সকালের আকাশটা ছিল বেশ পরিষ্কার।
স্কুলের দিকে যাওয়ার রাস্তায় তখন একের পর এক ছাত্রছাত্রী হেঁটে যাচ্ছে। কেউ দল বেঁধে গল্প করছে, কেউ বই হাতে দ্রুত পা চালাচ্ছে। রাস্তার পাশের ছোট দোকানগুলোতেও তখন ভিড় জমতে শুরু করেছে।
তারা ধীরে ধীরে স্কুলের দিকে হাঁটছিল।
মেয়েটার নাম তারা।
চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে। খুব বেশি কারও সঙ্গে মিশে না। পড়াশোনায় ভালো, নিজের মতো থাকতে পছন্দ করে।
তারা ছোটবেলা থেকেই তার চাচার বাসায় বড় হয়েছে। মা-বাবা কেউ নেই। চাচা-চাচিই তার পৃথিবী। তাই নিজের কষ্টগুলো সে কখনো কারও সামনে প্রকাশ করে না।
সেদিনও স্কুলের পোশাক পরে বইগুলো বুকের কাছে চেপে ধরে হাঁটছিল।
হঠাৎ—
ছপাৎ!
পেছন থেকে ছিটকে আসা রাস্তার কাদা পুরোপুরি তার পোশাকে এসে পড়ল।
তারা থমকে দাঁড়াল।
তার সাদা জামার নিচের অংশে কাদার দাগ।
কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা বলতে পারল না।
তারপর ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।
একটা সাইকেলের ওপর বসে থাকা ছেলে হাসতে হাসতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
ছেলেটার নাম রাহুল।
স্কুলে তার বেশ নামডাক। এক ব্যাচ জুনিয়র হলেও প্রায় সবাই তাকে চেনে। দুষ্টুমি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, সবার সঙ্গে মজা করা—এসব যেন তার নিত্যদিনের কাজ।
রাহুল একটু দূরে গিয়ে সাইকেল থামিয়ে পেছনে তাকাল।
তারা রাগে ফুঁসছে।
—এই!
রাহুল ভান করে অবাক হলো।
—জি?
—তুমি ইচ্ছা করে এটা করেছ!
—আমি? না তো!
—তাহলে কি আকাশ থেকে কাদা এসে আমার গায়ে পড়েছে?
রাহুল হাসি আটকে বলল,
—হয়তো প্রকৃতির ইচ্ছা।
—তোমার সাহস তো কম না!
তারা রাগে এগিয়ে এল।
—তুমি জানো আমি কে?
রাহুল মাথা চুলকে বলল,
—না। তবে মনে হচ্ছে খুব রাগী কেউ।
—বদমাইশ!
বলেই তারা চলে গেল।
রাহুল তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
—মেয়েটা তো বেশ ভয়ংকর!
কিছুক্ষণ পর রাহুল তার বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে ঢুকল।
বন্ধুদের একজনকে জিজ্ঞেস করল,
—এই মেয়েটা কে রে?
—কোন মেয়েটা?
—যার গায়ে কাদা লাগিয়ে দিলাম।
বন্ধুটি হেসে বলল,
—ও? তারা।
—কোন ক্লাসে?
বন্ধুটি বলল,
—তুই জানিস না? ও তো তোর এক ব্যাচ সিনিয়র!
রাহুলের হাসি মুহূর্তেই থেমে গেল।
—কী?!
—হ্যাঁ। তারা আপু।
রাহুল মাথায় হাত দিল।
—সর্বনাশ!
এদিকে তারাও স্কুলে ঢুকে বান্ধবীদের সব ঘটনা বলছিল।
এক বান্ধবী বলল,
—ছেলেটা কে জানিস?
—না।
—রাহুল। তোর এক ব্যাচ জুনিয়র।
তারা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—তাই নাকি?
—হ্যাঁ। বেশ দুষ্টু ছেলে।
তারা আর কিছু বলল না।
কিন্তু মনে মনে ঠিক করল—
ছেলেটাকে ক্ষমা করবে না।
পরদিন সকালে রাহুল সত্যিই তার সামনে এসে দাঁড়াল।
হাতে কান ধরে বলল,
—সরি।
তারা বই খুলে বসে রইল।
রাহুল আবার বলল,
—শুনছেন?
কোনো উত্তর নেই।
তার বান্ধবীরা বিষয়টা দেখে মজা পেয়ে গেল।
একজন বলল,
—তারা, ওকে ক্ষমা করিস না। আগে কান ধরে উঠবস করাস।
রাহুলের মুখটা একটু শক্ত হয়ে গেল।
—এতটা?
আরেকজন বলল,
—হ্যাঁ। না হলে সিনিয়র আপুর মান থাকবে কীভাবে?
রাহুল বিরক্ত হলেও শেষ পর্যন্ত কান ধরে উঠবস করতে শুরু করল।
—এক...
—দুই...
তারা এবার না চাইলেও মুখের কোণে সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
রাহুল সেটা দেখে ফেলল।
পরদিন সকাল থেকেই রাহুলের মাথায় একটা কথাই ঘুরছিল।
তারা আপু।
গতকাল পর্যন্ত যাকে সে শুধু রাগী একটা মেয়ে ভেবেছিল, আজ জানতে পেরেছে মেয়েটা তার এক ব্যাচ সিনিয়র।
আর সবচেয়ে বড় কথা, গতকাল সে সেই সিনিয়রের গায়ে কাদা ছিটিয়ে দিয়েছিল!
তারপর আবার কান ধরে উঠবসও করতে হয়েছে।
বন্ধুরা অবশ্য সকাল থেকেই তাকে নিয়ে মজা করছিল।
—কী রে রাহুল, আজকে তারা আপুর সামনে যাওয়ার সাহস আছে?
রাহুল ব্যাগটা বেঞ্চের ওপর ছুড়ে দিয়ে বলল,
—চুপ কর।
—কী হয়েছে? এত রাগ কেন?
—কিছু হয়নি।
—তাহলে কাল কান ধরে উঠবস করলি কেন?
রাহুল চোখ বড় করে তাকাল।
—তোদের জন্যই তো!
বন্ধুরা হেসে উঠল।
রাহুলও হাসল।
কিন্তু চোখের কোণে যেন অন্যরকম একটা ভাব ছিল।
সে জানত, তারা তাকে এখনো পছন্দ করে না। বরং তাকে দেখলেই বিরক্ত হয়।
তবু কেন জানি মেয়েটাকে তার বারবার মনে পড়ছিল।
ক্লাস শুরু হওয়ার আগে রাহুল করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ দূর থেকে তারা আর তার দুই বান্ধবীকে আসতে দেখা গেল।
রাহুল সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
তার এক বন্ধু ফিসফিস করে বলল,
—এই যে, তোর সিনিয়র আসছে।
রাহুল কনুই দিয়ে বন্ধুকে ধাক্কা দিল।
তারা পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় রাহুল আস্তে বলল,
—সুপ্রভাত, সিনিয়র।
তারা একবার তাকাল।
তারপর কোনো উত্তর না দিয়ে চলে গেল।
রাহুল মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—এত ভাব!
তারপর নিজেই হেসে ফেলল।
তারা অবশ্য ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিল।
কিন্তু সে পাত্তা দিল না।
স্কুলে রাহুলের দুষ্টুমির কোনো শেষ ছিল না। কখনো বন্ধুর ব্যাগ লুকিয়ে রাখা, কখনো ক্লাসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে ভয় দেখানো, কখনো শিক্ষকের চোখ এড়িয়ে ছোটখাটো কাণ্ড করা—সবকিছুতেই সে যেন সবার আগে।
তবে একটা ব্যাপার তারা ধীরে ধীরে লক্ষ্য করতে শুরু করল।
প্রতিদিন স্কুলে আসার পথে রাহুল রাস্তার পাশে থাকা কয়েকজন দরিদ্র মানুষকে খাবার কিনে দিত।
প্রথম দিন তারা বিষয়টা খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি।
দ্বিতীয় দিনও একই ঘটনা দেখল।
এক বৃদ্ধ রাস্তার পাশে বসে ছিলেন। রাহুল সাইকেল থামিয়ে দোকান থেকে একটা প্যাকেট খাবার কিনে বৃদ্ধের হাতে দিয়ে দিল।
বৃদ্ধ কিছু বলতে গেলে রাহুল হাসতে হাসতে বলল,
—দাদু, বেশি কিছু না। আপনি খান।
তারপর সাইকেল নিয়ে চলে গেল।
তারা দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
তার বান্ধবী বলল,
—ছেলেটা তো দেখি বাইরে থেকে যতটা বদমাশ, ভেতর থেকে ততটা খারাপ না।
তারা মৃদু স্বরে বলল,
—হুম।
—তুই ওর ওপর এত রাগ করে আছিস কেন?
—কাদায় ভিজিয়ে দিয়েছিল আমাকে।
—সেটা তো ভুল করে করেও থাকতে পারে।
তারা কিছু বলল না।
পরদিন আবার একই দৃশ্য।
রাহুল একটা ছোট্ট ছেলেকে বিস্কুট আর জুস কিনে দিল।
ছেলেটা হাসিমুখে বলল,
—ভাইয়া, কালও আসবেন?
রাহুল হেসে মাথায় হাত রেখে বলল,
—হ্যাঁ, আসব।
তারা এবার একটু অবাক হলো।
যে ছেলে স্কুলে সবার সঙ্গে দুষ্টুমি করে বেড়ায়, সেই ছেলেটার মধ্যে এতটা মায়া আছে—এটা সে ভাবেনি।
সেদিন স্কুল ছুটির পর তারা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
রাহুল সাইকেল নিয়ে বের হচ্ছিল।
হঠাৎ তারা ডাকল,
—এই!
রাহুল সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক করল।
—আমাকে ডাকছেন?
তারা একটু ইতস্তত করে বলল,
—হ্যাঁ।
রাহুল সাইকেল থেকে নামল।
—বলুন, সিনিয়র।
তারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—সেদিনের জন্য তোমাকে একটা কথা বলব।
রাহুল ভেবেছিল আবার কোনো অভিযোগ আসবে।
সে বলল,
—আবার কি কোনো শাস্তি দেবেন?
তারা মাথা নাড়ল।
—না।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
—তুমি তো আমার ছোট।
রাহুল চোখ কপালে তুলে বলল,
—ছোট?
—হ্যাঁ। এক ব্যাচ জুনিয়র।
—তা তো ঠিক।
—সেদিন তোমাকে এত বকাঝকা করা উচিত হয়নি। তোমার ওপর বেশি রাগ করেছিলাম। আমাকে মাফ করে দিও।
রাহুল কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইল।
তারপর হাসল।
—ব্যাপার না।
তারা একটু হাসল।
রাহুল বলল,
—তাহলে আজ থেকে আমরা বন্ধু?
তারা ভ্রু তুলে তাকাল।
—বন্ধু?
—হ্যাঁ। সিনিয়র-জুনিয়র না। বন্ধু।
তারা একটু ভেবে বলল,
—ঠিক আছে। ডান।
রাহুল হাত বাড়িয়ে দিল।
—ফ্রেন্ডশিপ?
তারা হাত মেলাল।
—ফ্রেন্ডশিপ।
সেদিন থেকেই যেন তাদের সম্পর্কটা একটু বদলে গেল।
আগে যেখানে রাহুল তাকে দেখলেই দুষ্টুমি করত, এখন সেখানে ইচ্ছে করেই তার পাশে হাঁটত।
তারা লাইব্রেরিতে গেলে রাহুলও কোনো অজুহাতে লাইব্রেরির আশেপাশে ঘুরঘুর করত।
তারা মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বললে রাহুল দূর থেকে তাকিয়ে থাকত।
একদিন তার বন্ধু তাকে ধরে ফেলল।
—কী দেখিস এত?
