পনেরো বছর পর আবার দেখা

শহরের আকাশটা সেদিন অদ্ভুত সুন্দর ছিল।

সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। রাস্তার দুপাশে জ্বলে উঠছিল একের পর এক বাতি। গাড়ির শব্দ, মানুষের ভিড়, দোকানের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে শহরটা যেন নিজের মতো করেই ছুটে চলছিল।

কিন্তু নীখিলের কাছে সেদিনের শহরটা অন্যরকম লাগছিল।

তার হাতে ছিল একটা পুরোনো ক্যামেরা। পেশায় সে একজন ফটোগ্রাফার। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ছবি তোলা তার কাজ হলেও কিছু জায়গা ছিল, যেখানে ক্যামেরা হাতে গেলেই তার পেশাদার চোখের চেয়ে স্মৃতিগুলো বেশি জেগে উঠত।

আজ সে ঠিক তেমনই একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল।

তার পুরোনো স্কুলের সামনে।

প্রায় পনেরো বছর পর।

স্কুলের গেটটা আগের মতোই আছে। শুধু দেয়ালের রং বদলে গেছে। মাঠটা আগের তুলনায় ছোট মনে হচ্ছে। বারান্দার সেই পুরোনো জানালাগুলোও যেন সময়ের ভারে একটু ক্লান্ত।

নীখিল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসল।

তার মনে পড়ল একটা মেয়ের কথা।

রিয়া।

একটা নাম।

কিন্তু নীখিলের কাছে সেই নামের ভেতর লুকিয়ে ছিল তার পুরো কৈশোর।

রিয়ার হাসি।

রিয়ার অভিমান।

ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে চুপিচুপি গল্প করা।

পরীক্ষার আগের রাতে একে অপরকে নোট দেওয়া।

বৃষ্টির দিনে একই ছাতার নিচে বাড়ি ফেরার চেষ্টা।

আর সেই একটা কথা—

যেটা তারা কেউ কোনোদিন বলতে পারেনি।

নীখিল ক্যামেরাটা নামিয়ে ফেলল।

এত বছর পরও কেন একটা নাম তার বুকের ভেতর এতটা শব্দ করে?

সে নিজেকেই প্রশ্ন করল।

কোনো উত্তর পেল না।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একজন পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

—“এই যে! নীখিল?”

নীখিল ঘুরে তাকাল।

তার পুরোনো বন্ধু সজীব দাঁড়িয়ে আছে।

সজীব ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।

—“তুই একদম বদলাসনি!”

নীখিল হেসে বলল,

—“তুইও না। শুধু চুলগুলো একটু বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।”

সজীব নিজের মাথায় হাত দিয়ে হেসে ফেলল।

—“চল, সবাই ভেতরে আছে। আজ কিন্তু কাউকে পালাতে দেব না।”

—“সবাই এসেছে?”

—“প্রায় সবাই।”

নীখিল হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল,

—“রিয়া এসেছে?”

প্রশ্নটা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেই থেমে গেল।

সজীবও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর মৃদু হাসল।

—“তুই এখনও ওর কথা মনে রেখেছিস?”

নীখিল চোখ সরিয়ে নিল।

—“কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় নাকি?”

সজীব আর কিছু বলল না।

শুধু নীখিলের কাঁধে হাত রেখে বলল,

—“ভেতরে চল।”

স্কুলের পুরোনো হলরুমটা আজ সাজানো হয়েছে।

চারদিকে পরিচিত মুখ।

কেউ কেউ এতটাই বদলে গেছে যে প্রথম দেখায় চেনা কঠিন। কেউ আবার আগের মতোই আছে। সবাই নিজেদের পুরোনো দিনের গল্প নিয়ে ব্যস্ত।

নীখিল এক কোণে দাঁড়িয়ে সবার কথা শুনছিল।

কেউ বলছে—

“মনে আছে, স্যার আমাদের কীভাবে বকেছিলেন?”

কেউ পুরোনো ছবি বের করছে।

কেউ আবার স্কুলের বেঞ্চের গল্প করছে।

নীখিলও হাসছিল।

কিন্তু তার চোখ বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল।

সে নিজেকে বোঝাচ্ছিল—

রিয়া হয়তো আসবে না।

এত বছর পর কেনই বা আসবে?

হয়তো সে নিজের জীবনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

হয়তো তাকে আর কিছুই মনে নেই।

হয়তো—

ঠিক তখনই হলরুমের দরজার কাছে হঠাৎ সবাই একটু চুপ হয়ে গেল।

একটা মেয়ে ভেতরে ঢুকেছে।

হালকা নীল শাড়ি।

চুলগুলো খোলা।

চোখে শান্ত একটা দৃষ্টি।

মুখে আগের সেই পরিচিত হাসি।

নীখিলের বুকের ভেতরটা কেমন যেন থেমে গেল।

সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য পিছিয়ে গেল।

সে আর পনেরো বছর আগের মানুষ নয়।

তবু সেই মেয়েটাকে দেখার মুহূর্তে তার মনে হলো—

সে আবার সেই স্কুলের শেষ বেঞ্চে বসে আছে।

আর তার পাশে রিয়া।

রিয়া ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকাচ্ছিল।

তারপর হঠাৎ চোখ এসে থামল নীখিলের ওপর।

দুজনেই স্থির হয়ে গেল।

কেউ কথা বলল না।

কয়েক সেকেন্ড।

শুধু চোখের ভাষায় যেন পনেরো বছরের গল্প হয়ে গেল।

রিয়ার ঠোঁটের কোণে খুব ছোট একটা হাসি ফুটল।

নীখিলও হাসল।

তারপর রিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

—“কেমন আছ?”

মাত্র তিনটা শব্দ।

কিন্তু নীখিলের মনে হলো, এই তিনটা শব্দ শুনতেই সে এত বছর অপেক্ষা করেছে।

সে ধীরে বলল,

—“ভালো আছি। তুমি?”

রিয়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

—“আমিও।”

কথা থেমে গেল।

কত কথা জমে ছিল তাদের মধ্যে!

কিন্তু এত বছর পর প্রথম দেখা হলে মানুষ কি আর সহজে পুরোনো কথায় ফিরে যেতে পারে?

সজীব দূর থেকে তাদের দেখে মুচকি হাসল। তারপর ইচ্ছে করেই অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে চলে গেল।

রিয়া একটা চেয়ারে বসল।

নীখিলও পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

রিয়া তার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“তুমি এখনও ছবি তোলো?”

—“হ্যাঁ।”

—“তোমার স্বপ্নটা তাহলে সত্যি হয়েছে।”

নীখিল অবাক হয়ে তাকাল।

—“তুমি মনে রেখেছ?”

রিয়া হেসে বলল,

—“তুমি কি ভুলে গেছ? তুমি বলেছিলে, একদিন এমন ছবি তুলবে যেগুলো দেখে মানুষ নিজের গল্প মনে করবে।”

নীখিল কিছু বলল না।

কারণ সে হঠাৎ বুঝতে পারল—

রিয়া তার কথা মনে রেখেছে।

এত বছর পরও।

রিয়া জানালার বাইরে তাকাল।

—“অনেক কিছু বদলে গেছে, তাই না?”

—“হ্যাঁ।”

—“আমরাও।”

নীখিল ধীরে বলল,

—“তুমি বদলেছ।”

রিয়া তার দিকে তাকাল।

—“ভালোভাবে?”

নীখিল মৃদু হেসে বলল,

—“না। আগের চেয়ে বেশি সুন্দরভাবে।”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর চোখ নামিয়ে হাসল।

সেই হাসিটা নীখিলের খুব পরিচিত।

স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন রিয়া লুকিয়ে হাসত, তখনও ঠিক এমনই হাসত।

নীখিল হঠাৎ বলল,

—“তুমি কি এখনও বৃষ্টিতে ভিজতে ভয় পাও?”

রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—“তুমি এখনও এসব মনে রেখেছ?”

—“সবকিছু না। কিছু কিছু।”

রিয়া মৃদু স্বরে বলল,

—“আমিও কিছু কিছু মনে রেখেছি।”

এই কথাটার পর দুজনেই চুপ হয়ে গেল।

বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে।

নীখিলের মনে হলো, পনেরো বছর আগে ফিরে গেছে সময়।

সেই একই বৃষ্টি।

সেই একই মেয়ে।

শুধু এবার তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পনেরো বছরের দূরত্ব।

কিছুক্ষণ পর রিয়া উঠে দাঁড়াল।

—“চলো, স্কুলটা একটু ঘুরে দেখি?”

নীখিল তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে মাথা নাড়ল।

—“চলো।”

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

পুরোনো করিডোর।

পুরোনো ক্লাসরুম।

পুরোনো সিঁড়ি।

প্রতিটি জায়গায় যেন তাদের ফেলে আসা দিনগুলো অপেক্ষা করছিল।

একটা ক্লাসরুমের সামনে এসে রিয়া থেমে গেল।

—“এই ঘরটা মনে আছে?”

নীখিল হেসে বলল,

—“এখানেই তুমি আমার খাতা লুকিয়ে রাখতে।”

—“আর তুমি আমার কলম চুরি করতে।”

—“তুমি আমাকে বকা দিতে।”

—“তুমি ইচ্ছে করেই আবার করতে।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

অনেক বছর পর সেই হাসিতে কোনো অস্বস্তি ছিল না।

ছিল শুধু পুরোনো পরিচিতির উষ্ণতা।

কিন্তু হাসির আড়ালে দুজনের মনেই একই প্রশ্ন ঘুরছিল—

এত বছর পরও কি কিছু অনুভূতি বেঁচে থাকতে পারে?

উত্তরটা কেউ জানত না।

স্কুলের করিডোর দিয়ে নীখিল আর রিয়া ধীরে ধীরে হাঁটছিল।

বাইরে তখন বৃষ্টি একটু বেড়েছে। টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ পড়ে পুরো স্কুলটা যেন আরও বেশি পুরোনো হয়ে উঠেছে। চারপাশে কেউ নেই। পুনর্মিলনীর সবাই নিচের হলরুমে ব্যস্ত।

এই নিরিবিলি করিডোরে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে দুজনেরই মনে হচ্ছিল, তারা যেন পনেরো বছর পেছনে ফিরে গেছে।

রিয়া হঠাৎ একটা দরজার সামনে থেমে গেল।

—“এই ক্লাসরুমে আমাদের শেষ বেঞ্চটা ছিল, মনে আছে?”

নীখিল হেসে বলল,

—“মনে থাকবে না কেন?”

—“তুমি সব সময় আমার খাতা নিয়ে পালিয়ে যেতে।”

—“কারণ তুমি আমাকে খাতা দিতে চাইতে না।”

—“তুমি পড়াশোনা করতে না।”

—“তোমার কাছ থেকে খাতা নিয়ে পড়তাম বলেই তো পরীক্ষায় পাস করতাম।”

রিয়া মুচকি হাসল।

—“তুমি খুব মিথ্যা কথা বলতে শিখেছ।”

নীখিল তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“তুমি না থাকলে হয়তো শিখতেই পারতাম না।”

রিয়ার হাসিটা ধীরে ধীরে থেমে গেল।

কথাটা খুব সাধারণভাবেই বলা হয়েছিল। কিন্তু তার ভেতরে যেন পুরোনো কোনো অনুভূতির দরজা খুলে গেল।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

রিয়া জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

বৃষ্টিভেজা মাঠের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“জানো, মাঝে মাঝে আমি ভাবতাম, এই স্কুলটা আর কোনোদিন দেখতে আসব না।”

—“কেন?”

—“কারণ এখানে অনেক স্মৃতি।”

নীখিল ধীরে বলল,

—“সব স্মৃতি কি কষ্ট দেয়?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“না। কিছু স্মৃতি কষ্ট দেয় না। বরং মনে করিয়ে দেয়, জীবনে একটা সময় ছিল যখন সবকিছু খুব সহজ ছিল।”

নীখিল কিছু বলল না।

তার মনে পড়ছিল সেই সময়টা।

তখন তাদের পৃথিবীটা ছিল খুব ছোট।

স্কুল, বাড়ি, বন্ধু আর একে অপরকে ঘিরেই তাদের দিনের বেশির ভাগটা কেটে যেত।

রিয়া একটু দুষ্টু ছিল। কোনোদিন নীখিলের ব্যাগে লুকিয়ে চক রেখে দিত, কোনোদিন তার কলম নিয়ে পালাত। নীখিলও কম যেত না। রিয়া যখন রাগ করে কথা বলা বন্ধ করত, তখন সে নানা অজুহাতে তার সামনে ঘোরাঘুরি করত।

একবার রিয়া তিন দিন তার সঙ্গে কথা বলেনি।

কারণ নীখিল তার জন্মদিনের কথা ভুলে গিয়েছিল।

তৃতীয় দিন স্কুল ছুটির পর নীখিল একটা ছোট প্যাকেট তার হাতে দিয়েছিল।

ভেতরে ছিল একটা নীল কলম।

রিয়া সেটা হাতে নিয়ে বলেছিল,

—“আমার জন্মদিন তো দুই দিন আগে ছিল।”

নীখিল বলেছিল,

—“জানি।”

—“তাহলে আজ কেন?”

—“কারণ গত দুই দিন তোমার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাইনি।”

রিয়া সেদিন আর রাগ করে থাকতে পারেনি।

সেই স্মৃতি মনে পড়তেই দুজনেই হেসে ফেলল।

রিয়া বলল,

—“তোমার সেই নীল কলমটার কথা মনে আছে?”

নীখিল অবাক হয়ে তাকাল।

—“তুমি এখনও রেখেছ?”

রিয়া উত্তর দিল না।

শুধু মৃদু হাসল।

তারপর বলল,

—“সবকিছু ফেলে দেওয়া যায় না।”

নীখিলের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।

সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।

ঠিক তখনই নিচ থেকে সজীবের ডাক শোনা গেল।

—“এই তোমরা! কোথায় হারিয়ে গেলে? সবাই ছবি তুলবে!”

রিয়া হেসে বলল,

—“চলো।”

হলরুমে ফিরে সবাই দলবেঁধে ছবি তুলতে শুরু করল।

নীখিল ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। সবাই তাকে নিয়ে মজা করছিল।

—“এই নীখিল, এবার কিন্তু তোকে ছবিতে থাকতে হবে!”

—“ফটোগ্রাফার নিজে কখনো ছবিতে থাকে না নাকি?”

