বৃষ্টির এক নরম বিকেল।
পুরনো শহরের সরু রাস্তাগুলো তখন বৃষ্টির পানিতে চকচক করছে। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো দালানগুলোর দেয়াল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কোথাও ভেজা মাটির গন্ধ, কোথাও গরম চায়ের ধোঁয়া। রিকশার ঘণ্টার শব্দ আর টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ মিলেমিশে শহরটাকে যেন অন্যরকম করে তুলেছে।
এই পুরনো শহরেরই এক কোণে ছিল ছোট্ট একটা বইয়ের দোকান।
দোকানটার নাম—‘পাতার গন্ধ’।
দোকানটা খুব বড় নয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, বহু বছর ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা কোনো পুরনো স্মৃতি। কাঠের দরজা, জানালার পাশে কয়েকটা পুরনো বইয়ের স্তূপ আর মাথার ওপর টিনের ছাউনি। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই মনে হতো, পুরো পৃথিবীটাই যেন বইয়ের পাতার মধ্যে লুকিয়ে আছে।
অদিতি সেই দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল।
তার হাতে একটা ছোট ছাতা। বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে যতটা সম্ভব শরীরটা গুটিয়ে রেখেছিল। তবু কপালের সামনের কয়েকটা চুল ভিজে গিয়েছিল।
সে দোকানের সাইনবোর্ডটার দিকে তাকাল।
‘পাতার গন্ধ।’
তারপর ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
দোকানের ভেতরটা বেশ অন্ধকার। একটা হলুদ বাতি জ্বলছিল। চারপাশে কাঠের তাকজুড়ে বই। পুরনো কাগজ আর বইয়ের পাতার মিশ্র গন্ধে অদিতির বুকের ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে গেল।
কাউন্টারের পেছনে বসে থাকা বৃদ্ধ লোকটা চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
—কী বই খুঁজছেন, মা?
অদিতি একটু ইতস্তত করে বলল,
—একটা কবিতার বই।
—নামটা জানেন?
অদিতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—‘বৃষ্টির চিঠি।’
বৃদ্ধ লোকটা ভুরু কুঁচকে ভাবলেন।
—বইটা পুরনো। অনেক বছর আগে বের হয়েছিল। এখন তো আর সহজে পাওয়া যায় না।
অদিতির মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।
—আপনি একটু খুঁজে দেখবেন? খুব দরকার।
বৃদ্ধ লোকটা এবার উঠে দাঁড়ালেন।
—দাঁড়ান, দেখি।
তিনি দোকানের ভেতরের দিকে চলে গেলেন।
অদিতি তাকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
বইটা তার মায়ের সবচেয়ে প্রিয় বই ছিল।
ছোটবেলায় মা প্রায়ই বইটা হাতে নিয়ে বারান্দায় বসতেন। বাইরে বৃষ্টি হলে জানালার পাশে বসে কবিতা পড়তেন। অদিতি তখন মায়ের পাশে বসে কিছুই বুঝত না, শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত।
মা হাসতে হাসতে বলতেন,
‘বড় হলে বুঝবি, কিছু কিছু কবিতা শুধু পড়তে হয় না, অনুভব করতে হয়।’
অদিতি তখন হেসে বলত,
‘আমি তো এখনই বুঝি।’
মা বলতেন,
‘না, তুই কিছুই বুঝিস না।’
সেই স্মৃতিটা মনে পড়তেই অদিতির ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
হঠাৎ পাশের তাক থেকে কারও কণ্ঠ ভেসে এল।
—‘বৃষ্টির চিঠি’ খুঁজছেন?
অদিতি চমকে তাকাল।
একজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাতে একটা পুরনো বই।
ছেলেটার নাম আরিয়ান।
সে দোকানের একটা তাকের সামনে দাঁড়িয়ে বইটার প্রচ্ছদ দেখছিল। সাধারণ পোশাক, কাঁধে কালো ব্যাগ। মুখে খুব বেশি ভাব নেই, কিন্তু চোখদুটো শান্ত।
অদিতির চোখ সরাসরি গিয়ে আটকাল বইটার ওপর।
তার বুকটা ধক করে উঠল।
‘বৃষ্টির চিঠি।’
এই সেই বই!
অদিতি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
আরিয়ান বইটার দিকে তাকিয়ে আবার অদিতির দিকে তাকাল।
—আপনি কি এই বইটাই খুঁজছেন?
অদিতি মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
তার কণ্ঠে এমন একটা আকুলতা ছিল যে আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—এটা কি আপনার খুব দরকার?
অদিতি এবার একটু হাসল।
—খুব।
আরিয়ান বইটার প্রচ্ছদে আঙুল বুলিয়ে বলল,
—আমিও বইটা নিতে এসেছিলাম।
অদিতির মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
—ওহ...
আরিয়ান খেয়াল করল মেয়েটার চোখে হতাশা।
সে কিছুক্ষণ বইটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর হঠাৎ বইটা অদিতির দিকে এগিয়ে দিল।
—তাহলে আপনি নিন।
অদিতি অবাক হয়ে তাকাল।
—কিন্তু আপনি তো—
—আমি অন্য কোথাও খুঁজে নেব।
—কিন্তু এটা তো শেষ কপি।
আরিয়ান হেসে বলল,
—হয়তো আবার পাওয়া যাবে।
অদিতি বইটা নেওয়ার সময় দুজনের আঙুল সামান্য ছুঁয়ে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য দুজনেই থেমে গেল।
খুব ছোট্ট একটা মুহূর্ত।
কিন্তু অদিতির মনে হলো, বৃষ্টির শব্দটাও যেন হঠাৎ একটু ধীর হয়ে গেছে।
সে দ্রুত বইটা হাতে নিয়ে বলল,
—ধন্যবাদ।
—স্বাগতম।
আরিয়ান আর কিছু বলল না।
অদিতিও না।
কিন্তু দুজনেই অদ্ভুতভাবে একে অপরের দিকে আরেকবার তাকাল।
ঠিক তখনই দোকানের মালিক দূর থেকে ফিরে এলেন।
—পেয়ে গেছি, মা।
তারপর অদিতির হাতে বইটা দেখে মুচকি হাসলেন।
—ও, আরিয়ান তোমাকে দিয়ে দিয়েছে?
অদিতি অবাক হয়ে তাকাল।
—আপনি ওনাকে চেনেন?
বৃদ্ধ লোকটা হাসলেন।
—এই ছেলেটা প্রায়ই আসে। বই নিয়ে বসে থাকে, চা খায়, আবার চলে যায়। দোকানের পুরনো কাস্টমার।
আরিয়ান হেসে বলল,
—কাকা, এত কথা বলার দরকার নেই।
—কেন? সত্যিই তো বলছি।
অদিতির মুখে এবার হালকা হাসি ফুটে উঠল।
বাইরে তখন বৃষ্টি আরও বেড়েছে।
অদিতি বইটা ব্যাগে রাখল। তারপর ছাতাটা খুলতে খুলতে দরজার কাছে গিয়ে থামল।
একবার পেছনে তাকাল।
আরিয়ান তখনও তাকের সামনে দাঁড়িয়ে।
তাদের চোখাচোখি হলো।
আরিয়ান মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
অদিতিও হেসে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।
বৃষ্টির মধ্যে ধীরে ধীরে তার ছাতাটা দূরে মিলিয়ে গেল।
আরিয়ান দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
কী আশ্চর্য!
যে বইটা সে এতদিন ধরে খুঁজছিল, সেটার শেষ কপিটা অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়ার পর তার একটুও খারাপ লাগছে না।
বরং মনে হচ্ছে—
আজ যেন সে বইয়ের বদলে অন্য কিছু পেয়েছে।
কী পেয়েছে, সেটা অবশ্য তখনও সে জানত না।
আর অদিতি?
বাড়ি ফেরার পথে বারবার ব্যাগের ভেতর রাখা বইটার দিকে তাকাচ্ছিল।
বইটা মায়ের জন্য পাওয়া গেছে।
কিন্তু আজকের বিকেলের সেই অপরিচিত ছেলেটার হাসিটাও কেন যেন তার মনে আটকে গেছে।
বৃষ্টির শহরে সেদিন দুজন অপরিচিত মানুষের দেখা হয়েছিল।
তারা কেউ জানত না—
এই ছোট্ট সাক্ষাৎ একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প হয়ে উঠবে।
আর সেই গল্পের প্রথম পাতাটা লেখা হয়ে গেল একটি পুরনো বইয়ের দোকানে।
একটি বইয়ের নাম ছিল—
‘বৃষ্টির চিঠি।’
পরের শুক্রবার।
সারাদিন আকাশটা মেঘলা ছিল। তবে সেদিন বৃষ্টি হয়নি। পুরনো শহরের রাস্তাগুলো শুকনো, বাতাসে হালকা শীতলতা। বিকেল নামতেই চারপাশে ব্যস্ততা একটু কমে এলো।
অদিতি নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল।
তার সামনে খোলা ছিল সেই বই—‘বৃষ্টির চিঠি’।
বইটার পাতাগুলো অনেক পুরনো। কিছু জায়গায় কাগজ হলদেটে হয়ে গেছে। তবু অদিতির কাছে বইটা যেন অমূল্য কোনো স্মৃতি।
গত শুক্রবার বইটা পাওয়ার পর থেকে সে কয়েকবার মায়ের পুরনো কথাগুলো মনে করেছে।
মা বলতেন, বইটা নাকি তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের সঙ্গী ছিল।
অদিতি বইয়ের একটা পাতা উল্টে থেমে গেল।
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল আরিয়ানের কথা।
বইটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা।
‘আমি অন্য কোথাও খুঁজে নেব।’
কথাটা খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু অদিতির মনে হচ্ছিল, ছেলেটা চাইলে বইটা নিজের কাছেই রাখতে পারত।
সে কেন দিল?
অদিতি নিজেই নিজের ভাবনায় বিরক্ত হয়ে বইটা বন্ধ করে ফেলল।
—অদ্ভুত ছেলে!
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল।
কেন যেন মনে হলো, আজ আবার যদি দোকানটায় যাওয়া যায়?
নিজের এই চিন্তায় সে নিজেই অবাক হলো।
—আমি কি বইয়ের জন্য যাচ্ছি, নাকি...?
কথাটা শেষ করল না।
কিছুক্ষণ পর ব্যাগটা হাতে নিল।
বিকেল পাঁচটা।
‘পাতার গন্ধ’ বইয়ের দোকানের সামনে এসে অদিতি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
দোকানের দরজার ওপর ঝোলানো ছোট্ট ঘণ্টাটা বাতাসে হালকা শব্দ করছিল।
সে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
কাউন্টারের পেছনে বৃদ্ধ লোকটা বসে ছিলেন।
অদিতিকে দেখেই হাসলেন।
—আবার এসেছ?
অদিতি একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—হ্যাঁ। কিছু বই দেখতে এসেছি।
বৃদ্ধ লোকটা মুচকি হেসে বললেন,
—বই দেখতে, নাকি কারও সঙ্গে দেখা করতে?
অদিতি থমকে গেল।
—মানে?
—কিছু না, কিছু না। যাও, বই দেখো।
অদিতি কিছু না বলে তাকের দিকে চলে গেল।
কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরই তার চোখ নিজে থেকেই দোকানের ভেতরটা খুঁজতে শুরু করল।
আরিয়ান নেই।
অদিতি নিজের অজান্তেই একটু হতাশ হলো।
সে একটা বই হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠ শোনা গেল,
—আপনি কি সবসময় বই হাতে নিয়ে এভাবে ভুরু কুঁচকে থাকেন?
অদিতি চমকে ঘুরে দাঁড়াল।
আরিয়ান।
কাঁধে সেই কালো ব্যাগ। হাতে দুটো বই। মুখে পরিচিত সেই মৃদু হাসি।
অদিতি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
—আপনি!
—হ্যাঁ, আমি।
—কখন এলেন?
—এই তো একটু আগে।
অদিতি বইটার দিকে তাকাল।
—আপনি কি আবার বই কিনতে এসেছেন?
—না। আগেরবার যে বইটা আপনাকে দিয়ে দিয়েছিলাম, তার বদলে নতুন একটা খুঁজতে এসেছি।
অদিতি হেসে বলল,
—পেয়েছেন?
—না।
—কেন?
