বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার দিনটা রোহানের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন ছিল।
সকাল থেকেই তার বুকের ভেতর কেমন যেন ধুকপুক করছিল। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, নতুন একটা জীবন—সবকিছুই তার কাছে অচেনা।
রোহান গ্রামের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই সে তার ফুফুর বাসায় মানুষ হয়েছে। বাবা-মায়ের স্নেহ খুব একটা পায়নি। ফুফুই তাকে মানুষ করেছেন। তবে ফুফুর সংসারে বড় হলেও রোহানের মধ্যে গ্রামের সরলতাটা এখনো রয়ে গেছে।
সে একটু ভোলাভালা ধরনের।
কথা বলতে গেলেই এমন কিছু বলে ফেলে, যেটা শুনে আশপাশের মানুষ হেসে ওঠে।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে রোহান এক হাতে কাগজপত্র আর অন্য হাতে কলম নিয়ে বেশ চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ পাশে দাঁড়ানো এক ছেলেকে জিজ্ঞেস করল,
— ভাই, এই লাইনে দাঁড়ালে কি ভর্তি হওয়া যাবে?
ছেলেটা কিছুক্ষণ রোহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাই, লাইনে দাঁড়ানোর জন্যই তো লাইন।
রোহান মাথা চুলকে বলল,
— ও আচ্ছা! আমি ভাবছিলাম আগে ভর্তি হয়ে তারপর লাইনে দাঁড়াতে হয়।
কথাটা শুনে আশপাশের কয়েকজন হেসে ফেলল।
রোহানও অপ্রস্তুত হয়ে মুচকি হাসল।
ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে থামল সামনের দিকে।
একটা মেয়ে ধীর পায়ে হাঁটছে।
সাদা-নীল পোশাক। কাঁধে একটা ব্যাগ। হাতে কয়েকটা কাগজ। মুখে কোনো বাড়তি অভিব্যক্তি নেই। আশপাশে এত মানুষের ভিড়, এত শব্দ—কিন্তু মেয়েটা যেন নিজের একটা আলাদা জগতের মধ্যে হাঁটছে।
রোহান তাকিয়ে রইল।
কেন যেন মেয়েটাকে প্রথম দেখাতেই তার ভালো লেগে গেল।
সে পাশে থাকা ছেলেটাকে আস্তে করে বলল,
— ভাই...
— কী?
— ওই মেয়েটা কি আমাদের ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবে?
ছেলেটা তাকিয়ে বলল,
— মনে হয়।
রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— মেয়েটা খুব চুপচাপ না?
— হ্যাঁ।
— ভালো।
— কেন?
রোহান গম্ভীর মুখে বলল,
— আমি বেশি কথা বলি। একজন বেশি কথা বললে আরেকজন চুপ থাকাই ভালো।
ছেলেটা হেসে ফেলল।
রোহান আবার মেয়েটার দিকে তাকাল।
মেয়েটার নাম তখনও সে জানে না।
শুধু জানে, মেয়েটাকে তার ভালো লেগেছে।
কয়েকদিন পর ক্লাস শুরু হলো।
রোহান নিজের অজান্তেই মেয়েটাকে খুঁজতে লাগল।
প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকেই সে তাকে দেখতে পেল।
মেয়েটা একদম সামনের সারিতে বসে বই খুলে রেখেছে।
রোহান পিছনের দিকে গিয়ে বসল।
ক্লাস শুরু হলো।
শিক্ষক কঠিন একটা বিষয় বোঝাচ্ছিলেন। রোহান মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পাঁচ মিনিট পরই তার মাথা ঘুরতে শুরু করল।
সে খাতায় কিছু লিখল।
তারপর পাশে বসা ছেলেটার খাতা দেখে নিজের খাতার সঙ্গে মিলিয়ে আবার লিখল।
কিছুক্ষণ পর নিজের লেখা দেখে নিজেই বুঝতে পারল না সে কী লিখেছে।
ক্লাস শেষে সবাই বের হতে শুরু করল।
রোহান ইচ্ছে করেই একটু ধীরে বের হলো।
সামনে সেই মেয়েটা হাঁটছে।
রোহান কিছুটা দূরত্ব রেখে তার পেছনে হাঁটতে লাগল।
মেয়েটা একবার পেছনে তাকাল।
রোহান সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে তাকিয়ে এমন ভান করল, যেন দেয়ালের পোস্টার পড়ছে।
মেয়েটা আবার সামনে চলে গেল।
রোহানও হাঁটল।
পরের দিনও একই ঘটনা।
তার পরের দিনও।
রোহান কখনো তার সামনে দিয়ে হাঁটে, কখনো পেছনে। কখনো দূর থেকে দেখে সে কোন ক্লাসে যাচ্ছে।
কথা বলার সাহস অবশ্য তার হচ্ছে না।
একদিন ক্লাসে শিক্ষক একটা প্রশ্ন করলেন।
কেউ উত্তর দিতে পারছিল না।
হঠাৎ রোহান হাত তুলল।
শিক্ষক বললেন,
— হ্যাঁ, রোহান। বলো।
রোহান দাঁড়িয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী মুখে বলল,
— স্যার, উত্তরটা হচ্ছে...
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— স্যার, আমি আসলে উত্তরটা জানি। কিন্তু মুখে আসছে না।
পুরো ক্লাস হেসে উঠল।
শিক্ষকও হাসি চেপে বললেন,
— বসো।
রোহান বসে পড়ল।
পেছন থেকে কয়েকজন বলতে লাগল,
— রোহান ভাই আবার শুরু করছে!
— ওকে প্রশ্ন করলে উত্তর না দিয়ে নাটক করে!
রোহান হেসে ফেলল।
কিন্তু সামনে বসা মেয়েটা এবার পেছনে ফিরে তাকাল।
তার চোখে বিরক্তি।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর কয়েকজন রোহানকে নিয়ে আবার হাসাহাসি করছিল।
মেয়েটা তখন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— তোমরা ওকে নিয়ে এত হাসাহাসি করছ কেন?
সবাই থেমে গেল।
একজন বলল,
— আরে মজা করছি।
মেয়েটা শান্ত গলায় বলল,
— মজা আর কাউকে ছোট করা এক জিনিস না।
কেউ আর কিছু বলল না।
রোহান দূর থেকে পুরো ঘটনাটা দেখছিল।
তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অনুভূতি হলো।
যে মেয়েটা তার সঙ্গে এখনো ঠিকমতো কথা বলেনি, সে তার জন্য অন্যদের থামিয়ে দিল।
মেয়েটা চলে যেতে শুরু করলে রোহান হঠাৎ বলে ফেলল,
— ধন্যবাদ।
মেয়েটা থামল।
প্রথমবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।
তারপর খুব ছোট করে বলল,
— ঠিক আছে।
এই প্রথম রোহান তার কণ্ঠ শুনল।
কী অদ্ভুত!
মাত্র দুটো শব্দ।
তবুও রোহানের মনে হলো, এই দুটো শব্দ সে অনেকদিন মনে রাখবে।
পরদিন রোহান ক্লাসে এসে দেখল, মেয়েটা আগের জায়গাতেই বসে আছে।
সে একটু সাহস করে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
— তোমার নামটা জানতে পারি?
মেয়েটা বই থেকে চোখ তুলে তাকাল।
— দিয়া।
রোহান মুচকি হাসল।
— আমি রোহান।
দিয়া বলল,
— জানি।
রোহান অবাক।
— তুমি আমার নাম জানো?
— ক্লাসে সবাই তোমার নাম জানে।
রোহান একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
— আমার এত নামডাক হয়ে গেছে নাকি?
দিয়া প্রথমবার হালকা হাসল।
— সেটা বলা যায়।
রোহানের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
সেদিন থেকেই তাদের কথাবার্তা একটু একটু করে বাড়তে লাগল।
দিয়া পড়াশোনায় ভীষণ ভালো।
আর রোহান?
সে ভালো ছাত্র হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু তার মাথার মধ্যে সবকিছু ঢুকতে একটু সময় লাগে।
একদিন ক্লাস শেষে রোহান খাতা নিয়ে দিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
— এই অঙ্কটা কিছুতেই বুঝতে পারছি না।
দিয়া খাতা নিয়ে বলল,
— বসো।
রোহান তার পাশে বসে পড়ল।
দিয়া ধৈর্য ধরে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে দিল।
রোহান মাঝখানে বলল,
— আবার বলো।
দিয়া আবার বুঝিয়ে দিল।
— এবার বুঝেছ?
রোহান মাথা নাড়ল।
— না।
দিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
— তুমি এত বোকা কীভাবে?
রোহান হেসে বলল,
— জানি না। তবে তুমি পাশে থাকলে হয়তো একদিন বুদ্ধিমান হয়ে যাব।
দিয়া কিছু বলল না।
শুধু মুখ ঘুরিয়ে লুকিয়ে একটা হাসি দিল।
সেদিন থেকেই তাদের বন্ধুত্বটা একটু অন্যরকম হয়ে গেল।
ক্লাসে তারা পাশাপাশি বসত।
ক্লাস শেষে একসঙ্গে বের হতো।
রোহান না বুঝলে দিয়া বুঝিয়ে দিত।
দিয়া কোনো নোট চাইলে রোহান ছুটে এনে দিত।
রোহান মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলত, যেগুলো শুনে দিয়া না হেসে পারত না।
দুজনের এই বন্ধুত্ব কখন যে তাদের দুজনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে উঠছে, তখনও তারা কেউ জানত না।
তবে রোহান একটা বিষয় বুঝে গিয়েছিল—
দিয়াকে সে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখতে পারছে না।
আর দিয়া?
সে কিছু না বললেও রোহানের প্রতি তার মায়াটা দিন দিন বাড়ছিল।
দিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার পর থেকে রোহানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা যেন পুরোপুরি বদলে গেল।
আগে ক্লাসে ঢুকে সে প্রথমে ভাবত, আজ কীভাবে কোনোমতে ক্লাসটা শেষ করবে। এখন ক্লাসে ঢুকেই তার প্রথম কাজ—দিয়াকে খোঁজা।
দিয়া কোথায় বসেছে?
