ঢাকার সকালটা আজ অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি ব্যস্ত।
রাস্তায় একের পর এক বাস ছুটে যাচ্ছে। ফুটপাতে মানুষের ভিড়। কোথাও অফিসগামী মানুষের তাড়া, কোথাও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কোলাহল। এই ব্যস্ত শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো একটি বাসের জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে তানভীর।
বয়স পঁচিশের কাছাকাছি। গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশে বড় হয়েছে সে। কয়েক বছর পড়াশোনা শেষ করে এবার ঢাকায় এসেছে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে।
তবে ঢাকায় আসার পর থেকেই একটা বিষয় তাকে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করছে।
এই শহরে কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করে না।
সবাই ছুটছে।
কেউ চাকরির পেছনে, কেউ ব্যবসার পেছনে, কেউ নিজের স্বপ্নের পেছনে।
তানভীরও সেই ছুটে চলা মানুষের একজন হতে চায়।
হাতে থাকা ছোট ব্যাগটা শক্ত করে ধরে সে বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইল।
তার বাবা হাবিবুর রহমান গ্রামের একজন সম্মানিত মানুষ। ছেলেকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। তানভীর যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সেটাই তার বাবার সবচেয়ে বড় ইচ্ছে।
ঢাকায় আসার আগে বাবা শুধু একটা কথাই বলেছিলেন,
—“শহরে গিয়ে নিজের মানুষ চিনে চলবি। সবাইকে বিশ্বাস করবি না। আর কোনো ঝামেলায় জড়াবি না।”
তানভীর তখন হেসে বলেছিল,
—“আমি কি আর ছোট বাচ্চা বাবা?”
কিন্তু ঢাকায় আসার কয়েক দিনের মধ্যেই সে বুঝতে পারল, বাবার কথাটা একেবারে ভুল ছিল না।
বাস থেকে নেমে তানভীর একটা ঠিকানার খোঁজ করতে লাগল।
তার বাবার পুরোনো বন্ধু কামাল সাহেব ঢাকায় থাকেন। তিনি তানভীরকে নিজের প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন।
তানভীরের কাছে এটা অনেক বড় ব্যাপার।
কিন্তু সে জানত না, এই চাকরির সঙ্গে তার জীবনে এমন একজন মানুষের আগমন ঘটতে যাচ্ছে, যার সঙ্গে প্রথম দেখাতেই তার সম্পর্কটা হবে ভীষণ অদ্ভুত।
অন্যদিকে ধানমন্ডির একটি বাড়িতে তখন তুমুল ব্যস্ততা।
রিভা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে।
বয়স চব্বিশ। ঢাকাতেই বড় হয়েছে। আধুনিক শহুরে পরিবেশে বেড়ে ওঠা মেয়ে হলেও স্বভাবটা বেশ জেদি। নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সে কাউকে খুব একটা কথা বলতে দেয় না।
রিভার বাবা কামাল সাহেব একজন সফল ব্যবসায়ী। কিন্তু মেয়েকে নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই।
আজ সকালেও তিনি রিভাকে ডাকছিলেন।
—“রিভা, কোথায় তুমি?”
ঘরের ভেতর থেকেই উত্তর এল,
—“আসছি বাবা!”
—“তাড়াতাড়ি এসো। একজন আসছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে।”
রিভা দরজা খুলে বেরিয়ে এসে অবাক হয়ে বলল,
—“কে আসছে?”
কামাল সাহেব মুচকি হেসে বললেন,
—“আমার পুরোনো বন্ধুর ছেলে।”
রিভা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“তাতে আমার কী?”
—“ছেলেটা গ্রাম থেকে এসেছে। নতুন চাকরিতে ঢুকবে। কয়েক দিন আমাদের অফিসের কাজ বুঝে নেবে।”
রিভা বিরক্ত হয়ে বলল,
—“তাহলে অফিসে রাখুন। আমার সঙ্গে দেখা করানোর কী দরকার?”
—“কারণ ও তোমার বাবার বন্ধুর ছেলে। আর তুমি তো সারাদিন বাড়িতে বসে থাকো না, অফিসেই থাকো। ওকে একটু সাহায্য করলে ক্ষতি কী?”
রিভা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—“আমি কি কাউকে সাহায্য করার জন্য অফিসে যাই?”
কামাল সাহেব হেসে ফেললেন।
—“তোমার মেজাজটা একদম তোমার মায়ের মতো হয়েছে।”
রিভা আর কিছু বলল না।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।
কামাল সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
—“মনে হয় তানভীর এসে গেছে।”
রিভা অনিচ্ছাভরে জানালার দিকে তাকাল।
কিছুক্ষণ পর একজন গৃহকর্মী এসে জানাল,
—“স্যার, একজন ছেলে এসেছে। নাম তানভীর।”
কামাল সাহেব দ্রুত বাইরে চলে গেলেন।
রিভা তখনও দাঁড়িয়ে আছে।
কী এমন ছেলে যে তার বাবা নিজে দরজায় গিয়ে তাকে নিয়ে আসছেন—এই কৌতূহলটা তার মধ্যে তৈরি হলো।
কয়েক মুহূর্ত পর তানভীর ঘরে ঢুকল।
সাধারণ পোশাক। হাতে একটা ব্যাগ। মুখে শহুরে চাকচিক্য নেই।
কামাল সাহেব হাসতে হাসতে বললেন,
—“এই হলো তানভীর। আমার বন্ধু হাবিবের ছেলে।”
তানভীর সম্মান করে সালাম দিল।
—“আসসালামু আলাইকুম, চাচা।”
—“ওয়ালাইকুম সালাম। কেমন আছো বাবা?”
—“ভালো আছি।”
কামাল সাহেব রিভার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“আর এই আমার মেয়ে রিভা।”
তানভীর তাকাল।
রিভাও তাকাল।
দুজনের চোখাচোখি হলো কয়েক সেকেন্ড।
তারপর রিভা প্রথমেই বলল,
—“আপনিই তানভীর?”
—“জি।”
—“আপনি ঢাকায় নতুন?”
—“জি।”
রিভা একটু মাথা নেড়ে বলল,
—“বোঝাই যাচ্ছে।”
তানভীর থমকে গেল।
—“মানে?”
—“কিছু না।”
তানভীর এবার একটু বিরক্ত হলো।
—“আপনি কিছু বলতে চাইলে সরাসরি বলতে পারেন।”
রিভা ঠান্ডা গলায় বলল,
—“আমি যা বলার সরাসরিই বলি।”
কামাল সাহেব দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
—“তোমরা দুজন পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঝগড়া শুরু করে দিলে?”
তানভীর চুপ করে গেল।
রিভা অন্যদিকে তাকাল।
কামাল সাহেব বললেন,
—“তানভীর, তুমি কয়েক দিন এখানে থেকো। তারপর অফিসের কাছাকাছি একটা বাসা ঠিক করে দেব।”
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
—“না চাচা, আমি কোনো সমস্যা করতে চাই না।”
—“সমস্যা কীসের? তুমি আমার ছেলের মতো।”
রিভা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—“বাবা, কিন্তু ওকে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিও না।”
তানভীর এবার সরাসরি রিভার দিকে তাকাল।
—“আপনাকে আমার দায়িত্ব নিতে বলেছে কে?”
রিভা অবাক হয়ে গেল।
—“কী বললেন?”
—“আপনি এমনভাবে কথা বলছেন যেন আমি আপনার কাছে থাকতে এসেছি।”
—“আমি তো শুধু বললাম—”
—“আপনি যত কম বলবেন, ততই ভালো।”
রিভার চোখ বড় হয়ে গেল।
—“আপনার সাহস তো কম না!”
তানভীর মুচকি হেসে বলল,
—“আপনারও কম নয়।”
কামাল সাহেব এবার হেসে ফেললেন।
—“ঠিক আছে, ঠিক আছে! তোমরা দুজন একটু শান্ত হও।”
কিন্তু কেউই বুঝতে পারল না, এই সামান্য কথাকাটাকাটি আসলে শুরু হতে যাচ্ছে আরও অনেক বড় এক গল্পের।
সেদিন বিকেলে তানভীর প্রথমবার কামাল সাহেবের অফিসে গেল।
অফিসটা ঢাকার ব্যস্ত এলাকায়। বড় একটি ভবনের কয়েকটি ফ্লোরজুড়ে তাদের ব্যবসা।
কামাল সাহেব তানভীরকে কর্মীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
—“তানভীর আমাদের নতুন প্রজেক্টের কাজে থাকবে। সবাই ওকে সহযোগিতা করবে।”
তানভীর মন দিয়ে সবকিছু দেখছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এল।
—“আপনি এখানে?”
তানভীর ঘুরে দেখল রিভা।
আজ সে অফিসের পোশাকে এসেছে।
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
—“আপনিও এখানে কাজ করেন?”
রিভা বলল,
—“হ্যাঁ। কেন?”
—“কিছু না।”
—“তাহলে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
তানভীর হেসে বলল,
—“ভাবছিলাম, আপনি শুধু বাড়িতেই ঝগড়া করেন।”
রিভা রাগী চোখে তাকাল।
—“আপনাকে একটা কথা বলি?”
—“বলুন।”
—“আমাকে বিরক্ত করবেন না।”
তানভীর শান্তভাবে উত্তর দিল,
—“আপনিও আমাকে করবেন না।”
রিভা কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কামাল সাহেব দূর থেকে ডাকলেন,
—“রিভা, তানভীর! তোমরা দুজনই আমার কেবিনে আসো।”
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
কেউ কারও দিকে তাকাল না।
কিন্তু দুজনের মনেই তখন একই প্রশ্ন—
এই মানুষটার সঙ্গে কি প্রতিদিনই এমন ঝগড়া করতে হবে?
কামাল সাহেবের কেবিনে ঢুকেই তানভীর আর রিভা দুজন দুই পাশে বসে পড়ল।
কামাল সাহেব কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন,
—“তোমাদের দুজনকে একটা দায়িত্ব দিতে চাই।”
রিভা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“বাবা, আমাকে আবার কোনো নতুন দায়িত্ব দিও না। আমার নিজের কাজই অনেক।”
তানভীর চুপচাপ বসে ছিল।
কামাল সাহেব হেসে বললেন,
—“তোমার কাজের কথাই বলছি। নতুন একটা প্রজেক্ট শুরু করছি। তানভীর এই প্রজেক্টের হিসাব আর মাঠপর্যায়ের কাজ দেখবে। আর রিভা ওকে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে দেবে।”
রিভা সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি করল।
—“আমি?”
—“হ্যাঁ, তুমি।”
—“বাবা, অফিসে আরও অনেক মানুষ আছে।”
—“আছে। কিন্তু তুমি এই প্রজেক্টটা শুরু থেকেই দেখছ। তাই তানভীরকে তুমি বুঝিয়ে দিলে কাজটা সহজ হবে।”
রিভা বিরক্ত হয়ে তানভীরের দিকে তাকাল।
তানভীরও তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল।
রিভা সেটা দেখে বলল,
—“হাসছেন কেন?”
—“কিছু না।”
—“নিশ্চয়ই কিছু আছে।”
—“ভাবছিলাম, আজ থেকে আপনার সঙ্গে আমাকে কাজও করতে হবে।”
—“আপনার যদি এত সমস্যা হয়, বাবাকে বলে চলে যেতে পারেন।”
তানভীর শান্তভাবে বলল,
—“আমি কাজ করতে এসেছি। কারও ভয়ে চলে যেতে আসিনি।”
রিভা আর কথা বলল না।
কামাল সাহেব দুজনের কথাবার্তা শুনে মাথা নাড়লেন।
—“তোমরা যদি এভাবে চলতে থাকো, তাহলে আমার প্রজেক্ট শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে।”
দুজনই চুপ।
—“কাল সকাল দশটায় তোমরা দুজন নারায়ণগঞ্জের সাইটে যাবে। সেখানে কিছু কাজ দেখতে হবে।”
রিভা অবাক হয়ে বলল,
—“দুজন একসঙ্গে?”
