তোমার চোখ খোলার অপেক্ষায়

শহরের একটি নামী হোটেলে কাজ করত ইশান। বয়স খুব বেশি নয়। প্রাণচঞ্চল, হাসিখুশি আর একটু অগোছালো স্বভাবের ছেলে। কাজের সময় কাজ করত ঠিকই, কিন্তু কাজের বাইরে জীবন নিয়ে খুব একটা ভাবত না।

তার কাছে জীবন মানেই ছিল—আজকের দিনটা ভালোভাবে কাটানো।

ভবিষ্যতে কী করবে, কোথায় থাকবে, নিজের স্বপ্নগুলো কীভাবে পূরণ করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর তার কাছে ছিল না।

হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে কাজ করত নীলা।

নীলা ছিল ইশানের একেবারে বিপরীত। শান্ত, দায়িত্বশীল এবং নিজের কাজের ব্যাপারে খুব যত্নশীল। অপ্রয়োজনীয় কথা বলত না। তবে পরিচিত মানুষদের সঙ্গে তার হাসিখুশি আচরণ ছিল।

ইশান আর নীলার পরিচয় অবশ্য খুব গভীর ছিল না।

একই হোটেলে কাজ করার কারণে প্রতিদিন দেখা হতো। কখনো ইশান নীলার ডেস্কের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বলত,

—আজ এত গম্ভীর কেন?

নীলা কম্পিউটার থেকে চোখ না তুলে বলত,

—আমি গম্ভীর না। কাজ করছি।

—কাজ করার সময় হাসা যায় না?

—তুমি তো কাজের সময়ও হাসো।

—সেটাই আমার বিশেষ গুণ।

নীলা তখন মুচকি হাসত।

এই ছোট ছোট কথার মধ্য দিয়েই তাদের একটা অদ্ভুত বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল।

কেউ কাউকে নিয়ে বিশেষ কিছু ভাবত না।

অন্তত ইশান তখনও সেটা বুঝতে পারেনি।

একদিন সকালে হোটেলে প্রচণ্ড ব্যস্ততা ছিল। শহরে একটি বড় অনুষ্ঠান থাকায় অতিথির সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

ইশান একের পর এক টেবিলে খাবার পৌঁছে দিচ্ছিল।

হঠাৎ নীলা তাকে ডাকল।

—ইশান!

সে ফিরে তাকাল।

—কী হয়েছে?

—এই ফাইলগুলো একটু ম্যানেজারের রুমে দিয়ে আসবে?

ইশান ফাইলগুলো হাতে নিয়ে বলল,

—আমি কি তোমার ব্যক্তিগত সহকারী?

নীলা বলল,

—না। কিন্তু আজ থেকে হতে পারো।

ইশান হেসে ফেলল।

—বেতন কত?

—এক কাপ চা।

—এত কম?

—চাইলে বিস্কুটও দেব।

—ঠিক আছে। চুক্তি হলো।

ফাইলগুলো নিয়ে ইশান চলে গেল।

ফিরে এসে দেখল, নীলা একটা কাগজ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

—কী হলো?

—আজ আমার একটু আগে বের হতে হবে।

—কেন?

—মায়ের ডাক্তার দেখানোর সময় আছে।

—সব ঠিক আছে তো?

—হ্যাঁ। নিয়মিত চেকআপ।

ইশান মাথা নাড়ল।

—ঠিক আছে। তুমি যাও। আজকের কাজ আমি সামলে দেব।

নীলা অবাক হয়ে বলল,

—তুমি?

—হ্যাঁ। এত অবাক হওয়ার কী আছে?

—তুমি সাধারণত নিজের কাজই ঠিকমতো সামলাতে পারো না।

—আজ প্রমাণ করে দেব আমি দায়িত্বশীল।

নীলা হেসে বলল,

—দেখি তাহলে।

সেদিন বিকেলে নীলা কাজ শেষ করে বেরিয়ে গেল।

ইশান কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও একবার তাকে গেট দিয়ে বের হতে দেখল।

নীলা যাওয়ার আগে হাত নেড়ে বলেছিল,

—কাল দেখা হবে।

ইশানও হেসে বলেছিল,

—কাল দেখা হবে।

কিন্তু সেই সাধারণ কথাটাই পরদিন তার কাছে সবচেয়ে ভারী হয়ে দাঁড়াবে—তা সে তখন জানত না।

পরদিন সকাল।

ইশান যথারীতি হোটেলে এসে কাজে যোগ দিল।

কিন্তু নীলাকে কোথাও দেখা গেল না।

সাড়ে আটটা।

নয়টা।

সাড়ে নয়টা।

নীলা এল না।

ইশান প্রথমে বিষয়টা নিয়ে খুব একটা ভাবল না।

হয়তো দেরি হয়েছে।

কিন্তু দশটা বেজে গেলেও নীলা এল না।

ইশান ফ্রন্ট ডেস্কের অন্য এক কর্মীকে জিজ্ঞেস করল,

—নীলা আজ আসেনি?

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

—না। আমিও দেখিনি।

ইশান পকেট থেকে ফোন বের করল।

নীলার নম্বরে কল দিল।

ফোন বন্ধ।

কেমন একটা অস্বস্তি হলো তার।

ঠিক তখনই হোটেলের ম্যানেজার দ্রুত রেস্টুরেন্টের দিকে এসে বললেন,

—ইশান, তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।

—জি স্যার?

ম্যানেজার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—তুমি নীলাকে চেনো, তাই না?

ইশানের বুকের ভেতর হঠাৎ ধক করে উঠল।

—জি।

—সকালে ওর পরিবারের কাছ থেকে ফোন এসেছে।

—কী হয়েছে?

ম্যানেজার নিচু গলায় বললেন,

—রাস্তায় একটা দুর্ঘটনা হয়েছে। নীলা হাসপাতালে আছে।

ইশানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—কী?

—ওর পরিবার এখন হাসপাতালে।

ইশান আর কিছু শুনতে পেল না।

তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরতে লাগল—

“নীলা হাসপাতালে আছে।”

সে কোনো কিছু না ভেবেই বেরিয়ে পড়ল।

হাসপাতালে পৌঁছে সে নীলার পরিবারের কাউকে খুঁজতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর একজন মধ্যবয়সী মহিলা ছুটে এসে বললেন,

—তুমি কি ইশান?

—জি। নীলার কী অবস্থা?

মহিলার চোখ ভেজা।

—ডাক্তাররা চিকিৎসা করছেন।

—আমি কি ওকে দেখতে পারব?

—এখন না। ওকে ভেতরে নেওয়া হয়েছে।

ইশান করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সবকিছু বদলে গেছে।

গতকালও নীলা তার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছিল।

আজ সে হাসপাতালের একটা কেবিনের ভেতরে, আর ইশান বাইরে দাঁড়িয়ে কিছুই করতে পারছে না।

অনেকক্ষণ পর একজন ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।

নীলার মা দ্রুত এগিয়ে গেলেন।

—ডাক্তার, আমার মেয়ে কেমন আছে?

—ওর মাথায় আঘাত লেগেছে। শরীরেও কিছু আঘাত আছে। আপাতত অবস্থা স্থিতিশীল, কিন্তু ও এখনো অচেতন।

নীলার মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

—ও কবে জ্ঞান ফিরে পাবে?

ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন,

—এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আমাদের পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

ইশান কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।

তার বুকের ভেতর অদ্ভুত ভারী একটা অনুভূতি হচ্ছিল।

সে নিজেকেই প্রশ্ন করল—

কেন এত কষ্ট হচ্ছে?

নীলা তো তার পরিবারের কেউ নয়।

তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্কও নেই।

তবু কেন মনে হচ্ছে, হাসপাতালের ওই দরজার ওপারে থাকা মানুষটা তার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ?

সন্ধ্যা হয়ে গেল।

হাসপাতালের করিডোর ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে লাগল।

নীলার পরিবার বারবার ডাক্তারের কাছে খবর নিচ্ছিল।

ইশান তখনও যায়নি।

নীলার মা অবাক হয়ে বললেন,

—বাবা, তুমি এখনো আছ?

ইশান মাথা নাড়ল।

—জি।

—তোমার বাসায় জানাবে না?

—জানাব।

—তুমি চাইলে বাড়ি যেতে পারো।

ইশান কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

—আমি একটু থাকি।

রাত বাড়তে লাগল।

একসময় নীলার মা ক্লান্ত হয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন।

ইশান পাশের চেয়ারে বসে রইল।

হাসপাতালের সাদা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়ছিল আগের দিনের কথা।

নীলার হাসি।

তার ছোট ছোট কথা।

“কাল দেখা হবে।”

ইশানের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

সে খুব আস্তে বলল,

—নীলা, তুমি তো বলেছিলে কাল দেখা হবে...

তারপর চোখ নামিয়ে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর একজন নার্স এসে জানালেন, নীলাকে কেবিনে নেওয়া হয়েছে।

ইশান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।

ভেতরে ঢোকার অনুমতি ছিল না।

তবু সে সেখান থেকে সরল না।

রাত প্রায় বারোটা।

নীলার মা বললেন,

—বাবা, তুমি বাড়ি যাও। অনেক রাত হয়েছে।

ইশান ধীরে মাথা নাড়ল।

—কাল সকালে আবার আসব।

তিনি অবাক হয়ে তাকালেন।

—আবার আসবে?

ইশান মৃদু স্বরে বলল,

—জি।

তারপর হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল সে।

কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের একটা অংশ হাসপাতালের সেই করিডোরেই রেখে এসেছে।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর তার প্রথম চিন্তা ছিল নীলা।

সে দ্রুত তৈরি হয়ে আবার হাসপাতালে ছুটে গেল।

হাসপাতালের গেটে পৌঁছেই সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ভেতরে ঢুকে নীলার মায়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—আজ ওর কোনো পরিবর্তন হয়েছে?

নীলার মা মাথা নাড়লেন।

—না বাবা। এখনো ঘুমের মতোই আছে।

ইশান চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পর কেবিনের কাঁচের দরজার ওপাশে নীলাকে দেখা গেল।

চোখ বন্ধ।

নড়াচড়া নেই।

যে মেয়েটা প্রতিদিন ব্যস্তভাবে কাজ করত, হাসত, কথা বলত—আজ সে সম্পূর্ণ নীরব।

ইশান অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজের অজান্তেই মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিল—

নীলা যতদিন এখানে থাকবে, সে ততদিন তার পাশে থাকবে।

কেন থাকবে, কতদিন থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর তখনও তার জানা ছিল না।

সে শুধু জানত,

নীলা একা অপেক্ষা করবে না।

সকালের হাসপাতালটা অন্যরকম।

কেউ দ্রুত হাঁটছে, কেউ রিপোর্ট হাতে নিয়ে ছুটছে, কেউ আবার করিডোরের এক কোণে বসে চুপচাপ অপেক্ষা করছে। প্রতিটি মানুষের চোখে যেন আলাদা আলাদা গল্প।

ইশান সেই গল্পগুলোর ভিড়ে শুধু একজনকেই খুঁজছিল—নীলা।

কেবিনের কাঁচের দরজার ওপাশে নীলা তখনও নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে ছিল।

চোখ বন্ধ।

মুখে কোনো কথা নেই।

শুধু যন্ত্রের নিয়মিত শব্দ।

ইশান কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে বাইরে এসে নীলার মায়ের পাশে বসল।

—ডাক্তার কী বলেছেন?

