বাজির আড়ালে সত্যি অনুভূতি

ইভান শহরে থেকে পড়াশোনা করত। গ্রামের বাড়িতে তার আসা খুব একটা হতো না। ছোটবেলা থেকেই সে একটু গম্ভীর স্বভাবের। অকারণে কারও সঙ্গে কথা বলত না, গ্রামের মানুষের সঙ্গে খুব বেশি মিশতও না। তার মধ্যে একটা আলাদা আত্মবিশ্বাস ছিল, যেটাকে অনেকেই অহংকার বলত।

কয়েকদিনের ছুটিতে এবার সে গ্রামের বাড়িতে এসেছে।

গ্রামের বাড়িতে এলেও ইভানের বেশিরভাগ সময় কাটত নিজের মতো করে। কখনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত, কখনো বাইরের দিকে ঘুরতে যেত।

এক বিকেলে গ্রামের পাশের বড় মাঠে গেল ইভান। তখন ধান কাটার মৌসুম। মাঠজুড়ে কৃষকেরা ব্যস্ত হয়ে ধান কাটছিল। কেউ ধান আঁটি বাঁধছে, কেউ কেটে রাখা ধান এক জায়গায় জমা করছে।

ইভান মাঠের আইলের ওপর দাঁড়িয়ে চুপচাপ সবার কাজ দেখছিল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা মেয়ের হাসির শব্দ শুনতে পেল।

—মায়া, আস্তে হাঁট! এত তাড়া কিসের?

ইভান পেছনে তাকাল।

সে মায়াকে চিনত। গ্রামের মেয়ে, ছোটবেলা থেকেই পরিচিত। মায়ার সঙ্গে আরও একজন মেয়ে ছিল।

মেয়েটাকে দেখে ইভান একবার তাকাল, তারপর আর কোনো আগ্রহ দেখাল না।

মায়া ইভানের কাছে এসে বলল,

—কী রে ইভান ভাই, কবে এলি?

ইভান স্বাভাবিক গলায় বলল,

—দুই দিন হলো।

—আমাদের বাড়িতে তো আসলি না!

—সময় পাইনি।

মায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—শহরে গিয়ে অনেক বড় মানুষ হয়ে গেছিস মনে হয়।

ইভান কোনো উত্তর দিল না।

মায়ার সঙ্গে থাকা মেয়েটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। ইভান একবারও তাকে জিজ্ঞেস করল না সে কে।

মায়া বলল,

—ওকে চিনিস?

ইভান ভ্রু কুঁচকে মেয়েটার দিকে তাকাল।

—না।

মায়া হেসে বলল,

—নীরা।

ইভান নামটা শুনে শুধু মাথা নাড়ল।

নীরা ইভানের দিকে তাকিয়ে ছিল।

তারপর মায়া হঠাৎ বলল,

—চল, ওইদিকে যাই।

দুজন এগিয়ে গেল।

ইভান আবার মাঠের দিকে তাকাল।

মায়া কিছুদূর গিয়ে পেছনে তাকিয়ে বলল,

—নীরা, চল।

নীরা যাওয়ার আগে একবার ইভানের দিকে তাকাল।

ইভান তখনও ধান কাটার দৃশ্য দেখছিল।

মেয়েটার দিকে তার কোনো খেয়ালই ছিল না।

নীরা মুখ ফিরিয়ে নিল।

তার ভেতরে অদ্ভুত একটা বিরক্তি তৈরি হলো।

মায়া ফিসফিস করে বলল,

—কী হলো?

নীরা বলল,

—কিছু না।

—মুখ এমন করেছিস কেন?

—তোর ওই ইভান ভাইটা এমন ভাব দেখায় কেন?

মায়া হেসে বলল,

—ও এমনই। ছোটবেলা থেকেই একটু গম্ভীর।

নীরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

—গম্ভীর না, অহংকারী।

মায়া হেসে ফেলল।

—তুই তো ওর সঙ্গে ঠিকমতো কথাই বলিসনি।

—কথা বললেই বুঝেছি।

দুজন হাসতে হাসতে চলে গেল।

নীরা জানত না, এই ইভানই তার দূরসম্পর্কের ফুফাতো ভাই। ছোটবেলায় তাদের দেখা হয়েছিল, কিন্তু এত বছর পর দুজনের কেউই একে অপরকে চিনতে পারেনি।

পরের কয়েকদিন নীরা মাঝেমধ্যেই ইভানকে দেখত।

কখনো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে, কখনো বাজারে যাচ্ছে, কখনো গ্রামের মাঠে ঘুরছে।

আর প্রতিবারই নীরার মনে হতো, ছেলেটার মধ্যে অসম্ভব একটা ভাব।

একদিন বিকেলে নীরা ইভানের এক বন্ধুকে দেখতে পেল।

ছেলেটা রাস্তার পাশে বসে ছিল।

নীরা কাছে গিয়ে বলল,

—কিরে?

—কী?

—তোর ওই বন্ধুর এত ভাব কেন?

ইভানের বন্ধু হেসে বলল,

—কোন বন্ধুর কথা বলছিস?

—ইভান।

ছেলেটা হেসে বলল,

—ও তো এমনই।

নীরা বলল,

—কিন্তু ওর এমন ভাব দেখানোর কারণটা কী?

—কী জানি!

নীরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আচ্ছা, ও কি সবার সঙ্গেই এমন?

—প্রায় সবার সঙ্গেই।

নীরা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

—আমার পেছনে তো কত ছেলে ঘোরে। আমি কাউকে পাত্তা দিই না। ওই ছেলের এত ভাব কিসের?

ইভানের বন্ধু এবার মুচকি হাসল।

সে বুঝতে পারল, নীরা ইভানের ব্যাপারে একটু বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছে।

সে বলল,

—আচ্ছা, একটা কাজ করবি?

—কী?

—বাজি ধর।

নীরা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

—কিসের বাজি?

ছেলেটা বলল,

—তুই যদি ইভানকে তোর পেছনে ঘোরাতে পারিস, তাহলে আমি তোকে মিষ্টি খাওয়াব।

নীরা হেসে বলল,

—আর যদি না পারি?

—তাহলে তুই আমাকে মিষ্টি খাওয়াবি।

নীরা কিছুক্ষণ ভাবল।

তারপর আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,

—রাজি।

—সত্যি?

—হ্যাঁ। কতদিন লাগবে বল?

বন্ধু হেসে বলল,

—যতদিন লাগে লাগুক। শুধু ইভানকে তোর পেছনে ঘুরাতে হবে।

নীরা চোখ ছোট করে বলল,

—ওকে ঘোরানো আমার জন্য কোনো ব্যাপার না।

বন্ধু বলল,

—দেখা যাবে।

নীরা হেসে চলে গেল।

কিন্তু সে জানত না, এই সামান্য বাজিটাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে দাঁড়াবে।

আর ইভান?

সে তখনও কিছুই জানত না।

সে জানত না, গ্রামের এক মেয়ে তাকে নিয়ে বাজি ধরেছে।

বাজি ধরার পর থেকেই নীরা মনে মনে ঠিক করে ফেলল, ইভানের অহংকারটা একটু হলেও কমিয়ে ছাড়বে।

তবে সরাসরি কিছু করার ইচ্ছা তার ছিল না। আগে সে বুঝতে চাইল, ইভান আসলে কেমন।

পরদিন বিকেলে নীরা তার চাচাতো বোন তানিয়ার বাড়িতে গেল। তানিয়ার সঙ্গে নীরার খুব ভালো সম্পর্ক। প্রায়ই সে এই বাড়িতে এসে গল্প করত।

তানিয়া ঘরে বসে কাপড় গুছাচ্ছিল। নীরা বিছানায় বসে মোবাইল হাতে নিয়ে বলল,

—জানিস, তোর ওই ইভান ভাইটাকে না আমার একদম ভালো লাগে না।

তানিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—কী করেছে আবার?

—কিছুই করেনি।

—তাহলে?