—“হ্যাঁ।”
—“বাবা, আমি একাই যেতে পারব।”
—“তুমি একা যাবে না। তানভীরও যাবে।”
তানভীর মাথা নাড়ল।
—“ঠিক আছে, চাচা।”
রিভা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
কামাল সাহেব বুঝতে পারলেন, মেয়ের আপত্তি থাকলেও এবার আর সে না করবে না।
পরদিন সকাল।
রিভা নির্দিষ্ট সময়ের দশ মিনিট আগেই অফিসে চলে এল।
সে ভেবেছিল তানভীর হয়তো দেরি করবে।
কিন্তু অফিসের গেটে গাড়ি থেকে নামতেই দেখল তানভীর আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে।
রিভা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আপনি এত সকালে?”
তানভীর বলল,
—“আপনার মতো আমিও সময় মেনে চলি।”
—“আমি কি কখনো বলেছি আমি সময় মেনে চলি না?”
—“না। তবে প্রথম দিন থেকেই আপনার কথার ধরন দেখে অনেক কিছু বোঝা যায়।”
রিভা চোখ কুঁচকে তাকাল।
—“আপনি কি সবসময় এমন কথা বলেন?”
—“আপনি যখন সামনে থাকেন, তখন বেশি বলি।”
রিভা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“চলুন।”
দুজন গাড়িতে উঠল।
রিভা গাড়ি চালাচ্ছিল।
তানভীর পাশের সিটে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর রিভা বলল,
—“আপনি আগে কখনো ঢাকার বাইরে এত বড় প্রজেক্টে কাজ করেছেন?”
—“না।”
—“তাহলে আজ আমাকে আপনার অনেক কিছু বুঝিয়ে দিতে হবে।”
—“আমি শিখতে রাজি।”
—“শুধু রাজি হলেই হবে না। মন দিয়ে শিখতে হবে।”
তানভীর হেসে বলল,
—“আপনি কি আমার শিক্ষক?”
—“কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে হতে পারি।”
—“তাহলে ম্যাডাম, আজকের ক্লাস শুরু করুন।”
রিভা বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আপনি আমাকে ‘ম্যাডাম’ বলবেন না।”
—“কেন?”
—“শুনতে ভালো লাগে না।”
—“তাহলে কী বলব?”
রিভা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—“রিভা বলবেন।”
তানভীর মাথা নাড়ল।
—“ঠিক আছে, রিভা।”
কথাটা শুনে রিভা অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে গেল।
কেন জানি না, তানভীরের মুখে নিজের নামটা শুনে তার একটু অন্যরকম লাগল।
সে দ্রুত বিষয় পরিবর্তন করল।
—“সাইটে গিয়ে প্রথমে আমাকে রিপোর্টগুলো দেখাবেন।”
—“আমি?”
—“হ্যাঁ। আপনি তো বলেছিলেন শিখতে চান।”
তানভীর হাসল।
—“ঠিক আছে।”
নারায়ণগঞ্জের সাইটে পৌঁছাতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লেগে গেল।
সেখানে পৌঁছে তানভীর বুঝতে পারল, কাজটা তার ধারণার চেয়েও কঠিন।
কর্মীদের সঙ্গে কথা বলা, পুরোনো হিসাব মিলিয়ে দেখা, নতুন কাজের পরিকল্পনা—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।
রিভা পাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছিল।
তানভীর খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিল।
কিছুক্ষণ পর একজন কর্মী এসে বলল,
—“স্যার, এই হিসাবটা মিলছে না।”
তানভীর কাগজটা নিয়ে ভালো করে দেখল।
—“এখানে একটা সংখ্যা ভুল লেখা হয়েছে। আবার হিসাব করুন।”
লোকটি আবার হিসাব করে বলল,
—“আপনি ঠিক বলেছেন।”
রিভা অবাক হয়ে তানভীরের দিকে তাকাল।
এই ছেলেটাকে সে এতক্ষণ শুধু গ্রামের সহজ-সরল ছেলে হিসেবেই দেখছিল।
কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে তানভীর যে এতটা মনোযোগী আর দক্ষ, সেটা সে ভাবেনি।
রিভা ধীরে ধীরে বলল,
—“আপনি হিসাবটা এত দ্রুত ধরলেন কীভাবে?”
তানভীর বলল,
—“আমাদের গ্রামে বাবার ব্যবসায় ছোটবেলা থেকেই হিসাব করতে সাহায্য করেছি।”
—“ও।”
রিভা আর কিছু বলল না।
তানভীর মুচকি হেসে বলল,
—“কী হলো? আজ কোনো ঝগড়া নেই?”
—“সব সময় ঝগড়া করতে হবে নাকি?”
—“আপনাকে দেখে মনে হয়।”
রিভা এবার হেসে ফেলল।
তানভীর কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
এই প্রথম সে রিভাকে হাসতে দেখল।
হাসলে মেয়েটাকে আগের চেয়ে অনেক শান্ত আর সুন্দর লাগছিল।
রিভা তানভীরের তাকিয়ে থাকা টের পেয়ে বলল,
—“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
তানভীর দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
—“না, কিছু না।”
রিভা আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার নিজের মনেও অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
বিকেলের দিকে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো বৃষ্টি।
সাইটের কাজ শেষ করে দুজন গাড়ির কাছে ফিরছিল।
হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাসে রিভার হাতে থাকা ফাইলগুলো মাটিতে পড়ে গেল।
কাগজগুলো বাতাসে উড়তে শুরু করল।
রিভা দৌড়ে কাগজ ধরতে গেল।
তানভীরও ছুটে গেল।
দুজন মিলে একে একে কাগজগুলো কুড়িয়ে নিতে লাগল।
একসময় রিভা পা পিছলে পড়ে যেতে যাচ্ছিল।
তানভীর দ্রুত তার হাত ধরে ফেলল।
কয়েক মুহূর্তের জন্য দুজন স্থির হয়ে রইল।
বৃষ্টির শব্দের মধ্যে চারপাশ যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
তানভীর বলল,
—“সাবধানে।”
রিভা ধীরে ধীরে হাতটা সরিয়ে নিল।
—“ধন্যবাদ।”
তানভীর মুচকি হেসে বলল,
—“এটা বলার জন্য এত সময় লাগল?”
রিভা মুখ গম্ভীর করে বলল,
—“বেশি কথা বলবেন না।”
—“আবার শুরু হলো।”
রিভা এবার হেসে ফেলল।
দুজন গাড়িতে উঠে বসল।
ফেরার পথে রিভা অস্বাভাবিকভাবে চুপ ছিল।
তানভীরও কিছু বলছিল না।
কিন্তু দুজনের মনেই বারবার ফিরে আসছিল সেই কয়েক সেকেন্ডের মুহূর্তটা।
ঢাকায় ফিরে সন্ধ্যার পর তানভীর কামাল সাহেবের বাড়িতে পৌঁছাল।
কামাল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
—“কাজ কেমন হলো?”
তানভীর বলল,
—“ভালো হয়েছে।”
—“রিভা কি তোমাকে বেশি বিরক্ত করেছে?”
তানভীর রিভার দিকে তাকাল।
রিভা তখন সোফায় বসে ফোন দেখছিল।
তানভীর বলল,
—“না। আজ তেমন করেনি।”
রিভা মাথা তুলে তাকাল।
—“আজ?”
তানভীর হেসে বলল,
—“মানে... আজ ভালোই সহযোগিতা করেছে।”
কামাল সাহেব খুশি হয়ে বললেন,
—“এই তো! এভাবেই কাজ করবে।”
রিভা কিছু বলল না।
কিন্তু রাতে নিজের ঘরে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে অকারণে তানভীরের কথা ভাবতে লাগল।
ছেলেটা আসলে যতটা বিরক্তিকর মনে হয়েছিল, ততটা নয়।
অন্যদিকে নিজের ঘরে বসে তানভীরও ভাবছিল,
রিভা সবসময় রাগী নয়।
মাঝে মাঝে হাসলে তাকে বেশ অন্যরকম লাগে।
দুজনেই নিজেদের ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে চাইল না।
কিন্তু তাদের অজান্তেই একটা ছোট্ট পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে।
পরের কয়েকটা দিন তানভীর আর রিভার সম্পর্কটা অদ্ভুতভাবে বদলে যেতে লাগল।
আগের মতো ঝগড়া অবশ্য হতো, কিন্তু সেই ঝগড়ার মধ্যে আগের তীব্র বিরক্তিটা আর ছিল না।
বরং দুজনেই যেন অকারণে একে অপরকে খোঁচা দেওয়ার সুযোগ খুঁজত।
অফিসে তানভীর নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। কিন্তু রিভা কখন অফিসে ঢুকল, কখন বের হলো—সেটা সে অজান্তেই খেয়াল করত।
রিভারও একই অবস্থা।
তানভীরকে কোথাও দেখা না গেলে সে নিজেই আশপাশে তাকিয়ে ফেলত।
তারপর নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে যেত।
‘আমি কেন ওকে খুঁজছি?’
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর সে খুঁজে পেত না।
একদিন দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনে বসে তানভীর একা খাচ্ছিল।
হঠাৎ রিভা এসে তার সামনে দাঁড়াল।
—“এখানে একা বসে আছেন কেন?”
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
—“খাচ্ছি।”
—“সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি।”
—“তাহলে প্রশ্ন করলেন কেন?”
রিভা চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
—“আজ আমার সঙ্গে কেউ নেই। তাই এখানে বসলাম।”
তানভীর ভ্রু তুলল।
—“আপনার তো অনেক বন্ধু আছে।”
—“সবাই আজ ব্যস্ত।”
—“তাই আমার কাছে আসতে হলো?”
রিভা চোখ বড় করে বলল,
—“আপনি নিজেকে এত গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন কেন?”
তানভীর হেসে ফেলল।
—“আপনিই তো এসে আমার সামনে বসেছেন।”
রিভা কিছু না বলে খাবার নিতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ দুজন চুপচাপ খেতে লাগল।
তারপর রিভা হঠাৎ বলল,
—“আপনি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন কীভাবে?”
—“আমি কি আপনার মতো সব সময় কথা বলি?”
—“আমি বেশি কথা বলি?”
—“অনেক।”
—“আর আপনি খুব কম বলেন।”
—“দুজনের একজন বেশি বললেই তো হয়।”
রিভা হেসে ফেলল।
তানভীরও হাসল।
ঠিক তখনই অফিসের একজন কর্মচারী পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল,
—“আপনাদের দুজনকে আজ বেশ ভালো লাগছে একসঙ্গে।”
দুজনেই একসঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
রিভা তাড়াতাড়ি বলল,
—“আপনি আপনার কাজ করুন।”
লোকটি চলে গেল।
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—“কী হলো?”
—“কিছু না।”
—“মনে হলো একটু লজ্জা পেলেন।”
—“আপনাকে এখনই খাবারটা মাথায় ঢেলে দিতে পারি।”
তানভীর হেসে বলল,
—“আবার আগের রিভা ফিরে এসেছে।”
রিভা এবার মুখ লুকিয়ে হাসল।
সেদিন বিকেলে কামাল সাহেব তানভীরকে তার কেবিনে ডাকলেন।
—“তানভীর, তোমার কাজ নিয়ে আমি খুশি।”
তানভীর বলল,
—“ধন্যবাদ, চাচা।”
—“তুমি চাইলে সামনে থেকে আরও বড় দায়িত্ব নিতে পারবে।”
তানভীর একটু অবাক হলো।
—“আমি চেষ্টা করব।”
কামাল সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“তোমার বাবা আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল। তোমাকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন।”
তানভীরের মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল।
—“জানি।”
—“তোমার বাবার সঙ্গে আমার একটা কথা হয়েছিল।”
তানভীর তাকাল।
—“কী কথা?”
কামাল সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
—“তুমি যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারো, সেটা আমি দেখব।”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“আমি আপনার বিশ্বাসটা নষ্ট করব না।”
কামাল সাহেব তার কাঁধে হাত রাখলেন।
—“আমি জানি।”
কথা শেষ করে তানভীর কেবিন থেকে বেরিয়ে এল।
বাইরে এসে দেখল রিভা দাঁড়িয়ে আছে।
—“আপনি এখানে?”
রিভা বলল,
—“বাবার সঙ্গে কী কথা হলো?”
