শৈশবের বন্ধু অবশেষে স্বামী

রাফিদের বাড়ি আর তৃষাদের বাড়ি পাশাপাশি। মাঝখানে শুধু একটা ছোট দেয়াল। দুই পরিবারের সম্পর্ক এতটাই ভালো যে, এক বাড়ির মানুষকে অন্য বাড়ির মানুষ আলাদা করে ভাবতই না।

রাফির বয়স যখন মাত্র সাত বছর, তখনই তৃষা জন্ম নেয়।

তৃষা জন্মানোর খবর শুনে রাফি যেন আর স্থির থাকতে পারছিল না। মায়ের হাত ধরে দৌড়ে পাশের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলো।

—আন্টি! তৃষা কোথায়?

তৃষার মা হেসে বললেন,

—এই তো, ঘুমাচ্ছে। আস্তে কথা বলো।

রাফি পা টিপে টিপে খাটের কাছে গেল। ছোট্ট তৃষা তখন কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় ঘুমিয়ে আছে।

রাফি মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

—এত ছোট কেন?

পাশ থেকে সবাই হেসে উঠল।

রাফি আবার বলল,

—আমি কোলে নেব।

—তুমি তো নিজেই ছোট! —তৃষার মা হাসতে হাসতে বললেন।

কিন্তু রাফি নাছোড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত বড়দের সাহায্যে তৃষাকে তার কোলে তুলে দেওয়া হলো।

রাফি খুব সাবধানে তৃষাকে ধরে বসে রইল।

তারপর গম্ভীর মুখে বলল,

—এটা আমার বোন।

তৃষার মা হেসে বললেন,

—বোন না, তোমার বন্ধু।

রাফি মাথা নেড়ে বলল,

—হুম। তবে আমার কথাই শুনবে।

কেউ তখন বুঝতে পারেনি, এই ছোট্ট কথাটাই একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কের গল্প হয়ে উঠবে।

সময় নিজের গতিতে এগিয়ে চলল।

তৃষা একটু একটু করে বড় হতে লাগল। রাফিও বড় হলো। দুজনের বয়সের পার্থক্য থাকলেও তাদের বন্ধুত্বে কখনো তার প্রভাব পড়েনি।

তৃষা হাঁটতে শেখার পর থেকেই রাফির পেছন পেছন ঘুরত। আর রাফি সুযোগ পেলেই তাকে নিয়ে দুষ্টুমি করত।

কখনো তৃষার পুতুল লুকিয়ে রাখত।

কখনো তার চুলের ফিতা নিয়ে পালিয়ে যেত।

আবার কখনো তৃষা পড়তে বসলে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে তাকে হাসানোর চেষ্টা করত।

তৃষা রেগে গিয়ে বলত,

—রাফি! তুই একদম অসহ্য!

রাফি দূরে দাঁড়িয়ে হাসত।

—তুই রাগলে তোকে আরও সুন্দর লাগে।

—আমি তোর সঙ্গে কথা বলব না।

—ঠিক আছে। পাঁচ মিনিট পর নিজেই এসে কথা বলবি।

আর সত্যিই পাঁচ মিনিট পর তৃষাই এসে বলত,

—রাফি, আমার ফিতাটা দে।

রাফি হেসে বলত,

—আগে বল, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো ছেলে।

—তুই পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর ছেলে।

—তাহলে ফিতা পাবি না।

—রাফি!

এইভাবেই তাদের দিন কাটত।

তৃষা যখন স্কুলে উঠল, তখন তার কয়েকজন নতুন বান্ধবী হলো। তাদের মধ্যে মিষ্টি ছিল সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

রাফির অবশ্য মিষ্টিকে দেখলেই দুষ্টুমি করার নতুন সুযোগ তৈরি হতো।

একদিন তৃষা আর মিষ্টি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। রাফি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মিষ্টির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চোখ টিপে দিল।

মিষ্টি অবাক।

তৃষা সঙ্গে সঙ্গে রাফির দিকে তাকাল।

—এই! কী করলি?

রাফি নির্দোষ মুখ করে বলল,

—কী করেছি?

—মিষ্টিকে চোখ মারলি কেন?

—ওকে তো শুধু সালাম দিলাম।

—চোখ মেরে কেউ সালাম দেয়?

রাফি হেসে বলল,

—আমার সালাম দেওয়ার স্টাইল আলাদা।

মিষ্টি হাসতে লাগল।

তৃষা রেগে গিয়ে বলল,

—মিষ্টি, তুই হাসছিস কেন?

মিষ্টি বলল,

—তোদের দুজনকে দেখলে হাসি পায়।

রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—শোন মিষ্টি, তুই চাইলে তোকে আমি প্রতিদিন চোখ মারতে পারি।

তৃষা এবার রেগে রাফির হাতে একটা হালকা চড় দিল।

—চুপ কর!

রাফি হেসে বলল,

—আহা! তুই এত রাগ করিস কেন? তোর কি জেলাসি হয়?

তৃষা চোখ বড় বড় করে তাকাল।

—জেলাসি? তোর জন্য? স্বপ্ন দেখিস!

রাফি আবার হাসল।

—ঠিক আছে, ঠিক আছে। কিন্তু তুই রাগলে দেখতে মজা লাগে।

তৃষা মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল।

মিষ্টি রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই কিন্তু তৃষাকে খুব জ্বালাস।

রাফি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

—ওকে না জ্বালালে আমার দিনই ভালো যায় না।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুষ্টুমিও বাড়তে লাগল।

তারা তিনজন—রাফি, তৃষা আর মিষ্টি—প্রায় সবসময় একসঙ্গে ঘুরত।

কখনো বিকেলে মাঠে বসে গল্প।

কখনো নদীর ধারে হাঁটাহাঁটি।

কখনো বাজারে গিয়ে ফুচকা খাওয়া।

আবার কখনো সামান্য বিষয় নিয়েই রাফি আর তৃষার মধ্যে ঝগড়া।

একদিন ফুচকার দোকানে তৃষা বলল,

—আমার ফুচকায় বেশি ঝাল দিস না।

রাফি দোকানদারকে ফিসফিস করে বলল,

—ওরটায় একটু বেশি ঝাল দেন।

তৃষা প্রথম ফুচকা মুখে দিয়েই কাশতে শুরু করল।

—রাফি!

রাফি হাসতে হাসতে দূরে সরে গেল।

—আমি কিছু করিনি!

তৃষা পানি খেতে খেতে বলল,

—আজ তোকে ছাড়ব না!

রাফি দৌড় দিল।

তৃষাও তার পেছনে দৌড়াতে লাগল।

মিষ্টি পাশে দাঁড়িয়ে হেসেই চলল।

তাদের এই ছোট ছোট ঝগড়া, হাসি আর দুষ্টুমিতেই কেটে যাচ্ছিল শৈশব।

কেউ বুঝতে পারছিল না, সময় তাদের বন্ধুত্বের ভেতর অদৃশ্যভাবে অন্যরকম একটা অনুভূতির বীজও বুনে দিচ্ছে।

তবে রাফি আর তৃষা তখনও সেটা বুঝতে শেখেনি।

তাদের কাছে তারা শুধু দুই পাশের বাড়ির মানুষ।

শৈশবের বন্ধু।

আর একে অপরের সবচেয়ে বড় বিরক্তির কারণ।

সময় যেন চোখের পলকেই চলে যাচ্ছিল।

ছোট্ট তৃষা আর আগের মতো ছোট নেই। রাফিও এখন বেশ বড় হয়েছে। কিন্তু বয়স বাড়লেও তাদের সম্পর্কের একটা জিনিস বদলায়নি—দুজনের ঝগড়া আর দুষ্টুমি।

বরং আগের চেয়ে আরও বেড়েছে।

তৃষা রাফিকে দেখলেই বুঝতে পারত, আজ আবার নিশ্চয়ই কোনো না কোনো দুষ্টুমি করবে।

একদিন বিকেলে তৃষা আর মিষ্টি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। রাফি দূর থেকে তাদের দেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

মিষ্টি রাফিকে দেখে বলল,

—এই যে, আজ আবার কী পরিকল্পনা করছিস?

রাফি ভ্রু নাচিয়ে বলল,

—কিছু না। তোমাদের সঙ্গে একটু গল্প করতে এলাম।

তৃষা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—তুই গল্প করতে আসিস না। ঝামেলা করতে আসিস।

রাফি হেসে বলল,

—আমার সম্পর্কে তোর ধারণা এত ভালো!

—খুব ভালো করেই জানি তোকে।

রাফি মিষ্টির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলল,

—মিষ্টি, তুই কিন্তু দিন দিন সুন্দর হচ্ছিস।

মিষ্টি হেসে ফেলল।

তৃষা সঙ্গে সঙ্গে বিরক্ত হয়ে বলল,

—আবার শুরু করলি?

রাফি বলল,

—কী শুরু করলাম?

—আমার বান্ধবীকে জ্বালানো।

—আরে, প্রশংসা করলাম।

—তুই চুপ কর।

রাফি এবার মিষ্টির দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,

—মিষ্টি, তুই চাইলে আমি তোকে আজই—

তৃষা মাঝখান থেকে বলে উঠল,

—কিছু বলবি না!

রাফি হেসে ফেলল।

—তুই এত ভয় পাচ্ছিস কেন?

—আমি ভয় পাচ্ছি না।

—তাহলে বাধা দিচ্ছিস কেন?

তৃষা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।

মিষ্টি দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

—তোদের দুজনের ব্যাপারটাই আলাদা।

তৃষা বলল,

—কী আলাদা?

মিষ্টি উত্তর না দিয়ে শুধু হাসল।

সেদিন সন্ধ্যায় তৃষা রাফির বাড়িতে গেল।

রাফি তখন ছাদে বসে মোবাইল দেখছিল।

তৃষা গিয়ে বলল,

—এই, আমার কলমটা কোথায়?

