ময়মনসিংহের এক পুরোনো জমিদারবাড়ির মতো বিশাল বাড়ি। বাড়ির সামনে বড় ফটক, চারপাশে গাছপালা আর পেছনে বিশাল পুকুর। এলাকার সবাই বাড়িটাকে এক নামে চেনে—চৌধুরী বাড়ি।
এই বাড়ির কর্তা মোতালেব চৌধুরী। এলাকায় তার বেশ প্রভাব। ব্যবসা আছে, অনেক জমিজমা আছে, আর আছে নিজের একটা অদ্ভুত নিয়ম।
তার বিশ্বাস, ছেলেরা নিজের পছন্দে বিয়ে করলে সংসার টেকে না। তাই পরিবারের অবিবাহিত ছেলেদের বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তিনি নিজের হাতেই রাখেন।
তবে তার সবচেয়ে বেশি ভরসা নিজের একমাত্র ছেলে অভিকে নিয়ে।
অভি অবশ্য বাবার মতো শান্ত স্বভাবের নয়। বরং তার মেজাজ খুব দ্রুত গরম হয়ে যায়। নিজের সিদ্ধান্তে অটল, কারও কথা সহজে শুনতে চায় না। তবে মানুষ হিসেবে খারাপ নয়। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করে, আর কাছের মানুষদের জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে।
সেদিন সকালেও অভি নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল।
হঠাৎ দরজা খুলে তার বাবা ঢুকলেন।
—অভি, আজ বিকেলে আমার সঙ্গে যাবে।
অভি চোখ না তুলেই বলল,
—কোথায়?
—একটা কাজ আছে।
—কী কাজ?
মোতালেব চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—তোর বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে যাব।
অভি এবার ল্যাপটপ বন্ধ করে বাবার দিকে তাকাল।
—আবার শুরু করেছ?
—তোর বয়স কম হলো না।
—বিয়ে করার ইচ্ছা নেই।
—ইচ্ছা থাকুক আর না থাকুক, এবার বিয়ে করতেই হবে।
অভি বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।
—বাবা, আমি কাউকে বিয়ে করব কি না, সেটা অন্তত আমাকে ঠিক করতে দাও।
মোতালেব চৌধুরী কঠিন গলায় বললেন,
—তুই নিজের জীবনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বয়সে পৌঁছেছিস ঠিকই। কিন্তু আমি তোকে এমন ভুল করতে দেব না, যেটা পরে সারাজীবন আফসোসের কারণ হবে।
অভি কিছু বলল না।
তার বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
অভি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তাকিয়ে তার হঠাৎ বহু বছর আগের একটা মুখ মনে পড়ে গেল।
একটা মেয়ের মুখ।
সবসময় ঝগড়া করত।
সবসময় তাকে হারানোর চেষ্টা করত।
আর সুযোগ পেলেই বলত—
“অভি, তুমি নিজেকে কী ভাবো?”
মেয়েটার নাম ছিল রিয়া।
প্রায় দশ বছর আগে।
তখন অভি আর রিয়া দুজনেই স্কুলে পড়ত।
তাদের বাড়ি ছিল পাশাপাশি। দুই পরিবারের মধ্যে বহু বছরের পরিচয়। ছোটবেলা থেকেই তারা একসঙ্গে বড় হয়েছে।
কিন্তু বন্ধুত্বের চেয়ে তাদের সম্পর্কটা ছিল অনেকটা বিড়াল-ইঁদুরের মতো।
একদিন রিয়া অভির নতুন ক্রিকেট ব্যাট লুকিয়ে রেখেছিল।
অভি পুরো বাড়ি খুঁজে ব্যাট না পেয়ে রেগে আগুন।
শেষে রিয়ার ঘরের জানালার পাশে ব্যাটটা দেখতে পেয়ে চিৎকার করে বলেছিল,
—রিয়া!
রিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলেছিল,
—কী হয়েছে?
—আমার ব্যাট কোথায় পেয়েছ?
—আমি চুরি করেছি।
—দাও!
—আগে বলো, আমি তোমার চেয়ে ভালো খেলি।
—তুমি?
অভি হেসে বলেছিল,
—তুমি ব্যাট ধরলেই বল পালিয়ে যাবে।
রিয়া রেগে গিয়ে ব্যাটটা ছুড়ে দিয়েছিল।
অভি ধরতে গিয়ে পুকুরের ধারে পড়ে গিয়েছিল।
তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছিল।
দুই পরিবারের বড়রা এসে দুজনকে বকেছিল।
কিন্তু পরদিন আবার তারা একই জায়গায় বসে ঝগড়া করেছিল।
শৈশবের সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই কখন যেন তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সময় কাউকে একই জায়গায় আটকে রাখে না।
রিয়ার বাবা চাকরির কারণে পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে যান।
অভিও ধীরে ধীরে নিজের পড়াশোনা ও ব্যবসার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
তারপর কেটে যায় প্রায় দশ বছর।
তাদের আর দেখা হয়নি।
বর্তমানে ফিরে এসে অভি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রিয়ার কথা কেন আজ হঠাৎ মনে পড়ছে, সে নিজেও জানে না।
ঠিক তখন তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে বন্ধুর নাম দেখে ফোন ধরল।
—হ্যালো?
ওপাশ থেকে সজীব বলল,
—দোস্ত, আজ রাতে কিন্তু বের হবি।
—কোথায়?
—নতুন একটা ক্যাফে খুলেছে। সবাই যাচ্ছে।
—আমার সময় নেই।
—তোর সময় কখন থাকে?
অভি হেসে বলল,
—আজ বাবা বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে যাচ্ছে।
সজীব কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হেসে উঠল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—তাহলে তোকে আজই অভিনন্দন জানাতে হবে।
—আগে মেয়েটাকে দেখি।
—মেয়ে যদি সুন্দর হয়?
—তাহলেও না।
—কেন?
অভি একটু থেমে বলল,
—জানি না। বিয়ের ব্যাপারটা আমার কাছে ঠিক স্বাভাবিক লাগে না।
সজীব মজা করে বলল,
—তোর মনে অন্য কেউ আছে নাকি?
অভি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
—না।
কিন্তু ফোন কেটে দেওয়ার পরও তার মনে একটা নাম ঘুরতে থাকল।
রিয়া।
অন্যদিকে ঢাকার এক ব্যস্ত এলাকায় ছোট্ট একটা ক্যাফেতে বসে ছিল রিয়া।
তার সামনে কফির কাপ। হাতে একটা বই।
রিয়া এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেছে। নিজের জীবন নিয়ে সে বেশ স্বাধীনচেতা। কারও ওপর নির্ভর করতে পছন্দ করে না।
তার ফোনে মায়ের কল এল।
—হ্যালো মা?
—রিয়া, আজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় আসিস।
—কেন?
—তোর সঙ্গে কথা আছে।
—কী কথা?
—বাসায় আয়, তারপর বলব।
রিয়া কিছুটা সন্দেহ করল।
—আবার বিয়ের কথা না তো?
ওপাশে মা চুপ।
রিয়া বুঝে গেল।
—মা!
—শুধু একবার ছেলেটাকে দেখে নে।
—আমি এখন বিয়ে করব না।
—দেখতে তো সমস্যা নেই।
রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—ঠিক আছে। কিন্তু আগে থেকেই বলে রাখছি, আমার পছন্দ না হলে আমি রাজি হব না।
—ঠিক আছে।
ফোন কেটে গেল।
রিয়া আবার বইয়ের দিকে তাকাল।
কিন্তু হঠাৎ তার মাথায়ও একটা পুরোনো মুখ ভেসে উঠল।
অভি।
ছোটবেলার সেই দুষ্টু ছেলেটা।
যে সবসময় তাকে বিরক্ত করত।
যে তার পুতুলের ঘর ভেঙে ফেলেছিল।
যে একবার তার জন্মদিনে কেকের ওপরের চেরিটা চুরি করে খেয়েছিল।
রিয়া হেসে ফেলল।
নিজেই অবাক হয়ে মনে মনে বলল,
—এত বছর পরও ওই ছেলেটার কথা মনে পড়ে কেন?
সন্ধ্যায় রিয়া বাসায় ফিরল।
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখল তার বাবা-মা বসে আছেন।
বাবা বললেন,
—রিয়া, বস।
রিয়া বসে বলল,
—বলুন।
বাবা একটা ছবি এগিয়ে দিলেন।
—ছেলেটা ভালো। ব্যবসা করে। পরিবারও ভালো।
রিয়া অনিচ্ছা নিয়ে ছবিটা হাতে নিল।
ছবির দিকে তাকানোর আগেই বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।
ঠিক তখনই বাবা বললেন,
—আজ ওদের পরিবার আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসছে।
রিয়া মাথা তুলল।
—আজ?
—হ্যাঁ।
কিছুক্ষণ পর দরজার সামনে গাড়ি এসে থামল।
রিয়ার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
সে জানত না, এই সন্ধ্যাটা তার জীবনকে এমনভাবে বদলে দিতে চলেছে, যার কথা সে কখনো কল্পনাও করেনি।
দরজা খুলে কয়েকজন মানুষ ভেতরে ঢুকলেন।
সবার শেষে একজন যুবক।
কালো পাঞ্জাবি, শান্ত মুখ, হাতে ফোন।
রিয়া প্রথমে তার দিকে তাকাল না।
কিন্তু ছেলেটি ঘরে ঢুকে হঠাৎ থেমে গেল।
তার চোখ আটকে গেল রিয়ার ওপর।
রিয়াও ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
এক মুহূর্ত।
দুজনের চোখে চোখ।
তারপর দুজনেই যেন একই সঙ্গে চিনে ফেলল একে অপরকে।
অভির মুখ থেকে অস্ফুটভাবে বেরিয়ে এল—
—রিয়া?
রিয়া অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
তারপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল।
—অভি?
ঘরের সবাই অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর মোতালেব চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন,
—তোমরা তাহলে একে অপরকে চেনো?
অভি আর রিয়া দুজনেই চুপ।
ড্রয়িংরুমে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা।
অভি আর রিয়া দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। এত বছর পর দেখা হবে—এটা তাদের কেউই ভাবেনি। তার ওপর প্রথম দেখাতেই জানতে হলো, দুই পরিবার তাদের বিয়ের জন্য একসঙ্গে বসেছে।
রিয়ার মা হাসিমুখে বললেন,
—তোমরা আগে থেকেই পরিচিত?
রিয়া কিছু বলার আগেই অভি বলল,
—পরিচিত না। ছোটবেলায় খুব ভালো করে চিনতাম।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—ও আমাকে সবসময় বিরক্ত করত।
অভি ভ্রু কুঁচকে বলল,
—তুমিও কি কম করতে?
—আমি কখনো তোমার ক্রিকেট ব্যাট লুকাইনি।
—তুমি আমার ব্যাট পুকুরে ফেলেছিলে।
—তুমি আগে আমার পুতুলের ঘর ভেঙেছিলে।
দুজনের কথায় ঘরের সবাই হেসে ফেলল।
রিয়ার বাবা মুচকি হেসে বললেন,
—দেখছি, তোমাদের পুরোনো হিসাব এখনো শেষ হয়নি।
অভি বিরক্ত হয়ে বলল,
—বাবা, আপনি আগে বলেননি যে মেয়েটা রিয়া।
মোতালেব চৌধুরী শান্তভাবে বললেন,
—বললে কি আসতে না?
অভি চুপ করে গেল।
রিয়ার মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তুইও তো আগে বলিসনি যে ছেলেটাকে চিনিস।
রিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
—জানতাম না যে ও হবে।
আবার সবাই হাসল।
কিন্তু অভি আর রিয়ার হাসি এল না।
তাদের দুজনের মাথাতেই তখন একটাই প্রশ্ন—
সত্যিই কি তাদের বিয়ে হতে যাচ্ছে?
কিছুক্ষণ পর দুই পরিবারের বড়রা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করলেন।
রিয়ার বাবা বললেন,
—আমরা তো আগে থেকেই মোতালেব সাহেবের পরিবারকে চিনি। অভিও ছোটবেলা থেকে আমাদের পরিচিত। ছেলেটা এখন নিজের ব্যবসা দেখছে, দায়িত্বশীলও হয়েছে।
রিয়ার মা মেয়ের দিকে তাকালেন।
—আমাদের শুধু রিয়ার মতামতটাই দরকার।
মোতালেব চৌধুরী বললেন,
—অভির মতামতও অবশ্যই দরকার। আমরা কাউকে জোর করে বিয়ে দিতে চাই না।
অভি বাবার দিকে তাকাল।
এই কথাটা শুনে তার মনে একটু স্বস্তি এল।
কিন্তু রিয়া তখনও চুপ।
হঠাৎ তার বাবা বললেন,
—রিয়া, তুই কী বলিস?
সব চোখ এবার রিয়ার দিকে।
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—আমি... এখনই কিছু বলতে পারছি না।
মোতালেব চৌধুরী বললেন,
—সময় নাও। তবে একটা কথা মনে রেখো, আমরা শুধু তোমাদের দুজনের ভালো চাই।
অভি উঠে দাঁড়াল।
—আমি রিয়ার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
সবাই অবাক হলেও বাধা দিল না।
রিয়া উঠে বারান্দার দিকে চলে গেল। অভিও তার পেছনে গেল।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে রিয়া বাইরে তাকিয়ে ছিল।
অভি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
—তুমি এত বদলে গেছ।
রিয়া ঘুরে তাকিয়ে বলল,
—তুমিও।
—আমি তো ভাবছিলাম তুমি আমাকে দেখেই দরজা বন্ধ করে দেবে।
—ইচ্ছা করছিল।
অভি হেসে ফেলল।
—তোমার স্বভাব একটুও বদলায়নি।
—তোমারও না।
—আমি এখন অনেক শান্ত।
রিয়া চোখ বড় করে তাকাল।
—তুমি?
অভি হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—তাহলে আজকে তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমার ভয় হচ্ছে, তুমি আবার আমার জীবনটা নষ্ট করবে।
—তোমার জীবন নষ্ট করার সময় কোথায় আমার?
রিয়া একটু চুপ করে বলল,
—বিয়ের কথা কী ভাবছ?
অভির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—জানি না।
—তুমি কি বিয়ে করতে চাও?
