বিয়ের আসরটা খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল।
চারপাশে আলো, ফুল আর মানুষের ব্যস্ততা। অথচ সেই সাজসজ্জার মাঝেও নেহার মনে হচ্ছিল, সে যেন একটা অচেনা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
তার পরনে লাল শাড়ি। কপালে ছোট্ট টিপ, হাতে মেহেদি। চোখের কোণে জমে থাকা পানি বারবার লুকানোর চেষ্টা করছিল সে।
আজ তার বিয়ে।
আয়ানের সঙ্গে।
আয়ান—শহরের পরিচিত ধনী পরিবারের ছেলে। নিজেদের ব্যবসা আছে, গাড়ি আছে, বিশাল বাড়ি আছে। আর নেহা? সাধারণ মধ্যবিত্তের চেয়েও একটু নিচে বলা যায় তাদের পরিবারকে। ছোট্ট একটা বাড়ি, বাবার সামান্য আয়, মায়ের সংসার চালানোর চিন্তা—এই নিয়েই তাদের জীবন।
এই বিয়েটা মূলত দুই পরিবারের সিদ্ধান্তে হয়েছে।
আয়ানের বাবা-মা নেহাকে পছন্দ করেছিলেন। নেহার বাবা-মাও ভেবেছিলেন, মেয়েটা ভালো পরিবারে যাবে। কিন্তু একটা বিষয় কেউ বুঝতে পারেনি—
আয়ান এই বিয়েটা কখনোই চায়নি।
তার জীবনে অন্য একজন ছিল।
মেহরিন।
শহরের অভিজাত পরিবারের মেয়ে। আয়ানের সঙ্গে তার কয়েক বছরের সম্পর্ক। আয়ান তাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল।
কিন্তু আয়ানের বাবা-মা মেহরিনকে পছন্দ করতেন না।
তাদের চোখে মেহরিন ছিল অহংকারী এবং স্বার্থপর।
তাই তারা ছেলের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে নেহাকে পছন্দ করে ফেলেছিলেন।
আয়ান অনেক চেষ্টা করেছিল বিয়েটা বন্ধ করার।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবারের চাপে তাকে রাজি হতে হয়েছিল।
বিয়ের মঞ্চে বসেও আয়ানের মুখে কোনো হাসি ছিল না।
কাজী যখন বললেন,
—কবুল?
আয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু গলায় বলল,
—কবুল।
নেহার বুকটা কেঁপে উঠল।
তারপর তার পালা।
—কবুল?
নেহা চোখ বন্ধ করে ধীরে বলল,
—কবুল।
তিনবার কবুল বলার সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনটা বদলে গেল।
কিন্তু সে জানত না, এই বিয়ের পর তাকে ভালোবাসার বদলে কতটা অবহেলা সহ্য করতে হবে।
বিয়ের রাত।
আয়ান ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করল।
নেহা বিছানার এক পাশে বসে ছিল।
আয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—তুমি নিশ্চয়ই অনেক খুশি?
নেহা অবাক হয়ে তাকাল।
—জি?
—ধনী পরিবারের বউ হতে পেরেছ। অভিনন্দন।
কথাটা শুনে নেহার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
—আমি এসবের জন্য বিয়ে করিনি।
আয়ান হেসে ফেলল।
—সবাই এটাই বলে।
—আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন।
—আমি তোমাকে বুঝতেই চাই না।
কথাটা বলে আয়ান আলমারি থেকে একটা ব্যাগ বের করল।
নেহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
—বাইরে।
—এখন?
—হ্যাঁ।
—আজ তো আমাদের—
আয়ান থামিয়ে দিল।
—নেহা, একটা কথা পরিষ্কার করে দিই। এই বিয়েটা আমার ইচ্ছায় হয়নি। তাই আমার কাছে স্বামী হওয়ার অভিনয় আশা করো না।
নেহা চুপ করে গেল।
আয়ান দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
সেদিন রাতে নেহা একা বসে ছিল।
তার চোখের পানি কেউ দেখেনি।
পরদিন সকাল থেকেই আয়ানের আচরণ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
নেহা নাশতা বানিয়েছিল।
আয়ান টেবিলে বসে খাবার মুখে দিয়েই ভ্রু কুঁচকে বলল,
—এটা কী রান্না করেছ?
—ভালো হয়নি?
—এটা খাবার?
নেহা চুপ করে গেল।
আয়ান প্লেট সরিয়ে উঠে দাঁড়াল।
—রান্না শিখে তারপর এসব করবে।
নেহা মাথা নিচু করে বলল,
—আমি চেষ্টা করব।
আয়ান কোনো উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ পর তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে মেহরিনের নাম দেখে আয়ানের মুখটা বদলে গেল।
যে মুখে এতক্ষণ বিরক্তি ছিল, সেখানে হঠাৎ হাসি ফুটে উঠল।
—হ্যালো, মেহরিন...