—বলেছেন, এখনো পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

—জ্ঞান ফেরার কোনো সম্ভাবনা...

কথাটা শেষ করতে পারল না ইশান।

নীলার মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—ডাক্তার বলেছেন সময় লাগতে পারে।

ইশান মাথা নিচু করল।

সময়।

শব্দটা খুব সাধারণ।

কিন্তু সেদিন থেকে ইশানের কাছে সময়ের অর্থ বদলে গেল।

আগে তার কাছে একদিন মানে ছিল চব্বিশ ঘণ্টা।

এখন একদিন মানে—নীলার চোখ খোলার জন্য আরও একদিন অপেক্ষা।

দুপুরের দিকে ইশান হোটেলে ফোন করল।

ম্যানেজার বললেন,

—তুমি আজও আসবে না?

—স্যার, আমি হাসপাতালে আছি।

—নীলার অবস্থা কেমন?

—এখনো জ্ঞান ফেরেনি।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর ম্যানেজার বললেন,

—তুমি যতদিন প্রয়োজন, ছুটি নাও।

ইশান ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রেখে দিল।

কিছুক্ষণ পর রাফি ফোন করল।

—ভাই, কেমন আছে নীলা?

—ভালো না।

—ডাক্তার কী বলেছে?

—সময় লাগবে।

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তুই ওর পাশে থাক।

ইশান জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—থাকব।

ফোন কেটে দেওয়ার পর সে আবার কেবিনের দিকে তাকাল।

বিকেলে নীলার মা বাড়ি থেকে কিছু কাপড় আনতে গেলেন। যাওয়ার আগে বললেন,

—বাবা, তুমি একটু এখানে থেকো।

—জি আন্টি।

নীলার মা চলে গেলে ইশান প্রথমবার কেবিনের ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেল।

সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধা করল।

তারপর ধীরে ধীরে নীলার বিছানার পাশে গিয়ে বসল।

এত কাছে থেকে নীলাকে দেখে তার বুকটা আরও ভারী হয়ে গেল।

সে খুব আস্তে বলল,

—নীলা...

কোনো উত্তর নেই।

ইশান একটু হেসে বলল,

—তুমি জানো, তোমার জন্য আমি আজকাল অনেক তাড়াতাড়ি উঠছি?

কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

—আগে সকাল আটটার আগে আমার ঘুমই ভাঙত না। এখন সাতটার আগেই উঠে যাই।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—তোমার জন্য আমার চাকরিটাও প্রায় হাতছাড়া হতে বসেছে।

তারপর নিজেই হেসে ফেলল।

—তবে চিন্তা করো না। ম্যানেজার আমাকে ছুটি দিয়েছে।

নীলা নিশ্চুপ।

ইশান এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

—তুমি কিন্তু খুব বেশি সময় নিচ্ছ।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

—আমাদের তো কাল দেখা হওয়ার কথা ছিল। তুমি এভাবে কথা না বলে শুয়ে আছ কেন?

তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এল।

—একবার চোখ খুলে বলো, তুমি ঠিক আছ।

কোনো উত্তর এল না।

ইশান আর কিছু বলল না।

শুধু কিছুক্ষণ নীলার পাশে বসে থাকল।

সন্ধ্যার দিকে নীলার মা ফিরে এলেন।

ইশান উঠে দাঁড়াল।

—আন্টি, আমি এখন যাই।

—কাল আসবে?

ইশান এক মুহূর্তও না ভেবে বলল,

—হ্যাঁ।

—প্রতিদিন আসতে হবে না বাবা।

ইশান মৃদু হেসে বলল,

—আমার আসতে ইচ্ছে করে।

নীলার মা তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুক।

ইশান হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু পরদিন সকালে আবার ফিরে এল।

হাতে ছিল একটা ছোট ব্যাগ।

নীলার মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

—এগুলো কী?

—কিছু দরকারি জিনিস এনেছি। আন্টি, আপনি তো ঠিকমতো খাচ্ছেন না।

—তুমি এসব কেন আনছ?

—আপনিও তো অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন।

তিনি কিছু বললেন না।

শুধু ইশানের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তুমি নীলার খুব ভালো বন্ধু, তাই না?

ইশান একটু থেমে বলল,

—হ্যাঁ।

কথাটা বলার সময় তার নিজের কাছেই শব্দটা অদ্ভুত লাগল।

বন্ধু।

তাদের মধ্যে কি সত্যিই শুধু বন্ধুত্ব ছিল?

ইশান উত্তর খুঁজে পেল না।

দিনগুলো ধীরে ধীরে এগোতে লাগল।

দ্বিতীয় দিন।

তৃতীয় দিন।

চতুর্থ দিন।

নীলার কোনো জ্ঞান ফিরল না।

ইশানের প্রতিদিনের রুটিনও বদলে গেল।

সকালে হাসপাতালে আসা।

ডাক্তারের খবর নেওয়া।

নীলার মায়ের জন্য খাবার আনা।

কিছুক্ষণ নীলার পাশে বসা।

তারপর নিজের নতুন কাজের খোঁজ করা।

সন্ধ্যায় আবার হাসপাতালে ফিরে আসা।

রাতে বাড়ি যাওয়া।

আগে যে ছেলে নিজের জীবন নিয়ে এতটা উদাসীন ছিল, এখন সে প্রতিটি কাজের সময় হিসাব করত।

একদিন নীলার মা বললেন,

—বাবা, তুমি নিজের জীবনটাও দেখো।

ইশান হেসে বলল,

—দেখছি তো।

—না। তুমি প্রতিদিন এখানে চলে আসো।

—আন্টি, আমি না এলে কী হবে?

—কিছুই হবে না।

ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমার মনে হবে কিছু একটা বাদ পড়ে গেছে।

নীলার মা আর কিছু বললেন না।

সেদিন রাতে ইশান কেবিনে বসে নীলার সঙ্গে কথা বলছিল।

—আজ একটা কাজ পেয়েছি।

নীলা নিশ্চুপ।

—একটা ছোট ক্যাফেতে। রান্নাঘরে কাজ।

সে হেসে বলল,

—তুমি তো জানো, আমি রান্না খুব একটা পারি না।

তারপর একটু থেমে বলল,

—তবু শিখব।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

—একদিন নিজের একটা রেস্টুরেন্ট করব। তখন তুমি এসে বলবে, খাবার ভালো হয়েছে কি না।

ইশান নিজের কথাতেই হেসে ফেলল।

—তবে তুমি বেশি সমালোচনা করবে না। আমি কিন্তু কষ্ট পাব।

কেবিনের নীরবতা যেন তার কথাগুলো গিলে ফেলল।

ইশান জানত, নীলা হয়তো কিছুই শুনছে না।

তবু সে কথা বলত।

কারণ কথা বললে তার মনে হতো, নীলা একেবারে দূরে নেই।

এক রাতে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার আগে সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,

—আমি কাল আবার আসব।

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে যোগ করল,

—তুমি কিন্তু তখনও এখানে থাকবে।

তারপর চলে গেল।

পরদিন সকালেও সে এল।

কিন্তু সেদিন কেবিনের সামনে গিয়ে সে থমকে দাঁড়াল।

ডাক্তার ভেতরে ছিলেন।

নীলার মা উদ্বিগ্ন মুখে বাইরে দাঁড়িয়ে।

ইশান এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—কী হয়েছে?

নীলার মা বললেন,

—ডাক্তার বলছেন, ওর শরীর চিকিৎসায় একটু সাড়া দিচ্ছে।

ইশানের চোখে হঠাৎ আলো ফুটে উঠল।

—মানে?

ডাক্তার বাইরে এসে বললেন,

—কিছু শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। খুব সামান্য, তবে এটা ইতিবাচক লক্ষণ।

নীলার মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

—তাহলে ও জ্ঞান ফিরে পাবে?

ডাক্তার শান্তভাবে বললেন,

—আমরা আশা করছি। তবে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না।

ডাক্তার চলে গেলেন।

ইশান কেবিনের কাঁচের দিকে তাকিয়ে রইল।

কয়েকদিন পর প্রথমবার তার মনে হলো, হয়তো নীলা সত্যিই আবার চোখ খুলবে।

সে খুব আস্তে বলল,

—শুনছ নীলা?

অবশ্য কোনো উত্তর এল না।

তবু ইশান হাসল।

—আমি কিন্তু অপেক্ষা করছি।

তারপর কেবিনের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সে মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিল—

নীলা যতদিন না নিজের চোখে তাকে দেখে, ততদিন সে এই অপেক্ষা ছেড়ে যাবে না।

দুর্ঘটনার পর প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেছে।

নীলার কোনো জ্ঞান ফেরেনি।

তবু ডাক্তাররা বলছিলেন, তার শরীর ধীরে ধীরে চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছে। এই সামান্য আশাটুকুই নীলার পরিবারকে শক্ত করে রেখেছিল।

আর ইশান?

সে যেন হাসপাতালেরই একজন হয়ে গিয়েছিল।

সকাল হলেই হাসপাতালে আসত।

কখনো হাতে নাস্তা, কখনো ফল, আবার কখনো নীলার জন্য ছোট কোনো জিনিস নিয়ে আসত।

যদিও নীলা কিছুই দেখতে বা ব্যবহার করতে পারছিল না।

তবু ইশানের মনে হতো, একদিন যখন নীলা জেগে উঠবে, তখন সে এসবের কথা বলবে।

একদিন সকালে ইশান কেবিনে ঢুকেই বলল,

—আজ তোমার জন্য একটা খবর আছে।

নীলা নিশ্চুপ।

ইশান চেয়ার টেনে বিছানার পাশে বসল।

—আমি নতুন কাজ শুরু করেছি।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—হ্যাঁ, সত্যি। একটা ছোট ক্যাফেতে।

তারপর একটু হেসে যোগ করল,

—তুমি থাকলে নিশ্চয়ই বলতে, “ইশান, তুমি কি সত্যিই কাজ করতে পারবে?”