রাহুল চোখ সরিয়ে বলল,
—কিছু না।
—তাহলে তারা আপুর দিকে তাকিয়ে হাসছিস কেন?
—আমি হাসছি?
—হ্যাঁ।
রাহুল কিছু বলল না।
বন্ধু আবার বলল,
—তোর কি তারা আপুকে ভালো লাগে?
রাহুল সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—পাগল নাকি?
—তাহলে?
রাহুল মুচকি হেসে বলল,
—জানি না।
কিন্তু সত্যিটা সে নিজেও বুঝতে শুরু করেছিল।
তাকে দেখলেই রাহুলের ভালো লাগত।
তারা যখন হাসত, রাহুলের অকারণে হাসি পেত।
তারা যখন মন খারাপ করে চুপ করে থাকত, রাহুলেরও অস্বস্তি লাগত।
তবে তারা নিজের ব্যাপারে খুব কম কথা বলত।
একদিন রাহুল জিজ্ঞেস করল,
—তুমি সবসময় এত চুপচাপ থাকো কেন?
তারা হেসে বলল,
—আমি কি বেশি কথা বলি না?
—না।
—তাহলে?
—জানি না। তোমাকে দেখলে মনে হয় তুমি অনেক কিছু লুকিয়ে রাখো।
তারা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—সব কথা সবাইকে বলা যায় না।
রাহুল আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
শুধু বলল,
—যেদিন বলতে ইচ্ছে করবে, আমাকে বলবে।
তারা তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—তুমি তো অনেক দুষ্টু।
—দুষ্টু হলেই কি খারাপ?
—না।
—তাহলে?
—তুমি যতটা দেখাও, তার চেয়ে ভালো।
রাহুল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হেসে বলল,
—এই কথাটা আবার বলো।
তারা হেসে ফেলল।
—কেন?
—ভালো লাগছে শুনতে।
দুজনেই হাসতে লাগল।
সেদিন বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় রাহুল আবার রাস্তার পাশে থামল।
এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক বসে ছিলেন।
রাহুল দোকান থেকে খাবার কিনে তার হাতে দিয়ে দিল।
দূরে দাঁড়িয়ে তারা সবটা দেখছিল।
তার মনে হলো—
রাহুল আসলে শুধু দুষ্টু একটা ছেলে নয়।
তার ভেতরে একটা নরম মনও আছে।
আর সেই নরম মনটাই ধীরে ধীরে তার অজান্তে তার নিজের মনেও জায়গা করে নিচ্ছে।
তারা তখনও জানত না—
এই বন্ধুত্ব একদিন এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে, যেখান থেকে আর ফিরে আসার কোনো পথ থাকবে না।
দিনগুলো কেমন যেন দ্রুত কেটে যাচ্ছিল।
তারা আর রাহুলের বন্ধুত্বটাও এর মধ্যে বেশ গভীর হয়ে উঠেছিল।
স্কুলে রাহুলকে এখন প্রায়ই তারার আশেপাশে দেখা যেত। কখনো লাইব্রেরির সামনে, কখনো মাঠের পাশে, আবার কখনো স্কুলের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করত।
তারা প্রথমদিকে ব্যাপারটা নিয়ে বিরক্ত হতো।
কিন্তু এখন আর হয় না।
বরং কোনোদিন রাহুলকে স্কুলে না দেখলে তারাই অজান্তে খেয়াল করত।
একদিন সকালে তারা স্কুলে এসে বান্ধবীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল।
এক বান্ধবী হঠাৎ বলল,
—কী রে, আজ তোর বন্ধু কোথায়?
তারা অবাক হয়ে বলল,
—কোন বন্ধু?
—আরে, রাহুল!
তারা একটু হেসে বলল,
—জানি না।
—তুই ওকে খুঁজছিস নাকি?
—একদম না।
বান্ধবী মুচকি হেসে বলল,
—তোর মুখ কিন্তু অন্য কথা বলছে।
তারা আর কিছু বলল না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে রাহুলের গলা শোনা গেল,
—কার মুখ কী বলছে?
তারা ঘুরে তাকাল।
রাহুল হাতে দুটো ছোট প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
—এই নাও।
তারা অবাক হয়ে বলল,
—এগুলো কী?
—খাবার।
—আমার জন্য?
—না, পাশের গাছটার জন্য।
তারা হেসে ফেলল।
—বদমাশ।
রাহুল একটা প্যাকেট তার হাতে দিয়ে বলল,
—সকালে কিছু খেয়েছ?
তারা মাথা নাড়ল।
—না।
—তাহলে আগে খাও।
তারা প্যাকেটটা হাতে নিল।
—তুমি এত খেয়াল রাখো কেন?
রাহুল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—বন্ধুর খেয়াল রাখা যায় না?
তারা মৃদু হেসে বলল,
—যায়।
সেদিন থেকেই তারা বুঝতে শুরু করল, রাহুলের দুষ্টুমির আড়ালে একটা অদ্ভুত যত্ন লুকিয়ে আছে।
তবে তারা নিজের মনটাকে কিছুতেই নাম দিতে পারছিল না।
রাহুলও পারছিল না।
শুধু জানত—
তারাকে দেখলে তার ভালো লাগে।
তারা হাসলে ভালো লাগে।
তারা রাগ করলে ভালো লাগে।
এমনকি তারা তাকে বকাঝকা করলেও ভালো লাগে।
একদিন স্কুল ছুটির পর রাহুল বলল,
—চলো, তোমাকে একটু এগিয়ে দিই।
তারা বলল,
—দরকার নেই। আমি নিজেই যেতে পারব।
—জানি। তবুও যাব।
—তুমি সবসময় এত জেদ করো কেন?
—কারণ আমি রাহুল।
তারা হেসে মাথা নাড়ল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
রাস্তার পাশে কয়েকজন অসহায় মানুষ বসেছিল।
রাহুল তাদের দেখে থেমে গেল।
দোকান থেকে কয়েকটা খাবার কিনে একজন একজন করে সবার হাতে তুলে দিল।
তারা চুপ করে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
ফেরার সময় সে বলল,
—তুমি প্রতিদিন এটা করো?
রাহুল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
—যতটুকু পারি।
—কেউ জানে?
—জানলে তো আর মজা থাকবে না।
তারা তাকিয়ে বলল,
—তুমি আসলে খুব ভালো।
রাহুল হেসে বলল,
—এই কথাটা মনে রাখবেন, সিনিয়র।
তারা বলল,
—তুমি কিন্তু আবার সিনিয়র বলা শুরু করেছ।
—মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে।
—কেন?
—শুনতে ভালো লাগে।
তারা হেসে ফেলল।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কোথাও যেন অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিচ্ছিল।
দিন কেটে গেল।
এক বিকেলে আকাশটা হঠাৎ বদলে গেল।
সকাল থেকে রোদ ছিল। কিন্তু বিকেলের দিকে পশ্চিম আকাশে একের পর এক কালো মেঘ জমতে শুরু করল।
স্কুলের মাঠ অন্ধকার হয়ে এল।
শিক্ষকেরা দ্রুত সবাইকে বাড়ি চলে যেতে বললেন।
স্কুল ছুটি ঘোষণা হলো।
ছাত্রছাত্রীরা যে যার মতো বেরিয়ে গেল।
তারা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে গেটের দিকে এগোচ্ছিল।
রাহুল তখন সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে।
—চলো।
তারা বলল,
—তুমি যাও। আমি একটু পরে যাব।
—কেন?
—চাচা আসবে নিতে।
রাহুল আকাশের দিকে তাকাল।
—এই আকাশ দেখে মনে হচ্ছে না কেউ আসবে।
তারা কিছু বলল না।
ঠিক তখনই—
ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হলো।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো স্কুল চত্বর পানিতে ভরে যেতে লাগল।
তারা ছুটে গিয়ে স্কুলের বারান্দার নিচে দাঁড়াল।
রাহুলও সাইকেল রেখে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
কিন্তু ততক্ষণে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে।
দূরে বজ্রপাতের আলো মুহূর্তের জন্য চারপাশ আলোকিত করে আবার সব অন্ধকার করে দিচ্ছিল।
স্কুলে আর প্রায় কেউ নেই।
শুধু তারা আর রাহুল।
দুজন বারান্দার পাশে দাঁড়িয়ে।
রাহুল বলল,
—ভয় লাগছে?
তারা মাথা নাড়ল।
—না।
ঠিক তখনই প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত হলো।
তারা চমকে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
অজান্তেই রাহুলকে জড়িয়ে ধরল।
রাহুল কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল।
তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে তারাকে শক্ত করে ধরে বলল,
—ভয় পেয়ো না। আমি আছি।
তারার চোখ বন্ধ।
বৃষ্টির শব্দের মধ্যে রাহুলের কণ্ঠ যেন আরও পরিষ্কার শোনা গেল।
—কিছু হবে না।
রাহুল তার মাথার ওপর হাত রাখল।
তারা ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছিল।
কিন্তু হঠাৎ যেন নিজের অবস্থাটা বুঝতে পেরে সে রাহুলকে ছেড়ে দিল।
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
রাহুল নরম গলায় বলল,
—তারা...
তারা তার দিকে তাকাল না।
চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।
রাহুল অবাক হয়ে বলল,
—তুমি কাঁদছ কেন?
তারা কোনো উত্তর দিল না।
ব্যাগটা শক্ত করে ধরে হঠাৎ বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে গেল।
রাহুল ছুটে তার পেছনে গেল।
—তারা! দাঁড়াও!
তারা থামল না।
—তারা, এত বৃষ্টিতে কোথায় যাচ্ছ?
সে আরও দ্রুত হাঁটতে লাগল।
রাহুল তার হাত ধরতে গিয়েও থেমে গেল।
তারপর চিৎকার করে বলল,
—তারা! অন্তত বলো কী হয়েছে!
তারা একবারও পেছনে তাকাল না।
বৃষ্টির পর্দার মধ্যে ধীরে ধীরে তার অবয়ানটাও হারিয়ে গেল।
রাহুল অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল।
তার বুকের ভেতর অজানা একটা ভয় জন্ম নিল।
এতদিন সে তারাকে হাসতে দেখেছে।
রাগ করতে দেখেছে।
অভিমান করতে দেখেছে।
কিন্তু আজ প্রথমবার—
সে তারাকে কাঁদতে দেখেছে।
আর সেই কান্নার কারণটা সে জানে না।
সারারাত রাহুলের ঘুম হলো না।
বারবার তার মনে হচ্ছিল—
তারা কেন হঠাৎ এমন করে চলে গেল?
পরদিন স্কুলে এসে রাহুল প্রথমেই তারাকে খুঁজল।
তারা ক্লাসে বসে ছিল।
চোখের নিচে কালচে দাগ।
মনে হচ্ছিল সেও সারারাত ঘুমায়নি।
রাহুল তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—তারা।
তারা মাথা তুলল না।
—কাল কী হয়েছিল?
—কিছু না।
—কিছু না হলে তুমি কাঁদছিলে কেন?
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
—শুধু বৃষ্টিতে?
তারা চুপ।
রাহুল এবার নিচু গলায় বলল,
—আমাকে বলো।
তারা মাথা নাড়ল।
—পারব না।
—কেন?
—কারণ...
তার গলা কেঁপে উঠল।
রাহুল আরও কাছে এসে বলল,
—তুমি আমাকে বন্ধু বলেছিলে। বন্ধুর কাছে কি কিছু বলা যায় না?
তারা চোখ তুলে তাকাল।
চোখে ভয়।
অনেকদিন ধরে লুকিয়ে রাখা একটা ভয়।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—আমার চাচাতো ভাই...
রাহুলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—কী হয়েছে?
তারা ঠোঁট কামড়ে বলল,
—ও আমার সঙ্গে প্রায়ই খারাপ আচরণ করে।
রাহুলের চোখ কঠিন হয়ে গেল।
—কী ধরনের?
