সকাল থেকেই কাশ্মীরের আকাশটা মেঘলা। পাহাড়ের চূড়ায় সাদা বরফ, নিচে সবুজ উপত্যকা আর তার মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে সরু নদী। দূর থেকে তাকালে জায়গাটাকে মনে হয় ছবির মতো সুন্দর। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই ছিল কঠিন দায়িত্ব আর সতর্কতার জীবন।
ক্যাপ্টেন তৌকির রহমান গত দুই বছর ধরে সেনাবাহিনীতে কর্মরত। বয়স খুব বেশি নয়, কিন্তু দায়িত্ববোধ আর কঠোর স্বভাবের কারণে সবাই তাকে সমীহ করে চলে। সহকর্মীরা তাকে মজা করে ‘ক্যাপ্টেন রাগী’ বলে ডাকে।
তৌকির খুব কম কথা বলে। নিয়মের বাইরে এক পা চলাও তার পছন্দ নয়।
সেদিন সকালেও সে সীমান্তবর্তী একটি এলাকায় টহল দিচ্ছিল। সঙ্গে ছিল তার দুই সহকর্মী—রাফি আর সাকিব।
হঠাৎ রাফি দূরে তাকিয়ে বলল,
—“স্যার, ওইদিকে কেউ আছে মনে হচ্ছে।”
তৌকির সঙ্গে সঙ্গে দূরবীন চোখে তুলল।
একটা মেয়ে!
মেয়েটা পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। তার পরনে হালকা নীল শাল, হাতে মোবাইল। আশপাশে যে সেনা-নিষিদ্ধ এলাকা রয়েছে, সে সম্পর্কে মেয়েটার কোনো ধারণাই নেই।
তৌকির ভ্রু কুঁচকে গেল।
—“ওখানে মানুষ কী করছে?”
রাফি বলল,
—“মনে হচ্ছে পর্যটক।”
তৌকির আর কিছু না বলে দ্রুত সেদিকে এগিয়ে গেল।
মেয়েটা তখন পাহাড়ের দৃশ্যের ছবি তুলতে ব্যস্ত। হঠাৎ পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ শুনে চমকে উঠল।
—“এই যে! আপনি এখানে কী করছেন?”
মেয়েটা ঘুরে তাকাল।
সামনে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একজন যুবক। মুখে কঠোর ভাব, চোখে বিরক্তি।
মেয়েটা একটু অবাক হয়ে বলল,
—“আমি ছবি তুলছি। দেখতে পাচ্ছেন না?”
তৌকিরের চোখ বড় হয়ে গেল।
এমন উত্তর সে আশা করেনি।
—“আপনি জানেন এটা নিষিদ্ধ এলাকা?”
—“না।”
—“জানেন না?”
—“না। জানলে কি এখানে আসতাম?”
তৌকির বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আপনার নাম কী?”
মেয়েটা ভ্রু তুলে তাকাল।
—“আগে আপনার নাম বলুন।”
—“আমি প্রশ্ন করছি।”
—“আর আমি উত্তর দেওয়ার আগে জানতে চাইছি, আপনি কে?”
তৌকির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
রাফি একটু দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছিল।
তৌকির কঠিন গলায় বলল,
—“ক্যাপ্টেন তৌকির রহমান।”
মেয়েটা এবার হেসে বলল,
—“ওহ! ক্যাপ্টেন সাহেব! আমি জুমা।”
—“জুমা?”
—“জি।”
—“শুধু জুমা?”
—“পুরো নাম জুমা আক্তার। এখন কি সন্তুষ্ট?”
তৌকির বিরক্ত মুখে বলল,
—“আপনাকে এখান থেকে বের হতে হবে।”
জুমা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—“আমি তো একটু আগেই এসেছি।”
—“তাতে কী?”
—“একটু ছবি তুলে চলে যাব।”
—“না। এখনই যাবেন।”
—“আপনি সবসময় এত রাগী?”
প্রশ্নটা শুনে তৌকির থমকে গেল।
—“কী?”
জুমা এবার একটু হেসে বলল,
—“কিছু না। চলুন, আপনার কথাই শুনছি।”
সে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু কয়েক পা যেতেই পা পিছলে গেল।
—“আহ!”
জুমা ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার আগেই তৌকির দ্রুত তার হাত ধরে ফেলল।
কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপ।
তৌকিরের হাত শক্ত করে জুমার কবজি ধরে ছিল।
জুমা নিচের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, আর এক সেকেন্ড দেরি হলে সে বেশ খানিকটা নিচে গড়িয়ে পড়ত।
তৌকির তাকে সামলে দাঁড় করিয়ে দিল।
—“সাবধানে হাঁটতে পারেন না?”
জুমা এবার একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—“আমি ঠিকই হাঁটছিলাম।”
—“তাই তো দেখলাম।”
—“আপনি না থাকলে পড়ে যেতাম।”
তৌকির শান্ত গলায় বলল,
—“তাই বলছি, এখানে একা আসা উচিত হয়নি।”
জুমা এবার প্রথমবারের মতো তৌকিরের কথায় কোনো তর্ক করল না।
—“ঠিক আছে।”
তৌকির অবাক হলো।
এতক্ষণ যে মেয়েটা কথায় কথায় তর্ক করছিল, হঠাৎ এত শান্ত হয়ে গেল কেন?
জুমা নিজের শালটা ঠিক করতে করতে বলল,
—“ধন্যবাদ।”
তৌকির মাথা নেড়ে সামনে এগিয়ে গেল।
জুমাও তার পেছনে হাঁটতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর তারা নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাল।
জুমা থেমে বলল,
—“ক্যাপ্টেন সাহেব।”
তৌকির ফিরে তাকাল।
—“জি?”
—“আপনি সবসময় মানুষকে এভাবে বকাঝকা করেন?”
—“যারা নিয়ম ভাঙে, তাদের করি।”
—“আমি তো ইচ্ছে করে নিয়ম ভাঙিনি।”
—“এখন জানেন। পরেরবার যেন না ভাঙেন।”
জুমা হেসে বলল,
—“ঠিক আছে। তবে একটা কথা বলব?”
—“বলুন।”
—“আপনি রাগী হলেও খারাপ না।”
তৌকির কিছু বলার আগেই জুমা চলে গেল।
তৌকির কয়েক মুহূর্ত তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
রাফি পাশে এসে বলল,
—“স্যার।”
—“কী?”
—“মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনার রাগ কিছুটা কমেছে।”
তৌকির কঠিন চোখে তাকাল।
—“রাফি।”
—“জি স্যার।”
—“ডিউটির সময় অপ্রয়োজনীয় কথা বলবে না।”
রাফি মুখ চেপে হাসল।
তৌকির আবার পাহাড়ের দিকে তাকাল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার চোখের সামনে বারবার সেই মেয়েটার হাসিটাই ভেসে উঠছিল।
অন্যদিকে জুমাও গাড়িতে উঠে বসেছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে সে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তৌকিরকে দেখল।
তার মুখে আবার হাসি ফুটল।
বন্ধুকে বলল,
—“জানিস, লোকটা অসম্ভব রাগী!”
বন্ধু হেসে বলল,
—“তুই আবার নিশ্চয়ই ঝামেলা করেছিস?”
জুমা গম্ভীর মুখে বলল,
—“আমি? একদম না।”
তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নিজেই হেসে ফেলল।
—“তবে লোকটার চোখ দুটো বেশ অদ্ভুত।”
বন্ধু অবাক হয়ে বলল,
—“কী রকম?”
জুমা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—“রাগী… কিন্তু তার ভেতরে যেন অনেক কিছু লুকানো।”
জুমার কাশ্মীর ভ্রমণের আজ তৃতীয় দিন। প্রথম দিনের সেই ঘটনাটা সে চাইলেও ভুলতে পারছে না। বিশেষ করে ক্যাপ্টেন তৌকিরের গম্ভীর মুখটা বারবার মনে পড়ছে।
তবে জুমা নিজেকে বোঝাচ্ছিল, লোকটার সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই।
কাশ্মীর এত বড় জায়গা। একজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে আবার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকুই বা!
কিন্তু ভাগ্য যেন জুমার কথাটা শুনে মুচকি হাসল।
সেদিন বিকেলে জুমা তার খালাতো বোন মিতুকে নিয়ে স্থানীয় একটা বাজারে গেল। চারপাশে ছোট ছোট দোকান, শুকনো ফল, শাল, কাঠের তৈরি জিনিস আর নানা রকম খাবারের দোকান।
জুমা একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রঙিন শাল দেখছিল।
—“মিতু, এটা কেমন?”
মিতু বলল,
—“তোর ওপর ভালোই লাগবে।”
—“তাহলে এটা নেব।”
শালটা হাতে নিয়ে দাম জিজ্ঞেস করতেই দোকানদার এমন একটা দাম বলল যে জুমার চোখ কপালে উঠল।
—“এত টাকা?”
দোকানদার হাসল।
—“ম্যাডাম, আসল পশমিনা।”
জুমা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“আসল হলেও এত দাম হওয়ার কথা না।”
দোকানদার বলল,
—“আপনি চাইলে একটু কম দেব।”
জুমা দরদাম শুরু করল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ শোনা গেল।
—“আপনি এখনও ঝামেলা করা বন্ধ করেননি?”
জুমা ঘুরে তাকিয়ে থমকে গেল।
তৌকির!
আজ তার পরনে সেনাবাহিনীর পোশাক নেই। সাধারণ কালো জ্যাকেট আর জিন্স পরেছে। সঙ্গে রাফি।
জুমার মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
—“ক্যাপ্টেন সাহেব!”
তৌকির চোখ সরু করে বলল,
—“আমাকে দেখে এত খুশি হওয়ার কী আছে?”
—“কে বলল আমি খুশি?”
—“আপনার মুখ বলছে।”
জুমা সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে ফেলল।
—“আমি আসলে অবাক হয়েছি।”
রাফি পাশে দাঁড়িয়ে হেসে ফেলল।
তৌকির তাকে চোখের ইশারা করতেই সে চুপ হয়ে গেল।
জুমা আবার শালের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আপনি এখানে কী করছেন?”
—“কাজে এসেছি।”
—“সেনাবাহিনীর কাজ বাজারেও হয়?”
তৌকির বলল,
—“সব জায়গায় কাজের ধরন এক নয়।”
জুমা মাথা নেড়ে বলল,
—“বুঝেছি। খুব রহস্যময় মানুষ আপনি।”
তৌকির কোনো উত্তর দিল না।
এর মধ্যেই দোকানদার আবার শালটার দাম বলল।
জুমা বিরক্ত হয়ে বলল,
—“না, এত টাকা দিয়ে আমি নেব না।”
সে শালটা রেখে চলে যেতে চাইছিল।
তৌকির হঠাৎ দোকানদারকে বলল,
—“প্যাক করে দিন।”
জুমা অবাক হয়ে তাকাল।
—“আপনি কেন কিনছেন?”
—“আমি কিনছি না। আপনি নিচ্ছেন।”
—“কিন্তু—”
তৌকির দোকানদারকে টাকা দিয়ে শালটা জুমার হাতে ধরিয়ে দিল।
জুমা আরও অবাক।
—“এটা আমি নিতে পারব না।”
—“কেন?”
