো আমি এসব পছন্দ করি না।”
প্রভা এবার শান্ত গলায় বলল,
“সেটাই সমস্যা, সিয়াম।”
“কী?”
“তুমি কী পছন্দ করো আর কী পছন্দ করো না—এই ভেবে যদি আমাকে সবকিছু করতে হয়, তাহলে সেটা বিশ্বাস না।”
সিয়াম কোনো উত্তর দিল না।
কথাটা তার মনে গিয়ে লাগল।
প্রভা আবার বলল,
“আমি তোমার ফোনে অন্য মেয়ের মেসেজ দেখেছি। তুমি আমার ফোনে অন্য ছেলের মেসেজ দেখেছ। কিন্তু আসল সমস্যা মেসেজ না।”
“তাহলে?”
“আমরা একে অপরকে বিশ্বাস করি কি না, সেটাই সমস্যা।”
সিয়াম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“হয়তো আমরা দুজনেই ভয় পাচ্ছি।”
“কিসের?”
“যাকে এতটা নিজের মনে করি, তাকে হারানোর।”
প্রভা আর কিছু বলল না।
পরদিন সকাল।
ফোন বদলের চব্বিশ ঘণ্টা শেষ হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি।
সিয়াম ঘুম থেকে উঠে প্রভার ফোনটা হাতে নিল।
হঠাৎ একটা পুরোনো ছবি তার চোখে পড়ল।
ছবিতে প্রভা আর রাফি।
দুজন হাসছে।
ছবিটা খুব পুরোনো।
কিন্তু ছবির নিচে একটা তারিখ লেখা—
তিন বছর আগের।
সিয়ামের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ তৈরি হলো।
সে ছবিটা বন্ধ করে দিল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার খুলল।
এইবার ছবির নিচের ক্যাপশনটা চোখে পড়ল।
“কিছু মানুষকে হারিয়ে ফেললেও স্মৃতিগুলো থেকে যায়।”
সিয়াম দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ফোনটা টেবিলে রেখে দিল।
তার মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন—
প্রভা কি সত্যিই তাকে সবকিছু বলেছে?
আর ঠিক সেই সময়ে প্রভাও সিয়ামের ফোনে একটি পুরোনো চ্যাট দেখতে পেল।
চ্যাটের নাম—
মেহরিন।
শেষ মেসেজটা চার মাস আগের।
প্রভা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার আঙুল ধীরে ধীরে চ্যাটের ওপর গেল।
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
তারপর—
সে চ্যাটটা খুলে ফেলল।
আর প্রথম কয়েকটি লাইন পড়ার পরই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
কারণ মেহরিন শুধু সিয়ামের সহকর্মী ছিল না।
তাদের মধ্যে এমন কিছু কথা ছিল, যার কথা সিয়াম কখনো প্রভাকে বলেনি।
প্রভা অনেকক্ষণ সিয়ামের ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
মেহরিনের সঙ্গে পুরোনো চ্যাটটা খোলা।
চার মাস আগের কথোপকথন।
প্রভা প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো অফিসের কোনো সাধারণ কাজের কথা। কিন্তু কয়েকটা মেসেজ পড়তেই তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে গেল।
সিয়াম লিখেছিল—
“তুমি যদি চাকরিটা ছেড়ে দাও, আমার খারাপ লাগবে।”
মেহরিন উত্তর দিয়েছিল—
“তুমি জানো আমি কেন থাকতে চাই না।”
তারপর সিয়াম লিখেছিল—
“সবকিছু বদলে গেছে।”
প্রভা থেমে গেল।
সবকিছু বদলে গেছে।
কী বদলে গেছে?
কেন বদলে গেছে?
আর মেহরিনের সঙ্গে এমন কী সম্পর্ক ছিল, যার কথা সিয়াম তাকে কখনো বলেনি?
প্রভা আরও কয়েকটা মেসেজ পড়ল।
কথাগুলো খুব বেশি কিছু নয়। কোথাও সরাসরি প্রেমের কথা নেই। কিন্তু কথার ভেতরে একটা পুরোনো ঘনিষ্ঠতা স্পষ্ট।
শেষদিকে মেহরিন লিখেছিল—
“তোমার জীবনে এখন অন্য কেউ আছে। তাই হয়তো আমার আর কিছু বলা উচিত না।”
সিয়াম উত্তর দিয়েছিল—
“হ্যাঁ। প্রভা আছে।”
প্রভা এই লাইনটা পড়ে কিছুটা থেমে গেল।
তারপরের মেসেজ—
“কিন্তু কিছু পুরোনো ব্যাপার তো একদিনে শেষ হয় না।”
প্রভা ফোনটা বন্ধ করে দিল।
তার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি জমে উঠল।
সিয়াম কি তাকে ভালোবাসে?
হ্যাঁ।
তাহলে মেহরিনের সঙ্গে তার অতীতে কী ছিল?
সে কেন কিছু বলেনি?
দুপুরে তারা আবার দেখা করল।
সিয়াম প্রথম দেখাতেই বুঝতে পারল, প্রভার মুখ ভার।
“কী হয়েছে?”
প্রভা কোনো উত্তর দিল না।
সিয়াম বলল,
“তুমি কি আমার ফোনে কিছু দেখেছ?”
প্রভা সরাসরি বলল,
“মেহরিন কে?”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
“আমি তো বলেছি, সহকর্মী।”
“শুধু সহকর্মী?”
সিয়াম এবার বুঝল, প্রভা চ্যাট পড়েছে।
“তুমি আমার চ্যাট পড়েছ?”
প্রভা মাথা নিচু করল।
“হ্যাঁ।”
সিয়ামের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“তুমি বলেছিলে আমার ব্যক্তিগত জিনিস পড়বে না।”
“জানি।”
“তাহলে পড়লে কেন?”
প্রভা এবার একটু কষ্ট নিয়ে বলল,
“কারণ আমি একটা মেসেজ দেখেছিলাম।”
“কোনটা?”
“যেখানে তুমি লিখেছিলে—‘কিছু পুরোনো ব্যাপার একদিনে শেষ হয় না।’”
সিয়াম চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর সে ধীরে বলল,
“মেহরিন আমার পুরোনো বন্ধু ছিল।”
“শুধু বন্ধু?”
“একসময় আমরা খুব কাছের ছিলাম।”
প্রভার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
“কতটা কাছের?”
সিয়াম চোখ নামিয়ে বলল,
“আমরা একসময় সম্পর্কের মধ্যে ছিলাম।”
প্রভা কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
তারপর ধীরে বলল,
“তুমি আমাকে কখনো বলোনি।”
“কীভাবে বলব?”
“সত্যি কথাটা বলেই।”
“আমি ভেবেছিলাম সেটা অতীত।”
প্রভা হেসে ফেলল।
কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।
“তাহলে অতীতের কথা বলতে এত ভয় পেলে কেন?”
সিয়াম চুপ।
“তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারতে না?”
“আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
“কিসের?”
“তোমাকে হারানোর।”
প্রভা এবার তার দিকে তাকাল।
“কিন্তু তুমি যেটা লুকিয়েছ, সেটা জানার পর তোমাকে হারানোর ভয়টা আমার হওয়া উচিত ছিল।”
সিয়াম কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
প্রভা ধীরে ধীরে বলল,
“কখন শেষ হয়েছিল?”
“প্রায় দুই বছর আগে।”
“কেন?”
“আমাদের মধ্যে অনেক সমস্যা ছিল।”
“তবু চার মাস আগেও তোমাদের এত কথা?”
“ওর চাকরি নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল। কিছু পরামর্শ দিয়েছিলাম।”
“আর ‘পুরোনো ব্যাপার একদিনে শেষ হয় না’?”
সিয়াম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ওটা ওর উদ্দেশ্যে বলা না।”
“তাহলে?”
“আমি বলতে চেয়েছিলাম, কোনো সম্পর্ক শেষ হলেও তার স্মৃতি কিছুদিন থাকে। এটাই স্বাভাবিক।”
প্রভা চুপ করে থাকল।
সিয়াম এবার বলল,
“আমি তোমার সঙ্গে প্রতারণা করিনি।”
“আমি সেটা বলছি না।”
“তাহলে?”
“আমি শুধু ভাবছি, তুমি আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলে কি না।”
সিয়াম কোনো উত্তর দিতে পারল না।
কারণ সত্যি বলতে, সে প্রভাকে ভালোবাসলেও নিজের অতীত নিয়ে কথা বলার সাহস করেনি।
কিছুক্ষণ পর সিয়াম বলল,
“এবার তুমি বলো।”
প্রভা অবাক হলো।
“আমি?”
“হ্যাঁ।”
“কী বলব?”
“রাফি।”
প্রভা চুপ করে গেল।
“তোমাদের কী ছিল?”
“বন্ধুত্ব।”
“শুধু?”
প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“একসময় রাফি আমাকে পছন্দ করত।”
সিয়াম স্থির হয়ে গেল।
“তুমি জানতেও?”
“হ্যাঁ।”
“আর তুমি?”
“আমি কখনো ওকে সেইভাবে ভাবিনি।”
“তাহলে আমাকে বলোনি কেন?”
“কারণ এটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।”
“কিন্তু আমার কাছে?”
প্রভা এবার কিছু বলতে পারল না।
সিয়াম একটু তিক্ত হেসে বলল,
“দেখেছ? আমরা দুজনেই একই কাজ করেছি।”
প্রভা তাকিয়ে রইল।
“তুমি তোমার অতীত লুকিয়েছ। আমি আমার জীবনের একটা অংশ তোমাকে বলিনি।”
“কিন্তু কারণটা তো একই।”
“হ্যাঁ।”
“আমরা দুজনেই ভেবেছি, সত্যিটা বললে অন্যজন ভুল বুঝবে।”
প্রভা মাথা নিচু করল।
বিকেলে তারা একটি পার্কে বসেছিল।
দুজনের ফোন এখনও বদলানো।
কিন্তু এবার তারা ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল না।
প্রভা বলল,
“সিয়াম, একটা কথা বলি?”
“বলো।”
“আমি তোমার ফোন দেখার পর তোমার ওপর রাগ করেছি। কিন্তু পরে বুঝলাম, আমার নিজেরও ভুল আছে।”
“কী ভুল?”
“আমি তোমার কাছ থেকে পুরো সত্যিটা আশা করেছি, কিন্তু নিজে সবকিছু বলিনি।”
সিয়াম ধীরে বলল,
“আমিও একই।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর প্রভা বলল,
“তুমি কি এখনও মেহরিনকে ভালোবাসো?”
সিয়াম সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“না।”
“একদমই না?”
“না।”
“কীভাবে এত নিশ্চিত?”
“কারণ যদি ভালোবাসতাম, তাহলে তোমাকে বিয়ে করতে চাইতাম না।”
প্রভা চুপ করে রইল।
সিয়াম এবার বলল,
“তুমি কি রাফিকে ভালোবাসো?”
প্রভা মাথা নাড়ল।
“না।”
“নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
সিয়াম হালকা হাসল।
“তাহলে হয়তো সমস্যাটা মানুষ না।”
প্রভা তাকাল।
“সমস্যা?”
“আমাদের ভয়।”
প্রভা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর ধীরে বলল,
“হয়তো।”
সন্ধ্যায় তারা ফোন দুটো ফেরত দেওয়ার কথা ভাবল।
কিন্তু ঠিক তখনই প্রভার ফোনে রাফির কল এল।
প্রভা ফোনটা হাতে নিল।
সিয়াম চুপ করে তাকিয়ে রইল।
প্রভা কল কেটে দিল।
“ধরলে না কেন?”
“তোমার সামনে ধরতে চাইনি।”
“কেন?”
“কারণ আমি জানি তুমি অস্বস্তি পাবে।”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
“ধরো।”
“সিয়াম…”
“ধরো। আমার সামনে কথা বলো।”
প্রভা ফোন ধরল।
“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে রাফির কণ্ঠ ভেসে এল।
“প্রভা, কালকে তুমি আসতে পারবে? তোমার সঙ্গে একটা জরুরি ব্যাপার আছে।”
প্রভা বলল,
“কী ব্যাপার?”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
“ফোনে বলা যাবে না।”
প্রভা অবাক হলো।
“কেন?”
“তোমার বাবা সম্পর্কে কিছু জানতে পেরেছি।”
প্রভা স্থির হয়ে গেল।
“আমার বাবা?”