—যে বইটা আমি চেয়েছিলাম, সেটা শেষ কপি ছিল।
অদিতি এবার বুঝতে পারল।
—ওহ...
আরিয়ান বলল,
—তবে একটা ভালো দিক হয়েছে।
—কী?
—এখন বুঝতে পারছি, বইটা আপনাকে দেওয়াটাই ভালো হয়েছিল।
অদিতি একটু অবাক হয়ে তাকাল।
—কীভাবে?
আরিয়ান বলল,
—কারণ আপনি বইটা নিয়ে এত খুশি হয়েছিলেন যে, সেটা দেখার পর নিজের বই না পাওয়ার কষ্টটা কমে গেছে।
অদিতি হেসে ফেলল।
—আপনি সবসময় এত সুন্দর করে কথা বলেন?
—না। আপনার সঙ্গে কথা বললেই এমন হয়।
কথাটা বলেই আরিয়ান নিজেও একটু থেমে গেল।
অদিতি চোখ নামিয়ে ফেলল।
কয়েক সেকেন্ড দুজনের মধ্যে নীরবতা।
তারপর অদিতি বলল,
—আপনার নামটা তো জানাই হয়নি।
—আরিয়ান।
—আমি অদিতি।
—জানি।
অদিতি অবাক হয়ে তাকাল।
—জানেন?
আরিয়ান একটু হেসে বলল,
—কাকা আপনাকে ডাকছিলেন। সেদিন শুনেছিলাম।
—ওহ।
অদিতি আবার বইয়ের দিকে তাকাল।
—আপনি কি নিয়মিত এখানে আসেন?
—হ্যাঁ। প্রায় প্রতি শুক্রবার।
—প্রতি শুক্রবার?
—হুম।
—কেন?
আরিয়ান দোকানের চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—এই জায়গাটা ভালো লাগে। পুরনো বইয়ের গন্ধ, শান্ত পরিবেশ... আর কাকার চা।
অদিতি হাসল।
—বইয়ের দোকানে চা?
—দোকানের পাশে একটা ছোট চায়ের দোকান আছে। কাকার চা খুব বিখ্যাত।
—সত্যি?
—আপনি কখনো খাননি?
অদিতি মাথা নাড়ল।
—না।
আরিয়ান দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তাহলে আজ খেয়ে দেখতে পারেন।
অদিতি একটু ইতস্তত করল।
—আজ?
—হ্যাঁ। যদি আপনার আপত্তি না থাকে।
অদিতি কিছু বলল না।
তারপর হালকা হাসল।
—ঠিক আছে।
দোকানের পাশেই ছোট্ট একটা চায়ের দোকান।
দোকান বলতে টিনের ছাউনি, কয়েকটা কাঠের বেঞ্চ আর একটা ছোট চুলা। চুলার ওপর কেটলি থেকে ধোঁয়া উঠছে।
আরিয়ান একটা বেঞ্চে বসে বলল,
—এই জায়গাটাই আমার শুক্রবারের ঠিকানা।
অদিতি পাশে বসে চারপাশে তাকাল।
—খুব ছোট।
—ছোট জায়গার গল্পগুলো বড় হয়।
অদিতি তাকাল তার দিকে।
—আপনি সব কথাই এমন অদ্ভুতভাবে বলেন?
আরিয়ান হেসে ফেলল।
—আপনি চাইলে সাধারণভাবেও বলতে পারি।
—না। এভাবেই ভালো।
দোকানের লোক দুজনের সামনে চা রেখে গেল।
অদিতি কাপটা হাতে নিল।
—আপনি কী করেন?
—লেখালেখি করি একটু। একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কাজও করি।
—ওহ! তাই এত বই পড়েন?
—হয়তো।
—আর আপনি?
অদিতি কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—আমি পড়াশোনা করছি। পাশাপাশি একটা ছোট্ট লাইব্রেরিতে কাজ করি।
আরিয়ান অবাক হলো।
—সত্যি?
—হুম।
—তাহলে বইয়ের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা বেশ পুরনো।
অদিতি মৃদু হাসল।
—বই আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া।
—উনি কি খুব বই পড়তেন?
অদিতির চোখে হঠাৎ নরম একটা ছায়া নামল।
—খুব।
—‘বৃষ্টির চিঠি’ও?
অদিতি মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ। এটা ছিল মায়ের সবচেয়ে প্রিয় বই।
আরিয়ান আর কোনো প্রশ্ন করল না।
সে বুঝতে পারল, কথাটা অদিতির কাছে শুধু একটা বইয়ের গল্প নয়।
কিছু স্মৃতি হয়তো এমন থাকে, যেগুলো নিয়ে বেশি প্রশ্ন করা যায় না।
দুজনেই চুপচাপ চা খেতে লাগল।
অদিতি অবাক হয়ে বুঝতে পারল, এই নীরবতাটা অস্বস্তিকর নয়।
বরং ভালো লাগছে।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান বলল,
—আপনি কি কবিতা পড়েন?
—মাঝে মাঝে।
—কবিতা লিখেন?
—না। তবে লিখতে ইচ্ছে করে।
—তাহলে লিখুন।
—কী নিয়ে?
আরিয়ান কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—আজকের বিকেল নিয়ে।
অদিতি হেসে বলল,
—আজ তো বৃষ্টি হয়নি।
আরিয়ান আকাশের দিকে তাকাল।
—বৃষ্টি না হলেও সব বিকেল বৃষ্টির মতো হতে পারে।
অদিতি কিছু বলল না।
শুধু তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
সেদিন তারা অনেকক্ষণ কথা বলেছিল।
বই নিয়ে, পুরনো শহর নিয়ে, তাদের পছন্দের গল্প নিয়ে।
সূর্য ডুবে যাওয়ার পর অদিতি উঠে দাঁড়াল।
—আজ তাহলে যাই।
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—আচ্ছা।
অদিতি কয়েক পা এগিয়ে আবার পেছনে তাকাল।
আরিয়ান তখনও বসে আছে।
তাদের চোখাচোখি হলো।
অদিতি বলল,
—আগামী শুক্রবার আসবেন?
আরিয়ান হেসে বলল,
—আমি তো প্রতি শুক্রবার আসি।
অদিতি এবার মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে আমিও আসব।
সে চলে গেল।
আরিয়ান অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরের শুক্রবারের অপেক্ষা যেন সেদিন থেকেই শুরু হয়ে গেল।
দুজনের কেউই তখনও জানত না—
একটা বইয়ের দোকান, একটা ছোট চায়ের দোকান আর প্রতি শুক্রবারের কয়েক ঘণ্টা—
একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হয়ে উঠবে।
পরের শুক্রবার আসতে যেন অদিতির কাছে অস্বাভাবিক রকম সময় লাগল।
সপ্তাহের বাকি দিনগুলো খুব দ্রুত কেটে গেলেও শুক্রবারটা যেন কোনোভাবেই আসতে চাইছিল না। পড়াশোনা, লাইব্রেরির কাজ, বাড়ির নানা ব্যস্ততা—সবকিছুর মাঝেও হঠাৎ হঠাৎ তার মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোট্ট চায়ের দোকানটার কথা।
আরিয়ানের কথা।
সেদিনের কথাগুলো।
বিশেষ করে একটা কথা বারবার মনে পড়ছিল—
‘আজকের বিকেল নিয়ে লিখুন।’
কেন যেন কথাটা অদিতির মনে আটকে গিয়েছিল।
শুক্রবার বিকেলে অদিতি আবার ‘পাতার গন্ধ’ বইয়ের দোকানে গেল।
দোকানে ঢুকেই প্রথমে সে চারপাশে তাকাল।
আরিয়ান নেই।
তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে গেল।
নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করল, সে তো বই দেখতেই এসেছে।
কিন্তু মনটা যেন তার কথা শুনল না।
দোকানের মালিক অদিতিকে দেখে হাসলেন।
—আজও বই দেখতে?
অদিতি হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
বৃদ্ধ লোকটা চোখ টিপে বললেন,
—চা খাবি?
অদিতি একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়ল।
—খাব।
—তাহলে পাশের দোকানে বস। আরিয়ানও আসবে।
অদিতি অবাক হয়ে তাকাল।
—আপনি কীভাবে জানেন?
—ও প্রতি শুক্রবার আসে। আজ একটু দেরি করছে।
অদিতি কিছু বলল না।
চুপচাপ দোকানের পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে বসে পড়ল।
তার সামনে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা।
সে বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল।
পাঁচ মিনিট।
দশ মিনিট।
পনেরো মিনিট।
তারপর দূর থেকে একটা পরিচিত অবয়ব দেখা গেল।
কালো ব্যাগ কাঁধে, হাতে কয়েকটা বই।
আরিয়ান।
অদিতির মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
আরিয়ান কাছে এসে প্রথমে তাকে দেখেই থেমে গেল।
—আপনি এসেছেন!
অদিতি ভান করে অবাক হলো।
—কেন? আসতে পারি না?
—না, তা নয়। ভাবছিলাম, আজ হয়তো আসবেন না।
—কেন?
আরিয়ান হেসে বলল,
—জানি না। তবে আপনি এসেছেন দেখে ভালো লাগছে।
অদিতি চোখ নামিয়ে চায়ের কাপের দিকে তাকাল।
—বসবেন?
—অবশ্যই।
আরিয়ান তার সামনে বসে পড়ল।
চায়ের দোকানের লোকটা আরিয়ানের জন্যও এক কাপ চা দিয়ে গেল।
আরিয়ান কাপ হাতে নিয়ে বলল,
—একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
—করুন।
—আপনি কি গত সপ্তাহের পর ‘বৃষ্টির চিঠি’ পড়েছেন?
অদিতির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
—হ্যাঁ।
—কেমন লেগেছে?
—খুব ভালো।
—শুধু ভালো?
—খুব খুব ভালো।
আরিয়ান হেসে বলল,
—তাহলে একটা কবিতা বলুন।
অদিতি অবাক হয়ে তাকাল।
—এখানে?
—হ্যাঁ।
—আমি মুখস্থ বলতে পারব না।
—বই খুলে পড়ুন।
অদিতি ব্যাগ থেকে বইটা বের করল।
বইটা বের করতেই আরিয়ানের চোখে অদ্ভুত একটা শান্তি ফুটে উঠল।
—বইটা এখনো আপনার কাছে আছে দেখে ভালো লাগছে।
অদিতি বইটার মলাটে হাত বুলিয়ে বলল,
—এটা আমি খুব যত্ন করে রাখি।
তারপর একটা পাতা খুলে কয়েক লাইন পড়তে শুরু করল।
আরিয়ান চুপচাপ শুনছিল।
কবিতার প্রতিটি শব্দের চেয়ে তার কাছে অদিতির কণ্ঠটাই যেন বেশি মনোযোগ পাওয়ার মতো হয়ে উঠেছিল।
কিছুক্ষণ পর অদিতি বই বন্ধ করল।
—কেমন হলো?
—ভালো।
—শুধু ভালো?
আরিয়ান হেসে বলল,
—খুব খুব ভালো।
অদিতি হেসে ফেলল।
—আমাকে নকল করছেন?
—আপনি তো বললেন কবিতাটা খুব খুব ভালো। আমিও বললাম আপনার পড়াটাও খুব খুব ভালো।
দুজনেই হেসে উঠল।
সেদিনের বিকেলটা খুব সহজভাবেই কেটে গেল।
তারা নিজেদের ছোটবেলার গল্প করল।
অদিতি বলল, ছোটবেলায় বৃষ্টি হলেই সে মায়ের সঙ্গে বারান্দায় বসত।
আরিয়ান বলল, ছোটবেলায় বৃষ্টি হলেই সে ছাদে উঠে ভিজত।
—আপনার মা বকতেন না?
—বকতেন। কিন্তু আমি পরের বৃষ্টিতেও একই কাজ করতাম।
—আপনি তাহলে ছোটবেলায়ও দুষ্টু ছিলেন।
—এখনও আছি।
অদিতি চোখ সরু করে তাকাল।
—দেখে তো মনে হয় না।
—আপনি আমাকে কতটুকুই বা দেখেছেন?
প্রশ্নটা শুনে অদিতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—দুই সপ্তাহ।
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—আরও অনেকদিন দেখবেন।
কথাটা খুব স্বাভাবিকভাবে বলা হলেও অদিতির বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।
সে বিষয়টা বদলে ফেলল।
—আপনি কি সবসময় শুক্রবার এখানে আসেন?
