এক মেয়ের জন্য অশান্তি

রাতের শহরটা তখন বৃষ্টিতে ভিজছিল।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আরিয়ান চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বহু বছর আগের একটা রাত।

সেদিনও এমনই বৃষ্টি হয়েছিল।

মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার পুরো জীবনটা বদলে গিয়েছিল।

বিয়ের তিন বছর পর তাদের ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছিল ছোট্ট একটা ছেলে—রিয়ান।

ছেলেটাকে নিয়ে আরিয়ান আর তার স্ত্রী মায়ার সংসারটা ছিল ছোট হলেও ভীষণ সুখের।

কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনায় মায়া মারা যায়।

রিয়ান তখন মাত্র কয়েক বছরের শিশু।

স্ত্রীর মৃত্যুর পর আরিয়ান নিজেকে পুরোপুরি কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। নিজের কষ্ট কাউকে দেখায়নি। ছেলেটার জন্যই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বছর কেটে গেল।

রিয়ান বড় হয়ে স্কুলে ভর্তি হলো।

অন্যদিকে মায়ার স্মৃতি বুকে নিয়ে আরিয়ান হয়ে উঠল একটি বড় প্রতিষ্ঠানের কঠোর ও সফল কর্মকর্তা। এখন সে কোম্পানির অন্যতম বড় পদে আছে। অফিসে সবাই তাকে ভয় পায়।

কারণ আরিয়ানের রাগ ভয়ংকর।

কেউ তার সামনে অযথা কথা বলার সাহস করে না।

অন্যদিকে শহরের আরেক প্রান্তে থাকত মেহরিন।

একটি স্কুলে শিক্ষকতা করত সে।

বেতন খুব বেশি নয়।

বাবা-মায়ের সংসার, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা—সবকিছু সামলাতে গিয়ে মাসের শেষ দিকে প্রায়ই হিসাব মেলাতে পারত না।

তাই সে নতুন চাকরি খুঁজছিল।

তবে স্কুলের চাকরিটা সে ছাড়তে চাইছিল না।

কারণ স্কুলে তার সবচেয়ে প্রিয় একজন ছিল।

রিয়ান।

ছেলেটা তাকে ভীষণ পছন্দ করত।

মেহরিনও নিজের সন্তানের মতোই তাকে আদর করত।

একদিন স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার পর বেশিরভাগ শিক্ষক চলে গেছে।

মেহরিন ক্লাসরুমে বসে রিয়ানের সঙ্গে গল্প করছিল।

—মাম, আপনি জানেন? আমার আব্বু অনেক রাগী।

মেহরিন হেসে বলল,

—তাই নাকি? তাহলে তোমাকে তো খুব ভয় পেতে হয়।

রিয়ান মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—না। আব্বু আমাকে কখনো বকা দেয় না।

মেহরিন হেসে তার চুল এলোমেলো করে দিল।

ঠিক তখনই দরজার সামনে একটা গাড়ি এসে থামল।

কয়েক মুহূর্ত পর দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকল আরিয়ান।

তার চোখ প্রথমে ছেলের ওপর গেল।

তারপর মেহরিনের দিকে।

রিয়ান বাবাকে দেখে দৌড়ে গেল।

—আব্বু!

আরিয়ান ছেলেকে কোলে তুলে নিল।

রিয়ান আনন্দে মেহরিনের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,

—আব্বু, দেখো! মাম একদম আমার আম্মুর মতো দেখতে!

কথাটা শুনেই আরিয়ান থমকে গেল।

তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।

মেহরিনও অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

আরিয়ান কোনো কথা না বলে ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।

পেছনে দাঁড়িয়ে মেহরিন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

—বাবা এত অহংকার!

পরদিনই মেহরিন নতুন চাকরির একটি ইন্টারভিউ দিতে গেল।

বড় কোম্পানির বিশাল অফিস।

রিসেপশন থেকে তাকে উপরের ফ্লোরে পাঠানো হলো।

মেহরিন দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল।

সামনের চেয়ারে বসা মানুষটাকে দেখে তার চোখ বড় হয়ে গেল।

আরিয়ানের চোখও স্থির হয়ে গেল।

দুজনেই কয়েক সেকেন্ড চুপ।

তারপর আরিয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,

—আপনি?

