ঢাকার ব্যস্ত শহরটা সেদিন অন্য দিনের মতোই ছুটে চলছিল। রাস্তায় গাড়ির শব্দ, মানুষের ব্যস্ততা, ফুটপাতে চায়ের দোকানের ভিড়—সব মিলিয়ে শহর যেন এক মুহূর্তের জন্যও থামতে জানে না।
সেই ব্যস্ততার মাঝেই গুলশানের একটি ক্যাফের জানালার পাশে বসে ছিল আকাশ।
বয়স ছাব্বিশ। শান্ত স্বভাবের ছেলে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করে। খুব বেশি আড্ডা দেওয়া কিংবা অকারণে কারও সঙ্গে মিশে বেড়ানো তার স্বভাবে নেই।
কিন্তু আজ অফিসের কাজেও তার মন বসছিল না।
কারণ আগামী মাসেই তার বিয়ে।
বিয়েটা পরিবারের পছন্দে হচ্ছে। মেয়েটির নাম মেহরিন। সুন্দর, ভদ্র, শিক্ষিত—সবদিক থেকেই ভালো মেয়ে। আকাশের মা-বাবাও তাকে খুব পছন্দ করেন।
আকাশও আপত্তি করেনি।
বরং সে মনে মনে ভাবত, মেহরিনকে বিয়ে করলে জীবনটা হয়তো সুন্দরভাবেই কেটে যাবে।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
—হ্যালো?
ওপাশ থেকে তার ছোট বোন তুলি বলল,
—ভাইয়া, কোথায় তুমি?
—ক্যাফেতে। কেন?
—আজ কিন্তু সন্ধ্যায় বাসায় তাড়াতাড়ি আসবে। মেহরিন আপুর পরিবার আসবে।
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—হ্যাঁ, মনে আছে।
—মনে আছে মানে? তোমার নিজের বিয়ে!
—জানি তো।
—তোমার গলায় এমন ভাব কেন, যেন তোমাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে!
আকাশ হেসে ফেলল।
—তুই বেশি বুঝিস।
—আমি কিন্তু সব বুঝি। তুই মেহরিন আপুকে পছন্দ করিস তো?
আকাশ একটু চুপ করে বলল,
—ভালো মেয়ে।
—এটা তো জিজ্ঞেস করিনি। পছন্দ করিস?
আকাশ উত্তর দেওয়ার আগেই ফোন কেটে গেল।
সে ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে জানালার বাইরে তাকাল।
ঠিক তখনই রাস্তার ওপাশে তার চোখ আটকে গেল।
একজন মেয়ে দ্রুত হাঁটছে।
পরনে হালকা নীল সালোয়ার-কামিজ। কাঁধে একটা ব্যাগ। চুলগুলো এলোমেলো। হাতে কয়েকটা কাগজ।
মেয়েটা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ নিজের ব্যাগ খুলে ফেলল।
তারপর ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে কী যেন খুঁজতে লাগল।
আকাশ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটা কিছু একটা বের করে আকাশের দিকে তাকাল।
তারপর হঠাৎ চিৎকার করে বলল,
—এই যে! আপনি!
আকাশ চারপাশে তাকাল।
নিজেকেই দেখাচ্ছে মেয়েটা।
সে ভ্রু কুঁচকে বাইরে গেল।
—আমাকে ডাকছেন?
মেয়েটা দৌড়ে এসে বলল,
—হ্যাঁ, আপনাকেই।
—কেন?
মেয়েটা হাতে থাকা একটা কাগজ তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
—এটা ধরুন।
আকাশ কাগজটা নিল।
—কী এটা?
—আপনার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস।
আকাশ কাগজটা খুলে দেখল।
ভেতরে একটা ঠিকানা লেখা।
—এটা কী?
মেয়েটা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
—আমার বাসার ঠিকানা।
আকাশ হতভম্ব।
—আপনার বাসার ঠিকানা আমাকে কেন দিচ্ছেন?
মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
—কারণ আমি ভুল করে আপনার গাড়িতে উঠে পড়েছিলাম।
আকাশ আরও অবাক।
—কী?
—পাঁচ মিনিট আগে।
—আমি তো গাড়ি নিয়ে আসিনি!
মেয়েটা থমকে গেল।
আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তাহলে আপনি কে?
—সেটা তো আমিও ভাবছি!
মেয়েটা কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ হেসে ফেলল।
—আচ্ছা, তাহলে ভুল হয়েছে।
সে কাগজটা আকাশের হাত থেকে নিয়ে নিল।
তারপর চলে যেতে শুরু করল।
আকাশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটা কয়েক পা যাওয়ার পর আবার ফিরে এল।
—আপনার নাম কী?
আকাশ বলল,
—আকাশ।
—আকাশ?
—হ্যাঁ।
মেয়েটা মুচকি হাসল।
—আমি দিয়া।
এই প্রথম আকাশ মেয়েটার নাম জানল।
দিয়া।
নামটার মতোই অদ্ভুত মেয়েটাও।
আকাশ কিছু বলার আগেই দিয়া আবার চলে গেল।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই সে আবার ফিরে এল।
—একটা কথা বলব?
—বলুন।
—আপনাকে খুব সিরিয়াস দেখায়।
আকাশ অবাক হয়ে বলল,
—তাতে কী হয়েছে?
—কিছু না। শুধু মনে হলো আপনার হাসা দরকার।
আকাশ কিছু বলার আগেই দিয়া হেসে দৌড়ে রাস্তার ওপারে চলে গেল।
আকাশ অনেকক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আকাশ দেখল, সবাই ব্যস্ত।
ড্রয়িংরুমে মেহরিনের পরিবার বসে আছে।
মেহরিনের বাবা-মা, ছোট ভাই—সবাই এসেছে।
আকাশ সালাম দিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলল।
মেহরিন শান্তভাবে বসে ছিল।
তুলি পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছিল।
আকাশ চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করল,
—কী?
তুলি ফিসফিস করে বলল,
—তুই হাসছিস কেন?
—আমি হাসছি?
—হ্যাঁ।
আকাশ বুঝতে পারল, সত্যিই সে হাসছে।
কিন্তু কেন?
তার নিজেরও জানা নেই।
কিছুক্ষণ পর মেহরিনের সঙ্গে একা কথা বলার সুযোগ হলো।
মেহরিন বলল,
—বিয়ের ব্যাপারে তোমার কোনো আপত্তি আছে?
আকাশ মাথা নাড়ল।
—না।
—তাহলে এত চুপচাপ কেন?
আকাশ একটু ভেবে বলল,
—আমি একটু কম কথা বলি।
মেহরিন মৃদু হাসল।
—জানি।
দুজনেই চুপ করে রইল।
সবকিছু স্বাভাবিক ছিল।
তবু আকাশের মাথায় বারবার অন্য একজনের কথা আসছিল।
নীল পোশাক পরা সেই অদ্ভুত মেয়েটা।
দিয়া।
কেন জানি তার বলা একটা কথা বারবার মনে পড়ছিল—
"আপনাকে খুব সিরিয়াস দেখায়। আপনার হাসা দরকার।"
আকাশ নিজের ওপরই বিরক্ত হলো।
মাত্র কয়েক মিনিটের পরিচয়।
তারপরও কেন মেয়েটাকে মনে পড়ছে?
পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় আকাশ গাড়ি নিয়ে বের হলো।
রাস্তার মোড়ে এসে হঠাৎ সে দেখল—
দিয়া!
মেয়েটা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে একটা ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে তর্ক করছে।
—আমি বলেছি তোমাকে পাঁচটা চকলেট দেব না!
ছেলেটা বলল,
—তাহলে তিনটা দেন।
দিয়া মাথায় হাত দিয়ে বলল,
—তুমি তো খুব চালাক!
আকাশ গাড়ি থামিয়ে ফেলল।
দিয়া তাকে দেখে প্রথমে অবাক হলো।
তারপর হাসল।
—ওহ! সিরিয়াস সাহেব!
আকাশ গাড়ির জানালা নামিয়ে বলল,
—আপনি আমাকে চিনেছেন?
—অবশ্যই।
—কীভাবে?
—আপনার মুখ ভুলে যাওয়ার মতো না।
আকাশ একটু লজ্জা পেল।
দিয়া বলল,
—কোথায় যাচ্ছেন?
—অফিসে।
—আমিও যাব।
আকাশ অবাক হয়ে বলল,
—আপনি আমার সঙ্গে যাবেন?
—না, আপনার অফিসে যাব না। রাস্তার ওই পাশে আমার কাজ আছে।
আকাশ মাথা নাড়ল।
দিয়া হেসে বলল,
—আপনি সব কথা এত সিরিয়াসভাবে নেন কেন?
আকাশ বলল,
—আপনি সব কথা এত অদ্ভুতভাবে বলেন কেন?
দিয়া কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল।
—আপনি আস্তে আস্তে শিখছেন।
—কী?
—আমার সঙ্গে কথা বলা।
আকাশ কিছু বলতে পারল না।
দিয়া রাস্তা পার হয়ে চলে গেল।
গাড়ি চালু করেও আকাশের মুখে হাসি রয়ে গেল।
পরদিন সকাল থেকেই আকাশের মনটা কেমন অস্থির হয়ে ছিল।
অফিসে বসে কম্পিউটারের সামনে কাজ করছিল সে। সামনে গুরুত্বপূর্ণ একটা রিপোর্ট। দুপুরের মধ্যে সেটা শেষ করে বসকে দিতে হবে। অথচ বারবার তার মন অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।
গত দুই দিনে দুবার দেখা হয়েছে দিয়ার সঙ্গে।
মেয়েটার সঙ্গে তার পরিচয় মোটে কয়েক ঘণ্টার। তবু কেন যেন দিয়ার হাসিটা বারবার মনে পড়ছে।
আকাশ নিজেকেই বোঝাল,
—এটা কিছু না। মেয়েটা একটু অদ্ভুত, তাই মনে আছে।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
মেহরিন ফোন করেছে।
—হ্যালো?
—কী করছ?
—অফিসে।
—আজ সন্ধ্যায় একটু সময় হবে?
—হ্যাঁ, কেন?
—বিয়ের কিছু কেনাকাটা করতে হবে। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
আকাশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
—ঠিক আছে।
ফোন রাখার পর সে আবার কাজে মন দিল।
কিন্তু পাঁচ মিনিটও যায়নি।
তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
“সিরিয়াস সাহেব, আজও কি হাসেননি?”
আকাশ চমকে উঠল।
নাম্বারটা অপরিচিত।
সে লিখল,
“আপনি কে?”
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল,
“যে আপনার হাসি ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে।”
আকাশ বুঝে গেল।
দিয়া।
সে অবাক হয়ে লিখল,
“আমার নাম্বার পেলেন কোথায়?”
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর নেই।
তারপর—
“আপনার অফিসের সামনে যে চায়ের দোকান আছে, সেখানে আপনার এক সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।”
আকাশ কপালে হাত দিল।
“আপনি সত্যিই অদ্ভুত।”
উত্তর এল—
“ধন্যবাদ। সবাই এটা বলে।”
আকাশের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল।
সন্ধ্যায় আকাশ মেহরিনের সঙ্গে দেখা করতে গেল।
একটি শপিং মলে তারা পাশাপাশি হাঁটছিল।
মেহরিন শাড়ি দেখছিল। আকাশ তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
—এইটা কেমন?
মেহরিন একটা হালকা গোলাপি শাড়ি দেখাল।
আকাশ বলল,
—ভালো।
—শুধু ভালো?
—খুব ভালো।
মেহরিন হেসে বলল,
—তোমাকে দিয়ে কেনাকাটা করানো খুব কঠিন।
আকাশও হাসল।
—আমি এসব বুঝি না।
মেহরিন বলল,
—তাহলে বিয়ের পর আমাকে সব একাই করতে হবে?
আকাশ মজা করে বলল,
—না। তখন তুমি আমাকে শিখিয়ে দিও।
মেহরিন হেসে ফেলল।
সবকিছু স্বাভাবিক।
তবু আকাশের মনে হলো, কোথাও যেন একটা অদৃশ্য ফাঁকা জায়গা আছে।
সে জানে না সেই জায়গাটা কী দিয়ে পূরণ হবে।
পরদিন অফিস ছুটির পর আকাশ গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছিল।
হঠাৎ তার চোখে পড়ল, রাস্তার পাশে দিয়া দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে একটা কাগজের ব্যাগ।
আকাশ গাড়ি থামিয়ে জানালা নামাল।
—কোথায় যাবেন?
দিয়া ভ্রু তুলে বলল,
—আপনি আমাকে লিফট দেবেন?
—হ্যাঁ।
—আপনার মতো সিরিয়াস মানুষের গাড়িতে উঠলে আমার ভয় লাগতে পারে।
আকাশ বলল,
—তাহলে উঠবেন না।
দিয়া সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে উঠে বসল।
—চলুন।
আকাশ হেসে ফেলল।
—আপনি খুব সুবিধাবাদী।
—আমি বুদ্ধিমান।
—দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে।
—আপনি সেটা বুঝবেন না।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর দিয়া বলল,
—আপনি কি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন?
—হ্যাঁ।
—বন্ধু নেই?
—আছে।
—অনেক?
—না।
—তাহলে আমি একজন হতে পারি?
আকাশ অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
দিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—মানে বন্ধু।
আকাশ হেসে বলল,
—হতে পারেন।
দিয়া হাত বাড়িয়ে দিল।
—তাহলে আজ থেকে আমরা বন্ধু।
আকাশ তার বাড়ানো হাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—ঠিক আছে।
দিয়া বলল,
—কিন্তু একটা শর্ত আছে।
—কী?
