রাগী স্বামীর নীরব যত্ন

সকাল ছয়টা।

পুরো বাড়িটা তখনও ঘুমে। কিন্তু বাড়ির পেছনের বড় উঠানে নিয়ম করে শরীরচর্চা করছিল রায়হান।

রায়হান একজন পুলিশ অফিসার। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। লম্বা, চওড়া কাঁধ, গম্ভীর চেহারা আর সবসময় কপালে ভাঁজ। অফিসে যেমন কঠোর, বাড়িতেও তার স্বভাব প্রায় একই।

কথা কম বলে।

আর বললেও এমনভাবে বলে, যেন তার কথার উত্তর দেওয়ার সাহস কারও নেই।

কিছুদিন আগেই তার বিয়ে হয়েছে মায়ার সঙ্গে।

মায়ার বয়স উনিশ। কলেজে পড়ে। শান্ত স্বভাবের মেয়ে। খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু হাসিটা খুব সুন্দর।

বিয়েটা মায়ার কাছে এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি।

একদিকে নতুন পরিবার, অন্যদিকে এমন একজন স্বামী, যার মুখ দেখলেই তার বুক কেমন ধড়ফড় করে।

রায়হান ব্যায়াম শেষ করে ঘরে ঢুকল।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল ছয়টা চল্লিশ।

তারপর গম্ভীর গলায় ডাকল,

— মায়া!

পাশের ঘর থেকে মায়া তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল।

— জি?

— নাস্তা হয়েছে?

— মা বলেছে একটু পরেই হবে।

রায়হান কিছু না বলে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।

টেবিলে একটা প্লেটে কয়েকটা সিদ্ধ ডিম রাখা ছিল।

সে একটা ডিম হাতে তুলে নিল। তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

— আমার জন্য কাঁচা ডিম আনতে বলেছিলাম।

মায়া অবাক হয়ে তাকাল।

— কাঁচা ডিম?

— হ্যাঁ।

— আপনি কাঁচা ডিম খান?

— খাই। সমস্যা?

মায়া একটু মুখ কুঁচকে বলল,

— এটা কীভাবে খান? ছি!

কথাটা শুনেই রায়হানের চোখ সরু হয়ে গেল।

মায়া বুঝতে পারল, ভুল করে ফেলেছে।

রায়হান ধীরে ধীরে তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— কী বললে?

মায়া মাথা নিচু করে ফেলল।

— কিছু না।

— যা বলেছ, আবার বলো।

— বলেছি... কাঁচা ডিম খেতে আমার ভালো লাগে না।

রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— তোমার ভালো লাগার ওপর তো আমি খাচ্ছি না।

মায়া চুপ।

রায়হান ডিমটা হাতে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

মায়া তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,

‘মানুষটা সবসময় এত রেগে থাকে কেন?’

কিছুক্ষণ পর রায়হানের মা সালমা বেগম এসে মায়ার পাশে দাঁড়ালেন।

— ওর কথায় মন খারাপ করিস না মা। ছোটবেলা থেকেই ও একটু রাগী।

মায়া মৃদু হেসে বলল,

— আমি বুঝতে পারি মা।

সালমা বেগম মায়ার মাথায় হাত রেখে বললেন,

— তুই আমাদের ঘরের মেয়ে। ওর রাগ দেখে ভয় পাবি না।

মায়া মাথা নাড়ল।

এই বাড়ির সবাই তাকে সত্যিই অনেক ভালোবাসে।

শুধু একজনকে বুঝতে তার একটু সময় লাগছে।

রায়হানকে।

সকাল আটটার দিকে মায়া কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো।

চুল ঠিক করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিল।

ঠিক তখনই রায়হান ঘরে ঢুকল।

পরিপাটি পোশাক, হাতে ঘড়ি, চোখে সেই চিরচেনা কঠোর দৃষ্টি।

মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

— কোথায় যাচ্ছ?

— কলেজে।

— কখন ফিরবে?

— ক্লাস শেষ হলে।

— নির্দিষ্ট সময় বলো।

মায়া একটু ভেবে বলল,

— দুপুর দুইটার মধ্যে।

রায়হান মাথা নাড়ল।

তারপর মায়ার পোশাকের দিকে তাকিয়ে বলল,

— ব্যাগটা ঠিক করে ধরো।

মায়া ব্যাগটা ঠিক করল।

— চুলটাও ঠিক করো।

মায়া অবাক হয়ে চুলে হাত দিল।

— ঠিকই তো আছে।

— আমি যা বলছি, করো।

মায়া চুপচাপ চুলটা ঠিক করল।

রায়হান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

— তুমি এখনও অনেক ছোট। নতুন সংসার, নতুন দায়িত্ব—কিছুই ঠিকমতো বুঝে ওঠোনি। কিন্তু তোমাকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে হবে।

মায়া ধীরে বলল,

— আমি চেষ্টা করছি।

— চেষ্টা না। সময় দিচ্ছি তোমাকে। নিজেকে ঠিক করো।

মায়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

রায়হান দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে থেমে বলল,

— আর কলেজ থেকে ফেরার সময় আমাকে ফোন করবে।

মায়া অবাক হয়ে তাকাল।

— আপনাকে?

— হ্যাঁ। কেন? সমস্যা?

— না।

— ভালো।

রায়হান বেরিয়ে গেল।

মায়া তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

লোকটা যতই রাগী হোক, তার প্রতিটা কথার মধ্যে যেন একটা অদ্ভুত চিন্তা লুকিয়ে থাকে।

দুপুরে কলেজ থেকে ফেরার সময় মায়া গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার সহপাঠী রাফি এসে বলল,

— মায়া, কালকের অ্যাসাইনমেন্টটা করেছ?

— হ্যাঁ। তোমারটা হয়েছে?

— না। একটু বুঝিয়ে দেবে?

মায়া হাসল।

— আচ্ছা, কাল দেখাব।

ঠিক তখনই রাস্তার ওপাশে পুলিশের গাড়ি থামল।

গাড়ির ভেতর থেকে রায়হান নামল।

মায়া তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল।

রায়হানও দূর থেকে মায়াকে দেখল।

তারপর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে তাকাল।

মুখটা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।

মায়া সেটা খেয়াল করল না।

রায়হান কিছু না বলে গাড়িতে উঠে চলে গেল।

রাত সাড়ে দশটা।

রায়হান কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরল।

সারা বাড়ি প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে।

মায়া তখন নিজের ঘরে বই পড়ছিল।

দরজা খুলতেই সে তাকিয়ে দেখল রায়হান দাঁড়িয়ে আছে।

মুখটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

মায়া আস্তে বলল,

— আপনি এসেছেন?

রায়হান কোনো উত্তর দিল না।

জুতা খুলে টেবিলের পাশে রাখল। ঘড়ি খুলে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে মায়ার দিকে তাকাল।

— আজ কলেজ থেকে ফেরার সময় কার সঙ্গে কথা বলছিলে?

মায়ার বুক ধক করে উঠল।

— একজন সহপাঠী।

— নাম?

— রাফি।

রায়হানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

— কতদিন ধরে চেনো?

— একই ক্লাসে পড়ি।

রায়হান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

তারপর গম্ভীর গলায় বলল,

— তোমাকে নিয়ে আমার টেনশন হয়। সেটা তুমি বোঝো না?

মায়া চুপ।

রায়হান এবার একটু নরম স্বরে বলল,

— আমি রাগ করি, কারণ তোমার নিরাপত্তা নিয়ে আমি খুব সতর্ক।

মায়া প্রথমবার তার চোখের দিকে তাকাল।

রায়হান বলল,

— সামনে থেকে কোথায় যাচ্ছ, কার সঙ্গে কথা বলছ—এসব আমাকে জানাবে। কিন্তু আমি তোমাকে কারও সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করছি না।

মায়া ধীরে মাথা নাড়ল।

— ঠিক আছে।

রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তারপর বলল,

— যাও, ঘুমাও। কাল কলেজ আছে।

মায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

রায়হান বিছানার পাশে গিয়ে বসে পড়ল।

মায়া ধীরে ধীরে বই বন্ধ করল।

তার মনে হলো, এই মানুষটার রাগের আড়ালে হয়তো এমন কিছু আছে, যা সে এখনও বুঝতে পারেনি।

আর সে জানত না—

এই শান্ত রাতের পরেই তাদের জীবনে নেমে আসতে যাচ্ছে এক ভয়ংকর ঝড়।

কারণ শহরের অন্য প্রান্তে, জেলের অন্ধকার জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছে রায়হানের পুরোনো শত্রু কামরুল।

পরদিন সকাল।

রায়হানের ঘুম ভাঙল ভোর পাঁচটা চল্লিশে।

অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে যায়। বিছানা থেকে উঠে সে প্রথমেই ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর চুপচাপ জিমের পোশাক পরে নিচে নেমে গেল।

মায়া তখনও ঘুমিয়ে।

বাড়ির সবাই জানত, রায়হানের সকাল শুরু হয় শরীরচর্চা দিয়ে।

বাড়ির পেছনের জায়গাটায় ছোট একটা জিম বানানো হয়েছে। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা ব্যায়াম করল সে।

দৌড়ানো, পুশ-আপ, ওজন তোলা—সব শেষ করে ঘামে ভিজে গেল তার শরীর।

ব্যায়াম শেষে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বলল,

— মা!

সালমা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

— কী হয়েছে?

— মায়াকে ডাকো। ওকে বলো আমার জন্য নাস্তা নিয়ে আসতে।

সালমা বেগম হেসে বললেন,

— নিজে গিয়ে ডাকলেই তো পারিস।

রায়হান ভ্রু কুঁচকে বলল,

— আমি ডাকতে গেলে ও ঘুম থেকে উঠতে উঠতে দেরি করবে। কলেজে যেতে হবে।

— তুই না ওকে নিয়ে খুব কড়া হয়ে গেছিস?

রায়হান উত্তর দিল না।

কিছুক্ষণ পর মায়া ঘুমজড়ানো চোখে নিচে নামল।

চুল এলোমেলো। হাতে একটা ওড়না।

রায়হান তাকিয়ে বলল,

— এত দেরি করে উঠেছ কেন?

মায়া চোখ মুছতে মুছতে বলল,

— ঘুম ভেঙেছে একটু আগে।

— তোমার কলেজ কয়টায়?

— নয়টায়।

— এখন কয়টা বাজে?

মায়া ঘড়ির দিকে তাকাল।

— সাড়ে সাতটা।

— তাহলে তাড়াতাড়ি তৈরি হও।

মায়া মাথা নাড়ল।

কিন্তু যাওয়ার আগে টেবিলের ওপর রাখা একটা গ্লাস দেখে থেমে গেল।

রায়হান গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেলল।

মায়া আবার মুখ কুঁচকে বলল,

— আপনি আবার কাঁচা ডিম খেলেন?

রায়হান তার দিকে তাকাল।

মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— সরি।

সালমা বেগম হেসে ফেললেন।

রায়হান কিছু বলল না।

শুধু মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

— তুমি আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করো কেন?

মায়া অবাক হয়ে বলল,

— আমি চিন্তা করছি কোথায়?

— কাল বললে ‘ছি’, আজ আবার জিজ্ঞেস করছ।

মায়া মৃদু হেসে বলল,

— কাঁচা ডিম খাওয়া আমার কাছে অদ্ভুত লাগে।

রায়হানের ঠোঁটের কোণে খুব হালকা হাসি ফুটে উঠল।

— একদিন তোমাকেও খাওয়াব।

মায়া চোখ বড় করে বলল,

— না! কখনও না।

রায়হান এবার সত্যিই একটু হাসল।

কিন্তু মায়া সেই হাসিটা দেখতে পেল না। কারণ রায়হান ইতিমধ্যে অন্যদিকে তাকিয়ে ফেলেছে।

সকাল সাড়ে আটটা।

মায়া কলেজের জন্য বের হলো।

রায়হান সেদিন অফিসে যাওয়ার আগে তাকে গাড়িতে তুলে দিতে চাইল।

মায়া বলল,

— দরকার নেই। আমি রিকশায় চলে যেতে পারব।

রায়হান বলল,

— আমি বলেছি গাড়িতে যাও।

— কিন্তু আপনার অফিসে দেরি হবে।

— আমার অফিসের সময় আমি বুঝব।

মায়া আর কিছু বলল না।

গাড়িতে বসে দুজনেই চুপ।

কিছুক্ষণ পর রায়হান বলল,

— কাল যে ছেলেটার সঙ্গে কথা বলছিলে, সে কি তোমার বন্ধু?

