সকাল আটটা।
হাসপাতালের করিডোরে তখন রোগী আর স্বজনদের ভিড়। সাদা অ্যাপ্রন পরা ডাক্তারদের ব্যস্ত পায়ে ছুটে চলা, নার্সদের ছোটাছুটি, কোথাও রোগীর স্বজনের উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ—সব মিলিয়ে পুরো হাসপাতালটা যেন নিজের গতিতে ছুটছিল।
আফিয়া হাতে কয়েকটা মেডিকেল ফাইল নিয়ে দ্রুত হাঁটছিল।
আজ তার প্রথম ক্লিনিক্যাল রোটেশনের দিন।
মেডিকেল কলেজে পড়ছে সে। পড়াশোনায় খারাপ নয়, বরং বেশ ভালো। তবে একটা সমস্যা আছে—আফিয়া অসম্ভব চঞ্চল।
আর আজকের দিনটা তার কাছে একটু বেশিই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ আজ প্রথমবার সে কাছ থেকে কাজ করবে ডা. অর্ণব রহমানের সঙ্গে।
অর্ণব রহমান।
হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট। শহরের নামকরা সার্জন। বয়স খুব বেশি নয়, কিন্তু দক্ষতা আর কঠোর স্বভাবের জন্য হাসপাতালে তার আলাদা একটা পরিচিতি আছে।
কেউ তার সামনে অযথা কথা বলে না।
কেউ কাজ ফেলে রাখে না।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
অর্ণবের রাগকে সবাই ভয় পায়।
আফিয়া অবশ্য এসব শুনেও বিশেষ ভয় পায়নি।
বরং মনে মনে বেশ আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করছিল।
দূর থেকে হঠাৎ একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
— রোগীর রিপোর্টটা আবার দেখেছেন?
আফিয়া থেমে গেল।
সামনে তাকাতেই দেখল, কয়েকজন জুনিয়র ডাক্তারকে নিয়ে অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে।
সাদা অ্যাপ্রনের নিচে হালকা নীল শার্ট। হাতে ফাইল। মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।
আফিয়া কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে নিজের অজান্তেই মুচকি হাসল।
পাশে দাঁড়ানো বান্ধবী মেহরিন ফিসফিস করে বলল,
— ওই যে, তোর ভয়ংকর স্যার।
আফিয়া চোখ সরাল না।
— ভয়ংকর কোথায়?
— তুই এখনো বুঝিসনি। পাঁচ মিনিট পর বুঝবি।
আফিয়া হেসে বলল,
— আমার মনে হয় উনি এতটাও রাগী না।
মেহরিন ভ্রু তুলে তাকাল।
— তুই কি ওনার প্রেমে পড়েছিস নাকি?
আফিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল।
— চুপ কর।
কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসিটা থেকেই গেল।
কিছুক্ষণ পর অর্ণবের চোখ হঠাৎ আফিয়ার ওপর এসে পড়ল।
তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।
— আপনি!
আফিয়া নিজের দিকে তাকিয়ে বলল,
— জি?
— এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
— আপনাকে দেখছিলাম।
কথাটা মুখ দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেহরিন পাশে দাঁড়িয়ে কাশির ভান করল।
অর্ণব কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
— আমাকে দেখার জন্য হাসপাতালে আসেননি নিশ্চয়ই।
আফিয়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
— না, সেটা ঠিক।
— তাহলে কাজের জায়গায় কাজ করুন।
— জি, স্যার।
আফিয়া ফাইলটা বুকে চেপে ধরল।
অর্ণব চলে যেতে উদ্যত হতেই আফিয়া হঠাৎ বলল,
— স্যার?
অর্ণব থামল।
— কী?
আফিয়া একটু হেসে বলল,
— আপনাকে হাসলে কিন্তু বেশি সুন্দর লাগে।
চারপাশের দু-একজন নার্স হঠাৎ মুখ চেপে হাসতে লাগল।
অর্ণব ধীরে ধীরে আফিয়ার দিকে ঘুরে তাকাল।
চোখে এবার স্পষ্ট রাগ।
— মিস আফিয়া।
— জি?
— আপনি কি আমার সঙ্গে মজা করছেন?
আফিয়া মাথা নাড়ল।
— না তো।
— তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলবেন না।
— কেন?
অর্ণব এক পা এগিয়ে এল।
আফিয়া এবার একটু পিছিয়ে গেল।
— কারণ আমি আপনার শিক্ষক। আর আপনি আমার ছাত্রী।
অর্ণবের কণ্ঠটা নিচু।
কিন্তু সেই নিচু গলাটাই যেন আরও ভয়ংকর।
— বুঝেছেন?
আফিয়া আস্তে মাথা নাড়ল।
— জি।
অর্ণব চলে গেল।
মেহরিন আফিয়ার কানে কানে বলল,
— তুই আজ বেঁচে গেলি কীভাবে?
আফিয়া অর্ণবের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
— মানুষটা রাগলে আরও ভালো লাগে।
— তুই সত্যিই পাগল!
আফিয়া কিছু বলল না।
তার চোখ তখনও অর্ণবের পেছনে।
সে জানত, এই মানুষটাকে পছন্দ করা সহজ হবে না।
তবু কেন যেন তার মনটা অর্ণবের কাছেই আটকে গেছে।
দুপুরের দিকে ওয়ার্ড রাউন্ড শুরু হলো।
অর্ণব রোগী দেখাচ্ছিলেন। আফিয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে নোট নিচ্ছিল।
একসময় অর্ণব বললেন,
— আফিয়া, রোগীর প্রেসক্রিপশনটা পড়ে বলুন।
আফিয়া ফাইলের দিকে তাকাল।
কিন্তু ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
সে এক ঝলক ফোনটা দেখে আবার ফাইলের দিকে তাকাল।
অর্ণব সেটা লক্ষ্য করলেন।
— ফোনটা দিন।
আফিয়া চমকে উঠল।
— জি?
— ফোন।
— স্যার, ফোনে কিছু হয়নি।
— আমি কি বলেছি হয়েছে?
আফিয়া ধীরে ধীরে ফোনটা এগিয়ে দিল।
অর্ণব ফোনটা হাতে নিয়ে টেবিলের ওপর রাখলেন।
— কাজের সময় কাজ করবেন।
আফিয়া মাথা নিচু করল।
— সরি।
— এখন প্রেসক্রিপশন পড়ুন।
আফিয়া পড়তে শুরু করল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর অর্ণব লক্ষ্য করলেন, মেয়েটা বারবার ভুল করছে।
— থামুন।
আফিয়া থেমে গেল।
— এত ভুল করছেন কেন?
— নার্ভাস লাগছে।
— কেন?
আফিয়া চুপ।
অর্ণব কাছে এসে দাঁড়ালেন।
— আমার জন্য?
আফিয়া মাথা তুলল।
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল।
অর্ণব খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আফিয়া নিজের হৃদস্পন্দন পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিল।
সে খুব আস্তে বলল,
— একটু।
অর্ণবের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত কিছু ফুটে উঠল।
কিন্তু পরক্ষণেই তিনি সরে গেলেন।
— নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই। ভুল করলে রোগীর ক্ষতি হতে পারে।
আফিয়া মাথা নিচু করল।
— বুঝেছি।
অর্ণব কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে তাকালেন।
— আর একটা কথা।
— জি?
— আমাকে নিয়ে এত ভাবার দরকার নেই।
আফিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
অর্ণবের ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য হাসি ফুটেছিল।
— নিজের পড়াশোনা নিয়ে ভাবুন।
বলেই তিনি চলে গেলেন।
আফিয়া হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মেহরিন পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল,
— দেখলি? মানুষটা পুরো পাথর না।
আফিয়া মৃদু হেসে বলল,
— আমি জানি।
তারপর নিজের অজান্তেই বলল,
— একদিন এই মানুষটাকে হাসাবই।
সন্ধ্যায় হাসপাতালের ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল আফিয়া।
আকাশে তখন হালকা মেঘ।
তার হাতে একটা কফির কাপ।
হঠাৎ পেছন থেকে অর্ণবের কণ্ঠ শুনতে পেল।
— এখানে একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
আফিয়া ঘুরে তাকাল।
— আপনি?
— হ্যাঁ, আমি।
আফিয়া হেসে বলল,
— ভাবছিলাম, আপনি কখন হাসবেন।
অর্ণব বিরক্ত হয়ে বললেন,
— আবার শুরু করলেন?
— কী করব বলুন? আপনি সবসময় এমন গম্ভীর থাকেন।
— এটা আমার স্বভাব।
— স্বভাব বদলানো যায়।
অর্ণব কিছু বললেন না।
আফিয়া একটু সাহস করে সামনে এগিয়ে এল।
— স্যার, একটা কথা বলব?
— বলুন।
— আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে।
অর্ণবের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
আফিয়া এবার আর হাসল না।
খুব শান্ত গলায় বলল,
— আমি জানি আপনি আমাকে শুধু ছাত্রী হিসেবেই দেখেন। তবু কথাটা না বললে হয়তো আফসোস থাকত।
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর কঠিন গলায় বললেন,
— এসব কথা এখন আপনার বয়সে মানায় না।
আফিয়ার চোখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— মানে?
— আগে পড়াশোনা শেষ করুন। নিজের পায়ে দাঁড়ান। একজন ভালো ডাক্তার হন।
অর্ণব এক মুহূর্ত থামলেন।
তারপর বললেন,
— তারপর যদি এই অনুভূতিটা একই থাকে, তখন আমাকে এসে বলবেন।
আফিয়া চুপ করে তাকিয়ে রইল।
অর্ণব চলে যাওয়ার আগে শুধু বললেন,
— এখন থেকে পড়াশোনায় মন দিন।
তিনি চলে গেলেন।
আফিয়া অনেকক্ষণ ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
চোখের কোণে পানি জমল।
তবু সে চোখ মুছে ফেলল।
নিজেকে খুব আস্তে বলল,
— ঠিক আছে, ডাক্তার সাহেব।
তারপর ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটল।
— আমি ডাক্তার হয়েই আপনাকে আবার বলব।
সেদিনই আফিয়া একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
অর্ণব তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
কিন্তু হার মানেনি সে।
বরং সেদিন থেকেই নিজের স্বপ্নটাকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল।
সে একদিন অর্ণবের সমান হয়ে দাঁড়াবে।
পরের কয়েকটা দিন আফিয়া নিজেকে বদলে ফেলল।
আগের মতো অর্ণবকে দেখলেই হাসাহাসি করা, ইচ্ছে করে সামনে গিয়ে দাঁড়ানো কিংবা অকারণে কথা বলা—সব বন্ধ।
এখন তার একমাত্র লক্ষ্য পড়াশোনা।
সকাল থেকে হাসপাতাল।
দুপুরে ক্লাস।
রাতে বই।
মাঝে মাঝে এতটাই পড়াশোনায় ডুবে থাকত যে মেহরিন কয়েকবার ফোন করে বলত,
— তুই মানুষ তো?
আফিয়া হেসে উত্তর দিত,
— না। আমি এখন ডাক্তার হওয়ার মেশিন।
কিন্তু নিজের অজান্তেই অর্ণবের কথা তার মাথায় ঘুরত।
বিশেষ করে সেদিনের কথাটা।
“আগে বড় হন। নিজের পায়ে দাঁড়ান। তারপর যদি এই অনুভূতিটা একই থাকে, আমাকে এসে বলবেন।”
কথাগুলো যেন আফিয়ার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সে চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করেছিল।
একদিন সকালবেলা ওয়ার্ডে রোগী দেখছিল অর্ণব।
আফিয়া দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছিল।
অর্ণব রোগীর সঙ্গে কথা বলার সময় আশ্চর্যরকম শান্ত থাকেন। অথচ একটু আগে একজন জুনিয়র ডাক্তার রিপোর্টে ভুল করায় তাকে এমনভাবে বকেছেন যে লোকটা প্রায় কেঁপে উঠেছিল।
আফিয়া মনে মনে হাসল।
লোকটা সত্যিই অদ্ভুত।
রাগী, কঠোর, অথচ রোগীর সামনে সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ।
হঠাৎ অর্ণব বললেন,
— আফিয়া।
— জি?
— এই রোগীর রিপোর্টটা দেখুন।
আফিয়া এগিয়ে গেল।
রিপোর্ট হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখল।
— স্যার, এখানে একটা সমস্যা আছে।
অর্ণব ভ্রু তুললেন।
— কী সমস্যা?
— এই রিপোর্টের একটা মান আগের রিপোর্টের সঙ্গে মিলছে না।
অর্ণব ফাইলটা হাতে নিলেন।
কয়েক সেকেন্ড দেখার পর বললেন,
— ঠিক বলেছেন।
আফিয়ার মুখে হাসি ফুটল।
— সত্যি?
— হ্যাঁ।
তারপর অর্ণব একটু থেমে বললেন,
— ভালো করছেন।
মাত্র দুটো শব্দ।
কিন্তু আফিয়ার কাছে যেন পুরো পৃথিবীর প্রশংসা।
সে মাথা নিচু করে হাসল।
— ধন্যবাদ, স্যার।
অর্ণব চলে গেলেন।
কিছুদূর গিয়ে আবার থামলেন।
— আফিয়া।
— জি?
— এভাবেই মন দিয়ে কাজ করুন।
— করব।
অর্ণব চলে গেলেন।
মেহরিন পাশে এসে বলল,
— আজ তো তোর মুখে সূর্য উঠেছে।
আফিয়া হাসল।
— উনি প্রশংসা করেছেন।
— দুইটা শব্দ বলেছে শুধু!
— আমার জন্য অনেক।
সময় এগিয়ে যেতে লাগল।
আফিয়ার পড়াশোনাও ভালো হতে থাকল।
অর্ণবও বিষয়টা লক্ষ্য করছিলেন।
আগের চঞ্চল মেয়েটা এখন অনেক বেশি দায়িত্বশীল।
কোনো কাজ ফেলে রাখে না।
রোগীর সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলে।
রাত জেগে পড়াশোনা করে।
কখনো কখনো অর্ণব দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করতেন।
নিজের অজান্তেই।
একদিন রাত প্রায় দশটা।
হাসপাতালের বেশিরভাগ করিডোর ফাঁকা।
আফিয়া লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিল।
হঠাৎ তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
অনেকক্ষণ ধরে বই পড়ার কারণে মাথা ব্যথা করছিল।
সে টেবিলের ওপর মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল।
কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল জানে না।
হঠাৎ কারও কণ্ঠে ঘুম ভাঙল।
— এখানে ঘুমাচ্ছেন কেন?
