ঝগড়াটাই হলো সম্পর্কের শুরু

বিমানবন্দরের ভেতর তখন বেশ ব্যস্ততা। কেউ দেশে ফিরছে, কেউ বিদেশে যাচ্ছে। চারপাশে মানুষের ভিড়, লাগেজের শব্দ আর ব্যস্ত পায়ের চলাচল।

দীর্ঘ কয়েক বছর প্রবাসে পড়াশোনা শেষ করে আজ দেশে ফিরেছে রোহান।

বয়স ছাব্বিশের কাছাকাছি। শান্ত স্বভাবের ছেলে হলেও নিজের ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী। বিদেশে পড়াশোনা করার পাশাপাশি নিজের কাজও সামলেছে। দেশে ফেরার পর বাবার ব্যবসার দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছা তার।

এক হাতে লাগেজের ট্রলি ঠেলে বের হচ্ছিল রোহান। ঠিক তখনই সামনে থেকে একটি মেয়ে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে এসে তার সঙ্গে ধাক্কা খেল।

মেয়েটির হাতে থাকা ফোন মাটিতে পড়ে গেল।

—আহ!

মেয়েটি নিচু হয়ে ফোনটা তুলে নিল। তারপর রোহানের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,

—আপনি দেখে হাঁটতে পারেন না?

রোহান অবাক হয়ে তাকাল।

—আমি?

—হ্যাঁ, আপনি!

রোহান চারপাশে তাকিয়ে বলল,

—আপনিই তো দৌড়ে এসে আমার সঙ্গে ধাক্কা খেলেন।

মেয়েটি ভ্রু কুঁচকে বলল,

—আমি দৌড়াচ্ছিলাম, কারণ আমার ফ্লাইটের সময় হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আপনি মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন?

রোহান হেসে বলল,

—এটা বিমানবন্দর। আপনার বাড়ির বারান্দা না যে শুধু আপনি হাঁটবেন।

মেয়েটি রেগে গেল।

—বেশি কথা বলবেন না।

—আপনিই তো শুরু করেছেন।

—আপনার মতো মানুষকে কথা না শুনিয়ে ছেড়ে দেওয়া উচিত না।

রোহান মুচকি হেসে বলল,

—আপনার মতো রাগী মেয়েকে দেখলে আমিও চুপ থাকতে পারি না।

মেয়েটি আর কিছু বলল না। ব্যাগটা টেনে নিয়ে হনহন করে চলে গেল।

রোহানও নিজের পথে হাঁটতে শুরু করল।

কিন্তু কয়েক কদম যাওয়ার পর অদ্ভুতভাবে মেয়েটির কথাগুলো মনে পড়তে লাগল।

‘কী রাগী মেয়ে!’

নিজেই হেসে ফেলল সে।

অন্যদিকে মেয়েটিও দূরে গিয়ে একবার পেছনে তাকাল।

রোহান তখনও দাঁড়িয়ে।

চোখাচোখি হতেই মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

মেয়েটির নাম দিয়া।

দিয়াও কয়েক বছর বিদেশে পড়াশোনা করেছে। আজ দেশে ফিরে সে প্রথমে ঢাকায় নিজের বাসায় যাবে। কিন্তু সেখান থেকে তাকে গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে।

কারণ কয়েকদিনের মধ্যেই তার বিয়ের কথা চলছে।

দিয়া অবশ্য বিষয়টি নিয়ে খুব একটা খুশি নয়। নিজের জীবন নিয়ে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে চায়। কিন্তু পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহসও তার নেই।

পরদিন সকাল।

ঢাকা থেকে গ্রামের উদ্দেশে ট্রেনে উঠেছে দিয়া।

জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল সে। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যাচ্ছে। সবুজ মাঠ, ছোট ছোট গ্রাম আর গাছপালা চোখে পড়তেই দিয়ার মনটা ভালো হয়ে গেল।

হঠাৎ পাশ থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল,

—আপনি এখানে?

দিয়া ঘুরে তাকিয়েই অবাক।

রোহান!

—আপনি!

রোহান হাসল।

—দেখছি, ভাগ্য আমাদের আবারও এক জায়গায় নিয়ে এসেছে।

দিয়া বিরক্ত মুখে বলল,

—ভাগ্য না, দুর্ভাগ্য।

—এতটা খারাপ লাগছে?

—অনেক।

রোহান নিজের ব্যাগটা তুলে পাশের সিটে রাখল।

দিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—এই সিটে বসবেন?

—হ্যাঁ।

—অন্য সিট নেই?

—আছে। কিন্তু এই সিটটাই ভালো লাগছে।

দিয়া চোখ ছোট করে তাকাল।

—আপনি ইচ্ছা করে আমাকে বিরক্ত করছেন, তাই না?

রোহান হাসতে হাসতে বলল,

—আপনি এত সহজে রেগে যান যে আপনাকে একটু বিরক্ত করতে ইচ্ছা করে।

দিয়া মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল।

—আপনার সঙ্গে কথা বলাই ভুল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।

ট্রেন ছুটে চলেছে।

হঠাৎ রোহান দিয়ার হাতে থাকা বইটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনি এখনো উপন্যাস পড়েন?

দিয়া বইটা বন্ধ করে বলল,

—হ্যাঁ। সমস্যা?

—না। ভাবছিলাম, আপনার মতো রাগী মানুষও বই পড়ে?

—আর আপনার মতো বিরক্তিকর মানুষ বই পড়ে?

—আমি কিন্তু অনেক ভালো বই পড়ি।

—বিশ্বাস হলো না।

—আপনি বিশ্বাস করবেন না বলেই তো মজা।

দিয়া এবার না চাইলেও হেসে ফেলল।

রোহান সেই হাসিটা লক্ষ্য করল।

কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল,

—আপনাকে হাসলে ভালো লাগে।

দিয়া একটু থমকে গেল।

তারপর নিজেকে সামলে বলল,

—আবার শুরু করেছেন?

রোহান হেসে জানালার বাইরে তাকাল।

কিন্তু নিজের অজান্তেই তার মুখেও হাসি ফুটে উঠেছে।

দুপুরের দিকে ট্রেন একটা ছোট স্টেশনে থামল।

রোহান নামতে যাবে, এমন সময় দিয়া বলল,

—আমার জন্য একটা চা নিয়ে আসবেন?

রোহান অবাক হয়ে বলল,

—আমি কেন?

—আপনিই তো নামছেন।

—নিজে নামুন।

—আমি জানালার পাশে বসেছি। উঠতে ইচ্ছা করছে না।

রোহান মাথা নাড়িয়ে বলল,

—আপনি সত্যিই খুব আদেশ করতে পারেন।

—চা আনবেন?

—ঠিক আছে।

কিছুক্ষণ পর রোহান ফিরে এল।

হাতে দুটো চায়ের কাপ।

একটা দিয়ার হাতে দিয়ে বলল,

—নিন।

দিয়া চায়ের কাপ হাতে নিয়ে মুচকি হাসল।

—ধন্যবাদ।

—এই প্রথম আপনার মুখে ভদ্র কথা শুনলাম।

—বেশি অভ্যাস করবেন না।

রোহান হেসে ফেলল।

ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।

বিকেলের আলো জানালা দিয়ে দুজনের মুখে পড়ছে।

দিয়া বাইরে তাকিয়ে ছিল।

রোহান চুপচাপ তাকে দেখছিল।

কেন জানি মেয়েটাকে এখন আর বিরক্তিকর মনে হচ্ছে না।

বরং তার রাগ, অভিমান আর ছোট ছোট হাসিগুলো অদ্ভুতভাবে ভালো লাগছে।

দিয়াও মাঝে মাঝে আড়চোখে রোহানের দিকে তাকাচ্ছিল।

নিজের মনকে প্রশ্ন করছিল,

‘ছেলেটাকে এত বিরক্তিকর লাগার কথা ছিল। তাহলে এখন ওকে দেখলে ভালো লাগছে কেন?’

