প্রথম দেখাতেই শুরু হয়েছিল ঝামেলা

ঢাকার বিমানবন্দরের ভেতরটা তখন বেশ ব্যস্ত।

কেউ লাগেজ নিয়ে ছুটছে, কেউ প্রিয়জনকে বিদায় জানাচ্ছে, আবার কেউ দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে আপনজনকে দেখে আনন্দে জড়িয়ে ধরছে।

এই ব্যস্ততার মাঝেই ট্রলি ঠেলে ধীর পায়ে বেরিয়ে আসছিল মেঘা।

প্রায় পাঁচ বছর বিদেশে পড়াশোনা করার পর আজ অবশেষে দেশে ফিরেছে সে।

মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখেমুখে ছিল অন্যরকম আনন্দ।

দেশের মাটিতে পা রাখার অনুভূতিটাই যেন আলাদা।

মেঘা নিজের ফোনটা বের করে বাবাকে কল দিতে যাবে, ঠিক তখনই—

ধাক্কা!

সামনের একজনের সঙ্গে তার সজোরে ধাক্কা লাগল।

মেঘার হাত থেকে ফোনটা প্রায় ছিটকে পড়ে যাচ্ছিল।

— দেখেশুনে হাঁটতে পারেন না?

সামনের লোকটার গম্ভীর কণ্ঠ শুনে মেঘা মাথা তুলে তাকাল।

লম্বা, সুদর্শন একজন ছেলে। কালো শার্ট, হাতে ঘড়ি, চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ। পাশে দুটো বড় স্যুটকেস।

মেঘা ভ্রু কুঁচকে বলল,

— আপনি নিজে কি খুব দেখেশুনে হাঁটছিলেন?

ছেলেটা ঠান্ডা চোখে তাকাল।

— আমি হাঁটছিলাম সোজা। আপনি এসে ধাক্কা দিয়েছেন।

— আমি?

মেঘা অবাক হয়ে নিজের দিকে আঙুল দেখাল।

— জি, আপনি।

— বাহ! দোষ করেও আবার এমন ভাব করছেন যেন আমি আপনাকে ধাক্কা মেরেছি!

ছেলেটার কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল।

মেঘার মেজাজ এমনিতেই একটু চড়া। পাঁচ বছর পর দেশে ফিরে প্রথম কয়েক মিনিটেই এমন একজনের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বে, সেটা সে কল্পনাও করেনি।

সে দাঁত চেপে বলল,

— বেশি কথা বলবেন না। আপনারও তো চোখ আছে। সেটা দিয়ে সামনে দেখলেই পারতেন।

— আপনার সঙ্গে তর্ক করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।

— তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?

— কারণ আপনি রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছেন।

মেঘা চারপাশে তাকাল।

সত্যিই সে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু সেটা স্বীকার করার মতো মানসিকতা তখন তার ছিল না।

— আমি রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছি, আর আপনি রাজপথের মালিক?

ছেলেটা এবার মৃদু হাসল।

সেই হাসিতে মেঘার রাগ আরও বেড়ে গেল।

— হাসছেন কেন?

— আপনার যুক্তি শুনে।

— আমার যুক্তি নিয়ে হাসার মতো কী আছে?

— অনেক কিছুই আছে।

— আপনি অসহ্য!

— ধন্যবাদ।

— এটা প্রশংসা ছিল না!

— আমিও প্রশংসা হিসেবে নিইনি।

মেঘা এবার একেবারে আগুন হয়ে গেল।

— আপনার নাম কী?

ছেলেটা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,

— জিহান।

— মনে রাখব। ভবিষ্যতে দেখলে রাস্তা বদলে চলে যাব।

জিহান ভ্রু তুলে বলল,

— আমিও ঠিক সেটাই করব।

দুজন দুদিকে চলে গেল।

কিন্তু ভাগ্যের লিখন তখনও বাকি।

বিমানবন্দরের বাইরে এসে মেঘা বুঝতে পারল, তার জন্য আসার কথা থাকা গাড়িটা আসেনি।

বাবাকে আবার ফোন করল।

— বাবা, গাড়ি কোথায়?

ওপাশ থেকে বাবা কিছু একটা বলতেই মেঘার মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল।

— কী? ড্রাইভার আসতে পারবে না?

কিছুক্ষণ কথা বলার পর ফোন কেটে দিল সে।

চারপাশে তাকিয়ে একটা গাড়ি ঠিক করার চেষ্টা করল।

ঠিক তখনই একজন ড্রাইভার এগিয়ে এসে বলল,

— ম্যাডাম, কোথায় যাবেন?

মেঘা নিজের ঠিকানা বলল।

ড্রাইভার ভাড়া বলল।

কিছুটা দরদাম করে অবশেষে গাড়ি ঠিক হয়ে গেল।

মেঘা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের স্যুটকেস গাড়িতে তুলে পেছনের সিটে বসে পড়ল।

সে জানালার পাশে বসে ফোন বের করল।

মনে মনে ভাবল,

‘আজ দেশে ফিরেই কী ঝামেলা!’

কিন্তু তার জানা ছিল না, সবচেয়ে বড় ঝামেলাটা এখনও তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রায় পাঁচ মিনিট পর গাড়ির দরজা খুলে কেউ একজন ভেতরে ঢুকল।

মেঘা প্রথমে তাকাল না।

তারপর পরিচিত একটা গম্ভীর কণ্ঠ শুনে মাথা তুলল।

— ভাই, লাগেজগুলো পেছনে রাখবেন।

মেঘার চোখ বড় হয়ে গেল।

জিহানও ভেতরে ঢুকে তাকে দেখে থমকে গেল।

দুজনের চোখাচোখি।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর একসঙ্গে দুজনের মুখ থেকে বের হলো—

— আপনি!

ড্রাইভার রিয়ারভিউ মিররে তাকিয়ে বলল,

— আপনারা একে অপরকে চেনেন?

মেঘা তাড়াতাড়ি বলল,

— না!

জিহানও একই সঙ্গে বলল,

— না।

তারপর দুজন দুজনের দিকে তাকাল।

মেঘা মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

— আমি এই গাড়িতে উঠেছি আগে।

জিহান শান্ত গলায় বলল,

— আমিও এই গাড়িটাই ঠিক করেছি।

— তাহলে আপনি অন্য গাড়িতে যান।

— কেন?

— কারণ আমি আগে উঠেছি।

— আমি আগে গাড়ি ঠিক করেছি।

মেঘা চোখ রাঙিয়ে বলল,

— তাহলে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করুন। আমি কোথাও যাচ্ছি না।

জিহান এবার ড্রাইভারের দিকে তাকাল।

— ভাই, আমি আগেই গাড়িটা ঠিক করেছিলাম। আমার বাড়ির ঠিকানা আপনাকে দেওয়া আছে।

ড্রাইভার একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

— আসলে সাহেব আগে আমাকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু ম্যাডামও ভাড়া ঠিক করে উঠে পড়েছেন। দুজনের গন্তব্য একই দিকেই।

মেঘা বিরক্ত হয়ে বলল,

— আমার গন্তব্য একই দিক হলেও আমি উনার সঙ্গে যাব না।

জিহান ঠান্ডা গলায় বলল,

— আমিও যেতে চাই না।

— তাহলে নামুন।

— আপনিই নামুন।

— আমি কেন?

— কারণ আমি গাড়িটা আগে ঠিক করেছি।

মেঘা চোখ কুঁচকে তাকাল।

— আপনি সবকিছুতে এত জেদ করেন কেন?

— আর আপনি সবকিছুতে এত চিৎকার করেন কেন?

— কারণ আপনি আমাকে বিরক্ত করছেন!

— আপনি আমাকে বিরক্ত করছেন।

ড্রাইভার এবার মাথায় হাত দিল।

— স্যার, ম্যাডাম, আপনারা যদি এভাবে করেন তাহলে আমার আজকে আর কোনো যাত্রী নিতে হবে না।

দুজনই চুপ করল।

কিছুক্ষণ পর মেঘা অনিচ্ছায় জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল।

জিহানও তার বিপরীত পাশে বসে ফোন বের করল।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

কিন্তু দুজনের মুখের বিরক্তি একটুও কমল না।

মেঘা মনে মনে বলল,

‘জীবনে এমন বিরক্তিকর মানুষ দেখিনি।’

অন্যদিকে জিহান ভাবল,

‘মেয়েটার রাগের মাত্রা তো ভয়ংকর!’

বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি মূল শহর ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নির্জন রাস্তায় ঢুকে পড়ল।

মেঘা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

হঠাৎ তার চোখে পড়ল—

রাস্তা প্রায় ফাঁকা।

দুই পাশে অন্ধকার।

দূরে দূরে কয়েকটা স্ট্রিটলাইট জ্বলছে।

মেঘার বুকের ভেতরটা অকারণে একটু কেঁপে উঠল।

ঠিক তখনই—

ড্রাইভার হঠাৎ গাড়ির গতি কমিয়ে দিল।

জিহান মাথা তুলে তাকাল।

— কী হয়েছে?

ড্রাইভার কোনো উত্তর দিল না।

পরের মুহূর্তেই সে সিটের নিচ থেকে একটা বন্দুক বের করল।

মেঘার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

ড্রাইভার বন্দুকটা তাদের দিকে তাক করে ঠান্ডা গলায় বলল,

— দুজনেই চুপচাপ বসে থাকবেন। যা যা আছে—সব স্যুটকেসসহ বাইরে নামবেন।

জিহান স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

মেঘা কাঁপা গলায় বলল,

— কী করছেন আপনি?

ড্রাইভার গর্জে উঠল,

— বেশি কথা নয়! সবকিছু দিয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে যান। না হলে এখানেই শেষ করে দেব!

মেঘা ভয়ে জিহানের দিকে তাকাল।

জিহানও তার দিকে তাকাল।

কয়েক সেকেন্ড দুজনের চোখাচোখি হলো।

তারপর মেঘা ফিসফিস করে বলল,

— সব আপনার জন্য হয়েছে।

জিহান অবাক।

— আমার জন্য?

— আপনি গাড়িতে উঠলেন কেন?

— আমি উঠলাম বলে ডাকাত পড়েছে?

— আপনি না উঠলে আমি একাই থাকতাম!

— একা থাকলে তো আরও সহজ টার্গেট হতেন।

— চুপ করুন!

ড্রাইভার এবার বন্দুকটা আরও উঁচু করে বলল,

— তোদের ঝগড়া পরে করিস! এখন দুজনেই বের হ!

জিহান ঠান্ডা গলায় বলল,

— ভাই, আমরা বের হচ্ছি।

ড্রাইভার চিৎকার করে উঠল,

— কথা কম, কাজ বেশি!

মেঘা কাঁপা হাতে দরজা খুলল।

জিহানও অন্য পাশের দরজা খুলে নামল।

দুজনেই নিজেদের স্যুটকেস রাস্তার পাশে রেখে দাঁড়িয়ে গেল।

গাড়িটা কয়েক সেকেন্ড তাদের সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর—

ধুলো উড়িয়ে দ্রুত অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেল।

রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল মেঘা আর জিহান।

দুজনের হাতেই কিছু নেই।

চারপাশে নিস্তব্ধতা।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

তারপর মেঘা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

— সব আপনার জন্য!