নেহা দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
আয়ান নরম গলায় কথা বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নেহা বুঝে গেল—
এই সংসারে তার জায়গাটা কতটা ছোট।
বিয়ের এক মাস কেটে গেল।
নেহা ধীরে ধীরে নতুন বাড়ির নিয়মকানুন বুঝে নিতে লাগল।
শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু আয়ানের আচরণে তাদেরও অস্বস্তি হতো।
আয়ান প্রায় প্রতিদিন রাত করে বাড়ি ফিরত।
কখনো বন্ধুদের সঙ্গে, কখনো ব্যবসার কাজে, আবার কখনো মেহরিনের সঙ্গে।
নেহা কিছু জিজ্ঞেস করত না।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়ার বদলে অপমানই জুটবে।
একদিন রাতে আয়ান প্রায় দুইটার দিকে বাড়ি ফিরল।
তার শরীর থেকে অ্যালকোহলের গন্ধ আসছিল।
নেহা দরজা খুলে দিল।
—আপনি এত রাতে?
আয়ান বিরক্ত হয়ে তাকাল।
—আমার সময়ের হিসাব দিতে হবে তোমাকে?
—না। আমি শুধু চিন্তা করছিলাম।
—আমার জন্য চিন্তা করার দরকার নেই।
আয়ান টলতে টলতে ঘরে ঢুকল।
নেহা তাকে ধরে বসাতে গেল।
—সাবধানে...
আয়ান হঠাৎ তার হাতটা ধরে ফেলল।
নেহা চমকে উঠল।
আয়ান তার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
নেশাগ্রস্ত চোখে আজকের আয়ানকে অন্যরকম লাগছিল।
—তুমি এত চুপচাপ কেন?
নেহা আস্তে বলল,
—আমি কী বলব?
আয়ান মৃদু হেসে বলল,
—কিছু বলো।
—আপনি শুনবেন?
আয়ান উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ পর সে নেহার কাঁধে মাথা রাখল।
নেহা স্থির হয়ে গেল।
এটা সেই মানুষটা নয়, যে প্রতিদিন তাকে কথা শুনিয়ে দেয়।
আজ আয়ান যেন ভীষণ ক্লান্ত।
নেহা ধীরে তার মাথায় হাত রাখল।
—ঘুমিয়ে পড়ুন।
আয়ান চোখ বন্ধ করে বলল,
—তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো?
নেহার চোখ ভিজে উঠল।
—না।
—কেন?
—জানি না।
আয়ান তার দিকে তাকাল।
কিছুক্ষণ দুজনের চোখাচোখি হলো।
সেই রাতে প্রথমবার তাদের দূরত্বটা একটু কমেছিল।
নেশার ঘোরে আয়ান নেহার হাত ধরে অনেকক্ষণ বসে ছিল। নেহাও তাকে সরিয়ে দেয়নি।
কিন্তু সকাল হতেই সব বদলে গেল।
আয়ানের ঘুম ভাঙতেই সে আগের মতো কঠিন হয়ে গেল।
—গত রাতে কিছু হয়েছে?
নেহা মাথা নিচু করল।
—আপনি মনে করতে পারছেন না?
আয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
—আমি নেশায় ছিলাম। এসব নিয়ে নাটক করো না।
নেহা চুপ করে গেল।
কিছুদিন পর সে জানতে পারল, আয়ান আবার মেহরিনের সঙ্গে দেখা করছে।
একদিন আয়ান মেহরিনকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে বসেছিল।
মেহরিন বলল,
—তুমি আমাকে ভুলে যাচ্ছ না তো?
আয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—কখনো না।
—তাহলে ওই মেয়েটার সঙ্গে সংসার করছ কেন?
আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—পরিবারের জন্য।
মেহরিন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—তাহলে ওকে সরাতে হবে।
আয়ান কিছু বলল না।
কিন্তু মেহরিনের চোখে তখন অন্যরকম একটা পরিকল্পনার ছায়া দেখা যাচ্ছিল।
এদিকে নেহা কয়েকদিন ধরে অসুস্থ বোধ করছিল।
সকালে খাবারের গন্ধ পেলেই বমি পেত।
শাশুড়ি বিষয়টা লক্ষ্য করলেন।
—নেহা, তোমার কি শরীর খারাপ?
—হয়তো একটু।
—ডাক্তার দেখানো দরকার।
নেহা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
সেদিনও আয়ান বাড়িতে ছিল না।
নেহা জানত না, তার জীবনে খুব শিগগিরই এমন একটা খবর আসতে চলেছে, যা আয়ানের পুরো পৃথিবীটাই বদলে দেবে।
পর্ব ৩ — নতুন খবর
ডাক্তারের চেম্বারে বসে নেহার হাত কাঁপছিল।
রিপোর্টটা হাতে নিয়ে ডাক্তার হাসলেন।
—অভিনন্দন।
নেহা কিছু বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল।
—কী হয়েছে?