দুজনেই উত্তরটা জানত না।

ট্রেনের জানালার বাইরে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে।

দিয়া জানালার পাশে বসে চুপচাপ বাইরের দৃশ্য দেখছিল। সবুজ ধানখেত, মাঝেমধ্যে ছোট ছোট নদী, দূরে তালগাছ—সবকিছু মিলিয়ে তার মনটা অদ্ভুতভাবে ভালো হয়ে উঠেছিল।

পাশে বসা রোহান অবশ্য চুপ করে থাকার মানুষ নয়।

সে দিয়ার বইটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

দিয়া চোখ না সরিয়েই বলল,

—না।

রোহান অবাক হয়ে বলল,

—প্রশ্নটা তো শুনলেনই না!

—শুনে কী হবে? আপনি এমন কিছু জিজ্ঞেস করবেন, যেটার উত্তর দিতে আমার বিরক্ত লাগবে।

—আপনি সবসময় এত নেতিবাচকভাবে চিন্তা করেন?

দিয়া এবার তার দিকে তাকাল।

—আপনি সবসময় এত বেশি কথা বলেন?

—না।

—তাহলে?

—শুধু আপনার সঙ্গে।

দিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল,

—বিরক্তিকর।

রোহান মুচকি হাসল।

—এই শব্দটা আপনার মুখে অনেক মানায়।

—কী?

—‘বিরক্তিকর’।

দিয়া চোখ বড় করে তাকাল।

—আপনি আমাকে নিয়ে মজা করছেন?

—একটু।

—আমি কিন্তু আপনার সঙ্গে আর কথা বলব না।

—দেখি কতক্ষণ থাকতে পারেন।

দিয়া সত্যিই আর কথা বলল না।

প্রায় দশ মিনিট কেটে গেল।

রোহানও চুপ।

পনেরো মিনিট।

বিশ মিনিট।

শেষ পর্যন্ত দিয়া নিজেই বলল,

—আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

রোহান মুখে হাসি এনে বলল,

—আমি ভেবেছিলাম আপনি আর কথা বলবেন না।

দিয়া বুঝতে পেরে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

—এমনিই জিজ্ঞেস করেছি।

—আমি গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি।

—কোথায়?

—মাধবপুর।

দিয়া চমকে তাকাল।

—মাধবপুর?

—হ্যাঁ। আপনি?

—আমিও।

রোহান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকল।

—তাহলে আমাদের যাত্রা আরও দীর্ঘ।

দিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—এটা শুনে আপনার এত খুশি হওয়ার কী আছে?

—আপনাকে বিরক্ত করার আরও সময় পাব।

দিয়া একটা বালিশ হাতে নিয়ে তার দিকে ছুড়ে মারল।

রোহান হাসতে হাসতে বালিশটা ধরে ফেলল।

—এই যে! ট্রেনে মারামারি করা নিষেধ।

—আপনাকে মারলে নিষেধ হলেও করব।

—বাহ! এত সাহস!

—আমাকে চেনেন না আপনি।

—সেটাই তো সমস্যা। চিনতে চাই।

দিয়া থমকে গেল।

কথাটা রোহান খুব স্বাভাবিকভাবে বললেও দিয়ার মনে কেমন যেন ঢেউ উঠল।

সে কিছু না বলে আবার জানালার বাইরে তাকাল।

সন্ধ্যার একটু আগে ট্রেনের ভেতর হঠাৎ ঝাঁকুনি হলো।

দিয়া ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে পড়ে যাচ্ছিল।

রোহান দ্রুত তার হাত ধরে ফেলল।

এক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো।

দিয়া স্থির হয়ে গেল।

রোহানের হাত তখনও তার হাত ধরে আছে।

রোহান ধীরে বলল,

—সাবধানে।

দিয়া নিজের হাতটা সরিয়ে নিল।

—আমি ঠিক আছি।

—দেখেই তো বুঝলাম।

—আপনি না থাকলেও আমি সামলে নিতে পারতাম।

—জানি।

—তাহলে ধরলেন কেন?

রোহান একটু হেসে বলল,

—হাতটা নিজে থেকেই এগিয়ে গেছে।

দিয়া আর কোনো উত্তর দিল না।

তার বুকের ভেতর কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।

রোহানও জানালার বাইরে তাকাল।

কিন্তু তার মনটা আর বাইরের দৃশ্যে নেই।

রাত নামার পর ট্রেনের ভেতরের আলো জ্বলে উঠল।

দিয়া ব্যাগ থেকে খাবার বের করল।

রোহান তাকিয়ে বলল,

—এটা কী?

—খাবার।

—দেখে তো মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার।

—আপনি খাবেন?

—আপনি দিলে খাব।

দিয়া একটু ভেবে নিজের খাবার থেকে কিছুটা এগিয়ে দিল।

রোহান খেতে খেতে বলল,

—আপনার রান্না?

দিয়া হেসে বলল,

—না, আমার মা দিয়েছে।

—তাহলে মায়ের রান্না।

—হ্যাঁ।

—ভালো হয়েছে।

—আপনি তো শুধু এক কামড় খেলেন।

—এক কামড়েই বুঝেছি।

দিয়া হাসল।

—আপনি খুব নাটক করতে পারেন।

—আপনি হাসলে আরও ভালো লাগে।

দিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে ফেলল।

—আবার শুরু করেছেন।

—কী শুরু করেছি?

—এইসব কথা।

রোহান কিছু বলল না।

কিন্তু তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল না।

রাত বাড়তে লাগল।

একসময় দিয়া ক্লান্ত হয়ে সিটে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল।

রোহান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

মেয়েটা এতক্ষণ ধরে তার সঙ্গে ঝগড়া করেছে, তর্ক করেছে, এমনকি বালিশও ছুড়ে মেরেছে।

তবু এখন তাকে দেখে রোহানের মনে হলো, এই মেয়েটাকে সে অনেকদিন ধরে চেনে।

কেন এমন মনে হচ্ছে, সে জানে না।

দিয়া ঘুমিয়ে পড়ার পর ট্রেনের ঝাঁকুনিতে তার মাথা বারবার সিটের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছিল।

রোহান নিজের ব্যাগটা ভাঁজ করে তার মাথার পাশে রেখে দিল।

দিয়া ঘুমের মধ্যেই একটু নড়েচড়ে আরাম করে শুয়ে পড়ল।

রোহান মৃদু হেসে জানালার বাইরে তাকাল।

নিজের মনেই বলল,

‘তুমি এত ঝগড়া করো কেন, দিয়া?’

কিছুক্ষণ পর দিয়া ঘুমের মধ্যেই অস্পষ্টভাবে বলল,

—রোহান...

রোহান চমকে তার দিকে তাকাল।

মেয়েটা ঘুমিয়েই আছে।

সে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

—আমাকে ডাকছও আবার ঘুমের মধ্যে?

কিন্তু সেই ছোট্ট ডাকটা রোহানের মনে অদ্ভুত আনন্দ এনে দিল।

পরদিন ভোরে ট্রেন মাধবপুর স্টেশনে পৌঁছাল।

দিয়া ঘুম থেকে উঠে চারপাশে তাকাল।

রোহান তখন তার লাগেজ নামাচ্ছে।

দিয়া বলল,

—আপনি আমার ব্যাগ ধরছেন কেন?

—কারণ আপনি ধরতে গেলে আবার পড়ে যাবেন।

—আমি এতটা অক্ষম নই।

—আমি জানি।

রোহান ব্যাগটা নামিয়ে দিল।

স্টেশনের বাইরে এসে দুজন দুদিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল।

দিয়ার গাড়ি এসে গেছে।

রোহানেরও লোকজন অপেক্ষা করছে।

দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

শেষ পর্যন্ত দিয়া বলল,

—তাহলে... বিদায়।

রোহান হেসে বলল,

—বিদায়।

দিয়া গাড়িতে উঠল।

কিন্তু গাড়ি ছাড়ার আগে জানালা দিয়ে একবার তাকাল।

রোহানও তাকিয়ে আছে।

চোখাচোখি হতেই দুজনেই মৃদু হাসল।

গাড়ি ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল।

রোহান দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হলো, এই বিদায়টা অদ্ভুত রকমের ভারী।

দিয়া গাড়ির ভেতর বসে নিজের মনকে বোঝাতে লাগল,

‘কয়েকদিন পর তো আবার দেখা হতে পারে।’

কিন্তু সে জানত না, সেই কয়েকদিনের মধ্যেই তার জীবনে এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে, যা রোহানকে তার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাবে।

আর সেই কারণেই হয়তো রোহানকে আবার খুঁজে পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হবে।

কিন্তু রোহান?