নীরা বিরক্ত হয়ে বলল,

—এই তো সমস্যা। এমন ভাব দেখায় যেন আমি ওর সামনে কেউই না। সেদিন মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি সামনে দিয়ে গেলাম, একবার ভালো করে তাকালও না।

তানিয়া হেসে বলল,

—তুই চাস ও তোর দিকে তাকাক?

নীরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—না! আমি শুধু বলছি, মানুষের সঙ্গে একটু স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে হয়।

তানিয়া মুচকি হেসে বলল,

—বুঝেছি।

—কী বুঝেছিস?

—কিছু না।

নীরা চোখ বড় করে বলল,

—তুই আবার কী বুঝলি?

তানিয়া হেসে বলল,

—তুই ইভানকে নিয়ে বেশ ভাবছিস।

নীরা সঙ্গে সঙ্গে বালিশ তুলে তানিয়ার দিকে ছুড়ে মারল।

—চুপ কর তো!

দুজনেই হেসে উঠল।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে কারও কণ্ঠ শোনা গেল।

—তানিয়া, আছিস?

তানিয়া বলল,

—ইভান ভাই!

নীরার হাসি সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।

ইভান ঘরে ঢুকল।

সে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোর বাবা কোথায়?

—বাইরে গেছেন।

—আচ্ছা।

ইভান ঘুরে দাঁড়াতেই তানিয়ার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এল।

সে নীরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

নীরা চোখের ইশারায় বলল, ‘কী?’

তানিয়া বলল,

—ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

—কর।

—আপনি নাকি নীরাকে সেদিন মাঠে দেখে খুব ভাব দেখিয়েছেন?

ইভান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

—আমি?

নীরা চুপ করে বসে রইল।

তানিয়া আবার বলল,

—হ্যাঁ। ও বলছে, আপনি নাকি ওর দিকে ঠিকমতো তাকানওনি।

ইভান নীরার দিকে তাকাল।

নীরা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

ইভান শান্তভাবে বলল,

—ওর দিকে তাকাব কেন?

নীরা এবার ঘুরে তাকাল।

—দেখেছিস?

তানিয়া হেসে ফেলল।

ইভান বলল,

—আমি তো ওকে চিনিই না।

নীরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

—এখন চিনেন।

—হ্যাঁ, নামটা জানলাম।

—তারপর?

—তারপর কী?

নীরা আর কিছু বলতে পারল না।

ইভান তানিয়ার সঙ্গে অন্য কথা বলে চলে গেল।

দরজা দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তানিয়া হেসে বলল,

—কী হলো? মুখ এমন কেন?

নীরা বিরক্ত হয়ে বলল,

—ছেলেটা সত্যিই অসহ্য।

তানিয়া বলল,

—তুই তো বলেছিলি ওকে তোর পেছনে ঘোরাবি।

নীরা আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,

—ঘোরাবই।

—কীভাবে?

নীরা একটু ভেবে বলল,

—ওকে আগে বুঝতে দিতে হবে যে আমি ওকে পাত্তা দিই না।

তানিয়া মাথা নাড়ল।

—তাহলে তো তুই ওর মতোই আচরণ করবি।

—ঠিক তাই।

এরপর কয়েকদিন নীরা ইভানের সামনে ইচ্ছা করেই নির্লিপ্ত থাকত।

রাস্তা দিয়ে ইভান এলে সে অন্যদিকে তাকাত।

ইভান কথা বললে ছোট করে উত্তর দিত।

আর ইভানের সামনে অন্যদের সঙ্গে হাসাহাসি করত।

ইভান প্রথমে বিষয়টা খেয়াল করেনি।

কিন্তু ধীরে ধীরে তার নজরে পড়ল।

একদিন বাজার থেকে ফেরার পথে ইভান তার বন্ধু রাকিবের সঙ্গে হাঁটছিল।

সামনে নীরা কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল।

নীরার চোখ ইভানের দিকে গেল।

কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে তাকিয়ে বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।

ইভান থেমে গেল না।

কিন্তু কয়েক পা যাওয়ার পর পেছনে তাকাল।

নীরা তখনও তার দিকে তাকায়নি।

রাকিব বিষয়টা খেয়াল করল।

সে হেসে বলল,

—কী হলো?

—কিছু না।

—পেছনে তাকালি কেন?

—এমনিই।

রাকিব আর কিছু বলল না।

কিন্তু তার মুখের হাসি আরও বড় হলো।

পরদিন ইভান আবার নীরাকে দেখল।

এবার নীরা ইভানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মায়াকে বলল,

—চল, অন্য রাস্তা দিয়ে যাই।

ইভান শুনে ফেলল।

তার ভ্রু কুঁচকে গেল।

সে মনে মনে ভাবল,

‘আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে কেন?’

এরপর থেকেই অদ্ভুত একটা ব্যাপার শুরু হলো।

ইভান অজান্তেই নীরাকে খুঁজতে শুরু করল।

সকালে বাড়ি থেকে বের হলে রাস্তার দিকে তাকাত।

বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে বের হলে নীরা কোথায় আছে, সেটা খেয়াল করত।

কেউ তাকে কিছু বললে সে বিরক্ত হয়ে বলত,

—আমি কাউকে খুঁজছি না।

কিন্তু সে নিজেই বুঝতে পারছিল, তার চোখ বারবার একই মানুষটাকে খুঁজছে।

একদিন রাকিব সরাসরি বলেই ফেলল,

—তুই নীরাকে খুঁজছিস?

ইভান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—না।

—তাহলে ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে তিনবার ঘুরলি কেন?

ইভান থেমে গেল।

—আমার কাজ ছিল।

রাকিব হেসে বলল,

—কী কাজ?

ইভান কোনো উত্তর দিল না।

সেদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তার মাথায় নীরার মুখটা ভেসে উঠল।

মাঠের সেই মেয়েটা।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা।

তারপর তর্কের সময় চোখ বড় করে তাকানো।

ইভান নিজেই অবাক হয়ে গেল।

‘আমি ওকে নিয়ে এত ভাবছি কেন?’

সে নিজেকে বোঝাল,

‘হয়তো ওর আচরণটাই বিরক্ত করছে।’

কিন্তু পরদিন সকালে আবার তার প্রথম প্রশ্ন ছিল—

নীরা আজ কোথায়?

এদিকে নীরা তানিয়ার কাছে গিয়ে গর্ব করে বলল,

—দেখেছিস? কাজ হচ্ছে।

তানিয়া বলল,

—কী কাজ?

—ও এখন আমাকে খুঁজে বেড়ায়।

—তুই কীভাবে জানলি?

নীরা হেসে বলল,

—আজ রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনবার তাকিয়েছে।

তানিয়া বলল,

—সাবধানে খেলিস কিন্তু।

নীরা হেসে বলল,

—ভয় নেই। বাজি আমি জিতবই।

কিন্তু নীরা জানত না, সে যে খেলাটা শুরু করেছে, তার নিয়ম খুব দ্রুত বদলে যেতে চলেছে।

কারণ ইভানের কাছে এখন আর ব্যাপারটা শুধু অহংকারের ছিল না।

তার মনে নীরাকে নিয়ে সত্যিই একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিতে শুরু করেছে।

নীরার ধারণা ছিল, সে খুব সহজেই ইভানকে নিজের পেছনে ঘোরাতে পারবে। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই সে নিজেই বুঝতে পারল, বিষয়টা আর শুধু বাজির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

ইভান এখন প্রায়ই নীরাদের বাড়ির আশপাশের রাস্তায় দেখা যায়।

কখনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আসে, কখনো একা।

নীরা জানালার আড়াল থেকে তাকে দেখত, কিন্তু ইচ্ছে করেই বাইরে আসত না।

একদিন মায়া এসে নীরাকে বলল,

—কী রে, তোর ওই বাজির খবর কী?

নীরা হেসে বলল,

—কোন বাজি?

—ইভানকে নিয়ে।

নীরা একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

—ওকে এখন সহজেই আমার পেছনে ঘোরানো যাবে।

মায়া হেসে বলল,

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—কীভাবে বুঝলি?

নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—ও এখন আমাকে দেখার জন্যই আশেপাশে ঘোরে।

মায়া বলল,

—তুই কি নিশ্চিত?