—হ্যাঁ।
—কখনো বাদ যায় না?
—না।
—কেন?
আরিয়ান একটু ভেবে বলল,
—আগে বইয়ের জন্য আসতাম। এখন...
সে থেমে গেল।
অদিতি তাকাল।
—এখন?
আরিয়ান হেসে চায়ের কাপের দিকে তাকাল।
—এখন শুক্রবারটা ভালো লাগে।
অদিতি বুঝতে পারল না, কথাটার আসল অর্থ কী।
তবু তার মনে হলো, কথাটা শুনে তারও ভালো লাগছে।
এরপর থেকে শুক্রবার যেন তাদের দুজনের জন্য আলাদা একটা দিন হয়ে গেল।
পরের শুক্রবারও তারা দেখা করল।
তার পরের শুক্রবারও।
কখনো বইয়ের দোকানে।
কখনো চায়ের দোকানে।
কখনো পুরনো শহরের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে।
তারা কখনো কবিতা নিয়ে তর্ক করত।
কখনো কে বেশি চা খায় সেটা নিয়ে হাসাহাসি করত।
কখনো কোনো কথা ছাড়াই পাশাপাশি বসে থাকত।
অদিতি বুঝতে পারছিল, আরিয়ানের সঙ্গে কথা বলাটা তার কাছে ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে।
শুক্রবার এলেই তার মন ভালো হয়ে যেত।
আরিয়ানও হয়তো একইভাবে অপেক্ষা করত।
একদিন অদিতি একটু দেরিতে পৌঁছাল।
চায়ের দোকানে এসে দেখল, আরিয়ান একা বসে আছে।
তার সামনে দুই কাপ চা।
অদিতি অবাক হয়ে বলল,
—দুই কাপ কেন?
আরিয়ান বলল,
—একটা আমার। আরেকটা আপনার।
—আমি তো বলিনি আসব।
—তবুও ভেবেছিলাম আসবেন।
অদিতি হেসে বসে পড়ল।
—যদি না আসতাম?
—তাহলে দুই কাপ চা একাই খেতে হতো।
—তাহলে আমাকে এতটা বিশ্বাস করেন?
আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—হ্যাঁ।
অদিতি আর কিছু বলল না।
সেদিন আকাশে মেঘ ছিল।
বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।
দুজনেই চুপচাপ বসে ছিল।
হঠাৎ আরিয়ান বলল,
—অদিতি, তুমি কি কখনো ভেবেছ, কিছু মানুষ শুধু একবারই জীবনে আসে, কিন্তু চলে যায় না?
অদিতি তার দিকে তাকাল।
প্রশ্নটা শুনে তার মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কেন যেন বুকের ভেতর একটা অজানা ভয় জেগে উঠল।
সে উত্তর দিল না।
আরিয়ানও জোর করল না।
কিছুক্ষণ পর অদিতি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কিছু মানুষকে হারানোর ভয় থাকলে তাদের কাছে যাওয়া যায় না।
আরিয়ান অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
—তুমি কি কাউকে হারানোর ভয় পাও?
অদিতি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
—জানি না।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—হয়তো।
আরিয়ান আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
শুধু চুপচাপ বসে রইল।
বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো।
টিনের ছাউনিতে বৃষ্টির শব্দ বেড়ে গেল।
অদিতি হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরতে চাইল।
আরিয়ান তাকিয়ে রইল।
সেদিন প্রথমবার অদিতির মনে হলো—
এই মানুষটার সঙ্গে কাটানো সময়গুলো হয়তো শুধু বন্ধুত্বের নয়।
এর মধ্যে অন্যরকম কিছু জন্ম নিচ্ছে।
যার নাম সে এখনো দিতে চাইছে না।
কিন্তু ভয়টা ঠিকই বুঝতে পারছে।
কারণ কিছু মানুষকে জীবনে পাওয়া যতটা সুন্দর,
তাদের হারানোর ভয়টা তার চেয়েও বেশি।
সেদিনের পর থেকে অদিতি আরিয়ানের সঙ্গে নিজের সম্পর্কটাকে নতুন করে ভাবতে শুরু করল।
আগে শুক্রবারের অপেক্ষা করত একটা ভালো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য।
এখন শুক্রবার এলেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা উত্তেজনা কাজ করে।
আরিয়ান থাকবে তো?
কী কথা হবে?
আজ কোথায় বসবে?
কখনো কখনো নিজের এই ভাবনাগুলোতেই অদিতি নিজে লজ্জা পেত।
সে নিজেকে বোঝাত,
‘এটা শুধু বন্ধুত্ব।’
কিন্তু মন যেন কথাটা মানতে চাইত না।
এদিকে আরিয়ানও আগের চেয়ে অদিতির প্রতি অনেক বেশি খেয়াল রাখতে শুরু করেছিল।
অদিতি চা বেশি মিষ্টি পছন্দ করে না—সে জানত।
অদিতি বইয়ের পাতার কোণা ভাঁজ করে রাখে না—সে জানত।
অদিতি বৃষ্টি খুব পছন্দ করে, কিন্তু ভিজতে ভয় পায়—সেটাও জানত।
আর সবচেয়ে বেশি জানত—
অদিতি কষ্ট পেলেও সহজে কাউকে সেটা বুঝতে দেয় না।
এক শুক্রবার বিকেলে অদিতি একটু মন খারাপ করে চায়ের দোকানে এসে বসেছিল।
আরিয়ান কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আজ কী হয়েছে?
—কিছু হয়নি।
—তুমি যখন বলো ‘কিছু হয়নি’, তখনই বুঝি কিছু একটা হয়েছে।
অদিতি মৃদু হাসল।
—আপনি এত কিছু বুঝতে পারেন কীভাবে?
—অনেকদিন ধরে দেখছি তো।
—কতদিন?
আরিয়ান একটু ভেবে বলল,
—চার মাসের মতো।
অদিতি অবাক হলো।
—চার মাস হয়ে গেছে?
—হ্যাঁ।
সময়ের কথা মনে পড়তেই অদিতি চুপ হয়ে গেল।
চার মাস আগে তারা একে অপরকে চিনতই না।
আর এখন?
শুক্রবার যেন একে অপরকে ছাড়া অসম্পূর্ণ লাগে।
আরিয়ান ধীরে বলল,
—সময় খুব দ্রুত চলে যায়, তাই না?
অদিতি মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—তবে কিছু মুহূর্ত থেকে যায়।
অদিতি তার দিকে তাকাল।
—কোন মুহূর্ত?
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—যেগুলো ভুলতে ইচ্ছে করে না।
অদিতি কিছু বলল না।
তারপর দুজনেই চুপ করে রইল।
সেদিন বিকেলে তারা বইয়ের দোকান থেকে বেরিয়ে পুরনো রাস্তা ধরে হাঁটছিল।
আকাশে কালো মেঘ জমেছিল।
অদিতি বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল।
আরিয়ান বলল,
—বৃষ্টি আসবে।
—হয়তো।
—ছাতা আছে?
—আছে।
—আমার নেই।
অদিতি ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা ছাতা বের করে বলল,
—তাহলে আমার ছাতার নিচে আসুন।
আরিয়ান একটু হেসে বলল,
—ছাতাটা তো ছোট।
—আপনি খুব বেশি বড় নন।
—এটা কি প্রশংসা?
—না। বাস্তবতা।
দুজনেই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি শুরু হলো।
ছাতার নিচে পাশাপাশি হাঁটছিল তারা।
রাস্তা ভিজে পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল।
হঠাৎ অদিতির পা একটু পিছলে গেল।
আরিয়ান দ্রুত তার হাত ধরে ফেলল।
অদিতি ভারসাম্য ফিরে পেলেও কয়েক সেকেন্ড হাতটা ছাড়ল না।
আরিয়ানও ছাড়ল না।
দুজনেই চুপ।
শুধু বৃষ্টির শব্দ।
অদিতি ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিল।
—ধন্যবাদ।
আরিয়ান হেসে বলল,
—আজকাল তোমাকে পড়ে যেতে দিতে পারি না।
অদিতি মুখ ফিরিয়ে নিল।
—আমি এমনিতেই পড়ে যাই না।
—জানি।
—তাহলে?
—তবুও সাবধান থাকা ভালো।
কথাটা শুনে অদিতির মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
দিনগুলো এভাবেই চলছিল।
শুক্রবারের দেখা, অসংখ্য কথা, চায়ের কাপ আর বই।
তাদের সম্পর্কের মধ্যে কোনো নাম ছিল না।
কোনো প্রতিশ্রুতিও ছিল না।
তবু দুজনের জীবনেই একে অপরের উপস্থিতি ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল।
একদিন আরিয়ান অদিতিকে একটা ছোট্ট নোটবুক দিল।
অদিতি অবাক হয়ে বলল,
—এটা কী?
—তোমার জন্য।
—কেন?
—তুমি তো বলেছিলে লিখতে ইচ্ছে করে।
অদিতি নোটবুকটা হাতে নিয়ে মলাটের দিকে তাকাল।
সাদা মলাটে ছোট করে লেখা—
‘যেসব কথা বলা হয় না।’
অদিতি নোটবুকটা বুকে চেপে ধরল।
—খুব সুন্দর।
—এখানে আজকের বিকেল নিয়ে লিখবে।
—আপনি এখনো সেই কথাটা মনে রেখেছেন?
—কিছু কথা মনে রাখার জন্যই বলা হয়।
অদিতি তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—আমি যদি লিখি, আপনি পড়বেন?
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—তুমি চাইলে।
অদিতি হেসে বলল,
—তাহলে এখনই দেব না।
—কেন?
—কিছু কথা আগে নিজের কাছে রাখতে হয়।
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—ঠিক আছে।
কিন্তু সুখের সময়গুলো সবসময় একইভাবে থাকে না।
একদিন সন্ধ্যায় অদিতি বাড়ি ফিরেই দেখল, তার বাবা বসার ঘরে চুপচাপ বসে আছেন।
মায়ের মুখেও চিন্তার ছাপ।
অদিতি ব্যাগ নামিয়ে বলল,
—কী হয়েছে?
তার বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।
মা ধীরে ধীরে বললেন,
—তোমার বাবার শরীরটা কিছুদিন ধরে ভালো যাচ্ছে না।
অদিতির বুক কেঁপে উঠল।
—কী হয়েছে?
—ডাক্তার কিছু পরীক্ষা করতে বলেছেন। সম্ভবত আমাদের কিছুদিনের জন্য অন্য শহরে যেতে হবে।
অদিতি চুপ হয়ে গেল।
অন্য শহর।
কতদিনের জন্য?
কেউ জানে না।
তার মাথায় প্রথমেই যে মুখটা ভেসে উঠল—
আরিয়ান।
সেদিন রাতে অদিতি তার ঘরে বসে নোটবুকটা খুলল।
প্রথম পাতায় লিখল—
‘কিছু মানুষকে খুব অল্প সময়ে খুব আপন মনে হয়। অথচ তখনই ভয় হয়, যদি কোনোদিন তাদের থেকে দূরে যেতে হয়?’
কলম থেমে গেল।
চোখের সামনে আরিয়ানের মুখ ভেসে উঠল।
পরদিনও সে আরিয়ানকে কিছু বলতে পারল না।
তারপরের শুক্রবারেও না।
আরিয়ান অবশ্য বুঝতে পারছিল, অদিতির আচরণ বদলে গেছে।
সে জিজ্ঞেস করল,
—তুমি কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছ?
অদিতি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—না।
—নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—যেদিন বলতে ইচ্ছে করবে, সেদিন বলবে।
অদিতির চোখ ভিজে উঠল।
সে মুখ ফিরিয়ে নিল।
কারণ সে জানে—
হয়তো খুব শিগগিরই তাকে একটা কথা বলতে হবে।
এমন একটা কথা, যা তাদের প্রতি শুক্রবারের গল্পটাকে থামিয়ে দিতে পারে।
কয়েকদিন পর খবরটা নিশ্চিত হলো।
অদিতির বাবার চিকিৎসার জন্য তাদের অন্য শহরে যেতে হবে।
কতদিন থাকতে হবে, কেউ জানে না।
বিদায়ের দিনও ঠিক হয়ে গেল।
শুক্রবার।
সেই দিনই।
অদিতি সারারাত ঘুমাতে পারল না।
ভোরে উঠে জানালার পাশে বসে ছিল।
তার হাতে ‘বৃষ্টির চিঠি’।
বইটার প্রথম পাতায় হাত রেখে সে চোখ বন্ধ করল।
মনে হলো, এই বইটার কারণেই তো আরিয়ানের সঙ্গে তার পরিচয়।
আর এখন?
