শহুরে ছেলের পাহাড়ি বউ

পাহাড়ের সকালটা যেন অন্যরকম।

শহরের মতো এখানে গাড়ির হর্ন নেই, মানুষের ব্যস্ততা নেই, নেই আকাশ ছোঁয়া দালানকোঠা। চারপাশে শুধু সবুজ পাহাড়, সরু আঁকাবাঁকা পথ, দূরে ঝরনার শব্দ আর ভোরের কুয়াশায় ঢাকা অসংখ্য গাছপালা।

পাহাড়ের একদম নিরিবিলি একটা জায়গায় ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর।

ঘরটা এতটাই ছোট যে একসঙ্গে দুজনের বেশি মানুষ থাকলে জায়গা কম পড়ে যায়। বাঁশ আর কাঠ দিয়ে তৈরি ঘরটার ছাদে পুরোনো টিন। দরজার সামনে ছোট্ট একটা উঠান। উঠানের এক পাশে কয়েকটা ফুলগাছ, অন্য পাশে শুকনো কাঠের স্তূপ।

এই ছোট্ট ঘরেই থাকত ইশা।

তার সঙ্গে তার দাদি।

ইশার বাবা-মা অনেক বছর আগেই মারা গিয়েছিল। তখন থেকেই দাদিই ছিল তার পৃথিবী।

ভোর হলেই ইশা ঘুম থেকে উঠে পড়ত। প্রথমে উঠানে পানি ছিটিয়ে পরিষ্কার করত। তারপর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটু নিচে নেমে ঝরনা থেকে পানি নিয়ে আসত।

সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।

মাটির কলসটা হাতে নিয়ে ইশা যখন ঝরনার দিকে যাচ্ছিল, তখন তার পরনে ছিল সাদামাটা একটা নীল সালোয়ার-কামিজ। লম্বা চুলগুলো একটা বেণি করে পিঠের ওপর ফেলে রেখেছিল।

পাহাড়ি বাতাসে তার বেণিটা বারবার দুলছিল।

ঝরনার কাছে গিয়ে পানি ভরার সময় ইশা হঠাৎ থেমে গেল।

দূর থেকে গাড়ির শব্দ আসছে।

পাহাড়ের এই নির্জন এলাকায় গাড়ির শব্দ খুব একটা শোনা যায় না।

ইশা কপাল কুঁচকে দূরের রাস্তার দিকে তাকাল।

একটা কালো গাড়ি পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে দ্রুতগতিতে উঠে আসছে।

গাড়ির ভেতরে বসে থাকা ছেলেটার নাম আদিত্য।

সবাই তাকে আদিই বলে ডাকে।

শহরের বড় ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে সে। ছোটবেলা থেকেই কোনো কিছুর অভাব হয়নি তার। দামি গাড়ি, বড় বাড়ি, ভালো পড়াশোনা—সবই ছিল।

কিন্তু একটা জিনিস তার খুব পছন্দ ছিল।

অজানা জায়গায় ঘুরে বেড়ানো।

আর সেই কারণেই কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে একাই গাড়ি নিয়ে পাহাড়ে বেরিয়ে পড়েছিল সে।

গাড়ি চালাতে চালাতে আদির চোখে ছিল অদ্ভুত এক আনন্দ।

—এই জায়গাটা সত্যিই অসাধারণ!

সে গাড়ির জানালা নামিয়ে দিল।

পাহাড়ি বাতাস এসে মুখে লাগতেই চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড হাসল।

কিন্তু সেই হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

সামনের রাস্তার একটা বাঁকে হঠাৎ গাড়ির চাকা পাথরের ওপর উঠে গেল।

আদি দ্রুত স্টিয়ারিং ঘোরাল।

গাড়িটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল।

—শিট!

একটা প্রচণ্ড শব্দ হলো।

গাড়িটা রাস্তার পাশের একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল।

কয়েক মুহূর্ত সবকিছু নিস্তব্ধ।

আদি স্টিয়ারিংয়ের ওপর মাথা রেখে বসে রইল।

কপালের পাশে তীব্র ব্যথা অনুভব করল সে।

ধীরে ধীরে দরজা খুলে গাড়ি থেকে নামার চেষ্টা করল।

কিন্তু দুই পা মাটিতে রাখতেই মাথাটা ঘুরে গেল।

সে রাস্তার পাশে বসে পড়ল।

এদিকে ঝরনা থেকে পানি নিয়ে ফেরার পথে ইশা হঠাৎ দুর্ঘটনার শব্দ শুনেছিল।

কলসটা মাটিতে রেখে সে দৌড়ে সেই দিকে গেল।

কিছুদূর যেতেই দেখতে পেল একটা কালো গাড়ি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

গাড়ির পাশে একটা ছেলে বসে আছে।

ইশা দ্রুত তার কাছে গেল।

—আপনি ঠিক আছেন?

আদি মাথা তুলে তাকাল।

প্রথম দেখাতেই সে থমকে গেল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার চোখে অদ্ভুত শান্তি।

চেহারায় কোনো সাজসজ্জা নেই, অথচ পাহাড়ের সকালের আলোয় তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল।

ইশা আবার বলল,

—আপনার মাথায় রক্ত বের হচ্ছে!

আদি হাত দিয়ে কপাল ছুঁয়ে দেখল।

আঙুলে রক্ত লেগে গেল।

—মনে হয় একটু কেটে গেছে।

—একটু?

ইশা বিরক্ত চোখে তাকাল।

—এভাবে বসে থাকলে তো আরও রক্ত বের হবে। উঠতে পারবেন?

আদি দাঁড়ানোর চেষ্টা করল।

পারল না।

ইশা সঙ্গে সঙ্গে তার হাতটা নিজের কাঁধে তুলে নিল।

—আস্তে।

আদি অবাক হয়ে তাকাল।

—আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

—আমাদের বাড়িতে।

—বাড়ি?

—এখানে আশেপাশে কোনো হাসপাতাল নেই। আগে ক্ষতটা পরিষ্কার করতে হবে।

আদি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।

মেয়েটার আত্মবিশ্বাস দেখে তার ভালোই লাগল।

ইশা তাকে ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথ ধরে নিজের বাড়ির দিকে নিয়ে চলল।

কিছুক্ষণ পর তারা ছোট্ট কুঁড়েঘরটার সামনে পৌঁছাল।

দাদি তখন উঠানে বসে সবজি কাটছিলেন।

ইশাকে একটা অচেনা ছেলেকে ধরে আনতে দেখে তিনি চমকে উঠলেন।

—ইশা, এ কে?

—দাদি, গাড়ি নিয়ে আসছিল। দুর্ঘটনা হয়েছে। মাথায় আঘাত পেয়েছে।

দাদি দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন।

—ওরে বাবা! ভেতরে নিয়ে আয়।

ইশা আদিকে ঘরের ভেতর একটা পুরোনো কাঠের খাটে বসিয়ে দিল।

তারপর একটা কাপড় আর পানি নিয়ে এসে কপালের ক্ষত পরিষ্কার করতে লাগল।

আদি চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে ছিল।

ইশা খুব মনোযোগ দিয়ে তার ক্ষতটা পরিষ্কার করছিল।

হঠাৎ আদি বলল,

—আপনার নাম কী?

ইশা চোখ না তুলেই বলল,

—ইশা।

—শুধু ইশা?

—হ্যাঁ।

—আমি আদি।

ইশা এবার তাকাল।

—জানি না।

আদি হেসে ফেলল।

—আমার নাম জানেন না?

—জানব কীভাবে?

আদি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—আপনি বেশ অদ্ভুত।

ইশা ভ্রু কুঁচকাল।

—কেন?

—সাধারণত কেউ আমাকে দেখলে আগে জিজ্ঞেস করে আমি কে, কী করি, কোথা থেকে এসেছি। আপনি কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না।

ইশা শান্তভাবে বলল,

—মানুষ বিপদে পড়লে তার পরিচয় জানতে হয় না। আগে তাকে সাহায্য করতে হয়।

আদি চুপ হয়ে গেল।

কথাটা খুব সাধারণ।

কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে কথাটা তার মনে গিয়ে আটকে রইল।

ইশা ব্যান্ডেজ করতে করতে বলল,

—আজকে আপনি কোথাও যেতে পারবেন না।

—কিন্তু আমার গাড়ি—

—গাড়ি পরে দেখা যাবে।

—আমার ফোন—

—চার্জ আছে?

আদি ফোন বের করে দেখল।

ব্যাটারি প্রায় শেষ।

ইশা হালকা হেসে বলল,

—তাহলে সেটাও পরে দেখা যাবে।

আদি অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।

শহরের জীবনে সে এমন কাউকে কখনো দেখেনি, যে তাকে না চিনেই এতটা স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে।

কিছুক্ষণ পর ইশা তার জন্য গরম পানি এনে দিল।

—এটা খান।

আদি কাপটা হাতে নিল।

—ধন্যবাদ।

ইশা চলে যেতে ফিরতেই আদি হঠাৎ বলল,

—ইশা।

মেয়েটা থামল।

—হুম?

—আপনি আমাকে ভয় পাচ্ছেন না?

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—আপনাকে ভয় পাওয়ার কী আছে?

—আমি তো আপনার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা।

—আপনিও তো আমাকে চেনেন না।

কথাটা বলে ইশা চলে গেল।

আদি তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

বাইরে তখন পাহাড়ি বাতাস বইছে।

দূরের গাছের পাতাগুলো নড়ছে।

আর ছোট্ট সেই কুঁড়েঘরের ভেতর বসে আদি প্রথমবার অনুভব করল—

এই পাহাড়ে আসাটা হয়তো নিছক ভ্রমণ ছিল না।

কারণ দুর্ঘটনার পর তার জীবনে এমন একজন মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে, যার নাম—

ইশা।

আর অদ্ভুতভাবে, মেয়েটার চোখ দুটো বারবার তার মনে পড়ছে।

সকালের আলো তখন ধীরে ধীরে পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

কুঁড়েঘরের ছোট্ট জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। দূরে কোথাও পাখির ডাক, ঝরনার কলকল শব্দ আর ঠান্ডা বাতাস—সব মিলিয়ে চারপাশটা যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল।

আদি ধীরে ধীরে চোখ খুলল।

প্রথম কয়েক সেকেন্ড সে বুঝতেই পারল না, সে কোথায় আছে।

তারপর আগের দিনের দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ল।

সে উঠে বসতে গেল।

কপালে হালকা ব্যথা অনুভব হলো।

—আহ!

শব্দটা শুনে পাশের ঘর থেকে ইশা ছুটে এল।

—উঠেছেন?

আদি তাকিয়ে দেখল, ইশার হাতে একটা কাপ।

মেয়েটার পরনে আজ হালকা হলুদ রঙের সালোয়ার-কামিজ। চুলগুলো খোলা। সকালের বাতাসে কয়েকটা চুল বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে।

আদি কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে রইল।

ইশা ভ্রু কুঁচকে বলল,

—এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?

আদি একটু অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নিল।

—কোথায় তাকাচ্ছি?

—আমার দিকে।

—না তো।

ইশা হেসে ফেলল।

—আপনি মিথ্যা বলতে পারেন না।

আদি কিছু বলল না।

মেয়েটার হাসিটা তার ভালো লাগল।

খুব বেশি সাজানো নয়।

খুব বেশি জোরে নয়।

একদম স্বাভাবিক একটা হাসি।

ইশা কাপটা এগিয়ে দিল।

—দুধ আর মধু দিয়েছি। খেয়ে নিন।

আদি কাপটা নিল।

—আমি সাধারণত সকালে কফি খাই।

—এখানে কফি নেই।

—চা?

—সেটাও নেই।

—তাহলে?

ইশা গম্ভীর মুখে বলল,

—পাহাড়ে এসে শহরের অভ্যাস করলে চলবে না।

আদি হেসে ফেলল।

—আপনি সবসময় এমন কথা বলেন?

—কেমন কথা?

—যেন আপনি এই পাহাড়ের মালিক।

ইশা মুচকি হেসে বলল,

—পাহাড়ের মালিক কেউ না। পাহাড় শুধু সবাইকে একটু জায়গা দেয়।

আদি আবার থেমে গেল।

এই মেয়েটা এমন কিছু কথা বলে, যেগুলো শুনলে তার অদ্ভুত শান্তি লাগে।

ইশা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

আদি কাপটা হাতে নিয়ে বসে রইল।

কিছুক্ষণ পর দাদি এসে বললেন,

—বাবা, শরীর কেমন?