সে নীলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

—আমি পারব। দেখো।

কোনো উত্তর নেই।

তবু সে কথা বলতে থাকল।

আগে ইশান কখনো নিজের সঙ্গে কথা বলত না।

এখন সে প্রতিদিন নীলার সঙ্গে কথা বলে।

কখনো নিজের দিনের গল্প।

কখনো ক্যাফের গল্প।

কখনো ছোটবেলার কথা।

কখনো আবার শুধু নীরব হয়ে বসে থাকে।

সেদিনও অনেকক্ষণ বসে থাকার পর সে উঠে দাঁড়াল।

ঠিক তখনই নীলার আঙুলে খুব সামান্য একটা নড়াচড়া হলো।

ইশান থমকে গেল।

সে আবার তাকাল।

কিছু হয়নি।

হয়তো তার ভুল।

সে নিজের চোখ ঘষে আবার তাকাল।

নীলা আগের মতোই নিশ্চুপ।

ইশান নিজেকে বোঝাল, হয়তো সে ভুল দেখেছে।

কিন্তু তবু তার বুকের ভেতর একটা আশার আলো জ্বলে উঠল।

সে সঙ্গে সঙ্গে নার্সকে ডাকল।

নার্স এসে পরীক্ষা করলেন।

—হয়তো অনিচ্ছাকৃত প্রতিক্রিয়া। তবে আমরা নজরে রাখছি।

ইশান মাথা নাড়ল।

কথাটা ছোট ছিল।

কিন্তু তার কাছে অনেক বড়।

সে বাইরে এসে নীলার মাকে বলল,

—আন্টি, আমি মনে হয় ওর আঙুল নড়তে দেখেছি।

নীলার মা ছুটে কেবিনের দিকে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে পরীক্ষা করলেন।

তিনি বললেন,

—হ্যাঁ, কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

নীলার মা চোখ মুছলেন।

ইশান দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার মনে হচ্ছিল, কয়েক সপ্তাহ ধরে জমে থাকা অন্ধকারের মধ্যে কেউ যেন ছোট্ট একটা আলো জ্বেলে দিয়েছে।

সেদিন সন্ধ্যায় নীলার মা ইশানকে বললেন,

—বাবা, তুমি না থাকলে আমরা এতটা সাহস পেতাম না।

ইশান মাথা নেড়ে বলল,

—আমি তো কিছুই করছি না।

—করছ।

—না আন্টি। আমি শুধু এখানে থাকি।

নীলার মা মৃদু হেসে বললেন,

—কখনো কখনো পাশে থাকাটাই সবচেয়ে বড় সাহায্য।

কথাটা ইশানের মনে গেঁথে গেল।

রাতে বাড়ি ফেরার সময় সে অনেকক্ষণ রাস্তায় হাঁটল।

ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি ছুটছে, মানুষ ছুটছে, দোকান বন্ধ হচ্ছে।

সবকিছু আগের মতোই আছে।

শুধু তার নিজের জীবনটা আর আগের মতো নেই।

সে বুঝতে পারছিল, নীলার জন্য তার অনুভূতিটা ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে।

কিন্তু সে সেটা নিয়ে কাউকে কিছু বলতে চাইছিল না।

এমনকি নিজেকেও না।

কারণ নীলা এখনো অসুস্থ।

এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—নীলা সুস্থ হয়ে উঠুক।

অন্য সবকিছু পরে।

পরদিন ইশান ক্যাফেতে কাজে যোগ দিল।

নতুন জায়গা, নতুন মানুষ।

কাজটা কঠিন ছিল।

রান্নাঘরে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকতে হতো।

প্রথম দিনই এক কর্মী তাকে বলল,

—তুমি আগে রান্না করেছ?

ইশান সত্যি কথা বলল,

—না।

—তাহলে এখানে টিকতে পারবে?

ইশান হেসে বলল,

—চেষ্টা করব।

সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে সে সরাসরি হাসপাতালে চলে গেল।

নীলার মা তাকে দেখে বললেন,

—আজ খুব ক্লান্ত লাগছে।

—কাজ একটু বেশি ছিল।

—তবু চলে এসেছ?

—হ্যাঁ।

—তোমার কি কাল আবার কাজ নেই?

—আছে।

—তাহলে বিশ্রাম নাও।

ইশান হেসে বলল,

—এখানে এলে ক্লান্তি কমে যায়।

নীলার মা আর কিছু বললেন না।

ইশান কেবিনে ঢুকে নীলার পাশে বসল।

আজ সে খুব ক্লান্ত ছিল।

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর বলল,

—আজ অনেক কাজ করেছি।

তারপর হেসে বলল,

—তুমি থাকলে বলতেই, “অবশেষে কাজ করতে শিখেছ।”

নীলা নিশ্চুপ।

ইশান কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

—তুমি জানো, আমি তোমার সঙ্গে এত কথা বলি কেন?

কোনো উত্তর নেই।

—কারণ তুমি চুপ করে থাকলে হাসপাতালটা আরও বেশি নীরব লাগে।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তুমি যখন জেগে উঠবে, আমাকে কিন্তু অনেক কথা শুনতে হবে।

হঠাৎ নীলার চোখের পাতা খুব সামান্য কেঁপে উঠল।

ইশান থমকে গেল।

সে এবার নিশ্চিতভাবে দেখল।

—নীলা?

কোনো উত্তর নেই।

ইশান দ্রুত নার্সকে ডাকল।

নার্স এসে পরীক্ষা করলেন।

কিছুক্ষণ পর ডাক্তারও এলেন।

পরীক্ষা শেষে ডাক্তার বললেন,

—এটা ভালো লক্ষণ হতে পারে। তবে এখনো অনেক সময় লাগতে পারে।

ইশান মাথা নাড়ল।

তারপর আবার নীলার পাশে বসে পড়ল।

সে নীলার হাতের কাছে নিজের হাত রাখল, কিন্তু স্পর্শ না করে বলল,

—আমি এখানে আছি।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—তুমি চাইলে এখনই চোখ খুলতে পারো।

কিছুই হলো না।

তবু ইশান অপেক্ষা করল।

সেদিন রাতেও সে অনেকক্ষণ হাসপাতালে ছিল।

শেষ পর্যন্ত নীলার মা তাকে বাড়ি যেতে বললেন।

হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় ইশান পেছনে তাকাল।

কেবিনের আলো তখনও জ্বলছে।

তার মনে হলো, নীলা যেন তাকে বলছে—

“আরেকটু অপেক্ষা করো।”

সে মৃদু হেসে মনে মনে উত্তর দিল—

“আমি তো অপেক্ষা করছিই।”

দিনের পর দিন এভাবেই চলতে লাগল।

নীলার আঙুলে মাঝে মাঝে নড়াচড়া দেখা যায়।

চোখের পাতা কেঁপে ওঠে।

ডাক্তাররা বলছেন, এগুলো ইতিবাচক লক্ষণ।

আর ইশান প্রতিদিন আগের চেয়ে একটু বেশি আশাবাদী হয়ে উঠছে।

পরদিন সকাল থেকেই ইশানের মনটা অস্থির ছিল।

আগের রাতে নীলার চোখের পাতা কেঁপে উঠেছিল। ডাক্তার বলেছিলেন, এটা ভালো লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু ইশান নিশ্চিত হতে পারছিল না।

তবু তার মনে একটা বিশ্বাস জন্মেছিল—নীলা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।

সকালে ক্যাফের কাজে যাওয়ার আগে সে হাসপাতালে গেল।

কেবিনের দরজা খুলে দেখল, নীলার মা পাশে বসে আছেন।

ইশান আসতেই তিনি মৃদু হেসে বললেন,

—আজ একটু আগে এসেছ।

—হ্যাঁ। কাজের আগে একবার দেখে যেতে ইচ্ছে হলো।

নীলার মা বললেন,

—আজ সকালে ওর চোখের পাতা কয়েকবার নড়েছে।

ইশানের চোখ চকচক করে উঠল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ। ডাক্তারও দেখেছেন।

ইশান ধীরে ধীরে নীলার পাশে গিয়ে বসল।

কিছুক্ষণ চুপ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—নীলা, আমি এসেছি।

কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

ইশান আবার বলল,

—শুনতে পাচ্ছ?

নীলার চোখের পাতা খুব সামান্য কেঁপে উঠল।

ইশান হঠাৎ সোজা হয়ে বসল।

—নীলা?

এবারও কোনো উত্তর নেই।

কিন্তু ইশানের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

—ঠিক আছে। তুমি কথা না বললেও চলবে। আমি একাই কথা বলব।

নীলার মা মৃদু হেসে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।

ইশান চেয়ারে বসে বলতে শুরু করল,

—আজকে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। ক্যাফেতে নতুন একজন ছেলে এসেছে। সে আমাকে দেখে বলেছে, আমি নাকি খুব ভালো রান্না করি।

কিছুক্ষণ থেমে বলল,

—আমি তাকে সত্যিটা বলিনি যে গতকাল আমি লবণ আর চিনি গুলিয়ে ফেলেছিলাম।

নিজের কথায় নিজেই হেসে ফেলল সে।

—তুমি থাকলে এখন নিশ্চয়ই হাসতে।

কেবিনে নীরবতা।

ইশান ধীরে বলল,

—তুমি হাসবে। আমি জানি।

সেদিন অনেকক্ষণ সে নীলার পাশে বসে রইল।

তারপর কাজে চলে গেল।

দিনের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় আবার হাসপাতালে ফিরল।

কিন্তু এবার কেবিনের সামনে গিয়ে সে দেখল ডাক্তার দাঁড়িয়ে আছেন।

ইশান এগিয়ে গেল।

—ডাক্তার, কিছু হয়েছে?

ডাক্তার বললেন,

—রোগী আজ কয়েকবার চোখ খোলার চেষ্টা করেছে।

ইশানের বুকের ভেতর আনন্দে ভরে গেল।

—মানে ও জ্ঞান ফিরে পাওয়ার কাছাকাছি?

—সম্ভাবনা আছে। তবে আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে।

—জি।

ডাক্তার চলে যাওয়ার পর ইশান কেবিনে ঢুকল।

নীলা তখনও চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল।

ইশান তার পাশে বসে বলল,

—আজ তোমার অনেক প্রশংসা শুনলাম।

কোনো উত্তর নেই।

—ডাক্তার বলেছেন তুমি খুব সাহসী।

কিছুক্ষণ পর ইশান আস্তে বলল,

—আমি কিন্তু জানতাম।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

—তুমি জানো, আমি প্রতিদিন তোমার সঙ্গে কথা বলি। প্রথমে সবাই ভাবত আমি পাগল হয়ে গেছি।

ইশান হেসে বলল,

—আমিও ভাবতাম, হয়তো সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছি।

তারপর তার কণ্ঠ নরম হয়ে গেল।

—কিন্তু এখন মনে হয়, তুমি শুনতে পাও।

হঠাৎ নীলার চোখের পাতা নড়ল।

ইশান থমকে গেল।

—নীলা?

এবার নীলার চোখ ধীরে ধীরে একটু খুলল।

খুব অল্প সময়ের জন্য।

আবার বন্ধ হয়ে গেল।

ইশান দ্রুত নার্সকে ডাকল।

কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তার এলেন।

পরীক্ষা শেষে বললেন,

—হ্যাঁ, ও সাড়া দিচ্ছে। তবে এখনো পুরোপুরি জ্ঞান ফেরেনি।

নীলার মা চোখ মুছতে মুছতে বললেন,

—ও কি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছে?

