খালাতো ভাই যখন জীবনসঙ্গী

শহরের এক ব্যস্ত এলাকায় রোহানের বাড়ি। চারপাশে বড় বড় দালান, গাড়ির শব্দ আর মানুষের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে একেবারে শহুরে পরিবেশ।

অন্যদিকে, অনেক দূরের এক গ্রামে থাকত আরিয়া। সবুজে ঘেরা শান্ত সেই গ্রাম। বাড়ির সামনে পুকুর, চারপাশে গাছপালা আর বিকেল হলেই পাখির ডাক—শহরের কোলাহল থেকে একেবারেই আলাদা।

রোহান আর আরিয়া ছিল খালাতো ভাই-বোন। বয়সের ব্যবধানও ছিল বেশ। রোহান আরিয়ার চেয়ে প্রায় আট বছরের বড়।

দুই পরিবারের সম্পর্ক ছিল খুবই ভালো। রোহানের মা আরিয়ার মা ছিলেন আপন বোন। তাই এক বাড়ির কোনো অনুষ্ঠান মানেই অন্য বাড়ির সবাই সেখানে উপস্থিত। ঈদ, বিয়ে, জন্মদিন কিংবা কোনো সাধারণ ছুটির দিন—সুযোগ পেলেই সবাই একে অপরের বাড়িতে যেত।

আর শহরে রোহানের নানির বাড়িটাও ছিল।

সেই কারণে আরিয়া যখন মাঝে মাঝে নানির বাড়িতে বেড়াতে আসত, তখন রোহানের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত।

ছোটবেলায় আরিয়া ছিল ভীষণ শান্ত স্বভাবের। অন্য বাচ্চারা যখন উঠানে ছুটোছুটি করত, তখন আরিয়া হয়তো এক কোণে বসে পুতুল নিয়ে খেলত। কারও সঙ্গে বেশি কথা বলত না। অপরিচিত মানুষের সামনে তো আরও চুপ হয়ে যেত।

কিন্তু রোহান ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সে ছিল ভীষণ চঞ্চল। সারাক্ষণ দৌড়ঝাঁপ, হাসাহাসি, দুষ্টুমি—কোনো কিছুতেই তার ক্লান্তি ছিল না। বাড়ির সবাই মজা করে তাকে ‘গুণ্ডা’ বলত।

রোহানের বড় ভাইয়েরাও ছিল বেশ দুষ্টু।

আরিয়া যখন ছোট ছিল, তখন সে নানির বাড়িতে এলেই রোহানের বড় ভাইরা তাকে ঘিরে নানা রকম মজা করত।

একদিন সবাই মিলে আরিয়াকে বলল,

—এই আরিয়া, তোর বিয়ে কিন্তু রোহানের সঙ্গেই দেব!

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ গোমড়া করে ফেলেছিল।

—না!

সবাই হেসে উঠেছিল।

—কেন? রোহানকে পছন্দ না?

আরিয়া তখন কিছু না বলে দৌড়ে নানির কাছে চলে গিয়েছিল।

দূর থেকে রোহান সব শুনে হেসে বলেছিল,

—ওকে এত জ্বালাচ্ছ কেন? ও তো এখনই পালিয়ে যাবে!

আরিয়া পেছন ফিরে একবার রোহানের দিকে তাকিয়েছিল। তারপর আবার মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল।

সময় এভাবেই কেটে যেতে লাগল।

ছোট্ট আরিয়া ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। রোহানও আগের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল হয়ে উঠল। তবে তার দুষ্টুমি একটুও কমেনি।

কয়েক বছর পর একবার আরিয়া নানির বাড়িতে বেড়াতে এলো।

সেদিন বিকেলে বাড়ির উঠানে বসে ছিল আরিয়া। হাতে একটা বই। চারপাশে সবাই গল্প করলেও সে নিজের মতো চুপচাপ বই পড়ছিল।

হঠাৎ রোহান এসে সামনে দাঁড়াল।

—কী করিস?

আরিয়া বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,

—দেখতেই তো পাচ্ছিস।

রোহান অবাক হয়ে তাকাল।

—ওহ! এখন আবার আমার সঙ্গে কথাও বলবি না?

আরিয়া এবার বই বন্ধ করে তাকাল।

—আমি তো কথা বলছি।

—এইটুকু কথা? তোর এত অহংকার কেন বল তো?

আরিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,

—আমার আবার অহংকার কোথায়?

রোহান হেসে বলল,

—সবার সঙ্গে কথা বলিস না, সবসময় চুপচাপ থাকিস। মনে হয় পৃথিবীর সব মানুষ তোর সঙ্গে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করে আছে!

আরিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,

—তুই শুধু আমাকে জ্বালাতে আসিস।

—হ্যাঁ। কারণ তোকে জ্বালালে মজা লাগে।

আরিয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল।

কিন্তু মুখের কোণে খুব ছোট একটা হাসি ফুটে উঠেছিল।

রোহান সেটা দেখে ফেলেছিল।

এরপর থেকে দেখা হলেই তাদের মধ্যে এমন খুনসুটি চলত।

কখনো রোহান আরিয়াকে ভয় দেখাত। কখনো আরিয়ার বই লুকিয়ে রাখত। আবার কখনো আরিয়া রোহানের কোনো দুষ্টুমির কথা নানিকে বলে দেওয়ার ভয় দেখাত।

ধীরে ধীরে আরিয়াও রোহানের সঙ্গে স্বাভাবিক হতে শুরু করল।

তবে আরিয়া তার দুই বড় ভাইকে খুব ভয় পেত।

আরিয়ার নিজের দুই ভাই ছিল। দুজনই তার চেয়ে অনেক বড়। তারা বোনকে খুব ভালোবাসত, কিন্তু একই সঙ্গে খুব কড়া নজরেও রাখত।

আরিয়া কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে কথা বলছে—সবকিছুতেই তাদের খেয়াল থাকত।

তাই রোহানের সঙ্গে যতই খুনসুটি হোক, আরিয়া সবসময় একটা সীমা বজায় রাখত।

রোহান মাঝে মাঝে গ্রামে আরিয়াদের বাড়িতেও যেত। খালার বাড়ি বলে সেখানে তার অবাধ যাতায়াত ছিল।

সে বাড়িতে ঢুকেই হৈচৈ শুরু করে দিত।

—খালা! আমি কিন্তু অনেক ক্ষুধার্ত!

আরিয়ার মা হেসে বলতেন,

—তুই এলেই শুধু খাওয়ার কথা মনে পড়ে?

—আমি তো অতিথি!

আরিয়া দূর থেকে শুনে বলত,

—অতিথি না, ঝামেলা!

রোহান সঙ্গে সঙ্গে বলত,

—এই যে! আবার শুরু করেছে!

সবাই হেসে উঠত।

এভাবেই তাদের সম্পর্কের মধ্যে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসতে লাগল।

শৈশবের সেই দুষ্টুমি আর খুনসুটির জায়গায় তৈরি হলো এক ধরনের আলাদা টান। কেউ কাউকে কিছু বলত না। এমনকি নিজেরাও ঠিক বুঝত না, এই অনুভূতির নাম কী।

একদিন আরিয়া নানির বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।

সন্ধ্যার সময়।

আকাশে তখন হালকা কমলা রং।

নিচের রাস্তা দিয়ে রোহান সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে আরিয়াকে ছাদে দেখতে পেল।

সাইকেলের গতি ধীরে গেল।

রোহান মাথা তুলে একবার তাকাল।

আরিয়াও তাকিয়ে ছিল।

দুজনের চোখাচোখি হতেই আরিয়া দ্রুত অন্যদিকে তাকিয়ে ফেলল।

রোহান মুচকি হেসে আবার সাইকেল চালিয়ে চলে গেল।

এমন ঘটনা মাঝে মাঝেই ঘটতে লাগল।

আরিয়া ছাদে দাঁড়ালে রোহান অকারণে নানির বাড়ির আশেপাশে সাইকেল নিয়ে ঘুরত।

আরিয়া জানত।

রোহানও জানত যে আরিয়া জানে।

তবু কেউ কিছু বলত না।

কিন্তু তাদের এই নীরব বোঝাপড়ার সময়টা বেশিদিন স্থায়ী হলো না।

একদিন এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা তাদের সম্পর্কের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দিল।

সেদিন আরিয়া নানির বাড়িতে ছিল।

বিকেলে রোহান বাইরে থেকে এসে তাকে দেখতে পেল। হাতে একটা ছোট কাগজ ছিল তার।

রোহান দূর থেকে কাগজটা ভাঁজ করে আরিয়ার দিকে ছুড়ে দিল।

আরিয়া অবাক হয়ে কাগজটা তুলে নিল।

কাগজের ভেতরে ছিল কয়েকটি গানের লাইন।

আরিয়ার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

কিন্তু সে জানত না, সেই ছোট্ট কাগজটাই খুব শিগগির তাদের জীবনে বড় ঝড় ডেকে আনবে।

কারণ আরিয়ার ছোট খালা কাগজটি দেখতে পেয়ে ফেলেছিলেন।

আর এরপর সেই চিঠি চলে গেল আরিয়ার বড় ভাইয়ের হাতে।

সেদিনের পর আরিয়ার জীবন আর আগের মতো থাকল না।

আরিয়ার হাতে থাকা ছোট্ট কাগজটা তার ছোট খালার চোখে পড়তেই সবকিছু যেন মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল।

খালা কাগজটা হাতে নিয়ে খুলে দেখলেন। কয়েক লাইন লেখা। গানের মতো করে লেখা কথাগুলো পড়েই তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

—এটা কে দিয়েছে?

আরিয়া কিছু বলল না।

—আরিয়া, আমি জিজ্ঞেস করছি, এটা কে দিয়েছে?

আরিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার নীরবতাই যেন সব বলে দিল।

খালা আর কিছু না বলে কাগজটা নিয়ে আরিয়ার বড় ভাইয়ের কাছে চলে গেলেন।

বড় ভাই কাগজটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তারপর চোখ তুলে আরিয়ার দিকে তাকাল।

সেই দৃষ্টি দেখেই আরিয়ার বুক কেঁপে উঠল।

—আমার সঙ্গে আয়।

আরিয়া ভয়ে বলল,

—ভাইয়া, আমি...

—কিছু বলবি না। বাড়ি চল।

আরিয়া বুঝতে পারছিল, আজ বড় কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

নানির বাড়ি থেকে তাকে নিয়ে সরাসরি নিজেদের বাড়িতে চলে গেল তার ভাই।

বাড়িতে ঢোকার পর আরিয়ার মা বিষয়টা বুঝতে পেরে ছুটে এলেন।

—কী হয়েছে?

বড় ভাই কোনো উত্তর না দিয়ে চিঠিটা মায়ের হাতে দিল।

চিঠিটা পড়ে আরিয়ার মা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।

—আরিয়া, এটা কী?

আরিয়া চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

সে জানত, সত্যিটা বললেও সমস্যা হবে, না বললেও সমস্যা হবে।

কিছুক্ষণ পর তার ভাই রাগে বলল,

—কতবার বলেছি, এসব কিছুতে জড়াবি না!