মেহরিন গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল,

—জি। চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছি।

আরিয়ান ফাইলটা হাতে নিল।

ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটল।

—বসুন।

মেহরিন বসে পড়ল।

কিন্তু সে জানত না—

এই একটা ইন্টারভিউ তার জীবনটাকে কতটা বদলে দিতে চলেছে।

ইন্টারভিউ শেষ হতে বেশি সময় লাগল না।

মেহরিন প্রায় নিশ্চিত ছিল, তাকে চাকরি দেওয়া হবে না।

কারণ আরিয়ানের আচরণ ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা।

শেষে আরিয়ান শুধু বলল,

—আপনি কাল থেকে জয়েন করবেন।

মেহরিন অবাক।

—জি?

—কানে কম শোনেন?

মেহরিন ভ্রু কুঁচকে বলল,

—না।

—তাহলে কাল সকাল আটটায় অফিসে থাকবেন।

মেহরিন উঠে দাঁড়াল।

—ঠিক আছে।

দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় আরিয়ান আবার বলল,

—আর একটা কথা।

মেহরিন ঘুরে তাকাল।

—অফিসে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো জায়গা নেই।

মেহরিন বুঝে গেল কথাটা কেন বলা হয়েছে।

সে শান্তভাবে বলল,

—আমিও অফিসে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আসতে চাই না।

তারপর বেরিয়ে গেল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

মনে মনে বলল,

‘মেয়েটা বেশ জবাব দিতে শিখেছে।’

পরদিন সকাল আটটার আগেই মেহরিন অফিসে চলে এল।

কিন্তু তার কাজ শুরু হওয়ার পরই সে বুঝল—তার বস তাকে মোটেও সহজে ছাড়বে না।

একটার পর একটা ফাইল।

তারপর মিটিংয়ের নোট।

তারপর রিপোর্ট।

তারপর পুরোনো ডকুমেন্ট সাজানো।

মেহরিন দুপুরে ক্লান্ত হয়ে চেয়ারটায় বসে পড়ল।

ঠিক তখন আরিয়ানের ফোন এল।

—আমার কেবিনে আসুন।

মেহরিন গিয়ে দাঁড়াল।

—জি, স্যার?

আরিয়ান একটা ফাইল এগিয়ে দিল।

—এটা আজকের মধ্যে শেষ করবেন।

মেহরিন ফাইল দেখে বলল,

—স্যার, এতগুলো কাজ একা করতে সময় লাগবে।

—তাহলে দ্রুত কাজ করতে শিখুন।

মেহরিন দাঁত চেপে বলল,

—জি।

সে বেরিয়ে গেল।

আরিয়ান তাকে যেতে দেখে মুচকি হাসল।

কেন যেন মেয়েটাকে বিরক্ত করতে তার ভালো লাগছিল।

সন্ধ্যায় অফিস প্রায় ফাঁকা।

মেহরিন তখনও কাজ করছে।

আরিয়ান কেবিন থেকে বের হয়ে দেখল, সে মাথা নিচু করে কাজ করছে।

—এখনও যাননি?

মেহরিন তাকাল না।

—আপনার দেওয়া কাজ শেষ হয়নি।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।

তারপর বলল,

—বাড়ি যান। বাকিটা কাল করবেন।

মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।

—কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন আজকের মধ্যে—

—আমি বলেছি বাড়ি যেতে।

মেহরিন আর কিছু বলল না।

ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল।

আরিয়ান তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল।

নিজেকেই প্রশ্ন করল,

‘আমি ওর সঙ্গে এত কঠোর হচ্ছি কেন?’

উত্তরটা সে জানত না।

কয়েকদিনের মধ্যেই মেহরিন অফিসের কাজে বেশ দক্ষ হয়ে উঠল।

তবে আরিয়ানের সঙ্গে তার সম্পর্ক মোটেও ভালো হলো না।

একদিন মিটিংয়ে মেহরিন একটি ভুল ধরিয়ে দিল।

—স্যার, এই হিসাবটা সম্ভবত ভুল আছে।

সবাই চুপ।

আরিয়ান ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।

—আপনি কি আমাকে শেখাচ্ছেন?

—না। শুধু ভুলটা দেখাচ্ছি।

—আমার ভুল খুব সহজে চোখে পড়ে আপনার?

