চ্যালেঞ্জ থেকে শুরু জীবনের গল্প

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন।

সকাল থেকেই পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল অন্যরকম ব্যস্ততা। নতুন শিক্ষার্থীদের ভিড়, পরিচিত হওয়ার চেষ্টা, কেউ বন্ধু বানাচ্ছে, কেউ আবার নিজের মতো করে পুরো ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখছে।

ইমন অবশ্য এসবের ধারেকাছেও নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবনের সামনে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে হাসছিল সে। ইমন ছিল বেশ বড়লোক পরিবারের ছেলে। বাবা শহরের পরিচিত ব্যবসায়ী। ছোটবেলা থেকেই কোনো কিছুর অভাব তাকে দেখতে হয়নি। দামি পোশাক, ভালো ফোন, গাড়ি—সবই তার কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার।

আর সেই কারণেই হয়তো নিজের মধ্যে একটা বাড়তি আত্মবিশ্বাস ছিল তার।

তার সঙ্গে থাকা বন্ধুরাও প্রায় একই রকম।

কেউ গল্প করছে, কেউ নতুন ছাত্রীদের নিয়ে মন্তব্য করছে, আবার কেউ ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়ে মজা করছে।

হঠাৎ ইমনের বন্ধু রাফি সামনে তাকিয়ে বলল,

—এই ইমন, ওই মেয়েটাকে দেখেছিস?

ইমন তাকিয়ে দেখল।

দূর থেকে একটা মেয়ে ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে ঢুকছে।

মেয়েটার নাম প্রীতি।

সাদামাটা একটা পোশাক, কাঁধে সাধারণ একটা ব্যাগ, চুল সুন্দর করে বাঁধা। সাজগোজ বলতে তেমন কিছুই নেই। মুখে কোনো বাড়তি অহংকারও নেই। চারপাশের মেয়েদের অনেকেই যেখানে আধুনিক পোশাকে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে প্রীতিকে দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন নিজের ছোট্ট একটা জগতের মধ্যেই আছে।

রাফি হেসে বলল,

—ভাই, মেয়েটা মনে হয় ভুল করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এসেছে!

সবাই হেসে উঠল।

ইমনও হেসে বলল,

—হয়তো গুগলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা দিয়ে দিয়েছে!

আবারও হাসির রোল উঠল।

প্রীতি কথাগুলো শুনতে পেয়েছিল।

সে একবার তাদের দিকে তাকাল।

কিন্তু কোনো কথা বলল না।

শুধু চুপচাপ মাথা নিচু করে সামনে চলে গেল।

ইমন ভেবেছিল মেয়েটা হয়তো রাগ দেখাবে কিংবা কিছু বলবে।

কিন্তু কিছুই হলো না।

রাফি বলল,

—কী ব্যাপার? ভাব দেখলি?

ইমন হেসে বলল,

—আরে থাক। প্রথম দিনেই এত ভাব!

প্রীতি ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। তার বাবা একটি সাধারণ চাকরি করতেন। সংসারে খুব বেশি স্বচ্ছলতা ছিল না, তবে মেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি কখনো আপস করেননি।

প্রীতিও ছোটবেলা থেকেই জানত, জীবনে নিজের জায়গা নিজেকেই তৈরি করতে হবে।

তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনেও সে অন্যদের মতো হৈচৈ না করে নিজের ক্লাসরুম খুঁজে নিল।

ক্লাস শুরু হওয়ার পর ইমনও এসে বসেছিল।

কিন্তু পড়াশোনার চেয়ে তার আগ্রহ ছিল বন্ধুদের সঙ্গে দুষ্টুমি করায়।

শিক্ষক বোর্ডে লিখছেন, আর পেছনের বেঞ্চে বসে ইমন আর তার বন্ধুরা ফিসফিস করে হাসছে।

প্রীতি একবার পেছনে তাকাল।

ইমন তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

প্রীতি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিল।

মেয়েটার এই আচরণ ইমনের কাছে বেশ অদ্ভুত লাগল।

সে বন্ধুদের বলল,

—মেয়েটা কথা বলে না নাকি?

রাফি বলল,

—তুই কথা বললেই তো কথা বলবে!

ইমন হেসে বলল,

—দেখিস, কয়েকদিনের মধ্যেই কথা বলবে।

প্রীতি এসব শুনেও চুপ করে রইল।

তার কাছে ইমনের এই দুষ্টুমি একদমই ভালো লাগছিল না।

দিনগুলো এভাবেই চলতে লাগল।

ইমন প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো কাণ্ড ঘটাত। কখনো বন্ধুর খাতা লুকিয়ে রাখত, কখনো ক্লাসে কাগজ ছুড়ে মারত, কখনো শিক্ষক বের হওয়ার পর পুরো ক্লাসে হৈচৈ শুরু করে দিত।

প্রীতি এসব থেকে সবসময় দূরে থাকত।

একদিন ক্লাস শেষ হওয়ার পর সবাই যখন বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ইমন একটা কাগজ গোল করে রাফির দিকে ছুড়ে মারল।

রাফি সেটা ধরে আবার ইমনের দিকে ছুড়ে দিল।

ইমন এবার আরও জোরে একটা কাগজ ছুড়ে দিল।

কিন্তু কাগজটা রাফির কাছে না গিয়ে সোজা গিয়ে লাগল প্রীতির চোখের পাশে।

—আহ!

প্রীতি সঙ্গে সঙ্গে চোখে হাত দিল।

পুরো ক্লাস এক মুহূর্তে চুপ হয়ে গেল।

ইমনের মুখের হাসিও মিলিয়ে গেল।

রাফি বলল,

—ইমন, তুই গিয়ে সরি বল।

আরেকজন বলল,

—হ্যাঁ ভাই, ভুল হয়ে গেছে। গিয়ে বল।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর বলল,

—আরে ইচ্ছা করে তো মারিনি।

রাফি বলল,

—ইচ্ছা করে মারিসনি, সেটা ঠিক। কিন্তু গিয়ে সরি বলতে সমস্যা কোথায়?

সবাই মিলে তাকে প্রায় জোর করেই প্রীতির সামনে পাঠিয়ে দিল।

ইমন অনিচ্ছাভরে প্রীতির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—সরি।

প্রীতি তার দিকে তাকাল।

চোখে তখনও একটু কষ্টের ছাপ।

কিন্তু সে কিছু বলল না।

ইমন আবার বলল,

—সত্যি বলছি, ইচ্ছা করে মারিনি।

প্রীতি ধীরে ধীরে বলল,

—ব্যাপার না।

এইটুকুই।

তারপর সে ব্যাগটা কাঁধে তুলে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল।

ইমন কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বন্ধুদের কাছে ফিরে এসে মনে মনে বলল,

‘বাহ! এত ভাব কেন মেয়েটার?’

সে জানত না, এই সাধারণ মেয়েটাই খুব শিগগির তার প্রতিদিনের চিন্তার একটা বড় অংশ হয়ে উঠবে।

কয়েকদিন কেটে গেল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশের সঙ্গে সবাই ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছিল। নতুন বন্ধু, নতুন ক্লাস, নতুন শিক্ষক—সব মিলিয়ে প্রথম বছরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ আনন্দের পরিবেশ।

তবে ইমনের জীবনটা যেন একটু অন্যরকম।

ক্লাসে ঢুকেই সে বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা শুরু করত। কখনো কারও কলম নিয়ে পালিয়ে যেত, কখনো বন্ধুর খাতায় অদ্ভুত ছবি এঁকে দিত। শিক্ষক এলেই অবশ্য চুপচাপ হয়ে যেত।

আর প্রীতি?

সে নিজের মতোই থাকত।

সময়মতো ক্লাসে আসত, মন দিয়ে পড়ত, ক্লাস শেষ হলে চুপচাপ বাসায় চলে যেত।

ইমনের সঙ্গে তার তেমন কোনো কথাই হতো না।

তবে ইমন লক্ষ্য করেছিল, প্রীতি তাকে একদম পছন্দ করে না।

সে যখন বন্ধুদের সঙ্গে দুষ্টুমি করত, প্রীতি বিরক্ত চোখে তাকাত। কখনো কখনো আবার এমনভাবে তাকাত, যেন ইমন পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর মানুষ।

একদিন ইমন রাফিকে বলল,

—এই মেয়েটা আমাকে দেখলেই এমন মুখ করে কেন?

রাফি হেসে বলল,

—কারণ তুই ওর পছন্দের মানুষ না।

—কে বলল?

—ওর মুখই তো বলে দেয়।

ইমন হেসে বলল,

—দেখিস, একদিন এই মেয়েই আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য বসে থাকবে।

রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—চ্যালেঞ্জ?

ইমন একটু থেমে গেল।

তারপর হাসল।

—চ্যালেঞ্জ।

আর এই ছোট্ট চ্যালেঞ্জটাই পরে ইমনের জীবনে অনেক বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে, সেটা তখন কেউই জানত না।

পরদিন দুপুরে সবাই ক্যান্টিনে বসে ছিল।

ইমন আর তার বন্ধুরা এক টেবিলে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। এমন সময় প্রীতি পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।

রাফি নিচু গলায় বলল,

—এই যে, তোর চ্যালেঞ্জের মানুষ যাচ্ছে।

ইমন মুচকি হাসল।

সে উঠে প্রীতির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

প্রীতি থেমে গেল।

—কিছু বলবেন?

ইমন একটু নাটকীয়ভাবে বলল,

—হ্যাঁ।

প্রীতি চুপ করে তাকিয়ে রইল।

ইমন বলল,

—সেদিনের জন্য আবারও সরি।

প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—বলেছি তো, ব্যাপার না।

—তাহলে রাগ করে আছ?

—না।

—আমার ওপর?

—না।

—তাহলে আমাকে দেখলেই মুখ এমন করে রাখেন কেন?

প্রীতি একটু অবাক হয়ে তাকাল।

—কেমন?

ইমন হেসে বলল,

—যেন আমি আপনার সবচেয়ে অপছন্দের মানুষ।

প্রীতি কিছু বলল না।

তারপর শান্ত গলায় বলল,

—আপনি সবসময় এত দুষ্টুমি করেন। আমার ভালো লাগে না।

ইমন হেসে ফেলল।

—ওহ! তাহলে আপনি আমার ব্যাপারে খেয়াল করেন!

প্রীতি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল, কথা বাড়ানো ঠিক হবে না।

সে বলল,

—আমার ক্লাস আছে।

বলেই চলে গেল।

দূর থেকে রাফি সব দেখছিল।

প্রীতি চলে যেতেই সে এসে ইমনের কাঁধে হাত রাখল।

—কী রে? প্রথম কথাতেই এত খুশি কেন?

ইমন হেসে বলল,

—চ্যালেঞ্জ শুরু হয়েছে মাত্র।

এরপর ইমন ইচ্ছে করেই প্রীতির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ খুঁজতে লাগল।

কখনো নোট চাইত।

কখনো বলত,

—এই প্রশ্নটা বুঝেছ?

প্রীতি প্রথমে বিরক্ত হলেও ধীরে ধীরে উত্তর দিতে শুরু করল।

একদিন ইমন ইচ্ছে করেই বলল,

—তুমি কি আমাকে পড়াটা বুঝিয়ে দেবে?

প্রীতি বলল,

—আপনার বন্ধুরা তো আছে।

—ওরা আমার মতোই পড়াশোনায় দুর্বল।

প্রীতি হেসে ফেলল।

ইমন সেই প্রথম প্রীতির হাসি দেখল।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে চুপ হয়ে গেল।

প্রীতি বলল,

—কী হলো?

ইমন দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

—কিছু না।

তারপর থেকে তাদের মধ্যে কথাবার্তা একটু একটু করে বাড়তে লাগল।

প্রীতি বুঝতে পারছিল, ইমন যতটা দুষ্টু মনে হয়, ততটা খারাপ নয়।

আর ইমনও বুঝতে শুরু করেছিল, প্রীতি অন্য মেয়েদের মতো নয়।

সে দামি জিনিসের প্রতি আগ্রহী নয়।

বড়লোকের ছেলে বলে ইমনকে আলাদা কোনো গুরুত্বও দেয় না।

বরং ইমন যত বেশি নিজের বড়লোক হওয়ার কথা দেখাতে চাইত, প্রীতি ততটাই স্বাভাবিকভাবে তার সঙ্গে কথা বলত।

একদিন ইমন বলল,

—তুমি কখনো আমাদের সঙ্গে আড্ডা দাও না কেন?

প্রীতি বলল,

—আপনাদের আড্ডা আমার ভালো লাগে না।

—কেন?

—সবসময় কাউকে না কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করেন।

ইমন একটু থেমে গেল।

প্রীতি আরও বলল,

—সবাইকে নিয়ে মজা করা ঠিক না।

ইমন প্রথমবারের মতো তার কথাটা মন দিয়ে শুনল।

কিন্তু বন্ধুদের সামনে গিয়ে আবার সেই পুরোনো ইমন হয়ে গেল।

রাফি তাকে বলল,

—ভাই, তোর চ্যালেঞ্জ কিন্তু অনেক দূর এগিয়েছে।

ইমন হেসে বলল,

—বন্ধুত্ব হয়ে গেছে বলতে পারিস।

রাফি বলল,

—তাহলে এবার আসল মজা শুরু।

ইমন বুঝতে পারেনি রাফি কী বলতে চাইছে।

সে জানত না, তার বন্ধুরা প্রীতিকে নিয়ে আরও বড় একটা পরিকল্পনা করছে।

আর সেই পরিকল্পনাই খুব শিগগির প্রীতির চোখে ইমনের আসল চেহারাটা তুলে ধরবে।

সেদিন বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় প্রীতি একবার পেছনে তাকাল।

দূরে দাঁড়িয়ে ইমন তার বন্ধুদের সঙ্গে হাসছিল।

প্রীতির মুখে অজান্তেই হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল।

কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল।

মনে মনে বলল,

‘এই ছেলেটাকে নিয়ে বেশি ভাবা যাবে না।’

অন্যদিকে ইমনও জানত না, তার মনের ভেতরেও ধীরে ধীরে একটা অচেনা অনুভূতি জন্ম নিতে শুরু করেছে।

তবে সে তখনও সেটাকে ভালো লাগা বলে চিনতে পারেনি।

তার কাছে প্রীতি ছিল শুধু একটা মজার চ্যালেঞ্জ।

প্রীতির সঙ্গে ইমনের বন্ধুত্বটা ধীরে ধীরে বেশ ভালোই জমে উঠেছিল।

প্রথমদিকে প্রীতি শুধু প্রয়োজনের সময় কথা বলত। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইমনের দুষ্টুমি, অদ্ভুত সব কথা আর হাসানোর চেষ্টা—এসবের সঙ্গে সে কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে গেল।

তবে প্রীতির একটা বিষয় ইমনের খুব ভালো লাগত।

মেয়েটা তাকে কখনো বড়লোকের ছেলে হিসেবে আলাদা গুরুত্ব দিত না।

ইমন নতুন গাড়ি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে অন্যরা যেখানে গাড়িটা দেখতে ছুটে আসত, প্রীতি শুধু একবার তাকিয়ে নিজের বই খুলে বসত।

ইমন একদিন বলেই ফেলল,

—তুমি জানো আমার গাড়ির দাম কত?

প্রীতি বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,

—জানার দরকার আছে?

ইমন একটু থমকে গেল।

তারপর হেসে বলল,

—না, নেই।

প্রীতি এবার তাকিয়ে মুচকি হাসল।

—তাহলে?

ইমনও হেসে ফেলল।

সে বুঝতে পারছিল না, কেন এই মেয়েটার সঙ্গে কথা বললে তার এত ভালো লাগে।

অন্যদিকে রাফিরা কিন্তু বিষয়টা অন্যভাবে দেখছিল।

একদিন ক্যান্টিনে সবাই বসে ছিল।

রাফি বলল,

—ইমন, একটা কথা বলব?

—বল।

—তুই কি সত্যিই প্রীতির সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ফেলেছিস?

—হ্যাঁ। তাতে কী?

রাফি হাসল।

—কিছু না। কিন্তু তুই তো শুরুতে বলেছিলি ওকে নিয়ে মজা করবি।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আরে, মজা তো করছি।

রাফি বলল,

—তাহলে একটা কাজ কর।

—কী?

—তোর জন্মদিনে ওকে পার্টিতে ডাক।

ইমন ভ্রু কুঁচকে বলল,

—তারপর?

রাফি মুচকি হেসে বলল,

—তারপর দেখা যাবে।

পাশ থেকে মায়া বলল,

—প্রীতি আসবে তো?

রাফি বলল,

—ইমন ডাকলে অবশ্যই আসবে।

ইমন একটু গর্বিতভাবে হাসল।

সত্যিই কি প্রীতি তার জন্য আসবে?

এই চিন্তাটা তার ভালো লাগল।

পরদিন ইমন নিজেই প্রীতিকে বলল,

—এই, তোমাকে একটা কথা বলব।

—বলুন।

—আমার জন্মদিন সামনে।

—ওহ, আগে থেকে শুভেচ্ছা।

ইমন হেসে বলল,

—শুধু শুভেচ্ছা দিলে হবে না। পার্টিতে আসতে হবে।

প্রীতি একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল।

—আমি?

—হ্যাঁ, তুমি।

—কিন্তু...

—কোনো কিন্তু না। তুমি আমার বন্ধু। তোমাকে না ডাকলে কাকে ডাকব?

