যে বৃষ্টি দুজনকে কাছে এনেছিল

ছাব্বিশ বছরের শাওন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। নিজের কাজ নিয়ে সে বেশ সিরিয়াস। সময়মতো অফিসে যাওয়া, কাজ শেষ করা, বাসায় ফিরে কিছুক্ষণ বই পড়া—এই ছিল তার প্রতিদিনের জীবন। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার চেয়ে নিজের মতো করে থাকা তার বেশি পছন্দ ছিল।

শাওনের স্বভাবটা একটু গম্ভীর। খুব বেশি কথা বলে না, প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে মিশতেও চায় না। তবে কাছের মানুষদের জন্য তার মনটা ছিল ভীষণ নরম।

সেদিনও প্রতিদিনের মতো সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল সে।

আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বৃষ্টির কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু শাওন সেটা তেমন গুরুত্ব দেয়নি।

অফিস থেকে বের হওয়ার সময় তার হাতে কোনো ছাতা ছিল না।

গেটের সামনে এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে শাওন বিরক্ত হয়ে বলল,

—আজকেই বৃষ্টি হতে হবে!

কথাটা বলেই সে দ্রুত গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু গাড়িতে ওঠার আগেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।

শাওন গাড়ির দরজা খুলতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের দিকে।

মেয়েটি সম্ভবত বাসের অপেক্ষায় ছিল। এক হাতে ব্যাগ, অন্য হাতে একটি নীল ছাতা। কিন্তু বাতাস এত জোরে ছিল যে ছাতাটা বারবার উল্টে যাচ্ছিল।

মেয়েটি একবার ছাতাটা ঠিক করছিল, আবার বাতাসে সেটা বেঁকে যাচ্ছিল।

দৃশ্যটা দেখে শাওনের মুখে অজান্তেই হালকা হাসি ফুটে উঠল।

মেয়েটি হঠাৎ বিরক্ত হয়ে ছাতার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনার সঙ্গে আমার এত শত্রুতা কেন বলুন তো?

শাওন কথাটা শুনে অবাক হলো।

সে কি ছাতার সঙ্গে কথা বলছে?

মেয়েটি আবার ছাতাটা ঠিক করার চেষ্টা করতেই ছাতার একটা অংশ খুলে গেল।

—উফ!

মেয়েটা বিরক্ত হয়ে ছাতাটা বন্ধ করে ফেলল।

এবার বৃষ্টিতে ভিজতেই হবে।

শাওন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের গাড়ির দিকে গেল। কিন্তু গাড়িতে ওঠার সময় তার মনে হলো, মেয়েটাকে এভাবে দাঁড়িয়ে রেখে চলে যাওয়া ঠিক হবে না।

সে নিজের ছাতাটা বের করল।

কয়েক পা এগিয়ে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

—আপনি চাইলে এই ছাতাটা নিতে পারেন।

মেয়েটি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

প্রথমবার শাওন মেয়েটার মুখটা ভালো করে দেখল।

মায়াবী একটা মুখ। চোখ দুটো বড়, আর চোখে সবসময় যেন কিছু একটা বলার চেষ্টা আছে। ভেজা চুলের কয়েকটা গোছা কপালের ওপর এসে পড়েছে।

মেয়েটি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—আপনি?

—আমি শাওন।

মেয়েটি একটু অবাক হয়ে হাসল।

—আমি তো আপনার নাম জানতে চাইনি।

শাওন একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

—ওহ... সরি। আমি বলতে চাচ্ছিলাম, ছাতাটা আপনি নিতে পারেন।

মেয়েটি হেসে বলল,

—আপনি কি সব অপরিচিত মানুষকে নিজের ছাতা দিয়ে দেন?

—না।

—তাহলে আমাকে কেন দিচ্ছেন?

শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—কারণ আপনি ভিজে যাচ্ছেন।

মেয়েটি এবার আর কিছু বলল না।

শুধু ছাতাটা নিয়ে বলল,

—ধন্যবাদ।

শাওন ঘুরে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।

দুই পা যেতেই পেছন থেকে মেয়েটির ডাক শুনতে পেল।

—এই যে!

শাওন ফিরে তাকাল।

—ছাতাটা ফেরত দেব কীভাবে?

—যখন দেখা হবে, তখন দিয়ে দেবেন।

মেয়েটি ভ্রু কুঁচকে বলল,

—যদি আর দেখা না হয়?

শাওন হালকা হাসল।

—তাহলে ছাতাটা আপনার।

মেয়েটিও হাসল।

—বেশ। তাহলে আজ থেকে এটা আমার।

শাওন আর কিছু না বলে গাড়িতে উঠে চলে গেল।

কিন্তু গাড়ি চালাতে চালাতে অদ্ভুতভাবে বারবার মেয়েটার কথাগুলো মনে পড়তে লাগল।

"যদি আর দেখা না হয়?"

শাওন নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হলো।

অচেনা একটা মেয়েকে নিয়ে এত ভাবার কী আছে?

সে মাথা ঝাঁকিয়ে গাড়ির দিকে মন দিল।

অন্যদিকে মেয়েটিও বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে শাওনের গাড়ির চলে যাওয়া দেখছিল।

তার নাম দিয়া।

দিয়া খুব সাধারণ পরিবারের মেয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে একটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করছিল। স্বভাবে প্রাণবন্ত, একটু দুষ্টু এবং প্রচণ্ড কথা বলতে ভালোবাসে। অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও খুব সহজে কথা বলতে পারে।

কিন্তু শাওনের সঙ্গে কয়েক মিনিটের সেই কথোপকথন তার মনেও অদ্ভুত একটা ছাপ ফেলেছিল।

দিয়া ছাতাটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

—লোকটা এত গম্ভীর কেন?

তারপর নিজেই উত্তর দিল,

—তবে হাসলে খারাপ লাগে না।

পরদিন সকালে দিয়া অফিসে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গোছাতে গিয়ে সেই ছাতাটা দেখতে পেল।

ছাতাটা হাতে নিয়ে তার মনে পড়ে গেল আগের দিনের কথা।

সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করতে করতে বলল,

—শাওন সাহেব, আপনার ছাতা কিন্তু আমার কাছে আছে।

তারপর হেসে ফেলল।

অন্যদিকে শাওনও অফিসে বসে কাজ করছিল। হঠাৎ তার মনে হলো, নিজের ছাতাটা সে সত্যিই মেয়েটাকে দিয়ে এসেছে।

তার সহকর্মী রাফি পাশ থেকে বলল,

—কী ভাবছিস?

—কিছু না।

—মুখ দেখে মনে হচ্ছে অনেক কিছু।

শাওন বিরক্ত হয়ে বলল,

—কাজ কর।

রাফি হাসতে হাসতে চলে গেল।

সেদিন বিকেলে অফিস থেকে বের হওয়ার সময় শাওনের মনে হলো, যদি মেয়েটার সঙ্গে আবার দেখা হয়ে যায়?

কিন্তু পরক্ষণেই নিজের চিন্তায় নিজেই হাসল।

ঢাকার মতো শহরে একজন মানুষের সঙ্গে একবার দেখা হওয়ার পর আবার দেখা হওয়া এত সহজ নয়।

তবুও ভাগ্যের গল্পটা হয়তো অন্যরকম ছিল।

পরদিন বিকেলে শাওন একটি বইয়ের দোকানে ঢুকল। কিছু বই কিনে বের হওয়ার সময় দরজার পাশে কারও সঙ্গে ধাক্কা খেল।

—সরি!

শাওন কথাটা বলেই থেমে গেল।

সামনের মেয়েটিও থেমে গেছে।

তার হাতে নীল ছাতা।

দুজনেই কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

দিয়া প্রথমে অবাক, তারপর তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

—আপনি!

শাওনের ঠোঁটেও অজান্তে হাসি চলে এল।

—আপনি!

দিয়া ছাতাটা একটু তুলে ধরে বলল,

—দেখুন, আপনার জিনিস আমি খুব যত্ন করে রেখেছি।

শাওন বলল,

—আপনি চাইলে রেখে দিতে পারেন।

দিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,

—না। এটা ফেরত দিতে হবে।

—কেন?

দিয়া একটু দুষ্টুমি করে বলল,

—কারণ আপনার ছাতা ফেরত দেওয়ার অজুহাতে যদি আবার দেখা করার সুযোগ পাই, সেটা তো নষ্ট করা যাবে না।

কথাটা বলেই দিয়া বুঝতে পারল, সে একটু বেশি বলে ফেলেছে।

শাওনও চুপ হয়ে গেল।

দিয়ার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।

বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে শাওন আর দিয়া দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

দিয়া নিজের কথাটার কথা ভেবে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। সে সাধারণত কাউকে কিছু বলতে ভয় পায় না। কিন্তু শাওনের সামনে দাঁড়ালেই কেন যেন তার কথাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল।

শাওন অবশ্য বিষয়টা নিয়ে কিছু বলল না।

সে শুধু দিয়ার হাতে থাকা নীল ছাতাটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে ছাতাটা ফেরত দেবেন?

দিয়া ছাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলল,

—হ্যাঁ। নিন।

শাওন ছাতাটা হাতে নিল।

—ধন্যবাদ।

দিয়া চোখ বড় বড় করে বলল,

—ধন্যবাদ কেন?

—ছাতাটা ভালো রেখেছেন।

—আমি তো আপনার ছাতা চুরি করিনি!

শাওন হেসে ফেলল।

—আমি সেটা বলিনি।

—তাহলে?

—আপনার সঙ্গে কথা বললে মনে হয়, আপনাকে সবকিছুর ব্যাখ্যা দিতে হয়।

দিয়া একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

—আপনি কথা বলতে পারেন তাহলে!

—কেন?

—সেদিন তো মনে হয়েছিল আপনি খুব কম কথা বলেন।

—আমি কম কথা বলি।

—কিন্তু আমার সঙ্গে বেশ কথা বলছেন।

শাওন এবার একটু থেমে গেল।

কথাটা সত্যি।

অচেনা একটা মেয়ের সঙ্গে সে এত সহজভাবে কথা বলছে—এটা তার নিজের কাছেও অদ্ভুত লাগছিল।

দিয়া মুচকি হেসে বলল,

—আপনি কি সবসময় এমন গম্ভীর থাকেন?

—সবসময় না।

—তাহলে কখন হাসেন?

—যখন হাসার মতো কিছু হয়।

—আমি কি হাসার মতো কিছু বলেছি?

শাওন দিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

—অনেক কিছু।

দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হেসে ফেলল।

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।

দিয়া ফোনটা বের করে বলল,

—হ্যালো, মা?

কিছুক্ষণ কথা বলার পর সে ফোন রেখে শাওনের দিকে তাকাল।

—আমাকে যেতে হবে।

—ঠিক আছে।

দিয়া কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

—শাওন!

—হুম?

—আবার দেখা হবে তো?

শাওন কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—হয়তো।

দিয়া হেসে বলল,

—হয়তো না। দেখা হবেই।

তারপর সে চলে গেল।

শাওন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

মেয়েটা চলে যাওয়ার পরও তার মুখের হাসিটা যেন চোখের সামনে ভাসছিল।

সেদিন রাতে শাওন বাসায় ফিরে নিজের ঘরে বসে ছিল।

মা রুমে এসে বললেন,

—আজ এত চুপচাপ কেন?

—আমি তো সবসময়ই চুপচাপ।

—না। আজ অন্যরকম লাগছে।

শাওন কিছু বলল না।

মা বিছানায় বসে বললেন,

—অফিসে কোনো সমস্যা হয়েছে?

—না।

—তাহলে?

—কিছু না মা।

মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—ঠিক আছে। যখন বলতে ইচ্ছে করবে, তখন বলিস।

মা চলে যাওয়ার পর শাওন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল।

বৃষ্টি দেখলেই এখন তার দিয়ার কথা মনে পড়ছে।

প্রথম দিন সেই বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা। ভাঙা ছাতা। ভেজা চুল। তারপর বইয়ের দোকানে হঠাৎ দেখা।

শাওন নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।

তারপর নিজেকেই বলল,

—মেয়েটাকে নিয়ে এত ভাবছি কেন?

কোনো উত্তর পেল না।

পরদিন দুপুরে অফিসে কাজের ফাঁকে শাওন লাঞ্চ করতে নিচে নামল।

রেস্টুরেন্টে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেল।

এক কোণে বসে দিয়া তার এক বান্ধবীর সঙ্গে গল্প করছে।

শাওন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না।

এত দ্রুত আবার দেখা!

দিয়াও তাকে দেখতে পেল।

চোখাচোখি হতেই দিয়ার মুখে সেই পরিচিত হাসি ফুটে উঠল।

সে বান্ধবীকে কিছু বলে উঠে শাওনের সামনে এসে দাঁড়াল।

—আপনি এখানে?

—হ্যাঁ।

—আমিও।

—দেখতেই পাচ্ছি।

দিয়া হেসে বলল,

—আপনি কি সবসময় এত ছোট ছোট উত্তর দেন?

—আপনি এত বেশি কথা বলেন বলেই হয়তো।

—আমি বেশি কথা বলি?

—হুম।

—তাহলে আপনি শুনবেন না।

দিয়া মুখ ঘুরিয়ে চলে যাওয়ার ভান করতেই শাওন বলল,

—দিয়া।

দিয়া সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।

ধীরে ধীরে ফিরে তাকিয়ে বলল,

—আপনি আমার নাম মনে রেখেছেন?

শাওন বলল,

—আপনি তো আমাকে বলেছিলেন।

—তবু মনে রেখেছেন?

—হ্যাঁ।

দিয়ার চোখে তখন অদ্ভুত একটা আনন্দ।

সে কিছু না বলে নিজের টেবিলে ফিরে গেল।

শাওনও অন্য টেবিলে বসে পড়ল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর দিয়ার বান্ধবী এসে বলল,

—আপনি শাওন, তাই না?

শাওন অবাক হয়ে বলল,

—হ্যাঁ।

—দিয়া বলেছে আপনি নাকি ওকে বৃষ্টির মধ্যে ছাতা দিয়েছিলেন?