—“কারণ আমি আপনার কাছে কিছু চাইনি।”
তৌকির শান্ত গলায় বলল,
—“আপনার জন্য না। ওইদিন আপনি যেখানে গিয়েছিলেন, সেখানে পড়ে গেলে বড় দুর্ঘটনা হতে পারত। এটাকে সতর্কতার উপহার ভাবুন।”
জুমা শালটা হাতে নিয়ে বলল,
—“আপনি কি সব মেয়েকেই এভাবে উপহার দেন?”
তৌকির এবার বিরক্ত হলো।
—“না।”
—“তাহলে আমাকে কেন?”
—“কারণ আপনি আলাদা।”
কথাটা বলেই তৌকির থেমে গেল।
জুমার চোখে কৌতূহল ফুটে উঠল।
—“কীভাবে আলাদা?”
তৌকির বুঝতে পারল, সে না ভেবেই কথাটা বলে ফেলেছে।
তাই দ্রুত বলল,
—“আপনি সবচেয়ে বেশি ঝামেলা করেন।”
জুমা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—“আমি ভেবেছিলাম ভালো কিছু বলবেন।”
—“ভালো কিছু বলার মতো কাজ করেননি।”
জুমা রাগ দেখানোর ভান করল।
—“ঠিক আছে। আপনার শালও চাই না।”
সে শালটা ফেরত দিতে গেল।
তৌকির বলল,
—“রাখুন।”
—“না।”
—“জুমা।”
এই প্রথম তৌকির তার নামটা এমনভাবে ডাকল।
জুমা থেমে গেল।
কণ্ঠটা কঠিন হলেও সেখানে অদ্ভুত একটা কোমলতা ছিল।
তৌকির বলল,
—“রাখুন। আর ওই জায়গায় একা যাবেন না।”
জুমা ধীরে ধীরে শালটা নিজের ব্যাগে রাখল।
—“ঠিক আছে।”
তারপর মৃদু হেসে বলল,
—“কিন্তু আপনাকে একটা কথা বলতে হবে।”
—“কী?”
—“আপনি যখন হাসেন, তখন আপনাকে এতটা রাগী লাগে না।”
তৌকির সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে ফেলল।
জুমা হেসে ফেলল।
—“এই তো! আবার রাগ!”
রাফি এবার আর হাসি আটকাতে পারল না।
তৌকির তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুমি চুপ করবে?”
রাফি বলল,
—“জি স্যার।”
জুমা হেসে বলল,
—“আপনার বন্ধুটা বেশ মজার।”
তৌকির বলল,
—“ওকে বেশি মাথায় তুলবেন না।”
কিছুক্ষণ পর জুমা আর মিতু চলে গেল।
তৌকির অনেকক্ষণ তাদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল।
রাফি ধীরে ধীরে বলল,
—“স্যার, একটা কথা বলব?”
—“না।”
—“কিন্তু—”
—“তবুও না।”
রাফি হেসে বলল,
—“আপনি মেয়েটার ব্যাপারে একটু বেশি খেয়াল করছেন।”
তৌকির চুপ করে রইল।
সে নিজেও বুঝতে পারছিল, কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা নয়।
অন্যদিকে গাড়িতে বসে জুমা ব্যাগ খুলে শালটা বের করল।
মিতু অবাক হয়ে বলল,
—“এটা কে দিয়েছে?”
জুমা একটু হেসে বলল,
—“একজন খুব রাগী মানুষ।”
—“ক্যাপ্টেন তৌকির?”
জুমা মাথা নেড়ে বলল,
—“হুম।”
—“তুই তো বলেছিলি লোকটাকে একদম পছন্দ করিস না।”
জুমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আমি কি বলেছি পছন্দ করি?”
—“তাহলে?”
জুমা শালটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—“জানি না।”
সেদিন রাতে হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে জুমা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল।
ঠান্ডা বাতাসে তার চুল উড়ছিল।
হঠাৎ ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“কাল ওই পাহাড়ি রাস্তায় যাবেন না। আবহাওয়া খারাপ হতে পারে।”
জুমা কয়েক সেকেন্ড মেসেজটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর বুঝতে পারল, নম্বরটা কার।
সে উত্তর দিল,
“আপনি কি সবসময় আমাকে নজরে রাখেন?”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
“না। শুধু সাবধান করি।”
জুমার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
সে লিখল,
“আপনি এত রাগী কেন?”
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর ছোট্ট একটা মেসেজ—
“সবাইকে নিয়ে রাগ করি না।”
জুমার বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।
সে আর কোনো উত্তর দিল না।
কিন্তু সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে শেষবারের মতো ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে তার মনে হলো—
তৌকিরকে হয়তো সে যতটা রাগী ভেবেছিল, মানুষটা আসলে ততটা কঠিন নয়।
পরদিন সকাল থেকেই আকাশটা ভারী হয়ে ছিল। পাহাড়ের ওপর ঘন মেঘ জমেছে। আবহাওয়া যে ভালো নয়, সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।
জুমা ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। গত রাতের তৌকিরের মেসেজটা তার মনে পড়ল।
“কাল ওই পাহাড়ি রাস্তায় যাবেন না। আবহাওয়া খারাপ হতে পারে।”
জুমা নিজের মনেই হেসে বলল,
—“লোকটা আসলেই অদ্ভুত। আমি কোথায় যাব, সেটাও ঠিক করে দেয়!”
মিতু এসে পাশে দাঁড়াল।
—“কী নিয়ে হাসছিস?”
—“কিছু না।”
—“তৌকিরের মেসেজ?”
জুমা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।
—“তুই আমার ফোন দেখেছিস?”
—“না। তোর মুখ দেখেই বুঝেছি।”
জুমা আর কিছু বলল না।
সকালের নাশতা শেষ করে সবাই ঠিক করল, আজ কাছের একটা গ্রামে যাবে। জায়গাটা পাহাড়ের মাঝখানে ছোট্ট একটা গ্রাম। সেখানে পুরোনো কাঠের বাড়ি আর সুন্দর একটা ঝরনা আছে।
তৌকিরের নিষেধ মনে থাকলেও জুমা ভাবল, তারা তো নিষিদ্ধ এলাকায় যাচ্ছে না।
তাই মিতুকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল।
অন্যদিকে তৌকির সেদিন সকালেই জরুরি ডিউটিতে বের হয়েছিল। আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় পাহাড়ি এলাকার কয়েকটি রাস্তা পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছিল।
গাড়িতে বসে রাফি বলল,
—“স্যার, আজকে ওই পর্যটক মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা করছেন নাকি?”
তৌকির জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—“কোন মেয়েটা?”
রাফি মুচকি হেসে বলল,
—“যার নাম আপনি ভুলেও মনে রাখেননি—জুমা।”
তৌকির এবার তার দিকে তাকাল।
—“ডিউটির সময় ব্যক্তিগত কথা নয়।”
—“জি স্যার।”
কিছুক্ষণ পর তৌকির নিজেই বলল,
—“ওরা আজ কোথায় যাবে জানো?”
রাফি মুখে হাসি লুকিয়ে বলল,
—“আমি কীভাবে জানব?”
তৌকির চুপ করে গেল।
কিন্তু কয়েক মিনিট পর আবার বলল,
—“গতকাল ও বলছিল একটা পাহাড়ি গ্রামের কথা।”
রাফি আর হাসি আটকাতে পারল না।
—“স্যার, আপনি তো বললেন ব্যক্তিগত কথা নয়।”
তৌকির বিরক্ত হয়ে বলল,
—“চুপ করো।”
জুমারা যখন গ্রামের কাছে পৌঁছাল, তখন হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
মিতু বলল,
—“আমরা কি ফিরে যাব?”
জুমা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“এতটুকু বৃষ্টিতে কিছু হবে না। একটু ঘুরেই ফিরে যাব।”
তারা গাড়ি থেকে নেমে গ্রামের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি আরও বেড়ে গেল।
রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে গেল।
জুমা একটা ছোট কাঠের সেতুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে পাহাড়ি নদী দ্রুত বয়ে যাচ্ছে।
সে মোবাইল বের করে ছবি তুলতে গেল।
মিতু দূর থেকে চিৎকার করল,
—“জুমা, সাবধানে!”
জুমা পেছনে তাকাতেই পা পিছলে গেল।
—“আহ!”
সে পড়ে যাওয়ার আগেই কেউ তার হাত ধরে ফেলল।
জুমা চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল।
কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে দেখল—
তৌকির!
জুমা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
—“আপনি এখানে?”
তৌকিরের মুখে এবার ভয় আর রাগ দুটোই।
—“আমি তোমাকে কী বলেছিলাম?”
জুমা চুপ।
—“এই রাস্তায় আসবে না বলেছিলাম না?”
—“আমি তো জানতাম না আপনি এখানেও থাকবেন।”
—“আমি তোমার জন্য এখানে আসিনি।”
—“তাহলে?”
—“ডিউটিতে এসেছি।”
তৌকির তার হাত ছেড়ে দিল।
—“নিজেকে এত বিপদে ফেলো কেন?”
জুমা একটু রেগে বলল,
—“আমি ইচ্ছে করে করিনি।”
—“তুমি কখনো ইচ্ছে করে করো না। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো বিপদে পড়ো।”
জুমা চুপ করে গেল।
তৌকির তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“লেগেছে কোথাও?”
জুমা মাথা নেড়ে বলল,
—“না।”
—“নিশ্চিত?”
—“হ্যাঁ।”
তৌকির কিছুটা শান্ত হলো।
মিতু এগিয়ে এসে বলল,
—“ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন।”
তৌকির মাথা নেড়ে বলল,
—“আপনারা এখনই গাড়িতে ফিরে যান।”
জুমা বলল,
—“কিন্তু আমরা তো ঝরনাটা—”
—“না।”
—“কেন?”
—“আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে।”
জুমা মুখ গোমড়া করল।
তৌকির সেটা দেখে বলল,
—“এই মুখ করে লাভ নেই।”
জুমা অবাক হয়ে তাকাল।
—“আপনি কি আমাকে বাচ্চা মনে করেন?”
—“কখনো কখনো।”
জুমা রেগে গেল।
—“আমি বাচ্চা না।”
তৌকিরের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
—“সেটা প্রমাণ করতে হলে আগে বুদ্ধিমানের মতো আচরণ করতে হবে।”
জুমা কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই প্রচণ্ড শব্দে পাহাড়ের ওপর থেকে কিছু পাথর নিচে গড়িয়ে পড়ল।
সবাই থমকে গেল।
তৌকির সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে উঠল।
—“সবাই নিচু হয়ে থাকুন!”
সে দ্রুত জুমা আর মিতুকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি শান্ত হলো।
জুমা এবার সত্যিই ভয় পেয়েছে।
তৌকির সেটা বুঝতে পারল।
সে শান্ত গলায় বলল,
—“ভয় পেয়েছ?”
জুমা মাথা নেড়ে বলল,
—“একটু।”
—“আমি আছি। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
কথাটা খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু জুমার মনে হলো, এই কয়েকটা শব্দ যেন তাকে অদ্ভুতভাবে শান্ত করে দিল।
বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই।
তৌকির সিদ্ধান্ত নিল, রাস্তা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে কাছের একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হবে।
সেখানে পৌঁছে জুমা একটা বেঞ্চে বসে ছিল।
তার কাপড় ভিজে গেছে।
তৌকির নিজের অতিরিক্ত শালটা এনে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
—“এটা নাও।”
জুমা শালটা হাতে নিয়ে বলল,
—“আপনার?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনি?”
