বন্ধুত্ব যখন বদলে গেল

ঢাকার ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে, গাজীপুরের কালিয়াকৈরের এক শান্ত এলাকায় পাশাপাশি দুটি বাড়ি। বাড়ি দুটির মানুষ শুধু প্রতিবেশী নয়, পারিবারিকভাবেও খুব কাছের। এক বাড়ির ছেলে অর্ণব, অন্য বাড়ির মেয়ে মেঘা।

ছোটবেলা থেকেই দুজনের বন্ধুত্ব।

তবে তাদের বন্ধুত্বটা ছিল অন্যরকম।

মেঘার কোনো সমস্যা হলে সবার আগে সে অর্ণবকে খুঁজত। আবার অর্ণবের জীবনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলে মেঘাকে না জানিয়ে সে কোনো সিদ্ধান্ত নিত না।

দুই পরিবারের সবাইও তাদের এই বন্ধুত্ব নিয়ে মজা করত।

সকাল সাড়ে আটটা।

মেঘা তখনও ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। নিচ থেকে অর্ণবের গলা শোনা গেল—

—মেঘা! আর কতক্ষণ?

মেঘা বারান্দা থেকে নিচে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,

—সকাল সকাল এত চিৎকার করছ কেন?

অর্ণব নিচে দাঁড়িয়ে হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

—চিৎকার করছি না। প্রায় বিশ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছি।

—তোমাকে তো অপেক্ষা করতে বলিনি।

—তুই বললে অপেক্ষা করব, না বললেও করব। এখন তাড়াতাড়ি নিচে আয়।

মেঘা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—দাঁড়াও। পাঁচ মিনিট।

অর্ণব হেসে বলল,

—তোর পাঁচ মিনিট মানে আধা ঘণ্টা।

—বেশি কথা বলো না।

মেঘা ভেতরে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর সে নিচে নেমে এল।

অর্ণব তার দিকে একটা কাগজের কাপ এগিয়ে দিল।

—নাও।

মেঘা অবাক হয়ে বলল,

—এটা কী?

—চা।

—আমি তো সকালে চা খাই না।

—জানি।

—তাহলে?

অর্ণব আরেকটা কাপ বের করে বলল,

—এটা তোর জন্য কফি।

মেঘা মুচকি হেসে কাপটা নিল।

—তুমি এত কিছু মনে রাখো কীভাবে?

অর্ণব স্বাভাবিক গলায় বলল,

—তুই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তোর পছন্দ-অপছন্দ মনে থাকবে না?

মেঘা হেসে বলল,

—তুমি না থাকলে আমার কী হতো বলো তো?

অর্ণব কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

মেঘা অবশ্য তার মুখের পরিবর্তন বুঝতে পারল না।

সে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

—চলো। আজ আমার ক্লাস আছে।

অর্ণবও গাড়িতে উঠে পড়ল।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

মেঘা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—আজ বিকেলে কিন্তু তোমার সঙ্গে কথা আছে।

—কী কথা?

—এখন বলব না।

—আবার রহস্য?

—হ্যাঁ।

অর্ণব হেসে বলল,

—ঠিক আছে। রহস্যই থাক।

কিন্তু সে জানত না, মেঘার সেই “কিছু কথা” তার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিতে চলেছে।

অর্ণব আর মেঘার পরিচয় আজকের নয়।

প্রায় পনেরো বছর আগে তাদের বন্ধুত্বের শুরু।

তখন দুজনের বয়স মাত্র আট বছর।

মেঘা ছিল ভীষণ চঞ্চল। আর অর্ণব ছিল শান্ত স্বভাবের। একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় মেঘা অর্ণবের নতুন কলমটা নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল।

অর্ণব পেছন পেছন ছুটতে ছুটতে বলেছিল,

—মেঘা! কলমটা দে!

মেঘা হাসতে হাসতে বলেছিল,

—দেব না।

—কেন?

—আমার ভালো লেগেছে।

—ওটা আমার।

—ছিল। এখন আমার।

শেষ পর্যন্ত মেঘা নিজেই এসে কলমটা ফিরিয়ে দিয়েছিল।

তারপর বলেছিল,

—আচ্ছা, একটা শর্তে দেব।

—কী?

—আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু।

অর্ণব তখন কিছু না বুঝেই মাথা নেড়ে রাজি হয়েছিল।

সেই ছোট্ট বন্ধুত্বই ধীরে ধীরে এত গভীর হয়ে উঠেছিল যে একসময় দুজনের জীবন একে অপরকে ছাড়া অসম্পূর্ণ মনে হতে লাগল।

তবে একটা বিষয় মেঘা জানত না।

অর্ণবের অনুভূতি অনেক আগেই বন্ধুত্বের সীমা পেরিয়ে গেছে।

মেঘা তার কাছে শুধু সবচেয়ে কাছের বন্ধু নয়।

সে অর্ণবের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।

কিন্তু অর্ণব কখনো নিজের মনের কথা বলেনি।

কারণ একটা ভয় তাকে সবসময় থামিয়ে দিয়েছে—

যদি মেঘা তাকে সেই চোখে না দেখে?

আর তার থেকেও বড় ভয়—

যদি সত্যিটা বলার পর তাদের এত বছরের বন্ধুত্বটাই নষ্ট হয়ে যায়?

তাই নিজের অনুভূতিগুলো বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে অর্ণব।

বিকেলে মেঘা ফোন করল।

—অর্ণব, কোথায়?

—বাসায়।

—আমাদের বাসায় আয়।

—কেন?

—আয়, তারপর বলব।

—কোনো সমস্যা হয়েছে?

—না।

—তাহলে এত রহস্য করছিস কেন?

—তুমি আসবে কি না?

অর্ণব হেসে বলল,

—আচ্ছা, আসছি।

কিছুক্ষণ পর অর্ণব মেঘাদের বাসায় পৌঁছাল।

দরজা খুললেন মেঘার মা শিরিন আক্তার।

—এসো বাবা, ভেতরে আসো।

অর্ণব সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বুঝল, বাসায় আজ অস্বাভাবিক ব্যস্ততা।

ড্রয়িংরুমে মেঘার বাবা হাবিবুর রহমান বসে আছেন। তার সঙ্গে আরও দু-একজন আত্মীয়।

অর্ণব বসতেই মেঘা এসে তার পাশে দাঁড়াল।

অর্ণব ফিসফিস করে বলল,

—কী হয়েছে?

মেঘা কিছু বলল না।

শিরিন আক্তার হাসিমুখে বললেন,

—অর্ণব, তোমাকে একটা সুখবর দেওয়ার জন্যই ডেকেছি।

অর্ণব মেঘার দিকে তাকাল।

—কী সুখবর?

মেঘার বাবা এবার বললেন,

—মেঘার জন্য একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছে।

অর্ণবের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল।

তবুও সে মুখে হাসি রাখল।

—তাই নাকি?

—হ্যাঁ। ছেলেটা ঢাকায় একটা ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। পরিবারও ভালো। আমরা খোঁজখবর নিয়েছি।

অর্ণবের চোখ চলে গেল মেঘার দিকে।

মেঘা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।

অর্ণব ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—তুই কী বলেছিস?

মেঘা নিচু গলায় বলল,

—আমি রাজি হয়েছি।

মুহূর্তের জন্য অর্ণবের মনে হলো, তার চারপাশের সবকিছু থেমে গেছে।

সে জানত একদিন মেঘার জীবনে অন্য কেউ আসবে।

কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সেই দিনটা চলে আসবে, সেটা ভাবেনি।

তবুও ঠোঁটে জোর করে হাসি এনে বলল,

—ভালোই তো।

মেঘা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই খুশি?

অর্ণব মাথা নাড়ল।

—অবশ্যই।

—সত্যি?

—হ্যাঁ। তোর জন্য আমি সবসময় ভালো কিছুই চাই।

মেঘার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।

—আমি জানতাম তুই খুশি হবি।

অর্ণবও হাসল।

কিন্তু তার ভেতরে তখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর মেঘা তাকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে গেল।

—অর্ণব।

—হুম?

—তুই কিন্তু আমার বিয়ের সব দায়িত্ব নিবি।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—আমি না থাকলে তোর বিয়েই হবে না।

মেঘা হাসল।

—সত্যি বলছি কিন্তু।

—ঠিক আছে। সব দায়িত্ব আমার।

—আর একটা কথা।

—কী?

—বিয়ের পরেও কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব আগের মতো থাকবে।

অর্ণবের মুখের হাসি একটু ম্লান হয়ে গেল।

সে ধীরে বলল,

—হয়তো।

মেঘা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—হয়তো কেন?

—না, কিছু না।

মেঘা তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—তুই আজকাল অদ্ভুত আচরণ করছিস।

অর্ণব হেসে বলল,

—আমি তো এমনই।

—না। আগে এমন ছিলি না।

অর্ণব কিছু বলল না।

মেঘা আবার বলল,

—তুই আমার পাশে থাকবি তো?

অর্ণব তার চোখের দিকে তাকাল।

তারপর ধীরে বলল,

—সবসময়।

মেঘা মুচকি হাসল।

—তাহলে আমার কোনো ভয় নেই।

মেঘা ভেতরে চলে গেল।

অর্ণব একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখের সামনে তখন শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—

“বিয়ের পরেও কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব আগের মতো থাকবে।”

অর্ণব জানত, বন্ধুত্ব হয়তো থাকবে।

কিন্তু তার নিজের অনুভূতিগুলো?

সেগুলো কীভাবে আগের মতো থাকবে?

সেদিন রাতে নিজের ঘরে একা বসে অর্ণবের ফোনে মেঘার একটা মেসেজ এল—

“তুই তো আমার পাশে থাকবি সবসময়, তাই না?”

অর্ণব অনেকক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর লিখল—

“হ্যাঁ, সবসময়।”

মেসেজ পাঠিয়ে সে ফোনটা পাশে রেখে দিল।

জানালার বাইরে তাকিয়ে তার মনে হলো—

মেঘাকে সে সারাজীবন পাশে রাখতে চেয়েছিল। অথচ এখন সেই মানুষটাকেই অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়ার জন্য তাকে নিজের হাতে সবকিছু গুছিয়ে দিতে হবে।

মেঘার বিয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না।

পরদিন সকাল থেকেই তাদের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। কেউ মেঘার জন্য শাড়ি নিয়ে আসছে, কেউ গয়না দেখছে, আবার কেউ বসে বিয়ের আয়োজন নিয়ে আলোচনা করছে।

আর এই পুরো ব্যস্ততার মাঝখানে সবচেয়ে বেশি ছুটে বেড়াচ্ছিল অর্ণব।

মেঘার বাবা হাবিবুর রহমান একসময় মজা করে বললেন,

—অর্ণব, তুই তো আমার নিজের ছেলের চেয়েও বেশি কাজ করছিস!

অর্ণব হেসে বলল,

—মেঘার বিয়ে। আমি কাজ না করলে কে করবে?

পাশ থেকে মেঘা বলল,

—এই জন্যই তো অর্ণবকে ছাড়া আমার কিছুই চলে না।

কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল।

অর্ণবও হাসল।

কিন্তু তার হাসিটা ছিল খুব স্বাভাবিক নয়।

মেঘা সেটা খেয়াল করল।

সেদিন দুপুরে সে অর্ণবকে ছাদে ডেকে বলল,

—কী হয়েছে তোমার?

অর্ণব অবাক হয়ে বলল,

—কী হয়েছে আবার?

—তুমি কেমন যেন চুপচাপ।

—বিয়ের বাড়িতে সবাই ব্যস্ত। আমিও ব্যস্ত।

—আগে তো তুই বিয়ের খবর শুনে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলি।

—এখনো খুশি।

মেঘা তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তাহলে চোখে মুখে এমন ভাব কেন?

অর্ণব হেসে বলল,

—তুই বেশি চিন্তা করিস।

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—ছেলেটাকে কবে দেখবি?

—তুই যার সঙ্গে বিয়ে করছিস, তাকে না দেখে কীভাবে থাকব?

—আগামীকাল আসবে।

—ভালো।

—তুই থাকবি?

অর্ণব একটু থেমে বলল,

—থাকব।

মেঘা মুচকি হাসল।

—তুই না থাকলে আমার সাহস হয় না।

অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে রইল।

এই একটা কথাই মেঘা বারবার বলে।

আর প্রতিবারই অর্ণবের মনে হয়, যদি সে জানত তার এই কথাগুলো অর্ণবের ভেতরে কী ঝড় তোলে!

পরদিন বিকেলে মেঘাদের বাড়িতে সাফওয়ান এল।

সাফওয়ান ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। শান্ত স্বভাবের, ভদ্র এবং কথাবার্তায় যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।

মেঘার পরিবারের সবাই তাকে পছন্দ করল।

অর্ণবও দূর থেকে সবকিছু দেখছিল।

সাফওয়ান একসময় নিজেই তার কাছে এসে হাত বাড়িয়ে বলল,

—আপনি অর্ণব, তাই তো?

অর্ণব হাত মেলাল।

—জি।

—মেঘার কাছ থেকে আপনার কথা অনেক শুনেছি।

অর্ণব হেসে বলল,

—ভালো কথা শুনেছেন, না খারাপ?

সাফওয়ান হেসে ফেলল।

—দুটোই শুনেছি মনে হয়।

অর্ণবও হাসল।

কিছুক্ষণ পর সাফওয়ান মেঘার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোমার বন্ধু কিন্তু বেশ মজার।

মেঘা হেসে বলল,

—ওকে বুঝতে হলে অনেক বছর লাগবে।

অর্ণব কথাটা শুনে মেঘার দিকে তাকাল।

এই একই কথা সে আগেও শুনেছে।

“তোকে বুঝতে আমার পুরো জীবন লেগে যাবে।”

আজ সেই কথাটা অন্যরকম লাগল।

সাফওয়ান চলে যাওয়ার পর মেঘা অর্ণবের পাশে এসে দাঁড়াল।

—কী মনে হলো?

—কীসের?

—সাফওয়ানকে।

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—ভালো ছেলে মনে হলো।

মেঘা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

—তাই তো?