শাওন দিয়ার দিকে তাকাল।

দিয়া দূর থেকে চোখ বড় বড় করে বান্ধবীকে চুপ করতে ইশারা করছে।

শাওন হেসে বলল,

—হ্যাঁ, দিয়েছিলাম।

বান্ধবী চলে যাওয়ার পর দিয়া লজ্জায় বলল,

—ওকে এসব বলতে বলিনি।

—সমস্যা নেই।

—আপনি হাসছেন কেন?

—আপনি লজ্জা পাচ্ছেন বলে।

দিয়া মুখ গোমড়া করে বলল,

—আমি কিন্তু এখন আপনার সঙ্গে কথা বলব না।

শাওন বলল,

—ঠিক আছে।

দিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—আপনি সত্যিই আমাকে থামাবেন না?

—আপনিই তো বললেন কথা বলবেন না।

দিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,

—আপনি অসম্ভব!

শাওন হেসে ফেলল।

সেদিন তাদের প্রথমবার অনেকক্ষণ কথা হলো।

জানা গেল, দিয়া বই পড়তে ভালোবাসে। বৃষ্টি তার প্রিয়। সুযোগ পেলেই নতুন জায়গায় ঘুরতে যায়। আর তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—একদিন নিজের একটা ছোট্ট বইয়ের দোকান করবে।

শাওনও নিজের কথা বলল।

সে জানাল, ছোটবেলা থেকেই নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে শিখেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের অনেক দায়িত্ব তার ওপর এসে পড়ে। তাই নিজের ইচ্ছাগুলোকে সে সবসময় পিছনে রেখেছে।

দিয়া মন দিয়ে কথাগুলো শুনছিল।

একসময় সে বলল,

—আপনি সবসময় এত দায়িত্বশীল কেন?

শাওন হেসে বলল,

—জীবন শিখিয়েছে।

দিয়া ধীরে বলল,

—তবু মাঝে মাঝে নিজের জন্যও বাঁচা উচিত।

শাওন তার দিকে তাকাল।

—আপনি কি সবসময় অন্যদের জীবন নিয়ে এত চিন্তা করেন?

—না।

—তাহলে আমারটা নিয়ে করছেন কেন?

দিয়া একটু থেমে বলল,

—কারণ আপনি অদ্ভুত।

—কীভাবে?

—আপনার চোখে সবসময় একটা চিন্তা থাকে। মনে হয় আপনি অনেক কিছু বলতে চান, কিন্তু বলেন না।

শাওন কোনো উত্তর দিল না।

দিয়ার কথাটা যেন তার মনের একদম ভেতরে গিয়ে লাগল।

কয়েকদিনের মধ্যেই তাদের দেখা হওয়া যেন নিয়মে পরিণত হলো।

কখনো অফিসের নিচের রেস্টুরেন্টে, কখনো বইয়ের দোকানে, কখনো রাস্তার পাশে কফির দোকানে।

কথা বাড়তে লাগল।

শাওন বুঝতে পারল, দিয়ার সঙ্গে কথা বললে তার দিনের ক্লান্তি কমে যায়।

আর দিয়া বুঝতে পারল, গম্ভীর এই মানুষটার ভেতরে অনেকটা নরম একটা মন লুকিয়ে আছে।

একদিন সন্ধ্যায় দিয়া ফোন করে বলল,

—আপনি কোথায়?

—অফিসে।

—এখনও?

—কাজ আছে।

—আপনি কি কখনো কাজ ছাড়া অন্য কিছু করেন?

—করি।

—কী?

—আপনার সঙ্গে কথা বলি।

ফোনের ওপাশে দিয়া চুপ হয়ে গেল।

শাওন নিজেও বুঝতে পারল না কেন কথাটা বলে ফেলল।

কয়েক সেকেন্ড পর দিয়া মৃদু গলায় বলল,

—তাহলে আজ একটু কথা বলবেন?

—বলুন।

—আপনি কি আমাকে বন্ধু ভাবেন?

শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—হ্যাঁ।

দিয়া হাসল।

—শুধু বন্ধু?

শাওনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।

সে উত্তর দেওয়ার আগেই দিয়া বলল,

—থাক। আজ এত কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না।

ফোন কেটে গেল।

শাওন অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

দিয়ার সঙ্গে পরিচয়ের পর প্রায় এক মাস কেটে গেছে।

এই এক মাসে শাওনের জীবনটা অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। আগে অফিস শেষ হলে সরাসরি বাসায় ফিরে যেত সে। এখন কাজ শেষ হওয়ার পর অজান্তেই তার চোখ ঘড়ির দিকে চলে যায়। কখন দিয়া ফোন করবে, কখন দেখা হবে—সেই অপেক্ষাটা তার প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে গেছে।

দিয়াও বিষয়টা বুঝতে পারছিল।

শাওন কখনো সরাসরি কিছু বলত না, কিন্তু তার আচরণে অনেক কিছুই প্রকাশ পেত।

সেদিন বিকেলে দিয়া অফিস থেকে বের হয়ে শাওনকে ফোন করল।

—আপনি কোথায়?

—অফিস থেকে বের হচ্ছি।

—আমার জন্য পাঁচ মিনিট সময় আছে?

—কোথায় আসব?

দিয়া একটু হেসে বলল,

—এই প্রথম দেখছি আপনি প্রশ্ন না করে সরাসরি রাজি হয়ে গেলেন।

—আপনি ডাকলে না করার কারণ পাই না।

কথাটা শুনে দিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তাহলে লেকের পাশে চলে আসুন।

শাওন কিছুক্ষণ পর সেখানে পৌঁছে দেখল, দিয়া বেঞ্চে বসে আছে।

হালকা বাতাস বইছে। চারপাশে সন্ধ্যার নরম আলো।

শাওন কাছে গিয়ে বলল,

—কী হয়েছে?

দিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,

—কিছু হয়নি।

—তাহলে ডাকলেন কেন?

—আপনার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করছিল।

শাওন থেমে গেল।

দিয়া নিজের কথায় একটু লজ্জা পেলেও এবার আর তা লুকাল না।

—কী হলো? চুপ করে আছেন কেন?

—কিছু না।

—আপনি সবসময় "কিছু না" বলেন কেন?

শাওন পাশে বসে বলল,

—কারণ অনেক কথা বলার অভ্যাস নেই।

দিয়া একটু চুপ করে থেকে বলল,

—আমার সঙ্গে তো বলতে পারেন।

শাওন তার দিকে তাকাল।

—আপনার সঙ্গে বলতে ইচ্ছে করে।

দিয়ার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

কিছুক্ষণ তারা দুজনেই চুপ করে বসে রইল।

কথা না থাকলেও সেই নীরবতাটা অস্বস্তিকর ছিল না।

বরং দুজনের কাছেই ভালো লাগছিল।

পরের সপ্তাহে দিয়া শাওনকে নিয়ে একটি বইমেলায় গেল।

দিয়া যেন ছোট বাচ্চার মতো এক স্টল থেকে আরেক স্টলে ছুটে বেড়াচ্ছিল।

—শাওন, এই বইটা দেখেছেন?

—না।

—এটা আমার খুব পছন্দ।

—তাহলে কিনে নিন।

—আপনি কিনে দিন।

শাওন ভ্রু তুলে বলল,

—কেন?

—কারণ আপনি আমার বন্ধু।

—বন্ধু হলেই বই কিনে দিতে হয়?

—হ্যাঁ।

শাওন হেসে বইটা কিনে দিল।

দিয়া বইটা হাতে নিয়ে বলল,

—ধন্যবাদ।

—এবার আর কোনো দাবি নেই তো?

—আছে।

—কী?

—ফুচকা।

শাওন মাথায় হাত দিয়ে বলল,

—আপনার চাহিদা শেষ হয় না?

—না।

ফুচকার দোকানে গিয়ে দিয়া এত আনন্দ করে ফুচকা খেতে লাগল যে শাওন তাকিয়ে হাসছিল।

দিয়া বলল,

—এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?

—আপনাকে দেখছি।

—কেন?

—আপনি ফুচকা খাওয়ার সময় খুব খুশি থাকেন।

দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আপনি কি আমাকে খুশি দেখতে পছন্দ করেন?

শাওন এবার কোনো উত্তর দিল না।

তার চোখে যে উত্তর ছিল, দিয়া সেটা বুঝে ফেলল।

সেদিন রাতে দিয়া বাসায় ফিরে নিজের ঘরে বসে রইল।

মা এসে বললেন,

—কী হয়েছে? আজ এত হাসছিস কেন?

দিয়া চমকে উঠে বলল,

—আমি হাসছি?

—হ্যাঁ।

—কিছু না।

মা মুচকি হেসে বললেন,

—কেউ কি জীবনে এসেছে?

দিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলল।

—মা!

—কী?

—কেউ আসেনি।

—তাহলে নামটা শাওন কেন?

দিয়া অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।

—তুমি কীভাবে জানো?

মা হেসে বললেন,

—গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তুই ফোনে যার সঙ্গে কথা বলিস, তার নাম শাওন। মায়ের কাছ থেকে কিছু লুকাতে পারবি?

দিয়া চুপ করে গেল।

মা কাছে এসে তার মাথায় হাত রেখে বললেন,

—ছেলেটা ভালো?

দিয়া ধীরে বলল,

—হ্যাঁ।

—তুই ওকে পছন্দ করিস?

দিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—জানি না।

মা বললেন,

—মন যখন কাউকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে, তখন অনেক সময় মুখে "জানি না" থাকলেও উত্তরটা ভেতরে জানা থাকে।

দিয়া কোনো উত্তর দিল না।

সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে সে শাওনের সঙ্গে শেষ কথোপকথনটা মনে করল।

"আপনার সঙ্গে বলতে ইচ্ছে করে।"

দিয়ার মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল।

অন্যদিকে শাওনের জীবনেও নতুন একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল।

তার মা কয়েকদিন ধরে বিয়ের কথা বলছিলেন।

সেদিন রাতেও মা বললেন,

—শাওন, একটা মেয়ের কথা বলেছি তোকে।

শাওন চুপ করে রইল।

—মেয়েটা ভালো। পরিবারও ভালো। একদিন গিয়ে দেখে আয়।

শাওন ধীরে বলল,

—মা, এখন এসব ভাবছি না।

—কতদিন ভাববি না?

—জানি না।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—তোর বয়স হচ্ছে। জীবনে তো একজন সঙ্গী দরকার।

শাওন কোনো উত্তর দিল না।

কিন্তু তার মনে তখন শুধু একজনের মুখই ভেসে উঠছিল।

দিয়া।

সে বুঝতে পারছিল না, দিয়া কি সত্যিই তার জীবনের সেই মানুষ, যাকে সে এতদিন অজান্তে খুঁজছিল?

নাকি এটা শুধু একটা সুন্দর বন্ধুত্ব?

কয়েকদিন পর হঠাৎ দিয়ার ফোন বন্ধ পাওয়া গেল।

শাওন প্রথমে বিষয়টা গুরুত্ব দিল না।

ভাবল, হয়তো ব্যস্ত।

এক ঘণ্টা পর আবার ফোন করল।

বন্ধ।

দুই ঘণ্টা পরও বন্ধ।

পরদিনও দিয়ার ফোন বন্ধ।

শাওনের অস্বস্তি বাড়তে লাগল।

সে দিয়ার অফিসে ফোন করল।

জানতে পারল, দিয়া দুই দিনের ছুটি নিয়েছে।

কিন্তু কেন?

শাওন তার কোনো আত্মীয়ের নম্বর জানত না।

দিয়ার বাসার ঠিকানাও জানত না।

প্রথমবার সে বুঝল, এতদিনে দিয়ার সঙ্গে এত কথা বলেও মেয়েটার জীবনের অনেক কিছুই সে জানে না।

সারাদিন কাজের মধ্যে মন বসছিল না।

সন্ধ্যায় সে আবার ফোন করল।

এবার ফোনটা বেজে উঠল।

দিয়া ফোন ধরতেই শাওন দ্রুত বলল,

—কোথায় ছিলেন আপনি?

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর দিয়া বলল,

—আপনি এত চিন্তা করেছেন?

শাওনের গলায় বিরক্তি মিশে গেল।

—অবশ্যই করেছি। ফোন বন্ধ ছিল কেন?

—বাসায় একটু সমস্যা হয়েছিল।

—সব ঠিক আছে?

—হ্যাঁ।

—নিশ্চিত?

—হ্যাঁ, শাওন।

শাওন কিছুটা শান্ত হলো।

তারপর বলল,

—আপনি আমাকে জানাতে পারতেন।

দিয়া মৃদু গলায় বলল,

—আপনি কি আমার জন্য এতটা চিন্তা করেন?

শাওন এবার থেমে গেল।

দিয়া আবার বলল,

—শাওন?

—হ্যাঁ।

—উত্তর দেবেন না?

শাওন ধীরে বলল,

—হ্যাঁ, করি।

ফোনের ওপাশে আবার নীরবতা।

দিয়ার চোখে তখন পানি জমে উঠেছিল।

সে খুব আস্তে বলল,

—আমিও করি।

শাওনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

—কী?

—আপনার জন্য চিন্তা করি।

শাওন আর কিছু বলতে পারল না।

দিয়া কথাটা বলেই ফোন কেটে দিল।

পরদিন বিকেলে দিয়া নিজেই শাওনের সঙ্গে দেখা করতে এল।

দুজন একটা শান্ত ক্যাফের কোণে বসেছিল।

শাওন বলল,

—এখন বলুন, আসলে কী হয়েছিল?

দিয়া বলল,

—বাবার একটু অসুস্থতা হয়েছিল। হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। এখন ভালো আছেন।

শাওন চিন্তিত হয়ে বলল,

—আমাকে জানাতে পারতেন।

—আপনাকে চিন্তায় ফেলতে চাইনি।

—আমি যদি চিন্তা করি?

দিয়া তার দিকে তাকাল।

—তাহলে?

শাওন ধীরে বলল,

—তাহলে আমাকে জানাবেন।

দিয়ার চোখে মায়া ফুটে উঠল।

—আপনি এতটা বদলে গেলেন কবে?

—কীভাবে?

—আগে তো আপনি আমাকে শুধু পরিচিত একজন মানুষ ভাবতেন।

শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—এখন আর তা ভাবি না।

দিয়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

—তাহলে কী ভাবেন?