তারা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নিচু করল।
—আমি কাউকে বলতে পারি না।
রাহুল কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—আজ থেকে পারবে।
তারা অবাক হয়ে তাকাল।
রাহুলের কণ্ঠ এবার দৃঢ়।
—ও যদি আবার তোমার সঙ্গে কিছু করতে আসে, আমাকে ফোন করবে।
—কিন্তু...
—কোনো কিন্তু না।
—তুমি কী করবে?
রাহুল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—যা করা দরকার, তাই করব।
তারা জানত না—
তার চাচাতো ভাই দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দুজনের কথাই লক্ষ্য করছিল।
আর তার চোখে তখন এমন এক দৃষ্টি—
যেটা দেখে ভবিষ্যতের বিপদ সম্পর্কে কেউই তখনও ধারণা করতে পারেনি।
সেদিন রাতটা তারার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর রাত ছিল।
রাহুলকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার পরও সে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল, কিন্তু তার চোখের পানি থামছিল না।
কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা তার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল—
“আমি ফিরব।”
সেই মানুষটাকেই এখন পুলিশ ভ্যানে করে নিয়ে চলে গেছে।
তারা নিজের বুকের ওপর হাত রাখল।
ভেতরটা কেমন শূন্য লাগছে।
চোখের সামনে বারবার সেই দৃশ্যটাই ভেসে উঠছিল।
রাহুলের হাতে ফুলদানি।
তারপর তার চাচাতো ভাই মাটিতে পড়ে গেল।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছিল যে তারা কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি।
রাহুল তাকে বাঁচাতে এসেছিল।
কিন্তু এখন সবাই তাকে অপরাধী বলছে।
তারা ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে এল।
ঘরের মেঝেতে তখনও ফুলদানির ভাঙা টুকরো পড়ে আছে।
সেই জায়গাটার দিকে তাকাতেই তার বুক কেঁপে উঠল।
সে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
“রাহুল...”
কোনো উত্তর এল না।
পরদিন সকালেই থানায় যাওয়া হলো।
রাহুলকে একবার দেখার জন্য তারা অনেক অনুরোধ করল।
কিন্তু তাকে প্রথমে দেখা করতে দেওয়া হলো না।
অনেকক্ষণ পর সুযোগ পেয়ে তারা যখন রাহুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তখন ছেলেটাকে যেন আগের মতো লাগছিল না।
চোখে ক্লান্তি।
চেহারায় অদ্ভুত একটা শান্ত ভাব।
তারা তাকে দেখেই কেঁদে ফেলল।
—রাহুল...
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—কাঁদছ কেন?
—সব আমার জন্য হয়েছে।
—এ কথা আর কখনো বলবে না।
—তুমি আমার জন্য এখানে...
রাহুল মাথা নাড়ল।
—আমি নিজের ইচ্ছায় এসেছি। তোমাকে বাঁচানো দরকার ছিল।
তারা চোখ মুছতে মুছতে বলল,
—তুমি কি বের হতে পারবে?
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—জানি না।
তারা ভয় পেয়ে গেল।
—তাহলে?
রাহুল ধীরে ধীরে বলল,
—তুমি একটা কাজ করবে?
—কী?
—পড়াশোনা করবে।
তারা অবাক হয়ে তাকাল।
—এখন?
—হ্যাঁ। এখনই।
—তুমি এখানে আর আমি পড়াশোনা করব?
রাহুল মৃদু হাসল।
—আমি চাই তুমি ডাক্তার হও।
তারার চোখ দিয়ে আবার পানি গড়িয়ে পড়ল।
—আমি পারব না।
—পারবে।
—তুমি ছাড়া...
রাহুল কথাটা শেষ করতে দিল না।
—আমি তো আছি।
তারা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—কোথায়?
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তোমার অপেক্ষার মধ্যে।
তারা মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল।
রাহুল বলল,
—শোনো তারা, জীবন থামিয়ে দেবে না। তুমি পড়বে। ভালো করবে। নিজের একটা পরিচয় তৈরি করবে।
—আর তুমি?
—আমি অপেক্ষা করব।
—কতদিন?
রাহুল একটু হেসে বলল,
—যতদিন লাগে।
তারা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—তুমি ফিরে এলে আমি তোমাকে একটা কথা বলব।
—কী কথা?
—এখন বলব না।
রাহুল হেসে ফেলল।
—ঠিক আছে। সেই কথাটা শোনার জন্যই ফিরব।
কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে জানাল, সময় শেষ।
তারা উঠে দাঁড়াল।
কিন্তু যাওয়ার আগে রাহুল তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তারা।
—হুম?
—আমাকে ভুলে যেও না।
তারার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে মাথা নাড়িয়ে বলল,
—কখনো না।
তারপর বেরিয়ে গেল।
এরপর শুরু হলো দীর্ঘ অপেক্ষা।
মামলা চলতে লাগল।
আইনের নিয়মে রাহুলকে হেফাজতে রাখা হলো।
তার পরিবারও চেষ্টা করছিল তাকে জামিনে বের করার জন্য।
কিন্তু ঘটনার পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় বিষয়টি সহজ হলো না।
তারা নিয়মিত খবর নিত।
যেদিন রাহুলের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেত, সেদিন তার মুখে একটু হাসি ফুটত।
রাহুলও প্রতিবার একই কথা বলত—
—পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?
তারা বলত,
—ভালো।
—কত নম্বর পেয়েছ?
—অনেক।
—মিথ্যা বলছ?
—না।
—তাহলে প্রমাণ দাও।
তারা ফলাফল দেখাত।
রাহুল হাসত।
—এই তো আমার তারা।
এভাবেই সময় চলে যেতে লাগল।
এক বছর।
দুই বছর।
তারপর আরও কয়েক বছর।
স্কুলের সেই মেয়েটা ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল।
তারা তার কথা রেখেছিল।
সে পড়াশোনায় মন দিল।
দিন-রাত পরিশ্রম করল।
মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো।
প্রথম দিন সাদা অ্যাপ্রন পরার সময় তার চোখে পানি চলে এসেছিল।
কারণ তার মনে পড়েছিল—
একদিন একজন বলেছিল,
“আমি চাই তুমি ডাক্তার হও।”
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আস্তে বলেছিল,
—আমি পেরেছি, রাহুল।
কিন্তু রাহুল তখনও দূরে।
অন্যদিকে জেলের ভেতরে রাহুলের দিনগুলো ভালো যাচ্ছিল না।
প্রথম দিকে সে তারার চিঠি, খবর আর স্মৃতিগুলো আঁকড়ে বেঁচে ছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একাকিত্ব তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে লাগল।
সে দিনের পর দিন কারও সঙ্গে কথা বলত না।
শুধু একটা নাম বারবার বলত—
—তারা...
জেলের কর্মকর্তারা লক্ষ্য করলেন, রাহুল ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
কখনো সে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে হাসে।
কখনো মনে করে তারা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপ করে বসে থাকে।
তার মানসিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে অবশেষে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
সেদিন রাহুলকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সে শুধু একটা কথাই বলেছিল—
—তারা কি জানে আমি এখানে যাচ্ছি?
কেউ উত্তর দেয়নি।
রাহুল জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
তার ঠোঁটে অস্পষ্ট হাসি।
—ও আমাকে খুঁজবে...
অন্যদিকে তারা তখন মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষে।
একদিন হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগ থেকে তাকে জানানো হলো,
—তারা, মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগে একজন নতুন রোগী এসেছে। কেসটা একটু কঠিন। তুমি চাইলে কেসটা পর্যবেক্ষণ করতে পারো।
তারা মাথা নাড়ল।
—অবশ্যই।
সে তখনও জানত না—
তার সামনে যে মানুষটাকে চিকিৎসা করার দায়িত্ব আসছে, সে আর কেউ নয়।
তার জীবনের সেই দুষ্টু ছেলেটা।
যে একদিন সাইকেল চালিয়ে তার গায়ে কাদা ছিটিয়েছিল।
যে তার সামনে কান ধরে উঠবস করেছিল।
যে বৃষ্টির রাতে তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,
“ভয় পেও না। আমি আছি।”
আর যে বিদায়ের সময় বলেছিল—
“আমি ফিরে আসব।”
তারা ফাইলটা হাতে নিয়ে রোগীর কক্ষে ঢুকল।
বিছানায় বসে থাকা মানুষটার মুখ দেখা যাচ্ছিল না।
তারা ধীরে ধীরে ফাইল খুলল।
তারপর রোগীর নামের জায়গায় চোখ পড়তেই তার হাত থেমে গেল।
রোগীর নাম: রাহুল।
তার বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ থেমে গেল।
তারা কয়েক সেকেন্ড ফাইলের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কাঁপা হাতে দরজার দিকে তাকাল।
বিছানায় বসে থাকা ছেলেটা তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে একা একা হাসছিল।
তারা ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
কিন্তু রাহুল তার দিকে তাকাল না।
তারা খুব আস্তে বলল,
—রাহুল...
কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
তারা আবার ডাকল,
—রাহুল, আমি তারা।
এইবার ছেলেটা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
চোখে অচেনা শূন্যতা।
তারপর কয়েক সেকেন্ড তারার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
তারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখ ভিজে উঠল।
এটাই কি সেই রাহুল?
যে তাকে একদিন বলেছিল—
“তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করবে।”
আজ এত বছর পর তারা সত্যিই তার সামনে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু রাহুল যেন তাকে চিনতেই পারছে না।
তারা চোখের পানি মুছে ফাইলটা বুকে চেপে ধরল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—আমি তোমাকে আবার ঠিক করে দেব, রাহুল।
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
—যেভাবেই হোক।
হাসপাতালের করিডোরটা সেদিন অস্বাভাবিক নীরব মনে হচ্ছিল।
তারা হাতে রাহুলের ফাইল নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল।
তার চোখ বারবার একই নামের ওপর আটকে যাচ্ছিল।
রাহুল।
নামটা এত পরিচিত।
অথচ কয়েক মিনিট আগে যে মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, সে যেন তাকে একেবারেই চিনতে পারেনি।
তারা চোখ বন্ধ করল।
মনে পড়ে গেল স্কুলের সেই দিনগুলো।
কাদা ছিটিয়ে দেওয়া।
তারপর কান ধরে উঠবস।
বন্ধুত্বের শুরু।
রাস্তার পাশে গরিব মানুষদের খাবার কিনে দেওয়া।
বৃষ্টির সেই রাত।
আর বিদায়ের সময় বলা সেই কথাটা—
“আমি ফিরে আসব।”
তারা চোখ মুছে আবার ফাইলের দিকে তাকাল।
তারপর নিজের মনকে শক্ত করল।
এখন সে শুধু তারা নয়।
সে একজন ডাক্তার।
আর রাহুল এখন তার রোগী।
ব্যক্তিগত আবেগকে পাশে রেখে তাকে চিকিৎসা করতেই হবে।
পরদিন থেকেই রাহুলের চিকিৎসা শুরু হলো।
প্রথম দিন তারা তার সঙ্গে খুব সাধারণভাবে কথা বলল।
—আজ কেমন আছেন?
রাহুল জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
কোনো উত্তর দিল না।
—নাশতা করেছেন?
চুপ।
তারা আবার বলল,
—আমি আপনার ডাক্তার।
রাহুল ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
—ডাক্তার?
—হ্যাঁ।
—আপনার নাম কী?
তারা কয়েক সেকেন্ড থেমে বলল,
—তারা।
রাহুল ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—তারা...
শব্দটা উচ্চারণ করতেই যেন তার চোখের ভেতর কিছু একটা নড়েচড়ে উঠল।
কিন্তু পরক্ষণেই আবার আগের মতো হয়ে গেল।
তারা সেটা লক্ষ্য করল।
সে চেয়ার টেনে তার সামনে বসল।
—আপনি কি কাউকে মনে করতে পারেন?
