তিন হৃদয় এক অনুভূতি

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন।

নতুন ক্যাম্পাস, নতুন মুখ, নতুন পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে চারপাশে যেন উৎসবের আমেজ।

আরিয়ান ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে ঢুকছিল। চারপাশে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের দিকে।

মেয়েটি শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। পরনে পরিপাটি পোশাক, হাতে ছোট্ট একটা ঘড়ি, চুল সুন্দর করে বাঁধা। কারও সঙ্গে খুব বেশি কথা বলছিল না। শুধু মাঝে মাঝে মুচকি হাসছিল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখন পাশ থেকে আরেকজন মেয়ের চিৎকার শোনা গেল,

—এই! বলটা এদিকে দে!

আরিয়ান ঘুরে তাকিয়ে দেখল, আরেকটি মেয়ে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে ক্রিকেট বল হাতে নিয়ে আছে।

চুল এলোমেলো, মুখে একরাশ আত্মবিশ্বাস। পরনে সাদামাটা টি-শার্ট আর জিন্স। একদল ছেলের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিল।

একজন ছেলে বলল,

—মেয়েরা আবার ক্রিকেট খেলবে নাকি?

মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—কেন? ক্রিকেট খেলতে কি তোর কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে?

ছেলেটা হেসে বলল,

—না, কিন্তু তুই তো ঠিকমতো বলই করতে পারিস না।

মেয়েটা বল ছুড়ে দিয়ে বলল,

—ব্যাটিং কর। তারপর বুঝবি।

আরিয়ান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল।

মেয়েটার এমন সাহস দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

কিছুক্ষণ পর সেই মেয়েটাই দৌড়ে এসে শান্ত মেয়েটার পাশে দাঁড়াল।

—মীরা, তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

শান্ত মেয়েটা মুচকি হেসে বলল,

—তুই আবার সবার সঙ্গে ঝগড়া করছিস।

—ওরা আগে শুরু করেছে।

—তুই কখনো শুরু করিস না, তাই না?

—না।

মীরা হেসে মাথা নাড়ল।

আরিয়ান বুঝল, শান্ত মেয়েটির নাম মীরা।

আর দুষ্টু মেয়েটির নাম আরিয়া।

সেদিনই কোনো এক অদ্ভুত কারণে তিনজনের পরিচয় হয়ে গেল।

আর সেই পরিচয়ই ধীরে ধীরে তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুত্বে পরিণত হলো।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনজন সবসময় একসঙ্গে থাকতে শুরু করল।

ক্লাসে একসঙ্গে বসা।

ক্যান্টিনে একসঙ্গে খাওয়া।

লাইব্রেরিতে একসঙ্গে পড়া।

আর ছুটির সময় মাঠে গিয়ে আড্ডা দেওয়া।

তবে আরিয়া আর আরিয়ানের সম্পর্কটা ছিল একেবারেই আলাদা।

তারা একে অপরকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে থাকতে দিত না।

একদিন ক্যান্টিনে বসে মীরা চা খাচ্ছিল।

আরিয়া নিজের ফোনে কিছু দেখছিল।

আরিয়ান হঠাৎ বলল,

—এই আরিয়া, তোর ফোনটা এত পুরোনো কেন?

আরিয়া মাথা না তুলেই বলল,

—তোর ফোনটা দিয়ে কী হবে? তোর তো মাথাটাই পুরোনো।

মীরা চা খেতে গিয়ে কাশতে লাগল।

আরিয়ান চোখ বড় করে বলল,

—আমার মাথা পুরোনো?

—হ্যাঁ।

—তুই জানিস আমার মাথার দাম কত?

—শূন্য টাকা।

—মীরা, তুই দেখছিস?

মীরা হেসে বলল,

—আমি কিছু শুনিনি।

আরিয়ান আরিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই একদিন আমার হাতে ধরা খাবি।

আরিয়া মুচকি হেসে বলল,

—আগে আমাকে ধর।

—ধরব।

—চেষ্টা করে দেখ।

আরিয়ান উঠে দাঁড়াতেই আরিয়া দৌড়ে পালাল।

মীরা মাথা নাড়িয়ে বলল,

—তোমরা দুজন সত্যিই পাগল।

আরিয়ান অবশ্য মীরাকে একটু অন্যরকম চোখে দেখত।

মীরার শান্ত স্বভাব তার খুব ভালো লাগত।

মীরা যখন ধীরে ধীরে কথা বলত, মন দিয়ে সবার কথা শুনত, কিংবা সুন্দর করে হাসত—আরিয়ান চুপচাপ তাকিয়ে থাকত।

আরিয়া বিষয়টা অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিল।

একদিন ক্যান্টিনে বসে সে মীরার কানে কানে বলল,

—ও তোকে পছন্দ করে।

মীরা অবাক হয়ে বলল,

—কে?

—আরিয়ান।

মীরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—চুপ কর!

আরিয়া হাসল।

—লজ্জা পাচ্ছিস?

—একদম না।

—তাহলে মুখ লাল কেন?

মীরা তার হাতে হালকা চিমটি কাটল।

—তুই খুব বিরক্তিকর।

ঠিক তখনই আরিয়ান এসে বলল,

—কী নিয়ে এত ফিসফাস?

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—কিছু না। মীরা বলছিল তুই দেখতে খুব সুন্দর।

মীরা অবাক হয়ে বলল,

—আমি বলিনি!

আরিয়ান হেসে বলল,

—সত্যিই?

মীরা রেগে আরিয়ার দিকে তাকাল।

—তুই একদম অসহ্য!

আরিয়া হেসে দৌড়ে পালাল।

আরিয়ানও তার পেছনে ছুটল।

—দাঁড়া, আজ তোকে ছাড়ব না!

মীরা দূরে দাঁড়িয়ে হাসতে লাগল।

দিনগুলো এভাবেই কেটে যাচ্ছিল।

আরিয়া ছিল পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত মুখ।

ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলে।

ক্লাসে তর্ক করে।

কেউ অন্যায় কিছু বললে প্রতিবাদ করে।

আর আরিয়ানের সঙ্গে তো প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঝামেলা হতো।

একদিন ক্রিকেট খেলতে গিয়ে আরিয়া একটা ছক্কা মারল।

বলটা মাঠের সীমানার অনেক দূরে গিয়ে পড়ল।

আরিয়া ব্যাট ঘুরিয়ে বলল,

—কী বলেছিলি? আমি পারি না?

আরিয়ান হাততালি দিয়ে বলল,

—বাহ! আজ তো একটা বল ঠিক জায়গায় মেরেছিস।

—একটা?

—হ্যাঁ।

—আরেকবার বল।

—একটা।

আরিয়া ব্যাট হাতে তার দিকে এগিয়ে গেল।

—তুই আজ মরবি।

আরিয়ান হাসতে হাসতে পিছিয়ে গেল।

—আচ্ছা আচ্ছা, পাঁচটা ছক্কা মেরেছিস।

—এই তো ভালো ছেলে।

আরিয়ান হঠাৎ তার গাল টিপে দিয়ে বলল,

—কিন্তু তুই একটা পাগলি।

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে তার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,

—আমার গাল টিপবি না!

—কেন?

—ভালো লাগে না।

—মিথ্যা।

—সত্যি!

—তাহলে গাল লাল হয়ে গেল কেন?

আরিয়া আয়নার মতো ফোনের স্ক্রিনে নিজের মুখ দেখে রেগে বলল,

—তুই...

সে আরিয়ানকে ধাওয়া করল।

মীরা দূরে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলল,

—তোমাদের দুজনের বিয়ে হলে আমি কিন্তু অনুষ্ঠানে যাব না।

দুজনই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল,

—কি?!

মীরা হেসে বলল,

—আচ্ছা আচ্ছা, মজা করলাম।

কিন্তু সেই মজার কথাটাই ভবিষ্যতে কতটা অদ্ভুত সত্যির কাছাকাছি চলে যাবে, তা তখন কেউ জানত না।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরিয়ান আর মীরার বন্ধুত্বও আরও গভীর হতে লাগল।

আরিয়া সবসময় তাদের দুজনের মাঝখানে থাকলেও কখনো কখনো দূর থেকে তাদের দেখত।

মীরা আরিয়ানকে কিছু বললে আরিয়ান মন দিয়ে শুনত।

মীরা হাসলে আরিয়ানও হাসত।

কখনো কখনো মীরার জন্য ক্যান্টিন থেকে খাবার এনে দিত।

আরিয়া এসব দেখে মজা করত।

কিন্তু কেন জানি না, তার নিজের বুকের ভেতরটাও কখনো কখনো অদ্ভুত লাগত।

তখন সে বিষয়টাকে গুরুত্ব দিত না।

বরং নিজের মনকেই বলত,

"আরিয়ান তো মীরাকে পছন্দ করে।"

"আর মীরা আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।"

"তাহলে আমার খারাপ লাগার কী আছে?"

কিন্তু মন সবসময় যুক্তির কথা শোনে না।

একদিন মীরা আরিয়াকে বলল,

—তুই চাইলে একটু মেয়েদের মতো সাজতে পারিস।

আরিয়া অবাক হয়ে বলল,

—মানে?

—মানে, তুই সবসময় এমন ছেলেদের মতো পোশাক পরিস কেন? তোর ওপর সুন্দর ড্রেসও ভালো লাগবে।

আরিয়া হেসে বলল,

—আমি তো এমনই ভালো আছি।

মীরা বলল,

—তবুও একদিন চেষ্টা করে দেখ।

আরিয়া কিছু বলল না।

কিন্তু সেদিন রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে মীরার কথাটা ভাবল।

তারপর নিজের অজান্তেই একটা প্রশ্ন মনে এলো—

"আরিয়ান যদি আমাকে এভাবে দেখে, কী বলবে?"

প্রশ্নটা মনে আসতেই আরিয়া নিজেই অবাক হয়ে গেল।

সে দ্রুত মাথা ঝাঁকাল।

—ধুর! আমি এসব কী ভাবছি?


বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো নিজের গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল।

আরিয়ান, আরিয়া আর মীরা—তিনজনকে এখন প্রায় সবসময় একসঙ্গেই দেখা যেত।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরিয়ার মধ্যে ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন আসতে শুরু করেছিল।

মীরা যেদিন তাকে বলেছিল, "তুই চাইলে একটু মেয়েদের মতো সাজতে পারিস"—সেদিনের কথাটা অদ্ভুতভাবে আরিয়ার মনে গেঁথে গিয়েছিল।

আগে এসব নিয়ে সে কখনো ভাবত না।

কিন্তু এখন আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের চেহারাটা একটু বেশি খেয়াল করত।

কোন পোশাকে তাকে ভালো লাগে, চুল কীভাবে রাখলে সুন্দর দেখায়—এসব নিয়েও মাঝে মাঝে ভাবত।

তবে তার সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল একজনকে নিয়ে।

আরিয়ান।

কেন?

সে নিজেও জানত না।

এক সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে আরিয়া আলমারি খুলে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর একটা সুন্দর সালওয়ার-কামিজ বের করল।

কিছুক্ষণ পোশাকটার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার রেখে দিল।

আবার তুলে নিল।

শেষ পর্যন্ত পরে ফেলল।

চুলগুলোও সুন্দর করে আঁচড়ে নিল।

আয়নায় নিজেকে দেখে একটু লজ্জা পেল।

—আমাকে কি সত্যিই ভালো লাগছে?

নিজেকেই প্রশ্ন করল সে।

তারপর মনে হলো, আরিয়ান নিশ্চয়ই হাসাহাসি করবে।

এই চিন্তাটাই তার মন খারাপ করে দিল।

তবুও সেদিন সে সালওয়ার-কামিজ পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল।

গেট দিয়ে ঢুকতেই মীরা তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল।

—আরিয়া!

আরিয়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

—কী?

মীরা কাছে এসে তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই!

—কী হয়েছে?

—তোকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

আরিয়ার মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ। একদম অন্যরকম লাগছে।

আরিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,

—বেশি হাসিস না কিন্তু।

মীরা তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

—আমি তোকে নিয়ে গর্বিত। এতদিন পর তুই নিজেকে একটু সময় দিলি।

আরিয়া মুচকি হাসল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো,

—এই যে! আজকে আবার কী হলো?