প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—ঠিক আছে। আসব।

ইমনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তাহলে কিন্তু না আসলে সমস্যা হবে।

প্রীতি হেসে বলল,

—আচ্ছা।

সেদিন বাড়ি ফিরে প্রীতি অনেকক্ষণ নিজের আলমারি খুলে বসে রইল।

পার্টিতে কী পরবে, সেটা নিয়ে ভাবতে লাগল।

তার খুব বেশি পোশাক ছিল না।

শেষ পর্যন্ত মায়ের সাহায্যে একটা সুন্দর, সাদামাটা পোশাক ঠিক করল।

মা জিজ্ঞেস করলেন,

—কোথায় যাবি?

প্রীতি বলল,

—এক বন্ধুর জন্মদিন।

মা মুচকি হেসে বললেন,

—ভালো করে যাস। বেশি রাত করিস না।

প্রীতি মাথা নাড়ল।

অন্যদিকে ইমনের জন্মদিন উপলক্ষে বিশাল আয়োজন হলো।

বাড়িটা আলো দিয়ে সাজানো হলো। বন্ধুদের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করা হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীকে আমন্ত্রণ জানানো হলো।

সন্ধ্যার পর একে একে সবাই আসতে শুরু করল।

ইমন দামি পোশাক পরে সবার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করছিল।

কিন্তু তার চোখ বারবার গেটের দিকে চলে যাচ্ছিল।

হঠাৎ রাফি বলল,

—ওই যে, তোর অতিথি এসেছে।

ইমন তাকিয়ে দেখল।

প্রীতি গেট দিয়ে ঢুকছে।

সাদামাটা পোশাকে মেয়েটাকে আজ অন্যরকম সুন্দর লাগছিল।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল।

রাফি কানের কাছে এসে বলল,

—কী রে? কথা হারিয়ে ফেলেছিস?

ইমন দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।

—চুপ কর।

সে নিজেই গিয়ে প্রীতিকে ভেতরে নিয়ে এল।

—তুমি এসেছ!

প্রীতি হেসে বলল,

—তুমিই তো বলেছিলে আসতে।

—ভালো করেছ।

কিছুক্ষণ সব ঠিকঠাকই চলছিল।

প্রীতি এক কোণে বসে ছিল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর রাফি আর মায়ারা ইচ্ছে করেই তার পাশে এসে বসে নানা কথা বলতে শুরু করল।

মায়া বলল,

—প্রীতি, তুমি এই পোশাকটা কোথা থেকে কিনেছ?

প্রীতি স্বাভাবিকভাবে বলল,

—আমাদের এলাকার একটা দোকান থেকে।

মায়া মুখ চেপে হাসল।

রাফি বলল,

—বুঝতেই পারছি।

সবাই হাসতে শুরু করল।

প্রীতি অস্বস্তিতে পড়ে গেল।

একজন বলল,

—এই পার্টিতে এসে অন্তত একটু আধুনিক হতে পারতে!

আরেকজন বলল,

—ইমন, তুই সত্যিই ওকে ডেকেছিস?

চারপাশে আবার হাসির শব্দ উঠল।

প্রীতি এবার ইমনের দিকে তাকাল।

তার চোখে প্রশ্ন।

ইমন সব দেখছিল।

সে চাইলে তখনই সবাইকে থামাতে পারত।

কিন্তু সে কিছু বলল না।

বরং বন্ধুরা যখন তাকে জিজ্ঞেস করল,

—কী রে, তোর এই স্পেশাল ফ্রেন্ড কেমন লাগছে?

ইমন অস্বস্তিকর একটা হাসি দিয়ে বলল,

—ভালোই তো।

কথাটা শুনে প্রীতির মুখটা মুহূর্তেই বদলে গেল।

সে আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।

চোখে পানি চলে এল।

চুপচাপ ব্যাগটা তুলে নিল।

কেউ তাকে থামানোর আগেই সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

ইমন তখনও দাঁড়িয়ে ছিল।

প্রীতি বের হওয়ার সময় একবার পেছনে তাকাল।

ইমনের সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো।

কিন্তু প্রীতি কিছু বলল না।

শুধু চোখের পানি মুছে দ্রুত বেরিয়ে গেল।

ইমন এবার যেন হঠাৎ নিজের ভুলটা বুঝতে পারল।

তার বুকের ভেতরটা কেমন খালি খালি লাগল।

রাফি পাশে এসে বলল,

—আরে ধুর! এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে?

ইমন কোনো উত্তর দিল না।

সে গেটের দিকে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর বলল,

—তোরা ওকে নিয়ে এত মজা করলি কেন?

রাফি হেসে বলল,

—আরে মজা করেছি। তুইও তো করিস।

ইমন চুপ করে গেল।

কিন্তু আজ প্রথমবার তার নিজের কাজটাই তার কাছে খারাপ লাগল।

রাত বাড়তে লাগল।

পার্টিতে সবাই আনন্দ করলেও ইমনের মনটা আর সেখানে ছিল না।

বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল প্রীতির সেই চুপচাপ মুখটা।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়েও ঘুম এল না।

সে ফোনটা হাতে নিয়ে প্রীতির নম্বর খুলল।

একবার কল করার কথা ভাবল।

আবার থেমে গেল।

মনে হলো, কী বলবে?

‘সরি’?

এই একটা শব্দ কি যথেষ্ট?

শেষ পর্যন্ত ফোনটা পাশে রেখে চোখ বন্ধ করল।

কিন্তু যতবার চোখ বন্ধ করছিল, ততবারই মনে হচ্ছিল—

প্রীতি তাকে বিশ্বাস করেছিল।

আর সে সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারেনি।

পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ইমন প্রথমেই প্রীতিকে খুঁজল।

কিন্তু প্রীতি এল না।

ইমন ভেবেছিল হয়তো দেরি করছে।

ক্লাস শুরু হলো।

প্রীতি এল না।

দ্বিতীয় ক্লাসও শেষ হয়ে গেল।

তবুও প্রীতি এল না।

ইমনের ভেতরটা অকারণে অস্থির হয়ে উঠল।

সে জানত না, প্রীতি শুধু আজ নয়—পরের কয়েকদিনও বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে না।

প্রীতি পরপর তিন দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এল না।

প্রথম দিন ইমন ভেবেছিল, হয়তো শরীর খারাপ।

দ্বিতীয় দিনও সে নিজেকে বোঝাল, হয়তো কোনো পারিবারিক কাজ আছে।

কিন্তু তৃতীয় দিনেও যখন প্রীতিকে দেখা গেল না, তখন ইমনের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল।

ক্লাসে শিক্ষক পড়াচ্ছিলেন।

ইমন সাধারণত ক্লাসে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করত। কিন্তু আজ সে একদম চুপ।

বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।

পাশ থেকে রাফি বলল,

—কী হলো? এত চুপচাপ কেন?

ইমন বিরক্ত হয়ে বলল,

—কিছু হয়নি।

—প্রীতির কথা ভাবছিস?

ইমন এবার কোনো উত্তর দিল না।

রাফি একটু হেসে বলল,

—আরে ভাই, মেয়েটা তো এমনিতেই একটু বেশি সিরিয়াস। দুই-একদিন পর ঠিকই চলে আসবে।

ইমন বলল,

—তুই ওকে নিয়ে আর কোনো কথা বলবি না।

রাফি অবাক হয়ে তাকাল।

—কী হলো তোর?

ইমন কিছু বলল না।

সে নিজেই বুঝতে পারছিল না, তার এত খারাপ লাগছে কেন।

সেদিন ক্লাস শেষ হওয়ার পর ইমন অনেকক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকল।

হয়তো প্রীতি আসবে।

হয়তো হঠাৎ তাকে দেখতে পাওয়া যাবে।

কিন্তু না।

প্রীতি এল না।

রাতে বাড়িতে ফিরেও ইমনের মন খারাপ হয়ে রইল।

তার ফোনে প্রীতির নম্বর ছিল।

অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার পর সে অবশেষে মেসেজ লিখল—

‘কেমন আছ?’

কিছুক্ষণ পর আবার মেসেজটা মুছে দিল।

আবার লিখল—

‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছ না কেন?’

সেটাও পাঠাতে পারল না।

শেষে শুধু লিখল—

‘সরি।’

অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে সেটাও মুছে দিল।

নিজের ওপরই রাগ হলো।

‘আমি কেন এত ভাবছি?’

সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, প্রীতি শুধু তার বন্ধু।

কিন্তু মনের ভেতর থেকে অন্য একটা উত্তর আসছিল।

‘শুধু বন্ধু?’

ইমন বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করল।

প্রীতির হাসি মনে পড়ল।

ক্লাসে তার চুপচাপ বসে থাকা মনে পড়ল।

তারপর জন্মদিনের সেই রাত।

সবশেষে মনে পড়ল, বেরিয়ে যাওয়ার আগে প্রীতি যেভাবে তার দিকে তাকিয়েছিল।

ইমনের বুকের ভেতরটা ভার হয়ে গেল।

অন্যদিকে প্রীতি বাড়িতে নিজের ঘরে বসে ছিল।

জন্মদিনের রাতের ঘটনাটা সে কাউকে বলেনি।

মাকে শুধু বলেছিল,

—আজ একটু মাথা ধরেছে।

মা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলেন, কোনো একটা সমস্যা হয়েছে।

কিন্তু জোর করে কিছু জানতে চাননি।

প্রীতি নিজের বই খুলে বসেছিল।

কিন্তু পড়ায় মন বসছিল না।

বারবার মনে হচ্ছিল, ইমন অন্তত একবার তাকে থামাতে পারত।

একবার বলতে পারত,

‘ওরা যা বলছে, সেটা ভুল।’

কিন্তু ইমন কিছু বলেনি।

এই ব্যাপারটাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিল।

পরদিন রাতে প্রীতি বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

আকাশে মেঘ ছিল।

হালকা বাতাস বইছিল।

সে একটা বই হাতে নিয়ে বারান্দার আলোয় দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করল।

হঠাৎ নিচ থেকে কেউ ডাকল,

—প্রীতি!

প্রীতি চমকে উঠল।

সে নিচে তাকাল।

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ইমন।

প্রীতি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

ইমন হাত তুলে বলল,

—একটু কথা বলবে?

প্রীতি কোনো উত্তর দিল না।

ইমন বলল,

—সেদিনের জন্য সরি।

প্রীতি চুপ।

—আমি জানি, আমার ভুল হয়েছে।

তবুও কোনো উত্তর এল না।

ইমন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

—তুমি আমার ওপর রাগ করতেই পারো। কিন্তু একটা কথা বলতে এসেছি। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।

প্রীতি এবারও কিছু বলল না।

তারপর ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে চলে গেল।

জানালার পর্দা টেনে দিল।

ইমন নিচে দাঁড়িয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর প্রীতির মনে হলো, ছেলেটা চলে গেছে।

কিন্তু কয়েক মিনিট পর সে আবার জানালার পর্দা সরিয়ে তাকাল।

ইমন তখনও নিচে দাঁড়িয়ে।

প্রীতি অবাক হলো।

‘এখনও যায়নি?’

আরও কিছুক্ষণ পর আবার তাকাল।

ইমন এবার রাস্তার এক পাশে বসে আছে।

প্রীতি নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।

ছেলেটা সত্যিই অদ্ভুত।

কিছুক্ষণ পর ইমন উঠে দাঁড়াল।

হঠাৎ পাশের গলি থেকে কয়েকটা কুকুর দৌড়ে বেরিয়ে এল।

ইমন ভয় পেয়ে দৌড় দিল।

কুকুরগুলোও তার পেছনে দৌড়াতে লাগল।

প্রীতি জানালা দিয়ে দৃশ্যটা দেখে মুখ চেপে হাসতে লাগল।

ইমন দৌড়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়াল।

তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে রাস্তার পাশে ফিরে এল।

সে আবার প্রীতিদের বাড়ির দিকে তাকাল।

উপরে জানালার আড়াল থেকে প্রীতি তখনও তাকিয়ে ছিল।

ইমন তাকে দেখতে পায়নি।

কিছুক্ষণ পর আকাশ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করল।

ইমন ভাবল, এবার হয়তো তাকে চলে যেতে হবে।

কিন্তু সে গেল না।

প্রীতি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, ইমন এখনও নিচে দাঁড়িয়ে।

বৃষ্টি একটু একটু করে বাড়তে লাগল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ইমনের চুল আর জামাকাপড় ভিজে গেল।

প্রীতি অস্থির হয়ে উঠল।

সে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

—এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

ইমন মাথা তুলে তাকাল।

তারপর মুচকি হাসল।

—তুমি কথা বলেছ!

প্রীতি বিরক্ত হয়ে বলল,

—বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকলে অসুস্থ হয়ে যাবে।

—তুমি আমাকে মাফ করবে?

প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

ইমন বলল,

—আমি সত্যিই দুঃখিত।

তারপর হঠাৎ দুই হাত দিয়ে কান ধরে উঠবস করতে শুরু করল।

প্রীতি অবাক হয়ে বলল,

—এগুলো কী করছ?

ইমন বলল,

—শাস্তি নিচ্ছি।

প্রীতি এবার আর হাসি আটকাতে পারল না।

সে দ্রুত নিচে নেমে এল।

দরজা খুলে বলল,

—ভেতরে আসুন।

ইমন অবাক হয়ে তাকাল।

—সত্যি?

—বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকলে তো আরও অসুস্থ হবেন। আসুন।

ইমন ভেতরে ঢুকতেই প্রীতির মা অবাক হয়ে তাকালেন।

—কে বাবা?

প্রীতি একটু ইতস্তত করে বলল,

—আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু।

মা মিষ্টি হেসে বললেন,

—ওহ, তাই নাকি! ভিজে একেবারে শেষ হয়ে গেছ। বসো বাবা, আমি তোয়ালে নিয়ে আসছি।

ইমন অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

—না আন্টি, আমি একটু পরেই চলে যাব।

—এই বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাবে? বসো।

প্রীতির মা তোয়ালে এনে দিলেন।

প্রীতি দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

কিছুক্ষণ পর তার মা রান্নাঘর থেকে চা বানিয়ে আনলেন।

—এই নাও বাবা, গরম চা খাও।

ইমন কাপটা হাতে নিয়ে বলল,

—ধন্যবাদ আন্টি।

প্রীতির মা হেসে বললেন,

—বন্ধুর বাড়িতে এসেছ, এত ধন্যবাদ দিতে হয় না।

ইমন চুপ করে চা খেতে লাগল।

তার চোখ বারবার প্রীতির দিকে যাচ্ছিল।

প্রীতিও মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল।

তাদের চোখাচোখি হলেই দুজনেই অন্যদিকে তাকিয়ে নিচ্ছিল।

বৃষ্টি থামতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল।

শেষে ইমন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—আন্টি, এখন যাই।

প্রীতির মা বললেন,

—ঠিক আছে বাবা। সাবধানে যেও।

ইমন দরজার কাছে এসে প্রীতির দিকে তাকাল।

—তাহলে... রাগ নেই?

প্রীতি মৃদু গলায় বলল,

—না।

ইমনের মুখে হাসি ফুটল।

সে বাইরে বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার পর প্রীতি কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর নিজের অজান্তেই হাসল।

আর সেদিন রাতেই দুজনের সম্পর্কের মধ্যে এমন একটা পরিবর্তন হলো, যার নাম তখনও কেউ জানত না।

বন্ধুত্বের আড়ালে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল এক নতুন অনুভূতি।

পরের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ইমন প্রথমেই প্রীতিকে খুঁজল।

গেট দিয়ে ঢুকেই তার চোখ এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগল। কয়েক মিনিট পর দূরে প্রীতিকে দেখা গেল। কাঁধে ব্যাগ, হাতে কয়েকটা বই। প্রতিদিনের মতোই শান্তভাবে হাঁটছিল সে।

ইমন একটু দ্রুত পায়ে তার কাছে গিয়ে বলল,

—এই যে!

প্রীতি থেমে তাকাল।

—কী?

—গতকাল ঠিকমতো ঘুম হয়েছে?

প্রীতি অবাক হয়ে বলল,

—হ্যাঁ। কেন?

—না, এত রাতে বৃষ্টিতে আমাকে বাড়িতে ঢুকিয়ে দিলে। তোমার ঘুম নষ্ট হয়নি তো?

প্রীতি মুচকি হেসে বলল,

—আপনিই তো বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ইমন হেসে বলল,

—তুমি না ডাকলে হয়তো আরও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম।

প্রীতি ভ্রু কুঁচকে বলল,

—এমন বোকামি আর করবেন না।

—কেন?

—অসুস্থ হয়ে গেলে?

ইমন একটু চুপ করে থেকে বলল,

—তুমি তাহলে আমার জন্য চিন্তা করো?

প্রীতি সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে তাকাল।

—আমি সবার জন্যই চিন্তা করি।

ইমন হেসে ফেলল।

—আচ্ছা, তাই নাকি?

প্রীতি আর কথা না বাড়িয়ে সামনে হাঁটতে লাগল।

ইমনও তার পাশে হাঁটতে শুরু করল।

সেদিন থেকেই তাদের সম্পর্কটা যেন অন্যরকম হয়ে গেল।

আগের মতো শুধু প্রয়োজনের কথা নয়, এখন তারা নিজেদের নানা কথা বলতে শুরু করল।

প্রীতি তার পরিবারের কথা বলত।

বাবা কীভাবে প্রতিদিন সকালে অফিসে যান, মা কীভাবে সংসার সামলান, ছোটবেলা থেকে কীভাবে সে নিজের প্রয়োজনের চেয়ে পরিবারের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে—এসব গল্প ইমন মন দিয়ে শুনত।

একদিন ইমন জিজ্ঞেস করল,

—তোমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী?