এই বইটাই হয়তো তাকে তার সবচেয়ে কঠিন কথাটা বলার সাহস দেবে।
অদিতি ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,
—আমি ফিরব।
কিন্তু কথাটা আরিয়ানকে বলা এত সহজ হবে না।
তবু বলতে হবে।
কারণ শুক্রবারের সেই মানুষটাকে না জানিয়ে সে চলে যেতে পারবে না।
বাইরে তখন আকাশ মেঘে ঢাকা।
দূরে কোথাও বৃষ্টি নামার প্রস্তুতি চলছে।
শুক্রবার।
সকাল থেকেই অদিতির মনটা অস্থির ছিল।
আজ তাদের অন্য শহরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা। বাবার চিকিৎসার জন্য কতদিন সেখানে থাকতে হবে, সেটা এখনো নিশ্চিত নয়।
হয়তো কয়েক সপ্তাহ।
হয়তো কয়েক মাস।
হয়তো আরও বেশি।
এই অনিশ্চয়তাটাই অদিতির বুকের ভেতর সবচেয়ে বেশি ভয় তৈরি করছিল।
তার ঘরের একপাশে ব্যাগ গুছানো। কাপড়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র—সব প্রায় প্রস্তুত।
কিন্তু একটা জিনিস সে বারবার হাতে নিয়ে আবার রেখে দিচ্ছিল।
‘বৃষ্টির চিঠি।’
বইটা সে সঙ্গে নেবে।
অবশ্যই নেবে।
এটা মায়ের স্মৃতি।
আর এই বইটার কারণেই তো আরিয়ানের সঙ্গে তার পরিচয়।
অদিতি বইটা ব্যাগে রেখে আবার বের করে আনল।
তারপর বইটার প্রথম পাতায় হাত বুলিয়ে ধীরে বলল,
—আমি ফিরে আসব।
কথাটা সে বইকে বলল, নাকি নিজেকে—সেটা সে জানে না।
দুপুরের পর অদিতি চুপচাপ বেরিয়ে পড়ল।
তার হাতে ছাতা ছিল।
আকাশ মেঘলা।
মনে হচ্ছিল, আজও বৃষ্টি হবে।
পুরনো শহরের সেই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটা জায়গা যেন আজ তাকে থামিয়ে দিতে চাইছে।
ওই পুরনো দালানটা।
রাস্তার পাশের ফুলের দোকান।
ছোট্ট মোড়টা।
সবকিছু আগের মতোই আছে।
শুধু আজকের বিকেলটা অন্যরকম।
‘পাতার গন্ধ’ বইয়ের দোকানের সামনে এসে অদিতি থেমে গেল।
কাঠের দরজার ওপর ঝোলানো ছোট্ট ঘণ্টাটা আজও বাতাসে দুলছে।
সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
বৃদ্ধ দোকানদার তাকে দেখে বললেন,
—আজ তো বেশ তাড়াতাড়ি!
অদিতি হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
বৃদ্ধ লোকটা কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সম্ভবত তিনিও বুঝতে পারলেন, মেয়েটার মধ্যে আজ অন্যরকম কিছু আছে।
—সব ঠিক আছে তো?
অদিতি মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
তারপর একটু থেমে বলল,
—কাকা, আমি কয়েকদিনের জন্য শহরের বাইরে যাচ্ছি।
বৃদ্ধ লোকটা চুপ করে গেলেন।
—কতদিন?
—জানি না।
—আচ্ছা।
তারপর তিনি আর কোনো প্রশ্ন করলেন না।
শুধু বললেন,
—ও আসবে একটু পর।
অদিতি বুঝতে পারল, ‘ও’ মানে আরিয়ান।
তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে দোকানের বাইরে এসে পাশের চায়ের দোকানে বসে পড়ল।
আজও সেই একই জায়গা।
সেই একই বেঞ্চ।
সামনে দুটো চেয়ার।
কিন্তু আজ একটা চেয়ার যেন খুব বেশি খালি লাগছে।
অদিতি ঘড়ির দিকে তাকাল।
পাঁচটা বাজতে দশ মিনিট বাকি।
তারপর পাঁচটা।
পাঁচটা দশ।
পাঁচটা পনেরো।
আরিয়ান আসছে না।
অদিতির মনে অদ্ভুত একটা ভয় ঢুকে গেল।
সে কি আজ আসবে না?
ঠিক তখনই দূর থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
—দেরি হয়ে গেল।
অদিতি তাকিয়ে দেখল, আরিয়ান দ্রুত হেঁটে আসছে।
কাঁধে ব্যাগ।
হাতে একটা বই।
মুখে সামান্য ক্লান্তি।
অদিতির মুখে অজান্তেই স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
আরিয়ান এসে বসে বলল,
—আজ এত চুপচাপ কেন?
অদিতি চুপ।
—কী হয়েছে?
—একটা কথা বলব?
—হ্যাঁ।
অদিতি কয়েক সেকেন্ড নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—আমি আজ চলে যাচ্ছি।
আরিয়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—কোথায়?
—অন্য শহরে।
—কেন?
—বাবার চিকিৎসার জন্য।
আরিয়ান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না।
তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করল,
—কতদিনের জন্য?
অদিতি মাথা নিচু করে বলল,
—জানি না।
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ ভিজে উঠল।
আরিয়ান চুপচাপ বসে রইল।
সে যেন কথাগুলো বুঝে নিতে চাইছিল।
—আজই যাচ্ছ?
—হ্যাঁ।
—তাহলে... এতদিন পর আবার কবে দেখা হবে?
অদিতি কোনো উত্তর দিতে পারল না।
তার গলা ধরে আসছিল।
আরিয়ান চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বলল,
—তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?
—পারিনি।
—কেন?
অদিতি ধীরে বলল,
—ভয় হচ্ছিল।
—কিসের?
—জানি না। মনে হচ্ছিল, বললে সবকিছু হঠাৎ বদলে যাবে।
আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
—সবকিছু বদলালেও একটা জিনিস বদলাবে না।
অদিতি চোখ তুলে তাকাল।
—কী?
—তুমি আমার বন্ধু।
অদিতির চোখের পানি এবার গড়িয়ে পড়ল।
সে দ্রুত চোখ মুছে নিল।
—শুধু বন্ধু?
প্রশ্নটা তার মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সে নিজেই থেমে গেল।
আরিয়ানও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার চোখে যেন অনেক কথা জমে ছিল।
কিন্তু সে কোনো উত্তর দিল না।
শুধু বলল,
—তুমি ফিরে আসবে তো?
অদিতি এবার দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল।
—আসব।
—কবে?
—জানি না।
—তাহলে কীভাবে বিশ্বাস করব?
অদিতি মৃদু হেসে বলল,
—বিশ্বাস করতে হবে।
আরিয়ানও হালকা হাসল।
—ঠিক আছে। করব।
বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা তখন টিনের ছাউনিতে পড়তে শুরু করেছে।
অদিতি ব্যাগ থেকে ‘বৃষ্টির চিঠি’ বের করল।
বইটা দেখে আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—এখনো সঙ্গে রাখো?
—সবসময়।
—আমাকে মনে পড়বে?
অদিতি বইটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—বইটা দেখলেই তো আপনাকে মনে পড়বে।
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে বইটা যত্ন করে রেখো।
—আপনিও নিজেকে যত্নে রাখবেন।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
বৃষ্টি তখন বেড়ে গেছে।
অদিতি উঠে দাঁড়াল।
—আমাকে যেতে হবে।
আরিয়ানও উঠে দাঁড়াল।
দুজনের চোখে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা।
বিদায়টা কেউ সহজ করতে পারছিল না।
অদিতি ধীরে বলল,
—আরিয়ান...
—হুম?
—আমি ফিরব।
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি অপেক্ষা করব।
অদিতি কিছু বলতে পারল না।
সে শুধু মাথা নাড়ল।
তারপর ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।
কয়েক পা যাওয়ার পর আবার থেমে পেছনে তাকাল।
আরিয়ান এখনো দাঁড়িয়ে।
বৃষ্টির নিচে।
অদিতি হাত নাড়ল।
আরিয়ানও হাত তুলল।
তারপর অদিতি ধীরে ধীরে রাস্তার মোড় পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আরিয়ান অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর চায়ের দোকানের বেঞ্চে ফিরে এসে বসে পড়ল।
সামনের খালি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে রইল।
দোকানের মালিক ধীরে এসে তার পাশে দাঁড়ালেন।
—মেয়েটা চলে গেল?
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—ফিরবে?
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—বলেছে ফিরবে।
বৃদ্ধ লোকটা মৃদু হাসলেন।
—তাহলে বিশ্বাস রাখো।
আরিয়ান খালি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—রাখব।
সেদিন রাতেই অদিতির পরিবার শহর ছেড়ে চলে গেল।
আরিয়ান জানত না, অপেক্ষাটা কত দীর্ঘ হবে।
অদিতিও জানত না, দূরত্ব তাদের সম্পর্ককে কোথায় নিয়ে যাবে।
শুধু দুজনের মনে একই একটা কথা ছিল—
‘আমি ফিরব।’
অদিতি চলে যাওয়ার পর প্রথম শুক্রবারটা আরিয়ানের কাছে অদ্ভুত রকমের নীরব ছিল।
সন্ধ্যার আগেই সে ‘পাতার গন্ধ’ বইয়ের দোকানে চলে এসেছিল।
বৃদ্ধ দোকানদার তাকে দেখে কিছু বললেন না।
শুধু এক কাপ চা এগিয়ে দিলেন।
আরিয়ান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে বসল।
সামনের চেয়ারটা খালি।
যে জায়গাটায় অদিতি বসত, সেখানে আজ শুধু বৃষ্টির কয়েকটা ফোঁটা এসে পড়ছে।
আরিয়ান ঘড়ির দিকে তাকাল।
পাঁচটা বাজল।
তারপর পাঁচটা দশ।
পাঁচটা পঁচিশ।
সে জানত, অদিতি আজ আসবে না।
তবুও কেন যেন মনে হচ্ছিল, হয়তো শেষ মুহূর্তে ছাতা হাতে দৌড়ে এসে বলবে—
‘দেরি হয়ে গেল।’
কিন্তু কেউ এল না।
সন্ধ্যা নামার পর আরিয়ান উঠে চলে গেল।
পরের শুক্রবারও সে একই জায়গায় এল।
তার পরের শুক্রবারও।
অদিতির অনুপস্থিতি ধীরে ধীরে একটা অভ্যাসের মতো হয়ে গেল।
কিন্তু অভ্যাস মানেই যে কষ্ট কমে যায়, তা নয়।
বরং কিছু কিছু অনুপস্থিতি যত দীর্ঘ হয়, তত বেশি অনুভব করা যায়।
অন্য শহরে অদিতির দিনগুলোও সহজ ছিল না।
বাবার চিকিৎসা, হাসপাতাল, পরীক্ষা, ডাক্তার—সব মিলিয়ে সময় যেন এক মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ সে নিজের মতো করে কিছুই ভাবতে পারছিল না।
সারাদিন হাসপাতাল আর বাড়ির মধ্যে ছুটতে হতো।
রাতে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে উঠত পুরনো শহরের সেই ছোট্ট চায়ের দোকান।
আরিয়ান।
তার হাসি।
প্রতি শুক্রবারের অপেক্ষা।
একদিন রাতে অদিতি ব্যাগ খুলতে গিয়ে ‘বৃষ্টির চিঠি’ বইটা বের করল।
বইটা হাতে নিয়েই তার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে প্রথম পাতা খুলল।
মায়ের হাতের লেখা একটা ছোট্ট বাক্য এখনো সেখানে ছিল।
‘বৃষ্টি থেমে গেলেও কিছু অপেক্ষা থেকে যায়।’
অদিতি অনেকক্ষণ সেই কথাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের নোটবুকটা বের করল।
সেই নোটবুক, যেটা আরিয়ান তাকে দিয়েছিল।
মলাটে লেখা—
‘যেসব কথা বলা হয় না।’
অদিতি কলম হাতে নিল।
লিখল—
‘আজ শুক্রবার।’
তারপর থেমে গেল।
কিছুক্ষণ পর আবার লিখল—
‘জানি না, তুমি আজও কি সেই চায়ের দোকানে বসেছ।’
কলম থেমে গেল।
চোখের কোণে পানি জমল।
সে পাতাটা বন্ধ করে দিল।
এদিকে আরিয়ানের জীবনও আগের মতো চলছিল।
কাজ, বই, বাড়ি—সবকিছুই ছিল।
শুধু শুক্রবারটা অন্যরকম।
সে নিয়ম করে প্রতি শুক্রবার সেই চায়ের দোকানে যেত।
একদিন দোকানের মালিক বিরক্ত হয়ে বললেন,
—এভাবে আর কতদিন বসে থাকবে?