আজ কী পড়েছে?
তার নোট তৈরি হয়েছে কি না?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আজ দিয়া তার সঙ্গে কথা বলবে তো?
দিয়া অবশ্য এসব নিয়ে কখনো বাড়তি কিছু বলত না। বরং নিজের পড়াশোনা নিয়েই থাকত।
কিন্তু রোহান ছিল ঠিক তার উল্টো।
একদিন ক্লাসে শিক্ষক খুব কঠিন একটা বিষয় পড়াচ্ছিলেন। প্রায় সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। রোহানও শুনছিল।
কিন্তু দশ মিনিট পর তার খাতায় দেখা গেল—
“দিয়া আজ নীল জামা পরেছে।”
তার নিচে—
“আজকে চুল খোলা রেখেছে।”
তারপর আরও নিচে—
“অনেক সুন্দর লাগছে।”
দিয়া পাশ থেকে খাতাটা দেখে ফেলল।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— তুমি ক্লাসে এসব লেখো?
রোহান দ্রুত খাতা বন্ধ করে ফেলল।
— না!
— তাহলে খাতায় কী লিখেছ?
— পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
— খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে।
রোহান হেসে বলল,
— অবশ্যই।
দিয়া আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
দিনগুলো এভাবেই চলছিল।
রোহান ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল, দিয়া শুধু পড়াশোনায় ভালো নয়, মানুষ হিসেবেও অন্যরকম।
ক্লাসের কেউ কোনো সমস্যায় পড়লে সে সাহায্য করত।
কেউ নোট না পেলে নোট দিত।
কেউ কোনো বিষয়ে দুর্বল হলে বুঝিয়ে দিত।
কিন্তু তার নিজের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলত না।
একদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের এক কোণে বসে রোহান জিজ্ঞেস করল,
— দিয়া, তোমাদের বাসা কোথায়?
দিয়া বলল,
— শহরেই।
— তোমার বাবা কী করেন?
দিয়া একটু থেমে বলল,
— ব্যবসা করেন।
— অনেক বড় ব্যবসা?
দিয়া মুচকি হেসে বলল,
— হ্যাঁ, বেশ বড়।
রোহান অবাক হয়ে বলল,
— তাই তো বলি, তোমার এত আত্মবিশ্বাস আসে কোথা থেকে!
দিয়া হাসল।
— আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে টাকার কী সম্পর্ক?
রোহান মাথা চুলকে বলল,
— আমার ক্ষেত্রে আছে।
— কীভাবে?
— আমার পকেটে টাকা থাকলে আমি খুব আত্মবিশ্বাসী থাকি। টাকা শেষ হলে নিজের কাছেই লজ্জা লাগে।
দিয়া হেসে ফেলল।
— তুমি আসলেই অদ্ভুত।
রোহান বলল,
— কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে থাকো।
দিয়া এবার চুপ হয়ে গেল।
রোহানও কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর দিয়া খুব আস্তে বলল,
— তুমি খারাপ না।
রোহানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
সে হাসল।
— শুধু একটু বোকা?
দিয়া বলল,
— অনেকটা।
দুজনেই হেসে উঠল।
তাদের বন্ধুত্বের সবচেয়ে সুন্দর সময় ছিল পরীক্ষার আগের দিনগুলো।
রোহান তখন প্রায় প্রতিদিন দিয়ার কাছে বসত।
— এইটা বুঝিনি।
— এইটা আবার বুঝিয়ে দাও।
— এই প্রশ্নটা কীভাবে করব?
দিয়া বিরক্ত হয়ে বলত,
— তুমি পুরো সেমিস্টার কী করেছ?
রোহান গম্ভীর মুখে বলত,
— তোমার দিকে তাকিয়েছি।
দিয়া সঙ্গে সঙ্গে তার খাতা বন্ধ করে দিত।
— তাহলে পরীক্ষায় ফেল করবে।
— তুমি আছ তো।
— আমি পরীক্ষার হলে তোমার হয়ে লিখব না।
— কিন্তু তুমি আমাকে পাশ করাতে পারবে।
দিয়া মাথা নাড়ত।
— অসম্ভব।
তারপরও শেষ পর্যন্ত রোহানের প্রতিটা অধ্যায় বুঝিয়ে দিত।
রোহানও চেষ্টা করত।
কারণ দিয়ার কাছে সে শুধু হাসির পাত্র হতে চাইত না।
সে চেয়েছিল দিয়া যেন একদিন তাকে নিয়ে গর্ব করে।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে রোহানের ফুফু এসে দাঁড়ালেন।
রোহান দূর থেকেই তাকে দেখে ভয় পেয়ে গেল।
ফুফু ডাকলেন,
— রোহান!
রোহান দৌড়ে গেল।
— ফুফু, তুমি এখানে?
— তোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। তুই দুপুরে বাসায় ফিরিস না কেন?
রোহান মাথা নিচু করে বলল,
— পড়াশোনা থাকে।
ফুফু বিরক্ত হয়ে বললেন,
— পড়াশোনা, না অন্য কিছু?
রোহান চুপ।
ঠিক তখনই দিয়া দূর থেকে তাদের দেখতে পেল।
রোহান বলল,
— ফুফু, উনি দিয়া। আমার বন্ধু।
দিয়া এগিয়ে এসে সালাম দিল।
ফুফু দিয়ার দিকে ভালোভাবে তাকালেন।
তারপর বললেন,
— বন্ধু?
রোহান মাথা নাড়ল।
— জি।
ফুফু কিছু না বলে চলে গেলেন।
দিয়া একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,
— তোমার ফুফু আমাকে পছন্দ করেননি মনে হলো।
রোহান হেসে বলল,
— উনি কাউকেই সহজে পছন্দ করেন না।
— তোমাকেও?
— আমাকে তো সবচেয়ে কম।
দিয়া হেসে ফেলল।
এর কিছুদিন পর দিয়ার জন্মদিন।
দিয়া খুব কাছের কয়েকজন বন্ধুকে বাসায় আসতে বলেছিল।
রোহানও ছিল সেই তালিকায়।
তবে রোহান খবরটা শুনে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
সে জানে দিয়ার পরিবার অনেক বড়লোক।
আর সে?
ফুফুর বাসায় থেকে পড়াশোনা করা একটা সাধারণ ছেলে।
তারপরও দিয়া তাকে বলেছিল,
— তুমি অবশ্যই আসবে।
রোহান বলেছিল,
— তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হবে?
— হ্যাঁ।
— উনি আমাকে দেখে ভয় পাবেন না তো?
দিয়া হেসে বলেছিল,
— তুমি কি এত ভয়ংকর?
রোহান বলেছিল,
— না। তবে আমার জামাটা একটু পুরোনো।
দিয়া বলেছিল,
— জামা দিয়ে মানুষ বিচার করা হয় না।
রোহান তখন কথাটা মনে গেঁথে নিয়েছিল।
জন্মদিনের দিন সে নিজের জমানো অল্প কিছু টাকা দিয়ে একটা ছোট্ট উপহার কিনল।
খুব দামি কিছু নয়।
একটা সুন্দর কলম।
কারণ দিয়া সবসময় লিখতে ভালোবাসত।
উপহারটা হাতে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রোহান অনেকক্ষণ নিজেকে দেখল।
তারপর নিজের মনে বলল,
— আজ কিছু হবে না। শুধু বন্ধুর জন্মদিন।
কিন্তু বুকের ভেতরটা তার কথা মানছিল না।
দিয়ার বাড়িতে পৌঁছাতেই রোহান বুঝল, তাদের পৃথিবী কতটা আলাদা।
বড় বাড়ি।
চারপাশে আলো।
দামি গাড়ি।
অতিথিদের আনাগোনা।
রোহান নিজের জামার দিকে তাকাল।
হঠাৎ নিজেকে খুব ছোট মনে হলো।
দিয়া দূর থেকেই তাকে দেখে ছুটে এল।
— তুমি এসেছ!
রোহান হেসে বলল,
— বলেছিলে আসতে। না এসে উপায় আছে?
দিয়া তার হাত থেকে ছোট বাক্সটা নিল।
— এটা কী?
— তোমার জন্য।
দিয়া খুলে দেখল কলমটা।
তার চোখে সত্যিকারের আনন্দ ফুটে উঠল।
— খুব সুন্দর।
রোহান বলল,
— খুব দামি না।
দিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— দাম দিয়ে সবকিছুর মূল্য হয় না।
রোহান চুপ করে গেল।
দিয়া বলল,
— চলো, বাবার সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই।
রোহানের বুক ধক করে উঠল।
— এখনই?
— হ্যাঁ।
দিয়া তাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
সেখানে বসে ছিলেন দিয়ার বাবা।
দিয়া হাসিমুখে বলল,
— বাবা, এ রোহান। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু।
লোকটা রোহানের দিকে তাকালেন।
কয়েক সেকেন্ড তার পোশাক, জুতা, হাতে থাকা পুরোনো ঘড়ি—সবকিছু পর্যবেক্ষণ করলেন।
তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন,
— তুমি কী করো?
রোহান ভদ্রভাবে বলল,
— পড়াশোনা করি, আঙ্কেল।
— পরিবার?
রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
— আমি ফুফুর কাছে বড় হয়েছি।
লোকটার মুখ আরও কঠিন হয়ে গেল।
— নিজের কোনো পরিচয় নেই?
রোহান মাথা নিচু করল।
দিয়া বলল,
— বাবা, তুমি এভাবে—
লোকটা দিয়াকে থামিয়ে দিলেন।
তারপর রোহানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তুমি দিয়ার জন্য কী এনেছ?
রোহান ছোট্ট বাক্সটার দিকে তাকাল।
— একটা কলম।
লোকটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,
— এই জিনিস নিয়ে তুমি আমার মেয়ের পাশে দাঁড়াতে এসেছ?
রোহান কিছু বলল না।
— তোমার কোনো যোগ্যতা নেই। আমার মেয়ের জীবন তোমার মতো একটা ছেলের সঙ্গে জড়ানোর প্রশ্নই আসে না।
দিয়া এবার কেঁপে উঠল।
— বাবা!