—হুম।

—তাহলে আমার জন্য চিন্তা নেই?

অর্ণব জোর করে হাসল।

—না।

মেঘা খুশি হয়ে বলল,

—আমি জানতাম তুই এমনই বলবি।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—তুই খুশি থাকলেই আমি খুশি।

কথাটা শুনে মেঘা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তুই সত্যিই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।

অর্ণবের মুখের হাসি এবার এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

সে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,

—হুম।

রাতে নিজের ঘরে ফিরে অর্ণব বিছানায় শুয়ে ছিল।

ঘুম আসছিল না।

বারবার সাফওয়ানের সঙ্গে মেঘার কথাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।

সাফওয়ান মেঘার জন্য একটা ঘড়ি এনেছিল।

মেঘা সেটা হাতে পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছিল।

অর্ণব দূর থেকে সব দেখেছিল।

তারপর নিজের অজান্তেই একটা প্রশ্ন মাথায় এসেছিল—

মেঘার জীবনে তার জায়গাটা কি সত্যিই এত সহজে অন্য কেউ নিয়ে নিতে পারবে?

সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের মনকে থামাল।

—এটা ভাবার কোনো অধিকার আমার নেই।

কারণ মেঘা কখনো তাকে সেই অধিকার দেয়নি।

অর্ণব জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

তার মনে পড়ল ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা।

স্কুলে মেঘা ভয় পেলে তার হাত ধরে থাকত।

পরীক্ষার আগের রাতে পড়া না বুঝলে ফোন করত।

কোনো কারণে মন খারাপ হলে অর্ণবের বাসায় এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত।

অর্ণবের মনে হলো, এত বছর ধরে সে মেঘার পাশে থেকেছে।

কিন্তু কখনো নিজের কথা বলেনি।

হয়তো এটাই তার সবচেয়ে বড় ভুল।

পরদিন সকালে অর্ণব তার বন্ধু রাকিবের সঙ্গে দেখা করতে গেল।

রাকিব অনেকদিন ধরেই অর্ণবের মনের কথা জানে।

সে সরাসরি বলল,

—তুই এখনো কিছু বলিসনি?

অর্ণব মাথা নাড়ল।

—না।

—কেন?

—এখন বললে কী হবে?

—যা হওয়ার হবে।

—মেঘার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

—বিয়ে এখনো হয়নি।

অর্ণব চুপ করে থাকল।

রাকিব বলল,

—তুই ওকে ভালোবাসিস।

—জানি।

—তাহলে বল।

—যদি ও আমাকে ভালো না বাসে?

—তাহলে অন্তত সত্যিটা জানবি।

অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—আর যদি ও আমাকে হারিয়ে ফেলার ভয় পায়?

রাকিব বলল,

—তাহলে বুঝবি, তোর উত্তরও আছে।

অর্ণব কোনো উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।

মেঘা।

—হ্যালো?

ওপাশ থেকে মেঘা বলল,

—কোথায়?

—বাইরে।

—আমার জন্য একটা কাজ আছে।

—বল।

—আমার বিয়ের শাড়ি দেখতে যাব। তুই আমার সঙ্গে যাবি।

অর্ণব একটু থেমে বলল,

—তুই আর তোর মা যাও।

—না। তুইও যাবি।

—কেন?

—কারণ তোর পছন্দের ওপর আমার অনেক বিশ্বাস।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—ঠিক আছে। যাব।

বিকেলে তারা গাজীপুরের একটি শপিংমলে গেল।

মেঘা একের পর এক শাড়ি দেখছিল।

—এইটা কেমন?

অর্ণব বলল,

—ভালো।

—এইটা?

—এটাও ভালো।

মেঘা বিরক্ত হয়ে বলল,

—সবকিছুই ভালো বলছিস কেন?

—কারণ সবকিছুই তোকে মানাবে।

মেঘা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—তুই আজকাল খুব অদ্ভুত কথা বলিস।

—কী অদ্ভুত?

—আগে কখনো এসব বলিসনি।

অর্ণব হেসে বিষয়টা এড়িয়ে গেল।

একসময় মেঘা একটা লাল শাড়ি হাতে নিল।

—এইটা কেমন?

অর্ণব শাড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—সুন্দর।

—আমার জন্য?

—হ্যাঁ।

—তাহলে এটা নেব।

মেঘা শাড়িটা কিনে ফেলল।

দোকান থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ মেঘা বলল,

—অর্ণব।

—হুম?

—তুই যদি একদিন আমার জীবন থেকে দূরে চলে যাস, আমার খুব খারাপ লাগবে।

অর্ণব থেমে গেল।

—এমন কথা কেন বলছিস?

—জানি না। কয়েকদিন ধরে মনে হচ্ছে তুই আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিস।

অর্ণব কিছু বলল না।

মেঘা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই কি সত্যিই আমার বিয়ের পর আমাকে ছেড়ে চলে যাবি?

অর্ণবের বুকটা ধক করে উঠল।

সে মৃদু গলায় বলল,

—আমি তোকে কখনো ছেড়ে যাব না।

—প্রমিস?

—প্রমিস।

মেঘা হাসল।

কিন্তু অর্ণব জানত—

এই প্রতিশ্রুতিটা দেওয়া তার জন্য যতটা সহজ ছিল, পালন করা হয়তো ততটাই কঠিন হবে।

সেই রাতেই অর্ণবের ই-মেইলে একটি বার্তা এল।

ঢাকার বাইরে একটি প্রতিষ্ঠানে তার জন্য ভালো চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। চাকরিটা গ্রহণ করলে তাকে চট্টগ্রামে গিয়ে থাকতে হবে।

অর্ণব দীর্ঘক্ষণ ই-মেইলটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মেঘার কথা মনে পড়ল।

মেঘার বিয়ে।

তার নতুন জীবন।

অর্ণব ধীরে ধীরে ল্যাপটপ বন্ধ করল।

নিজের মনকে বলল,

—হয়তো এটাই ভালো। মেঘার জীবন থেকে একটু দূরে গেলে আমিও নিজেকে সামলাতে পারব।

চট্টগ্রামের চাকরির ই-মেইলটা পাওয়ার পর থেকে অর্ণবের মনটা অস্থির হয়ে ছিল।

চাকরিটা খারাপ নয়। বরং তার নিজের ক্যারিয়ারের জন্য বেশ ভালো সুযোগ। বেতন ভালো, কাজের ক্ষেত্রও তার পছন্দের। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের একটা পরিচয় তৈরি করার সুযোগ।

তবুও সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না।

কারণ চট্টগ্রামে চলে গেলে মেঘার কাছ থেকে অনেকটা দূরে চলে যেতে হবে।

আর মেঘার বিয়ে হয়ে গেলে সেই দূরত্ব হয়তো আরও প্রয়োজন হবে।

সারারাত ভেবে অর্ণব শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিল—

সে চট্টগ্রামে যাবে।

পরদিন সকালে চাকরির প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে দিল।

ফোনটা নামিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

মনে হলো, একটা অধ্যায়ের শেষের দিকে সে নিজেই এগিয়ে যাচ্ছে।

সেদিন দুপুরে মেঘা ফোন করল।

—অর্ণব, কোথায়?

—বাসায়।

—আজ আমাদের বাসায় আসবি?

—আজ পারব না।

মেঘা অবাক হলো।

—কেন?

—কিছু কাজ আছে।

—কী কাজ?

—অফিসের।

—তুই তো আজ ছুটিতে।

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,

—কিছু ব্যক্তিগত কাজ আছে।

মেঘার গলায় বিরক্তি ফুটে উঠল।

—তুই কি ইচ্ছে করে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিস?

—না তো।

—তাহলে কয়েকদিন ধরে এমন করছিস কেন?

—কেমন?

—আগে দিনে দশবার ফোন করতিস। এখন আমি ফোন করলে তাড়াহুড়ো করে কথা বলিস। দেখা করতে চাইলে ব্যস্ততা দেখাস।

অর্ণব চুপ করে রইল।

মেঘা বলল,

—কিছু হয়েছে?

—না।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

মেঘা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—ঠিক আছে। আজ না পারলে কাল আসিস।

—দেখি।

—“দেখি” না। আসবি।

অর্ণব হেসে বলল,

—আচ্ছা, আসব।

ফোন কেটে গেল।

কিন্তু মেঘার মন থেকে অস্বস্তিটা গেল না।

পরদিন বিকেলে অর্ণব মেঘাদের বাসায় গেল।

মেঘা তাকে দেখেই বলল,

—এসেছিস অবশেষে!

—কেন? আমাকে আসতে নিষেধ করেছিলি নাকি?

—তুই তো নিজেই আসতে চাস না।

অর্ণব হেসে বলল,

—এত অভিযোগ জমিয়ে রেখেছিস?

—হ্যাঁ।

—শুনব।

মেঘা হাত গুটিয়ে বলল,

—প্রথম অভিযোগ, তুই আমাকে এড়িয়ে চলছিস।

—ভুল।

—দ্বিতীয় অভিযোগ, তুই আমার সঙ্গে আগের মতো কথা বলছিস না।

—ভুল।

—তৃতীয় অভিযোগ, তুই আমাকে কিছু লুকাচ্ছিস।

অর্ণব এবার চুপ করে গেল।

মেঘা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—এই অভিযোগটা কি সত্যি?

অর্ণব অন্যদিকে তাকাল।

—না।

মেঘা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল।

—মিথ্যা বলছিস।

অর্ণব বলল,

—সব কথা এখন বলা যায় না।

—কেন?

—সময় হলে বলব।

—কখন?

—জানি না।

মেঘা রাগ করে বলল,

—তুই আগের মতো নেই।

অর্ণব মৃদু গলায় বলল,

—সময় গেলে মানুষ বদলায়।

মেঘা বলল,

—কিন্তু তুই বদলাবি না বলেছিলি।

অর্ণব তার দিকে তাকাল।

—সবসময় কি একই থাকা যায়?

মেঘা কিছু বলল না।

সেদিন সন্ধ্যায় মেঘার বাবা অর্ণবকে ডেকে বললেন,

—বাবা, একটা কাজ ছিল।

—জি, আঙ্কেল।

—মেঘার বিয়ের অনেক কাজ বাকি। তুমি তো ওর সবকিছু জানো। কাল ওকে নিয়ে কয়েকটা জিনিস কিনে আনবে?

অর্ণব হাসল।

—অবশ্যই।

মেঘা পাশ থেকে বলল,

—আমি তো বলেছিলাম, অর্ণবকে ছাড়া আমার বিয়ের কোনো কাজ হবে না।

হাবিবুর রহমান হেসে বললেন,

—সেটাই তো দেখি।

অর্ণব কিছু বলল না।

তার মনে হচ্ছিল, যত বেশি সে মেঘার কাছ থেকে দূরে যেতে চাইছে, ততই সবাই তাকে মেঘার জীবনের সঙ্গে আরও জড়িয়ে দিচ্ছে।

পরদিন তারা দুজন বের হলো।

মেঘার বিয়ের জন্য কিছু গয়না, প্রসাধনী আর প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হবে।

দোকানে ঢুকেই মেঘা বলল,

—তুই এখানে দাঁড়া। আমি দেখে আসছি।

অর্ণব বলল,

—আমি দাঁড়িয়ে থাকব কেন? আমিও দেখব।

—তোর তো এসব বোঝার কথা না।

—এত বছর তোর সঙ্গে আছি। এখনো যদি না বুঝি, তাহলে অপমান।

মেঘা হেসে ফেলল।

একটা দোকানে গিয়ে মেঘা কয়েকটা চুড়ি হাতে নিল।

—কোনটা সুন্দর?

অর্ণব বলল,

—সবগুলো।

—আবার সবগুলো!

—সত্যিই তো।

মেঘা একটা চুড়ি তার হাতে দিয়ে বলল,

—এটা পরিয়ে দে।

অর্ণব অবাক হলো।

—আমি?

—হ্যাঁ।

অর্ণব চুড়িটা নিয়ে মেঘার হাতে পরিয়ে দিল।

এক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

মেঘা হঠাৎ চোখ সরিয়ে নিল।

অর্ণবও হাত সরিয়ে নিল।

দুজনেই অস্বস্তিতে পড়ে গেল।

দোকান থেকে বের হওয়ার পর মেঘা অনেকক্ষণ চুপ ছিল।

শেষে বলল,

—অর্ণব।

—হুম?

—তুই কি সত্যিই আমাকে শুধু বন্ধু ভাবিস?

প্রশ্নটা শুনে অর্ণব থেমে গেল।

তার বুকের ভেতর যেন আচমকা ঝড় উঠল।

সে মেঘার দিকে তাকাল।

মেঘা তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।

অর্ণবের মনে হলো, এটাই সেই মুহূর্ত।

এখনই সে সব বলে দিতে পারে।

এত বছরের লুকিয়ে রাখা কথাগুলো।

কিন্তু ঠিক তখনই মেঘার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে নাম—সাফওয়ান।

মেঘা ফোন ধরল।

—হ্যালো?

অর্ণব একটু দূরে সরে গেল।

কিছুক্ষণ পর মেঘা ফোন রেখে তার কাছে ফিরে এল।

—কী যেন বলছিলি?

অর্ণব মৃদু হাসল।

—কিছু না।

মেঘা বলল,

—না, আমি তোকে একটা প্রশ্ন করেছিলাম।

—কী প্রশ্ন?

—তুই কি আমাকে শুধু বন্ধু ভাবিস?

অর্ণব কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—হ্যাঁ।

মেঘা স্থির হয়ে গেল।

—শুধুই?

—হ্যাঁ।

মেঘা ধীরে মাথা নাড়ল।

—ঠিক আছে।

তারপর সে সামনে হাঁটতে শুরু করল।

অর্ণব পেছনে দাঁড়িয়ে রইল।

তার নিজের বলা মিথ্যাটা যেন তাকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছিল।

সে আসলে বলতে চেয়েছিল—

“না, মেঘা। তুই আমার কাছে শুধু বন্ধু নোস।”

কিন্তু পারেনি।

সেদিন রাতে মেঘা নিজের ঘরে একা বসে ছিল।

অর্ণবের কথাটা বারবার মনে পড়ছে।

“হ্যাঁ। শুধু বন্ধু।”

কথাটা শুনে তার কষ্ট হচ্ছে কেন?