সে কি এত সহজে দিয়াকে ভুলে থাকতে পারবে?

উত্তরটা তার নিজের কাছেই ছিল না।

মাধবপুর স্টেশন থেকে বেরিয়ে রোহান নিজের গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা হলো।

গাড়িতে বসে বারবার দিয়ার কথা মনে পড়ছিল তার।

প্রথম দেখা থেকেই মেয়েটার সঙ্গে ঝগড়া। তারপর ট্রেনে পাশাপাশি বসে খুনসুটি, তর্ক, হাসাহাসি—সবকিছু যেন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক পরিচয় তৈরি করে ফেলেছিল।

রোহান নিজেকে বোঝাল,

‘কয়েক দিনের পরিচয়। এত ভাবার কী আছে?’

কিন্তু মন তার কথা শুনল না।

অন্যদিকে দিয়া বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

শহরের বাড়ি থেকে গ্রামের বাড়িতে আসার কারণটা সে জানে।

তার বিয়ের কথা প্রায় ঠিক হয়ে গেছে।

মা তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন,

—দিয়া, আগামী শুক্রবার ছেলের পরিবার আসবে। তোমার বাবাও সব ঠিক করে ফেলেছে।

দিয়া চুপ করে রইল।

—কী হলো? কিছু বলছ না?

—আম্মু, এত তাড়াহুড়ো করে বিয়ে ঠিক করার কী আছে?

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—তোমার বাবা অনেক ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দিয়া জানালার বাইরে তাকাল।

তার মনে অদ্ভুত একটা অস্থিরতা।

বিয়ের কথা শুনে ভয় লাগছে না, কিন্তু মনটা কেন যেন অন্য কোথাও আটকে আছে।

সে নিজেই বুঝতে পারছে না কোথায়।

হঠাৎ তার মনে পড়ল রোহানের কথা।

‘আপনাকে হাসলে ভালো লাগে।’

কথাটা মনে পড়তেই দিয়া নিজের অজান্তে হেসে ফেলল।

তারপর সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাথায় হাত দিল।

—আমি আবার ওর কথা ভাবছি কেন?

তিন দিন কেটে গেল।

রোহান নিজের বাড়িতে থেকেও শান্তি পাচ্ছিল না।

বাড়ির সবাই লক্ষ্য করল, ছেলেটা যেন কিছু একটা নিয়ে চিন্তায় আছে।

রোহানের ছোট বোন রিমি একদিন বলল,

—ভাইয়া, তোমার কী হয়েছে?

—কিছু হয়নি।

—তাহলে সারাদিন ফোন হাতে নিয়ে কী করো?

রোহান ফোনটা টেবিলে রেখে বলল,

—কিছু না।

রিমি চোখ ছোট করে তাকাল।

—কোনো মেয়ের ব্যাপার?

রোহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—না।

—তাহলে এত তাড়াতাড়ি উত্তর দিলে কেন?

রোহান চুপ করে গেল।

রিমি হেসে বলল,

—বুঝেছি!

—কী বুঝেছ?

—তুমি প্রেমে পড়েছ।

রোহান ভ্রু কুঁচকে বলল,

—চুপ করো।

রিমি হেসে দৌড়ে চলে গেল।

রোহান একা হয়ে আবার ফোনটা হাতে নিল।

দিয়ার কোনো নম্বর তার কাছে নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও খুঁজে দেখেছে। কিন্তু দিয়ার পুরো নাম জানে না।

শুধু জানে—মেয়েটা মাধবপুরে এসেছে।

হঠাৎ তার মনে হলো, সে দিয়াকে একবার খুঁজে দেখবে।

কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবে?

পরদিন সকালে রোহান মাধবপুরের বাজারে গেল।

এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারল, মাধবপুরের পশ্চিমপাড়ায় একটি পরিবারে শহর থেকে তাদের মেয়ে এসেছে।

নাম—দিয়া।

রোহানের বুক ধক করে উঠল।

সে নিশ্চিত হতে পারছিল না।

তবুও খোঁজ নিতে লাগল।

শেষ পর্যন্ত ঠিকানা মিলল।

বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ভাবল।

‘আমি এখানে কী করছি?’

নিজের কাছেই প্রশ্নটা করল।

তারপর হেসে বলল,

—দেখা করতে এসেছি, এত ভাবার কী আছে?

ঠিক তখনই বাড়ির সামনে দিয়ে দিয়া বের হলো।

হাতে একটি কলসি।

রোহানকে দেখে সে থমকে গেল।

তারপর চোখ বড় বড় করে বলল,

—আপনি!

রোহান মুচকি হেসে বলল,

—হ্যাঁ, আমি।

দিয়া অবাক হয়ে এগিয়ে এল।

—আপনি এখানে কী করছেন?

—গ্রামে এসেছি।

—আমার বাড়ির সামনে?

—হ্যাঁ।

—কেন?

রোহান একটু থেমে বলল,

—বন্ধুর বাড়িতে এসেছি।

দিয়া সন্দেহের চোখে তাকাল।

—আপনার বন্ধু কে?

রোহান এক মুহূর্ত ভেবে বলল,

—আপনি।

দিয়া হেসে ফেলল।

—আমি?

—হ্যাঁ। ট্রেনে এত ঝগড়া করার পর আমরা তো বন্ধু হয়ে গেছি।

দিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,

—কে বলেছে?

—আমি বলেছি।

—আমি মানি না।

—আপনি না মানলেও আমি মানি।

দিয়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

সে বুঝতে পারল, রোহান তাকে খুঁজে এসেছে।

তবু সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করল না।

বরং বলল,

—বাড়িতে আসবেন?

রোহান বলল,

—আপনার বাবা কী বলবেন?

দিয়া একটু থেমে গেল।

—আপনি শুধু আমার বন্ধু। এতে সমস্যা হওয়ার কথা না।

রোহান মাথা নেড়ে বাড়িতে ঢুকল।

দিয়ার পরিবারের সবাই রোহানকে ভালোভাবে গ্রহণ করল।

রোহান নিজের পরিচয় দিল, কোথায় পড়াশোনা করেছে, এখন কী করতে চায়—সব বলল।

দিয়ার বাবা রফিক সাহেবও ভদ্রভাবে কথা বললেন।

তবে রোহান বুঝতে পারল, তিনি বেশ গম্ভীর মানুষ।

দিয়া দূর থেকে সব দেখছিল।

তার চোখে তখন অদ্ভুত আনন্দ।

রোহান তার জন্য এত দূর এসেছে—এই ব্যাপারটা তার ভেতরে একটা অজানা ভালো লাগা তৈরি করছিল।

বিকেলে দিয়া রোহানকে বাড়ির পেছনের মাঠের দিকে নিয়ে গেল।

চারদিকে সবুজ ধানখেত।

দূরে নদীর পাড়।

হালকা বাতাস।

দিয়া বলল,

—শহরে থেকে থেকে এসব জায়গা খুব মিস করতাম।

রোহান বলল,

—তাহলে এখানে এসে ভালো লাগছে?

—খুব।

—আমারও।

দিয়া তাকিয়ে বলল,

—আপনি তো গ্রামেরই মানুষ। আপনার আবার নতুন করে ভালো লাগছে কেন?

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—আগে এই জায়গাগুলো একরকম লাগত। এখন অন্যরকম লাগছে।

—কেন?

রোহান দিয়ার দিকে তাকাল।

—কারণ এখন আপনি এখানে আছেন।

দিয়া থেমে গেল।

তার গাল হালকা লাল হয়ে উঠল।

—আপনি সবসময় এমন কথা বলেন কেন?

—কী কথা?

—যেগুলোর উত্তর দেওয়া কঠিন।

রোহান হাসল।

—উত্তর দিতে হবে না।

দিয়া কিছু বলল না।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর দিয়া পা পিছলে কাদার কাছে পড়ে যাচ্ছিল।

রোহান দ্রুত তার হাত ধরে ফেলল।

দিয়া ভারসাম্য ফিরে পেলেও হাত ছাড়ল না।

রোহানও হাত ছাড়ল না।

দুজনের চোখে চোখ।

কয়েক মুহূর্তের নীরবতা।

তারপর দিয়া আস্তে করে বলল,

—হাতটা ছাড়বেন?

