সকাল থেকেই বাড়িটা অস্বাভাবিক ব্যস্ত।
বড় উঠানে প্যান্ডেল টাঙানো হয়েছে। বাড়ির সামনের রাস্তায় একের পর এক গাড়ি এসে থামছে। আত্মীয়স্বজনের ছোটাছুটি, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা নানা রকম খাবারের গন্ধ, হাসি-আনন্দ—সব মিলিয়ে পুরো বাড়িটাই যেন উৎসবের রঙে সেজেছে।
কিন্তু এই আনন্দের ভিড়েও একজন মানুষ যেন সম্পূর্ণ আলাদা।
রুদ্র।
বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের ব্যস্ততা দেখছিল সে। পরনে সাদা পাঞ্জাবি। চেহারায় কোনো উত্তেজনা নেই, আনন্দ নেই, এমনকি অস্বস্তিও নেই। শুধু এক ধরনের স্থিরতা।
তার হাতে ধরা চায়ের কাপটা অনেকক্ষণ আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে।
পেছন থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল,
—রুদ্র?
রুদ্র ঘুরে তাকাল।
—হুম?
মা কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
—আজ তোমার বিয়ে। অন্তত আজকের দিনটায় মুখটা একটু স্বাভাবিক রাখো।
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—আমি তো স্বাভাবিকই আছি।
—তুমি কখনো স্বাভাবিক থাকো না। সবসময় এমন মুখ করে থাকো, যেন পৃথিবীর সব দায়িত্ব তোমার একার।
রুদ্র কোনো উত্তর দিল না।
মা ধীরে ধীরে কাছে এসে বললেন,
—তুমি জানো, আমরা তোমাকে জোর করে বিয়ে দিতে চাইনি। কিন্তু তুমি বছরের পর বছর নিজেকে এভাবে আটকে রেখেছ। তোমার বয়স বাড়ছে। জীবনটা থেমে থাকে না, রুদ্র।
রুদ্র নিচের দিকে তাকাল।
তার চোখের সামনে হঠাৎ কয়েক বছর আগের একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।
ইরা।
হাসতে হাসতে বলছে,
—রুদ্র, তুমি এত গম্ভীর কেন? একদিন তোমাকে জোর করে হাসাতে হবে আমাকে।
রুদ্র চোখ বন্ধ করল।
স্মৃতিটা যতবার ফিরে আসে, ততবার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভারী হয়ে যায়।
ইরা তার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল। শুধু কাছের মানুষ নয়—তার ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় স্বপ্নও ছিল ইরাকে ঘিরে।
কিন্তু একটা দুর্ঘটনা সবকিছু শেষ করে দিয়েছিল।
সেদিনের পর রুদ্র বদলে গিয়েছিল।
ইরার জায়গায় কাউকে বসানোর কথা সে কখনো ভাবেনি।
মা ছেলের মুখের পরিবর্তন দেখে চুপ করে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর বললেন,
—মায়া খুব ভালো মেয়ে। অন্তত তাকে কষ্ট দিও না।
রুদ্র ধীর গলায় বলল,
—আমি কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি, মা।
—কিন্তু সে তো তোমার কোনো দোষ করেনি।
রুদ্র এবার মায়ের দিকে তাকাল।
—আমি চেষ্টা করব।
মা চলে গেলেন।
রুদ্র আবার বারান্দার রেলিংয়ে হাত রাখল।
তার মনে হলো, আজ সে শুধু একটা বিয়ে করছে না। নিজের জীবনের এমন একটা দরজা খুলছে, যেটা সে বহু বছর ধরে বন্ধ করে রেখেছিল।
অন্যদিকে একই সময়ে মায়াদের বাড়িতেও প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে।
ঘরের ভেতরে বসে আয়নার দিকে তাকিয়ে ছিল মায়া।
আজ তার বিয়ে।
কথাটা ভাবতেই নিজের অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
কয়েক মাস আগেও সে ভাবেনি তার জীবন এভাবে বদলে যাবে।
সায়ন ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বিশ্বাসের মানুষ।
মায়া সত্যিই বিশ্বাস করেছিল, একদিন তাদের সম্পর্ক পরিণতি পাবে।
কিন্তু একদিন সায়ন হঠাৎ চলে গেল।
কোনো ব্যাখ্যা নেই।
কোনো বিদায় নেই।
শুধু একটা ফোন বন্ধ হয়ে গেল, তারপর একে একে সব যোগাযোগও।
মায়া অনেকদিন অপেক্ষা করেছিল।
প্রথমে ভেবেছিল, সায়ন ফিরে আসবে।
তারপর ভেবেছিল, হয়তো কোনো সমস্যা হয়েছে।
শেষে বুঝেছিল—কেউ যদি সত্যিই থাকতে চায়, তাহলে তাকে এভাবে অন্ধকারে রেখে চলে যায় না।
সেদিনই মায়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে আর কারও জন্য নিজের জীবন থামিয়ে রাখবে না।
আজকের বিয়েটাও তার নিজের পছন্দে নয়।
পরিবারের পরিস্থিতি, কিছু পুরোনো সম্পর্কের দায়, আর দুই পরিবারের সিদ্ধান্ত—সবকিছু মিলিয়ে রুদ্রের সঙ্গে বিয়েটা ঠিক হয়েছে।
মায়া আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
—নতুন জীবন। এবার নিজের জন্য বাঁচব।
দরজা খুলে বান্ধবী নীলা ঢুকল।
—কী ভাবছিস?
মায়া হেসে বলল,
—ভাবছি, অচেনা একজন মানুষের সঙ্গে সারাজীবন কীভাবে কাটাব।
নীলা বলল,
—রুদ্রকে তো দেখেছিস।
—দেখেছি। লোকটার মুখ দেখে মনে হয়, জীবনে কোনোদিন হাসেনি।
নীলা হেসে ফেলল।
—শুনেছি খুব শান্ত, দায়িত্বশীল।
—শান্ত? আমার তো মনে হলো আমাকে দেখেও এমনভাবে তাকাচ্ছিল, যেন আমি তার জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
নীলা মুচকি হেসে বলল,
—তাহলে তোমাদের সংসার বেশ মজার হবে।
মায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
—মজার না, যুদ্ধ হবে।
বিকেলের দিকে বিয়ে সম্পন্ন হলো।
রুদ্র আর মায়া পাশাপাশি বসেছিল।
দুজনের মাঝখানে ছিল যথেষ্ট দূরত্ব।
কাজি যখন বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করলেন, চারপাশে সবাই আনন্দ করলেও রুদ্রের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না।
মায়াও চুপচাপ বসে রইল।
একসময় রুদ্র মৃদু গলায় বলল,
—আপনি চাইলে আমাকে কিছু বলতে পারেন।
মায়া তাকাল।
—কী বলব?
—যেমন... এই বিয়ে নিয়ে আপনার আপত্তি আছে কি না।
মায়া একটু হেসে বলল,
—আপনার আছে?
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—আছে।
মায়ার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
—তাহলে ভালো। অন্তত একটা বিষয়ে আমাদের মিল আছে।
রুদ্র তার দিকে তাকাল।
মায়া বলল,
—আমিও এই বিয়েতে নিজের ইচ্ছায় রাজি হইনি।
দুজনেই আবার চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর মায়া বলল,
—তবে একটা কথা।
—বলুন।
—আপনি যদি আমাকে আপনার জীবনে জায়গা দিতে না চান, সেটা পরিষ্কারভাবে বলবেন। আমি কারও করুণায় সংসার করতে চাই না।
রুদ্র স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—আমি কাউকে করুণা করি না।
—ভালো। আমিও কারও করুণা চাই না।
রুদ্র প্রথমবারের মতো সামান্য অবাক হলো।
মেয়েটা যতটা শান্ত মনে হয়েছিল, ততটা নয়।
মায়া আবার বলল,
—আর একটা কথা।
—কী?
—আমাকে আপনার অতীতের সঙ্গে তুলনা করবেন না।
রুদ্রের মুখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।
—আপনি আমার অতীত সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
মায়া শান্ত গলায় বলল,
—জানি না। জানতেও চাই না। যতক্ষণ না সেটা আমার বর্তমানকে প্রভাবিত করছে।
রুদ্র আর কিছু বলল না।
কিন্তু কথাটা তার মনে আটকে রইল।
রাত অনেক হয়েছে।
নতুন ঘরে বসে মায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে রুদ্র ঢুকল।
মায়া ঘুরে তাকাল।
রুদ্র বলল,
—আপনি বিছানায় ঘুমান। আমি সোফায় থাকব।
মায়া অবাক হলো।
—এটা কি আপনার নিয়ম?
—না। আমার সিদ্ধান্ত।
—ঠিক আছে।
রুদ্র সোফায় একটা বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ল।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—একটা প্রশ্ন করতে পারি?
—করুন।
—আপনি কি আমাকে একদমই পছন্দ করেন না?
রুদ্র ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
—আমি আপনাকে চিনি না।
—আর যদি চিনতে শুরু করেন?
রুদ্র এবার মায়ার দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর বলল,
—চেনার প্রয়োজন নেই।
মায়ার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।
তবু সে নিজের কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখল।
—ঠিক আছে। আমিও জোর করে কাউকে চিনতে চাই না।
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।
দুজন মানুষ একই ঘরে।
একজন অতীতের শূন্যতা নিয়ে।
অন্যজন অতীতের অপেক্ষা পেছনে ফেলে।
তাদের বিয়ে হয়েছে।
কিন্তু তাদের সংসার এখনো শুরু হয়নি।
বিয়ের পরের সকাল।
মায়ার ঘুম ভাঙল রান্নাঘর থেকে আসা বাসনের শব্দে। কিছুক্ষণ চোখ মেলে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ মনে পড়ল—এটা তার নিজের বাড়ি নয়।
এখন থেকে এই বাড়িটাই তার বাড়ি।
কিন্তু কথাটা মনে হতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হলো।
মায়া বিছানা থেকে উঠে জানালার পর্দা সরাল। সকালের নরম আলো ঘরে ঢুকতেই তার চোখ গেল সোফার দিকে।
সোফা খালি।
বালিশটা সুন্দর করে রাখা।
রুদ্র কোথায়?
মায়া দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল।
ডাইনিং রুমে রুদ্রের মা বসে ছিলেন। মায়াকে দেখেই হাসলেন।
—ঘুম কেমন হলো মা?
মায়া একটু ইতস্তত করে বলল,
—ভালো।
—রুদ্র তো অনেক আগেই বের হয়ে গেছে।
—কোথায়?
—অফিসে।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
—এত সকালে?
—ওর কাজটাই এমন। আর তুমি তো জানো, রুদ্র কখনো নিজের দায়িত্বে অবহেলা করে না।
মায়া চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর রুদ্রের মা বললেন,
—এসো, নাশতা করো।
মায়া বসতেই তিনি একটা প্লেট এগিয়ে দিলেন।
—রুদ্রের জন্যও একটা রেখে দিও। ও দুপুরে না ফিরলে অন্তত খেয়ে যাবে।
মায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
—ও কি বাড়িতে খায় না?
মা হেসে বললেন,
—খুব নিয়ম মেনে চলে। সময়মতো খাওয়া, সময়মতো ঘুম, কাজ—সবকিছুতেই নিয়ম।
মায়া মনে মনে বলল,
‘মানুষ না ঘড়ি?’
অফিসে বসেও রুদ্রের মন পুরোপুরি কাজে ছিল না।
বারবার মায়ার কথাগুলো মনে পড়ছিল।
‘আপনি যদি আমাকে আপনার জীবনে জায়গা দিতে না চান, সেটা পরিষ্কারভাবে বলবেন।’
মেয়েটার কথায় কোনো অভিযোগ ছিল না।
ছিল আত্মসম্মান।
রুদ্র ফাইল থেকে চোখ তুলে জানালার বাইরে তাকাল।
কেন জানি না, বিয়ের পর প্রথমবার তার মনে হলো—সে হয়তো অন্যায়ভাবে মায়াকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ইরার কথা মনে পড়তেই সেই ভাবনাটা থেমে গেল।
ইরার পর সে কাউকে নিজের কাছাকাছি আনতে চায়নি।
কারণ কাছের মানুষ হারানোর কষ্ট সে একবার পেয়েছে।
দ্বিতীয়বার সেই কষ্ট সহ্য করার সাহস তার নেই।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
রুদ্র ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখল, মায়ের কল।
—হ্যালো।
—কোথায় তুমি?
—অফিসে।
—বউকে একা রেখে এত তাড়াতাড়ি চলে আসা কি খুব জরুরি ছিল?
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—কাজ ছিল।
—কাজ তো প্রতিদিনই থাকবে। মেয়েটা নতুন এসেছে। অন্তত দুপুরে একবার ফোন করে খবর নাও।
রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলল,
—মা, ও তো ছোট বাচ্চা নয়।
—বাচ্চা না হলেও তোমার স্ত্রী।
রুদ্র কোনো উত্তর দিল না।
মা বললেন,
—আর শোনো, আজ সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি ফিরবে।
—কেন?
—মায়াকে নিয়ে বাইরে যাবে।
—আমি?
—হ্যাঁ, তুমি।
—মা, এসব আমার—
—রুদ্র!
মায়ের কণ্ঠ শুনেই রুদ্র থেমে গেল।
—বিয়েটা তুমি চাওনি, আমরা জানি। কিন্তু মেয়েটাকে শাস্তি দিও না।
ফোন কেটে গেল।
রুদ্র কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
এদিকে মায়া দুপুরের পর নিজের ঘরে বসে ছিল।
নতুন বাড়ির মানুষজন সবাই তাকে ভালোভাবেই গ্রহণ করেছে। শাশুড়ি তাকে মেয়ের মতোই দেখছেন। রুদ্রের ছোট বোন তুলি তো সকাল থেকেই তার সঙ্গে গল্প করছে।
তবু একটা জায়গায় এসে মায়ার মন বারবার আটকে যাচ্ছে।
রুদ্র।
লোকটা এতটাই নির্লিপ্ত কেন?
মায়া বিছানায় বসে মোবাইল হাতে নিল।
পুরোনো কিছু ছবি স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ সায়নের একটা ছবি সামনে চলে এল।
মায়ার আঙুল থেমে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতর পুরোনো কষ্টটা ফিরে এল।
সায়ন।
কেন চলে গিয়েছিল সে?
কেন কোনো উত্তর না দিয়ে?
মায়া ছবিটা বন্ধ করে দিল।
—না। আর না।
সে নিজেকেই বলল,
—অতীতকে পেছনে ফেলে এসেছি। আবার সেখানে ফিরে যাব না।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
তুলি দাঁড়িয়ে।
—ভাবি?
মায়া ফোনটা সরিয়ে রাখল।
—হুম?
—ভাইয়া ফোন করেছে।
মায়া একটু অবাক হয়ে বলল,
—আমাকে?
—না। মাকে। কিন্তু মা বলেছে তুমি যেন আজ সন্ধ্যায় তৈরি থাকো।
—কোথায় যাব?
তুলি রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,
—ভাইয়া তোমাকে নিয়ে যাবে।
মায়া চোখ ছোট করে বলল,
—আমাকে কোথাও নিয়ে যাওয়ার মতো মানুষ বলে মনে হয় তাকে?
তুলি হেসে ফেলল।
—ভাবি, তোমাদের দুজনকে নিয়ে আমার কিন্তু অনেক আশা।
—কী আশা?
—তোমরা সারাদিন ঝগড়া করবে, তারপর একদিন দেখব দুজনেই একে অপর ছাড়া থাকতে পারছ না।
মায়া বালিশ ছুড়ে মারল।
—যা তো!
তুলি হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল।
মায়াও হেসে ফেলল।
অনেকদিন পর এই বাড়িতে এসে অন্তত একজন মানুষ তাকে স্বাভাবিকভাবে হাসাতে পেরেছে।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা।
রুদ্র বাড়ি ফিরতেই মায়া বুঝল, তার স্বামীকে নিয়ে একটা সমস্যা আছে।
লোকটা দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রথমে ঘড়ির দিকে তাকাল।
তারপর জুতা খুলে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখল।
মায়া দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
রুদ্র তাকাতেই বলল,
—আপনি তৈরি হয়েছেন?