—একদম।

কিন্তু নীরা যতই আত্মবিশ্বাস দেখাক, নিজের মনের ভেতরেও একটা পরিবর্তন সে টের পাচ্ছিল।

ইভানকে দেখলে তার আগের মতো শুধু রাগ হতো না।

বরং অদ্ভুত একটা ভালো লাগাও হতো।

তবে সে নিজেকে বোঝাত,

‘এটা শুধু বাজির জন্য।’

অন্যদিকে ইভানও নিজের পরিবর্তন বুঝতে পারছিল না।

একদিন রাকিবের সঙ্গে বসে চা খাচ্ছিল।

রাকিব হঠাৎ বলল,

—একটা কথা বলব?

—বল।

—তুই নীরাকে পছন্দ করিস?

ইভান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—জানি না।

রাকিব হেসে বলল,

—জানি না মানে হ্যাঁ।

ইভান মুচকি হাসল।

—ওকে প্রথম দেখায় তেমন কিছু মনে হয়নি।

—এখন?

ইভান দূরে তাকিয়ে বলল,

—এখন ওকে না দেখলে কেমন যেন লাগে।

রাকিব কিছু বলল না।

ইভান আবার বলল,

—কিন্তু একটা সমস্যা আছে।

—কী?

—ও আমাকে পাত্তা দেয় না।

রাকিব হেসে বলল,

—তুই তো কাউকে পাত্তা দিতিস না। এখন বুঝলি কেমন লাগে?

ইভানও হেসে ফেলল।

এরপর একদিন বিকেলে ইভান নীরার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

নীরা তখন চাচাতো বোনের বাড়ি থেকে ফিরছিল।

ইভান বলল,

—একটু দাঁড়াবে?

নীরা থেমে গেল।

—কেন?

—তোমার সঙ্গে কথা আছে।

—বলুন।

ইভান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তুমি কি আমাকে ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছ?

নীরা ভান করে অবাক হলো।

—আমি? না তো।

—তাহলে আমাকে দেখলেই অন্যদিকে চলে যাও কেন?

নীরা মুচকি হাসল।

—আপনি কি আমাকে এত খেয়াল করেন?

ইভান একটু থমকে গেল।

নীরা বলল,

—যাই হোক, আমার যেতে হবে।

সে চলে যেতে শুরু করল।

ইভান পেছন থেকে বলল,

—নীরা!

নীরা থামল।

ইভান বলল,

—তোমাকে একটা কথা বলব।

—বলুন।

—তোমাকে আমার ভালো লাগে।

নীরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

কিন্তু মুখে সে কিছুই প্রকাশ করল না।

বরং বলল,

—আচ্ছা।

ইভান অবাক হয়ে বলল,

—আচ্ছা মানে?

—শুনলাম।

—তুমি কিছু বলবে না?

নীরা মাথা নাড়ল।

—না।

ইভান হতাশ হয়ে বলল,

—তুমি কি আমাকে একটুও পাত্তা দাও না?

নীরা হেসে বলল,

—আপনি তো আমাকে প্রথম দিন থেকেই পাত্তা দেননি।

ইভান বলল,

—আমি তখন তোমাকে চিনতাম না।

—এখন চিনেছেন।

—হ্যাঁ।

—তাহলে?

ইভান একটু এগিয়ে এসে বলল,

—এখন তোমাকে চিনেছি বলেই তো বলছি।

নীরার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

সে বলল,

—আপনি অনেক দেরি করে ফেলেছেন।

—কিসের?

—কিছু না।

এই বলে নীরা চলে গেল।

ইভান তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

সে বুঝতে পারল না, নীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করল, নাকি ইচ্ছে করেই এমন করল।

অন্যদিকে নীরা বাড়ি ফিরে সরাসরি তানিয়ার কাছে গেল।

তানিয়া জিজ্ঞেস করল,

—কী হলো?

নীরা হাসতে হাসতে বলল,

—ও আমাকে বলেছে, আমাকে ওর ভালো লাগে।

তানিয়া অবাক হয়ে বলল,

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তাহলে বাজি জিতে গেলি!

নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—হ্যাঁ।

তানিয়া খেয়াল করল, নীরার মুখে আগের সেই বিজয়ের আনন্দ নেই।

সে জিজ্ঞেস করল,

—তুই খুশি না?

নীরা মৃদু গলায় বলল,

—জানি না।

—কী হয়েছে?

নীরা মাথা নিচু করে বলল,

—ও যখন বলল, তখন আমার সত্যিই ভালো লেগেছিল।

তানিয়া চুপ হয়ে গেল।

নীরা নিজেই অবাক হয়ে বলল,

—কিন্তু আমি তো শুধু বাজির জন্য শুরু করেছিলাম।

তানিয়া বলল,

—সব খেলা শেষ পর্যন্ত খেলা থাকে না।

নীরা কোনো উত্তর দিল না।

সেদিন রাতে সে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

বারবার ইভানের কথাটা মনে পড়ছিল—

‘তোমাকে আমার ভালো লাগে।’

তার নিজের অজান্তেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।

পরদিন ইভান নীরাকে দেখলে নীরা এবার আর মুখ ফিরিয়ে নিল না।

বরং হেসে তাকাল।

ইভানও মুচকি হাসল।

তাদের মধ্যে দূরত্বটা যেন ধীরে ধীরে কমে আসছিল।

কিন্তু এই সম্পর্কের কথা নীরার বড় ভাই রাশেদ জানত না।

রাশেদ ছোটবেলা থেকেই নীরাকে খুব কড়া শাসনে রাখত।

নীরা কোথায় যায়, কার সঙ্গে কথা বলে—সবকিছুর ওপর তার নজর থাকত।

আর ইভানের সঙ্গে নীরার এই নতুন সম্পর্ক যদি সে জানতে পারে, তাহলে কী হবে—সেটা নীরা কল্পনাও করতে পারছিল না।

কয়েকদিন পর নীরা তার চাচার বাড়িতে গেল।

সেখানে ইভানও ছিল।

দুজনের দেখা হতেই আবার শুরু হলো খুনসুটি।

নীরা বলল,

—আপনি আবার এখানে?

ইভান বলল,

—তুমি যেখানে থাকো, সেখানেই কি আমি আসতে পারব না?

—আপনার তো অনেক কাজ।

—তোমাকে দেখার চেয়ে বড় কাজ নেই।

নীরা হেসে ফেলল।

—বেশি কথা শিখেছেন।

—তোমার কাছ থেকেই।

তাদের কথার মাঝে হঠাৎ নীরার চোখ পড়ল দরজার দিকে।

দূরে কেউ একজন হাঁটছে।

কিন্তু নীরা বুঝতে পারল না, সেটা কে।

আর কয়েক মুহূর্ত পরেই সেই মানুষটার উপস্থিতি তাদের হাসির মুহূর্তটাকে ভয়াবহ এক ঘটনায় পরিণত করতে চলেছে।

কারণ মানুষটা ছিল রাশেদ।

নীরার বড় ভাই।

নীরা তখনও বুঝতে পারেনি, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তার বড় ভাই রাশেদ।

সে ইভানের সঙ্গে হাসতে হাসতে কথা বলছিল।

ইভানও আগের মতো গম্ভীর ছিল না। নীরার সঙ্গে থাকলে তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠত।

নীরা বলল,

—আপনি সবসময় এত গম্ভীর থাকেন কেন?

ইভান বলল,

—সবাইকে তো আর তোমার মতো করে দেখা যায় না।

—মানে?

—মানে তুমি একটু আলাদা।

নীরা হেসে বলল,

—এই কথাটা আরও অনেক মেয়েকে বলেছেন নিশ্চয়ই।

ইভান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—না।

—বিশ্বাস করব কেন?

—কারণ সত্যি বলছি।

নীরা কিছু বলল না। শুধু মুচকি হাসল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে গম্ভীর একটা কণ্ঠ শোনা গেল,

—নীরা!

নীরার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

রাশেদ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

নীরার বুক কেঁপে উঠল।

—ভাইয়া...