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—ছাড়ব?

দিয়া নিচু গলায় বলল,

—না ছাড়লেও তো সমস্যা নেই।

কথাটা বলেই দিয়া নিজেই লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

রোহানের মুখে তখন প্রশান্ত হাসি।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে দুজনের কেউই খুব বেশি কথা বলল না।

তবু দুজনের মনেই একই অনুভূতি জন্ম নিল।

এটা আর শুধু বন্ধুত্ব নয়।

কিছু একটা বদলে গেছে।

রোহান রাতে নিজের ঘরে শুয়ে চোখ বন্ধ করল।

দিয়ার হাসি চোখের সামনে ভেসে উঠল।

আর দিয়া জানালার পাশে বসে নিজের মনকে প্রশ্ন করল,

‘আমি কি সত্যিই ওকে এতটা পছন্দ করে ফেলেছি?’

দুজনেই উত্তর জানত।

কিন্তু কেউই মুখে বলার সাহস করল না।

পরদিন সকাল থেকেই দিয়ার মুখে অন্যরকম হাসি।

ঘুম থেকে উঠেই তার প্রথম মনে হলো, আজ রোহানের সঙ্গে দেখা হবে।

এই ভাবনাটা মনে আসতেই নিজের অজান্তে হাসল সে।

কিন্তু পরক্ষণেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই বলল,

—দিয়া, তুমি এত বদলে যাচ্ছ কেন?

আয়না অবশ্য কোনো উত্তর দিল না।

দিয়া চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে আবার হাসল।

গত কয়েকদিনে রোহান যেন তার প্রতিদিনের একটা অংশ হয়ে গেছে। সকালে দেখা, দুপুরে গল্প, বিকেলে গ্রামের মাঠে হাঁটাহাঁটি—সবকিছুতেই রোহান জড়িয়ে গেছে।

অথচ প্রথম দেখায় ছেলেটাকে তার অসহ্য মনে হয়েছিল।

সকালে নাশতার টেবিলে দিয়া বসতেই তার মা বললেন,

—আজ আবার কোথায় যাবে?

দিয়া স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,

—কোথাও না।

মা মুচকি হেসে বললেন,

—কোথাও না মানে?

—এমনিই বললাম।

ঠিক তখন বাইরে থেকে রোহানের কণ্ঠ শোনা গেল।

—দিয়া!

দিয়া সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

মা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।

—এত তাড়াতাড়ি উঠলে কেন?

দিয়া অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

—আমি... পানি খাব।

মা হেসে ফেললেন।

—পানি তো রান্নাঘরে।

দিয়া কোনো উত্তর না দিয়ে বাইরে চলে গেল।

বাড়ির উঠানে রোহান দাঁড়িয়ে ছিল।

দিয়াকে দেখেই বলল,

—আজ এত দেরি?

দিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,

—আপনি কি আমাকে ডাকছিলেন?

—হ্যাঁ।

—কেন?

—চলুন।

—কোথায়?

—একটা জায়গা দেখাব।

দিয়া কিছুটা আগ্রহী হয়ে বলল,

—কী জায়গা?

—গেলে দেখবেন।

দিয়া সন্দেহের চোখে তাকাল।

—কোনো দুষ্টুমি করবেন না তো?

রোহান হেসে বলল,

—আপনার সঙ্গে দুষ্টুমি না করলে আমার দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগে।

দিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—আপনি একদম বদলাবেন না।

—আপনিও না।

দুজন হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের শেষ প্রান্তে চলে গেল।

সামনে বিশাল সবুজ মাঠ।

মাঠের এক পাশে সরু মাটির রাস্তা, অন্য পাশে ছোট্ট একটা খাল।

রোহান বলল,

—এই জায়গাটা আমার সবচেয়ে প্রিয়।

দিয়া চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল।

—সত্যিই সুন্দর।

—ছোটবেলায় এখানে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম।

দিয়া হেসে বলল,

—আপনাকে ছোটবেলায় কেমন দেখতে ছিল?

—খুব শান্ত।

দিয়া হেসে উঠল।

—আপনি শান্ত? বিশ্বাস হচ্ছে না।

—সত্যি।

—আমার মনে হয় আপনি তখনও মানুষকে বিরক্ত করতেন।

—শুধু বিশেষ মানুষদের।

দিয়া থেমে গেল।

—বিশেষ মানুষ?

রোহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—হ্যাঁ।

দিয়ার মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।

হাঁটতে হাঁটতে তারা খালের ধারে গিয়ে বসল।

বাতাসে দিয়ার চুল উড়ছিল।

রোহান কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।

দিয়া সেটা বুঝতে পেরে বলল,

—এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?

—এমনিই।

—মিথ্যা।

—ঠিক আছে। সত্যি বলব?

—বলুন।

রোহান একটু থেমে বলল,

—আপনাকে দেখলে আমার ভালো লাগে।

দিয়া কিছু বলল না।

তার চোখ নেমে গেল মাটির দিকে।

রোহান আবার বলল,

—আপনি কি জানেন, প্রথম দিন আপনাকে আমার খুব রাগী মনে হয়েছিল?

দিয়া হেসে বলল,

—আমারও আপনাকে খুব বিরক্তিকর মনে হয়েছিল।

—এখন?

দিয়া চুপ।

রোহান আবার প্রশ্ন করল,

—এখনও কি বিরক্তিকর মনে হয়?

দিয়া ধীরে ধীরে বলল,

—আগের মতো না।

—তাহলে কেমন?

দিয়া মুখ তুলে তাকাল।

—বলব না।

রোহান হেসে বলল,

—ঠিক আছে। আমিও বলব না।

দুজনেই হেসে ফেলল।

এরপর কয়েকটা দিন যেন খুব দ্রুত কেটে গেল।

রোহান প্রায় প্রতিদিনই দিয়ার বাড়িতে আসত।

কখনো গল্প, কখনো হাঁটাহাঁটি, কখনো গ্রামের বাজারে গিয়ে ফুচকা খাওয়া।

একদিন দিয়া রোহানকে নিয়ে নদীর পাড়ে গেল।

রোহান বলল,

—আপনি এতদিন শহরে থেকে গ্রামের এসব জায়গা কীভাবে ভুলে গেলেন?

দিয়া বলল,

—ভুলিনি। বরং এখন মনে হচ্ছে, শহরের চেয়ে এখানেই বেশি ভালো লাগে।

—কেন?

দিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—সবকিছু সহজ মনে হয়।

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—সবকিছু সহজ হয় না। কিছু মানুষ সহজ করে দেয়।

দিয়া তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, রোহান হয়তো তাকে নিয়েই কথা বলছে।

কিন্তু আনন্দের এই সময়ের মধ্যেই একটা খবর এসে দিয়ার মন খারাপ করে দিল।

সন্ধ্যায় মা তাকে ঘরে ডেকে বললেন,

—দিয়া, তোমার বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে।

দিয়া চমকে উঠল।

—কী?

—আগামী মাসের দশ তারিখ।

দিয়া কিছুক্ষণ নিশ্চুপ।

—এত তাড়াতাড়ি?

—তোমার বাবা সব ঠিক করে ফেলেছে।

দিয়ার বুকটা ধক করে উঠল।

তার মাথায় শুধু একজনের কথাই এলো।

রোহান।

সে কি জানে?

না।

দিয়া জানে না কী করবে।

রাতে ঘুমাতে গিয়ে বারবার রোহানের মুখ মনে পড়ল।

‘আপনাকে দেখলে আমার ভালো লাগে।’

‘বিশেষ মানুষ।’

এই কথাগুলো যেন তার কানে বাজতে লাগল।

পরদিন রোহান এলে দিয়া স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।

কিন্তু রোহান সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল কিছু একটা হয়েছে।

—কী হয়েছে?

—কিছু না।

—মিথ্যা বলছেন।

দিয়া চুপ করে রইল।

রোহান তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

—দিয়া, আমার সঙ্গে কিছু লুকাবেন না।

দিয়া চোখ তুলে তাকাল।

তার চোখে পানি চিকচিক করছে।

রোহান অস্থির হয়ে গেল।

—আপনি কাঁদছেন কেন?