মায়া বলল,
—কোথাও যাওয়ার কথা ছিল নাকি?
—মা বলেনি?
—বলেছে। কিন্তু কোথায় যাব, সেটা বলেনি।
—চলুন।
—কোথায়?
—বাইরে।
মায়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—এভাবে কেউ কাউকে বাইরে নিয়ে যায়?
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
—কীভাবে নিয়ে যেতে হয়?
—কমপক্ষে জায়গাটার নাম বলা যায়।
—জানলে কী হবে?
—মানসিক প্রস্তুতি নেব।
রুদ্র কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—গাড়িতে উঠুন।
মায়া দাঁড়িয়ে রইল।
—আপনি সবসময় এভাবে আদেশ করেন?
—আমি তো শুধু বললাম—
—আপনার বলার ধরনটা আদেশের মতো।
রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলল,
—ঠিক আছে। অনুগ্রহ করে গাড়িতে উঠবেন?
মায়া মুচকি হাসল।
—এবার ঠিক আছে।
রুদ্র মাথা নাড়ল।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
প্রথম দশ মিনিট দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।
মায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
রুদ্র গাড়ি চালাচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত মায়াই নীরবতা ভাঙল।
—আপনি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন?
—হ্যাঁ।
—কেন?
—ভালো লাগে।
—কথা বলতে ভালো লাগে না?
—সব মানুষের সঙ্গে না।
মায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—আমার সঙ্গে তো একদমই না।
রুদ্র একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার সামনে তাকাল।
—আপনি অনেক কথা বলেন।
—আর আপনি কম বলেন।
—তাই ভারসাম্য হচ্ছে।
মায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হেসে ফেলল।
রুদ্রও বুঝতে পারল না, কেন তার নিজের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি চলে এসেছে।
তবে সে দ্রুত মুখটা স্বাভাবিক করে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা শান্ত রেস্টুরেন্টের সামনে থামল।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
—এখানে?
—হ্যাঁ।
—খেতে?
—আর কী করতে?
মায়া বলল,
—আপনার সঙ্গে প্রথমবার বাইরে এলাম। ভাবছিলাম হয়তো কোনো সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাবেন।
রুদ্র বলল,
—রেস্টুরেন্ট সুন্দর না?
—খাবারের জন্য সুন্দর।
দুজন ভেতরে ঢুকে বসে পড়ল।
খাবারের অর্ডার দেওয়ার সময় রুদ্র জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কী খাবেন?
—যা আপনি খাবেন।
—আমি যা খাব, সেটা আপনার ভালো নাও লাগতে পারে।
—তাহলে আমার পছন্দ জিজ্ঞেস করুন।
রুদ্র একটু থেমে বলল,
—আপনার পছন্দ কী?
মায়া মেনু হাতে নিয়ে বলল,
—ঝাল খাবার।
—এত ঝাল?
—খুব।
রুদ্র ওয়েটারকে কিছু অর্ডার করল।
খাবার আসার পর মায়া প্রথম কামড় দিয়েই বুঝল, রুদ্র তার জন্য আলাদা করে কম ঝালের খাবার অর্ডার করেছে।
সে তাকাল।
—আপনি তো বলেছিলেন, আমার পছন্দ জানেন না।
রুদ্র স্বাভাবিক গলায় বলল,
—জানতাম না। এখন জানলাম।
মায়া কিছু বলল না।
কেন জানি ছোট্ট একটা ব্যাপার তার মনে অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করল।
লোকটা মুখে যতই কঠিন হোক, সবকিছু হয়তো সে এতটা অযত্নে করে না।
খাওয়া শেষে ফেরার সময় মায়া গাড়ির জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বসেছিল।
হঠাৎ সে বলল,
—রুদ্র।
—হুম?
—আপনি কি কখনো কাউকে খুব ভালোবেসেছিলেন?
রুদ্রের হাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর বলল,
—হ্যাঁ।
মায়া আর প্রশ্ন করল না।
কিন্তু রুদ্র নিজে থেকেই বলল,
—সে এখন নেই।
মায়া ধীরে তার দিকে তাকাল।
রুদ্রের চোখে তখন এমন এক শূন্যতা, যা মায়া আগে কখনো দেখেনি।
মায়া নরম গলায় বলল,
—দুঃখিত।
রুদ্র কোনো উত্তর দিল না।
গাড়ির ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
কিন্তু এবার সেই নীরবতা আগের মতো অস্বস্তিকর লাগল না।
মায়া জানত না, রুদ্রের জীবনে ইরা নামে একজন ছিল।
আর রুদ্র জানত না, মায়ার জীবনে সায়ন নামে একজন এখনো অসমাপ্ত অধ্যায়ের মতো রয়ে গেছে।
দুজনেই নিজেদের অতীত লুকিয়ে একই পথে এগিয়ে চলেছে।
বিয়ের পর এক সপ্তাহ কেটে গেছে।
এই এক সপ্তাহে রুদ্র আর মায়ার সম্পর্কের খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। তবে আগের মতো একেবারে অচেনাও তারা আর নেই।
রুদ্র এখন জানে মায়া সকালে চা না খেলে মাথা ধরে। মায়া জানে, রুদ্র কাজ থেকে ফিরলে অন্তত আধঘণ্টা কারও সঙ্গে কথা বলতে চায় না। রুদ্র জানে মায়া বই পড়তে ভালোবাসে। মায়া জানে, রুদ্র রাত জেগে কাজ করার অভ্যাসটা এখনো ছাড়তে পারেনি।
একই বাড়িতে থেকেও তাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য দূরত্ব ছিল।
তবে সেই দূরত্বের মাঝেই ছোট ছোট কিছু পরিবর্তনও ঘটছিল।
সেদিন সকালে মায়া রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চা বানাচ্ছিল।
তুলি এসে বলল,
—ভাবি, ভাইয়ার চা হয়ে গেছে?
মায়া বলল,
—হ্যাঁ। কিন্তু উনি কোথায়?
—বাগানে।
মায়া ট্রে হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
বাগানের একপাশে রুদ্র দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। মায়া কাছে যেতেই সে ফোন রেখে দিল।
—কী?
মায়া চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল,
—আপনার চা।
রুদ্র কাপটা নিল।
—ধন্যবাদ।
মায়া কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
—আপনি আজ অফিসে যাবেন না?
—যাব।
—কখন?
—আর একটু পর।
মায়া চলে যেতে উদ্যত হলে রুদ্র হঠাৎ বলল,
—চা ভালো হয়েছে।
মায়া থেমে গেল।
তারপর ঘুরে তাকিয়ে বলল,
—সত্যি?
—হুম।
—আপনি সাধারণত কাউকে প্রশংসা করেন?
রুদ্র চুপ করে রইল।
মায়া হেসে বলল,
—বুঝেছি। আজকে বিরল ঘটনা ঘটেছে।
রুদ্রের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
মায়া সেটা দেখে অবাক হয়ে গেল।
এই প্রথম সে রুদ্রকে হাসতে দেখল।
খুব অল্প সময়ের জন্য।
কিন্তু হাসিটা সত্যি ছিল।
মায়া নিজের অজান্তেই তাকিয়ে রইল।
রুদ্র সেটা বুঝতে পেরে আবার মুখ গম্ভীর করে ফেলল।
—কী দেখছেন?
মায়া দ্রুত চোখ সরিয়ে বলল,
—কিছু না।
—তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
—যাচ্ছি।
মায়া চলে গেল।
কিন্তু যাওয়ার সময় তার মুখেও অজান্তে হাসি ছিল।
সেদিন দুপুরে হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো।
মায়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। আকাশ কালো হয়ে গেছে। বাতাসে গাছের পাতাগুলো উড়ছে।
হঠাৎ তার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
মায়া ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা শোনা গেল না।
—হ্যালো?
নীরবতা।
—কে বলছেন?
কল কেটে গেল।
মায়া ভ্রু কুঁচকে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর আবার কল এল।
এবারও একই ঘটনা।
মায়া ফোন কেটে দিয়ে নম্বরটা ব্লক করে দিল।
তারপর নিজেকে বোঝাল,
‘হয়তো ভুল নম্বর।’
কিন্তু মনের কোথাও একটা অস্বস্তি থেকে গেল।
সন্ধ্যায় রুদ্র বাড়ি ফিরতেই দেখল, মায়া বারান্দায় বসে বই পড়ছে।
সে জুতা খুলে ভেতরে ঢুকল।
মায়া তাকিয়ে বলল,
—আজ একটু দেরি হয়েছে।
রুদ্র অবাক হয়ে বলল,
—আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন?
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বইয়ের দিকে তাকাল।
—না তো।
—তাহলে?
—ঘড়ির দিকে তাকিয়েছিলাম।
রুদ্র মুচকি হেসে বলল,
—ঠিক আছে।
মায়া বই বন্ধ করে বলল,
—আপনার জন্য একটা কথা ছিল।
—বলুন।
—আজ একটা অচেনা নম্বর থেকে বারবার ফোন এসেছে।
রুদ্রের মুখ বদলে গেল।
—কী বলেছে?
—কিছু না। চুপ করে ছিল।
—নম্বরটা দেখান।
মায়া ফোন এগিয়ে দিল।
রুদ্র নম্বরটা দেখে বলল,
—আপনি ব্লক করেছেন?
—হ্যাঁ।
—ভালো করেছেন।
মায়া তাকিয়ে বলল,
—আপনি এত সিরিয়াস হলেন কেন?
—অচেনা নম্বর নিয়ে সাবধান থাকা ভালো।
—আপনি কি মনে করছেন কেউ আমাকে বিরক্ত করছে?
—জানি না।
কথাটা বলে রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—এমন কিছু হলে আমাকে বলবেন।
মায়া হালকা হাসল।
—আপনাকে কেন বলব?
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
—কারণ আপনি আমার স্ত্রী।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
‘আমার স্ত্রী।’
দুটো সাধারণ শব্দ।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে কথাটা তার মনে দাগ কেটে গেল।
রাতে মায়া ঘুমাতে যাওয়ার আগে দেখল রুদ্র ডেস্কে বসে কাজ করছে।
সে বিছানায় শুয়ে বলল,
—আপনি প্রতিদিন এত রাত পর্যন্ত কাজ করেন?
—হুম।
—ঘুমান কখন?
—যখন কাজ শেষ হয়।
মায়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—এভাবে শরীর খারাপ হয়ে যাবে।
রুদ্র চোখ না তুলে বলল,
—আমি ঠিক আছি।
—সব মানুষই অসুস্থ হওয়ার আগে বলে, ‘আমি ঠিক আছি।’
রুদ্র এবার তাকাল।
—আপনি কি আমার স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করছেন?
মায়া কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
—না। বাড়ির মানুষ হিসেবে বললাম।
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার কাজে মন দিল।
—ঠিক আছে।
মায়া চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে খেয়াল করল, রুদ্রের কাশি হচ্ছে।
একবার।
দুবার।
তারপর বারবার।
মায়া উঠে রান্নাঘরে গিয়ে এক গ্লাস পানি আর গরম পানি নিয়ে এল।
টেবিলে রেখে বলল,
—এটা খান।
রুদ্র অবাক হয়ে তাকাল।
—কী?
—গরম পানি।
—আমার দরকার নেই।
—কাশছেন যে।
—সামান্য।
—তবু খান।
রুদ্র গ্লাসটা হাতে নিল।
—ধন্যবাদ।
মায়া বলল,
—এত ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই।
তারপর আবার বিছানায় চলে গেল।
রুদ্র গ্লাসের দিকে তাকিয়ে রইল।
এত বছর পর কেউ তার ছোটখাটো বিষয় নিয়ে এভাবে চিন্তা করেছে।
অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো তার।
কিন্তু সে অনুভূতিটাকে নাম দেওয়ার চেষ্টা করল না।
পরদিন সকালে মায়া রান্নাঘরে ঢুকতেই রুদ্রের মা বললেন,
—মা, আজ তুমি একটু রুদ্রের সঙ্গে অফিসে যাবে?
মায়া অবাক।
—আমি?
—হ্যাঁ। ওর কিছু কাগজ তোমার কাছে রেখে যেতে হবে। আর তোমারও তো বাইরে বের হওয়া দরকার।
রুদ্র পাশ থেকে শুনে বলল,
—ওকে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমাকেও নিয়ে যেতে হবে না।
দুজন একসঙ্গে কথা বলায় মা হেসে ফেললেন।
—দেখেছ? দুজনের কথা বলার ধরনও এক।
রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলল,
—মা।
—ঠিক আছে, তোমরা নিজেরা ঠিক করো।
মা চলে গেলেন।
মায়া রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি আমাকে অফিসে নিতে চান না?
—আপনি যেতে চান?
—আপনি না চাইলে আমিও যাব না।
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—চলুন।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—কিন্তু একটু আগে তো বললেন—
—আমি মত বদলেছি।
মায়া হাসল।
—আপনার মত বদলায় এত দ্রুত?
—আপনার জন্যই হয়তো।
রুদ্র কথাটা বলেই থেমে গেল।
মায়াও থমকে গেল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
রুদ্র দ্রুত অন্যদিকে তাকাল।
—গাড়ি দশ মিনিট পর বের হবে।
মায়া কিছু না বলে ঘরে চলে গেল।
কিন্তু তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করতে লাগল।
অফিসে গিয়ে মায়া বুঝল, রুদ্রকে সবাই খুব সম্মান করে।
কেউ তার সামনে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না।
কেউ তাকে ভয়ও পায় না, কিন্তু তার দায়িত্ববোধ আর কাজের প্রতি কঠোরতা সবাই জানে।
রুদ্র মায়াকে নিজের কেবিনে বসিয়ে বলল,
—আপনি এখানে থাকুন। আমার কাজ শেষ হলে বের হব।
মায়া বলল,
—আমি কি এতটাই বিরক্তিকর যে আমাকে কোথাও যেতে দেবেন না?
রুদ্র তাকিয়ে বলল,
—আপনি চাইলে নিচে যেতে পারেন।
—না, থাকি।
রুদ্র কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।
মায়া চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটাকে বাইরে থেকে যতটা কঠিন লাগে, ভেতরে কি সত্যিই ততটা?
তার চোখে একটা অদ্ভুত ক্লান্তি আছে।
এমন ক্লান্তি, যেটা শুধু বেশি কাজের কারণে হয় না।
মায়া বুঝতে পারল, রুদ্রের ভেতরে এমন কিছু আছে, যা সে কাউকে জানাতে চায় না।
অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ গাড়ি থামল।
রুদ্র বলল,
—নামুন।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
—কোথায়?
রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা বইয়ের দোকান।
মায়া তাকিয়ে বলল,
—এখানে কেন?
—আপনি সেদিন বলেছিলেন বই পড়তে ভালোবাসেন।
মায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
—আপনার মনে আছে?
রুদ্র স্বাভাবিক গলায় বলল,
—কিছু কিছু কথা মনে থাকে।
মায়া গাড়ি থেকে নামল।
দুজন পাশাপাশি দোকানে ঢুকল।
মায়া বই দেখতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
রুদ্র একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল।
তার মনে হলো, মেয়েটা এই কয়েকদিনে অজান্তেই তার জীবনের নীরবতাকে একটু একটু করে বদলে দিচ্ছে।
এটা কি বিপজ্জনক?