আরিয়া কাঁপা গলায় বলল,

—আমি কিছু করিনি ভাইয়া।

কিন্তু রাগের মাথায় ভাই তার কথা শুনতে চাইল না।

সেদিন আরিয়াকে খুব বকাঝকা করা হলো। এমনকি তাকে শাস্তিও দেওয়া হলো।

আরিয়া কান্নায় ভেঙে পড়ল।

তার মা বারবার বলছিলেন,

—থামো, মেয়েটাকে আর বকো না।

কিন্তু ভাইয়ের রাগ তখন এতটাই বেশি ছিল যে কারও কথা সে শুনছিল না।

সেদিনের পর আরিয়া অনেকটাই বদলে গেল।

আগে নানির বাড়িতে যাওয়ার জন্য সে নিজেই আগ্রহ দেখাত। কিন্তু এখন নানির বাড়ির কথা উঠলেই সে চুপ হয়ে যেত।

রোহানকে দেখার ভয় নয়, বরং তার কারণে আবার কোনো সমস্যা হবে—এই ভয়টাই তাকে গ্রাস করেছিল।

অন্যদিকে রোহান কিছুই বুঝতে পারছিল না।

সে ভাবছিল, আরিয়া হঠাৎ নানির বাড়িতে আসা কমিয়ে দিল কেন?

একদিন সে তার মাকে জিজ্ঞেস করল,

—মা, আরিয়া এখন আর নানির বাড়িতে আসে না কেন?

রোহানের মা একটু থেমে বললেন,

—ওর ভাইয়েরা হয়তো ব্যস্ত থাকে। তাই আসতে পারে না।

রোহান আর কিছু বলল না।

কিন্তু তার মনে প্রশ্ন থেকেই গেল।

কয়েকদিন পর সে আরিয়াদের গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু।

বিকেলের দিকে রোহানরা আরিয়াদের বাড়িতে পৌঁছাল।

বাড়িতে ঢুকেই রোহান হাসতে হাসতে বলল,

—খালা, কেমন আছো?

আরিয়ার মা হেসে বললেন,

—ভালো আছি। তোরা এতদিন পর এলি!

—আরিয়া কোথায়?

প্রশ্নটা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোহান নিজেই একটু থেমে গেল।

তার বন্ধুরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

আরিয়ার মা বিষয়টা বুঝলেও কিছু বললেন না।

—ও ঘরে আছে।

রোহান স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,

—ওকে ডাকো না?

আরিয়ার মা ডাকলেন,

—আরিয়া! মা, এদিকে আয়। রোহানরা এসেছে।

ঘরের ভেতরে বসে থাকা আরিয়ার বুক ধক করে উঠল।

রোহান এসেছে!

এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, দরজা খুলে বাইরে যাবে।

কিন্তু পরক্ষণেই বড় ভাইয়ের রাগী মুখটা মনে পড়ে গেল।

সে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল।

জানালাটাও আটকে দিল।

বাইরে থেকে আবার মায়ের ডাক এল।

—আরিয়া, বের হবি না?

আরিয়া কোনো উত্তর দিল না।

রোহান কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল।

তারপর আরিয়ার মা নাশতা নিয়ে এলেন।

—তোমরা বসো, আমি নাশতা দিচ্ছি।

রোহান নাশতা হাতে নিলেও তার চোখ বারবার বাড়ির ভেতরের দিকে যাচ্ছিল।

—খালা, আরিয়া কি ঘুমাচ্ছে?

—হয়তো। আজকাল একটু চুপচাপ থাকে।

রোহান মাথা নেড়ে চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পর বন্ধুরা তাকে ডাকল।

—চল, এবার যাই।

রোহান উঠল।

কিন্তু বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে সে একবার চারপাশে তাকাল।

আরিয়াকে কোথাও দেখা গেল না।

সে উঠানের একপাশে গেল।

তারপর বাড়ির পেছনের দিকেও তাকাল।

কিন্তু কোথাও আরিয়া নেই।

অবশেষে রোহানদের চলে যেতে হলো।

ঘরের ভেতর থেকে আরিয়া জানালার ছোট্ট ফাঁক দিয়ে সবকিছু দেখছিল।

সে দেখল, রোহান বাড়ির চারপাশে ঘুরে তাকে খুঁজছে।

একসময় রোহান গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আবার বাড়িটার দিকে তাকাল।

আরিয়া অজান্তেই মুচকি হাসল।

কতদিন পর সে রোহানকে দেখল!

তার ভেতরের জমে থাকা কষ্টের মাঝেও যেন একটু আলো ফুটে উঠল।

রোহানরা চলে যাওয়ার পর আরিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর নিজের মনেই বলল,

—এত পাগলামি করে কেন ছেলেটা?

তার ঠোঁটে আবারও হালকা হাসি ফুটে উঠল।

কিছুক্ষণ পর আরিয়ার দুই ভাই বাড়িতে ফিরল।

বড় ভাই মাকে জিজ্ঞেস করল,

—মা, আজ রোহানরা এসেছিল?

—হ্যাঁ।

আরিয়ার ভাই সঙ্গে সঙ্গে আরিয়ার ঘরের দিকে তাকাল।

আরিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

দুই ভাইয়ের চোখাচোখি হতেই আরিয়া দ্রুত সরে গেল।

বড় ভাই কিছু বলল না।

শুধু কয়েক সেকেন্ড বড় বড় করে তাকিয়ে থেকে নিজের ঘরে চলে গেল।

সেই দৃষ্টি আরিয়ার মনে ভয় ঢুকিয়ে দিল।

দিন কেটে যেতে লাগল।

আরিয়া আবার স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু করল।

কিন্তু গ্রামের এক ছেলে তাকে প্রায়ই বিরক্ত করতে শুরু করল।

স্কুল থেকে ফেরার সময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত। কখনো অকারণে কথা বলার চেষ্টা করত। কখনো পিছু নিত।

প্রথম দিকে আরিয়া বিষয়টা এড়িয়ে যেত।

কিন্তু একদিন ছেলেটা সীমা ছাড়িয়ে গেলে আরিয়া বাড়িতে এসে তার বড় ভাইকে সব বলে দিল।

ভাইয়ের মুখ সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে গেল।

—ছেলেটাকে চিনিস?

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

—ঠিক আছে। কাল থেকে আর কিছু হবে না।

পরদিন তার ভাই সেই ছেলেটাকে ডেকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিল।

—আরিয়াকে আর কখনো বিরক্ত করবি না। বুঝেছিস?

ছেলেটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

আরিয়া ভেবেছিল, এবার হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু সে জানত না, এই ছেলেটা অপমানটা এত সহজে ভুলবে না।

আর কয়েকদিন পরই সেই অপমানের ভয়ংকর প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে।

এক বিকেলে আরিয়া একা দোকানে গেল কিছু জিনিস কিনতে।

দোকান থেকে ফেরার সময় গ্রামের রাস্তাটা অস্বাভাবিকভাবে ফাঁকা ছিল।

আরিয়া চারপাশে তাকাল।

কেউ নেই।

হঠাৎ পেছন থেকে কয়েকজন এসে তাকে ঘিরে ফেলল।

আরিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা তাকে জোর করে অন্যদিকে নিয়ে যেতে শুরু করল।

ভয়ে আরিয়ার শরীর কাঁপতে লাগল।

সে চিৎকার করার চেষ্টা করল।

—আমাকে ছেড়ে দিন! আপনারা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

কেউ তার কথা শুনল না।

কিছুক্ষণ পর তাকে একটি অপরিচিত বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো।

আরিয়া তখন বুঝতে পারল, তাকে ভয়ংকর বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।

সে শুধু মনে মনে একটা কথাই ভাবছিল—

তার ভাইয়েরা কি তাকে খুঁজে পাবে?

অপরিচিত বাড়িটায় নিয়ে যাওয়ার পর আরিয়াকে একটা ঘরের মধ্যে বসিয়ে রাখা হলো।

ঘরটা খুব বড় নয়। চারপাশে কয়েকজন অপরিচিত মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। আরিয়া ভয়ে কাঁপছিল। বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল, কিন্তু বের হওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছিল না।

কিছুক্ষণ পর সেই ছেলেটা সামনে এসে দাঁড়াল, যাকে আরিয়া আগে থেকেই চিনত।

আরিয়া তাকে দেখেই বুঝতে পারল, সবকিছুর পেছনে এই ছেলেটাই আছে।

—তুই আমাকে কেন এখানে এনেছিস?

ছেলেটা ঠান্ডা গলায় বলল,

—তোকে অনেকবার বলেছি, আমার সঙ্গে কথা বলতে। তুই আমাকে সবার সামনে অপমান করেছিস।

আরিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি তোকে কোনোদিন কিছু বলিনি। তুই নিজেই আমাকে বিরক্ত করেছিস।

—আজ সব শেষ হবে।

আরিয়া ভয়ে বলল,

—আমাকে বাড়িতে যেতে দে।

ছেলেটা কোনো উত্তর দিল না।

তারপর সে জানাল, সে আরিয়াকে জোর করে বিয়ে করতে চায়।

কথাটা শুনে আরিয়ার শরীর যেন অবশ হয়ে গেল।

—না! আমি এই বিয়ে করব না।

সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাদের কারও ক্ষতি করিনি।

কেউ তার কথা শুনল না।

আরিয়া তখন শুধু নিজের পরিবারের কথা ভাবছিল। মায়ের মুখ মনে পড়ছিল। দুই ভাইয়ের কথা মনে পড়ছিল।

আর অদ্ভুতভাবে রোহানের কথাও মনে পড়ল।

সে জানত না কেন।

হয়তো এতদিন ধরে যে মানুষটা তাকে সবচেয়ে বেশি জ্বালিয়েছে, সেই মানুষটার কথাই বিপদের সময় তার মনে পড়ছিল।

আরিয়া মনে মনে বলল,

‘রোহান যদি এখানে থাকত!’

কিন্তু রোহান তো অনেক দূরে।

সে কিছুই জানে না।

এদিকে আরিয়া বাড়িতে না ফেরায় তার মা চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

সন্ধ্যা হয়ে গেল।

আরিয়া সাধারণত কোথাও গেলে সময়মতো বাড়ি ফিরত।

তার মা বারবার উঠানে এসে রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিলেন।

—মেয়েটা এখনো ফিরল না কেন?

বড় ভাই তখন বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরল।

মায়ের চিন্তিত মুখ দেখে সে জিজ্ঞেস করল,

—আরিয়া কোথায়?

মা বললেন,

—দোকানে গিয়েছিল। এখনো ফেরেনি।

ভাইয়ের মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।

—কতক্ষণ আগে গেছে?

—অনেকক্ষণ।

সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।

কয়েকজন পরিচিত মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আরিয়াকে খুঁজতে বের হলো।

দোকানে গিয়ে জানতে পারল, আরিয়া কিছুক্ষণ আগেই জিনিস কিনে বেরিয়েছে।

তারপর রাস্তার আশেপাশে খোঁজ করা হলো।

একজন বলল,

—আমি দেখেছি, কয়েকজন ছেলে ওর আশেপাশে ছিল।

এই কথা শুনেই আরিয়ার ভাইয়ের বুক ধক করে উঠল।

—কারা?