দিয়া খুব আস্তে বলল,

—আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

রোহান যেন হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বের হলো না তার মুখ দিয়ে।

—কবে?

—আগামী মাসের দশ তারিখ।

রোহান নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল।

দিয়া তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—কিছু বলছেন না কেন?

রোহান ধীরে মাথা তুলল।

চোখে তখন অন্যরকম দৃঢ়তা।

—আমি আপনার সঙ্গে একটা কথা বলতে চাই।

—কী?

—একটু সময় দিন।

দিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

রোহান বলল,

—আগামীকাল আমি আপনাকে আমার মনের কথাটা বলব।

দিয়ার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

সে বুঝতে পারছিল, আগামীকাল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হতে পারে।

রোহান চলে যাওয়ার পর দিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

তার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

সে বুঝে গেছে রোহান কী বলতে চায়।

আর সেই কথাটা শোনার জন্যই হয়তো এতদিন ধরে তার মন অপেক্ষা করছিল।

পরদিন সকালটা দিয়ার কাছে অন্যরকম লাগছিল।

ঘুম ভাঙার পর থেকেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা উত্তেজনা। বারবার মনে পড়ছে রোহানের কথা।

‘আগামীকাল আমি আপনাকে আমার মনের কথাটা বলব।’

রোহান কী বলবে, সেটা দিয়া জানে।

তবু নিজের কানে শুনতে চায়।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো।

দিয়া বারবার উঠানের দিকে তাকাচ্ছিল। কিন্তু রোহানের কোনো খবর নেই।

বিকেল হয়ে গেল।

সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে।

দিয়া অবশেষে বাড়ির পেছনের মাঠে গিয়ে দাঁড়াল।

সেখানেই রোহানকে দেখা গেল।

মাটির রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে সে।

দিয়াকে দেখেই তার মুখে হাসি ফুটল।

—আপনি এখানে?

দিয়া অভিমানী গলায় বলল,

—আপনি এত দেরি করলেন কেন?

—কাজ ছিল।

—আমাকে অপেক্ষা করালেন।

—জানি।

—তাহলে?

রোহান কাছে এসে দাঁড়াল।

—আপনাকে একটু অপেক্ষা করাতে চেয়েছিলাম।

দিয়া অবাক হয়ে বলল,

—কেন?

—কারণ আজ যে কথাটা বলব, সেটা বলার আগে আমাকেও অনেক অপেক্ষা করতে হয়েছে।

দিয়ার বুক ধক করে উঠল।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—দিয়া, আপনাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম, সেদিন ভেবেছিলাম আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে রাগী মেয়ে।

দিয়া মৃদু হেসে বলল,

—আর আমি ভেবেছিলাম আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর ছেলে।

—হ্যাঁ, জানি।

—তারপর?

রোহান দিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—তারপর ট্রেনে আপনার সঙ্গে এত ঝগড়া হলো যে কখন আপনি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলেন, বুঝতেই পারিনি।

দিয়ার চোখে পানি জমে উঠল।

রোহান বলল,

—আপনার হাসি, আপনার রাগ, আপনার অভিমান—সবকিছু আমার ভালো লাগে। আপনি পাশে থাকলে সময় কীভাবে চলে যায় বুঝি না। আর আপনি দূরে থাকলে অকারণে মন খারাপ হয়।

দিয়া নিঃশব্দে শুনছিল।

রোহান ধীরে বলল,

—আমি আপনাকে পছন্দ করি, দিয়া। খুব বেশি।

দিয়ার চোখ বেয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।

রোহান একটু চিন্তিত হয়ে বলল,

—কাঁদছেন কেন?

দিয়া হেসে ফেলল।

—খুশিতে।

রোহান স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।

দিয়া চোখ মুছে বলল,

—আমি ভেবেছিলাম, আপনি কখনো বলবেন না।

—আপনিও তো কিছু বলেননি।

—আমি অপেক্ষা করছিলাম।

—কিসের?

দিয়া নিচু গলায় বলল,

—আপনার মুখ থেকে এই কথাটা শোনার।

রোহানের মুখে প্রশান্ত হাসি ফুটে উঠল।

সে বলল,

—তাহলে এখন একটা কথা বলুন।

—কী?

—আপনি আমাকে পছন্দ করেন?

দিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ।

রোহানের চোখে আনন্দ ফুটে উঠল।

দুজনেই কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

চারপাশে শুধু বাতাসের শব্দ।

দিয়া হঠাৎ বলল,

—রোহান...

—হুম?

—আমাকে নিয়ে চলে যাবেন?

রোহান অবাক হয়ে তাকাল।

—কোথায়?

—আপনার সঙ্গে। এখনই।

রোহান মাথা নাড়ল।

—না।

দিয়া হতাশ হয়ে বলল,

—কেন?

—কারণ আমি আপনাকে লুকিয়ে বা পালিয়ে নিয়ে যেতে চাই না।

—তাহলে?

—আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। কিন্তু আপনার বাবার অনুমতি নিয়েই।

দিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

—আপনি জানেন বাবা কখনো রাজি হবেন না।

—তবু চেষ্টা করব।

—যদি অপমান করেন?

রোহান শান্ত গলায় বলল,

—তবুও চেষ্টা করব।

দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আপনি সত্যিই অদ্ভুত।

রোহান হেসে বলল,

—কেন?

—এত সহজে আমাকে ছেড়ে দিতে পারতেন। কিন্তু আপনি আমার বাবার সম্মতি চান।

—কারণ আমি শুধু আপনাকে পেতে চাই না। আমি চাই আপনার পরিবারও আমাদের সম্পর্ককে মেনে নিক।

দিয়ার চোখ আবার ভিজে উঠল।

সেদিন রাতে দিয়া বাবার সঙ্গে কথা বলার সাহস করল।

রফিক সাহেব খবরটা শুনে প্রচণ্ড রেগে গেলেন।

—কে সেই ছেলে?

দিয়া কাঁপা গলায় বলল,

—রোহান।

—ও কী করে?

—বিদেশে পড়াশোনা করেছে। এখন দেশে এসেছে।

—পরিবার?

—ভালো পরিবার।

রফিক সাহেব কঠিন গলায় বললেন,

—আমি মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছি। এখন নতুন করে এসব কথা শুনতে চাই না।

দিয়া বলল,

—কিন্তু আমি ওকে পছন্দ করি।

—তোমার পছন্দের ওপর জীবন চলে না।

—বাবা...

—আর একটা কথাও নয়।

দিয়া চোখের পানি সামলে নিজের ঘরে চলে গেল।

পরদিন রোহান দিয়াদের বাড়িতে এল।

তার সঙ্গে কথা বলার জন্য রফিক সাহেব তাকে বসতে বললেন।

রোহান সম্মান দিয়ে বলল,

—চাচা, আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।

রফিক সাহেব ঠান্ডা গলায় বললেন,

—তুমি কি জানো, দিয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে?

—জি।

—তবুও এসেছ?

—জি। কারণ আমি আপনার অনুমতি চাই।

রফিক সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—তোমার মনে হয় কয়েক দিনের পরিচয় দিয়ে আমার মেয়েকে তুমি বুঝে ফেলেছ?

—না চাচা। আমি দাবি করছি না যে আমি সব বুঝে গেছি। কিন্তু আমি জানি, আমি দিয়াকে সম্মান করি।

—তুমি বিদেশে পড়াশোনা করেছ বলে নিজেকে খুব যোগ্য ভাবছ?

রোহান শান্ত থাকার চেষ্টা করল।

—আমি নিজেকে যোগ্য বলছি না। শুধু বলছি, আমি আপনার মেয়েকে ভালোভাবে রাখতে চাই।

রফিক সাহেব হঠাৎ কঠিন স্বরে বললেন,

—আমার মেয়ের জন্য তোমাকে দরকার নেই। তুমি এখনই এই বাড়ি থেকে চলে যাও।

দিয়া পাশের ঘর থেকে সব শুনছিল।

তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।

রোহান কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকল।

তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—ঠিক আছে চাচা। আমি যাচ্ছি। কিন্তু একটা কথা রেখে যাচ্ছি—আমি দিয়াকে কোনোদিন অসম্মান করব না। আপনার সিদ্ধান্ত বদলালে আমাকে জানাবেন।

রোহান বেরিয়ে গেল।

দিয়া দরজার আড়াল থেকে তাকিয়ে রইল।

তার বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে যাচ্ছিল।

রোহান একবারও পেছনে তাকাল না।

মাটির রাস্তা ধরে দূরে চলে গেল সে।

আর দিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু ভাবল,

‘তুমি কি সত্যিই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে, রোহান?’