রুদ্র জানে না।
সে শুধু জানে, মায়া এখন আর পুরোপুরি অচেনা নয়।
সেদিন রাতে রুদ্র ঘুমানোর আগে পুরোনো একটা বাক্স খুলল।
বাক্সের ভেতর ইরার কিছু ছবি, কয়েকটা চিঠি আর একটি পুরোনো ঘড়ি।
রুদ্র একটা ছবি হাতে নিতেই চোখ আটকে গেল।
ইরা হাসছে।
ছবির পেছনে লেখা—
‘কিছু মানুষকে হারানোর ভয় এত বেশি থাকে যে, তাদের কাছে নিজের মনের কথাটাও বলা হয় না।’
রুদ্রের বুক কেঁপে উঠল।
সে এতদিন ধরে একটা বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছে—
ইরার মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা ছিল।
কিন্তু ছবিটা হাতে নিয়ে আজ প্রথমবার তার মনে হলো, হয়তো সেই রাতের গল্পটা সে পুরোপুরি জানে না।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
মাত্র এক লাইন—
‘ইরার মৃত্যুর সত্যিটা জানতে চাইলে পুরোনো ঘটনাটা আবার খুঁজে দেখুন।’
রুদ্রের চোখ স্থির হয়ে গেল।
তারপর আরও একটি মেসেজ এল—
‘সবকিছু আপনি যেভাবে জানেন, সেভাবে ঘটেনি।’
রুদ্রের হাত কেঁপে উঠল।
বহু বছর ধরে চাপা দেওয়া অতীত যেন হঠাৎ দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আর অন্যদিকে, একই সময়ে মায়ার ফোনেও একটি মেসেজ এসে পৌঁছাল।
প্রেরকের নাম দেখে তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
সায়ন।
মেসেজে লেখা—
‘মায়া, আমাকে একবার কথা বলার সুযোগ দাও। তুমি যা ভাবছ, সত্যিটা তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন।’
মায়া ফোনটা শক্ত করে ধরে বসে রইল।
অতীত কি সত্যিই কখনো শেষ হয়?
নাকি মানুষ যত দূরেই পালাক, একদিন না একদিন সেটা ফিরে এসে বর্তমানের সামনে দাঁড়ায়?
সারা রাত মায়ার ঘুম হলো না।
বারবার ফোনের স্ক্রিনে একই নামটা ভেসে উঠছিল।
সায়ন।
একটা নাম, যেটা একসময় তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে আপন ছিল। অথচ সেই নামটাই এখন তার ভেতরে অস্বস্তি তৈরি করছে।
মায়া ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
সায়ন আবার মেসেজ করেছে।
‘আমাকে একবার কথা বলার সুযোগ দাও।’
মায়া ঠোঁট কামড়ে ফোনটা পাশে রেখে দিল।
না।
সে আর ফিরে যেতে চায় না।
যে মানুষটা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে, তার ফিরে আসার কারণ জানারও প্রয়োজন নেই।
কিন্তু মনের ভেতরের আরেকটা কণ্ঠ বলল,
‘যদি সত্যিই কোনো কারণ থেকে থাকে?’
মায়া চোখ বন্ধ করল।
এতদিন পর কেন?
বিয়ের পর কেন?
রুদ্রের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার পরই কেন সায়ন ফিরে এল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সে জানে না।
অন্যদিকে রুদ্রও ঘুমাতে পারেনি।
তার সামনে ছড়িয়ে আছে ইরার পুরোনো ছবিগুলো।
ফোনের মেসেজটা বারবার পড়ছিল সে।
‘সবকিছু আপনি যেভাবে জানেন, সেভাবে ঘটেনি।’
রুদ্রের মনে পড়ল সেই রাত।
বৃষ্টিভেজা রাস্তা।
ইরার ফোন।
তারপর একটা ফোনকল।
‘দুর্ঘটনা হয়েছে।’
এরপর হাসপাতালের করিডোর।
ডাক্তারের মুখ।
আর তার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা।
কিন্তু এত বছর ধরে একটা বিষয় সে কখনো ভেবে দেখেনি।
দুর্ঘটনার ঠিক আগে ইরা তাকে কী বলতে চেয়েছিল?
সেদিন ইরা তাকে ফোন করেছিল।
রুদ্র ব্যস্ত থাকায় ফোন ধরেনি।
কিছুক্ষণ পর আবার ফোন এসেছিল।
সেটাও ধরতে পারেনি।
তারপর আর কোনো ফোন আসেনি।
সেদিনের পর থেকে রুদ্র নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনি।
কিন্তু যদি ইরা তাকে এমন কিছু বলতে চেয়েছিল, যা সে জানত না?
রুদ্র ফোনটা হাতে নিল।
তার পুরোনো বন্ধু অর্ণবকে কল করল।
অনেকক্ষণ পর ওপাশ থেকে ঘুমজড়ানো কণ্ঠ,
—হ্যালো?
—অর্ণব, ঘুমাচ্ছিলি?
—হ্যাঁ। কী হয়েছে?
রুদ্র বলল,
—ইরার দুর্ঘটনার ব্যাপারে পুরোনো কিছু তথ্য দরকার।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর অর্ণব বলল,
—এত বছর পর?
—হ্যাঁ।
—কেন?
রুদ্র ধীরে বলল,
—মনে হচ্ছে আমি পুরো সত্যিটা জানি না।
অর্ণবের কণ্ঠ এবার গম্ভীর হয়ে গেল।
—তুই নিশ্চিত?
—না। তাই জানতে চাই।
—ঠিক আছে। কাল দেখা কর।
রুদ্র ফোন রেখে দিল।
তারপর পাশের ঘরের দিকে তাকাল।
মায়ার ঘরে আলো জ্বলছে।
সে কি জেগে আছে?
রুদ্র দরজার কাছে গিয়ে থামল।
কিছুক্ষণ পর দরজায় হালকা টোকা দিল।
কোনো উত্তর নেই।
আবার টোকা।
মায়া বলল,
—কে?
—আমি।
—কিছু বলবেন?
রুদ্র দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল না। দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে বলল,
—ঘুমাননি?
—না।
—কেন?
মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—একটা পুরোনো মানুষ ফিরে এসেছে।
রুদ্রের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ অনুভূত হলো।
সে ধীরে বলল,
—সায়ন?
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
—আপনি নামটা জানেন?
—আপনি ঘুমের মধ্যে একদিন নামটা বলেছিলেন।
মায়া কিছুটা অপ্রস্তুত হলো।
—আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই না।
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
—তাহলে কথা বলবেন না।
মায়া তাকিয়ে রইল।
—আপনি কিছু জিজ্ঞেস করবেন না?
—না।
—কেন?
রুদ্র শান্ত গলায় বলল,
—আপনার অতীত আপনার। আপনি যতটুকু বলতে চান, ততটুকুই বলবেন।
মায়া প্রথমবার অনুভব করল, রুদ্র তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে না।
বরং তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করছে।
মায়া ধীরে বলল,
—ধন্যবাদ।
রুদ্র মাথা নেড়ে চলে যেতে লাগল।
হঠাৎ মায়া বলল,
—রুদ্র।
সে থামল।
—হুম?
—আপনারও কি আজ কোনো পুরোনো স্মৃতি মনে পড়েছে?
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বলল,
—হ্যাঁ।
—ইরাকে?
রুদ্র অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
—আপনি নামটা জানলেন কীভাবে?
—আপনার মা একদিন বলেছিলেন।
রুদ্রের মুখে আবার সেই পুরোনো বিষণ্ণতা নেমে এল।
মায়া নরম গলায় বলল,
—আপনি চাইলে আমাকেও বলতে পারেন।
রুদ্র কোনো উত্তর দিল না।
শুধু বলল,
—শুভরাত্রি।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
মায়া অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন দুপুরে মায়া অবশেষে সায়নের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল।
একটা ক্যাফেতে বসে ছিল সে।
প্রায় দশ মিনিট পর সায়ন এল।
মায়ার চোখে পড়তেই সে থেমে গেল।
সায়ন আগের মতোই ছিল।
শুধু চোখে ক্লান্তি।
সে ধীরে ধীরে এসে সামনে বসল।
—মায়া।
মায়া ঠান্ডা গলায় বলল,
—কেন ডেকেছ?
সায়ন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—তুমি বিয়ে করেছ?
—হ্যাঁ।
—রুদ্র?
মায়া অবাক হলো।
—তুমি রুদ্রের নাম জানো?
সায়ন উত্তর দিল না।
মায়া এবার কঠিন গলায় বলল,
—তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে। কোনো কথা না বলে। কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে। এতদিন পর ফিরে এসে আমার বিয়ের খবর নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার তোমার নেই।
সায়ন মাথা নিচু করল।
—আমি জানি।
—তাহলে কেন এসেছ?
সায়ন ধীরে বলল,
—কারণ আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাইনি।
মায়া তিক্ত হেসে বলল,
—তাহলে?
—আমাকে বাধ্য করা হয়েছিল।
মায়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—কে?
সায়ন চারপাশে তাকাল।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
—তোমার বাবা।
মায়া যেন কথা হারিয়ে ফেলল।
—আমার বাবা?
—হ্যাঁ।
—কেন?
সায়ন বলল,
—তোমার বাবার ব্যবসার একটা বড় সমস্যা হয়েছিল। কিছু লোক তাকে চাপ দিচ্ছিল। তারা তোমার ক্ষতি করতে পারে—এমন হুমকি দিয়েছিল। তোমার বাবা আমাকে বলেছিলেন, আমি যদি তোমার জীবন থেকে সরে না যাই, তাহলে তোমাকে বিপদে ফেলা হবে।
মায়া স্থির হয়ে বসে রইল।
—তুমি আমাকে সত্যিটা বলোনি কেন?
সায়নের চোখ ভিজে উঠল।
—আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তোমার বাবার লোকেরা আমার পরিবারকেও হুমকি দিয়েছিল।
মায়ার চোখের সামনে এতদিনের সব স্মৃতি এলোমেলো হয়ে গেল।
তবু সে বলল,
—তাহলে এতদিন পর কেন?
—কারণ এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
—আর আমার জীবন?
সায়ন চুপ।
মায়া ধীরে উঠে দাঁড়াল।
—তুমি আমাকে ভালোবেসেছিলে কি না, সেটা এখন আর আমার জানার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তুমি সত্যিটা এতদিন লুকিয়েছ। সেই সিদ্ধান্তের ফল আমি একাই ভোগ করেছি।
সায়ন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—মায়া, আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিতে আসিনি।
মায়া থেমে গেল।
—তাহলে?
—শুধু সত্যিটা জানাতে এসেছি। আর একটা কথা বলতে—
সায়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তোমার বাবা তোমার বিয়েটা এত তাড়াতাড়ি কেন দিলেন, সেটা একদিন জানতে চাইবে।
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—কী বলতে চাইছ?
সায়ন উত্তর দেওয়ার আগেই তার ফোন বেজে উঠল।
সে ফোন দেখে মুখ বদলে ফেলল।
—আমাকে যেতে হবে।
—সায়ন!
সায়ন বেরিয়ে গেল।
মায়া হতবাক হয়ে বসে রইল।
সন্ধ্যায় রুদ্র অর্ণবের সঙ্গে দেখা করল।
অর্ণব একটা পুরোনো ফাইল সামনে রাখল।
—এগুলো আমি অনেক কষ্টে জোগাড় করেছি।
রুদ্র ফাইল খুলল।
প্রথম কয়েকটা কাগজ দেখে তার মুখ স্বাভাবিক ছিল।
তারপর একটা রিপোর্টে চোখ আটকে গেল।
—এটা কী?
অর্ণব বলল,
—দুর্ঘটনার গাড়ির ব্রেক নিয়ে রিপোর্ট।
রুদ্র কাগজটা হাতে নিল।
—এখানে তো লেখা, ব্রেক সিস্টেমে সমস্যা ছিল।
—হ্যাঁ।
—তাহলে?
অর্ণব ধীরে বলল,
—সমস্যাটা দুর্ঘটনার দিন হঠাৎ হয়নি।
রুদ্রের চোখ বড় হয়ে গেল।
—মানে?
—গাড়িটা দুর্ঘটনার কয়েকদিন আগেই সার্ভিসিং করা হয়েছিল। কিন্তু রিপোর্ট অনুযায়ী ব্রেকের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বদলানো হয়েছিল।
রুদ্রের গলা শুকিয়ে গেল।
—কে বদলেছিল?
অর্ণব বলল,
—সেটাই খুঁজে বের করতে হবে।
রুদ্র ফাইলটা শক্ত করে ধরে বলল,
—ইরা কি কিছু জানত?
অর্ণব উত্তর দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—সম্ভবত।
রুদ্রের বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল।
—তুই এতদিন আমাকে বলিসনি কেন?
—কারণ তখন তুই ভেঙে পড়েছিলি। আর প্রমাণও পুরোপুরি ছিল না।
রুদ্র চোখ বন্ধ করল।
ইরার শেষ ফোনকলটা আবার মনে পড়ল।
সে কি সত্যিই তাকে কিছু বলতে চেয়েছিল?
রাতে মায়া বাড়ি ফিরতেই দেখল রুদ্র বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
মায়া কাছে যেতেই রুদ্র বলল,
—কোথায় গিয়েছিলেন?
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—সায়নের সঙ্গে দেখা করতে।
রুদ্রের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
কিন্তু সে রাগ দেখাল না।
—কী বলেছে?
মায়া ধীরে ধীরে সব বলল।
রুদ্র মন দিয়ে শুনল।
তারপর বলল,
—আপনি তাকে বিশ্বাস করেন?
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
—জানি না।
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—আপনি চাইলে এই বিষয়টা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
—আপনি রাগ করেননি?
—আপনার অতীত নিয়ে আমার রাগ করার অধিকার নেই।
মায়ার চোখে হঠাৎ পানি এসে গেল।
সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল।
রুদ্র সেটা দেখে বলল,
—আপনি কাঁদছেন?
—না।
—মায়া—
—বললাম তো না।
রুদ্র আর কিছু বলল না।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর ধীরে বলল,
—আপনি একা নন।
মায়া তার দিকে তাকাল।
এই প্রথম রুদ্র নিজে থেকে এমন একটা কথা বলল।
কথাটা খুব ছোট।
কিন্তু মায়ার কাছে সেটা অনেক বড় হয়ে ধরা দিল।
সেই রাতেই দুটো ঘটনা ঘটল।
রুদ্র তার ঘরে বসে ইরার পুরোনো ফাইল দেখছিল।
হঠাৎ একটা পুরোনো খাম মেঝেতে পড়ে গেল।
খামটা খুলতেই ভেতর থেকে একটা কাগজ বের হলো।
ইরার হাতের লেখা।
মাত্র কয়েকটি লাইন।
‘রুদ্র, যদি আমার কিছু হয়, তাহলে প্রথমে তাকে খুঁজবে, যাকে আমি সেদিন ফোন করতে চেয়েছিলাম।’
রুদ্রের চোখ স্থির হয়ে গেল।
‘তাকে’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
সে?
নাকি অন্য কেউ?
অন্যদিকে মায়ার ফোনে আবার সায়নের মেসেজ এল।
‘তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো—আমাদের আলাদা করার পর তিনি রুদ্রের পরিবারকে কেন বেছে নিয়েছিলেন।’
মায়া মেসেজটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
তার বিয়েটা কি শুধু পরিবারের সিদ্ধান্ত ছিল?
নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো কারণ আছে?
একই রাতে রুদ্র আর মায়া নিজেদের ঘরে বসে একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করল।
তাদের অতীতের দুটি আলাদা গল্প যেন ধীরে ধীরে এক জায়গায় এসে মিলতে শুরু করেছে।
পরদিন সকালটা অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি নীরব ছিল।
মায়া ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইল। গত রাতের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে।
সায়নের কথা।
বাবার কথা।
আর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে রুদ্রের বলা একটা বাক্য—
‘আপনি একা নন।’
মায়া জানে না কেন কথাটা এতটা মনে ধরেছে।
হয়তো কারণ, দীর্ঘদিন পর কেউ তার কষ্টের সমাধান দিতে যায়নি। শুধু পাশে থাকার কথা বলেছে।
সে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল।
ডাইনিং টেবিলে রুদ্র বসে নাশতা করছিল।
মায়াকে দেখে সে একবার তাকাল।
—ঘুম হয়েছে?