লোকটি কয়েকজনের নাম বলল।

এর মধ্যে সেই ছেলেটার নামও ছিল।

আরিয়ার ভাইয়ের মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল।

সে সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজনকে নিয়ে ছেলেটার বাড়ির দিকে রওনা দিল।

এদিকে অপরিচিত বাড়িতে বিয়ের আয়োজন শুরু করার চেষ্টা চলছিল।

আরিয়া এক কোণে বসে কাঁদছিল।

কিছুক্ষণ পর একজন কাজী সেখানে এলেন।

আরিয়া কাজীকে দেখেই উঠে দাঁড়াল।

কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আপনি দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন।

কাজী অবাক হয়ে তাকালেন।

—কী হয়েছে?

আরিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি এখানে নিজের ইচ্ছায় আসিনি। আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছে। আমি এই বিয়ে করতে চাই না।

কাজী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—তুমি কি নিশ্চিত?

আরিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,

—হ্যাঁ। আমি কাউকে চিনি না এখানে। আমাকে জোর করে আনা হয়েছে।

কাজী তখন বুঝতে পারলেন বিষয়টি গুরুতর।

তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন,

—জোর করে কাউকে বিয়ে দেওয়া যায় না। মেয়ের সম্মতি ছাড়া আমি কোনো বিয়ে পড়াব না।

এই কথা শুনে ছেলেটা রেগে গেল।

কিন্তু কাজী নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন।

ঠিক তখনই বাইরে হৈচৈ শোনা গেল।

কেউ চিৎকার করে বলল,

—দরজা খোল!

আরিয়ার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

সে বুঝতে পারল, তার পরিবার তাকে খুঁজে পেয়েছে।

কিছুক্ষণ পর দরজা খুলতেই আরিয়ার বড় ভাইসহ কয়েকজন মানুষ ভেতরে ঢুকে পড়ল।

ভাইকে দেখেই আরিয়া ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ল।

—ভাইয়া...

ভাই আর কোনো কথা বলল না।

শুধু বোনকে শক্ত করে ধরে রাখল।

তার চোখেও তখন রাগ আর কষ্ট।

কিছুক্ষণ পর সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।

আরিয়াকে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছিল—এটা সবাই জানতে পারল।

পরিবারের লোকজন তাকে সেখান থেকে নিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনল।

বাড়িতে ফিরেও আরিয়া স্বাভাবিক হতে পারছিল না।

সে সারাক্ষণ কাঁদছিল।

মা তাকে জড়িয়ে ধরে বলছিলেন,

—কিছু হয়নি মা। তুই এখন আমাদের কাছে আছিস।

কিন্তু আরিয়ার ভয় কাটছিল না।

রাতে সে বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

চোখ বন্ধ করলেই বিকেলের সেই ঘটনাগুলো মনে পড়ছিল।

সে কাউকে কিছু বলতে চাইছিল না।

কয়েকদিন ধরে সে প্রায় কারও সঙ্গে কথা বলল না।

আগের সেই চুপচাপ আরিয়া যেন আরও বেশি চুপ হয়ে গেল।

মা খাবার নিয়ে এসে বলতেন,

—মা, একটু খেয়ে নে।

আরিয়া মাথা নেড়ে বলত,

—খেতে ইচ্ছে করছে না।

ভাইরা কাছে এসে কথা বলার চেষ্টা করলেও সে শুধু চুপ করে থাকত।

এদিকে খবরটা কোনোভাবে রোহানের কাছেও পৌঁছে গেল।

রোহান খবর শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, সে যদি কাছাকাছি থাকত, তাহলে হয়তো কিছু করতে পারত।

কিন্তু সে তখন শহরে।

আরিয়া কেমন আছে, সেটা জানার জন্য তার ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠল।

একদিন রোহান তার ছোট ভাইদের ডাকল।

তাদের হাতে একটা চিঠি দিয়ে বলল,

—এটা আরিয়ার কাছে দিয়ে আসবি। কাউকে দেখাবি না।

ছোট ভাই জিজ্ঞেস করল,

—কী লিখেছ?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—যা লিখেছি, সেটাই পৌঁছে দিবি।

কয়েকদিন পর চিঠিটা আরিয়ার হাতে পৌঁছাল।

আরিয়া প্রথমে চিঠিটা নিতে চাইছিল না।

কিন্তু রোহানের নাম শুনে তার বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।

সে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে চিঠিটা খুলল।

ভেতরে লেখা ছিল—

“তোর সঙ্গে যা হয়েছে, সেটা খুব খারাপ হয়েছে। কিন্তু তুই কখনো মন খারাপ করবি না। তুই চাইলে আমার কাছে আসতে পারিস। আমি তোকে একা থাকতে দেব না।”

চিঠিটা পড়তে পড়তে আরিয়ার চোখে পানি চলে এল।

কিন্তু এবার সেই কান্নার মধ্যে শুধু কষ্ট ছিল না।

ছিল একটু স্বস্তিও।

অনেকদিন পর তার মনে হলো—

কেউ একজন অন্তত তাকে বুঝতে চেষ্টা করছে।

চিঠিটা বুকের কাছে ধরে আরিয়া ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।

তার ঠোঁটের কোণে খুব ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।

আর সেই ছোট্ট হাসিই যেন তার অন্ধকার দিনগুলোর মধ্যে প্রথম আলো হয়ে এল।

রোহানের চিঠিটা পড়ার পর আরিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

চিঠির প্রতিটি শব্দ যেন বারবার তার মনে বাজছিল।

“তুই চাইলে আমার কাছে আসতে পারিস। আমি তোকে একা থাকতে দেব না।”

কয়েকদিন ধরে আরিয়ার মনে যে ভয় আর কষ্ট জমে ছিল, সেদিন প্রথমবার তার মধ্যে একটু স্বস্তি ফিরে এল।

সে চিঠিটা ভাঁজ করে নিজের বইয়ের ভেতর রেখে দিল।

তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।

পুকুরের পানিতে শেষ বিকেলের আলো মিশে গেছে। দূরে কোথাও পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।

আরিয়া মনে মনে ভাবল,

‘রোহান আমাকে এখনো মনে রেখেছে।’

ভাবতেই তার মুখে আবারও হালকা হাসি ফুটে উঠল।

পরদিন সকালে মা ঘরে এসে দেখলেন, আরিয়া আগের দিনের তুলনায় একটু স্বাভাবিক।

মা অবাক হয়ে বললেন,

—আজ তোকে একটু ভালো লাগছে।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—হুম।

—কী হয়েছে?

—কিছু না মা।

মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

তিনি জানতেন, মেয়েটা অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে গেছে। তাই জোর করে কিছু জানতে চাইলেন না।

এরপর ধীরে ধীরে আরিয়ার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা শুরু হলো।

সে আবার বই পড়তে শুরু করল। মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে বসে গল্প করত। মাঝে মাঝে উঠানে এসে ছোট ভাইপোদের সঙ্গে খেলত।

তবু আগের মতো পুরোপুরি হাসিখুশি হয়ে উঠতে তার সময় লাগছিল।

আর রোহানের চিঠিটা সে সবসময় নিজের কাছে রাখত।

কেউ জানত না, সেই ছোট্ট চিঠিটাই তার জন্য কত বড় সাহস হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

কয়েকদিন পর রোহানের মা, অর্থাৎ আরিয়ার খালা, গ্রামে যাওয়ার কথা বললেন।

রোহানও সঙ্গে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে গেল।

মা অবাক হয়ে বললেন,

—তুইও যাবি?

রোহান স্বাভাবিক গলায় বলল,

—হ্যাঁ। অনেকদিন যাই না।

মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।

তিনি অনেক কিছুই বুঝতে পারতেন।

তবু কিছু বললেন না।

বিকেলের দিকে তারা আরিয়াদের বাড়িতে পৌঁছাল।

রোহান বাড়ির উঠানে পা রাখতেই আরিয়ার মা তাকে দেখে এগিয়ে এলেন।

—রোহান, কেমন আছিস বাবা?

—ভালো আছি খালা।

রোহানের চোখ অজান্তেই বাড়ির ভেতরের দিকে চলে গেল।

আরিয়া কোথায়?

কিছুক্ষণ পর সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়াকে দেখতে পেল।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল।

রোহানের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

সে কিছু বলল না।

কিন্তু তার চোখ যেন অনেক কথাই বলে দিল।

আরিয়ার মা বিষয়টা লক্ষ্য করলেন।

তবু কিছু বললেন না।

সেদিন সন্ধ্যায় সবাই মিলে বসে গল্প করছিল।

রোহান তার আগের মতোই হাসি-ঠাট্টা করছিল। তার বড় ভাইয়েরাও এসেছিল।

বাড়ির পরিবেশ অনেকদিন পর আবার আনন্দে ভরে উঠেছিল।

আরিয়া দূরে বসে সব দেখছিল।

হঠাৎ রোহান বলল,

—এই আরিয়া, এত চুপচাপ বসে আছিস কেন?

আরিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—আমি তো এমনিই বসে আছি।

—এমনিই বসে আছিস মানে? আগের মতো আমার সঙ্গে ঝগড়া করিস না কেন?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—তুই এখনো আগের মতোই বিরক্তিকর।

রোহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—এই তো! আমি ভাবছিলাম, আমার পুরোনো আরিয়াটা হারিয়ে গেছে।

আরিয়া আর কিছু বলল না।

কিন্তু তার মুখে হাসি ছিল।

রোহানের মা সবকিছু চুপচাপ লক্ষ্য করছিলেন।

রাতে বাড়িতে ফিরে রোহান মাকে বলল,

—মা, আরিয়াকে দেখেছ?

—হ্যাঁ।

—অনেক চুপচাপ হয়ে গেছে।

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—ও অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছে বাবা।

রোহান মাথা নিচু করল।

—জানি।

—তুই ওর পাশে থাকিস।

রোহান মায়ের দিকে তাকাল।

—আমি থাকব।

মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

কয়েকদিন পর রোহানের মা আবার আরিয়াদের বাড়িতে গেলেন।

এবার তার যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল আলাদা।

আরিয়ার মা তাকে বসতে দিলেন।

দুজন কিছুক্ষণ সাধারণ কথা বললেন।

তারপর রোহানের মা একটু থেমে বললেন,

—বোন, একটা কথা বলব?

আরিয়ার মা বললেন,

—বল।

—রোহানের জন্য আরিয়াকে চাই।

কথাটা শুনে আরিয়ার মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তিনি যেন এমন কথা শুনবেন, সেটা ভাবেননি।

তারপর ধীরে বললেন,

—তুই জানিস, ওরা খালাতো ভাই-বোন। আর সবচেয়ে বড় কথা, আরিয়া এখনো অনেক কিছু থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।

রোহানের মা মাথা নেড়ে বললেন,

—আমি জানি।

—তাহলে?

