সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা।
শহরের ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ির হর্ন, মানুষের ছুটে চলা আর অফিসগামী মানুষের ভিড়ের মাঝেও আদ্রিয়ান আজ অস্বাভাবিক রকম বিরক্ত।
সকাল আটটা বাজে। অথচ তাকে এখনো বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
হাতে ফোন নিয়ে বারবার সময় দেখছে সে।
—ধুর! আজকেই বাসটা দেরি করতে হলো!
আদ্রিয়ান শহরের ছেলে। ছোটবেলা থেকে শহরের পরিবেশেই বড় হয়েছে। নিজের কাজ নিজের মতো করে করতে অভ্যস্ত। কারও কথা সহজে মেনে নেওয়ার মানুষ সে নয়। তার কাছে সময়ের মূল্য অনেক।
আজ তাকে শহর থেকে প্রায় চার ঘণ্টা দূরের এক মফস্বল শহরে যেতে হবে। তার বড় বোন মায়ার বিয়ে সামনে। বিয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য বাবার পক্ষ থেকে আদ্রিয়ানকেই পাঠানো হয়েছে।
অবশেষে বাস এল।
আদ্রিয়ান দ্রুত উঠে নিজের টিকিটের সিট খুঁজে নিল।
জানালার পাশের সিট।
এই জায়গাটাই তার সবচেয়ে পছন্দ।
ব্যাগটা পাশে রেখে আরাম করে বসে ফোন বের করল।
কিন্তু তার শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
কয়েক মিনিট পর বাসে উঠে এল একটি মেয়ে।
হাতে কয়েকটা বই, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। পরনে সাদামাটা পোশাক। মুখে কোনো মেকআপ নেই। কিন্তু চোখ দুটো অসম্ভব প্রাণবন্ত।
মেয়েটা বাসের ভেতর তাকিয়ে নিজের সিট খুঁজতে লাগল।
তারপর হঠাৎ থেমে গেল আদ্রিয়ানের সামনে।
—এই যে, শুনছেন?
আদ্রিয়ান ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল,
—জি?
—আপনি আমার সিটে বসেছেন।
আদ্রিয়ান এবার ফোন নামিয়ে মেয়েটার দিকে তাকাল।
—আপনার সিট?
—হ্যাঁ।
—আপনার টিকিটটা দেখান তো।
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে টিকিট এগিয়ে দিল।
আদ্রিয়ান টিকিট দেখে নিজের টিকিট বের করল।
দুটোতেই একই সিট নম্বর।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
মেয়েটা বলল,
—কী হলো?
—আপনার আর আমার টিকিট একই সিটের।
—সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি।
—তাহলে?
—তাহলে আপনি উঠুন।
আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
—আমি কেন উঠব?
মেয়েটা অবাক হয়ে তাকাল।
—কারণ এটা আমার সিট।
—আমিও তো টিকিট কেটেছি।
—আপনি আগে বসেছেন বলে সিটটা আপনার হয়ে যায়নি।
আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
—আপনি কি সব মানুষের সঙ্গে এভাবেই কথা বলেন?
মেয়েটা শান্তভাবে বলল,
—শুধু যারা আমার সিট দখল করে বসে থাকে, তাদের সঙ্গে।
আদ্রিয়ান কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কন্ডাক্টর এসে হাজির হলো।
দুজনের টিকিট দেখে সে মাথা চুলকাল।
—আরে বাবা! কাউন্টারে ভুল হয়েছে মনে হয়।
মেয়েটা বলল,
—এখন কী হবে?
কন্ডাক্টর বলল,
—ভাই, আপনি একটু সামনে চলে যান। আপু জানালার পাশে বসবেন।
আদ্রিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—কেন?
মেয়েটা এবার হালকা হাসল।
—কারণ আমার জানালার পাশে বসতেই হবে।
—কেন?
—আমার মাথা ঘোরে।
আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাগটা তুলে নিল।
—ঠিক আছে।
সে উঠে সামনে চলে গেল।
যাওয়ার সময় মেয়েটা বলল,
—ধন্যবাদ।
আদ্রিয়ান পেছন ফিরে বলল,
—এত খুশি হওয়ার কিছু নেই। আপনার জন্য আজকে আমার যাত্রাটা নষ্ট হলো।
মেয়েটা মুচকি হেসে বলল,
—আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, আপনার যাত্রা এমনিতেই খুব একটা আনন্দের ছিল না।
আদ্রিয়ান আর কোনো উত্তর দিল না।
নিজের সিটে গিয়ে বসে পড়ল।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কিছুক্ষণ পরপর তার চোখ চলে যাচ্ছিল পেছনের জানালার দিকে।
মেয়েটা বই পড়ছে।
মাঝেমধ্যে জানালার বাইরে তাকাচ্ছে।
তার মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
আদ্রিয়ান নিজেকে বোঝাল,
‘আমি ওর দিকে তাকাচ্ছি না। রাস্তার দিকে তাকাচ্ছি।’
কিন্তু নিজের মনকে বোঝানো এত সহজ ছিল না।
দেড় ঘণ্টা পর বাস একটা রেস্টুরেন্টের সামনে থামল।
সবাই নেমে নাশতা করতে গেল।
আদ্রিয়ানও নামল।
চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে সে।
হঠাৎ পেছন থেকে সেই মেয়েটা বলল,
—আপনি কি সবসময় এত গম্ভীর থাকেন?
আদ্রিয়ান ঘুরে তাকাল।
—আপনি কি সবসময় এত প্রশ্ন করেন?
—না।
—তাহলে আজ এত করছেন কেন?
মেয়েটা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল,
—আপনাকে দেখলে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে।
—কেন?
—জানি না।
আদ্রিয়ান হেসে ফেলল।
—আপনার নামটা অন্তত জানা যাবে?
মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
—মেহরিন।
—মেহরিন?
—হ্যাঁ।
—ভালো নাম।
—ধন্যবাদ।
মেহরিন এবার পাল্টা জিজ্ঞেস করল,
—আপনার নাম?
—আদ্রিয়ান।
—আপনিও বেশ অদ্ভুত নাম।
—আমার নাম অদ্ভুত কেন?
—জানি না। শুধু মনে হলো।
আদ্রিয়ান মাথা নাড়ল।
—আপনি বেশ বিরক্তিকর।
মেহরিন হেসে বলল,
—আর আপনি বেশ রাগী।
দুজনেই কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।
তারপর মেহরিন বলল,
—চলুন, বাস ছাড়বে।
আদ্রিয়ান অবাক হয়ে বলল,
—আপনি আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করছেন কেন?
—আপনাকে নিয়ে চিন্তা করছি না। বাসটা মিস করতে চাই না।
কথাটা বলে মেহরিন চলে গেল।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
বাস আবার চলতে শুরু করল।
এবার মেহরিন জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে।
আদ্রিয়ান সামনের সিটে।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর মেহরিনের বইটা হঠাৎ হাত থেকে পড়ে গেল।
আদ্রিয়ান সেটা তুলে নিল।
বইয়ের ভেতর একটা ছোট কাগজ বেরিয়ে এল।
সেখানে লেখা—
“কিছু মানুষ প্রথম দেখাতেই বিরক্ত করে, অথচ পরে তারাই সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।”
আদ্রিয়ান কয়েক সেকেন্ড লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বইটা মেহরিনের হাতে দিয়ে বলল,
—আপনার বই।
মেহরিন কাগজটার দিকে তাকিয়ে দ্রুত সেটা বইয়ের ভেতর ঢুকিয়ে দিল।
আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বলল,
—লেখাটা সুন্দর।
মেহরিন একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—আপনি পড়েছেন?
—চোখের সামনে ছিল।
—তাহলে ভুলে যান।
—চেষ্টা করব।
মেহরিন জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটে উঠেছিল।
বিকেলের দিকে বাসটা মেহরিনের গন্তব্যে পৌঁছাল।
নামার আগে মেহরিন আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—বিদায়, রাগী সাহেব।
আদ্রিয়ান বলল,
—বিদায়, সিটের মালিক।
মেহরিন নেমে গেল।
আদ্রিয়ান জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কারও জন্য অপেক্ষা করছে।
কয়েক মুহূর্ত পর একটা সাদা গাড়ি এসে থামল।
মেহরিন গাড়িতে উঠে চলে গেল।
আদ্রিয়ান জানালা থেকে চোখ সরিয়ে নিল।
তার নিজের গন্তব্য এখনো প্রায় এক ঘণ্টা দূরে।
কিন্তু আশ্চর্যভাবে এতক্ষণ যে পথটাকে বিরক্তিকর মনে হচ্ছিল, এখন সেই পথটাই কেমন যেন ফাঁকা লাগছে।
সে নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল,
—মেহরিন...
তারপর হেসে ফেলল।
মেহরিনকে বাস থেকে নামার পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে মেয়েটার কথা আদ্রিয়ানের মাথা থেকে যাচ্ছিল না।
সে নিজেকে বারবার বোঝাচ্ছিল, ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক। একটা বাসযাত্রায় কারও সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কিছু কথা হয়েছে—এর বেশি কিছু নয়।
কিন্তু তারপরও কোনো কারণ ছাড়াই মাঝে মাঝে তার মনে পড়ে যাচ্ছিল মেয়েটার সেই হাসি।
বিশেষ করে সেই কথাটা—
“আপনাকে দেখলে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে।”
আদ্রিয়ান নিজের অজান্তেই হেসে ফেলত।
তারপর আবার নিজেকেই বকত।
—কী হচ্ছে আমার?
এদিকে মেহরিনও তার নিজের জীবনে ব্যস্ত।
সে একটি কলেজে শেষ বর্ষে পড়ছে। পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত। স্বভাবে শান্ত হলেও নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সে ভীষণ দৃঢ়।
তার পরিবার ছোট। বাবা সালেহ সাহেব স্থানীয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মা রওশন আরা সংসার সামলান। মেহরিনের ছোট ভাই রিফাত সারাক্ষণ দুষ্টুমি করে বেড়ায়।
সেদিন বিকেলে মেহরিন বাড়ির উঠানে বসে বই পড়ছিল।
রিফাত দৌড়ে এসে বলল,
—আপু, তোমাকে একজন ডাকছে।
—কে?
—বলো না!
—তুই আগে বল।
—বাড়ির সামনে একজন এসেছে।
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বই বন্ধ করল।
—কে এসেছে সেটা বললেই তো হয়।
রিফাত রহস্যময় মুখ করে বলল,
—শহর থেকে এসেছে।
মেহরিন দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
বাইরে গিয়ে দাঁড়াতেই সে থমকে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে—
আদ্রিয়ান।
মেহরিন কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারল না।
আদ্রিয়ানও তাকে দেখে অবাক।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
মেহরিন প্রথমে সামলে নিয়ে বলল,
—আপনি এখানে?
আদ্রিয়ান হেসে বলল,
—আমিও একই প্রশ্ন করতে পারি।
—আমি তো এখানে থাকি।
—ওহ, তাই নাকি?
মেহরিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
—আপনি কি আমার সঙ্গে মজা করছেন?
—একটু।
—আপনি এখানে কেন?
আদ্রিয়ান পাশে দাঁড়ানো তার চাচাতো ভাই নাবিলের দিকে তাকাল।
—ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
নাবিল হেসে বলল,
—তোমরা একে অপরকে চেনো?
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না।
একই সময়ে আদ্রিয়ান বলল,
—হ্যাঁ।
দুজনেই একে অপরের দিকে তাকাল।
নাবিল অবাক হয়ে বলল,
—কী ব্যাপার?
মেহরিন দ্রুত বলল,
—বাসে পরিচয় হয়েছিল।
আদ্রিয়ান যোগ করল,
—সিট নিয়ে ঝগড়ার সময়।
নাবিল হেসে উঠল।
—ওহ! তাহলে প্রথম দেখাতেই ঝগড়া?