জিহান ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।

— আবার শুরু করলেন?

— আপনার জন্যই আমি এই অবস্থায় পড়েছি।

— আমি তো আপনাকে গাড়িতে উঠতে বলিনি।

— আপনিই তো পরে উঠে সব নষ্ট করলেন!

— আপনি চাইলে নামতে পারতেন।

— আপনি নামলেই তো পারতেন!

দুজন আবার ঝগড়ায় জড়িয়ে গেল।

অথচ তারা কেউই জানত না—

এই অচেনা মানুষটাই খুব শিগগিরই তার জীবনের সবচেয়ে পরিচিত মানুষ হয়ে উঠবে।

আর আজকের এই ভয়ংকর রাতটাই হয়ে থাকবে তাদের গল্পের প্রথম অধ্যায়।

নির্জন রাস্তাটার ওপর তখন রাত আরও ঘন হয়ে এসেছে।

দূরে কোথাও একটা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। মাঝে মাঝে বাতাসে শুকনো পাতার শব্দ। রাস্তার দুপাশে বড় বড় গাছের কালো ছায়া।

মেঘা রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

তার মুখে রাগ স্পষ্ট।

অন্য পাশে কিছুটা দূরে জিহান দাঁড়িয়ে আছে। সেও কম যায় না। দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সামনে তাকিয়ে আছে।

প্রায় দশ মিনিট কেটে গেল।

কোনো গাড়ি নেই।

মেঘা বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে।

একটা গাড়ির আলো দূর থেকে দেখা গেলেই সে আশা করে তাকাচ্ছে। কিন্তু প্রতিবারই গাড়িগুলো অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।

হঠাৎ জিহান বলল,

— এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই।

মেঘা তাকাল না।

— আমি জানি।

— তাহলে?

— তাহলে কী?

— আপনার বাড়ি তো এই রাস্তা দিয়ে আরও অনেক দূর।

— আপনার?

— আমারও।

মেঘা এবার বিরক্ত হয়ে বলল,

— আপনি আপনারটা দেখুন। আমার চিন্তা আপনাকে করতে হবে না।

জিহান মুচকি হাসল।

— চিন্তা করছি না।

— তাহলে কথা বলছেন কেন?

— কারণ আপনি এত রাগ করে দাঁড়িয়ে আছেন যে মনে হচ্ছে এই রাস্তাটাও আপনার সঙ্গে ঝগড়া করেছে।

মেঘা ঘুরে তাকাল।

— খুব হাসি পাচ্ছে আপনার?

— একটু।

— হাসুন।

— হাসছি তো।

— একদিন এই হাসিটা বন্ধ করে দেব।

— চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

মেঘা আর কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর জিহান চারপাশে তাকিয়ে বলল,

— আমি সামনে হেঁটে যাচ্ছি। হয়তো সামনে কোনো দোকান, বাড়ি বা থাকার জায়গা পাওয়া যেতে পারে।

মেঘা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— যান।

জিহান হাঁটা শুরু করল।

দুই-তিন পা যাওয়ার পর পেছন ফিরে তাকাল।

মেঘা তখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।

জিহান বলল,

— আপনি আসছেন না?

মেঘা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

— না।

— নিশ্চিত?

— একশ ভাগ।

— ঠিক আছে।

জিহান আবার হাঁটতে শুরু করল।

মেঘা কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর চারপাশে চোখ বুলাল।

অন্ধকার।

কোথাও কোনো মানুষের দেখা নেই।

দূরে ঝোপের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ হলো।

মেঘা চমকে উঠল।

— কে?

কোনো উত্তর নেই।

আরেকবার শব্দ হলো।

মেঘা এবার গিলে ফেলল নিজের ভয়।

তারপর দূরে তাকিয়ে দেখল জিহান অনেকটা এগিয়ে গেছে।

মেঘা দাঁত চেপে বলল,

— ধুর!

তারপর দ্রুত পা বাড়িয়ে জিহানের পেছনে হাঁটতে শুরু করল।

জিহান কিছুদূর যাওয়ার পর পেছনে তাকিয়ে মেঘাকে দেখতে পেল।

মুখে হাসি ফুটে উঠল।

কিন্তু সে কিছু বলল না।

মেঘা কাছে এসে গম্ভীর গলায় বলল,

— বেশি কিছু ভাববেন না।

জিহান ভান করে বলল,

— কী ভাবব?

— আমি ভয় পেয়ে আপনার পেছনে আসিনি।

— আমি তো কিছু বলিনি।

— আপনার মুখেই লেখা আছে।

জিহান এবার হেসে বলল,

— আপনি চাইলে সামনে হাঁটতে পারেন।

— আমি আপনার সঙ্গে হাঁটছি না। একই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি।

— অবশ্যই।

কিছুক্ষণ দুজন পাশাপাশি হাঁটল।

রাত যত বাড়ছিল, মেঘার ভয় তত বাড়ছিল।

হঠাৎ রাস্তার পাশের ঝোপ থেকে একটা প্রাণী দৌড়ে বের হয়ে গেল।

মেঘা আঁতকে উঠে জিহানের হাত চেপে ধরল।

জিহান থেমে গেল।

— কী হলো?

মেঘা চোখ বড় বড় করে বলল,

— ওটা কী?

জিহান তাকিয়ে দেখল।

— কিছু না। সম্ভবত শেয়াল।

মেঘা সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিল।

— শেয়াল?

— হ্যাঁ।

— আপনি এত স্বাভাবিকভাবে বলছেন কীভাবে?

— শেয়াল তো আর বাঘ না।

মেঘা মুখ শক্ত করে বলল,

— আমি ভয় পাইনি।

— অবশ্যই।

— সত্যি বলছি।

— আমিও বিশ্বাস করছি।

মেঘা চোখ রাঙাল।

— আপনি আমাকে নিয়ে মজা করছেন?

— একটু।

— আপনি খুব খারাপ মানুষ।

— এই কথাটা আজ দ্বিতীয়বার শুনলাম।

— আরও শুনবেন।

জিহান আবার হাঁটতে শুরু করল।

প্রায় বিশ মিনিট হাঁটার পর তারা একটা পুরোনো, ভাঙাচোরা চা-দোকানের মতো জায়গা দেখতে পেল।

দোকান বন্ধ।

কিন্তু পাশে টিনের একটা ছোট ছাউনি আছে। ভেতরে পুরোনো বেঞ্চ, একটা কাঠের টেবিল আর কয়েকটা বস্তা পড়ে আছে।

জিহান চারপাশ দেখে বলল,

— আজ রাতটা এখানে কাটানো যেতে পারে।

মেঘা ভেতরে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল।

— এখানে?

— হ্যাঁ।

— এটা তো ভাঙাচোরা গোডাউনের মতো।

— আপনার কাছে হোটেলের কোনো ব্যবস্থা আছে?

মেঘা চুপ করে গেল।

জিহান বলল,

— তাহলে এটাই ভালো।

মেঘা অনিচ্ছায় ভেতরে ঢুকল।

জিহান একটা পুরোনো বেঞ্চ পরিষ্কার করে দিল।

— আপনি এখানে শুয়ে পড়ুন।

— আর আপনি?

— আমি ওই পাশে থাকব।

মেঘা কিছু বলল না।

দুজন নিজেদের মতো জায়গা ঠিক করে নিল।

কিছুক্ষণ পর মেঘা বলল,

— আপনার ফোন আছে?

— আছে।

— নেটওয়ার্ক?

জিহান ফোন দেখে বলল,

— নেই।

মেঘা নিজের ফোন বের করল।

— আমারও নেই।

দুজনই দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

কিছুক্ষণ পর জিহান দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল।

মেঘা ভাবল, লোকটা এত সহজে ঘুমিয়ে গেল কীভাবে!

সে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করল।

কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই কিছুক্ষণ আগের বন্দুকের দৃশ্য মনে পড়ছে।

তার ওপর বাইরে অদ্ভুত সব শব্দ।

কখনো পাতার শব্দ।

কখনো দূরে কোনো প্রাণীর ডাক।

মেঘা চোখ মেলে অন্ধকারের দিকে তাকাল।

— জিহান?

কোনো উত্তর নেই।

সে আবার ডাকল,

— জিহান!

জিহান ঘুমের মধ্যেই বলল,

— কী?

— আপনি ঘুমিয়ে পড়েছেন?

— না, ধ্যান করছি।

মেঘা বিরক্ত হলো।

— সিরিয়াস কথা বলছি।

জিহান চোখ না খুলেই বলল,

— বলুন।

— বাইরে শব্দ হচ্ছে।

— হতেই পারে।

— কীসের শব্দ?

— জানি না।

— আপনি একটু দেখবেন?

জিহান এবার চোখ খুলল।

— আপনি নিজে যেতে পারবেন না?

মেঘা চুপ।

জিহান বুঝতে পারল মেয়েটা সত্যিই ভয় পেয়েছে।

সে উঠে বাইরে তাকাল।

কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল,

— কিছু নেই।

— নিশ্চিত?

— হ্যাঁ।

মেঘা আবার শুয়ে পড়ল।

জিহানও শুয়ে পড়ল।

কিন্তু কয়েক মিনিট পর আবার একটা শব্দ হলো।

এবার শব্দটা আরও কাছে।

মেঘা উঠে বসল।

তার বুক ধড়ফড় করছে।

জিহান ঘুমিয়ে।

মেঘা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।

আরেকটা শব্দ।

সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

হঠাৎ চিৎকার করে জিহানকে জড়িয়ে ধরল।

— জিহান!

জিহান চমকে উঠে বসে গেল।

তারপর বুঝতে পারল মেঘা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।

কয়েক সেকেন্ড সে কিছুই বলল না।

তারপর হঠাৎ জোরে হেসে উঠল।

— হা হা হা!

মেঘা লজ্জায় সঙ্গে সঙ্গে তাকে ছেড়ে দিল।

— হাসছেন কেন?

জিহান হাসতে হাসতেই বলল,

— এত রাগী মানুষের আবার এত ভয়!

— আমি ভয় পাইনি!

— তাহলে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন কেন?

মেঘা থমকে গেল।

তার মুখ লাল হয়ে উঠল।

— আমি... আমি ভেবেছিলাম কেউ এসেছে।

জিহান আবার হাসল।

— শেয়ালের পায়ের শব্দ শুনে মানুষকে জড়িয়ে ধরতে হয়?

— আপনি চুপ করবেন?

— ঠিক আছে, ঠিক আছে।

জিহান কিছুটা নরম গলায় বলল,

— ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি আছি।

মেঘা এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।

কথাটা খুব সাধারণ।

তবুও অদ্ভুতভাবে তার বুকের ভেতরটা শান্ত হয়ে গেল।

জিহান বলল,

— শুয়ে পড়ুন। কিছু হবে না। Relax.