প্রীতি একটু ভেবে বলল,

—নিজের পায়ে দাঁড়ানো।

—শুধু এটুকুই?

—আর কী চাই?

—অনেক টাকা, গাড়ি, বড় বাড়ি?

প্রীতি হেসে মাথা নাড়ল।

—এসব থাকলে ভালো। কিন্তু এগুলোই জীবনের সব না।

ইমন চুপ করে গেল।

তার নিজের জীবনটা হঠাৎ মনে পড়ল।

ছোটবেলা থেকে সে যা চেয়েছে, তাই পেয়েছে।

কখনো তাকে টাকার মূল্য বুঝতে হয়নি।

কখনো তাকে ভাবতে হয়নি, মাসের শেষে সংসারে কীভাবে খরচ চলবে।

প্রীতির জীবনটা তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

তবু মেয়েটা কত সহজভাবে হাসতে পারে!

এই ব্যাপারটাই ইমনের ভালো লাগত।

ধীরে ধীরে ইমনও নিজের কিছু কথা প্রীতিকে বলতে শুরু করল।

তার বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক, বাবার কঠোরতা, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনিশ্চয়তা—সব।

প্রীতি অবাক হয়ে বুঝতে পারল, ইমন শুধু দুষ্টু ছেলে নয়।

তার ভেতরেও অনেক চিন্তা আছে।

একদিন লাইব্রেরিতে পাশাপাশি বসে পড়ছিল তারা।

ইমন বই খুলে বসেছিল ঠিকই, কিন্তু তার চোখ বইয়ে ছিল না।

প্রীতি কিছুক্ষণ পর বলল,

—কী দেখছেন?

ইমন চমকে উঠল।

—কোথায়?

—আমার দিকে।

—আমি?

—হ্যাঁ।

ইমন হেসে বলল,

—তুমি এত সুন্দর করে পড়ো, তাই দেখছিলাম।

প্রীতি লজ্জা পেয়ে বইয়ের দিকে তাকাল।

—আপনি সবসময় এমন কথা বলেন কেন?

—কেমন কথা?

—যে কথার কোনো দরকার নেই।

ইমন মৃদু হেসে বলল,

—আমার দরকার আছে।

প্রীতি আর কিছু বলল না।

তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠেছিল।

কিন্তু সে নিজেকে বোঝাল, ইমন হয়তো মজা করছে।

এদিকে রাফি আর মায়ারা লক্ষ্য করছিল, ইমন সত্যিই বদলে যাচ্ছে।

একদিন রাফি বলল,

—ভাই, তোর কী হয়েছে?

—কী হয়েছে?

—আগের মতো আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিস না।

ইমন হেসে বলল,

—ক্লাস থাকে।

—ক্লাস তো আগেও ছিল।

ইমন কিছু বলল না।

রাফি মুচকি হেসে বলল,

—বুঝেছি।

ইমন তাকাল।

—কী বুঝেছিস?

—তুই প্রেমে পড়েছিস।

ইমন সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—ধুর! এসব কিছু না।

—তাহলে প্রীতিকে দেখলেই তোর মুখে হাসি আসে কেন?

ইমন উত্তর দিতে পারল না।

সেদিন রাতে নিজের ঘরে বসে সে অনেকক্ষণ ভাবল।

সত্যিই কি সে প্রীতিকে পছন্দ করতে শুরু করেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও জানত না।

শুধু জানত, প্রীতি কয়েকদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে না এলে তার মন খারাপ হয়।

প্রীতি অন্য কারও সঙ্গে বেশি কথা বললে তার অদ্ভুত লাগে।

প্রীতি হাসলে তার ভালো লাগে।

আর প্রীতি কষ্ট পেলে তার নিজেরও কষ্ট হয়।

তবুও সে নিজের অনুভূতিকে ভালোবাসা বলে মানতে পারছিল না।

দিনগুলো এভাবেই চলতে লাগল।

একদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে বসে ছিল প্রীতি।

ইমন এসে পাশে বসল।

—কী করছ?

—কিছু না।

—চুপচাপ বসে আছ কেন?

—বাড়ির কথা মনে পড়ছে।

—কিছু হয়েছে?

প্রীতি মাথা নাড়ল।

—না। বাবা বলছিলেন, আমার পড়াশোনা শেষ হলে যেন দ্রুত চাকরি করি। সংসারের অবস্থা তো জানোই।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তুমি চাইলে আমি তোমাকে একটা চাকরি খুঁজে দিতে পারি।

প্রীতি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

—না।

—কেন?

—নিজের যোগ্যতায় চাকরি পেতে চাই।

ইমন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।

—তুমি সত্যিই আলাদা।

প্রীতি মৃদু হেসে বলল,

—সবাই তো আর তোমার মতো বড়লোক না।

ইমন একটু হাসল।

—আমি বড়লোক বলে কি মানুষ না?

প্রীতি তাকিয়ে বলল,

—আমি সেটা বলিনি।

—তাহলে?

—আপনি মাঝে মাঝে খুব ভালো।

ইমন হেসে বলল,

—মাঝে মাঝে?

—হ্যাঁ।

—বাকি সময়?

প্রীতি হেসে বলল,

—বিরক্তিকর।

দুজনেই হেসে উঠল।

সেদিন বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় ইমন প্রথমবার বুঝল, প্রীতির সঙ্গে কাটানো সময়গুলো তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

তারপর কয়েক মাস কেটে গেল।

ইমন ও প্রীতির বন্ধুত্ব আরও গভীর হলো।

ইমন এখন আর প্রীতিকে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মজা করত না।

বরং কেউ প্রীতিকে নিয়ে কিছু বললে সে সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দিত।

একদিন মায়া মজা করে বলল,

—ইমন, প্রীতির জন্য এত চিন্তা করিস কেন?

ইমন হেসে বলল,

—কারণ ও আমার বন্ধু।

মায়া বলল,

—শুধু বন্ধু?

ইমন উত্তর দিল না।

তার চোখ তখন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রীতির দিকে।

প্রীতি তখন কারও সঙ্গে কথা বলছিল।

ইমন বুঝতে পারল, তার মনটা যেন অজান্তেই মেয়েটার দিকে টেনে যাচ্ছে।

সে ধীরে ধীরে নিজের মনকে প্রশ্ন করল—

‘প্রীতি কি সত্যিই শুধু আমার বন্ধু?’

কিন্তু উত্তর আসার আগেই প্রীতি দূর থেকে তাকে দেখে হাসল।

আর সেই একটুখানি হাসিতেই ইমনের সব প্রশ্ন যেন আরও জটিল হয়ে গেল।

সে তখনও জানত না, খুব শিগগিরই তার জীবনে এমন একটা সময় আসবে, যখন বন্ধুত্বের এই সম্পর্ককে আর বন্ধুত্ব বলে লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

কারণ তার মন ইতিমধ্যেই প্রীতিকে নিজের করে ভাবতে শুরু করেছে।

সময় যেন খুব দ্রুত কেটে যাচ্ছিল।

ইমন আর প্রীতির বন্ধুত্ব এখন পুরো বিশ্ববিদ্যালয়েই পরিচিত হয়ে গেছে। দুজনকে প্রায়ই একসঙ্গে দেখা যেত—কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো ক্যান্টিনে, আবার কখনো ক্লাস শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে বসে গল্প করতে।

তবে তাদের সম্পর্কের মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ছিল।

ইমন মুখে কিছু না বললেও প্রীতির প্রতি তার যত্ন দিন দিন বাড়ছিল।

প্রীতি কখনো ক্লাসে না এলে ইমন অস্থির হয়ে উঠত।

কখনো প্রীতির মাথা ব্যথা করলে সে সঙ্গে সঙ্গে পানি এনে দিত।

আবার প্রীতি কোনো বিষয়ে মন খারাপ করে চুপ করে থাকলে ইমন নানা রকম কথা বলে তাকে হাসানোর চেষ্টা করত।

একদিন দুপুরে প্রীতি লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিল।

ইমন এসে তার সামনে একটা ছোট প্যাকেট রাখল।

প্রীতি অবাক হয়ে বলল,

—এটা কী?

—খোলো।

প্রীতি প্যাকেট খুলে দেখল একটা সুন্দর কলম।

—আমার জন্য?

—হ্যাঁ।

—কেন?

ইমন হেসে বলল,

—তোমার কলমটা কাল ক্লাসে শেষ হয়ে গিয়েছিল।

প্রীতি অবাক হয়ে তাকাল।

—তুমি মনে রেখেছ?

—সব কথা কি ভুলে যাই?

প্রীতির মুখে মৃদু হাসি ফুটল।

—ধন্যবাদ।

ইমন বলল,

—এত ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই।

প্রীতি কলমটা হাতে নিয়ে বলল,

—আমি এটা যত্ন করে রাখব।

এই কথাটা শুনে ইমনের বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ভালো লাগল।

কিন্তু সে কিছু বলল না।

এদিকে তাদের বন্ধুত্ব নিয়ে রাফিরা প্রায়ই ইমনকে খেপাত।

একদিন রাফি বলল,

—ভাই, আর কতদিন?

—কিসের?

—প্রীতিকে কবে বলবি?

ইমন চুপ করে গেল।

—কী বলব?

রাফি হেসে বলল,

—যেটা তোর চোখ প্রতিদিন বলে।

ইমন বিরক্ত হয়ে বলল,

—চুপ কর।

—তুই ওকে ভালোবাসিস।

ইমন এবার আর প্রতিবাদ করল না।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—হয়তো।

রাফি অবাক হয়ে তাকাল।

—হয়তো?

ইমন ধীরে বলল,

—আমি জানি না। কিন্তু ওকে ছাড়া এখন বিশ্ববিদ্যালয়টা কেমন ফাঁকা লাগে।

রাফি হাসল।

—এটাই তো ভালোবাসা।

ইমন সেদিন প্রথমবার নিজের কাছে স্বীকার করল—

হ্যাঁ, সে প্রীতিকে ভালোবেসে ফেলেছে।

কিন্তু প্রীতিকে বলার সাহস তার হচ্ছিল না।

সে ভয় পাচ্ছিল, প্রীতি যদি তাকে প্রত্যাখ্যান করে?

যদি তাদের বন্ধুত্বটাই শেষ হয়ে যায়?

এই ভয়েই সে চুপ করে থাকল।

অন্যদিকে প্রীতির মনেও পরিবর্তন আসছিল।

ইমন যখন অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বলত, তার ভেতরে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হতো।

সে নিজেকে বোঝাত,

‘ইমন তো আমার বন্ধু। ও যার সঙ্গে ইচ্ছা কথা বলতেই পারে।’

কিন্তু তবুও মনটা মানত না।

একদিন মায়া এসে ইমনের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলছিল।

প্রীতি দূর থেকে বিষয়টা দেখছিল।

কিছুক্ষণ পর সে চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল।

ইমন বিষয়টা খেয়াল করল।

সে মায়াকে বলল,

—একটু দাঁড়াও।

তারপর প্রীতির পেছনে হাঁটতে শুরু করল।

—প্রীতি!

প্রীতি থামল না।

ইমন কাছে গিয়ে বলল,

—কী হয়েছে?

—কিছু হয়নি।

—তাহলে চলে যাচ্ছ কেন?

—আমার কাজ আছে।

ইমন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মুচকি হেসে বলল,

—তুমি কি রাগ করেছ?

—না।

—নিশ্চিত?

—হ্যাঁ।

ইমন বলল,

—তাহলে আমার দিকে তাকাচ্ছ না কেন?

প্রীতি এবার তাকাল।

—আমি কেন আপনার দিকে তাকিয়ে থাকব?

ইমন হেসে বলল,

—কারণ আমি তোমার বন্ধু।

প্রীতি মুখ ফিরিয়ে নিল।

ইমন বুঝতে পারল, মেয়েটা সত্যিই রাগ করেছে।

সে বলল,

—মায়ার সঙ্গে শুধু একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম।

—আমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে না।

—আমি দিতে চাই।

প্রীতি এবার চুপ করে গেল।

ইমন একটু নরম গলায় বলল,

—তুমি রাগ করলে আমার ভালো লাগে না।

প্রীতির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে কিছু বলতে পারল না।

তারপর ধীরে বলল,

—আমি রাগ করিনি।

ইমন মুচকি হাসল।

—ঠিক আছে। কিন্তু তোমার মুখ অন্য কথা বলছে।

প্রীতি এবার হেসে ফেলল।

দুজন আবার পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

সেদিন সন্ধ্যায় ইমন সিদ্ধান্ত নিল, সে আর বেশি দেরি করবে না।

সে প্রীতিকে নিজের মনের কথা বলবে।

কিন্তু ঠিক তখনই তার জীবনে একটা নতুন সমস্যা এসে হাজির হলো।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার পথে।

সবাই ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

কেউ চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করছে।

ইমনও বাবার সঙ্গে কথা বলে চাকরির প্রস্তুতি শুরু করল।

তার বাবা বললেন,

—তুই এবার নিজের জীবনটা গুছিয়ে নে। পড়াশোনা শেষ হলে ভালো একটা চাকরিতে ঢুকতে হবে।

ইমন মাথা নাড়ল।

তার মনে তখন অন্য একটা কথাও ঘুরছিল।

সে প্রীতিকে নিজের জীবনে স্থায়ীভাবে চাই।

কিন্তু তার আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।

অন্যদিকে প্রীতিও চাকরির জন্য আবেদন করতে শুরু করল।

একদিন সে ইমনকে বলল,

—আমি একটা স্কুলে চাকরির জন্য আবেদন করেছি।

ইমন খুশি হয়ে বলল,

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তুমি নিশ্চয়ই পাবে।

প্রীতি হেসে বলল,

—এতটা নিশ্চিত কীভাবে?

—কারণ তুমি পরিশ্রমী।

প্রীতি মৃদু হেসে বলল,

—তুমি সবসময় আমাকে এত বিশ্বাস করো কেন?

ইমন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—কারণ তোমাকে আমি অন্য সবার থেকে আলাদা মনে করি।

প্রীতি চুপ করে গেল।

ইমনও আর কিছু বলল না।

দুজনেই নিজেদের মনের কথাটা লুকিয়ে রাখল।

কয়েকদিন পর ইমনের চাকরি হয়ে গেল।

সে শহরের একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেল।

খবরটা প্রথমে সে প্রীতিকেই জানাল।

ফোনে বলল,

—প্রীতি, আমার চাকরি হয়ে গেছে!

ওপাশ থেকে প্রীতির কণ্ঠে সত্যিকারের আনন্দ শোনা গেল।

—সত্যি? অভিনন্দন!

—তুমি খুশি হয়েছ?

—অনেক।

ইমন হেসে বলল,

—তাহলে একটা কথা বলি?

—বল।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তুমি আমার জীবনে থাকলে আমি আরও অনেক কিছু করতে পারব।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

প্রীতির গলা খুব আস্তে শোনা গেল,

—আমি থাকব।

ইমন অবাক হয়ে গেল।

—সত্যি?

প্রীতি বুঝতে পেরে দ্রুত বলল,

—মানে... বন্ধু হিসেবে।

ইমন মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ, বুঝেছি।

ফোন রেখে দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

কারও মুখে ভালোবাসার কথা বলা হয়নি।

কিন্তু দুজনের মনই তখন উত্তরটা জেনে গিয়েছিল।

তাদের বন্ধুত্ব আর আগের জায়গায় নেই।

এখন সেখানে ভালোবাসার রঙ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আর খুব শিগগিরই ইমন সেই কথাটা প্রীতিকে সরাসরি বলতে চলেছে।

ইমনের চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর জীবনটা যেন একটু বদলে গেল।

আগের মতো সারাদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে আড্ডা দেওয়া, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো—এসব আর সম্ভব হচ্ছিল না।

সকালবেলা অফিস।

সারাদিন কাজ।

সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা।

তারপরও দিনের সবচেয়ে অপেক্ষার সময় ছিল প্রীতির সঙ্গে কথা বলা।

অফিস থেকে বের হওয়ার পর প্রায় প্রতিদিনই সে প্রীতিকে ফোন করত।

—কী করছ?

প্রীতি বলত,

—পড়ছি।

—আমাকে ছাড়া?

—তুমি তো অফিসে।

—তাই বলে আমাকে ছাড়া পড়বে?

প্রীতি হেসে বলত,

—আপনি এখন অনেক বড় চাকরিজীবী হয়েছেন। আমার মতো সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় কোথায়?

ইমন সঙ্গে সঙ্গে বলত,

—এই কথাটা আর একবার বলবে না।

—কোনটা?

—সাধারণ মানুষ।

—কেন?

—তুমি আমার কাছে কোনোদিন সাধারণ ছিলে না।

প্রীতি তখন চুপ করে যেত।

ইমনও আর কথা বাড়াত না।

তাদের মধ্যে ভালোবাসা ছিল, কিন্তু সেই ভালোবাসার কথা দুজনেই মুখে আনছিল না।

একদিন ইমন অফিস থেকে ফেরার পথে প্রীতির সঙ্গে দেখা করতে গেল।

প্রীতি তখন একটা স্কুল থেকে বের হচ্ছিল।

হাতে কিছু কাগজ।

ইমন গাড়ি থামিয়ে বলল,

—এই যে ম্যাডাম!

