দূরত্ব শুধু সময়ের ছিল

ঢাকার অভিজাত একটি বিশ্ববিদ্যালয়—অরোরা ইউনিভার্সিটি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির নিয়ম ছিল অন্য অনেক জায়গার চেয়ে কঠোর। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আচরণ, পোশাক, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম—সবকিছুর ওপরই ছিল কড়া নজর।

বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ক্যাম্পাসে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা কর্তৃপক্ষ মোটেও পছন্দ করত না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান ফারহান কবির বিশ্বাস করতেন, আবেগ মানুষের মনকে দুর্বল করে দেয়।

তার কাছে শিক্ষার্থীদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—পড়াশোনা, ক্যারিয়ার আর ভবিষ্যৎ।

এই কারণেই অরোরা ইউনিভার্সিটিতে প্রেমের সম্পর্ক প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।

কেউ প্রকাশ্যে কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কথা বললে সতর্কবার্তা দেওয়া হতো।

কেউ নিয়ম ভাঙলে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থেকে বহিষ্কার করা হতো।

আর এই কঠোর পরিবেশেই একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিল নতুন একজন শিক্ষক।

তার নাম আরহান রহমান।

বয়স ত্রিশের কাছাকাছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা নিয়েছে। কিন্তু বিদেশে ভালো চাকরির সুযোগ পেয়েও দেশে ফিরে এসেছে শিক্ষকতা করতে।

আরহানের একটা অদ্ভুত ব্যাপার ছিল।

সে শুধু বই পড়াত না।

সে মানুষকে বুঝতে চেষ্টা করত।

প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকেই সে ছাত্রদের বলেছিল,

—শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়াকে আমি সাফল্য মনে করি না। নিজের পছন্দ, নিজের স্বপ্ন আর নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিতে পারাটাও সাফল্য।

ক্লাসে একটা নীরবতা নেমে এসেছিল।

কারণ অরোরা ইউনিভার্সিটিতে এমন কথা খুব কমই শোনা যেত।

সামনের সারিতে বসে থাকা এক মেয়ে চুপচাপ আরহানের দিকে তাকিয়ে ছিল।

মেয়েটির নাম নাইরা সায়ান।

বয়স বাইশ।

ইংরেজি সাহিত্যের শেষ বর্ষের ছাত্রী।

পড়াশোনায় ভালো হলেও তার আসল আগ্রহ ছিল গান লেখা আর সুর করা।

কিন্তু পরিবারের ইচ্ছা ছিল সে পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করবে।

নাইরা নিজের গান কাউকে খুব একটা শোনাত না।

তার একটা পুরোনো ডায়েরি ছিল।

সেখানে সে নিজের লেখা গান, কবিতা আর না বলা কথাগুলো লিখে রাখত।

আরহানের প্রথম ক্লাসে সে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিল একটি কথায়।

—তোমরা যে বিষয়টা ভালোবাসো, সেটা নিয়ে কাজ করার সাহস রাখো।

ক্লাস শেষে সবাই বেরিয়ে গেলেও নাইরা বসে রইল।

আরহান খাতা গুছাচ্ছিল।

হঠাৎ সে বলল,

—আপনি কি সত্যিই মনে করেন, নিজের পছন্দের কাজ করা উচিত?

আরহান তাকাল।

—অবশ্যই।

—যদি পরিবার সেটা না চায়?

—তাহলে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে।

—আর যদি কেউই না বোঝে?

আরহান মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়ার মতো সাহস থাকতে হবে।

নাইরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—আপনি খুব সহজভাবে বলেন।

—কারণ কঠিন কথাগুলো সহজ করে বলা দরকার।

নাইরা হেসে ফেলল।

—আপনার নাম আরহান রহমান, তাই তো?

—হ্যাঁ।

—আমি নাইরা।

—জানি। ক্লাসে তোমার নাম দেখেছি।

—ওহ।

নাইরা উঠে দাঁড়াল।

—ধন্যবাদ, স্যার।

—কিসের জন্য?

—জানি না। মনে হলো বলা দরকার।

সে চলে গেল।

আরহান কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

এর কয়েকদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক উৎসবের ঘোষণা হলো।

নাইরা গোপনে একটি গান জমা দিল।

কিন্তু তার নাম প্রকাশ করা হয়নি।

গানের কথা পড়ে সাংস্কৃতিক ক্লাবের সদস্যরা মুগ্ধ হয়ে গেল।

তারা গানটি নির্বাচিত করল।

নাইরার একমাত্র বন্ধু তাসনিম জানত গানটি কার লেখা।

সে বলল,

—তুই এবার মঞ্চে গাইবি।

নাইরা মাথা নেড়ে বলল,

—না।

—কেন?

—সবাই কী বলবে?

—তুই এতদিন ধরে গান লিখিস, অথচ নিজের গান গাইতে ভয় পাচ্ছিস?

নাইরা নিচু গলায় বলল,

—বাবা জানতে পারলে সমস্যা হবে।

তাসনিম বলল,

—সবকিছু নিয়ে ভয় পেলে নিজের জীবনটা কখনো নিজের মতো করে বাঁচতে পারবি না।

নাইরা কিছু বলল না।

ঠিক তখন পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—

—তোমার বন্ধু ঠিক বলেছে।

দুজন ঘুরে তাকাল।

আরহান দাঁড়িয়ে।

নাইরা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

—স্যার, আপনি এখানে?

—সাংস্কৃতিক ক্লাবের দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে।

তাসনিম হেসে বলল,

—তাহলে নাইরার গানটা আপনিই শুনুন।

—গানটা নাইরার?

নাইরা দ্রুত বলল,

—না, মানে...

তাসনিম হেসে ফেলল।

—জি স্যার।

আরহান নাইরার দিকে তাকাল।

—তুমি গান লেখো?

নাইরা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

—জি।

—তাহলে শুনব।

—এখানে?

—হ্যাঁ।

নাইরা কিছুক্ষণ দ্বিধা করল।

তারপর গিটার হাতে নিল।

আস্তে করে বাজাতে শুরু করল।

তার কণ্ঠ খুব জোরালো নয়, কিন্তু গভীর।

গানের কথায় ছিল এমন এক অনুভূতি—যেখানে একজন মানুষ নিজের মনের কথা বলতে চায়, অথচ ভয় তাকে আটকে রাখে।

গান শেষ হলে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

আরহান বলল,

—তুমি এই গানটা লিখেছ?

—জি।

—তাহলে মঞ্চেও তুমি গাইবে।

নাইরা মাথা নেড়ে বলল,

—আমি পারব না।

—কেন?

—আমি ভয় পাই।

আরহান বলল,

—ভয় পাওয়া আর পিছিয়ে যাওয়া এক জিনিস নয়।

নাইরা তার দিকে তাকাল।

—যদি ভুল করি?

—তাহলে ভুল করবে।

—সবাই হাসবে?

—হয়তো কেউ হাসবে।

—তাহলে?

—তুমি তাদের কথা শুনবে, নাকি নিজের গান শুনবে?

নাইরা চুপ করে গেল।

আরহান বলল,

—একটা কথা মনে রেখো, নাইরা। যে মানুষ নিজের অনুভূতিকে সবসময় লুকিয়ে রাখে, সে একদিন নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে যায়।

নাইরা ধীরে বলল,

—আপনি কি সবসময় এত গভীর কথা বলেন?

আরহান হেসে ফেলল।

—না। শুধু প্রয়োজন হলে।

নাইরার মুখেও হাসি ফুটল।

সেদিন প্রথমবার তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত বোঝাপড়া তৈরি হলো।

কেউ কিছু বলেনি।

কিন্তু দুজনেই বুঝতে পারল, এই পরিচয়টা হয়তো সাধারণ কোনো শিক্ষক-ছাত্রীর পরিচয় হয়ে থাকবে না।

উৎসবের দিন এগিয়ে আসছিল।

নাইরা শেষ পর্যন্ত মঞ্চে গান গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

কিন্তু সে জানত না, তার এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই তার জীবন অন্যদিকে মোড় নিতে যাচ্ছে।

কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠোর চেয়ারম্যান ফারহান কবিরের চোখেও বিষয়টা পড়েছে।

একদিন তিনি আরহানকে অফিসে ডাকলেন।

—মিস্টার রহমান, আপনি কি নাইরা সায়ানকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান করার অনুমতি দিয়েছেন?

—জি।

—আপনি জানেন, তার পরিবারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে?

—আমি জানি না।

—জানার প্রয়োজন ছিল।

আরহান শান্তভাবে বলল,

—স্যার, একজন প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী নিজের প্রতিভা নিয়ে মঞ্চে দাঁড়াবে। এতে সমস্যা কোথায়?

ফারহান কঠিন চোখে তাকালেন।

—সমস্যা হলো, আপনি এখানে শিক্ষক। আপনার কাজ শিক্ষার্থীদের আবেগকে উৎসাহ দেওয়া নয়।

আরহান বলল,

—আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা আর তাকে বুঝতে শেখানো এক নয়।

ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

—আমি চাই না আপনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বদলে যাক।

আরহান বলল,

—পরিবর্তন সবসময় খারাপ নয়, স্যার।

ফারহান ঠান্ডা গলায় বললেন,

—সময়ই বলবে।

সেদিন রাতে নাইরা মঞ্চে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

দূর থেকে আরহান তাকে দেখছিল।

নাইরার চোখে ভয় ছিল।

কিন্তু সেই ভয়কে অতিক্রম করার ইচ্ছাটাও ছিল।

মঞ্চে ওঠার আগে সে আরহানের কাছে এসে দাঁড়াল।

—স্যার...

—হ্যাঁ?

—যদি খুব ভয় লাগে?

আরহান বলল,

—তাহলে দর্শকদের দিকে তাকাবে না।

—তাহলে?

—শুধু নিজের গানটার দিকে মন দেবে।

নাইরা মৃদু হেসে বলল,

—আর আপনি?

—আমি সামনে থাকব।

নাইরা এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে মাথা নেড়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল।

মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে সে চোখ বন্ধ করল।

আরহান সত্যিই সামনের সারিতে বসে আছে।

নাইরা গিটার বাজিয়ে গান শুরু করল।

প্রথম কয়েক লাইন কাঁপা কণ্ঠে বেরোল।

তারপর ধীরে ধীরে কণ্ঠ স্থির হলো।

গান শেষ হওয়ার পর পুরো অডিটোরিয়াম হাততালিতে ভরে গেল।

নাইরা চোখ খুলে প্রথমেই আরহানের দিকে তাকাল।

আরহান উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে।

নাইরার মুখে ফুটে উঠল এক টুকরো হাসি।

কিন্তু অডিটোরিয়ামের একেবারে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ফারহান কবিরের মুখে কোনো হাসি ছিল না।

তিনি শুধু দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তার চোখে ছিল কঠোরতা।

নাইরার গান শেষ হওয়ার পরও অডিটোরিয়ামের হাততালি থামছিল না।

মঞ্চ থেকে নামার সময় তার হাত কাঁপছিল।

কিন্তু এবার সেটা ভয় থেকে নয়।

একটা অদ্ভুত আনন্দে।

সে নিজের গান সবার সামনে গেয়েছে।

আর সবচেয়ে বড় কথা, সে নিজেকে আটকে রাখেনি।

মঞ্চের পেছনে এসে তাসনিম তাকে জড়িয়ে ধরল।

—তুই পেরেছিস!

নাইরা হেসে বলল,

—আমি নিজেও বিশ্বাস করতে পারছি না।

—আরহান স্যারকে ধন্যবাদ দে।

নাইরা কিছু বলল না।

তার চোখ তখন অডিটোরিয়ামের সামনের সারির দিকে।

আরহান সেখানে নেই।

সে একটু অবাক হলো।

কিছুক্ষণ আগেও তো সেখানে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছিলেন।

তাসনিম বলল,

—কী খুঁজছিস?

—কিছু না।

কিন্তু নাইরা জানত, সে কাকে খুঁজছে।

অন্যদিকে অডিটোরিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল আরহান।

তার পাশে ফারহান কবির।

ফারহান কঠিন গলায় বললেন,

—আপনি বুঝতে পারছেন, আজকের ঘটনা থেকে কী হতে পারে?

আরহান শান্তভাবে বলল,

—একজন মেয়ে নিজের প্রতিভা দেখিয়েছে।

—আমি সেটা বলছি না।

—তাহলে?

—আপনি ওর প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

আরহান এবার ফারহানের দিকে তাকাল।

—আমি ওকে একজন প্রতিভাবান শিক্ষার্থী হিসেবে দেখি।

—আমি আশা করি ব্যাপারটা সেখানেই থাকবে।

আরহান কিছু বলল না।

ফারহান চলে গেলেন।

কিন্তু তার কথাগুলো আরহানের মনে থেকে গেল।

সে জানত, নাইরার প্রতি তার একটা আলাদা মায়া তৈরি হয়েছে।

তবে সেটা কী—সে নিজেও স্পষ্ট করে ভাবতে চাইছিল না।

কারণ নাইরা এখনো তার ছাত্রী।

আর শিক্ষক হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল সীমারেখাটা পরিষ্কার রাখা।

পরদিন ক্লাসে নাইরা চুপচাপ বসে ছিল।

আরহান ক্লাসে ঢুকতেই সবার মতো সেও খাতা খুলে বসে গেল।

আরহান স্বাভাবিকভাবেই ক্লাস নিল।

নাইরা কয়েকবার তার দিকে তাকাল।

কিন্তু আরহান একবারও আলাদা করে তার দিকে তাকাল না।

ক্লাস শেষে সবাই বেরিয়ে গেল।

নাইরা কিছুক্ষণ বসে রইল।

শেষে সাহস করে বলল,

—স্যার।

আরহান থামল।

—হ্যাঁ?

—আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছেন?

—না তো।

—তাহলে আমার সঙ্গে কথা বলছেন না কেন?

