শহরের ব্যস্ত রাস্তা থেকে একটু দূরে ছিল ছোট্ট একটি শান্ত পাড়া। পাড়ার শেষ মাথায় বিশাল একটি পুরোনো বাড়ি, সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছ, আর বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু খাল—সব মিলিয়ে জায়গাটা ছিল যেন অন্যরকম।
সেই বাড়িতেই থাকত ইশান।
ছোটবেলা থেকেই ইশান ছিল একটু চুপচাপ স্বভাবের ছেলে। বয়সে অন্যদের মতোই দুষ্টু ছিল, কিন্তু নিজের অনুভূতিগুলো সহজে প্রকাশ করত না। তার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল পাশের বাড়ির মেয়ে মাহি।
মাহি ছিল ঠিক তার বিপরীত।
সে সারাক্ষণ কথা বলত, হাসত, দৌড়াদৌড়ি করত। পাড়ার সবাই তাকে চিনত তার চঞ্চল স্বভাবের জন্য। আর ইশানকে চিনত মাহির ছায়াসঙ্গী হিসেবে।
দুজনের বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল খুব ছোটবেলায়।
একদিন বিকেলে মাহি ছুটতে ছুটতে ইশানদের বাড়িতে এসে বলল,
—ইশান! তাড়াতাড়ি বাইরে আয়।
ইশান তখন পড়ার টেবিলে বসে বই দেখছিল। বিরক্ত হয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কী হয়েছে?
—বড় একটা সমস্যা হয়েছে।
ইশান বই বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এল।
—কী সমস্যা?
মাহি গম্ভীর মুখ করে বলল,
—আমার ঘুড়িটা গাছে আটকে গেছে।
ইশান আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল, সত্যিই একটা লাল ঘুড়ি কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে আটকে আছে।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—এটার জন্য আমাকে ডাকলি?
—হ্যাঁ। তুই না থাকলে আমি কীভাবে নামাব?
—নিজে উঠতে পারিস না?
মাহি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না। আর তুই তো পারিস।
ইশান কিছুক্ষণ মাহির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—তুই সবসময় আমাকে দিয়ে কাজ করাস।
মাহি মুচকি হেসে বলল,
—কারণ তুই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
সেই কথাটার পর ইশানের আর কিছু বলার ছিল না।
সে গাছে উঠে ঘুড়িটা নামিয়ে দিল।
মাহি খুশি হয়ে ঘুড়িটা হাতে নিয়ে বলল,
—তুই সত্যিই অনেক ভালো।
ইশান হেসে বলল,
—এখন বাসায় যা।
—না, আগে ঘুড়ি ওড়াবি।
—আমার পড়া আছে।
—পড়াশোনা পরে হবে।
শেষ পর্যন্ত মাহির জেদের কাছে ইশানকে হার মানতেই হলো।
এভাবেই কেটে যাচ্ছিল তাদের শৈশব।
স্কুলে যাওয়া, একসঙ্গে খেলাধুলা করা, ছোটখাটো ঝগড়া, আবার কিছুক্ষণ পরেই সব ভুলে যাওয়া—তাদের প্রতিদিনের জীবন ছিল এমনই।
পাড়ার সবাই মজা করে বলত,
“ইশান আর মাহিকে আলাদা করা যায় না।”
তখন তারা কথাটার অর্থ বুঝত না।
তাদের কাছে বন্ধুত্ব মানেই ছিল পাশাপাশি থাকা।
কিন্তু সময় সবকিছু বদলে দেয়।
একদিন ইশানের বাবা জানালেন, তার চাকরির কারণে তাদের পরিবারকে ঢাকায় চলে যেতে হবে।
খবরটা শুনে ইশান চুপ হয়ে গেল।
কিন্তু মাহি খবরটা শুনে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
—তুই চলে যাবি?
—হ্যাঁ।
—কত দিনের জন্য?
ইশান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—জানি না।
মাহির মুখটা মলিন হয়ে গেল।
—তাহলে আমার সঙ্গে কে খেলবে?
ইশান হেসে বলল,
—তুই তো অনেক বন্ধু বানিয়ে ফেলবি।
—আমি নতুন বন্ধু চাই না।
কথাটা বলেই মাহি মুখ ঘুরিয়ে নিল।
পরদিন থেকেই সে ইশানের সঙ্গে খুব কম কথা বলতে শুরু করল।
ইশান বুঝতে পারছিল না, মাহি কেন এমন করছে।
যেদিন তাদের পরিবার চলে যাবে, সেদিন সকালে ইশান নিজের জিনিসপত্র গাড়িতে তুলছিল। মাহি দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
ইশান কাছে গিয়ে বলল,
—মাহি।
মাহি কোনো উত্তর দিল না।
—রাগ করেছিস?
—না।
—তাহলে কথা বলছিস না কেন?
মাহি এবার তাকাল।
তার চোখে অভিমান স্পষ্ট।
—তুই আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছিস।
ইশান ধীরে বলল,
—আমি তো ইচ্ছে করে যাচ্ছি না।
—তবুও যাচ্ছিস।
ইশান কিছু বলতে পারল না।
তারপর পকেট থেকে ছোট একটা নীল রঙের কলম বের করে মাহির হাতে দিল।
—এটা রাখ।
মাহি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কেন?
—যখন আমাকে মনে পড়বে, এটা দেখবি।
মাহি কলমটা শক্ত করে ধরে বলল,
—তুই ফিরে আসবি তো?
ইশান মাথা নাড়ল।
—অবশ্যই।
—কবে?
—বড় হয়ে।
মাহি চোখ মুছে বলল,
—তাহলে আমিও অপেক্ষা করব।
ইশান হেসে বলেছিল,
—ঠিক আছে। অপেক্ষা করিস।
গাড়ি যখন ধীরে ধীরে পাড়া ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, মাহি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
ইশান জানালার ভেতর থেকে শেষবারের মতো হাত নাড়ল।
মাহিও হাত নাড়ল।
তারপর গাড়িটা চোখের আড়াল হয়ে গেল।
সেদিনের পর তাদের জীবন বদলে গেল।
ইশান নতুন শহরে গিয়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হলো। নতুন বন্ধু হলো, নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করল। ধীরে ধীরে পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ আর পরিবারের নানা দায়িত্ব তাকে ব্যস্ত করে ফেলল।
মাহিও নিজের জীবনে এগিয়ে যেতে লাগল।
প্রথম দিকে তারা নিয়মিত কথা বলত।
তারপর সপ্তাহে একবার।
তারপর মাসে একবার।
একসময় সেই যোগাযোগও বন্ধ হয়ে গেল।
কেউ কাউকে ভুলে যেতে চায়নি।
কিন্তু জীবন তাদের দুজনকে এমনভাবে ব্যস্ত করে দিল যে, শৈশবের সেই বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় চাপা পড়ে গেল।
বছর কেটে গেল।
ইশান এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার পথে। সে পরিশ্রমী, আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব সচেতন।
অন্যদিকে মাহিও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে নিজের পছন্দের কাজ শুরু করেছে।
দুজনের জীবনই আলাদা পথে এগিয়ে যাচ্ছিল।
কেউ জানত না, তাদের পথ আবার একদিন একই জায়গায় এসে মিলবে।
সেদিন সন্ধ্যায় ইশান বাবার পুরোনো কিছু কাগজপত্র গোছাতে গিয়ে হঠাৎ একটি ছোট বাক্স পেল।
বাক্স খুলতেই তার চোখ আটকে গেল একটি পুরোনো ছবিতে।
ছবিতে দুটো ছোট্ট শিশু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
একজন ইশান।
আরেকজন মাহি।
ছবিটা হাতে নিয়ে ইশান অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তার মনে পড়ে গেল কৃষ্ণচূড়া গাছ, লাল ঘুড়ি, বিকেলের মাঠ আর সেই বিদায়ের দিন।
হঠাৎ তার মনে হলো—
মাহি এখন কেমন আছে?
কোথায় আছে?
সে কি এখনও তাকে মনে রেখেছে?
ইশান জানত না, ঠিক সেই সময় অন্য একটি শহরে মাহিও তার পুরোনো জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল।
তার হাতে ছিল একটি ছোট নীল কলম।
যে কলমটা সে বহু বছর আগে ইশানের কাছ থেকে পেয়েছিল।
মাহি কলমটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তারপর নিজের অজান্তেই বলল,
—তুই বলেছিলি ফিরে আসবি, ইশান।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি কল এলো।
কলটি ছিল তার মায়ের।
মা বললেন,
—মাহি, আগামী সপ্তাহে আমাদের পুরোনো শহরে যেতে হবে। অনেক বছর পর সবাই একসঙ্গে হবে।
মাহি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—পুরোনো শহরে?
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো।
সে জানত না, এই ফিরে যাওয়া শুধু একটি পুরোনো জায়গায় ফিরে যাওয়া নয়।
এটি তাকে এমন একজন মানুষের সামনে দাঁড় করাবে, যাকে সে বহু বছর ধরে নিজের স্মৃতির ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল।
আর সেই মানুষটির নাম—
ইশান।
পুরোনো শহরে ফেরার দিন যত এগিয়ে আসছিল, মাহির ভেতরের অস্থিরতাও তত বাড়ছিল।
কেন এমন হচ্ছে, সে নিজেও বুঝতে পারছিল না।
শুধু তো কয়েক দিনের জন্য পুরোনো বাড়িতে যাওয়া। সেখানে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হবে, পুরোনো পরিচিতদের সঙ্গে কথা হবে। এতটুকুই।
তাহলে ইশানের কথা বারবার মনে পড়ছে কেন?
মাহি নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করল, ইশান তো তার শৈশবের বন্ধু। বহু বছর ধরে দেখা নেই। তাই হয়তো পুরোনো জায়গায় যাওয়ার কথা শুনে স্মৃতিগুলো মনে পড়ছে।
কিন্তু মন যুক্তির কথা শুনল না।
ব্যাগ গোছাতে গিয়ে সে আবার সেই নীল কলমটা বের করল।
কলমটির গায়ে সময়ের ছাপ পড়েছে। অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। তবুও মাহি এত বছর ধরে সেটি যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
মাহি কলমটা হাতে নিয়ে হেসে বলল,
—তুই এখনও আমার কাছে আছিস, ইশান।
তারপর নিজেই অবাক হয়ে গেল নিজের কথায়।
সে দ্রুত কলমটা ব্যাগে রেখে দিল।
অন্যদিকে ইশানের জীবনেও তখন নতুন ব্যস্ততা শুরু হয়েছে।
তার বাবা হঠাৎ জানালেন,
—ইশান, আগামী সপ্তাহে আমাদের পুরোনো বাড়িটা একবার দেখতে যেতে হবে।
ইশান ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে বলল,
—পুরোনো বাড়ি?
—হ্যাঁ। অনেকদিন খালি পড়ে আছে। কিছু মেরামতের কাজ করাতে হবে।
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
পুরোনো বাড়ির কথা শুনতেই তার মনে পড়ে গেল মাহির কথা।
শৈশবের সেই বাড়ি, কৃষ্ণচূড়া গাছ আর পাশের বাড়ির ছোট্ট মেয়েটা—সব যেন হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল।
সে নিজের অজান্তেই জিজ্ঞেস করল,
—ওখানে কি এখনও মাহিদের বাড়িটা আছে?
বাবা একটু অবাক হয়ে তাকালেন।
—মাহি? পাশের বাড়ির মেয়েটা?
ইশান মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—মনে হয় আছে। তবে অনেক বছর তো হয়ে গেল। ওদের পরিবারও মাঝেমধ্যে আসে শুনেছি।
ইশান আর কিছু বলল না।
কিন্তু সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে আবার সেই পুরোনো ছবিটা বের করল।
ছবির মাহি তখন ছোট। দুই পাশে চুল বাঁধা, মুখে দুষ্টু হাসি।
ইশান ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—তুই কি আমাকে মনে রেখেছিস?
পরদিন সকালে তারা পুরোনো শহরের উদ্দেশে রওনা হলো।
শহরটা অনেক বদলে গেছে।
যে রাস্তায় একসময় ইশান সাইকেল চালাত, সেখানে এখন বড় বড় দোকান। পুরোনো মাঠের জায়গায় নতুন ভবন উঠেছে। কিন্তু কিছু জিনিস এখনও আগের মতোই আছে।
তাদের পুরোনো বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই ইশানের চোখ প্রথমে গেল সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে।
গাছটা আগের চেয়ে অনেক বড় হয়েছে।
ইশান গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, সে যেন কয়েক বছর নয়, কয়েক মুহূর্ত আগে এই জায়গা ছেড়ে গিয়েছিল।
ঠিক তখনই পাশের বাড়ির গেট খুলে গেল।
একজন মেয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
হাতে কয়েকটি বই।
চুলগুলো খোলা।
সাদা-নীল পোশাক পরা মেয়েটি ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিল।
ইশান প্রথমে খেয়াল করেনি।
মেয়েটি যখন রাস্তা পার হওয়ার জন্য সামনে এগিয়ে এল, তখন হঠাৎ তার চোখ ইশানের ওপর গিয়ে থেমে গেল।
দুজনেই স্থির হয়ে গেল।
মাহির হাত থেকে একটি বই মাটিতে পড়ে গেল।
ইশানের বুকের ভেতর কেমন যেন ধাক্কা লাগল।
মুখটা অনেক বদলে গেছে।
কিন্তু চোখ দুটো—
সে চোখ চিনতে ভুল করল না।
মাহিও তাকিয়ে রইল।
কয়েক সেকেন্ড যেন সময় থেমে ছিল।
তারপর মাহি খুব আস্তে বলল,
—ইশান?