প্রীতি অবাক হয়ে তাকাল।

—আপনি এখানে?

—তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।

প্রীতি একটু হাসল।

—কাজ ছিল না?

—ছিল।

—তাহলে?

—কাজের চেয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করা বেশি জরুরি মনে হলো।

প্রীতি কিছু বলল না।

ইমন তার হাতে থাকা কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,

—চাকরির কী খবর?

প্রীতির মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।

—হয়নি।

—কোথাও?

—দুই জায়গা থেকে উত্তরই দেয়নি।

ইমন বলল,

—হতাশ হয়ো না। তুমি অবশ্যই পাবে।

প্রীতি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—বাবার ওপর চাপ বাড়ছে। আমি যদি একটা চাকরি করতে পারতাম, সংসারে একটু সাহায্য করতে পারতাম।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আমি একটা কথা বলব?

—বলুন।

—আমার পরিচিত একটা প্রতিষ্ঠানে লোক নিচ্ছে। চাইলে তোমার সিভিটা আমি দিতে পারি।

প্রীতি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

—না।

—কেন?

—আমি চাই নিজের যোগ্যতায় চাকরি পেতে।

—তুমি যদি যোগ্য হও, তাহলে আমার সাহায্যে কী সমস্যা?

প্রীতি নরম গলায় বলল,

—সমস্যা আছে। আমি চাই না কেউ বলুক, ইমন আমাকে চাকরি পাইয়ে দিয়েছে।

ইমন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মুচকি হেসে বলল,

—তুমি সত্যিই জেদি।

প্রীতি বলল,

—হ্যাঁ।

—ঠিক আছে। আমি আর বলব না।

তারপর দুজন পাশাপাশি কিছুক্ষণ হাঁটল।

রাস্তার পাশে একটা ছোট দোকান দেখে ইমন বলল,

—চা খাবে?

প্রীতি হেসে বলল,

—আপনি তো বড়লোক। রাস্তার পাশের চা খাবেন?

ইমন বলল,

—তোমার সঙ্গে হলে সব জায়গার চা ভালো লাগে।

প্রীতি এবার আর কিছু বলতে পারল না।

দুজন চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে চা খেল।

ইমন মুগ্ধ হয়ে প্রীতির দিকে তাকিয়ে ছিল।

প্রীতি বলল,

—এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?

—ভাবছি।

—কী?

—কীভাবে এত সহজ একটা মানুষ এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল।

প্রীতি মাথা নিচু করল।

তার গাল লাল হয়ে উঠেছিল।

সেদিন রাতে ইমন সিদ্ধান্ত নিল, এবার আর অপেক্ষা করা যাবে না।

সে প্রীতিকে নিজের মনের কথা বলবে।

পরদিন ছুটির দিনে ইমন প্রীতিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো মাঠে ডাকল।

প্রীতি এসে দেখল, ইমন একা দাঁড়িয়ে আছে।

—এখানে ডাকলেন কেন?

ইমন বলল,

—একটা কথা বলব।

—কী কথা?

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তুমি কি মনে করতে পারো, আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল যেদিন?

প্রীতি হেসে বলল,

—মনে আছে।

—সেদিন তোমাকে নিয়ে আমি আর আমার বন্ধুরা মজা করেছিলাম।

প্রীতি মাথা নিচু করল।

—হ্যাঁ।

—তখন আমি তোমাকে একদম বুঝিনি।

প্রীতি চুপ।

—তারপর তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো।

ইমন ধীরে ধীরে বলল,

—আর একসময় বুঝলাম, তুমি আমার কাছে শুধু বন্ধু নও।

প্রীতির বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

সে কিছু বলতে পারছিল না।

ইমন বলল,

—তুমি যখন কষ্ট পাও, আমার খারাপ লাগে। তুমি যখন হাসো, আমার ভালো লাগে। তুমি আমার সঙ্গে কথা না বললে আমার পুরো দিনটাই খারাপ যায়।

প্রীতির চোখে পানি চলে এল।

ইমন আরও বলল,

—আমি জানি না এটাকে আর কী নামে ডাকব।

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে বলল,

—আমি তোমাকে ভালোবাসি, প্রীতি।

চারপাশটা যেন হঠাৎ নীরব হয়ে গেল।

প্রীতি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

ইমন ভয় পেয়ে গেল।

—তুমি কিছু বলছ না কেন?

প্রীতি ধীরে মুখ তুলল।

চোখে পানি, ঠোঁটে ছোট্ট হাসি।

—আপনি এত দেরি করলেন কেন?

ইমন অবাক হয়ে বলল,

—মানে?

প্রীতি চোখ মুছে বলল,

—আমি অনেক আগেই বুঝেছিলাম।

ইমনের মুখে অবিশ্বাসের হাসি ফুটল।

—তাহলে?

প্রীতি মৃদু গলায় বলল,

—আমিও আপনাকে ভালোবাসি।

ইমন কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

তারপর হাসতে হাসতে বলল,

—সত্যি?

প্রীতি মাথা নাড়ল।

ইমন বলল,

—আমি ভাবছিলাম তুমি না করে দেবে।

—আমি কি এত নিষ্ঠুর?

—না। কিন্তু তুমি খুব জেদি।

প্রীতি হেসে বলল,

—আর আপনি খুব দুষ্টু।

দুজনেই হাসল।

সেদিন তাদের জীবনে বন্ধুত্বের জায়গাটা পেরিয়ে ভালোবাসা এসে দাঁড়াল।

কিন্তু তারা জানত না, সামনে আরও অনেক পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।

কয়েক মাস পর ইমন নিজের বাবা-মায়ের কাছে প্রীতির কথা বলল।

ইমনের মা প্রথমে অবাক হলেও ছেলের মুখের আনন্দ দেখে বুঝলেন, মেয়েটা তার কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বললেন,

—তুই যাকে নিয়ে এতদিন ধরে এত কথা বলিস, তাকে একদিন আমাদের সঙ্গে দেখা করাস।

ইমন খুশি হয়ে বলল,

—সত্যি মা?

—হ্যাঁ।

অন্যদিকে প্রীতিও বাড়িতে ইমনের কথা বলল।

তার বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে শুধু বললেন,

—ছেলেটা ভালো তো?

প্রীতি মাথা নিচু করে বলল,

—হ্যাঁ বাবা।

—তোমাকে সম্মান করবে?

প্রীতি দৃঢ়ভাবে বলল,

—করবে।

বাবা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তাহলে একদিন তাকে নিয়ে এসো।

দুই পরিবারের সম্মতি পাওয়ার পর যেন তাদের সম্পর্ক আরও সুন্দর হয়ে উঠল।

ইমন এখন নিয়মিত প্রীতির সঙ্গে দেখা করত।

প্রীতি চাকরির জন্য চেষ্টা করতে থাকল।

কিছুদিন পর অবশেষে সে একটি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পেল।

খবরটা পেয়ে ইমন এতটাই খুশি হলো যে অফিসে বসেই তাকে ফোন করল।

—ম্যাডাম, অভিনন্দন!

প্রীতি হেসে বলল,

—আপনি এত খুশি কেন?

—কারণ আমার প্রীতি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রীতি চুপ করে গেল।

তারপর আস্তে বলল,

—আপনি পাশে ছিলেন বলেই সাহস পেয়েছি।

ইমন মৃদু গলায় বলল,

—আমি সবসময় পাশে থাকব।

তাদের ভবিষ্যৎ তখন সুন্দর একটা স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল।

কিন্তু তারা জানত না, খুব শিগগিরই তাদের জীবনে আসতে চলেছে বিয়ের দিন।

আর সেই দিনই ইমন প্রথমবার প্রীতিকে নিজের জীবনের সঙ্গী হিসেবে সবার সামনে গ্রহণ করবে।

ইমন আর প্রীতির সম্পর্কটা ধীরে ধীরে দুই পরিবারের কাছেই পরিচিত হয়ে গেল।

ইমনের মা প্রীতিকে প্রথম দেখার পর থেকেই মেয়েটাকে খুব পছন্দ করে ফেলেছিলেন। প্রীতির শান্ত স্বভাব, ভদ্রভাবে কথা বলা আর পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ববোধ—সবকিছুই তার ভালো লেগেছিল।

একদিন প্রীতিকে বাসায় ডেকে ইমনের মা বললেন,

—মা, তুমি ইমনকে কীভাবে সহ্য করো বলো তো?

প্রীতি হেসে বলল,

—সহ্য করতে হয় আন্টি।

পাশ থেকে ইমন প্রতিবাদ করে বলল,

—মা, তুমি আমার নামে আবার কী বলছ?

ইমনের মা হেসে বললেন,

—ছোটবেলা থেকেই ছেলেটা অনেক দুষ্টু। এখন তোর দায়িত্ব।

প্রীতি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।

ইমন মজা করে বলল,

—মা, তুমি ওকে আমার বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিচ্ছ।

—তুই তো এমনিতেই ওর কাছে হেরে গেছিস।

সবাই হেসে উঠল।

সেদিনের পর থেকে প্রীতি যেন ইমনের পরিবারেরই একজন হয়ে গেল।

ইমনের বাবা প্রথমদিকে খুব বেশি কথা বলতেন না। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করছিলেন, প্রীতি কখনো ইমনের টাকা-পয়সা বা পরিবারের অবস্থার প্রতি বাড়তি আগ্রহ দেখায় না।

একদিন তিনি ইমনকে আলাদা করে বললেন,

—মেয়েটা ভালো।

ইমন হাসল।

—আমি জানি বাবা।

—তুই ওকে সম্মান করিস?

—সবচেয়ে বেশি।

ইমনের বাবা মাথা নাড়লেন।

—তাহলে বিয়ের ব্যাপারে আর দেরি করিস না।

ইমনের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।

সে সেদিনই প্রীতিকে ফোন করল।

—প্রীতি!

—কী হয়েছে?

—বাবা রাজি।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর প্রীতির কণ্ঠ শোনা গেল,

—আমার বাবা-মাও রাজি।

ইমন আনন্দে বলল,

—তাহলে?

—তাহলে কী?

—আমাদের বিয়ে হবে।

প্রীতি হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

ইমন যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

কয়েক মাসের মধ্যে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল।

প্রীতির ছোট্ট পরিবারে আনন্দের সঙ্গে কিছুটা দুশ্চিন্তাও ছিল। বাবা-মা মেয়েকে বিদায় দেওয়ার কথা ভাবলেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন।

মা মাঝে মাঝে মেয়ের পোশাক গুছাতে গুছাতে বলতেন,

—শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে নিজের মতো থাকবি। সবাইকে সম্মান করবি, কিন্তু নিজের সম্মানটাও ধরে রাখবি।

প্রীতি মায়ের হাত ধরে বলত,

—তুমি চিন্তা করো না।

—ইমন তোকে ভালো রাখবে তো?

প্রীতি হেসে বলত,

—ও আমাকে খুব ভালোবাসে।

মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলতেন,

—তাহলে আমার আর ভয় নেই।

অন্যদিকে ইমনও বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত।

তার বন্ধুরা তাকে ছাড়ছিল না।

রাফি একদিন বলল,

—ভাই, যে মেয়েকে নিয়ে প্রথম দিন হাসাহাসি করেছিলি, আজ তাকেই বিয়ে করছিস!

ইমন হেসে বলল,

—জীবন মাঝে মাঝে মানুষকে নিজের ভুল বুঝিয়ে দেয়।

মায়া বলল,

—তখন তো বলেছিলি, মেয়েটা অনেক ভাব নেয়।

ইমন মুচকি হেসে বলল,

—এখন সেই ভাবটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।

সবাই হাসল।

বিয়ের দিন অবশেষে চলে এল।

বাড়ি আলো আর ফুলে সাজানো হলো।

প্রীতির বাবা-মায়ের চোখে আনন্দের সঙ্গে অশ্রুও ছিল।

প্রীতি বিয়ের সাজে যখন সবার সামনে এল, ইমন কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

রাফি পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,

—ভাই, চোখ বন্ধ কর। এতক্ষণ তাকিয়ে থাকলে সবাই বুঝে যাবে।

ইমন হেসে বলল,

—আজ বুঝলেও সমস্যা নেই।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর প্রীতি ইমনের পাশে এসে বসেছিল।

ইমন ধীরে বলল,

—বিশ্বাস হচ্ছে না, তুমি সত্যিই আমার স্ত্রী হয়ে গেলে।

প্রীতি মৃদু হেসে বলল,

—আমারও না।

ইমন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—মনে আছে, প্রথম দিন তোমাকে নিয়ে কী বলেছিলাম?

প্রীতি বলল,

—সব মনে আছে।

—আমাকে ক্ষমা করেছ?

প্রীতি মৃদু হেসে বলল,

—অনেক আগেই।

ইমন বলল,

—তবুও আমি মাঝে মাঝে সেই দিনের কথা মনে করে লজ্জা পাই।

প্রীতি বলল,

—ভালোই হয়েছে।

—কেন?

—না হলে আজকে আমাকে পেতেন না।

ইমন হেসে ফেলল।

রাতের অনুষ্ঠানের পর যখন দুজন একসঙ্গে কিছুটা সময় পেল, ইমন খুব যত্ন করে প্রীতিকে কাছে টেনে নিল।

প্রীতি লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।

ইমন মৃদু স্বরে বলল,

—তুমি জানো, তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি কতটা ভাগ্যবান মনে করি নিজেকে?

প্রীতি বলল,

—আর আমি ভাবি, এত দুষ্টু একটা মানুষকে কীভাবে ভালোবেসে ফেললাম!

ইমন হেসে বলল,

—তাহলে এখনো আফসোস আছে?

প্রীতি মাথা নাড়ল।

—একটুও না।

ইমন স্নেহভরে তার মাথায় হাত রাখল।

সেদিন তাদের নতুন জীবনের শুরু হলো।

ইমনের মা-বাবা প্রীতিকে নিজেদের মেয়ের মতোই গ্রহণ করলেন।

ইমনের মা প্রায়ই বলতেন,

—বউ না, আমার মেয়েটা।

প্রীতিও শাশুড়ির সঙ্গে খুব সহজে মিশে গেল।

সকালে একসঙ্গে নাশতা করা, বিকেলে গল্প করা—সবকিছুতেই একটা পরিবারের উষ্ণতা তৈরি হলো।

ইমন অফিস থেকে ফিরলে প্রথমেই প্রীতিকে খুঁজত।

—কোথায় তুমি?

প্রীতি রান্নাঘর থেকে বলত,

—এখানে।

ইমন গিয়ে বলত,

—আজ সারাদিন তোমাকে খুব মিস করেছি।

প্রীতি হেসে বলত,

—সকালেই তো বের হলেন।

—সকাল থেকে অনেক সময় হয়ে গেছে।

তাদের সংসার ছোট ছোট আনন্দে ভরে উঠল।

কিছুদিন পর প্রীতির স্কুলের চাকরিটাও ভালোভাবে চলতে শুরু করল।

সে প্রতিদিন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকত।

ইমন মাঝে মাঝে তাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসত।

একদিন স্কুল ছুটির পর প্রীতি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

ইমনের গাড়ি এসে থামল।

প্রীতি গাড়িতে উঠে বলল,

—আজ এত তাড়াতাড়ি?

ইমন বলল,

—তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।

—কোথায়?

—সেটা গিয়ে দেখবে।

প্রীতি কিছু না বলে হাসল।

তারা শহরের বাইরে একটা শান্ত জায়গায় গেল।

সেখানে একটা ছোট্ট নদীর পাশে বসে দুজন অনেকক্ষণ গল্প করল।

প্রীতি বলল,

—আমাদের জীবনটা কত বদলে গেছে, তাই না?

ইমন বলল,

—হ্যাঁ।

—প্রথম দিন যদি কেউ বলত, ওই দুষ্টু ছেলেটাকেই একদিন বিয়ে করব, আমি বিশ্বাস করতাম না।

ইমন হেসে বলল,

—আর আমি যদি জানতাম প্রথম দিন যাকে নিয়ে মজা করছি, সে একদিন আমার পুরো পৃথিবী হয়ে যাবে, তাহলে সেদিনই তোমার কাছে গিয়ে ভালো ব্যবহার করতাম।

প্রীতি হেসে মাথা নাড়ল।

—তাহলে আমাদের গল্পটা এত সুন্দর হতো না।

ইমন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—হয়তো ঠিক বলেছ।

দুজনেই হাসল।

তাদের মনে হচ্ছিল, জীবনের কঠিন দিনগুলো পেছনে ফেলে তারা অবশেষে শান্ত একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু জীবন কখনো সবকিছু এত সহজে চলতে দেয় না।

ইমনের বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো এক বান্ধবী—মায়া—আবার তার জীবনে ফিরে আসতে শুরু করল।

প্রথমে শুধু ফোন।

তারপর পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা।

ইমন বিষয়টাকে একেবারেই গুরুত্ব দেয়নি।

বিয়ের পর কয়েক মাস বেশ ভালোভাবেই কেটে গেল।

ইমন আর প্রীতির সংসার যেন ছোট ছোট আনন্দে ভরে উঠেছিল। দুজনের মধ্যে অভিমান হতো, ঝগড়াও হতো, কিন্তু বেশিক্ষণ কেউ কারও ওপর রাগ করে থাকতে পারত না।

ইমনের মা-বাবাও প্রীতিকে খুব ভালোবাসতেন।

প্রীতি সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে শাশুড়ির সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করত। আর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলে ইমন প্রায়ই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকত।

একদিন প্রীতি বাসায় ফিরতেই ইমন বলল,

—আজ এত দেরি হলো কেন?