লোকটা কঠিন গলায় বললেন,
— রোহান, তুমি এখনই এখান থেকে বের হয়ে যাও।
রোহানের চোখে পানি চলে এল।
সে দিয়ার দিকে তাকাল।
দিয়া অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে।
রোহান কিছু বলতে চেয়েও পারল না।
শুধু মাথা নিচু করে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল।
পেছন থেকে দিয়া ডাকল,
— রোহান!
রোহান থামল না।
বাড়ির বাইরে এসে সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।
সে হাঁটতে হাঁটতে শুধু একটা কথাই ভাবছিল—
“আমার কি সত্যিই কোনো যোগ্যতা নেই?”
আর সেই রাতেই প্রথমবার রোহান বুঝল—
কাউকে ভালো লাগা যতটা সহজ, তার পৃথিবীর সঙ্গে নিজের পৃথিবীকে মেলানো ততটা সহজ নয়।
জন্মদিনের সেই রাতটার পর রোহান বদলে গেল।
আগের মতো আর দিয়ার সঙ্গে কথা বলত না। ক্লাসে গেলেও দূরের কোনো একটা বেঞ্চে বসত। দিয়া সামনে বসে থাকলেও সে তাকাত না।
দিয়া কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করেছিল।
— রোহান, একটু কথা বলবে?
রোহান বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
— এখন না।
— আমার ওপর রাগ করেছ?
— না।
— তাহলে এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?
রোহান এবার দিয়ার দিকে তাকিয়েছিল।
চোখে কষ্ট ছিল, কিন্তু মুখে একটা হাসি এনে বলেছিল,
— তোমার বাবার কথা ঠিক। আমাদের দূরত্বটাই ভালো।
দিয়া কিছু বলতে পারেনি।
রোহান উঠে চলে গিয়েছিল।
এরপর কয়েক মাস কেটে গেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে দুজনের দেখা হতো, কিন্তু আগের মতো আর কথা হতো না।
রোহান নিজের পড়াশোনায় মন দিল। দিয়া তাকে সাহায্য করতে চাইলেও সে আর সাহায্য নিত না।
একদিন দিয়া বলেছিল,
— তুমি আগের মতো নেই।
রোহান হেসে বলেছিল,
— মানুষকে বদলাতে বেশি কিছু লাগে না। একটা কথা যথেষ্ট।
দিয়া বুঝেছিল, কথাটা তার বাবার জন্য।
কিন্তু সে বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো সাহস তখনও পায়নি।
তারপর একদিন খবর এল—
দিয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর ছেলের সঙ্গে।
রোহান খবরটা শুনে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে ছিল।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলেছিল,
— ভালোই তো।
বন্ধুরা বলেছিল,
— তুই যাবি?
রোহান মাথা নাড়েনি।
— না।
কেউ জানত না, সেদিন রাতে নিজের ঘরে বসে রোহান কতক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল।
দিয়ার বিয়েটা খুব ধুমধাম করে হলো।
দিয়া বাবার পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করল।
ছেলেটা দেখতে ভালো, শিক্ষিত, পরিবারেরও অনেক নামডাক।
বিয়ের দিন সবাই বলছিল,
— কী সুন্দর জুটি!
দিয়া শুধু চুপ করে ছিল।
কারণ তার মনের একটা জায়গায় তখনও একজন মানুষ ছিল, যাকে সে কোনোদিন নিজের করে পায়নি।
কিন্তু সে ভেবেছিল, হয়তো সময়ের সঙ্গে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
হয়নি।
বিয়ের কয়েক সপ্তাহ পরই সে বুঝতে পারল, তার স্বামী নিয়মিত মদ পান করে।
রাতে বাড়ি ফিরত নেশাগ্রস্ত অবস্থায়।
অন্য নারীদের সঙ্গে তার সম্পর্কও ছিল।
দিয়া প্রতিবাদ করলে সে রেগে যেত।
প্রথমে শুধু চিৎকার।
তারপর অপমান।
এক রাতে দিয়া বলেছিল,
— তুমি যদি আমাকে সম্মান না করতে পারো, তাহলে এই সম্পর্ক রাখার কোনো মানে হয় না।
লোকটা প্রচণ্ড রেগে গিয়ে তাকে ধাক্কা দিল।
দিয়া মেঝেতে পড়ে গেল।
তার চোখে পানি চলে এল।
কিন্তু সে সেদিনও চুপ করেছিল।
পরের কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো।
মারধর, অপমান, সন্দেহ—সবকিছুই তার জীবনের অংশ হয়ে গেল।
দিয়া একসময় বাবাকে ফোন করেছিল।
— বাবা, আমি আর পারছি না।
ওপাশ থেকে কঠিন কণ্ঠ এসেছিল,
— সংসারে এসব হয়। একটু মানিয়ে নাও।
দিয়া ফোনটা কেটে দিয়েছিল।
সেদিন সে বুঝেছিল, নিজের জীবনটা নিজেকেই বাঁচাতে হবে।
এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দিয়া ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিল।
অনেক বাধা এসেছিল।
অনেক কথা শুনতে হয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে মুক্ত হলো।
ডিভোর্সের কাগজ হাতে নিয়ে দিয়া দীর্ঘক্ষণ বসে ছিল।
তার সামনে পুরো জীবনটা পড়ে ছিল।
কিন্তু কোথায় যাবে?
বাবার কাছে ফিরবে?
যে বাবা একদিন তার পছন্দের একজন মানুষকে অপমান করে বের করে দিয়েছিলেন?
না।
সে সেখানে ফিরতে পারল না।
হঠাৎ তার মনে পড়ল রোহানের কথা।
অনেকদিন পর সে ফোনটা হাতে নিল।
রোহানের নম্বর এখনো তার ফোনে ছিল।
আঙুলটা কয়েকবার কল বাটনের ওপর গিয়ে থেমে গেল।
শেষ পর্যন্ত সে কল করল।
রোহান তখন একটা ছোট চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
ফোন বেজে উঠতেই সে অবাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
দিয়ার নাম।
তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
অনেকক্ষণ পর সে ফোন ধরল।
— হ্যালো?
ওপাশে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই।
তারপর দিয়ার কণ্ঠ।
— রোহান...
রোহান চুপ করে রইল।
— তুমি কি আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে?
— বলো।
দিয়া অনেক কষ্টে বলল,
— আমি... তোমার কাছে একটা সাহায্য চাই।
রোহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— কী হয়েছে?
— আমি কিছুদিন তোমাদের গ্রামের বাড়িতে থাকতে চাই।
রোহান থমকে গেল।
— কী?
— আমি কোথাও যেতে পারছি না। বাবার কাছে যেতে চাই না। তুমি যদি আমাকে কয়েকদিন থাকতে দাও...
রোহান আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
শুধু বলল,
— তুমি কোথায় আছ?
— শহরের একটা হোটেলে।
— সেখানে থেকো। আমি আসছি।
দিয়া অবাক হয়ে বলল,
— কিন্তু তোমার ফুফু?
রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— সেটা আমি সামলাব।
কয়েক ঘণ্টা পর রোহান দিয়াকে নিয়ে গ্রামের উদ্দেশে রওনা হলো।
গাড়ির জানালার পাশে বসে দিয়া চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে ছিল।
রোহানও খুব বেশি কথা বলছিল না।
অনেকক্ষণ পর দিয়া আস্তে বলল,
— তুমি আমাকে ঘৃণা করো?
রোহান সামনে তাকিয়েই বলল,
— না।
— তাহলে এত চুপ কেন?
— অনেক কথা জমে আছে। কোনটা আগে বলব বুঝতে পারছি না।
দিয়া মাথা নিচু করল।
— আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।
রোহান বলল,
— তুমি না। পরিস্থিতি দিয়েছে।
দিয়া চোখের পানি মুছে ফেলল।
গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর ফুফু দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
রোহানের পাশে দিয়াকে দেখে তার মুখ সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে গেল।
— এ কে?
রোহান বলল,
— আমার পরিচিত। কিছুদিন থাকবে।
ফুফু অবাক হয়ে বললেন,
— কোথাকার কোন মেয়েকে আবার বাড়িতে নিয়ে এলি?
দিয়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
রোহান বলল,
— ফুফু, ওর একটু সমস্যা হয়েছে।
— সমস্যা হয়েছে বলে আমার বাড়িতে থাকতে হবে?
রোহান চুপ করে গেল।
ফুফু আবার বললেন,
— মানুষজন কী বলবে?
দিয়া আস্তে বলল,
— আমি চাইলে চলে যেতে পারি।
রোহান সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
— তুমি কোথাও যাবে না।
ফুফু রেগে বললেন,
— তুই কি এখন আমার কথা শুনবি না?
রোহান শান্ত গলায় বলল,
— এতদিন আপনার কথা শুনেছি। কিন্তু এবার একজন মানুষকে বিপদে ফেলে রাখতে পারব না।
ফুফু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে ভেতরে চলে গেলেন।
দিয়া চোখ নামিয়ে বলল,
— তোমার জন্য সমস্যা হয়ে গেল।
রোহান মৃদু হেসে বলল,
— তুমি যখন আমাকে একবারও একা থাকতে দাওনি, তখন তো আমি তোমার জন্য সমস্যা হইনি।
দিয়া তাকাল।
রোহান বলল,
— এখন আমার পালা।
দিয়ার চোখ আবার ভিজে উঠল।
পরের দিন থেকেই গ্রামের বাড়ির জীবন শুরু হলো।
দিয়া শহুরে মেয়ে। গ্রামের জীবন তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন।
সকালে মোরগের ডাক।
পুকুরের পানি।
মাটির রাস্তা।
বাড়ির উঠোন।
সবকিছুই তার অচেনা।
প্রথম দিন রান্নাঘরে গিয়ে সে বিপদে পড়ে গেল।
ফুফু দূর থেকে দেখে বললেন,
— শহরের মেয়ে, এগুলো কীভাবে করবে?
দিয়া চুপ করে গেল।
রোহান পাশ থেকে বলল,
— না পারলে শিখবে।
দিয়া তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— তুমি শেখাবে?