মেহরিন বলল,
—ঝগড়া করেন উনি।
আদ্রিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমি?
—জি, আপনি।
—আপনি তো আমার সিট দখল করেছিলেন।
—আপনি আমার সিটে বসেছিলেন!
নাবিল দুই হাত তুলে বলল,
—থামো! তোমাদের আবার শুরু হয়ে গেল।
মেহরিন বিরক্ত মুখে ভেতরে চলে গেল।
আদ্রিয়ান তার পেছনে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
নাবিল বলল,
—মেয়েটার সঙ্গে সাবধানে কথা বলিস। খুব জেদি।
আদ্রিয়ান বলল,
—বুঝতে পেরেছি।
—আর একটা কথা।
—কী?
—ও কিন্তু সহজে কাউকে পাত্তা দেয় না।
আদ্রিয়ান হাসল।
—আমি পাত্তা পাওয়ার জন্য আসিনি।
কথাটা বললেও নিজের মনেই সে জানত, কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়।
পরের কয়েকদিন আদ্রিয়ানের গ্রামের বাড়িতে নানা ব্যস্ততা শুরু হলো।
বিয়ের আয়োজন, আত্মীয়স্বজন, বাজার করা—সব মিলিয়ে বাড়ি সরগরম।
আর মেহরিনও প্রায় প্রতিদিন নাবিলের বাড়িতে আসতে শুরু করল। কারণ মায়ার সঙ্গে তার ছোটবেলা থেকেই বন্ধুত্ব।
ফলে আদ্রিয়ান আর মেহরিনের দেখা হতে লাগল প্রায় প্রতিদিন।
কিন্তু দেখা হলেই ঝামেলা।
একদিন সকালে মেহরিন উঠানে দাঁড়িয়ে ফুল সাজাচ্ছিল।
আদ্রিয়ান পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলল,
—এভাবে ফুল সাজালে তো দেখতে ভালো লাগবে না।
মেহরিন ঘুরে তাকাল।
—আপনি জানেন কীভাবে সাজাতে হয়?
—অবশ্যই।
—তাহলে করুন।
আদ্রিয়ান কিছুটা অবাক হলো।
—সত্যি?
—জি। দেখি আপনার প্রতিভা।
আদ্রিয়ান ফুলগুলো হাতে নিল।
দশ মিনিট পর মেহরিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
ফুলের সাজটা সত্যিই সুন্দর হয়েছে।
মেহরিন ধীরে ধীরে বলল,
—খারাপ না।
আদ্রিয়ান বলল,
—শুধু খারাপ না?
—ভালো হয়েছে।
—এই প্রথম আমার প্রশংসা করলেন।
—বেশি ভাববেন না।
আদ্রিয়ান হেসে বলল,
—আপনি প্রশংসা করলেও ঝগড়ার মতো শোনান।
মেহরিনও হেসে ফেলল।
সেদিন প্রথমবার তাদের মধ্যে কোনো তর্ক হলো না।
দিন যত যেতে লাগল, তাদের সম্পর্কও অদ্ভুতভাবে বদলাতে শুরু করল।
কখনো একসঙ্গে বাজারে যাওয়া।
কখনো মায়ার জন্য কিছু কিনতে গিয়ে দুজনের মতের অমিল।
কখনো বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে গল্প।
তবে কেউই স্বীকার করছিল না যে তারা একে অপরের সঙ্গ উপভোগ করতে শুরু করেছে।
এক সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে গেল।
সবাই উঠানে বসে গল্প করছিল।
মেহরিন একপাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
আদ্রিয়ান এসে তার পাশে দাঁড়াল।
—কী দেখছেন?
—তারা।
—তারার মধ্যে কী আছে?
—শান্তি।
আদ্রিয়ান একটু হেসে বলল,
—আপনি সবকিছুর মধ্যে এত গভীর কিছু খুঁজে পান কীভাবে?
মেহরিন বলল,
—আপনি সবকিছু এত সহজ করে দেখেন কীভাবে?
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আদ্রিয়ান বলল,
—মেহরিন।
—হুম?
—সেদিন বাসে যে কথাটা লিখেছিলেন...
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
—কোন কথা?
—“কিছু মানুষ প্রথম দেখাতেই বিরক্ত করে, অথচ পরে তারাই সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।”
মেহরিন চুপ করে গেল।
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—সেটা কি সত্যি?
মেহরিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—জানি না।
—আপনার ক্ষেত্রে?
মেহরিন চোখ সরিয়ে নিল।
—আপনি খুব বেশি প্রশ্ন করছেন।
আদ্রিয়ান হাসল।
—আপনার কাছ থেকেই শিখেছি।
মেহরিন এবার হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই দূর থেকে নাবিলের ডাক এল।
—আদ্রিয়ান! কাল সকালে শহরে যাবি। গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত থাকিস।
আদ্রিয়ান উত্তর দিল,
—আচ্ছা।
মেহরিনের মুখটা হঠাৎ একটু মলিন হয়ে গেল।
আদ্রিয়ান সেটা লক্ষ্য করল।
—কী হলো?
—কিছু না।
—আপনি মন খারাপ করলেন?
—না।
—মিথ্যা বলছেন।
মেহরিন এবার তাকিয়ে বলল,
—আপনি কাল চলে যাচ্ছেন?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—হ্যাঁ। কিছু কাজ আছে।
মেহরিন ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—ভালো থাকবেন।
সে উঠে চলে যেতে লাগল।
আদ্রিয়ান পেছন থেকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ তার মনে হলো—
এই মেয়েটাকে মাত্র কয়েকদিন হলো চেনে। অথচ মেয়েটা চলে যাওয়ার কথা বলতেই কেন যেন বুকের ভেতরটা খালি লাগছে?
আর মেহরিনও নিজের ঘরে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুপ করে রইল।
পরদিন সকাল।
আদ্রিয়ান শহরে ফিরে যাওয়ার জন্য গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত হয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে ছিল। মায়ার বিয়ের বেশিরভাগ কাজ শেষ। এখন তাকে অফিসের জরুরি কিছু কাজ সামলাতে হবে।
নাবিল গাড়ির কাছে এসে বলল,
—সবকিছু নিয়ে নিয়েছিস তো?
—হ্যাঁ।
—দুপুরের মধ্যে পৌঁছে যাবি?
—রাস্তার ওপর নির্ভর করছে।
আদ্রিয়ান গাড়িতে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে মেহরিনের কণ্ঠ ভেসে এল।
—একটু দাঁড়ান।
আদ্রিয়ান ঘুরে তাকাল।
মেহরিন হাতে একটা বই নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
—এটা আপনার।
আদ্রিয়ান বইটা দেখে অবাক হলো।
—আমার?
—হ্যাঁ। গতকাল আপনার গাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন।
আদ্রিয়ান বইটা হাতে নিয়ে বলল,
—ওহ। মনে ছিল না।
মেহরিন মুচকি হেসে বলল,
—আপনার অনেক কিছুই মনে থাকে না মনে হচ্ছে।
—কী বলতে চাইছেন?
—কিছু না।
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি কি আমাকে বিদায় দিতে এসেছেন?
—না। বই দিতে এসেছি।
—শুধু বই?
—জি।
—একটুও মন খারাপ হচ্ছে না?
মেহরিন একটু থেমে বলল,
—কেন হবে?
আদ্রিয়ান মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
—ঠিক আছে।
সে গাড়িতে উঠে বসে।
গাড়ি চালু করার আগে আবার মেহরিনের দিকে তাকায়।
মেহরিন তখনও দাঁড়িয়ে।
আদ্রিয়ান হাত নেড়ে বলল,
—বিদায়, সিটের মালিক।
মেহরিনও হাত নেড়ে বলল,
—বিদায়, রাগী সাহেব।
গাড়ি চলে গেল।
মেহরিন অনেকক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজেকেই বলল,
—এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি কেন?
কোনো উত্তর পেল না।
শহরে ফিরে আদ্রিয়ান নিজের কাজে ডুবে গেল।
অফিসে ঢুকেই একের পর এক মিটিং।
ফোনে মায়ের কল।
বোনের বিয়ের আয়োজন নিয়ে আলোচনা।
সব মিলিয়ে দিনটা ব্যস্ততায় কেটে গেল।
কিন্তু রাত হলেই সমস্যা।
বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করলেই তার মনে পড়ছে গ্রামের বাড়ির উঠান।
মেহরিনের হাসি।
তার সঙ্গে ঝগড়া।
তার কথা বলার ধরন।
আর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে বিদায় নেওয়ার সময় মেয়েটার চোখ।
আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়ে উঠে বসে।
—এই মেয়েটার কথা এত মনে পড়ছে কেন?
সে ফোন হাতে নিল।
মেহরিনের কোনো নম্বর তার কাছে নেই।
নাবিলের নম্বর আছে।
অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার পর শেষ পর্যন্ত নাবিলকে কল করল।
—হ্যালো?
—কোথায় আছিস?
—বাসায়। কেন?
—এমনিই।
নাবিল হেসে বলল,
—মেহরিনকে ফোন করার জন্য আমার নম্বর লাগবে?
আদ্রিয়ান চুপ।
—কী হলো? চুপ করে আছিস কেন?
—তুই এসব কী বলছিস?
—আমি কিছু বলছি না। তোর কণ্ঠই সব বলে দিচ্ছে।
আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
—ওর নম্বর আছে?
নাবিল এবার জোরে হেসে উঠল।
—আহা! এতক্ষণে আসল কথা বের হলো!
—দিবি কি না বল?
—আছে। কিন্তু একটা শর্ত।
—কী?
—তুই কেন নম্বর চাস সেটা আগে বল।
—দরকার আছে।
—কী দরকার?
—একটা বই ফেরত দিতে হবে।
নাবিল আবার হাসতে শুরু করল।
—বই তো তুই কালই নিয়ে এসেছিস।
আদ্রিয়ান চুপ করে গেল।
নাবিল বলল,
—ঠিক আছে, বুঝেছি। কাল পাঠিয়ে দেব।
পরদিন দুপুরে আদ্রিয়ানের ফোনে একটি নতুন নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“বইয়ের জন্য এত কষ্ট করার দরকার ছিল না।”
আদ্রিয়ান বুঝে গেল।
মেহরিন।
সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
“বই না। আপনার সঙ্গে কথা বলার একটা অজুহাত দরকার ছিল।”
মেসেজ পাঠানোর পর আদ্রিয়ান নিজেই অবাক হয়ে গেল।
সে কি সত্যিই এটা লিখল?
কয়েক মিনিট কোনো উত্তর এল না।
তারপর ফোনে মেসেজ।
“আপনি আগের চেয়েও বেশি বেহায়া হয়েছেন।”
আদ্রিয়ান হেসে ফেলল।
“আপনি আগের চেয়েও বেশি কথা বলেন।”
মেহরিন উত্তর দিল,
“কারণ আপনি এখনো আগের মতোই বিরক্তিকর।”
সেদিন থেকেই তাদের নিয়মিত কথা বলা শুরু হলো।
প্রথমে ছোট ছোট বিষয়।
তারপর পড়াশোনা।
তারপর পরিবার।
তারপর পছন্দ-অপছন্দ।
দিনের শেষে কে কী করেছে—সেটাও একে অপরকে বলতে শুরু করল।
কখন যে তাদের কথাগুলো প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল, তারা কেউ বুঝতে পারেনি।
এক রাতে মেহরিন ফোনে বলল,
—আপনি কি সবসময় এত ব্যস্ত থাকেন?
—কাজ থাকে।
—আমার সঙ্গে কথা বলার সময়ও?
—আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য সময় বের করতে হয়।
—তাহলে কথা বলছেন কেন?
