সকালটা ছিল বেশ সুন্দর। হালকা রোদ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে। চারপাশে নতুন-পুরোনো শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা। কেউ ক্লাসে যাচ্ছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে, আবার কেউ ক্যাম্পাসের এক পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে।
জায়ান ধীর পায়ে নিজের ক্লাসের দিকে যাচ্ছিল।
জায়ান এই ইউনিভার্সিটির অন্যতম মেধাবী ছাত্র। পড়াশোনায় সবসময় সবার থেকে এগিয়ে থাকে। শিক্ষকরা তাকে খুব পছন্দ করেন। শান্ত স্বভাবের ছেলে হলেও নিজের কাজের ব্যাপারে সে ভীষণ মনোযোগী।
ক্লাসরুমে ঢুকে সে নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় বসে বই খুলে রাখল।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই ক্লাসরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে থেমে গেল জায়ান।
একটা মেয়ে দ্রুত পায়ে ক্লাসে ঢুকছে।
হালকা নীল পোশাক, কাঁধ পর্যন্ত চুল, হাতে কয়েকটা বই। মেয়েটা একটু অগোছালোভাবে চুল ঠিক করতে করতে চারপাশে তাকাল। তারপর খালি একটা আসন দেখে সেখানে গিয়ে বসে পড়ল।
জায়ানের চোখ অজান্তেই মেয়েটার দিকে আটকে গেল।
মেয়েটার নাম তখনও সে জানে না।
কিন্তু প্রথম দেখাতেই কেন যেন মেয়েটাকে তার খুব ভালো লেগে গেল।
জায়ান নিজেই অবাক হলো নিজের আচরণে।
সে সাধারণত কোনো মেয়ের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকে না। কিন্তু আজ চোখ সরাতে পারছে না।
কিছুক্ষণ পর শিক্ষক ক্লাসে ঢুকলেন।
সবাই চুপ হয়ে গেল।
ক্লাস শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর শিক্ষক বই বন্ধ করে বললেন,
—আজকে দেখি তোমরা আগের ক্লাসের বিষয়টা কতটা বুঝেছ। নীরা, তুমি দাঁড়াও।
মেয়েটা চমকে উঠে দাঁড়াল।
জায়ান প্রথমবার তার নাম শুনল।
নীরা।
নামটার সঙ্গেও মেয়েটাকে বেশ মানিয়ে যায় মনে হলো তার।
শিক্ষক একটি প্রশ্ন করলেন।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তার উত্তরটা ভুল হয়ে গেল।
পেছন থেকে কয়েকজন হেসে উঠল।
কেউ নিচু গলায় বলল,
—এটাও জানে না!
আরেকজন বলল,
—স্যারের মেয়ের পড়াশোনার অবস্থা তো দেখছি ভয়াবহ!
কথাগুলো শুনে নীরার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে মলিন হয়ে গেল।
শিক্ষক অবশ্য কাউকে কিছু না বলে নীরাকে বসতে বললেন।
নীরা চুপচাপ বসে পড়ল।
তার চোখেমুখে স্পষ্ট অস্বস্তি।
জায়ানের ভালো লাগল না বিষয়টা।
একজন কোনো প্রশ্নের উত্তর পারেনি বলে তাকে নিয়ে এভাবে হাসাহাসি করার কী আছে?
ক্লাস শেষ হওয়ার পর সবাই একে একে বেরিয়ে গেল।
নীরা তখনও নিজের জায়গায় বসে ছিল।
সে বইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু বোঝাই যাচ্ছিল তার মন বইয়ে নেই।
জায়ান কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে তার কাছে গেল।
—হাই।
নীরা মুখ তুলে তাকাল।
—হাই।
—আমি জায়ান।
—আমি নীরা।
জায়ান হেসে বলল,
—তোমার নাম জানি। আজ স্যার ডেকেছিলেন তো।
নীরা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—হুম।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল,
—তুমি কি আমার সঙ্গে পরিচিত হতে এসেছ?
—হ্যাঁ। বন্ধু হতে আপত্তি আছে?
নীরা একটু অবাক হয়ে তাকাল।
—আমার মতো খারাপ ছাত্রীর সঙ্গে?
জায়ান কথাটা শুনে বুঝল, অন্যদের হাসাহাসির কারণে মেয়েটা সত্যিই কষ্ট পেয়েছে।
সে শান্ত গলায় বলল,
—খারাপ ছাত্রী কে বলেছে?
—আমি নিজেই জানি।
—একটা প্রশ্নের উত্তর পারোনি বলে কেউ খারাপ ছাত্র হয়ে যায় না।
নীরা কিছু বলল না।
জায়ান তার সামনে থাকা বইটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—চাইলে আমি তোমাকে বিষয়টা বুঝিয়ে দিতে পারি।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—তুমি আমাকে পড়াবে?
—পড়াব না। বুঝিয়ে দেব। পড়তে তো তোমাকেই হবে।
নীরার মুখে প্রথমবারের মতো ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।
—ঠিক আছে।
সেদিন থেকেই তাদের পরিচয়ের শুরু।
পরের দিন লাইব্রেরিতে বসে জায়ান নীরাকে আগের দিনের পড়াটা বুঝিয়ে দিল। নীরা প্রথমে বেশ বিরক্ত হয়ে বলছিল,
—এত কঠিন করে কেন বুঝাচ্ছ?
জায়ান হেসে বলল,
—কঠিন না। তুমি মন দিয়ে শুনছ না।
—আমি শুনছি!
—তাহলে বলো, আমি কী বললাম?
নীরা চুপ।
জায়ান হেসে ফেলল।
—বুঝেছ?
নীরাও হেসে বলল,
—একটু।
—এই ‘একটু’কে পুরোটা করতে হবে।
দিন যেতে লাগল।
নীরা বুঝতে পারল, জায়ান শুধু মেধাবী নয়, খুব ধৈর্যশীলও।
কোনো বিষয় সে দশবার বুঝিয়ে দিতে হলেও বিরক্ত হয় না।
আর জায়ান বুঝতে পারল, নীরা আসলে পড়াশোনায় খারাপ নয়। তার সমস্যা হলো সে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।
জায়ান তাকে নিয়ম করে পড়তে সাহায্য করতে লাগল।
ক্লাসে নীরা কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে জায়ান পরে তাকে সেই বিষয়টা বুঝিয়ে দিত।
ধীরে ধীরে নীরার ফলাফলও ভালো হতে শুরু করল।
একদিন ক্লাস শেষে নীরা আনন্দে দৌড়ে এসে বলল,
—জায়ান!
জায়ান বই গুছাতে গুছাতে তাকাল।
—কী হয়েছে?
—আজ স্যার আমাকে একটা প্রশ্ন করেছিলেন। আমি ঠিক উত্তর দিয়েছি!
জায়ানের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ!
—দেখেছ? বলেছিলাম তুমি পারবে।
নীরা খুশিতে বলল,
—তোমার জন্যই পেরেছি।
জায়ান মাথা নেড়ে বলল,
—না। তুমি নিজে চেষ্টা করেছ বলেই পেরেছ।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
জায়ান বুঝতে পারল না, মেয়েটা এভাবে তাকিয়ে আছে কেন।
—কী?
নীরা মৃদু হেসে বলল,
—তুমি অন্যরকম।
—কীভাবে?
—সবাই যখন আমাকে নিয়ে হাসছিল, তুমি তখন আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলে।
জায়ান একটু থেমে বলল,
—বন্ধুর জন্য এটুকু করতেই হয়।
নীরা তখনও হাসছিল।
সেদিনের পর থেকে তাদের বন্ধুত্ব আরও গভীর হলো।
একসঙ্গে ক্লাস করা, লাইব্রেরিতে পড়া, ক্যাম্পাসে হাঁটা—সবকিছুতেই তারা ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গী হয়ে উঠল।
জায়ান কখন যে নীরার হাসি দেখার অপেক্ষা করতে শুরু করেছে, সে নিজেও বুঝতে পারল না।
আর নীরাও কখন যে জায়ানকে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন মনে করতে শুরু করেছে, সেটাও বুঝতে পারল না।
তবে একজন মানুষ বিষয়টা খুব ভালোভাবেই লক্ষ্য করছিলেন।
নীরার বাবা।
তিনি এই ইউনিভার্সিটির ইংরেজির শিক্ষক।
ক্লাসে তিনি যেমন কঠোর, মেয়ের ব্যাপারেও তেমনই সতর্ক।
কয়েকদিন ধরে তিনি লক্ষ্য করছিলেন, নীরা প্রায়ই জায়ানের সঙ্গে কথা বলে। ক্লাসের পরও দুজন একসঙ্গে থাকে।
তিনি তখনও কিছু বললেন না।
শুধু দূর থেকে বিষয়টা লক্ষ্য করতে থাকলেন।
আর এদিকে জায়ানের মনে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল এমন এক অনুভূতি, যার নাম সে তখনও কাউকে বলেনি।
নীরাকে সে শুধু বন্ধু হিসেবে আর দেখতে পারছিল না।
কিন্তু সামনে যে সময়টা তাদের জীবনে কত বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে চলেছে, তা তখনও কেউ জানত না।
পরের কয়েকটা মাস যেন খুব দ্রুত কেটে গেল।
জায়ান আর নীরার বন্ধুত্ব তখন পুরো ইউনিভার্সিটিতে পরিচিত হয়ে গেছে। তারা প্রায় সবসময় একসঙ্গে থাকে। একই ক্লাসে বসে, একসঙ্গে লাইব্রেরিতে যায়, কখনো ক্যাম্পাসের মাঠের পাশে বসে গল্প করে।
নীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগী হয়েছে।
এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান জায়ানের।
প্রতিদিন ক্লাসের পর জায়ান তাকে পড়া বুঝিয়ে দেয়। নীরা কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে বারবার প্রশ্ন করে। আর জায়ান ধৈর্য ধরে সব প্রশ্নের উত্তর দেয়।
একদিন বিকেলে লাইব্রেরিতে বসে নীরা বই বন্ধ করে বলল,
—জায়ান, একটা কথা বলব?
—বলো।
—তুমি এত ভালো ছাত্র হয়েও আমার মতো একজনকে পড়াতে এত সময় দাও কেন?
জায়ান বই থেকে চোখ তুলে তাকাল।
—কারণ তুমি চেষ্টা করছ।
—শুধু এই কারণে?
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—হ্যাঁ। আর তুমি আমার বন্ধু।
নীরা মৃদু হাসল।
—তুমি খুব ভালো বন্ধু।
জায়ানও হাসল।
কিন্তু নিজের মনের কথাটা সে বলল না।
কারণ সে জানত, নীরার প্রতি তার অনুভূতিটা বন্ধুত্বের চেয়ে অনেক বেশি।
নীরা যখন হাসে, তখন তার মন ভালো হয়ে যায়।
নীরা মন খারাপ করে থাকলে তার নিজেরও অস্বস্তি হয়।
নীরা কোনোদিন ইউনিভার্সিটিতে না এলে সারাদিন তার মনটা খারাপ থাকে।
এগুলো কি শুধু বন্ধুত্ব?
জায়ান জানত, না।
সে নীরাকে ভালোবেসে ফেলেছে।
কিন্তু সে নিজের অনুভূতিটা নীরাকে জানানোর সাহস পাচ্ছিল না।
অন্যদিকে নীরাও ধীরে ধীরে জায়ানের প্রতি আলাদা একটা টান অনুভব করতে শুরু করেছিল।
জায়ানের সঙ্গে কথা বললে তার মন ভালো হয়ে যেত।
কোনো সমস্যা হলে সবার আগে জায়ানের কথাই তার মনে পড়ত।
একদিন নীরা হঠাৎ বলল,
—জায়ান, তুমি কি কখনো কারও প্রেমে পড়েছ?
জায়ান একটু থেমে গেল।
তারপর বলল,
—হয়তো।
নীরা অবাক হয়ে তাকাল।
—হয়তো মানে?
—মানে... এখনো নিশ্চিত না।
—মেয়েটা কে?
জায়ান হেসে বলল,
—এত কৌতূহল কেন?
নীরা মুখ ঘুরিয়ে বলল,
—জানতে ইচ্ছে হলো।
—জানলেও কী করবে?
—কিছু না।
জায়ান মুচকি হেসে বলল,
—তাহলে এখন জানার দরকার নেই।
নীরা আর কিছু বলল না।
তবে সেদিন বাড়ি ফেরার পর অদ্ভুতভাবে তার মন খারাপ হয়ে রইল।
সে বারবার ভাবতে লাগল, জায়ান যে মেয়েটাকে পছন্দ করে সে কে?
পরদিন ইউনিভার্সিটিতে এসে নীরা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও জায়ান বুঝতে পারল, কিছু একটা হয়েছে।
—তুমি আজ এত চুপ কেন?
—কই, চুপ না তো।
—তুমি মিথ্যা বলছ।
—আমি মিথ্যা বলছি না।
জায়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?
নীরা এবার তার দিকে তাকাল।
—না।
—তাহলে?
নীরা নিচু গলায় বলল,
—তুমি যে মেয়েটাকে পছন্দ করো, সে কি তোমার খুব কাছের?
জায়ান বুঝতে পারল, ব্যাপারটা কোথায়।
সে একটু হেসে বলল,
—হ্যাঁ, খুব কাছের।
নীরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
সে আর কিছু বলল না।
জায়ানও তখন কিছু বলল না।
কিন্তু দুজনের মাঝেই একটা অদৃশ্য অনুভূতি জন্ম নিয়েছিল।
কয়েকদিন পর ইউনিভার্সিটিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলো।
সবাই অনুষ্ঠানে ব্যস্ত।
নীরা সেদিন খুব সুন্দর করে সেজেছিল। জায়ান দূর থেকে তাকে দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তার বন্ধু রাফি পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—কী রে? এত কী দেখছিস?