রাফি চোখ না তুলেই বলল,

—কোন কলম?

—কালকে তোর কাছে দিয়েছিলাম।

—আমি তো অনেক কলম দেখি।

—আমার নীল কলমটা।

রাফি এবার পকেট থেকে একটা কলম বের করে বলল,

—এটা?

তৃষা ছোঁ মেরে কলমটা নিয়ে নিল।

—হ্যাঁ।

তারপর সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল,

—তুই আমার জিনিসপত্র নিয়ে এত দুষ্টুমি করিস কেন?

রাফি মুচকি হেসে বলল,

—তোর জিনিস চুরি করতে ভালো লাগে।

—কেন?

—কারণ তুই সেটা নিতে এসে আমার সঙ্গে ঝগড়া করিস।

তৃষা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

—তুই সত্যিই পাগল।

রাফি হেসে বলল,

—এই কথাটা তুই ছোটবেলা থেকেই বলিস।

—কারণ তুই ছোটবেলা থেকেই পাগল।

দুজনেই হেসে ফেলল।

তবে এই হাসি-দুষ্টুমির মাঝেও তৃষার জীবনে ধীরে ধীরে নতুন কিছু ঘটতে শুরু করল।

তৃষার কলেজে নতুন একজন ছেলে ভর্তি হলো। নাম সায়েম।

সায়েম বেশ ভদ্রভাবে কথা বলত। তৃষার সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর সেই বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে অন্যরকম হয়ে গেল।

তৃষা কাউকে কিছু জানায়নি।

রাফিককেও না।

কিন্তু রাফি কিছু একটা বুঝতে পারছিল।

তৃষা আগের মতো আর সবসময় তাদের সঙ্গে ঘুরতে বের হতো না। মোবাইল হাতে নিয়ে প্রায়ই চুপচাপ থাকত। কখনো হেসে মেসেজ করত।

একদিন রাফি হঠাৎ তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

—কার সঙ্গে এত কথা বলিস?

তৃষা চমকে মোবাইলটা সরিয়ে নিল।

—কারও সঙ্গে না।

—মিথ্যা বলিস না।

—তোর এত জানার দরকার কী?

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আমি তোকে সাবধান করছি, তৃষা।

তৃষা বিরক্ত হয়ে বলল,

—কিসের জন্য?

—সবাইকে বিশ্বাস করিস না।

—সায়েমকে আমি বিশ্বাস করি।

রাফি অবাক হয়ে তাকাল।

—সায়েম?

তৃষা বুঝতে পারল, মুখ ফসকে নামটা বের হয়ে গেছে।

রাফি ধীরে ধীরে বলল,

—ওর সঙ্গে তোর সম্পর্ক কী?

তৃষা চুপ।

রাফি আবার বলল,

—বল।

তৃষা এবার বিরক্ত হয়ে বলল,

—আমি ওকে পছন্দ করি।

কথাটা শুনে রাফি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে গেল।

তারপর জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল,

—ওহ! তাই নাকি?

—হ্যাঁ।

—ভালো।

তৃষা অবাক হয়ে বলল,

—ভালো?

—হ্যাঁ। তোর জীবন, তুই যাকে পছন্দ করবি কর।

তৃষা রাফির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই রাগ করিসনি?

রাফি মাথা নেড়ে বলল,

—রাগ করার আমি কে?

তৃষা আর কিছু বলল না।

কিন্তু রাফি সেদিন রাতে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

বারবার তৃষার কথাটা মনে পড়ছিল।

“আমি ওকে পছন্দ করি।”

কেন জানি কথাটা তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শূন্যতা তৈরি করেছিল।

রাফি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ির দিকে তাকাল।

তৃষাদের ঘরের আলো জ্বলছিল।

সে ধীরে ধীরে বলল,

—পাগলি...

তারপর নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

কয়েকদিন পর রাফি আবার তৃষাকে বলল,

—ওই ছেলেটার সঙ্গে বেশি ঘোরাঘুরি করিস না।

তৃষা বিরক্ত হয়ে বলল,

—তুই কেন বারবার ওর কথা বলিস?

—কারণ আমি জানি, সবকিছু এত সহজ না।

—তুই ওকে চেনিসও না।

—চিনি না। তাই বলছি সাবধানে থাক।

তৃষা রেগে বলল,

—তুই আমাকে সবসময় ছোট ভাবিস কেন?

—কারণ তুই অনেক সময় বুদ্ধি দিয়ে কাজ করিস না।

—আমার বুদ্ধি আছে।

—প্রমাণ কর।

—কীভাবে?

রাফি মুচকি হেসে বলল,

—আমার কথা একবার শুনে।

তৃষা মুখ ঘুরিয়ে বলল,

—শুনব না।

রাফি বলল,

—ঠিক আছে। পরে যেন বলিস না, আমি তোকে সাবধান করিনি।

তৃষা কোনো উত্তর দিল না।

কিন্তু রাফির কথাগুলো তার মনে রয়ে গেল।

তবুও সায়েমের প্রতি তার বিশ্বাস কমল না।

বরং দিন দিন সে আরও বেশি জড়িয়ে পড়তে লাগল।

তৃষার আচরণ দিন দিন বদলে যাচ্ছিল।

আগের মতো সে রাফি আর মিষ্টির সঙ্গে নিয়ম করে বাইরে বের হতো না। সারাক্ষণ মোবাইল হাতে থাকত। কখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুপচাপ কথা বলত, আবার কখনো হঠাৎ করে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিত।

রাফি বিষয়টা লক্ষ্য করছিল।

কিন্তু সে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করত না।

একদিন বিকেলে রাফি ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ পাশের বাড়ির ছাদে তৃষাকে দেখা গেল।

রাফি ডাক দিল,

—এই পাগলি!

তৃষা তাকিয়ে বলল,

—কী?

—এদিকে আয়।

—কেন?

—কথা আছে।

তৃষা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে তারপর পাশের ছাদ থেকে রাফিদের ছাদে চলে এল।

রাফি বলল,

—তুই আমাকে কিছু লুকাচ্ছিস?

তৃষা অবাক হয়ে বলল,

—কী লুকাব?

—জানি না। কিন্তু কিছু একটা আছে।

তৃষা মুখ ঘুরিয়ে বলল,

—কিছু নেই।

রাফি শান্ত গলায় বলল,

—তৃষা, আমি তোকে ছোটবেলা থেকে চিনি। তুই মিথ্যা বললে বুঝতে পারি।

তৃষা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমি সায়েমকে বিয়ে করতে চাই।

রাফি যেন কথাটা শুনে থমকে গেল।

—কী?

—হ্যাঁ।

—তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?

—কেন?

—তোদের সম্পর্কের কথা তোর বাবা জানে?

তৃষা মাথা নাড়ল।

—না।

—তাহলে?

—বাবা জানলে কখনো রাজি হবে না।

রাফি এবার আরও গম্ভীর হলো।

—তাহলে আগে পরিবারকে বল। সবকিছু ঠিকভাবে কর।

তৃষা চোখ নামিয়ে বলল,

—ওরা রাজি হবে না।

—তার মানে?

তৃষা কোনো উত্তর দিল না।

রাফি বুঝতে পারল, তৃষার মাথায় ভয়ংকর কোনো সিদ্ধান্ত ঘুরছে।

সে শক্ত গলায় বলল,

—তুই কোথাও পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিস?

তৃষা চমকে তাকাল।

—না!

রাফি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমাকে মিথ্যা বলিস না।

তৃষা এবার চুপ করে গেল।

রাফির বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।

—তৃষা, কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিস না। তুই যা-ই করিস, আগে আমাকে বলবি।

তৃষা ধীরে বলল,

—সবকিছু তোর সঙ্গে বলে করতে হবে নাকি?

রাফি একটু কষ্ট পেলেও বলল,

—হ্যাঁ। অন্তত এই ব্যাপারে।

তৃষা কিছু না বলে চলে গেল।

সেদিন রাতে তৃষা অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

সায়েম তাকে বারবার বলছিল, তারা যদি একসঙ্গে চলে যায়, তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

তৃষাও ধীরে ধীরে সেই কথায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল।

পরদিন সায়েম তাকে বলল,

—তুমি যদি সত্যিই আমাকে বিশ্বাস করো, তাহলে আমার সঙ্গে চলে এসো।

তৃষা ভয় পেয়ে বলল,

—কোথায় যাব?

—অন্য শহরে। তারপর আমরা নিজেদের মতো জীবন শুরু করব।

তৃষা চুপ করে রইল।

সায়েম আবার বলল,

—তোমার কাছে কিছু টাকা-পয়সা থাকলে নিয়ে এসো। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও।

তৃষা শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল।

তার মাথায় তখন শুধু একটাই চিন্তা—সায়েমকে হারাবে না।

সে বুঝতে পারল না, মানুষকে বিশ্বাস করার আগে তাকে চিনে নেওয়াটাও জরুরি।

পরদিন ভোরে তৃষা চুপিচুপি ঘর থেকে বের হলো।

সঙ্গে ছিল কিছু টাকা, কয়েকটি গয়না আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

বাড়ির সবাই তখন ঘুমিয়ে।

তৃষা শেষবারের মতো নিজের ঘরের দিকে তাকাল।

মনে হলো, সে হয়তো আর কখনো এই ঘরে ফিরবে না।

তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।

স্টেশনে গিয়ে সায়েমের সঙ্গে দেখা হলো।

তৃষা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—আমি চলে এসেছি।

সায়েম চারপাশে তাকিয়ে বলল,

—তোমার কাছে যা ছিল সব এনেছ?

