রাগী স্যারের মায়ায় পড়লাম

নতুন সেমিস্টার শুরু হয়েছে। পুরোনো শিক্ষার্থীরা নিজেদের বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে ব্যস্ত, আর নতুনরা ব্যস্ত নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে।

কিন্তু পুরো ক্লাসের মধ্যে একজন ছিল, যার কাছে পড়াশোনার চেয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মজা করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সে হলো নেহা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নেহা। বয়স বিশের ওপরে। স্বভাবে ভীষণ চঞ্চল, দুষ্টু আর প্রাণবন্ত। ক্লাসে বসে চুপচাপ লেকচার শোনা তার কাছে প্রায় অসম্ভব একটা কাজ।

বন্ধুরা প্রায়ই বলত,

—“নেহা, তুই একদিন ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া খাবি।”

নেহা হেসে উত্তর দিত,

—“সেদিনও তোকে সঙ্গে নিয়ে বের হব।”

সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।

নেহা শেষ বেঞ্চে বসে তার বান্ধবী মিতুর সঙ্গে ফিসফিস করে গল্প করছিল। সামনে শিক্ষক আসার পরও তার কোনো হুঁশ নেই।

হঠাৎ দরজা খুলে একজন লম্বা, গম্ভীর চেহারার যুবক ক্লাসে ঢুকলেন।

পুরো ক্লাস এক মুহূর্তে চুপ হয়ে গেল।

কালো শার্ট, হাতে কিছু বই, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা। মুখে কোনো হাসি নেই।

তিনি বোর্ডের সামনে গিয়ে বইগুলো টেবিলের ওপর রাখলেন।

—“Good morning.”

সবাই একসঙ্গে উত্তর দিল,

—“Good morning, sir.”

তিনি বোর্ডে নিজের নাম লিখলেন।

Shayon Rahman

তারপর শান্ত গলায় বললেন,

—“আমি শায়ন রহমান। এই সেমিস্টারে তোমাদের ইংরেজি সাহিত্য পড়াব।”

নেহা মিতুর কানে ফিসফিস করে বলল,

—“স্যারকে দেখে মনে হচ্ছে উনি হাসতে ভুলে গেছেন।”

মিতু মুখ চেপে হাসল।

শায়ন বোর্ডের দিকে তাকিয়েই বললেন,

—“শেষ বেঞ্চের কথাবার্তা কি শেষ হয়েছে?”

নেহা চমকে গেল।

মিতু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলল।

নেহা কিছুটা সাহস নিয়ে বলল,

—“জি স্যার।”

শায়ন এবার তার দিকে তাকালেন।

চোখ দুটো এতটাই কঠিন যে নেহার মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

—“আপনার নাম?”

—“নেহা।”

—“নেহা, ক্লাসে গল্প করার জন্য আপনি এখানে আসেননি।”

নেহা মাথা নিচু করে বলল,

—“জি।”

—“ভালো। এবার বই খুলুন।”

নেহা বই খুলল।

কিন্তু পাঁচ মিনিট পরেই আবার মিতুর খাতায় একটা ছোট্ট ছবি আঁকতে শুরু করল।

মিতু সেটা দেখে হাসি আটকাতে পারছিল না।

শায়নের চোখ এবার সরাসরি নেহার খাতার দিকে।

—“মিস নেহা।”

নেহা মাথা তুলল।

—“জি স্যার?”

—“আপনি কি আমাকে আপনার আঁকা ছবিটা দেখাবেন?”

নেহার মুখ শুকিয়ে গেল।

ক্লাসের সবাই তাকিয়ে আছে।

সে ধীরে ধীরে খাতাটা এগিয়ে দিল।

শায়ন খাতা হাতে নিয়ে দেখলেন—তার নিজেরই একটা কার্টুন আঁকা হয়েছে। বড় চশমা, কপালে ভাঁজ, আর নিচে লেখা—‘রাগী স্যার’।

ক্লাসে চাপা হাসির শব্দ উঠল।

শায়নের মুখ আরও কঠিন হয়ে গেল।

তিনি খাতাটা বন্ধ করে নেহার দিকে তাকালেন।

—“আপনি মনে হয় খুব মজার মানুষ।”

নেহা কিছু বলল না।

—“কিন্তু ক্লাসরুমে আপনার এই ধরনের আচরণ মোটেও মজার নয়।”

নেহা এবার মাথা নিচু করল।

শায়ন খাতাটা তার হাতে দিয়ে বললেন,

—“আগামী ক্লাসে এই অধ্যায়ের ওপর পাঁচশো শব্দের একটি লিখিত কাজ জমা দেবেন।”

নেহা অবাক হয়ে তাকাল।

—“পাঁচশো?”

—“কোনো সমস্যা?”

—“না স্যার।”

—“ভালো।”

ক্লাস আবার শুরু হলো।

কিন্তু নেহার মুখ থেকে আর কোনো কথা বের হলো না।

ক্লাস শেষে সবাই বের হয়ে গেলেও নেহা কিছুক্ষণ বেঞ্চে বসে রইল।

মিতু এসে বলল,

—“কী হলো? এত চুপ কেন?”

নেহা বিরক্ত মুখে বলল,

—“লোকটা মানুষ না।”

—“কেন?”

—“একটা ছোট্ট মজা করলাম, তার জন্য পাঁচশো শব্দ!”

মিতু হেসে বলল,

—“তুই আগে থেকেই সাবধান হবি। স্যার কিন্তু খুব রাগী।”

নেহা ব্যাগ কাঁধে তুলে বলল,

—“আমিও কম না।”

পরের কয়েক সপ্তাহে শায়নের সঙ্গে নেহার সম্পর্কটা অদ্ভুত হয়ে উঠল।

নেহা প্রায়ই কোনো না কোনো দুষ্টুমি করত।

কখনো শায়নের ডেস্কে ছোট্ট কাগজ রেখে যেত।

কখনো ক্লাসে ইচ্ছা করে অদ্ভুত প্রশ্ন করত।

আবার কখনো বন্ধুরা মিলে পেছনের বেঞ্চে হাসাহাসি করত।

আর প্রতিবারই শায়নের কপালে ভাঁজ পড়ত।

একদিন নেহা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে গিয়ে দেখল, শায়ন তার খাতা হাতে নিয়ে বসে আছেন।

—“এটা কী?”

—“অ্যাসাইনমেন্ট, স্যার।”

—“এখানে আপনি যে উত্তর লিখেছেন, তার সঙ্গে প্রশ্নের কোনো সম্পর্ক নেই।”

নেহা মৃদু হেসে বলল,

—“আমি একটু অন্যভাবে ভেবেছি।”

শায়ন খাতাটা বন্ধ করলেন।

—“অন্যভাবে ভাবা আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতার মধ্যে পার্থক্য আছে।”

কথাটা নেহার মনে লাগল।

সে চুপ হয়ে গেল।

শায়ন আবার বললেন,

—“আপনার মধ্যে মেধা আছে। কিন্তু আপনি নিজের মেধাকে গুরুত্ব দেন না। সবকিছুকে মজা হিসেবে নেন।”

নেহা প্রথমবার কোনো উত্তর দিল না।

সেদিন বাসায় ফেরার সময় কথাগুলো বারবার তার মাথায় ঘুরছিল।

‘আপনার মধ্যে মেধা আছে।’

এর আগে কেউ তার দুষ্টুমির আড়ালে থাকা এই দিকটা খেয়াল করেছে বলে তার মনে পড়ল না।

তবুও শায়নের প্রতি তার বিরক্তি কমল না।

বরং মনে হলো, লোকটা তাকে সবসময় অপমানই করে।

একদিন ক্লাসে শায়ন একটি কঠিন প্রশ্ন করলেন।

অনেকেই উত্তর দিতে পারল না।

হঠাৎ নেহা হাত তুলল।

শায়ন কিছুটা অবাক হয়ে বললেন,

—“জি?”

নেহা এবার সুন্দরভাবে উত্তর দিল।

শায়ন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন,

—“Correct.”

নেহার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

শায়নও সামান্য মাথা নেড়ে বললেন,

—“এভাবেই পড়াশোনায় মন দিলে ভালো করবেন।”

কথাটা শুনে নেহার মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।

সে বুঝতে পারল, শায়ন শুধু রাগী নন।

তিনি কঠোর, কিন্তু অন্যায়ের জন্য নয়।

তবুও নিজের মনকে সে বোঝাল,

‘এই মানুষটাকে আমি কখনোই পছন্দ করব না।’

কিন্তু জীবন কখনো কখনো এমন কিছু গল্প শুরু করে, যার শেষটা আমরা শুরুতে কল্পনাও করতে পারি না।

আর নেহার জীবনেও ঠিক তেমনই কিছু শুরু হয়ে গিয়েছিল।

নেহা সেদিনের পর থেকে শায়নের ওপর ভীষণ বিরক্ত হয়ে গেল।

শায়ন তাকে যতই ভালোভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার কথা বলুক, নেহার মনে হচ্ছিল, মানুষটা তাকে সবার সামনে ছোট করতেই পছন্দ করে।

পরের দিন ক্লাসে নেহা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি চুপচাপ ছিল।

মিতু অবাক হয়ে বলল,

—“কী ব্যাপার? আজ কোনো দুষ্টুমি নেই?”

নেহা বই খুলে বলল,

—“না।”

—“তুই অসুস্থ?”

—“না।”

—“তাহলে?”