—এখন ভালো।

—তোমার বাড়িতে খবর দিতে হবে না?

আদি একটু থেমে গেল।

তার ফোনটা গতকালই বন্ধ হয়ে গেছে।

—ফোনে চার্জ নেই। আর এখানে নেটওয়ার্কও নেই।

দাদি মাথা নাড়লেন।

—আজ ইশা বাজারে যাবে। ওকে সঙ্গে দিয়ে একটা ফোন করতে পারো।

আদি বলল,

—কিন্তু আমি এখানে আর কতক্ষণ থাকব?

দাদি হেসে বললেন,

—তোমার মাথা ভালো না হওয়া পর্যন্ত কোথাও যেতে পারবে না।

ঠিক তখনই ইশা বাইরে থেকে বলল,

—আর আপনি হাঁটতে গেলেও আমি যেতে দেব না।

আদি দরজার দিকে তাকিয়ে হাসল।

—আপনি কি সবসময় আমাকে আটকাবেন?

ইশা বলল,

—আপনি নিজে নিজের যত্ন নিতে পারেন না। তাই আপাতত দায়িত্ব আমার।

আদি কিছু বলল না।

কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথাও যেন কথাটা নরম একটা অনুভূতি তৈরি করল।

দুপুরের দিকে ইশা তাকে নিয়ে বাইরে বের হলো।

আদি বলল,

—আমি কিন্তু এখন ভালো আছি।

—হাঁটলে বুঝব।

—কোথায় যাচ্ছি?

—পাহাড় দেখাতে।

—আপনি আমাকে পাহাড় ঘুরিয়ে দেখাবেন?

—হ্যাঁ।

—গাইডের মতো?

ইশা হাসল।

—গাইডের টাকা দিতে হবে কিন্তু।

আদি হেসে বলল,

—কত?

—আপনার মতো বড়লোকের জন্য অনেক বেশি।

আদি অবাক হলো।

—আপনি কীভাবে বুঝলেন আমি বড়লোক?

ইশা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনার গাড়িটা দেখেছি।

—শুধু গাড়ি দেখে?

—আপনার জুতোটাও দেখেছি।

আদি নিজের জুতোর দিকে তাকাল।

ইশা হেসে ফেলল।

—এত দামি জুতো পরে পাহাড়ে উঠতে আসা মানুষ গরিব হতে পারে?

আদি মাথা নাড়ল।

—আপনি বেশ বুদ্ধিমান।

—জানি।

দুজনেই হেসে উঠল।

পাহাড়ি সরু পথ ধরে তারা হাঁটতে লাগল।

কিছুদূর যাওয়ার পর ইশা একটা জায়গায় দাঁড়াল।

সামনে বিশাল পাহাড়ের সারি।

নিচে সবুজ উপত্যকা।

আর তার মাঝখান দিয়ে সরু একটা নদী বয়ে যাচ্ছে।

ইশা হাত বাড়িয়ে দেখাল।

—ওই জায়গাটাকে বলে নীলছড়া।

আদি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর তার চোখ পাহাড় থেকে সরে ইশার দিকে চলে গেল।

ইশা তখন বাতাসে উড়তে থাকা চুলগুলো ঠিক করছিল।

তার মুখে রোদের আলো পড়েছে।

আদি চুপচাপ তাকিয়ে রইল।

ইশা হঠাৎ বুঝতে পেরে বলল,

—আবার তাকিয়ে আছেন।

আদি এবার অস্বীকার করল না।

—হুম।

ইশা অবাক।

—কেন?

আদি একটু থেমে বলল,

—আপনাকে এই জায়গাটার মতোই লাগে।

ইশা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—কেমন?

—শান্ত।

ইশার মুখে অদ্ভুত একটা লজ্জার হাসি ফুটে উঠল।

সে দ্রুত অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,

—চলুন।

আদি তার পেছনে হাঁটতে লাগল।

তার মনে হচ্ছিল, পাহাড়ের দৃশ্য যত সুন্দরই হোক, ইশার পাশে দাঁড়িয়ে তার চোখ বারবার শুধু মেয়েটাকেই খুঁজছে।

বিকেলের দিকে তারা একটা ছোট্ট ঝরনার কাছে গেল।

ইশা পাথরের ওপর উঠে বলল,

—এখানকার পানি খুব ঠান্ডা।

আদি নিচে দাঁড়িয়ে বলল,

—আপনি নামবেন?

—প্রতিদিন নামি।

ইশা পা বাড়িয়ে একটা পাথরের ওপর উঠতেই পাথরটা ভিজে থাকার কারণে পিছলে গেল।

—আহ!

ইশা পড়ে যাওয়ার আগেই আদি দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেলল।

এক হাত দিয়ে তার কোমর ধরে রেখেছে, অন্য হাতটা ইশার কাঁধে।

দুজনেই কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।

ইশার মুখটা আদির খুব কাছে।

দুজনের চোখ একে অপরের চোখে আটকে গেল।

পাহাড়ি বাতাসও যেন সেই মুহূর্তে থেমে গেছে।

আদি আস্তে বলল,

—লেগেছে?

ইশা মাথা নাড়ল।

—না।

কিন্তু পরক্ষণেই পা মাটিতে রাখতেই মুখ কুঁচকে গেল।

—আহ!

আদি নিচে তাকিয়ে দেখল, তার গোড়ালির পাশে ব্যথা পেয়েছে।

—আপনি হাঁটতে পারবেন?

ইশা চেষ্টা করল।

পারল না।

আদি কিছু না বলে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

—উঠুন।

ইশা হতভম্ব।

—কোথায়?

—আমার পিঠে।

—না না, দরকার নেই।

—আপনি হাঁটতে পারছেন না।

—আমি একটু বসে থাকলেই—

আদি এবার আর কথা না শুনে তাকে কোলে তুলে নিল।

ইশা চমকে উঠল।

—আদি!

—চুপ করুন।

—আমাকে নামান!

—আপনি পড়ে গেলে আবার আমাকে দোষ দেবেন।

ইশা লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেলল।

আদির বুকের সঙ্গে তার শরীরটা খুব কাছাকাছি।

ইশা নিজের অজান্তেই আদির শার্টটা শক্ত করে ধরে ফেলল।

আদি ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর সে নিচু গলায় বলল,

—ভয় লাগছে?

ইশা আস্তে বলল,

—না।

—তাহলে এত শক্ত করে ধরে আছেন কেন?

ইশা সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিল।

—আমি তো ধরিনি।

আদি মুচকি হাসল।

—ঠিক আছে, ধরেননি।

ইশা মুখ লুকিয়ে ফেলল।

তার বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত একটা অনুভূতি।

সে বুঝতে পারছিল না কেন আদির এত কাছে থাকলে তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে।

সন্ধ্যার একটু আগে তারা বাড়িতে ফিরল।

দাদি ইশার পা দেখে চিন্তিত হয়ে গেলেন।

—কী হয়েছে?

—সামান্য পড়ে গিয়েছিলাম।

আদি বলল,

—পাথরে পা পিছলে গেছে।

দাদি ইশার পায়ে ওষুধ লাগাতে লাগাতে আদির দিকে তাকালেন।

—তুমি ওকে নিয়ে গিয়েছিলে?

আদি মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

দাদি মৃদু হেসে বললেন,

—তাহলে আজ থেকে তোমার আরেকটা দায়িত্ব হলো ওকে সাবধানে রাখা।

আদি ইশার দিকে তাকাল।

ইশাও তাকিয়ে আছে।

দুজনের চোখ আবার মিলল।

ইশা দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল।

আদি মনে মনে হাসল।

সে জানত না এই পাহাড় থেকে যাওয়ার পর কী হবে।

কিন্তু একটা ব্যাপার সে খুব স্পষ্ট বুঝতে পারছিল—

এই ছোট্ট কুঁড়েঘর, পাহাড়ি বাতাস আর ইশার হাসির প্রতি তার একটা অদ্ভুত টান তৈরি হয়ে গেছে।

আর ইশাও হয়তো ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে—

শহর থেকে আসা এই অচেনা ছেলেটা তার কাছে আর পুরোপুরি অচেনা নেই।

পরদিন সকাল।

ইশার ঘুম ভাঙল দাদির ডাকে।

—ইশা, উঠ মা। সকাল হয়ে গেছে।

ইশা চোখ মেলে উঠে বসতেই আগের দিনের কথা মনে পড়ে গেল।

ঝরনার পাশে পা পিছলে যাওয়া, তারপর আদির তাকে কোলে তুলে নেওয়া...

মুহূর্তটা মনে পড়তেই তার গাল গরম হয়ে উঠল।

নিজের অজান্তেই বালিশের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলল সে।

—এমন কেন হলো আমার?

বাইরে দাদি আবার ডাকলেন।

—ইশা!

—উঠেছি দাদি!

দ্রুত উঠে দরজা খুলে বাইরে এল সে।

কিন্তু উঠানে এসে প্রথমেই তার চোখ গেল একটা দৃশ্যের দিকে।

আদি একা দাঁড়িয়ে আছে।

হাতে একটা কাঠের লাঠি।

সম্ভবত হাঁটার অনুশীলন করছে।

ইশাকে দেখেই সে হেসে বলল,

—সুপ্রভাত।

ইশা একটু থেমে বলল,

—সুপ্রভাত।

—আপনার পা কেমন?

ইশা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

—ভালো।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

আদি একটু কাছে এসে বলল,

—হেঁটে দেখুন।

—কেন?

—দেখি সত্যিই ভালো হয়েছে কি না।

ইশা কয়েক পা হাঁটল।

আদি মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইল।

—ব্যথা করছে?

—না।

—তাহলে আজকে কোথাও যাবেন না।

ইশা অবাক হয়ে বলল,

—কেন?

—কালকে পড়ে গিয়েছিলেন।

—আজ তো ভালো আছি।

—তবুও।

ইশা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

—আপনি কে যে আমাকে আদেশ করবেন?

আদি হাসল।

—যে আপনাকে কাল কোলে করে বাড়ি নিয়ে এসেছে।

ইশা লজ্জায় চুপ করে গেল।

তারপর আস্তে বলল,

—সেটা নিয়ে এত কথা বলতে হবে?

—না। তবে মনে করিয়ে দিতে ভালো লাগে।

ইশা কিছু বলল না।

কিন্তু মুখের কোণে হাসি লুকাতে পারল না।

দুপুরের দিকে আদি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠল।

কপালের ব্যথাও কমেছে।

সে সিদ্ধান্ত নিল, আজই তার গাড়িটা দেখতে যাবে।

ইশা বাধা দিল।

—আপনি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি।

—আমি শুধু গাড়িটা দেখে আসব।

—রাস্তা অনেক দূর।

—আমি হাঁটতে পারব।

—পারবেন না।

আদি হেসে বলল,

—আপনি কি সবসময় এত জেদ করেন?

ইশা বলল,

—আপনার থেকে কম।

শেষ পর্যন্ত ইশাই তার সঙ্গে গেল।

পাহাড়ি পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আদি বারবার ইশার দিকে তাকাচ্ছিল।

মেয়েটা কখনো সামনে তাকাচ্ছে, কখনো গাছের ডাল সরিয়ে পথ করে দিচ্ছে।

হঠাৎ আদি বলল,

—আপনি প্রতিদিন এই পাহাড়ে ঘোরেন?

—হ্যাঁ।

—একাই?

—সবসময় না।

—কার সঙ্গে?

ইশা একটু ভেবে বলল,

—দাদির সঙ্গে ছোটবেলায় যেতাম। এখন বেশিরভাগ সময় একাই।

আদি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আজ থেকে একা যেতে হবে না।

ইশা তাকাল।

—মানে?

—আমি তো আছি।

ইশা কিছু বলতে পারল না।

তার বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।

দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখা গেল গাড়িটা এখনো গাছের পাশে পড়ে আছে।

আদি গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখল, সামনের অংশ বেশ ক্ষতিগ্রস্ত।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—অনেক ক্ষতি হয়েছে।

ইশা পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

—ঠিক হয়ে যাবে।

—আপনি জানেন গাড়ি ঠিক করা কত কঠিন?