সে তো নিজেই জানে, অর্ণব তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।

তাহলে?

মেঘা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল।

নিজেকেই প্রশ্ন করল,

—অর্ণব যদি শুধু বন্ধু হয়, তাহলে ও অন্য কোথাও চলে যাবে শুনে আমার এত খারাপ লাগে কেন?

কোনো উত্তর পেল না।

ঠিক তখন নীলা ঘরে ঢুকল।

—আপু, কী করছ?

—কিছু না।

—তুমি আবার অর্ণব ভাইয়ার কথা ভাবছ?

মেঘা চমকে তাকাল।

—না।

নীলা মুচকি হেসে বলল,

—মিথ্যা বলছ।

মেঘা চুপ করে গেল।

নীলা তার পাশে বসে বলল,

—আপু, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

—কী?

—অর্ণব ভাইয়া যদি সত্যিই দূরে চলে যায়, তুই কি খুশি থাকবি?

মেঘা উত্তর দিতে পারল না।

নীলা আবার বলল,

—আর যদি একদিন শুনিস, ও অন্য কাউকে বিয়ে করেছে?

মেঘার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

সে চোখ বন্ধ করল।

অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো, সে এই দৃশ্যটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারবে না।

কিন্তু কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও জানে না।

দুই দিন পর অর্ণব সবাইকে জানিয়ে দিল—

সে চট্টগ্রামের চাকরিটা নিয়েছে।

আগামী মাসের শুরুতেই তাকে চট্টগ্রামে যেতে হবে।

মেঘা খবরটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর শুধু বলল,

—তুই সত্যিই চলে যাচ্ছিস?

—হ্যাঁ।

—কতদিনের জন্য?

—জানি না। হয়তো অনেকদিন।

মেঘার চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।

—আমাকে আগে বলিসনি কেন?

—সবকিছু হঠাৎ হয়েছে।

—মিথ্যা।

অর্ণব চুপ।

মেঘা ধীরে বলল,

—তুই আমার বিয়ের জন্যই চলে যাচ্ছিস, তাই না?

অর্ণব এবারও কোনো উত্তর দিল না।

মেঘা তার নীরবতা দেখে সব বুঝে গেল।

চোখ নামিয়ে সে বলল,

—তাহলে তুই আমাকে সত্যিই ছেড়ে চলে যাচ্ছিস।

অর্ণব কষ্টের হাসি দিয়ে বলল,

—আমি তোকে ছেড়ে যাচ্ছি না, মেঘা। শুধু একটু দূরে যাচ্ছি।

মেঘা ধীরে বলল,

—দূরত্ব কখনো কখনো মানুষকে অনেক দূরে নিয়ে যায়, অর্ণব।

অর্ণব কিছু বলতে পারল না।

আর সেদিন প্রথমবার মেঘার মনে একটা ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠল—

অর্ণব যদি সত্যিই তার জীবন থেকে দূরে চলে যায়, তাহলে সে কি তাকে আগের মতোই শুধু বন্ধু হিসেবে মনে করতে পারবে?

অর্ণবের চট্টগ্রামে যাওয়ার খবরটা জানার পর থেকে মেঘার মনটা আর স্বাভাবিক থাকল না।

বিয়ের বাড়িতে চারদিকে আনন্দের প্রস্তুতি চলছে। নতুন শাড়ি কেনা হচ্ছে, আত্মীয়রা আসছে, ঘর সাজানোর পরিকল্পনা হচ্ছে। কিন্তু মেঘার মনে যেন কোনো আনন্দই নেই।

বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে অর্ণবের মুখ।

“আমি তোকে ছেড়ে যাচ্ছি না, মেঘা। শুধু একটু দূরে যাচ্ছি।”

কথাটা যতবার মনে পড়ছে, ততবার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগছে।

মেঘা নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—

অর্ণব তো শুধু বন্ধু।

বন্ধু দূরে চলে গেলে কষ্ট হতেই পারে।

কিন্তু এই কষ্টটা কি সত্যিই শুধু বন্ধুকে হারানোর ভয়?

সে নিজেই উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না।

সেদিন রাতে মেঘা অর্ণবকে ফোন করল।

অর্ণব ফোন ধরতেই বলল,

—হ্যালো?

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—ঘুমাচ্ছিলি?

—না।

—কী করছিলি?

—চট্টগ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

মেঘার বুকটা আবার ভারী হয়ে গেল।

—এত তাড়াতাড়ি?

—সময় তো কম।

—তুই কি সত্যিই যাবি?

অর্ণব হেসে বলল,

—চাকরিটা তো নিয়েছি।

—চাকরি না নিলেও পারতি।

—কেন?

মেঘা থেমে গেল।

কী বলবে সে?

“আমার জন্য থেকে যা”?

এই কথাটা কি বলা যায়?

সে ধীরে বলল,

—এখানেও তো চাকরি পাওয়া যায়।

—হ্যাঁ, যায়।

—তাহলে?

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আমার মনে হয় একটু পরিবর্তন দরকার।

মেঘা বুঝতে পারল, এই পরিবর্তনের আসল কারণটা সে।

কিন্তু মুখে বলল না।

—তুই গেলে আমার বিয়েতে কে থাকবে?

অর্ণব হেসে বলল,

—আমি থাকব।

—তারপর?

—তারপর কী?

—তারপর তো চলে যাবি।

—হ্যাঁ।

মেঘার গলা ভারী হয়ে গেল।

—তুই কি আমাকে একবারও মিস করবি না?

অর্ণব চোখ বন্ধ করল।

সে কতটা মিস করবে, সেটা কি মেঘাকে বলে বোঝানো সম্ভব?

—করব।

—কতটা?

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—অনেক।

মেঘা চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—ঠিক আছে। রাখছি।

—এত তাড়াতাড়ি?

—হুম।

—কী হলো?

—কিছু না।

ফোন কেটে গেল।

অর্ণব অনেকক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল।

সে বুঝতে পারছিল, মেঘার গলায় আজ অদ্ভুত একটা কষ্ট ছিল।

কিন্তু সেই কষ্টের কারণ সে জানে না।

পরদিন সকালে মেঘা অর্ণবের বাসায় গেল।

অর্ণব তখন নিজের বই আর কাপড় গুছাচ্ছিল।

মেঘা দরজায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।

অর্ণব তাকে দেখে বলল,

—তুই এখানে?

—হ্যাঁ।

—কিছু হয়েছে?

—তোর সঙ্গে কথা আছে।

অর্ণব ব্যাগের চেইন বন্ধ করে বলল,

—বল।

মেঘা ঘরের ভেতরে এসে বসে পড়ল।

তার চোখ ঘুরে ঘুরে অর্ণবের জিনিসপত্র দেখছিল।

একটা আলমারি প্রায় খালি।

বিছানার পাশে কয়েকটা কার্টন।

সবকিছু দেখে তার বুকটা আবার ভারী হয়ে উঠল।

—তুই সত্যিই সব গুছিয়ে ফেলেছিস।

অর্ণব বলল,

—হ্যাঁ।

—কবে যাবি?

—আগামী সপ্তাহে।

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আমার বিয়ের কতদিন পর?

—তিন দিন পর।

মেঘা মাথা তুলল।

—মানে আমার বিয়ের তিন দিন পরই তুই চলে যাবি?

—হ্যাঁ।

মেঘা ধীরে বলল,

—ইচ্ছে করে করছিস?

অর্ণব উত্তর দিল না।

মেঘা উঠে দাঁড়াল।

—তুই কি আমার বিয়েটা সহ্য করতে পারছিস না?

অর্ণব হঠাৎ তার দিকে তাকাল।

—মেঘা!

—তাহলে বল!

—কী বলব?

—কেন পালাচ্ছিস?

অর্ণব এবার কিছুটা কঠিন গলায় বলল,

—আমি পালাচ্ছি না।

—তাহলে কেন?

অর্ণব চুপ করে গেল।

মেঘার চোখে পানি চলে এসেছে।

—তুই যদি আমার বিয়েতে খুশি হতি, তাহলে চলে যাওয়ার এত তাড়া থাকত না।

অর্ণব ধীরে বলল,

—সবসময় কাছে থাকাটাই ভালোবাসা না।

মেঘা থমকে গেল।

অর্ণব বুঝতে পারল, কথাটা ভুল হয়ে গেছে।

মেঘা ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—তুই কী বললি?

অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিল।

—মানে... সবসময় কাছে থাকলেই তো বন্ধুত্ব টিকে থাকে না।

মেঘা কিছু বলল না।

কিন্তু “ভালোবাসা” শব্দটা তার মনে আটকে গেল।

অর্ণব কি অন্য কিছু বলতে চেয়েছিল?

নাকি সে ভুল শুনেছে?

মেঘা আর কোনো কথা না বলে বেরিয়ে গেল।

বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, মেঘার ভেতরের অস্থিরতাও তত বাড়ছিল।

সাফওয়ান নিয়মিত ফোন করত।

বিয়ের কেনাকাটা নিয়ে কথা বলত।

মেঘা সবকিছুর উত্তর দিত, হাসত, স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করত।

কিন্তু ফোন রাখার পর তার মনে হতো—

সে যেন কোথাও একটা ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।

একদিন সাফওয়ান তাকে জিজ্ঞেস করল,

—তুমি কি কোনো কারণে মন খারাপ করে আছ?

মেঘা চমকে বলল,

—না তো।

—তুমি আগের মতো কথা বলছ না।

—বিয়ের টেনশন।

সাফওয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—অর্ণবের ব্যাপার?

মেঘা অবাক হয়ে গেল।

—কেন অর্ণবের ব্যাপার হবে?

—কারণ তুমি ওর কথা বললেই তোমার গলার স্বর বদলে যায়।

মেঘা কিছু বলল না।

সাফওয়ান শান্ত গলায় বলল,

—আমি তোমার জীবনে এসে তোমার পুরোনো সম্পর্কগুলো মুছে দিতে চাই না।

—তুমি এমন কথা বলছ কেন?

—কারণ অর্ণব তোমার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটা আমি বুঝি।

মেঘা মাথা নিচু করল।

সাফওয়ান আবার বলল,

—তবে একটা জিনিস চাই।

—কী?

—তুমি নিজের কাছে সৎ থেকো।

মেঘা আর কথা বলতে পারল না।

সেদিন সন্ধ্যায় অর্ণব মেঘাদের বাসায় এল।

বিয়ের আগের শেষ কয়েকটা কাজ শেষ করতে হবে।

মেঘা তাকে দেখে কিছু বলল না।

অর্ণবও চুপচাপ কাজ করতে লাগল।

একসময় মেঘার মা বললেন,

—অর্ণব, বাবা, তুমি কালকের পর আর আসতে পারবে না। তুমি তো চট্টগ্রাম চলে যাবে।

মেঘা সঙ্গে সঙ্গে অর্ণবের দিকে তাকাল।

অর্ণব মাথা নাড়ল।

—জি, খালা।

শিরিন আক্তার বললেন,

—তোমাদের বন্ধুত্বটা দেখে সত্যিই ভালো লাগে। এত বছর ধরে একে অপরের পাশে আছো।

মেঘা মৃদু হেসে বলল,

—আমাদের বন্ধুত্ব কোনোদিন বদলাবে না।

অর্ণব তার দিকে তাকাল।

তারপর ধীরে বলল,

—হয়তো বদলাবে।

মেঘার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

—কেন?

অর্ণব কিছু বলল না।

রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর মেঘা ছাদে উঠে এল।

কিছুক্ষণ পর অর্ণবও সেখানে এসে দাঁড়াল।

দুজনেই চুপ।

শেষ পর্যন্ত মেঘাই বলল,

—অর্ণব।

—হুম?

—তুই কাল চলে যাচ্ছিস না তো?

—না। তোর বিয়ে শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোথাও যাচ্ছি না।

মেঘা ধীরে বলল,

—তারপর?

—তারপর চট্টগ্রাম।

মেঘা আকাশের দিকে তাকাল।

—তুই কি জানিস, তুই চলে গেলে আমার সবচেয়ে বেশি কী মনে পড়বে?

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—আমার অসহ্য চেহারা?

মেঘা হাসল না।

—তোর সঙ্গে কথা বলাটা।

অর্ণব চুপ হয়ে গেল।

মেঘা এবার তার দিকে তাকাল।

—প্রতিদিন তোকে না দেখলে আমার দিনটা কেমন হবে, আমি জানি না।

অর্ণবের চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।

সে ধীরে বলল,

—তুই অভ্যস্ত হয়ে যাবি।

মেঘা মাথা নাড়ল।

—আমি হতে চাই না।

অর্ণব তাকিয়ে রইল।

মেঘার চোখে তখন অশ্রু।

সে খুব আস্তে বলল,

—তুই যদি আমার বিয়ের পরও এভাবে দূরে চলে যাস... তাহলে আমি তোকে কীভাবে—

কথাটা শেষ করার আগেই সে থেমে গেল।

অর্ণব অপেক্ষা করল।

—কীভাবে কী?

মেঘা চোখ মুছে বলল,

—কিছু না।

তারপর দ্রুত নিচে চলে গেল।

অর্ণব একা ছাদে দাঁড়িয়ে রইল।

তার বুকের ভেতর একটাই প্রশ্ন—

মেঘা কি সত্যিই শুধু একজন বন্ধুকে হারানোর ভয় পাচ্ছে?

আর নিচে নিজের ঘরে ফিরে মেঘা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করল—

“অর্ণবকে হারানোর ভয়টা যদি বন্ধুত্বের না হয়, তাহলে সেটা কী?”