—আপনি মা হতে চলেছেন।
কথাটা শুনে নেহার চোখ ভিজে উঠল।
তার ভেতরে যেন একসঙ্গে হাজারটা অনুভূতি জন্ম নিল।
সে মা হবে।
কিন্তু তার সন্তানের বাবা?
যে মানুষটা তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবেই মেনে নিতে পারেনি।
হাসপাতাল থেকে বের হয়ে নেহা প্রথমে মাকে ফোন করল।
মায়ের কণ্ঠ শুনেই সে কেঁদে ফেলল।
—মা...
—কী হয়েছে?
—আমি মা হতে চলেছি।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মায়ের কান্নামেশানো হাসি।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—আল্লাহ তোকে সুখী করুক মা।
নেহা চোখ মুছল।
সে ঠিক করল, আয়ানকে নিজেই বলবে।
সেদিন রাতে আয়ান বাড়ি ফিরতেই নেহা তার সামনে দাঁড়াল।
—আপনাকে একটা কথা বলব?
—বলো।
—আমি...
কথাটা বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে উঠল।
—আমি মা হতে চলেছি।
আয়ান স্থির হয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত সে কোনো কথা বলল না।
তারপর ধীরে বলল,
—কী?
—ডাক্তার বলেছেন।
আয়ান সোফায় বসে পড়ল।
তার চোখে বিস্ময়।
সে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
—তুমি নিশ্চিত?
নেহা রিপোর্ট এগিয়ে দিল।
আয়ান রিপোর্টটা হাতে নিল।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
সেদিন প্রথমবার তার চোখে নেহার জন্য রাগ ছিল না।
ছিল অন্য কিছু।
দায়িত্ববোধ?
ভয়?
নাকি এমন কোনো অনুভূতি, যার নাম সে নিজেই জানে না?
পরদিন থেকে আয়ানের আচরণে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল।
নেহা সকালে রান্নাঘরে গেলে আয়ান বলল,
—তুমি দাঁড়িয়ে এতক্ষণ কাজ করছ কেন?
নেহা অবাক।
—কাজ তো করতেই হবে।
—কাজের লোক আছে।
—আমি পারব।
আয়ান কঠিন গলায় বলল,
—আমি বলেছি না, বেশি কাজ করবে না।
নেহা চুপ করে গেল।
কয়েকদিন পর আয়ান নিজেই তাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেল।
গাড়িতে বসে নেহা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
আয়ান হঠাৎ বলল,
—ডাক্তারের কাছে নিয়মিত যেতে হবে।
নেহা তাকাল।
—আপনি যাবেন?
—হ্যাঁ।
—কাজ থাকে না?
—কাজ থাকবে। কিন্তু...
সে বাকিটা বলল না।
নেহার ঠোঁটের কোণে খুব ছোট্ট একটা হাসি ফুটল।
কিন্তু সেই পরিবর্তন খুব বেশি দিন শান্তিতে থাকতে দিল না মেহরিন।
মেহরিন বুঝতে পারছিল, আয়ান ধীরে ধীরে নেহার দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে।
একদিন সে আয়ানকে বলল,
—তুমি বদলে যাচ্ছ।
—কীভাবে?
—ওই মেয়েটার জন্য।
আয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
—নেহা আমার স্ত্রী।
মেহরিন ঠান্ডা গলায় বলল,
—কিন্তু তুমি তো তাকে কখনো স্ত্রী হিসেবে চাওনি।
আয়ান চুপ করে গেল।
মেহরিন বলল,
—তোমার সন্তানের মা হয়েছে বলেই কি সব ভুলে যাবে?
আয়ান এবার রেগে গেল।
—এই বিষয়ে আর কথা বলবে না।
মেহরিন বুঝল, সরাসরি কিছু করে লাভ হবে না।
তাকে অন্যভাবে খেলতে হবে।
সময় এগোতে লাগল।
আয়ানের পরিবর্তন এবার নেহার চোখেও স্পষ্ট।
সে আর রাত করে মাতাল হয়ে ফিরত না।
বাইরে যাওয়ার সময় নেহাকে জানাত।
নেহা খাবার খেয়েছে কি না, ডাক্তার কী বলেছেন—এসব জানতে চাইত।
একদিন অফিসে যাওয়ার আগে আয়ান টেবিলে একটা ছোট্ট প্যাকেট রাখল।
নেহা খুলে দেখল, একটা সুন্দর সাদা শাড়ি।
—এটা?
—তোমার জন্য।
নেহা অবাক হয়ে তাকাল।
—কেন?
—এমনিই।
—আপনি নিজে কিনেছেন?
