অনেক বছর আগের কথা।
ছোট্ট একটি শহর। শহরের এক পাশে পাশাপাশি দুটি স্কুল। মাঝখানে খুব বেশি দূরত্ব না থাকলেও দুই স্কুলের মাঝখানে ছিল বিশাল একটি জঙ্গল। জঙ্গলটা খুব ঘন ছিল না, তবে বড় বড় গাছ, লতাপাতা আর ঝোপঝাড়ে ভরা ছিল জায়গাটা। স্থানীয়রা জায়গাটাকে প্রায় সবাই বাগান বলেই চিনত।
দুই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা অবশ্য সেই জায়গায় খুব একটা যেত না। কিন্তু ছোটদের কাছে নিষেধের জায়গাই যেন সবচেয়ে আকর্ষণীয়।
সেই সময় আয়ান আর ইশা দুজনেই মাত্র প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।
তারা দুজন দুই স্কুলের ছাত্রছাত্রী। একে অপরকে চেনে না, কখনো দেখেওনি।
আয়ান ছিল বেশ চঞ্চল ছেলে। সারাক্ষণ ছুটোছুটি, খেলাধুলা আর দুষ্টুমি করেই তার দিন কাটত। তবে তার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। সে যখন একা থাকত কিংবা মন ভালো থাকত, তখন নিজের অজান্তেই ঠোঁট দিয়ে খুব মিষ্টি সুরে শিস বাজাত।
আর ইশা ছিল শান্ত স্বভাবের মেয়ে। তবে বান্ধবীদের সঙ্গে থাকলে তার দুষ্টুমির কোনো শেষ থাকত না।
সেদিন স্কুল ছুটির পর ইশা তার এক বান্ধবীর সঙ্গে স্কুলের পাশের সেই বাগানে এসেছিল।
গাছের নিচে পড়ে থাকা তেঁতুল কুড়াচ্ছিল তারা।
ইশা একটা তেঁতুল হাতে নিয়ে বলল,
—দেখ, এটা কত বড়!
বান্ধবী হেসে বলল,
—ওটা আমাকে দে।
—না, এটা আমার!
—তুই তো এইমাত্র তিনটা নিয়েছিস।
—তাতে কী হয়েছে?
দুজনের মধ্যে তেঁতুল নিয়ে ছোটখাটো ঝগড়া শুরু হয়ে গেল।
ঠিক সেই সময় পাশের স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলছিল আয়ান।
ছোটদের ফুটবল খেলা। কেউ ঠিকমতো বল ধরতে পারছে না, কেউ দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে। আয়ান অবশ্য বেশ উৎসাহ নিয়ে খেলছিল।
হঠাৎ একজন জোরে বল মারতেই বলটা মাঠের সীমানা পেরিয়ে সোজা বাগানের ভেতর চলে গেল।
একজন বলল,
—আয়ান, তুই যা। বলটা নিয়ে আয়।
আয়ান বিরক্ত মুখে বলল,
—সবসময় আমাকেই যেতে হবে?
—তুই তো সবচেয়ে কাছে!
আয়ান আর কিছু না বলে বাগানের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতেই চারপাশটা বেশ শান্ত মনে হলো। বন্ধুদের আওয়াজও ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল।
আয়ান একা হয়ে গেল।
আর তখনই তার পুরোনো অভ্যাসটা শুরু হলো।
ঠোঁটে মিষ্টি একটা সুর তুলে সে শিস বাজাতে বাজাতে বল খুঁজতে লাগল।
ইশা হঠাৎ সেই সুর শুনে থেমে গেল।
সে অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল।
—এই শব্দটা কোথা থেকে আসছে?
তার বান্ধবী বলল,
—কীসের শব্দ?
—কেউ শিস বাজাচ্ছে।
ইশা তেঁতুল হাতে নিয়েই শব্দের দিকে এগিয়ে গেল।
কিছুটা এগোতেই সে দেখল, একটা ছেলে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ফুটবল খুঁজছে। ছেলেটাই শিস বাজাচ্ছে।
ইশা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে শুনল।
সুরটা তার ভীষণ ভালো লাগল।
সে ধীরে ধীরে ছেলেটার কাছে গিয়ে বলল,
—তুমি তো অনেক সুন্দর শিস বাজাও!
আয়ান চমকে পিছনে তাকাল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছোট্ট মেয়ে।
দুই হাতে কয়েকটা তেঁতুল। চোখেমুখে কৌতূহল।
আয়ান কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
—সত্যি?
—হ্যাঁ। কোথা থেকে শিখেছ?
আয়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
—জানি না। এমনিই পারি।
ইশা মুগ্ধ হয়ে বলল,
—আমাকে শেখাবে?
—শিস বাজানো শেখা এত সহজ না।
ইশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—তাহলে তুমি কীভাবে শিখলে?
—আমি তো নিজে নিজেই শিখেছি।
—তাহলে আমিও নিজে নিজেই শিখব।
আয়ান হেসে ফেলল।
এই প্রথম তাদের মধ্যে কথা হলো।
কিছুক্ষণ পর ইশা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
—তোমার নাম কী?
ছেলেটা একটু ভেবে বলল,
—আয়ান।
ইশাও বলল,
—আমার নাম ইশা।
আয়ান মাথা নেড়ে বলল,
—ইশা?
—হুম।
দুজনেই জানত না, তাদের আসল নাম অন্য।
আয়ানের ভালো নাম ছিল তানভীর। আর ইশার ভালো নাম সুনেহরা।
কিন্তু আয়ান আর ইশা ছিল তাদের একান্ত আপনজনদের দেওয়া ডাকনাম। শুধু মা-বাবাই তাদের এই নামে ডাকত।
সেদিন অবশ্য এই নাম দুটির পেছনের গল্প কেউ জানল না।
আয়ান বলল,
—তুমি এখানে কী করছ?
ইশা তেঁতুলগুলো দেখিয়ে বলল,
—তেঁতুল কুড়াচ্ছি।
—একা?
—আমার বান্ধবীও আছে।
আয়ান চারদিকে তাকিয়ে বলল,
—আমার বলটা হারিয়ে গেছে।
ইশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—চলো, আমি খুঁজে দিচ্ছি।
দুজন মিলে বল খুঁজতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর একটা ঝোপের পাশে বলটা পাওয়া গেল।
আয়ান বল হাতে নিয়ে বলল,
—পেয়ে গেছি!
ইশা খুশি হয়ে বলল,
—তাহলে কাল আবার আসবে?
আয়ান একটু থেমে বলল,
—তুমি আসবে?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমিও আসব।
সেদিন তারা যে বিদায় নিল, কেউ জানত না এই ছোট্ট পরিচয় একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিতে পরিণত হবে।
পরদিন সত্যিই আয়ান আবার সেই বাগানে এল।
ইশাও এল।
তারপরের দিনও।
তারপর তার পরের দিনও।
ধীরে ধীরে সেই বাগানের জায়গাটা তাদের নিজেদের একটা ছোট্ট পৃথিবী হয়ে উঠল।
কখনো তারা তেঁতুল কুড়াত।
কখনো গাছের নিচে বসে গল্প করত।
কখনো আয়ান শিস বাজাত আর ইশা মুগ্ধ হয়ে শুনত।
একদিন ইশা বলল,
—তোমার শিস শুনলে আমার খুব ভালো লাগে।
আয়ান হেসে বলল,
—তাহলে এটা শুধু তোমার জন্য বাজাব।
ইশা কিছু না বলে মুচকি হাসল।
কয়েকদিন পর আয়ান স্কুল থেকে ফেরার পথে ছোট্ট একটা দোকানের সামনে দাঁড়াল। সেখানে শিশুদের জন্য নানা রকম জিনিস সাজানো ছিল।
তার চোখ আটকে গেল একটা ছোট্ট রুপালি পায়ের নূপুরে।
আয়ান অনেকক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের জমানো টাকা দিয়ে নূপুরটা কিনে নিল।
পরদিন বাগানে এসে সে নূপুরটা ইশার হাতে দিল।
ইশা অবাক হয়ে বলল,
—এটা কী?
—তোমার জন্য।
—আমার জন্য?
আয়ান মাথা নেড়ে বলল,
—হুম।
ইশা নূপুরটা হাতে নিয়ে আনন্দে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
—অনেক সুন্দর!
আয়ান বলল,
—পায়ে পরবে?
ইশা সঙ্গে সঙ্গে নূপুরটা পায়ে পরে নিল।
হালকা ঝংকার উঠল।
ইশা পা নেড়ে খুশি হয়ে বলল,
—শোনো! কেমন শব্দ হচ্ছে!
আয়ান হেসে বলল,
—তোমাকে খুব মানিয়েছে।
সেই নূপুরটা ইশা আর খুলল না।
প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময়ও সেটা পরে থাকত। আয়ানের দেওয়া ছোট্ট উপহারটা তার কাছে হয়ে উঠল সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস।
কিন্তু তাদের এই ছোট্ট পৃথিবী বেশিদিন একই রকম থাকল না।
একদিন আয়ান অনেকক্ষণ ধরে বাগানের সেই জায়গায় বসে রইল।
ইশা আসছে না।
সময় পেরিয়ে গেল।
সূর্যও পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল।
আয়ান তবু অপেক্ষা করল।
শেষে ইশার এক বান্ধবী তেঁতুল কুড়াতে সেখানে এলো।
আয়ান ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—ইশা কোথায়?
মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তুমি জানো না?
—কী?
—ইশা চলে গেছে।
আয়ানের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
—কোথায়?
—ওর বাবার চাকরিতে ট্রান্সফার হয়েছে। তাই ওরা অন্য জায়গায় চলে গেছে।
আয়ান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
তার চোখ চলে গেল নিজের সামনে থাকা সেই গাছটার দিকে।
যেখানে প্রতিদিন ইশা বসত।
যেখানে তার পায়ে ঝংকার তুলত সেই নূপুর।
আয়ান ধীরে ধীরে বলল,
—ও... আবার আসবে?
বান্ধবী মাথা নাড়ল।
—জানি না।
আয়ান মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
সেদিন প্রথমবার তার ছোট্ট মনে বিচ্ছেদের কষ্ট নামের একটা অনুভূতি জায়গা করে নিল।
ইশা চলে যাওয়ার পর কয়েকটা দিন আয়ানের কাছে যেন খুব অদ্ভুতভাবে কাটতে লাগল।
প্রতিদিন স্কুল ছুটি হলেই সে আগের মতো দৌড়ে বাগানের দিকে যেত। কিন্তু সেখানে গিয়ে আর কাউকে পাওয়া যেত না।
তেঁতুল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকত।
যে জায়গায় বসে ইশা তেঁতুল খেত, সেখানে এখন শুধু শুকনো পাতা পড়ে থাকত।
আয়ান একদিন গাছটার নিচে বসে নিজের অজান্তেই শিস বাজাতে শুরু করল।
সেই একই সুর।
যে সুর শুনে একদিন ইশা প্রথম তার কাছে এসেছিল।
শিস বাজাতে বাজাতে আয়ান চারদিকে তাকাল।
তার মনে হচ্ছিল, হয়তো হঠাৎ ইশা এসে বলবে,
—তুমি আবার শিস বাজাচ্ছ?
কিন্তু কেউ এল না।
আয়ান সেদিন অনেকক্ষণ বসে থাকার পর ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে গেল।
বাড়িতে ফিরতেই তার মা জিজ্ঞেস করলেন,
—এত দেরি হলো কেন?
আয়ান কোনো উত্তর দিল না।
চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেল।
তার মা পেছন পেছন গিয়ে বললেন,
—কী হয়েছে?