জায়ান দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
—কিছু না।
রাফি হেসে বলল,
—কিছু না হলে এতক্ষণ তাকিয়ে থাকলি কেন?
জায়ান কোনো উত্তর দিল না।
সন্ধ্যার দিকে অনুষ্ঠান শেষে সবাই যখন বাড়ি ফিরছিল, নীরা জায়ানের পাশে এসে দাঁড়াল।
—আজ আমাকে কেমন লাগছে?
জায়ান একটু থেমে বলল,
—ভালো।
—শুধু ভালো?
—অনেক ভালো।
নীরা হেসে ফেলল।
—এবার ঠিক আছে।
তারা পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
হঠাৎ নীরা বলল,
—জায়ান?
—হুম?
—তুমি যদি কোনোদিন আমাকে ছেড়ে চলে যাও?
জায়ান থেমে গেল।
—এমন কথা বলছ কেন?
—জানি না। হঠাৎ মনে হলো।
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমি কোথাও যাচ্ছি না।
নীরা তার দিকে তাকাল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
নীরা শান্ত হলো।
কিন্তু তাদের এই কাছাকাছি আসার বিষয়টা নীরার বাবার চোখ এড়াল না।
একদিন বিকেলে তিনি নীরাকে নিজের ঘরে ডাকলেন।
—নীরা, তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।
নীরা বাবার সামনে বসে বলল,
—কী কথা?
—জায়ানের সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা কী?
নীরা চমকে গেল।
—সম্পর্ক মানে?
—তুমি কি ওকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখো?
নীরা চুপ করে রইল।
বাবা বুঝলেন, তার সন্দেহ অমূলক নয়।
তিনি শান্তভাবে বললেন,
—জায়ান খুব ভালো ছেলে। পড়াশোনায়ও ভালো। কিন্তু তোমার এখন এসব নিয়ে ভাবার সময় নয়।
নীরা মাথা নিচু করল।
—আমি তো কিছু করছি না বাবা।
—আমি জানি। কিন্তু সম্পর্কের বিষয়গুলো কখনো কখনো নিজের অজান্তেই মানুষকে অন্যদিকে নিয়ে যায়।
নীরা কিছু বলল না।
তার বাবা আবার বললেন,
—তুমি পড়াশোনা শেষ করো। নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করো। জায়ানের সঙ্গে প্রয়োজনের বাইরে বেশি মিশবে না।
নীরা কষ্ট পেল।
—কিন্তু বাবা...
—আমি তোমার খারাপ চাইছি না।
কথাটা বলে তিনি উঠে চলে গেলেন।
সেদিন রাতে নীরা অনেকক্ষণ জানালার পাশে বসে রইল।
তার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
বাবা কি সত্যিই জায়ানকে তার জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চান?
অন্যদিকে জায়ান কিছুই জানত না।
পরদিন নীরা ইউনিভার্সিটিতে এসে আগের মতোই জায়ানের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল।
কিন্তু তার আচরণে একটা দ্বিধা ছিল।
জায়ান সেটা বুঝতে পারলেও কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কয়েকদিন পর এক বিকেলে নীরার বাবা সরাসরি জায়ানকে ডাকলেন।
জায়ান শিক্ষকের কক্ষে গিয়ে দাঁড়াল।
—স্যার, আমাকে ডাকছিলেন?
নীরার বাবা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
—হ্যাঁ। তোমার সঙ্গে নীরাকে নিয়ে কিছু কথা আছে।
জায়ানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
তিনি শান্ত গলায় বললেন,
—আমি জানি তুমি নীরাকে খুব গুরুত্ব দাও। তোমাদের বন্ধুত্ব নিয়েও আমার আপত্তি নেই।
জায়ান চুপ করে শুনছিল।
—কিন্তু তুমি যদি সত্যিই ওর ভালো চাও, তাহলে এখন থেকে ওর কাছ থেকে একটু দূরে থাকবে।
জায়ান অবাক হয়ে তাকাল।
—স্যার?
—নীরা এখনো নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। তোমাদের এই সম্পর্ক ওর পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ—সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
জায়ান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
নীরার বাবার চোখে কঠোরতা থাকলেও সেখানে মেয়ের জন্য চিন্তাও ছিল।
তিনি আবার বললেন,
—তুমি মেধাবী ছেলে। তোমার সামনে অনেক সুযোগ আছে। নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করো। নীরার ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়, এমন কোনো কারণ যেন তুমি না হও।
জায়ান মাথা নিচু করল।
কথাগুলো তার মনে গভীরভাবে আঘাত করল।
কারণ সে নীরাকে সত্যিই ভালোবাসে।
কিন্তু সে এটাও জানে, নীরার ক্ষতি হোক—এটা সে কখনো চাইবে না।
কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় জায়ান একবার পেছনে তাকাল।
তার মনে তখন একটাই সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছে—
নীরার ভালো যদি তার থেকে দূরে থাকার মধ্যেই হয়, তাহলে সে দূরেই থাকবে।
যত কষ্টই হোক।
নীরার বাবার সঙ্গে কথা বলার পর জায়ানের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।
সে সেদিন অনেকক্ষণ ইউনিভার্সিটির মাঠের এক পাশে চুপচাপ বসে ছিল। চারপাশে সবাই হাসছে, গল্প করছে। কিন্তু জায়ানের কিছুই ভালো লাগছিল না।
তার মাথায় শুধু নীরার কথা ঘুরছিল।
সে জানত, নীরাকে সে ভালোবাসে। কিন্তু নীরার ভবিষ্যতের জন্য যদি তাকে দূরে সরে যেতে হয়, তাহলে সে সেটাই করবে।
পরদিন থেকেই জায়ানের আচরণ বদলে গেল।
নীরা ক্লাসে এসে আগের মতোই জায়ানের পাশে বসতে চাইল।
—জায়ান, একটু সরে বসো তো।
জায়ান বই খুলে বলল,
—তুমি অন্য জায়গায় বসো।
নীরা অবাক হলো।
—কেন?
—এমনিই।
নীরা কিছু বুঝতে পারল না।
—কাল পর্যন্ত তো আমি তোমার পাশেই বসেছি।
—আজ থেকে অন্য জায়গায় বসবে।
কথাটা বলেই জায়ান বইয়ের দিকে তাকাল।
নীরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে চুপচাপ অন্য বেঞ্চে গিয়ে বসল।
সেদিন ক্লাসে নীরার মন একদমই বসছিল না।
জায়ান কেন এমন করছে?
সে কি কোনো ভুল করেছে?
ক্লাস শেষে নীরা দ্রুত জায়ানের কাছে গেল।
—জায়ান, তোমার কী হয়েছে?
—কিছু হয়নি।
—তাহলে আমার সঙ্গে কথা বলছ না কেন?
—কাজ আছে।
—কী কাজ?
—পড়াশোনা।
নীরা কষ্ট পেল।
—আমার সঙ্গে পড়াশোনা করতে তোমার সমস্যা হচ্ছে?
জায়ান এবার তার দিকে তাকাল।
—নীরা, আমাদের একটু দূরে থাকা উচিত।
নীরা হতবাক হয়ে গেল।
—কেন?
—এমনিই।
—এমনিই কেউ বন্ধুর সঙ্গে দূরে সরে যায়?
জায়ান কোনো উত্তর দিল না।
নীরা তার হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?
—না।
—তাহলে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—সবকিছু আগের মতো থাকবে না।
নীরার চোখে পানি জমে উঠল।
—তুমি কি আর আমার বন্ধু থাকতে চাও না?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে জায়ানের খুব কষ্ট হচ্ছিল।
সে নীরার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ‘আমি তোমার বন্ধু থাকতে চাই। তোমার পাশে থাকতে চাই। কিন্তু তোমার ভালো যদি আমার দূরে সরে যাওয়ার মধ্যে হয়, তাহলে আমাকে যেতে হবে।’
কিন্তু মুখে বলল,
—আমাদের একটু দূরত্ব দরকার।
নীরা আর কিছু বলল না।
চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল।
সেদিন রাতে নীরা অনেক কাঁদল।
তার মনে হচ্ছিল, হঠাৎ করে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটা তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
পরের কয়েকদিন জায়ান ইচ্ছে করেই নীরাকে এড়িয়ে চলল।
নীরা কথা বলতে এলে সে ছোট ছোট উত্তর দিত।
নীরা পাশে বসতে চাইলে অন্য জায়গায় চলে যেত।
নীরা কোনো প্রশ্ন করলে অন্য সহপাঠীর মাধ্যমে উত্তর পাঠিয়ে দিত।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেল নীরা একদিন।
ইউনিভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়ায় জায়ান কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বসে ছিল। তাদের সঙ্গে একটি মেয়েও ছিল।
মেয়েটি জায়ানের সঙ্গে হাসতে হাসতে কথা বলছিল।
দূর থেকে নীরা সেটা দেখল।
তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল।
জায়ান দূর থেকেই নীরাকে দেখতে পেয়েছিল।
তার চোখে কষ্টের ছাপ দেখেই জায়ানের মনটা ভেঙে গেল।
কিন্তু সে নিজেকে শক্ত রাখল।
তার পাশে বসা মেয়েটি ছিল তার এক সহপাঠী। জায়ান ইচ্ছে করেই তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিল, যাতে নীরা মনে করে সে আর তাকে গুরুত্ব দেয় না।
কিন্তু নীরা চলে যাওয়ার পর জায়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে মনে মনে বলল,
‘ক্ষমা করো নীরা। তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু তোমার ভবিষ্যৎ নষ্ট হোক, সেটাও আমি চাই না।’
এরপর থেকে নীরা নিজেকে পড়াশোনায় ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করল।
জায়ানও নিজের পড়াশোনায় আরও বেশি মন দিল।
দুজন একই ক্লাসে থেকেও যেন অপরিচিত হয়ে গেল।
কয়েক মাস পর তাদের শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষা শুরু হলো।
নীরা আগের চেয়ে অনেক ভালো ফল করল।
জায়ান দূর থেকে তার ফলাফল দেখে হাসল।
কিন্তু নীরাকে কিছু বলল না।
নীরাও জায়ানের সঙ্গে আর কথা বলল না।
তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়ে গেল।
শেষ দিন সবাই ছবি তুলছিল, একে অপরকে বিদায় জানাচ্ছিল।
নীরা দূরে দাঁড়িয়ে জায়ানের দিকে তাকিয়ে ছিল।
জায়ানও তাকে দেখছিল।
দুজনের চোখে হাজার কথা ছিল।
কিন্তু কেউ কারও কাছে এগিয়ে গেল না।
শেষ পর্যন্ত নীরাই চোখ সরিয়ে নিল।
জায়ান সেদিন বাড়ি ফেরার পথে খুব কষ্ট পেয়েছিল।
তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু সে জানত, এই কষ্ট তাকে সহ্য করতেই হবে।
সময়ের সঙ্গে দুজনের জীবন আলাদা পথে চলে গেল।
নীরা পরিবারের সিদ্ধান্তে বিয়েতে রাজি হলো।
ছেলেটি ছিল বড় ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। অনেক টাকা-পয়সা, বড় বাড়ি, গাড়ি—সবই ছিল।
নীরার বাবা ভেবেছিলেন, মেয়ের ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকবে।
নীরাও বাবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গেল না।
একদিন নীরার বিয়ে হয়ে গেল।
বিয়ের দিন নীরা সাজঘরে বসে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে ছিল।
সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত।
কিন্তু তার মনে হঠাৎ জায়ানের কথা চলে এল।
সে জানে না জায়ান এখন কোথায়।
কেমন আছে।
সে কি তাকে একবারও মনে করে?
নীরা চোখ বন্ধ করল।
তারপর নিজের মনকে বোঝাল,
‘সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।’
অন্যদিকে জায়ান তখন নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে।
সে উচ্চশিক্ষা শেষ করে একটি বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেল। কয়েক বছরের মধ্যে নিজের যোগ্যতায় আরও বড় পদে চলে গেল।
তার জীবনে সাফল্য আসতে লাগল।
কিন্তু নীরার জায়গাটা তার মনে একই রকম রয়ে গেল।
সে আর কখনো নীরার খোঁজ নেয়নি।
কারণ সে জানত, নীরা এখন অন্য কারও স্ত্রী।
এদিকে নীরার নতুন সংসার শুরু হলো।
শুরুর কয়েকদিন সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল।
কিন্তু ধীরে ধীরে নীরা বুঝতে পারল, তার স্বামী খুব রাগী স্বভাবের মানুষ।
সামান্য বিষয় নিয়েও সে রেগে যায়।
নীরা একটু দেরি করলে প্রশ্ন করে।
কোনো কথা তার পছন্দ না হলে ঝগড়া শুরু করে।
কিছুদিন পর নীরা বুঝতে পারল, তার স্বামীর আরেকটি খারাপ অভ্যাস আছে।
সে প্রায়ই রাতে বাইরে থাকে এবং কোনো কোনো দিন মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফেরে।
নীরা চুপচাপ সব সহ্য করতে লাগল।
কিছুদিন পর তাদের ঘরে একটি কন্যাসন্তান এলো।
ছোট্ট মেয়েটাকে প্রথমবার কোলে নিয়ে নীরা মনে মনে ঠিক করল,
‘আমার জীবনে যত কষ্টই থাকুক, আমার মেয়েকে আমি সবসময় ভালো রাখব।’
মেয়েটার নাম রাখা হলো মায়া।
মায়া বড় হতে লাগল।
নীরা তার পুরো জীবন মেয়েকে ঘিরে সাজিয়ে নিল।
সকালে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, দুপুরে নিয়ে আসা, পড়াশোনা করানো, খাওয়ানো—সবকিছু নীরাই করত।
তার স্বামী এসবের দিকে খুব একটা নজর দিত না।
বরং মায়া একটু ভুল করলেই তাকে ধমক দিত।
নীরা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিত।
দিনের পর দিন এভাবেই চলতে থাকল।
একদিন মায়া স্কুলে যাওয়ার আগে নীরাকে বলল,
—আম্মু, তুমি আজ আমাকে নিতে আসবে তো?
