রিয়া ছিল শহরের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ীদের একজনের একমাত্র মেয়ে।
তার বাবা রাশেদ সাহেবের বিশাল ব্যবসা। শহরে তার কয়েকটা অফিস, বড় বড় গুদাম আর অসংখ্য কর্মচারী। শুধু ব্যবসাই নয়, রাশেদ সাহেবের সঙ্গে সবসময় কয়েকজন বিশ্বস্ত লোক থাকত। সবাই জানত, মেয়ের ব্যাপারে তিনি ভীষণ কঠোর।
তবে মেয়েকে তিনি কখনো কষ্ট দিতেন না।
রিয়ার চোখে পানি আসবে—এটা তিনি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারতেন না।
আর সেই মেয়েটাই ছিল অসম্ভব দুষ্টু।
রিয়ার বয়স বাইশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল সবাইকে বিরক্ত করা।
কখনো বাবার গুরুত্বপূর্ণ ফাইল লুকিয়ে রাখে।
কখনো বাবার ফোনের ওয়ালপেপার বদলে নিজের হাস্যকর ছবি দিয়ে দেয়।
আবার কখনো বাড়ির দারোয়ানদের সঙ্গে মিলে বাবাকে ভয় দেখানোর পরিকল্পনা করে।
রাশেদ সাহেব প্রতিবার রাগ করার অভিনয় করলেও শেষ পর্যন্ত মেয়ের মুখ দেখে হেসে ফেলতেন।
একদিন দুপুরে রিয়ার মা এসে বললেন,
—রিয়া, তোর বাবা তোকে ডাকছে।
রিয়া বিছানায় শুয়ে মোবাইল দেখছিল।
—কেন?
—সেটা গিয়ে জিজ্ঞেস কর।
রিয়া উঠে বলল,
—আবার কোনো কাজ দিয়েছে নাকি?
নিচে গিয়ে দেখল, বাবা বসার ঘরে বসে আছেন। সঙ্গে মা-ও আছেন।
রিয়া বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
—ডেকেছ?
রাশেদ সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন,
—হ্যাঁ।
রিয়া চোখ ছোট করে তাকাল।
—কী করেছি?
—তুই কিছু করিসনি।
—তাহলে এত গম্ভীর কেন?
রাশেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তোর বিয়ের কথা ভাবছি।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—আবার শুরু করলে?
—আবার না। এবার সত্যি।
—আমি এখন বিয়ে করব না।
—তুই সবসময় বলিস বিয়ে করবি না। কিন্তু একদিন তো করতেই হবে।
রিয়া চুপ করে গেল।
রাশেদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—মা, আমি তোকে জোর করছি না। শুধু একবার ছেলেটাকে দেখে কথা বলবি।
রিয়া বলল,
—ছেলে দেখতে আসবে?
—হ্যাঁ। আগামীকাল।
রিয়া চোখ বড় করে বলল,
—কাল?!
মা হেসে বললেন,
—হ্যাঁ।
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুচকি হাসল।
—ঠিক আছে।
রাশেদ সাহেব অবাক হলেন।
—এত সহজে রাজি?
রিয়া মিষ্টি হেসে বলল,
—দেখি না ছেলেটা কেমন!
মা মেয়ের হাসি দেখে সন্দেহ করলেন।
—রিয়া, কোনো দুষ্টুমি করবি না কিন্তু।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমি আবার কী করব?
মা বললেন,
—তোর মুখ দেখলেই বোঝা যায়।
পরদিন বিকেলে পাত্রপক্ষ এল।
ছেলেটার নাম সামির।
ভালো পরিবার, ভালো চাকরি, শিক্ষিত ছেলে। পরিবারের সবাই বেশ ভদ্র।
রিয়ার মা তাকে দেখতে পেয়ে খুশি হলেন।
কিন্তু রিয়া?
সে নিজের ঘরে বসে আয়নায় তাকিয়ে ভাবছিল,
‘দেখি, আজ কী করা যায়!’
কিছুক্ষণ পর মা এসে বললেন,
—রিয়া, নিচে আয়।
—আসছি।
রিয়া নিচে নামল।
সামিরের পাশে গিয়ে বসল।
সবাই রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
সামির ভদ্রভাবে বলল,
—আসসালামু আলাইকুম।
রিয়া বলল,
—ওয়ালাইকুম সালাম।
তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—আপনি কি সত্যিই মানুষ?
সামির হতভম্ব।
—জি?
রিয়া বলল,
—মানে... আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি মানুষ। কিন্তু নিশ্চিত হতে চাইলাম।
ঘরে বসা কয়েকজন হেসে ফেলল।
রাশেদ সাহেব কপালে হাত দিলেন।
সামির কোনো রকমে হাসল।
—জি, আমি মানুষই।
রিয়া মাথা নাড়ল।
—ভালো।
তারপর আবার বলল,
—আপনি কি ঘুমের মধ্যে কথা বলেন?
—না।
—নিশ্চিত?
—জি।
—আপনি কি রাগী?
—না, খুব একটা না।
রিয়া গম্ভীর মুখে বলল,
—তাহলে আপনি সন্দেহজনক।
সামির এবার কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল।
রিয়ার মা বললেন,
—রিয়া, চুপ কর।
রিয়া মুখ বন্ধ করল।
কিন্তু তার চোখে তখনও দুষ্টু ঝিলিক।
কিছুক্ষণ পর সামিরের মা বললেন,
—রিয়া মা, তুমি আমাদের ছেলের সঙ্গে একটু কথা বলো।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
—চলুন।
সামিরও উঠল।
দুজনকে বারান্দার দিকে পাঠানো হলো।
সামির বলল,
—আপনি কি সবসময় এমন?
রিয়া বলল,
—কেমন?
—এত অদ্ভুত প্রশ্ন করেন?
রিয়া মুচকি হাসল।
—আপনাকে একটু পরীক্ষা করছিলাম।
—কী পরীক্ষা?
—আপনি আমার দুষ্টুমি সহ্য করতে পারবেন কি না।
সামির কিছু বলার আগেই রিয়া তার হাতের দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
—আপনার হাতে ঘড়িটা সুন্দর।
সামির বলল,
—ধন্যবাদ।
রিয়া হঠাৎ তার হাত ধরে ফেলল।
সামির চমকে উঠল।
—কী করছেন?
রিয়া এক মুহূর্তের মধ্যে তার হাতে কামড় বসিয়ে দিল।
—আহ!
সামির হাত সরিয়ে নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
রিয়া তখন দৌড়ে ভেতরে চলে গেছে।
ঘরে ঢুকেই সে সোফায় বসে এমন ভাব করল যেন কিছুই হয়নি।
সামির রাগে লাল হয়ে ভেতরে ঢুকল।
তার মা জিজ্ঞেস করলেন,
—কী হয়েছে?
সামির নিজের হাত দেখিয়ে বলল,
—আপনাদের মেয়ের আচরণ কেমন, সেটা আপনারাই জানেন!
রাশেদ সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন,
—কী হয়েছে?
সামির রাগে বলল,
—আপনাদের মেয়ে আমাকে কামড় দিয়েছে!
ঘর একেবারে নিস্তব্ধ।
রিয়ার মা চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
রাশেদ সাহেব মেয়ের দিকে তাকালেন।
—রিয়া!
রিয়া ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।
সামিরের বাবা রেগে উঠে বললেন,
—আপনাদের মেয়ে এমন হলে আগে বলেননি কেন? আমাদের ছেলে কোনো পাগল মেয়েকে বিয়ে করবে না!
রিয়া এবার আর হাসি আটকাতে পারল না।
সে খিলখিল করে হেসে ফেলল।
সামিরের পরিবার আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকল না।
তারা রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
গাড়ি চলে যাওয়ার পর রাশেদ সাহেব ধীরে ধীরে রিয়ার দিকে তাকালেন।
রিয়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
বাবা বললেন,
—মা...
রিয়া আস্তে বলল,
—হুম?
—তোর দুষ্টুমি ভালো হবে কবে?
রিয়া বাবার কাছে গিয়ে বলল,
—বাবা, ছেলেটাকে আমার পছন্দ হয়নি।
—তাই বলে কামড় দিবি?
রিয়া মুচকি হেসে বলল,
—কথা বলে তো বুঝলাম না।
মা এবার হেসে ফেললেন।
রাশেদ সাহেবও শেষ পর্যন্ত হাসি চেপে রাখতে পারলেন না।
তিনি মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তুই আমাকে একদিন পাগল করে ছাড়বি।
রিয়া বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—আমি তো তোমার আদরের মেয়ে।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—হ্যাঁ, সেটাই তো আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা!
রিয়া হেসে উঠল।
কিন্তু রাশেদ সাহেবের মনে তখন একটা চিন্তা ঘুরছিল।
এই মেয়েকে সামলাতে পারবে—এমন মানুষ আদৌ পাওয়া যাবে তো?
সামিরের পরিবার চলে যাওয়ার পর পুরো বাড়িতে কিছুক্ষণ অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।
রিয়া নিজের ঘরে বসে জানালার পাশে দুলছিল।
মুখে তার হাসি।
কারণ একটা ঝামেলা থেকে সে আপাতত বেঁচে গেছে।
কিন্তু নিচে বসার ঘরে রাশেদ সাহেবের মুখটা ছিল চিন্তিত।
রিয়ার মা বললেন,
—মেয়েটাকে নিয়ে কী যে করি!
রাশেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—ওকে তো জোর করে কিছু করানো যাবে না।
—তবু একটা ভালো ছেলে তো দরকার।
—জানি।
কিছুক্ষণ পর রাশেদ সাহেব হঠাৎ বললেন,
—তবে একটা পরিবার সম্পর্কে শুনেছি। ছেলেটা ভালো। শিক্ষিত, দায়িত্বশীল। পরিবারও ভালো।
রিয়ার মা তাকালেন।
—আবার?
—এবার আমি আগে ছেলেটার ব্যাপারে সব জেনে নেব। তারপর রিয়াকে বলব।
পরদিন সকালে রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল।
হাতে ব্যাগ, কাঁধে ওড়না, মুখে দুষ্টু হাসি।
নিচে নামতেই বাবা বললেন,
—আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস।
রিয়া থেমে গেল।
—কেন?
—তোর সঙ্গে কথা আছে।
—আবার বিয়ে?
রাশেদ সাহেব চুপ।
রিয়া বুঝে গেল।
—বাবা!
—আগে ছেলেটার কথা শুন।
—আমি কিন্তু বিয়ের জন্য প্রস্তুত না।
—আমি তোকে এখনই বিয়ে দিচ্ছি না। শুধু একবার দেখা করবি।
রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—আচ্ছা, দেখি।
তারপর বেরিয়ে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় রিয়া বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে ঢুকতেই মা এসে বললেন,
—কাল বিকেলে আবার পাত্রপক্ষ আসবে।
রিয়া বিছানায় বসে বলল,
—আবার?
—হ্যাঁ।
—ছেলেটার নাম কী?
মা বললেন,
—তানভীর।
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তানভীর সাহেবকে এবার কামড় দেব না।
মা চোখ বড় করে বললেন,
—রিয়া!
রিয়া হেসে বলল,
—মজা করলাম।
মা জানতেন, মেয়ের মজা আর সত্যি কথার মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন।
পরদিন বিকেলে তানভীরের পরিবার এল।
তানভীর সামিরের মতো অস্বস্তিতে ভোগা ছেলে নয়। শান্তভাবে বসেছিল। তার বাবা-মাও বেশ ভদ্র।
রাশেদ সাহেব প্রথমে তানভীরের সঙ্গে ব্যবসা, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বললেন।
সবকিছুই ভালো লাগল।
তারপর রিয়ার মা মেয়েকে ডাকলেন।
রিয়া নিচে এসে সবার সামনে বসতেই তানভীর মৃদু হাসল।
—আসসালামু আলাইকুম।
রিয়া বলল,
—ওয়ালাইকুম সালাম।
তারপর সে তানভীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি আমাকে আগে থেকেই বিয়ে করতে রাজি?
তানভীর একটু থেমে বলল,
—পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপনাকে দেখে, কথা বলে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে চাই।
রিয়া মনে মনে বলল,
‘বেশ চালাক!’
সে আবার বলল,
—আমি কিন্তু অনেক দুষ্টু।
তানভীর হেসে বলল,
—সেটা শুনেছি।
রিয়া অবাক।
—কে বলেছে?
তানভীর বলল,
—আপনার ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার সময় অনেক কিছুই শুনেছি।
রিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
—কী শুনেছেন?
—আপনি বাবার খুব আদরের মেয়ে।
রিয়া একটু নরম হলো।
তানভীর আবার বলল,
—আর আপনি নাকি বাড়িতে সবাইকে হাসিয়ে রাখেন।
রিয়া এবার হাসল।
—এটা ঠিক।
তানভীর বলল,
—তাহলে সমস্যা কী?