রাশেদ কোনো কথা না বলে প্রথমে ইভানের দিকে তাকাল।

তার চোখে প্রচণ্ড রাগ।

—তুই এখানে কী করছিস?

ইভান শান্তভাবে বলল,

—চাচার বাড়িতে এসেছি।

রাশেদ গর্জে উঠল,

—মিথ্যা বলিস না।

নীরা তাড়াতাড়ি বলল,

—ভাইয়া, ও শুধু—

রাশেদ নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই চুপ কর।

ইভান এবার বলল,

—আপনি ভুল বুঝছেন। আমরা শুধু কথা বলছিলাম।

রাশেদ এগিয়ে এসে ইভানের জামার কলার ধরে ফেলল।

—আমার বোনের সঙ্গে কথা বলার সাহস কোথায় পেলি?

ইভান নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,

—কলার ছাড়ুন। আপনি ভুল করছেন।

রাশেদ তাকে ধাক্কা দিল।

—তুই আমাকে শেখাবি আমি ভুল করছি?

নীরা ভয় পেয়ে বলল,

—ভাইয়া, প্লিজ! ওকে কিছু করবেন না।

রাশেদ আরও রেগে গেল।

—তুই ওর জন্য এত কথা বলছিস কেন?

নীরা চুপ হয়ে গেল।

রাশেদ ইভানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।

ইভানও আর কিছু বলল না। সে বুঝতে পারছিল, এখন কথা বাড়ালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

রাশেদ নীরার হাত শক্ত করে ধরে বলল,

—চল বাড়ি।

—ভাইয়া, আমার কথা শোনো—

—একটা কথাও বলবি না।

রাশেদ নীরাকে টেনে বাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগল।

নীরা কাঁদতে কাঁদতে পেছনে তাকাল।

ইভান তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

ইভানের চোখে চিন্তা।

নীরার চোখে ভয়।

রাশেদ তাকে টেনে নিয়ে গেল।

বাড়িতে ঢুকেই রাশেদ দরজা বন্ধ করে দিল।

নীরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—ভাইয়া, আমি কোনো অন্যায় করিনি।

রাশেদ চিৎকার করে বলল,

—তুই জানিস না তুই কী করেছিস?

—আমি শুধু ওর সঙ্গে কথা বলেছি।

—কেন?

নীরা চুপ।

রাশেদ বলল,

—ওর সঙ্গে আর কোনোদিন কথা বলবি না।

নীরা চোখের পানি মুছে বলল,

—আমি কথা বলব কি না, সেটা—

কথা শেষ করার আগেই রাশেদ আরও রেগে গেল।

—তুই আমার সঙ্গে তর্ক করছিস?

নীরা ভয় পেয়ে চুপ করে গেল।

রাশেদ বলল,

—দাঁড়া। আমি বাইরে থেকে ফিরে এসে তোকে দেখে নেব। তখন বুঝবি, আমার কথা অমান্য করার ফল কী।

এই কথা বলে রাশেদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

নীরা ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল।

তার মনে হচ্ছিল, বাড়িতে থাকলে আজ বড় বিপদ হবে।

সে জানত, রাশেদ রাগের সময় কোনো কথা শুনবে না।

কিছুক্ষণ পর নীরা সুযোগ বুঝে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

সে কোথায় যাবে, কী করবে—কিছুই বুঝতে পারছিল না।

গ্রামের রাস্তা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হাঁটছিল।

ঠিক তখনই সামনে ইভানের দুই বন্ধু রাকিব আর সজীব এসে পড়ল।

রাকিব অবাক হয়ে বলল,

—নীরা? তুই কাঁদছিস কেন?

নীরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি বাড়িতে যাব না।

সজীব বলল,

—কী হয়েছে?

নীরা সবকিছু বলল।

রাকিব চিন্তিত হয়ে বলল,

—তুই এখন বাড়িতে গেলে রাশেদ ভাই তোকে অনেক বকাঝকা করবে।

নীরা বলল,

—আমি কোথায় যাব?

রাকিব একটু ভেবে বলল,

—আমাদের সঙ্গে চল।

—কোথায়?

—ইভানদের ফুফুর বাড়িতে। সেখানে ফুফুরা আছে, তোর চাচাতো বোনও আছে। তুই একা থাকবি না।

নীরা কিছুক্ষণ দ্বিধায় রইল।

তারপর বলল,

—চলো।

তারা তিনজন দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর তারা ইভানদের ফুফুর বাড়িতে পৌঁছাল।

নীরা দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।

ভেতরে ইভান বসে আছে।

ইভানও নীরাকে দেখে উঠে দাঁড়াল।

—তুমি এখানে?

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—আপনি এখানে কেন?

ইভান বলল,

—আমি তো এখানেই এসেছিলাম।

নীরা কিছু বলতে পারল না।

ফুফু পরিস্থিতি বুঝে নীরাকে কাছে টেনে নিলেন।

—ভয় পাস না মা। এখানে থাক।

কিছুক্ষণ পর পরিবারের বড়রা বসে আলোচনা শুরু করলেন।

একজন বললেন,

—এভাবে মেয়েটাকে রাখা ঠিক হবে না।

আরেকজন বললেন,

—ইভান আর নীরার মধ্যে যদি সত্যিই কিছু থাকে, তাহলে বিয়েটা দিয়ে দেওয়া যায়।

নীরা চমকে উঠল।

—না! আমি বিয়ে করব না।

ইভানও চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ পর একজন কাজিকে ডেকে আনা হলো।

কাজি এসে দুজনকে দেখে অবাক হয়ে বললেন,

—আরে, ছেলে-মেয়ে তো এখনো ছোট। এদের বিয়ে দেওয়া যাবে না।

বাড়ির সবাই চুপ হয়ে গেল।

নীরা মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

রাতের মধ্যেই রাশেদ লোকজন নিয়ে সেখানে এসে হাজির হলো।

সে নীরাকে দেখে বলল,

—চল আমার সঙ্গে।

নীরা ভয়ে ইভানের দিকে তাকাল।

ইভান কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু নীরার পরিবারের লোকজন তাকে থামিয়ে দিল।

রাশেদ নীরাকে নিয়ে চলে গেল।

সেই রাতেই সবকিছু আরও ভয়াবহ হয়ে উঠল।

পরদিন সকালে ইভান জানতে পারল, তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগ—

ইভান নাকি নীরাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে।

ইভান হতভম্ব হয়ে গেল।

—কী?

রাকিব বলল,

—হ্যাঁ। তোর নামে মামলা করেছে।

ইভান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।

তার মনে শুধু নীরার মুখটা ভেসে উঠল।

সে জানত, নীরা নিজের ইচ্ছায় তাদের সঙ্গে এসেছিল।

কিন্তু সেটা প্রমাণ করার মতো কোনো কাগজ বা সাক্ষ্য এখন তার হাতে নেই।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ এসে ইভানকে নিয়ে গেল।

নীরা খবরটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল।

সে বারবার বলতে চাইল, ইভান তাকে তুলে নেয়নি।

কিন্তু তার কথা শোনার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

গ্রামের মানুষজন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করতে লাগল।

—মেয়েটাকে নাকি নিয়ে পালিয়েছিল।

—ছেলেটা ধরা পড়েছে।

—এখন কী হবে কে জানে!

নীরা ঘরের ভেতর বসে কাঁদতে লাগল।

তার মনে হচ্ছিল, একটা ছোট্ট ভুলের জন্য দুজনের জীবনই যেন শেষ হয়ে গেল।

আর দূরে থানার ভেতরে বসে ইভান শুধু একটা কথাই ভাবছিল—

‘নীরা কি কখনো সত্যিটা বলতে পারবে?’