—আমি শুধু চাই, ও যেন এমন একজন মানুষের কাছে থাকে যে ছোটবেলা থেকেই ওকে চেনে। রোহান হয়তো দুষ্টু, হয়তো অনেক কথা বলে, কিন্তু ও আরিয়াকে মন থেকে খুব আপন মনে করে।

আরিয়ার মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—আমি ভয় পাই।

—কিসের?

—আরিয়ার জন্য। মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছে। আবার কোনো সমস্যা হোক, সেটা আমি চাই না।

রোহানের মা শান্তভাবে বললেন,

—আমি তোকে কোনো চাপ দিচ্ছি না। তুই সময় নিয়ে ভাব।

এদিকে আরিয়া কিছুই জানত না।

সে নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল।

হঠাৎ তার মা ঘরে ঢুকলেন।

—মা, একটু কথা বলব?

আরিয়া বই বন্ধ করল।

—কী হয়েছে?

মা মেয়ের পাশে বসে বললেন,

—রোহানের মা আজ একটা কথা বলেছে।

আরিয়ার বুক ধক করে উঠল।

—কী কথা?

মা কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

—রোহানের সঙ্গে তোর বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।

আরিয়া একেবারে চুপ হয়ে গেল।

তার চোখের সামনে যেন ছোটবেলার অনেকগুলো ছবি ভেসে উঠল।

রোহানের দুষ্টুমি।

তার সঙ্গে করা ঝগড়া।

ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নিচ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া রোহান।

আর সেই চিঠি—

“তুই চাইলে আমার কাছে আসতে পারিস।”

আরিয়ার মুখ লাল হয়ে উঠল।

মা জিজ্ঞেস করলেন,

—তুই কী ভাবছিস?

আরিয়া কোনো উত্তর দিল না।

সে শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।

মা আবার বললেন,

—আমি এখনো রাজি হইনি।

আরিয়া চমকে মায়ের দিকে তাকাল।

—কেন?

—কারণ আমি চাই, তুই নিজের মন থেকে সিদ্ধান্ত নিস। কাউকে ভয় পেয়ে বা কারও কথায় রাজি হবি না।

আরিয়া ধীরে ধীরে বলল,

—মা...

—হুম?

—রোহান কি জানে?

মা একটু হেসে বললেন,

—তার মা নিশ্চয়ই তাকে জানিয়েছে।

আরিয়া আর কিছু বলল না।

সেদিন রাতে সে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—

রোহান কি সত্যিই তাকে বিয়ে করতে চায়?

নাকি এটা শুধু পরিবারের সিদ্ধান্ত?

আর ঠিক তখনই জানালার বাইরে হালকা বাতাস বইল।

আরিয়ার মনে পড়ল ছোটবেলার সেই দিনগুলো।

যেদিন রোহান তাকে শুধু জ্বালানোর জন্য বলত,

—তোর এত অহংকার কেন রে?

আরিয়া অজান্তেই হেসে ফেলল।

কিন্তু তার এই হাসির পেছনে এবার একটা নতুন অনুভূতি জন্ম নিয়েছে।

হয়তো সেই অনুভূতির নাম সে এখনো জানে না।

তবে একটা কথা সে বুঝতে পারছিল—

রোহানকে হারানোর ভয় তার কখনো হয়নি।

বরং রোহানকে দূরে ভাবলেই তার বুকটা কেমন খালি খালি লাগে।

সেদিন রাতে আরিয়ার কিছুতেই ঘুম আসছিল না।

মায়ের বলা কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।

রোহানের মা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন।

একসময় যে কথাটা শুনলে আরিয়া হয়তো লজ্জায় ঘর থেকে পালিয়ে যেত, আজ সেই কথাটাই তার মনে অদ্ভুত এক শান্তি এনে দিচ্ছিল।

সে জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে রইল।

আকাশে তখন অসংখ্য তারা।

আরিয়ার মনে পড়ে গেল ছোটবেলার কথা।

নানির বাড়িতে গেলেই রোহান তাকে জ্বালাত।

কখনো বই লুকিয়ে রাখত, কখনো দূর থেকে ডাকত।

আরিয়া রাগ করে বলত,

—তুই একদম ভালো না।

রোহান হাসত।

—তবুও আমার সঙ্গেই কথা বলিস।

সেই সময় কথাগুলোকে আরিয়া শুধু দুষ্টুমি মনে করত।

কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সেই দুষ্টুমির মধ্যেই হয়তো অনেক না বলা কথা লুকিয়ে ছিল।

পরদিন সকালে মা আবার মেয়ের কাছে এলেন।

—মা, কিছু ভেবেছিস?

আরিয়া চুপ করে বসে ছিল।

মা পাশে বসে বললেন,

—তোর ওপর কোনো চাপ নেই। তুই না চাইলে আমি এই বিয়েতে রাজি হব না।

আরিয়া মায়ের দিকে তাকাল।

কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে বলল,

—রোহান খারাপ না।

মা মৃদু হেসে বললেন,

—আমি জানি।

—ও একটু বেশি দুষ্টু।

—সেটাও জানি।

আরিয়ার মুখে হালকা হাসি ফুটল।

মা বললেন,

—তাহলে?

আরিয়া অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—তুমি যা ভালো মনে করো।

মা মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, উত্তরটা আসলে কী।

তবু তিনি নিশ্চিত হতে চাইলেন।

—তুই রাজি?

আরিয়া মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।

তার চোখেও পানি এসে গেল।

—আল্লাহ তোকে সুখে রাখুক মা।

কিন্তু বিষয়টা এত সহজ ছিল না।

আরিয়ার দুই ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

তারা দুজনই বোনকে নিয়ে খুব চিন্তিত ছিল। আগের ঘটনার পর তারা আরও বেশি সতর্ক হয়ে গিয়েছিল।

সন্ধ্যায় মা দুই ছেলেকে ডেকে সব কথা বললেন।

বড় ভাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—রোহানকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি।

ছোট ভাই বলল,

—ওর স্বভাব ভালো। তবে সিদ্ধান্তটা আরিয়ার।

মা বললেন,

—আরিয়া রাজি।

দুই ভাই একে অপরের দিকে তাকাল।

বড় ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—তাহলে আমার আপত্তি নেই।

তবে সে একটা কথা স্পষ্ট করে দিল,

—রোহানকে কিন্তু বলে দিও, আরিয়াকে যেন কোনোদিন কষ্ট না দেয়।

মা মৃদু হেসে বললেন,

—সেটা বলার দরকার হবে না। ও নিজেই বুঝবে।

এদিকে রোহানের বাড়িতেও খবর পৌঁছে গেল।

রোহানের মা তাকে বললেন,

—আরিয়ার পরিবার রাজি।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর যেন বিশ্বাসই করতে পারল না।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

রোহানের মুখে বড় একটা হাসি ফুটে উঠল।

—মা, আমি তাহলে...

—হ্যাঁ, তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস।

রোহান হেসে বলল,

—আমি জানতাম না, আমার জীবনে এত ভালো একটা দিন আসবে।

মা মজা করে বললেন,

—এতদিন তো শুধু আরিয়াকে জ্বালিয়েছিস। এখন দেখ, বিয়ের পর সে তোকে কত জ্বালায়!

রোহান হেসে বলল,

—ও যত খুশি জ্বালাক। শুধু পাশে থাকুক।

কথাটা বলেই সে চুপ হয়ে গেল।

মা ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—তুই ওকে সত্যিই অনেকটা আপন করে ফেলেছিস, তাই না?

রোহান মাথা নিচু করল।

—অনেক আগে থেকেই।

বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো।

দুই পরিবারে আবার আনন্দের পরিবেশ তৈরি হলো।

যে দুই পরিবার এত বছর ধরে একসঙ্গে আনন্দ করেছে, এবার তাদের আনন্দের কারণ আরও বড়।

বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আসতে শুরু করল।

কেউ কাপড় কিনছে, কেউ গয়না দেখছে, কেউ বিয়ের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত।

আরিয়া নিজের ঘরে বসে এসব দেখছিল।

তার মনে একসঙ্গে আনন্দ আর ভয় কাজ করছিল।

একদিকে নতুন জীবনের চিন্তা।

অন্যদিকে এতদিনের পরিচিত মানুষটাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার অনুভূতি।

একদিন বিকেলে রোহান আরিয়াদের বাড়িতে এল।

বাড়িতে অনেক মানুষ ছিল।

তাই দুজনের আলাদা করে কথা বলার সুযোগ হচ্ছিল না।

রোহান দূর থেকে আরিয়ার দিকে তাকাল।

আরিয়া চোখাচোখি হতেই মাথা নিচু করে ফেলল।

রোহান মুচকি হাসল।

কিছুক্ষণ পর সে সুযোগ পেয়ে বারান্দার কাছে দাঁড়াল।

আরিয়া সেখানে আসতেই রোহান বলল,

—কী খবর?

আরিয়া বলল,

—ভালো।

—আমাকে দেখে এত লজ্জা পাচ্ছিস কেন?

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—আমি লজ্জা পাচ্ছি না।

—তাহলে আমার দিকে তাকাচ্ছিস না কেন?

আরিয়া এবার তাকিয়ে বলল,

—তুই আগের মতোই বিরক্তিকর।

রোহান হেসে ফেলল।

—তুইও আগের মতোই রাগী।

আরিয়া একটু হাসল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।

তারপর রোহান গম্ভীর হয়ে বলল,

—আরিয়া।

—হুম?

—তুই কি সত্যিই রাজি?

আরিয়া চুপ।

রোহান আবার বলল,

—আমি চাই না, তুই কারও চাপে এই সিদ্ধান্ত নে।

আরিয়া ধীরে ধীরে বলল,

—আমি নিজের ইচ্ছাতেই রাজি হয়েছি।

রোহানের মুখের হাসিটা এবার আরও গভীর হলো।

—সত্যি?

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

রোহান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—তাহলে একটা কথা বলি?

—কী?

—ছোটবেলায় সবাই যখন বলত, তোকে আমার সঙ্গে বিয়ে দেবে, তখন তুই রাগ করে পালিয়ে যেতিস।

আরিয়া হেসে বলল,

—এখনও পালাতে পারি।

রোহান ভান করে ভয় পেয়ে বলল,

—না না! এখন আর পালাতে দেব না।

আরিয়া হেসে ফেলল।

অনেকদিন পর তাদের দুজনের হাসি একসঙ্গে উঠল।

সেই মুহূর্তে যেন শৈশবের সব দুষ্টুমি আবার ফিরে এল।

কয়েকদিন পর বিয়ের দিন ঠিক হলো।

বাড়িতে ব্যস্ততা বেড়ে গেল।

আরিয়া নিজের ঘরে বসে বিয়ের কাপড় দেখছিল।

তার মা পাশে বসে বললেন,

—কেমন লাগছে?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—ভালো।

মা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

—ভয় লাগছে?

আরিয়া একটু ভেবে বলল,

—একটু।

—রোহানকে নিয়ে?