মেহরিন এবার একটু রেগে গেল।

—আপনি যদি ভুল না করেন, তাহলে চোখে পড়বে না।

কেবিনে নিস্তব্ধতা।

আরিয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,

—মিটিং শেষ।

সবাই বেরিয়ে গেল।

মেহরিনও বের হতে যাচ্ছিল।

—আপনি থাকুন।

মেহরিন থেমে গেল।

আরিয়ান বলল,

—আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলবেন না।

—আপনিও আমার সঙ্গে অকারণে রাগ দেখাবেন না।

—আমি আপনার বস।

—অফিসে, হ্যাঁ।

আরিয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

মেহরিন বেরিয়ে গেল।

সেদিন সন্ধ্যায় মেহরিনের প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হলো।

কাজ করতে করতে কখন যে টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে বুঝতেই পারেনি।

আরিয়ান অফিস থেকে বের হওয়ার সময় তাকে দেখে থেমে গেল।

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের কেবিনে ফিরে গেল।

কয়েক মিনিট পর অফিসের পিয়নকে বলল,

—ওনার জন্য একটা গাড়ি ডাকুন।

তারপর নিজেই যোগ করল,

—না, দরকার নেই। আমি পৌঁছে দেব।

নিজের কথাতেই আরিয়ান থেমে গেল।

সে নিজেই বুঝতে পারছিল না কেন মেহরিনকে নিয়ে এত ভাবছে।

পরদিন সকালে মেহরিন অফিসে এসে দেখল তার ডেস্কে একটা ওষুধের প্যাকেট।

কোনো নাম নেই।

সে পাশের সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করল,

—এটা কে দিয়েছে?

—জানি না।

দূর থেকে আরিয়ান তাকিয়ে ছিল।

মেহরিন প্যাকেটটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসল।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল।

কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠেছিল।

এক বিকেলে রিয়ান অফিসে বাবার কাছে চলে এল।

আরিয়ান মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকায় সে মেহরিনের ডেস্কে এসে দাঁড়াল।

—মাম!

মেহরিন অবাক হয়ে তাকিয়ে হাসল।

—তুমি এখানে?

—আব্বুর কাছে এসেছি।

মেহরিন তার মাথায় হাত রাখল।

—খাবে কিছু?

রিয়ান মাথা নাড়ল।

মেহরিন নিজের ব্যাগ থেকে বিস্কুট বের করে দিল।

ঠিক তখন আরিয়ান এসে দাঁড়াল।

তার চোখে বিরক্তি।

—রিয়ান, এখানে এসো।

রিয়ান বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমি মামের সঙ্গে থাকব।

আরিয়ান কিছু বলল না।

মেহরিন বুঝল, পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে যাচ্ছে।

সে বলল,

—আপনি ওকে নিয়ে যান। আমি কাজ করছি।

রিয়ান হঠাৎ বলল,

—আব্বু, মাম আমাদের বাসায় থাকলে কেমন হয়?

আরিয়ান চমকে উঠল।

মেহরিনও লজ্জায় পড়ে গেল।

—রিয়ান!

ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল,

—আমার মামকে ভালো লাগে।

আরিয়ান ছেলেকে নিয়ে চলে গেল।

কিন্তু গাড়িতে বসার পরও ছেলের কথাটা মাথা থেকে গেল না।

সেদিন রাতে রিয়ান বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

—আব্বু, মামকে তুমি পছন্দ করো না?

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—না।

রিয়ান বলল,

—মিথ্যা বলছ।

আরিয়ান অবাক।

—কেন?

—তুমি মামের দিকে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকাও।

আরিয়ান হাসি চেপে বলল,

—তুমি অনেক বেশি কথা বলতে শিখেছ।

রিয়ান হেসে উঠল।

কিন্তু আরিয়ানের মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিল।

মেহরিনকে দেখলে কেন তার এত শান্তি লাগে?

কেন মেয়েটা রাগ করলে তার ভালো লাগে না?

কেন সে অন্য কারও সঙ্গে কথা বললে অস্বস্তি হয়?