আয়ান বিছানায় বসে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
—ইশা চলে গেছে।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তিনি জানতেন, ইশা নামে একটা মেয়ের সঙ্গে আয়ানের খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়েছিল।
মাঝেমধ্যে আয়ান বাড়িতে ফিরে তার গল্প করত।
—মা, জানো, ইশা আজ অনেক তেঁতুল কুড়িয়েছে।
আবার কখনো বলত,
—মা, ইশা আজ আমার শিস শুনে বলেছে আমি নাকি সুন্দর শিস বাজাই।
আয়ানের মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
—ওরা তো আবার কোনোদিন আসবে।
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—কবে?
মা কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
কারণ তার নিজেরও জানা ছিল না।
কয়েক মাস কেটে গেল।
তারপর একদিন আয়ানের বাবা ব্যবসার কাজে সেই শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
আয়ান বাবার কাছে গিয়ে বলল,
—বাবা, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে?
বাবা হেসে বললেন,
—যাবি?
—হ্যাঁ।
আয়ানের মাথায় তখন একটাই চিন্তা।
হয়তো ইশা সেখানে আছে।
হয়তো সে আবার স্কুলে যায়।
হয়তো তাদের দেখা হয়ে যাবে।
সেই আশায় আয়ান বাবার সঙ্গে সেই পুরোনো শহরে গেল।
গাড়ি শহরে ঢুকতেই আয়ানের চোখ বারবার জানালার বাইরে চলে যাচ্ছিল।
সবকিছু যেন আগের মতোই আছে।
সেই রাস্তা।
সেই দোকান।
সেই স্কুল।
আর দূরে সেই বিশাল বাগান।
আয়ান বাবাকে বলল,
—বাবা, গাড়িটা এখানে থামাও।
বাবা অবাক হয়ে বললেন,
—কেন?
—আমার একজন বন্ধুকে খুঁজব।
বাবা গাড়ি থামিয়ে দিলেন।
আয়ান দৌড়ে নিজের পুরোনো স্কুলের দিকে গেল।
তারপর ইশার স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
একজন শিক্ষককে দেখে সে ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—স্যার, ইশা নামে একটা মেয়ে এখানে পড়ত। ও কোথায়?
শিক্ষক কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—ইশা?
—হ্যাঁ স্যার। ছোট ছিল। কয়েক বছর আগে পড়ত।
শিক্ষক মাথা নেড়ে বললেন,
—ওরা তো চলে গেছে বাবা।
আয়ানের বুকটা ধক করে উঠল।
—কোথায় গেছে স্যার?
—সেটা তো জানি না। ওর বাবার চাকরির কারণে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল।
আয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আস্তে করে বলল,
—ও কি আর কখনো আসেনি?
—আমার জানা নেই।
আয়ান ধীরে ধীরে স্কুলের সামনে থেকে সরে এল।
তারপর সে সেই বাগানে গেল।
তেঁতুল গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়াল।
সবকিছু একই রকম মনে হলেও তার কাছে জায়গাটা যেন একেবারেই বদলে গেছে।
সে মাটিতে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর আবার শিস বাজাল।
কিন্তু এবার সেই শিসে আগের আনন্দ ছিল না।
ছিল অপেক্ষা।
ছিল হারিয়ে যাওয়া একজন বন্ধুকে ফিরে পাওয়ার আকুলতা।
অন্যদিকে, অনেক দূরের এক শহরে ইশার জীবনও বদলে যাচ্ছিল।
নতুন স্কুল।
নতুন বন্ধু।
নতুন পরিবেশ।
কিন্তু পুরোনো শহরের সেই ছোট্ট বাগানটাকে সে ভুলতে পারেনি।
সবচেয়ে বেশি মনে পড়ত আয়ানকে।
রাতে ঘুমানোর আগে সে প্রায়ই নিজের পায়ের দিকে তাকাত।
সেখানে তখনও সেই নূপুর।
আয়ান তাকে দিয়েছিল।
ইশা নূপুরটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকত।
তার মা মাঝে মাঝে মেয়েকে জিজ্ঞেস করতেন,
—কী ভাবছিস?
ইশা বলত,
—কিছু না।
কিন্তু তার চোখে পানি জমে থাকত।
একদিন ইশা তার বাবাকে বলল,
—আমরা কি আগের শহরে যেতে পারি?
বাবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—কেন?
—এমনিই।
ইশার বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—সময় হলে নিয়ে যাব।
ইশা চুপ করে গেল।
তারপরও সুযোগ পেলেই সে পুরোনো শহরের কথা বলত।
বছর কেটে যেতে লাগল।
আয়ানের বাবা ব্যবসার কারণে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত তারা অন্য একটি বড় শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন।
সেখানেই তাদের নিজেদের বাড়ি হলো।
আয়ান নতুন স্কুলে ভর্তি হলো।
নতুন বন্ধু হলো।
জীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেল।
কিন্তু তার মনে ইশার জায়গাটা কখনো অন্য কেউ নিতে পারল না।
সে মাঝেমধ্যে বাবাকে বলত,
—বাবা, আমরা কি আবার সেই পুরোনো শহরে যাব?
বাবা বলতেন,
—কেন?
আয়ান উত্তর দিত না।
শুধু বলত,
—এমনিই।
বয়স একটু বাড়ার পর একদিন আয়ান তার মাকে বলল,
—মা, আমাকে আর আয়ান বলে ডাকবে না।
মা অবাক হয়ে বললেন,
—কেন?
আয়ান নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
—এই নামে ডাকলে আমার কষ্ট হয়।
মা ছেলের কথা বুঝতে পারলেন।
তিনি জানতেন, আয়ানের ছোটবেলার সেই বন্ধুর নাম ছিল ইশা এবং আয়ান নামটাই ছিল তাদের বন্ধুত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে বড় স্মৃতি।
মা আর কিছু বললেন না।
সেদিন থেকে তিনি ছেলেকে তার ভালো নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন।
—তানভীর, খেতে আয়।
—তানভীর, পড়তে বসেছিস?
—তানভীর, এত রাত পর্যন্ত জেগে আছিস কেন?
ধীরে ধীরে আয়ান নামটা পরিবারের মধ্যেও হারিয়ে গেল।
তানভীর হয়ে উঠল তার পরিচয়।
অন্যদিকে ইশার জীবনেও একই ঘটনা ঘটল।
একদিন সে তার বাবা-মাকে বলল,
—আমাকে আর ইশা বলে ডাকবে না।
তার মা অবাক হয়ে বললেন,
—কী বলছিস?
ইশা চোখ নামিয়ে বলল,
—ইশা নামটা শুনলেই আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে।
মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
তারপর থেকে তারাও মেয়েকে ভালো নামেই ডাকতে শুরু করলেন।
—সুনেহরা, খেতে আয়।
—সুনেহরা, পড়াশোনা করেছিস?
—সুনেহরা, কোথায় যাচ্ছিস?
ইশা নামটাও ধীরে ধীরে তাদের ঘরের ভেতর থেকে হারিয়ে গেল।
কিন্তু স্মৃতি কি কখনো নাম বদলালে হারিয়ে যায়?
না।
সুনেহরা মাঝে মাঝে রাতে নিজের পায়ের নূপুরটার দিকে তাকিয়ে থাকত।
তারপর আয়ানের কথা মনে পড়ত।
একদিন সে পুরোনো শহরে যাওয়ার সুযোগ পেল।
মায়ের কাছে অনেক অনুরোধ করে সে বাবার সঙ্গে সেখানে গেল।
শহরে পৌঁছে সে প্রথমেই সেই স্কুলের সামনে গেল।
তারপর দৌড়ে বাগানের দিকে গেল।
তেঁতুল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাল।
কেউ নেই।
সুনেহরা আস্তে করে বলল,
—আয়ান?
কোনো উত্তর এল না।
সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল।
তারপর মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে গেল।
এভাবেই বছরগুলো কেটে যেতে লাগল।
দুজনেই মাঝেমধ্যে সেই পুরোনো শহরে যেত।
দুজনেই একই জায়গায় গিয়ে অপেক্ষা করত।
কিন্তু সময় যেন তাদের দেখা হওয়ার আগেই দুজনকে আলাদা পথে নিয়ে যেত।
তারা কেউ জানত না, যার জন্য তারা এত বছর অপেক্ষা করছে, সে-ই একদিন তাদের জীবনে আবার ফিরে আসবে।
তবে এবার সে আসবে অন্য নামে।
তানভীর।
আর সুনেহরা।
আর তাদের কেউই জানবে না—
তারা আসলে সেই হারিয়ে যাওয়া দুই ছোট্ট বন্ধু।
সময় কারও জন্য থেমে থাকে না।
আয়ান আর ইশার সেই ছোট্ট বন্ধুত্বের পর অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। দুজনেই এখন বড় হয়েছে। শৈশবের সেই বাগান, তেঁতুল গাছ আর একসঙ্গে কাটানো সময়গুলো তাদের জীবনের পুরোনো স্মৃতি হয়ে গেছে।
তবু স্মৃতিগুলো পুরোপুরি মুছে যায়নি।
তানভীর পড়াশোনায় বরাবরই ভালো ছিল। বাবার ব্যবসার কারণে ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ালেও শেষ পর্যন্ত সে নিজের পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখে।
একসময় উচ্চশিক্ষার জন্য সে বিদেশে চলে গেল।
বিদেশে যাওয়ার আগের রাতে মা ছেলের ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছিলেন।
—সবকিছু নিয়েছিস তো?
তানভীর হেসে বলল,
—হ্যাঁ মা।
—পাসপোর্ট?
—আছে।
—কাগজপত্র?
—আছে।
মা আবার ব্যাগটা পরীক্ষা করে বললেন,
—তুই কিন্তু নিজের যত্ন নিবি।
তানভীর মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—চিন্তা করো না।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর মা বললেন,
—কখনো কখনো মনে হয় তুই এখনও সেই ছোট্ট ছেলেটাই আছিস।
তানভীর হেসে ফেলল।
—আমি কি খুব বদলে গেছি?
—অনেক।
মা একটু থেমে বললেন,
—তবে একটা জিনিস বদলায়নি।
—কী?
—তোর সেই পুরোনো অভ্যাস।
তানভীর বুঝতে পারল মা কী বলতে চাইছেন।
সে মৃদু হেসে বলল,
—শিস বাজানো?
মা মাথা নেড়ে বললেন,
—হ্যাঁ।
তানভীর জানালার বাইরে তাকাল।
তার মনে হঠাৎ সেই ছোট্ট বাগানের কথা ভেসে উঠল।
তেঁতুল গাছের নিচে বসে থাকা ছোট্ট একটা মেয়ে।
পায়ে রুপালি নূপুর।
আর তার নিজের শিসের সুর শুনে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা দুটো চোখ।
ইশা।
কত বছর হয়ে গেল!
সে জানে না ইশা কোথায় আছে।
কীভাবে আছে।
কখনো কি তার কথা মনে পড়ে?
তানভীর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আস্তে করে শিস বাজাল।
মা কিছু না বলে শুধু ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বিদেশে যাওয়ার পরও তানভীর মাঝে মাঝে সেই পুরোনো বন্ধুর কথা ভাবত।
কখনো ব্যস্ততার মধ্যে হঠাৎ কোনো মিষ্টি শিসের সুর শুনলে তার মনে হতো, ইশা হয়তো কোথাও কাছেই আছে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল অন্যরকম।
তানভীর নিজের পড়াশোনা শেষ করল।
বছর কয়েক পর অবশেষে দেশে ফেরার সময় হলো।
এবার তার মনে ছিল নতুন উত্তেজনা।
দীর্ঘদিন পর নিজের দেশে ফিরবে।
পরিবারের সঙ্গে থাকবে।
বাবার ব্যবসার কাজেও যুক্ত হবে।
তানভীরকে আনতে তার মা নিজেই বিমানবন্দরে গেলেন।
ফ্লাইটের সময়ের আগেই তিনি বাসে উঠে বসেছিলেন।
বাসটা ধীরে ধীরে বিমানবন্দরের দিকে এগোচ্ছিল।
একসময় পাশের সিটে এসে বসলো এক তরুণী।
তানভীরের মা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
মেয়েটার মুখে শান্ত একটা ভাব। হাতে ব্যাগ। চুলগুলো সুন্দর করে বাঁধা।
কিছুক্ষণ পর তানভীরের মা কথার সূত্র ধরে জিজ্ঞেস করলেন,
—মা, তুমি কি বিমানবন্দরে যাচ্ছ?