—হ্যাঁ।
রুদ্র মাথা নেড়ে আবার নাশতায় মন দিল।
মায়া চুপচাপ তার বিপরীতে বসল।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।
শেষ পর্যন্ত মায়াই বলল,
—আপনি কি ইরার ব্যাপারে কিছু জানতে পেরেছেন?
রুদ্রের হাত থেমে গেল।
—হ্যাঁ।
—কী?
রুদ্র সরাসরি উত্তর দিল না।
—এখনো নিশ্চিত কিছু না।
—তবু?
রুদ্র ধীরে বলল,
—মনে হচ্ছে ইরার দুর্ঘটনাটা যতটা সহজ মনে হয়েছিল, আসলে ততটা ছিল না।
মায়া চুপ হয়ে গেল।
—আপনি কি সত্যিটা জানতে চান?
—হ্যাঁ।
—সত্যিটা যদি কষ্টের হয়?
রুদ্র তার দিকে তাকাল।
—কষ্টের হলেও জানতে চাই।
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
—তাহলে খুঁজে বের করুন।
রুদ্র কিছু বলল না।
কিন্তু মায়ার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এই মেয়েটা তার জীবনে আসার পর সে নিজের অতীতের সামনে দাঁড়ানোর সাহস পাচ্ছে।
সেদিন দুপুরে রুদ্র অফিসে যাওয়ার আগে মায়াকে বলল,
—আজ আমি একটু দেরি করব।
মায়া বলল,
—কেন?
—একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
—ইরার ব্যাপারে?
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—সাবধানে যাবেন।
রুদ্র দরজার কাছে গিয়ে থামল।
—আপনি অপেক্ষা করবেন?
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
—কিসের জন্য?
—আমি ফিরতে দেরি করলে।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
—আপনি ফিরবেন কি না, সেটা নিয়ে এখন আর চিন্তা করি না।
রুদ্রের মুখে সামান্য হাসি ফুটল।
—মিথ্যা কথা বলছেন।
—কীভাবে বুঝলেন?
—আপনি ভালো মিথ্যা বলতে পারেন না।
রুদ্র চলে গেল।
মায়া দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই বলল,
—আপনিও ভালোভাবে লুকাতে পারেন না।
সে জানে, রুদ্র যতটা শক্ত দেখায়, ভেতরে ততটা নয়।
অন্যদিকে রুদ্র দেখা করতে গেল ইরার পুরোনো গাড়ির মেকানিকের সঙ্গে।
বয়স হয়েছে লোকটার। নাম কাদের।
রুদ্র সামনে বসতেই কাদের কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি ইরার পরিচিত?
—আমি রুদ্র।
লোকটার মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
—আপনি?
—হ্যাঁ।
কাদের দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—অনেক বছর হয়ে গেছে।
—আমি কিছু জানতে চাই।
—কী?
—ইরার গাড়িটা দুর্ঘটনার কয়েকদিন আগে আপনার কাছে এসেছিল?
কাদের মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
—ব্রেকে কোনো সমস্যা ছিল?
লোকটা চুপ করে গেল।
রুদ্র টেবিলের ওপর হাত রাখল।
—আমি সত্যিটা জানতে চাই।
কাদের ধীরে বলল,
—ব্রেকে সমস্যা ছিল।
রুদ্রের চোখ সরু হয়ে এল।
—কী ধরনের?
—একটা অংশ বদলাতে হয়েছিল।
—কে গাড়ি নিয়ে এসেছিল?
কাদের এবার আরও অস্বস্তিতে পড়ল।
—ইরা নিজে না।
রুদ্রের বুক ধক করে উঠল।
—তাহলে কে?
—একজন ছেলে।
—নাম?
কাদের মাথা নিচু করল।
—আমি পুরো নাম জানি না।
—চেহারা?
—লম্বা। কালো শার্ট পরেছিল। হাতে একটা কালো ঘড়ি ছিল।
রুদ্রের মনে হলো, কোথাও যেন এই বর্ণনা সে শুনেছে।
—আর কিছু?
কাদের বলল,
—সে বলেছিল, গাড়িটা যেন এমনভাবে ঠিক করা হয় যাতে মালিক বুঝতে না পারে যে আগে সমস্যা ছিল।
রুদ্র হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
—আপনি আমাকে এতদিন আগে বলেননি কেন?
কাদের কাঁপা গলায় বলল,
—ভয় পেয়েছিলাম।
—কার?
কাদের উত্তর দিল না।
রুদ্র বুঝল, ব্যাপারটা অনেক গভীর।
সন্ধ্যায় মায়া বারান্দায় বসে ছিল।
আকাশে মেঘ জমেছে।
রুদ্রের ফেরার কথা ছিল রাত দশটার মধ্যে।
সাড়ে দশটা।
এগারোটা।
মায়া বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।
নিজের ওপরই বিরক্ত লাগছিল তার।
‘আমি কেন অপেক্ষা করছি?’
সে উঠে ঘরে চলে যেতে চাইছিল, ঠিক তখনই গেটের বাইরে গাড়ির আলো দেখা গেল।
রুদ্র ফিরেছে।
মায়া জানালার আড়াল থেকে তাকিয়ে রইল।
রুদ্র গাড়ি থেকে নেমে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।
মায়া নিচে গিয়ে বলল,
—এত দেরি হলো?
রুদ্র অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
—আপনি এখনো জেগে?
—হুম।
—অপেক্ষা করছিলেন?
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না। ঘুম আসছিল না।
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—ঠিক আছে।
তারপর ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ মাথা ঘুরে দেয়ালে হাত রাখল।
মায়া দ্রুত এগিয়ে এল।
—কী হয়েছে?
—কিছু না।
—আপনি ঠিক নেই।
—আমি ঠিক আছি।
মায়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—এই কথাটা আপনি প্রতিদিন বলেন।
রুদ্র কিছু বলার আগেই মায়া তার হাত ধরে সোফায় বসিয়ে দিল।
—বসুন।
—মায়া, আমি—
—চুপ করুন।
রুদ্র অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
মায়া পানি এনে দিল।
—খান।
রুদ্র পানি খেল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
—আপনি এত চিন্তা করছেন কেন?
মায়া ধীরে বলল,
—কারণ আপনি আমার স্বামী।
রুদ্রের চোখ স্থির হয়ে গেল।
এই প্রথম মায়া কথাটা এত স্বাভাবিকভাবে বলল।
দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব।
তারপর মায়া বলল,
—আজ কী জানতে পেরেছেন?
রুদ্র সব কথা বলল না।
শুধু বলল,
—ইরার গাড়ি দুর্ঘটনার আগে কেউ ইচ্ছা করে নষ্ট করেছিল।
মায়া হতবাক হয়ে গেল।
—মানে?
—আমি এখনো নিশ্চিত নই। কিন্তু প্রমাণের কিছু অংশ আছে।
—আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—আমি ভয় পাই না।
মায়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—মিথ্যা।
রুদ্র চুপ হয়ে গেল।
মায়া বলল,
—আপনি ইরাকে হারানোর পরও সেই দিনটার মধ্যে আটকে আছেন।
রুদ্র এবার চোখ সরিয়ে নিল।
—হয়তো।
মায়া ধীরে বলল,
—আপনি চাইলে বেরিয়ে আসতে পারেন।
রুদ্র তার দিকে তাকাল।
—কীভাবে?
—অতীতকে ভুলে গিয়ে নয়। সত্যিটা মেনে নিয়ে।
রুদ্র কিছু বলল না।
মায়ার কথাটা তার মনে গেঁথে গেল।
পরদিন বিকেলে মায়া বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেল।
বাবা তাকে দেখে অবাক হলেন।
—হঠাৎ এসেছিস?
মায়া সরাসরি বলল,
—সায়ন আমার সঙ্গে দেখা করেছে।
বাবার মুখের রঙ বদলে গেল।
—সায়ন?
—হ্যাঁ।
—সে কী বলেছে?
—বলেছে, আপনি তাকে আমার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
বাবা চুপ।
মায়ার চোখে অবিশ্বাস।
—সত্যি?
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমি যা করেছি, তোমার ভালোর জন্য করেছি।
—আমার ভালো?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমাকে সত্যিটা বলেননি কেন?
বাবা চুপ করে রইলেন।
মায়া এবার কঠিন গলায় বলল,
—আর আমার বিয়ের ব্যাপারে? আপনি কি রুদ্রকে আগে থেকেই চিনতেন?
বাবা এবার তার দিকে তাকালেন।
—হ্যাঁ।
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—কীভাবে?
—রুদ্রের বাবা আর আমি অনেক বছর ধরে ব্যবসায়িকভাবে পরিচিত।
—তাহলে আমার বিয়েটা কি আগে থেকেই ঠিক করা ছিল?
বাবা কিছু বললেন না।
মায়া ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, তার বিয়ের পেছনে এমন কিছু আছে যা তাকে জানানো হয়নি।
সে উঠে দাঁড়াল।
—আমি সব জানতে চাই।
বাবা বললেন,
—মায়া, কিছু সত্যি না জানাই ভালো।
মায়া চোখে পানি নিয়ে বলল,
—এই কথাটা সবাই কেন বলে? যে সত্যি জানলে কষ্ট হবে?
তারপর সে বেরিয়ে গেল।
সেদিন রাতে বাড়িতে ফিরে মায়া দেখল রুদ্র তার ঘরে বসে আছে।
তার সামনে একটা পুরোনো ছবি।
মায়া কাছে গিয়ে দেখল—
ইরা।
কিন্তু ছবির পাশে আরেকজন দাঁড়িয়ে।
একজন যুবক।
মায়া ছবিটা দেখে থমকে গেল।
—এই মানুষটা কে?
রুদ্র বলল,
—জানি না।
—আপনি জানেন না?
—ছবিটা ইরার পুরোনো জিনিসের মধ্যে পেয়েছি।
মায়া ছবিটা হাতে নিল।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল লোকটার হাতে।
একটা কালো ঘড়ি।
তার মনে পড়ল সায়নের কথা।
সায়নেরও এমন একটা কালো ঘড়ি ছিল।
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—রুদ্র...
—হুম?
—এই ছবিটা আমাকে একটু দেখতে দেবেন?
রুদ্র ছবিটা এগিয়ে দিল।
মায়া ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
—আমি হয়তো এই মানুষটাকে চিনি।
রুদ্রের চোখে বিস্ময়।
—কে?
মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে সায়নের নাম।
মায়া ফোন ধরল না।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর একটা মেসেজ এল।
‘ছবিটা পেয়েছ? তাহলে এখন তুমি বুঝতে পারছ, কেন আমি তোমার জীবন থেকে চলে গিয়েছিলাম।’
মায়ার হাত কেঁপে উঠল।
রুদ্র মেসেজটা পড়ে ফেলেছে।
দুজনেই একে অপরের দিকে তাকাল।
এবার তাদের অতীত শুধু আলাদা কোনো গল্প নয়।
দুটি অতীত যেন একই রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
রুদ্র ধীরে বলল,
—মায়া, সায়নকে তুমি কতটা চিনতে?
মায়া কাঁপা গলায় বলল,
—আমি ভেবেছিলাম আমি ওকে খুব ভালোভাবে চিনি।
রুদ্র ছবিটার দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
—হয়তো আমাদের দুজনেরই ধারণা ভুল ছিল।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
আর সেই মুহূর্তে মায়ার মনে প্রথমবার একটা ভয় জন্ম নিল—
রুদ্রের অতীত আর তার অতীত যদি একই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তাহলে তাদের এই বিয়েটাও কি নিছক কাকতালীয়?
মায়ার হাত থেকে ছবিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
রুদ্র দ্রুত ছবিটা নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল।
—তুমি নিশ্চিত, লোকটাকে চেনো?
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
—চিনি... কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছি না।
—সায়ন?
—হ্যাঁ।
রুদ্র ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তাহলে ইরা আর সায়নের মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল?
মায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
—আমি জানি না। সায়ন কখনো ইরার কথা বলেনি।
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আর তুমি বলেছিলে, সায়নের হাতে এমন একটা কালো ঘড়ি ছিল?
—হ্যাঁ। বহু বছর আগে থেকেই।
রুদ্র ছবিটা আবার হাতে নিল।
—এই ছবিটা কখন তোলা হয়েছিল?
—জানি না।
—ইরা মারা যাওয়ার আগে?
—সম্ভবত।
দুজনেই চুপ হয়ে গেল।
হঠাৎ রুদ্রের মনে একটা প্রশ্ন এল।
—সায়ন কি তোমার বাবার সঙ্গে কখনো দেখা করেছিল?
মায়া ভেবে বলল,
—হ্যাঁ। কয়েকবার।
—কেন?
—আমি ভেবেছিলাম ব্যবসার কোনো কাজে।
রুদ্র ধীরে বলল,
—তোমার বাবা বলেছিলেন, তিনি সায়নকে তোমার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু যদি তার কারণ শুধু তোমাদের সম্পর্ক না হয়?
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—তাহলে?
—হয়তো সায়ন এমন কিছু জানত, যা তোমার বাবা চাইতেন না তুমি জানো।
মায়া কিছু বলল না।
তার মনে হলো, যতই তারা সত্যের কাছে যাচ্ছে, ততই সবকিছু আরও জটিল হয়ে উঠছে।
পরদিন সকালে মায়া খুব চুপচাপ ছিল।
রুদ্র নাশতার টেবিলে বসে কয়েকবার তার দিকে তাকাল।
শেষ পর্যন্ত বলল,
—আজও কি ছবিটার কথা ভাবছ?
—হ্যাঁ।
—চাইলে আমার সঙ্গে যেতে পারো।
মায়া তাকাল।
—কোথায়?
—অর্ণবের কাছে।
—ইরার ব্যাপারে?
—হ্যাঁ।
মায়া কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—আমি যাব।
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
—ঠিক আছে।
তুলি পাশ থেকে সব শুনছিল।
সে হেসে বলল,
—ভাবি, তোমরা এখন একসঙ্গে গোয়েন্দাগিরিও করছ?
মায়া তাকিয়ে বলল,
—তুলি, তুমি চুপ করো।
তুলি হেসে চলে গেল।
রুদ্রের মুখেও সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
মায়া সেটা দেখে বলল,
—আপনি হাসলেন?
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে বলল,
—না।
—আমি দেখেছি।
—ভুল দেখেছেন।
—আপনার হাসিও আপনার মতো জেদি।
রুদ্র মাথা নাড়িয়ে বলল,
—আপনি খুব বেশি কথা বলেন।
মায়া মুচকি হেসে বলল,
—আপনি এখন আগের চেয়ে বেশি কথা বলেন।
রুদ্র উত্তর দিল না।
কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করল।
অর্ণবের বাসায় পৌঁছাতেই সে মায়াকে দেখে কিছুটা অবাক হলো।
—তুই মায়াকে নিয়ে এসেছিস?
রুদ্র বলল,
—হ্যাঁ। ও সবকিছু জানে।
অর্ণব মাথা নেড়ে বলল,
—তাহলে বসো।
রুদ্র ছবিটা বের করল।
—এই ছবিটা পেয়েছি।
অর্ণব ছবিটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল।
তারপর তার মুখের ভাব বদলে গেল।
—এই লোকটাকে আমি চিনি।
রুদ্র দ্রুত বলল,
—কে?
অর্ণব বলল,
—নাম ছিল সায়ন।
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—আপনি তাকে চিনতেন?
অর্ণব বলল,
—ইরার মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ওর সঙ্গে দু-একবার দেখা হয়েছিল।
রুদ্রের চোখ সরু হয়ে গেল।
—কেন?
—ইরা কিছু একটা নিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলত। আমি পুরো বিষয়টা জানতাম না।
মায়া ধীরে বলল,
—সায়ন কি ইরাকে চিনত?
অর্ণব বলল,
—হ্যাঁ।
মায়ার মুখ শুকিয়ে গেল।
রুদ্র বলল,
—আরও কিছু?