—“আমার ঠান্ডা লাগে না।”
জুমা হেসে বলল,
—“মিথ্যা কথা।”
—“কীভাবে বুঝলে?”
—“আপনার নাক লাল হয়ে গেছে।”
তৌকির নিজের নাক স্পর্শ করে বলল,
—“তুমি অনেক কথা বলো।”
জুমা হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
তারপর জুমা ধীরে বলল,
—“তৌকির।”
তৌকির তাকাল।
—“জি?”
—“আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
—“করো।”
—“আপনি এত মানুষের জীবন নিয়ে চিন্তা করেন কেন?”
তৌকির কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—“কারণ আমাদের কাজই হলো অন্যদের নিরাপদ রাখা।”
—“নিজের কথা ভাবেন না?”
—“সবসময় ভাবলে এই কাজ করা যায় না।”
জুমা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই প্রথম সে তৌকিরকে শুধু একজন রাগী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দেখল না।
তার মনে হলো, এই কঠিন মানুষটার ভেতরে অনেক কোমলতা লুকিয়ে আছে।
হঠাৎ তৌকির বলল,
—“এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?”
জুমা চোখ সরিয়ে নিল।
—“কিছু না।”
—“মিথ্যা বলছ।”
—“আপনিও তো সবসময় সত্যি বলেন না।”
তৌকির হেসে ফেলল।
জুমা অবাক হয়ে সেই হাসির দিকে তাকিয়ে রইল।
তৌকির বলল,
—“কী?”
জুমা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—“কিছু না।”
কিন্তু তার মনে তখন একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—
এই মানুষটার হাসি দেখলে তার এত ভালো লাগে কেন?
আর তৌকিরও বুঝতে পারছিল না, জুমা বিপদে পড়লে তার ভেতরটা এত অস্থির হয়ে ওঠে কেন।
সেদিন বৃষ্টিভেজা পাহাড়ি আশ্রয়কেন্দ্রে দুজনের মধ্যে কোনো প্রেমের কথা হয়নি।
কোনো প্রতিশ্রুতিও হয়নি।
পরদিন সকালটা ছিল একেবারে পরিষ্কার। রাতের বৃষ্টিতে পাহাড়গুলো যেন আরও ধুয়ে-মুছে সুন্দর হয়ে উঠেছে। আকাশে মেঘ নেই, চারপাশে ঠান্ডা বাতাস।
জুমা হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার হাতে আগের দিন তৌকির দেওয়া শালটা।
মিতু ঘর থেকে বের হয়ে বলল,
—“আজও ওই শালটা?”
জুমা দ্রুত শালটা গুছিয়ে ফেলল।
—“ঠান্ডা লাগছে।”
মিতু মুচকি হেসে বলল,
—“শালটা তো অনেক শাল আছে। কিন্তু ওই শালটাই কেন?”
—“কারণ এটা ভালো।”
—“শাল ভালো, নাকি যে দিয়েছে সে?”
জুমা চোখ বড় করে তাকাল।
—“মিতু!”
মিতু হেসে পালিয়ে গেল।
জুমা কিছু না বলে নিচে তাকাল। অজান্তেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
গতকালের ঘটনা বারবার মনে পড়ছিল।
যখন সে পড়ে যাচ্ছিল, তৌকির যেভাবে তাকে ধরে ফেলেছিল…
যখন পাথর গড়িয়ে পড়েছিল, নিজের কথা না ভেবে যেভাবে তাদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল…
আর শেষে যখন বলেছিল—
“আমি আছি। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
কথাগুলো খুব সাধারণ।
কিন্তু জুমার মনে কেন যেন সেগুলোই বারবার বাজছিল।
অন্যদিকে তৌকিরও নিজের কাজে মন দিতে পারছিল না।
সকালের ব্রিফিং শেষ করে সে গাড়িতে উঠেছিল। রাফি পাশে বসে ছিল।
কিছুক্ষণ পর রাফি বলল,
—“স্যার?”
—“হুম?”
—“আপনি আজ চুপচাপ কেন?”
—“আমি তো প্রতিদিনই চুপচাপ থাকি।”
—“আজ একটু বেশি।”
তৌকির জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
রাফি মুচকি হেসে বলল,
—“জুমা ম্যাডামের কথা ভাবছেন?”
তৌকির সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“না।”
—“আমি তো শুধু নাম বললাম।”
তৌকির বুঝল, সে ধরা পড়ে গেছে।
—“রাফি।”
—“জি স্যার?”
—“ডিউটিতে মন দাও।”
—“জি স্যার।”
কিছুক্ষণ পর রাফি আবার বলল,
—“তবে একটা কথা বলি?”
—“আবার?”
—“মেয়েটা খারাপ না।”
তৌকির এবার কিছু বলল না।
রাফি বলল,
—“আর আপনিও ওর সঙ্গে থাকলে অন্যরকম হয়ে যান।”
তৌকির ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
—“কী রকম?”
—“আপনার রাগ কমে যায়।”
তৌকির হালকা হাসল।
—“তোমার পর্যবেক্ষণ শক্তি অনেক বেড়েছে।”
দুপুরের দিকে জুমা তার খালার সঙ্গে স্থানীয় একটা স্কুলে গেল। স্কুলটিতে কিছু বই ও শীতের কাপড় দেওয়ার আয়োজন ছিল। জুমা সবসময়ই এমন কাজে আগ্রহী।
স্কুলের মাঠে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেল।
দূরে কয়েকজন সেনা সদস্য দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের মাঝখানে তৌকির।
আজ তার পরনে ইউনিফর্ম। হাতে কিছু বাক্স।
জুমা অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি এখানে?”
তৌকিরও তাকে দেখে কিছুটা অবাক হলো।
—“আপনি?”
—“আমি এখানে একটা অনুষ্ঠানে এসেছি।”
—“আমি জানি।”
—“কীভাবে?”
—“এই স্কুলের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের।”
জুমা মাথা নেড়ে বলল,
—“আচ্ছা।”
তৌকিরের চোখ হঠাৎ জুমার হাতে থাকা শালের দিকে গেল।
সে চিনতে পারল।
জুমা বুঝতে পেরে বলল,
—“এটা ভালো শাল। তাই পরেছি।”
তৌকির কিছু না বলে অন্যদিকে তাকাল।
কিন্তু তার মুখে খুব হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল।
অনুষ্ঠান শুরু হলে জুমা শিশুদের সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে গেল। সে গল্প করছিল, বই দিচ্ছিল, তাদের সঙ্গে হাসছিল।
তৌকির দূর থেকে সব দেখছিল।
তার চোখে একসময় অজান্তেই মুগ্ধতা ফুটে উঠল।
জুমা যে শুধু দুষ্টু আর বেপরোয়া নয়, তার ভেতরে খুব সুন্দর একটা মন আছে—এটা আজ প্রথম বুঝল তৌকির।
একটা ছোট মেয়ে জুমার হাত ধরে বলল,
—“আপু, আপনি আবার আসবেন?”
জুমা হাঁটু গেড়ে বসে বলল,
—“অবশ্যই আসব।”
তৌকির দূর থেকে শুনে ফেলল।
তার মনে হলো, এই মেয়েটাকে সে যতটা বুঝেছিল, আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু আছে জুমার মধ্যে।
অনুষ্ঠান শেষে সবাই চলে গেলে জুমা মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
তৌকির এগিয়ে এসে বলল,
—“আজ আপনাকে দেখে একটা জিনিস বুঝলাম।”
জুমা তাকাল।
—“কী?”
—“আপনি শুধু ঝামেলা করেন না।”
জুমা হেসে বলল,
—“তাহলে?”
—“ভালো কাজও করেন।”
—“ধন্যবাদ।”
—“এত সহজে ধন্যবাদ?”
—“আর কী বলব?”
—“কিছু না।”
দুজনেই হাসল।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
জুমা হঠাৎ বলল,
—“আপনি কি সবসময় সেনাবাহিনীতেই থাকতে চান?”
তৌকিরের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—“হ্যাঁ।”
—“কখনো ভয় লাগে না?”
—“লাগে।”
জুমা অবাক হয়ে তাকাল।
—“আপনি ভয় পান?”
—“আমি মানুষ। ভয় আমারও লাগে।”
—“তাহলে?”
তৌকির শান্ত গলায় বলল,
—“ভয় থাকলেও দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়া যায় না।”
জুমা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ধীরে বলল,
—“আপনার পরিবার কি আপনাকে নিয়ে চিন্তা করে?”
তৌকির এবার উত্তর দিল না।
তার চোখে হঠাৎ একটা বিষণ্ণতা নেমে এল।
জুমা বুঝতে পারল, প্রশ্নটা হয়তো ঠিক হয়নি।
—“সরি। ব্যক্তিগত প্রশ্ন হয়ে গেছে।”
তৌকির মাথা নেড়ে বলল,
—“সমস্যা নেই।”
তারপর একটু থেমে বলল,
—“আমার মা আছেন। বাবা নেই।”
জুমা চুপ হয়ে গেল।
—“আপনার মা একা থাকেন?”
—“হ্যাঁ। ঢাকায়।”
—“আপনি নিয়মিত কথা বলেন?”
—“প্রতিদিন।”
জুমা মৃদু হেসে বলল,
—“তাহলে আপনি শুধু রাগী ছেলে নন। ভালো ছেলেও।”
তৌকির বলল,
—“আপনি আমাকে নিয়ে এত গবেষণা করছেন কেন?”
জুমা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—“আমি তো শুধু জানতে চাচ্ছি।”
—“সবকিছু জানতে হবে?”
—“হয়তো।”
কথাটা মুখ থেকে বের হতেই জুমা নিজেই চুপ হয়ে গেল।
তৌকিরও তার দিকে তাকিয়ে রইল।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
কয়েক সেকেন্ড যেন সময় থেমে গেল।
জুমা প্রথমে চোখ সরিয়ে নিল।
—“আমি চলি।”
—“জুমা।”
সে থামল।
—“হুম?”
—“কাল কোথাও যাচ্ছ?”
—“না।”
—“ভালো।”
—“কেন?”
তৌকির একটু ভেবে বলল,
—“কারণ কাল আবহাওয়া আবার খারাপ হতে পারে।”
জুমা হেসে বলল,
—“আপনি আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করেন?”
তৌকির উত্তর না দিয়ে বলল,
—“সাবধানে থাকবেন।”
জুমা চলে গেল।
তৌকির তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের মনেই বলল,
—“হ্যাঁ… হয়তো একটু বেশি চিন্তাই করি।”
সেদিন রাতে জুমার ফোনে আবার মেসেজ এল।
“শালটা ভালো লাগছে।”
জুমা কিছুক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল—
“শালটা ভালো, নাকি আমাকে?”
মেসেজ পাঠিয়েই সে নিজের মুখ চেপে ধরল।
—“আমি এটা কী লিখলাম!”