মায়া বুঝল, আবার সেই প্রসঙ্গ।

— সহপাঠী।

— শুধু সহপাঠী?

— হ্যাঁ।

— ঠিক আছে।

মায়া এবার সাহস করে বলল,

— আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছিলেন?

রায়হান গাড়ি চালাতে চালাতে বলল,

— রাগ করেছিলাম।

মায়া চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পর রায়হান নিজেই বলল,

— কিন্তু তোমার ওপর না।

মায়া তাকাল।

— তাহলে?

— পরিস্থিতির ওপর।

মায়া আর কিছু বলল না।

কলেজের সামনে গাড়ি থামল।

নামার আগে রায়হান বলল,

— ক্লাস শেষ হলে ফোন করবে।

— ঠিক আছে।

— আর একা কোথাও যাবে না।

— আচ্ছা।

মায়া গাড়ি থেকে নেমে গেল।

রায়হান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে গাড়ি চালিয়ে চলে গেল।

অন্যদিকে শহরের এক নির্জন জায়গায় বসে ছিল কামরুল।

কামরুলকে কয়েক বছর আগে রায়হান নিজে গ্রেপ্তার করেছিল।

অপরাধের প্রমাণ পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

কামরুলের কাছে সেই অপমান এখনও আগের মতোই জ্বলছে।

জেল থেকে বের হওয়ার পর সে রায়হানের গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজ নিতে শুরু করেছিল।

একজন লোক এসে তার সামনে দাঁড়াল।

— স্যার, খবর পেয়েছি।

কামরুল ধীরে মাথা তুলল।

— বল।

— রায়হানের বিয়ে হয়েছে।

কামরুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

— মেয়েটার নাম?

— মায়া।

— কোথায় পড়ে?

— কলেজে।

কামরুলের চোখে অদ্ভুত একটা দৃষ্টি ফুটে উঠল।

— রায়হানের দুর্বল জায়গা খুঁজে পেয়েছি তাহলে।

লোকটা বলল,

— কী করতে হবে?

কামরুল চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

— এখনই কিছু না।

— কেন?

— রায়হান খুব সাবধানী মানুষ। আগে তার রুটিন জানতে হবে।

সে টেবিলের ওপর রাখা কাগজের দিকে তাকিয়ে বলল,

— সে কখন অফিসে যায়, কখন বাড়ি ফেরে, তার স্ত্রী কখন কলেজে যায়—সব জানতে চাই।

— বুঝেছি।

— ভুল যেন না হয়।

লোকটা মাথা নেড়ে চলে গেল।

কামরুল জানালার বাইরে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

— রায়হান... তুমি আমাকে জেলে পাঠিয়েছিলে। এবার দেখো, তোমার নিজের জীবনটাই কীভাবে অশান্ত করে দিই।

দুপুরে মায়ার ক্লাস শেষ হলো।

সে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে কলেজের গেটের দিকে এগোচ্ছিল।

ঠিক তখন রাফি আবার সামনে এসে দাঁড়াল।

— মায়া, একটু দাঁড়াও।

মায়া থামল।

— কী হয়েছে?

— কাল যে অ্যাসাইনমেন্টের কথা বলেছিলাম, সেটা বুঝতে পারিনি।

— তুমি আমাকে ছবি পাঠিয়ে দিও। আমি বুঝিয়ে দেব।

— ঠিক আছে।

দুজন কথা বলছিল।

রাস্তার একটু দূরে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।

গাড়ির ভেতর থেকে একজন লোক তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।

সে ফোন বের করে কয়েকটা ছবি তুলল।

তারপর ফোনে কাউকে বলল,

— মেয়েটাকে শনাক্ত করা গেছে।

ওপাশ থেকে উত্তর এল,

— নিশ্চিত?

— হ্যাঁ।

— নজর রাখো।

লোকটা গাড়ি চালিয়ে চলে গেল।

সন্ধ্যায় মায়া বাড়ি ফিরল।

সালমা বেগম তাকে দেখে বললেন,

— এত দেরি হলো?

— রাস্তায় জ্যাম ছিল মা।

— রায়হান ফোন করেছিল। বলেছে, বাড়ি ফিরলে যেন তাকে জানাই।

মায়া অবাক হলো।

— উনি কোথায়?

— এখনও অফিসে।

মায়া নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগ রাখল।

তারপর ফোন হাতে নিয়ে রায়হানকে কল করল।

একবারেই ফোন ধরল রায়হান।

— হ্যাঁ?

— আমি বাড়ি এসেছি।

— ঠিক আছে।

— আপনি কখন আসবেন?

— কাজ শেষ হলে।

মায়া একটু চুপ থেকে বলল,

— সাবধানে আসবেন।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর রায়হান বলল,

— তুমি আমার জন্য চিন্তা করছ?

মায়া লজ্জায় বলল,

— না... মানে... সবাই করে।

রায়হান হালকা হেসে বলল,

— ঠিক আছে। ফোন রাখো।

কল কেটে গেল।

মায়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

রায়হান হাসতে পারে—এটা তার কাছে এখনও নতুন।

রাত এগারোটার দিকে রায়হান বাড়ি ফিরল।

মায়া তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

রায়হান গাড়ি থেকে নামতেই মায়া বলল,

— এত দেরি হলো?

— জরুরি কাজ ছিল।

— খাওয়া হয়েছে?

— না।

মায়া বলল,

— আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি।

রায়হান কিছু বলল না।

কিন্তু ঘরে ঢোকার সময় তার চোখ একবার বাড়ির গেটের বাইরে গেল।

রাস্তার ওপাশে একটা কালো গাড়ি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল।

রায়হানের অভিজ্ঞ চোখ সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টা খেয়াল করল।

সে কিছু না বলে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।

গাড়িটা ধীরে ধীরে সরে গেল।

রায়হানের কপালে ভাঁজ পড়ল।

তার মনে হলো—

কেউ যেন তাদের ওপর নজর রাখছে।

আর সেই সন্দেহটা সত্যি হলে, বিপদ খুব কাছেই।

পরদিন সকাল থেকেই রায়হানের মনটা অস্থির।

গত রাতের সেই কালো গাড়িটার কথা বারবার মনে পড়ছিল।

পুলিশের চাকরিতে থাকার কারণে ছোটখাটো বিষয়ও সে সহজে এড়িয়ে যায় না। বিশেষ করে যখন বিষয়টা তার পরিবারের সঙ্গে জড়িত।

সকালে ব্যায়াম করার সময়ও তার মন বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল।

শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে ব্যায়াম বন্ধ করে দিল।

ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

ঠিক তখন মায়া ঘরে ঢুকল।

— আপনি আজ এত তাড়াতাড়ি শেষ করলেন?

রায়হান গম্ভীরভাবে বলল,

— হ্যাঁ।

— শরীর খারাপ?

— না।

মায়া কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল।

রায়হান তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল,

— কী বলতে চাও?

— কিছু না।

— তাহলে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

মায়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

— সবসময় এমন করে কথা বলেন কেন?

রায়হান থেমে গেল।

— কেমন করে?

— যেন আমি আপনার কোনো কর্মচারী।

কথাটা শুনে রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— আমি এমনভাবে কথা বলি?

মায়া মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ।

রায়হান মায়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

— ঠিক আছে। চেষ্টা করব।

মায়া অবাক হয়ে গেল।

সে ভাবেনি রায়হান এত সহজে কথাটা মেনে নেবে।

নাস্তার টেবিলে সবাই বসেছে।

রায়হান আবার তার কাঁচা ডিম নিয়ে বসেছে।

মায়া দূর থেকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল।

সালমা বেগম হেসে বললেন,

— মায়া, তুই এত ঘৃণা করিস কেন?

— মা, আমি জানি না উনি কীভাবে এটা খেতে পারেন!

রায়হান ডিমটা হাতে নিয়ে বলল,

— আমি চাইলে তোমাকেও শেখাতে পারি।

মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— না!

বাড়ির সবাই হেসে উঠল।

রায়হানের মুখেও এবার হাসি ফুটল।

মায়া বুঝতে পারল, রায়হান সবসময় রাগী নয়।

তার ভেতরে একটা অন্য মানুষও আছে।

শুধু সেই মানুষটাকে খুব কম মানুষ দেখতে পায়।

নাস্তা শেষ করে রায়হান অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

মায়া কলেজের জন্য বের হওয়ার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।

রায়হান তাকে দেখে বলল,

— আজ কলেজ থেকে সরাসরি বাড়ি আসবে।

— কেন?

— আমার মনে হচ্ছে তোমার ওপর কেউ নজর রাখছে।

মায়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

— কী?

— ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

— আপনি কীভাবে বুঝলেন?

— গতকাল একটা গাড়ি তোমাদের বাড়ির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল।

মায়া চুপ করে গেল।

রায়হান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— আজ থেকে সাবধানে থাকবে।

— আপনি কি আমার সঙ্গে কাউকে পাঠাবেন?

— দরকার হলে পাঠাব।

মায়া একটু দ্বিধা করে বলল,

— আপনি কি আমার জন্য চিন্তা করেন?

রায়হান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর বলল,

— করি।

মায়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গেল।

রায়হান দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।

— এখন যাও।

অফিসে পৌঁছে রায়হান সরাসরি নিজের কক্ষে ঢুকল।

তার সহকর্মী আরিফ কিছু ফাইল নিয়ে এল।

— স্যার, গতকালের কেসের রিপোর্ট।

রায়হান ফাইল খুলে দেখছিল।

হঠাৎ আরিফ বলল,

— স্যার, একটা কথা বলব?

— বল।

— কামরুলকে নাকি জেল থেকে ছেড়ে দিয়েছে।

রায়হানের হাত থেমে গেল।

কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা বলল না।

তারপর ধীরে বলল,

— কবে?

— প্রায় দুই সপ্তাহ হলো।

রায়হান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

তার চোখে এবার কঠোরতা আরও বেড়ে গেল।

— তার বর্তমান অবস্থান জানো?

— খোঁজ নিচ্ছি।

— এখনই খোঁজ নাও।

— জি স্যার।

আরিফ বেরিয়ে গেল।

রায়হান জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

কামরুলের কথা মনে পড়তেই তার সন্দেহ আরও গভীর হলো।

কালো গাড়ি।

মায়ার ওপর নজর।

আর কামরুলের জেল থেকে বের হওয়া।

তিনটা ঘটনা কি একই সূত্রে বাঁধা?

অন্যদিকে মায়া কলেজে পৌঁছেছে।

আজ সে একটু অস্বস্তি বোধ করছিল।

বারবার মনে হচ্ছিল কেউ তাকে দেখছে।

ক্লাস শেষ করে সে দ্রুত বেরিয়ে এল।

কলেজের গেটের কাছে এসে রাফিকে দেখতে পেল।

রাফি হাত নেড়ে বলল,

— মায়া!

মায়া থামল।

— কী?

— তোমাকে একটা কথা বলব।

— বলো।

— তোমার স্বামী কি পুলিশ অফিসার?

মায়া অবাক হয়ে বলল,

— হ্যাঁ। কেন?

রাফি একটু ইতস্তত করে বলল,

— গত কয়েকদিন ধরে একজন লোক তোমাকে অনুসরণ করছে মনে হচ্ছে।

মায়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— তুমি কীভাবে জানো?

— কালও দেখেছি। আজও দেখলাম।

— কোথায়?

রাফি রাস্তার দিকে ইশারা করল।

দূরে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।

মায়ার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

সে সঙ্গে সঙ্গে রায়হানকে ফোন করল।

ফোন ধরতেই বলল,

— আপনি কোথায়?

— অফিসে। কী হয়েছে?

— কলেজের বাইরে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। রাফি বলছে কয়েকদিন ধরে একজন লোক আমাকে দেখছে।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর রায়হানের গলা কঠিন হয়ে গেল।

— তুমি এখন কোথায়?

— কলেজ গেটের ভেতরে।

— সেখানেই থাকবে। কোথাও যাবে না।

— কিন্তু...

— আমি আসছি।

কল কেটে গেল।

মায়া ফোনটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

রাফি বলল,

— তুমি চাইলে আমি তোমার সঙ্গে থাকি।

মায়া মাথা নাড়ল।

— না। আমার স্বামী আসছে।

প্রায় চল্লিশ মিনিট পর রায়হানের গাড়ি কলেজের সামনে এসে থামল।

রায়হান দ্রুত নেমে মায়ার কাছে গেল।

— তুমি ঠিক আছ?