মেয়েটা হেসে বলল,
—জি।
—দেশের বাইরে যাচ্ছ?
—না, দেশে এসেছি। এখন বাসায় যাচ্ছি।
তানভীরের মা আগ্রহ নিয়ে বললেন,
—তাই নাকি! কোথা থেকে এলে?
—ঢাকা থেকে।
—তোমার নাম কী মা?
মেয়েটা একটু হেসে বলল,
—সুনেহরা।
তানভীরের মা বললেন,
—সুন্দর নাম।
তারপর নিজের অজান্তেই বললেন,
—আমার ছেলেও আজ বিদেশ থেকে ফিরছে।
সুনেহরা সৌজন্যবশত বলল,
—তাই? নিশ্চয়ই অনেকদিন পর দেখা হবে।
—হ্যাঁ। ওর নাম তানভীর।
নামটা শুনেই সুনেহরার মুখটা সামান্য বদলে গেল।
তানভীর নামটা শুনে তার ভেতরে যেন অকারণে একটা বিরক্তি তৈরি হলো।
সে কিছু না বলে জানালার বাইরে তাকাল।
তানভীরের মা সেটা লক্ষ্য করলেন।
—কী হলো মা?
সুনেহরা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে বলল,
—কিছু না।
বাস এগিয়ে চলল।
কথা বলতে বলতে তানভীরের মা বুঝতে পারলেন, মেয়েটা খুব ভদ্র আর শান্ত স্বভাবের।
তিনি বললেন,
—তোমার বাড়ি কোথায়?
সুনেহরা ঠিকানাটা বলল।
তানভীরের মা বললেন,
—আচ্ছা! ওই দিকেই তো আমাদের বাড়ি।
দুজনের মধ্যে আরও কিছুক্ষণ কথা হলো।
কিন্তু কেউই বুঝতে পারল না, এই মেয়েটিই একদিন ছোট্ট আয়ানের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল।
আর তানভীরের মা-ও জানতেন না, তার পাশের সিটে বসা এই মেয়েটিই সেই ইশা।
বাস বিমানবন্দরে পৌঁছে গেল।
তানভীরের মা তাড়াহুড়ো করে নেমে গেলেন।
সুনেহরাও নিজের ব্যাগ নিয়ে চলে গেল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর তানভীরের মা টের পেলেন, তার মানিব্যাগটা নেই।
তিনি নিজের ব্যাগ খুঁজলেন।
কোথাও নেই।
হঠাৎ তার মনে পড়ল—
বাসে বসে থাকার সময় তিনি মানিব্যাগটা সিটের পাশে রেখেছিলেন।
কিন্তু তখন বাস অনেক দূরে চলে গেছে।
তিনি আর সেটা ফেরত পাওয়ার আশা করলেন না।
অন্যদিকে বাসের ভেতরে সুনেহরা সিটে বসে দেখল, পাশে একটা মানিব্যাগ পড়ে আছে।
সে সেটা তুলে নিল।
ভেতরে কিছু টাকা, কয়েকটি কার্ড এবং একটি পরিচয়পত্র ছিল।
সুনেহরা পরিচয়পত্রটা হাতে নিয়ে ঠিকানাটা দেখল।
তারপর অবাক হয়ে বলল,
—আরে! এ তো আমার বাড়ির কাছেই!
সে সিদ্ধান্ত নিল, মানিব্যাগটা নিজেই পৌঁছে দেবে।
সেদিন বিকেলে সুনেহরা সেই ঠিকানায় পৌঁছাল।
বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত করল।
তারপর দরজায় নক করল।
ভেতর থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়ানো ছেলেটাকে দেখে সুনেহরা থমকে গেল।
লম্বা, শান্ত চেহারা।
চোখে বিরক্তির ছাপ।
তানভীরও মেয়েটার দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হলো।
সে বলল,
—জি?
সুনেহরা মানিব্যাগটা সামনে ধরে বলল,
—আপনার মায়ের মানিব্যাগ। বাসে ফেলে এসেছিলেন।
তানভীর ভ্রু কুঁচকে বলল,
—আপনি কে?
সুনেহরা বিরক্ত হয়ে বলল,
—আমি কে সেটা জানার কী দরকার? আপনার মায়ের জিনিস ফিরিয়ে দিতে এসেছি।
—আমি তো শুধু জানতে চাইলাম।
—আপনার কথার ধরনটা এমন কেন?
তানভীরও একটু বিরক্ত হলো।
—আপনিই তো হঠাৎ এসে আমাকে প্রশ্ন করছেন!
সুনেহরা চোখ বড় করে বলল,
—আমি প্রশ্ন করছি?
—হ্যাঁ।
—মানিব্যাগটা না দিলে কি ভালো হতো?
তানভীর কিছু বলার আগেই ভেতর থেকে তার মা ছুটে এলেন।
সুনেহরাকে দেখেই তিনি বিস্ময়ে বললেন,
—আরে মা! তুমি!
তারপর মানিব্যাগটা দেখে বুঝতে পারলেন কী হয়েছে।
—এটা তুমি পেয়েছ?
সুনেহরা হেসে বলল,
—জি। আপনার পরিচয়পত্র দেখে ঠিকানাটা পেয়েছি।
তানভীরের মা খুব খুশি হয়ে বললেন,
—তুমি না থাকলে এটা হয়তো আর পাওয়া যেত না।
তারপর তিনি হঠাৎ সুনেহরার হাত ধরে বললেন,
—ভেতরে এসো মা।
সুনেহরা একটু ইতস্তত করলেও শেষ পর্যন্ত ভেতরে ঢুকল।
তানভীর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মা হঠাৎ ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তানভীর, এ সেই মেয়েটা যার সঙ্গে আমি বাসে এসেছিলাম।
সুনেহরা তানভীরের দিকে তাকাল।
তানভীরও তাকাল তার দিকে।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
কেউ জানত না—
কয়েক ঘণ্টা আগেই বাসে তাদের মায়েদের পরিচয় হয়েছে।
আর এখন তারা নিজেরাই পরিচিত হচ্ছে।
কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক সম্পর্ক, যার শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে—
একটি তেঁতুল গাছের নিচে,
একটি ছোট্ট নূপুরের ঝংকারে,
আর একটি মিষ্টি শিসের সুরে।
সেদিন সুনেহরা তানভীরদের বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পরও তানভীরের মা অনেকক্ষণ তার কথা বললেন।
—মেয়েটাকে আমার খুব ভালো লেগেছে।
তানভীর সোফায় বসে চুপচাপ মায়ের কথা শুনছিল।
—খুব ভদ্র। ব্যবহারটাও কত সুন্দর! এত দূর থেকে শুধু মানিব্যাগটা ফেরত দিতে চলে এসেছে।
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ, ভালোই তো।
মা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তুই কিন্তু মেয়েটার সঙ্গে বেশ ঝগড়া করছিলি।
—ও আগে আমাকে রাগিয়েছে।
—তুইও কম যাসনি।
তানভীর আর কিছু বলল না।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে সুনেহরার মুখটা তার মনে থেকে গেল।
অন্যদিকে বাড়ি ফেরার পথে সুনেহরারও একই অবস্থা।
তার বারবার মনে পড়ছিল দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার কথা।
কী রাগী!
কী অদ্ভুত ব্যবহার!
নিজের মনেই সে বলল,
—মানিব্যাগ দিতে গেলাম, উল্টো আমাকেই প্রশ্ন করছে!
কিন্তু তারপরই তার মনে হলো, ছেলেটার মা কত ভালো ছিলেন।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল, তানভীর নামটা শুনলেই কেন যেন তার ভেতরে অস্বস্তি হচ্ছিল।
ছোটবেলার একটা স্মৃতি যেন বারবার মাথার মধ্যে উঁকি দিচ্ছিল।
কিন্তু সে ঠিক ধরতে পারছিল না স্মৃতিটা কী।
পরদিন বিকেলে তানভীরের মা সুনেহরাকে ফোন করলেন।
বাসে কথা বলার সময় তারা ফোন নম্বর বিনিময় করেছিলেন।
—মা, আজ বিকেলে আমাদের বাসায় এসো। তোমার সঙ্গে একটু গল্প করব।
সুনেহরা প্রথমে না করতে চেয়েছিল।
কিন্তু তানভীরের মায়ের আন্তরিকতায় শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল।
বিকেলে সে আবার তানভীরদের বাড়িতে এল।
দরজা খুলল তানভীর।
সুনেহরা তাকে দেখেই থেমে গেল।
তানভীরও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—আপনি?
—হ্যাঁ, আমি।
—ভেতরে আসুন।
সুনেহরা ভেতরে ঢুকে বলল,
—আপনার মা কোথায়?
—রান্নাঘরে।
ঠিক তখনই তানভীরের মা এসে সুনেহরাকে দেখে হাসলেন।
—এসেছ মা! আয় আয়।
তিনি সুনেহরাকে পাশে বসিয়ে নানা কথা বলতে লাগলেন।
কোথায় পড়াশোনা করেছে, কী করে, পরিবারে কে কে আছে—সবকিছু জানতে চাইলেন।
তানভীর দূর থেকে মায়ের সঙ্গে সুনেহরার কথা বলা দেখছিল।
হঠাৎ তার মা বললেন,
—তানভীর, তুইও এখানে এসে বস।
তানভীর এসে সামনের সোফায় বসল।
সুনেহরা তার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিল।
মা বললেন,
—তোমরা তো প্রায় একই বয়সী। একে অপরের সঙ্গে গল্প করো।
তানভীর বলল,
—আমাদের তো এইমাত্র পরিচয় হলো।
সুনেহরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আর পরিচয়ের প্রথম দিনেই আপনার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়ে গেছে।
তানভীর হেসে বলল,
—সেটা আপনার জন্যই হয়েছিল।
—আবার শুরু করলেন?
—আমি তো সত্যিটাই বললাম।
তানভীরের মা হেসে বললেন,
—তোমরা দুজন একসঙ্গে থাকলে মনে হয় সারাদিন ঝগড়া করবে।
সুনেহরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—আমি কিন্তু ঝগড়া করি না।
তানভীর বলল,
—জি, আপনি শুধু ঝগড়া শুরু করেন।
সুনেহরা রাগ দেখানোর ভান করতেই তানভীরের মা হেসে ফেললেন।
সেদিনের পর থেকে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ বাড়তে লাগল।
তানভীরের মা সুনেহরাকে প্রায়ই বাড়িতে ডাকতেন।
কখনো দুপুরে খেতে।
কখনো বিকেলে চা খেতে।
কখনো শুধু গল্প করার জন্য।
ধীরে ধীরে তানভীর আর সুনেহরার মধ্যেও বন্ধুত্ব তৈরি হতে শুরু করল।
তাদের কথার বড় একটা অংশ অবশ্য ঝগড়া দিয়ে শুরু হতো।
—তুমি এত চুপচাপ থাকো কেন?
—তুমি এত কথা বলো কেন?
—আমি কি বেশি কথা বলি?
—অনেক বেশি।
—তাহলে আজ থেকে তোমার সঙ্গে কথাই বলব না।
—সেটাই ভালো।
কিন্তু কয়েক মিনিট পর আবার দুজন নিজেদের মধ্যে কথা বলা শুরু করত।
একদিন সুনেহরা তানভীরের ঘরে গিয়ে একটা বই হাতে নিয়ে বলল,
—তুমি বিদেশে এত বছর কী করেছ?