রিয়া চুপ করে গেল।
তানভীরের সঙ্গে তার কথা খারাপ লাগছিল না।
কিন্তু তার মনে বিয়ের জন্য কোনো আগ্রহই ছিল না।
কিছুক্ষণ পর দুই পরিবার সিদ্ধান্ত নিল, তানভীর ও রিয়া চাইলে বিয়ের ব্যাপারে এগোনো যায়।
তানভীরের পরিবারও রাজি।
রাশেদ সাহেব মেয়েকে আলাদা করে ডেকে বললেন,
—মা, তুই কী বলিস?
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তুমি খুশি?
বাবা বললেন,
—আমি চাই তুই সুখে থাকিস।
রিয়া বাবার দিকে তাকাল।
—তাহলে ঠিক আছে।
রাশেদ সাহেব অবাক হয়ে বললেন,
—তুই রাজি?
রিয়া জোর করে হাসল।
—হ্যাঁ।
কিন্তু তার ভেতরটা তখন একদম ফাঁকা।
রাতে নিজের ঘরে এসে রিয়া দরজা বন্ধ করল।
মা কিছুক্ষণ পর ঘরে ঢুকলেন।
—মা?
রিয়া বিছানায় বসে ছিল।
—হুম?
—তুই কি সত্যিই রাজি?
রিয়া মায়ের দিকে তাকাল।
তারপর আস্তে বলল,
—না।
মা চুপ করে গেলেন।
—তাহলে বাবাকে বলিস।
রিয়া মাথা নাড়ল।
—বাবা এত খুশি হয়েছে। আমি কীভাবে বলব?
—তুই নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবি।
রিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি বিয়ে করতে চাই না। কিন্তু বাবার মন খারাপ করতে চাই না।
মা মেয়ের পাশে বসে বললেন,
—তুই কি কোনো পরিকল্পনা করেছিস?
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হালকা হাসল।
—হ্যাঁ।
মা বুঝতে পারলেন, মেয়ের মাথায় আবার কোনো দুষ্টুমি এসেছে।
—কী পরিকল্পনা?
রিয়া ফিসফিস করে বলল,
—বিয়ের দিন আমি পালাব।
মা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।
—রিয়া!
—আমি সত্যিই বলছি।
—কোথায় যাবি?
—জানি না।
—কার কাছে থাকবি?
—আমার এক বান্ধবীর বাসায় কয়েকদিন থাকব।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তুই জানিস, তোর বাবা তোকে কত ভালোবাসে?
—জানি।
—তাহলে ওনাকে না জানিয়ে পালাবি?
রিয়ার চোখ নিচু হয়ে গেল।
—আমি বাবাকে কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু নিজের জীবনটাও তো নষ্ট করতে পারি না।
মা মেয়ের হাত ধরলেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আমি তোকে জোর করব না।
রিয়া মায়ের দিকে তাকাল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ। তবে সাবধানে থাকবি।
রিয়া মাকে জড়িয়ে ধরল।
—মা, তুমি পৃথিবীর সেরা।
মা হেসে বললেন,
—আর তুই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুষ্টু।
দিনগুলো দ্রুত কেটে গেল।
বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো।
বাড়িতে সাজসজ্জা, আত্মীয়দের আসা-যাওয়া, কেনাকাটা—সবকিছু নিয়ে ব্যস্ততা।
রিয়ার বাবা মেয়ের জন্য একের পর এক জিনিস কিনে আনছেন।
কখনো শাড়ি দেখাচ্ছেন।
কখনো গয়না।
কখনো বলছেন,
—মা, এটা কেমন?
রিয়া হাসিমুখে বলছে,
—খুব সুন্দর।
কিন্তু প্রতিবারই তার বুকের ভেতর একটা চাপা কষ্ট হচ্ছিল।
কারণ সে জানত—
এই বিয়ে সে করবে না।
তার মা সব জানতেন।
তিনি গোপনে রিয়ার প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস আলাদা করে রাখতে সাহায্য করলেন।
এদিকে রিয়া তার বান্ধবী মিতুকে ফোন করে বলল,
—মিতু, আমার বিয়ের দিন রাতে আমি তোমার বাসায় চলে আসব।
মিতু অবাক হয়ে বলল,
—তুই সত্যি পালাবি?
—হ্যাঁ।
—কিন্তু তোর বাবা?
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—বাবা আমাকে খুব ভালোবাসে। তাই জানি, রাগ করলেও একদিন বুঝবে।
মিতু বলল,
—ঠিক আছে। তুই চলে আসিস।
রিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
অবশেষে বিয়ের দিন চলে এল।
সারাদিন বাড়িতে হৈচৈ।
রিয়াকে সাজানো হলো।
লাল শাড়ি, গয়না, হাতে মেহেদি—সবকিছু ঠিকঠাক।
বাইরে অতিথিদের ভিড়।
রাশেদ সাহেব মেয়েকে দেখে আবেগে চোখ মুছে ফেললেন।
—আমার মেয়েটা এত বড় হয়ে গেল!
রিয়া বাবার হাত ধরে হাসল।
—বাবা...
—কী?
—তুমি কাঁদবে না কিন্তু।
বাবা হেসে বললেন,
—আমি কাঁদছি না।
রিয়া বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
তার বুকটা তখন ভারী হয়ে উঠেছে।
সে জানত, কয়েক ঘণ্টা পরই এই বাড়ি ছেড়ে পালাবে।
রাত গভীর হলো।
বাড়ির সবাই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত।
রিয়া সুযোগ বুঝে নিজের ঘরে ফিরে এল।
তার মা দরজা বন্ধ করে দিলেন।
—সব প্রস্তুত?
রিয়া মাথা নাড়ল।
মা জানালা খুলে দিলেন।
বারান্দার নিচে আগে থেকেই একটি দড়ি রাখা ছিল।
রিয়া শেষবারের মতো নিজের ঘরের দিকে তাকাল।
তার চোখে পানি চলে এল।
—মা...
মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।
—সাবধানে থাকিস।
রিয়া চোখ মুছে বলল,
—আমি ঠিক থাকব।
তারপর দড়ি ধরে ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর সে বাড়ির বাইরে।
কনে সাজে, গয়না পরে, হাতে ছোট একটা ব্যাগ।
সে দ্রুত অন্ধকার রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল।
তার মনে তখন একটাই চিন্তা—
আজ থেকে নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচবে।
রিয়া দ্রুত হাঁটছিল।
কনে সাজে তাকে দেখতে অদ্ভুত লাগছিল। লাল শাড়ির সঙ্গে ভারী গয়না, হাতে মেহেদি, কপালে টিপ—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল যেন কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে সরাসরি বেরিয়ে এসেছে।
অথচ সত্যিটা হলো, সে নিজের বিয়ের অনুষ্ঠান থেকেই পালিয়ে এসেছে।
রাস্তায় বের হওয়ার পর প্রথমে তার খুব সাহস লাগছিল।
মনে হচ্ছিল, সে অসম্ভব বুদ্ধিমানের কাজ করেছে।
কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরই বুঝল, সামনে আসলে কোথায় যাবে সে নিজেই জানে না।
তার বান্ধবী মিতুর বাসায় যাওয়ার কথা।
রিয়া ফোন বের করে মিতিকে কল দিল।
—হ্যালো?
মিতুর কণ্ঠ শুনেই রিয়া বলল,
—মিতু, আমি বের হয়ে গেছি। এখন তোমার বাসায় আসছি।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মিতু বলল,
—রিয়া, একটা সমস্যা হয়েছে।
রিয়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—কী সমস্যা?
—আম্মু জানতে পেরেছে তুই পালিয়ে আসছিস।
—তাহলে?
—আম্মু আমাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে, তোকে বাসায় আনা যাবে না।
রিয়া হতভম্ব।
—কী বলছিস?
—আমি খুব দুঃখিত রে। আমি চেষ্টা করেছি। কিন্তু আম্মু একদম রাজি না।
রিয়া রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—তুই তো বলেছিলি আমি গেলে থাকতে পারব!
—আমি জানি। কিন্তু এখন আমি কী করব?
রিয়া আর কিছু শুনল না।
—থাক, দরকার নেই।
কল কেটে দিল।
কিছুক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বিরক্ত হয়ে বলল,
—সবাই শুধু কথা দিতে জানে!
সে আবার হাঁটতে শুরু করল।
রাত তখন প্রায় বারোটা।
শহরের ব্যস্ত রাস্তার বেশিরভাগ দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।
কিছু দূরে রাস্তার বাতিগুলো জ্বলছে।
রিয়া হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেল।
পায়ের ভারী গয়না আর শাড়ি নিয়ে এতদূর হাঁটা সহজ ছিল না।
শেষ পর্যন্ত রাস্তার পাশে একটা বেঞ্চের মতো জায়গায় বসে পড়ল।
হাতের ব্যাগটা পাশে রাখল।
মাথাটা নিচু করে বসে রইল।
হঠাৎ দূর থেকে একটা বাইকের শব্দ শোনা গেল।
একটা কালো বাইক ধীরে ধীরে তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।
বাইক চালাচ্ছিল একজন যুবক।
লম্বা, গম্ভীর চেহারা, পরনে কালো শার্ট।
তার নাম আদনান।
আদনান পেশায় পুলিশ কর্মকর্তা।
সারাদিনের কাজ শেষে সে বাড়ি ফিরছিল।
কিন্তু কনে সাজে রাত বারোটায় রাস্তার পাশে একা বসে থাকা মেয়েটিকে দেখে সে স্বাভাবিকভাবেই বাইকের গতি কমিয়ে দিল।
কিছুদূর গিয়ে আবার থামল।
পেছনে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটি একইভাবে বসে আছে।
আদনান কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা করল।
তারপর বাইক ঘুরিয়ে রিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল।
হেলমেটটা খুলে বলল,
—আপনি কনে সেজে এত রাতে এখানে একা বসে আছেন কেন?
রিয়া মাথা তুলে তাকাল।
এই প্রথম সে আদনানকে দেখল।
গম্ভীর মুখ।
চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
কথাবার্তাতেও কোনো বাড়তি মিষ্টতা নেই।
রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—আপনার কী?
আদনান শান্তভাবে বলল,
—কিছু না। শুধু জানতে চাইলাম, কোনো সাহায্য লাগবে কি না।
রিয়া বলল,
—না। কোনো সাহায্য লাগবে না। আপনি যান।
আদনান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—ঠিক আছে।
বাইক ঘুরিয়ে চলে গেল।
রিয়া ভাবল, ‘বাঁচা গেল। লোকটা তো বেশ রাগী মনে হচ্ছে।’
কিন্তু কয়েক মিনিট পর আদনানের মনটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে ভরে উঠল।
মেয়েটাকে এভাবে একা রেখে চলে আসা ঠিক হয়েছে কি না, সে বুঝতে পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত নিজের অজান্তেই বাইক ঘুরিয়ে আবার সেই জায়গায় ফিরে এল।
ফিরে এসে আদনান দেখল, কয়েকজন ছেলে রিয়ার আশপাশে দাঁড়িয়ে আছে।
একজন বলছে,
—আপু, এত রাতে একা বসে আছেন কেন?
আরেকজন বলল,
—চলুন, আমরা আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিই।
রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—আপনারা এখান থেকে যান।
ছেলেগুলো হাসছিল।
ঠিক তখন আদনানের বাইক এসে থামল।
আদনান নেমে ধীর পায়ে এগিয়ে এল।
—কী হচ্ছে এখানে?
একজন ছেলে ঘুরে তাকিয়ে বলল,
—তুই কে?
আদনান বলল,
—আমি যা জিজ্ঞেস করেছি, তার উত্তর দাও।
ছেলেটা এগিয়ে এসে আদনানকে ধাক্কা দিল।
—তুই বেশি কথা বলিস কেন?
আদনান আর এক মুহূর্তও কথা বাড়াল না।
একটা চড় মারতেই ছেলেটা কয়েক পা দূরে গিয়ে পড়ে গেল।
বাকি ছেলেরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল।
আদনান কঠিন চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
—এখনও দাঁড়িয়ে আছ কেন?
তারা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
রিয়া পুরো ঘটনা দেখে হতভম্ব।
কিছুক্ষণ পর বলল,
—আপনি... এত জোরে মারলেন কেন?
আদনান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ওরা আপনাকে বিরক্ত করছিল।
রিয়া চুপ করে গেল।
আদনান বলল,
—আপনি কোথায় যাবেন?
রিয়া মুখ নিচু করে বলল,
—এক বান্ধবীর বাসায়।
—সে কি আপনাকে নিতে আসবে?