আরহান একটু হাসল।

—আমি তো সবার সঙ্গেই কথা বলছি।

—কিন্তু আগে আপনি আমার গান নিয়ে কথা বলতেন।

—এখনও বলব।

—কিন্তু আজ বললেন না।

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তুমি খুব ভালো গেয়েছ।

নাইরা বলল,

—শুধু এটুকুই?

—আর কী বলব?

নাইরা উত্তর দিল না।

আরহান ধীরে বলল,

—নাইরা, একটা বিষয় তোমাকে বুঝতে হবে।

—কী?

—তুমি আমার ছাত্রী। তাই আমাদের সম্পর্কটা পেশাগত থাকা উচিত।

নাইরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

—বুঝেছি।

সে চলে গেল।

কিন্তু করিডোরে বেরিয়ে আসার পর তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভারী লাগল।

সেদিন সন্ধ্যায় নাইরা নিজের ডায়েরি খুলে বসেছিল।

অনেকক্ষণ কলম হাতে নিয়ে বসে থেকেও কিছু লিখতে পারল না।

শেষে লিখল—

“কিছু মানুষকে খুব বেশি কিছু না বলেও মনে রাখা যায়। তাদের সঙ্গে কথা না বলেও তাদের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। কিন্তু সেই অনুভূতির নাম কী?”

সে লেখাটা পড়ে নিজেই কলম থামিয়ে দিল।

তারপর পাতা বন্ধ করে দিল।

সে জানত না এই অনুভূতিটা কী।

শুধু জানত, আরহান আগের মতো কথা না বললে তার মন খারাপ হয়।

কয়েকদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নতুন ঘোষণা এলো।

ছাত্রদের জন্য জাতীয় পর্যায়ের একটি সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন শিল্পী পাঠানো হবে।

সাংস্কৃতিক কমিটির সবাই নাইরার নাম প্রস্তাব করল।

ফারহান বললেন,

—সে কি প্রস্তুত?

আরহান বলল,

—হ্যাঁ।

ফারহান তার দিকে তাকালেন।

—আপনি নিশ্চিত?

—জি।

—তাহলে ওকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

নাইরা খবরটা শুনে খুব খুশি হলো।

তাসনিম বলল,

—তুই এবার সত্যিই বড় জায়গায় গান গাইবি!

নাইরা হাসল।

—ভয়ও লাগছে।

—আরহান স্যার কী বলেছে?

নাইরা একটু থেমে বলল,

—তিনি শুধু বলেছেন, নিজের গানটা যেন নিজের মতো করে গাই।

তাসনিম মুচকি হেসে বলল,

—তুই ওনার কথা খুব মন দিয়ে শুনিস।

নাইরা মাথা নিচু করল।

—উনি ভালো শিক্ষক।

তাসনিম আর কিছু বলল না।

প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি শুরু হলো।

নাইরা প্রতিদিন মিউজিক রুমে অনুশীলন করত।

আরহান দূর থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিত।

কখনো বেশি সময় কথা বলত না।

কিন্তু নাইরা বুঝতে পারত, তার গান ঠিক করার সময় আরহান খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে।

একদিন অনুশীলন শেষে আরহান বলল,

—তোমার শেষ অংশটা একটু বদলানো দরকার।

—কীভাবে?

—শেষ লাইনের আগে একটু বিরতি দাও।

নাইরা আবার গাইল।

আরহান মাথা নেড়ে বলল,

—এবার ঠিক হয়েছে।

নাইরা হেসে বলল,

—আপনার একটা “ঠিক হয়েছে” শুনলেই মনে হয় এতদিনের পরিশ্রম সফল।

আরহানও হেসে ফেলল।

—এত প্রশংসা করতে নেই।

—আমি সত্যি বলছি।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর আরহান বলল,

—তুমি জানো, তোমার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কী?

—কী?

—আগে তুমি অন্যরা কী ভাববে সেটা নিয়ে চিন্তা করতে। এখন তুমি নিজের গানটা ঠিকমতো হচ্ছে কি না, সেটা নিয়ে ভাবো।

নাইরা বলল,

—আপনি আমাকে বদলে দিয়েছেন।

আরহান মাথা নেড়ে বলল,

—না। তুমি নিজেই বদলেছ।

একদিন হঠাৎ নাইরা অসুস্থ হয়ে পড়ল।

প্রতিযোগিতা আর মাত্র তিন দিন পর।

তার কণ্ঠ বসে গেল।

তাসনিম চিন্তায় পড়ে গেল।

—এখন কী হবে?

নাইরা বলল,

—আমি পারব না হয়তো।

ঠিক তখন আরহান খবর পেল।

সে মিউজিক রুমে এসে বলল,

—তুমি আজ গান করবে না।

—কিন্তু স্যার—

—কোনো কিন্তু নয়।

—প্রতিযোগিতা তো আর তিন দিন পর!

—তিন দিন আছে বলেই আজ বিশ্রাম নেবে।

নাইরা বিরক্ত হয়ে বলল,

—আপনি সবসময় এত কঠোর কেন?

আরহান হাসল।

—কারণ কখনো কখনো স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যও থামতে হয়।

নাইরা চুপ করে গেল।

আরহান তাকে কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে চলে গেল।

দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

—আর একটা কথা।

—জি?

—নিজেকে নিয়ে এত চাপ নিও না।

নাইরা মৃদু হাসল।

—ঠিক আছে।

আরহান চলে যাওয়ার পর নাইরা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, মানুষটার সঙ্গে কথা বললেই কেন যেন তার ভেতরের অস্থিরতা কমে যায়।

তিন দিন পর প্রতিযোগিতার দিন।

নাইরা মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে।

হাজার মানুষের সামনে গান গাওয়ার প্রস্তুতি।

তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে।

তাসনিম বলল,

—ভয় লাগছে?

—অনেক।

—আরহান স্যার কোথায়?

নাইরা চারপাশে তাকাল।

—জানি না।

ঠিক তখন মঞ্চের সামনে তাকে দেখা গেল।

আরহান দর্শকদের মধ্যে বসে আছে।

নাইরার বুকের ভেতরটা শান্ত হয়ে গেল।

উপস্থাপক তার নাম ঘোষণা করলেন।

নাইরা মঞ্চে উঠল।

মাইক্রোফোন হাতে নিল।

কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ রাখল।

তারপর গান শুরু করল।

প্রথম কয়েক লাইন ছিল নরম।

তারপর গান এগোতে থাকল।

এবার তার কণ্ঠে শুধু স্বপ্ন ছিল না।

ছিল একটা অচেনা অনুভূতিও।

এমন একটা অনুভূতি, যার নাম সে এখনো জানে না।

গান শেষ হওয়ার পর দর্শকরা দাঁড়িয়ে হাততালি দিল।

নাইরা প্রথমেই আরহানের দিকে তাকাল।

আরহানও হাততালি দিচ্ছিল।

কিন্তু তার চোখে ছিল অন্যরকম এক গর্ব।

ফলাফল ঘোষণা হলো।

নাইরা প্রথম হয়েছে।

সবাই তাকে অভিনন্দন জানাল।

ফারহানও মঞ্চে উঠে তাকে পুরস্কার দিলেন।

—অভিনন্দন।

নাইরা হাসল।

—ধন্যবাদ স্যার।

ফারহান বললেন,

—তুমি প্রমাণ করেছ, সুযোগ পেলে প্রতিভা নিজের জায়গা করে নেয়।

আরহান কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

নাইরা পুরস্কার হাতে নিয়ে তার কাছে এল।

—স্যার, আমি জিতেছি।

—হ্যাঁ। তুমি জিতেছ।

—আপনি খুশি?

—অনেক।

নাইরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

—তাহলে আজ আমাকে একটা কথা বলবেন?

—কী?

—আমি কি সত্যিই বদলে গেছি?

আরহান মৃদু হেসে বলল,

—তুমি শুধু বদলাওনি। তুমি নিজের আসল রূপটা খুঁজে পেয়েছ।

নাইরা কিছু বলল না।

তার চোখে তখন আনন্দ।

কিন্তু দূর থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন ফারহান কবির।

তার মনে আবার সেই পুরোনো সন্দেহ জেগে উঠল।

কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন—

নাইরা আরহানের কথাকে শুধু একজন শিক্ষকের পরামর্শ হিসেবে নিচ্ছে না।

তার অনুভূতিতে অন্য কিছুর আভাস আছে।

নাইরা প্রতিযোগিতায় জেতার পর অরোরা ইউনিভার্সিটিতে তার পরিচিতি আরও বেড়ে গেল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এখন তাকে নিয়মিত ডাকা হয়। তার গান নিয়ে সবাই কথা বলে।

কিন্তু এই সাফল্যের মাঝেও একটা বিষয় নাইরাকে অস্থির করে তুলছিল।

আরহান।

সে যতই নিজেকে বোঝাতে চায় যে আরহান শুধু তার শিক্ষক, ততই বিষয়টা কঠিন হয়ে ওঠে।

আরহানের সঙ্গে কথা বললে তার মন ভালো হয়ে যায়।

আরহান দূরে থাকলে অকারণে মন খারাপ হয়।

কিন্তু সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় যখন সে বুঝতে পারে—

এই অনুভূতিটা হয়তো শুধু শ্রদ্ধা নয়।

একদিন বিকেলে নাইরা লাইব্রেরির পেছনের বাগানে বসে গান লিখছিল।

তার ডায়েরির পাতায় বারবার একই লাইন লিখে আবার কেটে দিচ্ছিল।

তাসনিম পাশে বসে বলল,

—কী লিখছিস?

—কিছু না।

—তুই গত দশ মিনিট ধরে একই লাইন লিখে কাটছিস।

নাইরা ডায়েরি বন্ধ করে ফেলল।

—একটা গান।

তাসনিম মুচকি হেসে বলল,

—গান, নাকি কারও জন্য চিঠি?

নাইরা অবাক হয়ে তাকাল।

—মানে?

—তোর চোখে এখন যে কথা দেখি, সেটা গান লেখার সময়ও দেখা যায়।

নাইরা চুপ।

তাসনিম ধীরে বলল,

—তুই কি আরহান স্যারকে পছন্দ করিস?

নাইরা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।

অনেকক্ষণ পর খুব নিচু গলায় বলল,

—আমি জানি না।

—কীভাবে জানিস না?

—উনাকে দেখলে ভালো লাগে। উনার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। উনি অন্য কারও সঙ্গে বেশি সময় কথা বললে কেন যেন মন খারাপ হয়।

তাসনিম মৃদু হেসে বলল,

—এগুলোকে সাধারণত মানুষ একটা নাম দেয়।

নাইরা মাথা নিচু করল।

—কিন্তু উনি আমার শিক্ষক।

—হ্যাঁ। তাই তুই তাড়াহুড়ো করে কিছু করবি না।

নাইরা মাথা নেড়ে বলল,

—আমি কিছু করতেও চাই না।

তাসনিম বলল,

—কখনো কখনো অনুভূতি থাকা আর সেটা নিয়ে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া এক জিনিস নয়।

নাইরা কথাটা মনে রাখল।

অন্যদিকে আরহানও নিজের মধ্যে একটা পরিবর্তন টের পাচ্ছিল।

নাইরাকে সে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে চায় না।

কিন্তু তার প্রতিভা, তার সাহস, তার পরিবর্তন—সবকিছুই তাকে মুগ্ধ করত।

আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, নাইরা এখন শুধু তার ছাত্রী নয়।

সে একজন তরুণী, যে নিজের স্বপ্নের জন্য লড়ছে।

আরহান জানত, তাকে নিজের অনুভূতির ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

তাই সে ইচ্ছা করেই নাইরার সঙ্গে প্রয়োজনের বাইরে কথা কমিয়ে দিল।

কিন্তু এতে পরিস্থিতি আরও অদ্ভুত হয়ে গেল।

নাইরা ভাবল, আরহান হয়তো তাকে এড়িয়ে চলছে।

একদিন ক্লাস শেষে সে আরহানকে থামাল।

—স্যার।

—হ্যাঁ?

—আপনি কি আমার ওপর বিরক্ত?

—না।

—তাহলে আমাকে এড়িয়ে চলছেন কেন?

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—আমি কাউকে এড়িয়ে চলছি না।

—কিন্তু আগে আপনি আমার গান শুনতেন। এখন আমি ডাকলেও সময় পান না।

আরহান শান্তভাবে বলল,

—তুমি এখন অনেক ব্যস্ত। তোমার নিজের কাজ আছে।

—আপনি কি চান না আমি আপনার সঙ্গে কথা বলি?

আরহান একটু থেমে বলল,

—আমি চাই তুমি তোমার পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে মনোযোগী হও।

নাইরা কষ্ট পেল।

—আমি কি সেটা করছি না?

—করছ।

—তাহলে সমস্যা কোথায়?

আরহান কোনো উত্তর দিল না।

নাইরা ধীরে বলল,

—আপনি যদি আমাকে কিছু বলতে চান, সরাসরি বলুন।

আরহান তার দিকে তাকাল।

কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না।

শেষ পর্যন্ত বলল,

—তুমি এখন যাও।

নাইরা চলে গেল।

আরহান অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

কয়েকদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হলো।

নাইরাকে প্রধান শিল্পী হিসেবে বেছে নেওয়া হলো।

এবার তার সঙ্গে একটি নতুন ছাত্রও পারফর্ম করবে—আরিয়ান।

আরিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের ছাত্র।

গিটার বাজায় এবং গান লেখে।

অনুশীলনের সময় আরিয়ান প্রায়ই নাইরার প্রশংসা করত।

—তোমার গলার টোনটা দারুণ।

নাইরা হেসে বলত,

—ধন্যবাদ।

—তুমি নিজের গান লেখো?

—হ্যাঁ।

—একদিন আমার সঙ্গে একটা গান করো।

নাইরা বলল,

—দেখা যাবে।

আরহান দূর থেকে তাদের অনুশীলন দেখছিল।

সে জানত, আরিয়ানের সঙ্গে নাইরার সম্পর্কের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই।

তবুও অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।

সে নিজেই অবাক হয়ে গেল।

কেন?

