ভুলে যাওয়া সেই প্রতিশ্রুতি

সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা। মাঝে মাঝে হালকা বাতাস বইছে। শহরের রাস্তায় মানুষের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। কেউ অফিসে যাচ্ছে, কেউ স্কুল-কলেজে, আবার কেউ নিজের কাজে ছুটছে।

এই ব্যস্ত শহরের এক প্রান্তে একটি পুরোনো দোতলা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল নাহিদ।

বয়স চব্বিশের কাছাকাছি। চেহারায় সবসময় একটা হাসি লেগেই থাকে। খুব বড়লোক পরিবারের ছেলে নয়, তবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যায়ের সামনে চুপ করে থাকা তার স্বভাবে নেই। কারও বিপদ দেখলে নিজের কথা না ভেবেই এগিয়ে যায়।

আজ তার জীবনের নতুন একটা দিন।

আজ থেকে সে শহরের একটি কলেজে পড়াশোনা শুরু করবে।

মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,

—নাহিদ, নাশতা করে যা। প্রথম দিনেই খালি পেটে কলেজে গেলে চলবে?

নাহিদ হেসে বলল,

—মা, আমি কি আর ছোট আছি? কলেজে যাচ্ছি, যুদ্ধ করতে না।

—তুই ছোট না, সেটা জানি। কিন্তু তোর মাথায় যে বুদ্ধি কম, সেটা নিয়েই আমার চিন্তা।

নাহিদ ভান করে রাগ দেখাল।

—এই তো! নিজের ছেলেকেই কেউ এমন কথা বলে?

মা হেসে ফেললেন।

—যা, আগে খেয়ে নে।

নাহিদ নাশতা শেষ করে ব্যাগ কাঁধে তুলে বেরিয়ে পড়ল।

কলেজের সামনে পৌঁছাতেই তার চোখে পড়ল বিশাল গেট। গেটের ভেতরে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী। কেউ নতুন বন্ধু বানাচ্ছে, কেউ ক্লাসরুম খুঁজছে, আবার কেউ দল বেঁধে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।

নাহিদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখল।

—বাহ! নতুন জীবন শুরু তাহলে।

সে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

ঠিক তখনই কলেজের অন্য প্রান্তে একটি রিকশা এসে থামল।

রিকশা থেকে নামল শান্তা।

শান্তা দেখতে খুব সাধারণ হলেও তার মধ্যে আলাদা একটা আকর্ষণ ছিল। লম্বা চুল, শান্ত মুখ আর চোখে সবসময় আত্মবিশ্বাসের ছাপ। সে খুব সহজে কারও সঙ্গে মিশে না। নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সে বেশ জেদি।

রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে শান্তা ব্যাগটা কাঁধে তুলে কলেজের গেটের দিকে এগিয়ে গেল।

তার সঙ্গে ছিল বান্ধবী মিতু।

মিতু বলল,

—শান্তা, আজ কিন্তু আমাদের নতুন জীবন শুরু।

শান্তা হেসে বলল,

—নতুন জীবন না। নতুন কলেজ।

—তুই সবকিছুতেই এত হিসাব করিস কেন?

—কারণ তুই বেশি স্বপ্ন দেখিস।

দুজন হাসতে হাসতে ভেতরে ঢুকে গেল।

কিন্তু তারা কেউই জানত না, এই কলেজেই তাদের জীবনের সবচেয়ে পুরোনো একটা অধ্যায় আবার ফিরে আসতে চলেছে।

প্রথম ক্লাস শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে নাহিদ ক্লাসরুমে ঢুকল। বেশিরভাগ বেঞ্চ তখন প্রায় ভরে গেছে।

সে পেছনের দিকে একটা খালি জায়গা দেখে সেখানে গিয়ে বসল।

কিছুক্ষণ পর শিক্ষক ক্লাসে ঢুকলেন।

—সবাই চুপ করো। আজ তোমাদের প্রথম দিন। আশা করি সবাই নিয়ম মেনে চলবে।

ক্লাস শুরু হলো।

নাহিদ মন দিয়ে শুনছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পাশের কয়েকজন ছাত্র নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করল। তাদের মধ্যে একজন ইচ্ছে করেই সামনে বসা এক ছাত্রীকে বিরক্ত করছিল।

নাহিদ বিষয়টা লক্ষ্য করল।

সে প্রথমে চুপ করে থাকল। কিন্তু ছেলেটা যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল, নাহিদ উঠে দাঁড়াল।

—ভাই, একটু চুপ করবেন?

ছেলেটা অবাক হয়ে তাকাল।

—তুই কে?

—আমি কেউ না। তবে ক্লাসে পড়াশোনা করতে এসেছি। আপনারও একই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

ছেলেটা হেসে বলল,

—অনেক জ্ঞান দেখাচ্ছিস!

নাহিদ শান্ত গলায় বলল,

—জ্ঞান দেখাচ্ছি না। শুধু বলছি, অন্যকে বিরক্ত না করলেই ভালো হয়।

শিক্ষকও তখন বিষয়টি লক্ষ্য করলেন।

—ওখানে কী হচ্ছে?

সবাই চুপ হয়ে গেল।

নাহিদ বসে পড়ল।

কিন্তু ক্লাসরুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা শান্তা পুরো ঘটনাটা দেখেছিল।

মিতু ফিসফিস করে বলল,

—ছেলেটা কিন্তু বেশ সাহসী।

শান্তা তাকিয়ে বলল,

—সাহসী না বোকা, সেটা পরে বোঝা যাবে।

—তোর ভালো লেগেছে নাকি?

শান্তা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—একদম না।

কিন্তু কথাটা বলার সময় তার চোখ একবার নাহিদের দিকে চলে গেল।

নাহিদ তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

দুপুরে ক্লাস শেষ হওয়ার পর সবাই বাইরে বেরিয়ে এলো।

শান্তা আর মিতু কলেজের করিডোর দিয়ে হাঁটছিল।

হঠাৎ সামনে থেকে নাহিদ দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে আসছিল। তার হাতে কয়েকটা বই।

ঠিক তখনই একজন ছাত্র দৌড়ে এসে নাহিদের সঙ্গে ধাক্কা খেল।

নাহিদের হাত থেকে বইগুলো পড়ে গেল।

—সরি ভাই!

ছেলেটা বই তুলে দিয়ে চলে গেল।

নাহিদ নিচে বসে বইগুলো তুলছিল।

শান্তা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি বই তার পায়ের কাছে এসে পড়ল।

সে বইটা তুলে নিল।

বইয়ের প্রথম পাতায় নাম লেখা—

নাহিদ রহমান।

শান্তা নামটা পড়তেই হঠাৎ থেমে গেল।

তার চোখের সামনে যেন বহু বছরের পুরোনো একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।

একটা ছোট্ট ছেলে।

ধুলোমাখা উঠান।

একটা মেয়ে হাতে কাগজের পাখি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ছেলেটা তাকে বলছে,

—তুই কাঁদিস না, শান্তি। আমি বড় হয়ে তোকে সবসময় রক্ষা করব।

মেয়েটা হেসে বলছে,

—তুই কি সত্যিই আমাকে মনে রাখবি?

ছেলেটা বলছে,

—কখনো ভুলব না।

হঠাৎ শান্তা বাস্তবে ফিরে এল।

তার হাত থেকে বইটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

নাহিদ সামনে এসে বলল,

—বইটা আমার।

শান্তা চমকে তাকাল।

—ওহ... হ্যাঁ।

সে বইটা এগিয়ে দিল।

নাহিদ বই নিয়ে বলল,

—ধন্যবাদ।

শান্তা কিছু না বলে চলে যেতে চাইল।

কিন্তু নাহিদ হঠাৎ বলল,

—এক মিনিট।

শান্তা ফিরে তাকাল।

—জি?

নাহিদ কয়েক সেকেন্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

কেন যেন মেয়েটাকে তার অদ্ভুত পরিচিত মনে হচ্ছে।

—আপনাকে কি আমি আগে কোথাও দেখেছি?

শান্তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

তবু সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,

—হয়তো দেখেছেন। শহরে মানুষ কম নাকি?

নাহিদ হেসে ফেলল।

—তা ঠিক।

শান্তা চলে গেল।

কিছুদূর গিয়ে সে একবার পেছনে তাকাল।

নাহিদ তখনও তার দিকে তাকিয়ে আছে।

শান্তা দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল।

মিতু কাছে এসে বলল,

—কী হলো?

—কিছু না।

—তুই ওর দিকে এমন করে তাকাচ্ছিলি কেন?

শান্তা ধীরে বলল,

—জানি না।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—মিতু, নাহিদ নামটা আমার খুব পরিচিত লাগছে।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে শান্তা নিজের ঘরে ঢুকল।

তার বাবা বসার ঘরে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।

—আজ কলেজ কেমন হলো?

শান্তা জুতা খুলতে খুলতে বলল,

—ভালো।

—কোনো সমস্যা হয়নি তো?

—না।

বাবা আবার বললেন,

—নতুন বন্ধু হয়েছে?

শান্তা হেসে বলল,

—একজন হয়েছে।

তারপর নিজের ঘরে চলে গেল।

ঘরে ঢুকে ব্যাগ খুলতেই তার চোখে পড়ল ছোট্ট একটা পুরোনো বাক্স।

শান্তা বাক্সটা বের করল।

অনেকদিন ধরে সে এটা খোলেনি।

ধীরে ধীরে ঢাকনা খুলতেই ভেতরে পাওয়া গেল পুরোনো কিছু ছবি আর কাগজের একটি পাখি।

ছবিগুলোর একটিতে ছিল ছোট্ট শান্তা আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলে।

ছেলেটার নাম ছিল নাহিদ।

শান্তা ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তার চোখে বিস্ময়।

—তাহলে... এত বছর পর তুই সত্যিই ফিরে এসেছিস, নাহিদ?

অন্যদিকে নাহিদও নিজের ঘরে বসে আজকের দিনের কথা ভাবছিল।

তার মাথায় বারবার সেই মেয়েটার মুখ ভেসে উঠছিল।

শান্তা।

নামটা শুনলেই কেন যেন তার শৈশবের একটা অসম্পূর্ণ স্মৃতি মনে পড়ছে।

সে জানে না, সেই ছোট্ট মেয়েটি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল।

সে শুধু জানে, বহু বছর আগে তার জীবনে একজন ছিল, যাকে সে কথা দিয়েছিল—

কখনো ভুলবে না।

আর আজ, সেই মানুষটাই হয়তো তার সামনে ফিরে এসেছে।

কিন্তু নাহিদ এখনো জানে না, শান্তাই তার সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবের সঙ্গী।

আর শান্তা জানে সত্যিটা।

সে শুধু অপেক্ষা করছে—

নাহিদ কবে নিজে থেকে তাকে চিনতে পারবে।

পরদিন সকাল।

ঘুম থেকে উঠেই নাহিদের মাথায় আগের দিনের সেই মেয়েটার কথা ঘুরছিল। শান্তা।

মেয়েটার চোখ, কথা বলার ধরন—সবকিছুতেই কেমন যেন পরিচিত একটা অনুভূতি ছিল। কিন্তু কোথায় দেখেছে, সেটা কিছুতেই মনে করতে পারছিল না।

মা নাশতার টেবিলে বসে বললেন,

—কী হয়েছে তোর? আজ এত চুপচাপ কেন?

নাহিদ চমকে উঠে বলল,

—কিছু হয়নি।

—কিছু হয়নি হলে সকাল থেকে একই জায়গায় তাকিয়ে আছিস কেন?

নাহিদ একটু হেসে বলল,

—নতুন কলেজ। তাই হয়তো একটু ভাবছি।

মা মাথা নেড়ে বললেন,

—পড়াশোনায় মন দিস। কলেজে গিয়ে অযথা ঝামেলায় জড়াস না।

নাহিদ হেসে বলল,

—আমি কি ঝামেলা করি?

মা মুচকি হেসে বললেন,

—তুই ঝামেলা করিস না, ঝামেলাই তোকে খুঁজে নেয়।

নাহিদ কিছু না বলে উঠে পড়ল।

কলেজে পৌঁছাতেই নাহিদ দেখল গেটের পাশে বেশ কিছু ছাত্র দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে গতকালের সেই ছেলেটাও ছিল, যাকে নাহিদ ক্লাসে চুপ করতে বলেছিল।

ছেলেটা নাহিদকে দেখেই তার বন্ধুদের কিছু বলল।

নাহিদ বিষয়টা বুঝতে পারল। কিন্তু পাত্তা না দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

ক্লাসরুমে ঢুকতেই শান্তাকে দেখা গেল জানালার পাশে বসে আছে। হাতে একটা বই। নাহিদ একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল।

কিন্তু শান্তা তাকে লক্ষ্য করেছিল।

সে মনে মনে ভাবল,

‘আজও কি আমাকে চিনতে পারবে না?’

