এক রাতের অচেনা যাত্রা

শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত রাস্তাগুলোর একটিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বাড়িটাকে সবাই চৌধুরী বাড়ি নামে চিনত। বাইরে থেকে বাড়িটা যতটা সুন্দর, ভেতরের নিয়মকানুন ছিল তার চেয়েও বেশি কঠিন।

এই বাড়ির কর্তা ছিলেন মাহমুদ চৌধুরী। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হলেও তার গম্ভীর মুখ দেখে অনেকেই অকারণে ভয় পেত। তিনি ব্যবসায়ী মানুষ। সময়ের ব্যাপারে কঠোর, নিয়মের ব্যাপারে আরও কঠোর। তার কাছে পরিবারের সম্মানই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আর তার ছোট ছেলে অর্ণব চৌধুরী ছিল ঠিক তার বিপরীত।

অর্ণব ছিল হাসিখুশি, দুষ্টু আর ভীষণ স্বাধীনচেতা। কোনো নিয়ম তার ভালো লাগত না। সুযোগ পেলেই বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়া, হঠাৎ কোথাও ঘুরতে চলে যাওয়া, বাবার গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের মাঝখানে মজা করা—এসব তার কাছে ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার।

কিন্তু এই স্বভাবের কারণে অর্ণবকে নিয়ে তার বাবার অভিযোগের শেষ ছিল না।

একদিন সকালের নাশতার টেবিলে মাহমুদ চৌধুরী গম্ভীর মুখে বললেন,

—অর্ণব, এবার কিন্তু সীমা পার হয়ে যাচ্ছে।

অর্ণব পরোটা মুখে দিয়ে অবাক হয়ে তাকাল।

—আমি আবার কী করলাম?

—গতকাল আমার গাড়ি নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিলে কেন?

—গাড়িটা তো বাড়িতেই ছিল। ভেবেছিলাম একটু ব্যবহার করি।

—অনুমতি নিয়েছিলে?

অর্ণব চুপ করে গেল।

বড় ভাই আরমান পাশ থেকে হেসে ফেলল।

মাহমুদ চৌধুরী এবার টেবিলে রাখা কাগজটা অর্ণবের দিকে এগিয়ে দিলেন।

—তোমার ভুলের হিসাব আমি রাখি। তুমি জানো সেটা।

অর্ণব কাগজটার দিকে তাকিয়ে চোখ বড় করল।

—আবার সেই হিসাব!

তার বাবা শান্ত গলায় বললেন,

—তোমার জীবনে করা ভুলের সংখ্যা এখন নিরানব্বই।

অর্ণবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

ছোটবেলা থেকেই তার বাবা একটা অদ্ভুত নিয়ম করে রেখেছিলেন। পরিবারের কেউ বারবার এমন কাজ করলে যা পরিবারকে সমস্যায় ফেলে, তার প্রতিটি বড় ভুল হিসাব করা হবে। একশোটি ভুল পূর্ণ হলে সেই ব্যক্তিকে নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। মাহমুদ চৌধুরী কথাটা মজা করে বলেননি—অর্ণব জানত।

—আর মাত্র একটা, বাবা?

—হ্যাঁ। আর একটা।

অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তাহলে আমি এখন থেকে খুব ভালো ছেলে হয়ে যাব।

আরমান হেসে বলল,

—তোর মুখে এই কথা শুনে আমার ভয়ই লাগছে।

অর্ণবও হেসে ফেলল।

ঠিক তখনই মা রেহানা চৌধুরী বললেন,

—আগামীকাল কিন্তু সবাইকে সময়মতো বের হতে হবে। আরমানের বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হবে পরশু। আমাদের ট্রেন সকাল আটটায়।

অর্ণব মাথা নেড়ে বলল,

—আমি সময়ের আগেই স্টেশনে পৌঁছে যাব।

বাবা তাকিয়ে বললেন,

—এই কথাটা মনে রেখো।

অর্ণব বুক ফুলিয়ে বলল,

—এইবার কোনো ভুল হবে না।

কিন্তু সে জানত না, সেই কথার কয়েক ঘণ্টা পরেই তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত রাত শুরু হতে যাচ্ছে।

পরদিন সকাল।

চৌধুরী বাড়িতে যেন উৎসবের আমেজ। সবাই ব্যস্ত। লাগেজ গোছানো হচ্ছে, গাড়িতে ব্যাগ তোলা হচ্ছে, আত্মীয়রা একে একে চলে আসছে।

অর্ণব অবশ্য তখনও নিজের ঘরে।

তার বন্ধু রাফি আগের রাতেই ফোন করে বলেছিল,

“ভাই, বের হওয়ার আগে পাঁচ মিনিট দেখা করবি?”

সেই পাঁচ মিনিটই অর্ণবের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।

স্টেশনে যাওয়ার ঠিক পনেরো মিনিট আগে অর্ণব বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে বের হলো।

—দশ মিনিটের বেশি লাগবে না, সে নিজেকেই বলল।

কিন্তু বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর গল্প জমে গেল।

তারপর হঠাৎ অর্ণবের ফোন বেজে উঠল।

মায়ের ফোন।

—অর্ণব, তুমি কোথায়?

—এই তো... আসছি।

—ট্রেন ছাড়তে আর দশ মিনিট!

অর্ণবের চোখ কপালে উঠে গেল।

—কী!

সে দৌড়ে রাস্তার দিকে ছুটল।

কিন্তু তখন শহরের রাস্তায় ভয়াবহ যানজট।

একটা গাড়ি, দুটো গাড়ি, তারপর পুরো রাস্তা যেন থেমে গেল।

অর্ণব ঘড়ির দিকে তাকাল।

সময় চলে যাচ্ছে।

অবশেষে সে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়াতে শুরু করল।

স্টেশনে পৌঁছানোর সময় ট্রেন ছাড়ার বাঁশি বাজছে।

অর্ণব দূর থেকে দেখতে পেল তার পরিবারের সবাই ট্রেনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

—মা!

সে দৌড়ে গেল।

কিন্তু ট্রেন ইতিমধ্যে চলতে শুরু করেছে।

অর্ণব যতই দৌড়াক, ট্রেন ততই দূরে চলে গেল।

সে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর ফোন বেজে উঠল।

বাবা।

অর্ণব ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,

—তুমি কোথায়?

—বাবা... আমি...

—ট্রেন মিস করেছ?

অর্ণব চুপ।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর বাবা বললেন,

—নিরানব্বইয়ের পর এবার একশো।

কল কেটে গেল।

অর্ণব মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।

—শেষ!

ঠিক তখনই পাশ থেকে একটা মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল,

—আপনার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ট্রেন না, পুরো জীবনটাই মিস করেছেন।

অর্ণব মাথা তুলে তাকাল।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার হাতে একটা ছোট ব্যাগ। পরনে সাদামাটা পোশাক। চোখে বিরক্তি, মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা ভাব।

মেয়েটার নাম স্নেহা।

অর্ণব ভ্রু কুঁচকে বলল,

—আপনি কি সব অপরিচিত মানুষকে এভাবে কথা বলেন?

স্নেহা কাঁধ ঝাঁকাল।

—না। শুধু যাদের দেখে মনে হয় তারা নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনে।

—ধন্যবাদ। খুব সাহায্য হলো।

স্নেহা হেসে ফেলল।

—আপনার ট্রেন মিস হয়েছে?

—হ্যাঁ।

—আমারও।

অর্ণব অবাক হয়ে তাকাল।

—আপনারও?

—হ্যাঁ। তবে আপনার মতো এত নাটক করে নয়।

অর্ণব এবার ভালো করে মেয়েটার দিকে তাকাল।

—তাহলে আপনি কোথায় যাবেন?

—শিলিগুড়ি।

অর্ণব চমকে গেল।

—আমিও।

স্নেহা একটু থেমে বলল,

—তাহলে ভাগ্য ভালো। অন্তত গন্তব্যটা একই।

অর্ণব মুচকি হেসে বলল,

—কিন্তু যাব কীভাবে?

স্নেহা চারপাশে তাকিয়ে বলল,

—সেটাই তো এখন ভাবতে হবে।

স্টেশনের বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে। তাদের সামনে অচেনা রাস্তা, অজানা যাত্রা আর হাতে খুব অল্প সময়।

অর্ণব জানত না, এই অপরিচিত মেয়েটিই তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত রাতের সঙ্গী হতে যাচ্ছে।

আর স্নেহাও জানত না, কয়েক ঘণ্টার এই যাত্রা তাদের দুজনের জীবনকে এমনভাবে বদলে দেবে, যা তারা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

অর্ণব ব্যাগটা কাঁধে তুলে বলল,

—চলুন। একটা গাড়ি খুঁজে দেখি।

স্নেহা তাকিয়ে বলল,

—আপনাকে বিশ্বাস করা যায় তো?

অর্ণব হেসে উত্তর দিল,

—না।

স্নেহা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

অর্ণব বলল,

—তবে আজকের রাতটা পার করতে হলে আমাকে বিশ্বাস করতেই হবে।

স্নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—ঠিক আছে। দেখি আপনার একশো নম্বর ভুলটা আমাদের কোথায় নিয়ে যায়।

দুজন পাশাপাশি স্টেশন থেকে বেরিয়ে গেল।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসতেই অর্ণব আর স্নেহা বুঝতে পারল, সামনে কাজটা যতটা সহজ মনে হচ্ছিল, আসলে ততটা সহজ নয়।

রাত নেমে এসেছে। চারপাশে মানুষের ভিড় কমে গেলেও রাস্তার যানবাহনের ব্যস্ততা কমেনি। শিলিগুড়ির দিকে যাওয়ার জন্য তারা একটা গাড়ি খুঁজছিল, কিন্তু একের পর এক গাড়ি থামিয়েও কোনো লাভ হচ্ছিল না।

অর্ণব একবার রাস্তার এপাশে, আবার ওপাশে ছুটছে।

স্নেহা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল।

শেষ পর্যন্ত অর্ণব ফিরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—আজকে মনে হচ্ছে ভাগ্য আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতা করেছে।

স্নেহা শান্তভাবে বলল,

—আপনি ভাগ্যের ওপর দোষ দিচ্ছেন কেন? ট্রেন মিস করেছেন আপনি নিজেই।

অর্ণব বিরক্ত হয়ে তাকাল।

—আপনি কি সবসময় এত সত্যি কথা বলেন?

—মিথ্যা বললে আপনার লাভ কী?

—আমার মনটা একটু ভালো থাকত।

স্নেহা হেসে ফেলল।

অর্ণবও হাসল।

ঠিক তখনই সামনে একটা পুরোনো মাইক্রোবাস এসে থামল। চালক জানালা নামিয়ে বলল,

—কোথায় যাবেন?

অর্ণব দ্রুত এগিয়ে গেল।

—শিলিগুড়ি।

চালক বলল,

—পুরো রাস্তা যাব। তবে ভাড়া একটু বেশি লাগবে।

অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল।

—সমস্যা নেই।

স্নেহা সন্দেহের চোখে গাড়িটার দিকে তাকাল।

—গাড়িটা নিরাপদ তো?

চালক হেসে বলল,

—ম্যাডাম, গাড়ি পুরোনো, কিন্তু আমি নতুন।

অর্ণব মুখ টিপে হাসল।

স্নেহা চোখ বড় করে তাকাল।

—আপনি হাসছেন কেন?

—কিছু না।

—আপনার এই “কিছু না” কথাটা আমার একদম বিশ্বাস হচ্ছে না।

দুজন গাড়িতে উঠল।

অর্ণব জানালার পাশে বসল। স্নেহা তার পাশের সিটে।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।

অর্ণবের ফোনে বারবার কল আসছিল। কখনো মা, কখনো বড় ভাই। শেষ পর্যন্ত বাবার ফোনও এল।

অর্ণব ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমি ধরলে বকা খাব, না ধরলে আরও বেশি বকা খাব।

স্নেহা বলল,

—ধরুন।

—আপনি আমার বাবাকে চেনেন না।

—আপনার বাবা কি খুব ভয়ংকর?

অর্ণব একটু হেসে বলল,

—ভয়ংকর না। তবে তার সামনে দাঁড়ালে মনে হয় আমি ছোটবেলার সেই স্কুলের ছাত্র, যে হোমওয়ার্ক করে আসেনি।

স্নেহা হেসে ফেলল।

অর্ণব ফোন ধরল।

—হ্যালো, মা।

ওপাশ থেকে মায়ের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ।

—তুমি কোথায়?

—আমি একটা গাড়িতে উঠেছি। শিলিগুড়ির দিকে আসছি।

—কার সঙ্গে?

অর্ণব একটু থেমে স্নেহার দিকে তাকাল।

—একজনের সঙ্গে।

মা আরও চিন্তিত হয়ে বললেন,

—কে?

অর্ণব উত্তর দেওয়ার আগেই ফোন কেটে গেল।

স্নেহা অবাক হয়ে বলল,

—আপনার মা কি আমাকে নিয়ে সন্দেহ করছেন?

—আমার মা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সন্দেহ করেন আমাকে নিয়ে।

—কেন?

—কারণ আমি অর্ণব।

স্নেহা হেসে বলল,

—বুঝতে পারছি।

গাড়ি কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল।

চালক কয়েকবার ইঞ্জিন চালু করার চেষ্টা করল। কিন্তু গাড়ি আর চলল না।

অর্ণব মাথা পেছনে ঠেকিয়ে বলল,

—না! এটা হতে পারে না।

স্নেহা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।

—কী হয়েছে?

চালক নিচে নেমে বলল,

—মনে হচ্ছে ইঞ্জিনে সমস্যা হয়েছে।

অর্ণব গাড়ি থেকে নেমে বলল,

—কতক্ষণ লাগবে?

—বলতে পারছি না।

অর্ণব আকাশের দিকে তাকাল।

—এক রাতেই এত কিছু কীভাবে সম্ভব?