—এই মুহূর্তে না।
রিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
—আমিও না।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর অভি বলল,
—তাহলে বিষয়টা সহজ। দুজনেই না বলে দেব।
রিয়া মাথা নেড়ে বলল,
—ঠিক আছে।
অভি হাত বাড়িয়ে বলল,
—ডিল?
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়াল।
—ডিল।
দুজনের হাত মিলল।
কিন্তু কেউই জানত না, এই ছোট্ট সিদ্ধান্তটাই পরে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যার কারণ হবে।
রাতের খাবারের সময় আবার সবাই একসঙ্গে বসেছিল।
রিয়ার বাবা সরাসরি বললেন,
—তাহলে তোমরা কী সিদ্ধান্ত নিলে?
অভি রিয়ার দিকে তাকাল।
রিয়া চোখের ইশারায় বোঝাল—না বলো।
অভি মুখ খুলতে যাবে, ঠিক তখনই মোতালেব চৌধুরী বললেন,
—আমি একটা কথা আগে বলে রাখি। আমি চাই না, তোমরা শুধু পরিবারের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নাও। তবে তোমরা যদি একে অপরকে আগে থেকেই চেনো, তাহলে নতুন করে বুঝতে তোমাদের সময় কম লাগবে।
রিয়ার বাবা বললেন,
—আমরাও তাড়াহুড়ো করছি না।
রিয়া এবার সাহস করে বলল,
—বাবা, আমি একটা কথা বলতে পারি?
—বল।
—অভি আর আমি ছোটবেলা থেকে একে অপরকে চিনি। কিন্তু এত বছর পর মানুষ অনেক বদলে যায়। তাই শুধু পুরোনো পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে বিয়ে করা ঠিক হবে না।
অভি মনে মনে রিয়ার কথায় খুশি হলো।
কিন্তু তার বাবা হঠাৎ বললেন,
—ঠিক কথা। তাই আমি প্রস্তাব দিচ্ছি, বিয়ের আগে তোমরা দুজন কিছুদিন একে অপরকে বোঝার সুযোগ নাও।
রিয়া অবাক।
—কীভাবে?
মোতালেব চৌধুরী বললেন,
—অভি এখন ঢাকার একটা নতুন প্রজেক্টের দায়িত্ব নিচ্ছে। রিয়াও যেহেতু একই শহরে কাজ করে, তোমরা চাইলে মাঝে মাঝে দেখা করতে পারো। একে অপরের স্বভাব বুঝতে পারো।
অভি কিছু বলল না।
রিয়া বুঝতে পারল, বিষয়টা এখন আর এত সহজ নয়।
পরদিন সকালে রিয়া অফিসে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিল।
হঠাৎ বাসার সামনে একটা কালো গাড়ি এসে থামল।
গাড়ির জানালা নামতেই অভির মুখ দেখা গেল।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—তুমি এখানে?
অভি স্বাভাবিকভাবে বলল,
—তোমাকে নিতে এসেছি।
—কেন?
—বাবা বলেছে।
—তোমার বাবা তোমাকে আমার অফিসে পাঠিয়েছে?
—হ্যাঁ।
রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—আমি নিজে যেতে পারি।
—জানি।
—তাহলে?
অভি একটু হাসল।
—আমাদের তো একে অপরকে বোঝার কথা। তাই শুরুটা আজ থেকেই হোক।
রিয়া চোখ সরু করে তাকাল।
—তুমি খুব চালাক হয়েছ।
—তুমি তো আমাকে ছোটবেলা থেকেই চালাক বলতে।
—আমি ব্যঙ্গ করে বলতাম।
—আমি প্রশংসা হিসেবে নিয়েছিলাম।
রিয়া কিছু না বলে গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
প্রথম কয়েক মিনিট কেউ কোনো কথা বলল না।
তারপর অভি বলল,
—তুমি এখন কী কাজ করো?
—একটা মিডিয়া কোম্পানিতে কাজ করি।
—ভালো লাগে?
—খুব।
—বিয়ে হলে চাকরি করবে?
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
—বিয়ে হলে চাকরি ছাড়তে হবে নাকি?
—আমি সেটা বলিনি।
—তাহলে প্রশ্নটা করলে কেন?
অভি হেসে বলল,
—তোমার রাগ এখনো আগের মতোই আছে।
রিয়া মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।
—তুমি এখনো আগের মতোই বিরক্তিকর।
অভি কিছু বলল না।
তবে তার মুখে একটা ছোট হাসি ফুটে উঠল।
অফিসে পৌঁছানোর পর রিয়া গাড়ি থেকে নামল।
—ধন্যবাদ।
অভি মাথা নেড়ে বলল,
—বিকেলে আমি আসব।
—দরকার নেই।
—আমি আসব।
—আমি নিজেই বাসায় ফিরব।
—দেখা যাবে।
রিয়া চলে গেল।
অভি গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যাওয়ার সময় তার ফোন বেজে উঠল।
বাবার কল।
—হ্যালো?
—রিয়ার সঙ্গে দেখা হলো?
—হ্যাঁ।
—কেমন লাগল?
অভি একটু চুপ করে বলল,
—আগের মতোই আছে।
—মানে?
—জেদি। রাগী। বিরক্তিকর।
ওপাশে তার বাবা হেসে বললেন,
—তাহলে তো ভালোই। তোর সঙ্গে মানাবে।
অভি ফোন কেটে দিল।
কিন্তু নিজের অজান্তেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
সেদিন বিকেলে রিয়া অফিস থেকে বের হয়ে দেখল অভি সত্যিই দাঁড়িয়ে আছে।
সে বিরক্ত হয়ে বলল,
—তুমি এখনো আছ?
—হ্যাঁ।
—আমাকে নিতে আসার দরকার ছিল না।
—আমি জানি।
—তাহলে এসেছ কেন?
অভি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—জানি না।
রিয়া চুপ হয়ে গেল।
অভির চোখে আজ আগের মতো দুষ্টুমি ছিল না।
বরং একটা অদ্ভুত শান্ত ভাব।
রিয়া প্রথমবারের মতো খেয়াল করল—
ছোটবেলার সেই অভি সত্যিই অনেক বদলে গেছে।
কিন্তু ঠিক তখনই অভির ফোনে একটা কল এল।
সে ফোন ধরতেই তার মুখের ভাব বদলে গেল।
—কী বলছ? এখনই?
রিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
অভি ফোন রেখে তার দিকে তাকাল।
—আমাদের বাসায় একটা সমস্যা হয়েছে।
—কী সমস্যা?
অভি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—বাবা আমাদের বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেলেছে।
রিয়ার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
—কী?
অভি ধীরে বলল,
—আগামী মাসে।
রিয়া হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
অভির মুখ থেকে কথাটা শুনে রিয়া কিছুক্ষণ যেন কথা বলতেই পারল না।
—আগামী মাসে আমাদের বিয়ে?
অভি মাথা নিচু করে বলল,
—হ্যাঁ।
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলল,
—অসম্ভব!
—আমি জানি।
—আমাদের তো কেউ জিজ্ঞেসই করল না!
—আমাকেও জিজ্ঞেস করেনি।
রিয়া রাগে বলল,
—তাহলে তুমি চুপ করে আছ কেন?
অভি এবার তার দিকে তাকাল।
—কারণ আমি ভাবছি কীভাবে এটা আটকানো যায়।
রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—আমাদের কালই কথা বলা উচিত।
—কার সঙ্গে?
—দুই পরিবারের সঙ্গে।
অভি মাথা নেড়ে বলল,
—ঠিক আছে।
কিন্তু সেদিন রাতেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে গেল।
রাতে চৌধুরী বাড়িতে সবাই বসেছিল।
মোতালেব চৌধুরীর মুখে খুশির ছাপ।
তিনি বললেন,
—সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। আগামী মাসের শেষ শুক্রবার বিয়ের দিন।
অভি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—বাবা, আপনি এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন?
—তাড়াহুড়ো কোথায়?
—আমরা তো বলেছি, আগে কিছুদিন সময় চাই।
—সময় তো পাচ্ছিস।
—এক মাস?
—এক মাস যথেষ্ট।
অভি বিরক্ত হয়ে বলল,
—আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি আমার নেই?
মোতালেব চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন,
—অবশ্যই আছে। তাই তো তোকে রিয়ার সঙ্গে সময় কাটাতে দিয়েছি।
—কিন্তু বিয়ের তারিখ ঠিক করার আগে অন্তত আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন।
—জিজ্ঞেস করলে কী বলতিস?
অভি চুপ।
তার বাবা বললেন,
—তুই হয়তো না বলতিস। কারণ তুই সবসময় নিজের সিদ্ধান্তকে সবচেয়ে ঠিক মনে করিস।
অভি রাগ সামলে বলল,
—আমি শুধু নিজের জীবনটা নিজের মতো করে বাঁচতে চাই।
মোতালেব চৌধুরী কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
—ঠিক আছে। তুই নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নে। কিন্তু মনে রাখিস, রিয়াকে অসম্মান করে কোনো সিদ্ধান্ত নিবি না। মেয়েটা আমাদের বিশ্বাস করে।
এই কথায় অভি একটু থেমে গেল।
অন্যদিকে রিয়ার বাসাতেও একই অবস্থা।
রিয়া মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—তোমরা কীভাবে আমার বিয়ের তারিখ ঠিক করলে?
মা শান্তভাবে বললেন,
—তোর বাবা আর অভির বাবা কথা বলেছেন।
—কিন্তু আমার মতামত?
—তোর মতামতও জানতে চেয়েছি।
—কবে?
—এখন জানছি।
রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।
তার বাবা পাশে বসে বললেন,
—অভিকে কি তোর খারাপ লাগে?
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ।
—না।
—তাহলে সমস্যা কোথায়?
রিয়া ধীরে বলল,
—সমস্যা হলো, ওকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। কিন্তু বড় হওয়ার পর আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। এখন হঠাৎ করে বিয়ে—এটা মেনে নেওয়া সহজ না।
বাবা মৃদু হেসে বললেন,
—তাই তো বলছি, সময় নিয়ে বুঝে নে।
রিয়া কিছু বলল না।
সে নিজের ঘরে চলে গেল।
বিছানায় বসে ফোন হাতে নিল।
অভির নম্বরের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর নিজেই ফোন করল।
অভি ফোন ধরতেই রিয়া বলল,
—তুমি কি ঘুমাচ্ছিলে?
—না।
—আমার কথা বলতে হবে।
—বলো।
—বিয়েটা আমরা আটকাব।
অভি হেসে বলল,
—আমি তো সেটাই ভাবছি।
—কীভাবে?
—একটা উপায় আছে।
—কী?
—আমরা দুজন মিলে সবাইকে বোঝাব যে আমরা একে অপরকে পছন্দ করি না।
রিয়া বলল,
—এটা তো সহজ।
—না, সহজ না।
—কেন?
—কারণ দুই পরিবারই মনে করছে আমাদের মধ্যে আগে থেকেই ভালো সম্পর্ক আছে।
রিয়া একটু ভেবে বলল,
—তাহলে আমরা এমনভাবে ঝগড়া করব, যাতে সবাই বুঝে যায় আমরা বিয়ে করতে চাই না।
অভি হেসে ফেলল।
—তুমি কি আবার ছোটবেলার মতো মারামারি করতে চাইছ?
—প্রয়োজনে করব।
—ঠিক আছে। তাহলে কাল থেকে অপারেশন শুরু।
রিয়া হাসল।
—অপারেশনের নাম কী?
অভি বলল,
—“বিয়ে ভাঙো অভিযান।”
রিয়া হেসে বলল,
—ঠিক আছে।
ফোন কেটে দেওয়ার পর দুজনেরই মন একটু হালকা হলো।
কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, তাদের এই পরিকল্পনা উল্টো তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে।
পরদিন সকালে দুই পরিবার একসঙ্গে নাশতার আয়োজন করেছিল।
রিয়া আর অভি পাশাপাশি বসে।
রিয়ার মা বললেন,
—তোমাদের দুজনকে আজ বেশ শান্ত লাগছে।
অভি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমরা তো সবসময় শান্ত।
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি শান্ত?
অভি বলল,
—হ্যাঁ।
—তুমি ছোটবেলায় আমার বই ছিঁড়ে দিয়েছিলে।
—তুমি আমার সাইকেলের চাকা থেকে বাতাস বের করে দিয়েছিলে।
—কারণ তুমি আমাকে পুকুরে ফেলে দিয়েছিলে।
—তুমি আগে আমাকে ধাক্কা দিয়েছিলে।
কথা বলতে বলতে আবার ঝগড়া শুরু হয়ে গেল।
দুই পরিবারের বড়রা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলেন।
মোতালেব চৌধুরী বললেন,
—দেখলে? ছোটবেলার মতোই আছে।
রিয়ার বাবা বললেন,
—এই সম্পর্কই তো সবচেয়ে ভালো। যেখানে অভিনয় নেই।
অভি আর রিয়া একসঙ্গে বলল,
—এটা ভালো সম্পর্ক না!
সবাই হেসে উঠল।
অভি রিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল।
রিয়া বুঝে গেল, পরিকল্পনা প্রথম দিনেই ব্যর্থ।
দুপুরে রিয়া ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
অভি সেখানে এসে বলল,
—আমাদের প্ল্যান কাজ করছে না।
রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—আমি বুঝেছি।
—তাহলে নতুন প্ল্যান দরকার।
—হ্যাঁ।
—তুমি কি সত্যিই বিয়ে করতে চাও না?
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—জানি না।
অভি অবাক হয়ে তাকাল।
—মানে?
রিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
—বিয়েটা নিয়ে ভয় লাগছে।
—আমাকে নিয়ে?
—শুধু তোমাকে নিয়ে না। পুরো ব্যাপারটা নিয়ে।
অভি শান্ত গলায় বলল,
—তাহলে ভয় পেও না। আমি তোমাকে কোনো সিদ্ধান্তে জোর করব না।
রিয়া তার দিকে তাকাল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
এই ছোট্ট কথাটা রিয়ার মনে অদ্ভুত একটা শান্তি এনে দিল।
কয়েকদিন এভাবেই কেটে গেল।
অভি আর রিয়ার মধ্যে পুরোনো ঝগড়া চলল, কিন্তু তার সঙ্গে যোগ হলো নতুন কিছু।
অভি রিয়ার অফিসে কখনো খাবার পাঠিয়ে দেয়।
রিয়া অভির কাজের ভুল ধরিয়ে দেয়।
অভি তাকে বিরক্ত করে।
রিয়া রাগ দেখায়।
কিন্তু দুজনেই বুঝতে শুরু করল—
তাদের সম্পর্কটা শুধু ছোটবেলার ঝগড়ার মধ্যে আটকে নেই।
একদিন সন্ধ্যায় রিয়ার অফিসে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।
সবাই বাইরে বেরিয়ে গেলেও রিয়া কিছু ফাইলের জন্য ভেতরে থেকে গেল।
ঠিক তখন বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো।
রিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে অভির কণ্ঠ—
—চলো।
রিয়া ঘুরে তাকাল।
—তুমি এখানে?