নাহিদ গিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ পর শিক্ষক ক্লাসে এলেন।

—আজ আমরা একটা গ্রুপ অ্যাসাইনমেন্ট করব। চারজন করে গ্রুপ বানাবে। প্রত্যেক গ্রুপকে আগামী সপ্তাহে কাজ জমা দিতে হবে।

সবাই নিজেদের মধ্যে দল বানাতে শুরু করল।

মিতু শান্তার পাশে এসে বলল,

—আমরা দুজন তো একসঙ্গে থাকব।

শান্তা মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ।

ঠিক তখন শিক্ষক বললেন,

—তোমরা ছেলেমেয়েরা মিশে গ্রুপ করবে। একই বন্ধুদের সঙ্গে সবসময় থাকলে চলবে না।

নাম ধরে ধরে তিনি গ্রুপ তৈরি করতে লাগলেন।

একসময় বললেন,

—নাহিদ, শান্তা, মিতু আর রাকিব—তোমরা এক গ্রুপ।

নাহিদ একটু অবাক হয়ে শান্তার দিকে তাকাল।

শান্তার মুখেও হালকা হাসি ফুটল।

মিতু নাহিদের দিকে তাকিয়ে বলল,

—মনে হচ্ছে ভাগ্য আমাদের একসঙ্গে কাজ করাবে।

নাহিদ হেসে বলল,

—ভাগ্য কিনা জানি না, স্যারের সিদ্ধান্ত।

শান্তা বলল,

—কাজটা ঠিকমতো করলেই হলো।

নাহিদ বলল,

—আপনি সবসময় এত সিরিয়াস থাকেন?

শান্তা ভ্রু কুঁচকে বলল,

—কেন?

—না, মনে হলো।

—আর আপনি সবসময় এত কথা বলেন?

নাহিদ হাসল।

—প্রয়োজন হলে বলি।

শান্তা আর কিছু বলল না।

তবে মিতু দুজনের কথোপকথন দেখে মুচকি হাসতে লাগল।

ক্লাস শেষে চারজন লাইব্রেরিতে বসে অ্যাসাইনমেন্টের বিষয় ঠিক করছিল।

নাহিদ একটা বিষয় প্রস্তাব করল।

—আমরা চাইলে শহরের পুরোনো স্থাপনা নিয়ে কাজ করতে পারি।

শান্তা বলল,

—ভালো। এতে তথ্যও সহজে পাওয়া যাবে।

রাকিব বলল,

—তাহলে কাল থেকে কাজ শুরু?

নাহিদ মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ।

সবাই চলে যাওয়ার পর শান্তা বই গুছাচ্ছিল।

নাহিদ তখনও দাঁড়িয়ে ছিল।

সে হঠাৎ বলল,

—শান্তা।

শান্তা থেমে গেল।

—হুম?

—তোমার বাড়ি কোথায়?

শান্তা কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,

—মিরপুরের দিকে।

নাহিদ বলল,

—তুমি কি ছোটবেলায় অন্য কোথাও থাকতে?

প্রশ্নটা শুনে শান্তার বুক ধক করে উঠল।

—কেন?

—জানি না। তোমাকে দেখে মনে হয় কোথাও যেন আগে দেখেছি।

শান্তা হালকা হাসল।

—হয়তো ভুল মনে হচ্ছে।

—হতে পারে।

নাহিদ মাথা নিচু করল।

শান্তা ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

নাহিদ তখন বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

শান্তা মনে মনে বলল,

‘আর কতদিন লাগবে তোমার মনে করতে?’

পরদিন অ্যাসাইনমেন্টের কাজের জন্য চারজন পুরোনো ঢাকার একটি ঐতিহাসিক স্থানে গেল।

সেখানে ঘুরতে ঘুরতে তারা অনেক ছবি তুলল এবং বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করল।

একসময় শান্তা একটু দূরে দাঁড়িয়ে একটা পুরোনো বাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল।

নাহিদ তার পাশে এসে দাঁড়াল।

—কী দেখছ?

শান্তা বলল,

—এই বাড়িটা কেমন যেন পরিচিত লাগছে।

নাহিদ হেসে বলল,

—আজকাল সবাইকেই তোমার পরিচিত লাগে?

শান্তা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোমারও তো আমাকে পরিচিত লাগে।

নাহিদ থমকে গেল।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

কয়েক মুহূর্ত কেউ কিছু বলল না।

হঠাৎ নাহিদের মাথায় একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।

একটা গ্রামের বাড়ি।

বড় পুকুর।

গাছের নিচে বসে থাকা একটা ছোট্ট মেয়ে।

তার হাতে লাল রঙের ফিতা।

মেয়েটা বলছে,

—নাহিদ, তুই শহরে চলে গেলে আমাকে ভুলে যাবি না তো?

ছোট্ট নাহিদ বলছে,

—না। আমি আবার আসব।

তারপর দৃশ্যটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল।

নাহিদ কপালে হাত দিল।

শান্তা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,

—কী হয়েছে?

—কিছু না। মাথাটা একটু ঘুরল।

—বসবে?

—না, ঠিক আছি।

শান্তা চুপ করে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, নাহিদ হয়তো ধীরে ধীরে সব মনে করতে শুরু করেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে নাহিদ পুরোনো আলমারি খুলল।

সে জানত না ঠিক কী খুঁজছে।

অনেক পুরোনো বই আর কাগজপত্র সরাতে সরাতে হঠাৎ একটা ছোট বাক্স তার হাতে এল।

বাক্সটা খুলতেই একটা পুরোনো ছবি বেরিয়ে এল।

ছবিতে দুই শিশু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

একজন নাহিদ।

আরেকজন শান্তা।

ছবিটা দেখে নাহিদের হাত কেঁপে উঠল।

—শান্তা!

তার মুখ থেকে অজান্তেই নামটা বেরিয়ে গেল।

তারপর আরও কিছু স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিরে আসতে লাগল।

ছোটবেলার সেই বাড়ি।

শান্তার হাসি।

একসঙ্গে পুকুরের ধারে বসে থাকা।

ঝগড়া।

আবার কয়েক মিনিট পর বন্ধুত্ব।

আর সেই শেষ দিন।

যেদিন নাহিদের পরিবার শহরে চলে এসেছিল।

শান্তা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,

—তুই আবার আসবি তো?

নাহিদ বলেছিল,

—অবশ্যই আসব।

কিন্তু সে আর আসতে পারেনি।

বছরের পর বছর কেটে গেছে।

নাহিদ ছবিটা হাতে নিয়ে চুপ করে বসে রইল।

তার চোখে যেন পুরোনো দিনের সব ছবি ফিরে আসছিল।

সে ধীরে ধীরে বলল,

—তাহলে তুইই সেই শান্তা...

অন্যদিকে শান্তা নিজের ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

তার ফোনে একটি মেসেজ এল।

নাহিদ লিখেছে—

“কাল তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।”

শান্তার বুকের ভেতর আনন্দ আর ভয় একসঙ্গে কাজ করল।

সে বুঝতে পারল, নাহিদ হয়তো তাকে চিনে ফেলেছে।

কিন্তু সে জানে না, এত বছর পর তাদের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে।

পরদিন কী হবে?

নাহিদ কি তাকে পুরোনো দিনের সেই শান্তা হিসেবেই গ্রহণ করবে?

নাকি এত বছরের দূরত্ব তাদের মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে?

শান্তা ফোনটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসল।

তারপর মনে মনে বলল,

—এবার আর হারিয়ে যাস না, নাহিদ।

পরদিন সকাল থেকেই শান্তার মনটা অস্থির হয়ে ছিল।

গত রাতে নাহিদের মেসেজ পাওয়ার পর থেকে তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—নাহিদ কি সত্যিই তাকে চিনে ফেলেছে?

বহু বছর ধরে বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা একটা পুরোনো অধ্যায় যেন হঠাৎ করে আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

কলেজে পৌঁছে শান্তা দেখল নাহিদ গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

দূর থেকেই তাকে দেখে শান্তার পা কিছুটা ধীর হয়ে গেল।

নাহিদও তাকে দেখতে পেল।

সে হেসে বলল,

—এত দেরি হলো কেন?

শান্তা অবাক হয়ে বলল,

—তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে?

—হ্যাঁ।

—কেন?

নাহিদ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—কিছু কথা ছিল।

শান্তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

—কী কথা?

নাহিদ বলল,

—এখানে না। কলেজের পেছনের মাঠে চল।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

মাঠের একপাশে একটা পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল। গাছটার নিচে গিয়ে নাহিদ থেমে দাঁড়াল।

তার হাতে একটা পুরোনো ছবি।

ছবিটা শান্তার সামনে ধরে বলল,

—এটা চিনতে পারো?

ছবিটা দেখেই শান্তা কিছু বলল না।

তার চোখ ভিজে উঠল।

ছবিতে ছিল ছোট্ট নাহিদ আর ছোট্ট শান্তা।

দুজনের হাতে কাগজের তৈরি একটা পাখি।

শান্তা ধীরে বলল,

—তুমি মনে করতে পেরেছ?

নাহিদ মাথা নেড়ে বলল,

—সব না। তবে অনেক কিছু।

শান্তা মৃদু হেসে বলল,

—আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো কোনোদিনই মনে করতে পারবে না।

নাহিদ বলল,

—আমি তোকে চিনতে পারিনি বলে নিজেকেই খারাপ লাগছে।

—তুমি কীভাবে চিনবে? এত বছর হয়ে গেছে।

—কিন্তু তুই আমাকে চিনেছিলি।

শান্তা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তোমার চোখে আগের মতোই একটা জেদ আছে। আর তুমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে এখনও আগের মতোই দাঁড়াও।

নাহিদ হেসে বলল,

—তাহলে আমাকে প্রথম দিন থেকেই চিনেছিলে?

—নামটা দেখার পর নিশ্চিত হয়েছিলাম।

—আর আমাকে বলোনি?

—দেখতে চেয়েছিলাম, তুমি নিজে থেকে আমাকে চিনতে পারো কি না।

নাহিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তুই বদলাসনি।

শান্তা হেসে বলল,

—তুমিও না।

দুজনের মধ্যে হঠাৎ অনেক বছরের দূরত্ব যেন কমে গেল।

কিছুক্ষণ পর মিতু দূর থেকে তাদের দেখতে পেল।

সে কাছে এসে বলল,

—এখানে কী হচ্ছে?

শান্তা হাসতে হাসতে বলল,

—পুরোনো একটা হিসাব মেলানো হচ্ছে।

মিতু কিছুই বুঝল না।

নাহিদ বলল,

—আমরা ছোটবেলার বন্ধু।

মিতু অবাক হয়ে চোখ বড় করল।

—কী! তোমরা আগে থেকেই একে অপরকে চিনতে?

শান্তা মাথা নেড়ে বলল,

—অনেক ছোটবেলা থেকে।

মিতু হেসে বলল,

—তাহলে এতদিন ধরে আমাকে কিছু বলিসনি কেন?

শান্তা বলল,

—সব কথা তো প্রথম দিনেই বলা যায় না।

মিতু নাহিদের দিকে তাকিয়ে বলল,

—বুঝেছি। তাহলে তোমাদের গল্প বেশ পুরোনো।

নাহিদ হেসে বলল,

—গল্প না। আমরা তখন শুধু ঝগড়া করতাম।

শান্তা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—মিথ্যা। ঝগড়া তুমি করতে।

—তুমি কি খুব শান্ত ছিলে?