রিয়া চুপ।
—ঠিকানা জানেন?
—জানি।
—তাহলে ফোন করুন।
রিয়া ফোন বের করে বলল,
—ওদের বাসায় যেতে পারব না।
আদনান বুঝল, পরিস্থিতি অন্যরকম।
—তাহলে?
রিয়া অসহায় গলায় বলল,
—জানি না।
আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—বুঝতেই পারছি, আপনি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছেন।
রিয়া চমকে তাকাল।
—কীভাবে বুঝলেন?
আদনান তার পোশাকের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কনে সাজে রাত বারোটায় রাস্তার পাশে একা বসে থাকা সাধারণ ব্যাপার নয়।
রিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—আমি বিয়ে করতে চাইনি।
—তাই বলে এভাবে বেরিয়ে এসেছেন?
—হ্যাঁ।
—আপনার পরিবার জানে?
রিয়া চুপ।
আদনান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—ঠিক আছে। এখন আর প্রশ্ন করব না।
রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
আদনান বলল,
—আমার বাড়ি এখান থেকে বেশি দূরে নয়। আমাদের বাড়িতে অনেক মানুষ থাকে। আপনি চাইলে আজ রাতে সেখানে থাকতে পারেন। সকালে নিরাপদ জায়গায় চলে যাবেন।
রিয়া কিছুক্ষণ দ্বিধা করল।
তারপর বলল,
—আপনার বাড়িতে?
—হ্যাঁ।
—আপনার পরিবার কী বলবে?
—আমি সামলে নেব।
রিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
আদনান বাইকের দিকে ইশারা করে বলল,
—উঠুন।
রিয়া বাইকের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি কখনো বাইকে উঠিনি।
আদনান বলল,
—তাহলে আজ প্রথমবার।
রিয়া পেছনে উঠে বসল।
আদনান বাইক চালু করল।
কিছুদূর যেতেই বলল,
—ভালোভাবে বসুন।
রিয়া বলল,
—আমি ঠিক আছি।
—পড়ে গেলে কিন্তু আমাকে দোষ দেবেন না।
রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—আমি পড়ব না।
আদনান আর কিছু বলল না।
বাইক রাতের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলল।
কিছুক্ষণ পর রিয়া পেছন থেকে আস্তে করে বলল,
—আপনার নাম কী?
আদনান বলল,
—আদনান।
—শুধু আদনান?
—হ্যাঁ।
রিয়া বলল,
—আমি রিয়া।
আদনান বলল,
—জানি।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—কীভাবে?
আদনান মৃদু হেসে বলল,
—আপনার হাতে মেহেদিতে নাম লেখা আছে।
রিয়া নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর বাইকটা একটা বড় গেটের সামনে এসে থামল।
আদনান গেটের দিকে তাকিয়ে বলল,
—এটাই আমার বাড়ি।
গেট খুলে গেল।
ভেতরে বিশাল বাড়ি।
আলোয় পুরো উঠান ঝলমল করছে।
আদনানের বাইক ঢুকতেই বাড়ির কয়েকজন সদস্য বাইরে বেরিয়ে এল।
আদনানের মা অবাক হয়ে বললেন,
—আদনান, এত রাতে?
তারপর রিয়ার দিকে তাকিয়ে আরও অবাক হলেন।
—এই মেয়েটি কে?
আদনান কিছু বলার আগেই রিয়া হাত জোড় করে বলল,
—আসসালামু আলাইকুম।
আদনানের মা মমতা নিয়ে বললেন,
—ওয়ালাইকুম সালাম মা। এসো, ভেতরে এসো।
রিয়া অবাক হয়ে আদনানের দিকে তাকাল।
সে ভাবেনি, অপরিচিত একটা বাড়িতে এসে এত সহজে কেউ তাকে আপন করে নেবে।
আর আদনান?
সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার জীবনে যে মেয়েটি মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে অচেনা ছিল, সেই মেয়েটিই যে খুব শিগগির পুরো বাড়িটাকে হাসিতে ভরিয়ে দেবে—তা তখনও কেউ জানত না।
আদনানের বাড়িতে ঢুকেই রিয়া বুঝল, এটা শুধু বড় একটা বাড়ি নয়—এখানে অনেক মানুষ একসঙ্গে থাকে।
বসার ঘর থেকে একজন চাচি বেরিয়ে এলেন।
তার পেছনে দুই-তিনজন মেয়ে।
সবাই কৌতূহলী চোখে রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
আদনানের মা রিয়ার কাছে এসে বললেন,
—মা, ভয় পেয়ো না। এসো, ভেতরে বসো।
রিয়া একটু ইতস্তত করে বলল,
—আমি আসলে...
আদনানের মা তার কথা থামিয়ে বললেন,
—আগে বসো। এত রাতে বাইরে ছিলে, নিশ্চয়ই অনেক ক্লান্ত।
রিয়া চুপচাপ সোফায় বসল।
আদনানের ছোট চাচাতো বোন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল,
—ভাবি, আপনি সত্যিই কনে সেজে পালিয়েছেন?
রিয়া চোখ বড় করে বলল,
—ভাবি?!
মেয়েটা হেসে বলল,
—আপনাকে দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।
রিয়া কিছু বলার আগেই আদনান বলল,
—এখনই এত প্রশ্ন করার দরকার নেই।
মেয়েটা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—আচ্ছা ভাইয়া।
তারপর আবার রিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
আদনানের মা বললেন,
—তুমি একটু ফ্রেশ হয়ে নাও মা। তারপর কথা হবে।
রিয়া মাথা নাড়ল।
—জি।
আদনান তার মাকে বলল,
—মা, ও আজ রাতে এখানে থাকবে। সকালে ও যেখানে যেতে চায়, আমি পৌঁছে দেব।
মা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—ঠিক আছে। কিন্তু আগে মেয়েটাকে খেতে দাও।
রিয়া তাড়াতাড়ি বলল,
—না না, আমি খাব না। আমার খিদে নেই।
আদনানের মা বললেন,
—এত রাতে একটা মেয়ে কনে সেজে একা রাস্তায় ছিল, নিশ্চয়ই কিছু খায়নি। তুমি চুপ করো, আমি খাবার দিচ্ছি।
রিয়া মৃদু হেসে ফেলল।
—আচ্ছা।
কিছুক্ষণ পর রিয়াকে একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো।
আদনানের চাচাতো বোনেরা তার সঙ্গে গেল।
একজন বলল,
—আপনার নাম রিয়া, তাই তো?
—হ্যাঁ।
—আপনি কোথা থেকে পালিয়েছেন?
রিয়া একটু চমকে তাকাল।
—তুমি কীভাবে বুঝলে?
—আপনার সাজ দেখেই।
আরেকজন বলল,
—বিয়ের শাড়ি, গয়না, হাতে মেহেদি... আর মাঝরাতে ভাইয়ার বাইকে এসে হাজির! গল্পটা তো দারুণ।
রিয়া হেসে ফেলল।
—গল্প শুনতে চাও?
সবাই একসঙ্গে বলল,
—হ্যাঁ!
রিয়া বিছানায় বসে শুরু করল,
—আমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল।
একজন জিজ্ঞেস করল,
—আপনি বিয়েতে রাজি ছিলেন না?
—না।
—তাই পালিয়েছেন?
—হ্যাঁ।
—আপনার বাবা কী করবেন?
রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—বাবা আমাকে খুব ভালোবাসে। তাই ভয় হচ্ছে।
মেয়েরা একটু চুপ হয়ে গেল।
তারপর রিয়া নিজেই বলল,
—কিন্তু আমার বাবা খুব মজারও।
—কীভাবে?
রিয়া হেসে বলল,
—একবার আমাকে দেখতে ছেলে এসেছিল। আমি গিয়ে ছেলেটার পাশে বসে একের পর এক অদ্ভুত প্রশ্ন করেছিলাম। শেষে তার হাতে কামড় দিয়ে দিয়েছিলাম।
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
একজন বলল,
—আপনি সত্যিই দুষ্টু!
রিয়া গর্ব করে বলল,
—আমি ছোটবেলা থেকেই।
আরেকজন বলল,
—তাহলে আজ রাতে পালানোর ঘটনাটা কীভাবে হলো?
রিয়া সব খুলে বলল।
কীভাবে মায়ের সাহায্যে বারান্দা দিয়ে নেমেছে, কীভাবে বান্ধবীকে ফোন করেছে, আর শেষ পর্যন্ত কীভাবে রাস্তায় বসে ছিল।
মেয়েরা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল।
ঠিক তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আদনান সব শুনে ফেলল।
সে কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
আদনানের ছোট বোন তাকে দেখে এগিয়ে এসে ধাক্কা দিয়ে বলল,
—কী ভাইয়া? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবির গল্প শুনছ?
আদনান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না। আমি তো এমনি দাঁড়িয়েছিলাম।
বোন মুচকি হেসে বলল,
—হ্যাঁ, বুঝেছি। এমনি!
আদনান বলল,
—তুই বেশি কথা বলিস না।
মেয়েটা হেসে পালিয়ে গেল।
রিয়া বিষয়টা দেখে হেসে ফেলল।
পরদিন সকাল।
আদনানের বাড়িতে রিয়া যেন এক রাতেই সবার প্রিয় হয়ে গেছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে নিচে এসে দেখল, আদনান উঠানের এক পাশে শরীরচর্চা করছে।
আদনানের পরনে সাধারণ ট্র্যাকপ্যান্ট আর টি-শার্ট।
রিয়া কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল।
আদনান তাকে দেখে বলল,
—কী দেখছেন?
রিয়া বলল,
—কিছু না।
—তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
—দেখছিলাম আপনি সকালে এত পরিশ্রম করেন কেন।
—অভ্যাস।
রিয়া বলল,
—আমি হলে আরও দশ মিনিট ঘুমাতাম।
আদনান বলল,
—সেটা আপনার দেখেই বোঝা যায়।
রিয়া চোখ বড় করে বলল,
—আপনি আমাকে অপমান করলেন?
—না। সত্যি বললাম।
রিয়া মুখ বাঁকিয়ে চলে গেল।
কিন্তু কয়েক পা যেতেই পেছন ফিরে বলল,
—আপনি খুব রাগী।
আদনান বলল,
—আমি রাগী নই।
রিয়া হেসে বলল,
—আপনার মুখই বলে দেয়।
নাশতার টেবিলে সবাই বসেছে।
রিয়ার সামনে অনেক খাবার।
আদনানের মা বললেন,
—মা, যা ইচ্ছা খাও।
রিয়া বলল,
—আমি এত কিছু খেতে পারব না।
আদনানের ছোট বোন বলল,
—ভাবি, ভাইয়া কিন্তু প্রতিদিন সকালে খুব নিয়ম করে খায়।
রিয়া কৌতূহলী হয়ে বলল,
—কী খায়?
মেয়েটা হেসে বলল,
—ডিম খায়। কখনো সেদ্ধ, কখনো কাঁচা ডিমও খেয়ে ফেলে।
রিয়া চোখ বড় করে আদনানের দিকে তাকাল।
—কাঁচা ডিম?
আদনান শান্তভাবে বলল,
—হ্যাঁ।
রিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—আপনি মানুষ তো?
সবাই হেসে ফেলল।
আদনানও হালকা হাসল।
—আপনি এই প্রশ্নটা আগেও করেছেন।
রিয়া বলল,
—আপনাকে দেখে মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়।
দিন যত গড়াতে লাগল, রিয়া ততই বাড়ির সবার সঙ্গে মিশে গেল।
আদনানের চাচাতো বোনেরা তাকে নিয়ে কখনো লুকোচুরি খেলছে, কখনো গল্প করছে।
একদিন রিয়া বলল,
—চলো, লুকোচুরি খেলি।
একজন বলল,
—আমরা বড় হয়ে গেছি!
রিয়া বলল,
—বড় হলেই খেলতে নেই?
শেষ পর্যন্ত সবাই রাজি হয়ে গেল।
রিয়া দৌড়ে গিয়ে একটা জায়গায় লুকিয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর সে দৌড়াতে গিয়ে হঠাৎ কারও সঙ্গে ধাক্কা খেল।
—আহ!
সামনে তাকিয়ে দেখল, আদনান দাঁড়িয়ে।
রিয়া ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
আদনান দ্রুত তার হাত ধরে সামলে দিল।
—সাবধানে!
রিয়া মাথা তুলে তাকাল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
ঠিক তখন পেছন থেকে চাচাতো বোনেরা হেসে উঠল।
—ওহহ! কী হলো?
রিয়া লজ্জা পেয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল।
—কিছু না!
আদনানও স্বাভাবিকভাবে বলল,
—দৌড়ানোর সময় সামনে তাকিয়ে দৌড়াবেন।
রিয়া বলল,
—আপনিই তো সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন!