মেঘা ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ল।

জিহানও চোখ বন্ধ করল।

কিন্তু মেঘার চোখ তখনও খোলা।

কিছুক্ষণ পর ভয় আবার ফিরে আসতেই সে খুব আস্তে জিহানের কাছাকাছি সরে এল।

জিহান সেটা টের পেলেও কিছু বলল না।

মেঘা অবশেষে ঘুমিয়ে পড়ল।

তার মুখে তখন আর কোনো রাগ নেই।

শান্ত।

জিহান চোখ খুলল।

তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ মেঘার দিকে তাকিয়ে রইল।

এই মেয়েটাকে সে কয়েক ঘণ্টা আগেও চিনত না।

অথচ আজ একই গাড়িতে বসেছে, একই বিপদে পড়েছে, একই জায়গায় রাত কাটাচ্ছে।

জিহান খুব আস্তে হাসল।

— অদ্ভুত মেয়ে...

বাইরে তখন রাত গভীর।

আর ভাঙা সেই ছাউনির নিচে, অচেনা দুজন মানুষের মধ্যে অদৃশ্য কোনো এক গল্পের শুরু হয়ে গেছে।

ভোরের আলো ফুটতে তখনও অনেক দেরি।

ভোরের আলো ধীরে ধীরে চারপাশের অন্ধকার সরিয়ে দিচ্ছিল।

পাখির ডাক আর দূরের মানুষের চলাচলের শব্দে মেঘার ঘুম ভাঙল।

চোখ মেলে প্রথমেই সে বুঝতে পারল, গত রাতের জায়গাটা আসলে স্বপ্ন ছিল না।

পুরোনো ছাউনি।

ধুলোমাখা মেঝে।

ভাঙা বেঞ্চ।

আর পাশে...

জিহান।

মেঘা সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল।

গত রাতের কথা মনে পড়তেই তার মুখ গরম হয়ে উঠল।

সে সত্যিই ভয় পেয়ে জিহানকে জড়িয়ে ধরেছিল!

‘ছিঃ!’

মনে মনে নিজেকেই বকতে লাগল।

ঠিক তখনই জিহানের কণ্ঠ শোনা গেল।

— সকাল সকাল এত চিন্তিত মুখ কেন?

মেঘা তাকিয়ে দেখল, জিহান অনেক আগেই উঠে বসেছে।

মুখে সেই চেনা মুচকি হাসি।

মেঘা গম্ভীর হয়ে বলল,

— কিছু না।

— গত রাতের কথা মনে পড়ছে?

মেঘার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল।

— কোন রাত?

— শেয়ালের রাত।

— জিহান!

জিহান হেসে ফেলল।

— আচ্ছা, আর বলব না।

— বললে কিন্তু...

— কী করবেন?

মেঘা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

— কিছু একটা করব।

— ভয় দেখাচ্ছেন?

— হ্যাঁ।

— গতকাল তো শেয়ালের শব্দেই ভয় পেয়েছিলেন।

মেঘা এবার মুখ ফিরিয়ে নিল।

— আপনি অসম্ভব বিরক্তিকর।

জিহান উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

— চলুন।

— কোথায়?

— রাস্তার পাশে গিয়ে দাঁড়াব। কোনো গাড়ি পেলে বাড়ি ফিরব।

মেঘা নিজের ব্যাগটা তুলে নিল।

দুজন ছাউনির বাইরে বেরিয়ে এল।

রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই মেঘা চারপাশে তাকাল।

গত রাতের ভয়াবহ জায়গাটা দিনের আলোয় কিছুটা স্বাভাবিক লাগছে।

কিন্তু গাড়ি কোথায়?

প্রথম আধঘণ্টা কেটে গেল।

কোনো গাড়ি নেই।

আরও আধঘণ্টা।

তারপরও নেই।

মেঘা বিরক্ত হয়ে বলল,

— এই রাস্তা কি পৃথিবীর বাইরে?

জিহান হেসে বলল,

— মনে হচ্ছে তাই।

— আমরা এখানে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব?

— যতক্ষণ না গাড়ি আসে।

— যদি না আসে?

জিহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— তাহলে হাঁটতে হবে।

মেঘা চোখ বড় করল।

— এত দূর?

— উপায় কী?

মেঘা রাস্তার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

ঠিক তখনই দূরে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

দুজনেই একসঙ্গে রাস্তার দিকে তাকাল।

গাড়িটা কাছে আসতেই জিহান হাত তুলল।

কিন্তু গাড়িটা থামল না।

মেঘা বিরক্ত হয়ে বলল,

— আমাদের মানুষই মনে করছে না!

জিহান হেসে বলল,

— আপনার চেহারা দেখে ভয় পেয়েছে হয়তো।

— আমার চেহারা দেখে?

— হ্যাঁ। রাগী দেখাচ্ছে।

মেঘা তাকিয়ে বলল,

— আপনার চেহারাও কম ভয়ংকর না।

— ধন্যবাদ।

— আবার ধন্যবাদ!

— আপনি আমাকে এত প্রশংসা করছেন, ধন্যবাদ তো দিতেই হবে।

মেঘা বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে তাকাল।

আরও কিছুক্ষণ পর জিহান হঠাৎ বলল,

— আমি সামনে যাচ্ছি।

— আবার?

— হ্যাঁ। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। সামনে গিয়ে কোনো গাড়ি বা মানুষের সন্ধান করি।

মেঘা এবার বলল,

— আপনি যান।

জিহান কয়েক পা এগিয়ে আবার থামল।

— আপনি আসবেন?

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— আপনি গেলে আমিও যাব।

জিহান মুচকি হাসল।

— কাল রাতে তো বলেছিলেন একা থাকবেন।

— আজ আর বলছি না।

— বুঝলাম।

দুজন হাঁটতে শুরু করল।

প্রায় চল্লিশ মিনিট পর পেছন থেকে গাড়ির হর্ন শোনা গেল।

জিহান ঘুরে তাকাল।

একটা কালো জিপ দ্রুতগতিতে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

জিহান রাস্তার পাশে সরে দাঁড়াল।

জিপটা তাদের সামনে এসে থামল।

দরজা খুলে একজন মধ্যবয়সী লোক দ্রুত নেমে এলেন।

জিহান তাকে দেখেই অবাক হয়ে বলল,

— চাচা!

লোকটা এগিয়ে এসে জিহানের কাঁধ ধরে বললেন,

— তুই ঠিক আছিস?

— হ্যাঁ।

— সারারাত কোথায় ছিলি? ফোন বন্ধ কেন?

— ফোনে নেটওয়ার্ক ছিল না। আর...

জিহান মেঘার দিকে তাকাল।

মেঘাও চুপ করে দাঁড়িয়ে।

লোকটা এবার মেঘাকে দেখে অবাক হলেন।

— এই মেয়েটা কে?

জিহান বলল,

— কাল রাতে একই গাড়িতে ছিল।

তারপর সংক্ষেপে সব ঘটনা বলল।

চাচার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

— ড্রাইভারটা ধরা পড়বে। পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে।

মেঘা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

লোকটা জিহানের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— তোরা ভাগ্যবান। ওই রাস্তায় এভাবে আটকে পড়া খুব বিপজ্জনক।

তারপর মেঘার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— মা, আপনার বাড়ি কোথায়?

মেঘা ঠিকানা বলল।

চাচা মাথা নেড়ে বললেন,

— সেটা তো আমাদের দিক থেকে অনেক দূর। আজকে রাত হয়ে যাবে।

জিহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— চাচা, ওকে আমাদের বাসায় নিয়ে চলেন। আজকে আমাদের বাসায় থাকুক। কাল সকালে আমি নিজে দিয়ে আসব।

মেঘা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— না, না! আমার বাড়িতে সবাই চিন্তা করছে।

জিহান বলল,

— আপনার ফোনে তো নেটওয়ার্ক নেই।

মেঘা চুপ হয়ে গেল।

চাচা বললেন,

— আগে বাসায় চল। ওখান থেকে ফোন করে জানিয়ে দিও।

মেঘা অনিচ্ছায় রাজি হলো।

জিপটা শহরের দিকে এগিয়ে চলল।

জিহান সামনের সিটে বসেছে।

মেঘা পেছনে।

চাচা মাঝে মাঝে রিয়ারভিউ মিররে তাকাচ্ছেন।

মেঘা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

কিন্তু তার মাথায় ঘুরছিল অন্য একটা বিষয়।

সে বারবার ভাবছিল—

‘আমি কি সত্যিই এই ছেলেটার বাড়িতে যাচ্ছি?’

কিছুক্ষণ পর জিপটা একটা বড় গেটের সামনে এসে থামল।

গেট খুলতেই মেঘার চোখ বড় হয়ে গেল।

বিশাল সুন্দর বাড়ি।

সামনে বাগান।

চারপাশে গাছপালা।

বাড়ির বারান্দায় কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে।

জিপ থামতেই একজন তরুণী দৌড়ে এসে জিহানের দিকে এগিয়ে গেল।

— ভাইয়া!

জিহান গাড়ি থেকে নামতেই মেয়েটা তাকে জড়িয়ে ধরল।

— তুমি ঠিক আছো তো?

— হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি।

— সারারাত কোথায় ছিলে?

— পরে বলব।

এবার মেয়েটার চোখ মেঘার দিকে গেল।

সে অবাক হয়ে বলল,

— এই আপু কে?

জিহান কিছু বলার আগেই মেঘা গাড়ি থেকে নামল।

— আমি...

জিহানের চাচা বললেন,

— কাল রাতে ও আর জিহান একই গাড়িতে ছিল। কিছু ঝামেলা হয়েছিল। আজ রাতে আমাদের বাসায় থাকবে।

মেয়েটার মুখ মুহূর্তেই হাসিতে ভরে গেল।

— সত্যি?

তারপর সে মেঘার হাত ধরে বলল,

— আসুন আপু। আপনি একদম চিন্তা করবেন না।

মেঘা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

— না, আসলে আমি...

— কোনো আসল-টাসল না। আপনি আজ আমাদের অতিথি।

আরেকজন মেয়ে এসে বলল,

— ভাইয়া, মেয়েটা তো বেশ মিষ্টি!

জিহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— তোমরা কেউ বেশি কিছু ভাববে না।

সবাই হেসে উঠল।

মেঘা জিহানের দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট করল।

— আপনার পরিবারও আপনার মতোই বিরক্তিকর মনে হচ্ছে।

জিহান ফিসফিস করে বলল,

— এখনো দেখেননি।

মেঘা বলল,

— দেখতেও চাই না।

ঠিক তখন জিহানের বোন বলল,

— কী ফিসফিস করছেন তোমরা?

জিহান বলল,

— কিছু না।

মেঘা বলল,

— ও আমাকে ভয় দেখাচ্ছিল।

সবাই আবার হেসে উঠল।

জিহান অবাক হয়ে মেঘার দিকে তাকাল।

— আমি?

— হ্যাঁ।

— কখন?

— একটু আগেই।

জিহানের বোন হেসে বলল,

— ভাইয়া, তুমি চুপ করো। আপুর পক্ষেই আমি আছি।

জিহান মাথা নেড়ে বলল,

— বুঝলাম। বাড়িতে আমার আর কোনো জায়গা নেই।

মেঘার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

এই প্রথম।

জিহান সেটা লক্ষ্য করল।

এক মুহূর্তের জন্য তার চোখও স্থির হয়ে গেল মেঘার মুখে।

কিন্তু পরক্ষণেই সে চোখ সরিয়ে নিল।

দুপুরের পর মেঘাকে ঘর দেখিয়ে দেওয়া হলো।

ঘরটা সুন্দর, পরিপাটি।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মেঘা বাইরে তাকাল।

কী অদ্ভুত!