সে উত্তর খুঁজে পেল না।

একদিন অফিসে মেহরিনের এক পুরোনো পরিচিত তাকে নিতে এল।

লোকটার সঙ্গে কথা বলতে দেখে আরিয়ানের মুখ কালো হয়ে গেল।

লোকটি চলে যাওয়ার পর আরিয়ান মেহরিনকে কেবিনে ডাকল।

—লোকটা কে?

মেহরিন অবাক।

—আপনার জানার দরকার আছে?

আরিয়ান চুপ।

—আমি আপনার বস। তাই জিজ্ঞেস করছি।

মেহরিন ঠান্ডা গলায় বলল,

—আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অফিসে আলোচনা করতে চাই না।

আরিয়ান রেগে গেল।

—তাহলে আমার অফিসে ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে আসবেন না।

মেহরিনের চোখে অভিমান ফুটে উঠল।

—আমি কিছু আনিনি। আপনি নিজেই জানতে চেয়েছেন।

সে বেরিয়ে গেল।

সেদিন প্রথমবার আরিয়ান বুঝল, তার কথায় মেহরিন কষ্ট পেয়েছে।

কিন্তু অহংকার তাকে ক্ষমা চাইতে দিল না।

পরদিন মেহরিন স্বাভাবিকভাবে কাজ করলেও আরিয়ানের সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলল না।

এই নীরবতা আরিয়ানের একদম ভালো লাগল না।

সন্ধ্যায় মেহরিন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি।

তার ছাতা নেই।

আরিয়ান গাড়ি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।

—উঠুন।

—না, আমি চলে যাব।

—বৃষ্টি হচ্ছে।

—আমি সামলে নেব।

আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,

—সবকিছু একা সামলাতে হবে না।

মেহরিন থেমে গেল।

কথাটার মধ্যে যেন অন্যরকম একটা অর্থ ছিল।

শেষ পর্যন্ত গাড়িতে উঠল।

দুজনের মধ্যে নীরবতা।

কিছুক্ষণ পর আরিয়ান বলল,

—সেদিন একটু বেশি রেগে গিয়েছিলাম।

মেহরিন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—আমি অভ্যস্ত।

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

—আমার ওপর রাগ করে আছেন?

মেহরিন এবার তাকাল।

—আপনার কি মনে হয়?

আরিয়ান কিছু বলল না।

কিন্তু তার মনে হলো—

এই মেয়েটার অভিমান ভাঙানোর ইচ্ছেটা কেন যেন খুব বেশি হচ্ছে।

দিন যেতে লাগল।

আরিয়ান আর মেহরিনের সম্পর্ক বদলাতে শুরু করল।

ঝগড়া এখনও হয়।

তবে সেই ঝগড়ার আড়ালে একটা অদ্ভুত টান তৈরি হয়েছে।

একদিন অফিসের কাজে দুজনকে একসঙ্গে বাইরে যেতে হলো।

ফেরার সময় গাড়ি নষ্ট হয়ে গেল।

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দুজন অপেক্ষা করছিল।

মেহরিন হঠাৎ হেসে ফেলল।

আরিয়ান তাকিয়ে বলল,

—হাসছেন কেন?

—আপনার মুখটা দেখছেন?

—কী হয়েছে?

—আপনি এমনভাবে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছেন, মনে হচ্ছে গাড়িটাকে এখনই চাকরি থেকে বরখাস্ত করবেন।

আরিয়ান হেসে ফেলল।

মেহরিন থমকে গেল।

এই প্রথম সে আরিয়ানের হাসি এত কাছ থেকে দেখল।

আরিয়ানও মেহরিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।

তারপর মেহরিন চোখ সরিয়ে নিল।

সেদিন রাতে রিয়ান মেহরিনকে ফোন করল।

—মাম, তুমি কি কাল আসবে?

—হ্যাঁ।

—তাহলে কাল আমার জন্য গল্প আনবে?

—আচ্ছা।

রিয়ান খুশি হয়ে ফোন রেখে দিল।

আরিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে বলল,

—তুমি ওকে এত পছন্দ করো কেন?