—“কাজের কথা।”
—“কী কাজ?”
—“বলব না।”
—“কেন?”
—“সব কথা আপনাকে বলতে হবে?”
রিভা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—“ঠিক আছে। বলার দরকার নেই।”
তানভীর হেসে বলল,
—“রাগ করলেন?”
—“না।”
—“আপনার মুখ বলছে করেছেন।”
রিভা কিছু না বলে চলে গেল।
তানভীর তার পেছনে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কয়েকদিন পর অফিসে একটি ছোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো।
কামাল সাহেবের প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক মিলনমেলা।
অফিসের সবাই সেখানে উপস্থিত।
রিভা সেদিন হালকা রঙের একটি শাড়ি পরেছিল।
অফিসে ঢোকার পর অনেকেই তার দিকে তাকাল।
তানভীরও তাকিয়েছিল।
কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল।
রিভা সেটা লক্ষ্য করল।
কিছুক্ষণ পর সে তানভীরের কাছে এসে বলল,
—“কী হলো? আজ এত চুপচাপ কেন?”
—“কিছু না।”
—“আমার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলেন কেন?”
তানভীর একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
—“আমি কি তাকিয়েছিলাম?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনি ভুল দেখেছেন।”
রিভা হেসে বলল,
—“আপনি মিথ্যা বললে খুব খারাপ লাগে।”
—“আপনি এত কিছু লক্ষ্য করেন?”
—“সবকিছু না।”
—“তাহলে?”
রিভা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
—“কিছু কিছু জিনিস।”
তারপর চলে গেল।
তানভীর তার কথার অর্থ বুঝতে পারল না।
অনুষ্ঠানের মাঝখানে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।
পুরো হলঘর অন্ধকার।
চারপাশে সবাই একটু হইচই শুরু করল।
রিভা নিজের জায়গা থেকে উঠতে গিয়ে কারও সঙ্গে ধাক্কা খেল।
সে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিল।
ঠিক তখন তানভীর তার হাত ধরে বলল,
—“সাবধানে।”
রিভা নিচু গলায় বলল,
—“আবার আপনি!”
—“আপনাকে একা ছাড়লেই বিপদ হয়।”
—“আমি কি সব সময় বিপদে পড়ি?”
—“আপনার সঙ্গে থাকলে আমার তো তাই মনে হয়।”
রিভা হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর জেনারেটর চালু হলো।
আলো ফিরে এল।
দুজনের হাত তখনও একসঙ্গে ছিল।
রিভা ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিল।
কিন্তু এবার কেউ কিছু বলল না।
রাতের অনুষ্ঠান শেষে সবাই যখন বের হচ্ছিল, তখন রিভার বান্ধবী মায়া এসে তাকে বলল,
—“তোর সঙ্গে তানভীরের কী ব্যাপার?”
রিভা অবাক হয়ে বলল,
—“কী ব্যাপার?”
—“তুই ওর দিকে যেভাবে তাকাস, সেটা কি আমি বুঝি না?”
রিভা দ্রুত বলল,
—“কিছুই না।”
মায়া হেসে বলল,
—“কিছুই না হলে এত তাড়াতাড়ি উত্তর দিচ্ছিস কেন?”
রিভা চুপ হয়ে গেল।
মায়া আবার বলল,
—“ছেলেটাকে কিন্তু খারাপ লাগে না।”
রিভা মৃদু গলায় বলল,
—“ও ভালো।”
—“তাহলে?”
রিভা জানালার বাইরে তাকাল।
—“জানি না।”
অন্যদিকে তানভীরকে নিয়ে তার এক বন্ধু রাকিব মজা করতে শুরু করল।
—“কী রে, কামাল সাহেবের মেয়েকে তো বেশ পছন্দ হয়েছে মনে হচ্ছে!”
তানভীর সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“যা বলিস না।”
—“তাহলে এত খেয়াল রাখিস কেন?”
—“ও আমার বসের মেয়ে।”
—“শুধু তাই?”
তানভীর কোনো উত্তর দিল না।
রাকিব হেসে বলল,
—“তোর চোখ কিন্তু অন্য কথা বলে।”
তানভীর বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আমার চোখ কী বলে, সেটা আমি নিজেও জানি না।”
সেই রাতে রিভা নিজের ঘরে বসে ফোন হাতে নিয়ে ছিল।
হঠাৎ তানভীরের কাছ থেকে একটি মেসেজ এল।
“কাল সকাল ৯টায় সাইটে যেতে হবে। সময়মতো প্রস্তুত থাকবেন।”
রিভা কিছুক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর লিখল,
“আপনিও দেরি করবেন না।”
কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল,
“আপনি থাকলে দেরি করার সাহস পাব না।”
রিভার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
সে ফোনটা পাশে রেখে দিল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার ফোন হাতে নিল।
মেসেজটা খুলে আরেকবার পড়ল।
তারপর নিজেকেই বলল,
—“এই ছেলেটা আমাকে এত বিরক্ত করে কেন?”
কিন্তু মনের ভেতর থেকে যেন অন্য একটা উত্তর ভেসে এল—
“হয়তো কারণ, সে এখন আর অচেনা নেই।”
আর তানভীরও সেদিন রাতে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।
তার মনে বারবার শুধু একটা মুখই ভেসে উঠছিল।
রিভার।
তাদের সম্পর্কের নাম তখনও কেউ জানত না।
এমনকি তারা নিজেরাও না।
পরদিন সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা।
তানভীর অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখছিল। সময় তখন সকাল ৮টা ৫৫।
রিভা এখনো আসেনি।
তানভীর ফোন বের করে সময় দেখল।
আরও পাঁচ মিনিট পর রিভার গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নেমেই রিভা বলল,
—“দেরি হয়ে গেছে?”
তানভীর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
—“না, মাত্র পাঁচ মিনিট।”
রিভা অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি তো সময়ের ব্যাপারে খুব কঠোর।”
—“আপনার জন্য নিয়ম একটু বদলানো যায়।”
রিভা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—“চলুন।”
তানভীর গাড়িতে উঠল।
আজ দুজনের মধ্যে আগের মতো ঝগড়া হলো না।
রাস্তায় কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর রিভা বলল,
—“কাল রাতে মেসেজ করেছিলেন কেন?”
—“কাল তো আপনাকে মনে করিয়ে দিতে হয়েছিল। আজ আর দরকার নেই।”
—“না, ওই মেসেজের কথা বলছি না।”
তানভীর ভান করে অবাক হলো।
—“কোন মেসেজ?”
রিভা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“যেটা লিখেছিলেন—‘আপনি থাকলে দেরি করার সাহস পাব না।’”
তানভীর হেসে ফেলল।
—“ওটা?”
—“হ্যাঁ।”
—“সত্যি কথাই তো বলেছি।”
রিভা একটু লজ্জা পেয়ে সামনে তাকাল।
—“আপনি মাঝে মাঝে খুব অদ্ভুত কথা বলেন।”
—“আপনাকে অদ্ভুত না লাগলে তো আমার কথার কোনো দামই নেই।”
রিভা আর উত্তর দিল না।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
সাইটে পৌঁছে তারা কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।
আজ কাজটা বেশ কঠিন।
নতুন ভবনের কিছু নকশা নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তানভীর মন দিয়ে সব শুনছিল।
রিভা মাঝে মাঝে তার দিকে তাকাচ্ছিল।
ছেলেটা আসার পর থেকে সত্যিই অনেক বদলে গেছে।
আগে গ্রামের সরল ছেলে বলে মনে হলেও এখন বোঝা যাচ্ছে, তানভীরের মধ্যে আত্মবিশ্বাস আছে। নিজের কাজের ব্যাপারে সে খুব দায়িত্বশীল।
একজন ইঞ্জিনিয়ার তানভীরকে বলল,
—“আপনি নতুন হলেও বিষয়টা খুব দ্রুত বুঝে ফেলছেন।”
তানভীর হেসে বলল,
—“শিখতে হলে মন দিয়ে শুনতে হয়।”
রিভা কথাটা শুনে মৃদু হেসে ফেলল।
দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো।
কাজ বন্ধ রাখতে হলো কিছু সময়ের জন্য।
সবাই আশ্রয় নিল পাশের একটি টিনের ঘরে।
রিভা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।
তানভীর একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ রিভা বলল,
—“আপনার বৃষ্টি ভালো লাগে?”
—“খুব।”
—“কেন?”
—“বৃষ্টি হলে গ্রামের কথা মনে পড়ে।”
—“আপনার গ্রাম কেমন?”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“শান্ত। চারপাশে গাছপালা, পুকুর, ধানক্ষেত। সন্ধ্যার পর রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়।”
রিভা মন দিয়ে শুনছিল।
—“আপনি গ্রামকে খুব মিস করেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে ঢাকায় এলেন কেন?”
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—“স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গেলে অনেক কিছু ছাড়তে হয়।”
রিভা চুপ করে গেল।
তারপর ধীরে বলল,
—“আপনার স্বপ্ন কী?”
তানভীর জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—“নিজের একটা প্রতিষ্ঠান করব। বাবাকে আর কাজ করতে দেব না।”
রিভা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই প্রথম সে তানভীরের স্বপ্নের কথা জানল।
—“আপনি পারবেন।”
তানভীর অবাক হয়ে তাকাল।
—“আপনি এত সহজে বিশ্বাস করছেন?”
—“আপনাকে দেখে মনে হয় আপনি চেষ্টা করলে পারবেন।”
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—“ধন্যবাদ।”
রিভা আবার বৃষ্টির দিকে তাকাল।
তার মনে হলো, তানভীরকে সে যতটা চিনেছে বলে ভাবছিল, আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু জানার বাকি।
বিকেলে ফেরার সময় গাড়ির একটা সমস্যা হলো।
চালক অনেক চেষ্টা করেও গাড়ি চালু করতে পারল না।
তানভীর বলল,
—“আপনারা একটু দাঁড়ান, আমি দেখি।”
রিভা অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি গাড়িও ঠিক করতে পারেন?”
—“গ্রামে থাকলে অনেক কিছুই শিখতে হয়।”
তানভীর কিছুক্ষণ চেষ্টা করে গাড়িটা চালু করে ফেলল।
রিভা হাততালি দিয়ে বলল,
—“বাহ!”
তানভীর হেসে বলল,
—“এই প্রথম আপনার মুখ থেকে প্রশংসা পেলাম।”
—“অতিরিক্ত ভাববেন না।”
—“তবু পেলাম তো।”
রিভা হাসল।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
কিছুদূর যাওয়ার পর রিভা বলল,
—“আজ একটা কথা বলব?”
—“বলুন।”
—“আপনাকে প্রথম দিন যেমন মনে হয়েছিল, এখন আর তেমন মনে হয় না।”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—“আমারও।”
—“আমার ব্যাপারেও?”
—“হ্যাঁ।”
—“এখন কেমন মনে হয়?”
তানভীর তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আপনি যতটা রাগী দেখান, আসলে ততটা নন।”
রিভা হেসে বলল,
—“আর আপনি যতটা চুপচাপ দেখান, আসলে ততটা নন।”
দুজনেই হেসে ফেলল।
কয়েক দিন পর রিভার জন্মদিন।
বাড়িতে ছোটখাটো আয়োজন করা হয়েছে।
বন্ধু, আত্মীয়স্বজন সবাই এসেছে।
তানভীরও নিমন্ত্রণ পেয়েছে।
সে প্রথমে যেতে চাইছিল না।
কিন্তু কামাল সাহেব নিজেই বললেন,
—“তুমি না গেলে রিভা মন খারাপ করবে।”
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
—“ও মন খারাপ করবে?”
কামাল সাহেব হেসে বললেন,
—“তুমি বুঝবে না।”
তানভীর শেষ পর্যন্ত গেল।
রিভা তখন অতিথিদের সঙ্গে কথা বলছিল।
তানভীরকে দেখে তার চোখে হঠাৎ আনন্দের ছাপ ফুটে উঠল।
সে এগিয়ে এসে বলল,
—“আপনি এসেছেন!”
—“নিমন্ত্রণ পেয়েছি। না এসে উপায় কী?”
রিভা হেসে বলল,
—“তবু ভেবেছিলাম আসবেন না।”
—“কেন?”