আয়ান একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,
—হ্যাঁ।
নেহা হাসল।
—সুন্দর হয়েছে।
আয়ান কিছু না বলে চলে গেল।
কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে একবার পিছনে তাকাল।
নেহা তখন শাড়িটা হাতে নিয়ে হাসছিল।
সেই হাসিটা আয়ানের মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি তৈরি করল।
সে বুঝতে পারছিল না, কখন নেহার উপস্থিতি তার কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল।
এক রাতে নেহার প্রচণ্ড মাথাব্যথা হলো।
আয়ান তখন অফিসের কাজ করছিল।
নেহা কিছু বলতে চাইছিল না।
কিন্তু হঠাৎ আয়ানের চোখে পড়ে গেল তার মুখের অবস্থা।
—তোমার কী হয়েছে?
—কিছু না।
—মিথ্যা বলছ।
আয়ান উঠে এসে তার পাশে বসল।
—মাথা ব্যথা?
নেহা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
আয়ান নিজে পানি এনে দিল।
তারপর ডাক্তারকে ফোন করল।
নেহা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল।
—আপনি এত চিন্তা করছেন কেন?
আয়ান থেমে গেল।
—তুমি আমার স্ত্রী।
কথাটা খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু নেহার কাছে সেটা অনেক বড় কিছু।
কারণ এই প্রথম আয়ান তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে স্বীকার করল।
রাতের একসময় নেহা ঘুমিয়ে পড়ল।
আয়ান পাশে বসে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে পড়ে গেল প্রথম রাতের কথা।
সে নেহাকে কতটা কষ্ট দিয়েছিল।
কতবার অপমান করেছিল।
কতবার অন্য একজনের জন্য নিজের স্ত্রীকে একা রেখে গিয়েছিল।
আয়ানের বুকের ভেতর অপরাধবোধ জমতে লাগল।
সে ধীরে নেহার কপালের ওপর হাত রাখল।
—আমি তোমাকে এত কষ্ট কেন দিয়েছি?
ঘুমন্ত নেহা কোনো উত্তর দিল না।
পরদিন মেহরিন আবার আয়ানকে ফোন করল।
—আমার সঙ্গে দেখা করো।
—কেন?
—জরুরি কথা।
আয়ান যেতে চাইছিল না।
কিন্তু মেহরিন বারবার ফোন করায় শেষ পর্যন্ত গেল।
মেহরিন একটা ছবি দেখাল।
ছবিটা ছিল নেহার।
তার সঙ্গে এক অপরিচিত পুরুষ দাঁড়িয়ে ছিল।
মেহরিন বলল,
—তুমি যাকে এত বিশ্বাস করতে শুরু করেছ, সে তোমার সঙ্গে কী করছে দেখো।
আয়ান ছবিটার দিকে তাকিয়ে রেগে গেল।
—এই লোকটা কে?
—আমি জানি না। তবে অনেকদিন ধরে ওদের যোগাযোগ আছে।
মেহরিন মিথ্যা বলছিল।
ছবিটা আসলে নেহার এক আত্মীয়ের সঙ্গে তোলা পুরোনো ছবি।
কিন্তু আয়ান সেটা জানত না।
তার চোখে আবার সন্দেহের ছায়া নেমে এল।
বাড়ি ফিরে আয়ানের আচরণ বদলে গেল।
নেহা বুঝতে পারছিল, কিছু একটা হয়েছে।
—আপনি এত চুপচাপ কেন?
—কিছু না।
—আপনার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে কিছু হয়েছে।
আয়ান তাকিয়ে বলল,
—ওই লোকটা কে?
নেহা কিছু বুঝতে পারল না।
—কোন লোক?
আয়ান ফোনে ছবিটা দেখাল।
নেহা দেখে অবাক হয়ে গেল।
—ও? উনি আমার মামাতো ভাই।
আয়ান থমকে গেল।
—মামাতো ভাই?
—হ্যাঁ। আপনি তো কখনো আমাদের বাড়িতে যাননি, তাই চিনবেন না।
আয়ান কিছু বলল না।
নেহা এবার বলল,
—আপনি আমাকে সন্দেহ করেছেন?
আয়ান চোখ সরিয়ে নিল।
—আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম।
নেহার চোখে পানি এসে গেল।
—আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন না।
আয়ান চুপ করে রইল।
নেহা ধীরে বলল,
—আমি এতদিন আপনার সবকিছু সহ্য করেছি। আপনার রাগ, অবহেলা, বাইরে অন্য কারও সঙ্গে সময় কাটানো—সব। কিন্তু আপনি যদি আমার চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন করেন, তাহলে আমি কীভাবে থাকব?
আয়ানের বুক কেঁপে উঠল।
সে বুঝতে পারল, সে আবার ভুল করেছে।
কিন্তু তার অহংকার তাকে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা চাইতে দিল না।
নেহা ঘরে চলে গেল।
সেদিন রাতে আয়ান অনেকক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।
ভেতর থেকে নেহার কান্নার শব্দ আসছিল।
তার নিজের ওপরই রাগ হচ্ছিল।
কয়েকদিন পর নেহার গর্ভাবস্থা কিছুটা জটিল হয়ে উঠল।
ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বললেন।
আয়ান এবার পুরোপুরি বদলে গেল।
নেহার ওষুধ থেকে শুরু করে খাবার—সবকিছুর খোঁজ সে নিজেই রাখত।
নেহা রাতে ঘুমালে আয়ান তার পাশে বসে থাকত।
একদিন নেহা ঘুমের মধ্যে বলল,
—আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না তো?