শাওন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন।

দিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।

তার মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই শাওনের ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে মায়ের নাম।

সে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মা বললেন,

—শাওন, মেয়েটার পরিবার আগামী শুক্রবার আমাদের বাসায় আসছে। তুই কিন্তু বাসায় থাকবি।

শাওন চুপ হয়ে গেল।

তার চোখ তখন দিয়ার দিকে।

দিয়া বুঝতে পারল, ফোনের ওপাশে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলা হয়েছে।

সে ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—সব ঠিক আছে?

শাওন উত্তর দিতে পারল না।

ক্যাফের টেবিলে বসে শাওন কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল।

মায়ের কথাগুলো বারবার কানে বাজছিল।

“মেয়েটার পরিবার আগামী শুক্রবার আমাদের বাসায় আসছে।”

শাওন জানত, তার মা বিষয়টাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। কিন্তু তার সামনে বসে থাকা দিয়ার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ সবকিছু আরও জটিল মনে হলো।

দিয়া ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—আপনার মা কী বললেন?

শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমার জন্য একটা মেয়ের পরিবার শুক্রবার আমাদের বাসায় আসবে।

দিয়ার মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,

—ওহ... তাই?

—হ্যাঁ।

—আপনি কি মেয়েটাকে আগে থেকে চেনেন?

—না।

—তাহলে?

—মা চেনেন। পরিবারও নাকি ভালো।

দিয়া মাথা নিচু করে টেবিলের ওপর রাখা কাপটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসছিল। অথচ সে জানত, শাওনকে কোনো প্রশ্ন করার অধিকার তার নেই।

তারা তো এখনো কোনো সম্পর্কের নাম দেয়নি।

শুধু কিছু সুন্দর মুহূর্ত ভাগ করে নিয়েছে।

শুধু একে অপরকে নিয়ে চিন্তা করেছে।

শুধু একে অপরের সঙ্গে কথা না বললে দিনটা অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে।

কিন্তু এসবের কোনোটারই তো কোনো নাম নেই।

দিয়া জোর করে হাসল।

—আপনার মায়ের পছন্দ নিশ্চয়ই ভালো হবে।

শাওন দিয়ার দিকে তাকাল।

—আপনি এমন বলছেন কেন?

—কীভাবে বলছি?

—মনে হচ্ছে আপনি খুশি নন।

দিয়া চোখ তুলে বলল,

—আমি কেন খুশি হব না?

—জানি না।

—আপনার বিয়ে হবে কি না, সেটা আপনার ব্যাপার।

কথাটা বলেই দিয়া চুপ হয়ে গেল।

শাওনের মনে হলো, দিয়ার কণ্ঠে অভিমান আছে।

সে ধীরে বলল,

—আমি এখনো কিছু ঠিক করিনি।

দিয়া মৃদু হেসে বলল,

—আপনাকে কিছু ঠিক করতেও বলিনি।

তারপর সে উঠে দাঁড়াল।

—আমি বাসায় যাব।

শাওনও উঠে দাঁড়াল।

—আমি আপনাকে পৌঁছে দিই।

—না, দরকার নেই।

—দিয়া...

—শাওন, আমি ঠিক আছি।

এই প্রথম দিয়া তাকে এমনভাবে থামিয়ে দিল।

শাওন কিছু বলল না।

দিয়া চলে গেল।

ক্যাফের দরজার কাছে গিয়ে একবার পেছনে তাকাল।

শাওন তখনও দাঁড়িয়ে আছে।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

দিয়া কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল।

সেদিন রাতে দিয়া নিজের ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

তার মনে হচ্ছিল, সে যেন অকারণে শাওনের জীবনে জায়গা করে নিয়েছে।

শাওন কখনো তাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

কখনো বলেনি যে সে দিয়াকে নিজের জীবনে চায়।

তাহলে এত কষ্ট হচ্ছে কেন?

দিয়া নিজের মনকে বোঝাতে চেষ্টা করল,

“শাওন শুধু একজন বন্ধু।”

কিন্তু কথাটা বলার পরই তার চোখে পানি চলে এল।

সে বুঝে গেল, শাওন তার কাছে শুধু বন্ধু হয়ে নেই।

অনেক আগেই তার জায়গাটা আরও গভীরে তৈরি হয়ে গেছে।

পরদিন থেকে দিয়া শাওনের ফোন এড়িয়ে চলতে শুরু করল।

প্রথম দিন শাওন দুবার ফোন করল।

দিয়া ধরল না।

একটা মেসেজও পাঠাল—

“সব ঠিক আছে?”

দিয়া মেসেজটা দেখেও কোনো উত্তর দিল না।

পরদিন শাওন আবার ফোন করল।

এবার দিয়া ফোন ধরল।

—হ্যালো?

—আপনি আমার ফোন ধরছেন না কেন?

—ব্যস্ত ছিলাম।

—দুই দিন ধরে?

—হ্যাঁ।

—আমার ওপর রাগ করেছেন?

দিয়া একটু থেমে বলল,

—না।

—তাহলে?

—কিছু হয়নি।

শাওন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—আপনি যখন বলেন কিছু হয়নি, তখনই বুঝি কিছু একটা হয়েছে।

দিয়া চুপ করে রইল।

শাওন আবার বলল,

—আমার সঙ্গে কথা বলতে চান না?

—এমন না।

—তাহলে?

দিয়া এবার একটু কঠিন গলায় বলল,

—শাওন, আপনার জীবনে এখন অনেক কিছু চলছে। আমি চাই না আমার জন্য কোনো সমস্যা হোক।

—আপনি কি নিজেকে সমস্যা ভাবেন?

—আমি সেটা বলিনি।

—কিন্তু আপনার কথার মানে সেটাই।

দিয়া আর কথা বাড়াল না।

—আমার একটু কাজ আছে। পরে কথা বলব।

ফোন কেটে দিল।

শাওন ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।

সে বুঝতে পারছিল না, হঠাৎ কী এমন হলো যে দিয়া এতটা বদলে গেল।

শুক্রবার চলে এল।

শাওনের মা সকাল থেকেই ব্যস্ত।

বাসায় আত্মীয়স্বজন এসেছে। মেয়েটির পরিবারও বিকেলে আসবে।

শাওন নিজের ঘরে বসে ছিল। তার কোনো আগ্রহ ছিল না।

মা এসে বললেন,

—শাওন, তৈরি হয়ে নিচে আয়।

—মা, আমি কি মেয়েটাকে না দেখে কিছু বলতে পারি?

—দেখতে তো হবে।

—আমি এখন বিয়ের জন্য প্রস্তুত না।

মা একটু বিরক্ত হয়ে বললেন,

—তুই সবসময় কাজের কথা বলিস। সংসার করার কথাও তো ভাবতে হবে।

শাওন চুপ করে গেল।

মা কিছুক্ষণ পর নরম গলায় বললেন,

—আমি তোকে জোর করছি না। শুধু একবার কথা বলে দেখ।

শাওন মাথা নাড়ল।

—ঠিক আছে।

সে নিচে নেমে এল।

কিছুক্ষণ পর মেয়েটির পরিবার এল।

মেয়েটির নাম মেহরিন।

শান্ত স্বভাবের মেয়ে। তার বাবা-মায়ের সঙ্গে শাওনের পরিবার কথা বলছিল।

মেহরিনও ভদ্রভাবে বসেছিল।

কিছুক্ষণ পর শাওনের মা বললেন,

—তোমরা দুজন একটু কথা বলো।

শাওন আর মেহরিন পাশের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।

মেহরিন প্রথমে বলল,

—আপনি হয়তো এই বিয়েতে খুব আগ্রহী নন।

শাওন অবাক হয়ে তাকাল।

—কীভাবে বুঝলেন?

—আপনার চোখে বোঝা যাচ্ছে।

শাওন হালকা হাসল।

—আপনি কি কাউকে পছন্দ করেন?

প্রশ্নটা শুনে শাওন চুপ হয়ে গেল।

দিয়ার মুখ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।

বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা দিয়া।

বইয়ের দোকানের সামনে হাসতে থাকা দিয়া।

ফুচকার দোকানে শিশুর মতো আনন্দ করা দিয়া।

অসুস্থ বাবার জন্য চিন্তিত দিয়া।

আর সেই দিয়া, যে গত কয়েকদিন ধরে তার ফোন এড়িয়ে চলছে।

শাওন ধীরে বলল,

—হ্যাঁ।

মেহরিন শান্তভাবে বলল,

—তাহলে আমার সঙ্গে এই সম্পর্কটা এগিয়ে নেওয়া উচিত হবে না।

শাওন অবাক হয়ে তাকাল।

—আপনি কিছু মনে করবেন না?

—না। বরং সত্যিটা জানাটাই ভালো।

মেহরিন মৃদু হাসল।

—যাকে পছন্দ করেন, তার সঙ্গে কথা বলুন। হয়তো সে আপনার অপেক্ষায় আছে।

কথাটা শুনে শাওনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে বুঝল, এতক্ষণ সে আসলে কী এড়িয়ে যাচ্ছিল।

সে দিয়াকে হারানোর ভয় পাচ্ছে।

আর সেই ভয়টাই তার উত্তর।

সেদিন রাতেই শাওন দিয়াকে ফোন করল।

দিয়া ফোন ধরল না।

আবার করল।

ধরল না।

তৃতীয়বার ফোন করার পর দিয়া অবশেষে ধরল।

—কী হয়েছে?

—আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।

—এখন?

—হ্যাঁ।

—কেন?

—সামনাসামনি বলব।

দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—ঠিক আছে।

এক ঘণ্টা পর তারা সেই লেকের পাশে দেখা করল, যেখানে একদিন দিয়া তাকে বলেছিল, “আপনার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করছিল।”

আজ দুজনের মাঝেই অদ্ভুত নীরবতা।

শাওন প্রথমে বলল,

—আপনি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন কেন?

দিয়া মাথা নিচু করে বলল,

—এড়িয়ে যাচ্ছি না।

—তাহলে?

—আমি ভেবেছি একটু দূরে থাকা ভালো।

—কেন?

দিয়া এবার তার দিকে তাকাল।

চোখে জমে থাকা কষ্টটা আর লুকাতে পারল না।

—কারণ আপনার জীবনে অন্য একজন আসছে।

শাওন ধীরে বলল,

—আমি বিয়েটা না করে দিয়েছি।

দিয়া যেন বিশ্বাস করতে পারল না।

—কী?

—আমি মেহরিনকে বলেছি, আমি অন্য কাউকে পছন্দ করি।

দিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল।

—আপনি... কী বলেছেন?

শাওন এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,

—আমি বলেছি, আমার জীবনে একজন আছে।

দিয়া কিছু বলতে পারল না।

শাওন এক পা এগিয়ে এসে বলল,

—আপনি জানেন সে কে?

দিয়ার চোখে পানি জমে উঠল।

—কে?

শাওন মৃদু হেসে বলল,

—আপনি।

দিয়া যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল।

শাওন ধীরে বলল,

—আমি জানি না এটা কখন হয়েছে। জানি না কখন আপনার জন্য অপেক্ষা করা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। কখন আপনার ফোন না এলে মন খারাপ হয়, কখন আপনার হাসিটা আমার দিনের সবচেয়ে ভালো মুহূর্ত হয়ে গেছে—আমি কিছুই বুঝিনি।

দিয়া নীরবে শুনছিল।

শাওন বলল,

—শুধু একটা জিনিস বুঝেছি। আপনাকে হারানোর কথা ভাবতেই আমার ভয় লাগে।

দিয়ার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।

সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

—আপনি এতদিন কিছু বলেননি কেন?

—আমি নিজেই বুঝতে পারিনি।

—আর এখন?

শাওন মৃদু গলায় বলল,

—এখন বুঝেছি।

দিয়া চোখ মুছে বলল,

—কিন্তু সবকিছু এত সহজ হবে না, শাওন।

—কেন?

দিয়া উত্তর দেওয়ার আগেই তার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে বাবার নাম।

দিয়া ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বাবার গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—

—দিয়া, তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে। আগামী সপ্তাহে তোমার জন্য একটা সম্বন্ধ আসছে। আর এবার আমি কোনো অজুহাত শুনব না।

দিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

শাওন তার মুখের পরিবর্তন দেখে বুঝতে পারল, নতুন কোনো ঝড় তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

ফোন কেটে দিয়া ধীরে শাওনের দিকে তাকাল।

—আমার বাবাও আমার বিয়ে ঠিক করতে চাইছেন।

শাওন কিছু বলল না।

দুজনেই বুঝল—

তারা একে অপরকে খুঁজে পেলেও, তাদের পথটা এখনো সহজ হয়নি।

দিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

একই সময়ে দুজনের পরিবারই তাদের জন্য বিয়ের কথা ভাবছে—কিন্তু একে অপরের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কথা কেউ জানে না।

দিয়া ধীরে বলল,

—আমি জানি না এখন কী করব।

শাওন শান্ত গলায় বলল,

—প্রথমে ভয় পাওয়া বন্ধ করুন।

—আপনি এত সহজে বলছেন! বাবা খুব কঠিন মানুষ। উনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সহজে সরে আসেন না।

—তবুও কথা বলতে হবে।

—উনি যদি না মানেন?

শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তাহলে আমি আপনার বাবার সঙ্গে কথা বলব।

দিয়া দ্রুত মাথা নাড়ল।

—না। এখনই না।

—কেন?

—আপনি যদি হঠাৎ গিয়ে কিছু বলেন, বাবা আরও রেগে যাবেন। উনি ভাববেন আমি আপনাকে আগে থেকেই চিনতাম এবং সবকিছু লুকিয়েছি।

—আপনি কি সত্যিই সবকিছু লুকিয়েছেন?

দিয়া মৃদু হাসল।

—আমি তো নিজেই জানতাম না যে আপনি আমার জীবনে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবেন।

শাওন তার দিকে তাকিয়ে রইল।

কথাটা খুব সাধারণ হলেও তার মনে গভীরভাবে ছুঁয়ে গেল।

সে ধীরে বলল,

—আমিও জানতাম না।

দিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।

সেদিন রাতে দিয়া বাসায় ফিরে দেখল, বাবা ড্রয়িংরুমে বসে আছেন।

তার সামনে কিছু কাগজপত্র আর একটি ছবির খাম।

বাবা দিয়াকে দেখেই বললেন,

—এসো। তোমার সঙ্গে কথা আছে।

দিয়া ধীরে সামনে গিয়ে বসল।

—কী হয়েছে বাবা?