—“জানি না।”
তানভীর তার হাতে একটা ছোট প্যাকেট দিল।
—“আপনার জন্য।”
রিভা অবাক হয়ে বলল,
—“আমার জন্য?”
—“হ্যাঁ।”
—“কী আছে?”
—“এখন খুলবেন না।”
রিভা কৌতূহলী হয়ে প্যাকেটটা হাতে নিল।
—“কেন?”
—“পরে খুলবেন।”
রিভা মাথা নাড়ল।
রাতের দিকে যখন সবাই ব্যস্ত, তখন সে নিজের ঘরে গিয়ে প্যাকেটটা খুলল।
ভেতরে একটি সুন্দর ডায়েরি।
প্রথম পাতায় লেখা—
“আপনার স্বপ্নগুলো যেন একদিন সত্যি হয়।”
রিভা অনেকক্ষণ সেই কথাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ডায়েরিটা বুকের কাছে ধরে মৃদু হাসল।
কেন যেন তার চোখে পানি চলে এল।
কেউ তাকে এত সাধারণ অথচ এত সুন্দর একটা উপহার আগে দেয়নি।
নিচে তখন তানভীর একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
রিভা এসে পাশে দাঁড়াল।
—“ধন্যবাদ।”
তানভীর তাকাল।
—“কিসের জন্য?”
—“উপহারের জন্য।”
—“পছন্দ হয়েছে?”
—“অনেক।”
কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর রিভা বলল,
—“তানভীর?”
—“হুম?”
—“আপনি কি কখনো কাউকে খুব আপন মনে করেছেন?”
তানভীর প্রশ্নটা শুনে থেমে গেল।
—“কেন জিজ্ঞেস করছেন?”
—“এমনিই।”
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—“হয়তো করেছি।”
—“কে?”
তানভীর রিভার দিকে তাকাল।
কিন্তু উত্তর দিল না।
রিভার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন ধক করে উঠল।
সে দ্রুত অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
—“ঠিক আছে। বলতে হবে না।”
তানভীর ধীরে বলল,
—“সব কথা মুখে বলা যায় না।”
রিভা এবার তার দিকে তাকাল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
কেউ কিছু বলল না।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে কামাল সাহেবের ডাক এল,
—“রিভা!”
রিভা চমকে উঠে ভেতরে চলে গেল।
তানভীরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে তখন একটা কথাই ঘুরছিল—
সে কি সত্যিই রিভাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে দেখতে শুরু করেছে?
রিভার জন্মদিনের পর থেকে তানভীর আর রিভার সম্পর্কটা যেন আরও একটু বদলে গেল।
আগে তারা সুযোগ পেলেই একে অপরের সঙ্গে তর্ক করত। এখনো খুনসুটি হয়, কিন্তু সেই কথার আড়ালে একটা অদৃশ্য টান তৈরি হয়েছে।
তানভীর অফিসে ঢুকলে রিভার চোখ তাকে খুঁজে নেয়।
রিভা কোনো কাজে বাইরে গেলে তানভীর অকারণে জানতে চায় কখন ফিরবে।
তবু কেউ কাউকে নিজের মনের কথা বলে না।
একদিন দুপুরে রিভা অফিসের কেবিনে বসে কাজ করছিল। হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
ফোনের ওপাশে একজন পরিচিত পুরুষের কণ্ঠ।
—“রিভা, কেমন আছ?”
রিভা হেসে বলল,
—“ভালো। তুমি কবে এলে?”
—“আজ সকালেই। তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
—“ঠিক আছে। বিকেলে দেখা করতে পারি।”
তানভীর পাশের কেবিনে কিছু কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। দরজা পুরোপুরি বন্ধ না থাকায় কথাগুলো তার কানে গেল।
রিভার হাসির শব্দটাও সে শুনল।
কেন জানি তার বুকের ভেতরটা একটু ভার হয়ে গেল।
কিন্তু সে নিজেকে বোঝাল,
‘রিভার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার মাথা ঘামানোর কী আছে?’
কাগজগুলো রেখে সে নিজের কাজে ফিরে গেল।
বিকেলে রিভা অফিস থেকে বের হলো।
তানভীর তখন নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।
রিভা তাকে দেখে বলল,
—“আপনি এখনো যাননি?”
—“কিছু কাজ আছে।”
—“আচ্ছা।”
রিভা চলে যেতে উদ্যত হলে তানভীর বলল,
—“কোথাও যাচ্ছেন?”
রিভা একটু অবাক হয়ে তাকাল।
—“হ্যাঁ।”
—“কোথায়?”
—“কেন?”
তানভীর কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বলল,
—“এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।”
রিভা মুচকি হেসে বলল,
—“আপনি কি আমার খবর নেওয়া শুরু করেছেন?”
তানভীর সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“না।”
—“তাহলে?”
—“কিছু না।”
রিভা আর কিছু না বলে গাড়িতে উঠে চলে গেল।
তানভীর অনেকক্ষণ সেই গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।
রিভা শহরের একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসেছিল।
কিছুক্ষণ পর একজন যুবক এসে তার সামনে বসল।
তার নাম আরমান।
রিভার স্কুলজীবনের পরিচিত। কয়েক বছর বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরেছে।
আরমান হাসতে হাসতে বলল,
—“তুমি একদম বদলাওনি।”
রিভা বলল,
—“তুমিও না।”
—“তোমাকে একটা কথা বলার জন্যই দেখা করতে চেয়েছিলাম।”
—“বলো।”
আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আমি দেশে ফিরে এসেছি। এবার স্থায়ীভাবে থাকতে চাই।”
রিভা মাথা নাড়ল।
—“ভালো।”
—“শুধু ভালো?”
রিভা হেসে বলল,
—“আর কী বলব?”
আরমান মৃদু হেসে বলল,
—“তুমি জানো আমি কেন ফিরে এসেছি।”
রিভা এবার গম্ভীর হয়ে গেল।
—“আরমান, পুরোনো বিষয়গুলো এখন আর—”
—“আমি জানি। তবু তোমার সঙ্গে একবার কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
রিভা কিছু বলল না।
সেদিন সন্ধ্যায় অফিসে ফিরে রিভা দেখল তানভীর অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ।
সে কাছে গিয়ে বলল,
—“কী হয়েছে?”
—“কিছু না।”
—“আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু হয়েছে।”
—“আমি ঠিক আছি।”
রিভা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
—“আজ আপনি অদ্ভুত আচরণ করছেন।”
তানভীর এবার বলল,
—“আপনি কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন?”
রিভা অবাক।
—“আপনি জানলেন কীভাবে?”
—“শুনেছিলাম।”
—“তাহলে?”
—“কিছু না।”
রিভা বুঝতে পারল, তানভীরের আচরণের পেছনে অন্য কিছু আছে।
সে মৃদু হেসে বলল,
—“আপনি কি ঈর্ষা করছেন?”
তানভীর সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
—“আমি কেন ঈর্ষা করব?”
—“সেটাই তো জানতে চাই।”
—“আপনি যার সঙ্গে ইচ্ছা দেখা করবেন। সেটা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।”
রিভার মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল।
—“তাহলে এত প্রশ্ন করছেন কেন?”
তানভীর চুপ করে গেল।
রিভা বলল,
—“আপনি যদি আমার জীবনের ব্যাপারে জানতে চান, সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারেন।”
তানভীর ধীরে বলল,
—“আমি আপনার জীবনে কে?”
প্রশ্নটা শুনে রিভা থমকে গেল।
কয়েক সেকেন্ড দুজনের চোখে চোখ।
রিভা আস্তে বলল,
—“আমি জানি না।”
তারপর চলে গেল।
তানভীরও আর তাকে আটকায়নি।
পরদিন অফিসে দুজনের মধ্যে অদ্ভুত দূরত্ব তৈরি হলো।
রিভা প্রয়োজন ছাড়া তানভীরের সঙ্গে কথা বলছে না।
তানভীরও নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছে।
কিন্তু দুজনের কেউই স্বস্তিতে নেই।
দুপুরে কামাল সাহেব দুজনকে ডেকে বললেন,
—“তোমাদের কী হয়েছে?”
রিভা বলল,
—“কিছু হয়নি।”
তানভীরও বলল,
—“কিছু না।”
কামাল সাহেব দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তোমাদের মুখ বলছে কিছু হয়েছে।”
কেউ উত্তর দিল না।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—“কাজের ব্যাপার যেন ব্যক্তিগত বিষয়ে নষ্ট না হয়।”
তানভীর মাথা নাড়ল।
রিভাও চুপ করে রইল।
কয়েকদিন পর কামাল সাহেবের ব্যবসায় একটি বড় সমস্যা দেখা দিল।
একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির কাগজে ভুল তথ্য পাওয়া গেল। ফলে বড় অঙ্কের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হলো।
কামাল সাহেব খুব চিন্তায় পড়লেন।
তিনি তানভীরকে বললেন,
—“তুমি কি হিসাবগুলো আবার দেখতে পারবে?”
তানভীর বলল,
—“অবশ্যই।”
রিভাও কাজে নেমে পড়ল।
সারাদিন দুজন একসঙ্গে কাজ করলেও ব্যক্তিগত কোনো কথা বলল না।
রাত হয়ে গেল।
অফিস প্রায় ফাঁকা।
তানভীর তখনও হিসাব মিলিয়ে যাচ্ছে।
রিভা এসে তার সামনে এক কাপ চা রাখল।
—“চা।”
তানভীর তাকিয়ে বলল,
—“ধন্যবাদ।”
রিভা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর বলল,
—“আপনি কি এখনো আমার ওপর রাগ করে আছেন?”
তানভীর মাথা নাড়ল।
—“না।”
—“মিথ্যা।”
তানভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“আমি রাগ করিনি।”
—“তাহলে দূরে সরে আছেন কেন?”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“কারণ আমি বুঝতে পারছি না, আপনার জীবনে আমার অবস্থানটা কী।”
রিভার চোখ নরম হয়ে গেল।
—“আপনি কি সত্যিই জানতে চান?”
তানভীর তার দিকে তাকাল।
—“হ্যাঁ।”
রিভা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
ঠিক তখনই তানভীরের ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে তার বাবার নাম।
তানভীর ফোন ধরে অন্যদিকে চলে গেল।
রিভা একা দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, আজ যদি সে নিজের মনের কথাটা বলে দিতে পারত!
কিন্তু সাহস হলো না।
পরদিন সকালে নতুন একটা খবর এল।
কামাল সাহেব রিভাকে নিজের কেবিনে ডাকলেন।
—“রিভা, তোমার জন্য একটা কথা আছে।”
—“কী বাবা?”
কামাল সাহেব বললেন,
—“আরমানের পরিবার আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে।”
রিভা চুপ হয়ে গেল।
—“তারা চায় তোমাদের সম্পর্কটা এবার আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নিতে।”
রিভার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—“বাবা, আমি—”
—“আমি তোমার ওপর কিছু চাপিয়ে দিচ্ছি না। কিন্তু পরিবার হিসেবে বিষয়টা আমাদের ভাবতে হচ্ছে।”
রিভা মাথা নিচু করল।
তার মনে তখন শুধু একজনের মুখ।
তানভীর।
অন্যদিকে এই কথোপকথনের কিছু অংশ অনিচ্ছাকৃতভাবে তানভীরের কানে চলে গেল।
সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।
‘আরমানের পরিবার... সম্পর্ক...’
তানভীরের বুকটা ভার হয়ে গেল।
সে আর কিছু শুনল না।
চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল।
তার মনে একটাই কথা—
রিভার জীবনে হয়তো তার জন্য কোনো জায়গাই নেই।
আরমানের পরিবারের প্রস্তাবের কথা জানার পর থেকে রিভার মনটা অস্থির হয়ে উঠল।
বাবা তাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেননি। বরং স্পষ্ট করে বলেছিলেন,
—“শেষ সিদ্ধান্ত তোমার। তুমি যাকে চাও, তাকেই বিয়ে করবে।”
কিন্তু রিভা জানত, সমস্যাটা শুধু বিয়ের সিদ্ধান্তে নয়।
তার নিজের মনেই যে এখন আরেকজন মানুষ জায়গা করে নিয়েছে, সেটা সে কীভাবে বাবাকে বলবে?