ডাক্তার বললেন,

—সম্ভাবনা আছে। তাই ওর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন।

সেদিন রাতে নীলার পাশে সবাই কিছুক্ষণ করে কথা বলল।

তার মা শৈশবের কথা বললেন।

বাবা বললেন, বাড়ি ফিরে গেলে তার জন্য প্রিয় খাবার রান্না করবেন।

আর ইশান?

সে শুধু চুপচাপ বসে ছিল।

নীলার মা বললেন,

—বাবা, তুমি কিছু বলছ না কেন?

ইশান মৃদু হেসে বলল,

—সবাই এত কথা বলছে, আমার কথা বলার দরকার নেই।

—তুমিও বলো।

ইশান নীলার দিকে তাকিয়ে বলল,

—ঠিক আছে।

সে ধীরে ধীরে বলল,

—নীলা, তুমি জানো তো, আমি কিন্তু আমার কথা রেখেছি।

তারপর হেসে বলল,

—প্রতিদিন আসছি।

নীলার চোখের পাতা আবার কেঁপে উঠল।

ইশান এবার আর হাসতে পারল না।

তার চোখ ভিজে গেল।

সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

পরদিন সকালে নীলার অবস্থা আরও একটু ভালো ছিল।

সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ খুলতে পারছিল।

তবে কাউকে স্পষ্টভাবে চিনতে পারছিল কি না, সেটা বোঝা যাচ্ছিল না।

ইশান কেবিনে ঢুকে তার সামনে দাঁড়াল।

—নীলা?

নীলা ধীরে চোখ খুলল।

তার দৃষ্টি অস্পষ্ট।

কয়েক সেকেন্ড পর আবার চোখ বন্ধ করল।

ইশান বলল,

—আমি ইশান।

এইবার নীলার চোখ আবার খুলল।

সে ইশানের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল।

কিন্তু কথা বলতে পারল না।

ইশানের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।

সে আস্তে বলল,

—তাড়াহুড়ো করে কথা বলতে হবে না।

নীলার চোখে অল্প পানি জমল।

ইশান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

সে বুঝতে পারছিল না, নীলা তাকে চিনেছে কি না।

তবু তার মনে হলো, হয়তো চিনেছে।

সে মৃদু হেসে বলল,

—আমি আছি।

নীলা চোখ বন্ধ করে ফেলল।

সেদিন প্রথমবার ইশানের মনে হলো, তার এতদিনের অপেক্ষা সত্যিই একটা উত্তর পেয়েছে।

কিন্তু নীলার সুস্থ হয়ে ওঠার পথ তখনও অনেক দীর্ঘ।

তার কথা বলার শক্তি ফিরতে সময় লাগবে।

হাঁটতে সময় লাগবে।

স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আরও বেশি সময় লাগবে।

তবু ইশান এবার আর ভয় পাচ্ছিল না।

কারণ অন্তত একটা বিষয় সে নিশ্চিতভাবে জানত—

নীলা তাকে শুনতে পাচ্ছে।

আর এই ছোট্ট ব্যাপারটাই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশার মতো মনে হচ্ছিল।

সন্ধ্যায় হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার আগে ইশান নীলার কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,

—কাল আবার আসব।

কয়েক সেকেন্ড পর ভেতর থেকে নীলার চোখ ধীরে ধীরে খুলল।

সে কিছু বলতে পারল না।

শুধু ইশানের দিকে তাকিয়ে রইল।

ইশান মৃদু হেসে বলল,

—এবার কিন্তু পালানোর সুযোগ নেই। তোমাকে অনেক কথা শুনতে হবে।

নীলার চোখের কোণে ক্ষীণ একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল।

নীলার চোখে সেই ক্ষীণ হাসিটা দেখার পর থেকে ইশানের দিনগুলো যেন একটু আলাদা হয়ে গেল।

এখন আর সে শুধু নীলার জন্য অপেক্ষা করত না। সে জানত, নীলা তাকে দেখতে পাচ্ছে, তার কথা শুনতে পাচ্ছে। যদিও এখনো ঠিকমতো কথা বলতে পারছে না, তবু সেই ছোট্ট পরিবর্তনই ইশানের কাছে অনেক বড় ছিল।

ডাক্তারও বলেছিলেন, নীলাকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হবে। শরীর দুর্বল, তাই বেশি কথা বলা বা বেশি সময় জেগে থাকা ঠিক হবে না।

ইশান তাই কেবিনে গিয়ে আগের মতো অনেক কথা বলত না।

শুধু পাশে বসে থাকত।

কখনো জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত।

কখনো নীলার জন্য বই নিয়ে আসত।

একদিন সকালে সে একটা ছোট বই নিয়ে কেবিনে ঢুকল।

নীলা তখন চোখ খোলা রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।

ইশান বলল,

—আজ তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।

নীলা ধীরে তার দিকে তাকাল।

ইশান বইটা দেখিয়ে বলল,

—বই।

নীলা চোখের পাতা নামিয়ে আবার তুলল।

ইশান হাসল।

—তুমি আগে বলেছিলে, আমি বই পড়ি না।

নীলার চোখে সামান্য হাসি ফুটল।

—তাই আজ থেকে পড়ব।

নীলা ঠোঁট নড়ানোর চেষ্টা করল।

কোনো শব্দ বের হলো না।

ইশান দ্রুত বলল,

—কথা বলার চেষ্টা করো না। ডাক্তার নিষেধ করেছেন।

নীলা আবার চোখ বন্ধ করল।

ইশান চুপচাপ বসে রইল।

কিছুক্ষণ পর নীলার মা কেবিনে ঢুকলেন।

মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—আজ কেমন লাগছে?

নীলা চোখের ইশারায় ভালো বোঝানোর চেষ্টা করল।

তার মা হেসে ফেললেন।

—আমার মেয়েটা আবার আগের মতো জেদি হয়ে গেছে।

ইশান মৃদু হেসে বলল,

—এটা ভালো লক্ষণ।

নীলার মা তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—তুমি থাকলে ওর মন ভালো থাকে।

ইশান কিছু বলল না।

তবে নীলা কথাটা শুনে ইশানের দিকে তাকাল।

সেই দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতা ছিল।

আর ছিল এমন একটা অনুভূতি, যেটার নাম দুজনের কেউই তখন দিতে পারছিল না।

দিন কয়েক পর নীলা বসতে পারল।

নার্সের সাহায্যে তাকে বিছানায় কিছুক্ষণ বসানো হলো।

ইশান তখন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।

নীলার মা বললেন,

—বাবা, তুমি ভেতরে এসো।

ইশান ঢুকতেই নীলা তার দিকে তাকাল।

ইশান হেসে বলল,

—বাহ! আজ তো অনেক উন্নতি।

নীলা ঠোঁট নেড়ে খুব আস্তে একটা শব্দ করার চেষ্টা করল।

ইশান কাছে ঝুঁকে বলল,

—কী বলছ?

নীলা আবার চেষ্টা করল।

এবার খুব দুর্বল একটা শব্দ শোনা গেল।

—ই...শান...

ইশান স্থির হয়ে গেল।

তার চোখ বড় হয়ে গেল।

—আমার নাম বললে?

নীলা খুব সামান্য মাথা নাড়ল।

ইশান হেসে ফেলল।

তার চোখে পানি এসে গেল।

সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল।

নীলার মা-ও চোখ মুছলেন।

ইশান আবার নীলার দিকে তাকিয়ে বলল,

—ঠিক আছে। এবার আর তোমাকে নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।

নীলা দুর্বলভাবে হাসল।

কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে পরীক্ষা করলেন।

তিনি বললেন,

—খুব ভালো উন্নতি। তবে এখনো অনেক বিশ্রাম দরকার।

ইশান মাথা নাড়ল।

ডাক্তার চলে গেলে নীলা খুব আস্তে বলল,

—কত...দিন?

ইশান বুঝতে পারল না।

—কী?

নীলা আবার বলল,

—কত...দিন?

—কীসের?

নীলা চোখের ইশারায় হাসপাতালের দিকে বোঝাল।

ইশান বুঝতে পেরে বলল,

—তুমি কতদিন এখানে আছ?

নীলা মাথা নাড়ল।

ইশান একটু থেমে বলল,

—এক মাসের মতো।

নীলার চোখ বড় হয়ে গেল।

—এক...মাস?

—হ্যাঁ।

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর চোখ বন্ধ করল।

ইশান বুঝতে পারল, এতদিনের সময়টা যেন তার কাছে একটা শূন্যতা।

সে আস্তে বলল,

—সবকিছু তোমাকে পরে বলব।

নীলা চোখ খুলল।

—তুমি...প্রতিদিন?

ইশান মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

নীলার চোখে পানি চলে এল।

—কেন?

প্রশ্নটা খুব ছোট।

কিন্তু উত্তরটা ইশানের কাছে সহজ ছিল না।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—কারণ তোমাকে একা রেখে যেতে পারিনি।

নীলা তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

—ধন্য...বাদ।

ইশান মাথা নাড়ল।

—ধন্যবাদ দিতে হবে না।

—তবু...

—না।

ইশান একটু হাসল।

—তুমি সুস্থ হয়ে যাও। সেটাই যথেষ্ট।

সেদিন বিকেলে নীলা অনেকক্ষণ ঘুমাল।

ইশান বাইরে বসে ছিল।

নীলার মা এসে বললেন,

—বাবা, তুমি ওকে খুব আপন করে ফেলেছ।

ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—জানি না আন্টি।

—জানো না?

—না।

—তাহলে প্রতিদিন এতটা সময় দাও কেন?

ইশান জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—হয়তো ওকে দেখে আমার মনে হয়, মানুষকে ছেড়ে যাওয়া সবসময় সহজ নয়।

নীলার মা মৃদু হেসে বললেন,

—তুমি ভালো ছেলে।

ইশান কিছু বলল না।

তার মনে তখন অন্য একটা প্রশ্ন ঘুরছিল।

নীলা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেলে কি সে আগের মতোই তার জীবনে থাকবে?

নাকি এই হাসপাতালের দিনগুলোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পর্কটাও শেষ হয়ে যাবে?

এই চিন্তাটা তাকে অদ্ভুতভাবে অস্থির করে তুলছিল।

পরদিন নীলা হাঁটার চেষ্টা করল।

নার্সের সাহায্যে কয়েক পা এগোল।

কিন্তু শরীর দুর্বল হওয়ায় আবার বসে পড়ল।

ইশান পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

—পারবে।

নীলা ক্লান্ত গলায় বলল,

—পারছি না।

—আজ না পারলে কাল পারবে।

—যদি কালও না পারি?