প্রীতি জুতা খুলতে খুলতে বলল,

—স্কুলে অভিভাবকদের মিটিং ছিল।

—আমাকে ফোন করতে পারতে।

—আপনি তো অফিসে ছিলেন।

—তাতে কী হয়েছে? তোমার ফোনের জন্য অফিসের কাজ বন্ধ করে দিতাম।

প্রীতি হেসে বলল,

—আপনি খুব বাড়াবাড়ি করেন।

ইমন বলল,

—তোমার ব্যাপারে একটু করতেই পারি।

প্রীতি হেসে ভেতরে চলে গেল।

তাদের এই শান্ত জীবনটাই হঠাৎ বদলে গেল একদিন।

সেদিন সন্ধ্যায় ইমন অফিসে কাজ করছিল।

হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে মায়ার নাম।

ইমন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফোন ধরল।

—হ্যালো?

ওপাশ থেকে মায়ার কণ্ঠ,

—ইমন, কেমন আছিস?

—ভালো। তুই?

—আমি ভালো নেই।

ইমন অবাক হয়ে বলল,

—কী হয়েছে?

—অনেকদিন পর তোকে একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে। দেখা করতে পারবি?

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—কোনো সমস্যা হয়েছে?

—সামনাসামনি বলব।

ইমন বিষয়টাকে পুরোনো বন্ধুর সমস্যা হিসেবেই নিল।

—ঠিক আছে। কাল সময় করে দেখা করব।

পরদিন অফিস শেষে মায়ার সঙ্গে দেখা করতে গেল ইমন।

একটা ক্যাফেতে বসে মায়া অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।

ইমন বলল,

—কী হয়েছে বল।

মায়া চোখ নামিয়ে বলল,

—তোর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

—বল।

—তুই কি আমাকে একদম ভুলে গেছিস?

ইমন অবাক হয়ে বলল,

—এমন কথা কেন বলছিস?

মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—কারণ তুই বিয়ের পর থেকে আমাকে একদম সময় দিস না।

ইমন বলল,

—এটাই তো স্বাভাবিক। আমার স্ত্রী আছে, সংসার আছে।

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তবুও তো আমি তোর পুরোনো বন্ধু।

—বন্ধুত্ব তো আছে।

মায়া তাকিয়ে বলল,

—শুধু বন্ধুত্ব?

ইমন এবার বুঝতে পারল, কথাটা অন্যদিকে যাচ্ছে।

সে গম্ভীর হয়ে বলল,

—মায়া, আমার বিয়ে হয়ে গেছে। প্রীতি আমার স্ত্রী। আমি ওকে খুব ভালোবাসি।

মায়া মুখ নিচু করল।

—আমি জানি।

—তাহলে এসব কথা কেন বলছিস?

মায়া কোনো উত্তর দিল না।

কিছুক্ষণ পর বলল,

—ঠিক আছে। আজ শুধু দেখা করতে চেয়েছিলাম।

ইমন উঠে দাঁড়াল।

—আমাকে এখন যেতে হবে।

মায়া বলল,

—ঠিক আছে।

ইমন চলে গেল।

কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, মায়ার মনে অন্য একটা পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে।

কয়েকদিন পর মায়া পুরোনো বন্ধুদের নিয়ে একটা ছোট পার্টির আয়োজন করল।

ইমনকে ফোন করে বলল,

—সবাই আসছে। তুই না এলে খুব খারাপ লাগবে।

ইমন প্রথমে রাজি হচ্ছিল না।

—আজ বাসায় প্রীতির সঙ্গে সময় কাটাব।

মায়া বলল,

—আরে, কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। তোর বউকে বলিস।

ইমন শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল।

বাসায় ফিরে প্রীতিকে বলল,

—আজ পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে একটা পার্টি আছে। একটু যেতে হবে।

প্রীতি বলল,

—ঠিক আছে। তবে বেশি রাত করো না।

ইমন হেসে বলল,

—চেষ্টা করব।

প্রীতি মজা করে বলল,

—চেষ্টা না, কথা দাও।

ইমন বলল,

—কথা দিলাম।

সেদিন রাতে পার্টিতে গিয়ে ইমন বুঝল, মায়া ইচ্ছা করেই তাকে আলাদা করে রাখছে।

পুরোনো বন্ধুরা গল্প করছিল।

অনেকদিন পর সবাই একসঙ্গে হওয়ায় পরিবেশও বেশ আনন্দের ছিল।

কিছুক্ষণ পর মায়া ইমনের হাতে একটা পানীয়ের গ্লাস তুলে দিল।

ইমন বলল,

—না, আমি খাব না।

মায়া হেসে বলল,

—একটু খা। আজ এতদিন পর সবাই একসঙ্গে হয়েছি।

—আমি চাই না।

মায়া জোর করতে লাগল।

বন্ধুরাও বলতে লাগল,

—আরে ইমন, এতদিন পর পার্টি! আজকে একটু না খেলে হবে?

ইমন শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছায় গ্লাসটা হাতে নিল।

মায়া আবার বলল,

—আরেকটু।

ইমন বলল,

—না, যথেষ্ট হয়েছে।

কিন্তু বন্ধুরা তাকে নিয়ে মজা করতে লাগল।

একসময় ইমন নিজের সীমার কথা ঠিকমতো বুঝতে পারল না।

রাত অনেক হয়ে গেল।

এদিকে প্রীতি বাসায় বসে অপেক্ষা করছিল।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বারবার ভাবছিল,

‘এত দেরি হচ্ছে কেন?’

ইমন কথা দিয়েছিল বেশি রাত করবে না।

প্রীতি কয়েকবার ফোন করল।

ফোন ধরল না।

তার চিন্তা হতে লাগল।

রাত আরও বাড়ল।

অবশেষে ইমন বাসায় ফিরল।

দরজা খুলে প্রীতি দেখল, ইমন ঠিক স্বাভাবিক অবস্থায় নেই।

প্রীতি এগিয়ে এসে বলল,

—এত দেরি হলো?

ইমন কোনো উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।

প্রীতি তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, কিছু একটা হয়েছে।

—তুমি ঠিক আছ?

ইমন বলল,

—হ্যাঁ।

—আমাকে ফোন করনি কেন?

—শুনতে পাইনি।

প্রীতির মন খারাপ হলো।

সে আর কিছু বলল না।

পরদিন সকালে ইমনের মাথা ভার লাগছিল।

প্রীতি চুপচাপ নাশতা তৈরি করছিল।

ইমন বলল,

—প্রীতি।

কোনো উত্তর নেই।

—রাগ করেছ?

প্রীতি বলল,

—না।

—তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি।

প্রীতি এবার তাকিয়ে বলল,

—আপনি কথা দিয়েছিলেন বেশি রাত করবেন না।

ইমন মাথা নিচু করল।

—সরি।

—আমি সারারাত চিন্তা করেছি।

ইমন নরম গলায় বলল,

—আমি ভুল করেছি।

প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আমি শুধু চাই, আপনি আমাকে কিছু লুকাবেন না।

ইমন বলল,

—আমি কিছু লুকাইনি।

কথাটা সত্যিই ছিল।

সে জানত না, মায়া তার জন্য আরও বড় একটা বিপদ তৈরি করছে।

কয়েকদিন পর মায়া আবার ইমনকে ফোন করল।

ইমন ফোন ধরতেই মায়া কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

—ইমন, আমার সঙ্গে দেখা কর।

—কেন?

—খুব জরুরি কথা।

—ফোনে বল।

—পারব না। সামনে বলতে হবে।

ইমন অনিচ্ছায় আবার দেখা করতে গেল।

মায়া এবার একেবারে অন্যরকম আচরণ করল।

সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—ইমন, আমি একটা সমস্যায় পড়েছি।

—কী সমস্যা?

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমি... মা হতে চলেছি।

ইমন যেন কথাটা শুনে জমে গেল।

—কী বলছিস?

মায়া চোখ মুছে বলল,

—আমি সত্যি বলছি।

ইমন হতভম্ব হয়ে বসে রইল।

—কিন্তু...

মায়া তার কথা থামিয়ে বলল,

—এই সন্তানের বাবা তুই।

ইমন কিছুই বুঝতে পারছিল না।

তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—

‘এটা কীভাবে সম্ভব?’

সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—মায়া, তুই কী বলছিস বুঝতে পারছিস?

মায়া বলল,

—আমি মিথ্যা বলছি না।

ইমন মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।

তার চোখের সামনে প্রীতির মুখ ভেসে উঠল।

যে মেয়েটা তাকে বিশ্বাস করে নিজের জীবনটা তার হাতে তুলে দিয়েছে।

যে মেয়েটা তাকে সবসময় সত্যি বলতে বলেছিল।

ইমন জানত, এই খবর যদি প্রীতির কানে যায়, তাহলে তাদের সংসারে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।

কিন্তু তার থেকেও বড় প্রশ্ন ছিল—

মায়া সত্যি বলছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো সত্য লুকিয়ে আছে?

মায়ার মুখ থেকে কথাটা শোনার পর ইমন যেন কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছিল না।

‘আমি মা হতে চলেছি।’

কথাটা বারবার তার কানে বাজছিল।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে মায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর কঠিন গলায় বলল,

—মায়া, তুমি যা বলছ, তার প্রমাণ কী?

মায়া চোখ মুছে বলল,

—তুই কি আমাকে বিশ্বাস করিস না?

—বিশ্বাসের কথা না। তুমি এত বড় একটা কথা বলছ। আমি সত্যিটা জানতে চাই।

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আমি কয়েকদিন পর রিপোর্ট দেখাতে পারব।

ইমন বলল,

—ঠিক আছে। রিপোর্ট না দেখা পর্যন্ত আমি কিছুই বিশ্বাস করছি না।

মায়া এবার একটু অস্থির হয়ে বলল,

—কিন্তু আমাকে বিয়ে করতে হবে।

ইমন অবাক হয়ে তাকাল।

—বিয়ে?

—হ্যাঁ। আমি এই অবস্থায় একা থাকতে পারব না।

ইমন মাথা নাড়ল।

—আমি তোমাকে সাহায্য করব, যদি সত্যিই কোনো সমস্যা হয়ে থাকে। কিন্তু তোমাকে বিয়ে করা সম্ভব নয়।

মায়া বলল,

—কেন?

—কারণ আমি প্রীতিকে ভালোবাসি। আমি ওকে ছেড়ে যেতে পারব না।

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তাহলে তুই আমাকে আর আমার সন্তানকে একা ফেলে দিবি?

ইমন কোনো উত্তর দিল না।

তার মাথা তখন পুরোপুরি এলোমেলো।

সেদিন বাড়ি ফিরে প্রীতির সামনে দাঁড়াতেই তার বুক কেঁপে উঠল।

প্রীতি হাসিমুখে বলল,

—আজ এত চুপচাপ কেন?

ইমন বলল,

—কাজের চাপ ছিল।

প্রীতি তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, কিছু একটা হয়েছে।

—আপনি আমাকে কিছু বলতে চান?

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—না।

প্রীতি মৃদু হাসল।

—ঠিক আছে।

সে আর জোর করল না।

কিন্তু ইমনের মনে হতে লাগল, সে যেন নিজের স্ত্রীকে মিথ্যা বলছে।

পরের কয়েকদিন ইমন মায়ার সঙ্গে বারবার কথা বলল।

মায়া প্রতিবারই একই কথা বলত।

সে সত্যিই গর্ভবতী এবং ইমনই সন্তানের বাবা।

ইমন একদিকে প্রীতিকে হারানোর ভয় পাচ্ছিল, অন্যদিকে মায়ার কথাও উপেক্ষা করতে পারছিল না।

অবশেষে মায়া তাকে একটা রিপোর্ট দেখাল।

ইমন রিপোর্টটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

সে বুঝতে পারল, ব্যাপারটা সত্যি।

কিন্তু রিপোর্টে সন্তানের বাবা কে, সেটা তো লেখা নেই।

ইমন বলল,

—এই রিপোর্ট শুধু এটা প্রমাণ করে যে তুমি মা হতে চলেছ। কিন্তু সন্তানের বাবা আমি—এটা প্রমাণ করে না।

মায়া রেগে গেল।

—তুই আমাকে অপমান করছিস?

—না। আমি শুধু সত্যিটা জানতে চাই।

মায়া চোখ মুছে বলল,

—তাহলে আমাকে বিয়ে কর।

ইমন মাথা নাড়ল।

—আমি প্রীতিকে ছেড়ে তোমাকে বিয়ে করতে পারব না।

মায়া বলল,

—তাহলে আমি সবকিছু প্রীতিকে বলে দেব।

ইমন চুপ হয়ে গেল।

মায়া চলে যাওয়ার পর সে অনেকক্ষণ একা বসে রইল।

সে জানত না কী করবে।

শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত নিল, সত্যিটা প্রীতিকে বলবে।

কিন্তু কীভাবে বলবে?

কথাটা মুখে আনতেই তার ভয় লাগছিল।

সেদিন রাতে প্রীতি ঘরে এসে দেখল, ইমন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

—কী ভাবছেন?

ইমন ঘুরে তাকাল।

—প্রীতি, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।

প্রীতি কাছে এসে বলল,

—বলুন।

ইমন গভীর শ্বাস নিল।

—আমি একটা ভুল করেছি।

প্রীতি অবাক হয়ে তাকাল।

—কী ভুল?

ইমন সবকিছু বলতে শুরু করল।

মায়ার ফোন।

পার্টি।

জোর করে পানীয় খাওয়ানো।

তারপর মায়ার দাবি।

সব।

প্রীতি একটাও কথা বলল না।

শুধু চুপ করে শুনল।

সব কথা শেষ করে ইমন বলল,

—আমি জানি না কীভাবে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হলো। কিন্তু আমি তোমার কাছে কিছু লুকাতে চাইনি।

প্রীতির চোখে পানি চলে এল।

সে ধীরে বলল,

—আপনি সেদিন এত রাতে বাড়ি ফিরেছিলেন... তাই?

ইমন মাথা নিচু করল।

—হ্যাঁ।

প্রীতি চোখ মুছে বলল,

—আপনি কি আমাকে প্রতারণা করেছেন?

ইমন সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—না। আমি তোমাকে কখনো প্রতারণা করিনি।

প্রীতি বলল,

—তাহলে মায়া কেন বলছে সন্তানটা আপনার?

—আমি জানি না।

প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে বলছেন?

ইমন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—হ্যাঁ। কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি।

প্রীতি চোখ নামিয়ে ফেলল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

—আমার সময় দরকার।

ইমন মাথা নাড়ল।

—যত সময় লাগে নাও।

প্রীতি সেদিন আলাদা ঘরে গিয়ে বসে রইল।

তার মাথায় হাজার প্রশ্ন।

সে ইমনকে বিশ্বাস করতে চায়।

কিন্তু মায়ার কথাও উপেক্ষা করতে পারছে না।

পরদিন প্রীতি স্কুলে গেল।

ক্লাসে দাঁড়িয়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেও তার মন অন্য জায়গায়।

সহকর্মী একজন জিজ্ঞেস করলেন,

—আপনার কি শরীর খারাপ?

প্রীতি মৃদু হাসল।

—না।

কিন্তু নিজের মনকে সে বোঝাতে পারছিল না।

অন্যদিকে ইমনও মায়ার ব্যাপারে সত্যিটা জানার জন্য চেষ্টা শুরু করল।

সে মায়াকে বলল,

—তুমি যদি সত্যিই নিশ্চিত হও, তাহলে সবকিছু পরিষ্কারভাবে বলো।

মায়া বলল,

—আমি যা বলেছি, সেটাই সত্যি।

ইমন বলল,

—তাহলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে সবকিছু যাচাই করা যাক।

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না।

—বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু আমাকে সত্যিটা জানতে হবে।

মায়া এবার আর কিছু বলল না।

ইমন বুঝতে পারল, বিষয়টার মধ্যে কোথাও একটা অস্বাভাবিকতা আছে।

কয়েকদিন পর মায়া আবার ইমনকে ফোন করল।

—ইমন, আমাকে বিয়ে করতে হবে। আর দেরি করা যাবে না।

ইমন দৃঢ় গলায় বলল,

—আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারব না।

—তাহলে আমি প্রীতিকে সব বলে দেব।

—তুমি যা খুশি করো। কিন্তু মিথ্যার ওপর আমি আমার সংসার ভাঙব না।

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফোন কেটে দিল।

ইমন সেদিন প্রথমবার একটু স্বস্তি পেল।

কিন্তু তার স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

কারণ পরদিন সকালে মায়া সরাসরি প্রীতির স্কুলে গিয়ে হাজির হলো।

প্রীতি তাকে দেখে অবাক হয়ে বলল,

—আপনি এখানে?

মায়া ঠান্ডা গলায় বলল,

—তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

প্রীতি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

মায়া বলল,

—ইমন তোমাকে সব বলেছে?

প্রীতির বুক ধক করে উঠল।

—হ্যাঁ।

মায়া মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে নিশ্চয়ই এটাও বলেছে, আমি তার সন্তানের মা হতে চলেছি।

প্রীতি চোখ নামিয়ে ফেলল।

মায়া বলল,

—আমি শুধু একটা জিনিস চাই। ইমন আমাকে বিয়ে করুক।

প্রীতি এবার শান্ত গলায় বলল,

—ইমন কী চায়?

মায়া বলল,

—ও চাইবে না। কিন্তু আমাকে বিয়ে করতেই হবে।

প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আপনি যা বলার বলেছেন?