রোহান বলল,
— আমি নিজেই ঠিকমতো পারি না।
দিয়া হেসে ফেলল।
অনেকদিন পর তার মুখে সেই পুরোনো হাসি ফুটল।
আর রোহানও বুঝল—
দিয়া তার জীবনে ফিরে আসার পর গ্রামের ছোট্ট বাড়িটাও যেন হঠাৎ অন্যরকম হয়ে গেছে।
কিন্তু সে জানত না, সামনে তার জীবনের আরও বড় একটা অধ্যায় অপেক্ষা করছে।
কারণ কয়েকদিন পরই রোহান এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে, যেটা শুধু তার নিজের জীবন নয়, দিয়ার জীবনও পুরোপুরি বদলে দেবে।
গ্রামের বাড়িতে আসার পর কয়েকটা দিন বেশ অদ্ভুতভাবে কেটে গেল।
দিয়ার জন্য সবকিছুই নতুন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে উঠোনে পা রাখলেই কাঁচা মাটির গন্ধ। দূরে ধানক্ষেত। পুকুরের পানিতে সকালের রোদ। গ্রামের মানুষজনের সহজ-সরল জীবন।
শহরের বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত দিয়া প্রথমদিকে এসব দেখে অবাক হতো।
কিন্তু ধীরে ধীরে তার ভালো লাগতে শুরু করল।
বিশেষ করে রোহানের সঙ্গে সময় কাটানোটা।
রোহান এখন আর তাকে আগের মতো শুধু পড়াশোনার সঙ্গী হিসেবে দেখত না। দিয়ার জীবনে কী ঘটেছে, সেটা সে জানত। তাই তার প্রতি রোহানের আচরণে একটা অদ্ভুত দায়িত্ববোধ চলে এসেছিল।
দিয়া সকালে উঠতে দেরি করলে রোহান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলত,
— দিয়া, উঠেছ?
ভেতর থেকে ঘুমজড়ানো গলায় উত্তর আসত,
— না।
— তাহলে কথা বলছ কীভাবে?
— স্বপ্নের মধ্যে বলছি।
রোহান হেসে ফেলত।
— ওঠো। নাশতা করো।
— তুমি নিয়ে আসো।
— আমি তোমার চাকর?
দিয়া একটু পর দরজা খুলে বলত,
— না। বন্ধু।
রোহান তাকিয়ে থাকত।
দিয়া মুচকি হেসে চলে যেত।
এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই যেন তাদের পুরোনো বন্ধুত্ব আবার ফিরে আসছিল।
কিন্তু ফুফুর মন থেকে দিয়াকে নিয়ে অস্বস্তিটা যাচ্ছিল না।
একদিন দুপুরে ফুফু রোহানকে একা পেয়ে বললেন,
— মেয়েটাকে আর কতদিন রাখবি?
রোহান শান্ত গলায় বলল,
— যতদিন ওর প্রয়োজন।
— তুই বুঝিস না, গ্রামের মানুষ কথা বলবে।
— মানুষ তো সবসময়ই কথা বলে।
— তুই কি ওকে বিয়ে করবি?
প্রশ্নটা শুনে রোহান থমকে গেল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— জানি না।
ফুফু বললেন,
— তাহলে এত দায়িত্ব নিচ্ছিস কেন?
রোহান কোনো উত্তর দিল না।
কারণ সে নিজেও জানত না।
শুধু জানত, দিয়া যখন কষ্ট পায়, তখন তার নিজেরও বুক ভার হয়ে আসে।
আর দিয়া যখন হাসে, তখন অকারণে তার নিজেরও হাসি পায়।
কয়েকদিন পর গ্রামের বাজারে রোহানকে নিয়ে একটা খবর ছড়িয়ে পড়ল।
আসন্ন নির্বাচনে সে সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হতে যাচ্ছে।
খবরটা শুনে দিয়া অবাক।
— তুমি নির্বাচন করবে?
রোহান মাথা চুলকে বলল,
— হ্যাঁ।
— তুমি রাজনীতিতে যাবে?
— কেন? আমি কি পারব না?
দিয়া হাসল।
— পারবে। কিন্তু তুমি তো কথা বলতে গেলেই গুলিয়ে ফেলো।
রোহান মুখ গম্ভীর করে বলল,
— এই জন্যই তো তোমাকে দরকার।
দিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
— আমাকে?
— হ্যাঁ। তুমি আমাকে শেখাবে।
— কী শেখাব?
— মানুষের সামনে কীভাবে কথা বলতে হয়।
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— ঠিক আছে।
তারপর শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়।
দিয়া রোহানের জন্য বক্তৃতা লিখে দিত।
তারপর তাকে দাঁড় করিয়ে বলত,
— এবার বলো।
রোহান কাগজ হাতে নিয়ে দাঁড়াত।
— প্রিয় দেশবাসী...
দিয়া সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দিত।
— না।
— কী হলো?
— তুমি গ্রামের মানুষের সামনে দেশবাসী বলবে কেন?
— তাহলে কী বলব?
— এলাকার মানুষকে নিজের মানুষ মনে করে কথা বলবে।
রোহান মাথা নাড়ল।
— আচ্ছা।
আবার শুরু করল।
— আমার এলাকার প্রিয় মানুষজন...
দিয়া বলল,
— এবার ভালো।
রোহান আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলল,
— আমি আপনাদের সেবা করতে চাই।
দিয়া হাত তুলে থামিয়ে দিল।
— শুধু মুখস্থ কথা বললে হবে না। তুমি কেন সেবা করতে চাও সেটা বলো।
রোহান একটু ভেবে বলল,
— কারণ আমি নিজেও অভাব দেখেছি।
দিয়া চুপ করে গেল।
রোহান এবার নিজের মতো করে বলতে শুরু করল,
— আমি গ্রামের মানুষ। এই মাটির কষ্ট আমি জানি। আমাদের গ্রামের অনেক ছেলে পড়াশোনা করতে পারে না। অনেক পরিবার চিকিৎসা করাতে পারে না। আমি বড়লোক হয়ে জন্মাইনি। আমি ফুফুর কাছে থেকে বড় হয়েছি। তাই আমি জানি, সুযোগ না থাকলে একজন মানুষের জীবন কতটা কঠিন হতে পারে।
দিয়া মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
রোহান থেমে জিজ্ঞেস করল,
— কেমন হলো?
দিয়া ধীরে বলল,
— এটাই বলবে।
— ভালো হয়েছে?
— খুব ভালো।
রোহান হেসে বলল,
— তোমার জন্যই।
দিয়া মাথা নিচু করল।
এরপর প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাদের অনুশীলন চলত।
কখনো উঠোনে দাঁড়িয়ে।
কখনো পুকুরের পাড়ে।
কখনো বাড়ির ছাদে।
দিয়া সামনে বসে থাকত আর রোহান ভাষণ দিত।
একদিন রোহান এত জোরে বক্তৃতা শুরু করল যে পাশের বাড়ির একজন এসে জিজ্ঞেস করল,
— কী হয়েছে রে? কার সঙ্গে ঝগড়া করছিস?
দিয়া হেসে কুটিকুটি।
রোহান বলল,
— আমি বক্তৃতা দিচ্ছি।
লোকটা বলল,
— এত চিৎকার করে?
দিয়া হাসতে হাসতে বলল,
— ওকে আমি এখনো শেখাচ্ছি।
লোকটা চলে যেতেই রোহান বলল,
— তুমি হাসছ কেন?
— কারণ তুমি বলেছিলে, মানুষের মন জয় করবে। আগে মনে হচ্ছে পাশের বাড়ির মানুষের ঘুম হারাম করবে।
রোহানও হেসে ফেলল।
একদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামল।
দিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।
রোহান পাশে এসে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর রোহান বলল,
— তুমি কি আবার শহরে ফিরে যাবে?
দিয়া চমকে তাকাল।
— জানি না।
— বাবার কাছে?
দিয়া মাথা নাড়ল।
— না।
— তাহলে?
দিয়া বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল,
— জানি না।
রোহান আস্তে বলল,
— তুমি চাইলে এখানে থাকতে পারো।
দিয়া তার দিকে তাকাল।
— তোমার ফুফু তো আমাকে পছন্দ করেন না।
— উনি একদিন না একদিন বুঝবেন।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
— তুমি সবকিছু এত সহজ ভাবো কীভাবে?
রোহান বলল,
— কারণ কঠিন করে ভাবলে জীবনটা আরও কঠিন লাগে।
দিয়া কিছু বলল না।
কিন্তু তার চোখে পানি এসে গেল।
রোহান সেটা দেখে অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
— তুমি কাঁদছ কেন?
দিয়া চোখ মুছে বলল,
— অনেকদিন পর মনে হচ্ছে আমি নিরাপদ।
রোহানের বুকটা ভার হয়ে গেল।
সে খুব আস্তে বলল,
— তুমি নিরাপদেই থাকবে।
দিন যেতে লাগল।
রোহানের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলো।
গ্রামের মানুষজন তার সহজ-সরল ব্যবহার পছন্দ করতে শুরু করল।
সে বড় বড় কথা বলত না।
যা জানত, সেটাই বলত।
আর তার প্রতিটা বক্তৃতার পেছনে ছিল দিয়ার পরামর্শ।
কখন কোথায় থামতে হবে।
কখন মানুষের দিকে তাকাতে হবে।
কীভাবে নিজের কথা বলতে হবে।
এমনকি কীভাবে ভুল করলে হাসতে হবে—সেটাও দিয়া তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল।
একদিন প্রচারণা শেষে রোহান ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরল।
দিয়া তার জন্য পানি এনে দিল।
রোহান পানি খেয়ে বলল,
— আজ একজন বৃদ্ধ লোক আমার হাত ধরে বলেছে, “তুই জিতলে আমাদের গ্রামের রাস্তা ঠিক করিস।”
দিয়া বলল,
— তুমি কী বলেছ?