স্নেহা তার পাশে এসে দাঁড়াল।

—আপনি চাইলে এখনো ফিরে যেতে পারেন।

—কোথায়?

—স্টেশনে।

—যে ট্রেন চলে গেছে?

—হ্যাঁ।

অর্ণব হেসে ফেলল।

—আপনি আমাকে খুব ভালোভাবে বিরক্ত করতে পারেন।

—ধন্যবাদ।

দুজন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর দূর থেকে একটা বাসের আলো দেখা গেল।

চালক বলল,

—ওই বাসটা হয়তো সামনে যাবে। আপনারা চাইলে চেষ্টা করতে পারেন।

অর্ণব আর স্নেহা ব্যাগ নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়াল।

বাসটা কাছে আসতেই অর্ণব হাত তুলল।

বাস থামল।

কন্ডাক্টর জানালা দিয়ে বলল,

—কোথায় যাবেন?

—শিলিগুড়ি।

—সরাসরি না। মাঝপথ পর্যন্ত যাব।

অর্ণব স্নেহার দিকে তাকাল।

স্নেহা মাথা নাড়ল।

—চলুন।

তারা বাসে উঠে বসল।

বাসের ভেতর খুব বেশি জায়গা ছিল না। পেছনের দিকে দুটো সিট খালি ছিল। অর্ণব একটিতে বসল, স্নেহা অন্যটিতে।

বাস আবার চলতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর অর্ণব খেয়াল করল, স্নেহা বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছে।

—আপনি কোথায় যাচ্ছেন আসলে?

স্নেহা একটু চুপ করে বলল,

—আমার একজন আত্মীয়ের বাড়ি।

—এত রাতে একা যাচ্ছেন?

—হ্যাঁ।

—পরিবার জানে?

স্নেহা এবার তার দিকে তাকাল।

—আপনি কি সবকিছু জানতে চান?

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—না। শুধু জানতে ইচ্ছে হলো।

স্নেহা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—কিছু কিছু যাত্রা আছে, যেখানে মানুষ নিজের ইচ্ছায় বের হয় না। পরিস্থিতি তাকে বের করে দেয়।

অর্ণব কথাটা শুনে একটু থেমে গেল।

—আপনারও কি তেমন কোনো কারণ আছে?

স্নেহা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,

—হয়তো।

তারপর আর কিছু বলল না।

অর্ণবও প্রশ্ন করল না।

কিছুক্ষণ পর বাস একটা ছোট বাজারের কাছে থামল।

কন্ডাক্টর বলল,

—দশ মিনিট বিরতি।

অর্ণব নেমে চা আনতে গেল।

স্নেহা বাসের সিটে বসে ছিল। কিছুক্ষণ পর সে ব্যাগ খুলে একটা পুরোনো ছবি বের করল।

ছবিতে ছিল স্নেহা আর একজন মধ্যবয়সী মানুষ।

স্নেহা ছবিটার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,

—আমি আসছি...

অর্ণব ফিরে এসে কথাটা শুনে ফেললেও কিছু বলল না।

সে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল,

—চা।

স্নেহা দ্রুত ছবিটা ব্যাগে রেখে দিল।

—ধন্যবাদ।

অর্ণব বসে বলল,

—একটা কথা বলব?

—বলুন।

—আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি কোনো একটা বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত।

স্নেহা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—আপনাকেও দেখে মনে হচ্ছে আপনি নিজের জীবন নিয়ে একটুও চিন্তিত নন।

অর্ণব হেসে বলল,

—আমি চিন্তা করি। তবে চিন্তা করলে তো সমস্যাগুলো কমে না।

স্নেহা বলল,

—সবসময় হাসি দিয়ে সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

অর্ণবের হাসি একটু থেমে গেল।

—আপনি ঠিক বলেছেন।

দুজনের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।

বাস কিছুক্ষণ পর আবার চলতে শুরু করল।

কিন্তু তারা জানত না, সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

প্রায় আধঘণ্টা পর বাসটি হঠাৎ থেমে গেল। সামনে কয়েকজন মানুষ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। চালক নেমে তাদের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।

অর্ণব উঠে দাঁড়াল।

—কী হয়েছে?

একজন যাত্রী বলল,

—সামনে রাস্তা বন্ধ। একটা গাড়ি নষ্ট হয়ে রাস্তার মাঝখানে পড়ে আছে।

অর্ণব জানালা দিয়ে তাকাল।

দূরে অন্ধকার রাস্তার মাঝে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গাড়িটার ভেতরে আলো জ্বলছিল।

স্নেহা ধীরে ধীরে অর্ণবের পাশে এসে দাঁড়াল।

—ওই গাড়িটা...

অর্ণব তাকাল।

—কী?

স্নেহা নিচু গলায় বলল,

—স্টেশন থেকে বের হওয়ার পরও আমি গাড়িটাকে একবার দেখেছি।

অর্ণব এবার ভালো করে তাকাল।

—আপনি নিশ্চিত?

স্নেহা মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

অর্ণবের মুখের হাসি এবার পুরোপুরি মিলিয়ে গেল।

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কালো গাড়ির ভেতর থেকে যেন কেউ তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল।

অর্ণব ধীরে ধীরে স্নেহার সামনে এসে দাঁড়াল।

—আপনি ভয় পাচ্ছেন?

স্নেহা বলল,

—হ্যাঁ।

অর্ণব শান্ত গলায় বলল,

—ভয় পাবেন না। আমরা একসঙ্গে আছি।

স্নেহা তার দিকে তাকাল।

অচেনা একজন মানুষ।

কয়েক ঘণ্টা আগেও যার নাম সে জানত না।

অথচ এই মুহূর্তে অদ্ভুতভাবে তার কথাটাই স্নেহার মনে একটু সাহস এনে দিল।

আর রাস্তার ওপারে কালো গাড়িটা তখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল।

তাদের যাত্রা যেন ধীরে ধীরে অন্য কোনো রহস্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা কালো গাড়িটার দিকে তাকিয়ে অর্ণবের মনে অস্বস্তি হচ্ছিল।

কয়েক মিনিট আগেও সে বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু স্নেহা যখন বলল, স্টেশন থেকে বের হওয়ার পরও গাড়িটাকে সে দেখেছে, তখন ব্যাপারটা আর সাধারণ মনে হলো না।

অর্ণব নিচু গলায় বলল,

—আপনি নিশ্চিত গাড়িটা একই?

স্নেহা মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ। গাড়িটার সামনের ডান পাশে একটা ছোট দাগ আছে। তখনও দেখেছিলাম।

অর্ণব আবার গাড়িটার দিকে তাকাল।

দাগটা সত্যিই দেখা যাচ্ছে।

—আপনি কি কাউকে সন্দেহ করছেন?

স্নেহা একটু চুপ করে বলল,

—জানি না।

—কেউ কি আপনাকে অনুসরণ করতে পারে?

স্নেহা উত্তর দিল না।

অর্ণব বুঝল, মেয়েটা কিছু একটা লুকাচ্ছে।

তবে এই মুহূর্তে জোর করে জানতে চাইল না।

এদিকে বাসের চালক আর কয়েকজন যাত্রী মিলে রাস্তার পাশে আটকে থাকা গাড়িটাকে সরানোর চেষ্টা করছিল। প্রায় পনেরো মিনিট পর রাস্তা একটু ফাঁকা হলো।

চালক উঠে এসে বলল,

—আর বেশি দেরি হবে না। তবে সামনে রাস্তা খুব খারাপ।

সবাই আবার বাসে উঠে বসল।

অর্ণব এবার স্নেহার পাশের সিটে বসল।

—আপনি চাইলে আমার সঙ্গে বসতে পারেন, যদি ওই গাড়িটা নিয়ে ভয় পান।

স্নেহা একটু তাকিয়ে বলল,

—আমি ভয় পাইনি।

—তাহলে ভালো।

—তবে আপনি কেন আমার পাশে বসলেন?

অর্ণব হেসে বলল,

—আমি ভয় পেয়েছি।

স্নেহা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল।

তারপর দুজনেই হেসে ফেলল।

বাস চলতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর স্নেহা বলল,

—আপনার পরিবার খুব রাগ করেছে?

—ভীষণ।

—কেন?

—আমি ট্রেন মিস করেছি।

—শুধু এটার জন্য?

অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—আমার বাবার কাছে এটা শুধু ট্রেন মিস করা নয়। এটা আমার একশো নম্বর ভুল।

স্নেহা অবাক হলো।

—একশো নম্বর ভুল?

অর্ণব পুরো ব্যাপারটা তাকে বলল।

স্নেহা মন দিয়ে শুনল।

তারপর বলল,

—আপনার বাবা সত্যিই একশোটা ভুল গুনে রেখেছেন?

—হ্যাঁ।

—আপনি এত ভুল কীভাবে করলেন?

—আমি প্রতিভাবান।

স্নেহা হেসে বলল,

—আপনি খুব অদ্ভুত।

—এটা আমার প্রশংসা হিসেবে নিলাম।

স্নেহা মাথা নেড়ে জানালার বাইরে তাকাল।

কিছুক্ষণ পর সে বলল,

—তবে একটা কথা ঠিক। ভুল করা মানেই মানুষ খারাপ নয়।

অর্ণব চুপ করে গেল।

—আপনি এটা বিশ্বাস করেন?

—হ্যাঁ।

—তাহলে আমার বাবাকে গিয়ে বলবেন?

স্নেহা হেসে ফেলল।

—আপনার বাবার সঙ্গে দেখা হলে আগে নিজেকে বাঁচাব।

অর্ণবও হাসল।

তাদের কথাবার্তায় সময় কেটে যাচ্ছিল।

কিন্তু হঠাৎ বাসের গতি কমে গেল।

চালক সামনে তাকিয়ে বলল,

—আবার সমস্যা।

সবাই জানালা দিয়ে তাকাল।

সামনে একটা ছোট সেতুর কাছে রাস্তার একপাশ ভেঙে গেছে। বড় গাড়ি যাওয়া সম্ভব নয়।

চালক বলল,

—এখান থেকে আর বাস যাবে না।

অর্ণব হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিল।

—এবার কী?

কন্ডাক্টর বলল,

—আরেকটা রাস্তা আছে। একটু ঘুরে যেতে হবে। কিন্তু এখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটতে হবে।

অর্ণব স্নেহার দিকে তাকাল।

—আপনি হাঁটতে পারবেন?

স্নেহা ব্যাগটা হাতে নিয়ে বলল,

—আপনার সঙ্গে এতদূর এসেছি, দুই কিলোমিটারও পারব।

দুজন বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করল।

রাত আরও গভীর হয়েছে।

রাস্তার দুপাশে গাছপালা। দূরে দূরে ছোট ছোট বাড়ির আলো।

অর্ণব নিজের ব্যাগটা স্নেহার কাছ থেকে নিয়ে নিল।

—এটা আমি নেব।

—কেন?

—আপনার ব্যাগ ভারী।

—আমি পারব।

—জানি। তবুও দিন।

স্নেহা আর কিছু বলল না।

কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ অর্ণব থেমে গেল।

স্নেহাও থামল।

—কী হয়েছে?

অর্ণব পেছনে তাকাল।

দূরে একটা আলো।

একটা গাড়ি ধীরে ধীরে তাদের দিকেই আসছে।

স্নেহার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—ওই গাড়িটা...

অর্ণব হাত তুলে তাকে চুপ করতে বলল।

গাড়িটা কাছে আসতেই দেখা গেল সেটা কালো গাড়ি।

অর্ণব দ্রুত স্নেহাকে রাস্তার পাশের একটা গাছের আড়ালে দাঁড় করাল।

গাড়িটা তাদের পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর গাড়িটা আবার থেমে গেল।

অর্ণবের বুক ধক করে উঠল।

গাড়ির দরজা খুলল।

একজন লোক নিচে নামল।

লোকটা চারপাশে তাকাচ্ছে।

অর্ণব খুব নিচু গলায় বলল,

—আপনি কি ওই লোকটাকে চেনেন?

স্নেহা মাথা নাড়ল।

—না।

লোকটা কিছুক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে আবার গাড়িতে উঠে চলে গেল।

দুজন কিছুক্ষণ নড়ল না।

গাড়ির শব্দ দূরে মিলিয়ে যাওয়ার পর স্নেহা ধীরে ধীরে বলল,

—আমার মনে হয় ওরা আমাকে খুঁজছে।

অর্ণব এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করল,

—কেন?

স্নেহা চুপ।

—স্নেহা, আপনি যদি কোনো সমস্যায় থাকেন, আমাকে বলতে পারেন।

স্নেহা চোখ নামিয়ে বলল,

—আমি একটা জিনিস নিয়ে যাচ্ছি।

—কী?

—একটা গুরুত্বপূর্ণ কাগজ।

অর্ণব অবাক।

—কাগজের জন্য কেউ আপনাকে অনুসরণ করছে?

—শুধু কাগজ নয়। ওই কাগজের মধ্যে এমন একটা তথ্য আছে, যেটা কয়েকজন মানুষ চায় না বাইরে আসুক।

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

—আপনি পুলিশে যাবেন না?

স্নেহা মাথা নাড়ল।

—আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু যাদের কাছে গিয়েছিলাম, তাদের মধ্যেই একজন আমাকে সতর্ক করে বলেছে, বিষয়টা নিয়ে আর এগোতে না।

অর্ণবের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

—তাহলে আপনি একা কেন?

—কারণ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না।

অর্ণব কিছু বলল না।

স্নেহা এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনিও চাইলে এখানেই আমাকে ছেড়ে যেতে পারেন।

অর্ণব কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর বলল,

—আপনি একটা জিনিস ভুলে যাচ্ছেন।

—কী?