—পড়াশোনা।
—শুধু পড়াশোনা?
—আর কী করব?
—বন্ধু বানাওনি?
তানভীর হেসে বলল,
—বন্ধু হয়েছিল।
—এখন নেই?
—কিছু মানুষ দূরে চলে গেলে বন্ধুত্বও দূরে চলে যায়।
সুনেহরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
অদ্ভুতভাবে কথাটা তার নিজের জীবনের সঙ্গে মিলে গেল।
তারও তো একজন বন্ধু ছিল।
ছোটবেলার।
নাম ছিল আয়ান।
হঠাৎ তার মনে হলো, আয়ান এখন কোথায়?
সে কি বড় হয়েছে?
সে কি তাকে মনে রেখেছে?
সুনেহরা নিজের অজান্তেই নিজের হাতের ব্রেসলেটটার দিকে তাকাল।
ব্রেসলেটটা দেখতে খুব সাধারণ নয়। পুরোনো হলেও এর মধ্যে আলাদা একটা মায়া ছিল।
তানভীর ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এটা সুন্দর।
সুনেহরা হাতটা একটু সরিয়ে নিল।
—এটা আমার খুব প্রিয়।
—কে দিয়েছে?
সুনেহরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—একজন খুব কাছের মানুষ।
—কোথায় সে?
সুনেহরা মৃদু হেসে বলল,
—জানি না।
তানভীর আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কিন্তু তার মনে প্রশ্ন জেগে রইল।
সুনেহরা বাড়ি ফেরার পর নিজের ঘরে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
তার হাতের ব্রেসলেটটার দিকে তাকাল।
কয়েক বছর আগে সেই ছোট্ট নূপুরটা সে নিয়ে গিয়েছিল তাদের নতুন শহরে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নূপুরটা আর পায়ে ঠিকমতো হতো না।
তবুও সে সেটাকে ফেলে দেয়নি।
একদিন সে মায়ের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেছিল,
—এটা দিয়ে কি কিছু বানানো যাবে?
তারপর একজন স্বর্ণকারের কাছে গিয়ে সেই নূপুরটা গলিয়ে ছোট্ট একটা ব্রেসলেট বানিয়েছিল।
সেই ব্রেসলেটটাই এখন তার হাতে।
সে প্রায় সবসময় এটা পরে থাকত।
কারণ এটা শুধু একটা অলংকার ছিল না।
এটা ছিল তার শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি।
অন্যদিকে তানভীরও সুনেহরার কথা ভাবছিল।
সে জানত না কেন মেয়েটার সঙ্গে কথা বললে তার ভেতরে এত পরিচিত একটা অনুভূতি হয়।
কিছু কিছু মুহূর্তে সুনেহরার আচরণ তাকে ছোটবেলার কারও কথা মনে করিয়ে দিত।
কিন্তু সে কোনোভাবেই মিলটা ধরতে পারছিল না।
এক রাতে তানভীর নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ তার মনে পড়ল সেই পুরোনো বাগানের কথা।
সে বহু বছর পর আবার সেই শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
পরদিন মাকে বলল,
—মা, আমি একটু পুরোনো শহরে যাব।
মা অবাক হয়ে বললেন,
—হঠাৎ?
—এমনিই।
মা ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, বিষয়টা শুধু এমনিই নয়।
তানভীর গাড়ি নিয়ে পুরোনো শহরের দিকে রওনা দিল।
শহরে পৌঁছে সে প্রথমে সেই পুরোনো স্কুলের সামনে গেল।
সবকিছু অনেক বদলে গেছে।
তারপর ধীরে ধীরে সেই বাগানের দিকে হাঁটল।
তেঁতুল গাছটা এখনও আছে।
আগের চেয়ে অনেক বড় হয়েছে।
তানভীর গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়াল।
তার মনে হলো, যেন কয়েক বছর আগের সেই ছোট্ট ছেলেটা আবার তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
সে মাটিতে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর নিজের অজান্তেই শিস বাজাতে শুরু করল।
একই সুর।
যে সুর একদিন একটা ছোট্ট মেয়েকে তার কাছে নিয়ে এসেছিল।
তানভীর চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হলো, যদি আজও ইশা কোথাও থাকে, তাহলে হয়তো এই সুর শুনে সে ফিরে আসবে।
কিন্তু কেউ এল না।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে তানভীর বাড়ি ফিরে গেল।
সে জানত না—
ঠিক সেই সময়, শহরের অন্য প্রান্তে সুনেহরাও তার ছোটবেলার সেই বন্ধুটিকে খুঁজতে এসেছিল।
দুজনেই একই শহরে ছিল।
একই স্মৃতির কাছে ফিরেছিল।
কিন্তু ভাগ্য এখনও তাদের মুখোমুখি দাঁড় করায়নি।
তাদের দেখা হয়েছিল।
তারা কথা বলছিল।
তারা বন্ধু হয়ে উঠছিল।
তবুও কেউ জানত না—
তানভীরই সেই আয়ান।
আর সুনেহরাই সেই ইশা।
পুরোনো শহর থেকে ফিরে আসার পর তানভীরের মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে রইল।
সেদিন তেঁতুল গাছটার নিচে বসে অনেকক্ষণ সে শিস বাজিয়েছিল। কিন্তু ইশার কোনো দেখা পায়নি।
তারপরও কেন যেন তার মনে হচ্ছিল, ইশা হয়তো খুব কাছেই আছে।
কখনো কখনো মানুষ কোনো প্রমাণ ছাড়াই কিছু অনুভব করে। তানভীরেরও ঠিক তেমনই মনে হচ্ছিল।
এদিকে সুনেহরার জীবনও ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল।
তানভীরের সঙ্গে তার বন্ধুত্বটা বেশ ভালোই হয়ে উঠেছে।
আগের মতো তাদের মধ্যে তর্ক হয়, মজা হয়, একে অন্যকে বিরক্ত করা হয়। কিন্তু এখন আর সেই ঝগড়াগুলোতে বিরক্তি নেই।
বরং একদিন কথা না হলে দুজনেরই দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে।
এক বিকেলে সুনেহরা তানভীরদের বাড়িতে এসে দেখল, তানভীর বারান্দায় বসে বই পড়ছে।
সুনেহরা সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
—কী পড়ছ?
তানভীর বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,
—বই।
—সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। বইয়ের নাম কী?
তানভীর এবার তাকিয়ে বলল,
—তুমি কি সব প্রশ্নের উত্তর চাও?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আগে বসো।
সুনেহরা পাশের চেয়ারে বসে বলল,
—তুমি সবসময় এত গম্ভীর থাকো কেন?
—আমি কি গম্ভীর?
—হুম।
—তুমি বেশি কথা বলো বলে আমার গম্ভীর মনে হয়।
সুনেহরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—আবার শুরু করেছ!
তানভীর হেসে ফেলল।
সুনেহরাও হাসল।
তাদের এই ছোট ছোট কথাগুলোই ধীরে ধীরে বন্ধুত্বকে আরও গভীর করে তুলছিল।
কিছুদিন পর তানভীর তার পুরোনো শহরে আবার যাওয়ার প্রস্তুতি নিল।
সুনেহরা জানতে পেরে জিজ্ঞেস করল,
—তুমি ওই শহরে বারবার যাও কেন?
তানভীর একটু চুপ করে বলল,
—একজনকে খুঁজতে।
—কাকে?
—আমার ছোটবেলার একজন বন্ধুকে।
সুনেহরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—ছেলে না মেয়ে?
তানভীর হেসে বলল,
—মেয়ে।
সুনেহরার মুখটা অজান্তেই একটু গম্ভীর হয়ে গেল।
—নাম কী?
তানভীর জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—ইশা।
নামটা শুনে সুনেহরার বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।
সে নিজের অজান্তেই হাতের ব্রেসলেটটা স্পর্শ করল।
তারপর ধীরে বলল,
—এত বছর পরও খুঁজছ?
—হ্যাঁ।
—কেন?
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—কারণ সে আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল।
সুনেহরা আর কিছু বলল না।
কিন্তু সেদিন বাড়ি ফেরার পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ নিজের ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, তানভীরের কথার মধ্যে কোথাও একটা অদ্ভুত পরিচিতি আছে।
কিন্তু সে নিজেও বুঝতে পারছিল না কেন।
পরদিন সুনেহরা একা পুরোনো শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
সে সেই পুরোনো স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
স্কুলের ভবন বদলে গেছে।
চারপাশও অনেকটা বদলে গেছে।
কিন্তু বাগানের দিকে তাকাতেই তার বুকটা কেমন ভারী হয়ে উঠল।
সে ধীরে ধীরে তেঁতুল গাছটার কাছে গেল।
গাছটার নিচে বসে হাতের ব্রেসলেটটা স্পর্শ করল।
মনে পড়ল ছোট্ট আয়ানের কথা।
সে তখন কত ছোট ছিল!
আয়ান তাকে বলেছিল,
—এটা শুধু তোমার জন্য।
সুনেহরা চোখ বন্ধ করল।
হঠাৎ তার মনে হলো, দূরে কোথাও শিস বাজছে।
সে চমকে উঠে দাঁড়াল।
চারদিকে তাকাল।
কেউ নেই।
কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারল, আসলে পাশের রাস্তা দিয়ে কেউ বাঁশি বাজাতে বাজাতে যাচ্ছিল।
সুনেহরা মৃদু হেসে নিজের মনকে বলল,
—তুই এখনও আয়ানকে খুঁজিস?
তারপর ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে গেল।
অন্যদিকে তানভীরও প্রায়ই সেই শহরে যাচ্ছিল।
কখনো স্কুলের সামনে বসে থাকত।
কখনো বাগানের ভেতর হাঁটত।
কখনো সেই তেঁতুল গাছটার নিচে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত।
তার পুরোনো বন্ধুদের মধ্যে দু-একজনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল।
একদিন সে তাদের একজনকে ফোন করে বলল,
—তোরা কি ইশার কোনো খবর পেয়েছিস?
বন্ধু বলল,
—না রে। তুই এখনও ওকে খুঁজছিস?
—হ্যাঁ।
—এত বছর হয়ে গেছে!
তানভীর শান্তভাবে বলল,
—কিছু মানুষকে সময় দিয়ে ভুলে যাওয়া যায় না।
বন্ধু আর কিছু বলল না।
দিনগুলো এভাবেই চলতে থাকল।
তানভীর আর সুনেহরার বন্ধুত্বও আরও গভীর হলো।
একদিন সুনেহরা তানভীরকে বলল,
—তুমি জানো, তোমাকে মাঝে মাঝে আমার খুব পরিচিত মনে হয়।
তানভীর হেসে বলল,
—আমারও তোমাকে মাঝে মাঝে পরিচিত লাগে।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—কোথায় দেখেছ আমাকে?
তানভীর একটু ভেবে বলল,
—জানি না।
সুনেহরা মজা করে বলল,
—তাহলে হয়তো আগের জন্মে পরিচিত ছিলাম!
তানভীর হেসে বলল,
—হতে পারে।
দুজনেই হেসে উঠল।
কিন্তু তাদের অজান্তেই সত্যিটা তাদের খুব কাছে চলে এসেছিল।
একদিন বিকেলে তারা দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল।
রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট দোকান ছিল। সুনেহরা সেখানে দাঁড়িয়ে কিছু একটা দেখতে লাগল।
তানভীর সামনে এগিয়ে গেল।
সুনেহরার হাতের ব্রেসলেটটা হঠাৎ তার ব্যাগের সঙ্গে আটকে গেল।
—আহ!
সে থেমে গেল।
—কী হয়েছে?