“হ্যাঁ। তোমার বিয়ের ব্যাপারে একটা কথা আছে, যেটা তোমার জানা দরকার।”
প্রভা আর কিছু বলতে পারল না।
সিয়ামও সব শুনেছে।
রাফি বলল,
“কাল বিকেলে পুরোনো লাইব্রেরির সামনে আসবে। একা।”
কল কেটে গেল।
প্রভা ধীরে ফোন নামিয়ে রাখল।
সিয়াম তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি যাবে?”
প্রভা উত্তর দিল না।
“প্রভা?”
“জানি না।”
“আমি তোমার সঙ্গে যাব।”
প্রভা মাথা নাড়ল।
“না।”
“কেন?”
“কারণ রাফি বলেছে একা যেতে।”
সিয়ামের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“তুমি কি আবার আমাকে কিছু না বলে কোথাও যাবে?”
প্রভা শান্তভাবে বলল,
“আমি তোমাকে না বলে যাব না।”
“তাহলে?”
“আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাব।”
সিয়াম অবাক হয়ে তাকাল।
“তাহলে একা যাওয়ার কথা বলছ কেন?”
প্রভা ধীরে বলল,
“কারণ আমি জানি না রাফি বাবার সম্পর্কে কী বলতে চায়।”
সিয়াম কিছু বলল না।
তার মনে হলো, এতক্ষণ তারা নিজেদের সম্পর্কের গোপন দিক নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
কিন্তু এখন তাদের সামনে আরও বড় একটা প্রশ্ন দাঁড়িয়ে গেছে।
প্রভার বাবা আসলে কী লুকিয়ে রেখেছেন?
রাতে বাড়ি ফিরে প্রভা তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
“বাবা, রাফি তোমার সম্পর্কে কিছু বলার কথা বলেছে।”
মাহবুব সাহেবের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল।
“রাফি?”
“হ্যাঁ।”
“ও তোমাকে কী বলেছে?”
“শুধু বলেছে, আমার বিয়ের ব্যাপারে এমন কিছু আছে যা আমি জানি না।”
মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
“তুমি কাল ওর সঙ্গে দেখা করবে না।”
প্রভা অবাক।
“কেন?”
“আমি বলেছি করবে না।”
“কিন্তু কেন?”
মাহবুব সাহেব এবার কঠিন গলায় বললেন,
“কারণ ও যা বলতে যাচ্ছে, সেটা তোমার জন্য ভালো হবে না।”
প্রভা বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
“তাহলে সত্যিটা কী?”
মাহবুব সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না।
আর সেই নীরবতাই প্রভার মনে আরও বড় সন্দেহ তৈরি করল।
অন্যদিকে সিয়াম নিজের ঘরে বসে প্রভার ফোন থেকে রাফির শেষ মেসেজটা আবার পড়ছিল।
“তোমার বিয়ের ব্যাপারে একটা কথা আছে, যেটা তোমার জানা দরকার।”
সিয়ামের মনে হলো—
হয়তো ফোন বদলের এই চব্বিশ ঘণ্টা শুধু তাদের সম্পর্কের গোপন কথাই প্রকাশ করবে না।
পরদিন সকাল থেকেই প্রভার মনটা অস্থির হয়ে ছিল।
রাফির কথাগুলো বারবার মাথায় ঘুরছিল।
“তোমার বিয়ের ব্যাপারে একটা কথা আছে, যেটা তোমার জানা দরকার।”
কী এমন কথা, যা তার বাবা জানেন কিন্তু সে জানে না?
আর বাবা কেন এতটা অস্বস্তি দেখালেন?
প্রভা নাশতার টেবিলে বসে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল। মাহবুব সাহেব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তার মুখের চিন্তার রেখা লুকানো যাচ্ছিল না।
প্রভা অবশেষে বলল,
“বাবা, তুমি কি সিয়ামকে নিয়ে কিছু লুকাচ্ছ?”
মাহবুব সাহেব চামচটা নামিয়ে রাখলেন।
“না।”
“তাহলে রাফির কথা শুনে তুমি এত ভয় পেলে কেন?”
“আমি ভয় পাইনি।”
“তাহলে?”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“প্রভা, সব কথা সব সময় জানা ভালো নয়।”
প্রভা হতাশ হয়ে বলল,
“এই কথাটা তুমি আমাকে ছোটবেলা থেকেই বলো। কিন্তু আমি এখন ছোট নেই।”
মাহবুব সাহেব মেয়ের দিকে তাকালেন।
“আমি জানি।”
“তাহলে সত্যিটা বলো।”
তিনি আর কোনো উত্তর দিলেন না।
প্রভা উঠে নিজের ঘরে চলে গেল।
অন্যদিকে সিয়াম সকাল থেকেই প্রভার ফোন হাতে নিয়ে বসে ছিল।
গত চব্বিশ ঘণ্টায় সে বুঝেছে, ফোনের ভেতরকার পৃথিবী আর বাস্তব জীবনের পৃথিবী এক নয়।
একটা মেসেজ দেখে মানুষ সন্দেহ করতে পারে।
একটা পুরোনো ছবি দেখে ভুল বুঝতে পারে।
একটা নাম দেখে নিজের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
কিন্তু সেই মেসেজ বা ছবির পুরো গল্প না জানলে সত্যিটা বোঝা যায় না।
সিয়াম নিজের ফোনে মেহরিনের চ্যাটের কথা ভাবছিল।
সে জানত, প্রভা কষ্ট পেয়েছে।
কিন্তু সে এটাও জানত, মেহরিন তার অতীত।
তার বর্তমান প্রভা।
তবু একটা বিষয় তাকে কষ্ট দিচ্ছিল—
প্রভা তার কথা না বলে তার চ্যাট পড়েছে।
সিয়াম নিজেও প্রভার ফোনের কিছু ব্যক্তিগত বিষয় দেখেছে।
তাই কাউকে দোষ দেওয়ার মতো অবস্থায় সে ছিল না।
দুপুরে প্রভা তাকে ফোন করল।
“সিয়াম?”
“হ্যাঁ।”
“আজ বিকেলে রাফির সঙ্গে দেখা করব।”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
“আমি সঙ্গে যাব।”
“হ্যাঁ।”
“তোমার বাবা কী বললেন?”
“তিনি যেতে নিষেধ করেছেন।”
“তাহলে?”
“আমি সত্যিটা জানতে চাই।”
সিয়াম ধীরে বলল,
“ঠিক আছে। আমি তোমার সঙ্গে থাকব।”
বিকেলে তারা পুরোনো লাইব্রেরির সামনে পৌঁছাল।
জায়গাটা খুব শান্ত। রাস্তার পাশে কয়েকটা পুরোনো গাছ। সামনে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান।
রাফি আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল।
সিয়ামকে দেখে সে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ল।
“তুমি ওকে নিয়ে এসেছ?”
প্রভা বলল,
“হ্যাঁ। সিয়াম আমার হবু স্বামী।”
রাফি কিছুক্ষণ সিয়ামের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
“ঠিক আছে।”
তিনজন একটা বেঞ্চে বসলো।
রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল,
“প্রভা, আমি তোমাকে ভয় দেখাতে চাই না।”
“তাহলে সরাসরি বলো।”
“তোমার বাবা আর আমার বাবার অনেক বছর ধরে পরিচয়।”
প্রভা অবাক হলো।
“এটা আমি জানি না।”
“জানার কথা না।”
সিয়াম জিজ্ঞেস করল,
“কী ধরনের পরিচয়?”
রাফি বলল,
“ব্যবসার সম্পর্ক ছিল।”
প্রভা বলল,
“আমার বাবা তো কখনো ব্যবসা করেননি।”
“তোমার বাবা নিজে ব্যবসা করতেন না। কিন্তু একটা সময় তিনি একটা কোম্পানির হিসাবের দায়িত্বে ছিলেন।”
প্রভা অবাক হয়ে বলল,
“কোন কোম্পানি?”
রাফি একটা নাম বলল।
প্রভা নামটা শুনে থেমে গেল।
“এই কোম্পানিটা তো অনেক বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে।”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
রাফি এবার ধীরে বলল,
“কোম্পানির মালিকের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল।”
সিয়াম মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
“তার সঙ্গে প্রভার বাবার কী সম্পর্ক?”
রাফি বলল,
“তোমার বাবা সেই সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ নথিতে সই করেছিলেন।”
প্রভা বলল,
“কী নথি?”
রাফি একটা ফাইল বের করল।
“এই কাগজের কপি আমার বাবার কাছে ছিল।”
প্রভা কাগজটা হাতে নিল।
তার বাবার নাম সেখানে স্পষ্ট লেখা।
প্রভা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।
“এটা কী?”
রাফি বলল,
“আমি জানি না পুরো সত্যিটা কী। কিন্তু তোমার বাবা ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।”
সিয়াম সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“এটা দিয়ে কিছু প্রমাণ হয় না।”
রাফি মাথা নাড়ল।
“আমি জানি।”
প্রভা বলল,
“তাহলে তুমি আমাকে এসব কেন বলছ?”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
“কারণ তোমার বাবা তোমার বিয়ের আগে একটা পুরোনো বিষয় মিটিয়ে ফেলতে চাইছেন।”
“কী বিষয়?”
“তোমার বাবার সেই পুরোনো কোম্পানির মালিকের সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়েছে।”
প্রভা অবাক।
“কীভাবে?”
“আমি জানি না। তবে আমার বাবা বলেছে, ওই লোকটা আবার ফিরে এসেছে।”
সিয়াম বলল,
“আর তার সঙ্গে প্রভার বিয়ের কী সম্পর্ক?”
রাফি উত্তর দেওয়ার আগেই দূরে একটা গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে একজন মধ্যবয়স্ক লোক নামলেন।
রাফি তাকে দেখে চুপ হয়ে গেল।
প্রভাও তাকাল।
তার মুখের রঙ বদলে গেল।
“উনি কে?”
রাফি ধীরে বলল,
“ওই লোকটাই।”
লোকটা তাদের দিকে এগিয়ে এল না।
শুধু কিছুক্ষণ দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
তারপর গাড়িতে উঠে চলে গেল।
প্রভা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“রাফি, উনি আমাকে কেন দেখছিলেন?”
“আমি জানি না।”
সিয়াম বলল,
“চলো। এখান থেকে আগে বের হই।”
তারা দ্রুত সেখান থেকে চলে এল।
কিন্তু প্রভার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন—
তার বাবা আসলে কী লুকাচ্ছেন?
বাড়ি ফিরে প্রভা সরাসরি বাবার ঘরে গেল।
“বাবা।”
মাহবুব সাহেব বই পড়ছিলেন।
মেয়েকে দেখে বইটা বন্ধ করলেন।
প্রভা টেবিলের ওপর কাগজটা রাখল।
“এটা কী?”
মাহবুব সাহেব কাগজটা দেখেই স্থির হয়ে গেলেন।
তার মুখের রঙ বদলে গেল।
“এটা তুমি কোথায় পেলে?”
“রাফি দিয়েছে।”
তিনি কয়েক সেকেন্ড কাগজটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
তারপর বললেন,
“রাফি তোমাকে এসব বলেছে?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি কেন ওর কথা বিশ্বাস করলে?”
“আমি কাউকে বিশ্বাস করছি না। আমি সত্যিটা জানতে চাই।”
মাহবুব সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তুমি যা ভাবছ, সেটা সত্যি নয়।”
“তাহলে সত্যিটা কী?”
তিনি চুপ।
প্রভা এবার কাঁপা গলায় বলল,
“বাবা, তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে সত্যিটা বলো।”
মাহবুব সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।
কিছুক্ষণ পর বললেন,
“আমি ওই কোম্পানিতে চাকরি করতাম। কিন্তু আমি কোনো টাকা আত্মসাৎ করিনি।”
“তাহলে?”
“কোম্পানির মালিক আমাকে কিছু কাগজে সই করতে বাধ্য করেছিল।”
“কেন?”
“কারণ আমি না করলে চাকরি চলে যেত।”
“তুমি পুলিশে যাওনি?”
“চেয়েছিলাম।”
“তারপর?”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন,
“তারপর তোমার মা অসুস্থ হয়ে পড়ে।”
প্রভা থেমে গেল।
“তখন তোমার চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার ছিল। আমি চাকরি ছেড়ে দিতে পারিনি।”
“তুমি এত বছর আমাকে কিছু বলোনি কেন?”