আদ্রিয়ান হেসে বলল,
—কারণ ভালো লাগে।
ওপাশে হঠাৎ নীরবতা।
আদ্রিয়ানও চুপ।
কয়েক সেকেন্ড পর মেহরিন ধীরে বলল,
—আমারও।
আদ্রিয়ানের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
কয়েক সপ্তাহ পর আদ্রিয়ান আবার গ্রামে গেল।
এবার কোনো পারিবারিক কাজের জন্য নয়।
নাবিলের জন্মদিন।
কিন্তু মেহরিন জানত না সে আসছে।
সন্ধ্যায় বাড়ির উঠানে সবাই বসে গল্প করছিল।
মেহরিন তখন রিফাতকে বকছিল।
—কতবার বলেছি আমার বইয়ে হাত দেবে না!
রিফাত হেসে বলল,
—আমি তো শুধু দেখছিলাম।
—তোর শুধু দেখাই সমস্যা।
ঠিক তখন পেছন থেকে একটা কণ্ঠ এল,
—তুমি এখনো একই রকম আছো।
মেহরিন থেমে গেল।
ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।
আদ্রিয়ান দাঁড়িয়ে আছে।
মেহরিনের মুখে বিস্ময়।
—আপনি?
আদ্রিয়ান হাসল।
—হ্যাঁ, আমি।
—কেউ তো বলেনি আপনি আসছেন।
—তোমাকে বললে তো চমকটা নষ্ট হয়ে যেত।
মেহরিন একটু হাসল।
—কতদিনের জন্য?
—দুই দিন।
—শুধু দুই দিন?
—কেন? বেশি দিন হলে সমস্যা?
মেহরিন চোখ সরিয়ে বলল,
—আমার কী সমস্যা হবে?
আদ্রিয়ান ধীরে বলল,
—জানি না। তবে তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, আমি আসায় তোমার খুব একটা খারাপ লাগেনি।
মেহরিন এবার তাকিয়ে বলল,
—খারাপ লাগেনি।
—ভালো লেগেছে?
মেহরিন উত্তর না দিয়ে ভেতরে চলে গেল।
আদ্রিয়ান তার পেছনে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
সেই রাতেই ছাদে দুজনের আবার দেখা হলো।
চারপাশ নিস্তব্ধ।
আকাশে অসংখ্য তারা।
মেহরিন রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে।
আদ্রিয়ান এসে পাশে দাঁড়াল।
—আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ?
—না।
—তাহলে এত চুপ কেন?
—কিছু ভাবছি।
—কী?
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আপনি শহরে ফিরে গেলে সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যায়।
—মানে?
—এই কয়েকটা দিন আপনার সঙ্গে কথা বললে মনে হয় আপনি খুব কাছের কেউ। তারপর আপনি চলে গেলে বুঝি, আপনি আসলে অনেক দূরের মানুষ।
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—তাহলে দূরত্বটা কমিয়ে দিই?
মেহরিন কিছু বলল না।
শুধু চোখ তুলে তার দিকে তাকাল।
সেই মুহূর্তে দুজনেই বুঝল—
তাদের সম্পর্ক আর শুধু বন্ধুত্বের জায়গায় নেই।
কিন্তু ঠিক তখনই নিচ থেকে মেহরিনের বাবা সালেহ সাহেবের কণ্ঠ ভেসে এল—
—মেহরিন! তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।
মেহরিন নিচে চলে গেল।
আদ্রিয়ান ছাদে দাঁড়িয়ে রইল।
মেহরিন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখল, তার বাবা সালেহ সাহেব বসার ঘরে বসে আছেন। মুখটা স্বাভাবিক, কিন্তু চোখেমুখে গম্ভীর ভাব।
—আব্বু, আমাকে ডাকছিলে?
—হ্যাঁ। বসো।
মেহরিন বাবার সামনে বসল।
সালেহ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—তোমার পড়াশোনা শেষ হতে আর বেশি সময় নেই। এরপর কী করতে চাও, ভেবেছ?
মেহরিন মাথা নিচু করে বলল,
—চাকরি করতে চাই।
—শহরে?
—হ্যাঁ। যদি ভালো সুযোগ পাই।
সালেহ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—শহরে একা থাকা সহজ নয়।
—আমি একা থাকব না। বান্ধবী নুসরাতের সঙ্গে থাকব।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আর একটা ব্যাপার আছে।
মেহরিন তাকাল।
—কী?
—তোমার জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে।
মেহরিনের মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।
—এখনই?
—এখনই না। শুধু কথা হয়েছে।
—আমি তো বলেছি, পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব নিয়ে ভাবতে চাই না।
—আমি জানি। কিন্তু ছেলেটা ভালো। পরিবারও ভালো।
মেহরিন কিছু বলল না।
তার মাথায় তখন অন্য একজনের কথা ঘুরছে।
আদ্রিয়ান।
কিন্তু সে বাবাকে কিছু বলতে পারল না।
কারণ আদ্রিয়ান তাকে কখনো সরাসরি কিছু বলেনি।
শুধু কিছু কথা, কিছু দৃষ্টি আর অদ্ভুত এক টান।
তাহলে সে কীভাবে বাবাকে বলবে?
এদিকে ছাদে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ান অপেক্ষা করছিল।
মেহরিন আর ফিরল না।
কিছুক্ষণ পর নাবিল এসে বলল,
—এখানে একা দাঁড়িয়ে কী করছিস?
—এমনিই।
—মেহরিনের জন্য অপেক্ষা করছিস?
আদ্রিয়ান হেসে বলল,
—হয়তো।
নাবিল তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুই কি ওকে সত্যিই পছন্দ করিস?
আদ্রিয়ান এবার চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
—হ্যাঁ।
—ওকে বলেছিস?
—না।
—কেন?
আদ্রিয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—ভয় হয়।
নাবিল অবাক।
—তুই ভয় পাচ্ছিস?
—হ্যাঁ। ও যদি না বলে?
নাবিল হেসে বলল,
—যে ছেলে সব বিষয়ে এত আত্মবিশ্বাসী, সে একটা মেয়েকে নিজের মনের কথা বলতে ভয় পাচ্ছে?
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—সবকিছুতে জেতা যায় না।
পরদিন সকাল।
আদ্রিয়ান শহরে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মেহরিন দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
তার ভেতরে অদ্ভুত একটা অস্থিরতা।
গত রাতের কথাগুলো বাবার সঙ্গে হওয়ার পর থেকেই তার মনটা খারাপ।
সে জানে, আদ্রিয়ানকে নিয়ে তার অনুভূতিটা আর বন্ধুত্বের মধ্যে নেই।
কিন্তু আদ্রিয়ান কী ভাবে?
এই প্রশ্নটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে।
আদ্রিয়ান গাড়িতে ওঠার আগে মেহরিনের সামনে এসে দাঁড়াল।
—কী হলো? এত চুপচাপ কেন?
—কিছু হয়নি।
—তুমি মিথ্যা বলছ।
—আপনি সব বুঝে ফেলেন?
—তোমার ব্যাপারে একটু বেশি বুঝতে শিখেছি।
মেহরিন তাকিয়ে রইল।
আদ্রিয়ান ধীরে বলল,
—কিছু বলতে চাও?
মেহরিনের ঠোঁট কেঁপে উঠল।
সে বলতে চেয়েছিল—
“আমি আপনাকে হারাতে চাই না।”
কিন্তু মুখ দিয়ে বের হলো,
—সাবধানে যাবেন।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—তুমিও।
গাড়ি চলে গেল।
মেহরিন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
শহরে ফিরে আদ্রিয়ান কয়েকদিন পর মেহরিনকে ফোন করল।
—কী করছ?
—পড়ছি।
—আমাকে মনে পড়ছে?
মেহরিন হেসে বলল,
—আপনি কি সবসময় এমন কথা বলেন?
—তুমি উত্তর দাও না কেন?
—মনে পড়ছে।
আদ্রিয়ানের মুখে হাসি ফুটল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—তাহলে একটা কথা বলি?
—বলুন।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।
মেহরিনের বুক ধক করে উঠল।
—কী কথা?
—সামনাসামনি বলব।
—কেন?
—কিছু কথা ফোনে বলা যায় না।
মেহরিন বুঝতে পারল, হয়তো সেই কথাটাই আসছে যার অপেক্ষায় সে এতদিন ছিল।
দুই দিন পর আদ্রিয়ান মেহরিনের শহরে গেল।
একটা ছোট ক্যাফের বাইরে মেহরিন অপেক্ষা করছিল।
আদ্রিয়ান এসে বলল,
—অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছ?
—না।
—মিথ্যা।
—হ্যাঁ, করেছি।
দুজনেই হাসল।
তারা ভেতরে গিয়ে বসল।
কিছুক্ষণ সাধারণ কথা হওয়ার পর আদ্রিয়ান হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
—মেহরিন।
—হুম?
—আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল একটা ঝগড়া দিয়ে।
মেহরিন হেসে বলল,
—কারণ আপনি আমার সিটে বসেছিলেন।
—তারপর তুমি আমাকে সারাক্ষণ বিরক্ত করেছ।
—আপনিও কম করেননি।
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—কিন্তু একটা সময়ের পর বুঝলাম, তোমার সঙ্গে ঝগড়া না করলে আমার দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে।
মেহরিন চুপ করে গেল।
আদ্রিয়ান এবার ধীরে বলল,
—তোমার সঙ্গে কথা না বললে খারাপ লাগে। তুমি দূরে থাকলে অস্থির লাগে। আর তোমাকে অন্য কারও সঙ্গে কল্পনা করতেও আমার ভালো লাগে না।
মেহরিনের চোখ নিচু হয়ে গেল।
আদ্রিয়ান বলল,
—আমি তোমাকে পছন্দ করি, মেহরিন। খুব বেশি।
মেহরিন কিছু বলল না।
শুধু চোখের কোণে জমে থাকা পানি হাতের আঙুল দিয়ে মুছে ফেলল।
আদ্রিয়ান চিন্তিত হয়ে বলল,
—তুমি কিছু বলছ না কেন?
মেহরিন ধীরে মুখ তুলল।
—আমি ভয় পাচ্ছি।
—কিসের?
—এই সম্পর্কটা যদি শেষ পর্যন্ত কোথাও না যায়?
আদ্রিয়ান বলল,
—আমি শেষ করতে চাই না।
—আপনি চান না। কিন্তু সবকিছু তো আমাদের হাতে থাকে না।
আদ্রিয়ান তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল না; শুধু সামনে ঝুঁকে বলল,
—তাহলে আমরা চেষ্টা করব।
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
—আমি আপনাকে একটা সুযোগ দিতে পারি।
আদ্রিয়ানের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
—মানে?
—মানে... আমিও আপনাকে পছন্দ করি।
দুজনের চোখে তখন এক ধরনের স্বস্তি।
তাদের সম্পর্কের শুরু হলো।
কিন্তু সুখটা বেশিদিন সহজ থাকল না।
কারণ মেহরিনের পরিবার ধীরে ধীরে জানতে পারল আদ্রিয়ানের কথা।
সালেহ সাহেব মেয়েকে ডেকে বললেন,
—আদ্রিয়ানকে তুমি কতদিন ধরে চেনো?
মেহরিন চুপ।
—আমি তোমাকে প্রশ্ন করছি।
—কয়েক মাস।
—ও কী করে?
—ব্যবসা করে।
—ওদের পরিবার সম্পর্কে তুমি কী জানো?
মেহরিন এবার বাবার চোখে কঠোরতা দেখতে পেল।
—আপনি কেন এসব জিজ্ঞেস করছেন?
সালেহ সাহেব ধীরে বললেন,
—কারণ আমি চাই না তুমি এমন একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ো যার ভবিষ্যৎ তুমি নিজেও জানো না।
মেহরিন বলল,
—আমি ওকে বিশ্বাস করি।
—বিশ্বাস করলেই সব ঠিক হয় না।
—তাহলে কী ঠিক হয়?