—অবশ্যই।

নাহিদ হেসে উঠল।

—এই কথাটা কেউ বিশ্বাস করবে না।

তিনজনই হেসে ফেলল।

এরপর থেকে নাহিদ আর শান্তার মধ্যে পুরোনো বন্ধুত্বটা আবার ফিরে এল।

ক্লাসে তারা পাশাপাশি বসত না, কিন্তু ক্লাসের বাইরে প্রায়ই একসঙ্গে দেখা যেত।

অ্যাসাইনমেন্টের কাজও তারা একসঙ্গে করতে লাগল।

একদিন কলেজ ছুটির পর তারা চারজন একটা ছোট ক্যাফেতে বসেছিল।

রাকিব বলল,

—অ্যাসাইনমেন্ট প্রায় শেষ। এখন শুধু রিপোর্টটা তৈরি করতে হবে।

নাহিদ বলল,

—ওটা আমি করে দেব।

শান্তা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—না, একা করবে না। আমিও করব।

নাহিদ হেসে বলল,

—তুমি এখনও আগের মতোই সবকিছুতে নাক গলাও।

শান্তা বলল,

—আর তুমি এখনও নিজের সব কাজ নিজে করার চেষ্টা করো।

মিতু দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

—তোমাদের দুজনের ঝগড়াও যেন আগে থেকে ঠিক করা।

শান্তা বলল,

—ওকে সহ্য করা কঠিন।

নাহিদ বলল,

—আমাকেও ওকে সহ্য করতে হয়।

আবার সবাই হেসে উঠল।

কিন্তু এই হাসির আড়ালে নাহিদের মনে ধীরে ধীরে একটা নতুন অনুভূতি জন্ম নিচ্ছিল।

শান্তাকে সে শুধু ছোটবেলার বন্ধু হিসেবে দেখছে না।

কখন যে তার সঙ্গে কথা বলার অপেক্ষা করতে শুরু করেছে, সে নিজেও বুঝতে পারছে না।

শান্তাও বিষয়টা বুঝতে পারছিল।

কিন্তু সে কিছু বলছিল না।

একদিন বিকেলে নাহিদ শান্তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চাইল।

শান্তা বলল,

—প্রয়োজন নেই। আমি নিজেই যেতে পারব।

—জানি। তবু যেতে চাই।

শান্তা আর কিছু বলল না।

দুজন রাস্তা ধরে হাঁটছিল।

হঠাৎ নাহিদ বলল,

—তোর মনে আছে, ছোটবেলায় আমরা একটা পুকুরের পাশে বসতাম?

শান্তা হেসে বলল,

—মনে আছে।

—তুই একবার পানিতে পড়ে গিয়েছিলি।

—আমি পড়িনি। তুমি ধাক্কা দিয়েছিলে।

—আমি?

—হ্যাঁ।

—তুই মিথ্যা বলছিস।

—আমি সব মনে রেখেছি।

নাহিদ হেসে বলল,

—তুই সত্যিই অনেক কিছু মনে রেখেছিস।

শান্তা ধীরে বলল,

—সবাই সবকিছু ভুলে যেতে পারে না।

নাহিদ তার দিকে তাকাল।

কথাটা শুনে সে কিছু বলতে পারল না।

শান্তার বাড়ির সামনে এসে দুজন থামল।

নাহিদ বলল,

—কাল দেখা হবে?

শান্তা বলল,

—হবে।

নাহিদ চলে যাওয়ার পর শান্তা দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

ভেতর থেকে তার বাবা বেরিয়ে এলেন।

তিনি নাহিদকে দূরে চলে যেতে দেখলেন।

তারপর শান্তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

—ছেলেটা কে?

শান্তা একটু থেমে বলল,

—আমার কলেজের বন্ধু।

বাবার চোখে কেমন একটা কঠিন ভাব দেখা গেল।

—বন্ধু?

—হ্যাঁ।

—ওর সঙ্গে বেশি মিশবে না।

শান্তা অবাক হয়ে বলল,

—কেন?

বাবা উত্তর না দিয়ে ভেতরে চলে গেলেন।

শান্তা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

সে বুঝতে পারল না, তার বাবা নাহিদকে দেখেই এমন আচরণ করলেন কেন।

অন্যদিকে নাহিদ বাড়ি ফেরার পথে ছিল।

হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।

একজন অপরিচিত নম্বর।

নাহিদ ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একজন বলল,

—আপনি নাহিদ?

—জি। কে বলছেন?

—আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে। শান্তার কাছ থেকে একটু দূরে থাকুন।

নাহিদ থমকে গেল।

—আপনি কে?

ওপাশ থেকে আর কোনো উত্তর এল না।

কল কেটে গেল।

নাহিদ কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

শান্তার সঙ্গে এত বছর পর দেখা হয়েছে।

পুরোনো বন্ধুত্ব ফিরে এসেছে।

সারারাত নাহিদের ঘুম হলো না।

বারবার সেই ফোনকলের কথা মনে পড়ছিল।

—আপনি নাহিদ? শান্তার কাছ থেকে একটু দূরে থাকুন।

লোকটা কে ছিল?

কেনই বা তাকে এমন কথা বলল?

নাহিদ অনেকবার নম্বরটিতে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু নম্বরটি বন্ধ।

সকালে মা তাকে কয়েকবার ডাকলেও সে শুনতে পায়নি।

শেষ পর্যন্ত মা ঘরে এসে বললেন,

—কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ?

নাহিদ চমকে তাকাল।

—না মা। একটু ঘুম কম হয়েছে।

—কোনো চিন্তা করছিস?

নাহিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—না।

সে মাকে বিষয়টা জানাল না।

কারণ সে জানে, মা অযথা চিন্তা করবেন।

কলেজে গিয়ে নাহিদ প্রথমেই শান্তাকে খুঁজল।

ক্লাসরুমে ঢুকতেই শান্তা তাকে দেখে হাসল।

—আজ এত চুপচাপ কেন?

নাহিদ বলল,

—কিছু না।

শান্তা ভালোভাবে তার মুখের দিকে তাকাল।

—তোমার কিছু হয়েছে।

—কীভাবে বুঝলে?

—ছোটবেলা থেকেই তো তোমাকে চিনি।

নাহিদ মৃদু হেসে বলল,

—তুই এখনও আমাকে এত ভালো চিনিস?

—কিছু মানুষকে চিনতে বেশি সময় লাগে না।

কথাটা শুনে নাহিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তোর বাবাকে আমি কি আগে কোথাও দেখেছি?

শান্তা একটু অবাক হলো।

—কেন?

—কাল আমাকে দেখে উনি একটু অদ্ভুত আচরণ করছিলেন।

শান্তা বলল,

—বাবা হয়তো তোমাকে চিনতে পারেননি।

নাহিদ মাথা নেড়ে বলল,

—হয়তো।

কিন্তু তার সন্দেহ কাটল না।

ক্লাস শেষে চারজন অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করতে লাইব্রেরিতে গেল।

কাজ করতে করতে শান্তা লক্ষ্য করল নাহিদ বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে।

সে বলল,

—তুমি কি কোনো সমস্যায় আছ?

নাহিদ বলল,

—না।

—আমাকে বলতে পারো।

নাহিদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—কাল একটা ফোন এসেছিল।

—কার?

—জানি না।

—কী বলেছে?

নাহিদ শান্তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোমার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলেছে।

শান্তার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—কী?

—হ্যাঁ।

—কোন নম্বর থেকে?

নাহিদ নম্বরটা দেখাল।

শান্তা নম্বর দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আমি জানি না।

নাহিদ বলল,

—তুমি কি কোনো কিছু আমার কাছ থেকে লুকাচ্ছ?

শান্তা চোখ নামিয়ে বলল,

—না।

কিন্তু তার গলার স্বরে দ্বিধা ছিল।

নাহিদ সেটা বুঝতে পারল।

সেদিন সন্ধ্যায় শান্তা বাড়ি ফিরে দেখল তার বাবা বসার ঘরে কারও সঙ্গে কথা বলছেন।

লোকটাকে শান্তা আগে কখনো দেখেনি।

সে নিজের ঘরে চলে যেতে চাইল।

কিন্তু যাওয়ার আগে শুনতে পেল লোকটি বলছে,

—আপনি চিন্তা করবেন না। ছেলেটার ব্যাপারে আমি খোঁজ নিয়েছি।

শান্তা থেমে গেল।

তারপর বাবার গলা শোনা গেল,

—ওকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে রাখতে হবে।

শান্তার বুক কেঁপে উঠল।

‘ছেলেটা’ বলতে কি নাহিদকে বোঝানো হচ্ছে?

সে আর কিছু শুনতে না পেরে নিজের ঘরে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর বাবা ঘরে এসে বললেন,

—শান্তা।

—জি?

—আজকাল তোমার কলেজে কারও সঙ্গে বেশি মিশছ?

শান্তা কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,

—বন্ধুদের সঙ্গে।

—কোনো ছেলে?

শান্তা বুঝতে পারল, বাবার প্রশ্নটা নাহিদকে নিয়েই।

—হ্যাঁ।

—ওর নাম নাহিদ?

শান্তা চমকে তাকাল।

—আপনি জানেন?

বাবা কঠিন গলায় বললেন,

—ওর সঙ্গে আর মিশবে না।

—কেন?

—আমি যা বলছি, সেটাই করবে।

শান্তা এবার প্রতিবাদ করল।

—কিন্তু বাবা, সে আমার ছোটবেলার বন্ধু।

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—তোমার ছোটবেলার অনেক কিছুই তুমি জানো না।

কথাটা বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন।

শান্তা হতভম্ব হয়ে বসে রইল।

তার মনে হলো, তার বাবা নিশ্চয়ই এমন কোনো সত্য জানেন যা তার কাছ থেকে এতদিন লুকানো হয়েছে।

পরদিন কলেজে নাহিদ শান্তার জন্য অপেক্ষা করছিল।

শান্তা দূর থেকে তাকে দেখে থেমে গেল।

নাহিদ এগিয়ে এসে বলল,

—কী হয়েছে?

—কিছু না।

—তুই আজ এত চুপচাপ কেন?

শান্তা বলল,

—বাবা তোমার সঙ্গে মিশতে নিষেধ করেছে।

নাহিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—কেন?

—জানি না।

—তুই জিজ্ঞেস করিসনি?

—করেছি। কিন্তু বাবা কিছু বলেনি।

নাহিদ বলল,

—তাহলে ব্যাপারটা শুধু আমাদের বন্ধুত্বের নয়।

শান্তা তাকিয়ে রইল।

—তুমি কী করবে?

নাহিদ শান্ত গলায় বলল,

—সত্যিটা জানব।

শান্তা ভয় পেয়ে বলল,

—কোনো ঝামেলায় যেও না।

—আমি ঝামেলা করতে যাচ্ছি না। শুধু জানতে চাই, এত বছর পর আমাদের দেখা হওয়ার পর সবাই কেন আমাদের আলাদা করতে চাইছে।

শান্তা কিছু বলল না।

সেদিন দুপুরে কলেজের বাইরে নাহিদ একা দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ সেই একই লোককে সে দেখতে পেল।

কাল ফোনে যে গলা শুনেছিল, সেই লোক।

লোকটি রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল।

নাহিদ দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গেল।

—আপনি!

লোকটি ঘুরে দাঁড়াল।

নাহিদ বলল,

—কাল ফোন করে আমাকে শান্তার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন কেন?

লোকটি কিছু বলল না।

নাহিদ আবার বলল,

—আপনি শান্তার পরিবারকে চেনেন?

লোকটি ঠান্ডা গলায় বলল,

—আপনি যদি শান্তার ভালো চান, তাহলে তার জীবন থেকে দূরে থাকুন।

—কিন্তু কেন?

—সব সত্য জানার পর হয়তো আপনিই দূরে চলে যেতে চাইবেন।

কথাটা বলে লোকটি চলে গেল।

নাহিদ তার পেছনে ছুটতে চাইল, কিন্তু লোকটি ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।

সন্ধ্যায় নাহিদ বাড়িতে ফিরে নিজের পুরোনো বাক্সটা আবার খুলল।

ছোটবেলার ছবিগুলো বের করল।

একটা ছবির পেছনে লেখা ছিল—

“নাহিদ ও শান্তা, ২০১১।”

তার নিচে আরেকটা লেখা চোখে পড়ল।

“দুই পরিবারের বন্ধুত্বের স্মৃতি।”

নাহিদ অবাক হয়ে গেল।

দুই পরিবারের বন্ধুত্ব?

তাহলে কি তার বাবা-মা শান্তার পরিবারকে আগে থেকেই চিনতেন?

সে সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কাছে গেল।

—মা, শান্তার পরিবারকে তুমি চেনো?

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—এই কথা এখন কেন?

—মানে?

—তুই শান্তার সঙ্গে দেখা করেছিস?

নাহিদ বুঝতে পারল, মা কিছু একটা জানেন।

—হ্যাঁ। অনেক বছর পর আবার দেখা হয়েছে।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—নাহিদ, কিছু বিষয় আছে যেগুলো এখন না জানাই ভালো।

—কিন্তু কেন?

মা উত্তর না দিয়ে অন্যদিকে তাকালেন।

নাহিদ বুঝল, তার ধারণাই ঠিক।

এই গল্পের পেছনে এমন একটা সত্য আছে, যেটা তার পরিবারও জানে।

অন্যদিকে শান্তা নিজের ঘরে বসে পুরোনো বাক্সটা খুলল।

ছোটবেলার সেই ছবিটা বের করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর ছবির পেছনে লেখা একটা পুরোনো লাইন তার চোখে পড়ল।

“একদিন নাহিদকে সত্যিটা জানাতেই হবে।”

শান্তার হাত কেঁপে উঠল।

সে এতদিন এই লেখাটা খেয়াল করেনি।

কে লিখেছিল?