—না।

—অনেক টাকা লাগবে।

ইশা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,

—টাকা দিয়ে তো সবকিছু ঠিক করা যায়।

আদি তার দিকে তাকাল।

—সবকিছু?

ইশা মাথা নাড়ল।

—সবকিছু না।

আদি কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—আপনি মাঝে মাঝে খুব গভীর কথা বলেন।

—আর আপনি মাঝে মাঝে খুব বেশি কথা বলেন।

—আমার কথা শুনতে বিরক্ত লাগে?

ইশা মাথা নিচু করে বলল,

—না।

খুব ছোট্ট একটা উত্তর।

কিন্তু সেই একটা শব্দই আদির মুখে হাসি এনে দিল।

বিকেলে ইশা তাকে পাহাড়ের আরও ভেতরে নিয়ে গেল।

সেখানে একটা উঁচু জায়গা।

চারপাশে শুধু সবুজ।

দূরে মেঘগুলো পাহাড়ের গায়ে এসে লেগে আছে।

ইশা বলল,

—এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

আদি চারপাশ দেখে বলল,

—সত্যিই সুন্দর।

ইশা হেসে বলল,

—আমি জানতাম আপনার ভালো লাগবে।

আদি বলল,

—জায়গাটা সুন্দর বলে ভালো লাগছে, নাকি আপনি দেখাচ্ছেন বলে?

ইশা থমকে গেল।

তারপর চোখ বড় বড় করে তাকাল।

—আপনি এসব কথা বলেন কীভাবে?

আদি হেসে বলল,

—কী বললাম?

—কিছু না।

ইশা অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়াল।

আদি তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।

শুধু বাতাসের শব্দ।

আদি আস্তে বলল,

—ইশা।

—হুম?

—আপনি কি কখনো পাহাড় ছেড়ে শহরে যেতে চেয়েছেন?

ইশা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

—না।

—কেন?

—এই পাহাড়েই আমার সব।

—আর যদি কেউ আপনাকে নিয়ে যেতে চায়?

ইশা এবার তার দিকে তাকাল।

—কোথায়?

—শহরে।

ইশা হেসে বলল,

—আমি শহরের মানুষ নই।

আদি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—মানুষ জায়গার নয়, মানুষের হয়।

ইশার হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

কথাটা তার হৃদয়ের কোথাও গিয়ে লাগল।

সে কিছু বলল না।

আদিও আর কিছু বলল না।

কিন্তু দুজনেই বুঝতে পারছিল, তাদের কথাগুলো এখন আর শুধু বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো।

পাহাড়ে বৃষ্টি খুব দ্রুত নামে।

ইশা বলল,

—দৌড়ান!

আদি হেসে বলল,

—আমি দৌড়াতে পারব না।

—তাহলে ভিজবেন।

দুজনেই দৌড়াতে শুরু করল।

কিছুদূর যেতেই ইশা হঠাৎ পিছলে গেল।

আদি তাকে ধরে ফেলল।

কিন্তু এবার দুজনেই পড়ে গেল নরম ঘাসের ওপর।

ইশা আদির ওপর।

দুজনের মুখ একদম কাছাকাছি।

বৃষ্টির পানি ইশার চুল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

আদি তাকিয়ে আছে তার চোখের দিকে।

ইশার বুক ধড়ফড় করছে।

কেউ কোনো কথা বলছে না।

আদি খুব আস্তে বলল,

—আপনি ঠিক আছেন?

ইশা মাথা নাড়ল।

কিন্তু উঠছে না।

আদিও তাকে উঠতে বলল না।

কয়েক সেকেন্ড পর ইশা হঠাৎ বুঝতে পারল, সে কী অবস্থায় আছে।

তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে গেল।

—আমি... আমি আসলে...

আদি উঠে দাঁড়িয়ে হাসল।

—জানি।

—কী জানেন?

—আপনি পড়ে গিয়েছিলেন।

ইশা চোখ সরিয়ে নিল।

—হুম।

আদি মৃদু হেসে বলল,

—আর আমি আপনাকে ধরেছিলাম।

ইশা কিছু বলল না।

তার গাল লাল হয়ে গেছে।

রাতে কুঁড়েঘরের ভেতর সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও আদির ঘুম এল না।

সে জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

বৃষ্টির পানি টিনের চালে পড়ছে।

তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে—

ইশা।

কেন মেয়েটাকে দেখলেই তার মন ভালো হয়ে যায়?

কেন তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে?

কেন সে চায় প্রতিদিন নতুন কোনো অজুহাতে ইশার সঙ্গে পাহাড়ে ঘুরতে?

আদি নিজেকেই প্রশ্ন করল।

তারপর মৃদু হেসে ফেলল।

—আমি কি তাহলে সত্যিই ওর প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি?

অন্যদিকে পাশের ঘরে ইশাও জেগে ছিল।

দাদির পাশে শুয়ে সে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে আদির মুখ।

বিশেষ করে আজকের সেই মুহূর্তটা...

বৃষ্টির মধ্যে যখন সে আদির ওপর পড়ে গিয়েছিল।

ইশা নিজের মুখ দুই হাত দিয়ে ঢেকে ফেলল।

তারপর খুব আস্তে মনে মনে বলল,

—ছেলেটা এত অদ্ভুত কেন?

কিন্তু তার হৃদয় যেন অন্য উত্তর দিচ্ছিল।

হৃদয় বলছিল—

অদ্ভুত নয়... ছেলেটাকে ভালো লাগতে শুরু করেছে।

আর সেই অনুভূতিটা যতটা সুন্দর, ততটাই ভয়ংকর।

কারণ ইশা জানে না—

শহরের সেই বড়লোক ছেলেটা একদিন পাহাড় ছেড়ে চলে গেলে তার এই অনুভূতিগুলোর কী হবে।

সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা অদ্ভুত সুন্দর ছিল।

নীল আকাশের গায়ে সাদা মেঘের ভেলা। পাহাড়ের গায়ে রোদের আলো এসে পড়েছে। রাতের বৃষ্টির পর চারপাশের গাছপালা আরও সবুজ হয়ে উঠেছে।

ইশা উঠানে বসে ফুলের গাছগুলোতে পানি দিচ্ছিল।

আদি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে তাকে দেখছিল।

কয়েকদিন আগেও মেয়েটা তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা ছিল।

আর এখন?

সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার চোখ প্রথমে ইশাকে খোঁজে।

ইশা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, খেয়েছে কি না—এসব ছোট ছোট বিষয়ও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইশা হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,

—এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?

আদি হাসল।

—আপনাকে দেখছিলাম।

—কেন?

—এমনিই।

ইশা চোখ ছোট করে বলল,

—আপনি ইদানীং খুব বেশি তাকান।

—তাকাতে ভালো লাগে।

ইশা আর কিছু বলল না।

মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।

দুপুরের পর আদি বলল,

—আজ আমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবেন?

ইশা অবাক হয়ে তাকাল।

—কোথায়?

—যেখানে আপনি কাউকে নিয়ে যান না।

ইশা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—একটা জায়গা আছে।

—কেমন?

—খুব নির্জন।

—তাহলে সেখানেই যাব।

ইশা হেসে মাথা নাড়ল।

দুজন বেরিয়ে পড়ল।

পাহাড়ি পথ ধরে অনেকটা যাওয়ার পর লোকালয় একেবারে কমে গেল।

এখানে কোনো দোকান নেই, কোনো বাড়ি নেই।

শুধু পাহাড়, গাছ আর দূরে মেঘে ঢাকা উপত্যকা।

শেষ পর্যন্ত ইশা একটা বিশাল পাথরের পাশে দাঁড়াল।

সামনে তাকাতেই আদির চোখ আটকে গেল।

নিচে বিশাল সবুজ উপত্যকা।

তার ওপরে ভাসছে মেঘ।

দূরে কয়েকটা পাহাড়ের চূড়া মেঘের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে।

আদি ধীরে বলল,

—অসাধারণ।

ইশা মুচকি হেসে বলল,

—বলেছিলাম, এখানে কাউকে আনি না।

—আমাকে কেন আনলেন?

ইশা কিছু বলল না।

আদি তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—বলুন।

ইশা নিচের দিকে তাকিয়ে আস্তে বলল,

—জানি না।

আদি মৃদু হেসে বলল,

—আমি জানি।

ইশা তাকাল।

—কী জানেন?

আদি তার দিকে এক পা এগিয়ে গেল।

—কারণ আমি এখন আপনার কাছে একটু হলেও বিশেষ হয়ে গেছি।

ইশা কিছু বলল না।

তার চোখে লজ্জা।

আদি আরও কাছে গেল।

দুজনের মাঝের দূরত্ব খুব কমে এল।

ইশা নিচু গলায় বলল,

—আপনি এমন কথা বলেন কেন?

—কোন কথা?

—যেগুলোর উত্তর দিতে গেলে আমি লজ্জা পাই।

আদি হেসে ফেলল।

তারপর খুব আস্তে হাত বাড়িয়ে ইশার মুখের পাশে এসে পড়া চুলগুলো সরিয়ে দিল।

ইশা হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।

আদির আঙুল তার কানের পাশ দিয়ে চুল সরিয়ে দিল।

মুহূর্তটা এতটাই নীরব ছিল যে দুজনেই নিজেদের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিল।

আদি নিচু গলায় বলল,

—ইশা।

—হুম?

—আমার একটা কথা আছে।

—বলুন।

আদি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমি জানি না ঠিক কখন এটা শুরু হয়েছে।

ইশার বুক ধুকপুক করতে লাগল।

—কী?

—আপনাকে দেখার পর থেকে আমার সবকিছু বদলে গেছে।

ইশা চুপ।

আদি বলল,

—আগে পাহাড়ে এসেছিলাম ঘুরতে। এখন মনে হয়, পাহাড়ের চেয়েও বেশি কিছু পেয়ে গেছি এখানে।

ইশার চোখে পানি চিকচিক করল।

আদি তার হাতটা আলতো করে ধরল।

—আপনাকে প্রথম দিন দেখেছিলাম একজন অচেনা মানুষ হিসেবে। তারপর আপনি আমার যত্ন নিলেন। আমার সঙ্গে হাঁটলেন। আমার সঙ্গে হাসলেন।

সে একটু থামল।

—আর কখন যে আপনার জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করেছি, সেটা আমি নিজেও বুঝিনি।

ইশা খুব আস্তে বলল,

—আদি...

—আমি জানি, আমাদের পৃথিবী আলাদা।

—আপনি শহরের মানুষ। আমি...

—আপনি ইশা।

আদি তার কথা থামিয়ে দিল।

—আমার কাছে এটাই যথেষ্ট।

ইশার চোখ বেয়ে একটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

আদি সেটা দেখে হাত বাড়িয়ে চোখের পানি মুছে দিল।

তারপর বলল,

—আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।

ইশা চোখ বন্ধ করে ফেলল।

আদি খুব শান্ত গলায় বলল,

—আপনি কি আমাকে আপনার জীবনে একটু জায়গা দেবেন?

ইশা কোনো উত্তর দিল না।

শুধু তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে ফেলল।

আদি মৃদু হেসে বলল,

—এটাকে কি হ্যাঁ ধরে নেব?

ইশা চোখ খুলে তার দিকে তাকাল।

মুখে লাজুক হাসি।

—হ্যাঁ।

একটা ছোট্ট শব্দ।

কিন্তু আদির কাছে মনে হলো, সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরটা পেয়েছে।

সে ইশাকে খুব আলতো করে নিজের কাছে টেনে নিল।

ইশা প্রথমে একটু অবাক হলেও সরে গেল না।

আদির বুকের কাছে মাথা রেখে সে চোখ বন্ধ করল।

চারপাশে শুধু পাহাড়ের বাতাস।

দূরে পাখির ডাক।

আর দুজন মানুষের নীরব হৃদস্পন্দন।

আদি খুব আস্তে বলল,

—আমি সত্যিই ভাগ্যবান।

ইশা মৃদু গলায় বলল,

—কেন?

—কারণ তোমাকে পেয়েছি।

ইশা মাথা তুলে তাকাল।

—তুমি আমাকে তুমি বললে?

আদি হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

—আগে তো আপনি বলতেন।

—এখন থেকে তুমি।

ইশার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।

—ঠিক আছে।

হঠাৎ দূরে মেঘ গর্জে উঠল।

ইশা আকাশের দিকে তাকাল।

—বৃষ্টি আসবে।

আদি বলল,

—আবার?