—পরশু।

নীলা তাকাল।

ইশান হাসল।

—যতদিন না পারো, ততদিন চেষ্টা করবে।

নীলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার উঠে দাঁড়াল।

এক পা।

তারপর আরেক পা।

খুব ধীরে।

কিন্তু এবার সে আগের চেয়ে একটু বেশি হাঁটতে পারল।

ইশান হাততালি দিয়ে বলল,

—দেখেছ? তুমি পারো।

নীলা হাসল।

—তুমি...অনেক কথা বলো।

ইশান হেসে বলল,

—তুমি এতদিন কথা বলতে পারোনি। তাই তোমার ভাগের কথাও আমাকে বলতে হয়েছে।

নীলা মাথা নেড়ে হাসল।

সেদিন রাতে ইশান বাড়ি ফেরার পথে বুঝতে পারল—

সে নীলার সুস্থ হওয়ার অপেক্ষা করছে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কিছু চাইছে।

সে চাইছে, নীলা সুস্থ হওয়ার পরও যেন তার জীবনে থাকে।

কিন্তু সেই কথাটা এখন বলা যাবে না।

কারণ নীলা এখনো নিজের জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করছে।

তাই ইশান নিজের অনুভূতিকে আবারও চুপ করে রাখল।

আর পরদিন হাসপাতালে গিয়ে শুধু বলল,

—আজ কেমন আছ?

নীলা মৃদু হেসে উত্তর দিল,

—ভালো।

মাত্র একটি শব্দ।

কিন্তু ইশানের কাছে মনে হলো—

অনেকদিন পর তার পৃথিবী আবার স্বাভাবিক একটা শব্দ শুনল।

নীলার শরীর এখন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিল।

সে নিজে বসতে পারছিল, কয়েক পা হাঁটতে পারছিল, আর অল্প অল্প করে কথা বলতেও পারছিল। ডাক্তাররা বলেছিলেন, আরও কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখার পর তাকে বাসায় নেওয়া যেতে পারে।

খবরটা শুনে নীলার মা খুব খুশি হলেন।

কিন্তু ইশানের মনে আনন্দের পাশাপাশি অদ্ভুত একটা শূন্যতা তৈরি হলো।

কারণ এতদিন হাসপাতালই ছিল তাদের দেখা হওয়ার জায়গা।

প্রতিদিন সকালে ইশান আসত।

নীলা অপেক্ষা করত।

দুজন কথা বলত।

এখন নীলা বাড়ি চলে গেলে?

এই প্রশ্নটা ইশান নিজেকেই করতে লাগল।

একদিন বিকেলে নীলা জানালার পাশে বসে ছিল।

ইশান এসে বলল,

—আজ কী ভাবছ?

নীলা বাইরে তাকিয়ে বলল,

—বাড়ির কথা।

—বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে?

—অনেক।

—তাহলে তো ভালো খবর।

নীলা একটু চুপ করে থেকে বলল,

—কিন্তু ভয়ও লাগছে।

—কিসের ভয়?

—এতদিন পর বাইরে গেলে সবকিছু কেমন লাগবে জানি না।

ইশান বলল,

—প্রথমে অদ্ভুত লাগবে। তারপর ঠিক হয়ে যাবে।

—তুমি কি থাকবে?

ইশান থেমে গেল।

—কোথায়?

—বাড়ি যাওয়ার পর।

প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিকভাবে করেছিল নীলা।

কিন্তু ইশানের মনে হলো, কেউ যেন তার বুকের ভেতর হাত রেখে প্রশ্ন করেছে।

সে হেসে বলল,

—থাকব।

নীলা তার দিকে তাকাল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—হাসপাতালে তো প্রতিদিন আসতে। তখন তো তোমার কোনো অসুবিধা হয়নি।

ইশান মৃদু হেসে বলল,

—তখন তোমার দরকার ছিল।

নীলা নিচু গলায় বলল,

—এখনও দরকার হতে পারে।

ইশান কিছু বলল না।

তারপর বলল,

—তুমি শুধু সুস্থ হও।

নীলা মাথা নাড়ল।

কয়েকদিন পর ডাক্তার জানালেন, নীলাকে দুই দিনের মধ্যে বাসায় নেওয়া যেতে পারে।

সেদিন নীলার মুখে অনেকদিন পর সত্যিকারের আনন্দ দেখা গেল।

সে বলল,

—ইশান, আমি বাড়ি যাব!

ইশান হাসল।

—অবশেষে।

—তুমি খুশি?

—অবশ্যই।

—তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুশির চেয়ে চিন্তিত।

ইশান একটু থেমে বলল,

—তুমি ঠিকমতো হাঁটতে পারবে তো?

—পারব।

—ওষুধ সময়মতো খাবে?

—হ্যাঁ।

—বিশ্রাম নেবে?

—হ্যাঁ।

—ডাক্তারের কথা শুনবে?

নীলা বিরক্ত মুখে বলল,

—আর কিছু?

ইশান হেসে বলল,

—আছে।

—কী?

—আমাকে ভুলে যেও না।

নীলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

—তোমাকে ভুলে থাকা কি এত সহজ?

ইশান উত্তর দিতে পারল না।

কথাটা শুনে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে গেল।

পরদিন নীলা নিজের হাতে কিছুটা হাঁটার চেষ্টা করল।

ইশান পাশে ছিল।

—ধীরে।

—আমি পারছি।

—জানি।

—তুমি সবসময় এত ভয় পাও কেন?

—কারণ তোমাকে আবার পড়ে যেতে দেখতে চাই না।

নীলা একটু হাসল।

—আমি আর পড়ে যাব না।

ইশান বলল,

—প্রমিস?

নীলা হাত বাড়িয়ে বলল,

—প্রমিস।

ইশান তার হাতের দিকে তাকিয়ে একটু থেমে নিজের হাত এগিয়ে দিল।

দুজনের হাত এক মুহূর্তের জন্য মিলল।

কোনো কথা হলো না।

কিন্তু দুজনের চোখেই যেন অনেক কথা ছিল।

সেদিন রাতে ইশান বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে বসে ছিল।

অনেকদিন পর সে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবল।

ক্যাফের কাজটা সে ভালোবেসে ফেলেছে।

রান্না শিখছে।

একদিন নিজের একটা ছোট রেস্টুরেন্ট করার স্বপ্নও আবার জেগে উঠেছে।

কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে এখন আরেকজন মানুষও জড়িয়ে গেছে।

নীলা।

সে বুঝতে পারছিল, নীলাকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করা তার কাছে কঠিন হয়ে উঠছে।

তবু সে নিজের অনুভূতি নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে চাইল না।

পরদিন সকালে হাসপাতালে গিয়ে সে দেখল, নীলা বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তার ব্যাগ গুছানো।

চোখে আনন্দ।

ইশান দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,

—বাড়ি যাওয়ার জন্য এত খুশি?

নীলা বলল,

—হ্যাঁ।

—আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছ?

—আমি তো তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি না।

ইশান মৃদু হাসল।

—কোথায় যাচ্ছ তাহলে?

—নিজের বাড়ি।

—ওহ।

নীলা বলল,

—তুমি কি ভেবেছিলে আমি তোমাকে নিয়ে যাব?

ইশান হেসে বলল,

—ভাবিনি।

—মিথ্যা।

—ঠিক আছে, একটু ভেবেছিলাম।

নীলা হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের কাগজপত্র শেষ হলো।

নীলা ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এল।

হাসপাতালের গেটের সামনে এসে সে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।

দীর্ঘ সময় পর বাইরের পৃথিবীকে এত কাছে থেকে দেখছিল সে।

সূর্যের আলো।

গাড়ির শব্দ।

মানুষের ভিড়।

সবকিছু যেন নতুন মনে হচ্ছিল।

ইশান পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

—ভয় লাগছে?

নীলা মাথা নাড়ল।

—না।

তারপর একটু হেসে বলল,

—তুমি আছ তো।

ইশান তার দিকে তাকাল।

—হ্যাঁ। আছি।

নীলার পরিবার গাড়িতে উঠল।

ইশান কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

গাড়ি ছাড়ার আগে নীলা জানালা দিয়ে তাকিয়ে বলল,

—ইশান!

—হুম?

—কাল আসবে?

ইশান হেসে বলল,

—আমি কি কোনোদিন না এসে থেকেছি?

নীলা হাসল।

গাড়ি ধীরে ধীরে চলে গেল।

ইশান অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর নিজের ফোন বের করল।

মেসেজ লিখতে গিয়ে আবার মুছে ফেলল।

শেষ পর্যন্ত শুধু লিখল—

“ভালো করে বিশ্রাম নিও।”

কয়েক সেকেন্ড পর নীলার উত্তর এল—

“তুমিও।”

ইশান ফোনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

তার মনে হলো, এতদিন সে হাসপাতালের করিডোরে নীলার জন্য অপেক্ষা করেছে।

এখন থেকে হয়তো অপেক্ষাটা অন্যরকম হবে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা নীলার জন্য নয়—

নিজের জীবনে ফিরে আসা নীলার জন্য।

আর সেই ফিরে আসার পথে ইশান এবারও পাশে থাকতে চেয়েছিল।

নীলা বাড়ি ফেরার পর প্রথম কয়েকটা দিন খুব ধীরে কাটল।

দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার কারণে শরীর এখনো দুর্বল। বেশি হাঁটলে ক্লান্ত হয়ে যায়, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে মাথা ঘুরে। ডাক্তারও বিশ্রাম নিতে বলেছেন।

তবু নিজের ঘরে ফিরে নীলার মনে হচ্ছিল, সে যেন নতুন করে জীবনটা পেয়েছে।

সকালে জানালার পর্দা সরিয়ে রোদ দেখতে ভালো লাগত।

মায়ের সঙ্গে বসে চা খেতে ভালো লাগত।

নিজের ঘরের পরিচিত জিনিসগুলো ছুঁয়ে দেখতে ভালো লাগত।

আর একটা বিষয় সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত—

প্রতিদিন বিকেলে ইশানের ফোন আসা।

—কী করছ?

—বসে আছি।

—ওষুধ খেয়েছ?

—হ্যাঁ।

—সময়মতো?

—হ্যাঁ বাবা!

ইশান হেসে বলত,

—বাবা আবার কে?

—তুমি যেভাবে সারাদিন জিজ্ঞেস করো, তাতে তো বাবাই মনে হয়।

—ঠিক আছে, আজ থেকে আর জিজ্ঞেস করব না।

—না না, জিজ্ঞেস করবে।

দুজনেই হেসে ফেলত।

ইশান প্রতিদিন হাসপাতালে না গিয়ে এবার ক্যাফের কাজে ব্যস্ত থাকত। কিন্তু কাজের ফাঁকে নীলার খবর নিত।

একদিন বিকেলে সে নীলার বাড়িতে গেল।

হাতে একটা ছোট প্যাকেট।

নীলা দরজা খুলে তাকে দেখে অবাক হলো।

—তুমি?

—হ্যাঁ।

—এখানে কেন?