সেই রাতেই প্রথমবার মেঘা নিজের মনের কাছে স্বীকার করল—

অর্ণবের জায়গাটা তার জীবনে অন্য সবার চেয়ে আলাদা।

মেঘার বিয়ের আর মাত্র দুই দিন বাকি।

গাজীপুরের বাড়িটা যেন উৎসবের রঙে ভরে উঠেছে। উঠানে প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে, বাড়ির সামনের গেট সাজানো হচ্ছে। আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা বেড়েছে। রান্নাঘর থেকে একের পর এক খাবারের গন্ধ আসছে।

সবাই ব্যস্ত।

শুধু মেঘার মনটাই যেন কোথাও আটকে আছে।

গত রাতের ছাদের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে।

“তুই যদি আমার বিয়ের পরও এভাবে দূরে চলে যাস... তাহলে আমি তোকে কীভাবে—”

এরপর সে আর কথাটা শেষ করতে পারেনি।

কিন্তু অর্ণব বুঝেছিল কি?

মেঘা জানে না।

নিজের ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে অনেকক্ষণ নিজের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

—আমি কি সত্যিই অর্ণবকে শুধু বন্ধু মনে করি?

উত্তর এল না।

কিন্তু তার মন যেন অনেক আগেই উত্তর দিয়ে দিয়েছে।

সকালে অর্ণব মেঘাদের বাড়িতে এল।

হাতে বেশ কয়েকটা বাজারের ব্যাগ।

মেঘার মা তাকে দেখে বললেন,

—বাবা, এত কিছু কেন এনেছ?

—খালাম্মা, কালকের অনুষ্ঠানের কিছু জিনিস বাকি ছিল। তাই নিয়ে এলাম।

মেঘা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অর্ণবকে দেখল।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

কিন্তু কেউ কিছু বলল না।

মেঘা নিচে এসে ব্যাগগুলো দেখতে লাগল।

—সব এনেছিস?

—হ্যাঁ।

—কিছু বাদ পড়েনি তো?

—তুই তো জানিস, তোর কোনো কাজ আমি বাদ দিই না।

মেঘা হঠাৎ চুপ করে গেল।

এই কথাটা তার বুকের ভেতর কেমন যেন লাগল।

সে ধীরে বলল,

—অর্ণব।

—হুম?

—আজ একটু সময় হবে?

—কেন?

—কথা আছে।

অর্ণব মেঘার মুখের দিকে তাকাল।

তারপর বলল,

—হবে।

দুপুরে বাড়ির সবাই যখন নিজেদের কাজে ব্যস্ত, মেঘা অর্ণবকে নিয়ে ছাদে উঠে গেল।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

মেঘা রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

অর্ণব বলল,

—কী কথা বলবি?

মেঘা গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,

—তুই চট্টগ্রামে গিয়ে আমাকে কতবার ফোন করবি?

অর্ণব অবাক হলো।

—এটা আবার কী প্রশ্ন?

—উত্তর দে।

—যতবার তুই ফোন করবি, ততবার।

—নিজে থেকে?

—চেষ্টা করব।

মেঘা কষ্টের গলায় বলল,

—চেষ্টা করবি?

—হ্যাঁ।

—আগে তো প্রতিদিন নিজে থেকে ফোন করতিস।

অর্ণব চুপ করে রইল।

মেঘা এবার সরাসরি বলল,

—তুই কি আমার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে চাইছিস?

অর্ণবের গলা ভারী হয়ে গেল।

—হয়তো দরকার।

—কার দরকার?

—আমার।

—কেন?

অর্ণব কিছু বলতে পারল না।

মেঘা ধীরে বলল,

—তুই কি আমার বিয়ের কারণে কষ্ট পাচ্ছিস?

অর্ণব চোখ বন্ধ করল।

এই প্রশ্নটার উত্তরই সে এতদিন এড়িয়ে এসেছে।

আজ আর পারল না।

সে খুব আস্তে বলল,

—হ্যাঁ।

মেঘা স্থির হয়ে গেল।

—কেন?

অর্ণব তার দিকে তাকাল।

চোখে জমে থাকা কথাগুলো যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে।

সে বলল,

—কারণ...

ঠিক তখনই নিচ থেকে মেঘার মা ডাকলেন,

—মেঘা! কোথায় তুমি? তোমার শাড়ি এসেছে!

মেঘা চোখ না সরিয়ে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে রইল।

অর্ণব কথাটা শেষ করতে পারল না।

মেঘা ধীরে বলল,

—পরে বলবি?

অর্ণব মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

মেঘা নিচে চলে গেল।

অর্ণব ছাদে দাঁড়িয়ে রইল।

সে জানত, আজ সে খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল সত্যিটা বলে ফেলার।

কিন্তু ভাগ্য যেন আবারও তাকে থামিয়ে দিল।

সন্ধ্যায় মেঘার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হলো।

বাড়ির উঠান আলোয় ঝলমল করছে।

মেঘা হলুদ শাড়ি পরে বসে আছে। আত্মীয়রা হাসছে, গান গাইছে।

অর্ণব একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

তার চোখে বারবার মেঘার মুখটাই ভেসে উঠছিল।

এই মেয়েটা তার জীবনের কতটা জায়গা দখল করে আছে, সেটা হয়তো আজ সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারছে।

রাকিব পাশে এসে দাঁড়াল।

—কী ভাবছিস?

—কিছু না।

—আজ বলবি?

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—জানি না।

—তুই যদি আজও না বলিস, কাল হয়তো আর সুযোগ পাবি না।

অর্ণব মেঘার দিকে তাকিয়ে বলল,

—জানি।

ঠিক তখন মেঘা দূর থেকে অর্ণবের দিকে তাকাল।

তাদের চোখে চোখ পড়ল।

মেঘা হঠাৎ হাসল।

অর্ণবও মৃদু হাসল।

কিন্তু সেই হাসির মধ্যে কতটা কষ্ট ছিল, সেটা শুধু অর্ণবই জানত।

রাতের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর মেঘা নিজের ঘরে এসে বসেছিল।

নীলা দরজা বন্ধ করে তার পাশে এসে বসল।

—আপু।

—হুম?

—আজ বলবি?

মেঘা চমকে তাকাল।

—কী?

—অর্ণব ভাইয়াকে।

মেঘা নিচু গলায় বলল,

—আমি জানি না কী বলব।

—যেটা সত্যি।

—কিন্তু আমার তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

—তাই বলে নিজের মনকে অস্বীকার করবি?

মেঘা চোখ নামিয়ে ফেলল।

—আমি সাফওয়ানকে অসম্মান করতে চাই না।

—তাহলে সত্যিটা জানানোই তো সবচেয়ে সম্মানের।

মেঘা চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—যদি অর্ণব আমাকে সেইভাবে না দেখে?

নীলা মৃদু হেসে বলল,

—তুই কি সত্যিই সেটা বিশ্বাস করিস?

মেঘা উত্তর দিল না।

তার মনে পড়ল অর্ণবের প্রতিটি আচরণ।

তার জন্য অপেক্ষা করা।

তার পছন্দ মনে রাখা।

তার মন খারাপ বুঝে যাওয়া।

বিপদে সবার আগে পাশে দাঁড়ানো।

আর এখন তার বিয়ের কথা শুনে হঠাৎ দূরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া।

সবকিছু যেন একসঙ্গে একটা উত্তর দিচ্ছে।

রাত প্রায় বারোটা।

অর্ণব নিজের ঘরে বসে ছিল।

চট্টগ্রামে যাওয়ার ব্যাগ প্রায় গুছানো।

হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।

অর্ণব দরজা খুলে অবাক হয়ে গেল।

মেঘা দাঁড়িয়ে আছে।

—তুই?

—হ্যাঁ।

—এত রাতে?

মেঘা ভেতরে ঢুকল।

কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

—আজ তুই আমাকে একটা কথা বলবি।

অর্ণবের বুক ধক করে উঠল।

—কী কথা?

—দুপুরে যেটা বলতে চেয়েছিলি।

অর্ণব চুপ।

মেঘা তার সামনে এসে দাঁড়াল।

—কেন কষ্ট পাচ্ছিস আমার বিয়েতে?

অর্ণব এবার আর চোখ সরাল না।

সে ধীরে বলল,

—কারণ আমি তোকে হারাতে চাই না।

মেঘার চোখ ভিজে উঠল।

—আমি তো কোথাও যাচ্ছি না।

—যাবি।

—কোথায়?

অর্ণব কষ্টের হাসি দিয়ে বলল,

—সাফওয়ানের জীবনে।

মেঘা চুপ করে গেল।

অর্ণব বলল,

—আমি জানি তুই সুখী হতে চাস। আমিও চাই তুই সুখী হোস।

—তাহলে তুই দূরে যাচ্ছিস কেন?

অর্ণব উত্তর দিল না।

মেঘা এবার কাঁপা গলায় বলল,

—অর্ণব, আমি যদি তোর কাছে শুধু বন্ধু হতাম, তাহলে আমার বিয়ে নিয়ে তোর এত কষ্ট হতো?

অর্ণবের চোখে পানি চলে এল।

সে ধীরে বলল,

—না।

মেঘা তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—তাহলে আমি কী?

অর্ণব ঠোঁট খুলল।

কিন্তু শব্দ বের হলো না।

মেঘা আরও কাছে এসে বলল,

—বল।

অর্ণব চোখ বন্ধ করল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

—তুই আমার কাছে...

ঠিক তখনই অর্ণবের ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে সাফওয়ানের নাম।

মেঘা ফোনটার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল।

অর্ণবও থেমে গেল।

মেঘা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।

—ফোন ধর।

—মেঘা...

—ধর।

অর্ণব ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে সাফওয়ান বলল,

—মেঘা কি তোমার সঙ্গে আছে?

অর্ণব চুপ করে রইল।

সাফওয়ান আবার বলল,

—কাল ওর বিয়ে। কিছু কথা বলার ছিল।

অর্ণবের বুকটা ভারী হয়ে গেল।

সে ফোন রেখে মেঘার দিকে তাকাল।

মেঘার চোখে তখন অদ্ভুত এক কষ্ট।

সে ধীরে বলল,

—আজ আর কিছু বলিস না।

—মেঘা...

—কাল আমার বিয়ে।

কথাটা বলে মেঘা দরজার দিকে হাঁটল।

দরজার কাছে গিয়ে থেমে বলল,

—কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, অর্ণব।

অর্ণব তাকিয়ে রইল।

মেঘা চোখের পানি মুছে বলল,

—তুই যদি আজ আমাকে শুধু বন্ধু বলিস, তাহলে আমি সারাজীবন তোকে বন্ধু হিসেবেই মনে রাখব। কিন্তু যদি তোর মনে অন্য কিছু থাকে, তাহলে কালকের পর হয়তো আমাদের দুজনের জীবনই বদলে যাবে।

মেঘা চলে গেল।

অর্ণব দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

তার সামনে এখন মাত্র এক রাত।

পরদিন মেঘার বিয়ে।

আর তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—

সে কি সারাজীবন নিজের ভালোবাসা লুকিয়ে রাখবে, নাকি মেঘার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনে সত্যিটা বলে সবকিছু বদলে দেবে?

মেঘা চলে যাওয়ার পরও অর্ণব অনেকক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

ঘরটা আগের মতোই আছে। টেবিলের ওপর ল্যাপটপ, পাশে গুছিয়ে রাখা কিছু বই, বিছানার একপাশে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার ব্যাগ।

সবকিছু একই।

শুধু অর্ণবের ভেতরটা যেন পুরোপুরি বদলে গেছে।

মেঘার শেষ কথাটা বারবার কানে বাজছে।

“তোর মনে অন্য কিছু থাকলে, কালকের পর হয়তো আমাদের দুজনের জীবনই বদলে যাবে।”

অর্ণব ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে বসল।

সে এত বছর ধরে যে কথাটা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে, আজ সেটা বলার সুযোগ এসেছে।

কিন্তু এখন বললে কী হবে?

মেঘার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

দুই পরিবার তাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখছে।

সাফওয়ানও হয়তো মেঘাকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অর্ণব কি নিজের অনুভূতির জন্য সবার জীবন এলোমেলো করতে পারে?

সে জানে না।

তবুও একটা প্রশ্ন তাকে বারবার কষ্ট দিচ্ছিল—

যদি মেঘার মনেও তার জন্য কিছু থাকে?

এই প্রশ্নের উত্তর না জেনে কি সে চট্টগ্রামে চলে যেতে পারবে?

পরদিন সকাল।

মেঘাদের বাড়িতে যেন উৎসবের আমেজ।

সকাল থেকেই আত্মীয়স্বজনের ভিড়। রান্নাঘরে ব্যস্ততা, উঠানে সাজসজ্জা, বাড়ির সামনে আলোকসজ্জার কাজ চলছে।

মেঘা নিজের ঘরে বসে ছিল।

তার সামনে বিয়ের শাড়ি।

মা এসে বললেন,

—কী রে, এমন চুপ করে বসে আছিস কেন?

মেঘা মৃদু হেসে বলল,

—কিছু না মা।

শিরিন আক্তার মেয়ের পাশে বসে তার মাথায় হাত রাখলেন।

—ভয় লাগছে?

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—মা, বিয়ের পর কি সবকিছু বদলে যায়?

মা অবাক হয়ে বললেন,

—কিছুটা বদলায়। নতুন একটা মানুষ জীবনে আসে, নতুন দায়িত্ব আসে। তবে নিজের মানুষগুলোকে তো হারাতে হয় না।

মেঘার মনে সঙ্গে সঙ্গে অর্ণবের কথা এল।

সে ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—পুরোনো কোনো মানুষ যদি নিজে থেকেই দূরে চলে যেতে চায়?

