—“আমি এই বিয়েতে রাজি নই!”
রমিশার কথায় ঘরের সবাই থেমে গেল।
সামনে বসে থাকা লোকজনের মুখে অস্বস্তি। তার মা মাথা নিচু করে আছেন। আর বাবা রাশেদ সাহেব মেয়ের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছেন, যেন কথাটা তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না।
রমিশা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সোজা নিজের ঘরে চলে গেল।
দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস নিল সে।
আজ আবার একই ঘটনা।
একজন পাত্র এসেছে। ভালো পরিবার, ভালো চাকরি, ভালো চেহারা—সবই নাকি ভালো। শুধু একটা জিনিসই নেই।
রমিশার মতামত।
তার কাছে মনে হচ্ছিল, তার নিজের জীবন নিয়ে সবাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, শুধু সে ছাড়া।
কিন্তু রমিশা জানত না, এই রাতের পর তার জীবনে এমন একজন মানুষ ঢুকতে চলেছে, যে তার সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দেবে।
পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে একটা মোটরবাইক এসে থামল।
বাইক থেকে নামল নীল।
চোখে সানগ্লাস, গায়ে সাদা শার্ট, মুখে সেই চেনা হাসি।
তার বন্ধু রাফি পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—“আজ এত সাজগোজ কেন?”
নীল চুল ঠিক করতে করতে বলল,
—“সাজগোজ না। মানুষ আমাকে সুন্দরই দেখে।”
রাফি হেসে বলল,
—“তোর আত্মবিশ্বাস দেখে একদিন আয়নাও তোকে ভয় পাবে।”
—“আয়না আমাকে ভয় পায় না। আয়না সত্যিটা জানে।”
—“কী সত্যি?”
—“আমি হ্যান্ডসাম।”
রাফি মাথায় হাত দিল।
—“আল্লাহ আমাকে ধৈর্য দাও।”
নীল হেসে উঠল।
ঠিক তখনই সামনে দিয়ে রমিশা হাঁটছিল।
নীল তাকে দেখেই চুপ হয়ে গেল।
গত কয়েকদিনে মেয়েটাকে সে বেশ কয়েকবার দেখেছে। প্রতিবারই দূর থেকে।
কিন্তু আজ প্রথমবার রমিশা নিজে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
—“এই যে।”
নীল অবাক হয়ে তাকাল।
—“আমাকে ডাকছেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“কী ব্যাপার?”
রমিশা ব্যাগ থেকে একটা কলম বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
—“এটা আপনার।”
নীল কলমটা দেখে হেসে বলল,
—“আপনি এতদিন এটা রেখে দিয়েছিলেন?”
—“আপনি দিয়েছিলেন, তাই ফিরিয়ে দিচ্ছি।”
—“আমি তো ভেবেছিলাম এটা স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছেন।”
রমিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আপনি কি সবসময় এমন কথা বলেন?”
—“আপনি পাশে থাকলে বেশি বলি।”
রমিশা চোখ কুঁচকে তাকাল।
—“আপনার সমস্যা কী?”
—“আপনাকে দেখলেই কেন জানি কথা বলতে ইচ্ছে করে।”
রমিশা কিছু বলল না।
নীলও এবার একটু শান্ত হলো।
—“আচ্ছা, রাগ করবেন না। একটা কথা বলি?”
—“বলুন।”
—“আপনার নাম রমিশা, তাই না?”
রমিশা অবাক।
—“আপনি জানলেন কীভাবে?”
—“বিশ্ববিদ্যালয়ে খবর ছড়াতে সময় লাগে না।”
—“আর আপনার নাম?”
নীল বুক ফুলিয়ে বলল,
—“নীল।”
—“শুধু নীল?”
—“পুরো নাম নীল আহমেদ। তবে যারা আমাকে ভালোভাবে চেনে, তারা শুধু নীলই বলে।”
রমিশা হেসে ফেলল।
—“আমি আপনাকে ভালোভাবে চিনি না।”
নীল মুচকি হেসে বলল,
—“এখনো চেনেন না।”
কথাটা শুনে রমিশা একটু থেমে গেল।
তারপর চলে গেল।
নীল তাকিয়ে রইল।
রাফি পাশে এসে বলল,
—“কী হলো?”
—“কিছু না।”
—“তোর চোখ তো অন্য কথা বলছে।”
নীল হেসে বলল,
—“মেয়েটাকে ভালো লাগে।”
রাফি অবাক হয়ে তাকাল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
—“কিন্তু তুই তো কাউকে নিয়ে সিরিয়াস হোস না।”
নীলের মুখের হাসি একটু কমে গেল।
—“সবাই একরকম হয় না।”
নীলের জীবনটা বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হতো, আসলে ততটা সহজ ছিল না।
সে মজা করত, বন্ধুদের হাসাত, সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করত। কিন্তু নিজের পরিবারের কথা উঠলেই সে চুপ হয়ে যেত।
তার বাবা আর মা বহু বছর ধরে আলাদা।
ছোটবেলায় সে অনেক চেষ্টা করেছে তাদের আবার একসঙ্গে আনতে।
কখনো বাবার কাছে গিয়ে বলেছে,
—“বাবা, তুমি বাসায় ফিরে আসো।”
কখনো মায়ের কাছে গিয়ে বলেছে,
—“মা, তুমি বাবার সঙ্গে কথা বলো।”
কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
দুজনের মধ্যে জমে থাকা অভিমান এতটাই গভীর ছিল যে, সময়ও সেটা মুছে দিতে পারেনি।
নীল এখন আর কাউকে এসব নিয়ে কিছু বলে না।
তার কাছে পরিবার মানেই একটা অসম্পূর্ণ গল্প।
কয়েকদিনের মধ্যেই নীল আর রমিশার বন্ধুত্ব হয়ে গেল।
তাদের দেখা হলেই কথার যুদ্ধ শুরু হতো।
রমিশা বলত,
—“আপনি খুব বিরক্তিকর।”
নীল বলত,
—“তবুও আমার সঙ্গে কথা বলেন।”
—“ভদ্রতার কারণে।”
—“তাহলে আমি প্রতিদিন ভদ্রতা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করব।”
রমিশা মুখ ঘুরিয়ে হাসত।
ধীরে ধীরে সেই হাসিটাই নীলের দিনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হয়ে উঠল।
আর রমিশাও বুঝতে পারছিল, নীলকে না দেখলে তার দিনটা কেমন যেন অসম্পূর্ণ লাগে।
একদিন বিকেলে নীল রমিশাকে বলল,
—“আমি একটা কথা বলব?”
—“বলুন।”
—“আপনি আমার সঙ্গে থাকলে খুব ভালো লাগে।”
রমিশা চুপ করে রইল।
—“কিছু বলবেন না?”
—“কী বলব?”
—“আপনারও কি ভালো লাগে?”
রমিশা ধীরে ধীরে তাকাল নীলের দিকে।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—“হয়তো।”
নীলের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
—“হয়তো মানে?”
—“বেশি কথা বলবেন না।”
—“ঠিক আছে। কিন্তু আজ আমি খুব খুশি।”
রমিশা মাথা নিচু করে হাসল।
সেদিনই তারা বুঝেছিল—তাদের সম্পর্কটা আর শুধু বন্ধুত্বের মধ্যে নেই।
কিন্তু সমস্যা শুরু হলো কয়েকদিন পর।
রাশেদ সাহেব জানতে পারলেন, রমিশার জীবনে একজন ছেলে এসেছে।
তিনি নীলের সম্পর্কে খোঁজ নিলেন।
জানলেন, নীলের পরিবার ভেঙে গেছে। বাবা-মা আলাদা থাকেন। ছেলেটার নিজের কোনো স্থায়ী পারিবারিক ভিত্তিও নেই।
রাশেদ সাহেব সোজা মেয়েকে ডেকে বললেন,
—“ও ছেলেটার সঙ্গে আর দেখা করবে না।”
রমিশা হতভম্ব।
—“কেন?”
—“কারণ আমি ওকে তোমার জন্য উপযুক্ত মনে করি না।”
—“আপনি ওকে চেনেন না।”
—“যতটুকু জানার দরকার, ততটুকু জেনেছি।”
—“আমি ওকে ভালোবাসি।”
কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর রমিশা নিজেই থমকে গেল।
রাশেদ সাহেবও চুপ হয়ে গেলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—“তাহলে নীলকে বলো, সে যদি সত্যিই তোমাকে বিয়ে করতে চায়, তাহলে একটা কাজ করতে হবে।”
রমিশা অবাক হয়ে তাকাল।
—“কী কাজ?”
রাশেদ সাহেব ঠান্ডা গলায় বললেন,
—“তার বাবা-মাকে আবার একসঙ্গে করতে হবে।”
রমিশার চোখ বড় হয়ে গেল।
—“কিন্তু তারা তো বহু বছর ধরে আলাদা!”
—“আমি জানি।”
—“এটা কীভাবে সম্ভব?”
রাশেদ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
—“সেটা নীলের সমস্যা।”
রমিশা কিছু বলতে পারল না।
সেদিন রাতে সে নীলকে সব জানাল।
সব শুনে নীল অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর হেসে বলল,
—“তোমার বাবা আমাকে বেশ কঠিন কাজ দিয়েছেন।”
রমিশার চোখে পানি চলে এল।
—“তুমি পারবে না, নীল।”
নীল তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য চেষ্টা করব না, এটা কি ভাবতে পারো?”
—“কিন্তু তোমার বাবা-মা…”
নীল ধীরে ধীরে পুরোনো একটা ছবির দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
—“হয়তো এতদিন আমি ভুল জায়গায় চেষ্টা করেছি।”
রমিশা তাকিয়ে রইল।
নীল ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,
—“যদি সত্যিই আমার বাবা-মাকে আবার একসঙ্গে করা সম্ভব হয়, তাহলে এবার আমি শেষবারের মতো চেষ্টা করব।”
তার চোখে তখন আর মজার ছেলেটার হাসি নেই।
ছিল শুধু এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
রাত প্রায় বারোটা।
ঘরের বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়েও নীলের চোখে ঘুম নেই।
বারবার বাবার মুখটা মনে পড়ছে। তারপর মায়ের মুখ। আর শেষে রমিশা।
একদিকে বহু বছরের ভাঙা সম্পর্ক, অন্যদিকে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।
নীল এতদিন বাবা-মায়ের সম্পর্ক ঠিক করার কথা ভাবলেও কখনো সত্যি করে চেষ্টা করেনি। কারণ সে জানত, দুজনের মধ্যে জমে থাকা অভিমান খুব গভীর।
কিন্তু এবার তাকে চেষ্টা করতেই হবে।
রমিশার বাবার দেওয়া শর্তটা তার কাছে শুধু একটা শর্ত ছিল না। এটা যেন তার নিজের অতীতের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ।
নীল বিছানা থেকে উঠে পুরোনো আলমারি খুলল।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা ছোট বাক্স বের করল।
বাক্সের ভেতরে পুরোনো ছবি, কিছু চিঠি আর কয়েকটা কাগজ।
সবচেয়ে ওপরে ছিল তার বাবা-মায়ের বিয়ের ছবি।
ছবিতে দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাসছেন।
মায়ের চোখে তখন স্বপ্ন।
বাবার মুখে গর্ব।
ছবিটা দেখে নীলের বুকটা ভারী হয়ে গেল।
এরা কি সত্যিই সেই মানুষ, যারা আজ একে অপরের নামও শুনতে চান না?
হঠাৎ তার চোখে একটা পুরোনো চিঠি পড়ল।
চিঠিটা তার মা লিখেছিলেন।
নীল চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল।
কিন্তু কয়েক লাইন পড়েই থেমে গেল।
চিঠির শেষ অংশটা ছিঁড়ে গেছে।
সে ভ্রু কুঁচকে কাগজটার দিকে তাকাল।
কেন চিঠিটা ছেঁড়া?
কী লেখা ছিল সেখানে?
নীল কিছুই বুঝতে পারল না।
পরদিন সকালেই সে মায়ের কাছে গেল।
মা রান্নাঘরে ছিলেন।
নীল দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
মা তাকিয়ে বললেন,
—“কী হয়েছে?”
—“মা, বাবার সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা কেন শেষ হয়েছিল?”
মায়ের হাত থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বললেন না তিনি।
তারপর বললেন,
—“এত বছর পর হঠাৎ এসব জানতে চাইছিস কেন?”
—“কারণ আমার জানতে হবে।”
—“কে কিছু বলেছে?”
—“না।”
—“তাহলে?”
নীল মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—“আমি তোমাদের আবার একসঙ্গে করতে চাই।”
মায়ের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
—“অসম্ভব।”
—“কেন?”
—“সব সম্পর্ক ঠিক করা যায় না।”
—“চেষ্টা করলে?”
—“তোর বাবা চেষ্টা করার মতো মানুষ নয়।”
নীল অবাক হয়ে বলল,
—“তুমি বাবাকে এত ঘৃণা করো?”
মা ধীরে ধীরে বললেন,
—“ঘৃণা করি না।”
—“তাহলে?”
—“কিছু মানুষকে ভালোবেসেও দূরে থাকতে হয়।”
এই কথাটা নীলকে আরও বিভ্রান্ত করল।
—“বাবা কি তোমার সঙ্গে খারাপ কিছু করেছিল?”
মা কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
—“এই ব্যাপারে আর কোনো কথা বলবি না।”
নীল বুঝল, আজ মায়ের কাছ থেকে কিছু বের করা সম্ভব হবে না।
কিন্তু সে হাল ছাড়ল না।
অন্যদিকে রমিশাও বাবার ওপর ভীষণ রাগ করে ছিল।
সেদিন দুপুরে সে বাবার সামনে গিয়ে বলল,
—“আপনি নীলকে কেন এমন শর্ত দিলেন?”
রাশেদ সাহেব পত্রিকা নামিয়ে বললেন,
—“কারণ আমি চাই সে বুঝুক, সংসার শুধু আবেগ দিয়ে চলে না।”
—“আপনি কি মনে করেন নীল পারবে না?”
—“আমি জানি না।”
—“তাহলে সুযোগ দিচ্ছেন কেন?”
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“কারণ আমি ওকে একটা অসম্ভব কাজ দিয়েছি।”
রমিশা অবাক হয়ে তাকাল।
—“অসম্ভব?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনি চান ও ব্যর্থ হোক?”