বাবা খাম থেকে একটি ছবি বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

—ছেলেটার নাম আরমান। ভালো পরিবার। নিজের ব্যবসা আছে। পরিবারও আমাদের পরিচিত।

দিয়া ছবিটার দিকে তাকাল না।

—বাবা, আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।

—কেন?

—আমি আরও কিছুদিন কাজ করতে চাই।

—কাজ করবে। বিয়ের পরেও করতে পারবে।

দিয়া চুপ করে রইল।

বাবা এবার একটু কঠিন গলায় বললেন,

—তোমার জন্য ভালো একটা পরিবার পেয়েছি। অযথা না করার কোনো কারণ নেই।

দিয়া সাহস করে বলল,

—কারণ আছে।

বাবা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

—কী কারণ?

দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমি কাউকে পছন্দ করি।

ঘরটা মুহূর্তেই নীরব হয়ে গেল।

বাবা ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,

—কাকে?

দিয়া উত্তর দিতে পারল না।

—কে সে?

—শাওন।

বাবার মুখের ভাব বদলে গেল।

—শাওন কে?

—আমি যাকে পছন্দ করি।

—কী করে?

—একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে।

—পরিবার?

—ভালো।

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—তুমি তাকে কতদিন ধরে চেনো?

দিয়া ধীরে বলল,

—কিছুদিন।

বাবা বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

—কিছুদিনের পরিচয়ের ওপর তুমি নিজের জীবন ঠিক করে ফেলেছ?

—বাবা, আমি ওকে বিশ্বাস করি।

—বিশ্বাস?

বাবা তিক্ত হেসে বললেন,

—মানুষকে চিনতে বছরের পর বছর লাগে। তুমি কয়েকদিনের পরিচয়ে বুঝে গেলে সে কেমন?

দিয়া চুপ করে গেল।

বাবা বললেন,

—আমি ছেলেটার সঙ্গে দেখা করতে চাই।

দিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ। যদি এতটাই বিশ্বাস করো, তাহলে তাকে নিয়ে এসো। আমি কথা বলব।

দিয়ার বুকের ভেতরটা একটু হালকা হলো।

কিন্তু সে জানত, কথাটা এত সহজ নয়।

পরদিন সকালে দিয়া শাওনকে সব জানাল।

শাওন বলল,

—আপনার বাবা আমার সঙ্গে দেখা করতে রাজি?

—হ্যাঁ।

—তাহলে আমি যাব।

—আপনি ভয় পাচ্ছেন না?

শাওন হেসে বলল,

—ভয় তো লাগছে।

—তবু যাবেন?

—আপনার জন্য ভয় পেলে তো আর পিছিয়ে আসা যায় না।

দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর মৃদু গলায় বলল,

—শাওন?

—হুম?

—আপনি কি সত্যিই আমাকে নিয়ে এতটা সিরিয়াস?

শাওন উত্তর দিতে একটু সময় নিল।

তারপর বলল,

—আমি আপনার সঙ্গে ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে শুরু করেছি। এর চেয়ে বড় উত্তর আর কী হতে পারে?

দিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল।

সেদিন সন্ধ্যায় শাওন প্রথমবার দিয়াদের বাসায় গেল।

পরনে সাদামাটা শার্ট। হাতে কোনো দামি উপহার নেই। শুধু দিয়ার জন্য কেনা একটি বই।

দিয়া দরজা খুলে তাকে দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

—আপনি এসেছেন!

শাওন হেসে বলল,

—আপনিই তো ডাকলেন।

—আমি ভাবছিলাম আপনি হয়তো শেষ মুহূর্তে ভয় পেয়ে যাবেন।

—আপনার বাবার সামনে দাঁড়াতে ভয় লাগছে। কিন্তু আপনাকে হারানোর ভয়টা তার চেয়ে বেশি।

দিয়া কিছু বলতে পারল না।

শাওন বইটা তার হাতে দিয়ে বলল,

—এটা আপনার জন্য।

দিয়া বইটা দেখে মুচকি হাসল।

—এই মুহূর্তেও বই?

—আপনি তো বই পছন্দ করেন।

—হ্যাঁ।

—তাহলে ঠিক আছে।

দিয়া বইটা বুকে চেপে ধরল।

ঠিক তখনই ভেতর থেকে তার বাবার কণ্ঠ ভেসে এল,

—দিয়া, কে এসেছে?

দিয়া ধীরে বলল,

—শাওন।

শাওন সোজা হয়ে দাঁড়াল।

দিয়ার বাবা এসে তার সামনে বসতে বললেন।

প্রথম কয়েক মিনিট খুব সাধারণ প্রশ্ন হলো।

—কী কাজ করেন?

—একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করি।

—মাসিক আয়?

শাওন উত্তর দিল।

—পরিবারে কে কে আছেন?

—মা আর আমি।

—বাবা?

—অনেক বছর আগে মারা গেছেন।

দিয়ার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—দিয়াকে কীভাবে চিনলেন?

শাওন সত্যিটাই বলল।

—একদিন বৃষ্টির মধ্যে আমাদের দেখা হয়েছিল।

দিয়ার বাবা অবাক হয়ে বললেন,

—তারপর?

শাওন মৃদু হেসে বলল,

—তারপর বারবার দেখা হতে থাকে।

দিয়ার বাবা দিয়ার দিকে তাকালেন।

দিয়া মাথা নিচু করে বসে ছিল।

কিছুক্ষণ পর বাবা বললেন,

—তুমি কি দিয়াকে ভালোভাবে রাখতে পারবে?

শাওন একটু থেমে বলল,

—আমি হয়তো পৃথিবীর সব সুখ তাকে দিতে পারব না। কিন্তু তাকে কখনো একা অনুভব করতে দেব না। তার সম্মান, তার ইচ্ছা আর তার স্বপ্নকে আমি নিজের মতোই গুরুত্ব দেব।

দিয়ার বাবা কিছু বললেন না।

কিন্তু তার মুখের কঠোরতা কিছুটা কমে এল।

হঠাৎ তিনি বললেন,

—তোমার মা কি জানেন?

—জানেন।

—তিনি কি রাজি?

—আমি তাকে সব বলেছি। তবে তিনি এখনো দিয়ার সঙ্গে দেখা করেননি।

বাবা ধীরে বললেন,

—তাহলে দুই পরিবারকে বসতে হবে।

দিয়ার চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা দিল।

শাওনও একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

কিন্তু সেই মুহূর্তেই দিয়ার বাবার ফোন বেজে উঠল।

তিনি ফোন ধরলেন।

কয়েক মিনিট কথা বলার পর তার মুখের ভাব আবার বদলে গেল।

ফোন রেখে তিনি শাওনের দিকে তাকালেন।

—একটা বিষয় জানতে চাই।

—জি।

—তোমার পরিবার কি জানে দিয়া কোন পরিবারের মেয়ে?

শাওন অবাক হলো।

—মানে?

—তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে আমাদের পরিবারের বহু বছর আগে একটা ব্যবসায়িক বিরোধ হয়েছিল। তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগে সেই বিষয়টা নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল।

শাওন স্থির হয়ে গেল।

—আমি এসব কিছু জানি না।

দিয়ার বাবার গলা কঠিন হয়ে গেল।

—হয়তো তুমি জানো না। কিন্তু তোমার মা জানেন।

দিয়া অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।

—বাবা, তুমি কী বলছ?

—এই সম্পর্ক যতটা সহজ মনে হচ্ছে, ততটা সহজ নয়।

শাওন উঠে দাঁড়াল।

—আমি আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলব।

দিয়ার বাবা বললেন,

—কথা বলো। তারপর সিদ্ধান্ত নাও।

শাওন দিয়ার দিকে তাকাল।

দিয়ার চোখে তখন ভয়।

সে ধীরে বলল,

—আপনি কি চলে যাবেন?

শাওন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—না।

—কিন্তু যদি আপনার পরিবার...

—পরিবারের পুরোনো কোনো সমস্যার জন্য আমাদের বর্তমানটা নষ্ট হতে দেব না।

দিয়া কিছু বলতে পারল না।

শাওন বেরিয়ে গেল।

রাতে বাসায় ফিরেই শাওন মায়ের সামনে দাঁড়াল।

—মা, তুমি কি দিয়ার পরিবারকে চেনো?

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

—কেন?

—তুমি শুধু আমার বিয়ের জন্য একটা পরিবার খুঁজছিলে না। তুমি কি জানতেও যে দিয়া কার মেয়ে?

মায়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

শাওন বুঝে গেল, তার ধারণা সত্যি।

—মা, সত্যিটা বলো।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—দিয়ার বাবা আর তোমার বাবার মধ্যে অনেক বছর আগে একটা বড় বিরোধ হয়েছিল।

—কী নিয়ে?

—একটা ব্যবসায়িক চুক্তি নিয়ে। তোমার বাবা মনে করেছিলেন, দিয়ার বাবা তাকে ঠকিয়েছেন।

শাওন স্তব্ধ হয়ে গেল।

—তারপর?

মা বললেন,

—তোমার বাবা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ওই মানুষটাকে ক্ষমা করেননি।

শাওন চোখ বন্ধ করল।

এতদিন পর তার সামনে এসে দাঁড়াল অতীতের এমন এক ঘটনা, যার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না—তবু সেটাই হয়তো তার ভবিষ্যৎকে নির্ধারণ করতে পারে।

মা ধীরে বললেন,

—তুই যদি ওই মেয়েটাকে বিয়ে করিস, তাহলে পুরোনো সব কথা আবার সামনে আসবে।

শাওন মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

—মা, আমি দিয়াকে হারাতে চাই না।

মা কিছু বললেন না।

শাওন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

তার ফোনে তখন দিয়ার একটি মেসেজ—

“সব ঠিক হবে তো?”

শাওন কিছুক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর লিখল—

“আমি জানি না সামনে কী আছে। কিন্তু তোমার হাত ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছি না।”

মেসেজ পাঠিয়ে সে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

শাওনের মেসেজটা পাওয়ার পর দিয়া অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

“আমি জানি না সামনে কী আছে। কিন্তু তোমার হাত ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছি না।”

কথাটা খুব ছোট। কিন্তু দিয়ার কাছে যেন অনেক বড় একটা আশ্বাস।

সে ধীরে ফোনটা বুকে চেপে ধরল।

বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার কাঁচ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সেই প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে গেল—যেদিন এমনই এক বৃষ্টির মধ্যে শাওন তাকে নিজের ছাতা দিয়েছিল।

সেদিন যদি শাওন তাকে ছাতাটা না দিত?

হয়তো তাদের আর কখনো দেখা হতো না।

হয়তো জীবন নিজের মতো করেই চলত।

কিন্তু একটা ছোট্ট ছাতা, একটা অচেনা মানুষের সাহায্য আর কয়েক মিনিটের কথোপকথন তাদের দুজনকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়।

দিয়া ধীরে মেসেজের উত্তর দিল,

“আমিও তোমার হাত ছাড়তে চাই না।”

মেসেজটা পাঠানোর পর তার বুকটা হালকা হয়ে গেল।

কিন্তু সে জানত না, অন্যদিকে শাওনের বাসায় তখন পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

শাওন মায়ের সামনে বসে ছিল।

তার মা অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর বললেন,

—তুই আমাকে ভুল বুঝিস না। আমি তোকে কষ্ট দিতে চাই না।

—তাহলে সত্যিটা পুরোটা বলো।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তোর বাবা আর দিয়ার বাবার মধ্যে ব্যবসা নিয়ে বড় ঝামেলা হয়েছিল। তোর বাবা বিশ্বাস করতেন, ওই মানুষটা তাকে ঠকিয়েছে।

—কিন্তু দিয়ার বাবা বললেন, তিনিই নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।

—প্রত্যেক গল্পের দুইটা দিক থাকে।

—তাহলে আসল সত্যিটা কী?

মা চুপ করে গেলেন।

শাওন বুঝল, এখানেই সবচেয়ে বড় সমস্যা।

—মা, তুমি কি জানো আসলে কী হয়েছিল?

—পুরোটা না।

—তাহলে শুধু পুরোনো রাগের জন্য দিয়াকে আমি হারাব?

মা কিছু বললেন না।

শাওন উঠে দাঁড়াল।

—আমি বাবাকে সম্মান করি। কিন্তু তার পুরোনো কোনো ভুল বা রাগের শাস্তি দিয়াকে দিতে পারি না।

মা ধীরে বললেন,

—তুই যদি এই সম্পর্কটা এগিয়ে নিতে চাস, তাহলে সবকিছু জেনে এগোতে হবে।

—আমি জানব।

—কীভাবে?

—যেখান থেকে সমস্যা শুরু হয়েছিল, সেখান থেকেই।

পরদিন শাওন তার বাবার পুরোনো অফিসে গেল।

অফিসটা এখন তার এক চাচাতো ভাই দেখাশোনা করে। শাওন সেখানে গিয়ে পুরোনো ফাইল খুঁজতে শুরু করল।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা পুরোনো ফাইল পাওয়া গেল।

ফাইলের ওপর লেখা—

“রহমান ট্রেডার্স – অংশীদারি চুক্তি।”

শাওনের চোখ আটকে গেল।

দিয়ার বাবার ব্যবসার নামও রহমান ট্রেডার্স।

সে ধীরে ফাইলটা খুলল।

পুরোনো কাগজপত্র, হিসাব, ব্যাংকের নথি—সবকিছু ঘেঁটে তার মাথা আরও ঘুরে গেল।

বিষয়টা শুধু টাকা নিয়ে ছিল না।

একটি বড় ব্যবসায়িক প্রকল্পে দুই পরিবার যৌথভাবে বিনিয়োগ করেছিল। প্রকল্পটি ব্যর্থ হওয়ার পর বিপুল টাকা লোকসান হয়।

শাওনের বাবা দাবি করেছিলেন, দিয়ার বাবা হিসাবের কিছু তথ্য গোপন করেছিলেন।

অন্যদিকে দিয়ার বাবার বক্তব্য ছিল, শাওনের বাবা প্রকল্প থেকে মাঝপথে সরে গিয়ে পুরো দায় তার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন।

দুই পক্ষই নিজেদের নির্দোষ মনে করেছিল।

শাওন আরও কয়েকটি কাগজ পড়ল।

হঠাৎ একটা কাগজ তার চোখে পড়ল।

সেখানে একটি স্বাক্ষর ছিল।

শাওন কাগজটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।

স্বাক্ষরটি তার বাবার নয়।

অন্য কারও।

সে ফাইলের শেষ পাতায় থাকা নামটা পড়ল।

“ফারহান আহমেদ।”

শাওন নামটা চিনতে পারল।

ফারহান ছিল তার বাবার পুরোনো ব্যবসায়িক সহযোগী।

কিন্তু সে এখানে কীভাবে জড়িত?