—আমাকে কখনো মিথ্যা বলবেন না।
আকাশ একটু থেমে বলল,
—ঠিক আছে।
—আর আপনি যখন মন খারাপ করবেন, আমাকে বলবেন।
—কেন?
—কারণ বন্ধুদের কাজই তো সেটা।
আকাশ কিছু বলল না।
কিন্তু দিয়ার কথাটা তার মনে গভীরভাবে থেকে গেল।
দিয়াকে নামিয়ে দেওয়ার পর আকাশ গাড়ি চালাতে চালাতে ভাবছিল—
মেয়েটা আসলে কেমন?
কখনো খুব হাসিখুশি। কখনো হঠাৎ চুপ। আবার কখনো এমন কিছু কথা বলে, যেগুলোর কোনো মাথামুণ্ডু নেই।
তবু তার সঙ্গে কথা বললে ভালো লাগে।
কেন লাগে, সেটা আকাশ জানে না।
এরপর থেকে তাদের দেখা হওয়া যেন নিয়ম হয়ে গেল।
কখনো দিয়া নিজেই ফোন করত।
—কোথায়?
—অফিসে।
—তাহলে বের হন।
—কেন?
—চা খাব।
—এখন?
—হ্যাঁ, এখন।
আকাশ বলত,
—আমি ব্যস্ত।
দিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলত,
—ঠিক আছে। ব্যস্ত থাকুন।
তারপর ফোন কেটে দিত।
দশ মিনিট পর আকাশ নিজেই তাকে ফোন করত।
—কোথায়?
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ।
—চায়ের দোকানে।
—ঠিক আছে, আসছি।
দিয়া তখন বলত,
—আমি জানতাম।
একদিন বিকেলে তারা ধানমন্ডির একটি ছোট্ট ক্যাফেতে বসেছিল।
দিয়া চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল,
—আপনি কি বিয়ে করতে যাচ্ছেন?
আকাশ থমকে গেল।
—কে বলেছে?
—আপনার ফোনে মেহরিন নামে যে মেয়েটা বারবার ফোন করে, সে।
আকাশ অবাক।
—আপনি আমার ফোন দেখেছেন?
—না। আপনার ফোন যখন টেবিলে ছিল, স্ক্রিনে নাম দেখেছি।
আকাশ কিছু বলল না।
দিয়া মৃদু হাসল।
—বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে?
—হ্যাঁ।
—মেয়েটাকে পছন্দ করেন?
প্রশ্নটা শুনে আকাশ চুপ হয়ে গেল।
দিয়া এবার তার দিকে তাকাল।
—উত্তর দিতে হবে না।
—মেহরিন খুব ভালো মেয়ে।
—আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম পছন্দ করেন কি না।
আকাশ এবারও চুপ।
দিয়া মাথা নিচু করে চায়ের কাপে চুমুক দিল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
—আপনি তাকে বিয়ে করবেন?
—হ্যাঁ।
দিয়া মাথা নেড়ে বলল,
—ভালো।
তারপর সে হেসে ফেলল।
কিন্তু সেই হাসিটা আগের মতো ছিল না।
আকাশ প্রথমবার বুঝতে পারল, দিয়ার হাসির আড়ালেও হয়তো অনেক কথা লুকিয়ে থাকে।
সেদিন রাতে আকাশের ফোনে আবার দিয়ার মেসেজ এল।
“আজ একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
আকাশ লিখল,
“কী কথা?”
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর—
“থাক। অন্যদিন বলব।”
আকাশ আবার লিখল,
“এখনই বলুন।”
দিয়া উত্তর দিল,
“আপনি কি সত্যিই মেহরিনকে বিয়ে করতে চান?”
আকাশ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে এত কঠিন কেন?
সে অনেকক্ষণ পর লিখল,
“হ্যাঁ।”
কিছুক্ষণ পর দিয়া শুধু লিখল—
“ঠিক আছে।”
তারপর আর কোনো মেসেজ এল না।
আকাশ ফোনটা নামিয়ে রাখল।
কিন্তু সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে প্রথমবার তার মনে হলো—
দিয়াকে সে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখছে তো?
প্রশ্নটার উত্তর সে জানত না।
আর এই উত্তর না জানাটাই ধীরে ধীরে তার জীবনকে আরও জটিল করে তুলছিল।
কারণ সে বুঝতে শুরু করেছে—
দিয়ার সঙ্গে দেখা হলে তার দিন ভালো লাগে।
দিয়ার সঙ্গে কথা না হলে মন খারাপ হয়।
আর দিয়া অন্য কারও সঙ্গে হাসলে তার ভেতরটা অকারণে অস্থির হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই অনুভূতির নাম কী?
দিয়ার সঙ্গে পরিচয়ের পর প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেছে।
এই দুই সপ্তাহে আকাশের জীবনটা যেন একটু একটু করে বদলে গেছে।
আগে অফিস, বাসা আর প্রয়োজনীয় কিছু কাজ—এই ছিল তার প্রতিদিনের জীবন। এখন তার দিনের মধ্যে আরেকটা বিষয় যোগ হয়েছে।
দিয়া।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিলে প্রথমেই সে দেখে, দিয়ার কোনো মেসেজ এসেছে কি না।
অফিসে কাজের ফাঁকে হঠাৎ ফোনটা হাতে নেয়।
দিয়া ফোন করেছে কি না দেখে।
বিকেলে অফিস থেকে বের হলে অজান্তেই তার মনে হয়, আজ হয়তো কোথাও দিয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আকাশ নিজেই বুঝতে পারছে না কখন দিয়া তার এতটা কাছের হয়ে গেল।
তবু সে নিজের মনকে বারবার বোঝায়—
দিয়া শুধু একজন বন্ধু।
কিন্তু মন কি সবসময় যুক্তির কথা শোনে?
এক শুক্রবার বিকেলে আকাশ বাসায় বসে ছিল।
তুলি এসে তার সামনে দাঁড়াল।
—ভাইয়া।
—হুম?
—একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—কর।
—তুই প্রেমে পড়েছিস?
আকাশ প্রায় চমকে উঠল।
—কী?
তুলি হেসে বলল,
—এত অবাক হওয়ার কী আছে?
—আমি কেন প্রেমে পড়ব?
—কারণ গত দুই সপ্তাহ ধরে তুই সারাক্ষণ ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকিস।
—অফিসের কাজ।
—ছুটির দিনেও?
আকাশ চুপ।
তুলি তার পাশে বসে বলল,
—মেহরিন আপুর সঙ্গে কথা বলিস?
—হ্যাঁ।
—আর অন্য কারও সঙ্গে?
আকাশ কিছু না বলে উঠে যেতে চাইলে তুলি তার হাত ধরে ফেলল।
—ভাইয়া, আমি কিন্তু তোর বোন। আমাকে বোকা বানাতে পারবি না।
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—একজন বন্ধু আছে।
—মেয়ে?
আকাশ চুপ।
তুলি চোখ বড় করে বলল,
—মেয়ে!
তারপর হাসতে হাসতে বলল,
—নাম কী?
—দিয়া।
—কী করে পরিচয়?
আকাশ পুরো ঘটনা বলল।
তুলি মন দিয়ে শুনল।
সব শুনে বলল,
—ভাইয়া, তুই বিপদে পড়েছিস।
—কীসের বিপদ?
—যে মেয়ের কথা তুই এত আগ্রহ নিয়ে বলছিস, সে শুধু বন্ধু না।
আকাশ বিরক্ত হয়ে বলল,
—তুই বেশি সিনেমা দেখিস।
তুলি উঠে যাওয়ার সময় বলল,
—সময় হলে বুঝবি।
সেদিন সন্ধ্যায় দিয়া ফোন করল।
—কোথায়?
আকাশ বলল,
—বাসায়।
—বের হতে পারবেন?
—কেন?
—আমার সঙ্গে একটু দেখা করতে হবে।
আকাশ ঘড়ির দিকে তাকাল।
—এখন?
—হ্যাঁ।
—কোথায়?
—ধানমন্ডি লেকের কাছে।
আকাশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
—ঠিক আছে।
আকাশ সেখানে পৌঁছে দেখল দিয়া বেঞ্চে বসে আছে।
আজ মেয়েটাকে অন্যরকম লাগছে।
চুল খোলা। পরনে সাদা-নীল পোশাক। হাতে একটা ছোট্ট ডায়েরি।
আকাশ পাশে গিয়ে বসতেই দিয়া বলল,
—আপনি দেরি করেছেন।
—মাত্র পাঁচ মিনিট।
—পাঁচ মিনিটও অনেক।
আকাশ হেসে বলল,
—আপনি আমাকে এত তাড়াহুড়া করে ডাকলেন কেন?
দিয়া ডায়েরিটা বন্ধ করে বলল,
—একটা কথা বলব।
—বলুন।
—আমি হয়তো কিছুদিনের জন্য বাইরে চলে যাব।
আকাশের হাসি মিলিয়ে গেল।
—কোথায়?
—ঢাকার বাইরে। হয়তো কয়েক মাসের জন্য।
—কেন?
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—আমার কিছু কাজ আছে।
আকাশের মনে অদ্ভুত একটা শূন্যতা তৈরি হলো।
সে বুঝতে পারল না কেন এই খবরটা শুনে তার এত খারাপ লাগছে।
—কবে যাবেন?
—জানি না।
—আমাকে আগে বললেন না কেন?
দিয়া মৃদু হাসল।
—আপনাকে কেন বলব?
আকাশ উত্তর দিতে পারল না।
দিয়া আবার বলল,
—আপনি তো আমাকে শুধু বন্ধু মনে করেন।
কথাটা শুনে আকাশ চুপ করে গেল।
দিয়া এবার তার দিকে তাকাল।
—তাই না?
আকাশ ধীরে বলল,
—হ্যাঁ।
দিয়ার মুখে হালকা হাসি ফুটল।
কিন্তু চোখের সেই হাসি ছিল না।
—ঠিক আছে।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে বসে রইল।
লেকের পানিতে বাতাসের ঢেউ উঠছিল। চারপাশে মানুষ হাঁটছে, কেউ গল্প করছে, কেউ ছবি তুলছে।
কিন্তু আকাশের মনে হচ্ছিল, তার চারপাশটা হঠাৎ খুব নীরব হয়ে গেছে।
সে বলল,
—আপনি গেলে আমি কাকে বিরক্ত করব?
দিয়া হেসে ফেলল।
—আপনি আমাকে মিস করবেন?
আকাশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
—হয়তো।
দিয়া বলল,
—শুধু হয়তো?
—অনেক।
দিয়া এবার আর কিছু বলল না।
তারপর আস্তে করে বলল,
—আমিও আপনাকে মিস করব।
আকাশের বুকের ভেতর কেমন যেন একটা শব্দ হলো।
সে বুঝতে পারল না, এই কয়েকটা সাধারণ কথা কেন এত গভীর মনে হচ্ছে।
হঠাৎ দিয়ার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে অস্বস্তি নিয়ে ফোনটা কেটে দিল।
আকাশ জিজ্ঞেস করল,
—কে ফোন করেছিল?
—কেউ না।
—কেউ না আবার ফোন করে?
দিয়া হেসে বলল,
—আপনি এত প্রশ্ন করেন কেন?
—কারণ আপনি সবকিছু লুকান।
দিয়া চুপ করে গেল।
তারপর বলল,
—সব কথা সবাইকে বলা যায় না, আকাশ।
এবার প্রথমবার দিয়া তাকে শুধু "আকাশ" বলে ডাকল।
কোনো "সিরিয়াস সাহেব" নয়।
আকাশের অদ্ভুত ভালো লাগল।
পরদিন আকাশের জীবনে আরেকটা ঘটনা ঘটল।
মেহরিনের পরিবার থেকে বিয়ের তারিখ চূড়ান্ত করা হলো।
তারিখ—এক মাস পর।
বাসায় সবাই আনন্দে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
মা আত্মীয়দের ফোন করছেন।
তুলি বিয়ের পোশাক নিয়ে আলোচনা করছে।
বাবা আত্মীয়দের তালিকা করছেন।
সবাই খুশি।
শুধু আকাশ নিজের ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
তার ফোনে দিয়ার মেসেজ এসেছে।
“শুনলাম তোমাদের বিয়ের তারিখ ঠিক হয়েছে।”
আকাশ কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল,
“হ্যাঁ।”
দিয়া উত্তর দিল না।
পাঁচ মিনিট।
দশ মিনিট।
আকাশ আবার ফোন হাতে নিল।
কোনো উত্তর নেই।
তারপর হঠাৎ একটা মেসেজ এল।
“ভালো থেকো।”
আকাশের বুকটা কেমন করে উঠল।
সে দ্রুত লিখল,
“এভাবে বলছ কেন?”
উত্তর এল—
“কীভাবে?”
“যেন আর কথা হবে না।”
অনেকক্ষণ পর দিয়া লিখল,
“হয়তো হবে না।”
আকাশ উঠে দাঁড়িয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।
দিয়া ফোন ধরল না।
আবার করল।
এবারও না।
তৃতীয়বারও না।
আকাশ অস্থির হয়ে উঠল।
কেন সে ফোন ধরছে না?
কেন তার এত চিন্তা হচ্ছে?
সে তো শুধু একজন বন্ধু।
তাহলে?