—তোমাকে নিতে এসেছি।
—আমি তো বলিনি আসতে।
—সবকিছু বলেই করতে হবে?
রিয়া কিছু বলল না।
দুজন একসঙ্গে বাইরে বের হলো।
অভি ছাতা খুলে রিয়ার মাথার ওপর ধরল।
রিয়া বলল,
—তুমি নিজে ভিজছ।
—সমস্যা নেই।
—ছাতাটা মাঝখানে ধরো।
—তাহলে তুমি ভিজবে।
রিয়া চুপ করে গেল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
হঠাৎ রিয়ার পা পিছলে গেল।
অভি দ্রুত তার হাত ধরে ফেলল।
রিয়া থেমে গেল।
অভিও থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড দুজনের চোখে চোখ।
রিয়ার মনে হলো, এত বছর পরও এই মানুষটার পাশে দাঁড়ালে কেন যেন পরিচিত একটা নিরাপত্তা অনুভব হয়।
অভি ধীরে হাত ছেড়ে দিল।
—সাবধানে হাঁটো।
রিয়া নিচু গলায় বলল,
—ধন্যবাদ।
সেদিন রাতে রিয়া নিজের ঘরে বসে ছিল।
মায়ের দেওয়া বিয়ের শাড়ির ছবিটা ফোনে দেখছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো—
বিয়েটা আটকানোর জন্য সে এতদিন চেষ্টা করছে, কিন্তু সত্যিই কি সে বিয়েটা চায় না?
অন্যদিকে অভিও নিজের ঘরে বসে একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল।
সে নিজেকে বোঝাচ্ছিল—
“রিয়া শুধু ছোটবেলার পরিচিত একজন।”
কিন্তু মনের ভেতর থেকে আরেকটা কণ্ঠ বলছিল—
“তাহলে ওর সঙ্গে অন্য কারও বিয়ে ঠিক হওয়ার কথা শুনে এত অস্বস্তি হচ্ছে কেন?”
পরদিন দুপুরে অভি অফিসে ছিল।
হঠাৎ তার বাবার ফোন এল।
—অভি, আজ সন্ধ্যায় বাসায় চলে আয়।
—কেন?
—একজন অতিথি আসছে।
—কে?
মোতালেব চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—তোর বিয়ের ব্যাপারে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।
অভি চিন্তিত হয়ে বলল,
—কী কথা?
—সন্ধ্যায় আয়। তখন বলব।
ফোন কেটে গেল।
অভি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার মনে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি তৈরি হলো।
আর ঠিক একই সময়ে রিয়ার ফোনেও একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
সে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একজন নারী বলল,
—আপনি কি রিয়া?
—জি, বলছি।
—আমি আপনার সঙ্গে অভির ব্যাপারে কিছু কথা বলতে চাই।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—আপনি কে?
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
—আমি অভির বিয়ের জন্য আগে থেকে ঠিক করা মেয়ে।
রিয়ার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন খালি হয়ে গেল।
অভির জীবনে তাহলে রিয়া আসার আগেই অন্য কেউ ছিল?
রিয়ার হাত তখনও কাঁপছিল।
ফোনের ওপাশের মেয়েটি আবার বলল,
—হ্যালো? আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন?
রিয়া নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
—জি... শুনছি।
—আমি নাবিলা। অভির পরিবারের সঙ্গে আমাদের অনেক দিনের পরিচয়। কিছুদিন আগে দুই পরিবার মিলে আমাদের বিয়ের কথা প্রায় ঠিক করেছিল।
রিয়া চুপ করে রইল।
নাবিলা বলল,
—আমি জানি, এখন অভির সঙ্গে আপনার বিয়ের কথা চলছে। তাই আপনার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চাইলাম।
রিয়ার গলা শুকিয়ে গেল।
—আপনি আমাকে কী বলতে চান?
—আমি শুধু জানতে চাই, অভি কি সত্যিই আপনাকে বিয়ে করতে চায়?
প্রশ্নটা শুনে রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থাকল।
তারপর বলল,
—আমি জানি না।
—আপনার সঙ্গে ওর সম্পর্কটা কেমন?
রিয়া উত্তর দিল না।
নাবিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—অভি ছোটবেলা থেকে আমার পরিবারের পরিচিত। ওর বাবা চেয়েছিলেন আমাদের বিয়ে হোক। কিন্তু অভি কখনো খুব আগ্রহ দেখায়নি। তারপর হঠাৎ করে আপনার কথা উঠল।
রিয়া শান্তভাবে বলল,
—তাহলে আপনি আমাকে কেন ফোন করেছেন?
—কারণ আমি একটা বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। আমি কাউকে জোর করে বিয়ে করতে চাই না। কিন্তু অভির ব্যাপারে আমারও কিছু প্রশ্ন আছে।
রিয়া কিছু বলার আগেই নাবিলা বলল,
—আপনি যদি সত্যিই ওকে পছন্দ করেন, তাহলে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবেন। আমি শুধু চাই না, কেউ আমাকে নিয়ে ভুল বুঝুক।
ফোন কেটে গেল।
রিয়া কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, যেন হঠাৎ করে তার চারপাশের সবকিছু বদলে গেছে।
সন্ধ্যায় অভি বাড়ি ফিরল।
ড্রয়িংরুমে তার বাবা, মা এবং নাবিলার বাবা-মা বসে ছিলেন।
অভি নাবিলাকে দেখে থমকে গেল।
—তুমি এখানে?
নাবিলা শান্তভাবে বলল,
—হ্যাঁ।
মোতালেব চৌধুরী বললেন,
—বস।
অভি বসে পড়ল।
তারপর বাবা বললেন,
—কিছুদিন আগে নাবিলার সঙ্গে তোর বিয়ের কথা হয়েছিল। কিন্তু তখন তুই রাজি ছিলি না।
অভি বলল,
—আমি এখনো রাজি নই।
নাবিলার বাবা বললেন,
—আমরা কোনো সমস্যা তৈরি করতে চাই না। শুধু বিষয়টা পরিষ্কার করতে এসেছি।
অভি একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
—বিষয়টা তো পরিষ্কারই। আমি কাউকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিইনি।
নাবিলা তখন শান্ত গলায় বলল,
—আমি রিয়াকে ফোন করেছি।
অভি চমকে তাকাল।
—কেন?
—কারণ ওর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা দরকার মনে হয়েছে।
অভির মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—তুমি ওকে কী বলেছ?
—সত্যিটাই বলেছি।
—কী সত্যি?
নাবিলা বলল,
—যে তোমার সঙ্গে আমার বিয়ের কথা আগে হয়েছিল।
অভি উঠে দাঁড়াল।
—তুমি জানো, এতে রিয়া কী ভাবতে পারে?
নাবিলা শান্তভাবে বলল,
—আমি জানি না। কিন্তু তুমি যদি ওকে সত্যিটা আগে বলতে, তাহলে আমাকে ফোন করতে হতো না।
অভি কিছু বলতে পারল না।
মোতালেব চৌধুরী বললেন,
—এখন তো সব পরিষ্কার। নাবিলার সঙ্গে তোর বিয়ের কোনো কথা আর নেই। আমরা রিয়ার পরিবারকেই জানিয়েছি।
অভি বাবার দিকে তাকাল।
—তাহলে আজ নাবিলাকে কেন ডেকেছ?
—পুরোনো বিষয়টা শেষ করার জন্য।
নাবিলা উঠে দাঁড়াল।
—আমি চলি।
বের হওয়ার আগে সে অভির দিকে তাকিয়ে বলল,
—একটা কথা মনে রেখো। রিয়াকে যদি সত্যিই গুরুত্ব দাও, তাহলে ওর সঙ্গে সবকিছু পরিষ্কার করে কথা বলো।
অভি কোনো উত্তর দিল না।
অন্যদিকে রিয়া নিজের ঘরে বসে ছিল।
তার মনে বারবার একই প্রশ্ন ঘুরছিল।
অভি কি তাকে কিছু লুকিয়েছে?
হয়তো নাবিলার সঙ্গে তার বিয়ের কথা সত্যিই ছিল।
হয়তো সে এখন রিয়ার সঙ্গে শুধু পরিবারের চাপে সময় কাটাচ্ছে।
হয়তো...
রিয়া আর ভাবতে পারল না।
ঠিক তখন তার ফোনে অভির কল এল।
রিয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েকবার বাজতে বাজতে কল কেটে গেল।
আবার ফোন এল।
এবার রিয়া ধরল।
—হ্যালো।
অভি বলল,
—তুমি কি আমার সঙ্গে দেখা করবে?
রিয়া ঠান্ডা গলায় বলল,
—কেন?
—নাবিলার ব্যাপারে কথা বলতে।
—কথা বলার কী আছে?
—অনেক কিছু।
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—কাল দেখা করব।
পরদিন বিকেলে তারা সেই পুরোনো ক্যাফেতে দেখা করল, যেখানে প্রথমবার বড় হয়ে দেখা হওয়ার পর একসঙ্গে বসেছিল।
অভি এসে বসতেই রিয়া বলল,
—তোমার সঙ্গে নাবিলার বিয়ের কথা ছিল?
অভি মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ, কথা হয়েছিল।
রিয়া নিচের দিকে তাকাল।
—আমাকে বলোনি কেন?
—কারণ সেটা কখনো আমার পছন্দের বিয়ে ছিল না।
—কিন্তু কথাটা তো সত্যি ছিল।
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমার জানার অধিকার ছিল।
অভি চুপ করে গেল।
রিয়া বলল,
—তুমি যদি আমাকে আগে বলতে, তাহলে হয়তো আমি অন্যভাবে নিতাম।
—আমি ভুল করেছি।
রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
—তুমি ভুল স্বীকার করছ?
অভি হেসে বলল,
—সবসময় করি না। আজ করছি।
রিয়ার মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠলেও সে দ্রুত মুখ গম্ভীর করল।
—নাবিলা আমাকে বলেছে, তুমি নাকি কখনো তাকে পছন্দ করোনি।
—সত্যি।
—তাহলে এতদিন কেন কথাটা চলল?
অভি বলল,
—আমাদের পরিবারগুলো অনেক বছর ধরে একে অপরকে চেনে। বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল। আমি বিষয়টা এড়িয়ে গেছি। ভেবেছিলাম একসময় নিজে থেকেই শেষ হয়ে যাবে।
রিয়া ধীরে বলল,
—আর এখন?
অভি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—এখন আমি অন্য কিছু নিয়ে ভাবছি।
রিয়ার বুক ধক করে উঠল।
—কী?
অভি উত্তর দিল না।
বরং বলল,
—তুমি কি বিয়েটা আটকাতে চাও?
রিয়া চোখ নামিয়ে বলল,
—আগে চাইতাম।
—এখন?
রিয়া চুপ।
অভি আবার বলল,
—এখন?
রিয়া ধীরে মাথা তুলল।
—জানি না।
এই উত্তর শুনে অভির মুখে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।
সেদিনের পর থেকে তাদের সম্পর্ক বদলাতে শুরু করল।
আগে তারা শুধু ঝগড়া করত।
এখন ঝগড়ার মাঝেও একে অপরের খেয়াল রাখত।
রিয়া অফিসে ব্যস্ত থাকলে অভি তাকে বিরক্ত করত না।
অভি রাতে দেরি করে কাজ করলে রিয়া মেসেজ করে জিজ্ঞেস করত,
“বাসায় ফিরেছ?”
কেউ কাউকে ভালো লাগার কথা বলত না।
কিন্তু দুজনেই বুঝতে শুরু করেছিল, তাদের সম্পর্কটা আর শুধু পারিবারিক সিদ্ধান্তের মধ্যে নেই।
একদিন রিয়া অফিস থেকে বের হয়ে দেখল অভি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—আজ আবার কেন এসেছ?
—তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।
—কোথায়?
—চলো।
—আগে বলো।
—বললে চমক থাকবে না।
রিয়া অনিচ্ছা নিয়ে গাড়িতে উঠল।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি শহর ছাড়িয়ে নদীর ধারে এসে থামল।
রিয়া গাড়ি থেকে নেমে অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল।
—এখানে কেন?
অভি বলল,
—চেনো জায়গাটা?
রিয়া চারদিকে তাকিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।
—এটা...
অভি হেসে বলল,
—আমাদের ছোটবেলার সেই জায়গা।
নদীর ধারে একটা পুরোনো বড় গাছ।
এই গাছটার নিচেই তারা ছোটবেলায় বসে গল্প করত।
রিয়া ধীরে ধীরে গাছটার কাছে গেল।
—এটা এখনো আছে!
—হ্যাঁ।
অভি বলল,
—মনে আছে, একবার তুমি বলেছিলে বড় হয়ে তুমি এমন কাউকে বিয়ে করবে যে তোমার সব কথা শুনবে?
রিয়া হেসে বলল,
—আমি এমন কথা বলেছিলাম?
—হ্যাঁ।
—তুমি কী বলেছিলে?
অভি একটু হেসে বলল,
—আমি বলেছিলাম, আমি কখনো বিয়ে করব না।
রিয়া তার দিকে তাকাল।
—দেখলে? তুমি নিজের কথাই রাখতে পারোনি।
অভি বলল,
—হয়তো কিছু কথা সময়ের সঙ্গে বদলে যায়।
রিয়া আর কিছু বলল না।
দুজনেই কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ রিয়ার ফোন বেজে উঠল।
তার বাবার কল।
রিয়া ফোন ধরল।
—হ্যালো বাবা?
ওপাশ থেকে বাবা বললেন,
—রিয়া, আজ রাতে বাসায় তাড়াতাড়ি আয়। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।
—কী কথা?
—তোর আর অভির বিয়ের ব্যাপারে।
রিয়া চুপ হয়ে গেল।
—আবার কী হয়েছে?