বাবা বললেন,
—সময়।
মেহরিন চুপ করে গেল।
আর ঠিক সেই রাতেই আদ্রিয়ানের ফোনে একটি মেসেজ এল।
মেহরিন লিখেছে—
“আমাদের একটু দূরে থাকা দরকার।”
আদ্রিয়ান মেসেজটা পড়ে হতভম্ব হয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।
মেহরিন ধরল না।
বারবার কল করেও কোনো উত্তর পেল না।
অবশেষে একটা মেসেজ এল—
“সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আমাকে একটু সময় দিন।”
আদ্রিয়ান ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
তার মনে হলো, তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন সময়টা হয়তো এখনই শুরু হলো।
মেহরিনের মেসেজটা পাওয়ার পর সারা রাত ঘুমাতে পারল না আদ্রিয়ান।
“আমাদের একটু দূরে থাকা দরকার।”
মাত্র কয়েকটা শব্দ।
কিন্তু সেই কয়েকটা শব্দই যেন তার মাথার ভেতর বারবার ঘুরছিল।
সকালে অফিসে গিয়েও কাজে মন বসাতে পারল না।
একটার পর একটা ফাইল সামনে রাখা, মিটিং চলছে, কর্মীরা নানা বিষয়ে কথা বলছে—কিন্তু আদ্রিয়ানের মন পড়ে আছে ফোনের স্ক্রিনে।
মেহরিনের কোনো মেসেজ নেই।
সে নিজে থেকে অনেকবার লিখেও মুছে ফেলল।
শেষ পর্যন্ত শুধু লিখল,
“আমি অপেক্ষা করব।”
মেসেজটা পাঠিয়ে ফোনটা টেবিলে রেখে দিল।
এদিকে মেহরিনও ভালো নেই।
বাবার সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই তার ওপর পরিবারের চাপ বাড়তে শুরু করেছে।
সালেহ সাহেব সরাসরি আদ্রিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলেননি। কিন্তু তার কথায় পরিষ্কার ছিল, তিনি এই সম্পর্ক মেনে নিতে রাজি নন।
এক সন্ধ্যায় বাবা-মায়ের কথা আড়াল থেকে শুনে ফেলল মেহরিন।
মা বলছিলেন,
—মেয়েটা ওকে সত্যিই পছন্দ করে মনে হচ্ছে।
সালেহ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—পছন্দ আর সংসার এক জিনিস নয়।
—ছেলেটা খারাপ কী করেছে?
—খারাপ করেছে এমন বলছি না। কিন্তু ওদের জীবনযাপন, পরিবার, চিন্তাভাবনা—সব আলাদা।
—সময় দিলে হয়তো মেহরিন বুঝবে।
—আমি চাই না ও পরে কষ্ট পাক।
মেহরিন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
তার চোখ ভিজে উঠল।
সে জানত, বাবা তাকে ভালোবাসেন।
কিন্তু একই সঙ্গে সে এটাও জানত, বাবার ভয়টা হয়তো পুরোপুরি অমূলক নয়।
আদ্রিয়ান শহরের বড় ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে।
আর মেহরিন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে।
তাদের জীবনযাত্রায় অনেক পার্থক্য।
কিন্তু মেহরিনের কাছে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল—
আদ্রিয়ান তাকে সম্মান করে।
কয়েকদিন কেটে গেল।
তাদের কথা প্রায় বন্ধ।
আদ্রিয়ান ফোন করলে মেহরিন ধরত না।
মেহরিন ফোন হাতে নিয়ে অনেকবার আদ্রিয়ানের নামের ওপর চাপ দিতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি।
নিজেকে বোঝাত,
‘এটা সাময়িক।’
কিন্তু দিন যত যাচ্ছিল, দূরত্ব তত বাড়ছিল।
একদিন রাতে মেহরিনের বান্ধবী নুসরাত এসে বলল,
—তুই এভাবে আর কতদিন থাকবি?
—কীভাবে?
—চুপচাপ।
মেহরিন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—আমি কী করব?
—যাকে ভালোবাসিস, তার সঙ্গে কথা বল।
মেহরিন ধীরে বলল,
—সবসময় নিজের ইচ্ছামতো চলা যায় না।
—তোর বাবা রাজি না?
মেহরিন চুপ করে রইল।
নুসরাত বলল,
—তুই কি আদ্রিয়ানকে বিশ্বাস করিস?
—হ্যাঁ।
—তাহলে ওর সঙ্গে কথা বল।
মেহরিন কিছু বলল না।
অন্যদিকে আদ্রিয়ান সিদ্ধান্ত নিল, সে আর অপেক্ষা করবে না।
সে সরাসরি মেহরিনের বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাবে।
নাবিলকে বলল,
—আমি সালেহ সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
নাবিল কিছুটা চিন্তিত হয়ে বলল,
—তুই নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
—উনি হয়তো রাজি হবেন না।
—তবুও কথা বলতে হবে।
দুদিন পর আদ্রিয়ান মেহরিনদের বাড়িতে গেল।
সালেহ সাহেব তাকে বসতে বললেন।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে নীরবতা।
তারপর সালেহ সাহেব বললেন,
—তুমি মেহরিনকে পছন্দ করো?
—জি।
—কতটা?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—এতটা যে ওকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনাদের সম্মতি চাই।
সালেহ সাহেব তাকিয়ে রইলেন।
—তুমি কি জানো, তোমাদের মধ্যে অনেক পার্থক্য?
—জানি।
—ও আমাদের একমাত্র মেয়ে।
—জানি।
—ওকে কষ্ট দিলে?
আদ্রিয়ান শান্ত গলায় বলল,
—তাহলে সেটা আমার নিজের ব্যর্থতা হবে।
সালেহ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—তোমাকে আমার খারাপ লাগছে না। কিন্তু আমি এখনই সম্মতি দিতে পারছি না।
আদ্রিয়ান মাথা নেড়ে বলল,
—আমি আপনার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি।
—তুমি কি মেহরিনের জন্য অপেক্ষা করবে?
আদ্রিয়ান একটু থেমে বলল,
—ও যদি আমার সঙ্গে থাকতে চায়, আমি অপেক্ষা করব।
সালেহ সাহেব বললেন,
—তাহলে সময়কে তার কাজ করতে দাও।
আদ্রিয়ান উঠে দাঁড়াল।
দরজার কাছে গিয়ে সে একবার পেছনে তাকাল।
মেহরিন দূর থেকে সব শুনছিল।
তাদের চোখাচোখি হলো।
মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।
আদ্রিয়ান কিছু বলল না।
শুধু মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।
সেদিন রাতে মেহরিন নিজেই ফোন করল।
আদ্রিয়ান অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে কলটা ধরল।
—হ্যালো?
ওপাশে নীরবতা।
তারপর মেহরিন বলল,
—আপনি আজ আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন?
—হ্যাঁ।
—কেন?
—তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে।
—কী বললেন?
—বলেছি, আমি তোমাকে পছন্দ করি।
মেহরিনের গলা কেঁপে উঠল।
—আর বাবা?
—সময় চেয়েছেন।
—আপনি কী বললেন?
—অপেক্ষা করব।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—আপনি জানেন, আমি কেন দূরে সরে গিয়েছিলাম?
—জানি না।
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
—আমাকে?
—না। আপনাকে হারানোর ভয়।
আদ্রিয়ান কিছু বলতে পারল না।
মেহরিন বলল,
—আমি ভাবছিলাম, পরিবারকে কষ্ট দিয়ে আপনাকে বেছে নিলে পরে যদি সবকিছু ভেঙে যায়?
আদ্রিয়ান শান্ত গলায় বলল,
—তাহলে আমরা তাড়াহুড়ো করব না।
—আপনি রাগ করেননি?
—করেছি।
—অনেক?
—খুব।
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
—তবুও অপেক্ষা করবেন?
—হ্যাঁ।
—কতদিন?
আদ্রিয়ান উত্তর দিল,
—তুমি যতদিন সময় নাও।
মেহরিনের চোখ দিয়ে এবার পানি গড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু সে হাসছিল।
এরপর আবার তাদের কথা বলা শুরু হলো।
তবে আগের মতো নয়।
এবার দুজনেই একটু বেশি সাবধান।
মেহরিন নিজের পড়াশোনায় মন দিল।
আদ্রিয়ান ব্যবসায় আরও ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
সময় এগোতে লাগল।
এক বছর।
তারপর আরও এক বছর।
ধীরে ধীরে আদ্রিয়ানের ব্যবসা বড় হতে লাগল। সে দেশের বাইরে একটি নতুন শাখা খোলার সুযোগ পেল।
মেহরিনও পড়াশোনা শেষ করে শহরে একটি চাকরি পেল।
তাদের সম্পর্ক তখনো ছিল।
কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।
এক রাতে আদ্রিয়ান মেহরিনকে বলল,
—আমাকে কয়েক মাসের জন্য দেশের বাইরে যেতে হবে।
মেহরিন চুপ করে রইল।
—কতদিন?
—ছয় মাস। হয়তো তারও বেশি।
—তারপর?
—ফিরে আসব।
মেহরিন ধীরে বলল,
—আপনি ফিরে আসবেন তো?
আদ্রিয়ান হেসে বলল,
—তুমি থাকলে অবশ্যই।
মেহরিনও হেসে ফেলল।
কিন্তু ভাগ্য যেন তাদের জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
আদ্রিয়ান বিদেশে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরই মেহরিনের জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা তাদের সম্পর্ককে সম্পূর্ণ বদলে দিল।
আদ্রিয়ান বিদেশে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ মেহরিনের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলত।
সময় দুজনের জন্যই একটু কঠিন ছিল। একজন নতুন ব্যবসার কাজে ব্যস্ত, অন্যজন নতুন চাকরিতে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবুও দিনের শেষে ফোনে কিছুক্ষণ কথা না হলে দুজনেরই দিনটা অসম্পূর্ণ মনে হতো।
এক রাতে ভিডিও কলে আদ্রিয়ান বলল,
—আজ তোমার দিন কেমন গেল?
মেহরিন ক্লান্ত মুখে বলল,
—ভালো। তবে অফিসের কাজ অনেক।
—তুমি ক্লান্ত দেখাচ্ছ।
—আপনিও তো কম ক্লান্ত নন।
—আমার কথা বাদ দাও।
মেহরিন হেসে বলল,
—সবসময় নিজের কথা বাদ দিতে হবে কেন?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—তুমি পাশে থাকলে হয়তো এতটা ক্লান্ত লাগত না।
মেহরিন কিছু বলল না। শুধু মৃদু হাসল।
ঠিক তখনই তার ফোনে আরেকটা কল এল।
সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমাকে একটা কল ধরতে হবে।
—ঠিক আছে।
কল কেটে গেল।
আদ্রিয়ান জানত না, ওই ফোনকলটাই পরবর্তী কয়েক মাসে তাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনবে।
পরদিন সকালে মেহরিনের বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
বাড়ির সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর জানা গেল, কয়েকদিন বিশ্রাম প্রয়োজন। মেহরিন চাকরি সামলে প্রতিদিন বাবার পাশে ছুটতে লাগল।
এই সময় তার জীবনে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করল তানভীর।
তানভীর ছিল সালেহ সাহেবের পুরোনো ছাত্র। বর্তমানে সে স্থানীয় একটি হাসপাতালে কাজ করত। সালেহ সাহেবের অসুস্থতার খবর শুনে সে নিয়মিত হাসপাতালে আসতে শুরু করল।
মেহরিনের জন্য ওষুধ আনা, রিপোর্ট সংগ্রহ করা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ—সবকিছুতেই সাহায্য করত।
মেহরিন তাকে শুধু বাবার একজন পরিচিত মানুষ হিসেবেই দেখত।
কিন্তু গ্রামের মানুষ তো সবসময় সত্যিটা জানে না।
কেউ একজন সালেহ সাহেবের বাড়িতে তানভীরের নিয়মিত আসা নিয়ে কথা ছড়াতে শুরু করল।
মেহরিন এসবের কিছুই জানত না।
এদিকে আদ্রিয়ান বিদেশে বসে নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত।
সে প্রতিদিন মেহরিনকে ফোন করার চেষ্টা করত।
কিন্তু মেহরিনের ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় কথা হতো না।
একদিন আদ্রিয়ান ফোন করতেই মেহরিন বলল,
—আজ একটু সময় কম। আব্বুকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
—কী হয়েছে?