নীরা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,
—অবশ্যই আসব।
মায়া হাসল।
কিন্তু সেদিন নীরার কিছু কাজ থাকায় স্কুলে যেতে তার একটু দেরি হয়ে গেল।
মায়া গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের অপেক্ষা করছিল।
আর ঠিক সেই সময়, রাস্তার ওপাশে একটি গাড়ি এসে থামল।
গাড়ির ভেতরে বসা মানুষটি জানালার বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।
বহু বছর পর তার চোখের সামনে সেই পরিচিত মুখ।
জায়ানের বুকটা কেঁপে উঠল।
সে গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল।
আর মায়া তখন রাস্তা পার হওয়ার জন্য এক পা বাড়িয়েছে।
সামনে একটি গাড়ি দ্রুত এগিয়ে আসছিল।
জায়ান দৌড়ে গিয়ে মায়াকে ধরে পিছনে টেনে নিল।
মায়া ভয় পেয়ে জায়ানের দিকে তাকাল।
জায়ান তাকে শান্ত করে বলল,
—ভয় পেয়ো না। তুমি ঠিক আছ।
ঠিক তখনই নীরা দৌড়ে এসে ঘটনাটা দেখল।
তার চোখ হঠাৎ বড় হয়ে গেল।
এত বছর পর—
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে জায়ান।
আর জায়ানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে তার ছোট্ট মেয়ে।
দুজনেই কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
কেউ কোনো কথা বলতে পারল না।
নীরা যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।
এত বছর পর জায়ানকে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে, এটা সে কখনো ভাবেনি।
জায়ানও নীরার দিকে তাকিয়ে চুপ করে ছিল।
সময় যেন হঠাৎ থেমে গেছে।
যে মানুষটাকে একসময় প্রতিদিন দেখত, যার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত, সেই মানুষটাকে আজ এত বছর পর সামনে দেখে জায়ানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি ঠিক আছ তো?
মায়া মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
নীরা দ্রুত মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নিল।
—মায়া, তুমি একা রাস্তা পার হচ্ছিলে কেন?
মায়া মাথা নিচু করল।
—আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তুমি আসছিলে না।
নীরা মেয়েকে জড়িয়ে ধরল।
—আর কখনো একা রাস্তা পার হবে না। বুঝেছ?
মায়া মাথা নাড়ল।
তারপর সে জায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আঙ্কেল, আপনি না থাকলে আজ আমি...
নীরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—ওনাকে ধন্যবাদ দাও।
মায়া মিষ্টি করে বলল,
—ধন্যবাদ, আঙ্কেল।
জায়ান মৃদু হেসে বলল,
—ধন্যবাদ দিতে হবে না। সাবধানে থাকবে, সেটাই যথেষ্ট।
মায়া আবার বলল,
—আপনি কি আমার আম্মুকে চেনেন?
প্রশ্নটা শুনে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
শেষ পর্যন্ত জায়ান বলল,
—হ্যাঁ। অনেক আগে থেকেই চিনি।
নীরা নিচু গলায় বলল,
—জায়ান আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু ছিল।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
জায়ান মৃদু হেসে বলল,
—তোমার আম্মু তখনও খুব দুষ্টু ছিল।
নীরা সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
—আমি দুষ্টু ছিলাম?
—ছিলে।
—একদম না।
জায়ান অনেক বছর পর নীরার মুখে সেই পুরোনো অভিমানী স্বর শুনে হেসে ফেলল।
নীরারও অজান্তে মুখে হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই দুজনের চোখে অতীতের স্মৃতি ফিরে এলো।
হাসিটা মিলিয়ে গেল।
নীরা ধীরে বলল,
—তুমি কেমন আছ?
—ভালো আছি। তুমি?
নীরা কিছু বলার আগেই মায়া বলল,
—আম্মু, আমরা বাড়ি যাব না?
—হ্যাঁ, চল।
নীরা জায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আজ তোমার জন্য আমার মেয়েটা বেঁচে গেল। ধন্যবাদ।
জায়ান মাথা নাড়ল।
—এটা নিয়ে আর কিছু বলো না।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—ভালো থেকো।
জায়ানও বলল,
—তুমিও।
নীরা মেয়েকে নিয়ে চলে গেল।
জায়ান অনেকক্ষণ তাদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে অদ্ভুত একটা শূন্যতা তৈরি হলো।
এত বছর পর নীরাকে দেখে তার মনে হয়েছিল, পুরোনো সব অনুভূতি হয়তো মরে যায়নি।
কিন্তু সে জানে, নীরা এখন একজনের স্ত্রী এবং একটি সন্তানের মা।
তাই নিজের মনকে আবারও বোঝাল—
‘ওর জীবনে আমার কোনো জায়গা নেই।’
অন্যদিকে গাড়িতে বসে মায়া মাকে প্রশ্ন করল,
—আম্মু, জায়ান আঙ্কেল তোমার বন্ধু ছিল?
নীরা চুপ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
—হ্যাঁ।
—তোমার খুব ভালো বন্ধু?
নীরা মৃদু গলায় বলল,
—হ্যাঁ। অনেক ভালো বন্ধু ছিল।
মায়া আবার প্রশ্ন করল,
—তাহলে এখন তোমরা বন্ধু না?
নীরা উত্তর দিল না।
মেয়ের প্রশ্নটা তার মনে পুরোনো অনেক কথা ফিরিয়ে আনল।
ক্লাসরুম, লাইব্রেরি, জায়ানের সঙ্গে পড়াশোনা, ক্যাম্পাসে হাঁটা—সবকিছু যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।
আর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ল সেই দিনটা, যেদিন জায়ান হঠাৎ তার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল।
তখন সে বুঝতে পারেনি কেন।
আজও জানে না।
সেদিন রাতে নীরা মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে নিজের ঘরে এসে বসে রইল।
তার স্বামী তখনও বাড়ি ফেরেনি।
ঘড়ির কাঁটা রাত অনেকটা পেরিয়ে গেছে।
নীরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছিল—
জায়ান কি সত্যিই তাকে ভুলে গেছে?
সে কি বিয়ে করেছে?
তার সংসার আছে?
কেন যেন নীরার বুকের ভেতরটা ভার হয়ে গেল।
ঠিক তখন দরজা জোরে খুলে তার স্বামী ঘরে ঢুকল।
তার মুখ দেখে নীরা বুঝতে পারল, সে স্বাভাবিক নেই।
—এত রাতে ফিরলে?
নীরার স্বামী রেগে তাকাল।
—আমাকে জিজ্ঞেস করার তুমি কে?
নীরা চুপ হয়ে গেল।
সে কোনো কথা না বলে স্বামীর জন্য পানি এগিয়ে দিল।
কিন্তু লোকটি পানির গ্লাস না নিয়ে বলল,
—আজ মেয়েকে নিতে এত দেরি হলো কেন?
—কিছু কাজ ছিল। তাই একটু দেরি হয়েছে।
—তোমার কোনো কাজই ঠিকমতো হয় না।
নীরা চুপ করে রইল।
লোকটি আবার বলল,
—মেয়েকে সামলাতে পারো না, সংসার সামলাতে পারো না, সারাদিন কী করো তুমি?
নীরা কিছু বলল না।
মেয়েটা পাশের ঘর থেকে কথাগুলো শুনছিল।
সে চুপচাপ দরজা বন্ধ করে দিল।
এভাবেই নীরার জীবন চলতে লাগল।
কিন্তু জায়ানের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তার মনে যেন একটা পরিবর্তন এসেছে।
সে বুঝতে পারল, এত বছর পরও কেউ একজন তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে পারে।
কেউ তার মেয়েকে নিজের সন্তানের মতো নিরাপদ রাখতে পারে।
কয়েকদিন পর আবার তাদের দেখা হলো।
মায়ার স্কুলে একটি অভিভাবক অনুষ্ঠান ছিল।
নীরা মেয়েকে নিয়ে সেখানে গিয়েছিল।
অনুষ্ঠান শেষে স্কুলের সামনে বের হতেই জায়ানকে দেখতে পেল।
সে স্কুলের একটি কাজে এসেছিল।
মায়া তাকে দেখেই ছুটে গেল।
—জায়ান আঙ্কেল!
জায়ান হাসল।
—এই যে মায়া! কেমন আছ?
—ভালো।
—স্কুল কেমন লাগছে?
—ভালো। কিন্তু আজকে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়েছে।
জায়ান হেসে বলল,
—তাহলে ক্লান্ত?
—হুম।
জায়ান তার ব্যাগটা নিয়ে নিল।
—চলো, আমি ধরে দিচ্ছি।
নীরা বলল,
—না, দরকার নেই।
—সমস্যা নেই।
মায়া খুশি হয়ে বলল,
—আঙ্কেল আমার ব্যাগটা নিয়ে যাচ্ছে!
নীরা মেয়ের মুখের আনন্দ দেখে কিছু বলল না।
তিনজন কিছুক্ষণ পাশাপাশি হাঁটল।
জায়ান মায়ার পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করল।
মায়া খুব আগ্রহ নিয়ে উত্তর দিতে লাগল।
একসময় মায়া বলল,
—আঙ্কেল, তুমি কি আমাকে অঙ্ক শেখাবে?
জায়ান হেসে বলল,
—অবশ্যই।
নীরা অবাক হয়ে তাকাল।
—ওকে এত প্রশ্রয় দিও না।
জায়ান বলল,
—প্রশ্রয় না। পড়াশোনায় সাহায্য করব।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আম্মু, আমি আঙ্কেলের কাছে পড়ব।
নীরা প্রথমবারের মতো মন থেকে হাসল।
—ঠিক আছে।
সেদিনের পর থেকে মাঝে মাঝে জায়ানের সঙ্গে মায়ার দেখা হতে লাগল।
কখনো স্কুলের সামনে, কখনো কোনো দোকানে, আবার কখনো নীরা মেয়েকে নিয়ে বাইরে বের হলে।
জায়ান মায়াকে খুব স্নেহ করত।
মায়াও ধীরে ধীরে জায়ানের সঙ্গে খুব সহজ হয়ে গেল।
একদিন মায়া জায়ানকে বলল,
—আঙ্কেল, তুমি আমার আব্বুর মতো না।
জায়ান একটু থেমে গেল।
—কেন?
মায়া বলল,
—আব্বু আমাকে সবসময় বকে। তুমি আমার সঙ্গে ভালো করে কথা বলো।
জায়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে মায়ার মাথায় হাত রেখে বলল,
—সব বাবা একই রকম হয় না। তবে তোমার বাবা তোমাকে ভালোবাসেন, শুধু হয়তো রাগ বেশি করেন।
মায়া মাথা নাড়ল।
—কিন্তু আম্মুকেও বকে।
জায়ান এবার চুপ করে গেল।
নীরা পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
তার চোখে পানি এসে গেল।
জায়ান বিষয়টা বুঝতে পেরে বলল,
—মায়া, এসব কথা এখন ভাববে না। তুমি শুধু ভালো করে পড়াশোনা করবে।
মায়া মাথা নাড়ল।
এইভাবে ধীরে ধীরে পুরোনো অভিমান কিছুটা কমতে লাগল।
জায়ান আর নীরা আবার বন্ধুর মতো কথা বলতে শুরু করল।
তাদের মধ্যে আগের মতো কোনো দাবি ছিল না।
শুধু একটা গভীর সম্মান আর পুরোনো পরিচয়ের টান ছিল।
কিন্তু তাদের এই দেখা-সাক্ষাৎ কারও চোখ এড়াচ্ছিল না।
নীরার স্বামী দূর থেকে কয়েকবার জায়ানকে দেখেছিল।
সে লক্ষ্য করেছিল, মায়া জায়ানকে খুব পছন্দ করে।
আর নীরাও জায়ানের সঙ্গে কথা বললে অন্যরকম শান্ত থাকে।
তার সন্দেহ ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।
একদিন স্কুলের সামনে নীরা মায়ার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল।
জায়ানও সেখানে এসে দাঁড়াল।
মায়া আনন্দে জায়ানের সঙ্গে কথা বলছিল।
হঠাৎ দূর থেকে একটি গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নীরার স্বামী নামল।
তার চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ল জায়ানের ওপর।
তার মুখ মুহূর্তেই রাগে কঠিন হয়ে গেল।
সে দ্রুত তাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
নীরা তাকে দেখে থমকে গেল।
জায়ানও বুঝতে পারল, পরিস্থিতি ভালো নয়।
মায়া কিছুই বুঝতে না পেরে হাসতে হাসতে বলল,
—আব্বু এসেছে!