আদনান বলল,
—এই বাড়ির সব দোষ আমার!
মেয়েরা আবার হেসে উঠল।
কয়েকদিন কেটে গেল।
রিয়া এখনো প্রতিদিন মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে।
একদিন ফোন রেখে তার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।
মা বলেছিলেন,
—মা, তুই ভালো আছিস তো?
রিয়া বলেছিল,
—হ্যাঁ।
কিন্তু ফোন রাখার পর তার চোখ ভিজে উঠেছিল।
আদনানের মা সেটা দূর থেকে দেখে ফেললেন।
তিনি কিছু বললেন না।
সন্ধ্যায় আদনান বাড়ি ফিরতেই মা তাকে ডেকে বললেন,
—বাবা, একটা কথা বলব?
—জি।
—রিয়ার মনটা ভালো নেই।
আদনান চুপ করে শুনল।
মা বললেন,
—মেয়েটা নিজের বাড়ি, বাবা-মা, সব ছেড়ে এসেছে। ওকে কোথাও একটু ঘুরিয়ে নিয়ে যা। মনটা ভালো হবে।
আদনান বলল,
—কোথায়?
মা হেসে বললেন,
—যেখানে গেলে ওর ভালো লাগবে।
আদনান কিছুক্ষণ ভাবল।
তারপর বলল,
—ঠিক আছে।
পরদিন সকালে আদনান রিয়াকে বলল,
—আজ আমার সঙ্গে বের হবেন?
রিয়া অবাক।
—কোথায়?
—জানবেন না।
—আমি না জেনে যাব?
—হ্যাঁ।
রিয়া মুচকি হেসে বলল,
—ঠিক আছে।
কিছুক্ষণ পর তারা বাইকে বেরিয়ে পড়ল।
শহর পেরিয়ে রাস্তা ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে লাগল।
চারপাশে সবুজ গাছপালা।
রিয়ার মুখে বাতাস লাগছে।
সে অনেকদিন পর মন খুলে হাসল।
আদনান বাইক চালাতে চালাতে বলল,
—আমার কাঁধে হাত রাখুন। না হলে হঠাৎ বাইক ঝাঁকুনি দিলে পড়ে যেতে পারেন।
রিয়া বলল,
—আমি ঠিক থাকতে পারব।
আদনান কিছু বলল না।
কিছুদূর পর রাস্তার একটা উঁচু জায়গায় বাইক উঠতেই সামান্য ঝাঁকুনি হলো।
রিয়া সামনের দিকে হেলে আদনানের পিঠে ধাক্কা খেল।
আদনান বলল,
—দেখলেন তো?
রিয়া এবার আর কিছু বলল না।
ধীরে ধীরে তার হাত আদনানের কাঁধে এসে রাখল।
আর আদনান বাইক চালাতে চালাতে প্রথমবার অনুভব করল—
তার পেছনে বসা এই দুষ্টু মেয়েটার উপস্থিতি যেন তার নিত্যদিনের জীবনের অংশ হয়ে যাচ্ছে।
আদনানের বাইকটা ধীরে ধীরে শহর থেকে আরও দূরে চলে গেল।
চারপাশে এখন শুধু সবুজ গাছপালা, ছোট ছোট পাহাড়ি টিলা আর সরু রাস্তা। বাতাসটাও যেন শহরের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত।
রিয়া এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল।
হঠাৎ সে দুই হাত একটু ছড়িয়ে দিয়ে বলল,
—আহা! কী সুন্দর বাতাস!
আদনান বাইক চালাতে চালাতেই মুচকি হাসল।
রিয়া চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিল।
—অনেকদিন পর মনে হচ্ছে আমি সত্যি ভালো আছি।
আদনান বলল,
—তাহলে আজকের ঘোরাটা কাজে লাগল।
রিয়া চোখ খুলে বলল,
—হুম।
কিছুক্ষণ পর রিয়া আবার হাত দুটো বাতাসে মেলে দিল।
ঠিক তখনই বাতাসে উড়ে আসা একটা চুল তার চোখে গিয়ে পড়ল।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ কুঁচকে ফেলল।
—আহ! চোখে কিছু ঢুকেছে।
আদনান সঙ্গে সঙ্গে বাইকটা রাস্তার পাশে থামাল।
—কোথায়?
—চোখে।
—কোন চোখ?
—এইটা।
রিয়া চোখ বন্ধ করে দেখানোর চেষ্টা করল।
আদনান কাছে এসে বলল,
—চোখটা খুলুন। দেখি।
রিয়া চোখ খুলতে পারছিল না।
আদনান তার মুখের সামনে এসে চুলগুলো সরিয়ে দিল।
—একটু স্থির থাকুন।
রিয়া চুপ করে রইল।
আদনান খুব সাবধানে চোখের কোণ থেকে ছোট্ট একটা কণা বের করে দিল।
—হয়ে গেছে।
রিয়া চোখ মেলে তাকাল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
কিছুক্ষণ দুজনের চোখাচোখি হলো।
আদনান হঠাৎ বুঝতে পারল, সে প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি সময় রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
সঙ্গে সঙ্গে সরে গিয়ে বলল,
—চলুন।
রিয়াও একটু অপ্রস্তুত হয়ে বাইকে উঠে বসল।
তার নিজেরও কেন যেন বুকের ভেতরটা অদ্ভুত লাগছিল।
কিছুক্ষণ পর তারা একটা সুন্দর জায়গায় পৌঁছাল।
সামনে বিস্তৃত সবুজ মাঠ। দূরে পাহাড়ের রেখা। পাশে ছোট্ট একটা ঝরনা।
রিয়া বাইক থেকে নেমেই অবাক হয়ে বলল,
—এটা কোথায়?
আদনান বলল,
—শহর থেকে একটু দূরে। আমি মাঝে মাঝে এখানে আসি।
রিয়া চারদিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি একা একা এখানে আসেন?
—কখনো একা। কখনো বন্ধুদের সঙ্গে।
রিয়া বলল,
—আজ থেকে আমি আপনার সঙ্গে আসব।
আদনান ভ্রু তুলে বলল,
—এত দ্রুত সিদ্ধান্ত?
—আমি জায়গাটা পছন্দ করেছি।
তারপর রিয়া দৌড়ে ঝরনার কাছে চলে গেল।
আদনান দূর থেকে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল।
মেয়েটা যেন কয়েকদিন আগের সেই কনে নয়।
আজ তার মুখে কোনো ভয় নেই।
শুধু হাসি।
রিয়া একটা পাথরের ওপর বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল,
—আদনান!
—হুম?
—আপনি ছোটবেলায়ও এত রাগী ছিলেন?
আদনান হেসে বলল,
—আমি রাগী নই।
—আবার বলছেন!
—সত্যিই।
—তাহলে সেদিন ওই ছেলেটাকে এত জোরে চড় মেরেছিলেন কেন?
—ও আপনাকে বিরক্ত করছিল।
রিয়া মুচকি হেসে বলল,
—আমার জন্য রাগ করেছিলেন?
আদনান একটু থেমে বলল,
—যে কাউকে বিরক্ত করলেও করতাম।
রিয়ার মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।
—ওহ।
আদনান তার মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করল।
—কী হলো?
—কিছু না।
তারপর আবার হাসল।
দুপুরের দিকে তারা একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্টে খাবার খেল।
রিয়া মেনু হাতে নিয়ে একের পর এক খাবারের নাম বলছে।
—এটা চাই।
—আর এটা।
—ওটা দুইটা।
আদনান বলল,
—আপনি এত খাবেন?
রিয়া বলল,
—আমি না খেলে কে খাবে?
আদনান হেসে ফেলল।
খাওয়া শেষে রিয়া বলল,
—আজকে কিন্তু বিল আপনি দেবেন।
—আমি জানি।
—কেন?
—কারণ আপনি একা বিল দেওয়ার মানুষ নন।
রিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—আমি কিন্তু অনেক টাকা খরচ করতে পারি।
আদনান বলল,
—সেটাও বুঝেছি।
রিয়া হেসে ফেলল।
বিকেলে তারা বাড়ি ফিরল।
গেট দিয়ে ঢুকতেই আদনানের ছোট বোন দৌড়ে এল।
—ভাবি! কোথায় গিয়েছিলেন?
রিয়া বলল,
—ঘুরতে।
—ভাইয়ার সঙ্গে?
—হ্যাঁ।
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে আদনানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
—ওহ্!
আদনান বলল,
—এই ‘ওহ্’ বন্ধ কর।
মেয়েটা হেসে পালিয়ে গেল।
রিয়া বলল,
—আপনার বোন খুব দুষ্টু।
আদনান বলল,
—ও আপনার চেয়েও দুষ্টু।
রিয়া বলল,
—অসম্ভব।
সন্ধ্যায় রিয়া তার মাকে ফোন করল।
—মা, আজ খুব সুন্দর একটা জায়গায় গিয়েছিলাম।
মা জিজ্ঞেস করলেন,
—কার সঙ্গে?
রিয়া একটু থেমে বলল,
—আদনানের সঙ্গে।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর মা মৃদু হেসে বললেন,
—ভালো লাগল?
রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—হ্যাঁ।
—খুব?
রিয়া উত্তর দিল না।
মা বুঝে গেলেন।
—মা, তুই ঠিক আছিস তো?
রিয়া এবার বলল,
—হ্যাঁ মা। এখানে সবাই খুব ভালো।
মা বললেন,
—আদনানও?
রিয়া চুপ করে গেল।
তারপর ধীরে বলল,
—হুম।
কয়েকদিনের মধ্যেই রিয়ার সঙ্গে আদনানের পরিবারের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে গেল।
আদনানের মা তাকে নিজের মেয়ের মতো দেখেন।
চাচাতো বোনেরা সারাদিন তাকে নিয়ে দুষ্টুমি করে।
আর রিয়া?
সে পুরো বাড়িটাকেই নিজের মতো করে নিয়েছে।
একদিন দুপুরে রিয়া সবাইকে নিয়ে লুকোচুরি খেলছিল।
আদনানের এক চাচাতো বোন বলল,
—ভাবি, ভাইয়াকে খেলায় নেব?
রিয়া বলল,
—না! উনি খেললে সবাইকে ধরে ফেলবেন।
ঠিক তখন পেছন থেকে আদনানের গলা,
—কাকে ধরে ফেলব?
সবাই চুপ।
রিয়া ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।
আদনান দাঁড়িয়ে।
রিয়া হাসি দিয়ে বলল,
—কাউকে না।
—তাহলে লুকোচুরি খেলছেন কেন?
—আমরা খেলছি। আপনি যান।
আদনান বলল,
—ঠিক আছে।
সে চলে যেতেই রিয়া ফিসফিস করে বলল,
—ওকে বিশ্বাস করা যায় না।
আদনান দূর থেকে শুনে ফেলেছিল।
সে ঘুরে বলল,
—আমি সব শুনেছি।
রিয়া দৌড়ে পালাল।
রাতের খাবারের পর সবাই বসে গল্প করছিল।
রিয়া তার বিয়ের আগের ঘটনা আবার সবাইকে বলছিল।
—তারপর আমি মাকে বললাম, আমি পালাব।
আদনানের ছোট বোন হেসে বলল,
—আর সত্যিই পালিয়ে গেলেন!
রিয়া গর্ব করে বলল,
—আমি যা বলি, করি।
আদনান পাশে বসে বলল,
—সবসময়?
রিয়া বলল,
—হ্যাঁ।
আদনান বলল,
—তাহলে সাবধান। একদিন আপনার কোনো কথা সত্যি হয়ে যেতে পারে।
রিয়া মজা করে বলল,
—যেমন?
আদনান কিছু না বলে উঠে চলে গেল।
রিয়া তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
সেদিন রাতে রিয়া ঘুমাতে যাওয়ার আগে মায়ের সঙ্গে আবার ফোনে কথা বলল।
মা বললেন,
—তোর বাবা তোকে খুব মনে করে।
রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
—আমিও বাবাকে খুব মনে করি।
—তাহলে ফিরে আয়।
রিয়া চুপ করে গেল।
তারপর বলল,
—মা, আমি জানি না এখন কী করব।
—তুই কি এখানে থাকতে ভালোবাসিস?
রিয়া অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—হ্যাঁ।
—কেন?
রিয়া উত্তর দিতে পারল না।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আদনানের মুখ।
তারপর সে আস্তে বলল,
—এখানে সবাই আমাকে খুব ভালোবাসে।
মা মৃদু হেসে বললেন,
—শুধু সবাই?
রিয়া কিছু বলল না।
অন্যদিকে আদনান নিজের ঘরে বসে ছিল।
তার মা এসে বললেন,
—বাবা, একটা কথা বলব?