“কারণ আমি চেয়েছিলাম তুমি এসব থেকে দূরে থাকো।”
প্রভার চোখে পানি এসে গেল।
“কিন্তু তুমি আমার বিয়ের ব্যাপারে এই লোকটার কথা লুকালে কেন?”
মাহবুব সাহেব মাথা নিচু করলেন।
“কারণ সে আবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।”
“কেন?”
“সে টাকা চায়।”
সিয়াম, যে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল, এবার ভেতরে এল।
“কত টাকা?”
মাহবুব সাহেব তাকালেন।
“তুমি এখানে?”
সিয়াম বলল,
“প্রভাকে একা ছাড়িনি।”
মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
“সে বলেছে, আমি টাকা না দিলে পুরোনো কাগজপত্র প্রকাশ করবে।”
সিয়াম বলল,
“কিন্তু আপনার তো দোষ নেই।”
“আইন সব সময় সত্যিটা দ্রুত বুঝতে পারে না।”
প্রভা বাবার হাত ধরল।
“তুমি আমাকে আগে বললে না কেন?”
“কারণ আমি তোমার বিয়ে নষ্ট করতে চাইনি।”
সিয়াম তখন ধীরে বলল,
“আপনি যদি সত্যিই নির্দোষ হন, তাহলে আমাদের বিয়ে নষ্ট হবে কেন?”
মাহবুব সাহেব তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সিয়াম বলল,
“আমরা সমস্যাটা একসঙ্গে সামলাব।”
প্রভা তার দিকে তাকাল।
এই প্রথমবার তার মনে হলো—
সিয়াম শুধু তাকে ভালোবাসে না।
সে কঠিন সময়েও তার পাশে দাঁড়াতে চায়।
সেদিন রাতে সিয়াম আর প্রভা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
প্রভা ধীরে বলল,
“আজ একটা জিনিস বুঝলাম।”
“কী?”
“মানুষকে শুধু তার ফোন দেখে বোঝা যায় না।”
সিয়াম হেসে বলল,
“এটা বুঝতে আমাদের এত ঝামেলা করতে হলো?”
“হ্যাঁ।”
“আর একটা জিনিস?”
“কী?”
“আমাদের দুজনেরই কিছু না কিছু লুকানো ছিল।”
প্রভা মাথা নিচু করল।
“হ্যাঁ।”
সিয়াম বলল,
“কিন্তু আজ থেকে একটা নিয়ম করি।”
“কী নিয়ম?”
“কিছু লুকাব না।”
প্রভা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সত্যি?”
“সত্যি।”
“যদি সত্যিটা শুনে অন্যজন কষ্ট পায়?”
“তবু বলব।”
প্রভা ধীরে মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে।”
ঠিক তখনই সিয়ামের ফোনে একটা কল এল।
অপরিচিত নম্বর।
সে ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে একজন শান্ত গলায় বলল,
“আপনি কি সিয়াম?”
“জি।”
“আপনি প্রভাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন?”
সিয়াম সতর্ক হয়ে বলল,
“আপনি কে?”
লোকটা বলল,
“আপনাদের বিয়ে হওয়ার আগে একটা কথা জানা দরকার।”
“কী কথা?”
“প্রভার বাবা যে গল্পটা আপনাদের বলেছেন, সেটা পুরো সত্যি নয়।”
সিয়াম চুপ হয়ে গেল।
লোকটা আরও বলল,
“আর আপনি যদি সত্যিটা জানতে চান, তাহলে আগামীকাল একা আমার সঙ্গে দেখা করবেন।”
কল কেটে গেল।
সিয়াম ধীরে ফোন নামিয়ে রাখল।
প্রভা জিজ্ঞেস করল,
“কে ছিল?”
সিয়াম তার দিকে তাকিয়ে রইল।
আজ তারা ঠিক করেছিল—
আর কোনো কথা লুকাবে না।
কিন্তু ফোনের ওপাশের অচেনা মানুষটার কথা শুনে সিয়ামের মনে হলো, সত্যিটা হয়তো তাদের ধারণার চেয়েও অনেক বড়।
রাতটা সিয়ামের একদম ভালো কাটল না।
অপরিচিত লোকটার কথাগুলো বারবার মাথায় ঘুরছিল।
“প্রভার বাবা যে গল্পটা আপনাদের বলেছেন, সেটা পুরো সত্যি নয়।”
কথাটা কি সত্যি?
মাহবুব সাহেব কি সত্যিই কিছু লুকিয়েছেন?
নাকি কেউ ইচ্ছা করে তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করতে চাইছে?
সিয়াম বিছানায় বসে প্রভার ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক ঘণ্টা আগেও এই ফোনটা তাদের সম্পর্কের মধ্যে কত প্রশ্ন তৈরি করেছিল। আর এখন তার মনে হচ্ছে, আসল রহস্য ফোনে নয়—মানুষের মুখের কথায়।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
“সিয়াম?”
প্রভার কণ্ঠ।
“হ্যাঁ, আসো।”
প্রভা ঘরে ঢুকল।
তার হাতে সিয়ামের ফোন।
“এই ফোনটা তোমার।”
সিয়াম ফোনটা নিল।
“তোমার?”
“আমার কাছেই আছে।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
প্রভা বলল,
“আজ আমরা ফোন দুটো ফেরত নিয়ে নিই।”
সিয়াম মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
প্রভা ফোনটা ফেরত দেওয়ার আগে বলল,
“তোমার ফোনে আজ অনেক কিছু দেখেছি।”
সিয়াম বলল,
“আমিও।”
“সবকিছু জানার পরও…”
সে থেমে গেল।
“তারপর?”
প্রভা ধীরে বলল,
“আমি তোমাকে আগের মতোই বিশ্বাস করতে চাই।”
সিয়াম তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে বিশ্বাস করো।”
“কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
“কী?”
“আজকের পর আর কোনো কথা লুকাবে না।”
সিয়াম একটু হেসে বলল,
“তুমিও না।”
“ঠিক আছে।”
দুজন ফোন বদলে নিল।
চব্বিশ ঘণ্টার সেই অদ্ভুত পরীক্ষা শেষ হলো।
কিন্তু তাদের সম্পর্কের আসল পরীক্ষা যেন এখনই শুরু।
পরদিন সকালে সিয়াম প্রভাকে সবকিছু বলল।
অপরিচিত লোকটার ফোন।
তার কথাগুলো।
এমনকি একা দেখা করার প্রস্তাবও।
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“তুমি যাবে?”
“জানি না।”
“আমি চাই তুমি যাও।”
সিয়াম অবাক হলো।
“তুমি আমাকে একা যেতে বলছ?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কারণ লোকটা যদি সত্যিই কিছু জানে, তাহলে আমাদের জানা দরকার।”
“তুমি ভয় পাচ্ছ না?”
“পাচ্ছি।”
“তবু?”
প্রভা ধীরে বলল,
“আমাদের সম্পর্কটা যদি সত্যি হয়, তাহলে সত্যি থেকে পালিয়ে লাভ কী?”
সিয়াম তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মেয়েটাই কয়েকদিন আগে তার ফোনে অন্য মেয়ের নাম দেখে সন্দেহ করেছিল।
আজ সেই মেয়েটাই তাকে সত্যি খুঁজতে যেতে বলছে।
সময় মানুষকে কত দ্রুত বদলে দেয়!
দুপুরে সিয়াম একা বের হলো।
প্রভা বারবার বলেছিল, কোথায় যাচ্ছে জানাতে।
সিয়াম লোকটার দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছাল।
একটা ছোট অফিস।
সেখানে চল্লিশের কাছাকাছি একজন লোক বসে ছিল।
সিয়াম ঢুকতেই লোকটা বলল,
“আপনি সিয়াম?”
“জি।”
“বসুন।”
সিয়াম বসে বলল,
“আপনি কে?”
লোকটা একটা কার্ড এগিয়ে দিল।
“আমার নাম ফারহান। আমি ওই পুরোনো কোম্পানিতে কাজ করতাম।”
সিয়াম কার্ডটা হাতে নিয়ে বলল,
“আপনি মাহবুব সাহেবকে চেনেন?”
“অনেক ভালোভাবে।”
“আপনি ফোনে বলেছিলেন, উনি পুরো সত্যি বলেননি।”
ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর একটা ফাইল বের করল।
“মাহবুব সাহেব কোম্পানির হিসাব বিভাগের প্রধান ছিলেন।”
“আমি জানি।”
“কিন্তু তিনি শুধু চাকরি করতেন না।”
সিয়াম ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে?”
“কোম্পানির মালিক যখন বড় অঙ্কের টাকা সরিয়ে ফেলছিল, তখন মাহবুব সাহেব সেটা জানতে পেরেছিলেন।”
“তাহলে উনি তো নির্দোষ।”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে সমস্যা কোথায়?”
ফারহান বলল,
“সমস্যা হলো, তিনি প্রমাণ লুকিয়েছিলেন।”
সিয়াম চুপ।
“কেন?”
“মেয়ের চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার ছিল।”
সিয়াম ধীরে বলল,
“প্রভার মায়ের?”
“হ্যাঁ।”
“তারপর?”
“মালিক তাকে বলেছিল, চুপ থাকলে চিকিৎসার টাকা দেবে।”
“উনি রাজি হয়েছিলেন?”
“প্রথমে।”
সিয়াম অবাক।
“তারপর?”
ফারহান বলল,
“কিন্তু পরে মাহবুব সাহেব সব প্রমাণ সংগ্রহ করে পুলিশে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।”
“তারপর?”
“তার আগেই কোম্পানির মালিক পালিয়ে যায়।”
সিয়াম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তাহলে আপনার কাছে সমস্যা কোথায়?”
ফারহান বলল,
“সমস্যা হলো, কিছু কাগজে মাহবুব সাহেবের সই আছে। আর সেই কাগজগুলো এখন মালিকের হাতে।”
“সে কী চায়?”
“টাকা।”
“কত?”
ফারহান একটা সংখ্যা বলল।
সিয়াম শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
“এত টাকা!”
“হ্যাঁ।”
“মাহবুব সাহেব দিতে পারবেন না।”
“জানি।”
“তাহলে?”
ফারহান এবার সরাসরি বলল,
“সে চায় মাহবুব সাহেব তার বিরুদ্ধে থাকা পুরোনো প্রমাণ নষ্ট করে দিন।”
সিয়াম বুঝতে পারল, ব্যাপারটা অনেক বড়।
“আপনি আমাকে এসব কেন বলছেন?”
ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
“কারণ আমি চাই না প্রভা এই সমস্যায় জড়িয়ে পড়ুক।”
সিয়াম সতর্ক হয়ে বলল,
“আপনি প্রভাকে চেনেন?”
ফারহান মাথা নাড়ল।
“শৈশব থেকে।”
সিয়াম অবাক।
“কীভাবে?”
“আমি তোমার হবু শ্বশুরের সহকর্মী ছিলাম। প্রভাকে ছোটবেলায় অনেকবার দেখেছি।”
সিয়াম আর কিছু বলল না।
ফারহান এবার বলল,
“তবে আরও একটা বিষয় আছে।”
“কী?”
“ওই কোম্পানির মালিকের কাছে প্রভার মায়ের চিকিৎসার সময়কার কিছু নথিও আছে।”
সিয়াম বলল,
“তাতে কী?”
“ওই নথিতে এমন কিছু তথ্য আছে, যা প্রভা জানে না।”
“কী তথ্য?”
ফারহান বলল,
“প্রভার মায়ের চিকিৎসার খরচের একটা অংশ কোম্পানির মালিক দিয়েছিল।”
সিয়াম থমকে গেল।
“মানে?”
“মানে, প্রভার বাবা যে টাকা দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছিলেন বলে পরিবার জানে, তার সবটা আসলে তার নিজের টাকা ছিল না।”
সিয়াম কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
তার মনে হলো, প্রভার বাবার অতীতের সঙ্গে প্রভার বর্তমানের সম্পর্ক আরও জটিল।
বিকেলে সিয়াম বাড়ি ফিরল।
প্রভা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল।
“কী হয়েছে?”
সিয়াম বলল,
“অনেক কিছু।”
“তুমি কি সব জেনেছ?”