আরিয়া ঘুরে তাকাল।

আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে।

তার চোখ প্রথমে আরিয়ার মুখে, তারপর পোশাকের দিকে গেল।

এক মুহূর্তের জন্য সে সত্যিই থেমে গিয়েছিল।

তার পরিচিত দুষ্টু আরিয়াকে আজ একেবারেই অন্যরকম লাগছিল।

চুলগুলো সুন্দর করে সাজানো।

পরনে পরিপাটি সালওয়ার-কামিজ।

মুখে হালকা লাজুক ভাব।

আরিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর নিজের অস্বস্তি লুকাতে হেসে ফেলল।

—ওহ্! আরিয়া!

আরিয়া মৃদু গলায় বলল,

—হুম?

আরিয়ান হাসতে হাসতে বলল,

—তুই তো একদম...

আরিয়া আগ্রহ নিয়ে তাকাল।

—কী?

আরিয়ান বলল,

—ক্ষেত ক্ষেত লাগছে!

আরিয়ার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

—মানে?

আরিয়ান হেসে বলল,

—মানে একদম গ্রামের নাটকের নায়িকার মতো। তোকে একদম কেত্তি কেত্তি লাগছে।

মীরা সঙ্গে সঙ্গে বিরক্ত হয়ে বলল,

—আরিয়ান!

আরিয়া আর কিছু বলল না।

শুধু মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল।

মীরা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি এটা কেন বললে?

আরিয়ান একটু অবাক হয়ে বলল,

—আরে, মজা করেছি।

—সবকিছু নিয়ে মজা করা যায়?

—আরে ও তো এমনিই পাগলি।

মীরা রাগ করে বলল,

—তুমি মাঝে মাঝে একদম বোকার মতো কথা বলো।

আরিয়ান কিছু বলল না।

কিন্তু দূরে চলে যাওয়া আরিয়ার দিকে তাকিয়ে তার নিজেরও একটু খারাপ লাগল।

আরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের একটা বেঞ্চে গিয়ে বসেছিল।

তার চোখে পানি চলে এসেছিল।

সে নিজের পোশাকের দিকে তাকাল।

কত যত্ন করে আজ সাজল।

শুধু একটা প্রশংসা শুনবে বলে নয়...

তবুও কেন যেন মনে হয়েছিল, আরিয়ান তাকে দেখে হয়তো বলবে—

"তোকে সুন্দর লাগছে।"

কিন্তু সে কী বলল?

"ক্ষেত ক্ষেত লাগছে।"

আরিয়ার চোখ থেকে একটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

সে দ্রুত মুছে ফেলল।

—আমি কেন ওর কথায় এত কষ্ট পাচ্ছি?

ঠিক তখন পেছন থেকে আরিয়ানের কণ্ঠ,

—এই!

আরিয়া তাকাল না।

—শোন।

চুপ।

—রাগ করেছিস?

—না।

—তাহলে তাকাচ্ছিস না কেন?

—ইচ্ছে করছে না।

আরিয়ান তার সামনে এসে দাঁড়াল।

—আচ্ছা, সরি।

আরিয়া চুপ।

—সত্যি বলছি, মজা করেছিলাম।

চুপ।

আরিয়ান হঠাৎ নিজের দুই কান ধরে বলল,

—সরি।

আরিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—কী করছিস?

—শাস্তি নিচ্ছি।

—কী শাস্তি?

আরিয়ান কান ধরে উঠবস শুরু করল।

—এক...

আরিয়া মুখ গম্ভীর করে বসে রইল।

—দুই...

তারপর আরিয়া আর থাকতে না পেরে হেসে ফেলল।

—থাম!

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

—মাফ করেছিস?

আরিয়া হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

আরিয়ান কাছে এসে তার গাল টিপে দিল।

—আমার পাগলি!

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে তার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,

—আবার গাল টিপলি!

—টিপবই।

—মারব কিন্তু।

—মার।

আরিয়া তাকে ধাওয়া করল।

আরিয়ান দৌড়ে পালাতে লাগল।

দূরে দাঁড়িয়ে মীরা পুরো দৃশ্যটা দেখে হাসতে হাসতে বলল,

—তোমাদের দুজনের কোনো চিকিৎসা নেই।

আরিয়া হেসে বলল,

—ওকে একদিন আমি সত্যিই মারব।

আরিয়ান দূর থেকে বলল,

—আগে ধর!

আরিয়া আবার তার পেছনে ছুটল।

কিন্তু সেদিনের পর থেকে একটা বিষয় আরিয়ার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।

আরিয়ান তাকে নিয়ে মজা করলেও তার একটা কথাও আরিয়ার মনে অদ্ভুতভাবে জায়গা করে নেয়।

আরিয়ান যদি বলে সুন্দর—তার সারাদিন ভালো লাগে।

আরিয়ান যদি সমালোচনা করে—তার সারাদিন মন খারাপ।

এই অনুভূতিটা আরিয়া বুঝতে শুরু করেছিল।

সে আরিয়ানকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখছে না।

আর এই উপলব্ধি তাকে একইসঙ্গে আনন্দ আর ভয় দুটোই দিচ্ছিল।

কয়েকদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে তিনজন বসেছিল।

মীরা আরিয়ানকে একটা বিষয় বোঝাচ্ছিল।

আরিয়ান খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।

মাঝে মাঝে মীরার দিকে তাকিয়ে হাসছিল।

আরিয়া চুপচাপ বসে ছিল।

তার হাতে থাকা চামচটা অকারণে নেড়ে যাচ্ছিল।

মীরা হঠাৎ বলল,

—আরিয়া, তুই এত চুপ কেন?

—আমি?

—হ্যাঁ।

—কিছু না।

আরিয়ান বলল,

—তুই আবার কী নিয়ে রাগ করে বসে আছিস?

—আমি রাগ করিনি।

—তোর মুখ দেখলেই বোঝা যায়।

আরিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,

—সবকিছু নিয়ে এত বুঝতে যাস না।

আরিয়ান হেসে বলল,

—তুই তো একদম রহস্যময় হয়ে গেছিস।

মীরা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি আরিয়াকে একটু কম বিরক্ত করো।

আরিয়ান বলল,

—ওকে বিরক্ত না করলে আমার দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগে।

কথাটা শুনে মীরা হেসে ফেলল।

কিন্তু আরিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।

সে চুপ করে গেল।

কেন যেন মীরার সঙ্গে আরিয়ানের এই ঘনিষ্ঠতা তার সহ্য হচ্ছিল না।

সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে আরিয়া অনেকক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজের বুকের ওপর হাত রেখে ধীরে বলল,

—আমি কি সত্যিই ওকে ভালোবেসে ফেলেছি?

কোনো উত্তর এলো না।

শুধু চোখের কোণে পানি জমল।

কয়েকদিন পর সে সিদ্ধান্ত নিল—

আর লুকিয়ে রাখবে না।

আরিয়ানকে সব বলে দেবে।

সে জানে না আরিয়ান কী বলবে।

হয়তো হাসবে।

হয়তো রাগ করবে।

হয়তো বন্ধুত্বটাও নষ্ট হয়ে যাবে।

তবুও সে বলবে।

কারণ নিজের মনের কথাটা আর লুকিয়ে রাখা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।

পরদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরিবিলি একটা জায়গায় আরিয়ানকে একা পেয়ে আরিয়া বলল,

—আরিয়ান...

আরিয়ান ঘুরে তাকাল।

—হুম?

আরিয়া কাঁপা গলায় বলল,

—তোকে একটা কথা বলব।

—বল।

আরিয়া গভীর শ্বাস নিল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

—আমি তোকে...

কথাটা শেষ করার আগেই তার চোখে পানি চলে এলো।

আরিয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

আরিয়া চোখ মুছে আবার বলল,

—আমি তোকে ভালোবাসি।

আরিয়ান যেন হঠাৎ কোনো কথা খুঁজে পেল না।

আরিয়ার বুক তখন প্রচণ্ড কাঁপছিল।

সে শুধু অপেক্ষা করছিল—

আরিয়ান কী উত্তর দেয়।

আরিয়ার মুখ থেকে কথাটা বের হওয়ার পর চারপাশটা যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

—আমি তোকে ভালোবাসি।

আরিয়ান স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

আরিয়ার বুকের ভেতরটা তখন ধুকপুক করছিল। এতদিন ধরে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখা কথাটা আজ বলে ফেলেছে সে। এখন শুধু আরিয়ানের উত্তরের অপেক্ষা।

আরিয়ান ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে নিল।

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,

—আরিয়া...

—হুম?

—তুই কি সত্যি বলছিস?

আরিয়া মাথা নিচু করে বলল,

—হ্যাঁ।

—কতদিন ধরে?

—জানি না।

—কীভাবে বুঝলি?

আরিয়া একটু হেসে বলল,

—তুই যখন মীরার সঙ্গে কথা বলিস, তখন আমার খারাপ লাগে। তুই যখন আমার সঙ্গে মজা করিস, তখন ভালো লাগে। তুই আমার কোনো কথায় রাগ করলে সারাদিন মন খারাপ থাকে। তুই অন্য কারও প্রশংসা করলে কেন জানি সহ্য হয় না।

তার চোখে পানি চলে এলো।

—তখন বুঝেছি... তোকে আমি শুধু বন্ধু হিসেবে দেখি না।

আরিয়ান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—আমি তোকে কী বলব বুঝতে পারছি না।

আরিয়া কাঁপা গলায় বলল,

—যা সত্যি, সেটাই বল।

আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—আমি তোকে ওইভাবে কখনো ভাবিনি।

আরিয়ার চোখের পানি এবার গড়িয়ে পড়ল।

তবুও সে দাঁড়িয়ে রইল।

আরিয়ান বলল,

—আমি মীরাকে ভালোবাসি।

কথাটা শুনে আরিয়া যেন ভেতর থেকে ভেঙে গেল।

কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।

তারপর খুব আস্তে বলল,

—বুঝেছি।

আরিয়ান বলল,

—আরিয়া, তুই আমার খুব ভালো বন্ধু। আমি তোকে হারাতে চাই না।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—বন্ধু?

—হ্যাঁ।

—শুধু বন্ধু?

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

আরিয়া চোখ মুছে বলল,

—ঠিক আছে।

—তুই রাগ করিস না।

—রাগ করিনি।

—সত্যি?

আরিয়া জোর করে হাসল।

—হ্যাঁ।

তারপর আর কিছু না বলে সেখান থেকে চলে গেল।

আরিয়ান অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

সে বুঝতে পারছিল না, কেন আরিয়ার চোখের পানি দেখে তার নিজের বুকটাও ভার হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু সে সেই অনুভূতির কোনো নাম দিল না।

সেদিন রাতে আরিয়া নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ কাঁদল।

তার বারবার মনে হচ্ছিল—

"আমি কেন বললাম?"

"কেন এত আশা করেছিলাম?"

"আমি তো জানতাম আরিয়ান মীরাকে পছন্দ করে।"

তারপর নিজের বালিশে মুখ গুঁজে বলল,

—তবুও আমি তোকে ভালোবেসেছিলাম...

পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেও আরিয়া আর আগের মতো ছিল না।

সে আরিয়ানের সঙ্গে কথা বলল না।

মীরার সঙ্গেও খুব বেশি কথা বলল না।

মীরা বিষয়টা বুঝতে পারছিল।

ক্লাস শেষে সে আরিয়ার পাশে এসে বসে বলল,

—তুই আমার ওপর রাগ করেছিস?

আরিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—না।

—তাহলে আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছিস কেন?

—তুই তো কিছু করিসনি।

মীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আরিয়ানের সঙ্গে কিছু হয়েছে?

আরিয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল।

—না।

মীরা তার হাত ধরে বলল,

—আমাকে বল।

আরিয়ার চোখ আবার ভিজে উঠল।

মীরা বুঝে গেল, ব্যাপারটা গুরুতর।

—ও কি কিছু বলেছে?

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—আমি ওকে বলেছিলাম।

মীরা চুপ।

—কী বলেছিলি?

আরিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি ওকে ভালোবাসি।

মীরা কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না।

তারপর আস্তে বলল,

—আরিয়ান কী বলেছে?

আরিয়া চোখ মুছে বলল,

—ও তোকে ভালোবাসে।

মীরা অবাক হয়ে গেল।

—আমাকে?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

মীরা আরিয়াকে জড়িয়ে ধরল।

—আমি জানতাম না।

—জানি।

—তুই আমাকে ঘৃণা করিস?