সজীব রিয়াকে নীখিলের পাশে দাঁড় করিয়ে দিল।

—“তোরা দুজন এখানে দাঁড়া।”

রিয়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল।

নীখিলও তার পাশে দাঁড়াল।

ক্যামেরার সামনে দুজনের মাঝখানে খুব সামান্য দূরত্ব।

কিন্তু তাদের মনে হচ্ছিল, এই সামান্য দূরত্বের মাঝখানে যেন পনেরো বছরের একটা জীবন দাঁড়িয়ে আছে।

ছবি তোলা হলো।

তারপর আরও অনেক ছবি।

কেউ পুরোনো শিক্ষকের সঙ্গে ছবি তুলল। কেউ মাঠে গেল। কেউ পুরোনো বেঞ্চে বসে ছবি তুলল।

রাত বাড়তে লাগল।

একসময় সবাই খাওয়ার জন্য নিচে চলে গেল।

রিয়া একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

নীখিল দূর থেকে তাকে দেখল।

তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

—“তুমি এখানে একা?”

রিয়া ফিরে তাকাল।

—“হ্যাঁ। একটু বাতাস খাচ্ছিলাম।”

নীখিল পাশে দাঁড়াল।

বৃষ্টি তখনও পড়ছে।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।

তারপর নীখিল বলল,

—“তোমার জীবন কেমন কাটছে?”

রিয়া কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,

—“ভালো।”

—“শুধু ভালো?”

রিয়া হালকা হেসে বলল,

—“সব জীবন কি গল্পের মতো হয়?”

নীখিল তার দিকে তাকাল।

—“না।”

—“তাহলে?”

—“কখনো কখনো মানুষ ভালো থাকার অভিনয়ও করে।”

রিয়া এবার তার দিকে তাকাল।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

রিয়া খুব ধীরে বলল,

—“তুমি এখনও আগের মতোই আছ।”

—“কীভাবে?”

—“মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলো। তাই মিথ্যা বলা কঠিন।”

নীখিল মৃদু হেসে বলল,

—“তুমি কি মিথ্যা বলছ?”

রিয়া উত্তর দিল না।

তার চোখ আবার বৃষ্টির দিকে চলে গেল।

নীখিল বুঝতে পারল, প্রশ্নটা হয়তো একটু বেশি ব্যক্তিগত হয়ে গেছে।

সে আর কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর রিয়া বলল,

—“তুমি বিয়ে করোনি?”

প্রশ্নটা শুনে নীখিল কিছুটা অবাক হলো।

—“না।”

—“কেন?”

—“কোনো কারণ নেই।”

—“সবকিছুরই তো কোনো না কোনো কারণ থাকে।”

নীখিল এবার মৃদু হাসল।

—“হয়তো ঠিক মানুষটাকে পাইনি।”

রিয়া তার দিকে তাকাল না।

কিন্তু তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর সে বলল,

—“জীবনে ঠিক মানুষ বলে কিছু থাকে না, নীখিল। মানুষকে ঠিক মনে হয়।”

নীখিল চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—“তুমি কি ঠিক মানুষটাকে পেয়েছিলে?”

রিয়া এবার তার দিকে তাকাল।

চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি।

—“জানি না।”

কথাটা খুব ছোট।

কিন্তু নীখিলের কাছে সেটাই ছিল অনেক বড় উত্তর।

হঠাৎ রিয়ার ফোন বেজে উঠল।

সে ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

তারপর বলল,

—“আমাকে যেতে হবে।”

—“এখনই?”

—“হ্যাঁ। বাড়িতে অপেক্ষা করছে।”

নীখিল মাথা নাড়ল।

—“ঠিক আছে।”

রিয়া কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আবার থেমে গেল।

পেছনে ফিরে বলল,

—“নীখিল?”

—“হুম?”

—“আজ তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল।”

নীখিল মৃদু হেসে বলল,

—“আমারও।”

রিয়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।

নীখিল বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখল।

কিছুক্ষণ পর সজীব এসে পাশে দাঁড়াল।

—“কী ভাবছিস?”

নীখিল চোখ সরাল না।

—“কিছু না।”

সজীব হেসে বলল,

—“তুই এখনও ওকে ভালোবাসিস?”

প্রশ্নটা শুনে নীখিল চুপ হয়ে গেল।

তারপর খুব ধীরে বলল,

—“জানি না।”

সজীব বলল,

—“তুই জানিস।”

নীখিল কোনো উত্তর দিল না।

রাত প্রায় সাড়ে দশটা।

নীখিল নিজের বাসায় ফিরে ক্যামেরাটা টেবিলের ওপর রাখল।

সারাদিনের ছবি দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা ছবিতে এসে তার হাত থেমে গেল।

ছবিটা রিয়া আর তার।

স্কুলের পুরোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে দুজনের ছবি।

ছবিটা খুব সাধারণ।

কিন্তু নীখিলের চোখ আটকে গেল রিয়ার মুখে।

পনেরো বছর আগে সে যে মেয়েটাকে দেখেছিল, আজকের রিয়ার মধ্যে সেই মেয়েটা এখনও কোথাও আছে।

শুধু চোখের কোণে একটু ক্লান্তি যোগ হয়েছে।

নীখিল ছবিটা ফোনে রেখে দিল।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল।

অচেনা নম্বর।

“আজ অনেক বছর পর তোমার সঙ্গে দেখা হলো। একটা কথা বলতে চেয়েও বলতে পারিনি।”

নীখিল কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর লিখল—

“কী কথা?”

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

তারপর আবার মেসেজ।

“তুমি কি এখনও সেই পুরোনো স্কুলের লাইব্রেরিটা মনে রেখেছ?”

নীখিলের বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।

লাইব্রেরি।

সেই জায়গা যেখানে তারা একদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ছিল।

যেখানে রিয়া তাকে একটা চিঠি দিয়েছিল।

যে চিঠির উত্তর নীখিল কোনোদিন দিতে পারেনি।

সে আবার মেসেজ লিখল—

“মনে আছে।”

কয়েক মুহূর্ত পর উত্তর এল—

“তাহলে কাল বিকেলে সেখানে এসো।”

নীখিল স্থির হয়ে বসে রইল।

পনেরো বছর পর দেখা হওয়ার প্রথম রাতেই রিয়া তাকে আবার সেই পুরোনো জায়গায় ডাকছে।

কেন?

কী বলতে চায় সে?

আর সেই পুরোনো চিঠিটা কি এখনও রিয়ার কাছে আছে?

নীখিল জানত না।

পরদিন সকাল থেকেই নীখিলের মনটা অস্থির ছিল।

কাজে মন বসছিল না। ক্যামেরা নিয়ে বের হওয়ার কথা থাকলেও বারবার তার চোখ ঘড়ির দিকে চলে যাচ্ছিল। গত রাতের সেই মেসেজটা মাথা থেকে কিছুতেই বের হচ্ছিল না।

“তাহলে কাল বিকেলে সেখানে এসো।”

রিয়া কেন তাকে স্কুলের লাইব্রেরিতে ডাকল?

শুধু পুরোনো স্মৃতি মনে করার জন্য?

নাকি এমন কিছু কথা আছে, যেগুলো পনেরো বছর আগে বলা হয়ে ওঠেনি?

নীখিল নিজেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছিল, বেশি কিছু ভাবার দরকার নেই। কিন্তু মন তো যুক্তি মানে না।

বিকেল সাড়ে চারটার দিকে সে স্কুলের সামনে এসে দাঁড়াল।

আকাশটা মেঘলা।

গত রাতের বৃষ্টির কারণে চারপাশে ভেজা মাটির গন্ধ।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নীখিল কিছুক্ষণ স্কুলটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

লাইব্রেরিটা স্কুলের দ্বিতীয় তলায়।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে তার মনে পড়ছিল পুরোনো দিনের কথা।

একসময় এই সিঁড়ি দিয়েই রিয়া তার আগে আগে ছুটত।

আর নীখিল পেছন থেকে বলত,

—“এই, আস্তে! পড়ে যাবে।”

রিয়া ঘুরে বলত,

—“তুমি ধরবে।”

তখন কথাটা ছিল নিছক মজা।

আজ সেই কথাটাই নীখিলের মনে অদ্ভুত একটা ব্যথা তৈরি করল।

সে লাইব্রেরির সামনে এসে থামল।

দরজা আধখোলা।

ভেতরে ঢুকতেই পুরোনো বইয়ের গন্ধ নাকে এল।

জায়গাটা খুব একটা বদলায়নি।

একই বড় জানালা।

একই কাঠের টেবিল।

দেয়ালের পাশে পুরোনো বইয়ের তাক।

নীখিল ধীরে ধীরে ভেতরে গেল।

তারপর চোখ পড়ল জানালার পাশে একটা মেয়ের ওপর।

রিয়া।

আজ তার পরনে সাদা-নীল সালোয়ার-কামিজ।

চুলগুলো পেছনে বাঁধা।

হাতে একটা ছোট বাক্স।

নীখিল কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

রিয়া তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—“তুমি এসেছ।”

নীখিল বলল,

—“তুমি ডাকলে না এসে কি থাকা যায়?”

রিয়া নিচের দিকে তাকাল।

—“জানি না।”

নীখিল তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

—“কী বলতে চেয়েছিলে?”

রিয়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।

বরং হাতে থাকা বাক্সটা টেবিলের ওপর রাখল।

—“এটা তোমার জন্য।”

নীখিল অবাক হলো।

—“আমার জন্য?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“খুলো।”

নীখিল ধীরে বাক্সটা খুলল।

ভেতরে কিছু পুরোনো জিনিস।

একটা শুকিয়ে যাওয়া ফুল।

একটা নীল কলম।

কয়েকটা ছোট ছবি।

আর একটা ভাঁজ করা কাগজ।

নীখিলের চোখ হঠাৎ থেমে গেল।

সে কাগজটা হাতে নিল।

খামের ওপর তার নাম লেখা।

“নীখিলের জন্য।”

হাতের লেখাটা সে চিনতে পারল।

রিয়ার হাতের লেখা।

তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

—“এটা…”

রিয়া ধীরে বলল,

—“হ্যাঁ। সেই চিঠি।”

নীখিলের চোখের সামনে যেন পনেরো বছর আগের একটা বিকেল ভেসে উঠল।

স্কুলের শেষ দিন।

সেদিন সবাই ব্যস্ত ছিল।

কেউ ছবি তুলছিল, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে বিদায় নিচ্ছিল।

রিয়া তাকে বলেছিল,

—“লাইব্রেরিতে একটু আসবে?”

নীখিল গিয়েছিল।

রিয়া তখন এই একই টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার হাতে ছিল একটা খাম।

সে বলেছিল,

—“এটা তোমার জন্য।”

নীখিল চিঠিটা নিতে গিয়েছিল।

কিন্তু ঠিক তখনই সজীব এসে তাকে ডেকে নিয়ে যায়।

নীখিল বলেছিল,

—“একটু পরে আসছি।”

সেই “একটু পরে” আর আসেনি।

সেদিনই নীখিল জানতে পেরেছিল, তার বাবা চাকরির কারণে অন্য শহরে বদলি হয়েছেন। রাতেই তাদের চলে যেতে হবে।

সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছিল যে রিয়ার কথা মনে থাকলেও চিঠিটা নেওয়া হয়নি।

পরদিন যখন নীখিল স্কুলে ফিরেছিল, রিয়া চলে গেছে।

তারপর কেটে যায় বছর।

নীখিল কখনো জানতে পারেনি সেই চিঠিতে কী লেখা ছিল।

আজ পনেরো বছর পর সেই চিঠি তার সামনে।

রিয়া ধীরে বলল,

—“তখন তুমি আর আসোনি।”

নীখিল চুপ।

—“আমি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলাম।”

রিয়ার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না।

শুধু পুরোনো একটা কষ্টের ছায়া।

নীখিল ধীরে বলল,

—“আমি সেদিন চলে গিয়েছিলাম। খুব তাড়াহুড়ো করে।”

—“জানি।”

—“তুমি জানো?”

—“তোমার বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছিলাম।”

—“তাহলে এত বছর চিঠিটা রেখে দিলে কেন?”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“কারণ আমি কখনো নিশ্চিত হতে পারিনি, তুমি চিঠিটা পড়তে চাওনি, নাকি পড়ার সুযোগ পাওনি।”

নীখিল তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব ধীরে বলল,

—“আমি আজ পড়তে চাই।”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“পড়ো।”

নীখিল কাগজটা খুলল।

হাত কাঁপছিল।

চিঠিটা খুব বড় ছিল না।

কয়েকটা ছোট ছোট কথা।

স্কুলের শেষ দিন।

পুরোনো বন্ধুত্ব।

আর এমন কিছু অনুভূতি, যেগুলো সে তখন মুখে বলতে পারেনি।

চিঠি পড়তে পড়তে নীখিলের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

রিয়া মুখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

সে নীখিলের মুখ দেখতে চাইছিল না।

চিঠির শেষ অংশে এসে নীখিল থেমে গেল।

তারপর রিয়ার দিকে তাকাল।

—“তুমি আমাকে তখনও…”

কথাটা শেষ করতে পারল না।

রিয়া ধীরে বলল,

—“হ্যাঁ।”

একটা শব্দ।

কিন্তু সেই একটা শব্দের মধ্যে যেন পনেরো বছর জমে থাকা সব অনুভূতি ছিল।

নীখিল চোখ নামিয়ে ফেলল।

—“তাহলে তুমি আমাকে কখনো বলোনি কেন?”

রিয়া হেসে বলল,

—“চিঠিটাই তো বলেছিল।”

—“কিন্তু আমি তো পাইনি।”

—“আমি জানতাম না।”

দুজনেই চুপ করে রইল।

বাইরে হালকা বাতাস উঠেছে।

জানালার পর্দা নড়ছে।

নীখিল চিঠিটা বুকের কাছে ধরে রাখল।

—“আমি যদি সেদিন এই চিঠিটা পড়তাম…”

রিয়া তার কথা থামিয়ে দিল।

—“তাহলে?”

নীখিল তার চোখের দিকে তাকাল।

—“হয়তো আমাদের গল্পটা অন্যরকম হতো।”

রিয়ার চোখে পানি জমে উঠল।

সে খুব আস্তে বলল,

—“হয়তো।”

এই “হয়তো” শব্দটাই যেন তাদের দুজনকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এল।

কিন্তু বাস্তবতা তখনও তাদের মাঝখানে ছিল।

রিয়া ধীরে বলল,

—“জীবন আমাদের অনেক দূরে নিয়ে গেছে, নীখিল।”

—“জানি।”

—“এখন সবকিছু আগের মতো করা সম্ভব না।”

নীখিল চুপ করে রইল।

রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আমি তোমাকে দোষ দিইনি কখনো।”

—“কিন্তু আমি নিজেকে দিয়েছি।”

রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—“কেন?”