—ভয় পাওয়ার মতো কিছু না। ডাক্তার কিছু পরীক্ষা করতে বলেছেন।
—আমি কি কিছু করতে পারি?
—না। আপনি আপনার কাজ করুন।
—মেহরিন, তুমি চাইলে আমি এখনই আসতে পারি।
মেহরিন দ্রুত বলল,
—না! আপনার কাজ ফেলে আসার দরকার নেই।
—তুমি নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
কথা শেষ করে মেহরিন ফোন রেখে দিল।
কিন্তু সে জানত না, তার এই ব্যস্ততা আর তানভীরের উপস্থিতি একদিন আদ্রিয়ানের কাছে সম্পূর্ণ অন্য অর্থ নিয়ে পৌঁছাবে।
দুই মাস কেটে গেল।
আদ্রিয়ান দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
মেহরিনকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ গিয়ে চমকে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সে।
নাবিলকে ফোন করে বলল,
—আমি শুক্রবার ফিরছি।
—মেহরিন জানে?
—না।
—ভালো। তবে একটা কথা বলব?
—কী?
—তুই দেশে ফিরে আগে মেহরিনের সঙ্গে কথা বলিস।
আদ্রিয়ান অবাক হলো।
—কেন?
নাবিল একটু থেমে বলল,
—কিছুদিন ধরে ওদের বাড়িতে নানা ঝামেলা চলছে।
—কী ধরনের?
—আমি ঠিক জানি না।
—তুই কিছু লুকাচ্ছিস?
—না। শুধু বললাম, আগে ওর সঙ্গে কথা বলিস।
আদ্রিয়ান বিষয়টা নিয়ে আর প্রশ্ন করল না।
শুক্রবার সন্ধ্যায় সে দেশে ফিরল।
পরদিন সকালে কোনো খবর না দিয়ে সরাসরি মেহরিনদের এলাকায় চলে গেল।
কিন্তু বাড়ির সামনে পৌঁছেই থেমে গেল।
গেটের বাইরে একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে।
গাড়ির পাশে তানভীর।
কিছুক্ষণ পর মেহরিন বাইরে এল।
তার হাতে কয়েকটা রিপোর্ট।
তানভীর সেগুলো নিয়ে কিছু একটা বলল।
মেহরিন মাথা নেড়ে হাসল।
দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে আদ্রিয়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল।
মেহরিন জানতেই পারল না, আদ্রিয়ান এসেছিল।
সেদিন সন্ধ্যায় মেহরিন ফোন করল।
—আপনি দেশে ফিরেছেন?
আদ্রিয়ান চুপ করে রইল।
—হ্যালো? শুনছেন?
—হ্যাঁ।
—কবে ফিরলেন?
—আজ।
মেহরিন খুশি হয়ে বলল,
—আমাকে তো জানালেন না!
—চমক দিতে চেয়েছিলাম।
—তাহলে?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—চমকটা ভালো হয়নি।
মেহরিন বুঝতে পারল না।
—কী হয়েছে?
—কিছু না।
—আপনি অদ্ভুত কথা বলছেন কেন?
আদ্রিয়ান এবার সরাসরি বলল,
—তানভীর কে?
মেহরিন থেমে গেল।
—তানভীর?
—হ্যাঁ।
—আব্বুর পরিচিত। হাসপাতালে অনেক সাহায্য করেছে।
—শুধু তাই?
মেহরিনের কণ্ঠ বদলে গেল।
—আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?
—আমি যা দেখেছি, সেটাই বলছি।
—আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন?
—আমি শুধু জানতে চাই—
—না। আপনি জানতে চাইছেন না। আপনি ধরে নিয়েছেন।
আদ্রিয়ান চুপ।
মেহরিন বলল,
—আপনি আমাকে একবারও জিজ্ঞেস না করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন?
—আমি নিজের চোখে দেখেছি।
—আপনি কী দেখেছেন?
—তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমার বাবার অসুস্থতার সময় যে মানুষটা সাহায্য করেছে, তাকে নিয়ে আপনি এমন কথা বলছেন?
আদ্রিয়ান বুঝতে পারল, তার কথাটা ভুল হয়েছে।
কিন্তু অহংকার তাকে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা চাইতে দিল না।
সে বলল,
—আমি শুধু বললাম, বিষয়টা আমার ভালো লাগেনি।
মেহরিনের গলা কেঁপে উঠল।
—আপনার ভালো লাগার ওপর কি আমার বাবার চিকিৎসা নির্ভর করবে?
—মেহরিন, আমি সেটা বলিনি।
—কিন্তু আপনার কথার অর্থ সেটাই।
কথা শেষ করে মেহরিন ফোন কেটে দিল।
আদ্রিয়ান ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
সে আবার ফোন করল।
মেহরিন ধরল না।
পরদিন নাবিল আদ্রিয়ানের সঙ্গে দেখা করতে এল।
—তুই কী করেছিস?
আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
—কী করেছি?
—মেহরিনের সঙ্গে ঝগড়া করেছিস?
—ও তানভীরের সঙ্গে—
নাবিল থামিয়ে দিল।
—তুই তানভীরকে চেনিস?
—না।
—তাহলে জানিস কীভাবে ওর সঙ্গে মেহরিনের সম্পর্ক কী?
আদ্রিয়ান চুপ।
নাবিল বলল,
—মেহরিনের বাবা হাসপাতালে ছিল। তানভীর ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিল। ও শুধু সাহায্য করেছে।
আদ্রিয়ানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—তুই নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—আমি ভুল করেছি।
—তাহলে গিয়ে ক্ষমা চা।
আদ্রিয়ান সঙ্গে সঙ্গে মেহরিনদের বাড়ির দিকে রওনা হলো।
কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারল, মেহরিন বাড়িতে নেই।
সে অফিসে গেছে।
আদ্রিয়ান অফিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
অফিসের সামনে পৌঁছে দূর থেকে মেহরিনকে দেখতে পেল।
কিন্তু মেহরিন একা ছিল না।
তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল তানভীর।
তানভীরের হাতে একটা খাম।
মেহরিন সেটা নিয়ে কিছু বলল।
দূর থেকে কথাগুলো শোনা যাচ্ছিল না।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার ভুল বুঝল।
সে আর এগোল না।
গাড়িতে ফিরে দরজা বন্ধ করে বসে রইল।
তার হাতে মেহরিনের ফোন নম্বর।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে ফোনটা বন্ধ করে দিল।
এদিকে মেহরিন জানতই না, আদ্রিয়ান তাকে দ্বিতীয়বার ভুল বুঝে চলে গেছে।
তার হাতে থাকা খামের ভেতরে ছিল—
চাকরির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজ।
কিন্তু সেই ছোট্ট ভুল বোঝাবুঝিই এবার তাদের সম্পর্কের মধ্যে এমন দূরত্ব তৈরি করল, যেখান থেকে ফিরে আসা সহজ হবে না।
সেদিন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় মেহরিনের মনটা অদ্ভুত ভালো ছিল।
তার হাতে তখন সেই খামটা।
তানভীর কিছুক্ষণ আগেই তাকে দিয়েছিল। শহরের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য যে আবেদন করেছিল, সেটার চূড়ান্ত কাগজপত্র ছিল সেখানে।
মেহরিন জানত না, কয়েক মিনিট আগে আদ্রিয়ান তাকে তানভীরের সঙ্গে দেখেছে।
আর দেখেই চলে গেছে।
বাড়ি ফেরার পর মেহরিন প্রথম কাজ হিসেবে আদ্রিয়ানকে ফোন করল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
কোনো উত্তর নেই।
সে মেসেজ করল—
“আপনি কোথায়?”
কোনো উত্তর নেই।
আবার লিখল—
“আমার সঙ্গে কথা বলবেন?”
নীরবতা।
মেহরিনের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
সে বুঝতে পারছিল, আদ্রিয়ান আবার কিছু একটা ভুল বুঝেছে।
কিন্তু এবার সে নিজে গিয়ে বিষয়টা পরিষ্কার করবে।
পরদিন সকালেই মেহরিন আদ্রিয়ানের বাড়িতে গেল।
দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ভাবার পর কলিংবেল চাপল।
দরজা খুলল আদ্রিয়ানের মা সাবিনা রহমান।
মেহরিনকে দেখে তিনি অবাক হলেন।
—মেহরিন? তুমি?
—জি, আন্টি। আদ্রিয়ান কি বাসায় আছে?
সাবিনা একটু থেমে বললেন,
—আছে। তবে কাল রাত থেকে ও খুব চুপচাপ।
মেহরিনের বুক কেঁপে উঠল।
—আমি ওর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
—যাও।
মেহরিন ধীরে ধীরে আদ্রিয়ানের ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় নক করল।
ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না।
সে আবার নক করল।
—আদ্রিয়ান?
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল।
আদ্রিয়ান সামনে দাঁড়িয়ে।
চোখেমুখে ক্লান্তি।
মেহরিন তাকিয়ে বলল,
—আমার সঙ্গে কথা বলবেন?
—কী কথা?
—আপনি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন কেন?
আদ্রিয়ান সরে দাঁড়িয়ে বলল,
—ভেতরে আসো।
মেহরিন ঘরে ঢুকল।
কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপ।
তারপর মেহরিন বলল,
—আপনি গতকাল আমাকে অফিসের সামনে দেখেছিলেন?
আদ্রিয়ান তাকাল।
—হ্যাঁ।
—তাহলে ফোন ধরলেন না কেন?
—কী বলব বুঝতে পারিনি।
—আপনি কী ভেবেছেন?
আদ্রিয়ান এবার সরাসরি বলল,
—আমি জানি না তানভীর তোমার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
মেহরিনের চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
—আপনি এখনো ওকে নিয়ে ভাবছেন?
—আমি যা দেখছি—
—আপনি কিছুই দেখছেন না!
আদ্রিয়ান চুপ।
মেহরিন খামটা টেবিলের ওপর রাখল।
—এটা কী জানেন?
আদ্রিয়ান তাকাল।
—কী?
—চাকরির কাগজ।
—কোন চাকরি?
—শহরের একটা প্রতিষ্ঠানে। তানভীর সেখানে পরিচিত একজনের মাধ্যমে আমার আবেদনটা এগিয়ে দিয়েছিল।
আদ্রিয়ান কিছু বলল না।
মেহরিন ধীরে বলল,
—আর আব্বুর অসুস্থতার সময় ও যে সাহায্য করেছে, সেটা আপনি জানেন। তারপরও আপনি আমাকে সন্দেহ করেছেন।
আদ্রিয়ান মাথা নিচু করল।
—আমি ভুল করেছি।
মেহরিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—আপনি শুধু ভুল করেননি। আপনি আমাকে বিশ্বাস করেননি।
—মেহরিন...
—না। আজ আমাকে বলতে দিন।
তার গলা কেঁপে উঠল।
—আপনি সবসময় বলেন, আপনি আমাকে ভালোবাসেন। কিন্তু ভালোবাসার সঙ্গে বিশ্বাস না থাকলে সেটা কীভাবে সম্পর্ক হয়?
আদ্রিয়ান চুপ করে রইল।
মেহরিন বলল,
—আমি আপনাকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম। তাই পরিবারের বিরোধিতা সত্ত্বেও আপনার পাশে থেকেছি। আর আপনি প্রথম সুযোগেই আমাকে সন্দেহ করলেন।
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
—কিসের?