—আমি আজকে আমার পরিবারের কাছে একশো নম্বর ভুল করেছি।

স্নেহা কিছু বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল।

অর্ণব হেসে বলল,

—তাই আজকে আরও একটা ভুল করলে আমার হিসাবের কী আসে যায়?

স্নেহা প্রথমবারের মতো একটু স্বস্তির হাসি দিল।

—আপনি সত্যিই পাগল।

—অনেকেই বলে।

দুজন আবার হাঁটতে শুরু করল।

কিছুদূর গিয়ে তারা একটা ছোট বাজার দেখতে পেল। কয়েকটা দোকান তখনও খোলা।

অর্ণব বলল,

—চলুন, আগে কোথাও বসি। তারপর ঠিক করব কীভাবে শিলিগুড়ি যাব।

তারা একটি চায়ের দোকানে ঢুকল।

দোকানদার তাদের দেখে বলল,

—এত রাতে কোথা থেকে?

অর্ণব বলল,

—স্টেশন থেকে এসেছি। শিলিগুড়ি যেতে হবে।

দোকানদার মাথা নেড়ে বলল,

—এই রাতে গাড়ি পাওয়া কঠিন।

স্নেহা হতাশ হলো।

ঠিক তখন পাশের টেবিলে বসে থাকা এক ব্যক্তি বলল,

—গাড়ি লাগলে আমি একটা ব্যবস্থা করতে পারি।

অর্ণব তার দিকে তাকাল।

লোকটা বলল,

—আমার পরিচিত একজন গাড়ি চালায়। একটু দূরে আছে। আপনাদের নিয়ে যেতে পারবে।

অর্ণব কিছু বলার আগেই স্নেহা তার হাতের কাছে আস্তে করে বলল,

—না।

অর্ণব বুঝল।

লোকটাকে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না।

সে হাসিমুখে বলল,

—ধন্যবাদ। আমরা একটু পরে সিদ্ধান্ত নেব।

লোকটা তাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর উঠে বাইরে চলে গেল।

স্নেহা নিচু গলায় বলল,

—ওই লোকটার আচরণ আমার ভালো লাগেনি।

অর্ণব বলল,

—আমারও না।

ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

অর্ণব দোকানের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল—

সেই কালো গাড়ি আবার এসে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছে।

অর্ণবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

স্নেহা তার পাশে এসে দাঁড়াল।

দুজনেই বুঝল, তাদের যাত্রা আর সাধারণ কোনো যাত্রা নেই।

চায়ের দোকানের জানালার বাইরে কালো গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল।

অর্ণব কিছুক্ষণ গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। গাড়ির ভেতর কাউকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তবে সামনের সিটে দুজন মানুষের ছায়া বোঝা যাচ্ছিল।

স্নেহা নিচু গলায় বলল,

—ওরা আমাদের দেখে ফেলেছে।

অর্ণব শান্ত থাকার চেষ্টা করল।

—নিশ্চিত?

—হ্যাঁ।

—তাহলে এখন এখান থেকে বের হতে হবে।

স্নেহা ব্যাগটা শক্ত করে ধরে বলল,

—কিন্তু যাব কোথায়?

অর্ণব দোকানের পেছনের দিকে তাকাল। সেখানে একটা সরু গলি দেখা যাচ্ছে।

—ওদিক দিয়ে বের হওয়া যাবে?

দোকানদার কথাটা শুনে কাছে এসে বলল,

—ওই গলি দিয়ে গেলে পেছনের রাস্তায় উঠতে পারবেন। তবে সাবধানে যাবেন।

অর্ণব মাথা নেড়ে বলল,

—ধন্যবাদ।

দুজন দ্রুত দোকানের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

গলিটা বেশ সরু। দুপাশে পুরোনো বাড়ি। কোথাও কোনো আলো নেই।

স্নেহা অর্ণবের পেছনে হাঁটছিল।

হঠাৎ পেছন থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

স্নেহা থেমে গেল।

—অর্ণব...

—চুপ।

দুজন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

পায়ের শব্দও থেমে গেল।

অর্ণব ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।

কেউ নেই।

—হয়তো ভুল শুনেছি, স্নেহা বলল।

অর্ণব বলল,

—হতে পারে।

তারা আবার হাঁটতে শুরু করল।

গলির শেষ মাথায় গিয়ে একটা পুরোনো বাড়ির সামনে পৌঁছাল। বাড়িটার পাশে একটা ছোট রাস্তা ছিল।

অর্ণব রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—এখান থেকে বের হলে মূল রাস্তায় উঠতে পারব।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল,

—দাঁড়ান!

দুজন ঘুরে তাকাল।

গলির মুখে সেই লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, যে চায়ের দোকানে গাড়ির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলেছিল।

স্নেহার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

লোকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।

—আপনারা এত তাড়াহুড়ো করে যাচ্ছেন কেন?

অর্ণব সামনে এসে দাঁড়াল।

—আমাদের যেতে হবে।

লোকটা ঠান্ডা গলায় বলল,

—মেয়েটার কাছে যে জিনিসটা আছে, সেটা দিয়ে দিন।

স্নেহা ব্যাগটা আরও শক্ত করে ধরল।

অর্ণব বলল,

—আপনি কীসের কথা বলছেন?

লোকটা হেসে বলল,

—আপনি জানেন না?

—না।

—তাহলে জানার দরকারও নেই। সরে দাঁড়ান।

অর্ণব তার সামনে থেকে সরল না।

—আপনি আগে বলুন, স্নেহার কাছ থেকে কী চান।

লোকটা বিরক্ত হয়ে বলল,

—আপনার এতে কোনো সম্পর্ক নেই।

অর্ণব মুচকি হেসে বলল,

—আজ থেকে আছে।

স্নেহা অবাক হয়ে অর্ণবের দিকে তাকাল।

লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—আপনি বুঝতে পারছেন না, আপনি কী বিপদে জড়াচ্ছেন।

অর্ণব শান্ত গলায় বলল,

—আমার জীবনে বিপদ নতুন কিছু না।

লোকটা এগিয়ে আসতেই অর্ণব স্নেহাকে ইশারা করল।

—দৌড়ান!

দুজন দৌড়ে গলির শেষ মাথার দিকে ছুটল।

পেছন থেকে লোকটার চিৎকার শোনা গেল,

—ওদের থামাও!

অর্ণব আর স্নেহা দৌড়াতে দৌড়াতে মূল রাস্তায় উঠে এল।

সামনে একটা ছোট পিকআপ ভ্যান দাঁড়িয়ে ছিল।

অর্ণব চালকের কাছে গিয়ে বলল,

—ভাই, একটু সামনে যাবেন? খুব জরুরি।

চালক অবাক হয়ে তাকাল।

—কোথায়?

—যতদূর পারেন।

চালক পরিস্থিতি বুঝতে না পারলেও তাদের দ্রুত উঠে বসতে বলল।

পিকআপ ভ্যান চলতে শুরু করল।

স্নেহা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—আপনি কেন আমাকে সাহায্য করছেন?

অর্ণব জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—জানি না।

—আপনি চাইলে আমাকে ছেড়ে যেতে পারতেন।

—পারতাম।

—তবু গেলেন না কেন?

অর্ণব একটু হেসে বলল,

—হয়তো আমার একশো নম্বর ভুলটা এত সহজে শেষ হতে চাইছে না।

স্নেহা মৃদু হেসে মাথা নিচু করল।

কিছুক্ষণ পর পিকআপ ভ্যানটা একটা বাজারের কাছে থামল।

চালক বলল,

—আমি আর সামনে যাব না। এখান থেকে আপনারা গাড়ি পাবেন।

অর্ণব ভাড়া দিতে গেল।

স্নেহা তখন ব্যাগ খুলে একটা কাগজ বের করল।

অর্ণব হঠাৎ দেখতে পেল কাগজটার এক কোণে একটা নাম লেখা—

“মাহমুদ চৌধুরী।”

অর্ণব থমকে গেল।

—এটা আমার বাবার নাম!

স্নেহার হাত কেঁপে উঠল।

—আপনার বাবা?

—হ্যাঁ। এটা এখানে কেন?

স্নেহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আমি জানতাম না উনার নাম এখানে আছে।

অর্ণব কাগজটা নিতে চাইলে স্নেহা থামিয়ে দিল।

—না। এখনো না।

—কিন্তু এটা আমার বাবার নাম!

—আমি জানি।

—আপনি জানেন এই কাগজে কী আছে?

স্নেহা এবার ধীরে ধীরে বলল,

—পুরোটা জানি না। তবে এটুকু জানি, এই তথ্য প্রকাশ হলে কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর সমস্যা হবে।

অর্ণবের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

—আমার বাবাও কি তাদের একজন?

স্নেহা উত্তর দিল না।

অর্ণব এবার নিজের বাবার কথা ভাবতে লাগল।

তার বাবা কঠোর মানুষ। কিন্তু কোনো বেআইনি কাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকতে পারে—এটা অর্ণব কখনো ভাবেনি।

স্নেহা বলল,

—আমি এই কাগজটা একজন সাংবাদিকের কাছে পৌঁছে দিতে যাচ্ছি। উনি সত্যিটা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।

—তারপর?

—তারপর উনি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান।

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার মাথায় তখন একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছে।

হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।

বাবা।

অর্ণব ফোন ধরল।

—হ্যালো।

ওপাশ থেকে মাহমুদ চৌধুরীর কণ্ঠ এল,

—তুমি এখন কোথায়?

অর্ণব বলল,

—শিলিগুড়ির পথে।

—কার সঙ্গে?

অর্ণব চুপ করে গেল।

বাবা আবার বললেন,

—অর্ণব, আমি সব জানি।

অর্ণবের বুক ধক করে উঠল।

—কী জানেন?

—তুমি যে মেয়েটার সঙ্গে আছ, তার নাম স্নেহা। ঠিক?

অর্ণব স্নেহার দিকে তাকাল।

স্নেহার মুখেও ভয় স্পষ্ট।

—বাবা, আপনি ওকে কীভাবে চেনেন?

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মাহমুদ চৌধুরী বললেন,

—ওর কাছ থেকে দূরে থাকো।

—কেন?

—কারণ ও যে জিনিসটা নিয়ে যাচ্ছে, সেটা তোমার ধারণার চেয়েও ভয়ংকর।

অর্ণব বলল,

—আপনি কি জানেন ওই কাগজে কী আছে?

বাবা এবার কঠিন গলায় বললেন,

—তুমি কোনো প্রশ্ন করবে না। শুধু মেয়েটাকে ছেড়ে দাও এবং যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি ফিরে এসো।

কল কেটে গেল।

অর্ণব ফোনটা নামিয়ে রাখল।

স্নেহা ধীরে বলল,

—আপনার বাবা আমাকে ছেড়ে দিতে বলেছেন?

অর্ণব উত্তর দিল না।

স্নেহা বলল,

—আমি বুঝতে পারছি। আপনিও আমাকে বিশ্বাস করছেন না।

অর্ণব এবার তার দিকে তাকাল।

—আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করব।

—করুন।

—আপনি কি আমার বাবাকে ফাঁসানোর জন্য এই কাগজ নিয়ে যাচ্ছেন?

স্নেহার চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।

—না।

—তাহলে?

—আমি শুধু সত্যিটা জানতে চাই।

অর্ণব চুপ করে রইল।

স্নেহা ব্যাগটা কাঁধে তুলে বলল,

—আপনি চাইলে এখানেই আমাকে ছেড়ে যেতে পারেন।

সে রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল।

অর্ণব কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকল।

তার সামনে ছিল বাবার নির্দেশ।

অন্যদিকে ছিল একজন অচেনা মেয়ের প্রতি তৈরি হওয়া বিশ্বাস।

শেষ পর্যন্ত অর্ণব গভীর শ্বাস নিয়ে স্নেহার পেছনে হাঁটা শুরু করল।

স্নেহা ফিরে তাকাল।

—আপনি আসছেন?

অর্ণব বলল,

—হ্যাঁ।

—কেন?

—কারণ আমি একটা জিনিস শিখেছি।

—কী?

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—কোনো সত্যি জানার আগে কাউকে দোষী ভাবা ঠিক না।

স্নেহা কিছু বলল না।

দুজন আবার পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

কিন্তু তারা জানত না, কিছু দূরেই তাদের জন্য আরেকটি গাড়ি অপেক্ষা করছে।

আর সেই গাড়িতে বসে থাকা মানুষটি ছিল এমন একজন—

যার সঙ্গে অর্ণবের পরিবারের বহু বছরের পুরোনো সম্পর্ক আছে।

রাত তখন অনেক গভীর।

অর্ণব আর স্নেহা রাস্তার পাশে পাশাপাশি হাঁটছিল। দুজনের কারও মুখে কথা নেই। কিছুক্ষণ আগের ঘটনাগুলো যেন দুজনের মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল।

অর্ণবের বাবা তাকে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন স্নেহার কাছ থেকে দূরে থাকতে। কিন্তু কেন?

স্নেহার কাছে থাকা কাগজে তার বাবার নামই বা কেন?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—স্নেহাকে কারা অনুসরণ করছে?

অর্ণব হাঁটতে হাঁটতে বলল,

—আপনি কি আমাকে সবকিছু খুলে বলবেন?

স্নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—সবকিছু আমি নিজেও জানি না।

—তাহলে যতটুকু জানেন, ততটুকু বলুন।

স্নেহা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,

—আমার বাবা একসময় একটা বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। কয়েক বছর আগে তিনি এমন কিছু হিসাব দেখতে পান, যেগুলো স্বাভাবিক ছিল না।

—কী ধরনের হিসাব?

—কোম্পানির অনেক টাকা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছিল। কাগজে অন্য হিসাব দেখানো হতো, কিন্তু আসল হিসাব ছিল আলাদা।

অর্ণব মন দিয়ে শুনছিল।

—আপনার বাবা তখন কী করেছিলেন?