—“কারণ আমি ভেবেছিলাম, তুমি হয়তো আমাকে ভুলে গেছ।”

রিয়া মৃদু হাসল।

—“ভুলে গেলে কি এত বছর চিঠিটা রেখে দিতাম?”

নীখিল কোনো উত্তর পেল না।

দুজনের মাঝে আবার নীরবতা নেমে এল।

কিছুক্ষণ পর রিয়া বাক্সটা বন্ধ করতে গেল।

নীখিল তার হাত থামিয়ে দিল।

—“এগুলো তুমি রেখে দাও।”

রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—“কেন?”

—“কারণ এগুলো তোমার।”

—“আর চিঠিটা?”

নীখিল চিঠিটা হাতে নিয়ে বলল,

—“এটা আমার।”

রিয়া কিছু বলল না।

তার চোখে অদ্ভুত এক কোমলতা।

নীখিল চিঠিটা খুব যত্ন করে ভাঁজ করে নিজের পকেটে রাখল।

তারপর বলল,

—“রিয়া।”

—“হুম?”

—“তুমি সুখী?”

প্রশ্নটা শুনে রিয়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“এই প্রশ্নের উত্তরটা এত সহজ না।”

—“তবুও জানতে চাই।”

রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

—“আমার জীবন ঠিকঠাক চলছে।”

নীখিল ধীরে বলল,

—“আমি সুখের কথা জিজ্ঞেস করেছি।”

রিয়া এবার তার দিকে তাকাল।

চোখ দুটো ভেজা।

—“কিছু মানুষ জীবনে সুখী হয় না, নীখিল। তারা শুধু নিজের জীবনটা ঠিকঠাক চালিয়ে যায়।”

নীখিলের বুক ভার হয়ে গেল।

সে বুঝতে পারল, গত রাতের “ভালো আছি” কথাটার ভেতরে কতটা না-বলা কথা লুকিয়ে ছিল।

ঠিক তখন রিয়ার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে কারও নাম দেখে রিয়া কিছুটা অস্থির হয়ে গেল।

নীখিল সেটা লক্ষ্য করল।

রিয়া ফোনটা কেটে দিল।

—“তোমাকে যেতে হবে?”

—“হ্যাঁ।”

—“কেউ অপেক্ষা করছে?”

রিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—“হ্যাঁ।”

তারপর ব্যাগ তুলে নিল।

দরজার কাছে গিয়ে আবার থামল।

পেছনে তাকিয়ে বলল,

—“চিঠিটা পড়ে আমাকে বিচার করো না।”

নীখিল মৃদু স্বরে বলল,

—“আমি তোমাকে কোনোদিন বিচার করিনি।”

রিয়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।

নীখিল লাইব্রেরিতে একা দাঁড়িয়ে রইল।

তার পকেটে পনেরো বছর পুরোনো একটা চিঠি।

আর মাথার ভেতর শুধু একটা প্রশ্ন—

রিয়া কি সত্যিই তার জীবনে সুখী নয়?

আর যদি না হয়…

তাহলে সেই জীবনের কারণ কী?

বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

নীখিল জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

বৃষ্টির ফোঁটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো—

পনেরো বছর আগে যে ভালোবাসা একটা চিঠির ভেতর আটকে গিয়েছিল, আজ সেই চিঠি খুলে গেছে।

কিন্তু চিঠি খোলার সঙ্গে সঙ্গে কি তাদের পুরোনো গল্পটাও আবার খুলে যাবে?

নাকি এই দেখা শুধু পুরোনো ক্ষতটাকে আরও গভীর করে দেবে?

রিয়া চলে যাওয়ার পরও নীখিল অনেকক্ষণ লাইব্রেরিতে দাঁড়িয়ে ছিল।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার কাঁচ বেয়ে পানির ফোঁটা নিচে নামছিল, আর সেই শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল পুরোনো স্মৃতিগুলো।

তার পকেটে রিয়ার দেওয়া চিঠি।

পনেরো বছর আগে যে কথাগুলো পড়ার সুযোগ সে পায়নি, আজ সেগুলো তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নীখিল ধীরে ধীরে স্কুল থেকে বেরিয়ে এল।

গেটের কাছে এসে আবার একবার পেছনে তাকাল।

এই স্কুলের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তার কৈশোরের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো।

আর সেই দিনগুলোর সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে ছিল রিয়া।

পরদিন সকাল।

নীখিল ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই চিঠিটা বের করল।

সে আবার পড়ল।

তারপরও পড়ল।

চিঠির প্রতিটি শব্দ যেন তাকে সেই পুরোনো দিনের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

রিয়া লিখেছিল, সে নীখিলকে হারাতে চায় না।

সে জানত না ভবিষ্যতে কী হবে।

শুধু জানত, নীখিল তার কাছে অন্য সবার চেয়ে আলাদা।

আর যদি কোনোদিন নীখিল দূরে চলে যায়, তাহলে অন্তত সে যেন জানে—

রিয়া তাকে কখনোই শুধু বন্ধু হিসেবে দেখেনি।

নীখিল চিঠিটা ভাঁজ করে চোখ বন্ধ করল।

এত বছর ধরে সে ভেবেছে, তাদের গল্পটা হয়তো কোনোদিন শুরুই হয়নি।

আজ বুঝতে পারছে, গল্পটা শুরু হয়েছিল।

শুধু দুজনের একজনও শেষ পর্যন্ত নিজের কথাটা বলতে পারেনি।

ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল।

সজীব।

—“হ্যালো?”

—“কী করছিস?”

—“কিছু না।”

—“রিয়ার সঙ্গে কথা হয়েছে?”

নীখিল একটু চুপ করে বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“কী বলল?”

—“অনেক কিছু।”

সজীব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—“তোকে একটা কথা বলব?”

—“বল।”

—“পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে শুরু করার আগে একটা জিনিস মনে রাখিস।”

—“কী?”

—“মানুষ শুধু নিজের ইচ্ছায় একা থাকে না। কখনো কখনো তার জীবনে এমন কিছু দায়িত্ব থাকে, যেগুলো বাইরে থেকে বোঝা যায় না।”

নীখিল বুঝতে পারল, সজীব কিছু জানে।

—“তুই কিছু জানিস?”

সজীব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“রিয়ার ব্যাপারে কিছু কথা শুনেছি। কিন্তু ওর ব্যক্তিগত বিষয়, তাই নিজে থেকে বলতে চাইনি।”

—“কী কথা?”

—“তুই ওর কাছ থেকেই শুনিস।”

নীখিল আর কিছু বলল না।

সেদিন বিকেলে নীখিল শহরের পুরোনো একটা ক্যাফেতে বসে ছিল।

ক্যামেরা ব্যাগটা পাশে।

এক কাপ কফি সামনে।

কিন্তু তার মন অন্য কোথাও।

হঠাৎ দরজার কাছে রিয়াকে দেখা গেল।

নীখিল অবাক হয়ে উঠে দাঁড়াল।

—“তুমি এখানে?”

রিয়া হেসে বলল,

—“সজীব বলল তুমি এখানে।”

—“কিছু হয়েছে?”

—“না। তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চেয়েছিলাম।”

রিয়া তার সামনে বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে থাকল।

তারপর রিয়া বলল,

—“গতকাল তোমার কাছে অনেক কথা বলা উচিত ছিল।”

—“আজ বলো।”

রিয়া টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাসটা হাতে নিল।

—“আমার বিয়ে হয়েছে তিন বছর আগে।”

নীখিল শান্তভাবে শুনছিল।

—“আমার স্বামীর নাম আরিফ। সে ভালো মানুষ।”

নীখিলের বুকের ভেতরটা একটু ভার হয়ে এল।

রিয়া বলল,

—“আমাদের বিয়েটা পরিবারের পছন্দে হয়েছিল। প্রথম দিকে সবকিছু ঠিকই ছিল।”

সে থামল।

—“তারপর?”

—“তার কাজের জন্য ওকে অনেক সময় বাইরে থাকতে হয়। আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। কথা কমে যায়। একসময় আমরা দুজনেই বুঝলাম, পাশাপাশি থেকেও আমরা আসলে আলাদা জীবন কাটাচ্ছি।”

নীখিল কোনো মন্তব্য করল না।

রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—“তবে আমি তোমাকে একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই।”

—“কী?”

—“আমি তোমার কাছে ফিরে আসার জন্য এসব বলছি না।”

নীখিল শান্তভাবে বলল,

—“আমি তোমাকে কিছু চাইতেও বলিনি।”

রিয়া তার দিকে তাকাল।

—“জানি।”

—“তাহলে?”

—“শুধু চাই, তুমি আমার জীবনের সত্যিটা জানো।”

নীখিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“তুমি কি সুখী নও?”

রিয়া উত্তর দিতে একটু সময় নিল।

—“আমি জানি না সুখী হওয়া বলতে কী বোঝায়।”

নীখিল নিচু স্বরে বলল,

—“যেখানে নিজের কথা বলতে ভয় লাগে, সেখানে মানুষ সুখী হয় না।”

রিয়া তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—“তুমি এখনও আমাকে এতটা বুঝতে পারো?”

নীখিল মৃদু হাসল।

—“কিছু মানুষকে বুঝতে অনেক বছর লাগে না। শুধু একবার সত্যি করে চিনলেই হয়।”

রিয়ার চোখে জল চিকচিক করল।

সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল।

—“তুমি জানো, তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?”

—“কী?”

—“তুমি আগের মতোই কথা বলো।”

নীখিল হেসে ফেলল।

—“এটা কি সমস্যা?”

—“আমার জন্য হয়তো।”

দুজনেই চুপ হয়ে গেল।

ক্যাফে থেকে বেরিয়ে তারা কিছুক্ষণ পাশাপাশি হাঁটল।

রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকান।

মানুষের ভিড়।

গাড়ির শব্দ।

শহর নিজের গতিতে চলছে।

কিন্তু নীখিলের কাছে মনে হচ্ছিল, তারা যেন আবার স্কুলের করিডোরে হাঁটছে।

রিয়া হঠাৎ বলল,

—“তুমি কি আমাকে নিয়ে কখনো রাগ করেছিলে?”

—“অনেক।”

—“কেন?”

—“তুমি আমাকে না জানিয়ে চলে গিয়েছিলে।”

রিয়া থেমে গেল।

—“আমি তো ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে চাও না।”

—“আর আমি ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে ভুলে গেছ।”

দুজনেই একে অপরের দিকে তাকাল।

তারপর রিয়া মৃদু হাসল।

—“আমরা দুজনেই কত বোকা ছিলাম।”

—“এখনও কি?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“হয়তো।”

হঠাৎ রিয়ার ফোন আবার বেজে উঠল।

সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ফোনটা ধরল।

—“হ্যালো?”

ওপাশ থেকে কিছু বলা হলো।

রিয়ার মুখ বদলে গেল।

—“আমি আসছি।”

ফোন রেখে সে নীখিলের দিকে তাকাল।

—“আমাকে যেতে হবে।”

—“সব ঠিক আছে?”

—“হ্যাঁ।”

কিন্তু এবার তার কণ্ঠে আগের মতো দৃঢ়তা ছিল না।

নীখিল বুঝতে পারল, কিছু একটা হয়েছে।

—“রিয়া।”

—“হুম?”

—“কিছু দরকার হলে আমাকে ফোন করবে।”

রিয়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর মৃদু হাসল।

—“তুমি কি এখনও আমার ফোন নম্বরটা রেখেছ?”

নীখিল পকেট থেকে ফোন বের করল।

—“তোমার নম্বর বদলেছে?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“না।”

—“তাহলে আমি কেন মুছব?”

রিয়া আর কিছু বলল না।

শুধু ধীরে চলে গেল।

নীখিল তার চলে যাওয়া দেখল।

সেদিন রাতেই রিয়ার ফোন এল।

নীখিল সঙ্গে সঙ্গে ধরল।

—“হ্যালো?”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর রিয়ার কণ্ঠ।

—“ঘুমাচ্ছিলে?”

—“না।”

—“একটা কথা বলব?”

—“বল।”

—“আজ তোমার সঙ্গে দেখা করার পর আমার মনে হলো, এত বছর পরও কিছু কথা মানুষের ভেতরে একই রকম থেকে যায়।”

নীখিল চুপ করে শুনছিল।

—“কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি।”

—“কিসের?”

—“সবকিছু আবার জটিল হয়ে যাওয়ার।”

নীখিল ধীরে বলল,

—“আমি তোমার জীবন জটিল করতে চাই না।”

—“তাহলে কী চাও?”

প্রশ্নটা শুনে নীখিল থেমে গেল।

তার কাছে উত্তরটা খুব সহজ ছিল।

সে রিয়াকে আবার নিজের জীবনে চায়।

কিন্তু সেটা বলা মানে শুধু নিজের অনুভূতির কথা বলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রিয়ার বর্তমান জীবন, তার সিদ্ধান্ত, তার দায়িত্ব।

তাই নীখিল বলল,

—“আমি শুধু চাই, তুমি নিজের জীবনে সত্যি করে সুখী হও।”

ওপাশে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ নেই।

তারপর রিয়া খুব আস্তে বলল,

—“তুমি জানো, এই কথাটাই তোমাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে?”

নীখিল মৃদু হাসল।

—“আর তুমি জানো, তুমি এখনও আগের মতোই?”

—“কীভাবে?”

—“যে কথাগুলো শুনলে আমার সব রাগ চলে যায়।”

রিয়া হেসে ফেলল।

সেই হাসি ফোনের ওপাশ থেকেও নীখিল স্পষ্ট শুনতে পেল।

কিছুক্ষণ তারা চুপচাপ কথা বলল।

স্কুলের স্মৃতি।

বন্ধুদের কথা।

পুরোনো দুষ্টুমি।

কে কাকে প্রথম চিনেছিল।

কে কার ওপর বেশি রাগ করত।

কথার মাঝে কখন রাত অনেক হয়ে গেল, কেউ বুঝতে পারল না।

শেষে রিয়া বলল,

—“নীখিল?”

—“হুম?”

—“কাল কি তুমি ফ্রি?”

—“তোমার জন্য?”

রিয়া একটু হেসে বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“সবসময়।”

রিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—“তাহলে কাল তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।”

—“কোথায়?”

—“যেখানে আমাদের গল্পটা আসলে শুরু হয়েছিল।”

নীখিল অবাক হয়ে গেল।

—“কোথায়?”