কেন লিখেছিল?

আর কোন সত্য নাহিদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে?

শান্তা ছবিটা বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,

—নাহিদ, তুমি যদি সত্যিটা জেনে যাও... তাহলে কি আমাদের সম্পর্ক আগের মতো থাকবে?

তার চোখে পানি জমে উঠল।

আর ঠিক সেই সময় তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল—

“তোমার বাবার কাছে যা জানতে চাও, আজ রাতেই জেনে নাও। দেরি করলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।”

শান্তা মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

আজ সে বাবার কাছ থেকে সব সত্য জানবে।

রাত অনেক হয়ে গেছে।

পুরো বাড়ি প্রায় নিস্তব্ধ। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু শান্তার চোখে ঘুম নেই।

ফোনে আসা মেসেজটা বারবার তার মনে পড়ছে।

“তোমার বাবার কাছে যা জানতে চাও, আজ রাতেই জেনে নাও। দেরি করলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।”

কে পাঠিয়েছে, সে জানে না।

তবু মেসেজটা পড়ে তার মনে একটা অদ্ভুত সাহস তৈরি হয়েছে।

শান্তা ধীরে ধীরে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে বাবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

দরজার নিচ দিয়ে আলো বের হচ্ছিল।

সে দরজায় নক করল।

—বাবা?

ভেতর থেকে উত্তর এল,

—কে?

—আমি।

—এসো।

শান্তা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।

তার বাবা তখন টেবিলের পাশে বসে কিছু কাগজ দেখছিলেন।

শান্তাকে দেখে তিনি কাগজগুলো দ্রুত গুছিয়ে রাখলেন।

শান্তা সেটা লক্ষ্য করল।

—বাবা, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।

—কী কথা?

—নাহিদকে তুমি কেন আমার সঙ্গে মিশতে নিষেধ করেছ?

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—কারণ আমি জানি, ওর সঙ্গে বেশি মিশলে তোমার ভালো হবে না।

—কিন্তু কেন?

—সবকিছুর উত্তর এখন দেওয়া সম্ভব না।

শান্তা এবার একটু জোরে বলল,

—আমি ছোট নই বাবা। সত্যিটা জানার অধিকার আমার আছে।

বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তুই নাহিদকে কতটা মনে করতে পারিস?

—সবটা না। তবে অনেক কিছু মনে আছে।

—ওর পরিবার সম্পর্কে কী জানিস?

শান্তা মাথা নাড়ল।

—খুব বেশি কিছু না।

বাবা চেয়ার থেকে উঠে জানালার কাছে গেলেন।

—তাহলে শোন।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—অনেক বছর আগে নাহিদের বাবার সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা একসঙ্গে ব্যবসা করতাম।

শান্তা অবাক হলো।

—তাহলে?

—একটা সময় আমাদের মধ্যে বড় একটা সমস্যা তৈরি হয়।

—কী সমস্যা?

বাবা সরাসরি উত্তর দিলেন না।

—ব্যবসায় বড় ক্ষতি হয়েছিল। তারপর আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।

শান্তা বলল,

—কিন্তু এর সঙ্গে নাহিদের কী সম্পর্ক?

বাবা বললেন,

—সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার পর তোমাদের দুজনকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল। কারণ আমরা চেয়েছিলাম, তোমরা আর কখনো একে অপরের জীবনে না ফিরো।

শান্তার চোখ বড় হয়ে গেল।

—কিন্তু কেন?

বাবা চুপ করে রইলেন।

শান্তা এবার বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

—তুমি কি নাহিদের বাবাকে কোনোদিন ক্ষমা করোনি?

বাবা ধীরে বললেন,

—কিছু ভুলের ক্ষমা হয় না।

—কী ভুল?

বাবা আর কিছু বললেন না।

শান্তা বুঝল, এখনো পুরো সত্য জানা হয়নি।

পরদিন সকালে শান্তা কলেজে গিয়ে নাহিদকে খুঁজল।

নাহিদ মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

শান্তা কাছে গিয়ে বলল,

—আমার বাবার সঙ্গে কথা বলেছি।

নাহিদ তাকাল।

—কী বলেছে?

—তোমার বাবা আর আমার বাবা একসময় খুব কাছের বন্ধু ছিলেন।

নাহিদ অবাক হয়ে বলল,

—আমার বাবা?

—হ্যাঁ।

নাহিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আমার মা-ও কিছু জানে। কিন্তু আমাকে বলেনি।

শান্তা বলল,

—আমাদের দুজনের পরিবারই যেন একটা কথা লুকাচ্ছে।

—হয়তো সেই কথাটাই আমাদের আলাদা করে রেখেছিল।

শান্তা ধীরে বলল,

—তুমি কি সত্যিটা জানতে চাও?

নাহিদ দৃঢ় গলায় বলল,

—অবশ্যই।

সেদিন তারা দুজন নাহিদের মায়ের কাছে গেল।

নাহিদ সরাসরি প্রশ্ন করল,

—মা, তুমি শান্তার বাবাকে চেনো?

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর শান্তার দিকে তাকালেন।

—তুই শান্তা?

শান্তা মাথা নেড়ে বলল,

—জি।

মায়ের চোখে কেমন একটা মায়া ফুটে উঠল।

—তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস।

শান্তা অবাক হয়ে বলল,

—আপনি আমাকে আগে থেকেই চিনতেন?

মা বললেন,

—তুই যখন ছোট ছিলি, তখন তোকে অনেকবার দেখেছি।

নাহিদ বলল,

—তাহলে এতদিন আমাকে কিছু বলোনি কেন?

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—কারণ অতীতটা খুব সহজ ছিল না।

—কী হয়েছিল?

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—তোর বাবা আর শান্তার বাবা একসঙ্গে ব্যবসা করত। কিন্তু একসময় ব্যবসার টাকা নিয়ে একটা বড় ভুল বোঝাবুঝি হয়।

নাহিদ বলল,

—কে ভুল করেছিল?

—কেউই পুরোপুরি দোষী ছিল না।

—তাহলে?

মা বললেন,

—একটা হিসাবের কাগজ হারিয়ে গিয়েছিল। সেই কাগজের কারণে তোর বাবাকে দায়ী করা হয়। তোর বাবা বলেছিল, সে টাকা নেয়নি। কিন্তু শান্তার বাবা বিশ্বাস করেনি।

শান্তা অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে কি আমাদের বাবাদের বন্ধুত্ব সেখানেই শেষ?

মা মাথা নেড়ে বললেন,

—হ্যাঁ।

নাহিদ বলল,

—কিন্তু কাগজটা কোথায় গেল?

মা উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

সবাই চুপ হয়ে গেল।

নাহিদ দরজা খুলতে গেল।

দরজার সামনে একজন বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন।

নাহিদ তাকে দেখে অবাক হলো।

—চাচা?

লোকটি বললেন,

—আমার সঙ্গে তোমার একটু কথা আছে।

নাহিদের মা তাকে দেখে চিনতে পারলেন।

—আপনি এতদিন পর?

লোকটি ঘরে ঢুকে বললেন,

—এবার আর চুপ থাকা ঠিক হবে না।

শান্তা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে রইল।

লোকটি বললেন,

—তোমাদের বাবাদের মধ্যে যে সমস্যাটা হয়েছিল, তার আসল সত্য আমি জানি।

নাহিদ উত্তেজিত হয়ে বলল,

—তাহলে বলুন।

লোকটি ধীরে ধীরে বসে বললেন,

—সেই সময় ব্যবসার হিসাব দেখাশোনা করত একজন কর্মচারী। নাম ছিল কামাল।

নাহিদ বলল,

—তারপর?

—কামালই সেই গুরুত্বপূর্ণ কাগজটা সরিয়ে দিয়েছিল।

শান্তা অবাক হয়ে বলল,

—কেন?

লোকটি বললেন,

—কারণ সে টাকা আত্মসাৎ করেছিল। কিন্তু দোষটা তোমাদের বাবাদের ওপর চাপিয়ে দেয়।

নাহিদ স্তব্ধ হয়ে গেল।

—তাহলে আমার বাবা নির্দোষ ছিলেন?

—হ্যাঁ।

শান্তার চোখে পানি চলে এল।

—আমার বাবা এত বছর ধরে ভুল মানুষকে দোষ দিয়ে এসেছেন?

লোকটি বললেন,

—তখন তিনি পুরো সত্য জানতেন না।

নাহিদ ধীরে বলল,

—কামাল এখন কোথায়?

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—জানি না।

ঠিক তখনই শান্তার ফোন বেজে উঠল।

একটি অচেনা নম্বর।

সে ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে পরিচিত সেই কণ্ঠ—

—তোমরা যদি সত্যিটা জানতে চাও, তাহলে পুরোনো গুদামঘরে যাও।

শান্তা বলল,

—আপনি কে?

কোনো উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে গেল।

নাহিদ বলল,

—কোথায় যেতে বলেছে?

শান্তা গুদামঘরের ঠিকানা জানাল।

নাহিদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—আমরা এখনই যাব।

রাতের শহর তখন অনেকটাই ফাঁকা।

নাহিদ আর শান্তা পাশাপাশি হাঁটছিল।

শান্তা বলল,

—তুমি ভয় পাচ্ছ?

নাহিদ হেসে বলল,

—সত্যি জানতে গেলে ভয় পেলে চলবে?

—কিন্তু যদি সত্যিটা আমাদের জন্য ভালো না হয়?

নাহিদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—যাই হোক, এবার আর পিছিয়ে যাব না।

পুরোনো গুদামঘরের সামনে এসে তারা দাঁড়াল।

দরজাটা আধখোলা।

ভেতর থেকে হালকা আলো আসছে।

শান্তা নাহিদের হাতা ধরে বলল,

—সাবধানে যেও।

নাহিদ মাথা নেড়ে বলল,

—তুমি আমার সঙ্গে থাকলে ভয় নেই।

দুজন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

হঠাৎ দরজাটা পেছন থেকে বন্ধ হয়ে গেল।

শান্তা চমকে উঠল।

—নাহিদ!

নাহিদ দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই অন্ধকারের মধ্যে একজনের কণ্ঠ শোনা গেল—

—অনেক বছর ধরে যে সত্য লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, আজ তোমরা সেটা জানতে এসেছ?

নাহিদ বলল,

—সামনে আসুন!

অন্ধকার থেকে একজন মানুষ ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল।

তার মুখ স্পষ্ট হতেই শান্তা চমকে উঠল।

—আপনি!

লোকটি মৃদু হাসল।

—হ্যাঁ, আমিই তোমাদের এখানে ডেকেছি।

নাহিদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

কারণ লোকটি ছিল—

শান্তার বাবার সবচেয়ে কাছের মানুষ।

আর তার হাতে ছিল সেই হারিয়ে যাওয়া পুরোনো হিসাবের কাগজ।

পুরোনো গুদামঘরের ভেতরটা অন্ধকার। চারপাশে পুরোনো কাঠের বাক্স আর ধুলোমাখা জিনিসপত্র। ছাদের সঙ্গে ঝুলে থাকা একটা দুর্বল বাতি বারবার কাঁপছিল।

নাহিদ আর শান্তা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির দিকে তাকিয়ে ছিল।

লোকটি ছিল মাহবুব চাচা—শান্তার বাবার দীর্ঘদিনের পরিচিত এবং একসময় তাদের ব্যবসার বিশ্বস্ত কর্মচারী।

নাহিদ কঠিন গলায় বলল,

—আপনি আমাদের এখানে ডেকেছেন কেন?

মাহবুব চাচা হাতে থাকা পুরোনো ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখলেন।

—কারণ এত বছর ধরে একটা মিথ্যা সবাইকে আলাদা করে রেখেছে।

শান্তা এগিয়ে এসে বলল,

—এই কাগজে কী আছে?

—যে কাগজের জন্য তোমাদের বাবাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়েছিল, সেটাই।

নাহিদ ফাইলটা হাতে নিল।

কাগজগুলো অনেক পুরোনো। কিছু হিসাব, কয়েকটা স্বাক্ষর আর ব্যবসার লেনদেনের তথ্য।

নাহিদ দ্রুত চোখ বুলিয়ে বলল,

—এখানে তো বাবার স্বাক্ষর আছে।

মাহবুব চাচা বললেন,

—স্বাক্ষর আছে, কিন্তু টাকা নেওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।

শান্তা অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে এত বছর ধরে সবাই কেন ভেবেছে নাহিদের বাবা টাকা নিয়েছিলেন?