তানভীরকে কীভাবে বলবে?
সবচেয়ে বড় কথা, তানভীর কি আদৌ তাকে সেভাবে দেখে?
এই প্রশ্নটাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছিল।
অন্যদিকে তানভীর নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছে।
আগে অফিসে ঢুকেই তার চোখ রিভাকে খুঁজত।
এখন সে ইচ্ছে করেই অন্যদিকে তাকায়।
রিভা কোনো কথা বললে শুধু প্রয়োজনীয় উত্তর দেয়।
একদিন সকালে রিভা তার কেবিনে এসে বলল,
—“এই রিপোর্টটা আজকের মধ্যে শেষ করতে হবে।”
তানভীর কাগজটা নিয়ে বলল,
—“ঠিক আছে।”
রিভা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
আগে তানভীর অন্তত একটা কথা বলত, কোনো মজা করত।
এখন শুধু কাজের কথা।
রিভা ধীরে বলল,
—“আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছেন?”
তানভীর মাথা তুলল না।
—“না।”
—“তাহলে আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছেন কেন?”
—“কাজের সময় কাজের কথাই বলা উচিত।”
রিভা কষ্ট পেয়ে বলল,
—“আগে তো এমন বলতেন না।”
তানভীর এবার তাকাল।
তার চোখে অনেক কথা ছিল, কিন্তু মুখে শুধু বলল,
—“আগে অনেক কিছু বুঝতাম না।”
রিভা থমকে গেল।
—“এখন বুঝেছেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“কী বুঝেছেন?”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“কিছু মানুষকে যতটা কাছে ভাবা হয়, তারা আসলে ততটা কাছে থাকে না।”
রিভার চোখ ভিজে উঠল।
সে আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর তানভীর চোখ বন্ধ করল।
নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, এটাই ভালো।
রিভার জীবনে যদি অন্য কেউ থাকে, তাহলে তার সরে যাওয়াই উচিত।
কিন্তু মন কি এত সহজে কাউকে ছেড়ে দিতে পারে?
সেদিন বিকেলে রিভা বাড়িতে ফিরে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে রইল।
মায়া তাকে ফোন করেছিল।
—“কী হয়েছে তোর?”
রিভা বলল,
—“কিছু না।”
—“তোর গলায় শুনেই বুঝতে পারছি কিছু হয়েছে।”
রিভা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“তুই কি কখনো কাউকে খুব কাছে পেয়ে আবার হঠাৎ দূরে চলে যেতে দেখেছিস?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“তানভীর?”
রিভা অবাক হয়ে গেল।
—“তুই কীভাবে বুঝলি?”
—“কারণ তোর কথা বলার ধরনটাই বদলে গেছে ওর নাম উঠলেই।”
রিভা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“ও আমাকে ভুল বুঝেছে।”
—“তাহলে বুঝিয়ে বল।”
—“কীভাবে?”
—“সত্যিটা বল।”
রিভা নিচু গলায় বলল,
—“আমি নিজেই তো এখনো জানি না, ও আমাকে কী ভাবে।”
মায়া বলল,
—“তুই জানিস। শুধু বলতে ভয় পাচ্ছিস।”
রিভা কোনো উত্তর দিল না।
পরদিন সকালে কামাল সাহেব ঘোষণা করলেন, আগামী সপ্তাহে তাদের প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তানভীরকে সবার সামনে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হবে।
সবাই খুশি।
কিন্তু তানভীরের মনটা তেমন ভালো ছিল না।
কামাল সাহেব তাকে বললেন,
—“তুমি আমার বিশ্বাস অর্জন করেছ। আমি চাই তুমি সামনে থেকে আমাদের নতুন শাখার দায়িত্ব নাও।”
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
—“আমি?”
—“হ্যাঁ।”
—“চাচা, আমি এখনো অনেক কিছু শিখছি।”
—“শেখার শেষ নেই। দায়িত্ব নিলে আরও শিখবে।”
তানভীর মাথা নাড়ল।
—“আমি চেষ্টা করব।”
রিভা দূর থেকে কথাগুলো শুনছিল।
তার মুখে গর্বের হাসি ফুটে উঠল।
সে এগিয়ে এসে বলল,
—“অভিনন্দন।”
তানভীর শুধু বলল,
—“ধন্যবাদ।”
রিভা কষ্ট পেল।
তবুও হাসি ধরে রাখল।
কয়েকদিন পর অফিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল।
রিভা প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিল।
হঠাৎ প্রজেক্টরের সমস্যা হলো।
সবাই একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
তানভীর দ্রুত উঠে এসে সমস্যাটা ঠিক করে দিল।
রিভা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু বলল,
—“ধন্যবাদ।”
তানভীর মাথা নাড়ল।
মিটিং শেষ হওয়ার পর রিভা তার পেছনে গেল।
—“তানভীর।”
তানভীর থামল।
—“জি?”
—“আমার সঙ্গে একটু কথা বলবেন?”
—“বলুন।”
—“এভাবে দূরে থাকবেন না।”
তানভীর চুপ।
রিভা বলল,
—“আপনি যে কথাগুলো ভাবছেন, সেগুলো সত্যি নয়।”
—“আপনি কী বলতে চাইছেন?”
—“আরমানের ব্যাপারে।”
তানভীরের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—“আপনাকে আমাকে কিছু ব্যাখ্যা করতে হবে না।”
রিভা বলল,
—“কিন্তু আমি চাই আপনি শুনুন।”
—“কেন?”
—“কারণ আপনার ভুল ধারণার জন্য আমি আপনাকে হারাতে চাই না।”
তানভীরের চোখে বিস্ময়।
—“হারাতে চান না?”
রিভা থেমে গেল।
সে কী বলতে যাচ্ছে, নিজেই বুঝতে পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত শুধু বলল,
—“আপনি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
তানভীর কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—“তাহলে আমাকে সত্যিটা বলুন।”
রিভা বলল,
—“আরমান আমার পুরোনো পরিচিত। সে আমাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু আমি তাকে সেইভাবে দেখি না।”
তানভীরের চোখে যেন আলো ফিরে এল।
—“তাহলে আপনার বাবা?”
—“বাবা শুধু প্রস্তাবের কথা বলেছেন। সিদ্ধান্ত আমার।”
তানভীর কিছু বলল না।
রিভা এবার বলল,
—“আপনি কি সত্যিই ভাবলেন আমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে যাচ্ছি?”
তানভীর নিচু গলায় বলল,
—“আমি জানতাম না আপনার মনে কী আছে।”
রিভা একটু এগিয়ে এসে বলল,
—“আপনি জানতে চাইলে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন।”
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—“ভয় হয়েছিল।”
—“কিসের?”
—“উত্তরটা শুনতে।”
রিভা চুপ করে গেল।
তারপর ধীরে বলল,
—“সব উত্তর শুনতে ভয় পেলে মানুষ কখনো সত্যিটা জানতে পারে না।”
তানভীর তার দিকে তাকিয়ে রইল।
দুজনের মধ্যকার দূরত্ব যেন একটু কমে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে বের হওয়ার সময় রিভা তানভীরকে বলল,
—“আজ কোথাও যাবেন?”
—“কোথায়?”
—“আমার সঙ্গে।”
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
—“কেন?”
—“একটা জায়গায় যেতে চাই।”
—“কোথায়?”
রিভা হাসল।
—“গেলে দেখবেন।”
তানভীর রাজি হয়ে গেল।
গাড়ি শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে হাতিরঝিলের দিকে গেল।
রিভা গাড়ি থামিয়ে দুজন নেমে হাঁটতে লাগল।
চারপাশে সন্ধ্যার আলো।
দূরে শহরের ব্যস্ততা, সামনে পানির ওপর আলো-ছায়ার খেলা।
রিভা বলল,
—“এই জায়গাটা আমার খুব পছন্দ।”
তানভীর বলল,
—“আমারও ভালো লাগছে।”
—“আপনি জানেন, আমি আপনাকে প্রথম দিন একদম পছন্দ করিনি।”
তানভীর হেসে বলল,
—“আমি আপনাকেও না।”
—“এখন?”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—“এখন আগের মতো নেই।”
রিভা মৃদু হেসে বলল,
—“আমারও না।”
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
কিন্তু তাদের কেউই জানত না, ঠিক সেই সময় দূর থেকে আরমান তাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখে ফেলেছে।
আর তার চোখে ফুটে উঠেছে কঠিন এক অভিব্যক্তি।
সে ফোন বের করে কাউকে কল করল।
—“আমার মনে হচ্ছে রিভার জীবনে অন্য কেউ এসেছে।”
ওপাশ থেকে কিছু একটা বলা হলো।
আরমান ঠান্ডা গলায় বলল,
—“আমি এত সহজে হাল ছাড়ব না।”
এদিকে তানভীর আর রিভা নিজেদের নতুন অনুভূতির দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছিল।
হাতিরঝিলের সেই সন্ধ্যার পর তানভীর আর রিভার মধ্যে আগের অস্বস্তিটা অনেকটাই কেটে গেল।
দুজনেই বুঝতে পারছিল, তাদের সম্পর্কটা আর শুধু বন্ধুত্ব বা অফিসের পরিচয়ের মধ্যে আটকে নেই।
তবে কেউই এখনো সরাসরি নিজের মনের কথা বলেনি।
তানভীরের মনে একটা দ্বিধা ছিল।
রিভা ধনী পরিবারের মেয়ে। তার নিজের জীবন, পরিবার, পরিচিতি—সবকিছু তানভীরের থেকে আলাদা।
অন্যদিকে রিভা ভাবছিল, তানভীর হয়তো তাকে নিজের মনের কথা বলবে।
কিন্তু তানভীর যতবারই কিছু বলতে যায়, ততবারই থেমে যায়।
পরদিন সকালে অফিসে ঢুকতেই রিভা দেখল তানভীর তার ডেস্কে বসে কাজ করছে।
রিভা কাছে গিয়ে বলল,
—“সুপ্রভাত।”
তানভীর মাথা তুলে হেসে বলল,
—“সুপ্রভাত।”
রিভা অবাক হলো।
—“আজ এত ভদ্রতা কেন?”
—“কেন? আমি কি সব সময় খারাপ ব্যবহার করি?”
—“না। তবে আজ একটু বেশি ভালো।”
—“কারণ আজ আপনার সঙ্গে ঝগড়া করার ইচ্ছে নেই।”
রিভা হেসে বলল,
—“আমারও নেই।”
দুজনের চোখাচোখি হলো।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর রিভা বলল,
—“চা খাবেন?”
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি বানাবেন?”
—“না। ক্যান্টিন থেকে আনব।”
—“তাহলে খাব।”
রিভা চলে গেল।
তানভীর তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
রাকিব পাশ থেকে এসে বলল,
—“ভাই, ব্যাপারটা কিন্তু সিরিয়াস।”
তানভীর ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“কী?”
—“তুই এখন ওর জন্য চা খাস।”
—“চুপ কর।”
রাকিব হেসে বলল,
—“দেখিস, একদিন চা থেকে শুরু হয়ে পুরো জীবনটাই বদলে যাবে।”
তানভীর কোনো উত্তর দিল না।
কিন্তু কথাটা তার মনে গেঁথে গেল।
দুপুরে কামাল সাহেব তানভীরকে বললেন,
—“আগামী সপ্তাহে নতুন শাখার উদ্বোধন। তুমি পুরো দায়িত্ব নেবে।”
তানভীর বলল,
—“ঠিক আছে।”
রিভা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আমি ওর সঙ্গে থাকব।”
কামাল সাহেব হাসলেন।
—“আমি জানি। তোমরা দুজন একসঙ্গে থাকলে কাজটা ভালো হবে।”
রিভা আর তানভীর দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল।
কিন্তু ঠিক তখনই অফিসে আরমান এসে হাজির হলো।
সে সরাসরি কামাল সাহেবের কেবিনে ঢুকে বলল,
—“আঙ্কেল, কেমন আছেন?”