কয়েক মিনিট কোনো উত্তর এল না।
তারপর রিপ্লাই এলো—
“দুটোই।”
জুমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল।
সে আর উত্তর দিল না।
শুধু ফোনটা বুকে চেপে ধরে মৃদু হেসে ফেলল।
আর দূরে কোনো এক সামরিক ক্যাম্পে বসে তৌকিরও ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার মুখে সেই বিরল হাসি।
তাদের সম্পর্ক তখনও কোনো নাম পায়নি।
কিন্তু দুজনেই বুঝতে শুরু করেছে—
এটা আর শুধু পরিচয় নয়।
তাদের অজান্তেই দুজনের জীবনের মাঝখানে একজন আরেকজনের জন্য জায়গা তৈরি করে ফেলছে।
জুমা বুঝতে পারছিল, তৌকিরকে ঘিরে তার ভাবনাগুলো দিন দিন বদলে যাচ্ছে। আগে তৌকিরকে দেখলেই তার রাগী মুখ নিয়ে মজা করতে ইচ্ছে করত। এখন তৌকির সামনে এলেই অকারণে মনটা ভালো হয়ে যায়।
কিন্তু একটা বিষয় তাকে ভেতর থেকে ভাবিয়ে তুলছিল।
তৌকির একজন সেনা কর্মকর্তা।
তার জীবন সাধারণ মানুষের মতো নয়। যেকোনো মুহূর্তে তাকে ডিউটিতে যেতে হতে পারে। কখনো দিনের পর দিন কোনো খবরও পাওয়া যায় না।
এই কথাগুলো ভাবলেই জুমার বুকের ভেতর অজানা ভয় জমে উঠত।
সেদিন বিকেলে জুমা হোটেলের বাগানে বসে ছিল। হাতে একটা বই, কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে একই পৃষ্ঠা খোলা।
মিতু এসে বলল,
—“কী হয়েছে?”
—“কিছু না।”
—“বইয়ের একই পৃষ্ঠা দশ মিনিট ধরে পড়ছিস।”
জুমা বইটা বন্ধ করে বলল,
—“মন বসছে না।”
মিতু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—“তৌকিরের কথা ভাবছিস?”
জুমা এবার আর অস্বীকার করল না।
—“হুম।”
—“কী নিয়ে?”
জুমা ধীরে বলল,
—“ওর জীবনটা খুব কঠিন।”
—“তুই ওকে নিয়ে চিন্তা করিস?”
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
জুমা কোনো উত্তর দিল না।
মিতু মৃদু হেসে বলল,
—“উত্তরটা তুই নিজেই জানিস।”
জুমা চুপ করে রইল।
অন্যদিকে তৌকিরের ক্যাম্পে সেদিন পরিবেশ বেশ ব্যস্ত। সীমান্তের কাছাকাছি একটি এলাকায় কিছু অস্বাভাবিক গতিবিধির খবর পাওয়া গেছে। তাই কয়েক দিনের জন্য বিশেষ টহল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তৌকিরের দায়িত্বও বাড়ল।
ব্রিফিং শেষে কমান্ডিং অফিসার বললেন,
—“তৌকির, আগামী কয়েকদিন তোমার ইউনিটকে খুব সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজন হলে রাতেও বের হতে হবে।”
তৌকির মাথা নেড়ে বলল,
—“জি, স্যার।”
তার মুখে দায়িত্বের দৃঢ়তা।
কিন্তু ব্রিফিং শেষ করে বাইরে আসতেই তার মনে পড়ল জুমার কথা।
গতকাল রাতে তাদের শেষ কথোপকথন।
“দুটোই।”
শাল আর জুমা—দুটোই ভালো।
তৌকির নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
কারণ সে জানত, এই পেশায় কাউকে কাছে টেনে নেওয়া মানে তাকে নিজের ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিয়ে আসা।
সন্ধ্যার দিকে জুমা বাজারে বের হয়েছিল।
হঠাৎ দূর থেকে তৌকিরকে দেখতে পেল।
সে দ্রুত এগিয়ে গেল।
—“তৌকির!”
তৌকির ঘুরে তাকাল।
জুমাকে দেখে তার মুখ নরম হয়ে গেল।
—“একা এসেছ?”
—“মিতু আছে।”
তৌকির চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—“আজ এখানে বেশি ভিড়। সাবধানে থাকবে।”
জুমা বলল,
—“আপনি কি কয়েকদিনের জন্য কোথাও যাচ্ছেন?”
তৌকির থেমে গেল।
—“কে বলেছে?”
—“আপনার মুখ দেখেই বুঝেছি।”
তৌকির মৃদু হেসে বলল,
—“কাজ আছে।”
—“কতদিন?”
—“জানি না।”
জুমার মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।
—“আপনি কি ফোন করবেন?”
তৌকির কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—“চেষ্টা করব।”
জুমা বলল,
—“চেষ্টা না। করবেন।”
তৌকির তার দিকে তাকাল।
—“ঠিক আছে। করব।”
জুমা এবার একটু হাসল।
—“প্রমিস?”
তৌকির মাথা নেড়ে বলল,
—“প্রমিস।”
ঠিক তখন তৌকিরের ফোন বেজে উঠল।
সে ফোনটা বের করে কিছুক্ষণ কথা বলল।
তার মুখের ভাব বদলে গেল।
জুমা বুঝতে পারল, ডিউটির ডাক এসেছে।
তৌকির ফোন রেখে বলল,
—“আমাকে যেতে হবে।”
—“এখনই?”
—“হ্যাঁ।”
জুমা মাথা নেড়ে বলল,
—“সাবধানে যাবেন।”
তৌকির কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—“তুমিও।”
এই প্রথম সে জুমাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করল।
জুমা চুপ করে তাকিয়ে রইল।
তৌকির দ্রুত চলে গেল।
জুমার চোখ তার চলে যাওয়ার দিকে স্থির হয়ে রইল।
পরদিন সকাল।
তৌকিরের কোনো ফোন নেই।
দুপুরেও নেই।
বিকেলেও নেই।
জুমা বারবার ফোনের স্ক্রিন দেখছিল।
কোনো মেসেজ নেই।
সে নিজেকে বোঝাল,
“ডিউটিতে আছে। সময় পাচ্ছে না।”
কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা বাড়তে লাগল।
মিতু বলল,
—“এত চিন্তা করিস না। নিশ্চয়ই কাজে ব্যস্ত।”
জুমা বলল,
—“জানি।”
কিন্তু তার গলার স্বরেই বোঝা যাচ্ছিল, সে জানে না।
রাত প্রায় বারোটার দিকে হঠাৎ ফোনে মেসেজ এল।
“আমি ঠিক আছি। চিন্তা করো না।”
জুমার চোখে সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তি ফিরে এল।
সে দ্রুত উত্তর দিল,
“এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?”
কিছুক্ষণ পর উত্তর—
“ডিউটিতে ছিলাম।”
—“ফোন করতে পারতেন।”
—“পারিনি।”
—“আমি অনেক চিন্তা করেছি।”
মেসেজ পাঠানোর পর জুমা থেমে গেল।
সে কি বেশি কিছু বলে ফেলল?
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর তৌকির লিখল—
“তুমি চিন্তা করেছ?”
জুমা কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল—
“হ্যাঁ।”
কয়েক মিনিট পর উত্তর এল—
“তাহলে আমি চেষ্টা করব যেন তোমাকে বেশি চিন্তা করতে না হয়।”
জুমার চোখ ভিজে উঠল।
সে বুঝতে পারছিল না কেন এই ছোট্ট কথাটা তার মনে এতটা জায়গা করে নিল।
কয়েকদিন পর তৌকির ফিরে এল।
জুমা তাকে দেখেই বুঝতে পারল, সে আগের চেয়ে ক্লান্ত।
চোখের নিচে হালকা কালো দাগ।
জুমা কাছে গিয়ে বলল,
—“আপনি ঠিক আছেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“মিথ্যা বলছেন।”
তৌকির মৃদু হাসল।
—“তুমি এখন আমার মুখও পড়তে শিখে গেছ?”
—“হ্যাঁ।”
—“খুব বিপদ।”
—“কেন?”
—“তাহলে আমার কিছুই আর লুকানো থাকবে না।”
জুমা কিছু বলল না।
তৌকির তার হাতে একটা ছোট প্যাকেট দিল।
—“তোমার জন্য।”
জুমা অবাক হয়ে খুলে দেখল—ছোট্ট কাঠের তৈরি একটি পাখি।
—“এটা কী?”
—“একটা গ্রামে পেয়েছিলাম।”
—“আমার জন্য কিনেছেন?”
—“হ্যাঁ।”
জুমার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—“আপনি আমাকে মনে করেছিলেন?”
তৌকির শান্ত গলায় বলল,
—“অনেকবার।”
কথাটা শুনে জুমা চুপ হয়ে গেল।
তৌকিরও বুঝতে পারল, সে হয়তো নিজের মনের কথা একটু বেশি প্রকাশ করে ফেলেছে।
দুজনের মাঝখানে নীরবতা নেমে এল।
কিন্তু সেই নীরবতাটা অস্বস্তির ছিল না।
বরং খুব আপন।
হঠাৎ দূর থেকে একজন সৈনিক এসে তৌকিরকে ডাকল।
—“স্যার, আপনাকে অফিসে ডাকছে।”
তৌকির মাথা নেড়ে জুমার দিকে তাকাল।
—“আমাকে যেতে হবে।”
জুমা এবার আগের মতো মন খারাপ করল না।
সে শুধু বলল,
—“ফিরে আসবেন তো?”
তৌকির থেমে গেল।
তারপর দৃঢ় গলায় বলল,
—“অবশ্যই।”
জুমা মৃদু হেসে বলল,
—“আমি অপেক্ষা করব।”
তৌকির কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর চলে গেল।
আর জুমা হাতে কাঠের ছোট্ট পাখিটা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তৌকির ফিরে আসার পর কয়েকটা দিন বেশ শান্তভাবেই কাটছিল। জুমা প্রতিদিন কোনো না কোনো অজুহাতে তার সঙ্গে দেখা করত। কখনো বাজারে, কখনো স্কুলের অনুষ্ঠানে, আবার কখনো ক্যাম্পের কাছের ছোট্ট চায়ের দোকানে।
তৌকিরও এখন আর জুমাকে দেখলে আগের মতো গম্ভীর হয়ে থাকত না।
বরং দূর থেকে জুমাকে দেখলেই তার চোখে এক ধরনের শান্তি ফুটে উঠত।
একদিন বিকেলে জুমা ক্যাম্পের কাছের একটা পাহাড়ি রাস্তা ধরে হাঁটছিল। হাতে সেই কাঠের পাখিটা। তৌকির তাকে দেখেই এগিয়ে এল।
—“এখানে একা?”
জুমা মুচকি হেসে বলল,
—“আপনি থাকলে একা কীভাবে?”
তৌকির কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—“তোমার কথা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।”
—“আপনার জন্যই।”
—“আমার জন্য?”
—“হ্যাঁ। আপনি আগে সবসময় বকতেন। এখন আর বকেন না। তাই আমিও সাহস পেয়েছি।”
তৌকির হেসে ফেলল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
পাহাড়ের ওপর তখন বিকেলের নরম আলো। দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়গুলো সোনালি রঙে ঝলমল করছে।
জুমা হঠাৎ বলল,
—“তৌকির।”
—“হুম?”
—“আপনার কি কখনো মনে হয়, আপনি ভুল পেশা বেছে নিয়েছেন?”
তৌকির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“না।”
—“একদমই না?”
—“না। ছোটবেলা থেকেই সেনাবাহিনীতে আসার ইচ্ছে ছিল।”
—“কিন্তু এই জীবনে তো অনেক ঝুঁকি।”
—“জানি।”
—“পরিবার ভয় পায় না?”