শিরিন আক্তার মেয়ের দিকে তাকালেন।

—তাহলে তাকে জোর করে ধরে রাখা যায় না। তবে যদি সে সত্যিই আপন হয়, কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসবে।

মেঘা আর কিছু বলল না।

দুপুরের দিকে অর্ণব মেঘাদের বাড়িতে এল।

আজ তাকে দেখে মেঘার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

অর্ণব সাদা পাঞ্জাবি পরে এসেছে।

মেঘা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিল।

অর্ণবও কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর মেঘার বাবা এসে বললেন,

—অর্ণব, বাবা, আজ কিন্তু অনেক কাজ। তুমি মেহমানদের দেখাশোনা করবে।

—জি, আঙ্কেল।

অর্ণব কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।

মেঘা দূর থেকে তাকে দেখছিল।

সবাই যখন তাকে নিয়ে ব্যস্ত, তখন অর্ণব যেন স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে।

কিন্তু মেঘা বুঝতে পারছিল, তার চোখের ভেতরেও অনেক কথা জমে আছে।

বিকেলের দিকে মেঘার বান্ধবীরা তাকে সাজাতে নিয়ে গেল।

মেহেদি পরানোর সময় সবাই হাসি-ঠাট্টা করছিল।

একজন বলল,

—মেঘা, তোমার হাতে কিন্তু স্বামীর নামের পাশাপাশি কারও নাম লুকানো আছে কি না দেখতে হবে!

সবাই হেসে উঠল।

মেঘাও হাসল।

কিন্তু তার হাসি বেশিক্ষণ থাকল না।

কারণ তার মনে হলো—

অর্ণবের নামটা যদি সত্যিই তার হাতে লুকানো থাকত?

সে নিজের চিন্তায় নিজেই অস্বস্তি পেল।

“আমি কী ভাবছি!”

সন্ধ্যার পর অর্ণব ছাদে গিয়ে দাঁড়াল।

নিচে বিয়ের আয়োজন চলছে।

আলোয় পুরো বাড়ি ঝলমল করছে।

অর্ণব পকেট থেকে ফোন বের করল।

চট্টগ্রামের অফিস থেকে মেসেজ এসেছে।

আগামীকাল রাতের বাসের টিকিট কনফার্ম।

মেঘার বিয়ের পরদিনই তাকে রওনা হতে হবে।

অর্ণব ফোনটা বন্ধ করে ফেলল।

পেছন থেকে মেঘার কণ্ঠ ভেসে এল—

—তুই এখানে?

অর্ণব ঘুরে তাকাল।

মেঘা বিয়ের পোশাকের প্রস্তুতিতে ছিল। হাতে মেহেদি, মুখে হালকা সাজ।

অর্ণব কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারল না।

মেঘা বলল,

—কী দেখছিস?

—কিছু না।

—মিথ্যা।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—আজ তোকে খুব সুন্দর লাগছে।

মেঘা চোখ নামিয়ে বলল,

—কাল আরও সুন্দর লাগবে।

অর্ণবের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।

—হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

মেঘা ধীরে বলল,

—আজ শেষবারের মতো আমাদের এই ছাদে দাঁড়ানো।

অর্ণব বলল,

—এভাবে বলিস না।

—কেন?

—মনে হচ্ছে সত্যিই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।

মেঘা তার দিকে তাকাল।

—সব শেষ হয়ে যাবে?

অর্ণব কোনো উত্তর দিল না।

মেঘা ধীরে কাছে এসে বলল,

—কাল যদি আমি তোকে একটা প্রশ্ন করি, সত্যি উত্তর দিবি?

—দেব।

—যাই হোক?

—যাই হোক।

মেঘা কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—ঠিক আছে।

রাত বাড়তে লাগল।

অর্ণব নিজের ঘরে ফিরে এসে পুরোনো একটা বাক্স খুলল।

ভেতরে ছোটবেলার অনেক জিনিস।

একটা পুরোনো কলম।

স্কুলের ছবি।

একটা ছোট্ট জন্মদিনের কার্ড।

কার্ডের ওপর শিশুসুলভ হাতের লেখায় লেখা—

“অর্ণব, তুমি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।”

কার্ডটা হাতে নিয়ে অর্ণবের চোখ ভিজে উঠল।

পনেরো বছর আগে মেঘা তাকে এই কার্ড দিয়েছিল।

অর্ণব তখনও জানত না, একদিন এই ছোট্ট মেয়েটাই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে।

সে কার্ডটা আবার বাক্সে রেখে দিল।

তারপর একটা কাগজ বের করল।

অনেকক্ষণ ধরে সে কিছু লিখল।

শেষে কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখল।

এটা ছিল মেঘার জন্য তার লেখা চিঠি।

চিঠিতে সে সব সত্যি কথা লিখেছে।

কিন্তু সরাসরি দেওয়ার সাহস এখনো হয়নি।

রাত প্রায় একটা।

অর্ণবের ফোন বেজে উঠল।

মেঘা।

সে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মেঘার কণ্ঠ—

—ঘুমিয়ে পড়েছিলি?

—না।

—আমি একটা কথা বলতে ফোন করেছি।

—বল।

—তুই কি কাল আমার সঙ্গে দেখা করবি?

—বিয়ের আগে?

—হ্যাঁ।

—কখন?

—সকালে। সবাই আসার আগে।

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—ঠিক আছে।

মেঘা ধীরে বলল,

—আর একটা কথা।

—হুম?

—কাল আমি যা জিজ্ঞেস করব, মিথ্যা বলবি না।

অর্ণবের বুক ধক করে উঠল।

—মিথ্যা বলব না।

ফোন কেটে গেল।

পরদিন ভোর।

মেঘা ঘুম থেকে উঠে জানালার পাশে দাঁড়াল।

বাড়ির চারপাশে তখনও পুরোপুরি আলো হয়নি।

দূরে মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে।

আজ তার বিয়ে।

কিন্তু তার মন অন্য একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।

সে কি সত্যিই সাফওয়ানকে বিয়ে করতে প্রস্তুত?

নাকি তার মন এতদিন অন্য কারও জন্য অপেক্ষা করে ছিল?

অন্যদিকে অর্ণবও প্রস্তুত হলো।

সে চিঠিটা পকেটে রাখল।

তারপর মেঘাদের বাড়ির পেছনের ছোট বাগানের দিকে গেল।

কিছুক্ষণ পর মেঘা সেখানে এল।

দুজন মুখোমুখি দাঁড়াল।

আজ তাদের মধ্যে কোনো হাসি নেই।

মেঘা ধীরে বলল,

—অর্ণব।

—হুম?

—আমি শেষবারের মতো জানতে চাই।

অর্ণব চুপ।

—তুই কি আমাকে শুধু বন্ধু ভাবিস?

অর্ণব মেঘার চোখের দিকে তাকাল।

এবার আর পালানোর কোনো জায়গা নেই।

সে ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল,

—না।

মেঘার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

—তাহলে?

অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তুই আমার কাছে শুধু বন্ধু নোস, মেঘা।

মেঘার চোখ ভিজে উঠল।

অর্ণব বলল,

—অনেক বছর ধরে তোকে একটা কথা বলতে চেয়েছি। কিন্তু ভয় পেয়েছি। তোকে হারানোর ভয়। তাই চুপ থেকেছি।

মেঘা নিঃশব্দে শুনছিল।

—আমি জানি তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। জানি সাফওয়ান ভালো ছেলে। জানি আমার এই কথার কারণে অনেক কিছু বদলে যেতে পারে। কিন্তু আজ আর মিথ্যা বলতে পারছি না।

সে পকেট থেকে চিঠিটা বের করল।

—এটা তোর জন্য।

মেঘা চিঠিটা নিল।

তার হাত কাঁপছিল।

অর্ণব ধীরে বলল,

—তুই যদি আমাকে না চাস, আমি আর কখনো তোকে কোনোভাবে বিরক্ত করব না। চট্টগ্রামে চলে যাব। নিজের জীবন নিয়ে থাকব।

মেঘার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

সে শুধু একটা কথাই বলল,

—তুই এতদিন আমাকে কেন বলিসনি?

অর্ণব মৃদু গলায় বলল,

—কারণ তোকে হারাতে চাইনি।

মেঘা চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।

তারপর বলল,

—কিন্তু তুই জানিস না, তোর কাছ থেকে দূরে যাওয়ার ভয়টাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে।

অর্ণব স্থির হয়ে গেল।

ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে কারও ডাক শোনা গেল—

—মেঘা! তাড়াতাড়ি আয়! বরপক্ষের লোকজন আসতে শুরু করেছে!

মেঘা অর্ণবের দিকে তাকাল।

দুজনের চোখে একই প্রশ্ন।

আজ তার বিয়ে।

আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—

সে কি পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে নতুন জীবনে পা রাখবে, নাকি এতদিনের নীরব অনুভূতিকে সত্যি করে অর্ণবের হাত ধরবে?

মেঘা ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।

কিন্তু এবার তার হাতে শুধু বিয়ের মেহেদি নয়—

অর্ণবের লেখা সেই চিঠিটাও ছিল।

মেঘা ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করে দিল।

তার হাতে তখনও অর্ণবের দেওয়া চিঠি।

বাইরে বিয়ের ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। আত্মীয়দের হাসি, কথাবার্তা, রান্নাঘরের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে বাড়িটা উৎসবের আমেজে ভরে আছে।

কিন্তু মেঘার মনে যেন কোনো শব্দই পৌঁছাচ্ছে না।

সে বিছানায় বসে ধীরে ধীরে চিঠিটা খুলল।

অর্ণবের হাতের লেখা।

প্রথম কয়েকটি লাইন পড়তেই তার চোখ ভিজে উঠল।

চিঠিতে অর্ণব লিখেছে—

“মেঘা, তোকে আমি কখনো কোনো সিদ্ধান্তের জন্য বাধ্য করতে চাই না। শুধু এতটুকু জানাতে চেয়েছি, তুই আমার কাছে কখনোই শুধু বন্ধু ছিলি না। ছোটবেলা থেকে তোকে পাশে পেতে পেতে একসময় বুঝতে পারিনি কখন তুই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে গেছিস। তোর সুখের জন্য আমি সরে যেতে পারি, কিন্তু মিথ্যা বলে নিজের অনুভূতিটা লুকিয়ে রাখতে আর পারলাম না।”

মেঘা চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।

তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

এতদিন সে যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল, আজ তার উত্তর পেয়ে গেছে।

অর্ণব তাকে ভালোবাসে।

কিন্তু এখন প্রশ্নটা অন্য জায়গায়—

সে নিজে অর্ণবকে কীভাবে দেখে?

মেঘা চোখ বন্ধ করল।

এক এক করে ছোটবেলার স্মৃতিগুলো মনে পড়তে লাগল।

স্কুলে যাওয়ার সময় অর্ণবের অপেক্ষা করা।

পরীক্ষার আগে পড়া বুঝিয়ে দেওয়া।

অসুস্থ হলে ওষুধ নিয়ে ছুটে আসা।

বাবার সঙ্গে মনোমালিন্য হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার কথা শোনা।

কোনো আনন্দের খবর সবার আগে অর্ণবকে বলা।

আর অর্ণব যখন চট্টগ্রামে চলে যাওয়ার কথা বলেছিল, তখন নিজের অজান্তেই তার বুকের ভেতর যে ভয়টা তৈরি হয়েছিল—

সেটা কি বন্ধুত্বের ভয় ছিল?

না।

এখন মেঘা বুঝতে পারছে।

সে অর্ণবকে হারানোর ভয় পেয়েছিল।

অন্য কাউকে অর্ণবের জীবনে দেখার কথা ভাবতেই তার ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠেছিল।

মেঘা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে বলল,

—আমি অর্ণবকে ভালোবাসি।

কথাটা মুখে উচ্চারণ করতেই তার চোখ দিয়ে আবার পানি বেরিয়ে এল।

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা প্রশ্ন মাথায় এলো—

সাফওয়ান?

সে সাফওয়ানকে কখনো খারাপ মানুষ হিসেবে দেখেনি।

বরং সাফওয়ান ভদ্র, দায়িত্বশীল এবং ভালো একজন মানুষ।

তাহলে তাকে বিয়ে করার আগে নিজের সত্যিটা বলা কি তার দায়িত্ব নয়?

মেঘা সিদ্ধান্ত নিল।

আজ সে কাউকে ঠকাবে না।

এদিকে নিচে অর্ণব এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

তার হাতে ফোন।

চট্টগ্রামের বাসের টিকিট আবারও খুলে দেখল।

সবকিছু যেন ঠিকঠাক।

আজ রাতের বিয়ের পর কাল রাতেই সে চলে যাবে।

মেঘা তাকে কী উত্তর দেবে, সেটা সে জানে না।

হয়তো মেঘা তাকে ফিরিয়ে দেবে।

হয়তো বলবে—

“তুই আমার বন্ধু।”

অর্ণব সেই উত্তর শোনার জন্যও প্রস্তুত।

কারণ অন্তত সত্যিটা বলা হয়েছে।

কিছুক্ষণ পর মেঘার বাবা এসে অর্ণবের কাঁধে হাত রাখলেন।

—বাবা, কী হয়েছে? এত চুপচাপ কেন?

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—কিছু না, আঙ্কেল।

—মেঘাকে তো তুই ছোটবেলা থেকেই চাস। আজ ওর বিয়ে। খুশি তো?

অর্ণব এক মুহূর্তের জন্য চোখ নামিয়ে বলল,

—জি।

হাবিবুর রহমান বললেন,

—তুই কিন্তু আজ আমাদের পরিবারেরই একজন।

কথাটা শুনে অর্ণবের বুকটা ভারী হয়ে গেল।

সে শুধু বলল,

—আমি সবসময়ই ছিলাম, আঙ্কেল।

কিছুক্ষণ পর মেঘার মা এসে বললেন,

—অর্ণব, বাবা, একটু ওপরে যা তো। মেঘার সঙ্গে কথা বল।

অর্ণব অবাক হলো।

—এখন?

—হ্যাঁ। ওকে একটু শান্ত কর।

অর্ণব ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল।

মেঘার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

টোকা দিতেই ভেতর থেকে মেঘার কণ্ঠ—

—এসো।

অর্ণব ভেতরে ঢুকল।

মেঘা তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।

তার হাতে সেই চিঠি।

অর্ণব সেটা দেখে বুঝে গেল—

মেঘা পড়েছে।

সে কিছু বলল না।

মেঘাই প্রথম বলল,

—চিঠিটা অনেকবার পড়েছি।

অর্ণব নিচু গলায় বলল,

—তোর উত্তর দেওয়ার দরকার নেই এখনই।

মেঘা ঘুরে দাঁড়াল।

—আছে।

অর্ণব তাকাল।

মেঘা ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

—তুই আমাকে একটা কথা বলেছিলি।

—কী?