—ব্রেসলেটটা আটকে গেছে।
তানভীর কাছে এসে বলল,
—দাঁড়াও, আমি খুলে দিচ্ছি।
—সাবধানে।
তানভীর ধীরে ধীরে ব্রেসলেটটা ছাড়ানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু হঠাৎ একটা টান লাগতেই ব্রেসলেটটা খুলে গিয়ে ছিটকে পড়ল।
রাস্তার পাশে থাকা একটি খোলা ম্যানহোলের ভেতর সোজা পড়ে গেল।
সুনেহরা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,
—আমার ব্রেসলেট!
তানভীর হতভম্ব হয়ে বলল,
—আমি তো ইচ্ছা করে করিনি!
সুনেহরা নিচে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
—তুমি বুঝতে পারছ এটা কী ছিল?
—আমি দুঃখিত।
—দুঃখিত বললেই হবে?
তানভীর বলল,
—আমি চেষ্টা করছি—
—কী চেষ্টা করবে?
সুনেহরার চোখে পানি চলে এল।
সে কাঁপা গলায় বলল,
—তুমি জানো না এটা আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তানভীর চুপ করে গেল।
সুনেহরা চোখের পানি মুছে বলল,
—তুমি কিছুই বোঝো না।
তারপর আর কিছু না বলে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
তানভীর পেছন থেকে ডাকল,
—সুনেহরা!
সে থামল না।
বাড়ি ফিরে সুনেহরা নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে দিল।
বিছানায় বসে তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।
ব্রেসলেটটা শুধু একটা অলংকার ছিল না।
ওটার ভেতরে ছিল তার ছোটবেলা।
ছিল আয়ানের দেওয়া নূপুর।
ছিল সেই বাগান।
ছিল সেই শিসের সুর।
ছিল এমন একজন বন্ধুর স্মৃতি, যাকে সে আজও খুঁজে বেড়ায়।
অন্যদিকে তানভীরও মন খারাপ করে বাড়ি ফিরল।
সে জানত না ব্রেসলেটটার সঙ্গে সুনেহরার এত গভীর সম্পর্ক।
কিন্তু সুনেহরার চোখের পানি তাকে ভেতর থেকে অস্বস্তিতে ফেলছিল।
সেদিন রাতে সে অনেকবার ফোন হাতে নিয়েও ফোন করতে পারল না।
অবশেষে নিজেকেই বলল,
—কাল ওর সঙ্গে কথা বলব।
কিন্তু পরদিন সুনেহরা তার ফোন ধরল না।
একদিন গেল।
দুই দিন গেল।
তাদের আর কথা হলো না।
তানভীরের মনে অপরাধবোধ আরও বাড়তে লাগল।
আর সুনেহরা বারবার নিজের কবজির দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল—
যে মানুষটা তার শৈশবের শেষ স্মৃতিটুকুও হারিয়ে দিল, তার সঙ্গে আর কথা বলবে না।
ব্রেসলেট হারানোর পর তানভীর আর সুনেহরার মধ্যে কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল।
তানভীর কয়েকবার ফোন করেছিল।
সুনেহরা ফোন ধরেনি।
মেসেজ পাঠিয়েছিল।
সেখানেও কোনো উত্তর আসেনি।
তানভীর বুঝতে পারছিল, সুনেহরা সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছে।
তার কাছে ব্রেসলেটটা যে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটা সে আগে বুঝতে পারেনি।
একদিন বিকেলে তানভীর একা বসে ছিল বারান্দায়।
তার মা এসে বললেন,
—কী হয়েছে?
—কিছু না।
—সুনেহরার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?
তানভীর মায়ের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
—তুমি কীভাবে বুঝলে?
মা হেসে বললেন,
—তোর মুখ দেখলেই বোঝা যায়।
তানভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—ওর একটা ব্রেসলেট হারিয়ে ফেলেছি।
—কীভাবে?
তানভীর পুরো ঘটনা বলল।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—ব্রেসলেটটা কি খুব বিশেষ কিছু ছিল?
—হ্যাঁ। ওর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
—তাহলে ওকে একটু সময় দে। মন খারাপ কমলে নিজেই কথা বলবে।
তানভীর মাথা নেড়ে চুপ করে রইল।
কিন্তু তার মন মানছিল না।
সে ঠিক করল, ব্রেসলেটটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে।
পরদিন সে সেই জায়গায় ফিরে গেল।
রাস্তার পাশে ম্যানহোলটা তখনও খোলা ছিল।
তানভীর নিচে তাকিয়ে দেখল, অনেক নিচে অন্ধকার।
সে আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করল, কিন্তু কেউ কিছু জানত না।
একজন বলল,
—এখানে পড়লে খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে সেখান থেকে ফিরে গেল।
সেদিন রাতে তার হঠাৎ ছোটবেলার কথা মনে পড়ল।
ইশা।
নূপুর।
তেঁতুল গাছ।
আর সেই শিস।
তানভীর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তেই শিস বাজাল।
সেই পুরোনো সুর।
সুরটা বাজাতে বাজাতে তার মনে হলো, ছোট্ট ইশা যেন এখনও তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
সে মৃদু হেসে বলল,
—তুই কোথায় হারিয়ে গেলি, ইশা?
অন্যদিকে সুনেহরার মনও ভালো ছিল না।
ব্রেসলেট হারানোর পর তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের শৈশবের একটা অংশ হারিয়ে ফেলেছে।
তার মা বিষয়টা জানতে পেরে বললেন,
—নতুন একটা বানিয়ে দিই?
সুনেহরা মাথা নেড়ে বলল,
—না মা।
—কেন?
—ওটার মতো আর কোনোটা হবে না।
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বললেন না।
তিনি জানতেন, ওই ব্রেসলেটের সঙ্গে মেয়ের পুরোনো কোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
কয়েকদিন পর সুনেহরা আবার সেই পুরোনো শহরে গেল।
তার মনে হলো, সেখানে গেলে হয়তো মনটা একটু ভালো হবে।
সে সেই পুরোনো স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
চারপাশে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে বাগানের দিকে হাঁটল।
তেঁতুল গাছটার নিচে গিয়ে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হলো, যেন বহু বছর আগের একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে।
—ইশা!
সে হঠাৎ চোখ খুলে চারদিকে তাকাল।
কেউ নেই।
সুনেহরা নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হলো।
—আমি এখনও কেন ওকে খুঁজছি?
কিন্তু প্রশ্নটার উত্তর তার জানা ছিল।
আয়ান তার শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি ছিল।
সে তাকে কোনোদিন ভুলতে পারেনি।
সেদিন অনেকক্ষণ সেখানে বসে থেকে সুনেহরা বাড়ি ফিরে গেল।
পরদিন আবার তানভীর পুরোনো শহরে গেল।
এই শহরটার প্রতি তার অদ্ভুত একটা টান ছিল।
সে জানত না কেন।
হয়তো ইশার জন্য।
হয়তো সেই শৈশবের স্মৃতির জন্য।
হয়তো সেই তেঁতুল গাছটার জন্য।
তানভীর স্কুলের পেছনের বাগানে গিয়ে বসে রইল।
সন্ধ্যা নেমে আসছিল।
পাখিরা গাছে ফিরছিল।
চারপাশ ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে গেল।
তানভীর আবার শিস বাজাতে শুরু করল।
সেই একই সুর।
সে জানত না, ঠিক সেই সময় সুনেহরাও শহরের অন্য প্রান্তে ছিল।
দুজন আবারও একই জায়গায় থেকেও একে অপরকে দেখতে পেল না।
এভাবে কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।
তানভীর আর সুনেহরার মধ্যে কোনো কথা হলো না।
তবু দুজনেই একে অপরকে নিয়ে ভাবত।
একদিন তানভীরের মা সুনেহরাকে ফোন করলেন।
—মা, কেমন আছ?
সুনেহরা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
—ভালো আছি।
—তানভীরের সঙ্গে কথা বলছ না কেন?
সুনেহরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—ওর ওপর একটু রাগ করেছি।
—কতদিন রাগ করে থাকবে?
সুনেহরা উত্তর দিল না।
তানভীরের মা মৃদু হেসে বললেন,
—তোমরা দুজনকে দেখলে আমার ছোটবেলার বন্ধুদের কথা মনে পড়ে।
সুনেহরা হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।
তার মনে হলো, কথাটা কোথাও যেন খুব পরিচিত।
কিছুক্ষণ পর সে বলল,
—আন্টি, তানভীর কি ছোটবেলা থেকে এমন?
—কেমন?
—একটু গম্ভীর, আবার হঠাৎ খুব হাসে।
মা হেসে বললেন,
—না। ছোটবেলায় কিন্তু একদম অন্যরকম ছিল।
—কেমন?
—খুব দুষ্টু ছিল। সারাদিন খেলত। আর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।
সুনেহরার বুকের ভেতর হঠাৎ ধক করে উঠল।
—কী অভ্যাস?
—শিস বাজানো।
সুনেহরা কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—শিস?
—হ্যাঁ। ছোটবেলা থেকে ও খুব সুন্দর শিস বাজাতে পারত।
সুনেহরার আঙুল কাঁপতে শুরু করল।
তার মনে হঠাৎ একটা পুরোনো দৃশ্য ভেসে উঠল।
একটা বাগান।
তেঁতুল গাছ।
একটা ছোট্ট ছেলে।
আর মিষ্টি একটা শিস।
সে সঙ্গে সঙ্গে কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বলল,
—আন্টি, পরে কথা বলব।
ফোন রেখে সুনেহরা বিছানায় বসে পড়ল।
তার মাথার ভেতর যেন ঝড় শুরু হয়েছে।
তানভীর শিস বাজায়।
তানভীরের নাম তানভীর।
কিন্তু ছোটবেলায় তার বন্ধুর নাম ছিল আয়ান।
তাহলে?
সে নিজেকেই বোঝাতে চেষ্টা করল,
—এটা কাকতালীয় হতে পারে।
কিন্তু তার মন কোনোভাবেই সেটা মানছিল না।
পরদিন সে তানভীরের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল।
কিন্তু দেখা করার আগে সে নিজের মনে একটা প্রশ্ন করল।
তানভীর যদি সত্যিই আয়ান হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য তাকে অতীতে ফিরতে হবে।
আর সে জানত, অতীতের সেই একমাত্র মানুষটি হয়তো এখনও তাকে চিনতে পারবে।
তাই সে আবার পুরোনো শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
এদিকে তানভীরও একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সে তার পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারল, তাদের স্কুলে শিগগিরই একটা পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে।
তানভীরের মনে হঠাৎ একটা আশা জাগল।
হয়তো সেখানে ইশার কোনো খবর পাওয়া যাবে।
হয়তো তার কোনো পুরোনো পরিচিত তাকে চিনবে।
হয়তো...
এই ‘হয়তো’ নিয়েই সে অনুষ্ঠানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল।
আর সুনেহরার মনেও একই আশা।
সে ভাবল,
—যদি আয়ান এখনও এই শহরে কোথাও থাকে?
হয়তো সেই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে সে আসবে।
হয়তো এত বছরের অপেক্ষার অবসান হবে।
কেউ জানত না, ভাগ্য এবার সত্যিই তাদের খুব কাছে নিয়ে আসছে।
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের দিন যতই এগিয়ে আসছিল, ততই তানভীরের ভেতরে অদ্ভুত এক উত্তেজনা তৈরি হচ্ছিল।
অনেক বছর পর সে আবার সেই স্কুলে যাবে।
সেই স্কুল, যার পাশেই ছিল অন্য স্কুলটা।
দুই স্কুলের মাঝখানে ছিল বিশাল সেই বাগান।
আর সেই বাগানের তেঁতুল গাছটার নিচেই তার শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিটা লুকিয়ে আছে।
ইশা।
তানভীর নিজের আলমারি খুলে একটা পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিটা অনেক আগের।
সে তখন ছোট।
ছবিটা তোলার সময় তার মুখে ছিল বড় একটা হাসি।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—তুই এখন কোথায় আছিস, ইশা?
