রাতের অন্ধকারে পাশে দাঁড়ানো

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।

শহরের ব্যস্ত রাস্তা অনেক আগেই ফাঁকা হয়ে গেছে। দু-একটা গাড়ি দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে, রাস্তার পাশের বাতিগুলো কুয়াশার মধ্যে অদ্ভুত হলুদ আলো ছড়াচ্ছে।

প্রিয়া দ্রুত পায়ে হাঁটছিল।

আজ অফিস থেকে বের হতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর ফোনের চার্জও শেষের দিকে। বারবার ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে সময় দেখছিল সে।

১১:৩৪।

প্রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— "আজও যদি বাসাটা মিস করি, তাহলে শেষ!"

হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে দিল সে।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা গাড়ির হেডলাইট এসে তার চোখ ধাঁধিয়ে দিল।

প্রিয়া রাস্তার একপাশে সরে দাঁড়াল।

কালো রঙের গাড়িটা তার পাশ দিয়ে না গিয়ে ঠিক তার সামনে এসে থামল।

প্রিয়া থমকে গেল।

গাড়ির কাঁচ ধীরে ধীরে নামল।

ভেতর থেকে একজন পুরুষের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—

— "এত রাতে একা কোথায় যাচ্ছেন?"

প্রিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

— "আপনাকে বলার প্রয়োজন মনে করছি না।"

লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— "আপনার ফোনটা বন্ধ।"

প্রিয়া চমকে উঠল।

— "আপনি জানলেন কীভাবে?"

লোকটা এবার গাড়ির দরজা খুলে নামল।

কালো শার্ট, গাঢ় রঙের প্যান্ট, এলোমেলো চুল। মুখে এমন এক ধরনের কঠোরতা, যা দেখলে সাধারণত কেউ দ্বিতীয়বার তাকানোর সাহস পায় না।

লোকটা ধীরে ধীরে প্রিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল।

— "কারণ গত দশ মিনিট ধরে আমি আপনাকে অনুসরণ করছি।"

প্রিয়ার বুক ধক করে উঠল।

— "কি?"

লোকটা পকেট থেকে একটা ফোন বের করল।

— "ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আমি আপনাকে অনুসরণ করছিলাম কারণ আপনার পেছনে আরেকজন ছিল।"

প্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে পেছনে তাকাল।

রাস্তা ফাঁকা।

কেউ নেই।

— "কোথায়?"

লোকটা এবার তার পাশ দিয়ে পেছনের অন্ধকার গলিটার দিকে তাকাল।

— "ছিল। এখন নেই।"

প্রিয়ার গলা শুকিয়ে গেল।

— "আপনি কে?"

লোকটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

— "নিশান।"

— "শুধু নিশান?"

— "আপনার জন্য আপাতত এতটুকুই যথেষ্ট।"

প্রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,

— "দেখুন, আপনি আমাকে অনুসরণ করেছেন, তারপর মাঝরাতে এসে ভয় দেখাচ্ছেন। আমি কিন্তু পুলিশে—"

কথাটা শেষ করার আগেই নিশান হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল।

— "পুলিশকে ফোন করতে পারেন।"

তারপর একটু ঝুঁকে নিচু গলায় বলল,

— "কিন্তু তার আগে আপনার ব্যাগটা খুলে দেখুন।"

প্রিয়া হতভম্ব হয়ে নিজের ব্যাগের দিকে তাকাল।

— "কেন?"

— "খুলুন।"

— "আপনি আমাকে আদেশ করার কে?"

নিশানের চোখে এবার অদ্ভুত একটা দৃষ্টি ফুটে উঠল।

— "যে মানুষটা জানে আপনার ব্যাগে এমন একটা জিনিস আছে, যেটার জন্য গত তিনদিন ধরে আপনাকে অনুসরণ করা হচ্ছে।"

প্রিয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে ধীরে ধীরে ব্যাগ খুলল।

ভেতরে ছিল একটা ছোট পার্স, কিছু কাগজ, কলম, একটা পানির বোতল আর অফিসের ফাইল।

হঠাৎ নিশানের চোখ একটা কালো খামের ওপর গিয়ে আটকে গেল।

প্রিয়া খামটা বের করল।

— "এটা তো আমার না।"

নিশান খামটা হাতে নিল।

খামটা খুলতেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।

ভেতরে একটা ছবি।

ছবিতে প্রিয়া নিজেই দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু ছবিটা তোলা হয়েছে তার বাড়ির সামনে থেকে।

ছবির পেছনে লেখা—

"তৃতীয় রাত শেষ হওয়ার আগেই মেয়েটাকে সরিয়ে দাও।"

প্রিয়ার হাত কাঁপতে শুরু করল।

— "এটা... এটা আমার ছবি!"

নিশান কোনো উত্তর দিল না।

সে ছবিটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল।

— "আপনি আজ রাতে আমার সঙ্গে যাবেন।"

প্রিয়া মাথা নাড়ল।

— "না।"

— "প্রিয়া, এখন জেদ করার সময় না।"

প্রিয়া থমকে গেল।

— "আপনি আমার নাম জানেন?"

নিশান তাকাল তার দিকে।

— "আপনার নাম, আপনার অফিস, আপনার বাসা—সব জানি।"

— "কেন?"

নিশান উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই দূর থেকে একটা বাইকের শব্দ শোনা গেল।

নিশান হঠাৎ প্রিয়ার হাত ধরে তাকে নিজের গাড়ির আড়ালে টেনে নিল।

— "চুপ।"

প্রিয়া তার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল।

— "ছাড়ুন!"

— "একদম চুপ।"

বাইকটা ধীরে ধীরে তাদের সামনে দিয়ে চলে গেল।

দুজনেই কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

প্রিয়া নিশানের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, লোকটা ভয় পাচ্ছে না।

বরং সে যেন এমন পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত।

বাইকটা চলে যাওয়ার পর নিশান তার হাত ছেড়ে দিল।

— "এখন বুঝতে পারছেন কেন আপনাকে নিয়ে যেতে চাইছি?"

প্রিয়া কিছু বলল না।

নিশান গাড়ির দরজা খুলে দিল।

— "উঠুন।"

প্রিয়া দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল।

— "আপনার ওপর আমি কেন বিশ্বাস করব?"

নিশান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,

— "বিশ্বাস করবেন না।"

প্রিয়া অবাক।

— "কি?"

— "আমাকে বিশ্বাস করার দরকার নেই। শুধু মনে রাখবেন, আজ রাতে আপনার সবচেয়ে বড় বিপদ আমি নই।"

সে একটু থামল।

— "আর সবচেয়ে বড় ভুল হবে আমাকে একা ছেড়ে চলে যাওয়া।"

প্রিয়া শেষ পর্যন্ত গাড়িতে উঠল।

গাড়ি ছুটতে শুরু করল।

কয়েক মিনিট পর প্রিয়া লক্ষ্য করল, নিশান বারবার রিয়ারভিউ মিররে তাকাচ্ছে।

— "কেউ আমাদের অনুসরণ করছে?"