পরদিন সকাল।
আকাশ অফিসে যাওয়ার পথে দিয়ার বাড়ির সামনে গেল।
সে জানত, দিয়া সেখানে থাকে।
দরজায় তালা।
পাশের বাসার একজনকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন,
—মেয়েটা তো কাল রাতেই চলে গেছে।
আকাশ অবাক হয়ে বলল,
—কোথায়?
—জানি না বাবা। শুনলাম আত্মীয়ের বাসায় গেছে।
আকাশ কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর গাড়িতে উঠে বসে ফোন বের করল।
দিয়ার নাম্বারে কল করল।
ফোন বন্ধ।
সেদিন অফিসে গিয়ে সে কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারল না।
বারবার মনে হচ্ছিল—
দিয়া কোথায়?
কেন তাকে কিছু না বলে চলে গেল?
আর কেন তার চলে যাওয়াটা আকাশকে এতটা কষ্ট দিচ্ছে?
রাতে ঘরে ফিরে আকাশ আলমারি খুলতে গিয়ে একটা ছোট্ট কাগজ পেল।
তারপর সে থমকে গেল।
কাগজটা দিয়ার হাতের লেখা।
সেদিন লেকের বেঞ্চে বসে দিয়া মজা করে লিখেছিল—
“সিরিয়াস সাহেব, হাসতে ভুলবেন না।”
আকাশ কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখের সামনে দিয়ার মুখ ভেসে উঠল।
তার হাসি।
তার অদ্ভুত কথা।
তার রাগ।
তার অভিমান।
সবকিছু।
হঠাৎ আকাশের মনে হলো—
সে মেহরিনকে বিয়ে করতে যাচ্ছে।
কিন্তু তার মন কেন দিয়াকে খুঁজছে?
এই প্রশ্নের উত্তর থেকে সে যতই পালাতে চাইছিল, উত্তরটা ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
দিয়া শুধু তার বন্ধু নয়।
দিয়া তার কাছে তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু হয়ে গেছে।
কিন্তু সত্যিটা স্বীকার করার আগেই আকাশের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“দিয়ার সঙ্গে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেন না। ওকে আপনার জীবন থেকে দূরে রাখুন।”
আকাশের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর লিখল—
“আপনি কে?”
কোনো উত্তর এল না।
আকাশ আবার ফোন করল।
নম্বরটি বন্ধ।
তার বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা তৈরি হলো।
দিয়া কেন হঠাৎ চলে গেল?
আর কে তাকে আকাশের জীবন থেকে দূরে থাকতে বলছে?
প্রশ্নগুলো তখনও অজানা।সারা রাত আকাশ ঠিকমতো ঘুমাতে পারল না।
বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল দিয়ার মুখ।
লেকের ধারে বসে মেয়েটার বলা কথাগুলোও মনে পড়ছিল।
“আমি হয়তো কিছুদিনের জন্য বাইরে চলে যাব।”
“আপনি তো আমাকে শুধু বন্ধু মনে করেন।”
তারপর হঠাৎ চলে যাওয়া।
আর সবশেষে সেই অচেনা নম্বরের মেসেজ—
“দিয়ার সঙ্গে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেন না।”
কে পাঠিয়েছে?
কেন পাঠিয়েছে?
আর দিয়া কোথায়?
একটার পর একটা প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরছিল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আকাশ প্রথমেই দিয়ার নম্বরে ফোন করল।
ফোন বন্ধ।
আবার করল।
একই অবস্থা।
শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত নিল, অফিসে যাওয়ার আগে দিয়ার খোঁজ করবে।
দিয়ার বাড়ির সামনে গিয়ে আকাশ দেখল, দরজায় এখনো তালা।
পাশের বাসার এক ভদ্রমহিলা দরজা খুলে বের হলেন।
আকাশ সালাম দিয়ে বলল,
—আন্টি, দিয়া কি বাড়িতে নেই?
ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তুমি কি আকাশ?
আকাশ অবাক।
—জি। আপনি আমার নাম জানেন?
—দিয়া তোমার কথা বলেছে।
আকাশের বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।
—কী বলেছে?
ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে বললেন,
—অনেক কথা। তবে সেসব তোমাকে বলার অধিকার আমার নেই।
—আন্টি, দিয়া কোথায় গেছে সেটা অন্তত বলবেন?
—ও তার মামার বাড়িতে গেছে।
—কোথায়?
ভদ্রমহিলা ঠিকানা বললেন।
আকাশ ধন্যবাদ দিয়ে দ্রুত গাড়িতে উঠে পড়ল।
কিন্তু অফিসে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
তারপরও সে গাড়ি ঘুরিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
আজ অফিসে যাওয়া তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো না।
প্রায় এক ঘণ্টা পর আকাশ একটি পুরোনো দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
দরজার সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধা করল।
তারপর কলিংবেল চাপল।
একজন মধ্যবয়সী মহিলা দরজা খুললেন।
আকাশ সালাম দিয়ে বলল,
—আমি আকাশ। দিয়া কি এখানে আছে?
মহিলার মুখের ভাব বদলে গেল।
—তুমি আকাশ?
—জি।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—ভেতরে আসো।
আকাশ ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেল, দিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
আকাশকে দেখে সে যেন পাথর হয়ে গেল।
—আপনি এখানে?
আকাশ ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—হ্যাঁ।
—কেন?
—কারণ তুমি কোনো কথা না বলে চলে এসেছ।
দিয়া মুখ ফিরিয়ে নিল।
—আমাকে আসতে হয়েছে।
—কেন?
—ব্যক্তিগত ব্যাপার।
আকাশ এবার একটু রাগ করে বলল,
—আমি কি তোমার কাছে এতটাই অপরিচিত যে একটা কথাও বলা যাবে না?
দিয়া চুপ।
আকাশ আবার বলল,
—তুমি জানো আমি কতবার ফোন করেছি?
—জানি।
—তাহলে ধরোনি কেন?
—কারণ ধরলে হয়তো ফিরে যেতে চাইতাম।
আকাশ থমকে গেল।
—কোথায়?
দিয়া তার দিকে তাকাল।
—তোমার কাছে।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আকাশ বুঝতে পারছিল না কী বলবে।
দিয়া ধীরে বলল,
—তুমি তো বিয়ে করতে যাচ্ছ।
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমার সঙ্গে এত কথা বলার দরকার কী?
আকাশের বুকের ভেতর কথাটা কেমন বিঁধল।
—তুমি কি সত্যিই চাও আমি আর তোমার সঙ্গে কথা না বলি?
দিয়া কোনো উত্তর দিল না।
আকাশ বলল,
—বল।
দিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।
—আমি জানি না।
আকাশ প্রথমবার বুঝতে পারল, দিয়া নিজেও তার অনুভূতি নিয়ে বিভ্রান্ত।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে সেই মধ্যবয়সী মহিলা বেরিয়ে এলেন।
—দিয়া, তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।
দিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি একটু বসো।
আকাশ সোফায় বসে রইল।
দিয়া ভেতরের ঘরে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর মহিলা ফিরে এসে আকাশের পাশে বসলেন।
—তুমি কি দিয়াকে সত্যিই বন্ধু মনে করো?
প্রশ্নটা শুনে আকাশ চুপ হয়ে গেল।
—আমি...
মহিলা বললেন,
—তাহলে তোমাকে একটা কথা বলা দরকার।
আকাশ মনোযোগ দিয়ে তাকাল।
—দিয়া ছোটবেলা থেকেই একটু আলাদা ধরনের মেয়ে। ও খুব সহজে কাউকে বিশ্বাস করে না। ওর নিজের একটা জগৎ আছে।
আকাশ মাথা নেড়ে বলল,
—আমি জানি।
—না, তুমি পুরোটা জানো না।
মহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—দিয়ার বাবা-মায়ের সঙ্গে ওর অনেক বছর ধরে সম্পর্ক ভালো নয়।
আকাশ অবাক হলো।
—কেন?
—কারণ দিয়া নিজের মতো করে জীবন বেছে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার পরিবার সেটা মেনে নেয়নি।
আকাশ বুঝতে পারল, দিয়ার আচরণের পেছনে হয়তো অনেক পুরোনো কষ্ট লুকিয়ে আছে।
মহিলা আবার বললেন,
—কিছুদিন আগে পরিবার থেকে ওকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছিল। দিয়া রাজি হয়নি। এরপর পরিস্থিতি খারাপ হয়।
—কী সিদ্ধান্ত?
—ওকে জোর করে একটা বিয়েতে রাজি করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
আকাশের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—কী?
—দিয়া রাজি হয়নি। তাই বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে।
আকাশের মনে পড়ে গেল, দিয়া একদিন বলেছিল—
“সব কথা সবাইকে বলা যায় না।”
সে তখন বুঝতে পারেনি।
এখন বুঝতে পারছে।
আকাশ দিয়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
—তুমি আমাকে এসব বলোনি কেন?
দিয়া মৃদু হাসল।
—তুমি তো নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত।
—আমি কি তোমার বন্ধু নই?
দিয়া চোখ তুলে তাকাল।
—বন্ধু বলেই তো ভয় পেয়েছি।
—কিসের ভয়?
—তোমাকে হারানোর ভয়।
আকাশ চুপ হয়ে গেল।
দিয়া ধীরে বলল,
—তুমি আমার জীবনে আসার পর প্রথমবার মনে হয়েছিল, কাউকে সবকিছু বলা যায়। তোমার সঙ্গে কথা বললে ভালো লাগত। তুমি যখন ফোন করতে, আমি অপেক্ষা করতাম। তুমি যখন দেখা করতে আসতে, আমার দিনটা ভালো হয়ে যেত।
আকাশের বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা হলো।
দিয়া চোখ মুছে বলল,
—তারপর জানতে পারলাম তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
—দিয়া...
—আমি তোমার জীবন নষ্ট করতে চাই না।
আকাশ তার কথা থামিয়ে বলল,
—তুমি আমার জীবন নষ্ট করছ না।
দিয়া তাকাল।
আকাশ কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।
সে কি সত্যিই বলতে পারবে?
সে কি বলতে পারবে যে দিয়ার জন্য তার মন বদলে গেছে?
কিন্তু মেহরিন?
বিয়ে?
পরিবার?
সবকিছু?
আকাশের নীরবতা দেখে দিয়া মৃদু হেসে বলল,
—দেখলে? তোমার উত্তর নেই।
আকাশ ধীরে বলল,
—আমার অনেক কথা আছে। কিন্তু আমি নিজেই বুঝতে পারছি না কোনটা সত্যি।
দিয়া বলল,
—তাহলে আগে নিজেকে বোঝো।
আকাশ সেদিন ফিরে এল।
গাড়ি চালাতে চালাতে তার মাথায় শুধু দিয়ার কথা।
সে জানে, মেহরিনের প্রতি তার কোনো ঘৃণা নেই। মেহরিন ভালো মানুষ।
কিন্তু ভালো মানুষ হওয়া আর নিজের জীবনের সঠিক মানুষ হওয়া—দুটো কি একই?
এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না।
পরদিন বাসায় গিয়ে আকাশ মাকে বলল,
—মা, আমার সঙ্গে একটু কথা আছে।
মা অবাক হয়ে বললেন,
—কী হয়েছে?
আকাশ বলল,
—বিয়েটা কি কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়া যায়?
মায়ের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—কেন?
—কিছু বিষয় নিয়ে ভাবতে চাই।
—মেহরিনকে কি পছন্দ করো না?
আকাশ চুপ করে রইল।
মা এবার বুঝতে পারলেন, বিষয়টা গুরুতর।
—আকাশ, অন্য কেউ কি আছে?
আকাশ কোনো উত্তর দিল না।
মায়ের চোখে বিস্ময়।
—সত্যিই কেউ আছে?
আকাশ ধীরে বলল,
—আমি জানি না।
—কী মানে জানো না?
—আমি শুধু জানি, একজন মানুষ আমার জীবনে এসেছে। তার সঙ্গে কথা না বললে আমার খারাপ লাগে। সে দূরে গেলে আমি অস্থির হয়ে যাই। কিন্তু আমি জানি না এটা কী।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তাহলে আগে নিজের মনটা বুঝে নাও। কাউকে বিয়ে করার আগে এটা জানা খুব জরুরি।
সেদিন সন্ধ্যায় আকাশ দিয়াকে ফোন করল।
অনেকবার রিং হওয়ার পর দিয়া ফোন ধরল।
—হ্যালো?
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—দিয়া।
—হুম?
—তুমি কি আমাকে একটা সুযোগ দেবে?
—কিসের?
—নিজের মনটা বুঝতে।
দিয়া চুপ।
আকাশ বলল,
—আমি এখনই কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারছি না। কিন্তু একটা কথা বলতে পারি—
—কী?
—তোমাকে হারাতে চাই না।
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর দিয়া খুব আস্তে বলল,
—আকাশ, কথাটা আরেকবার বলো।
আকাশ এবার পরিষ্কারভাবে বলল,
—আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
দিয়ার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
—তাহলে এবার সত্যিটা খুঁজে বের করো।
ফোন কেটে গেল।
আকাশ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
তার সামনে এখন দুটো পথ।
একদিকে পরিবার, বিয়ে, পরিচিত জীবন।
অন্যদিকে দিয়া—অগোছালো, অদ্ভুত, কিন্তু তার হৃদয়ের খুব কাছে চলে আসা একজন মানুষ।
আর সেই রাতেই আকাশ সিদ্ধান্ত নিল—
সে আর নিজের অনুভূতি থেকে পালাবে না।
পরদিন সকালটা আকাশের কাছে অন্যরকম ছিল।
সারারাত সে ঘুমাতে পারেনি। দিয়ার সঙ্গে শেষ কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
“নিজের মনটা বুঝে নাও।”
দিয়া ঠিকই বলেছিল।
আকাশ এতদিন শুধু পরিস্থিতির সঙ্গে চলেছে। পরিবার বিয়ের কথা বলেছে, সে রাজি হয়েছে। মেহরিন ভালো মেয়ে, তাই সে ভেবেছে বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু এখন বুঝতে পারছে, বিয়ে শুধু ভালো একজন মানুষকে পাওয়া নয়। এর সঙ্গে নিজের মনের সত্যিটাও জড়িয়ে থাকে।
অফিসে যাওয়ার আগেই মেহরিন ফোন করল।
—আজ একটু দেখা করতে পারবে?