রিয়া উত্তর দিল না।

শুধু বলল,

—“কাল দেখবে।”

ফোন কেটে গেল।

নীখিল কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর জানালার বাইরে তাকাল।

রাতের শহর নিস্তব্ধ নয়।

দূরে গাড়ির আলো।

রাস্তায় মানুষের চলাচল।

সবকিছু স্বাভাবিক।

কিন্তু নীখিলের মনে হচ্ছিল, তার জীবন আবার ধীরে ধীরে সেই পুরোনো পথে হাঁটতে শুরু করেছে।

যে পথে একদিন রিয়া তার পাশে হাঁটত।

পরদিন কোথায় নিয়ে যাবে রিয়া?

কোন জায়গায় শুরু হয়েছিল তাদের গল্প?

নীখিলের মনে একটা জায়গার নাম বারবার ভেসে উঠল।

পুরোনো নদীর ঘাট।

স্কুল থেকে একটু দূরে ছিল সেই জায়গাটা।

কিশোর বয়সে তারা কয়েকবার সেখানে গিয়েছিল।

সেখানে বসেই রিয়া একদিন বলেছিল—

“একদিন যদি আমরা আলাদা হয়ে যাই, তবুও তুমি আমাকে ভুলে যেও না।”

নীখিল তখন হেসে বলেছিল—

“তুমি কি আমাকে ভুলতে দেবে?”

সেই কথাটা আজও তার মনে আছে।

আর পরদিন রিয়া তাকে সেখানে নিয়ে যাবে।

হয়তো এত বছর পর সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এসেছে।

পরদিন বিকেলটা ছিল অদ্ভুত শান্ত।

আকাশে হালকা মেঘ। রোদের তেজ নেই। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে নীখিল যখন নদীর ঘাটের কাছে পৌঁছাল, তখন রিয়া ইতিমধ্যেই সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল।

নীল রঙের একটা সাধারণ পোশাক পরেছে সে। চুলগুলো খোলা। নদীর বাতাসে চুল উড়ে এসে বারবার মুখের ওপর পড়ছে।

নীখিল কিছুক্ষণ দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

রিয়া যেন পনেরো বছর আগের সেই মেয়েটাই।

শুধু সময় তাকে একটু শান্ত করেছে।

আর চোখের ভেতর কিছু অদৃশ্য গল্প জমিয়ে দিয়েছে।

নীখিল কাছে যেতেই রিয়া ফিরে তাকাল।

—“অনেকক্ষণ হলো?”

—“না। এই তো এসেছি।”

রিয়া মৃদু হাসল।

—“তুমি এখনও সময়ের ব্যাপারে খুব নিয়ম মেনে চল।”

—“তুমি এখনও দেরি করো।”

—“আমি আজ ইচ্ছে করেই আগে এসেছি।”

—“কেন?”

রিয়া নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—“জানি না। হয়তো তোমার অপেক্ষা করতে ভালো লাগছিল।”

কথাটা বলেই সে চোখ নামিয়ে ফেলল।

নীখিলের বুকের ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে গেল।

দুজন পাশাপাশি নদীর ধারে হাঁটতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

শুধু নদীর পানির শব্দ আর দূরের নৌকার মাঝির ডাক।

হঠাৎ রিয়া বলল,

—“এই জায়গাটা মনে আছে?”

—“সবচেয়ে বেশি।”

—“তখন আমরা কত ছোট ছিলাম!”

—“ছোট ছিলাম, কিন্তু অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখতাম।”

রিয়া হেসে বলল,

—“তুমি বলেছিলে, তুমি একদিন পুরো পৃথিবী ঘুরে ছবি তুলবে।”

—“আর তুমি বলেছিলে, তুমি একটা স্কুল খুলবে।”

—“আমি সত্যিই স্কুল খুলতে চেয়েছিলাম।”

—“এখন?”

রিয়া একটু থেমে বলল,

—“এখনও চাই।”

নীখিল অবাক হলো।

—“তাহলে করনি কেন?”

—“সব স্বপ্ন নিজের মতো করে বাঁচা যায় না।”

নীখিল তার দিকে তাকাল।

—“তুমি সবসময় এমন কথা বলো কেন?”

—“কেমন?”

—“যেন তোমার নিজের জীবনের ওপর তোমার কোনো অধিকার নেই।”

রিয়া চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পর বলল,

—“সবাই নিজের জীবন নিজের মতো করে বেছে নিতে পারে না, নীখিল।”

—“কিন্তু চেষ্টা করতে পারে।”

রিয়া হেসে বলল,

—“তুমি এখনও খুব জেদি।”

—“আর তুমি এখনও পালিয়ে যাও।”

রিয়া এবার তার দিকে তাকাল।

—“আমি কোথায় পালাচ্ছি?”

নীখিল ধীরে বলল,

—“নিজের কাছ থেকে।”

রিয়া কিছু বলতে পারল না।

দুজনেই নদীর ধারে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল।

বাতাসটা একটু ঠান্ডা হয়ে এসেছে।

রিয়া ব্যাগ থেকে একটা ছোট ডায়েরি বের করল।

—“এটা দেখো।”

নীখিল ডায়েরিটা হাতে নিল।

পাতা খুলতেই পুরোনো কিছু লেখা চোখে পড়ল।

তারিখগুলো পনেরো বছর আগের।

কোথাও স্কুলের কথা।

কোথাও বন্ধুদের কথা।

কোথাও নীখিলের নাম।

একটা পাতায় লেখা—

“আজ নীখিল বলল, একদিন সে আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা দেখাবে।”

নীখিল হেসে ফেলল।

—“আমি এমন বলেছিলাম?”

—“হ্যাঁ।”

—“মিথ্যা বলেছিলাম।”

—“কেন?”

—“কারণ তখন আমি জানতাম না পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা কোনটা।”

রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“এখন জানো?”

নীখিল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—“হ্যাঁ।”

রিয়া অপেক্ষা করছিল।

—“কোথায়?”

নীখিল নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—“যেখানে মানুষ নিজের মতো থাকতে পারে।”

রিয়া ধীরে মাথা নাড়ল।

—“তাহলে এখনও জানো না।”

—“কেন?”

—“কারণ এমন জায়গা খুব কম।”

কথাটা বলে রিয়া ডায়েরিটা বন্ধ করল।

নীখিল তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, রিয়া আজ শুধু পুরোনো স্মৃতি ভাগ করতে তাকে এখানে আনেনি।

তার ভেতরে আরও কিছু আছে।

সে ধীরে বলল,

—“রিয়া, তুমি আমাকে কিছু বলতে চাও?”

রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“হ্যাঁ।”

—“বল।”

—“আমার আর আরিফের সম্পর্কটা এখন আগের মতো নেই।”

নীখিল চুপ।

—“আমরা অনেকদিন ধরে আলাদা ঘরে থাকি।”

সে থামল।

—“আমাদের মধ্যে কথা হয়, কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মতো নয়। অনেকদিন ধরে আমরা শুধু একটা সম্পর্কের নাম ধরে বেঁচে আছি।”

নীখিলের বুক ভার হয়ে এল।

কিন্তু সে কোনো আনন্দ দেখাল না।

শুধু বলল,

—“তোমরা কি আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা ভাবছ?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“হ্যাঁ।”

—“তারপর?”

—“জানি না।”

নীখিল খুব শান্তভাবে বলল,

—“তুমি কি এই সিদ্ধান্তটা আমার জন্য নিচ্ছ?”

রিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল।

—“না।”

—“তাহলে?”

—“আমার নিজের জন্য।”

নীখিল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

—“তাহলে ঠিক আছে।”

রিয়া অবাক হয়ে বলল,

—“তুমি কিছু জানতে চাইবে না?”

—“চাই।”

—“তাহলে জিজ্ঞেস করছ না কেন?”

নীখিল কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—“কারণ তোমার সিদ্ধান্ত তোমার। আমি তোমার জীবনে ফিরে আসার জন্য তোমাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বলব না।”

রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

—“তুমি এতটা বদলে গেছ।”

নীখিল হেসে বলল,

—“না। শুধু বড় হয়েছি।”

রিয়া চোখ মুছে বলল,

—“তুমি জানো, আমি তোমাকে কেন এত বছর ভুলতে পারিনি?”

নীখিলের বুক ধক করে উঠল।

—“কেন?”

রিয়া তার দিকে তাকাল।

—“কারণ তুমি কখনো আমাকে ছোট করে দেখোনি।”

নীখিল কিছু বলল না।

রিয়া ধীরে বলল,

—“স্কুলে সবাই বলত আমি খুব জেদি, খুব দুষ্টু। তুমি বলেছিলে আমি শুধু নিজের কথা বলতে জানি।”

—“সেটা তো সত্যি।”

রিয়া হেসে ফেলল।

—“আর তুমি বলেছিলে, আমি যদি কখনো সত্যি করে কিছু চাই, তাহলে সেটা পেতে লড়াই করতে।”

—“বলেছিলাম?”

—“হ্যাঁ।”

রিয়া নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—“কিন্তু আমি নিজের জীবনে সেটা করতে পারিনি।”

নীখিল ধীরে তার দিকে তাকাল।

—“এখন পারবে।”

—“যদি দেরি হয়ে যায়?”

—“কিছু সিদ্ধান্তের জন্য দেরি হয়। কিন্তু নিজের জীবন বেছে নেওয়ার জন্য কখনো দেরি হয় না।”

রিয়া চুপ করে রইল।

তারপর হঠাৎ বলল,

—“নীখিল?”

—“হুম?”

—“তুমি কি আমাকে এখনও ভালোবাসো?”

প্রশ্নটা শুনে নীখিল স্থির হয়ে গেল।

নদীর বাতাস যেন হঠাৎ থেমে গেছে।

সে অনেক বছর ধরে নিজের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে।

কিন্তু আজ রিয়া নিজেই সামনে বসে আছে।

নীখিল ধীরে তার দিকে তাকাল।

—“তুমি কি সত্যি উত্তরটা শুনতে চাও?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“হ্যাঁ।”

নীখিল খুব শান্ত স্বরে বলল,

—“আমি জানি না ভালোবাসা কাকে বলে। কিন্তু পনেরো বছর পর তোমাকে দেখে আমার মনে হয়েছে, আমি তোমাকে কোনোদিন ভুলিনি।”

রিয়ার চোখ বেয়ে একটা অশ্রু নেমে এল।

—“এটা কি ভালোবাসা?”

নীখিল মৃদু হাসল।

—“হয়তো।”

রিয়া চোখ নামিয়ে বলল,

—“আমিও তোমাকে ভুলিনি।”

কিছুক্ষণ তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

কেউ এগিয়ে গেল না।

কেউ কোনো প্রতিশ্রুতি দিল না।

শুধু দুজন মানুষ নিজেদের সত্যিটা স্বীকার করল।

হঠাৎ দূর থেকে কারও কণ্ঠ শোনা গেল।

—“রিয়া!”

রিয়া চমকে উঠে দাঁড়াল।

নীখিলও ঘুরে তাকাল।

একজন পুরুষ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

রিয়ার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

নীখিল বুঝে গেল।

লোকটা আরিফ।

রিয়া ধীরে বলল,

—“তুমি এখানে কেন এসেছ?”

আরিফ কাছে এসে দাঁড়াল।

তার চোখ একবার নীখিলের দিকে গেল।

তারপর আবার রিয়ার দিকে।

—“তোমাকে নিতে এসেছি।”

রিয়া শান্ত গলায় বলল,

—“আমি নিজে যেতে পারি।”

আরিফের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

—“তাহলে আমার সঙ্গে কথা না বলে এখানে আসার দরকার ছিল?”

—“আমি কোথায় যাব, সেটা নিয়ে তোমার সঙ্গে এখন কথা বলতে চাই না।”

আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর নীখিলের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আপনি নীখিল?”

নীখিল মাথা নাড়ল।

—“হ্যাঁ।”

আরিফ কিছু বলল না।

কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতে অস্বস্তি স্পষ্ট।

রিয়া বুঝতে পারল পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে।

সে নীখিলের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আমি পরে তোমাকে ফোন করব।”

নীখিল মাথা নাড়ল।

রিয়া আরিফের সঙ্গে চলে গেল।

নীখিল নদীর ধারে দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হলো, এতদিন পর ফিরে পাওয়া মানুষটাকে আবারও তার জীবন থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে বাস্তবতা।

কিন্তু এবার সে চুপ করে থাকবে না।

রিয়াকে নিজের জীবনে পাওয়ার জন্য নয়—

রিয়ার নিজের জীবনটা যেন তার নিজের হয়, সেই জন্য।

আর দূরে যেতে যেতে রিয়া একবার পেছনে তাকাল।

নীখিল এখনও সেখানে দাঁড়িয়ে।

দুজনের চোখ আবার মিলল।

রিয়া ঠোঁট নাড়ল।

কোনো শব্দ শোনা গেল না।

তবু নীখিল বুঝতে পারল—

সে বলছে,

“অপেক্ষা করো।”

আর নীখিল মনে মনে উত্তর দিল—

“এবার যতদিনই লাগুক, আমি অপেক্ষা করব।”

নদীর ঘাট থেকে ফিরে সেদিন রাতে নীখিল অনেকক্ষণ জানালার পাশে বসে ছিল।

তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল রিয়ার মুখ।

বিশেষ করে চলে যাওয়ার আগে রিয়ার সেই শেষ দৃষ্টি।

কোনো কথা ছিল না।

তবু যেন অনেক কথা বলা হয়ে গিয়েছিল।

“অপেক্ষা করো।”

এই একটা শব্দই নীখিলের মনে সারারাত ঘুরতে থাকল।

কিন্তু সে জানত, অপেক্ষা করা মানে শুধু বসে থাকা নয়।

রিয়ার জীবনে এখন অনেক জটিলতা।

তার নিজের একটা সংসার আছে। একটা সম্পর্ক আছে, যেটা হয়তো শেষের দিকে এসে দাঁড়িয়েছে। আর নীখিল হঠাৎ ফিরে এসে সেই সম্পর্কের মধ্যে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে না।

সে চায়ও না।

রিয়াকে সে ফিরে পেতে চায় ঠিকই, কিন্তু কোনো ভুল সিদ্ধান্তের বিনিময়ে নয়।

পরের তিন দিন রিয়ার কোনো ফোন এল না।

নীখিল প্রথম দিন অপেক্ষা করল।

দ্বিতীয় দিনও।

তৃতীয় দিনে সে নিজেই ফোন করতে গিয়েও থেমে গেল।

ফোনের স্ক্রিনে রিয়ার নাম ভেসে উঠছিল।

আঙুলটা কলের ওপর রাখা।

তারপর সে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

নিজেকে বলল,

“ওকে সময় দিতে হবে।”

সেদিন সন্ধ্যায় সজীব তার বাসায় এল।

দরজা খুলে নীখিলকে দেখে বলল,

—“কী অবস্থা?”