তৌকির এবার ধীরে বলল,
—“মা ভয় পান। কিন্তু আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন।”
জুমা নিচের দিকে তাকাল।
—“আপনার মা যদি কোনোদিন বলেন, চাকরি ছেড়ে দাও?”
তৌকির মৃদু হেসে বলল,
—“তাহলে খুব কঠিন পরিস্থিতি হবে।”
—“আপনি কী করবেন?”
—“দায়িত্ব আর পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজব।”
জুমা আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল।
তৌকিরের জীবনে কি কোনোদিন তার জন্য জায়গা হবে?
সেদিন সন্ধ্যায় জুমার বাবা ফোন করলেন।
জুমা বাবার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ। তিনি মেয়ের কণ্ঠ শুনেই বুঝতে পারেন, কিছু একটা বদলেছে।
—“জুমা, তোমার কণ্ঠটা এমন কেন?”
—“কেমন?”
—“কেমন যেন অন্যরকম।”
জুমা হেসে বলল,
—“কিছু হয়নি।”
—“কাশ্মীরের ভ্রমণ কেমন চলছে?”
—“ভালো।”
—“কোনো নতুন বন্ধু হয়েছে?”
প্রশ্নটা শুনে জুমা চুপ করে গেল।
তার বাবা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
—“কী হলো?”
—“হ্যাঁ… একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।”
—“ছেলে?”
জুমা উত্তর দিল না।
বাবা বুঝে গেলেন।
—“জুমা, তুমি জানো তো, সেনাবাহিনীর জীবন কত কঠিন?”
জুমা চমকে উঠল।
—“আপনি কীভাবে জানলেন?”
—“তোমার মা বলেছে, তুমি নাকি একজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা করেছ।”
জুমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“তৌকির খুব ভালো মানুষ।”
বাবার কণ্ঠ কঠিন হয়ে গেল।
—“ভালো মানুষ হওয়া আর তোমার জন্য ভালো জীবনসঙ্গী হওয়া এক কথা নয়।”
জুমা কিছু বলল না।
—“ওর জীবন অনিশ্চিত। আজ এখানে, কাল কোথায় থাকবে কেউ জানে না। তুমি কি সেই জীবন সামলাতে পারবে?”
জুমা ধীরে বলল,
—“আমি জানি না।”
—“তাহলে এখন থেকেই দূরত্ব রাখো।”
—“কিন্তু বাবা—”
—“আমি তোমার ভালো চাই, জুমা।”
ফোন কেটে গেল।
জুমা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তার চোখে পানি এসে গেল।
সে জানত, বাবা তাকে কষ্ট দিতে চান না।
কিন্তু তৌকিরকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতেই তার ভেতরটা অদ্ভুত শূন্য লাগছিল।
পরদিন তৌকির জুমার সঙ্গে দেখা করতে এল।
জুমা দূর থেকেই তাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
তৌকির অবাক হলো।
সে কাছে এসে বলল,
—“কী হয়েছে?”
—“কিছু না।”
—“তোমার মুখ বলছে কিছু হয়েছে।”
—“সবসময় মানুষের মুখ পড়তে হয়?”
—“তোমার ক্ষেত্রে হয়।”
জুমা চুপ করে রইল।
তৌকির একটু নরম গলায় বলল,
—“জুমা, আমার সঙ্গে কিছু হয়েছে?”
—“না।”
—“তাহলে আমার দিকে তাকাচ্ছ না কেন?”
জুমা এবার তাকাল।
তার চোখে কষ্ট স্পষ্ট।
তৌকির সেটা দেখে শান্ত হয়ে গেল।
—“বল।”
জুমা কিছুক্ষণ দ্বিধা করে বলল,
—“আপনার কি মনে হয়… আমাদের এই সম্পর্কটা কোথায় যাবে?”
তৌকির থমকে গেল।
—“আমাদের সম্পর্ক?”
জুমা মাথা নিচু করে বলল,
—“হ্যাঁ।”
তৌকিরের মুখে কোনো হাসি নেই।
সে ধীরে বলল,
—“তুমি কী বলতে চাইছ?”
জুমা সাহস করে বলল,
—“আমি আপনাকে পছন্দ করি।”
কথাটা বলেই সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
চারপাশে যেন হঠাৎ সবকিছু নীরব হয়ে গেল।
তৌকির অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না।
জুমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
অবশেষে তৌকির ধীরে বলল,
—“জুমা, তুমি কি জানো তুমি কী বলছ?”
—“হ্যাঁ।”
—“আমার জীবনটা সহজ নয়।”
—“জানি।”
—“আমাকে যেকোনো সময় ডিউটিতে যেতে হয়।”
—“জানি।”
—“কখনো তোমার সঙ্গে কথা বলার সময়ও পাব না।”
—“সেটাও জানি।”
তৌকির গভীরভাবে তার দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
—“তবুও?”
জুমা এবার মাথা তুলে তাকাল।
—“তবুও।”
তৌকিরের চোখে আবেগ ফুটে উঠল।
কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
—“তাহলে একটা কথা আমিও বলি।”
জুমা চুপ করে শুনতে লাগল।
—“তোমাকে প্রথম দিন থেকেই আলাদা মনে হয়েছে।”
জুমার চোখে বিস্ময়।
তৌকির বলল,
—“প্রথম দিন তুমি আমার সঙ্গে তর্ক করেছিলে। তারপর বারবার বিপদে পড়েছ। তোমাকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে কখন যে তুমি আমার প্রতিদিনের চিন্তার একটা অংশ হয়ে গেছ, বুঝতেই পারিনি।”
জুমার চোখ ভিজে উঠল।
তৌকির বলল,
—“আমি তোমাকে পছন্দ করি, জুমা।”
জুমার মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল।
তাদের মধ্যে কোনো বড় প্রতিশ্রুতি হলো না।
শুধু দুজন মানুষ প্রথমবার নিজেদের মনের কথাটা স্পষ্ট করে বলল।
কিন্তু আনন্দটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
তৌকিরের ফোন বেজে উঠল।
সে ফোন ধরতেই তার মুখ বদলে গেল।
—“জি, স্যার।”
কিছুক্ষণ শুনে সে বলল,
—“আমি এখনই রওনা হচ্ছি।”
ফোন কেটে সে জুমার দিকে তাকাল।
—“আমাকে যেতে হবে।”
জুমার হাসি মিলিয়ে গেল।
—“আবার?”
—“হ্যাঁ। জরুরি দায়িত্ব।”
—“কতদিন?”
—“জানি না।”
জুমা এবার কিছু বলল না।
তৌকির বলল,
—“আমি ফিরে আসব।”
জুমা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—“আমি অপেক্ষা করব।”
তৌকির চলে গেল।
জুমা অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
তার হাতে তখনও সেই কাঠের পাখিটা।
সে পাখিটা শক্ত করে ধরে মনে মনে শুধু একটা কথাই ভাবল—
তাদের সম্পর্কের শুরুটা যত সুন্দর, সামনে পথটা কি ততটাই কঠিন হতে চলেছে?
তৌকির চলে যাওয়ার পর তিন দিন কেটে গেল।
এই তিন দিনে জুমার সঙ্গে তার মাত্র দুবার কথা হয়েছে। তাও খুব অল্প সময়ের জন্য।
প্রথম দিন রাতে তৌকির ফোন করে বলেছিল,
—“আমি ভালো আছি। তুমি চিন্তা করো না।”
জুমা বলেছিল,
—“আপনি ঠিকমতো খাচ্ছেন তো?”
তৌকির হেসে উত্তর দিয়েছিল,
—“তুমি এখন আমার মায়ের মতো কথা বলো।”
জুমা হেসেছিল।
কিন্তু ফোন কেটে যাওয়ার পর সেই হাসিটা আর থাকেনি।
কারণ সে জানত, তৌকিরের জীবনে কখন কী ঘটে যায়, কেউ জানে না।
তৃতীয় দিনের সকালে জুমার বাবা তাকে ফোন করলেন।
—“তুমি কবে বাড়ি ফিরছ?”
—“আর দুই দিন পর।”
—“ফিরে এসো। তোমার সঙ্গে কথা আছে।”
বাবার গলার স্বর শুনেই জুমা বুঝতে পারল, বিষয়টা তৌকিরকে নিয়েই।
দুই দিন পর জুমা ঢাকায় ফিরে এল।
বাড়িতে ঢুকেই বুঝতে পারল পরিবেশটা অন্যরকম।
বাবা ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন। মুখ গম্ভীর।
জুমা কাছে গিয়ে বলল,
—“বাবা, আমাকে ডাকছিলে?”
—“বসো।”
জুমা বাবার সামনে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বাবা বললেন,
—“তৌকিরের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কতদূর?”
জুমা চমকে গেল।
—“বাবা…”
—“আমি জানতে চাই।”
জুমা মাথা নিচু করে বলল,
—“আমরা একে অপরকে পছন্দ করি।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“আমি জানতাম।”
—“আপনি রাগ করেছেন?”
—“রাগ করিনি। কিন্তু আমি এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারছি না।”
জুমার চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
—“কেন?”
—“কারণ ছেলেটা সেনাবাহিনীতে। তার জীবন ঝুঁকিপূর্ণ।”
—“সে নিজের দায়িত্ব পালন করে।”
—“আমি জানি।”
—“তাহলে সমস্যা কোথায়?”
বাবা এবার কঠিন গলায় বললেন,
—“সমস্যা হলো, তুমি আমার মেয়ে। আমি চাই না তোমার স্বামী প্রতিদিন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বাইরে থাকুক।”
জুমা ধীরে বলল,
—“সব পেশাতেই তো ঝুঁকি আছে।”
—“কিন্তু ওর পেশার ঝুঁকি অন্যরকম।”
—“তবুও আমি ওকে বুঝতে চাই।”
বাবা মাথা নেড়ে বললেন,
—“তুমি এখন আবেগ দিয়ে ভাবছ।”
—“আমি শুধু আবেগ দিয়ে ভাবছি না।”
—“তাহলে বাস্তবতা বোঝো। আজ ও তোমার পাশে আছে। কাল যদি দীর্ঘদিন দূরে থাকে? যদি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ না থাকে? যদি কোনোদিন…”
বাবা বাক্যটা শেষ করলেন না।
কিন্তু জুমা বুঝে গেল তিনি কী বলতে চাইছেন।
তার চোখে পানি এসে গেল।
—“বাবা, এমন কথা বলো না।”
—“আমি ভয় দেখাচ্ছি না। বাস্তবতা বলছি।”
জুমা উঠে নিজের ঘরে চলে গেল।
দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, সবাই কেন শুধু তৌকিরের পেশার ঝুঁকিটাই দেখছে?
কেউ কি দেখছে না, মানুষটা কতটা সৎ, দায়িত্ববান আর যত্নশীল?
সেদিন রাতে তৌকির ফোন করল।
—“কেমন আছ?”
জুমা চুপ করে রইল।
তৌকির সঙ্গে সঙ্গে বুঝল কিছু হয়েছে।
—“কী হয়েছে?”
—“বাবা আমাদের সম্পর্কের কথা জেনে গেছে।”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
—“তারপর?”
—“তিনি আমাদের সম্পর্ক মেনে নিতে চান না।”
তৌকির ধীরে শ্বাস নিল।
—“আমি বুঝতে পারছি।”
—“আপনি কি কিছু বলবেন না?”