মায়া মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ।

রায়হান চারপাশে তাকাল।

কালো গাড়িটা নেই।

সে মায়াকে বলল,

— গাড়িতে ওঠো।

মায়া উঠল।

রায়হানও গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করল।

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সে বলল,

— তোমার ভয় লাগছে?

মায়া ধীরে বলল,

— একটু।

রায়হান তার দিকে তাকাল।

— আমি আছি। ভয় পেও না।

এই প্রথম রায়হানের গলায় মায়া এমন নিশ্চয়তা শুনল।

সে জানালার বাইরে তাকাল।

কিন্তু রায়হানের চোখ ছিল আয়নায়।

পেছনে একটা মোটরসাইকেল বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাদের অনুসরণ করছে।

রায়হান বিষয়টা বুঝতে পারল।

সে গাড়ির গতি বাড়াল।

মোটরসাইকেলটাও গতি বাড়াল।

রায়হানের সন্দেহ এবার নিশ্চিত হলো।

কেউ তাদের অনুসরণ করছে।

বাড়িতে ফিরে রায়হান মায়াকে সরাসরি তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিল।

তারপর আরিফকে ফোন করল।

— আরিফ, আমার সন্দেহ ঠিক।

— কী হয়েছে স্যার?

— কেউ আমার স্ত্রীকে অনুসরণ করছে।

— স্যার, কামরুলের ব্যাপারে একটা তথ্য পেয়েছি।

রায়হানের গলা কঠিন হয়ে গেল।

— বলো।

— কামরুল গত কয়েকদিন ধরে আপনার পরিবারের ওপর নজর রাখছে বলে খবর পেয়েছি।

রায়হান চোখ বন্ধ করল।

সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।

— তাকে খুঁজে বের করো।

— জি স্যার।

— কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আরিফ।

— জি?

— এবার আমি কোনো ভুল করতে চাই না।

ফোন রেখে রায়হান মায়ার ঘরের দিকে তাকাল।

তার চোখে রাগের সঙ্গে এবার ভয়ও ছিল।

কারণ সে বুঝতে পারছিল—

শত্রু শুধু তাকে লক্ষ্য করছে না।

শত্রুর লক্ষ্য এখন মায়া।

আর কামরুল ইতিমধ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে।

সেদিন রাতেই শহরের বাইরে একটা নির্জন জায়গায় কামরুল তার লোকদের নিয়ে বসেছিল।

টেবিলের ওপর মায়ার একটা ছবি রাখা।

কামরুল ছবিটার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,

— এবার রায়হানকে বুঝতে হবে, কাছের মানুষ হারানোর ভয় কাকে বলে।

তারপর সে ছবিটা তুলে পকেটে রাখল।

— সময় এসেছে।

পরদিন সকালটা অন্য দিনের মতো ছিল না।

রায়হান ভোরে উঠে ব্যায়াম করলেও তার মন একদম স্থির ছিল না। গত কয়েকদিনের ঘটনা বারবার মাথায় ঘুরছিল।

কালো গাড়ি।

মায়াকে অনুসরণ করা।

কামরুলের জেল থেকে বের হওয়া।

সবকিছু যেন একই সুতোয় বাঁধা।

ব্যায়াম শেষ করে রায়হান ঘরে ফিরল।

মায়া তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল।

রায়হান আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল,

— আজ কলেজে যাবে না।

মায়া ঘুরে তাকাল।

— কেন?

— আমার কথা শুনবে।

— কিন্তু আজ গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে।

— অনলাইনে নোট নিয়ে নিও।

মায়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

— আমি তো প্রতিদিন কলেজে যাই। আজ হঠাৎ কেন যাব না?

রায়হান এবার তার দিকে তাকাল।

— কারণ আমি বলছি।

মায়া চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পর রায়হান বুঝতে পারল, তার গলার স্বরটা বেশি কঠিন হয়ে গেছে।

সে একটু শান্ত হয়ে বলল,

— মায়া, আমি তোমাকে আটকাতে চাই না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভালো না। তুমি কলেজে গেলে আমার চিন্তা হবে।

মায়া ধীরে বলল,

— আপনি কি সত্যিই ভয় পাচ্ছেন?

রায়হান উত্তর দিল না।

মায়া আবার বলল,

— আমার জন্য?

রায়হান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

— হ্যাঁ।

একটা ছোট্ট উত্তর।

কিন্তু সেই কথাটা মায়ার মনে অনেকক্ষণ রয়ে গেল।

সকালের নাস্তার টেবিলে সবাই বসেছিল।

রায়হান আগের মতোই ডিম নিয়ে বসেছে।

মায়া এবার আর কিছু বলল না।

রায়হানের মা হেসে বললেন,

— আজ আর ‘ছি’ বলছিস না?

মায়া মুচকি হেসে বলল,

— বললে তো উনি আবার রাগ করবেন।

রায়হান ডিমের দিকে তাকিয়ে বলল,

— আজ রাগ করব না।

মায়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

— সত্যি?

— হ্যাঁ।

— তাহলে কাঁচা ডিম খেলে ‘ছি’ বলব?

রায়হান এবার মায়ার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।

— তুমি না সত্যিই খুব বেয়াদব।

বাড়ির সবাই হেসে উঠল।

মায়াও হেসে ফেলল।

কিন্তু সেই হাসির মুহূর্তটা খুব বেশি সময় স্থায়ী হলো না।

কারণ রায়হানের ফোন বেজে উঠল।

সে ফোন ধরে কিছুক্ষণ শুনল।

তার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

— আমি এখনই আসছি।

ফোন কেটে রায়হান উঠে দাঁড়াল।

মায়া জিজ্ঞেস করল,

— কী হয়েছে?

— অফিসে জরুরি কাজ।

— কখন ফিরবেন?

— জানি না।

তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

— তুমি আজ বাড়ি থেকে বের হবে না।

মায়া মাথা নাড়ল।

রায়হান বেরিয়ে গেল।

দুপুরের দিকে মায়া তার পড়ার টেবিলে বসে ছিল।

হঠাৎ তার ফোনে একটা মেসেজ এল।

অপরিচিত নম্বর।

“আপনার স্বামীকে নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। দেখা করতে চাই।”

মায়া মেসেজটা পড়ে ভ্রু কুঁচকাল।

কিছুক্ষণ পর আরেকটা মেসেজ এল।

“আপনার স্বামী আপনাকে সব কথা বলেন না।”

মায়ার বুকের ভেতর অস্বস্তি শুরু হলো।

সে সঙ্গে সঙ্গে রায়হানকে ফোন করল।

ফোন বন্ধ।

আবার করল।

তবুও বন্ধ।

মায়া এবার সালমা বেগমকে বিষয়টা জানাল।

সালমা বেগম মেসেজ দেখে বললেন,

— কাউকে কিছু না বলে বাইরে যাবি না।

— আমি যাব না মা।

— রায়হানকে জানাতে হবে।

মায়া মাথা নাড়ল।

ঠিক তখনই বাড়ির সামনে একটা গাড়ির শব্দ হলো।

মায়া জানালার কাছে গিয়ে দেখল, একজন লোক গাড়ি থেকে নেমে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

লোকটা বাড়ির দিকে তাকিয়ে ফোনে কথা বলছে।

মায়ার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

সে দ্রুত জানালা থেকে সরে এল।

অন্যদিকে রায়হান তখন থানায়।

তার সামনে কয়েকটা ছবি রাখা।

আরিফ বলল,

— স্যার, এই লোকটা গত কয়েকদিন ধরে ম্যাডামের কলেজের আশেপাশে দেখা গেছে।

রায়হান ছবিগুলো দেখল।

— পরিচয়?

— এখনও নিশ্চিত না।

— কামরুলের সঙ্গে যোগাযোগ আছে?

— সন্দেহ করছি।

রায়হান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

— মায়াকে একা রাখা যাবে না।

সে সঙ্গে সঙ্গে মায়াকে ফোন করল।

ফোন বন্ধ।

রায়হানের বুকটা কেঁপে উঠল।

— ওর ফোন বন্ধ কেন?

আরিফ বলল,

— হয়তো চার্জ নেই।

রায়হান মাথা নাড়ল।

— না। মায়া কখনও ফোন বন্ধ রাখে না।

সে দ্রুত গাড়িতে উঠল।

বাড়িতে ফিরে রায়হান দেখল, গেট খোলা।

তার বুকের ভেতর কেমন একটা আশঙ্কা হলো।

গাড়ি থামিয়েই সে দ্রুত ভেতরে ঢুকল।

— মা!

কেউ উত্তর দিল না।

সে আবার ডাকল,

— মায়া!

সালমা বেগম দৌড়ে এলেন।

— কী হয়েছে?

— মায়া কোথায়?

সালমা বেগমের মুখ ফ্যাকাশে।

— ও তো ঘরেই ছিল।

— এখন কোথায়?

— জানি না।

রায়হান ছুটে মায়ার ঘরে গেল।

ঘর ফাঁকা।

টেবিলের ওপর মায়ার ফোন পড়ে আছে।

রায়হান ফোনটা হাতে তুলে নিল।

স্ক্রিনে অপরিচিত নম্বর থেকে আসা মেসেজগুলো দেখা গেল।

তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।

— মা, আপনি শেষবার মায়াকে কখন দেখেছেন?

— কিছুক্ষণ আগে। ও বলছিল তোমাকে ফোন করবে।

রায়হান চারপাশে তাকাল।

জানালাটা খোলা।

বিছানার পাশে মায়ার একটা চুড়ি পড়ে আছে।

রায়হান সেটা হাতে তুলে নিল।

তার আঙুল শক্ত হয়ে গেল।

— কামরুল...

তার গলা থেকে নামটা খুব নিচু স্বরে বের হলো।

শহরের বাইরে তখন একটা গাড়ি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

মায়া গাড়ির ভেতরে বসে আছে।

তার চোখে ভয়।

কিন্তু তাকে কোনো আঘাত করা হয়নি।

সে শুধু বুঝতে পারছে না, তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সামনে বসা লোকটা ফোনে বলল,

— স্যার, মেয়েটা আমাদের সঙ্গে আছে।

ওপাশ থেকে কামরুলের গলা ভেসে এল,

— রায়হান জানে?

— মনে হয় এখন জেনে গেছে।

কামরুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— ভালো।

— এখন কী করব?

— শহরের বাইরে নিয়ে যাও। যে জায়গাটা ঠিক করেছি, সেখানে রাখো।

— জি।

মায়া চোখের পানি মুছে বলল,

— আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

লোকটা কোনো উত্তর দিল না।

মায়া আবার বলল,

— আমার স্বামী পুলিশ অফিসার। তিনি আপনাদের খুঁজে বের করবেন।

লোকটা এবার পেছনে তাকিয়ে বলল,

— আমরা সেটাই চাই।

মায়ার বুকটা আরও কেঁপে উঠল।

এদিকে রায়হান থানায় ফিরে এসেছে।

তার সামনে শহরের একটা বড় ম্যাপ।

আরিফ কয়েকজন অফিসারকে নিয়ে দাঁড়িয়ে।

রায়হান বলল,

— শহরের সব বের হওয়ার রাস্তা চেক করো।

— জি স্যার।

— টোল প্লাজা, সিসিটিভি, সব জায়গার ফুটেজ লাগবে।

— জি।

— আর কামরুলের পুরোনো লোকজনের ফোন ট্র্যাক করো।

একজন অফিসার বলল,

— স্যার, যদি মেয়েটাকে শহরের বাইরে নিয়ে যায়?

রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— তাহলে শহরের বাইরের সব রাস্তাও বন্ধ করতে হবে।

তার চোখে তখন ভয় নয়, কঠিন সংকল্প।

সে মায়ার ফোনটা হাতে নিয়ে শেষবারের মতো স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

মায়ার একটা ছবি ওয়ালপেপারে।

রায়হান ছবিটার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল,

— তুমি শুধু নিরাপদে থেকো, মায়া।

তারপর সে উঠে দাঁড়াল।

— আমি ওকে ফিরিয়ে আনব।

রাত নামার আগেই মায়াকে শহর থেকে অনেক দূরের এক নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হলো।

চারদিকে ঘন গাছপালা।

মানুষের কোনো চিহ্ন নেই।

একটা পুরোনো ঘরের দরজা খুলে তাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।

মায়া চারপাশে তাকিয়ে বুঝল—

সে এমন একটা জায়গায় এসেছে, যেখান থেকে সাহায্য চাওয়া প্রায় অসম্ভব।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

বাইরে তালা লাগার শব্দ হলো।

মায়া দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল,

— রায়হান আমাকে খুঁজে বের করবে।

কিন্তু তার নিজের মনেই তখন একটা প্রশ্ন—

রায়হান কি সত্যিই তাকে সময়মতো খুঁজে পাবে?