আফিয়া চোখ খুলে তাকিয়ে চমকে গেল।
অর্ণব দাঁড়িয়ে আছেন।
— স্যার!
— রাত দশটা বাজে।
আফিয়া ঘড়ির দিকে তাকাল।
— এত রাত হয়ে গেছে?
— হ্যাঁ।
অর্ণব তার সামনে রাখা বইগুলোর দিকে তাকালেন।
— এত পড়তে হবে না যে নিজের শরীরটাই খারাপ করে ফেলবেন।
আফিয়া একটু হেসে বলল,
— আপনি চিন্তা করছেন?
অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে কঠিন মুখ করলেন।
— আমি আমার ছাত্রীর ব্যাপারে দায়িত্বশীল।
— শুধু দায়িত্ব?
অর্ণব চুপ।
আফিয়া এবার চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে হঠাৎ মাথা ঘুরে গেল।
সে টলতে শুরু করতেই অর্ণব দ্রুত তার হাত ধরে ফেললেন।
— সাবধানে!
আফিয়া থমকে গেল।
অর্ণবের হাত তার কবজিতে।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।
অর্ণবের চোখে এবার রাগের চেয়ে চিন্তাই বেশি।
— আপনি ঠিক আছেন?
আফিয়া আস্তে বলল,
— এখন আছি।
অর্ণব হাত ছেড়ে দিলেন।
— বসুন।
— আমি ঠিক আছি।
— বসুন বলেছি।
আফিয়া আবার বসে পড়ল।
অর্ণব পাশের টেবিল থেকে পানির বোতল এনে তার দিকে এগিয়ে দিলেন।
— পানি খান।
আফিয়া বোতলটা নিল।
তারপর একটু দুষ্টুমি করে বলল,
— আপনি বাইরে থেকে যতই রাগী হন, ভেতরে কিন্তু ভালো মানুষ।
অর্ণব তাকালেন।
— বেশি কথা বলবেন না।
আফিয়া হেসে ফেলল।
— আবার রেগে গেলেন।
— আপনি আমাকে রাগান।
— ইচ্ছে করেই।
অর্ণব এবার সত্যিই বিরক্ত হলেন।
তিনি এক পা এগিয়ে এলেন।
— কেন?
আফিয়া একটু পিছিয়ে গেল।
— কারণ আপনি রেগে গেলে...
সে থেমে গেল।
— কী?
আফিয়া নিচু গলায় বলল,
— আপনাকে একটু বেশি সুন্দর লাগে।
অর্ণব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব ধীরে বললেন,
— আপনি একদিন সত্যিই আমাকে পাগল করে ছাড়বেন।
আফিয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে ভেবেছিল অর্ণব হয়তো আবার বকবেন।
কিন্তু অর্ণব শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— চলুন। আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিচ্ছি।
— দরকার নেই।
— আমি জিজ্ঞেস করিনি দরকার আছে কি না।
আফিয়া মুচকি হাসল।
— জি, ডাক্তার সাহেব।
সেদিন রাতে গাড়িতে দুজনের মধ্যে খুব বেশি কথা হয়নি।
আফিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
অর্ণব গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
কিছুক্ষণ পর আফিয়া বলল,
— আপনি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছেন?
অর্ণবের হাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে গেল।
— এসব প্রশ্ন কেন?
— জানতে ইচ্ছে করছে।
— আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে এত কৌতূহল কেন?
আফিয়া হেসে বলল,
— কারণ আপনি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্ণব কিছু বললেন না।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি আফিয়াদের বাড়ির সামনে থামল।
আফিয়া দরজা খুলে নামতে গিয়ে থেমে গেল।
— স্যার?
— হুম?
— আমি ডাক্তার হলে কিন্তু আবার বলব।
অর্ণব তার দিকে তাকালেন।
— কী বলবেন?
আফিয়া মুচকি হেসে বলল,
— যেটা সেদিন বলেছিলাম।
অর্ণবের মুখে খুব সামান্য হাসি ফুটল।
— আগে ডাক্তার হন।
আফিয়া নেমে গেল।
দরজা বন্ধ করার আগে বলল,
— হবই।
গাড়ি চলে গেল।
অর্ণব রিয়ারভিউ মিররে আফিয়াকে দেখলেন।
মেয়েটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর অর্ণব নিজেকেই প্রশ্ন করলেন,
“এই মেয়েটা কি সত্যিই একদিন আমার জীবনে জায়গা করে নেবে?”
তিনি উত্তর জানতেন না।
তবে একটা বিষয় তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন—
আফিয়াকে তিনি আর শুধু একজন ছাত্রী হিসেবে দেখছেন না।
এরপর বছর কেটে গেল।
আফিয়া কঠোর পরিশ্রম করল।
একটার পর একটা পরীক্ষা পেরিয়ে গেল।
ক্লাসের সবার মধ্যে তার নাম উঠে আসতে লাগল।
অর্ণব দূর থেকে সব দেখতেন।
কখনো প্রশংসা করতেন না।
কখনো উৎসাহও দিতেন না।
কিন্তু আফিয়া জানত—
তার প্রতিটা সাফল্য অর্ণব লক্ষ্য করেন।
একদিন মেডিকেল কলেজের শেষ পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো।
আফিয়া ভালো ফল করল।
সেদিন সন্ধ্যায় সে সরাসরি হাসপাতালে গেল।
অর্ণব তখন নিজের কেবিনে বসে রিপোর্ট দেখছিলেন।
দরজা খুলে আফিয়া ঢুকল।
অর্ণব মাথা তুলে তাকালেন।
— কী হয়েছে?
আফিয়া হাসতে হাসতে বলল,
— আমি পেরেছি।
অর্ণব বুঝতে পারলেন।
তিনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
— অভিনন্দন।
আফিয়ার চোখে পানি এসে গেল।
— তাহলে এখন?
অর্ণব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
— এখন আপনি আর আগের সেই ছাত্রী নন।
আফিয়ার বুক ধক করে উঠল।
— তাহলে?
অর্ণব ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এলেন।
দুজনের মধ্যে দূরত্ব খুব কমে গেল।
অর্ণব নিচু গলায় বললেন,
— এখন আপনার সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে।
আফিয়া নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল।
অর্ণব বললেন,
— আগামী শুক্রবার আপনার বাসায় আমার পরিবার যাবে।
আফিয়া কিছু বুঝতে পারল না।
— কেন?
অর্ণবের ঠোঁটে এবার স্পষ্ট হাসি ফুটল।
— যে মেয়েটা আমাকে বলেছিল, “ডাক্তার হয়ে আবার বলব”—তার কথাটা এবার আমারও শোনা উচিত।
আফিয়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে শুধু ফিসফিস করে বলল,
— আপনি... সত্যি?
অর্ণব মাথা নাড়লেন।
— হ্যাঁ।
তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন,
— এবার আর আপনাকে ফিরিয়ে দেব না।
অর্ণবের কথাটা শুনে আফিয়া কয়েক সেকেন্ড একদম চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মনে হচ্ছিল, এতদিনের অপেক্ষা, অভিমান, কষ্ট—সবকিছু যেন একসঙ্গে এসে বুকের ভেতর জমে গেছে।
সে খুব আস্তে বলল,
— আপনি সত্যিই আমাদের বাসায় যাবেন?
অর্ণব মৃদু হেসে বললেন,
— শুধু আমি না। আমার পরিবারও যাবে।
আফিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।
ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসিটা আর আটকাতে পারল না।
— কিন্তু আপনি তো সেদিন বলেছিলেন, আগে বড় হতে।
— বলেছিলাম।
— তাহলে আমি কি বড় হয়েছি?
অর্ণব একটু কাছে এসে দাঁড়ালেন।
— যথেষ্ট।
আফিয়া হেসে বলল,
— আর যদি আমি আবার বলি, আমি আপনাকে পছন্দ করি?
অর্ণবের চোখে এবার কোমলতা।
— তাহলে এবার আমি বলব, আমিও আপনাকে পছন্দ করি।
আফিয়া চোখ তুলে তাকাল।
— এতদিন পর?
— কিছু অনুভূতি বলতে সময় লাগে।
— কত বছর?
অর্ণব একটু ভেবে বললেন,
— যেদিন প্রথম আপনাকে ওয়ার্ডে দাঁড়িয়ে অকারণে হাসতে দেখেছিলাম, সেদিন থেকেই হয়তো।
আফিয়া অবাক হয়ে গেল।
— তাহলে আপনি এতদিন আমাকে বকেছেন কেন?
— কারণ আপনি অসহ্য রকম দুষ্টু ছিলেন।
— এখন?
— এখনো আছেন।
আফিয়া হেসে ফেলল।
— তাহলে বিয়ে করলে আমাকে বকবেন?
অর্ণব একটু ঝুঁকে বললেন,
— প্রয়োজন হলে।
— আর আমি যদি আপনার সঙ্গে দুষ্টুমি করি?
— তখন আরও বেশি।
— আর যদি ইচ্ছে করে আপনাকে রাগাই?
অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— সেটা করার অধিকার আপনার আছে।
আফিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
এত বছর ধরে যে মানুষটাকে সে দূর থেকে ভালোবেসেছে, সেই মানুষটাই আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অনুভূতি স্বীকার করছে।
শুক্রবার বিকেলে আফিয়াদের বাসায় আত্মীয়স্বজনের ভিড়।
আফিয়ার মা সকাল থেকেই ব্যস্ত।
বাবা বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন।
আর আফিয়া নিজের ঘরে বসে আয়নার সামনে চুপচাপ।
মেহরিন পাশে বসে বলল,
— তুই এত চুপ কেন?
আফিয়া ফিসফিস করে বলল,
— ভয় লাগছে।
— কীসের?
— যদি কিছু ভুল হয়?
— আরে পাগলি, অর্ণব তো নিজেই আসছে!
আফিয়া মৃদু হেসে বলল,
— জানি।
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
আফিয়ার বুক ধক করে উঠল।
মেহরিন জানালার পর্দা সরিয়ে বলল,
— এসেছে!
আফিয়া সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
— কেমন লাগছে আমাকে?
মেহরিন হেসে বলল,
— আজকে তোকে দেখে মনে হচ্ছে তুই ডাক্তার না, বউ!
আফিয়া লজ্জায় বলল,
— চুপ কর।
কিছুক্ষণ পর বসার ঘর থেকে কথাবার্তার শব্দ আসতে লাগল।
অর্ণবের বাবা-মা, পরিবারের আরও কয়েকজন এসেছেন।
আফিয়ার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছে।
সবকিছু খুব স্বাভাবিকভাবেই এগোচ্ছিল।
একসময় আফিয়ার মা তাকে ডাকলেন।
— মা, এখানে আয়।
আফিয়া ধীরে ধীরে বসার ঘরে ঢুকল।
অর্ণব তখন সোফায় বসে ছিল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
অর্ণবের চোখে মৃদু হাসি।
আফিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।
অর্ণবের মা তাকে কাছে ডেকে বললেন,
— মা, তুমি তো অর্ণবকে আগে থেকেই চেনো?
আফিয়া লজ্জায় মাথা নেড়ে বলল,
— জি।
— ওর স্বভাব তো জানোই। একটু রাগী।
আফিয়া মুচকি হেসে বলল,
— জানি।
অর্ণব পাশ থেকে বলল,
— মা, এত কিছু বলার দরকার নেই।
সবাই হেসে উঠল।
আফিয়ার বাবা বললেন,
— আপনাদের কোনো আপত্তি না থাকলে আমরাও রাজি।
অর্ণবের বাবা বললেন,
— আমাদেরও কোনো আপত্তি নেই।
তারপর অর্ণবের মা আফিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তাহলে বিয়ের ব্যাপারে এগোনো যাক?
আফিয়া চুপ করে থাকল।
তার বাবা বললেন,
— আফিয়া, তোমার মত কী?
আফিয়া একবার অর্ণবের দিকে তাকাল।
অর্ণবও তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
চোখে যেন একটা নিশ্চয়তা।
আফিয়া আস্তে বলল,
— আমার কোনো আপত্তি নেই।
বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল।
আফিয়া যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না—যে মানুষটাকে একদিন দূর থেকে দেখে বুক ধড়ফড় করত, সেই মানুষটাই এখন তার husband হতে চলেছে।
বিয়ের আগের রাতে অর্ণব ফোন করল।
আফিয়া ফোন হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রিসিভ করল।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে অর্ণবের গম্ভীর কণ্ঠ,
— ঘুমাননি?
— না।
— কাল অনেক কাজ।
— জানি।
— নার্ভাস?
আফিয়া হেসে বলল,
— একটু।
— ভয় পাচ্ছেন?
— না।
— তাহলে?
— ভাবছি, কাল থেকে আপনাকে স্যার ডাকব কীভাবে?
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর অর্ণব হেসে ফেললেন।
আফিয়া অবাক।
— আপনি হাসলেন?
— হ্যাঁ।
— আবার হাসুন।
— এত আবদার কেন?
— কারণ আপনার হাসিটা আমার ভালো লাগে।
অর্ণব একটু চুপ করে বললেন,
— কাল থেকে আমাকে শুধু অর্ণব বলবেন।
আফিয়া মৃদু স্বরে বলল,
— অর্ণব...
শব্দটা মুখে উচ্চারণ করতেই তার গাল লাল হয়ে গেল।
অর্ণবও কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর বললেন,
— ভালো লাগছে শুনতে।
আফিয়া হেসে বলল,
— আমারও।
পরদিন বিয়ে হয়ে গেল।
সাদামাটা কিন্তু সুন্দর আয়োজন।
চারপাশে আলো, আত্মীয়দের ভিড়, হাসি-আনন্দ।
কাজী সাহেব যখন অর্ণবকে প্রশ্ন করলেন,
— কবুল?