ইশান উত্তর দেওয়ার আগে নিজের অজান্তেই হাসল।
—মাহি?
মাহি কিছু বলল না।
তার চোখে বিস্ময়, আনন্দ আর অভিমানের অদ্ভুত মিশ্রণ।
ইশান নিচু হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা বইটা তুলে তার দিকে এগিয়ে দিল।
—এটা তোমার।
মাহি বইটা নিল।
তারপর বলল,
—তুই সত্যিই ফিরে এসেছিস?
ইশান একটু হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—কত বছর পর জানিস?
—জানি।
—কত?
ইশান একটু ভেবে বলল,
—অনেক।
মাহি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—খুব ভালো উত্তর।
ইশান বুঝতে পারল, মাহির অভিমান এখনও আগের মতোই আছে।
—তুই এখনও রাগী আছিস দেখছি।
মাহি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমি রাগী না।
—ছোটবেলায়ও এই কথাই বলতি।
—তুই এখনও আগের মতোই বিরক্তিকর।
দুজনেই হেসে ফেলল।
কিন্তু হাসির আড়ালে অনেক না বলা কথা জমে ছিল।
ইশান জিজ্ঞেস করল,
—কেমন আছিস?
—ভালো।
—কী করিস এখন?
—বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করেছি। একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি।
—ভালো তো।
—তুই?
—আমিও কাজ শুরু করেছি।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
আগে তাদের মধ্যে কখনো নীরবতা থাকত না।
মাহি একটার পর একটা কথা বলত, আর ইশান শুনত।
আজ এত বছর পর দেখা হওয়ার পরও কেন যেন দুজনের কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না কী বলা উচিত।
মাহি অবশেষে বলল,
—তুই কতদিন থাকবি?
—কয়েকদিন।
—তারপর আবার চলে যাবি?
প্রশ্নটা শুনে ইশান থেমে গেল।
মাহি বুঝতে পারল, প্রশ্নটা হয়তো বেশি হয়ে গেছে।
সে দ্রুত বলল,
—মানে, জানতে চাইলাম।
ইশান ধীরে বলল,
—হয়তো এবার একটু বেশি সময় থাকব।
মাহি তাকাল।
—কেন?
—পুরোনো বাড়িটা মেরামত করাতে হবে। কিছু কাজ আছে।
মাহি মাথা নাড়ল।
—ওহ।
তারপর আবার চুপ।
ঠিক তখন পাশ থেকে মাহির মা বেরিয়ে এলেন।
মেয়ের পাশে ইশানকে দেখে তিনি প্রথমে চিনতে পারলেন না। কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ বললেন,
—ইশান?
ইশান এগিয়ে গিয়ে সালাম করল।
—আন্টি, কেমন আছেন?
মাহির মা আনন্দে বললেন,
—আল্লাহ! তুই এত বড় হয়ে গেছিস! শেষবার তোকে দেখেছিলাম একদম ছোট।
মাহি হেসে বলল,
—মা, ওকে চিনতে তোমার এত সময় লাগল?
—তুই চিনলি কীভাবে?
মাহি একটু থেমে বলল,
—চোখ দেখে।
কথাটা বলেই সে অন্যদিকে তাকাল।
ইশান কথাটা শুনে মৃদু হাসল।
মাহির মা তাদের দুজনকে বাড়িতে আসতে বললেন।
অনেক বছর পর ইশান আবার মাহিদের বাড়িতে ঢুকল।
সবকিছু বদলে গেছে, তবুও কিছু জিনিস আগের মতো আছে।
দেয়ালের এক পাশে পুরোনো ছবিগুলো ঝুলছে।
মাহি ইশানকে নিয়ে নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—এখানে ঢুকবি না।
ইশান অবাক হয়ে বলল,
—কেন?
—কারণ ঘর অগোছালো।
—ছোটবেলায় তো তোর ঘর সবসময় অগোছালো থাকত।
—এখনও আছে। তাই ঢুকতে নিষেধ করছি।
ইশান হেসে বলল,
—ঠিক আছে।
কিছুক্ষণ পর মাহির মা চা নিয়ে এলেন।
কথার মাঝে তিনি বললেন,
—তোমরা দুজন ছোটবেলায় এক মুহূর্তও আলাদা থাকতে না।
মাহি অস্বস্তিতে বলল,
—মা, পুরোনো কথা বাদ দাও।
ইশান হেসে বলল,
—না, বলতে দাও।
মাহি তাকাল।
—তোর তো সব মনে আছে দেখছি।
ইশান একটু থেমে বলল,
—সব না। কিছু কিছু মনে আছে।
মাহি জানত, ইশান কী বোঝাচ্ছে।
তারপর হঠাৎ ইশানের চোখ গেল মাহির হাতের দিকে।
মাহি চা নামাতে গিয়ে ব্যাগটা পাশে রেখেছিল।
ব্যাগের ভেতর থেকে নীল কলমটা একটু বের হয়ে আছে।
ইশানের চোখ সেখানে আটকে গেল।
সে ধীরে বলল,
—তুই এটা এখনও রেখেছিস?
মাহি থমকে গেল।
তারপর কলমটা বের করে হাতে নিল।
—হ্যাঁ।
—এত বছর?
—হ্যাঁ।
—ফেলে দিসনি?
মাহি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—সবকিছু কি ফেলে দেওয়া যায়?
ইশান উত্তর দিল না।
দুজনের চোখ আবার এক হয়ে গেল।
সেই মুহূর্তে কেউ কিছু বলল না।
কিন্তু দুজনেই বুঝতে পারল, শৈশবের সেই সম্পর্কটা হয়তো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়নি।
শুধু অনেক বছর ধরে নীরবে অপেক্ষা করেছে।
সন্ধ্যায় ইশান নিজের বাড়িতে ফিরে এল।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে দেখল, কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে মাহি একা দাঁড়িয়ে আছে।
মাহিও তাকিয়ে ছিল তার দিকে।
দূরত্বটা খুব বেশি ছিল না।
তবুও এত বছরের ব্যবধান যেন তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
ইশান মনে মনে বলল,
“মাহি, এত বছর পরও তুই কি আগের মতোই আছিস?”
আর মাহির মনে তখন একটাই প্রশ্ন—
“ইশান কি এবার সত্যিই থাকবে, নাকি আবার একদিন হঠাৎ চলে যাবে?”
পরদিন সকাল থেকেই মাহির মনটা অদ্ভুত রকম ভালো হয়ে ছিল।
ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই তার মনে হচ্ছিল, গতকালের ঘটনাটা যেন স্বপ্ন। এত বছর পর ইশানের সঙ্গে দেখা হবে—এটা সে কখনো ভাবেনি।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করতে করতে নিজের ওপরই বিরক্ত হলো মাহি।
—আমি এত ভাবছি কেন?
কিন্তু উত্তরটা সে নিজেই জানত।
ইশান ফিরে এসেছে।
শুধু এই কথাটাই তার মনে বারবার ঘুরছিল।
অন্যদিকে ইশানের সকালটাও খুব স্বাভাবিক ছিল না। কাজের জন্য কিছু কাগজপত্র দেখছিল, কিন্তু বারবার মন চলে যাচ্ছিল পাশের বাড়ির দিকে।
শৈশবে মাহি প্রতিদিন সকালে তাকে ডাকত।
“ইশান, ওঠ! স্কুলে যাবি না?”
সেই স্মৃতি মনে পড়ে ইশান হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই দরজায় তার মা এসে দাঁড়ালেন।
—কী ব্যাপার? একা একা হাসছিস কেন?
ইশান দ্রুত গম্ভীর হয়ে বলল,
—কিছু না।
মা ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
—মাহির সঙ্গে দেখা হয়েছে শুনলাম।
ইশান অবাক হলো।
—কে বলেছে?
—তোমার বাবা।
ইশান চুপ করে গেল।
মা বললেন,
—অনেক বছর পর দেখা হয়েছে। ভালো লাগছে নিশ্চয়ই?
—হ্যাঁ।
—ছোটবেলায় তোকে ওর সঙ্গে ছাড়া ভাবাই যেত না।
ইশান কিছু বলল না।
মা চলে যাওয়ার পর সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
পাশের বাড়ির গেট বন্ধ।
মাহিকে দেখা যাচ্ছে না।
অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো, সে যেন আবার সেই ছোট্ট শহরে ফিরে এসেছে, যেখানে মাহি ছিল তার প্রতিদিনের সবচেয়ে পরিচিত মুখ।
দুপুরের দিকে ইশান পুরোনো বাড়ির কিছু কাজ দেখতে বের হলো।
বাড়ির পেছনের উঠোনে গিয়ে সে থমকে দাঁড়াল।
এক কোণে পুরোনো কাঠের বেঞ্চটা এখনও আছে।
এই বেঞ্চেই তারা ছোটবেলায় বসে গল্প করত।
ইশান বেঞ্চটার ওপর হাত রাখল।
হঠাৎ পেছন থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল,
—এখনও মনে আছে?
ইশান ঘুরে তাকাল।
মাহি দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে দুটি কাপ চা।
ইশান মুচকি হেসে বলল,
—সব ভুলে যাইনি।
মাহি একটা কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল,
—তাহলে এটা মনে আছে?
—কী?
—এই বেঞ্চে বসে তুই আমাকে বলেছিলি, বড় হয়ে অনেক দূরে চলে যাবি।
ইশান একটু হেসে বলল,
—আমি কি সত্যিই বলেছিলাম?
—হ্যাঁ।
—তারপর?
—তারপর আমি বলেছিলাম, আমি তোকে যেতে দেব না।
ইশান মাহির দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুই তখন খুব জেদি ছিলি।
—এখনও আছি।
দুজনেই হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর মাহি বেঞ্চে বসে বলল,
—তুই এত বছর কোথায় ছিলি?
—পড়াশোনা, কাজ... জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।
—আমাকে একবারও মনে পড়েনি?
প্রশ্নটা শুনে ইশান চুপ হয়ে গেল।
মাহি দ্রুত বলল,
—থাক। উত্তর দিতে হবে না।
ইশান ধীরে বলল,
—পড়ত।
মাহি তাকাল।
—কী?
—তোর কথা মনে পড়ত।
মাহির মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
ইশান বলল,
—কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষ অনেক দূরে চলে যায়। যোগাযোগ না থাকলে একসময় মনে হয়, হয়তো সেই মানুষটা নিজের জীবন নিয়ে এগিয়ে গেছে।
মাহি নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুইও তো এগিয়ে গিয়েছিলি।
—হ্যাঁ।
—তাহলে আবার ফিরে এলি কেন?
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—জানি না।
মাহি মৃদু হেসে বলল,
—জানি না—এটা তোর পুরোনো অভ্যাস।
ইশান তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তার মনে হলো, এত বছর পরও মাহি তাকে আগের মতোই বুঝতে পারে।
কথা বলতে বলতে তারা বাড়ির পেছনের পুরোনো খালের কাছে চলে গেল।
খালটা আগের চেয়ে সরু হয়েছে। পানিও কম।
মাহি বলল,
—মনে আছে? এখানে একবার পড়ে গিয়ে তুই ভিজে একাকার হয়েছিলি।
ইশান হেসে বলল,
—তুই আমাকে ধাক্কা দিয়েছিলি।
—আমি?
—হ্যাঁ।
—প্রমাণ আছে?
—তুই স্বীকার করেছিলি।
—মিথ্যা।
তাদের হাসির শব্দ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
দূর থেকে মাহির মা তাদের দেখছিলেন।
তার মুখেও হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
সন্ধ্যায় মাহির বাবা তাকে নিজের ঘরে ডাকলেন।
—মাহি, একটা কথা ছিল।
—কী বাবা?
—তোর জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে।
মাহি চুপ করে গেল।
—কার?
—আমার এক বন্ধুর ছেলে। ভালো পরিবার, ভালো চাকরি। ছেলেটা বিদেশে থাকে।
মাহি কিছু বলল না।
বাবা বললেন,
—তুই এখন বড় হয়েছিস। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে।
মাহি ধীরে বলল,
—আমি এখন এসব নিয়ে ভাবতে চাই না।
—কেন?
—আমার কাজ আছে। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবছি।
—কাজের পাশাপাশি সংসারও করা যায়।
মাহি আর কোনো উত্তর দিল না।
তার মাথায় তখন অন্য একজনের কথা ঘুরছিল।
ইশান।
কিন্তু সে নিজেকেই প্রশ্ন করল—
ইশান কি তার জীবনে ফিরে এসেছে শুধু একজন পুরোনো বন্ধু হিসেবে?