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

—না। তোকে কেন ঘৃণা করব?

মীরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি তোকে কষ্ট দিতে চাইনি।

আরিয়া তার হাত চেপে ধরে বলল,

—তুই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তোর কোনো দোষ নেই।

কিন্তু নিজের মনকে সে কীভাবে বোঝাবে?

কয়েকদিন পর আরিয়া সিদ্ধান্ত নিল, সে গ্রামের বাড়িতে চলে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সেমিস্টারও প্রায় শেষ।

এক বিকেলে তিনজন আবার একসঙ্গে বসেছিল।

মীরা কিছু বুঝতে না পেরে গল্প করছিল।

আরিয়ান আগের মতোই আরিয়াকে বিরক্ত করার চেষ্টা করছিল।

—এই আরিয়া, তুই এত চুপ কেন?

আরিয়া বলল,

—এমনিই।

—তোর কী হয়েছে?

—কিছু হয়নি।

—তুই কি আমাকে মিস করবি?

আরিয়া তাকিয়ে রইল।

আরিয়ান হেসে বলল,

—কী হলো? উত্তর দে।

আরিয়া চোখ নামিয়ে বলল,

—জানি না।

আরিয়ান তার গাল টিপতে হাত বাড়াল।

কিন্তু আরিয়া এবার পিছিয়ে গেল।

—গাল টিপিস না।

আরিয়ান থেমে গেল।

—কেন?

—ভালো লাগে না।

—আগে তো লাগত।

আরিয়া মৃদু গলায় বলল,

—সবকিছু তো আগের মতো নেই।

আরিয়ান চুপ হয়ে গেল।

মীরা দুজনের দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে চেষ্টা করল।

পরদিন ভোরে আরিয়া ব্যাগ গুছিয়ে নিল।

মা জিজ্ঞেস করলেন,

—এত তাড়াতাড়ি চলে এলি কেন?

আরিয়া হেসে বলল,

—বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা তো প্রায় শেষ। একটু গ্রামের বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করছিল।

মা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।

কিন্তু আরিয়া জানত, সে পালিয়ে এসেছে।

নিজের অনুভূতি থেকে।

আরিয়ান থেকে।

মীরা থেকে।

সবকিছু থেকে।

আরিয়া চলে যাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়টা অদ্ভুত ফাঁকা লাগতে শুরু করল।

আরিয়ান প্রথম কয়েকদিন ব্যাপারটা গুরুত্ব দিল না।

ভাবল, আরিয়া হয়তো কিছুদিনের জন্য গেছে।

কিন্তু দিন গড়াতে থাকল।

সে খেয়াল করল—

কেউ তাকে সকালে এসে বিরক্ত করছে না।

কেউ তার কলম চুরি করছে না।

কেউ ক্রিকেট খেলতে গিয়ে তাকে বাজে বলে ডাকছে না।

কেউ তার গাল টিপে দেওয়া নিয়ে ঝগড়া করছে না।

ক্যান্টিনে বসলে পাশে সেই চঞ্চল মেয়েটা নেই।

একদিন মীরা বলল,

—তুই আরিয়াকে মিস করছিস?

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—হয়তো।

মীরা মৃদু হেসে বলল,

—তুই ওকে খুব অভ্যস্ত হয়ে গেছিস।

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

কিন্তু "অভ্যস্ত" শব্দটার আড়ালে যে আরও গভীর কিছু লুকিয়ে আছে, সেটা তখনও সে বুঝতে পারেনি।

কয়েক মাস পর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ হয়ে গেল।

আরিয়ান আর মীরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিল।

বিয়ের দিন আরিয়ার কথা আরিয়ানের একবার মনে পড়েছিল।

সে ভেবেছিল, আরিয়া হয়তো দূরে কোথাও নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত।

মীরা আরিয়ানকে বলেছিল,

—তুমি কি ওকে খবর দিয়েছ?

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

—না।

—দেওয়া উচিত ছিল।

—ও হয়তো আসতে চাইবে না।

মীরা চুপ করে গেল।

বিয়ের পর তাদের সংসার শুরু হলো।

আর অন্যদিকে, গ্রামের বাড়িতে বসে আরিয়া নিজের জীবনকে নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল।

সে নিজেকে বদলাতে শুরু করল।

আগের মতো ঝগড়াটে নয়।

আগের মতো অগোছালো নয়।

ধীরে ধীরে সে শান্ত হতে শিখল।

নিজেকে সময় দিতে শিখল।

কিন্তু হৃদয়ের গভীরে একজন মানুষকে সে কখনোই পুরোপুরি ভুলতে পারল না।

আরিয়ান।

বছর দুয়েক পর একদিন আরিয়ার হাতে একটি খবর এলো।

আরিয়ান বাবা হয়েছে।

তার একটি ছেলে হয়েছে।

ছেলের নাম—রোহান।

খবরটা পড়ে আরিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল।

তার চোখে পানি এসে গেল।

সে নিজের মনকে বলল,

—ভালো থাকিস, আরিয়ান।

তারপর ফোনটা বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

সে জানত না—

কয়েক বছর পর সেই রোহানই তাকে আবার আরিয়ানের জীবনের সামনে এনে দাঁড় করাবে।

আর তখন...

আরিয়ানও বুঝবে,

যে মানুষটাকে সে একসময় শুধু "পাগলি বন্ধু" ভেবেছিল—

সে আসলে তার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ ছিল।

সময় কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না।

আরিয়ার চলে যাওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ হয়ে গেল। তারপর একসময় চাকরি, সংসার—সবকিছু নিয়েই আরিয়ানের জীবন ব্যস্ত হয়ে উঠল।

আর মীরা?

আরিয়ান শেষ পর্যন্ত মীরাকেই বিয়ে করল।

বিয়ের দিন আরিয়ানের মনে একবার আরিয়ার কথা এসেছিল।

মেয়েটা কোথায় আছে?

কেমন আছে?

তারপর নিজের মনকে বুঝিয়ে নিয়েছিল—আরিয়া নিশ্চয়ই ভালো আছে।

বিয়ের পর আরিয়ান আর মীরার সংসারও সুন্দরভাবেই চলছিল।

মীরা আগের মতোই শান্ত, মার্জিত। আরিয়ান ব্যস্ত হলেও মীরার সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করত।

কয়েক বছর পর তাদের সংসারে এলো ছোট্ট এক ছেলে।

নাম রাখা হলো—রোহান।

রোহান জন্মানোর পর যেন তাদের জীবন আরও পূর্ণ হয়ে উঠল।

ছোট্ট ছেলেটাকে কোলে নিয়ে মীরা প্রায়ই বলত,

—দেখেছ? একদম তোমার মতো হয়েছে।

আরিয়ান হেসে বলত,

—না, তোমার মতো হয়েছে।

—কেন?

—কারণ ও আমার মতো এত শান্ত হলে তোমার জীবন একদম বিরক্তিকর হয়ে যাবে।

মীরা হেসে বলত,

—তুমি আর শান্ত?

—আমি খুব শান্ত।

—বিশ্ববিদ্যালয়ে আরিয়ার সঙ্গে যে প্রতিদিন ঝগড়া করতে?

আরিয়ান একটু থেমে হেসে বলত,

—ওটা আলাদা ব্যাপার।

মীরা তখন মুচকি হাসত।

আরিয়ার কথা উঠলে দুজনের মনেই একটা পুরোনো বন্ধুত্বের স্মৃতি ফিরে আসত।

মীরা মাঝে মাঝে বলত,

—আরিয়ার কোনো খবর পাওনি?

আরিয়ান মাথা নাড়ত।

—না।

—একদিন ওকে খুঁজে বের করো।

—ও হয়তো নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত।

—তবুও।

মীরা আর কিছু বলত না।

রোহান ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল।

কিন্তু একদিন হঠাৎ মীরার শরীর খারাপ হতে শুরু করল।

প্রথমে সবাই ভেবেছিল সাধারণ সমস্যা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠল।

হাসপাতালে ভর্তি করা হলো মীরাকে।

আরিয়ান তখন হাসপাতালের করিডোরে পায়চারি করছিল।

তার বুকের ভেতর অজানা ভয়।

ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে ফিরে এসে সে মীরার হাত ধরে বসে রইল।

মীরা দুর্বলভাবে চোখ খুলল।

—রোহান কোথায়?

—বাসায় আছে।

—ওকে আমার কাছে আনবে?

আরিয়ান চোখের পানি লুকিয়ে বলল,

—অবশ্যই।

মীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আরিয়ান...

—হুম?

—যদি আমার কিছু হয়ে যায়...

—চুপ করো।

—আমাকে কথা বলতে দাও।

আরিয়ান তার হাত শক্ত করে ধরল।

—কিছু হবে না।

মীরা মৃদু হাসল।

—তুমি রোহানকে ভালো করে মানুষ করবে?

আরিয়ানের চোখ ভিজে উঠল।

—করব।

মীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

—আর একটা কথা...

—কী?

মীরা কষ্টের মধ্যেও মৃদু হাসল।

—আরিয়াকে খুঁজে নিও।

আরিয়ান থমকে গেল।

—কেন?

—ও তো তোমাদের জীবনের অংশ ছিল।

আরিয়ান কিছু বলল না।

মীরা ধীরে বলল,

—ওকে তুমি কষ্ট দিয়েছিলে।

আরিয়ান মাথা নিচু করল।

—জানি।

—একদিন যদি সুযোগ পাও... ওর কাছে ক্ষমা চেয়ো।

আরিয়ান মীরার হাতটা নিজের কপালে ঠেকাল।

—তুমি ভালো হয়ে যাও। তারপর আমরা সবাই মিলে ওকে খুঁজব।

মীরা আর কিছু বলল না।

শুধু মৃদু হাসল।

কিন্তু ভাগ্য তাদের জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।

রোহানের জন্মের সময় যে মানুষটিকে আরিয়ান হারানোর ভয় পেয়েছিল, এবার সত্যিই তাকে হারাতে হলো।

মীরা আর ফিরল না।

হাসপাতালের সেই রাতটা আরিয়ানের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাত হয়ে রইল।

তার সামনে তখন শুধু মীরার নিথর মুখ।

আর পাশের ঘরে ছোট্ট রোহান।

ছেলেটা তখনও বুঝতে পারছে না তার জীবনে কী ঘটে গেছে।

আরিয়ান দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রোহানের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজেকে শক্ত করে বলল,

—আমি তোমাকে মানুষ করব, রোহান।

—তোমার কোনো কষ্ট হতে দেব না।

সেদিন থেকে রোহানই হয়ে গেল আরিয়ানের পৃথিবী।

বছরগুলো কেটে গেল।

আরিয়ান নিজের ক্যারিয়ারে আরও মন দিল।

অল্প সময়ের মধ্যে সে বড় একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে গেল।

ব্যস্ততা বেড়ে গেল।

মিটিং, অফিস, সফর—সবকিছুর মাঝেও রোহানের জন্য সে সময় রাখত।

রোহানের স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময়ও সে নিজেই সবকিছু করল।

প্রথম দিন ছেলেকে স্কুলে নিয়ে গিয়ে রোহানের হাত ধরে বলল,

—ভয় লাগছে?

রোহান মাথা নাড়ল।

—একটু।

—কেন?

—তুমি চলে যাবে।

আরিয়ান হেসে তার মাথায় হাত রাখল।

—আমি তোকে রেখে যাব না।

—সত্যি?

—সত্যি।

রোহান ছোট্ট আঙুল বাড়িয়ে বলল,

—প্রমিজ?

আরিয়ান তার আঙুলের সঙ্গে নিজের আঙুল জড়িয়ে বলল,

—প্রমিজ।

তারপর রোহানকে স্কুলে দিয়ে অফিসে চলে গেল।

সে জানত না, আজ যে স্কুলে নিজের ছেলেকে ভর্তি করিয়ে গেল...