—“তোমার বাবার চিন্তাটা অস্বাভাবিক নয়।”
জুমা কষ্ট পেয়ে বলল,
—“আপনিও কি ভাবছেন, আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত?”
—“না।”
—“তাহলে?”
তৌকির শান্ত গলায় বলল,
—“আমি চাই না তোমার পরিবারকে কষ্ট দিয়ে তোমাকে নিজের জীবনে আনতে।”
জুমা বলল,
—“আমি কী চাই, সেটা কি গুরুত্বপূর্ণ নয়?”
—“অবশ্যই।”
—“তাহলে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাববেন না।”
তৌকির চুপ করে রইল।
জুমা বলল,
—“আপনি আমাকে বলেছিলেন, আমি চাইলে আপনি চেষ্টা করবেন।”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে এবারও চেষ্টা করুন।”
তৌকিরের কণ্ঠ নরম হয়ে গেল।
—“করব।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর তৌকির অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তার সামনে ছিল দুইটা পথ।
একদিকে জুমার পরিবারকে সম্মান করা।
অন্যদিকে নিজের অনুভূতিকে ধরে রাখা।
সে জানত, শুধু ভালো লাগা দিয়ে একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না।
বিশ্বাস আর দায়িত্বও দরকার।
কয়েকদিন পর তৌকির ঢাকায় এল।
সে প্রথমে জুমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে চাইল।
জুমা ভয় পাচ্ছিল।
—“বাবা হয়তো আপনার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলবেন না।”
তৌকির বলল,
—“তবুও আমাকে যেতে হবে।”
—“আপনি ভয় পাচ্ছেন না?”
তৌকির মৃদু হেসে বলল,
—“যুদ্ধের মাঠে ভয় পেলে দায়িত্ব পালন করা যায় না। আর তোমার বাবার সামনে তো শুধু সত্যি কথাই বলতে হবে।”
জুমার চোখে পানি চলে এল।
—“আপনি আমাকে এতটা গুরুত্ব দেন?”
তৌকির বলল,
—“তুমি কি এখনও সেটা বুঝতে পারোনি?”
জুমা আর কিছু বলতে পারল না।
সন্ধ্যায় তৌকির জুমাদের বাড়িতে গেল।
জুমার বাবা তাকে বসতে বললেন।
—“তুমি জানো কেন তোমাকে ডেকেছি?”
—“জি।”
—“তুমি আমার মেয়েকে পছন্দ করো?”
—“জি।”
—“বিয়ে করতে চাও?”
তৌকির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“জি, চাই। তবে আপনার সম্মতি ছাড়া নয়।”
জুমার বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।
—“তুমি কি জানো তোমার পেশা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?”
—“জি।”
—“তাহলে আমার মেয়েকে এমন জীবনে কেন টানতে চাও?”
তৌকির ধীরে বলল,
—“কারণ আমি তাকে কোনো স্বপ্ন দেখিয়ে ভুল পথে নিতে চাই না। আমি তাকে আমার জীবনের বাস্তবতাই জানাব। সিদ্ধান্তটা তার।”
বাবা বললেন,
—“তুমি কি চাকরি ছেড়ে দেবে?”
প্রশ্নটা শুনে তৌকির থেমে গেল।
—“না।”
জুমার বাবা বললেন,
—“তাহলে আমি এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারব না।”
তৌকির মাথা নিচু করল।
—“আমি আপনার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি।”
সে উঠে দাঁড়াল।
ঠিক তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জুমা সব শুনে ফেলল।
তার চোখে পানি।
তৌকির বেরিয়ে যাওয়ার সময় জুমার দিকে তাকাল।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
কেউ কিছু বলল না।
তৌকির শুধু মাথা নেড়ে বাইরে চলে গেল।
জুমা বাবার দিকে ফিরে বলল,
—“তুমি ওকে এত সহজে ফিরিয়ে দিলে?”
বাবা বললেন,
—“আমি তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি।”
জুমা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“কিন্তু আমার ভবিষ্যৎটা আমি কার সঙ্গে চাই, সেটা কি একবারও জানতে চাইলে না?”
বাবা চুপ করে গেলেন।
জুমা নিজের ঘরে চলে গেল।
রাতে তৌকিরের ফোনে জুমার মেসেজ এল—
“আপনি কি হাল ছেড়ে দেবেন?”
তৌকির অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল—
“না।”
জুমা আবার লিখল—
“যতদিন না বাবা রাজি হন?”
তৌকির উত্তর দিল—
“যতদিন তুমি আমার পাশে থাকতে চাও।”
জুমার চোখ ভিজে উঠল।
সে লিখল—
“আমি থাকব।”
পরদিন ভোরেই তৌকিরের ক্যাম্পে জরুরি নির্দেশ এসে পৌঁছাল।
সীমান্তের কাছের একটি দুর্গম এলাকায় কয়েকজন সাধারণ মানুষ আটকা পড়েছে। আবহাওয়া খারাপ, রাস্তার অবস্থা বিপজ্জনক। তাদের নিরাপদে বের করে আনার জন্য একটি বিশেষ দল পাঠানো হবে।
দলের নেতৃত্বে থাকবে তৌকির।
আদেশ হাতে নিয়ে তৌকির কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মাথায় প্রথমেই জুমার কথা এল।
জুমাকে সে কথা দিয়েছিল, কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যাওয়ার আগে তাকে জানাবে।
কিন্তু এবার সময় খুব কম।
রাফি এসে বলল,
—“স্যার, প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।”
তৌকির মাথা নেড়ে বলল,
—“হ্যাঁ। সবাইকে প্রস্তুত হতে বলো।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের ফোনটা বের করল।
জুমার নম্বরটা স্ক্রিনে জ্বলছে।
কল করবে কি না, কিছুক্ষণ ভাবল।
শেষ পর্যন্ত ফোন করল।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই জুমা ফোনটা হাতে নিয়েছিল।
তৌকিরের নাম দেখে তার বুকটা ধক করে উঠল।
—“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে তৌকিরের শান্ত কণ্ঠ।
—“ঘুম ভেঙে দিয়েছি?”
—“না। আমি এমনিতেই উঠেছি।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর তৌকির বলল,
—“জুমা, আমাকে একটা কাজে যেতে হবে।”
জুমার বুকটা কেমন করে উঠল।
—“কোথায়?”
—“দুর্গম একটা এলাকায়। কয়েকজন মানুষ আটকা পড়েছে।”
—“কতদিনের জন্য?”
—“নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।”
জুমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—“সাবধানে যাবেন।”
তৌকির হালকা হেসে বলল,
—“এতটুকুই?”
—“আর কী বলব?”
—“তুমি সাধারণত অনেক কথা বলো।”
জুমা এবার হেসে ফেলল।
—“ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন?”
—“না।”
—“তাহলে ফিরে এসে ফোন করবেন।”
—“করব।”
—“প্রমিস?”
—“প্রমিস।”
জুমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“তৌকির?”
—“হুম?”
—“আপনি ফিরে এলে… বাবার সঙ্গে আবার কথা বলবেন?”
তৌকিরের কণ্ঠ একটু নরম হয়ে গেল।
—“হ্যাঁ। আমি হাল ছাড়িনি।”
জুমার চোখ ভিজে উঠল।
—“আমিও না।”
ফোন কেটে গেল।
জুমা অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
অন্যদিকে তৌকির প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
রাফি তার ব্যাগ গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
—“স্যার, একটা কথা?”
—“বলো।”
—“জুমা ম্যাডামের সঙ্গে কথা হয়েছে?”
তৌকির মৃদু হেসে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“আপনি ফিরলে মনে হয় অনেক কিছু বদলে যাবে।”
তৌকির জিজ্ঞেস করল,
—“কীভাবে?”
—“আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আপনি এবার সত্যিই কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”
তৌকির কিছু বলল না।
তার চোখে দৃঢ়তা।
—“ফিরে গিয়ে প্রথম কাজ হবে জুমার বাবার সঙ্গে আবার কথা বলা।”
রাফি মাথা নেড়ে বলল,
—“তাহলে আগে ফিরতে হবে।”
তৌকির হেসে বলল,
—“অবশ্যই।”
দুপুরের দিকে তৌকিরদের দল রওনা হলো।
পাহাড়ি রাস্তা যত ওপরে উঠছিল, ততই আবহাওয়া খারাপ হচ্ছিল। কুয়াশায় কয়েক হাত দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না।
তৌকির বারবার সবাইকে সতর্ক করছিল।
—“কেউ দল থেকে আলাদা হবে না।”
কিছুদূর যাওয়ার পর তারা আটকে পড়া মানুষগুলোর অবস্থান জানতে পারল।
একটি ছোট পাহাড়ি বাড়ির ভেতরে কয়েকজন মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিল একজন বৃদ্ধ, দুইজন নারী এবং কয়েকটি শিশু।
তৌকির দ্রুত সবাইকে নিরাপদ জায়গায় নেওয়ার ব্যবস্থা করল।
একটি ছোট মেয়ে ভয়ে কাঁদছিল।
তৌকির তার কাছে বসে বলল,
—“ভয় পেয়ো না। আমরা তোমাদের বাড়ি পৌঁছে দেব।”
মেয়েটা চোখ মুছে বলল,
—“আপনি সত্যি নিয়ে যাবেন?”
—“হ্যাঁ।”
মেয়েটা তৌকিরের হাত ধরে ফেলল।
সেই মুহূর্তে তৌকিরের মনে জুমার কথা এল।
জুমাও তো এমনই করে তার ওপর বিশ্বাস রেখেছে।
সে মনে মনে বলল,
“আমাকে ফিরতেই হবে।”
সন্ধ্যার পর ফেরার সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে গেল।
হঠাৎ পাহাড়ের ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে রাস্তার একটা অংশ বন্ধ হয়ে গেল।
দল থেমে গেল।
রাফি বলল,
—“স্যার, সামনে রাস্তা বন্ধ।”
তৌকির চারপাশ দেখে বলল,
—“অন্য পথ খুঁজতে হবে।”
সময় যত যাচ্ছিল, আবহাওয়া তত খারাপ হচ্ছিল।
তাদের সঙ্গে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে কয়েকজন খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
তৌকির সবাইকে সাহস দিয়ে বলল,
—“আর একটু। আমরা নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে যাব।”
রাত গভীর হওয়ার আগেই তারা বিকল্প একটি পথ খুঁজে পেল।
অবশেষে অনেক কষ্টে সবাইকে নিরাপদ ক্যাম্পে নিয়ে আসা হলো।
কিন্তু তৌকিরের নিজের ফোনটি তখন আর কাজ করছিল না।
ব্যাটারি শেষ।
জুমাকে সে আর ফোন করতে পারল না।
ঢাকায় বসে জুমা বারবার ফোন করছিল।
ফোন বন্ধ।
প্রথমে সে নিজেকে বোঝাল, হয়তো নেটওয়ার্ক নেই।
এক ঘণ্টা।
দুই ঘণ্টা।
তিন ঘণ্টা।
ফোন এখনও বন্ধ।
জুমা জানালার পাশে বসে রইল।
মা এসে বললেন,
—“কী হয়েছে?”
জুমা মাথা নেড়ে বলল,
—“কিছু না।”
কিন্তু তার চোখে উদ্বেগ স্পষ্ট।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জুমার বাবা মেয়ের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তিনি দেখলেন, জুমা চুপচাপ বসে আছে।
বাবা বললেন,
—“তৌকিরের কোনো খবর পেয়েছ?”