নিশান উত্তর দিল না।

প্রিয়া আবার জিজ্ঞেস করল,

— "নিশান?"

এবার সে বলল,

— "হ্যাঁ।"

প্রিয়ার বুক কেঁপে উঠল।

— "কে?"

নিশান গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল।

— "যে মানুষটা তিন বছর আগে আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছিল।"

প্রিয়া চুপ হয়ে গেল।

তারপর ধীরে বলল,

— "সে আপনাকে কেন অনুসরণ করছে?"

নিশানের চোখ শক্ত হয়ে গেল।

— "কারণ সে মনে করছে, আপনার কাছে তার হারানো একটা জিনিস আছে।"

— "কি জিনিস?"

নিশান এবার তার দিকে তাকাল।

মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য।

তারপর বলল—

— "সত্যি।"

গাড়ির ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।

কিন্তু প্রিয়ার মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—

নিশান আসলে কে?

আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—

তার জীবনের সঙ্গে নিশানের অতীতের সম্পর্ক কী?

বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

আর শহরের অন্য প্রান্তে, অন্ধকার একটা ঘরে বসে কেউ একজন ফোনের স্ক্রিনে নিশানের গাড়ির ছবি দেখছিল।

লোকটা ঠান্ডা গলায় বলল,

— "মেয়েটাকে নিশানের কাছ থেকে আলাদা করো।"

ওপাশ থেকে প্রশ্ন এল,

— "আর নিশান?"

লোকটা মৃদু হেসে বলল,

— "ওকে বাঁচতে দাও।"

একটু থেমে সে বলল,

— "কারণ এবার ও নিজেই নিজের কবর খুঁড়বে।"

বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে।

নিশানের গাড়ি শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে নির্জন একটা এলাকায় ঢুকে গেল। রাস্তার দুপাশে বড় বড় গাছ। মাঝেমধ্যে স্ট্রিটলাইটের আলো বৃষ্টির ফোঁটায় ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।

প্রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

তার মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন।

নিশান কে?

কেন তাকে অনুসরণ করছিল?

তার ব্যাগে সেই ছবি কে রেখেছিল?

আর সবচেয়ে বড় কথা—নিশানের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?

কিন্তু নিশান যেন কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মানুষ নয়।

গাড়ির ভেতর গত বিশ মিনিট ধরে একটাও কথা হয়নি।

শেষ পর্যন্ত প্রিয়াই নীরবতা ভাঙল।

— "আর কতদূর?"

নিশান সামনে তাকিয়েই বলল,

— "আর পাঁচ মিনিট।"

— "আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?"

— "আমার বাড়িতে।"

প্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।

— "আপনার বাড়িতে?"

— "হ্যাঁ।"

— "আমি সেখানে যাব না।"

নিশান এবার ধীরে তার দিকে তাকাল।

— "আপনি চাইলে এখনই গাড়ি থেকে নেমে যেতে পারেন।"

প্রিয়া জানালার বাইরে তাকাল।

বৃষ্টি আরও বেড়েছে।

চারপাশ সম্পূর্ণ অচেনা।

সে আবার নিশানের দিকে তাকাল।

নিশানের মুখে কোনো জোর নেই। কিন্তু চোখ দুটো এমন শান্ত যে, তার ওপর রাগ করাও কঠিন।

প্রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,

— "আপনি সবসময় এত রহস্য করে কথা বলেন?"

— "প্রয়োজন হলে।"

— "আর অপ্রয়োজনে?"

— "চুপ থাকি।"

প্রিয়া চোখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল।

— "অসহ্য মানুষ!"

নিশানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।

প্রিয়া সেটা দেখতে পেল না।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা বিশাল লোহার গেটের সামনে এসে থামল।

গেট খুলে গেল।

ভেতরে ঢুকতেই প্রিয়া অবাক হয়ে গেল।

বাড়িটা বিশাল।

চারপাশে বড় বাগান। সামনে পাথরের পথ। বাড়ির দেয়ালে কোনো অপ্রয়োজনীয় সাজসজ্জা নেই। সবকিছুই খুব পরিপাটি, কিন্তু অদ্ভুতভাবে নির্জন।

গাড়ি থামতেই নিশান নেমে গেল।

প্রিয়াও নামল।

দরজার সামনে এসে নিশান বলল,

— "ভেতরে যান।"

প্রিয়া চারদিকে তাকাল।

— "এখানে আর কেউ থাকে না?"

— "না।"

— "আপনি একা থাকেন?"

— "হ্যাঁ।"

— "পরিবার?"

নিশান থেমে গেল।

তার মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

— "ছিল।"

প্রিয়া আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

দুজন ভেতরে ঢুকল।

বাড়ির ভেতরটা আরও অদ্ভুত।

বড় ড্রয়িংরুম। দেয়ালে কয়েকটা ছবি। একটা বড় বুকশেলফ। আর একপাশে কালো কাঠের পিয়ানো।

প্রিয়া ধীরে ধীরে চারদিকে তাকাচ্ছিল।

হঠাৎ একটা ছবির সামনে তার চোখ আটকে গেল।

ছবিতে নিশান দাঁড়িয়ে আছে একজন বয়স্ক পুরুষের পাশে।

আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী।

প্রিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

মেয়েটাকে কোথায় যেন দেখেছে।

কিন্তু মনে করতে পারছে না।

নিশান পিছন থেকে বলল,

— "ওদিকে যাবেন না।"

প্রিয়া চমকে ঘুরে দাঁড়াল।

— "কেন?"

— "কারণ আমি বলেছি।"

— "আপনি সবকিছুতে নিষেধ করেন কেন?"

নিশান এগিয়ে এসে ছবিটার সামনে দাঁড়াল।

তার চোখ এবার ছবির মেয়েটার ওপর।

— "কিছু স্মৃতি থেকে দূরে থাকাই ভালো।"

প্রিয়া আস্তে বলল,

— "মেয়েটা কে?"

নিশান কোনো উত্তর দিল না।

— "আপনার স্ত্রী?"

নিশানের চোখ হঠাৎ কঠিন হয়ে গেল।

— "না।"

— "তাহলে?"

— "এটা আপনার জানার দরকার নেই।"

প্রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,

— "ঠিক আছে।"

সে ঘুরে চলে যেতে চাইছিল।

ঠিক তখনই নিশানের ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে একটা নাম দেখে তার মুখের ভাব বদলে গেল।

সে দ্রুত ফোনটা রিসিভ করল।

— "বল।"

ওপাশ থেকে কিছু একটা বলা হলো।

নিশান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— "কখন?"

আবার কিছু শোনার পর নিশানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

— "আমি আসছি।"

ফোন কেটে দিল।

প্রিয়া জিজ্ঞেস করল,

— "কি হয়েছে?"

— "আপনি এই ঘরেই থাকবেন।"

— "কোথায় যাচ্ছেন?"

— "একটা কাজ আছে।"

— "আমাকে একা রেখে যাবেন?"