কোনো উত্তর এল না।
তবু সে মনে মনে ঠিক করে ফেলল, এবার যেভাবেই হোক তাকে খুঁজে বের করবে।
অন্যদিকে সুনেহরাও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তার বুকের ভেতরও অদ্ভুত একটা অনুভূতি।
আয়ানকে সে শেষ দেখেছিল ছোটবেলায়।
তারপর কত বছর কেটে গেছে!
আয়ান কি তাকে মনে রেখেছে?
তার দেওয়া নূপুরটার কথা মনে আছে?
সুনেহরা নিজের কবজির দিকে তাকাল।
ব্রেসলেটটা নেই।
ম্যানহোলে পড়ে হারিয়ে গেছে।
কিন্তু তার স্মৃতি এখনও অটুট।
সে ধীরে ধীরে বলল,
—আয়ান, তুমি যদি সত্যিই কোথাও থাকো, এবার আমাকে খুঁজে নিও।
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকেই পুরোনো স্কুলটা সাজানো হলো।
প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা একে একে আসতে শুরু করল।
তানভীরও দুপুরের দিকে সেখানে পৌঁছাল।
গাড়ি থেকে নেমে স্কুলের দিকে তাকিয়ে সে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
কত বছর পর!
সবকিছু বদলে গেছে।
কিন্তু বাতাসের মধ্যে যেন এখনও তার শৈশবের গন্ধ লুকিয়ে আছে।
সে ভেতরে ঢুকে কয়েকজন পুরোনো বন্ধুকে দেখতে পেল।
একজন তাকে দূর থেকেই চিনে ফেলল।
—এই তানভীর!
তানভীর ঘুরে তাকিয়ে হেসে বলল,
—কী খবর?
বন্ধুটি এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
—কত বছর পর দেখা!
আরেকজন এসে বলল,
—তুই তো একেবারে বদলে গেছিস!
তানভীর হেসে বলল,
—তোরা কিন্তু একটুও বদলাসনি।
সবাই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ গল্প করার পর একজন পুরোনো বন্ধু হঠাৎ বলল,
—মনে আছে, স্কুলের মাঠে তুই কীভাবে ফুটবল খেলতিস?
তানভীর বলল,
—মনে আছে।
আরেকজন হেসে বলল,
—আর তুই একা থাকলে যে শিস বাজাতি!
সবাই হেসে উঠল।
—হ্যাঁ রে! তোর সেই শিস এখনও মনে আছে।
তানভীরও হেসে ফেলল।
—এখনও বাজাতে পারি।
বন্ধুরা বলল,
—তাহলে বাজা দেখি!
তানভীর একটু ইতস্তত করলেও শেষ পর্যন্ত শিস বাজাতে শুরু করল।
একই সুর।
একই মিষ্টি ধ্বনি।
বছরগুলো যেন মুহূর্তের মধ্যে পিছিয়ে গেল।
আর সেই সময় স্কুলের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুনেহরার কানে হঠাৎ সেই সুর পৌঁছে গেল।
সে স্থির হয়ে গেল।
তার বুকের ভেতর যেন কেউ হঠাৎ দরজা খুলে দিল।
এই সুর!
এই সুর সে আগে শুনেছে।
অনেক বছর আগে।
একটা বাগানে।
একটা ছোট্ট ছেলের কাছ থেকে।
সুনেহরা চারদিকে তাকাতে লাগল।
—আয়ান?
তার ঠোঁট থেকে নামটা অজান্তেই বেরিয়ে গেল।
সে সুরের দিকে এগোতে শুরু করল।
কিন্তু মানুষের ভিড়ে কাউকে দেখতে পেল না।
একজনকে জিজ্ঞেস করল,
—এইমাত্র যে শিস বাজাচ্ছিল, সে কোথায়?
লোকটি বলল,
—জানি না।
সুনেহরা এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল।
কিন্তু তানভীর তখন তার বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলের ভেতরে চলে গেছে।
সুনেহরা হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর নিজের মনকে বলল,
—না, এটা নিশ্চয়ই কাকতালীয় নয়।
অন্যদিকে তানভীর তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছিল।
একসময় সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
—তোরা ইশার কোনো খবর জানিস?
বন্ধুরা একে অন্যের দিকে তাকাল।
একজন বলল,
—না।
আরেকজন বলল,
—ইশা কি এখনও এই শহরে থাকে?
তানভীর মাথা নেড়ে বলল,
—জানি না।
বন্ধু মজা করে বলল,
—তুই এখনও ওকে খুঁজছিস?
তানভীর শান্ত গলায় বলল,
—হ্যাঁ।
—এত বছর পর?
—হ্যাঁ।
বন্ধু একটু চুপ করে বলল,
—তুই সত্যিই পাগল।
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—হতে পারে।
এই কথোপকথনের কিছু অংশ দূর থেকে সুনেহরার কানে গেল।
সে থেমে গেল।
তারপর আবার খুঁজতে শুরু করল।
কিন্তু তানভীর তখন স্কুলের অন্য পাশে চলে গেছে।
সুনেহরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করল।
শিসের সুরটা এখনও তার কানে বাজছে।
তার মনে হচ্ছিল, সে যেন খুব কাছাকাছি।
কিন্তু কোথায়?
এদিকে তানভীরও ধীরে ধীরে স্কুলের পেছনের দিকে হাঁটতে লাগল।
তার পা যেন নিজের অজান্তেই তাকে সেই পুরোনো বাগানের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।
বাগানের ভেতর ঢুকতেই পুরোনো স্মৃতিগুলো একে একে ফিরে এল।
সেই তেঁতুল গাছ।
গাছটার নিচে ইশার বসে থাকা।
তার হাসি।
তার পায়ের নূপুরের শব্দ।
তানভীরের চোখে পানি চলে এল।
সে গাছটার নিচে গিয়ে বসে পড়ল।
মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ধীরে ধীরে শিস বাজাতে শুরু করল।
সেই সুর।
যে সুরের সঙ্গে তার শৈশব জড়িয়ে আছে।
সে শিস বাজাতে বাজাতে চোখ মুছল।
—ইশা, তুই যদি কোথাও থাকিস...
তার গলা কেঁপে উঠল।
—একবার ফিরে আয়।
ঠিক তখনই দূর থেকে সুনেহরা আবার সেই শিস শুনতে পেল।
এবার সুরটা অনেক পরিষ্কার।
তার বুকের ভেতর কাঁপন শুরু হলো।
সে দৌড়াতে শুরু করল।
এক গাছ থেকে আরেক গাছের দিকে তাকাতে তাকাতে এগোতে লাগল।
তার মনে হচ্ছিল, আজ যদি সে সেই মানুষটাকে না খুঁজে পায়, তাহলে হয়তো আর কোনোদিন সুযোগ আসবে না।
দৌড়াতে দৌড়াতে সে বাগানের আরও ভেতরে চলে গেল।
হঠাৎ সে থেমে গেল।
সামনে বিশাল সেই তেঁতুল গাছ।
তার নিচে একজন বসে আছে।
পেছন ফিরে।
সুনেহরার বুকের ভেতর যেন সবকিছু থেমে গেল।
সে ধীরে ধীরে সামনে এগোল।
ছেলেটা এখনও শিস বাজাচ্ছে।
সুনেহরার চোখে পানি চলে এল।
তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
তারপর খুব আস্তে করে সে বলল,
—আয়ান...
শিসের সুর থেমে গেল।
ছেলেটা স্থির হয়ে গেল।
সুনেহরা আরেক পা এগিয়ে গেল।
—আয়ান...
এবার ছেলেটা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
কিন্তু সুনেহরা এখনও নিশ্চিত নয়।
আর তানভীরও জানে না, তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিই সেই ছোট্ট ইশা।
দুজনের চোখ এখনও পুরোপুরি মুখোমুখি হয়নি।
শুধু কয়েক সেকেন্ডের দূরত্ব।
কয়েক বছরের অপেক্ষা।
আর একটা নাম—
আয়ান।
সুনেহরা চোখের পানি মুছে আবার ডাকতে যাবে...
ঠিক তখনই তানভীর পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াল।
তানভীর ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল।
তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুনেহরা।
দুজনের চোখে চোখ পড়তেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য সময় যেন থেমে গেল।
সুনেহরা কিছু বলতে পারল না।
তার চোখে পানি জমে আছে।
তানভীরও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
—সুনেহরা?
সুনেহরা কোনো উত্তর দিল না।
তার চোখ বারবার তানভীরের মুখের দিকে যাচ্ছিল।
তারপর হঠাৎ সে খুব আস্তে করে বলল,
—আয়ান...
তানভীরের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
এই নামটা সে কত বছর ধরে শোনেনি!
পরিবারের কেউ তাকে এই নামে ডাকে না।
বন্ধুরাও জানে না, ছোটবেলায় তাকে এই নামে ডাকা হতো।
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
—তুমি আমাকে কী নামে ডাকলে?
সুনেহরার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে আরেকবার বলল,
—আয়ান।
তানভীর কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর কাঁপা গলায় বলল,
—তুমি... আমাকে এই নামে কীভাবে চিনলে?
সুনেহরা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল।
—কারণ... এই নামটা আমি ছাড়া আর কে জানে?
তানভীরের চোখ বড় হয়ে গেল।
তার বুকের ভেতর যেন পুরোনো কোনো দরজা হঠাৎ খুলে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
—ইশা?
সুনেহরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,
—হ্যাঁ।
এক মুহূর্তের জন্য দুজনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর সুনেহরা দৌড়ে গিয়ে তানভীরকে জড়িয়ে ধরল।
তানভীরও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
বছরের পর বছর জমে থাকা অপেক্ষা, অভিমান আর হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট যেন সেই এক মুহূর্তে চোখের পানিতে ভেসে গেল।
সুনেহরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—তুমি আমাকে এত বছর কোথায় খুঁজেছ?
তানভীরের গলা ভারী হয়ে গেল।
—সব জায়গায়।
—আমি তোমাকে কতবার এই শহরে খুঁজেছি জানো?
—আমিও এসেছি কতবার!
—তবু আমাদের দেখা হয়নি।
—ভাগ্যই হয়তো আমাদের লুকিয়ে রেখেছিল।
সুনেহরা চোখ মুছে বলল,
—আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভুলে গেছ।
তানভীর মাথা নেড়ে বলল,
—কখনো না।
সুনেহরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তুমি জানো, তোমার দেওয়া নূপুরটা আমি এখনও রেখেছিলাম।
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
—নূপুরটা?
—হ্যাঁ।
—কোথায়?
সুনেহরা নিজের খালি কবজির দিকে তাকাল।
—ওটা দিয়েই আমি একটা ব্রেসলেট বানিয়েছিলাম।
তানভীর হঠাৎ সেই হারানো ব্রেসলেটের কথা মনে করল।
তার চোখ বড় হয়ে গেল।
—তাহলে ওই ব্রেসলেট...
সুনেহরা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—তোমার দেওয়া নূপুর থেকেই বানানো হয়েছিল।
তানভীর কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।
তারপর নিজের মাথায় হাত দিয়ে বলল,
—আমি তো কিছুই বুঝিনি!
সুনেহরা মৃদু হেসে বলল,
—আমিও বুঝিনি।
—তুমি যখন প্রথম আমার সঙ্গে দেখা করলে, তখনও চিনতে পারোনি?
—না।
—আমিও না।
দুজনেই হেসে ফেলল।
তারপর তানভীর হঠাৎ বলল,
—তুমি আমাকে প্রথম দিনেই এত রাগ দেখালে কেন?
সুনেহরা চোখ বড় করে বলল,
—কারণ তুমি আমার ব্রেসলেটটা ফেলে দিয়েছিলে!