— বলেছি, চেষ্টা করব।
দিয়া মাথা নাড়ল।
— ভালো করেছ। প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে ভাববে।
রোহান হেসে বলল,
— তুমি না থাকলে আমি এতদিনে দশটা ভুল প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলতাম।
দিয়া বলল,
— তাই তো আমি আছি।
কথাটা বলেই দিয়া থেমে গেল।
রোহানও তার দিকে তাকিয়ে রইল।
দুজনের চোখে কিছু একটা ছিল।
কিন্তু কেউ মুখে আনল না।
অবশেষে নির্বাচনের দিন এলো।
সারাদিন উত্তেজনা।
রাতের দিকে ফল ঘোষণা হলো।
রোহান জিতে গেছে।
গ্রামের মানুষ আনন্দে মেতে উঠল।
রোহান বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
সে প্রথমে ফুফুর পা ছুঁয়ে সালাম করল।
ফুফু চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
— তুই সত্যিই পারলি।
তারপর রোহানের চোখ দিয়াকে খুঁজল।
দিয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
তাদের চোখাচোখি হলো।
রোহান এগিয়ে এসে বলল,
— আমি পেরেছি।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
— তুমি না। আমরা পেরেছি।
রোহান কিছু বলতে পারল না।
শুধু তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে।
যে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বসে তার বোকা বোকা কথা শুনে হেসেছিল।
যে তার হয়ে অন্যদের থামিয়েছিল।
যে তাকে পড়াশোনা শিখিয়েছিল।
যে তাকে মানুষের সামনে কথা বলতে শিখিয়েছিল।
আর আজ—
সেই মেয়েটাই তার সবচেয়ে কঠিন সময়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু রোহান তখনও জানত না, এই আনন্দের রাতের পর তাদের জীবনে এমন একটা ঘটনা আসছে, যা আবার তাদের দুজনকে আলাদা করে দেবে।
রোহানের এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর পুরো গ্রাম যেন উৎসবে মেতে উঠেছিল।
বাড়ির উঠোনে সকাল থেকে মানুষের আনাগোনা। কেউ ফুল নিয়ে আসছে, কেউ মিষ্টি। কেউ আবার শুধু একবার রোহানকে কাছে থেকে দেখতে এসেছে।
যে রোহানকে একসময় গ্রামের মানুষ সাধারণ একটা ছেলে হিসেবে চিনত, আজ তার নাম সবাই সম্মানের সঙ্গে উচ্চারণ করছে।
কিন্তু এতসব আনন্দের মাঝেও রোহানের চোখ বারবার একজনকেই খুঁজছিল।
দিয়া।
সে উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে সবার আনন্দ দেখছিল।
রোহান একটু সুযোগ পেয়ে তার কাছে গিয়ে বলল,
— এত চুপচাপ কেন?
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
— তোমার দিন আজ। আমি কেন বেশি কথা বলব?
— তুমি না থাকলে আজকের দিনটা আসত না।
দিয়া মাথা নাড়ল।
— তুমি নিজেই পেরেছ।
রোহান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— তুমি কি জানো, আমার সবচেয়ে বড় ভয় কী?
— কী?
— একদিন তুমি আবার চলে যাবে।
দিয়া চমকে তাকাল।
কিছু বলল না।
রোহানও আর কিছু বলল না।
কয়েকদিন পর রাজধানীতে রোহানের নতুন দায়িত্ব গ্রহণের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলো।
সেখানে এলাকার অনেক মানুষ, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষ উপস্থিত থাকবে।
রোহানকে অনুষ্ঠানের জন্য একটা বক্তৃতা দিতে হবে।
কিন্তু সমস্যা হলো—
সে যতবারই বক্তৃতাটা পড়ছে, ততবারই কোথাও না কোথাও ভুল করছে।
দিয়া সামনে বসে বলল,
— আবার শুরু করো।
রোহান বিরক্ত হয়ে বলল,
— আমি কতবার বলব?
— যতবার ভুল করবে।
— তুমি কি আমাকে মানুষ ভাবো?
দিয়া হেসে বলল,
— মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়।
রোহান কাগজটা হাতে নিয়ে আবার দাঁড়াল।
— সম্মানিত অতিথিবৃন্দ...
দিয়া বলল,
— থামো।
— আবার কী?
— শুরুতেই এত কাঠখোট্টা হয়ে যেও না। মানুষের সঙ্গে কথা বলবে। বক্তৃতা মুখস্থ করবে না।
রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— তাহলে তুমি লিখে দাও।
দিয়া বলল,
— লিখে দিলেই তো হবে না। তোমার নিজের কথা তোমাকেই বলতে হবে।
রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর কাগজটা টেবিলে রেখে বলল,
— তাহলে তুমি সামনে থাকবে।
দিয়া অবাক হয়ে বলল,
— আমি?
— হ্যাঁ। তুমি সামনে থাকলে আমি ভুলব না।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
— ঠিক আছে। থাকব।
অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকেই রোহান ব্যস্ত।
দিয়া তাকে পোশাক ঠিক করে দিল।
টাইটা ঠিকমতো বাঁধা হয়েছে কি না দেখে বলল,
— এত বড় নেতা হয়েও নিজের টাই ঠিক করতে পারো না?
রোহান বলল,
— তুমি আছ কেন?
দিয়া হাসল।
— সবকিছুর জন্য আমাকে ডাকবে না।
রোহান বলল,
— তুমি না থাকলে আমি সত্যিই কিছুই পারি না।
দিয়া থেমে গেল।
তারপর আস্তে বলল,
— পারো। শুধু নিজেকে বিশ্বাস করতে শেখোনি।
রোহান দিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
— আজকে যদি ভালো বক্তৃতা দিতে পারি, তার অর্ধেক কৃতিত্ব তোমার।
— অর্ধেক?
— বাকি অর্ধেক আমার।
দিয়া হেসে ফেলল।
— ঠিক আছে।
সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শুরু হলো।
বিরাট মাঠ মানুষে ভরে গেছে।
মঞ্চে একে একে সবাই বক্তব্য দিচ্ছে।
রোহান পেছনে বসে ছিল।
তার হাতের তালু ঘেমে যাচ্ছিল।
দিয়া সামনের সারিতে বসেছিল।
মাঝে মাঝে রোহানের দিকে তাকিয়ে হাসছিল।
অবশেষে ঘোষকের কণ্ঠ শোনা গেল,
— এখন বক্তব্য রাখবেন আমাদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য, জনাব রোহান...
চারপাশে করতালি শুরু হলো।
রোহান উঠে দাঁড়াল।
মঞ্চে গিয়ে মাইকের সামনে দাঁড়াতেই তার চোখ প্রথমে দিয়াকে খুঁজল।
দিয়া হাত তুলে ইশারা করল—
“শান্ত হও।”
রোহান গভীর শ্বাস নিল।
তারপর বলল,
— আসসালামু আলাইকুম।
পুরো মাঠ শান্ত হয়ে গেল।
রোহান বলতে শুরু করল,
— আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছি একা নয়। আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে সেইসব মানুষ, যারা আমাকে বিশ্বাস করেছে। আমি বড় কোনো পরিবার থেকে আসিনি। আমার জীবনের শুরুটা ছিল খুব সাধারণ। কিন্তু আমি শিখেছি, মানুষের পাশে দাঁড়াতে বড় পরিবার লাগে না, বড় মন লাগে।
দিয়ার চোখে পানি চলে এল।
রোহান বলতে থাকল,
— আমি প্রতিশ্রুতি দেব না যে একদিনে সবকিছু বদলে দেব। কিন্তু আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আপনাদের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করব।
করতালিতে পুরো মাঠ কেঁপে উঠল।
দিয়া উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে লাগল।
রোহানের চোখে তখন শুধু দিয়া।
সে বক্তৃতা শেষ করল।
আর মঞ্চ থেকে নামার সময়ও তার মুখে একটা অদ্ভুত হাসি।
যেন সে জানত—
এই সাফল্যের পেছনে যে মানুষটা আছে, সে ঠিক তার সামনেই বসে আছে।
অনুষ্ঠান শেষ হতে রাত হয়ে গেল।
মানুষজন একে একে বেরিয়ে যেতে লাগল।
রোহান কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছিল।
হঠাৎ তার চোখ দিয়াকে খুঁজল।
সামনের সারি খালি।
দিয়া নেই।
রোহানের বুক কেঁপে উঠল।
সে চারদিকে তাকাল।
— দিয়া কোথায়?
কেউ জানে না।
সে অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে গেল।
এদিক-ওদিক খুঁজল।
কোথাও নেই।
রোহান দ্রুত দিয়ার ফোনে কল করল।
ফোন বন্ধ।
তারপর সে দিয়ার বান্ধবীকে ফোন করল।
— হ্যালো?
— হ্যাঁ রোহান?
— দিয়া কোথায়?
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
— আমি জানি না।
রোহান বিরক্ত হয়ে বলল,
— তুমি ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তুমি জানো না?
— সত্যি জানি না।
— শেষবার কখন কথা হয়েছে?
— কয়েকদিন আগে।
রোহান ফোন কেটে দিল।
তার মনে অজানা একটা ভয় ঢুকে গেল।
সেই রাতটা রোহান ঘুমাতে পারল না।
পরদিনও দিয়ার কোনো খবর নেই।
একদিন।
দুইদিন।
এক সপ্তাহ।
দিয়া যেন হঠাৎ পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল।
রোহান বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
কেউ জানে না।
দিয়ার বাড়িতে যাওয়ার কথা ভাবল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত গেল না।
কারণ সে জানত, দিয়ার বাবা হয়তো তাকে কিছুই বলবেন না।
দিনের পর দিন কেটে গেল।
রোহান কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখল।
কিন্তু রাত হলেই তার মনে পড়ত দিয়ার কথা।
একদিন সে আবার দিয়ার বান্ধবীকে ফোন করল।
— এবার সত্যি বলো। দিয়া কোথায়?
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতার পর মেয়েটা বলল,
— রোহান...
— বলো।
— দিয়া নিউইয়র্ক চলে গেছে।
রোহান যেন কিছু শুনতেই পেল না।
— কী?
— অনেকদিন ধরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কাউকে বলতে চায়নি।
— কেন?