রিয়ান বলল,

—কারণ মাম আমাকে আম্মুর মতো ভালোবাসে।

কথাটা শুনে আরিয়ানের বুকটা কেঁপে উঠল।

সে মেহরিনকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করল।

কিন্তু মায়ার জায়গা কেউ নিতে পারবে না—এটা সে জানে।

আর সে চায়ও না কেউ মায়ার জায়গা নিক।

তবু মেহরিনকে নিজের জীবনে একটু একটু করে জায়গা দিতে তার ইচ্ছে হচ্ছে।

একদিন মেহরিন জানতে পারল, আরিয়ান তার চাকরির ব্যাপারে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে সুপারিশ করেছে।

সে রেগে গেল।

—আপনি আমার চাকরি নিয়ে অন্য জায়গায় কথা বলেছেন?

আরিয়ান বলল,

—আমি শুধু সুযোগ তৈরি করেছি।

—আমি কারও দয়া চাই না।

—দয়া করছি না।

—তাহলে?

আরিয়ান চুপ করে গেল।

মেহরিন বলল,

—আপনি সবসময় মনে করেন আপনি যা করবেন সেটাই ঠিক।

সে চলে গেল।

আরিয়ান বিরক্ত হয়ে টেবিলে হাত রাখল।

কয়েকদিন পর মেহরিন চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিল।

আরিয়ান খবরটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল।

—আপনি সত্যিই চলে যাবেন?

—জি।

—কেন?

মেহরিন শান্ত গলায় বলল,

—কারণ এখানে কাজ করতে গিয়ে আমার মনে হচ্ছে আমি নিজের সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারছি না।

আরিয়ান কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।

মেহরিন বেরিয়ে গেল।

সেদিন রাতে রিয়ান বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

—মাম কি আর আসবে না?

আরিয়ান ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—জানি না।

রিয়ান মন খারাপ করে বলল,

—তাহলে তুমি তাকে ফিরিয়ে আনো।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—সব মানুষকে চাইলেই ফিরিয়ে আনা যায় না।

কিন্তু নিজের অজান্তেই সে বুঝে গেল—

সে মেহরিনকে হারাতে চায় না।

মেহরিন নতুন চাকরি পেয়ে গেল।

কিন্তু আনন্দের মধ্যেও কোথাও একটা শূন্যতা ছিল।

একদিন স্কুলে গিয়ে দেখে রিয়ান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

—মাম!

মেহরিন তাকে দেখে ছুটে গেল।

—তুমি এখানে?

—আব্বু নিয়ে এসেছে।

দূরে দাঁড়িয়ে ছিল আরিয়ান।

মেহরিনের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই দুজনেই থেমে গেল।

রিয়ান বলল,

—আব্বু বলেছে তুমি চাইলে আমাদের সঙ্গে ডিনার করতে পারো।

মেহরিন অবাক।

—তোমার আব্বু বলেছে?

রিয়ান মাথা নাড়ল।

আরিয়ান এগিয়ে এসে বলল,

—আমি কিছু কথা বলতে চাই।

সেদিন ডিনারের পর আরিয়ান মেহরিনকে বলল,

—আমি আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।

মেহরিন চুপ।

—কারণ আপনার ওপর রাগ ছিল না। নিজের ওপর ছিল।

মেহরিন তাকাল।

আরিয়ান বলল,

—মায়াকে হারানোর পর আমি ভেবেছিলাম, আমার জীবনে আর কাউকে জায়গা দেব না।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—কিন্তু আপনি যখন চলে গেলেন, তখন বুঝলাম... আপনার অনুপস্থিতিটা আমি সহ্য করতে পারছি না।

মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।

—আপনি কী বলতে চাইছেন?

আরিয়ান ধীরে বলল,

—আমি জানি না এটা ভালোবাসা কিনা। তবে আপনাকে ছাড়া আমার দিনগুলো অসম্পূর্ণ লাগে।

মেহরিন কোনো উত্তর দিল না।

শুধু বলল,

—আমাকে একটু সময় দিন।

আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল,

—যত সময় লাগে নিন।

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।

মেহরিন বুঝতে পারল, আরিয়ানের প্রতি তার নিজের অনুভূতিটাও বদলে গেছে।

একদিন স্কুল শেষে আরিয়ান তাকে নিতে এল।

গাড়িতে বসে মেহরিন বলল,

—আপনি আজকাল আমাকে আর বকেন না কেন?

আরিয়ান হেসে বলল,

—বকলে তো আপনি অভিমান করেন।

—আমি কি এত অভিমানী?