রাশেদ সাহেব মেয়ের দিকে তাকালেন।
—“আমি চাই তুমি এমন একজনকে বেছে নাও, যে দায়িত্ব নিতে জানে।”
রমিশা ধীরে বলল,
—“আর যদি নীল সত্যিই পারে?”
রাশেদ সাহেবের মুখে অদ্ভুত একটা ভাব ফুটে উঠল।
—“তাহলে আমি আমার কথা রাখব।”
রমিশার চোখে আশার আলো ফুটে উঠল।
সন্ধ্যায় রমিশা নীলের সঙ্গে দেখা করল।
নীলকে দেখে মনে হচ্ছিল সে অনেকক্ষণ ধরে কিছু ভাবছে।
রমিশা কাছে গিয়ে বলল,
—“কী হলো?”
—“তোমার বাবার শর্ত নিয়ে ভাবছি।”
—“ভয় পেয়েছ?”
নীল হেসে বলল,
—“তোমার বাবাকে ভয় পাই না।”
—“তাহলে?”
—“আমার বাবা-মাকে ভয় পাই।”
রমিশা চুপ করে গেল।
নীল একটু হেসে বলল,
—“তুমি জানো, ছোটবেলায় আমি কী করতাম?”
—“কী?”
—“বাবা-মা যখন ঝগড়া করত, আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুজনের হাত ধরে বলতাম, ‘তোমরা আবার বন্ধু হয়ে যাও।’”
রমিশার মুখটা নরম হয়ে গেল।
—“তারপর?”
—“একদিন বুঝলাম, বড়দের ঝগড়া বাচ্চাদের কথায় থামে না।”
—“তুমি তখন কী করেছিলে?”
—“চুপ করে গিয়েছিলাম।”
কিছুক্ষণ দুজনেই নীরব।
তারপর নীল বলল,
—“কিন্তু এবার চুপ থাকব না।”
রমিশা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—“আমি তোমার পাশে আছি।”
নীল সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“তাহলে একটা সাহায্য করবে?”
—“কী?”
—“তোমার বাবার কাছ থেকে আমার বাবা-মায়ের পুরোনো ব্যাপারটা জানতে হবে।”
রমিশা অবাক।
—“বাবা কী জানেন?”
—“আমি জানি না। কিন্তু আমার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের গল্পে তোমার বাবার নাম কোথাও না কোথাও আছে।”
রমিশা থমকে গেল।
—“তুমি এটা কীভাবে জানলে?”
নীল পকেট থেকে পুরোনো একটা কাগজ বের করল।
—“এই চিঠিটা মায়ের কাছে পেয়েছি।”
রমিশা কাগজটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল।
চিঠির কয়েকটা লাইন পড়েই তার চোখ আটকে গেল।
সেখানে লেখা ছিল—
“রাশেদকে আমি কথা দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমাকে না জানিয়ে যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছি, তার জন্য একদিন হয়তো আমাকে ক্ষমা করতে হবে…”
রমিশার হাত কেঁপে উঠল।
—“এখানে আমার বাবার নাম!”
নীল মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ।”
—“কিন্তু কেন?”
—“সেটাই জানতে হবে।”
রমিশা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“চলো, বাবার কাছে যাই।”
সেদিন রাতে তারা দুজন রাশেদ সাহেবের স্টাডি রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
রমিশা দরজায় নক করল।
ভেতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
—“কে?”
—“আমি।”
—“এসো।”
রমিশা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।
তার পেছনে নীল।
রাশেদ সাহেব নীলকে দেখেই বুঝলেন, বিষয়টা গুরুতর।
—“তুমি?”
নীল শান্তভাবে বলল,
—“আপনার দেওয়া শর্ত আমি মেনে নিয়েছি।”
—“আমি জানি।”
—“কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে।”
রাশেদ সাহেব চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
নীল পকেট থেকে চিঠিটা বের করল।
—“আমার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক?”
চিঠিটা দেখামাত্র রাশেদ সাহেবের মুখের রং বদলে গেল।
রমিশা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
—“বাবা?”
রাশেদ সাহেব চেয়ার থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন,
—“এই চিঠি তোমার কাছে এলো কীভাবে?”
নীল উত্তর দিল,
—“আমার মায়ের জিনিসের মধ্যে পেয়েছি।”
রাশেদ সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।
তারপর খুব নিচু স্বরে বললেন,
—“তোমার মা আমাকে কথা দিয়েছিলেন।”
নীল হতভম্ব।
—“কী কথা?”
রাশেদ সাহেব আর কিছু বললেন না।
শুধু বললেন,
—“এই গল্পটা তোমার ধারণার চেয়েও অনেক পুরোনো।”
নীল এক পা এগিয়ে গেল।
—“তাহলে সব সত্যি করে বলুন।”
রাশেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“তোমার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের জন্য শুধু তারা দুজন দায়ী ছিল না।”
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
রমিশা বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।
আর নীলের মাথায় একটাই প্রশ্ন—
“তাহলে আসল দোষী কে?”
রাশেদ সাহেব ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকালেন।
তারপর বললেন,
—“এই সত্যি জানলে হয়তো তুমি তোমার মাকেও ক্ষমা করতে পারবে না।”
নীল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রাশেদ সাহেবের শেষ কথাটা শুনে ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
নীল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রমিশাও বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে।
কিন্তু রাশেদ সাহেব আর কিছু বললেন না।
নীল ধীরে ধীরে বলল,
—“আপনি যদি সব জানেন, তাহলে আমাকে বলছেন না কেন?”
—“কারণ সব সত্যি জানার পর মানুষ সবসময় ভালো থাকে না।”
—“আমি সত্যিটা শুনতে চাই।”
রাশেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“আজ না।”
নীল হতাশ হয়ে বলল,
—“আপনি আমাকে শর্ত দিয়েছেন আপনার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য। আমি সেই শর্ত মেনে নিয়েছি। এখন আপনি যদি সত্যিটাই না বলেন, তাহলে আমি শুরু করব কীভাবে?”
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“আগে তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলো। তাদের কাছ থেকেই শুনো।”
—“তারা কিছু বলবে না।”
—“তাহলে তাদের মুখ খুলতে বাধ্য করো।”
নীল বুঝতে পারল, রাশেদ সাহেব ইচ্ছা করেই কিছু লুকাচ্ছেন।
সে আর জোর করল না।
শুধু বলল,
—“ঠিক আছে। আমি নিজেই সব খুঁজে বের করব।”
রাশেদ সাহেব তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তুমি যদি সত্যিই এই সম্পর্কের জন্য লড়তে চাও, তাহলে একটা কথা মনে রেখো—তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু তোমার নিজের রাগ।”
নীল মৃদু হেসে বলল,
—“আমি রাগ করি না।”
রমিশা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—“মিথ্যা কথা।”
নীল তার দিকে তাকাল।
—“তুমি আমার বিরুদ্ধে?”
—“সত্যের পক্ষে।”
রাশেদ সাহেবের মুখেও বহুদিন পর হালকা হাসি ফুটল।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ছিল অনেক পুরোনো কষ্ট।
পরদিন থেকেই নীল তার মিশন শুরু করল।
প্রথমে বাবার কাছে গেল।
তার বাবা সায়েম সাহেব এখন শহরের বাইরে থাকেন। ছোট একটা ব্যবসা করেন। নীলকে দেখে তিনি অবাক হলেও খুশি হলেন।
—“হঠাৎ এলি?”
—“বাবা, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।”
সায়েম সাহেব চুপচাপ বসে রইলেন।
নীল সরাসরি বলল,
—“তুমি আর মা কেন আলাদা হয়েছিলে?”
সায়েম সাহেবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—“এত বছর পর এসব কেন?”
—“কারণ আমি তোমাদের আবার একসঙ্গে করতে চাই।”
—“কে তোকে এসব বলেছে?”
—“আমার নিজের জীবন।”
বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।
নীল ধীরে ধীরে বলল,
—“আমি কাউকে বিয়ে করতে চাই। কিন্তু তার বাবা শর্ত দিয়েছেন, তোমরা আবার একসঙ্গে না হলে আমার বিয়ে হবে না।”
সায়েম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“তুই কি সত্যিই মেয়েটাকে ভালোবাসিস?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে তুই একটা জিনিস বুঝে রাখ। কিছু সম্পর্ক জোড়া লাগানো যায় না।”
—“চেষ্টা না করেই কীভাবে জানো?”
সায়েম সাহেব ছেলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“কারণ তোর মা আমাকে কখনো ক্ষমা করবে না।”
—“তুমি কী করেছিলে?”
সায়েম সাহেব চোখ নামিয়ে ফেললেন।
—“আমি ভুল করেছিলাম।”
—“কী ভুল?”
—“এটা তোর জানার দরকার নেই।”
নীল রেগে গেল।
—“সবাই আমাকে একই কথা বলছে! কেউ কিছু বলতে চায় না। কিন্তু আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত সবাই নিচ্ছে!”
সায়েম সাহেব শান্তভাবে বললেন,
—“রাগ করিস না।”
—“আমি রাগ করব না? আমার মা-বাবা আলাদা হয়ে আছে বছরের পর বছর, আর আমি জানিই না কেন!”
সায়েম সাহেব কিছু বললেন না।
নীল উঠে দাঁড়াল।
দরজার কাছে গিয়ে থেমে বলল,
—“তুমি যদি সত্যিই আমার বাবা হও, তাহলে অন্তত একবার আমার জন্য চেষ্টা করো।”
সায়েম সাহেব তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
নীল চলে গেল।
অন্যদিকে রমিশা তার মায়ের কাছেও সব কথা জানতে চাইল।
কিন্তু মায়ের কাছ থেকেও একই উত্তর।
—“তোর বাবা যেটা করেছে, সেটা ভুল ছিল।”
রমিশা অবাক।
—“বাবা কী করেছে?”
মা চুপ।
—“মা, তুমি কি নীলের পরিবারকে চেনো?”
মায়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—“কেন?”
—“নীলের বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের গল্পে বাবার নাম আছে।”
মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“সব পুরোনো কথা ভুলে যা।”
—“আমি পারব না।”
—“রমিশা…”
—“আমি নীলকে ভালোবাসি।”
মায়ের চোখে পানি চলে এল।
—“তুই বুঝতে পারছিস না, তুই কীসের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিস।”
রমিশা মায়ের হাত ধরে বলল,
—“তাহলে আমাকে বুঝিয়ে বলো।”
মা মুখ খুলেও কিছু বলতে পারলেন না।
শুধু বললেন,
—“নীলের মায়ের সঙ্গে দেখা করিস না।”
রমিশা অবাক।
—“কেন?”
কোনো উত্তর এল না।
এদিকে নীলের পরিকল্পনা ছিল একেবারে অন্যরকম।
সে ভাবল, প্রথমে বাবা-মাকে আলাদা আলাদাভাবে কাছে আনতে হবে।
তারপর কোনো একটা উপলক্ষ তৈরি করে দুজনকে মুখোমুখি বসাতে হবে।
কিন্তু সমস্যা হলো, তার মা বাবার নাম শুনলেই বিরক্ত হন।
বাবাও মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চান না।
তাই নীল একটা বুদ্ধি করল।
সে মাকে ফোন করে বলল,
—“মা, আমি একটা অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। তুমি আসবে?”
—“কী অনুষ্ঠান?”
—“আমার একটা বন্ধুর বিয়ের অনুষ্ঠান।”
মা বললেন,
—“আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে কী করবি?”
—“অনেকদিন তুমি বাইরে যাও না। একটু বের হও।”
মা শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন।
অন্যদিকে নীল বাবাকেও একই কথা বলে অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করল।
কিন্তু নীলের বন্ধু রাফি ব্যাপারটা জেনে ফেলল।
—“তুই কী করছিস?”
নীল বলল,
—“আমার বাবা-মাকে এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।”
—“তারা যদি সেখানে ঝগড়া করে?”
—“তাহলে করুক।”
—“আর যদি চলে যায়?”
—“তাহলে আবার নিয়ে আসব।”
রাফি মাথা নেড়ে বলল,
—“তুই সত্যিই পাগল।”
নীল হেসে বলল,
—“ভালোবাসার জন্য একটু পাগলামি না করলে কাজ হয়?”
রাফি হেসে ফেলল।
অনুষ্ঠানের দিন রমিশাও সেখানে ছিল।
নীল তাকে কিছু বলেনি।
রমিশা সাজগোজ করে এসে যখন নীলকে দেখল, অবাক হয়ে বলল,
—“তুমি এখানে?”
—“আমি তো সব জায়গাতেই থাকি।”
—“আজকাল তোমার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেছে।”
—“তোমাকে পাওয়ার চেষ্টা করছি তো।”
রমিশা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল।
কিন্তু কয়েক মিনিট পরই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
কারণ সে দেখল নীলের মা অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকেছেন।
তার কয়েক মিনিট পর ঢুকলেন নীলের বাবা।
দুজনের চোখ একে অপরের সঙ্গে মিলতেই যেন সময় থেমে গেল।
নীলের মা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর ঘুরে বেরিয়ে যেতে চাইলেন।
নীল দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—“মা, তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
—“আমাকে এখানে কেন এনেছিস?”
—“আমি চেয়েছিলাম তোমরা একবার কথা বলো।”
—“না।”
—“শুধু পাঁচ মিনিট।”
—“না, নীল।”
অন্যদিকে সায়েম সাহেবও দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি বললেন,
—“তুমি চাইলে আমি চলে যাচ্ছি।”
নীলের মা তীব্র চোখে তাকালেন।
—“তোমাকে দেখার ইচ্ছা আমার নেই।”
সায়েম সাহেব মাথা নিচু করলেন।
নীল দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল।
—“তোমরা আমার জন্য পাঁচ মিনিটও একসঙ্গে থাকতে পারবে না?”