নেহা একটু থেমে বলল,

—“আমি ঠিক করেছি, ওই স্যারের ক্লাসে আর কোনো কথা বলব না।”

মিতু হেসে বলল,

—“দেখি কতক্ষণ পারিস।”

ঠিক তখনই শায়ন ক্লাসে ঢুকলেন।

সবাই দাঁড়িয়ে গেল।

শায়ন বসতে বললেন।

ক্লাস শুরু হলো।

সেদিন নেহা সত্যিই কোনো কথা বলল না। এমনকি শায়ন দুবার তাকে প্রশ্ন করলেও সে উঠে দাঁড়িয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে আবার বসে পড়ল।

শায়ন বিষয়টা খেয়াল করলেন।

কিন্তু কিছু বললেন না।

কয়েকদিন পর মিডটার্ম পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো।

নেহা আশ্চর্যজনকভাবে ভালো করেছে।

শায়ন খাতা ফেরত দেওয়ার সময় তার খাতাটা আলাদা করে সামনে রাখলেন।

—“নেহা।”

নেহা উঠে দাঁড়াল।

—“জি স্যার?”

—“তোমার উত্তরগুলো ভালো হয়েছে।”

নেহা কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল।

—“ধন্যবাদ, স্যার।”

শায়ন বললেন,

—“তুমি চাইলে আরও ভালো করতে পারো।”

নেহা মাথা নেড়ে নিজের জায়গায় ফিরে গেল।

তার ভেতরে অদ্ভুত একটা ভালো লাগা তৈরি হলো।

যে মানুষটার কাছ থেকে সবসময় বকা শুনত, সেই মানুষটাই আজ তার প্রশংসা করেছে।

কিন্তু সে নিজেকে বেশি কিছু ভাবতে দিল না।

কয়েক সপ্তাহ পর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলো।

নেহা স্বভাবতই অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল।

সে ছিল সাংস্কৃতিক কমিটির অন্যতম সক্রিয় সদস্য। নাচ, গান, উপস্থাপনা—সবকিছুতেই তার আগ্রহ।

একদিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান প্রস্তুতির সময় নেহা মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি করছিল।

হঠাৎ শায়ন সেখানে এসে দাঁড়ালেন।

তিনি বিভাগের একজন শিক্ষক হিসেবে অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন।

নেহাকে দেখে বললেন,

—“তোমার কি এখনো কাজ শেষ হয়নি?”

নেহা বলল,

—“হচ্ছে স্যার।”

—“তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে গল্প করছ কেন?”

নেহা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

—“সব কাজ তো একসঙ্গে করা যায় না।”

শায়নের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

—“তোমার সবসময় যুক্তি দেওয়ার অভ্যাসটা বদলানো দরকার।”

নেহারও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।

—“আমি তো কোনো ভুল করিনি।”

—“তোমার সমস্যা হলো, তুমি নিজের ভুল কখনো স্বীকার করো না।”

কথাটা নেহার ভালো লাগল না।

সে চুপ করে গেল।

কিন্তু শায়ন সবার সামনে আবার বললেন,

—“তোমার মতো অমনোযোগী ছাত্রী দিয়ে কোনো দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন হবে, সেটা আমার বিশ্বাস হয় না।”

কথাটা শুনে আশপাশের সবাই চুপ হয়ে গেল।

নেহার মুখ লাল হয়ে গেল।

সে কোনো কথা না বলে সেখান থেকে চলে গেল।

মিতু পেছন পেছন গেল।

—“নেহা!”

নেহা কিছু বলল না।

একটা ফাঁকা করিডোরে গিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ মুছে বলল,

—“আমি কি সত্যিই এত খারাপ?”

মিতু বলল,

—“না। স্যার হয়তো রাগের মাথায় বলেছেন।”

নেহা মাথা নেড়ে বলল,

—“সবসময় আমাকে সবার সামনে অপমান করে। আমি তো আর তার ক্লাসে কোনো দুষ্টুমিও করি না।”

তার গলায় কষ্ট স্পষ্ট।

সেদিন রাতে নেহা অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

শায়নের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।

‘তোমার মতো অমনোযোগী ছাত্রী দিয়ে কোনো দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন হবে না।’

কথাগুলো যেন তার আত্মসম্মানে আঘাত করছিল।

সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই বলল,

—“ঠিক আছে। এবার দেখাব আমি কী করতে পারি।”

সেদিন থেকেই নেহার মধ্যে একটা পরিবর্তন শুরু হলো।

পরের দিন থেকে নেহা নিয়মিত ক্লাস করতে লাগল।

নোট তৈরি করত।

সময়মতো অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিত।

কোনো ক্লাসে অযথা কথা বলত না।

বন্ধুরা প্রথমে বিষয়টা বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

একদিন মিতু বলল,

—“তুই সত্যিই বদলে গেছিস।”

নেহা শান্তভাবে বলল,

—“নিজেকে প্রমাণ করতে চাই।”

—“কার কাছে?”

নেহা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—“নিজের কাছে।”

কিন্তু সত্যিটা সে নিজেও পুরোপুরি জানত না।

সে প্রমাণ করতে চাইছিল শায়নের কাছে।

যে সে অমনোযোগী নয়।

যে সে শুধু দুষ্টু বলেই অযোগ্য নয়।

শায়নও নেহার পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন।

আগের সেই চঞ্চল মেয়েটা এখন ক্লাসের প্রথম সারিতে বসে।

মন দিয়ে লেকচার শোনে।

প্রশ্ন করে।

উত্তর দেয়।

অ্যাসাইনমেন্টে যত্ন নেয়।

একদিন ক্লাস শেষে সবাই চলে যাওয়ার পর নেহা একা বসে কিছু লিখছিল।

শায়ন কাছে এসে দাঁড়ালেন।

—“নেহা।”

নেহা উঠে দাঁড়াল।

—“জি স্যার?”

—“তুমি এখন অনেক মনোযোগী হয়েছ।”

নেহা মৃদু স্বরে বলল,

—“হয়েছি।”

—“ভালো লাগছে।”

নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“সেদিন আপনি আমাকে যা বলেছিলেন, সেটা আমার খুব খারাপ লেগেছিল।”

শায়ন কিছু বললেন না।

নেহা আবার বলল,

—“আমি জানি আমি দুষ্টুমি করি। কিন্তু তাই বলে আমি দায়িত্বজ্ঞানহীন নই।”

শায়ন এবার শান্ত গলায় বললেন,

—“আমি জানি।”

নেহা অবাক হয়ে তাকাল।

—“জানেন?”

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে সেদিন সবার সামনে এমন বললেন কেন?”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—“কারণ তুমি নিজের ক্ষমতাটা নষ্ট করছিলে। আমি চেয়েছিলাম তুমি সেটা বুঝতে পারো।”

নেহা কিছু বলল না।

শায়ন বললেন,

—“তবে সবার সামনে কথাটা বলা ঠিক হয়নি। আমি দুঃখিত।”

নেহা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

এই প্রথম শায়ন তার কাছে ক্ষমা চাইলেন।

সে ধীরে ধীরে বলল,

—“ঠিক আছে, স্যার।”

শায়ন চলে গেলেন।

নেহা অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।

যে মানুষটাকে সে এতদিন শুধু রাগী আর কঠোর মনে করত, তার ভেতরে যে এতটা কোমলতা আছে, সেটা সে আজ প্রথমবার দেখল।

এরপর থেকে শায়নের প্রতি নেহার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করল।

আগের মতো তার ক্লাসে দুষ্টুমি করার ইচ্ছে হতো না।

বরং শায়ন কী পড়াচ্ছেন, কীভাবে বোঝাচ্ছেন—এসব খেয়াল করতে ভালো লাগত।

শায়ন যখন বোর্ডে লিখতেন, নেহা মন দিয়ে তাকিয়ে থাকত।

তিনি কোনো কঠিন বিষয় সহজ করে বুঝিয়ে দিলে নেহার মুখে হাসি ফুটত।

কখনো শায়ন হালকা করে হাসলে নেহার মন অকারণেই ভালো হয়ে যেত।

একদিন মিতু সেটা লক্ষ্য করে ফেলল।

—“নেহা।”

—“হুম?”

—“তুই স্যারের দিকে এত তাকাস কেন?”

নেহা চমকে গেল।

—“আমি?”

—“হ্যাঁ।”

—“না তো!”

মিতু মুচকি হেসে বলল,

—“তোর চোখ কিন্তু অন্য কথা বলে।”

নেহা সঙ্গে সঙ্গে বই খুলে ফেলল।

—“চুপ কর।”

কিন্তু নিজের মনকে সে চুপ করাতে পারল না।

সেদিন রাতে প্রথমবার শায়নের কথা মনে পড়তেই তার মুখে অজান্তে হাসি ফুটে উঠল।

সে নিজেকেই প্রশ্ন করল,

‘আমি কি সত্যিই ওই মানুষটাকে নিয়ে ভাবছি?’

উত্তরটা সে জানত না।

তবে একটা বিষয় সে বুঝতে শুরু করেছিল—

শায়নের রাগ এখন আর তার কাছে আগের মতো বিরক্তিকর লাগছে না।

বরং সেই রাগের আড়ালে লুকিয়ে থাকা যত্নটুকু তার চোখে ধীরে ধীরে ধরা পড়ছে।

নেহা নিজেকে যতই বোঝানোর চেষ্টা করুক, কিছুতেই মন থেকে শায়নের চিন্তাটা সরাতে পারছিল না।

আগে শায়ন ক্লাসে ঢুকলেই নেহার মনে হতো, আজ আবার কী নিয়ে বকা খাব!