তৃষা মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

সায়েম হঠাৎ বলল,

—তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি টিকিট নিয়ে আসছি।

তৃষা তার ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস করে দাঁড়িয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

সায়েম ফিরে এসে তৃষার কাছ থেকে ব্যাগ আর গয়নাগুলো নেওয়ার কথা বলল।

—এগুলো আমি রাখি। তুমি ট্রেনে উঠতে সুবিধা হবে।

তৃষা কোনো সন্দেহ না করে সব তার হাতে দিয়ে দিল।

ঠিক তখনই ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।

সায়েম ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল,

—তুমি এখানে দাঁড়াও, আমি আগে উঠে জায়গা দেখি।

বলেই সে দৌড়ে ট্রেনে উঠে গেল।

তৃষা পেছন থেকে বলল,

—সায়েম!

কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিল।

তৃষা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখের সামনে সায়েম চলে গেল।

আর সঙ্গে নিয়ে গেল তার টাকা, গয়না আর সবকিছু।

তৃষা বুঝতে পারল, সে প্রতারিত হয়েছে।

ঠিক তখনই স্টেশনের অন্য পাশে রাফিকে দেখা গেল।

রাফি হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে আসছিল।

সকালে তৃষার ঘর খালি দেখে তার সন্দেহ হয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সে জানতে পারে তৃষা স্টেশনে এসেছে।

দূর থেকে সে তৃষাকে দেখে চিৎকার করল,

—তৃষা!

তৃষা ফিরে তাকাল।

রাফি দৌড়ে তার কাছে এসে বলল,

—সায়েম কোথায়?

তৃষা কাঁদতে কাঁদতে ট্রেনের দিকে আঙুল দেখাল।

—ও... সব নিয়ে চলে গেছে।

রাফি সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনের দিকে দৌড় দিল।

কিন্তু ততক্ষণে ট্রেন অনেকটা দূরে চলে গেছে।

রাফি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে এল।

তার মুখে রাগ, কষ্ট আর হতাশা।

তৃষার সামনে এসে সে কঠিন গলায় বলল,

—এই জন্যই তোকে নিষেধ করেছিলাম!

তৃষা মাথা নিচু করে কাঁদছিল।

রাফি বলল,

—ওই পাগলি, এসব কেউ করে? আমি তোকে নষ্ট হতে মানা করেছিলাম। তোর মাথায় বুদ্ধি-সুদ্ধি কিছুই নেই?

তৃষা কান্নাভেজা গলায় বলল,

—আমি বুঝতে পারিনি...

রাফির রাগ কিছুটা নরম হয়ে গেল।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—চল। বাড়িতে চল। তোর বাবা-মা তোকে নিয়ে পাগলের মতো চিন্তা করছে।

তৃষা ধীরে ধীরে রাফির সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর রাফি বলল,

—আর কখনো এমন কিছু করার আগে আমাকে বলবি।

তৃষা চোখ মুছে মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

রাফি আর কিছু বলল না।

কিন্তু তার মনে তখন একটাই কথা ঘুরছিল—

এই মেয়েটা যতই তাকে রাগিয়ে দিক, যতই দুষ্টুমি করুক, তৃষার বিপদে সে কখনো তাকে একা ছেড়ে যেতে পারবে না।

রাফি আর তৃষা যখন বাড়িতে ফিরল, তখন দুই বাড়িতেই কান্নাকাটি আর দুশ্চিন্তার পরিবেশ।

তৃষার বাবা মেয়েকে দেখেই ছুটে এলেন।

—তৃষা!

তৃষা বাবার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে রইল।

তার চোখ দিয়ে তখনও পানি পড়ছে।

বাবা কাঁপা গলায় বললেন,

—কোথায় গিয়েছিলি মা? আমরা কত চিন্তা করেছি জানিস?

তৃষা কোনো উত্তর দিতে পারল না।

শুধু বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।

রাফি একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল।

তৃষার বাবা রাফির দিকে তাকিয়ে বললেন,

—বাবা, তুই না থাকলে আজ কী হতো জানি না। তুই ওকে খুঁজে বের করে নিয়ে এসেছিস।

রাফি মাথা নিচু করে বলল,

—আমি তো শুধু আমার বন্ধুর জন্য গিয়েছিলাম, আঙ্কেল।

তৃষার বাবা রাফির কাঁধে হাত রেখে বললেন,

—তুই শুধু বন্ধু না, তুই আমার ছেলের মতো।

রাফি কিছু বলল না।

কিন্তু কথাটা শুনে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।

সেদিন রাতে তৃষা নিজের ঘরে একা বসে ছিল।

ঘটনাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।

সায়েমকে সে কতটা বিশ্বাস করেছিল!

আর রাফি?

যে ছেলেটাকে সে সারাজীবন শুধু দুষ্টু, বিরক্তিকর আর ঝগড়াটে বলে মনে করেছে, সেই রাফিই তাকে খুঁজতে ছুটে গিয়েছিল।

রাফিই তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে এনেছে।

তৃষা নিজের অজান্তেই জানালার বাইরে তাকাল।

পাশের বাড়ির বারান্দায় রাফি দাঁড়িয়ে ছিল।

তাদের চোখাচোখি হলো।

রাফি কিছু না বলে মুখ ফিরিয়ে নিল।

তৃষার বুকটা কেমন যেন করে উঠল।

পরদিন সকালে তৃষা রাফির বাড়িতে গেল।

রাফি উঠানে বসে চা খাচ্ছিল।

তৃষাকে দেখে বলল,

—কী চাই?

তৃষা ধীরে বলল,

—তোর সঙ্গে কথা আছে।

রাফি চায়ের কাপ নামিয়ে বলল,

—বল।

—কালকের জন্য...

রাফি বাধা দিয়ে বলল,

—কোনো ধন্যবাদ দিতে হবে না।

—আমি ধন্যবাদ দিতে আসিনি।

—তাহলে?

তৃষা একটু চুপ থেকে বলল,

—তুই আমার ওপর খুব রাগ করেছিলি।

রাফি বলল,

—করব না?

—করেছিস।

—হ্যাঁ।

—কিন্তু আমাকে একবারও একা রেখে যাসনি।

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু। তোকে বিপদে ফেলে আমি কীভাবে চলে যাই?

তৃষা ধীরে বলল,

—শুধু বন্ধু?

রাফি তাকাল।

—কী?

তৃষা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল।

—কিছু না।

রাফি হেসে বলল,

—তুই আবার কী ভাবছিস?

তৃষা বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল,

—কিছুই ভাবছি না।

—তুই মিথ্যা বলছিস।

—চুপ কর।

রাফি হেসে উঠল।

অনেকদিন পর তৃষার মুখেও হালকা হাসি ফুটল।

কয়েকদিন পর আবার তাদের পুরোনো দুষ্টুমি শুরু হলো।

তবে আগের মতো নয়।

রাফি আগের মতো তৃষাকে বেশি জ্বালাত না। বরং একটু দূরত্ব রেখে চলত।

তৃষাই সেটা বেশি অনুভব করতে লাগল।

একদিন মিষ্টি এসে বলল,

—রাফি আজকাল তোকে আর আগের মতো জ্বালায় না কেন?

তৃষা বলল,

—জানি না।

মিষ্টি মুচকি হেসে বলল,

—তুই কি সেটা মিস করিস?

তৃষা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—একদম না!

মিষ্টি হাসল।

—মুখে না বললেও চোখে সব লেখা আছে।

তৃষা লজ্জা পেয়ে বলল,

—চুপ কর।

মিষ্টি আর কিছু বলল না।

সেদিন বিকেলে তিনজন নদীর ধারে গেল।

মিষ্টি সামনে হাঁটছিল।

রাফি আর তৃষা একটু পেছনে।

তৃষা হঠাৎ বলল,

—রাফি।

—হুম?

—তুই আমাকে আর আগের মতো জ্বালাস না কেন?

রাফি হেসে বলল,

—তুই বড় হয়ে গেছিস।

—তাতে কী?

—আগে তুই ছোট ছিলি।

—এখন?

রাফি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—এখন তোকে বেশি বুঝতে হয়।

তৃষা তাকিয়ে রইল।

—মানে?

রাফি উত্তর দিল না।

তৃষা আবার বলল,

—তুই কি আমার ওপর এখনো রাগ করে আছিস?

—না।

—তাহলে?

—কিছু না।

তৃষা হঠাৎ বলল,

—আমি যদি আবার ভুল করি?

রাফি এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তাহলে আবার বকব।

তৃষা মুচকি হাসল।

—আর যদি আমি না শুনি?

—তাহলে আবার খুঁজতে যাব।

তৃষার মুখের হাসিটা আরও গভীর হলো।

দিন যেতে লাগল।

তৃষা ধীরে ধীরে বুঝতে লাগল, রাফির প্রতি তার অনুভূতি বদলে যাচ্ছে।

রাফি পাশে থাকলে তার ভালো লাগে।

রাফি অন্য কারও সঙ্গে বেশি কথা বললে তার অস্বস্তি হয়।

রাফি তাকে নিয়ে মজা না করলে তার মন খারাপ হয়।

একদিন রাফি মিষ্টির সঙ্গে কথা বলছিল।

মিষ্টি কোনো একটা কথা বলে হেসে উঠল।

তৃষা দূর থেকে সেটা দেখছিল।

কেন জানি তার ভেতরে বিরক্তি তৈরি হলো।

রাফি তৃষাকে দেখে বলল,

—এই পাগলি, ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

তৃষা গম্ভীর মুখে বলল,

—এমনিই।

—এদিকে আয়।

তৃষা এগিয়ে এল।

রাফি বলল,

—কী হয়েছে?

—কিছু না।

—তুই আবার রাগ করেছিস?

—না।

রাফি হেসে বলল,

—তুই যখন বলিস ‘কিছু না’, তখনই বুঝি অনেক কিছু হয়েছে।

তৃষা মুখ ফিরিয়ে নিল।

মিষ্টি সব বুঝে মুচকি হাসল।

সেদিন রাতে তৃষা বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ ভাবল।

সায়েমকে নিয়ে যে অনুভূতিটাকে সে একসময় জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য মনে করেছিল, সেটা কত সহজেই ভেঙে গিয়েছিল।

আর রাফি?