আদ্রিয়ান ধীরে বলল,
—তোমাকে হারানোর।
মেহরিনের চোখে পানি এসে গেল।
—আমাকে হারানোর ভয়েই আমাকে হারিয়ে ফেলবেন না যেন।
আদ্রিয়ান আর কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।
কিছুক্ষণ পর মেহরিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আদ্রিয়ান তাকে আটকায়নি।
কারণ সে বুঝেছিল, এই মুহূর্তে কোনো কথা বলেই মেহরিনের কষ্ট কমানো সম্ভব নয়।
সেদিনের পর দুজনের মধ্যে আবার দূরত্ব তৈরি হলো।
তবে এবার দূরত্বটা আগের মতো ছিল না।
আগে মেহরিন নিজে থেকে দূরে সরে গিয়েছিল পরিবারের কারণে।
এবার সে দূরে সরে গেল অভিমানে।
কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।
আদ্রিয়ান বারবার মেহরিনকে ফোন করল।
কখনো ধরল না।
মেসেজের উত্তরও দিল না।
শেষ পর্যন্ত আদ্রিয়ান নাবিলকে বলল,
—আমি ওকে সময় দেব।
নাবিল বলল,
—এবার তুই সত্যিই বদলেছিস।
—বদলাতে হয়েছে।
—কীভাবে?
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—ওকে ভালোবাসি বলেই ওকে নিজের মতো করে বাঁচতে দিতে হবে। সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো চাইলে তো ভালোবাসা হয় না।
এদিকে মেহরিনও নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
সে নতুন চাকরিতে যোগ দিল।
প্রথম কয়েকদিন কঠিন গেলেও ধীরে ধীরে সে মানিয়ে নিল।
নিজের কাজ, নিজের দায়িত্ব—সবকিছুর মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করল।
কিন্তু রাত হলেই পুরোনো কথাগুলো মনে পড়ত।
আদ্রিয়ানের সঙ্গে প্রথম দেখা।
বাসের সিট নিয়ে ঝগড়া।
গ্রামের বাড়ির উঠান।
ছাদের সেই রাত।
তারপর সেই স্বীকারোক্তি—
“আমি তোমাকে পছন্দ করি। খুব বেশি।”
মেহরিন চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলত।
সে জানত, আদ্রিয়ানের ওপর রাগ আছে।
কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য—
সে এখনো তাকে ভুলতে পারেনি।
একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় মেহরিন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ একটা গাড়ি এসে থামল।
আদ্রিয়ান নামল।
মেহরিন অবাক।
—আপনি এখানে?
—তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসিনি।
মেহরিন ভ্রু কুঁচকাল।
—তাহলে?
আদ্রিয়ান গাড়ির পেছনের দরজা খুলে একটা বাক্স বের করল।
—তোমার বাবার জন্য কিছু ওষুধ। নাবিল বলেছে এগুলো দরকার।
মেহরিন কিছুক্ষণ বাক্সটার দিকে তাকিয়ে রইল।
—আপনি নিজে কেন আনলেন?
—কারণ সুযোগ পেয়েছি।
মেহরিন কিছু বলতে পারল না।
আদ্রিয়ান বলল,
—তোমাকে কোনো উত্তর দিতে হবে না।
—আদ্রিয়ান...
—শুধু একটা কথা বলব।
মেহরিন তাকাল।
—আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে শিখছি। আর চাই না, আমার কোনো ভুলের জন্য তুমি আবার কষ্ট পাও।
মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।
আদ্রিয়ান গাড়িতে উঠে চলে গেল।
মেহরিন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, মানুষটা সত্যিই বদলাচ্ছে।
কিন্তু পুরোনো কষ্টটা এত সহজে মুছে যায় না।
কয়েক মাস পর মেহরিনের চাকরির কারণে তাকে অন্য শহরে বদলি করা হলো।
সে বিষয়টা আদ্রিয়ানকে জানাল না।
কিন্তু যাওয়ার আগের দিন নুসরাতকে বলল,
—আমি যদি চলে যাই, হয়তো সবকিছু সহজ হবে।
নুসরাত বলল,
—কী সহজ হবে?
—ওকে ভুলে যাওয়া।
—তুই কি সত্যিই সেটা চাস?
মেহরিন চুপ করে রইল।
তার চোখে উত্তরটা স্পষ্ট ছিল।
সে চায় না।
তবুও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
পরদিন সকালে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল মেহরিন।
হাতে ব্যাগ।
চোখে অনিশ্চয়তা।
বাস আসার ঠিক আগে তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
আদ্রিয়ান:
“তুমি কি সত্যিই চলে যাচ্ছ?”
মেহরিন চমকে উঠল।
সে জানত না, কে তাকে জানিয়েছে।
কিছুক্ষণ পর আরেকটা মেসেজ এল—
“তুমি যদি যাও, আমি তোমাকে আটকাব না। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—আমি এখনো তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”
মেহরিনের চোখে পানি জমে উঠল।
বাস এসে থামল।
সে একবার পেছনে তাকাল।
আদ্রিয়ান কোথাও নেই।
মেহরিন বাসে উঠে জানালার পাশে বসে পড়ল।
বাস ধীরে ধীরে শহর ছাড়তে শুরু করল।
আর অন্যদিকে, বহু দূরে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ান শুধু একটা কথাই ভাবছিল—
কিছু মানুষকে কাছে রাখতে চাইলেই কাছে রাখা যায় না। কখনো কখনো তাদের নিজের মতো করে চলে যাওয়ার সুযোগ দিতে হয়।
তাদের জীবনে তখন শুরু হলো দীর্ঘ এক বিচ্ছেদ।
ছয় বছর কেটে গেছে।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে।
শহরের রাস্তা বদলেছে, মানুষের জীবন বদলেছে, সম্পর্কের সংজ্ঞাও বদলেছে।
কিন্তু কিছু স্মৃতি আছে, যেগুলো সময় যতই পেরিয়ে যাক, মনের কোনো এক কোণে একই রকম থেকে যায়।
আদ্রিয়ান এখন আর আগের সেই জেদি, আবেগী ছেলেটা নেই।
ছয় বছরে সে নিজের ব্যবসাকে অনেক বড় করেছে। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও তার প্রতিষ্ঠানের কাজ ছড়িয়ে পড়েছে। এখন তার নাম শুনলে মানুষ একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবেই চেনে।
কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবনে একটা জায়গা এখনো খালি।
মেহরিনের জায়গা।
সে আর কখনো মেহরিনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি।
মেহরিনও করেনি।
প্রথম কয়েক বছর আদ্রিয়ান অপেক্ষা করেছিল।
তারপর একসময় বুঝেছিল, কিছু সম্পর্ককে জোর করে ধরে রাখা যায় না।
তবুও সে বিয়ে করেনি।
কেউ কারণ জানতে চাইলে শুধু বলেছে,
—সময় হলে করব।
কিন্তু সে নিজেও জানত, সেই সময়টা আসেনি।
অন্যদিকে মেহরিনও বদলে গেছে।
ছয় বছর আগে যে মেয়েটা ছোট্ট শহর থেকে নতুন চাকরির জন্য বের হয়েছিল, আজ সে নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত।
চাকরির পাশাপাশি সে উচ্চশিক্ষা শেষ করেছে।
এখন একটি বড় প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজ করে।
বাইরে থেকে দেখলে তার জীবন সম্পূর্ণ।
ভালো চাকরি।
নিজের ফ্ল্যাট।
নিজের সিদ্ধান্ত।
নিজের পরিচয়।
কিন্তু তার ড্রয়ারের একেবারে নিচের অংশে আজও একটা পুরোনো বই রাখা আছে।
সেই বইটা—
যেটা একদিন বাসে আদ্রিয়ান তার হাতে তুলে দিয়েছিল।
মেহরিন বইটা খুব কমই খোলে।
কারণ বইটা খুললেই ছয় বছর আগের সেই দিনগুলো সামনে চলে আসে।
প্রথম দেখা।
ঝগড়া।
হাসি।
রাতের ছাদ।
আদ্রিয়ানের সেই স্বীকারোক্তি।
আর শেষবারের সেই কথাটা—
“আমি এখনো তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”
মেহরিন কখনো উত্তর দেয়নি।
কিন্তু মন থেকে কথাটা কখনো মুছেও ফেলতে পারেনি।
এক শুক্রবার সকালে মেহরিনের অফিসে একটি মিটিং ছিল।
তার কোম্পানি একটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন প্রজেক্টে কাজ করবে।
মেহরিনকে প্রজেক্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মিটিংয়ের আগে সে ফাইলগুলো দেখছিল।
তখন তার বস এসে বললেন,
—মেহরিন, আজকের ক্লায়েন্ট সম্পর্কে তোমাকে একটা কথা বলি।
—জি?
—ওরা দেশের বড় কয়েকটা কোম্পানির মধ্যে একটা। মালিক নিজে আজ মিটিংয়ে আসবেন।
মেহরিন মাথা নেড়ে বলল,
—ঠিক আছে।
—নামটা জানো?
—না।
বস ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,
—আদ্রিয়ান রহমান।
মেহরিনের হাত থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড সে ফাইলের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
—স্যার, আপনি কী বললেন?
—আদ্রিয়ান রহমান।
মেহরিন ধীরে ফাইলটা বন্ধ করে দিল।
ছয় বছর ধরে যে নামটা সে নিজের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল, সেই নামটাই আজ আবার তার সামনে।
সে নিজেকে বোঝাল,
‘এটা শুধু একটা ব্যবসায়িক মিটিং।’
কিন্তু নিজের হৃদয়কে বোঝানো এত সহজ হলো না।
দুপুরে মিটিং রুমে সবাই বসে অপেক্ষা করছিল।
মেহরিন ল্যাপটপ খুলে প্রেজেন্টেশন প্রস্তুত করছিল।
তার হাত সামান্য কাঁপছিল।
ঠিক তখন দরজা খুলে গেল।
প্রথমে ঢুকলেন আদ্রিয়ানের সহকারী।
তারপর—
আদ্রিয়ান।
কালো স্যুট।
পরিপাটি চেহারা।
চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস।
কিন্তু মেহরিনের চোখে সে এখনো সেই বাসের ছেলেটাই।
যে প্রথম দিন তার সিট নিয়ে ঝগড়া করেছিল।
আদ্রিয়ানের চোখও ঘুরে মেহরিনের ওপর এসে থামল।
এক মুহূর্ত।
দুই মুহূর্ত।
পুরো ঘর যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আদ্রিয়ানের মুখের স্বাভাবিক ভাবটা এক মুহূর্তের জন্য বদলে গেল।
সে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
মেহরিন।
ছয় বছর পর।
একেবারে সামনে।
মেহরিন নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
—স্বাগতম।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—ধন্যবাদ।
কণ্ঠ দুজনেরই অদ্ভুতভাবে শান্ত।
যেন তারা কখনো একে অপরকে চিনতই না।
মিটিং শুরু হলো।
মেহরিন প্রেজেন্টেশন দিতে লাগল।
ব্যবসায়িক তথ্য, পরিকল্পনা, বাজেট—সবকিছু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাখ্যা করছিল সে।
আদ্রিয়ান মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
মাঝে মাঝে তার চোখ মেহরিনের মুখে আটকে যাচ্ছিল।
মেহরিন সেটা বুঝতে পারছিল।
কিন্তু তাকাচ্ছিল না।
মিটিং শেষ হওয়ার পর সবাই একে একে বেরিয়ে গেল।
রুমে শুধু দুজন রইল।
ছয় বছর পর।
একই ঘরে।
একেবারে একা।
আদ্রিয়ান প্রথম কথা বলল,
—তুমি কেমন আছ?
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—ভালো।
—শুনেছি তুমি অনেক ভালো করছ।
—আপনিও।
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—আমার খবর রাখো?