—তুই যদি আমাকে না চাস, তাহলে চট্টগ্রামে চলে যাবি।

—হ্যাঁ।

—তুই কি সত্যিই চলে যেতে পারবি?

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

—চেষ্টা করব।

মেঘার চোখ ভিজে উঠল।

—আমি পারব না।

অর্ণবের বুক কেঁপে উঠল।

—মেঘা...

মেঘা বলল,

—তুই জানিস না, তুই যখন বলেছিলি চট্টগ্রামে চলে যাবি, তখন আমার কতটা ভয় হয়েছিল।

অর্ণব ধীরে বলল,

—কেন?

মেঘা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—কারণ আমি তোকে হারাতে চাই না।

—তুই আমাকে হারাবি না।

—বন্ধু হিসেবে?

অর্ণব চুপ।

মেঘা এবার চোখ নামিয়ে বলল,

—আমি নিজেকে অনেকবার বোঝাতে চেয়েছি, তুই শুধু আমার বন্ধু। কিন্তু আমি পারিনি।

অর্ণবের চোখে অবিশ্বাস।

—মেঘা...

—হ্যাঁ, অর্ণব। আমিও তোকে ভালোবাসি।

অর্ণব যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল।

তারপর ধীরে বলল,

—তুই নিশ্চিত?

মেঘা চোখের পানি মুছে বলল,

—এতদিন যে অনুভূতিটাকে বুঝতে পারিনি, আজ সেটা খুব পরিষ্কার বুঝতে পারছি।

অর্ণবের চোখেও পানি চলে এল।

সে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখনই বাইরে থেকে দরজায় টোকা পড়ল।

মেঘা দ্রুত চোখ মুছে নিল।

দরজা খুলতেই দেখা গেল তার বাবা।

—মেঘা, সবাই নিচে অপেক্ষা করছে।

মেঘা মাথা নাড়ল।

—আসছি বাবা।

হাবিবুর রহমান চলে গেলে মেঘা অর্ণবের দিকে তাকাল।

—এখন কী হবে?

অর্ণব বলল,

—সত্যিটা সবাইকে বলতে হবে।

মেঘা মাথা নিচু করল।

—আমি ভয় পাচ্ছি।

—আমি আছি।

—যদি সবাই আমাদের ভুল বোঝে?

—তবুও সত্যিটা বলতে হবে।

নিচে তখন সাফওয়ান ও তার পরিবারের লোকজন এসে পৌঁছেছে।

বাড়ির পরিবেশ মুহূর্তেই আরও ব্যস্ত হয়ে উঠল।

সাফওয়ান মেঘাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল।

কিছুক্ষণ পর মেঘা নিচে এল।

সবাই তাকে দেখে খুশি হলো।

সাফওয়ান মৃদু হেসে বলল,

—কেমন আছ?

মেঘা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর বলল,

—সাফওয়ান, তোমার সঙ্গে আমার একটু কথা আছে।

সাফওয়ান বুঝতে পারল, কিছু একটা হয়েছে।

—অবশ্যই।

তারা বাড়ির এক পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

মেঘা খুব ধীরে বলল,

—আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি।

সাফওয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—কেন?

—কারণ আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারব না।

সাফওয়ান চুপ।

মেঘার চোখে পানি।

—তুমি খুব ভালো মানুষ। তোমার কোনো দোষ নেই। কিন্তু আমি আমার মনকে মিথ্যা বলতে পারব না।

সাফওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—অর্ণব?

মেঘা মাথা নিচু করল।

এটাই উত্তর।

সাফওয়ান কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

—আমি বুঝেছিলাম।

মেঘা অবাক হয়ে তাকাল।

—তুমি?

—হ্যাঁ। তোমার চোখে ওর জায়গাটা আমি অনেক আগেই দেখেছিলাম।

মেঘার চোখে পানি আরও বেড়ে গেল।

—আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।

—জানি।

সাফওয়ান শান্ত গলায় বলল,

—বিয়ে সারাজীবনের সিদ্ধান্ত। সেখানে যদি মন অন্য কোথাও থাকে, তাহলে কাউকে ঠকিয়ে বিয়ে করা উচিত নয়।

মেঘা মাথা নিচু করে বলল,

—ধন্যবাদ।

সাফওয়ান মৃদু হাসল।

—একটা কথা বলব?

—হুম।

—অর্ণবকে কখনো অবহেলা করো না। তোমার জন্য ও অনেকদিন অপেক্ষা করেছে।

মেঘা চোখ মুছে বলল,

—করব না।

সাফওয়ান নিজের পরিবারের সঙ্গে কথা বলল।

দুই পরিবারের মধ্যে প্রথমে অস্বস্তি তৈরি হলেও ধীরে ধীরে সত্যিটা সবাই জানতে পারল।

মেঘার বাবা খুব কষ্ট পেলেন।

তিনি মেয়েকে বললেন,

—তুই আগে বলিসনি কেন?

মেঘা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি নিজেই জানতাম না বাবা।

হাবিবুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তারপর অর্ণবের দিকে তাকালেন।

—তুমি আগে থেকে জানাতে পারতে।

অর্ণব মাথা নিচু করে বলল,

—ভয় পেয়েছিলাম, আঙ্কেল।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর হাবিবুর রহমান বললেন,

—তোমরা যদি সত্যিই একে অপরকে চাও, তাহলে আমি জোর করে অন্য কোথাও বিয়ে দেব না।

মেঘা অবিশ্বাসে বাবার দিকে তাকাল।

—বাবা...

—তবে একটা শর্ত আছে।

অর্ণব বলল,

—কী শর্ত?

হাবিবুর রহমান মৃদু হেসে বললেন,

—বিয়ে করার আগে নিজেরা প্রমাণ করবে, এই সিদ্ধান্তটা শুধু আবেগের নয়। দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতাও তোমাদের আছে।

অর্ণব মাথা নাড়ল।

—আমি রাজি।

মেঘাও বলল,

—আমিও।

দূরে দাঁড়িয়ে সাফওয়ান সব শুনছিল।

সে শুধু মৃদু হাসল।

অর্ণব আর মেঘার জীবনে যে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে, তার শুরুটা সহজ ছিল না।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা আজ পরিষ্কার হয়ে গেছে—

এত বছরের বন্ধুত্বের আড়ালে যে অনুভূতিটা লুকিয়ে ছিল, শেষ পর্যন্ত তারা দুজনেই সেটাকে স্বীকার করেছে।

তবে তাদের পথ এখনো পুরোপুরি সহজ হয়নি।

বিয়ের আয়োজন থেমে যাওয়ার পর মেঘাদের বাড়ির পরিবেশটা একেবারে বদলে গেল।

যে বাড়িটা কয়েক ঘণ্টা আগেও হাসি-আনন্দে ভরা ছিল, সেখানে এখন অদ্ভুত এক নীরবতা।

আত্মীয়দের অনেকেই চলে গেছে। কেউ কেউ বিষয়টা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে।

মেঘা নিজের ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

তার পাশে অর্ণব দাঁড়িয়ে।

দুজনের চোখে স্বস্তি থাকলেও সামনে কী হবে, সেটা নিয়ে দুজনের মনেই ভয় ছিল।

মেঘা ধীরে বলল,

—সবকিছু এত দ্রুত বদলে গেল।

অর্ণব বলল,

—হ্যাঁ।

—কিছুক্ষণ আগেও আমি ভাবছিলাম আজ আমার বিয়ে হবে।

—আর এখন?

মেঘা মৃদু হেসে বলল,

—এখন মনে হচ্ছে, আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটা আজই নিয়েছি।

অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই চাইলে আমি এখনই সব ছেড়ে দিতে পারি।

মেঘা অবাক হয়ে তাকাল।

—কী?

—চট্টগ্রামের চাকরি। আমি থাকব এখানে।

মেঘা মাথা নাড়ল।

—না।

—কেন?

—কারণ তুই আমার জন্য নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবি না।

অর্ণব চুপ করে গেল।

মেঘা বলল,

—আমি চাই তুই নিজের স্বপ্ন পূরণ করিস।

—কিন্তু দূরে গেলে?

—দূরত্ব মানেই তো দূরে চলে যাওয়া নয়।

অর্ণব মৃদু হাসল।

—এই কথাটা তো আগে আমি বলেছিলাম।

—হ্যাঁ। তখন বুঝিনি। এখন বুঝি।

পরদিন সকালে মেঘার বাবা অর্ণবকে ডেকে পাঠালেন।

হাবিবুর রহমান বসার ঘরে বসে ছিলেন।

অর্ণব সালাম দিয়ে সামনে বসতেই তিনি বললেন,

—বাবা, তোমাদের সিদ্ধান্তে আমি বাধা দিচ্ছি না।

অর্ণব মাথা নিচু করে শুনছিল।

—কিন্তু একটা বিষয় বুঝতে হবে। মেঘা শুধু তোমার ছোটবেলার বন্ধু নয়। ও আমার মেয়ে। ওর দায়িত্ব এখন থেকে তোমারও হবে।

—জি, আঙ্কেল।

—তুমি চট্টগ্রামে চাকরি করবে। মেঘা এখানে থাকবে। এত দূরত্ব কীভাবে সামলাবে?

অর্ণব কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—আমি জানি সহজ হবে না। কিন্তু আমি দায়িত্ব থেকে পালাব না।

হাবিবুর রহমান বললেন,

—মেঘার পড়াশোনাও আছে। ওর নিজের ভবিষ্যৎ আছে। আমি চাই না তোমাদের সম্পর্কের কারণে ওর কোনো স্বপ্ন থেমে যাক।

—কখনো না।

—আর একটা কথা।

—জি?

—তোমরা এখনই বিয়ে করবে না।

অর্ণব অবাক হলো।

—জি?

—কিছু সময় একে অপরকে বুঝো। নিজেদের ভবিষ্যৎ গুছাও। তারপর বিয়ের সিদ্ধান্ত নেবে।

অর্ণব মাথা নাড়ল।

—আমি রাজি।

হাবিবুর রহমান মৃদু হাসলেন।

—তোমার ওপর আমার বিশ্বাস আছে।

কয়েকদিন পর অর্ণবের চট্টগ্রামে যাওয়ার দিন চলে এল।

এই কয়েকদিনে মেঘা আর অর্ণবের সম্পর্কটা বদলে গেছে।

আগে তারা ছিল বন্ধু।

এখন তারা একে অপরের অনুভূতি জানে।

কিন্তু সম্পর্কের নতুন পরিচয়টা যেন দুজনের কাছেই এখনো একটু অচেনা।

সকালে অর্ণব ব্যাগ গুছাচ্ছিল।

মেঘা পাশে বসে তার বইগুলো ঠিক করে দিচ্ছিল।

—এই বইটা নেবি?

—হ্যাঁ।

—এইটা?

—ওটাও।

—সবকিছুই নেবি নাকি?

অর্ণব হেসে বলল,

—চট্টগ্রামে গিয়ে পড়াশোনা করব না নাকি?

মেঘা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—তুই গেলে বাসাটা অনেক ফাঁকা লাগবে।

অর্ণব থেমে গেল।

—আমারও।

মেঘা তাকাল।

—সত্যি?

—হুম।

মেঘা ধীরে বলল,

—তুই প্রতিদিন ফোন করবি?

—করব।

—ভিডিও কল?

—যতবার চাইবি।

—আর আমি যদি মাঝরাতে ফোন করি?

—ধরব।

—ঘুমিয়ে থাকলেও?

—তখনও।

মেঘা হেসে ফেলল।

—তুই এতদিনেও বদলাসনি।

অর্ণব মৃদু গলায় বলল,

—তোকে নিয়ে বদলাতে চাইও না।

বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার সময় মেঘাও সঙ্গে গেল।

গাজীপুর থেকে ঢাকার পথে গাড়িতে দুজন পাশাপাশি বসেছিল।

কিন্তু আজ তাদের মধ্যে আগের মতো অবিরাম কথাবার্তা নেই।

মেঘা জানালার বাইরে তাকিয়ে।

অর্ণব মাঝেমধ্যে তার দিকে তাকাচ্ছে।

একসময় মেঘা বলল,

—কী দেখছিস?

—তোকে।

—কেন?

—জানি না।

মেঘা হেসে বলল,

—আগে তো এমন করে তাকাতিস না।

—আগে সাহস ছিল না।

মেঘা চুপ করে গেল।

তারপর ধীরে বলল,

—এখন আছে?

—আছে।

—তাহলে?

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—এখন তো জানি, তুই আমার কথা শুনবি।

মেঘার মুখ লাল হয়ে উঠল।

সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—বেশি কথা বলিস না।

অর্ণব হেসে ফেলল।

বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে অর্ণব ব্যাগ নামাল।

বাস ছাড়তে আর বেশি সময় নেই।

মেঘার মনটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

সে বলল,

—অর্ণব।

—হুম?

—সাবধানে থাকিস।

—থাকব।

—ঠিকমতো খাস।

—খাব।

—সময়মতো ঘুমাবি।

—চেষ্টা করব।

মেঘা ভ্রু কুঁচকে বলল,

—আবার চেষ্টা!

অর্ণব হেসে বলল,

—আচ্ছা, ঠিকমতো ঘুমাব।

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আর একটা কথা।

—বল।

—কোনোদিন যদি মনে হয় আমি তোকে বিরক্ত করছি, তবুও ফোন কেটে দিবি না।

অর্ণবের চোখে মায়া ফুটে উঠল।

—তুই আমাকে কখনো বিরক্ত করিসনি।

—সত্যি?

—সত্যি।

বাসের হর্ন বাজল।

অর্ণব ব্যাগ হাতে নিল।

মেঘার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমি যাচ্ছি।

মেঘা মাথা নাড়ল।

অর্ণব কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে এল।

মেঘা অবাক হয়ে তাকাল।

অর্ণব ধীরে বলল,

—একটা কথা বলতে ভুলে গেছি।

—কী?