গতকালও সে জানত না জিহান নামে কেউ তার জীবনে আসবে।

আর আজ সে জিহানের বাড়িতে দাঁড়িয়ে।

বিকেলে খাবার টেবিলে বসে মেঘা অবাক হয়ে গেল।

সবাই তাকে এমনভাবে আপন করে নিয়েছে যেন বহুদিনের পরিচিত।

জিহানের ছোট বোন মজা করে বলল,

— আপু, আপনি কি সত্যিই ভাইয়ার সঙ্গে প্রথম দিনেই ঝগড়া করেছিলেন?

মেঘা বলল,

— শুধু ঝগড়া না। ওনার সঙ্গে কথা বলাই কঠিন।

জিহান দূর থেকে বলল,

— আপনিও খুব সহজ নন।

মেঘা বলল,

— আপনাকে কেউ কথা বলতে বলেছে?

সবাই হেসে উঠল।

জিহানও হেসে ফেলল।

সন্ধ্যা নামল।

মেঘার বাবা-মায়ের সঙ্গে অবশেষে ফোনে কথা হলো।

সবাই ঘটনা শুনে চিন্তিত হলেও জিহানের চাচা কথা বলে তাদের আশ্বস্ত করলেন।

মেঘার বাবা বললেন,

— আজকে ওখানেই থাক। কাল সকালে চলে আসবি।

মেঘা রাজি হলো।

কিন্তু সেদিন রাতেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।

ঘুমানোর আগে মেঘা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

অন্য পাশের বারান্দায় জিহানও দাঁড়িয়ে।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না।

তারপর জিহান বলল,

— আজ আর ভয় লাগছে?

মেঘা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— একদম না।

— শেয়ালের শব্দ হলেও?

মেঘা চোখ রাঙাল।

— আবার শুরু করেছেন?

জিহান হেসে ফেলল।

মেঘাও এবার না চাইলেও হেসে ফেলল।

কেউ জানত না—

এই ছোট্ট হাসিটাই একদিন দুজনের জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতি হয়ে দাঁড়াবে।

পরদিন সকালটা মেঘার কাছে অদ্ভুত রকম শান্ত লাগল।

জানালার পর্দা সরাতেই বাইরে নরম রোদ এসে পড়ল ঘরের মেঝেতে। পাখির ডাক, বাগানের গাছের পাতায় বাতাসের মৃদু শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটাকে নিজের বাড়ির মতোই মনে হচ্ছিল।

কিন্তু মেঘা জানত, আজ তাকে চলে যেতে হবে।

সে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

গতকাল পর্যন্ত এই বাড়ির কারও সঙ্গে তার পরিচয় ছিল না। অথচ একদিনের মধ্যেই সবাই তাকে এত আপন করে নিয়েছে যে চলে যাওয়ার কথা ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন লাগছে।

বিশেষ করে—

জিহানের কথা মনে পড়তেই সে নিজেই বিরক্ত হয়ে গেল।

— ধুর! কেন ওর কথা মনে পড়ছে?

নিজেকেই প্রশ্ন করল মেঘা।

ঠিক তখন দরজায় টোকা পড়ল।

— আপু?

জিহানের ছোট বোনের কণ্ঠ।

— আসো।

মেয়েটা ঘরে ঢুকে মেঘার গোছানো ব্যাগ দেখে মুখটা মলিন করে ফেলল।

— আপনি আজ চলে যাবেন?

মেঘা মৃদু হেসে বলল,

— হ্যাঁ। বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি আমাকে বাড়িতে যেতে বলেছেন।

— কিন্তু আপনি থাকলে ভালো লাগত।

— আমারও ভালো লেগেছে তোমাদের সঙ্গে।

— তাহলে যাবেন কেন?

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

— নিজের বাড়ি তো যেতে হবে।

মেয়েটা অভিমান করে বলল,

— আমাদের বাড়িটা কি আপনার বাড়ি হতে পারে না?

মেঘার বুকটা কেমন করে উঠল।

সে মেয়েটাকে কাছে টেনে বলল,

— আবার আসব।

— সত্যি?

— সত্যি।

মেয়েটা খুশি হয়ে বেরিয়ে গেল।

মেঘা আবার ব্যাগ গোছাতে লাগল।

নিচে তখন সকালের নাশতার আয়োজন চলছে।

মেঘা নামতেই সবাই তাকে ঘিরে ফেলল।

— আজকে চলে যাবেন?

— হ্যাঁ।

— আরেকটা দিন থাকেন না?

— ইচ্ছে করছে। কিন্তু বাবা অপেক্ষা করছেন।

জিহান এতক্ষণ চুপচাপ খাচ্ছিল।

সে একবারও মেঘার দিকে তাকাচ্ছিল না।

কিন্তু কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনছিল।

তার বোন বলল,

— ভাইয়া, তুমি কিছু বলছ না কেন?

জিহান মাথা তুলল।

— কী বলব?

— আপু চলে যাচ্ছে।

— ওনার নিজের বাড়ি আছে। যেতে তো হবে।

কথাটা খুব স্বাভাবিক।

কিন্তু মেঘার কেন যেন মনে হলো, জিহানের গলায় অদ্ভুত একটা শূন্যতা।

সে চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পর জিহানের মা বললেন,

— মেঘা, আরেকটু থাকলে কী এমন হতো?

মেঘা মৃদু হেসে বলল,

— আমারও থাকতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু বাবা একা আছেন।

জিহান এবার ধীরে ধীরে বলল,

— আমি দিয়ে আসব।

মেঘা তার দিকে তাকাল।

— আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।

— কষ্টের কী আছে?

— আমি গাড়ি ঠিক করে চলে যাব।

— এত দূর একা যাবেন?

— আমি পারব।

জিহান একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

— আপনি সবকিছু একা পারবেন—এটা প্রমাণ করার দরকার নেই।

মেঘা চুপ হয়ে গেল।

জিহানের মা হেসে বললেন,

— জিহান, তুই-ই দিয়ে আয়।

— ঠিক আছে।

দুপুরের দিকে মেঘা গাড়িতে উঠল।

জিহান নিজেই গাড়ি চালাচ্ছে।

আগের মতো তাদের মধ্যে কোনো ঝগড়া নেই।

অদ্ভুত এক নীরবতা।

মেঘা জানালার বাইরে তাকিয়ে।

জিহান সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর মেঘা বলল,

— আপনার পরিবার খুব ভালো।

— জানি।

— সবাই আমাকে এত ভালোভাবে গ্রহণ করেছে...

— ওরা এমনই।

— আপনার বোনটা খুব মিষ্টি।

— আপনাকে পছন্দ করেছে।

মেঘা একটু হেসে বলল,

— আপনাকে পছন্দ করে?

জিহান মুচকি হাসল।

— সেটা আলাদা বিষয়।

মেঘা জানালার বাইরে তাকিয়ে আবার বলল,

— আপনার সঙ্গে প্রথম দিন এত ঝগড়া না করলে ভালো হতো।

— আপনার দোষ ছিল বেশি।

মেঘা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল।

— আবার!

জিহান হেসে বলল,

— আচ্ছা, আমারও ছিল।

মেঘা এবার হেসে ফেলল।

— এই প্রথম নিজের দোষ স্বীকার করলেন।

— আপনার জন্যই করলাম।

কথাটা বলেই জিহান কিছুটা চুপ হয়ে গেল।

মেঘাও।

দুজনের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।

কিন্তু এবার সেই নীরবতা অস্বস্তিকর ছিল না।

বরং কেমন যেন ভালো লাগছিল।

মেঘাদের বাড়ির সামনে গাড়ি থামল।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেঘার বাবা।

মেঘা গাড়ি থেকে নামতেই বাবা এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।

— মা, তুই ঠিক আছিস তো?

— হ্যাঁ বাবা।

— কালকের ঘটনা শুনে তো আমি...

বাবা কথা শেষ করতে পারলেন না।

জিহান গাড়ি থেকে নেমে সামনে এসে বলল,

— আঙ্কেল, চিন্তা করবেন না। ও নিরাপদেই ছিল।

মেঘার বাবা জিহানের দিকে তাকালেন।

— তুমিই জিহান?

— জি।

— তোমার চাচা ফোনে সব বলেছেন। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

— ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই।

মেঘার বাবা আন্তরিকভাবে বললেন,

— একদিন বাসায় এসো।

জিহান মাথা নেড়ে বলল,

— অবশ্যই।

মেঘা তখন পাশে দাঁড়িয়ে।

তার মনে হচ্ছিল, সময়টা যেন খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে।

জিহান গাড়ির দিকে ফিরে গেল।

মেঘা অদ্ভুত এক টান অনুভব করল।

কেন যেন মনে হচ্ছিল—

আরেকটু দাঁড়াক।

আরেকটু কথা বলুক।

কিন্তু সে কিছু বলল না।

জিহান গাড়িতে ওঠার আগে একবার তার দিকে তাকাল।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

কিছুক্ষণ কেউ চোখ সরাল না।

তারপর জিহান বলল,

— ভালো থাকবেন।

মেঘা খুব আস্তে বলল,

— আপনিও।

জিহান গাড়িতে উঠে চলে গেল।

মেঘা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে গাড়িটা অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

সেদিন রাতে নিজের ঘরে শুয়ে মেঘার ঘুম আসছিল না।

বালিশে মাথা রেখে সে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

তার মাথায় বারবার একই দৃশ্য ভেসে উঠছে।

জিহানের সঙ্গে প্রথম দেখা।

ঝগড়া।

একই গাড়িতে যাত্রা।

ডাকাতের ভয়।

নির্জন রাস্তা।

ভাঙা ছাউনিতে রাত কাটানো।

আর তারপর—

জিহানের বলা কথাটা।

‘আমি আছি।’

মেঘা চোখ বন্ধ করল।

কেন যেন বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসছে।

সে নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করল।

‘এটা শুধু কয়েকটা দিনের পরিচয়।’

‘ওকে আমি চিনি না।’

‘এমনকি ওর সঙ্গে আমার ঠিকমতো কথাও হয়নি।’

তবুও মন কোনো যুক্তিই মানতে চাইছিল না।

মেঘা বিরক্ত হয়ে উঠে বসল।

— আমার কী হচ্ছে?

অন্যদিকে জিহানের ঘরেও একই অবস্থা।

সে বিছানায় শুয়ে আছে।

ঘুম আসছে না।

তার চোখের সামনে বারবার মেঘার মুখ ভেসে উঠছে।

বিশেষ করে যাওয়ার সময় মেয়েটার চোখ।

কেন যেন মনে হচ্ছিল, মেঘা চলে যেতে চায়নি।

জিহান নিজের মনকে বোঝাল,

‘ও শুধু কয়েকদিন আমাদের সঙ্গে ছিল।’

‘এটাই স্বাভাবিক।’

কিন্তু তারপরও তার বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা।

সে ফোন হাতে নিল।

মেঘার নম্বর নেই।

চাচার কাছ থেকে চাইতে পারে।

কিন্তু কেন চাইবে?