—ব্যবসায়িক খবর সবাই রাখে।
—শুধু ব্যবসায়িক?
মেহরিন এবার তার দিকে তাকাল।
—ছয় বছর অনেক লম্বা সময়, আদ্রিয়ান।
—হ্যাঁ।
—মানুষ বদলে যায়।
—সবাই?
মেহরিন উত্তর দিল না।
আদ্রিয়ান ধীরে বলল,
—তুমি বদলেছ।
—আপনিও।
—কতটা?
মেহরিন একটু হেসে বলল,
—আগের মতো রাগী মনে হচ্ছে না।
আদ্রিয়ানও হেসে ফেলল।
—আর তুমি আগের মতো ঝগড়া করো?
—প্রয়োজন হলে।
—আমার সঙ্গে?
মেহরিন এবার চোখ সরিয়ে বলল,
—এখন তো আমাদের সম্পর্ক শুধু কাজের।
কথাটা শুনে আদ্রিয়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—ঠিক।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর মেহরিন ফাইল গুছিয়ে বলল,
—আমাদের কাল আবার মিটিং আছে।
—জানি।
—তাহলে কাল দেখা হবে।
—হ্যাঁ।
মেহরিন দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক বের হওয়ার সময় আদ্রিয়ান পেছন থেকে বলল,
—মেহরিন।
সে থামল।
—কী?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তুমি কি সুখী?
মেহরিনের চোখে অদ্ভুত একটা ছায়া নেমে এল।
সে ধীরে বলল,
—এই প্রশ্নের উত্তর ছয় বছর আগে দিলে হয়তো অন্যরকম হতো।
আদ্রিয়ান বলল,
—আর এখন?
মেহরিন ফিরে তাকাল।
—এখন জানি না।
তারপর সে চলে গেল।
আদ্রিয়ান একা দাঁড়িয়ে রইল।
ছয় বছর ধরে সে ভেবেছিল, মেহরিনকে দেখলে হয়তো তার সব অনুভূতি শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু আজ বুঝল—
কিছু গল্প শেষ হয়ে যায় না। শুধু মাঝখানে কয়েক বছর নীরবতা থাকে।
আর সেই নীরবতার পর আবার যখন দুজন মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন পুরোনো প্রশ্নগুলোও ফিরে আসে।
সেদিন রাতে মেহরিন বাসায় ফিরে ড্রয়ার খুলল।
পুরোনো বইটা বের করল।
ধীরে ধীরে বইয়ের মাঝখানের সেই কাগজটা বের করল।
ছয় বছর আগের নিজের হাতের লেখা এখনো সেখানে।
সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বলল,
—কিছু মানুষ কি সত্যিই এত বছর পরেও মনে থাকে?
অন্যদিকে নিজের ঘরে বসে আদ্রিয়ানও জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
তার মনে একই প্রশ্ন—
“মেহরিন কি আমাকে এখনো একটুও মনে রেখেছে?”
পরদিন সকাল থেকেই মেহরিনের মনটা অস্থির।
অফিসে যাওয়ার পথে বারবার মনে হচ্ছিল, আজ আবার আদ্রিয়ানের সঙ্গে দেখা হবে।
গতকাল ছয় বছর পর প্রথম দেখা হওয়ার পর থেকেই পুরোনো স্মৃতিগুলো যেন একে একে ফিরে আসছে।
বাসের সেই প্রথম দিন।
সিট নিয়ে ঝগড়া।
গ্রামের বাড়ির উঠান।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়া রাতের ছাদ।
আদ্রিয়ানের বলা কথাগুলো।
তারপর ভুল বোঝাবুঝি।
আর শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদ।
মেহরিন নিজের মনকে বোঝাল,
‘সব শেষ হয়ে গেছে।’
কিন্তু মনটা যেন কিছুতেই সেই কথাটা মানতে চাইছিল না।
অফিসে পৌঁছাতেই তার সহকর্মী রায়হান এসে বলল,
—মেহরিন, আজকের মিটিংটা একটু পরে হবে।
—কেন?
—আদ্রিয়ান সাহেবের একটা জরুরি মিটিং আছে।
আদ্রিয়ানের নাম শুনতেই মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—ঠিক আছে।
দুপুরে মিটিং শুরু হলো।
আজ আগের দিনের তুলনায় পরিবেশটা কিছুটা স্বাভাবিক।
ব্যবসায়িক আলোচনা চলছিল।
কিন্তু হঠাৎ একটা বিষয় নিয়ে মেহরিন আর আদ্রিয়ানের মতের অমিল হলো।
মেহরিন বলল,
—আমার মনে হয় এই পরিকল্পনাটা আমাদের মূল গ্রাহকদের জন্য খুব বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
আদ্রিয়ান বলল,
—ঝুঁকি না নিলে বড় কাজ করা যায় না।
—ঝুঁকি নেওয়া আর অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নেওয়া এক নয়।
—তুমি আগের মতোই জেদি।
ঘরটা হঠাৎ নীরব হয়ে গেল।
আদ্রিয়ানও বুঝতে পারল, কথাটা ব্যবসায়িক আলোচনার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
মেহরিন ধীরে বলল,
—আর আপনি আগের মতোই নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক মনে করেন।
আদ্রিয়ান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—হয়তো।
মিটিং শেষ হয়ে গেল।
সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর মেহরিনও বের হতে যাচ্ছিল।
আদ্রিয়ান বলল,
—এক মিনিট।
মেহরিন থামল।
—কী?
—তোমার সঙ্গে ব্যক্তিগত একটা কথা আছে।
—কাজের বাইরে কোনো কথা বলতে চাই না।
—ছয় বছর পরেও?
মেহরিন চুপ।
আদ্রিয়ান ধীরে বলল,
—আমি তোমার কাছে একটা প্রশ্নের উত্তর চাই।
—কী প্রশ্ন?
—তুমি কি আমাকে কখনো ক্ষমা করেছিলে?
মেহরিনের চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
—আপনি কি কখনো নিজেকে ক্ষমা করেছিলেন?
আদ্রিয়ান কোনো উত্তর দিল না।
মেহরিন চলে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় মেহরিন বাসায় ফেরার পর তার বাবা তাকে ডাকলেন।
সালেহ সাহেব এখন অনেকটাই বয়স্ক হয়েছেন।
মেহরিন কাছে গিয়ে বসতেই তিনি বললেন,
—আজ তোমার সঙ্গে একটা কথা বলব।
—কী?
—আদ্রিয়ান ফিরে এসেছে, তাই না?
মেহরিন চমকে তাকাল।
—আপনি জানেন?
—ব্যবসার জগতে ওর নাম এখন অনেক বড়। খবর না জানার উপায় আছে?
মেহরিন চুপ করে রইল।
সালেহ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তুমি কি এখনো ওকে ভালোবাসো?
মেহরিনের চোখে পানি এসে গেল।
সে উত্তর দিল না।
বাবা ধীরে বললেন,
—চুপ থাকা মানেই উত্তর বুঝি।
মেহরিন মাথা নিচু করল।
—আব্বু, এত বছর পর এসব কেন বলছেন?
—কারণ একটা কথা তোমার জানা দরকার।
মেহরিন বাবার দিকে তাকাল।
—কী কথা?
সালেহ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—ছয় বছর আগে তোমার আর আদ্রিয়ানের সম্পর্ক ভাঙার পেছনে শুধু আমাদের আপত্তি ছিল না।
মেহরিনের বুক ধক করে উঠল।
—মানে?
—তখন তুমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে, সেটা তোমার নিজের সিদ্ধান্ত ছিল না পুরোপুরি।
—আমি বুঝতে পারছি না।
বাবা বললেন,
—তোমার চাকরির বদলির খবর, পরিবারের কিছু কথা, আর আদ্রিয়ানের ব্যাপারে যে কিছু ভুল তথ্য তোমার কাছে পৌঁছেছিল... তার কিছু অংশ তোমাকে ইচ্ছে করেই জানানো হয়েছিল।
মেহরিন হতভম্ব।
—কে করেছিল?
সালেহ সাহেব চোখ নামিয়ে বললেন,
—তোমার চাচাতো ভাই ফাহিম।
মেহরিন যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
—ফাহিম?
—হ্যাঁ। সে তখন তোমার ভালোর কথা বলে অনেক কিছু বলেছিল। কিন্তু পরে বুঝেছি, তার নিজের কিছু স্বার্থ ছিল।
মেহরিনের চোখে পানি জমে গেল।
—আপনি আমাকে আগে বলেননি কেন?
—কারণ তখন তুমি এতটাই ভেঙে পড়েছিলে যে আর কিছু বলতে পারিনি।
মেহরিন উঠে দাঁড়াল।
—তাহলে আদ্রিয়ান...?
বাবা ধীরে বললেন,
—ওর ব্যাপারে তুমি যে কিছু কথা বিশ্বাস করেছিলে, তার সব সত্যি ছিল না।
মেহরিনের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
ছয় বছর ধরে সে যে গল্পটা নিজের মনে ধরে রেখেছিল, তার একটা বড় অংশ যদি ভুল হয়?
তাহলে তাদের বিচ্ছেদ কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল?
সেদিন রাতে মেহরিন ফাহিমকে ফোন করল।
—তুমি কি আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে?
ফাহিম কিছুটা অস্বস্তিতে বলল,
—কেন?
—ছয় বছর আগের কিছু কথা জানতে চাই।
ওপাশে নীরবতা।
মেহরিন বুঝতে পারল, কিছু একটা লুকানো হচ্ছে।
পরদিন তারা দেখা করল।
মেহরিন সরাসরি বলল,
—তুমি কি আদ্রিয়ানের ব্যাপারে আমাকে ভুল তথ্য দিয়েছিলে?
ফাহিম প্রথমে অস্বীকার করল।
—না।
—সত্যি বলো।
—আমি...
—ছয় বছর ধরে আমি একটা মানুষকে ভুল বুঝে দূরে থেকেছি। এবার সত্যিটা জানতে চাই।
ফাহিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—আমি তখন একটা ভুল করেছিলাম।
মেহরিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
—কী ভুল?
—আমি শুনেছিলাম, আদ্রিয়ান বিদেশে গিয়ে অন্য একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে।
—কী?
—কিন্তু সেটা সত্যি ছিল না।
মেহরিনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—তুমি আমাকে কেন বলেছিলে?
ফাহিম মাথা নিচু করে বলল,
—আমি ভেবেছিলাম, তোমাদের সম্পর্ক টিকলে আমাদের পরিবারের কিছু সমস্যার সৃষ্টি হবে। তাই...
মেহরিন আর শুনতে পারল না।
সে উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
আদ্রিয়ান তাকে কখনো ছেড়ে যেতে চায়নি।
আর সে?
সে বিশ্বাস করেছিল অন্যের কথা।
সেদিন রাতেই মেহরিন আদ্রিয়ানকে ফোন করল।
আদ্রিয়ান ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কোনো কথা এল না।
—হ্যালো?
মেহরিন ধীরে বলল,
—আপনি কি আমার সঙ্গে দেখা করবেন?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—কেন?
—কিছু কথা জানতে চাই।
—কী কথা?
—ছয় বছর আগের কথা।
আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—ঠিক আছে।
পরদিন তারা সেই পুরোনো ক্যাফেতে দেখা করল।
যেখানে ছয় বছর আগে আদ্রিয়ান প্রথমবার নিজের অনুভূতির কথা বলেছিল।
দুজন মুখোমুখি বসে রইল।
মেহরিন প্রথমেই বলল,
—আমি একটা সত্যি জেনেছি।
আদ্রিয়ান চুপ করে তাকিয়ে রইল।
—ছয় বছর আগে আপনি আমাকে ছেড়ে যেতে চাননি, তাই না?
আদ্রিয়ানের চোখে বিস্ময়।
—কে বলেছে?