সেদিন সন্ধ্যায় শাওন দিয়াকে ফোন করল।

দিয়া ফোন ধরতেই বলল,

—কেমন আছ?

—ভালো। তুমি?

—ভালো।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।

তারপর দিয়া বলল,

—কিছু পেয়েছ?

—হ্যাঁ।

—কী?

—আমাদের পরিবারের পুরোনো ঝামেলাটা যতটা বলা হয়েছে, আসলে ততটা সহজ না।

দিয়া চিন্তিত হয়ে বলল,

—মানে?

—আমি কিছু পুরোনো কাগজ পেয়েছি। সেখানে তৃতীয় একজন মানুষের নাম আছে।

—কে?

—ফারহান আহমেদ।

দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—এই নামটা আমার বাবার কাছেও শুনেছি।

—কী বলেছিলেন?

—কয়েক বছর আগে একবার বাবাকে কারও সঙ্গে ফোনে খুব রাগ করে কথা বলতে শুনেছিলাম। তখন ফারহান নামটা শুনেছিলাম।

শাওন ধীরে বলল,

—আমার মনে হয়, আমাদের বাবাদের ঝামেলার পেছনে অন্য কেউ ছিল।

দিয়া বলল,

—তাহলে সত্যিটা বের করতে হবে।

—হ্যাঁ।

—কিন্তু তার আগে একটা কথা বলো।

—কী?

—তুমি কি এখনও আমার পাশে আছ?

শাওন হেসে বলল,

—এই প্রশ্নটা আবার করছ কেন?

—কারণ ভয় লাগে।

—কিসের?

—যদি একদিন তোমার পরিবার বলে, আমাকে ছেড়ে দিতে?

শাওনের কণ্ঠ দৃঢ় হয়ে গেল।

—আমি আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারি।

দিয়া কিছু বলল না।

শাওন আবার বলল,

—তবে তোমাকেও একটা কথা বলতে হবে।

—কী?

—যাই হোক, তুমি একা কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।

দিয়া মৃদু হেসে বলল,

—ঠিক আছে।

পরদিন দিয়ার বাবা শাওনকে আবার ডাকলেন।

শাওন সেখানে পৌঁছালে তিনি বললেন,

—তুমি নিশ্চয়ই সবকিছু জানতে পেরেছ।

—কিছুটা।

—তোমার মা কি তোমাকে সব বলেছেন?

—হ্যাঁ।

দিয়ার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। তোমার বাবা আমার সঙ্গে অন্যায় করেছিলেন।

শাওন শান্তভাবে বলল,

—আর আমার মা বলেছেন, আপনি আমার বাবার সঙ্গে অন্যায় করেছিলেন।

দিয়ার বাবা মৃদু হাসলেন।

—দেখেছ? এত বছর পরেও আমরা দুজনেই নিজেদের ঠিক মনে করি।

—আমি সত্যিটা জানতে চাই।

—সত্যি অনেক সময় খুব কষ্টের হয়।

—তবু জানতে চাই।

দিয়ার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—তোমার বাবা আর আমি একসময় খুব ভালো বন্ধু ছিলাম।

শাওন অবাক হয়ে তাকাল।

—বন্ধু?

—হ্যাঁ। আমরা একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। একে অপরকে ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করতাম।

—তাহলে এত শত্রুতা কেন?

—একটা ভুল বোঝাবুঝি থেকে।

—কী ভুল বোঝাবুঝি?

দিয়ার বাবা বললেন,

—একদিন আমাদের ব্যবসার একটা বড় অঙ্কের টাকা গায়েব হয়ে গেল। তোমার বাবা ভাবলেন, আমি টাকা সরিয়েছি। আমি ভাবলাম, তোমার বাবা আমাকে বিশ্বাস করেননি। তারপর সম্পর্কটা ভেঙে গেল।

—কিন্তু টাকা কে নিয়েছিল?

দিয়ার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—সেটাই আমরা কখনো জানতে পারিনি।

শাওন স্তব্ধ হয়ে গেল।

—আপনারা এত বছর একে অপরকে দোষ দিলেন, অথচ আসল মানুষটাকে খুঁজলেন না?

—তখন পরিস্থিতি এমন ছিল না যে আমরা একসঙ্গে বসে সত্যিটা খুঁজব। রাগ, অহংকার আর ভুল বোঝাবুঝি সবকিছু নষ্ট করে দিয়েছিল।

শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আপনি কি এখনও আমার বাবাকে দোষী মনে করেন?

দিয়ার বাবা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

—আগে করতাম। এখন জানি না।

শাওনের মনে হলো, এত বছরের পুরোনো একটা দেয়ালে প্রথমবার ফাটল ধরেছে।

সেদিন রাতে শাওন দিয়াকে সব বলল।

দিয়া অবাক হয়ে বলল,

—মানে আমাদের বাবারা একসময় বন্ধু ছিলেন?

—হ্যাঁ।

—তাহলে আমাদের গল্পটা আরও অদ্ভুত।

শাওন হেসে বলল,

—কেন?

—আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল বৃষ্টির মধ্যে। তারপর পরিচয়। তারপর কাছাকাছি আসা। আর এখন দেখছি, আমাদের পরিবারগুলোরও একটা পুরোনো গল্প আছে।

—হয়তো সবকিছুর একটা কারণ থাকে।

দিয়া মৃদু গলায় বলল,

—তুমি কি কখনো ভাবো, যদি সেদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা না হতো?

শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—ভাবতে চাই না।

—কেন?

—কারণ তাহলে আমার জীবনটা কেমন হতো, সেটা আমি জানি না। কিন্তু এখন আমি জানি, তোমাকে ছাড়া জীবনটা কল্পনা করতে ভালো লাগে না।

দিয়া নীরবে হাসল।

কিছুক্ষণ পর সে বলল,

—শাওন?

—হুম?

—তুমি কি কখনো আমার হাত ধরবে?

শাওন একটু অবাক হয়ে বলল,

—এখনই?

—না। আমি শুধু জানতে চাইলাম।

শাওন মৃদু হেসে বলল,

—যেদিন তোমার বাবা-মা নিজের হাতে তোমাকে আমার হাতে তুলে দেবেন, সেদিন।

দিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

—ততদিন অপেক্ষা করতে পারবে?

—তুমি পাশে থাকলে পারব।

কিন্তু তাদের এই আশার মাঝেই নতুন বিপদ এসে দাঁড়াল।

পরদিন সকালে শাওনের মা তাকে একটা পুরোনো চিঠি দিলেন।

—এটা তোর বাবা রেখে গিয়েছিল।

শাওন চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল।

চিঠিতে তার বাবা লিখেছিলেন, ব্যবসার টাকা হারানোর ঘটনায় তিনি একজন নির্দিষ্ট মানুষকে সন্দেহ করেছিলেন।

আর সেই মানুষটির নাম—

ফারহান আহমেদ।

শাওনের হাত কেঁপে উঠল।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল—

“পুরোনো হিসাব ঘাঁটাঘাঁটি করা বন্ধ করুন। না হলে এবার ক্ষতি শুধু ব্যবসার হবে না।”

শাওন কয়েক সেকেন্ড মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর সঙ্গে সঙ্গে দিয়াকে ফোন করল।

দিয়া ফোন ধরতেই শাওন বলল,

—দিয়া, তোমাকে একটা কথা বলতে হবে।

—কী হয়েছে?

—আমাদের পরিবারকে কেউ এখনও নজরে রাখছে।

দিয়া ভয় পেয়ে বলল,

—কী বলছ?

শাওন মেসেজটা তাকে পড়ে শোনাল।

ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর দিয়া ধীরে বলল,

—তাহলে সত্যিটা শুধু আমাদের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়।

—হ্যাঁ।

—এটা হয়তো আমাদের পরিবারগুলোর পুরোনো রহস্যের সঙ্গেও জড়িত।

শাওন জানালার বাইরে তাকাল।

তার চোখে এবার শুধু দিয়া নয়, বহু বছর আগের একটি অমীমাংসিত গল্পও ভেসে উঠল।

আর সে বুঝতে পারল—

তাদের সম্পর্কের সামনে শুধু পরিবারের বাধাই নেই, এমন একজন মানুষও আছে যে চায় না পুরোনো সত্যিটা কখনো প্রকাশ পাক।

অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজটা পাওয়ার পর শাওনের মনটা আর শান্ত হলো না।

বারবার একই কথাটা মাথায় ঘুরছিল—

“পুরোনো হিসাব ঘাঁটাঘাঁটি করা বন্ধ করুন। না হলে এবার ক্ষতি শুধু ব্যবসার হবে না।”

এটা শুধু একটা হুমকি নয়। কেউ তাদের গতিবিধি সম্পর্কে জানে। অর্থাৎ শাওন আর দিয়া যতটা ভেবেছিল, বিষয়টা তার চেয়েও গভীর।

শাওন সঙ্গে সঙ্গে দিয়াকে বলল,

—আজ থেকে তুমি একা কোথাও যাবে না।

দিয়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

—আমি কি ছোট বাচ্চা?

—না। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক না।

—তাহলে তুমি কী করবে?

—আমি সত্যিটা বের করব।

দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমিও তোমার সঙ্গে থাকব।

শাওন মৃদু হেসে বলল,

—আমি জানতাম তুমি এটাই বলবে।

—কারণ এই গল্পে আমার পরিবারও আছে।

—ঠিক আছে। কিন্তু সাবধানে।

দিয়া মাথা নাড়ল।

পরদিন তারা প্রথমে শাওনের বাবার পুরোনো অফিসে গেল।

ফারহান আহমেদের নামটাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় সূত্র।

পুরোনো কর্মচারীদের একজন, কাদের চাচা, এখনো অফিসে কাজ করতেন। বয়স অনেক হয়েছে, কিন্তু তিনি শাওনের বাবার সময়ের অনেক ঘটনাই জানতেন।

শাওন তাকে ফারহানের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—ফারহান সাহেবকে তো অনেক বছর দেখিনি।

শাওন বলল,

—শেষবার কবে দেখেছিলেন?

—যেদিন সাহেবদের মধ্যে ঝামেলা হয়েছিল, তার কিছুদিন পর।

দিয়া আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—তিনি কি তখন এখানে কাজ করতেন?

—কাজ করতেন না। কিন্তু ব্যবসার অনেক হিসাব তিনি দেখতেন।

শাওন বলল,

—তারপর?

কাদের চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—একদিন হঠাৎ সবকিছু গুটিয়ে চলে গেলেন।

—কোথায়?

—জানি না।

শাওন একটু ভেবে বলল,

—তার কোনো বন্ধু বা পরিচিত ছিল?

কাদের চাচা বললেন,

—একজন লোক নিয়মিত তার সঙ্গে দেখা করতে আসত।

—কে?

—নামটা মনে নেই। তবে লোকটার গাড়ি কালো ছিল।

দিয়া আর শাওন একে অপরের দিকে তাকাল।

শাওনের মনে পড়ে গেল, হুমকির মেসেজ।

কাদের চাচা আবার বললেন,

—আর একটা কথা মনে পড়ছে।

—কী?

—ফারহান সাহেব চলে যাওয়ার আগের রাতে অফিসের হিসাবের কয়েকটা ফাইল নিয়ে গিয়েছিলেন।

শাওন অবাক হয়ে বলল,

—কোন ফাইল?

—যে প্রকল্প নিয়ে তোমার বাবা আর দিয়ার বাবার ঝামেলা হয়েছিল, সেই প্রকল্পের ফাইল।

দিয়ার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

—তাহলে হয়তো প্রমাণ তার কাছেই ছিল।

কাদের চাচা মাথা নাড়লেন।

—হতে পারে।

অফিস থেকে বের হওয়ার পর দিয়া বলল,

—আমাদের ফারহান সাহেবকে খুঁজে বের করতে হবে।

—হ্যাঁ।

—কিন্তু এত বছর পর তাকে কোথায় পাব?

শাওন বলল,

—পুরোনো নথি থেকে শুরু করব।

তারা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিতে শুরু করল।

একসময় শাওন জানতে পারল, ফারহান আহমেদ কয়েক বছর আগে শহরের বাইরে একটি ছোট ব্যবসা শুরু করেছিলেন।

ঠিকানা পাওয়া গেল।

সেদিন বিকেলেই তারা সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

কিন্তু জায়গাটায় পৌঁছে জানতে পারল, ফারহান সেখানে আর থাকেন না।

দোকানের পাশের এক বৃদ্ধ বললেন,

—লোকটা কয়েক মাস আগে চলে গেছে।

শাওন হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করল,

—কোথায় গেছেন জানেন?

—না। তবে একটা কথা জানি।

—কী?

—চলে যাওয়ার আগে প্রায়ই একজন লোক তার সঙ্গে দেখা করত।

দিয়া জিজ্ঞেস করল,

—কেমন লোক?

বৃদ্ধ বললেন,

—লম্বা। সবসময় গাঢ় রঙের পোশাক পরত। গাড়ি ছিল কালো।

আবার সেই কালো গাড়ি।

শাওনের মনে হলো, কেউ যেন ইচ্ছা করেই তাদের সামনে একই চিহ্ন রেখে যাচ্ছে।

সন্ধ্যায় তারা একটি ক্যাফেতে বসেছিল।

দিয়া চুপচাপ কফির কাপের দিকে তাকিয়ে ছিল।

শাওন বলল,

—কী ভাবছ?