নিশান তার দিকে তাকাল।

— "দশ মিনিটের জন্য।"

— "আর যদি কেউ আসে?"

— "কেউ আসবে না।"

— "আপনি নিশ্চিত?"

নিশান এবার একটু কাছে এসে নিচু গলায় বলল,

— "আমি যতক্ষণ বেঁচে আছি, কেউ আপনার কাছে আসতে পারবে না।"

কথাটা শুনে প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

নিশান ঘুরে চলে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

প্রিয়া একা দাঁড়িয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর তার কৌতূহল আবার মাথা চাড়া দিল।

সে ধীরে ধীরে সেই ছবিটার কাছে গেল।

ছবিটা হাতে নেওয়ার পর পেছনে একটা ছোট লেখা দেখতে পেল।

"Nishan & Rima — 2019"

প্রিয়ার ভ্রু কুঁচকে গেল।

রিমা।

নামটা তার কাছে অদ্ভুত পরিচিত।

হঠাৎ তার মাথায় একটা স্মৃতি ঝলকে উঠল।

চার বছর আগে।

একটা হাসপাতাল।

একজন কাঁদতে থাকা নারী।

আর একটা নাম—

রিমা।

প্রিয়া চোখ বন্ধ করল।

কেন মনে পড়ছে না?

সে ছবিটা আবার জায়গায় রাখতে গিয়ে খেয়াল করল, ছবির ফ্রেমটা একটু নড়ছে।

কৌতূহলবশত ফ্রেমটা সরাতেই পেছনে একটা ছোট ধাতব বাক্স দেখা গেল।

প্রিয়া থমকে গেল।

বাক্সটা তালাবদ্ধ।

কিন্তু তার পাশে একটা ছোট চাবি রাখা।

সে কয়েক সেকেন্ড দ্বিধা করল।

তারপর চাবিটা তুলে তালায় ঢুকিয়ে দিল।

ক্লিক করে বাক্স খুলে গেল।

ভেতরে কিছু কাগজ, একটা পুরোনো পেনড্রাইভ আর কয়েকটা ছবি।

প্রিয়া প্রথম ছবিটা তুলল।

তারপর দ্বিতীয়টা।

তৃতীয় ছবিটা হাতে নিয়ে তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

ছবিতে সে নিজেই।

চার বছর আগের প্রিয়া।

হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

তার পাশে একজন বয়স্ক পুরুষ।

আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে—

নিশান।

প্রিয়ার হাত কেঁপে উঠল।

— "এটা কীভাবে সম্ভব?"

সে দ্রুত অন্য ছবিগুলো দেখতে লাগল।

সব ছবিই চার বছর আগের।

কোনোটাতে সে হাসপাতালে।

কোনোটাতে তার বাবা।

কোনোটাতে নিশান দূর থেকে তাদের দেখছে।

আর একটা ছবিতে—

তার বাবার সঙ্গে নিশানের তীব্র তর্ক হচ্ছে।

প্রিয়া অবিশ্বাসের চোখে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—

— "ওগুলো কে বলেছে দেখতে?"

প্রিয়া চমকে ঘুরে দাঁড়াল।

দরজার সামনে নিশান দাঁড়িয়ে।

তার চোখে এমন একটা রাগ, যা প্রিয়া আগে কখনো দেখেনি।

প্রিয়া পিছিয়ে গেল।

— "আপনি... এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন?"

নিশান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

— "আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম।"

প্রিয়া হতভম্ব।

— "আমি শুধু—"

— "বাক্সটা বন্ধ করো।"

— "কিন্তু এই ছবিগুলোতে আমি কেন?"

নিশান থেমে গেল।

প্রিয়া এবার জোরে বলল,

— "আপনি আমাকে আগে থেকেই চিনতেন, তাই না?"

নিশান চুপ।

— "চার বছর আগে আপনি আমার বাবার সঙ্গে দেখা করেছিলেন?"

চুপ।

— "রিমা কে?"

নিশানের চোখে এবার কষ্টের ছায়া ফুটে উঠল।

প্রিয়া বুঝতে পারল, নামটা তার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সে আবার বলল,

— "আমাকে সত্যিটা বলুন।"

নিশান ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

— "তুমি সত্যিটা জানলে আমাকে ঘৃণা করবে।"

প্রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

— "আর না জানলে?"

নিশান তাকিয়ে রইল।

— "তাহলে হয়তো তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে।"

— "আমি এখন আপনাকে বিশ্বাসই করি না।"

কথাটা শুনে নিশানের চোখে একটা অদ্ভুত ব্যথা ফুটে উঠল।

সে ধীরে বাক্সটা তুলে নিল।

— "তোমার বাবা আমাকে একটা কাজ দিয়েছিলেন।"

প্রিয়া অবাক।

— "কী কাজ?"

নিশান উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির সব আলো নিভে গেল।

চারপাশ অন্ধকার।

প্রিয়া চমকে উঠল।

— "নিশান!"

কোনো উত্তর নেই।

হঠাৎ ওপরতলা থেকে একটা শব্দ হলো।

ধাম!

তারপর কাঁচ ভাঙার শব্দ।

প্রিয়া ভয়ে স্থির হয়ে গেল।

নিশানের কণ্ঠ অন্ধকারের মধ্যে শোনা গেল—

— "আমার কাছ থেকে একদম দূরে যেও না।"

কয়েক সেকেন্ড পর একটা ছায়া সিঁড়ির ওপর দিয়ে দৌড়ে গেল।

নিশান মুহূর্তের মধ্যে প্রিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল।

— "পেছনে থাকো।"

— "কে এসেছে?"

নিশান পকেট থেকে কিছু একটা বের করল।

তার চোখ তখন ভয়ংকর ঠান্ডা।

— "যে এতদিন শুধু আমাকে খুঁজছিল।"

সে সিঁড়ির দিকে তাকাল।

— "আজ প্রথমবার সে তোমার জন্য এসেছে।"

উপরতলা থেকে আবার পায়ের শব্দ।

একজন দৌড়ে নিচে নামতে শুরু করল।

নিশান প্রিয়াকে নিজের পেছনে সরিয়ে দিল।

কিন্তু লোকটা নিচে আসার আগেই হঠাৎ জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে বাইরে চলে গেল।

নিশান দৌড়ে জানালার কাছে গেল।

বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি।

কেউ নেই।

শুধু মাটিতে পড়ে আছে একটা ছোট কাগজ।

নিশান সেটা তুলে নিল।

কাগজে মাত্র এক লাইন লেখা—

"তুমি যাকে বাঁচাতে চাইছ, সে-ই তোমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।"

নিশান ধীরে ধীরে প্রিয়ার দিকে তাকাল।

প্রিয়া তখনও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে।

— "ওরা আমাকে কেন চায়?"

নিশান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,

— "কারণ তুমি শুধু প্রিয়া নও।"

প্রিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল।

— "মানে?"