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—না। নতুন জীবন নিয়ে।

মা বললেন,

—ভয় পাবি না। তুই খুব ভালো থাকবি।

আরিয়া মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।

অন্যদিকে রোহানও বিয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।

তার বন্ধুরা তাকে নিয়ে মজা করছিল।

—দোস্ত, এতদিন যাকে জ্বালিয়েছিস, এখন তার কাছেই সারাজীবন থাকতে হবে!

রোহান হেসে বলল,

—জানি।

—ভয় লাগছে?

রোহান কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—না।

তারপর মৃদু হেসে যোগ করল,

—বরং মনে হচ্ছে, এতদিন যে জায়গাটা খালি ছিল, সেটা এবার পূর্ণ হতে যাচ্ছে।

বিয়ের দিন যতই এগিয়ে আসছিল, দুই পরিবারের আনন্দ ততই বাড়ছিল।

অবশেষে সেই দিনটি এসে গেল।

সকাল থেকেই দুই বাড়িতে ব্যস্ততা। আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, হাসি-আনন্দ আর নানা রকম আয়োজন—সব মিলিয়ে বাড়ির পরিবেশ যেন উৎসবের মতো হয়ে উঠেছে।

আরিয়া নিজের ঘরে বসে ছিল।

তার সামনে বিয়ের পোশাক সাজানো। মা বারবার এসে দেখছেন সব ঠিক আছে কি না।

আরিয়া চুপচাপ বসে থাকলেও তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করছিল।

আজ থেকে তার জীবন বদলে যাবে।

যে রোহানকে ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে, যে তাকে সবচেয়ে বেশি জ্বালিয়েছে, সেই মানুষটাই আজ তার স্বামী হতে যাচ্ছে।

মা মেয়ের পাশে বসে বললেন,

—কী ভাবছিস?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—কিছু না।

—ভয় লাগছে?

—একটু।

মা মেয়ের হাত ধরে বললেন,

—ভয় পাওয়ার কিছু নেই। রোহান তো অপরিচিত কেউ না। ছোটবেলা থেকেই তোকে চেনে।

আরিয়া মাথা নাড়ল।

মায়ের কথায় তার মনটা একটু শান্ত হলো।

অন্যদিকে রোহানও প্রস্তুত হয়ে বসে ছিল।

তার বন্ধুরা তাকে ঘিরে নানা রকম মজা করছিল।

—আজ কিন্তু আর পালানোর সুযোগ নেই!

রোহান হেসে বলল,

—আমার পালানোর কোনো ইচ্ছাই নেই।

এক বন্ধু বলল,

—যে মেয়েকে ছোটবেলা থেকে এত জ্বালিয়েছিস, আজ তার কাছেই যেতে হচ্ছে।

রোহান মুচকি হেসে বলল,

—ওকে জ্বালানো আমার পুরোনো অভ্যাস। এখন থেকে দায়িত্বও আমার।

সবাই হেসে উঠল।

বিকেলের দিকে বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হলো।

বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড়।

আরিয়াকে যখন সাজিয়ে আনা হলো, সবাই একসঙ্গে তাকিয়ে রইল।

রোহানও প্রথমবার তাকে বিয়ের সাজে দেখল।

কিছুক্ষণ সে কোনো কথা বলতে পারল না।

তার পাশে বসা বন্ধু কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলল,

—কী হলো? কথা বন্ধ হয়ে গেল?

রোহান আস্তে বলল,

—চুপ কর।

তার চোখ তখন শুধু আরিয়ার দিকে।

আরিয়া একবার চোখ তুলে রোহানের দিকে তাকাল।

দুজনের চোখাচোখি হতেই আরিয়া দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল।

অনুষ্ঠান এগিয়ে চলল।

অবশেষে সেই মুহূর্তও এল।

তাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো।

চারপাশে সবাই আনন্দ করছিল।

দুই পরিবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরছিল।

আরিয়ার মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন।

—ভালো থাকিস মা।

আরিয়া মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বলল,

—আমি ভালো থাকব।

তার চোখেও পানি চলে এসেছিল।

রোহান একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

তার নিজের চোখও ভিজে উঠেছিল।

সে বুঝতে পারছিল, আজ থেকে আরিয়া শুধু তার পরিচিত মানুষ নয়।

আজ থেকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন।

কিছুক্ষণ পর বিদায়ের সময় এল।

আরিয়া মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠল।

রোহানও পাশে বসল।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে ছিল।

তারপর রোহান আস্তে বলল,

—কাঁদছিস?

আরিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—না।

—মিথ্যা বলছিস।

আরিয়া চোখ মুছে বলল,

—তুই চুপ কর।

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—ঠিক আছে।

কিছুক্ষণ পর সে আবার বলল,

—একটা কথা বলব?

—বল।

—তুই ভয় পাস না। আমি আছি।

আরিয়া এবার তার দিকে তাকাল।

কথাটা খুব সাধারণ ছিল।

কিন্তু আরিয়ার কাছে সেই মুহূর্তে কথাটা অনেক বড় মনে হলো।

সে শুধু মাথা নাড়ল।

রোহানের বাড়িতে পৌঁছানোর পর সবাই তাদের স্বাগত জানাল।

আরিয়া নতুন ঘরে ঢুকল।

ঘরটা সুন্দর করে সাজানো।

ফুল দিয়ে বিছানা সাজানো হয়েছে।

আরিয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চারপাশে তাকিয়ে রইল।

রোহান দরজার কাছে এসে বলল,

—কী হলো?

—কিছু না।

—ঘর পছন্দ হয়েছে?

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

রোহান হেসে বলল,

—এখন থেকে এটা তোর ঘরও।

আরিয়া চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ পর রোহান বলল,

—তুই চাইলে জানালাটা খুলে দিতে পারিস। তুই তো সবসময় বন্ধ ঘর পছন্দ করিস না।

আরিয়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

—তুই এসব মনে রেখেছিস?

রোহান বলল,

—সবকিছু মনে আছে।

আরিয়া কিছু বলল না।

কিন্তু তার চোখে একটা কোমলতা ফুটে উঠল।

রাত বাড়তে লাগল।

বাড়ির সবাই একে একে নিজেদের ঘরে চলে গেল।

রোহান আরিয়া দুজনেই ঘরে বসে ছিল।

কিছুক্ষণ পর রোহান বলল,

—আরিয়া।

—হুম?

—তোর যদি কখনো আমার কোনো আচরণ খারাপ লাগে, আমাকে সরাসরি বলবি।

আরিয়া তার দিকে তাকাল।

—কেন?

—কারণ আমি চাই না, তুই চুপ করে কষ্ট পাস।

আরিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—তুই আগের মতোই অনেক কথা বলিস।

রোহান হেসে ফেলল।

—আর তুই আগের মতোই কম কথা বলিস।

আরিয়া এবারও মুচকি হাসল।

সেই রাতে তাদের মধ্যে অনেক কথা হলো।

শৈশবের কথা।

নানির বাড়ির কথা।

ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা দিনগুলোর কথা।

আর সেই ছোট্ট চিঠির কথাও।

রোহান হঠাৎ বলল,

—সেই চিঠিটা কি এখনো আছে?

আরিয়া একটু চমকে গেল।

—কোন চিঠি?

—যেটা তোকে দিয়েছিলাম।

আরিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আছে।

রোহান অবাক হয়ে বলল,

—সত্যি?

—হুম।

—কোথায় রেখেছিস?

আরিয়া বলল,

—বলব না।

রোহান হেসে বলল,

—আচ্ছা, বলিস না।

কিছুক্ষণ পর আরিয়া নিজেই বলল,

—বইয়ের ভেতরে।

রোহান কিছু বলল না।

শুধু মৃদু হাসল।

তারপর বলল,

—তাহলে চিঠিটা এতদিন নষ্ট হয়নি?

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—না।

রোহানের চোখে তখন আনন্দের ছাপ।

সে বুঝতে পারল, সেই ছোট্ট চিঠির গুরুত্ব আরিয়ার কাছেও কম ছিল না।

দিনগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল।

বিয়ের পর প্রথম কয়েকদিন আরিয়া একটু অস্বস্তিতে থাকলেও রোহান তাকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করল।

সে আগের মতোই দুষ্টুমি করত।

কখনো আরিয়ার বই নিয়ে পালিয়ে যেত।

কখনো বলত,

—এই, আমার সঙ্গে কথা বলবি না?

আরিয়া বিরক্ত হয়ে বলত,

—তোর সঙ্গে কথা বলার কী আছে?

রোহান বলত,

—অনেক কিছু।

তারপর নিজেই গল্প শুরু করে দিত।

আরিয়া ধীরে ধীরে হাসতে শিখল।

তার আগের ভয়গুলোও অনেকটা কমে গেল।

রোহান কখনো তাকে কোনো কিছুতে জোর করত না।

বরং সবসময় বলত,

—তুই যেটাতে স্বস্তি পাবি, সেটাই করবি।

এই আচরণটাই আরিয়ার মনে রোহানের প্রতি বিশ্বাস আরও গভীর করে দিল।

একদিন বিকেলে দুজন নানির বাড়িতে গেল।

সেই পুরোনো বাড়ি।

যেখানে একসময় আরিয়া ছাদে দাঁড়িয়ে থাকত আর রোহান সাইকেল নিয়ে নিচ দিয়ে ঘুরত।

আরিয়া ছাদে উঠে দাঁড়াল।

রোহান নিচে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলল,

—মনে আছে?

আরিয়া নিচে তাকিয়ে বলল,

—সব মনে আছে।

রোহান বলল,

—তখন তোকে দেখার জন্য কতবার যে এই রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়েছি!

আরিয়া হেসে ফেলল।

—জানি।

রোহান অবাক হয়ে বলল,

—তুই জানতিস?

—হুম।

—তাহলে কিছু বলিসনি কেন?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—তুই বুঝে নেবি ভেবেছিলাম।

রোহানও হেসে উঠল।

সন্ধ্যার আলোয় দুজনের হাসি মিলেমিশে গেল।

শৈশবের সেই সম্পর্ক এবার নতুন পরিচয় পেয়েছে।

বিয়ের পর কয়েক মাস কেটে গেছে।

রোহান আর আরিয়ার সম্পর্ক ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়েছে। শৈশবের সেই খুনসুটি এখনো আছে, তবে তার সঙ্গে যোগ হয়েছে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস আর যত্ন।

রোহান এখনো আরিয়াকে সুযোগ পেলেই জ্বালায়।

সকালে নাশতার টেবিলে বসে একদিন সে বলল,

—এই আরিয়া, চা এত চিনি দিয়ে বানিয়েছিস কেন?