সে নিজেই আবার ফোনটা রেখে দিল।

— না। দরকার নেই।

কিছুক্ষণ পর আবার ফোন হাতে নিল।

তারপর বিরক্ত হয়ে নিজেকেই বলল,

— কী করছি আমি?

দিন কেটে যেতে লাগল।

মেঘা নিজের পড়াশোনা আর পরিবারের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।

জিহানও নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে দুজনের মনেই একজন আরেকজনের উপস্থিতি রয়ে গেল।

কখনো মেঘা কোনো গাড়ির হর্ন শুনলে সেই রাতের কথা মনে করত।

কখনো কোনো শেয়ালের ডাক শুনলে তার মনে পড়ত জিহানের হাসি।

আর জিহান?

সে মাঝেমধ্যে নিজের অজান্তেই মেঘার কথা ভাবত।

কাজের মাঝেও।

রাতে ঘুমানোর সময়ও।

একদিন জিহানের বোন তাকে বলল,

— ভাইয়া, কী হয়েছে তোমার?

— কিছু হয়নি।

— তুমি কয়েকদিন ধরে চুপচাপ।

— কাজের চাপ।

বোন মুচকি হেসে বলল,

— মিথ্যা বলছ।

জিহান তাকাল।

— কী বলতে চাইছ?

— মেঘা আপু চলে যাওয়ার পর থেকেই তুমি এমন।

জিহান কিছু বলল না।

বোন বলল,

— আপুকে মিস করছ?

— বাজে কথা বলো না।

— তাহলে এত রাগ করলে কেন?

— আমি রাগ করিনি।

— তাহলে মুখটা এমন কেন?

জিহান আর উত্তর দিল না।

বোন হেসে চলে গেল।

জিহান জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

তার নিজের কাছেই একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—

‘মেঘা চলে যাওয়ার পর কেন বাড়িটা এত ফাঁকা লাগছে?’

কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় মেঘার বাবা তাকে ডাকলেন।

— মা, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।

মেঘা বাবার সামনে গিয়ে বসল।

— কী বাবা?

বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— তোমার বিয়ের কথা পাকা করেছি।

মেঘার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল।

— বিয়ে?

— হ্যাঁ। অনেক ভালো পরিবার। ছেলেটাও ভালো।

মেঘা চুপ করে বসে রইল।

বাবা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,

— তুই তো সবসময় বলতিস, বাবা-মা যাকে পছন্দ করবে তাকেই বিয়ে করবি।

মেঘা কিছু বলতে পারল না।

কারণ তার মাথায় তখন অন্য একজনের মুখ ভেসে উঠেছে।

একজন অচেনা মানুষ।

যার সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়েছিল ঝগড়া দিয়ে।

যার সঙ্গে এক রাতের বিপদের কারণে অদ্ভুত এক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

আর যাকে ভুলে থাকার কথা ভাবলেই বুকের ভেতরটা অস্বস্তিতে ভরে যাচ্ছে।

মেঘা ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেলল।

সে নিজেও বুঝতে পারছিল না—

কেন জিহানের কথা মনে পড়তেই তার চোখে পানি চলে আসছে।

মেঘা বাবার সামনে চুপ করে বসে রইল।

বাবা যখন বললেন, তার বিয়ের কথা পাকা করা হয়েছে, তখন প্রথমে সে যেন কথাটার অর্থই বুঝতে পারছিল না।

— বাবা... এত তাড়াতাড়ি?

বাবা মৃদু হেসে বললেন,

— তাড়াতাড়ি কোথায়? তুই তো পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরেছিস। ছেলেটা ভালো, পরিবার ভালো। আমরা অনেক ভেবেচিন্তেই কথা বলেছি।

মেঘা মাথা নিচু করে বসে রইল।

বাবা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— তোর কোনো আপত্তি আছে?

মেঘা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না।

তার মাথায় তখন শুধু একজনের মুখ।

জিহান।

কী অদ্ভুত!

কয়েকদিন আগেও এই নামটা তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। বিমানবন্দরে প্রথম দেখা হওয়ার মুহূর্তে ছেলেটাকে তার পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর মানুষ মনে হয়েছিল।

তারপর ঝগড়া।

একই গাড়িতে ওঠা।

ডাকাতের কবলে পড়া।

নির্জন রাস্তায় একসঙ্গে রাত কাটানো।

জিহানের ঠাট্টা।

তার পরিবারের আন্তরিকতা।

আর বিদায়ের সময় সেই কয়েক সেকেন্ডের চোখাচোখি...

সবকিছু যেন একসঙ্গে মনে পড়তে লাগল।

বাবা আবার বললেন,

— কী হলো মা?

মেঘা চোখের পানি সামলে বলল,

— আমি... একটু সময় চাই।

বাবা অবাক হলেন।

— সময়?

— হ্যাঁ।

— কাউকে কি পছন্দ করিস?

প্রশ্নটা শুনে মেঘার বুক কেঁপে উঠল।

সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

— না।

মিথ্যাটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু নিজের কাছেই সে বুঝতে পারল, উত্তরটা কতটা দুর্বল।

বাবা কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

— ঠিক আছে। তুই ভেবে দেখ।

মেঘা উঠে নিজের ঘরে চলে গেল।

দরজা বন্ধ করেই বিছানায় বসে পড়ল।

তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

কাকে যেন ফোন করতে ইচ্ছে করছে।

কিন্তু কাকে?

জিহানের নম্বর তার কাছে নেই।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— কেন তোমার কথা এত মনে পড়ছে?

কোনো উত্তর নেই।

অন্যদিকে জিহানের দিনগুলোও স্বাভাবিক যাচ্ছিল না।

সকালে অফিসের কাজ, দুপুরে ব্যস্ততা, সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা—সবকিছুই আগের মতো।

শুধু একটা জিনিস বদলে গেছে।

বাড়িতে ঢুকলেই তার মনে হয়, কেউ একজন নেই।

ডাইনিং টেবিলে বসলে মনে পড়ে, মেঘা কীভাবে তার বোনের সঙ্গে হাসাহাসি করত।

বারান্দায় দাঁড়ালে মনে পড়ে, একদিন মেঘার সঙ্গে সেখানে চোখাচোখি হয়েছিল।

এমনকি গাড়িতে উঠলেও তার মনে পড়ে সেই রাতের কথা।

জিহান নিজেই বিরক্ত হয়ে গেল।

এক রাতে সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার ছোট বোন এসে পাশে দাঁড়াল।

— ভাইয়া?

— হুম?

— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

— কর।

— মেঘা আপুর সঙ্গে কথা বলো না কেন?

জিহান চুপ করে রইল।

— ওনার নম্বর তো চাচার কাছে আছে।

জিহান এবার তাকাল।

— তুমি কীভাবে জানলে?

বোন হেসে বলল,

— সব জানতে হয়।

— ওকে ফোন করার কী আছে?

— তোমার ইচ্ছে করে না?

জিহান কিছু বলল না।

বোন এবার মৃদু গলায় বলল,

— ভাইয়া, একটা কথা বলি?

— বল।

— কাউকে খুব অল্প সময় চিনেও যদি তার অনুপস্থিতি এত বেশি টের পাওয়া যায়, তাহলে ব্যাপারটা সাধারণ নয়।

জিহান ভ্রু কুঁচকে বলল,

— তুমি এখন থেকে প্রেমের উপন্যাস পড়া বন্ধ করো।

বোন হেসে বলল,

— তুমি শুধু নিজের মনটাকে জিজ্ঞেস করো।

সে চলে গেল।

জিহান আবার একা হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর সে নিজের ফোনটা হাতে নিল।

চাচার নম্বর খুলল।

অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত কল করল না।

ফোনটা রেখে দিল।

কিন্তু পাঁচ মিনিট পর আবার তুলে নিল।

এবার কল করল।

চাচা ফোন ধরতেই জিহান স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,

— চাচা, ওই... মেঘাদের বাড়িতে সব ঠিক আছে তো?

ওপাশ থেকে চাচা হেসে বললেন,

— কেন? মেঘার খবর নিতে এত রাতের ফোন?

জিহান একটু থেমে বলল,

— সেদিনের ঘটনার পর ও ঠিক আছে কি না, সেটাই জানতে চাচ্ছিলাম।

— ভালো আছে। তবে শুনলাম ওর বিয়ের কথা চলছে।

জিহান যেন হঠাৎ কিছু শুনতেই পেল না।

— কী?

— ওর বাবা নাকি বিয়ের কথা পাকা করেছেন।

জিহানের গলা শুকিয়ে গেল।

— আচ্ছা...

চাচা বললেন,

— কী হলো?

— কিছু না।

— তুই কি মেঘাকে পছন্দ করিস?

জিহান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— জানি না।

চাচা মৃদু হেসে বললেন,

— নিজের মনকে জিজ্ঞেস কর।

কল কেটে গেল।

জিহান অনেকক্ষণ ফোন হাতে নিয়ে বসে রইল।

‘ওর বিয়ে?’

কেন যেন বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

সে নিজেকেই প্রশ্ন করল,

‘এতে আমার এত খারাপ লাগছে কেন?’

পরের কয়েকদিন মেঘা নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করল।

বাড়িতে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

আত্মীয়স্বজন আসছে।

বিয়ের কাপড়, গয়না, সাজসজ্জা—সবকিছু নিয়ে ব্যস্ততা।

কিন্তু মেঘার মন কোথাও নেই।

একদিন তার বান্ধবী এসে বলল,

— তোর কী হয়েছে?

— কিছু হয়নি।

— মিথ্যা বলিস না।

— সত্যি।

— বিয়ের কথা শুনে তোকে খুশি হওয়ার কথা। অথচ তুই সারাদিন এমন মুখ করে থাকিস কেন?

মেঘা চুপ।

বান্ধবী বলল,

— কাউকে পছন্দ করিস?

মেঘা এবারও উত্তর দিল না।

কিছুক্ষণ পর ধীরে বলল,

— জানি না।

— জানিস না মানে?

মেঘা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

— এমন একজনের কথা বারবার মনে পড়ছে, যাকে আমি ঠিকমতো চিনিই না।

বান্ধবী অবাক হয়ে বলল,

— কে?

মেঘা চুপ করে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

— জিহান।

সেদিন রাত।

মেঘা বিছানায় শুয়ে ফোন হাতে নিয়ে জিহানের নাম খুঁজতে চেষ্টা করল।

কোথাও নেই।

তারপর হঠাৎ মনে পড়ল—জিহানের বোনের সঙ্গে তো তার যোগাযোগ হয়েছিল।

সেই নম্বরও নেই।

মেঘা বিরক্ত হয়ে ফোনটা পাশে রেখে দিল।

কিছুক্ষণ পর আবার ফোন তুলে নিল।

তার মনে হলো, শুধু একবার কথা বললে হয়তো মনটা শান্ত হবে।

কিন্তু কী বলবে?

‘আপনি কেমন আছেন?’

এটা কি বলা যায়?