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—ইরা একবার আমাকে বলেছিল, সে এমন একটা বিষয় জেনে গেছে, যেটা প্রকাশ করলে কয়েকজন বড় মানুষ বিপদে পড়বে।
রুদ্র উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—কী বিষয়?
—আমি জানি না।
—তাহলে সায়ন?
—সম্ভবত জানত।
মায়া হঠাৎ বলল,
—তাহলে সায়ন আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কারণ...
অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—হয়তো তুমি যা ভাবছ, তার চেয়ে অনেক বড় কিছু।
ফিরে আসার পথে গাড়িতে দুজনেই চুপ।
অনেকক্ষণ পর মায়া বলল,
—আপনি কি আমার ওপর রাগ করছেন?
রুদ্র অবাক হয়ে তাকাল।
—কেন?
—সায়নকে নিয়ে।
—না।
—আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, আমি এতদিন তাকে বিশ্বাস করেছি।
রুদ্র ধীরে বলল,
—আমি ভাবছি, তুমি যাকে চিনতে বলে মনে করেছিলে, হয়তো তাকে পুরোপুরি চিনতে পারোনি।
মায়া জানালার বাইরে তাকাল।
—আমার সবকিছু এত জটিল কেন?
রুদ্র বলল,
—সব মানুষের জীবনেই কিছু জটিলতা থাকে।
—আপনার জীবনেও?
—হ্যাঁ।
মায়া ধীরে বলল,
—ইরার জন্য?
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—ইরার জন্য।
তারপর গাড়িতে আবার নীরবতা।
কিছুক্ষণ পর রুদ্র বলল,
—তুমি চাইলে সায়নের সঙ্গে আর দেখা না করলেও পারো।
মায়া বলল,
—আমি আর ওর কাছে ফিরে যেতে চাই না।
রুদ্রের হাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হলো।
—নিশ্চিত?
মায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—হ্যাঁ।
কয়েক সেকেন্ড চোখাচোখি হলো।
মায়া ধীরে বলল,
—কারণ আমি এখন অন্য একটা জীবন বেছে নিয়েছি।
রুদ্র কিছু বলল না।
কিন্তু তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল।
সেদিন সন্ধ্যায় মায়া রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিল।
রুদ্রের মা বললেন,
—আজ রুদ্রের পছন্দের খাবারটা রান্না করো।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
—ওর পছন্দ কী?
—তুমি জানো না?
—না।
মা হেসে বললেন,
—তাহলে জেনে নাও।
মায়া কয়েকটা খাবারের নাম বলল।
মা মাথা নেড়ে বললেন,
—না।
শেষে মায়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—তাহলে কী খায় মানুষটা?
ঠিক তখনই পেছন থেকে রুদ্রের কণ্ঠ,
—যা রান্না হয় তাই খাই।
মায়া চমকে ঘুরে দাঁড়াল।
—আপনি এখানে?
—হ্যাঁ।
—কিছু শুনেছেন?
—সব।
মায়া অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
রুদ্র বলল,
—আমার জন্য আলাদা কিছু করতে হবে না।
মায়া বলল,
—আপনার মা তো বললেন—
—মা অনেক কিছু বলেন।
মা পাশ থেকে হেসে বললেন,
—তোমরা দুজন নিজেদের মতো করো।
তিনি চলে গেলেন।
মায়া বলল,
—আপনি কি সবসময় মায়ের কথা এভাবে এড়িয়ে যান?
—সবসময় না।
—আজ এড়িয়ে গেলেন কেন?
—কারণ আপনি রান্না করতে গিয়ে বিপদ ঘটাতে পারেন।
মায়া চোখ বড় করে বলল,
—মানে?
—আপনি সেদিন লবণের বদলে চিনি দিয়েছিলেন।
মায়া লজ্জায় পড়ে গেল।
—ওটা ভুলে হয়েছিল।
রুদ্র হেসে ফেলল।
মায়া তাকিয়ে রইল।
—আবার হাসছেন!
রুদ্র বলল,
—আপনার মুখটা দেখলে হাসি পায়।
—আপনি খুব খারাপ।
—জানি।
মায়া প্রথমবার তার সঙ্গে মন খুলে হাসল।
রাতের খাবারের পর দুজন ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
হালকা বাতাস।
শহরের আলো দূরে ঝিলমিল করছে।
মায়া বলল,
—রুদ্র।
—হুম?
—আপনি কি এখনো আমাকে দূরে রাখতে চান?
রুদ্র উত্তর দিতে পারল না।
মায়া বলল,
—বিয়ের দিন বলেছিলেন, আমাকে চেনার প্রয়োজন নেই।
রুদ্র ধীরে বলল,
—তখন বলেছিলাম।
—এখন?
রুদ্র তার দিকে তাকাল।
—এখন মনে হয়, কথাটা ভুল ছিল।
মায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
—কেন?
—কারণ আপনাকে না চিনে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
মায়া কিছু বলতে পারল না।
রুদ্র আবার আকাশের দিকে তাকাল।
—আপনি আমার জীবনে আসার পর অনেক কিছু বদলেছে।
—খারাপভাবে?
—সবকিছু না।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
—ভালোভাবে বদলেছে?
রুদ্র এবার তার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
—হয়তো।
দুজনেই চুপ করে রইল।
কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যে এবার দূরত্ব ছিল না।
ছিল অস্বীকার করা এক ধরনের টান।
কয়েক দিন পর রুদ্র ইরার পুরোনো কিছু জিনিস গোছাতে বসেছিল।
একটা ডায়েরি পেল।
ডায়েরির বেশিরভাগ পাতা ফাঁকা।
শেষের দিকে কয়েকটি পৃষ্ঠা ছেঁড়া।
একটা পাতায় শুধু লেখা—
‘সায়নকে বিশ্বাস করা যাবে না।’
রুদ্রের চোখ স্থির হয়ে গেল।
তারপর নিচে আরেকটা লাইন—
‘কিন্তু সায়ন সবকিছুর জন্য দায়ী নয়।’
রুদ্রের মাথা ঘুরে গেল।
সায়ন তাহলে আসলে কে?
সে কি শত্রু?
নাকি এমন একজন, যে কোনো বড় সত্যের মধ্যে আটকে গিয়েছিল?
ঠিক তখনই মায়া ঘরে ঢুকল।
রুদ্র ডায়েরিটা তার হাতে দিল।
মায়া লেখা পড়ল।
তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—তাহলে সায়ন...
রুদ্র বলল,
—আমরা এখনো জানি না।
হঠাৎ দরজার বাইরে শব্দ হলো।
দুজনেই তাকাল।
কেউ যেন দ্রুত সরে গেল।
রুদ্র ছুটে দরজা খুলল।
করিডোর খালি।
কিন্তু মেঝেতে একটা ছোট খাম পড়ে আছে।
রুদ্র খামটা তুলে খুলল।
ভেতরে একটা পুরোনো ছবি।
ছবিতে ইরা, সায়ন এবং আরও একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
তৃতীয় ব্যক্তির মুখ দেখে মায়ার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে কাঁপা গলায় বলল,
—এটা... আমার বাবা।
রুদ্র ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—তাহলে তোমার বাবা ইরাকে চিনতেন।
মায়ার চোখে পানি এসে গেল।
—আর তিনি আমাকে কখনো কিছু বলেননি।
রুদ্র ছবিটা শক্ত করে ধরে বলল,
—আমাদের দুজনের বিয়ের পেছনেও হয়তো এই মানুষগুলোর কোনো পরিকল্পনা ছিল।
মায়া তাকাল তার দিকে।
—আপনি কি মনে করেন, আমাদের বিয়েটাও এই রহস্যের অংশ?
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—আমি জানি না।
তারপর মায়ার হাতের দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে বলল,
—কিন্তু একটা বিষয় জানি।
—কী?
—যে কারণেই আমাদের বিয়ে হয়ে থাকুক, এখন তোমাকে এই সবকিছুর মধ্যে একা ছাড়ব না।
মায়ার চোখ ভিজে উঠল।
সে কিছু বলতে পারল না।
রুদ্রও আর কিছু বলল না।
কিন্তু সেদিন প্রথমবার তাদের সম্পর্কটা শুধু স্বামী-স্ত্রীর আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের মধ্যে থাকল না।
তার মধ্যে তৈরি হলো বিশ্বাসের একটা ছোট্ট জায়গা।
পরদিন সকাল থেকেই মায়ার মনটা অস্থির।
গত রাতের ছবিটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
ইরা।
সায়ন।
আর তার বাবা।
তিনজন মানুষ, যাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকার কথা সে কখনো কল্পনাও করেনি।
মায়া ডাইনিং টেবিলে বসে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুপ করে ছিল।
রুদ্র বিপরীত পাশে বসে অফিসের কিছু কাগজ দেখছিল।
শেষ পর্যন্ত মায়াই বলল,
—আপনি কি আজ বাবার সঙ্গে কথা বলবেন?
রুদ্র কাগজ থেকে চোখ তুলল।
—হ্যাঁ।
—আমি সঙ্গে যাব।
—তুমি নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
রুদ্র কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
—ঠিক আছে।
মায়া চুপ করে গেল।
তারপর রুদ্র বলল,
—তবে একটা কথা।
—কী?
—যা শুনবে, তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রেখো।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
—এখন আর কিছুতেই অবাক হই না।
রুদ্র ধীরে বলল,
—আমি চাই না তুমি নিজের পরিবারকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়ো করে নাও।
মায়া তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটা এত কম কথা বলে, অথচ যখন বলে, তখন কথাগুলো অদ্ভুতভাবে ভরসা দেয়।
দুপুরে তারা মায়ার বাবার বাড়িতে পৌঁছাল।
মায়ার বাবা তাদের একসঙ্গে দেখে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লেন।
—রুদ্র, তুমি এখানে?
রুদ্র শান্ত গলায় বলল,
—কিছু কথা জানতে এসেছি।
বাবা বুঝতে পারলেন, বিষয়টা সাধারণ নয়।
—কী কথা?
মায়া টেবিলের ওপর ছবিটা রাখল।
বাবার মুখের রঙ বদলে গেল।
কয়েক সেকেন্ড তিনি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
—এটা কোথায় পেয়েছ?
মায়া বলল,
—আপনার মেয়ের কাছ থেকে সত্যি লুকিয়ে রেখে আর কতদিন চলবে?
বাবা চোখ বন্ধ করলেন।
—মায়া, সবকিছু তোমাকে বলা হয়নি। কিন্তু তার কারণ ছিল।
রুদ্র বলল,
—ইরাকে আপনি চিনতেন?
বাবা রুদ্রের দিকে তাকালেন।
—হ্যাঁ।
—কীভাবে?
—ব্যবসায়িক একটা বিষয়ের সূত্রে।
রুদ্রের কণ্ঠ কঠিন হলো।
—শুধু ব্যবসা?
বাবা চুপ।
মায়া বলল,
—সায়নও কি এই ব্যাপারের সঙ্গে যুক্ত ছিল?
বাবা এবার মাথা নিচু করলেন।
—হ্যাঁ।
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—তাহলে সায়ন আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কারণ সত্যি ছিল?
বাবা বললেন,
—আংশিক।
—আংশিক মানে?
—সায়ন তোমাকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু সে পুরো সত্যিটা জানত না।
রুদ্র দ্রুত বলল,
—কী সত্যি?
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—ইরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পেরেছিল। এমন কিছু তথ্য, যা প্রকাশ পেলে কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষ বিপদে পড়ত।
রুদ্রের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
—তারপর?
—ইরা আমাকে সাহায্য করতে বলেছিল।
—আপনি তাকে সাহায্য করেছিলেন?
বাবা মাথা নেড়ে বললেন,
—চেষ্টা করেছিলাম।
মায়া অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে বলল,
—তাহলে ইরা মারা গেল কীভাবে?
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
বাবা ধীরে বললেন,
—দুর্ঘটনার আগের রাতে ইরা আমাকে ফোন করেছিল।
রুদ্রের বুক কেঁপে উঠল।
—সে কী বলেছিল?
—বলেছিল, সে বিপদে আছে।
রুদ্র টেবিলে হাত রাখল।
—আপনি আমাকে কেন বলেননি?
—কারণ তখন তুমি ভেঙে পড়েছিলে। আর আমি ভেবেছিলাম, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
রুদ্র দাঁত চেপে বলল,
—সবকিছু শেষ হয়নি।
বাবা মাথা নিচু করলেন।
—না।
মায়া এবার বলল,
—আমার বিয়েটা?
বাবা তার দিকে তাকালেন।
—তোমার বিয়ের সঙ্গে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।
মায়া তৎক্ষণাৎ বলল,
—সায়ন বলেছে, আপনি রুদ্রের পরিবারকে আগে থেকেই চিনতেন।
—চিনতাম।
—তাহলে?
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—তোমার সঙ্গে রুদ্রের বিয়েটা আমার পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু যখন প্রস্তাবটা আসে, আমি রাজি হয়ে যাই।
—কেন?
বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—কারণ আমি জানতাম, রুদ্র দায়িত্বশীল মানুষ। আর তোমাকে এমন একজন মানুষের কাছে দেখতে চেয়েছিলাম, যে তোমাকে নিরাপদ রাখবে।
মায়া কিছু বলতে পারল না।
রুদ্রও নীরব।
কিন্তু তার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরছে—
যদি মায়ার বাবা এত কিছু জানতেন, তাহলে এত বছর তিনি চুপ ছিলেন কেন?
বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে কেউ কথা বলল না।
অনেকক্ষণ পর মায়া বলল,
—আমি বাবাকে ঘৃণা করতে পারছি না।
রুদ্র বলল,
—তোমার উচিতও না।
—কিন্তু তিনি আমাকে সব বলেননি।
—হয়তো তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছেন।
মায়া জানালার বাইরে তাকাল।
—সবাই আমাকে বাঁচাতে গিয়ে আমার জীবনটাই জটিল করে ফেলেছে।
রুদ্র হালকা হাসল।
—কখনো কখনো সত্যি লুকিয়ে রাখাও এক ধরনের ভুল।
মায়া তার দিকে তাকাল।
—আপনি কি ইরার ব্যাপারে কাউকে দোষ দেন?
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—নিজেকে।
মায়া অবাক হলো।
—কেন?
—সেদিন ও আমাকে ফোন করেছিল। আমি ধরিনি।
—আপনি জানতেন না কী হয়েছিল।
—তবু মনে হয়, ফোনটা ধরলে হয়তো সবকিছু বদলে যেত।
মায়া ধীরে বলল,
—সবকিছু সবসময় আমাদের হাতে থাকে না।
রুদ্র তার দিকে তাকাল।
মায়া বলল,
—আপনি নিজেকে এত বছর ধরে শাস্তি দিয়েছেন। এবার থামুন।
রুদ্র কিছু বলল না।
কিন্তু কথাটা তার ভেতরে কোথাও গভীরভাবে গিয়ে লাগল।
সেদিন রাতে হঠাৎ মায়ার প্রচণ্ড জ্বর এল।
রুদ্র তখন অফিসের কিছু কাজ করছিল।
তুলি দৌড়ে এসে বলল,
—ভাইয়া! ভাবির শরীর খুব গরম।
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেল।
মায়া বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।
রুদ্র তার কপালে হাত রাখতেই বুঝল, সত্যিই জ্বর অনেক।
—মায়া।
মায়া চোখ খুলল।
—হুম?
—কেমন লাগছে?
—ভালো।
রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলল,
—এই কথাটা আমার কাছে বলবে না।
মায়া দুর্বলভাবে হাসল।
—আপনার কাছ থেকে শিখেছি।
রুদ্র আর কিছু বলল না।
ডাক্তারকে ফোন করা হলো।
ওষুধ দেওয়ার পরও জ্বর কিছুক্ষণ কমল না।
রুদ্র সারারাত তার পাশে বসে রইল।
মায়া আধো ঘুমের মধ্যে কয়েকবার বলল,
—রুদ্র...