নাইরা তো তার ছাত্রী।

তার জীবনে কে আসবে, সেটা নিয়ে তার অস্বস্তি হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু মন সবসময় যুক্তির কথা শোনে না।

একদিন সন্ধ্যায় আরহান একা মিউজিক রুমে বসে ছিল।

নাইরা এসে দরজায় দাঁড়াল।

—স্যার?

আরহান তাকাল।

—এসো।

নাইরা ভেতরে এসে গিটারটা টেবিলে রাখল।

—একটা গান লিখেছি।

—শুনব?

—হ্যাঁ।

সে গিটার হাতে নিল।

গানটি ছিল অদ্ভুত শান্ত।

একজন মানুষকে নিয়ে, যে কাছে থেকেও দূরে থাকে।

যাকে কিছু বলা যায় না।

যার কাছে নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে হয়।

গান শেষ হলে আরহান অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—গানটা খুব ব্যক্তিগত।

নাইরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—হ্যাঁ।

—কার জন্য লিখেছ?

নাইরা সরাসরি উত্তর দিল,

—আপনার জন্য।

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

আরহান ধীরে উঠে দাঁড়াল।

—নাইরা...

—আমি জানি আপনি কী বলবেন।

—তাহলে?

—আপনি বলবেন, এটা ঠিক নয়।

আরহান কিছু বলল না।

নাইরা বলল,

—আমি কোনো উত্তর চাইছি না।

—তাহলে?

—শুধু চেয়েছিলাম আপনি জানুন।

আরহান গভীর শ্বাস নিল।

—তুমি জানো, আমাদের অবস্থাটা সহজ নয়।

—জানি।

—তুমি এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।

—আমি প্রাপ্তবয়স্ক।

—আমি জানি।

—তাহলে?

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমি তোমার অনুভূতিকে অসম্মান করছি না। কিন্তু এখন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।

নাইরা মাথা নেড়ে বলল,

—আমি বুঝেছি।

সে গিটারটা তুলে নিল।

দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

—একটা কথা বলব?

—বলো।

—আপনি আমাকে দূরে ঠেলে দিলে অনুভূতিটা কমবে না।

আরহান তার দিকে তাকিয়ে রইল।

নাইরা চলে গেল।

সেদিন রাতে আরহান ঘুমাতে পারল না।

তার মনে বারবার নাইরার কথা ঘুরছিল।

সে জানত, নাইরার অনুভূতি সত্যি।

আর নিজের মনও সে অস্বীকার করতে পারছিল না।

কিন্তু সে জানত, শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়।

তাই সে সিদ্ধান্ত নিল—

নাইরার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে কোনো সম্পর্কের সিদ্ধান্ত নেবে না।

অন্যদিকে নাইরাও নিজের সিদ্ধান্ত নিল।

সে আরহানকে কোনো চাপ দেবে না।

নিজের পড়াশোনা শেষ করবে।

নিজের গান নিয়ে কাজ করবে।

তারপর সময় হলে নিজের অনুভূতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

কিন্তু তাদের এই নীরব বোঝাপড়া বেশিদিন গোপন রইল না।

ফারহান কবির জানতে পারলেন নাইরার লেখা গানটির কথা।

তিনি আরহানকে আবার অফিসে ডাকলেন।

—আমি সবকিছু জানি।

আরহান চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

—নাইরা আপনার প্রতি অনুভূতি তৈরি করেছে।

—জি।

—আর আপনি?

আরহান কিছু বলল না।

ফারহান কঠিন গলায় বললেন,

—আপনার নীরবতাই আমার উত্তর পেয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

আরহান বলল,

—আমি কোনো সীমা অতিক্রম করিনি।

—এখনও করেননি।

—এবং করবও না।

ফারহান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,

—তাহলে প্রমাণ করুন।

—কীভাবে?

—নাইরার জীবন থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে যান।

আরহান চমকে উঠল।

—আমি ওর শিক্ষক। ওর পড়াশোনার দায়িত্ব আছে।

—অন্য শিক্ষকও আছে।

—আপনি কি আমাকে চাকরি ছাড়তে বলছেন?

ফারহান ধীরে বললেন,

—আমি চাই না এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক আর কোনো ছাত্রীর অনুভূতির অংশ হয়ে উঠুক।

আরহান চুপ করে রইল।

তার সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত।

একদিকে তার পেশা।

অন্যদিকে নাইরার অনুভূতি।

আরহান জানত—

সে যদি সত্যিই নাইরাকে সম্মান করে, তাহলে এখন নিজের আবেগের চেয়ে তার ভবিষ্যৎকে বড় করে দেখতে হবে।

কিন্তু সে জানত না, তার পরের সিদ্ধান্ত নাইরার জীবনকে কতটা বদলে দেবে।

সেই রাতেই আরহান নিজের পদত্যাগপত্র লিখতে বসে গেল।

আরহান সারা রাত ঘুমাতে পারেনি।

তার সামনে পড়ে ছিল পদত্যাগপত্র।

একটা কাগজ।

কিন্তু সেই কাগজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তার চাকরি, পরিচিত পরিবেশ আর গত কয়েক বছরের জীবন।

সবচেয়ে বড় কথা, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নাইরার ভবিষ্যৎও।

সে জানত, নাইরার প্রতি নিজের অনুভূতি অস্বীকার করা কঠিন হয়ে গেছে।

কিন্তু একই সঙ্গে এটাও জানত—নাইরা এখনো তার ছাত্রী।

তাই কোনো সম্পর্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাকে শিক্ষক-ছাত্রীর সীমারেখাটা পরিষ্কার করতেই হবে।

ভোরের দিকে আরহান সিদ্ধান্ত নিল।

সে পদত্যাগ করবে।

পরদিন সকালে অরোরা ইউনিভার্সিটিতে খবর ছড়িয়ে পড়ল।

আরহান রহমান আর বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকছেন না।

কেউ কারণ জানে না।

ছাত্রদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ল।

নাইরা খবরটা শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না।

তাসনিম দৌড়ে এসে বলল,

—নাইরা, শুনেছিস?

—কী?

—আরহান স্যার পদত্যাগ করেছেন।

নাইরার হাত থেকে কলম পড়ে গেল।

—কী বলছিস?

—সত্যি।

নাইরা কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল।

সোজা আরহানের অফিসের দিকে গেল।

কিন্তু দরজা বন্ধ।

টেবিলও খালি।

শুধু কিছু বই পড়ে আছে।

নাইরা চারপাশে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হলো।

সন্ধ্যায় সে আরহানকে ফোন করল।

প্রথমবার ফোন ধরল না।

দ্বিতীয়বারও না।

তৃতীয়বার ফোন করলে ওপাশ থেকে কণ্ঠ এল।

—হ্যালো?

নাইরা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

শেষে বলল,

—আপনি চলে যাচ্ছেন?

—হ্যাঁ।

—কেন?

—এটাই ভালো হবে।

—কার জন্য?

আরহান চুপ।

নাইরা আবার বলল,

—আমার জন্য?

—নাইরা...

—আপনি আমাকে না জানিয়ে চলে যাচ্ছেন কেন?

—তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।

—কিন্তু এখন তো আরও বেশি কষ্ট হচ্ছে।

আরহান চোখ বন্ধ করল।

—আমি জানি।

—তাহলে কেন?

—কারণ তোমার ভবিষ্যৎ আমার অনুভূতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নাইরা নীরব হয়ে গেল।

আরহান ধীরে বলল,

—তুমি এখন নিজের জীবন তৈরি করার সময়ের মধ্যে আছ। আমি চাই না আমার কারণে তোমার পড়াশোনা, পরিবার বা ভবিষ্যৎ কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোক।

নাইরার চোখে পানি চলে এল।

—আপনি কি আমাকে এড়িয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে?

—আমি জানি না।

—আপনি কি আমার অনুভূতিকে একটুও গুরুত্ব দেন না?

আরহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—দিই।

—তাহলে?

—তাই তো যাচ্ছি।

কথাটা শুনে নাইরা আর কিছু বলতে পারল না।

ফোন কেটে গেল।

সে অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।

পরদিন আরহান বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন কাটাল।

কয়েকজন ছাত্র তাকে বিদায় জানাতে এল।

রাফি বলল,

—স্যার, আপনি চলে গেলে আমাদের মিউজিক ক্লাবটা কে দেখবে?

আরহান হাসল।

—তোমরাই দেখবে।

—আমরা পারব?

—আমি কি তোমাদের কিছুই শেখাইনি?

সবাই হেসে ফেলল।

কিন্তু নাইরা কোথাও ছিল না।

আরহান তাকে খুঁজল না।

সে জানত, দেখা হলে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা কঠিন হবে।

অন্যদিকে নাইরা নিজের ঘরে বসে ছিল।

তার সামনে আরহানের দেওয়া পুরোনো কিছু নোট।

প্রথম ক্লাসের সেই লেখা—

“নিজের গল্প নিজে লিখবে।”

সে কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল।

তারপর নিজের ডায়েরিতে লিখল—

“আপনি আমাকে নিজের গল্প লিখতে শিখিয়েছেন। অথচ আমার গল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় না লিখেই চলে গেলেন।”

কলম থেমে গেল।

সে চোখ মুছে আবার লিখল—

“তবু আমি থামব না।”

ছয় মাস কেটে গেল।

নাইরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের পড়াশোনায় মন দিল।

সে গান লেখা আরও বাড়িয়ে দিল।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট অনুষ্ঠানে গান করতে শুরু করল।

কিন্তু আরহানের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।

আরহান ঢাকার বাইরে একটি সংগীত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা শুরু করেছে।

সেখানে নতুন ছাত্রদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

কখনো কখনো রাতে একা বসে নাইরার কথা মনে পড়ে।

তার প্রথম গান।

প্রথম মঞ্চে ওঠা।

প্রথমবার নিজের অনুভূতির কথা বলা।

কিন্তু সে নিজেকে মনে করিয়ে দেয়—

সময় আসেনি।

একদিন নাইরা একটি জাতীয় সংগীত প্রতিযোগিতার ফাইনালে পৌঁছে গেল।

সেদিন তার পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ।

সে নিজের লেখা একটি গান গাইল।

গানটির নাম—

“অপেক্ষার ওপারে”।

গানটি শুনে বিচারকরা মুগ্ধ হয়ে গেলেন।

শেষে নাইরা প্রথম স্থান অর্জন করল।

সংবাদমাধ্যমে তার ছবি প্রকাশ হলো।

একটি সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল,

—আপনার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কে?

নাইরা একটু থেমে বলল,

—একজন শিক্ষক।

—তিনি কে?

নাইরা মৃদু হাসল।

—তার নাম বলার প্রয়োজন নেই। তিনি আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছেন—নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিতে।

সাক্ষাৎকারটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল।

আর সেই সাক্ষাৎকার দেখল আরহান।

সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

নাইরা বদলে গেছে।

আগের সেই দ্বিধাগ্রস্ত মেয়েটা আর নেই।

সে নিজের জায়গা তৈরি করেছে।

আরহানের মনে অদ্ভুত একটা গর্ব তৈরি হলো।

কয়েক সপ্তাহ পর আরহানের কাছে একটি খাম এল।

অরোরা ইউনিভার্সিটি থেকে।

ভেতরে আমন্ত্রণপত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সমাবর্তন অনুষ্ঠান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

আরহান প্রথমে যেতে চাইল না।

কিন্তু আমন্ত্রণের নিচে আরেকটি লাইন ছিল—

“এ বছরের সেরা শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক পুরস্কারপ্রাপ্তদের বিশেষ সম্মাননা প্রদান করবেন অধ্যাপক আরহান রহমান।”

নাইরার নামও সেখানে ছিল।

আরহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

সে জানত, সেখানে গেলে আবার পুরোনো অনুভূতিগুলো সামনে আসবে।

তবু সে গেল।

সমাবর্তনের দিন অরোরা ইউনিভার্সিটি আবার উৎসবের সাজে সেজেছে।

নাইরা সাদা-কালো গাউন পরে মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে।

তার হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক পুরস্কার।

হঠাৎ ঘোষণার শব্দ ভেসে এল—

—এবার বিশেষ সম্মাননা প্রদান করবেন অধ্যাপক আরহান রহমান।

নাইরার বুক ধক করে উঠল।

সে ধীরে মঞ্চের দিকে তাকাল।

আরহান উঠে এল।

ছয় মাস পর তাদের দেখা।

চোখে চোখ পড়তেই দুজনই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল।

তারপর আরহান স্বাভাবিক হয়ে গেল।

—নাইরা সায়ান।

নাইরা মঞ্চে উঠল।

আরহান তার হাতে পুরস্কার তুলে দিল।

দুজনের হাত এক মুহূর্তের জন্য স্পর্শ করল।

নাইরা খুব নিচু গলায় বলল,

—কেমন আছেন?

আরহানও নিচু গলায় বলল,

—ভালো। তুমি?

—এখন ভালো।

আরহান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—তুমি অনেক দূর এগিয়েছ।

নাইরা বলল,

—আপনি বলেছিলেন নিজের গল্প নিজে লিখতে।

—তুমি লিখেছ?

—হ্যাঁ।

—কেমন হয়েছে?

নাইরা চোখে চোখ রেখে বলল,

—এখনও শেষ হয়নি।

আরহানের মুখের হাসি থেমে গেল।

সে বুঝতে পারল, নাইরা হয়তো শুধু তার ক্যারিয়ারের কথা বলছে না।

অনুষ্ঠান শেষে নাইরা বাইরে এসে দাঁড়াল।

আরহানও কিছুক্ষণ পর সেখানে এল।

দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ নীরবতা।

নাইরা বলল,

—আপনি কি এখনও মনে করেন, আমাদের কথা বলা উচিত নয়?

আরহান ধীরে বলল,

—তুমি এখন আর আমার ছাত্রী নও।

নাইরা মাথা নেড়ে বলল,

—না।

—তোমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনও শেষ।

—হ্যাঁ।

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

নাইরা বলল,

—তাহলে এবার কি আপনি নিজের সত্যিটা বলবেন?