নাকি এর চেয়েও বেশি কিছু?
সে উত্তর জানত না।
সেদিন রাতে মাহি ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ পাশের বাড়ির ছাদে ইশানকে দেখা গেল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
ইশান বলল,
—ঘুমাসনি?
—না।
—কী ভাবছিস?
—কিছু না।
—মিথ্যা বলছিস।
মাহি হেসে বলল,
—তুই এখনও বুঝতে পারিস?
—কিছুটা।
মাহি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—ইশান, তুই যদি আবার চলে যাস?
ইশান অবাক হয়ে তাকাল।
—কী?
—মানে... এতদিন পর এসেছিস। আবার তো চলে যাবি।
ইশান উত্তর দিল,
—এবার জানি না।
—কী জানিস না?
—কতদিন থাকব।
মাহির চোখে একটু কষ্ট ফুটে উঠল।
—মানে চলে যাবি?
—হয়তো।
মাহি মুখ ঘুরিয়ে নিল।
—ঠিক আছে।
ইশান বুঝতে পারল, কথাটা মাহির ভালো লাগেনি।
সে বলল,
—কিন্তু একটা কথা বলতে পারি।
মাহি তাকাল না।
—কী?
—এইবার যদি যাইও, যোগাযোগ হারাব না।
মাহি ধীরে বলল,
—এটা আগেও বলেছিলি।
ইশান থেমে গেল।
মাহি এবার তার দিকে তাকাল।
—তুই বলেছিলি, “আমি তোকে ভুলব না।”
ইশান মৃদু স্বরে বলল,
—আমি ভুলিনি।
মাহির চোখে পানি জমে উঠেছিল, কিন্তু সে সেটা লুকিয়ে ফেলল।
—তাহলে এত বছর কোনো খবর নিসনি কেন?
ইশান কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।
সত্যিই তো।
কেন নেয়নি?
ব্যস্ততা ছিল, জীবন ছিল, দূরত্ব ছিল—কিন্তু এগুলো কি সত্যিই যথেষ্ট কারণ?
কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষের নিজের কাছেও থাকে না।
পরদিন ইশান শহরের একটি ক্যাফেতে কাজের জন্য গিয়েছিল।
সেখানে তার সঙ্গে দেখা হলো তার পুরোনো বন্ধু রাফির।
রাফি ইশানকে দেখে অবাক হয়ে বলল,
—তুই এখানে?
—কয়েক দিনের জন্য এসেছি।
—শুনলাম পুরোনো বাড়িতে উঠেছিস।
—হ্যাঁ।
রাফি হেসে বলল,
—আর শুনলাম মাহির সঙ্গেও দেখা হয়েছে।
ইশান চুপ করে রইল।
রাফি তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কী হয়েছে?
—কিছু না।
—তোর মুখ কিন্তু অন্য কথা বলছে।
ইশান হেসে এড়িয়ে গেল।
কিন্তু রাফি যাওয়ার আগে একটা কথা বলে গেল,
—ইশান, জীবনে কিছু মানুষকে দ্বিতীয়বার পাওয়ার সুযোগ সবাই পায় না।
ইশান কথাটা শুনে চুপ করে রইল।
সেদিন বিকেলে সে মাহির বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
মাহি তখন বারান্দায় বসে ছিল।
ইশান বলল,
—হাঁটতে যাবি?
মাহি অবাক হয়ে বলল,
—কোথায়?
—যেখানে ছোটবেলায় যেতাম।
মাহি একটু হাসল।
—চল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
পুরোনো রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারা নিজেদের শৈশবের গল্প করছিল।
কখনো হাসছিল, কখনো পুরোনো কথা মনে করে চুপ হয়ে যাচ্ছিল।
একসময় তারা সেই মাঠের সামনে এসে দাঁড়াল, যেখানে একসময় তারা বিকেল কাটাত।
এখন সেখানে একটি বড় ভবন তৈরি হচ্ছে।
মাহি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—সবকিছু বদলে গেছে।
ইশান বলল,
—সবকিছু না।
মাহি তাকাল।
—কিছু কিছু জিনিস এখনও একই আছে।
—যেমন?
ইশান একটু হেসে বলল,
—তোর অভিমান।
মাহি হেসে ফেলল।
তারপর দুজনের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।
কিন্তু এবার সেই নীরবতা অস্বস্তিকর ছিল না।
বরং মনে হচ্ছিল, বহু বছর ধরে থেমে থাকা একটি গল্প আবার ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে।
পরদিন সকালটা অন্য দিনের চেয়ে একটু আলাদা ছিল।
মাহি ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই জানালার পর্দা সরাল। পাশের বাড়ির বারান্দায় ইশান দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। মাহি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে দ্রুত পর্দা টেনে দিল।
নিজের আচরণে নিজেই অবাক হলো সে।
এত বছর পর ইশান ফিরে এসেছে। অথচ তার সামনে পড়লেই কেন যেন বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে?
মাহি নিজেকে বোঝাল, এটা শুধু পুরোনো বন্ধুকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ।
এর বেশি কিছু নয়।
কিন্তু মনের ভেতর থেকে আরেকটা কণ্ঠ যেন বলল, সত্যিই কি তাই?
মাহি আর ভাবতে চাইল না।
অন্যদিকে ইশানের সকালটা শুরু হয়েছিল এক অপ্রত্যাশিত ফোনে।
তার অফিস থেকে জানানো হলো, ঢাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের দায়িত্ব তাকে নিতে হবে। কাজটি বেশ বড়। সফল হলে তার ক্যারিয়ারে ভালো সুযোগ তৈরি হবে।
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—কবে থেকে কাজটা শুরু করতে হবে?
ওপাশ থেকে বলা হলো,
—দুই সপ্তাহের মধ্যে। তবে চাইলে আপনি এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারেন।
ফোন রেখে ইশান জানালার বাইরে তাকাল।
দুই সপ্তাহ।
মানে, তাকে খুব শিগগিরই আবার শহরে ফিরে যেতে হবে।
তার চোখ চলে গেল পাশের বাড়ির দিকে।
মাহি।
সে কি আবারও চলে যাবে?
প্রশ্নটা মাথায় আসতেই ইশানের মনটা ভার হয়ে গেল।
এই কয়েকদিনে সে বুঝতে পেরেছে, মাহিকে শুধু শৈশবের বন্ধু হিসেবে দেখাটা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।
মাহির সঙ্গে কথা বললে তার ভালো লাগে।
মাহির হাসি দেখলে অদ্ভুত শান্তি লাগে।
আর মাহি অভিমান করলে তার নিজেরও খারাপ লাগে।
কিন্তু সে এখনও নিজের অনুভূতিকে কোনো নাম দিতে চাইছিল না।
কারণ নাম দিলে দায়িত্বও আসে।
আর ইশান জানত, সে আবার কাউকে হারানোর মতো অবস্থায় যেতে চায় না।
দুপুরের দিকে মাহি তাকে ফোন করল।
—কী করছিস?
ইশান অবাক হয়ে বলল,
—কাজ করছি।
—তুই সবসময় কাজ করিস?
—প্রায়।
—তাহলে বিকেলে একটু সময় পাবি?
—কেন?
—একটা জায়গায় যেতে হবে।
—কোথায়?
—বলব না।
ইশান হেসে বলল,
—তুই এখনও রহস্য করতে ভালোবাসিস।
—যাবি কি না?
—যাব।
বিকেলে মাহি ইশানকে নিয়ে গেল শহরের পুরোনো একটি বইয়ের দোকানে।
দোকানটা অনেক পুরোনো। ছোট্ট জায়গা, চারদিকে বইয়ের তাক।
ইশান চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—এখানে কেন?
মাহি একটা বই তুলে নিয়ে বলল,
—মনে আছে? ছোটবেলায় তুই বলেছিলি বড় হয়ে একটা বিশাল লাইব্রেরি বানাবি।
ইশান হেসে ফেলল।
—আমি এত কিছু বলতাম?
—হ্যাঁ। তুই ছোটবেলায় অনেক স্বপ্ন দেখতিস।
—এখনও দেখি।
—কী স্বপ্ন?
ইশান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—নিজের একটা জায়গা বানানোর। যেখানে কেউ আমাকে কোনো কিছু হতে বাধ্য করবে না।
মাহি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুই কি এখন নিজের মতো আছিস?
প্রশ্নটা সহজ হলেও ইশান উত্তর দিতে পারল না।
মাহি বলল,
—চুপ করে গেলি কেন?
—জানি না।
—তুই আজকাল অনেক “জানি না” বলিস।
ইশান হেসে বলল,
—তুই অনেক প্রশ্ন করিস।
মাহি মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—ছোটবেলা থেকেই করি।
দুজনেই আবার হাসল।
বইয়ের দোকান থেকে বের হওয়ার সময় মাহি একটি পুরোনো গল্পের বই কিনল।
ইশান বলল,
—এটা তুই পড়বি?
—হ্যাঁ।
—তুই তো ছোটবেলায় গল্পের বই পড়তে পারতিস না।
—তখন তুই পড়ে শোনাতি।
কথাটা শুনে ইশান থেমে গেল।
মাহিও থেমে গেল।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ইশান মৃদু হেসে বলল,
—এখনও পড়ে শোনাতে পারি।
মাহি তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
—দেখা যাবে।
সন্ধ্যার দিকে তারা নদীর ধারে গিয়ে বসেছিল।
সূর্য তখন ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছিল।
মাহি পানির দিকে তাকিয়ে বলল,
—ইশান, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—কর।
—তুই কি কখনো আমাকে খুঁজেছিলি?
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—হ্যাঁ।
মাহি অবাক হলো।
—কখন?
—বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর। তোর পুরোনো ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়েছিলাম।
—আমি পাইনি।
—জানি।
—কীভাবে?
—চিঠিটা ফেরত এসেছিল।
মাহির চোখ বড় হয়ে গেল।
—তাহলে আমাকে আবার খুঁজিসনি কেন?
ইশান নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
—ভেবেছিলাম হয়তো তুই নিজের জীবন নিয়ে এগিয়ে গেছিস। হয়তো আমাকে আর মনে রাখিসনি।
মাহি ধীরে বলল,
—তুই ভুল ভেবেছিলি।
ইশান তার দিকে তাকাল।
—কীভাবে?
মাহি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।
সে বলতে চেয়েছিল, “আমি তোকে ভুলিনি।”
কিন্তু কথাটা মুখে এল না।
শুধু বলল,
—কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না।
ইশানের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল।
সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
সেদিন রাতে মাহি নিজের ঘরে বসে নীল কলমটা হাতে নিল।
তার মনে পড়ছিল ইশানের কথা।
“আমি তোকে ভুলিনি।”
কথাটা বারবার মনে পড়ছিল।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
মাহির বাবা।
—মাহি, কাল বিকেলে ছেলেটার পরিবার আসবে।
মাহি চুপ করে গেল।
—কোন ছেলে?
—যার কথা বলেছিলাম।
—বাবা, আমি তো বলেছি—
—আমি জানি তুই এখন বিয়ের কথা ভাবতে চাস না। কিন্তু একবার দেখা করতে সমস্যা কী?
মাহি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—ঠিক আছে।
ফোন রেখে সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
পরদিন বিকেলে মাহির বাড়িতে অতিথিরা এল।
ছেলেটির নাম রিদওয়ান।
ভদ্র, শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। তার পরিবারও বেশ ভালো।
মাহি সবার সামনে বসে ছিল, কিন্তু তার মন অন্য কোথাও।
রিদওয়ান স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিল।
—আপনি কী কাজ করেন?
—একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ করি।
—ভালো। আপনার কাজটা কি পছন্দ?
—হ্যাঁ।
রিদওয়ান হাসল।
—ভালো লাগল শুনে।
কথাবার্তা চলছিল।
ঠিক তখন মাহির চোখ জানালার বাইরে চলে গেল।
পাশের বাড়ির গেট দিয়ে ইশান বের হচ্ছিল।
এক মুহূর্তের জন্য তাদের চোখাচোখি হলো।
ইশান প্রথমে হাসতে যাচ্ছিল।
কিন্তু ঘরের ভেতর অপরিচিত একজন পুরুষকে মাহির পাশে বসে থাকতে দেখে তার মুখের হাসি থেমে গেল।
মাহিও বুঝতে পারল, ইশান সব দেখেছে।
ইশান আর দাঁড়াল না।
চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল।
মাহির বুকটা হঠাৎ ভার হয়ে গেল।
কেন?
ইশান চলে যাওয়ায় তার এত খারাপ লাগছে কেন?
রিদওয়ান কিছু একটা বলছিল, কিন্তু মাহির কানে ঢুকছিল না।
অন্যদিকে ইশান বাড়িতে ফিরে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।
সে জানত, মাহির নিজের জীবন আছে।
তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে।
তবুও অদ্ভুত এক কষ্ট তাকে গ্রাস করছিল।
সে নিজের মনকে বলল,
“তুই তো এতদিন ওর জীবনে ছিলিই না। তাহলে এখন কেন কষ্ট হচ্ছে?”