অন্যদিকে থানায় হঠাৎ একটা ফোন এল।

আরিফ ফোনটা রায়হানের হাতে দিয়ে বলল,

— স্যার, গাড়িটার একটা সূত্র পাওয়া গেছে।

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।

— কোথায়?

আরিফ ম্যাপের একটা জায়গায় আঙুল রাখল।

— শহর থেকে অনেক দূরে। একটা পুরোনো বন এলাকার কাছে।

রায়হানের চোখ কঠিন হয়ে গেল।

— গাড়ি প্রস্তুত করো।

তারপর সে এক মুহূর্তও দেরি না করে বেরিয়ে গেল।

রাত অনেকটা গভীর হয়ে গেছে।

ঘন জঙ্গলের ভেতর পুরোনো সেই বাড়িটা যেন অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে আছে। চারপাশে শুধু গাছের পাতার শব্দ আর দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।

মায়া ঘরের এক কোণে বসে আছে।

ঘরটা খুব বড় নয়। একটা পুরোনো চেয়ার, একটা ছোট টেবিল আর একটা জানালা ছাড়া তেমন কিছু নেই।

জানালাটা বাইরে থেকে আটকানো।

মায়া বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে।

তার চোখে ভয়।

কিন্তু নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করছে—

রায়হান তাকে খুঁজছে।

সে নিশ্চয়ই আসবে।

কিছুক্ষণ পর দরজার বাইরে পায়ের শব্দ হলো।

মায়া উঠে দাঁড়াল।

দরজা খুলে একজন লোক ভেতরে ঢুকল।

তার হাতে খাবারের প্যাকেট।

লোকটা খাবারটা টেবিলে রেখে বলল,

— খেয়ে নিন।

মায়া জিজ্ঞেস করল,

— আমাকে এখানে কেন আনা হয়েছে?

লোকটা কোনো উত্তর দিল না।

— আমার স্বামীকে আপনারা চেনেন?

লোকটা এবার তাকাল।

— বেশি প্রশ্ন করবেন না।

— রায়হান আপনাদের কিছু করেনি।

লোকটা হেসে বলল,

— আপনি আপনার স্বামীকে যতটা চেনেন, তার শত্রুরা তাকে তার চেয়েও ভালো চেনে।

কথাটা বলে লোকটা বেরিয়ে গেল।

দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল।

মায়া ধীরে ধীরে টেবিলের কাছে গিয়ে বসে পড়ল।

খাবারের দিকে তাকিয়েও তার খেতে ইচ্ছে করল না।

তার মনে পড়ল বাড়ির কথা।

সালমা বেগমের কথা।

বাড়ির সবাই।

আর রায়হান।

হঠাৎ তার চোখে পানি চলে এল।

সে নিজের মনেই বলল,

— আপনি আমাকে খুঁজে পাবেন তো?

অন্যদিকে রায়হানের গাড়ি তখন জঙ্গলের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলছে।

তার সঙ্গে আরিফসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা।

গাড়ির ভেতরে কেউ কথা বলছে না।

রায়হানের হাতে মায়ার একটা ছবি।

সে বারবার ছবিটার দিকে তাকাচ্ছে।

আরিফ বলল,

— স্যার, সামনে রাস্তা খুব খারাপ।

— যতটা সম্ভব দ্রুত যাও।

— জি।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামল।

সামনে আর রাস্তা নেই।

এরপর পায়ে হেঁটে যেতে হবে।

রায়হান গাড়ি থেকে নামল।

টর্চ হাতে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

চারপাশে ঘন জঙ্গল।

আরিফ বলল,

— স্যার, জায়গাটা অনেক বড়। যদি ওরা বাড়িটা অন্যদিকে সরিয়ে থাকে?

রায়হান থামল।

— ওরা মায়াকে নিয়ে বেশি দূরে যেতে পারবে না।

— কেন?

— কারণ মায়াকে লুকানোর জন্য এমন জায়গা দরকার যেখানে সহজে কেউ খুঁজে পাবে না। কিন্তু গাড়ি চলাচলের একটা রাস্তা অবশ্যই থাকতে হবে।

রায়হান চারপাশে তাকাল।

হঠাৎ মাটিতে গাড়ির চাকার দাগ দেখতে পেল।

সে নিচু হয়ে দাগটা দেখল।

— এই দিক দিয়ে গেছে।

সবাই তার পেছনে এগিয়ে গেল।

প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটার পর দূরে একটা পুরোনো বাড়ির ছায়া দেখা গেল।

আরিফ ফিসফিস করে বলল,

— স্যার...

রায়হান হাত তুলে সবাইকে থামাল।

সে দূর থেকে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।

বাড়ির সামনে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে।

রায়হানের চোখ সরু হয়ে গেল।

— সবাই সাবধানে থাকবে।

পুলিশ সদস্যরা চারদিকে ছড়িয়ে গেল।

রায়হান ধীরে ধীরে বাড়িটার কাছে এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই ভেতর থেকে একটা শব্দ হলো।

কেউ যেন দরজা খুলছে।

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের আড়ালে সরে গেল।

দুজন লোক বাইরে বের হলো।

তারা চারপাশে তাকিয়ে আবার ভেতরে ঢুকে গেল।

রায়হান আরিফকে ইশারা করল।

— এখন।

পুলিশ সদস্যরা দ্রুত বাড়িটাকে ঘিরে ফেলল।

রায়হান দরজার সামনে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

— পুলিশ! সবাই বের হয়ে আসো!

ভেতরে হঠাৎ হৈচৈ শুরু হয়ে গেল।

মায়া দরজার ভেতর থেকে শব্দ শুনল।

তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

বাইরে কারও গলা ভেসে এল—

“পুলিশ!”

মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।

সে দরজার কাছে ছুটে গেল।

— রায়হান!

তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

কিন্তু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ।

মায়া জোরে দরজায় ধাক্কা দিল।

— আমি এখানে!

বাইরে গোলমাল শুরু হয়ে গেছে।

কয়েকজন লোক পালানোর চেষ্টা করছে।

পুলিশ তাদের আটকাতে ব্যস্ত।

রায়হান একটা ঘর থেকে আরেকটা ঘর খুঁজতে লাগল।

হঠাৎ ভেতর থেকে মায়ার কণ্ঠ শুনতে পেল।

— রায়হান!

রায়হান থেমে গেল।

তার চোখে মুহূর্তের জন্য স্বস্তি ফুটে উঠল।

সে দ্রুত সেই ঘরের দিকে গেল।

দরজায় তালা।

রায়হান পেছনে সরে এসে জোরে ধাক্কা দিল।

তালা ভেঙে গেল।

দরজা খুলতেই মায়া ছুটে বেরিয়ে এল।

রায়হান তাকে দেখে কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারল না।

মায়ার চোখে পানি।

সে শুধু বলল,

— আপনি এসেছেন...

রায়হান গম্ভীর মুখে বলল,

— তোমাকে নিতে আসব না?

মায়া মাথা নাড়ল।

রায়হান তার কাঁধে হাত রাখল।

— তুমি ঠিক আছ?

— হ্যাঁ।

— কেউ তোমাকে আঘাত করেছে?

— না।

রায়হানের মুখে এবার স্বস্তি দেখা গেল।

কিন্তু ঠিক তখনই বাইরে থেকে আরিফের চিৎকার শোনা গেল—

— স্যার! একজন পালিয়ে গেছে!

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে বাইরে তাকাল।

মায়াকে নিরাপদ জায়গায় রেখে সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।

বাড়ির পেছনের দিকে একজন লোক দৌড়ে পালাচ্ছিল।

রায়হান তার পেছনে ছুটল।

লোকটা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল।

রায়হানও পিছনে গেল।

কিছু দূর গিয়ে লোকটাকে ধরে ফেলল।

লোকটা মাটিতে পড়ে গেল।

রায়হান তাকে ধরে বলল,

— কামরুল কোথায়?

লোকটা চুপ।

— বল!

লোকটা ভয়ে তাকাল।

— স্যার... কামরুল এখানে ছিল না।

রায়হান থেমে গেল।

— কী বললে?

— সে শুধু আমাদের নির্দেশ দিয়েছিল। মায়াকে এখানে রাখতে।

— এখন কোথায়?

— জানি না।

রায়হানের চোখে রাগ জমে উঠল।

সে বুঝল—

এটা ছিল শুধু একটা পরিকল্পনার প্রথম ধাপ।

কিছুক্ষণ পর রায়হান মায়াকে নিয়ে গাড়িতে ফিরল।

মায়া চুপচাপ বসে আছে।

রায়হানও কিছু বলছে না।

অনেকক্ষণ পর মায়া ধীরে বলল,

— আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছেন?

রায়হান তার দিকে তাকাল।

— তোমার ওপর কেন রাগ করব?

— আমি আপনার কথা শুনিনি।

— তুমি তো ইচ্ছে করে যাওনি।

মায়া চুপ করে গেল।

রায়হান কিছুক্ষণ পর বলল,

— আমি তোমাকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম।

মায়া তার দিকে তাকাল।

রায়হানের চোখে তখন আর সেই কঠোরতা নেই।

ছিল শুধু ক্লান্তি আর চিন্তা।

মায়া ধীরে বলল,

— আমি ভেবেছিলাম আপনি আসবেন।

রায়হান চোখ সরিয়ে নিল।

— আমি না এসে পারি?

মায়ার চোখ আবার ভিজে উঠল।

ভোরের দিকে তারা বাড়িতে ফিরল।

সালমা বেগম মায়াকে দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন।

— মা!

মায়াও তাকে শক্ত করে ধরে কেঁদে ফেলল।

বাড়ির সবাই মায়াকে ঘিরে দাঁড়াল।

রায়হান একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

তারপর ধীরে নিজের ঘরে চলে গেল।

মায়া কিছুক্ষণ পর ঘরে এসে দেখল, রায়হান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

সে বলল,

— আপনি ঘুমাবেন না?

— ঘুম আসছে না।

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।

তারপর বলল,

— ধন্যবাদ।

রায়হান ঘুরে তাকাল।

— কিসের?

— আমাকে খুঁজে বের করার জন্য।

রায়হান ধীরে বলল,

— এটা আমার দায়িত্ব ছিল।

মায়া মৃদু হেসে বলল,

— শুধু দায়িত্ব?

রায়হান উত্তর দিল না।

জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

কিন্তু তার মুখের নীরবতাই যেন অনেক কিছু বলে দিল।

আর শহরের অন্য প্রান্তে—

কামরুল খবর পেল তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে।

সে রাগে টেবিলে রাখা গ্লাস ছুড়ে ফেলল।

তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,

— রায়হান মায়াকে ফিরিয়ে এনেছে?

লোকটা মাথা নিচু করে বলল,

— জি।

কামরুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে হেসে উঠল।

— ভালো।

লোকটা অবাক হয়ে তাকাল।

— ভালো?

— হ্যাঁ। এবার আমি জানি, মেয়েটা তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

কামরুল ফোনটা হাতে তুলে নিল।

— পরেরবার মায়াকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ রায়হান পাবে না।

তারপর সে একটা নম্বরে কল করল।

— দ্বিতীয় পরিকল্পনা শুরু করো।

মায়াকে উদ্ধার করার পর তিন দিন কেটে গেছে।

বাড়ির পরিবেশ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেও রায়হানের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং সে আগের চেয়ে আরও সতর্ক হয়ে গেছে।

মায়া কোথায় যাচ্ছে, কখন ফিরছে, কার সঙ্গে কথা বলছে—সবকিছুর খোঁজ রাখছে সে।

তবে এবার তার কথার মধ্যে আগের মতো শুধু রাগ নেই।

চিন্তাটাও স্পষ্ট বোঝা যায়।

সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়া বারান্দায় এসে দেখল, রায়হান ব্যায়াম করছে।

প্রতিদিনের মতোই কঠিন অনুশীলন।

মায়া কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখল।

ব্যায়াম শেষ করে রায়হান তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে তার দিকে তাকাল।

— এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

মায়া বলল,

— আপনাকে দেখছিলাম।

— কেন?

— আপনি প্রতিদিন এত ব্যায়াম করেন কীভাবে?