—আজ দুই পরিবার বসে ঠিক করবে, বিয়েটা কোথায় হবে এবং কবে হবে।
ফোন কেটে গেল।
রিয়া অভির দিকে তাকাল।
—বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে।
অভি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—হ্যাঁ।
রিয়া ধীরে বলল,
—আমরা তো এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি।
অভি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমাদের হয়তো আর বেশি সময় নেই।
রিয়া মৃদু গলায় বলল,
—অভি...
—হুম?
—তুমি যদি সত্যিই না চাও, তাহলে এখনই আমাকে বলো।
অভি তার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—আমি আগে বিয়েটা চাইনি।
রিয়ার বুক কেঁপে উঠল।
—আর এখন?
অভি উত্তর দেওয়ার আগেই দূরে মেঘ গর্জে উঠল।
কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করল।
অভি ধীরে বলল,
—এখন আমি নিশ্চিত নই, আমি এই বিয়েটা আটকাতে চাই কি না।
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার নিজের মনেও তখন একই দ্বন্দ্ব।
সে কি সত্যিই অভিকে হারাতে ভয় পাচ্ছে?
আর ঠিক তখনই রিয়ার ফোনে একটা মেসেজ এল।
মেসেজটি নাবিলার।
মাত্র একটি লাইন—
“রিয়াকে বিয়ে করতে অভি রাজি হলেও, একটা সত্যি তোমার জানা দরকার।”
রিয়ার মুখের রং বদলে গেল।
সে কাঁপা হাতে মেসেজের নিচের অংশ খুলল।
সেখানে লেখা ছিল—
“অভির পরিবার তোমাদের বিয়ের জন্য যে কারণটা বলছে, সেটা আসল কারণ নয়।”
নাবিলার মেসেজটা পড়ার পর রিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
“অভির পরিবার তোমাদের বিয়ের জন্য যে কারণটা বলছে, সেটা আসল কারণ নয়।”
রিয়া বারবার মেসেজটা পড়ল।
তারপর নাবিলাকে ফোন করল।
কিন্তু ফোন বন্ধ।
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
অভি তার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কী হয়েছে?
রিয়া ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
অভি মেসেজটা পড়ে গম্ভীর হয়ে গেল।
—নাবিলা এটা পাঠিয়েছে?
—হ্যাঁ।
—ও কী বলতে চাইছে?
—আমি জানি না।
অভি কয়েকবার নাবিলাকে ফোন করল। কোনো উত্তর নেই।
রিয়া বলল,
—তুমি কি কিছু জানো?
অভি মাথা নাড়ল।
—না।
—নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
রিয়া কিছু বলল না।
অভি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছ?
রিয়া ধীরে বলল,
—আমি তোমাকে সন্দেহ করতে চাই না। কিন্তু এত কিছু একসঙ্গে ঘটছে যে আমি বুঝতে পারছি না কাকে বিশ্বাস করব।
অভি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তাহলে আমার সঙ্গে চলো।
—কোথায়?
—বাবার কাছে।
সেদিন রাতেই তারা চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছাল।
ড্রয়িংরুমে মোতালেব চৌধুরী বসে ছিলেন। অভি ঢুকেই বলল,
—বাবা, তোমার সঙ্গে কথা আছে।
—বলো।
অভি ফোনটা তার সামনে রাখল।
—নাবিলা এই মেসেজ পাঠিয়েছে। সে বলছে, আমাদের বিয়ের আসল কারণ অন্য কিছু।
মোতালেব চৌধুরী কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—নাবিলা এসব বলেছে?
—হ্যাঁ।
—ওর কথা বিশ্বাস করিস?
অভি বলল,
—আমি কাউকে বিশ্বাস করছি না। শুধু সত্যিটা জানতে চাই।
রিয়াও চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
মোতালেব চৌধুরী ধীরে উঠে জানালার কাছে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর বললেন,
—তোমাদের দুজনের বিয়ের কথা শুধু পারিবারিক সম্পর্কের কারণে নয়।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—তাহলে?
তিনি ঘুরে তাকালেন।
—তোমাদের পরিবার দুইটা একটা পুরোনো সমস্যার মধ্যে জড়িয়ে আছে।
অভি অবাক।
—কী সমস্যা?
—অনেক বছর আগে তোর দাদার সঙ্গে রিয়ার বাবার একটা ব্যবসায়িক অংশীদারি ছিল।
রিয়া কিছু বুঝতে পারল না।
—আমার বাবা আর আপনার বাবার?
—হ্যাঁ।
মোতালেব চৌধুরী বললেন,
—সেই ব্যবসায় বড় একটা ক্ষতি হয়েছিল। দুই পরিবারের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। সম্পর্ক প্রায় ভেঙে যায়।
অভি বলল,
—কিন্তু এত বছর পর বিয়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
মোতালেব চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন,
—তোমাদের বিয়ে হলে দুই পরিবারের পুরোনো সম্পর্ক আবার শক্ত হবে। সেই সঙ্গে একটা পুরোনো সম্পত্তির বিষয়ও মিটে যাবে।
রিয়া হতভম্ব।
—সম্পত্তি?
—হ্যাঁ।
অভি রাগে বলল,
—তাহলে আমাদের বিয়ে শুধু সম্পত্তির জন্য?
—আমি সেটা বলছি না।
—কিন্তু তুমি বলছ, বিয়ের সঙ্গে সম্পত্তির সম্পর্ক আছে!
মোতালেব চৌধুরী শান্তভাবে বললেন,
—আমি চেয়েছিলাম তোমরা দুজনও ভালো থাকো। তোমরা ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে চেনো। তাই এই সম্পর্ককে খারাপ কিছু মনে করিনি।
রিয়া ধীরে বলল,
—আমাদের কি তাহলে একটা চুক্তির অংশ বানানো হচ্ছে?
মোতালেব চৌধুরী কিছু বললেন না।
সেই নীরবতাই যেন সব উত্তর দিয়ে দিল।
রিয়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।
বাইরে বেরিয়ে আসতেই অভি তার পেছনে গেল।
—রিয়া, দাঁড়াও।
রিয়া থামল না।
অভি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—আমার দিকে তাকাও।
রিয়া চোখ তুলে তাকাল।
তার চোখে রাগ আর কষ্ট।
—তুমি জানতেও না?
—না।
—একবারও সন্দেহ হয়নি?
—না।
—তাহলে তোমার বাবা কেন এত জোর করে বিয়েটা দিতে চাইছে?
অভি কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—আমি জানি না।
রিয়া বলল,
—আমি আর এই বিয়ে চাই না।
অভির বুকটা কেঁপে উঠল।
—কেন?
—কারণ আমি চাই না কেউ আমাদের সম্পর্ককে কোনো হিসাবের অংশ বানাক।
অভি ধীরে বলল,
—আমিও চাই না।
রিয়া বলল,
—তাহলে সব শেষ।
অভি তার হাত ধরতে গিয়ে থেমে গেল।
—রিয়া...
রিয়া বলল,
—আমাকে একটু সময় দাও।
তারপর সে চলে গেল।
অভি একা দাঁড়িয়ে রইল।
পরদিন থেকে রিয়া অভির ফোন ধরল না।
মেসেজের উত্তর দিল না।
অফিসে যাওয়ার সময়ও অন্য পথে যাতায়াত করতে লাগল।
অভি প্রথম দুই দিন অপেক্ষা করল।
তৃতীয় দিন সে রিয়ার অফিসে গেল।
রিয়া তাকে দেখে বলল,
—এখানে কেন এসেছ?
—তোমার সঙ্গে কথা বলতে।
—আমার কথা বলার ইচ্ছা নেই।
—কিন্তু আমার আছে।
রিয়া চুপ।
অভি বলল,
—আমি বাবার সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী নই।
রিয়া ঠান্ডা গলায় বলল,
—আমি জানি।
—তাহলে আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছ কেন?
—কারণ আমি ভয় পাচ্ছি।
অভি অবাক।
—কীসের ভয়?
রিয়া ধীরে বলল,
—যদি আমাদের সম্পর্ক সত্যি হয়, আর সবাই সেটাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে?
অভি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তাহলে আমরা নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেব।
—কীভাবে?
—সবকিছুর বিরুদ্ধে গিয়ে।
রিয়া তার দিকে তাকাল।
অভি বলল,
—আমি চাই না আমাদের সম্পর্ক কোনো সম্পত্তি, ব্যবসা বা পরিবারের চুক্তির ওপর দাঁড়াক।
রিয়ার চোখে জল চলে এল।
—তুমি কি সত্যিই এটা বলতে পারছ?
—হ্যাঁ।
—তাহলে একটা কথা বলো।
—কী?
—যদি তোমার বাবা সবকিছু বাতিল করে দেন, তবুও কি তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাইবে?
অভি কোনো দ্বিধা না করে বলল,
—হ্যাঁ।
রিয়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিল।
—আমাকে সময় দাও।
অভি মাথা নেড়ে চলে গেল।
সেদিন রাতে রিয়ার বাবা তার ঘরে এলেন।
—রিয়া, তুই কি অভির সঙ্গে কথা বলেছিস?
—হ্যাঁ।
—ও কী বলেছে?
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—বাবা, আমাদের বিয়ের সঙ্গে কি সত্যিই পুরোনো সম্পত্তির বিষয় জড়িত?
তার বাবা থমকে গেলেন।
—কে বলেছে?
—আপনি শুধু উত্তর দিন।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—হ্যাঁ, কিছুটা সম্পর্ক আছে।
রিয়া বলল,
—কিছুটা?
—তোর দাদার সময়কার একটা বিষয়। তোর বিয়ে হলে দুই পরিবারের পুরোনো সমস্যাটা সহজে মিটে যাবে।
—তাহলে আমার মতামত কোথায়?
—তোর মতামতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
—তাহলে আমাকে আগে সত্যিটা বলোনি কেন?
বাবা চুপ করে রইলেন।
রিয়া বলল,
—আমি অভিকে বিয়ে করব কি না, সেটা আমি ঠিক করব। কিন্তু কোনো সম্পত্তির জন্য নয়।
তার বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তুই কি ওকে পছন্দ করিস?
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না।
অনেকক্ষণ পর ধীরে বলল,
—আমি জানি না।
কিন্তু তার মুখের উত্তর ছিল অন্যরকম।
অন্যদিকে অভি নিজের ঘরে বসে পুরোনো অ্যালবাম দেখছিল।
একটা ছবিতে ছোট্ট রিয়া দাঁড়িয়ে আছে।
তার পাশে ছোট্ট অভি।
দুজনের মুখে রাগী ভাব, কারণ তারা একই খেলনা নিয়ে ঝগড়া করছিল।
অভি ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
ঠিক তখন তার মা ঘরে এলেন।
—তুই রিয়াকে খুব পছন্দ করিস, তাই না?
অভি চমকে তাকাল।
—মা...
—মায়ের কাছে লুকাতে হবে না।
অভি কিছু বলল না।
তার মা বললেন,
—তোর বাবা হয়তো অনেক হিসাব করে এই বিয়েটা ঠিক করেছে। কিন্তু তুই যেন নিজের মনটাকে হারিয়ে ফেলিস না।
অভি মায়ের দিকে তাকাল।
—তুমি কি চাও আমি রিয়াকে বিয়ে করি?
—আমি চাই তুই এমন একজনকে বিয়ে করিস, যার সঙ্গে তুই সুখী হবি।
অভি ধীরে বলল,
—আমি রিয়াকে হারাতে চাই না।
মা মৃদু হেসে বললেন,
—তাহলে ওকে শুধু বিয়ের প্রস্তাব দিস না। ওকে নিজের সত্যিটা বল।
পরদিন বিকেলে অভি রিয়ার বাসার সামনে গেল।
রিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
অভি নিচ থেকে বলল,
—রিয়া!
রিয়া নিচে তাকাল।
—কী হয়েছে?
—নিচে আসবে?
—কেন?
—একটা কথা বলব।
কিছুক্ষণ পর রিয়া নিচে এল।
অভি বলল,
—আমি তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত জানাতে এসেছি।
রিয়া চুপ করে শুনছিল।
অভি বলল,
—আমি বাবার সম্পত্তি চাই না। ব্যবসার কোনো সুবিধাও চাই না। আমি শুধু নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে চাই।
রিয়া বলল,
—তাহলে?
অভি গভীরভাবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
রিয়ার বুক কেঁপে উঠল।
—কিন্তু কেন?
অভি মৃদু হেসে বলল,
—কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি।
রিয়া স্থির হয়ে গেল।
এটাই প্রথমবার অভি সরাসরি নিজের মনের কথা বলল।
কিন্তু রিয়া কিছু বলার আগেই পেছন থেকে তার বাবার কণ্ঠ শোনা গেল—
—রিয়া, ঘরে আয়।
দুজনেই পেছনে তাকাল।
রিয়ার বাবা হাতে একটা পুরোনো ফাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
তিনি অভির দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তোমার বাবাকে একটা কথা জানাতে হবে।
অভি বলল,
—কী কথা?
রিয়ার বাবা ফাইলটা খুলে বললেন,
—পুরোনো সম্পত্তির কাগজে এমন একটা শর্ত আছে, যেটা তোমাদের কেউ জানে না।
অভি আর রিয়া দুজনেই অবাক হয়ে তাকাল।
তিনি ধীরে বললেন,
—তোমাদের বিয়ে না হলে এই সম্পত্তি দুই পরিবারের কারও হাতে থাকবে না।
অভির মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
রিয়া বুঝতে পারল—
তাদের বিয়ের সঙ্গে শুধু পরিবারের ইচ্ছা নয়, আরও বড় একটা রহস্য জড়িয়ে আছে।
রিয়ার বাবার কথাটা শুনে অভি আর রিয়া দুজনেই কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
—তোমাদের বিয়ে না হলে এই সম্পত্তি দুই পরিবারের কারও হাতে থাকবে না।
অভি ভ্রু কুঁচকে বলল,
—কিন্তু এই শর্ত কে দিয়েছিল?
রিয়ার বাবা ফাইলটা বন্ধ করে বললেন,
—তোমাদের দাদারা।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—দাদারা?
—হ্যাঁ। অনেক বছর আগে দুই পরিবার যখন ব্যবসায় একসঙ্গে কাজ করত, তখন কিছু সম্পত্তি যৌথভাবে কেনা হয়েছিল। পরে ব্যবসায় সমস্যা হওয়ার পর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। তখন তোমাদের দাদারা একটা চুক্তি করেন।
অভি বলল,
—কী চুক্তি?