—হুম?
—আপনি আছেন?
—হ্যাঁ।
—যাবেন না তো?
রুদ্রের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
সে ধীরে বলল,
—না। আমি আছি।
মায়া আবার চোখ বন্ধ করল।
সেই রাতে রুদ্র প্রথমবার বুঝল, কাউকে হারানোর ভয় শুধু অতীতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
কাউকে কাছে পেলে তাকে হারানোর ভয় আরও তীব্র হয়।
ভোরের দিকে মায়ার জ্বর কমল।
রুদ্র তখনও পাশে বসে।
মায়া চোখ খুলে দেখল, রুদ্র চেয়ারে মাথা হেলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
তার হাতে এখনো মায়ার ওষুধের তালিকা।
মায়া কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, এই মানুষটা আসলে যতটা কঠিন, ততটা নয়।
সে ধীরে হাত বাড়িয়ে রুদ্রের কাঁধে একটা চাদর দিল।
রুদ্র ঘুমের মধ্যেই নড়ল।
মায়া হাত সরিয়ে নিল।
তারপর নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল,
—আপনি বদলে যাচ্ছেন।
দুপুরে রুদ্র অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
মায়া বলল,
—আজ যাবেন না।
রুদ্র তাকাল।
—কেন?
—গত রাতে ঘুমাননি।
—কাজ আছে।
—একদিন কাজ না করলে পৃথিবী থেমে যাবে না।
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—আপনি এখন আমার অফিস নিয়েও সিদ্ধান্ত নেন?
—হ্যাঁ।
—খুব সাহস বেড়েছে।
—আপনার কারণেই।
রুদ্র কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
—ঠিক আছে। আজ থাকছি।
মায়া অবাক।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
তারপর রুদ্র হঠাৎ বলল,
—আপনি যদি আবার অসুস্থ হন, আমি কিন্তু আপনাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দেব।
মায়া হেসে বলল,
—এত ভয় পেয়েছিলেন?
রুদ্র থেমে গেল।
—হ্যাঁ।
একটা মাত্র শব্দ।
কিন্তু মায়ার মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই প্রথম রুদ্র নিজের ভয় স্বীকার করল।
সন্ধ্যায় মায়ার ফোনে আবার সায়নের কল এল।
এবার মায়া ফোন ধরল।
—হ্যালো?
সায়নের কণ্ঠ ভেসে এল,
—তুমি কি আমার ওপর বিশ্বাস করো?
মায়া বলল,
—না।
—তবু আমার কথা শুনবে?
—বল।
সায়ন ধীরে বলল,
—ইরার মৃত্যুর আগের রাতে সে আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল।
মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
—কেন?
—সে জানত, কিছু একটা ঘটতে পারে।
—তারপর?
—সে আমাকে একটা জিনিস দিয়েছিল।
—কী?
সায়ন বলল,
—একটা পেনড্রাইভ।
মায়া চুপ।
—ওটার মধ্যে কী ছিল?
—আমি জানি না।
—তাহলে এখন কোথায় সেটা?
সায়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—রুদ্রের কাছে।
মায়া হতবাক।
—কী?
—ইরা বলেছিল, যদি কিছু হয়, তাহলে সেটা রুদ্রের কাছে পৌঁছে দিতে।
মায়া দ্রুত রুদ্রের দিকে তাকাল।
রুদ্র তখন কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
মায়ার চোখের পরিবর্তন দেখে সে কাছে এল।
—কী হয়েছে?
সায়নের কণ্ঠ তখনও ফোনে।
—মায়া, একটা কথা মনে রেখো। ইরার মৃত্যু শুধু দুর্ঘটনা ছিল না।
কল কেটে গেল।
রুদ্র বলল,
—সায়ন কী বলল?
মায়া ধীরে সবটা জানাল।
রুদ্রের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
—পেনড্রাইভ?
—হ্যাঁ।
—আমার কাছে তো নেই।
মায়া বলল,
—তাহলে কোথায়?
রুদ্র হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।
তার মনে পড়ল—
ইরার পুরোনো বাক্সে একটা ছোট কালো পেনড্রাইভ ছিল।
সে কখনো সেটার দিকে গুরুত্ব দেয়নি।
রুদ্র দ্রুত ঘরে গেল।
পুরোনো বাক্স খুলে সবকিছু সরাতে লাগল।
কয়েক মুহূর্ত পর তার হাত একটা ছোট কালো জিনিসে গিয়ে থামল।
পেনড্রাইভ।
মায়া তার পাশে এসে দাঁড়াল।
দুজনেই একে অপরের দিকে তাকাল।
রুদ্র বলল,
—এটা এতদিন এখানে ছিল।
মায়া ধীরে বলল,
—তাহলে এত বছর ধরে সত্যিটাও আমাদের কাছেই ছিল।
রুদ্র পেনড্রাইভটা হাতে নিল।
কিন্তু কম্পিউটারে লাগানোর আগেই দরজার বাইরে হঠাৎ শব্দ হলো।
রুদ্র দরজা খুলে বাইরে তাকাল।
কেউ নেই।
শুধু মেঝেতে একটা কাগজ পড়ে আছে।
রুদ্র কাগজটা তুলে খুলল।
এক লাইনের লেখা—
‘পেনড্রাইভটা খুললে শুধু ইরার মৃত্যুর সত্যিই জানবে না, তোমাদের বিয়ের আসল কারণও জানতে পারবে।’
মায়া কাগজটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
রুদ্র তার দিকে তাকাল।
দুজনেই বুঝল—
এবার আর পেছনে ফেরার পথ নেই।
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
ঘরের সব আলো বন্ধ। শুধু রুদ্রের স্টাডি রুমে টেবিল ল্যাম্পের আলো জ্বলছে।
টেবিলের ওপর রাখা ছোট কালো পেনড্রাইভটার দিকে তাকিয়ে আছে রুদ্র আর মায়া।
দুজনের কারও মুখে কথা নেই।
এতদিনের প্রশ্নের উত্তর হয়তো এই ছোট্ট জিনিসটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে।
রুদ্র কম্পিউটার অন করল।
মায়া তার পাশে দাঁড়িয়ে।
রুদ্র পেনড্রাইভটা লাগিয়ে ফোল্ডার খুলতেই মাত্র তিনটি ফাইল দেখা গেল।
একটি ভিডিও।
একটি অডিও।
আর একটি ডকুমেন্ট।
রুদ্র প্রথমে ডকুমেন্টটা খুলল।
সেখানে ইরার হাতের লেখা কিছু কথা।
মায়া ধীরে ধীরে পড়তে লাগল।
‘রুদ্র, যদি তুমি এই লেখাটা পড়ো, তাহলে হয়তো আমি আর তোমার সামনে নেই। আমি জানি না কী হবে। কিন্তু একটা কথা তোমাকে জানাতেই হবে—আমার সঙ্গে যা ঘটছে, তার সঙ্গে তোমার কোনো দোষ নেই।’
রুদ্রের চোখ ভিজে উঠল।
মায়া তার হাতের কাছে হাত রাখল।
ইরার লেখা চলতে থাকল—
‘কিছু মানুষ এমন একটা কাজ করছে, যার প্রমাণ আমার কাছে আছে। আমি সেটা প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা বুঝে গেছে।’
রুদ্র ফিসফিস করে বলল,
—কারা?
ডকুমেন্টে সেই নাম ছিল না।
পরের লাইনে লেখা—
‘সায়ন সবকিছু জানে না। কিন্তু সে আমাকে সাহায্য করতে চেয়েছে। ওকে দোষ দিও না।’
মায়া চোখ বন্ধ করল।
এতদিন সায়নকে নিয়ে তার মনে যে প্রশ্ন ছিল, তার একটা উত্তর মিলল।
সায়ন পুরো সত্যের অংশ ছিল।
কিন্তু অপরাধী নয়।
রুদ্র পরের লাইন পড়ল।
‘আর একটা বিষয়। তোমার জীবনে যে মেয়েটি একদিন আসবে, তাকে কখনো এই ঘটনার জন্য দায়ী করো না।’
রুদ্র থেমে গেল।
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
—এটা কী?
রুদ্র উত্তর দিল না।
ইরার লেখা আবার শুরু হলো।
‘হয়তো তুমি ভাববে, আমি ভবিষ্যতের কথা কীভাবে জানি। আমি জানি না। শুধু একটা আশঙ্কা আছে। যারা আমাকে থামাতে চাইছে, তারা তোমার কাছের মানুষদেরও ব্যবহার করতে পারে।’
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—মানে?
রুদ্রও কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।
তারপর ডকুমেন্টের শেষ লাইন—
‘যদি কখনো মনে হয় তোমার জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত তোমার নিজের ছিল না, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কে ছিল সেটা খুঁজে দেখো।’
স্ক্রিনে লেখা শেষ।
ঘর নিস্তব্ধ।
মায়া ধীরে বলল,
—আপনার বিয়ের কথা বলছে?
রুদ্র বলল,
—সম্ভবত।
—কিন্তু ইরা কীভাবে জানত?
—জানি না।
রুদ্র এবার অডিও ফাইলটা চালু করল।
কয়েক সেকেন্ড শব্দহীন থাকার পর ইরার কণ্ঠ শোনা গেল।
রুদ্রের শরীর যেন জমে গেল।
এত বছর পর সে আবার সেই কণ্ঠ শুনছে।
ইরা বলছে,
—রুদ্র, তুমি যদি এটা শোনো, তাহলে হয়তো আমি নেই। কিন্তু তুমি নিজেকে দোষ দেবে না। তুমি সেদিন আমার ফোন ধরতে পারোনি, এটা তোমার অপরাধ নয়।
রুদ্র চোখ বন্ধ করল।
তার বুকের ভেতরের বহু বছরের একটা ভার যেন ধীরে ধীরে নড়ল।
ইরার কণ্ঠ আবার শোনা গেল।
—আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম। আমি এমন কিছু জানতে পেরেছি, যার সঙ্গে তোমার পরিবারের একটা পুরোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে। কিন্তু আমি এখনো নিশ্চিত নই, তোমার পরিবার এর সঙ্গে জড়িত কি না।
রুদ্র চোখ খুলল।
মায়া তার দিকে তাকিয়ে আছে।
অডিও চলতে থাকল।
—আর মায়া...
মায়া হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।
ইরা তার নাম জানে!
—মায়াকে তুমি হয়তো তখন চিনতে না। কিন্তু ওর পরিবারও এই ঘটনার কাছাকাছি আছে। আমি জানি না ওরা অপরাধী কি না। তবে যদি একদিন তোমাদের পথ এক হয়, মায়াকে সন্দেহ করো না।
অডিও থেমে গেল।
ঘরে নিস্তব্ধতা।
মায়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—ইরা আমাকে চিনত?
রুদ্র ধীরে বলল,
—সম্ভবত।
—কীভাবে?
—জানি না।
মায়া মাথা নিচু করল।
তারপর বলল,
—তাহলে আমাদের বিয়েটা...
রুদ্র এবার ডকুমেন্টের শেষ কথাটা মনে করল।
‘যদি কখনো মনে হয় তোমার জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত তোমার নিজের ছিল না...’
তার মনে একটা ভয় ঢুকে গেল।
পরদিন সকালেই রুদ্র মায়াকে নিয়ে তার বাবার কাছে গেল।
বাবা তাদের দেখে বুঝতে পারলেন, এবার আর কোনো কথা লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
রুদ্র সরাসরি বলল,
—ইরা আমাদের বিয়ের কথা জানত।
বাবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—কীভাবে?
রুদ্র পেনড্রাইভ থেকে পাওয়া অডিও চালু করল।
ইরার কণ্ঠ শুনে মায়ার বাবা চোখ বন্ধ করলেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি ধীরে বললেন,
—আমি জানতাম, একদিন এটা তোমাদের সামনে আসবে।
মায়া কাঁপা গলায় বলল,
—আমাদের বিয়ের সঙ্গে ইরার কী সম্পর্ক?
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তোমাদের বিয়ে আমি ঠিক করিনি।
রুদ্র বলল,
—কিন্তু আপনি জানতেন, প্রস্তাবটা আসবে।
বাবা চুপ।
—কেন?
তিনি ধীরে বললেন,
—কারণ ইরা আমাকে একটা অনুরোধ করেছিল।
রুদ্রের চোখ বড় হয়ে গেল।
—কী অনুরোধ?
—সে বলেছিল, যদি তার কিছু হয়, তাহলে তোমাকে এমন একজন মানুষের পাশে রাখতে, যে তোমাকে অতীত থেকে বের হতে সাহায্য করবে।
মায়া অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
—কিন্তু আমি কেন?
বাবা বললেন,
—কারণ ইরা তোমাকে একবার দেখেছিল।
মায়া স্তব্ধ।
—কোথায়?
—একটা অনুষ্ঠানে। তুমি তখন তোমার বাবার সঙ্গে গিয়েছিলে।
মায়ার মনে পড়ল না।
বাবা বললেন,
—ইরা বলেছিল, তোমার মধ্যে এমন একটা স্বভাব আছে, যা রুদ্রের জীবনে ভারসাম্য আনতে পারে।
রুদ্রের চোখে পানি এসে গেল।
—ইরা আমার জন্য এটা ভেবেছিল?
বাবা মাথা নেড়ে বললেন,
—হ্যাঁ।
মায়া চুপ করে রইল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল,
—কিন্তু সায়ন?
বাবা বললেন,
—সায়ন ইরাকে সাহায্য করেছিল। পরে সে বুঝতে পারে, তোমার সঙ্গে তার সম্পর্কও বিপদের কারণ হতে পারে।
—তাই আপনি তাকে বাধ্য করেছিলেন?
—হ্যাঁ।
মায়ার চোখ ভিজে গেল।
—আপনি আমাকে সত্যিটা বললেন না কেন?
—কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। যদি তুমি জানতে, তুমি হয়তো সায়নের কাছে ফিরে যেতে চাইতে। আর তখন তোমাকে আবার সেই বিপদের মধ্যে ফেলতে হতো।
মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—আপনারা সবাই আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বাবা চুপ।
রুদ্র এবার বলল,
—কিন্তু একটা প্রশ্ন এখনো আছে।
—কী?
—ইরার দুর্ঘটনা কে ঘটিয়েছিল?
বাবার মুখ কঠিন হয়ে গেল।
—আমি জানি না।
—আপনি সত্যিই জানেন না?
—না।
রুদ্র কিছু বলল না।
বাড়ি ফেরার পথে মায়া খুব চুপ ছিল।
গাড়ি থামার পরও সে নামল না।
রুদ্র জিজ্ঞেস করল,
—কী ভাবছ?
মায়া ধীরে বলল,
—আমাদের বিয়েটা তাহলে ইরার ইচ্ছার একটা অংশ ছিল।
—হয়তো।
—কিন্তু আমি আপনাকে বেছে নিইনি।
রুদ্রের বুকটা হালকা কেঁপে উঠল।
—আমি জানি।
মায়া তার দিকে তাকাল।
—আপনিও আমাকে বেছে নেননি।
রুদ্র চুপ।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
—কিন্তু এখন একটা ব্যাপার বদলে গেছে।
—কী?
—এখন যদি আমাকে আবার সুযোগ দেওয়া হয়, আমি কি আপনাকে বেছে নেব?
রুদ্র কিছু বলতে পারল না।
মায়া গাড়ি থেকে নেমে গেল।
রুদ্র অনেকক্ষণ গাড়িতে বসে রইল।
তার মনে হলো, প্রশ্নটা শুধু মায়ার নয়।
তার নিজের কাছেও একই প্রশ্ন।
সে কি মায়াকে সত্যিই নিজের জীবনে চায়?
উত্তরটা অনেকক্ষণ আগেই তার ভেতরে তৈরি হয়ে গেছে।
শুধু সে স্বীকার করতে ভয় পাচ্ছে।
সেদিন রাতে মায়া ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
রুদ্র এসে পাশে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর মায়া বলল,
—আপনি কি ইরাকে এখনো ভালোবাসেন?