নিশান উত্তর দিল না।

সে শুধু সেই পুরোনো ছবিটার দিকে তাকাল।

যেখানে চার বছর আগে প্রিয়া দাঁড়িয়ে ছিল তার বাবার পাশে।

আর ছবির পেছনে লেখা ছিল—

"যদি কিছু হয়ে যায়, মেয়েটাকে নিশানের কাছে পৌঁছে দিও।"

প্রিয়া ধীরে ধীরে ছবিটা হাতে নিল।

তার চোখ থেকে একটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

সে বুঝতে পারল—

নিশানের সঙ্গে তার পরিচয় আজ রাতে হয়নি।

তাদের গল্প শুরু হয়েছিল চার বছর আগেই।

আর সেই গল্পের মাঝখানে এমন একটা সত্যি লুকিয়ে আছে, যেটা জানার পর হয়তো তাদের দুজনের জীবনই বদলে যাবে।

সকালের আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছিল।

কিন্তু প্রিয়ার কাছে মনে হচ্ছিল, রাত এখনো শেষ হয়নি।

সারা রাত সে ঘুমাতে পারেনি।

বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই ছবিগুলো।

চার বছর আগের প্রিয়া।

তার বাবা।

নিশান।

আর সেই অচেনা মেয়ে—রিমা।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় ছিল, প্রিয়ার নিজেরই কিছু মনে নেই।

চার বছর আগের সেই সময়টা তার স্মৃতিতে যেন কুয়াশায় ঢাকা একটা জায়গা।

কিছু ঘটনা মনে আছে, কিছু একেবারেই নেই।

প্রিয়া বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে দাঁড়াল।

নিচে বাগানে নিশান দাঁড়িয়ে ছিল।

কালো টি-শার্ট পরে, হাতে কফির মগ। রাতের ঘটনার পরও তার মুখে কোনো ক্লান্তি নেই।

প্রিয়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

লোকটার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা তাকে একই সঙ্গে ভয়ও দেখায়, আবার অদ্ভুতভাবে টানেও।

সে নিজের মনকে ধমক দিল।

"এই মুহূর্তে এসব ভাবার সময় না।"

দরজায় হালকা শব্দ হলো।

নিশান ভেতরে ঢুকল।

হাতে একটা কাপ।

— "কফি।"

প্রিয়া কাপটা নিল না।

— "আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর চাই।"

— "জানি।"

— "চার বছর আগে কী হয়েছিল?"

নিশান চুপ করে রইল।

প্রিয়া এবার সরাসরি বলল,

— "আমার বাবার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী ছিল?"

নিশান জানালার দিকে তাকাল।

— "তোমার বাবা আমার সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন ছিলেন।"

— "ছিলেন?"

— "হ্যাঁ।"

— "আর রিমা?"

এই নামটা শুনতেই নিশানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

— "রিমা ছিল আমার বোন।"

প্রিয়া থমকে গেল।

— "আপনার... বোন?"

নিশান মাথা নেড়ে বলল,

— "ছোট বোন।"

প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

— "সে কোথায়?"

নিশানের হাতে থাকা কাপটা সামান্য কেঁপে উঠল।

— "মারা গেছে।"

প্রিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল।

— "কীভাবে?"

নিশান এবার তার দিকে তাকাল।

চোখে কোনো রাগ নেই।

শুধু গভীর ক্লান্তি।

— "চার বছর আগে।"

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

প্রিয়া আস্তে বসে পড়ল।

— "আর আমার বাবা?"

— "তোমার বাবা সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।"

প্রিয়া চমকে উঠল।

— "অসম্ভব!"

— "আমি জানতাম তুমি এটা বলবে।"

— "আমার বাবা কখনো কাউকে ক্ষতি করেননি।"

নিশান ধীরে বলল,

— "আমি একসময় আমিও তাই ভাবতাম।"

প্রিয়া মাথা নাড়ল।

— "আপনি মিথ্যা বলছেন।"

— "তোমার ইচ্ছে হলে আমাকে মিথ্যাবাদী ভাবতে পারো।"

— "তাহলে প্রমাণ দিন।"

নিশান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে একটা পুরোনো পেনড্রাইভ টেবিলের ওপর রাখল।

— "সব উত্তর এখানে আছে।"

প্রিয়া পেনড্রাইভটার দিকে তাকাল।

— "আপনি এতদিন এটা লুকিয়ে রেখেছিলেন কেন?"

— "কারণ সময় আসেনি।"

— "আর এখন?"

— "এখন যারা তোমাকে খুঁজছে, তারা জানে তুমি সত্যিটা জানো না।"

প্রিয়া পেনড্রাইভটা হাতে নিল।

— "এখানে কী আছে?"

— "তোমার বাবার শেষ রেকর্ডিং।"

প্রিয়ার বুক ধক করে উঠল।

— "আমার বাবার?"

নিশান মাথা নেড়ে বলল।

— "হ্যাঁ।"

কিছুক্ষণ পর তারা দুজন নিচের স্টাডি রুমে বসে ছিল।

নিশান ল্যাপটপ খুলে পেনড্রাইভ লাগাল।

একটা ভিডিও ফাইল দেখা গেল।

তারিখ—

১৭ আগস্ট, ২০২২।

প্রিয়ার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

ভিডিও চালু হলো।

স্ক্রিনে তার বাবা।

মুখে ক্লান্তি।

চোখে ভয়।

তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন—

— "যদি এই ভিডিওটা কখনো প্রিয়ার হাতে যায়, তাহলে বুঝতে হবে আমি আর বেঁচে নেই।"

প্রিয়ার চোখে পানি চলে এল।

— "বাবা..."

ভিডিওতে তার বাবা বলতে থাকলেন—

— "প্রিয়া, আমি তোমার কাছে অনেক কিছু লুকিয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে বাঁচানোর জন্যই লুকিয়েছি।"

প্রিয়া নিশানের দিকে তাকাল।

নিশান নীরবে বসে ছিল।

ভিডিও চলতে থাকল।

— "চার বছর আগে যে দুর্ঘটনায় রিমা মারা গিয়েছিল, সেটা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।"

প্রিয়ার শ্বাস আটকে গেল।

নিশানের চোখ বন্ধ হয়ে গেল।

তারপর স্ক্রিনে তার বাবা বললেন—

— "রিমাকে হত্যা করা হয়েছিল।"

প্রিয়া মুখে হাত দিল।

ভিডিওর পরের কথাগুলো আরও ভয়ংকর।

— "আমি জানতাম কারা এটা করেছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো প্রমাণ আমার কাছে ছিল না।"

একটু বিরতি।

— "নিশানকে আমি সব বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই..."

ভিডিও হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।

প্রিয়া চমকে উঠল।

— "কি হলো?"

নিশান স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

— "ফাইল শেষ।"

— "না। এটা অসম্পূর্ণ।"

— "জানি।"

প্রিয়া উঠে দাঁড়াল।

— "আপনি সব জানেন!"

— "সব না।"

— "তাহলে আমাকে বলুন!"

নিশানও উঠে দাঁড়াল।

— "আমি চার বছর ধরে সেই মানুষটাকে খুঁজছি।"

— "কাকে?"