অর্ণব দৃঢ় গলায় বললেন,
— কবুল।
তারপর আফিয়ার পালা।
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
— কবুল।
একটা শব্দেই যেন তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ হলো।
বিয়ের পরের দিনগুলো আশ্চর্য সুন্দর ছিল।
অর্ণব আগের মতোই রাগী।
কিন্তু আফিয়ার সঙ্গে তার আচরণ বদলে গিয়েছিল।
সকালে আফিয়া ঘুম থেকে উঠতে দেরি করলে অর্ণব বলতেন,
— ডাক্তার সাহেবা, হাসপাতাল যেতে হবে।
আফিয়া বালিশে মুখ লুকিয়ে বলত,
— আজ যাব না।
— কেন?
— আপনার পাশে থাকতে ইচ্ছে করছে।
অর্ণব ভ্রু কুঁচকে বলতেন,
— এসব বলে দায়িত্ব এড়ানো যাবে না।
আফিয়া উঠে বসে বলত,
— তাহলে আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন।
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন।
— আপনি সত্যিই খুব ঝামেলার মানুষ।
আফিয়া হেসে বলত,
— তবুও বিয়ে করেছেন।
অর্ণব তখন কিছু না বলে তার কপালে হাত রেখে বলতেন,
— সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
এভাবেই দিন কাটছিল।
দুজনেই নিজেদের পেশায় ব্যস্ত, কিন্তু দিনের শেষে যতটা সম্ভব সময় একসঙ্গে কাটানোর চেষ্টা করত।
কখনো ছাদে বসে চা।
কখনো রাতের শহরে গাড়ি নিয়ে বের হওয়া।
কখনো একই সোফায় বসে দুজনের আলাদা বই পড়া।
তাদের সংসারে বড় কোনো চাওয়া ছিল না।
শুধু একে অপরকে পাশে পাওয়া।
বিয়ের প্রায় দুই বছর পর।
একদিন আফিয়া চুপচাপ বসে ছিল।
অর্ণব হাসপাতাল থেকে ফিরে তার পাশে বসে বললেন,
— কী হয়েছে?
— কিছু না।
— মিথ্যা বলছেন।
আফিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আমাদের কি একটা বাচ্চা হবে না?
অর্ণব থেমে গেলেন।
প্রশ্নটা সহজ হলেও উত্তরটা কঠিন।
অনেকদিন ধরে তারা চেষ্টা করছিল।
কিন্তু কোনো সুখবর আসছিল না।
অর্ণব আফিয়ার হাতটা নিজের হাতে নিলেন।
— হবে।
আফিয়া চোখে পানি নিয়ে তাকাল।
— যদি না হয়?
— তাহলে আমরা দুজন থাকব।
— কিন্তু...
— আফিয়া।
অর্ণব তার হাত শক্ত করে ধরলেন।
— তোমাকে নিয়ে আমার সংসার অসম্পূর্ণ না।
আফিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ে গেল।
সে মাথা রাখল অর্ণবের কাঁধে।
অর্ণব তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
— আমরা একসঙ্গে আছি। এটাই সবচেয়ে বড় কথা।
সেদিন তারা বুঝতে পারেনি—
সময় তাদের সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কারণ ভালোবাসা শুধু একসঙ্গে থাকার নাম নয়।
কখনো কখনো ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সময়, যত্ন আর একে অপরকে ধরে রাখার ইচ্ছাটাও প্রয়োজন হয়।
আর তাদের জীবনে খুব শিগগিরই সেই সময়টাই কমে আসতে শুরু করবে।
বিয়ের পর প্রথম দুটো বছর যেন চোখের পলকেই কেটে গিয়েছিল।
অর্ণব আর আফিয়ার সংসারে বড় কোনো বিলাসিতা ছিল না, কিন্তু ছোট ছোট আনন্দে ভরা ছিল প্রতিটা দিন।
সকালে বের হওয়ার আগে আফিয়া অর্ণবের টাই ঠিক করে দিত।
অর্ণব আয়নার দিকে তাকিয়ে বলত,
— ঠিক হয়েছে?
আফিয়া মুচকি হেসে বলত,
— না।
— কী ভুল?
— আপনি এত সুন্দর কেন?
অর্ণব বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলত,
— সকাল সকাল এসব শুরু করবেন না।
আফিয়া হেসে বলত,
— আপনি রাগ করলে আরও ভালো লাগে।
অর্ণব তখন তার কপালে হালকা টোকা দিয়ে বলত,
— অসহ্য।
আফিয়া হাসত।
তারপর দুজন নিজেদের কাজে বেরিয়ে যেত।
কিন্তু ধীরে ধীরে সবকিছু বদলাতে শুরু করল।
অর্ণবের রোগী বাড়তে লাগল।
হাসপাতালের পাশাপাশি তাকে বিভিন্ন জরুরি অপারেশনে থাকতে হতো। কখনো রাত পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতে হতো, কখনো গভীর রাতে ফোন আসত।
অন্যদিকে আফিয়াও নিজের ক্যারিয়ারে এগোতে শুরু করেছিল।
সে এখন আর শুধু অর্ণবের ছাত্রী নয়।
নিজের পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
নিজের রোগী আছে।
নিজের দায়িত্ব আছে।
প্রথমদিকে দুজনই ব্যস্ততার মাঝেও সময় বের করত।
কিন্তু একসময় সেই সময়টুকুও কমে গেল।
এক সন্ধ্যায় আফিয়া রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে অর্ণবের প্রিয় খাবার রান্না করছিল।
ঘড়িতে রাত আটটা।
নয়টা।
সাড়ে নয়টা।
অর্ণবের কোনো খবর নেই।
আফিয়া ফোন করল।
একবার।
দুবার।
তৃতীয়বারে অর্ণব ফোন ধরল।
— হ্যালো?
ওপাশে হাসপাতালের শব্দ।
আফিয়া বলল,
— কখন আসবে?
— জানি না। একটা ইমার্জেন্সি কেস এসেছে।
— আজও?
অর্ণব একটু থেমে বলল,
— আফিয়া, আমি এখন ব্যস্ত। পরে কথা বলি।
কল কেটে গেল।
আফিয়া কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর টেবিলের দিকে তাকাল।
দুজনের জন্য সাজানো খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
সে ধীরে ধীরে একটা প্লেট তুলে রাখল।
নিজের প্লেটটাও।
সেদিন একাই খেয়ে নিল।
রাত প্রায় একটা।
দরজা খোলার শব্দে আফিয়ার ঘুম ভেঙে গেল।
অর্ণব ক্লান্ত শরীরে ঘরে ঢুকল।
আফিয়া বিছানায় উঠে বসল।
— খেয়েছ?
— না।
— খাবার রেখেছি।
— খুব ক্লান্ত লাগছে।
— তাহলে আগে খেয়ে নাও।
অর্ণব জামা বদলে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল।
আফিয়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— অর্ণব?
— হুম?
— আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে?
— কাল বলি?
আফিয়া চুপ হয়ে গেল।
অর্ণব কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
আফিয়া তার দিকে তাকিয়ে রইল।
একসময় খুব আস্তে বলল,
— কালটা কখন আসবে?
অর্ণব শুনল না।
পরদিন সকালেও অর্ণব খুব তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেল।
আফিয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
— আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবে?
অর্ণব জুতা পরতে পরতে বলল,
— চেষ্টা করব।
— চেষ্টা না। ফিরবে।
অর্ণব তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— ঠিক আছে।
কিন্তু সেই “ঠিক আছে” আর বাস্তব হলো না।
রাত দশটা।
অর্ণব ফিরল না।
আফিয়া বারবার ঘড়ির দিকে তাকাল।
তারপর সোফায় বসে টেলিভিশন চালু করল।
কিন্তু কোনো কিছুতেই মন বসছিল না।
হঠাৎ তার মনে পড়ল, বিয়ের পর প্রথম জন্মদিনে অর্ণব তাকে বলেছিল,
“আমি যত ব্যস্তই থাকি, তোমার জন্য সময় বের করব।”
কথাটা মনে পড়তেই আফিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল।
সে বুঝতে পারল—
মানুষ বদলায় না সবসময়।
পরিস্থিতি মানুষকে বদলে দেয়।
কয়েকদিন পর আফিয়া অর্ণবকে বলল,
— আমাদের কোথাও ঘুরতে যাওয়া উচিত।
অর্ণব ল্যাপটপে রিপোর্ট দেখছিল।
— কোথায়?
— যেকোনো জায়গায়।
— এখন সম্ভব না।
— কেন?
— কাজ আছে।
আফিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— কাজ তো সবসময়ই থাকবে।
অর্ণব এবার ল্যাপটপ বন্ধ করল।
— তুমি বুঝতে চেষ্টা করো। আমার ওপর অনেক দায়িত্ব।
আফিয়া শান্ত গলায় বলল,
— আমি কি দায়িত্ব না?
অর্ণব থেমে গেল।
— এমন কথা বলো না।
— তাহলে কী বলব?
— আমি তোমাকে অবহেলা করছি না।
— কিন্তু আমার তো সেটাই মনে হয়।
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আফিয়া, আমি এই কাজটা শুধু নিজের জন্য করি না।
— জানি।
— তাহলে?
— কিছু না।
আফিয়া উঠে চলে গেল।
অর্ণব কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
সে বুঝতে পারছিল, আফিয়া কষ্ট পেয়েছে।
কিন্তু পরক্ষণেই ফোন বেজে উঠল।
হাসপাতাল থেকে জরুরি কল।
অর্ণব আবার কাজে বেরিয়ে গেল।
এভাবেই মাস কেটে গেল।
তাদের মধ্যে ঝগড়া বাড়েনি।
বরং ঝগড়াই কমে গেল।
কারণ কথা বলার সময়ই কমে গেল।
আগে আফিয়া রাগ করলে অর্ণব তাকে শান্ত করত।
এখন আফিয়া রাগ করলে অর্ণব সেটা দেখতেই পায় না।
আগে অর্ণব ক্লান্ত হয়ে ফিরলে আফিয়া তার পাশে বসে চা দিত।
এখন অর্ণব অনেক রাত করে ফিরে দেখে আফিয়া ঘুমিয়ে গেছে।
আগে তারা একই বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ গল্প করত।
এখন দুজনেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
একই ঘরে থেকেও যেন তাদের মধ্যে অদৃশ্য একটা দেয়াল তৈরি হচ্ছিল।
এক রাতে আফিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
অর্ণব পেছন থেকে এসে বলল,
— ঘুমাওনি?
আফিয়া ঘুরল না।
— না।
— কী হয়েছে?
— কিছু না।
অর্ণব তার পাশে এসে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর আফিয়া বলল,
— তুমি কি আমাকে আগের মতো ভালোবাসো?
অর্ণব চমকে তাকাল।
— এ প্রশ্ন কেন?
— কারণ আমি তোমাকে আগের মতো পাই না।
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আমি তো বদলাইনি।
আফিয়া এবার তার দিকে তাকাল।
— মানুষটা বদলায়নি। কিন্তু সময়টা বদলে গেছে।
অর্ণব চুপ।
আফিয়া বলল,
— জানো, কখনো কখনো মনে হয় আমি তোমার wife না। তোমার schedule-এর একটা ফাঁকা ঘর।
অর্ণবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
— এমন কথা বলো না।
— তাহলে আমাকে সময় দাও।
— আমি চেষ্টা করছি।
— আমি চেষ্টা দেখতে চাই না। তোমাকে চাই।
কথাটা শুনে অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে আফিয়ার হাত ধরল।
— আমি সব ঠিক করে দেব।
আফিয়া তার দিকে তাকাল।
— কবে?
অর্ণব উত্তর দিতে পারল না।
কয়েকদিন পর আফিয়া একটা পরিকল্পনা করল।
সে ভাবল, হয়তো একটু বাইরে গেলে সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে।
একসঙ্গে সময় কাটালে তাদের দূরত্বটা কমবে।
সেই রাতে অর্ণব বাসায় ফিরতেই আফিয়া বলল,
— অর্ণব?
— হুম?
— এই শুক্রবার কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে ঘুরতে যাবে।
অর্ণব ক্লান্তভাবে জিজ্ঞেস করল,
— কোথায়?
আফিয়া মুচকি হাসল।
— সেটা সারপ্রাইজ।
— শুক্রবার?
— হ্যাঁ।
— ঠিক আছে।
আফিয়া আনন্দে বলল,
— কথা দিলা?
অর্ণব তার কপালে হাত রেখে বলল,
— কথা দিলাম।
আফিয়ার মুখে অনেকদিন পর সেই পুরোনো হাসিটা ফুটে উঠল।
সে মনে মনে ঠিক করে ফেলল—
শুক্রবার সে সুন্দর করে সাজবে।
অর্ণবের জন্য তার প্রিয় খাবার বানাবে।
তারপর দুজন অনেকক্ষণ কোথাও বসে থাকবে।
কোনো ফোন থাকবে না।
কোনো হাসপাতাল থাকবে না।
কোনো রোগী থাকবে না।
শুধু তারা দুজন।
কিন্তু আফিয়া জানত না—
এই ছোট্ট পরিকল্পনাটাই তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার শুরু হতে চলেছে।
কারণ শুক্রবার আসার আগেই অর্ণবের জীবনে এমন একটা জরুরি দায়িত্ব এসে দাঁড়াবে, যা আফিয়ার অপেক্ষাকে আরও দীর্ঘ করে দেবে।
শুক্রবার সকাল থেকেই আফিয়ার মনটা ভালো ছিল।
ঘুম থেকে উঠেই তার মনে হয়েছিল, আজকের দিনটা অন্যরকম হবে।
অনেকদিন পর অর্ণবকে সে শুধু নিজের জন্য চাইছে।
হাসপাতালের অর্ণব নয়।
রোগীদের ডাক্তার অর্ণব নয়।
সবার সমস্যার সমাধান করা সেই কঠোর মানুষটাও নয়।
আজ শুধু তার husband অর্ণব।
সকালে নাশতা বানাতে বানাতে আফিয়া বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।
অর্ণব টেবিলে বসে কফি খাচ্ছিল।
আফিয়া সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
— আজ কিন্তু ভুলে যেও না।
অর্ণব ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কী?
আফিয়া অবাক হয়ে গেল।
— কী আবার! আজ আমরা ঘুরতে যাব।
অর্ণব কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হেসে ফেলল।
— ভুলিনি।
আফিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
— আমি ভেবেছিলাম আবার কোনো ইমার্জেন্সি বলে...