রুদ্র আকাশের দিকে তাকাল।
—আমি ইরাকে ভুলিনি।
—আমি সেটা জিজ্ঞেস করিনি।
রুদ্র মায়ার দিকে তাকাল।
—ইরার জন্য আমার মনে সম্মান আছে। কৃতজ্ঞতা আছে। কিন্তু...
সে থেমে গেল।
মায়া অপেক্ষা করল।
রুদ্র ধীরে বলল,
—আমার জীবনে এখন অন্য একজন আছে।
মায়ার বুক ধক করে উঠল।
সে কিছু বলল না।
রুদ্রও আর কিছু বলল না।
কিন্তু দুজনেই বুঝে গেল, অনেক কথা না বলেও বলা হয়ে গেছে।
পরদিন সকালে রুদ্র অফিসে যাওয়ার সময় মায়াকে বলল,
—আজ রাতে তাড়াতাড়ি ফিরব।
মায়া হাসল।
—কেন?
—আপনাকে নিয়ে কোথাও যাব।
—কোথায়?
—বলব না।
—আবার রহস্য?
—হুম।
মায়া বলল,
—ঠিক আছে।
রুদ্র চলে গেল।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর অফিসে একটা ফোন এল।
রুদ্রের মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।
অর্ণব ফোন করেছে।
—রুদ্র, একটা খবর পেয়েছি।
—কী?
—ইরার দুর্ঘটনার গাড়ির যে অংশটা বদলানো হয়েছিল, সেই যন্ত্রাংশের দোকানের পুরোনো রেকর্ড পেয়েছি।
—তারপর?
—যে ব্যক্তি সেটা কিনেছিল, তার নাম পাওয়া গেছে।
রুদ্রের বুক ধক করে উঠল।
—কে?
অর্ণব ধীরে বলল,
—সায়ন নয়।
—তাহলে?
অর্ণব বলল,
—তোমার নিজের পরিবারের একজনের নাম আছে।
রুদ্র স্তব্ধ হয়ে গেল।
—কে?
অর্ণব বলল,
—তোমার চাচা।
রুদ্রের হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
সন্ধ্যায় মায়া অপেক্ষা করছিল।
রুদ্র ফিরল না।
এক ঘণ্টা।
দুই ঘণ্টা।
রাত বাড়তে লাগল।
অবশেষে রাত প্রায় বারোটার দিকে রুদ্র বাড়ি ফিরল।
মায়া দৌড়ে দরজার কাছে গেল।
—কোথায় ছিলেন? ফোনও ধরেননি!
রুদ্র কোনো উত্তর দিল না।
তার মুখ দেখে মায়া বুঝল, ভয়ংকর কিছু ঘটেছে।
—কী হয়েছে?
রুদ্র ধীরে বলল,
—ইরার দুর্ঘটনার সঙ্গে আমার পরিবারের একজন জড়িত থাকতে পারে।
মায়া হতবাক।
—কে?
রুদ্র বলল,
—আমার চাচা।
মায়া কিছু বলতে পারল না।
রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল,
—আর যদি সত্যিই আমার পরিবার ইরার মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত হয়...
সে থেমে গেল।
মায়া ধীরে তার হাত ধরল।
—তাহলে?
রুদ্র চোখ বন্ধ করে বলল,
—তাহলে এতদিন আমি যাদের নিজের মানুষ ভেবেছি, তাদেরই হয়তো চিনিনি।
মায়া তার হাত শক্ত করে ধরল।
—আপনি একা নন।
রুদ্র চোখ খুলে তার দিকে তাকাল।
এই একই কথা সে একদিন মায়াকে বলেছিল।
আজ সেই কথাটাই ফিরে এসেছে তার নিজের জীবনে।
আর সেই মুহূর্তে রুদ্র বুঝল—
অতীত যতই ভয়ংকর হোক, মায়াকে হারানোর ভয়টা এখন তার কাছে অতীতের সব ভয়কেও ছাড়িয়ে গেছে।
কিন্তু সামনে যে সত্যি অপেক্ষা করছে, সেটা শুধু ইরার মৃত্যুর রহস্য নয়।
সেটা রুদ্রের নিজের পরিবারকে ভেঙে দিতে পারে।
আর তাদের সম্পর্ককেও।
পরদিন সকালটা রুদ্রের বাড়িতে অস্বাভাবিক ভারী।
সাধারণত সকালের নাশতার টেবিলে সবাই কিছু না কিছু কথা বলে। কিন্তু আজ কেউ স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে না।
রুদ্র চুপচাপ বসে আছে।
তার সামনে রাখা চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে গেছে।
মায়া পাশের চেয়ারে বসে আছে।
গত রাতের কথাগুলো দুজনের মনেই ঘুরছে।
রুদ্রের চাচা।
ইরার দুর্ঘটনা।
সায়নের অজানা ভূমিকা।
আর সবচেয়ে বড় কথা—রুদ্রের নিজের পরিবারের ওপর সন্দেহ।
রুদ্রের মা ধীরে এসে বললেন,
—রুদ্র, কী হয়েছে?
রুদ্র মায়ের দিকে তাকাল।
—মা, বাবার পুরোনো ব্যবসার কিছু কাগজ কোথায় রাখা আছে?
মা অবাক হলেন।
—কেন?
—দরকার আছে।
—স্টাডির আলমারিতে কিছু পুরোনো ফাইল আছে। তোমার চাচার কাছেও থাকতে পারে।
রুদ্র মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল।
মায়াও তার সঙ্গে গেল।
স্টাডি রুমের পুরোনো আলমারি খুলে রুদ্র একের পর এক ফাইল দেখতে লাগল।
মায়া পাশে দাঁড়িয়ে।
কিছুক্ষণ পর একটা ফাইল হাতে নিয়ে রুদ্র থেমে গেল।
ফাইলের ভেতরে কয়েক বছর আগের একটা ব্যবসায়িক চুক্তির কপি।
সেখানে রুদ্রের চাচার নাম।
আর অন্যপাশে মায়ার বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম।
মায়া কাগজটা দেখে বলল,
—আমার বাবার কোম্পানি আর আপনার চাচার ব্যবসার মধ্যে এত বড় লেনদেন ছিল?
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
—আমি জানতাম না।
আরেকটা কাগজ বের হলো।
সেখানে একটি গাড়ির সার্ভিসিং বিল।
রুদ্রের চোখ আটকে গেল।
গাড়ির নম্বরটা ইরার গাড়ির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—এটা কীভাবে সম্ভব?
রুদ্র বলল,
—আমি জানি না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল।
—কারণ গাড়িটা আমার লোকই সার্ভিসিং করেছিল।
রুদ্র ঘুরে দাঁড়াল।
দরজায় তার চাচা দাঁড়িয়ে।
মায়া চমকে গেল।
রুদ্র ধীরে বলল,
—আপনি?
চাচা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
—তোমরা যা খুঁজছ, সেটা আর খুঁজো না।
রুদ্র কঠিন গলায় বলল,
—কেন?
—কারণ সত্যিটা জানলে তোমাদের কারও ভালো হবে না।
—আমি এত বছর মিথ্যা বিশ্বাস করে বেঁচেছি। আর কতটা শুনব?
চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—ইরার দুর্ঘটনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে।
মায়া নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল।
রুদ্রের চোখ লাল হয়ে উঠল।
—আপনি কী করেছিলেন?
চাচা মাথা নিচু করলেন।
—আমি গাড়ির ব্রেক নষ্ট করিনি।
রুদ্র থেমে গেল।
—তাহলে?
—আমি শুধু এমন একজনের কথায় গাড়িটা সার্ভিসিং করিয়েছিলাম, যে বলেছিল গাড়িতে একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে।
—কী জিনিস?
—একটা ডকুমেন্ট।
রুদ্র বলল,
—কোন ডকুমেন্ট?
চাচা বললেন,
—তোমার বাবার ব্যবসার কিছু হিসাব।
মায়া বলল,
—তাহলে ইরা কীভাবে জড়িত?
চাচা উত্তর দিলেন,
—ইরা সেই হিসাবের কিছু অংশ হাতে পেয়েছিল।
রুদ্র বুঝতে পারল, এতদিনের রহস্যের একটা অংশ পরিষ্কার হচ্ছে।
কিন্তু মূল প্রশ্নটা এখনো রয়ে গেছে।
—দুর্ঘটনা কীভাবে হলো?
চাচা বললেন,
—আমি জানি না।
—আপনি সত্যি বলছেন?
—হ্যাঁ।
—তাহলে ব্রেকের অংশ কে বদলেছিল?
চাচা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—যে মেকানিককে আমি গাড়িটা দিয়েছিলাম, সে বলেছিল কাজটা অন্য একজন করেছিল।
—কে?
চাচা নামটা বললেন না।
মায়া এগিয়ে এসে বলল,
—আপনি জানেন।
চাচা চোখ বন্ধ করলেন।
তারপর বললেন,
—সায়ন।
ঘর নিস্তব্ধ।
মায়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—না।
রুদ্রও স্থির।
চাচা বললেন,
—কিন্তু সায়ন ইচ্ছা করে করেনি।
মায়া তাকিয়ে বলল,
—তাহলে?
—তাকে বলা হয়েছিল, গাড়িতে একটা যান্ত্রিক সমস্যা আছে। সে শুধু গাড়িটা ঠিক করানোর ব্যবস্থা করেছিল। সে জানত না, ব্রেকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বদলানো হবে।
রুদ্র ধীরে বলল,
—তাহলে আসল অপরাধী কে?
চাচা উত্তর দিলেন,
—আমি জানি না।
রুদ্র রাগে টেবিলে হাত মারল।
—কেউ জানে না!
চাচা চুপ করে রইলেন।
চাচা চলে যাওয়ার পর মায়া অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
রুদ্র তার পাশে এসে দাঁড়াল।
—মায়া।
—হুম?
—তুমি ঠিক আছ?
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
—না।
রুদ্র কিছু বলল না।
মায়া ধীরে বলল,
—আমি এতদিন সায়নকে ঘৃণা করেছি।
—তোমার কারণ ছিল।
—কিন্তু সে হয়তো আমাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য যতটা দোষী, ইরার মৃত্যুর জন্য ততটা নয়।
রুদ্র বলল,
—হয়তো।
মায়া চোখ মুছে বলল,
—আমি ওর কাছে ক্ষমা চাইব না। কিন্তু অন্তত সত্যিটা জানার অধিকার তার আছে।
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
—ঠিক।
সেদিন বিকেলে সায়ন নিজেই রুদ্রের বাড়িতে এল।
গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সায়নকে দেখে মায়া কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
রুদ্র এগিয়ে গিয়ে বলল,
—ভেতরে আসো।
সায়ন অবাক হলো।
—তুমি আমাকে বিশ্বাস করো?
রুদ্র বলল,
—না। কিন্তু সত্যিটা জানতে চাই।
সায়ন ভেতরে এসে বসলো।
মায়া কিছুটা দূরে বসে রইল।
রুদ্র বলল,
—ইরার সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক ছিল?
সায়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—ইরা আমার বন্ধু ছিল।
—আর?
—সে আমার কাছে কিছু তথ্য দিয়েছিল। আমি তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম।
—দুর্ঘটনার আগে গাড়িটা তুমি সার্ভিসিং করিয়েছিলে?
সায়ন মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—তুমি জানতেও না গাড়ির কী হয়েছিল?
—না।
রুদ্র বলল,
—তাহলে সেদিন ইরা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল কেন?
সায়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে।
মায়া বলল,
—কারা?
—আমি জানি না।
সায়ন পকেট থেকে একটা ছোট কাগজ বের করল।
—ইরা আমাকে এটা দিয়েছিল।
রুদ্র কাগজটা নিল।
তাতে একটা ঠিকানা লেখা।
একটা পুরোনো গুদামের ঠিকানা।
সায়ন বলল,
—ইরা বলেছিল, যদি তার কিছু হয়, সেখানে যেতে।
রুদ্র উঠে দাঁড়াল।
—আমরা এখনই যাব।
রাতের দিকে তারা তিনজন সেই পুরোনো গুদামে পৌঁছাল।
গুদাম বহু বছর ধরে বন্ধ।
ভেতরে ধুলো, পুরোনো বাক্স আর ভাঙা আসবাব।
সায়ন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে মেঝের একটা কাঠের অংশ সরাল।
নিচে একটা লোহার বাক্স।
রুদ্র বাক্সটা খুলল।
ভেতরে পুরোনো নথি, কয়েকটা ছবি আর একটা চিঠি।
চিঠিটা ইরার।
রুদ্র পড়তে শুরু করল।
‘আমি যদি এখানে না থাকি, তাহলে বুঝবে আমার সন্দেহ সত্যি ছিল। কিন্তু আমি কাউকে একা দোষী বলতে পারছি না। কারণ যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভয় পেয়েছে, কেউ লোভ করেছে, আর কেউ অন্যদের বিশ্বাস করেছে।’
রুদ্রের চোখ আটকে গেল শেষ অংশে।
‘সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ সে নয়, যে সামনে থেকে শত্রু হয়। সবচেয়ে ভয়ংকর সে, যে নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়।’
চিঠির নিচে একটা নামের প্রথম অক্ষর।
‘A’
রুদ্র, মায়া আর সায়ন তিনজনেই একে অপরের দিকে তাকাল।
সায়ন বলল,
—আমি জানি না এটা কার নাম।
হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।
রুদ্র দ্রুত উঠে দাঁড়াল।
—কেউ এসেছে।
তিনজন গুদামের একপাশে সরে গেল।
বাইরে দুজন মানুষের কথা শোনা গেল।
—বাক্সটা এখানে থাকার কথা।
—কেউ আগে এসে নিয়ে গেছে।
রুদ্র মায়ার দিকে তাকাল।
তার চোখে ভয়।
রুদ্র ধীরে তার হাত ধরল।
—ভয় পেও না।
মায়া হাতটা শক্ত করে ধরল।
সায়নও নীরব।
কিছুক্ষণ পর বাইরে গাড়ি চলে গেল।
তারা বেরিয়ে এল।
রুদ্র বলল,
—আমাদের এখন বুঝতে হবে ‘A’ কে।
মায়া ধীরে বলল,
—আমার মনে হচ্ছে আমি জানি।
রুদ্র তাকাল।
—কে?
মায়া বলল,
—আমার বাবার ব্যবসায়িক অংশীদারদের একজনের নাম আদিব।
সায়ন মাথা নেড়ে বলল,
—আমি নামটা শুনেছি।
রুদ্র বলল,
—তাহলে কালই তার সঙ্গে দেখা করব।
কিন্তু সেই রাতেই আরও বড় একটা ঘটনা ঘটল।
বাড়ি ফিরে মায়া নিজের ঘরে ঢুকতেই বিছানার ওপর একটা খাম দেখতে পেল।
খাম খুলে একটা চিঠি বের করল।
লেখা—
‘মায়া, তুমি সত্যের খুব কাছে চলে এসেছ। কিন্তু একটা সত্য এখনো জানো না। তোমার বিয়েটা শুধু ইরার ইচ্ছা ছিল না। রুদ্রের পরিবারও এই বিয়ের মাধ্যমে নিজেদের একটা পুরোনো ভুল ঢাকতে চেয়েছিল।’
মায়ার হাত কেঁপে উঠল।
সে চিঠিটা নিয়ে রুদ্রের কাছে গেল।
রুদ্র পড়েই স্তব্ধ।
—এটা কে দিয়েছে?
—জানি না।
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি কি মনে করো, আমাদের বিয়েটা ভুল ছিল?
মায়া দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—বিয়েটা হয়তো আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল না।
রুদ্রের মুখ ভারী হয়ে গেল।
মায়া তার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
—কিন্তু এখন?
রুদ্র উত্তর দিল না।
মায়া বলল,
—এখন যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কি এই সংসার ছেড়ে চলে যেতে চাই?
রুদ্রের চোখে অস্থিরতা দেখা দিল।
—তুমি কী বলবে?