কোনো উত্তর এল না।
রাতে মাহি ইশানকে ফোন করল।
প্রথমবার।
দ্বিতীয়বার।
তৃতীয়বার।
ইশান ফোন ধরল না।
মাহি শেষ পর্যন্ত একটি মেসেজ পাঠাল—
“আজ যা দেখেছিস, সেটা নিয়ে ভুল বুঝিস না।”
ইশান মেসেজটা দেখল।
কিন্তু উত্তর দিল না।
মাহি আবার লিখল—
“তুই কি আমার ওপর রাগ করেছিস?”
অনেকক্ষণ পর ইশানের উত্তর এলো।
“না।”
শুধু একটা শব্দ।
মাহির মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল।
সে লিখল,
“তাহলে কথা বলছিস না কেন?”
ইশান কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে লিখল,
“তোর জীবনে আমার জায়গাটা কী, সেটা আমি জানি না। তাই কিছু জিজ্ঞেস করার অধিকারও আমার নেই।”
মাহির চোখ ভিজে উঠল।
সে দ্রুত লিখল,
“অধিকার কি সবসময় সম্পর্কের নাম দিয়ে পাওয়া যায়?”
মেসেজটা পাঠানোর পর মাহি ফোনটা নামিয়ে রাখল।
ওপাশে ইশান কথাটা পড়ে স্থির হয়ে বসে রইল।
তারপর অনেকক্ষণ পর উত্তর লিখল—
“তাহলে তুই আমাকে কী মনে করিস?”
মাহির আঙুল কীবোর্ডের ওপর থেমে গেল।
সে অনেকক্ষণ ধরে একটা উত্তর লিখতে চেষ্টা করল।
শেষ পর্যন্ত কিছুই পাঠাতে পারল না।
সেদিন রাতের পর মাহি আর ইশানের মধ্যে অদ্ভুত একটা দূরত্ব তৈরি হলো।
আগের মতো ইশান আর নিজে থেকে মাহির বাড়িতে যেত না। মাহিও অকারণে পাশের বাড়িতে আসত না।
দুজনেই যেন একে অপরকে এড়িয়ে চলছিল।
অথচ দুজনের মনেই ছিল একে অপরের কথা।
মাহি বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল।
ইশান কোনো মেসেজ পাঠায়নি।
সে নিজেকে বোঝাল, ইশানের হয়তো কাজ আছে।
কিন্তু মন বলল, ব্যাপারটা শুধু কাজ নয়।
ইশান ইচ্ছে করেই দূরে সরে যাচ্ছে।
পরদিন সকালে মাহি অফিসে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিল। গেটের সামনে এসে সে থেমে গেল।
পাশের বাড়ির সামনে ইশানের গাড়ি দাঁড়িয়ে।
কয়েকজন লোক কিছু জিনিস গাড়িতে তুলছে।
মাহির বুকটা ধক করে উঠল।
সে দ্রুত এগিয়ে গেল।
—ইশান কোথায়?
লোকগুলোর একজন বলল,
—স্যার ভেতরে আছেন।
মাহি দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল।
ইশান তখন নিজের ঘরের কিছু জিনিস গুছিয়ে নিচ্ছিল।
মাহি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
—তুই চলে যাচ্ছিস?
ইশান থেমে গেল।
তারপর শান্তভাবে বলল,
—হ্যাঁ।
—কখন?
—আজ।
মাহির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—এত তাড়াতাড়ি?
—অফিসের কাজ আছে।
—কিন্তু তুই তো বলেছিলি আরও কয়েকদিন থাকবি।
ইশান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—পরিস্থিতি বদলে গেছে।
মাহি বুঝতে পারল, কথাটা শুধু অফিসের জন্য নয়।
সে ধীরে বলল,
—আমার জন্য চলে যাচ্ছিস?
ইশান তার দিকে তাকাল।
কিছুক্ষণ দুজনের চোখে চোখ রেখে সে বলল,
—তুই কেন এমন ভাবছিস?
—কারণ গতকাল থেকে তুই বদলে গেছিস।
ইশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—মাহি, তোর জীবন আছে। তোর নিজের সিদ্ধান্ত আছে। আমি এত বছর ছিলাম না। এখন হঠাৎ এসে তোর জীবনে কোনো ঝামেলা তৈরি করতে চাই না।
—তুই ঝামেলা?
—হয়তো।
মাহি মাথা নাড়ল।
—না। তুই ঝামেলা না।
ইশান চুপ।
মাহি এগিয়ে এসে বলল,
—তুই জানিস, এত বছর আমি কী ভেবেছি?
ইশান তাকিয়ে রইল।
—আমি ভেবেছি একদিন তুই ফিরে আসবি।
ইশানের চোখে বিস্ময়।
মাহি বলল,
—শৈশবে তুই বলেছিলি, ফিরে আসবি। আমি সেই কথাটা ভুলিনি।
ইশান ধীরে বলল,
—কিন্তু তুই তো অন্য কাউকে বিয়ে করতে যাচ্ছিস।
মাহি চমকে উঠল।
—কে বলেছে?
—গতকাল নিজের চোখে দেখেছি।
—ওটা আমার বিয়ের সিদ্ধান্ত না।
—তাহলে?
—বাবা শুধু ছেলের সঙ্গে দেখা করতে বলেছিল।
ইশান চুপ করে গেল।
মাহি বলল,
—আমি তোকে কিছুই বলিনি। কারণ তুই নিজেই আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলি।
ইশান নিচের দিকে তাকাল।
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
—কিসের?
—আবার তোকে হারানোর।
মাহির চোখ ভিজে উঠল।
—তুই আমাকে হারাসনি, ইশান। তুই নিজেই দূরে চলে গিয়েছিলি।
কথাটা ইশানের মনে গিয়ে লাগল।
সে কিছু বলতে পারল না।
মাহি এবার ধীরে বলল,
—এবারও কি তাই করবি?
ইশান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, সে যতই পালাতে চাইছে, ততই মাহির দিকে ফিরে আসছে।
শেষ পর্যন্ত সে বলল,
—আমি জানি না কী করা উচিত।
মাহি মৃদু স্বরে বলল,
—সবকিছুর উত্তর এখনই জানতে হবে না।
ইশান অবাক হয়ে তাকাল।
—তাহলে?
—শুধু এবার পালিয়ে যাস না।
দুজনের মধ্যে দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল।
ইশান শেষ পর্যন্ত ব্যাগটা নামিয়ে রাখল।
—ঠিক আছে।
মাহির মুখে প্রথমবারের মতো স্বস্তির হাসি ফুটল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আজ যাবি না?
—না। আজ না।
মাহি হেসে ফেলল।
—তুই জানিস, তুই মাঝে মাঝে খুব বোকা?
ইশানও হেসে বলল,
—আর তুই এখনও আগের মতোই বেশি কথা বলিস।
মাহি বলল,
—এটা আমার একটা ভালো গুণ।
দুজনেই হাসল।
কিন্তু তাদের এই শান্ত মুহূর্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
সন্ধ্যার দিকে মাহির বাবা তাকে আবার ডাকলেন।
—মাহি, রিদওয়ানের পরিবার তোমাকে পছন্দ করেছে।
মাহি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
—ওরা চাইছে দ্রুত বিয়ের ব্যাপারে এগোতে।
মাহি এবার দৃঢ়ভাবে বলল,
—আমি চাই না।
তার বাবা অবাক হয়ে গেলেন।
—কেন?
—আমি এখন বিয়ে করতে প্রস্তুত নই।
—কাউকে কি পছন্দ করিস?
প্রশ্নটা শুনে মাহি থেমে গেল।
তার চোখের সামনে ইশানের মুখ ভেসে উঠল।
সে কোনো উত্তর দিল না।
বাবা আবার বললেন,
—যদি কেউ থাকে, আমাকে বলতে পারিস।
মাহি মাথা নিচু করে বলল,
—আমি নিজেও জানি না।
তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—তাহলে সময় নে। কিন্তু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শুধু আবেগ দিয়ে নেওয়া ঠিক নয়।
মাহি নিজের ঘরে ফিরে এল।
তার মনে হচ্ছিল, বাবা ঠিকই বলেছেন।
কিন্তু ইশানকে দেখার পর থেকে তার নিজের মনটাই যেন আর আগের মতো নেই।
অন্যদিকে ইশানও নিজের জীবনের একটা কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
অফিস থেকে আবার ফোন এসেছে।
তাকে জানানো হলো, ঢাকার প্রজেক্টটা এখন স্থায়ীভাবে তার দায়িত্বে থাকবে। অর্থাৎ তাকে নিয়মিত ঢাকায় থাকতে হবে।
ইশান জানত, এই কাজটা তার ক্যারিয়ারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু তার মানে আবার মাহির কাছ থেকে দূরে থাকা।
সে ফোন রেখে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর মাহিকে ফোন করল।
—কোথায় আছিস?
—বাড়িতে।
—দেখা করতে পারবি?
—হ্যাঁ।
কিছুক্ষণ পর তারা সেই পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে এসে দাঁড়াল।
ইশান বলল,
—আমার একটা কথা আছে।
—বল।
—আমাকে ঢাকায় ফিরতে হবে।
মাহির মুখটা মলিন হয়ে গেল।
—কবে?
—খুব শিগগির।
—কতদিনের জন্য?
—জানি না।
মাহি কিছু বলল না।
ইশান বলল,
—কিন্তু এবার আমি যোগাযোগ বন্ধ করব না।
মাহি মৃদু হেসে বলল,
—তুই প্রতিশ্রুতি দিতে খুব ভালোবাসিস।
—এইবার রাখব।
—দেখা যাবে।
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—মাহি, একটা কথা বলবি?
—কী?
—যদি আমি সত্যিই চলে যাই, তুই কি আমার জন্য অপেক্ষা করবি?
মাহি প্রশ্নটার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিল না।
সে কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ছোটবেলায় তো বলেছিলাম, অপেক্ষা করব।
ইশানের বুকটা কেঁপে উঠল।
—আর এখন?
মাহি তার দিকে তাকাল।
—এখন আমি ছোট নেই।
ইশান চুপ করে গেল।
মাহি ধীরে বলল,
—এখন আমি শুধু অপেক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না। তুই যদি আমাকে জীবনে রাখতে চাস, তাহলে তোকেও সেটা প্রমাণ করতে হবে।
ইশান বুঝতে পারল, মাহি আর সেই ছোট্ট মেয়েটি নেই যে শুধু কথায় বিশ্বাস করত।
এখন সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়।
ইশান মৃদু হেসে বলল,
—ঠিক আছে।
—কী ঠিক আছে?
—আমি প্রমাণ করব।
মাহি আর কিছু বলল না।
সেদিন রাতে ইশান নিজের ব্যাগ গুছিয়ে রাখল।
কিন্তু এবার তার ভেতরে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না।
বরং একটা সিদ্ধান্ত জন্ম নিয়েছিল।
সে মাহিকে হারাতে চায় না।
পরদিন সকালে ইশান ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলো।
মাহি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
গাড়ি চলতে শুরু করলে ইশান জানালা দিয়ে হাত নাড়ল।
মাহিও হাত নাড়ল।
কিন্তু গাড়ি চোখের আড়াল হওয়ার পর মাহি আর হাসতে পারল না।
তার হাতে তখনও সেই নীল কলম।
সে কলমটা শক্ত করে ধরে মনে মনে বলল,
—এবার কিন্তু কথা রাখিস, ইশান।
ঢাকায় পৌঁছে ইশানও গাড়ি থেকে নামার আগে শেষবারের মতো পেছনে তাকাল।
তার মনে হচ্ছিল, এত বছর পর সে প্রথমবার বুঝতে পারছে—কিছু মানুষকে হারানোর ভয় কেন এত গভীর হয়।
কারণ তারা শুধু জীবনের অংশ নয়।
তারা নিজের একটা অংশ হয়ে যায়।
ঢাকায় ফিরে আসার পর ইশানের দিনগুলো আবার ব্যস্ত হয়ে উঠল।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিসের কাজ, মিটিং, নতুন প্রজেক্টের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখার অনেক কারণ ছিল তার।
তবুও দিনের শেষে যখন ঘরে ফিরত, তখন প্রথমেই তার মনে পড়ত মাহির কথা।
মাহি এখন কী করছে?
খেয়েছে তো?
আজ কি তার সঙ্গে কথা বলা যাবে?
প্রথম কয়েকদিন ইশান নিজেকে আটকে রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে নিজেই মাহিকে ফোন করল।
—হ্যালো?
ওপাশ থেকে মাহির কণ্ঠ শুনেই ইশানের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—কী করছিস?
—তোর ফোনের অপেক্ষা করছিলাম।
কথাটা শুনে ইশান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
—সত্যি?