রোহান চলে যাওয়ার পর দিয়ার দিনগুলো যেন হঠাৎ থেমে গেল।

যে বাড়িতে কয়েকদিন আগেও তার হাসির শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন সে চুপচাপ বসে থাকে। গ্রামের মাঠে গেলে রোহানের সঙ্গে কাটানো সময়গুলোর কথা মনে পড়ে। নদীর পাড়ে দাঁড়ালে মনে হয়, এই বুঝি পেছন থেকে রোহানের কণ্ঠ ভেসে আসবে—

‘দিয়া, এত চুপ করে আছেন কেন?’

কিন্তু কেউ আসে না।

রোহানও আর ফোন করে না।

দিয়া কয়েকবার ফোন হাতে নিয়েও কল করতে পারেনি।

তার মনে হয়, রোহান হয়তো বাবার অপমানের পর আর তাকে বিরক্ত করতে চাইছে না।

অন্যদিকে রোহানও নিজের বাড়িতে ফিরে অস্থির হয়ে আছে।

তার মা জিজ্ঞেস করলেন,

—কী হয়েছে তোমার?

রোহান মৃদু গলায় বলল,

—কিছু না।

—তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে অনেক কিছু হয়েছে।

রোহান চুপ করে রইল।

মা আবার বললেন,

—যদি কাউকে ভালোবেসে থাকো, তাহলে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভেবেচিন্তে এগোও। তবে কারও সম্মান নষ্ট করে নয়।

রোহান মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—আমি সেটাই চাই।

—তাহলে হাল ছেড়ো না।

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

—আমি হাল ছাড়ব না।

কয়েকদিন পর দিয়ার বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো।

বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আসতে শুরু করল। উঠানে প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে। সবাই ব্যস্ত।

কিন্তু দিয়া যেন এই আয়োজনের মাঝেও একা।

তার মা একদিন ঘরে এসে বললেন,

—দিয়া, তোমার বিয়ের কেনাকাটা শেষ করতে হবে।

দিয়া চুপ করে বসে ছিল।

—কী হয়েছে?

—কিছু না।

—তুমি কি রোহানের কথা ভাবছ?

দিয়া চমকে মায়ের দিকে তাকাল।

মা ধীরে বললেন,

—মা হিসেবে অনেক কিছুই বুঝতে পারি।

দিয়ার চোখে পানি চলে এল।

—আমি ওকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারব না, আম্মু।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তোমার বাবাকে বোঝানো কঠিন।

—আমি জানি।

—তবু তোমার বাবা হয়তো একদিন বুঝবে।

দিয়া মায়ের হাত ধরে বলল,

—সেদিন যেন খুব দেরি না হয়ে যায়।

বিয়ের আর মাত্র তিন দিন বাকি।

রোহান তখনও কোনো যোগাযোগ করেনি।

দিয়া শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিল, সে নিজেই রোহানের সঙ্গে কথা বলবে।

বিকেলে বাড়ির পেছনে গিয়ে ফোন করল।

অনেকক্ষণ পর রোহান ফোন ধরল।

—হ্যালো?

রোহানের কণ্ঠ শুনেই দিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

—কেমন আছেন?

—ভালো। আপনি?

—ভালো না।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

রোহান ধীরে বলল,

—দিয়া, আমি আপনাকে কোনো সমস্যায় ফেলতে চাই না।

—আপনি কি আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—না।

দিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল।

—তাহলে এতদিন যোগাযোগ করেননি কেন?

—আপনার বাবার সম্মতি ছাড়া আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।

—কিন্তু আমার বিয়ে তো ঠিক হয়ে গেছে!

—আমি জানি।

—তাহলে কিছু করছেন না কেন?

রোহান শান্ত গলায় বলল,

—আমি চেষ্টা করছি।

—কী চেষ্টা?

—আপনার বাবাকে বোঝানোর।

—কিন্তু তিনি তো আপনাকে অপমান করেছেন।

—তাতে কী?

—আপনি আবার যাবেন?

—হ্যাঁ।

দিয়া অবাক হয়ে বলল,

—কখন?

—আপনার বিয়ের আগের দিন।

দিয়া কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

তারপর ধীরে বলল,

—আপনি যদি না পারেন?

রোহান বলল,

—তাহলে আমি আপনার সিদ্ধান্তকে সম্মান করব।

দিয়ার গলা কেঁপে উঠল।

—আমি আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাই না।

রোহান কিছু বলল না।

দিয়া বলল,

—আপনি কি আমাকে একটা কথা বলবেন?

—কী?

—আপনি আমাকে সত্যিই এতটা ভালোবাসেন?

রোহানের কণ্ঠ নরম হয়ে গেল।

—আপনি যদি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না হতেন, তাহলে আপনার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে অপমানিত হওয়ার পরও আমি আবার ফিরে আসতাম না।

দিয়ার চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল।

—আমি অপেক্ষা করব।

—আমি আসব।

কল কেটে গেল।

দিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করল।

পরদিন সকালে রোহান দিয়াদের বাড়িতে গেল।

রফিক সাহেব তাকে দেখে বিরক্ত হলেন।

—আবার কেন এসেছ?

রোহান শান্ত গলায় বলল,

—শেষবারের মতো কথা বলতে এসেছি।

—আমি আমার সিদ্ধান্ত জানিয়েছি।

—জানি।

—তাহলে?

—আপনি যদি মনে করেন আমি আপনার মেয়ের জন্য উপযুক্ত নই, আমাকে কারণটা বলুন।

রফিক সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—আমি তোমাকে চিনি না। কয়েকদিনের পরিচয়ে আমার মেয়ের জীবন তোমার হাতে তুলে দিতে পারি না।

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

—আপনার ভয়টা আমি বুঝতে পারছি।

—তাহলে ফিরে যাও।

—আমি ফিরে যাব। কিন্তু একটা অনুরোধ রেখে যাব।

—কী?

—দিয়াকে জিজ্ঞেস করুন, সে কাকে বিয়ে করতে চায়।

রফিক সাহেব কঠিনভাবে বললেন,

—আমার মেয়ের সিদ্ধান্ত সবকিছু নয়।

রোহান বলল,

—হয়তো সবকিছু নয়। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি তো অবশ্যই।

রফিক সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না।

রোহান উঠে দাঁড়াল।

—আমি আর আপনাকে বিরক্ত করব না।

দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

—চাচা, আমি আপনার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারতাম। সে নিজেও আমাকে বলেছিল। কিন্তু আমি তা করিনি। কারণ আমি চাই, একদিন আপনি নিজে আমাদের বিয়েতে সম্মতি দিন।

রফিক সাহেব এবারও কোনো কথা বললেন না।

রোহান চলে গেল।

সেদিন রাতে রফিক সাহেব অনেকক্ষণ একা বসে রইলেন।

তার মনে বারবার রোহানের কথাগুলো ঘুরতে লাগল।

‘আমি আপনার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি।’

একজন ছেলে যদি সত্যিই খারাপ উদ্দেশ্যে আসত, তাহলে কি সে এত সহজে ফিরে যেত?

রফিক সাহেব প্রথমবারের মতো নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন।

কিন্তু তখনও তিনি মুখে কিছু বললেন না।

এদিকে বিয়ের দিন একেবারে সামনে।

দিয়া জানে না, তার বাবা শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেবেন।

আর রোহানও জানে না, শেষ মুহূর্তে তার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে।

তবু দুজনের মনেই একটাই বিশ্বাস—

তারা একে অপরকে হারাতে চায় না।

বিয়ের দিন।

সকাল থেকেই দিয়াদের বাড়িতে ব্যস্ততা। উঠানে আত্মীয়স্বজনের ভিড়, রান্নাঘরে ব্যস্ততা, চারপাশে সাজসজ্জা—সব মিলিয়ে বাড়িটা উৎসবের মতো হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও দিয়া নিজের ঘরে চুপ করে বসে আছে।

তার সামনে বিয়ের পোশাক রাখা।

কিন্তু পোশাকটির দিকে তাকালেই তার বুকটা ভার হয়ে আসছে।

বারবার মনে পড়ছে রোহানের কথা।

‘আমি আসব।’

সে কি সত্যিই আসবে?