—“কীসের?”

—“যে রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ পাঁচ মিনিট পরপর ফোন দেখে।”

নীখিল হেসে বলল,

—“তুই বস।”

সজীব সোফায় বসে চারপাশে তাকিয়ে বলল,

—“রিয়ার সঙ্গে কথা হয়নি?”

—“না।”

—“তুই ফোন করিসনি?”

—“না।”

সজীব অবাক হয়ে তাকাল।

—“এটা আবার কেমন ভালোবাসা?”

নীখিল শান্তভাবে বলল,

—“ওর ওপর কোনো চাপ দিতে চাই না।”

সজীব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“তুই জানিস, রিয়া ছোটবেলা থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পেত?”

—“হ্যাঁ।”

—“তখনও তুই ওর পাশে থাকতিস।”

নীখিল মৃদু হেসে বলল,

—“তখন ব্যাপারগুলো সহজ ছিল।”

—“এখন কঠিন?”

—“অনেক।”

সজীব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“কঠিন জিনিসের জন্যই তো মানুষকে সাহসী হতে হয়।”

নীখিল কোনো উত্তর দিল না।

চতুর্থ দিন সকালে রিয়ার ফোন এল।

নীখিল তখন ক্যামেরা নিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

ফোনের স্ক্রিনে নামটা দেখেই সে থেমে গেল।

তারপর কল ধরল।

—“হ্যালো?”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর রিয়ার কণ্ঠ।

—“কেমন আছ?”

—“ভালো। তুমি?”

—“ভালো আছি।”

নীখিল হেসে বলল,

—“এই ‘ভালো আছি’ কথাটা তুমি অনেকবার বলো।”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“কারণ সবাইকে সব কথা বলা যায় না।”

—“আমাকে যায়?”

ওপাশে নীরবতা।

তারপর খুব আস্তে রিয়া বলল,

—“হয়তো।”

নীখিল আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

রিয়া বলল,

—“সেদিনের জন্য দুঃখিত।”

—“কেন?”

—“আরিফ যেভাবে তোমার সামনে কথা বলেছিল…”

—“তোমাকে তার জন্য দুঃখিত হতে হবে না।”

—“তবুও।”

নীখিল জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—“তুমি ঠিক আছ তো?”

রিয়া এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

নীখিলের বুক কেঁপে উঠল।

—“কী সিদ্ধান্ত?”

—“আমি কিছুদিনের জন্য আমার মায়ের বাসায় থাকব।”

—“আরিফ?”

—“ওর সঙ্গে কথা হয়েছে।”

—“সব ঠিক আছে?”

—“না। কিন্তু এবার আমাকে নিজের জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।”

নীখিল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—“তুমি নিশ্চিত?”

—“হ্যাঁ।”

রিয়ার কণ্ঠে এবার আগের সেই দ্বিধা ছিল না।

ছিল একটা দৃঢ়তা।

নীখিলের মনে হলো, বহু বছর পর সে সেই পুরোনো রিয়াকে আবার শুনছে।

যে মেয়েটা নিজের কথা বলতে জানত।

—“আমি তোমার জন্য কিছু করতে চাই না, নীখিল।”

—“আমি জানি।”

—“আমি চাই না তুমি ভাবো, তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমি আমার জীবন বদলাচ্ছি।”

—“আমি সেটা ভাবব না।”

—“আমি শুধু বুঝেছি, এত বছর ধরে আমি নিজের জীবনটাকে অন্যদের ইচ্ছেমতো চালিয়েছি।”

নীখিল ধীরে বলল,

—“এবার নিজের মতো চালাও।”

রিয়া হেসে ফেলল।

—“তুমি এখনও একই কথা বলো।”

—“কোনটা?”

—“নিজের মতো বাঁচতে বলো।”

—“কারণ তোমাকে সেটা করতেই হবে।”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—“আজ বিকেলে দেখা করবে?”

নীখিলের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

—“কোথায়?”

—“তুমি ঠিক করো।”

—“পুরোনো বইয়ের দোকানে?”

—“যেখানে আমরা প্রথম একসঙ্গে বই কিনেছিলাম?”

—“হ্যাঁ।”

রিয়া মৃদু স্বরে বলল,

—“ঠিক আছে।”

বিকেলে তারা পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে দেখা করল।

দোকানটা এখন অনেক ছোট মনে হচ্ছে।

নীখিল দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,

—“এখানেই তুমি প্রথম আমাকে একটা উপন্যাস কিনে দিয়েছিলে।”

রিয়া হেসে বলল,

—“তুমি টাকা আনোনি।”

—“তুমি বলেছিলে, পরে দেব।”

—“তুমি আর কখনো দাওনি।”

—“আজ দিতে পারি।”

—“এত বছর পর?”

—“সুদসহ।”

রিয়া হেসে ফেলল।

দুজন দোকানের ভেতরে ঢুকল।

পুরোনো বইয়ের গন্ধে তাদের মন আবার হালকা হয়ে গেল।

রিয়া একটা বই হাতে নিয়ে বলল,

—“এটা মনে আছে?”

—“হ্যাঁ।”

—“তুমি আমাকে বলেছিলে, গল্পের শেষটা তোমার পছন্দ হয়নি।”

—“কারণ নায়ক-নায়িকার মিল হয়নি।”

—“তখন তুমি খুব বোকা ছিলে।”

—“এখন?”

—“এখনও।”

দুজনেই হাসল।

অনেকদিন পর রিয়াকে এতটা স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল।

নীখিল তাকিয়ে ছিল তার দিকে।

রিয়া সেটা বুঝে বলল,

—“কী দেখছ?”

—“তোমাকে।”

—“কেন?”

—“তুমি হাসছ।”

রিয়া একটু থেমে গেল।

—“আমি কি হাসি না?”

—“আগে যেমন হাসতে, তেমন না।”

রিয়া ধীরে বলল,

—“আগের রিয়াকে অনেকদিন আগে কোথাও রেখে এসেছি।”

নীখিল বলল,

—“তাহলে তাকে ফিরিয়ে আনো।”

রিয়া তার দিকে তাকাল।

—“তুমি কি সাহায্য করবে?”

—“যতটা পারি।”

রিয়া মৃদু হাসল।

—“শুধু বন্ধু হয়ে?”

প্রশ্নটা শুনে নীখিল থেমে গেল।

তারপর বলল,

—“তুমি যেটা স্বস্তি মনে করো।”

রিয়া কোনো উত্তর দিল না।

কিন্তু তার চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি ফুটে উঠল।

সন্ধ্যায় তারা বইয়ের দোকান থেকে বের হলো।

রাস্তায় হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

রিয়া ছাতা খুলল।

নীখিল পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

—“মনে আছে? এক ছাতার নিচে আমরা কতবার বাড়ি ফিরেছি।”

রিয়া হেসে বলল,

—“তখন ছাতাটা তোমার ছিল।”

—“আজও আছে।”

—“তুমি এখনও রেখেছ?”

—“কিছু জিনিস ফেলে দিতে ইচ্ছে করে না।”

রিয়া কিছু বলল না।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

কিছু দূর যাওয়ার পর রিয়া থেমে বলল,

—“নীখিল।”

—“হুম?”

—“আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।”

—“বল।”

—“যদি আমার জীবনে আবার নতুন করে কিছু শুরু হয়…”

সে থেমে গেল।

নীখিল অপেক্ষা করল।

—“আমি চাই সেটা যেন কোনো পুরোনো স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে না থাকে।”

নীখিল বুঝতে পারল কথাটার গভীরতা।

সে বলল,

—“তাহলে নতুন করে শুরু করব।”

রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—“তুমি এত সহজে বললে?”

—“কারণ পুরোনো গল্পটা আমরা দুজনেই জানি।”

—“আর নতুন গল্প?”

—“সেটা ধীরে ধীরে লিখব।”

রিয়ার চোখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—“কোনো প্রতিশ্রুতি দিও না।”

—“দিচ্ছি না।”

—“আমিও না।”

—“ঠিক আছে।”

দুজন আবার হাঁটতে শুরু করল।

কিন্তু সেই শান্ত মুহূর্তটা বেশি সময় স্থায়ী হলো না।

রিয়ার ফোন বেজে উঠল।

সে ফোন ধরতেই মুখের রং বদলে গেল।

—“হ্যালো?”

ওপাশ থেকে কিছু বলা হলো।

রিয়া চুপ করে শুনল।

তারপর বলল,

—“আমি এখনই আসছি।”

ফোন রেখে সে নীখিলের দিকে তাকাল।

—“কী হয়েছে?”

রিয়া উত্তর দিল না।

শুধু বলল,

—“আমাকে যেতে হবে।”

—“কেউ ফোন করেছিল?”

—“হ্যাঁ।”

—“আরিফ?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“না।”

নীখিলের কণ্ঠে উদ্বেগ।

—“তাহলে?”

রিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—“আমার বাবা হাসপাতালে।”

নীখিল থমকে গেল।

—“কী হয়েছে?”

—“হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।”

—“আমি তোমার সঙ্গে যাব।”

রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—“না, দরকার নেই।”

—“রিয়া—”

—“নীখিল, এটা আমার পরিবারের ব্যাপার।”

—“আমি বুঝি।”

—“তুমি শুধু… অপেক্ষা করো।”

নীখিল ধীরে মাথা নাড়ল।

—“ঠিক আছে।”

রিয়া কয়েক পা এগিয়ে গেল।

তারপর আবার ফিরে তাকাল।

চোখে এবার ভয়।

—“আমার জন্য প্রার্থনা করো।”

নীখিল শান্তভাবে বলল,

—“সব ঠিক হবে।”

রিয়া চলে গেল।

নীখিল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কিছু মুহূর্তের পরেই যেন অদৃশ্য কোনো পরীক্ষা এসে দাঁড়ায়।

সে জানত না সামনে কী আছে।

শুধু জানত—

এবার রিয়া একা নয়।

যত কঠিন সময়ই আসুক, সে অন্তত দূর থেকে হলেও পাশে থাকবে।

আর সেই রাতেই রিয়ার কাছ থেকে একটা মেসেজ এল।

মাত্র কয়েকটি শব্দ—

“নীখিল, বাবার অবস্থা ভালো না। তোমার সঙ্গে খুব জরুরি কথা আছে।”

মেসেজটা পড়ে নীখিলের বুক কেঁপে উঠল।

কী কথা বলতে চায় রিয়া?

তার বাবার অসুস্থতার সঙ্গে কি তাদের পুরোনো গল্পের কোনো সম্পর্ক আছে?

নাকি এমন কোনো সত্য সামনে আসতে চলেছে, যা এতদিন রিয়াও জানত না?

নীখিল ফোনটা শক্ত করে ধরে রইল।

তারপর শুধু একটা উত্তর পাঠাল—

“আমি আছি। তুমি যখনই ডাকবে, আমি আসব।”

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।

নীখিল বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল। রিয়ার শেষ মেসেজটা আসার পর অনেকক্ষণ হয়ে গেছে।

“তোমার সঙ্গে খুব জরুরি কথা আছে।”

কথাটা তার মাথা থেকে কিছুতেই বের হচ্ছিল না।

শেষ পর্যন্ত রাত বারোটার কিছু আগে ফোন বেজে উঠল।

রিয়া।

নীখিল সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরল।

—“হ্যালো?”

ওপাশে রিয়ার কণ্ঠ খুব নিচু।

—“তুমি কি এখন বের হতে পারবে?”

—“হ্যাঁ। কোথায় আসব?”

—“হাসপাতালে।”

—“তোমার বাবার কী অবস্থা?”

—“ডাক্তার বলেছে এখন কিছুটা স্থিতিশীল। কিন্তু…”

রিয়া থেমে গেল।

—“কিন্তু কী?”

—“তুমি এলে বলব।”

নীখিল আর কোনো প্রশ্ন করল না।

হাসপাতালের করিডোরে পৌঁছে নীখিল রিয়াকে দেখতে পেল।

সে একা একটা চেয়ারে বসে ছিল।

চোখ লাল।

চুল এলোমেলো।

সারাদিনের ক্লান্তি মুখে স্পষ্ট।

নীখিল কাছে যেতেই রিয়া উঠে দাঁড়াল।

কিছু বলতে গিয়েও পারল না।

নীখিল ধীরে বলল,

—“কেমন আছেন?”

—“এখন স্থির।”

তারপর একটু থেমে বলল,

—“তুমি এসেছ।”

—“তুমি ডাকলে।”

রিয়া কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

—“আমার খুব ভয় লাগছে।”

নীখিল তার পাশে বসে বলল,

—“ভয় পেও না। ডাক্তাররা দেখছেন।”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“আমি বাবাকে কখনো বুঝতে পারিনি।”

—“সব বাবা-মাকে সবসময় বোঝা যায় না।”

—“কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, অনেক কথা বলা বাকি ছিল।”

নীখিল চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ পর রিয়া বলল,

—“তুমি জানো, বাবা তোমার কথা জানতেন?”

নীখিল অবাক হলো।

—“আমার কথা?”

—“হ্যাঁ।”

—“কীভাবে?”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“আমি স্কুলে তোমার কথা অনেক বলতাম।”

—“তুমি?”

—“হ্যাঁ। খুব বেশি।”

নীখিলের মুখে হালকা হাসি ফুটল।

—“তাহলে উনি আমাকে চিনতেন?”

—“ছবিতে।”

—“কী ছবি?”

—“আমাদের স্কুলের ছবি।”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“বাবা সবসময় বলতেন, তুমি নাকি আমার খুব কাছের বন্ধু।”

নীখিল ধীরে বলল,

—“তখন তো ছিলাম।”

রিয়া তার দিকে তাকাল।

—“এখন?”

নীখিল কোনো উত্তর দিল না।

রিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর রিয়ার মা এসে বললেন,

—“রিয়া, ডাক্তার তোমাকে ডাকছেন।”

রিয়া উঠে দাঁড়াল।

নীখিল বলল,

—“আমি বাইরে থাকছি।”

রিয়া তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।

প্রায় আধঘণ্টা পর রিয়া ফিরে এল।

তার হাতে একটা পুরোনো খাম।

সে নীখিলের সামনে এসে দাঁড়াল।

—“এটা বাবা আমাকে দিয়েছেন।”

—“আমাকে কেন দেখাচ্ছ?”

রিয়া খামটা তার হাতে দিল।

—“কারণ এটা তোমার।”

নীখিল খামটা খুলে দেখল।

ভেতরে একটা পুরোনো ছবি।

ছবিতে স্কুলের অনুষ্ঠানে নীখিল আর রিয়া পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

পেছনে রিয়ার বাবা।

ছবির নিচে একটা তারিখ।

পনেরো বছর আগের।

নীখিল অবাক হয়ে বলল,

—“এটা উনি রেখেছিলেন?”