রাহুল মাথা নাড়ল।
—না।
—কাউকে খুব ভালোবাসতেন?
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—একজন ছিল।
তারার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
—কে?
রাহুল জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
—মনে নেই।
তারা আর প্রশ্ন করল না।
দিন যেতে লাগল।
রাহুলের সঙ্গে কথা বলার জন্য তারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় বের করত।
কখনো তার সঙ্গে গল্প করত।
কখনো পুরোনো গান শোনাত।
কখনো তাকে ছবি আঁকতে দিত।
কখনো শুধু পাশে বসে থাকত।
রাহুল প্রথমদিকে কোনো কিছুতেই আগ্রহ দেখাত না।
কিন্তু একটা ব্যাপার ছিল—
তারা ঘরে ঢুকলে সে আর আগের মতো অস্থির থাকত না।
অন্য ডাক্তাররা গেলে সে বিরক্ত হতো।
কিন্তু তারা গেলে চুপচাপ বসে থাকত।
একদিন তারা তাকে খাবার দিল।
—খেয়ে নিন।
রাহুল খাবারের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি খেয়েছেন?
তারা থমকে গেল।
এতদিন পর রাহুল প্রথমবার তাকে নিয়ে প্রশ্ন করেছে।
সে মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
রাহুল আবার খাবারের দিকে তাকাল।
তারপর হঠাৎ বলল,
—মিথ্যা।
তারা অবাক হয়ে গেল।
—কেন?
—আপনি মিথ্যা বলছেন।
—কীভাবে বুঝলেন?
রাহুল উত্তর দিল না।
তারা হেসে বলল,
—ঠিক আছে। আমিও খাব।
সে খাবারের প্যাকেট খুলে পাশে বসে একটু খেল।
রাহুলও খেতে শুরু করল।
তারা তাকে দেখছিল।
এই ছোট্ট ব্যাপারটাও তার কাছে বিশাল কিছু মনে হলো।
কারণ যে রাহুল কয়েকদিন ধরে কারও কথা শুনছিল না, সে আজ তার সঙ্গে খাবার ভাগ করে খেল।
একদিন বিকেলে বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল।
বৃষ্টির শব্দে রাহুল হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠল।
সে জানালার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করতে লাগল,
—না... দাঁড়াও...
তারা দ্রুত তার কাছে গেল।
—কী হয়েছে?
রাহুল চোখ বন্ধ করল।
তার কপালে ঘাম জমেছে।
—ও কাঁদছে।
তারা চমকে উঠল।
—কে?
—ও...
—কে কাঁদছে?
রাহুল কাঁপা গলায় বলল,
—তারা।
তারার বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
সে খুব আস্তে বলল,
—আমি তো এখানে।
রাহুল চোখ খুলে তার দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড দুজনের চোখাচোখি হলো।
তারপর রাহুল হঠাৎ বলল,
—আপনি কে?
তারা চুপ করে গেল।
তারপর বলল,
—আমি তারা।
রাহুল মাথা নাড়ল।
—না।
—কেন?
—তারা এমন ছিল না।
তারার চোখে পানি চলে এল।
—কেমন ছিল?
রাহুল দূরের দিকে তাকিয়ে বলল,
—ও অনেক হাসত।
তারা মৃদু কাঁদতে কাঁদতে হাসল।
—আমি এখনও হাসি।
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু কিছু বলল না।
এরপর থেকে তারা আরও বেশি চেষ্টা করতে লাগল।
সে রাহুলকে পুরোনো কোনো ঘটনা সরাসরি বলত না।
কারণ সে জানত, জোর করে স্মৃতি ফিরিয়ে আনা ঠিক নয়।
তাই ছোট ছোট জিনিস দিয়ে তাকে পরিচিত অনুভূতির মধ্যে ফিরিয়ে আনতে লাগল।
একদিন সে একটা সাইকেলের ছবি দেখাল।
রাহুল ছবিটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
—সাইকেল...
তারা বলল,
—আপনি সাইকেল চালাতেন?
রাহুল মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—কোথায়?
রাহুল চোখ বন্ধ করল।
হঠাৎ তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—স্কুলে...
তারার চোখ চকচক করে উঠল।
—স্কুল?
—হ্যাঁ।
—কাউকে মনে পড়ে?
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—একজন মেয়েকে।
তারার গলা কেঁপে উঠল।
—কী করত মেয়েটা?
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—আমার ওপর রাগ করত।
তারা চোখের পানি লুকিয়ে হাসল।
—কেন?
—আমি ওর গায়ে কাদা ছিটিয়ে দিয়েছিলাম।
তারার আর নিজেকে সামলানো গেল না।
সে মুখ ফিরিয়ে চোখের পানি মুছে নিল।
রাহুল তখনও স্মৃতির ভেতরে ডুবে আছে।
—তারপর ও আমাকে অনেক বকেছিল।
তারা খুব আস্তে বলল,
—তারপর?
রাহুল বলল,
—আমি ওর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম।
—ও ক্ষমা করেছিল?
রাহুলের ঠোঁটে হাসি ফুটল।
—হ্যাঁ।
—তারপর?
—বন্ধু হয়েছিলাম।
তারা চোখ বন্ধ করল।
তার বুকের ভেতরে যেন বহু বছর ধরে আটকে থাকা একটা কষ্ট একটু নরম হয়ে গেল।
রাহুল হঠাৎ তার দিকে তাকাল।
—আপনি এত কাঁদছেন কেন?
তারা দ্রুত চোখ মুছে বলল,
—কিছু না।
রাহুল বলল,
—আপনাকে দেখে মনে হয় আপনি অনেকদিন ধরে কাউকে খুঁজছেন।
তারা মৃদু গলায় বলল,
—হ্যাঁ।
—পেয়েছেন?
তারা তার চোখের দিকে তাকাল।
—পেয়েছি।
রাহুল কিছু বুঝতে পারল না।
সে শুধু বলল,
—ভালো।
সেদিন রাতে হাসপাতালের কেবিনে একা বসে তারা পুরোনো একটা বাক্স খুলল।
ভেতরে ছিল কয়েকটা পুরোনো জিনিস।
একটা স্কুলের ব্যাজ।
একটা পুরোনো ছবি।
আর একটা ছোট্ট কাগজ।
কাগজটায় বহু বছর আগে রাহুল লিখেছিল—
“আমার প্রিয় সিনিয়র, আমার জন্য অপেক্ষা করো।”
তারা কাগজটা হাতে নিয়ে কাঁদতে লাগল।
এত বছর ধরে সে এই কাগজটা আগলে রেখেছে।
আর আজ সেই মানুষটা তার সামনে।
কিন্তু তাকে চিনতে পারছে না।
পরদিন সকালে তারা আবার রাহুলের কক্ষে গেল।
রাহুল তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
তারা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—আজ একটা প্রশ্ন করব।
রাহুল তাকাল।
—কী?
—আপনি কি মনে করতে পারেন, আপনার সেই মেয়েটার নাম কী ছিল?
রাহুল অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর কপালে হাত রাখল।
মনে করার চেষ্টা করল।
তার চোখের সামনে যেন কয়েকটা ছবি ভেসে উঠল।
একটা স্কুলের রাস্তা।
একটা সাদা পোশাক।
কাদায় ভেজা একটা মেয়ে।
তারপর হাসিমুখ।
তারপর বৃষ্টির রাত।
তারপর একটা কণ্ঠ—
“রাহুল!”
হঠাৎ সে মাথা চেপে ধরল।
—আহ!
তারা দ্রুত এগিয়ে গেল।
—রাহুল!
রাহুল চোখ বন্ধ করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—তারা...
তারা স্থির হয়ে গেল।
রাহুল ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
তারপর তার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—তারার মতো একটা নাম ছিল...
তারার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।
কিন্তু সে কিছু বলল না।
কারণ সে বুঝতে পারছিল—
রাহুলের স্মৃতির দরজা একটু একটু করে খুলছে।
আর সেই দরজার ওপাশে এখনও তাদের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা বেঁচে আছে।
সেদিন রাতটা তারা একদম ঘুমাতে পারল না।
বারবার তার কানে বাজছিল রাহুলের সেই কণ্ঠ—
“তারার মতো একটা নাম ছিল...”
এত বছর পরও রাহুলের স্মৃতির কোথাও সে বেঁচে আছে।
এই একটা উপলব্ধিই তারার বুকের ভেতরটা ভরে দিচ্ছিল।
কিন্তু সে জানত, সামনে পথটা সহজ নয়।
রাহুলকে জোর করে পুরোনো স্মৃতি মনে করানো যাবে না।
তাকে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনতে হবে।
স্মৃতির সেই জায়গায়, যেখানে একদিন একটা দুষ্টু ছেলে সাইকেল নিয়ে ছুটে এসেছিল আর একটা মেয়ের সাদা পোশাকে কাদা ছিটিয়ে দিয়েছিল।
পরদিন সকালে তারা রাহুলের কক্ষে ঢুকতেই দেখল, সে জানালার পাশে বসে আছে।
তারা বলল,
—সুপ্রভাত।
রাহুল তাকিয়ে বলল,
—আপনি আজ দেরি করেছেন।
তারা অবাক হয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল।
—মাত্র পাঁচ মিনিট।
—তবুও।
তারা মৃদু হাসল।
—আমাকে মিস করেছেন?
রাহুল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—হয়তো।
তারার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,
—আজ কেমন লাগছে?
—ভালো।
—কাল যা মনে পড়েছিল?
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—একটা মেয়ের কথা।
—কী মনে পড়েছে?
—ও আমাকে খুব বকেছিল।
তারা হেসে বলল,
—কেন?
—আমি ওর গায়ে কাদা ছিটিয়েছিলাম।
তারা এবার আর হাসি থামাতে পারল না।
—আপনি খুব দুষ্টু ছিলেন তাহলে।
রাহুলও মৃদু হাসল।
—ছিলাম?
—হ্যাঁ।
—এখন?
তারা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এখনও একটু আছেন।
রাহুল প্রথমবার একটু জোরে হেসে ফেলল।
তারা চুপ করে সেই হাসির দিকে তাকিয়ে রইল।
এ হাসিটা সে কত বছর পর দেখল!
স্কুলের সেই রাহুল।
এক মুহূর্তের জন্য যেন আবার ফিরে এসেছে।
কয়েকদিন ধরে চিকিৎসা ভালোভাবেই এগোতে লাগল।
রাহুল এখন তারার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলে।
কখনো নিজের শৈশবের কথা বলে।
কখনো স্কুলের কথা।
কখনো এমন কিছু ঘটনা বলে, যেগুলো শুনে তারা বুঝতে পারে—
তার স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।
একদিন রাহুল বলল,
—আমি স্কুলে একটা মেয়েকে খুব বিরক্ত করতাম।
তারা বলল,
—কেন?
—ওকে দেখলেই দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে করত।
—তারপর?
—একদিন ওর গায়ে কাদা ছিটিয়ে দিয়েছিলাম।
—ও কী করেছিল?
—অনেক বকেছিল।
তারা হাসল।
—ঠিকই করেছে।
রাহুলও হাসল।
—তারপর ও আমার সিনিয়র ছিল।
তারা এবার চুপ হয়ে গেল।
রাহুলের চোখে তখন অদ্ভুত একটা কোমলতা।
—ও আমাকে একদিন বলেছিল, “তুমি তো আমার ছোট।”
তারার চোখ ভিজে উঠল।
রাহুল আবার বলল,
—আমি ওকে বলেছিলাম, “আজ থেকে আমার বন্ধু হবেন?”
তারা এবার মুখ ফিরিয়ে নিল।
চোখের পানি সে রাহুলকে দেখাতে চাইল না।
কিন্তু রাহুল লক্ষ্য করল।
—আপনি কাঁদছেন?