—তিনি বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। এরপর থেকেই তার ওপর চাপ আসতে শুরু করে।

—তারপর?

স্নেহার কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল।

—এক রাতে বাবা আমাকে কিছু কাগজ দিয়ে বলেছিলেন, যদি তার কোনো সমস্যা হয়, যেন আমি এগুলো নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিই।

অর্ণব থেমে গেল।

—আপনার বাবা এখন কোথায়?

স্নেহা মাথা নিচু করল।

—তিন মাস ধরে নিখোঁজ।

অর্ণব আর কোনো প্রশ্ন করল না।

কিছুক্ষণ দুজন নীরবে হাঁটল।

তারপর অর্ণব বলল,

—আপনি কি মনে করেন আপনার বাবার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে এই কাগজের সম্পর্ক আছে?

—হ্যাঁ।

—আর আমার বাবার নাম?

স্নেহা এবার তার দিকে তাকাল।

—সেটাই আমি জানতে চাই।

অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—আমিও।

ঠিক তখনই সামনে একটা গাড়ির আলো দেখা গেল।

গাড়িটা ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছিল।

অর্ণব সতর্ক হয়ে গেল।

গাড়িটা তাদের সামনে এসে থামল।

দরজা খুলে একজন মধ্যবয়সী লোক নিচে নামলেন।

অর্ণব লোকটাকে দেখে থমকে গেল।

—আপনি?

লোকটি মৃদু হেসে বললেন,

—অনেক বছর পর দেখা হলো, অর্ণব।

লোকটির নাম রাশেদ করিম।

অর্ণব তাকে ছোটবেলা থেকেই চিনত। তিনি তার বাবার পুরোনো ব্যবসায়িক সহযোগী ছিলেন। ছোটবেলায় অর্ণব তাকে প্রায়ই তাদের বাড়িতে আসতে দেখেছে।

কিন্তু বহু বছর ধরে তার সঙ্গে আর দেখা হয়নি।

অর্ণব অবাক হয়ে বলল,

—আপনি এখানে কী করছেন?

রাশেদ বললেন,

—তোমাকে নিতে এসেছি।

—আমাকে?

—হ্যাঁ। তোমার বাবা আমাকে পাঠিয়েছেন।

অর্ণব স্নেহার দিকে তাকাল।

স্নেহার মুখে সন্দেহ স্পষ্ট।

রাশেদ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—আপনিই নিশ্চয় স্নেহা?

স্নেহা কোনো উত্তর দিল না।

রাশেদ শান্তভাবে বললেন,

—ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি শুধু তোমাদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যেতে চাই।

অর্ণব বলল,

—বাবা আপনাকে পাঠিয়েছেন?

—হ্যাঁ।

—তাহলে উনি আমাকে ফোন করে নিজে বলেননি কেন?

রাশেদ একটু হেসে বললেন,

—সব কথা ফোনে বলা যায় না।

অর্ণবের সন্দেহ আরও বাড়ল।

—আপনার গাড়িতে আমরা উঠব না।

রাশেদ ভ্রু কুঁচকে বললেন,

—কেন?

—কারণ আমি জানি না আপনাকে বিশ্বাস করা যায় কি না।

রাশেদ কিছুক্ষণ অর্ণবের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—তোমার বাবা ঠিকই বলতেন। তুমি বড় হয়ে খুব জেদি হয়েছ।

অর্ণব বলল,

—আর আপনি আগের মতোই রহস্যময়।

রাশেদ মৃদু হাসলেন।

—তোমার বাবা তোমাকে একটা কথা বলেনি?

—কোন কথা?

—আমাদের পুরোনো ব্যবসার ব্যাপারে?

অর্ণব চুপ করে গেল।

রাশেদ এবার স্নেহার দিকে তাকালেন।

—আপনার বাবাকে আমি চিনতাম।

স্নেহা অবাক হয়ে বলল,

—আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?

—হ্যাঁ।

—কীভাবে?

—তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেখানে আমি কয়েক বছর পরামর্শক হিসেবে ছিলাম।

স্নেহার চোখ বড় হয়ে গেল।

—তাহলে আপনি জানেন এই কাগজে কী আছে?

রাশেদ এবার আর হাসলেন না।

—কিছুটা জানি।

—আমার বাবা কোথায়?

রাশেদ চুপ করে রইলেন।

স্নেহা এগিয়ে এসে বলল,

—বলুন!

রাশেদ নিচু গলায় বললেন,

—আমি জানি না তিনি এখন কোথায়।

স্নেহার চোখে হতাশা ফুটে উঠল।

রাশেদ বললেন,

—তবে আমি জানি, তিনি কেন নিখোঁজ হয়েছিলেন।

অর্ণব দ্রুত বলল,

—কেন?

রাশেদ উত্তর দেওয়ার আগেই দূর থেকে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

রাশেদের মুখ বদলে গেল।

—এখানে আর থাকা যাবে না।

অর্ণব বলল,

—কী হয়েছে?

—ওরা এসে গেছে।

স্নেহা আতঙ্কিত হয়ে চারপাশে তাকাল।

রাশেদ দ্রুত গাড়ির দরজা খুলে বললেন,

—এখন আমার ওপর বিশ্বাস করা ছাড়া তোমাদের আর কোনো উপায় নেই।

অর্ণব কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করল।

তারপর স্নেহার দিকে তাকাল।

স্নেহা ধীরে মাথা নাড়ল।

দুজন গাড়িতে উঠে বসল।

রাশেদ গাড়ি দ্রুত চালিয়ে দিলেন।

কিছুক্ষণ পর পেছনে তাকিয়ে দেখা গেল, কালো গাড়িটা তাদের অনুসরণ করছে।

অর্ণব বলল,

—ওরা আবার এসেছে।

রাশেদ শান্তভাবে বললেন,

—ওরা অনেকক্ষণ ধরেই তোমাদের পেছনে আছে।

—আপনি জানতেন?

—হ্যাঁ।

—তাহলে আগে বলেননি কেন?

—কারণ তুমি তখনও আমাকে বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিলে না।

অর্ণব বিরক্ত হয়ে বলল,

—আপনি সবসময় এমন ধাঁধার মতো কথা বলেন?

রাশেদ হেসে বললেন,

—তোমার বাবা আর আমি একসঙ্গে অনেক বছর কাজ করেছি। কিছু বিষয় না বলাই নিরাপদ ছিল।

স্নেহা হঠাৎ বলল,

—আপনি কি জানেন আমার বাবা কোথায়?

রাশেদ এবার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—তোমার বাবা বেঁচে আছেন।

স্নেহা যেন কথা হারিয়ে ফেলল।

—কি?

—আমি নিশ্চিত নই তিনি কোথায় আছেন। কিন্তু তিনি মারা যাননি।

স্নেহার চোখে পানি চলে এল।

—আপনি এতদিন এটা জানতেন?

—পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম না। কয়েকদিন আগে একটা খবর পেয়েছি।

—কী খবর?

রাশেদ বললেন,

—তিনি এমন একজনের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন, যাকে তোমার পরিবার বহু বছর ধরে বিশ্বাস করে।

স্নেহা কাঁপা গলায় বলল,

—কে?

রাশেদ উত্তর দেওয়ার আগেই অর্ণব বলল,

—আমার বাবা?

রাশেদ চুপ করে গেলেন।

অর্ণবের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

—আপনি কিছু লুকাচ্ছেন।

রাশেদ বললেন,

—আমি তোমার বাবাকে দোষী বলছি না।

—তাহলে?

—তোমার বাবার নাম এই ঘটনায় এসেছে কারণ তিনি একটা বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

অর্ণব বলল,

—কী সিদ্ধান্ত?

রাশেদ গাড়ির গতি কমিয়ে দিলেন।

—কয়েক বছর আগে তোমার বাবা বুঝতে পেরেছিলেন, তার ব্যবসার ভেতরে কেউ গোপনে বড় ধরনের দুর্নীতি করছে। তিনি সেটা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন।

স্নেহা অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে তিনি আমার বাবার শত্রু নন?

—না।

অর্ণবের চোখে বিস্ময়।

—তাহলে বাবা আমাকে স্নেহার কাছ থেকে দূরে থাকতে বললেন কেন?

রাশেদ উত্তর দেওয়ার আগেই গাড়ির সামনে একটা ট্রাক এসে দাঁড়াল।

রাশেদ দ্রুত ব্রেক করলেন।

গাড়ি থেমে গেল।

পেছনের কালো গাড়িটাও এসে থামল।

রাশেদ ফিসফিস করে বললেন,

—এবার আমাদের গাড়ি থেকে নামতে হবে।

অর্ণব বলল,

—কেন?

রাশেদ বললেন,

—কারণ ওরা শুধু স্নেহার পেছনে নেই।

তিনি অর্ণবের দিকে তাকালেন।

—ওরা তোমার বাবার কাছেও পৌঁছাতে চায়।

অর্ণবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

স্নেহা তার হাতের ব্যাগটা আরও শক্ত করে ধরল।

ঠিক তখনই পেছনের কালো গাড়ির দরজা খুলে কয়েকজন লোক নেমে এল।

রাশেদ বললেন,

—দৌড়াও!

তিনজন গাড়ি থেকে নেমে অন্ধকার রাস্তার দিকে ছুটতে শুরু করল।

পেছন থেকে লোকগুলোর পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছিল।

কিছুদূর গিয়ে রাশেদ একটা পুরোনো গুদামের দরজা খুলে তাদের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন।

দরজা বন্ধ করে তিনি ফিসফিস করে বললেন,

—এখন কয়েক মিনিটের জন্য আমরা নিরাপদ।

অর্ণব হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—এবার সব সত্যি বলুন।

রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—ঠিক আছে।

তিনি স্নেহার দিকে তাকালেন।

—তোমার কাছে যে কাগজটা আছে, সেটা আসলে শুধু দুর্নীতির হিসাব নয়।

স্নেহা নিঃশ্বাস আটকে শুনছিল।

রাশেদ ধীরে বললেন,

—ওই কাগজে এমন একজনের নাম আছে, যাকে প্রকাশ্যে আনা হলে পুরো চক্রটা ভেঙে পড়বে।

অর্ণব বলল,

—কে সেই মানুষ?

রাশেদ উত্তর দেওয়ার আগেই গুদামের বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।

তারপর দরজায় ধাক্কা পড়ল।

একবার।

দুবার।

তৃতীয়বার আরও জোরে।

তিনজন একে অপরের দিকে তাকাল।

আর স্নেহা বুঝতে পারল—

তার বাবার নিখোঁজ হওয়ার রহস্যের সঙ্গে অর্ণবের পরিবার জড়িয়ে আছে।

গুদামের দরজায় আবার জোরে ধাক্কা পড়ল।

অর্ণব, স্নেহা আর রাশেদ তিনজনই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে কয়েকজন মানুষের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছিল।

—ভেতরে কেউ আছে। ভালো করে খুঁজে দেখো।

স্নেহা ভয়ে অর্ণবের দিকে তাকাল।

অর্ণব আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে বলল।

রাশেদ দ্রুত গুদামের ভেতরটা চোখ বুলিয়ে দেখলেন। পুরোনো বাক্স, কাঠের তাক আর কিছু ভাঙা আসবাব ছাড়া তেমন কিছু নেই।

তিনি ফিসফিস করে বললেন,

—আমার সঙ্গে আসো।

গুদামের পেছনে একটা ছোট দরজা ছিল। রাশেদ সেটা খুলে দেখালেন। দরজার ওপাশে সরু একটা পথ।

—এটা কোথায় যায়? অর্ণব জিজ্ঞেস করল।

—পুরোনো রেললাইনের পাশে।

—তারপর?

—সেখান থেকে একটা ছোট স্টেশন আছে। যদি ভাগ্য ভালো থাকে, রাতের একটা লোকাল ট্রেন পাব।

স্নেহা বলল,

—আর যদি না পাই?

রাশেদ মৃদু হেসে বললেন,

—তাহলে হাঁটতে হবে।

অর্ণব বলল,

—আজকে মনে হচ্ছে হাঁটাই আমার ভাগ্যে লেখা।

তিনজন নিঃশব্দে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

কিছুদূর যাওয়ার পর গুদামের ভেতর থেকে দরজা ভাঙার শব্দ শোনা গেল।

অর্ণব পেছনে তাকাল।

—ওরা ভেতরে ঢুকে গেছে।

রাশেদ বললেন,

—দৌড়াও।

তারা দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।

রাতের অন্ধকারে রেললাইনের পাশে হাঁটা সহজ ছিল না। স্নেহা কয়েকবার হোঁচট খেলেও কিছু বলল না।

অর্ণব খেয়াল করে তার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিল।

—এটা দিন।

স্নেহা বলল,

—আমি নিতে পারব।

—জানি।

—তাহলে?

—আপনি অনেকক্ষণ ধরে এটা ধরে আছেন। এবার আমি রাখি।

স্নেহা আর আপত্তি করল না।

কিছুক্ষণ পর তারা একটা ছোট স্টেশনে পৌঁছাল।

স্টেশন প্রায় ফাঁকা।

একজন বৃদ্ধ কর্মচারী বেঞ্চে বসে ছিলেন।

রাশেদ তাকে দেখে বললেন,

—চাচা, রাতের ট্রেনটা কি গেছে?

বৃদ্ধ বললেন,

—আর দশ মিনিটের মধ্যে আসবে।

অর্ণব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

তিনজন বেঞ্চে বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর স্নেহা বলল,

—রাশেদ সাহেব, এবার আমাকে সত্যিটা বলুন।

রাশেদ তার দিকে তাকালেন।

—কোন সত্যি?

—আমার বাবা।

রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

—তোমার বাবা অনেক বছর ধরে সৎভাবে কাজ করেছেন। তিনি এমন কিছু হিসাব খুঁজে পেয়েছিলেন, যেগুলো প্রকাশ পেলে কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী মানুষের ক্ষতি হতো।

—তারপর?