ছোটবেলা থেকে যে ছেলেটা তাকে বিরক্ত করেছে, হাসিয়েছে, রাগিয়েছে, আবার বিপদে সবচেয়ে আগে পাশে দাঁড়িয়েছে—

সেই রাফির কথাই এখন তার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।

তৃষা বালিশে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—আমি কি তাহলে রাফিকে...

কথাটা শেষ করতে পারল না।

নিজেই লজ্জা পেয়ে চোখ বন্ধ করল।

অন্যদিকে রাফিও নিজের ঘরে বসে একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল।

তৃষাকে সে কবে থেকে এতটা গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে, সে নিজেও জানে না।

শুধু জানে—

তৃষা অন্য কারও সঙ্গে থাকলে তার ভালো লাগে না।

তৃষা কাঁদলে তার কষ্ট হয়।

আর তৃষা হাসলে অদ্ভুত একটা শান্তি লাগে।

কিন্তু মুখে বলার সাহস তার নেই।

দুজনেই বুঝতে শুরু করেছিল অনুভূতিটা বদলে গেছে।

তবুও কেউ কাউকে কিছু বলল না।

তৃষা আর রাফির সম্পর্কটা বাইরে থেকে আগের মতোই ছিল। দুজনের ঝগড়া হতো, দুষ্টুমি হতো, মিষ্টিকে নিয়ে রাফি ইচ্ছে করে তৃষাকে জ্বালাত।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুজনের মনেই অনেক কিছু বদলে গেছে।

তৃষা এখন রাফির প্রতিটি ছোট আচরণ খেয়াল করত।

রাফি কখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছে, কখন ফিরছে, কার সঙ্গে কথা বলছে—এসব না চাইলেও তার চোখে পড়ে যেত।

আর রাফিও তৃষার ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গেছে।

তৃষা কোথাও গেলে সে খোঁজ নিত।

রাতে দেরি হলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত।

তবে মুখে কিছুই বলত না।

একদিন বিকেলে মিষ্টি তৃষার ঘরে এসে বলল,

—তোর একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

তৃষা বই পড়ছিল।

—কর।

—তুই রাফিকে পছন্দ করিস?

তৃষার হাত থেকে বইটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

—কী বলছিস এসব?

মিষ্টি হেসে বলল,

—আমি তো শুধু প্রশ্ন করলাম।

—না।

—নিশ্চিত?

—হ্যাঁ।

মিষ্টি বলল,

—তাহলে রাফি অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বললে তুই রাগ করিস কেন?

তৃষা চুপ হয়ে গেল।

মিষ্টি আবার বলল,

—ও তোকে জ্বালালে তুই রাগ করিস, আবার জ্বালানো বন্ধ করলে মন খারাপ করিস।

তৃষা নিচু গলায় বলল,

—আমি জানি না।

মিষ্টি এবার নরম হয়ে বলল,

—তুই হয়তো জানিস। শুধু বলতে ভয় পাচ্ছিস।

তৃষা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—রাফি আমাকে কখনো ওইভাবে দেখবে না।

—কীভাবে জানিস?

—ও আমাকে সবসময় পাগলি বলে। ছোটবেলার বন্ধু মনে করে।

মিষ্টি মুচকি হেসে বলল,

—অনেক সম্পর্কের শুরুই তো বন্ধুত্ব থেকে হয়।

তৃষা আর কিছু বলল না।

কিন্তু মিষ্টির কথাগুলো তার মনে গভীরভাবে বসে গেল।

অন্যদিকে রাফির এক বন্ধু তাকে একদিন বলল,

—তুই তৃষাকে এত খেয়াল রাখিস কেন?

রাফি হেসে বলল,

—ছোটবেলার বন্ধু।

—শুধু বন্ধু?

রাফি চুপ করে গেল।

বন্ধুটি বলল,

—তোর চোখ কিন্তু অন্য কথা বলে।

রাফি কিছুক্ষণ পর বলল,

—সব কথা বলা যায় না।

—কেন?

—কিছু সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।

বন্ধুটি আর কিছু বলল না।

রাফি জানত, তৃষাকে নিজের মনের কথা বললে যদি তৃষা তাকে ফিরিয়ে দেয়, তাহলে তাদের এত বছরের বন্ধুত্বও হয়তো অস্বস্তিকর হয়ে যাবে।

সে সেই ঝুঁকি নিতে পারছিল না।

এক সন্ধ্যায় দুই পরিবার একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করছিল।

হঠাৎ তৃষার বাবা বললেন,

—তৃষার জন্য একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছে।

রাফির হাত থেমে গেল।

তৃষাও চমকে বাবার দিকে তাকাল।

—আমার জন্য?

—হ্যাঁ মা। ছেলেটা ভালো, পরিবারও ভালো। সবাইকে চিনে-জেনে তারপর সিদ্ধান্ত নেব।

তৃষা কিছু বলল না।

রাফি মাথা নিচু করে খাবারের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, কেউ যেন হঠাৎ বুকের ভেতরটা খালি করে দিয়েছে।

তৃষার মা বললেন,

—রাফি, তুই এত চুপ হয়ে গেলি কেন?

রাফি জোর করে হেসে বলল,

—কিছু না আন্টি।

তৃষা আড়চোখে রাফির দিকে তাকাল।

তার মুখের হাসিটা কেমন যেন অস্বাভাবিক।

পরদিন তৃষা রাফিকে নদীর ধারে ডেকে নিল।

রাফি গিয়ে বলল,

—কী হয়েছে?

তৃষা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আমার বিয়ের কথা চলছে।

—জানি।

—তুই খুশি?

রাফি থমকে গেল।

তারপর জোর করে হাসল।

—খুশি হব না কেন?

তৃষা তাকিয়ে রইল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তোর কোনো কষ্ট হচ্ছে না?

রাফি চোখ সরিয়ে নিল।

—কেন কষ্ট হবে?

তৃষা ধীরে বলল,

—জানি না।

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—ছেলেটা নিশ্চয়ই ভালো।

—আমি ওকে চিনি না।

—চেনার পর ভালো লাগবে।

তৃষার চোখে পানি জমে উঠল।

—তুই আমাকে এত সহজে অন্য কারও হাতে তুলে দিচ্ছিস?

রাফি এবার তার দিকে তাকাল।

কিছু বলতে চেয়েও পারল না।

শুধু বলল,

—তোর ভালো থাকাটাই তো চাই।

তৃষা মুখ ফিরিয়ে নিল।

—তুই মিথ্যা বলছিস।

রাফি চুপ।

—তুই যদি সত্যিই আমার ভালো চাস, তাহলে আমার দিকে তাকিয়ে বল, তোর একটুও কষ্ট হচ্ছে না।

রাফির চোখ ভিজে উঠেছিল।

কিন্তু সে মুখ ফিরিয়ে নিল।

—চল, বাড়ি যাই।

তৃষা আর কিছু বলল না।

এরপর কয়েকদিন রাফি ইচ্ছে করেই তৃষার কাছ থেকে দূরে থাকতে লাগল।

তৃষা ডাকলে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিত।

আগের মতো দুষ্টুমি করত না।

তৃষা মিষ্টিকে বলল,

—রাফি বদলে গেছে।

মিষ্টি বলল,

—হয়তো নিজের মনকে বোঝাচ্ছে।

তৃষা বলল,

—আমি ওকে কিছু বলতে পারছি না।

—কেন?

—ভয় হয়।

—কিসের ভয়?

—যদি ও আমাকে শুধু বন্ধু ভাবে?

মিষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তাহলে অন্তত জানবি।

তৃষা মাথা নেড়ে বলল,

—আমি পারব না।

এদিকে বিয়ের তারিখও ঠিক হয়ে গেল।

বাড়িতে প্রস্তুতি শুরু হলো।

তৃষা বাইরে থেকে সবকিছু মেনে নিলেও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছিল।

আর রাফি?

সে যেন নিজেকে সবকিছু থেকে সরিয়ে নিল।

বিয়ের কেনাকাটায় গেল না।

তৃষার সঙ্গে দেখা করা কমিয়ে দিল।

সবাই ভাবল, হয়তো রাফি ব্যস্ত।

কিন্তু সত্যিটা ছিল অন্য।

রাফি জানত, তৃষার বিয়ে হয়ে গেলে তার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে অন্য কারও সঙ্গে চলে যেতে দেখতে হবে।

সে সেটা মেনে নিতে পারছিল না।

তবুও সে কিছু বলল না।

কারণ তার মনে হচ্ছিল—

তৃষা যদি তাকে নিজের করে চাইত, তাহলে এতদিনে নিশ্চয়ই কিছু বলত।

আর তৃষাও একই ভুল ধারণায় ছিল।

সে ভাবছিল—

রাফি যদি তাকে সত্যিই চায়, তাহলে এত চুপ করে আছে কেন?

এই না বলা কথাগুলোই ধীরে ধীরে তাদের দুজনকে একে অপরের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছিল।

অবশেষে এসে গেল সেই দিন—

তৃষার বিয়ের দিন।

বিয়ের দিন সকাল থেকেই তৃষাদের বাড়িতে উৎসবের পরিবেশ।

বাড়ির উঠানজুড়ে মানুষজনের ভিড়। আত্মীয়স্বজন আসছে, হাসি-আনন্দে চারপাশ মুখর।

তৃষার ঘরও সাজানো হয়েছে সুন্দর করে।

কিন্তু তৃষার মুখে কোনো আনন্দ নেই।

সে চুপচাপ আয়নার সামনে বসে আছে।

মিষ্টি পাশে বসে বলল,

—কী ভাবছিস?