—তোমাদের পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের ছেলে আর মেয়ের মধ্যে বিয়ে হলে তবেই সেই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
রিয়া হতভম্ব।
—এটা তো একেবারে অদ্ভুত!
রিয়ার বাবা মাথা নেড়ে বললেন,
—আমিও জানি।
অভি রাগ সামলে বলল,
—তাহলে আমার বাবা এতদিন ধরে আমাকে কিছু বলেনি কেন?
—হয়তো সে চেয়েছে তুই নিজে থেকেই রিয়াকে বিয়ে করতে রাজি হোস।
অভি হেসে ফেলল।
—নিজে থেকে? অথচ পেছনে এত বড় একটা শর্ত লুকানো ছিল?
রিয়ার বাবা বললেন,
—আমি ভুল করেছি। কিন্তু এখন সবকিছু তোমাদের সামনে পরিষ্কার করে দিলাম।
রিয়া ধীরে বলল,
—বাবা, এই সম্পত্তির জন্য আমি বিয়ে করব না।
অভি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমিও না।
দুজনের কথা শুনে রিয়ার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—তোমরা যদি একে অপরকে সত্যিই বিয়ে করতে চাও, তাহলে সম্পত্তির বিষয়টা বাদ দিয়েই সিদ্ধান্ত নাও।
অভি রিয়ার দিকে তাকাল।
রিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।
সেদিন রাতে দুই পরিবার আবার একসঙ্গে বসল।
মোতালেব চৌধুরী সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—আমি জানতাম এই শর্তের কথা।
অভি রাগে উঠে দাঁড়াল।
—তুমি জানতে?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমাকে বলোনি কেন?
—কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম, তুই হয়তো বিয়েটাকে শুধু সম্পত্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখবি।
অভি বলল,
—আর এখন কী দেখব?
মোতালেব চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমি ভুল করেছি।
এই স্বীকারোক্তি শুনে অভি একটু থেমে গেল।
তার বাবা খুব কমই নিজের ভুল স্বীকার করেন।
মোতালেব চৌধুরী বললেন,
—তুই যদি রিয়াকে সত্যিই চাস, তাহলে সম্পত্তির কথা ভুলে যা। তুই যদি না চাস, তাও আমি তোকে জোর করব না।
অভি অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—তাহলে বিয়েটা বাতিল করে দাও।
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
রিয়ার বাবা বললেন,
—বিয়েটা বাতিল করতে হলে দুই পরিবারকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রিয়া বলল,
—কী সিদ্ধান্ত?
—পুরোনো সম্পত্তি দুই পরিবারের কেউ দাবি করবে না।
অভি বলল,
—আমি রাজি।
রিয়ার বাবা মেয়ের দিকে তাকালেন।
রিয়াও মাথা নেড়ে বলল,
—আমিও।
মোতালেব চৌধুরী ধীরে বললেন,
—তাহলে সম্পত্তির হিসাব এখানেই শেষ।
কিন্তু তার মুখে তখনও একটা অদ্ভুত চিন্তার ছাপ।
পরদিন সকালে অভি রিয়াকে ফোন করল।
—ঘুম থেকে উঠেছ?
—হ্যাঁ।
—আজ দেখা করবে?
রিয়া একটু হেসে বলল,
—কেন?
—একটা জায়গায় নিয়ে যাব।
—আবার কোনো পুরোনো জায়গা?
—হ্যাঁ।
—ঠিক আছে।
দুপুরে অভি রিয়াকে নিয়ে গেল তাদের ছোটবেলার স্কুলের সামনে।
স্কুলটা এখন অনেক বদলে গেছে। পুরোনো ভবনের জায়গায় নতুন ভবন হয়েছে। কিন্তু মাঠটা এখনো আগের মতোই আছে।
রিয়া মাঠের দিকে তাকিয়ে বলল,
—মনে আছে?
—কী?
—তুমি একবার পরীক্ষার খাতা লুকিয়ে রেখেছিলে।
অভি হেসে বলল,
—তুমি আমার খাতা ছিঁড়ে ফেলেছিলে।
—তুমি আগে আমাকে নকল করার অভিযোগ দিয়েছিলে।
—কারণ তুমি সত্যিই নকল করেছিলে।
—মিথ্যা!
দুজনেই হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর রিয়া চুপ করে বলল,
—অভি?
—হুম?
—আমাদের ছোটবেলার এত কিছু মনে আছে তোমার?
অভি বলল,
—সব।
রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
—সব?
—হ্যাঁ।
—আমার জন্মদিন?
—১২ জুলাই।
রিয়া থেমে গেল।
—আমার প্রিয় খাবার?
—ফুচকা।
—আমি ভয় পেতাম কীসে?
—বজ্রপাত।
রিয়া এবার সত্যিই অবাক।
—তুমি এসব মনে রেখেছ?
অভি হেসে বলল,
—কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না।
রিয়া আর কোনো কথা বলল না।
তার চোখে অদ্ভুত একটা কোমলতা ফুটে উঠল।
সেদিন বিকেলে তারা নদীর ধারে বসে ছিল।
অভি বলল,
—রিয়া, আমি তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—করো।
—তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে চাও?
রিয়া চুপ।
অভি বলল,
—ভেবে উত্তর দিও।
রিয়া নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি আগে ভাবতাম, তুমি শুধু আমার ছোটবেলার ঝগড়ার সঙ্গী।
অভি হেসে বলল,
—শুধু ভাবতে?
—হ্যাঁ।
—এখন?
রিয়া ধীরে তার দিকে তাকাল।
—এখন মনে হয়, তুমি আমার সবচেয়ে পরিচিত মানুষ।
অভির মুখে হাসি ফুটল।
—এটা কি হ্যাঁ?
রিয়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—এত তাড়াতাড়ি উত্তর চাইছ কেন?
—কারণ আমি অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছি।
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে অপেক্ষা করো।
অভি বলল,
—কতদিন?
—জানি না।
—এক মাস?
—হয়তো।
—এক বছর?
রিয়া হেসে বলল,
—এতদিন অপেক্ষা করতে হবে না।
অভি তার দিকে তাকিয়ে রইল।
রিয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল।
এরপরের কয়েকদিন যেন খুব দ্রুত কেটে গেল।
দুই পরিবারও বিয়ের ব্যাপারে আর কোনো চাপ দিল না।
বরং তারা দুজনকে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিল।
অভি আর রিয়া ধীরে ধীরে একে অপরের জীবনের আরও কাছাকাছি আসতে লাগল।
অভি রিয়ার কাজের চাপ বুঝতে শিখল।
রিয়া অভির ব্যবসার চিন্তা বুঝতে শুরু করল।
অভি কখনো রাগ করলে রিয়া তাকে শান্ত করত।
রিয়া মন খারাপ করলে অভি তাকে হাসানোর চেষ্টা করত।
তাদের সম্পর্কের মধ্যে এখন আর আগের মতো শুধু ঝগড়া ছিল না।
ছিল বোঝাপড়া।
ছিল অপেক্ষা।
ছিল এমন কিছু অনুভূতি, যেগুলোর নাম দুজনেই জানত, কিন্তু মুখে বলতে চাইত না।
এক সন্ধ্যায় রিয়া অভির সঙ্গে দেখা করতে গেল।
অভি তাকে একটা ছোট বাক্স দিল।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—এটা কী?
—খুলো।
রিয়া বাক্স খুলে দেখল ভেতরে একটা পুরোনো চুলের ক্লিপ।
সে অবাক হয়ে বলল,
—এটা!
অভি হেসে বলল,
—মনে আছে?
রিয়া ক্লিপটা হাতে নিয়ে চুপ করে গেল।
—এটা আমার?
—হ্যাঁ।
—তুমি এত বছর ধরে এটা রেখেছিলে?
—হ্যাঁ।
—কেন?
অভি একটু থেমে বলল,
—জানি না।
রিয়া ক্লিপটা হাতে ধরে মৃদু হেসে বলল,
—তুমি সত্যিই অদ্ভুত।
অভি বলল,
—তুমি তো ছোটবেলা থেকেই জানো।
ঠিক তখনই অভির ফোন বেজে উঠল।
সে ফোন ধরতেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—কী বলছ?
ওপাশ থেকে কেউ কিছু বলল।
অভি বলল,
—আমি এখনই আসছি।
ফোন রেখে সে রিয়ার দিকে তাকাল।
রিয়া জিজ্ঞেস করল,
—কী হয়েছে?
—বাবা হাসপাতালে।
রিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—কী?
—হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
দুজন দ্রুত হাসপাতালে গেল।
হাসপাতালে পৌঁছে দেখল মোতালেব চৌধুরী চিকিৎসাধীন।
অভি উদ্বিগ্ন হয়ে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল,
—আমার বাবা কেমন আছেন?
ডাক্তার বললেন,
—এখন স্থিতিশীল। তবে অনেকদিন ধরে তিনি মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন।
অভি বাবার কেবিনে ঢুকল।
মোতালেব চৌধুরী চোখ খুলে ছেলের দিকে তাকালেন।
তারপর রিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
—তোমরা এসেছ?
অভি তার হাত ধরল।
—বাবা, তুমি আমাকে কিছু বলোনি।
মোতালেব চৌধুরী ধীরে বললেন,
—একটা কথা বলব।
—বলো।
—তোমাদের দাদাদের পুরোনো চুক্তির মধ্যে আরেকটা বিষয় ছিল।
অভি আর রিয়া দুজনেই অবাক।
—কী?
মোতালেব চৌধুরী ধীরে বললেন,
—যদি তোমরা বিয়ে না করো, তাহলে সম্পত্তি শুধু দুই পরিবার হারাবে না...
তিনি একটু থামলেন।
—তোমাদের পরিবারের ওপর একটা বড় ঋণের দায়ও এসে পড়বে।
অভি হতভম্ব হয়ে গেল।
—কীসের ঋণ?
মোতালেব চৌধুরী চোখ বন্ধ করে বললেন,
—সেই ঋণের গল্প তোমাদের বাবা-মায়ের কেউ জানে না।
রিয়া অবাক হয়ে অভির দিকে তাকাল।
আর অভির মনে হলো—
তাদের সম্পর্কের পেছনে যে রহস্য লুকিয়ে আছে, সেটা তারা যতটা ভেবেছিল তার চেয়েও অনেক বড়।
হাসপাতালের কেবিনে তখন নীরবতা।
মোতালেব চৌধুরীর কথা শুনে অভি আর রিয়া দুজনেই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
অভি বাবার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
—কীসের ঋণ, বাবা?
মোতালেব চৌধুরী কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন,
—এই ঋণের কথা আমি কাউকে বলতে চাইনি।
—কিন্তু এখন বলতে হবে।
—হ্যাঁ। কারণ সময় খুব কম।
রিয়া এগিয়ে এসে বলল,
—চাচা, আপনি যদি না বলেন, তাহলে আমরা কিছুই বুঝতে পারব না।
মোতালেব চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—অনেক বছর আগে তোমাদের দাদারা একসঙ্গে একটা বড় ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ব্যবসাটা খুব ভালো চলছিল। কিন্তু একসময় একজন ব্যবসায়িক অংশীদার তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে।
অভি জিজ্ঞেস করল,
—তারপর?
—ব্যবসায় বড় ক্ষতি হয়। অনেক টাকা ধার করতে হয়। সেই ধার শোধ করার জন্য দুই পরিবার তাদের কিছু সম্পত্তি বন্ধক রাখে।
রিয়া বলল,
—তাহলে সম্পত্তিগুলো এখনো বন্ধক আছে?
—না। বেশিরভাগ ঋণ শোধ হয়ে গেছে। কিন্তু একটা অংশের কাগজ নিয়ে সমস্যা রয়ে গেছে।
অভি বলল,
—কী সমস্যা?
মোতালেব চৌধুরী ধীরে বললেন,
—সেই সময় একটা চুক্তি করা হয়েছিল। দুই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের ছেলে-মেয়ের বিয়ে হলে পুরোনো অংশীদারির হিসাব পুরোপুরি শেষ হবে।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—এমন চুক্তি কেন?
—কারণ তখন দুই পরিবারের বড়রা মনে করেছিল, ভবিষ্যতে পরিবার দুটি আবার এক হয়ে গেলে পুরোনো সব বিরোধ শেষ হবে।
অভি বিরক্ত হয়ে বলল,
—মানুষের বিয়েকে ব্যবসার হিসাবের সঙ্গে জড়ানোর কী দরকার ছিল?
মোতালেব চৌধুরী চুপ করে গেলেন।
তারপর বললেন,
—তখনকার মানুষ অন্যভাবে ভাবত।
অভি মাথা নিচু করল।
রিয়া ধীরে বলল,
—কিন্তু এখন?
মোতালেব চৌধুরী বললেন,
—এখন তোমাদের সিদ্ধান্ত তোমরাই নেবে।
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর অভি আর রিয়া করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল।
অভি বলল,
—আমি বুঝতে পারছি না, কোথা থেকে সব শুরু করব।
রিয়া বলল,
—আমাদের পুরোনো কাগজগুলো খুঁজে দেখতে হবে।
—কোথায়?
—তোমাদের বাড়িতে নিশ্চয়ই আছে।
অভি মাথা নেড়ে বলল,
—চলো।
দুজন সোজা চৌধুরী বাড়িতে গেল।
মোতালেব চৌধুরীর ঘরের পুরোনো আলমারি খুলে অনেক কাগজপত্র বের করা হলো।
একটার পর একটা ফাইল দেখা হতে লাগল।
অবশেষে একটা পুরোনো কাঠের বাক্স পাওয়া গেল।
বাক্সের ওপর ধুলো জমে ছিল।
অভি বলল,
—এটা আমি আগে কখনো দেখিনি।
রিয়া বলল,
—খুলো।
অভি তালা খুলল।
ভেতরে পুরোনো দলিল, কিছু ছবি আর কয়েকটা চিঠি।
একটা চিঠি হাতে নিয়ে রিয়া বলল,
—এখানে তোমার দাদার নাম লেখা।
অভি চিঠিটা নিল।
চিঠিতে লেখা ছিল তাদের পুরোনো ব্যবসায়িক অংশীদারের নাম—হারুন মিয়া।
অভি বলল,
—এই লোকটাই কি সেই অংশীদার?