“কিছুটা।”
“আমাকে বলো।”
সিয়াম চুপ করে রইল।
প্রভা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আবার কিছু লুকাচ্ছ?”
“না।”
“তাহলে বলো।”
সিয়াম ধীরে ধীরে সব বলল।
কোম্পানি।
পুরোনো নথি।
প্রভার বাবার সই।
মালিকের হুমকি।
তারপর মায়ের চিকিৎসার টাকা নিয়ে নতুন তথ্য।
সব শুনে প্রভা স্থির হয়ে গেল।
“আমার মা জানতেন?”
“জানি না।”
“বাবা জানতেন?”
“সম্ভবত।”
প্রভা ধীরে বসে পড়ল।
“আমি কিছুই জানতাম না।”
সিয়াম তার পাশে বসল।
“তোমার দোষ নেই।”
“আমি বাবাকে এত বছর ধরে একটা মানুষ হিসেবে দেখেছি। এখন মনে হচ্ছে, আমি তাকে চিনি না।”
সিয়াম বলল,
“তুমি তাকে চেনো।”
“কিন্তু উনি আমাকে সব বলেননি।”
“আমরা কেউই সব বলি না।”
প্রভা তার দিকে তাকাল।
“তুমিও?”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
“হ্যাঁ। আমিও।”
প্রভা কিছু বলল না।
রাতে প্রভা বাবার ঘরে গেল।
মাহবুব সাহেব জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
“বাবা।”
তিনি ফিরে তাকালেন।
“সিয়াম কি তোমাকে সব বলেছে?”
“হ্যাঁ।”
মাহবুব সাহেব চোখ নামিয়ে ফেললেন।
“তুমি আমার ওপর রাগ করেছ?”
প্রভা ধীরে বলল,
“আমি রাগ করিনি।”
“তাহলে?”
“আমি কষ্ট পেয়েছি।”
তিনি চুপ করে রইলেন।
“তুমি আমাকে কেন বলোনি?”
“আমি চেয়েছিলাম তোমার জীবনটা স্বাভাবিক থাকুক।”
“কিন্তু আমার জীবন যদি তোমার লুকানো সমস্যার কারণে বদলে যায়?”
মাহবুব সাহেব কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
প্রভা বলল,
“মায়ের চিকিৎসার টাকা কি সত্যিই ওই কোম্পানির মালিক দিয়েছিল?”
মাহবুব সাহেব এবার মাথা তুললেন।
কয়েক সেকেন্ড মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“হ্যাঁ।”
প্রভার চোখে পানি চলে এল।
“মা জানত?”
“না।”
“তাহলে এত বছর তুমি একা এই বোঝা নিয়ে ছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কারণ তোমাদের নিরাপদ রাখতে চেয়েছিলাম।”
প্রভা বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“তুমি যদি শুরুতেই সত্যিটা বলতে, হয়তো এত কিছু হতো না।”
মাহবুব সাহেব মৃদু গলায় বললেন,
“মানুষ অনেক সময় সত্যি বলতে চায়। কিন্তু সত্যিটা বলার সাহস পায় না।”
কথাটা শুনে প্রভার মনে হলো, সিয়ামও তো ঠিক একই কাজ করেছে।
তার অতীত লুকিয়েছিল।
সে রাফির ব্যাপার লুকিয়েছিল।
দুজনেই ভেবেছিল, সত্যি বললে সম্পর্ক নষ্ট হবে।
অথচ সত্যি লুকিয়েই তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।
পরদিন সকালে প্রভার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“তোমার বাবার সত্যিটা জানলে তুমি সিয়ামকে বিয়ে করবে না।”
প্রভা মেসেজটা দেখে চমকে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা মেসেজ এল—
“কারণ সিয়ামের পরিবারও এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত।”
প্রভার হাত কেঁপে উঠল।
সে কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মেসেজটা সিয়ামকে দেখাল।
সিয়াম পড়ে স্থির হয়ে গেল।
“আমার পরিবার?”
প্রভা ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
“এটা মিথ্যাও হতে পারে।”
“কিন্তু যদি সত্যি হয়?”
সিয়াম উত্তর দিল না।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে বাবার নাম।
সিয়াম ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে তার বাবা বললেন,
“সিয়াম, তুমি এখনই বাসায় আসো।”
“কেন?”
“তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।”
“কী হয়েছে?”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর বাবা বললেন,
“তুমি প্রভার পরিবারকে নিয়ে যতটা জানো, তার চেয়েও বেশি কিছু আমি জানি।”
সিয়ামের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“বাবা, আপনি কী বলতে চাইছেন?”
ওপাশ থেকে শুধু একটা কথাই এল—
“প্রভার বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু পরিচয়ের ছিল না।”
কল কেটে গেল।
সিয়াম ধীরে ফোন নামিয়ে প্রভার দিকে তাকাল।
দুজনের চোখে একই প্রশ্ন।
সিয়াম বাবার ফোনটা কেটে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
প্রভা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিল, কথাটা সাধারণ কিছু নয়।
“তোমার বাবা কী বললেন?”
সিয়াম ধীরে বলল,
“উনি বলেছেন, তোমার বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু পরিচয়ের ছিল না।”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“তাহলে?”
“জানি না।”
“চলো।”
“কোথায়?”
“তোমার বাবার কাছে।”
সিয়াম অবাক হয়ে তাকাল।
“এখন?”
“হ্যাঁ। আমরা দুজনেই এতদিন অন্যের কাছ থেকে অর্ধেক অর্ধেক সত্যি শুনেছি। এবার দুই পরিবারকে সামনে বসিয়ে কথা বলতে হবে।”
সিয়াম মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে।”
সন্ধ্যার আগেই তারা সিয়ামের বাসায় পৌঁছাল।
সিয়ামের বাবা কামরুল সাহেব বসার ঘরে একা বসে ছিলেন। সামনে একটা পুরোনো ফাইল।
সিয়াম ঢুকতেই তিনি ফাইলটা টেবিলে রাখলেন।
“তুমি এসেছ?”
“জি।”
প্রভাকে দেখে তিনি কিছুটা অবাক হলেন।
“প্রভা, তুমিও?”
প্রভা শান্তভাবে বলল,
“জি। যা কিছু হচ্ছে, তার সঙ্গে আমার পরিবারও জড়িত। তাই আমিও জানতে চাই।”
কামরুল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“হয়তো এখন আর কিছু লুকিয়ে লাভ নেই।”
সিয়াম বসে বলল,
“বাবা, আপনি প্রভার বাবাকে কীভাবে চিনতেন?”
কামরুল সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“আমি ওই কোম্পানির আইন বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।”
প্রভা চমকে উঠল।
“আপনিও?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে?”
“তোমার বাবা আর আমি একই সময়ে ওই কোম্পানিতে কাজ করতাম।”
সিয়াম বলল,
“কিন্তু আপনি তো কখনো বলেননি।”
“কারণ আমি চেয়েছিলাম সেই সময়টা ভুলে যেতে।”
“কেন?”
কামরুল সাহেব ফাইল খুললেন।
“কারণ ওই কোম্পানিতে যা ঘটেছিল, তার একটা বড় অংশের জন্য আমিও নিজেকে দায়ী মনে করি।”
প্রভা স্থির হয়ে গেল।
কামরুল সাহেব ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
“কোম্পানির মালিক বড় অঙ্কের টাকা অন্য জায়গায় সরিয়ে ফেলছিল। তোমার শ্বশুর তখন হিসাব বিভাগে ছিলেন। তিনি ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। আমাকে বলেছিলেন।”
সিয়াম জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কী করেছিলেন?”
“আমি প্রথমে তাকে বলেছিলাম, চুপ থাকতে।”
প্রভা অবাক হয়ে বলল,
“কেন?”
“কারণ তখন আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমার নিজের পরিবার ছিল। চাকরি চলে গেলে কী হবে, সেটা ভাবছিলাম।”
“তারপর?”
“তোমার বাবা রাজি হননি। তিনি প্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করেন।”
সিয়াম বলল,
“তাহলে আপনারা শত্রু হয়ে গেলেন?”
“না। বরং তখন আমরা দুজন একসঙ্গে কাজ করেছিলাম।”
কামরুল সাহেব ফাইল থেকে কয়েকটি কাগজ বের করলেন।
“এই নথিগুলো আমরা দুজন মিলে তৈরি করেছিলাম।”
প্রভা কাগজগুলো হাতে নিল।
তার বাবার হাতের লেখা।
পাশে কামরুল সাহেবের স্বাক্ষর।
“তাহলে এগুলো পুলিশের কাছে যায়নি কেন?”
কামরুল সাহেব চোখ নামিয়ে বললেন,
“কারণ আমরা শেষ মুহূর্তে থেমে গিয়েছিলাম।”
“কেন?”
“তোমার মায়ের চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার ছিল। কোম্পানির মালিক সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিল।”
প্রভা ধীরে বলল,
“আমার মা…”
“হ্যাঁ।”
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
সিয়াম এবার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি আমাকে এতদিন কিছু বলেননি কেন?”
কামরুল সাহেব বললেন,
“কারণ তুমি এসবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে।”
“কিন্তু আমি তো এখন জড়িয়েই গেছি।”
“আমি জানি।”
“আর একটা কথা।”
সিয়াম একটু থেমে বলল,
“ওই লোকটা এখন আবার কেন ফিরে এসেছে?”
কামরুল সাহেব বললেন,
“কারণ সে জানতে পেরেছে, পুরোনো নথিগুলো এখনও আমাদের কাছে আছে।”
প্রভা বলল,
“আপনাদের কাছে?”
“হ্যাঁ।”
“কোথায়?”
কামরুল সাহেব সরাসরি উত্তর দিলেন না।
সিয়াম বুঝল, বিষয়টা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
ঠিক তখনই দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
সবাই চুপ করে গেল।
কামরুল সাহেব উঠে দরজা খুললেন।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাহবুব সাহেব।
প্রভা উঠে দাঁড়াল।
“বাবা!”
মাহবুব সাহেব ভেতরে এসে কামরুল সাহেবের দিকে তাকালেন।
দুজনের চোখে এমন এক দৃষ্টি বিনিময় হলো, যা দেখে মনে হলো তারা বহু বছর পর আবার মুখোমুখি হয়েছে।
কামরুল সাহেব বললেন,
“তুমি আসবে ভাবিনি।”
মাহবুব সাহেব উত্তর দিলেন,
“এখন আর না এসে উপায় নেই।”
সিয়াম বলল,
“আপনারা আমাদের সামনে সব সত্যি বলুন।”
দুজনেই চুপ।
প্রভা এবার বলল,
“বাবা, আমি আর কিছু লুকানো শুনতে চাই না।”
মাহবুব সাহেব ধীরে বসে বললেন,
“ঠিক আছে।”
“ওই কোম্পানির মালিক শুধু আমাদের টাকা নিয়ে প্রতারণা করেনি,” মাহবুব সাহেব বললেন, “সে অনেক কর্মচারীর নামে মিথ্যা নথি তৈরি করেছিল।”
সিয়াম বলল,
“আপনার নামও?”
“হ্যাঁ।”
“কামরুল সাহেবের?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আপনারা দুজন?”
“আমরা দুজনই জানতাম, একদিন এই নথিগুলো আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে।”
প্রভা বলল,
“তাহলে এতদিন চুপ ছিলেন কেন?”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“কারণ সেই সময় আমরা ভেবেছিলাম, নথিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।”
কামরুল সাহেব যোগ করলেন,
“কিন্তু কয়েক মাস আগে জানতে পারি, কিছু কপি এখনও আছে।”
সিয়াম বলল,
“কার কাছে?”
মাহবুব সাহেব ধীরে বললেন,
“কোম্পানির সাবেক মালিকের কাছে।”
প্রভা বলল,
“তাহলে সে আপনাদের ব্ল্যাকমেল করছে।”
“হ্যাঁ।”
“আর আমার বিয়ে?”
মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
“সে তোমার বিয়ের কথাও জানে।”
সিয়ামের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“কীভাবে?”
“সে আমাদের ওপর নজর রাখছে।”
প্রভা ভয় পেয়ে বলল,
“কেন?”