মাহবুব চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—কারণ আসল হিসাবের একটা অংশ গায়েব করে দেওয়া হয়েছিল।

নাহিদ বলল,

—কে করেছিল?

মাহবুব চাচা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—কামাল।

নাহিদের চোখ কঠিন হয়ে গেল।

—কামাল কোথায়?

—এখন আর কেউ জানে না।

—আপনি জানেন না?

—শেষবার যখন তাকে দেখেছিলাম, সে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছিল।

শান্তা বলল,

—আপনি তখন সত্যিটা বলেননি কেন?

মাহবুব চাচা মাথা নিচু করলেন।

—আমি ভয় পেয়েছিলাম।

—কিসের ভয়?

—কামাল একা ছিল না। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। তারা আমাকে ভয় দেখিয়েছিল। বলেছিল, আমি মুখ খুললে আমার পরিবার বিপদে পড়বে।

শান্তা ধীরে বলল,

—তাহলে আপনি এত বছর চুপ ছিলেন?

—হ্যাঁ। কিন্তু কিছুদিন আগে পুরোনো কাগজগুলো আবার আমার হাতে আসে। তখন বুঝলাম, আর চুপ থাকা ঠিক হবে না।

নাহিদ বলল,

—তাহলে আজই সব সত্য প্রকাশ করতে হবে।

মাহবুব চাচা মাথা নেড়ে বললেন,

—হ্যাঁ। কিন্তু তার আগে তোমাদের একটা কথা জানা দরকার।

তিনি একটু থামলেন।

—তোমাদের বাবাদের মধ্যে শুধু ব্যবসার ঝামেলাই ছিল না। সেই ঘটনার পর তোমাদের দুজনকে আলাদা রাখার আরেকটা কারণ ছিল।

শান্তা অবাক হয়ে বলল,

—কী কারণ?

মাহবুব চাচা বললেন,

—তোমাদের বাবা-মায়েরা ভয় পেয়েছিলেন, পুরোনো বিরোধের প্রভাব তোমাদের ওপর পড়বে।

নাহিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর শান্তার দিকে তাকাল।

—তাহলে আমাদের আলাদা করা হয়েছিল আমাদের ভালোর জন্য?

মাহবুব চাচা বললেন,

—ঠিক তাই।

শান্তার চোখ ভিজে উঠল।

—কিন্তু এত বছর আমাদের কেউ সত্যিটা বলেনি কেন?

—কারণ বড়রা অনেক সময় মনে করে, কিছু সত্য লুকিয়ে রাখলেই সমস্যা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সত্য কখনো শেষ হয় না। শুধু আরও বড় হয়ে ফিরে আসে।

গুদাম থেকে বের হওয়ার পর নাহিদ আর শান্তা কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটল।

রাতের বাতাস ঠান্ডা।

শান্তা ধীরে বলল,

—তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছিলে?

নাহিদ তাকাল।

—কখন?

—যখন তুমি ভেবেছিলে আমি তোমাকে চিনেও কিছু বলিনি।

নাহিদ মৃদু হাসল।

—না।

—কেন?

—কারণ তুইও তো জানতিস না, এত বছর পর আমাদের জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

শান্তা কিছু বলল না।

নাহিদ বলল,

—তবে একটা কথা সত্যি।

—কী?

—তুই আমাকে চিনেছিলি, কিন্তু আমি তোকে চিনতে সময় নিয়েছি। এটা নিয়ে আমার একটু আফসোস আছে।

শান্তা হেসে বলল,

—এখন তো চিনেছ।

—হ্যাঁ।

—তাহলে আর ভুলবে না তো?

নাহিদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—এবার আর না।

শান্তা মৃদু হেসে মাথা নিচু করল।

পরদিন সকালে নাহিদ তার বাবার সঙ্গে কথা বলল।

—বাবা, তুমি কি শান্তার বাবার সঙ্গে ব্যবসা করতে?

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—কে বলেছে?

—আমি জেনেছি।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—হ্যাঁ। আমরা একসময় খুব ভালো বন্ধু ছিলাম।

—তারপর কী হয়েছিল?

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সবকিছু খুলে বললেন।

—ব্যবসায় একটা বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে যায়। হিসাবের কাগজে ভুল পাওয়া যায়। আমি বলেছিলাম, আমি টাকা নিইনি। কিন্তু শান্তার বাবা আমাকে বিশ্বাস করেনি।

নাহিদ বলল,

—কিন্তু তুমি সত্যিই টাকা নাওনি।

—না।

—তাহলে এত বছর তুমি চুপ ছিলে কেন?

বাবা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

—কারণ তখন আমার কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না। আর আমি চাইনি তোদের জীবনেও সেই ঝামেলা আসুক।

নাহিদ বলল,

—কিন্তু এখন প্রমাণ আছে।

বাবা চমকে তাকালেন।

—কী বলছিস?

নাহিদ সবকিছু খুলে বলল।

বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—তাহলে এত বছর পর সত্যিটা সামনে আসতে চলেছে।

অন্যদিকে শান্তাও বাবার সামনে দাঁড়াল।

—বাবা, তুমি নাহিদের বাবাকে ভুল বুঝেছিলে।

বাবা কিছু বললেন না।

শান্তা বলল,

—মাহবুব চাচা সব বলেছেন।

বাবার মুখ বদলে গেল।

—মাহবুব?

—হ্যাঁ।

—সে তোকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল?

—পুরোনো গুদামে।

বাবা রাগ করে বললেন,

—তুই সেখানে গিয়েছিলি?

—হ্যাঁ।

—তুই জানিস না জায়গাটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

শান্তা শান্তভাবে বলল,

—বাবা, এত বছর ধরে তুমি আমাকে একটা মিথ্যার মধ্যে রেখেছ।

বাবা চুপ করে গেলেন।

শান্তা বলল,

—নাহিদের বাবা তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি।

বাবা ধীরে ধীরে চেয়ারটায় বসে পড়লেন।

তার চোখে অনুতাপের ছাপ।

—আমি যদি তখন একটু অপেক্ষা করতাম...

শান্তা বলল,

—তাহলে হয়তো আজ এতগুলো বছর নষ্ট হতো না।

বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—তুই কি নাহিদকে পছন্দ করিস?

শান্তা হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।

বাবা আবার বললেন,

—সত্যি বল।

শান্তা ধীরে মাথা নিচু করল।

—হ্যাঁ।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—আমি জানতাম, একদিন এমন প্রশ্ন আসবে।

কয়েকদিন পর দুই পরিবার মুখোমুখি হলো।

একই ঘরে নাহিদের বাবা, শান্তার বাবা, নাহিদ ও শান্তা।

ঘরজুড়ে অস্বস্তিকর নীরবতা।

নাহিদের বাবা প্রথমে বললেন,

—ভাই, এত বছর পরও যদি আমার ওপর রাগ থাকে, আমি বুঝতে পারি। কিন্তু আজ প্রমাণ আছে।

শান্তার বাবা মাথা নিচু করে বললেন,

—আমি ভুল করেছি।

নাহিদের বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।

—কী বলছেন?

—আমি তোমাকে বিশ্বাস করিনি। সেটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

তারপর তিনি উঠে গিয়ে নাহিদের বাবার হাত ধরলেন।

—আমাকে ক্ষমা করো।

নাহিদের বাবা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

—বন্ধুত্বে ভুল হতে পারে। কিন্তু এত বছর পর তুমি সত্যিটা স্বীকার করেছ, সেটাই বড় কথা।

দুজনের চোখেই পানি চলে এল।

নাহিদ আর শান্তা দূর থেকে সব দেখছিল।

শান্তা মৃদু হাসল।

নাহিদ ফিসফিস করে বলল,

—মনে হচ্ছে আমাদের ছোটবেলার বন্ধুত্বটা আবার পুরো হলো।

শান্তা বলল,

—হয়তো।

কিন্তু ঠিক তখনই নাহিদের ফোন বেজে উঠল।

সে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একটি অপরিচিত কণ্ঠ বলল,

—আপনারা যদি মনে করেন সব শেষ হয়ে গেছে, তাহলে ভুল করছেন।

নাহিদ থমকে গেল।

—কে বলছেন?

—যে মানুষটা এত বছর আগে হিসাবের টাকা সরিয়েছিল, সে এখনো সব জানে।

নাহিদ উঠে দাঁড়াল।

—কামাল?

ওপাশ থেকে হাসির শব্দ শোনা গেল।

তারপর কল কেটে গেল।

নাহিদ শান্তার দিকে তাকাল।

শান্তার মুখেও ভয়।

এতদিনের পুরোনো সমস্যার সত্য জানা গেছে।

কিন্তু যে মানুষ এই সমস্যার শুরু করেছিল, সে এখনো তাদের জীবনের বাইরে যায়নি।

ফোনটা কেটে যাওয়ার পরও নাহিদ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ঘরের সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে।

শান্তার বাবা জিজ্ঞেস করলেন,

—কী হয়েছে?

নাহিদ ধীরে বলল,

—কামাল এখনো আমাদের ব্যাপারে সব জানে।

ঘরের পরিবেশ আবার ভারী হয়ে গেল।

নাহিদের বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—আমি ভেবেছিলাম এত বছর পর সব শেষ হয়ে গেছে।

শান্তার বাবা বললেন,

—আমিও।

শান্তা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

—কামাল কি আমাদের ক্ষতি করতে পারে?

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—আমি জানি না। তবে এত বছর পর সে যদি আবার সামনে আসে, তাহলে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।

নাহিদ বলল,

—যে-ই হোক, এবার আমরা সত্যিটা লুকাব না।

শান্তা তার দিকে তাকাল।

নাহিদের চোখে ভয় নেই। বরং একটা দৃঢ়তা।

পরদিন কলেজে গিয়ে শান্তা লক্ষ্য করল, নাহিদ আগের মতো নেই।

ক্লাসে বসে থাকলেও বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে।

শান্তা ধীরে বলল,

—তুমি কি এখনো গতকালের ফোনের কথা ভাবছ?

—হ্যাঁ।

—আমার জন্য তুমি চিন্তা করছ?

নাহিদ একটু হেসে বলল,

—তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু। তোর জন্য চিন্তা করব না?

শান্তা মৃদু হেসে বলল,

—শুধু বন্ধু?

নাহিদ একটু থেমে গেল।

সে শান্তার চোখের দিকে তাকাল।

কয়েক মুহূর্ত দুজনের কেউ কিছু বলল না।

তারপর নাহিদ বলল,

—কিছু সম্পর্কের নাম দিতে হয় না।

শান্তা চোখ নামিয়ে ফেলল।

তার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।

ঠিক তখন মিতু এসে বলল,

—এখানে এত চুপচাপ কেন?

নাহিদ বলল,

—কিছু না।

মিতু দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোমাদের দুজনকে এখন বেশ রহস্যময় লাগছে।

শান্তা হেসে বলল,

—তুমি বেশি ভাবছ।

কয়েকদিন শান্তিতে কেটে গেল।

অ্যাসাইনমেন্টের কাজ শেষ হলো। কলেজেও তাদের ব্যস্ততা বাড়তে লাগল।

কিন্তু নাহিদের মনে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল—

কামাল কোথায়?

সে বাবার পুরোনো ব্যবসার কাগজপত্র দেখতে শুরু করল। একদিন পুরোনো একটি ফাইলের মধ্যে সে একটা ঠিকানা খুঁজে পেল।

ঠিকানাটা ছিল শহরের বাইরে একটি ছোট বাজারের।

ফাইলের পাশে লেখা ছিল—

“কামালের শেষ পরিচিত ঠিকানা।”

নাহিদ সঙ্গে সঙ্গে শান্তাকে ফোন করল।

—শান্তা, একটা ঠিকানা পেয়েছি।

—কী ঠিকানা?

—কামালের।

—তুমি সেখানে যাবে?

—হ্যাঁ।

শান্তা কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,

—আমিও যাব।

—না, তুই থাক।

—না। এতদিনের ব্যাপারে আমি জড়িত। এবার আমিও সত্যিটা জানতে চাই।

নাহিদ শেষ পর্যন্ত রাজি হলো।

পরদিন সকালে তারা শহরের বাইরে রওনা দিল।

বাসের জানালার পাশে বসে শান্তা বাইরে তাকিয়ে ছিল।

কিছুক্ষণ পর সে বলল,

—নাহিদ।

—হুম?

—আমাদের ছোটবেলার সেই গ্রামের বাড়িটা কি তোমার মনে আছে?