কথা শেষ হওয়ার আগেই কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি তাদের গায়ে পড়ল।

ইশা হাসতে হাসতে বলল,

—চলুন, ফিরে যাই।

আদি নড়ল না।

—কেন?

—ভিজে যাব।

—ভিজি।

—আপনার জ্বর আসবে।

—তুমি থাকলে আসবে না।

ইশা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল।

বৃষ্টি ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।

দুজনেই একটা বড় গাছের নিচে দাঁড়াল।

জায়গাটা ছোট হওয়ায় তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হলো।

ইশার ভেজা চুল মুখের ওপর এসে পড়ছিল।

আদি আবার হাত বাড়িয়ে তার চুলগুলো সরিয়ে দিল।

ইশা এবার আর চোখ সরাল না।

আদি বলল,

—তুমি জানো, তোমাকে প্রথম দেখার দিনই আমার মনে হয়েছিল তুমি অন্যরকম।

—কীভাবে?

—সবাই যেখানে নিজের কথা ভাবে, তুমি একটা অচেনা মানুষকে বাঁচানোর জন্য নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলে।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—তখন তো জানতাম না তুমি এত ঝামেলার মানুষ।

আদি হেসে উঠল।

—আর এখন?

—এখন জানি।

—তবুও আমাকে ভালোবাসো?

ইশা চোখ নামিয়ে বলল,

—হুম।

আদি তার হাতটা ধরল।

বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়ে গেল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

কোনো বড় প্রতিশ্রুতিও নেই।

শুধু দুজনের হাত একে অপরের হাতে ধরা।

আদি আস্তে বলল,

—ইশা।

—হুম?

—আমি তোমাকে নিয়ে একদিন শহরে যাব।

ইশার মুখের হাসিটা একটু ম্লান হয়ে গেল।

—শহরে?

—হ্যাঁ।

—আমি তো শহরের মানুষ নই।

—তাহলে শহরটাকেই তোমার মতো করে নেব।

ইশা তাকিয়ে রইল।

সে জানত না সামনে কী আছে।

জানত না আদির পরিবার তাকে মেনে নেবে কি না।

জানত না তাদের ভালোবাসার পথ কতটা কঠিন।

কিন্তু এই মুহূর্তে একটা কথাই সে বিশ্বাস করতে চাইল—

আদি তাকে সত্যিই ভালোবাসে।

বৃষ্টি থামার পর দুজন যখন বাড়ির পথে হাঁটছিল, তখন আদি হঠাৎ ইশার হাত ধরে ফেলল।

ইশা তাকিয়ে বলল,

—কী হলো?

আদি হাসল।

—কিছু না।

—তাহলে হাত ধরেছ কেন?

—আজ থেকে এটা আমার অধিকার।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—বেশি অধিকার দেখালে কিন্তু ছেড়ে দেব।

আদি হাত আরও শক্ত করে ধরে বলল,

—তাহলে কোনোদিন বেশি অধিকার দেখাব না।

ইশা হাসতে হাসতে বলল,

—মিথ্যাবাদী।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে।

হাতের মুঠোয় হাত রেখে।

আর তাদের অজান্তেই সেই দিন থেকে শুরু হলো এমন এক গল্প—

যার সামনে অপেক্ষা করছিল ভালোবাসার পাশাপাশি কঠিন এক পরীক্ষা।

পরদিন সকাল থেকেই ইশার মনে অদ্ভুত এক আনন্দ।

গতকালের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে।

আদির মুখে সেই স্বীকারোক্তি—

“আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।”

ভাবতেই ইশার গাল লাল হয়ে যাচ্ছে।

সে উঠানে বসে শাক কাটছিল। কিন্তু বারবার ছুরিটা থেমে যাচ্ছে।

দাদি অনেকক্ষণ ধরে নাতনির দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

শেষ পর্যন্ত হেসে বললেন,

—কী হয়েছে তোর?

ইশা চমকে তাকাল।

—কিছু হয়নি তো!

—সকাল থেকে শাক কাটতে গিয়ে একই জায়গায় ছুরি চালাচ্ছিস। শাক কাটছিস, নাকি শাকের সঙ্গে গল্প করছিস?

ইশা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।

দাদি মুচকি হাসলেন।

—বুঝেছি।

—কী বুঝেছ?

—যার জন্য এতদিন পাহাড়ের বাতাসও ভালো লাগত, আজ তার জন্যই বোধহয় বাতাসটা আরও ভালো লাগছে।

ইশা কিছু বলতে পারল না।

ঠিক তখনই পেছন থেকে আদির গলা—

—দাদি, আপনি কিন্তু সব বুঝে ফেলেছেন।

ইশা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল।

আদি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে।

দাদি বললেন,

—তোমাদের চোখের ভাষা বুঝতে আমার বয়স হয়েছে বাবা।

ইশা লজ্জায় উঠে ঘরের ভেতর চলে গেল।

আদি হেসে দাদির পাশে বসে পড়ল।

—দাদি।

—হুম?

—আমি ইশাকে বিয়ে করতে চাই।

দাদির মুখের হাসি ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে গেল।

—তুই কি ভেবে বলছিস?

—হ্যাঁ।

—তোর পরিবার?

আদি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—জানি না বাবা কী বলবে।

দাদি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তোর পরিবার আর ইশার জীবন এক নয়।

—আমি জানি।

—শুধু ভালোবাসা দিয়ে সংসার সবসময় সহজ হয় না।

আদি দৃঢ় গলায় বলল,

—কঠিন হলে কঠিন হবে। কিন্তু আমি ওকে ছেড়ে যাব না।

দাদি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর মৃদু হেসে বললেন,

—তাহলে ইশাকে কষ্ট দিস না।

আদি মাথা নিচু করে বলল,

—কখনো না।

দুপুরের দিকে আদি ইশাকে নিয়ে নদীর ধারে বসেছিল।

আজ দুজনের আচরণেই নতুন একটা স্বাভাবিকতা এসেছে।

আগে যেখানে কথা বলতে গিয়ে দুজনেই লজ্জা পেত, এখন সেখানে হাত ধরে পাশাপাশি বসে থাকাটাও যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

আদি বলল,

—ইশা।

—হুম?

—তুমি আমার সঙ্গে শহরে যাবে?

ইশা নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।

—তোমার পরিবার আমাকে মেনে নেবে?

আদি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

—আমি জানি না।

—তাহলে?

—আমি জানি, আমার মা ভালো মানুষ। কিন্তু বাবা খুব কঠিন।

ইশা আস্তে বলল,

—তোমার বাবা যদি আমাকে পছন্দ না করেন?

আদি তার হাতটা ধরল।

—তাহলে আমি তোমার পাশে থাকব।

—আর যদি আমাকে তোমার বাড়িতে যেতে না দেন?

—তাহলে আমরা অন্য কোথাও থাকব।

ইশা তাকাল।

—তুমি সত্যিই এতটা করতে পারবে?

আদি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোমার জন্য না পারলে আর কার জন্য পারব?

ইশার চোখ ভিজে উঠল।

সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

আদি মৃদু হেসে বলল,

—কাঁদছ?

—না।

—চোখে পানি কেন?

—নদীর পানি।

আদি হেসে ফেলল।

—নদী তো তোমার সামনে।

—বাতাসে এসেছে।

—আচ্ছা, তাই হবে।

ইশা হেসে ফেলল।

সেদিন সন্ধ্যায় আদি তার মাকে আবার ফোন করল।

—মা।

—হুম, বাবা?

—আমি একটা কথা বলতে চাই।

মায়ের কণ্ঠে উদ্বেগ।

—কী হয়েছে?

—আমি একজনকে ভালোবাসি।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মা খুব শান্তভাবে বললেন,

—আমি জানতাম।

আদি অবাক।

—কীভাবে?

—তুই যখন প্রথম ফোন করেছিলি, তখন থেকেই বুঝেছিলাম।

আদি হাসল।

—আমি তাকে বিয়ে করতে চাই।

মা এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

—মেয়েটা কেমন?

আদি ইশার দিকে তাকাল।

সে তখন দাদির সঙ্গে রান্না করছে।

—খুব ভালো।

—কী করে?

—পাহাড়ে থাকে। দাদির সঙ্গে।

মা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তোর বাবা কী বলবে জানিস তো?

—জানি।

—তবুও?

—হ্যাঁ।

মা কিছুক্ষণ পর বললেন,

—তুই যদি সত্যিই সুখী হোস, আমি তোকে আটকাব না।

আদির চোখ ভিজে উঠল।

—ধন্যবাদ, মা।

—কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস। মেয়েটাকে যেন কোনোদিন মনে না হয়, তুই তার জন্য নিজের পরিবার হারিয়েছিস।

আদি বলল,

—আমি কাউকে হারাতে চাই না।

—তাহলে বাবাকে বোঝাতে হবে।

—চেষ্টা করব।

পরদিন সকালে আদির গাড়ি ঠিক করার লোক এসে পৌঁছাল।

গাড়িটা দেখে আদি বুঝল, আর এখানে বেশিদিন থাকা সম্ভব হবে না।

গাড়ি ঠিক হতে দুদিন লাগবে।

এই খবর শুনে ইশার বুকটা হঠাৎ ভার হয়ে গেল।

এতদিন সে ভেবেছিল আদি তার সঙ্গে থাকবে।

কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

সন্ধ্যায় তারা দুজন উঠানে বসেছিল।

ইশা চুপ।

আদি বলল,

—কী ভাবছ?

—কিছু না।

—মিথ্যা।

ইশা কিছুক্ষণ পর বলল,

—তুমি চলে গেলে আমাকে মনে থাকবে?

আদি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

—এই প্রশ্ন কেন?

—জানি না।

আদি তার পাশে বসে হাত ধরল।

—তুমি কি আমাকে ভুলে যেতে পারবে?

ইশা মাথা নাড়ল।

—না।

—তাহলে আমিও পারব না।

ইশা চোখ তুলে তাকাল।

আদি বলল,

—আমি তোমাকে শুধু এই পাহাড়ে রেখে চলে যাচ্ছি না। আমি তোমাকে আমার জীবনে নিয়ে যেতে চাই।

ইশা ধীরে বলল,

—তোমার বাবা?

—আমি কথা বলব।

—যদি না মানেন?

আদি তার হাত নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,

—তাহলে তোমাকে নিয়ে আমার নিজের একটা পৃথিবী বানাব।

ইশা কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেলল।

—তুমি এত বড় বড় কথা বলো কীভাবে?

আদি বলল,

—তুমি পাশে থাকলে সাহস হয়।

দুই দিন পর গাড়ি পুরোপুরি ঠিক হয়ে গেল।

আদি জানত, এবার তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সে ইশার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

—চলো।

ইশা তাকাল।

—কোথায়?

—আমার সঙ্গে।

ইশা চুপ করে রইল।

দাদি তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তিনি ইশার মাথায় হাত রেখে বললেন,

—যা মা। যদি মানুষটা সত্যিই তোকে ভালোবাসে, তাহলে ভয় পাবি না।

ইশার চোখ দিয়ে পানি পড়ে গেল।

সে দাদিকে জড়িয়ে ধরল।

—দাদি, আমি আবার আসব।

—জানি।

আদি গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়াল।

ইশা শেষবারের মতো নিজের ছোট্ট কুঁড়েঘরটার দিকে তাকাল।

এই ঘরেই তার শৈশব।

এই উঠানেই তার হাসি-কান্না।

এই পাহাড়েই তার পুরো পৃথিবী।

কিন্তু আজ সে সেই পৃথিবী ছেড়ে নতুন এক জীবনের দিকে পা বাড়াচ্ছে।

গাড়িতে ওঠার আগে আদি তার হাত ধরল।

—ভয় পাচ্ছ?

ইশা মাথা নাড়ল।

—একটু।

—আমি আছি।

ইশা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—তাহলে ভয় নেই।

গাড়ি ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথ ছেড়ে নিচে নামতে শুরু করল।

ইশা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

পাহাড়টা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।

আদি একবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—ইশা।

—হুম?