সেই স্কুলেই কয়েক মাস আগে নতুন ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে এমন একজন—

যার সঙ্গে তার জীবনের সবচেয়ে পুরোনো স্মৃতিগুলো জড়িয়ে আছে।

আর সেই মানুষটি হলো—

আরিয়া।

এই কয়েক বছরে আরিয়াও পুরোপুরি বদলে গেছে।

আগের সেই ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা, সারাক্ষণ ঝগড়া করা, এলোমেলো পোশাকের মেয়েটি আর নেই।

এখন সে খুব পরিপাটি।

শান্ত।

মার্জিত।

স্মার্ট।

কথা বলার ধরনেও এসেছে কোমলতা।

বিশেষ করে শিশুদের সে অসম্ভব ভালোবাসে।

ক্লাসে কোনো বাচ্চা ভুল করলে সে রাগ না করে বুঝিয়ে দেয়।

কেউ মন খারাপ করে বসে থাকলে কাছে গিয়ে কথা বলে।

রোহানও খুব দ্রুত তার প্রিয় ছাত্র হয়ে উঠল।

একদিন ক্লাস শেষে রোহান তার কাছে এসে বলল,

—ম্যাম!

আরিয়া হাসল।

—কী হয়েছে?

—আপনি আজও আমাকে স্টিকার দেবেন?

—আজ কী করেছ?

—সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

আরিয়া তার খাতাটা দেখে বলল,

—বাহ! সত্যিই তো।

সে একটা স্টিকার বের করে রোহানের খাতায় লাগিয়ে দিল।

রোহান খুশিতে বলল,

—ম্যাম, আপনি আমার সবচেয়ে প্রিয়।

আরিয়া হেসে বলল,

—কেন?

—আপনি আমাকে বকা দেন না।

—দুষ্টুমি করলে কিন্তু বকা দেব।

রোহান মুচকি হেসে বলল,

—তবুও আপনি ভালো।

আরিয়া তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

অদ্ভুতভাবে এই শিশুটার প্রতি তার একটা আলাদা টান তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু সে জানত না—

এই শিশুটিই আসলে তার পুরোনো জীবনের সঙ্গে নতুন জীবনের সবচেয়ে বড় সেতু।

একদিন স্কুল ছুটির পর রোহান মাঠে আরিয়ার সঙ্গে খুনসুটি করছিল।

রোহান হেসে বলল,

—ম্যাম, আপনাকে আমার অনেক ভালো লাগে।

আরিয়া হেসে বলল,

—আমারও তোমাকে ভালো লাগে।

—আপনি আমার মায়ের মতো।

আরিয়ার হাসি থেমে গেল।

সে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,

—তোমার মা কোথায়?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

—আমার মা নেই।

আরিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল।

—কেন?

রোহান বলল,

—আমি আমার মাকে কখনো দেখিনি।

আরিয়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—কেন?

রোহান বলল,

—আমার জন্মের সময় মা মারা গেছে।

আরিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

সে রোহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

—তোমার খুব কষ্ট হয়?

রোহান মাথা নাড়ল।

—না। আমার আব্বু আছে।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—তোমার আব্বু তোমাকে খুব ভালোবাসে?

—অনেক।

ঠিক তখনই দূর থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—

—রোহান!

আরিয়া স্থির হয়ে গেল।

কণ্ঠটা...

এই কণ্ঠ সে কীভাবে ভুলবে?

বহু বছর আগের সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর।

ক্রিকেট মাঠ।

ক্যান্টিন।

গাল টিপে দেওয়া।

ঝগড়া।

হাসি।

সবকিছু এক মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠল।

আরিয়া ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরল।

আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

আরিয়ানও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।

তার মুখ থেকে শুধু একটা কথাই বের হলো—

—আরিয়া?

আরিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

—আরিয়ান...

—আরিয়া?

আরিয়ানের কণ্ঠে যেন অবিশ্বাস মিশে ছিল।

আরিয়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

বহু বছর পর এই মানুষটাকে সামনে দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।

শান্ত গলায় বলল,

—হ্যাঁ। আমি।

আরিয়ান যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।

এ কি সেই আরিয়া?

যে একসময় ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলত?

যে তার সঙ্গে সারাক্ষণ ঝগড়া করত?

যে তার একটা কথায় রেগে গিয়ে চলে যেত?

আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা একেবারেই অন্যরকম।

পরিপাটি পোশাক।

সুন্দর করে সাজানো চুল।

চোখেমুখে শান্ত ভাব।

কথাবার্তায় ভদ্রতা আর পরিমিতি।

আরিয়ান অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

—তুই... এখানে?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ। আমি এখানে ইংরেজি পড়াই।

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

—আমি জানতাম না।

—আমিও জানতাম না তুই এখানে আসবি।

কথাটা বলেই দুজনেই চুপ হয়ে গেল।

তাদের মাঝে যেন কয়েক বছরের দূরত্ব দাঁড়িয়ে ছিল।

রোহান দুজনের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,

—আব্বু, তুমি ম্যামকে চেনো?

আরিয়ান ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,

—হ্যাঁ।

—কীভাবে?

আরিয়ান একটু থেমে বলল,

—অনেক পুরোনো বন্ধু।

রোহান খুশি হয়ে বলল,

—তাহলে তো ভালোই! আমার প্রিয় ম্যাম আর তোমার পুরোনো বন্ধু!

আরিয়া হেসে ফেলল।

আরিয়ানও মৃদু হাসল।

তারপর হঠাৎ পুরোনো অভ্যাসবশত আরিয়ার গাল টিপে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াল।

কিন্তু মাঝপথে তার হাত থেমে গেল।

আরিয়া সেই হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।

আরিয়ানও হাত নামিয়ে নিল।

মৃদু হেসে বলল,

—তুই অনেক বদলে গেছিস।

আরিয়া শান্ত গলায় বলল,

—হয়তো।

—আগে তোকে দেখে মনে হতো, সারাক্ষণ ঝগড়া করার জন্যই পৃথিবীতে এসেছিস।

আরিয়ার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।

—তুইও কম ছিলি না।

—আমি তো ভালো ছিলাম।

—হ্যাঁ, খুব।

দুজনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য পুরোনো দিনের হাসি ফুটে উঠল।

তারপর আরিয়ান হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,

—মীরার কী খবর?

আরিয়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

সে ধীরে বলল,

—মীরা কেমন আছে?

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর নিচু গলায় বলল,

—মীরা মারা গেছে।

আরিয়া যেন কথাটা শুনেও বুঝতে পারল না।

—কী?

—কয়েক বছর আগে।

আরিয়ার চোখে পানি চলে এলো।

—কীভাবে?

—রোহানের জন্মের সময়।

আরিয়া রোহানের দিকে তাকাল।

ছোট্ট ছেলেটা তখন মাটিতে পড়ে থাকা একটা পাতা নিয়ে খেলছিল।

আরিয়ার বুকটা ভার হয়ে গেল।

সে ধীরে বলল,

—আমি জানতাম না।

—আমি কাউকে জানাতে পারিনি।

—তুই... খুব কষ্ট পেয়েছিলি?

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—পেয়েছিলাম।

আরিয়া আর কিছু বলতে পারল না।

তার চোখের পানি দেখে আরিয়ান বলল,

—তুই কাঁদছিস কেন?

আরিয়া চোখ মুছে বলল,

—মীরা আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল।

—জানি।

—আমি ওকে খুব মিস করেছি।

আরিয়ান মাথা নিচু করল।

—ওও তোকে মিস করত।

আরিয়া তাকাল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর রোহান দৌড়ে এসে আরিয়ার হাত ধরে বলল,

—ম্যাম, আপনি কালও থাকবেন তো?

আরিয়া হেসে বলল,

—হ্যাঁ, থাকব।

—তাহলে আমি কালও আপনার সঙ্গে কথা বলব।

—অবশ্যই।

আরিয়ান ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,

—চলো বাবা, এখন বাড়ি যেতে হবে।

রোহান আরিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

—বাই ম্যাম।

—বাই, রোহান।

রোহান কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে এলো।

—ম্যাম!

—হুম?

—আপনি কাল আমাকে গল্প বলবেন?

আরিয়া হেসে বলল,

—ঠিক আছে।

রোহান খুশি হয়ে দৌড়ে বাবার কাছে গেল।

আরিয়ান একবার পেছনে তাকাল।

আরিয়ার সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো।

দুজনেই কিছু বলল না।

শুধু একটা নীরব হাসি বিনিময় হলো।

সেদিন গাড়িতে ফেরার সময় রোহান একটানা কথা বলছিল।

—আব্বু, তুমি জানো?

—কী?

—আরিয়া ম্যাম খুব ভালো।

—হুম।

—উনি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—তুই তো সব ম্যামকেই ভালোবাসিস।

—না। উনাকে বেশি।

আরিয়ান কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর রোহান জিজ্ঞেস করল,

—আব্বু, তুমি ম্যামের সঙ্গে আগে কোথায় ছিলে?

—বিশ্ববিদ্যালয়ে।

—তোমরা কি তখনও বন্ধু ছিলে?

—হ্যাঁ।

—তোমরা কি তখন ঝগড়া করতে?

আরিয়ান হেসে ফেলল।

—অনেক।

—তাহলে তুমি ম্যামকে পছন্দ করতে না?

প্রশ্নটা শুনে আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তুই এত প্রশ্ন করিস কেন?

রোহান হেসে বলল,

—কারণ আমি বুদ্ধিমান।

আরিয়ান মাথা নাড়িয়ে বলল,

—হ্যাঁ, অনেক বুদ্ধিমান।

কিন্তু রোহানের প্রশ্নটা তার মনে আটকে রইল।

"তুমি ম্যামকে পছন্দ করতে না?"

আরিয়ান জানালার বাইরে তাকাল।

তার মনে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিন।

আরিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল—

"আমি তোকে ভালোবাসি।"

আর সে কী বলেছিল?

"আমি মীরাকে ভালোবাসি।"

আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।

এত বছর পরও কথাটা তার মনে এত স্পষ্ট কেন?

পরদিন স্কুলে আরিয়া স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।

কিন্তু নিজের অজান্তেই বারবার স্কুলের গেটের দিকে তাকাচ্ছিল।

সে জানত না কেন।

আরিয়ান কি আজ রোহানকে নিতে আসবে?

এসব ভাবা উচিত নয়।

সে নিজেকে বোঝাল—

"অতীত শেষ।"

কিন্তু বিকেলে রোহানকে নিতে আরিয়ান সত্যিই এলো।

আরিয়া দূর থেকে তাকে দেখেই চোখ সরিয়ে নিল।

আরিয়ানও তাকে দেখল।

কিন্তু এবার তার চোখে আগের দিনের চেয়ে অন্যরকম কিছু ছিল।

সে কাছে এসে বলল,

—আজ কেমন আছিস?

আরিয়া বলল,

—ভালো।

—রোহান কোনো দুষ্টুমি করেছে?

—না। আজ বেশ ভালো ছিল।

রোহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—আমি সবসময়ই ভালো।

আরিয়া হেসে বলল,

—হ্যাঁ, খুব ভালো।

আরিয়ান ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

তারপর আরিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই এখানে কতদিন ধরে আছিস?

—কয়েক মাস।

—আমাকে জানাসনি কেন?

আরিয়া একটু থেমে বলল,

—জানানোর মতো কী ছিল?

আরিয়ান চুপ হয়ে গেল।

কথাটা সত্যি।

তাদের মধ্যে এখন কী সম্পর্ক?

পুরোনো বন্ধু?

নাকি তার থেকেও বেশি কিছু?

কেউ জানে না।

দিন যেতে লাগল।

রোহানের সঙ্গে আরিয়ার সম্পর্ক আরও গভীর হতে লাগল।

রোহান প্রতিদিন স্কুলে এসে আরিয়ার কাছে গল্প করত।

কখনো তার খাতা দেখাত।

কখনো আঁকা ছবি এনে বলত,

—ম্যাম, এটা আপনার জন্য।

একদিন একটা ছবি এঁকে আনল।

ছবিতে তিনজন মানুষ।

একজন ছোট ছেলে।

একজন পুরুষ।

আর একজন মহিলা।

আরিয়া ছবিটা দেখে বলল,

—এরা কারা?

রোহান বলল,

—আমি, আব্বু আর আপনি।

আরিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—আমি কেন?

রোহান বলল,

—কারণ আপনি আমার সবচেয়ে প্রিয়।

আরিয়া তাকে জড়িয়ে ধরল।

—তুমিও আমার খুব প্রিয়।

দূরে দাঁড়িয়ে আরিয়ান পুরো দৃশ্যটা দেখছিল।

তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।

বহু বছর আগে আরিয়া তাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল।

তখন সে বুঝতে পারেনি।

আজ নিজের ছেলেকে আরিয়ার এত কাছের দেখে তার মনে হলো—

কিছু মানুষকে জীবন থেকে সরিয়ে দিলেও ভাগ্য হয়তো তাদের আবার ফিরিয়ে আনে।

সেদিন রাতে আরিয়ান বাসায় ফিরে মীরার ছবির সামনে দাঁড়াল।

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—মীরা...