দিয়া জানে না।

কয়েকবার ফোন হাতে নিয়েও কল করার সাহস হলো না।

অন্যদিকে রোহান নিজের বাড়িতে বসে ছিল।

তার মা এসে বললেন,

—আজ কি তুমি মাধবপুর যাবে?

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ।

—শেষবার চেষ্টা করবে?

—হ্যাঁ।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—যদি তবুও রাজি না হয়?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—তাহলে আমি চলে আসব।

—দিয়াকে ছেড়ে?

রোহান নিচু গলায় বলল,

—আমি তাকে কষ্ট দিতে চাই না। তার বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে নিয়ে কিছু করতে চাই না।

মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তোমার সিদ্ধান্ত ঠিক।

রোহান উঠে দাঁড়াল।

তার চোখে তখন অদ্ভুত শান্তি।

যেন শেষবারের মতো নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে যাচ্ছে।

দুপুরের দিকে রোহান মাধবপুরে পৌঁছাল।

কিন্তু দিয়াদের বাড়ির সামনে গিয়ে থামল না।

সে সরাসরি গ্রামের এক পরিচিত মানুষের বাড়িতে গেল।

সেখান থেকে খবর পেল, বিয়ের আয়োজন চলছে।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর দিয়াদের বাড়ির দিকে রওনা দিল।

দরজার কাছে পৌঁছাতেই রফিক সাহেব তাকে দেখে বললেন,

—তুমি আবার এসেছ?

রোহান শান্ত গলায় বলল,

—জি।

—আজ আমার মেয়ের বিয়ে।

—জানি।

—তাহলে কেন এসেছ?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আপনার সঙ্গে শেষবার কথা বলতে।

রফিক সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন,

—আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলাব না।

রোহান মাথা নিচু করল।

তারপর বলল,

—ঠিক আছে।

রফিক সাহেব যেন একটু অবাক হলেন।

—এত সহজে চলে যাচ্ছ?

—আপনি আমার চেয়ে মেয়ের বাবা। আপনার সিদ্ধান্তকে সম্মান করা আমার দায়িত্ব।

—তুমি দিয়াকে ভালোবাসো?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—জি।

—তাহলে লড়াই করবে না?

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—ভালোবাসার নামে আমি তার পরিবারকে ভাঙতে চাই না।

রফিক সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না।

রোহান ফিরে যেতে লাগল।

দরজার আড়াল থেকে দিয়া সব দেখছিল।

তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।

সে দৌড়ে বাবার কাছে এসে বলল,

—বাবা!

রফিক সাহেব তাকালেন।

দিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আপনি ওকে যেতে দিলেন?

—দিয়া...

—আমি ওকে ছাড়া বিয়ে করতে পারব না।

—তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

—আমি জানি। কিন্তু আমার মন তো অন্য কাউকে মেনে নিয়েছে।

রফিক সাহেব চুপ করে রইলেন।

দিয়া বলল,

—আপনি যদি আমাকে জোর করেন, আমি হয়তো এই বাড়ি থেকে বিয়ের সাজে বের হব। কিন্তু আমার মনটা কখনো আপনার কাছে থাকবে না।

এই কথাটা রফিক সাহেবের মনে গভীরভাবে আঘাত করল।

তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, দিয়া সত্যিই ভেঙে পড়েছে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা।

বিয়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে।

রফিক সাহেব নিজের ঘরে একা বসে আছেন।

তার সামনে দিয়ার ছোটবেলার ছবি।

মেয়েটাকে তিনি সবসময় নিজের ইচ্ছামতো সুখী করতে চেয়েছেন।

কিন্তু এখন বুঝতে পারছেন, সুখের সংজ্ঞা তিনি নিজের মতো করে ঠিক করে ফেলেছেন।

তিনি ভাবলেন, রোহানকে তিনি যতটা দেখেছেন, ছেলেটা একবারও সীমা অতিক্রম করেনি।

অপমানের পরও ফিরে এসেছে।

কিন্তু মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যায়নি।

বরং বারবার তার অনুমতি চেয়েছে।

রফিক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তারপর উঠে দাঁড়ালেন।

দিয়া তখন বিয়ের পোশাকে বসে আছে।

চোখে পানি।

মা এসে তার পাশে বসলেন।

—দিয়া...

দিয়া মায়ের দিকে তাকাল।

মা বললেন,

—তোমার বাবা তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান।

দিয়া ধীরে উঠে দাঁড়াল।

বাবার সামনে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

রফিক সাহেব কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

—তুমি কি সত্যিই রোহানকে বিয়ে করতে চাও?

দিয়ার চোখ মুহূর্তেই ভিজে উঠল।

—হ্যাঁ, বাবা।

—ও তোমাকে সুখী রাখতে পারবে?

দিয়া মাথা নেড়ে বলল,

—আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। কিন্তু আমি জানি, ও আমাকে সম্মান করে।

রফিক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—আমি এতদিন ভাবছিলাম, তোমার জন্য কোনটা ভালো সেটা আমি সবচেয়ে ভালো জানি।

দিয়া চুপ করে শুনছিল।

—কিন্তু আজ বুঝলাম, তোমার জীবনটা তোমাকেই বেছে নিতে হবে।

দিয়া বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

রফিক সাহেব ধীরে বললেন,

—আমি রাজি।

দিয়া যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

দিয়া সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—ধন্যবাদ বাবা!

রফিক সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—যাকে এতটা বিশ্বাস করো, তাকে হারিয়ে ফেলো না।

দিয়া চোখ মুছে বলল,

—আমি এখনই ওর কাছে যাব।

রফিক সাহেব হেসে বললেন,

—যাও।

অন্যদিকে রোহান তখন গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটছে।

তার মনে কোনো রাগ নেই।

শুধু একটাই কষ্ট—দিয়াকে হয়তো আর কোনোদিন নিজের করে পাওয়া হবে না।

সে ধীরে ধীরে গ্রামের শেষ প্রান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল—

—রোহান!

রোহান থেমে গেল।

কিন্তু ঘুরে তাকাল না।

আবার ডাক এল,

—রোহান!

এই কণ্ঠে কান্না।

রোহানের বুক কেঁপে উঠল।

সে ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।

দিয়া দৌড়ে আসছে।

বিয়ের পোশাক পরা।

চোখে পানি।

রোহান অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

দিয়া কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন কেন?

রোহান কিছু বলতে পারল না।

দিয়া চোখের পানি মুছে বলল,

—আমাকে একা রেখে চলে যাচ্ছেন, স্বার্থপর?

রোহানের চোখ ভিজে উঠল।

—দিয়া...

দিয়া আর কোনো কথা না বলে দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

রোহান কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ধীরে দিয়াকে ধরে বলল,

—তোমার বাবা?

দিয়া হাসতে হাসতে কাঁদল।

—রাজি হয়েছেন।

রোহান যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।

—সত্যি?

দিয়া মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ। এবার আমাকে আর কোথাও যেতে হবে না।

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে এতদিনের সব ঝগড়া শেষ?

দিয়া চোখ তুলে বলল,

—না।

—কেন?

—ঝগড়া তো চলবেই।

রোহান হেসে ফেলল।

দিয়া বলল,

—তবে এবার ঝগড়া করার অধিকারটা শুধু আমার।

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

—ঠিক আছে। আমি সারাজীবন হার মেনে নেব।

দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।

দূরে গ্রামের আকাশে সন্ধ্যার আলো নেমে এসেছে।

দিয়ার চোখের পানি তখনও শুকায়নি।

রোহানও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না, এতদিনের অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত তাদের পথটা সত্যিই এক হয়ে গেল।

দিয়া ধীরে ধীরে রোহানের কাছ থেকে সরে এসে বলল,

—চলুন।

রোহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

—কোথায়?