ইভানকে থানায় নেওয়ার পর থেকেই নীরাদের বাড়ির সামনে মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেল। কেউ সরাসরি কিছু বলত না, কিন্তু দূর থেকে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করত।

নীরা জানালার পাশে বসে সব শুনত।

কেউ বলত,

—মেয়েটা নাকি ছেলেটার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল।

আরেকজন বলত,

—এখন আবার নাটক করছে।

নীরা চোখ বন্ধ করে ফেলত।

প্রতিটা কথা তার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধত।

সে জানত, সত্যিটা কী।

কিন্তু সত্যি জানলেই তো সবাই বিশ্বাস করে না।

সেদিন রাতেও নীরা ঘুমাতে পারল না।

তার মনে শুধু ইভানের কথা।

ইভান তাকে কখনো জোর করেনি।

বরং সেদিন যখন রাশেদ তাকে নিয়ে যাচ্ছিল, ইভান শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।

তবুও আজ সে জেলে।

আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী যেন নীরাই।

নীরা নিজের মনেই বলল,

‘আমি যদি সেদিন বাড়ি থেকে বের না হতাম!’

তারপর আবার মনে হলো,

‘আমি তো ভয় পেয়েছিলাম।’

চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে নীরার মা ঘরে এসে বসে বললেন,

—মা, কিছু খেয়েছিস?

নীরা মাথা নাড়ল।

—না।

—কেন?

—খেতে ইচ্ছে করছে না।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—সব ঠিক হয়ে যাবে।

নীরা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

—মা, ইভান তো আমাকে নিয়ে যায়নি।

মা চুপ করে রইলেন।

—তুমি তো জানো, তাই না?

নীরার মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—জানি।

—তাহলে সবাইকে বলো না কেন?

মা চোখ নামিয়ে বললেন,

—সবকিছু এত সহজ না।

নীরা বুঝতে পারল, পরিবার, সমাজ আর মানুষের কথা—সবকিছু মিলে তার মাকে অসহায় করে দিয়েছে।

কয়েকদিন পর ইভানের মা নীরাদের বাড়িতে এলেন।

চোখে পানি, মুখে অসহায়ত্ব।

তিনি নীরার মায়ের হাত ধরে বললেন,

—আপা, আমার ছেলেটাকে বাঁচান।

নীরার মা কিছু বলতে পারলেন না।

ইভানের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

—ও কোনো খারাপ কাজ করেনি। ও শুধু তোমার মেয়েকে ভালোবেসেছিল।

নীরা পাশের ঘরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।

তার বুকটা ভার হয়ে গেল।

ইভানের মা এবার নীরার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

—মা, তুই তো জানিস আমার ছেলে তোকে তুলে নেয়নি।

নীরা চোখের পানি মুছে বলল,

—জানি।

—তাহলে সত্যিটা বল।

নীরা চুপ।

—আমার ছেলেটার জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে।

নীরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি সত্যি বলতে চাই।

ইভানের মা তার হাত ধরে বললেন,

—তাহলে বল।

নীরা মাথা নিচু করে বলল,

—কিন্তু আমার ভাই আমাকে বলতে দেবে না।

ঠিক তখন রাশেদ ঘরে ঢুকল।

সে কঠিন গলায় বলল,

—এখানে কী হচ্ছে?

ইভানের মা উঠে দাঁড়ালেন।

—আমি শুধু আমার ছেলেকে বাঁচানোর কথা বলতে এসেছি।

রাশেদ বলল,

—আপনার ছেলে যা করেছে, তার বিচার হবে।

নীরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—ভাইয়া, ইভান আমাকে তুলে নেয়নি।

রাশেদ নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই আবার শুরু করেছিস?

—আমি সত্যি বলছি।

—চুপ কর।

ইভানের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

—মেয়েটা যখন নিজেই বলছে, তখন—

রাশেদ তাকে থামিয়ে বলল,

—আপনি এখন বাড়ি যান।

ইভানের মা কিছুক্ষণ নীরার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেলেন।

নীরা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের কাছেই হেরে যাচ্ছে।

এদিকে দিন যত যাচ্ছিল, ইভানের অবস্থা তত খারাপ হচ্ছিল।

কারাগারে বসে সে খুব কম কথা বলত।

রাকিব একদিন দেখা করতে গিয়ে বলল,

—ইভান, তুই ভেঙে পড়িস না।

ইভান মৃদু হেসে বলল,

—আমি ভেঙে পড়িনি।

—তাহলে এমন চুপ করে আছিস কেন?

ইভান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আমি শুধু ভাবছি, মানুষকে ভালোবাসা কি এত বড় অপরাধ?

রাকিব কোনো উত্তর দিতে পারল না।

ইভান আবার বলল,

—নীরাকে কেউ দোষ দিস না।

—কিন্তু—

—ওকে দোষ দিস না।

রাকিব মাথা নেড়ে বলল,

—ঠিক আছে।

ইভান জেলের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল,

—ও নিশ্চয়ই অনেক ভয় পেয়েছে।

তার কণ্ঠে রাগ ছিল না।

ছিল শুধু কষ্ট।

কয়েক সপ্তাহ পর ইভানের পরিবার বুঝতে পারল, মামলা এভাবে চলতে থাকলে ইভানের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ—সব শেষ হয়ে যাবে।

তারা অনেক জায়গায় চেষ্টা করল।

কিন্তু রাশেদ কোনোভাবেই মামলা তুলে নিতে রাজি হচ্ছিল না।

একদিন রাশেদ ইভানের পরিবারের কাছে একটা প্রস্তাব দিল।

—টাকা দিলে মামলা মিটিয়ে দেব।

ইভানের মা হতভম্ব হয়ে বললেন,

—টাকা?

—হ্যাঁ।

—কত?

রাশেদ একটা বড় অঙ্কের টাকা বলল।

ইভানের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

—আমরা এত টাকা কোথায় পাব?

রাশেদ বলল,

—ছেলের জীবন বাঁচাতে হলে ব্যবস্থা করতে হবে।

এই কথাটা নীরার কানে গেল।

সে রাশেদের সামনে এসে দাঁড়াল।

—আমার সম্মানের বিনিময়ে টাকা নেবে?

রাশেদ বিরক্ত হয়ে বলল,

—আবার শুরু করিস না।

নীরা চোখে পানি নিয়ে বলল,

—আমি কোনো অপরাধ করিনি। ইভানও করেনি। তাহলে আমার নামে মামলা করে এখন সেই মামলা তোলার জন্য টাকা কেন?

রাশেদ বলল,

—এটা আমাদের ব্যাপার।

নীরা বলল,

—না। এটা আমার জীবন।

রাশেদ কোনো উত্তর দিল না।

কিন্তু তার চোখে তখনও টাকার লোভ স্পষ্ট।

নীরা সেদিন রাতে মায়ের কাছে গিয়ে বলল,

—মা, আমি কি এতটাই বোঝা হয়ে গেছি?

মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন।

—এমন কথা বলিস না।

নীরা বলল,

—তাহলে আমার জীবনটা এভাবে কেন শেষ হয়ে যাচ্ছে?

মা কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।

শুধু মেয়ের মাথায় হাত রেখে কাঁদতে থাকলেন।

আর সেই রাতেই নীরার মা একটা সিদ্ধান্ত নিলেন।

তিনি মেয়েকে বোঝাবেন, মামলাটা মিটিয়ে দিতে হবে।

কারণ তিনি জানতেন, ইভানকে মুক্ত করার আর কোনো সহজ পথ নেই।

রাত অনেক হয়েছে।

নীরাদের বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও নীরার চোখে ঘুম নেই। জানালার পাশে বসে সে অন্ধকার উঠানের দিকে তাকিয়ে ছিল।

বারবার তার মনে পড়ছিল ইভানের কথা।

সেদিন চাচার বাড়িতে বসে ইভান বলেছিল,

—তোমাকে আমার ভালো লাগে।

কত সহজ ছিল কথাটা।

কিন্তু সেই কথার পর তাদের জীবনে কত কিছু ঘটে গেল!

একটা মামলা।

একটা জেল।

গ্রামের মানুষের হাজার কথা।

আর এখন টাকা দিয়ে সেই মামলা মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

নীরা চোখ মুছে নিল।

ঠিক তখন তার মা ঘরে ঢুকলেন।

—ঘুমাসনি?

নীরা মাথা নাড়ল।

মা পাশে এসে বসলেন।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—মা, তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।

নীরা বুঝতে পারল, কথাটা গুরুত্বপূর্ণ।

—কী কথা?