কিন্তু নীরার স্বামীর চোখে তখন শুধু রাগ।
নীরার স্বামী দ্রুত তাদের সামনে এসে দাঁড়াল।
তার চোখেমুখে প্রচণ্ড রাগ।
—এখানে কী হচ্ছে?
নীরা শান্তভাবে বলল,
—মায়াকে স্কুল থেকে নিতে এসেছিলাম। জায়ানের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল।
লোকটি জায়ানের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
—আপনি?
জায়ান শান্তভাবে উত্তর দিল,
—আমি জায়ান। নীরার বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বন্ধু।
—বন্ধু?
লোকটি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে শব্দটা বলল।
জায়ান আর কিছু বলল না।
মায়া তখন বাবার হাত ধরতে চাইছিল। কিন্তু তার বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়েও হাসল না।
বরং বলল,
—চলো।
মায়া একটু ভয় পেয়ে নীরার দিকে তাকাল।
—আম্মু, আমি তোমার সঙ্গে যাব।
—না। বাবার সঙ্গে যাও।
মায়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবার সঙ্গে গাড়িতে উঠল।
নীরা পেছনে দাঁড়িয়ে রইল।
জায়ান ধীরে বলল,
—তুমি ঠিক আছ?
নীরা মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
কিন্তু তার চোখে ভয় স্পষ্ট ছিল।
জায়ান বলল,
—কিছু হলে আমাকে জানাবে।
নীরা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—ঠিক আছে।
তারপর সে বাড়ির দিকে চলে গেল।
সেদিন রাতে নীরার স্বামী বাড়ি ফিরে প্রচণ্ড রাগ দেখাল।
—তোমার ওই পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে এত কী কথা?
নীরা শান্তভাবে বলল,
—কিছু না। স্কুলের সামনে দেখা হয়েছিল।
—আমি কিন্তু তোমাকে আগেও বলেছি, ওর সঙ্গে বেশি মিশবে না।
—সে শুধু মায়াকে সাহায্য করেছে।
—মায়াকে সাহায্য করার জন্য কি প্রতিদিন দেখা করতে হবে?
নীরা চুপ করে গেল।
তার স্বামী আবার বলল,
—তুমি আমার স্ত্রী। তোমার কার সঙ্গে মিশবে, সেটা আমি ঠিক করব।
নীরা আর কোনো উত্তর দিল না।
কিছুদিন পরও পরিস্থিতি বদলাল না।
বরং নীরার স্বামীর রাগ আরও বাড়তে লাগল।
সে সামান্য বিষয়েও ঝগড়া করত। অনেক সময় বাইরে থেকে দেরি করে ফিরত। নীরাকে সংসারের সব দায়িত্ব একাই সামলাতে হতো।
মায়ার পড়াশোনা, স্কুল, খাবার, পোশাক—সবকিছুর দায়িত্ব নীরার।
মায়াও ধীরে ধীরে বাবাকে ভয় পেতে শুরু করেছিল।
একদিন রাতে মায়া পড়ার টেবিলে বসে ছিল।
অঙ্কের খাতায় একটি ভুল হওয়ায় তার বাবা খাতা দেখে রেগে গেল।
—এত সহজ অঙ্কও পারো না?
মায়া ভয় পেয়ে বলল,
—আমি আবার করব, আব্বু।
—সবসময় একই কথা!
নীরা দ্রুত মেয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
—ওকে একটু সময় দাও। ও চেষ্টা করছে।
লোকটি রেগে বলল,
—তুমিই ওকে মাথায় তুলেছ!
মায়া চুপ করে গেল।
নীরা মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নিল।
সেদিন রাতে মায়া মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—আম্মু, আমি কি খারাপ মেয়ে?
নীরার বুক কেঁপে উঠল।
—না মা। তুমি একদমই খারাপ নও।
—তাহলে আব্বু আমাকে সবসময় বকে কেন?
নীরা মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বলল,
—সবসময় কেউ যা বলে, সেটা সত্যি হয় না। তুমি মন দিয়ে পড়বে, ভালো মানুষ হবে। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মায়া মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
নীরা অনেকক্ষণ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
তার চোখে তখন পানি।
অন্যদিকে জায়ান নিজের জীবনে আরও এগিয়ে যাচ্ছিল।
তার চাকরিতে বড় দায়িত্ব এসেছে। নিজের যোগ্যতায় সে ভালো অবস্থানে পৌঁছে গেছে।
একদিন অফিস শেষে গাড়িতে বসে সে নীরার কথা ভাবছিল।
সে জানত, নীরার সংসার খুব সুখের নয়।
কিন্তু সে কখনো নীরার ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করতে চায়নি।
শুধু মায়ার কথা মনে পড়লে তার মনটা নরম হয়ে যেত।
মেয়েটাকে সে সত্যিই খুব ভালোবেসে ফেলেছিল।
একদিন মায়ার স্কুল থেকে নীরাকে ফোন করা হলো।
মায়ার কয়েকটি বই দরকার ছিল। নীরা অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকায় জায়ানের সাহায্য নিল।
জায়ান বইগুলো কিনে স্কুলে দিয়ে গেল।
মায়া তাকে দেখে খুব খুশি হলো।
—আঙ্কেল, তুমি আবার এসেছ!
—হ্যাঁ। তোমার বই নিয়ে এসেছি।
—তুমি খুব ভালো।
জায়ান হেসে বলল,
—বইগুলো ঠিকমতো পড়বে কিন্তু।
—পড়ব।
ঠিক তখন নীরা সেখানে এসে পৌঁছাল।
জায়ান বলল,
—বইগুলো দিয়ে দিলাম। এখন আমাকে যেতে হবে।
নীরা বলল,
—ধন্যবাদ।
—এতে ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই।
জায়ান চলে গেল।
নীরা মেয়ের হাত ধরে স্কুল থেকে বের হচ্ছিল।
কিন্তু কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ি থেকে কেউ পুরো ঘটনাটা দেখছিল।
নীরার স্বামী।
সে কিছু বলল না।
শুধু গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় নীরা বাড়ি ফিরতেই তার স্বামী প্রশ্ন করল,
—আজও ওই লোকটার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
নীরা অবাক হলো।
—তুমি কীভাবে জানলে?
—আমি যা জানতে চাই, তা জানতে পারি।
নীরা চুপ করে গেল।
—সে কেন তোমার মেয়ের জন্য বই কিনে দেয়?
—মায়ার বই দরকার ছিল। সে সাহায্য করেছে।
—তোমার মেয়ের জন্য তোমার স্বামীর দরকার নেই?
নীরা এবার একটু কঠিন গলায় বলল,
—তুমি যদি দায়িত্ব নিতে, তাহলে অন্য কারও সাহায্য নিতে হতো না।
কথাটা শুনে লোকটি আরও রেগে গেল।
—আমাকে তুমি দায়িত্ব শেখাবে?
নীরা ভয় পেলেও এবার চুপ করল না।
—সারাদিন আমি সংসার সামলাই। মেয়ের স্কুল, পড়াশোনা, ডাক্তার, সবকিছু আমি করি। তুমি নিজের দায়িত্ব কতটা পালন করো, সেটা তুমি নিজেই জানো।
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নীরা দরজা বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
সে বুঝতে পারছিল, পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
কয়েকদিন পর মায়ার স্কুলে একটি অনুষ্ঠান ছিল।
নীরা মেয়েকে নিয়ে স্কুলে গেল।
সেখানে আবার জায়ানের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
মায়া দৌড়ে গিয়ে জায়ানের হাত ধরল।
—আঙ্কেল, আজ তুমি আমার অনুষ্ঠান দেখবে?
—অবশ্যই।
মায়া খুশিতে হেসে উঠল।
নীরাও দূর থেকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কিন্তু সেই মুহূর্তেই স্কুলের গেটের সামনে একটি গাড়ি এসে থামল।
নীরার স্বামী গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি তাদের দিকে এগিয়ে এল।
তার মুখ দেখে আশেপাশের কয়েকজন শিক্ষকও থেমে গেলেন।
সে নীরার সামনে এসে বলল,
—তুমি এখানে কী করছ?
নীরা বলল,
—মায়ার অনুষ্ঠান ছিল।
লোকটি জায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আর উনি?
জায়ান শান্তভাবে বলল,
—আমি শুধু মায়ার অনুষ্ঠান দেখতে এসেছি।
—আপনার এত দরকার কেন?
জায়ান কোনো উত্তর দিল না।
নীরা এবার বলল,
—তুমি এখানে এসে এসব করো না। মায়ার অনুষ্ঠান চলছে।
লোকটি নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি আমাকে আদেশ দিচ্ছ?
—আমি শুধু বলছি, মেয়ের সামনে ঝগড়া করো না।
মায়া ভয় পেয়ে মায়ের হাত ধরল।
স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক এবং অভিভাবক তখন তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
নীরার স্বামী রাগ সামলাতে না পেরে উচ্চস্বরে বলতে শুরু করল,
—তুমি সারাদিন কী করো আমি জানি! আমার মেয়েকে নিয়ে এখানে এসে ওই লোকটার সঙ্গে ঘোরাঘুরি করো!
নীরা অপমানিত হলেও চুপ করে ছিল।
জায়ান এতক্ষণ নিজেকে সামলে রেখেছিল।
সে শুধু বলল,
—দয়া করে স্কুলের পরিবেশটা নষ্ট করবেন না।
লোকটি এবার জায়ানের দিকে এগিয়ে গেল।
—আপনি আমাকে শেখাবেন কী করতে হবে?
জায়ান শান্ত গলায় বলল,
—আমি ঝগড়া করতে চাই না।
নীরা বুঝতে পারছিল, পরিস্থিতি ভয়ংকর দিকে যাচ্ছে।
সে স্বামীকে বলল,
—চলো, বাড়ি যাই। এখানে এসব কোরো না।
লোকটি নীরার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
—চলো।
মায়া ভয় পেয়ে বলল,
—আম্মু!
জায়ানের চোখে এবার কঠোরতা নেমে এলো।
সে এগিয়ে এসে বলল,
—ওর হাত ছাড়ুন।
নীরার স্বামী রাগে তাকাল।
—আপনি আমার স্ত্রীকে নিয়ে কথা বলার কে?
জায়ান দৃঢ় গলায় বলল,
—আমি কেউ না। কিন্তু কাউকে জোর করে ধরে রাখার অধিকারও কারও নেই।
চারপাশে সবাই নিস্তব্ধ।
নীরা কাঁপা গলায় বলল,
—জায়ান, তুমি থাকো। আমি সামলে নেব।
জায়ান তার দিকে তাকাল।
তার মনে হলো, এত বছর আগে যে মানুষটার ভালো থাকার জন্য সে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল, সেই মানুষটাই আজ নিজের জীবনে এত কষ্ট সহ্য করছে।
স্কুলের সামনে তখন অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে।
নীরার স্বামী রাগে নীরার হাত ধরে রেখেছিল। নীরা বারবার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল।
—হাতটা ছাড়ো। এখানে সবাই আছে।
লোকটি আরও রেগে বলল,
—সবাই থাকলেই কী? তুমি আমাকে অপমান করবে?
নীরা এবার শক্ত গলায় বলল,
—আমি তোমাকে অপমান করিনি। শুধু বলেছি মেয়ের সামনে ঝগড়া কোরো না।
মায়া মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে শুরু করল।
—আম্মু...
জায়ানের চোখে তখন রাগ স্পষ্ট।
সে এগিয়ে এসে বলল,
—আপনি ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলবেন না।
নীরার স্বামী ঘুরে জায়ানের দিকে তাকাল।
—আপনি আবার মাঝখানে আসছেন কেন?
—কারণ আপনার আচরণ ঠিক নয়।
—আপনি কি জানেন, ও আমার স্ত্রী?
—জানি। কিন্তু স্ত্রী বলে তাকে অপমান করার অধিকার কেউ পায় না।
লোকটি রাগে নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—সব তোমার জন্য হচ্ছে।
নীরা কাঁপা গলায় বলল,
—তুমি সবসময় আমাকে দোষ দাও। নিজের কাজের দিকে কখনো তাকাও না।
কথাটা শুনে লোকটি হঠাৎ নীরাকে চড় মারল।
চারপাশের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
মায়া চিৎকার করে উঠল,
—আম্মু!
নীরা কয়েক মুহূর্ত কথা বলতে পারল না।
তার চোখে পানি চলে এলো।
জায়ান আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে এগিয়ে গিয়ে নীরার স্বামীকে এক চড় মারল।
—আর একবার নীরার গায়ে হাত তুলবেন না।
লোকটি রাগে জায়ানের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলে জায়ান তাকে থামিয়ে দিল।
—আমি ঝগড়া করতে চাই না। কিন্তু অন্যায়ও সহ্য করব না।
স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক দ্রুত তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন।
একজন শিক্ষক বললেন,
—এটা স্কুলের জায়গা। দয়া করে এখান থেকে চলে যান।
নীরার স্বামী রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
—এই বিষয় এখানেই শেষ হয়নি।
জায়ান শান্ত গলায় বলল,
—আপনার সঙ্গে পরে কথা হবে।
লোকটি নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি আমার সঙ্গে বাড়ি যাবে।
নীরা এবার প্রথমবারের মতো দৃঢ়ভাবে বলল,
—আমি এখন তোমার সঙ্গে কোথাও যাব না।
মায়া মায়ের হাত শক্ত করে ধরে ছিল।
জায়ান নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি আমার সঙ্গে চলো।
নীরা অবাক হয়ে তাকাল।
—কোথায়?