জুমা মাথা নেড়ে বলল,
—“না।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“চিন্তা করো না। সেনাবাহিনীতে এমন হয়।”
জুমা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
—“আপনি এতদিন তো বলতেন, এই জীবন খুব অনিশ্চিত।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“বলেছি।”
—“তাহলে আজ আপনি আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন কেন?”
বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।
কিছুক্ষণ পর ধীরে বললেন,
—“কারণ আজ বুঝতে পারছি, তুই ওকে কতটা বিশ্বাস করিস।”
জুমার চোখে পানি এসে গেল।
বাবা বললেন,
—“আমি এখনও সবকিছু মেনে নিইনি। কিন্তু তোর কষ্টটাও আমি বুঝতে পারছি।”
জুমা বাবার হাত ধরে বলল,
—“আমি ওর জন্য ভয় পাই, বাবা। কিন্তু ওকে ছেড়ে দিতে চাই না।”
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
—“দেখা যাক।”
পরদিন সকাল।
জুমার ফোনে হঠাৎ একটা কল এল।
অচেনা নম্বর।
সে দ্রুত ফোন ধরল।
—“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ—
—“আমি তৌকির।”
জুমার চোখ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—“আপনি ঠিক আছেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনার ফোন বন্ধ ছিল কেন?”
—“ব্যাটারি শেষ হয়ে গিয়েছিল।”
জুমা রাগে আর স্বস্তিতে একসঙ্গে বলল,
—“আপনি জানেন আমি কতটা চিন্তা করেছি?”
—“জানি।”
—“আর করবেন না এমন।”
—“চেষ্টা করব।”
—“চেষ্টা না।”
তৌকির হেসে বলল,
—“ঠিক আছে। এবার থেকে আরও সাবধান হব।”
জুমা চোখ মুছে বলল,
—“কবে ফিরবেন?”
—“খুব শিগগির।”
—“আমি অপেক্ষা করব।”
তৌকির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আমিও তোমার সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় আছি।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর জুমা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
কিছুক্ষণ পর তার বাবা ঘরে এলেন।
—“ওর সঙ্গে কথা হয়েছে?”
—“হ্যাঁ।”
—“ভালো আছে?”
—“হ্যাঁ।”
বাবা মাথা নেড়ে বললেন,
—“তাহলে ও ফিরে আসুক।”
জুমা অবাক হয়ে তাকাল।
—“তারপর?”
বাবা বললেন,
—“তারপর তোমাদের দুজনের সঙ্গে বসে কথা বলব।”
জুমার চোখে আশার আলো ফুটে উঠল।
কয়েকদিন পর তৌকির সত্যিই ফিরে এল।
ক্লান্ত শরীর নিয়ে ক্যাম্পে পৌঁছেই সে প্রথমে মাকে ফোন করল।
তারপর জুমাকে।
—“আমি ফিরে এসেছি।”
ওপাশে জুমার হাসি শোনা গেল।
—“জানি।”
—“কীভাবে?”
—“আপনার কণ্ঠ শুনেই বুঝেছি।”
তৌকির হেসে বলল,
—“তাহলে কাল দেখা হবে?”
জুমা বলল,
—“হবে।”
কিন্তু সেই দেখা হওয়ার আগেই তৌকিরের জীবনে আরেকটি খবর এল।
তার ইউনিট থেকে জানানো হলো—
তাকে খুব শিগগিরই দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বে অন্য একটি জায়গায় পাঠানো হতে পারে।
তৌকিরের বদলির খবরটা জুমাকে জানানো হলো তার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই।
ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার সময় তৌকির নিজেই জানত না কীভাবে কথাটা জুমাকে বলবে।
কয়েক মাসের জন্য অন্য একটি এলাকায় দায়িত্ব।
কাজটা গুরুত্বপূর্ণ।
না বলার সুযোগ নেই।
কিন্তু জুমাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর কথা মনে পড়তেই তার বুকটা ভারী হয়ে উঠছিল।
সন্ধ্যায় তারা দেখা করল সেই পাহাড়ি লেকের পাশে, যেখানে কয়েক সপ্তাহ আগে প্রথমবার দুজন নিজেদের মনের কথা বলেছিল।
জুমা দূর থেকে তৌকিরকে দেখে হাসল।
—“আপনাকে আজ বেশ চুপচাপ লাগছে।”
তৌকির বলল,
—“তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।”
জুমার হাসি একটু থেমে গেল।
—“কী কথা?”
তৌকির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
—“আমাকে বদলি করা হয়েছে।”
জুমা চুপ।
—“কোথায়?”
—“দূরের একটা এলাকায়। কয়েক মাসের দায়িত্ব।”
জুমা নিচের দিকে তাকাল।
—“কত মাস?”
—“সম্ভবত ছয় মাস। হয়তো তারও বেশি।”
জুমা ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখে কষ্ট স্পষ্ট।
—“এতদিন?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনি কি যেতে চান?”
তৌকির বলল,
—“এটা আমার দায়িত্ব।”
—“আমি জানি।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে থাকল।
জুমা হঠাৎ বলল,
—“তাহলে আমাদের কী হবে?”
তৌকির তার দিকে তাকাল।
—“আমাদের কিছু হবে না।”
—“আপনি এত সহজে বলছেন?”
—“কারণ আমি বিশ্বাস করি।”
—“কিন্তু ছয় মাস অনেক সময়।”
—“আমি জানি।”
—“আপনি কি আমাকে ভুলে যাবেন?”
তৌকিরের চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
সে ধীরে বলল,
—“তুমি কি সত্যিই মনে করো আমি তোমাকে এত সহজে ভুলে যেতে পারি?”
জুমার চোখ ভিজে উঠল।
—“আমি জানি না।”
তৌকির তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমি জানি।”
জুমা কিছু বলল না।
তৌকির বলল,
—“আমি তোমাকে একটা কথা দিতে পারি।”
—“কী?”
—“দূরত্ব যতই হোক, আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না।”
জুমা ফিসফিস করে বলল,
—“বাবা এখনও রাজি নন।”
—“জানি।”
—“তবুও?”
—“তবুও।”
পরদিন তৌকির জুমার বাবার সঙ্গে আবার দেখা করল।
এইবার তার সঙ্গে ছিল তার মা।
জুমার বাবা তাদের সম্মানের সঙ্গে বসালেন।
তৌকিরের মা বললেন,
—“আমি জানি, আপনার ভয়টা অমূলক নয়। আমার ছেলের পেশা সত্যিই কঠিন।”
জুমার বাবা চুপ করে শুনছিলেন।
—“কিন্তু আমি আমার ছেলেকে কখনো দায়িত্ব থেকে সরতে বলিনি। কারণ দেশকে দেওয়া দায়িত্ব তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি জুমার দিকে তাকালেন।
—“আর জুমার সিদ্ধান্তকেও আমি সম্মান করি।”
তৌকিরের মা ধীরে বললেন,
—“আপনি যদি ভয় পান, আমিও একজন মা হিসেবে সেই ভয় বুঝি। কিন্তু শুধু ভয় দিয়ে তো জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।”
ঘরটা কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল।
তারপর জুমার বাবা তৌকিরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তুমি কি আমার মেয়েকে সুখী রাখতে পারবে?”
তৌকির সোজা হয়ে বসে বলল,
—“আমি চেষ্টা করব। কিন্তু আমি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেব না। আমার জীবন সবসময় সহজ হবে না। হয়তো অনেক সময় দূরে থাকতে হবে। কিন্তু আমি জুমাকে কখনো অন্ধকারে রাখব না।”
বাবা বললেন,
—“আর যদি তোমার দায়িত্বের কারণে ওকে একা থাকতে হয়?”
—“তাহলে যতটা সম্ভব পাশে থাকার চেষ্টা করব।”
—“আর যদি কোনোদিন ও তোমার পেশার কারণে ভয় পায়?”
তৌকির বলল,
—“তাহলে আমি ওর ভয়কে ছোট করব না। বুঝিয়ে বলব।”
জুমার বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
শেষে বললেন,
—“আমি এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নই।”
জুমার মুখ মলিন হয়ে গেল।
কিন্তু তিনি পরের কথাটা বললেন,
—“তবে তোমাদের সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করব না।”
জুমা বিস্ময়ে বাবার দিকে তাকাল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ। আমি শুধু চাই, তোমরা দুজনেই ভালোভাবে ভেবে সিদ্ধান্ত নাও।”
তৌকির মাথা নত করল।
—“ধন্যবাদ।”
কয়েকদিন পর তৌকিরের যাওয়ার দিন চলে এল।
ভোরে ক্যাম্প থেকে গাড়ি ছাড়বে।
জুমা শেষবারের মতো তার সঙ্গে দেখা করতে এল।
তার হাতে একটা ছোট প্যাকেট।
তৌকির বলল,
—“এটা কী?”
—“খুলে দেখুন।”
প্যাকেট খুলে তৌকির দেখল, ভেতরে একটা ছোট ডায়েরি।
প্রথম পাতায় লেখা—
“যখন আমাকে মনে পড়বে, এখানে লিখবেন।”
তৌকির কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“তুমি আমাকে কাঁদাবে নাকি?”
জুমা মৃদু হেসে বলল,
—“আপনি তো খুব শক্ত মানুষ।”
—“সবসময় না।”
জুমার চোখ ভিজে উঠল।
তৌকির বলল,
—“কাঁদবে না।”
—“আমি কাঁদছি না।”
—“তোমার চোখ বলছে অন্য কথা।”
জুমা চোখ মুছে বলল,
—“আপনি ফিরে আসবেন তো?”
তৌকির এবার কোনো মজা করল না।
সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমি ফিরব।”
—“প্রমিস?”
—“প্রমিস।”
জুমা ধীরে বলল,
—“তাহলে আমিও অপেক্ষা করব।”
তৌকির তার হাতে একটা ছোট কাঠের পাখি দিল।
একই রকম আরেকটা।
—“এটা আমার কাছে থাকবে।”
জুমা অবাক হয়ে বলল,
—“দুটো?”
—“একটা তোমার কাছে, একটা আমার কাছে।”
—“কেন?”
—“যতদিন দূরে থাকব, ততদিন মনে হবে আমরা একই জিনিস ধরে আছি।”
জুমা চোখ মুছে হেসে ফেলল।
তৌকির গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
কয়েক পা যাওয়ার পর আবার ফিরে তাকাল।
জুমা তখনও দাঁড়িয়ে।
তৌকির হাত তুলে ইশারা করল।
জুমাও হাত নাড়ল।
গাড়ি ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল।
দিন কেটে যেতে লাগল।
প্রথম মাসে তৌকির প্রায় প্রতিদিন ফোন করত।
দ্বিতীয় মাসে কাজের চাপ বাড়ল।
তবুও সে সুযোগ পেলেই মেসেজ পাঠাত।
জুমাও তার ডায়েরিতে প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখত।
“আজ তোমাকে খুব মনে পড়েছে।”
“আজ বাবার সঙ্গে তোমার কথা হয়েছে।”
“আজ তোমার মা ফোন করেছিলেন।”
“আজ পাহাড়ের ছবি দেখলাম। মনে হলো তুমি পাশে আছ।”
তৃতীয় মাসে একদিন হঠাৎ তৌকিরের ফোন বন্ধ পাওয়া গেল।
একদিন।
দুইদিন।
তিনদিন।
জুমা নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করল, নিশ্চয়ই কাজে ব্যস্ত।
কিন্তু চতুর্থ দিনেও কোনো খবর এল না।
পঞ্চম দিন রাতে জুমার বাবা তার ঘরে এসে দাঁড়ালেন।
মেয়ের হাতে ফোন দেখে তিনি বুঝলেন, আবার অপেক্ষা করছে।
তিনি কিছু না বলে পাশে বসলেন।
জুমা ফিসফিস করে বলল,
—“বাবা, আমার ভয় করছে।”
বাবা তার হাত ধরলেন।
—“সবসময় খারাপ কিছু ভাবিস না।”
—“কিন্তু ও ফোন করছে না।”
বাবা এবার কোনো উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখনই জুমার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
জুমা কাঁপা হাতে ফোন ধরল।
—“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে অপরিচিত একজনের কণ্ঠ—
—“আপনি কি জুমা?”