তৃষা ধীরে বলল,

—রাফি কোথায়?

মিষ্টি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—জানি না।

—আজও কি আমার কাছে আসবে না?

মিষ্টি তৃষার হাত ধরে বলল,

—তুই ওকে এত খুঁজছিস কেন?

তৃষার চোখে পানি জমে উঠল।

—জানি না।

মিষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তুই কি ওকে কিছু বলতে চাস?

তৃষা মাথা নিচু করে বলল,

—হ্যাঁ।

—তাহলে বল।

—কিন্তু ও তো আসছেই না।

মিষ্টি আর কিছু বলল না।

এদিকে রাফি বাড়িতে নেই।

সকালে সবাই ভেবেছিল, সে হয়তো কোনো কাজে বের হয়েছে।

কিন্তু আসলে রাফি অনেক দূরে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে ছিল।

নদীর পানি ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে।

চারপাশে নির্জনতা।

রাফি একা একটা গাছের নিচে বসে ছিল।

তার চোখের সামনে বারবার তৃষার ছোটবেলার ছবি ভেসে উঠছিল।

সাত বছর বয়সে প্রথম তাকে কোলে নেওয়া।

তৃষার প্রথম হাঁটা।

ছোটবেলায় একসঙ্গে খেলাধুলা।

তৃষার সঙ্গে ঝগড়া।

তার রাগ।

তার হাসি।

তার কান্না।

সবকিছু।

রাফি চোখ বন্ধ করল।

তারপর চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারল না।

অঝোরে কাঁদতে লাগল।

সে নিজের মুখ দুহাত দিয়ে ঢেকে বলল,

—আমি তোকে কখনো বলতে পারলাম না, পাগলি।

কিছুক্ষণ পর সে আকাশের দিকে তাকাল।

—আজ তোর বিয়ে। আর আমি এখানে বসে আছি।

তার গলা কেঁপে উঠল।

—আমি তোকে কীভাবে অন্য কারও হাতে তুলে দিই?

কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো কেউ ছিল না।

শুধু নদীর পানির শব্দ।

তৃষাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তুতি আরও জোরে চলছে।

কিন্তু তৃষার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও।

বাবা ঘরে এসে বললেন,

—মা, তৈরি হচ্ছিস না কেন?

তৃষা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

—বাবা...

—হুম?

—রাফি কোথায়?

বাবা একটু অবাক হলেন।

—জানি না তো। সকালে বের হয়েছে।

তৃষা চুপ করে গেল।

বাবা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, কিছু একটা সমস্যা আছে।

তিনি বললেন,

—তুই কি আমাকে কিছু বলতে চাস?

তৃষা মাথা নিচু করে রইল।

—না।

বাবা চলে গেলেন।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলেন।

—তৃষা, তোর চোখে যে ভয় দেখছি, সেটা বিয়ের ভয় না।

তৃষা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

কান্নায় ভেঙে পড়ে বাবাকে সব বলে দিল।

সায়েমের ঘটনা।

রাফি তাকে স্টেশন থেকে ফিরিয়ে আনার ঘটনা।

তারপর রাফির প্রতি নিজের বদলে যাওয়া অনুভূতি।

সবকিছু।

বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে শুনলেন।

শেষে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তুই আগে আমাকে বলিসনি কেন?

তৃষা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—ভয় পেয়েছিলাম।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—যদি তুই রাফিকেই চাস, তাহলে অন্য কারও সঙ্গে তোর বিয়ে আমি কীভাবে দেব?

তৃষা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।

—তুমি রাজি?

বাবা হেসে বললেন,

—রাফিকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। ওকে নিজের ছেলের মতো দেখেছি। তুই যদি ওর সঙ্গে সুখী হোস, আমার আপত্তি নেই।

তৃষার চোখে পানি।

—কিন্তু রাফি তো কিছু বলেনি।

বাবা বললেন,

—তুই গিয়ে বল।

তৃষা অবাক হয়ে বলল,

—আমি?

—হ্যাঁ। সবসময় মেয়েরাই কি চুপ করে থাকবে? নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেকেও নিতে হয়।

তারপর বাবা বললেন,

—তুই যা মা। আমি এখানে সব সামলাচ্ছি।

তৃষা বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

—বাবা...

—যা। দেরি করিস না।

তৃষা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।

বিয়ের পোশাকেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

মিষ্টি তাকে দেখে অবাক হয়ে বলল,

—কোথায় যাচ্ছিস?

তৃষা শুধু বলল,

—রাফির কাছে।

তারপর দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।

কিছুদূর গিয়ে দৌড় দিল।

তার চোখে তখন একটাই মানুষ।

রাফি।

নদীর পাড়ে তখনও রাফি বসে আছে।

চোখের পানি মুছে সে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছিল।

হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এল,

—রাফি!

রাফি চমকে ফিরে তাকাল।

তৃষা দাঁড়িয়ে আছে।

বিয়ের পোশাকে।

চোখে পানি।

রাফি কয়েক সেকেন্ড কিছুই বলতে পারল না।

তারপর দ্রুত চোখের পানি মুছে মুখে হাসি এনে বলল,

—ওই পাগলি! তোর আজকে বিয়ে। আজকেও আমার সঙ্গে ঘুরবি নাকি?

তৃষা কোনো উত্তর দিল না।

রাফি হাসতে হাসতে বলল,

—যা, বাড়িতে যা। সবাই তোকে খুঁজছে।

তৃষা ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এল।

রাফি আবার বলল,

—কী হলো? দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

তৃষা হঠাৎ রাফিকে জড়িয়ে ধরল।

রাফি পুরোপুরি অবাক হয়ে গেল।

তার হাত দুটো মাঝপথে থেমে রইল।

তৃষা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাব না।

রাফির চোখ আবার ভিজে উঠল।

সে ধীরে বলল,

—পাগলি নাকি তুই?

তৃষা মাথা তুলে বলল,

—তুই কি আমাকে চাস না?

রাফি কিছু বলতে পারল না।

তৃষা আবার বলল,

—তুই কি আমাকে ভালোবাসিস না?

রাফি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে তৃষার চোখের দিকে তাকাল।

কিন্তু উত্তরটা সে এখনও দিতে পারল না।

কারণ এত বছরের জমে থাকা কথাগুলো যেন এক মুহূর্তে মুখে আসতে চাইছিল না।

নদীর পাড়ে বাতাস তখন ধীরে ধীরে বইছে।

চারপাশে নীরবতা।

শুধু নদীর পানির ঢেউয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

তৃষা এখনও রাফিকে জড়িয়ে ধরে আছে। আর রাফি যেন বুঝতেই পারছে না, এতদিন যে কথাটা নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল, আজ সেই কথাই তাকে বলতে হবে।

তৃষা ধীরে ধীরে রাফিকে ছেড়ে তার সামনে দাঁড়াল।

চোখের পানি মুছে বলল,

—তুই চুপ করে আছিস কেন?

রাফি কোনো উত্তর দিল না।

তৃষা আবার বলল,

—আমি তোকে জিজ্ঞেস করছি, তুই কি আমাকে চাস না?

রাফি মাথা নিচু করল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—তুই আজও সেই আগের মতোই পাগলি আছিস।

তৃষা বিরক্ত হয়ে বলল,

—আমি পাগলি কি না সেটা পরে বলবি। আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দে।

রাফি এবার তার দিকে তাকাল।

তৃষার চোখে তখন শুধু অপেক্ষা।

রাফি ধীরে বলল,

—তুই তো আজ অন্য কারও বউ হতে যাচ্ছিস।

তৃষা মাথা নেড়ে বলল,

—না।

—না মানে?

—আমি কাউকে বিয়ে করতে চাই না।

রাফি অবাক হয়ে তাকাল।

—তাহলে?

তৃষা চোখের পানি মুছে বলল,

—আমি তোকে চাই।

রাফি যেন কথাটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল।

তৃষা আবার বলল,

—অনেকদিন ধরে বুঝেছি। কিন্তু বলতে পারিনি।

রাফি ধীরে বলল,

—তুই নিশ্চিত?

—হ্যাঁ।

—ভালো করে ভেবে বলছিস?

—অনেক ভেবেছি।

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তুই জানিস, আমি কেমন?

তৃষা হেসে বলল,

—জানি। ছোটবেলা থেকে জানি।

—আমি তোকে সারাজীবন জ্বালাব।

—জানি।

—তোকে পাগলি বলব।

—সেটাও জানি।

—তোর সঙ্গে ঝগড়া করব।

তৃষা মৃদু হেসে বলল,

—সেটাও জানি।

রাফির মুখে হাসি ফুটল।

—তাহলে তুই এখনও আমাকে চাইছিস?

তৃষা মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ।

রাফি এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।

তার চোখের কোণে আবার পানি জমে উঠেছে।

তৃষা সেটা দেখে বলল,

—তুই কাঁদছিস?

রাফি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে বলল,

—না।

—মিথ্যা বলছিস।

—চোখে পানি চলে এসেছে। বাতাসের জন্য।

তৃষা হেসে ফেলল।

—এত বছর পরেও তুই মিথ্যা বলতে শিখলি না।

রাফিও হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ দুজনেই নদীর পাড়ে পাশাপাশি বসে রইল।

তৃষা ধীরে বলল,

—তুই আজ এখানে কেন এসেছিলি?

রাফি নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোর বিয়ের দিন তোকে অন্য কারও সঙ্গে যেতে দেখব, সেটা পারতাম না।

—তাই কাঁদছিলি?

—আমি কাঁদিনি।

—আমি নিজের চোখে দেখেছি।

রাফি কিছু বলল না।

তৃষা আবার বলল,

—তুই আমাকে কখন থেকে পছন্দ করিস?

রাফি একটু হেসে বলল,

—জানি না।

—কখনো বুঝিসনি?