— "রিমাকে যে মেরেছিল।"

প্রিয়ার চোখে পানি।

— "আর আমার বাবা?"

নিশান চুপ করে রইল।

— "আমার বাবা কি তাকে চিনতেন?"

— "হ্যাঁ।"

— "তাহলে তিনি আমাকে আপনার কাছে পাঠাতে চেয়েছিলেন কেন?"

নিশান কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

— "কারণ তোমার কাছে এমন একটা জিনিস আছে, যেটা তুমি নিজেই জানো না।"

প্রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

— "আমার কাছে?"

— "হ্যাঁ।"

— "কী?"

— "সেটাই এখনো জানি না।"

ঠিক তখনই নিশানের ফোন বেজে উঠল।

সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরল।

— "হ্যালো?"

ওপাশ থেকে একজন দ্রুত কিছু বলল।

নিশানের মুখের রং বদলে গেল।

— "কোথায়?"

আরেকটু শুনে সে বলল,

— "কেউ যেন তাকে ছুঁতেও না পারে। আমি আসছি।"

ফোন কেটে দিল।

প্রিয়া এগিয়ে এল।

— "কি হয়েছে?"

নিশান তাকাল তার দিকে।

— "তোমার বাড়িতে কেউ ঢুকেছে।"

প্রিয়ার বুক কেঁপে উঠল।

— "আমার মা?"

— "নিরাপদে আছেন।"

প্রিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

কিন্তু নিশান পরের কথাটা বলতেই তার বুক আবার কেঁপে উঠল।

— "তোমার ঘর থেকে একটা পুরোনো ডায়েরি পাওয়া গেছে।"

— "ডায়েরি?"

— "হ্যাঁ।"

— "কার?"

নিশান কিছু বলল না।

প্রিয়া তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, উত্তরটা ভালো কিছু নয়।

— "আমার?"

— "না।"

একটু থেমে নিশান বলল,

— "রিমার।"

এক ঘণ্টা পর তারা প্রিয়ার বাড়িতে পৌঁছাল।

বাড়ির সামনে দুজন নিরাপত্তাকর্মী দাঁড়িয়ে।

সবকিছু আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রিয়ার মনে হচ্ছিল, এই পরিচিত বাড়িটাই আজ অচেনা।

তার মা তাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন।

— "তুই ঠিক আছিস তো?"

প্রিয়া মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

— "আমি ভালো আছি।"

তারপর নিশানের দিকে তাকাল।

নিশান ইতিমধ্যে ঘরটা পরীক্ষা করছিল।

প্রিয়া তার মায়ের কাছে জানতে চাইল,

— "ডায়েরিটা কোথায়?"

মা কিছু বলার আগেই নিশান বলল,

— "আমার সঙ্গে আসুন।"

তারা প্রিয়ার ঘরে গেল।

বিছানার ওপর একটা পুরোনো বাদামি রঙের ডায়েরি রাখা।

প্রিয়া ধীরে সেটার কাছে গেল।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

"যদি নিশান কখনো এটা পড়ে, তাহলে তাকে বলো—আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে বিশ্বাস করেছিলাম।"

নিশানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

প্রিয়া তার দিকে তাকাল।

— "এটা রিমা আপনাকে লিখেছে?"

— "হ্যাঁ।"

পরের পাতায় একটা তারিখ।

১৬ আগস্ট, ২০২২।

রিমার লেখা—

"আজ আমি এমন একটা সত্যি জেনেছি, যেটা জানার পর আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এমনকি নিজের কাছের মানুষকেও না। নিশানকে সব বলতে চাই। কিন্তু ভয় হচ্ছে, ওকে বললে ওও বিপদে পড়বে।"

তারপর—

"কাল যদি আমার কিছু হয়, তাহলে প্রিয়ার কাছে পৌঁছাবে।"

প্রিয়া থমকে গেল।

— "আমার কাছে?"

নিশান ডায়েরিটা নিয়ে পরের পাতায় গেল।

সেখানে মাত্র একটা বাক্য—

"প্রিয়াই জানে না, সে কী দেখেছিল সেই রাতে।"

প্রিয়ার মাথা ঘুরে উঠল।

— "আমি?"

নিশান এবার তার দিকে তাকাল।

— "তুমি চার বছর আগে কী দেখেছিলে, সেটা তোমার মনে নেই।"

প্রিয়া চোখ বন্ধ করল।

হঠাৎ একটা অস্পষ্ট দৃশ্য ভেসে উঠল।

বৃষ্টি।

একটা গাড়ি।

রক্তাক্ত একজন নারী।

আর কেউ একজন তার হাত ধরে বলছে—

"প্রিয়া, যা দেখেছ কাউকে বলবে না।"

প্রিয়া হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল।

সে হাঁপাতে শুরু করেছে।

— "আমি... আমি মনে করতে পারছি।"

নিশান দ্রুত তার কাছে এগিয়ে এল।

— "কি দেখেছিলে?"

প্রিয়া কাঁপা গলায় বলল,

— "সেই রাতে..."

তারপর হঠাৎ থেমে গেল।

কারণ দরজার বাইরে একটা শব্দ হলো।

সবাই চুপ।

নিশান সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলে একজন নিরাপত্তাকর্মী ভেতরে ঢুকল।

— "স্যার, বাইরে একটা লোককে পাওয়া গেছে।"

নিশান বলল,

— "কোথায়?"

— "গেটের কাছে।"

— "কে?"

লোকটা নিচু গলায় বলল,

— "সে শুধু একটা কথা বলছে।"

নিশানের ভ্রু কুঁচকে গেল।

— "কি কথা?"

নিরাপত্তাকর্মী প্রিয়ার দিকে তাকাল।

তারপর বলল—

— "সে বলছে, 'নিশানকে বলুন, রিমা এখনো বেঁচে আছে।'"

ঘরের সবাই স্থির হয়ে গেল।

প্রিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

আর নিশানের চোখে প্রথমবারের মতো দেখা গেল—

ভয়।

সে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই বাইরে গুলির শব্দ হলো।

ধাম!

নিরাপত্তাকর্মী মাটিতে পড়ে গেল।

প্রিয়া চিৎকার করে উঠল।

নিশান মুহূর্তের মধ্যে তাকে নিজের বুকের আড়ালে নিয়ে নিচু হয়ে গেল।

বাইরে আবার গুলির শব্দ।

নিশান প্রিয়ার হাত শক্ত করে ধরে বলল—

— "এখন থেকে তুমি আমার কাছ থেকে এক পা দূরেও যাবে না।"

প্রিয়া কাঁপা গলায় বলল,

— "রিমা কি সত্যিই বেঁচে আছে?"

নিশান তার দিকে তাকাল।

কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলল না।

তারপর খুব ধীরে বলল—

— "আমি জানি না।"

সে জানালার দিকে তাকাল।

— "কিন্তু যদি সত্যিই বেঁচে থাকে..."