আরহান তার দিকে তাকাল।

অনেকদিন ধরে বুকের মধ্যে আটকে থাকা কথাগুলো যেন ঠোঁটের কাছে এসে দাঁড়াল।

কিন্তু সে তখনও কিছু বলল না।

শুধু বলল,

—আজ না।

নাইরা একটু অবাক হলো।

—কেন?

—কারণ এতদিন আমরা দূরত্বের মধ্যে ছিলাম। আমি চাই না হঠাৎ করে একটা সিদ্ধান্ত নিই।

নাইরা মৃদু হেসে বলল,

—আমি অপেক্ষা করতে পারি।

আরহান তাকিয়ে রইল।

নাইরা বলল,

—এবার কিন্তু আপনি আমাকে অপেক্ষা করতে বলছেন না। আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।

আরহানের চোখে প্রথমবার স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল।

—ঠিক আছে।

নাইরা চলে গেল।

আরহান তার চলে যাওয়া দেখল।

এবার তার মনে হলো—

দূরত্ব হয়তো তাদের আলাদা করেনি।

বরং দুজনকেই নিজেদের সত্যিটা বুঝতে সময় দিয়েছে।

সেদিন রাতে নাইরা নিজের ডায়েরির শেষ পাতায় লিখল—

“কিছু অপেক্ষা কাউকে পাওয়ার জন্য নয়। কিছু অপেক্ষা নিজেকে বোঝার জন্য। আমি এখন জানি, আমার অনুভূতিটা কেবল শ্রদ্ধা নয়। কিন্তু আমি এটাও জানি, তাকে পাওয়ার আগে আমাকে নিজের জীবনটাকে সম্পূর্ণ করতে হবে।”

আরহানও নিজের ডায়েরিতে লিখল—

“আজ প্রথমবার মনে হলো, নাইরা আর সেই ছাত্রী নেই যাকে আমি একদিন নিজের স্বপ্নের পথে হাঁটতে শিখিয়েছিলাম। সে এখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে। হয়তো এবার আমাকেও নিজের সত্যিটা স্বীকার করার সময় এসেছে।”

কিন্তু তাদের সামনে তখনও সবচেয়ে বড় বাধা ছিল—

ফারহান কবির।

কারণ তিনি এখনো এই সম্পর্ক মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নন।

সমাবর্তনের পর প্রায় দুই মাস কেটে গেছে।

নাইরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নয়। সে নিজের গান নিয়ে নিয়মিত কাজ করছে। কয়েকটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করে কোনো চুক্তি করছে না।

আরহানের সঙ্গে তার যোগাযোগও খুব সীমিত।

মাঝে মাঝে কোনো অনুষ্ঠানের খবর নিয়ে কথা হয়।

কখনো কোনো নতুন গানের ব্যাপারে মতামত নেয়।

কিন্তু দুজনের কেউই সেই দিনের অসমাপ্ত কথাটা আর তোলেনি।

তবু দুজনেই জানে—

কথাটা এখনো শেষ হয়নি।

এক বিকেলে নাইরা নিজের স্টুডিওতে বসে নতুন গান রেকর্ড করছিল।

হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।

তাসনিম।

—হ্যালো?

—নাইরা, একটা খবর আছে।

—কী?

—অরোরা ইউনিভার্সিটিতে নতুন মিউজিক প্রোগ্রাম শুরু হচ্ছে।

—ভালো তো।

—আরহান স্যার সেটার প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে ফিরছেন।

নাইরা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ। আর একটা ব্যাপার আছে।

—কী?

—তোমাকেও অতিথি শিল্পী হিসেবে নেওয়ার কথা চলছে।

নাইরার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

—তাহলে দেখা হচ্ছে।

কয়েকদিন পর অরোরা ইউনিভার্সিটিতে নতুন সংগীত কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হলো।

আরহান আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছে।

তবে এবার সে আগের পদে নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একটি স্বাধীন সংগীত কর্মসূচির পরিচালক হিসেবে কাজ করবে।

নাইরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল।

অনেকদিন পর আবার সেই পরিচিত ক্যাম্পাস।

একসময় যেখানে সে নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখত।

আজ সেখানে সে একজন শিল্পী হিসেবে এসেছে।

অনুষ্ঠান শেষে আরহান তার কাছে এল।

—কেমন আছ?

নাইরা হাসল।

—ভালো। আপনি?

—ভালো।

—আপনাকে এখানে দেখে ভালো লাগছে।

—তোমাকেও।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।

তারপর নাইরা বলল,

—আপনি কি এবার আর হঠাৎ চলে যাবেন?

আরহান হেসে বলল,

—না।

—নিশ্চিত?

—এবার যাওয়ার কোনো কারণ নেই।

নাইরা তার চোখের দিকে তাকাল।

—ভালো।

সেদিন সন্ধ্যায় দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বাগানে হাঁটছিল।

একসময় এই জায়গাতেই নাইরা বসে গান লিখত।

আরহান বলল,

—মনে আছে?

—সব মনে আছে।

—তখন তুমি সবসময় ভয় পেতে।

—এখনও পাই।

—কীসের?

নাইরা মৃদু হেসে বলল,

—কিছু সিদ্ধান্তের।

—যেমন?

—যে সিদ্ধান্তের পর জীবন আর আগের মতো থাকবে না।

আরহান বুঝতে পারল সে কী বলতে চাইছে।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

—নাইরা, একটা কথা বলতে চাই।

—বলুন।

—তোমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়েছে অনেকদিন। তুমি নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করছ। আমি তোমার শিক্ষক হিসেবে আর নেই।

নাইরা চুপচাপ শুনছিল।

আরহান বলল,

—তাই এবার আমি একটা সত্যি কথা বলতে চাই।

নাইরার বুক ধক করে উঠল।

—কী?

আরহান ধীরে বলল,

—তোমাকে প্রথম দেখার দিন থেকেই আমি বুঝেছিলাম তুমি অন্যরকম। কিন্তু তখন তোমার প্রতি আমার দায়িত্ব ছিল শুধু একজন শিক্ষক হিসেবে। তাই আমি সবসময় দূরত্ব রেখেছি।

নাইরা নিচু গলায় বলল,

—আমি জানি।

—তোমার অনুভূতির কথা জানার পরও আমি দূরে সরে গিয়েছিলাম।

—সেটাও জানি।

—কিন্তু সময়ের সঙ্গে একটা বিষয় বুঝেছি।

নাইরা তাকাল।

—কী?

আরহান বলল,

—তোমাকে শুধু একজন ছাত্রী হিসেবে দেখার অনুভূতি অনেক আগেই বদলে গেছে।

নাইরার চোখে জল চিকচিক করল।

সে কিছু বলল না।

আরহান বলল,

—আমি জানি না ভবিষ্যৎ কী হবে। কিন্তু আমি আর নিজের অনুভূতিটাকে মিথ্যে বলতে চাই না।

নাইরা ধীরে বলল,

—আমি তো অনেক আগেই সত্যিটা মেনে নিয়েছি।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

কিন্তু সেই মুহূর্তেই দূর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল—

—নাইরা!

দুজন ঘুরে তাকাল।

ফারহান কবির।

তার মুখ কঠিন।

ফারহান কাছে এসে বললেন,

—আরহান, আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে?

আরহান মাথা নেড়ে বলল,

—অবশ্যই।

নাইরা বলল,

—আমি তাহলে—

ফারহান তাকে থামিয়ে বললেন,

—তুমিও থাকবে।

তিনজন একটি খালি কক্ষে গিয়ে বসল।

ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—আমি জানতাম এই দিনটা একসময় আসবে।

নাইরা নিচু গলায় বলল,

—স্যার—

—আমাকে স্যার বলার দরকার নেই এখন। আমি তোমাদের দুজনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি।

আরহান বলল,

—তাহলে সমস্যা কোথায়?

ফারহান তাকালেন তার দিকে।

—সমস্যা হলো, তোমাদের সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিল এমন একটা সময়ে, যখন তুমি ওর শিক্ষক ছিলে।

—কিন্তু আমি কোনো সীমা অতিক্রম করিনি।

—আমি সেটা জানি।

—তাহলে?

ফারহান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—আমি ভয় পাই।

নাইরা অবাক।

—কিসের?

—তোমাদের সম্পর্কের জন্য নয়। তোমাদের ভবিষ্যতের জন্য।

তিনি নাইরার দিকে তাকালেন।

—তুমি এখন ক্যারিয়ার শুরু করছ। আরহানও নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। মানুষ অনেক কথা বলবে।

নাইরা শান্তভাবে বলল,

—মানুষ তো সবসময়ই কথা বলে।

ফারহান বললেন,

—কিন্তু একটা সম্পর্ক শুধু অনুভূতি দিয়ে চলে না। সম্মান, বিশ্বাস আর দায়িত্বও লাগে।

আরহান বলল,

—আমি সেটা বুঝি।

—তাহলে আমাকে একটা কথা দাও।

—কী?

—নাইরার ক্যারিয়ারের পথে তুমি কখনো বাধা হবে না।

আরহান বিনা দ্বিধায় বলল,

—কখনো না।

ফারহান এবার নাইরার দিকে তাকালেন।

—আর তুমি?

—আমি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেব। তবে পরিবারকে সম্মান করব।

ফারহান দীর্ঘক্ষণ দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—তাহলে আমি তোমাদের থামাব না।

নাইরা অবাক হয়ে গেল।

—সত্যি?

ফারহান মৃদু হাসলেন।

—সব যুদ্ধ নিয়ম দিয়ে জেতা যায় না।

সেদিন রাতে নাইরা বাড়িতে ফিরে বাবাকে সব বলল।

তার বাবা সায়ান রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—আরহান কী করে?

—সংগীত শিক্ষক। নিজের একাডেমিও আছে।

—তোমাদের বয়সের পার্থক্য?

—খুব বেশি নয়।

—তুমি নিশ্চিত?

নাইরা মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—আমি তোমাকে থামাব না। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—ক্যারিয়ার আর সম্পর্ক, দুটোই দায়িত্ব নিয়ে সামলাতে হবে।

নাইরা বাবার হাত ধরল।

—আমি পারব।

কিন্তু সবকিছু এত সহজ ছিল না।

আরহানের পরিবারও বিষয়টা জানল।

তার মা প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও ছেলের সিদ্ধান্ত শুনে বললেন,

—তুমি কি নিশ্চিত?

আরহান বলল,

—হ্যাঁ।

—মেয়েটা কি তোমাকে বুঝতে পারে?

—আমার মনে হয়, অন্য সবার চেয়ে বেশি।

তার মা মৃদু হাসলেন।

—তাহলে ওর সঙ্গে কথা বলো। শুধু অনুভূতি নয়, ভবিষ্যৎ নিয়েও।

পরের সপ্তাহে আরহান নাইরাকে নিয়ে তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেল।

নাইরা কিছুটা নার্ভাস ছিল।

আরহানের মা তাকে দেখে হাসলেন।

—তুমি নাইরা?

—জি।

—তোমার গান আমি শুনেছি।

নাইরা অবাক।

—সত্যি?

—হ্যাঁ। আরহান তোমার কথা অনেক বলেছে।

আরহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—মা!

তিনি হেসে বললেন,

—আমি কি মিথ্যে বলছি?

নাইরা লজ্জায় মাথা নিচু করল।

কিছুক্ষণ পর সবাই স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে শুরু করল।

নাইরার পড়াশোনা, গান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছু নিয়ে আলোচনা হলো।

বিদায়ের সময় আরহানের মা নাইরার হাত ধরে বললেন,

—জীবনে নিজের পরিচয় কখনো হারিয়ে ফেলো না।

নাইরা মৃদু হাসল।

—জি।

কয়েকদিন পর আরহান নাইরাকে একটি জায়গায় নিয়ে গেল।

ঢাকার বাইরে শান্ত একটি নদীর পাড়।

সূর্য ডুবে যাচ্ছে।

নাইরা বলল,

—এখানে কেন এনেছেন?

আরহান বলল,

—একটা কথা বলার জন্য।

—কী কথা?

—আমি চাই না আমাদের সম্পর্ক শুধু আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকুক।

নাইরা চুপ করে শুনছিল।

—আমি চাই তুমি তোমার গান নিয়ে এগিয়ে যাও। আমি আমার কাজ করব। আমরা একে অপরকে থামাব না।

নাইরা বলল,

—আর যদি কোনোদিন আমাদের মধ্যে সমস্যা হয়?

—তাহলে কথা বলব।

—রাগ হলে?

—তবুও কথা বলব।

নাইরা হাসল।

—আপনি এত পরিকল্পনা করে সম্পর্ক করেন?

আরহানও হেসে বলল,

—আমি শুধু ভুল করতে চাই না।

নাইরা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমি একটা কথা চাই।

—কী?

—আপনি আর কখনো না বলে চলে যাবেন না।

আরহান বলল,

—কখনো না।

নাইরা হাত বাড়িয়ে দিল।

—তাহলে কথা থাকল?

আরহান তার হাত ধরল।

—কথা থাকল।

দুজন কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।

কোনো বড় ঘোষণা নেই।

কোনো নাটকীয়তা নেই।

শুধু দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের একটি সিদ্ধান্ত—

তারা একে অপরকে ভালোবাসবে, কিন্তু নিজেদের স্বপ্ন হারিয়ে নয়।

কিন্তু ঠিক তখনই নাইরার ফোন বেজে উঠল।

একটি আন্তর্জাতিক সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তাকে ছয় মাসের জন্য বিদেশে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে।

নাইরা খবরটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।

আরহান জিজ্ঞেস করল,

—কী হয়েছে?

নাইরা ফোনটা তার দিকে এগিয়ে দিল।

আরহান পড়ে মৃদু হাসল।

—এটা তো অসাধারণ সুযোগ।

নাইরা বলল,

—ছয় মাসের জন্য যেতে হবে।

—তাহলে যাবে।

—আপনি?