তার গলা ভারী হয়ে এলো।

—তুই ঠিকই বলেছিলি।

সে একটু থামল।

—আরিয়াকে আমার খুঁজে নেওয়া উচিত ছিল।

মীরার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখে পানি চলে এলো।

—কিন্তু এত বছর দেরি হয়ে গেল।

তারপরও সে জানত না—

মীরা চলে যাওয়ার আগে আরিয়ানকে যে কথাটা বলেছিল, সেই কথার অর্থ খুব শিগগিরই তার জীবনের সামনে আরও গভীরভাবে ফিরে আসবে।

আর আরিয়া?

সে নিজের ঘরে বসে পুরোনো একটা ডায়েরি খুলে বসেছিল।

অনেক বছর আগে লেখা একটা পাতায় এখনও একটা নাম লেখা ছিল—

আরিয়ান।

আরিয়ার চোখের কোণে পানি জমল।

সে ধীরে ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।

কিন্তু এবার তার মনে একটা প্রশ্ন জেগে উঠল—

"মানুষ কি সত্যিই প্রথম ভালোবাসাকে ভুলতে পারে?"

উত্তরটা সে জানত।

না।

আরিয়ার সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার পর থেকে আরিয়ানের জীবনটা যেন অদ্ভুতভাবে বদলে গেল।

সে নিজেকে বারবার বোঝাত, আরিয়া তার পুরোনো বন্ধু ছাড়া আর কিছু নয়।

কিন্তু যত দিন যাচ্ছিল, ততই সে বুঝতে পারছিল—এই মেয়েটার উপস্থিতি তার মনে এমন কিছু নাড়া দিচ্ছে, যার কোনো সহজ ব্যাখ্যা নেই।

আরিয়ার সঙ্গে কথা বললে তার ভালো লাগত।

আরিয়াকে হাসতে দেখলে তার নিজেরও হাসি পেত।

আর রোহান যখন আরিয়ার সঙ্গে সময় কাটাত, তখন অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করত সে।

অন্যদিকে আরিয়াও নিজের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছিল।

সে জানত, আরিয়ান এখন একজন বিধুর বাবা।

তার জীবনে মীরার স্মৃতি আছে।

আর সে নিজে বহু বছর আগে আরিয়ানের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।

তাই এবার কোনো ভুল করতে চায় না।

সে শুধু রোহানের শিক্ষক হয়ে থাকতে চায়।

কিন্তু জীবন কখনো মানুষের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না।

একদিন স্কুল ছুটির পর রোহান মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল।

আরিয়া তার হাতে একটা ছোট্ট চকোলেট দিয়ে বলল,

—আজ এত চুপচাপ কেন?

রোহান মুখ ফুলিয়ে বলল,

—আমার আব্বু আজ আমাকে নিতে আসতে দেরি করছে।

—আসবে তো।

—হুম।

কিছুক্ষণ পর স্কুলের গেটের সামনে আরিয়ানের গাড়ি এসে থামল।

রোহান দৌড়ে গেল।

—আব্বু!

আরিয়ান গাড়ি থেকে নেমে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল।

—কী হলো?

—তুমি আজ দেরি করেছ।

—সরি বাবা। অফিসে কাজ ছিল।

রোহান বলল,

—ম্যাম আমার সঙ্গে ছিল।

আরিয়ান আরিয়ার দিকে তাকাল।

—ধন্যবাদ।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—এতে ধন্যবাদের কী আছে?

আরিয়ান বলল,

—তবুও।

রোহান হঠাৎ বলল,

—আব্বু, ম্যামকে বাসায় নিয়ে চলো না?

আরিয়া চমকে গেল।

—রোহান!

—কেন?

আরিয়ান হেসে বলল,

—তোর ম্যামেরও তো বাসা আছে।

রোহান মুখ ফুলিয়ে বলল,

—তাহলে আমরা ম্যামের বাসায় যাব।

আরিয়া হেসে ফেলল।

—তুমি খুব দুষ্টু হয়ে গেছ।

রোহান বলল,

—আপনার কাছ থেকেই শিখেছি।

আরিয়ান হেসে উঠল।

আরিয়া চোখ বড় করে বলল,

—আমার কাছ থেকে?

—হ্যাঁ।

আরিয়ান মজা করে বলল,

—দেখেছিস? তুই আবার আগের মতোই বাচ্চাদের দুষ্টুমি শেখাচ্ছিস।

আরিয়া বলল,

—তোর ছেলে আমাকে দোষ দিচ্ছে, আর তুই আমাকে সমর্থন না করে ওর সঙ্গে যোগ দিচ্ছিস?

—আমি সত্যের পক্ষ নিই।

—তুই এখনও আগের মতোই বিরক্তিকর।

আরিয়ান হেসে বলল,

—আর তুই এখনও আগের মতোই রাগী।

কথাটা শুনে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

কারণ দুজনেরই মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের সেই দিনগুলো।

কয়েকদিন পর স্কুলে বনভোজনের আয়োজন করা হলো।

শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী—সবাই যাবে।

রোহান খবরটা শুনে ভীষণ খুশি।

বাড়িতে এসে সে বাবাকে বলল,

—আব্বু, তুমিও যাবে।

আরিয়ান বলল,

—আমি কেন?

—সব বাচ্চার বাবা যাবে।

—আচ্ছা, যাব।

রোহান লাফিয়ে উঠল।

—ইয়েস!

তারপর একটু থেমে বলল,

—আরিয়া ম্যামও যাবে।

আরিয়ান হেসে বলল,

—তাই?

—হ্যাঁ। তুমি ম্যামের সঙ্গে ঝগড়া করো না যেন।

আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,

—আমি কেন ঝগড়া করব?

—তোমরা আগে ঝগড়া করতে না?

আরিয়ান হেসে বলল,

—করতাম।

—তাহলে এখন করবে না।

—ঠিক আছে।

বনভোজনের দিন সবাই খুব আনন্দে ছিল।

স্কুলের বাসে গান, হাসাহাসি, গল্প—সব মিলিয়ে চমৎকার পরিবেশ।

রোহান কখনো বাবার কাছে যাচ্ছে, কখনো আরিয়ার কাছে।

একসময় সে আরিয়ানের হাত ধরে বলল,

—আব্বু, আমরা তিনজন একসঙ্গে হাঁটব।

আরিয়ান একটু থেমে আরিয়ার দিকে তাকাল।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—চলো।

তিনজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

রোহান মাঝখানে।

কখনো সে আরিয়ার হাত ধরে টানছে।

কখনো বাবার হাত।

দূর থেকে দেখলে যেন একটা ছোট্ট পরিবার।

আরিয়ানের মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।

সে দ্রুত সেই চিন্তা সরিয়ে দিল।

দুপুরের দিকে সবাই পাহাড়ি এলাকার একটা বনের রাস্তা ধরে হাঁটছিল।

রাস্তাটা একটু অসমান ছিল।

আরিয়া রোহানের সঙ্গে গল্প করতে করতে হাঁটছিল।

হঠাৎ তার পা একটা পাথরের সঙ্গে আটকে গেল।

—আহ্!

সে ভারসাম্য হারিয়ে বসে পড়ল।

রোহান দৌড়ে গেল।

—ম্যাম!

আরিয়ানও দ্রুত কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে বলল,

—কোথায় লেগেছে?

আরিয়া পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

—গোড়ালিতে।

—দাঁড়াতে পারবি?

আরিয়া চেষ্টা করল।

কিন্তু ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেল।

—না।

আরিয়ান চারপাশে তাকাল।

সবাই একটু দূরে।

রোহান চিন্তিত হয়ে বলল,

—আব্বু, ম্যামকে তুমি কোলে করে নিয়ে যাও।

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—না না, দরকার নেই।

রোহান বলল,

—কিন্তু আপনি তো হাঁটতে পারছেন না।

আরিয়ান আর কিছু বলল না।

সে ধীরে ধীরে আরিয়ার সামনে বসে বলল,

—উঠ।

আরিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—কী?

—কোলে উঠ।

—না, আমি...

—আরিয়া, বেশি হাঁটলে ব্যথা বাড়বে।

আরিয়া আর কিছু বলল না।

আরিয়ান তাকে সাবধানে কোলে তুলে নিল।

আরিয়ার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

এত বছর পর আবার আরিয়ানের এত কাছে।

তার বুকের কাছে মাথা চলে এসেছে।

আরিয়ানও অস্বস্তি লুকানোর চেষ্টা করছিল।

রোহান সামনে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

—আব্বু, সাবধানে!

আরিয়ান বলল,

—তুই আগে যা।

—ম্যামকে ফেলে দিও না কিন্তু!

আরিয়া লজ্জায় বলল,

—রোহান!

রোহান হেসে দৌড়ে সামনে চলে গেল।

হোটেলে পৌঁছে আরিয়ান আরিয়াকে একটা রুমে নিয়ে গেল।

—এখানে বস।

আরিয়াকে বিছানায় বসিয়ে দিল।

—পা একটু বিশ্রাম দে।

আরিয়া আস্তে বলল,

—ধন্যবাদ।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—এত ধন্যবাদ দিতে হবে না।

সে উঠে যেতেই

ঠিক তখন আরিয়া টের পেল তার চুল কোথাও আটকে গেছে।

—দাঁড়া!

আরিয়ান ঘুরে তাকাল।

—কী হয়েছে?

—আমার চুল...

চুলগুলো আরিয়ানের শার্টের একটা বোতামের সঙ্গে আটকে গেছে।

দুজনেই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

আরিয়া ধীরে ধীরে চুল ছাড়াতে লাগল।

—আমি ছাড়িয়ে নিচ্ছি।

—হুম।

চুল ছাড়াতে ছাড়াতে আরিয়া বুঝতে পারল, আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে আছে।

সে চোখ তুলে তাকাতেই তাদের চোখে চোখ পড়ল।

কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না।

তারপর আরিয়া দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল।

চুলটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

—হয়ে গেছে।

আরিয়ানও যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলো।

—আচ্ছা... তাহলে আমি গেলাম।

—হুম।

আরিয়ান দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার পর আরিয়া নিজের বুকের ওপর হাত রাখল।

তার হৃদস্পন্দন যেন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।

সে নিজেকে ধমক দিল,

—আরিয়া, নিজেকে সামলাও।

অন্যদিকে করিডোরে বেরিয়ে আরিয়ানও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তার মাথায় শুধু একটা দৃশ্য—

আরিয়ার লাজুক মুখ।

বহু বছর আগে যে মেয়েটা তাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল, আজ সেই মেয়ের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তার নিজের বুক কেন এত অস্থির হয়ে উঠল?

সে উত্তর খুঁজে পেল না।

বনভোজন শেষে সবাই বাড়ি ফিরল।

কিন্তু সেই দিনের পর আরিয়ান আর আরিয়ার সম্পর্ক যেন অদৃশ্যভাবে একটু বদলে গেল।

তারা আগের মতো কথা বলত না।

কিন্তু একে অপরকে দেখলে চোখে চোখ পড়ত।

কখনো হালকা হাসি।

কখনো দীর্ঘ নীরবতা।

আর রোহান?

সে কিছুই বুঝত না।

শুধু নিজের প্রিয় ম্যাম আর বাবাকে একইসঙ্গে দেখলেই খুশি হয়ে যেত।

একদিন রাতে রোহান বাবাকে বলল,

—আব্বু?

—হুম?

—আরিয়া ম্যামকে তোমার ভালো লাগে?

আরিয়ান চমকে ছেলের দিকে তাকাল।

—এমন প্রশ্ন কেন?

রোহান খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,

—কারণ তুমি ম্যামের দিকে তাকালে হাসো।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—ঘুমাতে যা।

রোহান চলে গেল।

আরিয়ান একা বসে রইল।

তার সামনে মীরার ছবি।

আর মনের মধ্যে বারবার ভেসে উঠছে—

আরিয়ার মুখ।

বহু বছর পর সে প্রথমবার নিজের কাছে প্রশ্ন করল—

"আমি কি সত্যিই আরিয়াকে হারিয়ে ফেলিনি?"