আরিয়ান চায়ের কাপ নামিয়ে বলল,
—কতদিন মানে?
—এক বছর? দুই বছর?
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—যতদিন লাগে।
বৃদ্ধ লোকটা মাথা নাড়লেন।
—মেয়েটা তো বলেছে ফিরবে।
—হ্যাঁ।
—তবুও?
—তবুও অপেক্ষা করতে ভালো লাগে।
দোকানদার আর কিছু বললেন না।
অদিতির বাবার চিকিৎসা ধীরে ধীরে ভালো দিকে এগোতে লাগল।
কয়েক মাস পর হাসপাতালের যাতায়াত কিছুটা কমে গেল।
অদিতিও আবার নিজের পড়াশোনা আর কাজের দিকে ফিরতে শুরু করল।
তবু প্রতি শুক্রবার একটা শূন্যতা তাকে ঘিরে রাখত।
কখনো সে পুরনো শহরের ছবি ফোনে খুলে দেখত।
কখনো ‘পাতার গন্ধ’ বইয়ের দোকানের কথা মনে পড়ত।
কখনো আরিয়ানের সঙ্গে শেষ কথোপকথনটা মনে পড়ত।
‘আমি অপেক্ষা করব।’
এই চারটি শব্দ তার মনে গেঁথে ছিল।
অদিতি অনেকবার ভেবেছে, আরিয়ানকে ফোন করবে।
তার নম্বরও ছিল।
কিন্তু ফোনটা হাতে নিয়েও থেমে গেছে।
কী বলবে?
‘কেমন আছেন?’
এতটুকু?
তারপর?
দূরত্বের মধ্যে কখনো কখনো অনেক কথা জমে যায়।
সেই কথাগুলো শুরু করার সাহস পাওয়া কঠিন।
তাই সে অপেক্ষা করল।
ছয় মাস কেটে গেল।
একদিন অদিতি তার বাবার সঙ্গে হাসপাতালে বসে ছিল।
বাবা হঠাৎ বললেন,
—তুই কি শহরটাকে খুব মিস করিস?
অদিতি চমকে তাকাল।
—কোন শহর?
—যে শহরে আমরা থাকতাম।
অদিতি মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—কাউকে মিস করিস?
প্রশ্নটা শুনে অদিতি চুপ হয়ে গেল।
বাবা তার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
—সব কথা বলতে হয় না।
অদিতি চোখ নামিয়ে ফেলল।
তারপর আস্তে বলল,
—একজন বন্ধুকে।
বাবা আর কিছু বললেন না।
শুধু বললেন,
—ভালো মানুষ হলে একদিন দেখা হয়ে যাবে।
অদিতি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, হয়তো সত্যিই হবে।
অন্যদিকে আরিয়ান একদিন ‘পাতার গন্ধ’ দোকানে গিয়ে একটা পুরনো বই কিনল।
বইটা হাতে নিয়ে সে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
দোকানদার হঠাৎ বললেন,
—‘বৃষ্টির চিঠি’টা এখনো রেখেছ?
আরিয়ান তাকাল।
—হ্যাঁ।
—কোথায়?
আরিয়ান নিজের ব্যাগের দিকে তাকাল।
—আমার কাছে।
—এতদিনেও পড়োনি?
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—না।
—কেন?
আরিয়ান একটু হেসে বলল,
—ওকে দেওয়ার পর বইটা আর আমার ছিল না। তাই পড়িনি।
বৃদ্ধ লোকটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—তুই মেয়েটার জন্য অপেক্ষা করছিস, নাকি বইটার জন্য?
আরিয়ান হেসে ফেলল।
—দুটোই হয়তো।
সময় আরও এগিয়ে গেল।
নয় মাস।
দশ মাস।
এগারো মাস।
অদিতির বাবার অবস্থা অনেকটাই ভালো হয়ে এল।
ডাক্তার বললেন, আর কিছুদিন পর তারা চাইলে বাড়ি ফিরতে পারবেন।
অদিতির বুকের ভেতর হঠাৎ যেন আলো জ্বলে উঠল।
ফিরতে পারবে?
তাহলে কি সত্যিই আবার সেই শহরে যাওয়া হবে?
আবার সেই বইয়ের দোকান?
আবার সেই চায়ের দোকান?
আরিয়ান?
সেই রাতে অদিতি তার নোটবুক খুলল।
এবার অনেকদিন পর সে একটা পুরো পাতা লিখল।
‘আজ মনে হচ্ছে, অপেক্ষার শেষ হয়তো খুব কাছে। জানি না, তুমি আগের মতোই আছ কি না। জানি না, আমাকে মনে রেখেছ কি না। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।’
পাতাটা লেখার পর সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর বইয়ের ব্যাগে নোটবুকটা রেখে দিল।
ঠিক এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগের শুক্রবার।
আরিয়ান আগের মতোই চায়ের দোকানে বসেছিল।
দোকানের মালিক এবার চুপচাপ তার সামনে চা রেখে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর বললেন,
—আর কতদিন?
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—এক বছর।
—তারপর?
আরিয়ান আকাশের দিকে তাকাল।
—তারপরও যদি না আসে?
কথাটা বলেই সে থেমে গেল।
এই প্রথমবার তার কণ্ঠে সামান্য অনিশ্চয়তা শোনা গেল।
বৃদ্ধ লোকটা বললেন,
—তুই তো বলতিস, আসবে।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আসবে।
তারপর নিজের মনেই যেন বলল,
—ও কথা দিয়েছে।
সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার সময় আকাশে বৃষ্টি নামল।
আরিয়ান রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে পড়ল প্রথম দিনের কথা।
একটা পুরনো বই।
একটা অপরিচিত মেয়ে।
আর সেই বইটা তার হাতে তুলে দেওয়ার মুহূর্ত।
কে জানত, একটা বই দিয়ে শুরু হওয়া পরিচয় একদিন তাকে এক বছরের অপেক্ষা শেখাবে?
অবশেষে সেই দিনটি এল।
অদিতিদের শহরে ফেরার দিন ঠিক হলো।
অদিতি ব্যাগ গোছাতে গিয়ে আবার ‘বৃষ্টির চিঠি’ বইটা হাতে নিল।
বইয়ের মলাটে হাত রেখে সে মৃদু হেসে বলল,
—চলো। এবার ফিরি।
বাইরে তখন আকাশে মেঘ।
দূরে বৃষ্টি নামার শব্দ।
আর পুরনো শহরে—
একজন মানুষ তখনও জানত না, তার অপেক্ষার শেষ দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
শুধু আরেকটা শুক্রবার বাকি।
আর সেই শুক্রবারই হয়তো বদলে দেবে পুরো গল্পটা।
এক বছর।
পুরো একটা বছর কেটে গেছে।
এই এক বছরে শহরটা খুব একটা বদলায়নি। পুরনো দালানগুলো এখনো একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে, ‘পাতার গন্ধ’ বইয়ের দোকানের কাঠের দরজাটাও আগের মতোই কড়কড়ে শব্দ করে, আর দোকানের পাশের ছোট্ট চায়ের দোকানে এখনো বিকেল হলেই কেটলি থেকে ধোঁয়া ওঠে।
শুধু একটা জিনিস বদলে গেছে।
অদিতি নেই।
আরিয়ান অবশ্য প্রতি শুক্রবার এখনো আসে।
কেউ তাকে আর জিজ্ঞেসও করে না কেন আসে।
সবাই জানে।
তবু সেদিনের শুক্রবারটা অন্যরকম ছিল।
সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা।
বিকেলের দিকে হালকা বৃষ্টি শুরু হলো।
আরিয়ান কাজ শেষ করে স্বাভাবিকভাবেই ‘পাতার গন্ধ’ বইয়ের দোকানের দিকে হাঁটতে লাগল।
তার ব্যাগে একটা পুরনো বই।
আর বুকের ভেতর আগের মতোই একটা অদ্ভুত অপেক্ষা।
এক বছর আগে অদিতি বলেছিল—
‘আমি ফিরব।’
আরিয়ান সেই কথাটাকে কখনো ভুলতে পারেনি।
কখনো কখনো অবশ্য নিজের মনেই প্রশ্ন এসেছে—
যদি না আসে?
যদি দূরত্ব তাদের দুজনকে বদলে দেয়?
যদি অদিতি ফিরে এসে তাকে আর আগের মতো মনে না রাখে?
কিন্তু প্রতিবারই সে নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিয়েছে—
‘আসবে।’
আজও তাই।
আরিয়ান চায়ের দোকানে গিয়ে আগের জায়গাটাতেই বসল।
দোকানের মালিক তাকে দেখে মুচকি হাসলেন।
—আজও একই জায়গা?
আরিয়ান চায়ের অর্ডার দিয়ে বলল,
—জায়গাটা বদলালে যদি সে এসে আমাকে না পায়?
বৃদ্ধ লোকটা হেসে ফেললেন।
—তুই এক বছরেও বদলালি না।
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—সবকিছু বদলানোর দরকার হয় না।
চা এসে গেল।
আরিয়ান কাপটা হাতে নিল।
বৃষ্টির শব্দ বাড়ছে।
সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
একটা রিকশা গেল।
দুজন মানুষ ছাতা হাতে রাস্তা পার হলো।
একটা ছোট ছেলে বৃষ্টিতে দৌড়াচ্ছে।
কিন্তু অদিতি নেই।
ঘড়িতে পাঁচটা পনেরো।
তারপর পাঁচটা ত্রিশ।
আরিয়ান এবার চোখ নামিয়ে চায়ের কাপের দিকে তাকাল।
ঠিক তখনই—
চায়ের দোকানের সামনে একটা রিকশা এসে থামল।
আরিয়ান প্রথমে খেয়াল করল না।
রিকশা থেকে একজন নামল।
হাতে ছাতা।
চুলের সামনের অংশ বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।
তারপর সে ছাতাটা বন্ধ করল।
আরিয়ান হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।
মেয়েটা ধীরে ধীরে দোকানের দিকে এগিয়ে আসছে।
পরিচিত মুখ।
পরিচিত চোখ।
এক বছর আগের সেই হাসি।
অদিতি।
আরিয়ানের হাতে থাকা চায়ের কাপটা মাঝপথে থেমে গেল।
সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
অদিতিও তাকে দেখে থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড দুজনেই শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর অদিতির ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল।
—কেমন আছেন?
আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু উঠে দাঁড়াল।
অদিতি একটু কাছে এসে বলল,
—এত অবাক হচ্ছেন কেন?
আরিয়ান এবার খুব আস্তে বলল,
—তুমি সত্যিই এসেছ?
অদিতি মৃদু হেসে বলল,
—বলেছিলাম তো, আসব।
আরিয়ান কিছু বলতে পারল না।
তার চোখে তখন স্বস্তি আর আনন্দ মিশে ছিল।
এক বছর ধরে জমে থাকা অপেক্ষা যেন এক মুহূর্তে হালকা হয়ে গেল।
সে শুধু বলল,
—অনেক দেরি করেছ।
অদিতি মজা করে বলল,
—এক বছর তো খুব বেশি না।
আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল।
—তোমার কাছে না?