রিয়া মাথা নেড়ে বলল,
—সম্ভবত।
তারা আরও কাগজ দেখতে লাগল।
হঠাৎ একটা কাগজের মধ্যে একটা নাম দেখে রিয়া থেমে গেল।
—অভি...
—কী?
—এখানে আমার বাবার স্বাক্ষর আছে।
অভি কাগজটা হাতে নিল।
তার চোখ বড় হয়ে গেল।
—এটা তো অনেক পুরোনো।
—হ্যাঁ।
কাগজে লেখা ছিল, পুরোনো ঋণের একটা অংশ রিয়ার বাবা নিজের নামে নিয়েছিলেন।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—বাবা আমাকে কখনো বলেনি।
অভি বলল,
—হয়তো আমাদের দুজনের পরিবারই অনেক কিছু লুকিয়েছে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একজনের কণ্ঠ শোনা গেল।
—ওগুলো তোমাদের দেখার কথা ছিল না।
অভি আর রিয়া ঘুরে তাকাল।
দরজায় দাঁড়িয়ে সজীব।
অভি অবাক।
—তুই এখানে?
সজীব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—আমি একটা কথা বলতে এসেছিলাম।
—কী কথা?
সজীব ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
—হারুন মিয়া এখনো বেঁচে আছে।
অভি থমকে গেল।
—কী?
—হ্যাঁ।
রিয়া বলল,
—তুমি কীভাবে জানো?
সজীব বলল,
—আমার বাবার কাছ থেকে শুনেছি। তিনি আগে হারুন মিয়ার সঙ্গে কাজ করতেন।
অভি বলল,
—সে কোথায়?
—কেউ জানে না।
—তাহলে তুই কীভাবে জানলি?
সজীব নিচু গলায় বলল,
—কারণ গত কয়েকদিন ধরে একজন লোক তোমাদের বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে।
রিয়া ভয় পেয়ে বলল,
—কে?
—আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু আমার ধারণা, সে হারুন মিয়ার লোক।
অভি জানালার দিকে তাকাল।
বাইরে সত্যিই একটা কালো গাড়ি কিছুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।
অভি দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু গাড়িটা ততক্ষণে চলে গেছে।
রিয়া কিছুটা চিন্তিত হয়ে বলল,
—অভি, আমাদের কি বিপদ হতে পারে?
অভি শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলল,
—আমি জানি না।
—তাহলে?
—তুমি ভয় পেয়ো না। আগে সত্যিটা বের করি।
রিয়া বলল,
—তুমি সবসময় এমনভাবে কথা বলো, যেন সবকিছু তোমার নিয়ন্ত্রণে।
অভি হেসে বলল,
—না। সবকিছু আমার নিয়ন্ত্রণে নেই।
—তাহলে?
অভি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তবে তোমাকে একা হতে দেব না।
রিয়া কিছু বলল না।
পরদিন তারা রিয়ার বাবার কাছে গেল।
রিয়া সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
—বাবা, হারুন মিয়া কে?
তার বাবা যেন হঠাৎ পাথরের মতো স্থির হয়ে গেলেন।
—কে বলেছে এই নাম?
—আমরা পুরোনো কাগজ পেয়েছি।
রিয়ার বাবা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
—তোমরা ওই কাগজ কোথায় পেয়েছ?
অভি বলল,
—আমাদের বাড়িতে।
রিয়ার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—হারুন মিয়া আমাদের ব্যবসার অংশীদার ছিল। পরে সে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে পালিয়ে যায়।
—কিন্তু সে কি বেঁচে আছে?
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর তিনি বললেন,
—হ্যাঁ।
রিয়া অবাক।
—আপনি জানতেন?
—কিছুদিন আগে খবর পেয়েছিলাম।
অভি বলল,
—তাহলে আমাদের বলেননি কেন?
—কারণ আমি চাইনি তোমরা এই পুরোনো সমস্যায় জড়াও।
রিয়া বলল,
—কিন্তু আমরা তো এখন জড়িয়ে গেছি।
তার বাবা মাথা নিচু করলেন।
—আমি জানি।
সেদিন রাতে অভি রিয়াকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেল।
গাড়ির ভেতর দুজনই চুপ।
রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ সে বলল,
—অভি?
—হুম?
—তুমি কি কখনো ভাবো, আমাদের ছোটবেলার সেই ঝগড়াগুলো কত সহজ ছিল?
অভি হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—তখন সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল কে আগে আইসক্রিম খাবে।
—আর এখন?
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—এখন পুরো দুই পরিবারের ইতিহাস আমাদের মাথায়।
অভি বলল,
—তবুও একটা জিনিস আগের মতোই আছে।
—কী?
—তুমি এখনো আমার সঙ্গে ঝগড়া করো।
রিয়া হেসে ফেলল।
—তুমিও।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর অভি বলল,
—রিয়া?
—হুম?
—সবকিছু যদি ঠিক হয়ে যায়...
—তারপর?
—তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?
রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—হয়তো।
অভি বলল,
—শুধু হয়তো?
—হ্যাঁ।
—আমি কিন্তু এবার নিশ্চিত।
রিয়া তাকাল।
—কী নিয়ে?
অভি ধীরে বলল,
—আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
রিয়া কিছু বলল না।
তবে তার মুখে একটা শান্ত হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই তাদের গাড়ির সামনে একটা কালো গাড়ি এসে দাঁড়াল।
অভি দ্রুত ব্রেক করল।
রিয়া চমকে উঠল।
—কী হয়েছে?
অভি বলল,
—কেউ আমাদের পথ আটকে দিয়েছে।
কালো গাড়ির দরজা খুলে একজন মধ্যবয়স্ক লোক বেরিয়ে এল।
সে ধীরে ধীরে তাদের গাড়ির কাছে এসে জানালায় টোকা দিল।
অভি জানালা নামাল না।
লোকটা দূর থেকেই বলল,
—অভি চৌধুরী?
অভি চুপ।
লোকটা বলল,
—তোমার বাবাকে বলো, পুরোনো হিসাব এখনো শেষ হয়নি।
অভি জানালা নামিয়ে বলল,
—আপনি কে?
লোকটা হেসে বলল,
—যার জন্য তোমাদের দুই পরিবার এত বছর ধরে ভয় পেয়ে আছে।
রিয়া আতঙ্কিত হয়ে গেল।
লোকটা আরও বলল,
—বিয়েটা যদি হয়, অনেক কিছু প্রকাশ হয়ে যাবে।
অভি বলল,
—কী প্রকাশ হবে?
লোকটা উত্তর দিল না।
গাড়িতে উঠে দ্রুত চলে গেল।
অভি কিছুক্ষণ তার গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।
রিয়া কাঁপা গলায় বলল,
—ও কি হারুন মিয়ার লোক?
অভি বলল,
—সম্ভবত।
তারপর রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি ঠিক আছ?
রিয়া মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
অভি গাড়ি আবার চালু করল।
কালো গাড়িটা চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার পরও অভি অনেকক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
রিয়া ধীরে বলল,
—অভি, গাড়ি চালাবে?
অভি যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরল।
—হ্যাঁ।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। কিন্তু এবার দুজনের কেউ কোনো কথা বলল না।
কিছুক্ষণ পর রিয়া বলল,
—লোকটা বলল, আমাদের বিয়ে হলে অনেক কিছু প্রকাশ হয়ে যাবে।
—হ্যাঁ।
—তুমি কি কিছু ধারণা করতে পারছ?
—না।
—তোমার বাবাও কি সব জানেন না?
অভি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—মনে হচ্ছে, আমাদের পরিবারের বড়রা নিজেদের মধ্যে অনেক কিছু লুকিয়েছে।
রিয়া চুপ করে গেল।
তারপর বলল,
—তাহলে সত্যিটা আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে।
অভি মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
পরদিন সকালে অভি আবার হাসপাতালে গেল।
মোতালেব চৌধুরী তখন কিছুটা সুস্থ।
অভি তার পাশে বসে বলল,
—বাবা, কাল রাতে একজন লোক আমাদের পথ আটকে ছিল।
মোতালেব চৌধুরীর মুখ সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।
—কী বলেছে?
—বলেছে, পুরোনো হিসাব এখনো শেষ হয়নি। আর বলেছে, আমাদের বিয়ে হলে অনেক কিছু প্রকাশ পাবে।
মোতালেব চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
অভি বলল,
—এবার আর কিছু লুকাবে না। সব বলো।
তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—হারুন মিয়া শুধু ব্যবসায় প্রতারণা করেনি। সে আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাগজও নিয়ে পালিয়েছিল।
—কী কাগজ?
—একটা মূল দলিল।
—কোন দলিল?
—যে দলিল প্রমাণ করতে পারে, পুরোনো সম্পত্তির আসল মালিকানা কার।
অভি অবাক হয়ে বলল,
—তাহলে এতদিন ধরে সম্পত্তির ব্যাপারে যে সমস্যা...
—সব ওই দলিলের কারণে।
রিয়া তখন কেবিনে ঢুকেছিল। সে সব শুনে বলল,
—দলিলটা যদি হারুন মিয়ার কাছে থাকে, তাহলে সে এত বছর পর এখন কেন সামনে আসছে?
মোতালেব চৌধুরী বললেন,
—কারণ সে জানে, তোমাদের বিয়ে হলে পুরোনো চুক্তি কার্যকর হবে।
রিয়া বলল,
—তাহলে সে বিয়েটা আটকাতে চাইছে?
—হয়তো।
অভি বলল,
—কিন্তু কেন?
মোতালেব চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন,
—কারণ বিয়ে হলে দলিলের সত্যিটা প্রকাশ করার সুযোগ তৈরি হবে।
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর অভি আর রিয়া সরাসরি সজীবের কাছে গেল।
সজীব বলল,
—আমি গতকাল থেকে হারুন মিয়া সম্পর্কে খোঁজ করছি।
অভি জিজ্ঞেস করল,
—কিছু পেয়েছিস?
—একটা ঠিকানা পেয়েছি।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—কোথায়?
—পুরোনো একটা গুদামঘর। শহরের বাইরে।
অভি বলল,
—চলো।
সজীব বাধা দিয়ে বলল,
—এখনই যাওয়া ঠিক হবে না।
—কেন?
—কারণ আমরা জানি না ওখানে কে আছে।
অভি বলল,
—তাহলে আগে জায়গাটা দেখে আসব।
রিয়া বলল,
—আমি যাব।
অভি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—না।
—কেন?
—ঝুঁকি থাকতে পারে।
রিয়া গম্ভীর হয়ে বলল,
—এটা শুধু তোমাদের পরিবারের সমস্যা নয়। আমার পরিবারও এর সঙ্গে জড়িত।
অভি কিছু বলল না।
রিয়া বলল,
—তুমি একা গেলে আমি তোমাকে যেতে দেব না।
অভি শেষ পর্যন্ত মাথা নেড়ে বলল,
—ঠিক আছে। তবে সাবধানে থাকব।
বিকেলে তারা তিনজন গুদামঘরের কাছে পৌঁছাল।
জায়গাটা অনেক পুরোনো। চারপাশে ঝোপঝাড়। সামনে বড় লোহার দরজা।
সজীব দূর থেকে দেখে বলল,
—এখানে কেউ আছে কি না বুঝতে পারছি না।
অভি ধীরে দরজার কাছে গেল।
দরজা পুরোপুরি বন্ধ ছিল না।
ভেতরে ঢুকতেই একটা পুরোনো টেবিল দেখা গেল।
টেবিলের ওপর কিছু কাগজ ছড়ানো।
রিয়া একটা কাগজ হাতে নিল।
—এখানে আমাদের দুই পরিবারের নাম আছে।
অভি কাগজটা নিল।
তার চোখ আটকে গেল একটা তারিখে।
—এটা তো আমাদের জন্মের আগের সময়ের।
সজীব বলল,
—মানে পরিকল্পনাটা অনেক পুরোনো।
হঠাৎ পেছনে একটা শব্দ হলো।
তিনজনই ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ ছিল না।
অভি দ্রুত চারদিকে তাকাল।
তারপর টেবিলের নিচে একটা ছোট বাক্স দেখতে পেল।
বাক্স খুলতেই ভেতরে কয়েকটা ছবি।
একটা ছবিতে তাদের দুই পরিবারের দাদা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে।
আর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে একজন অচেনা মানুষ।
রিয়া ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,
—এই লোকটা কে?
সজীব বলল,
—হারুন মিয়া?
অভি মাথা নাড়ল।
—না। এটা হারুন মিয়া নয়।
ছবির পেছনে একটা নাম লেখা ছিল।
“সালেহ উদ্দিন।”
রিয়া অবাক।
—এই নামটা কোথাও শুনেছ?
অভি বলল,
—না।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।
সজীব বলল,
—কেউ আসছে!
তিনজন দ্রুত গুদামের পেছনের দিকে লুকিয়ে পড়ল।
একজন লোক ভেতরে ঢুকল।
তার সঙ্গে আরও দুজন।
প্রথম লোকটি বলল,
—ওরা এখানে এসেছিল।
অন্যজন বলল,
—তাহলে বুঝেছে ব্যাপারটা।
প্রথম লোকটি বলল,
—সালেহ সাহেবকে খবর দাও।
রিয়া অভির দিকে তাকাল।
অভি আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে বলল।
লোকগুলো কিছুক্ষণ পর চলে গেল।
তিনজন ধীরে বেরিয়ে এল।
সজীব বলল,
—তাহলে আসল মানুষটা হারুন মিয়া নয়।
অভি বলল,
—সম্ভবত সালেহ উদ্দিন।
রিয়া বলল,
—কিন্তু সে আমাদের পরিবারের সঙ্গে কীভাবে জড়িত?
সেদিন রাতে তারা রিয়ার বাবার কাছে ছবিটা নিয়ে গেল।
ছবি দেখে রিয়ার বাবা কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেলেন।
অভি বলল,
—আপনি তাকে চেনেন।
রিয়ার বাবা ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,
—হ্যাঁ।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—কে তিনি?
তিনি চুপ করে রইলেন।
অভি বলল,
—এবার সত্যিটা বলতেই হবে।
রিয়ার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—সালেহ উদ্দিন ছিলেন তোমাদের দুই পরিবারের ব্যবসার হিসাবরক্ষক।
অভি বলল,
—তাহলে তিনি এখন আমাদের বিরুদ্ধে কেন?