এখন ঠিক তার উল্টো।

শায়ন ক্লাসে ঢোকার অপেক্ষায় কখন যে সে কয়েক মিনিট আগে থেকেই বই খুলে বসে থাকে, সেটা নিজেই বুঝতে পারে না।

মিতু বিষয়টা বেশ ভালোভাবেই বুঝে ফেলেছিল।

একদিন ক্লাস শুরু হওয়ার আগে মিতু বলল,

—“নেহা, একটা কথা বলব?”

—“বল।”

—“তুই স্যারকে পছন্দ করতে শুরু করেছিস?”

নেহা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।

—“কী বলছিস এসব!”

—“আমি কিন্তু মজা করছি না।”

—“উনি আমার শিক্ষক।”

—“আমি জানি। তাই তো বলছি, নিজের অনুভূতিটা বুঝে চলবি।”

নেহা কিছু বলল না।

তার বুকের ভেতর হঠাৎ অস্বস্তি শুরু হলো।

সে কখনো শায়নের সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্কের কথা ভাবেনি। কিন্তু মানুষের মন তো সবসময় নিজের নিয়মে চলে না।

শায়নের প্রতি তার ভালো লাগাটা ছিল অদ্ভুত।

সে শায়নের সঙ্গে কথা বলতে চাইত, আবার কথা বলার সময় নার্ভাস হয়ে যেত।

শায়ন তাকে প্রশংসা করলে ভালো লাগত।

আবার বকা দিলে মন খারাপ হতো।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল—শায়ন অন্য কোনো ছাত্রীর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও নেহার ভেতরটা কেমন যেন খারাপ হয়ে যেত।

সে নিজেই বুঝতে পারছিল না কেন এমন হচ্ছে।

একদিন ক্লাস শেষে শায়ন নেহাকে ডাকলেন।

—“নেহা, একটু দাঁড়াও।”

নেহা থেমে গেল।

সবাই চলে যাওয়ার পর শায়ন তার দিকে একটা ফাইল বাড়িয়ে দিলেন।

—“এই সেমিনারের জন্য বিভাগের পক্ষ থেকে তোমাকে একটা দায়িত্ব দিতে চাই।”

নেহা অবাক হলো।

—“আমাকে?”

—“হ্যাঁ।”

—“কিন্তু আমি তো…”

—“তুমি পারবে।”

শায়নের গলায় এবার কোনো রাগ ছিল না।

নেহা ফাইলটা হাতে নিয়ে বলল,

—“আমি চেষ্টা করব।”

—“চেষ্টা না। ভালোভাবে করবে।”

নেহা মৃদু হেসে বলল,

—“জি, স্যার।”

শায়নও সামান্য হাসলেন।

সেই ছোট্ট হাসিটা নেহার মনে সারাদিন রয়ে গেল।

রাতে ঘুমানোর আগে সে ফাইলটা খুলে আবার দেখল।

একই দায়িত্ব অন্য কাউকেও দেওয়া যেত।

তাহলে তাকে কেন?

মনের ভেতর একটা উত্তর ভেসে উঠল—

‘কারণ শায়ন তোমাকে বিশ্বাস করেন।’

এই চিন্তাটা তার ভালো লাগল।

পরের কয়েকদিন নেহা নিজের দায়িত্বটা খুব মন দিয়ে করতে লাগল।

শায়নের সঙ্গে মাঝে মাঝে প্রয়োজনীয় কথা হতো।

কখনো কোনো বিষয়ে পরামর্শ চাইত।

শায়ন ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দিতেন।

একদিন নেহা একটা ভুল করে ফেলল।

সে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজ ভুল ফাইলে রেখে দিয়েছিল।

শায়ন সেটা দেখে রেগে গেলেন।

—“নেহা, তুমি এত অসাবধান কীভাবে হলে?”

নেহা মাথা নিচু করে বলল,

—“সরি স্যার।”

—“শুধু সরি বললে তো দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।”

নেহার চোখে পানি চলে এল।

—“আমি ঠিক করে দিচ্ছি।”

শায়ন কিছুটা নরম হয়ে বললেন,

—“ঠিক আছে। কিন্তু পরেরবার সাবধানে করবে।”

নেহা মাথা নেড়ে চলে গেল।

করিডোরে এসে তার মনটা খারাপ হয়ে গেল।

কেন জানি শায়নের বকা অন্য সবার বকার চেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

মিতু তাকে দেখে বলল,

—“কী হয়েছে?”

নেহা বলল,

—“স্যার বকা দিয়েছেন।”

—“তাতে তুই কাঁদছিস?”

—“আমি কাঁদছি না।”

—“তোর চোখ তো অন্য কথা বলছে।”

নেহা চুপ করে রইল।

মিতু এবার মৃদু গলায় বলল,

—“তুই ওনাকে সত্যিই অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিস।”

নেহা কোনো উত্তর দিল না।

সেদিন বিকেলে প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী চলে গেছে।

নেহা লাইব্রেরিতে আটকে ছিল।

বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই।

সে ব্যাগ নিয়ে গেটের কাছে এসে দাঁড়াল।

ছাতা নেই।

ঠিক তখন পাশ থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল,

—“তুমি এখনো যাওনি?”

নেহা ঘুরে দেখল—শায়ন।

তার হাতে কালো ছাতা।

—“বৃষ্টি কমলে যাব।”

শায়ন বাইরে তাকিয়ে বললেন,

—“এ বৃষ্টি এখনই কমবে না।”

নেহা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

শায়ন বললেন,

—“তোমার বাসা কোন দিকে?”

—“ধানমন্ডি।”

—“আমি ওই দিকেই যাচ্ছি। চাইলে গেট পর্যন্ত তোমাকে পৌঁছে দিতে পারি।”

নেহা একটু দ্বিধা করে বলল,

—“না স্যার, আমি থাকব।”

শায়ন বললেন,

—“এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো দরকার নেই।”

নেহা শেষ পর্যন্ত রাজি হলো।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

ছাতাটা শায়নের হাতে ছিল। নেহা একটু দূরে হাঁটছিল, যাতে অস্বস্তি না হয়।

হঠাৎ শায়ন বললেন,

—“তুমি আবার আগের মতো হয়ে যাচ্ছ।”

নেহা অবাক হলো।

—“মানে?”

—“আজ লাইব্রেরিতে তোমার বই খোলা ছিল, কিন্তু তুমি পড়ছিলে না।”

নেহা হেসে বলল,

—“আপনি সব খেয়াল করেন?”

শায়ন শান্তভাবে বললেন,

—“শিক্ষক হিসেবে কিছু জিনিস খেয়াল করতেই হয়।”

নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“আপনি কি সবসময় এত রাগী?”

শায়ন তার দিকে তাকালেন।

—“কেন?”

—“আপনাকে হাসতে দেখলে অদ্ভুত লাগে।”

শায়ন প্রথমে কিছু বললেন না।

তারপর মৃদু হেসে ফেললেন।

নেহা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

এই প্রথম সে শায়নকে এত স্বাভাবিকভাবে হাসতে দেখল।

তার মনে হলো, এই মানুষটা যখন হাসেন, তখন তাকে আরও ভালো লাগে।

নিজের চিন্তায় সে নিজেই লজ্জা পেল।

পরদিন ক্লাসে নেহা আগের চেয়ে বেশি চুপচাপ ছিল।

শায়ন বোর্ডে পড়াচ্ছিলেন।

একসময় তিনি নেহাকে প্রশ্ন করলেন।

—“নেহা, তুমি বলো।”

নেহা উত্তর দিল।

শায়ন বললেন,

—“Very good.”

নেহার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

শায়ন সেটা লক্ষ্য করলেন।

কিন্তু কিছু বললেন না।

এরপর কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।

নেহার পরিবর্তন এখন সবাই দেখতে পাচ্ছে।

সে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছে।

নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে।

আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—সে আর আগের মতো সবার সঙ্গে অকারণে দুষ্টুমি করে না।

কিন্তু তার ভেতরের অনুভূতিটা দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।

একদিন রাতে নেহা ডায়েরি খুলে লিখতে বসেছিল।

অনেকক্ষণ কলম হাতে নিয়ে বসে থাকার পর সে মাত্র একটা লাইন লিখল—

“কিছু মানুষকে প্রথমে খুব অপছন্দ হয়, পরে কেন যেন তাদের কথাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?”

লাইনটা লিখেই সে ডায়েরি বন্ধ করে দিল।

নিজের অনুভূতির নাম দিতে সে ভয় পাচ্ছিল।

কারণ সে জানত, শায়ন তার শিক্ষক।

এই সম্পর্কের সীমা আছে।

তাই নিজের মনকে সে বারবার বলছিল—

‘এটা শুধু শ্রদ্ধা। ভালো লাগা নয়।’

কিন্তু মন কি এত সহজে যুক্তির কথা শোনে?

একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারের প্রস্তুতি শেষ করে নেহা শায়নের কাছে ফাইল জমা দিতে গেল।

শায়ন ফাইল দেখে বললেন,

—“সবকিছু খুব সুন্দরভাবে করেছ।”

নেহা মৃদু হেসে বলল,

—“আপনি বিশ্বাস করেছিলেন বলেই পেরেছি।”

শায়ন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শেখো। সবসময় অন্য কারও স্বীকৃতির প্রয়োজন হয় না।”

কথাটা নেহার মনে গভীরভাবে দাগ কাটল।

সে বুঝল, শায়ন তাকে শুধু পড়াশোনা শেখাচ্ছেন না।

নিজেকে চিনতেও শেখাচ্ছেন।

আর এই কারণেই হয়তো তার প্রতি নেহার অনুভূতি এতটা গভীর হয়ে উঠছে।

তবে সেই অনুভূতির কথা নেহা কাউকে বলবে না।

এমনকি নিজেকেও নয়।

কিন্তু ভাগ্য যেন তাকে খুব বেশি সময় গোপন রাখতে দিল না।

সেমিনারের দিন যতই এগিয়ে আসছিল, নেহার ব্যস্ততাও তত বাড়ছিল।

শায়ন তাকে যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেটা নেহা নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে পালন করছিল। একসময় যে মেয়েটা ক্লাসে বসে গল্প আর দুষ্টুমি করত, সেই নেহাই এখন সবার আগে এসে হল সাজানোর কাজ দেখত।

শায়ন দূর থেকে সবকিছু লক্ষ্য করতেন।

মাঝে মাঝে নেহা ভুল করলে তিনি বকতেন, আবার ঠিক করে দিলে প্রশংসাও করতেন।

এই ছোট ছোট বিষয়গুলো নেহার কাছে অনেক বড় হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু নেহা বুঝতে পারছিল, তার ভেতরের অনুভূতিটা আর আগের জায়গায় নেই।

শায়নকে দেখলে তার মন ভালো হয়ে যায়।

শায়ন রাগ করলে তার সারাদিন মন খারাপ থাকে।

আর শায়ন অন্য কারও সঙ্গে হাসিমুখে কথা বললে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হয়।

একদিন মিতু সরাসরি বলে ফেলল,

—“তুই স্যারের প্রেমে পড়ে গেছিস।”

নেহা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—“চুপ!”

—“কেন? সত্যিটা শুনতে খারাপ লাগছে?”

—“উনি আমার শিক্ষক।”

—“আমি জানি। তাই তো বলছি, অনুভূতিটাকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে কিছু করিস না।”

নেহা চুপ করে গেল।

মিতুর কথাটা ঠিকই।

কিন্তু নিজের মনকে কীভাবে বোঝাবে?

সেমিনারের আগের দিন নেহা শায়নের কেবিনে একটা ফাইল দিতে গেল।

দরজার কাছে গিয়ে দেখল, ভেতরে আরেকজন শিক্ষিকা দাঁড়িয়ে আছেন।

শায়ন তার সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলছেন।

মেয়েটি একটা কথা বলতেই শায়ন হেসে ফেললেন।

নেহা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে গেল।

তার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন যেন লাগল।

সে বুঝতে পারল না কেন।

কিছুক্ষণ পর শিক্ষিকাটি বেরিয়ে গেলেন।

শায়ন নেহাকে দেখে বললেন,

—“তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

—“ফাইল দিতে এসেছিলাম।”

—“দাও।”

নেহা ফাইলটা এগিয়ে দিল।

শায়ন খুলে দেখলেন।

—“সব ঠিক আছে।”

—“জি।”

—“কাল একটু আগে আসবে।”

—“জি।”

নেহা ঘুরে চলে যেতে লাগল।

শায়ন ডাকলেন,

—“নেহা।”

সে থামল।

—“কিছু হয়েছে?”

—“না।”

—“তোমাকে আজ অদ্ভুত লাগছে।”

নেহা জোর করে হাসল।

—“কিছু হয়নি, স্যার।”

শায়ন আর কিছু বললেন না।

কিন্তু নেহার মন তখন অন্য কোথাও।

পরদিন সেমিনার খুব সুন্দরভাবে শুরু হলো।

নেহা দৌড়াদৌড়ি করে সব সামলাচ্ছিল।

একসময় একজন অতিথির বক্তব্যের সময় মাইক্রোফোনে সমস্যা হলো।

নেহা দ্রুত গিয়ে সমস্যাটা ঠিক করল।

সবাই তার প্রশংসা করল।

শায়ন দূর থেকে তাকিয়ে ছিলেন।

অনুষ্ঠান শেষে তিনি নেহার কাছে এসে বললেন,

—“আজ তুমি খুব ভালো কাজ করেছ।”

নেহা মাথা নিচু করে বলল,

—“ধন্যবাদ।”

—“তোমার ওপর আমি গর্বিত।”

এই কথাটা শুনে নেহার বুক কেঁপে উঠল।

সে এতদিনে শায়নের কাছ থেকে অনেক প্রশংসা শুনেছে, কিন্তু ‘গর্বিত’ শব্দটা যেন অন্যরকম।

নেহা তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—“আপনি খুশি হয়েছেন?”

—“অবশ্যই।”

নেহা কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পাশ থেকে সেই শিক্ষিকাটি এসে শায়নকে ডাকলেন।

—“স্যার, আপনাকে একটু আসতে হবে।”

শায়ন নেহাকে বললেন,

—“তুমি যাও। পরে কথা হবে।”

নেহা মাথা নেড়ে চলে গেল।

তার মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল।

সে জানত, কোনো কারণ নেই।

তবুও নিজের ভেতরের অস্বস্তিটাকে আটকাতে পারছিল না।

সেদিন সন্ধ্যায় নেহা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে একা বসে ছিল।

মিতু এসে পাশে বসল।

—“এখানে একা বসে আছিস কেন?”

নেহা বলল,

—“এমনিই।”

—“আবার স্যারের ব্যাপার?”

নেহা বিরক্ত হয়ে বলল,

—“সবকিছুতে স্যারের কথা বলিস না।”

মিতু একটু চুপ করে বলল,

—“তাহলে বল, কী হয়েছে?”

নেহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—“আমি জানি না।”

—“কী জানিস না?”

—“কেন উনি অন্য কারও সঙ্গে কথা বললে আমার খারাপ লাগে।”

মিতু কিছু বলল না।

নেহা আবার বলল,

—“আমি জানি এটা ঠিক না। উনি শিক্ষক। তার নিজের জীবন আছে। নিজের মানুষ আছে কি না, সেটাও আমার জানার বিষয় না। তবু…”

তার কথা থেমে গেল।

মিতু ধীরে বলল,

—“তুই ওনার প্রতি অনুভূতি তৈরি করে ফেলেছিস।”

নেহার চোখে পানি চলে এল।

—“আমি চাই না।”

—“তাহলে দূরত্ব রাখ।”

নেহা মাথা নেড়ে বলল,

—“চেষ্টা করব।”

এরপর নেহা ইচ্ছা করেই শায়নের কাছ থেকে দূরে থাকতে শুরু করল।

প্রয়োজন ছাড়া কথা বলত না।

ক্লাসে সামনে বসা বাদ দিয়ে মাঝের সারিতে বসতে শুরু করল।

কোনো কাজের জন্য শায়নের কাছে না গিয়ে অন্যদের সাহায্য নিত।

শায়ন বিষয়টা খেয়াল করলেন।

একদিন ক্লাস শেষে তিনি বললেন,

—“নেহা, একটু দাঁড়াও।”

নেহা থেমে গেল।

—“জি স্যার?”

—“তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?”

নেহা অবাক হয়ে বলল,

—“না তো।”

—“তাহলে আমাকে এড়িয়ে চলছ কেন?”

নেহা কিছু বলল না।

শায়ন আবার বললেন,

—“আগে কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে তুমি সরাসরি আমার কাছে আসতে। এখন অন্যদের জিজ্ঞেস করো।”

—“এমনিই।”

—“এমনিই?”

নেহা মাথা নিচু করে বলল,

—“আপনি হয়তো ব্যস্ত থাকেন।”

শায়ন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

—“আমি ব্যস্ত থাকলেও তোমার পড়াশোনার বিষয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর দেব। সেটা নিয়ে অস্বস্তি বোধ করার কিছু নেই।”

নেহার চোখ ভিজে উঠল।

সে দ্রুত বলল,

—“ঠিক আছে, স্যার।”

তারপর চলে গেল।

শায়ন অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তিনি বুঝতে পারছিলেন না, নেহার আচরণ হঠাৎ এমন কেন হয়ে গেল।

কয়েকদিন পর একটি ছোট ভুলের জন্য শায়ন নেহাকে ক্লাসে বকা দিলেন।

আগের মতোই কঠিন গলায় বললেন,

—“তুমি এতদিন ভালো করছিলে। আবার কেন এমন ভুল করলে?”

নেহা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।

শায়ন বললেন,

—“তোমার কাছ থেকে আমি আরও ভালো আশা করি।”

এই কথাটা শুনে নেহার চোখে পানি চলে এল।

ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই সে বের হয়ে গেল।

মিতু তাকে পেছনে গিয়ে ধরল।

—“নেহা!”

নেহা বলল,

—“আমি আর পারছি না।”

—“কী হয়েছে?”

—“উনি আমাকে বকা দিলে এত কষ্ট হয় কেন?”

মিতু চুপ করে রইল।

নেহা চোখ মুছে বলল,

—“আমি তো শুধু একজন ছাত্রী। উনি আমার শিক্ষক। তাহলে কেন উনার একটা কথাই আমার পুরো দিনটা নষ্ট করে দেয়?”

মিতু এবার তার হাত ধরল।

—“কারণ তোর অনুভূতিটা বদলে গেছে।”

নেহা চোখ বন্ধ করল।

এই সত্যিটা সে এতদিন এড়িয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু আজ আর পারল না।

সে শায়নকে ভালোবেসে ফেলেছে—এই কথাটা স্বীকার করার সাহস তখনও তার হয়নি।

তবে তার মন ইতিমধ্যেই শায়নের দিকে অনেকটা এগিয়ে গেছে।

অন্যদিকে শায়নও বুঝতে পারছিলেন, নেহা তাকে এড়িয়ে চলছে।

কিন্তু তিনি নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।

তিনি শিক্ষক।

নেহা তার ছাত্রী।

তাই নেহার আচরণের কারণ খুঁজতে গিয়ে নিজের সীমা অতিক্রম করতে চাননি।

শুধু একটা ব্যাপার তাকে ভাবিয়ে তুলছিল—

যে মেয়েটা একসময় তার সামনে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে তর্ক করত, সেই নেহা এখন তাকে দেখলেই চুপ হয়ে যায় কেন?