বনভোজনের সেই দিনের পর কয়েক মাস কেটে গেল।

আরিয়ান আর আরিয়ার মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছিল।

আগের মতো সহজে ঝগড়া করত না তারা। কথা বললেও দুজনেই যেন একটু সাবধানে কথা বলত।

তবে রোহানের কারণে তাদের দেখা প্রায়ই হয়ে যেত।

রোহান প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে আরিয়া ম্যামের গল্প করত।

—আব্বু, আজ ম্যাম আমাকে একটা নতুন গল্প বলেছে।

—তাই?

—হ্যাঁ। ম্যাম বলেছে আমি বড় হয়ে ভালো মানুষ হব।

আরিয়ান মুচকি হেসে বলত,

—তুই তো এখনই ভালো ছেলে।

রোহান গর্ব করে বলত,

—আমি জানি।

একদিন রোহান স্কুল থেকে ফিরে একটা কাগজ বাবার হাতে দিল।

—এটা তোমার জন্য।

আরিয়ান কাগজ খুলে দেখল, একটা ছবি।

তিনজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

রোহান মাঝখানে। এক পাশে আরিয়ান, অন্য পাশে আরিয়া।

আরিয়ান কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

—এটা কে এঁকেছে?

—আমি।

—এখানে ম্যাম কেন?

রোহান খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,

—কারণ আমরা একসঙ্গে থাকলে ভালো লাগে।

আরিয়ান কিছু বলল না।

ছোট্ট একটা কথাই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত আলোড়ন তুলল।

পরদিন স্কুলে গিয়ে আরিয়ান আরিয়ার সঙ্গে দেখা করল।

আরিয়া তখন ক্লাসরুমে খাতা দেখছিল।

আরিয়ান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,

—এই...

আরিয়া তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—কী?

আরিয়ান ছবিটা তার সামনে ধরল।

—এটা দেখেছিস?

আরিয়ার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

—রোহান এঁকেছে?

—হুম।

আরিয়া ছবিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—খুব সুন্দর হয়েছে।

আরিয়ান বলল,

—ওর মাথায় এসব কীভাবে আসে?

আরিয়া বলল,

—বাচ্চারা যা অনুভব করে, সেটা সহজেই বলে ফেলে।

কথাটা শুনে আরিয়ান চুপ করে গেল।

আরিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—কী হলো?

—কিছু না।

—তুই আজকাল খুব চুপচাপ থাকিস।

—তুইও।

আরিয়া মৃদু হাসল।

—হয়তো বয়স হয়েছে।

আরিয়ান হেসে ফেলল।

—তুই বয়সের কথা বলিস না। তোর কথা শুনলে মনে হয় তুই এখনও সেই আগের আরিয়া।

আরিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,

—সেই আগের আরিয়া কেমন ছিল?

—সারাক্ষণ ঝগড়া করত।

—আর তুই?

—আমি তো শান্ত ছিলাম।

আরিয়া হেসে বলল,

—তুই?

—হ্যাঁ।

—মিথ্যাবাদী।

দুজনেই হেসে ফেলল।

কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, তারা আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোতে ফিরে গেছে।

সেদিন স্কুল ছুটির পর প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো।

আরিয়া স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই।

সে ছাতা আনেনি।

ঠিক তখন আরিয়ান গাড়ি নিয়ে এসে নামল।

রোহানকে নিতে এসেছে।

রোহান দৌড়ে এসে বাবার হাত ধরল।

তারপর আরিয়াকে দেখে বলল,

—ম্যাম, আপনি যাবেন কীভাবে?

আরিয়া বলল,

—বৃষ্টি একটু কমলে যাব।

রোহান বাবার দিকে তাকাল।

—আব্বু, ম্যামকে বাসায় দিয়ে আসো।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—চলো।

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—না, দরকার নেই।

—বৃষ্টিতে ভিজে যাবে।

—আমি চলে যেতে পারব।

আরিয়ান একটু কঠিন গলায় বলল,

—আগেও তো পায়ে ব্যথা নিয়ে হাঁটতে চেয়েছিলি। এখন আবার বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হবি?

আরিয়া চুপ করে গেল।

রোহান হেসে বলল,

—ম্যাম, আব্বুর কথা শুনুন।

আরিয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়িতে উঠে বসল।

রোহান পেছনের সিটে।

আরিয়া সামনে।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

তারপর রোহান পেছন থেকে বলল,

—ম্যাম, আপনি জানেন?

—কী?

—আমার আব্বু আগে আপনার গাল টিপত।

আরিয়া চমকে আরিয়ানের দিকে তাকাল।

আরিয়ান বিব্রত হয়ে বলল,

—এই ছেলে, চুপ কর।

রোহান হেসে বলল,

—কেন?

আরিয়া হেসে ফেলল।

—তুই এখনও মনে রেখেছিস?

—হ্যাঁ।

আরিয়ান বলল,

—ওকে বিশ্বাস করিস না। ছোটবেলায় সবকিছু ভুল মনে রাখে।

আরিয়া মৃদু গলায় বলল,

—কিন্তু এটা সত্যি।

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

—তোর মনে আছে?

—সব মনে আছে।

দুজনের চোখে আবার সেই পুরোনো দিনের ছায়া নেমে এলো।

কিছুদিন পর রোহানের স্কুলে অভিভাবক সভা ছিল।

আরিয়ান ব্যস্ত থাকলেও নিজে গেল।

সভা শেষে আরিয়া তাকে বলল,

—রোহান পড়াশোনায় ভালো করছে।

আরিয়ান গর্বিত হয়ে বলল,

—তোর জন্যই।

—আমার জন্য কেন?

—তুই ওকে অনেক সময় দিস।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—ও খুব ভালো ছেলে।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—মীরা থাকলে তোকে খুব পছন্দ করত।

আরিয়ার মুখটা নরম হয়ে গেল।

—আমি ওকে খুব মিস করি।

—আমিও।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।

তারপর আরিয়া বলল,

—মীরা শেষ সময়ে আমার কথা বলেছিল?

আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল।

—তুই কীভাবে জানলি?

—জানি না। শুধু জানতে ইচ্ছে হলো।

আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—হ্যাঁ। বলেছিল।

আরিয়া ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—কী বলেছিল?

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—বলেছিল, একদিন যেন তোকে খুঁজে নিই।

আরিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

—কেন?

—বলেছিল, তুই আমাদের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলি।

আরিয়া চোখ মুছে বলল,

—মীরা সবসময় এমনই ছিল।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

সেদিন রাতে আরিয়ান অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

মীরার ছবির সামনে বসে ছিল সে।

তারপর ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি কি সব বুঝতে পেরেছিলে?

কোনো উত্তর নেই।

—তুমি কি বুঝেছিলে, আরিয়া আমাকে ভালোবাসত?

নীরবতা।

আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনের কথা আবার মনে পড়ল।

আরিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল—

"আমি তোকে ভালোবাসি।"

আরিয়ান তখন মীরাকে ভালোবাসত।

কিন্তু আজ এত বছর পর নিজের মনের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারছিল—

আরিয়ার জায়গাটা তার জীবনে কখনো খালি ছিল না।

শুধু সে নামটা দিতে পারেনি।

এদিকে আরিয়াও নিজের ঘরে বসে পুরোনো স্মৃতিগুলো ভাবছিল।

সে জানত, আরিয়ান এখনও মীরাকে ভালোবাসে।

এটা বদলানোর অধিকার তার নেই।

তবুও আরিয়ান যখন তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলে, যখন রোহানের কথা বলতে বলতে হাসে, তখন তার মন অকারণে ভালো হয়ে যায়।

সে নিজেকে বোঝাল,

—আমি কিছু চাইব না।

—শুধু ওরা ভালো থাকুক।

কিন্তু ভাগ্য যেন তার কথা শুনছিল না।

কয়েক সপ্তাহ পর আরিয়ার বাড়ি থেকে খবর এলো।

তার পরিবার তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছে।

ছেলেটা ভালো চাকরি করে, ভদ্র, শিক্ষিত।

পরিবারের সবাই রাজি।

আরিয়া প্রথমে কিছু বলতে পারল না।

মা বললেন,

—তুই তো আর ছোট নেই। ছেলেটা ভালো। আমরা মনে করি তুই সুখী হবি।

আরিয়া চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—আপনারা যদি ভালো মনে করেন...

পরিবার বিয়ের ব্যাপারে এগিয়ে গেল।

কিন্তু আরিয়া জানত না—

এই খবরটা আরিয়ানের জীবনে কী পরিবর্তন আনবে।

কয়েকদিন পর আরিয়া নিজেই আরিয়ানকে বলল,

—আমার একটা কথা বলার ছিল।

—বল।

—আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।

কথাটা শুনে আরিয়ান যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

—কী?

—আমার বিয়ে।

—কবে?

—কয়েক মাস পর।

আরিয়ান চুপ করে রইল।

আরিয়া বলল,

—তুই আসবি তো?

আরিয়ান জোর করে হাসল।

—অবশ্যই।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তাহলে তোকে দাওয়াত রইল।

আরিয়া চলে গেল।

আরিয়ান অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।

তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শূন্যতা তৈরি হলো।

সে নিজেকে প্রশ্ন করল—

"ও অন্য কারও হয়ে যাবে—এই কথাটা শুনে আমার এত খারাপ লাগছে কেন?"

উত্তরটা এবার আর তার অজানা ছিল না।

কিন্তু স্বীকার করার সাহস তখনও তার হয়নি।

সেদিন রাতে রোহান বাবার মুখ দেখে বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে।

সে কাছে এসে বলল,

—আব্বু, তুমি মন খারাপ করেছ?

আরিয়ান ছেলের মাথায় হাত রাখল।

—না বাবা।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আরিয়া ম্যামের বিয়ে হবে বলে?

আরিয়ান চমকে গেল।

—তুই জানিস?

রোহান মাথা নাড়ল।

—ম্যাম আমাকে বলেছে।

তারপর হঠাৎ রোহানের চোখে পানি চলে এলো।

—আব্বু...

—কী হয়েছে?

—ম্যাম যদি চলে যায়?

আরিয়ান চুপ করে রইল।

রোহান কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি ম্যামকে হারাতে চাই না।

আরিয়ান ছেলেকে বুকে টেনে নিল।

কিন্তু সেই মুহূর্তে তার নিজের বুকের ভেতরেও একই ভয় জন্ম নিল—

সে কি আবার আরিয়াকে হারাতে যাচ্ছে?

আরিয়ার বিয়ের খবর জানার পর থেকে আরিয়ানের ভেতরটা অদ্ভুত অস্থির হয়ে উঠেছিল।

সে যতই নিজেকে বোঝাতে চাইছিল, কিছুতেই মন মানছিল না।

অফিসে বসে কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ আরিয়ার কথা মনে পড়ত।

স্কুলের সামনে গাড়ি থামালে মনে হতো, আজ হয়তো আরিয়াকে দেখা যাবে।

রোহান যখন বলত, "আরিয়া ম্যাম আজ আমাকে গল্প বলেছে", তখন তার বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হতো।

কিন্তু সে কাউকে কিছু বলত না।

এমনকি নিজের কাছেও স্বীকার করত না।

একদিন রাতে রোহান বাবার পাশে বসে বলল,

—আব্বু?

—হুম?

—আরিয়া ম্যামের বিয়ে হয়ে গেলে উনি কি আর স্কুলে থাকবেন না?

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

—হয়তো থাকবেন।

—তাহলে আমাকে পড়াবেন?

—জানি না।

রোহান মুখ নিচু করে বলল,

—আমি চাই উনি আমার কাছে থাকুক।

আরিয়ান ছেলের মাথায় হাত রাখল।

—তুই ওনাকে এত ভালোবাসিস?

—অনেক।

তারপর একটু থেমে বলল,

—আব্বু, একটা কথা বলব?

—বল।

—ম্যাম যদি আমার মা হতো, তাহলে কেমন হতো?

প্রশ্নটা শুনে আরিয়ানের বুক কেঁপে উঠল।

সে সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিতে পারল না।

রোহান আবার বলল,

—ম্যাম আমাকে মায়ের মতো ভালোবাসে।

আরিয়ান ধীরে বলল,

—ঘুমিয়ে পড় বাবা।

রোহান বলল,

—তুমি আমার কথা ভাববে তো?