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—হ্যাঁ। কোথায়?
—যেখানে প্রথমবার আমরা একসঙ্গে বসেছিলাম, সেই ক্যাফেতে।
—ঠিক আছে।
বিকেলে আকাশ ক্যাফেতে গিয়ে দেখল মেহরিন আগে থেকেই বসে আছে।
তার সামনে একটা কফির কাপ।
আকাশ বসতেই মেহরিন বলল,
—তুমি কয়েকদিন ধরে বদলে গেছ।
আকাশ অবাক হলো।
—কীভাবে?
—আগে তোমার সঙ্গে কথা বললে মনে হতো তুমি আমার কথা মন দিয়ে শুনছ। এখন মনে হয় তোমার শরীরটা এখানে, কিন্তু মন অন্য কোথাও।
আকাশ চুপ করে গেল।
মেহরিন ধীরে বলল,
—কেউ আছে?
আকাশ এবারও উত্তর দিল না।
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
—তোমার নীরবতাই উত্তর দিয়ে দিল।
আকাশ মাথা নিচু করল।
—আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।
—তাহলে সত্যিটা বলো।
আকাশ গভীর শ্বাস নিল।
—আমি একজনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি।
মেহরিন শান্তভাবে শুনছিল।
—কতদিন?
—কয়েক সপ্তাহ।
—তাকে ভালোবাসো?
আকাশ থমকে গেল।
“ভালোবাসা”—শব্দটা শুনে তার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল।
সে ধীরে বলল,
—আমি জানি না। কিন্তু তাকে ছাড়া থাকলে আমার খুব অস্থির লাগে।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—মেয়েটার নাম কী?
—দিয়া।
মেহরিন চোখ নামিয়ে বলল,
—তুমি কি তাকে বিয়ে করতে চাও?
আকাশের কাছে প্রশ্নটার উত্তর খুব কঠিন ছিল।
কিন্তু এবার সে পালাল না।
—হয়তো।
মেহরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তাহলে আমাকে বিয়ে করা উচিত হবে না।
আকাশ তাকাল।
—মেহরিন...
—না, আমাকে কিছু বোঝাতে হবে না। আমি শুধু একটা কথা চাই—আমার সঙ্গে বিয়ে করার আগে তুমি নিশ্চিত হও।
আকাশের চোখে কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠল।
—তুমি রাগ করোনি?
মেহরিন হালকা হাসল।
—রাগ করেছি। কষ্টও পেয়েছি। কিন্তু কাউকে জোর করে নিজের পাশে রাখা যায় না।
আকাশ মাথা নিচু করল।
মেহরিন বলল,
—তবে একটা কথা বলব।
—কী?
—দিয়াকে তুমি যতটা চেনো, তার চেয়ে বেশি হয়তো সে তোমাকে চেনে।
আকাশ অবাক।
—মানে?
মেহরিন বলল,
—তুমি যেদিন প্রথম ওর কথা বলেছিলে, তোমার চোখে এমন একটা পরিবর্তন দেখেছিলাম, যেটা আমি আগে কখনো দেখিনি।
আকাশ চুপ করে গেল।
মেহরিন উঠে দাঁড়াল।
—তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হলে হয়তো সংসার করতে পারতাম। কিন্তু তোমার মন যদি অন্য কারও কাছে থাকে, তাহলে সেই সংসারে সুখ থাকবে না।
আকাশ কিছু বলতে পারল না।
মেহরিন চলে যাওয়ার আগে বলল,
—নিজের সত্যিটাকে ভয় পেয়ো না, আকাশ।
সেদিন সন্ধ্যায় আকাশ দিয়াকে ফোন করল।
দিয়া ফোন ধরতেই আকাশ বলল,
—তুমি কোথায়?
—বাসায়।
—আমার সঙ্গে দেখা করবে?
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—কেন?
—তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।
—ফোনে বলো।
—না। সামনে বসে বলতে চাই।
দিয়া অবশেষে রাজি হলো।
এক ঘণ্টা পর তারা ধানমন্ডি লেকের সেই একই জায়গায় বসেছিল।
দিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কী হয়েছে?
আকাশ বলল,
—আজ মেহরিনের সঙ্গে কথা হয়েছে।
দিয়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—তারপর?
—আমি সব বলেছি।
—সব?
—হ্যাঁ।
দিয়া নিচের দিকে তাকাল।
—তুমি আমাকে নিয়ে কী বলেছ?
—বলেছি, আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
দিয়া চুপ।
আকাশ আবার বলল,
—মেহরিনও বুঝেছে।
—তোমাদের বিয়ে?
—হবে না।
দিয়া হঠাৎ তার দিকে তাকাল।
—তুমি কি নিশ্চিত?
আকাশ বলল,
—হ্যাঁ।
দিয়ার চোখে বিস্ময়।
—শুধু আমার জন্য?
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—শুধু তোমার জন্য না। নিজের জন্যও।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে তুমি অবশেষে নিজের মনটা বুঝতে শুরু করেছ।
আকাশও হাসল।
—হয়তো।
দিয়া বলল,
—তুমি জানো, আমি তোমাকে নিয়ে ভয় পেয়েছিলাম।
—কেন?
—কারণ তুমি খুব গুছানো মানুষ। তোমার জীবনেও সবকিছু গুছানো। আর আমি?
সে হেসে বলল,
—আমি যেখানে যাই, সেখানে একটু ঝামেলা রেখে আসি।
আকাশ বলল,
—সেটা আমি জানি।
—তারপরও?
—তারপরও।
দিয়া মাথা নিচু করল।
কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে বলল,
—তুমি যদি একদিন আমার জন্য আফসোস করো?
আকাশ বলল,
—তাহলে সেটা আমার সিদ্ধান্তের ভুল হবে। তোমার না।
দিয়া এবার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কিন্তু তাদের এই মুহূর্তটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
আকাশের ফোন বেজে উঠল।
তার বাবা।
—হ্যালো, বাবা?
ওপাশ থেকে কঠিন কণ্ঠ।
—তুমি কি মেহরিনের সঙ্গে বিয়ে ভেঙে দিয়েছ?
আকাশ চুপ।
—হ্যাঁ।
—কেন?
—আমি মনে করি আমাদের বিয়ে করা ঠিক হবে না।
—কারণ কী?
আকাশ দিয়ার দিকে তাকাল।
দিয়া সব শুনতে পাচ্ছিল।
আকাশ বলল,
—কারণ আমি অন্য একজনকে পছন্দ করি।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর বাবা বললেন,
—কে সে?
আকাশ বলল,
—দিয়া।
—তার পরিবার সম্পর্কে তুমি কিছু জানো?
—হ্যাঁ।
—তুমি কি জানো, মেয়েটার পরিবার নিয়ে কী সমস্যা আছে?
আকাশ চমকে গেল।
—আপনি কী বলতে চাইছেন?
বাবার কণ্ঠ আরও কঠিন হলো।
—তুমি যে মেয়েটার কথা বলছ, তার পরিবার আমাদের পরিবারের সঙ্গে বহু বছর আগে একটা সমস্যায় জড়িয়েছিল।
আকাশ স্থির হয়ে গেল।
—কী সমস্যা?
—সেটা বাসায় এসে বলব।
ফোন কেটে গেল।
আকাশ কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
দিয়া তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কী হয়েছে?
আকাশ ধীরে বলল,
—আমার বাবা তোমার পরিবারকে চেনেন।
দিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—কী বললেন?
—বললেন, তোমার পরিবারের সঙ্গে তাদের পুরোনো একটা সমস্যা আছে।
দিয়া মাথা নিচু করল।
—আমি জানতাম।
আকাশ অবাক।
—তুমি জানো?
দিয়া ধীরে বলল,
—আমার বাবা আর তোমার বাবার মধ্যে অনেক বছর আগে ব্যবসা নিয়ে একটা বড় সমস্যা হয়েছিল।
আকাশ কিছু বলতে পারল না।
দিয়া বলল,
—আমি জানতাম না তোমার পরিবার কারা। তুমি যখন বলেছিলে তোমার নাম আকাশ, আমি কখনো ভাবিনি...
আকাশ তার কথা থামিয়ে বলল,
—তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?
—কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না।
আকাশের মাথায় যেন সবকিছু ঘুরতে লাগল।
এতদিন যে সম্পর্কটা ধীরে ধীরে সুন্দর হয়ে উঠছিল, সেখানে এবার অতীত এসে দাঁড়িয়েছে।
সেদিন রাতে আকাশ বাসায় ফিরতেই তার বাবা তাকে ডেকে বসালেন।
টেবিলের ওপর একটা পুরোনো ফাইল রাখা।
বাবা ফাইলটা খুলে বললেন,
—এই নামটা দেখো।
আকাশ কাগজের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।
“সালেহ আহমেদ।”
দিয়ার বাবার নাম।
আকাশ বাবার দিকে তাকাল।
—কী হয়েছিল?
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—অনেক বছর আগে আমরা দুজন অংশীদার ছিলাম। একটা ব্যবসায় বড় ক্ষতি হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম সে আমাকে ঠকিয়েছে। সে ভেবেছিল আমি তাকে ঠকিয়েছি।
—তারপর?
—ব্যবসা শেষ। সম্পর্ক শেষ। কিন্তু সেই ঘটনার পর দুই পরিবার আর কখনো এক হয়নি।
আকাশ ধীরে বলল,
—কিন্তু এতে দিয়ার দোষ কী?
বাবা চুপ।
আকাশ বলল,
—দিয়া তো তখন ছোট ছিল।
—আমি জানি।
—তাহলে?
বাবা বললেন,
—তুমি যদি তাকে বিয়ে করো, এই পুরোনো সম্পর্ক আবার সামনে আসবে।
আকাশ দৃঢ় গলায় বলল,
—অন্যায় যদি কেউ করে থাকে, তার শাস্তি কি তাদের সন্তানদের দিতে হবে?
বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।
আকাশ উঠে দাঁড়াল।
—আমি দিয়াকে ছাড়ব না শুধু অতীতের একটা ঘটনার জন্য।
বাবা বললেন,
—তুমি খুব সহজ ভাবছ বিষয়টাকে।
আকাশ দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে থামল।
—হয়তো। কিন্তু আমি অন্তত সত্যিটা জানার চেষ্টা করব।
রাতে আকাশ দিয়াকে ফোন করল।
দিয়া ফোন ধরল।
—হ্যালো?
আকাশ বলল,
—দিয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব।
—হুম।
—তোমার বাবার সঙ্গে আমার বাবার কী হয়েছিল, সেটা কি তুমি পুরোপুরি জানো?
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—না।
—তাহলে আমাদের দুজনেরই সত্যিটা খুঁজে বের করতে হবে।
দিয়া বলল,
—তুমি কি সত্যিই আমার পাশে থাকবে?
আকাশ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—হ্যাঁ।
দিয়া খুব আস্তে বলল,
—তাহলে আমিও পালাব না।
ফোন কেটে যাওয়ার পর আকাশ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তার সামনে এখন শুধু একটা সম্পর্কের প্রশ্ন নয়।
দুই পরিবারের বহু বছরের পুরোনো এক রহস্য।
পরদিন সকালেই আকাশ বাবার সঙ্গে আবার কথা বলতে চাইল।
গত রাতের কথাগুলো তার মাথা থেকে কিছুতেই বের হচ্ছিল না।
দিয়ার বাবা সালেহ আহমেদ আর তার বাবার মধ্যে ঠিক কী হয়েছিল?
কেন দুই পরিবার এত বছর ধরে একে অপরের কাছ থেকে দূরে?
আর সবচেয়ে বড় কথা—এই পুরোনো ঘটনার জন্য কি আকাশ আর দিয়ার বর্তমান সম্পর্ক নষ্ট হবে?
নাশতার টেবিলে বসে আকাশ বলল,
—বাবা, গতকাল যে ঘটনাটা বলছিলেন, সেটা পুরোটা জানতে চাই।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—সবকিছু জানা তোমার জন্য ভালো হবে না।
আকাশ শান্ত গলায় বলল,
—আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে সত্যিটা জানা দরকার।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—ঠিক আছে।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলতে শুরু করলেন,
—প্রায় বিশ বছর আগে আমি আর সালেহ একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। একে অপরকে ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করতাম।
আকাশ মন দিয়ে শুনছিল।
—ব্যবসা ভালোই চলছিল। তারপর একটা বড় অর্ডারের সময় আমাদের অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। সেই সময় হিসাবের মধ্যে বড় একটা গরমিল ধরা পড়ে।
—কী ধরনের গরমিল?
—কোম্পানির হিসাব থেকে অনেক টাকা কম পাওয়া যায়। আমি ভেবেছিলাম সালেহ টাকা সরিয়েছে। আর সালেহ ভেবেছিল আমি তাকে ফাঁসাচ্ছি।
আকাশ বলল,
—প্রমাণ?