তার চোখে কঠিন আগুন জ্বলে উঠল।

— "তাহলে চার বছর ধরে আমি যাকে খুঁজছি, সে মানুষটা রিমাকে মেরে ফেলেনি।"

প্রিয়া ফিসফিস করে বলল,

— "তাহলে কে?"

নিশান উত্তর দিল না।

কারণ ঠিক তখনই প্রিয়ার ফোনে একটা মেসেজ এল।

অজানা নম্বর।

মাত্র তিনটি শব্দ—

"তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো।"

প্রিয়া কাঁপতে কাঁপতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

কিন্তু তার বাবা তো চার বছর আগেই মারা গেছেন।

তাহলে—

এই মেসেজটা কে পাঠাল?

প্রিয়ার হাত তখনও কাঁপছিল।

ফোনের স্ক্রিনে সেই তিনটি শব্দ জ্বলজ্বল করছে—

"তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো।"

বারবার মেসেজটা পড়েও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না সে।

তার বাবা মারা গেছেন চার বছর আগে।

তাহলে এই মেসেজ?

নিশান ধীরে ধীরে তার হাত থেকে ফোনটা নিল।

স্ক্রিনে নম্বরটা দেখেই তার মুখের ভাব বদলে গেল।

প্রিয়া লক্ষ্য করল।

— "নম্বরটা চেনেন?"

নিশান কোনো উত্তর দিল না।

— "নিশান, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি।"

সে এবার ফোনটা শক্ত করে ধরে বলল,

— "হ্যাঁ।"

— "কার?"

নিশান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— "তোমার বাবার।"

প্রিয়ার বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেল।

— "কি?"

— "এই নম্বরটা তোমার বাবার ছিল।"

প্রিয়া দ্রুত ফোনটা নিয়ে নিল।

— "অসম্ভব।"

— "আমি জানি।"

— "নম্বরটা তো চার বছর ধরে বন্ধ!"

— "হ্যাঁ।"

— "তাহলে মেসেজ এল কীভাবে?"

নিশান জানালার বাইরে তাকাল।

বাইরে তখনও বৃষ্টি।

তার চোখে এবার আগের সেই ঠান্ডা ভাব নেই।

বরং একটা অদ্ভুত অস্থিরতা।

— "এখন আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।"

প্রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

— "কোথায় যাব?"

— "আমার বাড়িতে।"

— "আবার?"

— "হ্যাঁ।"

— "কিন্তু এখানে আমার মা—"

— "তোমার মা আমাদের সঙ্গে যাবেন।"

প্রিয়া মায়ের দিকে তাকাল।

মা তখন সোফায় বসে কাঁদছেন।

— "কী হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।"

নিশান তার সামনে গিয়ে বসে নরম গলায় বলল,

— "আন্টি, আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে হবে।"

প্রিয়ার মা চোখ মুছলেন।

— "কি প্রশ্ন?"

— "চার বছর আগে রিমার মৃত্যুর রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?"

প্রিয়ার মা হঠাৎ থেমে গেলেন।

তার মুখের রং বদলে গেল।

প্রিয়া সেটা লক্ষ্য করল।

— "মা?"

মা কোনো উত্তর দিলেন না।

নিশান আবার বলল,

— "আন্টি, এখন সত্যিটা বলা খুব জরুরি।"

মা ধীরে মাথা তুললেন।

চোখে পানি।

— "তুমি যদি সত্যিটা জানতে চাও, তাহলে আগে একটা কথা মনে রেখো—প্রিয়াকে কখনো একা রেখো না।"

নিশান স্থির হয়ে গেল।

— "কেন?"

প্রিয়ার মা কাঁপা গলায় বললেন,

— "কারণ যারা ওকে খুঁজছে, তারা শুধু ওকে মারতে চায় না।"

একটু থেমে তিনি বললেন,

— "ওকে দিয়ে কিছু করাতে চায়।"

প্রিয়া হতভম্ব।

— "আমি কী করতে পারি?"

মা চোখ বন্ধ করলেন।

— "তুই জানিস না।"

— "কি জানি না?"

— "তোর স্মৃতি।"

প্রিয়া স্থির হয়ে গেল।

নিশান মায়ের দিকে তাকাল।

— "আপনি কি বলতে চাইছেন, প্রিয়ার স্মৃতির কিছু অংশ ইচ্ছা করে মুছে ফেলা হয়েছিল?"

মা ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,

— "হ্যাঁ।"

প্রিয়ার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

— "কেন?"

মা এবার তার দিকে তাকালেন।

— "কারণ তুই সেদিন সব দেখেছিলি।"

ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

নিশান ধীরে বলল,

— "কি দেখেছিল?"

প্রিয়ার মা উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে আবার একটা শব্দ হলো।

কেউ যেন জানালার কাঁচে কিছু ছুড়ে মেরেছে।

নিশান দ্রুত উঠে দাঁড়াল।

— "সবাই নিচু হন!"

কাঁচ ভেঙে একটা ছোট ধাতব বস্তু ঘরের ভেতর এসে পড়ল।

নিশান সেটা দেখে সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল।

— "গ্রেনেড!"

সে প্রিয়াকে টেনে মেঝেতে ফেলে দিল।

পরের মুহূর্তেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ।

ধাম!

ঘর কেঁপে উঠল।

প্রিয়ার কান ঝাঁঝরা হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ কিছুই শুনতে পেল না।

ধোঁয়ায় চারপাশ ঢেকে গেছে।

— "মা!"

সে উঠে দাঁড়াতে চাইতেই নিশান তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল।

— "নিচু হও!"

— "আমার মা!"

— "আমি দেখছি!"

নিশান ধোঁয়ার মধ্যে ছুটে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর সে প্রিয়ার মাকে ধরে নিয়ে এল।

মা আহত হয়েছেন, কিন্তু জ্ঞান আছে।

প্রিয়া তাকে জড়িয়ে ধরল।

— "মা!"

মা কষ্ট করে বললেন,

— "আমি ঠিক আছি।"

নিশান চারপাশ দেখল।

দরজা ভাঙা।

জানালা চূর্ণ।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—

বাড়ির ভেতরে কাউকে পাওয়া গেল না।

যে হামলা করেছে, সে যেন হাওয়ার মতো অদৃশ্য হয়ে গেছে।

রাত প্রায় দুইটা।

তারা নিশানের বাড়িতে ফিরে এসেছে।

প্রিয়ার মা অতিথি ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন।

প্রিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

তার মাথায় একের পর এক প্রশ্ন।

নিশান পাশে এসে দাঁড়াল।

— "ভয় পাচ্ছ?"

প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— "হ্যাঁ।"

নিশান অবাক হলো।

সম্ভবত সে ভেবেছিল প্রিয়া ভয় পাওয়ার কথা স্বীকার করবে না।

প্রিয়া ধীরে বলল,

— "কিন্তু নিজের জন্য না।"

নিশান তার দিকে তাকাল।

— "তাহলে?"

— "মায়ের জন্য।"

নিশান কিছু বলল না।

প্রিয়া এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— "আপনি এত কিছু কীভাবে সামলান?"