সেদিন সন্ধ্যায় শায়ন কেবিনে বসে নেহার জমা দেওয়া পুরোনো অ্যাসাইনমেন্টগুলো দেখছিলেন।

প্রথম দিকের লেখাগুলোতে অগোছালো ভাব ছিল।

আর সাম্প্রতিক লেখাগুলো ছিল পরিপাটি, চিন্তাশীল।

তিনি ধীরে ধীরে হাসলেন।

মেয়েটা সত্যিই বদলে গেছে।

কিন্তু কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর তখনও শায়নের জানা ছিল না।

আর নেহা তখন নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল—

‘এই অনুভূতি আমাকে ভুল পথে নিয়ে যাবে। আমাকে দূরে থাকতেই হবে।’

কিন্তু দূরত্ব তৈরি করা যত সহজ মনে হয়েছিল, ততটা সহজ ছিল না।

নেহা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে শায়নের কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকবে।

কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া আর সেটা মেনে চলা এক জিনিস নয়।

প্রতিদিন ক্লাসে শায়নকে দেখতে হয়। তার পড়ানো শুনতে হয়। কোনো ভুল হলে তার কাছ থেকেই সংশোধন নিতে হয়।

তাই দূরত্ব তৈরি করেও নেহা শায়নের উপস্থিতি থেকে পুরোপুরি নিজেকে সরিয়ে নিতে পারল না।

তবে আগের মতো দুষ্টুমি আর করত না।

ক্লাসে চুপচাপ বসে থাকত।

শায়নও তার সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত কথা বলতেন না।

দুজনের মাঝখানে যেন অদৃশ্য একটা দেয়াল তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

একদিন ক্লাসে শায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসাইনমেন্ট দিলেন।

—“আগামী সপ্তাহের মধ্যে সবাইকে এটা জমা দিতে হবে। কাজটা কঠিন। তাই সময় নষ্ট না করে আজ থেকেই শুরু করবে।”

সবাই নোট নিতে লাগল।

নেহাও লিখছিল।

ক্লাস শেষে শায়ন বললেন,

—“যাদের কোনো সমস্যা হবে, তারা ক্লাসের পর আমার সঙ্গে কথা বলতে পারো।”

নেহা মাথা নিচু করে ব্যাগ গোছাতে লাগল।

সে ঠিক করেছিল, কোনো সাহায্য নেবে না।

কিন্তু কাজটা শুরু করার পর বুঝল, একটি বিষয় সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না।

দুই দিন চেষ্টা করেও সমাধান হলো না।

শেষ পর্যন্ত সে মিতুর কাছে গেল।

—“তুই এটা বুঝেছিস?”

মিতু খাতা দেখে বলল,

—“না।”

—“তাহলে?”

—“স্যারকে জিজ্ঞেস কর।”

নেহা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,

—“না।”

—“কেন?”

—“এমনিই।”

মিতু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“তুই যতই এড়িয়ে চলিস, পড়াশোনার ক্ষতি তো তোরই হবে।”

নেহা চুপ করে রইল।

শেষ পর্যন্ত সে শায়নের কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

দরজায় দুবার নক করল।

ভেতর থেকে শায়নের কণ্ঠ এল,

—“Come in.”

নেহা ঢুকে দাঁড়াল।

শায়ন তাকিয়ে বললেন,

—“কী হয়েছে?”

নেহা খাতা এগিয়ে দিল।

—“এই অংশটা বুঝতে পারছি না।”

শায়ন খাতাটা নিলেন।

কয়েক মিনিট ধরে বুঝিয়ে দিলেন।

—“এখানে তুমি মূল ধারণাটা ভুল ধরেছ। আবার চেষ্টা করো।”

নেহা মাথা নেড়ে বলল,

—“এখন বুঝেছি।”

শায়ন খাতা ফেরত দিয়ে বললেন,

—“ভালো। আর একটা কথা।”

নেহা তাকাল।

—“পড়াশোনার ব্যাপারে আমাকে এড়িয়ে চলবে না। তুমি আমার ছাত্রী। তোমার প্রয়োজন হলে সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।”

নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“জি, স্যার।”

তারপর বেরিয়ে গেল।

করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো, শায়ন তাকে কখনো ছোট করতে চাননি।

বরং তিনি সবসময় চেয়েছেন সে নিজের যোগ্যতা দিয়ে সামনে এগিয়ে যাক।

এই উপলব্ধিটা নেহার মনকে শান্ত করল।

কয়েকদিন পর নেহার জীবনে আরও একটি ঘটনা ঘটল।

তার বাবার ব্যবসায় কিছু সমস্যা হওয়ায় বাড়িতে টানাটানি শুরু হলো।

নেহা বিষয়টা কাউকে জানায়নি।

কিন্তু এর প্রভাব তার পড়াশোনায় পড়তে শুরু করল।

অ্যাসাইনমেন্ট অসম্পূর্ণ থাকল।

ক্লাসে মনোযোগ কমে গেল।

একদিন শায়ন তার খাতা দেখে বললেন,

—“তোমার কাজ আগের মতো হচ্ছে না। কোনো সমস্যা হচ্ছে?”

নেহা মাথা নেড়ে বলল,

—“না।”

—“নিশ্চিত?”

—“জি।”

শায়ন আর প্রশ্ন করলেন না।

তবে পরদিন বিভাগ থেকে একটি বইয়ের তালিকা দেওয়ার সময় তিনি নেহাকে বললেন,

—“তোমার যদি কোনো একাডেমিক সমস্যা থাকে, জানাবে। পড়াশোনা যেন কোনো কারণে থেমে না যায়।”

নেহা বুঝতে পারল, শায়ন তার পরিবর্তনটা খেয়াল করেছেন।

সে শুধু বলল,

—“ধন্যবাদ, স্যার।”

সেদিন রাতে নেহা অনেকক্ষণ ভাবল।

সে এতদিন শায়নের আচরণকে শুধু কঠোরতা হিসেবে দেখেছিল।

কিন্তু এখন বুঝতে পারছে, সেই কঠোরতার ভেতরেও দায়িত্ববোধ ছিল।

শায়ন তাকে আলাদা কোনো সুবিধা দেননি।

বরং অন্য সবার মতোই নিয়ম মেনে চলেছেন।

এটাই নেহার কাছে সবচেয়ে সম্মানের বিষয় হয়ে উঠল।

তার অনুভূতিটাও ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল।

আগের মতো শায়নের কাছ থেকে কোনো বিশেষ আচরণ পাওয়ার ইচ্ছা তার রইল না।

বরং সে চাইতে লাগল, একদিন নিজের যোগ্যতায় এমন জায়গায় পৌঁছাবে, যেদিন শায়ন সত্যিই তাকে নিয়ে গর্ব করতে পারবেন।

এক মাস পর পরীক্ষার ফল বের হলো।

নেহা বিভাগে ভালো ফল করল।

শায়ন ফলাফল হাতে নিয়ে তাকে বললেন,

—“আমি জানতাম তুমি পারবে।”

নেহা মৃদু হেসে বলল,

—“আপনি না বললে হয়তো পারতাম না।”

—“আমি শুধু বলেছি। কাজটা তুমি করেছ।”

নেহা মাথা নেড়ে বলল,

—“তবুও ধন্যবাদ।”

শায়ন বললেন,

—“নিজের ওপর বিশ্বাস রাখবে। সামনে আরও বড় পথ আছে।”

এই কথাটা নেহার মনে গভীরভাবে বসে গেল।

সে বুঝল, তার সামনে শুধু অনুভূতির জগৎ নয়—নিজের ভবিষ্যৎও আছে।

আর সে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চায় না।

সময় এগিয়ে চলল।

নেহা আগের সেই দুষ্টু মেয়েটা আর রইল না।

বন্ধুরা মাঝেমধ্যে মজা করে বলত,

—“আমাদের নেহা কোথায় গেল?”

নেহা হেসে বলত,

—“বড় হয়ে গেছি।”

কিন্তু তার পুরোনো প্রাণবন্ত স্বভাব পুরোপুরি হারায়নি।

কখনো কখনো ক্লাসে মজার কোনো কথা বললে শায়নও হেসে ফেলতেন।

সেই মুহূর্তগুলো নেহার কাছে সুন্দর লাগত।

তবে সে নিজের সীমাটা বুঝে গিয়েছিল।

শায়ন তার শিক্ষক।

তার প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালো লাগা—সবকিছুকে সে নিজের ভেতরেই রাখবে।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে নেহা হঠাৎ শুনতে পেল, শায়ন হয়তো পরের সেমিস্টারে অন্য একটি বিভাগে দায়িত্ব নিতে পারেন।

কথাটা শুনেই তার মনটা খারাপ হয়ে গেল।

সে বুঝল, মানুষটা তার জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছেন।

একসময় যে শিক্ষককে সে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করত, সেই মানুষটিই তাকে নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন।

সেদিন ক্লাস শেষে নেহা শায়নের কাছে গিয়ে বলল,

—“স্যার, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

—“হ্যাঁ।”

—“আপনি কি সত্যিই অন্য বিভাগে চলে যাচ্ছেন?”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—“সম্ভাবনা আছে।”

নেহা মাথা নিচু করল।

তার চোখে হালকা কষ্ট ফুটে উঠল।

শায়ন সেটা দেখে বললেন,

—“মন খারাপ করার কিছু নেই। শিক্ষক বদলালেও তোমার পথ থেমে থাকবে না।”