—তিনি তোমার বাবার কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন।

অর্ণব অবাক হয়ে বলল,

—আমার বাবা?

—হ্যাঁ।

—কিন্তু কেন?

—কারণ তোমার বাবা তখন সেই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বড় অংশীদার ছিলেন।

অর্ণব মাথা নিচু করল।

রাশেদ বললেন,

—তোমার বাবা প্রথমে বিষয়টা তদন্ত করতে শুরু করেন। কিন্তু খুব দ্রুত বুঝতে পারেন, ব্যাপারটা শুধু টাকা আত্মসাতের নয়। এর সঙ্গে আরও কয়েকটি কোম্পানি জড়িত।

স্নেহা মন দিয়ে শুনছিল।

—তাহলে আমার বাবাকে কেন নিখোঁজ হতে হলো?

রাশেদ বললেন,

—কারণ তিনি এমন একটা প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন, যেটা পুরো চক্রকে প্রকাশ করে দিতে পারত।

—ওই কাগজ?

—হ্যাঁ।

স্নেহা ব্যাগের দিকে তাকাল।

—এটা কি সেই প্রমাণ?

রাশেদ মাথা নাড়লেন।

—এটা তার একটা অংশ।

অর্ণব এবার বলল,

—আর বাকি অংশ?

রাশেদ উত্তর দিলেন না।

অর্ণব বলল,

—আমার বাবার কাছে?

রাশেদ এবার তার দিকে তাকালেন।

—সম্ভবত।

অর্ণবের ভেতরে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। এতক্ষণ যে বাবাকে সে শুধু কঠোর মানুষ হিসেবে দেখেছে, আজ প্রথমবার মনে হলো বাবার জীবনে এমন অনেক কিছু আছে যা সে কখনো জানেনি।

স্নেহা ধীরে বলল,

—আপনার বাবা যদি সত্যিই আমার বাবাকে সাহায্য করে থাকেন, তাহলে আমাকে তার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলছেন কেন?

রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—কারণ তোমার বাবা জানেন, এখন যারা তোমাদের পেছনে আছে, তারা খুব শক্তিশালী।

—তাই বলে আমাকে একা ছেড়ে দিতে হবে?

—তিনি তোমাকে বাঁচাতে চাইছেন।

অর্ণব চুপ করে রইল।

ঠিক তখন দূরে ট্রেনের আলো দেখা গেল।

বৃদ্ধ কর্মচারী উঠে দাঁড়ালেন।

—ট্রেন আসছে।

তিনজন প্ল্যাটফর্মের কাছে দাঁড়াল।

ট্রেন থামতেই তারা উঠে পড়ল।

ভেতরে যাত্রী খুব কম।

একটা ফাঁকা কামরায় বসে পড়ল সবাই।

ট্রেন চলতে শুরু করল।

অর্ণব জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

স্নেহা তার পাশে এসে বসল।

—আপনি চুপ কেন?

—ভাবছি।

—কী?

—আমার বাবা সম্পর্কে।

স্নেহা কিছু বলল না।

অর্ণব বলল,

—আমি সবসময় ভাবতাম বাবা শুধু আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান। কিন্তু হয়তো উনি অন্য কিছু লুকিয়ে আমাকে নিরাপদ রাখতে চেয়েছেন।

স্নেহা মৃদু গলায় বলল,

—সব বাবা-মা সব কথা সন্তানকে বলতে পারেন না।

অর্ণব তার দিকে তাকাল।

—আপনি আপনার বাবাকে খুব মিস করেন?

স্নেহা জানালার দিকে তাকাল।

—প্রতিদিন।

অর্ণব আর কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর ট্রেন হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল।

সবাই অবাক হয়ে উঠল।

রাশেদ জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন।

—কী হয়েছে?

একজন যাত্রী বলল,

—সামনে সিগন্যাল সমস্যা।

অর্ণব উঠে দাঁড়াল।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল।

অচেনা নম্বর।

“স্নেহাকে সঙ্গে নিয়ে আর এগোবেন না। শেষবারের মতো সতর্ক করছি।”

অর্ণব মেসেজটা স্নেহাকে দেখাল।

স্নেহা মুখ ফ্যাকাশে করে বলল,

—ওরা আমাদের ট্রেনেও পৌঁছে গেছে?

রাশেদ বললেন,

—সম্ভব।

অর্ণব বলল,

—এবার কী করব?

রাশেদ বললেন,

—আমাদের ট্রেন থেকে নামতে হবে।

—কিন্তু ট্রেন তো মাঝপথে দাঁড়িয়ে!

—সেটাই ভালো।

তারা দ্রুত ব্যাগ নিয়ে দরজার কাছে গেল।

রাশেদ আগে নামলেন। তারপর স্নেহা। অর্ণব নামার সময় হঠাৎ পিছনে তাকাল।

কামরার শেষ মাথায় একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল।

কালো পোশাক।

মুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু লোকটি তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।

অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে নেমে গেল।

তিনজন রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল।

কিছুদূর যাওয়ার পর রাশেদ বললেন,

—আমাদের এখন আলাদা হতে হবে।

স্নেহা অবাক হয়ে বলল,

—কেন?

—কারণ ওরা যদি আমাকে অনুসরণ করে, তোমাদেরও খুঁজে পাবে।

অর্ণব বলল,

—না। আমরা একসঙ্গে যাব।

রাশেদ মাথা নাড়লেন।

—অর্ণব, তোমাকে একটা কথা বলতে হবে।

—কী?

রাশেদ পকেট থেকে একটা ছোট খাম বের করলেন।

—এটা তোমার বাবার কাছ থেকে।

অর্ণব খামটা নিয়ে অবাক হয়ে তাকাল।

—আমার জন্য?

—হ্যাঁ।

অর্ণব খাম খুলে একটা ছোট কাগজ বের করল।

বাবার হাতের লেখা।

“অর্ণব, যদি কখনো স্নেহার সঙ্গে তোমার দেখা হয়, তাকে একা ছেড়ে যেও না। ওর কাছে এমন একটা সত্যি আছে, যা আমাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।”

অর্ণব কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।

স্নেহা কাগজটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনার বাবা আমাকে রক্ষা করতে বলেছেন?

অর্ণব ধীরে মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

তারপর সে রাশেদের দিকে তাকাল।

—আপনি এতদিন এটা লুকিয়ে রেখেছিলেন কেন?

রাশেদ বললেন,

—কারণ সময়ের আগে এই চিঠি তোমার হাতে গেলে তুমি হয়তো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে।

অর্ণব কাগজটা মুঠোয় চেপে ধরল।

ঠিক তখনই দূরে গাড়ির আলো দেখা গেল।

রাশেদ দ্রুত বললেন,

—ওরা এসে গেছে।

স্নেহা ভয় পেয়ে বলল,

—আমরা কোথায় যাব?

রাশেদ সামনে একটা পুরোনো রাস্তার দিকে দেখালেন।

—ওই রাস্তা ধরে গেলে একটা গ্রাম আছে। সেখানে একজন মানুষ আছেন, যিনি তোমার বাবার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু।

অর্ণব বলল,

—তার নাম?

রাশেদ উত্তর দিলেন,

—হাবিব চাচা।

—উনি কি জানেন আমার বাবার ব্যাপারে?

—হ্যাঁ।

রাশেদ স্নেহার দিকে তাকালেন।

—আর উনিই হয়তো বলতে পারবেন, তোমার বাবা এখন কোথায়।

স্নেহার চোখে আশার আলো ফুটে উঠল।

—তাহলে চলুন।

তিনজন অন্ধকার রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল।

কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর রাশেদ হঠাৎ থেমে গেলেন।

—এক মিনিট।

অর্ণব তাকাল।

—কী হয়েছে?

রাশেদ নিচু হয়ে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটা কাগজ তুলে নিলেন।

কাগজের ওপর একটা ঠিকানা লেখা।

তিনি কাগজটা দেখে চমকে উঠলেন।

—এটা তো...

অর্ণব জিজ্ঞেস করল,

—কী?

রাশেদ ধীরে বললেন,

—এটা হাবিব চাচার ঠিকানা নয়।

স্নেহা অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে?

রাশেদ কাগজটা উল্টে দেখলেন।

পেছনে মাত্র একটি বাক্য লেখা—

“তোমরা যতই পালাও, শেষ পর্যন্ত তোমাদের আমার কাছেই আসতে হবে।”

তিনজনই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

কারণ তারা বুঝতে পারল—

তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আগে থেকেই কেউ জানে।

রাতের অন্ধকারে তিনজনই কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

রাশেদের হাতে ধরা কাগজটার দিকে অর্ণব তাকিয়ে আছে। কয়েকটি শব্দই যেন পুরো পরিস্থিতিটাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

“তোমরা যতই পালাও, শেষ পর্যন্ত তোমাদের আমার কাছেই আসতে হবে।”

স্নেহা ধীরে বলল,

—আমরা কি তাহলে ভুল পথে যাচ্ছি?

রাশেদ মাথা নাড়লেন।

—না। কিন্তু এখন থেকে আমাদের খুব সাবধানে চলতে হবে।

অর্ণব বলল,

—আপনি কি মনে করেন হাবিব চাচাও বিপদে আছেন?

—সম্ভব।

—তাহলে আমাদের ওনার কাছে যাওয়া উচিত?

রাশেদ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। তোমার বাবার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জানেন উনিই।

স্নেহা ব্যাগটা বুকের কাছে ধরে বলল,

—তাহলে চলুন।

তিনজন আবার হাঁটা শুরু করল।

প্রায় আধঘণ্টা পর তারা একটা ছোট গ্রামের কাছে পৌঁছাল। চারপাশে ঘন গাছপালা, দু-একটা বাড়িতে মৃদু আলো জ্বলছে। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে।

রাশেদ একটা সরু মাটির রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেন।

শেষে একটা পুরোনো টিনের বাড়ির সামনে এসে থামলেন।

দরজার পাশে ছোট একটা বাতি জ্বলছিল।

রাশেদ দরজায় তিনবার কড়া নাড়লেন।

ভেতর থেকে বৃদ্ধ কণ্ঠ ভেসে এল,

—কে?

রাশেদ বললেন,

—আমি রাশেদ।

কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে গেল।

সাদা পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধ সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

তার চেহারায় বয়সের ছাপ থাকলেও চোখ দুটো খুব তীক্ষ্ণ।

তিনি রাশেদকে দেখে বললেন,

—এত রাতে?

তারপর অর্ণবকে দেখে থমকে গেলেন।

—এটা কি অর্ণব?

অর্ণব অবাক হয়ে বলল,

—আপনি আমাকে চেনেন?

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

—তোমাকে শেষ দেখেছিলাম যখন তুমি স্কুলে পড়তে। তখন তোমার চুল এত বড় ছিল যে তোমার বাবা বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, “এই ছেলেকে একদিন মানুষ করতে হবে।”

অর্ণব হেসে ফেলল।

—তাহলে আপনি হাবিব চাচা?

—হ্যাঁ।

স্নেহার দিকে তাকিয়ে হাবিব চাচার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

তিনি ধীরে বললেন,

—তুমি স্নেহা?

স্নেহা মাথা নাড়ল।

হাবিব চাচা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

—তোমার বাবার চোখের মতো চোখ।

স্নেহার বুকটা কেঁপে উঠল।

—আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?

—শুধু চিনতাম না। বহু বছর একসঙ্গে কাজ করেছি।

স্নেহা দ্রুত বলল,

—উনি কোথায়?

হাবিব চাচা দরজা বন্ধ করে দিলেন।

—ভেতরে আসো।

তারা ঘরে ঢুকে বসল।

ঘরটা খুব সাধারণ। একটা পুরোনো কাঠের আলমারি, কয়েকটা চেয়ার আর দেয়ালে কিছু পুরোনো ছবি।

অর্ণব দেয়ালের একটা ছবির সামনে গিয়ে থামল।

ছবিতে তার বাবা, রাশেদ, হাবিব চাচা এবং আরও কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।

—এটা কবে তোলা?

হাবিব চাচা বললেন,

—প্রায় আট বছর আগে।

অর্ণব ছবিটা ভালো করে দেখল।

—এই লোকটা কে?

ছবির একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে সে আগে কখনো দেখেনি।

হাবিব চাচার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

—ওর নাম সাইফুল রহমান।

স্নেহা চমকে উঠল।

—সাইফুল রহমান?

—হ্যাঁ।

—আমার বাবা কি ওনাকে চিনতেন?

—খুব ভালোভাবে।

হাবিব চাচা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—সাইফুলই ছিল পুরো হিসাবের মূল ব্যক্তি।

অর্ণব অবাক।

—মানে?

—যে টাকা গায়েব হচ্ছিল, যে নকল কাগজ তৈরি হচ্ছিল, যে তথ্য গোপন করা হচ্ছিল—সবকিছুর পেছনে সাইফুলের হাত ছিল।

স্নেহা বলল,

—তাহলে আমার বাবা তাকে ধরে ফেলেছিলেন?

—হ্যাঁ।

—আর আমার বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর?

হাবিব চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—সাইফুলও কয়েকদিনের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়।

অর্ণব বলল,

—এখন কোথায়?

হাবিব চাচা উত্তর দিলেন,

—আমি জানি না।

রাশেদ এতক্ষণ চুপ ছিলেন।

তিনি বললেন,

—তুমি কি নিশ্চিত সাইফুলের সঙ্গে মাহমুদের কোনো সম্পর্ক নেই?

হাবিব চাচা রাশেদের দিকে তাকালেন।

—মাহমুদ তাকে একসময় বিশ্বাস করত।

অর্ণবের বুক ধক করে উঠল।

—বাবা তাকে বিশ্বাস করতেন?