— সেটা আমি জানি না।
রোহান চুপ হয়ে গেল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— সে আমাকে একটা কথাও বলল না?
— না।
ফোন কেটে গেল।
রোহান অনেকক্ষণ একই জায়গায় বসে রইল।
তারপর নিজের মনে বলল,
— তুমি আবার আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, দিয়া।
পরদিন ভোরেই রোহান সিদ্ধান্ত নিল।
সে নিউইয়র্ক যাবে।
কেউ তাকে থামাতে পারল না।
তার কাছে কোনো ঠিকানা নেই।
শুধু জানে—
দিয়া নিউইয়র্কে আছে।
আর একটা মানুষকে খুঁজে পাওয়ার জন্য কখনো কখনো ঠিকানার চেয়েও বেশি দরকার হয় বিশ্বাস।
রোহান সেই বিশ্বাস নিয়েই রওনা হলো।
তার মনে একটাই কথা—
“এইবার তোমাকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমি ফিরব না।”
নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েকটা দিন রোহানের কাছে যেন দুঃস্বপ্নের মতো কাটল।
এত বড় শহর।
এত মানুষ।
এত রাস্তা।
আর সেই বিশাল শহরের কোথাও একজন মানুষ আছে, যাকে সে খুঁজছে—কিন্তু তার কাছে কোনো ঠিকানা নেই।
শুধু একটা নাম।
দিয়া।
বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর রোহান কিছুক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
চারপাশে মানুষ ছুটছে।
কেউ ট্যাক্সি ধরছে, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ নিজের গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে।
রোহান শুধু ভাবছিল—
এই শহরের কোথায় আছে দিয়া?
সে দিয়ার বান্ধবীকে আবার ফোন করল।
— তুমি কি ওর কোনো ঠিকানা জানো?
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
— না। শুধু জানি, নিউইয়র্কে একটা কোর্স করার জন্য গিয়েছিল।
— কোন এলাকায়?
— সেটাও জানি না।
রোহান হতাশ হয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
কিন্তু হাল ছাড়ল না।
প্রথম দিন সে কয়েকটা জায়গায় গেল।
দিয়া আগে যেসব বিষয় নিয়ে আগ্রহী ছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করল।
বিশ্ববিদ্যালয়।
লাইব্রেরি।
ক্যাফে।
পার্ক।
কমিউনিটি সেন্টার।
যেখানে মনে হলো দিয়া যেতে পারে, সেখানেই গেল।
কখনো কাউকে তার ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করত,
— আপনি কি এই মেয়েটাকে দেখেছেন?
কেউ মাথা নাড়ত।
কেউ ছবিটা দেখে বলত,
— দুঃখিত, মনে পড়ছে না।
রোহান প্রতিবারই ধন্যবাদ দিয়ে সরে আসত।
রাতে হোটেলে ফিরে সে বিছানায় বসে দিয়ার ছবি দেখত।
একটা ছবিতে দিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ছে।
আরেকটায় সে হাসছে।
আরেকটায় রোহানের সঙ্গে দূর থেকে তোলা একটা ছবি।
ছবিটা দেখে রোহানের বুকটা কেমন করে উঠল।
সে নিজের মনে বলল,
— তুমি কেন চলে গেলে?
এক সপ্তাহ কেটে গেল।
রোহানের খোঁজার কোনো ফল হলো না।
তবুও প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে পড়ত।
কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে বেড়াত।
কখনো বাসে উঠত।
কখনো ট্রেনে।
নিউইয়র্কের বিশাল শহর তার কাছে যেন একটা গোলকধাঁধা।
একদিন প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে রোহান একটা পার্কের বেঞ্চে বসে ছিল।
হঠাৎ তার চোখ দূরের একটা মেয়ের ওপর আটকে গেল।
দিয়ার মতো দেখতে।
একইরকম চুল।
একইরকম হাঁটার ভঙ্গি।
রোহানের বুক ধক করে উঠল।
সে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
— দিয়া!
মেয়েটা ঘুরল না।
রোহান দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু ভিড়ের মধ্যে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মেয়েটা হারিয়ে গেল।
রোহান এদিক-ওদিক তাকাল।
কোথাও নেই।
সে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
নিজেকে বোঝাল—
“না, এটা দিয়া ছিল না।”
কিন্তু তার মন বলছিল—
“ওটাই ছিল।”
এরপর আরও কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।
রোহান ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল।
কাজের দায়িত্বও ছিল।
কিন্তু সে ফিরে যেতে চাইছিল না।
একদিন সন্ধ্যায় সে একটা রাস্তার পাশে বেঞ্চে বসে ছিল।
শীতের হাওয়া বইছে।
মানুষজন দ্রুত হাঁটছে।
কেউ তাকে খেয়াল করছে না।
রোহান মাথা নিচু করে বসে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, সে যেন পুরো পৃথিবীর ভিড়ে একা।
হঠাৎ—
তার চোখ আবার থেমে গেল।
রাস্তার ওপারে একটা মেয়ে হাঁটছে।
রোহান উঠে দাঁড়াল।
মেয়েটার হাঁটার ভঙ্গি।
চুল।
শরীরের গড়ন।
সবকিছু যেন পরিচিত।
রোহান এবার নিশ্চিত হতে চাইছিল।
সে রাস্তা পার হয়ে মেয়েটার পেছনে হাঁটতে শুরু করল।
মেয়েটা একটা মোড় ঘুরল।
রোহানও ঘুরল।
কিন্তু সামনে গিয়ে দেখল—
কেউ নেই।
তার বুকটা ভার হয়ে গেল।
সে চারদিকে তাকাল।
একটা ছোট্ট দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করল,
— এইমাত্র একটা মেয়ে এখানে দিয়ে গেল। দেখেছেন?
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
— না।
রোহান আবার হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু এবারও মেয়েটাকে পেল না।
সেই রাতেই সে হোটেলে ফিরে গিয়ে প্রথমবার ভেঙে পড়ল।
বিছানার পাশে বসে নিজের মুখ দুহাতে ঢেকে কাঁদতে লাগল।
সে কখনো ভাবেনি, একজন মানুষকে হারানোর কষ্ট এতটা হতে পারে।
তার মনে পড়ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলো।
দিয়ার প্রথম কথা—
“আমি দিয়া।”
তারপর একসঙ্গে পড়া।
দিয়ার হাতে তার খাতা।
তার বোকা বোকা কথা শুনে দিয়ার হাসি।
তার জন্মদিনের ছোট্ট উপহার।
দিয়ার বাবার অপমান।
তারপর দিয়ার ফিরে আসা।
গ্রামের বাড়ির উঠোন।
বৃষ্টির দিন।
তার বক্তৃতা শেখানো।
আর শেষ পর্যন্ত—
মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে হাততালি দেওয়া দিয়া।
রোহানের চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।
সে ফিসফিস করে বলল,
— তুমি যদি আমাকে ছেড়ে যেতে চেয়েই থাকো, তাহলে ফিরে এসেছিলে কেন?
কোনো উত্তর এল না।
পরদিন সকালেও রোহান বের হলো।
এবার সে শহরের অন্য প্রান্তে গেল।
অনেক দূরে একটা বড় লেকের পাশে এসে দাঁড়াল।
জায়গাটা তুলনামূলক শান্ত।
শহরের কোলাহল এখানে অনেকটাই কম।
লেকের পানিতে আলো ঝিকমিক করছে।
দূরে কিছু মানুষ হাঁটছে।
রোহান ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল।
হঠাৎ তার মনে হলো—
এখানে দিয়া থাকলে ভালোবাসত।
কারণ দিয়া শান্ত জায়গা পছন্দ করত।
সে লেকের পাশে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর তার চোখে পানি চলে এল।
সে মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল।
— কেন গেলে তুমি?
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
— আমি তো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি।
সে চোখ মুছে আবার বলল,
— তুমি আমাকে একটা সুযোগও দিলে না।
বাতাসে তার কথাগুলো মিলিয়ে গেল।
রোহান অনেকক্ষণ সেখানেই বসে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
চোখের পানি মুছে পেছনে ঘুরতেই—
সে থমকে গেল।
কয়েক গজ দূরে একটা মেয়ে বেঞ্চে বসে আছে।
মেয়েটার হাতে খাবারের ছোট প্যাকেট।
সে লেকের পানির দিকে ছুড়ে দিচ্ছে।
হাঁসগুলো পানিতে সাঁতার কাটতে কাটতে তার কাছে আসছে।
রোহানের বুকের ভেতর যেন আচমকা সবকিছু থেমে গেল।
চুলগুলো বাতাসে উড়ছে।
মুখটা পাশ ফিরে আছে।
কিন্তু এই মুখটা সে ভুলতে পারেনি।
কখনোই পারেনি।
রোহানের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
সে খুব আস্তে বলল,
— দিয়া?
মেয়েটা নড়ল না।
রোহান আবার ডাকল,
— দিয়া...
এবার মেয়েটার হাত থেমে গেল।
ধীরে ধীরে সে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল।
রোহানের সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো।
কয়েক সেকেন্ড দুজনেই স্থির।
দিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
তার হাতে থাকা খাবারের প্যাকেটটা মাটিতে পড়ে গেল।
রোহান আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে দৌড়ে দিয়ার কাছে গেল।
দিয়া উঠে দাঁড়ানোর আগেই রোহান তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
তার বুক কেঁপে উঠছিল।
চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছিল।
রোহান কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমি তোমাকে কতদিন ধরে খুঁজছি জানো?
দিয়া কোনো কথা বলল না।
রোহান আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে কেন?
দিয়ার চোখেও পানি এসে গেল।
রোহান কাঁপা গলায় বলল,
— আমি তোমাকে ভালোবাসি, দিয়া।
কথাটা বলেই সে চোখ বন্ধ করল।
— আমি তোমাকে ভালোবাসি। অনেকদিন ধরে। শুধু বলতে পারিনি।
দিয়া চোখের পানি মুছে তার দিকে তাকাল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— তোমার ভালোর জন্যই তোমাকে ছেড়ে এসেছিলাম।
রোহান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
— আমার ভালো?