কেউ উত্তর দিল না।
নীলের চোখে পানি চলে এল।
—“ছোটবেলায় যখন তোমরা আলাদা হলে, আমি ভাবতাম বড় হলে তোমাদের আবার এক করে দেব। কিন্তু তোমরা কেউ আমাকে সুযোগ দাওনি।”
তার মা চোখ ফিরিয়ে নিলেন।
নীল বলল,
—“আজ আমি তোমাদের কাছে কিছু চাইছি না। শুধু সত্যিটা চাই।”
সায়েম সাহেব ধীরে বললেন,
—“সত্যি জানলে তুই আমাদের দুজনকেই ঘৃণা করবি।”
নীল কাঁপা গলায় বলল,
—“তবুও বলো।”
ঠিক তখনই রমিশা দূর থেকে এগিয়ে এল।
কিন্তু তার আগেই নীলের মা রমিশাকে দেখে থমকে গেলেন।
তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
তিনি রমিশার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তুমি… রাশেদের মেয়ে?”
রমিশা অবাক হয়ে মাথা নাড়ল।
—“জি।”
নীলের মা হঠাৎ নীলের দিকে তাকালেন।
তারপর বললেন,
—“তুই জানিস না, তোর বাবার সঙ্গে রাশেদের কী হয়েছিল।”
নীল বলল,
—“আমি জানতে চাই।”
মা চোখের পানি মুছে ধীরে বললেন,
—“তাহলে আজ থেকে সত্যিটা খুঁজতে শুরু কর।”
তারপর তিনি চলে গেলেন।
নীল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আর রমিশার মনে তখন একটাই প্রশ্ন—
তার বাবা আসলে নীলের পরিবারের সঙ্গে কী করেছিলেন?
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও নীল এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখের সামনে বারবার মায়ের শেষ কথাটা ঘুরছিল—
“তুই জানিস না, তোর বাবার সঙ্গে রাশেদের কী হয়েছিল।”
রাশেদ।
রমিশার বাবা।
এই নামটাই যেন হঠাৎ সবকিছুকে আরও জটিল করে দিল।
নীল এতদিন ভেবেছিল, তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ শুধু তাদের নিজেদের সমস্যা। এখন বুঝতে পারছে, সেই বিচ্ছেদের পেছনে বাইরের কারও হাত ছিল।
আর সেই মানুষটা যদি সত্যিই রমিশার বাবা হন?
তাহলে রমিশা?
সে কি কোনো ভুলের শাস্তি ভোগ করছে?
নীল মাথা তুলে দেখল, রমিশা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
সে এগিয়ে গেল।
—“তোমার বাবা কি আমার পরিবারকে চিনতেন?”
রমিশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—“হ্যাঁ।”
—“কতটা?”
—“আমি জানি না।”
—“তুমি কিছু জানো।”
—“আমি সত্যিই জানি না, নীল।”
নীল তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, রমিশা মিথ্যা বলছে না।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“তোমার ওপর আমি রাগ করছি না।”
রমিশা ধীরে বলল,
—“তুমি আমার ওপর রাগ করলে আমি কষ্ট পাব।”
নীল হালকা হাসল।
—“তুমি তো আমার বাবার ভুল করোনি।”
রমিশা মাথা নিচু করল।
—“কিন্তু যদি আমার বাবা তোমাদের জীবনে কোনো অন্যায় করে থাকেন?”
—“তাহলে সত্যিটা বের করব।”
—“তারপর?”
নীল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“তারপরও তোমাকে ছেড়ে দেব না।”
রমিশা তার দিকে তাকাল।
চোখের কোণে পানি জমে উঠেছিল।
নীল মজা করে বলল,
—“তবে একটা শর্ত আছে।”
—“কী?”
—“এত সহজে কাঁদা যাবে না।”
রমিশা চোখ মুছে বলল,
—“তুমি সবকিছুর মধ্যেও মজা করতে পারো?”
—“না করলে তো আমি নীল থাকব না।”
রমিশা মৃদু হেসে ফেলল।
কিন্তু দুজনেই জানত, সামনে যে সত্যি অপেক্ষা করছে সেটা তাদের হাসি কেড়ে নিতে পারে।
পরদিন সকালে নীল সোজা বাবার কাছে গেল।
সায়েম সাহেব দরজা খুলে ছেলেকে দেখে অবাক হলেন।
—“আবার এসেছিস?”
—“হ্যাঁ।”
—“কী হয়েছে?”
—“আমি সত্যিটা জানতে চাই।”
সায়েম সাহেব চুপ।
নীল এবার আর ঘুরিয়ে কথা বলল না।
—“রাশেদ চৌধুরীর সঙ্গে তোমার কী হয়েছিল?”
বাবার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল।
—“কে তোকে এই নাম বলেছে?”
—“তোমার মা।”
সায়েম সাহেব কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—“রাশেদ আর আমি একসময় খুব ভালো বন্ধু ছিলাম।”
নীল অবাক।
—“বন্ধু?”
—“হ্যাঁ। ব্যবসা করতাম একসঙ্গে। তখন আমাদের খুব ভালো সময় ছিল।”
—“তাহলে সমস্যা কোথায়?”
সায়েম সাহেব জানালার বাইরে তাকালেন।
—“তোর মায়ের সঙ্গে আমার বিয়ের পর সব বদলে গেল।”
—“কেন?”
—“রাশেদ একটা বড় ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিল। আমি রাজি হইনি।”
—“তারপর?”
—“সে আমার ওপর বিশ্বাস হারায়।”
নীল ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“এত বড় কারণে সংসার ভাঙে?”
সায়েম সাহেব চুপ করে গেলেন।
নীল বুঝল, গল্পের আরও একটা অংশ লুকানো আছে।
—“শুধু ব্যবসার কারণে তোমাদের সম্পর্ক ভাঙেনি। তাই তো?”
সায়েম সাহেব এবার ছেলের দিকে তাকালেন।
—“না।”
—“তাহলে?”
অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন,
—“রাশেদ আমাকে একটা মিথ্যা কথা বলেছিল।”
—“কী মিথ্যা?”
—“সে বলেছিল, তোর মা আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।”
নীল হতভম্ব।
—“মা?”
—“হ্যাঁ।”
—“তুমি বিশ্বাস করেছিলে?”
সায়েম সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।
—“সেই সময় আমি করেছিলাম।”
নীলের বুক কেঁপে উঠল।
—“আর পরে?”
—“পরে বুঝেছিলাম, আমি ভুল করেছি।”
—“তাহলে মায়ের কাছে ক্ষমা চাওনি?”
সায়েম সাহেব তিক্ত হেসে বললেন,
—“ক্ষমা চেয়েছিলাম।”
—“মা দেয়নি?”
—“না।”
—“কেন?”
—“কারণ ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
নীল চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
—“তাহলে রাশেদ চৌধুরী তোমাদের আলাদা করার জন্য মিথ্যা বলেছিল?”
সায়েম সাহেব সরাসরি উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
—“আমি নিশ্চিত নই।”
নীল বিরক্ত হয়ে উঠল।
—“তুমি নিজেই জানো না?”
—“জানি না।”
—“তাহলে এত বছর কীভাবে চুপ করে ছিলে?”
সায়েম সাহেবের চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
—“কারণ তোর মাকে হারানোর পর আমি আর কিছু ঠিক করার সাহস পাইনি।”
নীল কিছু বলল না।
সে বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু বের হওয়ার আগে বলল,
—“আমি এবার ঠিক করব।”
এদিকে রমিশাও বাবার সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল।
সন্ধ্যায় রাশেদ সাহেব স্টাডি রুমে বসে ছিলেন।
রমিশা দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকল।
—“বাবা, নীলের বাবা-মায়ের সঙ্গে আপনার কী হয়েছিল?”
রাশেদ সাহেব বই বন্ধ করলেন।
—“কে তোকে বলেছে?”
—“আমি জানতে চেয়েছি।”
—“এই ব্যাপারে তোর মাথা না ঘামালেই ভালো।”
—“কিন্তু নীলের জীবন এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”
রাশেদ সাহেব কঠিন গলায় বললেন,
—“তুই নীলকে ভুলে যা।”
রমিশা হতভম্ব।
—“কী?”
—“আমি বলছি, নীলের সঙ্গে তোর সম্পর্ক আমি মেনে নেব না।”
—“কিন্তু আপনি তো শর্ত দিয়েছিলেন!”
—“আমি শর্ত বদলে দিচ্ছি।”
রমিশার চোখে পানি চলে এল।
—“আপনি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।”
রাশেদ সাহেব চুপ।
—“বাবা, আমি কখনো আপনার অবাধ্য হতে চাইনি। কিন্তু এবার আপনি আমাকে বাধ্য করছেন।”
রাশেদ সাহেব ধীরে বললেন,
—“তুই বুঝতে পারছিস না, নীলের পরিবারে ঢুকলে তোর জীবনও নষ্ট হবে।”
—“কেন?”
—“কারণ সেই পরিবারের সঙ্গে আমার হিসাব এখনো শেষ হয়নি।”
রমিশা কাঁপা গলায় বলল,
—“আপনার হিসাবের জন্য আমার জীবন নষ্ট হবে?”
রাশেদ সাহেব চোখ ফিরিয়ে নিলেন।
রমিশা দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
সেই রাতে রমিশা নীলকে ফোন করল।
—“নীল…”
—“হুম?”
—“বাবা আমাদের সম্পর্ক মেনে নিচ্ছেন না।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর নীল বলল,
—“আমি জানি।”
—“তুমি কী করবে?”
—“যেটা করার কথা দিয়েছি।”
—“তোমার বাবা-মাকে আবার এক করতেই হবে?”
—“হ্যাঁ।”
—“আর যদি তারা রাজি না হয়?”
নীল একটু চুপ থেকে বলল,
—“তাহলে আমি কারণটা খুঁজব।”
—“কী কারণ?”
—“কেন তারা আলাদা হয়েছে, সেটা।”
রমিশা চোখ বন্ধ করল।
—“আমি তোমার পাশে থাকব।”
নীল হেসে বলল,
—“আমি জানি।”
—“কীভাবে জানো?”
—“কারণ তুমি আমাকে এত সহজে ছাড়বে না।”
রমিশার ঠোঁটে হাসি ফুটল।
পরদিন নীল তার মায়ের কাছে গেল।
মা তখন পুরোনো একটা বাক্স গোছাচ্ছিলেন।
নীল দরজায় দাঁড়াতেই মা বললেন,
—“কী চাই?”
—“সত্যি।”
মা থেমে গেলেন।
নীল বলল,
—“বাবা বলেছে তুমি আমাকে ভুল বুঝেছিলে। তুমি বলেছ বাবা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে। আর রাশেদ চৌধুরীর নাম দুজনের কথাতেই আসছে।”
মা চুপ।
নীল এবার বাক্সটার দিকে তাকাল।
—“ওখানে কী আছে?”
—“কিছু পুরোনো জিনিস।”
—“আমি দেখতে পারি?”
মা সঙ্গে সঙ্গে বাক্সটা বন্ধ করে দিলেন।
—“না।”
নীলের সন্দেহ আরও বাড়ল।
—“কেন?”
—“কারণ কিছু জিনিস পুরোনো থাকাই ভালো।”
মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
নীল কিছুক্ষণ বাক্সটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খেয়াল করল, বাক্সের পাশে একটা পুরোনো খাম পড়ে আছে।
খামের ওপর লেখা—
“সায়েমের জন্য—রাশেদ।”
নীলের বুক ধক করে উঠল।
সে খামটা হাতে নিল।
খাম খুলতেই ভেতর থেকে একটা ছবি পড়ে গেল।
ছবিতে তার বাবা, মা আর রাশেদ সাহেব একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।
কিন্তু ছবির পেছনে হাতে লেখা একটা তারিখ।
তারিখটা দেখে নীলের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
কারণ সেটা ছিল—
তার জন্মের ঠিক এক সপ্তাহ আগে।
আর ছবির নিচে লেখা ছিল মাত্র চারটি শব্দ—
“সেদিন যা ঘটেছিল…”
নীল বাকিটা পড়ার আগেই পেছন থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল—
—“ওটা পড়িস না, নীল।”
নীল ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
মায়ের চোখে তখন ভয়।
নীলের হাতে তখনও পুরোনো ছবিটা।
ছবিতে তার বাবা সায়েম, মা নন্দিনী আর রমিশার বাবা রাশেদ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাসছেন। তিনজনকে দেখে মনে হচ্ছে, তাদের মধ্যে খুব গভীর সম্পর্ক ছিল।
কিন্তু ছবির পেছনে লেখা মাত্র কয়েকটি শব্দ—
“সেদিন যা ঘটেছিল…”
বাকিটা যেন ইচ্ছা করেই মুছে ফেলা হয়েছে।
নীল ধীরে ধীরে মায়ের দিকে তাকাল।
—“মা, ছবিটা আমি পড়ব।”
নন্দিনী এগিয়ে এসে ছবিটা নিতে চাইলেন।
—“না, নীল।”
—“কেন?”
—“কারণ তুই সত্যিটা জানলে আমাকে আর আগের মতো দেখবি না।”
নীল কষ্টের হাসি দিল।
—“আমি এতদিন ধরে তোমাদের দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। সত্যিটা না জেনে আমি আর কতদিন থাকব?”
নন্দিনী কিছু বললেন না।
নীল এবার ছবিটা বুকের কাছে ধরে বলল,
—“আমি তোমাদের আবার এক করতে চাই।”
—“অসম্ভব।”
—“তুমি সবসময় এই কথাটাই বলো।”
—“কারণ এটা সত্যি।”
—“তাহলে আমাকে অন্তত কারণটা বলো।”
নন্দিনীর চোখে পানি চলে এল।
তিনি ধীরে ধীরে সোফায় বসে বললেন,
—“তুই ছোট ছিলি। তাই তোকে কিছু বলিনি।”
—“এখন আমি বড় হয়েছি।”
—“কিছু সত্যি বয়স বাড়লেও সহজ হয় না।”
নীল মায়ের পাশে বসে পড়ল।
—“তুমি কি বাবাকে ভালোবাসতে?”
প্রশ্নটা শুনে নন্দিনী অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর মৃদু স্বরে বললেন,
—“এখনও করি।”
নীল অবাক হয়ে তাকাল।
—“তাহলে আলাদা কেন?”
নন্দিনী চোখ মুছে বললেন,
—“কারণ ভালোবাসা থাকলেই সব সম্পর্ক টিকে থাকে না।”
নীলের বুকটা ভারী হয়ে গেল।
—“রাশেদ চৌধুরী কী করেছিলেন?”