নাহিদ হেসে বলল,

—অনেকটাই।

—আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম, তুমি আর কখনো ফিরবে না।

—আমিও ভাবতাম, তুই হয়তো আমাকে ভুলে গেছিস।

শান্তা মাথা নাড়ল।

—আমি পারিনি।

নাহিদ তার দিকে তাকাল।

শান্তা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—কিছু মানুষকে ভুলে থাকা যায় না।

নাহিদ কিছু বলল না।

তবে তার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

বিকেলের দিকে তারা সেই ছোট বাজারে পৌঁছাল।

ঠিকানাটা খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগল না।

একটি পুরোনো চায়ের দোকানে গিয়ে নাহিদ জিজ্ঞেস করল,

—চাচা, এখানে কি কামাল নামে কেউ থাকতেন?

বৃদ্ধ দোকানি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন,

—কামাল? হ্যাঁ, অনেক বছর আগে থাকত।

নাহিদের বুক ধক করে উঠল।

—এখন কোথায়?

—অনেক বছর আগে এখান থেকে চলে গেছে।

শান্তা বলল,

—কোথায় গেছে জানেন?

দোকানি বললেন,

—শহরের দিকে। তবে যাওয়ার আগে একটা ছোট ঘর ভাড়া নিয়েছিল। সেখানে কিছুদিন ছিল।

—ঘরটা কোথায়?

দোকানি রাস্তার ওপাশে একটা সরু গলির দিকে ইশারা করলেন।

—ওইদিকে।

নাহিদ আর শান্তা দ্রুত সেখানে গেল।

গলির শেষে একটি পুরোনো টিনের ঘর।

দরজায় তালা নেই।

নাহিদ ধীরে দরজা ঠেলে খুলল।

ঘরের ভেতর প্রায় কিছুই নেই।

একটা পুরোনো চেয়ার, কাঠের বাক্স আর ধুলোমাখা একটা আলমারি।

শান্তা বলল,

—এখানে কেউ অনেকদিন আসেনি।

নাহিদ আলমারিটা খুলল।

ভেতরে কিছু পুরোনো কাগজ।

হঠাৎ শান্তা একটা খাম বের করল।

খামের ওপর লেখা—

“রহমান সাহেবের জন্য।”

নাহিদ অবাক হয়ে বলল,

—এটা তো আমার বাবার নাম।

খাম খুলে তারা একটা চিঠি পেল।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“আমি জানি, আপনারা আমাকে খুঁজছেন। কিন্তু আমি যা করেছি, তা নিজের ইচ্ছায় করিনি। আমাকে বাধ্য করা হয়েছিল। আসল টাকা অন্য একজন নিয়েছিল। আমি শুধু হিসাবের কাগজ সরিয়েছিলাম।”

নাহিদ চমকে উঠল।

—অন্য একজন?

শান্তা বলল,

—তাহলে কামাল একা ছিল না।

চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল—

“যদি সত্য জানতে চান, পুরোনো নদীর ঘাটে যান। সেখানে যে মানুষটিকে পাবেন, সে সব জানে।”

নাহিদ চিঠিটা শক্ত করে ধরে বলল,

—আমাদের এবার নদীর ঘাটে যেতে হবে।

সন্ধ্যা হয়ে আসছিল।

তারা স্থানীয় একজনের কাছ থেকে নদীর ঘাটের রাস্তা জেনে সেখানে পৌঁছাল।

ঘাট প্রায় ফাঁকা।

দূরে একটা নৌকা বাঁধা।

নাহিদ চারপাশে তাকাল।

—কেউ নেই।

শান্তা বলল,

—হয়তো আমরা ভুল জায়গায় এসেছি।

ঠিক তখন পেছন থেকে একটা কণ্ঠ শোনা গেল,

—আপনারা ভুল জায়গায় আসেননি।

দুজন ঘুরে দাঁড়াল।

একজন মধ্যবয়সী লোক দাঁড়িয়ে আছে।

নাহিদ বলল,

—আপনি কে?

লোকটি ধীরে কাছে এসে বলল,

—আমি কামালকে চিনতাম।

শান্তা বলল,

—কামাল কোথায়?

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—কামাল অনেক আগেই শহর ছেড়ে চলে গেছে।

—কোথায়?

—সে এখন আর নিজের নামে কোথাও থাকে না।

নাহিদ বলল,

—আপনি আসল সত্যটা জানেন?

লোকটি মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ।

তারপর সে চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

—তোমাদের বাবাদের মধ্যে যে টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল, সেই টাকা কামাল নেয়নি।

নাহিদ বলল,

—তাহলে কে নিয়েছিল?

লোকটি বলল,

—যে মানুষটাকে তোমাদের দুই পরিবারই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করত।

শান্তা অবাক হয়ে বলল,

—কে?

লোকটি উত্তর দেওয়ার আগেই দূর থেকে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

লোকটির মুখের ভাব বদলে গেল।

সে দ্রুত বলল,

—আমাকে এখন যেতে হবে।

নাহিদ তার হাত ধরে বলল,

—না! আগে বলুন কে ছিল!

লোকটি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

—যার নাম শুনলে তোমরা বিশ্বাসই করতে পারবে না।

এই কথা বলে সে দৌড়ে অন্ধকারের দিকে চলে গেল।

নাহিদ তার পেছনে ছুটতে গেল, কিন্তু কিছুদূর গিয়েই থেমে গেল।

কারণ নদীর ঘাটের সামনে একটি কালো গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে।

গাড়ির দরজা খুলল।

একজন মানুষ ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল।

শান্তা লোকটিকে দেখেই স্তব্ধ হয়ে গেল।

—বাবা!

নাহিদও অবাক।

শান্তার বাবা তাদের এখানে দেখে কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তিনি এগিয়ে এসে বললেন,

—তোমরা এখানে কেন এসেছ?

শান্তা বলল,

—সত্য জানতে।

বাবা নাহিদের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—আমি তোমাদের এই ব্যাপারে আর জড়াতে চাই না।

নাহিদ বলল,

—কিন্তু আপনি তো জানেন আসল সত্যটা।

শান্তার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

—হ্যাঁ।

শান্তা এগিয়ে এসে বলল,

—তাহলে বলুন। কে টাকা নিয়েছিল?

বাবা চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—যাকে তোমরা সবাই এতদিন বিশ্বাস করে এসেছ...

তিনি বাক্যটা শেষ করার আগেই দূরে আবার গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

আর এবার সেই গাড়ি তাদের দিকেই এগিয়ে আসছিল।

শান্তার বাবা হঠাৎ নাহিদ ও শান্তাকে পেছনে সরে যেতে বললেন।

—এখন আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়।

নাহিদ অবাক হয়ে বলল,

—কেন?

শান্তার বাবা কঠিন গলায় বললেন,

—কারণ সে আমাদের খুঁজে পেয়েছে।

নাহিদ আর শান্তা একে অপরের দিকে তাকাল।

অতীতের রহস্য এবার আরও গভীর হয়ে উঠেছে।

আর সেই রহস্যের কেন্দ্রে রয়েছে এমন একজন মানুষ, যাকে তারা এতদিন নিজেদের আপনজন বলেই জানত।

নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে সবাই কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ।

শান্তার বাবা বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। দূরের গাড়িটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।

নাহিদ বুঝতে পারছিল, বিষয়টা সাধারণ কোনো ব্যাপার নয়।

সে শান্তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি আমার পাশে থাকবে।

শান্তা মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ।

শান্তার বাবা এবার তাদের দুজনকে নিয়ে ঘাটের পাশের একটা পুরোনো চায়ের দোকানের আড়ালে দাঁড়ালেন।

কিছুক্ষণ পর কালো গাড়িটা তাদের সামনে দিয়ে চলে গেল।

কেউ গাড়ি থেকে নামল না।

শান্তা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

—বাবা, এবার অন্তত বলো। কে আমাদের এত বছর ধরে এই সমস্যার মধ্যে রেখেছে?

তার বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—তোমরা যাকে এতদিন বিশ্বাস করে এসেছ, সে-ই সবকিছুর মূল কারণ।

নাহিদ বলল,

—কে?

শান্তার বাবা ধীরে ধীরে বললেন,

—রাশেদ।

নাহিদ অবাক হয়ে গেল।

—রাশেদ চাচা?

রাশেদ ছিল শান্তাদের পরিবারের একজন পুরোনো পরিচিত। ছোটবেলা থেকেই শান্তা তাকে চাচা বলে ডাকত। তাদের ব্যবসার সঙ্গেও সে বহু বছর ধরে জড়িত।

শান্তা অবিশ্বাসের চোখে বাবার দিকে তাকাল।

—রাশেদ চাচা এমন কিছু করতে পারে?

—আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু পরে অনেক প্রমাণ পেয়েছি।

নাহিদ বলল,

—তাহলে কামাল?

—কামাল রাশেদের কথাতেই কাজ করেছিল।

শান্তা স্তব্ধ হয়ে গেল।

—কিন্তু কেন?

তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—রাশেদ ব্যবসার একটা অংশ নিজের দখলে নিতে চেয়েছিল। সে জানত, তোমার বাবা আর নাহিদের বাবা একসঙ্গে থাকলে সেটা সম্ভব হবে না। তাই তাদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করেছিল।

নাহিদ বলল,

—আর সেই জন্যই আমাদের পরিবার আলাদা হয়ে গেল?

—হ্যাঁ।

শান্তার চোখে পানি এসে গেল।

—এত বছর...

তার বাবা মাথা নিচু করে বললেন,

—আমি ভুল করেছি। প্রমাণ না পেয়ে নাহিদের বাবাকে সন্দেহ করেছিলাম। রাশেদ সেই সুযোগটাই নিয়েছিল।

নাহিদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—রাশেদ চাচা এখন কোথায়?

শান্তার বাবা বললেন,

—শহরে। তবে সে জানে না যে আমি সব সত্য জেনে গেছি।

নাহিদ বলল,

—তাহলে আমাদের সাবধানে চলতে হবে।

শান্তা বলল,

—কিন্তু আমরা কি চুপ করে থাকব?

নাহিদ মাথা নেড়ে বলল,

—না।

শান্তার বাবা বললেন,

—তোমরা এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিও না। রাশেদ খুব চালাক মানুষ। তার বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া কিছু করা যাবে না।

নাহিদ বলল,

—প্রমাণ আমরা খুঁজে বের করব।

পরদিন নাহিদ তার বাবাকে সবকিছু জানাল।

রাশেদের নাম শুনে তার বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

—আমি কখনো ভাবিনি ও এমন করতে পারে।

নাহিদ বলল,

—কিন্তু এখন আমাদের সত্যিটা প্রমাণ করতে হবে।

বাবা বললেন,

—আমার কাছে পুরোনো কিছু হিসাব আছে। হয়তো কাজে লাগতে পারে।

তারা পুরোনো কাগজপত্র বের করতে শুরু করল।

একটা ফাইলের মধ্যে নাহিদ এমন কিছু হিসাব পেল, যেখানে রাশেদের নামে কয়েকটি অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য ছিল।

নাহিদ বলল,

—এগুলোই হয়তো প্রমাণ।

বাবা বললেন,

—শুধু এগুলো যথেষ্ট নয়।

—তাহলে আরও খুঁজব।

অন্যদিকে শান্তাও বাবার কাছ থেকে পুরোনো কাগজপত্র সংগ্রহ করছিল।

হঠাৎ একটা পুরোনো ডায়েরি তার হাতে এল।

ডায়েরিটা ছিল তার বাবার।

পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটা জায়গায় এসে শান্তা থেমে গেল।

সেখানে লেখা—

“রাশেদকে বিশ্বাস করার ভুল করেছি। হিসাবের টাকা হারানোর আগের দিন সে অফিসে একা ছিল।”

শান্তার বুক ধক করে উঠল।

সে সঙ্গে সঙ্গে বাবার কাছে গেল।

—বাবা, তুমি এটা আগে জানতেই?

বাবা ডায়েরির পাতার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু কোনো প্রমাণ ছিল না।

—তাহলে এতদিন আমাকে বলোনি কেন?

—আমি চাইনি তোর জীবনে এসব আসুক।

শান্তা বলল,

—কিন্তু এসবের জন্যই তো আমাদের জীবন এত বছর আলাদা ছিল।

বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বললেন না।

সন্ধ্যায় নাহিদ আর শান্তা একটা পার্কে দেখা করল।

শান্তার হাতে ডায়েরির কপি।

নাহিদের হাতে পুরোনো হিসাবের কাগজ।

নাহিদ বলল,

—দেখছি আমাদের দুজনের কাছেই কিছু না কিছু প্রমাণ আছে।

শান্তা বলল,

—কিন্তু এখনও যথেষ্ট নয়।

—হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে বসে রইল।

শান্তা ধীরে বলল,

—নাহিদ, তুমি কি কখনো ভেবেছিলে আমরা আবার এভাবে একসঙ্গে বসব?