কামরুল সাহেব বললেন,
“কারণ সে জানে, তুমি আর সিয়াম বিয়ে করলে দুই পরিবার আবার কাছাকাছি আসবে। আর আমরা যদি একসঙ্গে হই, পুরোনো নথি বের করে সত্যিটা প্রমাণ করা সম্ভব হবে।”
সিয়াম ধীরে বলল,
“মানে সে চায় না আমরা বিয়ে করি?”
মাহবুব সাহেব মাথা নাড়লেন।
“সম্ভবত।”
ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।
প্রভা হঠাৎ বলল,
“কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে।”
সবাই তার দিকে তাকাল।
“আমাদের ফোন বদলের ব্যাপারটা?”
কেউ উত্তর দিল না।
প্রভা বলল,
“বাবা, তুমি আমাকে ফোন বদলাতে বলেছিলে কেন?”
মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
“কারণ আমি দেখতে চেয়েছিলাম, তোমরা একে অপরকে কতটা বিশ্বাস করো।”
সিয়াম অবাক হয়ে বলল,
“এটা কি শুধু সেই কারণেই?”
মাহবুব সাহেব তার দিকে তাকালেন।
“হ্যাঁ।”
কামরুল সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
“আমরা পুরোনো জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছি। তোমাদের সম্পর্কটা যেন সেই ভুলের কারণে নষ্ট না হয়, সেটাই চেয়েছিলাম।”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার মনে পড়ল গত কয়েকদিনের কথা।
মেহরিন।
রাফি।
চ্যাট।
সন্দেহ।
অভিমান।
সবকিছু।
তারা দুজনেই ভেবেছিল, ফোনের ভেতরের সত্যিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আসলে তাদের সম্পর্কের বড় পরীক্ষা ছিল—
সত্যি জানার পরও তারা একে অপরের পাশে থাকবে কি না।
সিয়াম প্রভার দিকে তাকাল।
“প্রভা।”
“হুম?”
“তুমি কি আমাকে এখনও বিয়ে করতে চাও?”
প্রভা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
“তুমি কি আমাকে এখনও বিয়ে করতে চাও?”
সিয়াম মৃদু হাসল।
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আমিও চাই।”
কামরুল সাহেব আর মাহবুব সাহেব একে অপরের দিকে তাকালেন।
কিন্তু সেই মুহূর্তের শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
সিয়ামের ফোন বেজে উঠল।
অপরিচিত নম্বর।
সে ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ।
“আপনারা সবাই একসঙ্গে বসেছেন?”
সিয়ামের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“আপনি কে?”
লোকটা হেসে বলল,
“যাকে আপনারা এতদিন এড়িয়ে চলেছেন।”
কামরুল সাহেব ইশারা করলেন, ফোনটা স্পিকারে দিতে।
লোকটা বলল,
“আপনাদের কাছে থাকা নথিগুলো আমাকে দিয়ে দিন।”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“আমাদের কাছে কিছু নেই।”
“মিথ্যা বলবেন না।”
“তুমি কী চাও?”
“নথি।”
কামরুল সাহেব বললেন,
“আর যদি না দিই?”
লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
“তাহলে আগামীকাল এমন কিছু প্রকাশ করব, যা শুধু আপনাদের নয়, সিয়াম আর প্রভার সম্পর্ককেও শেষ করে দেবে।”
কল কেটে গেল।
প্রভা ভয়ে সিয়ামের দিকে তাকাল।
“ও কী বলতে চাইছে?”
সিয়াম তার হাত ধরল।
“জানি না।”
ঠিক তখনই কামরুল সাহেবের ফোনে একটা ছবি এল।
তিনি ছবিটা খুলে স্থির হয়ে গেলেন।
“কী হয়েছে?” সিয়াম জিজ্ঞেস করল।
কামরুল সাহেব ফোনটা তার দিকে এগিয়ে দিলেন।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—
সিয়াম আর প্রভা গতকাল পুরোনো লাইব্রেরির সামনে রাফির সঙ্গে কথা বলছে।
তার নিচে একটা মেসেজ—
“আপনাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আমি দেখছি।”
প্রভার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সিয়াম ফোনটা শক্ত করে ধরল।
এবার তারা বুঝতে পারল—
এটা শুধু পুরোনো কোনো হিসাবের বিষয় নয়।
কেউ তাদের জীবনকে খুব কাছ থেকে নজরদারি করছে।
ছবিটা দেখার পর ঘরের সবাই কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল।
ছবিতে সিয়াম, প্রভা আর রাফিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ছবিটা তোলা হয়েছে দূর থেকে। তার মানে কেউ তাদের অনুসরণ করছিল।
প্রভা ধীরে বলল,
“আমাদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে?”
কামরুল সাহেব মাথা নাড়লেন।
“সম্ভবত।”
সিয়াম বলল,
“কিন্তু কে?”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“যে মানুষটা এত বছর পর ফিরে এসেছে, সে-ই হয়তো।”
সিয়াম ফোনটা টেবিলে রাখল।
“আমরা পুলিশে যাব।”
মাহবুব সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
“এখনই না।”
“কেন?”
“কারণ আমাদের কাছে এখনও যথেষ্ট প্রমাণ নেই।”
সিয়াম একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
“কেউ আমাদের অনুসরণ করছে। হুমকি দিচ্ছে। এর চেয়ে বড় কারণ আর কী দরকার?”
কামরুল সাহেব শান্ত গলায় বললেন,
“আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিও না।”
সিয়াম চুপ করে গেল।
প্রভা তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
গত কয়েকদিনে তাদের সম্পর্কের মধ্যে যত ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, আজ তার কোনোটাই নেই। বরং অদ্ভুতভাবে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—
বিপদ যত বাড়ছে, তারা তত বেশি একে অপরের ওপর নির্ভর করছে।
পরদিন সকাল।
প্রভা অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
সিয়াম ফোন করল।
“আজ অফিসে যাবে?”
“হ্যাঁ।”
“আমি তোমাকে নিয়ে যাব।”
“দরকার নেই।”
“আমি নিয়ে যাব।”
প্রভা হেসে বলল,
“তুমি কি এখন থেকে আমার পাহারাদার?”
“না। শুধু নিশ্চিত হতে চাই তুমি নিরাপদে পৌঁছাও।”
“ঠিক আছে।”
কিছুক্ষণ পর সিয়াম গাড়ি নিয়ে প্রভার বাড়ির সামনে পৌঁছাল।
প্রভা গাড়িতে উঠে বলল,
“তুমি আজ খুব চুপ।”
“ভাবছি।”
“কী?”
“আমাদের বিয়েটা নিয়ে।”
প্রভা অবাক হয়ে তাকাল।
“এখন?”
“হ্যাঁ।”
“কী ভাবছ?”
সিয়াম বলল,
“এত কিছু ঘটছে। তবু আমি চাই না আমরা বিয়েটা পিছিয়ে দিই।”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
“আমিও না।”
সিয়াম তার দিকে তাকাল।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে একটা কথা বলি?”
“বলো।”
“আমাদের মধ্যে আর কোনো গোপন কথা থাকবে না।”
প্রভা মৃদু হেসে বলল,
“এই কথাটা তুমি আগেও বলেছ।”
“এবার সত্যিই বলছি।”
“ঠিক আছে।”
প্রভাকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে সিয়াম নিজের অফিসে গেল।
কাজে মন বসছিল না।
সকাল থেকেই তার মনে হচ্ছিল, কেউ তাকে অনুসরণ করছে।
অফিস থেকে বের হওয়ার সময় সে লক্ষ্য করল, রাস্তার বিপরীতে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
গাড়িটা কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে চলে গেল।
সিয়াম নম্বরটা মনে রাখার চেষ্টা করল।
তার সন্দেহ হলো, গতকালের ছবির লোকজনই হয়তো।
সে সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে ফোন করল।
“বাবা, একটা কালো গাড়ি কয়েকদিন ধরে দেখছি।”
“নম্বর মনে আছে?”
সিয়াম বলল।
কামরুল সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“সাবধানে থেকো। একা কোথাও যেও না।”
এদিকে প্রভা অফিসে বসে কাজ করছিল।
হঠাৎ তার ডেস্কে একটা খাম এসে পৌঁছাল।
কোনো প্রেরকের নাম নেই।
প্রভা খাম খুলল।
ভেতরে একটা ছোট কাগজ।
মাত্র এক লাইন লেখা—
“সিয়ামকে তুমি যতটা চেনো, সে আসলে ততটা সহজ মানুষ নয়।”
প্রভার বুক ধক করে উঠল।
কাগজের সঙ্গে একটা ছবি ছিল।
ছবিতে সিয়াম দাঁড়িয়ে আছে মেহরিনের সঙ্গে।
ছবিটা খুব পুরোনো।
কিন্তু ছবির নিচে লেখা—
“তুমি কি নিশ্চিত, তাদের সম্পর্ক দুই বছর আগেই শেষ হয়েছিল?”
প্রভার হাত কেঁপে উঠল।
তার মনে পড়ল সেই পুরোনো চ্যাট।
মেহরিন।
সিয়ামের অতীত।
সবকিছু।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে সন্দেহ জাগল।
সিয়াম কি সত্যিই সব বলেছে?
সে সঙ্গে সঙ্গে সিয়ামকে ফোন করল।
“হ্যালো?”
“তুমি কোথায়?”
“অফিসে।”
“তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।”
“কী হয়েছে?”
“মেহরিনের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কবে শেষ হয়েছিল?”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
“আমি তো বলেছি।”
“আমি আবার শুনতে চাই।”
“দুই বছর আগে।”
“নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
“তারপর আর কিছু হয়নি?”
সিয়াম এবার বুঝতে পারল, প্রভার সন্দেহের কারণ আছে।
“কেন এসব জিজ্ঞেস করছ?”
“আমার অফিসে একটা ছবি এসেছে।”
“কী ছবি?”
“তোমার আর মেহরিনের।”
সিয়াম চুপ হয়ে গেল।
“সিয়াম?”
“আমি আসছি।”
এক ঘণ্টার মধ্যে সিয়াম প্রভার অফিসের সামনে পৌঁছাল।
প্রভা ছবিটা তার হাতে দিল।
সিয়াম ছবিটা দেখে বলল,
“এটা পুরোনো।”
“কত পুরোনো?”
“প্রায় তিন বছর।”
“কিন্তু এখানে তারিখ নেই।”
“কারণ ছবিটা একটা পুরোনো অনুষ্ঠানের।”
“তুমি নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
প্রভা কিছু বলল না।
সিয়াম তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছ?”
প্রভা ধীরে বলল,
“আমি জানি না।”
সিয়াম কষ্ট পেল।
“তুমি জানো না?”
“আমি চাই তোমাকে বিশ্বাস করতে।”
“কিন্তু?”
“কিন্তু গত কয়েকদিনে এত কিছু হয়েছে যে আমি সবকিছু নিয়ে ভয় পাচ্ছি।”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“প্রভা, যদি তুমি আমাকে বিশ্বাস না করো, তাহলে আমি কীভাবে প্রমাণ করব?”
প্রভা মাথা নিচু করল।
“আমি জানি না।”
সিয়াম ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,
“এই ছবিটা যে পাঠিয়েছে, সে জানে তুমি কী নিয়ে দুর্বল। সে চায় তুমি আমাকে সন্দেহ করো।”
প্রভা তাকাল।
“তুমি কি বলতে চাইছ, এগুলো সব পরিকল্পিত?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু কেন?”
“আমাদের আলাদা করার জন্য।”
সেদিন সন্ধ্যায় তারা দুজন একটা ক্যাফেতে বসেছিল।
প্রভা চুপচাপ।
সিয়ামও চুপ।
কিছুক্ষণ পর প্রভা বলল,
“আমার একটা কথা মনে পড়ছে।”
“কী?”
“ফোন বদলের দিন তুমি বলেছিলে, তোমার ফোনে এমন কিছু নেই যা আমার দেখার মতো না।”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু আমি দেখেছিলাম তোমার অতীত।”
“হ্যাঁ।”
“তুমি কি জানো, আমি তখন তোমাকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম?”
সিয়াম ধীরে বলল,
“আমিও।”
“তাহলে?”
“তখন বুঝিনি। এখন বুঝি।”
প্রভা চোখ নামিয়ে বলল,
“আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা ফোন ছিল না।”
“তাহলে?”