—অনেক।

—আর আপনি?

—আমি?

—আপনি তো আরও বেশি।

দুজনেই হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর মেহরিন জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে বলল,

—আপনি সেদিন যে কথাটা বলেছিলেন...

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

—কোন কথাটা?

—আমাকে ছাড়া দিন অসম্পূর্ণ লাগে।

আরিয়ান চুপ।

মেহরিন মৃদু হেসে বলল,

—আমারও লাগে।

আরিয়ানের চোখে বিস্ময়।

—মানে?

মেহরিন লজ্জায় চোখ নামিয়ে বলল,

—মানে, আপনাকে আমারও ভালো লাগে।

আরিয়ান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে হেসে ফেলল।

—এতদিন লাগল বলতে?

মেহরিন ভ্রু কুঁচকে বলল,

—আপনি আগে বলেছিলেন?

—হ্যাঁ।

—সেটা স্বীকারোক্তি ছিল?

—আমার মতো রাগী মানুষের কাছে ওটাই অনেক।

মেহরিন হেসে ফেলল।

ঠিক তখন রিয়ান পেছনের সিট থেকে বলে উঠল,

—তাহলে মাম আমাদের সঙ্গে থাকবে?

দুজনেই চমকে তাকাল।

রিয়ান হেসে বলল,

—আমি কিন্তু সব শুনেছি।

মেহরিন লজ্জায় মুখ লুকাল।

আরিয়ান ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই এত কথা কোথা থেকে শিখলি?

রিয়ান বলল,

—মাম শিখিয়েছে!

তিনজনের হাসিতে গাড়িটা ভরে গেল।

কয়েক মাস পর।

ছোট্ট একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে আরিয়ান আর মেহরিনের বিয়ে হলো।

মেহরিনের চোখে তখন আনন্দের অশ্রু।

আরিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে তাকিয়ে ছিল তার দিকে।

রিয়ান সবচেয়ে বেশি খুশি।

সে সবার কাছে গিয়ে ঘোষণা করছিল,

—আজ থেকে মাম আমার আব্বুর বউ!

সবাই হেসে ফেলছিল।

বিয়ের পর এক সন্ধ্যায় মেহরিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

আরিয়ান এসে পাশে দাঁড়াল।

—কী ভাবছেন?

মেহরিন মৃদু হেসে বলল,

—ভাবছি, প্রথম দিন আপনাকে দেখে মনে হয়েছিল আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে অহংকারী মানুষ।

আরিয়ান বলল,

—আর এখন?

—এখন মনে হয়... মানুষটা একটু ভালো।

—শুধু একটু?

—হুম।

আরিয়ান হেসে বলল,

—আপনিও প্রথম দিন থেকেই আমাকে সহ্য করতে পারতেন না।

—এখনও পারি না।

—তাহলে বিয়ে করলেন কেন?

মেহরিন তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—রিয়ানকে তো ভালোবাসি।

আরিয়ান ভ্রু তুলল।

—শুধু রিয়ানকে?

মেহরিন কিছু বলল না।

শুধু হেসে ভেতরে চলে গেল।

পেছন থেকে আরিয়ান বলল,

—মেহরিন!

সে ঘুরে তাকাল।

—জি?

—আমি কিন্তু শুনতে চেয়েছিলাম।

মেহরিন লাজুক হাসি দিয়ে বলল,

—আপনি নিজেই বুঝে নিন।

ঠিক তখন রিয়ান দৌড়ে এসে দুজনের হাত ধরে ফেলল।

—চলো! আজ আমরা তিনজন একসঙ্গে গল্প করব।

আরিয়ান আর মেহরিন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল।

কিছু সম্পর্ক শুরু হয় রাগ দিয়ে।

কিছু সম্পর্ক শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি দুজন মানুষ একে অপরকে বুঝতে শেখে, তাহলে সেই সম্পর্কই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে সুন্দর আশ্রয়।

আরিয়ানের জীবনে মায়ার স্মৃতি চিরকাল থাকবে।

কিন্তু তার পাশে নতুন করে জায়গা করে নিল মেহরিন।

আর তাদের ছোট্ট সংসারের সবচেয়ে বড় বন্ধন হয়ে রইল রিয়ান।

....
👁 816