আয়ানের বুকটা ভার হয়ে গেল।
সে ধীরে বলল,
—না।
নেহা ঘুমের মধ্যেই তার হাতটা ধরে ফেলল।
আয়ান সেই হাত ছাড়ল না।
বরং নিজের হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখল।
সেই মুহূর্তে সে বুঝল—
মেহরিনকে সে হয়তো ভালোবেসেছিল।
কিন্তু নেহাকে হারানোর ভয়টা তার ভেতর এত গভীরে কেন?
মেহরিন দূর থেকে সব দেখছিল।
তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হচ্ছে।
তাই সে আরও বড় ফাঁদ পাতল।
সে আয়ানের কাছে এমন কিছু নথি পাঠাল, যেখানে দেখানো হলো নেহার বাবার ব্যবসায় আয়ানের বাবার কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছিল।
মেহরিন বলল,
—তোমার বিয়েটা আসলে পরিকল্পিত ছিল।
আয়ান অবাক হয়ে বলল,
—মানে?
—তোমার পরিবারকে ব্যবহার করে নেহার পরিবার তোমার সম্পত্তির কাছে যেতে চেয়েছে।
মিথ্যা কথাগুলো এত সুন্দরভাবে সাজানো ছিল যে আয়ানের মাথা ঘুরে গেল।
সে নেহাকে কিছু বলল না।
কিন্তু তার মনে আবার সন্দেহ ঢুকে গেল।
নেহা বুঝতে পারছিল, আয়ানের ভেতরে কিছু একটা চলছে।
তবে সে আর প্রশ্ন করছিল না।
কারণ এখন তার নিজের শরীর আর অনাগত সন্তানটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একদিন নেহার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
নেহা বাবাকে দেখতে যেতে চাইলে আয়ান প্রথমে না বলল।
—তোমার এখন বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না।
—বাবা অসুস্থ।
—আমি ডাক্তার পাঠিয়ে দেব।
—না। আমি বাবাকে দেখতে চাই।
আয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—ঠিক আছে। আমি নিয়ে যাব।
নেহা অবাক হলো।
আগের আয়ান হলে কখনোই এমন করত না।
তারা নেহার বাবার বাড়িতে গেল।
নেহার বাবা আয়ানকে দেখে বললেন,
—বাবা, আমার মেয়েটাকে কষ্ট দিও না।
আয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমি চেষ্টা করছি।
নেহার বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।
কারণ তিনি জানতেন, আয়ান আগে এমন কথা বলত না।
ফেরার পথে গাড়িতে নেহা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
আয়ান হঠাৎ বলল,
—তুমি তোমার বাবাকে খুব ভালোবাসো?
—হ্যাঁ।
—আমাকে?
নেহা চমকে তার দিকে তাকাল।
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল।
—এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।
নেহার মুখে লাজুক হাসি ফুটল।
সে উত্তর দিল না।
কিন্তু তার নীরবতাই যেন আয়ানকে একটা উত্তর দিয়ে দিল।
সেদিন রাতে আয়ান মেহরিনকে ফোন করল।
—আমার সঙ্গে আর দেখা করবে না।
মেহরিন স্তব্ধ।
—কী বলছ?
—আমার সংসার আছে।
—তাহলে এতদিন?
—ভুল করেছি।
—তুমি আমাকে ছেড়ে ওই মেয়েটার কাছে যাবে?
আয়ান শান্ত গলায় বলল,
—সে শুধু আমার সন্তানের মা নয়। সে আমার স্ত্রী।
মেহরিন রেগে ফোন কেটে দিল।
কিন্তু সে হার মানার মানুষ নয়।
সে এবার এমন একটা পরিকল্পনা করল, যাতে আয়ান নিজের চোখে নেহাকে দোষী ভাববে।
পরদিন রাতে আয়ান অফিসে যাওয়ার পর মেহরিন নেহার কাছে একটা খাম পাঠাল।
খামের ভেতরে ছিল কিছু ছবি এবং একটা চিঠি।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, আয়ান আর মেহরিন একসঙ্গে।
চিঠিতে লেখা—
“তোমার স্বামী এখনো আমাকে ভালোবাসে। তুমি তার জীবনে শুধু একটা বাধা।”
নেহা ছবিগুলো দেখে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল।
তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে জানত, ছবিগুলো পুরোনো হতে পারে।
কিন্তু তার বুকের ভেতরের ভয়টা আবার জেগে উঠল।
সে ভাবল—
হয়তো আয়ান সত্যিই তাকে কখনো ভালোবাসেনি।
নেহা আয়ানের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলল না।
আয়ান বাড়ি ফিরে দেখল, নেহা অস্বাভাবিক চুপচাপ।
—কী হয়েছে?