—হ্যাঁ।

রোহান চলে যাওয়ার পর আরিয়ান একা বসে রইল।

তার সামনে মীরার ছবি।

সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,

—মীরা, আমি কি ভুল করছি?

নীরব ঘর কোনো উত্তর দিল না।

পরদিন স্কুলে আরিয়ানের সঙ্গে আরিয়ার দেখা হলো।

আরিয়া তখন রোহানের খাতা দেখছিল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

—কেমন আছিস?

আরিয়া তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—ভালো।

—বিয়ের প্রস্তুতি কেমন চলছে?

আরিয়া একটু থেমে বলল,

—চলছে।

—ছেলেটা কেমন?

—ভালো।

আরিয়ান জোর করে হাসল।

—ভালো মানুষ হলে তো ভালোই।

আরিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই অদ্ভুত আচরণ করছিস কেন?

—আমি?

—হ্যাঁ।

—কী করেছি?

—কথা বলছিস, কিন্তু মনটা অন্য কোথাও।

আরিয়ান কিছু বলল না।

আরিয়া আবার খাতার দিকে তাকাল।

—যদি কিছু বলতে চাস, বলতে পারিস।

আরিয়ান অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তুই কি এই বিয়েতে খুশি?

আরিয়া থমকে গেল।

—কেন?

—এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—পরিবার খুশি। ছেলেটা ভালো। তাই আমিও খুশি থাকার চেষ্টা করছি।

"খুশি থাকার চেষ্টা করছি"—এই কথাটা আরিয়ানের মনে আটকে গেল।

সে আর কিছু বলতে পারল না।

দিনগুলো দ্রুত কেটে যাচ্ছিল।

আরিয়ার বিয়ের তারিখও ঠিক হয়ে গেল।

রোহান খবরটা শুনে ভীষণ মন খারাপ করল।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে সে বাবাকে বলল,

—আব্বু, তুমি আরিয়া ম্যামের বিয়ে হতে দিও না।

আরিয়ান চমকে বলল,

—কী বলছিস?

—আমি সত্যি বলছি।

—কেন?

রোহান চোখ মুছে বলল,

—ম্যামকে আমার খুব ভালো লাগে। উনি আমার মায়ের মতো। উনি যদি অন্য কোথাও চলে যান, আমি কাকে মা বলব?

আরিয়ানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

সে ছেলেকে বুকে টেনে নিল।

—তোর ম্যাম তোকে কখনো ভুলবে না।

রোহান কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—তবুও আমি চাই উনি আমাদের সঙ্গে থাকুক।

আরিয়ান আর কোনো উত্তর দিল না।

কারণ রোহানের কথার উত্তর তার নিজের কাছেও ছিল না।

সেই রাতে আরিয়ান আবার মীরার ছবির সামনে বসে রইল।

মীরার শেষ কথাগুলো মনে পড়ছিল।

"আরিয়াকে খুঁজে নিও।"

"ওর কাছে ক্ষমা চেয়ো।"

আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।

হঠাৎ তার মনে হলো—

মীরা হয়তো তখনই বুঝেছিল, আরিয়া তার জীবনে শুধু একজন বন্ধু নয়।

আরিয়ান ফিসফিস করে বলল,

—আমি এত দেরি করে বুঝলাম কেন?

তার চোখ ভিজে গেল।

—আমি ওকে একবার ভালোবাসার সুযোগও দিইনি।

—আর এখন যখন বুঝলাম, তখন ও অন্য কারও হয়ে যাচ্ছে।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তারপর হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত নিল।

সে আর চুপ থাকবে না।

যদি আরিয়া সত্যিই অন্য কাউকে ভালোবাসে, সে নিজে সরে যাবে।

কিন্তু যদি তার হৃদয়ে এখনও একটুও জায়গা থাকে...

তাহলে এবার সে নিজের মনের কথা বলবে।

বিয়ের কয়েকদিন আগে আরিয়া স্কুলে শেষ কয়েকটা ক্লাস নিচ্ছিল।

রোহান তার কাছে এসে বলল,

—ম্যাম, আপনি সত্যিই বিয়ে করবেন?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

—তারপর?

—তারপরও তো আমি তোমার ম্যাম থাকব।

রোহান মাথা নাড়ল।

—না। আপনি আমাদের কাছে থাকবেন।

আরিয়া অবাক হয়ে বলল,

—আমাদের?

—আমি আর আব্বু।

আরিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল।

সে রোহানের মাথায় হাত রেখে বলল,

—তোমার আব্বু খুব ভালো মানুষ।

রোহান বলল,

—হ্যাঁ। কিন্তু উনি আপনাকে দেখলে অন্যরকম হয়ে যান।

আরিয়া চমকে গেল।

—কী বলছ?

—আমি বুঝি।

আরিয়া হেসে তার গাল টিপে দিল।

—তুমি খুব বেশি বুঝে ফেলেছ।

রোহানও হেসে বলল,

—আপনিও তো আমার গাল টিপেন।

আরিয়া তাকে জড়িয়ে ধরল।

তার চোখের কোণে পানি জমে গেল।

বিয়ের আগের রাতে আরিয়া নিজের ঘরে বসে ছিল।

সাজগোজের জিনিসপত্র চারপাশে ছড়ানো।

তার হাতে একটা পুরোনো ডায়েরি।

সে ডায়েরির একটা পাতা খুলল।

বহু বছর আগে লেখা—

"আজ আমি আরিয়ানকে বলেছি, আমি ওকে ভালোবাসি।"

তার নিচে আরেকটা লাইন—

"ও আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।"

আরিয়া চোখ বন্ধ করল।

তারপর ডায়েরিটা বন্ধ করে বলল,

—সব শেষ হয়ে গেছে।

কিন্তু তার মন বলল—

সত্যিই কি সব শেষ?

অন্যদিকে আরিয়ান গাড়িতে বসে ছিল।

তার পাশে রোহান।

রোহান বলল,

—আব্বু, আমরা কাল ম্যামের বিয়েতে যাব তো?

—হ্যাঁ।

—তুমি ম্যামকে কিছু বলবে?

আরিয়ান ছেলের দিকে তাকাল।

—কী বলব?

রোহান খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,

—যা বলতে চাও।

আরিয়ান হেসে ফেলল।

—তুই এত বড় হয়ে গেলি কবে?

রোহান বলল,

—আমি সব বুঝি।

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ, বুঝিস।

অবশেষে এল সেই দিন।

আরিয়ার বিয়ে।

বাড়িটা আলো আর ফুলে সাজানো।

চারপাশে মানুষের ভিড়।

আরিয়া তার ঘরে বসে ছিল।

কনে সাজে তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল।

মুখে মেকআপ, পরনে সুন্দর শাড়ি, মাথায় ওড়না।

কিন্তু চোখের ভেতর কোথাও একটা অস্থিরতা।

সে জানত না কেন।

ঠিক তখন দরজার বাইরে রোহানের কণ্ঠ শোনা গেল।

—ম্যাম!

আরিয়ার মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।

—রোহান!

রোহান দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।

—আপনাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে।

আরিয়া তাকে চুমু দিয়ে বলল,

—তোমাকেও অনেক সুন্দর লাগছে।

রোহান বলল,

—আমি একটা কথা বলতে এসেছি।

—কী?

—আমি চাই না আপনি চলে যান।

আরিয়ার চোখ ভিজে গেল।

—আমি তো তোমাকে ছেড়ে যাব না।

রোহান বলল,

—প্রমিজ?

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—প্রমিজ।

রোহান বাইরে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর দরজার কাছে আরিয়ান এসে দাঁড়াল।

আরিয়া তাকিয়ে দেখল—

আরিয়ান একা।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

কেউ কথা বলল না।

আরিয়ান ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল।

তার বুকের ভেতরটা প্রচণ্ড কাঁপছিল।

আরিয়া আয়নার সামনে বসে বলল,

—আমায় কেমন লাগছে বল?

আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

—সুন্দর।

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—শুধু সুন্দর?

আরিয়ান চুপ।

আরিয়া এবার তার দিকে ফিরে তাকাল।

—কিছু বলবি?

আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তারপর কয়েক পা এগিয়ে এসে থেমে গেল।

তার চোখে পানি।

গলায় কাঁপন।

সে বলল,

—আরিয়া...

আরিয়া তাকিয়ে রইল।

আরিয়ান চোখ নামিয়ে বলল,

—আমি তোকে একটা কথা বলতে এসেছি।

আরিয়ার বুক ধক করে উঠল।

আরিয়ান ধীরে মাথা তুলে তার চোখের দিকে তাকাল।

তারপর বলল—

—আমি তোকে ভালোবাসি।

—আমি তোকে ভালোবাসি।

আরিয়ানের কথাটা শুনে আরিয়া যেন পাথর হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ সে শুধু আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে তার চোখে পানি জমতে শুরু করল।

আরিয়ান কাঁপা গলায় বলল,

—আরিয়া, আমি জানি অনেক দেরি হয়ে গেছে। অনেক বেশি দেরি। কিন্তু আমি আর নিজের মনের কথাটা লুকাতে পারছি না।

আরিয়ার ঠোঁট কাঁপছিল।

—তুই... সত্যি বলছিস?

—হ্যাঁ।

—আমাকে ভালোবাসিস?

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

—অনেক।

আরিয়ার চোখ থেকে এবার অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আগে কেন বলিসনি?

আরিয়ান চুপ করে রইল।

আরিয়া আবার বলল,

—আগে কেন বলিসনি, আরিয়ান?

তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল।

—তুই জানিস আমি কতদিন অপেক্ষা করেছিলাম? কতদিন ভেবেছিলাম, একদিন হয়তো তুই বুঝবি?

আরিয়ান চোখ নামিয়ে বলল,

—জানি না কীভাবে এত দেরি হয়ে গেল।

আরিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি তোকে ভালোবাসতাম। তখনও ভালোবাসতাম। তুই যখন বললি তুই মীরাকে ভালোবাসিস, তখনও তোকে ভুলতে পারিনি।

আরিয়ান ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এল।

—আরিয়া...

আরিয়া চোখ তুলে তাকাল।

—আমি তোকে খুব কষ্ট দিয়েছি।

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ। অনেক।

—সরি।

আরিয়া কিছু বলতে পারল না।

পরক্ষণেই সে আরিয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

বুকের ভেতর জমে থাকা এত বছরের কষ্ট যেন কান্না হয়ে বেরিয়ে এলো।

—আমিও তোকে অনেক ভালোবাসি, আরিয়ান।

আরিয়ানও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

তার চোখও ভিজে গেল।

—আমি জানি না কেন এত দেরি করলাম।

আরিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আর দেরি করিস না।

—কখনো না।

কিছুক্ষণ তারা এভাবেই দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর আরিয়ান ধীরে আরিয়ার মুখটা দেখল।

চোখ দুটো কান্নায় লাল হয়ে গেছে।

আরিয়ান মৃদু হেসে তার গাল টিপে দিল।

—পাগলি।

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় করে বলল,

—আবার গাল টিপলি?

—হুম।

—এত বছর পরেও বদলাসনি!

—তুইও তো বদলাসনি।

আরিয়া তার হাত ধরে টান দিল।

—তোকে আমি এখনই মারব!

আরিয়ান হেসে পিছিয়ে গেল।

ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে হাততালির শব্দ হলো।

—ইয়েস!

দুজনেই চমকে পেছনে তাকাল।

রোহান দাঁড়িয়ে আছে।

মুখে বিশাল হাসি।

সে খুশিতে হাততালি দিচ্ছে।

—আমি জানতাম!

আরিয়া লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলল।

—রোহান!

রোহান দৌড়ে এসে বলল,

—আব্বু, তুমি ম্যামকে ভালোবাসো!

আরিয়ান হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

রোহান এবার আরিয়াকে জড়িয়ে ধরল।

—আমি খুব খুশি!

আরিয়া তাকে বুকে টেনে নিল।

রোহান বলল,

—আজ থেকে তাহলে তোমাকে আম্মু ডাকতে পারি?

আরিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর চোখে পানি নিয়েই রোহানের কপালে চুমু দিয়ে বলল,

—তোমার ইচ্ছা।

রোহান খুশিতে আবার হাততালি দিল।

—ইয়েস! আজ থেকে আমার আম্মু আছে!