দিয়া মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ।
— আমাকে না বলে?
দিয়া কিছু বলল না।
রোহান তার হাত ধরে বলল,
— এবার আর আমাকে ছেড়ে যেও না।
দিয়ার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে কিছু বলতে যাচ্ছিল।
কিন্তু রোহান তখনও তার হাত শক্ত করে ধরে ছিল।
দুজনের সামনে বিশাল লেক।
পেছনে শহরের আলো।
আর বহুদিন পর—
তারা আবার একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে।
তবে দিয়ার মনে এখনো একটা কথা ছিল, যেটা সে রোহানকে বলতে পারেনি।
কেন সে আসলে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল?
সেই উত্তরটা জানার পর হয়তো রোহান বুঝতে পারবে—
দিয়া তাকে ছেড়ে যায়নি।
বরং নিজের ভালোবাসাকে বাঁচাতেই দূরে সরে গিয়েছিল।
লেকের ধারে কয়েক মুহূর্ত যেন সময় থেমে ছিল।
রোহানের হাত তখনও দিয়ার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
এতদিনের অপেক্ষা, কষ্ট, অভিমান—সবকিছু যেন একসঙ্গে এসে বুকের ভেতর জমাট বেঁধে ছিল।
রোহান দিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে কেন?
দিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।
— বলেছি তো, তোমার ভালোর জন্য।
— এই কথাটা আমি বুঝতে পারছি না।
— বুঝবে।
— তাহলে বুঝিয়ে বলো।
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— তুমি এমপি হওয়ার পর তোমার জীবন বদলে গিয়েছিল, রোহান। মানুষ তোমাকে চিনতে শুরু করেছিল। তোমার সামনে নতুন নতুন সুযোগ আসছিল। আর আমি?
রোহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— তুমি আমার কাছে কী ছিলে, সেটা তুমি জানো না?
দিয়া চোখ তুলে তাকাল।
— জানতাম।
— তাহলে?
দিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আমি ভয় পেয়েছিলাম।
— কিসের ভয়?
— তোমার ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়।
রোহান কিছু বুঝতে পারল না।
দিয়া বলল,
— তোমার ফুফু আমাকে পছন্দ করতেন না। তোমার রাজনৈতিক জীবনে আমার উপস্থিতি নিয়ে গ্রামের মানুষ কথা বলছিল। তোমার বিরোধীরা তোমাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছিল। তারা বলতে শুরু করেছিল, তুমি নাকি একজন ডিভোর্সি মেয়েকে নিয়ে থাকো। তোমার চরিত্র নিয়ে কথা বলবে, তোমার পরিবার নিয়ে কথা বলবে—এসব আমি শুনেছিলাম।
রোহান চুপ হয়ে গেল।
দিয়া বলল,
— আমি চাইনি আমার জন্য তুমি তোমার জায়গাটা হারাও।
রোহান ধীরে বলল,
— তাই তুমি আমাকে না জানিয়ে চলে গেলে?
— হ্যাঁ।
— তুমি কি একবারও ভাবোনি, তোমার চলে যাওয়ায় আমি কী অবস্থায় থাকব?
দিয়া চোখের পানি মুছে বলল,
— ভেবেছি।
— তাহলে?
— প্রতিদিন ভেবেছি।
রোহান আর কথা বলতে পারল না।
দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব থাকল।
লেকের পানিতে হাঁসগুলো ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল।
রোহান মাটিতে পড়ে থাকা খাবারের প্যাকেটটা তুলে দিলিয়াকে দিল।
— তুমি এখনো হাঁসকে খাবার দাও?
দিয়া মৃদু হাসল।
— হ্যাঁ। ছোটবেলায় ভালো লাগত। এখানে এসে আবার শুরু করেছি।
রোহানও হেসে ফেলল।
— তুমি একদম বদলাওনি।
দিয়া বলল,
— তুমিও না।
— আমি তো অনেক বদলেছি।
— না। তুমি এখনো ভোলাভালা।
রোহান হেসে বলল,
— আর তুমি এখনো আমাকে বকা দাও।
দিয়া এবার সত্যি করে হেসে উঠল।
অনেকদিন পর রোহানের মনে হলো, তার পৃথিবীটা আবার স্বাভাবিক হচ্ছে।
সেদিন তারা অনেকক্ষণ লেকের পাশে বসে কথা বলল।
রোহান তার গত কয়েক মাসের কথা বলল।
কীভাবে সে দিয়াকে খুঁজেছে।
কীভাবে প্রতিদিন নতুন জায়গায় গিয়ে তার ছবি দেখিয়েছে।
কীভাবে কখনো কখনো দূর থেকে কাউকে দেখে মনে হয়েছে, দিয়া।
দিয়া চুপ করে শুনছিল।
একসময় সে বলল,
— তুমি এত কষ্ট করলে কেন?
রোহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— কারণ তুমি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
দিয়া বলল,
— শুধু বন্ধু হিসেবে?
রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
— তুমি কি এখনো সেটা বিশ্বাস করো?
দিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।
তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।
রোহান বলল,
— আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন থেকেই তোমাকে পছন্দ করতাম।
দিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
— প্রথম দিন থেকেই?
— হ্যাঁ।
— তখন তো তুমি আমার নামও জানতে না।
— নাম না জানলেও মানুষকে ভালো লাগতে পারে।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
— তুমি তখন আমাকে অনুসরণ করতে?
রোহান লজ্জা পেয়ে বলল,
— একটু।
— একটু?
— আচ্ছা, অনেকটা।
দিয়া হেসে ফেলল।
— আমি জানতাম।
রোহান চোখ বড় করে বলল,
— জানতেও?
— তুমি খুব গোপন করে করতে না।
— তাহলে তুমি কিছু বলোনি কেন?
— দেখতে ভালো লাগত।
রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— তুমি আমাকে এতদিন ধরে বোকা বানিয়েছ!
দিয়া হেসে বলল,
— তুমি নিজেই বোকা ছিলে।
রাত নামতে শুরু করল।
দিয়া বলল,
— তোমার হোটেলে ফিরে যাও।
রোহান মাথা নাড়ল।
— তুমি কোথায় থাকবে?
— আমি একটা ছোট অ্যাপার্টমেন্টে থাকি।
— ঠিকানা দাও।
দিয়া অবাক হলো।
— কেন?
— কাল তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসব।
দিয়া একটু ভেবে ঠিকানা দিল।
পরদিন থেকে তাদের নতুন জীবন শুরু হলো।
রোহান নিউইয়র্কে আরও কিছুদিন থাকার সিদ্ধান্ত নিল।
সে দিয়ার সঙ্গে সময় কাটাতে লাগল।
দিয়া তাকে শহরের নানা জায়গা ঘুরিয়ে দেখাল।
রোহানও নিজের দেশের গ্রামের গল্প করত।
কখনো তারা রাস্তার পাশে বসে কফি খেত।
কখনো বইয়ের দোকানে ঘুরত।
কখনো নদীর ধারে দাঁড়িয়ে শহরের আলো দেখত।
একদিন দিয়া বলল,
— তুমি কি দেশে ফিরে যাবে?
রোহান বলল,
— হ্যাঁ।
— কখন?
— তুমি গেলে।
দিয়া থেমে গেল।
— আমি?
— তুমি ছাড়া যাব না।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
— আমার তো এখানে কিছু কাজ আছে।
— শেষ করো।
— তারপর?
— তারপর আমার সঙ্গে চলো।
দিয়া কিছু বলল না।
কয়েকদিন পর রোহান দিয়ার ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে গেল।
সেখানে একটা টেবিলের ওপর পুরোনো কিছু জিনিস রাখা।
রোহান হঠাৎ একটা পরিচিত বাক্স দেখতে পেল।
সে তুলে নিল।
বাক্সটা খুলতেই ভেতরে সেই কলম।
যেটা সে দিয়ার জন্মদিনে দিয়েছিল।
রোহান স্তব্ধ হয়ে গেল।
— তুমি এটা রেখেছ?
দিয়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
— হ্যাঁ।
— এতদিন?
— হ্যাঁ।
রোহান কলমটা হাতে নিয়ে বলল,
— তুমি তো বলেছিলে এটা শুধু একটা কলম।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
— তখন মিথ্যা বলেছিলাম।
— কেন?
— কারণ তুমি যেদিন আমাকে এটা দিয়েছিলে, সেদিন আমি প্রথমবার বুঝেছিলাম—কেউ আমার জন্য দামি কিছু নয়, নিজের সামর্থ্যের মধ্যে সবচেয়ে যত্নের জিনিসটা বেছে নিতে পারে।
রোহানের চোখ ভিজে উঠল।
সে কলমটা আবার দিয়ার হাতে দিয়ে বলল,
— এটা তুমি রেখো।
দিয়া বলল,
— এটা তো আমারই।
রোহান হেসে বলল,
— হ্যাঁ। সবসময়ই ছিল।
কয়েকদিন পর দেশে ফেরার প্রস্তুতি শুরু হলো।
রোহান ফুফুকে ফোন করল।
— ফুফু, আমি ফিরছি।
ওপাশ থেকে ফুফু বললেন,
— একা?
রোহান একটু থেমে বলল,
— না।
ফুফু বুঝতে পারলেন।
— দিয়া আসছে?
রোহান বলল,
— হ্যাঁ।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর ফুফু বললেন,
— তুই সুখী তো?
রোহান মৃদু হেসে বলল,
— অনেক।
ফুফু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— তাহলে নিয়ে আয়।
রোহান অবাক হয়ে গেল।
— সত্যি?
— হ্যাঁ। এতদিন বুঝিনি। মানুষকে সমাজ কী বলবে সেটা ভেবে বিচার করেছি। এবার বুঝেছি, তোর সুখটাই বড়।
রোহানের চোখে পানি চলে এল।
— ফুফু...