—কারণ হারুন মিয়া পালিয়ে যাওয়ার আগে যে টাকা সরিয়েছিল, তার হিসাব সালেহই করত।
রিয়া বলল,
—তাহলে?
—সালেহ জানত, আসল টাকা কোথায় গেছে। কিন্তু সে কখনো সত্যিটা বলেনি।
অভি অবাক হয়ে বলল,
—কেন?
—কারণ সে নিজেও ওই টাকার একটা অংশ নিয়েছিল।
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
রিয়া বলল,
—তাহলে এত বছর ধরে যে সম্পত্তির ঝামেলা চলছে...
—তার একটা বড় অংশের পেছনে সালেহর হাত ছিল।
রিয়ার বাবা আরও একটা কথা বললেন।
—কিন্তু একটা বিষয় আমি জানতাম না।
অভি জিজ্ঞেস করল,
—কী?
—সালেহর কাছে এখনো সেই পুরোনো দলিল আছে কি না।
রিয়া বলল,
—আমরা গুদামে কিছু কাগজ পেয়েছি।
তার বাবা কাগজগুলো দেখে বললেন,
—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
অভি বলল,
—তাহলে আমাদের কী করতে হবে?
রিয়ার বাবা বললেন,
—দলিলটা খুঁজে বের করতে হবে।
পরদিন সকালেই তারা আবার অনুসন্ধান শুরু করল।
সজীব পুরোনো ব্যবসার রেকর্ড খুঁজতে লাগল।
অভি বাবার অফিসের পুরোনো ফাইল দেখতে লাগল।
রিয়া তার বাবার কাছ থেকে পুরোনো চিঠিগুলো সংগ্রহ করল।
একটা চিঠিতে তারা একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেল।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“মূল দলিলটি নদীর ধারের পুরোনো বাড়িতে রাখা হয়েছে।”
অভি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল।
—আমাদের সেই পুরোনো বাড়ি!
রিয়া বলল,
—যেখানে আমরা ছোটবেলায় খেলতাম?
—হ্যাঁ।
তারা দ্রুত সেখানে গেল।
বাড়িটা বহু বছর ধরে বন্ধ।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই পুরোনো কাঠের গন্ধ।
অভি বলল,
—চিঠিতে নদীর ধারের বাড়ির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কোথায় খুঁজব?
রিয়া চারদিকে তাকিয়ে বলল,
—ছোটবেলায় দাদু একটা ঘরে কাউকে ঢুকতে দিতেন না।
অভি বলল,
—কোন ঘর?
রিয়া তাকে নিয়ে বাড়ির পেছনের একটা ঘরের সামনে গেল।
দরজাটা তালাবদ্ধ।
অভি পুরোনো তালা খুলে ফেলল।
ঘরের ভেতর একটা বড় কাঠের আলমারি।
আলমারি সরাতেই দেয়ালের মধ্যে একটা ছোট গোপন তাক দেখা গেল।
ভেতরে একটা খাম।
অভি খামটা খুলল।
তার ভেতরে একটা পুরোনো দলিল।
রিয়া কাগজটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল।
কয়েক লাইন পড়েই তার চোখ বড় হয়ে গেল।
—অভি...
—কী?
রিয়া কাঁপা গলায় বলল,
—এখানে লেখা আছে, এই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে আমাদের পরিবারের যে ধারণা ছিল, সেটা ভুল।
অভি কাগজটা নিল।
তার চোখও বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
দলিলে লেখা ছিল—
সম্পত্তির একটা বড় অংশ আসলে কোনো পরিবারের নয়।
অভি বলল,
—তাহলে কার?
রিয়া নিচের নামটা পড়ল।
তারপর যেন কথা হারিয়ে ফেলল।
অভি বলল,
—রিয়া, বলো।
রিয়া ধীরে মাথা তুলল।
—সালেহ উদ্দিনের।
দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
হঠাৎ বাইরে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
অভি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।
—কে?
কোনো উত্তর নেই।
রিয়া অভির হাত শক্ত করে ধরল।
বাইরে থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
—দলিলটা পেয়ে গেছ, তাই না?
অভি দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কে আপনি?
কণ্ঠটা আবার শোনা গেল—
—যে মানুষটার কাছ থেকে তোমরা এই গল্প শুরু হয়েছে ভাবছ, আসল গল্প তারও আগে থেকে।
রিয়া ফিসফিস করে বলল,
—সালেহ?
বাইরে থেকে হাসির শব্দ এল।
—সালেহ না। আমি সেই মানুষ, যে জানে তোমাদের দুই পরিবারের সবচেয়ে বড় গোপন কথা।
অভি রিয়ার হাত আরও শক্ত করে ধরল।
পুরোনো বাড়ির ঘরটা তখন অন্ধকার।
বাইরে থেকে অচেনা লোকটির কণ্ঠ ভেসে আসছে।
—দলিলটা আমার হাতে দিয়ে দাও। তাহলে তোমাদের কোনো সমস্যা হবে না।
অভি রিয়ার দিকে তাকাল।
রিয়া ধীরে মাথা নাড়ল।
দলিলটা তার হাতে শক্ত করে ধরা।
অভি দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি আগে বলুন, আপনি কে?
বাইরে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর লোকটি বলল,
—আমার নাম সালেহ উদ্দিন।
রিয়া চমকে উঠল।
অভি বলল,
—আপনি তাহলে এতদিন কোথায় ছিলেন?
—যেখানে তোমাদের পরিবার আমাকে খুঁজে পাবে না।
—আপনি আমাদের বিয়ের বিরুদ্ধে কেন?
সালেহ হেসে বলল,
—আমি তোমাদের বিয়ের বিরুদ্ধে নই। আমি চাই না তোমাদের বিয়ের নামে সত্যিটা চাপা পড়ে যাক।
অভি বলল,
—কোন সত্যি?
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে গেল।
মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে।
তার মুখে বয়সের ছাপ, চোখে কঠিন দৃষ্টি।
সে ঘরে ঢুকে বলল,
—তোমরা যেটাকে পারিবারিক সম্পত্তির ঝামেলা ভাবছ, সেটা আসলে একটা পুরোনো প্রতারণার ফল।
রিয়া বলল,
—আপনি কী করেছিলেন?
সালেহ ধীরে বলল,
—আমি একা কিছু করিনি।
অভি বলল,
—তাহলে কার সঙ্গে?
সালেহ উত্তর দিল,
—হারুন মিয়ার সঙ্গে।
অভি অবাক।
—আপনারা দুজন মিলে টাকা সরিয়েছিলেন?
সালেহ মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
রিয়া বলল,
—তাহলে আমার বাবা আর তোমার বাবা কেন দায়ী হলো?
সালেহ বলল,
—কারণ হারুন মিয়া সব কাগজ এমনভাবে তৈরি করেছিল, যাতে সন্দেহটা তাদের ওপর পড়ে।
অভি রাগে বলল,
—আর আপনি এত বছর চুপ ছিলেন?
—ভয় পেয়েছিলাম।
—কিসের?
—হারুন মিয়ার।
রিয়া বলল,
—হারুন মিয়া এখন কোথায়?
সালেহ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—মারা গেছে।
অভি আর রিয়া দুজনেই অবাক।
—কী?
—বহু বছর আগে।
অভি বলল,
—তাহলে এতদিন আমরা যাকে ভয় পাচ্ছিলাম?
সালেহ বলল,
—হারুন মিয়ার নাম ব্যবহার করে অন্য একজন কাজ করছে।
—কে?
সালেহ ধীরে বলল,
—তার ছেলে, রাকিব।
রিয়া বলল,
—রাকিব কেন আমাদের পেছনে লেগেছে?
সালেহ বলল,
—কারণ তার বিশ্বাস, তার বাবার হারানো টাকা তোমাদের পরিবার নিয়েছে।
অভি বলল,
—কিন্তু আমরা তো কিছুই জানি না।
—সে জানে না।
রিয়া বলল,
—তাহলে আমাদের বিয়ে হলে কী হবে?
সালেহ দলিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তখন প্রমাণ হবে যে সম্পত্তির একটা অংশ তোমাদের পরিবারের নয়। আর রাকিব সেই সুযোগে সব সম্পত্তির ওপর দাবি করবে।
অভি বলল,
—কিন্তু দলিলে তো আপনার নাম আছে।
সালেহ মাথা নিচু করল।
—হ্যাঁ। কিন্তু আমি ওই সম্পত্তি চাই না।
রিয়া অবাক।
—তাহলে?
—আমি শুধু চাই সত্যিটা প্রকাশ হোক।
অভি বলল,
—আপনি এতদিন পরে কেন সত্যি বলতে এলেন?
সালেহ ধীরে বলল,
—কারণ আমি অসুস্থ। আমার হাতে আর বেশি সময় নেই।
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আপনি কি আমাদের সাহায্য করবেন?
সালেহ মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।
সালেহ জানালার দিকে তাকাল।
তার মুখের ভাব বদলে গেল।
—ওরা এসে গেছে।
অভি বলল,
—কারা?
—রাকিবের লোক।
সালেহ বলল,
—তোমরা পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে যাও।
অভি বলল,
—আপনি?
—আমি থাকব।
রিয়া বলল,
—না। আপনাকেও সঙ্গে যেতে হবে।
সালেহ মৃদু হেসে বলল,
—আমার জন্য তোমাদের বিপদে পড়তে হবে না।
অভি বলল,
—আপনি এতদিন সত্যিটা লুকিয়েছেন। এখন আর আপনাকে একা রেখে যাব না।
তিনজন দ্রুত পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল।
বাইরে অন্ধকার।
কিছুদূর গিয়ে তারা একটা পুরোনো গাড়ির কাছে পৌঁছাল।
সালেহ বলল,
—এই গাড়িটা নিয়ে তোমরা শহরে ফিরে যাও।
অভি বলল,
—আপনি?
—আমি অন্য পথে যাব।
রিয়া বলল,
—আমরা আবার দেখা করব?
সালেহ বলল,
—যদি তোমরা সত্যিটা সবাইকে জানাতে পারো, তাহলে আমার কাজ শেষ।
শহরে ফিরে অভি সরাসরি বাবার কাছে গেল।
মোতালেব চৌধুরী তখনও হাসপাতালে।
অভি সবকিছু খুলে বলল।
হারুন মিয়ার প্রতারণা, সালেহর কথা, রাকিবের নাম—সব।
মোতালেব চৌধুরী কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—আমি ভয় করছিলাম, একদিন না একদিন সত্যিটা বের হবেই।
অভি বলল,
—তুমি আগে থেকেই জানতেও?
—সবটা না।
—কী জানতেন?
—আমি জানতাম হারুন মিয়া আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছিল। কিন্তু আমি জানতাম না, সালেহ এতদিন পরে ফিরে আসবে।
রিয়া বলল,
—আর রাকিব?
মোতালেব চৌধুরী মাথা নেড়ে বললেন,
—তার কথা আমি শুনেছি।
অভি বলল,
—তাহলে আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা?
মোতালেব চৌধুরী ধীরে বললেন,
—বিয়েটা আসলে সম্পত্তির সমাধান নয়। এটা শুধু পুরোনো চুক্তির একটা অংশ।
রিয়া বলল,
—তাহলে আমরা বিয়ে না করলেও সত্যিটা প্রকাশ করা সম্ভব?
—হ্যাঁ।
অভি যেন স্বস্তি পেল।
—তাহলে আর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
তার বাবা মৃদু হেসে বললেন,
—না।
অভি রিয়ার দিকে তাকাল।
রিয়ার চোখেও স্বস্তি।
কিন্তু সমস্যা তখনও শেষ হয়নি।
পরদিন সকালে রিয়ার বাবা ফোন পেলেন।
ওপাশ থেকে রাকিবের কণ্ঠ।
—আপনার মেয়ের বিয়ে থামিয়ে দিন।
রিয়ার বাবা বললেন,
—তুমি কে?
—আপনি আমাকে চেনেন না। কিন্তু আপনার পরিবারের পুরোনো হিসাব আমি জানি।
—তুমি কী চাও?
—দলিল।
—আমাদের কাছে নেই।
—মিথ্যা বলবেন না।
—আমরা কোনো অন্যায় করিনি।
রাকিব ঠান্ডা গলায় বলল,
—আপনার মেয়ে আর অভি যদি বিয়ে করে, তাহলে আপনাদের সব সত্যি প্রকাশ পাবে।
ফোন কেটে গেল।
রিয়ার বাবা সঙ্গে সঙ্গে অভিকে ফোন করলেন।
অভি সব শুনে রিয়ার কাছে গেল।
—রিয়া, তোমার বাবাকে হুমকি দিয়েছে।
রিয়া চিন্তিত হয়ে বলল,
—তাহলে কী করব?
—আমরা পুলিশে যাব।
রিয়া বলল,
—কিন্তু কোনো প্রমাণ?
—দলিল আছে। সালেহ সাক্ষী।
—সালেহ কোথায়?
অভি থেমে গেল।
তারা সালেহকে ফোন করল।
ফোন বন্ধ।
আরও কয়েকবার চেষ্টা করেও কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।
সজীব বলল,
—হয়তো ওকে রাকিবের লোকেরা খুঁজে পেয়েছে।
অভি বলল,
—আমাদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সেদিন রাতে রিয়া ঘুমাতে পারছিল না।
অভি তাকে ফোন করল।
—ঘুমাওনি?
—না।
—ভয় লাগছে?
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—হ্যাঁ।
অভি বলল,
—ভয় পেও না। সব ঠিক হবে।
রিয়া মৃদু গলায় বলল,
—অভি?
—হুম?
—যদি সবকিছু ঠিক না হয়?
—তবুও আমি থাকব।
রিয়া চুপ করে রইল।
অভি বলল,
—তুমি কি এখনো বিয়েটা নিয়ে দ্বিধায় আছ?
রিয়া অনেকক্ষণ পর বলল,
—না।
অভি অবাক।
—না মানে?
রিয়া ধীরে বলল,
—আমি এখন আর বিয়েটা নিয়ে ভয় পাই না।
অভির মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—তাহলে?