—কিছু না।
—তোমার চোখে পানি কেন?
নেহা মুখ ফিরিয়ে নিল।
—আমি ক্লান্ত।
আয়ান তার পাশে বসে বলল,
—আমার ওপর রাগ করেছ?
নেহা মাথা নেড়ে না বলল।
আয়ান তার হাত ধরতে গেল।
নেহা হাত সরিয়ে নিল।
আয়ান থমকে গেল।
—কী হয়েছে তোমার?
নেহা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে ছবিগুলো আয়ানের সামনে ছুড়ে দিল।
—আপনি এখনো তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন?
আয়ান ছবিগুলো দেখে হতভম্ব।
—এসব তোমাকে কে দিয়েছে?
—সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। সত্যি কি না সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
—এগুলো পুরোনো ছবি।
—তাহলে এতদিন আমাকে বলেননি কেন?
আয়ান চুপ করে গেল।
নেহা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আমি আপনার কাছে কখনো কিছু চাইনি। শুধু একটু সম্মান চেয়েছিলাম।
—নেহা...
—আপনি আমাকে বারবার কষ্ট দিয়েছেন। আমি ভেবেছিলাম আপনি বদলেছেন। কিন্তু হয়তো আমি ভুল ভেবেছি।
আয়ান এবার তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
—আমি ভুল করেছি। কিন্তু এখন আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
নেহা চোখ মুছে বলল,
—তাহলে আমাকে সত্যিটা বলুন।
আয়ান সব বলল।
মেহরিনের সঙ্গে তার পুরোনো সম্পর্ক, বিয়ের পরেও দেখা করা—সব।
নেহা শুনে নীরব হয়ে গেল।
তারপর বলল,
—আপনি আমাকে ভালোবাসেন?
আয়ান উত্তর দিতে পারল না।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর বলল,
—আমি জানি না কখন কীভাবে হলো। কিন্তু এখন তোমাকে ছাড়া আমার জীবন কল্পনা করতে পারি না।
নেহার চোখ ভিজে গেল।
সে মুখ ফিরিয়ে নিল।
আয়ান বলল,
—আমাকে একটা সুযোগ দাও।
নেহা কোনো উত্তর দিল না।
সেই রাতেই নেহার প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলো।
আয়ান আতঙ্কিত হয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
ডাক্তার বললেন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ তার জন্য ভালো নয়।
আয়ান হাসপাতালের করিডোরে বসে নিজের মাথায় হাত দিল।
সে বুঝল—
তার ভুলের জন্য নেহা এবং তার সন্তান দুজনেই কষ্ট পাচ্ছে।
সেদিন সে মেহরিনকে শেষবার ফোন করল।
—আমার জীবন থেকে বেরিয়ে যাও।
মেহরিন বলল,
—তুমি ভাবছ এত সহজে আমি হার মানব?
আয়ান উত্তর দিল,
—তুমি যা করার করো। আমি আর তোমার কাছে ফিরব না।
মেহরিন ঠান্ডা গলায় বলল,
—তাহলে তোমাকে এমন কিছু দেখাব, যা দেখার পর তোমার স্ত্রী নিজেই তোমাকে ছেড়ে যাবে।
আয়ান বুঝতে পারল—
বিপদ এখনো শেষ হয়নি।
মেহরিন এবার আয়ানের ব্যবসার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ জাল করে নেহার বাবার নামে তৈরি করল।
তারপর সেগুলো আয়ানের বাবার কাছে পাঠিয়ে দিল।
বাড়িতে তীব্র উত্তেজনা শুরু হলো।
আয়ানের বাবা নেহার বাবাকে ডেকে বললেন,
—আপনি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন?
নেহার বাবা হতভম্ব।
—আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
আয়ানও কাগজগুলো দেখে অবাক।
তার মনে আবার সন্দেহ ঢুকল।
কিন্তু এবার সে আগের মতো নেহাকে দোষ দিল না।
সে বলল,
—আগে সত্যিটা বের করতে হবে।
নেহা স্বামীর পাশে দাঁড়াল।
—আমি জানি, আমার বাবা এমন কিছু করতে পারেন না।
আয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি জানি।
এই একটা কথাই নেহার চোখে পানি এনে দিল।
কারণ আয়ান এবার তাকে বিশ্বাস করেছে।
আয়ান তার ব্যবসার লোকজনকে দিয়ে তদন্ত শুরু করল।
কয়েকদিনের মধ্যেই জানা গেল, কাগজগুলো ভুয়া।
কিন্তু কে বানিয়েছে?