—বাড়িতে।

—এখন?

—হ্যাঁ। বাবা অপেক্ষা করছেন।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—তুমি জানো, আজ তোমাকে প্রথম দেখার দিনের কথা মনে পড়ছে।

দিয়া হেসে বলল,

—আমারও।

—তখন তুমি আমার সঙ্গে কীভাবে ঝগড়া করেছিলে মনে আছে?

—আপনিও কম করেননি।

—আমি তো নির্দোষ ছিলাম।

দিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—মিথ্যা!

রোহান হেসে ফেলল।

—দেখলে? বিয়ের আগেই আবার ঝগড়া শুরু।

দিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—আমি বদলাব না।

—আমিও চাই না তুমি বদলাও।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

গ্রামের সরু মাটির পথ ধরে তারা ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

আজ সেই পথটাও যেন অন্যরকম সুন্দর লাগছিল।

বাড়ির উঠানে পৌঁছাতেই রোহান দেখল, সবাই তার অপেক্ষায় আছে।

রফিক সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—এসো।

রোহান এগিয়ে গিয়ে সালাম করল।

রফিক সাহেব তাকে বসতে বললেন।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর তিনি বললেন,

—আমি তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি।

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

—না চাচা।

—হ্যাঁ। আমি তোমাকে না জেনেই বিচার করেছি।

রোহান শান্ত গলায় বলল,

—আপনি বাবা। আপনার চিন্তা থাকাটাই স্বাভাবিক।

রফিক সাহেব মৃদু হেসে বললেন,

—এই কথাটাই আমাকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়েছে, তুমি আমার মেয়েকে সম্মান করতে পারবে।

রোহান কিছু বলল না।

দিয়া পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।

তার মুখে তখন প্রশান্তির হাসি।

রফিক সাহেব বললেন,

—আমি একটা শর্তে রাজি।

রোহান একটু চিন্তিত হয়ে বলল,

—কী শর্ত?

—দিয়াকে সবসময় সম্মান করবে।

রোহান দৃঢ়ভাবে বলল,

—এটা শর্ত নয় চাচা। এটা আমার দায়িত্ব।

রফিক সাহেবের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

কয়েকদিনের মধ্যেই দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ের আয়োজন শুরু হলো।

যে বিয়েটা একসময় দিয়ার কাছে ভয় হয়ে এসেছিল, সেটাই এখন তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের অপেক্ষা।

বিয়ের দিন সকালে দিয়া আয়নার সামনে বসে ছিল।

তার বান্ধবী এসে বলল,

—তুই এত হাসছিস কেন?

দিয়া বলল,

—এমনিই।

—রোহানের কথা ভাবছিস?

দিয়া লজ্জা পেয়ে বলল,

—চুপ কর।

বান্ধবী হেসে বলল,

—প্রথম দেখায় তো বলেছিলি, ছেলেটা খুব বিরক্তিকর!

দিয়া মুচকি হেসে বলল,

—তখন জানতাম না, ওই বিরক্তিকর ছেলেটাই একদিন আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে যাবে।

অন্যদিকে রোহানও বিয়ের পোশাক পরে প্রস্তুত।

তার বন্ধু এসে বলল,

—কী ব্যাপার? এত চুপচাপ কেন?

রোহান হেসে বলল,

—ভাবছি।

—কী?

—প্রথম দিন মেয়েটার সঙ্গে ঝগড়া না করলে হয়তো আজকের দিনটা আসত না।

বন্ধু হেসে বলল,

—মানে ঝগড়াই তোমাদের মিলিয়ে দিল?

রোহান বলল,

—হয়তো।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো।

দুই পরিবারের মানুষজন আনন্দে ভরে উঠল।

রফিক সাহেব নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

দিয়া তখন রোহানের পাশে বসে।

রোহান নিচু গলায় বলল,

—দিয়া।

—হুম?

—একটা কথা বলব?

—বলুন।

—তোমাকে প্রথম দেখার দিন যদি জানতাম, তুমি আমার জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে যাবে, তাহলে হয়তো সেদিনই তোমার সঙ্গে এত ঝগড়া করতাম না।

দিয়া মুচকি হেসে বলল,

—না। ঝগড়া করতেই হতো।

—কেন?

—কারণ ওই ঝগড়া না হলে তো আমাদের গল্প শুরু হতো না।

রোহান হেসে বলল,

—তাহলে আমাদের গল্পের নাম কী হওয়া উচিত?

দিয়া একটু ভেবে বলল,

—প্রথম দেখাতেই ঝগড়া।

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

—খারাপ না।

বিয়ের পর কয়েকদিনের জন্য তারা গ্রামেই থাকল।

এক বিকেলে দিয়া আর রোহান আবার সেই পরিচিত মাঠে গেল।

যেখানে তারা প্রথমবার নিজেদের মনের কথা বুঝতে শুরু করেছিল।

দিয়া ধীরে ধীরে হাঁটছিল।

রোহান পাশে।

দিয়া হঠাৎ বলল,

—মনে আছে?

—সব মনে আছে।

—এই জায়গাতেই আপনি বলেছিলেন, আমাকে দেখলে আপনার ভালো লাগে।

—হ্যাঁ।

—আর আমি বলেছিলাম, উত্তর দেব না।

—কিন্তু পরে দিয়েছিলে।

—অনেক দেরি করে।

রোহান হেসে বলল,

—তবু দিয়েছ।

দিয়া একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল।

বাতাসে তার চুল উড়ছিল।

রোহান বলল,

—কী ভাবছ?

দিয়া মুচকি হেসে বলল,

—ভাবছি, কয়েকদিন আগেও মনে হয়েছিল সব শেষ।

—আর এখন?

দিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—এখন মনে হচ্ছে, তখনই তো আমাদের আসল গল্প শুরু হয়েছিল।

রোহান ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।

—একটা কথা বলি?

—আবার কী?

—জীবনে যত ঝগড়াই করো, আমার সঙ্গে থেকো।

দিয়া হেসে বলল,

—আপনি কি ভয় পাচ্ছেন, আমি চলে যাব?

—হ্যাঁ।

দিয়া মাথা নেড়ে বলল,

—কোথাও যাব না।

রোহান মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে ঠিক আছে।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

সামনে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ।

দূরে অস্ত যাওয়ার পথে সূর্য।

আর তাদের সামনে নতুন জীবনের দীর্ঘ পথ।

তাদের সম্পর্কের শুরু হয়েছিল একটুখানি ঝগড়া দিয়ে।

তারপর ট্রেনের পথে জন্ম নিয়েছিল বন্ধুত্ব, খুনসুটি আর টান।

গ্রামের মাঠে এসে সেই টান পরিণত হয়েছিল গভীর অনুভূতিতে।

বাধা এসেছিল, অপমান এসেছিল, বিচ্ছেদের ভয়ও এসেছিল।

তবু শেষ পর্যন্ত তারা একে অপরকে হারায়নি।

কারণ সত্যিকারের সম্পর্ক শুধু একসঙ্গে থাকার নাম নয়।

একে অপরকে সম্মান করা, পরিবারের সম্মতি পাওয়ার চেষ্টা করা এবং কঠিন সময়েও বিশ্বাস ধরে রাখাই তাদের সম্পর্ককে পূর্ণতা দিয়েছিল।

দিয়া হঠাৎ রোহানের দিকে তাকিয়ে বলল,

—একটা কথা বলি?

—হুম?

—প্রথম দেখায় আপনাকে সত্যিই খুব বিরক্তিকর লেগেছিল।

রোহান হেসে বলল,

—আমারও আপনাকে খুব রাগী লেগেছিল।

—এখন?

—এখন মনে হয়, সেই রাগী মেয়েটাকে না পেলে আমার গল্পটাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

দিয়া মুচকি হেসে তার পাশে হাঁটতে লাগল।

গ্রামের সেই মাটির পথে পাশাপাশি চলতে চলতে তাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো।

আর তাদের গল্পের প্রথম লাইনটা রয়ে গেল একই—

প্রথম দেখাতেই ঝগড়া।

কিন্তু সেই ঝগড়ার শেষ হয়েছিল একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতিতে।

 

....
👁 1359