—জি।
—রিয়াকে আমাদের বাড়ির সবাই খুব ভালোবেসে ফেলেছে।
আদনান মৃদু হেসে বলল,
—জানি।
মা একটু থেমে বললেন,
—তুইও কি?
আদনান চুপ করে গেল।
মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
—সব কথা মুখে বলতে হয় না।
তিনি চলে গেলেন।
আদনান জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
দূরের ঘরে রিয়ার হাসির শব্দ ভেসে আসছিল।
আদনান নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
সে বুঝতে পারছিল না কখন থেকে এই মেয়েটার হাসি তার কাছে এত পরিচিত হয়ে গেছে।
আর ঠিক তখনই—
শহরের অন্য প্রান্তে রিয়ার বাবা রাশেদ সাহেব নিজের গাড়িতে বসে একটা ছবি হাতে নিয়ে ছিলেন।
ছবিটা আদনানের।
রাশেদ সাহেব গম্ভীর চোখে তার লোককে বললেন,
—ছেলেটার সম্পর্কে সব তথ্য চাই।
লোকটি মাথা নেড়ে বলল,
—জি, স্যার।
রাশেদ সাহেব জানালার বাইরে তাকালেন।
তার একমাত্র মেয়েকে তিনি খুঁজে পেয়েছেন।
রাশেদ সাহেব গাড়িতে বসে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তার হাতে আদনানের ছবি।
চোখে রাগের চেয়ে চিন্তাই বেশি।
তিনি মেয়েকে ভালোবাসেন। রিয়া কোথায় আছে, কী করছে—এই চিন্তায় কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না।
তিনি জানেন, রিয়া জেদি।
কিন্তু এত রাতে একা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো বোকা মেয়েও নয়।
তাই রিয়ার খোঁজ পেয়ে তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন, মেয়েটি কার সঙ্গে আছে।
লোকটা কিছুক্ষণ পর এসে বলল,
—স্যার, ছেলেটার নাম আদনান। পুলিশ অফিসার। পরিবার নিয়ে থাকে। বাড়িটাও বেশ বড়।
রাশেদ সাহেব ছবিটার দিকে তাকালেন।
—আর কোনো সমস্যা?
—না স্যার। ছেলেটার বিরুদ্ধে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি।
রাশেদ সাহেব কিছু বললেন না।
শুধু বললেন,
—ওর বাড়ির ঠিকানা বের করো।
অন্যদিকে আদনানের বাড়িতে তখন রিয়ার দুষ্টুমি চলছে।
সকালে নাশতার টেবিলে আদনানের মা বললেন,
—রিয়া, আজ কী খাবে?
রিয়া বলল,
—আপনি যা দেবেন, তাই।
আদনানের ছোট বোন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—মা, ওকে বেশি আদর করবেন না। তাহলে মাথায় উঠে বসবে।
রিয়া চোখ বড় করে বলল,
—আমি কিন্তু খুব ভালো মেয়ে।
মেয়েটা হেসে বলল,
—আপনি?
—হ্যাঁ।
—তাহলে বিয়ের দিন পালিয়েছিলেন কেন?
রিয়া থেমে গেল।
সবাই হেসে উঠল।
রিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—সেটা ছিল বিশেষ পরিস্থিতি।
আদনানের মা বললেন,
—ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখন খাও।
রিয়া হাসতে হাসতে খাবার শুরু করল।
ঠিক তখন আদনান নিচে নামল।
সে টেবিলে বসতেই রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আজও ব্যায়াম করেছেন?
—হ্যাঁ।
—আপনি প্রতিদিন এত ভোরে উঠেন কীভাবে?
—অভ্যাস।
রিয়া বলল,
—আমাকে শেখাবেন?
আদনান অবাক হয়ে তাকাল।
—আপনি ব্যায়াম করবেন?
রিয়া বলল,
—না। শুধু দেখতে চাই।
সবাই আবার হেসে উঠল।
আদনান মাথা নাড়িয়ে বলল,
—আপনাকে বোঝানো অসম্ভব।
রিয়া হেসে বলল,
—আমি তো আগেই বলেছি, আমি দুষ্টু।
দুপুরে রিয়া আদনানের চাচাতো বোনদের সঙ্গে বসে গল্প করছিল।
একজন বলল,
—ভাবি, আপনি ভাইয়াকে ভয় পান?
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—একদম না।
—ভাইয়া কিন্তু অনেক রাগী।
—জানি।
—তবু ভয় পান না?
রিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,
—না। উনি আমাকে কিছু বললে আমিও পাল্টা বলি।
মেয়েরা হেসে উঠল।
ঠিক তখন দরজার কাছে আদনান এসে দাঁড়াল।
—কী নিয়ে এত আলোচনা?
সবাই চুপ।
রিয়া বলল,
—আপনার ব্যাপারে।
আদনান বলল,
—আমার কী হয়েছে?
—বলছিলাম, আপনি খুব রাগী।
আদনান বলল,
—আপনি তো প্রতিদিনই এটা বলেন।
রিয়া হেসে ফেলল।
আদনান চলে যাওয়ার পর সবাই আবার হাসতে শুরু করল।
সন্ধ্যায় রিয়ার ফোনে বাবার কল এল।
রিয়া কিছুক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কল ধরল।
—হ্যালো বাবা।
ওপাশ থেকে রাশেদ সাহেবের কণ্ঠ ভেসে এল,
—মা, কেমন আছিস?
রিয়া চুপ করে বলল,
—ভালো।
—কোথায় আছিস?
রিয়া কিছু বলল না।
বাবা আবার বললেন,
—তুই কি নিরাপদে আছিস?
—হ্যাঁ।
—তুই কি কোনো বিপদে পড়েছিস?
—না বাবা।
রাশেদ সাহেবের গলা নরম হয়ে গেল।
—তাহলে আমার সঙ্গে একবার দেখা কর।
রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
—বাবা...
—আমি তোকে বকা দেব না।
রিয়া কিছু বলল না।
—শুধু তোকে একবার দেখতে চাই।
রিয়া চোখ মুছে বলল,
—আমি ভালো আছি বাবা।
—জানি। কিন্তু বাবা হিসেবে তোকে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে।
রিয়া আর কথা বলতে পারল না।
চুপচাপ ফোন কেটে দিল।
তারপর বিছানায় বসে চোখ মুছতে লাগল।
রিয়ার মন খারাপ দেখে আদনানের মা তার ঘরে এলেন।
—মা, কাঁদছিস?
রিয়া মাথা নাড়ল।
—না।
—আমাকে মিথ্যা বলতে হবে না।
রিয়া চোখ মুছে বলল,
—বাবার ফোন ছিল।
—কী বলেছে?
—আমাকে দেখতে চায়।
আদনানের মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—তাহলে দেখা কর।
রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
—আপনি রাগ করবেন না?
—কেন রাগ করব? তোর বাবা তোকে ভালোবাসেন।
—কিন্তু আমি যদি ফিরে যাই...
—ফিরে যেতে চাইলে যাবি। থাকতে চাইলে থাকবি। সিদ্ধান্ত তোর।
রিয়ার চোখ আবার ভিজে উঠল।
সে আদনানের মাকে জড়িয়ে ধরল।
—মা, আপনি এত ভালো কেন?
মা হেসে বললেন,
—কারণ তুই আমাদের বাড়িতে এসে সবাইকে পাগল করে দিয়েছিস।
রিয়া হেসে ফেলল।
সেই রাতেই আদনান বাড়ি ফিরল।
তার মা তাকে সব বললেন।
—বাবা, রিয়ার বাবার সঙ্গে ওর দেখা করা দরকার।
আদনান মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ। আমিও সেটাই ভাবছিলাম।
—তুই কি ওকে নিয়ে যাবি?
—হ্যাঁ।
পরদিন সকালে আদনান রিয়াকে বলল,
—আপনার বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন?
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—হ্যাঁ।
আদনান বলল,
—আমি নিয়ে যাব।
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি কি আমার বাবাকে ভয় পান?
আদনান মৃদু হেসে বলল,
—কেন?
—উনি খুব বড় ব্যবসায়ী। অনেক লোকজন আছে তার।
—আমি পুলিশ অফিসার। ভয় পাওয়ার অভ্যাস নেই।
রিয়া হেসে বলল,
—ভালো।
কিন্তু তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেখা করা হলো না।
কারণ দুপুরের আগেই আদনানের বাড়ির সামনে কয়েকটি গাড়ি এসে থামল।
আদনান বাইরে বেরিয়ে দেখল, কয়েকজন অপরিচিত লোক দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের দেখে সে সতর্ক হয়ে গেল।
একজন এগিয়ে এসে বলল,
—আমরা রাশেদ সাহেবের লোক।
আদনান বলল,
—কী চান?
লোকটি বলল,
—স্যার আপনাকে একবার দেখা করতে বলেছেন।
আদনান শান্তভাবে বলল,
—আমি নিজেই ওনার সঙ্গে কথা বলব।
লোকটি বলল,
—স্যার বলেছেন, মেয়েকে নিয়ে যেতে চান।
ঠিক তখন পেছন থেকে রিয়া বেরিয়ে এল।
—বাবার লোক?
লোকটি মাথা নেড়ে বলল,
—জি, ম্যাডাম।
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—বাবা নিজে আসেননি কেন?
লোকটি বলল,
—স্যার আসছেন।
আদনান রিয়ার দিকে তাকাল।
—আপনি ভেতরে যান।
রিয়া মাথা নাড়ল।
—না। বাবা এলে আমি এখানেই থাকব।
কিছুক্ষণ পর কালো রঙের একটি গাড়ি এসে বাড়ির সামনে থামল।
গাড়ির দরজা খুলে রাশেদ সাহেব নামলেন।
তার চোখ প্রথমেই মেয়ের ওপর গিয়ে পড়ল।
রিয়া কনে সাজে পালানোর পর আজ প্রথমবার বাবার সামনে দাঁড়িয়েছে।
রাশেদ সাহেব কয়েক সেকেন্ড শুধু মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।
—মা...
রিয়া বাবার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বাবা বললেন,
—তুই ভালো আছিস?
রিয়ার চোখ ভিজে গেল।
—হ্যাঁ বাবা।
রাশেদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
—তুই আমাকে এত ভয় পেলি যে পালিয়ে গেলি?
রিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।
—তাহলে?
—আমি ওই বিয়েটা করতে চাইনি।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—আমি বুঝেছি।
রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
রাশেদ সাহেব এবার আদনানের দিকে তাকালেন।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—আপনিই আদনান?
—জি।
—আপনি আমার মেয়েকে আশ্রয় দিয়েছেন?
—জি।
—কেন?
আদনান শান্তভাবে বলল,
—ওকে ওই অবস্থায় রাস্তায় একা রেখে আসতে পারিনি।
রাশেদ সাহেব কিছু বললেন না।
শুধু মাথা নাড়লেন।
তারপর রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—মা, তুই কি আমার সঙ্গে বাড়ি যাবি?
রিয়া চুপ করে রইল।
তার চোখ চলে গেল আদনানের দিকে।
আদনান কিছু বলল না।
শুধু শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
রিয়া ধীরে ধীরে বলল,
—আমি এখনই যেতে চাই না বাবা।
রাশেদ সাহেব মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—ঠিক আছে।
সবাই অবাক।
রাশেদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তুই যেখানে খুশি থাক। শুধু ভালো থাকিস।
রিয়া বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
—বাবা...
রাশেদ সাহেব মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—আমি তোকে কোনোদিন জোর করব না।
তারপর তিনি আদনানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আমার মেয়েটাকে ভালোভাবে দেখবেন।
আদনান মাথা নেড়ে বলল,
—জি।
রাশেদ সাহেব গাড়িতে উঠে চলে গেলেন।
রিয়া অনেকক্ষণ গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ মুছল।
আদনান পাশে এসে বলল,
—আপনি ঠিক আছেন?
রিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,
—হ্যাঁ।
রাশেদ সাহেব সেদিন মেয়েকে সঙ্গে না নিয়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই অদ্ভুত চুপ হয়ে গেলেন।
গাড়িতে বসে তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
তার লোক পাশে বসে বলল,
—স্যার, মেয়েকে নিয়ে আসবেন না?
রাশেদ সাহেব ধীরে বললেন,
—না।
—কিন্তু স্যার...
—ওর মুখ দেখেছিস?
লোকটি চুপ করে গেল।
রাশেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমার মেয়ে ওখানে খুশি আছে।
কিছুক্ষণ পর আবার বললেন,
—কিন্তু ছেলেটার ব্যাপারে সব জানতে হবে।
লোকটি মাথা নেড়ে বলল,
—জি, স্যার।
রাশেদ সাহেব জানতেন না, তার এই অতিরিক্ত চিন্তাই খুব শিগগির একটা বড় ভুল বোঝাবুঝির কারণ হবে।
এদিকে আদনানের বাড়িতে রিয়া আগের মতোই সবার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করছিল।
আদনানের ছোট বোন এসে বলল,
—ভাবি, আজ একটা খেলা খেলব?