নেহা মৃদু হেসে বলল,

—“আমি জানি।”

তারপর একটু থেমে বলল,

—“আপনি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন।”

শায়ন শান্ত গলায় বললেন,

—“তুমি নিজেই শিখেছ। আমি শুধু পথটা দেখিয়েছি।”

নেহা কিছু বলল না।

কিন্তু সেদিন বাড়ি ফেরার পথে তার মনে হলো—

কিছু মানুষ জীবনে আসে, আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য নয়; আমাদের বদলে দেওয়ার জন্য।

শায়ন হয়তো তেমনই একজন।
সময় কারও জন্য থেমে থাকে না।

নেহার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শেষ বছর শুরু হয়ে গেল। পড়াশোনা, প্রজেক্ট, পরীক্ষা—সবকিছু মিলিয়ে ব্যস্ততা বেড়ে গেল।

তবে একটা বিষয় বদলায়নি।

শায়নের প্রতি তার শ্রদ্ধা।

বরং সময়ের সঙ্গে সেই অনুভূতি আরও পরিণত হয়েছিল।

এখন আর নেহা আগের মতো অস্থির হয় না। শায়ন তাকে নিয়ে কী ভাবছেন, তিনি কার সঙ্গে কথা বলছেন—এসব নিয়ে অকারণে মন খারাপও করে না।

সে বুঝে গেছে, অনুভূতি থাকলেই সব অনুভূতিকে সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের রূপ দিতে হয় না।

কখনো কখনো অপেক্ষা করাও ভালোবাসার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

একদিন ক্লাস শেষে শায়ন বললেন,

—“নেহা, তোমার প্রজেক্টের কাজটা আমি দেখেছি।”

নেহা একটু চিন্তিত হয়ে বলল,

—“কেমন হয়েছে?”

—“ভালো। তবে আরও কিছু যোগ করলে এটা অনেক শক্তিশালী হবে।”

নেহা দ্রুত খাতা বের করল।

—“কী যোগ করব?”

শায়ন কয়েকটি বিষয় বুঝিয়ে দিলেন।

নেহা মন দিয়ে সব লিখে নিল।

তারপর বলল,

—“স্যার, একটা কথা।”

—“হ্যাঁ?”

—“আমি কি সত্যিই আগের চেয়ে বদলেছি?”

শায়ন কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন।

—“হ্যাঁ।”

—“অনেক?”

—“অনেক।”

নেহা মৃদু হাসল।

—“আপনার বকার কারণেই।”

শায়নও হেসে বললেন,

—“আমার বকার জন্য নয়। তুমি নিজে বদলাতে চেয়েছ বলেই।”

নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“আপনি না থাকলে হয়তো আমি এতটা বুঝতাম না।”

শায়ন শান্তভাবে উত্তর দিলেন,

—“জীবনে এমন অনেক মানুষ আসবে, যারা তোমাকে কিছু না কিছু শেখাবে। প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে, কিন্তু নিজের পথটা নিজেকেই বেছে নিতে হবে।”

নেহা মাথা নেড়ে বলল,

—“জি।”

সেদিনের কথাগুলো নেহার মনে অনেকক্ষণ রয়ে গেল।

এরপর পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু হলো।

নেহা এবার সত্যিই মন দিয়ে পড়াশোনা করতে লাগল।

বন্ধুরা মজা করে বলত,

—“নেহা এখন পুরো বইপোকা।”

নেহা হাসত।

—“যে মেয়ে একসময় ক্লাসে কার্টুন আঁকত, সে বইপোকা হয়ে গেছে—এটাই তো আশ্চর্য।”

একদিন মিতু বলল,

—“তোর সেই কার্টুনটা মনে আছে?”

নেহা হেসে ফেলল।

—“রাগী স্যারের?”

—“হ্যাঁ।”

—“ওটা এখন দেখলে লজ্জা লাগে।”

মিতু বলল,

—“তখন কিন্তু তুই বুঝিসনি, মানুষটা একদিন তোর জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে।”

নেহা কিছু বলল না।

শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

ফাইনাল পরীক্ষার দিন চলে এলো।

পরীক্ষা শেষে নেহা যখন হল থেকে বের হলো, তার বুকটা হালকা লাগছিল।

এত বছরের পড়াশোনার একটা বড় অধ্যায় শেষ হলো।

বন্ধুরা সবাই আনন্দ করছিল।

নেহা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ শায়নকে দেখতে পেল।

তিনি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলছিলেন।

নেহা কিছুক্ষণ দ্বিধা করে এগিয়ে গেল।

—“স্যার।”

শায়ন ঘুরে তাকালেন।

—“পরীক্ষা শেষ?”

—“জি।”

—“কেমন হয়েছে?”

—“ভালো।”

—“আমি জানতাম।”

নেহা হেসে বলল,

—“আপনি সবসময় এত আত্মবিশ্বাসী কেন?”

শায়ন বললেন,

—“কারণ তোমার পরিশ্রম আমি দেখেছি।”

কথাটা শুনে নেহার চোখে পানি চলে এল।

সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।

শায়ন বিষয়টা বুঝলেও কিছু বললেন না।

নেহা ধীরে বলল,

—“স্যার, আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।”

—“বল।”

—“আপনি আমাকে প্রথম দিন থেকেই অনেক বকেছেন।”

শায়ন মৃদু হাসলেন।

—“সেটা মনে আছে?”

—“সব মনে আছে।”

—“আর?”

—“আপনাকে প্রথমে আমি খুব অপছন্দ করতাম।”

শায়ন হেসে বললেন,

—“সেটাও বুঝতাম।”

নেহা হেসে ফেলল।

—“কিন্তু পরে বুঝেছি, আপনি খারাপ ছিলেন না।”

শায়ন কিছু বললেন না।

নেহা বলল,

—“আপনি আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন। এজন্য আমি সবসময় কৃতজ্ঞ থাকব।”

শায়ন মাথা নেড়ে বললেন,

—“তুমি ভালো থেকো। এটাই চাই।”

কয়েক মাস পর নেহার ফল প্রকাশ হলো।

সে খুব ভালো ফল করল।

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগও পেল।

নেহার বাবা-মা ভীষণ খুশি।

নেহাও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আনন্দ অনুভব করল।

এখন তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হবে।

শায়নের সঙ্গে তার যোগাযোগও প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।

কখনো কোনো অনুষ্ঠানে দেখা হলে শুধু সৌজন্য বিনিময় হতো।

নেহা নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল।

সময় কেটে গেল।

এক বছর।

দুই বছর।

নেহার জীবনে অনেক পরিবর্তন এল।

সে এখন নিজের কাজ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত।

আগের মতো দুষ্টু মেয়ে নেই, কিন্তু হাসিটা এখনো একই রকম।

একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সে একটি বইয়ের দোকানে ঢুকল।

বই দেখতে দেখতে হঠাৎ পরিচিত একটা কণ্ঠ শুনল।

—“নেহা?”

সে ঘুরে তাকাল।

তার বুক যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে শায়ন।

আগের মতোই শান্ত মুখ।

তবে এবার তার চোখে শিক্ষকসুলভ কঠোরতার বদলে এক ধরনের উষ্ণতা ছিল।

নেহা কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারল না।

শায়ন বললেন,

—“কেমন আছ?”

নেহা ধীরে হাসল।

—“ভালো।”

—“কাজ কেমন চলছে?”

—“ভালো। আপনি?”

—“আমিও।”

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে থাকল।

তারপর শায়ন বললেন,

—“তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে সত্যিই অনেক বদলে গেছ।”

নেহা হেসে বলল,

—“আপনিই তো বলেছিলেন বদলাতে।”

—“আমি বলেছিলাম নিজের জন্য বদলাতে।”

—“হ্যাঁ। তাই করেছি।”

শায়ন মাথা নেড়ে হাসলেন।

তাদের কথাবার্তা খুব সাধারণ ছিল।

তবুও নেহার মনে হলো, এতদিন পরেও এই মানুষটার সামনে দাঁড়ালে তার ভেতরে সেই পুরোনো অনুভূতিটা কোথাও যেন রয়ে গেছে।

তবে এবার পরিস্থিতি অন্যরকম।

নেহা আর তার ছাত্রী নয়।

সে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে।

আর শায়নও এখন তাকে সেই আগের ছোট্ট দুষ্টু ছাত্রী হিসেবে দেখছেন না।

তবে তাদের মাঝখানে এখনও কিছু না বলা কথা রয়ে গেছে।

বইয়ের দোকান থেকে বের হওয়ার সময় শায়ন হঠাৎ বললেন,

—“নেহা, তোমার সঙ্গে একটা বিষয়ে কথা বলতে চাই। সময় হবে?”

নেহা অবাক হয়ে তাকাল।

—“জি।”

—“তাহলে আগামী শুক্রবার দেখা করো। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”

নেহার বুকের ভেতর আবার অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।

সে শুধু মাথা নেড়ে বলল,

—“ঠিক আছে।”

সেদিন রাতে নেহা অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

শায়ন কী বলতে চান?

কেন এতদিন পর তাকে দেখা করতে বললেন?

তার মনের ভেতর পুরোনো স্মৃতিগুলো একে একে ফিরে আসতে লাগল।

প্রথম দিনের সেই রাগী মুখ।

কার্টুন আঁকার ঘটনা।

সবার সামনে বকা।

তারপর ক্ষমা চাওয়া।

বৃষ্টির দিন।

দূরত্ব।

পরীক্ষা।

বিদায়।

আর আজ—হঠাৎ আবার দেখা।

নেহা জানত না সামনে কী অপেক্ষা করছে।

তবে একটা বিষয় সে এবার পরিষ্কারভাবে বুঝেছিল—

সে আর আগের সেই অপরিণত নেহা নেই।

জীবন তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।

শুক্রবার বিকেলটা যেন নেহার কাছে অন্য সব দিনের চেয়ে ধীর মনে হচ্ছিল।

অফিসের কাজ শেষ করার পরও তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—

শায়ন কী বলতে চান?