—হ্যাঁ। কারণ সাইফুল বহু বছর ধরে তোমার বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছে।

অর্ণব চুপ হয়ে গেল।

তার বাবার নাম বারবার এই ঘটনায় আসছে।

কিন্তু কেন?

স্নেহা ধীরে বলল,

—আমার বাবার কাছে থাকা কাগজে মাহমুদ চৌধুরীর নাম কেন ছিল?

হাবিব চাচা বললেন,

—কারণ তোমার বাবা শেষ মুহূর্তে বুঝেছিলেন, পুরো চক্রটা ভাঙতে হলে মাহমুদের সাহায্য দরকার।

অর্ণব অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে বাবা সাহায্য করেছিলেন?

—হ্যাঁ।

—কিন্তু আমাকে স্নেহার কাছ থেকে দূরে থাকতে বললেন কেন?

হাবিব চাচা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—কারণ তিনি ভয় পেয়েছিলেন।

—কিসের?

—তোমাকে হারানোর।

ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।

হাবিব চাচা ধীরে ধীরে বললেন,

—মাহমুদ জানত, যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত তারা প্রয়োজনে যেকোনো সীমা পার হতে পারে। তাই সে তোমাকে সবকিছু থেকে দূরে রাখতে চেয়েছে।

অর্ণব মাথা নিচু করল।

হঠাৎ তার মনে হলো, এতদিন সে বাবাকে ভুল বুঝেছে।

কঠোর নিয়ম, শাসন, তার প্রতিটি ভুলের হিসাব—সবকিছুর পেছনে হয়তো ছিল ভয়।

স্নেহা বলল,

—তাহলে আমার বাবাকে কোথায় খুঁজব?

হাবিব চাচা এবার উঠে গিয়ে আলমারি খুললেন।

ভেতর থেকে একটা পুরোনো খাম বের করলেন।

—তোমার বাবা এটা আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন।

স্নেহার হাত কাঁপতে লাগল।

—আমার বাবার?

—হ্যাঁ।

সে খামটা খুলল।

ভেতরে একটা ছোট চিঠি।

স্নেহা চিঠিটা পড়তে শুরু করল।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“স্নেহা, যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছায়, তাহলে বুঝবে আমি তোমার কাছে নেই। কিন্তু তুমি ভয় পেয়ো না। সত্যিটা খুঁজে বের করো। আর মাহমুদ চৌধুরীকে বিশ্বাস করো। সে তোমার শত্রু নয়।”

স্নেহার চোখ ভিজে উঠল।

অর্ণব চুপচাপ তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল—

“সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা আসবে এমন একজনের কাছ থেকে, যাকে তুমি নিজের মানুষ বলে বিশ্বাস করো।”

স্নেহা চিঠি নামিয়ে বলল,

—এটার মানে কী?

হাবিব চাচা বললেন,

—আমি জানি না।

রাশেদ হঠাৎ বললেন,

—আমি জানি।

সবাই তার দিকে তাকাল।

রাশেদ ধীরে বললেন,

—তোমার বাবা যেদিন নিখোঁজ হন, সেদিন রাতে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

স্নেহা বিস্মিত।

—আপনি এতদিন বলেননি কেন?

—কারণ আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সময় না আসা পর্যন্ত কাউকে বলব না।

—সেদিন কী হয়েছিল?

রাশেদ বললেন,

—তোমার বাবা বলেছিলেন, তিনি একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। এমন একজন, যাকে তিনি নিজের ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করেন।

অর্ণব বলল,

—কে?

রাশেদ চুপ করে রইলেন।

হাবিব চাচা এবার বললেন,

—সাইফুল?

রাশেদ মাথা নাড়লেন।

—না।

অর্ণবের বুক কেঁপে উঠল।

—তাহলে কে?

রাশেদ ধীরে বললেন,

—আরমান।

অর্ণব স্তব্ধ হয়ে গেল।

—আমার ভাই?

রাশেদ বললেন,

—হ্যাঁ।

অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করল।

আরমানকে কল দিল।

ফোন বন্ধ।

আবার দিল।

বন্ধ।

তারপর হঠাৎ অর্ণবের ফোনে একটা মেসেজ এল।

অচেনা নম্বর।

“তোমার ভাইকে খুঁজছ? তাহলে স্নেহাকে নিয়ে পুরোনো চৌধুরী কারখানায় এসো। একা।”

অর্ণব মেসেজটা পড়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

স্নেহা বলল,

—কী হয়েছে?

অর্ণব ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।

স্নেহা মেসেজটা পড়ে বলল,

—এটা ফাঁদ হতে পারে।

হাবিব চাচা বললেন,

—অবশ্যই ফাঁদ।

অর্ণব বলল,

—কিন্তু আরমান যদি সত্যিই বিপদে থাকে?

রাশেদ বললেন,

—তাহলে আমাদের পরিকল্পনা করে যেতে হবে।

অর্ণবের চোখে দৃঢ়তা ফুটে উঠল।

—আমি যাব।

স্নেহা বলল,

—আমি একা আপনাকে যেতে দেব না।

অর্ণব তার দিকে তাকাল।

—আপনি জানেন সেখানে বিপদ থাকতে পারে।

—জানি।

—তবু?

স্নেহা মাথা নাড়ল।

—আমার বাবার সত্যি খুঁজতে হলে আমাকেও যেতে হবে।

হাবিব চাচা বললেন,

—তাহলে ভোর হওয়ার আগেই বের হতে হবে।

অর্ণব জানালার বাইরে তাকাল।

আকাশের পূর্ব দিকে সামান্য আলো ফুটতে শুরু করেছে।

এক রাতের যাত্রা ধীরে ধীরে ভোরের দিকে এগোচ্ছে।

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটেনি।

হাবিব চাচার বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে অর্ণব বারবার ফোনে ভাই আরমানের নম্বরে কল করছিল। কিন্তু প্রতিবারই একই উত্তর—ফোন বন্ধ।

অর্ণবের চোখেমুখে উদ্বেগ স্পষ্ট।

স্নেহা ধীরে এসে বলল,

—আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা ওনাকে খুঁজে বের করব।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—আমি ছোটবেলা থেকে ভাইয়ার ওপর অনেক রাগ করেছি। কিন্তু কখনো ভাবিনি একদিন ওনাকে নিয়ে এত ভয় পাব।

রাশেদ গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে বললেন,

—সময় নষ্ট করলে চলবে না। চৌধুরী কারখানায় পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে না।

হাবিব চাচা অর্ণবের হাতে একটা ছোট টর্চ আর পুরোনো একটা কাগজ দিলেন।

—এই রাস্তা ধরে গেলে কারখানার পেছনের গেট পাওয়া যাবে।

অর্ণব কাগজটা নিয়ে বলল,

—আপনি আমাদের সঙ্গে যাবেন না?

হাবিব চাচা মাথা নাড়লেন।

—আমার বয়স হয়েছে। তোমাদের সঙ্গে গেলে বরং সমস্যা বাড়বে। তবে একটা কথা মনে রেখো—সামনে যাকে দেখবে, তার কথা সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করবে না।

অর্ণব স্নেহার দিকে তাকাল।

—চলুন।

তিনজন গাড়িতে উঠে রওনা হলো।

রাস্তা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছিল। শহরের আলো পেছনে পড়ে রইল। সামনে শুধু সরু রাস্তা আর কুয়াশায় ঢাকা গাছপালা।

কিছুক্ষণ পর স্নেহা বলল,

—আপনার ভাই সত্যিই কি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত হতে পারেন?

অর্ণব মাথা নাড়ল।

—আমি বিশ্বাস করি না।

রাশেদ গাড়ি চালাতে চালাতে বললেন,

—বিশ্বাস আর সত্যি সবসময় এক জিনিস নয়।

অর্ণব বিরক্ত হয়ে বলল,

—আপনিও কি মনে করেন ভাইয়া দোষী?

—আমি কিছুই বলছি না। শুধু বলছি, সবকিছু চোখে দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।

অর্ণব চুপ করে গেল।

প্রায় এক ঘণ্টা পর তারা পুরোনো চৌধুরী কারখানার সামনে এসে পৌঁছাল।

কারখানাটা বহু বছর ধরে বন্ধ। বিশাল লোহার গেট মরচে পড়ে বাদামি হয়ে গেছে। ভেতরে আগাছা আর পুরোনো ভবন।

স্নেহা গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকাল।

—এখানে কেউ থাকে?

রাশেদ বললেন,

—অনেক বছর ধরে না।

অর্ণব ফোনটা বের করল।

অচেনা নম্বরে কল দিল।

একবার।

দুবার।

তৃতীয়বার কল ধরল।

ওপাশ থেকে ভারী কণ্ঠ—

—এসেছ?

অর্ণব বলল,

—আমার ভাই কোথায়?

—ভেতরে।

—তাকে আগে বাইরে পাঠাও।

—তুমি একা আসার কথা ছিল।

অর্ণব স্নেহা আর রাশেদের দিকে তাকাল।

—আমি একা আসিনি।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর লোকটা বলল,

—তাহলে তোমার ভাইকে আর জীবিত দেখতে নাও পারো।

কল কেটে গেল।

স্নেহার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

অর্ণব গেটের দিকে এগিয়ে গেল।

রাশেদ তাকে থামিয়ে বললেন,

—শান্ত থাকো। ওরা চায় তুমি উত্তেজিত হয়ে ভুল করো।

অর্ণব গভীর শ্বাস নিল।

—চলুন।

তারা পেছনের ছোট গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

কারখানার ভেতর অন্ধকার। কোথাও পুরোনো মেশিন, কোথাও ভাঙা কাঠের বাক্স।

হঠাৎ দূর থেকে একটা শব্দ এল।

অর্ণব থেমে গেল।

—কেউ আছে।

তিনজন ধীরে ধীরে শব্দের দিকে এগোল।

একটা বড় ঘরের দরজা আধখোলা।

অর্ণব দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই থমকে গেল।

একটা চেয়ারে বসে আছে আরমান।

হাত বাঁধা, কিন্তু সে সচেতন।

—ভাইয়া!

অর্ণব ছুটে গেল।

আরমান মাথা তুলে বলল,

—অর্ণব! তুমি এখানে কেন এসেছ?

অর্ণব তার বাঁধন খুলতে লাগল।

—আপনাকে মেসেজ করে ডেকেছে ওরা।

আরমান বলল,

—তুমি এখানে আসবে, সেটা ওরা জানত।

স্নেহা বলল,

—কারা?

আরমান উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

বাইরে থেকে তালা লাগানোর শব্দ।

রাশেদ দ্রুত দরজার দিকে গেলেন।

—আমরা ফাঁদে পড়েছি।

ঘরের অন্য পাশে একটা পুরোনো মেশিনের ওপর আলো জ্বলে উঠল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে অর্ণবের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

সাইফুল রহমান।

ছবিতে দেখা সেই মানুষ।

অর্ণব বলল,

—আপনি!

সাইফুল মৃদু হেসে বলল,

—অবশেষে দেখা হলো।

স্নেহা এগিয়ে এসে বলল,

—আমার বাবা কোথায়?

সাইফুল তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোমার বাবা বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন। কিন্তু খুব বেশি সত্যি জানতে চেয়েছিলেন।

—উনি কোথায়?

—জীবিত।

স্নেহার চোখে আশার আলো ফুটে উঠল।

—কোথায়?

—সেটা জানার আগে তোমার কাছে থাকা কাগজটা আমাকে দিতে হবে।

স্নেহা ব্যাগটা শক্ত করে ধরে বলল,

—না।

সাইফুল শান্ত গলায় বলল,

—তুমি বুঝতে পারছ না, ওই কাগজ তোমার বাবার জীবনকেও বিপদে ফেলতে পারে।

অর্ণব বলল,

—মিথ্যা বলছেন।

সাইফুল তার দিকে তাকাল।

—তোমার বাবা কি তোমাকে কখনো সব সত্যি বলেছেন?

অর্ণব চুপ হয়ে গেল।

সাইফুল ধীরে বলল,

—তোমার বাবা আমাকে বিশ্বাস করতেন।

রাশেদ বললেন,

—একসময় করতেন।

সাইফুল হেসে উঠল।

—তুমি তো সব জানো, রাশেদ। তাহলে বলো, কেন মাহমুদ এত বছর চুপ করে ছিল?

রাশেদ কোনো উত্তর দিলেন না।

অর্ণব এবার বলল,

—আপনি আমার বাবার নাম ব্যবহার করে নিজের অপরাধ লুকিয়েছেন।

সাইফুলের হাসি মিলিয়ে গেল।

—তোমার বাবা অপরাধী নন।

অর্ণব অবাক।

—তাহলে?

সাইফুল বলল,

—তোমার বাবা আমাকে থামাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, তার নিজের কাছের একজন মানুষ তাকে কতটা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

অর্ণবের চোখ সরু হয়ে গেল।

—কে?

সাইফুল বলল,

—তোমার পরিবারে এমন একজন আছে, যে তোমার বাবার সব পরিকল্পনা আমাকে জানাত।

আরমান হঠাৎ মাথা নিচু করল।

অর্ণব তার দিকে তাকাল।

—ভাইয়া?

আরমান চোখ তুলে বলল,

—না, অর্ণব।

সাইফুল হেসে বলল,

—তোমার ভাই তোমাকে অনেক কিছু বলতে চেয়েছে। কিন্তু সময় পায়নি।

অর্ণব বলল,

—তাহলে কে?

সাইফুল উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে কারও কণ্ঠ ভেসে এল।

—আমি বলছি।

দরজা খুলে গেল।

ঘরে ঢুকলেন মাহমুদ চৌধুরী।

অর্ণব অবাক হয়ে গেল।

—বাবা!

স্নেহাও স্তব্ধ।

মাহমুদ ধীরে ধীরে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন।

তার মুখে আগের সেই কঠোরতা নেই। বরং ক্লান্তি।

অর্ণব বলল,

—আপনি এখানে?