রিয়া বলল,
—কী খেলা?
—লুকোচুরি।
—চলো!
সবাই দৌড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
রিয়া এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ আদনানের সামনে পড়ে গেল।
আদনান তখন হাতে কিছু কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
রিয়া থেমে বলল,
—আপনি এখানে?
—আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছি। এখানে থাকব না?
রিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—আপনি সবসময় এমন কথা বলেন কেন?
আদনান মুচকি হাসল।
—আপনি সবসময় এমন প্রশ্ন করেন কেন?
রিয়া কিছু বলার আগেই পেছন থেকে মেয়েরা চিৎকার করে উঠল,
—ভাবি! তাড়াতাড়ি আসুন!
রিয়া দৌড়ে চলে গেল।
আদনান তার চলে যাওয়া দেখে হালকা হাসল।
দিনগুলো এভাবেই কাটছিল।
রিয়া এখন আর এই বাড়িকে অপরিচিত মনে করত না।
সকালে আদনানের মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে বসে গল্প করে।
দুপুরে চাচাতো বোনদের সঙ্গে হাসাহাসি করে।
সন্ধ্যায় ছাদে বসে সবার সঙ্গে গল্প করে।
আর মাঝেমধ্যে আদনানকে বিরক্ত করার নতুন নতুন উপায় বের করে।
একদিন সকালে আদনান ব্যায়াম করছিল।
রিয়া দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
আদনান বলল,
—কী দেখছেন?
—ভাবছি, আপনি এত ব্যায়াম করেন অথচ এত রাগী কেন?
আদনান থেমে তাকাল।
—ব্যায়াম করলে রাগ কমে।
রিয়া বলল,
—তাহলে আপনাকে আরও বেশি করতে হবে।
আদনান হেসে ফেলল।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—আপনি হাসতেও পারেন?
—কেন, আমাকে কী মনে হয়?
—সবসময় রাগী পুলিশ অফিসার।
আদনান বলল,
—আপনার জন্যই তো এখন হাসতে হচ্ছে।
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি কিন্তু ইচ্ছে করে হাসাই।
আদনান বলল,
—জানি।
কিন্তু সুখের এই দিনগুলো বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
এক সন্ধ্যায় আদনান বাইরে থেকে বাড়ি ফিরছিল।
গেটের কাছে পৌঁছাতেই কয়েকজন অপরিচিত লোক তার সামনে এসে দাঁড়াল।
আদনান থেমে গেল।
—আপনারা কারা?
একজন বলল,
—আপনার সঙ্গে কথা আছে।
—কী কথা?
লোকটি কোনো উত্তর না দিয়ে এগিয়ে এল।
আদনান বুঝে গেল, বিষয়টা স্বাভাবিক নয়।
সে সতর্ক হয়ে দাঁড়াল।
কিন্তু কয়েকজন একসঙ্গে তাকে ঘিরে ফেলল।
বাড়ির ভেতর থেকে আদনানের মা বিষয়টা দেখে চিৎকার করে উঠলেন,
—আদনান!
তিনি দ্রুত বাইরে চলে এলেন।
—আপনারা কারা? কী চান?
লোকগুলো কিছু বলল না।
আদনান তাদের থামানোর চেষ্টা করছিল।
ঠিক তখন রিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
দৃশ্যটা দেখে সে স্তব্ধ হয়ে গেল।
—আদনান!
সে দৌড়ে এগিয়ে গেল।
—ওকে ছেড়ে দিন!
একজন বলল,
—আপনি দূরে থাকুন।
রিয়া চিৎকার করে বলল,
—কেন মারছেন তাকে? সে কী করেছে?
আদনান রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি ভেতরে যান।
রিয়া মাথা নাড়ল।
—না!
সে আদনানের সামনে দাঁড়িয়ে গেল।
—কেউ ওকে ছুঁবেন না।
ঠিক তখন বাড়ির বাইরে একটা গাড়ি এসে থামল।
রিয়া গাড়িটার দিকে তাকিয়ে জমে গেল।
গাড়ি থেকে তার বাবা রাশেদ সাহেব নামলেন।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—বাবা?
রাশেদ সাহেব কোনো কথা বললেন না।
তার চোখ আদনানের দিকে।
রিয়া বাবার কাছে গিয়ে বলল,
—তুমি এদের এখানে পাঠিয়েছ?
রাশেদ সাহেব চুপ।
—বাবা, তুমি কিছু বলছ না কেন?
তিনি শুধু বললেন,
—মা, আমার সঙ্গে চল।
রিয়া মাথা নাড়ল।
—না।
—রিয়া।
—আমি যাব না।
রাশেদ সাহেব এবার কঠিন গলায় বললেন,
—ওকে আমি বিশ্বাস করি না।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—কেন?
—তুই ওর বাড়িতে কতদিন আছিস, আমি জানি না। ওর সম্পর্কে কতটুকু জানিস, তাও জানি না।
রিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—ও আমাকে কোনোদিন খারাপ কিছু করেনি।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—আমি আমার মেয়েকে ঝুঁকির মধ্যে রাখতে পারি না।
রিয়া বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—বাবা, তুমি ভুল বুঝছ।
আদনান এতক্ষণ চুপ ছিল।
সে রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি বাবার সঙ্গে যান।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না!
আদনান শান্তভাবে বলল,
—উনি আপনার বাবা। উনি আপনার ভালো চান।
রিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আর আপনি?
আদনান কিছু বলল না।
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বাবার দিকে ফিরে বলল,
—আমি ওকে এভাবে রেখে কোথাও যাব না।
রাশেদ সাহেবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠল।
রাশেদ সাহেবের লোকেরা আদনানকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল।
আদনান বুঝতে পারছিল, এই পরিস্থিতি আর বেশি বাড়ানো ঠিক হবে না।
কিন্তু হঠাৎ একজন তাকে ধাক্কা দিল।
আদনান পিছিয়ে গেল।
রিয়া চিৎকার করে উঠল,
—বাবা, থামাও!
রাশেদ সাহেব চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
রিয়া এবার বাবার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে ওকে ছেড়ে দাও।
রাশেদ সাহেব কিছু বললেন না।
রিয়া আদনানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—ওর কোনো দোষ নেই।
আদনান নিচু গলায় বলল,
—রিয়া, সরে যান।
—না।
—আপনি আঘাত পেতে পারেন।
—তাতে কী?
আদনান তার দিকে তাকাল।
রিয়ার চোখ দিয়ে তখন পানি পড়ছে।
আদনানের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
রিয়া হঠাৎ বাবার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
—বাবা!
রাশেদ সাহেব তাকালেন।
রিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আমি ওকে ভালোবাসি!
চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আদনানও স্থির হয়ে রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
রিয়া চোখ মুছে আবার বলল,
—হ্যাঁ বাবা। আমি আদনানকে ভালোবাসি।
রাশেদ সাহেব যেন কথাটা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
—রিয়া...
—আমি ওর সঙ্গে থাকতেই চাই।
আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তারপর রিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল।
তার চোখে এবার কঠিন দৃঢ়তা।
—এবার যথেষ্ট।
আদনান তার পুলিশ পরিচয় ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শুরু করল।
তার বাবা ইতিমধ্যেই পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের গাড়ি এসে বাড়ির সামনে থামল।
রাশেদ সাহেবের লোকেরা আর কোনো সুযোগ পেল না।
পুলিশ তাদের নিয়ে গেল।
বাড়ির সামনে আবার নীরবতা নেমে এল।
রিয়া দৌড়ে আদনানের কাছে গেল।
—আপনি ঠিক আছেন?
আদনান বলল,
—হ্যাঁ।
রিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।
সে নিজের ওড়না দিয়ে আদনানের মুখের ছোটখাটো দাগ মুছে দিল।
আদনান হালকা হেসে বলল,
—এত কাঁদছেন কেন?
রিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আপনাকে কিছু হয়ে গেলে আমি কী করতাম?
আদনান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
—আমাকে ভালোবাসেন?
রিয়া চোখ তুলে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড পর মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
আদনানের মুখে এবার সত্যিকারের হাসি ফুটে উঠল।
আর দূরে দাঁড়িয়ে রাশেদ সাহেব সেই দৃশ্য দেখছিলেন।
প্রথমবার তিনি বুঝলেন—
তার মেয়ে শুধু অভিমান করে এখানে থাকছে না।
রিয়ার হৃদয়ে সত্যিই জায়গা করে নিয়েছে আদনান।
রাশেদ সাহেব ধীরে ধীরে আদনানের বাবার দিকে এগিয়ে গেলেন।
তার চোখে তখন অনুতাপ।
—ভাই সাহেব, আমি ভুল করেছি।
আদনানের বাবা বললেন,
—আপনি নিজের মেয়েকে নিয়ে চিন্তা করেছেন। সেটা ভুল নয়। কিন্তু আজ যা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি।
রাশেদ সাহেব মাথা নিচু করে বললেন,
—আমি আর আমার মেয়ের চোখে পানি দেখতে চাই না।
তিনি রিয়ার দিকে তাকালেন।
রিয়া তখনও আদনানের পাশে দাঁড়িয়ে।
রাশেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমি বুঝে গেছি, আমার মেয়ের সুখ কোথায়।
তারপর তিনি আদনানের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আমাকে ক্ষমা করবেন।
আদনানের বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—ক্ষমা চাওয়ার দরকার নেই। তবে একটা কথা মনে রাখবেন—মেয়ের সিদ্ধান্তকেও সম্মান করতে হয়।
রাশেদ সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
—ঠিক বলেছেন।
তারপর তিনি রিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
—মা, তুই সুখে থাকিস।
রিয়ার চোখ আবার ভিজে উঠল।
কিন্তু এবার সেই চোখের পানি কষ্টের ছিল না।
রাশেদ সাহেব চলে যাওয়ার পর বাড়ির পরিবেশ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো।
কিন্তু রিয়া তখনও চুপচাপ।
সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
আদনান কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল।
কিছুক্ষণ পর এগিয়ে এসে বলল,
—আপনি মন খারাপ করছেন?
রিয়া মাথা নাড়ল।
—না।
—মিথ্যা বলছেন।
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—আজ বাবা আমাকে প্রথমবার নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দিল।
আদনান বলল,
—উনি আপনাকে খুব ভালোবাসেন।
—জানি।
—তাই এত চিন্তা করেন।
রিয়া ধীরে বলল,
—কিন্তু আজ উনি বুঝেছেন, আমি আর ছোট নেই।
আদনান কিছু বলল না।
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনিও কিন্তু আজ খুব ভয় পেয়েছিলেন।
আদনান অবাক হয়ে বলল,
—আমি?
—হ্যাঁ।
—কখন?
—যখন বাবা লোকজন নিয়ে এসেছিল।
আদনান হেসে বলল,
—আমি ভয় পাইনি।
রিয়া বলল,
—মিথ্যা।
—আপনি এত কিছু কীভাবে বুঝে ফেলেন?
রিয়া হাসল।
—আমি তো দুষ্টু।
আদনানও হেসে ফেলল।
পরদিন সকালে রাশেদ সাহেব আবার আদনানের বাবাকে ফোন করলেন।
—ভাই সাহেব, কালকের জন্য আবারও দুঃখিত।
আদনানের বাবা বললেন,
—এসব নিয়ে আর ভাববেন না।
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আমি একটা কথা বলতে চাই।
—বলুন।
—আমি চাই, আমাদের দুই পরিবারের সম্পর্কটা এবার আনুষ্ঠানিক হোক।
আদনানের বাবা বুঝতে পারলেন তিনি কী বলতে চাইছেন।
—আপনি কি রিয়া আর আদনানের বিয়ের কথা বলছেন?
রাশেদ সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
—জি।
আদনানের বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—আমাদের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি নেই। তবে সিদ্ধান্তটা ওদের।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—আমি সেটাই চাই।
দুপুরে রাশেদ সাহেব নিজেই আবার আদনানের বাড়িতে এলেন।
এইবার সঙ্গে কোনো লোকজন নেই।
শুধু তিনি আর তার স্ত্রী।
গাড়ি থেকে নেমে তিনি সরাসরি বাড়িতে ঢুকলেন।
রিয়া তখন আদনানের ছোট বোনদের সঙ্গে বসে গল্প করছিল।
বাবাকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল।
—বাবা!
রাশেদ সাহেব মেয়েকে কাছে টেনে নিলেন।
—কেমন আছিস?
—ভালো।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—আজ তোর সঙ্গে একটা কথা বলতে এসেছি।
রিয়া একটু চিন্তিত হয়ে গেল।
—কী কথা?