নন্দিনী চমকে উঠলেন।
—“তুই তার নাম কোথা থেকে জানলি?”
—“ছবিতে দেখেছি।”
—“আর কিছু?”
নীল খামটা দেখাল।
—“এই চিঠিটাও পেয়েছি।”
নন্দিনী চিঠিটা দেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“এই চিঠিটা কোথায় পেলি?”
—“তোমার বাক্সে।”
নন্দিনী চোখ বন্ধ করলেন।
—“তুই কেন আমার কথা শুনিস না?”
—“কারণ আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”
মায়ের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
তিনি ধীরে বললেন,
—“রাশেদ একসময় আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল।”
—“বাবার বন্ধু?”
—“শুধু বন্ধু না। ভাইয়ের মতো।”
—“তাহলে কী হয়েছিল?”
নন্দিনী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“একটা ভুল বোঝাবুঝি।”
—“কী ভুল বোঝাবুঝি?”
—“সেদিন তোর বাবার ব্যবসার একটা বড় চুক্তি ছিল। রাশেদ সেটা নিয়ে খুব চিন্তিত ছিল। সে চেয়েছিল তোর বাবা একটা সিদ্ধান্ত নিক। কিন্তু তোর বাবা রাজি হয়নি।”
—“তারপর?”
—“তারপর রাশেদ আমার কাছে আসে।”
নীল মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
—“সে আমাকে কিছু কাগজে সই করতে বলেছিল।”
—“কেন?”
—“বলেছিল, এতে তোর বাবার ব্যবসা বাঁচবে।”
নীল অবাক।
—“তুমি সই করেছিলে?”
নন্দিনী মাথা নিচু করলেন।
—“হ্যাঁ।”
—“তারপর?”
—“কয়েকদিন পর তোর বাবা জানতে পারে, সেই কাগজে এমন কিছু ছিল যার কারণে ব্যবসার বড় একটা অংশ অন্য একজনের হাতে চলে যাচ্ছিল।”
নীল হতভম্ব।
—“আর বাবা ভাবল তুমি…?”
—“আমি ওকে ধোঁকা দিয়েছি।”
—“কিন্তু তুমি তো জানতেই না!”
—“আমি জানতাম না।”
—“তাহলে বাবাকে বলোনি?”
নন্দিনী তিক্ত হেসে বললেন,
—“বলেছিলাম। কিন্তু তখন রাশেদ এমন কিছু প্রমাণ দেখিয়েছিল, যাতে মনে হচ্ছিল আমিই সব করেছি।”
নীল মুঠো শক্ত করল।
—“মিথ্যা প্রমাণ?”
—“হয়তো।”
—“হয়তো?”
নন্দিনী চুপ করে গেলেন।
নীল বুঝতে পারল, মা এখনও পুরো সত্যিটা জানেন না।
অন্যদিকে রমিশাও বাবার আচরণে ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছিল।
সে বাবার স্টাডি রুমে গিয়ে দাঁড়াল।
—“বাবা, আপনি নীলের পরিবারকে কেন এত ঘৃণা করেন?”
রাশেদ সাহেব মাথা তুললেন।
—“আমি কাউকে ঘৃণা করি না।”
—“তাহলে?”
—“আমি শুধু চাই না তুই ওই পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়িস।”
—“আপনি নীলের বাবা-মাকে চিনতেন, তাই তো?”
রাশেদ সাহেব চুপ।
—“আপনি কি নীলের মাকে কোনো কাগজে সই করিয়েছিলেন?”
এবার রাশেদ সাহেবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—“কে তোকে এসব বলেছে?”
—“নীল।”
—“সে কী জানে?”
—“সব না। কিন্তু জানবে।”
রাশেদ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
—“তুই নীলের সঙ্গে আর দেখা করবি না।”
রমিশা শান্তভাবে বলল,
—“না।”
বাবা অবাক।
—“না মানে?”
—“আমি নীলের সঙ্গে দেখা করব।”
—“রমিশা!”
—“আপনি যদি সত্যিই নির্দোষ হন, তাহলে ভয় পাওয়ার কী আছে?”
কথাটা শুনে রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
রমিশা আরও বলল,
—“আপনি আমাকে ভালোবাসেন, জানি। কিন্তু আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাকে সত্যিটা জানার অধিকার দিন।”
রাশেদ সাহেব মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
—“সব সত্যি জানলে হয়তো তুই আমাকে আর বাবা বলে ডাকবি না।”
রমিশার বুক কেঁপে উঠল।
—“এত বড় কী করেছেন আপনি?”
রাশেদ সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না।
সেদিন সন্ধ্যায় নীল আর রমিশা দেখা করল।
রমিশার মুখ দেখে নীল বুঝল কিছু একটা হয়েছে।
—“তোমার বাবা কী বলেছেন?”
রমিশা ধীরে বলল,
—“তিনি অনেক কিছু লুকাচ্ছেন।”
—“আমার মা-ও।”
—“তোমার মা কি কিছু বলেছেন?”
—“বলেছেন, তোমার বাবা একসময় তাদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন।”
রমিশা অবাক হয়ে গেল।
—“বাবা বলেছেন তিনি নীলের পরিবারের সঙ্গে ব্যবসা করতেন।”
নীল বলল,
—“আমার মা বলেছে, তোমার বাবা তাকে কিছু কাগজে সই করিয়েছিলেন।”
রমিশা চুপ করে গেল।
—“কী ধরনের কাগজ?”
—“জানি না।”
—“আমাদের দুজনের বাবাই কিছু লুকাচ্ছেন।”
নীল মাথা নেড়ে বলল,
—“হ্যাঁ।”
কিছুক্ষণ পর রমিশা বলল,
—“তাহলে আমরা একসঙ্গে সত্যিটা খুঁজব।”
নীল মুচকি হেসে বলল,
—“তুমি আমার সঙ্গে থাকলে কাজটা সহজ হবে।”
—“আমি তো বলেছি, তোমার পাশে আছি।”
নীল তার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—“তুমি জানো, তোমার একটা সমস্যা আছে?”
—“কী?”
—“তুমি যখন সিরিয়াস কথা বলো, তখন খুব সুন্দর দেখাও।”
রমিশা সঙ্গে সঙ্গে বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আবার শুরু করলে?”
নীল হেসে ফেলল।
—“আচ্ছা, আর বলব না।”
রমিশাও হেসে ফেলল।
কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
কারণ ঠিক তখনই নীলের ফোন বেজে উঠল।
অপরিচিত নম্বর।
সে ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে একজন বৃদ্ধ কণ্ঠ বলল,
—“তুমি কি নীল?”
—“জি।”
—“তোমার বাবা-মায়ের ব্যাপারে জানতে চাও?”
নীল সোজা হয়ে দাঁড়াল।
—“আপনি কে?”
—“আমি সেই মানুষ, যে সেদিনের ঘটনা নিজের চোখে দেখেছিল।”
নীলের বুক ধক করে উঠল।
—“কোথায় দেখা করতে হবে?”
লোকটি একটা জায়গার নাম বলল।
—“এক ঘণ্টার মধ্যে আসবে। একা।”
ফোন কেটে গেল।
রমিশা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
—“কে ছিল?”
নীল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“কেউ একজন, যে আমাদের বাবা-মায়ের পুরোনো সত্যি জানে।”
—“তুমি একা যাবে?”
—“হ্যাঁ।”
—“আমি যাব।”
—“না।”
—“কেন?”
—“কারণ লোকটা একা যেতে বলেছে।”
রমিশা কঠিন গলায় বলল,
—“আর আমি তোমাকে একা যেতে দেব না।”
নীল হেসে বলল,
—“তুমি এত জেদি কেন?”
—“তোমার জন্য।”
কথাটা বলেই রমিশা থেমে গেল।
নীলও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু হাসল।
—“ঠিক আছে। তুমি যাবে।”
এক ঘণ্টা পর তারা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাল।
একটা পুরোনো চায়ের দোকান।
কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
নীল চারদিকে তাকাল।
—“লোকটা কোথায়?”
রমিশা বলল,
—“হয়তো আসেনি।”
ঠিক তখনই দোকানের ভেতর থেকে একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন।
তিনি নীলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তোমাকে দেখে তোমার বাবার কথা মনে পড়ছে।”
নীল এগিয়ে গেল।
—“আপনি কে?”
বৃদ্ধ লোকটি উত্তর দেওয়ার আগে চারপাশে তাকালেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন,
—“তোমার বাবা আর রমিশার বাবার মধ্যে যে ঝামেলা হয়েছিল, তার আসল কারণ ব্যবসা ছিল না।”
নীল আর রমিশা দুজনেই স্থির হয়ে গেল।
—“তাহলে?”
বৃদ্ধ লোকটি বললেন,
—“কারণ ছিল একজন নারী।”
রমিশার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
নীল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
বৃদ্ধ আবার বললেন,
—“আর সেই নারীকে নিয়ে যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, তার জন্য দায়ী ছিল এমন একজন, যাকে তোমরা দুজনেই খুব কাছের মানুষ মনে করো।”
—“কে?”
বৃদ্ধ লোকটি উত্তর দেওয়ার আগেই দূরে একটা গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে একজন লোক নেমে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
বৃদ্ধ লোকটি তাকে দেখেই ভয় পেয়ে গেলেন।
—“তোমরা এখান থেকে চলে যাও!”
নীল অবাক হয়ে বলল,
—“কেন?”
বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন,
—“কারণ সে তোমাদের সত্যিটা জানতে দিতে চায় না।”
নীল পিছনে তাকাল।
আর গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তার মুখের হাসি এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।
লোকটা ছিল রমিশার বাবার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ।
লোকটাকে দেখেই রমিশার বুক কেঁপে উঠল।
তিনি তার বাবার বহু বছরের বিশ্বস্ত কর্মচারী—করিম চাচা। ছোটবেলা থেকেই রমিশা তাকে দেখে আসছে। বাবার প্রায় সব কাজেই তিনি সঙ্গে থাকেন।
কিন্তু আজ তাকে দেখে নীলের মনে হলো, এই মানুষটার উপস্থিতি নিছক কাকতালীয় নয়।
বৃদ্ধ লোকটা দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন।
—“তোমরা এখনই চলে যাও।”
নীল অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি তো বলছিলেন সত্যিটা জানাবেন!”
বৃদ্ধ লোকটা নিচু গলায় বললেন,
—“সময় নেই। ওই মানুষটা যদি বুঝতে পারে আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাহলে সব শেষ।”
নীল করিম চাচার দিকে তাকাল।
করিম চাচা গাড়ির দরজা বন্ধ করে তাদের দিকে এগিয়ে আসছিলেন।
—“আপনারা এখানে?”
রমিশা দ্রুত বলল,
—“আপনি এখানে কেন?”
করিম চাচা একটু থেমে বললেন,
—“তোমার বাবা আমাকে পাঠিয়েছেন।”
নীল ঠান্ডা গলায় বলল,
—“কেন?”
—“আপনাদের নিয়ে যেতে।”
—“আমাদের?”
করিম চাচা নীলের দিকে তাকালেন।
—“হ্যাঁ।”
নীল হেসে বলল,
—“অদ্ভুত ব্যাপার। আমরা কোথায় আছি সেটা আপনারা কীভাবে জানলেন?”
করিম চাচা কোনো উত্তর দিলেন না।
বৃদ্ধ লোকটা তখন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিলেন।
নীল তাকে থামাতে গেল।
—“এক মিনিট!”
কিন্তু বৃদ্ধ লোকটা দ্রুত রাস্তার অন্যদিকে চলে গেলেন।
করিম চাচা নীলকে থামিয়ে বললেন,
—“ওনার সঙ্গে আর কথা বলবেন না।”
নীল চোখ সরু করে বলল,
—“কেন?”
—“কারণ উনি যা বলবেন, তার সব সত্যি নয়।”
—“আপনি জানেন কী সত্যি?”
করিম চাচা চুপ করে গেলেন।
এই নীরবতাই নীলের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিল।
গাড়িতে ফেরার সময় রমিশা কোনো কথা বলছিল না।
নীল জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
কিছুক্ষণ পর রমিশা বলল,
—“তুমি কী ভাবছ?”
—“করিম চাচা আমাদের অনুসরণ করছিলেন।”
—“হয়তো বাবা চিন্তিত হয়ে পাঠিয়েছেন।”
—“হতে পারে।”
—“কিন্তু?”
নীল তার দিকে তাকাল।
—“কিন্তু উনি আমাদের এখানে আসার কথা জানলেন কীভাবে?”
রমিশা চুপ করে গেল।
—“তুমি কি মনে করো বাবা আমাদের ওপর নজর রাখছেন?”
—“আমি জানি না।”
—“তুমি বাবাকে সন্দেহ করছ?”
নীল ধীরে বলল,
—“আমি তোমার বাবাকে সন্দেহ করতে চাই না।”
রমিশা নিচু স্বরে বলল,
—“আমিও না।”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর নীল তার হাতের পুরোনো ছবিটার দিকে তাকাল।
—“আমাদের সত্যিটা বের করতেই হবে।”
রমিশা মাথা নেড়ে বলল,
—“হ্যাঁ।”
সেদিন রাতে রাশেদ সাহেব বাড়ি ফিরে করিম চাচাকে ডাকলেন।
—“তুমি ওদের দেখেছ?”
—“জি।”
—“কী কথা বলেছে?”
—“ওরা অনেক প্রশ্ন করছে।”
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
—“বৃদ্ধ লোকটার সঙ্গে কথা বলেছে?”
করিম চাচা মাথা নিচু করলেন।
—“জি।”
রাশেদ সাহেবের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
—“সে কী বলেছে?”
—“সব বলতে পারেনি।”
—“ভালো।”
করিম চাচা একটু দ্বিধা করে বললেন,
—“স্যার, আর কতদিন এভাবে লুকিয়ে রাখবেন?”
রাশেদ সাহেব তার দিকে তাকালেন।
—“যতদিন না পরিস্থিতি ঠিক হয়।”
—“কিন্তু নীল যদি সব জেনে যায়?”