—আমি তোকে খুব মিস করব।

মেঘা মৃদু হেসে বলল,

—আমিও।

অর্ণব বাসে উঠে গেল।

মেঘা দাঁড়িয়ে রইল।

বাসটা ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল।

তারপরও মেঘা অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল।

চট্টগ্রামে পৌঁছে অর্ণব নতুন চাকরিতে যোগ দিল।

প্রথম কয়েকদিন সবকিছু নতুন লাগছিল।

নতুন অফিস, নতুন সহকর্মী, নতুন শহর।

কিন্তু প্রতিদিন রাত হলেই সে মেঘাকে ফোন করত।

একদিন ফোনে মেঘা বলল,

—আজ সারাদিন ফোন করিসনি কেন?

—কাজে ব্যস্ত ছিলাম।

—আমি ভেবেছিলাম আমাকে ভুলে গেছিস।

অর্ণব হেসে বলল,

—তুই কি এত সহজে ভোলার মানুষ?

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—না।

—তাহলে?

—কিছু না।

দুজনেই হাসল।

এইভাবেই দিন কাটতে লাগল।

কয়েক সপ্তাহ পর মেঘার পড়াশোনার একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছিল।

অর্ণব তাকে প্রতিদিন পড়ার কথা মনে করিয়ে দিত।

একদিন রাতে মেঘা বলল,

—তুই এত দূরে থেকেও আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করিস কেন?

অর্ণব বলল,

—কারণ তুই আমার দায়িত্ব।

মেঘা হেসে বলল,

—আমি কি এতটাই দুর্বল?

—না। তুই শক্ত। কিন্তু শক্ত মানুষকেও মাঝে মাঝে কারও পাশে থাকা দরকার।

মেঘা চুপ করে গেল।

তারপর বলল,

—অর্ণব।

—হুম?

—আমি একটা কথা বুঝেছি।

—কী?

—তুই আমার জীবনে শুধু একজন মানুষ না। তুই আমার অভ্যাস।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—আর তুই আমারও।

কিন্তু সুখের এই সময়টা বেশিদিন একরকম থাকল না।

এক সন্ধ্যায় অর্ণব অফিস থেকে বের হওয়ার সময় দেখল, তার ফোনে হাবিবুর রহমানের কয়েকটি মিসড কল।

সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।

ওপাশ থেকে মেঘার বাবা বললেন,

—বাবা, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।

অর্ণবের গলা কেঁপে উঠল।

—মেঘার কিছু হয়েছে?

—না। তবে একটা সমস্যা হয়েছে।

—কী?

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর হাবিবুর রহমান বললেন,

—মেঘার জন্য আবার একটা সম্বন্ধ এসেছে।

অর্ণব স্তব্ধ হয়ে গেল।

—কী বলছেন?

—একজন আত্মীয়ের ছেলে। পরিবার খুব চাপ দিচ্ছে।

—কিন্তু আপনি তো জানেন...

—জানি। কিন্তু সবাই তোমাদের সম্পর্ক মেনে নেয়নি।

অর্ণবের বুক ভারী হয়ে গেল।

—মেঘা কী বলেছে?

হাবিবুর রহমান ধীরে বললেন,

—ও রাজি নয়।

অর্ণব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

কিন্তু পরের কথাটা শুনে আবার চিন্তিত হয়ে গেল।

—সমস্যা হলো, ছেলেটার পরিবার খুব প্রভাবশালী। তারা বিষয়টা সহজভাবে নিচ্ছে না।

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আমি কালই ঢাকায় আসছি।

—এখনই আসার দরকার নেই।

—না, আঙ্কেল। এবার আমি দূরে থেকে কিছু দেখব না।

ফোন রেখে অর্ণব আকাশের দিকে তাকাল।

চট্টগ্রামের সমুদ্রের বাতাস তার মুখে লাগছিল।

কিন্তু তার মনে তখন শুধু একটাই কথা—

মেঘার জীবনে সে আর নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না।

আর গাজীপুরে নিজের ঘরে বসে মেঘাও জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

তার ফোনে অর্ণবের শেষ মেসেজ—

“আমি আসছি। ভয় পাস না।”

মেঘা মেসেজটা পড়ে মৃদু হাসল।

কারণ সে জানত—

অর্ণব দূরে থাকলেও তার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিটা কখনো দূরে যায়নি।

অর্ণবের ফোনটা কেটে যাওয়ার পর থেকেই মেঘার মনটা অস্থির হয়ে ছিল।

বাবার কাছ থেকে সে জানতে পেরেছে, আত্মীয়দের একজন আবার তার জন্য সম্বন্ধ এনেছে। বিষয়টা শুধু একটা সাধারণ প্রস্তাব নয়—পরিবারের কয়েকজন এটাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

মেঘা জানত, সে কাউকে বিয়ে করতে চায় না।

তার সিদ্ধান্ত অনেক আগেই হয়ে গেছে।

সে অর্ণবকেই চায়।

কিন্তু শুধু নিজের সিদ্ধান্ত নিলেই তো সব সমস্যার সমাধান হয় না।

পরিবারের সবাইকে বোঝাতে হবে।

বিশেষ করে তার বড় চাচা মোবারক হোসেন অর্ণবকে নিয়ে খুব একটা সন্তুষ্ট নন।

তার ধারণা, অর্ণব এখনো নিজের ক্যারিয়ার গুছিয়ে উঠতে পারেনি।

পরদিন সকালে অর্ণব চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার বাসে উঠল।

মেঘা বারবার ফোন করছিল।

—কোথায় পৌঁছেছিস?

—এখনো রাস্তায়।

—কতক্ষণ লাগবে?

—আর কয়েক ঘণ্টা।

—সাবধানে আসিস।

—হুম।

—আর অর্ণব...

—বল।

—রাগ করে কিছু করিস না।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—আমি কি এমন কিছু করি?

—তুই মাঝে মাঝে খুব জেদি হয়ে যাস।

—ঠিক আছে, জেদ করব না।

মেঘা একটু স্বস্তি পেল।

—তাহলে রাখি।

—মেঘা?

—হুম?

—ভয় পাস না।

মেঘা মৃদু গলায় বলল,

—তুই থাকলে ভয় লাগে না।

ফোন কেটে গেল।

অর্ণব জানালার বাইরে তাকাল।

তার মনে শুধু একটা কথা—

এইবার সে মেঘাকে একা কোনো সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করাবে না।

দুপুরের দিকে অর্ণব গাজীপুরে পৌঁছাল।

সরাসরি নিজের বাড়িতে না গিয়ে মেঘাদের বাসায় গেল।

দরজা খুলে মেঘা অর্ণবকে দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তুই সত্যিই চলে এসেছিস!

—বলেছিলাম তো।

মেঘা মৃদু হেসে বলল,

—ভালো করেছিস।

অর্ণব ভেতরে ঢুকতেই দেখল, বসার ঘরে হাবিবুর রহমান, মোবারক হোসেন এবং আরও কয়েকজন আত্মীয় বসে আছেন।

পরিবেশটা বেশ গম্ভীর।

মোবারক হোসেন অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—এসো বাবা।

—আসসালামু আলাইকুম, চাচা।

—ওয়ালাইকুম সালাম।

অর্ণব বসতেই তিনি বললেন,

—তোমাদের সম্পর্কের কথা আমরা সবাই জানি।

অর্ণব চুপ করে শুনছিল।

—কিন্তু সম্পর্ক শুধু অনুভূতি দিয়ে চলে না।

অর্ণব মাথা নাড়ল।

—জি, আমি জানি।

—তুমি চট্টগ্রামে নতুন চাকরি শুরু করেছ। মেঘার পড়াশোনা আছে। ভবিষ্যতে সংসার কীভাবে চালাবে?

অর্ণব শান্ত গলায় বলল,

—আমি এখনই বিয়ের কথা বলছি না।

মোবারক হোসেন একটু অবাক হলেন।

—তাহলে?

—আমি চাই মেঘা পড়াশোনা শেষ করুক। আমিও নিজের ক্যারিয়ারটা আরও গুছিয়ে নিই। তারপর দুই পরিবার বসে সিদ্ধান্ত নিক।

হাবিবুর রহমান ছেলের মতো করে তাকালেন।

মোবারক হোসেন বললেন,

—তাহলে তুমি শুধু মেঘাকে পাওয়ার জন্য এখানে আসোনি?

অর্ণব মৃদু হাসল।

—না, চাচা। আমি ওর পাশে থাকার জন্য এসেছি।

মেঘা পাশের ঘর থেকে সব শুনছিল।

তার চোখ ভিজে উঠল।

কথাবার্তার এক পর্যায়ে মোবারক হোসেন বললেন,

—কিন্তু ওই নতুন সম্বন্ধটা?

অর্ণব বলল,

—মেঘা যদি না চায়, তাহলে কোনো সম্বন্ধের প্রশ্নই আসে না।

—সবসময় কি মেয়েদের ইচ্ছামতো পরিবার চলে?

অর্ণব এবার একটু দৃঢ় গলায় বলল,

—বিয়ে তো মেঘার জীবন। তাই তার মতামত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

ঘরে নীরবতা নেমে এল।

হাবিবুর রহমান মাথা নাড়লেন।

—অর্ণব ঠিকই বলেছে।

মোবারক হোসেন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি বিষয়টা হালকাভাবে নিচ্ছ না।

—না, চাচা।

—তাহলে প্রমাণ করো।

অর্ণব অবাক হলো।

—কীভাবে?

—তোমার চাকরি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছু গুছিয়ে দেখাও। তারপর আমরা নিজেরাই মেঘার সঙ্গে তোমার বিয়ের কথা ভাবব।

অর্ণব মাথা নত করল।

—আমি রাজি।

সেদিন বিকেলে অর্ণব আর মেঘা বাড়ির পেছনের বাগানে বসেছিল।

মেঘা বলল,

—তুই এত শান্তভাবে সবকিছু সামলালি কীভাবে?

—রাগ করলে তো সমস্যার সমাধান হবে না।

—আমি ভাবছিলাম, তুই চাচার সঙ্গে ঝগড়া করবি।

অর্ণব হেসে বলল,

—তুই আমাকে এতটাই খারাপ ভাবিস?

—না। তবে তুই আমাকে নিয়ে একটু বেশি জেদি।

—হতে পারে।

মেঘা মৃদু হেসে বলল,

—অর্ণব।

—হুম?

—আজ তোকে একটা কথা বলতে চাই।

—বল।

—আমি চাই না আমাদের কারণে তুই নিজের স্বপ্ন ছেড়ে দিস।

অর্ণব তার দিকে তাকাল।

—আমি ছাড়ছি না।

—সত্যি?

—হ্যাঁ। তুই আমার জীবনের অংশ। কিন্তু তুই আমার পুরো জীবন না। আমার নিজের দায়িত্বও আছে।

মেঘা কথাটা শুনে খুশি হলো।

—এই জন্যই তোকে এত বিশ্বাস করি।

অর্ণব মৃদু হাসল।

দিন কেটে যেতে লাগল।

অর্ণব চট্টগ্রামে ফিরে গেল।

এবার তার কাজের প্রতি মনোযোগ আরও বেড়ে গেল।

সে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে শুরু করল। অফিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের দায়িত্ব পেল।

মেঘাও নিজের পড়াশোনায় মন দিল।

তাদের সম্পর্কটা দূরত্বের মধ্যেও আরও শক্ত হতে লাগল।

প্রতিদিন রাতে ফোনে কথা হতো।

কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

কখনো মাত্র কয়েক মিনিট।

কিন্তু যোগাযোগ কখনো বন্ধ হয়নি।

এক রাতে মেঘা বলল,

—আজ একটা মজার ঘটনা হয়েছে।

—কী?

—আমার বান্ধবী জিজ্ঞেস করেছে, অর্ণব কি সত্যিই আমার প্রেমিক?

অর্ণব হেসে বলল,

—তুই কী বলেছিস?

—বলেছি, জানি না।

—জানিস না?

—হুম।

—এতদিন পরও?

মেঘা হাসল।

—তুই কী বলতিস?

অর্ণব বলল,

—বলতাম, “হ্যাঁ।”

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমিও তাই বলতাম।

অর্ণবের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

তবে তাদের সুখের মধ্যে আবারও একটা সমস্যা এল।

একদিন অর্ণব অফিস থেকে বের হওয়ার সময় তার ম্যানেজার বললেন,

—অর্ণব, তোমাকে ঢাকায় ট্রান্সফার করার সুযোগ এসেছে। চাইলে আগামী মাস থেকে ঢাকায় কাজ করতে পারবে।

অর্ণব অবাক হয়ে গেল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ। তোমার কাজ ভালো হয়েছে বলেই সুযোগটা এসেছে।

অর্ণবের মনে সঙ্গে সঙ্গে মেঘার কথা এল।

চট্টগ্রামে গিয়ে সে নতুন জীবন শুরু করেছিল।

এখন ঢাকায় ফিরে এলে মেঘার কাছাকাছি থাকা সম্ভব।

কিন্তু একই সঙ্গে নতুন দায়িত্বও আছে।

সে বলল,

—আমি একটু সময় নিয়ে জানাতে পারি?

—অবশ্যই।

সেদিন রাতে অর্ণব মেঘাকে ফোন করল।

—একটা খবর আছে।

—কী?

—আমাকে ঢাকায় ট্রান্সফার করার সুযোগ দিয়েছে।

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তুই কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিস?

—জানি না।

—তোর ক্যারিয়ারের জন্য যেটা ভালো, সেটাই করবি।

অর্ণব হেসে বলল,

—আমি ভেবেছিলাম তুই বলবি, “ঢাকায় চলে আয়।”

মেঘা মৃদু হেসে বলল,

—আমি চাই তুই আমার কাছে থাকিস। কিন্তু তোর স্বপ্নের বিনিময়ে না।

অর্ণবের বুকটা ভরে গেল।

সে বলল,

—তুই জানিস, এই কারণেই তোকে আরও বেশি ভালো লাগে।

মেঘা লজ্জায় চুপ করে গেল।

কয়েকদিন পর অর্ণব সিদ্ধান্ত নিল—

সে ঢাকায় ফিরবে।

কারণ তার ক্যারিয়ারের জন্যও সুযোগটা ভালো, আর পরিবার ও মেঘার কাছাকাছি থেকেও কাজ করা সম্ভব।

সে খবরটা মেঘাকে জানালে মেঘা খুব খুশি হলো।

—সত্যি আসছিস?