নাহিদ হেসে বলল,

—না।

—আমি ছোটবেলায় ভাবতাম, তুমি একদিন ফিরে আসবে।

—আর আমি ভাবতাম, তুই আমাকে ভুলে গেছিস।

শান্তা মৃদু হেসে বলল,

—আমি তো ভুলিনি।

নাহিদ তার দিকে তাকাল।

—আমিও না।

দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ নীরবতা।

শান্তা ধীরে বলল,

—আমাদের সম্পর্কটা কি শুধু পুরোনো বন্ধুত্ব?

নাহিদ উত্তর দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ ভাবল।

—আমি জানি না।

—তুমি কি জানতে চাও?

নাহিদ শান্তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—হ্যাঁ।

শান্তা কিছু বলল না।

তার মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।

নাহিদও হেসে ফেলল।

কিন্তু সেই মুহূর্তটা বেশি সময় স্থায়ী হলো না।

হঠাৎ শান্তার ফোনে একটা মেসেজ এল।

“রাশেদের বিরুদ্ধে প্রমাণ খুঁজছ? সাবধান। তোমাদের খুব কাছের একজন তোমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।”

শান্তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—কী হয়েছে?

সে ফোনটা নাহিদের হাতে দিল।

নাহিদ মেসেজটা পড়ে বলল,

—কেউ আমাদের ভয় দেখাতে চাইছে।

শান্তা বলল,

—কিন্তু যদি সত্যিই আমাদের কাছের কেউ...

নাহিদ বলল,

—আমরা কাউকে সন্দেহ করব না প্রমাণ ছাড়া।

পরদিন কলেজে নাহিদ লক্ষ্য করল, তাদের অ্যাসাইনমেন্টের কিছু কাগজ নেই।

সে ব্যাগ খুলে অবাক হয়ে গেল।

শান্তাও নিজের ব্যাগ পরীক্ষা করল।

—আমার ডায়েরির কপিটা নেই!

নাহিদ বলল,

—কেউ নিয়েছে।

—কিন্তু কে?

দুজন একে অপরের দিকে তাকাল।

ঠিক তখন মিতু তাদের কাছে এসে বলল,

—তোমরা এত চিন্তিত কেন?

শান্তা বলল,

—আমার কিছু কাগজ হারিয়ে গেছে।

মিতু বলল,

—আমি তো কাল তোমাদের ব্যাগের কাছে যাইনি।

নাহিদ অবাক হয়ে বলল,

—তুমি এমন কথা বলছ কেন? আমরা তো তোমাকে কিছু জিজ্ঞেসই করিনি।

মিতু থেমে গেল।

তার মুখের রং বদলে গেল।

—আমি... মানে...

নাহিদ শান্তভাবে বলল,

—মিতু, তুমি কি কিছু জানো?

মিতু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমি তোমাদের একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।

শান্তা বলল,

—কী কথা?

মিতু চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

—গতকাল রাতে আমি রাশেদ চাচাকে তোমাদের কলেজের সামনে দেখেছি।

নাহিদ চমকে উঠল।

—কী?

—হ্যাঁ। তিনি একা ছিলেন না।

শান্তা জিজ্ঞেস করল,

—কার সঙ্গে?

মিতু ধীরে বলল,

—একজন লোকের সঙ্গে। আর সেই লোকটাকে আমি আগে কোথাও দেখেছি।

নাহিদ বলল,

—কোথায়?

মিতু উত্তর দিল,

—তোমাদের সেই গুদামঘরে।

শান্তা আর নাহিদ দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেল।

মিতু বলল,

—আমার মনে হয়, সে লোকটাই কামাল।

সেদিন রাতেই নাহিদের ফোনে একটা ছবি এল।

ছবিতে রাশেদ এবং কামাল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

ছবিটা দেখে নাহিদ বুঝল—

মিতু সত্যিই মিথ্যা বলেনি।

কিন্তু ছবির নিচে লেখা ছিল আরও ভয়ংকর একটা কথা—

“রাশেদকে ধরতে গেলে তোমাদের নিজেদের ঘরের একজনের সত্যিও প্রকাশ পাবে।”

নাহিদ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

শান্তা পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

—আমাদের ঘরের একজন?

নাহিদ ধীরে মাথা তুলল।

—হ্যাঁ।

—কে?

নাহিদ কোনো উত্তর দিতে পারল না।

কারণ তার মাথায় হঠাৎ একটা সন্দেহ জেগে উঠেছে।

আর সেই সন্দেহ যদি সত্যি হয়, তাহলে এতদিন যাকে তারা নিজেদের সবচেয়ে কাছের মানুষ মনে করেছে, সেই মানুষই হয়তো রাশেদের সঙ্গে জড়িত।

নাহিদের হাতে ধরা ফোনটা কাঁপছিল।

স্ক্রিনে তখনও সেই ছবিটা দেখা যাচ্ছে—রাশেদ আর কামাল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

শান্তা ধীরে বলল,

—তুমি কাকে সন্দেহ করছ?

নাহিদ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।

তার মাথায় একের পর এক নাম আসছিল।

কিন্তু সে কাউকে প্রমাণ ছাড়া সন্দেহ করতে চায় না।

—আমি জানি না।

শান্তা বলল,

—তাহলে আমরা কী করব?

নাহিদ দৃঢ় গলায় বলল,

—প্রথমে ছবিটা কে পাঠিয়েছে, সেটা বের করব।

ঠিক তখনই আবার ফোনে মেসেজ এল।

“যাকে খুঁজছ, সে তোমাদের খুব কাছেই আছে। আগামীকাল দুপুরে পুরোনো অফিসে এসো।”

নাহিদ মেসেজটা শান্তাকে দেখাল।

শান্তা বলল,

—এটা কি ফাঁদ?

—হতে পারে।

—তবু যাবে?

—হ্যাঁ। কারণ সত্যিটা এবার সামনে আনতেই হবে।

পরদিন দুপুরে নাহিদ আর শান্তা পুরোনো অফিসের সামনে পৌঁছাল।

বহু বছর ধরে অফিসটি বন্ধ। দরজায় ধুলো জমে আছে।

নাহিদ চারপাশে তাকিয়ে বলল,

—কেউ নেই।

শান্তা বলল,

—তাহলে মেসেজটা কে পাঠাল?

দুজন ভেতরে ঢুকল।

অফিসের ভেতরে পুরোনো টেবিল, চেয়ার আর ফাইলের আলমারি পড়ে আছে।

হঠাৎ পাশের ঘর থেকে শব্দ হলো।

নাহিদ দ্রুত সেখানে গেল।

একজন মানুষ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

নাহিদ তাকে দেখে থমকে গেল।

—মাহবুব চাচা!

মাহবুব চাচা ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন।

—তোমরা এসেছ।

শান্তা বলল,

—আপনি আমাদের এখানে ডেকেছেন?

—হ্যাঁ।

নাহিদ বলল,

—কেন?

মাহবুব চাচা একটা ফাইল এগিয়ে দিলেন।

—এখানে রাশেদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ আছে।

নাহিদ ফাইলটা খুলে দেখল।

ভেতরে কয়েকটি ব্যাংক লেনদেনের কাগজ, পুরোনো হিসাব আর রাশেদের স্বাক্ষর।

শান্তা অবাক হয়ে বলল,

—এগুলো কোথায় পেলেন?

—কামালের কাছ থেকে।

নাহিদ চমকে উঠল।

—কামাল কোথায়?

মাহবুব চাচা বললেন,

—সে এখন আর রাশেদের সঙ্গে নেই।

—তাহলে?

—কামাল বুঝতে পেরেছে, এত বছর ধরে সে ভুল কাজ করেছে। তাই সব সত্য প্রকাশ করতে চায়।

নাহিদ বলল,

—তাহলে তাকে এখানে আনুন।

মাহবুব চাচা মাথা নেড়ে বললেন,

—সে আসবে। তবে আগে তোমাদের একটা কথা জানতে হবে।

তিনি ধীরে বললেন,

—রাশেদ শুধু ব্যবসার টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করেনি। সে দুই পরিবারকে আলাদা করার জন্য ইচ্ছা করেই মিথ্যা প্রমাণ তৈরি করেছিল।

শান্তা বলল,

—কিন্তু আমাদের পরিবারকে আলাদা করার সঙ্গে আমাদের ছোটবেলার সম্পর্কের কী সম্পর্ক?

মাহবুব চাচা বললেন,

—রাশেদ জানত, তোমাদের পরিবার আবার এক হলে পুরোনো ব্যবসার হিসাব খোলা হবে। তাই সে চেয়েছিল, তোমাদের দুই পরিবার যেন আর কখনো কাছাকাছি না আসে।

নাহিদ বলল,

—তাহলে আমাদের আলাদা করে রাখার পেছনেও রাশেদের হাত ছিল।

—হ্যাঁ।

শান্তা চোখ মুছে বলল,

—একজন মানুষের কারণে এতগুলো বছর...

মাহবুব চাচা চুপ করে রইলেন।

হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

মাহবুব চাচা দ্রুত জানালার দিকে তাকালেন।

—ওরা এসে গেছে।

নাহিদ বলল,

—রাশেদ?

—হ্যাঁ।

শান্তা ভয় পেলেও নিজেকে সামলে নিল।

নাহিদ বলল,

—আমরা পালাব না।

মাহবুব চাচা বললেন,

—তোমরা পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও।

নাহিদ মাথা নেড়ে বলল,

—না। এতদিন আমরা পালিয়েছি। এবার সত্যের সামনে দাঁড়াব।

কিছুক্ষণ পর সামনের দরজা খুলে গেল।

রাশেদ ভেতরে ঢুকল।

তার সঙ্গে কামালও ছিল।

শান্তা অবাক হয়ে কামালের দিকে তাকাল।

—আপনি?

কামাল মাথা নিচু করে বলল,

—আমি অনেক ভুল করেছি।

রাশেদ রাগী গলায় বলল,

—কামাল, তুমি এখানে কেন?

কামাল এবার সাহস করে বলল,

—আর আপনার কথা শুনব না।

রাশেদ থমকে গেল।

নাহিদ বলল,

—তাহলে সব সত্যি?

কামাল মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ।

—টাকার হিসাব আপনি বদলাতে বলেছিলেন?

কামাল বলল,

—হ্যাঁ।

রাশেদ চিৎকার করে বলল,

—মিথ্যা!

কামাল বলল,

—আমার কাছে প্রমাণ আছে।

সে একটা ছোট রেকর্ডার বের করল।

—আপনার সঙ্গে আমার আগের কথোপকথনের রেকর্ড আছে।

রাশেদের মুখের রং বদলে গেল।

নাহিদ শান্তার দিকে তাকাল।

এতদিনের রহস্যের শেষ অধ্যায় যেন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

কামাল রেকর্ডারটা চালু করল।

রাশেদের নিজের কণ্ঠ শোনা গেল।

সে স্বীকার করছিল, কীভাবে হিসাবের কাগজ সরাতে বলেছিল এবং দুই পরিবারের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করেছিল।

শান্তার চোখে পানি চলে এল।

রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমি যা করেছি, ব্যবসার জন্য করেছি।

নাহিদ কঠিন গলায় বলল,

—ব্যবসার জন্য মানুষের পরিবার ভেঙে দিতে হয়?

রাশেদ কোনো উত্তর দিতে পারল না।

মাহবুব চাচা বললেন,

—তোমার জন্য দুই বন্ধু আলাদা হয়েছে। তাদের সন্তানরা বছরের পর বছর একে অপরের থেকে দূরে ছিল।

রাশেদ মাথা নিচু করল।

ঠিক তখন শান্তার বাবা সেখানে এসে পৌঁছালেন।

তার সঙ্গে নাহিদের বাবাও ছিলেন।

শান্তার বাবা রাশেদের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—আমি তোকে নিজের ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করেছিলাম।

রাশেদ কিছু বলল না।

নাহিদের বাবা বললেন,

—একটা মিথ্যার জন্য আমাদের এত বছর নষ্ট হয়েছে।

রাশেদ ধীরে বলল,

—আমি ভুল করেছি।

শান্তা বলল,

—আপনার ভুলের জন্য শুধু ব্যবসার ক্ষতি হয়নি। আমাদের শৈশবও নষ্ট হয়েছে।

রাশেদ এবার মাথা নিচু করল।

সব সত্য প্রকাশ পাওয়ার পর দুই পরিবার আবার একসঙ্গে হলো।

নাহিদের বাবা শান্তার বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—এবার আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি যেন আমাদের আলাদা করতে না পারে।

শান্তার বাবা হাসলেন।

—আর হবে না।

নাহিদ আর শান্তা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

নাহিদ বলল,

—তাহলে আমাদের যুদ্ধ শেষ?