— আজ চেষ্টা করব কোনো কিছু যেন বাধা না হয়।
আফিয়া মুচকি হেসে বলল,
— চেষ্টা না। আজ তোমাকে আমার চাই।
অর্ণব কাপটা নামিয়ে তার দিকে তাকাল।
— ঠিক আছে। আজ আমি শুধু তোমার।
আফিয়া হেসে ফেলল।
তারপর হঠাৎ অর্ণবের টাইটা ঠিক করতে করতে বলল,
— জানো, তুমি যখন এভাবে কথা বলো তখন তোমাকে একদম রাগী ডাক্তার মনে হয় না।
— আমি কি সবসময় রাগী?
— হ্যাঁ।
— এত বছর ধরে আমার সঙ্গে থেকেও এই ধারণা?
— হুম।
অর্ণব হেসে তার হাতটা ধরে বলল,
— তাহলে আজকের দিনটা ভালোভাবে কাটাই।
আফিয়া মাথা নাড়ল।
তার চোখে তখন অনেক দিনের জমে থাকা আনন্দ।
দুপুরের পর থেকেই আফিয়া প্রস্তুতি নিতে শুরু করল।
আলমারি খুলে অনেকক্ষণ পর একটা পোশাক বের করল।
অর্ণব একবার বলেছিল, এই রঙটা তার ওপর ভালো লাগে।
সেই কথা মনে রেখেই পোশাকটা পরল আফিয়া।
চুল ঠিক করল।
হালকা সাজল।
তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে মুচকি হাসল।
মনে হলো, বিয়ের প্রথম দিকের সেই আফিয়াটা যেন আবার ফিরে এসেছে।
সন্ধ্যা ছয়টা।
অর্ণব বলেছিল সাতটার মধ্যে ফিরবে।
আফিয়া রান্নাঘরে গিয়ে অর্ণবের পছন্দের খাবার তৈরি করল।
সাতটা বাজল।
অর্ণব এল না।
সাড়ে সাতটা।
তবুও না।
আটটা বাজতেই আফিয়া ফোন করল।
ফোন বেজে কেটে গেল।
আবার করল।
এবার ফোন বন্ধ।
আফিয়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে নিজেকে বোঝাল,
“হয়তো কোনো রোগী এসেছে।”
আরও আধঘণ্টা অপেক্ষা করল।
অর্ণবের কোনো খবর নেই।
নয়টা বাজল।
টেবিলে সাজানো খাবার ঠান্ডা হয়ে গেল।
আফিয়া জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
রাস্তায় একের পর এক গাড়ি যাচ্ছে।
প্রতিটা গাড়ির শব্দে তার মনে হচ্ছিল—
অর্ণব এসেছে।
কিন্তু প্রতিবারই ভুল।
রাত সাড়ে নয়টার দিকে ফোন বেজে উঠল।
অর্ণব।
আফিয়া তাড়াতাড়ি ফোন ধরল।
— কোথায় তুমি?
ওপাশ থেকে অর্ণবের ক্লান্ত কণ্ঠ,
— হাসপাতালে।
আফিয়া চোখ বন্ধ করল।
— আজও?
— একটা জটিল কেস এসেছে। অপারেশন করতে হচ্ছে।
— কিন্তু তুমি তো কথা দিয়েছিলে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
অর্ণব বলল,
— জানি।
— তুমি কখন আসবে?
— বলতে পারছি না।
আফিয়ার গলা কেঁপে উঠল।
— আমি তোমার জন্য এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি।
— আফিয়া, প্লিজ বুঝতে চেষ্টা করো।
— আমি সবসময় বুঝি।
— তাহলে...
— কিন্তু তুমি কি কখনো আমাকে বোঝার চেষ্টা করেছ?
অর্ণব চুপ করে গেল।
আফিয়া চোখের পানি মুছে বলল,
— আজ আমি তোমার জন্য সাজলাম। তোমার পছন্দের খাবার রান্না করলাম। কতদিন পর একটা দিন শুধু তোমার সঙ্গে কাটাব বলে অপেক্ষা করলাম।
তার গলা ভারী হয়ে এল।
— আর তুমি আমাকে আবার অপেক্ষা করালে।
অর্ণব খুব আস্তে বলল,
— আমি সত্যিই দুঃখিত।
আফিয়া তিক্ত হেসে বলল,
— তোমার দুঃখিত কথাটাও এখন খুব পরিচিত।
তারপর ফোন কেটে দিল।
রাত বাড়তে লাগল।
দশটা।
এগারোটা।
বারোটা।
আফিয়া এখনও পোশাক বদলায়নি।
চোখের কাজল ছড়িয়ে গেছে।
চুল এলোমেলো।
টেবিলে রাখা খাবারের দিকে আর তাকাতেও পারছে না।
অবশেষে রাত একটা নাগাদ সে ধীরে ধীরে সব খাবার ফ্রিজে তুলে রাখল।
তারপর আয়নার সামনে দাঁড়াল।
নিজেকে দেখে তার চোখে পানি চলে এল।
সে খুব আস্তে বলল,
— এতটা সময় কি সত্যিই আমার প্রাপ্য ছিল না?
রাত প্রায় আড়াইটায় দরজা খুলল।
অর্ণব ঢুকল।
তার মুখে ক্লান্তি।
চোখে ঘুম নেই।
আফিয়া তখন সোফায় বসে ছিল।
অর্ণব তাকে দেখে থেমে গেল।
— তুমি এখনো জেগে?
আফিয়া শান্তভাবে বলল,
— হ্যাঁ।
অর্ণব তার কাছে এসে দাঁড়াল।
— আমি সত্যিই দুঃখিত।
আফিয়া তার দিকে তাকাল।
— আজ আর দুঃখিত বলো না।
— তাহলে?
— কিছু না।
অর্ণব তার পোশাকের দিকে তাকাল।
তারপর বুঝতে পারল—
সে এখনও বের হওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বসে আছে।
অর্ণবের মুখটা মলিন হয়ে গেল।
— তুমি এতক্ষণ এভাবেই ছিলে?
আফিয়া উত্তর দিল না।
অর্ণব ধীরে ধীরে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
— আফিয়া...
আফিয়া চোখ সরিয়ে নিল।
— আজকে আমার খুব কষ্ট হয়েছে।
— জানি।
— না। তুমি জানো না।
অর্ণব চুপ।
আফিয়া বলল,
— তুমি জানো একজন মানুষ অপেক্ষা করলে কেমন লাগে?
অর্ণব তার হাত ধরতে চাইল।
আফিয়া হাত সরিয়ে নিল।
অর্ণব থেমে গেল।
— আমি তোমাকে কখনো ইচ্ছা করে কষ্ট দিতে চাইনি।
আফিয়া বলল,
— কিন্তু কষ্ট তো হয়েছে।
অর্ণব মাথা নিচু করল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
— আমি তোমাকে ভালোবাসি।
আফিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
— ভালোবাসা শুধু বললে হয়?
অর্ণব কোনো উত্তর দিতে পারল না।
পরদিন সকালে আফিয়া ঘুম থেকে উঠে দেখল, অর্ণব তার পাশে নেই।
বিছানার ওপর একটা ছোট্ট কাগজ।
“আজ সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি ফিরব। তোমাকে সময় দেব।”
আফিয়া কাগজটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর ভাঁজ করে রেখে দিল।
কিন্তু সেই সন্ধ্যাতেও অর্ণব ফিরল না।
পরদিনও না।
তারপর আরও একদিন।
অর্ণবের কাজ বাড়তেই থাকল।
আফিয়াও নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
তাদের কথাবার্তা এখন প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
“খেয়েছ?”
“হ্যাঁ।”
“কখন ফিরবে?”
“জানি না।”
“ওষুধটা নিয়েছ?”
“হ্যাঁ।”
এর বাইরে আর কিছু নেই।
একসময় আফিয়া বুঝতে পারল—
তাদের সংসারে ঝগড়া নেই।
কারণ ঝগড়া করার মতো ঘনিষ্ঠতাটুকুও যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
এক রাতে অর্ণব বাসায় ফিরল প্রায় বারোটায়।
আফিয়া তখন ডাইনিং টেবিলে বসে কাজ করছিল।
অর্ণব বলল,
— এত রাতে কাজ করছ?
— হুম।
— ঘুমাওনি?
— কাজ শেষ হয়নি।
অর্ণব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
— আফিয়া, আমরা কি একটু কথা বলতে পারি?
আফিয়া ল্যাপটপ বন্ধ করল।
— বলো।
অর্ণব চেয়ার টেনে বসে বলল,
— আমাদের মধ্যে কী হচ্ছে?
আফিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— তুমি জানো না?
— জানতে চাই তোমার কাছ থেকে।
আফিয়া গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
— আমরা দুজনেই ব্যস্ত।
— শুধু এতটুকু?
— আর কী বলব?
— তুমি আগের মতো নেই।
আফিয়া হেসে ফেলল।
— আমিও তোমাকে একই কথা বলতে পারি।
অর্ণব চুপ করে গেল।
আফিয়া বলল,
— জানো, একটা সময় ছিল যখন তুমি আমার হাসি দেখে বুঝতে পারতে আমি খুশি না দুঃখী।
তার চোখে পানি জমল।
— এখন আমি সারাদিন তোমার সামনে থাকলেও তুমি বুঝতে পারো না আমি কেমন আছি।
অর্ণব মাথা নিচু করল।
— আমি ঠিক করার চেষ্টা করব।
আফিয়া বলল,
— আমরা দুজনেই অনেকবার এই কথাটা বলেছি।
এরপর আরও কিছুদিন কেটে গেল।
তাদের মধ্যে দূরত্বটা যেন ধীরে ধীরে স্থায়ী হয়ে গেল।
একদিন রাতে আফিয়া একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
অর্ণব ঘুমিয়ে।
আফিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”
তারপর চোখের পানি মুছে ফেলল।
“কিন্তু এভাবে তোমাকে পেয়েও তো আমি তোমাকে পাচ্ছি না।”
সেই রাতেই আফিয়া সিদ্ধান্ত নিল—
আর চুপ করে থাকবে না।
সে শেষবারের মতো অর্ণবকে একটা সুযোগ দেবে।
পরদিন সকালে অর্ণব বের হওয়ার আগে আফিয়া বলল,
— আজ রাতে তোমার সঙ্গে আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।
অর্ণব থেমে তাকাল।
— কী কথা?
আফিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,
— রাতে বলব।
অর্ণব কিছু বুঝতে না পেরে চলে গেল।
আর আফিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখল।
তার চোখে তখন ভয়।
কারণ সে জানত না—
এই কথোপকথন তাদের সংসারকে আবার জোড়া লাগাবে, নাকি আরও দূরে ঠেলে দেবে।
সেদিন সারাদিন আফিয়ার মনটা অস্থির ছিল।
সকালে অর্ণবকে যে কথাটা বলেছিল, সেটাই বারবার মনে পড়ছিল।
“আজ রাতে তোমার সঙ্গে আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
অর্ণবও হয়তো বিষয়টা নিয়ে ভাবছিল। দুপুরে একবার ফোন করেছিল।
— কী কথা বলবে রাতে?
আফিয়া তখন হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল।
— রাতে বলব।
— এখন বললে হয় না?
— না।
— খুব সিরিয়াস কিছু?
আফিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বলেছিল,
— আমাদের জন্য সিরিয়াস।
ওপাশে অর্ণবের দীর্ঘশ্বাস শোনা গিয়েছিল।
— ঠিক আছে। আজ একটু তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করব।
আফিয়া মৃদু হেসেছিল।
“চেষ্টা করব”—এই কথাটা এখন তার কাছে কতটা পরিচিত!
তবুও আজ সে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল।
আজ হয়তো অর্ণব সত্যিই ফিরবে।
আজ হয়তো তারা বসে কথা বলবে।
আজ হয়তো আবার সেই পুরোনো অর্ণবকে ফিরে পাবে সে।
সন্ধ্যার পর আফিয়া বাসায় ফিরল।
ঘরটা গোছাল।
অর্ণবের পছন্দের চা বানাল।
ডাইনিং টেবিলে দুটো কাপ রাখল।
তারপর নিজের ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে বসে রইল।
সাতটা বাজল।
অর্ণব এল না।
আটটা বাজল।
না।
সাড়ে আটটায় ফোন করল আফিয়া।
ফোন বন্ধ।
তার বুকটা ধক করে উঠল।
“হয়তো অপারেশন শুরু হয়েছে।”
নিজেকে বোঝাল সে।
নয়টা।
সাড়ে নয়টা।
দশটা।
অর্ণবের কোনো খবর নেই।
আফিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
টেবিলের ওপর রাখা চায়ের কাপ দুটো সরিয়ে ফেলল।
তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
চোখের সামনে হঠাৎ তাদের বিয়ের প্রথম দিকের দিনগুলো ভেসে উঠল।
অর্ণবের সঙ্গে রাতের শহরে গাড়ি নিয়ে বের হওয়া।
রাস্তায় থেমে ফুচকা খাওয়া।
অর্ণবের বিরক্ত মুখে আফিয়ার দুষ্টুমি।
তারপর অর্ণবের সেই কথাটা—
“আপনি সত্যিই খুব ঝামেলার মানুষ।”
আর আফিয়ার উত্তর—
“তবুও বিয়ে করেছেন।”
স্মৃতিগুলো মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
কত সহজ ছিল তখন সবকিছু!
তাদের কাছে টাকা-পয়সা, বড় বাড়ি, নাম-যশ—কিছুই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
শুধু একে অপরের পাশে থাকা।
কখন যে সেই “পাশে থাকা”টাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে গেল, আফিয়া বুঝতেই পারেনি।
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা।
অবশেষে দরজা খুলল।
অর্ণব ঢুকল।
চেহারায় ক্লান্তি।
হাতে হাসপাতালের ব্যাগ।
আফিয়া তখনও বসার ঘরে বসে ছিল।
অর্ণব তাকে দেখে থেমে গেল।
— তুমি এখনো জেগে?
আফিয়া শান্ত গলায় বলল,
— তোমার সঙ্গে কথা বলব বলেছিলাম।
অর্ণব ঘড়ির দিকে তাকাল।
— আজ খুব খারাপ একটা দিন গেছে।
— জানি।
— একটা রোগীর অবস্থা খুব খারাপ ছিল।
— জানি।
— অপারেশন শেষ করতেই অনেক দেরি হয়ে গেল।
আফিয়া কিছু বলল না।
অর্ণব ব্যাগটা নামিয়ে সোফায় বসল।
— বলো, কী কথা?