—সত্যিটা জেনেছি।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে যেতে চাইনি।
মেহরিনের চোখ ভিজে গেল।
—তাহলে এত বছর আমাকে খুঁজলেন না কেন?
—কারণ তুমি আমাকে স্পষ্ট করে বলেছিলে, তুমি আর এই সম্পর্ক রাখতে চাও না।
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
—আর আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে আর চাও না।
দুজনেই চুপ।
ছয় বছর ধরে জমে থাকা ভুল বোঝাবুঝিগুলো যেন একে একে সামনে এসে দাঁড়াল।
মেহরিন বলল,
—আমরা কি খুব সহজেই একে অপরকে হারিয়ে ফেলেছিলাম?
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—হয়তো আমরা দুজনেই তখন খুব কম বুঝতাম।
মেহরিন চোখ মুছে বলল,
—এখন?
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এখন বুঝি, কাউকে ভালোবাসলে শুধু তাকে পাওয়া নয়, তার ওপর বিশ্বাস রাখাটাও জরুরি।
মেহরিনের ঠোঁটে অল্প হাসি ফুটল।
—আপনি অনেক বদলে গেছেন।
—তুমিও।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর মেহরিন ধীরে বলল,
—আমি একটা কথা বলতে চাই।
—বল।
—আমি এখনো আপনাকে ভুলতে পারিনি।
আদ্রিয়ানের চোখে অদ্ভুত এক আলো ফুটে উঠল।
কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিল না।
শুধু বলল,
—আমাদের ছয় বছর আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।
মেহরিন মাথা নেড়ে বলল,
—আমি আগের জায়গায় ফিরতে চাইও না।
—তাহলে?
মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—নতুন করে শুরু করতে চাই।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
—এবার কিন্তু সিট নিয়ে ঝগড়া করা যাবে না।
মেহরিন হেসে ফেলল।
—আপনি এখনো ওই কথা মনে রেখেছেন?
—সবকিছু।
তাদের চোখে তখন ছয় বছরের অপেক্ষার ক্লান্তি ছিল।
কিন্তু সেই ক্লান্তির মাঝেও ছিল নতুন আশার আলো।
তবুও একটা বড় প্রশ্ন সামনে—
মেহরিনের বাবা কি এবার তাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন?
পরদিন সকাল থেকেই মেহরিনের মনটা অদ্ভুত শান্ত।
গত ছয় বছর ধরে যে প্রশ্নটা তাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিয়েছে, তার উত্তর সে অবশেষে পেয়েছে।
আদ্রিয়ান তাকে ছেড়ে যেতে চায়নি।
সে-ও আদ্রিয়ানকে ভুলতে পারেনি।
তাদের মাঝখানে যা ছিল, তার বড় একটা অংশই ছিল ভুল বোঝাবুঝি।
কিন্তু সত্যিটা জানার পরও মেহরিন জানত, সামনে সবচেয়ে কঠিন কাজটা এখনো বাকি।
তার বাবাকে রাজি করানো।
সন্ধ্যায় মেহরিন বাবার ঘরে গেল।
সালেহ সাহেব চুপচাপ বই পড়ছিলেন।
মেহরিন সামনে গিয়ে বসতেই তিনি বই বন্ধ করলেন।
—কথা বলবে?
—হ্যাঁ।
—আদ্রিয়ানের সঙ্গে দেখা হয়েছে?
মেহরিন মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—তুমি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছ?
মেহরিন ধীরে বলল,
—আমি ওকে আবার একটা সুযোগ দিতে চাই।
সালেহ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তুমি নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
—ছয় বছর আগে যা হয়েছিল, সেটা ভুলে গেছ?
—না। ভুলিনি। বরং সেই কারণেই এবার তাড়াহুড়ো করতে চাই না।
বাবা তাকিয়ে রইলেন।
মেহরিন বলল,
—আমি জানি, আপনি তখন আমাকে কষ্ট থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আমি কী চাই, সেটা হয়তো আমরা কেউই ঠিকমতো বুঝিনি।
সালেহ সাহেব কিছু বললেন না।
—আদ্রিয়ান বদলেছে, আব্বু। আমিও বদলেছি। আমরা যদি আবার শুরু করি, এবার নিজেরা সবকিছু বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে চাই।
বাবা ধীরে বললেন,
—তুমি কি মনে করো, ও তোমাকে এখনো আগের মতোই চায়?
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
—ছয় বছর অপেক্ষা করার পরও যদি চায়, তাহলে মনে হয় উত্তরটা পরিষ্কার।
সালেহ সাহেবের চোখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
—তাহলে ওকে একদিন নিয়ে এসো।
মেহরিন যেন বিশ্বাসই করতে পারল না।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
মেহরিনের চোখে পানি চলে এল।
সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
—ধন্যবাদ, আব্বু।
সালেহ সাহেব মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তোমার সুখটাই চাই। তবে এবার একটা কথা মনে রেখো—সম্পর্কে কোনো সমস্যা হলে নিজেদের মধ্যে কথা বলবে। অন্য কারও কথায় সিদ্ধান্ত নেবে না।
মেহরিন মাথা নেড়ে বলল,
—কথা দিচ্ছি।
পরদিন মেহরিন আদ্রিয়ানকে ফোন করল।
—হ্যালো?
—আপনি কি ব্যস্ত?
—তোমার ফোনের জন্য কখনো ব্যস্ত নই।
মেহরিন হেসে ফেলল।
—একটা কথা ছিল।
—বল।
—আব্বু আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—তুমি নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
—মেহরিন, আমি জানি না কী বলব।
—কিছু বলতে হবে না। শুধু সত্যিটা বলবেন।
—আমি ভয় পাচ্ছি।
মেহরিন অবাক হয়ে হেসে বলল,
—আপনি এখনো ভয় পান?
—তোমার বাবার সামনে ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক।
—যে মানুষ ছয় বছর অপেক্ষা করতে পারে, সে আমার বাবার সামনে দাঁড়াতেও পারবে।
আদ্রিয়ান হেসে বলল,
—ঠিক আছে। আমি আসব।
সন্ধ্যায় আদ্রিয়ান মেহরিনদের বাড়িতে এল।
ছয় বছর আগে যে বাড়ির দরজা থেকে সে নীরবে বেরিয়ে গিয়েছিল, আজ সেই দরজায় আবার দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাতে কিছু ফল আর মিষ্টি।
মেহরিন দরজা খুলে তাকে দেখে মুচকি হাসল।
—এত কিছু কেন?
—জানি না। খালি হাতে আসতে অস্বস্তি লাগছিল।
—ভেতরে আসুন।
আদ্রিয়ান ভেতরে ঢুকল।
সালেহ সাহেব বসার ঘরে অপেক্ষা করছিলেন।
আদ্রিয়ান গিয়ে সালাম করল।
—আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।
—ওয়ালাইকুম আসসালাম। বসো।
আদ্রিয়ান বসল।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
সালেহ সাহেব বললেন,
—ছয় বছর আগে তুমি যখন এখানে এসেছিলে, তখনও তোমার চোখে একই জেদ দেখেছিলাম।
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—জেদ ছিল।
—এখন?
—এখন বুঝি, সবকিছু জোর করে পাওয়া যায় না।
সালেহ সাহেব তাকিয়ে রইলেন।
—মেহরিনকে নিয়ে তোমার ইচ্ছা কী?
আদ্রিয়ান এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
—আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।
মেহরিন পাশের ঘর থেকে কথাটা শুনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
সালেহ সাহেব বললেন,
—তুমি কি নিশ্চিত? ছয় বছর পরও?
—হ্যাঁ।
—কেন?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—কারণ ছয় বছরে আমি অনেক মানুষ দেখেছি, অনেক জায়গায় গিয়েছি, অনেক কিছু পেয়েছি। কিন্তু মেহরিনের জায়গাটা কখনো কেউ নিতে পারেনি।
সালেহ সাহেবের চোখ নরম হয়ে গেল।
—আর যদি আবার কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়?
আদ্রিয়ান বলল,
—তাহলে এবার কারও কথা শুনে সিদ্ধান্ত নেব না। সরাসরি ওর সঙ্গে কথা বলব।
সালেহ সাহেব মৃদু হাসলেন।
—তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই।
আদ্রিয়ান যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
—মানে?
—আমি রাজি।
মেহরিনের চোখে পানি চলে এল।
আদ্রিয়ানও মাথা নিচু করে কয়েক সেকেন্ড বসে রইল।
ছয় বছর আগে যে দরজা থেকে সে কষ্ট নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, আজ সেই বাড়িতেই তাকে আবার স্বাগত জানানো হলো।
কয়েক মাস পর।
বিয়ের দিন।
বাড়ি আলোয় ঝলমল করছে।
উঠানে আত্মীয়স্বজনের ভিড়।
মেহরিন সাজঘরে বসে আছে।
নুসরাত পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—কী ভাবছিস?
মেহরিন হেসে বলল,
—ভাবছি, ছয় বছর আগে যে ছেলেটার সঙ্গে বাসে সিট নিয়ে ঝগড়া করেছিলাম, আজ তাকেই বিয়ে করতে যাচ্ছি।
নুসরাত হেসে বলল,
—তখন কি ভেবেছিলি এমন হবে?
—একদম না।
—আর এখন?
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—এখন মনে হয়, কিছু মানুষকে হারিয়ে ফেললেও গল্পটা শেষ হয় না।
অন্যদিকে বরযাত্রী নিয়ে আদ্রিয়ান এসে পৌঁছেছে।
নাবিল তাকে বলল,
—কী রে? এত চুপ কেন?
আদ্রিয়ান হেসে বলল,
—ভাবছি।
—কী?
—প্রথম দিন ওর সঙ্গে ঝগড়া না করলে হয়তো আজকের দিনটা আসত না।
নাবিল হেসে বলল,
—তাহলে তোর জীবনের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত ছিল সিট নিয়ে ঝগড়া করা।
আদ্রিয়ানও হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর মেহরিনকে নিয়ে আসা হলো।
আদ্রিয়ান তাকিয়ে রইল।
ছয় বছর আগের সেই মেয়েটার মধ্যে আর আজকের মেহরিনের মধ্যে অনেক পার্থক্য।
কিন্তু চোখ দুটো একই।
শান্ত।
গভীর।
চেনা।
মেহরিনও আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কোনো কথা হলো না।
তবুও দুজনেই যেন অনেক কিছু বলে ফেলল।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর রাতে দুজন কিছুক্ষণ ছাদে দাঁড়াল।
আকাশে চাঁদ।
মেহরিন রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—মনে আছে, একবার এইরকম রাতে আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, দূরত্ব কমিয়ে দেব কি না?
আদ্রিয়ান হেসে বলল,
—মনে আছে।
—তখন আমি উত্তর দিতে পারিনি।
—এখন পারো?
মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এখন তো দূরত্বই নেই।
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—একটা কথা বলি?
—বলুন।
—আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল ঝগড়া দিয়ে।
—হ্যাঁ।
—তারপর হারিয়ে গিয়েছিলাম ছয় বছরের জন্য।
—হ্যাঁ।
—এবার আর হারিয়ে যেতে চাই না।
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
—এবার যদি হারিয়ে যান, আমি কিন্তু খুঁজে বের করব।
আদ্রিয়ান হেসে বলল,
—তাহলে ভয় নেই।
দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।
ছয় বছর আগে যে গল্পটা ভুল বোঝাবুঝির কারণে থেমে গিয়েছিল, আজ সেই গল্প নতুন করে শুরু হলো।
তাদের জীবনে এবার আর কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না যে সবসময় সবকিছু সহজ হবে।
কিন্তু একটা জিনিস তারা শিখেছিল—
ভালো সম্পর্ক শুধু কাছে থাকার নাম নয়। বিশ্বাস, সম্মান আর ভুল হলে কথা বলে ঠিক করে নেওয়ার নামও সম্পর্ক।
....