—না।
—আপনি মিথ্যা বলছেন।
তারা মৃদু হেসে বলল,
—কখনো কখনো পুরোনো গল্প শুনলে চোখে পানি আসে।
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—আপনি কি সেই মেয়েটাকে চেনেন?
তারা থমকে গেল।
—কেন?
—কারণ আপনি ওর গল্প শুনে এত কাঁদছেন।
তারা উত্তর দিল না।
রাহুল বলল,
—ও কি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
তারা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—আপনার জন্য?
—অনেক।
রাহুল আবার জানালার বাইরে তাকাল।
তার মুখে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা ফুটে উঠল।
—আমারও ছিল।
তারা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে কাঁদল।
কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে আবার ঘরে ফিরল।
রাহুল তখনও জানালার পাশে।
একদিন তারা রাহুলকে স্কুলের পুরোনো একটা ছবি দেখাল।
ছবিতে অনেক ছাত্রছাত্রী।
রাহুল ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ তার আঙুল একটা জায়গায় গিয়ে থেমে গেল।
—এটা কে?
তারা তাকাল।
ছবিতে সে নিজেই ছিল।
তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তারা।
রাহুল ছবিটা হাতে তুলে নিল।
কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর তার চোখ বড় হয়ে গেল।
—এই মেয়েটা...
তারার বুক ধক করে উঠল।
—কী?
—ও...
রাহুল ছবিটা আরও কাছে নিয়ে এল।
তারপর ফিসফিস করে বলল,
—ওর নাম তারা।
তারার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—হ্যাঁ।
রাহুল তার দিকে তাকাল।
—আপনি জানলেন কীভাবে?
তারা কোনো উত্তর দিল না।
রাহুল আবার ছবির দিকে তাকাল।
—আমরা একসঙ্গে স্কুলে পড়তাম।
—হ্যাঁ।
—ও আমার সিনিয়র ছিল।
—হ্যাঁ।
—আমি ওকে খুব বিরক্ত করতাম।
তারা এবার হাসল।
—হ্যাঁ।
রাহুল হঠাৎ ছবির মেয়েটার দিকে আঙুল রেখে বলল,
—ও আমাকে ক্ষমা করেছিল।
তারা আর কিছু বলতে পারল না।
তার চোখে তখন শুধু পানি।
কিন্তু স্মৃতি ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাহুলের কষ্টও বাড়তে লাগল।
এক রাতে সে ঘুমের মধ্যে অস্থির হয়ে উঠল।
বারবার বলছিল,
—তারা... দৌড়াও...
তারা দ্রুত কক্ষে গিয়ে তার পাশে দাঁড়াল।
রাহুল ঘুমের মধ্যেই কাঁপছিল।
—না... ওকে যেতে দাও...
তারা তার হাত ধরে বলল,
—রাহুল, আমি আছি।
রাহুল চোখ খুলে তাকাল।
তারপর হঠাৎ তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
—তুমি কোথায় ছিলে?
তারা থমকে গেল।
রাহুলের চোখে পানি।
—আমি এতদিন তোমাকে খুঁজেছি।
তারা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আমি তো তোমার কাছেই ছিলাম।
রাহুল মাথা নাড়ল।
—না। তুমি ছিলে না।
—ছিলাম।
—তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে।
তারা বুকের ভেতর চাপা কষ্ট নিয়ে বলল,
—আমি যাইনি।
রাহুল তার দিকে তাকাল।
—তাহলে?
তারা তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
—আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
রাহুল স্থির হয়ে গেল।
—কতদিন?
তারা চোখের পানি মুছে বলল,
—অনেক বছর।
রাহুলের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
—তুমি...
তারা মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
রাহুল কিছু বলার আগেই তার মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হলো।
সে মাথা চেপে ধরল।
—আহ!
তারা দ্রুত তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করল।
—চোখ বন্ধ করো।
রাহুল কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—আমি মনে করতে পারছি...
—কী?
—বৃষ্টি...
তারার চোখ বড় হয়ে গেল।
—আর তুমি...
রাহুল চোখ বন্ধ করল।
—তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে।
তারার বুক কেঁপে উঠল।
—তারপর?
রাহুলের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—তুমি কাঁদছিলে।
তারা আর কথা বলতে পারল না।
রাহুল ফিসফিস করে বলল,
—তুমি কেন চলে গিয়েছিলে?
তারা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
—কিসের?
—সবকিছুর।
রাহুল ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
তার দৃষ্টিতে এবার আগের সেই শূন্যতা নেই।
সেখানে একটা পরিচিত আলো ফুটে উঠেছে।
সে খুব আস্তে বলল,
—তুমি তারা?
তারা তার সামনে বসে পড়ল।
চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারল না।
—হ্যাঁ।
রাহুল অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঠোঁটের কোণে খুব ছোট্ট একটা হাসি ফুটল।
—আমার সেই রাগী সিনিয়র?
তারা কাঁদতে কাঁদতেই হেসে ফেলল।
—হ্যাঁ।
রাহুল মাথা নিচু করে বলল,
—আমি তোমাকে অনেক খুঁজেছি।
তারা তার হাত ধরে বলল,
—আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি।
রাহুল এবার তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
কিন্তু ঠিক তখনই বাইরে থেকে একজন নার্স এসে জানাল—
ডাক্তারদের বোর্ড মিটিংয়ে রাহুলের কেস নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রাহুলের চিকিৎসা আরও কিছুদিন চলবে।
আর যদি তার স্মৃতি স্থায়ীভাবে ফিরে আসে, তাহলে বহু বছর আগের সেই মামলাটাও নতুন করে খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তারা রাহুলের দিকে তাকাল।
তার মনে হলো—
এবার শুধু রাহুলকে সুস্থ করাই নয়।
তাকে তার জীবনটাও ফিরিয়ে দিতে হবে।
পরদিন সকালটা অন্যরকম ছিল।
রাহুল ঘুম থেকে উঠে অনেকক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার মাথার ভেতর যেন বহু বছরের পুরোনো ছবিগুলো একে একে ফিরে আসছিল।
স্কুলের গেট।
সাদা পোশাক পরা একটা মেয়ে।
সাইকেলের চাকা।
রাস্তার কাদা।
তারপর সেই রাগী চোখ।
রাহুল হঠাৎ হেসে ফেলল।
—তারা...
ঠিক তখনই দরজা খুলে তারা ভেতরে ঢুকল।
—কী হয়েছে?
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি আজও দেরি করেছ।
তারা অবাক হয়ে গেল।
—আজ তো আমি সময়ের আগেই এসেছি।
—তবুও।
—কেন?
রাহুল মুচকি হেসে বলল,
—কারণ আমি তোমার অপেক্ষা করছিলাম।
তারার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
এই কথাটা যেন বহু বছর আগের সেই রাহুলই বলছে।
সে চেয়ার টেনে তার সামনে বসল।
—আজ কেমন লাগছে?
—ভালো।
—কিছু মনে পড়েছে?
রাহুল একটু চুপ করে বলল,
—অনেক কিছু।
—কী কী?
রাহুল হাসল।
—প্রথমে তোমার গায়ে কাদা ছিটানোর কথা।
তারা হেসে ফেলল।
—ওটা তোমার মনে থাকার মতো ঘটনা?
—অবশ্যই। কারণ ওই ঘটনার পর আমাকে কান ধরে উঠবস করতে হয়েছিল।
তারা চোখ বড় করে বলল,
—মনে আছে?
—সব মনে নেই। কিন্তু এখন অনেকটা মনে পড়ছে।
—আর কী মনে পড়ছে?
—তুমি আমাকে ক্ষমা করেছিলে।
—তারপর?
—বন্ধু হয়েছিলে।
তারা মাথা নিচু করে হাসল।
রাহুল বলল,
—তারপর আমি প্রতিদিন তোমার সঙ্গে দেখা করার অজুহাত খুঁজতাম।
তারা বলল,
—আমি জানতাম।
—জানতে?
—হ্যাঁ।
রাহুল অবাক হয়ে তাকাল।
—তাহলে বলোনি কেন?
তারা মুচকি হেসে বলল,
—তুমি নিজেই বুঝবে ভেবেছিলাম।
রাহুল মাথা নাড়ল।
—আমি বোকা ছিলাম।
তারা বলল,
—অনেকটাই।
দুজনেই হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর রাহুলের মুখটা আবার গম্ভীর হয়ে গেল।
—তারপর সেই বৃষ্টির রাত...
তারা চুপ হয়ে গেল।
রাহুল চোখ বন্ধ করল।
—স্কুল খালি হয়ে গিয়েছিল।
—হ্যাঁ।
—অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল।
—হ্যাঁ।
—বজ্রপাত হয়েছিল।
তারা ধীরে মাথা নাড়ল।
রাহুল বলল,
—তুমি ভয় পেয়েছিলে।
তারার চোখে পানি চলে এল।
—হ্যাঁ।
—তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে।
তারা মাথা নিচু করল।
রাহুল খুব আস্তে বলল,
—তারপর তুমি হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে চলে গিয়েছিলে।
তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—হ্যাঁ।
—কেন?
তারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।
—আমার জন্য?
—না। বাসার জন্য।
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারা এবার সব খুলে বলল।
তার চাচাতো ভাই কীভাবে তাকে ভয় দেখাত।
কীভাবে সে কাউকে কিছু বলতে পারত না।
কীভাবে সেই রাতে সে রাহুলকে ফোন করেছিল।
সবকিছু।
রাহুল মন দিয়ে শুনল।
তার চোখ ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠল।
—তুমি এত বছর একা এসব সহ্য করেছ?
তারা চোখ মুছে বলল,
—তখন কাউকে বিশ্বাস করতে পারতাম না।
—আমাকে বলতে পারতে।
—বলেছিলাম তো।
রাহুল তার দিকে তাকাল।
—হ্যাঁ। আর তারপর আমি...
সে বাকিটা বলতে পারল না।
তারা তার হাতের ওপর হাত রাখল।
—তুমি আমাকে বাঁচাতে গিয়েছিলে।
রাহুল চোখ বন্ধ করল।
—আমি কাউকে মারতে চাইনি।
—আমি জানি।
—আমি শুধু তোমাকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিলাম।
—আমি জানি।
—তাহলে এত বছর...
তারা মাথা নাড়ল।
—সবকিছু তোমার দোষ ছিল না।
রাহুল চুপ করে গেল।
এরপর শুরু হলো নতুন একটা লড়াই।
তারা হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলল।
রাহুলের মানসিক অবস্থার উন্নতি দ্রুত হচ্ছে।
তার স্মৃতি ফিরে আসছে।
সে নিজের অতীতের ঘটনাগুলো পরিষ্কারভাবে মনে করতে পারছে।
এটা চিকিৎসার জন্য যেমন ভালো খবর, তেমনি বহু বছর আগের মামলার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তারা পুরোনো নথি সংগ্রহ করতে শুরু করল।
সেদিনের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত রিপোর্ট।
পুলিশের কাগজপত্র।
সাক্ষীদের তথ্য।
সবকিছু।
রাহুলও ধীরে ধীরে নিজের বক্তব্য মনে করতে পারছিল।
একদিন তারা তাকে জিজ্ঞেস করল,
—সেদিন তুমি কেন আমার বাসায় গিয়েছিলে?
রাহুল বলল,
—তোমার ফোন এসেছিল।
—তুমি কী শুনেছিলে?
—তুমি কাঁদছিলে।
—আর?
—একজন পুরুষের কণ্ঠ।
—কী বলছিল?
রাহুল কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করল।
তারপর বলল,
—সে বলছিল, “আজ তোকে শিক্ষা দেব।”
তারার চোখ ভিজে উঠল।
রাহুল বলল,
—আমি বুঝেছিলাম তুমি বিপদে আছ।
—তারপর?