বাবা মাথা নাড়লেন।
—সেটাই সমস্যা। কোনো পরিষ্কার প্রমাণ ছিল না।
—তারপর?
—আমাদের মধ্যে এত বড় ঝগড়া হলো যে ব্যবসা ভেঙে গেল। দুজনের সম্পর্কও শেষ।
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—তাহলে আপনি নিশ্চিত ছিলেন যে কাকা টাকা সরিয়েছিলেন?
বাবা ধীরে বললেন,
—তখন ছিলাম।
—আর এখন?
বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।
আকাশ বুঝতে পারল, বাবার মনেও হয়তো সন্দেহ আছে।
সেদিন দুপুরে আকাশ দিয়ার সঙ্গে দেখা করল।
দিয়া একটা ছোট ক্যাফেতে বসে ছিল।
আকাশ সামনে বসতেই দিয়া বলল,
—তোমার বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে?
—হ্যাঁ।
—সব বলেছে?
—কিছুটা।
দিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—আমার বাবাও একই কথা বলেন। তবে তার version আলাদা।
আকাশ অবাক হয়ে বলল,
—তোমার বাবা কী বলেন?
—তিনি বলেন, তোমার বাবা নাকি ব্যবসার কিছু টাকা অন্য একটা জায়গায় বিনিয়োগ করেছিলেন, কিন্তু সেটা লোকসান হওয়ার পর দায়টা তার ওপর চাপিয়েছিলেন।
আকাশ চুপ হয়ে গেল।
—তাহলে দুজনের কথাই আলাদা।
দিয়া বলল,
—হ্যাঁ।
—আমাদের সত্যিটা খুঁজে বের করতে হবে।
দিয়া মৃদু হাসল।
—তুমি জানো, তোমার একটা সমস্যা আছে?
—কী?
—তুমি অসম্ভব জেদি।
আকাশ হেসে বলল,
—তোমার থেকে শিখেছি।
দিয়া হাসল।
অনেকদিন পর তাদের মধ্যে আবার আগের স্বাভাবিকতা ফিরে এলো।
সন্ধ্যায় তারা পুরোনো কিছু নথি খুঁজতে দিয়ার মামার বাড়িতে গেল।
দিয়ার মামা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা। পুরোনো হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে তার কিছু ধারণা ছিল।
আকাশ সব ঘটনা বলতেই তিনি চুপ করে গেলেন।
—এই ঘটনা তো অনেক পুরোনো।
দিয়া বলল,
—মামা, আপনার কাছে কি কোনো পুরোনো কাগজ আছে?
তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন।
—হয়তো আছে।
তারপর তিনি স্টোররুমে গিয়ে একটা পুরোনো বাক্স নিয়ে এলেন।
বাক্সের ভেতর পুরোনো ফাইল, কাগজ আর কিছু ব্যাংকের নথি।
একটা একটা করে তারা দেখতে লাগল।
প্রায় এক ঘণ্টা পর দিয়া হঠাৎ বলল,
—এইটা দেখো!
আকাশ কাগজটা হাতে নিল।
এটা ছিল সেই সময়ের একটা ব্যাংক স্টেটমেন্ট।
তারিখটা ঘটনার সময়ের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
আকাশ বলল,
—এখানে একটা বড় অঙ্কের টাকা অন্য একটা অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার হয়েছে।
দিয়া বলল,
—অ্যাকাউন্টটা কার?
নামটা দেখে দুজনেই থমকে গেল।
অ্যাকাউন্টটি ছিল কোম্পানির এক পুরোনো হিসাবরক্ষকের নামে।
আকাশ বলল,
—তাহলে টাকা তোমার বাবা বা আমার বাবা কেউই সরাননি!
দিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
—তাহলে কে?
ঠিক তখন দিয়ার মামা ফাইলটা হাতে নিয়ে বললেন,
—এই নামটা আমি চিনি।
আকাশ তাকাল।
—কে?
মামা বললেন,
—তোমাদের কোম্পানির তখনকার ম্যানেজার। নাম ছিল রাশেদ।
দিয়া বলল,
—সে এখন কোথায়?
মামা বললেন,
—জানি না। অনেক বছর আগে বিদেশে চলে গেছে শুনেছিলাম।
আকাশ ফাইলটা শক্ত করে ধরে বলল,
—তাহলে আসল সত্যিটা অন্য কোথাও।
সেদিন রাতে আকাশ বাবাকে সব জানাল।
ব্যাংক স্টেটমেন্টের কপিটাও দেখাল।
বাবা অনেকক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তার মুখের ভাব বদলে গেল।
—আমি এটা আগে কখনো দেখিনি।
আকাশ বলল,
—তাহলে আপনি আর সালেহ কাকাকে কেউ ভুল বুঝিয়েছিল।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—সম্ভবত।
—আপনি কি কাকার সঙ্গে কথা বলবেন?
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—হয়তো আমার কথা বলা উচিত।
আকাশের মনে হলো, এত বছরের একটা দেয়াল হয়তো ভাঙতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে দিয়া নিজের বাবার সঙ্গে কথা বলল।
—বাবা, আপনি কি জানতেন টাকা রাশেদের অ্যাকাউন্টে গিয়েছিল?
সালেহ আহমেদ চমকে উঠলেন।
—রাশেদ?
দিয়া কাগজটা দেখাল।
তিনি কিছুক্ষণ কাগজের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
—এটা কোথায় পেয়েছ?
—পুরোনো ফাইলে।
সালেহ চুপ করে গেলেন।
দিয়া বলল,
—আপনি আর আকাশের বাবার মধ্যে এত বছর যে ভুল বোঝাবুঝি ছিল, সেটা হয়তো সত্যি ছিল না।
তার বাবা ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।
—আমি জানতাম না।
তার চোখে অনুশোচনা ফুটে উঠল।
—আমি এত বছর ধরে একজন মানুষকে ভুল বুঝে এসেছি?
দিয়া বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
—আপনি চাইলে এখনো সব ঠিক করতে পারেন।
পরদিন দুই পরিবার প্রথমবার মুখোমুখি হলো।
আকাশ আর দিয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
সালেহ আহমেদ আর আকাশের বাবা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কেউ কিছু বলছিলেন না।
শেষ পর্যন্ত আকাশের বাবা এগিয়ে গিয়ে বললেন,
—সালেহ, আমি হয়তো তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম।
সালেহ আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—আমিও তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম।
দুজনের চোখে পুরোনো দিনের স্মৃতি ভেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর তারা হাত মিলালেন।
আকাশের বুকটা হালকা হয়ে গেল।
দিয়া তার পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসল।
কিন্তু সবকিছু এত সহজে শেষ হলো না।
সালেহ আহমেদ হঠাৎ বললেন,
—একটা সমস্যা এখনো আছে।
আকাশ তাকাল।
—কী?
—রাশেদ এখন কোথায়, সেটা আমাদের জানতে হবে। কারণ শুধু এই কাগজ দিয়ে সবকিছু প্রমাণ করা যাবে না।
আকাশ বলল,
—আমি খুঁজে বের করব।
দিয়া বলল,
—আমিও।
তার বাবা দুজনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
—তোমরা দুজন একসঙ্গে থাকলে মনে হয় সত্যিই অনেক কিছু সম্ভব।
আকাশ দিয়ার দিকে তাকাল।
দিয়ার চোখেও তখন একটা শান্ত আলো।
সন্ধ্যায় তারা দুজন নদীর ধারে বসেছিল।
দিয়া বলল,
—আজ অনেকদিন পর মনে হচ্ছে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
আকাশ বলল,
—হ্যাঁ।
—তুমি কি এখনো ভয় পাও?
—কিসের?
—আমাদের নিয়ে।
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—না।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
—কেন?
আকাশ উত্তর দিল,
—কারণ আমি এখন জানি, তোমাকে হারানোর ভয়টার চেয়ে তোমাকে পাশে পাওয়ার ইচ্ছেটা অনেক বড়।
দিয়া কিছু বলল না।
শুধু মাথা নিচু করে হাসল।
আকাশ বলল,
—দিয়া?
—হুম?
—আমি একটা কথা বুঝেছি।
—কী?
—তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে আমি ভাবতাম জীবন মানে সবকিছু পরিকল্পনা করে রাখা।
দিয়া বলল,
—আর এখন?
—এখন বুঝি, কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলো কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই জীবনে আসে।
দিয়া তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—তাহলে আমি কি তোমার সেই অগোছালো সুন্দর জিনিস?
আকাশ হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
দিয়া মাথা নাড়ল।
—ঠিক আছে। তবে একটা কথা মনে রেখো।
—কী?
—আমি কিন্তু সহজ মানুষ নই।
আকাশ বলল,
—আমি জানি।
—আমাকে সামলানো কঠিন হবে।
—সেটাও জানি।
দিয়া হেসে ফেলল।
তাদের মাঝের দূরত্বটা যেন আগের চেয়ে অনেক কমে গেল।
কিন্তু সেই রাতেই আকাশের ফোনে একটা মেসেজ এল।
একটি অচেনা নম্বর।
“রাশেদকে খুঁজে লাভ নেই। সে দেশে নেই। আর পুরোনো হিসাব ঘাঁটাঘাঁটি করলে তোমাদের জন্য সমস্যা হবে।”
আকাশের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
সে মেসেজটা দিয়াকে দেখাল।
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—কেউ আমাদের ভয় দেখাতে চাইছে।
আকাশ মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমরা থামব?
আকাশ দৃঢ়ভাবে বলল,
—না।
দিয়া মৃদু হাসল।
—আমিও না।
আকাশ ফোনটা হাতে নিয়ে বলল,
—এবার সত্যিটা বের করেই ছাড়ব।
দিয়া তার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—একসঙ্গে।
রাশেদের পাঠানো মেসেজের পর থেকেই আকাশ আর দিয়া আরও সতর্ক হয়ে গেল।
তবে ভয় পাওয়ার বদলে তাদের মনে হলো, এতদিনের পুরোনো রহস্যের কাছাকাছি তারা পৌঁছে গেছে।
আকাশ মেসেজটা বাবাকে দেখাল।
বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—রাশেদ যদি সত্যিই দেশে থাকে, তাহলে তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব।
—কীভাবে?
—তার পুরোনো পরিচিতদের খুঁজতে হবে।
আকাশ মাথা নাড়ল।
—আমি শুরু করছি।
দিয়া পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—আমিও থাকব।
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
—তুমি থাকলে কাজের চেয়ে ঝামেলাই বেশি হবে।
দিয়া চোখ বড় করে বলল,
—তাহলে আমি চলে যাই।
সে উঠে যাওয়ার ভান করতেই আকাশ হেসে ফেলল।
—আরে বসো।
দিয়া মুচকি হেসে আবার বসে পড়ল।
—আমি জানতাম, আমাকে ছাড়া তোমার চলবে না।
আকাশ মাথা নেড়ে বলল,
—তুমি সত্যিই অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
—নিজের ব্যাপারে আমি সবসময় আত্মবিশ্বাসী।
এই ছোট ছোট কথাগুলোতেই তাদের সম্পর্কটা যেন আরও গভীর হয়ে উঠছিল।
পরের কয়েকদিন তারা রাশেদের পুরোনো পরিচিতদের খুঁজতে লাগল।
পুরোনো ব্যবসায়িক নথি থেকে তারা একটা ঠিকানা পেল।
ঠিকানাটা ঢাকার পুরোনো এক এলাকায়।
আকাশ আর দিয়া সেখানে গেল।
বাড়িটা অনেক পুরোনো। দরজার রং উঠে গেছে। চারপাশে অগোছালো পরিবেশ।
দরজায় নক করতেই একজন বৃদ্ধ বের হলেন।
আকাশ বলল,
—চাচা, আপনি কি রাশেদ সাহেবকে চিনতেন?
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—রাশেদ? কোন রাশেদ?
আকাশ পুরোনো একটা ছবি দেখাল।
বৃদ্ধ ছবিটা দেখে থমকে গেলেন।
—হ্যাঁ। চিনতাম।
দিয়া এগিয়ে এসে বলল,
—তিনি এখন কোথায়?
বৃদ্ধ নিচু গলায় বললেন,
—কয়েক বছর আগে এখানে এসেছিল।
—কখন?
—প্রায় ছয় মাস আগে।
আকাশ আর দিয়া একে অপরের দিকে তাকাল।
আকাশ বলল,
—সে কি বলেছিল কোথায় থাকবে?
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—একটা জায়গার নাম বলেছিল। কেরানীগঞ্জের দিকে।
আকাশের চোখে আশার আলো ফুটল।
—ঠিকানা?
বৃদ্ধ একটা কাগজে ঠিকানা লিখে দিলেন।
গাড়িতে ওঠার পর দিয়া বলল,
—দেখলে? আমার জন্যই আমরা এতদূর এলাম।
আকাশ হেসে বলল,
—তোমার জন্য?
—হ্যাঁ। তুমি তো আমাকে নিয়ে বের না হলে এই তথ্য পেতে না।
—ঠিক আছে। সব কৃতিত্ব তোমার।
দিয়া গম্ভীর মুখ করে বলল,
—ধন্যবাদ।
আকাশ হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর দিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—আকাশ?
—হুম?
—আমাদের ব্যাপারটা নিয়ে তুমি কি সত্যিই সিরিয়াস?
আকাশ গাড়ি চালাতে চালাতে বলল,
—কোন ব্যাপার?
দিয়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—আমাদের দুজনের।
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—হ্যাঁ।
দিয়া নিচু গলায় বলল,
—তাহলে একটা কথা বলি?