আরিয়া অবাক হয়ে বলল,

—তুই তো চিনি বেশি পছন্দ করিস।

—কিন্তু আজ কম খেতে ইচ্ছা করছে।

আরিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,

—তাহলে নিজে বানিয়ে খা।

রোহান হেসে বলল,

—না, তোর বানানোই খাব।

আরিয়া মুখ ঘুরিয়ে ফেলল।

কিন্তু মুখের কোণে হাসি লুকাতে পারল না।

রোহানের মা দূর থেকে সব দেখছিলেন।

তিনি মুচকি হেসে বললেন,

—তোদের ঝগড়া দেখে মনে হয় তোরা এখনো ছোটই আছিস।

রোহান বলল,

—মা, ও আমাকে সবসময় বকাঝকা করে।

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—কারণ তুই সবসময় দুষ্টুমি করিস।

সবাই হেসে উঠল।

তাদের সংসার এভাবেই ছোট ছোট আনন্দে ভরে উঠতে লাগল।

তবে আরিয়ার মনের মধ্যে একটা ভয় এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

আগের সেই ঘটনার পর কোনো জায়গায় একা গেলে তার অস্বস্তি হতো।

রোহান সেটা বুঝতে পারত।

একদিন আরিয়া বাজারে যাওয়ার কথা বলতেই রোহান বলল,

—আমি সঙ্গে যাব।

আরিয়া বলল,

—তুই কেন যাবি? আমি একাই যেতে পারব।

—জানি।

—তাহলে?

রোহান হেসে বলল,

—তোর সঙ্গে ঘুরতে ইচ্ছে করছে।

আরিয়া কিছু না বলে মাথা নাড়ল।

দুজন একসঙ্গে বের হলো।

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রোহান নানা কথা বলছিল।

আরিয়া হেসে বলল,

—তুই এত কথা কীভাবে বলিস?

—অনুশীলন আছে।

—কীসের?

—তোকে জ্বালানোর।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—বিয়ের পরেও তোর স্বভাব বদলাল না।

রোহান বলল,

—স্বভাব বদলানোর দরকার কী? তুই তো এখন আমার সঙ্গেই আছিস।

আরিয়া চুপ করে গেল।

কথাটা শুনে তার মনে অদ্ভুত এক শান্তি নেমে এল।

সেদিন রাতে তারা ছাদে বসেছিল।

আকাশ পরিষ্কার।

দূরে শহরের আলো জ্বলছে।

আরিয়া চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

রোহান বলল,

—কী ভাবছিস?

—কিছু না।

—তুই সবসময় ‘কিছু না’ বলিস।

আরিয়া একটু হেসে বলল,

—সব কথা কি বলা যায়?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—না। কিন্তু যেদিন বলতে ইচ্ছে করবে, সেদিন আমাকে বলবি।

আরিয়া তার দিকে তাকাল।

—তুই শুনবি?

—অবশ্যই।

—বিরক্ত হবি না?

—না।

আরিয়া ধীরে বলল,

—তাহলে একটা কথা বলি?

—বল।

—আগের সেই ঘটনাটা আমি এখনো মাঝে মাঝে মনে করি।

রোহানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আমি জানি।

—তখন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম।

—জানি।

—কখনো কখনো মনে হয়, যদি আবার এমন কিছু হয়?

রোহান শান্ত গলায় বলল,

—হবে না।

আরিয়া চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

রোহান বলল,

—কারণ এখন তুই একা না।

আরিয়ার চোখে পানি এসে গেল।

সে দ্রুত চোখ মুছে ফেলল।

রোহান বলল,

—কাঁদছিস কেন?

—কাঁদছি না।

—আবার মিথ্যা!

আরিয়া হেসে ফেলল।

তারপর ধীরে বলল,

—তুই পাশে থাকলে ভয়টা কম লাগে।

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—আমি সবসময় পাশে থাকব।

সেই রাতের কথাগুলো আরিয়া অনেকদিন মনে রেখেছিল।

দিন যেতে লাগল।

একদিন রোহানের নানির বাড়িতে সবাই একসঙ্গে জড়ো হয়েছিল।

দুই পরিবারের মানুষজন এসেছে।

পুরোনো দিনের মতোই হাসি-আনন্দ চলছে।

আরিয়ার বড় ভাইও এসেছিল।

রোহান তাকে দেখে বলল,

—ভাইয়া, এখন তো আমাকে আর ভয় দেখাতে পারবেন না।

আরিয়ার ভাই হেসে বলল,

—কেন?

—এখন আরিয়া আমার দায়িত্ব।

ভাই একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

—দায়িত্বের কথা বলেছিস যখন, তাহলে একটা কথা মনে রাখিস।

রোহান বলল,

—বলুন।

—আরিয়াকে যেন কখনো একা মনে না হয়।

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

—কখনো হবে না।

আরিয়ার ভাই কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর বলল,

—তাহলে ঠিক আছে।

আরিয়া দূর থেকে সব শুনছিল।

তার বুকের ভেতরটা কেমন উষ্ণ হয়ে উঠল।

সে বুঝতে পারছিল, তার পরিবারও ধীরে ধীরে রোহানকে বিশ্বাস করতে শিখেছে।

একসময় যে দুই ভাই রোহান আর আরিয়ার বন্ধুত্ব নিয়েও সতর্ক থাকত, তারাই এখন রোহানের হাতে বোনের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে।

সেদিন রাতে আরিয়া নিজের মাকে ফোন করল।

—মা, কেমন আছ?

—ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?

—ভালো।

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—রোহান তোকে ভালো রাখছে তো?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ মা।

—তুই সুখী?

আরিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—হ্যাঁ।

মায়ের গলা ভারী হয়ে গেল।

—এই কথাটাই শুনতে চেয়েছিলাম।

ফোন রাখার পর আরিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল।

তারপর রোহান ঘরে ঢুকল।

—কার সঙ্গে কথা বলছিলি?

—মায়ের সঙ্গে।

—কী বলল?

—তোর কথা জিজ্ঞেস করছিল।

—আমার নামে আবার কোনো অভিযোগ করল?

আরিয়া হেসে বলল,

—না।

রোহান স্বস্তির ভান করে বলল,

—বাঁচলাম!

আরিয়া বলল,

—তুই একটা পাগল।

রোহান হেসে বলল,

—তবুও তোকে হাসাতে পারি।

আরিয়া চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর বলল,

—রোহান?

—হুম?

—তুই কি কখনো ভাবিস, আমরা যদি ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারতাম?

রোহান একটু ভেবে বলল,

—না।

আরিয়া অবাক হয়ে বলল,

—কেন?

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—কারণ তখন তোকে শুধু দূর থেকে দেখতাম। এখন তো তুই আমার পাশে।

আরিয়া আর কিছু বলল না।

তার মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।

কিছুদিন পর তাদের সংসারে নতুন খবর এলো।

আরিয়া মা হতে চলেছে।

খবরটা শুনে দুই পরিবারেই আনন্দের সীমা রইল না।

রোহান তো আনন্দে কী করবে বুঝতেই পারছিল না।

সে বারবার বলছিল,

—সত্যি?

আরিয়া হেসে বলল,

—হ্যাঁ, সত্যি।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমি বাবা হতে যাচ্ছি!

আরিয়া বলল,

—হ্যাঁ।

রোহান হেসে বলল,

—তাহলে এখন থেকে আমার দুষ্টুমি কমাতে হবে।

আরিয়া বলল,

—তুই সেটা পারবি?

রোহান একটু ভেবে বলল,

—চেষ্টা করব।

দুজনেই হেসে ফেলল।

তাদের জীবনে এবার আসতে চলেছে নতুন একজন।

একটি ছোট্ট প্রাণ।

আরিয়া মা হতে চলেছে—এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই দুই পরিবারের আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল।

রোহানের মা তো খুশিতে আত্মীয়স্বজন সবাইকে খবর দিয়ে দিলেন।

আরিয়ার মা ফোন করে বারবার মেয়ের খোঁজ নিতেন।

—মা, ঠিকমতো খাচ্ছিস তো?

—হ্যাঁ মা।

—সময়মতো বিশ্রাম নিচ্ছিস?

—নিচ্ছি।

—রোহান তোকে ঠিকমতো দেখাশোনা করছে তো?

আরিয়া হেসে বলত,

—হ্যাঁ। ও আমাকে একা এক মুহূর্তও থাকতে দেয় না।

পাশ থেকে রোহান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠত,

—আমি কিন্তু সব শুনছি!

আরিয়া হেসে বলত,

—শুনলেই হলো।

রোহান তখন গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলত,

—তোমার মেয়ের সঙ্গে আমাকে খারাপ বলছ?

আরিয়া বলত,

—এখন থেকেই মেয়েকে নিজের দলে নেওয়ার চেষ্টা করছিস?

রোহান হেসে বলত,

—অবশ্যই। ও জন্মানোর আগেই আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে যাবে।

এভাবেই তাদের দিন কাটছিল।

রোহানের আচরণও অনেকটাই বদলে গিয়েছিল।

আগের সেই চঞ্চল মানুষটা এখন আরিয়াকে নিয়ে খুব সতর্ক।

আরিয়া একটু বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকলেই বলত,

—বসো।

আরিয়া একটু দেরি করে খাবার খেলেই বলত,

—এখনই খেয়ে নাও।

আরিয়া বিরক্ত হয়ে বলত,

—আমি এত ছোট বাচ্চা না।

রোহান বলত,

—তুমি আমার কাছে এখন ছোট বাচ্চার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আরিয়া তখন চুপ করে যেত।

মাঝে মাঝে রোহানের এই অতিরিক্ত যত্ন তাকে হাসিয়ে দিত।

একদিন বিকেলে আরিয়া বারান্দায় বসে ছিল।

রোহান পাশে এসে বসে বলল,

—আমাদের বাচ্চার নাম কী রাখব?

আরিয়া অবাক হয়ে বলল,

—এখন থেকেই?

—হ্যাঁ। আগে থেকেই ঠিক করে রাখব।

—তুই কী নাম ভাবছিস?

রোহান একটু ভেবে বলল,

—মেয়ে হলে?

—মেয়ে হলে?

রোহান আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

—কথা।

আরিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—কথা?

—হ্যাঁ। নামটা কেমন?

আরিয়ার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

—সুন্দর।

রোহান বলল,

—তাহলে ঠিক হলো। মেয়ে হলে নাম হবে কথা।

আরিয়া হেসে বলল,

—আর ছেলে হলে?

রোহান বলল,

—সেটা পরে ভাবব।

—কেন?

—কারণ আমার মনে হচ্ছে মেয়ে হবে।

আরিয়া হেসে বলল,

—তুই কীভাবে বুঝলি?

—জানি না। আমার মন বলছে।

দিনগুলো এভাবেই কেটে যাচ্ছিল।

সময় যত এগোচ্ছিল, আরিয়ার শরীরও তত ভারী হয়ে উঠছিল।

রোহান তাকে প্রায় সব কাজ থেকেই বিরত রাখত।

আরিয়া মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলত,

—সবকিছু তুমি করে দেবে?

রোহান বলত,

—হ্যাঁ।

—তাহলে আমি কী করব?

—আমাকে বিরক্ত করবে।

আরিয়া হেসে বলত,

—সেটা তো আমি এমনিতেই করি।

রোহান বলত,

—সেটাই তো তোমার সবচেয়ে ভালো কাজ।

তাদের হাসির শব্দে বাড়ির পরিবেশ ভরে উঠত।

একদিন রোহান আরিয়াকে নিয়ে নানির বাড়িতে গেল।

সেই পুরোনো বাড়ি।

যেখানে তাদের শৈশব কেটেছে।

আরিয়া উঠানে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাল।

কত স্মৃতি!