—আজ থেকে তোমার নতুন জীবন শুরু।

ইশা তার হাতটা ধরে ফেলল।

—আমাদের নতুন জীবন।

আদি মুচকি হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

আমাদের।

কিন্তু তারা কেউই জানত না—

শহরে পৌঁছানোর পর তাদের সেই নতুন জীবন শুরু হওয়ার আগেই অপেক্ষা করছে এমন এক ঝড়, যা তাদের ভালোবাসাকে কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে।

শহরের ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি ঢোকার পর থেকেই ইশার বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল।

এত গাড়ি, এত মানুষ, এত বড় বড় বিল্ডিং—সবকিছু তার কাছে অচেনা।

সে জানালার বাইরে তাকিয়ে চুপ করে বসে ছিল।

আদি মাঝে মাঝে তার দিকে তাকাচ্ছিল।

—ভয় লাগছে?

ইশা আস্তে বলল,

—একটু।

—আমার হাত ধরবে?

ইশা তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—গাড়ি চালানোর সময় হাত ধরলে দুর্ঘটনা হবে।

আদি হেসে বলল,

—ঠিক আছে। তাহলে পৌঁছানোর পর ধরো।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা বিশাল বাড়ির সামনে এসে থামল।

ইশা জানালা দিয়ে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।

তিনতলা বিশাল বাড়ি। সামনে বড় বাগান। লোহার গেট। গেটের পাশে নিরাপত্তারক্ষী।

ইশা ফিসফিস করে বলল,

—এটাই তোমাদের বাড়ি?

—হ্যাঁ।

—এত বড়!

আদি গাড়ি থেকে নেমে তার দরজা খুলে দিল।

—নামো।

ইশা ধীরে ধীরে নামল।

আদি তার হাত ধরল।

—আমি আছি।

ইশা মাথা নাড়ল।

দুজন একসঙ্গে গেটের ভেতর ঢুকল।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আদির মা।

ছেলেকে দেখেই তিনি এগিয়ে এলেন।

—আদি!

তিনি ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।

তারপর ইশার দিকে তাকালেন।

এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠলেও পরক্ষণেই মুখে মায়া চলে এল।

—তুমিই ইশা?

ইশা মাথা নিচু করে বলল,

—জি।

আদির মা তার হাত ধরে বললেন,

—ভয় পেয়ো না মা। এতদিন ধরে যার কথা শুনেছি, তাকে আজ সামনে দেখে ভালো লাগছে।

ইশার চোখ ভিজে উঠল।

সে ভেবেছিল হয়তো তাকে প্রশ্ন করা হবে, বিচার করা হবে।

কিন্তু তার বদলে এতটা আন্তরিকতা পাবে, সেটা ভাবেনি।

আদি মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—মা, আমি জানতাম তুমি বুঝবে।

মা বললেন,

—তুই যাকে নিয়ে এত কথা বলেছিস, তাকে কি আমি না বুঝে পারি?

ঠিক তখনই ভেতর থেকে ভারী কণ্ঠ ভেসে এল।

—কী হচ্ছে এখানে?

আদির হাসি থেমে গেল।

ইশা তাকিয়ে দেখল, একজন গম্ভীর চেহারার মধ্যবয়সী মানুষ সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছেন।

আদির বাবা।

তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

প্রথমে ছেলের দিকে তাকালেন।

তারপর ইশার দিকে।

চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।

—এই মেয়েটা কে?

আদি শান্ত গলায় বলল,

—বাবা, এ ইশা।

—আমি সেটা জানতে চাইনি। এ এখানে কেন?

আদি মায়ের দিকে তাকিয়ে আবার বাবার দিকে বলল,

—আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।

বাড়ির পরিবেশ মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

আদির মা বললেন,

—শুনুন, আগে মেয়েটার সঙ্গে—

—আপনি চুপ করুন।

আদির বাবা কঠিন গলায় বললেন,

—তুমি কি মাথা খারাপ করে ফেলেছ?

আদি বলল,

—না।

—একটা পাহাড়ি গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছ?

ইশার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

আদি তার হাতটা শক্ত করে ধরল।

—ও শুধু পাহাড়ি গ্রামের মেয়ে নয়। ও একজন ভালো মানুষ।

—আমার কাছে এসব যুক্তি চলবে না।

—কেন?

—কারণ আমাদের পরিবারের একটা সম্মান আছে।

আদি এবার গম্ভীর হয়ে বলল,

—সম্মান কি মানুষের পরিচয় দিয়ে হয়?

বাবা রেগে গেলেন।

—তুমি আমাকে শেখাবে সম্মান কী?

মা দ্রুত এগিয়ে এসে বললেন,

—আপনি একটু শান্ত হন। মেয়েটা এতদূর থেকে এসেছে।

—এই মেয়েকে আমি এই বাড়িতে ঢুকতে দেব না।

ইশা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।

আদি তার সামনে এসে দাঁড়াল।

—বাবা, আমি ওকে ভালোবাসি।

—ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে না।

—সংসার আমি চালাব।

—তুমি জানো না তুমি কী বলছ।

—আমি খুব ভালোভাবেই জানি।

আদির বাবা দরজার দিকে আঙুল তুলে বললেন,

—এখনই মেয়েটাকে নিয়ে বের হয়ে যাও।

আদির মা আঁতকে উঠলেন।

—আপনি কী করছেন?

—আমি যা করার দরকার, তাই করছি।

আদি কয়েক সেকেন্ড বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর শান্ত গলায় বলল,

—ঠিক আছে।

ইশা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

—আদি...

আদি তার হাত ধরল।

—চলো।

মা ছুটে এসে ইশার হাত ধরলেন।

—মা, তুমি কিছু মনে কোরো না।

ইশা চোখে পানি নিয়ে বলল,

—আমি কিছু মনে করিনি।

আদির মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন।

—তুই আমার ছেলের পছন্দ। তাই তুই আমার কাছেও আপন।

আদির বাবা মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

আদি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

—মা, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

মা চোখ মুছে বললেন,

—আমিও তোকে।

আদি ইশাকে নিয়ে গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

বাড়ির বিশাল গেটের সামনে এসে ইশা থেমে গেল।

পেছনে তাকাল।

এই বাড়িতে তার স্বপ্নের কোনো জায়গা হলো না।

কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার চোখে সে নিজের জন্য একটা পুরো পৃথিবী দেখতে পেল।

আদি বলল,

—চলো।

ইশা চোখের পানি মুছে তার পাশে এসে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ পর তারা শহরের একটা ছোট্ট বাসার সামনে এসে থামল।

বাসাটা খুব সাধারণ।

একটা ছোট ড্রয়িংরুম, একটা শোবার ঘর, ছোট্ট রান্নাঘর।

ইশা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখল।

আদি বলল,

—খুব ছোট।

ইশা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—আমার কুঁড়েঘরও তো ছোট ছিল।

—কিন্তু এটা তোমার নিজের ঘর।

ইশা কিছু বলল না।

আদি দরজা খুলে দিল।

ইশা ভেতরে ঢুকল।

ঘরটা খুব সাধারণ হলেও পরিষ্কার।

একটা ছোট বিছানা, দুটো চেয়ার, একটা টেবিল।

আদি বলল,

—এখানে হয়তো তোমার অনেক কিছুর অভাব হবে।

ইশা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল।

—তুমি থাকলে হবে না।

আদি থমকে গেল।

ইশা তার হাত ধরল।

—আমার জন্য বড় বাড়ি দরকার নেই। তোমার সঙ্গে থাকাটাই যথেষ্ট।

আদি তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল,

—আমি তোমাকে কোনোদিন কষ্ট দিতে চাই না।

—তুমি আমাকে কষ্ট দাওনি।

—তোমাকে আজ আমার বাবার সামনে অপমানিত হতে হয়েছে।

ইশা মাথা নাড়ল।

—তুমি তো আমার পাশে ছিলে।

আদি আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

সে ইশাকে নিজের কাছে টেনে নিল।

ইশা তার বুকের ওপর মাথা রাখল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।

তারপর আদি খুব আস্তে বলল,

—তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?

ইশা মাথা তুলে তাকাল।

—এতদিন পরে জিজ্ঞেস করছ?

আদি হেসে বলল,

—সরাসরি শুনতে চাই।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

আদি তার কপালে আলতো করে চুমু দিল।

—তাহলে এবার সত্যিই তুমি আমার।

ইশা হেসে বলল,

—আমি তো অনেক আগেই তোমার হয়ে গেছি।

পরদিন সকালে তারা খুব ছোট করে বিয়ের আয়োজন করল।

আদির মা গোপনে সব ব্যবস্থা করলেন।

তিনি ইশার জন্য একটা সুন্দর শাড়ি পাঠালেন।

ইশা শাড়িটা হাতে নিয়ে চোখের পানি মুছল।

—এটা মা দিয়েছেন?

আদি মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

ইশা শাড়িটা বুকে জড়িয়ে ধরল।

সেদিন তাদের বিয়ে হলো খুব সাধারণভাবে।

কোনো বড় আয়োজন ছিল না।

কোনো জাঁকজমক ছিল না।

কিন্তু দুজনের চোখে ছিল অসীম আনন্দ।

বিয়ের পর ইশা যখন আদির পাশে বসে ছিল, আদি তার হাত ধরে বলল,

—আজ থেকে তুমি শুধু আমার ভালোবাসা নও।

—তাহলে?

—আমার স্ত্রী।

ইশা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।

কিন্তু তাদের ছোট্ট ঘরের সেই আনন্দের মধ্যেও দুজনেই জানত—

আদির বাবার রাগ এখনো শেষ হয়নি।

আর তাদের সামনে শুরু হতে যাচ্ছে জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।

তবুও সেদিন রাতে ইশা আদির পাশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।

কারণ তার কাছে একটা ছোট্ট ঘর আর প্রিয় মানুষটির হাত—

বিশাল প্রাসাদের চেয়েও বেশি মূল্যবান ছিল।

বিয়ের পর প্রথম কয়েকটা দিন যেন স্বপ্নের মতো কেটে গেল।

ছোট্ট বাসাটা খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু ইশার কাছে সেটাই হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা।

সকালে ঘুম থেকে উঠে সে রান্না করত। আদি অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিত। যাওয়ার আগে দুজনের মধ্যে ছোটখাটো খুনসুটি হতো।

—আজ নাশতায় কী?

আদি রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল।

ইশা বলল,

—যা রান্না করেছি, তাই।

—আমি যদি অন্য কিছু চাই?

—তাহলে নিজে রান্না করো।

আদি হেসে বলল,

—বিয়ের পর স্ত্রী এত কঠিন হয়ে যাবে জানতাম না।

ইশা মুচকি হেসে বলল,

—পাহাড়ি মেয়েদের সঙ্গে বিয়ে করলে এমনই হয়।

আদি কাছে এসে বলল,

—তাহলে আমি ভুল করিনি।

ইশা লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

এই ছোট ছোট মুহূর্তেই তাদের সংসারটা ভালোবাসায় ভরে উঠছিল।

কিন্তু সুখটা বেশিদিন শান্তিতে থাকল না।

একদিন বিকেলে ইশা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

হঠাৎ নিচে গাড়ি এসে থামল।

আদির বাবার গাড়ি।

ইশার বুক ধক করে উঠল।

কিছুক্ষণ পর দরজায় জোরে ধাক্কা পড়ল।

আদি দরজা খুলতেই তার বাবা সামনে দাঁড়িয়ে।

—তোমার সঙ্গে কথা আছে।

আদি শান্তভাবে বলল,

—বলুন।

বাবা ভেতরে ঢুকলেন।

তার চোখ ঘুরে ঘুরে ছোট্ট বাসাটা দেখল।

—এই জায়গায় থাকছ?

—হ্যাঁ।

—তুমি জানো তোমার কী আছে? বড় বাড়ি, ব্যবসা, টাকা—সব ছেড়ে এই অবস্থায় এসেছ।

আদি বলল,

—আমি নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

—একটা মেয়ের জন্য নিজের পরিবার ছেড়ে দেওয়া কি সিদ্ধান্ত?

আদি গম্ভীর হয়ে বলল,

—ইশা কোনো সমস্যা নয়, বাবা।

—তোমার সমস্যা ওই মেয়েটাই।

ইশা দূরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।

আদি সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

—ইশাকে নিয়ে একটা কথাও বলবেন না।

বাবা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন।

—তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছ?