—আমি শুধু চাই, আমরা নিজেদের সিদ্ধান্তে বিয়ে করি। কারও চাপ, সম্পত্তি বা কোনো পুরোনো চুক্তির জন্য নয়।
অভি বলল,
—আমিও সেটাই চাই।
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে বিয়েটা হবে।
অভি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
অভির কণ্ঠে আনন্দ ফুটে উঠল।
—আমি কালই তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলব।
পরদিন দুই পরিবার একসঙ্গে বসে।
অভি দাঁড়িয়ে বলল,
—আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
সবাই চুপ।
অভি রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমরা বিয়ে করব।
রিয়ার বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
মোতালেব চৌধুরী চোখ মুছলেন।
কিন্তু অভি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—তবে একটা শর্ত আছে।
সবাই তাকাল।
—এই বিয়ের সঙ্গে কোনো সম্পত্তি, ব্যবসা বা পুরোনো চুক্তির সম্পর্ক থাকবে না।
রিয়ার বাবা বললেন,
—আমি রাজি।
মোতালেব চৌধুরীও মাথা নেড়ে বললেন,
—আমিও।
রিয়া অভির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
সবকিছু যেন অবশেষে ঠিক পথে ফিরছে।
ঠিক তখনই রিয়ার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
সে ফোন ধরল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর রাকিবের কণ্ঠ—
—বিয়ে করতে পারো।
রিয়া চমকে গেল।
—কী?
—আমি বিয়েটা আটকাব না।
—তাহলে?
—কারণ বিয়ের দিনই আমি সবাইকে এমন একটা সত্যি জানাব, যেটা জানার পর তোমাদের দুই পরিবার আর কোনোদিন একসঙ্গে দাঁড়াতে পারবে না।
রিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—কী সত্যি?
রাকিব হেসে বলল,
—অভি আর তোমার জন্মের আগের একটা ঘটনা।
ফোন কেটে গেল।
রিয়া ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
অভি তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কী হয়েছে?
রিয়া কিছু বলতে পারল না।
বিয়ের আর মাত্র তিন দিন বাকি।
চৌধুরী বাড়ি আর রিয়ার বাড়ি—দুই জায়গাতেই ব্যস্ততা। আত্মীয়স্বজন আসতে শুরু করেছে, বাড়ি সাজানো হচ্ছে, সবার মুখে আনন্দ।
কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও অভি আর রিয়ার মনে একটা অস্বস্তি রয়ে গেছে।
রাকিবের শেষ কথাটা বারবার মনে পড়ছে—
“বিয়ের দিনই এমন একটা সত্যি জানাব, যেটা জানার পর তোমাদের দুই পরিবার আর কোনোদিন একসঙ্গে দাঁড়াতে পারবে না।”
অভি বারবার রিয়াকে বলছিল,
—তুমি ভয় পেয়ো না। যা-ই হোক, আমরা একসঙ্গে সামলাব।
রিয়া বলত,
—আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।
কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছিল—
অভি আর রিয়ার জন্মের আগের এমন কী ঘটনা থাকতে পারে, যা তাদের পুরো সম্পর্ক বদলে দিতে পারে?
বিয়ের আগের রাতে হঠাৎ সজীব ছুটে এল।
—অভি!
অভি ঘর থেকে বেরিয়ে বলল,
—কী হয়েছে?
সজীব একটা ফাইল এগিয়ে দিল।
—আমি রাকিবের ব্যাপারে কিছু খুঁজে পেয়েছি।
অভি ফাইল খুলে দেখল।
ভেতরে পুরোনো কিছু কাগজ।
একটা কাগজে রাকিবের বাবার নাম।
আর তার নিচে একটা পুরোনো ছবি।
ছবিতে অভির বাবা, রিয়ার বাবা, হারুন মিয়া আর সালেহ উদ্দিন—চারজন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে।
অভি অবাক হয়ে বলল,
—এটা তো আমি আগে দেখেছি।
সজীব বলল,
—কিন্তু পেছনের লেখাটা দেখ।
অভি ছবিটা উল্টে দিল।
পেছনে লেখা—
“১৯৯৮—চুক্তির দিন।”
অভি থমকে গেল।
—এই বছর তো আমাদের জন্মের আগের।
—হ্যাঁ।
আরেকটা কাগজে লেখা ছিল—
“যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বিয়ে হয়, তাহলে পুরোনো বিরোধ শেষ হবে। কিন্তু যদি বিয়ে না হয়, তাহলে পুরো সম্পত্তির অধিকার তৃতীয় পক্ষের হাতে যাবে।”
অভি বলল,
—তৃতীয় পক্ষ মানে?
সজীব বলল,
—সম্ভবত রাকিবের পরিবার।
অভি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—কিন্তু রাকিব কেন এত বছর পর এই সম্পত্তি চাইছে?
সজীব বলল,
—কারণ তার বাবা হারুন মিয়া মারা যাওয়ার আগে তাকে বলেছিল, এই সম্পত্তি তাদের পরিবারেরই ছিল।
অভি বলল,
—কিন্তু সেটা তো সত্যি নয়।
সজীব মাথা নেড়ে বলল,
—হয়তো না।
ঠিক তখন অভির ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
সে ফোন ধরল।
রাকিব বলল,
—কাগজ পেয়েছ?
অভি গম্ভীর হয়ে বলল,
—তুমি কী চাও?
—তোমাদের বিয়ে বন্ধ করো।
—না করলে?
—তাহলে কাল বিয়ের মঞ্চে সব সত্যি বলব।
অভি বলল,
—কী সত্যি?
রাকিব বলল,
—তোমাদের দুই পরিবারের বড়রা তোমাদের কাছে একটা বিষয় লুকিয়েছে।
—কী?
—সেটা কাল সবাই জানবে।
ফোন কেটে গেল।
পরদিন সকাল।
বিয়ের দিন।
রিয়া সাজঘরে বসে ছিল।
তার চারপাশে আত্মীয়স্বজন, বান্ধবী, কাজিন—সবাই ব্যস্ত।
কিন্তু রিয়া আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু অভির কথা ভাবছিল।
তার মা এসে পাশে বসে বললেন,
—কী ভাবছিস?
রিয়া মায়ের হাত ধরে বলল,
—মা, তুমি কি আমার কাছে কোনো কথা লুকিয়েছ?
মা অবাক।
—কী কথা?
—আমাদের বিয়ের ব্যাপারে।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—না।
রিয়া মায়ের চোখের দিকে তাকাল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
রিয়া আর কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর তার বাবা ঘরে এলেন।
রিয়া বলল,
—বাবা, আজ যদি কোনো পুরোনো সত্যি সামনে আসে, তুমি কি আমাকে সব বলবে?
তার বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আজ আর কিছু লুকাব না।
রিয়া মাথা নেড়ে বলল,
—ঠিক আছে।
অন্যদিকে অভিও বিয়ের পোশাক পরে প্রস্তুত।
মোতালেব চৌধুরী ছেলের ঘরে এসে দাঁড়ালেন।
অভি বলল,
—বাবা, আজ সব সত্যি বলবে তো?
—হ্যাঁ।
—যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে?
মোতালেব চৌধুরী ধীরে বললেন,
—ভুল হয়েছিল।
অভি অবাক।
—কী ভুল?
তার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—তোর জন্মের আগে একটা বড় ভুল হয়েছিল।
অভি বলল,
—কী?
মোতালেব চৌধুরী উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে ডাক এল—
—বর প্রস্তুত?
তিনি বললেন,
—আজ সব জানতে পারবি।
বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হলো।
অভি মঞ্চে বসে রিয়ার অপেক্ষা করছে।
কিছুক্ষণ পর রিয়া এসে পাশে বসল।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
অভি মৃদু হেসে বলল,
—ভয় লাগছে?
রিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,
—না।
—সত্যি?
—কারণ তুমি পাশে আছ।
অভি তার দিকে তাকিয়ে রইল।
চারপাশে আনন্দের পরিবেশ।
কিন্তু হঠাৎ মাইক্রোফোনে একটা শব্দ হলো।
সবাই তাকাল।
মঞ্চের সামনে রাকিব দাঁড়িয়ে।
তার হাতে একটা ফাইল।
রিয়া চমকে উঠল।
অভি উঠে দাঁড়াল।
—তুমি এখানে কী করছ?
রাকিব বলল,
—আজ সত্যিটা সবাইকে জানাতে এসেছি।
চারপাশে ফিসফাস শুরু হলো।
রাকিব একটা কাগজ বের করল।
—এই বিয়ের পেছনে যে পুরোনো চুক্তি আছে, সেটা সবাই জানে।
মোতালেব চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন।
—রাকিব, এখান থেকে চলে যাও।
রাকিব হেসে বলল,
—আজ আর কেউ আমাকে থামাতে পারবে না।
সে সবার সামনে একটা পুরোনো ছবি তুলে ধরল।
—এই ছবিতে যারা আছে, তারা সবাই জানত সত্যিটা।
রিয়ার বাবা মাথা নিচু করলেন।
অভি বলল,
—কী সত্যি?
রাকিব বলল,
—১৯৯৮ সালে তোমাদের বাবারা একটা ব্যবসায়িক চুক্তি করেছিলেন। সেই চুক্তিতে আমার বাবারও অংশ ছিল।
রিয়া বলল,
—তাহলে?
—কিন্তু পরে তোমাদের দুই পরিবার আমার বাবাকে বাদ দিয়ে ব্যবসার সব সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।
অভি বলল,
—এটা মিথ্যা।
রাকিব বলল,
—প্রমাণ আছে।
সে একটা কাগজ এগিয়ে দিল।
রিয়ার বাবা কাগজটা দেখে বললেন,
—এই স্বাক্ষরটা আমার নয়।
রাকিব থমকে গেল।
—কী?
রিয়ার বাবা বললেন,
—এটা নকল।
মোতালেব চৌধুরীও কাগজটা হাতে নিয়ে বললেন,
—আমার স্বাক্ষরও নকল।
সবাই অবাক।
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
ঠিক তখন পেছন থেকে একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন।
সালেহ উদ্দিন।
সবাই তাকে দেখে অবাক।
রাকিব পিছিয়ে গেল।
সালেহ বললেন,
—আমি সত্যিটা জানি।
রাকিব বলল,
—আপনি এখানে কেন?
—কারণ এত বছর পর সত্যিটা বলার সময় এসেছে।
সালেহ সবার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
—হারুন মিয়া একা প্রতারণা করেনি। কিন্তু অভির বাবা আর রিয়ার বাবা নির্দোষ ছিল।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—তাহলে আসল দোষী কে?
সালেহ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—আমি।
সবাই স্তব্ধ।
সালেহ বললেন,
—আমি হিসাবরক্ষক ছিলাম। হারুন মিয়ার সঙ্গে মিলে কিছু টাকা সরিয়েছিলাম। পরে ভয় পেয়ে সবকিছু তার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলাম।
রাকিব চিৎকার করে বলল,
—আপনি মিথ্যা বলছেন!
সালেহ বললেন,
—না। আমার কাছে সব প্রমাণ আছে।
তিনি আরেকটা ফাইল বের করলেন।
—হারুন মিয়া মারা যাওয়ার আগে আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিল। সেখানে সব সত্যি লেখা।
সালেহ চিঠিটা অভির বাবার হাতে দিলেন।
মোতালেব চৌধুরী পড়ে চোখ বন্ধ করলেন।
—তাহলে এত বছর আমরা ভুল মানুষকে দোষ দিয়েছি।
সালেহ মাথা নেড়ে বললেন,
—হ্যাঁ।
রাকিব ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।
—আমার বাবা তাহলে...
সালেহ বললেন,
—তোমার বাবা ভুল করেছিল। কিন্তু পুরো সত্যিটা তোমাকে বলেনি।
রাকিব চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।
পুরোনো সম্পত্তি নিয়ে যে বিরোধ ছিল, তার বেশিরভাগই ভুল হিসাব আর মিথ্যা কাগজের কারণে তৈরি হয়েছিল।
কোনো বিয়ের শর্তে কারও জীবন বাঁধা ছিল না।
দুই পরিবার চাইলে সেই পুরোনো চুক্তি বাতিল করতে পারে।
মোতালেব চৌধুরী সবার সামনে বললেন,
—আজ থেকে এই পুরোনো চুক্তির কোনো মূল্য নেই।
রিয়ার বাবা বললেন,
—আমরাও একই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।
রিয়া অভির দিকে তাকাল।
অভি মৃদু হেসে বলল,
—এবার?
রিয়া বলল,
—এবার কেউ আমাদের বিয়েতে কোনো শর্ত দিতে পারবে না।
অভি বলল,
—তাহলে সত্যিই আমাকে বিয়ে করবে?
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
অভি বলল,
—কেন?
রিয়া বলল,
—কারণ ছোটবেলার সবচেয়ে বিরক্তিকর ছেলেটা কখন যে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে গেছে, আমি নিজেও বুঝিনি।
অভি হেসে বলল,
—তুমি এখনো আমাকে বিরক্তিকর বলছ?
—হ্যাঁ।
—তাহলে কিছুই বদলায়নি।
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—অনেক কিছু বদলেছে।
দুই পরিবারের বড়রা এবার সত্যিকারের আনন্দ নিয়ে তাদের বিয়ের আয়োজন শেষ করলেন।
কোনো সম্পত্তির হিসাব নেই।
কোনো পুরোনো চুক্তি নেই।
কোনো জোর নেই।
শুধু দুইজন মানুষের নিজেদের সিদ্ধান্ত।
বিয়ের পর রিয়া যখন নতুন বাড়িতে এল, অভি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
রিয়া তাকে দেখে বলল,
—একটা কথা বলব?
—বলো।
—আমাদের ছোটবেলার সেই ঝগড়াগুলো কিন্তু শেষ হয়নি।
অভি হেসে বলল,
—আমি জানি।
—আর আমি তোমাকে সারাজীবন বিরক্ত করব।
—সেটাও জানি।
রিয়া মুচকি হেসে বলল,
—তাহলে ঠিক আছে।
অভি বলল,
—একটা কথা আমারও আছে।
—কী?
—তুমি ছোটবেলায় বলেছিলে, তুমি এমন একজনকে বিয়ে করবে যে তোমার সব কথা শুনবে।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—তুমি এখনো সেটা মনে রেখেছ?
অভি হেসে বলল,
—সব মনে আছে।
রিয়া ধীরে বলল,
—তাহলে আজ থেকে সত্যিই শুনবে?
—চেষ্টা করব।
—শুধু চেষ্টা?
—ঠিক আছে। সারাজীবন শুনব।
রিয়া মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
....