—আমি তো জানতাম না সেটা তোমার শৈশবের স্মৃতি!
—জানলে কি ফেলতে?
—না।
—তাহলে আগে জানতে চেষ্টা করা উচিত ছিল।
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—ঠিক আছে। আমার ভুল।
সুনেহরাও হাসল।
কিছুক্ষণ তারা তেঁতুল গাছটার নিচে বসে রইল।
সেই একই জায়গা।
যেখানে বহু বছর আগে তাদের প্রথম বন্ধুত্ব হয়েছিল।
তানভীর বলল,
—মনে আছে? তুমি প্রথম দিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে, আমি এত সুন্দর শিস কোথা থেকে শিখেছি।
সুনেহরা হেসে বলল,
—মনে আছে।
—আর তুমি বলেছিলে তোমাকে শেখাতে।
—হ্যাঁ। কিন্তু তুমি শেখাওনি।
—তুমি নিজেই শিখে নেবে বলেছিলে।
—শিখতে পারিনি।
তানভীর আবার শিস বাজাল।
সুনেহরা চোখ বন্ধ করে শুনল।
তার মুখে শান্ত একটা হাসি ফুটে উঠল।
—এই সুরটা আমি এত বছর পরও চিনতে পেরেছি।
তানভীর বলল,
—আমি জানতাম না তুমি চিনবে।
—এই সুরটা তো আমার শৈশবের অংশ।
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর তানভীর বলল,
—তুমি জানো, আমি প্রায়ই এখানে আসতাম।
—আমিও।
—তাহলে এতদিন দেখা হলো না কেন?
সুনেহরা মৃদু হেসে বলল,
—হয়তো আমরা দুজনেই একটু দেরিতে এসেছিলাম।
তানভীর বলল,
—কিন্তু আজ তো ঠিক সময়ে এসেছি।
সুনেহরা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
দুজন ধীরে ধীরে বাগান থেকে বেরিয়ে স্কুলের দিকে হাঁটতে লাগল।
পথে সুনেহরা হঠাৎ বলল,
—তুমি আমাকে এত বছর ধরে খুঁজেছ?
—হ্যাঁ।
—কেন?
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—কারণ তুমি আমার প্রথম বন্ধু ছিলে।
সুনেহরা মৃদু হেসে বলল,
—শুধু বন্ধু?
তানভীর তার দিকে তাকাল।
কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
সুনেহরাও আর প্রশ্ন করল না।
তবে দুজনের মনেই একটা নতুন অনুভূতি জন্ম নিতে শুরু করেছে।
শৈশবের বন্ধুত্বটা যেন বড় হয়ে অন্যরকম হয়ে উঠছে।
স্কুলে ফিরে তারা কয়েকজন পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করল।
তানভীর সবাইকে বলল,
—তোরা যার কথা এতদিন শুনেছিস, সেই ইশা সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
বন্ধুরা অবাক হয়ে সুনেহরার দিকে তাকাল।
একজন বলল,
—তুই এত বছর পর সত্যিই ওকে খুঁজে পেলি?
তানভীর হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
সুনেহরা মৃদু হেসে বলল,
—আর আমিও ওকে খুঁজে পেয়েছি।
বন্ধুরা আনন্দে তাদের ঘিরে ফেলল।
অনুষ্ঠান শেষে তানভীরের মা যখন জানতে পারলেন, সুনেহরাই সেই ছোটবেলার ইশা, তিনি কিছুক্ষণ বিশ্বাসই করতে পারলেন না।
—তুই এতদিন ধরে যাকে খুঁজছিলি, সে-ই তো সুনেহরা!
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ মা।
মা সুনেহরাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন,
—তোমাকে আমি প্রথম দেখেই কেন যেন খুব আপন মনে করেছিলাম, জানো?
সুনেহরার চোখে পানি এসে গেল।
—আমারও আপন মনে হয়েছিল।
সেদিন সন্ধ্যায় তানভীর আর সুনেহরা পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরল।
দুজনের মনে একটাই অনুভূতি—
এত বছরের অপেক্ষা শেষ হয়েছে।
সেদিনের পর তানভীর আর সুনেহরার সম্পর্কটা যেন নতুন একটা অর্থ পেল।
এতদিন তারা একে অপরকে শুধু বন্ধু হিসেবে চিনেছিল। অথচ তাদের বন্ধুত্বের শুরু হয়েছিল আরও অনেক বছর আগে, যখন তারা দুজনেই প্রথম শ্রেণির ছোট্ট শিশু।
এখন তারা জানে—
তানভীরই সেই আয়ান।
সুনেহরাই সেই ইশা।
যে দুজনকে সময় আর দূরত্ব বছরের পর বছর আলাদা করে রেখেছিল।
তবে সত্যিটা জানার পরও তাদের মধ্যে আগের সেই বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি একটুও কমল না।
একদিন বিকেলে সুনেহরা তানভীরদের বাড়িতে এসে বলল,
—তোমার একটা কথা কিন্তু আমার এখনও মনে আছে।
তানভীর বই থেকে চোখ তুলে বলল,
—কোন কথা?
—ছোটবেলায় তুমি বলেছিলে, তোমার শিস শুধু আমার জন্য।
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হেসে বলল,
—আমি কি সত্যিই বলেছিলাম?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আজও সেটা সত্যি।
সুনেহরা অবাক হয়ে তাকাল।
তানভীর মৃদু শিস বাজাতে শুরু করল।
সুনেহরা চুপ করে শুনতে লাগল।
শৈশবের সেই একই সুর।
তবে এবার সেই সুরের অর্থ যেন অনেক গভীর।
সুনেহরা বলল,
—জানো, আমি এই সুরটা কতবার খুঁজেছি?
—আমি তো ভাবতাম, একদিন তুমি হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াবে।
—আমিও তাই ভাবতাম।
—কিন্তু আমরা বারবার একই জায়গায় গিয়েও একে অপরকে পাইনি।
সুনেহরা মৃদু হেসে বলল,
—তখন হয়তো আমাদের দেখা হওয়ার সময় হয়নি।
তানভীর বলল,
—এখন হয়েছে।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না।
এদিকে দুই পরিবারের মধ্যেও সুনেহরার সঙ্গে তানভীরের সম্পর্কটা নিয়ে আনন্দ তৈরি হলো।
তানভীরের মা তো ছোটবেলা থেকেই ইশার গল্প শুনেছিলেন।
তিনি বারবার বলছিলেন,
—আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না, এত বছর পর আমার ছেলের সেই ছোটবেলার বন্ধু আবার আমাদের বাড়িতে ফিরে এসেছে!
সুনেহরার মা-বাবাও যখন পুরো ঘটনা জানলেন, তারাও অবাক হয়ে গেলেন।
সুনেহরার মা বললেন,
—তুই এত বছর যে আয়ানের কথা বলতিস, সে-ই তানভীর?
সুনেহরা মাথা নেড়ে হেসে বলল,
—হ্যাঁ মা।
মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—তাই তো বলি, তোর ছোটবেলার গল্পগুলো শুনলে কেন যেন মনে হতো ছেলেটাকে আমি চিনি!
সুনেহরা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
কয়েকদিন পর তানভীর সুনেহরার বাড়িতে গেল।
দুই পরিবারের মধ্যে অনেক কথা হলো।
পুরোনো দিনের স্মৃতিও উঠে এলো।
তানভীরের মা বললেন,
—ওদের বন্ধুত্বটা ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম ছিল।
সুনেহরার বাবা হেসে বললেন,
—সুনেহরা তো আয়ানের কথা বলতে বলতে আমাদের বিরক্ত করে ফেলত।
তানভীর মজা করে বলল,
—তাই নাকি?
সুনেহরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—চুপ করো!
সবাই হেসে উঠল।
দিনের পর দিন তানভীর আর সুনেহরার বন্ধুত্ব আরও গভীর হতে লাগল।
তারা একসঙ্গে বাইরে যেত।
গল্প করত।
পুরোনো ছবি দেখত।
শৈশবের কথা মনে করে হাসত।
একদিন তারা আবার সেই পুরোনো শহরে গেল।
দুজন মিলে বাগানের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে সেই তেঁতুল গাছটার কাছে এসে দাঁড়াল।
সুনেহরা গাছটার গায়ে হাত রেখে বলল,
—এই গাছটা আমাদের সবকিছু জানে।
তানভীর হেসে বলল,
—এটাই আমাদের প্রথম দেখা দেখেছে।
—আর শেষ দেখাটাও।
—শেষ নয়। মাঝখানের সব অপেক্ষাও।
সুনেহরা চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তুমি জানো, তুমি চলে যাওয়ার পর আমি অনেকদিন এখানে এসে বসতাম।
তানভীর বলল,
—আমিও।
—কখনো কি মনে হয়েছে আমি আসব?
—প্রতিদিন।
সুনেহরা মৃদু হেসে বলল,
—আমারও।
তানভীর গাছটার নিচে বসে বলল,
—তখন আমরা এত ছোট ছিলাম। তবুও কীভাবে যেন তোমাকে এতটা মনে রেখেছিলাম!
সুনেহরা তার পাশে বসে বলল,
—কিছু মানুষকে মনে রাখার জন্য বয়স লাগে না।
তানভীর তার দিকে তাকাল।
—তুমি কি আমাকে সত্যিই কখনো ভুলোনি?
সুনেহরা মাথা নেড়ে বলল,
—না।
তারপর নিজের কবজির দিকে তাকাল।
ব্রেসলেটটা হারিয়ে গেছে।
তবুও সে বলল,
—তোমার দেওয়া নূপুরটা আমি এত বছর ধরে রেখেছিলাম। সেটা হারিয়ে যাওয়ার পরও আমি তোমার স্মৃতি হারাইনি।
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে তোমার জন্য নতুন একটা নূপুর কিনব।
সুনেহরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না।
—কেন?
—ওই নূপুরটার মতো আর কিছু হবে না।
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তাহলে এবার এমন একটা জিনিস দেব, যেটা আমাদের নতুন গল্পের স্মৃতি হবে।
সুনেহরা লজ্জায় হেসে ফেলল।
তানভীরের কথায় তার মনে অদ্ভুত একটা আনন্দ হলো।
এরপর একদিন তানভীর তার মায়ের সঙ্গে কথা বলছিল।
মা বললেন,
—তানভীর, একটা কথা বলব?
—বলো।
—সুনেহরাকে তোর কেমন লাগে?
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
—অনেক ভালো লাগে।
মা বললেন,
—শুধু বন্ধু হিসেবে?
তানভীর এবার আর উত্তর দিল না।
মা বুঝে গেলেন।
তিনি ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তাহলে নিজের মনের কথা বুঝতে শেখ।
অন্যদিকে সুনেহরার মা-ও মেয়েকে একই প্রশ্ন করলেন।
—তানভীরকে কেমন লাগে?
সুনেহরা লজ্জা পেয়ে বলল,
—ভালো।
—শুধু ভালো?
সুনেহরা চুপ করে রইল।
তার মা মৃদু হেসে বললেন,
—বুঝেছি।
কিছুদিন পর তানভীর সুনেহরাকে শহরের একটি সুন্দর জায়গায় নিয়ে গেল।
সেখানে বসে দুজন অনেকক্ষণ কথা বলল।
তানভীর বলল,
—আমাদের গল্পটা খুব অদ্ভুত, তাই না?
সুনেহরা বলল,
—হ্যাঁ।
—প্রথমে বন্ধু হলাম।
—তারপর হারিয়ে গেলাম।
—তারপর আবার দেখা হলো।
—আবার বন্ধুত্ব হলো।
—তারপর আবার হারিয়ে গেলাম।
সুনেহরা হেসে বলল,
—এবার কিন্তু আর হারাতে চাই না।
তানভীরও হেসে বলল,
—আমিও না।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর তানভীর বলল,
—সুনেহরা...