—আমি আপনার সঙ্গে অসম্মান করছি না। কিন্তু আমার স্ত্রীকে অপমান করতে দেব না।

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—তুমি একদিন বুঝবে তুমি কী ভুল করেছ।

আদি উত্তর দিল,

—হয়তো। কিন্তু সেই ভুলটা আমি নিজের ইচ্ছায় করেছি।

বাবা রাগে বেরিয়ে গেলেন।

দরজা বন্ধ হওয়ার পর ইশা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

আদি তার কাছে এসে বলল,

—তুমি কাঁদছ?

ইশা মাথা নাড়ল।

—না।

—মিথ্যা বলো না।

ইশা চোখ মুছে বলল,

—আমি চাই না তোমার জন্য তোমার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হোক।

আদি তার হাত ধরল।

—তুমি আমার পরিবার।

ইশা তাকিয়ে রইল।

—কিন্তু তোমার মা?

—মা আমাকে বুঝবেন।

দিন যেতে লাগল।

আদি নিজের বাবার ব্যবসায় কাজ করত।

কিন্তু বাবার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর সে সিদ্ধান্ত নিল, সে আর বাবার টাকায় চলবে না।

একদিন সকালে সে ইশাকে বলল,

—আমি চাকরি খুঁজব।

ইশা অবাক।

—তুমি তো বাবার ব্যবসায় কাজ করতে পারতে।

—না।

—কেন?

—আমি চাই আমার সংসার নিজের উপার্জনে চালাতে।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—আমি তোমার সঙ্গে আছি।

আদি তার কপালে আলতো করে হাত রাখল।

—জানি।

কিন্তু চাকরি পাওয়া এত সহজ হলো না।

একটার পর একটা জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরেও আদি কোনো কাজ পেল না।

কখনো অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন।

কখনো যোগ্যতা নিয়ে।

কখনো তার পারিবারিক পরিচয় জেনে তাকে সন্দেহ করা।

একদিন রাতে আদি খুব ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরল।

ইশা দরজা খুলে দিল।

আদির মুখ দেখে সে বুঝতে পারল, আজও কিছু হয়নি।

—কী হয়েছে?

আদি জুতো খুলতে খুলতে বলল,

—কিছু না।

—চাকরি হলো না?

আদি মাথা নাড়ল।

ইশা চুপ করে তার সামনে দাঁড়াল।

তারপর বলল,

—তুমি কি হাল ছেড়ে দেবে?

আদি তাকাল।

—না।

—তাহলে মন খারাপ করছ কেন?

আদি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।

ইশা তার হাত ধরে বলল,

—তুমি আমাকে কষ্ট দিচ্ছ না। বরং তুমি চেষ্টা করছ—এটাই আমার জন্য অনেক।

আদি কিছু বলল না।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—পাহাড়ে একটা কথা শিখেছি।

—কী?

—পাহাড় যত উঁচুই হোক, ধীরে ধীরে উঠলে একসময় চূড়ায় পৌঁছানো যায়।

আদি তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

—তুমি না থাকলে আমি কী করতাম?

—জানি না।

—আমি জানি।

আদি তাকে কাছে টেনে বলল,

—হয়তো হার মেনে নিতাম।

কয়েকদিন পর অবশেষে একটা ছোট প্রতিষ্ঠানে আদির চাকরি হলো।

বেতন খুব বেশি নয়।

কিন্তু নিজের উপার্জনের প্রথম টাকা হাতে নিয়ে সে বাসায় ফিরল।

ইশা দরজা খুলতেই আদি হাসতে হাসতে বলল,

—হয়ে গেছে।

—কী?

—চাকরি।

ইশার চোখ আনন্দে ভিজে উঠল।

সে বলল,

—আমি জানতাম তুমি পারবে।

আদি পকেট থেকে প্রথম বেতনের টাকা বের করে ইশার হাতে দিল।

—এটা তোমার।

ইশা টাকা নিতে চাইল না।

—না, এটা তোমার প্রথম বেতন।

আদি বলল,

—আমাদের প্রথম বেতন।

ইশা টাকাটা হাতে নিয়ে চোখের কাছে ধরে হাসল।

—এটা আমি রেখে দেব।

—কেন?

—আমাদের সংগ্রামের স্মৃতি হিসেবে।

আদি তার কপালে চুমু দিয়ে বলল,

—তুমি আমার সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি।

এরপর তাদের জীবন ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।

আদি কঠোর পরিশ্রম করতে লাগল।

সকালে অফিস।

রাতে বাড়ি।

ছুটির দিনেও কাজ।

ইশা সবসময় পাশে থাকত।

কখনো রাত জেগে তার জন্য খাবার রেখে দিত।

কখনো ক্লান্ত হয়ে ফিরলে মাথায় তেল দিয়ে দিত।

আর আদি প্রতিদিন নতুন করে বুঝতে লাগল—

ইশা শুধু তার ভালোবাসা নয়।

সে তার শক্তি।

এক রাতে দরজায় হালকা শব্দ হলো।

ইশা দরজা খুলে অবাক হয়ে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে আদির মা।

তিনি চারপাশ দেখে নিচু গলায় বললেন,

—আদি কোথায়?

—অফিস থেকে এখনো ফেরেনি।

মা ঘরে ঢুকে ইশাকে জড়িয়ে ধরলেন।

—কেমন আছিস মা?

ইশার চোখে পানি এসে গেল।

—ভালো আছি।

মা তার হাতে একটা ব্যাগ দিলেন।

—তোর জন্য কিছু এনেছি।

ইশা ব্যাগ খুলে দেখল, কয়েকটা শাড়ি, কিছু খাবার আর ছোট্ট একটা বাক্স।

—এসব কেন?

মা হেসে বললেন,

—মেয়ের বাড়িতে মা খালি হাতে আসে?

ইশা তাকে জড়িয়ে ধরল।

—আপনি এভাবে লুকিয়ে আসেন কেন?

মায়ের মুখটা একটু ম্লান হয়ে গেল।

—তোর বাবা এখনো রাগ করে আছে।

—আপনি ভয় পান?

—তোর জন্য না। ওর রাগের জন্য।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—আপনি আসবেন। যতবার পারেন আসবেন।

মা তার মাথায় হাত রাখলেন।

—তুই সত্যিই আমার মেয়ের মতো হয়ে গেছিস।

ঠিক তখনই দরজার বাইরে চাবির শব্দ হলো।

আদি ফিরে এসেছে।

মাকে দেখে সে অবাক হয়ে গেল।

—মা!

মা হেসে বললেন,

—তোমাদের দেখতে এসেছি।

আদি মাকে জড়িয়ে ধরল।

তারপর ইশার দিকে তাকাল।

ইশা মুচকি হাসল।

সেদিন তাদের ছোট্ট বাসায় অনেকদিন পর সত্যিকারের পরিবারের মতো একটা সন্ধ্যা কেটেছিল।

কিন্তু সেই রাতের শেষে কেউ জানত না—

কয়েক মাস পর আদির জীবনে এমন এক খবর আসবে, যা তাকে আবার তার বাবার বাড়ির দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে।

আর সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেবে তাদের পুরো জীবন।

বিয়ের প্রায় এক বছর কেটে গেছে।

সময় খুব ধীরে ধীরে তাদের জীবন বদলে দিয়েছে।

যে ছোট্ট বাসাটায় একসময় শুধু দুজন মানুষ আর অল্প কিছু আসবাব ছিল, এখন সেটাই ইশার কাছে নিজের পৃথিবী।

আদি প্রতিদিন আরও বেশি পরিশ্রম করে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যায়, রাত করে ফেরে।

কিন্তু যতই ক্লান্ত থাকুক, বাসায় ঢোকার সময় তার মুখে হাসি থাকেই।

কারণ দরজার ওপাশে ইশা অপেক্ষা করে।

সেদিনও রাত প্রায় দশটা।

দরজা খুলে আদি ভেতরে ঢুকতেই ইশা এগিয়ে এল।

—এত দেরি হলো?

আদি ব্যাগটা নামিয়ে বলল,

—অফিসে কাজ ছিল।

ইশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—আপনার অফিসটা আপনাকে আমার চেয়ে বেশি ভালোবাসে মনে হয়।

আদি হেসে বলল,

—তাই নাকি?

—হুম।

আদি কাছে গিয়ে বলল,

—তাহলে চাকরিটা ছেড়ে দিই?

ইশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—না না!

আদি হেসে ফেলল।

—তাহলে এত রাগ কেন?

—রাগ না। অভিমান।

—অভিমান ভাঙাব কীভাবে?

ইশা মুখ ঘুরিয়ে বলল,

—জানি না।

আদি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

—তাহলে আমি নিজেই একটা উপায় বের করি।

ইশা তাকাতেই আদি তার হাতে একটা ছোট প্যাকেট দিল।

—এটা কী?

—খুলো।

ইশা খুলে দেখল একটা সুন্দর শাড়ি।

তার চোখ বড় হয়ে গেল।

—এটা আমার জন্য?

—হ্যাঁ।

—কেন?

—এমনিই।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—আপনি না, মাঝে মাঝে খুব ভালো।

আদি বলল,

—মাঝে মাঝে?

—হুম।

—সবসময় না?

—না।

আদি ভান করে রাগ দেখাল।

—তাহলে শাড়িটা ফেরত দাও।

ইশা দ্রুত শাড়িটা বুকে জড়িয়ে বলল,

—না!

দুজনেই হেসে ফেলল।

কয়েকদিন পর আদি অফিস থেকে ফিরেই খুব উত্তেজিতভাবে ইশাকে ডাকল।

—ইশা!

ইশা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল।

—কী হয়েছে?

আদি বলল,

—আমার প্রমোশন হয়েছে!

ইশা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর আনন্দে আদিকে জড়িয়ে ধরল।

—আমি জানতাম!

আদি হেসে বলল,

—তুমি জানতেই?

—হ্যাঁ।

—কীভাবে?

—কারণ তুমি এত পরিশ্রম করো।

আদি তার মাথায় হাত রাখল।

—তোমার জন্যই।

ইশা বলল,

—আমার জন্য না। নিজের জন্যও।

আদি মৃদু হেসে বলল,

—আমার সবকিছুর মধ্যে তুমি আছ।

ইশা তার বুকের ওপর মাথা রাখল।

তাদের জীবনটা সত্যিই বদলে যাচ্ছিল।

অল্প অল্প করে।

ধীরে ধীরে।

অন্যদিকে আদির মা প্রায়ই তাদের বাসায় আসতেন।

কখনো দুপুরে।

কখনো বিকেলে।

কখনো আবার সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পরও।

তিনি ইশার সঙ্গে বসে গল্প করতেন।

একদিন ইশা বলল,

—মা, আপনি এত লুকিয়ে লুকিয়ে আসেন কেন?

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তোর বাবা এখনো তোকে মেনে নিতে পারেনি।

—আমাকে না, নাকি আদি তাকে ছেড়ে চলে যাওয়াটাকে?

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—দুটোই।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—একদিন ঠিক বুঝবে।

—তুই এখনো ওকে নিয়ে আশাবাদী?

—হ্যাঁ।

—কেন?

ইশা বলল,

—কারণ আদি তার বাবাকে ঘৃণা করে না। শুধু তার ভুলটা মেনে নেয় না।

মা ইশার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—তুই আমার ছেলেকে অনেক বদলে দিয়েছিস।

ইশা মাথা নেড়ে বলল,

—না মা। আদি নিজেই ভালো।

মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

—তুই সত্যিই আমার মেয়ের মতো হয়ে গেছিস।

একদিন দুপুরে ইশা রান্না করছিল।

হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।

অপরিচিত একটা নম্বর।

—হ্যালো?

ওপাশ থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ।

—আপনি কি ইশা?

—জি।

—আমি আদির অফিস থেকে বলছি।

ইশার বুক ধক করে উঠল।

—কী হয়েছে?

—আদিকে দ্রুত ফোন করতে বলবেন।

—কেন?

—তার বাবার বাড়ি থেকে ফোন এসেছে।

ইশা কিছু বুঝতে পারল না।

সন্ধ্যায় আদি বাসায় ফিরলে ইশা সব বলল।

আদি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—বাবার বাড়ি থেকে কেন ফোন করবে?

—জানি না।

—মাকে ফোন করি।

আদি ফোন করল।

কিন্তু মা ফোন ধরলেন না।

আবার করল।

তবুও না।

আদির বুকের ভেতর অস্বস্তি বাড়তে লাগল।

রাতের দিকে অবশেষে তার বাবার কাছ থেকে ফোন এল।

আদি ফোন ধরল।

ওপাশে বাবার কণ্ঠ অদ্ভুতভাবে ভারী।

—আদি।

—হ্যাঁ।

—তোর মা অসুস্থ।

আদি যেন পাথর হয়ে গেল।

—কী?