—ভাবছি, এত বছর ধরে একটা ভুল বোঝাবুঝি দুইটা পরিবারকে আলাদা করে রেখেছে।

—হুম।

—আর আমরা না চাইতেও সেই গল্পের মাঝখানে এসে পড়েছি।

শাওন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি কি ভয় পাচ্ছ?

দিয়া সত্যি কথাটাই বলল,

—হ্যাঁ।

—আমাকেও?

দিয়া মাথা নাড়ল।

—না। তোমাকে হারাতে ভয় পাই।

শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমি তোমাকে হারাব না।

দিয়া মৃদু হেসে বলল,

—এত আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে আসে?

—কারণ তুমি আমার ওপর বিশ্বাস রাখো।

—আর তুমি?

—আমি তোমার ওপর তার চেয়েও বেশি বিশ্বাস রাখি।

দিয়া তার দিকে তাকিয়ে রইল।

শাওন ধীরে বলল,

—যাই হোক না কেন, আমরা একসঙ্গে থাকব।

দিয়া মাথা নাড়ল।

—একসঙ্গে।

পরদিন শাওন তার মায়ের কাছ থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারল।

মা বললেন,

—তোর বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে ফারহানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

শাওন অবাক হয়ে বলল,

—তুমি আগে বলোনি কেন?

—কারণ তোর বাবা আমাকে কিছু বলতে নিষেধ করেছিলেন।

—কী হয়েছিল সেই দেখা?

—জানি না। শুধু জানি, সেদিন রাতে তোর বাবা খুব চিন্তিত ছিলেন।

—কোনো চিঠি?

মা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—হ্যাঁ। একটা খাম ছিল।

—কোথায়?

—তোর বাবার পুরোনো আলমারিতে হয়তো আছে।

শাওন সঙ্গে সঙ্গে আলমারি খুলে খুঁজতে শুরু করল।

অনেক পুরোনো কাগজপত্রের নিচে একটি খাম পাওয়া গেল।

খামের ওপর লেখা—

“শুধু শাওনের জন্য।”

শাওনের বুক ধক করে উঠল।

সে ধীরে খামটা খুলল।

ভেতরে একটা ছোট চিঠি।

চিঠিতে তার বাবা লিখেছিলেন—

“শাওন, যদি কখনো এই পুরোনো বিষয়টা আবার সামনে আসে, তাহলে মনে রাখিস—যাকে তুই দোষী ভাবছিস, সে হয়তো আসল মানুষ নয়। সত্যিটা খুঁজে বের করিস। কিন্তু কাউকে বিশ্বাস করার আগে প্রমাণ খুঁজিস।”

চিঠির শেষ লাইনে একটি নাম ছিল।

“রহমান।”

শাওন হতবাক।

রহমান দিয়ার বাবার পদবি।

সে সঙ্গে সঙ্গে দিয়াকে ফোন করল।

—দিয়া, তোমার বাবার পুরো নাম কী?

দিয়া অবাক হয়ে বলল,

—তুমি তো জানো।

—হ্যাঁ, কিন্তু একটা পুরোনো চিঠিতে শুধু রহমান নামটা আছে।

—মানে?

—আমি জানি না।

দিয়া বলল,

—আমি বাবার পুরোনো কাগজপত্র দেখব।

সেদিন রাতে দিয়া বাবার পুরোনো আলমারি খুলে সবকিছু খুঁজতে লাগল।

পুরোনো ছবি, কাগজ, ব্যবসার নথি—সব একে একে বের করছিল।

হঠাৎ একটা ছোট ডায়েরি তার হাতে এল।

ডায়েরিটা তার বাবার।

দিয়া প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা উল্টে দেখল।

বছরের পর বছর আগের কিছু ব্যবসায়িক নোট।

এক জায়গায় একটা তারিখের পাশে লেখা—

“ফারহানকে আর বিশ্বাস করা যাবে না।”

দিয়া থমকে গেল।

আরও কয়েক পৃষ্ঠা উল্টাতেই আরেকটি লেখা পেল—

“টাকার হিসাব সে বদলেছে। কিন্তু প্রমাণ নেই।”

দিয়ার হাত কেঁপে উঠল।

সে সঙ্গে সঙ্গে শাওনকে ফোন করল।

—শাওন!

—কী হয়েছে?

—আমি কিছু পেয়েছি।

—কী?

—বাবার ডায়েরিতে ফারহানের নাম আছে।

—কী লেখা?

দিয়া সব বলল।

শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তাহলে আমাদের ধারণা ঠিক।

—কিন্তু একটা সমস্যা আছে।

—কী?

—ডায়েরির কয়েকটা পৃষ্ঠা ছেঁড়া।

শাওনের কণ্ঠ গম্ভীর হয়ে গেল।

—কোন সময়ের পৃষ্ঠা?

দিয়া তারিখটা বলল।

শাওন স্তব্ধ হয়ে গেল।

তার বাবার চিঠির তারিখও প্রায় একই সময়ের।

অর্থাৎ সেই সময়েই হয়তো আসল ঘটনা ঘটেছিল।

পরদিন দুই পরিবারকে আবার একসঙ্গে বসানো হলো।

শাওনের মা এবং দিয়ার বাবা মুখোমুখি বসেছিলেন।

দুজনের মধ্যে বহু বছরের অভিমান।

শাওন টেবিলের ওপর পুরোনো কাগজগুলো রাখল।

—আমাদের মনে হয়, আপনাদের দুজনকেই কেউ ভুল পথে চালিত করেছিল।

দিয়ার বাবা চুপ করে কাগজগুলো দেখলেন।

শাওনের মা বললেন,

—আমারও এখন তাই মনে হচ্ছে।

দিয়ার বাবা ধীরে বললেন,

—আমি এত বছর ধরে একটা মানুষকে দোষ দিয়ে এসেছি।

শাওনের মা বললেন,

—আমিও।

দুজনেই নীরব হয়ে গেলেন।

তারপর দিয়ার বাবা বললেন,

—যদি সত্যিই ফারহান এসব করে থাকে, তাহলে আমাদের দুজনের জীবনই সে নষ্ট করেছে।

শাওন বলল,

—আমাদেরও।

দিয়ার বাবা শাওনের দিকে তাকালেন।

কিছুক্ষণ পর ধীরে বললেন,

—আমি একটা কথা বুঝেছি।

—কী?

—আমাদের ভুলের শাস্তি তোমাদের পাওয়া উচিত নয়।

দিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

শাওনের মা দিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—তুমি কি সত্যিই আমার ছেলেকে এতটা পছন্দ করো?

দিয়া লজ্জায় মাথা নিচু করল।

—জি।

শাওনের মা হেসে বললেন,

—তাহলে আমাকে মা বলে ডাকতে শিখে যাও।

দিয়ার চোখে পানি চলে এল।

শাওন অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মৃদু হাসল।

মনে হলো, এতদিনের অন্ধকারের মধ্যে প্রথমবার আলো দেখা দিয়েছে।

কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

সেদিন রাতেই শাওনের ফোনে আবার অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল—

“তোমরা সত্যের খুব কাছে চলে এসেছ। এবার থামো।”

এর ঠিক এক মিনিট পর দিয়ার ফোনে আরেকটি ছবি এল।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে—

দিয়া আর শাওন ক্যাফের বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।

ছবিটা তোলা হয়েছে দূর থেকে।

অর্থাৎ কেউ তাদের অনুসরণ করছে।

দিয়া ছবিটা দেখে ভয় পেয়ে গেল।

শাওন ফোনটা শক্ত করে ধরে বলল,

—এবার বিষয়টা আর শুধু পুরোনো হিসাবের মধ্যে নেই।

দিয়া ধীরে তার দিকে তাকাল।

—তাহলে?

শাওন দৃঢ় গলায় বলল,

—যে মানুষটা আমাদের অনুসরণ করছে, তাকে এবার খুঁজে বের করতেই হবে।

দিয়া তার পাশে এসে দাঁড়াল।

—আমি তোমার সঙ্গে আছি।

শাওন তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—আমি জানি।

রাতটা শাওন আর দিয়ার কারও কাছেই স্বাভাবিক ছিল না।

অচেনা নম্বর থেকে পাওয়া ছবিটা বারবার তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল—কেউ একজন তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করছে।

দিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। শাওন তার সামনে বসে ফোনের ছবিটা দেখছিল।

দিয়া ধীরে বলল,

—আমরা কি পুলিশকে জানাব?

শাওন কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—হুমকি দেওয়ার বিষয়টা জানানো উচিত। কিন্তু তার আগে আমি জানতে চাই, কে আমাদের অনুসরণ করছে।

—যদি বিপদ হয়?

—তাহলে একা কিছু করব না। কিন্তু সত্যিটা জানতে হবে।

দিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তুমি সবসময় এত জেদি কেন?

শাওন হেসে বলল,

—তোমার কাছ থেকে শিখেছি।

দিয়া মৃদু হাসল।

কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ থাকল না।

তার মনে হচ্ছিল, এতদিনে পাওয়া সুখটা আবার কোনো অজানা কারণে হারিয়ে যাবে না তো?

পরদিন সকালে শাওন দিয়াকে তার অফিসে পৌঁছে দিয়ে নিজে পুরোনো নথি নিয়ে বসে গেল।

সে আগের সব কাগজ আবার পরীক্ষা করছিল।

হঠাৎ একটি নথিতে তার চোখ আটকে গেল।

ব্যবসার যে প্রকল্প নিয়ে এত ঝামেলা হয়েছিল, সেই প্রকল্পের মূল হিসাবের দায়িত্বে ছিল তিনজন—

শাওনের বাবা, দিয়ার বাবা এবং ফারহান।

কিন্তু টাকা স্থানান্তরের শেষ অনুমোদন ছিল ফারহানের হাতে।

শাওন দ্রুত কাগজটার ছবি তুলে রাখল।

এরপর ব্যাংকের পুরোনো নথিতে খুঁজে দেখল, টাকা যে অ্যাকাউন্টে গিয়েছিল সেটি কোনো ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট ছিল না।

একটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট।

অ্যাকাউন্টের নাম দেখে শাওন থমকে গেল।

ফারহান আহমেদ।

এবার সন্দেহটা অনেক বেশি শক্ত হলো।

কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই গেল—

যদি ফারহানই টাকা সরিয়ে থাকে, তাহলে এত বছর ধরে দুই পরিবারকে একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে রাখল কীভাবে?

শাওন আবার পুরোনো ফাইল ঘাঁটতে লাগল।

হঠাৎ একটি কাগজের পেছনে ছোট করে লেখা একটি ঠিকানা পেল।

ঠিকানাটা শহরের বাইরে।

আর তার নিচে লেখা—

“যদি কিছু হয়, এখানে যোগাযোগ করো।”

শাওন বুঝল, তার বাবা হয়তো কোনো একসময় সত্যিটা বুঝতে পেরেছিলেন।

অন্যদিকে দিয়া তার বাবার সঙ্গে কথা বলছিল।

—বাবা, তুমি কি ফারহানকে শেষবার কখন দেখেছিলে?

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—অনেক বছর আগে।

—তখন কী হয়েছিল?

—সে বলেছিল, সবকিছু ভুলে যেতে।

—কেন?

—জানি না।

দিয়া অবাক হয়ে বলল,

—তুমি কি তখন তাকে সন্দেহ করতে?

—হ্যাঁ।

—তাহলে ব্যবস্থা নাওনি কেন?

বাবা তিক্ত হেসে বললেন,

—কারণ আমার হাতে কোনো প্রমাণ ছিল না। আর ততদিনে তোমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ব্যবসা, সংসার—সব মিলিয়ে আমি ভেঙে পড়েছিলাম।

দিয়া বাবার হাত ধরে বলল,

—তুমি যদি আগে সত্যিটা খুঁজতে, তাহলে এত বছর শাওনের পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খারাপ থাকত না।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—মানুষ যখন রাগের মধ্যে থাকে, তখন সত্যিটা দেখতে পায় না।

দিয়া কিছু বলল না।

তার বাবা ধীরে বললেন,

—তবে একটা কথা মনে রাখিস। শাওনকে বিশ্বাস করিস, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে কাউকে বিশ্বাস করিস না।

দিয়া মাথা নাড়ল।

সেদিন বিকেলে শাওন দিয়াকে ফোন করল।

—দিয়া, একটা জায়গার ঠিকানা পেয়েছি।

—কোথায়?

—শহরের বাইরে।

—ফারহানের?

—সম্ভবত।

দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমিও যাব।

—না।

—কেন?

—জায়গাটা নিরাপদ কি না জানি না।

—তাহলে তোমাকেও একা যেতে দেব না।

শাওন হেসে বলল,

—তুমি আমাকে কখনো সহজে কিছু করতে দাও না।

—কারণ তুমি নিজের কথা ভাবো না।

—আর তুমি?

—আমি তোমার কথা ভাবি।

শাওন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—ঠিক আছে। কিন্তু সাবধানে থাকবে।

পরদিন সকালে তারা ঠিকানাটায় পৌঁছাল।

জায়গাটা শহর থেকে অনেক দূরে। ছোট একটা পুরোনো বাড়ি। বাড়ির চারপাশে নির্জনতা।

শাওন গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকাল।

দিয়া ধীরে বলল,

—এখানে কেউ থাকে?

—মনে হচ্ছে না।

তারা দরজার কাছে গিয়ে দেখল, দরজায় তালা নেই।

শাওন দরজা ঠেলে খুলল।

ভেতরে পুরোনো আসবাবপত্র, কিছু ফাইল আর ধুলো জমে থাকা বাক্স।

দিয়া বলল,

—মনে হচ্ছে অনেকদিন কেউ এখানে আসেনি।

শাওন একটি টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলো দেখতে লাগল।

হঠাৎ সে একটি পুরোনো ছবি পেল।

ছবিতে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

তার বাবা।

দিয়ার বাবা।

আর ফারহান।

তিনজনের মুখেই হাসি।

ছবিটা দেখে দিয়া অবাক হয়ে বলল,

—ওরা একসময় এত ভালো বন্ধু ছিল!

শাওন মৃদু গলায় বলল,

—হয়তো আমাদের মতোই।

দিয়া তার দিকে তাকাল।

—তাহলে আমাদের গল্পটা কি তাদের গল্পের পুনরাবৃত্তি?