রাশেদ সাহেব হাসলেন।
—যেটা তুই সেদিন বলেছিলি।
রিয়া কিছু বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল।
বাবা বললেন,
—তুই আদনানকে ভালোবাসিস, তাই তো?
রিয়া লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।
—হ্যাঁ।
—তাহলে তুই কি ওকেই বিয়ে করতে চাস?
রিয়া ধীরে মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ বাবা।
রাশেদ সাহেব মুচকি হেসে বললেন,
—ঠিক আছে।
রিয়া অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
রিয়ার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল।
সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
—বাবা!
রাশেদ সাহেব মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—তোর হাসিটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কিছুক্ষণ পর আদনানও সেখানে এল।
রাশেদ সাহেব তাকে দেখে বললেন,
—আদনান, তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে।
আদনান সামনে এসে দাঁড়াল।
—জি।
—আমার মেয়েটাকে তুমি যেভাবে সামলেছ, তার জন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।
আদনান বলল,
—আমি শুধু যা ঠিক মনে হয়েছে, সেটাই করেছি।
রাশেদ সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
—তবু ধন্যবাদ।
তারপর একটু থেমে বললেন,
—তুমি কি রিয়াকে বিয়ে করতে চাও?
আদনান এক মুহূর্তের জন্য রিয়ার দিকে তাকাল।
রিয়া তখন লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে।
আদনান বলল,
—জি।
রাশেদ সাহেবের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
—তাহলে আমার আর কোনো আপত্তি নেই।
আদনানের বাবা এগিয়ে এসে বললেন,
—তাহলে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করা যাক।
রিয়ার চাচাতো বোনেরা সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল,
—বিয়ে! বিয়ে!
রিয়া লজ্জা পেয়ে বলল,
—তোমরা চুপ করো!
সবাই হেসে ফেলল।
কিন্তু রিয়ার মনে তখন হঠাৎ একটা কথা এল।
সে তার বাবার কাছে গিয়ে বলল,
—বাবা?
—হুম?
—তুমি কি আমার ওপর রাগ করোনি?
বাবা বললেন,
—রাগ করেছি।
রিয়া মুখ মলিন করল।
বাবা হেসে বললেন,
—কিন্তু তোর ওপর রাগ করে কতদিন থাকব?
রিয়া বাবার হাত ধরে বলল,
—আমি আর পালাব না।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—এবার পালানোর দরকারও নেই।
রিয়া হেসে ফেলল।
বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো।
দুই বাড়িতেই উৎসবের আমেজ।
আদনানের মা রিয়ার জন্য শাড়ি কিনতে গেলেন।
রিয়া বলল,
—মা, এত কিছু কেন?
—তুই আমার ছেলের বউ হবি।
—কিন্তু আমি তো আগেই আপনার মেয়ের মতো আছি।
আদনানের মা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—এই কথাটাই তো আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।
অন্যদিকে রিয়ার বাবা আদনানের জন্য কিছু কিনতে চাইলেন।
আদনান বলল,
—কিছু লাগবে না।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—আমি আমার মেয়ের জন্য অনেক কিছু করেছি। এখন আমার মেয়ের মানুষটার জন্যও কিছু করতে ইচ্ছে করছে।
আদনান মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে যা ইচ্ছা দিন।
বিয়ের আগের রাতে রিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
আদনান পাশে এসে দাঁড়াল।
—কী ভাবছেন?
রিয়া বলল,
—ভাবছি, কয়েকদিন আগে আমি এখান থেকে পালানোর কথা ভাবছিলাম।
আদনান বলল,
—এখন?
রিয়া হেসে বলল,
—এখন মনে হচ্ছে এখান থেকেই আবার নতুন জীবন শুরু করব।
আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আপনি কিন্তু আমাকে অনেক ঝামেলায় ফেলেছেন।
রিয়া অবাক হয়ে বলল,
—আমি?
—হ্যাঁ।
—কী করেছি?
—প্রথমে রাতের বেলা রাস্তায় একা বসে ছিলেন। তারপর আমার বাড়িতে এলেন। তারপর পুরো বাড়িটা দখল করে নিলেন।
রিয়া হেসে বলল,
—আপনি চাইলে আমাকে বের করে দিতে পারেন।
আদনান মাথা নাড়িয়ে বলল,
—এখন আর সেটা সম্ভব না।
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—কেন?
আদনান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কারণ আপনাকে ছাড়া এই বাড়িটা এখন কেমন যেন ফাঁকা লাগে।
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর আস্তে বলল,
—আমারও।
দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
পরদিন সকাল থেকে বাড়িতে আবার ব্যস্ততা শুরু হলো।
রিয়া সাজছে।
মেয়েরা তাকে ঘিরে আছে।
একজন বলল,
—ভাবি, আজ কিন্তু পালাতে পারবেন না।
রিয়া বলল,
—আজ পালাব না।
—কেন?
রিয়া হেসে বলল,
—কারণ আজ যাকে বিয়ে করছি, তার কাছেই তো যেতে চাই।
সবাই হেসে উঠল।
অন্যদিকে আদনানও প্রস্তুত হচ্ছে।
তার বন্ধুরা তাকে মজা করে বলছে,
—ভাই, আপনার দুষ্টু বউকে সামলাবেন কীভাবে?
আদনান মৃদু হেসে বলল,
—চেষ্টা করব।
বিয়ের আসরে দুই পরিবার একসঙ্গে হলো।
রিয়ার বাবা মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তার চোখে আনন্দ।
আদনানের মা বারবার রিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর রাশেদ সাহেব মেয়ের হাত আদনানের হাতে তুলে দিয়ে বললেন,
—মা, সবসময় হাসিখুশি থাকিস।
তারপর আদনানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আমার মেয়েটার চোখে যেন কখনো কষ্টের পানি না আসে।
আদনান মাথা নেড়ে বলল,
—আমি চেষ্টা করব।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—চেষ্টা না। কথা দাও।
আদনান বলল,
—কথা দিলাম।
রিয়া বাবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
তারপর আদনানের দিকে তাকাল।
আদনানও হাসল।
একসময় যে বিয়ের হাত থেকে পালাতে গিয়ে রিয়া অচেনা এক রাস্তায় বসেছিল, সেই রাস্তাই তাকে এনে দিয়েছিল এমন একজন মানুষের কাছে—
যার সঙ্গে সে নিজের ইচ্ছায় নতুন জীবন শুরু করতে চলেছে।
আর এইবার...
রিয়া পালাচ্ছে না।
সে নিজের ইচ্ছায় আদনানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
বিয়ের পর কয়েকদিন কেটে গেছে।
রিয়ার জীবনে যেন নতুন একটা অধ্যায় শুরু হয়েছে।
আগে সে ছিল বাবার আদরের একমাত্র মেয়ে।
এখন সে আদনানের বাড়ির সবার আদরের মানুষ।
আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের নতুন সংসারেও সে আগের মতোই দুষ্টু।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে প্রথমে আদনানের মাকে খুঁজে।
—মা!
আদনানের মা রান্নাঘর থেকে বললেন,
—কী হয়েছে?
—চা খাব।
—নিজে বানিয়ে খেতে পারিস।
রিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—আমি তো নতুন বউ। আমাকে দিয়ে কাজ করাবেন?
আদনানের মা হেসে বললেন,
—আচ্ছা, আয়। আমি বানিয়ে দিচ্ছি।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আদনানের ছোট বোন বলল,
—মা, ওকে বেশি আদর করবেন না। তাহলে ভাইয়ার মাথায় উঠবে।
রিয়া বলল,
—আমি তো উঠেই গেছি।
সবাই হেসে ফেলল।
ঠিক তখন আদনান সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল।
সে কথাটা শুনে বলল,
—কী উঠেছেন?
রিয়া বলল,
—আপনার মাথায়।
আদনান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে থেকে বলল,
—বুঝলাম।
রিয়া হেসে ফেলল।
আদনানের প্রতিদিনের রুটিন খুব নিয়মমাফিক।
ভোরে উঠে শরীরচর্চা করা, তারপর গোসল করে নাশতা করা।
বিয়ের পরও তার রুটিন বদলায়নি।
এক সকালে রিয়া ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় গিয়ে দেখল, আদনান শরীরচর্চা করছে।
রিয়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
—আপনি কি কোনোদিন বিশ্রাম নেন?
আদনান বলল,
—নিই।
—কবে?
—যেদিন শরীরচর্চা করি না।
রিয়া বলল,
—মানে?
—মানে আজও বিশ্রাম নেই।
রিয়া হেসে বলল,
—আপনাকে বোঝা কঠিন।
আদনান বলল,
—আপনাকে বোঝা আরও কঠিন।
রিয়া বলল,
—আমি কিন্তু খুব সহজ।
—আপনি?
—হ্যাঁ।
আদনান হেসে মাথা নাড়ল।
নাশতার টেবিলে রিয়া বসতেই আদনানের সামনে একটা কাঁচা ডিম রাখা হলো।
রিয়া চোখ বড় করে বলল,
—আপনি সত্যিই এটা খাবেন?
আদনান বলল,
—হ্যাঁ।
রিয়া মুখ কুঁচকে বলল,
—আমার সামনে খাবেন না।
—কেন?
—দেখতেই অদ্ভুত লাগে।
আদনান ইচ্ছে করেই ডিমটা হাতে তুলে নিল।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল।
—উফ!
সবাই হেসে ফেলল।
আদনানের ছোট বোন বলল,
—ভাবি, আপনি তো ভাইয়ার সবকিছু নিয়েই অভিযোগ করেন।
রিয়া বলল,
—ওকে ঠিকঠাক মানুষ বানানোর দায়িত্ব আমার।
আদনান বলল,
—আমি মানুষই আছি।
রিয়া বলল,
—সেটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
দুপুরে রিয়া তার শ্বশুরের সঙ্গে বসে গল্প করছিল।
আদনানের বাবা রিয়াকে খুব পছন্দ করেন।
তিনি বললেন,
—মা, তুই আসার পর বাড়িটা যেন আরও আনন্দের হয়ে গেছে।
রিয়া হেসে বলল,
—আমি তো এমনিই।
—হ্যাঁ, সেটা আমরা সবাই বুঝেছি।
ঠিক তখন আদনান পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।
তার বাবা বললেন,
—আদনান, তোর বউকে একটু সামলাস।
আদনান বলল,
—চেষ্টা করছি বাবা।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমাকে সামলানোর দরকার নেই। আমি নিজেই সামলে নিতে পারি।
আদনানের বাবা হেসে বললেন,
—এই আত্মবিশ্বাসটাই ভালো লাগে।
একদিন বিকেলে রিয়া তার চাচাতো ননদদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছিল।
আদনান অফিস থেকে ফিরেছে।
বাড়িতে ঢুকেই সে দেখল সবাই ছুটোছুটি করছে।
সে মাকে জিজ্ঞেস করল,
—এখানে কী হচ্ছে?
মা বললেন,
—তোমার বউ লুকোচুরি খেলছে।
আদনান অবাক হয়ে বলল,
—এখনো?
—হ্যাঁ।
আদনান নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল।
ঠিক তখন রিয়া দৌড়ে এসে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
—চুপ!
আদনান বলল,
—কী?
—ওরা আমাকে খুঁজছে।
—তাহলে?
—আমাকে লুকিয়ে রাখুন।
আদনান চারপাশে তাকাল।
—কোথায়?
রিয়া তার হাত ধরে বলল,
—আপনার ঘরে।
আদনান বলল,
—আমার ঘরে কেন?
—কারণ ওরা সেখানে খুঁজবে না।
আদনান বলল,
—আমার বোনেরা আপনার সঙ্গে খেলছে, আর আপনি আমার ঘরকে গোপন আস্তানা বানাচ্ছেন?
রিয়া ফিসফিস করে বলল,
—প্লিজ।
আদনান কিছু বলার আগেই কয়েকজন মেয়ে দৌড়ে এসে বলল,
—ভাবি কোথায়?
আদনান স্বাভাবিক মুখে বলল,
—জানি না।
তারা চলে যেতেই রিয়া হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল।
—ধন্যবাদ!
আদনান বলল,
—আপনি আমাকে মিথ্যা বলালেন।
রিয়া হেসে বলল,
—স্বামী হিসেবে এটা আপনার প্রথম দায়িত্ব।
আদনান মাথা নাড়িয়ে বলল,
—আপনার সঙ্গে তর্ক করে জেতা যাবে না।
সেদিন রাতে রিয়া বারান্দায় বসে ছিল।
আদনান এসে পাশে দাঁড়াল।
—কী ভাবছেন?
রিয়া বলল,
—বাবার কথা।
—মনে পড়ছে?