— "অভ্যাস হয়ে গেছে।"

— "মানুষের ভয় পাওয়ারও কি অভ্যাস হয়?"

নিশান হালকা হাসল।

— "হয়।"

— "আপনার?"

— "আমি ভয় পাই।"

প্রিয়া অবাক।

— "আপনি?"

— "হ্যাঁ।"

— "কিসের?"

নিশান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— "তোমাকে হারানোর।"

কথাটা শুনে প্রিয়া স্থির হয়ে গেল।

নিশানও যেন নিজের কথায় নিজেই থমকে গেল।

কয়েক মুহূর্ত দুজনের চোখে চোখ।

বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না।

প্রিয়া ধীরে চোখ নামিয়ে নিল।

তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি।

এত ভয়, এত রহস্য, এত বিপদের মাঝেও নিশানের পাশে দাঁড়ালে কেন যেন নিরাপদ লাগে?

সে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করল—

এটা শুধু কৃতজ্ঞতা।

এর বেশি কিছু না।

কিন্তু হৃদয় কি সবসময় যুক্তির কথা শোনে?

নিশান হঠাৎ বলল,

— "ঠান্ডা লাগছে?"

প্রিয়া মাথা নাড়ল।

— "না।"

— "মিথ্যা বলছ।"

সে নিজের জ্যাকেট খুলে প্রিয়ার কাঁধে দিয়ে দিল।

প্রিয়া কিছু বলল না।

নিশান একটু দূরে সরে গেল।

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।

সে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠ—

— "তুমি ভুল জায়গায় খুঁজছ।"

নিশান থমকে গেল।

— "কে?"

— "যে মেয়েটাকে তুমি এতদিন মৃত ভেবেছ, সে তোমার কাছেই আছে।"

নিশানের চোখ বড় হয়ে গেল।

— "রিমা?"

ওপাশ থেকে হালকা হাসি।

— "না।"

তারপর লাইন কেটে গেল।

নিশান ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রিয়া কাছে এসে বলল,

— "কে ছিল?"

নিশান উত্তর দেওয়ার আগেই তার চোখ পড়ল প্রিয়ার হাতে।

প্রিয়া নিজের অজান্তেই গলায় ঝোলানো ছোট লকেটটা ধরে রেখেছে।

নিশানের চোখ হঠাৎ সেই লকেটের ওপর আটকে গেল।

— "এটা তোমার কাছে কোথা থেকে এসেছে?"

প্রিয়া অবাক।

— "এটা?"

— "হ্যাঁ।"

— "মা দিয়েছিল। ছোটবেলা থেকে আছে।"

নিশান দ্রুত তার কাছে এসে লকেটটা হাতে নিল।

তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— "এটা তোমার কাছে কত বছর ধরে?"

— "জানি না।"

নিশান লকেটটা উল্টে দেখল।

পেছনে খুব ছোট করে খোদাই করা একটা সংখ্যা—

১৭০৮২২

নিশান যেন পাথর হয়ে গেল।

প্রিয়া জিজ্ঞেস করল,

— "কি হয়েছে?"

নিশান ধীরে বলল,

— "এই সংখ্যাটা আমি চিনি।"

— "কোথায় দেখেছেন?"

— "রিমার ডায়েরিতে।"

প্রিয়ার বুক কেঁপে উঠল।

— "মানে?"

নিশান লকেটটা শক্ত করে ধরে বলল,

— "রিমা মারা যাওয়ার আগের রাতে এই সংখ্যাটা লিখেছিল।"

প্রিয়া নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।

নিশান এবার লকেটটা খুলতে চেষ্টা করল।

প্রথমে কিছু হলো না।

তারপর হঠাৎ লকেটটা ক্লিক করে খুলে গেল।

ভেতরে কোনো ছবি নেই।

শুধু একটা ক্ষুদ্র মেমোরি কার্ড।

প্রিয়া অবাক হয়ে বলল,

— "এটা এখানে ছিল?"

নিশান কিছু বলল না।

সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের ল্যাপটপ নিয়ে এল।

মেমোরি কার্ড লাগাতেই একটা মাত্র ভিডিও ফাইল দেখা গেল।

নাম—

P_170822.mp4

প্রিয়া নিশানের পাশে এসে দাঁড়াল।

ভিডিও চালু হলো।

স্ক্রিনে চার বছর আগের একটা রাত।

বৃষ্টি পড়ছে।

ক্যামেরা কাঁপছে।

তারপর একজন নারী ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়াল।

প্রিয়া তাকে দেখেই নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।

মেয়েটার মুখ স্পষ্ট।

চোখে ভয়।

ঠোঁটে কাঁপুনি।

সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল—

— "নিশান, যদি তুমি এই ভিডিও দেখো, তাহলে বুঝবে আমি মারা যাইনি।"

নিশানের শরীর যেন জমে গেল।

প্রিয়া মুখে হাত দিল।

মেয়েটা আবার বলল—

— "কিন্তু একটা কথা মনে রেখো..."

ভিডিওতে হঠাৎ সে পেছনে তাকাল।

তারপর খুব নিচু গলায় বলল—

— "যে মানুষটাকে তুমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো, সে-ই আমাকে তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে।"

ভিডিও শেষ।

স্ক্রিন কালো।

ঘরে নিস্তব্ধতা।

প্রিয়া ধীরে নিশানের দিকে তাকাল।

— "রিমা বেঁচে আছে।"

নিশান কোনো উত্তর দিল না।

তার চোখে এবার রাগ, অবিশ্বাস আর কষ্ট একসঙ্গে।

কিন্তু ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির ব্রেকের শব্দ হলো।

নিশান জানালার দিকে তাকাল।

একটা কালো গাড়ি বাড়ির সামনে এসে থেমেছে।

গাড়ি থেকে একজন নারী নামল।

তার হাতে কালো ছাতা।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

সে ধীরে ধীরে বাড়ির দরজার দিকে এগিয়ে এল।

নিশান দরজার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল।

নারীটা দরজার সামনে এসে ছাতা বন্ধ করল।

তারপর মাথা তুলল।

প্রিয়া প্রথমবার তার মুখ দেখল।

আর নিশানের ঠোঁট থেকে শুধু একটা শব্দ বের হলো—

— "রিমা..."

নারীটা মৃদু হাসল।

কিন্তু তার পরের কথাটা শুনে প্রিয়ার বুক কেঁপে উঠল।

— "নিশান, তুমি এখনো একই রকম বোকা আছ।"

সে প্রিয়ার দিকে তাকাল।

তারপর বলল—

— "কারণ তুমি যাকে এতদিন বাঁচাতে চাইছ..."