—কয়েকদিন ধরে শরীর খারাপ ছিল। আজ অবস্থা খারাপ হয়েছে।

আদি উঠে দাঁড়িয়ে গেল।

—আমি আসছি।

ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর বাবা বললেন,

—এসো।

ফোন কেটে গেল।

আদি ফোনটা নামিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ইশা তার কাছে এসে বলল,

—কী হয়েছে?

আদি ধীরে বলল,

—মা অসুস্থ।

ইশার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—তাহলে যাও।

আদি মাথা নাড়ল।

—না।

—কেন?

—বাবা আমাকে এতদিন সেই বাড়িতে ঢুকতে দেননি।

—কিন্তু তোমার মা অসুস্থ।

—আমি জানি।

—তাহলে?

আদি চুপ করে রইল।

তার চোখে রাগ, কষ্ট আর অভিমান একসঙ্গে।

—আমি গেলে আবার অপমান করবে।

ইশা তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

—তোমার মা কি তোমাকে অপমান করেছেন?

—না।

—তাহলে তার শাস্তি কেন হবে?

আদি কিছু বলল না।

ইশা তার হাত ধরল।

—তুমি যদি আজ না যাও, পরে নিজেকেই ক্ষমা করতে পারবে না।

—কিন্তু বাবা—

—তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছ না। তুমি তোমার মায়ের কাছে যাচ্ছ।

আদি চোখ বন্ধ করল।

ইশা বলল,

—আমি তোমাকে হারাতে চাই না। কিন্তু তোমাকে তোমার মায়ের কাছ থেকেও দূরে রাখতে চাই না।

আদি রাগী গলায় বলল,

—তুমি বুঝতে পারছ না।

—আমি বুঝতে পারছি।

—না, তুমি বুঝছ না!

আদি প্রথমবার ইশার সঙ্গে একটু উঁচু গলায় কথা বলল।

ইশা চুপ হয়ে গেল।

আদি সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল বুঝতে পারল।

—ইশা...

মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে নিল।

আদি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—আমি দুঃখিত।

ইশার চোখে পানি এসে গেল।

—তোমার রাগ আমার ওপর না। পরিস্থিতির ওপর।

আদি তার কাছে এসে দাঁড়াল।

—আমি ভয় পাচ্ছি।

ইশা তার দিকে তাকাল।

—কিসের?

—মাকে হারানোর।

ইশা এবার তার হাত দুটো নিজের হাতে নিল।

—তাহলে যাও।

—তুমি?

—আমি আছি।

—বাবা যদি—

—যা হওয়ার হবে।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—তোমার মা তোমাকে দেখতে চাইছেন। আর তুমি তার ছেলে। এত বছর পরও সেই সম্পর্কটা কেউ কেড়ে নিতে পারেনি।

আদি চোখ মুছে ফেলল।

তারপর বলল,

—তুমি আমার সঙ্গে যাবে?

ইশা একটু থেমে মাথা নাড়ল।

—না।

—কেন?

—এটা তোমার আর তোমার মায়ের সময়। আমি গেলে হয়তো পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে।

আদি কিছু বলল না।

ইশা তার হাতে গাড়ির চাবি তুলে দিল।

—যাও।

আদি দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

ইশা দাঁড়িয়ে আছে।

আদি বলল,

—আমি ফিরে আসব।

ইশা মৃদু হাসল।

—জানি।

আদি বেরিয়ে গেল।

আর সেই রাতেই বহুদিন পর সে আবার সেই বিশাল বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।

গেটটা তার সামনে।

এই গেট দিয়েই একদিন তার স্ত্রীকে অপমান করে বের করে দেওয়া হয়েছিল।

আজ সেই একই গেটের ওপাশে তার মা মৃত্যুশয্যায়।

আদি গাড়ি থেকে নামল।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করল।

তারপর ধীরে ধীরে গেটের দিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু সে জানত না—

এইবার গেটের ওপাশে শুধু অসুস্থ মা নয়।

অপেক্ষা করছে তার বাবার সঙ্গে বহু বছরের জমে থাকা অভিমানের শেষ অধ্যায়ও।

রাত অনেক হয়েছে।

বাড়ির বিশাল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আদি কয়েক মুহূর্ত নড়ল না।

একসময় যে বাড়িটা তার নিজের ছিল, আজ সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েই তার মনে হচ্ছে সে যেন একজন অপরিচিত মানুষ।

গেটের ভেতরে আলো জ্বলছে।

কিন্তু তার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছে—

মা কেমন আছে?

অবশেষে সে গেট খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

দরজার কাছে পৌঁছাতেই একজন পুরোনো কর্মচারী তাকে দেখে থমকে গেল।

—ছোট সাহেব!

আদি নিচু গলায় বলল,

—মা কোথায়?

লোকটা চোখ মুছে বলল,

—উপরে।

আদি আর কোনো কথা না বলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল।

ঘরের দরজা খোলা।

বিছানায় তার মা শুয়ে আছেন।

চোখ বন্ধ।

মুখটা অনেক শুকিয়ে গেছে।

আদি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে মায়ের কাছে গিয়ে বসে হাত ধরল।

—মা...

মা চোখ খুললেন।

প্রথমে যেন বিশ্বাসই করতে পারলেন না।

—আদি?

আদি মায়ের হাত নিজের মুখে চেপে ধরল।

—হ্যাঁ মা।

মায়ের চোখে সঙ্গে সঙ্গে পানি চলে এল।

—তুই এসেছিস?

—তুমি ডাকলে আমি না এসে থাকতে পারি?

মা কাঁপা হাতে তার মাথায় হাত রাখলেন।

—তোর বাবা বলেছিল তুই হয়তো আসবি না।

আদি চোখ নামিয়ে বলল,

—আমি আসতে চাইনি।

মা কষ্টের হাসি দিয়ে বললেন,

—জানি।

—কিন্তু ইশা আমাকে পাঠিয়েছে।

মায়ের চোখে এক মুহূর্তে মায়া ফুটে উঠল।

—ও?

আদি মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ। ও বলেছে, মায়ের কাছে না গেলে পরে নিজেকেই ক্ষমা করতে পারব না।

মা চোখ বন্ধ করলেন।

—মেয়েটা সত্যিই ভালো।

আদি মৃদু হেসে বলল,

—অনেক ভালো।

ঠিক তখন দরজার কাছে একটা ছায়া দেখা গেল।

আদির বাবা।

তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।

আদি বাবার দিকে তাকাল।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

অনেকদিন পর বাবা-ছেলের দেখা।

কিন্তু কোনো কথা নেই।

বাবা ধীরে ঘরে ঢুকলেন।

—ডাক্তার বলেছে, কয়েকদিন বিশ্রাম দরকার।

আদি মায়ের হাত ছাড়ল না।

—কী হয়েছিল?

—অনেকদিন ধরে শরীর খারাপ ছিল। তোর মা তোকে বলতে দেয়নি।

মা আস্তে বললেন,

—তুই নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তোকে চিন্তায় ফেলতে চাইনি।

আদি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমি কি তোমার ছেলে নই?

মায়ের চোখ ভিজে উঠল।

—তুই তো আমার সব।

আদি মাথা নিচু করল।

বাবা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

সেই রাতটা আদি মায়ের পাশেই কাটাল।

রাতের একসময় মা ঘুমিয়ে পড়লে সে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

বাবাও সেখানে ছিলেন।

দুজনের মাঝে কয়েক হাত দূরত্ব।

বাবা প্রথমে কথা বললেন।

—ইশা কেমন আছে?

আদি অবাক হয়ে তাকাল।

—ভালো।

—তুই সুখে আছিস?

আদি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—হ্যাঁ।

—খুব?

আদি মৃদু হাসল।

—খুব।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তোর মা বলেছিল, মেয়েটা তোকে বদলে দিয়েছে।

আদি বলল,

—ও আমাকে বদলায়নি। শুধু আমার ভালো দিকটা বুঝতে শিখিয়েছে।

বাবা নিচের বাগানের দিকে তাকালেন।

—আমি হয়তো ভুল করেছিলাম।

আদি কিছু বলল না।

—তখন মনে হয়েছিল, তুই আবেগের বশে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছিস।

আদি শান্ত গলায় বলল,

—আপনি আমাকে নিজের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ দেননি।

বাবা মাথা নিচু করলেন।

—আমি ভয় পেয়েছিলাম।

—কিসের?

—তুই কষ্ট পাবি।

আদি হেসে ফেলল।

—আমি কষ্ট পেয়েছি, বাবা। কিন্তু ইশার জন্য না।

বাবা তার দিকে তাকালেন।

আদি বলল,

—ইশাকে অপমান করে আপনি আমাকে কষ্ট দিয়েছিলেন।

বাবা কিছু বললেন না।

কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে বললেন,

—আমি বুঝেছি।

আদি অবাক হয়ে তাকাল।

—কী বুঝেছেন?

—মানুষের মূল্য তার পরিবারের টাকা দিয়ে মাপা যায় না।

আদির চোখ ভিজে উঠল।

বাবা এবার তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—তুই কি ওকে নিয়ে আসবি?

আদি কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারল না।

—আপনি সত্যি বলছেন?

বাবা মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ।

—আপনি ওকে মেনে নেবেন?

বাবার গলা ভারী হয়ে গেল।

—আমি ভুল করেছি।

আদি বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

অনেক বছর পর।

বাবাও ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।

কেউ কিছু বলল না।

শুধু দুজনের চোখের পানি অনেক কথা বলে দিল।

সকালে ইশার ফোনে আদির কল এল।

—হ্যালো?

ওপাশে আদির কণ্ঠ।

—ইশা।

—মা কেমন আছেন?

—ভালো আছেন। ডাক্তার বলেছেন এখন বিপদ নেই।

ইশা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

—আলহামদুলিল্লাহ।

আদি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।

—কী?

—বাবা তোমাকে দেখতে চান।

ইশা চুপ।

—কী বললে?

—বাবা তোমাকে মেনে নিয়েছেন।

ইশার চোখে পানি চলে এল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—তুমি নিশ্চিত?

আদি হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

ইশা কিছু বলতে পারল না।

আদি বলল,

—আজ তুমি আমার সঙ্গে যাবে?

ইশা চোখ মুছে বলল,

—হ্যাঁ।

কয়েক ঘণ্টা পর ইশা সেই বিশাল বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।

একই গেট।

একই বাড়ি।

কিন্তু আজকের অনুভূতিটা সম্পূর্ণ আলাদা।

আদি গাড়ি থেকে নেমে তার হাত ধরল।

—ভয় পাচ্ছ?

ইশা আস্তে বলল,

—একটু।

—আমি আছি।

ইশা মৃদু হাসল।

—তুমি সবসময় এই কথাটাই বলো।

—কারণ এটা সত্যি।

দুজন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

দরজার সামনে আদির মা দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ইশাকে দেখেই তিনি এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন।

—মা!

ইশার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

—মা, আপনি কেমন আছেন?

—এখন ভালো আছি। তুই এসেছিস, তাই আরও ভালো লাগছে।

তারপর মা ইশার হাত ধরে তাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।

ইশা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আদির বাবাকে দেখল।

তিনি চুপচাপ তাকিয়ে আছেন।

ইশা মাথা নিচু করে সালাম করল।

—আসসালামু আলাইকুম।

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

—ওয়ালাইকুম সালাম।

তিনি কাছে এসে ইশার দিকে তাকালেন।

—আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?

ইশা অবাক হয়ে তাকাল।

—আপনি?