—হয়তো বুঝেছিলাম। কিন্তু স্বীকার করতে ভয় পেয়েছিলাম।

—কিসের ভয়?

—তোকে হারানোর ভয়।

তৃষা চুপ করে গেল।

রাফি বলল,

—ভাবতাম, যদি তোকে বলি আর তুই না বলিস, তাহলে আমাদের বন্ধুত্বটাও হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে।

তৃষা মৃদু গলায় বলল,

—আমিও একই ভয় পেয়েছিলাম।

রাফি তাকিয়ে বলল,

—তাহলে এতদিন দুজনেই বোকা ছিলাম।

তৃষা হেসে বলল,

—তুই তো এমনিতেই বোকা।

রাফি বলল,

—এই জন্যই তোকে এত পাগলি বলি।

কিছুক্ষণ পর তৃষা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।

—চল।

রাফি অবাক হয়ে বলল,

—কোথায়?

—বাড়ি।

—তুই কি ভুলে গেছিস, আজ তোর বিয়ে?

তৃষা হাসল।

—সেটা আর হচ্ছে না।

রাফি বলল,

—তোর বাবা কী বলবেন?

—বাবা সব জানেন।

রাফি থমকে গেল।

—সব জানেন?

—হ্যাঁ। আমি সব বলে এসেছি।

—আর উনি?

তৃষা হাসল।

—উনি রাজি হয়েছেন।

রাফি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

রাফি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,

—আঙ্কেল এত সহজে রাজি হলেন?

তৃষা বলল,

—উনি তোকে ছোটবেলা থেকেই চেনেন। আর আমাকে বলেছেন, আমি যদি তোকে নিয়েই সুখী হতে চাই, তাহলে উনার কোনো আপত্তি নেই।

রাফির চোখ আবার ভিজে উঠল।

—তুই সত্যিই পাগলি।

তৃষা বলল,

—হ্যাঁ, তোর পাগলি।

রাফি হেসে ফেলল।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

কিছুদূর যাওয়ার পর রাফি বলল,

—তুই কিন্তু আজ আমাকে খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি।

—কেন?

—ভাবছিলাম, তুই সত্যিই অন্য কারও সঙ্গে চলে যাবি।

তৃষা বলল,

—সায়েমের পর বুঝেছি, সবাইকে বিশ্বাস করা যায় না।

তারপর একটু থেমে বলল,

—কিন্তু তোকে করা যায়।

রাফি মুচকি হাসল।

—এই বিশ্বাসটা যেন সারাজীবন থাকে।

তৃষা বলল,

—থাকবে।

বাড়ির কাছে এসে তৃষা থেমে গেল।

দুই বাড়ির মাঝের সেই ছোট্ট দেয়ালটার দিকে তাকাল।

এই দেয়ালের এপাশ-ওপাশেই কেটেছে তাদের পুরো শৈশব।

এই দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে তারা কত ঝগড়া করেছে!

কতবার রাফি তৃষার ফিতা নিয়ে পালিয়েছে।

কতবার তৃষা রাগ করে রাফির বাড়িতে গিয়ে অভিযোগ করেছে।

কতবার মিষ্টি তাদের ঝগড়া থামিয়েছে।

আজ সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তৃষার মনে হলো, এতদিনে তাদের সম্পর্কটা যেন পূর্ণতা পেল।

রাফি বলল,

—কী ভাবছিস?

তৃষা মুচকি হেসে বলল,

—ভাবছি, ছোটবেলায় যখন তুই আমাকে কোলে নিয়েছিলি, তখন যদি জানতাম একদিন তুই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে যাবি...

রাফি হেসে বলল,

—তাহলে কী করতি?

—তোকে আরও বেশি জ্বালাতাম।

—এখনও তো জ্বালাস।

তৃষা বলল,

—সারাজীবন জ্বালাব।

রাফি মাথা নেড়ে বলল,

—ঠিক আছে। সহ্য করব।

বাড়িতে পৌঁছাতেই সবাই তাদের দিকে তাকাল।

তৃষার বাবা এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

তারপর রাফির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।

—তোরা দুজন এতদিনে বুঝলি?

রাফি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।

তৃষা বলল,

—বাবা, তুমি আগে থেকেই বুঝতে?

তিনি হেসে বললেন,

—তোদের দুজনের ঝগড়া দেখলেই বোঝা যেত।

সবাই হেসে উঠল।

মিষ্টিও পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

—আমি তো অনেক আগেই বুঝেছিলাম।

তৃষা অবাক হয়ে বলল,

—তুই জানতিস?

মিষ্টি বলল,

—হ্যাঁ। শুধু তোরা দুজন বুঝিসনি।

রাফি তৃষার দিকে তাকিয়ে বলল,

—দেখলি? আমরা সত্যিই বোকা।

তৃষা মুচকি হেসে বলল,

—তুই বোকা। আমি না।

রাফি বলল,

—আবার শুরু হলো!

তৃষা বলল,

—কী করব? তোর সঙ্গে ঝগড়া না করলে তো দিনই কাটে না।

দুজনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

তৃষা আর রাফির সম্পর্কের কথা দুই পরিবারই মেনে নিল।

যে বাড়ি দুটো এত বছর পাশাপাশি ছিল, সেখানে এবার যেন আনন্দ আরও বেড়ে গেল।

তৃষার বাবা নিজে রাফির বাবার সঙ্গে বসে বিয়ের বিষয়ে কথা বললেন।

রাফির বাবা হেসে বললেন,

—আমরা তো অনেক আগেই ভেবেছিলাম, একদিন এমন কিছুই হবে।

রাফি পাশ থেকে শুনে বলল,

—আপনারা আগে থেকে সব জানতেন নাকি?

তার বাবা হেসে বললেন,

—তোদের ঝগড়া দেখলেই বোঝা যেত।

তৃষা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—কিন্তু বাবা, আমরা তো শুধু বন্ধু ছিলাম!

তৃষার বাবা বললেন,

—বন্ধু ছিলি, কিন্তু তোদের বন্ধুত্বটা অন্য সবার বন্ধুত্বের মতো ছিল না।

রাফি হেসে বলল,

—তৃষা তো আমাকে সারাজীবন শুধু জ্বালিয়েছে।

তৃষা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—আমি? তুই আমাকে জ্বালাসনি?

রাফি বলল,

—আমি তোকে একটু মজা করতাম।

—মজা?

—হ্যাঁ।

—আমার ফিতা লুকিয়ে রাখা মজা?

—হ্যাঁ।

—আমার ফুচকায় বেশি ঝাল দেওয়া?

—ওটাও মজা।

তৃষা রাগী মুখ করল।

—আমি তোকে এখনই—

সবাই হেসে উঠল।

পরদিন বিকেলে রাফি আর তৃষা নদীর ধারে হাঁটতে গেল।

আগের মতোই পাশাপাশি হাঁটছিল তারা।

তবে আজ দুজনের মধ্যে একটা নতুন লজ্জা কাজ করছিল।

তৃষা মাঝে মাঝে রাফির দিকে তাকাচ্ছিল।

রাফিও তাকাচ্ছিল।

কিন্তু চোখাচোখি হলেই দুজনেই অন্যদিকে তাকিয়ে ফেলছিল।

শেষ পর্যন্ত তৃষা বলল,

—এই!

—হুম?

—এত চুপচাপ কেন?

রাফি বলল,

—তুই তো চুপ।

—আমি তোর সঙ্গে কথা বলছি।

—তাহলে বল।

তৃষা একটু ভেবে বলল,

—তুই আমাকে এখনো পাগলি বলবি?

রাফি মুচকি হেসে বলল,

—অবশ্যই।

—কেন?

—কারণ তুই পাগলি।

—আমি কিন্তু রাগ করব।

—আগেও তো রাগ করতিস।

—এখনও করব।

রাফি হেসে বলল,

—ঠিক আছে। রাগ করিস।

তৃষা বলল,

—আর তুই মিষ্টিকে আর চোখ মারবি না।

রাফি অবাক হয়ে বলল,

—এটা আবার কী?

—আমি বলেছি।

—তুই কি এখন থেকেই এত নিয়ম করবি?

তৃষা মুখ ঘুরিয়ে বলল,

—হ্যাঁ।

রাফি হাসতে হাসতে বলল,

—আচ্ছা, করব না।

তৃষা মুচকি হাসল।

তারপর ধীরে বলল,

—ভালো ছেলে।

রাফি বলল,

—এই কথাটা আবার বলিস না। আমার সম্মান আছে।

তৃষা হেসে ফেলল।

কিছুদিন পর তাদের বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো।

দুই পরিবার মিলে আয়োজন করতে লাগল।

তৃষার ঘরে বান্ধবীরা আসা-যাওয়া করছে।

মিষ্টি এসে একদিন বলল,

—তোর তো অবশেষে ইচ্ছা পূরণ হলো।

তৃষা হেসে বলল,

—কোন ইচ্ছা?

—রাফিকে নিয়ে সারাজীবন ঝগড়া করার।

তৃষা বলল,

—আমি ঝগড়া করব না।

মিষ্টি চোখ বড় করে বলল,

—তুই?

—হ্যাঁ।

—অসম্ভব।

তৃষা হেসে বলল,

—আচ্ছা, একটু করব।

মিষ্টি বলল,

—আমি কিন্তু একটা কথা বলব।

—বল।

—রাফিকে কখনো বদলাতে যাস না। ও যেমন আছে, তেমনই থাকুক।

তৃষা কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,

—আমি ওকে বদলাতে চাই না। আমি শুধু চাই, ও সবসময় আমার পাশে থাকুক।

মিষ্টি হেসে বলল,

—এটাই তো সবচেয়ে বড় কথা।

এক সন্ধ্যায় রাফি তৃষার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

তৃষা বারান্দা থেকে বলল,

—কী করছিস?

—তোর বাবার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।

—আমাকে না বলে?