—“জি।”
—“আমি তৌকিরের ইউনিট থেকে বলছি।”
জুমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
—“তৌকির কোথায়?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর লোকটি বলল,
—“আপনাকে শান্ত থাকতে হবে…”
জুমার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তার বাবা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।
আর জুমার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরতে লাগল—
“তৌকির… ঠিক আছে তো?”
জুমার হাত কাঁপছিল।
ফোনের ওপাশের মানুষটি কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর বলল,
—“আপনি চিন্তা করবেন না। ক্যাপ্টেন তৌকির নিরাপদে আছেন।”
জুমা যেন হঠাৎ নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেল।
—“তাহলে ফোন বন্ধ কেন? কী হয়েছে?”
—“একটি অভিযানের সময় তার ফোনটি নষ্ট হয়ে গেছে। এরপর যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। তিনি কিছুটা আহত হয়েছেন, তবে এখন চিকিৎসাধীন এবং বিপদের বাইরে।”
জুমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—“আমি কি ওর সঙ্গে কথা বলতে পারব?”
—“এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। তবে খুব শিগগিরই কথা বলতে পারবেন।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর জুমা কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল।
তার বাবা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
—“কী হয়েছে?”
জুমা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“ও ভালো আছে, বাবা।”
বাবা গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
—“আলহামদুলিল্লাহ।”
জুমা বাবার হাত ধরে বলল,
—“আমি ওকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম।”
বাবা এবার মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
—“তুই ওকে সত্যিই অনেকটা ভালোবেসে ফেলেছিস।”
জুমা কোনো উত্তর দিল না।
তার চোখের পানি যেন সব উত্তর দিয়ে দিল।
তিন দিন পর তৌকির নিজেই ফোন করল।
ফোন ধরতেই জুমা কোনো কথা বলতে পারল না।
ওপাশ থেকে তৌকির বলল,
—“জুমা?”
জুমা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“আপনি আমাকে এত ভয় দেখালেন কেন?”
তৌকির মৃদু হেসে বলল,
—“ইচ্ছে করে করিনি।”
—“আমি পাঁচ দিন ঠিকমতো ঘুমাইনি।”
—“সরি।”
—“শুধু সরি?”
—“আর কী বলব?”
—“বলবেন, আর কখনো আমাকে এভাবে ভয় দেখাবেন না।”
তৌকির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“চেষ্টা করব।”
জুমা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আবার চেষ্টা!”
তৌকির হেসে ফেলল।
—“ঠিক আছে। যতটা সম্ভব তোমাকে চিন্তামুক্ত রাখব।”
জুমা এবার একটু শান্ত হলো।
—“আপনি কেমন আছেন?”
—“কিছুটা বিশ্রাম নিচ্ছি।”
—“ব্যথা করছে?”
—“একটু।”
—“ডাক্তারের কথা শুনছেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“ওষুধ ঠিকমতো খাচ্ছেন?”
—“হ্যাঁ, মা।”
জুমা হেসে ফেলল।
—“আমাকে মা বলবেন না।”
—“কেন?”
—“আমার বয়স কম।”
—“তুমি তো এমনভাবে কথা বলো!”
দুজনেই হেসে ফেলল।
অনেকদিন পর সেই হাসিটা দুজনের মনেই শান্তি এনে দিল।
কয়েক সপ্তাহ পর তৌকির পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ঢাকায় ফিরল।
জুমা তাকে দেখতে গেল।
দূর থেকে তৌকিরকে দেখেই তার চোখ ভিজে উঠল।
তৌকির বলল,
—“কাঁদবে না।”
জুমা বলল,
—“আমি কাঁদছি না।”
—“তাহলে চোখে পানি কেন?”
—“আপনাকে দেখে চোখে পানি চলে এসেছে।”
তৌকির কিছু বলল না।
শুধু মৃদু হেসে বলল,
—“আমি তো ফিরে এসেছি।”
জুমা ধীরে বলল,
—“হ্যাঁ। এবার সত্যিই ফিরেছেন।”
তৌকির তার হাতে সেই কাঠের পাখিটা দিল।
—“তোমারটা এখনও আছে?”
জুমা ব্যাগ থেকে নিজের পাখিটা বের করল।
দুটো পাশাপাশি রেখে বলল,
—“একটুও হারাইনি।”
তৌকিরের চোখে আবেগ ফুটে উঠল।
—“আমিও না।”
কয়েকদিন পর তৌকির আবার জুমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেল।
এইবার তার চোখে আগের চেয়ে বেশি দৃঢ়তা।
জুমার বাবা তাকে বসতে বললেন।
—“তোমার খবর আমি পেয়েছি।”
—“জি।”
—“তুমি আহত হয়েছিলে।”
—“সামান্য।”
—“জুমা খুব ভয় পেয়েছিল।”
তৌকির মাথা নিচু করল।
—“আমি জানি।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“আমি অনেক ভেবেছি।”
তৌকির তাকাল।
—“আমি এখনও তোমার পেশাকে ভয় পাই।”
—“আমি বুঝি।”
—“কিন্তু আমি এটাও বুঝেছি, মানুষকে শুধু তার পেশা দিয়ে বিচার করা যায় না।”
তৌকির চুপ করে শুনছিল।
বাবা বললেন,
—“তুমি আমার মেয়েকে সম্মান করো। তার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দাও। আর সবচেয়ে বড় কথা, তুমি কখনো আমাকে এড়িয়ে গিয়ে কিছু করতে চাওনি।”
তৌকিরের চোখে স্বস্তি ফুটে উঠল।
—“তাহলে?”
জুমার বাবা মৃদু হেসে বললেন,
—“তোমাদের সম্পর্কের জন্য আমার আর আপত্তি নেই।”
তৌকির মাথা নত করে বলল,
—“ধন্যবাদ।”
ঠিক তখন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা জুমার চোখে পানি এসে গেল।
বাবা তাকে দেখে বললেন,
—“কী দাঁড়িয়ে আছিস? ভেতরে আয়।”
জুমা ছুটে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
—“ধন্যবাদ, বাবা।”
বাবা বললেন,
—“আমার একটা শর্ত আছে।”
জুমা অবাক হয়ে তাকাল।
—“কী?”
—“তুই পড়াশোনা শেষ করবি। নিজের স্বপ্নও পূরণ করবি।”
জুমা হাসল।
—“অবশ্যই।”
তৌকির বলল,
—“আমি নিজেও চাই ও নিজের স্বপ্ন পূরণ করুক।”
জুমার বাবা তৌকিরের দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্ট হলেন।
কয়েক মাস পর তাদের বিয়ের আয়োজন শুরু হলো।
জুমার বাড়ি আনন্দে ভরে উঠল।
তৌকিরের মা নিজে এসে জুমার জন্য শাড়ি পছন্দ করলেন।
মিতু তো সুযোগ পেলেই জুমাকে খেপাত।
—“রাগী ক্যাপ্টেনের বউ হচ্ছিস!”
জুমা হেসে বলত,
—“ও এখন আর তেমন রাগী না।”
মিতু বলত,
—“তুই তো ওকে পুরো বদলে দিয়েছিস।”
জুমা মুচকি হেসে বলত,
—“না। ওর ভেতরে যে মানুষটা ছিল, সেটাই শুধু চিনেছি।”
বিয়ের দিন তৌকির যখন জুমাকে প্রথমবার দেখল, তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য সেই প্রথম দিনের স্মৃতি ফিরে এল।
পাহাড়ি রাস্তা।
দুষ্টু এক মেয়ে।
রাগী এক ক্যাপ্টেন।
প্রথম ঝগড়া।
তারপর একে একে কত ঘটনা!
জুমা কাছে এসে ধীরে বলল,
—“কী দেখছেন?”
তৌকির মৃদু হেসে বলল,
—“ভাবছি, প্রথম দিন যদি তোমাকে ওই নিষিদ্ধ জায়গা থেকে বের করে না আনতাম?”
জুমা হেসে বলল,
—“তাহলে আমাদের গল্পটাই হতো না।”
—“হয়তো ভাগ্য আমাদের আবারও দেখা করিয়ে দিত।”
—“এত আত্মবিশ্বাস?”
—“তোমাকে পাওয়ার ব্যাপারে একটু আছে।”
জুমা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল।
বিয়ের পরও তৌকিরের জীবন বদলায়নি।
ডিউটি ছিল।
ঝুঁকি ছিল।
দূরত্বও ছিল।
কিন্তু এখন তার পাশে ছিল এমন একজন মানুষ, যে তার জীবনের বাস্তবতাকে বুঝত।
তৌকির যখন কাজে বের হতো, জুমা শুধু বলত,
—“সাবধানে থেকো।”
আর তৌকির প্রতিবারই বলত,
—“আমি ফিরে আসব।”
একদিন পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে জুমা তৌকিরকে বলল,
—“মনে আছে, প্রথম দিন আপনি আমাকে কত বকেছিলেন?”
তৌকির হেসে বলল,
—“তুমি তখন নিয়ম ভেঙেছিলে।”
—“আর আপনি?”
—“আমি কী?”
—“আপনিও তো আমার জীবনে ঢুকে সব নিয়ম ভেঙে দিয়েছিলেন।”
তৌকির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“সেটা ঠিক।”
জুমা মৃদু হেসে তার হাতে থাকা কাঠের পাখিটার দিকে তাকাল।
দুটো পাখি এখনও তাদের কাছে যত্ন করে রাখা।
একটা তৌকিরের কাছে।
আরেকটা জুমার কাছে।
তাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল রাগ আর ঝগড়া দিয়ে।
তারপর এসেছিল দূরত্ব, ভয়, পরিবারের আপত্তি আর অনিশ্চয়তা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা বুঝেছিল—
সত্যিকারের সম্পর্ক শুধু পাশাপাশি থাকার নাম নয়।
দূরে থেকেও একে অপরের প্রতি বিশ্বাস রাখা, কঠিন সময়ে পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি ধরে রাখাই সম্পর্ককে সত্যি করে তোলে।
আর তৌকিরের সেই প্রথম দিনের রাগী মুখ দেখে যে মেয়েটা ভেবেছিল, “লোকটা অসম্ভব রাগী!”
সেই জুমাই একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল—
“আপনি রাগী হলেও খারাপ নন।”
তৌকিরের উত্তর ছিল—
“তোমার জন্য আমি আর আগের মতো রাগী নই।”
....