‘আপনাকে মনে পড়ছে।’

এটা তো একেবারেই বলা সম্ভব নয়।

মেঘা নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে গেল।

— আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?

সে ফোনটা বন্ধ করে দিল।

অন্যদিকে জিহানও সেই রাতে ঘুমাতে পারছিল না।

সে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছে।

মেঘার কথা মনে পড়ছে।

মনে পড়ছে সেই রাতের কথা।

মেঘার ভয় পাওয়া মুখ।

তারপর হঠাৎ তাকে জড়িয়ে ধরা।

জিহানের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ থাকল না।

‘ওর তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।’

সে চোখ বন্ধ করল।

কেন যেন মনে হলো, মেঘাকে অন্য কারও পাশে কল্পনা করতেই তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে।

জিহান উঠে জানালার কাছে গেল।

বাইরে রাত।

সবকিছু নিস্তব্ধ।

সে নিজেকে বলল,

— এটা সম্ভব না।

কয়েকদিনের পরিচয়।

এত অল্প সময়ে কাউকে নিয়ে এমন অনুভূতি হওয়া সম্ভব না।

কিন্তু তার মন যেন বলল—

‘তাহলে কেন ঘুম আসছে না?’

সময় এগিয়ে গেল।

মেঘার বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসতে লাগল।

বাড়িতে সবাই ব্যস্ত।

মেঘার মা শাড়ি দেখছেন।

বোনেরা গয়না সাজাচ্ছে।

আত্মীয়রা আসছে।

কিন্তু মেঘা প্রতিদিন রাতে একা ঘরে বসে একটা কথাই ভাবছে—

‘আমি কি সত্যিই অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারব?’

তার চোখের সামনে বারবার জিহানের মুখ ভেসে উঠছে।

সে জানে না, এটা ভালোবাসা কি না।

কিন্তু একটা বিষয় সে বুঝে গেছে—

জিহানকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেই তাকে আরও বেশি মনে পড়ে।

অবশেষে এক রাতে মেঘা বাবার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

বাবা তখন কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন।

মেঘা দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,

— বাবা?

— আয় মা।

মেঘা ভেতরে গিয়ে বাবার সামনে বসল।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— বাবা, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।

— বল।

মেঘার চোখে পানি জমে উঠল।

— আমি... একজনকে পছন্দ করি।

বাবার হাত থেমে গেল।

— কাকে?

মেঘা চোখ নামিয়ে বলল,

— যার সঙ্গে আমার পরিচয় খুব অল্প দিনের।

— সে কে?

মেঘা ধীরে ধীরে জিহানের কথা বলতে শুরু করল।

বিমানবন্দরের ঝগড়া থেকে শুরু করে সেই রাতের পুরো ঘটনা।

বাবা সব শুনলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার মুখ কঠিন হয়ে গেল।

— না।

মেঘা তাকাল।

— বাবা...

— আমি এই বিয়ে ভাঙব না।

— কিন্তু বাবা, আমি...

— কয়েকদিনের পরিচয়কে ভালোবাসা ভাবছিস। এটা আবেগ, মেঘা।

মেঘার চোখ দিয়ে পানি পড়ে গেল।

— আমি জানি না এটা কী। কিন্তু আমি জানি, আমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারব না।

বাবা কিছু বললেন না।

মেঘা উঠে নিজের ঘরে চলে গেল।

দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে কাঁদতে লাগল।

আর ঠিক সেই রাতেই—

জিহান নিজের ঘরে বসে একটা সিদ্ধান্ত নিল।

সে আবার বিদেশে ফিরে যাবে।

এখানে থেকে প্রতিদিন মেঘার কথা ভাবার চেয়ে দূরে চলে যাওয়াই ভালো।

সে ল্যাপটপ খুলল।

ফ্লাইটের টিকিট খুঁজতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর টিকিট বুক হয়ে গেল।

জিহান জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,

— ভালো থাকবেন, মেঘা।

তারপর চোখ বন্ধ করল।

কিন্তু সে জানত না—

যে মেয়েটাকে ভুলে যাওয়ার জন্য সে দেশ ছাড়তে চাইছে, সেই মেয়েটাই খুব শিগগির তার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

জিহানের সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়ে গেল।

সে আবার বিদেশে ফিরে যাবে।

বছরের পর বছর বিদেশে পড়াশোনা করার পর দেশে ফিরেছিল নতুন করে জীবন শুরু করার জন্য। নিজের কাজ, পরিবার—সবকিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল।

কিন্তু দেশে ফেরার পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এমন একজন মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হলো, যাকে সে চেনেও না অথচ ভুলতেও পারছে না।

মেঘা।

জিহান নিজের মনকে যতই বোঝানোর চেষ্টা করুক, একটা সত্যি অস্বীকার করতে পারছিল না—

মেঘাকে অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে হতে দেখার কথা সে মেনে নিতে পারছে না।

তাই পালিয়ে যাওয়াই তার কাছে সহজ মনে হলো।

পরদিন সকালে জিহানের মা জানতে পারলেন, ছেলে বিদেশ যাওয়ার টিকিট করেছে।

— তুই আবার বিদেশ যাচ্ছিস?

জিহান স্বাভাবিক গলায় বলল,

— হ্যাঁ মা। কিছু কাজ বাকি আছে।

— এত তাড়াতাড়ি?

— কিছু জরুরি কাজ আছে।

মা ছেলের মুখের দিকে তাকালেন।

— তোর মন খারাপ?

জিহান মৃদু হাসল।

— না তো।

— মায়ের চোখ ফাঁকি দিতে পারবি না।

জিহান চুপ করে গেল।

তার ছোট বোনও পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে সব বুঝে গিয়েছিল।

— ভাইয়া, তুমি কি মেঘা আপুর জন্য যাচ্ছ?

জিহান চোখ তুলে তাকাল।

— আবার শুরু করেছ?

— আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম।

— এর সঙ্গে মেঘার কোনো সম্পর্ক নেই।

বোন মৃদু হেসে বলল,

— তাহলে এত তাড়াহুড়ো করে বিদেশে যাচ্ছ কেন?

জিহান উত্তর দিল না।

তার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— তুই যদি কাউকে পছন্দ করে থাকিস, তাহলে পালিয়ে যাস না।

জিহান মায়ের দিকে তাকাল।

কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।

তারপর ধীরে বলল,

— কিছু মানুষকে কাছে পাওয়ার চেয়ে দূরে থাকাই ভালো।

মা বুঝলেন, ছেলে কোনো গভীর কষ্টের মধ্যে আছে।

কিন্তু জোর করলেন না।

অন্যদিকে মেঘার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তুতি আরও জোরেশোরে চলছে।

বাড়িতে সাজসজ্জা শুরু হয়েছে।

আত্মীয়স্বজন আসতে শুরু করেছে।

কিন্তু মেঘার ঘরের দরজা প্রায় সবসময় বন্ধ।

সে কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলছে না।

তার মা এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন,

— মা, দরজা খুল।

মেঘা খুলে দিল।

মা বিছানায় বসে বললেন,

— তুই এমন করছিস কেন?

মেঘা চুপ করে রইল।

— তুই কি সত্যিই ওই ছেলেটাকে ভালোবাসিস?

মেঘার চোখে পানি চলে এল।

— মা, আমি জানি না ভালোবাসা কীভাবে বোঝে। কিন্তু ওকে ভুলতে পারছি না।

— কতদিনের পরিচয়?

— কয়েকদিন।

মা অবাক হয়ে বললেন,

— কয়েকদিনের পরিচয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়?

মেঘা নিচু গলায় বলল,

— আমিও তো চাইনি এমন হোক।

মা তার মাথায় হাত রাখলেন।

— তোর বাবা খুব রাগ করেছে।

— জানি।

— কিন্তু তুই যদি সত্যিই না চাস, তাহলে বিয়ের আগে পরিষ্কার করে বল।

মেঘা মায়ের দিকে তাকাল।

— বাবা শুনবে না।

— চেষ্টা কর।

মেঘা চোখ বন্ধ করল।

তারপর হঠাৎ মনে হলো—

জিহানের সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার।

যদি সে-ও কিছু অনুভব না করে?

যদি জিহানের কাছে এই কয়েকটা দিন শুধু একটা অদ্ভুত ঘটনা হয়?

তাহলে?

মেঘার বুক কেঁপে উঠল।

তবুও সে সত্যিটা জানতে চায়।

সেদিন বিকেলে মেঘা অনেক কষ্টে জিহানের বোনের নম্বর জোগাড় করল।

ফোন করল।

ওপাশ থেকে মেয়েটা ফোন ধরতেই মেঘা বলল,

— হ্যালো...

— আপু!

মেঘা একটু থেমে বলল,

— জিহান কি বাসায় আছে?

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মেয়েটা বলল,

— ভাইয়া?

— হ্যাঁ।

— ভাইয়া তো... বাইরে।

মেঘার বুকটা ধক করে উঠল।

— কোথায়?

— জানি না। তবে আজকাল খুব চুপচাপ থাকে।

মেঘা কিছু বলতে পারল না।

মেয়েটা হঠাৎ বলল,

— আপু, আপনি কি ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলতে চান?

মেঘা লজ্জায় চুপ হয়ে গেল।

— আসলে...

— বুঝেছি।

— না, তেমন কিছু না।

— আপনি ওকে খুব মিস করেন, তাই না?

মেঘার চোখে পানি চলে এল।

সে আর কিছু বলল না।

মেয়েটা নরম গলায় বলল,

— আপু, ভাইয়ার সঙ্গে আপনার কথা বলা দরকার।

— ও কি আমার সঙ্গে কথা বলবে?

— অবশ্যই।

কিন্তু তখনও মেঘা জানত না—

জিহান ইতিমধ্যেই বিমানবন্দরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

দুই দিন পর।

রাত।

জিহানের স্যুটকেস গুছানো।

পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সব প্রস্তুত।

ভোরের ফ্লাইট।

তার মা শেষবারের মতো ঘরে এসে দাঁড়ালেন।

— এখনও সময় আছে।

জিহান তাকাল।

— কিসের?

— মন বদলানোর।

জিহান মৃদু হেসে বলল,

— কিছু সিদ্ধান্ত বদলানো যায় না।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— তুই কি সত্যিই ওকে কিছু না বলে চলে যাবি?

জিহান চুপ।

— মেঘাকে?

জিহান চোখ নামিয়ে বলল,

— ওর বিয়ে হয়ে যাবে। আমার এখানে থেকে কী লাভ?

— তুই কি নিশ্চিত, ওর মনেও তোর জন্য কিছু নেই?