কামাল সাহেব তাকে দেখে খুশি হলেন।
—“আরমান! এসো বাবা। অনেক দিন পর।”
রিভা দূর থেকে আরমানকে দেখে একটু অস্বস্তিতে পড়ল।
তানভীরও তাকে লক্ষ্য করল।
কামাল সাহেব বললেন,
—“তুমি তো তানভীরকে চেনো না। এই তানভীর।”
আরমান তানভীরের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়াল।
—“হাই।”
তানভীর হাত মিলিয়ে বলল,
—“আসসালামু আলাইকুম।”
আরমান একটু থেমে বলল,
—“ওয়ালাইকুম সালাম।”
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
কথা খুব সাধারণ হলেও পরিবেশের মধ্যে একটা অদৃশ্য উত্তেজনা তৈরি হলো।
রিভা সেটা বুঝতে পারছিল।
সে দ্রুত বলল,
—“আরমান, তুমি আমার সঙ্গে একটু আসবে?”
আরমান মাথা নাড়ল।
দুজন বাইরে চলে গেল।
তানভীর দূর থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে পুরোনো অস্বস্তিটা আবার ফিরে এল।
অফিসের বাইরে এসে রিভা বলল,
—“তুমি এখানে কেন এসেছ?”
আরমান বলল,
—“তোমার সঙ্গে কথা বলতে।”
—“কী কথা?”
—“তোমাকে নিয়ে।”
রিভা গম্ভীর হয়ে গেল।
—“আরমান, আমি আগেই বলেছি—”
—“আমি জানি। কিন্তু তুমি কি সত্যিই ওই ছেলেটাকে পছন্দ করো?”
রিভা চুপ করে গেল।
আরমান বলল,
—“চুপ করে আছ মানে উত্তরটা হ্যাঁ?”
রিভা শান্ত গলায় বলল,
—“আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে তোমার প্রশ্ন করার অধিকার নেই।”
—“আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”
—“কিন্তু আমি তো তোমাকে সেইভাবে কখনো চাইনি।”
আরমানের মুখটা শক্ত হয়ে গেল।
—“তাহলে আমাকে একটা সুযোগও দেবে না?”
—“না।”
রিভা আর দাঁড়াল না।
সে অফিসে ফিরে গেল।
কিন্তু দরজার কাছে এসে দেখল তানভীর দাঁড়িয়ে আছে।
রিভা বুঝতে পারল না, সে কতটা কথা শুনেছে।
—“আপনি এখানে?”
তানভীর বলল,
—“এমনিই।”
রিভা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, কিছু একটা হয়েছে।
—“আপনি আবার ভুল বুঝছেন?”
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—“না।”
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
রিভা কিছু বলতে যাচ্ছিল।
তানভীর বলল,
—“আপনার সঙ্গে একটা কথা আছে।”
—“বলুন।”
—“আজ অফিস শেষে একটু সময় দেবেন?”
রিভার চোখে কৌতূহল।
—“কেন?”
—“একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলব।”
সন্ধ্যায় অফিস ফাঁকা হওয়ার পর তানভীর রিভাকে ছাদের ওপর নিয়ে গেল।
শহরের আলো চারপাশে জ্বলছে।
দূরে গাড়ির শব্দ।
রিভা বলল,
—“কী কথা বলবেন?”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“আমি অনেক দিন ধরে একটা কথা বলতে চাইছি।”
রিভার বুক ধকধক করতে লাগল।
—“কী কথা?”
তানভীর ধীরে বলল,
—“আপনি আমার কাছে...”
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
তানভীর বিরক্ত হয়ে ফোনের দিকে তাকাল।
বাবার ফোন।
সে ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে হাবিবুর রহমানের কণ্ঠ শোনা গেল,
—“বাবা, কেমন আছিস?”
তানভীর বলল,
—“ভালো আছি।”
কিছুক্ষণ কথা বলার পর বাবার কণ্ঠে উদ্বেগ শোনা গেল।
—“তুই কি আমাদের কথা ভুলে যাচ্ছিস?”
তানভীর অবাক।
—“এমন বলছ কেন?”
—“কামাল সাহেবের মেয়ে রিভার সঙ্গে তোর নাকি বেশ ভালো সম্পর্ক হয়েছে?”
তানভীর চুপ হয়ে গেল।
—“বাবা, কে বলেছে?”
—“মানুষজন বলাবলি করছে। আমি শুধু চাই না তুই এমন কোনো সিদ্ধান্ত নে, যেটা পরে তোকে কষ্ট দেবে।”
তানভীর কিছু বলল না।
ফোন কেটে দেওয়ার পর রিভা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আপনার বাবা কী বললেন?”
তানভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“আমাদের সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা করছেন।”
রিভা ধীরে বলল,
—“আমাদের সম্পর্ক?”
তানভীর তার দিকে তাকাল।
—“হ্যাঁ।”
রিভার চোখে তখন এক ধরনের আশা।
—“তাহলে আপনি কী বললেন?”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আমি এখনো কিছু বলিনি।”
রিভার মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।
—“কেন?”
তানভীর ধীরে বলল,
—“কারণ আমি নিশ্চিত নই।”
রিভা অবাক।
—“কিসে?”
—“আপনি সত্যিই আমাকে চান কি না।”
রিভা কিছু বলতে পারল না।
তানভীর আবার বলল,
—“আমি আপনাকে পছন্দ করি। অনেক বেশি। কিন্তু শুধু পছন্দ করলেই তো সব হয় না।”
রিভার চোখে জল চলে এল।
—“আপনি কখনো আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন আমি কী চাই?”
তানভীর চুপ।
রিভা ধীরে বলল,
—“না।”
তারপর সে চলে যেতে উদ্যত হলো।
তানভীর তার হাত বাড়িয়ে থামাতে চেয়েও থেমে গেল।
রিভা নিচে চলে গেল।
সেদিন রাতে তানভীর অনেকক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে রইল।
সে বুঝতে পারছিল, সে নিজের ভয়ের কাছে হেরে যাচ্ছে।
রিভাকে সে ভালোবেসে ফেলেছে—এটা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু সে ভয় পাচ্ছে।
রিভার পরিবার কি তাকে মেনে নেবে?
কামাল সাহেব কি তাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন?
আর তার নিজের বাবা?
অন্যদিকে রিভা ঘরে ফিরে ডায়েরিটা খুলে বসে রইল।
যেটা তানভীর তাকে জন্মদিনে দিয়েছিল।
একটা খালি পাতায় সে লিখল—
“কখনো কখনো মানুষ খুব কাছে থেকেও মনের কথাটা বলতে পারে না। অথচ একটা কথাই সবকিছু বদলে দিতে পারে।”
তারপর কলম থামিয়ে দিল।
ঠিক তখনই ফোনে একটি মেসেজ এল।
তানভীর।
“আগামীকাল আমার সঙ্গে একটু সময় কাটাবেন? কিছু কথা শেষ করতে চাই।”
রিভা মেসেজটা পড়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর উত্তর দিল,
“ঠিক আছে।”
পরদিন সকালটা তানভীরের কাছে অন্যরকম লাগছিল।
রাতে খুব একটা ঘুম হয়নি।
বারবার মনে হয়েছে, আজ তাকে রিভার সঙ্গে পরিষ্কার করে কথা বলতে হবে।
আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি নয়।
আর কোনো দ্বিধা নয়।
কিন্তু একটা ভয় বারবার তাকে থামিয়ে দিচ্ছিল।
যদি রিভা তাকে প্রত্যাখ্যান করে?
যদি সে শুধু বন্ধুর মতোই দেখে?
তাহলে এতদিনের সুন্দর সম্পর্কটাও কি নষ্ট হয়ে যাবে?
তবু আজ সে পিছিয়ে যেতে চায় না।
সকাল দশটার দিকে রিভা অফিসে এসে দেখল তানভীর তার জন্য অপেক্ষা করছে।
তানভীর বলল,
—“চলুন।”
—“কোথায়?”
—“আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।”
রিভা মৃদু হেসে বলল,
—“আবার রহস্য?”
—“আজ রহস্য না।”
—“তাহলে?”
—“আজ কিছু কথা বলব।”
রিভার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
—“ঠিক আছে।”
দুজন গাড়িতে উঠল।
গাড়ি শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে পুরোনো ঢাকার দিকে এগোতে লাগল।
রিভা অবাক হয়ে বলল,
—“এদিকে কেন?”
তানভীর বলল,
—“আমার একটা পছন্দের জায়গা আছে।”
কিছুক্ষণ পর তারা বুড়িগঙ্গার পাড়ের কাছে এসে থামল।
তানভীর বলল,
—“ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে এখানে এসেছিলাম। তখন ঢাকায় আসা আমার কাছে খুব বড় ব্যাপার ছিল।”
রিভা চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—“আপনার এত পছন্দের জায়গা এটা?”
—“হ্যাঁ।”
—“কেন আমাকে এখানে আনলেন?”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“কারণ আপনার সঙ্গে এমন একটা জায়গায় কথা বলতে চেয়েছিলাম, যেখানে আমার জীবনের অনেক পুরোনো স্মৃতি আছে।”
রিভা আর কিছু বলল না।
দুজন নদীর ধারে হাঁটতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর তানভীর থেমে গেল।
—“রিভা।”
রিভা তার দিকে তাকাল।
—“হুম?”
তানভীর বলল,
—“আমি জানি না কীভাবে কথাটা শুরু করব।”
রিভা মৃদু হেসে বলল,
—“আপনি তো অনেক কথা বলতে পারেন। আজ এত ভাবছেন কেন?”
তানভীরও হাসল।
—“কারণ আজকের কথাটা অন্যরকম।”
রিভার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
তানভীর ধীরে বলল,
—“আপনার সঙ্গে প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল, সেদিন আপনাকে আমার একদম ভালো লাগেনি।”
রিভা হেসে বলল,
—“আমারও আপনাকে ভালো লাগেনি।”
—“জানি।”
—“তাহলে?”
—“তারপর ধীরে ধীরে সব বদলে গেল।”
রিভা চুপ করে শুনছিল।
—“আপনার সঙ্গে ঝগড়া করা, আপনার সঙ্গে কাজ করা, আপনার রাগ দেখা, আপনার হাসি দেখা—সবকিছুই কখন যেন আমার দিনের একটা অংশ হয়ে গেল।”
রিভার চোখ নরম হয়ে এল।
তানভীর বলল,
—“একদিন বুঝলাম, আপনি অফিসে না থাকলে আমার দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে।”
রিভা কিছু বলতে পারল না।
—“আপনি অন্য কারও সঙ্গে কথা বললে আমার ভালো লাগে না। আপনি দূরে গেলে অস্থির লাগে। আর যখন ভাবলাম আপনার জীবনে অন্য কেউ আছে, তখন বুঝলাম...”
তানভীর থেমে গেল।
রিভা ধীরে বলল,
—“কী বুঝলেন?”
তানভীর তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।”
রিভা চোখ নামিয়ে ফেলল।
কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা নেই।
তারপর তার চোখে পানি জমে উঠল।
তানভীর অস্থির হয়ে বলল,
—“আপনি কিছু বলছেন না কেন?”
রিভা মৃদু হেসে চোখের পানি মুছে বলল,
—“কারণ আমি ভয় পাচ্ছিলাম, আপনি হয়তো কখনো এই কথাটা বলবেন না।”
তানভীর অবাক।
—“মানে?”
রিভা ধীরে বলল,
—“আমি অনেক আগেই বুঝেছিলাম, আপনি আমার কাছে শুধু একজন সহকর্মী নন।”
তানভীরের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—“তাহলে?”
রিভা মৃদু গলায় বলল,
—“আমিও আপনাকে ভালোবাসি।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তাদের মধ্যে কোনো বড় প্রতিশ্রুতি ছিল না।
কোনো নাটকীয় মুহূর্তও নয়।
শুধু দুজন মানুষ প্রথমবার নিজেদের সত্যিকারের অনুভূতিটা স্বীকার করেছিল।
ফেরার পথে দুজনের মধ্যে অদ্ভুত আনন্দ।
রিভা জানালার বাইরে তাকিয়ে হাসছিল।
তানভীর বলল,
—“আজ এত চুপ কেন?”
—“ভালো লাগছে।”
—“কী?”