—“হ্যাঁ।”

তারপর রিয়া ধীরে বলল,

—“আর একটা কথা বলেছেন।”

—“কী?”

—“তুমি যদি কোনোদিন আমার জীবনে ফিরে আসো, তাহলে যেন তোমাকে আর দূরে না সরাই।”

নীখিল স্তব্ধ হয়ে গেল।

—“উনি এমন কথা কেন বললেন?”

রিয়া চোখের পানি মুছে বলল,

—“কারণ বাবা জানতেন, আমি তোমাকে কখনো ভুলিনি।”

নীখিলের বুক ভার হয়ে গেল।

রিয়া বলল,

—“আমার বিয়ের সময়ও বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি সত্যিই এই বিয়ে করতে চাই কি না।”

—“তুমি কী বলেছিলে?”

—“আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ।”

—“কেন?”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“কারণ তখন আমি ভাবতাম, পুরোনো কোনো অনুভূতির জন্য নিজের জীবন থামিয়ে রাখা উচিত নয়।”

নীখিল ধীরে বলল,

—“তুমি ভুল করোনি।”

রিয়া তার দিকে তাকাল।

—“কিন্তু এখন বুঝি, অনুভূতিকে অস্বীকার করেও মানুষ পুরোপুরি সুখী হতে পারে না।”

নীখিল কিছু বলল না।

রিয়া তার পাশে বসে পড়ল।

—“নীখিল, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিতে চাই।”

—“কী সিদ্ধান্ত?”

—“আমি আরিফের সঙ্গে সম্পর্কটা শেষ করতে চাই।”

নীখিলের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—“এই সিদ্ধান্তটা তুমি আমার জন্য নেবে না।”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“না।”

—“তাহলে কেন?”

—“কারণ আমি বুঝেছি, এই সম্পর্কটা আমি আর ধরে রাখতে পারছি না।”

—“তুমি কি নিশ্চিত?”

—“অনেক বছর ধরে ভাবছি।”

নীখিল ধীরে বলল,

—“তাহলে তোমার সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান করি।”

রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

—“তুমি আমাকে আটকাবে না?”

—“কেন আটকাব?”

—“কারণ তুমি আমাকে…”

সে থেমে গেল।

নীখিল শান্তভাবে বলল,

—“আমি তোমাকে ভালোবাসি। তাই তোমার সিদ্ধান্তের ওপর আমার অধিকার নেই।”

রিয়া চোখের পানি মুছে ফেলল।

—“এই কথাটার জন্যই তোমাকে এত বছর পরও মনে পড়ে।”

নীখিল হালকা হাসল।

—“তাহলে মনে রেখো।”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“এবার আর ভুলব না।”

ভোরের দিকে রিয়ার বাবা কিছুটা সুস্থ বোধ করলেন।

রিয়া তার কাছে বসে ছিল।

নীখিল দূর থেকে সব দেখছিল।

হঠাৎ রিয়ার বাবা তাকে কাছে ডাকলেন।

—“নীখিল?”

নীখিল এগিয়ে গেল।

—“জি।”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

—“তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, অনেক বছর পর আমার মেয়েটা আবার হাসতে শিখেছে।”

নীখিল মাথা নিচু করল।

—“রিয়া নিজেই শক্ত মেয়ে।”

—“ছিল।”

তিনি একটু থেমে বললেন,

—“এখনও আছে। শুধু মাঝে মাঝে কাউকে পাশে দরকার হয়।”

নীখিল কোনো উত্তর দিল না।

রিয়ার বাবা তার হাত ধরে বললেন,

—“আমার একটা অনুরোধ আছে।”

—“বলুন।”

—“রিয়াকে কখনো নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে না।”

নীখিল দৃঢ়ভাবে বলল,

—“কখনো না।”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

—“তাহলে আমি নিশ্চিন্ত।”

সকালে নীখিল হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসছিল।

রিয়া তার সঙ্গে গেট পর্যন্ত এল।

—“তুমি বাসায় যাবে?”

—“হ্যাঁ।”

—“একটু বিশ্রাম নাও।”

নীখিল বলল,

—“তুমিও।”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—“আজ রাতে আমি মায়ের বাসায় যাব।”

—“ঠিক আছে।”

—“আরিফকে আমি সব বলে দিয়েছি।”

নীখিল থেমে গেল।

—“কী বলেছে?”

রিয়া মৃদু হাসল।

—“সে রাগ করেছে। কিন্তু এবার আমি আর ভয় পাইনি।”

নীখিলের চোখে গর্ব ফুটে উঠল।

—“এই তো আমার পরিচিত রিয়া।”

রিয়া হেসে বলল,

—“তোমার পরিচিত রিয়া?”

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে একটা কথা বলি?”

—“বল।”

—“আমি তোমার সঙ্গে একটা নতুন স্মৃতি তৈরি করতে চাই।”

নীখিল মৃদু হাসল।

—“কোথায়?”

রিয়া একটু ভেবে বলল,

—“যেখানে আমাদের কোনো পুরোনো স্মৃতি নেই।”

—“কেন?”

—“কারণ এবার আমি চাই, আমাদের গল্পটা শুধু অতীতের ওপর দাঁড়িয়ে না থাকুক।”

নীখিল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—“ঠিক আছে।”

—“তাহলে আজ সন্ধ্যায় দেখা হবে?”

—“হবে।”

রিয়া চলে গেল।

নীখিল কিছুক্ষণ হাসপাতালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হলো, এতদিন পর তাদের গল্প সত্যিই একটা নতুন পথে হাঁটতে শুরু করেছে।

কিন্তু সে জানত না—

সেদিন দুপুরেই আরিফ তার ফোনে একটা মেসেজ পাঠাবে।

মাত্র এক লাইন।

“আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। আজ সন্ধ্যায় একা দেখা করুন।”

নীখিল মেসেজটা পড়ে স্থির হয়ে গেল।

রিয়াকে সে কিছু জানাল না।

কারণ সে জানত, এই দেখা শুধু তার আর আরিফের মধ্যে নয়।

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রিয়ার ভবিষ্যৎ।

আর নীখিল প্রথমবার বুঝতে পারল—

কাউকে ভালোবাসা মানে শুধু তাকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছা নয়।

কখনো কখনো তাকে রক্ষা করার জন্য নিজের অনুভূতিকেও চুপ করিয়ে রাখতে হয়।

সন্ধ্যার আগে নীখিল ঠিক করল—

সে আরিফের সঙ্গে দেখা করবে।

সন্ধ্যা নামার আগেই নীখিল শহরের এক নিরিবিলি ক্যাফেতে পৌঁছে গেল।

আরিফ তাকে এখানেই দেখা করতে বলেছিল।

ক্যাফের এক কোণের টেবিলে বসে নীখিল অপেক্ষা করছিল। তার মনে কোনো রাগ ছিল না। শুধু একটা অদ্ভুত অস্বস্তি।

কিছুক্ষণ পর আরিফ এসে সামনে বসে পড়ল।

দুজনের মধ্যে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর আরিফ বলল,

—“আপনি জানেন আমি কেন আপনাকে ডেকেছি?”

—“সম্ভবত রিয়ার ব্যাপারে।”

আরিফ মাথা নাড়ল।

—“হ্যাঁ।”

নীখিল শান্তভাবে বলল,

—“আমি আপনার আর রিয়ার ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে চাই না।”

আরিফ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—“আপনি এখনও তাকে ভালোবাসেন?”

প্রশ্নটা সরাসরি।

নীখিলও সরাসরি উত্তর দিল।

—“হ্যাঁ।”

আরিফের চোখে অদ্ভুত একটা ক্লান্তি ফুটে উঠল।

—“আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো মিথ্যা বলবেন।”

—“মিথ্যা বলার কোনো কারণ নেই।”

আরিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“রিয়া আপনাকে পনেরো বছর ধরে ভুলতে পারেনি।”

নীখিল চুপ করে রইল।

—“আমি বিয়ের পর সেটা বুঝতে পেরেছিলাম।”

—“তাহলে?”

—“আমি ভেবেছিলাম সময়ের সঙ্গে সব বদলে যাবে।”

আরিফ জানালার বাইরে তাকাল।

—“কিন্তু বদলায়নি।”

নীখিল কিছু বলল না।

আরিফ বলল,

—“আপনি জানেন, আমাদের বিয়ে কেন ভেঙে যাচ্ছে?”

—“রিয়া বলেছে আমরা দুজন আলাদা হয়ে গেছি।”

—“সেটা ঠিক। কিন্তু পুরো সত্যি নয়।”

নীখিল তার দিকে তাকাল।

আরিফ ধীরে বলল,

—“রিয়া কখনো আমাকে ঘৃণা করেনি। আমিও তাকে ঘৃণা করি না। কিন্তু আমরা একে অপরকে সেইভাবে ভালোবাসিনি, যেভাবে একটা সংসার টিকিয়ে রাখতে হয়।”

নীখিলের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না।

আরিফ বলল,

—“আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি। ও-ও করেছে। কিন্তু ওর ভেতরে একটা জায়গা সবসময় খালি ছিল।”

—“আমার জন্য?”

আরিফ হালকা হাসল।

—“হয়তো।”

তারপর সে পকেট থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করল।

ছবিটা নীখিলের দিকে বাড়িয়ে দিল।

ছবিতে স্কুলের ইউনিফর্ম পরা নীখিল আর রিয়া।

দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাসছে।

নীখিল ছবিটা দেখে থেমে গেল।

—“এটা কোথায় পেলেন?”

—“রিয়ার পুরোনো জিনিসের মধ্যে।”

আরিফ ধীরে বলল,

—“বিয়ের পর একদিন ওর জিনিস গোছাতে গিয়ে ছবিটা পাই।”

—“তারপর?”

—“তখনই বুঝেছিলাম, এই মানুষটার জীবনে এমন একটা অধ্যায় আছে, যেটা আমি কখনো ছুঁতে পারব না।”

নীখিল চুপ করে রইল।

আরিফ বলল,

—“আমি আপনাকে একটা অনুরোধ করতে চাই।”

—“কী?”

—“রিয়াকে এখনই কোনো প্রতিশ্রুতি দেবেন না।”

নীখিল অবাক হলো।

—“কেন?”

—“কারণ ও এখন দুর্বল। বাবার অসুস্থতা, আমাদের সম্পর্কের ভাঙন, পুরোনো স্মৃতি—সব একসঙ্গে এসেছে। এই সময়ে আপনার প্রতি ওর অনুভূতি আরও তীব্র হওয়া স্বাভাবিক।”

নীখিল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“আপনি ঠিক বলেছেন।”

আরিফ অবাক হয়ে তাকাল।

—“আপনি রাগ করলেন না?”

—“না। কারণ আমি চাই না রিয়া কোনো সিদ্ধান্ত আবেগের মুহূর্তে নিক।”

আরিফ মৃদু হাসল।

—“তাহলে হয়তো আমি ভুল মানুষকে নিয়ে এতদিন ভয় পেয়েছি।”

নীখিল বলল,

—“আমি রিয়াকে চাই। কিন্তু তার স্বাধীন সিদ্ধান্তের বিনিময়ে নয়।”

আরিফ মাথা নাড়ল।

—“এই কারণেই হয়তো রিয়া আপনাকে এত বছর মনে রেখেছে।”

সেদিন রাতে নীখিল রিয়ার সঙ্গে দেখা করল না।

রিয়াকে শুধু একটা মেসেজ পাঠাল—

“আজ দেখা না করলেও চলবে। তুমি একটু নিজের মতো সময় কাটাও।”

কিছুক্ষণ পর রিয়ার উত্তর এল—

“তুমি ঠিক আছ?”

নীখিল লিখল,

“হ্যাঁ। তুমি?”

“তোমার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করছে।”

নীখিল অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর লিখল—

“আমারও। কিন্তু আজ নয়। কাল।”

রিয়া শুধু লিখল—

“ঠিক আছে।”

পরদিন বিকেলে তারা শহরের একটা ছোট্ট পার্কে দেখা করল।

এই জায়গাটা তাদের কোনো পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে জড়িত নয়।

নীখিল ইচ্ছে করেই এই জায়গাটা বেছে নিয়েছিল।

রিয়া এসে বলল,

—“তুমি এখানে কেন এনেছ?”

—“তুমি বলেছিলে, নতুন স্মৃতি চাই।”

রিয়া চারপাশে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—“এখানে সত্যিই আমাদের কোনো স্মৃতি নেই।”

—“তাই তো।”

দুজন একটা বেঞ্চে বসল।

কিছুক্ষণ পর রিয়া বলল,

—“গতকাল তুমি আমাকে এড়িয়ে গেলে।”

—“এড়াইনি।”

—“তাহলে?”

নীখিল সত্যিটা বলল।

—“আরিফের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।”

রিয়া চুপ করে গেল।

—“সে কী বলেছে?”

—“তোমার কথা।”

—“আর?”

—“সে বলেছে, তুমি এখন অনেক চাপের মধ্যে আছ। তাই আমি যেন তোমাকে কোনো প্রতিশ্রুতি না দিই।”

রিয়া কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

—“তুমি কী বলেছ?”

—“আমি বলেছি, আমি তোমাকে কোনো সিদ্ধান্তে বাধ্য করব না।”

রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

—“তুমি কেন এমন?”

—“কেমন?”

—“সবকিছুর পরেও আমাকে এত স্বাধীনতা দাও।”

নীখিল মৃদু হাসল।

—“কারণ তোমাকে ভালোবাসি।”

রিয়া স্থির হয়ে গেল।

এই প্রথম নীখিল এত সরাসরি কথাটা বলল।

তার চোখে পানি জমে উঠল।

—“আর যদি আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলি?”

নীখিল ধীরে বলল,

—“তাহলে কষ্ট পাব।”

—“তারপর?”

—“তারপরও চাইব তুমি সুখী হও।”

রিয়া চোখের পানি মুছে বলল,

—“তুমি জানো না, তোমার এই কথাগুলো আমাকে কতটা দুর্বল করে।”

—“আমি দুর্বল করতে চাই না।”

—“তাহলে শক্ত করে ধরো।”

কথাটা বলেই রিয়া থেমে গেল।

নীখিলও কিছু বলল না।

দুজনের চোখে চোখ।

কিছুক্ষণ পর নীখিল ধীরে তার হাতের কাছে নিজের হাত রাখল।

রিয়া হাত সরিয়ে নিল না।

তাদের হাত দুটো পাশাপাশি ছিল।

কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।

শুধু একে অপরের উপস্থিতি।

রিয়া খুব আস্তে বলল,

—“পনেরো বছর আগে যদি তুমি আমার চিঠিটা পড়তে…”

নীখিল বলল,

—“তাহলে?”