—আমার বাড়িতে।
নীরা দ্বিধায় পড়ে গেল।
—না, এটা ঠিক হবে না।
জায়ান শান্তভাবে বলল,
—এই মুহূর্তে তোমার এবং মায়ার নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তুমি এখানে থাকলে আবার সমস্যা হবে।
নীরা কিছু বলতে পারছিল না।
জায়ান আবার বলল,
—তোমার স্বামীকে আমি বলছি, আপনি এখন শান্ত হন। নীরার সঙ্গে পরে প্রয়োজনীয় কথা হবে।
তারপর সে নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—চলো।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আম্মু, আমরা আঙ্কেলের সঙ্গে যাব?
নীরা মেয়ের ভীত মুখের দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
তারা জায়ানের গাড়িতে উঠল।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—কাঁদছ কেন?
—জানি না।
—অনেকদিন ধরে তুমি এসব সহ্য করছ?
নীরা কোনো উত্তর দিল না।
জায়ান বুঝে গেল।
কিছুক্ষণ পর নীরা বলল,
—আমি ভেবেছিলাম সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে।
—সবসময় সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয় না।
নীরা চুপ করে রইল।
জায়ান বলল,
—তুমি ভয় পেয়ো না। যতদিন পরিস্থিতি ঠিক না হচ্ছে, তুমি আমার বাড়িতে থাকতে পারো।
নীরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না জায়ান। মানুষ কী বলবে?
—মানুষ কী বলবে সেটা পরে ভাববে। আগে তুমি আর মায়া নিরাপদে থাকো।
মায়া পেছনের সিট থেকে বলল,
—আম্মু, আঙ্কেলের বাড়ি কি অনেক সুন্দর?
জায়ান হেসে বলল,
—তুমি গিয়ে নিজেই দেখবে।
মায়া একটু হাসল।
অনেকদিন পর নীরার মুখেও সামান্য হাসি ফুটল।
কিছুক্ষণ পর তারা জায়ানের বাড়িতে পৌঁছাল।
বাড়িটা বড় হলেও খুব শান্ত।
সেখানে জায়ান আর তার মা থাকেন।
জায়ানের মা দরজা খুলে তাদের দেখে অবাক হয়ে গেলেন।
—জায়ান? এরা কারা?
জায়ান বলল,
—মা, এটা নীরা। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। আর ওর মেয়ে মায়া।
জায়ানের মা নীরার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারলেন।
তারপর মায়ার কাছে গিয়ে বললেন,
—এসো মা।
মায়া একটু লজ্জা পেয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
নীরা বলল,
—যাও।
মায়া এগিয়ে গেল।
জায়ানের মা তাকে কোলে তুলে নিলেন।
—কী সুন্দর মেয়ে! তোমার নাম কী?
—মায়া।
—বাহ! খুব সুন্দর নাম।
মায়া একটু হেসে ফেলল।
জায়ানের মা নীরার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তুমি ভয় পেয়ো না মা। নিজের বাড়ির মতো থেকো।
নীরার চোখ আবার ভিজে উঠল।
—খালা, আপনাকে অনেক কষ্ট দিচ্ছি।
—কী যে বলো! তুমি কষ্ট দিচ্ছ কেন? তুমি তো আমার ছেলের বন্ধু। তোমার কষ্ট হলে আমি কি পাশে দাঁড়াব না?
নীরা কিছু বলতে পারল না।
সেদিন রাতে নীরা ও মায়ার জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করা হলো।
মায়া ঘুমানোর আগে জায়ানকে বলল,
—আঙ্কেল, তুমি আজ আমাকে বাঁচিয়েছিলে। আবার আজ আমাদেরও নিয়ে এলে।
জায়ান তার মাথায় হাত রেখে বলল,
—তুমি ভয় পেয়ো না। এখন তুমি নিরাপদে আছ।
—তুমি কি আমাদের সঙ্গে থাকবে?
—হ্যাঁ।
মায়া হাসল।
—তাহলে আমি ভয় পাব না।
জায়ান মৃদু হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নীরা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
জায়ান বাইরে আসতেই নীরা বলল,
—তুমি মায়াকে এত ভালোবাসো কেন?
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—জানি না। হয়তো ওর মধ্যে তোমাকে দেখি।
নীরা থমকে গেল।
জায়ান সঙ্গে সঙ্গে কথাটা বদলে বলল,
—মানে, ও খুব ভালো মেয়ে। তাই।
নীরা আর কিছু বলল না।
কিছুদিন নীরা আর মায়া জায়ানের বাড়িতেই থাকল।
জায়ানের মা নীরাকে মেয়ের মতো ভালোবাসতে লাগলেন।
মায়ার জন্য খাবার তৈরি করতেন, স্কুলের কথা জিজ্ঞেস করতেন।
জায়ানও প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে মায়ার পড়াশোনা দেখত।
একদিন মায়া খাতা নিয়ে জায়ানের কাছে এসে বলল,
—আঙ্কেল, এই অঙ্কটা পারছি না।
জায়ান পাশে বসে বলল,
—চলো, একসঙ্গে করি।
নীরা দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিল।
জায়ান খুব যত্ন করে মেয়েটাকে পড়াচ্ছে।
মায়া মাঝে মাঝে ভুল করলে হাসতে হাসতে আবার বুঝিয়ে দিচ্ছে।
নীরার মনে অদ্ভুত শান্তি তৈরি হলো।
অনেক বছর আগে ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে বসে জায়ান যেমন তাকে পড়াত, আজ ঠিক তেমনই তার মেয়েকে পড়াচ্ছে।
শুধু সময়টা বদলে গেছে।
একদিন মায়া নীরাকে বলল,
—আম্মু, জায়ান আঙ্কেল খুব ভালো।
নীরা মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—আমার আব্বুর মতো না।
নীরা চুপ করে গেল।
মায়া আবার বলল,
—আব্বু আমাকে শুধু বকে। আঙ্কেল আমাকে বকে না।
নীরা মেয়েকে বুকে টেনে নিল।
—সবসময় মানুষের সঙ্গে তুলনা করতে হয় না মা।
মায়া বলল,
—কিন্তু আঙ্কেল আমাকে তোমার মতো ভালোবাসে।
নীরার চোখ ভিজে উঠল।
সেদিন রাতে জায়ান নিজের ঘরে বসে ছিল।
তার মা এসে বললেন,
—তুই নীরাকে এখনো ভালোবাসিস?
জায়ান চমকে মায়ের দিকে তাকাল।
—মা...
—মায়ের কাছ থেকে কিছু লুকাতে হয় না।
জায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—আমি জানি না মা। এত বছর পর ওকে দেখে মনে হয়েছে, অনুভূতিটা হয়তো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
তার মা বললেন,
—কিন্তু নীরা এখন অন্যের স্ত্রী।
—জানি।
—তাহলে?
—তাই আমি কিছু চাই না। শুধু চাই ও আর মায়া ভালো থাকুক।
মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তুই ছোটবেলা থেকেই অন্যের কথা আগে ভাবিস।
জায়ান মৃদু হাসল।
কিন্তু সুখের এই ছোট্ট সময় বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
একদিন দুপুরে নীরা বাজারে গিয়েছিল।
মায়া তখন জায়ানের মায়ের সঙ্গে ছিল।
হঠাৎ বাড়ির সামনে একটি গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নীরার স্বামী নেমে এল।
তার মুখে প্রচণ্ড রাগ।
দরজা খুলেই সে বলল,
—আমার মেয়ে কোথায়?
জায়ানের মা ভয় পেয়ে গেলেন।
মায়া দৌড়ে এসে দরজার কাছে দাঁড়াল।
তার বাবাকে দেখে সে পিছিয়ে গেল।
—আব্বু...
লোকটি মেয়ের হাত ধরে বলল,
—চলো।
মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আমি আম্মুর কাছে যাব।
—তোমার আম্মু পরে আসবে।
—না, আমি যাব না।
লোকটি জোর করে মেয়েকে গাড়িতে তুলে নিল।
জায়ান তখনও অফিসে ছিল।
নীরা বাজার থেকে ফিরে এসে মেয়েকে না দেখে আতঙ্কিত হয়ে গেল।
—মায়া কোথায়?
জায়ানের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
—ওর বাবা এসে জোর করে নিয়ে গেছে।
নীরা যেন পাথর হয়ে গেল।
তারপর কাঁপা হাতে মেয়ের ফোনে কল করল।
কয়েকবার কল যাওয়ার পর মায়া ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ।
—আম্মু...
নীরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—মা, কোথায় তুমি?
—আব্বুর সঙ্গে।
—তুমি ঠিক আছ?
—না আম্মু। আব্বু আমাকে বকছে। আমি তোমার কাছে আসতে চাই।
নীরা চোখের পানি মুছে বলল,
—ভয় পেয়ো না মা। আমি তোমাকে নিয়ে আসব।
ফোন কেটে যাওয়ার পর নীরা ভেঙে পড়ল।
ঠিক তখন জায়ান বাড়িতে ফিরল।
নীরার কান্না দেখে সে ছুটে এসে বলল,
—কী হয়েছে?
নীরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—মায়াকে ও নিয়ে গেছে।
জায়ানের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল,
—নীরা, এবার তোমাকে নিজের মেয়ের জন্য লড়তে হবে।
নীরা ভয়ে তাকাল।
—আমি কীভাবে?
জায়ান দৃঢ় গলায় বলল,
—আইনের সাহায্য নাও। আমি তোমাকে সবভাবে সাহায্য করব।
নীরা কাঁপা গলায় বলল,
—যদি আমি না পারি?
জায়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি পারবে। কারণ এবার শুধু তোমার জন্য নয়, তোমার মেয়ের জন্য লড়াই।
নীরা চোখ মুছে মাথা নাড়ল।
আর সেই মুহূর্তেই তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই শুরু হলো।
মায়াকে তার বাবা নিয়ে যাওয়ার পর নীরা যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল।
সারাক্ষণ মেয়েটার কথাই মনে পড়ছিল।
মায়া কি খেয়েছে?
ঠিকমতো ঘুমিয়েছে?
তার বাবা আবার তাকে বকছে কি না?
নীরা বারবার মেয়ের ফোনে কল করছিল। কখনো মায়া ফোন ধরছিল, কখনো ধরতে পারছিল না।
এক রাতে অবশেষে মায়া ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে খুব নিচু গলায় বলল,
—আম্মু...
নীরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—মা, তুমি কেমন আছ?
—আমি ভালো নেই।
নীরার চোখে পানি চলে এলো।
—কী হয়েছে?
—আব্বু আমাকে সবসময় বকে। আমি কোনো কিছু করলেই বলে আমি কিছু পারি না।
—তুমি ভয় পেয়ো না। আমি তোমাকে নিয়ে আসব।
—কবে?
নীরা কিছু বলতে পারল না।
—খুব তাড়াতাড়ি, মা।
মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আম্মু, তুমি আমাকে নিতে এসো। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না।
নীরা চোখের পানি মুছে বলল,
—আমি আসব। তুমি শুধু সাহস রাখো।
ফোন কেটে যাওয়ার পর নীরা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল।
জায়ান কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
সে কাছে এসে বলল,
—তুমি ভয় পেয়ো না।
নীরা বলল,
—আমি আমার মেয়েকে হারাতে চাই না।
—তুমি হারাবে না।
—যদি আদালত আমার কথা বিশ্বাস না করে?
—তাহলে আমরা সত্যিটা প্রমাণ করব।
নীরা অবাক হয়ে তাকাল।
—তুমি আমার জন্য এত কিছু কেন করছ?
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—কারণ তুমি আমার পুরোনো বন্ধু। আর মায়া আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
নীরা চোখ নামিয়ে ফেলল।
জায়ান বলল,
—তুমি আইনি সাহায্য নাও। আমি তোমার পাশে থাকব।
নীরা ধীরে মাথা নাড়ল।
পরদিন জায়ান একজন আইনজীবীর সঙ্গে নীরার কথা বলিয়ে দিল।
নীরা সব ঘটনা খুলে বলল।
তার স্বামীর আচরণ, মেয়ের প্রতি তার ব্যবহার, সংসারে প্রতিদিনের অশান্তি—সবকিছু জানাল।
আইনজীবী বললেন,
—আপনি ভয় পাবেন না। সন্তানের নিরাপত্তা ও ভালো থাকার বিষয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নীরা কিছুটা সাহস পেল।
কয়েকদিন পর আদালতে বিষয়টি উঠল।
নীরা খুব নার্ভাস ছিল।
জায়ান তাকে বলল,
—সত্যি কথা বলবে। ভয় পাবে না।
নীরা মাথা নাড়ল।
তারপর মায়াকেও আদালতে আনা হলো।
ছোট্ট মেয়েটা চারপাশে তাকিয়ে ভয় পাচ্ছিল।
নীরা দূর থেকে মেয়ের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ধরে রাখার চেষ্টা করছিল।
বিচারক মায়ার সঙ্গে শান্তভাবে কথা বললেন।
—তুমি কার সঙ্গে থাকতে চাও?
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি আমার আম্মুর সঙ্গে থাকতে চাই।
নীরার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
বিচারক আবার জিজ্ঞেস করলেন,
—কেন?