মা ধীরে বললেন,

—ইভানের পরিবার টাকা দিতে রাজি হয়েছে।

নীরা চমকে তাকাল।

—কেন?

—মামলাটা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য।

নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তোমরা কি আমার সম্মানের দাম ঠিক করেছ?

মায়ের চোখ ভিজে উঠল।

—এভাবে বলিস না মা।

—তাহলে কীভাবে বলব?

—তুই তো জানিস, ইভান কোনো অন্যায় করেনি।

—জানি।

—ওর জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে।

নীরা চুপ।

মা বললেন,

—ওর পড়াশোনা থেমে গেছে। ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে। ওর মা প্রতিদিন কাঁদছে।

নীরার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।

—আমি কী করব মা?

—মামলাটা মিটিয়ে দিতে হবে।

নীরা কষ্টের গলায় বলল,

—আমার নামে মামলা হয়েছে। গ্রামের সবাই আমাকে নিয়ে কথা বলেছে। আমার সম্মান নষ্ট হয়েছে। এখন সেই সম্মানের বিনিময়ে টাকা নেবে?

মা মেয়ের হাত ধরে বললেন,

—টাকার জন্য না মা। একটা জীবন বাঁচানোর জন্য।

নীরা মাথা নিচু করে বসে রইল।

মা আবার বললেন,

—তুই যদি মামলা না মেটাস, ইভানের কী হবে জানিস?

নীরা ধীরে বলল,

—জানি না।

—ও হয়তো বছরের পর বছর এই ঝামেলায় থাকবে।

নীরা চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো, ইভানকে সে আরও কষ্ট দিতে পারে না।

পরদিন সকালে নীরা রাশেদের কাছে গিয়ে বলল,

—মামলাটা তুলে নাও।

রাশেদ অবাক হয়ে তাকাল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তাহলে টাকা নিয়ে আর কোনো কথা বলবি না।

নীরা শান্ত গলায় বলল,

—আমি শুধু চাই, ইভান মুক্ত হোক।

রাশেদ মাথা নাড়ল।

—ঠিক আছে।

কয়েকদিনের মধ্যেই ইভানের পরিবার টাকা জোগাড় করল।

রাশেদ টাকা নিল।

তারপর মামলাটি মিটিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলো।

অবশেষে ইভান মুক্ত হলো।

কারাগার থেকে বের হওয়ার দিন তার মা তাকে দেখে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরলেন।

—বাবা, তুই বাড়ি চল।

ইভান মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।

—মা, নীরা কি ভালো আছে?

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—হ্যাঁ।

ইভান জিজ্ঞেস করল,

—মামলাটা কীভাবে উঠল?

মা উত্তর দিলেন,

—নীরার জন্য।

ইভান থমকে গেল।

—নীরা?

—হ্যাঁ। ও রাজি হয়েছে।

ইভানের চোখে পানি চলে এল।

সে নিচু গলায় বলল,

—ও কেন করল?

মা বললেন,

—তোর জন্য।

ইভান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আমি ওর সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই।

কিন্তু সে সুযোগ আর হলো না।

কারণ নীরার পরিবার ইতিমধ্যেই তার বিয়ের কথা ঠিক করে ফেলেছিল।

ইভান যখন জানতে পারল, নীরার বিয়ে অন্য একজনের সঙ্গে ঠিক হয়েছে, তখন সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

রাকিব পাশে বসে বলল,

—কিছু বলবি?

ইভান মাথা নাড়ল।

—না।

—তুই কি ওকে থামাবি না?

ইভান ধীরে বলল,

—কী অধিকার নিয়ে?

—তুই ওকে ভালোবাসিস।

ইভান মৃদু হাসল।

—ভালোবাসলেই তো সবকিছু পাওয়া যায় না।

রাকিব বলল,

—তবুও চেষ্টা করতে পারিস।

ইভান মাথা নিচু করে বলল,

—ওর জীবন আর জটিল করতে চাই না।

অন্যদিকে নীরা বিয়ের প্রস্তুতির মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল।

তার মা একদিন বললেন,

—মা, তুই কি এই বিয়েতে রাজি?

নীরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—রাজি।

—মন থেকে?

নীরা উত্তর দিল না।

মা বুঝে গেলেন।

—তুই ইভানকে ভুলতে পারিসনি, তাই না?

নীরার চোখ ভিজে উঠল।

সে মায়ের কোলে মাথা রেখে বলল,

—মা, আমি চেষ্টা করেছি।

—তারপর?

—পারিনি।

মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

—সবসময় নিজের ইচ্ছেমতো জীবন পাওয়া যায় না।

নীরা বলল,

—জানি।

তারপর ধীরে ধীরে বিয়ের দিন এগিয়ে এল।

গ্রামে আবার মানুষজন জড়ো হতে লাগল।

যারা একসময় নীরাকে নিয়ে ফিসফিস করেছিল, তারাই এখন বিয়ের আয়োজন দেখতে এল।

কেউ বলল,

—মেয়েটার শেষ পর্যন্ত বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।

নীরা এসব শুনেও চুপ করে থাকল।

তার মনে শুধু একজন মানুষ।

ইভান।

সে জানত, ইভান হয়তো এখন তাকে ঘৃণা করে।

কিন্তু সত্যিটা ছিল অন্যরকম।

ইভান নীরাকে একটুও ঘৃণা করত না।

বরং সে যতবার নীরার কথা ভাবত, ততবার নিজের ভাগ্যকে দোষ দিত।

বিয়ের আগের রাতে নীরা একা ঘরের মধ্যে বসে ছিল।

হাতে ছিল তার পুরনো একটা ছবি।

সেই ছবিটা তানিয়া একদিন ইভানকে দেখিয়েছিল।

নীরা ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—তুমি তো বলেছিলে, আমাকে তোমার ভালো লাগে।

তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

—তাহলে এত তাড়াতাড়ি চলে গেলে কেন?

কেউ উত্তর দিল না।

শুধু জানালার বাইরে রাতের বাতাস বয়ে গেল।

আর অনেক দূরে, নিজের ঘরে বসে ইভানও সেই একই রাত জেগে কাটাল।

দুজনের মাঝখানে ছিল শুধু দূরত্ব নয়—

ছিল সময়, পরিস্থিতি আর এমন কিছু সিদ্ধান্ত, যেগুলো আর কখনো বদলানো সম্ভব হবে না।

পরদিন নীরার বিয়ে।

সকালের আলো ফুটতেই নীরাদের বাড়িতে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল।

বাড়ির উঠানে মানুষজনের ভিড়। রান্নাঘর থেকে খাবারের গন্ধ আসছে, মেয়েরা নীরাকে সাজাচ্ছে, কেউ বিয়ের শেষ মুহূর্তের কাজগুলো দেখছে।

সবাই ব্যস্ত।

শুধু নীরা যেন এই বাড়ির কারও সঙ্গে নেই।

সে আয়নার সামনে চুপচাপ বসে ছিল।

চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। মুখে কোনো আনন্দ নেই।

তানিয়া এসে পাশে বসে বলল,

—কী রে? আজ তো তোর বিয়ে।

নীরা আয়নার দিকে তাকিয়েই বলল,

—জানি।

—খুশি না?

নীরা মৃদু হাসল।

—খুশি হওয়ার চেষ্টা করছি।

তানিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তুই চাইলে এখনো—

নীরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—না।

—কিন্তু—

—আর কিছু বলিস না।

তানিয়া চুপ হয়ে গেল।

নীরা কিছুক্ষণ পর বলল,

—জানিস, আমি একসময় ভেবেছিলাম ইভানকে শুধু একটা বাজির জন্য আমার পেছনে ঘোরাব।

তানিয়া নিচু গলায় বলল,

—জানি।

—কিন্তু কখন যে সত্যি ওকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, বুঝতেই পারিনি।

তার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।

—এখন ওকে নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখার অধিকারও আমার নেই।

তানিয়া নীরার হাত ধরে বলল,

—সবকিছু যদি অন্যরকম হতো!