—হ্যাঁ।

—তাহলে এখন যেতে পারেন।

মায়া অবাক হয়ে তাকাল।

—তুমি এত শান্ত কেন?

প্রীতি ধীরে বলল,

—কারণ আমি আমার স্বামীকে চিনি।

মায়া কিছু বলল না।

প্রীতি আরও বলল,

—আর যদি সত্যিই কোনো সন্তান থাকে, তার ভবিষ্যৎ নিয়েও আমরা দায়িত্বশীলভাবে সিদ্ধান্ত নেব। কিন্তু মিথ্যা বা চাপ দিয়ে কাউকে বিয়ে করানো যাবে না।

মায়া কিছুক্ষণ প্রীতির দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেল।

প্রীতি অনেকক্ষণ স্কুলের ফাঁকা করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখে পানি ছিল।

কিন্তু এবার তার মনে একটা দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল—

ইমন যদি সত্যিই কোনো ভুল না করে থাকে, তাহলে সত্য একদিন প্রকাশ হবেই।

মায়া চলে যাওয়ার পরও প্রীতি অনেকক্ষণ স্কুলের করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল।

তার বুকের ভেতরটা ভার হয়ে ছিল।

সে ইমনকে বিশ্বাস করত। কিন্তু একজন স্ত্রী হিসেবে স্বামীর বিরুদ্ধে এমন একটা কথা শুনে পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকা সহজ ছিল না।

সেদিন স্কুল ছুটির পর ইমন নিজেই তাকে নিতে এল।

গাড়িতে উঠেই প্রীতি চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

ইমন বুঝতে পারছিল, তার মন ভালো নেই।

কিছুক্ষণ পর সে বলল,

—মায়া আজ তোমার কাছে গিয়েছিল?

প্রীতি অবাক হয়ে তাকাল।

—তুমি জানলে কীভাবে?

—ও আমাকে ফোন করে বলেছে।

প্রীতি আর কিছু বলল না।

ইমন গাড়ি চালাতে চালাতে বলল,

—আমি চাই না তুমি কোনো কিছু নিয়ে একা কষ্ট পাও।

প্রীতি ধীরে বলল,

—আমি চেষ্টা করছি তোমাকে বিশ্বাস করতে।

ইমন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—শুধু চেষ্টা না, আমাকে বিশ্বাস করো। আমি ভুল করেছি, কিন্তু তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি।

প্রীতির চোখে পানি চলে এল।

—আমি তোমাকে হারাতে চাই না।

ইমনের বুক কেঁপে উঠল।

সে গাড়ি থামিয়ে প্রীতির দিকে তাকাল।

—তুমি আমাকে হারাবে না।

প্রীতি চোখ মুছে বলল,

—তাহলে সত্যিটা বের করো।

ইমন মাথা নাড়ল।

—আমি বের করব।

পরদিন থেকেই ইমন বিষয়টা খতিয়ে দেখতে শুরু করল।

মায়ার সঙ্গে তার শেষ দেখা হওয়ার পর থেকে কী ঘটেছিল, কারা সেখানে ছিল, সেদিনের পার্টিতে কারা উপস্থিত ছিল—সবকিছু সে মনে করার চেষ্টা করল।

তার পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলল।

রাফির সঙ্গে কথা বলতেই রাফি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলল।

—ইমন, সেদিন তোকে মায়াই বারবার পানীয় দিচ্ছিল।

ইমন বলল,

—হ্যাঁ। কিন্তু তারপর?

—তারপর তো আমরা সবাই ছিলাম। তুই অনেকক্ষণ পর চলে গিয়েছিলি।

—মায়া?

—ও তখনও ছিল।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

রাফি বলল,

—কী হয়েছে?

—কিছু একটা ঠিক মিলছে না।

রাফি বলল,

—তুই চাইলে সেদিনের পার্টিতে থাকা অন্যদের সঙ্গেও কথা বলতে পারিস।

ইমন মাথা নাড়ল।

সেদিন সে আরও কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলল।

একজন বলল,

—মনে আছে, পার্টির মাঝখানে মায়া তোকে একটা ঘরে নিয়ে গিয়েছিল।

ইমন চমকে উঠল।

—কী?

—হ্যাঁ। বলেছিল, তুই নাকি অসুস্থ বোধ করছিস।

ইমনের মাথায় যেন কিছু একটা আঘাত করল।

সে জিজ্ঞেস করল,

—তারপর আমি কোথায় ছিলাম?

—আমরা পরে তোকে নিচে দেখেছিলাম।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—মায়া কতক্ষণ পর নিচে এসেছিল?

বন্ধুটি বলল,

—অনেকক্ষণ পর।

ইমন বুঝতে পারল, ঘটনাটার মধ্যে সত্যিই একটা অস্বাভাবিক জায়গা আছে।

কিন্তু শুধু সন্দেহ দিয়ে তো কাউকে দোষী করা যায় না।

তাই সে আবার মায়ার সঙ্গে দেখা করল।

মায়া তাকে দেখে বলল,

—তুই আবার কেন এসেছিস?

ইমন শান্ত গলায় বলল,

—কিছু প্রশ্নের উত্তর চাই।

—কী প্রশ্ন?

—সেদিন পার্টিতে তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলে?

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তুই ভালো বোধ করছিলি না। তাই নিয়ে গিয়েছিলাম।

—কতক্ষণ ছিলাম সেখানে?

—মনে নেই।

—তোমার কি সত্যিই মনে নেই?

মায়া বিরক্ত হয়ে বলল,

—তুই আমাকে জেরা করছিস কেন?

ইমন বলল,

—কারণ আমার সংসার ভেঙে যাচ্ছে।

মায়া কিছু বলল না।

ইমন আরও বলল,

—তুমি যদি সত্যি বলো, আমি তোমার পাশে থাকব। কিন্তু মিথ্যা হলে আমি সেটা মেনে নেব না।

মায়া হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল।

—আমি তোকে ভালোবাসি, ইমন।

ইমন বলল,

—ভালোবাসা মানে কারও জীবন নষ্ট করা নয়।

মায়া মুখ ফিরিয়ে নিল।

ইমন সেখান থেকে চলে এল।

সেদিন রাতে প্রীতি বারান্দায় বসে ছিল।

ইমন গিয়ে তার পাশে দাঁড়াল।

—ঘুমাওনি?

প্রীতি মাথা নাড়ল।

—না।

ইমন বলল,

—আমি কিছু তথ্য পেয়েছি। সেদিনের ঘটনায় কিছু বিষয় মিলে যাচ্ছে না।

প্রীতি তার দিকে তাকাল।

—মানে?

—আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে মায়া পুরো সত্যি বলছে না।

প্রীতি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তাহলে সত্যিটা বের করো।

ইমন বলল,

—করব।

প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—একটা কথা বলব?

—হ্যাঁ।

—যদি সত্যিই সন্তানটা তোমার হয়?

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর দৃঢ় গলায় বলল,

—তবুও আমি দায়িত্ব থেকে পালাব না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোমাকে ছেড়ে দেব।

প্রীতির চোখ ভিজে উঠল।

—তুমি এমন কথা বললে আমার আরও ভয় লাগে।

ইমন ধীরে বলল,

—আমি তোমাকে হারাতে চাই না।

প্রীতি এবার তার হাতটা ধরে বলল,

—আমিও না।

দুজন কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল।

পরদিন সকালে হঠাৎ ইমনের ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এল।

—আপনি কি ইমন সাহেব?

—জি, বলুন।

—আমি একটা বিষয় নিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।

—কে বলছেন?

—সেদিনের পার্টিতে আমি ছিলাম।

ইমন সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল।

—আপনি কী জানেন?

ওপাশ থেকে লোকটি বলল,

—সেদিন রাতে যা ঘটেছিল, তার একটা অংশ আমি দেখেছিলাম।

ইমন দ্রুত বলল,

—আপনি কোথায় আছেন? আমি এখনই আসছি।

লোকটি একটা জায়গার নাম বলল।

ইমন আর দেরি করল না।

প্রীতিকে শুধু বলল,

—আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর পেয়েছি।

প্রীতি জিজ্ঞেস করল,

—কী খবর?

ইমন বলল,

—ফিরে এসে সব বলব।

কিছুক্ষণ পর ইমন সেই ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করল।

লোকটি বলল,

—সেদিন পার্টিতে মায়া আপনাকে একা একটা ঘরে নিয়ে গিয়েছিল।

ইমন মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

—কিন্তু আপনি তখন নিজের মতো ছিলেন না।

ইমন অবাক হয়ে বলল,

—তারপর?

লোকটি বলল,

—তারপর মায়া আমাকে বলেছিল, কাউকে যেন ওই ঘরের কাছে যেতে না দিই।

ইমনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

—আপনি কি বলতে চাইছেন?

লোকটি একটা ফোন বের করল।

—সেদিনের পার্টির কিছু ছবি আর ভিডিও আমার ফোনে আছে। সবকিছু পরিষ্কার না হলেও একটা বিষয় হয়তো আপনার কাজে লাগবে।

ইমন ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

কয়েকটা ছবি দেখার পর তার চোখ বড় হয়ে গেল।

একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পার্টির এক পর্যায়ে মায়া ইমনকে একা নিয়ে যাচ্ছে।

আর কিছুক্ষণ পর মায়াকে দেখা যাচ্ছে অন্য একজনের সঙ্গে গোপনে কথা বলতে।

ইমন ছবিটা দেখে থমকে গেল।

—এই লোকটা কে?

লোকটি বলল,

—আমি ঠিক জানি না। তবে সেদিন মায়ার সঙ্গে তাকে কয়েকবার কথা বলতে দেখেছিলাম।

ইমন ছবিটা নিজের ফোনে রেখে দিল।

তারপর বলল,

—আপনি আমাকে এই তথ্য দিলেন কেন?

লোকটি বলল,

—কারণ আপনার স্ত্রীকে আমি কয়েকদিন আগে স্কুলে দেখেছি। মনে হলো, তিনি সত্যিই আপনাকে বিশ্বাস করেন। তাই চুপ থাকতে পারলাম না।

ইমন গভীর শ্বাস নিল।

তার মনে হলো, সত্যের দরজা হয়তো একটু একটু করে খুলছে।

কিন্তু ছবির সেই অচেনা মানুষটি কে?

আর মায়ার সঙ্গে তার সম্পর্কই বা কী?

ইমন সেদিন বাড়ি ফিরে সরাসরি নিজের ঘরে গেল।

তার মাথায় শুধু সেই ছবিটা ঘুরছিল।

মায়া একজন অচেনা লোকের সঙ্গে গোপনে কথা বলছে।

কিন্তু লোকটা কে?

আর কেনই বা মায়া তাকে লুকিয়ে কথা বলছিল?

ইমন ফোনটা হাতে নিয়ে ছবিটা আবার দেখল।

তারপর ছবিটা ভালো করে দেখে হঠাৎ একটা বিষয় খেয়াল করল।

লোকটার মুখ পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও তার পোশাকটা পরিচিত লাগছিল।

ইমন অনেকক্ষণ ভাবার পর মনে করতে পারল—সেদিন পার্টিতে ওই লোকটাকে মায়ার খুব কাছাকাছি দেখা গিয়েছিল।

সে সঙ্গে সঙ্গে রাফিকে ফোন করল।

—রাফি, একটা কথা মনে করার চেষ্টা কর।

—কী?

—সেদিনের পার্টিতে মায়ার সঙ্গে একটা লোক ছিল। কালো শার্ট পরা।

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—হ্যাঁ, মনে হয় ছিল।

—ওকে চিনিস?

—মুখটা ঠিক মনে নেই।

—আরেকবার ভেবে দেখ।

কিছুক্ষণ পর রাফি বলল,

—এক মিনিট। আমার মনে হচ্ছে লোকটা মায়ার এক বন্ধুর পরিচিত।

ইমন বলল,

—নাম জানিস?

—সম্ভবত সজীব। তবে নিশ্চিত না।

ইমন ফোন রেখে দিল।

পরদিন সকালেই সে সজীবের খোঁজ শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর রাফির কাছ থেকে তার নম্বর পাওয়া গেল।

ইমন ফোন করল।

—আপনি কি সজীব?

—জি।

—আমি ইমন। আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর সজীব বলল,

—কেন?

—সেদিনের পার্টি নিয়ে কথা আছে।

সজীবের গলায় অস্বস্তি শোনা গেল।

—কোন পার্টি?

—যেখানে মায়া ছিল।

সজীব আর কোনো কথা না বলে বলল,

—কোথায় দেখা করবেন?

দুজন একটা শান্ত জায়গায় দেখা করল।

ইমন সরাসরি বলল,

—সেদিন মায়ার সঙ্গে আপনার কী কথা হয়েছিল?

সজীব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আমি আসলে বিষয়টা নিয়ে জড়াতে চাই না।

ইমন বলল,

—আপনি যদি সত্যিটা জানেন, তাহলে আমাকে বলতেই হবে।

সজীব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—মায়া আমাকে বলেছিল, একটা কাজ করতে হবে।

—কী কাজ?

—আপনাকে একটা ঘরে নিয়ে যেতে হবে।

ইমনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

—কেন?

সজীব বলল,

—আমি জানি না। শুধু বলেছিল, আপনি যেন কিছু সময় একা থাকেন।

—তারপর?

—তারপর সে আমাকে বলেছিল, কেউ যেন আপনাকে বিরক্ত না করে।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

—মায়া কি আমাকে কিছু খাওয়াতে বলেছিল?

সজীব মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ। তবে সেটা আমি দিইনি। মায়াই দিয়েছিল।

ইমন এবার বুঝতে পারল, মায়া তাকে ইচ্ছা করেই এমন অবস্থায় ফেলেছিল যাতে পরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে পারে।

কিন্তু তবুও একটা প্রশ্ন রয়ে গেল।

—সজীব, মায়া কেন এমন করবে?

সজীব বলল,

—আমি পুরো ব্যাপারটা জানি না। তবে একটা কথা জানি।

—কী?

—মায়া অনেকদিন ধরে আপনাকে নিয়ে কথা বলত।

ইমন বলল,

—কী বলত?

—বলত, আপনি নাকি তাকে ছেড়ে অন্য একজনকে বিয়ে করেছেন। সে নাকি আপনাকে কোনোভাবেই হার মানতে চায় না।

ইমন চোখ বন্ধ করল।

তারপর ধীরে বলল,

—তুমি কি নিশ্চিত?

—হ্যাঁ।

সজীব কিছুক্ষণ পর আরও বলল,

—আর একটা কথা।

—বল।

—মায়া আমাকে বলেছিল, যদি সবকিছু ঠিকঠাক হয়, তাহলে আপনি বাধ্য হয়ে তাকে বিয়ে করবেন।

ইমনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

এখন সবকিছু অনেকটাই পরিষ্কার।

মায়া তাকে ভালোবাসে না—সে তাকে পেতে চাইছে জোর করে।

ইমন সেদিনই মায়ার মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

সে মায়াকে ফোন করে বলল,

—আমাদের দেখা করতে হবে।

মায়া বলল,

—কেন?

—সব জানি।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মায়া বলল,

—কী জানিস?

—সেদিন পার্টিতে কী করেছিলি, সব।

মায়া চুপ।

ইমন বলল,

—সজীব সব বলেছে।

মায়ার গলা কেঁপে উঠল।

—তুই ওর সঙ্গে কথা বলেছিস?

—হ্যাঁ।

মায়া এবার বলল,

—আমি তোকে ভালোবাসি, ইমন।

ইমন কঠিন গলায় বলল,

—ভালোবাসা হলে এভাবে কাউকে ফাঁসানো যায় না।

মায়া কান্নার গলায় বলল,

—আমি শুধু তোকে ফিরে পেতে চেয়েছি।

—আমি তোকে কখনো সেইভাবে ভালোবাসিনি।

—কিন্তু আমি তোকে ভালোবাসি!

—তোমার ভালোবাসার জন্য আমার স্ত্রীকে কষ্ট পেতে হবে না।

মায়া চুপ করে গেল।

ইমন বলল,

—আর একটা কথা। তুমি যে সন্তানকে আমার বলে দাবি করছ, তার সত্যিটাও জানতে হবে।

মায়া এবার আর কথা বলল না।

ইমন বুঝতে পারল, এখানেই সবচেয়ে বড় রহস্য।

সে বলল,

—তুমি যদি সত্যি বলো, আমি তোমার পাশে থাকব। কিন্তু মিথ্যা হলে তোমার এই নাটক এখানেই শেষ।

মায়া কিছুক্ষণ পর বলল,

—আমি তোমাকে সব বলব।

—কখন?

—কাল।

ইমন ফোন রেখে দিল।

সেদিন রাতে সে প্রীতিকে সব জানাল।

প্রীতি চুপচাপ শুনল।

তারপর বলল,

—তুমি কি মনে করো, মায়া মিথ্যা বলছে?

ইমন বলল,

—এখন আমার সন্দেহ খুব বেশি।

প্রীতি বলল,

—তাহলে কাল সত্যিটা জানতে হবে।

ইমন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি আমার ওপর এখনও বিশ্বাস করো?