মায়া তার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
—না।
রুদ্র স্থির হয়ে গেল।
মায়া ধীরে বলল,
—কারণ এই সম্পর্কটা যেভাবেই শুরু হোক, আমি এখন আর এটাকে শুধু একটা বাধ্যতামূলক বিয়ে মনে করি না।
রুদ্র কিছু বলতে পারল না।
মায়া তার হাত ধরে বলল,
—আমি আপনাকে বেছে নিতে শুরু করেছি, রুদ্র।
রুদ্রের চোখ ভিজে উঠল।
সে ধীরে মায়ার হাতটা শক্ত করে ধরল।
—আমিও।
দুজনের মাঝের দূরত্ব যেন সেই মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু তাদের সুখের এই মুহূর্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
রুদ্রের ফোন বেজে উঠল।
অর্ণবের কল।
রুদ্র ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে অর্ণবের কণ্ঠ—
—রুদ্র, আদিবকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
রুদ্রের মুখ বদলে গেল।
—কোথায় ছিল?
—শেষবার তাকে তোমার চাচার সঙ্গে দেখা গেছে।
রুদ্র মায়ার দিকে তাকাল।
তারপর অর্ণব বলল,
—আর একটা খবর আছে।
—কী?
—ইরার মৃত্যুর রাতে তোমার চাচার গাড়িটা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ছিল।
রুদ্রের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
মায়া তার হাত শক্ত করে ধরল।
অতীতের শেষ পর্দা নামার আগে তাদের সামনে এখন শুধু একটা প্রশ্ন—
ইরাকে কে হারিয়েছিল?
আর সেই উত্তরই ঠিক করবে, রুদ্র ও মায়ার নতুন জীবন সত্যিই কতটা নিরাপদ।
রাত অনেক গভীর।
রুদ্রের হাতে তখনও ফোন।
অর্ণবের শেষ কথাটা মাথার ভেতর বারবার ঘুরছে—
“ইরার মৃত্যুর রাতে তোমার চাচার গাড়ি ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ছিল।”
মায়া রুদ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিল, ভেতরে ভেতরে সে আবার সেই পুরোনো রাতটার মধ্যে ফিরে গেছে।
মায়া ধীরে বলল,
—রুদ্র...
রুদ্র কোনো উত্তর দিল না।
—আমার দিকে তাকান।
রুদ্র তাকাল।
মায়া শান্ত গলায় বলল,
—আপনি এখন একা নন।
রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—আমি জানি।
—তাহলে এবার সত্যিটা খুঁজে বের করি।
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
পরদিন সকালেই রুদ্র, মায়া ও অর্ণব একসঙ্গে রুদ্রের চাচার কাছে গেল।
চাচা তাদের দেখে বুঝতে পারলেন, আর কিছু লুকানোর সুযোগ নেই।
রুদ্র টেবিলের ওপর পুরোনো ছবিটা রাখল।
—ইরার মৃত্যুর রাতে আপনার গাড়ি ঘটনাস্থলের কাছে কেন ছিল?
চাচা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—আমি সেখানে গিয়েছিলাম।
রুদ্রের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
—কেন?
—ইরার সঙ্গে দেখা করতে।
মায়া চমকে উঠল।
—আপনি ইরার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন?
—হ্যাঁ।
রুদ্র বলল,
—তাহলে সেদিন কী হয়েছিল?
চাচা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
—ইরা আমাকে ফোন করে বলেছিল, সে একটা বড় ভুল করেছে। সে এমন কিছু কাগজ পেয়েছে, যেগুলো নিয়ে অনেক মানুষ বিপদে পড়বে। আমি তাকে থামাতে গিয়েছিলাম।
—আপনি তাকে ভয় দেখাতে?
—না।
চাচা মাথা নাড়লেন।
—আমি তাকে বলেছিলাম, কাগজগুলো পুলিশের হাতে দিয়ে দিতে। কিন্তু ইরা রাজি হয়নি। সে বলেছিল, আগে সব প্রমাণ জোগাড় করবে।
রুদ্র জিজ্ঞেস করল,
—তারপর?
—আমি চলে আসি।
—ইরার গাড়ি?
—আমি চলে আসার সময় সে গাড়ি নিয়ে অন্যদিকে যাচ্ছিল।
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তারপর দুর্ঘটনা।
চাচা চোখ নামিয়ে বললেন,
—হ্যাঁ।
—আপনি কি জানতেন গাড়ির ব্রেকে সমস্যা ছিল?
চাচা মাথা নেড়ে বললেন,
—না।
—কিন্তু গাড়িটা আপনার লোক সার্ভিসিং করেছিল।
—হ্যাঁ। আর এটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল।
রুদ্র চুপ করে রইল।
চাচা এবার বললেন,
—পরদিন জানতে পারি, গাড়ির ব্রেকের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বদলে দেওয়া হয়েছিল। যে লোকটা কাজটা করেছিল, সে পালিয়ে যায়।
অর্ণব বলল,
—লোকটার নাম?
চাচা বললেন,
—আদিব।
মায়া আর রুদ্র একে অপরের দিকে তাকাল।
সবকিছু যেন এক জায়গায় এসে মিলল।
আদিবকে খুঁজে বের করতে খুব বেশি সময় লাগল না।
তার পুরোনো এক সহযোগীর মাধ্যমে জানা গেল, সে শহরের বাইরে একটি ছোট বাড়িতে লুকিয়ে আছে।
রুদ্র পুলিশকে খবর দিয়ে সেখানে গেল।
আদিব পালানোর চেষ্টা করলেও ধরা পড়ে গেল।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রথমে সে কিছুই স্বীকার করছিল না।
কিন্তু ইরার পুরোনো নথি, গাড়ির সার্ভিসিং রেকর্ড এবং পেনড্রাইভের তথ্য একে একে সামনে আনা হলে শেষ পর্যন্ত সে ভেঙে পড়ল।
আদিব বলল,
—আমি ইরাকে মারতে চাইনি।
রুদ্রের চোখ কঠিন।
—তাহলে?
—আমাকে শুধু গাড়ির ব্রেকের একটা অংশ বদলাতে বলা হয়েছিল।
—কে বলেছিল?
আদিব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নাম বলল।
নামটা শুনে রুদ্র স্তব্ধ।
রুদ্রের চাচা নয়।
মায়ার বাবাও নয়।
আদিব বলল,
—আপনাদের ব্যবসায়িক অংশীদার রাকিব আমাকে টাকা দিয়েছিল।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
—রাকিব?
রুদ্রের মনে পড়ল—আদিবই সেই ‘A’ নয়। ইরার চিঠির ‘A’ আসলে ছিল আদিবের নামের প্রথম অক্ষর। কিন্তু তাকে নির্দেশ দিয়েছিল রাকিব।
আদিব বলল,
—রাকিব সাহেব ভয় পেয়েছিলেন, ইরা সব প্রমাণ প্রকাশ করে দেবে। তিনি আমাকে শুধু গাড়ির ব্রেক দুর্বল করতে বলেছিলেন। কিন্তু কাজটা এতটাই খারাপভাবে করা হয়েছিল যে ইরা গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারায়।
রুদ্র চোখ বন্ধ করল।
এত বছরের প্রশ্নের উত্তর অবশেষে সামনে।
ইরা তাকে ছেড়ে যায়নি।
সে ইচ্ছা করে কোনো ভুল করেনি।
তার জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল অন্য মানুষের স্বার্থের জন্য।
সব সত্যি প্রকাশ পাওয়ার পর কয়েক দিন কেটে গেল।
রুদ্রের চাচা নিজের ভুলের জন্য পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইলেন।
মায়ার বাবাও স্বীকার করলেন, এত বছর সত্যি লুকিয়ে রেখে তিনি ভুল করেছেন।
আর সায়ন?
সে মায়ার সামনে এসে দাঁড়াল।
—আমি জানি, তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না।
মায়া কিছু বলল না।
সায়ন বলল,
—তবু একটা কথা বলতে চাই। আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাইনি। কিন্তু তখন আমাকে বলা হয়েছিল, তোমার জীবন বিপদের মধ্যে পড়ে যাবে।
মায়া ধীরে বলল,
—তুমি অন্তত সত্যিটা বলতে পারতে।
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
—আমিও পেয়েছিলাম।
সায়ন মাথা নিচু করল।
—আমি দুঃখিত।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—আমি তোমাকে ক্ষমা করার চেষ্টা করব। কিন্তু আমাদের পথ এখন আলাদা।
সায়ন মাথা নেড়ে চলে গেল।
মায়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
কিছু সম্পর্কের শেষ হয়তো রাগ দিয়ে নয়।
কখনো কখনো সত্যিটা জানার পর মানুষ বুঝতে পারে, সেই সম্পর্কটা ধরে রাখার সময় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
এদিকে রুদ্র ধীরে ধীরে নিজের অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করল।
এক বিকেলে সে ইরার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
হাতে কয়েকটা ফুল।
অনেকক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর বলল,
—ইরা, আমি এতদিন ভেবেছি তোমাকে হারানোর জন্য আমি দায়ী।
সে থামল।
—আজ বুঝলাম, সেটা সত্যি নয়।
হালকা বাতাস বইছিল।
রুদ্র চোখ মুছে বলল,
—তুমি আমাকে একটা জীবন বাঁচতে বলেছিলে। আমি এত বছর সেই জীবন থেকে পালিয়েছি।
তারপর মায়ার কথা মনে পড়ল।
—এবার আর পালাব না।
রুদ্র ফুলগুলো রেখে ধীরে ফিরে এল।
দূরে মায়া দাঁড়িয়ে ছিল।
সে কিছুক্ষণ ধরে রুদ্রকে দেখছিল।
রুদ্র কাছে আসতেই মায়া বলল,
—সব কথা বলে এলেন?
—হ্যাঁ।
—মনটা হালকা হয়েছে?
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
—অনেকটা।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে চলুন।
—কোথায়?
—বাড়ি।
রুদ্র থেমে গেল।
—আমাদের বাড়ি?
মায়া ভ্রু তুলে বলল,
—আপনার আর আমার আলাদা বাড়ি নাকি?
রুদ্রের মুখে দীর্ঘদিন পর খুব স্বাভাবিক একটা হাসি ফুটল।
—না।
কয়েক মাস কেটে গেল।
রুদ্র আর মায়ার সম্পর্ক বদলে গেল পুরোপুরি।
আগের সেই ঠান্ডা আচরণ নেই।
তবু খুনসুটি আছে।
মায়া রান্না করতে গিয়ে আবার লবণের বদলে চিনি দিয়ে ফেললে রুদ্র হাসতে হাসতে বলত,
—আপনাকে রান্নাঘর থেকে নিষিদ্ধ করা উচিত।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিত,
—আপনি খেয়ে তো ফেললেন!
—ভালোবাসি বলে।
মায়া থমকে যেত।
রুদ্রও বুঝতে পারত, মুখ ফসকে কথাটা বেরিয়ে গেছে।
তখন মায়া মুচকি হেসে বলত,
—আবার বলুন।
রুদ্র গম্ভীর মুখ করে বলত,
—কিছু বলিনি।
—আমি কিন্তু শুনেছি।
—ভুল শুনেছেন।
তাদের ছোট ছোট হাসি দিয়ে বাড়িটা আবার প্রাণ ফিরে পেল।
রুদ্রের মা দূর থেকে দুজনকে দেখে মুচকি হাসতেন।
একদিন সন্ধ্যায় মায়া বারান্দায় বসে ছিল।
রুদ্র এসে তার পাশে বসল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—মায়া।
—হুম?
—তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—করুন।
—আমাদের বিয়েটা যদি আবার নতুন করে করার সুযোগ দেওয়া হতো?
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
—মানে?
—মানে... যদি আমাদের পরিবার, ইরা, অতীত—কেউ কোনো সিদ্ধান্ত না নিত। শুধু তুমি আর আমি সিদ্ধান্ত নিতাম। তাহলে তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে?
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—আপনি কি আমাকে করতেন?
রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—হ্যাঁ।
মায়া মৃদু হাসল।
—তাহলে আমিও করতাম।
রুদ্রের চোখে আনন্দ ফুটে উঠল।
—নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
—কেন?
মায়া শান্ত গলায় বলল,
—কারণ আপনি আমাকে আমার অতীত দিয়ে বিচার করেননি। আমার ভয়কে বুঝেছেন। আমাকে কখনো বদলে দিতে চাননি। আর যখন সবাই আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন আপনি প্রথম মানুষ, যিনি আমাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দিয়েছেন।
রুদ্র ধীরে বলল,
—আর তুমি?
—আমি?
—তুমি আমার জীবনে কী বদলেছ?
মায়া হেসে বলল,
—আপনার বাড়িতে হাসি ফিরিয়েছি।
রুদ্রও হেসে ফেলল।
—সেটা ঠিক।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে মায়া বলল,
—আপনি একটা জিনিস ভুলে যাচ্ছেন।
—কী?
—আপনাকে একা থাকতে দিইনি।
রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—সেটাই সবচেয়ে বড় কথা।
কয়েক দিন পর পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল, তাদের বিয়ের আবার একটা ছোট অনুষ্ঠান হবে।
এবার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
কোনো পারিবারিক চাপ নেই।
কোনো অতীতের হিসাব নেই।
শুধু দুজন মানুষের ইচ্ছা।
মায়া সাদামাটা সাজে দাঁড়িয়ে ছিল।
রুদ্র সামনে এসে থামল।
মায়া হেসে বলল,
—এত চুপ করে আছেন কেন?
রুদ্র বলল,
—ভাবছি।
—কী?
—কয়েক মাস আগে এই মেয়েটাকে আমার জীবনে চাইনি।
মায়া চোখ বড় করে বলল,
—তাই?
—হ্যাঁ।
—এখন?
রুদ্র শান্তভাবে বলল,
—এখন মনে হয়, তোমাকে ছাড়া জীবনটা আবার আগের মতো ফাঁকা হয়ে যাবে।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে আমাকে ছাড়ার চেষ্টা করবেন না।
রুদ্র বলল,
—করব না।
দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তাদের প্রথম বিয়ে হয়েছিল পরিস্থিতির কারণে।
কিন্তু এইবার?
এইবার তারা নিজেরাই একে অপরকে বেছে নিল।
কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
কোনো ভয় নেই।
শুধু বিশ্বাস।
রাতের শেষে ছাদে দাঁড়িয়ে মায়া আকাশের দিকে তাকাল।
রুদ্র পাশে এসে দাঁড়াল।
মায়া বলল,
—জানেন, আমাদের গল্পটা অদ্ভুত।
—খুব।
—শুরু হয়েছিল দুজনের অনিচ্ছায়।
রুদ্র বলল,
—আর শেষ?
মায়া তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—শেষ নয়।
—তাহলে?
—শুরু।
রুদ্র হেসে বলল,
—ঠিক বলেছ।
মায়া তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
দূরে রাতের আকাশে অসংখ্য তারা।
একসময় যে দুজন মানুষ নিজেদের অতীতের ভেতর আটকে ছিল, তারা অবশেষে বুঝতে পারল—
সব সম্পর্ক প্রথম দেখায় শুরু হয় না।
কিছু সম্পর্ক শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে।
কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় পরিস্থিতির কারণে।
কিন্তু সম্পর্কের সত্যিকারের মূল্য তখনই বোঝা যায়, যখন মানুষকে দ্বিতীয়বার বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
রুদ্র আর মায়ার বিয়েটা হয়েছিল পরিবারের সিদ্ধান্তে।
কিন্তু তাদের একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের।
রুদ্র ধীরে বলল,
—মায়া?
—হুম?
—আজ থেকে তোমাকে একটা কথা আর বলতে হবে না।
—কী?
—‘আপনি একা নন।’
মায়া হেসে বলল,
—কেন?
রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কারণ এখন সেটা আমি জানি।
মায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।
অতীত তাদের জীবনের একটা অধ্যায় হয়ে রইল।
....