নীরা মৃদু হেসে বলল,

—হয়নি তো।

অন্যদিকে ইভান সেদিন গ্রামের বাড়িতেই ছিল।

বিয়ের কথা সে জানত।

সকাল থেকেই তার মনটা অস্থির।

সে বারবার নিজেকে বোঝাচ্ছিল, নীরার বিয়ে হয়ে গেলে সবকিছু শেষ।

তারপর নিজের জীবন নিয়ে তাকে এগিয়ে যেতে হবে।

কিন্তু মন কি এত সহজে কথা শোনে?

দুপুরের দিকে রাকিব ইভানের কাছে এসে বলল,

—আজ ওর বিয়ে।

ইভান জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—জানি।

—তুই যাবি?

ইভান মাথা নাড়ল।

—না।

—কেন?

—ওর জীবনে আমার আর কোনো জায়গা নেই।

রাকিব বলল,

—তবুও শেষবার দেখতে পারিস।

ইভান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—শেষবার দেখলে হয়তো নিজেকে আর সামলাতে পারব না।

রাকিব আর কিছু বলল না।

সন্ধ্যার দিকে নীরার বিয়ের আয়োজন শেষ হলো।

বরের গাড়ি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।

নীরা ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হলো।

মা তাকে দেখে কাঁদতে শুরু করলেন।

নীরা মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

—মা, কাঁদো না।

মা বললেন,

—তুই ভালো থাকিস মা।

নীরা চোখের পানি মুছে বলল,

—চেষ্টা করব।

বিদায়ের সময় নীরার বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল।

এই বাড়িতে তার শৈশব কেটেছে।

এই উঠানে সে খেলেছে।

এই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ইভানের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।

আর আজ সে সবকিছু ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

গাড়িতে ওঠার আগে নীরা একবার চারপাশে তাকাল।

তার চোখ হঠাৎ দূরের একটা রাস্তার দিকে আটকে গেল।

সেই রাস্তা দিয়ে একসময় ইভান প্রায়ই যেত।

নীরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, হয়তো ইভান কোথাও দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু কেউ ছিল না।

সে ধীরে গাড়িতে উঠে বসল।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

নীরা জানালার পাশে বসে চোখ বন্ধ করল।

তার কানে যেন ইভানের সেই কথাটা বাজতে লাগল—

‘তোমাকে আমার ভালো লাগে।’

নীরা চোখ মুছে ফেলল।

অন্যদিকে ইভান নিজের ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

দূর থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ শুনে তার বুক কেঁপে উঠল।

সে জানত, নীরার বিয়ের গাড়ি হয়তো এখনই গ্রামের রাস্তা পার হচ্ছে।

ইভান উঠে দাঁড়াল।

জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

দূরে একটা গাড়ি ধীরে ধীরে চলে গেল।

সে শুধু গাড়িটার পেছনের আলো দেখতে পেল।

কিন্তু নীরাকে দেখতে পেল না।

ইভান ধীরে জানালা থেকে সরে এল।

তার মা ঘরে এসে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—বাবা...

ইভান বলল,

—মা, আমি ঠিক আছি।

মা বুঝলেন, ছেলে ঠিক নেই।

তিনি কাছে এসে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।

—সবকিছু সময়ের সঙ্গে ঠিক হয়ে যাবে।

ইভান মৃদু হেসে বলল,

—কিছু জিনিস ঠিক হয় না মা। শুধু মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যায়।

নীরার বিয়ের পর রাশেদ সেই টাকাগুলো হাতে পেল, যেগুলো মামলাটা মিটিয়ে নেওয়ার জন্য নেওয়া হয়েছিল।

তার মনে তখন শুধু টাকা।

কিছুদিন পর সে সেই টাকা নিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

নীরার মা তাকে বললেন,

—তুই এত তাড়াতাড়ি চলে যাবি?

রাশেদ বলল,

—এখানে থেকে কী করব?

কিছুদিন পর সে সত্যিই বিদেশে চলে গেল।

নীরা তখন নিজের নতুন জীবনে পা রাখল।

সে স্বামীর বাড়িতে গিয়ে চুপচাপ সংসারের দায়িত্ব নিতে শুরু করল।

তার স্বামী তার প্রতি খারাপ আচরণ করত না।

বরং যতটা সম্ভব তাকে ভালো রাখার চেষ্টা করত।

কিন্তু নীরার ভেতরের শূন্যতা সে বুঝতে পারত না।

এক রাতে স্বামী তাকে জিজ্ঞেস করল,

—তুমি কি এখানে ভালো আছ?

নীরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—হ্যাঁ।

—তোমাকে খুব চুপচাপ লাগে।

—আমি এমনই।

স্বামী আর প্রশ্ন করল না।

নীরা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

দূরে শহরের আলো।

কিন্তু তার চোখের সামনে ভেসে উঠল গ্রামের সেই ধানক্ষেত।

সেই বিকেল।

ইভানের গম্ভীর মুখ।

আর একটা বাজি।

যে বাজি জিততে গিয়ে সে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে হারিয়েছিল।

কয়েক মাস পর ইভান আবার শহরে ফিরে গেল।

পড়াশোনা শেষ করার পর সে চাকরিতে যোগ দিল।

তার জীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে লাগল।

কিন্তু একটা জায়গা কখনো স্বাভাবিক হলো না।

নীরার জায়গাটা।

কখনো রাতে একা থাকলে ইভান নিজের অজান্তেই নীরার কথা ভাবত।

‘ও এখন কেমন আছে?’

‘ভালো আছে তো?’

তারপর নিজেকেই বলত,

‘ওর কথা ভাবার অধিকার আমার নেই।’

তবু মানুষ সবসময় নিজের মনের কথা শুনতে পারে না।

বছর কেটে গেল।

একদিন ইভান ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ফিরল।

বন্ধুরা তাকে দেখে বলল,

—অনেক বদলে গেছিস।

ইভান হেসে বলল,

—সময় বদলালে মানুষও বদলায়।

রাকিব বলল,

—নীরার কথা মনে পড়ে?

ইভান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না।

সন্ধ্যায় সে একা গ্রামের সেই মাঠের দিকে হাঁটতে গেল।

যেখানে প্রথম নীরাকে দেখেছিল।

মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে ইভান অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

তার মনে হলো, একটু পরেই হয়তো নীরা মায়ার সঙ্গে হেঁটে আসবে।

হয়তো আবার বলবে,

—আপনি এত ভাব দেখান কেন?

ইভান মৃদু হাসল।

কিন্তু কেউ এল না।

শুধু বাতাসে ধানের গন্ধ।

আর সেই পুরনো স্মৃতিগুলো।

ঠিক তখন দূরে একটা গাড়ি এসে থামল।

ইভান তাকিয়ে দেখল।

গাড়ি থেকে একজন নারী নামল।

দূর থেকে মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না।

কিন্তু ইভানের বুক হঠাৎ কেঁপে উঠল।

সে বুঝতে পারল না—

এ কি সত্যিই নীরা?

নাকি শুধু তার মনের ভুল?

গাড়ি থেকে নামা মেয়েটার দিকে ইভান স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।

দূরত্বের কারণে মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তবুও তার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা শুরু হয়ে গেল।

মেয়েটা ধীরে ধীরে রাস্তার দিকে এগিয়ে আসছিল।

আর কয়েক পা এগোতেই ইভান বুঝতে পারল—

নীরা।

এত বছর পরেও সে নীরাকে এক মুহূর্তে চিনে ফেলল।

নীরা তার মায়ের সঙ্গে গ্রামে এসেছিল। মায়ের শরীর কিছুদিন ধরে ভালো যাচ্ছিল না। তাই কয়েকদিনের জন্য বাবার বাড়িতে থাকার উদ্দেশ্যেই তার আসা।

কিন্তু নীরা জানত না, এই গ্রামে ফিরে এসে তার সবচেয়ে পুরনো স্মৃতির সামনে দাঁড়াতে হবে।

নীরা হঠাৎ সামনে তাকিয়ে থেমে গেল।

ইভান।

দুজনেই কয়েক মুহূর্ত একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

কেউ কথা বলল না।

এত বছর পর দেখা হলেও মনে হলো, তাদের মাঝখানে যেন কোনো শব্দের প্রয়োজন নেই।

শেষ পর্যন্ত ইভানই বলল,

—কেমন আছ?