“আমরা দুজনেই ভাবতাম, অন্যজন সত্যিটা জানলে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে।”
সিয়াম বলল,
“কিন্তু এখন বুঝছি, সত্যি জানার পরেও যদি মানুষ পাশে থাকে, তখনই তো সম্পর্কটা সত্যি হয়।”
প্রভা তার দিকে তাকাল।
“তুমি কি পাশে থাকবে?”
সিয়াম কোনো দ্বিধা না করে বলল,
“হ্যাঁ।”
“যদি আমার বাবার জন্য তোমার পরিবার সমস্যায় পড়ে?”
“তবু।”
“যদি আমাদের বিয়ে নিয়ে অনেক সমস্যা হয়?”
“তবু।”
“যদি সবাই আমাদের আলাদা করতে চায়?”
সিয়াম মৃদু হেসে বলল,
“তাহলে সবাইকে বুঝিয়ে বলব।”
প্রভার চোখে পানি চলে এল।
সে দ্রুত চোখ মুছে নিল।
“তুমি খুব জেদি।”
“তুমিও।”
ঠিক তখনই প্রভার ফোনে একটা মেসেজ এল।
সিয়াম বলল,
“দেখো।”
প্রভা মেসেজ খুলল।
“তোমরা যদি কাল বিয়ের তারিখ ঠিক করো, তাহলে তোমার বাবার পুরোনো নথি প্রকাশ হয়ে যাবে।”
প্রভা সিয়ামের দিকে তাকাল।
আরেকটা মেসেজ এল।
“সিয়ামকে বেছে নিলে তোমার পরিবার ধ্বংস হবে।”
সিয়াম ফোনটা নিয়ে পড়ল।
তারপর বলল,
“এবার বুঝলাম।”
“কী?”
“সে আমাদের বিয়ে থামাতে চাইছে।”
“কিন্তু কেন?”
“কারণ আমাদের বিয়ে হলে দুই পরিবার একসঙ্গে দাঁড়াবে।”
প্রভা বলল,
“তাহলে আমরা কী করব?”
সিয়াম তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“বিয়ে করব।”
প্রভা অবাক।
“এই অবস্থায়?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি পাগল?”
“হয়তো।”
তারপর সিয়াম শান্ত গলায় বলল,
“যে মানুষটা আমাদের ভয় দেখিয়ে আলাদা করতে চাইছে, তার হাতে সিদ্ধান্তটা কেন দেব?”
প্রভা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল।
“ঠিক আছে।”
“ঠিক আছে মানে?”
“বিয়ে করব।”
সেই রাতেই দুই পরিবার বসে বিয়ের তারিখ ঠিক করার সিদ্ধান্ত নিল।
সবাই যখন আলোচনা করছে, তখন সিয়ামের ফোনে একটা নতুন মেসেজ এল।
“তোমরা সত্যিই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছ?”
সিয়াম উত্তর দিল না।
আরেকটা মেসেজ এল—
“তাহলে এবার সত্যিটা তোমাদের সামনে আসবে।”
তারপর একটি ছবি পাঠানো হলো।
সিয়াম ছবিটা খুলে স্থির হয়ে গেল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—
মেহরিন আর প্রভা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
ছবিটা আজকের।
সিয়াম অবাক হয়ে প্রভার দিকে তাকাল।
“প্রভা…”
প্রভা এগিয়ে এল।
“কী হয়েছে?”
সিয়াম ফোনটা তার হাতে দিল।
ছবিটা দেখে প্রভাও স্তব্ধ।
“আমি তো আজ মেহরিনের সঙ্গে দেখা করিনি।”
“আমি জানি।”
“তাহলে এই ছবি?”
দুজনেই ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
ছবির নিচে একটা মাত্র বাক্য—
“তোমাদের মধ্যে যে মানুষটাকে তোমরা সবচেয়ে কম সন্দেহ করছ, সত্যিটা তার কাছেই আছে।”
প্রভা ধীরে সিয়ামের দিকে তাকাল।
এবার সন্দেহটা মেহরিন বা রাফিকে নিয়ে নয়।
তাদের খুব কাছের কারও দিকে।
মেহরিন আর প্রভার একসঙ্গে তোলা ছবিটা দেখার পর সিয়াম আর প্রভা দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
ছবিটা আজকের।
কিন্তু প্রভা আজ মেহরিনের সঙ্গে দেখা করেনি।
সিয়ামও জানে, সে মেহরিনের সঙ্গে দেখা করেনি।
তাহলে ছবিটা কীভাবে সম্ভব?
সিয়াম ছবিটা আবার বড় করে দেখল।
পেছনে একটা কফিশপের সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে।
প্রভা ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“জায়গাটা চেনা মনে হচ্ছে।”
“আমারও।”
“কোথায় যেন দেখেছি।”
সিয়াম কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
“এটা তো তোমার অফিসের কাছের কফিশপ।”
প্রভা মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু তুমি আজ অফিস থেকে বের হওনি।”
“না।”
দুজনেই আবার চুপ হয়ে গেল।
সিয়াম বলল,
“ছবিটা এডিট করা হতে পারে।”
প্রভা বলল,
“হতে পারে।”
“তাহলে এখনই কাউকে সন্দেহ করা ঠিক হবে না।”
প্রভা ধীরে বলল,
“কিন্তু যে পাঠিয়েছে, সে আমাদের খুব কাছ থেকে দেখছে।”
পরদিন সকালে সিয়াম আর প্রভা মেহরিনের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল।
মেহরিন একটা ছোট ক্যাফেতে বসে ছিল।
সিয়ামকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল।
“তুমি আমাকে ডেকেছ?”
“হ্যাঁ।”
মেহরিন প্রভার দিকে তাকাল।
“প্রভা?”
প্রভা শান্ত গলায় বলল,
“আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল।”
মেহরিন বুঝতে পারল, ব্যাপারটা সাধারণ নয়।
তারা বসে পড়ল।
সিয়াম সরাসরি ছবিটা দেখাল।
“এই ছবিটা কি আপনার কাছে ছিল?”
মেহরিন ছবিটা দেখে অবাক হয়ে গেল।
“না।”
“আপনি কি গতকাল প্রভার সঙ্গে দেখা করেছেন?”
“না।”
“নিশ্চিত?”
মেহরিন এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
“সিয়াম, তুমি কি মনে করো আমি তোমাদের পেছনে লেগে আছি?”
সিয়াম কিছু বলল না।
মেহরিন প্রভার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আমাকে বিশ্বাস না করলেও একটা কথা বলব। সিয়ামের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক আগেই শেষ হয়েছে।”
প্রভা চুপ করে রইল।
মেহরিন ধীরে বলল,
“আমি ওকে একসময় ভালোবাসতাম। কিন্তু এখন সেটা নেই।”
সিয়াম মাথা নিচু করল।
মেহরিন আবার বলল,
“তুমি ওকে ভালোবাসো। এটা আমি বুঝি। আর আমি চাই না আমার অতীতের কারণে তোমাদের সম্পর্ক নষ্ট হোক।”
প্রভা এবার একটু নরম হলো।
“তাহলে এই ছবি?”
“আমি জানি না।”
“আপনি কি কারও সঙ্গে এই ছবি শেয়ার করেছিলেন?”
মেহরিন কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
“একটা পুরোনো ছবি ছিল। কিন্তু এটা আজকের ছবি নয়।”
সিয়াম অবাক হয়ে বলল,
“কী?”
মেহরিন ফোন বের করে গ্যালারি খুলল।
একই ছবি।
কিন্তু তারিখ—
তিন বছর আগের।
প্রভা ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিন্তু আমাদের কাছে যে ছবিটা এসেছে, সেটার ফাইলের তারিখ আজকের।”
মেহরিন বলল,
“তাহলে কেউ পুরোনো ছবিটা আজ নতুন করে পাঠিয়েছে।”
সিয়াম বুঝতে পারল—
কেউ ইচ্ছা করেই তাদের বিভ্রান্ত করছে।
মেহরিনের কাছ থেকে বেরিয়ে আসার পর প্রভা বলল,
“আমি ওকে ভুল বুঝেছিলাম।”
সিয়াম বলল,
“আমিও।”
“তোমার কি খারাপ লাগছে?”
“কেন?”
“পুরোনো কথা মনে পড়েছে?”
সিয়াম হেসে বলল,
“না।”
“একটুও?”
“না। কারণ এখন আমার পাশে তুমি।”
প্রভা কিছু বলল না।
তবে তার মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল।
বিকেলে তারা রাফির সঙ্গে দেখা করল।
রাফি বলল,
“আমি একটা জিনিস জানতে পেরেছি।”
“কী?”
“তোমাদের ওপর নজর রাখছে যে লোক, সে একা কাজ করছে না।”
সিয়াম জিজ্ঞেস করল,
“কার সঙ্গে?”
“আমি এখনও নিশ্চিত না।”
“তাহলে?”
রাফি একটা নাম বলল।
প্রভা অবাক হয়ে গেল।
“অসম্ভব!”
সিয়ামও বলল,
“তুমি নিশ্চিত?”
রাফি মাথা নাড়ল।
“পুরোপুরি না। কিন্তু কিছু প্রমাণ আছে।”
“কে?”
রাফি ধীরে বলল,
“ফারহান।”
সিয়াম থেমে গেল।
ফারহান!
যে লোকটা তাকে পুরোনো কোম্পানির কথা বলেছিল।
যে বলেছিল, সে প্রভাকে ছোটবেলা থেকে চেনে।
সিয়াম বলল,
“কিন্তু ফারহান তো আমাদের সাহায্য করছে।”
রাফি বলল,
“সেটাই সমস্যা।”
“মানে?”
“সে তোমাদের এমন কিছু তথ্য দিয়েছে, যেগুলো সত্যি। কিন্তু সেই সত্যির সঙ্গে কিছু মিথ্যা তথ্যও মিশিয়ে দিয়েছে।”
প্রভা বলল,
“কেন?”
“তোমাদের ভেতরে সন্দেহ তৈরি করার জন্য।”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার মনে পড়ল—
ফারহানই প্রথম বলেছিল, প্রভার বাবার ব্যাপারে।
ফারহানই তাকে মায়ের চিকিৎসার টাকার কথা বলেছিল।
ফারহানই তাকে একা দেখা করতে ডেকেছিল।
তাহলে কি সে সবকিছু পরিকল্পনা করে করছিল?
সিয়াম সঙ্গে সঙ্গে ফারহানকে ফোন করল।
ফোন বন্ধ।
আবার করল।
বন্ধ।
রাফি বলল,
“আমি ওর অফিসে গিয়েছিলাম।”
“তারপর?”
“অফিস বন্ধ।”
প্রভা বলল,
“তাহলে এখন?”
রাফি উত্তর দেওয়ার আগেই সিয়ামের ফোনে একটা মেসেজ এল।
“যাকে খুঁজছ, তাকে আর খুঁজে লাভ নেই।”
তারপর আরেকটি মেসেজ—
“তোমরা ভুল মানুষকে বিশ্বাস করেছ।”
সিয়াম এবার নিশ্চিত হলো।
কেউ তাদের খুব কাছ থেকে পরিচালনা করছে।
সেই রাতে সিয়াম আর প্রভা ছাদে বসেছিল।
প্রভা বলল,
“সিয়াম, একটা কথা বলি?”
“বলো।”
“আমি এখন বুঝতে পারছি, ফোন বদলানোর দিন আমি তোমাকে কতটা ভুল বুঝেছিলাম।”
“আমিও তোমাকে।”
“তখন মনে হয়েছিল, তোমার ফোনে কিছু পাওয়া মানেই তুমি আমাকে ঠকিয়েছ।”
সিয়াম বলল,
“আর আমার মনে হয়েছিল, তোমার ফোনে রাফির নাম মানেই তুমি ওর সঙ্গে কিছু লুকাচ্ছ।”
প্রভা হেসে বলল,
“কী বোকা ছিলাম আমরা।”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু একটা ভালো দিক হয়েছে।”
“কী?”
“এখন আমরা সত্যি কথা বলতে শিখেছি।”
সিয়াম মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
প্রভা ধীরে বলল,
“তুমি কি আমাকে একটা কথা প্রতিশ্রুতি দেবে?”
“কী?”
“কেউ যদি আমাদের মধ্যে সন্দেহ ঢোকাতে চায়, আমরা আগে একে অপরকে জিজ্ঞেস করব।”
“প্রমিস।”
“কাউকে বিশ্বাস করার আগে?”