—না।
—আমার কাছে অনেক।
অদিতির মুখের হাসি একটু নরম হয়ে গেল।
সে ধীরে বলল,
—আমার কাছেও।
দুজনেই চুপ।
বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছে।
চায়ের দোকানের মালিক দূর থেকে সবকিছু দেখছিলেন।
তিনি হেসে বললেন,
—এই যে, এতদিন পর দেখা হলো। এবার বসো।
অদিতি হেসে বেঞ্চে বসে পড়ল।
আরিয়ানও তার সামনে বসল।
চায়ের দোকানটা যেন হঠাৎ আগের মতো হয়ে গেল।
শুধু এক বছর আগের জায়গাটায় আজ অদিতি আবার ফিরে এসেছে।
দোকানের মালিক কোনো কথা না বলে অদিতির সামনে এক কাপ চা রেখে দিলেন।
অদিতি অবাক হয়ে বলল,
—আমি তো চা চাইনি।
বৃদ্ধ লোকটা হেসে বললেন,
—জানি। তবুও বানিয়েছি।
আরিয়ান মুচকি হেসে বলল,
—এখনো তোমার জন্য চা মনে রাখা হয়।
অদিতি কাপটা হাতে নিল।
—এখানে অনেক কিছুই বদলায়নি দেখছি।
—সবকিছু না।
—কী বদলেছে?
আরিয়ান একটু ভেবে বলল,
—তুমি।
অদিতি ভুরু কুঁচকে বলল,
—আমি?
—হ্যাঁ।
—কীভাবে?
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আগের চেয়ে বেশি চুপচাপ হয়েছ।
অদিতি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—এক বছর অনেক কিছু শেখায়।
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—বাবা কেমন আছেন?
—এখন অনেক ভালো।
—চিকিৎসা ঠিকমতো হয়েছে?
—হ্যাঁ। এখন অনেকটাই সুস্থ।
আরিয়ান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
—ভালো হয়েছে।
কিছুক্ষণ তারা নিজেদের এক বছরের গল্প বলতে লাগল।
অদিতি বলল হাসপাতালের দিনগুলোর কথা।
বাবার অসুস্থতার সময় কতটা ভয় পেয়েছিল।
কীভাবে ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হয়েছে।
আরিয়ান বলল তার কাজের কথা।
বইয়ের কথা।
আর প্রতি শুক্রবারের কথা।
অদিতি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি সত্যিই প্রতি শুক্রবার এখানে এসেছেন?
আরিয়ান চায়ের কাপ নামিয়ে বলল,
—হ্যাঁ।
—এক বছর?
—হ্যাঁ।
—একটাও শুক্রবার বাদ দেননি?
—না।
অদিতি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—আপনি জানতেন না আমি ফিরব কি না।
—জানতাম।
—কীভাবে?
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—তুমি বলেছিলে।
অদিতির চোখে পানি জমে উঠল।
সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল।
আরিয়ান সেটা দেখেও কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর অদিতি নিজের ব্যাগ থেকে একটা নোটবুক বের করল।
সেই একই নোটবুক।
মলাটে লেখা—
‘যেসব কথা বলা হয় না।’
আরিয়ান তাকিয়ে বলল,
—এটা এখনো রেখেছ?
—হ্যাঁ।
—লিখেছ?
—অনেক কিছু।
—আমাকে পড়াবে?
অদিতি নোটবুকটা বন্ধ করে বলল,
—আজ না।
—তাহলে কবে?
অদিতি মৃদু হেসে বলল,
—যেদিন সাহস হবে।
আরিয়ান আর জোর করল না।
বৃষ্টি তখন ধীরে ধীরে কমে এসেছে।
আকাশের মেঘের ফাঁক দিয়ে হালকা আলো দেখা যাচ্ছে।
অদিতি উঠে দাঁড়াল।
—চলুন?
—কোথায়?
—বইয়ের দোকানে।
আরিয়ানও উঠে দাঁড়াল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
‘পাতার গন্ধ’ দোকানের দরজায় পৌঁছে অদিতি থামল।
বৃদ্ধ দোকানদার তাকে দেখে এতটাই খুশি হলেন যে হেসে বললেন,
—অবশেষে ফিরলি!
অদিতি হেসে বলল,
—হ্যাঁ, কাকা।
—‘বৃষ্টির চিঠি’টা এনেছিস?
অদিতি ব্যাগের দিকে হাত রাখল।
—হ্যাঁ।
বৃদ্ধ লোকটা মুচকি হেসে বললেন,
—তাহলে গল্পটা পুরো হলো।
অদিতি কথাটার অর্থ বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল।
আরিয়ানও চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
কিছুক্ষণ পর অদিতি বইয়ের তাকের দিকে তাকাল।
তার চোখে পুরনো দিনের স্মৃতি।
প্রথম দেখা।
শেষ কপি।
আরিয়ানের হাসি।
সেই ছোট্ট স্পর্শ।
তারপর এক বছরের দূরত্ব।
সে ধীরে ধীরে বলল,
—এই দোকানটা একটুও বদলায়নি।
আরিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—কারণ কেউ একজন ফিরে আসবে বলে অপেক্ষা করছিল।
অদিতি তার দিকে তাকাল।
দুজনের চোখে একই প্রশ্ন।
একই উত্তর।
কিন্তু কেউ মুখে বলল না।
সেদিন সন্ধ্যায় অদিতি বাড়ি ফেরার আগে আরিয়ান শুধু একটা কথা বলেছিল—
—আগামী শুক্রবার আসবে তো?
অদিতি হেসে বলেছিল,
—এবার থেকে শুক্রবারের জন্য এক বছর অপেক্ষা করতে হবে না।
আরিয়ান মৃদু হেসে বলেছিল,
—ভালো।
অদিতি চলে যাওয়ার পরও আরিয়ান অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল।
এক বছর আগে যে মানুষটা বৃষ্টির মধ্যে চলে গিয়েছিল,
আজ সে আবার বৃষ্টির মধ্যেই ফিরে এসেছে।
কিন্তু তাদের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো এখনো বলা হয়নি।
হয়তো পরের কোনো শুক্রবারে—
‘যেসব কথা বলা হয় না’ নোটবুকের পাতাগুলোই সেই কথাগুলো প্রকাশ করবে।
আর তার আগে—
আরিয়ানের হাতে থাকা একটা পুরনো বই অদিতির জন্য অপেক্ষা করছিল।
‘বৃষ্টির চিঠি’।
যে বইটা সে এক বছর ধরে খুলেও দেখেনি।
কারণ বইটার প্রথম অধিকারী ছিল অদিতি।
এবার বইটা তার হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে।
অদিতি ফিরে আসার পরের সপ্তাহটা যেন দুজনের কাছেই অন্যরকম ছিল।
আগে শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা করত তারা।
এখন শুক্রবার আসছে—এই ভাবনাটাই যেন অদিতির মন ভালো করে দিচ্ছিল।
তবু একটা অদ্ভুত সংকোচ ছিল।
এক বছর অনেক লম্বা সময়।
এই এক বছরে তারা দুজনেই বদলেছে। অনেক কিছু ঘটেছে। অনেক কথা জমেছে। কিন্তু সেই কথাগুলোর বেশিরভাগই এখনো বলা হয়নি।
অদিতি বারবার নিজের নোটবুকটা খুলছিল।
সেই নোটবুক—যেটা আরিয়ান তাকে এক বছর আগে দিয়েছিল।
‘যেসব কথা বলা হয় না।’
প্রথম কয়েকটা পাতা ভরা ছিল ছোট ছোট কথায়।
কখনো এক লাইনের লেখা।
কখনো পুরো একটা পাতা।
কিন্তু শেষের দিকে এসে লেখাগুলো আরও ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছিল।
একদিন সে লিখেছিল—
‘আজ শুক্রবার। তোমার সঙ্গে দেখা করার দিন। অথচ তুমি অনেক দূরে। জানি না, তুমি কি আজও আমার কথা ভাবো।’
আরেকদিন—
‘কিছু মানুষকে কাছে পাওয়ার পর দূরে যেতে হয় কেন?’
আর সবচেয়ে শেষ পাতায়—
‘যেদিন ফিরব, সেদিন হয়তো তোমাকে সব কথা বলব।’
অদিতি সেই পাতাটা পড়ে নোটবুক বন্ধ করে দিল।
তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই বলল,
—আজ বলব।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আবার মনে হলো—
সত্যিই পারবে?
শুক্রবার বিকেলে অদিতি আগের চেয়ে একটু আগেই ‘পাতার গন্ধ’ বইয়ের দোকানে পৌঁছাল।
আরিয়ান তখনও আসেনি।
অদিতি দোকানের ভেতরে ঢুকে পুরনো বইয়ের তাকগুলো দেখতে লাগল।
হঠাৎ তার চোখ একটা পরিচিত জায়গায় গিয়ে থামল।
সেখানেই এক বছর আগে ‘বৃষ্টির চিঠি’র শেষ কপিটা রাখা ছিল।
অদিতি হাত বাড়িয়ে তাকটা ছুঁয়ে দেখল।
বৃদ্ধ দোকানদার দূর থেকে বললেন,
—সেদিনের কথা মনে পড়ছে?
অদিতি হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—সেদিন তো বইটা ওর হাতে ছিল।
—জানি।
—আর আজ?
অদিতি একটু থেমে বলল,
—আজও বইটা ওর কাছেই আছে।
বৃদ্ধ লোকটা মুচকি হেসে বললেন,
—তাহলে গল্পটা এখনো শেষ হয়নি।
অদিতি কিছু বলল না।
ঠিক তখনই দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
আরিয়ান ঢুকল।
অদিতি তাকাতেই সে বলল,
—আজ আপনি আগে চলে এসেছেন?
—হ্যাঁ।
—আমাকে না জানিয়ে?
—আপনাকে চমকে দেওয়ার জন্য।
আরিয়ান হেসে বলল,
—চমকে গেছি।
দুজনেই দোকান থেকে বেরিয়ে পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে বসল।
আগের মতোই দুটো চা এল।
আরিয়ান কাপটা অদিতির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
—এবার কিন্তু চা বেশি মিষ্টি হয়নি।
অদিতি হেসে বলল,
—মনে আছে?
—অনেক কিছুই মনে আছে।
অদিতি চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর সে ব্যাগ থেকে নোটবুকটা বের করল।
আরিয়ান বইটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আজ কি সাহস হয়েছে?
অদিতি তার দিকে তাকাল।
—হয়েছে।
—কীসের?
—সব কথা বলার।
আরিয়ান আর হাসল না।
সে মনোযোগ দিয়ে অদিতির দিকে তাকাল।
অদিতি নোটবুকটা খুলল।
—এগুলো আমি গত এক বছরে লিখেছি।
—আমাকে নিয়ে?
অদিতি মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—সবটা পড়তে হবে?
—না। আমি কিছু পড়ে শোনাব।
আরিয়ান চুপচাপ শুনতে লাগল।
অদিতি প্রথম একটা পাতা খুলে পড়ল—
‘আজ শুক্রবার। জানি না তুমি আজও সেই চায়ের দোকানে বসেছ কি না। কিন্তু আমি বসে আছি অন্য এক শহরে, আর মনে হচ্ছে আমার সামনে একটা চেয়ার খালি।’
আরিয়ান নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
অদিতি আরেকটা পাতা খুলল।
‘আজ বাবা একটু ভালো। সবাই খুশি। আমিও খুশি। তবুও মনে হলো, তোমাকে এই খবরটা বলতে পারলে ভালো লাগত।’
আরেকটা পাতা।
‘আজ খুব বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির শব্দ শুনলেই তোমার কথা মনে পড়ে।’
তারপর অদিতি থেমে গেল।
শেষ পাতাটা খুলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আরিয়ান ধীরে বলল,
—পড়বে না?
অদিতি মাথা তুলল।
তার চোখে পানি।
—এটা মুখে বলতে চাই।
আরিয়ান কিছু বলল না।
অদিতি নোটবুকটা বন্ধ করল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—আমি তোমাকে মিস করেছি।
আরিয়ান স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।
অদিতি আবার বলল,
—প্রথমে ভাবতাম, এটা শুধু বন্ধুত্বের অভ্যাস। তারপর বুঝলাম, বিষয়টা তার চেয়ে বেশি।
আরিয়ান ধীরে বলল,
—কতটা বেশি?