—হুম।
আদনান বলল,
—ফোন করেছেন?
—আজ কথা হয়েছে।
—তাহলে?
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
—বাবা বলেছে, আমি নাকি আগের চেয়ে বেশি হাসি।
আদনান বলল,
—সেটা সত্যি।
রিয়া তার দিকে তাকাল।
—আপনি খুশি?
—কেন?
—আমি এখানে আছি বলে।
আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—হ্যাঁ।
রিয়া হেসে বলল,
—আমিও।
কয়েকদিন পর রিয়ার বাবা-মা তাদের বাড়িতে বেড়াতে এলেন।
রিয়া বাবাকে দেখেই দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল।
—বাবা!
রাশেদ সাহেব মেয়েকে দেখে বললেন,
—মা, তুই তো আরও বেশি দুষ্টু হয়ে গেছিস।
রিয়া বলল,
—এখানে সবাই আমাকে দুষ্টুমি করতে দেয়।
আদনানের মা বললেন,
—ওকে বকতে গেলে তো আমাদেরই মন খারাপ হয়।
সবাই হাসল।
রাশেদ সাহেব আদনানের বাবার সঙ্গে বসে কথা বলছিলেন।
একসময় বললেন,
—ভাই সাহেব, সত্যি বলছি, আমি খুব ভাগ্যবান যে আমার মেয়ের জন্য আপনাদের মতো একটা পরিবার পেয়েছি।
আদনানের বাবা বললেন,
—আর আমরা ভাগ্যবান যে রিয়ার মতো একটা মেয়ে পেয়েছি।
রিয়া দূর থেকে শুনে মুচকি হাসল।
আদনানও তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
রাতে রিয়া ঘরে এসে দেখল, আদনান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
রিয়া বলল,
—কী করছেন?
—কিছু না।
—আবার কিছু না!
আদনান হেসে বলল,
—আপনি এত প্রশ্ন করেন কেন?
রিয়া বলল,
—কারণ আমি আপনার স্ত্রী।
আদনান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এই কথাটা শুনতে ভালো লাগে।
রিয়া একটু থেমে বলল,
—আমারও।
তারপর দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
বিয়ের আগে রিয়া ভাবত, সংসার মানেই হয়তো একরকম বন্দিত্ব।
কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে—
সঠিক মানুষ আর ভালোবাসায় একটা বাড়িই নিজের পৃথিবী হয়ে যেতে পারে।
আর আদনান?
সে নিজের কঠিন, রাগী স্বভাবের আড়ালে কখন যে রিয়ার হাসির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তা নিজেও বুঝতে পারেনি।
বিয়ের কয়েক মাস পর।
আদনানের বাড়িতে এখন রিয়ার হাসির শব্দ ছাড়া একটা দিনও কাটে না।
সকালে আদনানের ব্যায়ামের সময় রিয়া গিয়ে হাজির হয়।
নাশতার টেবিলে বসে সে সবার সঙ্গে গল্প করে।
দুপুরে আদনানের মা আর চাচাতো বোনদের সঙ্গে রান্নাঘরে গল্প।
আর সন্ধ্যা হলেই ছাদে বসে আড্ডা।
আদনানের ছোট বোন একদিন মাকে বলল,
—মা, ভাবি আসার আগে আমাদের বাড়িটা এত শান্ত ছিল কেন?
মা হেসে বললেন,
—কারণ তখন রিয়া ছিল না।
রিয়া পাশ থেকে বলল,
—আমি শুনেছি কিন্তু!
সবাই হেসে উঠল।
আদনানও দূর থেকে হাসছিল।
রিয়া তাকে দেখে বলল,
—আপনি হাসছেন কেন?
—কিছু না।
—আপনিও তো এখন অনেক হাসেন।
আদনান বলল,
—আগে এত হাসার কারণ ছিল না।
রিয়া একটু থেমে গেল।
তারপর মুচকি হাসল।
একদিন সকালে আদনান অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
রিয়া তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
—আজ এত তাড়াতাড়ি যাবেন?
—জরুরি কাজ আছে।
—কখন ফিরবেন?
—জানি না।
রিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—আপনি সবসময় অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
আদনান বলল,
—আপনি কি আমাকে মিস করবেন?
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না।
আদনান ভ্রু তুলে তাকাল।
—একদমই না?
—না।
আদনান হেসে বলল,
—ঠিক আছে।
সে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করতেই রিয়া পেছন থেকে বলল,
—তাড়াতাড়ি ফিরবেন।
আদনান ঘুরে তাকাল।
রিয়া মুখ লুকিয়ে ফেলল।
—কী হলো?
—কিছু না।
আদনান মুচকি হেসে বলল,
—ঠিক আছে। চেষ্টা করব।
সেদিন বিকেলে রিয়া তার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল।
রাশেদ সাহেব বললেন,
—মা, তুই সুখে আছিস তো?
রিয়া হেসে বলল,
—হ্যাঁ বাবা।
—আদনান তোকে কষ্ট দেয় না তো?
রিয়া বলল,
—না।
—রাগ দেখায়?
রিয়া একটু ভেবে বলল,
—মাঝে মাঝে।
—তাহলে?
—কিন্তু এখন আমি ওর রাগ ভয় পাই না।
বাবা হেসে বললেন,
—কেন?
—কারণ আমি জানি, ওর রাগের চেয়ে মায়া বেশি।
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—তাহলে আমি নিশ্চিন্ত।
রিয়া বলল,
—বাবা?
—হুম?
—সেদিন তুমি যদি আমাকে জোর করে নিয়ে যেতে...
রাশেদ সাহেব মেয়ের কথা শেষ করতে দিলেন না।
—আমি আর কোনোদিন তোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করব না।
রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
—তুমি পৃথিবীর সেরা বাবা।
—আর তুই পৃথিবীর সবচেয়ে দুষ্টু মেয়ে।
রিয়া হেসে ফেলল।
সন্ধ্যায় আদনান বাড়ি ফিরল।
দরজা খুলতেই রিয়া দৌড়ে এসে বলল,
—আপনি এসেছেন!
আদনান বলল,
—হ্যাঁ।
—আজ এত দেরি হলো কেন?
—বলেছিলাম তো, জরুরি কাজ ছিল।
রিয়া বলল,
—আপনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমি বিরক্ত হয়ে গেছি।
আদনান বলল,
—তাহলে আমাকে মিস করেছেন?
রিয়া একটু থেমে বলল,
—হয়তো।
আদনান হেসে ফেলল।
—হয়তো?
—হ্যাঁ।
রাতে সবাই মিলে ছাদে বসেছিল।
আকাশে অসংখ্য তারা।
আদনানের মা বললেন,
—রিয়া, তোর কথা মনে আছে? প্রথম দিন তোকে যখন এই বাড়িতে আনা হয়েছিল, তুই কত ভয় পেয়েছিলি।
রিয়া হেসে বলল,
—মনে আছে।
—তখন কি ভাবছিলি, এই বাড়িতে এতদিন থাকবি?
রিয়া মাথা নাড়ল।
—না।
আদনানের ছোট বোন বলল,
—আর এখন?
রিয়া চারপাশে তাকাল।
তারপর বলল,
—এখন মনে হয়, এই বাড়িটা ছাড়া থাকতে পারব না।
সবাই মুচকি হাসল।
আদনান চুপচাপ রিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল।
রিয়া সেটা লক্ষ্য করে বলল,
—কী দেখছেন?
আদনান বলল,
—কিছু না।
—আবার?
—ভাবছি।
—কী?
আদনান একটু হেসে বলল,
—যেদিন আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম, তখন ভাবিনি আপনি একদিন আমার পুরো সংসারটাকে এমনভাবে বদলে দেবেন।
রিয়া বলল,
—আমি তো কিছু করিনি।
আদনান বলল,
—সেটাই তো সমস্যা। কিছু না করেও সবকিছু করে ফেলেছেন।
রিয়া হেসে মাথা নিচু করল।
হঠাৎ আদনানের ছোট বোন বলল,
—ভাবি, একটা কথা বলব?
—বলো।
—আপনি প্রথম দিন ভাইয়ার বাইকে উঠেছিলেন কীভাবে?
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে হাসতে শুরু করল।
—সেটা একটা লম্বা গল্প।
সবাই বলল,
—শুনব!
রিয়া শুরু করল,
—সেদিন আমি কনে সেজে পালিয়ে রাস্তায় বসে ছিলাম...
সবাই মন দিয়ে শুনতে লাগল।
রিয়া বলল,
—তারপর আদনান এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কোনো সাহায্য লাগবে কি না।
আদনানের ছোট বোন বলল,
—ভাইয়া তখনই প্রেমে পড়ে গিয়েছিল?
আদনান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না!
সবাই হেসে উঠল।
রিয়া বলল,
—তাহলে পরে?
আদনান কিছু বলল না।
রিয়া মজা করে বলল,
—চুপ কেন?
আদনান মৃদু হেসে বলল,
—পরে বুঝেছিলাম, এই মেয়েটাকে ছাড়া আমার দিনটা অসম্পূর্ণ।
রিয়া চুপ হয়ে গেল।
তার চোখে আনন্দের ঝিলিক।
কিছুক্ষণ পর রিয়া উঠে ছাদের এক পাশে গেল।
আদনানও সেখানে গেল।
রিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—জানেন, আমার একটা কথা মনে হয়।
—কী?
—সেদিন আমি যদি পালিয়ে না আসতাম?
আদনান বলল,
—তাহলে হয়তো আমাদের দেখা হতো না।
রিয়া বলল,
—আর যদি সেদিন আপনি আমাকে রাস্তা থেকে চলে যেতে দিয়ে আর ফিরে না আসতেন?
আদনান মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে আজ এই গল্পটাই থাকত না।
রিয়া বলল,
—আপনি কেন ফিরে এসেছিলেন?
আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—জানি না।
তারপর যোগ করল,
—শুধু মনে হয়েছিল, আপনাকে একা রেখে আসা ঠিক হবে না।
রিয়া হেসে বলল,
—তাহলে সেদিন থেকেই আপনার কপালে আমি ছিলাম।
আদনান বলল,
—সম্ভবত।
রিয়া হেসে উঠল।
রাত আরও গভীর হলো।
সবাই ঘরে চলে গেল।
রিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
আদনান এসে পাশে দাঁড়াল।
রিয়া বলল,
—একটা কথা বলব?
—বলুন।
—আমি যখন বিয়ের দিন পালাচ্ছিলাম, তখন ভাবিনি আমার জীবন এত সুন্দর হয়ে যাবে।
আদনান বলল,
—আমিও ভাবিনি, একজন অচেনা মেয়েকে রাস্তা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে।
রিয়া মুচকি হেসে বলল,
—আপনি কিন্তু খুব ভালো মানুষ।
আদনান বলল,
—আর আপনি খুব দুষ্টু।
রিয়া বলল,
—দুষ্টু না হলে আপনার জীবন এত সুন্দর হতো?
আদনান হেসে বলল,
—হতো না।
রিয়া হাসতে হাসতে বলল,
—তাহলে আমি সারাজীবন দুষ্টুই থাকব।
আদনান বলল,
—থাকুন।
তারপর দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
দূরে রাতের আকাশ।
চারপাশে শান্ত পরিবেশ।
আর সেই বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছে পরিবারের হাসির শব্দ।
একসময় রিয়া ছিল এমন এক মেয়ে, যে নিজের বিয়ে থেকে পালিয়ে অচেনা রাস্তায় বসে ছিল।
তার বাবা শুধু চাইতেন মেয়ের চোখে যেন কখনো কান্না না আসে।
আর ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় সেই পালিয়ে যাওয়া রাতই তাকে এনে দিয়েছিল আদনানের কাছে।
আদনান, যে প্রথমে তাকে শুধু একজন অসহায় মেয়ে হিসেবে সাহায্য করেছিল, ধীরে ধীরে তার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ হয়ে উঠেছিল।
রিয়ার দুষ্টুমিতে বাড়ি ভরে গিয়েছিল।
আদনানের কঠিন মুখে হাসি ফুটেছিল।
দুই পরিবারের দূরত্ব মুছে গিয়েছিল।
আর রিয়ার বাবাও বুঝেছিলেন—
মেয়ের সুখ যেখানে, তার ঘরও সেখানেই।
রিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—আদনান?
—হুম?
—আমি কিন্তু আর কোনোদিন পালাব না।
আদনান হেসে বলল,
—জানি।
রিয়া বলল,
—কীভাবে জানেন?
আদনান শান্ত গলায় বলল,
—কারণ এবার আপনার পালানোর কোনো কারণ নেই।
রিয়া হেসে ফেলল।
আর সেই হাসির শব্দে পুরো বাড়িটা যেন আবারও প্রাণ ফিরে পেল।
....