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—সেদিন তোকে গেটের সামনে থেকে বের করে দিয়েছিলাম। তুই কিছু বলিসনি। আমার ছেলেকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম।

ইশার চোখ ভিজে উঠল।

—আপনি আমার বড়। আপনার ওপর রাগ করে থাকলে আমি ছোট হয়ে যাব।

বাবার চোখেও পানি চলে এল।

তিনি ইশার মাথায় হাত রাখলেন।

—তুই আজ থেকে এই বাড়ির বউ না।

ইশা তাকাল।

বাবা বললেন,

—তুই আমার মেয়ে।

ইশা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

সে কাঁদতে কাঁদতে বাবার হাত ধরে ফেলল।

দূরে দাঁড়িয়ে আদি সব দেখছিল।

তার মুখে হাসি।

কিন্তু চোখে পানি।

তার মা পাশে এসে বললেন,

—দেখলি? আমি বলেছিলাম, একদিন সব ঠিক হবে।

আদি মায়ের হাত ধরল।

—ইশা না থাকলে কিছুই ঠিক হতো না।

মা হেসে বললেন,

—তোর ভাগ্য ভালো যে তুই ওকে পেয়েছিস।

আদি ইশার দিকে তাকাল।

—আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ির সবাই একসঙ্গে খেতে বসল।

অনেকদিন পর সেই টেবিলে হাসির শব্দ।

ইশা এক পাশে বসে।

আদি তার পাশে।

মা সামনে।

আর বাবা কিছুক্ষণ পর পর ইশার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন।

—এটা নাও।

—জি।

—আর এটা খাও।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—আমি এত খেতে পারব না।

বাবা বললেন,

—বউ হয়ে এসে এত লজ্জা করলে চলবে?

আদি হেসে ফেলল।

—বাবা, তুমি কিন্তু একদম বদলে গেছ।

বাবা গম্ভীর মুখে বললেন,

—চুপ কর। তোর বউকে খাওয়াচ্ছি।

সবাই হেসে উঠল।

ইশা চুপচাপ আদির দিকে তাকাল।

আদি তার হাতের নিচে লুকিয়ে নিজের হাতটা এগিয়ে দিল।

ইশা হাতটা ধরল।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

কোনো কথা প্রয়োজন হলো না।

তাদের দীর্ঘ পথের কষ্ট যেন আজ সত্যিই শেষ হয়ে গেল।

তবে গল্পের শেষটা এখানেই নয়।

কারণ আদি আর ইশার সামনে অপেক্ষা করছে আরও সুন্দর একটা সকাল—

যেখানে পাহাড়ের সেই ছোট্ট কুঁড়েঘরের মেয়ে আর শহরের বড়লোক পরিবারের ছেলে একই ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে বুঝবে—

ভালোবাসা সত্যি হলে, দূরত্ব যতই বড় হোক, শেষ পর্যন্ত মানুষ তার আপন জায়গায় ফিরেই আসে।

সকালের আলো পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকতেই ইশার ঘুম ভেঙে গেল।

কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে সে চারপাশে তাকাল।

এটা সেই ছোট্ট বাসা নয়।

এটা সেই পাহাড়ের কুঁড়েঘরও নয়।

এটা তার শ্বশুরবাড়ির ঘর।

অথচ আজ ঘরটাকে আর অচেনা লাগছে না।

কারণ এই বাড়ির মানুষগুলো এখন তাকে আপন করে নিয়েছে।

ইশা ধীরে ধীরে উঠে জানালার কাছে গেল।

বাইরে বিশাল বাগান।

ফুলের গাছ।

সবুজ ঘাস।

দূরে গাড়ি রাখার জায়গা।

কিন্তু তার চোখ বারবার চলে গেল পাশের বালিশের দিকে।

আদি নেই।

বিছানায় একটা ছোট্ট কাগজ রাখা।

ইশা সেটা তুলে পড়ল।

“ঘুম থেকে উঠলে নিচে এসো। তোমার জন্য একটা চমক আছে।”

ইশার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

—এই ছেলেটা আবার কী করছে?

নিচে এসে ইশা দেখল, আদি ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

তার মা-বাবাও সেখানে।

আদি ইশাকে দেখেই বলল,

—এসেছ?

ইশা মাথা নাড়ল।

—চমক কোথায়?

আদি মুচকি হেসে বলল,

—আগে নাশতা।

ইশা বিরক্ত মুখে বলল,

—না। আগে চমক।

আদির বাবা হেসে ফেললেন।

—এই মেয়েটা কিন্তু তোকে একদম নিজের মতো করে ফেলেছে।

আদি বলল,

—অনেক আগেই।

মা ইশার সামনে নাশতা রেখে বললেন,

—খেয়ে নে মা।

ইশা বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ পর আদি বলল,

—আজ আমরা পাহাড়ে যাব।

ইশা চমকে তাকাল।

—পাহাড়ে?

—হ্যাঁ।

—কেন?

—তোমার দাদিকে দেখতে।

ইশার মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

আদির বাবা বললেন,

—তোমার দাদিকেও আমাদের সঙ্গে নিয়ে আসব।

ইশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর চোখে পানি চলে এল।

—আপনি সত্যিই দাদিকে নিয়ে আসবেন?

বাবা মাথা নাড়লেন।

—অবশ্যই। উনি তো আমাদের মেয়েকে এতদিন মানুষ করেছেন।

ইশা উঠে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল।

—ধন্যবাদ।

বাবা মৃদু হেসে বললেন,

—আমাকে ধন্যবাদ দিস না। বরং আমাকে আরেকটা সুযোগ দিস।

ইশা মাথা নিচু করে বলল,

—আপনি তো অনেক আগেই আমার বাবা হয়ে গেছেন।

বাবার চোখেও পানি এসে গেল।

আদি পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছিল।

কয়েক ঘণ্টা পর তারা সবাই পাহাড়ের পথে রওনা হলো।

এবার গাড়িতে শুধু আদি আর ইশা নয়।

আদির মা-বাবাও সঙ্গে।

ইশা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে কাছে আসছে।

একসময় সেই পরিচিত সবুজ পথগুলো চোখে পড়ল।

ইশার বুক কেঁপে উঠল।

—ওই রাস্তা!

আদি হেসে বলল,

—চিনতে পেরেছ?

—এই পথেই তো তুমি দুর্ঘটনা করেছিলে।

আদি বলল,

—আর সেখানেই তোমাকে পেয়েছিলাম।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—তুমি যদি সেদিন এত জোরে গাড়ি না চালাতে, তাহলে হয়তো আমাদের দেখা হতো না।

আদি হেসে বলল,

—তাহলে দুর্ঘটনাটা আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘটনা।

ইশা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—এমন দুর্ঘটনা আবার করো না।

—না।

আদি তার হাত ধরে বলল,

—কারণ এবার তোমাকে হারানোর ভয় আছে।

ইশা মৃদু হেসে তার হাতটা চেপে ধরল।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি সেই ছোট্ট কুঁড়েঘরের সামনে থামল।

ইশা প্রায় দৌড়ে ভেতরে গেল।

—দাদি!

দাদি দরজা থেকে বেরিয়ে এলেন।

নাতনিকে দেখে তার চোখে পানি।

—ইশা!

দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরল।

দাদি আদির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—তুই কথা রেখেছিস বাবা।

আদি এগিয়ে এসে দাদির পায়ে হাত রাখল।

—আপনি না থাকলে আমি ইশাকে পেতাম না।

দাদি তার মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তাহলে আমাকে ভুলে যাস না।

—কখনো না।

আদির মা এগিয়ে এসে দাদিকে জড়িয়ে ধরলেন।

—আপনি আমাদের মেয়েকে এতদিন নিজের হাতে বড় করেছেন। আপনার কাছে আমরা ঋণী।

দাদি মৃদু হেসে বললেন,

—মেয়েকে ভালো রাখবেন। তাহলেই আমার ঋণ শোধ হবে।

আদির বাবা সামনে এসে দাঁড়ালেন।

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।

দাদি অবাক হয়ে তাকালেন।

—আমার কাছে?

—হ্যাঁ। আপনার নাতনিকে আমি একসময় গ্রহণ করতে পারিনি। তাকে কষ্ট দিয়েছি।

দাদি মাথা নাড়লেন।

—ভুল মানুষই করে।

বাবা বললেন,

—কিন্তু ভুল বুঝতে দেরি করেছি।

দাদি হেসে বললেন,

—দেরিতে হলেও বুঝেছেন। এটাই বড় কথা।

সন্ধ্যার দিকে সবাই পাহাড়ের সেই জায়গাটায় গেল, যেখানে একদিন আদি ইশাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল।

সেই নির্জন জায়গা।

সামনে সবুজ উপত্যকা।

দূরে মেঘ।

ইশা দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক সেই জায়গায়।

আদি ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

—মনে আছে?

ইশা হেসে বলল,

—সব মনে আছে।

—এখানেই আমি তোমাকে প্রথম বলেছিলাম...

ইশা তার কথা শেষ করে দিল।

—তুমি আমাকে ভালোবাসো।

আদি হাসল।

—আর তুমি বলেছিলে?

ইশা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—হ্যাঁ।

আদি তার হাত ধরল।

—আজ আবার একটা কথা বলব।

—কী?

আদি পকেট থেকে ছোট্ট একটা বাক্স বের করল।

ইশার চোখ বড় হয়ে গেল।

—এটা কী?

আদি বাক্সটা খুলে একটা সুন্দর আংটি বের করল।

—সেদিন তোমাকে ভালোবাসার কথা বলেছিলাম। আজ আবার প্রতিশ্রুতি দিতে চাই।

ইশার চোখে পানি জমল।

আদি বলল,

—জীবনে যত ঝড় আসুক, যত সমস্যা আসুক, আমি তোমার হাত ছাড়ব না।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—আমিও না।

আদি তার আঙুলে আংটিটা পরিয়ে দিল।

তারপর দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

দূরে দাঁড়িয়ে আদির মা-বাবা আর দাদি তাদের দেখছিলেন।

দাদি মুচকি হেসে বললেন,

—দেখলেন? পাহাড় ঠিকই ওদের মিলিয়েছে।

আদির বাবা মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ। আর আমি প্রায় এই সুখটা নষ্ট করে ফেলেছিলাম।

মা তার হাত ধরলেন।

—কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনি ঠিক হয়েছেন।

বাবা মৃদু হেসে বললেন,

—আমার ছেলের বউ আমাকে ঠিক করে দিয়েছে।

সন্ধ্যা নেমে এলো।

পাহাড়ের আকাশে লালচে আলো ছড়িয়ে পড়েছে।

ইশা আর আদি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছিল।

আদি বলল,

—তুমি কি কখনো ভাবতে পেরেছিলে, সেদিন ঝরনা থেকে পানি আনতে গিয়ে একটা গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার ছেলেকে পাবে?

ইশা হেসে বলল,

—না।

—আর আমি ভাবিনি, পাহাড়ে ঘুরতে এসে আমার পুরো জীবনটাই বদলে যাবে।

ইশা তার কাঁধে মাথা রাখল।

—আমাদের গল্পটা কিন্তু খুব অদ্ভুত।

আদি বলল,

—অদ্ভুত না।

—তাহলে?

—ভাগ্যের লেখা।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে ভাগ্যকে ধন্যবাদ।

আদি তার হাত ধরে বলল,

—আমিও।

কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে থাকল।

পাহাড়ের বাতাস ইশার চুল উড়িয়ে দিচ্ছিল।

আদি আগের মতোই আলতো করে তার মুখের পাশের চুল সরিয়ে দিল।

ইশা হেসে বলল,

—তুমি এখনো এটা করো?

—সবসময় করব।

—কেন?

আদি মৃদু গলায় বলল,

—কারণ তোমার মুখটা দেখতে আমার ভালো লাগে।

ইশা লজ্জা পেয়ে তার বুকে মাথা রাখল।

দূরে তখন সূর্য পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু তাদের জীবনে যেন নতুন সূর্য উঠেছে।

একসময় যে মেয়েটা ছোট্ট কুঁড়েঘরে দাদির সঙ্গে থাকত, সে আজ ভালোবাসা, সম্মান আর আপন মানুষের ভরা একটা পরিবার পেয়েছে।

আর যে ছেলে সবকিছু পেয়েও নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটাকে খুঁজে পায়নি, সে পাহাড়ের এক অচেনা মেয়ের মধ্যে নিজের পুরো পৃথিবী খুঁজে পেয়েছে।

আদি ধীরে বলল,

—ইশা।

—হুম?

—একটা কথা বলব?

—বলো।

—আমি তোমাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম, সেদিনই জানতাম না তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প হয়ে যাবে।

ইশা মৃদু হেসে বলল,

—আর আমি জানতাম না, একটা দুর্ঘটনা আমার জীবনটাকে এত সুন্দর করে দেবে।

দুজনের হাসি মিশে গেল পাহাড়ি বাতাসে।

 

....
👁 727