দুই বছর ধরে তাদের তেমন যোগাযোগ নেই। হঠাৎ দেখা হওয়ার পর শায়ন তাকে আলাদা করে কথা বলতে ডাকলেন। ব্যাপারটা সাধারণ মনে হচ্ছিল না।

তবুও নেহা নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল।

সে নিজের মনে বলল,

‘যাই হোক, আগে শুনব। অযথা কিছু ভাবব না।’

নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে সে ক্যাফেটিতে পৌঁছে গেল।

কিছুক্ষণ পর শায়ন এলেন।

নেহা তাকে দেখে উঠে দাঁড়াল।

—“আসসালামু আলাইকুম।”

—“ওয়ালাইকুম আসসালাম। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছ?”

—“না। আমিও একটু আগেই এসেছি।”

দুজন মুখোমুখি বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।

তারপর শায়ন বললেন,

—“তুমি এখন নিজের কাজ নিয়ে খুব ভালো করছ, শুনলাম।”

নেহা মৃদু হেসে বলল,

—“আপনি খবর রাখেন?”

—“তোমার এক সহকর্মীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সেখান থেকেই শুনেছি।”

—“ওহ।”

আবার নীরবতা।

নেহা শেষ পর্যন্ত বলল,

—“আপনি আমাকে কী বলতে চেয়েছিলেন?”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“আমি আসলে অনেক ভেবেই তোমাকে ডেকেছি।”

নেহার বুক ধুকপুক করতে লাগল।

—“কী নিয়ে?”

শায়ন সরাসরি তার দিকে তাকালেন।

—“তোমার মনে হয়তো অনেক প্রশ্ন আছে। তাই আগে একটা বিষয় পরিষ্কার করতে চাই।”

নেহা চুপ করে শুনতে লাগল।

—“তুমি যখন আমার ছাত্রী ছিলে, তখন তোমার প্রতি আমার দায়িত্ব ছিল একজন শিক্ষকের। সেই সীমাটা আমি সবসময় বুঝেছি এবং মেনেছি।”

নেহা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

—“আমি জানি।”

—“তুমি হয়তো তখন অনেক কিছু অনুভব করতে। কিন্তু তোমার বয়স, তোমার অবস্থান—এসব বিবেচনা করে আমি কখনো সেই অনুভূতিকে উৎসাহ দিইনি।”

নেহার চোখ নিচু হয়ে গেল।

এতদিনের লুকানো কথাগুলো যেন হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল।

শায়ন আবার বললেন,

—“তখন তোমাকে আমি শুধু একজন ছাত্রী হিসেবেই দেখেছি। তোমার উন্নতি, তোমার ভবিষ্যৎ—এসব নিয়েই চিন্তা করেছি।”

নেহা ধীরে বলল,

—“আমি সেটাই বুঝেছি।”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“কিন্তু এখন পরিস্থিতি আলাদা।”

নেহা মাথা তুলল।

শায়নের গলায় এবার অন্যরকম দৃঢ়তা।

—“তুমি এখন নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত। তুমি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারো। আর আমি তোমার শিক্ষক হিসেবে তোমার জীবনে নেই।”

নেহার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কাঁপন হলো।

শায়ন বললেন,

—“গত কয়েক মাসে আমি নিজের অনুভূতি নিয়েও ভেবেছি।”

নেহা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।

—“আমি বুঝেছি, তোমাকে শুধু আমার পুরোনো ছাত্রী হিসেবে দেখাটা আর সম্ভব হচ্ছে না।”

নেহার চোখে বিস্ময়।

সে কিছু বলল না।

শায়ন শান্ত গলায় বললেন,

—“তোমার প্রতি আমার এখন যে অনুভূতি, সেটা দায়িত্বের জায়গা থেকে নয়। সেটা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে তোমাকে একজন সমান মানুষ হিসেবে জানার ইচ্ছা।”

নেহা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, এতদিন ধরে বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা একটা দরজা যেন ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে।

তবুও সে সহজে কোনো উত্তর দিতে পারল না।

কারণ তার মনে অনেক অভিমান জমে ছিল।

সে বলল,

—“আপনি জানেন, একসময় আপনার ওপর আমি খুব রাগ করতাম?”

শায়ন মৃদু হাসলেন।

—“জানি।”

—“আপনি আমাকে সবার সামনে বকতেন।”

—“জানি।”

—“অনেকবার অপমানিতও মনে হয়েছে।”

শায়নের মুখ গম্ভীর হলো।

—“সেটার জন্য আমি আজও দুঃখিত।”

নেহা ধীরে বলল,

—“তখন মনে হতো, আপনি আমাকে একদম পছন্দ করেন না।”

শায়ন মাথা নেড়ে বললেন,

—“তোমাকে পছন্দ করি কি না, সেই প্রশ্নটা তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তুমি আমার ছাত্রী ছিলে। তোমার ভালো করাটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”

নেহার চোখে পানি জমল।

—“আর এখন?”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“এখন তুমি আমার কাছে এমন একজন মানুষ, যাকে আমি সম্মান করি। তোমার সাহস, তোমার পরিশ্রম, তোমার পরিবর্তন—সবকিছু আমাকে মুগ্ধ করেছে।”

নেহা চোখ নামিয়ে ফেলল।

তার বুকের ভেতর জমে থাকা পুরোনো অভিমান যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছিল।

কিন্তু সে তখনও একটা কথা বলতে পারছিল না।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে নেহা নিজের ঘরে বসে অনেকক্ষণ ভাবল।

তার মনে পড়ে গেল প্রথম দিনের কথা।

শায়নের রাগী মুখ।

তার নিজের দুষ্টুমি।

কার্টুন আঁকা।

সবার সামনে বকা খাওয়া।

তারপর নিজেকে বদলে ফেলা।

কত বছর কেটে গেছে!

একসময় সে ভেবেছিল, শায়নকে ভুলে যাবে।

কিন্তু পারেনি।

তবে আজকের অনুভূতিটা আগের মতো নয়।

এটা কোনো কিশোরীসুলভ মুগ্ধতা নয়।

এখন সে জানে, শায়নের কঠোরতা তাকে কষ্ট দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই কঠোরতার মধ্যেই সে নিজের শক্তি খুঁজে পেয়েছিল।

পরের দিন মিতুর সঙ্গে দেখা হলে নেহা সবকিছু বলল।

মিতু প্রথমে অবাক হয়ে গেল।

—“সত্যি?”

—“হ্যাঁ।”

—“তুই কী বলেছিস?”

নেহা মাথা নেড়ে বলল,

—“কিছু বলিনি।”

—“কেন?”

—“আমি সময় নিতে চাই।”

মিতু বলল,

—“সেটাই ঠিক।”

নেহা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—“আমি ওনাকে অনেকদিন ধরে পছন্দ করি। কিন্তু এবার যদি কিছু হয়, সেটা যেন শুধু পুরোনো অনুভূতির কারণে না হয়।”

—“তাহলে?”

—“আমি চাই, আমরা দুজন একে অপরকে নতুন করে জানি। কোনো শিক্ষক-ছাত্রীর সম্পর্কের জায়গা থেকে নয়।”

মিতু হেসে বলল,

—“তুই সত্যিই অনেক বদলে গেছিস।”

নেহাও হেসে ফেলল।

—“হয়তো।”

পরের কয়েক সপ্তাহ নেহা আর শায়ন ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করল।

কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না।

শায়ন নেহার কাজ, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইতেন।

নেহাও শায়নের জীবন সম্পর্কে জানতে শুরু করল।

শায়ন বই পড়তে ভালোবাসেন।

ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন।

কাজের বাইরে খুব শান্ত জীবন কাটান।

আর আশ্চর্যের বিষয়—তিনি আসলে মোটেও সবসময় রাগী নন।

নেহা একদিন মজা করে বলল,

—“আপনি জানেন, আপনার একটা বদনাম আছে?”

—“কী?”

—“আপনি নাকি খুব রাগী।”

শায়ন হেসে বললেন,

—“তোমার কাছ থেকে এই অভিযোগ শুনতে মজাই লাগছে।”

—“আমি তো প্রথম থেকেই বলেছি।”

—“আর এখন?”

নেহা একটু ভেবে বলল,

—“এখন মনে হয় আপনি প্রয়োজনের সময় রাগ করেন।”

—“উন্নতি হয়েছে তোমার।”

নেহা হেসে ফেলল।

এই হাসির মধ্যে আর আগের অস্বস্তি ছিল না।

ছিল স্বস্তি।

এক সন্ধ্যায় শায়ন নেহাকে বললেন,

—“আমি তোমার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে চাই।”

নেহা চমকে গেল।

—“এত তাড়াতাড়ি?”

—“তাড়াহুড়ো করছি না। আমি শুধু চাই, সবকিছু সম্মানের সঙ্গে হোক।”

নেহার চোখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

সে বলল,

—“আমি বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলব।”

শায়ন মাথা নেড়ে বললেন,

—“সময় নিয়ে বলো।”

নেহা কয়েকদিন ধরে নিজের পরিবারের সঙ্গে কীভাবে কথাটা বলবে, সেটা ভাবছিল।

বাবা-মা দুজনই তাকে খুব ভালোবাসেন। তার পড়াশোনা, চাকরি, ভবিষ্যৎ—সবকিছু নিয়েই তারা সবসময় সচেতন।

তাই হঠাৎ করে শায়নের কথা বললে তারা কীভাবে নেবেন, সেটা নিয়ে নেহার ভয় হচ্ছিল।

এক সন্ধ্যায় নেহা সাহস করে মায়ের পাশে গিয়ে বসল।

—“মা, তোমার সঙ্গে একটা কথা বলব?”