সিসিটিভি ফুটেজ খুঁজতে গিয়ে তারা একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেল।
একজন লোক নিয়মিত মেহরিনের সঙ্গে যোগাযোগ করছিল।
আয়ানের সন্দেহ এবার নিশ্চিত হলো।
সে পুলিশে অভিযোগ না করে প্রথমে মেহরিনের মুখোমুখি হতে চাইল।
মেহরিন দেখা করতে রাজি হলো।
আয়ান বলল,
—কেন করছ এসব?
মেহরিন হেসে বলল,
—কারণ আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
—তুমি আমাকে হারাওনি। আমি তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি।
—ওই মেয়েটা তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।
আয়ান মাথা নেড়ে বলল,
—না। তুমি নিজেই আমাকে হারিয়েছ।
মেহরিনের চোখে রাগ জ্বলে উঠল।
—তাহলে তুমি সত্যিই তাকে ভালোবাসো?
আয়ান প্রথমবার কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল,
—হ্যাঁ।
মেহরিন স্তব্ধ হয়ে গেল।
আয়ান চলে আসতে চাইলে মেহরিন শেষ চেষ্টা করল।
—আমি তোমাকে একটা সত্যি বলব।
আয়ান থামল।
—নেহা যে সন্তান ধারণ করেছে...
মেহরিন কিছুক্ষণ থেমে বলল,
—ওটা তোমার সন্তান নয়।
আয়ানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—প্রমাণ আছে?
মেহরিন একটা নকল রিপোর্ট এগিয়ে দিল।
আয়ান রিপোর্টটা নিল।
তার চোখে আবার অন্ধকার নেমে এলো।
কিন্তু এবার সে কোনো সিদ্ধান্ত নিল না।
সে রিপোর্ট নিয়ে সরাসরি ডাক্তারের কাছে গেল।
ডাক্তার রিপোর্ট দেখে অবাক হয়ে বললেন,
—এই রিপোর্ট ভুয়া।
আয়ান যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাঁচল।
—আপনি নিশ্চিত?
—অবশ্যই।
ডাক্তার তাকে আসল রিপোর্ট দেখালেন।
সবকিছু স্বাভাবিক।
সন্তান তারই।
আয়ান হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সরাসরি নেহার কাছে গেল।
নেহা তখন জানালার পাশে বসে ছিল।
আয়ান কাছে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল।
—নেহা।
নেহা তাকাল।
আয়ানের চোখে আজ অন্যরকম কিছু।
—আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।
নেহা চুপ করে রইল।
আয়ান বলল,
—আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। তোমাকে ছোট করেছি। তোমার পরিবারের সামর্থ্য নিয়ে কথা বলেছি। তোমাকে একা রেখেছি। অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছি।
তার গলা কেঁপে উঠল।
—কিন্তু তুমি কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যাওনি।
নেহার চোখে পানি জমল।
আয়ান ধীরে বলল,
—আমি বুঝতে অনেক দেরি করেছি। তুমি আমার জীবনের দায়িত্ব নও, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষ।
নেহা চোখ নামিয়ে বলল,
—এখন এসব বলছেন কেন?
—কারণ আমি সত্যি বুঝেছি।
—যদি আবার বদলে যান?
আয়ান তার সামনে বসে বলল,
—তাহলে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেও। কিন্তু এবার আমাকে সুযোগ দাও প্রমাণ করার।
নেহা কিছু বলল না।
আয়ান তার হাতটা ধরল।
এইবার নেহা হাত সরিয়ে নিল না।
কিছুদিন পর মেহরিনের ষড়যন্ত্রের সব প্রমাণ বেরিয়ে এল।
জাল কাগজ, মিথ্যা রিপোর্ট, পুরোনো ছবি—সবকিছুর পেছনে তার হাত ছিল।
আয়ান তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিল।
মেহরিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেল।
নেহার গর্ভাবস্থার শেষ সময় এগিয়ে আসছিল।
আয়ান এখন প্রতিদিন তার পাশে থাকত।
রাতে নেহার ঘুম না এলে গল্প করত।
বাচ্চার জন্য ছোট ছোট জামাকাপড় কিনত।
একদিন আয়ান একটা ছোট্ট জুতো এনে নেহার হাতে দিল।
—কেমন?
নেহা হেসে বলল,
—খুব সুন্দর।
—আমাদের বাচ্চার জন্য।
নেহা তাকিয়ে রইল।
আয়ান বলল,
—আমি কি খুব দেরি করে ফেলেছি?
নেহা মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
আয়ান মাথা নিচু করল।
নেহা তার হাত ধরল।
—তবে পুরোপুরি দেরি হয়নি।
আয়ান তাকাল।
দুজনের চোখে পানি।
কিন্তু সেই পানিতে এবার কষ্টের চেয়ে স্বস্তিই বেশি ছিল।
কয়েক মাস পর।
সেদিন গভীর রাতে নেহার প্রসবব্যথা শুরু হলো।
আয়ান এতটাই ঘাবড়ে গেল যে কী করবে বুঝতে পারছিল না।
—নেহা, ভয় পেয়ো না।
নেহা ব্যথার মধ্যেও বলল,
—আপনিই তো ভয় পাচ্ছেন।
আয়ান হেসে ফেলল।
—আমি ভয় পাচ্ছি।
—কেন?