—আমি দৌড়ে গিয়েছিলাম।
—তারপর কী হয়েছিল?
রাহুল ধীরে ধীরে সব বলল।
ধস্তাধস্তি।
তারাকে বাঁচানোর চেষ্টা।
ফুলদানি।
আঘাত।
তারপর সেই মানুষটির পড়ে যাওয়া।
রাহুলের গলা কেঁপে উঠল।
—আমি তখন বুঝতেই পারিনি যে আঘাতটা এত ভয়ংকর হয়েছে।
তারা বলল,
—তুমি ইচ্ছে করে করোনি।
রাহুল মাথা নিচু করল।
—তবুও একজন মানুষ মারা গেছে।
—তুমি তাকে মারতে যাওনি।
—কিন্তু সে মারা গেছে।
তারা এবার দৃঢ় গলায় বলল,
—সত্যিটা আদালতে বলতে হবে।
রাহুল তার দিকে তাকাল।
—তুমি কি আমার জন্য সাক্ষ্য দেবে?
তারা এক মুহূর্তও দেরি করল না।
—হ্যাঁ।
—তুমি ভয় পাবে না?
তারা মৃদু হেসে বলল,
—যে মেয়েটা একসময় তোমার গায়ে কাদা ছিটানোর জন্য তোমাকে কান ধরে উঠবস করিয়েছিল, সে এখন আর আগের তারা নেই।
রাহুল হেসে ফেলল।
—আমার সিনিয়র বড় হয়ে গেছে।
তারা বলল,
—অনেক।
দিনগুলো যেতে লাগল।
রাহুলের চিকিৎসা আরও ভালো হতে লাগল।
সে এখন নিয়মিত খায়।
নিজে থেকে কথা বলে।
হাসে।
কখনো কখনো হাসপাতালের বাগানে হাঁটে।
সবচেয়ে বড় কথা—
সে আবার স্বাভাবিকভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।
একদিন তারা তাকে বাগানে নিয়ে গেল।
রাহুল একটা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ সে বলল,
—তারা।
—হুম?
—তুমি কি এখনও আমার ওপর রাগ করো?
তারা হেসে বলল,
—কোন ব্যাপারে?
—কাদার ব্যাপারে।
—না।
—কান ধরে উঠবস করানোর জন্য?
—ওটার জন্যও না।
—তাহলে?
তারা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোমার ওপর কখনো রাগ করে থাকতে পারিনি।
রাহুল চুপ করে গেল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—আমি জেলে থেকেও তোমার কথা ভাবতাম।
তারা চোখ নামিয়ে ফেলল।
—আমি জানি।
—কীভাবে?
—কারণ আমিও তোমার কথা ভাবতাম।
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে রইল।
দুজনের মাঝখানে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর রাহুল বলল,
—তুমি কি আমার জন্য সত্যিই অপেক্ষা করেছিলে?
তারা মৃদু হেসে বলল,
—তুমি তো বলেছিলে অপেক্ষা করতে।
রাহুলের চোখ ভিজে উঠল।
—আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো ভুলে যাবে।
—কখনো না।
কয়েক সপ্তাহ পর হাসপাতাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলো—
রাহুলের মানসিক অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।
সে আদালতে নিজের বক্তব্য দেওয়ার মতো অবস্থায় আছে।
পুরোনো মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
তারা খবরটা শুনে চোখ বন্ধ করল।
এত বছর ধরে যে দিনটার অপেক্ষা করেছিল—
সেটা অবশেষে আসছে।
কিন্তু সামনে আদালত।
সামনে সাক্ষ্য।
সামনে অতীতের সব ভয়ংকর স্মৃতি।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
রাহুলের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে তারার সাক্ষ্যের ওপর।
আদালতে যাওয়ার আগের রাতে তারা রাহুলের কক্ষে গেল।
রাহুল তখন চুপচাপ বসে ছিল।
তারা বলল,
—কাল ভয় পাবে?
রাহুল মাথা নাড়ল।
—না।
—কেন?
রাহুল মুচকি হেসে বলল,
—কারণ আমার পাশে আমার প্রিয় সিনিয়র থাকবে।
তারা হেসে ফেলল।
চোখে পানি জমে গেল।
—আর তুমি?
—আমি?
—তুমি কি আবার আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?
রাহুল উঠে দাঁড়িয়ে তার সামনে এল।
খুব শান্ত গলায় বলল,
—এইবার না।
তারপর একটু থেমে বলল,
—এইবার যদি কেউ আমাকে কোথাও নিয়ে যেতে চায়, আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়েই যাব।
তারা চোখের পানি মুছে হাসল।
কিন্তু তাদের কেউ জানত না—
পরদিন আদালতে শুধু একটা পুরোনো মামলার বিচার হবে না।
সেখানে বিচার হবে তাদের হারিয়ে যাওয়া বহু বছরের কষ্টেরও।
পরদিন সকাল।
আকাশটা অদ্ভুত রকম পরিষ্কার।
হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তারা কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
আজকের দিনটার জন্য সে কত বছর অপেক্ষা করেছে, তার কোনো হিসাব নেই।
একসময় যে মেয়েটা স্কুলের ইউনিফর্ম পরে রাহুলের জন্য কাঁদত, আজ সে একজন ডাক্তার।
আর আজ সেই ডাক্তারকেই আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিতে হবে।
রাহুলকে নিয়ে যখন গাড়ি হাসপাতাল থেকে বের হলো, তারা তার পাশে বসেছিল।
রাহুল জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
তারা আস্তে বলল,
—ভয় লাগছে?
রাহুল মাথা নাড়ল।
—না।
—সত্যি?
—হুম।
তারপর সে তারার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—তুমি আছ তো।
তারা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
—আছি।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছাল।
অনেক মানুষ।
আইনজীবী।
পুলিশ।
সাংবাদিক।
পুরোনো মামলার কাগজপত্র।
সবকিছু দেখে তারার বুকটা ধুকপুক করতে লাগল।
রাহুলও কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—তারা।
—হুম?
—আজ যদি কিছু হয়...
তারা সঙ্গে সঙ্গে তার কথা থামিয়ে দিল।
—কিছু হবে না।
—কিন্তু—
—আমি বলেছি, কিছু হবে না।
রাহুল মৃদু হাসল।
—আগের মতোই জেদি আছ।
তারা বলল,
—তুমিও আগের মতোই কথা বেশি বলো।
দুজনেই হেসে ফেলল।
তারপর তারা আদালতের ভেতরে ঢুকল।
বিচারক আসন গ্রহণ করলেন।
সবাই চুপ হয়ে গেল।
রাহুলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো।
তারা একটু দূরে বসেছিল।
রাহুল একবার তার দিকে তাকাল।
তারা চোখে চোখ রেখে মাথা নাড়ল।
“আমি আছি।”
শুনানি শুরু হলো।
পুরোনো মামলার কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করা হলো।
রাহুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল গুরুতর।
তার আঘাতে একজনের মৃত্যু হয়েছিল।
তবে নতুন করে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে ছিল—
ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল না।
রাহুল সেখানে গিয়েছিল তারাকে রক্ষা করতে।
এবং ঘটনার আগে তারার কাছ থেকে করা ফোনকলের তথ্যও তদন্তে যুক্ত করা হয়েছিল।
রাহুলের আইনজীবী বললেন,
—মাননীয় আদালত, এই মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি বহু বছর ধরে কারাগারে ছিলেন। পরবর্তীতে তার মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এখন চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি সুস্থতার পথে। আমরা আজ এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে আদালতের সামনে আনছি, যিনি ঘটনার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী এবং ঘটনার মূল কারণ সম্পর্কে সরাসরি জানেন।
বিচারক বললেন,
—সাক্ষীকে হাজির করা হোক।
তারার নাম ডাকা হলো।
তারা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার পা কাঁপছিল।
কিন্তু সে নিজেকে সামলে সাক্ষীর কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়াল।
বিচারক প্রশ্ন করলেন,
—আপনার নাম?
—তারা রহমান।
—আপনি অভিযুক্তকে চেনেন?
তারা রাহুলের দিকে তাকাল।
রাহুলও তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তারা বলল,
—হ্যাঁ।
—কীভাবে?
তারা একটু থেমে বলল,
—আমরা একই স্কুলে পড়তাম। সে আমার এক ব্যাচ জুনিয়র ছিল।
আদালতে মৃদু গুঞ্জন উঠল।
তারা বলল,
—প্রথমে আমাদের সম্পর্ক ভালো ছিল না। একদিন সে সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় আমার গায়ে কাদা ছিটিয়ে দিয়েছিল। আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম।
কেউ কেউ হেসে ফেলল।
তারা নিজেও মৃদু হাসল।
তারপর বলল,
—কিন্তু পরে সে আমার কাছে ক্ষমা চায়। আমরা বন্ধু হয়ে যাই।
বিচারক বললেন,
—এরপর?
তারার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—এরপর আমি তাকে বুঝতে পারি। সে দুষ্টু ছিল, কিন্তু খারাপ মানুষ ছিল না।
রাহুলের চোখ ভিজে উঠল।
তারা বলতে থাকল,
—সে প্রায়ই রাস্তার দরিদ্র মানুষদের খাবার কিনে দিত। কাউকে দেখানোর জন্য নয়। চুপচাপ করে চলে যেত।
তারপর সে থামল।
তার বুকের ভেতর পুরোনো ভয় ফিরে এল।
কিন্তু এবার সে থামল না।
—আমার চাচাতো ভাই আমার সঙ্গে অনেকদিন ধরে খারাপ আচরণ করত। সে আমাকে ভয় দেখাত। আমি কাউকে বলতে পারতাম না।
আদালত একদম নীরব।
—সেই রাতে সে আমাকে তার ঘরে ডাকল। আমি ভয় পেয়ে যাই। তখন আমি রাহুলকে ফোন করি।
বিচারক জিজ্ঞেস করলেন,
—আপনি কি তাকে সাহায্যের জন্য ফোন করেছিলেন?
—হ্যাঁ।
—কী হয়েছিল এরপর?
তারা চোখের পানি মুছে বলল,
—রাহুল আমার ফোন পেয়েই সেখানে আসে।
—তারপর?
—আমার চাচাতো ভাই রাহুলের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে। পরে ধস্তাধস্তি হয়।
—রাহুল কি তাকে মারার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিল?
তারা দৃঢ় গলায় বলল,
—না।
—আপনি নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
—তাহলে ফুলদানির আঘাত?
তারা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—রাহুল আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। সে কাউকে হত্যা করতে যায়নি। ঘটনাটা হঠাৎ ঘটে যায়।
রাহুল মাথা নিচু করল।
তারা বলল,
—আমি সেদিন ভয় পেয়েছিলাম। এত ভয় পেয়েছিলাম যে অনেক কিছু বলতে পারিনি। কিন্তু আজ আমি সব বলব।
বিচারক বললেন,
—আপনি এত বছর পর কেন এই বক্তব্য দিচ্ছেন?