শান্তা মৃদু হেসে বলল,

—মনে হয়।

—তুই খুশি?

—হ্যাঁ।

—শুধু সত্যি বের হওয়ার জন্য?

শান্তা কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,

—না। তোমাকে আবার ফিরে পাওয়ার জন্যও।

নাহিদ তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

—আমিও।

কয়েকদিন পর কলেজে তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরে এল।

অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়া হলো।

সবাই ব্যস্ত নিজের কাজে।

এক বিকেলে কলেজের সেই কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে নাহিদ আর শান্তা বসেছিল।

শান্তা বলল,

—মনে আছে, ছোটবেলায় তুমি বলেছিলে আমাকে কখনো ভুলবে না?

নাহিদ হেসে বলল,

—মনে আছে।

—তাহলে এত বছর ভুলে গেলে কীভাবে?

—ভুলিনি। শুধু স্মৃতিটা হারিয়ে গিয়েছিল।

শান্তা মৃদু হেসে বলল,

—এখন?

নাহিদ শান্তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—এখন সব মনে আছে।

শান্তা মাথা নিচু করল।

কিছুক্ষণ পর নাহিদ বলল,

—শান্তা, একটা কথা বলব?

—বলো।

—ছোটবেলার বন্ধুত্বটা আমি হারাতে চাই না।

শান্তা বলল,

—আমিও না।

নাহিদ একটু থেমে বলল,

—তবে আমি চাই, আমাদের সম্পর্কটা শুধু বন্ধুত্বের মধ্যে না থাকুক।

শান্তা চুপ করে রইল।

তার চোখে মৃদু হাসি।

সে ধীরে বলল,

—আমি অনেক আগেই সেই উত্তরটা জানতাম।

নাহিদ অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে এতদিন বলোনি কেন?

—তোমার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম।

দুজনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

ঠিক তখন মিতু দূর থেকে চিৎকার করে বলল,

—এই যে! তোমরা দুজন আবার কী নিয়ে এত গোপন কথা বলছ?

শান্তা হেসে উঠে দাঁড়াল।

নাহিদও উঠে পড়ল।

তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শেষ হয়েছে।

কয়েকদিন আগেও নাহিদ আর শান্তার জীবন ছিল নানা প্রশ্ন আর দুশ্চিন্তায় ভরা।

কিন্তু এখন সবকিছু অনেকটাই বদলে গেছে।

রাশেদের ষড়যন্ত্রের সত্য প্রকাশ পেয়েছে। নাহিদের বাবা ও শান্তার বাবার মধ্যকার বহু বছরের ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে। দুই পরিবার আবার আগের মতো একে অপরের কাছাকাছি এসেছে।

তবুও নাহিদের মনে একটা প্রশ্ন ছিল।

শান্তার বাবা কি তাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন?

যদিও তিনি আর নাহিদের পরিবারের ওপর রাগ করে নেই, তবুও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার নিজের কিছু চিন্তা থাকতেই পারে।

সেদিন বিকেলে নাহিদ বাড়ির বারান্দায় বসে ছিল।

তার বাবা পাশে এসে বসলেন।

—কী ভাবছিস?

নাহিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—বাবা, একটা কথা বলব?

—বল।

—শান্তাকে আমি বিয়ে করতে চাই।

বাবা মৃদু হাসলেন।

—আমি জানি।

নাহিদ অবাক হয়ে তাকাল।

—কীভাবে?

—বাবা-মায়েরা অনেক কিছুই বুঝতে পারে।

নাহিদ একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

—কিন্তু ওর বাবা যদি রাজি না হন?

বাবা বললেন,

—এবার সিদ্ধান্তটা শুধু আমাদের নয়। ওর বাবার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

নাহিদ মাথা নেড়ে বলল,

—আমি নিজে কথা বলতে চাই।

—ঠিক আছে। তবে সম্মান দিয়ে কথা বলবি।

—অবশ্যই।

অন্যদিকে শান্তাও নিজের মায়ের সঙ্গে কথা বলছিল।

—মা, বাবা কি নাহিদকে পছন্দ করেন?

মা হেসে বললেন,

—তুই কেন এমন প্রশ্ন করছিস?

—এমনিই।

—তোর বাবাকে আমি যতদিন চিনি, তাতে একটা কথা বলতে পারি।

—কী?

—সে রাগী হতে পারে, কিন্তু অন্যায় বোঝার পর ভুল স্বীকার করতেও জানে।

শান্তা মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে আমি আশা করতে পারি?

মা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তুই যদি নিজের সিদ্ধান্তে খুশি থাকিস, তাহলে তোর বাবা শেষ পর্যন্ত তোর কথাই শুনবে।

শান্তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

পরদিন সন্ধ্যায় দুই পরিবার একসঙ্গে বসেছিল।

একসময় যে দুই পরিবার একে অপরের সঙ্গে কথা বলত না, আজ একই টেবিলে বসে হাসি-আড্ডা দিচ্ছে।

শান্তার বাবা নাহিদের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—ভাবতে পারিনি, এত বছর পর আবার এভাবে একসঙ্গে বসব।

নাহিদের বাবা হেসে বললেন,

—আমিও ভাবিনি।

কিছুক্ষণ পর নাহিদ উঠে দাঁড়াল।

—চাচা, আপনার সঙ্গে একটা কথা আছে।

শান্তার বাবা বললেন,

—বলো।

নাহিদ শান্ত গলায় বলল,

—আমি শান্তাকে পছন্দ করি।

ঘরে হঠাৎ নীরবতা নেমে এল।

শান্তা মাথা নিচু করে বসে ছিল।

নাহিদ আবার বলল,

—আমরা ছোটবেলার বন্ধু। এত বছর পর আবার দেখা হয়েছে। আমি জানি, আমাদের পরিবার নিয়ে অনেক সমস্যা ছিল। কিন্তু এখন সবকিছু পরিষ্কার। আমি চাই, শান্তা আমার জীবনের সঙ্গী হোক।

শান্তার বাবা কিছুক্ষণ নাহিদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—তুই কি সত্যিই শান্তাকে বুঝতে পারিস?

নাহিদ হেসে বলল,

—ছোটবেলা থেকেই চেষ্টা করছি।

ঘরে হালকা হাসির পরিবেশ তৈরি হলো।

শান্তার বাবা আবার বললেন,

—শান্তা, তুই কী চাস?

সবাই শান্তার দিকে তাকাল।

শান্তা ধীরে মাথা তুলে বলল,

—আমি নাহিদের সঙ্গে থাকতে চাই।

তার বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কিছুক্ষণ পর তার মুখে হাসি ফুটল।

—তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই।

শান্তা অবাক হয়ে বলল,

—সত্যি?

—হ্যাঁ। তবে একটা শর্ত আছে।

নাহিদ বলল,

—কী শর্ত?

—তোমরা দুজন আগে নিজেদের পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ ঠিক করবে। জীবনের সিদ্ধান্ত শুধু আবেগ দিয়ে নেওয়া যায় না।

নাহিদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—আমি রাজি।

শান্তাও মাথা নেড়ে বলল,

—আমিও।

সময় এগিয়ে গেল।

নাহিদ নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি একটা চাকরির প্রস্তুতি নিতে শুরু করল।

শান্তাও পড়াশোনায় মন দিল।

তাদের সম্পর্ক নিয়ে দুই পরিবারেও আর কোনো আপত্তি রইল না।

বরং আগের মতোই দুই পরিবারের মধ্যে যাতায়াত শুরু হলো।

একদিন শান্তা পুরোনো গ্রামের বাড়িতে গেল।

বাড়ির পেছনে সেই পুকুর।

সেই কৃষ্ণচূড়া গাছ।

সবকিছু যেন আগের মতোই আছে।

শান্তা গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে পুরোনো দিনের কথা ভাবছিল।

হঠাৎ পেছন থেকে নাহিদের কণ্ঠ—

—এখানে একা দাঁড়িয়ে কী করছিস?

শান্তা ফিরে তাকিয়ে হাসল।

—পুরোনো কথা মনে করছিলাম।

নাহিদ পাশে এসে দাঁড়াল।

—আমাদের ছোটবেলার কথা?

—হ্যাঁ।

—মনে আছে, তুই একবার বলেছিলি, আমি শহরে চলে গেলে তোকে ভুলে যাব?

শান্তা হেসে বলল,

—তুমি তো সত্যিই অনেক বছর হারিয়ে গিয়েছিলে।

—কিন্তু ফিরে তো এসেছি।

শান্তা বলল,

—হ্যাঁ। এবার আর হারিয়ে যেও না।

নাহিদ মৃদু হেসে বলল,

—এবার আর কোথাও যাব না।

কিছুদিন পর তাদের বিয়ের আয়োজন শুরু হলো।

বাড়িতে ব্যস্ততা বেড়ে গেল।

আত্মীয়স্বজন আসতে শুরু করল।

মিতু তো শান্তাকে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়ছে না।

—বল তো, ছোটবেলার সেই ছেলেটাই শেষ পর্যন্ত বর হয়ে গেল!

শান্তা হেসে বলল,

—তুই এখনো এসব নিয়ে মজা করছিস?

—মজা না করে কী করব? তোর গল্প তো সিনেমার মতো!

শান্তা হেসে ফেলল।

অন্যদিকে নাহিদের বন্ধুরাও তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছিল।

—ভাই, এত বছর পর পুরোনো বন্ধুকেই বিয়ে করছিস!

নাহিদ বলল,

—কিছু মানুষকে হারিয়ে ফেললেও ভাগ্য একদিন আবার ফিরিয়ে দেয়।

বিয়ের দিন সকাল থেকেই বাড়ি উৎসবের মতো সাজানো হলো।

শান্তা লাল শাড়ি পরে আয়নার সামনে বসে ছিল।

তার চোখে আনন্দের ঝিলিক।

মা এসে বললেন,

—কী ভাবছিস?

শান্তা মৃদু হেসে বলল,

—ভাবছি, ছোটবেলায় যে ছেলেটাকে বিদায় দিয়েছিলাম, আজ তার সঙ্গেই নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি।

মা বললেন,

—জীবন কখনো কখনো সত্যিই অদ্ভুতভাবে গল্প লিখে।

অন্যদিকে নাহিদও প্রস্তুত।

বিয়ের আসরে বসে সে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।

অবশেষে শান্তা এলো।

নাহিদের চোখে আনন্দ ফুটে উঠল।

তাদের চোখে চোখ পড়ল।

দুজনের মুখেই হাসি।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো।

দুই পরিবারের মানুষ একসঙ্গে আনন্দ করল।

নাহিদের বাবা শান্তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

—আমাদের হারানো বন্ধুত্ব এবার সত্যিই ফিরে পেলাম।

শান্তার বাবা বললেন,

—আর আমাদের সন্তানরা আমাদের সেই ভুলের শেষটাও সুন্দর করে দিল।

রাতের শেষ দিকে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল নাহিদ আর শান্তা।

চারপাশে নীরবতা।

আকাশে অসংখ্য তারা।

শান্তা বলল,

—নাহিদ।

—হুম?

—একটা কথা বলব?

—বলো।

—ছোটবেলায় তুমি বলেছিলে, আমাকে কখনো ভুলবে না।

—হ্যাঁ।

—আজও কি সেই কথা মনে আছে?

নাহিদ হেসে বলল,

—শুধু মনে নেই, আজ সেটা সত্যি করার দায়িত্বও নিয়েছি।

শান্তা মৃদু হেসে বলল,

—আমিও।

কিছুক্ষণ দুজন নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।

তাদের গল্প শুরু হয়েছিল ছোটবেলার বন্ধুত্ব দিয়ে।

তারপর এসেছিল বিচ্ছেদ, ভুল বোঝাবুঝি, পারিবারিক বিরোধ আর বহু বছরের অপেক্ষা।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্য সব ভুল দূর করে দিয়েছিল।

নাহিদ হারিয়ে যাওয়া শৈশবের বন্ধুকে আবার খুঁজে পেয়েছিল।

আর শান্তা ফিরে পেয়েছিল সেই মানুষটিকে, যার সঙ্গে ছোটবেলায় ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা না থাকলেও মনে মনে একটা বিশ্বাস ছিল—

একদিন সে আবার ফিরে আসবে।

সেই অপেক্ষার শেষ হয়েছিল।

দুই পরিবারের পুরোনো বন্ধুত্ব ফিরে এসেছিল।

আর নাহিদ-শান্তার শৈশবের সম্পর্ক পেয়েছিল নতুন এক পরিচয়।

....
👁 183