জিহান কিছু বলল না।

মা বললেন,

— কখনো কখনো উত্তর না জানার ভয়, উত্তর জানার ভয় থেকেও বড়।

জিহান মায়ের দিকে তাকাল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু বলল না।

সকাল।

জিহান বিমানবন্দরে এসে বসে আছে।

তার সামনে বড় স্যুটকেস।

পাসপোর্ট হাতে।

বোর্ডিংয়ের সময় এগিয়ে আসছে।

বিমানবন্দরের ভেতরে মানুষজনের ব্যস্ততা।

কেউ দেশে ফিরছে।

কেউ দেশ ছাড়ছে।

জিহান চুপচাপ বসে আছে।

তার চোখের সামনে মেঘার মুখ।

সে মনে মনে বলল,

‘তুমি হয়তো এখন তোমার বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছ।’

‘আমি তোমাকে কিছুই বলতে পারলাম না।’

‘হয়তো এটাই ভালো।’

কিন্তু বুকের ভেতরটা যেন বলছে—

‘না।’

‘ফিরে যাও।’

‘একবার কথা বলো।’

জিহান চোখ বন্ধ করল।

নিজের অনুভূতিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করল।

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।

চাচা ফোন করেছেন।

জিহান ফোন ধরল।

— হ্যালো, চাচা?

ওপাশ থেকে চাচা বললেন,

— কোথায় তুই?

— এয়ারপোর্টে।

— কেন?

— বিদেশ যাচ্ছি।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর চাচা বললেন,

— মেঘার ব্যাপারটা জানিস?

জিহানের বুক ধক করে উঠল।

— কী হয়েছে?

— মেয়েটা নাকি তার বাবাকে বলেছে, সে অন্য কাউকে ভালোবাসে।

জিহানের চোখ বড় হয়ে গেল।

— কী?

— হ্যাঁ।

— সে... কার কথা বলেছে?

চাচা একটু হেসে বললেন,

— সেটা তুই জানিস না?

জিহান কথা হারিয়ে ফেলল।

তার বুকের ভেতর হঠাৎ এমন একটা আলো জ্বলে উঠল, যেটাকে সে কয়েকদিন ধরে জোর করে নিভিয়ে রেখেছিল।

— চাচা... মেঘা কি...

— আমি নিশ্চিত না। কিন্তু তুই যদি ওকে নিয়ে কিছু ভাবিস, তাহলে এখনই ভাব।

জিহান উঠে দাঁড়াল।

তার হাতের পাসপোর্ট কেঁপে উঠল।

কিন্তু সে কিছু করার আগেই ফোনের ওপাশ থেকে চাচা বললেন,

— আর একটা কথা।

— কী?

— ওর বিয়ের দিন খুব কাছে।

জিহান স্থির হয়ে গেল।

চাচা ফোন রেখে দিলেন।

জিহান চারপাশে তাকাল।

বিমানবন্দরের বিশাল স্ক্রিনে তার ফ্লাইটের নাম দেখা যাচ্ছে।

বোর্ডিং শুরু হতে যাচ্ছে।

সে ধীরে ধীরে নিজের স্যুটকেসের দিকে তাকাল।

তারপর মেঘার কথা মনে পড়ল।

মেঘার সেই চোখ।

বিদায়ের সময়ের নীরবতা।

গত রাতের ভয়।

তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা।

সবকিছু।

জিহান নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল,

— মেঘা...

তারপর সে চোখ বন্ধ করল।

অন্যদিকে মেঘার বাড়িতে বিয়ের আগের দিনের ব্যস্ততা।

বাড়ি আলোয় সাজানো।

গান চলছে।

আত্মীয়স্বজনের ভিড়।

কিন্তু মেঘা নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে আছে।

তার সামনে বিয়ের শাড়ি।

গয়না।

সবকিছু সাজানো।

সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

নিজেকে দেখে মনে হলো—

এ যেন সে নয়।

হঠাৎ ফোনটা হাতে নিল।

জিহানের কোনো নম্বর নেই।

তবুও সে ফোনের কনট্যাক্টে বারবার তাকাচ্ছে।

মনে হলো, যদি কোনোভাবে একটা নম্বর পাওয়া যেত!

সে জিহানের বোনকে ফোন করল।

— আপু?

— হ্যাঁ, বলুন।

— জিহান কোথায়?

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর উত্তর এল,

— ভাইয়া বিদেশ চলে যাচ্ছে।

মেঘার হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

— কী?

— আজ রাতের ফ্লাইট।

মেঘার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

— ও... আমাকে কিছু বলেনি?

— না।

মেঘা ফোন কেটে দিল।

তার বুকের ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে গেল।

সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

মনে হলো, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।

জিহান চলে যাবে।

সে বিয়ে করবে।

তারপর?

তারা আর কোনোদিন দেখা করবে না?

মেঘা চোখ মুছে বলল,

— না।

তারপর নিজের মনকে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট করে বলল,

— আমি ওকে হারাতে পারব না।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে মা ডাকলেন,

— মেঘা! কাল তো তোর বিয়ে। দরজা খোল মা!

মেঘা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

ভেতর থেকে বলল,

— মা, আমি কাউকে বিয়ে করব না।

বাইরে সবাই স্তব্ধ।

মেঘার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

— আমি জিহানকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করব না।

বাড়ির ভেতর যেন মুহূর্তেই সব শব্দ থেমে গেল।

তার বাবা দ্রুত এসে দরজার সামনে দাঁড়ালেন।

— মেঘা, দরজা খোল।

— না বাবা।

— তুই কী বলছিস বুঝতে পারছিস?

— হ্যাঁ।

— এই ছেলেটাকে তুই কতদিন চাস?

মেঘা চোখের পানি মুছে বলল,

— যতদিন চিনেছি, ততদিনই যথেষ্ট হয়েছে।

বাবা চুপ।

মেঘা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— আমি জানি না এটা কখন কীভাবে হয়েছে। কিন্তু আমি জানি, ওকে ছাড়া অন্য কারও পাশে দাঁড়াতে পারব না।

দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর বাইরে থেকে বাবার গলা এল—

— যদি সত্যিই এটাই তোর সিদ্ধান্ত হয়...

মেঘা দরজার ওপাশে কান পেতে রইল।

বাবা ধীরে বললেন,

— তাহলে আমি জোর করব না।

মেঘা অবিশ্বাসে দরজার দিকে তাকাল।

— বাবা?

— তুই যাকে চাস, তাকেই বিয়ে করবি।

মেঘার চোখ ভিজে উঠল।

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ল—

জিহান তো বিদেশ চলে যাচ্ছে!

সে তাড়াতাড়ি ফোন হাতে নিল।

জিহানের নম্বর নেই।

তারপর চাচার নম্বর খুঁজতে লাগল।

অবশেষে নম্বর পেল।

কাঁপা হাতে ফোন করল।

— হ্যালো, চাচা?

ওপাশ থেকে জিহানের চাচা বললেন,

— মেঘা মা?

— জিহান কোথায়?

— এয়ারপোর্টে।

মেঘার বুক কেঁপে উঠল।

— ও কি এখনো আছে?

— হ্যাঁ।

মেঘা আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।

— চাচা, আমাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যেতে পারবেন?

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর চাচা বললেন,

— আমি আসছি।

মেঘা ফোন রেখে আয়নার সামনে দাঁড়াল।

তার পরনে বিয়ের পোশাক।

চোখে পানি।

কিন্তু মুখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।

সে ফিসফিস করে বলল,

— জিহান, তুমি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাও...

তারপর চোখ মুছে বলল,

— আমি নিজেই তোমাকে ফিরিয়ে আনব।

মেঘা দরজা খুলতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য নিঃশব্দ হয়ে গেল।

তার পরনে বিয়ের পোশাক।

চোখের কোণে কান্নার দাগ।

কিন্তু সেই চোখেই ছিল অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।

মেঘার বাবা কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

— তুই নিশ্চিত?

মেঘা মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ বাবা।

— যদি ছেলেটা তোকে গ্রহণ না করে?

মেঘা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

তারপর বলল,

— তাহলে অন্তত আমি জানব, আমি চেষ্টা করেছি।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— চল।

মেঘার চোখ ভিজে উঠল।

— সত্যি?

— হ্যাঁ। তোর জীবন তুই বেছে নে।

মেঘা বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

— ধন্যবাদ বাবা।

মা পাশে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছিলেন।

— সাবধানে যাস মা।

মেঘা মাথা নেড়ে দ্রুত বেরিয়ে এল।

বাড়ির সামনে জিহানের চাচার গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।

চাচা নিজেই গাড়ি থেকে নেমে মেঘার দিকে তাকালেন।

— মা, সময় খুব কম।

মেঘা দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল।

তার বাবা-মাও সঙ্গে উঠলেন।

গাড়ি ছুটে চলল বিমানবন্দরের দিকে।

মেঘার হাত কাঁপছে।

মনে হচ্ছে বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক জোরে ধুকপুক করছে।

সে বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে।

জিহানের নম্বর নেই।

চাচাকে বলল,

— ও কি ফোন ধরছে?

— আমি ওকে কল করেছিলাম। ধরেনি।

মেঘার বুকটা ধক করে উঠল।

— যদি চলে যায়?

চাচা শান্ত গলায় বললেন,

— এখনও ফ্লাইট ছাড়েনি।

— কিন্তু যদি...

— ভয় পাস না।

মেঘা জানালার বাইরে তাকাল।

রাস্তার গাড়িগুলো যেন আজ অসম্ভব ধীরগতিতে চলছে।

প্রতিটা মিনিট তার কাছে ঘণ্টার মতো লাগছে।

সে চোখ বন্ধ করল।

মনে পড়ল সেই প্রথম দিন।

বিমানবন্দরের ভিড়।

একটা ধাক্কা।

তারপর ঝগড়া।

জিহানের বিরক্ত মুখ।

একই গাড়িতে বসা।

ড্রাইভারের হাতে বন্দুক।

নির্জন রাস্তা।

ভাঙা ছাউনি।

রাতের অন্ধকারে ভয় পেয়ে জিহানের কাছে ছুটে যাওয়া।

জিহানের হাসি।

সবকিছু যেন একসঙ্গে চোখের সামনে ভেসে উঠল।

মেঘার চোখে পানি চলে এল।

সে খুব আস্তে বলল,

— তুমি আমাকে এত সহজে কীভাবে ভুলে গেলে?

অন্যদিকে বিমানবন্দরে জিহান বসে আছে।

বোর্ডিংয়ের ঘোষণা হয়ে গেছে।

কিন্তু সে এখনও উঠছে না।

তার সামনে স্যুটকেস।

হাতে পাসপোর্ট।

মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন—

সে কি সত্যিই চলে যাবে?

তার চাচার কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে।

‘মেঘা নাকি তার বাবাকে বলেছে, সে অন্য কাউকে ভালোবাসে।’

জিহানের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি।

সে জানে না মেঘা কাকে ভালোবাসে।

তবুও তার মনে হচ্ছে—

হয়তো সেই মানুষটা সে নিজেই।

কিন্তু এত অল্প দিনের পরিচয়ে?

এটা কি সম্ভব?

জিহান নিজের মাথা নাড়ল।

— না। এসব ভাবা ঠিক না।

সে উঠে দাঁড়াল।

স্যুটকেস হাতে নিল।

বোর্ডিং গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

দুই পা এগিয়ে আবার থেমে গেল।

পেছনে তাকাল।

বিমানবন্দরের কাঁচের দেয়ালের ওপারে অসংখ্য মানুষ।

কেউ কাউকে বিদায় দিচ্ছে।

কেউ কাউকে গ্রহণ করছে।

জিহানের বুকের ভেতর হঠাৎ একটা শূন্যতা তৈরি হলো।

সে খুব আস্তে বলল,

— মেঘা...