—না, মিথ্যা বললাম।
—তুই এখনও আগের মতোই।
—আর তুই এখনও সহজ কথায় বিশ্বাস করিস।
দুজনেই হেসে ফেলল।
তারপর প্রতিদিনই তাদের কথা হতে লাগল।
কখনো দশ মিনিট, কখনো এক ঘণ্টা।
শৈশবের স্মৃতি, বর্তমানের কাজ, ছোটখাটো ঝগড়া—সবকিছু নিয়েই তারা কথা বলত।
মনে হচ্ছিল, এত বছরের দূরত্ব ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
কিন্তু মাহির জীবনে তখন অন্য একটি সমস্যা তৈরি হচ্ছিল।
রিদওয়ানের পরিবার আবার বিয়ের কথা তুলেছে।
মাহির বাবা এবার বিষয়টি নিয়ে বেশ সিরিয়াস।
এক সন্ধ্যায় তিনি মাহিকে বললেন,
—তুই যদি এই সম্পর্কটা না চাইস, পরিষ্কার করে বল। কিন্তু এভাবে বিষয়টা ঝুলিয়ে রাখিস না।
মাহি মাথা নিচু করে বলল,
—আমি চাই না।
—কেন?
মাহি চুপ।
—কাউকে পছন্দ করিস?
এবারও মাহি কোনো উত্তর দিল না।
তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—তোর জীবনে যদি কেউ থাকে, আমাকে বল। আমি তোর শত্রু নই।
মাহি ধীরে বলল,
—বাবা, আমি শুধু একটু সময় চাই।
—সময় নে। কিন্তু নিজের মনটা আগে পরিষ্কার কর।
সেদিন রাতে মাহি ইশানকে ফোন করল।
—ইশান?
—হুম?
—তোর সঙ্গে একটা কথা বলব?
—বল।
—তুই কি মনে করিস, অনেক বছর পর ফিরে এসে পুরোনো সম্পর্ককে আবার আগের জায়গায় নেওয়া যায়?
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—সব সম্পর্ক একই জায়গায় ফিরে যায় না।
—তাহলে?
—কিছু সম্পর্ক নতুন করে তৈরি হয়।
মাহি চুপ করে গেল।
ইশান জিজ্ঞেস করল,
—কী হয়েছে?
—বাবা আমার বিয়ের কথা বলছে।
ইশানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
তবুও সে শান্তভাবে বলল,
—তুই কী চাস?
মাহি খুব আস্তে বলল,
—আমি জানি না।
—তুই যদি আমাকে নিয়ে কিছু ভাবিস, সেটা লুকাস না।
মাহি চুপ।
ইশান আবার বলল,
—আর যদি না ভাবিস, তাও আমাকে সত্যিটা বলবি।
—তুই কি সত্যিটা শুনতে পারবি?
—চেষ্টা করব।
মাহি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তাহলে আগে তুই বল।
—কী?
—তুই আমাকে কী মনে করিস?
ইশান জানালার বাইরে তাকাল।
অনেকক্ষণ পর বলল,
—তুই আমার কাছে এমন একজন, যাকে হারানোর পরও আমি পুরোপুরি ভুলতে পারিনি।
মাহির চোখ ভিজে উঠল।
—আর এখন?
—এখন মনে হচ্ছে, তোকে আবার হারাতে চাই না।
মাহি কিছু বলতে পারল না।
ফোনের ওপাশে শুধু নীরবতা।
ঠিক তখনই ইশানের ফোনে আরেকটি কল এলো।
সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।
কলটি তার বাবার।
—মাহি, আমাকে একটু রাখতে হবে। বাবা ফোন করেছে।
—ঠিক আছে।
ফোন কেটে ইশান বাবাকে কল করল।
ওপাশ থেকে তার বাবা বললেন,
—ইশান, তোকে একটা পুরোনো বিষয় জানানো দরকার।
—কী হয়েছে?
—তুই কি মাহিদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিস?
ইশান অবাক হলো।
—হ্যাঁ। কেন?
কিছুক্ষণ নীরবতার পর বাবা বললেন,
—তুই ছোট ছিলি তখন একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমরা তোকে পুরোটা বলিনি।
ইশানের কণ্ঠ বদলে গেল।
—কী ঘটনা?
—তোর আর মাহির পরিবার একসময় খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। কিন্তু তোর চলে যাওয়ার আগে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল।
—কী নিয়ে?
—মাহির বাবার সঙ্গে আমার ব্যবসায়িক একটা সমস্যা হয়েছিল।
ইশান চুপ করে রইল।
তার বাবা বললেন,
—সেই সময় দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। তোর মা চাইছিল না তুই মাহির সঙ্গে আর বেশি মিশিস।
ইশানের চোখ বড় হয়ে গেল।
—কিন্তু আমি তো কিছুই জানতাম না।
—তুই তখন ছোট ছিলি। তাই তোকে কিছু বলা হয়নি।
—তারপর?
—আমরা শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা শুধু চাকরির কারণে নিইনি।
ইশান স্তব্ধ হয়ে গেল।
—মানে?
—তোর নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হয়েছিল।
ইশানের মাথায় যেন সবকিছু ঘুরে গেল।
এত বছর সে ভেবেছে, তাদের দূরে চলে যাওয়ার কারণ ছিল শুধু বাবার চাকরি।
কিন্তু আসল সত্য অন্য কিছু।
—মাহির বাবা কি জানতেন?
—জানি না।
—আর মাহি?
—ওর জানার কথা নয়।
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—বাবা, ঠিক কী হয়েছিল?
তার বাবা বললেন,
—সেটা পরে বলব। কিছু পুরোনো কাগজপত্র খুঁজে বের করতে হবে।
ফোন কেটে ইশান অনেকক্ষণ একই জায়গায় বসে রইল।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
তাহলে কি তাদের বিচ্ছেদের পেছনে অন্য কারও সিদ্ধান্ত ছিল?
পরদিন সকালে ইশান পুরোনো শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
কাজের অজুহাতে ছুটি নিয়ে সে রওনা হলো।
মাহিকে কিছু জানাল না।
সে সরাসরি নিজের পুরোনো বাড়িতে গেল।
বাড়ির স্টোররুমে বাবার পুরোনো কিছু কাগজ খুঁজতে গিয়ে একটি কাঠের বাক্স পেল।
বাক্সের ভেতরে ছিল কয়েকটি পুরোনো চিঠি, কিছু নথি আর একটি ছবি।
ইশান একটি চিঠি খুলতেই থমকে গেল।
চিঠিটা লেখা হয়েছিল তার বাবার উদ্দেশে।
চিঠির নিচে স্বাক্ষর—
মাহির বাবা।
ইশান দ্রুত পড়তে শুরু করল।
চিঠিতে লেখা ছিল, বহু বছর আগে একটি ব্যবসায়িক চুক্তি নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। কিন্তু মাহির বাবা নাকি শেষ পর্যন্ত ইশানের বাবার ক্ষতি করতে চাননি।
বরং তিনি সমস্যাটা মিটিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।
ইশানের চোখ আটকে গেল শেষ কয়েকটি লাইনে।
সেখানে লেখা ছিল—
“ইশান আর মাহির সম্পর্ক যেন আমাদের ভুলের কারণে নষ্ট না হয়। ওরা ছোট। ওদের জীবনে আমাদের সমস্যার কোনো প্রভাব পড়া উচিত নয়।”
ইশান অবাক হয়ে গেল।
তাহলে?
যদি মাহির বাবা সম্পর্ক নষ্ট করতে না চান, তাহলে তাদের পরিবার কেন চলে গেল?
ঠিক তখন বাক্সের নিচে আরেকটি কাগজ পেল সে।
সেটা ছিল তার মায়ের লেখা একটি চিঠি।
চিঠিটা পড়তে গিয়ে ইশানের হাত কেঁপে উঠল।
সেখানে লেখা ছিল, মাহির বাবাকে নিয়ে একটি ভুল তথ্য তাদের পরিবারকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল।
কেউ একজন বলেছিল, মাহির বাবা নাকি ইশানের পরিবারকে প্রতারণা করেছেন।
কিন্তু চিঠির শেষে তার মা লিখেছিলেন—
“অনেক বছর পর বুঝেছি, আমরা হয়তো ভুল মানুষকে বিশ্বাস করেছিলাম।”
ইশান স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
তার মানে তাদের শৈশবের বিচ্ছেদের পেছনে ছিল একটি ভুল বোঝাবুঝি।
আর সেই ভুলের কারণে দুজন মানুষ বছরের পর বছর একে অপরের জীবন থেকে দূরে ছিল।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
মাহি।
ইশান কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে ফোন ধরল।
—হ্যালো?
মাহি বলল,
—তুই কোথায়?
—পুরোনো বাড়িতে।
—আমাকে না জানিয়েই এসেছিস?
—হ্যাঁ।
—কেন?
ইশান উত্তর দিতে পারল না।
মাহি বলল,
—কী হয়েছে?
ইশান ধীরে বলল,
—মাহি, আমাদের ছোটবেলায় কেন আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম, সেটা আমি হয়তো জানতে পেরেছি।
ওপাশে নীরবতা।
—কী জানতে পেরেছিস?
ইশান চোখ বন্ধ করল।
—আমাদের পরিবারগুলো যে কারণে আলাদা হয়েছিল, সেটা সত্যি ছিল না।
মাহির কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
—মানে?
—আমাদের দুজনের পরিবারের মধ্যে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল।
মাহি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তাহলে এত বছর...
ইশান ধীরে বলল,
—হ্যাঁ। এত বছর আমরা যে দূরত্বটা বয়ে বেড়িয়েছি, সেটা হয়তো একটা ভুলের কারণে।
মাহির চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
ইশানের হাতে ধরা পুরোনো চিঠিটা যেন তার জীবনের অনেক প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে সামনে এনে দিয়েছিল।
কিন্তু উত্তর পাওয়ার বদলে তার মাথায় আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি হলো।
কে সেই মানুষ, যার কারণে দুই পরিবারের মধ্যে এত বড় ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল?
কেন তাদের আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল?
আর সবচেয়ে বড় কথা—এত বছর পর সেই সত্য সামনে আসার কারণই বা কী?
ইশান চিঠিটা আবার পড়ল।
চিঠির একদম নিচে একটি নাম লেখা ছিল।
সায়েম।
নামটা তার কাছে পরিচিত মনে হলো না।
সে বাবাকে ফোন করল।
—বাবা, সায়েম নামে কাউকে চেনো?
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর বাবা বললেন,
—তুই এই নাম কোথায় পেলি?
ইশান বুঝতে পারল, নামটা গুরুত্বপূর্ণ।
—পুরোনো কাগজে।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—সায়েম ছিল আমার ব্যবসায়িক পরিচিত। কিন্তু অনেক বছর আগে ওর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়।
—কেন?
—কারণ তখন আমরা বুঝতে পারিনি, ও আমাদের মধ্যে কী করছে।
ইশান চুপ করে গেল।
—মানে?
—সায়েমই প্রথম আমাকে বলেছিল, মাহির বাবা নাকি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
ইশানের বুক ধক করে উঠল।
—আর তুমি সেটা বিশ্বাস করেছিলে?
—হ্যাঁ। পরে বুঝেছিলাম, তথ্যগুলো ঠিক ছিল না। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
—তাহলে তুমি মাহির বাবার সঙ্গে কথা বলোনি?
—চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তখন পরিস্থিতি এত খারাপ ছিল যে দুই পরিবারই একে অপরের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল।
ইশান চোখ বন্ধ করল।
এত বছর ধরে যে দূরত্বকে সে ভাগ্যের সিদ্ধান্ত মনে করেছিল, সেটার পেছনে ছিল মানুষের ভুল।
আর সেই ভুলের শিকার হয়েছিল তারা দুজন।
বাবা বললেন,
—ইশান, পুরোনো কথা ঘাঁটিস না। সবকিছু এখন বদলে গেছে।
ইশান দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—কিন্তু মাহি আর আমি যদি এত বছর এই ভুলের জন্য আলাদা হয়ে থাকি, তাহলে সত্যিটা জানার অধিকার আমাদের আছে।
বাবা আর কিছু বললেন না।
ফোন কেটে ইশান অনেকক্ষণ বসে রইল।
তারপর সে মাহিকে ফোন করল।
—কোথায় আছিস?
—বাড়িতে।
—দেখা করতে পারবি?
—এখনই?
—হ্যাঁ।
মাহি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—পারব।
এক ঘণ্টা পর তারা পুরোনো নদীর ধারে দেখা করল।
মাহি এসে দেখল, ইশানের হাতে সেই পুরোনো বাক্স।
—সবকিছু পেয়েছিস?
ইশান মাথা নাড়ল।
—কিছুটা।
—কী ছিল?
ইশান সবকিছু খুলে বলল।
মাহি চুপ করে শুনছিল।
সায়েমের নাম শুনে সে বলল,
—এই নামটা আমারও পরিচিত।
ইশান অবাক হলো।
—তুই চিনিস?
—ছোটবেলায় একবার একজন কাকু আমাদের বাড়িতে এসেছিল। বাবা ওনার সঙ্গে খুব রাগ করে কথা বলেছিল।
—কেন?
—জানি না। আমি তখন ছোট।
ইশান বলল,
—তাহলে আমাদের দুজনের পরিবারই হয়তো কিছু জানে, যা আমাদের বলা হয়নি।
মাহি নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
—ইশান, এত বছর আমরা একে অপরকে হারিয়ে রেখেছিলাম শুধু একটা ভুলের কারণে।
—হ্যাঁ।
—তুই কি মনে করিস, সবকিছু আবার আগের মতো হতে পারে?