আরিয়া তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

আরিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল।

তার চোখের সামনে যেন মীরার মুখ ভেসে উঠল।

মনে হলো, মীরা হয়তো দূর থেকে হাসছে।

কিছুক্ষণ পর আরিয়া ধীরে বলল,

—কিন্তু আমার বিয়েটা?

আরিয়ান একটু চুপ করে বলল,

—তুই চাইলে আমি এখনই সবার সঙ্গে কথা বলব।

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—না। আমি নিজেই বলব।

রোহান বলল,

—আমি কী বলব?

আরিয়ান হেসে বলল,

—তুই কিছু বলবি না।

রোহান গম্ভীর মুখ করে বলল,

—আমি কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।

আরিয়া হেসে বলল,

—হ্যাঁ, তুমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সেদিন অনেক কিছু বদলে গেল।

আরিয়া তার পরিবারকে নিজের সিদ্ধান্ত জানাল।

প্রথমে সবাই অবাক হলেও আরিয়ার চোখের দৃঢ়তা দেখে শেষ পর্যন্ত তারা রাজি হলো।

অন্যদিকে আরিয়ানও রোহানকে নিয়ে আরিয়ার পরিবারের সঙ্গে কথা বলল।

সব বাধা ধীরে ধীরে দূর হলো।

আরিয়ার বিয়ের দিন বদলে গেল।

এবার সে যার পাশে দাঁড়াবে, তাকে সে বহু বছর আগে থেকেই চিনত।

যাকে ভালোবেসে একদিন কেঁদেছিল।

যে তাকে একদিন ফিরিয়ে দিয়েছিল।

আর যে শেষ পর্যন্ত তাকে বুঝতে পেরেছিল।

কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় আরিয়া ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার পাশে আরিয়ান।

আর একটু দূরে রোহান খেলছিল।

আকাশে তখন ম্লান চাঁদ।

আরিয়ান হঠাৎ বলল,

—মীরা চলে যাওয়ার আগে আমাকে একটা কথা বলেছিল।

আরিয়া তাকাল।

—কী?

আরিয়ান ধীরে বলল,

—বলেছিল, তোকে যেন আমি খুঁজি।

আরিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

—কেন বলেছিল?

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—হয়তো ও বুঝেছিল, তুই আমার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আরিয়া কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—মীরা সত্যিই খুব ভালো ছিল।

—হ্যাঁ।

—আমি ওকে খুব মিস করি।

—আমিও।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর আরিয়া বলল,

—তুই জানিস, আমি কখনো ভাবিনি আমরা আবার এভাবে একসঙ্গে দাঁড়াব।

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমিও না।

—তাহলে এত বছর পর ভাগ্য আমাদের আবার কেন মিলিয়ে দিল?

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—হয়তো কিছু গল্প শেষ হওয়ার জন্য লেখা হয় না।

আরিয়া তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

রোহান দৌড়ে এসে দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলল,

—আম্মু!

আরিয়া চমকে তাকাল।

—কী?

—আমাকে ধরো!

সে দৌড়ে আরিয়ার কোলে উঠে গেল।

আরিয়া হেসে তাকে জড়িয়ে ধরল।

আরিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে হাসতে লাগল।

রোহান বলল,

—এখন থেকে আমরা তিনজন একসঙ্গে থাকব, তাই না?

আরিয়ান আরিয়ার দিকে তাকাল।

আরিয়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ। সবসময়।

তিনজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।

কিন্তু তাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটা তখনও বাকি।

কারণ পরের দিনই আরিয়ান এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল, যা আরিয়ার জীবনের সব অপেক্ষার শেষ করে দেবে।

তাদের বিয়ে।

বিয়ের দিনটা যেন স্বপ্নের মতো ছিল।

সকাল থেকেই আরিয়ানের বাড়িতে ব্যস্ততা। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সবার ছোটাছুটি। আর সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত ছিল রোহান।

সে কখনো এদিক যাচ্ছে, কখনো ওদিক যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পরপর সবাইকে বলছে,

—আজ কিন্তু আমার আম্মুর বিয়ে!

যে-ই শুনছে, হাসছে।

আরিয়ান তাকে ডেকে বলল,

—বাবা, একটু শান্ত হ।

রোহান গম্ভীর মুখ করে বলল,

—আজ আমি শান্ত থাকব না।

—কেন?

—আজ আমি খুব খুশি।

আরিয়ান হেসে ছেলের মাথায় হাত রাখল।

—আমিও।

অন্যদিকে আরিয়া বিয়ের সাজে বসে ছিল।

আজ তার চোখে সেই পুরোনো দুষ্টুমি নেই, আবার পুরোপুরি আগের শান্ত মেয়েটাও নেই।

আজ তার চোখে শুধু অপেক্ষা।

যে মানুষটার জন্য একসময় সে কেঁদেছিল, আজ সেই মানুষটাই তাকে নিজের করে নিতে আসছে।

আরিয়ার মা কাছে এসে তার মাথায় হাত রাখলেন।

—খুশি তো?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—অনেক।

—ভালোবাসিস?

আরিয়া একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।

—অনেক।

মা হেসে বললেন,

—তাহলে আজ থেকে সব কষ্ট শেষ।

আরিয়া চোখ বন্ধ করল।

তার মনে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো।

আরিয়ানের সঙ্গে ঝগড়া।

ক্রিকেট খেলা।

তার গাল টিপে দেওয়া।

"ক্ষেত  পাগলি" বলে বিরক্ত করা।

আর সেই একটা দিন—

যেদিন সে নিজের ভালোবাসার কথা বলেছিল।

আরিয়ান তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।

কত রাত সে কেঁদেছে!

কতবার নিজেকে বলেছে, আর কখনো এই মানুষটার সামনে দাঁড়াবে না।

কিন্তু জীবন তাকে আবার ফিরিয়ে এনেছে।

আর এবার আরিয়ান নিজেই বলেছে—

"আমি তোকে ভালোবাসি।"

আরিয়ার চোখের কোণে পানি চলে এলো।

বিয়ের আসরে আরিয়ান যখন বসেছিল, তখন তার চোখ বারবার দরজার দিকে যাচ্ছিল।

অবশেষে আরিয়া এলো।

লাল শাড়ি, মাথায় ওড়না, মুখে লাজুক হাসি।

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে রইল।

তারপর মৃদু হাসল।

রোহান পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,

—আব্বু, আম্মুকে খুব সুন্দর লাগছে, তাই না?

আরিয়ান ছেলের মাথায় হাত রেখে বলল,

—হ্যাঁ।

রোহান বলল,

—তুমি তাকিয়ে আছ কেন?

আরিয়ান হেসে বলল,

—চুপ কর।

রোহান আবার হাসতে লাগল।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।

কাজী সাহেব প্রশ্ন করলেন।

আরিয়া কাঁপা গলায় বলল,

—কবুল।

কিছুক্ষণ পর আরিয়ানও বলল,

—কবুল।

শব্দটা শুনেই আরিয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

এত বছরের অপেক্ষার শেষ হলো এই একটা শব্দে।

চারপাশে আনন্দের ধ্বনি উঠল।

রোহান সবচেয়ে বেশি জোরে হাততালি দিতে লাগল।

—ইয়েস!

সবাই হেসে ফেলল।

বিয়ের পর একসময় আরিয়া আর আরিয়ানকে একটু একা থাকতে দেওয়া হলো।

আরিয়া চুপ করে বসে ছিল।

আরিয়ান তার পাশে এসে বসল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।

তারপর আরিয়ান বলল,

—কী ভাবছিস?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—ভাবছি, এটা সত্যি কি না।

—কেন?

—কারণ একসময় ভাবতাম, তোকে আর কোনোদিন পাব না।

আরিয়ান ধীরে তার হাত ধরল।

—আমিও ভাবিনি তোকে আবার পাব।

আরিয়া তার দিকে তাকাল।

—একটা কথা বলব?

—বল।

—তুই আমাকে এত দেরিতে বুঝলি কেন?

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—কারণ আমি বোকা ছিলাম।

আরিয়া হেসে ফেলল।

—হ্যাঁ। ছিলি।

—এখনও?

—অনেক।

আরিয়ান হঠাৎ তার গাল টিপে দিল।

—পাগলি।

আরিয়া সঙ্গে সঙ্গে তার হাত সরিয়ে বলল,

—এই অভ্যাসটা এখনও গেল না?

—যাবে না।

—কেন?

—কারণ এই গাল টিপে দেওয়ার অধিকারটা আমি অনেক বছর মিস করেছি।

আরিয়ার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

সে নিচু গলায় বলল,

—বেশি কথা বলিস না।

—কেন?

—লজ্জা লাগে।

আরিয়ান মৃদু হেসে তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।

কিছুদিন পর।

এক সন্ধ্যায় তারা তিনজন ছাদে বসেছিল।

আকাশে তারার মেলা।

রোহান মেঝেতে বসে খেলছিল।

আরিয়া আর আরিয়ান পাশাপাশি বসে ছিল।

ছাদের এক পাশে মীরার একটা ছবি রাখা।

আরিয়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—মীরাকে এখানে রাখলি কেন?

আরিয়ান বলল,

—ও আমাদের জীবনের একটা অংশ।

আরিয়া মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর আরিয়ান বলল,

—মীরা চলে যাওয়ার আগে আমাকে বলেছিল, তোকে যেন খুঁজি।

আরিয়া ধীরে ছবিটার দিকে তাকাল।

—ও হয়তো জানত।

—কী?

—যে আমি তোকে ভালোবাসি।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—হয়তো।

আরিয়া চোখ মুছে বলল,

—আমি ওর কাছে কৃতজ্ঞ।

রোহান হঠাৎ দৌড়ে এসে বলল,

—আম্মু!

—কী হয়েছে?

—আমি একটা কথা বলব।

—বল।

রোহান দুজনের মাঝখানে এসে বসে বলল,

—আমরা কি এখন সত্যি একটা পরিবার?

আরিয়া তাকে জড়িয়ে ধরল।

—হ্যাঁ।

আরিয়ানও দুজনকে কাছে টেনে নিল।

রোহান হাসতে হাসতে বলল,

—তাহলে আমি খুব খুশি।

রাত আরও গভীর হলো।

রোহান ঘুমিয়ে পড়ল।

আরিয়া ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল।

আরিয়ান পেছন থেকে এসে বলল,

—কী দেখছিস?

—আকাশ।

—এতদিন পর?

—হুম।

—কী মনে হচ্ছে?

আরিয়া মৃদু হেসে বলল,

—মনে হচ্ছে, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা এখন শুরু হলো।

আরিয়ান তার পাশে এসে দাঁড়াল।

—আমারও।

আরিয়া বলল,

—তবে একটা অভিযোগ আছে।

—কী?

—তুই আমাকে অনেক কাঁদিয়েছিস।

—জানি।

—অনেক অপেক্ষা করিয়েছিস।

—জানি।

—আর অনেক দেরি করেছিস।

আরিয়ান তার হাত ধরল।

—এই জীবনের বাকি সময়টা দিয়ে সেই দেরির ক্ষতিপূরণ করব।

আরিয়া তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—সত্যি?

—সত্যি।

তারপর আরিয়ান তার গাল টিপে বলল,

—আমার সেই পুরোনো পাগলি কোথায়?

আরিয়া হেসে তার হাত চাপড়ে দিল।

—এখানেই আছে।

দুজনেই হেসে উঠল।

দূরে ঘুমন্ত রোহানের মুখে শান্তির হাসি।

আর পাশে মীরার ছবি।

মনে হলো, অতীতের সব কষ্ট, ভুল বোঝাবুঝি আর অপেক্ষা পেরিয়ে অবশেষে তিনটি মানুষ একটা নতুন জীবনের শুরু করেছে।

আরিয়ার চোখে যে ভালোবাসা একদিন শুধু একতরফা ছিল, আজ সেটাই পূর্ণতা পেয়েছে।

আরিয়ান যে মানুষটাকে একসময় "পাগলি" বলে বিরক্ত করত, আজ সেই মানুষটাই তার জীবনসঙ্গী।

আর রোহান?

সে পেয়েছে তার বহুদিনের চাওয়া একজন আম্মু।

জীবন কখনো কখনো মানুষকে অনেক দেরিতে তার প্রাপ্য সুখ দেয়।

কিন্তু যখন দেয়—

তখন সেই সুখের মূল্য হয়তো আগের সব কষ্টের চেয়েও বেশি।

....
👁 710