এক কোণে দাঁড়িয়ে সে বলল,

—মনে আছে, এখানে তুই আমাকে কতবার দৌড় করিয়েছিস?

রোহান বলল,

—আর তুই আমার নামে কত অভিযোগ করেছিস!

—কারণ তুই অনেক দুষ্ট ছিলি।

—এখন কেমন?

আরিয়া তাকিয়ে বলল,

—এখনও।

রোহান হেসে ফেলল।

তারপর দুজন ধীরে ধীরে ছাদে উঠল।

আরিয়া ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তার দিকে তাকাল।

হঠাৎ তার চোখে পুরোনো দিনের একটা ছবি ভেসে উঠল।

একটা ছেলে সাইকেল নিয়ে বারবার এই রাস্তা দিয়ে ঘুরছে।

ছেলেটা দূর থেকে ছাদের দিকে তাকাচ্ছে।

আর ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা মুখ লুকিয়ে হাসছে।

রোহান বলল,

—কী ভাবছিস?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—ভাবছি, তুই তখন কত পাগলামি করতিস।

—তখন তোকে দেখতে সাইকেল নিয়ে ঘুরতাম।

আরিয়া বলল,

—জানি।

—তুই তখনও জানতিস?

—হ্যাঁ।

রোহান অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে এতদিন আমাকে কিছু বলিসনি কেন?

আরিয়া হেসে বলল,

—তুই নিজেই বুঝে যাবে ভেবেছিলাম।

রোহান মাথা নাড়িয়ে বলল,

—তুই তখন থেকেই আমাকে ঘুরিয়েছিস।

আরিয়া হেসে ফেলল।

সন্ধ্যা নামতে শুরু করল।

রোহান বলল,

—চল, বাড়ি যাই।

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—চল।

তারা ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল।

বাড়ি ফেরার পথে রোহান হঠাৎ বলল,

—আরিয়া।

—হুম?

—একটা কথা মনে রাখিস।

—কী?

—আমাদের মেয়েটা যেন কখনো মনে না করে, সে একা।

আরিয়া তার দিকে তাকাল।

রোহান বলল,

—আমরা ওকে সবসময় আগলে রাখব।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

—কেউ যেন ওকে কষ্ট দিতে না পারে।

—হ্যাঁ।

—কেউ যেন ওর মুখের হাসিটা কেড়ে নিতে না পারে।

আরিয়া এবার তার হাতটা শক্ত করে ধরল।

—আমরা দুজন মিলে ওকে সবসময় আগলে রাখব।

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—এই তো আমার আরিয়া।

কয়েক মাস পর সেই প্রতীক্ষিত দিন চলে এল।

সকালে আরিয়ার শরীর খারাপ লাগতে শুরু করল।

রোহান সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে হাসপাতালে গেল।

দুই পরিবারের সবাই খবর পেয়ে ছুটে এল।

হাসপাতালের বাইরে রোহান অস্থির হয়ে হাঁটছিল।

একবার বসছে, আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে।

তার মা বললেন,

—এত অস্থির হচ্ছিস কেন?

রোহান বলল,

—মা, আমার কিছুই ভালো লাগছে না।

—সব ঠিক হবে।

রোহান মাথা নেড়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

অনেকক্ষণ পর ভেতর থেকে শিশুর কান্নার শব্দ শোনা গেল।

রোহান স্থির হয়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর ডাক্তার বাইরে এসে হাসিমুখে বললেন,

—অভিনন্দন। মা এবং বাচ্চা দুজনেই ভালো আছে।

রোহানের চোখে পানি চলে এল।

—মেয়ে?

ডাক্তার মুচকি হেসে বললেন,

—হ্যাঁ, মেয়ে হয়েছে।

রোহান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তার মনে শুধু একটা নামই এলো—

কথা।

কিছুক্ষণ পর তাকে আরিয়ার কাছে যেতে দেওয়া হলো।

আরিয়া ক্লান্ত, কিন্তু মুখে শান্ত হাসি।

তার পাশে ছোট্ট শিশুটি ঘুমিয়ে আছে।

রোহান ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে শিশুটার দিকে তাকাল।

তার চোখ ভিজে উঠল।

সে আস্তে বলল,

—আমাদের কথা...

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ। আমাদের মেয়ে।

রোহান মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর আরিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই আমাকে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর উপহারটা দিয়েছিস।

আরিয়া মৃদু হেসে চোখ বন্ধ করল।

বাইরে তখন দুই পরিবারের মানুষজন আনন্দে কাঁদছে, হাসছে।

আর একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু হলো।

কথা পৃথিবীতে আসার পর রোহান আর আরিয়ার জীবন যেন পুরোপুরি বদলে গেল।

বাড়ির সবাই এখন শুধু ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়েই ব্যস্ত।

রোহানের মা সারাক্ষণ নাতনিকে কোলে নিয়ে বসে থাকেন। আরিয়ার মা তো মেয়ের বাড়িতে এলেই কথাকে কোলে নিয়ে আদর করেন।

আর রোহানের কথা না হয় বাদই দেওয়া গেল।

সে মেয়েকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে চায় না।

কথা একটু নড়াচড়া করলেই রোহান ছুটে আসে।

—কী হয়েছে আমার মেয়ের?

আরিয়া হাসতে হাসতে বলে,

—কিছু হয়নি। শুধু নড়েছে।

—তবুও দেখতে হবে।

আরিয়া মাথা নাড়িয়ে বলে,

—তুমি একদম পাগল হয়ে গেছ।

রোহান হেসে বলে,

—মেয়ের বাবা হয়েছি। পাগল তো হবই।

কথা ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল।

তার ছোট ছোট হাত, মিষ্টি হাসি আর অস্পষ্ট শব্দে পুরো বাড়ি যেন আনন্দে ভরে থাকত।

একদিন কথা প্রথমবারের মতো স্পষ্ট করে ‘বাবা’ বলার চেষ্টা করল।

রোহান তখন পাশেই বসে ছিল।

শব্দটা শুনে সে অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকাল।

—কথা, আবার বল তো!

কথা হেসে আবার অস্পষ্টভাবে বলল,

—বাবা...

রোহান আনন্দে মেয়েকে কোলে তুলে নিল।

—আরিয়া! শুনেছিস? আমার মেয়ে আমাকে বাবা বলেছে!

আরিয়া রান্নাঘর থেকে এসে হাসতে হাসতে বলল,

—হ্যাঁ, শুনেছি।

রোহান বলল,

—তুই দেখেছিস? ও আমাকে আগে ডাকল!

আরিয়া মজা করে বলল,

—এখন থেকেই এত অহংকার?

রোহান বলল,

—অবশ্যই।

কথা তখন বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছিল।

আরিয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

—দেখেছিস, তোর বাবা কত পাগল?

রোহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—এই যে কথা, তোর মা আমাকে পাগল বলছে!

কথা কিছুই বুঝল না।

শুধু হাসতে থাকল।

তিনজনের হাসিতে ঘরটা ভরে উঠল।

সময় আরও এগিয়ে গেল।

কথা হাঁটতে শিখল।

তারপর দৌড়াতে শিখল।

বাড়ির এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছুটে বেড়াত।

রোহান তাকে ধরতে গিয়ে হাঁপিয়ে যেত।

—কথা! এই দাঁড়া!

কথা আরও জোরে দৌড়াত।

আরিয়া দূর থেকে হাসত।

—তোমার মেয়েকে ধরতে পারছ না?

রোহান বলত,

—তোর মেয়ে তোকে দেখে এত শান্ত থাকে। আমার কাছে এলেই দৌড়ায়!

আরিয়া বলত,

—কারণ তুমি ওকে সারাদিন দুষ্টুমি শেখাও।

রোহান গর্ব করে বলত,

—শিখবেই তো। আমার মেয়ে!

আরিয়া মাথা নাড়িয়ে হাসত।

তবে মেয়ের বিষয়ে দুজনের একটা বিষয় এক ছিল।

তারা কখনোই কথাকে একা কোথাও যেতে দিত না।

আরিয়ার জীবনে ঘটে যাওয়া সেই পুরোনো ঘটনাটা তাদের দুজনের মনেই গভীরভাবে গেঁথে ছিল।

তারা চাইত না, তাদের মেয়ের জীবনে কখনো এমন কোনো ভয় আসুক।

একদিন কথা একটু বড় হয়ে স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়সে পৌঁছাল।

স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিন রোহান নিজেই মেয়েকে নিয়ে গেল।

কথা নতুন জামা পরে বাবার হাত ধরে হাঁটছিল।

স্কুলের গেটের কাছে গিয়ে সে বাবার হাত আরও শক্ত করে ধরল।

—বাবা, তুমি যাবে না?

রোহান হাঁটু গেড়ে মেয়ের সামনে বসে বলল,

—আমি বাইরে থাকব।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

কথা একটু সাহস পেল।

তারপর ধীরে ধীরে ভেতরে চলে গেল।

রোহান গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।

আরিয়া পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

—ওকে এত চিন্তা করছ কেন?

রোহান বলল,

—ও তো আমার ছোট্ট মেয়ে।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—এখন আর এত ছোট নেই।

রোহান বলল,

—আমার কাছে সবসময় ছোটই থাকবে।

আরিয়া তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

কিছুক্ষণ পর স্কুল ছুটি হলো।

কথা দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

—বাবা!

রোহান মেয়েকে কোলে তুলে নিল।

—কেমন লাগল?

—অনেক ভালো!

—কেউ কিছু বলেছে?

—না।

—কেউ বিরক্ত করেছে?

কথা মাথা নাড়ল।

আরিয়া হেসে বলল,

—তুমি একশোটা প্রশ্ন করবে নাকি?

রোহান বলল,

—আমার মেয়েকে নিয়ে প্রশ্ন করতেই পারি।

দিনগুলো দ্রুত কেটে যেতে লাগল।

কথা একটু একটু করে বড় হলো।

সে বুঝতে শিখল, তার বাবা-মা তাকে কতটা ভালোবাসে।

একদিন রাতে কথা ঘুমানোর আগে মাকে জিজ্ঞেস করল,

—মা, তুমি আর বাবা কি ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে ছিলে?

আরিয়া একটু অবাক হয়ে বলল,

—কেন?

—বাবা বলেছে, তুমি নাকি ছোটবেলায় খুব চুপচাপ ছিলে।

আরিয়া হেসে ফেলল।

—তোর বাবা অনেক কথা বলে।

কথা বলল,

—তোমাদের কি ছোটবেলায় ঝগড়া হতো?

আরিয়া কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—অনেক।

—কে জিতত?

—আমি।

ঠিক তখন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রোহান বলল,

—মিথ্যা কথা!

কথা হেসে ফেলল।

—বাবা, তুমি সব শুনছিলে?

রোহান ঘরে এসে বলল,

—হ্যাঁ।

তারপর মেয়ের পাশে বসে বলল,

—তোর মা ছোটবেলায় আমাকে অনেক বকত।

আরিয়া বলল,

—কারণ তুমি আমাকে সবসময় জ্বালাতে।

কথা অবাক হয়ে বলল,

—বাবা তোমাকে জ্বালাত?