“একজন আরেকজনকে বিশ্বাস করব।”
প্রভা মৃদু হাসল।
“ঠিক আছে।”
পরদিন সকালে মাহবুব সাহেব সিয়ামকে ডেকে পাঠালেন।
সিয়াম পৌঁছাতেই তিনি বললেন,
“তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।”
“কী?”
মাহবুব সাহেব একটা পুরোনো পেনড্রাইভ টেবিলে রাখলেন।
“এটা আমি এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম।”
সিয়াম তাকিয়ে রইল।
“এতে কী আছে?”
“ওই কোম্পানির হিসাবের আসল নথি।”
“আপনি বলেছিলেন এগুলো নেই।”
“আমি বলেছিলাম, শত্রুদের হাতে নেই।”
“মানে?”
“এটা আমার কাছে ছিল।”
সিয়াম পেনড্রাইভটা হাতে নিল।
“তাহলে এতদিন?”
“আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
“এখন কেন দিচ্ছেন?”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“কারণ এখন আর শুধু আমার ব্যাপার নয়। তোমার আর প্রভার জীবনও এতে জড়িয়ে গেছে।”
সিয়াম বলল,
“আমরা এটা পুলিশের কাছে দেব।”
মাহবুব সাহেব মাথা নাড়লেন।
“দেবে। কিন্তু তার আগে একটা জিনিস জানতে হবে।”
“কী?”
“এই নথির একটা অংশ বহু বছর আগে কেউ কপি করেছিল।”
সিয়াম চমকে গেল।
“কে?”
মাহবুব সাহেব ধীরে বললেন,
“আমি জানি না।”
ঠিক তখনই দরজার বাইরে একটা শব্দ হলো।
সিয়াম দ্রুত ঘুরে তাকাল।
কেউ নেই।
সে বাইরে বেরিয়ে দেখল, গেটের কাছে একটা খাম পড়ে আছে।
খাম খুলতেই একটা ছবি।
ছবিতে সিয়াম, প্রভা, মাহবুব সাহেব এবং কামরুল সাহেব একসঙ্গে বসে আছে।
ছবিটা তোলা হয়েছে গত রাতের।
সিয়ামের বুক কেঁপে উঠল।
তার নিচে লেখা—
“তোমরা যতই সত্যি খুঁজে বের করো, আমি তোমাদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকব।”
আর খামের ভেতরে ছিল আরেকটা কাগজ।
সেখানে শুধু একটা নাম—
“রাফি।”
সিয়াম স্তব্ধ হয়ে গেল।
সে ধীরে প্রভার দিকে তাকাল।
রাফি কি সত্যিই তাদের সাহায্য করছে?
নাকি এতদিন ধরে তাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়েই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে?
প্রভা কাগজটা হাতে নিয়ে বলল,
“আমি রাফিকে বিশ্বাস করি।”
সিয়াম বলল,
“আমিও।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে যোগ করল,
“কিন্তু এবার প্রমাণ ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না।”
প্রভা মাথা নাড়ল।
রাফির নামটা কাগজে দেখার পর প্রভা অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
রাফি তাদের জন্য এত কিছু করেছে। বাবার পুরোনো সমস্যার কথা জানিয়েছে, সতর্ক করেছে, এমনকি তাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে—সেটাও প্রথম বলেছিল।
তাহলে কি এতদিন সে-ই সবকিছুর পেছনে?
প্রভা ধীরে বলল,
“আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছি না।”
সিয়াম শান্ত গলায় বলল,
“বিশ্বাস না করার কারণ আছে।”
“কী?”
“কারণ আমাদের কাছে এখনো কোনো প্রমাণ নেই।”
প্রভা কাগজটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিন্তু নামটা তো আছে।”
“একটা কাগজে নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণ হয় না।”
প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তুমি এখন আগের মতো দ্রুত কাউকে সন্দেহ করো না।”
সিয়াম হেসে বলল,
“ফোন বদলের চব্বিশ ঘণ্টা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।”
প্রভাও মৃদু হাসল।
“আমাকেও।”
সেদিন সন্ধ্যায় তারা রাফির সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল।
রাফি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাতেই প্রভা সরাসরি বলল,
“তোমার নাম একটা কাগজে পেয়েছি।”
রাফি থমকে গেল।
“কী কাগজ?”
সিয়াম কাগজটা তার সামনে রাখল।
রাফি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
“আমি এটা প্রথমবার দেখছি।”
“তুমি কি আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছ?”
প্রভা কথাটা বলতেই রাফির মুখ বদলে গেল।
“তুমি সত্যিই এটা ভাবছ?”
প্রভা চুপ করে গেল।
রাফি ধীরে বলল,
“আমি তোমাকে পছন্দ করতাম, সেটা সত্যি। কিন্তু তোমার ক্ষতি করার কথা কখনো ভাবিনি।”
সিয়াম বলল,
“তাহলে তোমার নাম এখানে কেন?”
“জানি না।”
“ফারহানের সঙ্গে তোমার যোগাযোগ ছিল?”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“হ্যাঁ।”
প্রভা তাকাল।
“কী!”
“কিন্তু আমি ওকে বিশ্বাস করতাম না।”
“তাহলে যোগাযোগ কেন?”
রাফি বলল,
“কারণ আমি ওর কাছ থেকে তথ্য বের করার চেষ্টা করছিলাম।”
সিয়াম জিজ্ঞেস করল,
“কাদের জন্য?”
“তোমাদের জন্য।”
প্রভা এবার আরও অবাক হলো।
“তুমি আমাদের জন্য এসব করছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আগে বলোনি কেন?”
রাফি তিক্ত হেসে বলল,
“কারণ তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে না।”
প্রভা চুপ হয়ে গেল।
রাফি পকেট থেকে একটা ফোন বের করল।
“আমার কাছে কিছু রেকর্ড আছে।”
সে ফোনটা সিয়ামের হাতে দিল।
একটা অডিও চালু হলো।
ফারহানের কণ্ঠ শোনা গেল—
“সিয়ামকে আমি বিশ্বাস করাতে পেরেছি যে মাহবুব সাহেবের কিছু কথা সত্যি, কিছু কথা মিথ্যা। এখন প্রভার মনে সিয়ামকে নিয়ে সন্দেহ তৈরি করতে হবে।”
প্রভা স্থির হয়ে গেল।
সিয়াম অডিওটা বন্ধ করল।
“এটা তুমি কোথায় পেলে?”
“ফারহান আমাকে পাঠিয়েছিল।”
“কেন?”
“সম্ভবত ভুল করে।”
রাফি বলল,
“তারপর থেকেই আমি বুঝতে পারি, সে শুধু তোমাদের পরিবারকে নয়, তোমাদের সম্পর্ককেও ভাঙতে চাইছে।”
প্রভা ধীরে বলল,
“তাহলে মেহরিনের ছবি?”
“ফারহান।”
“আমার অফিসে পাঠানো চিঠি?”
“সম্ভবত ফারহান।”
“আমাদের ছবি?”
রাফি মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
“তাহলে ফারহান কোথায়?”
রাফি উত্তর দিল,
“জানি না।”
রাতে বাড়ি ফিরে প্রভা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।
সিয়াম পাশে বসে বলল,
“কী ভাবছ?”
“ভাবছি, আমরা মানুষকে কত সহজে ভুল বুঝি।”
“হ্যাঁ।”
“মেহরিনকে সন্দেহ করেছি।”
“আমিও।”
“রাফিকে সন্দেহ করেছি।”
“আমিও।”
“এমনকি একসময় তোমাকেও।”
সিয়াম হেসে বলল,
“আমিও তোমাকে।”
প্রভা ধীরে বলল,
“কিন্তু একটা বিষয় বদলেছে।”
“কী?”
“এখন সন্দেহ হলে আমি আগে তোমাকে জিজ্ঞেস করি।”
সিয়াম বলল,
“এটাই তো দরকার ছিল।”
পরদিন সকালে তারা থানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
পুরোনো নথি, অডিও রেকর্ডিং, হুমকির মেসেজ—সব একসঙ্গে নিয়ে তারা পুলিশের কাছে গেল।
কর্তব্যরত কর্মকর্তা সব শুনে বললেন,
“আপনাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য আছে। আমরা বিষয়টা তদন্ত করব।”
প্রভা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
সিয়াম তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এবার অন্তত একটু শান্তি।”
কিন্তু ঠিক তখনই পুলিশের একজন কর্মকর্তা এসে একটা খবর দিলেন।
“ফারহানকে আমরা খুঁজে পেয়েছি।”
সিয়াম চমকে উঠল।
“কোথায়?”
“তার পুরোনো অফিসে।”
“ওকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে?”
“না।”
“কেন?”
“কারণ সে সেখানে ছিল না।”
“তাহলে?”
কর্মকর্তা একটা ফাইল এগিয়ে দিলেন।
“কিন্তু আমরা তার ডেস্কে একটা নথি পেয়েছি।”
সিয়াম ফাইল খুলে দেখল।
ভেতরে পুরোনো কোম্পানির নথি।
আর একটা চিঠি।
চিঠিটা লেখা মাহবুব সাহেবের নামে।
সেখানে বলা—
“আপনি যদি সত্যিই সব নথি পুলিশের হাতে দিয়ে দেন, তাহলে আপনার মেয়ের বিয়ের দিনই সব প্রকাশ করা হবে।”
প্রভা চিঠিটা পড়ে কেঁপে উঠল।
“বিয়ের দিন?”
সিয়াম বলল,
“মানে সে এখনও আমাদের বিয়ে থামাতে চাইছে।”
পুলিশ কর্মকর্তা বললেন,
“আমরা বিয়ের আগে আপনাদের নিরাপত্তা বাড়াতে পারি।”
প্রভা মাথা নাড়ল।
“আমরা বিয়ে পিছিয়ে দেব না।”
সিয়াম তার দিকে তাকাল।
“নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
বিয়ের আগের দিন।
বাড়িতে ব্যস্ততা।
আত্মীয়স্বজন আসছে।
সবাই আনন্দে ব্যস্ত।
কিন্তু সিয়াম আর প্রভার মনে অদ্ভুত একটা চাপ।
দুজনেই জানে, কেউ তাদের ওপর নজর রাখছে।
তবু তারা সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
রাতে প্রভা সিয়ামকে ফোন করল।
“ঘুমিয়েছ?”
“না।”
“ভয় লাগছে?”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
“একটু।”
“আমারও।”
“কিন্তু আমরা পারব।”
“হ্যাঁ।”
প্রভা হেসে বলল,
“একটা কথা মনে আছে?”
“কোনটা?”
“ফোন বদলের দিন।”
“কীভাবে ভুলব?”
“সেদিন মনে হয়েছিল, তোমার ফোনে অন্য মেয়ের নাম দেখাই আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা।”
সিয়াম হেসে বলল,
“আর তোমার ফোনে রাফির নাম।”
“হ্যাঁ।”
“কী বোকা ছিলাম।”
“খুব।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর প্রভা বলল,
“সিয়াম?”
“হুম?”
“যদি কাল কিছু হয়?”
“কিছু হবে না।”
“তবু যদি হয়?”
“তাহলে একসঙ্গে সামলাব।”
প্রভা মৃদু গলায় বলল,
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।”
সিয়াম বলল,
“আমিও।”
পরদিন বিয়ের দিন।
বাড়ি সাজানো হয়েছে।
সবাই ব্যস্ত।
প্রভা বিয়ের পোশাক পরে বসে আছে।
তার মুখে শান্ত একটা হাসি।
সিয়ামও প্রস্তুত।
ঠিক বিয়ের কিছুক্ষণ আগে তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
“শেষবারের মতো বলছি—বিয়ে বন্ধ করুন।”
সিয়াম মেসেজটা প্রভাকে দেখাল।
প্রভা বলল,
“এবার কী করবে?”
সিয়াম ফোনটা পকেটে রাখল।
“বিয়ে করব।”
প্রভা হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই বাইরে হঠাৎ হৈচৈ শুরু হলো।
কেউ একজন দৌড়ে এসে বলল,
“কামরুল সাহেব কোথায়?”
সিয়াম ছুটে গেল।
“কী হয়েছে?”
লোকটা বলল,
“আপনার বাবার সঙ্গে যে ফাইলটা ছিল, সেটা নেই।”
সিয়ামের বুক কেঁপে উঠল।
“কোন ফাইল?”