শাওন উত্তর দিল,

—না। আমরা তাদের ভুলগুলো আবার করব না।

দিয়া মৃদু হাসল।

হঠাৎ পাশের ঘর থেকে একটা শব্দ হলো।

দুজনেই থেমে গেল।

শাওন ধীরে দিয়াকে নিজের পেছনে রাখল।

—এখানে কেউ আছে।

তারা শব্দের দিকে এগিয়ে গেল।

একটা ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।

শাওন দরজায় ধাক্কা দিল।

—কে আছেন?

কোনো উত্তর নেই।

আরেকবার ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল।

ঘরের ভেতর কেউ নেই।

শুধু একটা টেবিল।

টেবিলের ওপর একটি পুরোনো রেকর্ডার।

শাওন সেটা হাতে তুলে নিল।

রেকর্ডার চালু করতেই একটা পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল।

কণ্ঠটা তার পরিচিত নয়।

“যদি এই রেকর্ডিং কারও হাতে পড়ে, তাহলে বুঝতে হবে সত্যিটা অনেক দেরিতে সামনে এসেছে।”

দিয়া নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

কণ্ঠটা আবার বলল,

“ফারহান একা কাজ করেনি। টাকা সরানোর পরিকল্পনা ছিল আরও একজনের।”

শাওন আর দিয়া একে অপরের দিকে তাকাল।

রেকর্ডিংয়ে কণ্ঠটা বলল,

“যে মানুষটাকে সবাই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করত, সেই মানুষটাই ছিল আসল পরিকল্পনাকারী।”

এরপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর একটি নাম উচ্চারণ হলো।

“সালেহ...”

হঠাৎ রেকর্ডিং বন্ধ হয়ে গেল।

শাওন দ্রুত আবার চালু করার চেষ্টা করল।

কিন্তু আর কিছু শোনা গেল না।

দিয়া বলল,

—সালেহ কে?

শাওন মাথা নাড়ল।

—জানি না।

ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

দুজনেই চমকে উঠল।

জানালা দিয়ে তাকিয়ে তারা একটি কালো গাড়ি দেখতে পেল।

দিয়া ফিসফিস করে বলল,

—এই গাড়িটাই!

শাওন সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ডারটা পকেটে রাখল।

—চলো।

তারা দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠল।

কালো গাড়িটাও তাদের পেছনে চলতে শুরু করল।

শাওন গাড়ি চালাচ্ছিল।

দিয়া বারবার পেছনে তাকাচ্ছিল।

—ওরা আমাদের অনুসরণ করছে।

—হ্যাঁ।

—কী করব?

—ভয় পেও না।

শাওন গাড়ির গতি বাড়াল।

কিছুক্ষণ পর একটা ব্যস্ত রাস্তার মধ্যে ঢুকে পড়তেই কালো গাড়িটা আর দেখা গেল না।

দিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

—বেঁচে গেলাম।

শাওন বলল,

—এখন আমাদের আরও সাবধান হতে হবে।

দিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি ভয় পেয়েছিলে?

—হ্যাঁ।

—কিসের জন্য?

শাওন মৃদু গলায় বলল,

—তোমার জন্য।

দিয়া কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর ধীরে তার হাতটা শাওনের হাতের ওপর রাখল।

শাওন অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

দিয়া মৃদু হাসল।

—আমি আছি।

শাওন তার হাতটা আলতো করে ধরে বলল,

—থেকো।

দিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।

তাদের সম্পর্কের মধ্যে কোনো বড় ঘোষণা ছিল না, তবুও সেই মুহূর্তে দুজনেই বুঝে গেল—তারা আর শুধু একে অপরকে পছন্দ করে না। তারা একে অপরের জীবনের দায়িত্বও নিতে শুরু করেছে।

রাতে তারা রেকর্ডিংটা আবার শুনল।

শাওন বলল,

—সালেহ নামটা আমার পরিচিত।

দিয়া অবাক হয়ে বলল,

—কে?

—আমাদের বাবাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের একজন পুরোনো হিসাবরক্ষক ছিলেন। নাম সালেহ খান।

—তিনি এখন কোথায়?

—জানি না।

দিয়া বলল,

—তাহলে তাকে খুঁজতে হবে।

শাওন মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটা কল এল।

অচেনা নম্বর।

শাওন কলটা ধরল।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর একটি ভারী কণ্ঠ বলল,

—তোমার বাবার পুরোনো ফাইল নিয়ে আর খোঁজাখুঁজি করো না।

শাওন বলল,

—আপনি কে?

—যে মানুষটা তোমাকে শেষবারের মতো সতর্ক করছে।

—ফারহান?

ওপাশে হালকা হাসি শোনা গেল।

—ফারহান শুধু একটা নাম।

শাওনের চোখে কঠোরতা ফুটে উঠল।

—তাহলে আসল নামটা বলুন।

কণ্ঠটা ধীরে বলল,

—তোমার খুব কাছের একজন মানুষকে তুমি যতটা বিশ্বাস করো, সে ততটা তোমার নয়।

কল কেটে গেল।

শাওন স্থির হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

দিয়া জিজ্ঞেস করল,

—কে ছিল?

শাওন ধীরে বলল,

—জানি না।

—কী বলল?

শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পুরো কথাটা বলল।

দিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—তোমার কাছের মানুষ?

—হ্যাঁ।

—কে হতে পারে?

শাওন উত্তর দিল না।

তার মাথায় একে একে অনেকগুলো মুখ ভেসে উঠতে লাগল।

মা।

চাচা।

পুরোনো ব্যবসায়িক পরিচিতরা।

এমনকি দিয়ার পরিবারের কেউও।

কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে সন্দেহ করা সম্ভব নয়।

ঠিক তখনই শাওনের ফোনে আরেকটি মেসেজ এল।

“সালেহকে খুঁজতে গেলে প্রথমে তোমার নিজের বাড়ির পুরোনো আলমারিটা দেখো।”

শাওন আর দিয়া একে অপরের দিকে তাকাল।

অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজটা দেখার পর শাওন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

“সালেহকে খুঁজতে গেলে প্রথমে তোমার নিজের বাড়ির পুরোনো আলমারিটা দেখো।”

দিয়া ধীরে বলল,

—তোমার বাড়ির আলমারি?

—হ্যাঁ।

—কিন্তু সেখানে এমন কী থাকতে পারে?

শাওন মাথা নাড়ল।

—জানি না। তবে এতদিনে যত সূত্র পেয়েছি, সবকিছু কোনো না কোনোভাবে আমাদের পরিবারে ফিরে এসেছে।

দিয়া বলল,

—তাহলে আজই খুঁজে দেখো।

শাওন উঠে দাঁড়াল।

—তুমিও আমার সঙ্গে যাবে?

—অবশ্যই।

দুজনেই শাওনের বাড়ির দিকে রওনা হলো।

শাওনের মা তখন রান্নাঘরে ছিলেন। তাদের একসঙ্গে দেখে মৃদু হাসলেন।

—এত রাতে তোমরা একসঙ্গে?

শাওন বলল,

—মা, তোমার কাছে একটা কথা জানতে চাই।

—কী?

—বাবার পুরোনো আলমারিটা কোথায়?

মায়ের মুখটা মুহূর্তের জন্য গম্ভীর হয়ে গেল।

—কেন?

—কিছু পুরোনো কাগজ দেখতে হবে।

মা একটু দ্বিধা করে বললেন,

—ওটা তো অনেকদিন খোলা হয়নি। স্টোররুমে আছে।

শাওন আর দেরি করল না।

স্টোররুমে গিয়ে পুরোনো আলমারিটা খুলতেই ধুলোর গন্ধ বের হলো।

ভেতরে অনেক পুরোনো নথি, ছবি, ডায়েরি আর কিছু চিঠি রাখা।

দিয়া একদিকে খুঁজতে লাগল, শাওন অন্যদিকে।

প্রায় আধা ঘণ্টা পরও কিছু পাওয়া গেল না।

দিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,

—মনে হচ্ছে কেউ আমাদের ভুল জায়গায় পাঠিয়েছে।

শাওন বলল,

—হতে পারে।

ঠিক তখন দিয়ার চোখ পড়ল আলমারির নিচের দিকে।

—শাওন, এটা দেখো।

একটা ছোট কাঠের বাক্স।

বাক্সটা তালাবদ্ধ।

শাওন মায়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—এর চাবি আছে?

মা বাক্সটা দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

—এটা তোমার বাবার খুব প্রিয় জিনিস ছিল। চাবিটা কোথায় রেখেছেন, জানি না।

শাওন বাক্সটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করল।

তালা পুরোনো। অনেক চেষ্টা করেও খোলা গেল না।

হঠাৎ দিয়া বলল,

—এক মিনিট।

সে শাওনের বাবার পুরোনো চাবির গোছা থেকে একটা ছোট চাবি বের করল।

চাবিটা তালায় লাগাতেই—

ক্লিক।

বাক্স খুলে গেল।

ভেতরে কয়েকটা পুরোনো ছবি, একটি পেনড্রাইভ এবং কিছু কাগজ।

শাওন পেনড্রাইভটা হাতে তুলে নিল।

—এটাই হয়তো আসল প্রমাণ।

তারা দ্রুত শাওনের ঘরে গিয়ে ল্যাপটপে পেনড্রাইভটা খুলল।

ভেতরে কয়েকটি ফাইল।

একটি ভিডিও।

শাওন ভিডিওটা চালু করল।

স্ক্রিনে তার বাবাকে দেখা গেল।

ভিডিওটি অনেক পুরোনো।

তার বাবা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলছেন,

“আমি জানি না এই ভিডিও কখন কার হাতে যাবে। কিন্তু যদি এটা শাওনের হাতে যায়, তাহলে বুঝব আমি যে আশঙ্কা করেছিলাম, সেটা সত্যি হয়েছে।”

শাওন নিঃশ্বাস আটকে ভিডিও দেখছিল।

তার বাবা বললেন,

“রহমানকে আমি কখনো টাকা চুরির জন্য দায়ী করিনি। প্রথমে আমি ভুল বুঝেছিলাম। পরে জানতে পারি, হিসাবের কিছু অংশ ফারহান বদলেছে। কিন্তু ফারহান একা ছিল না।”

দিয়া শিউরে উঠল।

ভিডিওতে শাওনের বাবা আবার বললেন,

“আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, আমি নিজের কাছের একজন মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করেছিলাম।”

ভিডিও এখানেই থেমে গেল।

শাওন দ্রুত দ্বিতীয় ভিডিও চালু করল।

এবার তার বাবা একটি অফিসে বসে কারও সঙ্গে কথা বলছেন।

অন্য মানুষটির মুখ পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু কণ্ঠটা পরিষ্কার।

শাওন হঠাৎ বলল,

—এই কণ্ঠটা...

দিয়া তাকাল।

—কী?

—আমি এই কণ্ঠ আগে শুনেছি।

—কোথায়?

শাওন চিন্তা করতে লাগল।

তারপর তার চোখ বড় হয়ে গেল।

—ফোনে।

দিয়া স্তব্ধ।

—মানে?

—যে মানুষটা আমাদের হুমকি দিচ্ছে... তার কণ্ঠের সঙ্গে এটা মিলে যাচ্ছে।

দুজনেই আবার ভিডিওর দিকে তাকাল।

ভিডিওতে কথোপকথন চলছিল।

লোকটি বলছিল,

“আপনি যদি রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে সবকিছু প্রকাশ হয়ে যাবে।”

শাওনের বাবা বললেন,

“আমি সত্যিটা প্রকাশ করব।”

লোকটি বলল,

“তাহলে আপনার পরিবারও নিরাপদ থাকবে না।”

ভিডিও হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।

দিয়া ধীরে বলল,

—এটা কে?

শাওন কোনো উত্তর দিল না।

কারণ তার মাথায় তখন একজন মানুষের নাম ঘুরছিল।

একজন, যাকে সে বহু বছর ধরে বিশ্বাস করে এসেছে।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

শাওন চমকে উঠল।

—কে?

কোনো উত্তর নেই।

সে দরজা খুলে বাইরে বের হলো।

করিডোর ফাঁকা।

কিন্তু নিচতলার দরজা খোলা।

শাওন দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল।

দিয়া তার পেছনে।

বাইরে এসে তারা দেখল, বাড়ির সামনে একটি কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।

গাড়িটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দ্রুত চলে গেল।

দিয়া বলল,

—ওরা কি এখানে এসেছিল?

শাওন বলল,

—সম্ভবত।

তারপর সে ঘুরে মায়ের দিকে তাকাল।

মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

শাওন কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—মা, তুমি কি কাউকে এখানে আসতে দেখেছ?

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—হ্যাঁ।

—কে?

মা ধীরে বললেন,

—তোর চাচা।

শাওন থমকে গেল।

—চাচা?

—হ্যাঁ। কিছুক্ষণ আগে এসেছিল।

—কেন?

মা বললেন,

—সে বলেছিল, পুরোনো কাগজপত্রের কিছু বিষয় নিয়ে তোর সঙ্গে কথা বলতে এসেছে।

শাওনের বুকের ভেতরটা ভার হয়ে গেল।

তার চাচা বহু বছর ধরে তাদের পরিবারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

আর ভিডিওতে তার বাবার বলা “কাছের মানুষ”—এই কথাটা আবার মনে পড়ল।

শাওন সঙ্গে সঙ্গে চাচাকে ফোন করল।

ফোন বন্ধ।

দিয়া বলল,

—তুমি কি তাকে সন্দেহ করছ?

শাওন বলল,

—আমি কাউকে প্রমাণ ছাড়া সন্দেহ করতে চাই না।

—কিন্তু সব সূত্র...

—আমি জানি।

ঠিক তখনই শাওনের ফোনে একটি নতুন মেসেজ এল।

“সত্যিটা জানতে চাইলে পুরোনো গুদামে এসো। একা।”

নিচে একটি ঠিকানা।

দিয়া মেসেজটা দেখে বলল,

—তুমি একা যাবে না।

—ওরা আমাকে একা যেতে বলেছে।

—তাই বলে যাবে?