মায়া নিচু গলায় বলল,
—আম্মু আমাকে খুব ভালোবাসে। আমি অসুস্থ হলে আম্মু পাশে থাকে। আমি ভয় পেলে আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে।
কিছুক্ষণ থেমে সে বলল,
—আমার আব্বু আমাকে সবসময় বকে। আর আম্মুকেও অনেক সময় বকা দেয়। আমি আম্মুর সঙ্গে থাকলেই ভালো থাকি।
নীরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল।
জায়ানও চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
মায়ার কথা শুনে তার বুকটা ভার হয়ে গেল।
বিচারক কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর প্রয়োজনীয় কথা বললেন।
পরবর্তী শুনানির পর মায়ার দেখাশোনার দায়িত্ব নীরার কাছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
নীরা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।
—মা, আমি তোমাকে আর একা থাকতে দেব না।
মায়াও মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
—আম্মু, আমি তোমার কাছে থাকব তো?
—হ্যাঁ মা।
জায়ান একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
মায়া তাকে দেখে দৌড়ে গেল।
—জায়ান আঙ্কেল!
জায়ান নিচু হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
মায়া বলল,
—আমি এখন আম্মুর সঙ্গে থাকব।
জায়ান হাসল।
—এটাই তো তুমি চেয়েছিলে।
মায়া বলল,
—তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে?
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—যতটা পারি।
মায়া খুশি হয়ে বলল,
—তাহলে আমি খুব খুশি।
সময়ের সঙ্গে নীরার জীবন ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করল।
তবে তার স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি।
আইনি বিষয়গুলো চলতে থাকল।
নীরা নিজের এবং মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করল।
এই সময় নীরার বাবা একদিন মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে এলেন।
অনেক বছর পর মেয়ের জীবনে কী ঘটেছে, সব শুনে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন।
তিনি নীরার সামনে বসে বললেন,
—আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই।
নীরা অবাক হয়ে তাকাল।
—কেন বাবা?
—অনেক বছর আগে আমি তোমাকে জায়ানের কাছ থেকে দূরে থাকতে বলেছিলাম।
নীরা চুপ করে রইল।
তার বাবা বললেন,
—আমি ভেবেছিলাম তোমার ভালো হবে। আমি ভেবেছিলাম বড় পরিবার, টাকা-পয়সা—এসব তোমাকে সুখী করবে।
তার কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল।
—কিন্তু আমি বুঝিনি, মানুষের ভালো থাকা শুধু টাকা দিয়ে হয় না।
নীরার চোখে পানি এলো।
—বাবা, অতীতের কথা এখন থাক।
—না মা। আমার ভুল স্বীকার করতেই হবে।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—জায়ানকে আমি তখন ভুল বুঝেছিলাম। ছেলেটা তোমাকে সত্যিই সম্মান করত।
নীরা মাথা নিচু করল।
তার বাবাও বুঝতে পারলেন, মেয়ের মনে সেই পুরোনো মানুষটির জায়গা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
কিন্তু তিনি আর কিছু বললেন না।
এদিকে জায়ানের মা নীরা ও মায়াকে নিজের বাড়ির মানুষের মতো করে নিয়েছেন।
মায়া এখন স্কুল থেকে ফিরে প্রথমেই জায়ানের মাকে গিয়ে বলত,
—খালা, আজ স্কুলে কী হয়েছে জানো?
জায়ানের মা হাসতে হাসতে সব শুনতেন।
আর জায়ান অফিস থেকে ফিরলেই মায়া ছুটে যেত।
—আঙ্কেল!
—কী হলো?
—আজ আমি পরীক্ষায় ভালো করেছি।
—কত পেয়েছ?
—নব্বই!
জায়ান খুশি হয়ে বলত,
—বাহ! তাহলে তো আজ তোমাকে পুরস্কার দিতে হবে।
মায়া হাসত।
নীরা দূর থেকে তাদের দেখত।
তার মনে অদ্ভুত এক শান্তি তৈরি হতো।
একদিন রাতে মায়া জায়ানের পাশে বসে বলল,
—আঙ্কেল, তুমি জানো? আমার আব্বু আমাকে কখনো এভাবে ভালোবাসেনি।
জায়ান মৃদু গলায় বলল,
—তোমার বাবা তোমাকে ভালোবাসেন। শুধু তার ভালোবাসা প্রকাশ করার পদ্ধতি হয়তো ঠিক নয়।
মায়া মাথা নাড়ল।
—কিন্তু তুমি আমাকে বকো না।
জায়ান হেসে বলল,
—ভুল করলে বকব। তবে আগে বুঝিয়ে বলব।
মায়া হেসে তার কাঁধে মাথা রাখল।
নীরা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল।
তার চোখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
কিছুদিন পর নীরার স্বামী আবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করল।
সে নীরাকে বলল,
—তুমি আমার সঙ্গে ফিরে আসো। সব ঠিক হয়ে যাবে।
নীরা শান্তভাবে বলল,
—অনেকবার এই কথা শুনেছি। কিন্তু কিছুই ঠিক হয়নি।
—আমি বদলে যাব।
—বদলানোর সুযোগ তোমাকে অনেকবার দিয়েছি।
—তাহলে তুমি কি ওই জায়ানের সঙ্গে থাকতে চাও?
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আমি এখন শুধু আমার মেয়ের শান্তি চাই।
ফোন কেটে দিল সে।
জায়ান দূর থেকে সব দেখেছিল।
সে নীরার কাছে এসে বলল,
—তুমি ঠিক আছ?
—হ্যাঁ।
—তুমি চাইলে আমি তোমার পাশে আছি।
নীরা তার দিকে তাকাল।
—জায়ান, তুমি কেন এখনো আমার পাশে আছ?
জায়ান মৃদু হেসে বলল,
—কারণ কিছু মানুষকে জীবনে একবার হারানোর পর আবার হারাতে ইচ্ছে করে না।
নীরার চোখ ভিজে উঠল।
সে কিছু বলল না।
জায়ানও আর কিছু বলল না।
কিন্তু দুজনের মাঝের নীরবতাটা অনেক কথা বলে গেল।
এরপর থেকে তাদের সম্পর্ক আবার ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।
তারা পুরোনো দিনের মতো কথা বলতে লাগল।
কখনো একসঙ্গে চা খায়, কখনো মায়াকে নিয়ে বাইরে যায়।
তবে এবার তাদের সম্পর্কের মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না।
ছিল শুধু বিশ্বাস।
একদিন বিকেলে নীরার বাবা জায়ানের সঙ্গে দেখা করতে এলেন।
জায়ান তাকে দেখে সম্মান করে দাঁড়াল।
—স্যার, আপনি?
নীরার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—তোমার কাছে আমার ক্ষমা চাওয়ার আছে।
জায়ান অবাক হয়ে বলল,
—আপনি এমন বলছেন কেন?
—কারণ অনেক বছর আগে আমি তোমাকে নীরার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম।
জায়ান মাথা নিচু করল।
—আপনি তখন নীরার ভালো চেয়েছিলেন।
—কিন্তু আমি ভুল করেছিলাম।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—আজ বুঝতে পারছি, নীরার জন্য তোমার মতো একজন মানুষই দরকার ছিল।
জায়ান কিছু বলল না।
নীরার বাবা এবার বললেন,
—তুমি কি এখনো নীরাকে ভালোবাসো?
জায়ান কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
—ভালোবাসি। কিন্তু ওর সিদ্ধান্তই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নীরার বাবা মাথা নেড়ে বললেন,
—তাহলে এবার সিদ্ধান্তটা নীরা নেবে।
সেদিন রাতে নীরার বাবা মেয়েকে সব বললেন।
নীরা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল—
জায়ান কি সত্যিই তার জীবনে আবার ফিরে এসেছে?
আর এবার কি সে নিজের মনের কথা বলার সাহস করবে?
উত্তরটা তখনও সে জানত না।
নীরার বাবা চলে যাওয়ার পর নীরা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তার মাথায় শুধু বাবার কথাগুলো ঘুরছিল।
“এবার সিদ্ধান্তটা নীরা নেবে।”
এত বছর পর নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে সে।
কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না।
একদিকে তার অতীত, অন্যদিকে জায়ান।
জায়ানকে সে কখনো ভুলতে পারেনি। যতই নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করুক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলো তার মনে সবসময় থেকে গেছে।
পরদিন সকালে নীরা রান্নাঘরে ছিল।
মায়া দৌড়ে এসে বলল,
—আম্মু, আজ আমাকে স্কুলে কে নিয়ে যাবে?
—আমি।
—জায়ান আঙ্কেল যাবে না?
নীরা হেসে বলল,
—না, আজ আঙ্কেলের অফিস আছে।
মায়া একটু মন খারাপ করে বলল,
—ও থাকলে ভালো হতো।
নীরা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
—তুমি আঙ্কেলকে খুব পছন্দ করো?
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—হ্যাঁ। উনি আমাকে কখনো ভয় দেখান না।
নীরা মৃদু হাসল।
—ঠিক আছে, এখন তৈরি হও।
স্কুলে যাওয়ার পথে মায়া হঠাৎ বলল,
—আম্মু, জায়ান আঙ্কেল কি আমাদের সঙ্গেই থাকবে সবসময়?
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—কেন জিজ্ঞেস করছ?
—কারণ উনি থাকলে আমার ভালো লাগে।
নীরা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—জানি না মা।
মায়া আবার বলল,
—তুমি চাইলে উনি থাকতে পারে না?
নীরা এবার কোনো উত্তর দিল না।
কিন্তু মেয়ের কথাটা তার মনে গেঁথে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় জায়ান অফিস থেকে বাড়ি ফিরলে মায়া দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
—আঙ্কেল!
—এই যে আমার ছোট্ট বন্ধু!
—আজ তুমি আমাকে স্কুলে নিতে যাওনি।
—আজ কাজ ছিল।
—কাল যাবে?
জায়ান হেসে বলল,
—চেষ্টা করব।
নীরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিল।
জায়ান মায়ার মাথায় হাত রেখে বলল,
—আজ পড়াশোনা হয়েছে?
—হ্যাঁ।
—আমাকে দেখাবে?
—চলো।
দুজন পড়ার ঘরে চলে গেল।
নীরা কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের ঘরে চলে গেল।
রাতে জায়ান বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
নীরা ধীরে ধীরে সেখানে এসে দাঁড়াল।
জায়ান তাকিয়ে বলল,
—কিছু বলবে?
—হ্যাঁ।
—বলো।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তুমি কি সত্যিই আমাকে এখনো ভালোবাসো?
জায়ান অবাক হয়ে গেল।
এত বছর পর নীরা নিজে তাকে এই প্রশ্ন করবে, সে কখনো ভাবেনি।
সে কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
—হ্যাঁ।
নীরার চোখে পানি এসে গেল।
জায়ান বলল,
—কিন্তু তোমার ওপর আমার কোনো দাবি নেই। তোমার জীবনে কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা তোমার ব্যাপার।
—তুমি কি আমাকে নিয়ে কখনো রাগ করেছিলে?
—অনেক।
—তাহলে আমাকে ছেড়ে চলে গেলে কেন?
জায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তোমার বাবার কথা শুনেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, তোমার ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে। আমি ভেবেছিলাম, আমি যদি তোমার কাছ থেকে দূরে থাকি, তাহলে তুমি ভালো থাকবে।
নীরা চোখ মুছে বলল,
—কিন্তু তুমি জানো না, তুমি দূরে যাওয়ার পর আমি কত কেঁদেছিলাম।
জায়ান চুপ করে রইল।
নীরা আবার বলল,
—আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না।
—আমি ইচ্ছে করেই তোমাকে সেটা বিশ্বাস করিয়েছিলাম।
—অন্য মেয়েদের সঙ্গে ঘুরতে?
জায়ান মাথা নিচু করল।
—হ্যাঁ।
নীরা কষ্টের হাসি হাসল।
—তুমি জানো, তখন আমার কত কষ্ট হয়েছিল?
—জানি না। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
তারপর নীরা বলল,
—আমি তোমাকে কখনো ঘৃণা করতে পারিনি।
জায়ান ধীরে তার দিকে তাকাল।
—নীরা...
—কিন্তু এখন আমি একা নই। আমার সঙ্গে মায়া আছে।
—আমি জানি।
—আমি চাই না আমার কোনো সিদ্ধান্তের কারণে মায়া কষ্ট পাক।
জায়ান দৃঢ়ভাবে বলল,
—মায়া আমার কাছে শুধু তোমার মেয়ে নয়। আমি ওকে নিজের সন্তানের মতো দেখি।
নীরা কিছু বলল না।
জায়ান আবার বলল,
—তোমার যদি মনে হয়, আমার সঙ্গে থাকলে তুমি আর মায়া নিরাপদ থাকবে, তাহলে আমি সারাজীবন তোমাদের পাশে থাকব।
নীরার চোখ ভিজে উঠল।
—তুমি কি সত্যিই মায়াকে এত ভালোবাসো?
জায়ান মৃদু হেসে বলল,
—ও আমাকে প্রথম দিন থেকেই আপন করে নিয়েছে। আমি কীভাবে ওকে দূরে রাখি?
ঠিক তখন মায়া ঘুম জড়ানো চোখে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
—আম্মু?
নীরা দ্রুত চোখ মুছে ফেলল।
—কী হয়েছে মা?
মায়া জায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আঙ্কেল, তুমি এখানে?
—হ্যাঁ।
—আমার একটা কথা আছে।
—বলো।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তুমি কি আমার সঙ্গে সবসময় থাকবে?
জায়ান একটু থেমে বলল,
—তুমি চাইলে থাকব।
মায়া হাসল।
—আমি চাই।
নীরা মেয়ের কথা শুনে আবেগে চোখ বন্ধ করল।
পরদিন নীরার বাবা আবার এলেন।
তিনি এবার সরাসরি বললেন,
—নীরা, আমি চাই তুমি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নাও।
নীরা বাবার দিকে তাকাল।
—আপনি কি জায়ানকে মেনে নিয়েছেন?