আফিয়া তার সামনে এসে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আমরা কি ভালো আছি?
অর্ণব ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কী বলতে চাইছ?
— আমরা কি সত্যিই husband-wife-এর মতো আছি?
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আবার এসব?
— হ্যাঁ, আবার এসব।
— আফিয়া, আমি সারাদিন কাজ করি। বাড়ি ফিরে যদি এসব নিয়ে ঝামেলা করতে হয়...
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আফিয়া বলল,
— আমি ঝামেলা করছি?
অর্ণব চুপ হয়ে গেল।
আফিয়ার চোখে পানি।
— আমি শুধু তোমাকে একটু সময় চাইছি।
— আমি তো চেষ্টা করছি।
— তোমার চেষ্টা কোথায়?
অর্ণব এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— তাহলে কী করব বলো?
আফিয়া কাঁপা গলায় বলল,
— আমাকে তোমার জীবনের একটা অংশ বানাও। শুধু এমন একজন মানুষ না, যে রাতে ঘরে ফিরে তোমার অপেক্ষা করে।
অর্ণব মাথা নিচু করল।
আফিয়া বলল,
— আমি তোমাকে ভালোবাসি, অর্ণব। খুব ভালোবাসি।
তার গলা ভেঙে গেল।
— কিন্তু প্রতিদিন তোমার পাশে থেকেও যদি একা থাকতে হয়, তাহলে এই সম্পর্কের মানে কী?
অর্ণব এবার তার দিকে তাকাল।
চোখে কষ্ট।
— তুমি কি বলতে চাইছ, আমরা আলাদা হয়ে যাই?
আফিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— আমি সেটা চাই না।
অর্ণবের চোখ নরম হলো।
— তাহলে?
— আমি চাই তুমি আমাকে বেছে নাও।
অর্ণবের মুখে অসহায়তা।
— আমি তো তোমাকেই বেছে নিয়েছি।
আফিয়া মাথা নাড়ল।
— বিয়ের দিন বেছে নিয়েছিলে। এখন প্রতিদিন বেছে নিতে হয়।
কথাটা শুনে অর্ণব চুপ হয়ে গেল।
অনেকক্ষণ।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে এসে আফিয়ার সামনে দাঁড়াল।
— আমি জানতাম না তুমি এতটা একা হয়ে গেছ।
আফিয়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
— কারণ তুমি জানতে চাওনি।
অর্ণব হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরল।
এবার আফিয়া হাত সরিয়ে নিল না।
অর্ণব খুব নিচু গলায় বলল,
— আমি ঠিক করব।
আফিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— শেষবারের মতো?
অর্ণব মাথা নেড়ে বলল,
— শেষবারের মতো।
পরের কয়েকদিন অর্ণব সত্যিই চেষ্টা করল।
একদিন সময়মতো বাসায় ফিরল।
আরেকদিন আফিয়াকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে গেল।
এক রাতে দুজন বারান্দায় বসে অনেকক্ষণ কথা বলল।
আফিয়া মনে মনে ভাবল—
হয়তো সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
হয়তো তাদের সংসারটা আবার আগের মতো হবে।
কিন্তু হাসপাতালের কাজ থেমে থাকে না।
কয়েকদিন পর অর্ণবের ওপর আরও বড় দায়িত্ব এসে পড়ল।
একসঙ্গে কয়েকজন জটিল রোগী।
জরুরি অপারেশন।
হাসপাতালের প্রশাসনিক কাজ।
অর্ণব আবার আগের মতো ব্যস্ত হয়ে গেল।
প্রথমদিকে আফিয়া অপেক্ষা করল।
তারপর অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেল।
এক রাতে আফিয়া নিজের ঘরে বসে একটা পুরোনো ছবি দেখছিল।
ছবিটা তাদের বিয়ের দিনের।
দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
অর্ণবের চোখে সেই আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টি।
আফিয়ার মুখে লাজুক হাসি।
ছবিটা বুকের কাছে চেপে ধরে আফিয়া ফিসফিস করে বলল,
— আমরা এত দূরে চলে গেলাম কীভাবে?
তারপর হঠাৎ তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
অর্ণব।
“আজ ফিরতে দেরি হবে। অপেক্ষা করো না।”
আফিয়া মেসেজটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
আগে এই কথাটা তাকে কষ্ট দিত।
আজ অদ্ভুতভাবে কিছুই অনুভব হলো না।
সে শুধু ফোনটা পাশে রেখে দিল।
সেদিন প্রথমবার অর্ণবের জন্য অপেক্ষা করল না।
কয়েক সপ্তাহ এভাবেই কেটে গেল।
তাদের মধ্যে কথা কমতে কমতে প্রায় শেষ হয়ে গেল।
একদিন আফিয়া বলল,
— আমাদের কি একটু বিরতি দরকার?
অর্ণব চমকে তাকাল।
— কীসের বিরতি?
— এই সম্পর্ক থেকে।
— তুমি কি আমাকে ছেড়ে যেতে চাও?
আফিয়া চোখ নামিয়ে বলল,
— জানি না।
অর্ণবের গলা ভারী হয়ে গেল।
— আফিয়া, আমার জীবনে তোমার জায়গাটা কেউ নিতে পারবে না।
— কিন্তু তোমার জীবনে আমার জন্য জায়গাটা কি এখনো আছে?
অর্ণব উত্তর দিতে পারল না।
সেই নীরবতাই আফিয়ার কাছে উত্তর হয়ে গেল।
কিছুদিন পর তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের কথা পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাল।
দুই পক্ষের মানুষ অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল।
কেউ বলল, “আরেকটু সময় দাও।”
কেউ বলল, “সংসারে এমন হয়।”
কেউ বলল, “অর্ণব খুব ব্যস্ত, সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু সময় তো ইতিমধ্যেই অনেক কিছু নিয়ে নিয়েছিল।
একদিন অর্ণব আর আফিয়া একই টেবিলে বসে ছিল।
মাঝখানে রাখা ছিল কিছু কাগজ।
আইনজীবীর পাঠানো কাগজ।
অর্ণব কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুমি নিশ্চিত?
আফিয়ার চোখ ভিজে ছিল।
— না।
— তাহলে সই করবে কেন?
আফিয়া কাঁপা গলায় বলল,
— কারণ আমরা দুজনেই এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে একসঙ্গে থেকেও একে অপরকে হারিয়ে ফেলছি।
অর্ণব চোখ বন্ধ করল।
— আমি তোমাকে ভালোবাসি।
আফিয়া চোখের পানি মুছে বলল,
— আমিও।
— তাহলে?
— সব ভালোবাসার শেষ একসঙ্গে থাকা হয় না, অর্ণব।
অর্ণবের বুকের ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে গেল।
তবু সে কাগজে সই করল।
আফিয়াও করল।
কলমটা নামিয়ে রাখার সময় তার হাত কাঁপছিল।
তাদের বিয়ের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু ভালোবাসা?
সেটা কি সত্যিই শেষ হয়েছিল?
কেউ জানত না।
সেদিন সন্ধ্যায় অর্ণব একা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
কোথায় যাবে সে নিজেও জানত না।
শহর পেরিয়ে অনেক দূরে চলে গেল।
শেষে গাড়ি থামাল নদীর পাড়ে।
চারপাশে অন্ধকার।
নদীর কালো পানিতে শহরের আলো ভেঙে ভেঙে পড়ছে।
অর্ণব গাড়ি থেকে নেমে নদীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে পানি জমল।
সে মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
— আফিয়া...
তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
দুই হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল।
যে মানুষটা অপারেশন থিয়েটারে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে,
যে মানুষটা অন্যের জীবন বাঁচাতে নিজের ঘুম হারাম করে,
যে মানুষটার সামনে সবাই নিজের ভয় লুকিয়ে রাখে—
সেই মানুষটা আজ নিজের জীবনটাই ধরে রাখতে পারল না।
অর্ণব কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমি তোমাকে সময় দিতে পারিনি...
তার গলা কেঁপে উঠল।
— কিন্তু কোনোদিন তোমাকে হারাতে চাইনি।
নদীর বাতাস তার চোখের পানি শুকিয়ে দিচ্ছিল।
অর্ণব জানত না—
ঠিক সেই সময়, অনেক দূরে একজন মানুষ তাকে খুঁজতে বেরিয়েছে।
একজন মানুষ, যে কাগজে তার থেকে আলাদা হয়ে গেছে।
কিন্তু হৃদয় থেকে পারেনি।
আফিয়া।
সে তখন অর্ণবকে খুঁজতে খুঁজতে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছে।
তার হাতে সেই বিচ্ছেদের কাগজ।
চোখে অশ্রু।
আর মনে একটাই কথা—
“আমি অর্ণবকে হারাতে পারব না।”
রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে।
শহরের ব্যস্ততা অনেক আগেই থেমে গেছে। রাস্তার দু-একটা বাতি ছাড়া চারপাশ প্রায় অন্ধকার।
আফিয়া গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
চোখের পানি বারবার গড়িয়ে পড়ছে।
সে জানত না অর্ণব কোথায়।
শুধু জানত—
আজ তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
ডিভোর্সের কাগজে সই করার পর অর্ণব একটা কথাও বলেনি।
চুপচাপ উঠে চলে গিয়েছিল।
আফিয়া তখনও চেয়ারে বসে ছিল।
সামনে রাখা কাগজটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হচ্ছিল—
এই কয়েকটা কাগজ কীভাবে এত বছরের সম্পর্ক শেষ করে দিতে পারে?
এই কাগজে তো লেখা নেই—
অর্ণব প্রথমবার তাকে হাসপাতালে দেখে কীভাবে চোখ সরিয়ে নিয়েছিল।
লেখা নেই—
প্রথমবার অর্ণব তার হাত ধরে বলেছিল, “সাবধানে।”
লেখা নেই—
রাতে লাইব্রেরিতে ঘুমিয়ে পড়া আফিয়ার হাতে কীভাবে সে পানির বোতল তুলে দিয়েছিল।
লেখা নেই—
বিয়ের পর প্রতিদিন সকালে অর্ণবের টাই ঠিক করে দেওয়ার সেই ছোট্ট অভ্যাস।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
লেখা নেই, তারা দুজন এখনও একে অপরকে ভালোবাসে।
তাহলে এই সম্পর্ক কীভাবে শেষ হয়?
আফিয়া হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছিল।
কাগজটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে ছুটে গিয়েছিল।
কিন্তু ততক্ষণে অর্ণব চলে গেছে।
তার ফোন বন্ধ।
কেউ জানে না সে কোথায়।
আফিয়া শুধু মনে করার চেষ্টা করেছিল—
অর্ণব যখন খুব কষ্ট পেত, কোথায় যেত?
হঠাৎ তার মনে পড়ল।
বিয়ের আগে একদিন অর্ণব বলেছিল,
“আমার খুব খারাপ লাগলে আমি নদীর পাশে বসে থাকি। পানি দেখলে মাথাটা একটু শান্ত হয়।”
আফিয়ার বুক কেঁপে উঠেছিল।
সে গাড়ি নিয়ে সোজা নদীর দিকে রওনা হয়েছিল।
অন্যদিকে নদীর পাড়ে অর্ণব তখনও দাঁড়িয়ে।
চোখের পানি থামছে না।
সে নিজের ওপরই রাগ করছিল।
এত বড় ডাক্তার হয়েও নিজের সংসারটাকে বাঁচাতে পারেনি।
হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছে।
কিন্তু যে মানুষটা তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার মনটা বুঝতে পারেনি।
অর্ণব পকেট থেকে ফোন বের করল।
স্ক্রিনে আফিয়ার নাম।
অনেক পুরোনো ছবি।
একটা ছবি দেখে তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
ছবিতে আফিয়া হাসছে।
অর্ণব ছবিটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— তুমি কেন এত জেদি?
তারপর নিজেই উত্তর দিল,
— আমিও তো কম নই।
চোখের পানি আবার গড়িয়ে পড়ল।
— কিন্তু তোমাকে হারানোর জেদটা কেন করলাম?
হঠাৎ দূর থেকে গাড়ির শব্দ এল।
অর্ণব মাথা তুলল না।
গাড়ি এসে কিছুটা দূরে থামল।
দরজা খোলার শব্দ।
তারপর দ্রুত পায়ের শব্দ।
আফিয়া চারপাশে তাকাচ্ছে।
— অর্ণব!
কোনো উত্তর নেই।
সে আরও এগিয়ে গেল।
— অর্ণব!
নদীর বাতাসে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
অর্ণব শব্দটা শুনে স্থির হয়ে গেল।
এটা কি সত্যিই আফিয়ার কণ্ঠ?
নাকি তার কল্পনা?
আবার ডাক এল।
— অর্ণব!
এবার সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।
দুজনের চোখ একসঙ্গে মিলল।
আফিয়া দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা দূরে।
চুল এলোমেলো।
চোখ ফুলে গেছে।
গাল বেয়ে অশ্রু।
হাতে কাগজ।
অর্ণবের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে কিছু বলতে পারল না।
আফিয়াও কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল।
তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— তুমি এখানে?
অর্ণব মুখ ফিরিয়ে নিল।
— তুমি এখানে কেন এসেছ?
আফিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
— তোমাকে খুঁজতে।
— কেন?
— জানি না।
অর্ণব তিক্ত হেসে বলল,
— আমাদের তো সব শেষ।
আফিয়া মাথা নাড়ল।
— না।
— কাগজে সই করেছি আমরা দুজনেই।
— কাগজে করেছি।
— তাহলে?
আফিয়া তার হাতে থাকা কাগজটা তুলে ধরল।
— এই কাগজটা আমাদের সম্পর্কের শেষ হতে পারে। কিন্তু আমার অনুভূতির না।
অর্ণব চুপ।
আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমি ভেবেছিলাম তোমাকে ছেড়ে দিলে হয়তো তুমি ভালো থাকবে।
অর্ণবের গলা কেঁপে উঠল।
— তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে আমি তোমাকে ছাড়া ভালো থাকব?
আফিয়া চোখ বন্ধ করল।
— জানি না।
— তাহলে আমাকে ছেড়ে দিলে কেন?
— কারণ আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম।
— আমিও হয়েছিলাম।
— কিন্তু তোমাকে হারানোর পর বুঝলাম...
আফিয়া কথা শেষ করতে পারল না।
অর্ণব তাকিয়ে রইল।
— কী বুঝলে?
আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— তোমার কাছ থেকে দূরে থাকার চেয়ে তোমার সঙ্গে কষ্টে থাকা অনেক ভালো।
অর্ণব চোখ ফিরিয়ে নিল।
তার নিজের চোখও ভিজে গেছে।
আফিয়া আরও কাছে এসে বলল,
— আমি তোমাকে সময় চেয়েছিলাম।
— জানি।
— তুমি দিতে পারোনি।
— জানি।
— কিন্তু আমি তোমাকে ছেড়ে দিতে চাইনি।
অর্ণব এবার তার দিকে তাকাল।
— তাহলে সই করলে কেন?
আফিয়া কাগজের দিকে তাকাল।
তারপর হঠাৎ কাগজটা দুই হাতে ছিঁড়ে ফেলল।
একবার।
দুবার।
তারপর টুকরো টুকরো করে নদীর দিকে ছুড়ে দিল।
অর্ণব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমি পারব না।
— কী?
— তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না।
অর্ণবের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
আফিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে দৌড়ে গিয়ে অর্ণবকে জড়িয়ে ধরল।
দুজনেই কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ।
অর্ণব প্রথমে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
তারপর ধীরে ধীরে আফিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
যেন এতদিনের হারানোর ভয়টা এক মুহূর্তে মুছে ফেলতে চাইছে।
আফিয়া তার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমাকে আর কখনো একা করে দিও না।
অর্ণব চোখ বন্ধ করল।
— দেব না।
— কথা দাও।
— কথা দিলাম।
— আবার যদি কাজের চাপে আমাকে ভুলে যাও?
অর্ণব তার মাথায় হাত রেখে বলল,
— এবার থেকে কাজের জন্য সময় থাকবে। কিন্তু তোমার জন্য সময় না থাকার অজুহাত থাকবে না।
আফিয়া কাঁদতে কাঁদতেই হেসে ফেলল।
— তুমি আবার রাগ করবে?
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
— অবশ্যই।
— আমাকে বকবে?
— অনেক।
— তাহলে আগের মতোই থাকবে?
অর্ণব তার দিকে তাকাল।
— আমি আগের মতোই আছি।
আফিয়া চোখ মুছে বলল,
— কিন্তু আমি আগের মতো নেই।
— কেন?
— কারণ এখন আমি জানি, তোমাকে হারানোর কষ্টটা কেমন।
অর্ণব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— আমিও।
নদীর পাশে দুজন অনেকক্ষণ বসে রইল।
কথা বলল।
অভিমান খুলে বলল।
কে কোথায় কষ্ট পেয়েছে, সেটা বলল।
আফিয়া বলল,
— আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল কী জানো?
অর্ণব বলল,
— কী?
— আমরা দুজনেই ভাবছিলাম, অন্যজন বুঝে নেবে।
অর্ণব মাথা নাড়ল।
— ঠিক।
— তুমি ভাবছিলে আমি বুঝব তোমার কাজের চাপ।
— আর তুমি ভাবছিলে আমি বুঝব তোমার একাকিত্ব।
— হুম।
অর্ণব তার হাতটা ধরল।
— এবার থেকে না বলা কথাও জিজ্ঞেস করব।
আফিয়া মৃদু হেসে বলল,
— আমিও।
হঠাৎ অর্ণব বলল,
— একটা কথা বলব?
— বলো।
— তুমি কি আবার আমাকে বিয়ে করবে?
আফিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
— আবার?
— হ্যাঁ।
— আমরা তো আগেই বিয়ে করেছি।
— জানি।
— তাহলে?
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
— আগের বিয়েতে আমরা সংসার করেছিলাম। এবার এমন একটা সম্পর্ক চাই, যেখানে আমরা সত্যিই একে অপরকে সময় দেব।
আফিয়ার চোখে আবার পানি এসে গেল।
সে মাথা নাড়িয়ে বলল,
— করব।
সেদিন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছিল।
নদীর ওপর হালকা কুয়াশা।
আফিয়া অর্ণবের পাশে বসে ছিল।
দুজনের হাত একসঙ্গে।
অনেক কিছু ভেঙে গিয়েছিল।
কিন্তু সবকিছু শেষ হয়নি।
বরং তারা বুঝতে পেরেছিল—
ভালোবাসা শুধু সুখের দিনে পাশে থাকার নাম নয়।
কখনো কখনো ভেঙে যাওয়ার পরও একে অপরের কাছে ফিরে আসার সাহসের নামও ভালোবাসা।
অর্ণব আফিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— চল, বাসায় যাই।
আফিয়া মাথা রাখল তার কাঁধে।
— হুম।
গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে আফিয়া হঠাৎ থেমে গেল।
অর্ণব ফিরে তাকাল।
— কী হলো?
আফিয়া মুচকি হেসে বলল,
— একটা কথা।
— কী?
— এত বছর আগে তুমি আমাকে বলেছিলে, “আগে বড় হও, তারপর এসো।”
অর্ণব হাসল।
— মনে আছে।
— আমি বড় হয়েছি।
— হ্যাঁ।
— কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমাকেই আমার কাছে আসতে হলো।
অর্ণব হেসে বলল,
— কারণ তখন বুঝিনি, তুমি আমার জীবনের কতটা জায়গা নিয়ে ফেলেছ।
আফিয়া তার হাত শক্ত করে ধরল।
— এবার কিন্তু ছাড়ব না।
অর্ণবও তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
— আমিও না।
ভোরের আলোয় তারা পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
পেছনে পড়ে রইল ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলো।
আর সামনে শুরু হলো তাদের জীবনের নতুন অধ্যায়।
নদীর পাড় থেকে ফেরার পর কয়েকটা দিন যেন স্বপ্নের মতো কেটে গেল।
সবকিছু আগের জায়গায় ফিরেছিল, কিন্তু আগের মতো ছিল না।
বরং এবার দুজনেই জানত—একজন আরেকজনকে হারানোর ভয়টা কতটা গভীর।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আফিয়া দেখত, অর্ণব আগেই উঠে গেছে। কিন্তু আগের মতো চুপচাপ বেরিয়ে না গিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে।
— উঠবে?
আফিয়া চোখ না খুলেই বলত,
— আর পাঁচ মিনিট।
অর্ণব হেসে বলত,
— ডাক্তার হয়ে এখনো পাঁচ মিনিটের রোগ সারেনি?
আফিয়া বালিশটা মুখের ওপর চাপা দিয়ে বলত,
— আপনি গেলে আমি উঠব।
— আমি যাচ্ছি।
— না, দাঁড়াও!
অর্ণব হেসে ফেলত।
এই ছোট্ট কথোপকথনগুলোই যেন তাদের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরিয়ে আনছিল।
তবে একটা বিষয় দুজনেই বুঝেছিল—
শুধু আবার একসঙ্গে থাকলেই হবে না।
তাদের সম্পর্কটাকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।
একদিন সকালে নাশতার টেবিলে আফিয়া বলল,
— আজ একটা নিয়ম করি।
অর্ণব কফির কাপ নামিয়ে তাকাল।
— কী নিয়ম?
— সপ্তাহে অন্তত একদিন আমরা শুধু নিজেদের জন্য রাখব।
— হাসপাতাল?
— থাকবে।
— ফোন?
— থাকবে না।
— জরুরি কল?
আফিয়া একটু ভেবে বলল,
— সত্যিই জরুরি হলে ধরবে। কিন্তু রোগীর আত্মীয়ের অকারণ ফোন হলে না।
অর্ণব হেসে ফেলল।
— তুমি তো আমাকে পুরো চাকরি থেকে অবসর দিয়ে দিচ্ছ।
আফিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— না। শুধু husband হিসেবে তোমার দায়িত্ব মনে করিয়ে দিচ্ছি।
অর্ণব তার হাতটা ধরল।
— ঠিক আছে।
আফিয়া বলল,
— কথা?
— কথা।
কয়েক সপ্তাহ পর অর্ণব সত্যিই নিজের কাজের সময় একটু গুছিয়ে নিল।
আগে যেখানে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করত, এখন চেষ্টা করত দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর কাজ বন্ধ করতে।
সহকর্মীরা অবাক হয়ে গেল।
একদিন একজন জুনিয়র ডাক্তার মজা করে বলল,
— স্যার, আপনাকে ইদানীং অনেক খুশি মনে হচ্ছে।
অর্ণব গম্ভীর মুখে বলল,
— কাজ করুন।
লোকটা হেসে বলল,
— ম্যাডাম নিশ্চয়ই কিছু করেছেন।
অর্ণব আর কিছু বলল না।
কিন্তু মুখের কোণে যে হাসি ফুটে উঠেছিল, সেটা লুকাতে পারল না।
অন্যদিকে আফিয়াও বুঝেছিল, অর্ণবের কাজটা শুধু একটা চাকরি নয়।
হাজারো মানুষের জীবন তার ওপর নির্ভর করে।
তাই এবার সে অর্ণবের ওপর রাগ না করে তার ব্যস্ততাকে বুঝতে চেষ্টা করত।
তবে একটা ব্যাপারে সে কোনো ছাড় দিত না।
সময়।
একদিন অর্ণব রাত করে ফিরলে আফিয়া দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
— আজ কতক্ষণ দেরি?
অর্ণব ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
— মাত্র এক ঘণ্টা।
— এক ঘণ্টা?
— হ্যাঁ।
— শাস্তি হবে।
অর্ণব অবাক।
— কী শাস্তি?
আফিয়া হাত গুটিয়ে বলল,
— আজ আমার সঙ্গে ছাদে বসে চা খেতে হবে।
অর্ণব হেসে ফেলল।
— এটাই শাস্তি?
— আমার সঙ্গে সময় কাটানো আপনার কাছে শাস্তি?
অর্ণব কাছে এসে বলল,
— না। এখন এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ।
আফিয়া মুচকি হেসে সরে গেল।
এক সন্ধ্যায় দুজন ছাদে বসে ছিল।
আকাশে হালকা বাতাস।
আফিয়া অর্ণবের কাঁধে মাথা রেখে বলল,
— একটা কথা বলি?
— বলো।
— আমরা যদি সেদিন সত্যিই আলাদা হয়ে যেতাম?
অর্ণব চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
— ভাবতে চাই না।
— কেন?
— কারণ ওই কয়েক ঘণ্টা আমি বুঝেছি, তোমাকে ছাড়া আমার জীবন কেমন।
আফিয়া তার দিকে তাকাল।
— কেমন?
অর্ণব দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— খুব ফাঁকা।
আফিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
— আমিও বুঝেছি।
— কী?
— তোমাকে ছাড়া আমি স্বাধীন হতে পারি, কিন্তু সুখী হতে পারি না।
অর্ণব তার হাতটা নিজের হাতে নিল।
— আমাদের একটা ভুল হয়েছিল।
— কী?
— আমরা ভেবেছিলাম ভালোবাসা থাকলেই সব ঠিক থাকবে।
আফিয়া মাথা নাড়ল।
— আসলে ভালোবাসার সঙ্গে সময়ও দরকার।
— আর কথা বলা।
— আর একে অপরকে বোঝা।
অর্ণব হেসে বলল,
— আর তোমার দুষ্টুমি সহ্য করা।
আফিয়া তার কাঁধে হালকা ধাক্কা দিল।
— আমি কি এত দুষ্টু?
— তুমি না থাকলে আমার জীবনটা অনেক শান্ত হতো।
— তাহলে?
— শান্ত জীবন আমার ভালো লাগে না।
আফিয়া হেসে ফেলল।
তাদের জীবনে আরেকটা বিষয় অবশ্য রয়ে গিয়েছিল।
সন্তান না হওয়ার কষ্ট।
আগে এই বিষয়টা নিয়ে তারা অনেকবার মন খারাপ করেছে।
কিন্তু বিচ্ছেদের পর তারা বুঝেছিল—
তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা সন্তান না থাকা ছিল না।
সমস্যা ছিল তারা নিজেদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে দিয়েছিল।
একদিন আফিয়া অর্ণবকে বলল,
— আমরা কি আবার চেষ্টা করব?
অর্ণব বুঝতে পারল সে কী বোঝাতে চাইছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— করব।
তারপর আফিয়ার হাত ধরে বলল,
— তবে এবার কোনো চাপ নিয়ে না।
— যদি না হয়?
— তাহলে?
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
— আমরা আগের মতোই থাকব।
— আর যদি হয়?
— তাহলে আমাদের পৃথিবীটা আরও বড় হবে।
আফিয়া হাসল।
— তুমি ছেলে চাও না মেয়ে?
অর্ণব বলল,
— সুস্থ থাকলেই হলো।
আফিয়া চোখ ছোট করে তাকাল।
— এড়িয়ে যাচ্ছ।
— ডাক্তাররা এমন প্রশ্নের উত্তর দেয় না।
— husband হিসেবে?
অর্ণব একটু হেসে বলল,
— তাহলে বলব, তোমার মতো একটা মেয়ে হলে ভালো।
আফিয়া হেসে ফেলল।
— আমার মতো হলে তো তোমার জীবন শেষ।
— আমার জীবন তো তোমার সঙ্গেই শেষ।
কথাটা শুনে আফিয়া কিছু বলতে পারল না।
শুধু অর্ণবের হাতটা শক্ত করে ধরে থাকল।
দিন যেতে লাগল।
তাদের সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত হয়ে উঠল।
আগে আফিয়া রাগ করলে চুপ করে থাকত।
এখন সরাসরি বলত।
— তোমার ওপর রাগ করেছি।
অর্ণব বলত,
— কেন?
— কারণ তুমি আজ সময়মতো ফিরোনি।
— সরি।
— শুধু সরি বললে হবে না।
— তাহলে?
— আমাকে নিয়ে বাইরে যেতে হবে।
অর্ণব হাসত।
— ঠিক আছে।
আবার অর্ণব কোনো বিষয়ে কষ্ট পেলে সেটাও বলত।
— আজ তোমার কথাটা আমার ভালো লাগেনি।
আফিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলত,
— সরি। আমি বুঝিনি।
তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হতো।
কিন্তু এবার তারা ভুল বোঝাবুঝিকে জমতে দিত না।
এক রাতে অর্ণব হাসপাতালে থেকে ফিরছিল।
রাস্তায় হঠাৎ তার গাড়ি থামাতে হলো।
রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট ফুলের দোকান।
সে গাড়ি থেকে নেমে একটা ছোট্ট ফুলের তোড়া কিনল।
বাসায় ফিরে দেখল আফিয়া বই পড়ছে।
অর্ণব ফুলগুলো তার সামনে রেখে বলল,
— তোমার জন্য।
আফিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
— আজ কী?