—আমি অপেক্ষা করব।

নাইরা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

নাইরার সামনে তখন জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ।

একটি আন্তর্জাতিক সংগীত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাকে ছয় মাসের জন্য বিদেশে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সেখানে সে নিজের গান নিয়ে কাজ করবে, বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেবে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ পাবে।

কিন্তু প্রস্তাবটা হাতে পাওয়ার পর থেকেই নাইরার মনে একটা দ্বিধা তৈরি হয়েছিল।

কারণ এবার তার জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এসেছে।

আরহান।

তাই সে প্রথমে ভাবছিল, সুযোগটা ছেড়ে দেবে কি না।

কিন্তু আরহান তাকে এক মুহূর্তও সেই সুযোগ ছাড়ার কথা বলল না।

বরং বলল,

—তুমি যাবে।

নাইরা তাকিয়ে বলেছিল,

—ছয় মাসের জন্য।

—জানি।

—অনেক দূরে।

—সেটাও জানি।

—তাহলে আপনি এত সহজে বলছেন কেন?

আরহান মৃদু হেসে বলেছিল,

—কারণ তোমার স্বপ্নের জন্য যদি আমি বাধা হয়ে দাঁড়াই, তাহলে আমি তোমাকে ভালোবাসি বলার অধিকার হারাব।

কথাটা নাইরার মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।

বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হলো।

নাইরা প্রতিদিন ব্যস্ত।

পাসপোর্ট, কাগজপত্র, গান, রেকর্ডিং—সবকিছু নিয়ে ছুটছে।

তার বাবা-মাও এবার তাকে পুরোপুরি সমর্থন করলেন।

বাবা বললেন,

—তুই অনেক দূর এগিয়েছিস। এখন আরও শিখে আয়।

মা বললেন,

—নিজের যত্ন নেবি।

আরহানও প্রতিদিন তার প্রস্তুতির খবর নেয়।

কখনো ফোনে।

কখনো মেসেজে।

তবে দুজনেই একটা বিষয় ঠিক করে নিয়েছিল—

দূরত্ব যেন তাদের জীবনকে থামিয়ে না দেয়।

বিদেশ যাওয়ার আগের রাতে নাইরা আরহানের সঙ্গে দেখা করতে গেল।

একটা ছোট ক্যাফের নিরিবিলি কোণে দুজন বসেছিল।

নাইরা বলল,

—কাল চলে যাচ্ছি।

—জানি।

—আপনার মন খারাপ করছে?

—করছে।

—তবু আমাকে যেতে বলছেন?

—অবশ্যই।

নাইরা একটু হাসল।

—আপনি মাঝে মাঝে খুব অদ্ভুত।

—কেন?

—নিজের মন খারাপ হলেও আমাকে আটকে রাখতে চান না।

আরহান বলল,

—কারণ তোমাকে আটকে রাখার জন্য আমি তোমার জীবনে আসিনি।

নাইরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আমি ভয় পাচ্ছি।

—কীসের?

—দূরত্বের।

আরহান বলল,

—দূরত্ব মানুষকে আলাদা করে না। অনেক সময় মানুষের সত্যিকারের জায়গাটা বুঝিয়ে দেয়।

নাইরা বলল,

—আর যদি আমি আপনাকে খুব মিস করি?

—তাহলে ফোন করবে।

—আর আপনি?

—আমিও করব।

নাইরা হেসে বলল,

—আপনি কথা দিলেন?

—কথা দিলাম।

পরদিন বিমানবন্দরে নাইরাকে বিদায় দিতে পুরো পরিবার এসেছিল।

আরহানও এসেছিল।

নাইরা তার সামনে এসে দাঁড়াল।

—আমি যাচ্ছি।

—ভালো থেকো।

—এত ছোট করে বলছেন?

—তাহলে কী বলব?

—জানি না।

আরহান মৃদু হেসে বলল,

—নিজের স্বপ্নটা পূরণ করে ফিরে এসো।

নাইরা বলল,

—আপনার জন্য একটা গান লিখব।

—আমি অপেক্ষা করব।

নাইরা চলে গেল।

আরহান অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

বিদেশে গিয়ে প্রথম কয়েক সপ্তাহ নাইরা প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

নতুন পরিবেশ।

নতুন মানুষ।

নতুন কাজ।

প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রশিক্ষণ।

তারপরও রাতে ঘুমানোর আগে সে আরহানকে ফোন করত।

—আজ কী হয়েছে জানেন?

—কী?

—আজ একজন বিখ্যাত সংগীতশিল্পী আমার গান শুনে প্রশংসা করেছেন।

—আমি তো আগেই বলেছিলাম তুমি পারবে।

—আপনার কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার পর অন্য কারও প্রশংসা আর তেমন বড় লাগে না।

আরহান হেসে বলত,

—এটা বলা যাবে না।

—কেন?

—অন্যরা কষ্ট পাবে।

নাইরা হেসে ফেলত।

এই ছোট ছোট কথাগুলোই তাদের দূরত্বকে সহজ করে তুলছিল।

কিন্তু একসময় কাজের চাপ বেড়ে গেল।

নাইরার ফোন করার সময় কমে গেল।

আরহানও নিজের একাডেমি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

কয়েকদিন পর তাদের কথাবার্তা দিনে একবার থেকে দুদিনে একবার হয়ে গেল।

তারপর কখনো শুধু ছোট মেসেজ।

নাইরার মনে অস্বস্তি তৈরি হলো।

এক রাতে সে ফোন করল।

আরহান ধরতে দেরি করল।

—হ্যালো?

—ব্যস্ত ছিলেন?

—হ্যাঁ, একটা ক্লাস ছিল।

—আপনি আমাকে আগে জানাতে পারতেন।

—দুঃখিত।

নাইরা চুপ।

আরহান বুঝতে পারল তার মন খারাপ।

—কী হয়েছে?

—কিছু না।

—নাইরা।

—আপনি কি আমাকে মিস করেন না?

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

—করি।

—তাহলে এত কম কথা বলেন কেন?

—আমি ভেবেছিলাম তোমাকে কাজের মধ্যে বিরক্ত করব না।

—কিন্তু আমি তো আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।

আরহান নরম গলায় বলল,

—তাহলে আমাকে বলবে।

নাইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—আমি ভয় পাই।

—কীসের?

—দূরত্বে মানুষ বদলে যায়।

আরহান বলল,

—তাহলে আমাদের এমন কিছু তৈরি করতে হবে, যেটা দূরত্ব বদলাতে পারবে না।

পরদিন থেকে তারা একটা নিয়ম করল।

প্রতিদিন অন্তত পনেরো মিনিট শুধু নিজেদের জন্য কথা বলবে।

কাজ যতই থাকুক।

সমস্যা যতই থাকুক।

এই সময়টুকু থাকবে তাদের জন্য।

আবার সব স্বাভাবিক হতে শুরু করল।

কিন্তু কিছুদিন পর নাইরার জীবনে নতুন একটি ঘটনা ঘটল।

তার সঙ্গে কাজ করা এক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী রায়ান তার একটি গান নিয়ে যৌথভাবে কাজ করার প্রস্তাব দিল।

প্রস্তাবটা ছিল বড়।

রায়ান নিজেও খুব পরিচিত।

নাইরা খুশি হয়ে আরহানকে খবর দিল।

—আমি রায়ানের সঙ্গে একটা গান করছি!

—দারুণ!

—আপনি রাগ করছেন না?

আরহান হেসে বলল,

—কেন রাগ করব?

—জানি না।

—তুমি গান করতে গেছ। গানই করবে।

নাইরা মুচকি হেসে বলল,

—আমি চেয়েছিলাম আপনি একটু ঈর্ষা করুন।

আরহান বলল,

—হয়তো করছি।

নাইরা অবাক।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তাহলে?

—ঈর্ষা আর অবিশ্বাস এক জিনিস নয়।

নাইরা চুপ করে গেল।

আরহান বলল,

—আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।

এই একটা বাক্য নাইরার সব অস্থিরতা দূর করে দিল।

যৌথ গানটি প্রকাশের পর নাইরা আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠল।

তারপর তাকে একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হলো।

নাইরা খবরটা শুনে প্রথমে আরহানকে ফোন করল।

—আমি মনোনীত হয়েছি!

—আমি জানতাম।

—আপনি সবসময় জানেন আমি কী করতে পারি।

—কারণ তুমি নিজে যতটা বিশ্বাস করো, তার চেয়েও বেশি আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।

নাইরার চোখে পানি চলে এল।

—আপনি থাকলে আমার সবকিছু সহজ লাগে।

আরহান বলল,

—আমি তোমার পাশে আছি। কিন্তু পথটা তোমাকেই হাঁটতে হবে।

ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হয়ে এলো।

নাইরা দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিতে লাগল।

তার শেষ পারফরম্যান্সের আগের রাতে সে আরহানকে ভিডিও কলে বলল,

—কাল আমার শেষ অনুষ্ঠান।

—তারপর?

—তারপর আমি বাড়ি ফিরব।

—অবশেষে।

নাইরা হেসে বলল,

—আমাকে মিস করেছেন?

—অনেক।

—কতটা?

—তুমি ফিরে এলে বলব।

—এখন বলুন।

—না।

—কেন?

—সামনাসামনি বলব।

নাইরা হেসে মাথা নাড়ল।

দেশে ফেরার দিন বিমানবন্দরে আরহান অপেক্ষা করছিল।

নাইরা বেরিয়ে এসে তাকে দেখল।

কয়েক সেকেন্ড দুজনেই শুধু তাকিয়ে রইল।

তারপর নাইরা এগিয়ে এসে বলল,

—আমি ফিরে এসেছি।

আরহান মৃদু হেসে বলল,

—দেখতে পাচ্ছি।

—আপনি কিছু বলবেন না?

—তুমি অনেক বদলে গেছ।

নাইরা হেসে বলল,

—ভালোভাবে?

—অনেক ভালোভাবে।

নাইরা বলল,

—আর আপনি?

—আমি তোমাকে অনেক মিস করেছি।

নাইরা চুপ করে গেল।

ছয় মাসের দূরত্ব যেন এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল।

কিন্তু দেশে ফেরার কয়েকদিন পর নতুন সমস্যা দেখা দিল।

নাইরার বিদেশি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তাকে স্থায়ীভাবে সেখানে কাজ করার প্রস্তাব দিল।

আরহানও নিজের একাডেমির একটি নতুন শাখা খোলার পরিকল্পনা করছে।

দুজনের সামনে এখন দুটি আলাদা ভবিষ্যৎ।

একজনের ক্যারিয়ারের সুযোগ বিদেশে।

অন্যজনের স্বপ্ন বাংলাদেশে।

নাইরা এক রাতে বলল,

—যদি আমাদের দুজনকে দুই দেশে থাকতে হয়?

আরহান বলল,

—তাহলে আমরা আবার পথ খুঁজব।

—যদি পথ না পাই?

আরহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তাহলে নতুন পথ তৈরি করব।

নাইরা মৃদু হাসল।

নাইরা দেশে ফেরার পর প্রায় এক মাস কেটে গেছে।

বিদেশের কাজের প্রস্তাবটি এখনো তার সামনে।

চাইলে সে সেখানে স্থায়ীভাবে কাজ করতে পারে। বড় বড় শিল্পীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ, নিজের অ্যালবাম প্রকাশের সম্ভাবনা—সবকিছুই হাতের নাগালে।

অন্যদিকে বাংলাদেশেও তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে।

বিভিন্ন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তাকে নিয়ে কাজ করতে চাইছে।

কিন্তু নাইরার সবচেয়ে বড় দ্বিধা ছিল অন্য জায়গায়।

আরহান।

সে জানত, আরহান নিজের সংগীত একাডেমি নিয়ে বাংলাদেশেই থাকতে চায়।

একদিন বিকেলে তারা দুজন ধানমন্ডির একটি শান্ত ক্যাফেতে বসেছিল।

নাইরা বলল,

—আমাকে আবার বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

আরহান শান্তভাবে বলল,

—আমি জানি।

—আপনি কীভাবে জানেন?

—তুমি বলেছিলে।

—আমি ভয় পাচ্ছি।

—কিসের?

—যদি চলে যাই, আবার দূরত্ব তৈরি হবে।

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তুমি কি যেতে চাও?

নাইরা উত্তর দিল না।

আরহান আবার বলল,

—আমার জন্য উত্তর দেবে না। নিজের জন্য দাও।

নাইরা ধীরে বলল,

—হ্যাঁ। আমি যেতে চাই।

আরহান মৃদু হাসল।

—তাহলে যাও।

নাইরা অবাক।

—এত সহজ?

—স্বপ্নের সুযোগ বারবার আসে না।

—আর আপনি?

—আমি এখানেই থাকব।

নাইরার চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।

—আপনি কি আমাকে ধরে রাখতে চান না?

আরহান বলল,

—চাই।

—তাহলে?

—কাউকে ভালোবাসা আর তাকে নিজের কাছে আটকে রাখা এক জিনিস নয়।

নাইরা চুপ করে গেল।

আরহান বলল,

—তুমি যদি আমার জীবনে থাকতে চাও, তাহলে তোমার স্বপ্ন নিয়েই থাকবে। তোমার স্বপ্ন বাদ দিয়ে নয়।

কিন্তু এবার সমস্যা হলো নাইরার পরিবার।

তার বাবা বললেন,

—তুই কি আবার এত দূরে চলে যাবি?

—ছয় মাস বা এক বছর হতে পারে।

—আরহানের কী হবে?

নাইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—ও আমাকে যেতে বলেছে।

বাবা অবাক হলেন।

—সে নিজে বলেছে?

—হ্যাঁ।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তাহলে ছেলেটা অন্তত তোকে বুঝতে শিখেছে।

নাইরা মৃদু হাসল।

—আমিও ওকে বুঝতে শিখেছি।

অন্যদিকে আরহানের মা ছেলের সঙ্গে কথা বলছিলেন।

—নাইরা আবার বিদেশে যাবে?

—হ্যাঁ।

—তুমি রাজি?

—আমি ওকে আটকাতে চাই না।

—কিন্তু তুমি কি নিশ্চিত, এত দূরত্বের পর সম্পর্কটা আগের মতো থাকবে?