তারা চোখ তুলে বলল,
—কারণ এত বছর ধরে একজন মানুষ সেই ঘটনার সম্পূর্ণ দায় নিজের ওপর নিয়ে বেঁচে আছে।
তারপর রাহুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি চাই না সে আর মিথ্যা অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচুক।
আদালত নিস্তব্ধ।
তারা এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—সে আমাকে বাঁচাতে গিয়েছিল। আমার জন্য নিজের জীবন হারিয়েছে। জেল খেটেছে। অসুস্থ হয়েছে। আজ আমি শুধু সত্যিটা বলতে এসেছি।
রাহুলের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে মাথা নিচু করে কাঁদছিল।
এরপর রাহুলের আইনজীবী বিভিন্ন প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করলেন।
তারার করা সেই পুরোনো ফোনকলের তথ্য।
চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি।
রাহুলের মানসিক অবস্থার রিপোর্ট।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য তথ্য।
এক পর্যায়ে আদালতে সেই রাতের ঘটনাস্থলের পুরোনো রিপোর্টও উপস্থাপন করা হলো।
সবকিছু পর্যালোচনা করার পর বিচারক কিছুক্ষণ নীরবে নথিপত্র দেখলেন।
তারপর বললেন,
—আদালত মনে করছে, এই ঘটনার পেছনে পূর্বপরিকল্পিত হত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়নি। ঘটনার পরিস্থিতি, সাক্ষ্য এবং উপস্থাপিত তথ্যসমূহ পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
তারা নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।
বিচারক আরও বললেন,
—অভিযুক্তের বর্তমান মানসিক ও চিকিৎসাগত অবস্থার বিষয়টিও আদালত বিবেচনায় নিচ্ছে।
রাহুলের আইনজীবী উঠে দাঁড়ালেন।
—মাননীয় আদালত, আমরা তার জামিন প্রার্থনা করছি।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর বিচারক বললেন,
—আবেদন মঞ্জুর করা হলো।
তারার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।
রাহুল যেন কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না কী বলা হয়েছে।
তার আইনজীবী তার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
—রাহুল, তুমি জামিন পেয়েছ।
রাহুল ধীরে ধীরে তারার দিকে তাকাল।
তারা কাঁদতে কাঁদতে হাসছিল।
রাহুলের ঠোঁট কেঁপে উঠল।
সে খুব আস্তে বলল,
—আমি বলেছিলাম না...
তারা কাছে এগিয়ে গেল।
—কী?
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—আমি ফিরে আসব।
তারা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে রাহুলকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
রাহুলও তাকে জড়িয়ে ধরল।
বহু বছরের অপেক্ষা, কান্না, ভয় আর বিচ্ছেদের পর—
আজ প্রথমবার তারা দুজন আবার একসঙ্গে দাঁড়িয়ে।
আদালতের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
কিন্তু তারা কিছুই দেখছিল না।
তাদের কাছে তখন পৃথিবীতে শুধু দুজন মানুষ—
তারা আর রাহুল।
রাহুল খুব আস্তে বলল,
—আমার প্রিয় সিনিয়র...
তারা চোখের পানি মুছে হেসে বলল,
—হুম?
—এবার কিন্তু আমাকে আর ছেড়ে যেও না।
তারা তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
—কখনো না।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
কারণ এত বছর পর মুক্তি পাওয়া রাহুলকে এখনও নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে।
আর সেই জীবনের প্রথম সকালটা—
সে কাটাতে চায় তার প্রিয় সিনিয়রের পাশে।
আদালত থেকে বের হওয়ার পরও রাহুল যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না—
সে সত্যিই মুক্ত।
এতগুলো বছর পর আজ তার সামনে খোলা আকাশ।
কোনো লোহার দরজা নেই।
কোনো পাহারাদার নেই।
কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘরে ফেরার নিয়ম নেই।
সে স্বাধীন।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
তার পাশে তারা।
গাড়িতে বসে রাহুল বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল।
রাস্তার মানুষগুলোকে আজ তার কাছে অন্যরকম লাগছিল।
তারা পাশে বসে চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
রাহুল হঠাৎ বলল,
—তুমি সত্যিই আমার জন্য এত বছর অপেক্ষা করেছ?
তারা মৃদু হেসে বলল,
—তুমি কি এখনও বিশ্বাস করো না?
—বিশ্বাস করতে চাই।
—তাহলে করো।
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—আমি ভাবতাম তুমি হয়তো আমাকে ভুলে গেছ।
তারা মাথা নাড়ল।
—তোমাকে ভুলে গেলে তো এত বছর পর তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম না।
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—আমি তোমাকে অনেক মিস করেছি।
তারা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—আমিও।
গাড়ির ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
কিন্তু সেই নীরবতা আর আগের মতো ভারী ছিল না।
এবার সেই নীরবতার মধ্যে শান্তি ছিল।
রাহুলকে থাকার জন্য একটা ছোট্ট বাসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তারা তাকে সেখানে নিয়ে গেল।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই রাহুল চারপাশে তাকাল।
সবকিছু নতুন।
তবুও কোথাও যেন একটা অদ্ভুত পরিচিত অনুভূতি।
তারা বলল,
—কেমন লাগছে?
—ভালো।
—কিছু লাগবে?
—হ্যাঁ।
—কী?
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—একটা সাইকেল।
তারা হেসে ফেলল।
—এত বছর পরও সাইকেল?
—কেন? ওই সাইকেল থেকেই তো আমার সর্বনাশ শুরু হয়েছিল।
তারা বলল,
—সর্বনাশ না। আমার গায়ে কাদা ছিটিয়েছিলে।
—সেটাই তো সর্বনাশ।
দুজনেই হেসে উঠল।
পরদিন তারা সত্যিই রাহুলের জন্য একটা সাইকেল নিয়ে এল।
রাহুল সাইকেলটা দেখে শিশুর মতো খুশি হয়ে গেল।
—তুমি এটা কিনেছ?
—হ্যাঁ।
—আমার জন্য?
—হ্যাঁ।
রাহুল সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে বলল,
—তাহলে আজ একটা জায়গায় যাব।
—কোথায়?
—আমাদের স্কুলে।
তারা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—চলো।
বিকেলে তারা দুজন পুরোনো স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
গেটটা প্রায় একই রকম।
মাঠটা একই।
পুরোনো গাছগুলোও আছে।
শুধু তারা দুজন বদলে গেছে।
রাহুল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
—সবকিছু এত ছোট মনে হচ্ছে কেন?
তারা বলল,
—কারণ আমরা বড় হয়ে গেছি।
রাহুল হেসে বলল,
—তুমি তো তখনও আমার চেয়ে বড় ছিলে।
তারা চোখ বড় করে বলল,
—আবার সিনিয়র নিয়ে শুরু করেছ?
—আমার প্রিয় সিনিয়র বলে কথা।
তারা মৃদু হেসে ফেলল।
দুজন ধীরে ধীরে স্কুলের ভেতরে হাঁটতে লাগল।
একসময় তারা সেই জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল যেখানে রাহুল তার গায়ে কাদা ছিটিয়েছিল।
রাহুল চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—এই জায়গাটা।
তারা বলল,
—হ্যাঁ।
—এখানেই আমি তোমার গায়ে কাদা ছিটিয়েছিলাম।
—আর আমি তোমাকে অনেক বকেছিলাম।
—তারপর?
—তুমি কান ধরে উঠবস করেছিলে।
রাহুল হেসে বলল,
—তোমার বান্ধবীদের জন্য।
তারা বলল,
—তবুও করেছিলে।
—কারণ তখন থেকেই তোমাকে একটু ভয় পেতাম।
—মিথ্যা।
—সত্যি।
তারা হাসল।
রাহুল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর বলল,
—তখন যদি জানতাম, এই একটা কাদা ছিটানোর ঘটনা আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাবে, তাহলে আরও আগে করতাম।
তারা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—আবার কাদা ছিটালে কিন্তু এবার ছাড়ব না।
রাহুল হাসল।
—এখন তো আমি জানি, আমার সিনিয়র আমাকে কিছু করবে না।
তারা মাথা নাড়ল।
—বেশি আত্মবিশ্বাস হয়ে গেছে।
স্কুলের পেছনের সেই বারান্দায় গিয়ে দুজন দাঁড়াল।
আকাশে তখন সন্ধ্যার আলো।
রাহুল হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।
তারা বুঝতে পারল, সে কিছু মনে করার চেষ্টা করছে।
—কী হয়েছে?
—এই জায়গাটা মনে আছে।
—কী?
—বৃষ্টি।
তারার মুখও গম্ভীর হয়ে গেল।
রাহুল ধীরে ধীরে বলল,
—সেদিন তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে।
তারা চোখ নামিয়ে ফেলল।
—হুম।
—তুমি ভয় পেয়েছিলে।
—হুম।
—তারপর কাঁদতে কাঁদতে চলে গিয়েছিলে।
তারা বলল,
—হ্যাঁ।
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—সেদিন আমি বুঝতে পারিনি তুমি কতটা ভয় পেয়েছিলে।
তারা মৃদু গলায় বলল,
—তখন আমিও বুঝিনি, তোমাকে হারানোর ভয়টা আমার এত বেশি।
রাহুল তার দিকে তাকাল।
—এখন?
তারা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—এখন বুঝি।
দুজনের চোখে চোখ।
অনেক কথা যেন কোনো শব্দ ছাড়াই বলা হয়ে গেল।
রাহুল ধীরে বলল,
—তারা...
—হুম?
—আমি একটা কথা বলব?
—বলো।
—আমি তোমাকে শুধু বন্ধু ভাবতাম না।
তারা চুপ করে রইল।
রাহুল বলল,
—অনেক আগেই তোমাকে আমার ভালো লাগত।
তারার চোখে পানি জমল।
—আমি জানতাম।
রাহুল অবাক হলো।
—জানতে?
—হ্যাঁ।
—তাহলে বলোনি কেন?
তারা মৃদু হাসল।
—তুমি নিজে কখনো বলোনি।
রাহুল হেসে মাথা নাড়ল।
—আমি সত্যিই বোকা ছিলাম।
তারা বলল,
—হ্যাঁ।
—তাহলে তুমি?
—আমি কী?
—তোমারও কি...
তারা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
—এত বছর পরেও কি একই প্রশ্ন করবে?
রাহুল চুপ।
তারা ধীরে ধীরে বলল,
—হ্যাঁ, রাহুল।
রাহুলের চোখ ভিজে উঠল।
—সত্যি?
—সত্যি।
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে এত বছর আমি অকারণে অপেক্ষা করিনি।
তারা মাথা নাড়ল।
—না।
সেদিন ফেরার পথে রাহুল সাইকেল চালাচ্ছিল।
তারা পাশে হাঁটছিল।
হঠাৎ রাহুল বলল,
—চলো, তোমাকে বাসা পর্যন্ত দিয়ে আসি।
তারা হাসল।
—এখনও সেই পুরোনো অভ্যাস?
—হ্যাঁ।
—তুমি বদলাওনি।
রাহুল বলল,
—কিছু মানুষ বদলায় না।
—কেউ কেউ বদলায়।
—তুমি বদলেছ?
তারা বলল,
—অনেক।
—কীভাবে?
—আগে তোমাকে দেখে রাগ হতো।
—এখন?
তারা হেসে বলল,
—এখন তোমাকে দেখে শান্তি লাগে।
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু হাসল।
—এই কথাটা আমি সারাজীবন মনে রাখব।
কয়েক মাস কেটে গেল।
রাহুল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করল।
তার মানসিক চিকিৎসাও চলছিল।
তারা নিয়মিত তার পাশে থাকত।
রাহুলও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করল।
একদিন তারা হাসপাতালে ডিউটি শেষে বের হচ্ছিল।
গেটের সামনে রাহুল দাঁড়িয়ে।
হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট।
তারা অবাক হয়ে বলল,
—এটা কী?
রাহুল বলল,
—তোমার জন্য।
—কী আছে?
—খুলে দেখো।
তারা প্যাকেট খুলে দেখল—
একটা সুন্দর কলম।
তারা অবাক হয়ে বলল,
—কলম?
—হ্যাঁ।
—কেন?
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—যে মেয়েটা আমার জন্য ডাক্তার হয়েছে, তার জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু খুঁজে পাইনি।
তারার চোখ ভিজে উঠল।
রাহুল বলল,
—তুমি আমার জীবনটা ফিরিয়ে দিয়েছ।
তারা মাথা নাড়ল।
—তুমি তো আগে থেকেই বেঁচে ছিলে।
—না।
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি আসার পর আমি আবার বাঁচতে শিখেছি।
তারা চোখের পানি মুছে হাসল।
রাহুল বলল,
—তাহলে একটা কথা বলি?