রিভা তাকিয়ে বলল,
—“অনেক দিন ধরে যে কথাটা শুনতে চেয়েছিলাম, আজ শুনেছি।”
তানভীর মুচকি হেসে বলল,
—“আমি তো ভাবছিলাম আপনি আমাকে ফিরিয়ে দেবেন।”
—“আর আমি ভাবছিলাম আপনি কোনোদিন বলবেনই না।”
দুজনেই হেসে ফেলল।
কিন্তু এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরতেই রিভা দেখল, বসার ঘরে আরমানের পরিবার বসে আছে।
তার বাবা-মা দুজনেই উপস্থিত।
রিভা থেমে গেল।
কামাল সাহেব তাকে দেখে বললেন,
—“রিভা, এদিকে এসো।”
রিভা ধীরে এগিয়ে গেল।
আরমানের মা হাসিমুখে বললেন,
—“মা, তোমার সঙ্গে একটা কথা বলতে এসেছি।”
রিভা বুঝতে পারল, বিষয়টা কী।
সে শান্ত গলায় বলল,
—“কী কথা?”
কামাল সাহেব বললেন,
—“ওরা চায়, তোমাদের সম্পর্কটা আনুষ্ঠানিকভাবে ঠিক করা হোক।”
রিভার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—“বাবা, আমি তো বলেছি—”
কামাল সাহেব হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।
—“আমি জানি। তাই তোমাকে কোনো সিদ্ধান্তে বাধ্য করছি না।”
আরমান তখন চুপচাপ বসে ছিল।
সে রিভার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমি শুধু একটা সুযোগ চেয়েছিলাম।”
রিভা শান্তভাবে বলল,
—“আরমান, আমি তোমাকে সম্মান করি। কিন্তু তোমাকে সেইভাবে কখনো ভাবিনি।”
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
আরমানের বাবা বললেন,
—“তাহলে কি তোমার জীবনে অন্য কেউ আছে?”
রিভা এবার চুপ হয়ে গেল।
কামাল সাহেব মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, উত্তরটা হ্যাঁ।
তিনি ধীরে বললেন,
—“কে?”
রিভা বাবার চোখের দিকে তাকাল।
তারপর সাহস করে বলল,
—“তানভীর।”
কামাল সাহেব কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন।
আরমানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—“ওই ছেলে?”
রিভা বলল,
—“হ্যাঁ।”
আরমান উঠে দাঁড়াল।
—“তুমি জানো, ও তোমার পরিবারের জন্য কী?”
রিভা শান্ত গলায় বলল,
—“আমি জানি ও কোথা থেকে এসেছে। আর আমি ওকে মানুষ হিসেবে পছন্দ করি।”
আরমান কিছু বলতে যাচ্ছিল।
কামাল সাহেব এবার কঠিন গলায় বললেন,
—“এখন কেউ কোনো কথা বলবে না।”
সবাই চুপ হয়ে গেল।
সেদিন রাতেই কামাল সাহেব তানভীরকে ফোন করলেন।
—“তানভীর, কাল সকালে আমার সঙ্গে দেখা করো।”
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
—“জি, চাচা।”
—“একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
ফোন কেটে গেল।
তানভীরের মনে অজানা আশঙ্কা তৈরি হলো।
রিভা তাকে ফোন করে বলল,
—“বাবা তোমাকে ডাকছেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“ভয় পেয়ো না।”
—“তুমি কি জানো কী বলবেন?”
—“হয়তো জানি।”
—“কী?”
রিভা ধীরে বলল,
—“আমাদের ব্যাপারে।”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“যাই হোক, এবার আমি পিছিয়ে যাব না।”
রিভার মুখে হাসি ফুটল।
—“আমিও না।”
পরদিন সকালে তানভীর কামাল সাহেবের সামনে বসে ছিল।
কামাল সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন,
—“রিভা তোমাকে পছন্দ করে। এটা আমি বুঝেছি।”
তানভীর মাথা নিচু করল।
—“জি।”
—“কিন্তু আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করব।”
তানভীর তাকাল।
—“তুমি কি শুধু রিভাকে পছন্দ করো, নাকি তার দায়িত্বও নিতে পারবে?”
তানভীর এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
—“আমি তার পাশে থাকতে চাই। আর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান দিয়ে জীবন কাটাতে চাই।”
কামাল সাহেব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“তাহলে তোমাকে একটা সুযোগ দেব।”
তানভীর অবাক হয়ে গেল।
—“কী সুযোগ?”
কামাল সাহেব বললেন,
—“আমার নতুন শাখার পুরো দায়িত্ব তুমি নেবে। নিজের যোগ্যতায় সেটা দাঁড় করাতে পারলে, আমাদের সম্পর্ক নিয়ে আমি আর আপত্তি করব না।”
তানভীরের চোখে দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
—“আমি রাজি।”
কামাল সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
—“তাহলে প্রমাণ করো, তুমি শুধু রিভাকে ভালোবাসো না—তার ভবিষ্যতের জন্য লড়তেও পারো।”
কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ কথাগুলো শুনে ফেলেছিল।
আরমান।
তার চোখে তখন একটাই সিদ্ধান্ত—
তানভীরকে এই সম্পর্ক থেকে সরাতেই হবে।
কামাল সাহেবের দেওয়া দায়িত্বটা তানভীরের জন্য শুধু একটা ব্যবসায়িক সুযোগ ছিল না।
এটা ছিল নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ।
সবচেয়ে বড় কথা, রিভার বাবার সামনে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ।
পরদিন থেকেই তানভীর নতুন শাখার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিস, হিসাব, কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা, নতুন জায়গা পরিদর্শন—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।
রিভা দূর থেকে সব দেখছিল।
একদিন রাতে সে তানভীরকে ফোন করল।
—“এখনো অফিসে?”
—“হ্যাঁ।”
—“কতক্ষণ থাকবে?”
—“জানি না। কাজ শেষ হয়নি।”
রিভা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“নিজের যত্ন নেবেন।”
তানভীর হেসে বলল,
—“আপনি চিন্তা করছেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে আমার কাজের অর্ধেক চাপ কমে গেল।”
রিভা হেসে বলল,
—“বেশি কথা বলবেন না।”
—“ঠিক আছে।”
ফোন কেটে দেওয়ার পর তানভীরের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু তানভীর জানত না, তার বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে একটা পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে।
আরমান তার বাবার পরিচিত কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করল।
তার উদ্দেশ্য ছিল, তানভীর যে নতুন শাখার দায়িত্ব পেয়েছে, সেখানে যেন বড় কোনো সমস্যা তৈরি হয়।
কয়েকদিন পরই প্রথম সমস্যা দেখা দিল।
নতুন শাখার জন্য আনা কিছু পণ্যের হিসাব মিলছে না।
তানভীর কাগজপত্র দেখে অবাক হয়ে গেল।
—“এই চালানটা তো আমরা অনুমোদনই করিনি।”
একজন কর্মী বলল,
—“স্যার, কাগজে আপনার অনুমোদনের সই আছে।”
তানভীর কাগজটা হাতে নিয়ে দেখল।
সইটা তার নিজের মতোই।
কিন্তু সে জানে, এই সই তার নয়।
সে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“সব কাগজ আলাদা করে রাখুন। কাউকে কিছু বলবেন না।”
কর্মী মাথা নাড়ল।
তানভীর বুঝতে পারল, কেউ তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।
সেদিন সন্ধ্যায় রিভা অফিসে এসে তানভীরের মুখ দেখে বুঝল কিছু একটা হয়েছে।
—“কী হয়েছে?”
তানভীর বলল,
—“একটা সমস্যা হয়েছে।”
সবকিছু শুনে রিভা বলল,
—“তুমি কি নিশ্চিত?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে আমরা খুঁজে বের করব কে করেছে।”
তানভীর বলল,
—“তুমি জড়িও না।”
রিভা বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আমি তোমার পাশে আছি। এখন আমাকে দূরে রাখতে চাচ্ছ?”
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—“না। শুধু চাই না তোমার কোনো সমস্যা হোক।”
রিভা বলল,
—“তোমার সমস্যা হলে সেটা আমারও সমস্যা।”
তানভীর কিছু বলল না।
রিভা তার হাতের ওপর হাত রেখে বলল,
—“একসঙ্গে থাকলে সমস্যাগুলোও সহজ লাগে।”
তানভীর তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
দুদিন পর সমস্যাটা আরও বড় হয়ে গেল।
কামাল সাহেবের কাছে অভিযোগ গেল, তানভীর নাকি কোম্পানির টাকা অন্য কাজে ব্যবহার করেছে।
কামাল সাহেব তানভীরকে নিজের কেবিনে ডাকলেন।
—“তানভীর, তুমি কি এই টাকাটা নিয়েছ?”
তানভীর দৃঢ় গলায় বলল,
—“না, চাচা।”
—“তাহলে কাগজে তোমার অনুমোদন কেন?”
—“সইটা জাল করা হয়েছে।”
কামাল সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—“তুমি কি প্রমাণ করতে পারবে?”
—“চেষ্টা করব।”
—“তোমার হাতে বেশি সময় নেই।”
তানভীর মাথা নাড়ল।
—“আমি সত্যিটা বের করব।”
কেবিন থেকে বেরিয়ে সে দেখল রিভা দাঁড়িয়ে আছে।
রিভা তার মুখ দেখে বলল,
—“বাবা কী বলেছে?”
—“আমাকে প্রমাণ করতে হবে আমি নির্দোষ।”
রিভা দৃঢ়ভাবে বলল,
—“তাহলে আমরা সেটা করব।”
তারা দুজন মিলে কাগজপত্র পরীক্ষা করতে শুরু করল।
প্রথমে কিছুই পাওয়া গেল না।
তারপর রিভা একটা বিষয় লক্ষ্য করল।
—“এই চালানের তারিখটা দেখো।”
তানভীর বলল,
—“কী হয়েছে?”
—“এই তারিখে তুমি তো ঢাকার বাইরে ছিলে।”
তানভীর থমকে গেল।
—“ঠিক।”
রিভা বলল,
—“তাহলে তোমার অনুমোদনের সই কীভাবে হলো?”
তানভীরের চোখে আশার আলো ফুটল।
—“এটাই প্রমাণ করতে হবে।”
তারা অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে গেল।
কিন্তু সমস্যাটা আরও বড়।
ওই দিনের ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে।
তানভীর হতাশ হয়ে চেয়ারে বসে পড়ল।
রিভা বলল,
—“হাল ছেড়ো না।”
—“সবকিছু যেন আমার বিপক্ষে যাচ্ছে।”
—“আমি আছি।”
তানভীর তার দিকে তাকাল।
—“তুমি না থাকলে হয়তো সত্যিই ভেঙে পড়তাম।”
রিভা মৃদু হেসে বলল,
—“তাহলে আমাকে কোথাও যেতে দিও না।”
তানভীর তার হাতটা ধরে বলল,
—“কখনো না।”
এদিকে আরমান দূর থেকে সবকিছু দেখছিল।
সে ভেবেছিল, তানভীর সমস্যায় পড়লে রিভা তার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে।
কিন্তু উল্টো রিভা আরও শক্তভাবে তানভীরের পাশে দাঁড়িয়েছে।
আরমান বুঝতে পারল, এভাবে তানভীরকে সরানো সম্ভব হবে না।
তাই সে আরও বড় একটা চাল দিল।
কামাল সাহেবের কাছে একটি নথি পাঠানো হলো, যেখানে দেখা যাচ্ছে তানভীর নাকি আগেও একটি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম করেছিল।
কামাল সাহেব নথিটা দেখে হতবাক।
তিনি তানভীরকে ডাকলেন।
—“এটা কী?”
তানভীর কাগজটা দেখে বলল,
—“এটা মিথ্যা।”
—“তুমি নিশ্চিত?”