—বলো।
—আমি তোমাকে খুব বিশ্বাস করি।
আকাশের মুখে মৃদু হাসি ফুটল।
—আমিও।
কিছুক্ষণ পর তারা ঠিকানায় পৌঁছাল।
কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখা গেল বাড়িটা বন্ধ।
দিয়া বলল,
—এখানে কেউ থাকে না মনে হচ্ছে।
আকাশ চারপাশে তাকাল।
দরজার পাশে একটা পুরোনো পোস্টবক্স।
তার ভেতরে একটা কাগজ পাওয়া গেল।
আকাশ কাগজটা বের করল।
সেখানে একটা ফোন নম্বর লেখা।
দিয়া বলল,
—এটা হয়তো রাশেদের নম্বর।
আকাশ ফোন করল।
একবার।
দুবার।
তৃতীয়বারে ফোন ধরল কেউ।
—হ্যালো?
আকাশ বলল,
—আপনি কি রাশেদ সাহেব?
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ফোন কেটে গেল।
আকাশ আবার ফোন করল।
ফোন বন্ধ।
দিয়া বলল,
—সে আমাদের ভয় পাচ্ছে।
আকাশ বলল,
—অথবা কেউ তাকে লুকিয়ে রেখেছে।
সেদিন রাতে তারা বাসায় ফিরল।
আকাশের মা দিয়াকে প্রথমবার বাসায় আসতে বললেন।
দিয়া কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে এল।
আকাশের মা তাকে দেখে মৃদু হাসলেন।
—তুমি দিয়া?
দিয়া মাথা নেড়ে বলল,
—জি আন্টি।
—তোমার কথা অনেক শুনেছি।
দিয়া অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকাল।
আকাশ চোখ সরিয়ে নিল।
মা হেসে বললেন,
—আকাশ ছোটবেলা থেকে খুব চুপচাপ। তোমার সঙ্গে পরিচয়ের পর ওকে অনেক হাসতে দেখছি।
দিয়া লজ্জা পেয়ে বলল,
—ও আসলে খুব ভালো মানুষ।
আকাশ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—মা, তুমি ওর কথা বিশ্বাস করো না।
দিয়া বলল,
—কেন?
—তুমি আমাকে যতটা ভালো ভাবছ, আমি ততটা ভালো না।
দিয়া হেসে বলল,
—সেটা আমি জানি।
তিনজনেই হেসে উঠল।
আকাশের মা দিয়ার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—তোমাদের পথটা হয়তো সহজ হবে না। কিন্তু যদি দুজনের মধ্যে বিশ্বাস থাকে, তাহলে অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায়।
দিয়া মৃদু মাথা নেড়ে বলল,
—জি।
কিছুদিনের মধ্যেই দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্কও কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠল।
আকাশের বাবা আর দিয়ার বাবা নিয়মিত কথা বলতে শুরু করলেন।
পুরোনো ভুল বোঝাবুঝি ধীরে ধীরে দূর হচ্ছিল।
কিন্তু রাশেদের কোনো সন্ধান মিলছিল না।
একদিন বিকেলে আকাশ অফিস থেকে বের হওয়ার সময় দেখল, দিয়া রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে দুটো আইসক্রিম।
আকাশ গাড়ি থামিয়ে নেমে বলল,
—এগুলো কী?
দিয়া বলল,
—তোমার জন্য।
—কেন?
—কারণ আজ তোমার মন ভালো নেই।
আকাশ অবাক হয়ে বলল,
—তুমি কীভাবে বুঝলে?
—তোমার ফোনে কথা বলার সময় কণ্ঠ শুনেই বুঝেছি।
আকাশ আইসক্রিমটা নিল।
—তুমি আমাকে এত ভালোভাবে বুঝতে শিখলে কবে?
দিয়া মুচকি হেসে বলল,
—তুমি বুঝতে পারোনি, আমি অনেকদিন ধরেই তোমাকে লক্ষ্য করছি।
আকাশ কিছু বলল না।
দিয়া ধীরে বলল,
—আকাশ?
—হুম?
—তুমি কি আমাকে সত্যিই তোমার জীবনে চাও?
আকাশ এবার এক মুহূর্তও দেরি করল না।
—হ্যাঁ।
দিয়ার চোখে জল চিকচিক করল।
—কেন?
আকাশ মৃদু হাসল।
—কারণ তুমি না থাকলে আমার দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে।
দিয়া কিছু বলতে পারল না।
শুধু হেসে ফেলল।
সন্ধ্যায় তারা লেকের ধারে হাঁটছিল।
দিয়া বলল,
—আমাদের প্রথম দেখা মনে আছে?
আকাশ হাসল।
—তুমি ভুল করে আমার গাড়িতে উঠেছিলে।
—আমি ভুল করে উঠিনি।
—তাহলে?
—আমি ভেবেছিলাম সেটা তোমার গাড়ি।
—কিন্তু সেটা আমার গাড়িই ছিল না।
দিয়া হেসে বলল,
—তবু তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
আকাশ বলল,
—হয়তো সেটাই সবচেয়ে ভালো ভুল ছিল।
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে হাঁটল।
তারপর বলল,
—তুমি কি কখনো ভাবতে পেরেছিলে, একটা ভুল পরিচয় তোমার জীবন এতটা বদলে দেবে?
আকাশ মাথা নাড়ল।
—না।
—আমিও না।
তারা পাশাপাশি হাঁটছিল।
কোনো বড় কথা নেই।
কোনো প্রতিশ্রুতিও নেই।
শুধু একে অপরের পাশে থাকার শান্ত অনুভূতি।
হঠাৎ দিয়ার ফোন বেজে উঠল।
সে ফোনটা দেখে থমকে গেল।
স্ক্রিনে লেখা—
অজানা নম্বর।
দিয়া ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ—
—দিয়া, আমাকে চিনতে পারছ?
দিয়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—আপনি কে?
ওপাশে হালকা হাসি।
—তোমার বাবার পুরোনো বন্ধু।
দিয়া কাঁপা গলায় বলল,
—রাশেদ?
আকাশ তার দিকে তাকাল।
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
—হ্যাঁ।
দিয়া কিছু বলতে পারল না।
রাশেদ বলল,
—তোমরা আমাকে খুঁজছ, তাই না?
আকাশ ফোনটা স্পিকারে দিল।
—হ্যাঁ। আমরা সত্যিটা জানতে চাই।
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—সত্যিটা জানতে চাইলে কাল রাত আটটায় পুরোনো গুদামের সামনে এসো।
আকাশ বলল,
—ঠিকানা বলুন।
রাশেদ বলল,
—তোমরা জানো।
তারপর ফোন কেটে গেল।
দিয়া আকাশের দিকে তাকাল।
—ও সত্যিই রাশেদ।
আকাশ বলল,
—হ্যাঁ।
—কাল আমরা যাব?
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—যাব।
দিয়া তার হাতের দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে বলল,
—তুমি পাশে থাকবে তো?
আকাশ মৃদু হাসল।
—সবসময়।
দিয়া এবার প্রথমবার কোনো কথা না বলে শুধু তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
পরদিন সকাল থেকেই আকাশের মনে অদ্ভুত একটা অস্থিরতা ছিল।
রাশেদের সঙ্গে দেখা হবে।
বহু বছর ধরে যে রহস্য দুই পরিবারকে আলাদা করে রেখেছে, তার উত্তর হয়তো আজ পাওয়া যাবে।
কিন্তু আকাশের অস্থিরতার আরেকটা কারণও ছিল।
দিয়া।
গত কয়েকদিনে মেয়েটা তার জীবনের এতটা কাছাকাছি চলে এসেছে যে এখন দিয়াকে হারানোর কথা ভাবলেই বুকের ভেতর কেমন শূন্য লাগে।
সকালে দিয়া ফোন করল।
—ঘুম থেকে উঠেছ?
আকাশ হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—আজ কিন্তু ভয় পেলে চলবে না।
—আমি ভয় পাচ্ছি না।
—মিথ্যা।
—তুমি কীভাবে বুঝলে?
—তোমার গলার আওয়াজ শুনেই।
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—তুমি আমাকে অনেক বেশি বুঝে ফেলেছ।
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আর তুমি আমাকে?
আকাশ বলল,
—চেষ্টা করছি।
দিয়া হেসে ফেলল।
—ঠিক আছে। আজ রাতে দেখা হবে।
রাত আটটার কিছু আগে আকাশ আর দিয়া পুরোনো গুদামের সামনে পৌঁছাল।
জায়গাটা অনেকটাই নির্জন।
চারপাশে পুরোনো ভবন, বন্ধ দোকান আর অল্প আলো।
দিয়া গাড়ি থেকে নেমে আকাশের পাশে দাঁড়াল।
—এখানে মানুষ থাকে?
আকাশ বলল,
—মনে হয় না।
—তাহলে রাশেদ আমাদের এখানে কেন ডাকল?
—সেটাই দেখব।
ঠিক তখনই দূর থেকে একটা গাড়ির আলো দেখা গেল।
গাড়িটা এসে তাদের সামনে থামল।
একজন মধ্যবয়সী লোক গাড়ি থেকে নামল।
আকাশ ছবিতে তাকে দেখেছিল।
রাশেদ।
দিয়া এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল।
রাশেদ ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এল।
—তোমরা এসেছ।
আকাশ বলল,
—হ্যাঁ।
রাশেদ চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—এখানে বেশি সময় দাঁড়ানো ঠিক হবে না।
দিয়া বলল,
—আপনি আমাদের এত বছর ধরে কী থেকে দূরে রেখেছেন?
রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তোমাদের বাবা-মায়ের ভুল বোঝাবুঝির পেছনে আমি ছিলাম।
আকাশের চোখ কঠিন হয়ে গেল।
—কীভাবে?
রাশেদ বলল,
—আমি তখন তোমাদের কোম্পানির ম্যানেজার ছিলাম। ব্যবসাটা ভালো চলছিল। কিন্তু আমি নিজের জন্য টাকা সরাতে শুরু করি।
দিয়া অবাক হয়ে বলল,
—তাহলে টাকা আপনি নিয়েছিলেন?
রাশেদ মাথা নিচু করল।
—হ্যাঁ।
আকাশ বলল,
—তাহলে দুই পরিবারকে একে অপরের বিরুদ্ধে লাগালেন কেন?
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—ভয় পেয়েছিলাম। ধরা পড়ে গেলে সব শেষ হয়ে যেত। তাই হিসাবের কাগজে এমন কিছু পরিবর্তন করি, যাতে মনে হয় তোমাদের বাবারা একে অপরের টাকা সরিয়েছে।
দিয়া বলল,
—আপনি জানতেন, এর ফলে দুই পরিবার ভেঙে যাবে?
—জানতাম।
—তবু করলেন?
রাশেদ মাথা নিচু করে বলল,
—লোভ মানুষকে অন্ধ করে দেয়।
আকাশ রাগ সামলাতে না পেরে বলল,
—আপনার জন্য এত বছর দুই পরিবার একে অপরকে শত্রু ভেবেছে!
রাশেদ বলল,
—আমি জানি।
—আপনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন?
রাশেদ মাথা নেড়ে বলল,
—না। কিছুদিন বাইরে ছিলাম। পরে দেশে ফিরে আসি। কিন্তু সামনে আসার সাহস হয়নি।
দিয়া বলল,
—তাহলে এখন কেন?
রাশেদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কারণ তোমরা দুজন আমাকে খুঁজে বের করেছ। আর আমি আর এই বোঝা নিয়ে থাকতে পারছি না।
আকাশ বলল,
—আপনার কাছে প্রমাণ আছে?
রাশেদ পকেট থেকে একটা ছোট্ট পেনড্রাইভ বের করল।
—এখানে পুরোনো হিসাবের কপি আছে। আমি সবকিছু সংরক্ষণ করেছিলাম।
আকাশ সেটা হাতে নিল।
—এতদিন পর এগুলো দিলেন কেন?
রাশেদ ধীরে বলল,
—কারণ আমার ভুলের কারণে দুই পরিবার অনেক বছর হারিয়েছে। অন্তত এখন তাদের সত্যিটা জানার অধিকার আছে।
রাশেদ চলে যাওয়ার পর আকাশ আর দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
দিয়া বলল,
—শেষ পর্যন্ত সত্যিটা পাওয়া গেল।
আকাশ মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে?
আকাশ দিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আশা করি।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
—আমি আজ খুব খুশি।
—কেন?
—কারণ এতদিন মনে হতো আমাদের সম্পর্কের পথে সবসময় একটা দেয়াল থাকবে।
আকাশ বলল,
—এখন আর নেই।
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—একটা কথা বলব?
—বলো।
—তুমি যদি আমার জীবনে না আসতে, হয়তো আমি কখনো এই সত্যিটা খুঁজতাম না।
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—আর তুমি না এলে আমি হয়তো কখনো নিজের মনটা বুঝতাম না।
দিয়া তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে এবার কোনো ভয় নেই।
পরদিন দুই পরিবার একসঙ্গে বসেছিল।
আকাশ পেনড্রাইভের তথ্য সবার সামনে দেখাল।
পুরোনো হিসাব, টাকা সরানোর প্রমাণ, রাশেদের স্বীকারোক্তি—সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।
দিয়ার বাবা আকাশের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আমরা এত বছর ভুল মানুষকে বিশ্বাস করিনি। বরং একে অপরকেই ভুল বুঝেছি।
আকাশের বাবা বললেন,
—আমাদের দুজনেরই উচিত ছিল তখন আরও ভালোভাবে সত্যিটা খোঁজা।
সালেহ আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তবু আজ অন্তত সত্যিটা সামনে এসেছে।
দুই বৃদ্ধ একে অপরের হাত ধরলেন।
আকাশ আর দিয়া দূর থেকে তাকিয়ে ছিল।
দিয়া আস্তে বলল,
—দেখো, সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
আকাশ বলল,
—হ্যাঁ।
কয়েকদিন পর আকাশের মা দিয়াকে বাসায় ডাকলেন।
দিয়া কিছুটা নার্ভাস হয়ে বসে ছিল।
আকাশের মা তার সামনে এসে বললেন,
—তুমি কি আকাশকে সত্যিই চাও?