—“হয়তো আজ আমাদের জীবন অন্যরকম হতো।”

—“হয়তো।”

—“তোমার আফসোস হয়?”

নীখিল একটু ভেবে বলল,

—“হয়।”

—“আমারও।”

—“কিন্তু একটা জিনিস শিখেছি।”

—“কী?”

—“যে সময় চলে গেছে, সেটা ফেরানো যায় না। কিন্তু সামনে যে সময় আছে, সেটা নষ্ট না করার চেষ্টা করা যায়।”

রিয়া মৃদু হাসল।

—“তুমি কি এবার আমাকে অপেক্ষা করতে বলবে?”

—“না।”

—“কেন?”

—“কারণ আমি চাই না তুমি কারও জন্য অপেক্ষা করো।”

রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—“তাহলে?”

—“নিজের জন্য সিদ্ধান্ত নাও। তারপর যদি সেই সিদ্ধান্তে আমার জন্য কোনো জায়গা থাকে, আমি থাকব।”

রিয়ার চোখ ভিজে গেল।

সে ধীরে বলল,

—“আমি মনে হয় জানি, আমার সিদ্ধান্ত কী।”

নীখিল কিছু বলল না।

রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আমি নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু করতে চাই।”

—“নিজের জন্য?”

—“হ্যাঁ।”

—“আমার জন্য নয়?”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“তোমার কথা না ভেবে পারব না। কিন্তু সিদ্ধান্তটা আমার।”

নীখিলের মুখে শান্ত একটা হাসি ফুটে উঠল।

—“তাহলে আমি তোমার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকব।”

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।

রিয়া মায়ের বাসায় থাকছিল।

তার বাবার অবস্থাও ধীরে ধীরে ভালো হতে শুরু করল।

আরিফের সঙ্গে তার আইনগত বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হলো।

এই সময়ে নীখিল আর রিয়া খুব কম দেখা করত।

কথা হতো।

কখনো ফোনে।

কখনো মেসেজে।

কিন্তু তারা ইচ্ছে করেই নিজেদের মধ্যে একটা দূরত্ব রাখছিল।

তারা দুজনেই বুঝেছিল—

এবারের সম্পর্কটা যেন শুধু পুরোনো আবেগের ওপর না দাঁড়ায়।

রিয়া নিজের জন্য একটা ছোট শিক্ষা প্রকল্প শুরু করল।

শিশুদের পড়ানোর একটা উদ্যোগ।

নীখিল তার প্রথম দিনের ছবি তুলতে গিয়েছিল।

সেদিন রিয়াকে দেখে তার মনে হলো—

এই তো সেই মেয়েটা।

যে একদিন স্কুল খুলতে চেয়েছিল।

আজ সে নিজের হাতে সেই স্বপ্নের প্রথম দরজা খুলেছে।

রিয়া দূর থেকে তাকে দেখে বলল,

—“ছবি তুলছ?”

—“হ্যাঁ।”

—“আমার অনুমতি নিয়েছ?”

—“তোমাকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি।”

রিয়া হেসে বলল,

—“তবুও।”

নীখিল ক্যামেরা নামিয়ে বলল,

—“তুমি চাইলে ছবি মুছে দেব।”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“না। রেখে দাও।”

—“কেন?”

—“কারণ এটা আমার নতুন জীবনের প্রথম ছবি।”

নীখিল ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে তাকাল।

ক্লিক।

একটা ছবি বন্দী হলো।

এই ছবিতে কোনো পুরোনো স্কুল নেই।

কোনো হারিয়ে যাওয়া সময় নেই।

শুধু একজন নারী, যে নিজের জীবনকে আবার নিজের মতো করে গড়তে শুরু করেছে।

আর দূরে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ, যে তাকে পাওয়ার আগে তার নিজের হয়ে ওঠার অপেক্ষা করছে।

কিন্তু ঠিক সেই রাতেই নীখিলের ফোনে একটা খবর এল।

আরিফের কাছ থেকে।

“রিয়ার সঙ্গে আমার বিচ্ছেদের ব্যাপারে একটা নতুন সমস্যা হয়েছে। পরিবার থেকে কেউ বিষয়টা মেনে নিচ্ছে না। পরিস্থিতি হয়তো আরও কঠিন হবে।”

নীখিল মেসেজটা পড়ে বুঝল—

তাদের নতুন গল্পের সামনে শেষ বাধাটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

আর এবার সেই বাধা শুধু অতীত নয়।

পুরো একটা পরিবার।

আরিফের মেসেজ পাওয়ার পর নীখিল অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল।

সে জানত, রিয়ার জন্য সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।

কিন্তু এবার একটা বিষয় পরিষ্কার ছিল—

রিয়া আর আগের সেই দ্বিধায় থাকা মেয়ে নয়।

সে নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস পেয়েছে।

পরদিন সকালে নীখিল রিয়াকে ফোন করল।

—“কী খবর?”

—“ভালো।”

—“আরিফের মেসেজ পেয়েছি।”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

—“আমি জানি।”

—“পরিবার থেকে সমস্যা করছে?”

—“হ্যাঁ।”

—“তুমি ঠিক আছ?”

রিয়া ধীরে বলল,

—“ভয় লাগছে।”

—“কিসের?”

—“সবাইকে বোঝানো সহজ হবে না।”

—“তোমাকে সবাইকে বোঝাতে হবে না।”

—“কিন্তু পরিবার?”

—“তোমার জীবনটা তোমার।”

রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“তুমি জানো, বাবা অসুস্থ। মা একা। সবাই বলছে এখন এসব নিয়ে ভাবার সময় নয়।”

—“তুমি কী ভাবছ?”

—“আমি মনে করি, নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনোদিন ভুল সময় নয়।”

নীখিলের মুখে হাসি ফুটল।

—“এই তো।”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“তোমার একটা কথা আমার খুব মনে আছে।”

—“কোনটা?”

—“তুমি বলেছিলে, ‘যে জীবন নিজের নয়, সেটা ঠিকঠাক চালালেও একসময় ক্লান্তি আসে।’”

—“বলেছিলাম?”

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে এবার নিজের জীবনটা নিজের মতো চালাও।”

সেদিন বিকেলে রিয়া বাবার সঙ্গে কথা বলল।

হাসপাতালের কেবিনে তখন নীরবতা।

বাবা জানালার পাশে বসে ছিলেন।

রিয়া ধীরে গিয়ে তার পাশে বসে বলল,

—“বাবা, তোমার সঙ্গে একটা কথা বলব?”

—“বল।”

—“আমি আরিফের সঙ্গে থাকতে পারছি না।”

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“আমি জানি।”

রিয়া অবাক হলো।

—“তুমি জানো?”

—“তোর চোখ দেখে অনেকদিন আগেই বুঝেছি।”

রিয়ার চোখে পানি চলে এল।

—“তাহলে এতদিন কিছু বলোনি কেন?”

—“কারণ সিদ্ধান্তটা তোর হতে হতো।”

রিয়া বাবার হাত ধরে বলল,

—“আমি ভয় পাচ্ছি।”

—“কিসের?”

—“মানুষ কী বলবে।”

বাবা মৃদু হেসে বললেন,

—“মানুষ আজ বলবে, কাল ভুলে যাবে। কিন্তু তুই নিজের সঙ্গে সারাজীবন থাকবি।”

রিয়া বাবার কাঁধে মাথা রাখল।

—“আর নীখিল?”

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“তুই কি ওকে ভালোবাসিস?”

রিয়া চোখ মুছে বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“ও কি তোকে ভালোবাসে?”

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে তাড়াহুড়ো করিস না।”

রিয়া তাকাল।

—“কেন?”

—“কারণ পুরোনো অনুভূতি খুব সুন্দর। কিন্তু সংসার শুধু অনুভূতিতে চলে না। আগে নিজের জীবনটা ঠিক কর। তারপর যদি তোদের দুজনের পথ একই থাকে, তখন সিদ্ধান্ত নিস।”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“তুমি নীখিলকে পছন্দ করো?”

বাবা মৃদু হাসলেন।

—“আমি ছেলেটাকে খুব ভালো করে চিনি না। কিন্তু তোর চোখে ওর নাম শুনলে যে শান্তি দেখি, সেটা চিনি।”

রিয়া বাবার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।

কয়েকদিন পর রিয়ার আরিফের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের বিষয়টি প্রায় শেষ হয়ে এল।

সবকিছু সহজ ছিল না।

পরিবারের অনেক প্রশ্ন।

অনেক অভিযোগ।

অনেক কান্না।

কিন্তু রিয়া এবার পিছিয়ে গেল না।

সে কাউকে দোষারোপও করল না।

শুধু বলল,

—“আমরা দুজনেই চেষ্টা করেছি। কিন্তু একসঙ্গে থেকে যদি দুজন মানুষই একা হয়ে যায়, তাহলে আলাদা হয়ে যাওয়াই হয়তো সৎ সিদ্ধান্ত।”

আরিফও শেষ পর্যন্ত তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করল।

বিচ্ছেদের কাগজে সই করার দিন আরিফ রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“তুমি সুখী হও।”

রিয়া মৃদু হাসল।

—“তুমিও।”

আরিফ একটু থেমে বলল,

—“নীখিলকে একটা কথা বলো।”

—“কী?”

—“ও যেন কখনো তোমাকে নিজের জীবনের বোঝা মনে না করে।”

রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

—“তুমি ভালো থেকো, আরিফ।”

দুজন আলাদা পথে চলে গেল।

কোনো নাটকীয়তা ছিল না।

শুধু একটা সম্পর্কের শান্ত সমাপ্তি।

সেদিন সন্ধ্যায় রিয়া নীখিলকে ফোন করল।

—“সব শেষ।”

নীখিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—“তুমি ঠিক আছ?”

—“হ্যাঁ।”

—“কাঁদছ?”

রিয়া হেসে ফেলল।

—“একটু।”

—“কাঁদো।”

—“তুমি আমাকে কাঁদতে বলছ?”

—“কখনো কখনো কান্না জমে থাকা কথাগুলোকে বের করে দেয়।”

রিয়া চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—“তুমি কোথায়?”

—“শহরের পুরোনো ব্রিজের কাছে।”

—“আমি আসব।”

—“এখন?”

—“হ্যাঁ।”

কিছুক্ষণ পর রিয়া এসে পৌঁছাল।

নীখিল ব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

রিয়াকে দেখে সে শুধু বলল,

—“এসেছ?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“হ্যাঁ।”

দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকাল।

অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না।

তারপর রিয়া বলল,

—“আজ মনে হচ্ছে, আমি খুব হালকা।”

নীখিল মৃদু হেসে বলল,

—“কারণ অনেকদিন পর নিজের একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছ।”

—“হ্যাঁ।”

রিয়া তার দিকে তাকাল।

—“কিন্তু এখন একটা প্রশ্ন আছে।”

—“কী?”

—“তুমি কি এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করবে?”

নীখিল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—“তুমি যদি আমার জীবনে আসতে চাও, আমি থাকব।”

—“আর যদি আমি না আসি?”

—“তবুও চাইব তুমি ভালো থাকো।”

রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

—“তুমি কেন আমাকে এত স্বাধীনতা দাও?”

নীখিল মৃদু স্বরে বলল,

—“কারণ ভালোবাসা যদি কাউকে নিজের করে রাখার নাম হয়, তাহলে সেটা ভালোবাসা নয়।”

রিয়া ধীরে বলল,

—“তাহলে কী?”

—“কারও স্বাধীনতাকেও নিজের অনুভূতির মতো সম্মান করা।”

রিয়া আর কিছু বলতে পারল না।

সে শুধু নীখিলের হাতটা ধরল।

অনেক বছর পর।

এবার কোনো স্কুলের বেঞ্চে নয়।

কোনো পুরোনো স্মৃতির আড়ালে নয়।

নিজের ইচ্ছায়।

নীখিল তার হাতের দিকে তাকাল।

রিয়া খুব আস্তে বলল,

—“আমি তোমার সঙ্গে একটা নতুন জীবন শুরু করতে চাই।”

নীখিলের চোখে বিস্ময়।

—“নিশ্চিত?”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“হ্যাঁ।”

—“কেন?”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“কারণ তোমাকে ফিরে পেয়ে বুঝেছি, আমি শুধু পুরোনো একটা মানুষকে ফিরে পাইনি। আমি নিজের হারিয়ে যাওয়া একটা অংশও ফিরে পেয়েছি।”

নীখিল কিছু বলতে পারল না।

রিয়া বলল,

—“কিন্তু আমি চাই না আমরা শুধু অতীত নিয়ে বাঁচি।”

—“আমিও না।”

—“আমাদের নতুন স্মৃতি চাই।”

—“তাহলে শুরু করি।”

রিয়া হাসল।

—“এত সহজ?”

—“গল্প লেখা সহজ নয়। কিন্তু প্রথম লাইনটা লেখা যায়।”

রিয়া তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।

—“তাহলে প্রথম লাইন কী হবে?”

নীখিল নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—“অনেক বছর পর তারা আবার দেখা করেছিল।”

রিয়া মাথা নেড়ে বলল,

—“না।”

—“তাহলে?”

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“অনেক বছর পর তারা বুঝেছিল, তাদের গল্প আসলে কখনো শেষ হয়নি।”

নীখিল তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

কয়েক মাস পরে রিয়ার বাবা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

রিয়ার ছোট শিক্ষা প্রকল্পটা আরও বড় হলো।

নীখিল তার ছবি আর কাজ নিয়ে নতুন একটা প্রদর্শনীর প্রস্তুতি নিতে শুরু করল।

তারা প্রতিদিন দেখা করত না।

প্রতিদিন কথা বলতও না।

কিন্তু তাদের সম্পর্কের মধ্যে এবার একটা শান্ত নিশ্চয়তা ছিল।

তাড়াহুড়ো নেই।

ভয় নেই।

অতীতের ভুলের জন্য অভিযোগ নেই।

একদিন রিয়া নীখিলের স্টুডিওতে গেল।

দেয়ালে অনেক ছবি ঝুলছে।

শহর।

নদী।

বৃষ্টি।

মানুষের মুখ।

আর এক কোণে একটা ছবি।

রিয়া ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

ছবিতে সে দাঁড়িয়ে আছে তার শিক্ষা প্রকল্পের প্রথম দিনের মাঠে।

মুখে হাসি।

চোখে আত্মবিশ্বাস।

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“এই ছবিটা এত বড় করে রেখেছ কেন?”