—“তাহলে…”
রাশেদ সাহেব বাকিটা বললেন না।
করিম চাচা বুঝলেন, তার ভয়টা সত্যিই গভীর।
অন্যদিকে নীল সেদিন রাতে আবার মায়ের বাক্সটা খুলল।
সে জানত, এবার তাকে খুব সাবধানে এগোতে হবে।
বাক্সের ভেতরে থাকা পুরোনো কাগজগুলো একে একে দেখতে লাগল।
একটা পুরোনো রসিদ।
একটা ছবি।
কয়েকটা চিঠি।
আর একটা ছোট ডায়েরি।
ডায়েরিটা খুলতেই প্রথম পাতায় লেখা—
“যদি কোনোদিন নীল সব জানতে চায়…”
নীলের হাত কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত পরের পৃষ্ঠা খুলল।
কিন্তু কয়েকটি পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলা।
শুধু একটা লাইন দেখা যাচ্ছে—
“রাশেদ যা করেছে, তার জন্য সায়েমকে দোষ দেওয়া যাবে না।”
নীল স্তব্ধ হয়ে গেল।
তারপর আরেকটা পৃষ্ঠা।
সেখানে লেখা—
“সেদিন রাতে নন্দিনী একা ছিল না।”
নীলের মাথা ঘুরে গেল।
“নন্দিনী একা ছিল না”—এর মানে কী?
তার মা কি কারও সঙ্গে ছিলেন?
রাশেদ কি সেই ঘটনা দেখেছিল?
নাকি কেউ ইচ্ছা করে তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করেছিল?
নীল আর অপেক্ষা করতে পারল না।
সে মাকে ডাকল।
—“মা!”
নন্দিনী ঘরে এসে ডায়েরিটা দেখে থেমে গেলেন।
—“তুই এটা কোথায় পেলি?”
—“তোমার বাক্সে।”
—“আমি তোকে বলেছিলাম এগুলো না দেখতে।”
—“মা, এখানে কী লেখা আছে?”
নন্দিনী ডায়েরিটা হাতে নিলেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“এই ডায়েরি আমি লিখিনি।”
নীল অবাক।
—“তাহলে?”
—“এটা রাশেদের বোনের।”
—“তার কাছে কেন ছিল?”
—“সে অনেক কিছু জানত।”
—“এখন কোথায়?”
নন্দিনীর চোখে ভয় দেখা দিল।
—“সে আর বেঁচে নেই।”
নীল থমকে গেল।
—“কীভাবে মারা গিয়েছিল?”
নন্দিনী উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
—“এই কারণেই আমি চাই না তুই আর এসবের মধ্যে ঢুকিস।”
নীল দৃঢ় গলায় বলল,
—“আমি আর পেছনে ফিরব না।”
পরদিন নীল রমিশাকে সব বলল।
ডায়েরির কথা শুনে রমিশাও চিন্তিত হয়ে পড়ল।
—“রাশেদের বোন কি বাবাকে চিনত?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে তার কাছে নিশ্চয়ই অনেক কিছু ছিল।”
—“সমস্যা হলো, সে মারা গেছে।”
রমিশা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“বাবার পুরোনো অফিসে হয়তো কিছু থাকতে পারে।”
নীল তাকাল।
—“তুমি কীভাবে জানো?”
—“ছোটবেলায় বাবার পুরোনো অফিসে একটা ঘর ছিল, যেখানে কাউকে ঢুকতে দিতেন না।”
—“এখনও আছে?”
—“জানি না।”
—“চলো দেখে আসি।”
রমিশা একটু ভয় পেলেও রাজি হয়ে গেল।
পুরোনো অফিসটা শহরের অন্য প্রান্তে।
বহুদিন ব্যবহার না হওয়ায় জায়গাটা ধুলোয় ভরা।
রমিশা দরজা খুলে নীলকে ভেতরে নিয়ে গেল।
—“এই ঘরটা।”
দরজায় পুরোনো তালা।
নীল তালাটা দেখে বলল,
—“চাবি আছে?”
—“না।”
নীল চারপাশে তাকাল।
দরজার পাশে একটা পুরোনো আলমারি।
আলমারির ওপর ধুলো জমে আছে।
হঠাৎ রমিশার চোখ পড়ল একটা ছোট কাঠের বাক্সে।
সে বাক্সটা নামিয়ে খুলল।
ভেতরে কিছু পুরোনো কাগজ।
নীল একে একে দেখতে লাগল।
হঠাৎ একটা চিঠি তার হাতে এল।
খামের ওপর লেখা—
“নন্দিনীর জন্য।”
নীল খামটা খুলল।
ভেতরের চিঠিটা পড়তে পড়তে তার চোখ বড় হয়ে গেল।
—“রমিশা…”
—“কী?”
নীল চিঠিটা তার হাতে দিল।
চিঠিতে লেখা—
“নন্দিনী, তুমি সায়েমকে যা বলেছ, সেটা পুরো সত্যি নয়। তুমি যদি চুপ থাকো, তাহলে শুধু তোমাদের সংসার নয়, তোমার ছেলের জীবনও বদলে যাবে। রাশেদকে থামাও।”
রমিশা চিঠিটা পড়ে স্তব্ধ।
—“রাশেদকে থামাও?”
নীল মাথা নেড়ে বলল,
—“মানে তোমার বাবা কিছু করতে যাচ্ছিলেন।”
ঠিক তখনই বাইরে দরজার শব্দ হলো।
দুজনেই চমকে উঠল।
কেউ দরজা খুলছে।
নীল দ্রুত চিঠিটা পকেটে রাখল।
রমিশা ফিসফিস করে বলল,
—“কে?”
কোনো উত্তর নেই।
দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে—
রাশেদ সাহেব।
তার চোখ সরাসরি নীলের হাতে থাকা বাক্সের দিকে।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না।
তারপর রাশেদ সাহেব ধীরে বললেন,
—“তোমরা এখানে কী খুঁজছ?”
নীল এবার আর ভয় পেল না।
সে পকেট থেকে চিঠিটা বের করে বলল,
—“সত্যি।”
রাশেদ সাহেব চিঠিটা দেখেই যেন পাথর হয়ে গেলেন।
রমিশা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“বাবা, আপনি কী করেছিলেন?”
রাশেদ সাহেবের চোখে এবার সেই কঠোরতা নেই।
ছিল শুধু ক্লান্তি।
তিনি ধীরে ধীরে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন।
তারপর বললেন,
—“তোমরা যদি সত্যিই সব জানতে চাও…”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“তাহলে আজ তোমাদের এমন একটা কথা বলব, যেটা আমি গত বিশ বছর ধরে নিজের কাছেও স্বীকার করিনি।”
নীল আর রমিশা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
রাশেদ সাহেব মাথা নিচু করে বললেন,
—“সায়েম আর নন্দিনীর বিচ্ছেদের জন্য আমি দায়ী।”
রমিশার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আর নীলের মনে হলো, এতদিনের সন্দেহ অবশেষে সত্যি হতে শুরু করেছে।
কিন্তু রাশেদ সাহেবের পরের কথাটাই ছিল আরও ভয়ংকর—
—“তবে আমি যা করেছি, সেটা তাদের আলাদা করার জন্য নয়…”
তিনি থেমে গেলেন।
—“আমি সেটা করেছিলাম তোমাকে বাঁচানোর জন্য, নীল।”
রাশেদ সাহেবের কথাটা শুনে নীল যেন কিছুক্ষণের জন্য কথা বলার শক্তিই হারিয়ে ফেলল।
“আমি সেটা করেছিলাম তোমাকে বাঁচানোর জন্য, নীল।”
রমিশাও বাবার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
—“আপনি কী বলছেন, বাবা?”
রাশেদ সাহেব চোখ তুলে মেয়ের দিকে তাকালেন।
—“যে গল্পটা এতদিন তোমরা শুনে এসেছ, তার অর্ধেকও সত্যি নয়।”
নীল ধীরে ধীরে বলল,
—“আমার বাবা-মায়ের সংসার ভাঙার জন্য আপনি দায়ী ছিলেন। এখন বলছেন আমাকে বাঁচানোর জন্য?”
—“হ্যাঁ।”
—“কিসের হাত থেকে?”
রাশেদ সাহেব উত্তর দিতে পারলেন না।
নীল এবার উত্তেজিত হয়ে উঠল।
—“আপনি আমাকে ভালোবাসতেন না। আপনি আমার পরিবার ধ্বংস করেছেন। এখন নিজের ভুল ঢাকার জন্য নতুন গল্প বানাচ্ছেন!”
রমিশা দ্রুত নীলের হাত ধরল।
—“নীল, শান্ত হও।”
নীল হাত সরিয়ে নিল।
—“না, রমিশা। আজ আমাকে বলতে দাও।”
সে রাশেদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমি ছোটবেলা থেকে জানি আমার বাবা-মা কেন আলাদা। কিন্তু আজ জানতে পারছি, আমি যা জানি সেটা মিথ্যা।”
রাশেদ সাহেব ধীরে বললেন,
—“মিথ্যা নয়। অসম্পূর্ণ।”
—“তাহলে পুরোটা বলুন।”
রাশেদ সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“তোমার জন্মের আগের ঘটনা।”
নীল থমকে গেল।
রাশেদ সাহেব বলতে শুরু করলেন।
—“সায়েম আর নন্দিনী তখন নতুন সংসার শুরু করেছে। দুজনের জীবন খুব ভালোই চলছিল। আমি তখন সায়েমের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। ব্যবসার কাজেও আমরা একসঙ্গে ছিলাম।”
—“তারপর?”
—“একদিন জানতে পারলাম, আমাদের ব্যবসার টাকা কেউ ধীরে ধীরে সরিয়ে নিচ্ছে।”
নীল বলল,
—“কে?”
—“আমি জানতাম না।”
—“তাহলে মাকে কেন দোষ দেওয়া হলো?”
রাশেদ সাহেব চোখ নামিয়ে বললেন,
—“কারণ সব প্রমাণ নন্দিনীর বিরুদ্ধে সাজানো হয়েছিল।”
রমিশা অবাক।
—“সাজানো হয়েছিল?”
—“হ্যাঁ।”
—“কে সাজিয়েছিল?”
রাশেদ সাহেব চুপ করে গেলেন।
নীল এগিয়ে এসে বলল,
—“কে?”
—“আমাদের ব্যবসার একজন পুরোনো অংশীদার।”
—“নাম?”
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“মাহবুব।”
নীল নামটা মনে রাখল।
—“সে কী করেছিল?”
—“সে নন্দিনীর স্বাক্ষর নকল করে কয়েকটা কাগজ তৈরি করেছিল। তারপর এমনভাবে সব প্রমাণ সাজিয়েছিল, যাতে মনে হয় নন্দিনী গোপনে ব্যবসার টাকা অন্য জায়গায় পাঠিয়েছে।”
নীল মাথা নাড়ল।
—“আর বাবা সেটা বিশ্বাস করেছিলেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনি করেননি?”
রাশেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“আমি সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু তখন একটা বড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল।”
—“কী?”
রাশেদ সাহেব নীলের দিকে তাকালেন।
—“তোমার জন্মের আগে নন্দিনী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।”
নীল চুপ করে গেল।
—“তার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা দরকার ছিল। মাহবুব সেই সুযোগ নিয়েছিল। সে সায়েমকে বলেছিল, যদি নন্দিনীকে দায়ী করে ব্যবসার টাকা উদ্ধার করা না হয়, তাহলে সে সবকিছু ধ্বংস করে দেবে।”
—“তাহলে আপনি কী করেছিলেন?”
—“আমি নন্দিনীকে বলেছিলাম কিছুদিনের জন্য সায়েমের কাছ থেকে দূরে থাকতে।”
রমিশা অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি তাদের আলাদা করেছিলেন?”
—“হ্যাঁ।”
নীল ক্ষুব্ধ হয়ে বলল,
—“তাহলে আপনি দায়ী!”
রাশেদ সাহেব মাথা নিচু করলেন।
—“হ্যাঁ। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম সাময়িকভাবে দূরে থাকলে পরিস্থিতি শান্ত হবে। আমি জানতাম না, মাহবুব আরও বড় একটা পরিকল্পনা করেছে।”
—“কী পরিকল্পনা?”
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“সে চেয়েছিল সায়েম আর নন্দিনীর সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যাক। কারণ তারা একসঙ্গে থাকলে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ বেরিয়ে আসত।”
নীল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—“আর আমাকে?”
রাশেদ সাহেব ধীরে বললেন,
—“তুমি তখন জন্মও নাওনি। কিন্তু মাহবুব জানত, নন্দিনী তোমাকে নিয়ে সায়েমের কাছে ফিরতে চাইছে।”
—“তারপর?”
—“সে হুমকি দিয়েছিল, নন্দিনী যদি সায়েমের কাছে ফিরে যায়, তাহলে সে তোমার ক্ষতি করবে।”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
রমিশা ধীরে ধীরে বলল,
—“তাহলে বাবা… আপনি ভয় পেয়েছিলেন?”
রাশেদ সাহেব চোখ মুছে বললেন,
—“হ্যাঁ। আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম তাদের সাময়িক বিচ্ছেদই তোমাকে নিরাপদ রাখবে।”
নীল কাঁপা গলায় বলল,
—“কিন্তু আপনি তো আমার পরিবারটাই ভেঙে দিলেন।”
—“জানি।”
—“বাবা-মাকে সত্যিটা বলেননি কেন?”
—“কারণ মাহবুবের হাতে তখন অনেক ক্ষমতা ছিল। আমি ভেবেছিলাম সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
নীল তিক্ত হেসে বলল,
—“সময় কিছু ঠিক করেনি।”
রাশেদ সাহেব মাথা নিচু করলেন।
—“আমি জানি।”
হঠাৎ নীলের মনে একটা প্রশ্ন এল।
—“মাহবুব এখন কোথায়?”
রাশেদ সাহেব তাকালেন।
—“মারা গেছে।”
—“কবে?”
—“প্রায় দশ বছর আগে।”
—“তাহলে এতদিন আপনি সত্যিটা প্রকাশ করেননি কেন?”
রাশেদ সাহেব কিছু বললেন না।
রমিশা এবার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“কারণ?”
রাশেদ সাহেব ধীরে বললেন,
—“কারণ মাহবুব মারা যাওয়ার আগে একটা কথা বলে গিয়েছিল।”
—“কী কথা?”