— অভ্যাস।

মায়া মুচকি হেসে বলল,

— আমি করলে দুই মিনিটেই ক্লান্ত হয়ে যাব।

রায়হান বলল,

— তুমি আগে শুরু করো, তারপর বুঝবে।

মায়া মাথা নাড়ল।

রায়হান ঘরে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর মায়াও তার পেছনে গেল।

টেবিলের ওপর রায়হানের সকালের খাবার রাখা।

এক গ্লাস পানি, কিছু খাবার আর সেই কাঁচা ডিম।

মায়া আবার মুখ কুঁচকে ফেলল।

রায়হান সেটা দেখে বলল,

— আবার শুরু করেছ?

— আমি এখনও বুঝি না আপনি এটা কীভাবে খান।

— তোমার দেখতে হবে না।

— কিন্তু আপনি যদি অসুস্থ হয়ে যান?

রায়হান থেমে গেল।

তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

— তুমি আমার স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করছ?

মায়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

— আপনি আমার স্বামী। চিন্তা করব না?

রায়হান কিছু বলল না।

শুধু ডিমটা নামিয়ে রাখল।

মায়া অবাক হয়ে বলল,

— কী হলো?

— আজ আর খাব না।

— কেন?

— তোমার এত আপত্তি যখন, তখন না হয় বাদ দিলাম।

মায়া হেসে ফেলল।

রায়হানও খুব হালকা হাসল।

সেদিন মায়ার কলেজ ছিল।

কিন্তু কলেজে যাওয়ার আগে রায়হান তাকে ডেকে বলল,

— আজ তোমাকে একজন গাড়ি করে দিয়ে যাবে।

— আপনি যাবেন না?

— অফিসে জরুরি কাজ আছে।

— আমি একা যেতে পারি।

— জানি।

— তাহলে?

রায়হান গম্ভীরভাবে বলল,

— জানি তুমি পারো। কিন্তু এখন থেকে কিছুদিন সাবধানে চলতে হবে।

মায়া মাথা নাড়ল।

— ঠিক আছে।

রায়হান আবার বলল,

— আর একটা কথা।

— কী?

— কোনো অপরিচিত মানুষ যদি তোমার সঙ্গে কথা বলতে আসে, উত্তর দেবে না।

— আচ্ছা।

— আর যদি কেউ বলে আমার সঙ্গে তার জরুরি কথা আছে, তবুও না।

— বুঝেছি।

মায়া বেরিয়ে গেল।

রায়হান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তার গাড়ি চলে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে রইল।

অফিসে পৌঁছেই রায়হান আরিফকে ডেকে পাঠাল।

আরিফ এসে বলল,

— স্যার?

— কামরুলের কোনো খবর?

— এখনও নিশ্চিত খবর নেই।

রায়হান টেবিলে হাত রাখল।

— তিন দিন হয়ে গেল।

— আমরা খুঁজছি।

— সে আবার আঘাত করবে।

আরিফ চুপ।

রায়হান বলল,

— এবার তার লক্ষ্য শুধু মায়া নয়। সে আমাকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে চাইছে।

— স্যার, নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

— বাড়ির আশেপাশে?

— সার্বক্ষণিক নজরদারি আছে।

রায়হান মাথা নাড়ল।

কিন্তু তার মনে শান্তি এল না।

কারণ সে জানত, কামরুল খুব সহজে থামবে না।

দুপুরে মায়া কলেজের লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিল।

হঠাৎ তার সামনে একটা কাগজ এসে পড়ল।

মায়া অবাক হয়ে কাগজটা তুলে নিল।

তাতে লেখা—

“রায়হানকে যতটা চেনো, সে তোমাকে তার অতীতের সব কথা বলেনি।”

মায়ার হাত কেঁপে উঠল।

সে চারপাশে তাকাল।

কেউ নেই।

কাগজটা নিয়ে সে সরাসরি রায়হানকে ফোন করল।

রায়হান ফোন ধরতেই মায়া বলল,

— আপনি কি আমাকে কিছু লুকাচ্ছেন?

— কী হয়েছে?

— আমার বইয়ের মধ্যে একটা কাগজ পাওয়া গেছে।

— কী লেখা?

মায়া কথাগুলো পড়ে শোনাল।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর রায়হান বলল,

— কাগজটা ফেলে দিও না।

— কেন?

— কারও হাতে দিও না। আমি লোক পাঠাচ্ছি।

মায়া একটু ভয় পেয়ে বলল,

— আপনি কি কিছু জানেন?

রায়হান শান্ত গলায় বলল,

— তোমাকে পরে সব বলব।

— এখন বলবেন না?

— ফোনে না।

কল কেটে গেল।

মায়া কাগজটা ব্যাগে রেখে দিল।

তার মনে প্রশ্ন জমতে লাগল।

রায়হানের অতীতে কী আছে?

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়া দেখল রায়হান আগেই এসেছে।

সে ড্রইংরুমে বসে ছিল।

মায়া ঘরে ঢুকতেই রায়হান বলল,

— এখানে এসো।

মায়া কাছে গেল।

রায়হান বলল,

— আজ যে কাগজ পেয়েছিলে, সেটা দাও।

মায়া ব্যাগ থেকে কাগজ বের করে দিল।

রায়হান কাগজটা দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— কামরুল এসব করছে।

— কিন্তু আমার কাছে কেন এসব লিখছে?

— তোমাকে ভয় দেখানোর জন্য।

— আপনার কোনো পুরোনো শত্রু আছে?

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— আছে।

— সে কি অনেক ভয়ংকর?

— হ্যাঁ।

মায়া নিচু স্বরে বলল,

— সে কি আবার আমাকে নিয়ে কিছু করবে?

রায়হান সরাসরি উত্তর দিল,

— চেষ্টা করবে।

মায়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

রায়হান এবার শান্ত স্বরে বলল,

— কিন্তু এবার তাকে সুযোগ দেব না।

মায়া তার দিকে তাকাল।

— আপনি এত নিশ্চিন্ত কীভাবে?

রায়হান বলল,

— কারণ এবার আমি প্রস্তুত।

রাতে মায়া ঘুমিয়ে পড়ার পর রায়হান অনেকক্ষণ জেগে ছিল।

সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল।

— বাড়ির চারপাশে নজর রাখবে।

ওপাশ থেকে উত্তর এল।

— জি স্যার।

— মায়ার কলেজেও নজর থাকবে।

— জি।

— আর কেউ যদি সন্দেহজনকভাবে কাছে আসে, আমাকে জানাবে।

ফোন রেখে রায়হান ঘরে ঢুকল।

মায়া ঘুমাচ্ছে।

রায়হান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর ধীরে কম্বলটা ঠিক করে দিল।

মায়া ঘুমের মধ্যেই বলল,

— আপনি এখনও জেগে আছেন?

রায়হান চমকে গেল।

— হ্যাঁ।

— ঘুমান।

— তুমি ঘুমাও।

মায়া চোখ না খুলেই বলল,

— আপনি সবসময় আমার জন্য এত চিন্তা করেন কেন?

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর খুব নিচু গলায় বলল,

— কারণ তুমি আমার জীবনের দায়িত্ব।

মায়া আর কিছু বলল না।

রায়হানও আলো নিভিয়ে দিল।

কিন্তু রাত শেষ হওয়ার আগেই বিপদ আবার দরজায় এসে দাঁড়াল।

বাড়ির বাইরে পাহারায় থাকা একজন পুলিশ সদস্য হঠাৎ ওয়্যারলেসে বলল,

— সন্দেহজনক একটা গাড়ি দেখা গেছে।

অন্যজন জিজ্ঞেস করল,

— কোথায়?

— বাড়ির উত্তর পাশে।

ঠিক তখনই গাড়িটা দ্রুত চলে গেল।

পুলিশ সদস্য গাড়ির নম্বর নোট করার চেষ্টা করল।

কিন্তু গাড়িটা অন্ধকারে হারিয়ে গেল।

পরদিন সকালে রায়হান সেই খবর শুনে বুঝতে পারল—

কামরুল শুধু দূর থেকে ভয় দেখাচ্ছে না।

সে তাদের বাড়ির খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।

রায়হান মায়াকে বলল,

— আজ থেকে তুমি একা কোথাও যাবে না।

মায়া এবার কোনো তর্ক করল না।

শুধু বলল,

— ঠিক আছে।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— আপনি আমার পাশে থাকবেন তো?

রায়হান তার দিকে তাকাল।

— যতক্ষণ প্রয়োজন।

মায়া মৃদু হাসল।

কিন্তু তারা কেউই জানত না—

সেই রাতেই কামরুল এমন একটা পরিকল্পনা করেছে, যা রায়হানের সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা অচল করে দিতে পারে।

পরদিন সকাল থেকেই রায়হানের মনে অদ্ভুত একটা অশান্তি।

বাড়ির চারপাশে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। মায়ার কলেজে যাতায়াতের সময়ও নজরদারি রাখা হচ্ছে। তারপরও তার মনে হচ্ছিল, কামরুল নিশ্চয়ই আরও বড় কিছু পরিকল্পনা করছে।

সকালে রায়হান যথারীতি ব্যায়াম করছিল।

মায়া বারান্দা থেকে তাকে দেখছিল।

ব্যায়াম শেষ করে রায়হান ঘরে এসে দেখল, টেবিলে নাস্তা রাখা।

মায়া বলল,

— আজ আপনার জন্য কাঁচা ডিম রাখিনি।

রায়হান ভ্রু তুলল।

— কেন?

— আপনি সেদিন বলেছিলেন আমার জন্য বাদ দিয়েছেন। তাই আজ আমি বললাম, আর খাবেন না।

রায়হান হালকা হাসল।

— তুমি তাহলে আমার খাবারও নিয়ন্ত্রণ করবে?

মায়া বলল,

— আপনি আমার এত কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। আমি একটু করতেই পারি।

রায়হান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

— সাহস বেড়ে গেছে দেখছি।

মায়া হেসে ফেলল।

— আপনার কাছেই শিখছি।

রায়হানও মৃদু হাসল।

কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ থাকল না।

তার ফোন বেজে উঠল।

— হ্যালো?

ওপাশ থেকে আরিফের গলা।

— স্যার, জরুরি খবর।

রায়হানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

— বলো।

— কামরুলের একজন সহযোগীকে আমরা ধরেছি।

— কোথায়?

— পুরোনো গুদামঘরের কাছে।

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

— আমি আসছি।

মায়া বলল,

— আবার বাইরে যাচ্ছেন?

— হ্যাঁ।

— সাবধানে যাবেন।

রায়হান দরজার কাছে গিয়ে থামল।

— তুমি আজ বাড়ি থেকে বের হবে না।

মায়া মাথা নাড়ল।

— ঠিক আছে।

রায়হান চলে গেল।

পুরোনো গুদামঘরে পৌঁছে রায়হান দেখল, একজন লোককে পুলিশ ধরে রেখেছে।

লোকটা খুব ভীত।

রায়হান সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

— কামরুল কোথায়?

লোকটা চুপ।

রায়হান কঠিন গলায় বলল,

— তোমার সামনে দুইটা রাস্তা। সত্যি বলবে, অথবা আইনের নিয়মে জিজ্ঞাসাবাদ হবে।

লোকটা নিচু গলায় বলল,

— আমি শুধু ওর নির্দেশ পালন করেছি।

— কী নির্দেশ?

— আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে।

রায়হান ভ্রু কুঁচকাল।

— কোথায়?

লোকটা একটা কাগজ বের করে দিল।

কাগজে একটা পুরোনো ভবনের ঠিকানা।

আরিফ বলল,

— স্যার, জায়গাটা শহরের পুরোনো শিল্প এলাকায়।

রায়হান কাগজটা হাতে নিয়ে বলল,

— কামরুল কি সেখানে আছে?

লোকটা মাথা নাড়ল।

— জানি না।

রায়হান বুঝল, এটা হয়তো ফাঁদ।

কিন্তু তবুও তাকে যেতে হবে।

দুপুরের দিকে মায়া বাড়িতে একা ছিল না। সালমা বেগমও ছিলেন।

মায়া নিজের ঘরে পড়ছিল।

হঠাৎ নিচতলা থেকে একটা শব্দ হলো।

মায়া দরজা খুলে বাইরে এল।

সালমা বেগম বললেন,

— মনে হয় গেটের কাছে কিছু পড়েছে।

মায়া জানালার কাছে গিয়ে দেখল, একটা ছোট বাক্স পড়ে আছে।

বাড়ির নিরাপত্তার লোক একজন সেটি তুলে আনল।

মায়া দূর থেকে তাকিয়ে ছিল।

লোকটা বাক্সটা খুলতেই ভেতরে একটা কাগজ পাওয়া গেল।

কাগজে লেখা—

“রায়হানকে একা আসতে বলো।”

মায়ার বুক কেঁপে উঠল।

রায়হানকে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।

ফোন ধরতেই বলল,

— আপনি কোথায়?