—আবার কী?
—এইবার কিন্তু আমি তোমার কাছে একটা জিনিস চাইব।
তারা হেসে বলল,
—কী?
রাহুল মৃদু গলায় বলল,
—আমার সঙ্গে সারাজীবন থাকবে?
তারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর চোখে পানি নিয়ে মাথা নাড়ল।
—থাকব।
রাহুলের মুখে সেই পুরোনো দুষ্টু হাসিটা ফিরে এল।
—তাহলে আমার প্রিয় সিনিয়রকে আর পালাতে দেওয়া যাবে না।
তারা হেসে বলল,
—তুমি কিন্তু এখনও সেই বদমাশ রাহুলই আছ।
রাহুল বলল,
—আর তুমি এখনও আমার সেই রাগী সিনিয়র।
দুজনেই হাসল।
কিন্তু তাদের সামনে তখনও ছিল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টা।
একটা নতুন শুরু।
একটা নতুন সকাল।
আর বহু বছরের অপেক্ষার পর—
একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি।
কয়েক মাস কেটে গেছে।
রাহুল এখন অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে।
নিয়মিত চিকিৎসা চলছে, তবে আগের মতো আর অস্থিরতা নেই। মাঝেমধ্যে পুরোনো স্মৃতির কিছু অংশ তাকে কষ্ট দেয়, কিন্তু তারা পাশে থাকলে সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিতে পারে।
আর একটা ব্যাপার বদলায়নি।
রাহুল এখনও আগের মতোই দুষ্টু।
হাসপাতালে তারা যখন ব্যস্ত থাকে, রাহুল কখনো চুপচাপ তার জন্য খাবার রেখে যায়।
কখনো হঠাৎ ফোন করে বলে,
—প্রিয় সিনিয়র, আমাকে ভুলে গেছ?
তারা বিরক্ত হয়ে বলে,
—রাহুল, আমি ডিউটিতে আছি।
—তাই তো ফোন করেছি। ব্যস্ত মানুষকে বিরক্ত করতে ভালো লাগে।
—তুমি একদম বদলাওনি।
—বদলালে তো তুমি আমাকে চিনতেই পারতে না।
তারা ফোনের ওপাশে হেসে ফেলে।
এই হাসিটাই যেন রাহুলের সবচেয়ে প্রিয় শব্দ।
একদিন বিকেলে তারা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দেখল, রাহুল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাতে একটা ছোট্ট ফুলের তোড়া।
তারা কাছে গিয়ে বলল,
—এগুলো কী?
—ফুল।
—সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি।
—তাহলে আবার প্রশ্ন করছ কেন?
তারা চোখ বড় করে তাকাল।
—তোমার সঙ্গে কথা বলাই ভুল।
রাহুল হাসল।
—ফুলগুলো তোমার জন্য।
তারা ফুলগুলো হাতে নিয়ে বলল,
—কেন?
—আজ একটা বিশেষ দিন।
—কী বিশেষ?
রাহুল রহস্যময়ভাবে বলল,
—বলব না।
—তাহলে আমি যাচ্ছি।
তারা হাঁটা শুরু করতেই রাহুল তার সামনে এসে দাঁড়াল।
—আচ্ছা বলছি।
—বলো।
—আজ সেই দিন, যেদিন তুমি প্রথমবার আমাকে বন্ধু বলেছিলে।
তারা অবাক হয়ে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে হাসল।
—তুমি এখনও দিনটা মনে রেখেছ?
—সবকিছু মনে আছে।
—সব?
রাহুল মাথা নাড়ল।
—তোমার প্রথম রাগ।
—হুম।
—প্রথম বকা।
—হুম।
—প্রথমবার কান ধরে উঠবস।
তারা হেসে ফেলল।
—ওটা ভুলে যাও।
—অসম্ভব।
—আর?
রাহুল একটু থেমে বলল,
—প্রথমবার তোমাকে ভালো লাগার দিনটাও মনে আছে।
তারার মুখ লাল হয়ে উঠল।
—সেটা কখন?
—যেদিন দেখেছিলাম তুমি রাস্তার এক গরিব বাচ্চার জন্য খাবার কিনে দিচ্ছিলে।
তারা অবাক হয়ে বলল,
—আমি?
—হ্যাঁ।
—আমি তো মনে করতে পারছি না।
—আমি পারি।
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—তখনই বুঝেছিলাম, তুমি শুধু রাগী সিনিয়র নও। তোমার মনটা খুব ভালো।
তারা কিছু বলল না।
শুধু ফুলগুলো বুকে চেপে ধরল।
কিছুদিন পর রাহুল তারাকে নিয়ে তার চাচার বাড়িতে গেল।
যে বাড়িতে একসময় তারা ভয় নিয়ে থাকত, আজ সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তার বুকের মধ্যে আর কোনো ভয় নেই।
চাচা বয়সে অনেকটা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন।
তারা তাকে দেখে এগিয়ে গেল।
চাচা তারাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন।
—তুই এত বড় হয়ে গেছিস।
তারা মৃদু হেসে বলল,
—সময় তো থেমে থাকে না, চাচা।
তারপর চাচা রাহুলের দিকে তাকালেন।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—তুই রাহুল?
রাহুল মাথা নিচু করে বলল,
—জি।
চাচা তার কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখলেন।
—তুই আমার মেয়েটাকে বাঁচিয়েছিলি।
রাহুল কিছু বলল না।
চাচার চোখে পানি।
—আমি তোকে তখন কিছু দিতে পারিনি।
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—আপনি শুধু তারাকে আমার পাশে থাকতে দিন।
চাচা তারার দিকে তাকালেন।
তারপর হাসলেন।
—ও তো অনেক আগেই তোর পাশে দাঁড়িয়ে গেছে।
তারা লজ্জায় মাথা নিচু করল।
রাহুল হেসে ফেলল।
সেদিন রাতে তারা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
আকাশে অনেক তারা।
রাহুল এসে পাশে দাঁড়াল।
—কী দেখছ?
তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তারা।
রাহুল বলল,
—কোনটা?
তারা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ওই যে।
রাহুল হাসল।
—আকাশের তারা না আমি?
তারা হেসে বলল,
—তুমি আবার শুরু করেছ।
রাহুল বলল,
—আমার একটা প্রশ্ন আছে।
—কী?
—তুমি কি কখনো আফসোস করেছ?
তারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—কীসের?
—আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য।
তারা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
—না।
—একবারও?
—একবারও না।
—এমনকি যখন আমি জেলে গেলাম?
তারার চোখে পানি এসে গেল।
—তখন শুধু মনে হয়েছে, তোমাকে আরও আগে শক্ত করে ধরে রাখা উচিত ছিল।
রাহুল কিছু বলল না।
তারা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি না থাকলে আমি হয়তো ডাক্তার হতে পারতাম। কিন্তু মানুষ হিসেবে এতটা শক্ত হতে পারতাম না।
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ।
—না।
—হ্যাঁ।
—আমি শুধু তোমার পাশে ছিলাম।
—কখনো কখনো পাশে থাকাটাই সবচেয়ে বড় বাঁচানো।
তারা কিছু বলতে পারল না।
রাহুল ধীরে তার হাতটা ধরল।
—তারা।
—হুম?
—আমার একটা ভয় আছে।
—কী?
—আবার যদি তোমাকে হারিয়ে ফেলি?
তারা তার হাত শক্ত করে ধরল।
—এইবার হারাবে না।
—প্রমিস?
—প্রমিস।
কয়েক মাস পর তাদের বিয়ের দিন ঠিক হলো।
বাড়ি আলোয় সাজানো হলো।
চারপাশে আত্মীয়স্বজন।
বন্ধুবান্ধব।
হাসি-আনন্দ।
তারা লাল শাড়ি পরে বসেছিল।
মুখে লাজুক হাসি।
রাহুল দূর থেকে তাকে দেখছিল।
তার মনে হচ্ছিল—
এই তো সেই মেয়েটা।
যার গায়ে একদিন সে কাদা ছিটিয়েছিল।
যে তাকে বকেছিল।
যে তাকে কান ধরে উঠবস করিয়েছিল।
যে তাকে বন্ধু বানিয়েছিল।
যে তার জন্য অপেক্ষা করেছিল।
যে তার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিল।
আজ সেই মেয়েটাই তার সামনে বসে আছে।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর রাহুল তারার কাছে এসে খুব আস্তে বলল,
—প্রিয় সিনিয়র।
তারা তাকাল।
—কী?
—আজ থেকে কিন্তু তুমি আর আমার সিনিয়র নও।
তারা মুচকি হেসে বলল,
—কেন?
—কারণ আজ থেকে তুমি আমার স্ত্রী।
তারা হেসে ফেলল।
—তবুও আমি তোমার থেকে এক ব্যাচ সিনিয়র।
রাহুল মাথা নাড়ল।
—ঠিক আছে। তাহলে সারাজীবন তোমাকে প্রিয় সিনিয়রই ডাকব।
তারা হেসে বলল,
—ডেকো।
বিয়ের পরের রাতে তারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো।
রাহুল জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।
বৃষ্টির শব্দ শুনে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারা ধীরে বলল,
—মনে আছে?
রাহুল বলল,
—সব মনে আছে।
—সেই রাত?
—হ্যাঁ।
—তখন আমরা জানতাম না আমাদের গল্প কোথায় গিয়ে শেষ হবে।
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এখন জানি।
—কোথায়?
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—শেষ হবে না।
তারা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
রাহুল বলল,
—কারণ আমাদের গল্পের শেষ নেই।
—তাহলে?
—প্রতিদিন নতুন একটা অধ্যায় শুরু হবে।
তারা হেসে তার হাত ধরল।
বাইরে তখন বৃষ্টি আরও জোরে নামছে।
একসময় যে বৃষ্টি তাদের আলাদা করে দিয়েছিল, আজ সেই বৃষ্টিই যেন তাদের নতুন জীবনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রাহুল তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
—তারা?
—হুম?
—আমি তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।
—কী?
রাহুল মুচকি হেসে বলল,
—সেদিন স্কুলে তোমার গায়ে কাদা ছিটানোর জন্য আমি একদমই দুঃখিত নই।
তারা অবাক হয়ে তাকাল।
—কী বললে?
রাহুল দৌড়ে একটু দূরে সরে গেল।
—কারণ ওই কাদা না ছিটালে আমার প্রিয় সিনিয়রকে পেতাম না!
তারা একটা বালিশ তুলে তার দিকে ছুড়ে মারল।
—রাহুল!
রাহুল হাসতে হাসতে পালাতে লাগল।
—ধরতে পারলে ধরো!
তারা তার পেছনে ছুটল।
পুরো বাড়ি হাসিতে ভরে গেল।
কিছু গল্প শুরু হয় একটা ছোট্ট দুষ্টুমি দিয়ে।
কিছু গল্প পেরিয়ে যায় কান্না, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা আর অসংখ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে।
কিন্তু কিছু মানুষকে যত দূরেই সরিয়ে দেওয়া হোক, ভাগ্য তাদের আবার পাশাপাশি এনে দাঁড় করায়।
রাহুল আর তারার গল্পটাও তেমনই।
একদিন কাদায় ভেজা স্কুলের রাস্তা থেকে শুরু হওয়া সেই সম্পর্ক—
বহু বছরের অপেক্ষা পেরিয়ে এসে থেমে গেল না।
বরং সেখান থেকেই শুরু হলো তাদের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।
কারণ কিছু মানুষকে হারানো যায়, কিন্তু হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যায় না।
আর রাহুলের কাছে তারা সারাজীবনই থেকে গেল—
তার প্রিয় সিনিয়র।
....