—তোমার কিছু হলে?
নেহা তার হাত চেপে ধরল।
—কিছু হবে না।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর আয়ান বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।
প্রতিটা মিনিট তার কাছে ঘণ্টার মতো লাগছিল।
অবশেষে ভেতর থেকে শিশুর কান্নার শব্দ শোনা গেল।
আয়ানের চোখে পানি চলে এলো।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন,
—অভিনন্দন। মা এবং সন্তান দুজনেই সুস্থ।
আয়ান চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।
তারপর ভেতরে ঢুকল।
নেহা ক্লান্ত হয়ে শুয়ে ছিল।
তার পাশে ছোট্ট একটা শিশু।
আয়ান বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
তার চোখ আটকে গেল সন্তানের মুখে।
তারপর নেহার দিকে তাকাল।
—ধন্যবাদ।
নেহা মৃদু হাসল।
—কিসের জন্য?
—আমাকে বাবা বানানোর জন্য।
নেহা বলল,
—আপনাকে মানুষ বানানোর জন্যও হয়তো।
আয়ান হেসে ফেলল।
—সেটার কৃতিত্ব তোমার।
নেহা শিশুটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—নাম কী রাখবেন?
আয়ান একটু ভেবে বলল,
—যে নামের অর্থ নতুন শুরু।
নেহা হাসল।
—তাহলে ঠিক আছে।
আয়ান নেহার হাত ধরে বলল,
—আমাদের জীবনটাও তো নতুন করে শুরু হয়েছে।
নেহা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটাকেই একসময় সে ভয় পেত।
যে মানুষটা তার রান্না নিয়ে সমালোচনা করত, তাকে অবহেলা করত, রাতের পর রাত বাইরে কাটাত, অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিল।
আজ সেই মানুষটাই তার পাশে বসে সন্তানের হাত ধরে আছে।
জীবন কখনো কখনো অদ্ভুতভাবে বদলে যায়।
এক বছর পর।
আয়ানের বাড়ির বাগানে নেহা বসে ছিল।
তাদের ছোট্ট সন্তান সামনে খেলছিল।
আয়ান অফিস থেকে ফিরে সরাসরি ছেলের কাছে গেল।
তারপর নেহার পাশে বসে বলল,
—আজ সারাদিন তোমাকে খুব মনে পড়েছে।
নেহা হেসে বলল,
—আগে তো মনে পড়ত না।
আয়ান মাথা নিচু করে বলল,
—আগে আমি বোকা ছিলাম।
—এখন?
—এখনও বোকা।
—কেন?
—কারণ এতদিন ধরে তোমার পাশে থেকেও বুঝতে পারিনি, তুমি আমার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
নেহা মৃদু হাসল।
আয়ান তার হাত ধরে বলল,
—একটা কথা বলব?
—বলুন।
—তোমাকে প্রথম দেখার দিন যদি জানতাম, এই মেয়েটাই একদিন আমার পুরো পৃথিবী হয়ে যাবে, তাহলে হয়তো তোমাকে এত কষ্ট দিতাম না।
নেহার চোখ ভিজে উঠল।
—সব কষ্ট কি ভুলে গেছেন?
আয়ান মাথা নেড়ে বলল,
—না। ভুলিনি। কারণ ওই কষ্টগুলোই আমাকে বুঝিয়েছে, তোমাকে হারানোর ভয় কতটা বড়।
নেহা কিছু বলল না।
শুধু তার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল।
দূরে তাদের সন্তান হাসছিল।
আয়ান আর নেহা পাশাপাশি বসে সেই হাসি দেখছিল।
একটা সময় যে বিয়েটা ছিল অনিচ্ছার,
যে সংসারে ছিল শুধু রাগ, অভিমান আর দূরত্ব,
সেই সংসারটাই একদিন হয়ে উঠল তাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
আয়ান নেহার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
—আমি তোমাকে ভালোবাসি।
নেহা মুচকি হেসে উত্তর দিল,
—এবার বিশ্বাস করতে পারি।
আয়ান তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
আর নেহা বুঝল—
কিছু সম্পর্ক শুরু হয় ভুল দিয়ে।
কিছু মানুষ ভালোবাসতে শেখে হারানোর ভয় থেকে।
আর কিছু সংসার ভেঙে যাওয়ার আগেই নিজেদের নতুন করে গড়ে নেয়।
তাদের গল্পটাও তেমনই ছিল।
অবহেলা থেকে যত্নে,
অভিমান থেকে বিশ্বাসে,
আর এক অসম্পূর্ণ সম্পর্ক থেকে—
একটা পূর্ণ সংসারে।
....