— কিছু না।
— তাহলে ফুল কেন?
— দিতে ইচ্ছে করেছে।
আফিয়া ফুল হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— এত বছর পরেও তুমি আমাকে নতুন করে অবাক করো।
অর্ণব বলল,
— কারণ তোমাকে হারানোর পর বুঝেছি, ছোট ছোট জিনিসও কত বড় হয়ে যায়।
আফিয়া উঠে দাঁড়িয়ে তার সামনে এল।
— একটা কথা বলব?
— বলো।
— আমি তোমাকে আবার নতুন করে ভালোবাসছি।
অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— আমিও।
কয়েক মাস পর তাদের জীবনে একটা নতুন পরিবর্তন এল।
এক সকালে আফিয়া অর্ণবকে বলল,
— তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
অর্ণব তখন কফি খাচ্ছিল।
— আবার কী?
আফিয়ার মুখে অদ্ভুত একটা হাসি।
— আগে তুমি প্রতিশ্রুতি দাও, রাগ করবে না।
অর্ণব কাপ নামিয়ে বলল,
— কী হয়েছে?
আফিয়া কিছু না বলে তার হাতে একটা ছোট্ট রিপোর্ট দিল।
অর্ণব রিপোর্টের দিকে তাকাল।
তারপর আবার আফিয়ার দিকে।
কয়েক সেকেন্ড সে কিছুই বলল না।
তার চোখ ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেল।
— আফিয়া...
আফিয়া ঠোঁট কামড়ে হাসল।
— হুম।
অর্ণব আবার রিপোর্টের দিকে তাকাল।
তার হাত কেঁপে উঠল।
— সত্যি?
আফিয়ার চোখে পানি এসে গেল।
সে মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ।
অর্ণব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ যেন কথা খুঁজে পেল না।
তারপর আফিয়ার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল,
— আমি বাবা হতে যাচ্ছি?
আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে হেসে বলল,
— হ্যাঁ।
অর্ণব তাকে কাছে টেনে নিল।
তার চোখেও পানি।
— তুমি আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখটা দিলে।
আফিয়া তার বুকে মুখ লুকিয়ে বলল,
— আমাদের নতুন শুরুটা এবার সত্যিই পূর্ণ হলো।
অর্ণব তার মাথায় হাত রাখল।
কিন্তু তারা কেউই জানত না—
সামনের দিনগুলোতে তাদের জন্য আবারও কিছু কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
তবে এবার তারা একসঙ্গে।
আর এবার তারা জানে—
দূরত্ব যতই আসুক, কথা না বলে তাকে বড় হতে দেওয়া যাবে না।
রিপোর্টটা হাতে নিয়ে অর্ণব অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল।
তার চোখে যে আনন্দ ছিল, সেটা দেখে আফিয়ার বুক ভরে গিয়েছিল।
কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
কয়েকদিন পর আরও কিছু পরীক্ষা করার পর জানা গেল, আগের রিপোর্টে ভুল হয়েছিল।
আফিয়া মা হতে চলেনি।
খবরটা যখন অর্ণব তাকে জানাল, দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।
আফিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
অর্ণব ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে বলল,
— আফিয়া...
আফিয়া মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।
— হুম?
— মন খারাপ করো না।
আফিয়া মৃদু হাসল।
— করছি না।
— তুমি কাঁদছ।
— সব কান্না দুঃখের হয় না।
অর্ণব তার চোখের পানি মুছে দিল।
— আমাদের সন্তান না হলেও...
আফিয়া তার কথা শেষ করতে দিল না।
— জানি। আমরা দুজন আছি।
অর্ণব তাকে কাছে টেনে নিল।
— হ্যাঁ। আমরা দুজন।
সেদিন দুজনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—
সন্তান তাদের জীবনের একটা সুন্দর স্বপ্ন হতে পারে, কিন্তু তাদের সম্পর্কের একমাত্র কারণ নয়।
তারা আবার নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
সময় কেটে যেতে লাগল।
আফিয়া এখন নিজের ক্যারিয়ারে প্রতিষ্ঠিত।
অর্ণবও আগের চেয়ে আরও বড় দায়িত্বে।
দুজনের নামই চিকিৎসাজগতে পরিচিত হয়ে উঠছিল।
তাদের জীবন বাইরে থেকে নিখুঁত মনে হতো।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে আবার একটা সমস্যা তৈরি হচ্ছিল।
কাজ।
আবার সেই কাজ।
প্রথমবার তারা যে ভুল করেছিল, এবার দুজনেই সেটা বুঝতে পারছিল।
তবুও মানুষ সবসময় নিজের ভুল এড়িয়ে চলতে পারে না।
অর্ণবের ওপর নতুন দায়িত্ব এল।
একটা বড় হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ তার হাতে তুলে দেওয়া হলো।
প্রায় প্রতিদিনই তাকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে হতো।
আফিয়ারও রোগী বেড়ে গেল।
আগে দুজনের ব্যস্ততার মধ্যে একটা ভারসাম্য ছিল।
এবার সেটা ধীরে ধীরে নষ্ট হতে লাগল।
এক রাতে আফিয়া বাসায় ফিরে দেখল অর্ণব এখনো আসেনি।
সে ফোন করল।
— কোথায়?
— হাসপাতালে।
— আজ ফিরবে?
— চেষ্টা করব।
আফিয়া চোখ বন্ধ করল।
আবার সেই পুরোনো শব্দ।
“চেষ্টা করব।”
সে আর কিছু বলল না।
— ঠিক আছে।
ফোন রেখে দিল।
অর্ণব ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারও খারাপ লাগছিল।
কিন্তু তখন একটা জরুরি অপারেশন সামনে।
সে নিজেকে বলল,
“আরেকটু সময়। তারপর সব ঠিক করব।”
কিন্তু সেই “আরেকটু” সময়টাই কখনো শেষ হলো না।
একদিন আফিয়া অর্ণবের জন্য অপেক্ষা করতে করতে পুরোনো অ্যালবাম বের করল।
একটা ছবি হাতে নিল।
তাদের বিয়ের দিনের ছবি।
আফিয়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তারপর পাশের ছবিটা দেখল।
নদীর পাড়ের সেই রাতের পরের সকাল।
দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
অর্ণবের হাত তার হাতে।
আফিয়ার মনে হলো—
তারা একবার মৃত্যুর মতো একটা বিচ্ছেদ থেকে ফিরে এসেছিল।
তাহলে আবার কেন একই জায়গায় যাচ্ছে?
সে ছবিগুলো গুছিয়ে রেখে দিল।
কয়েকদিন পর অর্ণব বাসায় ফিরতেই আফিয়া বলল,
— আমাদের কথা বলা দরকার।
অর্ণব ক্লান্ত ছিল।
তবুও এবার সে থামল।
— বলো।
আফিয়া ধীরে বলল,
— আমরা আবার আগের জায়গায় চলে যাচ্ছি।
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— আমি চেষ্টা করছি।
আফিয়া মৃদু হেসে বলল,
— তুমি চেষ্টা করছ। আমিও করছি।
— তাহলে সমস্যা কোথায়?
— সময়ের।
অর্ণব তার দিকে তাকাল।
আফিয়া বলল,
— আমরা আবার একই ঘরে থেকেও আলাদা হয়ে যাচ্ছি।
অর্ণব চুপ।
— এবার কি আমরা আগের ভুলটা করব?
অর্ণব তার কাছে এসে দাঁড়াল।
— না।
— তাহলে সময় দাও।
— দেব।
আফিয়া তার চোখের দিকে তাকাল।
— সত্যি?
অর্ণব মাথা নাড়ল।
— সত্যি।
কিন্তু পরদিনই হাসপাতালে একটা বড় জটিলতা তৈরি হলো।
অর্ণবকে কয়েকদিন টানা হাসপাতালে থাকতে হলো।
আফিয়াও নিজের কাজ সামলাতে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল।
কথা কমে গেল।
আবার।
এক সন্ধ্যায় আফিয়া অর্ণবকে ফোন করল।
— আজ রাতে বাসায় ফিরবে?
— জানি না।
— তোমার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করছে।
অর্ণব চোখ বন্ধ করল।
— আমারও।
— তাহলে ফিরো।
— চেষ্টা করছি।
আফিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফোন রেখে দিল।
সে বুঝতে পারছিল—
অর্ণব তাকে ভালোবাসে।
কিন্তু ভালোবাসা আর সময়ের মধ্যে একটা অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে।
আর সেই যুদ্ধে প্রতিদিন একটু একটু করে তাদের সম্পর্ক হারছে।
এক রাতে অর্ণব অনেক দেরিতে বাসায় ফিরল।
দেখল আফিয়া ডাইনিং টেবিলে বসে আছে।
সামনে দুটো কাপ।
অর্ণব অবাক হলো।
— এত রাতে চা?
আফিয়া বলল,
— তোমার সঙ্গে কথা বলব বলে।
অর্ণব বসে পড়ল।
— বলো।
আফিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
— তুমি কি কখনো ভেবেছ, আমাদের জীবনটা কোথায় যাচ্ছে?
অর্ণব তাকিয়ে রইল।
— কী বলতে চাইছ?
— আমরা দুজনেই কাজ করছি। দুজনেই সফল হচ্ছি। কিন্তু আমাদের সংসার?
অর্ণব চুপ।
আফিয়া বলল,
— আমাদের কি শুধু দুটো মানুষের পাশাপাশি থাকা হয়ে গেছে?
— না।
— তাহলে কী?
অর্ণব উত্তর দিতে পারল না।
আফিয়ার চোখে পানি।
— তুমি আমাকে ভালোবাসো। আমি জানি।
— হ্যাঁ।
— আমিও তোমাকে ভালোবাসি।
— জানি।
— কিন্তু শুধু ভালোবাসা দিয়ে একটা সংসার বাঁচে না।
অর্ণবের বুকটা কেঁপে উঠল।
— তুমি আবার চলে যাওয়ার কথা ভাবছ?
আফিয়া মাথা নিচু করল।
— আমি যেতে চাই না।
— তাহলে?
— আমি চাই তুমি আমাকে ধরে রাখো।
অর্ণব তার হাত ধরল।
— আমি ধরে আছি।
আফিয়া তার হাতের দিকে তাকাল।
— তোমার হাতটা আমার হাতে আছে। কিন্তু তোমার সময়টা কোথায়?
অর্ণবের চোখ ভিজে গেল।
সে কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।
এরপর কিছুদিন তারা চেষ্টা করল।
কখনো একসঙ্গে রাতের খাবার।
কখনো সকালে এক কাপ চা।
কখনো সপ্তাহান্তে বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা।
কিন্তু পরিকল্পনা প্রায়ই ভেস্তে যেত।
অর্ণবের জরুরি কল আসত।
আফিয়ার রোগী আসত।
কখনো আফিয়া অপেক্ষা করত।
কখনো অর্ণব।
ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত ক্লান্তি জমে উঠল।
কেউ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চাইত না।
কারণ দুজনেই জানত—
দোষটা কারও একার নয়।
এক রাতে প্রচণ্ড ঝড় হচ্ছিল।
আফিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
অর্ণব পেছন থেকে এসে বলল,
— এত রাতে এখানে কেন?
— ঘুম আসছে না।
অর্ণব পাশে দাঁড়াল।
— আমারও না।
আফিয়া হেসে বলল,
— আমরা দুজনেই একই ঘরে থেকেও একা হয়ে গেছি।
অর্ণব কিছু বলল না।
হঠাৎ আফিয়া বলল,
— অর্ণব, যদি কোনোদিন আমি তোমার জীবনে না থাকি?
অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
— এমন কথা বলবে না।
— উত্তর দাও।
— আমি ভাবতেও পারি না।
আফিয়া চোখ নামিয়ে বলল,
— আমিও পারি না।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— কিন্তু ভয় হচ্ছে।
— কিসের?
— আবার তোমাকে হারানোর।
অর্ণব তার হাত ধরে বলল,
— এবার হারাব না।
আফিয়া মৃদু হেসে বলল,
— তুমি সবসময় এই কথাটাই বলো।
অর্ণব চুপ করে গেল।
পরের কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠল।
তাদের মধ্যে বড় কোনো ঝগড়া হয়নি।
কিন্তু নীরবতা বেড়ে গেল।
একদিন আফিয়া অর্ণবের কেবিনে গিয়ে দাঁড়াল।
অর্ণব রোগীর রিপোর্ট দেখছিল।
আফিয়া কিছু না বলে তার সামনে একটা খাম রাখল।
অর্ণব তাকাল।
— এটা কী?
— খুলে দেখো।
অর্ণব খামটা খুলল।
ভেতরে কিছু কাগজ।
সে পড়তে শুরু করল।
তার মুখের রং বদলে গেল।
— আফিয়া...
আফিয়া চোখে পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
— এবারও কি তুমি আমাকে থামাবে?
অর্ণব কাগজটা নামিয়ে রাখল।
— তুমি সত্যিই এটা করতে চাও?
আফিয়া মাথা নাড়ল।
— না।
— তাহলে?
— আমি শুধু চাই, তুমি বুঝো আমি কতটা ক্লান্ত।
অর্ণব উঠে দাঁড়াল।
— আমরা আবার সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি।
আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— হ্যাঁ।
অর্ণব তার দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু এবার কেউ কাউকে জড়িয়ে ধরল না।
দুজনেই শুধু দাঁড়িয়ে রইল।
মাঝখানে কয়েক হাত দূরত্ব।
অথচ সেই দূরত্বটাই যেন বছরের সমান।
অর্ণব কাগজগুলো হাতে নিয়ে বলল,
— আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
আফিয়া চোখের পানি মুছে বলল,
— আমিও না।
— তাহলে?