—তোমাকে দেখতে।

—ফোনে তো প্রতিদিন দেখো।

—ফোনে দেখা আর সামনে দেখা এক না।

নীলা একটু হাসল।

—ভেতরে এসো।

ইশান ঘরে ঢুকে দেখল, নীলা সোফায় বসে আছে।

তার সামনে একটা বই।

—বই পড়ছ?

—হ্যাঁ।

—ভালো।

—তুমি পড়তে শুরু করেছ?

ইশান একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

—চেষ্টা করছি।

—কী পড়ছ?

—যে বইটা তুমি দিয়েছিলে।

নীলার মুখে মৃদু হাসি ফুটল।

—তাহলে তুমি সত্যিই বদলেছ।

ইশান প্যাকেটটা এগিয়ে দিল।

—এটা তোমার জন্য।

নীলা খুলে দেখল, একটা ছোট ডায়েরি।

—ডায়েরি?

—হ্যাঁ।

—কেন?

—তুমি অনেকদিন হাসপাতালে ছিলে। এখন থেকে তোমার প্রতিদিনের কথা লিখবে।

নীলা ডায়েরিটা হাতে নিয়ে বলল,

—কী লিখব?

—যা মনে হয়।

—তুমি কি পড়বে?

—না।

—তাহলে লিখে কী লাভ?

—নিজের সঙ্গে কথা বলা যায়।

নীলা কিছুক্ষণ ডায়েরির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—তুমি এসব কোথা থেকে শিখলে?

ইশান হেসে বলল,

—তোমার কাছ থেকে।

সেদিন তারা অনেকক্ষণ কথা বলল।

হাসপাতালের দিনগুলোর কথা।

ক্যাফের কথা।

ইশানের নতুন কাজের কথা।

নীলা হেসে বলল,

—তুমি এখন রান্না করতে পারো?

—একটু।

—একটু মানে?

—আগের চেয়ে ভালো।

—কখনো আমাকে খাওয়াবে?

ইশান বলল,

—অবশ্যই।

—কী রান্না করবে?

—তোমার পছন্দের কিছু।

—তুমি কীভাবে জানো আমার পছন্দ?

ইশান হেসে বলল,

—অনেকদিন ধরে খেয়াল করছি।

নীলা চুপ হয়ে গেল।

কথাটা শুনে তার মুখে হালকা লজ্জার ছাপ ফুটে উঠল।

কিছুক্ষণ পর সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—হাসপাতালে থাকাকালীন আমি অনেক কিছু ভাবতাম।

ইশান শান্ত হয়ে শুনছিল।

—কী ভাবতে?

—জানি না আমি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব কি না।

ইশান বলল,

—তুমি ফিরেছ।

—হ্যাঁ।

নীলা একটু থেমে বলল,

—আর ভাবতাম, কে আমার পাশে থাকবে।

ইশান কিছু বলল না।

নীলা ধীরে তার দিকে তাকাল।

—তখন তোমার কথা মনে হতো।

ইশানের বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।

সে মৃদু গলায় বলল,

—আমি তো ছিলাম।

—জানি।

—থাকবও।

নীলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—সবসময়?

ইশান উত্তর দেওয়ার আগে একটু থামল।

—যতদিন তুমি চাইবে।

নীলা চোখ নামিয়ে ফেলল।

সেদিন সন্ধ্যায় ইশান চলে যাওয়ার পর নীলা নিজের ঘরে ফিরে ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম পাতায় কিছুক্ষণ কলম ধরে বসে থাকল।

তারপর লিখল—

“হাসপাতাল থেকে ফিরে বুঝলাম, কিছু মানুষকে জীবনে আলাদা করে চিনতে হয় না। তারা নিজেরাই ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।”

লেখাটা শেষ করে নীলা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর ডায়েরি বন্ধ করে রাখল।

অন্যদিকে ইশানও নিজের ঘরে বসে ছিল।

তার ফোনে নীলার একটা মেসেজ এল—

“আজ আসার জন্য ধন্যবাদ।”

ইশান উত্তর দিল—

“ধন্যবাদ কেন?”

কিছুক্ষণ পর নীলার উত্তর—

“জানি না। তবু বলতে ইচ্ছে হলো।”

ইশান মুচকি হাসল।

“তাহলে আমিও বলি—আমাকে ভুলে যেও না।”

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

তারপর ফোনে ভেসে উঠল—

“চেষ্টা করব।”

ইশান হেসে ফোনটা পাশে রাখল।

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।

নীলা ধীরে ধীরে আগের জীবনে ফিরতে শুরু করল।

ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা হাঁটাহাঁটি করত।

বই পড়ত।

মায়ের কাজে সাহায্য করার চেষ্টা করত।

আর ইশান তার নিজের স্বপ্নের দিকে এগোচ্ছিল।

ক্যাফেতে কাজ করতে করতে সে নতুন নতুন রান্না শিখছিল।

একদিন ক্যাফের মালিক বললেন,

—তুমি চাইলে কয়েক মাস পর রান্নাঘরের দায়িত্ব নিতে পারো।

ইশানের চোখে আনন্দ ফুটে উঠল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ। তুমি মন দিয়ে শিখছ।

সেদিন সন্ধ্যায় সে প্রথমেই নীলাকে ফোন করল।

—একটা খবর আছে।

—কী?

—আমাকে রান্নাঘরের দায়িত্ব দিতে পারে।

নীলা খুশি হয়ে বলল,

—আমি জানতাম তুমি পারবে।

—তুমি এত বিশ্বাস করো কেন?

—কারণ আমি তোমাকে দেখেছি।

—কোথায়?

—হাসপাতালে।

ইশান চুপ হয়ে গেল।

নীলা ধীরে বলল,

—সেখানে তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করতে পেরেছ। নিজের স্বপ্নের জন্যও পারবে।

ইশান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না।

তারপর বলল,

—তুমি জানো, তুমি আমার জীবনে অনেক কিছু বদলে দিয়েছ?

নীলা চুপ।

—আগে আমি কোনো কিছু নিয়ে সিরিয়াস ছিলাম না। এখন একটা লক্ষ্য আছে।

—কী লক্ষ্য?

—একদিন নিজের একটা জায়গা খুলব।

—রেস্টুরেন্ট?

—হ্যাঁ।

—আর নাম?

ইশান একটু হেসে বলল,

—এখনো ঠিক করিনি।

নীলা বলল,

—আমি কিন্তু একটা নাম ভেবেছি।

—কী?

—‘অপেক্ষা’।

ইশান মৃদু হেসে বলল,

—তুমি এখনো সেই নামটা ভুলোনি?

—না।

—তাহলে ঠিক আছে।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তাহলে একদিন তোমার রেস্টুরেন্টের নাম হবে ‘অপেক্ষা’।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর নীলা বলল,

—ইশান?

—হুম?

—তুমি কি কখনো ভাবো, সেদিন যদি দুর্ঘটনাটা না ঘটত?

ইশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—ভাবি।

—তাহলে?

—হয়তো আমরা আগের মতোই থাকতাম।

—মানে?

—তুমি তোমার কাজে ব্যস্ত থাকতে। আমি আমার কাজে। হয়তো প্রতিদিন কথা হতো না।

নীলা আস্তে বলল,

—তাহলে দুর্ঘটনাটা আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে।

ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—হ্যাঁ। তবে আমি চাই না তুমি আবার কোনোদিন এমন কষ্ট পাও।

নীলা মৃদু স্বরে বলল,

—আমিও না।

ফোনের ওপাশে নীরবতা নেমে এল।

দুজনেই কিছু বলতে চেয়েও বলল না।

কারণ তারা দুজনেই বুঝতে শুরু করেছিল—

এটা আর শুধু হাসপাতালের সেই কয়েক মাসের সম্পর্ক নয়।

নীলা এখন সুস্থ হয়ে উঠছে।

ইশান নিজের স্বপ্নের দিকে এগোচ্ছে।

তবু তাদের দুজনের দিনের মধ্যে একে অপরের জন্য একটা জায়গা তৈরি হয়ে গেছে।

নীলা ধীরে ধীরে পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরছিল।

দুর্ঘটনার পর কয়েক মাস কেটে গেছে। এখন সে একা হাঁটতে পারে, বাইরে যেতে পারে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে পারে। তবে ডাক্তার এখনো তাকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে নিষেধ করেছেন।

ইশানের জীবনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে।

ক্যাফেতে তার দায়িত্ব বেড়েছে। রান্নার প্রতি আগ্রহও এখন অনেক বেশি। মাঝে মাঝে সে নতুন কোনো খাবার তৈরি করে নীলাকে ছবি পাঠায়।

একদিন ছবি পাঠিয়ে লিখল,

—আজকের স্পেশাল।

নীলা উত্তর দিল,

—দেখতে তো ভালো।

—শুধু দেখতে?

—খেয়ে দেখিনি তো।

—একদিন খাওয়াব।

—কবে?

—যেদিন আমার নিজের জায়গা হবে।

নীলা হেসে লিখল,

—তাহলে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।

ইশান উত্তর দিল,

—অপেক্ষা করতে আমি এখন অভ্যস্ত।

মেসেজটা পড়ে নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ফোনটা পাশে রেখে জানালার দিকে তাকাল।

ইশানের সঙ্গে তার সম্পর্কটা ঠিক কী—এই প্রশ্নটা সে নিজেকেও অনেকবার করেছে।

বন্ধু?

হয়তো।

তার চেয়ে বেশি?

সম্ভবত।

কিন্তু সে জানত, তাদের সম্পর্ককে কোনো নাম দেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই।

কারণ ইশান কখনো তার কাছে কিছু দাবি করেনি।

হাসপাতালে যখন সে অচেতন ছিল, তখনও না।

সুস্থ হওয়ার পরও না।

সে শুধু পাশে ছিল।

এই বিষয়টাই নীলার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান।

এক বিকেলে নীলা ইশানকে ফোন করল।

—আজ কোথায়?

—ক্যাফেতে।

—কাজ শেষ?

—আর আধা ঘণ্টা।

—শেষ হলে আমাকে ফোন করবে?

—অবশ্যই।

ইশান ফোন রাখার পরও ভাবতে লাগল, নীলা হঠাৎ তাকে ফোন করল কেন।

আধা ঘণ্টা পর কাজ শেষ করে ফোন করতেই নীলা বলল,

—চলো, একটু বাইরে যাই।

—কোথায়?

—জানি না।

—তাহলে কোথায় যাব?

—তুমি ঠিক করো।

ইশান একটু ভেবে বলল,

—নদীর ধারে যাবে?

—চলো।

সন্ধ্যায় তারা নদীর ধারের একটা শান্ত জায়গায় গিয়ে বসে থাকল।

চারপাশে হালকা বাতাস।

সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে।

নীলা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।

ইশান বলল,

—কী ভাবছ?

—জীবনের কথা।

—এত বড় বিষয়?

—হ্যাঁ।

ইশান মৃদু হাসল।

—আমার মতো মানুষকে এসব বললে লাভ হবে?

নীলা বলল,

—তুমি বদলে গেছ।

—আবার সেই কথা?

—হ্যাঁ।

—কীভাবে?