— কাজে আছি। কী হয়েছে?

মায়া সব খুলে বলল।

রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

— বাক্সটা যেখানে ছিল, সেখানেই আছে?

— না। নিরাপত্তার লোক সরিয়ে ফেলেছে।

— কেউ সেটা স্পর্শ করবে না। আমি লোক পাঠাচ্ছি।

মায়া বলল,

— আপনি কোথাও যাবেন না তো?

রায়হান উত্তর দিল,

— আমি সাবধানে আছি।

— কথা দিন।

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— কথা দিলাম।

রায়হান আরিফকে সব জানাল।

আরিফ বলল,

— স্যার, এটা স্পষ্ট ফাঁদ।

— জানি।

— তাহলে যাবেন না।

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

— কামরুল আমাকে সেখানে চায়। কিন্তু কেন?

আরিফ বলল,

— হয়তো আপনাকে ব্যস্ত রাখার জন্য।

রায়হান হঠাৎ থেমে গেল।

তার চোখে চিন্তার ছাপ।

— মায়া!

সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করল।

ফোন করল।

মায়া ধরল।

— হ্যালো?

— তুমি কোথায়?

— ঘরে।

— দরজা বন্ধ করে বসে থাকো।

— কেন?

— শুধু আমার কথা শোনো।

— ঠিক আছে।

রায়হান ফোন কাটল।

তার মনে হঠাৎ ভয় ঢুকে গেল।

যদি গুদামঘরের ঘটনাটা শুধু তাকে বাড়ি থেকে দূরে রাখার জন্য হয়ে থাকে?

কয়েক মিনিট পর বাড়ির নিরাপত্তার একজন লোক দৌড়ে রায়হানকে ফোন করল।

— স্যার!

— কী হয়েছে?

— ম্যাডামের ঘরের পাশের জানালার বাইরে একজন লোক দেখা গেছে।

রায়হানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

— মায়া কোথায়?

— ঘরে।

— তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে?

— না স্যার।

রায়হান আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।

— আমি বাড়িতে আসছি।

রায়হান বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই নিরাপত্তার লোকেরা বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলেছে।

মায়া ঘরের ভেতর বসে আছে।

তার হাত কাঁপছে।

কিছুক্ষণ পর দরজায় শব্দ হলো।

মায়া ভয় পেয়ে গেল।

— কে?

ওপাশ থেকে রায়হানের গলা।

— আমি।

মায়া দ্রুত দরজা খুলল।

রায়হান ভেতরে ঢুকেই চারপাশে তাকাল।

— তুমি ঠিক আছ?

মায়া মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ।

রায়হান বলল,

— কেউ তোমার কাছে এসেছিল?

— না।

রায়হান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

মায়া ধীরে বলল,

— আপনি এত চিন্তা করেন কেন?

রায়হান উত্তর দিল না।

তারপর হঠাৎ বলল,

— কারণ তোমাকে হারানোর ভয় আমার আছে।

মায়া চুপ হয়ে গেল।

সেদিন রাতে রায়হান বাড়ির সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজে পরীক্ষা করল।

কোথায় ক্যামেরা, কোথায় পাহারা—সবকিছু দেখে নিল।

রাত প্রায় বারোটা।

সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।

রায়হান তখনও জেগে।

মায়া ধীরে এসে বলল,

— আপনি এখনও ঘুমাননি?

— না।

— আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?

রায়হান তাকাল।

— আমি ভয় পাই না।

মায়া মৃদু হেসে বলল,

— তাহলে এত চিন্তা কেন?

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— সাহসী মানুষও প্রিয় মানুষকে নিয়ে চিন্তা করে।

মায়া আর কিছু বলল না।

সে শুধু পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

পরদিন সকালে নতুন খবর এল।

কামরুলকে শহরের এক পুরোনো বাড়িতে দেখা গেছে।

রায়হান নিজে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

কিন্তু যাওয়ার আগে মায়াকে বলল,

— আমি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাচ্ছি।

— কোথায়?

— একটা কাজ আছে।

— আবার ঝুঁকি নেবেন?

— যতটা দরকার।

মায়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

— ফিরে আসবেন তো?

রায়হান মায়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

— অবশ্যই।

পুরোনো বাড়িতে পৌঁছে রায়হান দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।

ঘরটা খালি।

হঠাৎ পেছন থেকে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল।

অন্ধকার ঘরের এক কোণ থেকে কামরুল বেরিয়ে এল।

তার মুখে ঠান্ডা হাসি।

— অনেকদিন পর, রায়হান।

রায়হানের চোখ কঠিন হয়ে গেল।

— এবার পালানোর রাস্তা নেই, কামরুল।

কামরুল হেসে বলল,

— আজ আমি পালাতে আসিনি।

— তাহলে?

কামরুল ধীরে সামনে এগিয়ে এসে বলল,

— আজ শুধু একটা কথা বলতে এসেছি।

রায়হান চুপ করে তাকিয়ে রইল।

কামরুল বলল,

— তুমি আমাকে জেলে পাঠিয়েছিলে। আমি সেটা ভুলিনি।

— তোমার অপরাধের শাস্তি পেয়েছিলে।

— কিন্তু এবার শাস্তি তুমি পাবে।

রায়হান ঠান্ডা গলায় বলল,

— আমার পরিবারকে দূরে রাখো।

কামরুল হেসে বলল,

— তোমার পরিবারই তো তোমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

রায়হানের চোখে রাগ জ্বলে উঠল।

ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

কামরুল জানালার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

— আবার দেখা হবে।

সে পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

রায়হান তার পেছনে ছুটল।

কিন্তু বাইরে এসে দেখল—

কামরুল নেই।

শুধু মাটিতে পড়ে আছে একটা ছোট কাগজ।

রায়হান সেটা তুলে নিল।

তাতে লেখা—

“পরেরবার তোমার সামনে থেকে কাউকে নিয়ে যাব না। তোমার চোখের আড়াল থেকেই নিয়ে যাব।”

রায়হানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

সে সঙ্গে সঙ্গে মায়াকে ফোন করল।

ফোন বাজছে।

কেউ ধরছে না।

রায়হানের বুকের ভেতর হঠাৎ অজানা আশঙ্কা তৈরি হলো।

সে আবার ফোন করল।

এবারও কোনো উত্তর নেই।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে, বাড়ির ভেতরে মায়ার ঘরের দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

রায়হানের ফোনে মায়ার কোনো উত্তর আসছিল না।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

প্রতিবারই শুধু রিং হয়ে যাচ্ছিল।

রায়হানের বুকের ভেতর অস্বস্তি বাড়তে লাগল।

সে গাড়ির দরজা খুলে উঠে বসল।

— আরিফ!

আরিফ দৌড়ে এল।

— জি স্যার?

— গাড়ি ঘোরাও। এখনই বাড়ি।

— স্যার, কামরুলকে?

— পরে। আগে বাড়ি।

রায়হানের গলার স্বর শুনেই আরিফ বুঝল, পরিস্থিতি গুরুতর।

গাড়ি দ্রুত ছুটল।

এদিকে বাড়িতে সালমা বেগম রান্নাঘরে ছিলেন।

হঠাৎ ওপরতলা থেকে একটা শব্দ শুনে তিনি সিঁড়ির দিকে এগোলেন।

— মায়া?

কোনো উত্তর নেই।

তিনি ধীরে ধীরে মায়ার ঘরের দিকে গেলেন।

দরজা একটু খোলা।

ভেতরে ঢুকে দেখলেন, মায়ার বই মেঝেতে পড়ে আছে।

চেয়ারটা উল্টে আছে।

জানালাটা খোলা।

সালমা বেগমের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— মায়া!

তিনি দ্রুত ঘরের বাইরে বেরিয়ে নিরাপত্তার লোকদের ডাকলেন।

কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো বাড়িতে হৈচৈ শুরু হয়ে গেল।

রায়হান বাড়িতে পৌঁছাতেই গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে ভেতরে ঢুকল।

— মায়া কোথায়?

সালমা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

— জানি না বাবা।

রায়হান সোজা মায়ার ঘরে গেল।

মেঝেতে পড়ে থাকা বইটা তুলে নিল।

তারপর জানালার দিকে তাকাল।

জানালার বাইরে মাটিতে কিছু পায়ের দাগ।

সে নিচু হয়ে দাগগুলো দেখল।

তার চোখে ভয় নয়, তীব্র রাগ।

— বাড়ির নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে?

একজন নিরাপত্তাকর্মী মাথা নিচু করে বলল,

— স্যার, আমরা কাউকে ঢুকতে দেখিনি।

রায়হান বলল,

— ক্যামেরার ফুটেজ দেখাও।

ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা হলো।

রাতের কয়েক ঘণ্টার ভিডিও সামনে এগিয়ে চলল।

একসময় দেখা গেল, বাড়ির পাশের আলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে।

আর ঠিক সেই সময় কয়েক সেকেন্ডের জন্য ক্যামেরার ছবি অন্ধকার হয়ে গেল।

আরিফ বলল,

— স্যার, কেউ ইচ্ছা করে ক্যামেরা বন্ধ করেছে।

রায়হান মাথা নাড়ল।

— মানে বাড়ির নিরাপত্তার সবকিছু আগে থেকেই জানত।

সে দাঁত চেপে বলল,

— কামরুল।

ঠিক তখনই একজন পুলিশ সদস্য দৌড়ে এসে বলল,

— স্যার, বাইরে একটা গাড়ির চাকার দাগ পাওয়া গেছে।

— নম্বর?

— দেখা যায়নি।

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর বলল,

— পুরো এলাকা ঘিরে ফেলো।

অন্যদিকে মায়ার চোখ খুলতেই সে বুঝতে পারল, সে একটা গাড়ির ভেতরে।

হাত বাঁধা নয়, কিন্তু চারপাশে দুজন লোক বসে আছে।

মায়া ভয় পেলেও শান্ত থাকার চেষ্টা করল।

— আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

সামনে বসা লোকটা বলল,

— চুপ করে বসুন।

— আমার স্বামী আপনাদের খুঁজে বের করবেন।

লোকটা মৃদু হেসে বলল,

— আমরা জানি।

মায়া বুঝল, এবারও সবকিছু পরিকল্পনা করে করা হয়েছে।

সে জানালার বাইরে তাকাল।

শহরের আলো ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা নির্জন রাস্তায় ঢুকল।

মায়ার মনে পড়ল আগেরবারের সেই জঙ্গলের বাড়ি।

সে ভাবল, এবারও কি তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?

কিন্তু গাড়ি অন্যদিকে চলে গেল।

প্রায় এক ঘণ্টা পর গাড়ি একটা পুরোনো কারখানার সামনে থামল।

মায়াকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।

সেখানে কামরুল দাঁড়িয়ে ছিল।

মায়া তাকে দেখেই বুঝতে পারল—

এটাই সেই মানুষ, যার জন্য রায়হান এতদিন চিন্তায় ছিল।

কামরুল ধীরে বলল,

— অবশেষে দেখা হলো।

মায়া চুপ।

— ভয় পাচ্ছ?

মায়া সাহস করে বলল,

— না।

কামরুল হেসে বলল,

— তোমার স্বামীও ঠিক এমন উত্তর দেয়।

মায়া বলল,

— তাকে নিয়ে আপনি যা করেছেন, তার জন্য একদিন আপনাকে আইনের কাছে জবাব দিতে হবে।

কামরুলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

— তোমার সাহস আছে।

মায়া বলল,

— আমার স্বামী আমাকে খুঁজে বের করবেন।

— আমি জানি।

কামরুল টেবিলের ওপর একটা ফোন রাখল।

— এই ফোনটা দিয়ে তাকে একটা কথা বলতে হবে।

মায়া ফোনটার দিকে তাকাল।

— কী কথা?

— বলবে তুমি নিরাপদে আছ। তারপর বলবে, সে যেন একা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আসে।

মায়া মাথা নাড়ল।

— আমি মিথ্যা বলব না।

কামরুল ঠান্ডা গলায় বলল,

— তাহলে তোমার স্বামীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাবে না।

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— ঠিক আছে। ফোন দিন।

এদিকে রায়হান ইতিমধ্যে মায়ার ফোনের অবস্থান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।

আরিফ বলল,

— স্যার, ম্যাডামের ফোনটা বাড়িতেই পড়ে আছে।

রায়হান থমকে গেল।

— তাহলে এটা পরিকল্পিত।

— জি।

— ওরা ফোন রেখে গেছে যাতে আমরা ভুল জায়গায় খুঁজি।

ঠিক তখন রায়হানের নিজের ফোন বেজে উঠল।

অপরিচিত নম্বর।

সে সঙ্গে সঙ্গে ধরল।

— হ্যালো?