ইশান মৃদু হেসে বলল,
—আগের মতো নয়।
মাহি তাকাল।
—তাহলে?
—আগের চেয়ে ভালো হতে পারে।
মাহির চোখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে একটা ভয়ও ছিল।
সে বলল,
—ইশান, যদি সত্যিটা জানার পর আমাদের পরিবার আবার আমাদের বিরুদ্ধে যায়?
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তাহলে এবার আমরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নেব।
মাহি তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই ইশানকে সে আগে কখনো দেখেনি।
শৈশবের শান্ত, একটু লাজুক ছেলেটা যেন বদলে গেছে।
এখন সে নিজের সিদ্ধান্তের জন্য দাঁড়াতে জানে।
পরদিন ইশান মাহির বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেল।
মাহির বাবা তাকে দেখে কিছুটা অবাক হলেন।
—ইশান, তুমি এখানে?
—আঙ্কেল, আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল।
—বলো।
ইশান টেবিলের ওপর পুরোনো চিঠিটা রাখল।
চিঠি দেখে মাহির বাবার মুখের রং বদলে গেল।
তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
—এগুলো তুমি কোথায় পেয়েছ?
—পুরোনো বাড়িতে।
মাহির বাবা চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
—তুমি এত বছর পর এসব কেন জানতে চাইছ?
ইশান বলল,
—কারণ আমি জানতে চাই, আসলে কী হয়েছিল।
মাহির বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তোমার বাবা কি তোমাকে কিছু বলেছেন?
—কিছুটা।
—আর কী জানো?
—সায়েমের কথা।
এই নামটা শুনেই তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
—আমি ভেবেছিলাম এই নামটা আর কখনো শুনব না।
ইশান চুপ করে রইল।
মাহির বাবা বলতে শুরু করলেন,
—সায়েম একসময় আমার ব্যবসার অংশীদার ছিল। পরে সে তোমার বাবার সঙ্গেও কাজ শুরু করে। কিন্তু ওর উদ্দেশ্য ভালো ছিল না।
—কী করেছিল সে?
—দুই পরিবারের মধ্যে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছিল। একে অপরের বিরুদ্ধে সন্দেহ তৈরি করেছিল।
ইশান বলল,
—কিন্তু কেন?
মাহির বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—ব্যবসার জন্য।
—শুধু ব্যবসার জন্য?
—না।
তিনি একটা পুরোনো ফাইল বের করলেন।
ফাইলের ভেতর কয়েকটি কাগজ ছিল।
—সায়েম চেয়েছিল আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে একটা বড় ব্যবসায়িক চুক্তি ভেঙে যাক। সেই সুযোগে সে নিজে লাভবান হতে চেয়েছিল।
ইশান সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল।
—আর আমাদের?
মাহির বাবা নিচের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তোমাদের ব্যাপারটা তখন কেউ গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি। কিন্তু পরে যখন তোমাদের দুজনকে আলাদা করতে হলো, তখন বুঝলাম ভুল হয়ে গেছে।
—তাহলে আমাকে কেন কিছু বলা হয়নি?
—তুমি ছোট ছিলে।
ইশান ধীরে বলল,
—আর মাহি?
—ওকেও কিছু বলা হয়নি।
ইশানের চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
—আপনারা কি জানতেন আমরা একে অপরকে খুব কাছের বন্ধু মনে করতাম?
মাহির বাবা মৃদু হাসলেন।
—জানতাম। তাই তো এত বছর পরও আফসোস হয়।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর তিনি বললেন,
—তবে একটা কথা তোমাকে জানানো দরকার।
ইশান তাকাল।
—কী?
—সায়েম শুধু ব্যবসায়িক কারণে এসব করেনি।
ইশানের কপালে ভাঁজ পড়ল।
—তাহলে?
মাহির বাবা বললেন,
—তোমার বাবার কাছে এমন একটা তথ্য ছিল, যেটা সায়েম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। সেই তথ্যটা কী ছিল, সেটা আমি পুরোপুরি জানি না।
ইশান অবাক হয়ে গেল।
—আপনি জানেন না?
—না। কিন্তু আমি জানি, সেই তথ্যের কারণে তোমার বাবাকে ভয় দেখানো হয়েছিল।
ইশান আরও প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল, ঠিক তখন মাহির বাবা থেমে বললেন,
—এখন তুমি যদি সত্যিই সব জানতে চাও, তোমাকে তোমার বাবার কাছেই ফিরে যেতে হবে।
ইশান মাথা নাড়ল।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তার মনে হচ্ছিল, রহস্যটা যেন আরও গভীর হয়ে গেছে।
কিন্তু অন্তত একটা বিষয় পরিষ্কার—
মাহি তার থেকে দূরে সরে যায়নি।
তাদের আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল।
সন্ধ্যায় ইশান মাহিকে সবকিছু জানাল।
মাহি চুপ করে শুনল।
তারপর বলল,
—আমরা তাহলে সত্যিই একে অপরকে হারাইনি।
ইশান মৃদু হাসল।
—না।
—শুধু আমাদের আলাদা করে রাখা হয়েছিল।
—হ্যাঁ।
মাহির চোখে পানি চলে এলো।
—জানিস, আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম, হয়তো তুই আমাকে ভুলে গেছিস।
ইশান বলল,
—আমি কখনো ভুলিনি।
মাহি তাকিয়ে রইল।
—তাহলে এত বছর কেন ফিরে আসিসনি?
ইশান এবার সত্যি করে বলল,
—কারণ আমি জানতাম না, তুই আমার জন্য অপেক্ষা করছিস।
মাহি হেসে বলল,
—আমি তো জানতাম না, তুইও অপেক্ষা করছিস।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
সেদিন প্রথমবার তারা নিজেদের অনুভূতিগুলোকে আর বন্ধুত্বের নামে লুকাল না।
ইশান ধীরে বলল,
—মাহি, আমি জানি না সামনে কী হবে।
—আমিও জানি না।
—কিন্তু এবার আমি পালাব না।
মাহি মৃদু হেসে বলল,
—আমিও না।
ঠিক তখন মাহির ফোন বেজে উঠল।
তার বাবা।
মাহি ফোন ধরতেই বাবার কণ্ঠ শুনে তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—মাহি, কাল সকালে আমার সঙ্গে একটু বাইরে যেতে হবে।
—কোথায়?
—একজনের সঙ্গে দেখা করতে।
—কার?
কিছুক্ষণ নীরবতার পর বাবা বললেন,
—সায়েম।
মাহির হাত কেঁপে উঠল।
ইশান তার মুখের পরিবর্তন দেখে জিজ্ঞেস করল,
—কী হয়েছে?
মাহি ধীরে ফোনটা নামিয়ে বলল,
—সায়েম ফিরে এসেছে।
ইশান স্থির হয়ে গেল।
বহু বছর পর যে মানুষটির নাম আবার তাদের জীবনে ফিরে এসেছে, সে এখন তাদের সামনে দাঁড়িয়ে।
সায়েমের নাম শোনার পর থেকে ইশানের মাথায় যেন একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছিল।
এত বছর পর সে হঠাৎ ফিরে এসেছে কেন?
মাহির বাবার সঙ্গে তার কী কথা?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তাদের শৈশবের বিচ্ছেদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরোনো রহস্যের পুরো সত্যটা কি এবার সামনে আসবে?
পরদিন সকালে মাহি বাবার সঙ্গে দেখা করতে বের হলো।
ইশানকে সে কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত থেমে গেল।
তার মনে হচ্ছিল, সায়েমের সঙ্গে দেখা করার আগে সবকিছু জানা দরকার।
মাহির বাবা তাকে শহরের একটি পুরোনো অফিসে নিয়ে গেলেন।
অফিসটা এখন প্রায় ব্যবহার হয় না।
ভেতরে ঢুকতেই মাহি দেখল, একজন মধ্যবয়সী মানুষ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
চুলে পাক ধরেছে, মুখে বয়সের ছাপ।
কিন্তু চোখের দৃষ্টি এখনও তীক্ষ্ণ।
মাহির বাবা বললেন,
—এটাই সায়েম।
সায়েম মাহির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—তুমি মাহি? শেষবার তোমাকে দেখেছিলাম খুব ছোট অবস্থায়।
মাহি কোনো উত্তর দিল না।
তার মনে হচ্ছিল, এই মানুষটির সঙ্গে তার শৈশবের কোনো স্মৃতি থাকার কথা, কিন্তু কিছুই মনে পড়ছে না।
সায়েম চেয়ার দেখিয়ে বলল,
—বসো।
মাহি বসল না।
—আমাকে কেন ডেকেছেন?
সায়েম কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—তোমার আর ইশানের ব্যাপারে কথা বলতে।
মাহির বুক ধক করে উঠল।
—ইশানের ব্যাপারে?
—হ্যাঁ।
মাহির বাবা কঠিন গলায় বললেন,
—পুরোনো বিষয়গুলো পরিষ্কার করো।
সায়েম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—অনেক বছর আগে আমি ভুল করেছি।
মাহি অবাক হলো।
—কী ভুল?
—তোমার বাবা আর ইশানের বাবার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করেছিলাম।
—কেন?
—ব্যবসার জন্য।
মাহি বলল,
—শুধু ব্যবসার জন্য এত বড় একটা সম্পর্ক নষ্ট করেছিলেন?
সায়েম মাথা নিচু করল।
—তখন আমি নিজের লাভ ছাড়া কিছু ভাবিনি।
মাহির চোখে রাগ ফুটে উঠল।
—আপনার জন্য দুজন মানুষ বছরের পর বছর একে অপরের জীবন থেকে দূরে ছিল।
সায়েম কোনো উত্তর দিল না।
তারপর ধীরে বলল,
—আমি জানি।
—তাহলে এখন কেন এসেছেন?
সায়েম বলল,
—কারণ আমি চাই না আমার পুরোনো ভুলের কারণে তোমাদের জীবন আবার নষ্ট হোক।
মাহি অবাক হয়ে তাকাল।
—আপনি কী বলতে চাইছেন?
—তোমাদের দুজনের সম্পর্ক যদি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে তোমাদের সব সত্য জানা উচিত।
সায়েম তার ব্যাগ থেকে একটি ফাইল বের করল।
—এখানে কিছু পুরোনো নথি আছে।
মাহির বাবা ফাইলটা নিয়ে খুললেন।
কয়েকটি কাগজ দেখে তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
সায়েম বলল,
—তখন তোমার বাবার ব্যবসা প্রায় ভেঙে পড়ছিল। আমি এমন কিছু তথ্য তোমার বাবার বিরুদ্ধে ছড়িয়েছিলাম, যার বেশিরভাগই মিথ্যা ছিল।
মাহি বলল,
—ইশানের পরিবারও কি বিশ্বাস করেছিল?
—হ্যাঁ।
—কেন?
সায়েম বলল,
—কারণ আমি এমন কিছু নথি দেখিয়েছিলাম, যেগুলো সত্যি মনে হয়েছিল।
মাহি চুপ করে গেল।
সায়েম আবার বলল,
—কিন্তু একটা বিষয় আমি তখন জানতাম না।
—কী?
—ইশানের বাবা তোমার বাবাকে বিশ্বাস করতেন।
মাহির চোখ বড় হয়ে গেল।
—তাহলে?
—আমি বুঝেছিলাম, ওদের সম্পর্ক পুরোপুরি ভাঙা যাবে না। তাই আরও একটা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছিলাম।
মাহির বাবা এবার কঠিন গলায় বললেন,
—সেটা কী?
সায়েম ধীরে বলল,
—আমি বলেছিলাম, তোমার বাবা ইশানের পরিবারকে আইনি ঝামেলায় ফেলতে চাইছেন।
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
মাহি বুঝতে পারল, তখনকার পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল।
সায়েম বলল,
—তোমার পরিবার শহর ছাড়েনি শুধু ব্যবসার জন্য। তারা ভয় পেয়েছিল পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
মাহি নিচু গলায় বলল,
—আর আমাদের?
—তোমাদের কথা কেউ ভাবেনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সবাই বুঝেছিল ভুল হয়েছে।
মাহির চোখ ভিজে উঠল।
—তাহলে এত বছর পরও কেন সত্যিটা বলা হয়নি?
সায়েম মাথা নিচু করে বলল,
—লজ্জা।
মাহি কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর সে উঠে দাঁড়াল।
—আমি বাড়ি যাব।
বের হওয়ার সময় সায়েম বলল,
—মাহি।
সে থামল।
—ইশানকে একটা কথা বলো।
—কী?
—ও যেন নিজের বাবার ওপর সন্দেহ না করে।
মাহি অবাক হলো।
—কেন?
সায়েম বলল,
—ওর বাবা অনেক কিছু সহ্য করেছিলেন। কিন্তু আমাকে কখনো প্রকাশ করেননি।
মাহি আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেল।
বাইরে এসে সে ইশানকে ফোন করল।
—হ্যালো?
—কী হয়েছে?