মাহমুদ সাইফুলের দিকে তাকালেন।

—এত বছর পরও তুমি একই রকম আছ।

সাইফুল হেসে বলল,

—আর তুমি আগের মতোই সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাও।

মাহমুদ বললেন,

—স্নেহাকে ছেড়ে দাও।

সাইফুল মাথা নাড়ল।

—অসম্ভব।

—তাহলে আমাকে নাও।

ঘরের সবাই চুপ।

সাইফুল বলল,

—তুমি জানো আমি কী চাই।

মাহমুদ বললেন,

—হ্যাঁ।

—তাহলে কাগজটা কোথায়?

মাহমুদ কিছু বললেন না।

অর্ণব বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

—বাবা, আপনি কি এতদিন ধরে সবকিছু জানতেন?

মাহমুদ ছেলের দিকে তাকালেন।

—হ্যাঁ।

—আমাকে কিছু বলেননি কেন?

—কারণ তোমাকে এই জটিলতার মধ্যে টানতে চাইনি।

অর্ণবের চোখে অভিমান ফুটে উঠল।

—কিন্তু আমি তো নিজেই চলে এসেছি।

মাহমুদ ধীরে বললেন,

—আমি জানতাম তুমি একদিন নিজের মতো করে সত্যিটা খুঁজবে।

স্নেহা কাঁপা গলায় বলল,

—আমার বাবা?

মাহমুদ তার দিকে তাকালেন।

—তোমার বাবা আমাকে শেষবার একটা কথা বলেছিলেন।

—কী?

—“স্নেহাকে যেন কখনো একা না হতে দিই।”

স্নেহার চোখ ভিজে উঠল।

—উনি কোথায়?

মাহমুদ উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ হলো।

কারখানার পেছনের দরজা ভেঙে কয়েকজন মানুষ ভেতরে ঢুকে পড়ল।

সাইফুল চমকে উঠল।

রাশেদ বললেন,

—ওরা কারা?

মাহমুদ গম্ভীর হয়ে বললেন,

—যাদের আমি এতদিন ধরে খুঁজছি।

অর্ণব বুঝতে পারল, পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে গেছে।

হঠাৎ সাইফুল স্নেহার ব্যাগের দিকে এগিয়ে গেল।

অর্ণব তার পথ আটকাল।

—ওর কাছ থেকে দূরে থাকুন।

সাইফুল থেমে গেল।

ঠিক তখন মাহমুদ চিৎকার করে বললেন,

—অর্ণব, স্নেহাকে নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বের হও!

অর্ণব বলল,

—কিন্তু আপনি?

—আমার কথা ভাববে না!

স্নেহা বলল,

—না, আমরা সবাই একসঙ্গে যাব।

মাহমুদ কঠিন গলায় বললেন,

—এখন আমার কথা শোনো!

অর্ণব স্নেহার হাত ধরে পেছনের দরজার দিকে দৌড়াল।

আরমানও তাদের সঙ্গে বেরিয়ে এল।

রাশেদ পেছনে রইলেন।

বের হওয়ার আগে অর্ণব একবার বাবার দিকে তাকাল।

মাহমুদ শুধু বললেন,

—স্নেহাকে নিরাপদে রেখো। আর মনে রেখো, আসল বিশ্বাসঘাতক এখনো ধরা পড়েনি।

অর্ণব আর দাঁড়াল না।

তারা দৌড়ে বাইরে চলে গেল।

কারখানার পেছনের রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে স্নেহা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—আপনার বাবা এত কিছু জানেন, তবু সত্যিটা পুরো বলছেন না কেন?

অর্ণব বলল,

—আমি জানি না।

আরমান এতক্ষণ চুপ ছিল।

হঠাৎ সে বলল,

—আমি জানি।

অর্ণব থেমে গেল।

—কী জানো?

আরমান ধীরে বলল,

—যে মানুষটা আমাদের বাবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সে সাইফুল নয়।

অর্ণব অবাক হয়ে তাকাল।

—তাহলে কে?

আরমান চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

—আমাদের পরিবারের সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ।

স্নেহা আর অর্ণব একে অপরের দিকে তাকাল।

আরমানের মুখে ভয়।

—আর সে এখনো আমাদের সবার খুব কাছে আছে।

দূরে তখন সূর্যের আলো ফুটতে শুরু করেছে।

কিন্তু রাতের রহস্যের শেষ হয়নি।

ভোরের আলো ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু অর্ণব, স্নেহা আর আরমানের মনে যেন রাত আরও ঘন হয়ে উঠেছে।

আরমানের শেষ কথাটা অর্ণবের মাথায় ঘুরছিল—

“আমাদের পরিবারের সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ।”

তিনজনই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। কিছু দূরে রাশেদের গাড়ি দেখা যাচ্ছিল। মাহমুদ কোথায়, সাইফুল কোথায়—কেউ জানে না।

অর্ণব অধৈর্য হয়ে বলল,

—ভাইয়া, তুমি আসলে কী জানো?

আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—সবটা আমি জানি না। তবে বাবা গত কয়েক মাস ধরে একজনকে নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন।

—কে?

—বাড়ির ভেতরের একজন।

স্নেহা বলল,

—তাহলে সরাসরি নাম বলছেন না কেন?

আরমান নিচু গলায় বলল,

—কারণ আমি নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নই।

অর্ণব বিরক্ত হয়ে বলল,

—আমরা এতক্ষণ ধরে পালাচ্ছি, এত বিপদের মধ্যে পড়েছি, আর তুমি এখন বলছ তুমি নিশ্চিত নও?

আরমান বলল,

—আমি তোমাকে বাঁচাতেই এতদিন কিছু বলিনি।

অর্ণব থেমে গেল।

—আমাকে?

—হ্যাঁ। কারণ বাবা জানতেন, তুমি সত্যিটা জানতে পারলে নিজেকে সামলাতে পারবে না।

স্নেহা শান্ত গলায় বলল,

—আপনারা কি চৌধুরী বাড়িতে ফিরে যেতে পারবেন?

আরমান মাথা নাড়ল।

—বাড়িতে এখন যাওয়া নিরাপদ নয়।

অর্ণব বলল,

—তাহলে কোথায় যাব?

আরমান বলল,

—একটা জায়গা আছে। বাবার পুরোনো অফিস।

তারা দ্রুত গাড়িতে উঠল।

রাশেদের গাড়ি তখনও কারখানার কাছে ছিল না। তাই আরমান নিজেই গাড়ি চালাতে শুরু করল।

কিছুদূর যাওয়ার পর অর্ণব বলল,

—ভাইয়া, একটা কথা বলো।

—কী?

—তুমি কি সত্যিই বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে ওই রাতে?

আরমানের হাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে গেল।

—হ্যাঁ।

—কেন?

—বাবা আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

—কী দায়িত্ব?

আরমান চুপ করে রইল।

অর্ণব আবার বলল,

—ভাইয়া!

আরমান ধীরে বলল,

—স্নেহার বাবাকে খুঁজে বের করা।

স্নেহা বিস্ময়ে তাকাল।

—আপনি?

—হ্যাঁ। তোমার বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর আমি গোপনে তাকে খুঁজছিলাম।

—কিন্তু আমাকে কিছু বলেননি কেন?

—কারণ বাবা নিষেধ করেছিলেন।

স্নেহা চোখ নামিয়ে ফেলল।

—তাহলে আপনি কি জানেন উনি কোথায়?

আরমান বলল,

—শেষ খবর পেয়েছিলাম, তিনি শহরের বাইরে একটা পুরোনো বাড়িতে ছিলেন।

—কোথায়?

—এই মুহূর্তে নিশ্চিত না।

অর্ণব বলল,

—তুমি একা তাকে খুঁজছিলে?

—না। রাশেদ চাচা সাহায্য করছিলেন।

অর্ণব অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে রাশেদ সব জানেন?

—অনেক কিছু।

কিছুক্ষণ পর তারা পুরোনো অফিসে পৌঁছাল।

অফিসটা অনেক বছর ধরে ব্যবহার করা হয়নি। আরমান একটা পুরোনো চাবি দিয়ে দরজা খুলল।

ভেতরে ঢুকে অর্ণব চারপাশে তাকাল।

ধুলোমাখা টেবিল, পুরোনো ফাইল আর দেয়ালে বাবার একটি ছবি।

আরমান একটা আলমারি খুলে কয়েকটা ফাইল বের করল।

—এগুলো বাবা আমাকে দিয়েছিলেন।

অর্ণব একটা ফাইল খুলল।

সেখানে কয়েকজন ব্যবসায়ীর নাম, কোম্পানির হিসাব এবং কিছু গোপন লেনদেনের তথ্য ছিল।

স্নেহা তার বাবার নাম খুঁজতে লাগল।

হঠাৎ একটা পাতায় সে থেমে গেল।

—এখানে দেখুন!

অর্ণব আরমানের কাছে গেল।

পাতায় লেখা—

“প্রকল্প ৭১ — অভ্যন্তরীণ তদন্ত।”

তার নিচে কয়েকজনের নাম।

মাহমুদ চৌধুরী।

রাশেদ করিম।

সাইফুল রহমান।

আর একজন—

কামরুল হাসান।

অর্ণব নামটা দেখে বলল,

—এই মানুষটা কে?

আরমান বলল,

—বাবার ব্যক্তিগত হিসাবরক্ষক।

স্নেহা বলল,

—তিনি কি এখনো আপনাদের সঙ্গে কাজ করেন?

আরমান ধীরে মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

অর্ণবের চোখ বড় হয়ে গেল।

—তাহলে...

আরমান বলল,

—আমাদের পরিবারের সবচেয়ে কাছের মানুষ বলতে আমি ওকেই বুঝিয়েছিলাম।

স্নেহা বলল,

—কিন্তু প্রমাণ?

আরমান আরেকটা ফাইল খুলল।

ভেতরে কয়েকটা ছবি।

একটা ছবিতে দেখা গেল কামরুল হাসান সাইফুলের সঙ্গে গোপনে দেখা করছেন।

অর্ণব বলল,

—এটা কবে?

—তিন মাস আগে।

স্নেহার মুখ শক্ত হয়ে গেল।

—তিন মাস আগে তো আমার বাবা নিখোঁজ হন।

আরমান মাথা নাড়ল।

—ঠিক তাই।

হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

সবাই থেমে গেল।

আরমান জানালার কাছে গিয়ে তাকাল।

—কেউ এসেছে।

অর্ণব বলল,

—কে?

আরমান পর্দা সরিয়ে দেখল।

একটা গাড়ি অফিসের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

গাড়ি থেকে নেমে এল—

কামরুল হাসান।

স্নেহা ফিসফিস করে বলল,

—ওই মানুষটাই?

আরমান মাথা নাড়ল।

কামরুল দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।

তারপর দরজায় কড়া নাড়ল।

—আরমান সাহেব?

অর্ণব আর স্নেহা একে অপরের দিকে তাকাল।

আরমান ইশারা করে সবাইকে পেছনে যেতে বলল।

সে দরজা খুলল না।

কামরুল আবার বলল,

—আমি জানি আপনারা ভেতরে আছেন।

আরমান চুপ করে রইল।

কামরুলের কণ্ঠ এবার বদলে গেল।

—আপনার বাবা আমাকে খুব বিশ্বাস করতেন। এই বিশ্বাসের মর্যাদা আমি রেখেছি।

অর্ণব নিচু গলায় বলল,

—মিথ্যা বলছে।

কামরুল দরজায় হাত রেখে বলল,

—স্নেহা, তোমার বাবার কথা জানতে চাইলে দরজা খোলো।

স্নেহা চমকে উঠল।

—সে আমার নাম জানে।

অর্ণব বলল,

—ওকে কিছুতেই বিশ্বাস করবেন না।

কামরুল আবার বলল,

—তোমার বাবা বেঁচে আছেন।

স্নেহা আর চুপ থাকতে পারল না।

সে দরজার কাছে এগিয়ে গেল।

অর্ণব তাকে থামিয়ে বলল,

—না।

স্নেহা চোখে পানি নিয়ে বলল,

—যদি সত্যি হয়?

অর্ণব বলল,

—তাহলে অন্যভাবে তাকে খুঁজব।

হঠাৎ কামরুল বলল,

—তোমার কাছে যে কাগজ আছে, সেটা আমাকে দাও। বিনিময়ে তোমার বাবার অবস্থান বলব।

স্নেহা ব্যাগটা শক্ত করে ধরল।

অর্ণব বলল,

—ওর কাছে কোনো প্রমাণ নেই। শুধু আমাদের ভয় দেখাচ্ছে।

কামরুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তাহলে শোনো।

—তোমার বাবা যেদিন নিখোঁজ হন, সেদিন রাতে তিনি নিজেই আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

স্নেহার চোখ বড় হয়ে গেল।

—মিথ্যা!

—আমি জানি তুমি বিশ্বাস করবে না। কিন্তু সত্যিটা জানতে চাইলে পুরোনো নদীর ধারের বাড়িতে যাও।

আরমান বলল,

—কোন বাড়ি?

কামরুল বলল,

—যেখানে তোমার বাবা শেষবার লুকিয়ে ছিলেন।

অর্ণব দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

—আপনি এত কিছু জানেন, তাহলে নিজে আমাদের সঙ্গে যাবেন না কেন?

কামরুল হেসে বলল,

—কারণ তোমরা আমাকে বিশ্বাস করো না।

অর্ণব বলল,

—ঠিক ধরেছেন।

কামরুল চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর গাড়ির শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল।

আরমান দরজা খুলে বাইরে তাকাল।

কেউ নেই।

স্নেহা বলল,

—আমাদের নদীর ধারের বাড়িতে যেতে হবে।

অর্ণব বলল,

—হ্যাঁ। কিন্তু আগে বাবার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

সে ফোন বের করল।

এইবার মাহমুদের ফোনে কল গেল।

কয়েকবার রিং হওয়ার পর বাবা ফোন ধরলেন।

—অর্ণব?