—হ্যাঁ।

—কবে?

—আগামী মাসে।

—তাহলে তোকে প্রতিদিন দেখা যাবে!

—প্রতিদিন না।

—কেন?

—আমারও তো কাজ আছে।

মেঘা হাসতে হাসতে বলল,

—ঠিক আছে। সপ্তাহে কয়েকদিন।

অর্ণব ঢাকায় ফিরে আসার আগেই দুই পরিবার আবার বসলো।

হাবিবুর রহমান এবার নিজেই বললেন,

—আমি মনে করি, তোমাদের সম্পর্ককে আর অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা ঠিক হবে না।

মেঘা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।

—মানে?

—তোমাদের বিয়ের ব্যাপারে আমরা রাজি।

মেঘার চোখ আনন্দে ভিজে উঠল।

অর্ণবও কিছু বলতে পারল না।

মোবারক হোসেনও এবার হেসে বললেন,

—তবে শর্ত আগেরটাই। আগে অর্ণব ঢাকায় ফিরে নিজের কাজটা গুছিয়ে নেবে। তারপর বিয়ের তারিখ ঠিক হবে।

অর্ণব মাথা নেড়ে বলল,

—আমি রাজি।

মেঘা মৃদু হেসে তার দিকে তাকাল।

তাদের দীর্ঘ বন্ধুত্ব অবশেষে নতুন একটা পরিচয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু ঠিক তখনই অর্ণবের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।

“মেঘাকে বিয়ে করার আগে নিজের অতীত সম্পর্কে কিছু জানা দরকার। সব সত্যি জানতে চাইলে আগামী শুক্রবার রাতে একা দেখা করো।”

অর্ণব মেসেজটা পড়ে থমকে গেল।

মেঘা জিজ্ঞেস করল,

—কী হয়েছে?

অর্ণব ফোনটা বন্ধ করে বলল,

—কিছু না।

কিন্তু তার মুখের পরিবর্তন মেঘার চোখ এড়াল না।

অর্ণবের ফোনে আসা অচেনা নম্বরের মেসেজটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।

“মেঘাকে বিয়ে করার আগে নিজের অতীত সম্পর্কে কিছু জানা দরকার। সব সত্যি জানতে চাইলে আগামী শুক্রবার রাতে একা দেখা করো।”

মেসেজটা পড়ে অর্ণবের মনে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল।

তার নিজের অতীতে এমন কী আছে, যেটা মেঘার বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত?

অনেক ভেবেও সে কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।

তবু মেঘাকে কিছু বলল না।

কারণ অর্ণব জানত, অকারণে মেঘাকে চিন্তায় ফেলে কোনো লাভ নেই।

পরের কয়েকটা দিন স্বাভাবিকভাবেই কাটল।

মেঘা বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

এবার অবশ্য আগের মতো অস্থিরতা নেই।

কারণ সে জানে, তার জীবনের মানুষটি কে।

অর্ণবও ঢাকায় ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

একদিন বিকেলে মেঘা তাকে ফোন করে বলল,

—অর্ণব, আজ কোথায়?

—অফিসে।

—কাজ শেষ হয়েছে?

—আর একটু বাকি।

—তাড়াতাড়ি শেষ কর।

—কেন?

—তোর সঙ্গে দেখা করতে চাই।

অর্ণব হেসে বলল,

—এত জরুরি?

—হ্যাঁ।

—ঠিক আছে। এক ঘণ্টার মধ্যে আসছি।

সন্ধ্যায় অর্ণব মেঘাদের বাড়িতে পৌঁছাল।

মেঘা ছাদে অপেক্ষা করছিল।

অর্ণব উঠতেই মেঘা বলল,

—এত দেরি হলো কেন?

—রাস্তায় জ্যাম ছিল।

—সবসময় অজুহাত।

অর্ণব হেসে বলল,

—তুই আগের মতোই আছিস।

—তুইও।

দুজনেই হাসল।

মেঘা কিছুক্ষণ পর গম্ভীর হয়ে বলল,

—একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

—কর।

—সেদিন ফোনে কী হয়েছিল?

অর্ণব চুপ করে গেল।

—কোন সেদিন?

—যেদিন তোর মুখ হঠাৎ বদলে গিয়েছিল।

অর্ণব বুঝল, মেঘার চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

সে বলল,

—একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছিল।

—কী মেসেজ?

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফোনটা বের করল।

মেঘা মেসেজটা পড়ল।

তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

—তোর অতীত সম্পর্কে?

—হুম।

—তুই কি কিছু জানিস?

—না।

—তাহলে আমাকে বলিসনি কেন?

অর্ণব ধীরে বলল,

—কারণ তোকে অযথা ভয় দেখাতে চাইনি।

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমাদের জীবনে যদি কোনো সমস্যা আসে, সেটা একসঙ্গে সামলাব।

অর্ণব তার দিকে তাকাল।

—ঠিক আছে।

মেঘা বলল,

—একটা কথা মনে রাখিস, অর্ণব। এখন থেকে তোর কোনো সমস্যা শুধু তোর সমস্যা না।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে?

—আমাদের সমস্যা।

অর্ণবের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

শুক্রবার রাত।

অর্ণব ঠিক করল, সে ওই অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করবে।

ঢাকার একটি শান্ত জায়গায় তাকে দেখা করতে বলা হয়েছিল।

অর্ণব সেখানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর একজন মধ্যবয়সী লোক সামনে এসে দাঁড়াল।

লোকটি বলল,

—তুমিই অর্ণব?

—জি।

—আমার নাম মাহবুব।

অর্ণব সতর্ক হয়ে বলল,

—আপনি আমাকে কেন ডেকেছেন?

মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—মেঘাকে তুমি কতটা ভালোবাসো?

অর্ণব ভ্রু কুঁচকে বলল,

—এই প্রশ্নের সঙ্গে আপনার কথার কী সম্পর্ক?

—অনেক সম্পর্ক।

তারপর তিনি একটি পুরোনো খাম অর্ণবের হাতে দিলেন।

—এটা দেখো।

অর্ণব খাম খুলে কিছু পুরোনো কাগজ বের করল।

তার চোখ ধীরে ধীরে বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

সেখানে ছিল বহু বছর আগের কিছু পারিবারিক কাগজপত্র।

অর্ণব বলল,

—এগুলো কী?

মাহবুব সাহেব বললেন,

—তোমার বাবা আর মেঘার বাবার মধ্যে বহু বছর আগে একটা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল।

অর্ণব অবাক হয়ে গেল।

—আমি জানতাম না।

—তখন তোমরা দুজনই অনেক ছোট।

—তারপর?

—ব্যবসায় বড় একটা ক্ষতি হয়েছিল।

অর্ণব কাগজগুলো দেখছিল।

মাহবুব সাহেব বললেন,

—তোমার বাবা মনে করেছিলেন, সেই ক্ষতির জন্য মেঘার পরিবারের কিছু সিদ্ধান্ত দায়ী।

অর্ণব ধীরে বলল,

—কিন্তু আমার বাবা তো কখনো এসব বলেননি।

—কারণ তিনি বিষয়টা শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন।

অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তাহলে এখন কেন এসব বলছেন?

মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—কারণ তোমাদের বিয়ে নিয়ে আবার কথা উঠেছে। আর কেউ কেউ পুরোনো হিসাব সামনে আনতে চাইছে।

অর্ণব বুঝতে পারল, বিষয়টা শুধু অতীতের নয়।

—আপনি কি চান আমি মেঘাকে বিয়ে না করি?

মাহবুব সাহেব মাথা নাড়লেন।

—না। আমি শুধু চাই, তোমরা যেন সত্যিটা জেনে সিদ্ধান্ত নাও।

অর্ণব কাগজগুলো ভাঁজ করে রাখল।

—এই সত্যি আমাদের সম্পর্ক ভাঙবে না।

মাহবুব সাহেব মৃদু হাসলেন।

—তাহলে তুমি সত্যিই মেঘাকে ভালোবাসো।

অর্ণব দৃঢ় গলায় বলল,

—হ্যাঁ।

অর্ণব বাড়ি ফিরে সবকিছু মেঘাকে জানাল।

মেঘা মন দিয়ে সব শুনল।

তারপর বলল,

—এটাই সব?

—হ্যাঁ।

—তাহলে এত ভয় পাওয়ার কী আছে?

অর্ণব অবাক হয়ে তাকাল।

মেঘা বলল,

—আমাদের বাবাদের মধ্যে যদি কোনো পুরোনো সমস্যা থেকেও থাকে, তার জন্য আমরা কেন নিজেদের সম্পর্ক নষ্ট করব?

অর্ণব মৃদু হাসল।

—তুই ঠিকই বলেছিস।

মেঘা বলল,

—আমাদের সম্পর্কটা তো আজকের না। ছোটবেলা থেকে আমরা একে অপরের পাশে আছি।

অর্ণব ধীরে বলল,

—আর এখন সারাজীবনও থাকতে চাই।

মেঘা হেসে বলল,

—তাহলে থাক।

কয়েকদিন পর দুই পরিবার আবার একসঙ্গে বসল।

পুরোনো বিষয়গুলো নিয়ে কথা হলো।

অবশেষে জানা গেল, বহু বছর আগের সেই ব্যবসায়িক সমস্যাটা আসলে ভুল বোঝাবুঝি থেকেই তৈরি হয়েছিল। মেঘার বাবার কোনো প্রতারণা ছিল না, অর্ণবের বাবারও কোনো অন্যায় ছিল না।

একটি ভুল হিসাব আর তৃতীয় একজনের ভুল তথ্য থেকেই দুই পরিবারের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

বিষয়টা পরিষ্কার হওয়ার পর দুই পরিবারের মনও হালকা হয়ে গেল।

মেঘার বাবা অর্ণবের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—এত বছর পর বুঝলাম, একটা ভুল বোঝাবুঝির কারণে আমরা কতটা দূরে ছিলাম।

অর্ণবের বাবা হেসে বললেন,

—এখন আর সেই ভুলের জায়গা নেই।

তারপর দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন।

মেঘা দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে অর্ণবের দিকে তাকাল।

অর্ণবও হাসল।

কয়েক মাস পর।

অর্ণব ঢাকায় নিজের চাকরিতে ভালো অবস্থানে পৌঁছে গেছে।

মেঘার পড়াশোনাও শেষের পথে।

দুই পরিবার মিলে নতুন করে বিয়ের তারিখ ঠিক করল।

এবার কোনো বাধা নেই।

বিয়ের আগের রাতে মেঘা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।

অর্ণব তার পাশে এসে দাঁড়াল।

মেঘা বলল,

—মনে আছে, এই ছাদেই একদিন তুই বলেছিলি, সব বদলে যেতে পারে?

অর্ণব হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

—সত্যিই তো সব বদলে গেছে।

—কীভাবে?

মেঘা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আগে তুই ছিলি আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

অর্ণব বলল,

—আর এখন?

মেঘা মৃদু হেসে বলল,

—এখন তুই আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ।

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমাদের গল্পটা আসলে কবে শুরু হয়েছিল জানিস?

—কবে?

—যেদিন আমরা বন্ধু হয়েছিলাম।

মেঘা মাথা নাড়ল।

—না। সেদিন শুধু শুরু হয়েছিল বন্ধুত্ব।

—তাহলে?

—আমাদের গল্প শুরু হয়েছিল সেদিন, যেদিন তুই দূরে চলে যাওয়ার কথা বলেছিলি আর আমি বুঝেছিলাম, তোকে হারানোর ভয়টা বন্ধুত্বের ভয় নয়।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে এতদিন আমরা কী ছিলাম?

মেঘা বলল,

—বন্ধুত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুজন মানুষ।

অর্ণব বলল,

—আর এখন?

মেঘা উত্তর দিল,

—এখন আর কোনো আড়াল নেই।

দুজনেই হাসল।

দূরে রাতের আকাশে চাঁদ উঠেছে।

একসময় যে সম্পর্ককে তারা শুধু বন্ধুত্ব বলে চিনত, সেই সম্পর্কই তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।

পরদিন তাদের বিয়ে হলো।

বিয়ের পরও মেঘা নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেল।

অর্ণবও নিজের কর্মজীবনে এগিয়ে যেতে থাকল।

তাদের জীবনে নতুন দায়িত্ব এল, নতুন ব্যস্ততা এল, কখনো মতের অমিলও হলো।

কিন্তু একটা জিনিস কখনো বদলায়নি—

তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেনি।

কারণ তারা বুঝেছিল,

সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু অনুভূতি নয়—

বিশ্বাস, সম্মান আর বন্ধুত্ব।

বিয়ের কয়েক মাস পর এক সন্ধ্যায় মেঘা অর্ণবকে বলল,

—জানিস, মাঝে মাঝে ভাবি, যদি সেদিন তুই চট্টগ্রামে চলে না যেতিস?

অর্ণব হেসে বলল,

—তাহলে হয়তো তুই কোনোদিন নিজের মনের কথা বুঝতিই না।

মেঘা বলল,

—আর যদি আমি সেদিন তোকে থামাতাম না?

—তাহলে হয়তো আমি সারাজীবন আফসোস করতাম।

মেঘা মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে ভালোই হয়েছে, তুই গিয়েছিলি।

—কেন?

—কারণ তোর দূরে চলে যাওয়ার ভয়টাই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তুই আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আর তোর সেই ভয়টাই আমাদের এত বছরের বন্ধুত্বকে নতুন একটা নাম দিয়েছে।

মেঘা হাসল।

তারপর ধীরে বলল,

—বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হওয়া সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিক কী জানিস?

—কী?

—যাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়া যায়, তাকে আগে থেকেই নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসেবে পাওয়া থাকে।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে আমাদের গল্পের শেষ কোথায়?

মেঘা মাথা নাড়িয়ে বলল,

—শেষ নেই।

....
👁 66