—সায়েমের সঙ্গে দেখা হয়েছে।
ইশান চুপ করে গেল।
—সব বলেছে?
—হ্যাঁ।
—তুই ঠিক আছিস?
মাহি বলল,
—হ্যাঁ। কিন্তু একটা কথা বুঝেছি।
—কী?
—আমাদের আলাদা হওয়ার পেছনে আমাদের কারও দোষ ছিল না।
ইশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—আমি জানি।
—আর একটা কথা।
—বল।
—তোর বাবাকে নিয়ে ভুল কিছু ভাবিস না।
ইশান চমকে গেল।
—কেন?
—সায়েম বলেছে, তোর বাবা অনেক কিছু সহ্য করেছিলেন।
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আমি বাবার সঙ্গে কথা বলব।
সেদিন রাতেই ইশান বাবার কাছে সব জানতে চাইল।
—বাবা, সায়েম সব বলেছে।
তার বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
—তাহলে শেষ পর্যন্ত সত্যিটা জানতে পারলি।
—তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?
—কারণ আমি চাইনি তোর শৈশবের একটা ভুল বোঝাবুঝি তোর বর্তমান জীবনকে প্রভাবিত করুক।
ইশান বলল,
—কিন্তু সেই ভুলের কারণে আমি মাহিকে হারিয়েছিলাম।
বাবা ছেলের দিকে তাকালেন।
—তুই কি ওকে ভালোবাসিস?
প্রশ্নটা শুনে ইশান থেমে গেল।
প্রথমবার কেউ সরাসরি তাকে প্রশ্নটা করল।
সে ধীরে বলল,
—হ্যাঁ।
তার বাবা মৃদু হাসলেন।
—তাহলে এবার হারাস না।
ইশানের চোখ ভিজে উঠল।
—তুমি আপত্তি করবে না?
—কিসের?
—মাহিকে নিয়ে।
বাবা বললেন,
—তোর সুখের বিরুদ্ধে আমি কখনো যাব না।
সেদিন রাতে ইশান মাহিকে ফোন করল।
—মাহি?
—হুম?
—আজ বাবার সঙ্গে কথা বলেছি।
—কী বললেন?
—তিনি আমাদের বিরুদ্ধে নন।
মাহি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আমার বাবাও না।
ইশান হেসে বলল,
—তাহলে আমাদের এতদিনের ভয়গুলো কোথায় গেল?
মাহি মৃদু হাসল।
—হয়তো আমরা নিজেরাই বানিয়েছিলাম।
ইশান বলল,
—মাহি, একটা কথা বলব?
—বল।
—তুই কি এখনও আমার ওপর বিশ্বাস করিস?
মাহি উত্তর দিল,
—তুই কি আমার ওপর করিস?
—সবচেয়ে বেশি।
—তাহলে আমিও করি।
দুজনেই চুপ করে রইল।
এই নীরবতার মধ্যে এবার কোনো ভয় ছিল না।
ছিল শুধু নিশ্চিন্ততা।
কিন্তু পরদিন সকালে সবকিছু আবার বদলে গেল।
মাহি ঘুম থেকে উঠে দেখল, তার বাবার টেবিলে একটি চিঠি।
চিঠিটা সায়েমের।
মাহি কৌতূহল নিয়ে খুলে পড়তে শুরু করল।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“আমি সব সত্য বলেছি। কিন্তু একটা বিষয় এখনও বলা হয়নি। বহু বছর আগে যে নথিগুলো ব্যবহার করে তোমাদের পরিবারকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়েছিল, সেগুলোর আসল কপি এখনও আমার কাছে নেই। সেই নথি যার কাছে আছে, সে চাইলে আবার সবকিছু বদলে দিতে পারে।”
মাহির বুক ধক করে উঠল।
চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল—
“ইশানকে সাবধানে রেখো।”
মাহি সঙ্গে সঙ্গে ইশানকে ফোন করল।
ফোন বন্ধ।
সে আবার করল।
কোনো উত্তর নেই।
তারপর ইশানের অফিসে ফোন করল।
সেখান থেকেও জানানো হলো, ইশান সকালে অফিসে বের হলেও এখনও পৌঁছায়নি।
মাহির বুকের ভেতর অজানা ভয় তৈরি হলো।
সে জানত না, ইশান কোথায়।
শুধু জানত—
কেউ একজন এখনও তাদের অতীতের সত্যকে নিজের হাতে ধরে রেখেছে।
আর সেই মানুষটি যদি আবার সামনে আসে, তাহলে এতদিনের অপেক্ষার পর ফিরে পাওয়া সম্পর্কটাও বিপদের মুখে পড়তে পারে।
মাহি আর দেরি করল না।
সে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
তার একটাই লক্ষ্য—
ইশানকে খুঁজে বের করা।
সকাল থেকে ইশানের কোনো খোঁজ নেই।
মাহি বারবার তার ফোনে কল করছিল, কিন্তু প্রতিবারই একই উত্তর—ফোন বন্ধ।
ইশানের অফিসেও সে পৌঁছায়নি।
মাহির বুকের ভেতর অস্বস্তি বাড়ছিল।
গতকাল সায়েমের চিঠিতে লেখা কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল—
“ইশানকে সাবধানে রেখো।”
মাহি বুঝতে পারছিল না, এর অর্থ কী।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার ছিল—কেউ একজন এখনও পুরোনো ঘটনাগুলো নিয়ে কিছু লুকিয়ে রেখেছে।
মাহি প্রথমে ইশানের বাবাকে ফোন করল।
—আঙ্কেল, ইশান কি আপনাকে কিছু বলেছে?
ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এলো,
—না। আজ সকালে ওর সঙ্গে কথা হয়নি। কী হয়েছে?
মাহি সবকিছু খুলে বলল।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ইশানের বাবা বললেন,
—তুমি কি সায়েমের সঙ্গে আবার কথা বলেছ?
—না।
—তাহলে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করো। আমার মনে হচ্ছে পুরোনো বিষয়টার শেষ অংশ এখনও বাকি।
মাহি সঙ্গে সঙ্গে সায়েমকে ফোন করল।
প্রথমবার ফোন ধরল না।
দ্বিতীয়বারও না।
তৃতীয়বার ফোন করতেই অবশেষে সায়েম ধরল।
—হ্যালো?
মাহি দ্রুত বলল,
—ইশান কোথায়?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
—আমি জানি না।
—আপনি মিথ্যা বলছেন।
—মাহি, আমি সত্যিই জানি না।
—আপনার চিঠিতে কী লিখেছিলেন? “ইশানকে সাবধানে রেখো”—এর মানে কী?
সায়েম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তোমার ভয় পাওয়ার কারণ আছে।
মাহির গলা কেঁপে উঠল।
—কী হয়েছে?
—যে নথিগুলোর কথা বলেছিলাম, সেগুলোর একটা কপি বহু বছর ধরে অন্য একজনের কাছে ছিল।
—কার কাছে?
সায়েম নামটা বলল।
মাহি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
—ওই মানুষটা এখন কোথায়?
—শহরের বাইরে একটা পুরোনো অফিস আছে। সেখানে হয়তো কিছু পাওয়া যেতে পারে।
—ঠিকানা দিন।
সায়েম ঠিকানা বলল।
মাহি আর কোনো কথা না বলে গাড়ি চালিয়ে সেখানে চলে গেল।
জায়গাটা ছিল শহরের এক নির্জন এলাকায়। পুরোনো একটি অফিস ভবন, চারপাশে প্রায় কোনো মানুষ নেই।
মাহি গাড়ি থামিয়ে ভেতরে ঢুকল।
প্রথমে কাউকে দেখা গেল না।
হঠাৎ পেছন থেকে একজন বৃদ্ধ কণ্ঠ বলল,
—তুমি মাহি?
মাহি ঘুরে তাকাল।
সামনে একজন বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে।
—আপনি কে?
—আমার নাম কামাল। আমি অনেক বছর আগে ইশানের বাবার সঙ্গে কাজ করতাম।
মাহি সতর্ক হয়ে বলল,
—ইশান কোথায়?
কামাল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—সে এখানে এসেছিল।
মাহির বুক ধক করে উঠল।
—কখন?
—আজ সকালে।
—তারপর?
—ও কিছু পুরোনো নথি দেখতে চেয়েছিল।
—তারপর কোথায় গেল?
কামাল একটা চেয়ারের দিকে দেখালেন।
—বসো। সব বলছি।
মাহি বসল না।
—আমার এখন বসার সময় নেই।
কামাল বললেন,
—তোমার আর ইশানের গল্পটা আমি অনেক আগে থেকেই জানি।
মাহি চুপ করে গেল।
—তোমরা যখন ছোট ছিলে, তখন তোমাদের পরিবারকে আলাদা করার ঘটনাটা আমি কাছ থেকে দেখেছি।
—আপনি কি সায়েমের সঙ্গে ছিলেন?
—হ্যাঁ। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম, সে কী করছে।
কামাল একটা পুরোনো ফাইল বের করলেন।
—এখানে সেই নথির কপি আছে।
মাহি ফাইল খুলে দেখল।
তার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
নথিগুলোতে প্রমাণ ছিল, ইশানের বাবা ও মাহির বাবার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছিল, সেগুলো জাল।
অর্থাৎ এত বছর ধরে যে বিরোধের ওপর তাদের পরিবারগুলোর দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তিই ছিল মিথ্যা।
মাহি বলল,
—ইশান এগুলো দেখতে এসেছিল?
—হ্যাঁ।
—তারপর?
কামাল বললেন,
—ও বলেছিল, সব সত্য সামনে আনবে।
মাহির বুকটা ভার হয়ে গেল।
—তাহলে এখন কোথায়?
কামাল একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন।
—এটা ও রেখে গেছে।
মাহি কাগজটা খুলল।
ইশানের হাতের লেখা।
“মাহি, যদি তুমি এই চিঠি পাও, তাহলে বুঝবে আমি সত্যিটা খুঁজে পেয়েছি। ভয় পেয়ো না। আমি ঠিক আছি। শুধু একটা কাজ শেষ করতে হবে। তারপর তোমার কাছে ফিরে আসব।”
মাহির চোখ ভিজে উঠল।
সে কাগজটা বুকে চেপে ধরল।
—কিন্তু কোথায় গেছে?
কামাল বললেন,
—ও সায়েমের পুরোনো গুদামের কথা বলেছিল।
মাহি আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
সে বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে উঠল।
ঠিক তখন তার ফোন বেজে উঠল।
অপরিচিত নম্বর।
—হ্যালো?
ওপাশে ইশানের কণ্ঠ।
—মাহি?
মাহির বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় যেন এক মুহূর্তে কমে গেল।
—ইশান! তুই কোথায়?
—আমি ঠিক আছি।
—কোথায় আছিস?
—আমি সব সত্যের শেষ জায়গাটা খুঁজে পেয়েছি।
—আমাকে বল।
—তুই এখন বাড়ি ফিরে যা।
মাহি রেগে বলল,
—না। এতদিন তুই একা সব সামলেছিস। এবার আমি যাব।
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—মাহি, এটা বিপজ্জনক হতে পারে।
—আমি ভয় পাচ্ছি না।
—আমি চাই না তোর কোনো সমস্যা হোক।
মাহি দৃঢ় গলায় বলল,
—তাহলে আমাকে থামানোর চেষ্টা করিস না।
ওপাশে ইশানের মৃদু হাসি শোনা গেল।
—তুই সত্যিই বদলাইনি।
—তুইও না।
—ঠিক আছে। তাহলে পুরোনো গুদামের সামনে দেখা কর।
মাহি দ্রুত সেখানে পৌঁছে গেল।
গুদামটি শহরের প্রান্তে।
দরজা আধখোলা।
মাহি ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেল ইশান দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাতে একটি পুরোনো ফাইল।
মাহি ছুটে গিয়ে বলল,
—তুই ঠিক আছিস?
—হ্যাঁ।
—তুই আমাকে এত ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি কেন?
ইশান মৃদু হেসে বলল,
—আমি জানতাম তুই আসবি।
—তাহলে ফোন বন্ধ রেখেছিলি কেন?
—ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল।
মাহি বিরক্ত হয়ে বলল,
—আমি তোকে একদিনও শান্তিতে থাকতে দেব না।
ইশান হেসে ফেলল।
কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—মাহি, আমি সত্যিটা পেয়েছি।
—কী সত্যি?
ইশান ফাইল খুলে কয়েকটি নথি বের করল।
—সায়েমের মিথ্যা তথ্যের পেছনে শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থ ছিল না।
—তাহলে?
—আরেকজন মানুষ তাকে সাহায্য করেছিল।
মাহি অবাক হলো।
—কে?
ইশান একটি নাম বলল।
মাহি স্তব্ধ হয়ে গেল।
—অসম্ভব।
—আমিও প্রথমে বিশ্বাস করিনি।
—কিন্তু কেন?
ইশান বলল,
—কারণ সেই মানুষটা চেয়েছিল আমাদের দুই পরিবার যেন কখনো একসঙ্গে না হয়।
মাহি ধীরে বলল,
—কিন্তু এখন তো সব শেষ।
ইশান মাথা নাড়ল।
—না। এখনও একটা বিষয় বাকি।
—কী?