—বাবা, আমরা সব জেনে গেছি।

ওপাশে নীরবতা।

—কামরুলের কথা বলছ?

অর্ণব চমকে গেল।

—আপনি জানতেন?

—হ্যাঁ।

—তাহলে এতদিন তাকে আপনার কাছে রেখেছিলেন কেন?

মাহমুদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—কারণ তাকে ধরার জন্য প্রমাণ দরকার ছিল।

অর্ণব বলল,

—সাইফুল কি তার সঙ্গে ছিল?

—হ্যাঁ।

স্নেহা কাছে এসে বলল,

—আমার বাবা?

মাহমুদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—স্নেহার বাবা বেঁচে আছেন।

স্নেহার চোখে পানি চলে এল।

—কোথায়?

মাহমুদ বললেন,

—নদীর ধারের পুরোনো বাড়িতে যাও। কিন্তু সাবধানে।

অর্ণব জিজ্ঞেস করল,

—আপনি আসবেন?

—হ্যাঁ।

—এবার সব সত্যি বলবেন?

মাহমুদ বললেন,

—সব।

কল কেটে গেল।

অর্ণব স্নেহার দিকে তাকাল।

—আপনার বাবাকে আমরা খুঁজে বের করব।

স্নেহা চোখ মুছে বলল,

—আর আপনার বাবাকেও সত্যি বলতে হবে।

তারা অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠল।

কিন্তু অর্ণব জানত না, তাদের যাওয়ার খবর ইতিমধ্যেই অন্য কারও কাছে পৌঁছে গেছে।

শহরের অন্য প্রান্তে, একটা ঘরের ভেতর কামরুল ফোনে কথা বলছিল।

—ওরা নদীর ধারের বাড়ির দিকে যাচ্ছে।

ওপাশ থেকে কণ্ঠ এল,

—ভালো।

কামরুল বলল,

—কিন্তু একটা সমস্যা হয়েছে।

—কী?

—অর্ণব এখন সবকিছু জেনে গেছে।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর বলা হলো,

—তাহলে অর্ণবকেও থামাতে হবে।

কামরুল জিজ্ঞেস করল,

—কীভাবে?

উত্তর এল,

—যেভাবে তার বাবাকে থামানো হয়েছিল।

কামরুল কিছু বলল না।

তারপর ফোনের ওপাশের মানুষটি শেষবার বলল—

“নদীর ধারের বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই ওদের থামাও।”

আর সেই কণ্ঠটা ছিল এমন একজনের—

যাকে অর্ণব সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করত।

সকাল পুরোপুরি হয়ে গেছে।

অর্ণব গাড়ি চালাচ্ছিল। পাশে স্নেহা, পেছনের সিটে আরমান। তাদের গন্তব্য নদীর ধারের সেই পুরোনো বাড়ি, যেখানে স্নেহার বাবা শেষবার লুকিয়ে ছিলেন।

কিন্তু অর্ণবের মাথায় ঘুরছিল অন্য একটা প্রশ্ন।

ফোনের ওপাশের মানুষটি কে?

কামরুল যার নির্দেশে কাজ করছে, সে কি সত্যিই তাদের পরিবারেরই কেউ?

স্নেহা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে উদ্বেগ, কিন্তু সেই সঙ্গে অনেকদিন পর একটা আশাও দেখা যাচ্ছে।

—আপনি কি ভাবছেন? স্নেহা জিজ্ঞেস করল।

অর্ণব বলল,

—ভাবছি, এই রাতটা যেন শেষই হতে চাইছে না।

স্নেহা মৃদু হেসে বলল,

—আমাদের তো যাত্রাই শুরু হয়েছিল ট্রেন মিস করার পর।

অর্ণবও হেসে ফেলল।

—ঠিক। আর সেই ট্রেন মিস করাটাই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল ছিল।

স্নেহা তার দিকে তাকাল।

—সব ভুল কি সত্যিই খারাপ হয়?

অর্ণব মাথা নাড়ল।

—না। কিছু ভুল মানুষকে সঠিক জায়গায় নিয়ে যায়।

আরমান পেছন থেকে বলল,

—তোমাদের দার্শনিক কথা পরে হবে। আগে বাড়িটা খুঁজে বের করি।

তিনজনই হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর তারা নদীর ধারে পৌঁছাল।

পুরোনো বাড়িটা একটা বড় গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। দরজা বন্ধ। জানালাগুলোও বন্ধ।

অর্ণব গাড়ি থামাল।

—এখানেই?

আরমান বলল,

—কামরুল যে ঠিকানা দিয়েছে, এটাই।

স্নেহা গাড়ি থেকে নেমে দরজার সামনে দাঁড়াল।

তার হাত কাঁপছিল।

অর্ণব বলল,

—ভয় পাবেন না। আমি আছি।

স্নেহা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু মাথা নাড়ল।

দরজা ধাক্কা দিতেই খুলে গেল।

ভেতরে অন্ধকার।

তিনজন ধীরে ধীরে ঢুকল।

—বাবা?

স্নেহার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

কোনো উত্তর নেই।

ঘরের ভেতর একটা পুরোনো টেবিলের ওপর কিছু কাগজ পড়ে ছিল।

স্নেহা ছুটে গিয়ে কাগজগুলো হাতে নিল।

হঠাৎ পেছনের ঘর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—

—স্নেহা?

স্নেহা স্থির হয়ে গেল।

কণ্ঠটা তার পরিচিত।

অনেকদিনের পরিচিত।

সে ধীরে ধীরে পেছনের ঘরের দরজা খুলল।

সেখানে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন।

চেহারায় ক্লান্তি, চোখে গভীর দুশ্চিন্তা।

স্নেহা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে চিৎকার করে উঠল,

—বাবা!

সে ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

অর্ণব আর আরমান নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

স্নেহার বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—আমি জানতাম তুমি একদিন আমাকে খুঁজে বের করবে।

স্নেহা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আপনি কোথায় ছিলেন? আমাকে একবারও জানালেন না কেন?

—তোমাকে বাঁচানোর জন্য।

—কিন্তু আমি তো ভেবেছিলাম আপনি আর নেই!

—আমি জানি।

তিনি মেয়েকে শান্ত করে বললেন,

—এখন সব বলার সময় এসেছে।

অর্ণব এগিয়ে এল।

—চাচা, আমার বাবার নামও এই ঘটনায় এসেছে।

স্নেহার বাবা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—তোমার বাবা আমাকে শেষ পর্যন্ত সাহায্য করেছিলেন।

অর্ণব অবাক।

—তাহলে এতদিন উনি আমাকে দূরে রাখলেন কেন?

—কারণ তিনি জানতেন, শত্রুরা তোমাকে ব্যবহার করতে পারে।

আরমান বলল,

—কামরুল?

স্নেহার বাবা মাথা নাড়লেন।

—কামরুল এই চক্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কিন্তু সে একা নয়।

অর্ণব বলল,

—আর সাইফুল?

—সাইফুলও জড়িত ছিল। তবে সে পুরো বিষয়টা পরিচালনা করত না।

স্নেহা বলল,

—তাহলে আসল মানুষটা কে?

স্নেহার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—যার কথা তোমরা এতক্ষণ ধরে খুঁজছ, সে তোমাদের ধারণার চেয়েও কাছে।

অর্ণবের বুক ধক করে উঠল।

ঠিক তখন বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

আরমান জানালার কাছে গিয়ে তাকাল।

—বাবা!

অর্ণব দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল।

মাহমুদ চৌধুরী গাড়ি থেকে নামছেন।

তার সঙ্গে রাশেদ।

অর্ণব বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

—বাবা, এবার আর কিছু লুকাবেন না।

মাহমুদ কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—আমি আর কিছু লুকাব না।

সবার সামনে তিনি সত্যিটা বলতে শুরু করলেন।

বহু বছর আগে তার ব্যবসার ভেতরে বড় ধরনের অর্থ জালিয়াতি শুরু হয়েছিল। কামরুল ও সাইফুল সেই চক্রের অংশ ছিল। কিন্তু তাদের পেছনে ছিল আরও বড় একজন ব্যক্তি।

মাহমুদ সেই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলেন।

একসময় তিনি বুঝতে পারেন, তার নিজের পরিবারের একজন মানুষও তাদের তথ্য পাচার করছে।

অর্ণবের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—কে?

মাহমুদ ধীরে বললেন,

—তোমার কাকা, ফারুক।

অর্ণব স্তব্ধ হয়ে গেল।

ফারুক চৌধুরী—তার বাবার ছোট ভাই। ছোটবেলা থেকে যাকে সে নিজের পরিবারের একজন আপন মানুষ হিসেবে জেনে এসেছে।

আরমান বলল,

—কিন্তু কাকা কেন?

মাহমুদ বললেন,

—ব্যবসার অংশীদার হওয়ার লোভে। সে চেয়েছিল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে। সাইফুল আর কামরুলকে ব্যবহার করে সে ধীরে ধীরে সবকিছু নিজের দখলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।

স্নেহার বাবা বললেন,

—আমি হিসাবগুলো খুঁজে বের করেছিলাম। মাহমুদ আমাকে সাহায্য করেছিল। কিন্তু ফারুক সব জেনে যায়।

স্নেহা বলল,

—তাহলে আপনাকে অপহরণ করা হয়েছিল?

—হ্যাঁ। তবে আমি সুযোগ পেয়ে পালিয়ে যাই এবং এখানে লুকিয়ে থাকি।

অর্ণব বলল,

—আর কামরুল?

রাশেদ বললেন,

—কামরুলকে আমরা অনেকদিন ধরে নজরে রেখেছিলাম। তার ফোনে ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ পেয়েছি।

ঠিক তখন অর্ণবের ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

ফারুক চাচা।

অর্ণব কল ধরল।

—হ্যালো?

ওপাশে ফারুকের কণ্ঠ।

—তোমরা সব জেনে গেছ?

অর্ণব চুপ।

ফারুক বললেন,

—তোমার বাবা সবসময় নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুমিই তার পরিকল্পনা নষ্ট করে দিলে।

অর্ণব বলল,

—আপনি কোথায়?

—তোমরা যেখানে আছ, সেখান থেকে খুব বেশি দূরে নই।

অর্ণব চারপাশে তাকাল।

মাহমুদ ইশারা করে সবাইকে ভেতরে থাকতে বললেন।

ফারুক বলল,

—অর্ণব, তুমি চাইলে সবকিছু এখানেই শেষ করতে পারো। শুধু স্নেহার কাছে থাকা কাগজটা আমাকে দাও।

অর্ণব বলল,

—না।

—তাহলে তোমাদের পরিবারকে অনেক কিছু হারাতে হবে।

অর্ণব শান্ত গলায় বলল,

—আমার পরিবার সত্যি লুকিয়ে বাঁচতে চায় না।

কল কেটে গেল।

কিছুক্ষণ পর দূরে পুলিশের গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

রাশেদ মৃদু হেসে বললেন,

—এবার পালানোর সময় শেষ।

মাহমুদ বললেন,

—প্রমাণগুলো আমরা আগেই পুলিশের কাছে পাঠিয়েছি।

অল্প সময়ের মধ্যেই পুলিশ এসে ফারুক, কামরুল এবং তাদের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে আটক করল।

সাইফুলও পরে ধরা পড়ল।

সবকিছু ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গেল।

স্নেহার বাবা দীর্ঘদিন পর মেয়ের কাছে ফিরে এলেন।

আর মাহমুদও প্রথমবার ছেলেদের সামনে নিজের ভয়, ভুল আর অতীতের কথা খুলে বললেন।

অর্ণব বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনি আমাকে এত শাসন করতেন কেন?

মাহমুদ মৃদু হেসে বললেন,

—কারণ আমি ভয় পেতাম, তুমি আমার মতো ভুল করবে।

অর্ণব বলল,

—কিন্তু আপনি কখনো বলেননি যে আপনি আমাকে নিয়ে ভয় পান।

—বাবারা সবসময় বলতে পারে না।

অর্ণব বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

মাহমুদের চোখেও পানি এসে গেল।

কিছুক্ষণ পর স্নেহা অর্ণবের পাশে এসে দাঁড়াল।

—আপনার ট্রেন মিস না হলে কি আমরা কখনো দেখা করতাম?

অর্ণব হেসে বলল,

—সম্ভবত না।

—তাহলে আপনার সেই একশো নম্বর ভুলের জন্য আমি কৃতজ্ঞ।

অর্ণব মজা করে বলল,

—তাহলে ওই ভুলটা আসলে ভুল ছিল না।

স্নেহা মাথা নাড়ল।

—না। সেটা ছিল একটা নতুন যাত্রার শুরু।

অর্ণব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—একটা কথা বলব?

—বলুন।

—আমার মনে হয় এবার আমাদের সত্যিকারের গন্তব্যে যাওয়া উচিত।

স্নেহা হাসল।

—শিলিগুড়ি?

অর্ণব বলল,

—হ্যাঁ। এত কিছুর পরও তো আমরা সেখানে পৌঁছাতে পারিনি।

সবাই হেসে ফেলল।

সেদিন বিকেলে তারা অবশেষে শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা হলো।

এক রাতের সেই অদ্ভুত যাত্রা তাদের জীবন বদলে দিয়েছিল।

অর্ণব শিখেছিল, প্রতিটি নিয়মের পেছনে কারণ থাকতে পারে, প্রতিটি ভুলের পেছনে শিক্ষা থাকতে পারে।

স্নেহা ফিরে পেয়েছিল তার বাবাকে।

আর দুজন অচেনা মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।

ট্রেন মিস করার সেই রাতটা তাই তাদের কাছে আর কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।

....
👁 257