—হুম?
—আমাদের ছোটবেলার বন্ধুত্বটা কি এখনও আগের মতো আছে?
সুনেহরা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—আগের চেয়ে বেশি।
তানভীরের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
তবে দুজনেই এখনও নিজেদের অনুভূতিটাকে পুরোপুরি মুখে প্রকাশ করেনি।
তারা শুধু জানত—
এবার আর দূরে যেতে চায় না।
একদিন তানভীরের বাবা-মা আনুষ্ঠানিকভাবে সুনেহরার পরিবারের সঙ্গে কথা বললেন।
দুই পরিবারই বিষয়টাকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করল।
তানভীরের মা সুনেহরাকে বললেন,
—তুমি তো অনেক আগেই আমাদের পরিবারের একজন হয়ে গেছ মা।
সুনেহরার চোখে পানি এসে গেল।
সে মৃদু হেসে বলল,
—আমারও তাই মনে হয়।
বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল।
তানভীর আর সুনেহরা আবার সেই পুরোনো শহরে গেল।
তেঁতুল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে তানভীর বলল,
—আমাদের গল্প এখান থেকে শুরু হয়েছিল।
সুনেহরা বলল,
—আর এখানেই একদিন আমাদের আবার দেখা হয়েছিল।
তানভীর মৃদু শিস বাজাল।
সুনেহরা হাসতে হাসতে বলল,
—এই সুরটা আর কখনো বদলাবে না, তাই তো?
তানভীর বলল,
—না।
তারপর দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।
তাদের সামনে এখন নতুন জীবন।
আর পেছনে রয়ে গেল দীর্ঘ অপেক্ষার এক অসম্ভব সুন্দর গল্প।
শুধু একটা কাজ এখনও বাকি।
যে বন্ধুত্ব একদিন তেঁতুল গাছের নিচে শুরু হয়েছিল, তাকে এবার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কে পরিণত করা।
বিয়ের দিন যতই এগিয়ে আসছিল, ততই দুই পরিবারে আনন্দের আমেজ বাড়ছিল।
তানভীর আর সুনেহরার বিয়েটা শুধু দুইজন মানুষের নতুন জীবনের শুরু ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দুই পরিবারের বহু বছরের স্মৃতি, অপেক্ষা আর এক অসম্ভব সুন্দর গল্প।
সুনেহরা নিজের ঘরে বসে বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তার মা এসে পাশে বসে বললেন,
—কী ভাবছিস?
সুনেহরা মৃদু হেসে বলল,
—ছোটবেলার কথা।
—আয়ানের কথা?
সুনেহরা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।
—হুম।
মা হেসে বললেন,
—তুই ছোটবেলায় যে ছেলেটার কথা বলতে বলতে আমাদের কান ঝালাপালা করে ফেলতিস, শেষ পর্যন্ত সেই ছেলেটাই তোর জীবনে ফিরে এলো।
সুনেহরা হেসে বলল,
—আমি তখন জানতাম না, ও এত কাছে থেকেও আমার থেকে এত দূরে থাকবে।
মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—কিছু সম্পর্ককে সময় একটু পরীক্ষা করে নেয়।
সুনেহরা চুপ করে রইল।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই পুরোনো বাগান।
একটা ছোট্ট ছেলে।
তার মিষ্টি শিস।
আর তার পায়ে ঝংকার তোলা ছোট্ট নূপুর।
অন্যদিকে তানভীরও নিজের ঘরে বসে ছিল।
তার মা এসে বললেন,
—কী রে, এত চুপচাপ কেন?
তানভীর হেসে বলল,
—ভাবছি।
—কী?
—কত বছর আগে একটা ছোট্ট মেয়েকে হারিয়েছিলাম।
মা বললেন,
—আর আজ সেই মেয়েটাই তোর পাশে।
তানভীর জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—জীবন সত্যিই অদ্ভুত।
বিয়ের আগের দিন তানভীর আবার একবার পুরোনো শহরে গেল।
সে একা সেই বাগানের দিকে হাঁটতে লাগল।
সন্ধ্যার আলোয় তেঁতুল গাছটা আগের চেয়েও বিশাল মনে হচ্ছিল।
তানভীর গাছটার নিচে গিয়ে বসে পড়ল।
তার মনে পড়ল প্রথম দিনের কথা।
সেদিন বল খুঁজতে এসে সে শিস বাজাচ্ছিল।
আর হঠাৎ একটা ছোট্ট মেয়ে এসে বলেছিল,
—তুমি তো অনেক সুন্দর শিস বাজাও!
তানভীর হেসে ফেলল।
তারপর ধীরে ধীরে শিস বাজাতে শুরু করল।
সেই একই সুর।
আজও সুরটা বদলায়নি।
কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল,
—তুমি এখনও একইভাবে শিস বাজাও?
তানভীর ঘুরে তাকাল।
সুনেহরা দাঁড়িয়ে আছে।
তানভীর অবাক হয়ে বলল,
—তুমি এখানে?
—তুমি একা এখানে আসবে আর আমি জানব না?
তানভীর হেসে বলল,
—কীভাবে জানলে?
—তোমার মা বলেছে।
সুনেহরা ধীরে ধীরে তার পাশে এসে বসল।
কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে রইল।
তারপর সুনেহরা বলল,
—কাল আমাদের বিয়ে।
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—বিশ্বাস হচ্ছে?
—না।
সুনেহরা হেসে বলল,
—আমারও না।
তানভীর বলল,
—ভাবতে পারো? প্রথম শ্রেণিতে যখন তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তখন যদি কেউ বলত একদিন তোমাকে বিয়ে করব, তুমি বিশ্বাস করতে?
সুনেহরা হেসে বলল,
—আমি তো তখন বিয়েই কী বুঝতাম না!
দুজনেই হেসে উঠল।
হাসির পর আবার নীরবতা।
সুনেহরা গাছটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এই জায়গাটাকে আমি কখনো ভুলিনি।
—আমিও না।
—তুমি চলে যাওয়ার পর আমি কতবার এখানে এসেছি জানো?
—আমিও এসেছি।
—কখনো কখনো মনে হতো, তুমি হয়তো ঠিক এই জায়গায় বসে আছ।
তানভীর বলল,
—আমারও তাই মনে হতো।
সুনেহরা মৃদু হাসল।
তারপর বলল,
—আমাদের দুজনের এত কাছাকাছি থেকেও এত বছর দেখা হয়নি।
তানভীর বলল,
—হয়তো আমাদের গল্পটা একটু দেরিতে শুরু হওয়ার ছিল।
সুনেহরা বলল,
—কিন্তু এবার যেন আর শেষ না হয়।
তানভীর শান্ত গলায় বলল,
—শেষ হবে না।
পরদিন সকাল।
দুই বাড়িতেই ব্যস্ততা।
বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন।
অতিথিরা আসতে শুরু করেছে।
সুনেহরা বিয়ের পোশাকে সেজে বসে আছে।
তার মুখে লাজুক হাসি।
হাতের গয়নার দিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ তার মনে হলো, যদি আজও তার সেই পুরোনো ব্রেসলেটটা থাকত!
কিন্তু সেটি হারিয়ে গেছে।
তারপর মনে হলো—
ব্রেসলেট হারিয়েছে, কিন্তু স্মৃতিটা তো হারায়নি।
অন্যদিকে তানভীরও বিয়ের পোশাকে প্রস্তুত।
তার বন্ধুরা তাকে ঘিরে মজা করছে।
—কী রে, আজ এত চুপ কেন?
তানভীর হেসে বলল,
—ভাবছি, আমার ছোটবেলার বন্ধু আজ আমার স্ত্রী হতে যাচ্ছে।
বন্ধুরা বলল,
—এমন গল্প তো সিনেমাতেও হয় না!
তানভীর মৃদু হেসে বলল,
—আমাদের জীবনে হয়েছে।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।
দুই পরিবার আনন্দে ভরে উঠল।
একসময় তানভীর আর সুনেহরা একে অপরের সামনে বসে।
দুজনের চোখে চোখ পড়তেই সুনেহরা মৃদু হেসে ফেলল।
তানভীরও হাসল।
সেই হাসির মধ্যে ছিল শৈশবের পরিচয়, বিচ্ছেদের কষ্ট আর বহু বছরের অপেক্ষার পূর্ণতা।
বিয়ের পর যখন তারা পাশাপাশি বসে ছিল, সুনেহরা আস্তে করে বলল,
—আয়ান।
তানভীর তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
—হুম, ইশা?
দুজনেই হেসে ফেলল।
এই দুটি নাম এখন আর কেবল শৈশবের স্মৃতি নয়।
এগুলো তাদের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় পরিচয়।
রাতে তানভীর সুনেহরাকে বলল,
—একটা কথা বলব?
—বলো।
—তোমার জন্য একটা জিনিস আছে।
সে পকেট থেকে ছোট্ট একটা বাক্স বের করল।
সুনেহরা অবাক হয়ে বলল,
—এটা কী?
বাক্স খুলতেই ভেতরে একটি সুন্দর নূপুর।
সুনেহরার চোখে পানি চলে এল।
তানভীর বলল,
—এটা আগেরটার মতো নয়। এটা নতুন। কিন্তু এর সঙ্গে একটা কথা জড়িয়ে আছে।
—কী কথা?
—প্রথম নূপুরটা দিয়েছিলাম আমার ছোট্ট বন্ধু ইশাকে। আর এটা দিচ্ছি আমার জীবনের সঙ্গী সুনেহরাকে।
সুনেহরা চোখের পানি মুছে মৃদু হেসে বলল,
—এবার কিন্তু এটা হারাতে দেব না।
তানভীর হেসে বলল,
—এবার হারানোর সুযোগই দেব না।
সুনেহরা নূপুরটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—জানো, এত বছর আমি ভাবতাম আমাদের গল্পটা অসম্পূর্ণ।
—এখন?
—এখন মনে হচ্ছে, গল্পটা কখনো অসম্পূর্ণ ছিল না। শুধু শেষ অধ্যায়টা লেখা বাকি ছিল।
তানভীর তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—আর সেই অধ্যায়টা আজ লেখা হয়ে গেল।
সুনেহরা মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
কিছুদিন পর তারা আবার সেই পুরোনো শহরে গেল।
সঙ্গে ছিল তাদের দুই পরিবার।
সবাই মিলে সেই তেঁতুল গাছটার নিচে দাঁড়াল।
তানভীরের মা বললেন,
—এই গাছটার নিচেই তোদের গল্প শুরু হয়েছিল?
সুনেহরা হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
তানভীর বলল,
—আর এখানেই আমরা একে অপরকে আবার খুঁজে পেয়েছিলাম।
সুনেহরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এই জায়গাটা আমাদের জন্য সবসময় বিশেষ থাকবে।
তানভীর মৃদু শিস বাজাল।
সুনেহরা চোখ বন্ধ করে সেই সুর শুনল।
একই সুর।
একই মানুষ।
কিন্তু সময় বদলে দিয়েছে তাদের।
ছোট্ট আয়ান আর ছোট্ট ইশা আজ তানভীর আর সুনেহরা।
তবুও তাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটা বদলায়নি—
একজনের শিস শুনলে অন্যজন আজও ফিরে তাকায়।
তেঁতুল গাছের পাতাগুলো বাতাসে দুলছিল।
পাশ থেকে ভেসে আসছিল নূপুরের মিষ্টি ঝংকার।
তানভীর আর সুনেহরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল।
তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে।
শৈশবের সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্ব আজ জীবনের সঙ্গীতে পরিণত হয়েছে।
আর সেই মিষ্টি শিসের সুর যেন বলে গেল—
কিছু মানুষ যত দূরেই হারিয়ে যাক, সত্যিকারের টান থাকলে একদিন না একদিন তারা ঠিকই ফিরে আসে।
....