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,

—আমি নিশ্চিত নই।

তার মা বললেন,

—তাহলে ভয় পাচ্ছ?

—হ্যাঁ।

—কিসের?

আরহান মৃদু হেসে বলল,

—ওকে হারানোর।

তার মা শান্তভাবে বললেন,

—তাহলে ভয়কে সম্পর্কের সিদ্ধান্ত নিতে দিও না।

আরহান মাথা নেড়ে বলল,

—আমি চেষ্টা করব।

নাইরার যাওয়ার দিন আবার ঘনিয়ে এলো।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি আগের মতো নয়।

তারা দুজনই জানে, এই দূরত্ব হয়তো দীর্ঘ হতে পারে।

নাইরা নিজের লাগেজ গোছাচ্ছিল।

তার ডায়েরির শেষ পাতায় লিখল—

“স্বপ্নের জন্য দূরে যাচ্ছি। কিন্তু যাকে ভালোবাসি, তাকে পেছনে রেখে নয়। তাকে সঙ্গে নিয়েই যাচ্ছি—আমার বিশ্বাসের মধ্যে।”

বিদেশে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ সবকিছু ভালোই চলল।

নাইরা নতুন অ্যালবামের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।

আরহানও বাংলাদেশে নিজের একাডেমির নতুন শাখা তৈরির কাজে ব্যস্ত।

তারা নিয়মিত কথা বলত।

কিন্তু ধীরে ধীরে কাজের চাপ বাড়তে থাকল।

নাইরার রেকর্ডিং চলত রাত পর্যন্ত।

আরহানের একাডেমিতে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছিল।

একদিন নাইরা ফোন করল।

আরহান ধরতে পারল না।

দুই ঘণ্টা পর ফোন ব্যাক করল।

—সরি, একটা মিটিংয়ে ছিলাম।

নাইরা বলল,

—ঠিক আছে।

—তুমি কেমন আছ?

—ভালো।

কথাটা খুব ছোট হয়ে গেল।

আরহান বুঝল কিছু একটা হয়েছে।

—তুমি কি রাগ করেছ?

—না।

—নাইরা।

—সত্যি কিছু হয়নি।

কিন্তু ফোন রাখার পর দুজনের মনেই একটা অস্বস্তি রয়ে গেল।

কয়েকদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ল।

ছবিতে নাইরা আর রায়ান একটি স্টুডিওতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

সংবাদে লেখা—

“নতুন অ্যালবামে নাইরা ও রায়ানের জুটি!”

আরহান ছবিটা দেখল।

তার ভেতরে অস্বস্তি হলো।

কিন্তু সে নিজেকে থামাল।

সে নাইরাকে সন্দেহ করতে চাইল না।

রাতে নাইরা ফোন করলে সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।

—ছবিটা দেখেছি।

—কোন ছবি?

—তোমার আর রায়ানের।

নাইরা হেসে বলল,

—ওটা তো স্টুডিওর ছবি।

—জানি।

—আপনি কি রাগ করেছেন?

—না।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

নাইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আপনি চাইলে আমি ওর সঙ্গে কাজ বন্ধ করে দিতে পারি।

আরহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—না।

—কেন?

—কারণ তোমার ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্ত আমার অস্বস্তির ওপর নির্ভর করবে না।

নাইরা নরম গলায় বলল,

—তাহলে আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন?

—অবশ্যই।

—আমি শুধু সেটাই শুনতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু সবকিছু এত সহজ ছিল না।

একদিন নাইরার বিদেশি প্রযোজক তাকে জানালেন, তার নতুন অ্যালবাম বিশাল সাফল্য পেয়েছে।

তারা তাকে স্থায়ী চুক্তির প্রস্তাব দিল।

এবার আর ছয় মাস নয়।

স্থায়ীভাবে সেখানে থাকার সুযোগ।

নাইরা চুপ করে গেল।

সে জানত, এটা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সুযোগ।

কিন্তু একই সঙ্গে সে জানত, এই সিদ্ধান্ত তার এবং আরহানের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

সেদিন রাতে সে আরহানকে ফোন করল।

—একটা কথা আছে।

—বলো।

—ওরা আমাকে স্থায়ীভাবে থাকতে বলেছে।

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—তুমি কী ভাবছ?

—জানি না।

—তুমি কি থাকতে চাও?

নাইরার চোখে পানি এসে গেল।

—হ্যাঁ।

আরহান বলল,

—তাহলে থাকো।

নাইরা এবার কেঁদে ফেলল।

—আপনি সবসময় আমাকে যেতে বলেন কেন?

—কারণ আমি চাই তুমি তোমার জীবনের সিদ্ধান্ত ভয় থেকে না নাও।

—আর আমাদের?

—আমাদের সিদ্ধান্ত আমরা একসঙ্গে নেব।

নাইরা বলল,

—যদি আমি থেকে যাই?

—তাহলে আমি তোমার কাছে আসব।

—আর আপনার একাডেমি?

—বাংলাদেশে থাকবে।

—আপনার জীবন?

—আমিও তো নতুনভাবে ভাবতে পারি।

নাইরা চুপ করে গেল।

আরহান বলল,

—সবসময় একজনকে অন্যজনের জন্য সবকিছু ছেড়ে দিতে হয় না। কখনো কখনো দুজন মিলে এমন একটা জীবন তৈরি করতে হয় যেখানে দুজনের স্বপ্নই থাকে।

এই কথাটাই নাইরার মনে গভীরভাবে জায়গা করে নিল।

সে বুঝল—

ভালোবাসার অর্থ সবসময় একই জায়গায় থাকা নয়।

বরং একে অপরের স্বপ্নকে জায়গা দেওয়া।

কয়েক সপ্তাহ পর নাইরা দেশে ফিরল।

স্থায়ী চুক্তিতে সই করার আগে সে আরহানের সঙ্গে দেখা করতে চাইল।

দুজন আবার সেই নদীর পাড়ে গেল যেখানে তারা প্রথমবার নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছিল।

নাইরা বলল,

—আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

—কী?

—আমি চুক্তিটা নেব।

আরহান হাসল।

—আমি খুশি।

—কিন্তু একটা শর্তে।

—কী শর্ত?

—আমার কাজের একটা অংশ বাংলাদেশে হবে।

—এটা সম্ভব?

—হ্যাঁ। ওরা রাজি হয়েছে।

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তাহলে তো সমস্যাই নেই।

নাইরা হাসল।

—আর একটা কথা।

—বলো।

—আমি চাই আমার নিজের একটা মিউজিক স্টুডিও বাংলাদেশে তৈরি করতে।

—আমি সাহায্য করব।

—না। ব্যবসায়িকভাবে নয়।

—তাহলে?

—সহযোগী হিসেবে।

আরহান হেসে বলল,

—ঠিক আছে।

দুজন হাত মেলাল।

কিন্তু এবার সেই হাত মেলানোতে শুধু সম্পর্ক ছিল না।

ছিল ভবিষ্যৎ গড়ার পরিকল্পনা।

কয়েকদিন পর তারা নিজেদের সম্পর্কের কথা দুই পরিবারের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাল।

দুই পরিবারই সম্মতি দিল।

কিন্তু ফারহান কবির তখনও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নন।

তিনি আরহানকে একা ডেকে বললেন,

—একটা কথা মনে রেখো।

—জি?

—নাইরা যেন কোনোদিন মনে না করে, তোমার কারণে তাকে নিজের স্বপ্নের সঙ্গে আপস করতে হয়েছে।

আরহান দৃঢ় গলায় বলল,

—আমি সেটা কখনো হতে দেব না।

ফারহান মৃদু হাসলেন।

—তাহলে হয়তো আমি ভুল ছিলাম।

—কোন বিষয়ে?

—আমি ভাবতাম আবেগ মানুষকে দুর্বল করে।

তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

—কখনো কখনো সঠিক মানুষ পাশে থাকলে আবেগ মানুষকে আরও শক্ত করে।

আরহান কিছু বলল না।

সবকিছু যেন সুন্দরভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু সেই রাতেই নাইরা একটি ফোন পেল।

বিদেশি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জানাল—

তার নতুন অ্যালবামের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে সমস্যা হয়েছে।

চুক্তি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

নাইরার ক্যারিয়ার আবার অনিশ্চয়তার মুখে।

সে ফোন রেখে চুপ করে বসে রইল।

আরহান পাশে এসে বলল,

—কী হয়েছে?

নাইরা ধীরে বলল,

—আমার স্বপ্নটা হয়তো আবার ভেঙে যেতে পারে।

আরহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—স্বপ্ন ভাঙলে আবার গড়ব।

নাইরা চোখ মুছে বলল,

—আপনি এত সহজে কীভাবে বলেন?

আরহান মৃদু হাসল।

—কারণ তুমি একবার আমাকে শিখিয়েছিলে—

স্বপ্নকে ভয় পেলে স্বপ্ন কখনো সত্যি হয় না।

নাইরা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

নাইরার বিদেশি অ্যালবামের কাজ নিয়ে সমস্যা হওয়ার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে তার জীবন যেন থমকে গেল।

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান হঠাৎ জানিয়ে দিল, তাদের আর্থিক সমস্যার কারণে কয়েকটি বড় প্রজেক্ট স্থগিত করা হচ্ছে।

নাইরার অ্যালবামও সেই তালিকায়।

যে স্বপ্নের জন্য সে এতদিন পরিশ্রম করেছে, সেটাই হঠাৎ অনিশ্চিত হয়ে গেল।

সে বাইরে থেকে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিল।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছিল।

এক রাতে সে আরহানকে বলল,

—আমি কি ভুল করেছিলাম?

—কোন বিষয়ে?

—সব ছেড়ে এতদূর এসেছিলাম। এত পরিশ্রম করলাম। শেষ পর্যন্ত কিছুই হলো না।

আরহান শান্তভাবে বলল,

—কিছুই হয়নি?

নাইরা চুপ।

—তুমি ছয় মাস আগে যে জায়গায় ছিলে, আজ তুমি সেখানে নেই। তুমি নতুন গান শিখেছ, নতুন মানুষদের সঙ্গে কাজ করেছ, নিজের পরিচিতি তৈরি করেছ। একটা অ্যালবাম আটকে গেছে বলে তোমার অর্জনগুলো শেষ হয়ে যায়নি।

নাইরা বলল,

—কিন্তু আমার স্বপ্নটা?

—স্বপ্ন একটা নির্দিষ্ট প্রজেক্টের নাম নয়।

নাইরা তাকাল।

—তাহলে?

—তোমার স্বপ্ন হলো গান করা। নিজের গান মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। একটা প্রতিষ্ঠান সেটা বন্ধ করে দিলে তোমার স্বপ্নও বন্ধ হয়ে যাবে কেন?

নাইরা কিছু বলল না।

কথাগুলো ধীরে ধীরে তার মনে ঢুকতে লাগল।

পরদিন সকালে নাইরা নিজের পুরোনো ডায়েরি খুলল।

সেখানে লেখা ছিল—

“নিজের গল্প নিজে লিখবে।”

সে অনেকক্ষণ সেই লাইনটার দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।

ল্যাপটপ খুলে নিজের পুরোনো গানগুলো বের করল।

একটা একটা করে শুনতে শুরু করল।

কিছু গান অসম্পূর্ণ।

কিছু গান শুধু ডায়েরির পাতায় লেখা।

কিছু গান সে কখনো কাউকে শোনায়নি।

তার মাথায় একটা নতুন পরিকল্পনা এলো।

নিজের স্বাধীন মিউজিক স্টুডিও।

কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে নিজের গান নিজেই তৈরি করবে।

নাইরা পরিকল্পনাটা আরহানকে বলল।

—আমি একটা স্টুডিও বানাতে চাই।

—আমি জানতাম তুমি এমন কিছুই ভাববে।

—আপনি সাহায্য করবেন?

—অবশ্যই।

—কিন্তু এবার আমি চাই এটা শুধু আমার না হোক।

—মানে?

—নতুন শিল্পীরা যেন এখানে এসে গান করতে পারে। যাদের সুযোগ নেই, তাদের জন্যও জায়গা থাকবে।

আরহানের চোখে গর্ব ফুটে উঠল।

—এটাই তো তোমার আসল স্বপ্ন।

নাইরা হাসল।

—হয়তো।

স্টুডিও তৈরির কাজ শুরু হলো।

ঢাকার একটি শান্ত এলাকায় ছোট একটি জায়গা নেওয়া হলো।

আরহান সাউন্ড সেটআপের দায়িত্ব নিল।

নাইরা ডিজাইন আর গান নিয়ে ব্যস্ত হলো।

তারা দুজন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করত।

কখনো তর্ক হতো।

কখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে মতের অমিল।

কিন্তু এবার তারা দুজনেই একটা জিনিস শিখে গেছে—

সমস্যা হলে দূরে সরে যাওয়া নয়, কথা বলা।

একদিন স্টুডিওর দেয়ালে কী লেখা হবে সেটা নিয়ে তর্ক হলো।

নাইরা বলল,

—এখানে লিখব, “স্বপ্নের কোনো সীমা নেই।”

আরহান বলল,

—অনেক সাধারণ।

—তাহলে কী লিখবেন?

আরহান কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—“নিজের কণ্ঠকে ভয় পেয়ো না।”

নাইরা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে হেসে বলল,

—এটাই হবে।

কয়েক মাস পর স্টুডিও তৈরি হয়ে গেল।

নাম রাখা হলো—

“সুরের ওপারে”।

উদ্বোধনের দিন ছোট একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো।

নাইরার বাবা-মা এলেন।

আরহানের পরিবার এল।

ফারহান কবিরও এলেন।

স্টুডিওর দেয়ালে সেই কথাটাই লেখা—

“নিজের কণ্ঠকে ভয় পেয়ো না।”

ফারহান অনেকক্ষণ লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—তোমরা যা তৈরি করেছ, এটা শুধু একটা স্টুডিও নয়।

নাইরা হেসে বলল,

—তাহলে কী?