—তোর বাবার সঙ্গে আমারও তো কথা থাকতে পারে।

তৃষা নিচে নেমে এল।

—কী কথা?

রাফি বলল,

—তুই বিয়ের পরও আমাকে বিরক্ত করবি তো?

তৃষা অবাক হয়ে বলল,

—এই জন্য বাবার সঙ্গে কথা বলতে এসেছিস?

—হ্যাঁ।

তৃষা হেসে বলল,

—বিয়ের পর তোকে বিরক্ত করার দায়িত্ব আমারই থাকবে।

রাফি বলল,

—ভালো। তাহলে আমি নিশ্চিন্ত।

তৃষা একটু চুপ করে বলল,

—রাফি।

—হুম?

—সেদিন নদীর পাড়ে তুই সত্যি কাঁদছিলি?

রাফি মুখ ঘুরিয়ে বলল,

—না।

—আবার মিথ্যা!

—আমি কাঁদিনি।

—তাহলে চোখ লাল ছিল কেন?

রাফি হেসে বলল,

—ধুলো ঢুকেছিল।

তৃষা বলল,

—নদীর ধারে ধুলো?

রাফি কিছু বলতে না পেরে হেসে ফেলল।

তৃষাও হেসে ফেলল।

বিয়ের আগের দিন রাতে দুই পরিবার একসঙ্গে বসেছিল।

তৃষার বাবা রাফিকে বললেন,

—বাবা, একটা কথা মনে রাখিস।

রাফি গম্ভীর হয়ে বলল,

—জি, আঙ্কেল।

—তৃষা একটু জেদি। ছোটবেলা থেকে এমনই।

রাফি হেসে বলল,

—জানি।

—রাগও বেশি।

—সেটাও জানি।

—তবে মনটা খুব ভালো।

রাফি মাথা নেড়ে বলল,

—আমি জানি।

তৃষার বাবা কিছুক্ষণ রাফির দিকে তাকিয়ে বললেন,

—ওকে সবসময় সম্মান করিস।

রাফি গম্ভীরভাবে বলল,

—আমি কথা দিচ্ছি।

তৃষা দূর থেকে কথাগুলো শুনছিল।

তার চোখে পানি এসে গেল।

সে বুঝতে পারছিল, তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভয়গুলো আজ ধীরে ধীরে দূর হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে তৃষার মা তাকে বললেন,

—মা, তুই ছোটবেলা থেকেই রাফির সঙ্গে বড় হয়েছিস। এখন তোদের সম্পর্কটা আরও সুন্দর করে রাখিস।

তৃষা মৃদু হেসে বলল,

—মা, আমি চেষ্টা করব।

—ওকে বুঝতে শিখিস।

—ও আমাকে বোঝে।

—আর তুই?

তৃষা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—আমি ওকে বোঝার চেষ্টা করব।

মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তাহলেই হবে।

রাত গভীর হলো।

সবাই ঘুমিয়ে পড়ল।

তৃষা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।

ছোটবেলায় যে বাড়িটাকে নিজের বাড়ির মতো মনে হতো, সেই বাড়িতেই এবার তার নতুন জীবন শুরু হবে।

পাশের বাড়ির সেই দুষ্টু ছেলেটা—

যে তাকে সবসময় পাগলি বলত,

যে তার সঙ্গে ঝগড়া করত,

যে বিপদে তাকে একা ছেড়ে যায়নি,

সেই রাফিই এবার তার জীবনের সঙ্গী হতে চলেছে।

অন্যদিকে রাফিও নিজের ঘরে বসে ভাবছিল,

—তৃষা সত্যিই আমার জীবনের অংশ হয়ে যাচ্ছে।

তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

বিয়ের দিন যতই কাছে আসছিল, ততই দুই বাড়িতে ব্যস্ততা বাড়ছিল।

কয়েক দিনের মধ্যেই সেই দিন চলে এল।

সকাল থেকেই তৃষাদের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড়। উঠানে প্যান্ডেল করা হয়েছে। বাড়ির সামনে আলো লাগানো হয়েছে। রান্নাঘর থেকেও একের পর এক খাবারের গন্ধ আসছে।

তৃষা নিজের ঘরে বসে ছিল।

মিষ্টি এসে বলল,

—কী রে? আজ তোকে বেশ শান্ত লাগছে।

তৃষা মৃদু হেসে বলল,

—কী করব?

—আজ তো তোর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন।

তৃষা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—রাফি কোথায়?

মিষ্টি হেসে বলল,

—তুই বিয়ের দিনেও রাফির খোঁজ করছিস?

—হ্যাঁ।

—কেন?

তৃষা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

—জানি না।

মিষ্টি বলল,

—তুই ওকে ছাড়া কিছু ভাবতেই পারিস না।

তৃষা এবার হাসল।

—হয়তো।

অন্যদিকে রাফিদের বাড়িতেও সবাই ব্যস্ত।

রাফিকে সাজানোর জন্য সবাই তাকে ডাকছিল।

কিন্তু রাফি বারবার বলছিল,

—আচ্ছা, আসছি।

তার বাবা এসে বললেন,

—কী হলো? আজ এত চুপ কেন?

রাফি হেসে বলল,

—কিছু না।

—তুই কি নার্ভাস?

রাফি একটু হেসে বলল,

—তৃষাকে এত বছর ধরে চিনি। ওকে বিয়ে করতে আবার নার্ভাস হব কেন?

বাবা বললেন,

—বিয়ে আর বন্ধুত্ব এক জিনিস নয়।

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—জানি।

তারপর মৃদু হেসে যোগ করল,

—তবে তৃষা যদি আগের মতোই থাকে, তাহলে ভয় নেই।

বাবা হেসে বললেন,

—ও তোকে আগের মতোই জ্বালাবে।

রাফি বলল,

—সেটাই তো চাই।

বিকেলের দিকে তৃষার সাজ শেষ হলো।

মিষ্টি তাকে দেখে বলল,

—আজ তোকে খুব সুন্দর লাগছে।

তৃষা মৃদু হেসে বলল,

—রাফি কী বলবে কে জানে!

মিষ্টি বলল,

—ও নিশ্চয়ই বলবে, ‘পাগলি’।

তৃষা হেসে ফেলল।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে রাফির কণ্ঠ শোনা গেল,

—এই পাগলি! তৈরি হয়েছিস?

তৃষা অবাক হয়ে মিষ্টির দিকে তাকাল।

—ও এখানে?

মিষ্টি হেসে বলল,

—যার কথা ভাবছিলি, সে নিজেই এসে গেছে।

তৃষা দরজার কাছে গেল।

রাফি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।

তৃষাকে দেখে কয়েক মুহূর্ত চুপ হয়ে গেল।

তৃষা বলল,

—কী হলো? কথা বলছিস না কেন?

রাফি হেসে বলল,

—কিছু না।

—কিছু তো হয়েছে।

রাফি মাথা নেড়ে বলল,

—আজ তোকে একটু আলাদা লাগছে।

তৃষা মুচকি হেসে বলল,

—ভালো লাগছে?

রাফি বলল,

—হুম।

তৃষা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল।

রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—তবে একটা জিনিস বদলায়নি।

—কী?

—তুই এখনও সেই পাগলি।

তৃষা রাগ দেখিয়ে বলল,

—তুই একদম বদলাবি না।

—আমি কেন বদলাব?

—তোর সঙ্গে কথা বলাই ভুল।

রাফি হেসে বলল,

—এই তো, আমার তৃষা ফিরে এসেছে।

সন্ধ্যা নামল।

বাড়িতে বিয়ের আয়োজন আরও জমে উঠল।

তৃষা আর রাফি দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

তবে সুযোগ পেলেই দুজন একে অপরকে খুঁজে নিচ্ছিল।

একসময় তৃষা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

রাফি নিচ থেকে বলল,

—এই!

তৃষা তাকিয়ে বলল,

—কী?

—ভয় লাগছে?

তৃষা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—একটু।

রাফি বলল,

—কিসের?

—সবকিছু বদলে যাবে বলে।

রাফি শান্ত গলায় বলল,

—সবকিছু বদলাবে না।

—কীভাবে?

—আমরা তো একই থাকব।

তৃষা বলল,

—সত্যি?

—সত্যি।

তৃষা হেসে বলল,

—তাহলে ঠিক আছে।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।

দুই পরিবারের মানুষজন আনন্দে ব্যস্ত।

তৃষার বাবা বারবার অতিথিদের দেখছেন।

রাফির বাবা আত্মীয়দের সামলাচ্ছেন।

সবকিছু সুন্দরভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল।

একসময় তৃষার বাবা রাফির কাছে এসে বললেন,

—বাবা, আজ থেকে তৃষার দায়িত্ব তোকে দিলাম।

রাফি মাথা নত করে বলল,

—আমি সবসময় ওর পাশে থাকব।

তৃষার বাবা হাসলেন।

—আমি জানি।

বিয়ের পর সবাই যখন নানা কাজে ব্যস্ত, তখন তৃষা একটু নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল।

রাফি সেখানে এসে বলল,

—একা দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

তৃষা বলল,

—তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

রাফি অবাক হয়ে বলল,

—আমার জন্য?

—হ্যাঁ।

রাফি মৃদু হেসে বলল,

—এখন থেকে তোকে আর আমার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।

তৃষা বলল,

—কেন?

—আমি নিজেই সবসময় তোর কাছে থাকব।

তৃষার চোখ ভিজে উঠল।

সে ধীরে বলল,

—রাফি...

—হুম?

—সেদিন নদীর পাড়ে তুই যদি আমাকে না বলতে...

রাফি তার কথা থামিয়ে বলল,

—আমি সেদিনই তো সব বলতে চেয়েছিলাম।

—তাহলে বলিসনি কেন?