দিয়া লজ্জায় মাথা নিচু করল।
—জি।
—তুমি জানো, ও একটু বেশি চুপচাপ?
দিয়া হেসে বলল,
—জানি।
—আর একটু জেদি?
—সেটাও জানি।
—তবু?
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
—তবু।
আকাশের মা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তাহলে আমার আর কোনো আপত্তি নেই।
দিয়ার চোখে জল চলে এল।
সে আস্তে বলল,
—ধন্যবাদ, আন্টি।
সেদিন রাতে আকাশ দিয়াকে ফোন করল।
—আজ মা তোমার সঙ্গে কী কথা বলেছে?
দিয়া বলল,
—বলব না।
—কেন?
—গোপন কথা।
—আমি তোমার হবু স্বামী। আমার কাছেও গোপন?
দিয়া একটু চুপ করে থেকে বলল,
—হবু?
আকাশ বুঝতে পারল, কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।
দিয়া হেসে বলল,
—আচ্ছা, তাহলে কবে বিয়ে?
আকাশ বলল,
—তুমি রাজি হলে।
দিয়া বলল,
—আমি তো অনেক আগেই রাজি।
আকাশের মুখে বড় একটা হাসি ফুটে উঠল।
—তাহলে?
—তাহলে কী?
—তাহলে এবার আমাকে সিরিয়াস হওয়ার অনুমতি দাও।
দিয়া হেসে বলল,
—তুমি সিরিয়াস থাকো, আমি তোমাকে হাসাব।
আকাশ বলল,
—এই চুক্তিটা ভালো।
দিয়া বলল,
—আর একটা শর্ত আছে।
—আবার?
—হ্যাঁ। আমাকে কখনো একা রেখে যাবে না।
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—যতদিন তুমি আমার পাশে থাকতে চাও, আমি থাকব।
দিয়া মৃদু গলায় বলল,
—আমি সারাজীবন চাই।
কথাটা বলেই সে চুপ হয়ে গেল।
আকাশও কিছু বলল না।
দুজনের নীরবতার মধ্যেই যেন অনেক কথা বলা হয়ে গেল।
কিন্তু ঠিক সেই রাতেই নতুন একটা সমস্যা সামনে এল।
আকাশের বাবা তাকে নিজের ঘরে ডাকলেন।
—আকাশ, একটা বিষয় নিয়ে কথা আছে।
—কী?
বাবা বললেন,
—রাশেদের দেওয়া তথ্য সত্যি। কিন্তু একটা বিষয় এখনো পরিষ্কার হয়নি।
—কী?
—যে টাকা সরানো হয়েছিল, তার একটা অংশ পরে অন্য একটা কোম্পানিতে বিনিয়োগ হয়েছিল।
আকাশ অবাক।
—কার কোম্পানি?
বাবা বললেন,
—মেহরিনের বাবার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেই কোম্পানির যোগাযোগ ছিল।
আকাশ স্তব্ধ হয়ে গেল।
—মানে?
—আমি জানি না মেহরিনের পরিবার এর সঙ্গে জড়িত কি না। কিন্তু হিসাবটা নতুন করে দেখতে হবে।
আকাশের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
মেহরিনের সঙ্গে বিয়ে ভেঙে গেছে।
দুই পরিবার এখন শান্তির পথে।
দিয়া তার জীবনে এসেছে।
সবকিছু ঠিক হয়ে আসছিল।
তাহলে আবার কেন মেহরিনের পরিবারের নাম সামনে আসছে?
আকাশ সারা রাত বাবার কথাগুলো ভাবল।
মেহরিনের পরিবারের ব্যবসার সঙ্গে পুরোনো সেই টাকার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। কিন্তু এতদিন ধরে একের পর এক সত্য সামনে আসার পর নতুন এই তথ্যকে উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে দিয়াকে ফোন করল।
—দিয়া, আজ দেখা করতে পারবে?
—পারব। কী হয়েছে?
—একটা নতুন বিষয় জানতে পেরেছি।
দিয়ার কণ্ঠ চিন্তিত হয়ে গেল।
—আবার কী?
—মেহরিনের বাবার ব্যবসার সঙ্গে সেই পুরোনো টাকার একটা যোগসূত্র থাকতে পারে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর দিয়া বলল,
—তুমি কি মনে করো মেহরিনের পরিবার জড়িত?
—আমি জানি না। আর অনুমান করে কাউকে দোষ দিতে চাই না।
—ঠিক বলেছ। আগে সত্যিটা জানতে হবে।
দুপুরে তারা আকাশের বাবার অফিসে গেল।
পুরোনো হিসাবের কাগজগুলো আবার বের করা হলো।
একটা একটা করে নথি দেখা হচ্ছিল।
দিয়া খুব মন দিয়ে কাগজগুলো পড়ছিল।
হঠাৎ সে একটা নামের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,
—এই কোম্পানির নামটা পরিচিত লাগছে।
আকাশ বলল,
—কোনটা?
—এটা। আমার বাবার পুরোনো ব্যবসায়িক নথিতেও এই নাম দেখেছি।
আকাশ কাগজটা হাতে নিল।
দুই জায়গার হিসাব মিলিয়ে দেখা হলো।
দেখা গেল, রাশেদ টাকা সরানোর কয়েক মাস পর সেই টাকা একটি তৃতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঘুরে অন্য একটি ব্যবসায়িক হিসাবে যায়।
আর সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মেহরিনের বাবার কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল।
আকাশ বলল,
—এতে এখনো প্রমাণ হয় না যে মেহরিনের বাবা জড়িত ছিলেন।
দিয়া মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ। কিন্তু কেন এই লেনদেন হয়েছিল, সেটা জানতে হবে।
আকাশ সিদ্ধান্ত নিল মেহরিনের বাবার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে।
মেহরিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ হলেও সে জানত, মেহরিনকে অযথা কোনো সন্দেহের মধ্যে রাখা ঠিক হবে না।
সন্ধ্যায় সে মেহরিনকে ফোন করল।
—আমার সঙ্গে একটু দেখা করবে?
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—ঠিক আছে।
তারা আগের সেই ক্যাফেতে দেখা করল।
মেহরিন আকাশকে দেখে মৃদু হাসল।
—অনেকদিন পর।
—হ্যাঁ।
—দিয়াকে বিয়ে করছ?
আকাশ কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল,
—সম্ভবত।
মেহরিন হাসল।
—তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি, তুমি খুশি।
আকাশও হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তাহলে আমার জন্য খুশি হওয়া উচিত।
আকাশ বলল,
—তুমি খুব ভালো মানুষ, মেহরিন।
—জানি।
দুজনেই হেসে ফেলল।
তারপর আকাশ মূল কথায় এল।
—তোমার বাবার ব্যবসার সঙ্গে একটা পুরোনো লেনদেনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
মেহরিনের মুখের ভাব বদলে গেল।
—কী ধরনের লেনদেন?
আকাশ সবকিছু খুলে বলল।
মেহরিন মন দিয়ে শুনে বলল,
—আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করব।
—আমি তোমাকে সন্দেহ করছি না।
—জানি।
মেহরিন কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—তুমি কি জানো, কয়েক বছর আগে বাবার একটা ব্যবসায়িক অংশীদার ছিল?
—কে?
—নাম ছিল রাশেদ।
আকাশ চমকে উঠল।
—রাশেদ?
—হ্যাঁ। তবে সেটা অনেক পরে। বাবা বলতেন লোকটা খুব বিশ্বাসযোগ্য ছিল না।
আকাশের মনে হলো, রহস্যটা আবার নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে।
মেহরিন বলল,
—আমি আজই বাবার সঙ্গে কথা বলব।
সেই রাতেই মেহরিন তার বাবার কাছে গেল।
—বাবা, রাশেদ নামে একজনের সঙ্গে আপনার ব্যবসা ছিল?
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
—কেন জিজ্ঞেস করছ?
—আকাশ কিছু পুরোনো হিসাব পেয়েছে।
বাবার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—আকাশ তোমাকে কী বলেছে?
মেহরিন সব খুলে বলল।
তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমি জানতাম একদিন না একদিন এই বিষয়টা সামনে আসবে।
মেহরিন অবাক।
—আপনি কী বলতে চাইছেন?
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
—রাশেদ কয়েক বছর আগে আমার কাছে এসেছিল। সে একটা ব্যবসায় টাকা বিনিয়োগ করতে চেয়েছিল।
—কোথা থেকে টাকা পেয়েছিল?
—সে বলেছিল তার নিজের সঞ্চয়।
—আপনি বিশ্বাস করেছিলেন?
—তখন হ্যাঁ।
মেহরিন বলল,
—তাহলে পরে?
—পরে জানতে পারি তার টাকার উৎস পরিষ্কার ছিল না। তাই আমি ব্যবসা থেকে সরে আসি।
মেহরিন অবাক হয়ে বলল,
—তাহলে আপনি কোনো টাকা নেননি?
—না।
মেহরিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু তখনই তার বাবা বললেন,
—তবে একটা জিনিস আছে।
—কী?
—রাশেদ আমাকে একটা পুরোনো ফাইল দিয়েছিল। সেখানে দুই পরিবারের ব্যবসার হিসাবের কিছু কাগজ ছিল।
মেহরিন বলল,
—ফাইলটা কোথায়?
—আমার স্টাডি রুমে।
পরদিন মেহরিন সেই ফাইল নিয়ে আকাশের কাছে গেল।
দিয়া তখনও আকাশের সঙ্গে ছিল।
মেহরিনকে দেখে দিয়া কিছুটা অস্বস্তি পেলেও মেহরিন হাসল।
—চিন্তা করো না। আমি তোমাদের সম্পর্কের মাঝে আসতে আসিনি।
দিয়া মৃদু হাসল।
—আমি সেটা ভাবিনি।
মেহরিন ফাইলটা আকাশের হাতে দিল।
—এগুলো দেখো।
আকাশ ফাইল খুলে একের পর এক কাগজ দেখতে লাগল।
হঠাৎ একটা নথিতে তার চোখ আটকে গেল।
সেখানে রাশেদের নিজের হাতে লেখা কিছু হিসাব ছিল।
সবশেষে একটা স্বীকারোক্তির মতো নোট।
রাশেদ লিখেছিল—
সে টাকা সরিয়েছিল।
সে দুই ব্যবসায়ীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করেছিল।
আর পরে সেই টাকা অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিল।
কিন্তু মেহরিনের বাবার নাম কোথাও অপরাধী হিসেবে ছিল না।
বরং সেখানে লেখা ছিল—
“আমি কাউকে পুরো সত্যি জানাইনি। সবাইকে ব্যবহার করেছি নিজের লাভের জন্য।”
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তাহলে মেহরিনের বাবা নির্দোষ।
দিয়া বলল,
—হ্যাঁ।
মেহরিনের চোখে স্বস্তি এল।
—তাহলে শেষ পর্যন্ত সত্যিটা পুরোপুরি পরিষ্কার হলো।
আকাশ মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোমাকে ধন্যবাদ।
মেহরিন মৃদু হাসল।
—আমাকে নয়। সত্যিটাকে ধন্যবাদ দাও।
সব বাধা যেন একে একে দূর হয়ে গেল।
দুই পরিবার এখন আর একে অপরের বিরুদ্ধে নেই।
রাশেদের অপরাধও পরিষ্কার।
মেহরিনের পরিবারও নির্দোষ প্রমাণিত।
এবার আকাশ আর দিয়ার সম্পর্কের পথে কোনো পুরোনো দেয়াল নেই।
সেদিন সন্ধ্যায় আকাশ দিয়াকে নিয়ে তাদের প্রথম দেখা হওয়ার জায়গায় গেল।
সেই রাস্তা।
সেই ক্যাফে।
সবকিছু প্রায় আগের মতো।
দিয়া হেসে বলল,
—মনে আছে?
—সব মনে আছে।
—আমি সেদিন তোমাকে একটা কাগজ দিয়েছিলাম।
—হ্যাঁ।
—আর তুমি আমাকে খুব অদ্ভুতভাবে দেখছিলে।
আকাশ হেসে বলল,
—কারণ তুমি নিজেই অদ্ভুত ছিলে।
দিয়া ভান করে রাগ দেখাল।
—এখনো?
—এখন আরও বেশি।
দিয়া হাসতে হাসতে বলল,
—তাহলে এতদিন আমাকে সহ্য করলে কেন?
আকাশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—কারণ তুমি আমার জীবনটাকে বদলে দিয়েছ।
দিয়ার হাসি থেমে গেল।
আকাশ ধীরে বলল,
—আমি আগে ভাবতাম, ভালো জীবন মানে সবকিছু নিজের মতো করে সাজিয়ে রাখা।
—আর এখন?