নীরা মৃদু গলায় বলল,

—ভালো।

—অনেক বছর পর।

—হ্যাঁ।

ইভান একটু হাসল।

—গ্রামে কবে এলে?

—আজ।

—কতদিন থাকবে?

—কয়েকদিন।

আবার নীরবতা।

ইভান মাঠের দিকে তাকাল।

—এই জায়গাটা মনে আছে?

নীরা চারপাশে তাকিয়ে বলল,

—মনে আছে।

—সেদিন তুমি মায়ার সঙ্গে এসেছিলে।

নীরা মৃদু হেসে বলল,

—আর আপনি আমাকে চিনতেনও না।

ইভানও হেসে বলল,

—তুমি তো আমাকেও চিনতে না।

—আপনাকে দেখে মনে হয়েছিল, খুব অহংকারী।

ইভান বলল,

—তখন ছিলামও।

নীরা কিছু বলল না।

ইভান ধীরে বলল,

—তুমি আমাকে প্রথম দিন থেকেই অপছন্দ করতে?

নীরা একটু হেসে বলল,

—প্রথমে হ্যাঁ।

—তারপর?

নীরা উত্তর দিল না।

ইভান বুঝতে পারল, উত্তরটা হয়তো দুজনেই জানে।

কিছুক্ষণ পর নীরা বলল,

—আপনি কি আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করেছিলেন?

ইভান অবাক হয়ে তাকাল।

—তোমাকে ক্ষমা করার মতো তুমি কী করেছিলে?

নীরা নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,

—সবকিছুর জন্য নিজেকে দায়ী মনে হয়।

ইভান মাথা নাড়ল।

—না। তুমি দায়ী ছিলে না।

—কিন্তু আমার জন্যই তো—

—পরিস্থিতির জন্য হয়েছিল।

নীরা চোখের পানি আটকে বলল,

—তবুও আপনার জীবনটা নষ্ট হয়েছিল।

ইভান মৃদু গলায় বলল,

—জীবন নষ্ট হয়নি। শুধু কিছু স্বপ্ন বদলে গেছে।

নীরা তার দিকে তাকাল।

—আপনি কি সুখী?

প্রশ্নটা শুনে ইভান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—জানি না।

নীরা মাথা নিচু করল।

—আমিও না।

দুজনেই আবার চুপ।

হঠাৎ নীরা বলল,

—আপনি কি এখনও সেই আগের মতোই আছেন?

ইভান মৃদু হাসল।

—না। অনেক বদলে গেছি।

—কীভাবে?

—আগে ভাবতাম, নিজের ইচ্ছেমতো সবকিছু পাওয়া যায়। এখন জানি, কিছু জিনিস শুধু চাইলেই পাওয়া যায় না।

নীরা চোখ মুছে নিল।

—আমি একটা কথা বলব?

—বল।

—সেদিন আমি আপনাকে ঘোরানোর জন্য বাজি ধরেছিলাম।

ইভান হেসে বলল,

—জানি।

নীরা অবাক হয়ে তাকাল।

—জানতেন?

—পরে জেনেছিলাম।

—তাহলে?

ইভান বলল,

—তখন খুব রাগ হয়েছিল।

নীরা মাথা নিচু করল।

—তারপর?

ইভান ধীরে বলল,

—তারপর বুঝলাম, বাজিটা তুমিই জিতেছিলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরাই দুজন হেরে গিয়েছিলাম।

নীরার চোখ বেয়ে পানি নেমে এল।

সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল।

ইভানও আর কিছু বলল না।

দূরে মাগরিবের আজান ভেসে আসছিল।

নীরা বলল,

—আমাকে যেতে হবে।

ইভান মাথা নাড়ল।

—যাও।

নীরা কয়েক পা এগিয়ে গেল।

তারপর আবার থেমে পেছনে তাকাল।

ইভান তখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।

নীরা মৃদু গলায় বলল,

—ভালো থাকবেন।

ইভান উত্তর দিল,

—তুমিও।

নীরা চলে গেল।

ইভান অনেকক্ষণ মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু বছর আগের সেই বিকেল।

ধান কাটার মাঠ।

মায়ার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা নীরা।

তার নিজের উদাসীন মুখ।

তারপর নীরার রাগ।

বাজি।

খুনসুটি।

ভালো লাগা।

তারপর একটা রাত।

একটা মামলা।

একটা জেল।

আর একটা বিয়ে।

ইভান ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।

পথে তার বন্ধু রাকিবের সঙ্গে দেখা হলো।

রাকিব জিজ্ঞেস করল,

—কার সঙ্গে কথা বলছিলি?

ইভান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—নীরা।

রাকিব থেমে গেল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—কী বলল?

ইভান মৃদু হাসল।

—কিছু না। শুধু ভালো থাকার কথা বলল।

রাকিব বুঝতে পারল, এই কয়েকটা শব্দের ভেতরে কত বছরের কষ্ট লুকিয়ে আছে।

সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

ইভান বাড়ি ফিরে নিজের পুরনো ঘরে ঢুকল।

ঘরের এক কোণে তার পুরনো বইগুলো পড়ে ছিল।

একটা বই খুলতেই ভেতর থেকে একটা পুরনো কাগজ বেরিয়ে এল।

কাগজটা ছিল বহু বছর আগের।

তাতে কয়েকটা শব্দ লেখা—

‘আপনাকে এত ভাব দেখাতে হবে না।’

ইভান কাগজটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসল।

তারপর চোখের কোণে পানি জমে উঠল।

সে বুঝতে পারল, সময় চলে যায়।

মানুষ বদলে যায়।

জীবন অন্যদিকে চলে যায়।

কিন্তু কিছু স্মৃতি কোথাও যায় না।

অন্যদিকে নীরা তার মায়ের সঙ্গে বাড়ির পথে হাঁটছিল।

মা জিজ্ঞেস করলেন,

—কার সঙ্গে কথা বলছিলি?

নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—ইভানের সঙ্গে।

মা থেমে গেলেন।

—এত বছর পর?

নীরা মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

—কী বলল?

নীরা চোখ মুছে বলল,

—কিছু না।

মা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, এই ‘কিছু না’-এর ভেতরে অনেক কিছু আছে।

নীরা ধীরে বলল,

—মা, কিছু মানুষকে ভুলে থাকা যায়, কিন্তু ভুলে যাওয়া যায় না।

মা মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখলেন।

নীরা পেছনে তাকাল।

দূরে গ্রামের মাঠটা দেখা যাচ্ছে।

সেই মাঠেই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতিটা তৈরি হয়েছিল।

নীরা মনে মনে বলল,

‘যদি সেদিন জানতাম, একটা ছোট্ট বাজি আমাদের এত দূরে নিয়ে যাবে, তাহলে হয়তো কোনোদিন সেই বাজি ধরতাম না।’

কিন্তু সময়কে তো আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।

ইভান নিজের জীবনে ফিরে গেল।

নীরাও নিজের সংসারে ফিরে গেল।

তাদের পথ আর এক হলো না।

তবুও দুজনের হৃদয়ের এক কোণে সেই পুরনো গ্রামের মাঠটা থেকে গেল।

যেখানে একদিন একজন গম্ভীর ছেলে ধান কাটতে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।

আর তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল এক অচেনা মেয়ে।

যে মেয়েটাকে সে সেদিন চিনত না।

কিন্তু পরে বুঝেছিল—

সেই অচেনা মেয়েটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে পরিচিত অনুভূতি।

তাদের গল্পের শেষটা সুখের হয়নি।

কেউ কাউকে পায়নি।

কেউ কাউকে ফিরে পায়নি।

শুধু দুজন মানুষ নিজেদের জীবনের বাকি পথটুকু হেঁটে গেছে একটা অসমাপ্ত গল্পকে বুকের ভেতর নিয়ে।

....
👁 844