—হ্যাঁ।
—কেন?
—কারণ আমি বুঝেছি, মানুষের চরিত্র, দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসাই আসল। শুধু টাকা-পয়সা দিয়ে সুখ কেনা যায় না।
নীরা চুপ করে রইল।
তার বাবা বললেন,
—জায়ান তোমার সবচেয়ে কঠিন সময়ে তোমার পাশে দাঁড়িয়েছে। তোমার মেয়েকেও নিজের সন্তানের মতো দেখছে। এমন মানুষকে আমি আর হারাতে চাই না।
নীরার চোখে পানি এলো।
—বাবা...
—তুই যদি রাজি থাকিস, আমি নিজে গিয়ে জায়ানের মায়ের সঙ্গে কথা বলব।
নীরা মাথা নিচু করে মৃদু হেসে ফেলল।
—আমি রাজি।
কথাটা বলতে তার গলায় কাঁপন ছিল।
কিন্তু তার মনে অদ্ভুত শান্তি।
কয়েকদিনের মধ্যে দুই পরিবারের মধ্যে কথা হলো।
জায়ানের মা নীরাকে আগে থেকেই খুব পছন্দ করতেন।
তিনি নীরার হাত ধরে বললেন,
—তুমি আমার ঘরে অনেক আগেই মেয়ের জায়গা করে নিয়েছ। এবার যদি বউ হয়ে আসো, তাহলে আমার আনন্দ আরও বাড়বে।
নীরা লজ্জায় মাথা নিচু করল।
মায়া পাশ থেকে বলল,
—তাহলে জায়ান আঙ্কেল আমার সঙ্গে সবসময় থাকবে?
সবাই হেসে ফেলল।
জায়ানের মা বললেন,
—হ্যাঁ মা।
মায়া খুশিতে হাততালি দিল।
বিয়ের দিন ঠিক হলো।
তবে নীরার মনে তখনও একটা ভয় ছিল।
পুরোনো সম্পর্কের পর নতুন করে সংসার শুরু করা সহজ নয়।
সে একদিন জায়ানকে বলল,
—তুমি কি কখনো আমার অতীত নিয়ে প্রশ্ন করবে?
জায়ান বলল,
—না।
—আমার জীবনে যা হয়েছে, তা নিয়ে?
—তুমি যা পেছনে ফেলে এসেছ, সেটা নিয়ে আমি তোমাকে বিচার করব না।
নীরা শান্ত হয়ে গেল।
—আর মায়া?
—ও আমার জীবনের অংশ।
নীরা মৃদু হেসে বলল,
—তুমি বদলাওনি।
জায়ান বলল,
—তুমিও না।
বিয়ের আগের রাতে মায়া জায়ানের পাশে বসে ছিল।
হঠাৎ বলল,
—আঙ্কেল, কাল থেকে আমি তোমাকে কী বলে ডাকব?
জায়ান হেসে বলল,
—যা ইচ্ছে ডাকো।
মায়া কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—তাহলে... বাবা?
জায়ান থমকে গেল।
মায়া লজ্জা পেয়ে বলল,
—না, যদি তুমি না চাও।
জায়ান সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—আমি চাই।
মায়া খুশিতে হাসল।
—সত্যি?
—সত্যি।
নীরা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
তার চোখে তখন আনন্দের পানি।
সে মনে মনে ভাবল,
‘এত বছর পর আমার জীবন কি সত্যিই আবার পূর্ণ হতে চলেছে?’
পরদিন তাদের বিয়ের আয়োজন শুরু হলো।
নীরা সাজঘরে বসে ছিল।
জানালার বাইরে আলো ঝলমল করছিল।
তার বাবা এসে পাশে বসলেন।
—কেমন লাগছে?
নীরা মৃদু হেসে বলল,
—ভয়ও লাগছে, আবার ভালোও লাগছে।
বাবা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
—এবার তুই নিজের পছন্দের মানুষের সঙ্গে জীবন শুরু করছিস। এবার যেন কোনো ভুল না করি।
নীরা বাবার হাত ধরে বলল,
—আপনি আমার ভালো চেয়েছিলেন বাবা। ভুলটা শুধু সিদ্ধান্তে হয়েছিল।
বাবার চোখে পানি এসে গেল।
—আমাকে ক্ষমা করিস।
—আমি অনেক আগেই করেছি।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।
জায়ান নীরার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার চোখে সেই একই মায়া, যেটা নীরাকে প্রথম দেখার দিন ছিল।
শুধু এবার সেই অনুভূতিটা আর লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই।
নীরা ধীরে ধীরে জায়ানের পাশে এসে দাঁড়াল।
দুজনের চোখে চোখ পড়তেই জায়ান মৃদু হাসল।
নীরাও হাসল।
বহু বছরের ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব আর কষ্টের পর অবশেষে তারা আবার একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু তাদের নতুন জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটি এখনও বাকি ছিল।
বিয়ের পর কয়েকটা দিন যেন স্বপ্নের মতো কেটে গেল।
নীরা এখন জায়ানের বাড়িতেই থাকে। জায়ানের মা তাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসেন। আর মায়া তো একেবারেই বদলে গেছে।
আগে যে মেয়েটা সবসময় ভয় পেত, এখন সে সারাক্ষণ হাসে।
জায়ান অফিস থেকে ফিরলেই মায়া দৌড়ে যায়।
—বাবা!
জায়ান দরজা খুলেই মেয়েকে কোলে তুলে নেয়।
—কী খবর আমার মেয়ের?
—আজ আমি স্কুলে একটা গল্প বলেছি।
—সত্যি? সবাই শুনেছে?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আজ তোমার জন্য একটা পুরস্কার আছে।
মায়া খুশিতে বলল,
—কী?
—আগে বলো, আজ পড়াশোনা করেছ?
—করেছি।
—তাহলে পুরস্কার পাবে।
মায়া হেসে উঠল।
নীরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখত।
তার মনে হতো, এতদিন পর তার মেয়ের মুখে এমন হাসি দেখতে পাচ্ছে।
এক সন্ধ্যায় জায়ান অফিস থেকে ফিরতে একটু দেরি করল।
মায়া দরজার কাছে বসে অপেক্ষা করছিল।
নীরা বলল,
—মা, তুমি ভেতরে যাও। বাবা আসবে।
মায়া মাথা নাড়িয়ে বলল,
—না। বাবা আসলে আমি আগে দরজা খুলব।
কিছুক্ষণ পর গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
মায়া দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল।
—বাবা!
জায়ান হাসতে হাসতে বলল,
—এই যে! তুমি এখনো জেগে আছ?
—তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
জায়ান মেয়েকে কোলে তুলে নিল।
নীরা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
জায়ান মায়াকে কোলে নিয়েই নীরার দিকে তাকাল।
—তুমি এখনো ঘুমাওনি?
—মায়া অপেক্ষা করছিল।
জায়ান বলল,
—তাহলে তোমরা দুজনেই আমাকে খুব ভালোবাসো।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—হ্যাঁ!
নীরা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—এত কথা না বলে ভেতরে এসো।
জায়ান হেসে ভেতরে ঢুকল।
জীবন যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল।
তবে নীরার মনে মাঝে মাঝে অতীতের কথা ফিরে আসত।
সে ভাবত, যদি সেদিন জায়ান তার জীবন থেকে দূরে না সরে যেত, তাহলে কি তার জীবন অন্যরকম হতো?
কিন্তু এখন সে এসব ভেবে আর কষ্ট পেত না।
কারণ তার পাশে জায়ান আছে।
আর মায়া পেয়েছে এমন একজন মানুষ, যাকে সে নিজের বাবা বলে ডাকতে পারে।
একদিন সকালে নীরা রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল।
জায়ান মায়াকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করছিল।
—মায়া, তোমার চুলটা ঠিক করে দাও।
—বাবা, তুমি করে দাও।
—আমি?
—হ্যাঁ।
জায়ান চিরুনি হাতে নিয়ে মেয়ের চুল আঁচড়াতে শুরু করল।
মায়া আয়নার সামনে বসে হাসছিল।
—বাবা, আস্তে করো।
—আমি তো আস্তেই করছি।
—তবু টান লাগছে।
—তোমার চুল এত জট পাকানো কেন?
—কারণ তুমি আমাকে কাল চুল আঁচড়ে দাওনি।
—আজ থেকে প্রতিদিন আঁচড়ে দেব।
মায়া খুশি হয়ে বলল,
—সত্যি?
—সত্যি।
নীরা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গেল।
তার চোখের সামনে দৃশ্যটা দেখে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
জায়ান খুব যত্ন করে মায়ার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে।
মায়া আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
নীরার বুকটা আনন্দে ভরে গেল।
এমন দৃশ্য দেখার জন্যই হয়তো সে এত বছর অপেক্ষা করেছে।
জায়ান আয়নায় নীরাকে দেখে বলল,
—এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
নীরা হেসে বলল,
—কিছু না।
—কিছু না হলে হাসছ কেন?
—তোমাকে দেখে ভালো লাগছে।
জায়ান মৃদু হেসে বলল,
—আমাদের মেয়েকে চুল আঁচড়ে দিতে পারছি, এটা আমার জন্যও ভালো লাগার।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আম্মু, দেখেছ? বাবা এখন খুব ভালো চুল আঁচড়াতে পারে।
নীরা বলল,
—হ্যাঁ, দেখছি।
মায়া বলল,
—বাবা আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে?
জায়ান বলল,
—আজ আমি নিয়ে যাব।
মায়া আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
নীরা মেয়ের ব্যাগ গুছিয়ে দিল।
জায়ান মেয়ের হাত ধরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
হঠাৎ মায়া পেছনে তাকিয়ে বলল,
—আম্মু, তুমি আসবে না?
নীরা বলল,
—আজ তোমার বাবা নিয়ে যাবে।
মায়া একটু ভেবে বলল,
—তাহলে তোমরাও পরে আমাকে নিতে আসবে?
জায়ান হেসে বলল,
—আমরা দুজনেই আসব।
মায়া খুশি হয়ে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর নীরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে অজান্তেই পানি এসে গেল।
জায়ান সেটা দেখে কাছে এসে বলল,
—কাঁদছ কেন?
নীরা মাথা নাড়িয়ে বলল,
—খুশিতে।
জায়ান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—তাহলে হাসো।
নীরা হেসে ফেলল।
—আমি ভাবিনি আমার জীবন কখনো এমন হবে।
—আমিও ভাবিনি।
—তুমি কি কখনো আফসোস করো?
জায়ান একটু ভেবে বলল,
—কীসের?
—আমাদের এতগুলো বছর নষ্ট হয়ে গেল।
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—হয়তো কিছু বছর হারিয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমাকে পেয়েছি। তাই আফসোস নেই।
নীরা নিচু গলায় বলল,
—তুমি না থাকলে আমি হয়তো কখনো নিজের জন্য দাঁড়াতেই পারতাম না।
—তুমি নিজেই শক্ত ছিলে। শুধু নিজের শক্তিটা চিনতে সময় লেগেছে।
নীরা হেসে বলল,
—তুমি এখনো আগের মতোই কথা বলো।
—আর তুমি এখনো আগের মতোই বেশি প্রশ্ন করো।
দুজনেই হেসে ফেলল।
এভাবেই দিনগুলো চলতে লাগল।
জায়ান মায়ার পড়াশোনার খোঁজ নেয়, তাকে স্কুলে নিয়ে যায়, গল্প শোনায়।
নীরা সংসার সামলায়, মায়ার পড়াশোনায় সাহায্য করে।
জায়ানের মা নীরা ও মায়াকে নিয়ে সবসময় ব্যস্ত থাকেন।
বাড়িটা যেন আবার হাসিতে ভরে উঠেছে।
একদিন রাতে মায়া জায়ানের পাশে বসে বলল,
—বাবা, তুমি আমাকে একটা গল্প বলবে?
—কী গল্প?
—একটা ছেলে আর একটা মেয়ের গল্প।
জায়ান হেসে বলল,
—কেন?
—আম্মু বলেছে তুমি নাকি ছোটবেলায় খুব ভালো ছাত্র ছিলে।
নীরা পাশ থেকে বলল,
—আমি সেটা বলেছি?
মায়া বলল,
—হ্যাঁ।
জায়ান হেসে বলল,
—তাহলে গল্পটা তোমার আম্মুই বলবে।
মায়া নীরার কাছে গিয়ে বলল,
—আম্মু, তুমি বলো।
নীরা কিছুক্ষণ জায়ানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—একটা ছেলে ছিল। খুব ভালো ছাত্র। আর একটা মেয়ে ছিল, যে পড়াশোনায় একটু দুর্বল ছিল।
মায়া হেসে বলল,
—তারপর?
—ছেলেটা মেয়েটাকে পড়াশোনায় সাহায্য করত।
—তারপর?
নীরা থেমে গেল।
জায়ান বলল,
—তারপর তারা ভালো বন্ধু হয়ে গেল।
মায়া বলল,
—তারপর?
জায়ান নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তারপর অনেক বছর তারা আলাদা ছিল।
নীরা ধীরে বলল,
—কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবার একসঙ্গে হলো।
মায়া খুশি হয়ে বলল,
—গল্পটা খুব সুন্দর!
জায়ান মৃদু হেসে বলল,
—কারণ এটা আমাদের গল্প।
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
—সত্যি?