প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমি তোমাকে প্রথম দিন থেকেই পুরোপুরি বুঝিনি। কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছি—তুমি ভুল করতে পারো, কিন্তু আমাকে হারানোর ভয় তোমার সত্যি।

ইমনের চোখ ভিজে উঠল।

সে প্রীতির হাত ধরল।

—আমি তোমাকে কখনো হারাতে চাই না।

পরদিন মায়া নির্দিষ্ট জায়গায় এল।

ইমনও সেখানে ছিল।

কিছুক্ষণ পর মায়া ধীরে ধীরে বলল,

—আমি তোমার কাছে একটা সত্যি স্বীকার করব।

ইমন চুপ করে শুনছিল।

মায়া বলল,

—সন্তানটা...

সে থেমে গেল।

ইমন বলল,

—বল।

মায়া চোখ নামিয়ে বলল,

—সন্তানটা তোমার নয়।

ইমন যেন কিছুক্ষণ শ্বাস নিতেই ভুলে গেল।

—কী বললে?

মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি ভুল করেছি। আমি জানতাম, তুমি আমাকে বিয়ে করবে না। তাই মিথ্যা বলেছিলাম।

ইমন রাগে উঠে দাঁড়াল।

—তুমি বুঝতে পারছ তুমি কী করেছ?

মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি তোকে হারাতে চাইনি।

—তুমি আমাকে পাওয়ার জন্য আমার সংসার ভাঙতে চেয়েছিলে!

মায়া মাথা নিচু করে রইল।

ইমন বলল,

—এটা শুধু আমার সঙ্গে অন্যায় না। প্রীতির সঙ্গেও অন্যায়।

মায়া কোনো উত্তর দিল না।

কিছুক্ষণ পর ইমন শান্ত হয়ে বলল,

—আমি তোমাকে ঘৃণা করতে চাই না। কিন্তু আজকের পর আমার জীবন থেকে তুমি দূরে থাকবে।

মায়া চোখ মুছল।

—তুই আমাকে ক্ষমা করবি?

ইমন বলল,

—ক্ষমা করা আর আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া এক জিনিস নয়।

সে সেখান থেকে চলে এল।

বাড়িতে ফিরে প্রীতিকে দেখেই তার চোখ ভিজে উঠল।

প্রীতি বুঝে গেল, সত্যিটা জানা গেছে।

—সব মিথ্যা ছিল?

ইমন মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে ইমনের কাছে গিয়ে বলল,

—আমি জানতাম।

ইমন অবাক হয়ে বলল,

—কীভাবে?

প্রীতি মৃদু হাসল।

—কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম।

ইমন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

সে প্রীতিকে কাছে টেনে নিল।

দুজনেই কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টা অবশেষে শেষ হয়েছিল।

কিন্তু এই ঘটনার পর ইমন একটা জিনিস আরও ভালোভাবে বুঝল—

ভালোবাসা শুধু সুখের দিনে পাশে থাকার নাম নয়।

কখনো কখনো সন্দেহ, ভয় আর ভুল বোঝাবুঝির মধ্যেও একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রাখার নামই ভালোবাসা।

আর প্রীতি বুঝল, প্রথম দিনের সেই দুষ্টু ছেলেটা সত্যিই বদলে গেছে।

এখন সে শুধু তার স্বামী নয়—

তার সবচেয়ে বড় ভরসা।

মায়ার সত্যিটা জানার পর ইমন আর প্রীতির জীবনে যেন আবার শান্তি ফিরে এল।

কয়েকটা দিন দুজনই খুব চুপচাপ ছিল। এতদিনের দুশ্চিন্তা, ভয় আর ভুল বোঝাবুঝির পর দুজনেরই একটু সময় দরকার ছিল নিজেদের স্বাভাবিক করে নিতে।

এক সন্ধ্যায় প্রীতি বারান্দায় বসে বই পড়ছিল।

ইমন অফিস থেকে ফিরে সরাসরি তার পাশে এসে দাঁড়াল।

—কী পড়ছ?

প্রীতি বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,

—বই।

ইমন হেসে বলল,

—সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি।

প্রীতি এবার তাকিয়ে মুচকি হাসল।

—তাহলে জিজ্ঞেস করছেন কেন?

—তোমার সঙ্গে কথা বলার একটা অজুহাত দরকার ছিল।

প্রীতি বইটা বন্ধ করে বলল,

—আজকাল আপনার অজুহাতের অভাব হয় না।

ইমন পাশে বসে বলল,

—তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য অজুহাত লাগে নাকি?

প্রীতি কিছু বলল না।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—একটা কথা বলব?

—বলুন।

—তুমি আমাকে এত সহজে ক্ষমা করে দিলে কীভাবে?

প্রীতি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—আমি তোমাকে সবকিছুর জন্য ক্ষমা করিনি।

ইমন অবাক হলো।

—তাহলে?

—তুমি যে ভুল করেছিলে, সেটা আমি ভুলে যাইনি। কিন্তু তুমি সত্যিটা আমার কাছে লুকাওনি। আর যখন বুঝলে সমস্যা হয়েছে, তখন সত্যিটা বের করার চেষ্টা করেছ।

ইমন মাথা নিচু করল।

—আমি ভয় পেয়েছিলাম তোমাকে হারানোর।

প্রীতি মৃদু গলায় বলল,

—আমি তো তোমাকে হারাতে চাইনি।

ইমন তার দিকে তাকাল।

—তাহলে একটা কথা দাও।

—কী?

—জীবনে যত বড় সমস্যাই আসুক, আমরা কেউ কারও কাছ থেকে কিছু লুকাব না।

প্রীতি হাত বাড়িয়ে বলল,

—কথা দিলাম।

ইমন তার হাতটা ধরে মুচকি হাসল।

—আমিও কথা দিলাম।

সেদিনের পর তাদের সম্পর্ক যেন আরও গভীর হয়ে গেল।

ইমন অফিসের কাজের পাশাপাশি প্রীতির স্কুলের ব্যাপারেও আগ্রহ দেখাত।

প্রীতি প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে ছাত্রছাত্রীদের গল্প করত।

কেউ পড়া শিখেছে, কেউ দুষ্টুমি করেছে, কেউ আবার পরীক্ষায় ভালো করেছে—সবকিছু ইমন মন দিয়ে শুনত।

একদিন প্রীতি খুব খুশি হয়ে বাসায় ফিরল।

ইমন দরজা খুলে বলল,

—আজ এত খুশি কেন?

প্রীতি বলল,

—আমার একটা ছাত্রী পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে।

—তাতে তুমি এত খুশি?

—হ্যাঁ। ওর পরিবার খুব সাধারণ। মেয়েটা পড়াশোনা করতে খুব চায়। আজ যখন ও এসে আমাকে বলল, ‘ম্যাডাম, আমি পারলাম’, তখন আমার খুব ভালো লেগেছে।

ইমন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে বলল,

—তুমি জানো, তোমার এই ব্যাপারটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে?

—কোন ব্যাপার?

—তুমি নিজের জন্য যতটা ভাবো, অন্যদের জন্য তার চেয়ে বেশি ভাবো।

প্রীতি হেসে বলল,

—আর আপনি?

—আমি শুধু তোমার জন্য ভাবি।

প্রীতি মাথা নিচু করে ফেলল।

ইমন হাসতে হাসতে বলল,

—আবার লজ্জা পাচ্ছ?

—চুপ করুন।

তাদের সংসারে আবার আগের মতো হাসি ফিরে এল।

ইমনের মা-বাবাও বিষয়টা বুঝতে পেরেছিলেন।

একদিন ইমনের মা প্রীতিকে কাছে ডেকে বললেন,

—মা, তোমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবে।

প্রীতি অবাক হয়ে বলল,

—কেন বলছেন?

—মা তো। বুঝতে পারি।

প্রীতি মৃদু হেসে বলল,

—এখন আর কোনো সমস্যা নেই।

ইমনের মা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তুই আমাদের ঘরে এসে সত্যিই ঘরটা পূর্ণ করে দিয়েছিস।

প্রীতির চোখ ভিজে উঠল।

সে বলল,

—আপনারা আমাকে এত ভালোবাসেন, আমি খুব ভাগ্যবান।

ইমনের মা বললেন,

—ভাগ্যবান আমরা। তুই আমাদের বউ হয়ে আসিসনি, মেয়ে হয়ে এসেছিস।

প্রীতি তাকে জড়িয়ে ধরল।

কিছুদিন পর ইমন প্রীতিকে নিয়ে তার পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল।

অনেকদিন পর সেই জায়গায় পা রেখে প্রীতির মনে পুরোনো স্মৃতি ফিরে এল।

প্রথম দিন।

ইমনের বন্ধুদের হাসাহাসি।

ক্লাসের ভেতর কাগজ ছোড়াছুড়ি।

তারপর চোখে কাগজ লেগে যাওয়া।

ইমনের বাধ্য হয়ে এসে ক্ষমা চাওয়া।

সবকিছু যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।

ইমন পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

—কী ভাবছ?

প্রীতি হেসে বলল,

—প্রথম দিনের কথা।

ইমন মাথা নিচু করে বলল,

—ওই দিনের কথা মনে করিয়ে দিও না।

—কেন?

—খুব লজ্জা লাগে।

প্রীতি হেসে বলল,

—তখন তো অনেক ভাব দেখিয়েছিলেন।

—আর এখন?

—এখন আরও বেশি ভাব দেখান।

ইমন বলল,

—তুমি চাইলে আজকেও তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে পারি।

প্রীতি মজা করে বলল,

—চাই।

ইমন সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—ঠিক আছে। সরি।

প্রীতি হেসে ফেলল।

—এত সহজে?

—তাহলে কীভাবে?

—একটু কষ্ট করে বলুন।

ইমন হাত জোড় করে বলল,

—ম্যাডাম, জীবনের প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত যত ভুল করেছি, সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাইছি।

প্রীতি হেসে বলল,

—এবার ঠিক আছে।

দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো মাঠে গিয়ে বসে পড়ল।

ইমন বলল,

—জানো, আমি কখনো ভাবিনি এই জায়গায় বসেই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটাকে খুঁজে পাব।

প্রীতি মৃদু হেসে বলল,

—আর আমি ভাবিনি যে যে ছেলেটা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে, একদিন সেই ছেলেটাই আমার সবচেয়ে বড় ভরসা হবে।

ইমন বলল,

—জীবন আসলেই অদ্ভুত।

—হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে থাকল।

হঠাৎ ইমন বলল,

—প্রীতি।

—হুম?

—তুমি কি সুখী?

প্রীতি তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—খুব।

ইমন মৃদু হেসে বলল,

—আমিও।

সেদিন ফেরার পথে ইমন গাড়ি থামিয়ে রাস্তার পাশে একটা ছোট ফুলের দোকান থেকে ফুল কিনল।

প্রীতি অবাক হয়ে বলল,

—ফুল কেন?

—এমনিই।

—আজ কি কোনো বিশেষ দিন?

—না।

—তাহলে?

ইমন ফুলটা তার হাতে দিয়ে বলল,

—বিশেষ দিন না হলেও তোমাকে ফুল দেওয়া যায়।

প্রীতি ফুলটা নিয়ে মৃদু হাসল।

—আপনি সত্যিই বদলে গেছেন।

ইমন বলল,

—তোমার জন্যই।

রাতে বাসায় ফিরে প্রীতি ফুলগুলো যত্ন করে একটা গ্লাসে সাজিয়ে রাখল।

ইমন দূর থেকে তাকিয়ে বলল,

—ফুলের চেয়ে তোমার হাসিটা সুন্দর।

প্রীতি সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—আবার শুরু করেছেন!

ইমন হেসে উঠল।

এভাবেই দিন কাটতে লাগল।

একদিন প্রীতি স্কুল থেকে ফিরে একটু ক্লান্ত ছিল।

ইমন বলল,

—আজ তুমি বিশ্রাম নাও। আমি চা বানিয়ে দিচ্ছি।

প্রীতি অবাক হয়ে বলল,

—আপনি চা বানাবেন?

—কেন? আমি পারি না?

—না, ভয় হচ্ছে চা না বানিয়ে রান্নাঘরটাই শেষ করে ফেলেন!

ইমন ভান করে রাগ দেখাল।

—ঠিক আছে, আজ থেকে তুমি নিজেই বানাবে।

প্রীতি হেসে বলল,

—আচ্ছা, আচ্ছা। বানান।

ইমন রান্নাঘরে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর এক কাপ চা এনে প্রীতির সামনে রাখল।

প্রীতি এক চুমুক দিয়ে বলল,

—খারাপ না।

ইমন গর্ব করে বলল,

—শুধু খারাপ না?

—হ্যাঁ।

—তাহলে আর বানাব না।

প্রীতি হাসতে হাসতে বলল,

—ভালো হয়েছে। এত অভিমান করেন কেন?

ইমন বলল,

—তোমার কাছ থেকে একটু প্রশংসা পাওয়ার আশায় বানিয়েছিলাম।

প্রীতি তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—ভালো হয়েছে।

ইমন বলল,

—এবার ঠিক আছে।

দুজনের এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাদের সংসারকে সুন্দর করে তুলেছিল।

তবে সামনে তাদের জীবনে আরও একটি বড় সুখবর অপেক্ষা করছিল।

একদিন সকালে প্রীতি ইমনকে বলল,

—আপনার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে।

ইমন চিন্তিত হয়ে বলল,

—কী হয়েছে?

প্রীতি মৃদু হেসে বলল,

—আগে বসুন।

ইমন বসে পড়ল।

প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আপনি বাবা হতে চলেছেন।

ইমন প্রথমে কথাটা বুঝতেই পারল না।

তারপর বিস্ময়ে প্রীতির দিকে তাকিয়ে বলল,

—সত্যি?

প্রীতি মাথা নাড়ল।

ইমনের মুখে মুহূর্তের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল।

সে প্রীতির হাত ধরে বলল,

—আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না!

প্রীতি হেসে বলল,

—এবার কিন্তু খুব দায়িত্বশীল হতে হবে।

ইমন বলল,

—আমি চেষ্টা করব।

প্রীতি মজা করে বলল,

—শুধু চেষ্টা না, কথা দিন।

ইমন হাসতে হাসতে বলল,

—কথা দিলাম।

দূরে দাঁড়িয়ে ইমনের মা তাদের কথা শুনে ফেলেছিলেন।

তিনি ছুটে এসে বললেন,

—কী হয়েছে?

ইমন আনন্দে বলল,

—মা, তুমি দাদি হতে চলেছ!

ইমনের মা আনন্দে প্রীতিকে জড়িয়ে ধরলেন।

বাড়িটা মুহূর্তেই আনন্দে ভরে উঠল।

আর ইমন মনে মনে ভাবল—

যে মেয়েটাকে একদিন সে বন্ধুদের সঙ্গে বসে হাসির বিষয় বানিয়েছিল, আজ সেই মেয়েটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখের কারণ।

কিন্তু এই সুখের পথটাও সহজে শেষ হবে না।

প্রীতি মা হতে চলেছে—এই খবরটা জানার পর ইমন যেন একেবারে বদলে গেল।

আগে যেখানে অফিসের কাজ শেষ করে বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিত, এখন কাজ শেষ হলেই সোজা বাসায় ফিরে আসত।

প্রীতি অবাক হয়ে একদিন বলল,

—আপনি এত তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসেন কেন?

ইমন জবাব দিল,

—তোমাকে একা রেখে ভালো লাগে না।

—আমি তো একা নই। মা আছেন।

—তবুও।

প্রীতি মুচকি হেসে বলল,

—আপনি বাবা হওয়ার আগেই এত চিন্তা করছেন, বাবা হওয়ার পর কী করবেন কে জানে!

ইমন হেসে বলল,

—তখন তো তোমাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করব না।

প্রীতি বলল,

—এত চিন্তা করবেন না। আমি ঠিক আছি।

—তুমি ঠিক আছ কি না, সেটা আমি নিজে দেখব।

ইমনের এই পরিবর্তন দেখে সবাই হাসত।

ইমনের মা প্রায়ই বলতেন,

—বউকে নিয়ে এত চিন্তা করিস না। ওকে বিশ্রাম নিতে দে।

ইমন বলত,

—আমি তো বিশ্রামই নিতে দিচ্ছি।

প্রীতি পাশ থেকে বলত,

—আপনি আমাকে সারাদিন জিজ্ঞেস করেন, খেয়েছি কি না, পানি খেয়েছি কি না, বিশ্রাম নিয়েছি কি না। এটাকে বিশ্রাম দেওয়া বলে?

সবাই হেসে উঠত।

দিনগুলো এভাবেই কাটতে লাগল।

প্রীতির স্কুলের কাজও চলছিল। তবে সে আগের মতো বেশি পরিশ্রম করত না। ইমনও তাকে বারবার বলত, শরীর খারাপ লাগলে যেন সঙ্গে সঙ্গে বিশ্রাম নেয়।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে প্রীতি বলল,

—আজ একটা মজার ঘটনা ঘটেছে।

ইমন বলল,

—কী?

—আমার এক ছাত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, ম্যাডাম, আপনার বাসায় কি সত্যিই একটা বাচ্চা আসবে?

ইমন হেসে বলল,

—তুমি কী বলেছ?

—বলেছি, হ্যাঁ।

—তারপর?

—সে বলেছে, তাহলে আপনি আর আমাকে বকা দিতে পারবেন না। কারণ আপনি নিজেই এখন মা হতে যাচ্ছেন!