—“সে বলেছিল, তার কাছে এমন একটা প্রমাণ আছে যা প্রকাশ হলে সায়েম আর নন্দিনীর জীবন আরও ভয়াবহ হয়ে যাবে।”
নীল বিরক্ত হয়ে বলল,
—“কী প্রমাণ?”
—“আমি জানি না।”
—“তাহলে আপনি ভয় পাচ্ছেন কিসের?”
রাশেদ সাহেব উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে একটা শব্দ হলো।
তিনজনই দরজার দিকে তাকাল।
কেউ যেন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।
নীল দ্রুত দরজা খুলে বাইরে গেল।
কিন্তু করিডোর ফাঁকা।
শুধু মেঝেতে একটা খাম পড়ে আছে।
নীল খামটা তুলে নিল।
তার ওপর লেখা—
“নীলের জন্য।”
রমিশা তার পাশে এসে দাঁড়াল।
—“খামটা কে রেখে গেল?”
নীল খাম খুলল।
ভেতরে একটা ছোট কাগজ।
মাত্র একটি বাক্য—
“তোমার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের সত্যি জানতে চাইলে, পুরোনো রেলস্টেশনে রাত দশটায় এসো।”
নীল কাগজটা শক্ত করে ধরল।
রাশেদ সাহেব দূর থেকে সেটা দেখে ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন।
—“তুমি সেখানে যাবে না।”
নীল ঘুরে তাকাল।
—“কেন?”
—“কারণ এটা ফাঁদ।”
—“আপনি কীভাবে জানেন?”
রাশেদ সাহেব চুপ।
নীল এবার বুঝল, তার বাবা-মায়ের পুরোনো রহস্য এখনও শেষ হয়নি।
সন্ধ্যায় নীল রমিশার সঙ্গে দেখা করল।
রমিশা বলল,
—“তুমি যাবে?”
—“হ্যাঁ।”
—“আমি তোমার সঙ্গে যাব।”
—“না।”
—“আবার না?”
—“এবার সত্যিই বিপদ হতে পারে।”
রমিশা শান্তভাবে বলল,
—“তুমি যদি বিপদে পড়ো আর আমি পাশে না থাকি, তাহলে তোমার সঙ্গে থাকার মানে কী?”
নীল কিছু বলল না।
রমিশা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুমি আমার জন্য তোমার পরিবারকে ঠিক করতে চাইছ। আমি তোমার জন্য এতটুকু করতে পারব না?”
নীলের মুখে মৃদু হাসি ফুটল।
—“তুমি জানো তুমি অসম্ভব জেদি?”
—“জানি।”
—“ঠিক আছে। তুমি যাবে।”
রাত দশটা।
পুরোনো রেলস্টেশন প্রায় ফাঁকা।
দূরে একটা ট্রেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
নীল আর রমিশা ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে গেল।
—“কেউ নেই তো।”
রমিশা চারপাশে তাকাল।
—“হয়তো একটু পর আসবে।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে কণ্ঠ ভেসে এল—
—“তোমরা এসেছ।”
দুজন ঘুরে দাঁড়াল।
একজন মধ্যবয়সী লোক দাঁড়িয়ে আছে।
নীল বলল,
—“আপনি কে?”
লোকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
—“আমি মাহবুবের ছেলে।”
নীল অবাক।
—“মাহবুব মারা গেছে।”
—“হ্যাঁ। কিন্তু যাওয়ার আগে বাবা আমাকে সব বলেছিল।”
রমিশা বলল,
—“কী বলেছিল?”
লোকটা চারদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
—“তোমাদের বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের গল্পে সবচেয়ে বড় মিথ্যাটা হলো—মাহবুব একা কিছু করেনি।”
নীলের বুক কেঁপে উঠল।
—“তার সঙ্গে আর কে ছিল?”
লোকটা নীলের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তোমাদের খুব কাছের একজন।”
—“কে?”
লোকটা উত্তর দেওয়ার আগেই দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
লোকটা বলল,
—“যার ওপর তোমরা সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো…”
তারপর সে নীলের হাতে একটা পেনড্রাইভ দিয়ে দ্রুত চলে গেল।
নীল পেনড্রাইভটার দিকে তাকিয়ে রইল।
রমিশা ধীরে বলল,
—“এতে কী আছে?”
নীল মাথা নাড়ল।
—“জানি না।”
সে পেনড্রাইভটা শক্ত করে ধরে বলল,
—“কিন্তু মনে হচ্ছে, এবার আমরা সত্যির একদম কাছে চলে এসেছি।”
পুরোনো রেলস্টেশন থেকে বের হওয়ার পরও নীলের মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
“যার ওপর তোমরা সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো…”
কে সেই মানুষ?
মাহবুবের সঙ্গে আর কে ছিল?
আর সেই মানুষটাই বা কীভাবে তাদের পরিবার ভাঙার সঙ্গে জড়িত?
রমিশা পাশে হাঁটছিল চুপচাপ।
কিছুদূর যাওয়ার পর সে বলল,
—“নীল, পেনড্রাইভটা এখনই খুলবে?”
—“না।”
—“কেন?”
—“আমার ভয় হচ্ছে, এর ভেতরে এমন কিছু আছে যেটা আমরা দেখার জন্য প্রস্তুত নই।”
রমিশা ধীরে বলল,
—“সত্যি কখনো প্রস্তুতি নিয়ে আসে না।”
নীল তার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
—“তুমি মাঝে মাঝে অনেক বুদ্ধির কথা বলো।”
—“মাঝে মাঝে?”
—“বেশিরভাগ সময়ও বলা যায়।”
রমিশা মুচকি হাসল।
কিন্তু বাড়ি পৌঁছানোর পর তাদের হাসির আর কোনো কারণ থাকল না।
নীল নিজের ঘরে কম্পিউটার খুলে পেনড্রাইভটা লাগাল।
ভেতরে মাত্র তিনটি ফাইল।
দুটি ছবি।
আর একটি ভিডিও।
ভিডিওর নাম—
“সেদিনের রাত।”
নীল কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
রমিশা তার পাশে বসে আছে।
—“চালাও।”
নীল ভিডিও চালু করল।
স্ক্রিনে প্রথমে অন্ধকার।
তারপর ধীরে ধীরে একটা পুরোনো অফিসঘর দেখা গেল।
ঘরটা দেখে নীল চমকে উঠল।
—“এটা তো বাবার পুরোনো অফিস!”
ভিডিওতে সায়েম দাঁড়িয়ে আছে।
তার সামনে মাহবুব।
আর একটু দূরে রাশেদ সাহেব।
তিনজনের মুখেই তীব্র উত্তেজনা।
মাহবুব বলছে,
—“আমি শেষবারের মতো বলছি, কাগজে সই করুন।”
সায়েম গর্জে উঠল,
—“আমি কোনো অন্যায় কাগজে সই করব না।”
রাশেদ তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
মাহবুব তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুমি অন্তত ওকে বোঝাও।”
রাশেদ কিছু বলল না।
সায়েম রাশেদের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুই আমার বন্ধু। তুই অন্তত বল, আমি ভুল করছি কি না।”
রাশেদ মাথা নিচু করে রইল।
ভিডিওতে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মাহবুব একটা ফাইল টেবিলে ছুড়ে দিয়ে বলল,
—“তাহলে তোমার স্ত্রীকে জেলে যেতে হবে।”
নীলের চোখ বড় হয়ে গেল।
রমিশা মুখে হাত দিল।
—“নন্দিনী?”
ভিডিওতে সায়েম ফাইলটা খুলে দেখল।
তারপর চিৎকার করে উঠল,
—“এগুলো মিথ্যা!”
মাহবুব ঠান্ডা গলায় বলল,
—“প্রমাণ সব তোমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে।”
রাশেদ তখন প্রথমবার কথা বলল।
—“সায়েম, আপাতত নন্দিনীকে কিছুদিন দূরে রাখো।”
সায়েম তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুইও ওদের কথা বিশ্বাস করছিস?”
রাশেদ বলল,
—“আমি শুধু চাই পরিস্থিতি শান্ত হোক।”
সায়েম রেগে বলল,
—“তুই আমার পাশে নেই?”
রাশেদ কোনো উত্তর দিল না।
ভিডিও এখানেই থেমে গেল।
নীল হতভম্ব হয়ে বসে রইল।
—“মানে বাবা আর মাহবুবের মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছিল?”
রমিশা ধীরে বলল,
—“কিন্তু ভিডিওটা এখানেই শেষ।”
—“হ্যাঁ।”
—“এরপর কী হয়েছিল?”
নীল ফাইলগুলোর দিকে তাকাল।
—“হয়তো অন্য ভিডিও আছে।”
তারা আবার পেনড্রাইভটা পরীক্ষা করল।
কিন্তু আর কোনো ভিডিও নেই।
শুধু দ্বিতীয় একটা ছবি।
নীল ছবিটা খুলল।
ছবিতে রাশেদ সাহেব একা দাঁড়িয়ে আছেন।
তার পাশে মাহবুব।
আর তাদের পেছনে দেখা যাচ্ছে একটা হাসপাতালের করিডোর।
রমিশা ছবিটা দেখে চমকে উঠল।
—“এটা তো আমাদের পুরোনো হাসপাতাল।”
—“তুমি নিশ্চিত?”
—“হ্যাঁ। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে সেখানে যেতাম।”
নীল ছবির তারিখ দেখল।
তারিখটা ছিল তার জন্মের ঠিক আগের দিন।
তার বুক ধক করে উঠল।
—“আমার জন্মের আগের দিন তারা হাসপাতালে কেন ছিল?”
রমিশা কোনো উত্তর দিতে পারল না।
পরদিন সকালে নীল সরাসরি তার বাবার কাছে গেল।
সায়েম সাহেব তাকে দেখে বললেন,
—“তুই আবার এসেছিস?”
নীল কোনো ভূমিকা না করে ল্যাপটপটা খুলে ভিডিও চালিয়ে দিল।
ভিডিও শেষ হওয়ার পর সায়েম সাহেবের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—“এটা কোথায় পেলি?”
—“পেনড্রাইভে।”
—“কে দিয়েছে?”
—“মাহবুবের ছেলে।”
সায়েম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“আমি ভেবেছিলাম এই ভিডিও আর কখনো বের হবে না।”
—“তুমি জানতেও?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে আমাকে বলোনি কেন?”
সায়েম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“কারণ এই ভিডিওর পরের ঘটনাটা আরও ভয়ংকর।”
নীল সামনে এগিয়ে গেল।
—“বল।”
সায়েম সাহেব অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“সেদিন রাতে নন্দিনী হাসপাতালে ছিল।”
—“কেন?”
—“তোর জন্মের আগে ওর শরীর খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল।”
—“তারপর?”
—“মাহবুব আমাকে বোঝাল, নন্দিনীকে কিছুদিন আলাদা রাখলে সমস্যা মিটে যাবে। রাশেদও তখন তার কথায় বিশ্বাস করেছিল।”
নীল বলল,
—“কিন্তু তুমি?”
—“আমি নন্দিনীকে বিশ্বাস করতাম। কিন্তু প্রমাণগুলো এত শক্ত ছিল যে আমিও দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম।”
—“তুমি কি মাকে বিশ্বাসঘাতক মনে করেছিলে?”
সায়েম সাহেব চোখ নামিয়ে বললেন,
—“একসময় হ্যাঁ।”
নীলের চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
—“তুমি মাকে সন্দেহ করেছিলে।”
—“আমি ভুল করেছিলাম।”
—“আর রাশেদ?”
—“সে আমাকে থামাতে চেয়েছিল।”
নীল থমকে গেল।
—“কী?”
—“হ্যাঁ। এতদিন আমি ভেবেছিলাম রাশেদই সব করেছে। কিন্তু পরে বুঝেছি, সে আমাকে নন্দিনীর কাছ থেকে দূরে রাখছিল ঠিকই, কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল অন্য।”
—“কী উদ্দেশ্য?”
সায়েম সাহেব ধীরে বললেন,
—“তোর জীবন বাঁচানো।”
নীল স্তব্ধ হয়ে গেল।
একই কথা রাশেদ সাহেবও বলেছিলেন।
—“তাহলে রাশেদ সত্যি বলছে?”
সায়েম সাহেব মাথা নাড়লেন।
—“হয়তো।”
—“হয়তো?”
—“কারণ একটা ব্যাপার আমি এখনো বুঝিনি।”
—“কী?”
সায়েম সাহেব টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা পুরোনো ফাইল বের করলেন।
—“তোর জন্মের আগের রাতে হাসপাতাল থেকে একটা রিপোর্ট হারিয়ে যায়।”
—“কী রিপোর্ট?”
—“তোর মায়ের চিকিৎসার রিপোর্ট।”
নীল অবাক।
—“কেন?”
—“সেই রিপোর্টে এমন কিছু লেখা ছিল, যা প্রমাণ করতে পারত নন্দিনী কোনো অপরাধ করেনি।”
—“তাহলে রিপোর্টটা কে সরিয়েছিল?”
সায়েম সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
—“জানি না।”
অন্যদিকে রমিশা বাবার পুরোনো অফিসে আবার গেল।
সে এবার একাই গিয়েছিল।
ঘরের ভেতর ঢুকে পুরোনো আলমারিগুলো দেখতে লাগল।
হঠাৎ একটা ড্রয়ারের ভেতর ছোট একটা চাবি পেল।
চাবির সঙ্গে একটা কাগজ।
কাগজে লেখা—
“যেদিন রমিশা সব জানতে চাইবে, সেদিন আলমারি ১৭ খুলবে।”
রমিশার বুক ধক করে উঠল।
আলমারি ১৭!
সে দ্রুত গুদামঘরের দিকে গেল।
সেখানে অনেক পুরোনো আলমারি।
একটার পর একটা নম্বর।
শেষে পেল—১৭।
চাবি ঢোকাতেই তালা খুলে গেল।
ভেতরে একটা ফাইল।
ফাইলের ওপরে লেখা—
“নন্দিনী — ব্যক্তিগত।”
রমিশার হাত কাঁপতে লাগল।
সে ফাইল খুলল।
প্রথমেই একটা হাসপাতালের রিপোর্ট।
তারিখ—নীলের জন্মের আগের দিন।
রিপোর্টে লেখা—
“রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল। শিশুর কোনো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই।”
রমিশা অবাক হয়ে গেল।
—“তাহলে নীলকে বিপদে বলা হয়েছিল কেন?”