শাওন দিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

—না। আমরা আগে পুলিশকে জানাব।

দিয়া অবাক হয়ে হাসল।

—অবশেষে তুমি আমার কথা শুনলে!

শাওনও মৃদু হাসল।

তারা সব প্রমাণের ছবি তুলে রাখল এবং নিরাপদভাবে পুরোনো গুদামের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

গুদামটা ছিল শহরের এক পুরোনো এলাকায়।

শাওন আর দিয়া কিছুটা দূরে গাড়ি রেখে এগিয়ে গেল।

চারপাশে নির্জনতা।

হঠাৎ ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল—

—শাওন!

শাওন থেমে গেল।

কণ্ঠটা পরিচিত।

সে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

সালেহ খান।

বয়স বেড়েছে, চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু মুখটা পুরোনো ছবির সঙ্গে মিলে যায়।

শাওন দ্রুত বলল,

—আপনি সালেহ?

লোকটি মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ।

দিয়া এগিয়ে এসে বলল,

—আপনি এত বছর কোথায় ছিলেন?

সালেহ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—লুকিয়ে ছিলাম।

—কার ভয়ে?

সালেহ শাওনের দিকে তাকালেন।

—তোমার বাবার মৃত্যুর পর আমি বুঝেছিলাম, সত্যিটা প্রকাশ করলে অনেক মানুষ বিপদে পড়বে।

শাওন বলল,

—ফারহান কী করেছিল?

সালেহ ধীরে বললেন,

—ফারহান টাকা সরিয়েছিল। কিন্তু সে একা ছিল না।

—কে ছিল তার সঙ্গে?

সালেহ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—তোমার বাবার খুব কাছের একজন মানুষ।

শাওনের বুক ধক করে উঠল।

—আমার চাচা?

সালেহ মাথা নাড়লেন না।

তিনি শুধু বললেন,

—তোমার চাচা নয়।

শাওন অবাক।

—তাহলে কে?

সালেহ উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

সালেহ ভয়ে পিছিয়ে গেলেন।

—ওরা এসে গেছে।

শাওন বলল,

—কারা?

সালেহ দ্রুত বললেন,

—যার নাম তুমি ভাবছ, সে নয়। আসল মানুষটা তোমাদের ধারণার চেয়েও কাছে।

হঠাৎ গুদামের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

দিয়া শাওনের দিকে তাকাল।

বাইরে কয়েকজন মানুষের পায়ের শব্দ।

সালেহ ফিসফিস করে বললেন,

—আমাকে বিশ্বাস করো। তোমার বাবা আর দিয়ার বাবার মধ্যে যে সম্পর্ক ভেঙেছিল, তার পেছনে একজন মানুষের ব্যক্তিগত প্রতিশোধ ছিল।

শাওন জিজ্ঞেস করল,

—কার?

সালেহ মুখ খুললেন।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল—

—সালেহ! এত বছর পরও তুমি চুপ থাকতে পারলে না?

দিয়া কেঁপে উঠল।

শাওনও স্থির হয়ে গেল।

কারণ সেই কণ্ঠ সে খুব ভালোভাবে চেনে।

দিয়ার বাবা।

দিয়া অবিশ্বাসের চোখে শাওনের দিকে তাকাল।

—বাবা এখানে কেন?

সালেহ মুখ নিচু করে ফেললেন।

গুদামের ভেতর হঠাৎ সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

দিয়ার চোখ তখন দরজার দিকে স্থির।

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির কণ্ঠ সে হাজারবার শুনেছে।

তার বাবা।

দিয়া ধীরে শাওনের দিকে তাকাল।

—বাবা এখানে কেন?

শাওন কোনো উত্তর দিতে পারল না।

সালেহ খান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার মুখে ভয় আর অপরাধবোধের ছাপ।

কিছুক্ষণ পর গুদামের দরজা খুলে গেল।

দিয়ার বাবা ভেতরে ঢুকলেন।

তার সঙ্গে আর কেউ ছিল না।

তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলেন।

—দিয়া!

দিয়া কাঁপা গলায় বলল,

—বাবা, তুমি এখানে?

দিয়ার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—তোমাদের দুজনকে থামাতে নয়। সত্যিটা শেষবারের মতো বলতে এসেছি।

শাওন এগিয়ে গিয়ে বলল,

—তাহলে এতদিন আমাদের কেন লুকিয়ে রেখেছিলেন?

দিয়ার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—কারণ আমি নিজেও পুরো সত্যিটা জানতাম না।

সালেহ ধীরে বললেন,

—এখন সময় হয়েছে সব বলার।

সালেহ একটা পুরোনো চেয়ার টেনে বসলেন।

—অনেক বছর আগে তোমার বাবা আর দিয়ার বাবা একসঙ্গে ব্যবসা করতেন। তারা শুধু ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন না, খুব ভালো বন্ধুও ছিলেন।

শাওন চুপ করে শুনছিল।

—সেই সময় ফারহান তাদের হিসাব দেখত। কিন্তু ফারহান চেয়েছিল ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজের হাতে নিতে। তাই সে কিছু হিসাব বদলে দেয় এবং একটি বড় অঙ্কের টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেয়।

দিয়া বলল,

—কিন্তু আমার বাবা আর শাওনের বাবা একে অপরকে কেন দোষ দিলেন?

সালেহ বললেন,

—কারণ ফারহান এমনভাবে প্রমাণ সাজিয়েছিল, যাতে দুজনের কাছেই মনে হয় অন্যজন টাকা সরিয়েছে।

শাওনের চোখে রাগ ফুটে উঠল।

—তাহলে এত বছর ধরে আমাদের পরিবারগুলো যে শত্রুতা করে এসেছে...

—সবই একটা মিথ্যার ওপর দাঁড়ানো ছিল।

দিয়া নিঃশব্দে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

—তুমি কি সত্যিটা জানতে?

তার বাবা ধীরে বললেন,

—অনেক পরে সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু তখন তোমার মায়ের অসুস্থতা, ব্যবসার সমস্যা—সবকিছু মিলিয়ে আমি ভেঙে পড়েছিলাম। আর ততদিনে তোমার শাওনের বাবার সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।

শাওন বলল,

—আমার বাবা কি পরে সত্যিটা জানতে পেরেছিলেন?

সালেহ মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ। তোমার বাবা আমাকে খুঁজে বের করেছিলেন। আমরা দুজন মিলে প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলাম।

—তাহলে প্রকাশ করলেন না কেন?

সালেহ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—কারণ ফারহান তখন আর একা ছিল না।

শাওন বলল,

—কার সঙ্গে ছিল?

সালেহ উত্তর দেওয়ার আগেই দিয়ার বাবা বললেন,

—আমার ভাই।

দিয়া অবাক হয়ে গেল।

—আমার চাচা?

—হ্যাঁ।

শাওনও স্তব্ধ।

দিয়ার বাবা বললেন,

—তোমার চাচা ফারহানের সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত ছিল। সে ভেবেছিল, দুই পরিবারের ব্যবসা ভেঙে গেলে পরে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে।

শাওন ধীরে বলল,

—কিন্তু এতদিন তো আমরা চাচাকেই নির্দোষ ভাবতাম।

—কারণ সে খুব ভালোভাবে নিজের মুখোশটা ধরে রেখেছিল।

সালেহ বললেন,

—তোমার বাবা যখন সত্যিটা প্রকাশ করতে চাইলেন, তখন তাকে ভয় দেখানো হয়। তিনি বুঝেছিলেন, বিষয়টা প্রকাশ করলে তোমাদের পরিবারেরও ক্ষতি হতে পারে। তাই তিনি সব প্রমাণ লুকিয়ে রেখে তোমার জন্য ভিডিও তৈরি করেছিলেন।

শাওনের চোখ ভিজে উঠল।

তার বাবার শেষ কথাগুলো মনে পড়ে গেল।

“সত্যিটা খুঁজে বের করিস।”

সে ধীরে বলল,

—তাহলে বাবা আমাকে সত্যিটা খুঁজে বের করার পথ দেখিয়ে গেছেন।

সালেহ মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ।

ঠিক তখন বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

দিয়ার বাবা দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—ওরা হয়তো এসেছে।

শাওন সতর্ক হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে কয়েকজন মানুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

সালেহ বললেন,

—আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।

শাওন বলল,

—কিন্তু প্রমাণ?

—সব আমার কাছে আছে।

সালেহ তার ব্যাগ থেকে কিছু কাগজ বের করলেন।

পুরোনো ব্যাংক নথি, স্বাক্ষর করা কাগজ এবং ফারহানের সঙ্গে করা কয়েকটি চুক্তি।

শাওন সবকিছুর ছবি তুলে রাখল।

দিয়া বাবার হাত ধরে বলল,

—বাবা, তুমি এতদিন এই সত্যিটা একা বহন করেছ?

দিয়ার বাবা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

—আমি শুধু একটা ভুলের কারণে দুই পরিবারকে এত বছর দূরে রেখেছি। এখন বুঝি, সেই ভুলের সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে তোমরা।

দিয়া চোখ মুছে বলল,

—তুমি আর শাওনের পরিবার কি আবার বন্ধু হতে পারবে?

দিয়ার বাবা শাওনের দিকে তাকালেন।

কিছুক্ষণ পর বললেন,

—আমি চাই।

শাওনও মাথা নেড়ে বলল,

—আমিও।

পরদিন সব প্রমাণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে দেওয়া হলো।

পুরোনো ব্যবসায়িক নথি, ব্যাংকের তথ্য, ভিডিও রেকর্ডিং এবং সালেহের সাক্ষ্য—সবকিছু মিলিয়ে বহু বছরের রহস্যের সত্যিটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গেল।

ফারহান ও শাওনের চাচার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলো।

সবচেয়ে বড় কথা, দুই পরিবারের মধ্যে যে ভুল বোঝাবুঝি এত বছর ধরে চলে আসছিল, সেটার অবসান হলো।

শাওনের মা দিয়ার বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন।

দুজন কিছুক্ষণ মুখোমুখি বসে ছিলেন।

তারপর শাওনের মা বললেন,

—আমরা দুজনেই অনেক বছর ভুল মানুষকে দোষ দিয়েছি।

দিয়ার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—আর নিজেদের অহংকারের কারণে সন্তানদেরও সেই ভুলের বোঝা বইতে হয়েছে।

শাওনের মা হাত বাড়িয়ে দিলেন।

—সব ভুলে যাই?

দিয়ার বাবা হাতটা ধরে বললেন,

—সব ভুলে যাই।

সেদিন বহু বছর পর দুই পরিবার আবার পাশাপাশি বসেছিল।

আর সেই মিলনের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল দুই তরুণ-তরুণী—

শাওন আর দিয়া।

কয়েক মাস পর।

শহরের এক সুন্দর ছাদে সন্ধ্যার আয়োজন।

চারপাশে ছোট ছোট আলো। পরিবারের সবাই ব্যস্ত।

দিয়া এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার পরনে সাদামাটা সুন্দর পোশাক। মুখে লাজুক হাসি।

শাওন দূর থেকে তাকে দেখছিল।

দিয়া তাকে দেখে বলল,

—এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?

শাওন কাছে এসে বলল,

—ভাবছি।

—কী?

—সেদিন যদি তোমাকে ছাতা না দিতাম?

দিয়া হেসে বলল,

—তাহলে আমি ভিজতাম।

—তারপর?

—হয়তো অসুস্থ হতাম।

—আর আমাদের দেখা হতো না।

দিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,

—হয়তো ভাগ্য অন্য কোনো রাস্তা খুঁজে নিত।

শাওন মৃদু হেসে বলল,

—কিন্তু আমি খুশি যে সেদিন তোমাকে ছাতাটা দিয়েছিলাম।

দিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমিও।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে থাকল।

তারপর দিয়া বলল,

—তুমি জানো, আমাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার কী?

—কী?

—আমাদের প্রথম দেখা কোনো পরিকল্পনা ছিল না।

শাওন বলল,

—হ্যাঁ।

—কোনো পরিচিত মানুষ আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়নি।

—না।

—কোনো বড় আয়োজন ছিল না।

—ছিল শুধু বৃষ্টি।

দিয়া হেসে বলল,

—আর একটা নীল ছাতা।

শাওন বলল,

—আর তুমি।

দিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।

কিছুদিন পর তাদের বিয়ে হলো।

দুই পরিবারের সবাই উপস্থিত।

বিয়ের পর রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে দিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

শাওন পাশে এসে দাঁড়াল।

—কী ভাবছ?

দিয়া মৃদু হেসে বলল,

—সেই প্রথম দিনের কথা।

—বৃষ্টির দিন?

—হ্যাঁ।

—আমি ভাবছি, সেদিন তুমি যদি ছাতাটা ফেরত না দিতে?

দিয়া বলল,

—তাহলে?

শাওন হেসে বলল,

—তাহলে তোমার সঙ্গে আবার দেখা করার অজুহাত আমার থাকত না।

দিয়া বলল,

—অজুহাতের দরকার হতো না।

—কেন?

দিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—কারণ আমি নিজেই তোমাকে খুঁজে নিতাম।

শাওন মৃদু হাসল।

—তাহলে এতদিনে একটা কথা বুঝলাম।

—কী?

—আমাদের গল্পটা আসলে সেই দিন শুরু হয়নি, যেদিন আমাদের দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল।

দিয়া অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে কবে?

শাওন বলল,

—যেদিন দুজন অচেনা মানুষ একে অপরের জীবনে একটু জায়গা করে দিয়েছিল।

দিয়া হেসে বলল,

—আর সেই জায়গাটা আর খালি হয়নি।

দূরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হলো।

দিয়া বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল,

—দেখো, আবার বৃষ্টি।

শাওন হাসল।

—এইবার ছাতা লাগবে?

দিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,

—না।

—কেন?

দিয়া মৃদু হেসে বলল,

—এবার তো তুমি পাশে আছ।

শাওন আর কিছু বলল না।

শুধু বৃষ্টিভেজা রাতের দিকে তাকিয়ে রইল।

একদিনের হঠাৎ দেখা থেকে শুরু হওয়া তাদের গল্পটা পেরিয়ে গেছে ভুল বোঝাবুঝি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, অতীতের রহস্য আর অনেক অপেক্ষা।

....
👁 99