— জানি না।
সেদিন রাতে আফিয়া বাসায় ফিরে নিজের আলমারি খুলল।
বিয়ের শাড়িটা বের করল।
অনেকক্ষণ হাতে ধরে রাখল।
তারপর চোখের পানি মুছে আবার ভাঁজ করে রেখে দিল।
সে জানত না সামনে কী আছে।
শুধু জানত—
কিছু সম্পর্ক শেষ হওয়ার আগে অনেকবার বাঁচতে চায়।
তাদের সম্পর্কও শেষবারের মতো বাঁচার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু এবার সিদ্ধান্তটা আরও কঠিন।
কারণ দুজনেই বুঝতে পেরেছিল—
ভালোবাসা এখনো আছে, কিন্তু একে অপরকে সময় দেওয়ার ক্ষমতাটাই যেন হারিয়ে ফেলেছে।
আর সেই রাতের পর এমন একটা দিন আসবে, যেদিন আফিয়া অর্ণবকে বলবে—
“আজ আমরা কোথাও ঘুরতে যাব। শুধু তুমি আর আমি।”
অর্ণব রাজি হবে।
আফিয়া আবার নতুন করে সাজবে।
অপেক্ষা করবে।
কিন্তু সেই দিনটাই তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অপেক্ষার দিন হয়ে উঠবে।
সেদিন সকাল থেকেই আফিয়ার মনটা অদ্ভুত ভালো ছিল।
অনেকদিন পর সে নিজের ভেতর একটা পুরোনো অনুভূতি ফিরে পেয়েছিল—আশা।
অর্ণবের সঙ্গে গত কয়েক মাসে অনেক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কথা হয়, কিন্তু প্রয়োজনের বাইরে নয়। একই বাড়িতে থেকেও দুজনের জীবন যেন আলাদা পথে চলছে।
তবু আফিয়া হাল ছাড়েনি।
কারণ সে জানত, অর্ণব তাকে ভালোবাসে।
সমস্যা শুধু একটাই—
তারা দুজনেই সেই ভালোবাসার জন্য সময় বের করতে পারছে না।
তাই আজ সে শেষবারের মতো চেষ্টা করতে চাইল।
সকালে অর্ণব নাশতা করছিল।
আফিয়া তার সামনে এসে দাঁড়াল।
— আজকে সন্ধ্যায় তুমি ফ্রি?
অর্ণব কফির কাপ নামিয়ে বলল,
— কেন?
— তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাব।
অর্ণব একটু অবাক হলো।
— আজ?
— হ্যাঁ, আজ।
— কোথায়?
আফিয়া মুচকি হাসল।
— সেটা বলব না।
অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— ঠিক আছে।
আফিয়ার মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
— সত্যি?
— সত্যি।
— কোনো অজুহাত নয়?
অর্ণব হেসে বলল,
— কোনো অজুহাত নয়।
আফিয়া তার হাতটা ধরে বলল,
— কথা?
— কথা।
সেদিন বিকেল থেকে আফিয়া প্রস্তুতি নিতে শুরু করল।
আলমারি খুলে অনেকক্ষণ পর সেই পোশাকটা বের করল, যেটা অর্ণব একবার বলেছিল তার ওপর খুব সুন্দর লাগে।
চুল ঠিক করল।
হালকা সাজল।
তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে মৃদু হাসল।
মনে হলো—
কতদিন পর সে আবার অর্ণবের জন্য সাজছে!
বিয়ের প্রথম দিকের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ল।
অর্ণবের অপেক্ষা।
তার রাগ।
তার দুষ্টুমি।
তাদের রাতের গল্প।
নদীর পাড়ে সেই রাত।
ডিভোর্সের কাগজ ছিঁড়ে অর্ণবকে জড়িয়ে ধরা।
সবকিছু একসঙ্গে মনে পড়তে লাগল।
আফিয়ার চোখে পানি এসে গেল।
সে নিজেকে বলল,
— আজকের পর আর কোনো অভিমান রাখব না।
আজ সে অর্ণবকে সব বলবে।
বলবে—
সে আবার নতুন করে সংসার করতে চায়।
বলবে—
তাদের সন্তান না থাকলেও সমস্যা নেই।
বলবে—
অর্ণব যত ব্যস্তই হোক, সে অপেক্ষা করবে।
শুধু মাঝে মাঝে তাকে একটু সময় দিতে হবে।
সন্ধ্যা সাতটা।
অর্ণব আসার কথা ছিল।
আফিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
সাড়ে সাতটা।
আটটা।
অর্ণব এল না।
সে ফোন করল।
ফোন বেজে কেটে গেল।
আবার করল।
এবারও কোনো উত্তর নেই।
আফিয়া নিজেকে বোঝাল,
“হয়তো হাসপাতাল থেকে বের হতে পারেনি।”
আটটা ত্রিশ।
নয়টা।
বৃষ্টি শুরু হলো।
আফিয়া জানালার পাশে বসে রইল।
তারপর অর্ণবকে একটা মেসেজ পাঠাল—
“আমি অপেক্ষা করছি।”
কোনো উত্তর এল না।
রাত দশটা।
আফিয়ার চোখের সাজ নষ্ট হয়ে গেছে।
সে এখনও পোশাক বদলায়নি।
টেবিলে দুজনের জন্য খাবার রাখা।
ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে।
অর্ণবের কোনো খবর নেই।
অবশেষে রাত এগারোটার দিকে ফোন এল।
অর্ণব।
আফিয়া তাড়াতাড়ি ফোন ধরল।
— কোথায় তুমি?
ওপাশে অর্ণবের কণ্ঠ খুব ক্লান্ত।
— হাসপাতালে।
আফিয়ার চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
— আজও?
— একটা রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। অপারেশন করতে হয়েছে।
— তুমি আসবে?
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
— আজ সম্ভব হবে না।
আফিয়া আর কিছু বলল না।
— আফিয়া?
সে খুব আস্তে বলল,
— ঠিক আছে।
— আমি সত্যিই দুঃখিত।
— তুমি তো দুঃখিতই।
— কী?
— কিছু না।
ফোন কেটে দিল আফিয়া।
সেদিন রাতে সে অনেকক্ষণ বসে ছিল।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে আয়নার সামনে গেল।
নিজের দিকে তাকিয়ে রইল।
মুখে কোনো অভিমান নেই।
শুধু ক্লান্তি।
সে খুব আস্তে বলল,
— আমি আর পারছি না।
তারপর বিয়ের ছবিটা হাতে নিল।
ছবিতে অর্ণব হাসছে।
আফিয়ার চোখে পানি চলে এল।
— তুমি জানো, আমি তোমাকে কতবার বেছে নিয়েছি?
সে ছবিটা বুকে চেপে ধরল।
— কিন্তু তুমি কি একবারও আমাকে বেছে নিয়েছ?
পরদিন সকালে অর্ণব বাসায় ফিরল।
দরজা খুলে দেখল ঘর অস্বাভাবিক নীরব।
— আফিয়া?
কোনো উত্তর নেই।
টেবিলের ওপর একটা খাম রাখা।
অর্ণব খামটা হাতে নিল।
ভেতরে কাগজ।
তার বুকটা ধক করে উঠল।
সে কাগজ খুলে পড়ল।
ডিভোর্সের কাগজ।
অর্ণবের হাত কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত আফিয়াকে ফোন করল।
ফোন বন্ধ।
আলমারি খুলল।
আফিয়ার বেশিরভাগ জিনিস নেই।
শুধু একটা পুরোনো ছবি পড়ে আছে।
তাদের বিয়ের ছবি।
অর্ণব ছবিটা হাতে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।
— তুমি সত্যিই চলে গেলে?
কেউ উত্তর দিল না।
কয়েক ঘণ্টা পর আইনজীবীর অফিসে তারা আবার মুখোমুখি হলো।
আফিয়া চুপচাপ বসে ছিল।
অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুমি নিশ্চিত?
আফিয়া চোখ তুলে তাকাল।
চোখ দুটো লাল।
— না।
— তাহলে সই করছ কেন?
— কারণ আমি আর তোমার জীবনে বোঝা হতে চাই না।
অর্ণব কেঁপে উঠল।
— তুমি বোঝা?
আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— তোমার কাজের মাঝে আমি সবসময় একটা বাধা হয়ে দাঁড়াই।
— তুমি কখনো বাধা ছিলে না।
— কিন্তু আমি তোমার সময় চাই।
— আমি দেব।
— তুমি পারবে না।
অর্ণব চুপ করে গেল।
আফিয়া বলল,
— আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো।
তার গলা কেঁপে উঠল।
— কিন্তু তুমি আমাকে সময় দিতে পারো না।
অর্ণবের চোখে পানি।
— তাহলে কি ভালোবাসাটা এতটাই মূল্যহীন?
আফিয়া মাথা নাড়ল।
— না। তাই তো এত কষ্ট হচ্ছে।
দুজনেই কাগজে সই করল।
আবারও।
কিন্তু এবার আগের মতো কেউ কাগজ ছিঁড়ল না।
আফিয়া কাগজটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
অর্ণব চুপ করে বসে রইল।
তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটা আবার তার কাছ থেকে চলে গেল।
সন্ধ্যার পর অর্ণব গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
শহর পেরিয়ে।
রাস্তা পেরিয়ে।
শেষে সেই নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াল।
একই জায়গা।
যেখানে একবার আফিয়া এসে তাকে ফিরিয়ে নিয়েছিল।
অর্ণব নদীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
চোখের পানি থামছিল না।
— এবার তো সত্যিই শেষ হয়ে গেল...
সে মাটিতে বসে পড়ল।
দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল।
— আমি কেন তোমাকে সময় দিতে পারলাম না?
তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
— তুমি তো শুধু আমাকে চেয়েছিলে...
অর্ণব আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমি এত মানুষের জীবন বাঁচালাম। অথচ নিজের জীবনটাই বাঁচাতে পারলাম না।
নদীর বাতাস তার চোখের পানি মুছে দিল।
কিন্তু বুকের কষ্ট মুছল না।
অন্যদিকে আফিয়া গাড়িতে বসে ছিল।
সে বারবার অর্ণবের ফোন নম্বরের দিকে তাকাচ্ছিল।
কল করবে?
করবে না?
অবশেষে ফোনটা হাতে নিল।
তারপর আবার রেখে দিল।
হঠাৎ তার মনে পড়ল—
নদীর পাড়।
সেই রাত।
অর্ণবের কান্না।
তার নিজের দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরা।
আফিয়ার বুক কেঁপে উঠল।
সে গাড়ি ঘুরিয়ে দিল।
অনেকক্ষণ খোঁজার পর অবশেষে সে নদীর পাড়ে পৌঁছাল।
গাড়ি থামিয়ে দ্রুত নেমে গেল।
চারপাশ অন্ধকার।
দূরে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
আফিয়ার বুক ধক করে উঠল।
সে দৌড়াতে শুরু করল।
— অর্ণব!
অর্ণব শুনেও নড়ল না।
আফিয়া আরও জোরে ডাকল,
— অর্ণব!
এবার অর্ণব ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।
দুজনের চোখ মিলল।
আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে তার দিকে এগিয়ে এল।
— তুমি আবার এখানে এসেছ?
অর্ণব কিছু বলল না।
আফিয়া বলল,
— তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাব?
অর্ণব চোখ মুছে বলল,
— এবার তো কাগজে সই করেছ।
আফিয়া তার হাতে থাকা ডিভোর্সের কাগজটা তুলে ধরল।
— এইটার কথা বলছ?
অর্ণব তাকিয়ে রইল।
আফিয়া কাগজটা দুই হাতে ধরল।
তারপর—
ছিঁড়ে ফেলল।
একবার।
দুবার।
তারপর টুকরো টুকরো করে নদীর বাতাসে ছুড়ে দিল।
অর্ণব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমি পারব না।
অর্ণবের ঠোঁট কাঁপল।
— কী পারবে না?
— তোমাকে ছাড়া থাকতে।
তারপর আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না।
দৌড়ে গিয়ে অর্ণবকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
অর্ণব প্রথমে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
তারপর দুহাত দিয়ে আফিয়াকে জড়িয়ে ধরল।
দুজনেই কাঁদছিল।
অনেকক্ষণ।
আফিয়া অর্ণবের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে বলল,
— তুমি আমাকে সময় দাওনি বলে আমি তোমাকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম।
অর্ণব তার মাথায় হাত রেখে বলল,
— আর তুমি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলে, তোমাকে ছাড়া আমার সময়ের কোনো মূল্য নেই।
আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আর কখনো আমাকে একা করে দিও না।
— দেব না।
— কাজের জন্য হলেও?
— কাজ থাকবে।
— তাহলে?
অর্ণব তার চোখের পানি মুছে বলল,
— কিন্তু তোমার জন্যও সময় থাকবে।
আফিয়া তার বুকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
— আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।
অর্ণব চোখ বন্ধ করে বলল,
— আমিও। প্রথম দিন থেকে।
আফিয়া একটু সরে এসে অবাক হয়ে তাকাল।
— প্রথম দিন থেকে?
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
— যেদিন তুমি আমাকে বলেছিলে, “রাগলে আপনাকে বেশি সুন্দর লাগে।”
আফিয়া চোখের পানি মুছে হেসে ফেলল।
— আর তুমি আমাকে কত বকেছিলে!
— কারণ তখনই বুঝেছিলাম, এই মেয়েটা আমার শান্তি নষ্ট করবে।
— এখন?
অর্ণব তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
— এখন বুঝি, সেই অশান্তিটাই আমার সবচেয়ে দরকার ছিল।
নদীর ওপর দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল।
দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
পেছনে পড়ে রইল ডিভোর্সের ছেঁড়া কাগজ।
সামনে ছিল নতুন একটা সকাল।
হয়তো তাদের জীবনে সব সমস্যা শেষ হয়নি।
হয়তো কাজের চাপ আবার আসবে।
হয়তো অভিমান হবে।
হয়তো কোনো কোনো দিন আবার ঝগড়াও হবে।
কিন্তু এবার তারা জানে—
সম্পর্ক ভাঙার আগে কথা বলতে হয়।
অভিমান জমার আগে তা খুলে বলতে হয়।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
যে মানুষটাকে সত্যিই ভালোবাসা যায়, তাকে হারানোর আগে একবার হলেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে হয়।
অর্ণব আফিয়ার হাত ধরে বলল,
— চল, বাসায় যাই।
আফিয়া তার কাঁধে মাথা রাখল।
— হুম।
দুজন ধীরে ধীরে নদীর পাড় ছেড়ে হাঁটতে লাগল।
আর সেই রাতেই, বহু বছর পর, তাদের গল্পটা শেষ হলো না।
বরং—
আবার শুরু হলো।
....