ফাইলের নিচে আরও কিছু কাগজ।
একটা পুরোনো চিঠি।
চিঠিটা রাশেদ সাহেবের লেখা।
সেখানে লেখা—
“আমি জানি তুমি নির্দোষ। কিন্তু যদি সত্যিটা এখন প্রকাশ করি, তাহলে নীলকে যারা হুমকি দিয়েছে তারা তাকে ছাড়বে না। তাই আমাকে সায়েমের কাছে অপরাধী হতে হবে।”
রমিশার চোখে পানি চলে এল।
তাহলে তার বাবা সত্যিই নিজের ওপর দোষ নিয়েছিলেন?
কিন্তু কেন?
আর কারা নীলকে হুমকি দিয়েছিল?
ঠিক তখনই পেছন থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
রমিশা ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার সামনে করিম চাচা।
—“আপনি এখানে?”
করিম চাচা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“তোমার এখানে আসা উচিত হয়নি।”
—“এই কাগজগুলো কী?”
করিম চাচা ধীরে বললেন,
—“তোমার বাবা তোমাকে সবসময় সত্যিটা থেকে দূরে রাখতে চেয়েছেন।”
—“কিন্তু কেন?”
করিম চাচার চোখে পানি চলে এল।
—“কারণ তিনি একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।”
—“কাকে?”
করিম চাচা উত্তর দিলেন,
—“নন্দিনীকে।”
রমিশা অবাক হয়ে গেল।
—“আমার বাবার সঙ্গে নীলের মায়ের এমন কী সম্পর্ক ছিল?”
করিম চাচা বললেন,
—“তোমার বাবা নন্দিনীকে একটা কথা দিয়েছিলেন—নীল বড় না হওয়া পর্যন্ত তিনি কখনো সত্যিটা প্রকাশ করবেন না।”
রমিশার হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
নীলের ফোন।
সে ধরতেই নীলের উত্তেজিত কণ্ঠ—
—“রমিশা, আমি একটা জিনিস জানতে পেরেছি।”
—“কী?”
—“আমার জন্মের আগের রাতের হাসপাতালের রিপোর্টে একটা নাম আছে।”
—“কার নাম?”
নীল কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—“ডাক্তারের।”
রমিশা বলল,
—“কে?”
নীল ধীরে উত্তর দিল—
—“ডাক্তার মাহবুবের স্ত্রী।”
রমিশা স্তব্ধ হয়ে গেল।
ডাক্তারের নামটা শুনে রমিশা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।
—“মাহবুবের স্ত্রী?”
নীল ফোনের ওপাশ থেকে বলল,
—“হ্যাঁ। হাসপাতালের পুরোনো রিপোর্টে তার স্বাক্ষর আছে।”
—“কিন্তু তিনি তো ডাক্তার ছিলেন। তাহলে এই ঘটনার সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?”
—“সেটাই জানতে হবে।”
রমিশা করিম চাচার দিকে তাকাল।
—“আপনি জানতেন?”
করিম চাচা মাথা নিচু করলেন।
—“সবটা না। তবে এতটুকু জানতাম যে সেই রাতের ঘটনা স্বাভাবিক ছিল না।”
—“তাহলে এতদিন কাউকে বলেননি কেন?”
—“তোমার বাবা নিষেধ করেছিলেন।”
রমিশা কষ্টের গলায় বলল,
—“আমার বাবা কেন সবকিছু লুকিয়েছেন?”
করিম চাচা উত্তর দিলেন,
—“কারণ তিনি মনে করতেন সত্যিটা প্রকাশ করলে নীলের জীবন বিপদে পড়বে।”
সেদিন রাতেই নীল আর রমিশা পুরোনো হাসপাতালের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
হাসপাতালটি এখন আর আগের মতো নেই। নতুন ভবন তৈরি হয়েছে, পুরোনো অংশের বেশিরভাগই ভেঙে ফেলা হয়েছে।
তবুও পেছনের একটা ছোট ভবন এখনও রয়ে গেছে।
নীল বলল,
—“রিপোর্টে এই হাসপাতালের নামই আছে।”
রমিশা চারদিকে তাকাল।
—“ডাক্তার মাহবুবের স্ত্রী যদি এখানে কাজ করতেন, তাহলে পুরোনো রেকর্ড নিশ্চয়ই কোথাও আছে।”
তারা হাসপাতালের রেকর্ড রুমে গেল।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর একজন বৃদ্ধ কর্মচারী তাদের একটা পুরোনো রেজিস্টার এনে দিলেন।
নীল পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।
হঠাৎ একটা জায়গায় তার আঙুল থেমে গেল।
নন্দিনী সায়েম — ভর্তি: রাত ৮টা ২০ মিনিট।
তার নিচে লেখা—
“ডাক্তারের বিশেষ নির্দেশে রোগীকে আলাদা কক্ষে রাখা হয়।”
নীল ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“কেন আলাদা কক্ষে?”
কর্মচারী বললেন,
—“পুরোনো রেকর্ডে কারণ লেখা নেই।”
রমিশা রেজিস্টারের পরের পৃষ্ঠা দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা নাম পেল।
ডা. শারমিন মাহবুব।
তার নিচে একটা নোট।
“রোগীর সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।”
নীল বলল,
—“ব্যক্তিগত বিষয়ে?”
কর্মচারী মাথা নেড়ে বললেন,
—“এই পুরোনো রেকর্ডগুলোতে অনেক কিছুই অসম্পূর্ণ।”
ঠিক তখনই রমিশার চোখে আরেকটা লেখা পড়ল।
—“নীল!”
সে আঙুল দিয়ে দেখাল।
নন্দিনীর নামের নিচে আরেকটা ছোট নোট ছিল—
“রোগীর স্বামীকে সত্যিটা জানানো হয়নি।”
নীলের বুক কেঁপে উঠল।
—“কী সত্যি?”
কেউ জানত না।
রাতেই নীল তার মাকে ফোন করল।
—“মা, তুমি কি ডা. শারমিনকে চিনতে?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর নন্দিনী বললেন,
—“হ্যাঁ।”
—“তিনি তোমার চিকিৎসা করেছিলেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“সেই রাতে কী হয়েছিল?”
নন্দিনীর কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
—“তুই এসব কোথা থেকে জানলি?”
—“মা, এবার আর কিছু লুকিও না।”
নন্দিনী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“সেদিন রাতে আমি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। ডাক্তার বলেছিলেন আমার শরীর খারাপ হলেও তুমি নিরাপদে আছিস।”
—“তাহলে?”
—“রাত প্রায় বারোটার দিকে ডা. শারমিন আমাকে বললেন, আমার কিছু রিপোর্টে সমস্যা এসেছে।”
—“কী সমস্যা?”
—“তিনি বলেছিলেন, তোর জন্মের পর তোকে অন্য হাসপাতালে নিতে হতে পারে।”
নীল চমকে গেল।
—“আমাকে?”
—“হ্যাঁ। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি আবার বললেন সব ঠিক আছে।”
—“তাহলে সমস্যা কোথায়?”
নন্দিনী বললেন,
—“পরদিন সকালে যখন তোর জন্ম হলো, তখন আমি জানতে পারলাম আমার রিপোর্ট বদলে দেওয়া হয়েছে।”
—“কে বদলেছিল?”
—“আমি জানি না।”
নীল চুপ করে গেল।
নন্দিনী আবার বললেন,
—“তোর বাবা তখন আমার ওপর সন্দেহ করছিল। আর রাশেদ বারবার বলছিল আমাকে কিছুদিন নিরাপদ জায়গায় রাখতে হবে।”
—“তুমি কি রাশেদের কথা বিশ্বাস করেছিলে?”
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
নন্দিনী ধীরে বললেন,
—“কারণ সে আমাকে একটা কথা বলেছিল।”
—“কী?”
—“সে বলেছিল, ‘তোমার সন্তানকে বাঁচাতে হলে তোমাকে সায়েমের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে।’”
নীলের বুক ভারী হয়ে গেল।
—“তুমি তখন কী করেছিলে?”
—“আমি রাজি হয়েছিলাম।”
—“তারপর?”
—“তারপর সবকিছু বদলে গেল।”
পরদিন নীল রাশেদ সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—“আপনি আমাকে সত্যিটা বলেননি।”
রাশেদ সাহেব শান্তভাবে বললেন,
—“কোন সত্যি?”
—“ডা. শারমিন।”
রাশেদ সাহেবের মুখ বদলে গেল।
নীল বুঝল, নামটা এখনও তার মনে ভয় তৈরি করে।
—“আপনি তাকে চিনতেন।”
—“হ্যাঁ।”
—“মাহবুবের স্ত্রী ছিলেন তিনি।”
—“হ্যাঁ।”
—“তিনি কি মাহবুবের সঙ্গে মিলে আমার পরিবার ভেঙেছিলেন?”
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“না।”
নীল অবাক।
—“তাহলে?”
—“শারমিন মাহবুবের সবকিছু জানত। কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত মাহবুবের বিরুদ্ধে গিয়েছিল।”
—“কীভাবে?”
—“সে বুঝতে পেরেছিল, মাহবুব যে প্রমাণগুলো তৈরি করছে সেগুলো মিথ্যা।”
—“তাহলে সে আমাদের সাহায্য করেনি কেন?”
—“করেছিল।”
—“কীভাবে?”
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“সেই রাতেই সে তোমার মায়ের আসল রিপোর্ট আলাদা করে রেখে দিয়েছিল।”
নীল থমকে গেল।
—“কোথায়?”
—“আমি জানি না।”
—“আপনি জানেন না?”
—“সে আমাকে বলেছিল, যদি কখনো প্রয়োজন হয়, একটা নির্দিষ্ট জায়গায় খুঁজতে।”
—“কোথায়?”
রাশেদ সাহেব চোখ বন্ধ করে বললেন,
—“পুরোনো বাড়ির লাইব্রেরিতে।”
নীল আর রমিশা সেই রাতেই রাশেদ সাহেবের পুরোনো বাড়িতে গেল।
লাইব্রেরির দেয়ালজুড়ে বই।
অনেক পুরোনো আলমারি।
রমিশা বলল,
—“কীভাবে খুঁজব?”
নীল বলল,
—“শারমিন যদি কোনো জায়গা বেছে থাকেন, সেটা সহজে চোখে পড়বে না।”
তারা ঘণ্টাখানেক খুঁজল।
হঠাৎ নীল একটা বই বের করতে গিয়ে দেখল, বইটা খুব সহজে বের হয়ে আসছে।
বইটা সরাতেই পেছনে ছোট একটা কাঠের দরজা।
রমিশা অবাক হয়ে বলল,
—“এটা আগে দেখিনি।”
নীল দরজাটা খুলল।
ভেতরে ছোট একটা লকার।
তার মধ্যে একটা ফাইল।
ফাইলের ওপরে লেখা—
“নন্দিনীর আসল রিপোর্ট।”
নীলের হাত কাঁপতে লাগল।
সে ফাইল খুলল।
ভেতরে ছিল হাসপাতালের আসল রিপোর্ট।
আর রিপোর্টের সঙ্গে একটা চিঠি।
চিঠিতে ডা. শারমিন লিখেছিলেন—
“সায়েম, নন্দিনী নির্দোষ। তার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। মাহবুব তোমাকে ভুল বোঝাচ্ছে। কিন্তু তাকে থামাতে গেলে নীলের জীবন বিপদে পড়বে। আমি সব প্রমাণ রেখে যাচ্ছি। একদিন নীল বড় হলে তাকে সত্যিটা জানিও।”
নীল চোখ বন্ধ করল।
সবকিছু ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসছিল।
তার মা নির্দোষ।
তার বাবা ভুল বুঝেছিলেন।
রাশেদ সত্যিটা জানতেন।
আর মাহবুব সবকিছুর পেছনে ছিল।
কিন্তু একটা প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে।
নীল চিঠির শেষ লাইনটা পড়ল।
“তবে মনে রেখো, মাহবুব একা নয়।”
নীল থমকে গেল।
রমিশা বলল,
—“আবার সেই একই কথা।”
—“হ্যাঁ।”
—“মাহবুবের সঙ্গে আর কে ছিল?”
ঠিক তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ হলো।
দুজনেই চমকে উঠল।
নীল দ্রুত ফাইলটা হাতে নিল।
দরজা খুলতেই দেখা গেল—
সায়েম সাহেব।
তার চোখে পানি।
নীল অবাক হয়ে বলল,
—“বাবা?”
সায়েম ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে বললেন,
—“আমি জানতাম একদিন তুই এই জায়গায় আসবি।”
নীল বলল,
—“তুমি সব জানো?”
সায়েম মাথা নেড়ে বললেন,
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে এতদিন চুপ ছিলে কেন?”
সায়েম কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
—“কারণ আমি ভেবেছিলাম সত্যিটা প্রকাশ করলে তোর জীবন বিপদে পড়বে।”
—“কিন্তু এখন?”
সায়েম বললেন,
—“এখন আর লুকিয়ে লাভ নেই।”
নীল এগিয়ে গেল।
—“মাহবুবের সঙ্গে কে ছিল?”
সায়েম চোখ নামিয়ে ফেললেন।
—“আমি নামটা বললে তুই বিশ্বাস করবি না।”
—“বল।”
সায়েম ধীরে বললেন,
—“যে মানুষটা আমাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য করার কথা ছিল, সেই মানুষটাই মাহবুবকে সাহায্য করেছিল।”
রমিশা কাঁপা গলায় বলল,
—“কে?”
সায়েম উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে রাশেদ সাহেবের কণ্ঠ শোনা গেল—
—“আমি।”
রমিশা দরজার দিকে তাকাল।
রাশেদ সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন।
তার চোখে অপরাধবোধ।
নীল হতভম্ব।
—“আপনি?”
রাশেদ সাহেব ধীরে বললেন,
—“হ্যাঁ। একসময় আমি মাহবুবকে সাহায্য করেছিলাম।”
রমিশার চোখে পানি চলে এল।
—“বাবা…”
রাশেদ সাহেব মাথা নিচু করে বললেন,
—“কিন্তু তোমরা যে কারণটা ভাবছ, তার জন্য নয়।”
নীল কঠিন গলায় বলল,
—“তাহলে আসল কারণটা কী?”