—ওই মানুষটা এখনও জানে না যে আমরা সত্যিটা জেনে গেছি।
ঠিক তখন গুদামের বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।
দুজনেই চুপ করে গেল।
ইশান জানালার দিকে তাকাল।
একটি কালো গাড়ি এসে থেমেছে।
মাহির বুক কেঁপে উঠল।
ইশান ধীরে বলল,
—আমাদের বের হতে হবে।
তারা দ্রুত পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
কিছু দূর গিয়ে মাহি বলল,
—কে ছিল?
ইশান উত্তর দিল না।
তার হাতে ধরা ফাইলটা আরও শক্ত করে ধরল।
তারপর বলল,
—যে মানুষটার কারণে আমরা আলাদা হয়েছিলাম, সে এখনও আমাদের থামাতে চাইছে।
মাহি বলল,
—কিন্তু এবার আমরা একসঙ্গে।
ইশান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—হ্যাঁ।
কিছুক্ষণ পর তারা নদীর ধারে এসে দাঁড়াল।
অনেকদিন পর দুজনেই যেন একটু শান্ত হলো।
মাহি বলল,
—ইশান, একটা কথা বলব?
—বল।
—যদি এই সবকিছুর পরেও আমাদের পরিবার আমাদের সম্পর্ক মেনে না নেয়?
ইশান ধীরে বলল,
—তাহলে আমরা তাদের বোঝাব।
—আর যদি না বোঝে?
ইশান মাহির দিকে তাকিয়ে বলল,
—তাহলে অন্তত এবার আমরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেব।
মাহির চোখে পানি এসে গেল।
—তুই সত্যিই আর আমাকে ছেড়ে যাবি না তো?
ইশান ধীরে মাথা নাড়ল।
—না।
মাহি মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে আমিও আর ভয় পাব না।
তারা জানত না, ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে কেউ একজন তাদের দেখছিল।
সায়েম।
তার মুখে ছিল গভীর চিন্তার ছাপ।
সে ফোন বের করে একটি নম্বরে কল করল।
—ওরা সত্যিটা জেনে গেছে।
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর উত্তর এলো,
—তাহলে এখন শেষ কাজটা করতে হবে।
সায়েমের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—তুমি কি নিশ্চিত?
—হ্যাঁ। এবার ওদের দুজনকে আলাদা করতেই হবে।
সায়েম ফোনটা নামিয়ে নিল।
তার চোখে উদ্বেগ।
কারণ সে বুঝতে পারছিল—
ইশান আর মাহিকে এবার আলাদা করা আগের মতো সহজ হবে না।
সায়েমের ফোনের কথাগুলো শোনার পর থেকেই ইশানের মনে একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল।
কেউ একজন এখনও তাদের আলাদা করতে চাইছে।
কিন্তু এবার ইশান আর আগের মতো দুর্বল ছিল না।
তার পাশে মাহি ছিল।
আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদের পরিবারের মধ্যে এত বছরের ভুল বোঝাবুঝির সত্যিটাও সামনে এসেছে।
পরদিন সকালে ইশান মাহির বাবাকে সব জানাল।
পুরোনো নথি, সায়েমের স্বীকারোক্তি, কামালের দেওয়া প্রমাণ—সবকিছু একসঙ্গে রেখে তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
শেষে তিনি ধীরে বললেন,
—আমি এত বছর একটা ভুলের বোঝা বয়ে বেড়িয়েছি।
ইশান বলল,
—আপনার কোনো দোষ ছিল না, আঙ্কেল।
—ছিল। আমি তোমার বাবাকে বিশ্বাস করতে পারিনি।
কিছুক্ষণ পর তিনি ইশানের বাবাকে ফোন করলেন।
দুই পরিবারের মধ্যে বহু বছর পর প্রথমবার সরাসরি কথা হলো।
প্রথমে দুজনেই নীরব ছিলেন।
তারপর মাহির বাবা বললেন,
—আমাদের ছেলেমেয়েদের জীবন যেন আমাদের ভুলের কারণে আর নষ্ট না হয়।
ইশানের বাবা উত্তর দিলেন,
—আমি একই কথা বলতে চেয়েছিলাম।
সেই কথোপকথনের পর যেন দুই পরিবারের মধ্যেকার বহু বছরের দূরত্ব ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করল।
কিন্তু একটা সমস্যা তখনও রয়ে গেল।
সায়েমের কাছে থাকা শেষ নথিটা কোথায়?
আর সেই নথিতে এমন কী ছিল, যা এখনও কেউ প্রকাশ করতে চাইছে না?
ইশান সায়েমের সঙ্গে দেখা করল।
—আপনি আমাদের সাহায্য করছেন, আবার কিছু বিষয় লুকাচ্ছেন কেন?
সায়েম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—কারণ সব সত্যি সামনে আনলে শুধু তোমাদের পরিবার নয়, আরও কয়েকজনের জীবন বদলে যাবে।
—আমাদের জীবনের সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নেবে না।
সায়েম কিছুক্ষণ ইশানের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর একটি খাম এগিয়ে দিল।
—এটা নাও।
ইশান খাম খুলে দেখল, সেখানে একটি পুরোনো চুক্তিপত্র।
নথিটা দেখে তার চোখ বড় হয়ে গেল।
এতে প্রমাণ ছিল, সায়েম একসময় দুই পরিবারের ব্যবসা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।
কিন্তু সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল।
আর সেই ব্যর্থতার পর সে দুই পরিবারের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল।
ইশান বলল,
—এত বছর ধরে এই নথি লুকিয়ে রেখেছিলেন?
সায়েম মাথা নিচু করল।
—হ্যাঁ।
—কেন?
—ভয় পেয়েছিলাম।
—কিসের?
—সবাই আমাকে ঘৃণা করবে।
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—ভুল করলে মানুষকে তার দায়িত্ব নিতে হয়।
সায়েম মাথা নেড়ে বলল,
—আমি জানি।
ইশান চলে যাওয়ার আগে বলল,
—আপনি একটা কাজ করতে পারেন।
—কী?
—সত্যিটা দুই পরিবারের সামনে নিজে স্বীকার করুন।
সায়েম সম্মতি দিল।
সেদিন সন্ধ্যায় দুই পরিবার একসঙ্গে বসেছিল।
সায়েম সবকিছু স্বীকার করল।
কেউ তাকে ক্ষমা করল না সঙ্গে সঙ্গে।
কিন্তু অন্তত সত্যিটা আর লুকিয়ে রইল না।
মাহি চুপচাপ ইশানের পাশে বসে ছিল।
ইশান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
মাহিও হাসল।
অনেক বছর পর তাদের মনে হলো, তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় বাধাটা অবশেষে সরে গেছে।
কিন্তু এখন সামনে আরেকটি প্রশ্ন।
তাদের ভবিষ্যৎ কী?
মাহির বাবা ইশানকে নিজের ঘরে ডাকলেন।
—ইশান, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।
—জি, আঙ্কেল।
—তুমি মাহিকে নিয়ে কী ভাবছ?
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমি ওকে হারাতে চাই না।
মাহির বাবা মৃদু হাসলেন।
—আমি সেটা বুঝতে পেরেছি।
—আমি জানি, আমাদের দুজনের পরিবারে অনেক সমস্যা হয়েছে। কিন্তু আমি চাই না সেই অতীত আবার আমাদের ভবিষ্যৎ ঠিক করুক।
মাহির বাবা বললেন,
—তুমি যদি সত্যিই মাহিকে সম্মান করো এবং ওর পাশে থাকতে পারো, তাহলে আমার আপত্তি নেই।
ইশানের চোখে স্বস্তি ফুটে উঠল।
—ধন্যবাদ।
অন্যদিকে মাহির মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—তুই কি খুশি?
মাহি হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—ইশানকে নিয়ে?
মাহি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।
—হ্যাঁ।
মা মৃদু হেসে বললেন,
—তাহলে এতদিন যে অপেক্ষা করেছিস, সেটা বৃথা যায়নি।
মাহির চোখে পানি চলে এলো।
—আমি জানতাম না ও সত্যিই ফিরে আসবে।
মা বললেন,
—কখনো কখনো মানুষ দূরে যায়, কিন্তু সম্পর্কটা থেকে যায়।
কয়েকদিন পর পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে ইশান আর মাহি দাঁড়িয়ে ছিল।
সন্ধ্যার আলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।
মাহি গাছটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—মনে আছে, ছোটবেলায় এখানে দাঁড়িয়ে তুই বলেছিলি, বড় হয়ে ফিরে আসবি?
ইশান হেসে বলল,
—মনে আছে।
—তুই অনেক দেরি করেছিস।
—জানি।
—খুব বেশি।
—সেটাও জানি।
মাহি মৃদু অভিমান করে বলল,
—আমি কিন্তু এতদিন অপেক্ষা করিনি।
ইশান অবাক হয়ে তাকাল।
—করিসনি?
—না।
—তাহলে?
মাহি হাসল।
—আমি শুধু ভাবতাম, তুই একদিন আসবি।
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—মাহি, আমি একটা প্রতিশ্রুতি দিতে চাই।
—আবার প্রতিশ্রুতি?
—এইবার শেষবার।
মাহি তার দিকে তাকাল।
ইশান বলল,
—আমি আর কখনো তোর জীবন থেকে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে চলে যাব না। যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক, তোকে সত্যিটা বলব। তোর সঙ্গে কথা বলব। আর আমাদের সম্পর্কের সিদ্ধান্ত আমরা দুজন মিলে নেব।
মাহির চোখে পানি এসে গেল।
সে মৃদু হেসে বলল,
—এবার কিন্তু কথা রাখতে হবে।
—রাখব।
—না রাখলে?
—তুই আমাকে মনে করিয়ে দিবি।
মাহি হেসে ফেলল।
—আমি তোকে সবসময় মনে করিয়ে দেব।
দুজনেই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে রইল।
দূরে সন্ধ্যার আকাশে পাখিরা ঘরে ফিরছিল।
ইশান হঠাৎ পকেট থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল।
মাহি অবাক হয়ে বলল,
—এটা কী?
ইশান বাক্সটা খুলে দেখাল।
ভেতরে সেই পুরোনো ছবিটা।
শৈশবের ইশান আর মাহি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
মাহি ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
—তুই এটা রেখেছিলি?
—হ্যাঁ।
—এত বছর?
—হ্যাঁ।
মাহির চোখ ভিজে উঠল।
সে ব্যাগ থেকে সেই নীল কলমটা বের করল।
—এটাও আমি রেখেছিলাম।
ইশান মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে আমরা দুজনেই বোকা ছিলাম।
—কেন?
—এত বছর ধরে একই জিনিস রেখে দিয়েছি।
মাহি বলল,
—কিছু জিনিস পুরোনো হলেও ফেলে দিতে নেই।
ইশান তার কথার অর্থ বুঝে হাসল।
সেই রাতে দুই পরিবার একসঙ্গে বসে ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলল।
কেউ আর অতীতের ভুল নিয়ে কথা তুলল না।
কারণ তারা বুঝে গিয়েছিল—
দুটি মানুষকে দূরে রাখতে যত বড় ভুলই করা হোক, সত্যিকারের সম্পর্ককে চিরদিন আটকে রাখা যায় না।
কয়েক মাস পর ইশান আর মাহির বিয়ের আয়োজন শুরু হলো।
বাড়িতে আবার উৎসবের পরিবেশ।
মাহি ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজের প্রস্তুতি নিয়ে।
ইশানও কাজের ফাঁকে বারবার মাহির সঙ্গে কথা বলত।
একদিন ফোনে মাহি বলল,
—ইশান, একটা কথা বলব?
—বল।
—আমাদের গল্পটা যদি ছোটবেলায় শেষ হয়ে যেত?
ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তাহলে আমরা জানতেই পারতাম না, অপেক্ষার পর কাউকে ফিরে পাওয়া কতটা মূল্যবান।
মাহি মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে ভালোই হয়েছে, গল্পটা শেষ হয়নি।
—হ্যাঁ।
—আর একটা কথা।
—কী?
—এবার কিন্তু কোথাও যাস না।
ইশান হেসে বলল,
—এবার আমি কোথাও যাচ্ছি না।
ফোনের ওপাশে মাহি চুপ করে হাসছিল।
বহু বছর আগে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দুই ছোট্ট শিশু যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সময় তাদের অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল।
তারা আলাদা হয়েছিল।
ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছিল।
একে অপরকে হারিয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবার ফিরে এসেছিল সেই একই জায়গায়।
তাদের গল্প প্রমাণ করল—
কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না।
শুধু একটু দূরে সরে গিয়ে আবার নতুন করে শুরু হয়।
আর কখনো কখনো, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি শুরু হয় তখনই—
যখন আমরা ভাবি, গল্পটা হয়তো শেষ হয়ে গেছে।
ইশান আর মাহির গল্পও সেদিন শেষ হয়নি।
বরং সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল তাদের নতুন জীবন।
একসঙ্গে।
একই পথে।
আর এবার—
কেউ তাদের আলাদা করতে পারবে না।
....