মা হেসে বললেন,

—“বল।”

—“তুমি যদি আমার পছন্দের কাউকে বিয়ের জন্য দেখো, তাহলে কী করবে?”

মা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন।

—“হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”

নেহা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।

—“একজন আছে।”

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“কে?”

নেহা ধীরে ধীরে সব বলল।

শায়ন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। অনেক বছর আগে তাদের পরিচয়। সে তখন ছাত্রী ছিল, আর শায়ন সবসময় সীমারেখা বজায় রেখেছিলেন। পরে নেহা পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর তাদের আবার দেখা হয়।

সব শুনে মা বললেন,

—“তোমার বাবা জানে?”

—“না।”

—“তাহলে আগে বাবার সঙ্গে কথা বল।”

নেহা ভয় পেলেও শেষ পর্যন্ত বাবাকেও সব জানাল।

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“তুমি কি নিশ্চিত?”

নেহা শান্ত গলায় বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“এটা কি শুধু পুরোনো কোনো অনুভূতি?”

নেহা মাথা নেড়ে বলল,

—“না। অনেক সময় নিয়ে ভেবেছি। এখন আমি নিজের সিদ্ধান্ত বুঝে নিতে পারি। উনিও আমাকে সম্মান করেন।”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“তাহলে ছেলেটাকে একদিন নিয়ে এসো। কথা বলব।”

নেহার বুকটা হালকা হয়ে গেল।

কয়েকদিন পর শায়ন নেহাদের বাড়িতে এলেন।

পরিপাটি পোশাকে, শান্ত স্বভাবের শায়নকে দেখে নেহার বাবা-মায়ের প্রথম ধারণা ভালোই হলো।

চা-নাশতার পর নেহার বাবা সরাসরি বললেন,

—“আপনি নেহাকে আগে পড়িয়েছেন, তাই না?”

—“জি।”

—“তখন নিশ্চয়ই ও অনেক দুষ্টু ছিল।”

শায়নের মুখে হালকা হাসি ফুটল।

—“জি, বেশ দুষ্টু ছিল।”

নেহা পাশ থেকে বলল,

—“বাবা!”

সবাই হেসে ফেলল।

শায়ন বললেন,

—“তবে ও নিজের ভুল বুঝে বদলাতে পেরেছে। সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

নেহার বাবা কিছুক্ষণ শায়নের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“আমি একটা বিষয় জানতে চাই। আপনি তখন কেন ওকে এত কঠোরভাবে শাসন করতেন?”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন,

—“কারণ ওর মধ্যে অনেক সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তখন ও নিজের গুরুত্ব বুঝত না। শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল সেটা বুঝতে সাহায্য করা।”

নেহার বাবা মাথা নেড়ে বললেন,

—“আর এখন?”

শায়ন শান্তভাবে উত্তর দিলেন,

—“এখন নেহা আমার ছাত্রী নয়। সে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ। আমি তাকে সম্মান করি। যদি আপনারা এবং নেহা রাজি থাকেন, তাহলে আমি তাকে জীবনের সঙ্গী হিসেবে চাই।”

ঘরটা কয়েক মুহূর্ত নীরব হয়ে রইল।

নেহার মা মেয়ের দিকে তাকালেন।

নেহার মুখে লাজুক হাসি।

বাবা অবশেষে বললেন,

—“আপনি দায়িত্বশীল মানুষ বলেই মনে হচ্ছে। আমাদের আপত্তি নেই।”

নেহার চোখে আনন্দের পানি চলে এল।

সে চুপ করে মায়ের হাত ধরে রাখল।

বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো।

নেহা মাঝে মাঝে নিজের পুরোনো দিনগুলোর কথা ভাবত।

একসময় যে শায়নকে দেখলেই তার রাগ উঠত, আজ সেই মানুষটার সঙ্গে তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।

একদিন শায়ন তাকে বললেন,

—“তোমার সেই পুরোনো কার্টুনটা কি এখনো আছে?”

নেহা হেসে বলল,

—“কোনটা?”

—“যেটাতে আমাকে ‘রাগী স্যার’ বানিয়েছিলে।”

নেহা লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলল।

—“ওটা ভুলে যান।”

—“কেন?”

—“খুব লজ্জার ব্যাপার।”

শায়ন হেসে বললেন,

—“আমি কিন্তু ভুলিনি।”

নেহা মজা করে বলল,

—“আপনিও তো আমাকে অনেক অপমান করেছিলেন।”

শায়নের হাসি মিলিয়ে গেল।

—“সেটার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত।”

নেহা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আমি এখন আর অভিমান করি না।”

—“সত্যি?”

—“হ্যাঁ।”

—“একটুও?”

নেহা মুচকি হেসে বলল,

—“একটু আছে।”

শায়ন হাসলেন।

—“তাহলে বিয়ের পর ধীরে ধীরে সেটা কমাব।”

নেহা মাথা নিচু করে হাসল।

বিয়ের দিন নেহা খুব শান্ত ছিল।

সবাই ব্যস্ত।

আত্মীয়-স্বজনের ভিড়।

আনন্দ, হাসি, ছবি—সব মিলিয়ে বাড়িটা উৎসবের মতো হয়ে উঠেছে।

শায়ন যখন বিয়ের আসরে এলেন, নেহা দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, এই মানুষটাকে ঘিরে তার জীবনের কত স্মৃতি!

প্রথম দিনের ভয়।

দুষ্টুমি।

অপমান।

অভিমান।

নিজেকে বদলে ফেলা।

দূরত্ব।

আবার দেখা।

আর শেষে এই দিন।

সবকিছু যেন একটা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এখানে এসে থেমেছে।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর শায়ন নেহার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

নেহাও হাসল।

কেউ কিছু বলল না।

তবুও সেই হাসির মধ্যে যেন অনেক কথা ছিল।

বিয়ের পর কয়েকদিনের মধ্যে নেহা বুঝতে পারল, শায়ন শুধু বাইরে থেকেই গম্ভীর।

বাড়িতে তিনি অনেক বেশি স্বাভাবিক।

একদিন নেহা মজা করে বলল,

—“আপনার রাগটা কোথায় গেল?”

শায়ন বই থেকে চোখ তুলে বললেন,

—“কোন রাগ?”

—“যে রাগের জন্য আপনাকে একসময় ‘রাগী স্যার’ বলতাম।”

শায়ন হেসে বললেন,

—“ওটা তো তোমার দুষ্টুমির সঙ্গে চলে গেছে।”

নেহা হেসে ফেলল।

তারপর বলল,

—“জানেন, আমি একসময় আপনাকে খুব অপছন্দ করতাম।”

—“জানি।”

—“তারপর আপনার ওপর অভিমান করতাম।”

—“সেটাও জানি।”

—“তারপর…”

নেহা থেমে গেল।

শায়ন বললেন,

—“তারপর?”

নেহা মৃদু হেসে বলল,

—“তারপর বুঝলাম, আপনার রাগের আড়ালেও অনেক যত্ন ছিল।”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“আর তোমার দুষ্টুমির আড়ালেও অনেক ভালো গুণ ছিল।”

নেহা হেসে বলল,

—“তাহলে আমরা দুজনেই ভুল বুঝেছিলাম।”

—“হয়তো।”

নেহা জানালার বাইরে তাকাল।

সন্ধ্যার আকাশে হালকা আলো।

তার মনে হলো, কিছু সম্পর্ক শুরু হয় ঝগড়া দিয়ে, কিছু শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে।

কিন্তু সময়, সম্মান আর বোঝাপড়া সেই সম্পর্ককে অন্যরকম সুন্দর করে তুলতে পারে।

নেহার জীবনও তেমনই বদলে গিয়েছিল।

একসময় সে ছিল চঞ্চল, দুষ্টু আর দায়িত্বহীন।

শায়নের কঠোর কথাগুলো তাকে কষ্ট দিয়েছিল।

কিন্তু সেই কষ্টই তাকে নিজের শক্তি চিনতে শিখিয়েছিল।

আর শায়নও বুঝেছিলেন, কাউকে বদলাতে হলে শুধু বকা নয়, বিশ্বাসও দিতে হয়।

তাদের গল্প তাই শুধু ভালো লাগার গল্প ছিল না।

এটা ছিল রাগ, অভিমান, পরিবর্তন, সম্মান আর নতুন করে একে অপরকে বোঝার গল্প।

নেহা মুচকি হেসে বলল,

—“স্যার…”

শায়ন তাকালেন।

—“এখনও স্যার ডাকছ?”

নেহা হেসে বলল,

—“অভ্যাস তো!”

শায়নও হেসে ফেললেন।

—“তাহলে আজ থেকে একটা নতুন নাম শিখে নাও।”

—“কী?”

—“শায়ন।”

নেহা লাজুক হেসে মাথা নিচু করল।

পুরোনো ‘রাগী স্যার’ আর নেই।

তার জায়গায় এসেছে এমন একজন মানুষ, যাকে নেহা আজ নিজের জীবনের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ হিসেবে জানে।

আর তাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো—রাগ আর অভিমানের সব পুরোনো দেয়াল পেরিয়ে, একে অপরকে সম্মান আর বোঝাপড়ার সঙ্গে পাশে নিয়ে।

 

....
👁 129