রাফি মুচকি হেসে বলল,

—ভয় পেয়েছিলাম।

তৃষা বলল,

—আমি তোকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম।

রাফি বলল,

—আমিও।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর তৃষা হেসে বলল,

—জানিস, আমাদের গল্পটা খুব অদ্ভুত।

রাফি বলল,

—কেন?

—ছোটবেলা থেকে এত ঝগড়া, এত দুষ্টুমি... অথচ শেষ পর্যন্ত আমরা একসঙ্গেই এলাম।

রাফি হেসে বলল,

—আমি তো প্রথম দিন থেকেই জানতাম।

তৃষা অবাক হয়ে বলল,

—কী জানতিস?

রাফি বলল,

—তুই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝামেলা হবি।

তৃষা রাগ দেখিয়ে বলল,

—এই!

রাফি হেসে দৌড়ে সরে গেল।

তৃষা পেছন থেকে বলল,

—দাঁড়া! আজ তোকে ছাড়ব না!

রাফি হাসতে হাসতে বলল,

—এই তো আমার পাগলি!

তৃষাও হেসে তার পেছনে ছুটল।

দুই পরিবারের মানুষজন তাদের দেখে হাসতে লাগল।

কারণ তারা জানত—

এই দুজনের সম্পর্কের সৌন্দর্যই হলো, এত বছরের দুষ্টুমি আর বন্ধুত্বের মধ্য দিয়েই তারা একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে।

তবুও একটা কথা এখনও পুরোপুরি বলা হয়নি।

সেই একটি কথা, যেটা তৃষা সেদিন নদীর পাড়ে জানতে চেয়েছিল।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে।

দুই বাড়ির মানুষজন আনন্দে ব্যস্ত। আত্মীয়স্বজন কেউ গল্প করছে, কেউ ছবি তুলছে, আবার কেউ নতুন দম্পতিকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করছে।

কিন্তু এসবের মাঝেও রাফি আর তৃষার চোখ বারবার একে অপরকে খুঁজে নিচ্ছিল।

এত বছরের পরিচয়, বন্ধুত্ব, ঝগড়া আর দুষ্টুমি—সবকিছুর পর আজ তারা সত্যিই একসঙ্গে।

তৃষা একসময় বাড়ির ছাদে এসে দাঁড়াল।

আকাশে তখন চাঁদের আলো।

কিছুক্ষণ পর রাফিও সেখানে এসে দাঁড়াল।

—এই পাগলি!

তৃষা ঘুরে তাকিয়ে হেসে বলল,

—আবার পাগলি?

—তুই তো পাগলিই।

—আজও?

—আজ থেকে আরও বেশি।

তৃষা মুচকি হেসে বলল,

—তুই একটুও বদলাসনি।

রাফি বলল,

—তুইও না।

দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।

তৃষা কিছুক্ষণ পর ধীরে বলল,

—রাফি।

—হুম?

—একটা কথা বলবি?

—বল।

—তুই কি সত্যিই আমাকে ছোটবেলা থেকেই এতটা পছন্দ করতিস?

রাফি হেসে বলল,

—ছোটবেলায় তোকে কোলে নিয়েছিলাম ঠিকই। তখন তোকে নিয়ে অন্য কিছু ভাবিনি।

তৃষা বলল,

—তারপর?

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তারপর তুই বড় হতে থাকলি। আর আমি বুঝতে পারলাম, তুই শুধু আমার পাশের বাড়ির মেয়ে না।

তৃষা তাকিয়ে রইল।

রাফি বলল,

—তুই আমার অভ্যাস হয়ে গেছিস।

তৃষার চোখে পানি চলে এল।

—কবে থেকে?

—জানি না।

—তুই তো কখনো বলিসনি।

—ভয় পেয়েছিলাম।

—আমাকে হারানোর?

—হ্যাঁ।

তৃষা মৃদু হেসে বলল,

—আর আমি ভাবতাম, তুই আমাকে শুধু বন্ধু ভাবিস।

রাফি বলল,

—আমিও ভাবতাম, তুই আমাকে শুধু বন্ধু ভাবিস।

দুজনেই হেসে ফেলল।

হঠাৎ তৃষা বলল,

—মনে আছে, একসময় তুই আমার বান্ধবী মিষ্টিকে চোখ মারতি?

রাফি হেসে বলল,

—মনে আছে।

—আমার খুব রাগ হতো।

—জানি।

—কেন করতি?

রাফি মুচকি হেসে বলল,

—তোর রাগ দেখতে ভালো লাগত।

তৃষা বলল,

—আর যখন আমাকে প্রপোজ করার অভিনয় করতি?

—ওটাও তোর রাগ দেখার জন্য।

—তুই জানিস, তখন আমি সত্যিই রেগে যেতাম?

—জানতাম।

—তবুও করতি?

—হ্যাঁ।

তৃষা মাথা নাড়িয়ে বলল,

—তুই সত্যিই অসহ্য।

রাফি হেসে বলল,

—তবুও তো আমাকে বিয়ে করলি।

তৃষা মুচকি হেসে বলল,

—কারণ তুই আমার সবচেয়ে আপন মানুষ।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর তৃষা বলল,

—একটা কথা মনে আছে?

—কোনটা?

—সেদিন স্টেশনে তুই আমাকে কত বকেছিলি।

রাফি হেসে ফেলল।

—ওই দিনের কথা মনে করিয়ে দিস না।

—কেন?

—তুই কী বোকামিই না করেছিলি!

তৃষা মুখ নিচু করে বলল,

—আমি সত্যিই ভুল করেছিলাম।

রাফি শান্ত গলায় বলল,

—হ্যাঁ, করেছিলি।

—কিন্তু তুই আমাকে ছেড়ে যাসনি।

—কখনো যাব না।

তৃষা রাফির দিকে তাকাল।

—কথা দে।

রাফি বলল,

—কথা দিলাম।

তৃষা মৃদু হেসে বলল,

—তুই না থাকলে আমি কী করতাম জানি না।

রাফি বলল,

—আমিও জানি না।

তৃষা হঠাৎ সেই নদীর পাড়ের দিনের কথা মনে করে ফেলল।

সে বলল,

—সেদিন আমি যখন তোর কাছে গিয়েছিলাম, তুই কাঁদছিলি।

রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—আমি কাঁদিনি।

—আবার মিথ্যা!

—চোখে পানি এসেছিল।

—কেন?

রাফি এবার আর লুকাল না।

—কারণ আমি ভাবছিলাম, তোকে হয়তো চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলব।

তৃষার চোখে পানি জমল।

সে ধীরে বলল,

—আমি যদি সেদিন না আসতাম?

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তাহলে হয়তো সারাজীবন আফসোস করতাম।

তৃষা মাথা নিচু করল।

—আমিও।

তারপর তৃষা ধীরে ধীরে রাফির সামনে এসে দাঁড়াল।

—রাফি।

—হুম?

—তুই কি আমাকে ভালোবাসিস?

রাফি এবারও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তৃষা অপেক্ষা করতে লাগল।

রাফি তার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

তারপর বলল,

—পাগলি নাকি তুই?

তৃষা হেসে বলল,

—প্রশ্নের উত্তর দে।

রাফি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে অবশেষে বলল,

—হ্যাঁ।

তৃষার চোখে আনন্দের পানি চলে এল।

রাফি মৃদু হেসে বলল,

—অনেকদিন ধরেই।

তৃষা বলল,

—তাহলে এতদিন বলিসনি কেন?

—তুইও তো বলিসনি।

—আমি ভয় পেয়েছিলাম।

—আমিও।

তৃষা হেসে বলল,

—দুজনেই বোকা।

রাফি মাথা নেড়ে বলল,

—একদম।

ছাদ থেকে নিচে তাকাতেই দেখা গেল, দুই পরিবারের সবাই তাদের খুঁজছে।

তৃষার মা দূর থেকে ডাকলেন,

—তৃষা! রাফি! কোথায় তোমরা?

তৃষা হেসে বলল,

—চল, সবাই ডাকছে।

রাফি বলল,

—চল।

দুজন পাশাপাশি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল।

হঠাৎ তৃষা বলল,

—রাফি।

—হুম?

—একটা কথা।

—বল।

—ছোটবেলায় তুই বলেছিলি, আমি তোর কথা শুনব।

রাফি হেসে বলল,

—মনে আছে।

—এখন থেকে তুই আমার কথা শুনবি।

রাফি বলল,

—আচ্ছা।

—সবসময়?

—সবসময়।

তৃষা মুচকি হেসে বলল,

—ভালো ছেলে।

রাফি বলল,

—এই কথাটা শুনতে ভালো লাগে।

তৃষা বলল,

—তাহলে মাঝে মাঝে বলব।

রাফি হেসে বলল,

—ঠিক আছে, পাগলি।

দুজনের হাসির শব্দে পুরো বাড়িটা যেন আরও আনন্দে ভরে উঠল।

দুই পাশের বাড়ির সেই ছোট্ট বন্ধুত্ব অবশেষে জীবনের সবচেয়ে আপন সম্পর্কে পরিণত হলো।

যে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল সাত বছরের এক ছোট্ট ছেলের কোলে এক নবজাতক মেয়েকে তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে, সেটাই এত বছর পর এসে পূর্ণতা পেল।

রাফি আর তৃষার গল্পে ছিল ঝগড়া, দুষ্টুমি, ভুল সিদ্ধান্ত, অভিমান আর না বলা অনেক কথা।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা বুঝেছিল—

কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে চিনতে আমাদের অনেক বছর লেগে যায়।

আর সেই মানুষটা যদি শৈশব থেকেই পাশে থাকে, তাহলে তাকে হারানোর ভয়টাই হয়তো সবচেয়ে বড় ভয়।

রাফি আর তৃষা একে অপরকে হারায়নি।

বরং এত বছরের বন্ধুত্বের হাত ধরে তারা শেষ পর্যন্ত একে অপরকেই খুঁজে পেয়েছে।

 

....
👁 601