—এখন বুঝি, জীবনে এমন একজন মানুষও দরকার, যে সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে আবার সেই এলোমেলো জীবনটাকেই সুন্দর করে দেয়।
দিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
—তুমি আমাকে খুব সুন্দর কথা বলতে শিখে গেছ।
আকাশ হেসে বলল,
—তোমার কাছ থেকেই শিখেছি।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে একটা কথা বলো।
—কী?
—তুমি কি আমাকে সত্যিই তোমার জীবনের অংশ করতে চাও?
আকাশ এক মুহূর্তও দেরি করল না।
—আমি চাই তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হও।
দিয়া মাথা নিচু করল।
—তাহলে আমি রাজি।
—কিসে?
—তোমার সঙ্গে জীবন কাটাতে।
আকাশের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
দিয়া বলল,
—তবে একটা শর্ত আছে।
আকাশ হাসল।
—আবার শর্ত?
—হ্যাঁ।
—কী?
—আমাকে কখনো সিরিয়াস হয়ে থাকতে দেবে না।
আকাশ হেসে বলল,
—এই শর্ত আমি মেনে নিলাম।
দিয়া বলল,
—আর তুমি আমাকে সবসময় সত্যি কথা বলবে।
—সেটাও মেনে নিলাম।
কয়েকদিন পর দুই পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলল।
আকাশের মা খুব খুশি।
দিয়ার বাবাও অনেকদিন পর মেয়েকে হাসতে দেখে শান্তি পেলেন।
দুই পরিবার মিলে বিয়ের তারিখ ঠিক করল।
সবাই ব্যস্ত হয়ে গেল।
কিন্তু বিয়ের কয়েকদিন আগে দিয়া হঠাৎ আকাশকে বলল,
—আমার একটা ভয় হচ্ছে।
আকাশ বলল,
—কী?
—আমাদের জীবন কি বিয়ের পর বদলে যাবে?
আকাশ মৃদু হাসল।
—বদলাবে।
দিয়া চিন্তিত হয়ে তাকাল।
আকাশ বলল,
—কিন্তু আমি চাই না আমাদের বন্ধুত্বটা বদলে যাক।
দিয়া হেসে বলল,
—তাহলে?
—তুমি আমার স্ত্রী হওয়ার আগে যেমন আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিলে, বিয়ের পরও থাকবে।
দিয়া বলল,
—তাহলে ঠিক আছে।
আকাশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—দিয়া?
—হুম?
—তুমি আমার জীবনে আসার পর একটা জিনিস শিখেছি।
—কী?
—কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কটা শুরু হয় একেবারে অদ্ভুত একটা ভুল থেকে।
দিয়া মুচকি হেসে বলল,
—তাহলে আমাদের প্রথম দেখা ছিল একটা ভুল?
আকাশ বলল,
—হ্যাঁ।
দিয়া মাথা নেড়ে বলল,
—কিন্তু সেই ভুলটা আমি সারাজীবন মনে রাখব।
তাদের সামনে তখন নতুন জীবনের দরজা খুলে গেছে।
বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, আকাশ আর দিয়ার বাড়িতে ততই ব্যস্ততা বাড়ছিল।
দুই পরিবার এখন একসঙ্গে।
যে দুই পরিবার বছরের পর বছর একে অপরকে ভুল বুঝে দূরে ছিল, আজ তারাই একসঙ্গে বসে বিয়ের আয়োজন করছে।
আকাশের মা সকাল থেকে আত্মীয়দের ফোন করছেন।
দিয়ার মা আর খালা বিয়ের পোশাক নিয়ে ব্যস্ত।
তুলি তো সারাদিন দিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে।
—ভাবি, বিয়ের পর কিন্তু ভাইয়াকে বেশি প্রশ্রয় দিও না।
দিয়া হেসে বলল,
—কেন?
—ও এমনিতেই খুব শান্ত সেজে থাকে।
—আমি জানি।
—কীভাবে জানো?
—ওকে অনেকদিন ধরে দেখছি।
তুলি হাসতে হাসতে বলল,
—তাহলে তুমি প্রস্তুত।
দিয়া হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
কিন্তু ফোন রাখার পর দিয়ার মুখে হঠাৎ একটা চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।
বিয়ে।
শব্দটা যতই কাছে আসছিল, ততই তার মনে হচ্ছিল জীবনটা সত্যিই বদলে যাচ্ছে।
আকাশকে সে ভালোভাবে চিনে ফেলেছে।
তার নীরবতা, তার রাগ, তার জেদ, তার অকারণ চিন্তা—সবকিছু।
তবু বিয়ের পর তাদের সম্পর্কটা কেমন হবে, সেটা নিয়ে একটু ভয় ছিল।
বিয়ের আগের রাতে আকাশ তার ঘরে বসে ছিল।
তুলি এসে বলল,
—ভাইয়া।
—হুম?
—কাল কিন্তু তোর বিয়ে।
—জানি।
—ভয় লাগছে?
আকাশ কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—একটু।
তুলি অবাক।
—তুই ভয় পাচ্ছিস?
আকাশ হেসে বলল,
—দিয়াকে নিয়ে না। নতুন একটা জীবন শুরু করার কথা ভাবলে একটু ভয় তো লাগেই।
তুলি বলল,
—কিন্তু তুই খুশি?
আকাশ এবার কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল,
—অনেক।
তুলি মুচকি হেসে বলল,
—তাহলে কাল থেকে কিন্তু তুই একা থাকবি না।
আকাশ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—আমি কখনো একা ছিলাম না।
তুলি বুঝতে পারল, ভাইয়ার কথার মধ্যে অন্যরকম একটা শান্তি আছে।
অন্যদিকে দিয়া নিজের ঘরে বসে ছিল।
তার সামনে বিয়ের পোশাক।
মা এসে পাশে বসলেন।
—কী ভাবছিস?
দিয়া মৃদু হাসল।
—কিছু না।
—মিথ্যা বলিস না।
দিয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি ভাবছি, এত কিছু কীভাবে বদলে গেল।
মা বললেন,
—জীবন এমনই।
দিয়া বলল,
—কয়েক মাস আগেও আকাশকে আমি চিনতাম না।
—আর এখন?
দিয়া হেসে বলল,
—এখন মনে হয়, ওকে ছাড়া জীবনটা কেমন হবে সেটা ভাবতেই পারি না।
মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তাহলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
দিয়া ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
পরদিন সকাল।
বাড়িতে উৎসবের আমেজ।
আকাশ পাঞ্জাবি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
তুলি এসে বলল,
—ভাইয়া, এত সিরিয়াস কেন?
আকাশ বলল,
—আমি কি হাসব?
—হ্যাঁ।
—কেন?
—দিয়া না হলে তোকে সারাজীবন সিরিয়াস মুখেই থাকতে হতো।
আকাশ হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই তার ফোনে মেসেজ এল।
দিয়া লিখেছে—
“সিরিয়াস সাহেব, আজ কিন্তু হাসতে ভুলবেন না।”
আকাশ মেসেজটা পড়ে হেসে ফেলল।
তুলি বলল,
—দেখেছিস? ভাবি এখন থেকেই কাজ শুরু করে দিয়েছে।
আকাশ কিছু বলল না।
শুধু মেসেজের উত্তর দিল—
“আজ থেকে তোমার দায়িত্ব।”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
“সারাজীবনের জন্য?”
আকাশ লিখল—
“সারাজীবনের জন্য।”
বিয়ের অনুষ্ঠান সুন্দরভাবে সম্পন্ন হলো।
দুই পরিবারের মানুষের হাসি, আনন্দ আর ব্যস্ততায় পুরো বাড়ি ভরে গেল।
আকাশ আর দিয়া যখন পাশাপাশি বসেছিল, তাদের চোখে বারবার একে অপরের দিকে তাকানোর সেই পরিচিত হাসি ফুটে উঠছিল।
যে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল এক অদ্ভুত ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে, আজ সেটাই তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর রাতে তারা কিছুক্ষণ একসঙ্গে বসে কথা বলল।
দিয়া বলল,
—আকাশ?
—হুম?
—আমাদের প্রথম দেখা যদি সেদিন না হতো?
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে আমি হয়তো তোমাকে খুঁজে বেড়াতাম।
দিয়া হেসে বলল,
—কোথায়?
—জানি না।
—আমি তো নিজেই তোমার সামনে এসে পড়েছিলাম।
—হ্যাঁ।
—ভুল করে।
আকাশ বলল,
—সেই ভুলটাই আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘটনা।
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তুমি জানো, সেদিন তোমাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল তুমি অসম্ভব বিরক্তিকর একটা মানুষ।
আকাশ অবাক হয়ে বলল,
—কী?
দিয়া হেসে বলল,
—সত্যি।
—আর এখন?
—এখনও বিরক্তিকর।
আকাশ মাথা নাড়ল।
—তাহলে এতদিন আমাকে বিয়ে করলে কেন?
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
—কারণ তোমাকে ছাড়া থাকাটা আরও বেশি বিরক্তিকর।
আকাশ হেসে ফেলল।
বিয়ের কয়েকদিন পর তাদের জীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করল।
আকাশ অফিসে যায়।
দিয়া নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
কিন্তু তাদের মধ্যে একটা বিষয় বদলায়নি।
তারা এখনো একে অপরের সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
একদিন অফিস থেকে ফিরে আকাশ দেখল, দিয়া রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বানানোর চেষ্টা করছে।
আকাশ দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
—কী করছ?
দিয়া ঘুরে তাকিয়ে বলল,
—রান্না।
—এটা?
—হ্যাঁ।
আকাশ সন্দেহের চোখে তাকাল।
—খাওয়া যাবে তো?
দিয়া রেগে বলল,
—তুমি চাইলে না খেতে পারো।
আকাশ হেসে বলল,
—না, খাব।
দিয়া বলল,
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—যদি ভালো না হয়?
আকাশ বলল,
—তাহলে আমরা বাইরে থেকে খাব।
দিয়া হেসে ফেলল।
—তুমি সত্যিই অদ্ভুত।
আকাশ বলল,
—তোমার সঙ্গে থাকতে থাকতে হয়েছি।
এক সন্ধ্যায় তারা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
শহরের বাতিগুলো একে একে জ্বলছিল।
দিয়া বলল,
—আকাশ?
—হুম?
—আমাদের গল্পটা যদি কেউ শুনত, বিশ্বাস করত?
আকাশ হেসে বলল,
—হয়তো না।
—কারণ?
—কারণ একটা মেয়ে ভুল করে একজন অচেনা মানুষের গাড়িতে উঠে যায়, তারপর তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, তারপর তাকে বিয়ে করে—এটা সত্যিই অদ্ভুত।
দিয়া হাসতে হাসতে বলল,
—তুমি আবার সেই গাড়ির কথা শুরু করলে!
আকাশ বলল,
—ওটাই তো সবকিছুর শুরু।
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমি একটা কথা বুঝেছি।
—কী?
—জীবনে সব সম্পর্ক পরিকল্পনা করে তৈরি হয় না।
আকাশ তার দিকে তাকাল।
দিয়া বলল,
—কখনো কখনো একজন মানুষ হঠাৎ আসে। প্রথমে তাকে অদ্ভুত মনে হয়। তারপর তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। তারপর একদিন বুঝতে পারো, সে মানুষটা ছাড়া তোমার জীবন কল্পনা করা কঠিন।
আকাশ মৃদু হাসল।
—তুমি কি আমার কথাই বলছ?
দিয়া বলল,
—হয়তো।
আকাশ বলল,
—তাহলে আমিও একটা কথা বলি।
—বলো।
—তোমাকে প্রথম দেখার দিন আমি জানতাম না তুমি আমার জীবন বদলে দেবে।
দিয়া চুপ করে শুনছিল।
—আমি জানতাম না তোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে একদিন তোমার নীরবতাও বুঝতে শিখব।
—হুম।
—আমি জানতাম না, তোমার হাসি আমার দিনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হয়ে যাবে।
দিয়ার চোখে জল জমল।
আকাশ বলল,
—আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি জানতাম না যে একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া কখনো কখনো পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
—এখন জানো?
আকাশ মাথা নেড়ে বলল,
—এখন জানি।
দিয়া ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
—তাহলে একটা কথা মনে রেখো।
—কী?
—সেদিন আমি ভুল করে তোমার গাড়িতে উঠেছিলাম।
আকাশ হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—কিন্তু তোমার জীবনে থেকে যাওয়াটা আমার কোনো ভুল ছিল না।
আকাশ কিছু বলল না।
শুধু মৃদু হাসল।
কারণ সে জানত—
দিয়ার সঙ্গে তার গল্পটা কোনো পরিকল্পনা থেকে শুরু হয়নি।
শুরু হয়েছিল এক অদ্ভুত ভুল দিয়ে।
তারপর সেই ভুল বদলে দিয়েছিল দুজন মানুষের জীবন।
আর তাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার ছিল—
তারা শুধু একে অপরকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পায়নি, পেয়েছিল এমন একজন মানুষকে, যে একই সঙ্গে তাদের বন্ধু, ভরসা আর জীবনের সবচেয়ে আপন সঙ্গী।
সেদিন রাতের আকাশে চাঁদ ছিল।
দিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—তোমার নামটা কিন্তু তোমার জন্য একদম ঠিক।
আকাশ অবাক হয়ে বলল,
—কেন?
দিয়া বলল,
—কারণ তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমার আকাশটাই বদলে গেছে।
আকাশ হেসে বলল,
—আর তুমি?
দিয়া মুচকি হেসে উত্তর দিল,
—আমি সেই মানুষ, যে তোমার আকাশে হঠাৎ করে এসে পড়েছিল।
দুজনেই হেসে উঠল।
....