— আর দেরি করিস না।
ফোন কেটে গেল।
দিয়া পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
তার চোখেও পানি।
রোহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— এবার আর তোমাকে কেউ থামাতে পারবে না।
দিয়া আস্তে বলল,
— আমিও আর যাব না।
রোহান তার হাত ধরল।
কিন্তু দেশে ফেরার আগে তাদের সামনে ছিল আরও একটা কঠিন কাজ—
দিয়ার বাবার মুখোমুখি হওয়া।
কারণ রোহান জানত, মানুষ বদলাতে পারে।
কিন্তু বহু বছরের অহংকার বদলানো সহজ নয়।
আর দিয়ার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে রোহান এবার আর সেই ভোলাভালা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেটা থাকবে না।
সে নিজের জায়গা তৈরি করেছে।
তবু তার মনে একটাই প্রশ্ন—
দিয়ার বাবা কি এবারও তাকে অযোগ্য বলবেন?
নাকি মেয়ের চোখের সুখ দেখে অবশেষে বুঝবেন, যোগ্যতা শুধু অর্থ আর বংশে হয় না?
দেশে ফেরার দিনটা দিয়ার কাছে অদ্ভুত লাগছিল।
বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার সময় সে বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল।
এই শহর তাকে অনেক কিছু দিয়েছে।
নতুন জীবন দিয়েছে।
একাকিত্ব দিয়েছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা—রোহানকে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে।
রোহান পাশের সিটে বসে ছিল।
হঠাৎ দিয়া বলল,
— রোহান?
— হুম?
— তুমি কি সত্যিই মনে করো সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে?
রোহান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— সবকিছু একদিনে ঠিক হয় না।
— তাহলে?
— আমরা চেষ্টা করব।
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— যদি বাবা তোমাকে আবার অপমান করেন?
রোহান এবার
দিয়া প্রশ্নটা করার পর রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
বিমানের জানালার বাইরে মেঘের সাদা স্তর।
তারপর রোহান দিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোমার বাবা যদি আমাকে আবার অপমান করেন, আমি এবারও মাথা নিচু করব।
দিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
— কেন?
— কারণ আমি তোমার বাবাকে হারাতে চাই না। আমি চাই একদিন উনি নিজের ইচ্ছায় আমাকে মেনে নিন।
দিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
— আর যদি উনি না মানেন?
রোহান তার হাতটা ধরে বলল,
— তাহলে তোমার সিদ্ধান্তই শেষ কথা।
দিয়া কিছু বলল না।
শুধু তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
দেশে ফিরে প্রথম কয়েকদিন রোহান আর দিয়া গ্রামের বাড়িতেই থাকল।
ফুফু এবার দিয়াকে আগের মতো দেখতেন না।
সকালে দিয়া রান্নাঘরে গেলে ফুফু নিজে থেকে বলতেন,
— থাক, আমি করছি। তুমি চা বানিয়ে রোহানকে দাও।
দিয়া অবাক হয়ে হাসত।
— ফুফু, আমি পারি।
— জানি।
এই ছোট্ট কথাটুকুই দিয়ার কাছে অনেক বড় হয়ে উঠেছিল।
একদিন ফুফু তাকে একা পেয়ে বললেন,
— তোকে একটা কথা বলব?
দিয়া মাথা নাড়ল।
— বলুন।
— সেদিন তোকে অনেক কথা বলেছিলাম। মাফ করে দিস।
দিয়ার চোখে পানি চলে এল।
— আপনি আমাকে তখন চিনতেন না।
ফুফু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— মানুষকে না চিনেই বিচার করে ফেলেছিলাম।
দিয়া তার হাত ধরল।
— এখন তো চেনেন।
ফুফু মৃদু হেসে বললেন,
— এখন বুঝি, তুই রোহানের জীবনে আসার পর ছেলেটা বদলায়নি। বরং নিজের আসল রূপটা খুঁজে পেয়েছে।
দিয়া মাথা নিচু করে হাসল।
কয়েকদিন পর রোহান সিদ্ধান্ত নিল দিয়ার বাবার সঙ্গে দেখা করবে।
দিয়া ভয় পাচ্ছিল।
— আমি কি তোমার সঙ্গে যাব?
রোহান বলল,
— অবশ্যই।
দুজন গাড়িতে করে শহরের দিকে রওনা হলো।
দিয়ার বাবার বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই তার বুক ধক করে উঠল।
এই বাড়ি থেকেই একদিন রোহান চোখের পানি নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।
সেই দিনের কথা মনে পড়তেই দিয়ার চোখে পানি এসে গেল।
রোহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভয় পেয়ো না।
— তুমি?
— আমি তো তোমার পাশেই আছি।
দুজন ভেতরে ঢুকল।
দিয়ার বাবা ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন।
মেয়েকে দেখে প্রথমে তিনি অবাক হলেন।
তারপর রোহানের দিকে তাকালেন।
ঘরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
শেষে দিয়ার বাবা বললেন,
— তুমি আবার এসেছ?
রোহান শান্তভাবে বলল,
— জি।
— এবার কী চাও?
রোহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আপনার মেয়েকে।
দিয়ার বাবা কঠিন চোখে তাকালেন।
— তুমি কি মনে করো, এমপি হয়ে গেছ বলে তুমি যোগ্য হয়ে গেছ?
রোহান মাথা নাড়ল।
— না।
— তাহলে?
— আপনার মেয়েকে ভালোবাসার জন্য এমপি হওয়া লাগে না।
দিয়ার বাবা চুপ করে গেলেন।
রোহান বলল,
— সেদিন আপনি আমাকে বলেছিলেন, আমার কোনো যোগ্যতা নেই। তখন আমি খুব কেঁদেছিলাম। মনে হয়েছিল, হয়তো সত্যিই আমি ছোট। কিন্তু পরে বুঝেছি, মানুষের যোগ্যতা শুধু টাকা, বাড়ি বা পরিচয়ে হয় না।
সে দিয়ার দিকে তাকাল।
— একজন মানুষ বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়াতে পারা, তাকে সম্মান করতে পারা, তার হাত ছেড়ে না দেওয়া—আমার কাছে যোগ্যতা মানে এগুলো।
দিয়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
দিয়ার বাবা এবার মেয়ের দিকে তাকালেন।
— তুমি কি সত্যিই ওর সঙ্গে থাকতে চাও?
দিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— হ্যাঁ, বাবা।
— সবকিছু জেনেও?
— হ্যাঁ।
— ওর জীবন সহজ হবে না।
দিয়া রোহানের হাত ধরল।
— আমার জীবনও সহজ ছিল না। কিন্তু ওর সঙ্গে থাকলে অন্তত একা থাকব না।
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।
দিয়ার বাবা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
রোহানের সামনে এসে থামলেন।
তারপর বললেন,
— সেদিন আমি ভুল করেছিলাম।
রোহান কিছু বলতে পারল না।
— তোমাকে আমি তোমার পোশাক, পরিবার আর সামর্থ্য দিয়ে বিচার করেছিলাম। আজ বুঝছি, আমার মেয়ের পাশে দাঁড়ানোর মতো সাহস তোমার ছিল, আমার ছিল না।
রোহানের চোখ ভিজে উঠল।
দিয়ার বাবা হাত বাড়িয়ে দিলেন।
— আমাকে ক্ষমা করো।
রোহান সেই হাত দুহাতে ধরে ফেলল।
— আপনি আমার বড়। আপনার ওপর আমার কোনো রাগ নেই।
দিয়ার বাবা এবার মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
— সুখী হোস।
দিয়া কেঁদে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
কয়েক মাস পর রোহান আর দিয়ার বিয়ের আয়োজন হলো।
এবার কোনো বাধা ছিল না।
ফুফু নিজ হাতে দিয়ার জন্য শাড়ি পছন্দ করলেন।
দিয়ার বাবা নিজে এসে রোহানের সঙ্গে বসে বিয়ের সব আয়োজন করলেন।
বিয়ের দিন রোহানকে দেখে তার এক বন্ধু মজা করে বলল,
— কী রে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ভোলাভালা রোহান কোথায়?
রোহান হেসে বলল,
— আছে। তবে এখন তাকে একজন খুব বুদ্ধিমান মানুষ সামলায়।
দূরে দাঁড়িয়ে দিয়া কথাটা শুনে হেসে ফেলল।
রোহান তার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করল।
দিয়া মাথা নিচু করে ফেলল।
বিয়ের পরের সন্ধ্যায় দুজন গ্রামের সেই পুকুরপাড়ে বসেছিল।
যেখানে একসময় তারা বক্তৃতার অনুশীলন করত।
রোহান বলল,
— মনে আছে? তুমি আমাকে শেখাতে কীভাবে মানুষের সামনে কথা বলতে হয়।
দিয়া হাসল।
— তুমি তখন একটা কথাও ঠিকমতো বলতে পারতে না।
— এখন পারি।
— কে শিখিয়েছে?
রোহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— যে মেয়েটা আমাকে প্রথম দিন থেকেই বুঝত।
দিয়া চুপ করে গেল।
রোহান বলল,
— একটা কথা বলব?
— বলো।
— তুমি যদি সেদিন আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব না করতে, তাহলে আমার জীবনটা কেমন হতো জানি না।
দিয়া মৃদু হেসে বলল,
— আর তুমি যদি সেদিন আমাকে অনুসরণ না করতে, তাহলে আমার জীবনটাও হয়তো অন্যরকম হতো।
রোহান অবাক হয়ে বলল,
— তুমি সেটা জানতেও?
দিয়া হাসল।
— বলেছি তো, তুমি খুব গোপন করে কিছু করতে পারতে না।
দুজনেই হেসে উঠল।
তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।
রোহান দিয়ার হাতটা ধরল।
— এবার কিন্তু কোথাও যাবে না।
দিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— না।
— প্রতিশ্রুতি?
দিয়া মাথা নাড়ল।
— প্রতিশ্রুতি।
কিন্তু রোহান জানত না, তাদের গল্প এখানেই শেষ নয়।
কারণ ভালোবাসার গল্পে কখনো কখনো শেষটা বিয়েতে হয় না।
কখনো শেষটা হয় সেই মুহূর্তে—
যখন দুজন মানুষ বুঝতে পারে, পৃথিবী তাদের যতবারই আলাদা করুক, শেষ পর্যন্ত তারা একে অপরের কাছেই ফিরে আসবে।
....