—যারা নিজেদের কথা বলতে ভয় পায়, তাদের জন্য একটা জায়গা।

আরহান বলল,

—এটাই তো উদ্দেশ্য।

ফারহান এবার প্রথমবার দুজনের সম্পর্কের দিকে অন্য চোখে তাকালেন।

তিনি বুঝতে পারলেন, এই সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্যে আটকে নেই।

এরা একে অপরকে বড় হতে সাহায্য করছে।

উদ্বোধনের পর নাইরা তার নতুন একটি গান প্রকাশ করল।

গানটির নাম—

“পথ যদি বদলে যায়”।

গানটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে গেল।

অনেক তরুণ শিল্পী গানটির সঙ্গে নিজেদের গল্প মিলিয়ে নিল।

নাইরার নাম আবার ছড়িয়ে পড়ল।

কিন্তু এবার সে আর কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল নয়।

তার নিজের প্ল্যাটফর্ম আছে।

নিজের কণ্ঠ আছে।

নিজের সিদ্ধান্ত আছে।

এক রাতে স্টুডিও বন্ধ করার পর নাইরা আরহানের সঙ্গে বসেছিল।

ঘড়িতে রাত প্রায় এগারোটা।

নাইরা বলল,

—মনে আছে, একসময় আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, “আপনি আমাকে দূরে ঠেলে দিলে অনুভূতিটা কমবে না”?

আরহান হেসে বলল,

—মনে আছে।

—তখন আমি খুব সাহসী ছিলাম।

—তুমি এখনও সাহসী।

—না। তখন আমি শুধু অনুভূতির কথা জানতাম। এখন বুঝি, সম্পর্ক ধরে রাখতে কতটা দায়িত্ব লাগে।

আরহান বলল,

—আমিও অনেক কিছু শিখেছি।

—কী?

—কখনো কখনো কাউকে ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো তাকে নিজের মতো করে বাঁচতে দেওয়া।

নাইরা মৃদু হাসল।

—আর সবচেয়ে সুন্দর অংশ?

আরহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—সে নিজের মতো করেই থেকেও তোমার পাশে থাকতে চায়।

নাইরা কিছু বলল না।

শুধু হাসল।

কিন্তু ঠিক সেই সময় একটা অপ্রত্যাশিত খবর এলো।

রায়ান তাদের স্টুডিওতে এসে জানাল—

তার নতুন আন্তর্জাতিক প্রজেক্টে একজন প্রধান শিল্পীর প্রয়োজন।

সে নাইরাকে প্রস্তাব দিল।

এবার কাজটি আরও বড়।

কিন্তু শর্ত হলো, নাইরাকে প্রায় এক বছর বিদেশে থাকতে হবে।

নাইরা দ্বিধায় পড়ে গেল।

কারণ এবার সে নিজের স্টুডিও তৈরি করেছে।

বাংলাদেশে তার নতুন দায়িত্ব তৈরি হয়েছে।

আরহানও তার নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।

রায়ান বলল,

—এটা তোমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সুযোগ হতে পারে।

নাইরা বলল,

—আমি ভাবতে চাই।

রায়ান চলে যাওয়ার পর আরহান কিছু বলল না।

নাইরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনি কিছু বলছেন না কেন?

—কারণ সিদ্ধান্তটা তোমার।

—আপনি কি চান আমি যাই?

আরহান একটু হেসে বলল,

—আমি চাই তুমি এমন সিদ্ধান্ত নাও, যেটা নিয়ে পাঁচ বছর পর তোমার আফসোস হবে না।

নাইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—আপনি সবসময় এত কঠিন কথা বলেন কেন?

—কারণ সহজ উত্তর সবসময় সঠিক উত্তর নয়।

সেই রাতে নাইরা একা স্টুডিওতে বসে রইল।

তার সামনে দুটি পথ।

একদিকে বাংলাদেশে নিজের তৈরি করা প্রতিষ্ঠান।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়ার বিশাল সুযোগ।

আর মাঝখানে তার সঙ্গে থাকা মানুষটি।

সে বুঝতে পারছিল—

এবার সিদ্ধান্তটা শুধু তার ক্যারিয়ারের নয়।

তার ভবিষ্যৎ জীবনও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

পরদিন সকালে নাইরা আরহানকে বলল,

—আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আরহান তাকাল।

—কী?

—আমি বিদেশে যাব।

আরহান মৃদু হাসল।

—ঠিক আছে।

—কিন্তু এবার একা যাব না।

আরহান অবাক হয়ে বলল,

—মানে?

নাইরা বলল,

—আমরা একটা পরিকল্পনা করব। স্টুডিওটা এখানেই থাকবে। আমি কাজের জন্য যাতায়াত করব। আর আপনি এখানে আপনার কাজ চালাবেন।

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—এটা সহজ হবে না।

—জানি।

—দূরত্ব থাকবে।

—জানি।

—অনেক চাপ থাকবে।

—সেটাও জানি।

—তবু?

নাইরা হাসল।

—তবু আমরা তো আগেও পেরেছি।

আরহানের মুখে হাসি ফুটল।

—ঠিক আছে। তাহলে আবার নতুন করে শুরু করি।

কিন্তু এবার আরেকটি বিষয় সামনে এল।

দুই পরিবার এতদিন ধরে তাদের সম্পর্ক মেনে নিয়েছে।

এখন তারা চাইছে—

নাইরা আর আরহানের বিয়ের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঠিক করা হোক।

নাইরা খবরটা শুনে চুপ হয়ে গেল।

আরহানও কিছুক্ষণ কথা বলল না।

কারণ দুজনেই জানত—

তারা একে অপরকে ভালোবাসে।

কিন্তু বিয়ে মানে শুধু অনুভূতি নয়।

দায়িত্ব।

সমঝোতা।

দুটি মানুষের পাশাপাশি দুটি স্বপ্নেরও একসঙ্গে চলা।

সেদিন রাতে নাইরা আরহানকে বলল,

—আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত?

আরহান বলল,

—আমি জানি না।

নাইরা অবাক হয়ে তাকাল।

—আপনি জানেন না?

—আমি শুধু জানি, আমি তোমার সঙ্গে জীবনটা কাটাতে চাই।

—আর আমার স্বপ্ন?

—সেটাও চাই।

নাইরা মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে হয়তো প্রস্তুত হওয়ার জন্য আলাদা কোনো দিন আসে না।

আরহান বলল,

—হয়তো।

দুজন জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

দূরে শহরের আলো জ্বলছিল।

তাদের পথ অনেক দূর।

কিন্তু এবার তারা একা নয়।

নাইরা আর আরহানের সম্পর্ক এখন দুই পরিবারের কাছেই স্বীকৃত।

দুজনেই নিজেদের কাজ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

“সুরের ওপারে” স্টুডিওটাও ভালোভাবে চলছে।

নতুন শিল্পীরা সেখানে গান রেকর্ড করছে। নাইরা নিয়মিত নতুন গান প্রকাশ করছে। আরহান তরুণ শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, তাদের জীবনে আর কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু বিয়ের কথা উঠতেই দুজনের সামনে নতুন কিছু প্রশ্ন এসে দাঁড়াল।

নাইরা বিদেশের আন্তর্জাতিক প্রজেক্টে কাজ করতে যাচ্ছে।

আরহানের একাডেমি বাংলাদেশেই।

বিয়ের পর তারা কোথায় থাকবে?

কীভাবে দুজনের কাজ চলবে?

কে কখন কোথায় থাকবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ ছিল না।

এক সন্ধ্যায় দুই পরিবার একসঙ্গে বসেছিল।

নাইরার বাবা বললেন,

—আমরা চাই তোমরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নাও। তবে বিয়ের পর জীবনটা কীভাবে চালাবে, সেটা আগে ঠিক করা দরকার।

আরহানের মা বললেন,

—দুজনের ক্যারিয়ারই গুরুত্বপূর্ণ।

ফারহান কবিরও উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বললেন,

—আমি একটা কথা বলতে চাই।

সবাই তার দিকে তাকাল।

—একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে যদি একজনের স্বপ্ন নষ্ট হয়, তাহলে সেটা সফল সম্পর্ক নয়।

নাইরা আর আরহান একে অপরের দিকে তাকাল।

ফারহান বললেন,

—তোমরা দুজনই অনেক পথ পেরিয়ে এসেছ। এবার সিদ্ধান্তটা আবেগ দিয়ে নয়, বুঝে নাও।

নাইরা মাথা নেড়ে বলল,

—আমরা বুঝেই সিদ্ধান্ত নিতে চাই।

সেদিন রাতে নাইরা আর আরহান একসঙ্গে বসে ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলল।

নাইরা বলল,

—আমি চাই না বিয়ের পর আমার গান থেমে যাক।

—থামবে না।

—আপনার একাডেমিও যেন বন্ধ না হয়।

—বন্ধ হবে না।

—তাহলে?

আরহান বলল,

—আমরা কিছু সময় বাংলাদেশে থাকব। কাজের প্রয়োজনে তুমি বিদেশে যাবে। প্রয়োজনে আমিও তোমার সঙ্গে যাব।

নাইরা বলল,

—আপনার একাডেমি?

—অনলাইনে ক্লাস চালানো যায়। আর আমার সহকারী আছে।

নাইরা একটু হেসে বলল,

—আপনি সব সমস্যার সমাধান এত সহজে কীভাবে করেন?

আরহান বলল,

—কারণ সমস্যাকে বড় করে দেখলে সমাধান ছোট মনে হয়।

নাইরা মাথা নেড়ে বলল,

—ঠিক আছে।

বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার আগেই নাইরা বিদেশের সেই আন্তর্জাতিক প্রজেক্টের চূড়ান্ত চুক্তিতে সই করতে গেল।

চুক্তিতে এক বছরের কাজ।

কিন্তু সেখানে গিয়ে সে একটি অপ্রত্যাশিত তথ্য জানতে পারল।

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চায় তার ব্যক্তিগত জীবনও তাদের প্রচারণার অংশ হোক।

তারা চাইছিল নাইরাকে একটি নির্দিষ্ট ইমেজে উপস্থাপন করতে।

নাইরা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলো না।

প্রযোজক বলল,

—আপনার জনপ্রিয়তা বাড়াতে এটা খুব দরকার।

নাইরা বলল,

—আমার গান নিয়ে কাজ করুন। আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নয়।

—কিন্তু এটা ব্যবসা।

—আমি বুঝি। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও আমার।

আলোচনা তর্কে গড়াল।

শেষে নাইরা চুক্তির কিছু শর্ত পরিবর্তনের দাবি করল।

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রাজি না হলে সে চুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিল।

খবরটা আরহানকে জানালে সে বলল,

—তুমি ঠিক করেছ।

—আপনি কি জানেন, এটা করলে আমি অনেক বড় সুযোগ হারাতে পারি?

—জানি।

—তবু?

—তোমার পরিচয় কোনো প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের অংশ নয়।

নাইরা মৃদু হাসল।

—আপনি সবসময় আমার পাশে থাকেন।

আরহান বলল,

—কারণ তুমি নিজের জন্য দাঁড়ালে আমি তোমার পাশে না থাকলে কে থাকবে?

কিন্তু এরপর পরিস্থিতি আরও কঠিন হলো।

চুক্তি বাতিলের খবর প্রকাশ্যে চলে গেল।

অনেক সংবাদমাধ্যম নাইরাকে নিয়ে নানা কথা লিখতে শুরু করল।

কেউ বলল, সে নাকি অহংকারী।

কেউ বলল, সে সুযোগের মূল্য বোঝে না।

কেউ আবার বলল, তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।

নাইরা প্রথমে এসব নিয়ে ভেঙে পড়ল।

এক রাতে সে আরহানকে ফোন করে বলল,

—সবাই আমাকে ভুল বুঝছে।

—সবাইকে বোঝানো তোমার দায়িত্ব নয়।

—কিন্তু কষ্ট হচ্ছে।

—হতেই পারে।

—আমি কি ভুল করেছি?

—তুমি কি নিজের সিদ্ধান্তে বিশ্বাস করো?

—হ্যাঁ।

—তাহলে মানুষের কথায় নিজের সিদ্ধান্ত বদলাবে না।

নাইরা চোখ মুছে বলল,

—আপনি থাকলে আমি শক্ত থাকি।

আরহান বলল,

—তুমি আমার জন্য শক্ত নও। তুমি নিজের জন্য শক্ত।

কয়েকদিন পর নাইরা একটি স্বাধীন সংগীত প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে চুক্তি করল।

তারা তার গানকে গুরুত্ব দেবে, ব্যক্তিগত জীবনকে নয়।

নাইরা আবার নিজের মতো করে কাজ শুরু করল।

তার নতুন গান প্রকাশ হলো।

গানের নাম—

“আমি আমার মতো”।

গানটি কয়েক দিনের মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে গেল।

মানুষ তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজেদের গল্প মিলিয়ে নিতে শুরু করল।

নাইরা বুঝল—

কখনো কখনো একটা দরজা বন্ধ হওয়া মানে সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।

বরং অন্য দরজাটা খুলে যাওয়া।

এরপর এল বিয়ের প্রস্তুতি।

দুই পরিবার ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

নাইরার মা শাড়ি দেখছেন।

আরহানের মা গয়না পছন্দ করছেন।

বন্ধুরা পরিকল্পনা করছে।

আর নাইরা আরহান নিজেদের কাজের মাঝেও সময় বের করে বিয়ের পরিকল্পনা করছে।

একদিন নাইরা বলল,

—আমাদের বিয়েতে গান থাকবে।

—অবশ্যই।

—আমি নিজে গান গাইব।

—সেটাও জানি।

—আর আপনি?

—আমি?

—আপনাকেও গাইতে হবে।

আরহান হেসে বলল,

—আমি গান গাইলে সবাই অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যাবে।

নাইরা হেসে বলল,

—তাহলে আমি পাশে থাকব।

বিয়ের কয়েকদিন আগে ফারহান কবির আরহানকে একা ডেকে বললেন,

—একটা কথা মনে আছে?

—কী?