নীলা একটু ভেবে বলল,

—আগে তুমি নিজের জীবন নিয়েই ভাবতে না। এখন তুমি নিজের একটা স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছ।

—তোমার জন্য।

নীলা অবাক হয়ে তাকাল।

ইশান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—মানে... তোমাকে দেখে।

নীলা হেসে ফেলল।

—দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে?

ইশান কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর নীলা বলল,

—তুমি কি ভয় পাও?

—কিসের?

—আমি আবার অসুস্থ হয়ে গেলে?

ইশান তার দিকে তাকাল।

—হ্যাঁ।

—কেন?

—কারণ আমি তোমাকে আবার হারানোর ভয় পাই।

কথাটা বলে ইশান নিজেই চুপ হয়ে গেল।

নীলাও কিছু বলল না।

দুজনের মধ্যে দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল।

কিছুক্ষণ পর নীলা বলল,

—তুমি আমাকে হারাওনি।

ইশান তাকাল।

—আমি তো আছি।

ইশানের মুখে মৃদু হাসি ফুটল।

—হ্যাঁ। তুমি আছ।

সেদিন ফেরার সময় নীলা হঠাৎ বলল,

—আমার একটা ইচ্ছে আছে।

—কী?

—তোমার রেস্টুরেন্টটা যখন হবে, প্রথম দিন আমি সেখানে থাকতে চাই।

—শুধু থাকতে?

—হ্যাঁ।

—খাবার খাবে না?

—খাব।

—তাহলে তো লাভ হলো।

নীলা হেসে বলল,

—তুমি সবকিছু লাভ-ক্ষতি দিয়ে দেখো কেন?

—কারণ আমি ব্যবসা করতে চাই।

দুজনেই হেসে ফেলল।

কয়েক সপ্তাহ পর ইশান সত্যিই নিজের ছোট একটা জায়গা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

বড় রেস্টুরেন্ট নয়।

ছোট্ট একটা ক্যাফে।

কিন্তু তার নিজের।

নামও ঠিক হয়ে গেল—

অপেক্ষা।

সাইনবোর্ডের ডিজাইন নিয়ে সে নীলার মতামত চাইল।

একটা ছবি পাঠিয়ে লিখল,

—এটা কেমন?

নীলা কিছুক্ষণ পর উত্তর দিল,

—খুব সুন্দর।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—নামটা?

—সবচেয়ে সুন্দর।

ইশান মুচকি হাসল।

ক্যাফে সাজানোর কাজ শুরু হলো।

নীলাও মাঝে মাঝে এসে সাহায্য করত।

একদিন দেয়ালে একটা ছবি লাগাতে গিয়ে নীলা বলল,

—এটা একটু বাঁকা হয়েছে।

ইশান বলল,

—না, ঠিক আছে।

—না। বাঁকা।

—তুমি সবকিছু এত নিখুঁত করতে চাও কেন?

—কারণ এটা তোমার স্বপ্ন।

ইশান থেমে গেল।

তারপর বলল,

—আমার স্বপ্ন?

নীলা তাকিয়ে বলল,

—হ্যাঁ।

—তাহলে তুমি?

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমি তোমার পাশে আছি।

ইশান আর কিছু বলল না।

সেদিন রাতে নীলা বাড়ি ফিরে ডায়েরি খুলল।

অনেকদিন পর সে আবার লিখল।

“কিছু মানুষ জীবনে আসে খুব সাধারণভাবে। প্রথমে তাদের আলাদা করে মনে হয় না। তারপর একদিন বুঝতে পারো, তারা তোমার প্রতিদিনের জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছে। ইশান আমার কাছে ঠিক তেমনই।”

লেখাটা শেষ করে সে কিছুক্ষণ কলম হাতে বসে থাকল।

তারপর আরেকটা লাইন লিখল—

“আমি জানি না এই অনুভূতির নাম কী।”

ডায়েরি বন্ধ করে সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

অন্যদিকে ইশানও তার নতুন ক্যাফেতে বসে ছিল।

চারপাশে এখনো সাজসজ্জার কাজ চলছে।

টেবিল-চেয়ার পুরোপুরি বসানো হয়নি।

কিন্তু দেয়ালের একপাশে একটা ছোট বোর্ড লাগানো হয়ে গেছে—

অপেক্ষা

নিচে ছোট করে লেখা—

“ভালো কিছু আসতে সময় লাগে।”

ইশান বোর্ডটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

তার মনে পড়ল হাসপাতালের সেই দিনগুলো।

অন্ধকার করিডোর।

নীলার বন্ধ চোখ।

তার দীর্ঘ অপেক্ষা।

আর আজ—

নীলা নিজের পায়ে হাঁটছে।

হাসছে।

তার সঙ্গে কথা বলছে।

ইশান বুঝতে পারল, তার জীবনে নীলার জায়গাটা আর কোনো সাধারণ জায়গা নয়।

তবু সে কিছু বলতে চাইছিল না।

কারণ সে জানত—

কিছু অনুভূতি তাড়াহুড়ো করে বলা যায় না।

কিছু অনুভূতিকে সময় দিতে হয়।

আর তাদের গল্পটাও হয়তো এখনো শেষ হয়নি।

অবশেষে সেই দিনটা এসে গেল।

ইশানের ছোট্ট ক্যাফে ‘অপেক্ষা’ খুলবে আজ।

অনেকদিনের পরিশ্রম, ক্লান্তি, ব্যর্থতা আর নতুন করে শুরু করার পর নিজের একটা জায়গা দাঁড় করাতে পেরেছে সে।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই ইশানের মনে হলো, নীলাকে খবরটা আগে দেওয়া দরকার।

সে ফোন করল।

—ঘুম থেকে উঠেছ?

ওপাশ থেকে নীলার কণ্ঠ এল,

—হ্যাঁ। আজ তো তোমার বড় দিন।

ইশান অবাক হলো।

—তুমি মনে রেখেছ?

—তোমার জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন আমি ভুলব?

ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আজ কিন্তু তোমাকে আসতেই হবে।

—আমি কি না এসে পারি?

—না।

—তাহলে আসব।

সকাল থেকেই ক্যাফেতে ব্যস্ততা।

টেবিল সাজানো হচ্ছে, রান্নাঘরে খাবার তৈরি হচ্ছে, কর্মীরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইশান বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।

রাফি সেটা দেখে বলল,

—কাউকে খুঁজছিস?

—না।

—মিথ্যা বলিস না।

ইশান হেসে বলল,

—নীলা আসবে।

—তাই তো বলছি।

রাফি মজা করে বলল,

—ওকে না দেখলে তোর দিন শুরু হয় না, তাই না?

ইশান কোনো উত্তর দিল না।

কিছুক্ষণ পর বাইরে একটা গাড়ি এসে থামল।

নীলা নামল।

আজ তাকে দেখে ইশানের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল।

নীলা মৃদু হেসে বলল,

—কী হলো? এমন করে তাকিয়ে আছ কেন?

—কিছু না।

—ক্যাফে কেমন হয়েছে?

—নিজেই দেখো।

নীলা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

দেয়ালের একপাশে বড় করে লেখা—

অপেক্ষা

আর তার নিচে ছোট অক্ষরে—

“ভালো কিছু আসতে সময় লাগে।”

নীলা কিছুক্ষণ লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ইশানের দিকে তাকাল।

—খুব সুন্দর হয়েছে।

ইশান বলল,

—তুমি না থাকলে এটা হতো না।

—আমি কী করেছি?

—অপেক্ষা নামটা তুমি দিয়েছিলে।

—আর তুমি সেটা রেখেছ।

—কারণ নামটা আমার জীবনের সঙ্গে মিলে গেছে।

নীলা কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর সে ক্যাফের একটা টেবিলে গিয়ে বসল।

ইশান রান্নাঘর থেকে একটা প্লেট নিয়ে এল।

—এটা তোমার জন্য।

নীলা অবাক হয়ে বলল,

—আজকের প্রথম খাবার?

—হ্যাঁ।

—আমি কি প্রথম কাস্টমার?

—তুমি প্রথম মানুষ যে এই জায়গাটার শুরু থেকে ছিলে।

নীলা খাবারটা একটু চেখে দেখল।

ইশান উৎকণ্ঠিত চোখে তাকিয়ে ছিল।

—কেমন?

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—ভালো।

ইশান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তাহলে আমি সফল।

নীলা হেসে বলল,

—এত সহজে সফল হওয়া যায়?

—আমার কাছে যায়।

দুজনেই হাসল।

ক্যাফে ধীরে ধীরে অতিথিতে ভরে উঠল।

ইশান কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।

নীলা এক কোণে বসে তাকে দেখছিল।

সে বুঝতে পারছিল, হাসপাতালের সেই অগোছালো ছেলেটা আর নেই।

ইশান এখন নিজের কাজ নিয়ে মনোযোগী।

মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে।

কর্মীদের সাহায্য করছে।

কেউ ভুল করলে রাগ না করে বুঝিয়ে দিচ্ছে।

নীলার মনে হলো, সত্যিই মানুষ বদলে যেতে পারে।

শুধু কখনো কখনো সেই পরিবর্তনের জন্য একটা কঠিন সময়ের প্রয়োজন হয়।

বিকেলের দিকে ক্যাফে একটু ফাঁকা হলো।

নীলা বলল,

—ইশান, একটু বসবে?

—হ্যাঁ।

সে এসে নীলার সামনে বসল।

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তুমি কি জানো, দুর্ঘটনার পর আমি সবচেয়ে বেশি কী নিয়ে ভয় পেয়েছিলাম?

ইশান মাথা নাড়ল।

—কী?

—আমি ভাবতাম, হয়তো আমি আর আগের মতো হতে পারব না।

ইশান শান্তভাবে শুনছিল।

—তারপর যখন চোখ খুললাম, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কথা বলতে পারছিলাম না। হাঁটতে পারছিলাম না।

সে একটু থামল।

—কিন্তু প্রতিদিন একটা কণ্ঠ শুনতাম।

ইশান চুপ হয়ে গেল।

নীলা বলল,

—তোমার কণ্ঠ।

ইশান নিচু স্বরে বলল,

—তুমি শুনতে পেতে?

—সবসময় না। কিন্তু মাঝে মাঝে তোমার কথা শুনতাম।

—তাহলে তুমি কিছু বলোনি কেন?

নীলা মৃদু হেসে বলল,

—পারতাম না।

তারপর বলল,

—তুমি যখন বলতে, “আমি আছি”, তখন আমার মনে হতো, সত্যিই কেউ আছে।

ইশান কিছু বলল না।

নীলা এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি জানো, ওই সময়টা আমার কাছে খুব অন্ধকার ছিল।

ইশান ধীরে বলল,

—জানি।

—কিন্তু তুমি সেটা একটু সহজ করে দিয়েছিলে।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর ইশান বলল,

—আমি শুধু যা করার দরকার ছিল, করেছি।

নীলা মাথা নাড়ল।

—না। সবাই পারে না।

ইশান তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—তুমি সুস্থ হয়ে গেছ। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তুমি কি সত্যিই মনে করো, এটাই সব?