অদিতি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—এতটা বেশি যে এক বছর দূরে থেকেও তোমাকে ভুলতে পারিনি।
চারপাশের শব্দ যেন মুহূর্তের জন্য দূরে সরে গেল।
আরিয়ান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না।
তারপর নিজের ব্যাগ থেকে একটা বই বের করল।
‘বৃষ্টির চিঠি।’
অদিতি বইটার দিকে তাকিয়ে অবাক হলো।
—এটা?
—তোমার জন্য রেখেছিলাম।
—আপনি তো বলেছিলেন, অন্য একটা কপি খুঁজে নেবেন।
—খুঁজেছিলাম।
—পেয়েছিলেন?
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
অদিতি বইটা হাতে নিতে গিয়ে থেমে গেল।
—তাহলে এতদিন আপনার কাছে ছিল কেন?
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—তোমাকে না দিয়ে খুলতে ইচ্ছে করেনি।
অদিতির চোখ আবার ভিজে উঠল।
সে বইটা হাতে নিল।
মলাটে হাত রাখতেই প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে গেল।
একই বই।
একই শহর।
একই মানুষ।
শুধু আজ তারা আর অপরিচিত নয়।
অদিতি ধীরে বলল,
—আপনি কি আমার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন?
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি তো বলেছিলে, ফিরবে।
—শুধু সেই কথার জন্য?
—হ্যাঁ।
—যদি না ফিরতাম?
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তাহলেও শুক্রবারে আসতাম।
অদিতি অবাক হয়ে তাকাল।
—কেন?
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—কারণ কিছু অপেক্ষার শেষ কী হবে, সেটা জানা না থাকলেও অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করে।
অদিতির চোখ বেয়ে একটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সে দ্রুত চোখ মুছে ফেলল।
—আপনি জানেন, আমি একটা কথা নিয়ে ভয় পেতাম?
—কী?
—ফিরে এসে দেখব, আপনি আর আগের মতো নেই।
আরিয়ান বলল,
—আমারও ভয় ছিল।
—কিসের?
—ফিরে এসে দেখব, তুমি আমাকে আর মনে রাখোনি।
অদিতি মাথা নাড়ল।
—ভুলিনি।
—আমিও না।
দুজনেই চুপ।
এই নীরবতা এবার আগের চেয়েও গভীর।
কিন্তু অস্বস্তিকর নয়।
বরং মনে হচ্ছিল, এতদিনের না-বলা কথাগুলো যেন এই নীরবতার মধ্যেই জায়গা করে নিচ্ছে।
হঠাৎ অদিতি বলল,
—আর একটা কথা আছে।
—বল।
—আমি ফিরে আসার পর থেকেই ভাবছি, আমাদের আগের মতো শুক্রবারগুলো কি আবার হবে?
আরিয়ান হেসে বলল,
—শুধু শুক্রবার কেন?
অদিতি তাকিয়ে রইল।
আরিয়ান বলল,
—তুমি চাইলে অন্য দিনও দেখা হতে পারে।
অদিতির মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—তাহলে ঠিক আছে।
—কী ঠিক আছে?
—এখন থেকে শুধু শুক্রবার না।
আরিয়ানও হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই বৃষ্টি শুরু হলো।
টিনের ছাউনিতে টুপটাপ শব্দ।
অদিতি আকাশের দিকে তাকাল।
—দেখেছেন? আবার বৃষ্টি।
আরিয়ান বলল,
—বৃষ্টি হলেই তো গল্প শুরু হয়।
অদিতি মৃদু হেসে বলল,
—আমাদের গল্প তো একটা বই দিয়েই শুরু হয়েছিল।
আরিয়ান তার হাতে থাকা ‘বৃষ্টির চিঠি’র দিকে তাকাল।
—আর হয়তো এই বইটাই আমাদের গল্পটা শেষ হতে দেবে না।
অদিতি কিছু বলল না।
শুধু বইটা বুকে চেপে ধরল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।
ভেতরে দুজন মানুষের বহুদিনের দূরত্ব ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল।
তবু একটা কথা এখনো বলা হয়নি।
অদিতির মনে হচ্ছিল—
আরিয়ানকে সে যতটা নিজের করে অনুভব করে, সেটা শুধু কয়েকটা কথায় বলা সম্ভব নয়।
আরিয়ানও যেন কিছু বলতে চাইছে।
কিন্তু দুজনেই অপেক্ষা করছিল সঠিক মুহূর্তের জন্য।
কারণ কিছু কথা তাড়াহুড়ো করে বলা যায় না।
কিছু কথা বলতে হয় এমন এক বিকেলে—
যখন আকাশে বৃষ্টি থাকে,
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া ওঠে,
আর পাশে বসে থাকা মানুষটাকে দেখে মনে হয়—
এই মানুষটাকেই তো এতদিন ধরে খুঁজছিলাম।
অদিতি ফিরে আসার পর আরও কয়েকটা শুক্রবার কেটে গেল।
তাদের দেখা হওয়া এখন আর শুধু শুক্রবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কখনো বইয়ের দোকানে, কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো পুরনো শহরের কোনো শান্ত রাস্তায়—দুজনের দেখা হয়ে যায়।
তবু ‘পাতার গন্ধ’ আর পাশের ছোট্ট চায়ের দোকানটার প্রতি তাদের আলাদা একটা টান রয়ে গেছে।
সেদিনও ছিল শুক্রবার।
বিকেল থেকেই আকাশ মেঘলা।
অদিতি দোকানে পৌঁছানোর আগেই হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছিল।
সে ছাতা হাতে নিয়ে ভেজা রাস্তা পেরিয়ে দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, আরিয়ান একটা বই হাতে নিয়ে তাকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
অদিতিকে দেখেই সে বলল,
—আজ বৃষ্টি দেখে মনে হলো, তুমি নিশ্চয়ই আসবে।
অদিতি হেসে বলল,
—কেন?
—তোমার সঙ্গে বৃষ্টির একটা আলাদা সম্পর্ক আছে।
—আর আপনার সঙ্গে?
—আমার সঙ্গে তোমার।
অদিতি কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
আরিয়ান যেন নিজের কথাটার গভীরতা বুঝে একটু হেসে ফেলল।
—চলবে?
—কোথায়?
—চায়ের দোকানে।
দুজন পাশাপাশি বেরিয়ে এল।
বৃষ্টি তখন একটু বেড়েছে।
চায়ের দোকানের টিনের ছাউনির নিচে বসতেই দোকানদার দুটো চা দিয়ে গেলেন।
অদিতি কাপ হাতে নিয়ে বলল,
—আপনি কি একটা বিষয় খেয়াল করেছেন?
—কী?
—আমরা যতবার এখানে বসি, বৃষ্টি হয়।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে বৃষ্টি আমাদের পছন্দ করে।
—বৃষ্টি মানুষকে পছন্দ করে?
—কিছু মানুষকে করে।
অদিতি হেসে মাথা নাড়ল।
তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
—আরিয়ান?
—হুম?
—একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—করো।
—আমি যখন চলে গিয়েছিলাম, তখন কি আপনার খুব খারাপ লেগেছিল?
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—খুব।
অদিতি কাপের দিকে তাকিয়ে রইল।
—কতটা?
—যতটা হলে প্রতি শুক্রবার একই জায়গায় এসে বসতে হয়।
অদিতির চোখ ভিজে উঠল।
সে ধীরে বলল,
—আমারও খুব খারাপ লাগত।
—জানি।
—কীভাবে?
—তোমার নোটবুক পড়ে।
অদিতি অবাক হয়ে তাকাল।
—আপনি তো বলেছিলেন, আমার অনুমতি ছাড়া পড়বেন না!
আরিয়ান হেসে বলল,
—তুমি নিজেই পড়ে শুনিয়েছিলে।
—ওহ।
দুজনেই কিছুক্ষণ হাসল।
তারপর আবার নীরবতা।
বৃষ্টির শব্দটা যেন চারপাশের সবকিছুকে ঢেকে ফেলেছে।
অদিতি ধীরে বলল,
—আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আমি ফিরে এসে যদি অন্যরকম হয়ে যাই?
—ভেবেছি।
—তবুও অপেক্ষা করেছেন?
—হ্যাঁ।
—কেন?
আরিয়ান এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।
—কারণ তুমি চলে যাওয়ার সময় বলেছিলে, ‘আমি ফিরব।’
অদিতি মৃদু কণ্ঠে বলল,
—শুধু সেই কথাটাই এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
—না।
—তাহলে?
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তুমি ছিলে।
অদিতির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
আরিয়ান চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।
—অদিতি, একটা কথা অনেকদিন ধরে বলতে চাই।
অদিতি স্থির হয়ে তার দিকে তাকাল।
—কী কথা?
আরিয়ান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
তারপর হেসে বলল,
—আজ না।
অদিতি অবাক হলো।
—কেন?
—আজ বৃষ্টি খুব বেশি।
—বৃষ্টির সঙ্গে কথার কী সম্পর্ক?
—জানি না। তবে মনে হচ্ছে, কথাটা একটু সুন্দর একটা দিনে বলা উচিত।
অদিতি মৃদু হাসল।
—আপনি সবকিছু এত রহস্য করে বলেন কেন?
—কারণ তোমাকে একটু অপেক্ষা করাতে ভালো লাগে।
অদিতি ভুরু কুঁচকে বলল,
—এক বছর অপেক্ষা করেছি। আর কত?
আরিয়ান হেসে বলল,
—আর বেশি না।
কয়েকদিন পর অদিতি আবার ‘পাতার গন্ধ’ বইয়ের দোকানে গেল।
দোকানে আরিয়ান ছিল না।
বৃদ্ধ দোকানদার তাকে দেখে বললেন,
—ও একটু বাইরে গেছে।
—কোথায়?
—জানি না। বলেছে, একটু পর আসবে।
অদিতি একটা বই হাতে নিয়ে তাকের পাশে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ পর দোকানের পুরনো কাঠের ড্রয়ার খুলতে গিয়ে তার চোখে একটা খাম পড়ল।
খামের ওপর লেখা—
‘অদিতির জন্য।’
অদিতি থমকে গেল।
খামটা হাতে নিয়ে সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর বুঝতে পারল, এটা হয়তো আরিয়ানের লেখা।
ঠিক তখনই পেছন থেকে আরিয়ানের কণ্ঠ শোনা গেল,
—ওটা তুমি পেয়ে গেছ?
অদিতি ঘুরে দাঁড়াল।
—এটা কী?
আরিয়ান ধীরে ধীরে কাছে এসে বলল,
—তোমার জন্য লেখা একটা চিঠি।
—চিঠি?
—হ্যাঁ।
—কখন লিখেছেন?
—তুমি ফিরে আসার আগে।
অদিতি খামটা হাতে নিয়ে বলল,
—তাহলে আমাকে দেননি কেন?
—সাহস হয়নি।
অদিতি মৃদু হেসে বলল,
—আপনি তো আমাকে সাহসের কথা বলেন!
—নিজের ক্ষেত্রে সবসময় কাজ করে না।
অদিতি খামটা খুলল না।
শুধু বলল,
—এটা এখন পড়ব?
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—না।
—কেন?
—কারণ কিছু কথা চোখের সামনে পড়ে শোনানোর চেয়ে মুখে বলা ভালো।
অদিতি তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—তাহলে আপনি আমাকে কী বলতে চান?
আরিয়ান একটু হেসে বলল,
—শিগগিরই বলব।
সেদিন বিকেলে তারা বইয়ের দোকানের বাইরে এসে দাঁড়াল।
বৃষ্টি থেমে গেছে।
রাস্তার ওপর জমে থাকা পানিতে আকাশের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে।
অদিতি হঠাৎ বলল,
—আমি একটা কথা বলব?
—হুম।
—আপনি যখন প্রথম আমাকে বইটা দিয়েছিলেন, তখন যদি না দিতেন?
আরিয়ান বলল,
—তাহলে হয়তো আমাদের গল্পটাই শুরু হতো না।
—আর যদি আমি সেদিন দোকানে না আসতাম?
—তাহলে আমি অন্য কাউকে বইটা দিয়ে দিতাম।
অদিতি হেসে বলল,
—মানে আমি শুধু কপাল ভালো বলে পেয়েছিলাম?
আরিয়ান বলল,
—হয়তো।
—আর আপনি?
—আমার কপালও ভালো ছিল।
—কেন?
আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কারণ বইটা তোমার হাতে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।
অদিতি এবার আর হাসল না।
তার চোখে নরম একটা আলো ফুটে উঠল।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর অদিতি বলল,
—আমি অপেক্ষা করব।
আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল।
—কিসের?
—যে কথাটা আপনি বলবেন, তার।
আরিয়ান মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
—ঠিক আছে।
সেদিন রাতে অদিতি বাড়ি ফিরে খামটা খুলল।
ভেতরে একটা মাত্র চিঠি।
সে ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করল।
চিঠিটা খুব ছোট।
কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন এক বছরের অপেক্ষা পেরিয়ে এসেছে।
অদিতি পড়তে পড়তে থেমে গেল।
তার চোখ ভিজে উঠেছে।
চিঠির শেষে একটা মাত্র লাইন—
‘যেদিন তুমি ফিরবে, সেদিন তোমাকে আর অপরিচিত বলে ডাকতে পারব না।’
অদিতি চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।
তার ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।
সে বুঝতে পারল—
আরিয়ান যে কথাটা এতদিন ধরে বলতে চাইছে, সেটা হয়তো তার ধারণার চেয়েও কাছের।
পরদিন সকালেই অদিতি নোটবুক খুলল।
শেষ পাতায় লিখল—
‘আমি প্রস্তুত।’
তারপর কলম থামিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল।
শেষে আরও একটা লাইন যোগ করল—
‘তুমিও প্রস্তুত থেকো।’
বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
আর শহরের অন্য প্রান্তে আরিয়ান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সেই একই বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার হাতে ছিল ‘বৃষ্টির চিঠি’।
আর মনে ছিল একটা সিদ্ধান্ত—
পরের শুক্রবার আর কোনো কথা অসম্পূর্ণ থাকবে না।
পরের শুক্রবার।
সকাল থেকেই অদিতির মনটা অদ্ভুত শান্ত।
গত কয়েকদিন ধরে তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
আজ আর কোনো কথা অসম্পূর্ণ থাকবে না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে সে অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশ পরিষ্কার, তবে বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।
অদিতি আলমারি খুলে ‘বৃষ্টির চিঠি’ বইটা বের করল।
বইটার পাতাগুলো এখন তার কাছে শুধু মায়ের স্মৃতি নয়।
এই বইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত সুন্দর একটা গল্প।
প্রথম দেখা।
একটা শেষ কপি।
একটা অপরিচিত ছেলে।
তারপর প্রতি শুক্রবারের অপেক্ষা।
এক বছরের দূরত্ব।
আর ফিরে আসা।
অদিতি বইটা ব্যাগে রাখল।
তারপর সেই নোটবুকটাও নিল।
মলাটে লেখা—
‘যেসব কথা বলা হয় না।’
আজ হয়তো সত্যিই সব কথা বলা হবে।
বিকেল পাঁচটার একটু আগেই অদিতি ‘পাতার গন্ধ’ বইয়ের দোকানে পৌঁছে গেল।
দোকানে ঢুকতেই বৃদ্ধ দোকানদার মুচকি হেসে বললেন,
—আজ তো অনেক আগেই চলে এসেছিস।
অদিতি হাসল।
—আজ একটু তাড়াহুড়ো ছিল।
—কিসের?
অদিতি লজ্জা পেয়ে বলল,
—জানি না।
বৃদ্ধ লোকটা কিছু না বলে হেসে ফেললেন।
—পাশের দোকানে যা। ও অপেক্ষা করছে।
অদিতির বুক ধক করে উঠল।
—আরিয়ান এসেছে?
—অনেকক্ষণ হলো।
অদিতি আর কিছু না বলে দোকানের বাইরে চলে গেল।
চায়ের দোকানে গিয়ে দেখল, আরিয়ান একা বসে আছে।
তার সামনে একটা কাপ চা।
আর টেবিলের ওপর রাখা সেই পুরনো বই—
‘বৃষ্টির চিঠি।’
অদিতিকে দেখেই আরিয়ান উঠে দাঁড়াল।
—আজ তুমি আগে এসেছ।
অদিতি হেসে বলল,
—আজ আপনাকে অপেক্ষা করাতে চাইনি।
—আমি অপেক্ষা করতে অভ্যস্ত।
—এক বছর পরেও?
—এক বছর পরেও।
দুজনেই বসে পড়ল।
দোকানদার আজ কোনো কথা না বলে দুটো চা দিয়ে গেলেন।
কিছুক্ষণ তারা চুপচাপ চা খেল।
তারপর আরিয়ান বইটা হাতে নিল।
—এটা তোমার।
অদিতি বইটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এটা তো আপনার।
—না। প্রথম দিন থেকেই এটা তোমার ছিল।
অদিতি বইটা হাতে নিল।
—এতদিন রেখেছিলেন কেন?
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—কারণ তোমাকে দেওয়া ছাড়া বইটা খোলা ঠিক মনে হয়নি।
অদিতি বইটার প্রথম পাতা খুলল।
মায়ের হাতের লেখা সেই পুরনো বাক্য।
‘বৃষ্টি থেমে গেলেও কিছু অপেক্ষা থেকে যায়।’
অদিতি আঙুল দিয়ে লেখাটার ওপর হাত রাখল।
তারপর ধীরে বইটা বন্ধ করল।
আরিয়ান বলল,
—তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।
অদিতি তার দিকে তাকাল।
—জানি।
আরিয়ান অবাক হলো।
—কীভাবে?
—আপনি অনেকদিন ধরে বলছেন।
—তাহলে শুনবে?
অদিতি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
—তুমি যেদিন প্রথম দোকানে এসেছিলে, সেদিন তোমাকে আমি চিনতাম না। শুধু দেখেছিলাম, একটা বইয়ের জন্য তোমার চোখ কতটা বদলে গেল। তাই বইটা তোমাকে দিয়ে দিয়েছিলাম।
অদিতি মন দিয়ে শুনছিল।
—তারপর তুমি আবার এলে। তারপর প্রতি শুক্রবার এলে। ধীরে ধীরে বুঝলাম, আমি শুক্রবারের জন্য বইয়ের অপেক্ষা করি না।
সে একটু থামল।
—তোমার জন্য করি।
অদিতির চোখ ভিজে উঠল।
আরিয়ান বলল,
—তুমি চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েকটা দিন নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, এটা শুধু বন্ধুত্ব। তারপর বুঝলাম, এক বছর অপেক্ষা করার মতো কোনো বন্ধুত্বের ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই।
অদিতি চোখ নামিয়ে ফেলল।
আরিয়ান ধীরে বলল,
—তুমি না থাকলেও তোমার জায়গাটা খালি ছিল। প্রতি শুক্রবার আমি সেই খালি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে বসে থাকতাম।
তার কণ্ঠ আরও নরম হয়ে গেল।
—আমি জানি না এই অনুভূতির নাম কী। তবে এটুকু জানি, তোমাকে ছাড়া আমার শুক্রবারগুলো অসম্পূর্ণ।
অদিতির চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সে মৃদু হেসে বলল,
—এতদিনে বললেন?
আরিয়ানও হেসে ফেলল।
—ভয় লাগত।
—আমারও।
—কিসের?
অদিতি ধীরে বলল,
—আপনাকে হারানোর।
আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—তাহলে এতদিন চুপ ছিলে কেন?
—কারণ মনে হয়েছিল, কিছু সম্পর্ককে নাম দিলে হয়তো বদলে যায়।
আরিয়ান বলল,
—আর এখন?
অদিতি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—এখন মনে হচ্ছে, কিছু সম্পর্কের নাম না দিলেও তারা বদলে যায়।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর অদিতি ব্যাগ থেকে নোটবুকটা বের করল।
—এবার আমার পালা।
আরিয়ান হেসে বলল,
—কী?
—আপনাকে কিছু পড়ে শোনাব।
সে নোটবুক খুলল।
শেষ পাতাটা।
অদিতি ধীরে পড়তে শুরু করল—
—‘যেদিন ফিরব, সেদিন হয়তো সব কথা বলতে পারব না। কিন্তু একটা কথা বলতে পারব—দূরে থেকেও কিছু মানুষকে ভুলে থাকা যায় না।’
আরিয়ান চুপচাপ শুনছিল।
অদিতি নোটবুক বন্ধ করে বলল,
—আমি আপনাকে ভুলিনি।
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
—জানি।
—কীভাবে?
—কারণ তুমি ফিরে এসেছ।
অদিতি এবার হেসে ফেলল।
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
প্রথমে টুপটাপ।
তারপর ধীরে ধীরে জোরে।
দোকানের টিনের ছাউনিতে বৃষ্টির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
অদিতি আকাশের দিকে তাকাল।
—আবার বৃষ্টি।
আরিয়ান বলল,
—আমাদের গল্পে বৃষ্টি না থাকলে হয়?
অদিতি হেসে বলল,
—হয়তো না।
দুজনেই কিছুক্ষণ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর অদিতি ধীরে বলল,
—একটা কথা বলব?
—হুম।
—প্রথম দিন আপনি যখন বইটা আমার হাতে দিয়েছিলেন, তখন আমি ভাবিনি এই বইটা আমার জীবনটাই বদলে দেবে।
আরিয়ান বলল,
—আমিও ভাবিনি।
—তখন তো আমরা একে অপরকে চিনতামও না।
—এখন?
অদিতি মৃদু হেসে বলল,
—এখন মনে হয়, অনেকদিন ধরে চিনি।
আরিয়ান কিছু বলল না।
শুধু হাসল।
চায়ের দোকানের বৃদ্ধ মালিক দূর থেকে তাকিয়ে ছিলেন।
তিনি দুজনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
বৃষ্টি আরও বাড়ল।
অদিতি বলল,
—আজ কি আমরা এখানেই বসে থাকব?
—যতক্ষণ তুমি চাও।
—তাহলে আজ কোনো তাড়া নেই।
—কোনো তাড়া নেই।
দুজনেই আবার চুপচাপ বসে রইল।
কথা না বলেও যেন অনেক কিছু বলা হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর অদিতি ‘বৃষ্টির চিঠি’ বইটা খুলল।
একটা খালি পাতায় নিজের কলম দিয়ে লিখল—
‘এই বইটা একদিন আমার মায়ের প্রিয় ছিল। তারপর এটা আমার আর তোমার গল্পের শুরু হলো।’
আরিয়ান তাকিয়ে বলল,
—আর শেষ?
অদিতি কলম থামিয়ে তার দিকে তাকাল।
মৃদু হেসে লিখল—
‘শেষ নয়। এখান থেকেই নতুন অধ্যায়।’
তারপর বইটা আরিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল।
আরিয়ান লেখাটা পড়ে মুচকি হাসল।
—এটা কি তাহলে চিঠি?
অদিতি বলল,
—হ্যাঁ।
—কার জন্য?
—যে মানুষটা একদিন আমার জন্য একটা বই ছেড়ে দিয়েছিল।
আরিয়ান বইটা হাতে নিয়ে বলল,
—তাহলে আমি এটা যত্ন করে রাখব।
অদিতি হেসে বলল,
—এবার কিন্তু খুলবেন।
—প্রতিদিন।
বাইরে বৃষ্টি তখনও থামেনি।
পুরনো শহরের রাস্তা ভিজে গেছে।
বইয়ের দোকানের হলুদ আলো জানালা দিয়ে বাইরে এসে পড়ছে।
চায়ের দোকানে দুজন মানুষ পাশাপাশি বসে আছে।
এক বছর আগে তারা ছিল অপরিচিত।
তারপর একটি বই তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।
প্রতি শুক্রবার তাদের কাছে এনেছিল।
এক বছরের দূরত্ব তাদের অপেক্ষা শিখিয়েছিল।
আর ফিরে আসার দিন তাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল—
সত্যিকারের কিছু অনুভূতির জন্য বড় কোনো প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন হয় না।
শুধু একজন মানুষকে মনে রেখে অপেক্ষা করতে হয়।
অদিতি আরিয়ানকে দেখে মৃদু হাসল।
আরিয়ানও হাসল।
তারপর দুজনেই বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল।
সেদিন তাদের গল্পের কোনো শেষ হয়নি।
কারণ কিছু গল্পের শেষ লেখা থাকে না।
শুধু একটা নতুন পাতা খুলে যায়।
আর সেই পাতার নাম—
‘বৃষ্টির চিঠি।’
....