রাশেদ সাহেব চোখ তুলে তাকালেন।
—“কারণ মাহবুব আমাকে বলেছিল, নীলকে বাঁচাতে হলে আমাকে তার সঙ্গে থাকতে হবে।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আর ঠিক তখনই নীলের ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল—
“সব সত্যি জেনে গেছ। এবার রমিশাকে নিয়ে সাবধানে থেকো।”
নীল মেসেজটা দেখে রমিশার দিকে তাকাল।
অচেনা নম্বরের মেসেজটা দেখে নীলের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“সব সত্যি জেনে গেছ। এবার রমিশাকে নিয়ে সাবধানে থেকো।”
রমিশা মেসেজটা পড়েই বাবার দিকে তাকাল।
—“বাবা, এখনও কি বিপদ আছে?”
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
—“হ্যাঁ।”
নীল এগিয়ে এল।
—“কে মেসেজটা পাঠিয়েছে?”
—“আমি জানি না।”
—“আপনি জানেন।”
রাশেদ সাহেব মাথা নিচু করলেন।
—“আমি একজনকে সন্দেহ করি।”
—“কে?”
—“মাহবুবের পুরোনো সহযোগী।”
নীল বলল,
—“তার নাম?”
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“ফারুক।”
সায়েম সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
—“ফারুক এখনও বেঁচে আছে?”
—“হ্যাঁ।”
নীল অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকাল।
—“তোমরা দুজনই তাকে চেনো?”
সায়েম ধীরে বললেন,
—“ফারুক ছিল আমাদের ব্যবসার হিসাবরক্ষক। মাহবুবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক।”
রাশেদ বললেন,
—“সে সব কাগজপত্র তৈরি করত। নন্দিনীর স্বাক্ষর জাল করার কাজটাও সে করেছিল।”
নীলের চোখে রাগ ফুটে উঠল।
—“তাহলে এতদিন তাকে খুঁজে বের করা হয়নি কেন?”
সায়েম তিক্তভাবে বললেন,
—“কারণ সে উধাও হয়ে গিয়েছিল।”
—“আর এখন?”
রাশেদ বললেন,
—“এখন সে ফিরে এসেছে।”
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল।
পরদিন সকালে নীল সিদ্ধান্ত নিল, আর পালিয়ে বেড়াবে না।
সে ফারুককে খুঁজবে।
রাশেদ সাহেব তাকে একটা পুরোনো ঠিকানা দিলেন।
—“ওখানে আগে তার বাড়ি ছিল।”
নীল বলল,
—“আপনি আমার সঙ্গে যাবেন।”
রাশেদ অবাক হয়ে তাকালেন।
—“কেন?”
—“কারণ এই গল্পটা আপনি শুরু করেছিলেন। শেষটাও আপনাকেই করতে হবে।”
সায়েমও বললেন,
—“আমি যাব।”
রমিশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আমিও।”
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—“না, তুমি থাকবে।”
রমিশা দৃঢ় গলায় বলল,
—“না। এতদিন সবাই আমাকে সত্যি থেকে দূরে রেখেছে। এবার আর না।”
নীল তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“ঠিক আছে। আমরা সবাই একসঙ্গে যাব।”
পুরোনো ঠিকানায় গিয়ে তারা দেখল, বাড়িটা বহু বছর ধরে বন্ধ।
দরজায় তালা।
কিন্তু পাশের এক বৃদ্ধ জানালেন, কয়েকদিন আগে একজন লোক সেখানে এসেছিল।
—“কেমন দেখতে?”
বৃদ্ধ বললেন,
—“মাঝবয়সী। গায়ে কালো শার্ট। খুব চুপচাপ ছিল।”
নীল আর রমিশা একে অপরের দিকে তাকাল।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“ফারুক।”
বৃদ্ধ আরও বললেন,
—“সে একটা ছোট বাক্স নিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল।”
—“কখন?”
—“দুই দিন আগে।”
নীল দরজার দিকে তাকাল।
তালা ভাঙা নয়, কিন্তু ভেতর থেকে যেন কেউ সম্প্রতি দরজা খুলেছিল।
তারা পাশের পথ দিয়ে বাড়ির পেছনে ঢুকল।
ভেতরে পুরোনো আসবাবপত্র।
একটা ঘরে গিয়ে নীল একটা টেবিল দেখতে পেল।
টেবিলের ওপর পুরোনো কাগজ।
একটা কাগজে লেখা—
“যদি সত্যি জানতে চাও, হাসপাতালের পুরোনো রেকর্ড রুমে যাও।”
নীল বলল,
—“সে আমাদের ঘুরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।”
সায়েম বললেন,
—“হয়তো সে চায় আমরা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় যাই।”
তারা আবার হাসপাতালে ফিরে গেল।
রেকর্ড রুম প্রায় ফাঁকা।
নীল চারদিকে তাকাল।
—“এখানে কী খুঁজব?”
রাশেদ বললেন,
—“ফারুক সবসময় প্রমাণ লুকিয়ে রাখত এমন জায়গায়, যেখানে কেউ সন্দেহ করবে না।”
রমিশা হঠাৎ বলল,
—“ডা. শারমিনের পুরোনো কেবিন।”
সবাই তার দিকে তাকাল।
—“চলো।”
কেবিনটা অনেক বছর ধরে বন্ধ।
দরজা খুলতেই ধুলোয় ভরা ঘর।
একটা পুরোনো টেবিল।
টেবিলের নিচে একটা ধাতব বাক্স।
নীল বাক্সটা বের করল।
ভেতরে কয়েকটা ছবি, কাগজ আর একটা ক্যাসেট।
ক্যাসেটের ওপর লেখা—
“মাহবুব — শেষ স্বীকারোক্তি।”
নীল কিছুক্ষণ বাক্সটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—“এটাই হয়তো শেষ সত্যি।”
ক্যাসেট চালানোর ব্যবস্থা করা হলো।
কিছুক্ষণ শব্দের পর মাহবুবের কণ্ঠ ভেসে এল।
—“আমি জানি, এই রেকর্ড যদি কখনো কারও হাতে যায়, তাহলে সব শেষ।”
ঘরে থাকা সবাই নিঃশব্দে শুনতে লাগল।
মাহবুব বলছিল—
—“নন্দিনী নির্দোষ। তার স্বাক্ষর ফারুক জাল করেছে। সায়েমকে আমি ইচ্ছা করে ভুল বুঝিয়েছি।”
নীলের চোখে পানি চলে এল।
মাহবুব আবার বলল—
—“কিন্তু রাশেদ আমাকে সাহায্য করেছিল।”
রমিশা বাবার দিকে তাকাল।
রাশেদ চোখ বন্ধ করলেন।
মাহবুবের কণ্ঠ আবার শোনা গেল—
—“রাশেদ জানত নন্দিনী নির্দোষ। কিন্তু সে ভয় পেয়েছিল। আমি তাকে বলেছিলাম, যদি সে আমার কথা না শোনে, তাহলে নীলকে বিপদে ফেলব।”
সায়েম মুঠো শক্ত করলেন।
মাহবুব বলছিল—
—“রাশেদ আমাকে সাহায্য করেছিল শুধু নীলকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, নীল নিরাপদ থাকবে। আমি কথা রাখিনি।”
তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।
—“সেদিন হাসপাতালে নন্দিনীর রিপোর্ট বদলানো হয়েছিল। কিন্তু আসল রিপোর্ট ডা. শারমিন লুকিয়ে রেখেছিল। সে সত্যিটা জানত।”
ক্যাসেটের শব্দ আরও দুর্বল হয়ে এল।
শেষে মাহবুব বলল—
—“আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সায়েম আর নন্দিনীর জীবন নষ্ট করা। যদি এই রেকর্ড কখনো তাদের কাছে পৌঁছায়, তাহলে তাদের বলো—তাদের কেউ বিশ্বাসঘাতক ছিল না। তারা শুধু আমার মিথ্যার শিকার।”
ক্যাসেট শেষ।
ঘরে কেউ কথা বলল না।
রাশেদ সাহেব ধীরে ধীরে বসে পড়লেন।
রমিশা বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
—“আপনি এত বছর একা এই বোঝা বয়ে বেড়িয়েছেন?”
রাশেদ সাহেব চোখ মুছলেন।
—“হ্যাঁ।”
—“আমাকে বলেননি কেন?”
—“আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
রমিশা বাবার হাত ধরল।
—“আপনি ভুল করেছিলেন। কিন্তু আপনি সবকিছু নিজের মতো করে ঠিক করার চেষ্টা করেছিলেন।”
রাশেদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারলেন না।
নীল এবার তার বাবার দিকে তাকাল।
—“বাবা।”
সায়েম তার দিকে তাকালেন।
—“আমি মাকে অনেক বছর ভুল বুঝেছি।”
—“তুই একা ভুল করিসনি।”
—“তবুও তাকে আমি কষ্ট দিয়েছি।”
সায়েমের চোখে পানি চলে এল।
নীল তার বাবার কাঁধে হাত রাখল।
—“তাহলে এবার কষ্টটা শেষ করো।”
সায়েম বুঝতে পারলেন ছেলে কী বলতে চাইছে।
সেদিন সন্ধ্যায় নীল তার মাকে নিয়ে রাশেদ সাহেবের বাড়িতে গেল।
নন্দিনী আর সায়েম বহু বছর পর একই জায়গায় মুখোমুখি দাঁড়ালেন।
কেউ কথা বলছিল না।
শেষ পর্যন্ত সায়েম ধীরে বললেন,
—“নন্দিনী…”
নন্দিনী চোখ তুলে তাকালেন।
—“আমি জানি।”
—“আমি তোমাকে বিশ্বাস করিনি।”
—“আমিও তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম।”
—“তুমি দোষী ছিলে না।”
নন্দিনীর চোখে পানি জমল।
—“তুমিও একা দোষী ছিলে না।”
দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
নীল দূর থেকে দাঁড়িয়ে ছিল।
রমিশা তার পাশে।
নীল ধীরে বলল,
—“কখনো কখনো একটা ভুল বোঝাবুঝি একটা পুরো জীবন বদলে দেয়।”
রমিশা বলল,
—“কিন্তু সত্যি সামনে এলে জীবন আবার বদলানো যায়।”
নীল তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—“তুমি পাশে থাকলে সম্ভবত যায়।”
রমিশা হেসে বলল,
—“তাহলে এবার তোমার বাবার শর্ত পূরণ হয়েছে।”
নীল অবাক হয়ে বলল,
—“কোন শর্ত?”
—“তোমাদের পরিবার আবার একসঙ্গে হয়েছে।”
নীল হেসে ফেলল।
—“তাহলে এবার?”
রমিশা চোখ নামিয়ে বলল,
—“এবার বাবার সঙ্গে কথা বলো।”
কয়েকদিন পর রাশেদ সাহেব নিজেই নীলকে ডাকলেন।
—“নীল।”
—“জি।”
—“আমি তোমার কাছে একটা কথা বলতে চাই।”
—“বলুন।”
—“তোমার আর রমিশার সম্পর্ক নিয়ে আমার আর কোনো আপত্তি নেই।”
নীল মৃদু হাসল।
—“আমি জানতাম।”
রাশেদ সাহেব বললেন,
—“তবে একটা শর্ত আছে।”
নীল ভ্রু তুলল।
—“আবার শর্ত?”
রাশেদ হেসে বললেন,
—“এইবার খুব ছোট।”
—“কী?”
—“তোমরা দুজন যেন কখনো কোনো ভুল বোঝাবুঝিকে নিজেদের মধ্যে জায়গা না দাও।”
নীল মাথা নেড়ে বলল,
—“এই শর্ত আমি সারাজীবন মেনে চলব।”
দূরে দাঁড়িয়ে রমিশা সব শুনছিল।
তার মুখে শান্ত হাসি।
কয়েক মাস পর দুই পরিবার আবার একসঙ্গে বসেছিল।
সায়েম আর নন্দিনী আগের মতো পুরোপুরি ফিরে যেতে পারেননি। এত বছরের দূরত্ব একদিনে মুছে যায় না।
কিন্তু তারা কথা বলা শুরু করেছিলেন।
একসঙ্গে বসেছিলেন।
পুরোনো কষ্টগুলো ধীরে ধীরে ভাগ করে নিচ্ছিলেন।
আর নীল ও রমিশার সম্পর্কও পরিবারের সম্মতিতে এগিয়ে চলছিল।
এক বিকেলে নীল আর রমিশা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
আকাশে মেঘ।
রমিশা বলল,
—“তুমি কি কখনো ভাবতে পেরেছিলে, আমাদের গল্প এত জটিল হবে?”
নীল হেসে বলল,
—“না।”
—“তাহলে?”
—“ভাবতাম তোমাকে পছন্দ করি। পরে বুঝলাম তোমার সঙ্গে পুরো একটা ইতিহাস জড়িয়ে আছে।”
রমিশা মৃদু হেসে বলল,
—“আর সেই ইতিহাসের শেষে কী পেলাম?”
নীল কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“একটা পরিবার ফিরে পেলাম।”
রমিশা বলল,
—“আর?”
নীল তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
—“একজন মানুষ, যার সঙ্গে সত্যিটা খুঁজতে গিয়ে জীবনটাই বদলে গেল।”
রমিশা মাথা নিচু করে হাসল।
দূরে সায়েম আর নন্দিনী কথা বলছিলেন।
রাশেদ সাহেবও তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
বহু বছরের ভুল, অভিমান আর গোপন সত্যির পর অবশেষে দুই পরিবার বুঝেছিল—
সম্পর্ক ভাঙে শুধু বড় কোনো অপরাধে নয়, কখনো কখনো একটি মিথ্যা আর একটি ভুল বোঝাবুঝিই যথেষ্ট।
কিন্তু সেই সম্পর্ককে আবার ফিরিয়ে আনার জন্য দরকার সত্যি স্বীকার করার সাহস।
নীল আর রমিশা সেই সাহসটাই দেখিয়েছিল।
আর তাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল—
তারা শুধু একে অপরকে খুঁজে পায়নি।
তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া পরিবারকেও আবার খুঁজে পেয়েছিল।
....