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মায়ার কাঁপা গলা—

— আপনি...

রায়হানের বুক কেঁপে উঠল।

— মায়া! তুমি কোথায়?

ওপাশ থেকে মায়া কিছু বলতে যাচ্ছিল।

কিন্তু কামরুলের গলা শোনা গেল।

— শান্ত হও, রায়হান।

রায়হানের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

— কামরুল।

— এবার বুঝতে পারছ, তোমার দুর্বলতা কোথায়?

— মায়াকে ছেড়ে দাও।

— এত সহজে?

— যা চাও বলো।

কামরুল হেসে বলল,

— এবার তোমার কাছ থেকে টাকা চাই না।

— তাহলে?

— তুমি আমার বিরুদ্ধে যে পুরোনো মামলাটা চালু করেছিলে, সেটা বন্ধ করতে হবে।

রায়হান বলল,

— সেটা আমার হাতে নেই।

— তাহলে মায়াকে তুমি দেখতে পাবে না।

রায়হানের চোখে রাগ ফুটে উঠল।

— তাকে কোনো ক্ষতি করলে তোমাকে ছাড়ব না।

কামরুল হেসে বলল,

— তুমি সবসময় আইন দিয়ে কথা বলো। এবার দেখি, আইন তোমার স্ত্রীকে কত দ্রুত ফিরিয়ে আনতে পারে।

ফোন কেটে গেল।

রায়হান কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর আরিফকে বলল,

— কলটা ট্রেস করা গেছে?

— চেষ্টা করছি স্যার।

কয়েক সেকেন্ড পর আরিফের মুখ বদলে গেল।

— স্যার!

— কী?

— লোকেশন পাওয়া গেছে।

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

— কোথায়?

— পুরোনো শিল্প এলাকার একটা পরিত্যক্ত কারখানা।

রায়হান অস্ত্র প্রস্তুত করে বলল,

— দল প্রস্তুত করো।

অন্যদিকে কামরুল মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

— তোমার স্বামী আসছে।

মায়া চুপ করে রইল।

তার ভেতরে ভয় থাকলেও একটা বিশ্বাস ছিল।

রায়হান আসবে।

কামরুলের লোকেরা চারপাশে অবস্থান নিল।

কামরুল জানত, রায়হান আসবে।

আর সে এটাও জানত—

এইবার রায়হানকে ফাঁদে ফেলাই তার আসল উদ্দেশ্য।

রাত আরও গভীর হলো।

পরিত্যক্ত কারখানার বাইরে কয়েকটা গাড়ি এসে থামল।

রায়হান গাড়ি থেকে নামল।

তার সঙ্গে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা।

সে চারপাশ দেখে বলল,

— সবাই সাবধানে।

আরিফ বলল,

— স্যার, ভেতরে অনেক লোক থাকতে পারে।

— মায়া ভেতরে আছে।

রায়হানের চোখে তখন শুধু একটাই লক্ষ্য।

সে ধীরে ধীরে কারখানার ভেতরে ঢুকল।

অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল।

সামনে কামরুল দাঁড়িয়ে।

আর তার পাশে মায়া।

মায়া রায়হানকে দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না।

— আপনি এসেছেন...

রায়হান বলল,

— আমি তো বলেছিলাম, তোমাকে ফিরিয়ে আনব।

কামরুল হেসে উঠল।

— আবেগের মুহূর্তটা উপভোগ করো।

রায়হান তার দিকে তাকাল।

— এবার শেষ, কামরুল।

কামরুল ধীরে পিছিয়ে গেল।

— সেটা তুমি ঠিকই বলেছ।

হঠাৎ চারপাশের কয়েকটা দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

আরিফ চিৎকার করে বলল,

— স্যার! এটা ফাঁদ!

রায়হান বুঝে গেল।

কামরুল এতক্ষণ শুধু মায়াকে ব্যবহার করে তাকে এখানে আনতে চেয়েছিল।

আর এখন পুরো দলকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে।

রায়হান মায়ার দিকে তাকাল।

— ভয় পেয়ো না।

মায়া মাথা নাড়ল।

তারপর রায়হান পুলিশ সদস্যদের বলল,

— সবাই নিজের জায়গায় থাকো।

কারখানার ভেতর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।

আর ঠিক তখনই—

উপরে থেকে একটা বিকট শব্দ হলো।

সবাই চমকে উঠল।

রায়হান বুঝতে পারল—

কামরুলের আসল পরিকল্পনা এখনও বাকি।

কারখানার ভেতর হঠাৎ অন্ধকার নেমে এলো।

চারদিকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।

তারপর জরুরি আলো জ্বলে উঠতেই রায়হান দেখল—কামরুল আর মায়ার মাঝখানে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে গেছে।

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— সবাই নিজের জায়গায় থাকো!

আরিফ মায়ার দিকে এগোতে চাইলে একজন লোক সামনে এসে পথ আটকাল।

কামরুল দূর থেকে হেসে বলল,

— রায়হান, তুমি সবসময় ভাবো তুমি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারো। আজ সেটা হবে না।

রায়হান শান্ত গলায় বলল,

— তুমি ভুল করছ।

— কীভাবে?

— কারণ তুমি একটা জিনিস ভুলে গেছ।

কামরুল ভ্রু কুঁচকাল।

— কী?

— আমি একা আসিনি।

কামরুল চারপাশে তাকাল।

বাইরে পুলিশের গাড়ির শব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

কামরুলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

রায়হান বলল,

— তুমি যতই পরিকল্পনা করো, আইন থেকে পালানোর পথ নেই।

কামরুল রেগে গিয়ে তার লোকদের দিকে তাকাল।

— সবাই বের হওয়ার রাস্তা বন্ধ করো!

লোকগুলো নড়েচড়ে উঠল।

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে নিজের দলের দিকে ইশারা করল।

— এখন!

পুলিশ সদস্যরা দ্রুত চারদিক থেকে এগিয়ে গেল।

কারখানার ভেতর কিছুক্ষণ উত্তেজনা তৈরি হলো।

কেউ পালানোর চেষ্টা করল, কেউ আত্মসমর্পণ করল।

আরিফ একজনকে ধরে ফেলল।

রায়হান সরাসরি মায়ার দিকে এগিয়ে গেল।

— তুমি ঠিক আছ?

মায়া মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ।

— ভয় পেয়েছিলে?

মায়া ধীরে বলল,

— আপনাকে দেখে আর ভয় লাগছে না।

রায়হানের চোখে এক মুহূর্তের জন্য কোমলতা ফুটে উঠল।

কিন্তু সে কিছু বলার আগেই কামরুল পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করল।

রায়হান সেটা দেখতে পেল।

— কামরুল!

কামরুল দৌড় দিল।

রায়হান তার পেছনে ছুটল।

কারখানার পেছনে একটা সরু পথ।

কামরুল দ্রুত দৌড়াচ্ছে।

রায়হান কিছুটা দূর থেকে তাকে অনুসরণ করছে।

কামরুল হঠাৎ একটা পুরোনো গুদামের আড়ালে ঢুকে গেল।

রায়হান ধীরে ধীরে সেখানে পৌঁছাল।

— বেরিয়ে আসো।

কোনো উত্তর নেই।

রায়হান চারপাশে তাকাল।

তারপর বলল,

— আর পালানোর রাস্তা নেই।

কামরুল অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল।

— তুমি জিতেছ ভাবছ?

রায়হান বলল,

— আমি কাউকে হারাতে আসিনি। তোমার অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে এসেছি।

কামরুল তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।

— তোমার জন্য সবকিছু এত সহজ?

— না। কিন্তু আমি জানি, আইন কীভাবে কাজ করে।

কামরুল বলল,

— আমি তোমাকে ভাঙতে চেয়েছিলাম।

রায়হান চুপ করে রইল।

— তোমার স্ত্রীকে সামনে রেখে তোমাকে ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম।

রায়হানের চোখ কঠিন হয়ে গেল।

— আর সেই কারণেই তোমার অপরাধ আরও গুরুতর হয়েছে।

কামরুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— তুমি কি সত্যিই তাকে এত ভালোবাসো?

রায়হান উত্তর দিল না।

কামরুল আবার বলল,

— তাহলে আজ তুমি খুব ভয় পেয়েছিলে।

রায়হান ধীরে বলল,

— হ্যাঁ।

কামরুল অবাক হয়ে তাকাল।

রায়হান বলল,

— ভয় পেয়েছিলাম। কারণ মায়া আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই ভয় আমাকে দুর্বল করেনি।

কামরুলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

ঠিক তখন আরিফ ও অন্য পুলিশ সদস্যরা সেখানে পৌঁছে গেল।

আরিফ বলল,

— স্যার, চারপাশ ঘিরে ফেলেছি।

রায়হান মাথা নাড়ল।

কামরুল বুঝে গেল, এবার তার পালানোর আর কোনো পথ নেই।

সে ধীরে হাত তুলে আত্মসমর্পণ করল।

কিছুক্ষণ পর কামরুলকে পুলিশ গাড়িতে তোলা হলো।

রায়হান দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মায়ার কাছে ফিরে এল।

মায়া তখন গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে।

রায়হান কাছে যেতেই মায়া বলল,

— সব শেষ?

রায়হান বলল,

— আপাতত।

মায়া একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

— আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম।

রায়হান বলল,

— জানি।

— কিন্তু আপনি এসেছিলেন।

— আসব না?

মায়া মৃদু হেসে বলল,

— আপনি সবসময় এমন করেন।

— কী করি?

— রাগী গলায় কথা বলেন, কিন্তু যখন দরকার হয় তখন সবার আগে পাশে দাঁড়ান।

রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

— তোমার এতদিনে বুঝতে পেরেছ?

মায়া মাথা নাড়ল।

— একটু একটু।

রাতের দিকে তারা বাড়িতে ফিরল।

বাড়ির সবাই মায়াকে দেখে স্বস্তি পেল।

সালমা বেগম মায়াকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

— আর কোথাও যাবি না একা।

মায়া হেসে বলল,

— ঠিক আছে মা।

রায়হান পাশ থেকে বলল,

— শুধু ওকে বললে হবে না। আমাকেও বলুন।

সালমা বেগম বললেন,

— তোকে তো কেউ কোথাও যেতে বলছে না!

সবাই হেসে ফেলল।

অনেকদিন পর বাড়িতে আবার হাসির পরিবেশ ফিরল।

রাতে মায়া ঘরে বসে ছিল।

রায়হান পোশাক বদলে এসে টেবিলের পাশে বসল।

মায়া বলল,

— আপনি আজ খুব ক্লান্ত।

— হ্যাঁ।

— এতদিন ধরে আমার জন্য যে ঝামেলা হলো...

রায়হান থামিয়ে দিল।

— এসব নিয়ে আর ভাববে না।

— কিন্তু—

— মায়া।

তার গলা আগের মতো কঠিন।

মায়া চুপ হয়ে গেল।

রায়হান কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে বলল,

— তুমি একটা ভুল করেছিলে।

— কী?

— আমাকে একা রেখে ভয় পেয়েছিলে।

মায়া অবাক হয়ে তাকাল।

— সেটা কি আমার ভুল?

— হ্যাঁ।

— তাহলে কী করা উচিত ছিল?

রায়হান বলল,

— আমাকে বিশ্বাস করা উচিত ছিল।

মায়া চুপ করে গেল।

তারপর ধীরে বলল,

— আমি আপনাকে বিশ্বাস করি।

রায়হান তার দিকে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর বলল,

— তাহলে আর ভয় পেও না।

মায়া মাথা নাড়ল।

পরদিন সকালে অনেকদিন পর রায়হান স্বাভাবিকভাবে ব্যায়াম করল।

মায়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

ব্যায়াম শেষে রায়হান ঘরে এসে টেবিলে বসতেই মায়া একটা প্লেট এগিয়ে দিল।

রায়হান তাকিয়ে বলল,

— এটা কী?

— নাস্তা।

— কাঁচা ডিম নেই?

মায়া হেসে বলল,

— না।

— কেন?

— আপনি কয়েকদিন ধরে কাঁচা ডিম খাচ্ছেন না।

রায়হান বলল,

— আজ খাব।

মায়া চোখ বড় করে বলল,

— আবার?