নীখিল বলল,

—“কারণ এটা তোমার জীবনের নতুন শুরুর ছবি।”

—“আর আমাদের?”

নীখিল তার দিকে তাকাল।

—“আমাদের ছবি এখনও তোলা হয়নি।”

রিয়া অবাক হলো।

—“কেন?”

নীখিল ক্যামেরা হাতে নিল।

—“কারণ আমি চাই, আমাদের প্রথম ছবি কোনো পুরোনো গল্পের স্মৃতি না হোক।”

—“তাহলে?”

—“আজ থেকে শুরু হোক।”

রিয়া ক্যামেরার সামনে দাঁড়াল।

নীখিল ক্যামেরা তুলল।

—“হাসবে?”

রিয়া বলল,

—“তুমি পাশে থাকলে।”

নীখিল মৃদু হাসল।

ক্যামেরার ক্লিকের সঙ্গে একটা নতুন মুহূর্ত আটকে গেল।

এই ছবিতে পনেরো বছরের অপেক্ষা নেই।

হারিয়ে যাওয়া চিঠি নেই।

ভুল বোঝাবুঝি নেই।

আছে শুধু দুজন মানুষ—

যারা জীবনের অনেকটা পথ ঘুরে আবার একে অপরের কাছে ফিরে এসেছে।

পনেরো বছর আগে যে গল্পটা একটা চিঠির ভেতর আটকে গিয়েছিল, আজ সেই গল্পের শেষ অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নীখিল আর রিয়া।

তাদের জীবনে অনেক কিছু বদলে গেছে।

রিয়া এখন নিজের শিক্ষা প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। ছোট্ট উদ্যোগটা ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। কয়েকজন শিশুকে নিয়ে শুরু করা কাজ এখন একটা ছোট শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

আর নীখিলের ছবির প্রদর্শনীও সফল হয়েছে।

কিন্তু এত ব্যস্ততার মাঝেও তারা একটা বিষয় খুব যত্ন করে রেখেছে—

তাদের সম্পর্ক।

তারা তাড়াহুড়ো করেনি।

অতীতের আবেগকে বর্তমানের সিদ্ধান্তের ওপর চাপিয়ে দেয়নি।

বরং ধীরে ধীরে একে অপরকে নতুন করে চিনেছে।

কারণ তারা বুঝেছিল—

পনেরো বছর আগের রিয়া আর নীখিলকে ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।

কিন্তু আজকের রিয়া আর নীখিলের জন্য নতুন একটা জীবন তৈরি করা সম্ভব।

এক সকালে রিয়া নীখিলকে ফোন করল।

—“আজ তুমি ফ্রি?”

—“তোমার জন্য সবসময়।”

—“তাহলে আজ আমার সঙ্গে বাসায় যাবে।”

নীখিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—“তোমার বাসায়?”

—“হ্যাঁ।”

—“তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে?”

—“হ্যাঁ।”

নীখিল একটু নার্ভাস হয়ে গেল।

—“আমি কী পরব?”

রিয়া হেসে ফেলল।

—“তুমি কি ছবি তুলতে যাচ্ছ?”

—“না।”

—“তাহলে যা পরো।”

—“কিন্তু যদি তোমার বাবা আমাকে পছন্দ না করেন?”

রিয়া শান্তভাবে বলল,

—“বাবা তোমাকে অনেক আগেই পছন্দ করে ফেলেছেন।”

—“কীভাবে?”

—“কারণ তিনি দেখেছেন, তুমি আমাকে নিজের মতো থাকতে দাও।”

নীখিল মৃদু হাসল।

—“তবুও একটু ভয় লাগছে।”

—“তুমি তো এত সাহসী ছিলে!”

—“স্কুলে ছিলাম।”

—“এখন?”

—“তোমার সামনে দাঁড়ালে সাহস কমে যায়।”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হেসে বলল,

—“আজ তোমার অনেক কথা মনে আছে দেখছি।”

—“তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে সবকিছুই মনে পড়ছে।”

বিকেলে নীখিল রিয়ার বাসায় গেল।

রিয়ার মা দরজা খুলে তাকে দেখে হাসলেন।

—“এসো নীখিল।”

নীখিল একটু অবাক হয়ে বলল,

—“আপনি আমাকে চিনলেন?”

—“তোমাকে চিনতে এত বছর লাগবে?”

রিয়া ভেতর থেকে বলল,

—“মা, ওকে ভয় দেখিয়ো না।”

সবাই হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর রিয়ার বাবা এসে বসলেন।

তিনি আগের চেয়ে অনেক সুস্থ।

নীখিল উঠে দাঁড়িয়ে সালাম করল।

—“কেমন আছেন?”

—“এখন ভালো।”

তারপর মৃদু হাসি দিয়ে বললেন,

—“তুমি অনেক দেরি করে এলে।”

নীখিল একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

রিয়া হেসে ফেলল।

—“বাবা!”

তিনি বললেন,

—“আমি তো সত্যিই বলছি। পনেরো বছর আগে এলে এত ঝামেলা হতো না।”

সবাই হাসল।

নীখিলও হেসে বলল,

—“তখন তো বুঝতেই পারিনি কী হারাচ্ছি।”

রিয়ার বাবা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

—“এখন বুঝেছ?”

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে এবার হারিয়ো না।”

নীখিল মাথা নাড়ল।

—“কখনো না।”

রিয়া চুপচাপ বসে তাদের দেখছিল।

তার চোখে তখন অদ্ভুত এক শান্তি।

যে মানুষটার সামনে একদিন নিজের অনুভূতি লুকাতে হয়েছিল, আজ সেই মানুষটার হাতেই তার বাবা-মা তাকে তুলে দিতে প্রস্তুত।

জীবন সত্যিই অদ্ভুত।

খাওয়ার পর রিয়ার মা একটা পুরোনো বাক্স নিয়ে এলেন।

—“এটা তোমাদের জন্য।”

রিয়া অবাক হয়ে বলল,

—“কী এটা?”

বাক্স খুলতেই ভেতরে বের হলো পুরোনো কিছু ছবি।

স্কুলের ছবি।

বন্ধুদের ছবি।

একটা জন্মদিনের ছবি।

আর একটা ছোট্ট কাগজ।

রিয়া কাগজটা হাতে নিয়ে থেমে গেল।

—“এটা কী?”

তার মা মৃদু হেসে বললেন,

—“তোমার বাবা এটা অনেক বছর ধরে রেখেছিল।”

কাগজটা খুলতেই রিয়া দেখল—

একটা ছোট্ট নোট।

পনেরো বছর আগের।

নীখিলের হাতের লেখা।

“রিয়াকে যেন কেউ কাঁদায় না।”

রিয়া অবাক হয়ে নীখিলের দিকে তাকাল।

—“তুমি এটা লিখেছিলে?”

নীখিল মাথা চুলকে বলল,

—“মনে নেই।”

রিয়ার বাবা হেসে বললেন,

—“তুই লিখেছিলি। রিয়া তখন খুব রাগ করেছিল কারও ওপর।”

রিয়া চোখ মুছে ফেলল।

—“তুমি এত কিছু রেখেছ?”

তার বাবা বললেন,

—“কিছু জিনিস সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়। কিন্তু মূল্য কমে না।”

রিয়া নীখিলের দিকে তাকাল।

নীখিল শুধু হাসল।

কয়েকদিন পর নীখিল আর রিয়া সেই পুরোনো স্কুলে গেল।

একটা বিকেল।

স্কুল তখন ছুটির পর প্রায় ফাঁকা।

তারা ধীরে ধীরে করিডোর দিয়ে হাঁটল।

পুরোনো ক্লাসরুম।

লাইব্রেরি।

সিঁড়ি।

সবকিছু যেন তাদের চিনতে পারছে।

রিয়া লাইব্রেরির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

—“এখানেই তো তোমাকে চিঠিটা দিয়েছিলাম।”

—“আর আমি পড়িনি।”

—“তুমি না পড়ে এত বছর কীভাবে বেঁচে ছিলে?”

—“ভুল করে।”

রিয়া হেসে ফেলল।

—“এবার পড়েছ?”

—“অনেকবার।”

—“কতবার?”

—“গুনিনি।”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—“চিঠিটা এখনও আছে?”

নীখিল পকেট থেকে একটা ছোট কাগজের খাম বের করল।

—“সবসময়।”

রিয়া অবাক হয়ে বলল,

—“তুমি সঙ্গে নিয়ে ঘোরো?”

—“সবসময় না। আজ ইচ্ছে হলো।”

রিয়া চিঠিটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আমি ভাবতাম, এই চিঠিটা হয়তো কোনোদিন তোমার কাছে পৌঁছাবে না।”

—“দেরি হয়েছে।”

—“খুব।”

—“কিন্তু পৌঁছেছে।”

রিয়া মৃদু হাসল।

—“হ্যাঁ।”

তারপর তারা স্কুলের মাঠে গেল।

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নেমে আসছিল।

যেখানে একসময় তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে গল্প করত, সেখানে আজ দুজন পাশাপাশি হাঁটছে।

রিয়া হঠাৎ বলল,

—“তুমি কি জানো, আমি তোমাকে প্রথম কখন ভালোবেসেছিলাম?”

নীখিল হেসে বলল,

—“কখন?”

—“যেদিন আমি স্কুলে খুব মন খারাপ করে বসেছিলাম।”

—“কেন?”

—“সবাই আমাকে নিয়ে হাসছিল।”

—“কী নিয়ে?”

—“আমি নাকি খুব বেশি কথা বলি।”

নীখিল হেসে ফেলল।

—“তুমি সত্যিই বেশি কথা বলতে।”

—“সেটা এখন বলবে?”

—“হ্যাঁ।”

রিয়া তাকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল,

—“তুমি তখন আমার পাশে এসে বসেছিলে।”

—“তারপর?”

—“বলেছিলে, ‘তুমি যত কথা বলবে, আমি তত শুনব।’”

নীখিল থেমে গেল।

রিয়া মৃদু হেসে বলল,

—“সেদিন বুঝেছিলাম, তুমি অন্যরকম।”

নীখিল কিছু বলল না।

রিয়া তার হাত ধরল।

—“আর তুমি?”

—“আমি?”

—“কখন বুঝেছিলে?”

নীখিল একটু ভেবে বলল,

—“যেদিন তুমি আমার নোট খাতায় লিখেছিলে, ‘তুমি না থাকলে স্কুলটা খুব ফাঁকা লাগে।’”

রিয়া হেসে ফেলল।

—“আমি লিখেছিলাম?”

—“হ্যাঁ।”

—“তুমি এত কিছু মনে রেখেছ?”

—“তোমার ব্যাপারে ভুলে থাকার মতো কিছু ছিল না।”

রিয়া আর কিছু বলল না।

শুধু তার হাতটা শক্ত করে ধরল।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

স্কুলের গেটের কাছে এসে রিয়া থামল।

—“নীখিল?”

—“হুম?”

—“আমাদের গল্পের নাম কী হবে?”

নীখিল একটু হাসল।

—“যে গল্প শেষ হয়নি।”

রিয়া মাথা নাড়ল।

—“না।”

—“তাহলে?”

—“যে গল্প আবার শুরু হয়েছে।”

নীখিল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—“ভালো।”

রিয়া মৃদু হাসল।

—“কারণ এবার আমি চাই না আমাদের গল্পটা শুধু পুরোনো দিনের স্মৃতি হয়ে থাকুক।”

—“থাকবে না।”

—“প্রতিশ্রুতি?”

নীখিল তার হাতটা ধরে বলল,

—“প্রতিশ্রুতি।”

কয়েক মাস পর তাদের বিয়ে হলো।

বড় কোনো আয়োজন নয়।

পরিবারের মানুষ।

কাছের কয়েকজন বন্ধু।

আর সেই পুরোনো স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক।

বিয়ের দিন রিয়া যখন মঞ্চে এসে দাঁড়াল, নীখিল কিছুক্ষণ শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, পনেরো বছর আগের সেই স্কুলের মেয়েটা যেন আজ আবার তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

শুধু আজ আর তাকে হারিয়ে ফেলার ভয় নেই।

রিয়া কাছে এসে ধীরে বলল,

—“কী দেখছ?”

নীখিল হাসল।

—“ভাবছি, এত বছর অপেক্ষা করেও ভুল মানুষকে অপেক্ষা করিনি।”

রিয়া চোখ নামিয়ে মৃদু হাসল।

—“আমিও না।”

বিয়ের পরের এক সকালে নীখিল তার স্টুডিওতে বসে পুরোনো ছবিগুলো দেখছিল।

একটা ছবিতে সে থেমে গেল।

পনেরো বছর আগের রিয়া।

স্কুলের ইউনিফর্ম।

চোখে দুষ্টুমি।

মুখে হাসি।

আরেকটা ছবিতে আজকের রিয়া।

চোখে শান্তি।

মুখে পরিণত হাসি।

দুটি ছবির মাঝখানে পনেরো বছরের দূরত্ব।

নীখিল বুঝল—

মানুষ বদলে যায়।

সময় বদলে যায়।

জীবনও বদলে যায়।

কিন্তু কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না।

বরং দূরত্বের ভেতর দিয়ে আরও গভীর হয়।

রিয়া স্টুডিওতে এসে তার পাশে দাঁড়াল।

—“কী দেখছ?”

নীখিল ছবিটা দেখাল।

রিয়া হাসল।

—“আমি তখন খুব বোকা ছিলাম।”

—“এখনও।”

—“তুমি?”

—“আমি তো আরও বোকা।”

রিয়া হেসে তার পাশে বসল।

নীখিল ক্যামেরাটা হাতে তুলে নিল।

—“একটা ছবি তুলব?”

—“এখন?”

—“হ্যাঁ।”

—“কেন?”

—“কারণ আমি আমাদের গল্পের প্রতিটা নতুন মুহূর্ত মনে রাখতে চাই।”

রিয়া ক্যামেরার দিকে তাকাল।

—“একটা কথা বলি?”

—“বল।”

—“আগে তুমি ছবি তুলতে, যেন মানুষ পুরোনো গল্প মনে করতে পারে।”

—“এখন?”

—“এখন তুমি এমন ছবি তোলো, যেগুলো দেখে মানুষ নতুন গল্প শুরু করতে চায়।”

নীখিল হেসে ফেলল।

ক্যামেরার ক্লিকের সঙ্গে তাদের আরেকটা মুহূর্ত বন্দী হলো।

একটা দীর্ঘ অপেক্ষার পর।

একটা হারিয়ে যাওয়া চিঠির পর।

একটা অসমাপ্ত কৈশোরের পর।

তাদের গল্প অবশেষে নিজের ঠিকানা খুঁজে পেল।

....
👁 78