—হ্যাঁ।

রোহান হেসে বলল,

—কিন্তু তোর মা তখনও আমাকে খুব আপন মনে করত।

আরিয়া লজ্জা পেয়ে বলল,

—এইসব এখন মেয়ের সামনে বলার কী দরকার?

কথা হেসে উঠল।

সেদিন রাতে মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে রোহান আরিয়া ছাদে গিয়ে দাঁড়াল।

আকাশে চাঁদ।

রোহান বলল,

—মনে আছে, একসময় তুই এই ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতিস?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—মনে আছে।

—আর আমি নিচে সাইকেল নিয়ে ঘুরতাম।

—সেটাও মনে আছে।

রোহান বলল,

—তখন ভাবিনি, একদিন এই ছাদে দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের মেয়ের কথা বলব।

আরিয়া ধীরে বলল,

—জীবন অনেক কিছু বদলে দেয়।

রোহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—হ্যাঁ। তবে একটা জিনিস বদলায়নি।

—কী?

—তুই।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—আমি তো অনেক বদলেছি।

—না। তুই এখনো সেই চুপচাপ আরিয়া।

—আর তুই?

রোহান হেসে বলল,

—আমি এখনো সেই দুষ্টু রোহান।

দুজনেই হেসে উঠল।

নিচে ঘরের ভেতর থেকে কথার ঘুমন্ত কণ্ঠ শোনা গেল।

—মা...

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে নিচে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল।

রোহান বলল,

—চল।

দুজন একসঙ্গে মেয়ের কাছে ফিরে গেল।

কথা ঘুমের মধ্যেও মাকে খুঁজছিল।

আরিয়া মেয়ের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, এই ছোট্ট মেয়েটিই তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।

সে ধীরে ধীরে বলল,

—আরিয়া, একটা কথা মনে আছে?

—কী?

—আমরা একদিন ঠিক করেছিলাম, আমাদের সন্তানকে সবসময় আগলে রাখব।

আরিয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

—হ্যাঁ। মনে আছে।

রোহান বলল,

—আমরা সেই কথাটা রাখব।

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—সবসময়।

তাদের ছোট্ট সংসারে তখন শান্ত রাত নেমে এসেছে।

বাইরে চাঁদের আলো।

ঘরের ভেতরে ঘুমিয়ে আছে তাদের ছোট্ট কথা।

আর তার পাশে বসে আছে দুইজন মানুষ, যারা শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি পেরিয়ে অবশেষে নিজেদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

বিয়ের পর অনেক বছর কেটে গেছে।

রোহান আর আরিয়ার সংসার এখন আরও বড় হয়েছে। ছোট্ট কথা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তার হাসি, দুষ্টুমি আর ছোট ছোট আবদারে প্রতিদিন নতুন আনন্দ যোগ হচ্ছে তাদের জীবনে।

কথা এখন স্কুলে পড়ে।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই মায়ের কাছে যায়।

—মা, আমার স্কুলের জামাটা কোথায়?

আরিয়া হাসতে হাসতে বলে,

—কাল রাতেই তো গুছিয়ে রেখেছিলাম।

—আমি খুঁজে পাচ্ছি না।

রোহান পাশ থেকে বলে,

—তোর জামা আমি বের করে দিচ্ছি।

কথা সঙ্গে সঙ্গে বাবার কাছে ছুটে যায়।

—বাবা, তুমি দাও।

রোহান মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,

—ঠিক আছে, আমার রাজকন্যা।

আরিয়া দূর থেকে তাকিয়ে হাসে।

—বাবা-মেয়ের জোট হয়েছে দেখছি।

রোহান মজা করে বলে,

—হ্যাঁ। তুই একা হয়ে গেলি।

কথা সঙ্গে সঙ্গে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে,

—না, আমি মায়ের দলেও আছি।

আরিয়া হেসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে।

তিনজনের এমন ছোট ছোট মুহূর্তেই তাদের দিনগুলো কেটে যায়।

একদিন বিকেলে কথা স্কুল থেকে ফিরে খুব চুপচাপ ছিল।

আরিয়া জিজ্ঞেস করল,

—কী হয়েছে?

কথা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—মা, আজ একটা মেয়েকে সবাই অনেক বিরক্ত করছিল।

আরিয়ার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

—তুই কী করেছিস?

—আমি ওর পাশে দাঁড়িয়েছি।

রোহানও তখন পাশে এসে দাঁড়াল।

সে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,

—খুব ভালো করেছিস।

কথা বলল,

—কেউ যেন কাউকে ভয় দেখাতে না পারে, তাই না বাবা?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলল,

—হ্যাঁ। কাউকে ভয় দেখানো বা কষ্ট দেওয়া কখনোই ঠিক নয়।

আরিয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

সে মনে মনে ভাবল, তার মেয়েকে তারা যে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, সেটা ধীরে ধীরে কথার মধ্যেও তৈরি হচ্ছে।

সেদিন রাতে কথা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর রোহান আরিয়া ছাদে গিয়ে দাঁড়াল।

আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ।

রোহান বলল,

—মনে আছে, একসময় তুই এই ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতিস?

আরিয়া হাসল।

—তুই নিচ দিয়ে সাইকেল নিয়ে ঘুরতিস।

—আর তুই আমাকে দেখেও না দেখার ভান করতিস।

—আমি তখন ছোট ছিলাম।

—এখনও তো খুব বেশি বড় হয়ে যাসনি।

আরিয়া মুচকি হেসে বলল,

—তুই বদলাসনি একটুও।

রোহান বলল,

—একটা জিনিস বদলেছে।

—কী?

—তখন তোকে দূর থেকে দেখতাম। এখন তুই আমার পাশে।

আরিয়া কিছু বলল না।

সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ রোহান বলল,

—জানিস, আমাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল কত ছোট একটা ব্যাপার দিয়ে?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—সেই চিঠি?

—হ্যাঁ।

—আমি এখনো রেখেছি।

রোহান অবাক হয়ে বলল,

—এখনো?

—হ্যাঁ।

আরিয়া ঘরে গিয়ে পুরোনো একটা বই নিয়ে এল।

বইয়ের ভেতরে যত্ন করে রাখা সেই ছোট্ট কাগজ।

কাগজটা অনেক পুরোনো হয়ে গেছে।

লেখাগুলোও কিছুটা ফিকে।

রোহান কাগজটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—ভাবতে পারিস, এই ছোট্ট চিঠির পর কত কিছু বদলে গেছে?

আরিয়া বলল,

—অনেক কিছু।

—তখন তোকে শুধু ভালো লাগত।

আরিয়া তাকিয়ে রইল।

রোহান বলল,

—কিন্তু কখন যে তুই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে গেলি, বুঝতেই পারিনি।

আরিয়ার চোখে পানি চলে এল।

সে ধীরে বলল,

—তুই জানিস, ওই চিঠিটা পাওয়ার পর আমার খুব ভালো লেগেছিল।

রোহান অবাক হয়ে বলল,

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তাহলে আগে বলিসনি কেন?

আরিয়া হেসে বলল,

—সব কথা কি তখন বলা যায়?

রোহানও হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর দুজন নিচে ফিরে এল।

কথা তখন ঘুমিয়ে আছে।

তার পাশে বসে আরিয়া মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

রোহানও পাশে এসে দাঁড়াল।

দুজনেই তাদের মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

রোহান ধীরে বলল,

—আমাদের মেয়েটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে।

আরিয়া বলল,

—হ্যাঁ।

—জানিস, আমি একটা জিনিস নিয়ে সবসময় ভয় পাই।

আরিয়া তার দিকে তাকাল।

—কী?

—একদিন ও বড় হয়ে যাবে। নিজের জীবন হবে। আমাদের ছেড়ে নিজের পথে চলে যাবে।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—সেটাই তো স্বাভাবিক।

—জানি।

—তবুও ভয় লাগে?

রোহান মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ। কারণ ও আমাদের ছোট্ট কথা।

আরিয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

—ও যত বড়ই হোক, আমাদের কাছে সবসময় ছোট থাকবে।

রোহান বলল,

—আর আমরা ওকে সবসময় আগলে রাখব।

আরিয়া তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ। তবে ওকে ভয় দিয়ে নয়। ভালোবাসা আর বিশ্বাস দিয়ে।

রোহান মাথা নাড়ল।

—ঠিক বলেছিস।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।

তারপর রোহান বলল,

—তুই কি কখনো ভাবিস, যদি সেই ছোটবেলার দিনগুলোতে আমরা একে অপরকে চিনতাম না?

আরিয়া একটু ভেবে বলল,

—তাহলে হয়তো আমাদের জীবন অন্যরকম হতো।

—কিন্তু আমি সেটা ভাবতে চাই না।

—কেন?

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—কারণ আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মানুষটা তুই।

আরিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।

তারপর ধীরে বলল,

—আর আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা তুই।

রোহান কিছু বলল না।

শুধু আরিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

তাদের গল্পের শুরুটা ছিল শৈশবের দুষ্টুমি দিয়ে।

তারপর ছিল দূরত্ব।

ছিল ভুল বোঝাবুঝি।

ছিল ভয় আর কষ্ট।

ছিল এক টুকরো চিঠি।

তারপর সেই চিঠিই যেন তাদের দুজনকে আবার কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল।

সময় তাদের সম্পর্ককে বদলে দিয়েছে।

একসময় যে রোহান শুধু আরিয়াকে জ্বালানোর জন্য বলত,

—তোর এত অহংকার কেন রে?

আজ সেই রোহানই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা।

আর যে আরিয়া একসময় সবার সামনে চুপচাপ থাকত, আজ সে নিজের সংসারে হাসি-আনন্দে ভরে আছে।

তাদের ছোট্ট কথা ঘুমিয়ে আছে শান্তিতে।

রোহান আর আরিয়া মেয়ের পাশে বসে শেষবারের মতো একে অপরের দিকে তাকাল।

রোহান ধীরে বলল,

—আমরা আমাদের মেয়েকে সবসময় আগলে রাখব।

আরিয়া তার কথাটা শেষ করে দিল,

—কোনো ভয় ওর কাছে আসতে দেব না। কারও খারাপ নজর ওর হাসিটা কেড়ে নিতে দেব না।

রোহান মেয়ের মাথায় হাত রাখল।

—আমাদের কথা সবসময় নিরাপদে থাকবে।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ। আমাদের ছোট্ট কথা।

বাইরে তখন রাত গভীর।

আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছে।

আর ঘরের ভেতর পাশাপাশি বসে থাকা দুজন মানুষ তাদের ছোট্ট মেয়েকে দেখে বুঝতে পারছিল—

জীবন তাদের যত পরীক্ষা নিয়েছে, শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে তুলে দিয়েছে সবচেয়ে সুন্দর উপহার।

একটা পরিবার।

একটা ঘর।

আর সেই ঘরের সবচেয়ে মিষ্টি নাম—

কথা।

....
👁 286