—অনেক বছর আগে আমি বলেছিলাম, আবেগ মানুষকে দুর্বল করে।

আরহান মৃদু হেসে বলল,

—মনে আছে।

—এখন বুঝেছি, আবেগ নয়—ভুল সিদ্ধান্ত মানুষকে দুর্বল করে।

আরহান চুপ করে শুনছিল।

ফারহান বললেন,

—তুমি আর নাইরা নিজেদের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিয়েছ। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আরহান বলল,

—আপনার জন্যও অনেক কিছু শিখেছি।

ফারহান হেসে বললেন,

—তাহলে একটা কথা দাও।

—কী?

—নাইরাকে কখনো তার স্বপ্ন আর তোমার মধ্যে একটা বেছে নিতে বলবে না।

আরহান দৃঢ়ভাবে বলল,

—কখনো না।

বিয়ের আগের রাতে নাইরা নিজের ঘরে বসে ছিল।

তার পুরোনো ডায়েরিটা হাতে।

প্রথম পাতায় লেখা—

“নিজের গল্প নিজে লিখবে।”

সে ধীরে ধীরে সব পুরোনো পাতা উল্টে দেখল।

প্রথম গান।

প্রথম মঞ্চ।

আরহানের সঙ্গে প্রথম দেখা।

তারপর দূরত্ব।

বিদেশ যাওয়া।

ফিরে আসা।

নিজের স্টুডিও।

সবকিছু।

শেষ পাতায় এসে সে নতুন করে লিখল—

“একসময় ভেবেছিলাম, ভালোবাসা মানে কাউকে কাছে পাওয়া। এখন বুঝি, ভালোবাসা মানে এমন একজন মানুষকে পাওয়া, যে তোমাকে তোমার নিজের মতো থাকতে দেয়।”

ডায়েরি বন্ধ করল সে।

তার মুখে শান্ত হাসি।

অন্যদিকে আরহানও নিজের ঘরে বসে ছিল।

তার মা এসে বললেন,

—ঘুমাবে না?

—একটু পরে।

—চিন্তা হচ্ছে?

—হ্যাঁ।

—কিসের?

আরহান মৃদু হেসে বলল,

—জীবন বদলে যাচ্ছে।

মা বললেন,

—জীবন তো বদলাবেই।

—কিন্তু আমি চাই না নাইরার জীবন আমার কারণে বদলে যাক।

মা বললেন,

—তাহলে ওর সঙ্গে পাশে হাঁটো। সামনে গিয়ে পথ দেখাতে যেও না, পেছনে গিয়ে থামাতেও যেও না।

আরহান মাথা নেড়ে বলল,

—এটাই করব।

বিয়ের দিন সকাল।

নাইরার বাড়ি আলোয় সাজানো।

পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু—সবাই ব্যস্ত।

নাইরা সাজঘরে বসে।

তার মুখে শান্ত হাসি।

তাসনিম এসে বলল,

—কী ভাবছিস?

নাইরা বলল,

—অনেক কিছু।

—ভয় লাগছে?

—একটু।

—কেন?

—জীবনের নতুন অধ্যায়।

তাসনিম হেসে বলল,

—তুই তো নিজের গল্প নিজেই লিখিস।

নাইরা মৃদু হাসল।

—হ্যাঁ।

অন্যদিকে আরহানও প্রস্তুত।

সবকিছু ঠিকঠাক চলছে।

ঠিক তখন তার ফোনে একটি মেসেজ এলো।

বিদেশি একটি বড় সংগীত প্রতিষ্ঠান নাইরাকে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে।

এবার শুধু একটি অ্যালবাম নয়।

বিশ্বব্যাপী তার ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ।

শর্ত—

নাইরাকে দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকতে হবে।

আরহান মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

বিয়ের কয়েক ঘণ্টা আগে এমন প্রস্তাব।

সে জানত, এই সুযোগ নাইরার জন্য বিশাল।

কিন্তু একই সঙ্গে সে জানত, এটা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে আবার কঠিন করে তুলবে।

তবুও তার মুখে হাসি ফুটল।

কারণ সে জানে—

নাইরাকে থামিয়ে বিয়ে করা নয়, তার স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়েই জীবন শুরু করতে হবে।

বিয়ের দিন।

চারপাশে উৎসবের আমেজ।

নাইরার বাড়ি আলোয় সাজানো। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু আর পরিচিতদের ভিড়ে পুরো বাড়ি মুখর।

কিন্তু আরহানের মনে তখন একটাই কথা ঘুরছিল—

নাইরার নতুন প্রস্তাব।

বিয়ের কয়েক ঘণ্টা আগে সে জানতে পেরেছে, একটি আন্তর্জাতিক সংগীত প্রতিষ্ঠান নাইরাকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে।

এটা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সুযোগ হতে পারে।

কিন্তু শর্তও কঠিন।

নাইরাকে দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকতে হবে।

আরহান জানত, এই খবরটা এখন বললে নাইরা হয়তো নিজের স্বপ্ন আর বিয়ের মধ্যে একটা বেছে নিতে বাধ্য বোধ করবে।

সে সেটা হতে দিতে চায় না।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে আরহান নাইরার বাবার সঙ্গে কথা বলল।

—চাচা, আপনাকে একটা কথা বলতে হবে।

সায়ান রহমান বললেন,

—কী হয়েছে?

আরহান তাকে পুরো বিষয়টা জানাল।

সায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—তুমি কি ওকে এই সুযোগটা নিতে দিতে চাও?

—অবশ্যই।

—বিয়ের পর?

—বিয়ের পরও।

—তাহলে সমস্যা কোথায়?

আরহান মৃদু হেসে বলল,

—সমস্যা নেই। শুধু চাই না, ও ভাবুক যে বিয়ের কারণে তাকে কোনো কিছু ছেড়ে দিতে হবে।

সায়ান রহমান তার কাঁধে হাত রেখে বললেন,

—তাহলে আজই ওকে বলো।

কিছুক্ষণ পর নাইরা আরহানের সঙ্গে একান্তে কথা বলার সুযোগ পেল।

নাইরা বলল,

—আপনাকে আজ একটু চিন্তিত লাগছে।

আরহান মৃদু হেসে বলল,

—একটা খবর আছে।

—কী?

আরহান তাকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের কথা বলল।

নাইরা প্রথমে কিছু বলল না।

তার চোখে বিস্ময়।

তারপর ধীরে বলল,

—আপনি এটা কখন জানলেন?

—আজ।

—আর আমাকে এতক্ষণ বলেননি কেন?

—কারণ আজ তোমার বিয়ের দিন। আমি চাইনি তুমি মনে করো, তোমাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

নাইরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—আমি কি আপনার কাছে এতটাই দুর্বল?

—না।

—তাহলে?

—আমি শুধু চাই তুমি নিজের সিদ্ধান্তটা স্বাধীনভাবে নাও।

নাইরা মৃদু হাসল।

—তাহলে শুনুন।

—কী?

—আমি এই সুযোগটা নেব।

আরহানের মুখে হাসি ফুটল।

—আমি জানতাম।

—কিন্তু একটা শর্ত আছে।

—কী?

—আমি একা যাব না।

আরহান অবাক হয়ে বলল,

—মানে?

নাইরা বলল,

—আমরা আমাদের জীবন এমনভাবে সাজাব, যাতে আমার কাজও থাকে, আপনার কাজও থাকে। আমি বিদেশে কাজ করব, কিন্তু বাংলাদেশে আমার স্টুডিও থাকবে। আপনি আপনার একাডেমি চালাবেন। আমরা সময় ভাগ করে নেব।

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তুমি নিশ্চিত?

—হ্যাঁ।

—কঠিন হবে।

—জানি।

—দূরত্ব থাকবে।

—জানি।

—তাহলে?

নাইরা মৃদু হেসে বলল,

—আমরা তো শুরু থেকেই সহজ পথ পাইনি।

আরহান হেসে ফেলল।

—ঠিক বলেছ।

বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হলো।

নাইরা মঞ্চে এল।

তার পরনে গাঢ় লাল শাড়ি।

মুখে শান্ত হাসি।

আরহান তার পাশে এসে দাঁড়াল।

দুজনের চোখে তখন অদ্ভুত এক নিশ্চয়তা।

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে ফারহান কবির মাইক্রোফোন হাতে নিলেন।

তিনি বললেন,

—কয়েক বছর আগে আমি বিশ্বাস করতাম, কঠোর নিয়ম মানুষকে সঠিক পথে রাখে। কিন্তু পরে বুঝেছি, নিয়মের উদ্দেশ্য মানুষকে আটকে রাখা নয়; তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা।

সবাই চুপ করে শুনছিল।

তিনি আরহানের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—আরহান আমাকে শিখিয়েছে, কাউকে নিজের কাছে রাখার চেয়ে তার স্বপ্নকে সম্মান করা অনেক বড় দায়িত্ব।

তারপর নাইরার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—আর নাইরা আমাকে শিখিয়েছে, নিজের কণ্ঠকে ভয় না পাওয়াই সত্যিকারের স্বাধীনতা।

চারপাশে হাততালি পড়ে গেল।

নাইরার চোখে পানি এসে গেল।

আরহান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর রাত গভীর হলো।

সবাই চলে গেলে নাইরা আর আরহান কিছুক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।

ঢাকার রাতের আলো চারপাশে ছড়িয়ে আছে।

নাইরা বলল,

—মনে আছে, আমাদের প্রথম দেখা?

—তুমি ক্লাস শেষে থেকে গিয়েছিলে।

—আর আপনি বলেছিলেন, নিজের পছন্দের কাজ করার সাহস থাকতে হবে।

—হ্যাঁ।

—সেদিন যদি আপনি ওই কথাটা না বলতেন?

—তাহলে হয়তো তুমি এখনও গান লুকিয়ে রাখতে।

নাইরা হাসল।

—আর সেদিন যদি আমি গান না গাইতাম?

আরহান বলল,

—তাহলে হয়তো আমাদের গল্পও শুরু হতো না।

নাইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আমাদের গল্পটা খুব অদ্ভুত।

—কেন?

—কারণ শুরুতে আপনি আমাকে নিজের অনুভূতি থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন।

—ঠিকই বলেছিলাম।

—তারপর আপনি নিজেই ফিরে এলেন।

আরহান মৃদু হাসল।

—কারণ তখন তুমি আর আমার ছাত্রী ছিলে না।

—আর এখন?

—এখন তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন।

নাইরা হাসল।

—একজন?

আরহান বলল,

—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নাইরা মৃদু হেসে বলল,

—এবার ঠিক আছে।

কয়েক মাস পর।

নাইরা আবার বিদেশে গেল।

এইবার তার সঙ্গে ছিল নিজের টিম।

সে আন্তর্জাতিক মঞ্চে গান করছে।

আর বাংলাদেশে “সুরের ওপারে” আরও বড় হয়েছে।

আরহান নতুন শিল্পীদের নিয়ে কাজ করছে।

তাদের জীবন আগের মতো এক জায়গায় নয়।

কখনো তারা বাংলাদেশে।

কখনো বিদেশে।

কখনো কয়েক সপ্তাহ আলাদা।

কিন্তু তাদের সম্পর্কের ভিত্তি বদলায়নি।

প্রতিদিন কথা বলা সম্ভব না হলেও, দুজনেই জানে—

একজন অন্যজনের স্বপ্নের বিরুদ্ধে নয়।

বরং পাশে।

এক বছর পর নাইরা দেশে ফিরে এলো।

তার আন্তর্জাতিক অ্যালবাম ব্যাপক সফল হয়েছে।

ঢাকার একটি বড় অনুষ্ঠানে তার বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার আয়োজন করা হয়েছে।

মঞ্চে উঠে নাইরা পুরস্কার হাতে নিল।

উপস্থাপক প্রশ্ন করলেন,

—আপনার এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কে?

নাইরা মুচকি হেসে বলল,

—অনেক মানুষ।

—একজনের নাম বলতে হলে?

নাইরা একটু থামল।

তারপর দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বলল,

—একজন শিক্ষক একদিন আমাকে বলেছিলেন, নিজের গল্প নিজেকেই লিখতে হয়।

দর্শকদের মধ্যে বসে থাকা আরহানের চোখে হাসি ফুটল।

নাইরা বলল,

—আমি তখন বুঝিনি, নিজের গল্প লিখতে গেলে কখনো কখনো সাহসের সঙ্গে ভালোবাসাকেও জায়গা দিতে হয়।

হাততালিতে পুরো হল ভরে গেল।

অনুষ্ঠান শেষে নাইরা আরহানের কাছে এল।

—কেমন হয়েছে?

—অসাধারণ।

—শুধু গান?

—সবকিছু।

নাইরা হেসে বলল,

—আমাদের স্টুডিওর নতুন শাখাটা দেখেছেন?

—না।

—চলুন।

দুজন গাড়িতে উঠল।

নতুন শাখার দরজা খুলতেই দেখা গেল দেয়ালে বড় করে লেখা—

“নিজের কণ্ঠকে ভয় পেয়ো না।”

আর তার নিচে আরেকটি লাইন—

“নিজের গল্প নিজেই লিখো।”

আরহান লেখাটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—এটা তুমি লিখেছ?

নাইরা বলল,

—আমরা দুজন মিলে।

আরহান তার দিকে তাকাল।

নাইরা বলল,

—আমাদের গল্পের শুরু ছিল নিয়মের মধ্যে।

—আর শেষ?

নাইরা মৃদু হেসে বলল,

—শেষ হয়নি।

আরহান বলল,

—তাহলে?

—এখনও লিখছি।

দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।

তাদের সামনে ছিল নতুন জীবন, নতুন স্বপ্ন, নতুন পথ।

কিন্তু এবার তারা জানে—

পথ যতই বদলাক, যদি দুজন মানুষ একে অপরের স্বাধীনতা, স্বপ্ন আর সিদ্ধান্তকে সম্মান করে, তাহলে সম্পর্ক কোনো নিয়মের বন্দি থাকে না।

কারণ সত্যিকারের সম্পর্ক কাউকে নিজের মতো করে বদলে দেয় না—বরং তাকে নিজের সেরা রূপটা হয়ে উঠতে সাহায্য করে।

....
👁 75