রায়হান মৃদু হেসে বলল,

— হ্যাঁ।

মায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,

— ছি!

রায়হান হেসে ফেলল।

— এই একটা কথার জন্যই তো তোমাকে বিয়ে করেছি মনে হয়।

মায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে বলল,

— বেশি ভাবো না।

মায়া হেসে ফেলল।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হলো না।

সেদিন দুপুরে রায়হানের অফিসে একটা ফোন এল।

কামরুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার কাছ থেকে একটা পুরোনো ডায়েরি পাওয়া গেছে।

ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল—

“আমি একা নই।”

রায়হানের মুখ আবার গম্ভীর হয়ে গেল।

সে বুঝল, কামরুল হয়তো শুধু নিজের জন্য কাজ করছিল না।

তার পেছনে আরও কেউ থাকতে পারে।

রায়হান ডায়েরিটা হাতে নিয়ে ধীরে বলল,

— তাহলে আসল মানুষটা এখনও বাইরে।

আর সেই মুহূর্তে তার ফোনে একটা অচেনা মেসেজ এল—

“কামরুল ছিল শুধু শুরু।”

রায়হান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

কারণ সে জানত—

মায়াকে রক্ষা করার লড়াই শেষ হয়নি।

কামরুল গ্রেপ্তার হওয়ার পর কয়েকদিন কেটে গেছে।

বাড়ির পরিবেশ আবার আগের মতো হয়ে উঠেছে। মায়া কলেজে যাচ্ছে, পড়াশোনা করছে, বাড়ির সবার সঙ্গে গল্প করছে।

তবু রায়হানের মনে শান্তি নেই।

কামরুলের ডায়েরির সেই কথাটা বারবার মনে পড়ছে—

“আমি একা নই।”

তার ওপর অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজ—

“কামরুল ছিল শুধু শুরু।”

রায়হান বিষয়টা কাউকে জানায়নি।

বিশেষ করে মায়াকে নয়।

সে জানত, মায়া আবার ভয় পাবে।

সকালে ব্যায়াম শেষ করে রায়হান ঘরে ফিরল।

মায়া তখন টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছিল।

রায়হান বসতেই মায়া একটা প্লেট এগিয়ে দিল।

— নিন।

রায়হান প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল,

— আজ কী?

— আপনার পছন্দের খাবার।

রায়হান চারপাশে তাকিয়ে বলল,

— কাঁচা ডিম কোথায়?

মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— আজ নেই।

— কেন?

— কারণ আমি ঠিক করেছি, আপনি প্রতিদিন কাঁচা ডিম খাবেন না।

রায়হান ভ্রু কুঁচকে বলল,

— তুমি আবার আমার খাবারের তালিকা ঠিক করছ?

মায়া হেসে বলল,

— হ্যাঁ।

— খুব সাহস হয়েছে।

— আপনার কাছেই তো শিখেছি।

রায়হান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল।

মায়া অবাক হয়ে বলল,

— আপনি হাসছেন?

— না।

— আমি দেখেছি।

— ভুল দেখেছ।

মায়া হেসে বলল,

— আপনি খুব জেদি।

রায়হান বলল,

— আর তুমি খুব বেশি কথা বলতে শিখেছ।

মায়া মাথা নিচু করে হাসতে লাগল।

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কটাকে বদলে দিচ্ছিল।

সেদিন দুপুরে রায়হান অফিসে ছিল।

আরিফ একটা ফাইল নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

— স্যার, কামরুলের ব্যাপারে নতুন তথ্য পেয়েছি।

রায়হান মাথা তুলল।

— কী?

— কামরুল একা কাজ করত না।

— সেটা আমরা জানি।

— কিন্তু তার পেছনে যে লোকটা ছিল, তার নাম পাওয়া গেছে।

রায়হানের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

— কে?

আরিফ একটা কাগজ এগিয়ে দিল।

রায়হান নামটা পড়তেই থেমে গেল।

নাসির হোসেন।

কয়েক সেকেন্ড সে কিছু বলল না।

আরিফ বলল,

— স্যার, লোকটা কয়েক বছর আগে আপনার সঙ্গে কাজ করত।

রায়হান ধীরে মাথা তুলল।

— আমি জানি।

— সে এখন কোথায়?

— জানি না।

— আমরা খুঁজছি।

রায়হান কাগজটা ভাঁজ করে রাখল।

তার চোখে পুরোনো স্মৃতি ফিরে এল।

নাসির একসময় তার খুব পরিচিত একজন অফিসার ছিল।

কিন্তু কয়েক বছর আগে একটি বড় মামলায় তার নাম জড়িয়ে যায়।

প্রমাণের অভাবে বিষয়টা শেষ হয়ে গেলেও রায়হানের মনে সবসময় সন্দেহ ছিল।

হয়তো সেই মানুষটাই এখন কামরুলকে ব্যবহার করেছে।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে রায়হান দেখল, মায়া বারান্দায় বসে বই পড়ছে।

সে কাছে গিয়ে বলল,

— কী পড়ছ?

মায়া বই বন্ধ করে বলল,

— কলেজের বই।

— কাল পরীক্ষা?

— না।

— তাহলে এত মন দিয়ে পড়ছ কেন?

মায়া হেসে বলল,

— আমি ভালো ছাত্রী হতে চাই।

রায়হান বলল,

— হও।

— আপনি সাহায্য করবেন?

— যে বিষয়ে পারি।

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— একটা কথা বলব?

— বলো।

— আপনি কি এখনও আমার ওপর রাগ করেন?

রায়হান অবাক হয়ে তাকাল।

— কেন?

— আপনি সবসময় গম্ভীর থাকেন।

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— আমি তোমার ওপর রাগ করি না।

মায়া অবাক।

— তাহলে?

— আমি নিজের স্বভাবের কারণে এমন।

মায়া হেসে বলল,

— তাহলে একটু বদলান।

রায়হান বলল,

— চেষ্টা করছি।

মায়া তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

রাতের খাবারের সময় বাড়ির সবাই একসঙ্গে বসেছিল।

সালমা বেগম হঠাৎ বললেন,

— রায়হান, তোর বিয়ের পর তোকে অনেক বদলে গেছে মনে হচ্ছে।

রায়হান বলল,

— কীভাবে?

— আগে তুই কারও কথা শুনতিস না। এখন মায়া কিছু বললে অন্তত শুনিস।

মায়া লজ্জায় মাথা নিচু করল।

বাড়ির সবাই হাসল।

রায়হান মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

— ও বেশি কথা বলে বলেই শুনতে হয়।

মায়া বলল,

— আপনি না শুনলে তো আমি আরও বেশি বলব।

সবাই আবার হেসে উঠল।

রায়হানের মুখেও হাসি ফুটে উঠল।

সেই রাতেই রায়হানের ফোনে আবার একটা মেসেজ এল।

“নাসিরকে খুঁজে লাভ নেই। সে তোমার খুব কাছেই আছে।”

রায়হান সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করল।

তারপর মায়ার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল।

মায়া তখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

— কী হয়েছে?

রায়হান বলল,

— আজ থেকে দরজা ঠিকমতো বন্ধ করে ঘুমাবে।

মায়া অবাক হয়ে বলল,

— আবার কী হয়েছে?

— কিছু না।

— আপনি কিছু লুকাচ্ছেন।

রায়হান চুপ।

মায়া কাছে এসে বলল,

— আমাকে সত্যি বলুন।

রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— কামরুলের পেছনে আরও একজন ছিল।

— কে?

— নাসির।

মায়া নামটা শুনে চুপ করে গেল।

— সে কি আমাদের ক্ষতি করবে?

— জানি না।

মায়া ধীরে বলল,

— তাহলে আপনি একা সব সামলাবেন না। আমাকেও বলবেন।

রায়হান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— তুমি ভয় পাবে।

— ভয় পেলেও জানতে চাই।

রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল।

— ঠিক আছে।

পরদিন সকালে পুলিশ নাসিরের অবস্থান খুঁজে পেল।

সে শহরের বাইরে একটা পুরোনো বাড়িতে লুকিয়ে ছিল।

রায়হান নিজে দল নিয়ে সেখানে গেল।

বাড়িটা ঘিরে ফেলার পর রায়হান গম্ভীর গলায় বলল,

— নাসির! বেরিয়ে আসো!

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর দরজা খুলে নাসির বেরিয়ে এল।

রায়হান তাকে দেখে বলল,

— কেন?

নাসির হাসল।

— এত বছর পরও তুমি একই রকম আছ, রায়হান।

— আমার পরিবারকে ব্যবহার করলে কেন?

— কারণ তোমাকে হারানোর সবচেয়ে সহজ উপায় ওটাই ছিল।

— কামরুলকে তুমি ব্যবহার করেছ?

নাসির মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ।

— কেন?

নাসির বলল,

— তুমি আমাকে অপমান করেছিলে। আমার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গিয়েছিল তোমার কারণে।

রায়হান শান্তভাবে বলল,

— আমি শুধু সত্যিটা সামনে এনেছিলাম।

নাসির কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর তাকে গ্রেপ্তার করা হলো।

রায়হান বুঝল—

এবার সত্যিই সব শেষ।

বাড়িতে ফিরে মায়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

রায়হান গাড়ি থেকে নামতেই সে দৌড়ে এল।

— সব শেষ?

রায়হান মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ।

মায়ার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটল।

— এবার আর কেউ আমাকে নিয়ে যাবে না তো?

রায়হান বলল,

— না।

মায়া হেসে বলল,

— তাহলে আজ আপনি কাঁচা ডিম খেতে পারবেন।

রায়হান অবাক হয়ে বলল,

— হঠাৎ?

— এতদিন তো আমি ভয় পেতাম আপনি অসুস্থ হয়ে যাবেন। এখন আর ভয় নেই।

রায়হান হেসে ফেলল।

— তুমি সত্যিই অদ্ভুত।

মায়া বলল,

— আপনি না থাকলে আমি কী করতাম?

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর শান্ত গলায় বলল,

— আর আমি তোমাকে ছাড়া?

মায়া তার দিকে তাকিয়ে রইল।

দুজনেই কিছু বলল না।

কিন্তু দুজনেই বুঝে গেল—

তাদের সম্পর্কটা আর শুধু দায়িত্বের জায়গায় নেই।

কয়েক মাস পরে।

মায়া আগের মতো কলেজে যায়।

রায়হান এখনও সকালে উঠে ব্যায়াম করে।

তবে এখন তার সকালের একটা নতুন অভ্যাস হয়েছে।

ব্যায়াম শেষে সে রান্নাঘরে গিয়ে মায়াকে ডাকে।

— মায়া!

ভেতর থেকে উত্তর আসে,

— কী?

— নাস্তা দাও।

মায়া হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে।

— নিজে নিতে পারেন না?

রায়হান গম্ভীর মুখ করে বলে,

— না।

— এত বড় অফিসার হয়ে?

— বাড়িতে আমি শুধু তোমার স্বামী।

মায়া থেমে যায়।

তারপর মৃদু হেসে বলে,

— কাঁচা ডিম খাবেন?

রায়হান বলে,

— তুমি খাওয়ালে খাব।

মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলে,

— না, আমি দূর থেকেই দেখব।

রায়হান হেসে ফেলে।

বাড়ির সবাই তাদের দেখে হাসে।

একসময় যে মানুষটার রাগ দেখে মায়া ভয় পেত, সেই মানুষটাই এখন তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

রায়হান হয়তো এখনও রাগী।

কথা বলার সময় এখনও গম্ভীর।

সবকিছু এখনও পরিপাটি না হলে বিরক্ত হয়।

কিন্তু মায়া এখন জানে—

তার রাগের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর যত্ন।

আর রায়হানও বুঝে গেছে—

সংসার শুধু নিয়ম আর দায়িত্ব দিয়ে চলে না।

সংসার চলে বিশ্বাস, বোঝাপড়া আর একে অপরের পাশে থাকার মাধ্যমে।

সেদিন সকালে মায়া আবার কাঁচা ডিম দেখে মুখ বাঁকাল।

— ছি!

রায়হান হেসে বলল,

— এই কথাটা তুমি কোনোদিন বদলাবে না?

মায়া বলল,

— আপনি কাঁচা ডিম খাওয়া ছাড়বেন?

— না।

— তাহলে আমিও ‘ছি’ বলা ছাড়ব না।

রায়হান হেসে মাথা নাড়ল।

আর মায়া হাসতে হাসতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

 

....
👁 669