—“একশ ভাগ।”
রিভা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে বলল,
—“বাবা, তানভীর এমন কিছু করতে পারে না।”
কামাল সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন,
—“রিভা, আমি তোমার আবেগ বুঝি। কিন্তু ব্যবসায় প্রমাণ ছাড়া কাউকে নির্দোষ বলা যায় না।”
রিভার চোখ ভিজে উঠল।
তানভীর শান্ত গলায় বলল,
—“চাচা, আমাকে একটু সময় দিন।”
কামাল সাহেব বললেন,
—“তোমাকে তিন দিন সময় দিলাম।”
তানভীর মাথা নাড়ল।
সেই রাতেই তানভীর তার পুরোনো এক বন্ধুকে ফোন করল।
—“রাকিব, আমার একটা সাহায্য দরকার।”
—“বল।”
—“আমি যে প্রতিষ্ঠানে আগে কাজ করতাম, সেখানকার পুরোনো নথি দরকার।”
রাকিব বলল,
—“আমি কালই খোঁজ নিচ্ছি।”
পরদিন সকালে রাকিব কিছু কাগজ নিয়ে এল।
তানভীর সেগুলো খুলে দেখল।
তারপর হঠাৎ থেমে গেল।
একটি পুরোনো নথিতে যে স্বাক্ষর ছিল, সেটার সঙ্গে বর্তমান জাল নথির স্বাক্ষরের মিল রয়েছে।
তানভীর বলল,
—“এই মানুষটাকে আমি চিনি।”
রাকিব বলল,
—“কে?”
তানভীর নামটা বলল।
রাকিব অবাক হয়ে গেল।
—“সে তো আরমানের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করে!”
তানভীরের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
এবার সবকিছু পরিষ্কার হতে শুরু করল।
সে সঙ্গে সঙ্গে রিভাকে ফোন করল।
—“রিভা, আমি কিছু খুঁজে পেয়েছি।”
—“কী?”
—“আমার মনে হয় কে এসব করছে, সেটা জানি।”
—“কে?”
তানভীর একটু থেমে বলল,
—“আরমানের লোকজন।”
রিভা স্তব্ধ।
—“তুমি নিশ্চিত?”
—“প্রমাণ পুরোপুরি পাইনি। কিন্তু সূত্র আছে।”
রিভা বলল,
—“তাহলে সাবধানে থেকো।”
—“তুমিও।”
পরদিন তানভীর সব প্রমাণ নিয়ে কামাল সাহেবের সামনে হাজির হলো।
নথি, পুরোনো স্বাক্ষর, কর্মচারীর তথ্য—সব একসঙ্গে সাজিয়ে সে বলল,
—“চাচা, আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা হয়েছে।”
কামাল সাহেব সবকিছু মন দিয়ে দেখলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
—“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।”
তানভীর অবাক হয়ে তাকাল।
—“চাচা?”
—“তুমি যদি সত্যিই দোষী হতে, এতটা লড়াই করতে না।”
কামাল সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে তানভীরের কাঁধে হাত রাখলেন।
—“তুমি পরীক্ষায় পাস করেছ।”
তানভীরের চোখ ভিজে উঠল।
—“তাহলে...?”
কামাল সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
—“রিভাকে তোমার সঙ্গে জীবন কাটাতে দিতে আমার আপত্তি নেই।”
ঠিক তখন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রিভা সব শুনে ফেলল।
তার চোখে আনন্দের পানি।
তানভীর বাইরে বেরিয়ে এসে তাকে দেখে থেমে গেল।
রিভা হাসতে হাসতে বলল,
—“তুমি পেরেছ।”
তানভীর বলল,
—“আমরা পেরেছি।”
দুজনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু গল্পের শেষ তখনও হয়নি।
কারণ আরমান শেষবারের মতো তানভীরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—“তুমি ভাবছ সব শেষ? আসল পরীক্ষা এখনো বাকি।”
তানভীর শান্তভাবে উত্তর দিল,
—“যতবার আসবে, ততবার সত্যিটা জিতবে।”
আরমান কিছু না বলে চলে গেল।
তানভীর রিভার দিকে তাকাল।
রিভা তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
—“এবার আর কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—“আমি শুধু চাই, তুমি আমার পাশে থেকো।”
রিভা বলল,
—“সবসময়।”
আরমানের শেষ কথাটা তানভীরের মনে কিছুটা দুশ্চিন্তা তৈরি করেছিল।
তবে এবার সে আর ভয় পাচ্ছিল না।
কারণ একদিকে ছিল রিভার ভালোবাসা, অন্যদিকে কামাল সাহেবের বিশ্বাস।
সবচেয়ে বড় কথা, এতদিনের ভুল বোঝাবুঝি আর পরীক্ষার পর তারা দুজন অবশেষে নিজেদের অনুভূতিটা স্বীকার করেছে।
তবু তানভীর জানত, সম্পর্ক শুধু ভালোবাসায় টিকে থাকে না। দায়িত্বও নিতে হয়।
তাই নতুন শাখার কাজ শেষ করার পর সে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে শুরু করল।
কয়েক সপ্তাহ পর নতুন শাখার উদ্বোধনের দিন চলে এল।
সকাল থেকেই সবাই ব্যস্ত।
কামাল সাহেব নিজে উপস্থিত ছিলেন।
রিভাও পুরো আয়োজনের দায়িত্ব নিয়েছিল।
তানভীর শেষবারের মতো সবকিছু পরীক্ষা করে দেখছিল।
কামাল সাহেব তার কাছে এসে বললেন,
—“তানভীর।”
—“জি, চাচা?”
—“আজ থেকে এই শাখার পুরো দায়িত্ব তোমার।”
তানভীর কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
—“পুরোপুরি?”
—“হ্যাঁ। তুমি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছ।”
তানভীর মাথা নিচু করে বলল,
—“আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখার চেষ্টা করব।”
কামাল সাহেব হাসলেন।
—“আমি জানি।”
দূর থেকে রিভা সব দেখছিল।
তানভীর তার দিকে তাকাতেই রিভা হাতের ইশারায় অভিনন্দন জানাল।
তানভীরও হাসল।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যায় সবাই যখন বাড়িতে ফিরল, কামাল সাহেব পরিবারের সবাইকে বসার ঘরে ডাকলেন।
রিভা বুঝতে পারল, আজ গুরুত্বপূর্ণ কিছু হতে যাচ্ছে।
কামাল সাহেব বললেন,
—“আজ একটা সিদ্ধান্ত নিতে চাই।”
রিভা চুপ করে বসে রইল।
তানভীরও সেখানে ছিল।
কামাল সাহেব তানভীরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তানভীর, তুমি জানো আমি তোমার পরিবারকে অনেক বছর ধরে চিনি।”
—“জি।”
—“তোমাকে প্রথম যখন দেখেছিলাম, তখন তুমি শুধু আমার বন্ধুর ছেলে ছিলে। আজ তুমি আমার নিজের ছেলের মতো।”
তানভীরের চোখে আবেগ ফুটে উঠল।
কামাল সাহেব এবার রিভার দিকে তাকালেন।
—“আর রিভা তোমাকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে।”
রিভা মাথা নিচু করল।
—“আমি চাই তোমরা দুজন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে এগিয়ে যাও।”
তানভীর কিছু বলতে পারল না।
রিভা বাবার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
—“ধন্যবাদ বাবা।”
কামাল সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—“তুমি সুখী থাকলেই আমি খুশি।”
ঠিক তখনই দরজায় তানভীরের বাবা হাবিবুর রহমান এসে দাঁড়ালেন।
তানভীর অবাক হয়ে উঠল।
—“বাবা!”
হাবিবুর রহমান হাসলেন।
—“চমকে গেলি?”
—“আপনি এখানে?”
কামাল সাহেব এগিয়ে গিয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরলেন।
—“তুই না এলে কি এই দিনটা পূর্ণ হতো?”
দুজন পুরোনো বন্ধু হাসতে লাগলেন।
হাবিবুর রহমান তানভীরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তুই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছিস। আমি শুধু চাই, তুই যাকে বেছে নিয়েছিস তাকে সম্মান করিস।”
তানভীর বলল,
—“আমি চেষ্টা করব বাবা।”
রিভা এগিয়ে এসে সালাম করল।
হাবিবুর রহমান তাকে আশীর্বাদ করে বললেন,
—“ভালো থেকো মা।”
রিভার চোখে পানি এসে গেল।
কয়েক দিন পর দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ের দিন ঠিক হলো।
বাড়িতে আবার ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল।
রিভার বান্ধবী মায়া তাকে নিয়ে মজা করতে লাগল।
—“কী রে, যে ছেলেটাকে প্রথম দিন দেখেই বিরক্তিকর বলেছিলি, তাকেই এখন বিয়ে করতে যাচ্ছিস?”
রিভা হেসে বলল,
—“আমি তখন জানতাম না, বিরক্তিকর মানুষটাই একদিন এত আপন হয়ে যাবে।”
মায়া বলল,
—“আর তোর সেই বিখ্যাত ঝগড়া?”
রিভা বলল,
—“সেটাও থাকবে।”
—“বিয়ের পরও?”
—“অবশ্যই।”
দুজনেই হেসে ফেলল।
অন্যদিকে তানভীর আর রাকিব একসঙ্গে বসেছিল।
রাকিব বলল,
—“তোর কথা মনে আছে? প্রথম দিন বলেছিলি, মেয়েটাকে তোর একদম ভালো লাগে না।”
তানভীর হেসে বলল,
—“মানুষ নিজের মনকেও সব সময় চিনতে পারে না।”
—“এখন?”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“এখন মনে হয়, ওকে ছাড়া আমার জীবনটা কল্পনা করতে পারি না।”
রাকিব হেসে বলল,
—“শেষ পর্যন্ত মজনু হয়ে গেলি!”
তানভীরও হেসে ফেলল।
বিয়ের দিন এসে গেল।
পুরো বাড়ি আলোয় সাজানো।
চারপাশে আত্মীয়স্বজনের ভিড়।
তানভীর পরেছিল পাঞ্জাবি।
রিভা পরেছিল সুন্দর শাড়ি।
দুজনের চোখে-মুখে ছিল এক ধরনের শান্তি।
যে সম্পর্কটা শুরু হয়েছিল ঝগড়া দিয়ে, সেটা আজ পরিবার আর সবার সম্মতিতে নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর একসময় দুজন পাশাপাশি বসে রইল।
রিভা মৃদু হেসে বলল,
—“মনে আছে, প্রথম দিন তোমাকে দেখেই আমার কী মনে হয়েছিল?”
তানভীর বলল,
—“মনে হয়েছিল আমি খুব বিরক্তিকর?”
—“হ্যাঁ।”
—“আর আমার মনে হয়েছিল তুমি ভীষণ রাগী।”
রিভা হেসে বলল,
—“আমি কি এখনো রাগী?”
তানভীর বলল,
—“অনেক।”
—“তাহলে বিয়ে করলে কেন?”
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—“কারণ তোমার রাগের আড়ালে যে মানুষটাকে দেখেছি, তাকে ছেড়ে থাকা সম্ভব ছিল না।”
রিভা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—“তুমিও কিন্তু কম জেদি নও।”
—“জানি।”
—“তবু তোমাকে পেয়েছি বলে ভালো লাগছে।”
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—“আমিও।”
কিছুদিন পর তাদের নতুন জীবন শুরু হলো।
তানভীর নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
রিভাও তার নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে ছোটখাটো ঝগড়া হয়।
কখনো তানভীর দেরি করে বাড়ি ফেরে।
রিভা রাগ করে।
কখনো রিভা কোনো কথা না বলে নিজের মতো কোথাও চলে যায়।
তানভীর বিরক্ত হয়।
কিন্তু দিনের শেষে দুজনেই বুঝতে পারে—
ঝগড়া তাদের দূরে সরায় না।
বরং একে অপরকে আরও ভালোভাবে বুঝতে শেখায়।
এক সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে রিভা বলল,
—“তানভীর?”
—“হুম?”
—“আমাদের গল্পটা যদি আবার শুরু করা যেত, তুমি কি প্রথম দিনের মতোই আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে?”
তানভীর হেসে বলল,
—“অবশ্যই।”
রিভা অবাক হয়ে বলল,
—“কেন?”
তানভীর বলল,
—“কারণ সেই ঝগড়া না হলে হয়তো তোমাকে চিনতেই পারতাম না।”
রিভা মৃদু হেসে বলল,
—“তাহলে আমাদের গল্পের শুরুটা ছিল ঝগড়া দিয়ে।”
—“আর শেষ?”
রিভা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“শেষ নয়।”
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—“ঠিক বলেছ।”
....