তারপর চোখ বন্ধ করল।

গাড়ি বিমানবন্দরের গেটে পৌঁছাতেই মেঘা প্রায় দৌড়ে নেমে গেল।

তার বাবা পেছন থেকে ডাকলেন,

— ধীরে মা!

কিন্তু মেঘা থামল না।

চাচা দ্রুত তার পেছনে গেলেন।

— মেঘা! এদিকে!

মেঘা ঘুরে তাকাল।

চাচা বললেন,

— জিহানের ফ্লাইটের বোর্ডিং শুরু হয়ে গেছে।

মেঘার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— তাহলে আমি কোথায় যাব?

— আন্তর্জাতিক টার্মিনালের দিকে।

মেঘা দ্রুত দৌড়াতে শুরু করল।

বিয়ের পোশাক সামলাতে সামলাতে।

চারপাশের মানুষ অবাক হয়ে তাকাচ্ছে।

কেউ কেউ ফিসফিস করছে।

কিন্তু মেঘার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।

তার মাথায় শুধু একটা কথাই—

‘ওকে যেতে দেওয়া যাবে না।’

জিহান তখন বোর্ডিং গেটের সামনে।

একজন কর্মী তার পাসপোর্ট দেখে বলল,

— Sir, please proceed.

জিহান মাথা নেড়ে এগিয়ে যেতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই—

দূর থেকে কারও কণ্ঠ ভেসে এল।

— জিহান!

জিহান থেমে গেল।

কণ্ঠটা পরিচিত।

খুব পরিচিত।

সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

তার চোখ বড় হয়ে গেল।

দূরে—

বিয়ের পোশাকে মেঘা দাঁড়িয়ে।

চোখে পানি।

চুল কিছুটা এলোমেলো।

শ্বাসকষ্টে হাঁপাচ্ছে।

কিন্তু চোখ দুটো সরাসরি জিহানের দিকে।

জিহান যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

— মেঘা?

মেঘা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না।

দৌড়ে তার কাছে গেল।

জিহানও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মেঘা সামনে এসে কিছু বলতে পারল না।

শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।

জিহান কাঁপা গলায় বলল,

— তুমি এখানে?

মেঘা মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ।

— তোমার... আজ তো...

কথাটা শেষ করতে পারল না।

মেঘা চোখ মুছে বলল,

— বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।

জিহানের বুকটা কেঁপে উঠল।

— তাহলে?

মেঘা খুব আস্তে বলল,

— আমি বিয়ে করব না।

জিহান স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।

— কেন?

মেঘা এবার চোখ তুলে তার দিকে তাকাল।

— কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি।

চারপাশের শব্দ যেন হঠাৎ থেমে গেল।

জিহানের চোখে বিস্ময়।

সে যেন কথাটা শুনেও বিশ্বাস করতে পারছে না।

— মেঘা...

মেঘা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— আমি জানি, আমাদের পরিচয় খুব অল্প দিনের। জানি, তোমাকে নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াটা হয়তো পাগলামি। কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি তোমাকে ভুলতে।

সে চোখ মুছে বলল,

— পারিনি।

জিহান কিছু বলতে পারল না।

মেঘা আবার বলল,

— তোমাকে ভুলে অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবলেই মনে হয়েছে আমি নিজেকে ঠকাচ্ছি।

জিহান ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এল।

— তুমি কি জানো, আমি কেন বিদেশ যাচ্ছিলাম?

মেঘা মাথা নাড়ল।

— জানি না।

জিহান মৃদু হেসে বলল,

— তোমাকে ভুলতে।

মেঘা অবাক হয়ে তাকাল।

— আমাকে?

— হ্যাঁ।

জিহানের কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল।

— আমি ভেবেছিলাম তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করবে। তাই মনে হলো, এখানে থেকে তোমার কথা ভেবে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে দূরে চলে যাই।

মেঘার চোখ আবার ভিজে উঠল।

— তাহলে তুমি আমাকে না জানিয়েই চলে যাচ্ছিলে?

— আমি ভেবেছিলাম তোমার জীবনে আমার কোনো জায়গা নেই।

মেঘা মাথা নাড়ল।

— ছিল।

জিহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— এখন আছে?

মেঘা চোখ নামিয়ে বলল,

— জানি না।

জিহান অবাক হলো।

— কেন?

মেঘা চোখ তুলে তাকিয়ে হেসে বলল,

— তুমি তো আমাকে এতদিন শুধু রাগী মেয়ে আর ভীতু মেয়ে বলেই দেখেছ।

জিহানের মুখে হাসি ফুটল।

— সত্যি বলছি, তুমি দুটোই।

মেঘা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

— আবার শুরু করেছ?

— না।

— তাহলে?

— তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না—এটা বলছি।

মেঘা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

— আমিও না।

জিহান আর কোনো কথা বলল না।

সে মেঘাকে কাছে টেনে নিল।

মেঘাও আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

দুজন একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

মেঘার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

জিহানের মুখে স্বস্তির হাসি।

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পরিবারের মানুষজনও আবেগে ভেসে গেলেন।

মেঘার মা চোখ মুছতে মুছতে বললেন,

— আল্লাহ, শেষ পর্যন্ত মেয়েটার মুখে হাসি ফিরল।

জিহানের মা-ও চোখ মুছলেন।

তারপর কেউ একজন হাততালি দিতে শুরু করল।

একজন।

তারপর আরেকজন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশে হাততালির শব্দ উঠল।

— বাহ!

— অবশেষে!

— কী সুন্দর!

মেঘা লজ্জায় জিহানের কাছ থেকে একটু সরে দাঁড়াল।

জিহানও হেসে ফেলল।

ঠিক তখনই—

ভিড়ের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মধ্যবয়সী লোকও হাততালি দিতে শুরু করল।

তার চোখে পানি।

সে বারবার চোখ মুছছে।

মুখে অদ্ভুত একটা আবেগের হাসি।

মেঘা প্রথমে খেয়াল করল না।

জিহানও না।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর জিহানের চোখ হঠাৎ লোকটার দিকে পড়ল।

সে থেমে গেল।

লোকটাকে দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল।

মেঘা জিহানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— কী হলো?

জিহান লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

— লোকটাকে চেনা লাগছে।

মেঘাও তাকাল।

এক সেকেন্ড।

দুই সেকেন্ড।

তারপর মেঘার চোখ বড় হয়ে গেল।

— জিহান...

— হুম?

— আরে...

সে একটু জোরে বলল,

— এ তো সেই ড্রাইভার!

জিহানও সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেলল।

— আরে! সত্যিই তো!

লোকটার মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও।

সে হাততালি দেওয়া বন্ধ করে এক পা পিছিয়ে গেল।

জিহান বলল,

— আপনি এখানে কী করছেন?

লোকটা কিছু বলল না।

আরেক পা পিছিয়ে গেল।

তারপর হঠাৎ—

দৌড়!

— এই! দাঁড়ান!

জিহান চিৎকার করে তার পেছনে ছুটল।

লোকটা বিমানবন্দরের ভেতর দিয়ে দৌড়াচ্ছে।

জিহানও তার পেছনে।

ঠিক তখনই জিহানের পুলিশ চাচা ব্যাপারটা বুঝে গেলেন।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে দৌড় শুরু করলেন।

— ধর! লোকটাকে ধর!

চারপাশের সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।

মেঘা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর দৃশ্যটা দেখে হেসে ফেলল।

জিহানের বোনও হেসে বলল,

— আপু, আপনাদের গল্পে এই লোকটারও এত বড় ভূমিকা!

মেঘা হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল।

— সত্যি! মানুষটা না থাকলে হয়তো আমাদের গল্পটাই অন্যরকম হতো।

কিছুক্ষণ পর দূর থেকে জিহানের চাচার গলা শোনা গেল,

— ধরেছি!

সবাই আবার হাততালি দিয়ে উঠল।

মেঘা হেসে বলল,

— এবার কিন্তু আমাদের লাগেজের হিসাব চাই!

দূর থেকে জিহানের কণ্ঠ ভেসে এল,

— লাগেজ পরে! আগে লোকটাকে থানায় নিয়ে যাই!

সবাই হেসে উঠল।

মেঘার বাবা মাথা নাড়িয়ে বললেন,

— তোমাদের গল্পে নাটক কম নেই!

মেঘার মা হেসে বললেন,

— শুরু হয়েছিল ঝগড়া দিয়ে, শেষ হচ্ছে পুলিশ দিয়ে!

সবাই আবার হেসে উঠল।

কিছুক্ষণ পর জিহান ফিরে এল।

তার চাচা সেই ড্রাইভারকে ধরে রেখেছেন।

লোকটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।

মেঘা তাকে দেখে বলল,

— আপনাকে দেখে মনে হলো আপনি আমাদের জন্য খুব আবেগী হয়ে কাঁদছিলেন!

লোকটা লজ্জায় মাথা নিচু করল।

জিহান হেসে বলল,

— এত আবেগী হলে আমাদের লাগেজগুলো চুরি করেছিলেন কেন?

লোকটা কোনো উত্তর দিতে পারল না।

সবাই আবার হেসে উঠল।

শেষ পর্যন্ত জিহানের বিদেশ যাওয়া আর হলো না।

মেঘাও নিজের পরিবারকে নিয়ে নিশ্চিন্ত হলো।

দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ের আয়োজন করা হলো।

আর সেই দিনটার কথা তারা যতবার মনে করত, ততবার হাসত।

মেঘা প্রায়ই জিহানকে বলত,

— জানো, আমাদের গল্পটা কত অদ্ভুত?

জিহান বলত,

— কেন?

— প্রথম দেখা ধাক্কায়।

— তারপর ঝগড়া।

— তারপর একই গাড়ি।

— তারপর ডাকাতি।

— তারপর সেই ভাঙা ছাউনি।

— তারপর আমি তোমাকে খুঁজতে বিমানবন্দরে ছুটে এলাম।

মেঘা হেসে বলত,

— আর শেষে সেই চোর ড্রাইভারও আমাদের মিল দেখে হাততালি দিল!

জিহানও হেসে ফেলত।

— হ্যাঁ। তবে হাততালি দেওয়ার পর দৌড়টাও ভালোই দিয়েছে।

মেঘা হেসে বলত,

— ওটা বোধহয় আমাদের গল্পের সবচেয়ে মজার অংশ।

জিহান তার দিকে তাকিয়ে বলত,

— কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর অংশটা?

মেঘা জিজ্ঞেস করত,

— কোনটা?

জিহান মৃদু হেসে বলত,

— যেদিন তুমি আমাকে হারাতে না চেয়ে সবার সামনে ছুটে এসেছিলে।

মেঘা কিছু বলত না।

শুধু মৃদু হেসে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত।

কারণ তাদের গল্পের শুরুটা যতই অদ্ভুত হোক—

শেষ পর্যন্ত তারা বুঝেছিল,

কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কটা শুরু হয় একেবারে অপ্রত্যাশিত একটা ধাক্কা থেকে।

....
👁 360