“পুরোনো কোম্পানির আসল নথি।”
সিয়াম স্থির হয়ে গেল।
“কোথায় ছিল?”
“আপনার বাবার ঘরে।”
প্রভাও ছুটে এল।
“কী হয়েছে?”
সিয়াম বলল,
“ফাইলটা নেই।”
প্রভা ধীরে বলল,
“কেউ নিয়ে গেছে?”
ঠিক তখনই তার ফোনে একটা ছবি এল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—
ফারহান।
তার হাতে সেই ফাইল।
ছবির নিচে লেখা—
“বিয়ে থামাতে পারোনি। কিন্তু সত্যিটা আমার হাতে।”
প্রভা সিয়ামের দিকে তাকাল।
সিয়াম বলল,
“ফারহানই সবকিছুর পেছনে।”
কিন্তু ছবির নিচে আরেকটা ছোট বাক্য ছিল—
“আর আমি একা নই।”
সিয়াম আর প্রভা দুজনেই স্থির হয়ে গেল।
ফারহান একা নয়।
তার সঙ্গে আর কে?
বিয়ের সব আয়োজনের মাঝখানে সেই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াল।
ফারহানের হাতে পুরোনো নথির ছবি দেখার পর সিয়াম কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না।
চারপাশে তখন বিয়ের ব্যস্ততা। বাড়িতে অতিথিদের ভিড়, হাসি-আনন্দ, সাজসজ্জা—সবকিছু স্বাভাবিক।
কিন্তু সিয়াম আর প্রভার কাছে মুহূর্তটা যেন হঠাৎ থেমে গেছে।
প্রভা ধীরে বলল,
“ফারহান যদি ফাইলটা নিয়ে থাকে, তাহলে এখন কী হবে?”
সিয়াম বলল,
“আমরা পুলিশকে জানাব।”
“কিন্তু বিয়ে?”
সিয়াম তার দিকে তাকাল।
“বিয়ে হবে।”
প্রভা কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“তুমি এত নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কারণ এতদিন সবাই আমাদের ভয় দেখিয়ে সিদ্ধান্ত বদলাতে চেয়েছে। আজ আর সেটা হতে দেব না।”
প্রভা মৃদু হাসল।
“ঠিক আছে।”
কিন্তু ঠিক তখনই কামরুল সাহেব এসে বললেন,
“সিয়াম, আমার সঙ্গে আসো।”
দুজন একটা আলাদা ঘরে গেল।
কামরুল সাহেব দরজা বন্ধ করে বললেন,
“আমি একটা কথা তোমাদের কাছে লুকিয়েছিলাম।”
সিয়াম বিরক্ত হয়ে বলল,
“বাবা, এখন আর কিছু লুকাবেন না।”
“এই কারণেই বলছি।”
তিনি একটা ছোট খাম বের করলেন।
“ফারহান যে ফাইলটা নিয়ে গেছে, সেটা আসল নয়।”
সিয়াম অবাক হয়ে তাকাল।
“মানে?”
“আসল নথি এখনও আমার কাছে।”
“তাহলে এতদিন যে ফাইল নিয়ে আমরা চিন্তা করছিলাম?”
“ওটা কপি।”
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আপনি ফারহানকে ভুল ফাইল দিয়েছিলেন?”
“ইচ্ছা করে।”
কামরুল সাহেব বললেন,
“আমি অনেকদিন ধরেই বুঝেছিলাম, আমাদের আশেপাশে কেউ খবর দিচ্ছে। তাই আসল নথি আলাদা করে রেখেছিলাম।”
প্রভা এবার বলল,
“তাহলে ফারহান কী পেয়েছে?”
“এমন কিছু কাগজ, যেগুলো দেখে মনে হবে সে সত্যিটা পেয়ে গেছে।”
সিয়াম বুঝতে পারল।
“আপনি ওকে ফাঁদে ফেলেছেন।”
কামরুল সাহেব মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ।”
সিয়াম সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ফারহানের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা শুরু করল।
রাফিও সেখানে ছিল।
প্রভা তাকে দেখে বলল,
“তুমি এখানে কেন?”
রাফি মৃদু হেসে বলল,
“তোমার বিয়ে। না এসে পারি?”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আমি তোমাকে সন্দেহ করেছিলাম।”
“জানি।”
“ক্ষমা করবে?”
রাফি হেসে বলল,
“তুমি সন্দেহ করেছ বলে খারাপ লাগেনি। বরং ভালো লেগেছে।”
“কেন?”
“কারণ এবার তুমি প্রমাণ ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করোনি।”
প্রভা হেসে ফেলল।
“তুমি সত্যিই বদলে গেছ।”
রাফি বলল,
“মানুষ বদলায় না। পরিস্থিতি মানুষকে নিজের আসল রূপ দেখায়।”
এদিকে পুলিশ ফারহানের অবস্থান খুঁজে পেল।
সে শহরের বাইরে একটা পুরোনো গুদামে ছিল।
কিছুক্ষণ পর খবর এল—
ফারহানকে আটক করা হয়েছে।
তার কাছ থেকে কিছু নথি, কয়েকটি ফোন এবং পুরোনো রেকর্ডিং পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার ফোনে থাকা কথোপকথন।
সেখানে পরিষ্কার বোঝা গেল, ফারহান একা কাজ করেনি।
কিন্তু তার সঙ্গে যে ব্যক্তি যোগাযোগ করছিল, তার নাম শুনে সবাই অবাক হয়ে গেল।
ওই ব্যক্তি ছিল কোম্পানির সাবেক মালিক।
যে এত বছর ধরে নিখোঁজ ছিল।
সে বিদেশে পালিয়ে গিয়েছিল এবং বিভিন্ন মানুষের মাধ্যমে পুরোনো ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণ করছিল।
ফারহান ছিল তার একজন সহযোগী।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আরও কিছু সত্যি বেরিয়ে এল।
মেহরিনের পুরোনো ছবি নতুন করে পাঠানো হয়েছিল।
রাফির নাম ব্যবহার করে মিথ্যা কাগজ তৈরি করা হয়েছিল।
সিয়ামকে ফোন করে যে ব্যক্তি ভয় দেখিয়েছিল, সেটাও ফারহানের দলের একজন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
সিয়াম ও প্রভার ফোন বদলের ঘটনাটাও তারা ব্যবহার করেছিল।
তারা জানত, দুজনের মধ্যে অতীত নিয়ে কিছু ভুল বোঝাবুঝি আছে।
তাই সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বারবার সন্দেহ তৈরি করা হয়েছিল।
প্রভা সব শুনে বলল,
“মানে আমাদের আলাদা করার জন্য আমাদের নিজেদের ভুল বোঝাবুঝিই ব্যবহার করা হয়েছে।”
সিয়াম বলল,
“হ্যাঁ।”
“আমরা যদি একে অপরকে বিশ্বাস না করতাম?”
“তাহলে ওরা জিতে যেত।”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“তাহলে আসলে আমাদের সম্পর্কটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রমাণ।”
সিয়াম মৃদু হাসল।
“হয়তো।”
সব সমস্যা পুরোপুরি শেষ হতে কিছুটা সময় লাগবে।
আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলো।
পুরোনো কোম্পানির নথি তদন্তে গেল।
মাহবুব সাহেব এবং কামরুল সাহেবও তাদের কাছে থাকা সব তথ্য জমা দিলেন।
অনেক বছর ধরে যে সত্যিটা তারা ভয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন, অবশেষে সেটা সামনে এলো।
তারা কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন না।
বরং ভয় আর পারিবারিক সমস্যার কারণে তারা এতদিন চুপ ছিলেন।
প্রভার কাছে সবচেয়ে কঠিন ছিল বাবাকে ক্ষমা করা।
একদিন রাতে সে বাবার পাশে বসে বলল,
“বাবা?”
“হুম?”
“তোমার ওপর রাগ করেছিলাম।”
“জানি।”
“কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, তুমি আমাকে হারানোর ভয়েই সবকিছু লুকিয়েছিলে।”
মাহবুব সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
“বাবা-মায়েরা অনেক সময় সন্তানকে নিরাপদ রাখতে গিয়ে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়, যা পরে ভুল হয়ে যায়।”
প্রভা বাবার হাত ধরল।
“আর আমি তোমাকে একটা কথা বলি।”
“কী?”
“ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হলে আমার কাছ থেকে কিছু লুকাবে না।”
তিনি হেসে বললেন,
“প্রতিশ্রুতি।”
বিয়েটা শেষ পর্যন্ত হলো।
কোনো বড় আয়োজন নয়।
দুই পরিবারের কাছের মানুষজন।
সাদামাটা পরিবেশ।
কিন্তু সিয়াম আর প্রভার কাছে দিনটা ছিল বিশেষ।
কারণ তারা জানত—
এই বিয়ে শুধু দুজন মানুষের একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নয়।
এটা ছিল সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ আর ভয়ের বিরুদ্ধে তাদের একটা সিদ্ধান্ত।
বিয়ের পর রাতে তারা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
শহরের আলো দূরে জ্বলছিল।
প্রভা বলল,
“একটা কথা বলব?”
“বলো।”
“আমাদের গল্পটা যদি শুরুতেই এত সহজ হতো?”
সিয়াম হেসে বলল,
“তাহলে হয়তো আমরা একে অপরকে এতটা চিনতাম না।”
“মানে?”
“আমরা ফোনের ভেতর দিয়ে একে অপরকে বিচার করেছিলাম। তারপর বুঝেছি, একজন মানুষকে কয়েকটা মেসেজ, কয়েকটা ছবি বা কিছু পুরোনো কথায় বোঝা যায় না।”
প্রভা বলল,
“মানুষকে বুঝতে হলে?”
সিয়াম বলল,
“সময় দিতে হয়।”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আর বিশ্বাস?”
“সেটা?”
“সেটা কীভাবে তৈরি হয়?”
সিয়াম মৃদু হেসে বলল,
“একবারে না। প্রতিদিন একটু একটু করে।”
প্রভা মাথা নাড়ল।
“ঠিক বলেছ।”
কিছুদিন পর এক সকালে প্রভা তার ফোন হাতে নিয়ে পুরোনো ছবিগুলো দেখছিল।
একটা ছবি চোখে পড়ল।
সেদিনের ছবি—
যেদিন প্রথম তারা ফোন বদলেছিল।
ছবিতে দুজনের মুখেই অস্বস্তি।
প্রভা ছবিটা দেখে হেসে ফেলল।
সিয়াম জিজ্ঞেস করল,
“কী দেখছ?”
“আমাদের পুরোনো ছবি।”
“ওটা মুছে দাও।”
“কেন?”
“দেখতে ভালো লাগে না।”
“না। এটা থাকবে।”
“কেন?”
প্রভা বলল,
“কারণ এই ছবিটা আমাকে মনে করিয়ে দেবে—কাউকে বুঝতে হলে তার ফোন নয়, তার মনটা জানতে হয়।”
সিয়াম কিছু বলল না।
প্রভা আবার বলল,
“আর একটা কথা।”
“কী?”
“পরের বার কেউ যদি আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করতে চায়?”
সিয়াম বলল,
“তাহলে?”
“আগে একে অপরকে জিজ্ঞেস করব।”
“তারপর?”
“তারপর ফোন দেখব না।”
সিয়াম হেসে বলল,
“তাহলে?”
প্রভা বলল,
“সরাসরি কথা বলব।”
দুজনেই হেসে ফেলল।
শেষ কথা
সিয়াম আর প্রভার গল্পটা কোনো নিখুঁত সম্পর্কের গল্প ছিল না।
তাদের মধ্যে সন্দেহ এসেছে।
অভিমান এসেছে।
অতীতের মানুষ এসেছে।
পরিবারের সমস্যা এসেছে।
ভুল বোঝাবুঝিও হয়েছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা একটা বিষয় শিখেছে—
বিশ্বাস মানে কখনো সন্দেহ না করা নয়।
বিশ্বাস মানে সন্দেহ হলে পালিয়ে না গিয়ে সত্যিটা জানতে চাওয়া।
একটা ফোন তাদের সম্পর্ককে ভেঙে দিতে পারত।
কিন্তু সেই ফোনই তাদের শিখিয়েছিল—
মানুষের ব্যক্তিগত কথার চেয়ে তার আচরণ, সত্যি কথা আর কঠিন সময়ে পাশে থাকার মানসিকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
....