ইশান প্রশ্নটা বুঝেও যেন না বোঝার ভান করল।

—আর কী?

নীলা মৃদু হাসল।

—কিছু না।

ঠিক তখনই ক্যাফের একজন কর্মী এসে ইশানকে ডাকল।

—ভাই, রান্নাঘরে একটু আসবেন?

ইশান উঠে দাঁড়াল।

—আমি আসছি।

যাওয়ার আগে নীলার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি বসো। আমি কাজটা শেষ করে আসছি।

নীলা মাথা নাড়ল।

ইশান চলে গেলে সে চুপচাপ ক্যাফেটার চারপাশে তাকাল।

এখানে তার অনেক স্মৃতি।

হাসপাতালের দিনগুলো।

ইশানের প্রতিদিন আসা।

তার সঙ্গে কথা বলা।

তার হাত ধরে হাঁটতে শেখানো।

প্রথমবার নিজের পায়ে কয়েক পা হাঁটা।

সবকিছু যেন একসঙ্গে মনে পড়তে লাগল।

সন্ধ্যার পর নীলা বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে বসে ডায়েরিটা খুলল।

আজ অনেকদিন পর সে দীর্ঘ কিছু লিখল।

“আজ ইশানের স্বপ্ন সত্যি হলো। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এই স্বপ্নের মধ্যে আমিও কোথাও জড়িয়ে আছি। হাসপাতালের সেই দিনগুলো যদি না আসত, হয়তো আমরা কেউই বুঝতাম না—কে কার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।”

সে কিছুক্ষণ থামল।

তারপর লিখল—

“আমি জানি না ইশান আমার জন্য কী অনুভব করে। কিন্তু আমি জানি, ওর পাশে থাকলে আমার ভয় কমে যায়।”

ডায়েরি বন্ধ করার আগে নীলা আরও একটা লাইন লিখল—

“হয়তো কিছু সম্পর্কের নাম দেওয়ার আগে তাদের একটু সময় দেওয়া দরকার।”

অন্যদিকে ইশান ক্যাফে বন্ধ করে রাতের শেষে একা বসে ছিল।

দেয়ালের ‘অপেক্ষা’ নামটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এতদিন সে শুধু নীলার সুস্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছে।

এখন তার সামনে নতুন একটা অপেক্ষা।

নীলা কি তার জীবনে সত্যিই থাকবে?

নাকি হাসপাতালের সেই কঠিন সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পর্কও ধীরে ধীরে বদলে যাবে?

সে উত্তর জানত না।

তবু এবার তার ভয় লাগছিল না।

কারণ সে শিখে গেছে—

কিছু জিনিস জোর করে পাওয়া যায় না। শুধু যত্ন নিয়ে পাশে থাকতে হয়।

আর সেই রাতেই নীলা তাকে একটা ছোট মেসেজ পাঠাল—

“অপেক্ষা খুব সুন্দর হয়েছে। কিন্তু একটা কথা বলব?”

ইশান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—

“বলো।”

কিছুক্ষণ পর নীলার মেসেজ এল—

“আগামীকাল তোমার সঙ্গে একটু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”

মেসেজটা পড়ে ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তারপর অজান্তেই মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল।

পরদিন সকাল থেকেই ইশানের মনে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।

গত রাতে নীলার মেসেজটা বারবার মনে পড়ছিল—

“আগামীকাল তোমার সঙ্গে একটু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”

কী কথা বলবে নীলা?

কোনো সমস্যায় পড়েছে?

নাকি তার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু?

ইশান যতই নিজের মনকে শান্ত করতে চাইল, ততই নানা প্রশ্ন মাথায় আসছিল।

সকাল দশটার দিকে নীলা ‘অপেক্ষা’ ক্যাফেতে এল।

আজ ক্যাফে খোলার আগের সময়। ভেতরে শুধু ইশান আর দুজন কর্মী ছিল।

নীলা ঢুকতেই ইশান বলল,

—এসো।

নীলা মৃদু হেসে বলল,

—তুমি এত চিন্তিত কেন?

—তুমিই তো বলেছিলে গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।

—হ্যাঁ।

—তাহলে বলো।

নীলা একটা চেয়ার টেনে বসল।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আমি অনেকদিন ধরে একটা কথা ভাবছি।

ইশানও সামনে বসে পড়ল।

—কী কথা?

নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—দুর্ঘটনার আগে আমি তোমাকে শুধু একজন পরিচিত মানুষ হিসেবেই দেখতাম।

ইশান চুপ করে শুনছিল।

—হাসপাতালে যখন চোখ খুলতে পারছিলাম না, তখন চারপাশে কিছুই বুঝতে পারতাম না। কিন্তু তোমার কণ্ঠ চিনতে পারতাম।

ইশানের চোখ নরম হয়ে গেল।

—তখন তুমি প্রতিদিন আমার সঙ্গে কথা বলতে।

নীলা একটু হাসল।

—কখনো তোমার কাজের গল্প, কখনো রান্নার গল্প, কখনো নিজের স্বপ্নের কথা। আর কখনো শুধু বসে থাকতে।

ইশান বলল,

—আমি ভাবতাম তুমি হয়তো কিছুই শুনতে পাও না।

—সবকিছু না। কিন্তু তোমার কণ্ঠ শুনলে আমার মনে হতো, আমি একা নই।

ইশান নিচু স্বরে বলল,

—তুমি একা ছিলে না।

নীলা এবার তার দিকে তাকাল।

—আমি জানি।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর নীলা বলল,

—বাড়ি ফেরার পরও তুমি একই রকম ছিলে।

—কেমন?

—কোনো কিছু চাওনি।

ইশান একটু অবাক হলো।

—মানে?

—আমার কাছে কিছু দাবি করোনি। শুধু জানতে চেয়েছ আমি কেমন আছি।

ইশান মৃদু হেসে বলল,

—তোমার ভালো থাকা ছাড়া আর কী চাইব?

নীলার চোখে পানি এসে গেল।

সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল।

ইশান কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু থেমে গেল।

কিছুক্ষণ পর নীলা বলল,

—আমি বুঝতে পেরেছি, তোমার উপস্থিতিটা আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ইশান চুপ করে রইল।

—তুমি পাশে না থাকলে হয়তো আমি এত সহজে সবকিছু পার হতে পারতাম না।

—তুমি নিজেই পেরেছ।

—না।

নীলা মাথা নাড়ল।

—তুমি আমাকে সাহস দিয়েছ।

ইশান ধীরে বলল,

—তাহলে তুমি আমাকে কী বলতে চেয়েছিলে?

নীলা এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।

—আমি চাই, আমাদের এই সম্পর্কটা এখানেই শেষ না হোক।

ইশানের বুকের ভেতর যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল।

সে কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিতে পারল না।

নীলা ধীরে বলল,

—আমি জানি না এই সম্পর্কের নাম কী।

—আমিও জানি না।

—কিন্তু আমি জানি, তোমাকে ছাড়া এখন আমার দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে।

ইশান চোখ নামিয়ে মৃদু হাসল।

তারপর বলল,

—আমারও।

নীলা অবাক হয়ে তাকাল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তবে একটা কথা বলব?

—বলো।

—আমি কখনো চাইনি তোমার দুর্বল সময়কে আমার অনুভূতি বলার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে।

নীলা চুপ করে শুনছিল।

—তুমি অসুস্থ ছিলে। তোমার সামনে তখন শুধু সুস্থ হয়ে ওঠার লড়াই ছিল। তাই আমি কিছু বলিনি।

নীলার চোখে আবার পানি জমল।

ইশান মৃদু স্বরে বলল,

—আজ তুমি নিজের ইচ্ছায় আমার সামনে বসে কথা বলছ। তাই আজ আমি বলতে পারি—

সে একটু থামল।

—তুমি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

নীলা কিছু বলল না।

শুধু মৃদু হাসল।

ইশানও হাসল।

কোনো বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো না।

কোনো নাটকীয় ঘোষণা হলো না।

তাদের সম্পর্কটা শুধু একটু পরিষ্কার হয়ে গেল।

সেদিন দুপুরে ক্যাফে খুলল।

নীলা একটা টেবিলে বসে ছিল।

ইশান কাজ করছিল।

মাঝে মাঝে দুজনের চোখাচোখি হচ্ছিল।

আর প্রতিবারই দুজনের মুখে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠছিল।

বিকেলে নীলা বলল,

—ইশান।

—হুম?

—তোমার ‘অপেক্ষা’ নামটা এখনো আমার খুব পছন্দ।

—আমারও।

—কেন?

ইশান দেয়ালের লেখাটার দিকে তাকাল।

“ভালো কিছু আসতে সময় লাগে।”

তারপর বলল,

—কারণ আমাদের গল্পটাও তো অপেক্ষা দিয়ে শুরু।

নীলা মৃদু হাসল।

—আর শেষ?

ইশান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—শেষ না।

—তাহলে?

—চলতে থাকবে।

নীলা মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ। চলতে থাকবে।

কয়েক মাস পর ‘অপেক্ষা’ ক্যাফে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠল।

ইশান নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু নীলার জন্য তার সময় সবসময় থাকত।

নীলাও নিজের জীবন নতুন করে সাজাতে শুরু করল।

সে আবার পড়াশোনা শুরু করল।

বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করত।

নিজের পছন্দের কাজগুলো করত।

দুর্ঘটনা তার জীবনকে থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু শেষ করে দিতে পারেনি।

বরং তাকে নতুনভাবে বাঁচতে শিখিয়েছিল।

আর ইশান?

সে শিখেছিল, ভালোবাসা সবসময় বড় বড় কথায় প্রকাশ পায় না।

কখনো সেটা হাসপাতালের করিডোরে চুপচাপ অপেক্ষা করা।

কখনো সময়মতো ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া।

কখনো পাশে বসে থাকা।

কখনো শুধু বলা—

“আমি আছি।”

এক সন্ধ্যায় নীলা ‘অপেক্ষা’ ক্যাফের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছিল।

ইশান দরজা বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

নীলা বলল,

—চলো?

—কোথায়?

—হাঁটতে।

ইশান হাসল।

—ঠিক আছে।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

কিছু দূর যাওয়ার পর নীলা বলল,

—ইশান?

—হুম?

—সেদিন হাসপাতালে তুমি যদি না আসতে?

ইশান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তাহলে হয়তো আজকের গল্পটা অন্যরকম হতো।

নীলা মৃদু হেসে বলল,

—কিন্তু তুমি এসেছিলে।

—হ্যাঁ।

—আর থেকেছিলে।

—হ্যাঁ।

নীলা ধীরে বলল,

—তাহলে ভালোই হয়েছে।

ইশান তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দুজন পাশাপাশি হাঁটতে থাকল।

....
👁 63