ইমন হেসে ফেলল।

—ছাত্রছাত্রীরা তোমাকে বেশ ভালোই চেনে।

প্রীতি বলল,

—ওরা খুব মিষ্টি।

কিছুদিন পর ইমনের বাবা-মা ছোট্ট একটা অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এলেন।

প্রীতির মা-বাবাও এলেন।

প্রীতির মা মেয়েকে দেখে আবেগে বললেন,

—মনে হচ্ছে, সেদিনই তোকে বিয়ের সাজে দেখেছিলাম। আর আজ তুই মা হতে চলেছিস।

প্রীতি মায়ের হাত ধরে হাসল।

—সময় এত দ্রুত চলে যায়, মা।

ইমনের মা বললেন,

—এখন থেকে আমাদের বাড়িতে আরও একজন ছোট্ট মানুষ আসবে।

ইমন সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—আর সেই ছোট্ট মানুষটা কিন্তু আমার মতো দুষ্টু হবে না।

প্রীতি বলল,

—আপনার মতো দুষ্টু হলে আমি সামলাব কীভাবে?

ইমন বলল,

—তুমি তো আমাকে সামলাতে পারছ।

সবাই আবার হেসে উঠল।

সেই রাতে সবাই চলে যাওয়ার পর ইমন আর প্রীতি বারান্দায় বসেছিল।

ইমন অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।

প্রীতি জিজ্ঞেস করল,

—কী ভাবছেন?

ইমন ধীরে বলল,

—আমাদের প্রথম দিনের কথা।

প্রীতি হেসে বলল,

—আবার?

—হ্যাঁ।

—কী মনে পড়ছে?

ইমন বলল,

—সেদিন আমি তোমাকে কতটা কষ্ট দিয়েছিলাম।

প্রীতি কিছু বলল না।

ইমন আবার বলল,

—তুমি যদি সেদিন আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব না করতে, তাহলে আজ আমার জীবনটা কেমন হতো জানি না।

প্রীতি মৃদু গলায় বলল,

—আমিও জানি না।

—তখন তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল, তুমি খুব অহংকারী।

প্রীতি অবাক হয়ে বলল,

—আমি?

—হ্যাঁ।

—আমি তো কথাই বলিনি।

—সেই জন্যই তো ভেবেছিলাম ভাব দেখাচ্ছ।

প্রীতি হেসে ফেলল।

—আপনি সত্যিই বোকা ছিলেন।

ইমন বলল,

—এখন?

প্রীতি কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—এখনও আছেন।

ইমন ভান করে রাগ দেখাল।

—ঠিক আছে। আর কথা বলব না।

প্রীতি হেসে বলল,

—এই যে, আবার অভিমান!

ইমনও হেসে ফেলল।

তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।

ইমন ধীরে বলল,

—প্রীতি।

—হুম?

—আমাদের সন্তানকে আমি একটা জিনিস শেখাতে চাই।

—কী?

—কাউকে তার পোশাক, পরিবার বা জীবনযাপন দেখে বিচার করা যাবে না।

প্রীতি তার দিকে তাকিয়ে রইল।

ইমন বলল,

—আমি একসময় তোমাকে সেভাবেই বিচার করেছিলাম। তুমি সাধারণ পোশাক পরতে, শান্ত থাকতে—আর আমি বন্ধুদের সঙ্গে বসে তোমাকে নিয়ে হাসতাম। তখন বুঝিনি, মানুষের আসল সৌন্দর্য তার মন আর ব্যবহারে।

প্রীতির চোখ ভিজে উঠল।

—আপনি এখন এসব বলছেন কেন?

—কারণ আমি চাই আমাদের সন্তান যেন কখনো আমার মতো ভুল না করে।

প্রীতি মৃদু হেসে বলল,

—আপনি ভুল করেছেন ঠিকই, কিন্তু ভুল বুঝে নিজেকে বদলেছেন। সেটাই বড় কথা।

ইমন প্রীতির দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি পাশে ছিলে বলেই পেরেছি।

সময় আরও এগিয়ে গেল।

একদিন রাতে প্রীতির হঠাৎ শরীর খারাপ লাগল।

ইমন ভয় পেয়ে গেল।

সে দ্রুত পরিবারের সবাইকে ডাকল।

কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ইমনের চিন্তা কিছুতেই কমল না।

পরদিন সে অফিসে বসে বারবার ফোন করছিল।

প্রীতি ফোন ধরে বলল,

—আমি ঠিক আছি। আপনি কাজ করুন।

—তুমি নিশ্চিত?

—হ্যাঁ।

—আমি আজ একটু তাড়াতাড়ি চলে আসব।

—আচ্ছা।

ফোন রেখে প্রীতি মুচকি হাসল।

সে বুঝতে পারছিল, ইমন এখন আগের সেই দুষ্টু ছেলে নেই।

সে অনেক দায়িত্বশীল হয়েছে।

কয়েক মাস পর তাদের জীবনে এল সেই প্রতীক্ষিত দিন।

হাসপাতালের বাইরে ইমন অস্থির হয়ে পায়চারি করছিল।

তার বাবা বললেন,

—এভাবে হাঁটলে কি সময় তাড়াতাড়ি যাবে?

ইমন বলল,

—বাবা, আমার খুব ভয় করছে।

মা তার কাঁধে হাত রেখে বললেন,

—সব ঠিক হবে।

অনেকক্ষণ পর ভেতর থেকে খবর এল।

মা ও সন্তান দুজনেই ভালো আছে।

ইমন যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

তার চোখে আনন্দের পানি চলে এল।

কিছুক্ষণ পর সে প্রীতির কাছে গেল।

প্রীতি ক্লান্ত হলেও মুখে হাসি ছিল।

ইমন তার পাশে বসে ধীরে বলল,

—তুমি কেমন আছ?

প্রীতি বলল,

—ভালো।

ইমন শিশুটির দিকে তাকাল।

তার চোখে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।

প্রীতি মৃদু হেসে বলল,

—কী হলো? কথা বলছেন না কেন?

ইমন বলল,

—আমি ভাবছি, এত ছোট একটা মানুষ কীভাবে আমার পুরো পৃথিবী হয়ে গেল।

প্রীতি বলল,

—আপনার পৃথিবী তো আগে থেকেই ছিল।

ইমন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—হ্যাঁ। তুমি ছিলে।

প্রীতির চোখে পানি এসে গেল।

ইমন ধীরে বলল,

—এখন আমাদের পৃথিবীটা আরও বড় হলো।

বাড়িতে ফেরার পর আনন্দের সীমা রইল না।

ইমনের মা শিশুটিকে কোলে নিয়ে বারবার বলছিলেন,

—আমার নাতি!

প্রীতির বাবা-মায়ের চোখেও আনন্দের পানি।

সবাই শিশুটিকে ঘিরে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

ইমন একসময় একটু দূরে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল।

তার মনে হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই প্রথম দিনের কথা মনে পড়ল।

একটা সাধারণ পোশাক পরা মেয়েকে নিয়ে সে আর তার বন্ধুরা হাসছিল।

সেদিন যদি কেউ তাকে বলত—

‘এই মেয়েটাই একদিন তোমার স্ত্রী হবে, তোমার সন্তানের মা হবে, আর তোমার সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে দাঁড়াবে।’

সে হয়তো বিশ্বাসই করত না।

ইমন ধীরে প্রীতির পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

প্রীতি তাকিয়ে বলল,

—কী ভাবছেন?

ইমন হেসে বলল,

—ভাবছি, তোমাকে প্রথম দিন চিনতেই পারিনি।

প্রীতি মৃদু হেসে বলল,

—এখন চিনেছেন?

ইমন বলল,

—এখনও প্রতিদিন নতুন করে চিনছি।

প্রীতি তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

তাদের জীবনে যেন নতুন একটা অধ্যায় শুরু হলো।

কিন্তু ইমন জানত, সংসারে শুধু আনন্দ নয়, দায়িত্বও আছে।

আর সেই দায়িত্ব সে এবার পুরোপুরি নিজের কাঁধে নিতে প্রস্তুত।

কারণ একসময় যে ছেলেটা মানুষকে বাহ্যিক চেহারা দিয়ে বিচার করত, আজ সে শিখেছে—

মানুষের মূল্য তার পোশাকে নয়, তার হৃদয়ে।

আর প্রীতি ছিল সেই মানুষ, যে ইমনের পুরো জীবনটাই বদলে দিয়েছিল।

বিয়ের পর কেটে গেছে কয়েক বছর।

ইমন আর প্রীতির ছোট্ট সংসার এখন আরও বড় হয়েছে।

তাদের সন্তান একটু একটু করে বড় হচ্ছে। সকাল হলেই বাড়িতে তার হাসির শব্দ শোনা যায়। ইমন অফিসে যাওয়ার আগে সন্তানের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটায়, আর প্রীতি স্কুলে যাওয়ার আগে সবকিছু গুছিয়ে দেয়।

একদিন সকালে ইমন অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল।

ছোট্ট সন্তানটা দৌড়ে এসে তার পা জড়িয়ে ধরল।

—বাবা, আজ তাড়াতাড়ি আসবে?

ইমন নিচু হয়ে তাকে কোলে তুলে বলল,

—অবশ্যই। আজ তোমার জন্য একটা জিনিস আনব।

—কী?

—সেটা এখন বলব না।

পাশ থেকে প্রীতি বলল,

—প্রতিদিন এভাবে আদর করে যাচ্ছেন। ওকে কিন্তু নষ্ট করে ফেলবেন।

ইমন হেসে বলল,

—তুমি সামলাবে।

প্রীতি মাথা নাড়ল।

—সব দায়িত্ব আমার?

—তুমি তো আমার সংসারের সবচেয়ে দায়িত্বশীল মানুষ।

প্রীতি মুচকি হাসল।

ইমন বেরিয়ে যাওয়ার আগে প্রীতির দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমি আসছি।

প্রীতি বলল,

—সাবধানে যাবেন।

দরজা বন্ধ হওয়ার পরও প্রীতি কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল।

তার মনে পড়ে গেল অনেক বছর আগের সেই দিনগুলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন।

সাধারণ পোশাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা একটা মেয়ে।

চারপাশে আধুনিক পোশাকে অনেক মেয়ে।

আর কয়েকজন ছেলে-মেয়ে বসে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে।

সবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছেলেটার নাম ইমন।

তখন প্রীতি ভাবতেই পারেনি, এই ছেলেটাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে।

কিছুদিন পর সেই একই ছেলে কাগজ ছুড়ে তার চোখে ব্যথা দিয়েছিল।

সেদিন ইমনকে বাধ্য হয়ে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল।

তারপর বন্ধুত্ব।

তারপর বন্ধুত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনুভূতি।

তারপর সেই রাত—

যেদিন ইমন বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে তার বাড়ির সামনে ক্ষমা চেয়েছিল।

প্রীতির ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

সেদিন যদি সে বারান্দা থেকে নিচে না নামত?

যদি ইমনকে ঘরে না আনত?

তাহলে কি তাদের গল্পটা এমন হতো?

হয়তো না।

বিকেলে ইমন অফিস থেকে ফিরল।

হাতে একটা ছোট প্যাকেট।

সন্তানটা দৌড়ে এসে বলল,

—বাবা! আমার জন্য কী এনেছ?

ইমন প্যাকেটটা তার হাতে দিয়ে বলল,

—খুলে দেখো।

শিশুটি প্যাকেট খুলে আনন্দে চিৎকার করে উঠল।

প্রীতি দূর থেকে দাঁড়িয়ে হাসছিল।

ইমন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোমার জন্যও একটা জিনিস আছে।

প্রীতি অবাক হয়ে বলল,

—আমার জন্য?

—হ্যাঁ।

ইমন আরেকটা ছোট প্যাকেট এগিয়ে দিল।

প্রীতি খুলে দেখল, একটা সুন্দর কলম।

প্রীতি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—কলম?

ইমন মুচকি হেসে বলল,

—মনে আছে?

প্রীতির চোখে সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো স্মৃতি ফিরে এল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি।

ইমন প্রথমবার তাকে একটা কলম দিয়েছিল।

প্রীতি ধীরে বলল,

—মনে আছে।

—সেদিন বলেছিলে, যত্ন করে রাখবে।

প্রীতি কলমটা হাতে নিয়ে বলল,

—এটাও যত্ন করে রাখব।

ইমন হেসে বলল,

—এই কলমটার সঙ্গে কিন্তু একটা চিঠি আছে।

প্রীতি অবাক হয়ে চিঠিটা খুলল।

ভেতরে ইমনের নিজের হাতে লেখা কয়েকটা কথা।

প্রীতি পড়তে পড়তে হাসছিল।

চিঠির শেষে লেখা—

“যে মেয়েটাকে একদিন না বুঝে হাসির কারণ বানিয়েছিলাম, সেই মেয়েটাই আজ আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প। তোমাকে হারানোর ভয় আমাকে ভালোবাসার মূল্য শিখিয়েছে। আর তোমাকে পাওয়ার পর বুঝেছি—ভালোবাসা শুধু কাউকে কাছে পাওয়া নয়, তাকে সম্মান করা, তার পাশে থাকা আর প্রতিদিন নতুন করে তাকে বেছে নেওয়া।”

প্রীতির চোখ ভিজে উঠল।

সে চিঠিটা ভাঁজ করে ইমনের দিকে তাকাল।

—আপনি এত সুন্দর করে লিখতে পারেন?

ইমন বলল,

—তোমার জন্য লিখতে গিয়ে শিখেছি।

প্রীতি হেসে বলল,

—আপনি সত্যিই অনেক বদলে গেছেন।

ইমন বলল,

—তুমি বদলে দিয়েছ।

সন্তানটা তখন তাদের দুজনের মাঝখানে এসে বলল,

—তোমরা কী করছ?

ইমন হেসে বলল,

—তোমার মায়ের সঙ্গে গল্প করছি।

—আমাকেও বলো।

প্রীতি তাকে কোলে তুলে নিল।

—তোমার বাবা ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিল।

ইমন সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—এই কথাটা বলার দরকার ছিল?

প্রীতি হাসতে হাসতে বলল,

—সত্যি কথা তো!

শিশুটি অবাক হয়ে বলল,

—বাবা দুষ্টু ছিল?

ইমন বলল,

—হ্যাঁ। কিন্তু তোমার মা আমাকে ভালো মানুষ বানিয়েছে।

প্রীতি মৃদু হেসে বলল,

—আমি না, আপনার নিজের ভুলগুলো আপনাকে শিখিয়েছে।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—সেটাও ঠিক।

সন্ধ্যা নেমে এলো।

তিনজন বারান্দায় বসে ছিল।

প্রীতির মাথা ইমনের কাঁধে হেলান দেওয়া।

সন্তানটা তাদের পাশে খেলছিল।

আকাশে মেঘ ছিল।

হঠাৎ হালকা বৃষ্টি শুরু হলো।

ইমন আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—বৃষ্টি মনে আছে?

প্রীতি বলল,

—কোন বৃষ্টি?

—যেদিন তোমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

প্রীতি হেসে বলল,

—সেদিন আপনাকে দেখে আমার খুব হাসি পেয়েছিল।

—আমি এত কষ্ট করে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর তুমি হাসছিলে?

—আপনি তখন কাঁপছিলেন, আবার আমাকে দেখে কান ধরে উঠবস করছিলেন। হাসি পাবে না?

ইমনও হেসে ফেলল।

—তুমি সেদিন আমাকে ঘরে না তুললে হয়তো আজকের গল্পটাই হতো না।

প্রীতি ধীরে বলল,

—আপনি সেদিন সত্যি করে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

ইমন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আর তুমি আমাকে সত্যি করে ক্ষমা করেছিলে।

কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে রইল।

তারপর ইমন বলল,

—প্রীতি?

—হুম?

—তুমি কি আমার সঙ্গে সুখী?

প্রীতি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—খুব।

—কোনো আফসোস নেই?

প্রীতি মাথা নাড়ল।

—একটুও না।

ইমন বলল,

—আমারও নেই।

প্রীতি বলল,

—শুধু একটা আফসোস আছে।

ইমন অবাক হয়ে বলল,

—কী?

প্রীতি হেসে বলল,

—আপনার সঙ্গে আরও আগে বন্ধুত্ব করা উচিত ছিল।

ইমন হেসে বলল,

—আর আমার উচিত ছিল প্রথম দিন থেকেই তোমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা।

প্রীতি বলল,

—তাহলে আমাদের গল্পটা এত সুন্দর হতো না।

ইমন তার কথায় মৃদু হাসল।

সত্যিই তো।

কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কগুলো শুরু হয় এমন একটা জায়গা থেকে, যেখানে আমরা ভাবতেই পারি না ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে।

একসময় ইমন প্রীতিকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিল।

প্রীতি তখন চুপ করে সহ্য করেছিল।

তারপর একদিন সেই মেয়েটাই ইমনের জীবনে এসে তাকে শিখিয়েছিল—

অহংকার নয়, মানুষের মনটাই আসল।

টাকার বড়ত্ব নয়, ভালোবাসার মূল্যটাই বড়।

আর কাউকে পাওয়ার চেয়ে তাকে সম্মান করে পাশে রাখাটাই সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইমন প্রীতির দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

—জানো, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া কী?

প্রীতি বলল,

—কী?

ইমন তার পরিবারের দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি।

প্রীতি হেসে বলল,

—আর আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো, সেই দুষ্টু ইমনটা শেষ পর্যন্ত মানুষ হয়েছে।

ইমন হেসে ফেলল।

বৃষ্টির শব্দ ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।

তিনজন একসঙ্গে বারান্দা থেকে ঘরের ভেতরে চলে গেল।

পেছনে পড়ে রইল সেই বৃষ্টিভেজা বারান্দা, যেখানে একদিন একটা ভুলের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক জানত না—

সেই রাতটাই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পের শুরু।

 

....
👁 874