নীরা হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
মায়া দুজনকে জড়িয়ে ধরল।
—তাহলে আমি গল্পের শেষ অংশ।
জায়ান মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
—তুমি আমাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশ।
নীরা তাদের দুজনকে দেখে মৃদু হাসল।
তার মনে হলো, জীবনে কখনো কখনো মানুষ খুব কঠিন পথ পেরিয়ে এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে পুরোনো সব কষ্টের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।
তার অতীতের ভুল, বিচ্ছেদ, কান্না—সবকিছু যেন আজকের এই ছোট্ট সুখের কাছে হার মেনে গেছে।
কয়েকদিন পর নীরার বাবা তাদের বাড়িতে এলেন।
মায়া দৌড়ে গিয়ে বলল,
—নানা!
তিনি নাতনিকে কোলে তুলে নিলেন।
—কেমন আছিস?
—অনেক ভালো।
তারপর তিনি জায়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তোমার কাছে আমার মেয়েকে দেখে মনে হয়, আমি সত্যিই ভাগ্যবান যে তুমি ওর জীবনে আছ।
জায়ান সম্মান করে বলল,
—স্যার, নীরাকে ভালো রাখা আমার দায়িত্ব।
নীরার বাবা মৃদু হেসে বললেন,
—আজ থেকে আমাকে স্যার বলবে না। বাবা বলবে।
জায়ান একটু অবাক হয়ে তারপর হেসে বলল,
—ঠিক আছে, বাবা।
নীরার চোখে আনন্দের পানি চলে এলো।
সব ভুল বোঝাবুঝির যেন অবসান হয়েছে।
মায়া তখন সবাইকে নিয়ে বসে গল্প করছিল।
হঠাৎ সে বলল,
—বাবা, আমার চুল আবার আঁচড়ে দেবে?
জায়ান বলল,
—অবশ্যই।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে বসে গেল।
নীরা দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
জায়ান ধীরে ধীরে মেয়ের চুল আঁচড়ে দিচ্ছে।
মায়া আয়নায় নিজের মুখ দেখে হাসছে।
নীরা মনে মনে বলল,
‘এই দৃশ্যটাই তো আমি চেয়েছিলাম।’
একসময় যে মানুষটাকে হারানোর ভয়ে সে কেঁদেছিল, আজ সেই মানুষটিই তার পাশে।
আর তার ছোট্ট মেয়েটা সেই মানুষটাকে বাবা বলে ডাকছে।
নীরার জীবনের অপূর্ণ গল্প যেন অবশেষে পূর্ণ হয়ে গেছে।
বিয়ের পর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে।
জায়ান আর নীরার সংসার এখন শান্তিতে ভরা। মায়া স্কুল থেকে ফিরে কখনো জায়ানের সঙ্গে পড়তে বসে, কখনো তার মায়ের সঙ্গে গল্প করে। জায়ানের মা-ও নীরা আর মায়াকে নিয়ে খুব খুশি।
সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে মায়া।
আগে যে মেয়েটা সবসময় বাবার রাগের ভয়ে চুপ করে থাকত, এখন সে সারাক্ষণ হাসে।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে মায়া দৌড়ে জায়ানের কাছে এসে বলল,
—বাবা!
জায়ান তখন অফিসের কিছু কাজ করছিল।
—কী হয়েছে?
মায়া তার খাতা সামনে ধরল।
—আজ ম্যাডাম আমাকে পুরো ক্লাসের সামনে প্রশংসা করেছে।
জায়ান খাতা হাতে নিয়ে বলল,
—বাহ! তাহলে তো আজকে একটা পুরস্কার অবশ্যই প্রাপ্য।
—কী পুরস্কার?
—তুমি যা চাইবে।
মায়া একটু ভেবে বলল,
—আজ তুমি আমার সঙ্গে খেলবে।
জায়ান হেসে বলল,
—শুধু এটুকুই?
—হ্যাঁ।
—ঠিক আছে।
মায়া খুশিতে লাফিয়ে উঠল।
নীরা দূর থেকে সব দেখছিল।
জায়ানকে মায়ার সঙ্গে এভাবে সময় কাটাতে দেখে তার বুকটা আনন্দে ভরে গেল।
কিছুদিন আগেও সে ভাবত, তার মেয়ের জীবন হয়তো সবসময় ভয় আর কষ্টের মধ্যে থাকবে।
কিন্তু আজ তার মেয়ের মুখে শুধু হাসি।
এটাই তার সবচেয়ে বড় পাওয়া।
এক সন্ধ্যায় নীরা বারান্দায় বসে ছিল।
জায়ান এসে পাশে বসল।
—কী ভাবছ?
নীরা মৃদু হেসে বলল,
—আমাদের কথা।
—কোন কথা?
—বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো।
জায়ানও হাসল।
—মনে আছে, প্রথম দিন তোমাকে দেখে আমি কী ভেবেছিলাম?
—কী?
—ভেবেছিলাম, মেয়েটা নিশ্চয়ই অনেক শান্ত।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—আমি শান্ত?
—হ্যাঁ।
—তুমি তো প্রথম দিন থেকেই আমাকে চিনতেই না।
—দেখেই বুঝেছিলাম।
নীরা হেসে বলল,
—তুমি তখন জানতেও না আমি ইংরেজি স্যারের মেয়ে।
—জানতাম না।
—আর যখন স্যার আমাকে প্রশ্ন করে আমি উত্তর দিতে পারিনি?
জায়ান হেসে বলল,
—তখন আমার খুব খারাপ লেগেছিল।
—কেন?
—কারণ সবাই তোমাকে নিয়ে হাসছিল।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—সেদিন তুমি আমার পাশে না দাঁড়ালে হয়তো আমি এত সহজে পড়াশোনায় মন দিতে পারতাম না।
জায়ান বলল,
—তুমি নিজেই পারতে। আমি শুধু একটু সাহায্য করেছিলাম।
—তারপর তুমি আমাকে পড়াতে পড়াতে আমার জীবনটাই বদলে দিলে।
জায়ান মৃদু হেসে বলল,
—তুমি আমার জীবনও বদলে দিয়েছিলে।
নীরা তার দিকে তাকাল।
—কীভাবে?
—তোমাকে প্রথম দেখার পর থেকেই।
নীরা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।
ঠিক তখন মায়া দৌড়ে এসে বলল,
—আম্মু! বাবা!
দুজনেই তাকাল।
—কী হয়েছে?
মায়া বলল,
—আমার চুল বেঁধে দাও।
জায়ান বলল,
—এসো।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে জায়ানের সামনে গিয়ে বসে পড়ল।
জায়ান চিরুনি হাতে নিল।
নীরা হাসতে হাসতে বলল,
—তুমি এখন তো বেশ ভালো চুল আঁচড়াতে পারো।
—প্র্যাকটিস হয়েছে।
মায়া বলল,
—বাবা আমার চুল খুব সুন্দর করে দেয়।
জায়ান বলল,
—কারণ আমার মেয়ে খুব সুন্দর।
মায়া আয়নার দিকে তাকিয়ে হাসল।
নীরা তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, এই দৃশ্যটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ।
কিছুক্ষণ পর মায়া হঠাৎ বলল,
—বাবা, তুমি আমাকে প্রথম কবে দেখেছিলে?
জায়ান বলল,
—তুমি যখন রাস্তা পার হতে যাচ্ছিলে, তখন।
—তখন তুমি আমাকে বাঁচিয়েছিলে।
—হ্যাঁ।
মায়া বলল,
—তখনই কি তুমি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলে?
জায়ান হেসে বলল,
—হয়তো।
মায়া একটু ভেবে বলল,
—আমি কিন্তু তোমাকে প্রথম দেখেই পছন্দ করেছিলাম।
জায়ান মেয়েকে জড়িয়ে ধরল।
—আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি।
নীরা চুপচাপ তাদের দেখছিল।
তার চোখে পানি এসে গেল।
জায়ান সেটা দেখে বলল,
—আবার কাঁদছ?
নীরা হেসে বলল,
—এগুলো আনন্দের কান্না।
জায়ান উঠে এসে তার পাশে দাঁড়াল।
—তাহলে আজ থেকে আনন্দ ছাড়া আর কোনো কান্না নয়।
নীরা মাথা নাড়ল।
—চেষ্টা করব।
জীবনের সব কষ্ট যে একদিনে শেষ হয়ে যায় না, নীরা সেটা জানত।
কিন্তু এখন তার পাশে এমন মানুষ আছে, যে তার কথা শোনে, তাকে সম্মান করে এবং তার মেয়েকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসে।
এটাই তার জন্য যথেষ্ট।
কয়েকদিন পর নীরার বাবা আবার তাদের বাড়িতে এলেন।
মায়া দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
—নানা!
তিনি হাসতে হাসতে বললেন,
—আমার নাতনি কেমন আছে?
—ভালো।
তারপর তিনি জায়ানের দিকে তাকালেন।
—জায়ান, তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।
জায়ান এগিয়ে গেল।
নীরার বাবা বললেন,
—আমি অনেক বছর আগে একটা ভুল করেছিলাম।
জায়ান চুপ করে শুনছিল।
—আমি ভেবেছিলাম, টাকা-পয়সা আর বড় পরিবারই মেয়ের সুখ নিশ্চিত করবে। কিন্তু আমি বুঝিনি, একজন ভালো মানুষই আসলে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
জায়ান বলল,
—আপনি তখন নীরার ভালোর কথাই ভেবেছিলেন।
—হ্যাঁ। কিন্তু সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল।
তিনি জায়ানের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
—তুই আমার মেয়েকে ভালো রাখিস। আর মায়াকে নিজের মেয়ের মতোই দেখিস।
জায়ান দৃঢ় গলায় বলল,
—আমি সবসময় তাই করব।
নীরার বাবা হাসলেন।
—আমি জানি।
তারপর তিনি নীরার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তোর হাসি দেখে এখন বুঝি, এবার আমি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
নীরা বাবার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
—বাবা, তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি।
তিনি মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
—আমিও মা।
সেদিন রাতে সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছিল।
জায়ানের মা, নীরার বাবা, নীরা, জায়ান আর মায়া।
মায়া একদিকে বসে গল্প করছে।
—বাবা, আজ স্কুলে আমি একটা ছবি এঁকেছি।
—কী এঁকেছ?
—আমাদের পরিবার।
জায়ান ছবিটা হাতে নিল।
ছবিতে ছিল পাঁচজন মানুষ।
জায়ান, নীরা, মায়া, জায়ানের মা আর নীরার বাবা।
জায়ান ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
নীরা বলল,
—কেমন হয়েছে?
—খুব সুন্দর।
মায়া বলল,
—এটা আমার সবচেয়ে সুন্দর ছবি।
জায়ান বলল,
—কারণ এতে আমাদের সবাই আছে।
মায়া মাথা নাড়ল।
তারপর হঠাৎ বলল,
—আমাদের পরিবার সবসময় এমন থাকবে তো?
জায়ান মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,
—আমরা সবাই চেষ্টা করব, যেন সবসময় এমনই থাকে।
নীরা মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ মা।
মায়া খুশি হয়ে খাবার খেতে শুরু করল।
নীরা কিছুক্ষণ চুপচাপ সবাইকে দেখল।
একসময় তার জীবন ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা।
সে ভেবেছিল, তার ভালোবাসা হারিয়ে গেছে।
তারপর ভুল মানুষকে বিয়ে করে সে অনেক কষ্ট পেয়েছে।
কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যেই সে নিজের শক্তি খুঁজে পেয়েছে।
তার মেয়ের জন্য দাঁড়াতে শিখেছে।
আর বহু বছর পর ফিরে পেয়েছে সেই মানুষটাকে, যে একসময় তার পড়াশোনার পাশে বসে বলেছিল—
“একটা প্রশ্নের উত্তর পারোনি বলে কেউ খারাপ ছাত্র হয়ে যায় না।”
সেই মানুষটাই আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা।
রাত গভীর হলে মায়া ঘুমিয়ে পড়ল।
জায়ান তার ঘরে গিয়ে মেয়ের চাদর ঠিক করে দিল।
নীরা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
জায়ান ফিরে এসে বলল,
—ঘুমিয়ে গেছে।
নীরা মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
জায়ান বলল,
—চলো, আমরাও ঘুমাই।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—জায়ান?
—হুম?
—তুমি যদি সেদিন আমার বাবার কথা না শুনতে?
জায়ান একটু ভেবে বলল,
—তাহলে হয়তো আমাদের গল্পটা অন্যরকম হতো।
—আর এখন?
জায়ান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—এখন মনে হয়, আমাদের গল্পটা যত দেরিতেই হোক, ঠিক জায়গায় এসে শেষ হয়েছে।
নীরার চোখে পানি এলো।
সে হাসতে হাসতে বলল,
—শেষ হয়নি।
জায়ান অবাক হয়ে বলল,
—শেষ হয়নি?
—না। এখন তো আমাদের নতুন গল্প শুরু।
জায়ানও হাসল।
দুজন একসঙ্গে মায়ার ঘরের দিকে তাকাল।
ছোট্ট মেয়েটা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।
তার মুখে শান্তির হাসি।
নীরা মনে মনে বলল,
‘কিছু ভালোবাসা সময়ের কাছে হেরে যায় না। শুধু একটু দেরিতে নিজের ঠিকানা খুঁজে পায়।’
জায়ান নীরার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
আর তাদের ছোট্ট সংসারে ধীরে ধীরে রাত নেমে এলো।
যে ভালোবাসা একদিন ভুল বোঝাবুঝির কারণে হারিয়ে গিয়েছিল, সেটাই বহু বছর পর ফিরে এসে পূর্ণতা পেল।
....