একটু থেমে সে মৃদু হাসল।

— "সে-ই তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য।"

রিমার মুখটা দেখার পর নিশান যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিজের অস্তিত্বই ভুলে গেল।

চার বছর।

পুরো চার বছর ধরে সে যে মানুষটাকে মৃত ভেবে প্রতিদিন নিজের ভেতরে একটা অপরাধবোধ নিয়ে বেঁচে আছে, সেই মানুষটাই আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে।

রিমা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকল।

প্রিয়া নিশানের দিকে তাকাল।

নিশানের চোখে অবিশ্বাস।

রাগ।

কষ্ট।

আর এমন এক আবেগ, যেটা প্রিয়া আগে কখনো দেখেনি।

নিশান ধীরে বলল,

— "তুমি?"

রিমা হালকা হাসল।

— "হ্যাঁ, আমি।"

— "তুমি বেঁচে আছ?"

— "তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।"

নিশান কয়েক পা এগিয়ে গেল।

— "তাহলে এত বছর কোথায় ছিলে?"

রিমার হাসি মিলিয়ে গেল।

— "যেখানে তোমার শত্রুরা আমাকে রেখেছিল।"

— "কারা?"

রিমা কিছু বলল না।

নিশান তার কাঁধ ধরে বলল,

— "চার বছর ধরে আমি তোমাকে খুঁজেছি!"

রিমা শান্ত গলায় বলল,

— "আমি জানি।"

— "তুমি জানো?"

— "তোমার প্রতিটা পদক্ষেপ আমি জানতাম।"

নিশান যেন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।

— "তাহলে একবারও আমার কাছে আসোনি কেন?"

রিমা চোখ নামিয়ে বলল,

— "কারণ আমাকে বলা হয়েছিল, আমি যদি তোমার কাছে আসি, তাহলে তুমি মারা যাবে।"

ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

প্রিয়া দূর থেকে সবকিছু দেখছিল।

তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিশানের জীবনের এমন একটা অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার কোনো জায়গা নেই।

কিন্তু রিমা হঠাৎ তার দিকে তাকাল।

— "তুমি প্রিয়া?"

প্রিয়া ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

— "হ্যাঁ।"

রিমা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে অদ্ভুত একটা মায়া।

— "তোমাকে দেখলে তোমার মায়ের কথা মনে পড়ে।"

প্রিয়া অবাক।

— "আপনি আমার মাকে চিনতেন?"

রিমা উত্তর দিল না।

বরং নিশানের দিকে তাকিয়ে বলল,

— "তুমি এখনো ওকে সত্যিটা বলোনি?"

নিশান চুপ।

— "কী সত্যি?"

প্রিয়া এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করল।

রিমা নিশানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

— "ওকে জিজ্ঞেস করো।"

প্রিয়া নিশানের দিকে ফিরল।

— "কি সত্যি?"

নিশান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— "আমি জানি না।"

রিমা হেসে উঠল।

— "তুমি এখনো মিথ্যা বলতে পারো না, নিশান।"

নিশানের চোখ কঠিন হয়ে গেল।

— "তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।"

— "কোনটা?"

— "কে তোমাকে বন্দি করে রেখেছিল?"

রিমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— "একজন মানুষ।"

— "নাম?"

— "তুমি তার নাম জানো।"

— "কে?"

রিমা এবার প্রিয়ার দিকে তাকাল।

— "প্রিয়ার বাবা।"

প্রিয়ার শরীর যেন অবশ হয়ে গেল।

— "আমার বাবা?"

নিশানও হতভম্ব।

— "অসম্ভব।"

রিমা শান্তভাবে বলল,

— "অসম্ভব নয়।"

প্রিয়া মাথা নাড়ল।

— "না। আমার বাবা এমন করতে পারেন না।"

রিমা তার কাছে এসে দাঁড়াল।

— "আমি জানি তুমি বিশ্বাস করবে না। আমিও একসময় বিশ্বাস করিনি।"

— "তাহলে কেন?"

— "কারণ তোমার বাবা আমাকে মারতে চাননি।"

প্রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

— "তাহলে?"

রিমা ধীরে বলল,

— "তিনি আমাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।"

— "কাদের কাছ থেকে?"

রিমা নিশানের দিকে তাকাল।

— "ওদের কাছ থেকে।"

— "ওরা কারা?"

রিমা উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে একটা গাড়ির শব্দ হলো।

নিশান সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল।

সে জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দেখল।

রাস্তার ওপারে একটা সাদা গাড়ি দাঁড়িয়ে।

নিশান বলল,

— "আমরা এখানে নিরাপদ নই।"

রিমা মাথা নেড়ে বলল,

— "আমি জানতাম তারা আমাকে অনুসরণ করবে।"

নিশান তার দিকে তাকাল।

— "তুমি ইচ্ছা করে এখানে এসেছ?"

— "হ্যাঁ।"

— "কেন?"

রিমা প্রিয়ার দিকে তাকাল।

— "কারণ ওকে আজ রাতেই সত্যিটা জানতে হবে।"

প্রিয়ার বুক ধক করে উঠল।

— "কী সত্যি?"

রিমা ধীরে বলল,

— "চার বছর আগে যে রাতে আমার ওপর হামলা হয়েছিল, সেই রাতে তুমি সেখানে ছিলে।"

প্রিয়া চোখ বন্ধ করল।

মাথার ভেতর আবার সেই অস্পষ্ট দৃশ্য।

বৃষ্টি।

গাড়ি।

রক্ত।

কেউ তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

সে কাঁপা গলায় বলল,

— "আমি... একটা গাড়ি দেখেছিলাম।"

রিমা বলল,

— "আর?"

প্রিয়া চোখ বন্ধ রেখেই বলল,

— "একজন মানুষ ছিল।"

নিশান কাছে এসে দাঁড়াল।

— "কে?"

প্রিয়া মাথা চেপে ধরল।

— "আমি দেখতে পাচ্ছি না।"

রিমা বলল,

— "চেষ্টা করো।"

প্রিয়া হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।

— "থামুন!"

সে হাঁপাতে লাগল।

নিশান সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে ফেলল।

— "প্রিয়া!"

প্রিয়া চোখ খুলল।

তার চোখে পানি।

— "আমি পারছি না।"

নিশান তার কাঁধে হাত রেখে বলল,

— "তোমাকে এখনই মনে করতে হবে না।"

রিমা নিশানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

— "এই কারণেই তো তোমাকে ওর পাশে রেখেছিলাম।"

নিশান থমকে গেল।

— "তুমি?"

রিমা বলল,

— "হ্যাঁ।"

— "তুমি আমাকে প্রিয়ার কাছে পাঠিয়েছিলে?"

— "চার বছর আগে তোমার সঙ্গে ওর দেখা হওয়াটাও কাকতালীয় ছিল না।"

নিশানের চোখ বড় হয়ে গেল।

— "মানে?"

রিমা ধীরে বলল,

— "প্রিয়ার বাবা মৃত্যুর আগে আমাকে একটা কথা বলেছিলেন।"

— "কি?"

— "তিনি বলেছিলেন, 'নিশানকে প্রিয়ার কাছ থেকে দূরে রেখো না।'"

প্রিয়া অবাক হয়ে নিশানের দিকে তাকাল।

— "কেন?"

রিমা উত্তর দিল,

— "কারণ নিশানই একমাত্র মানুষ যে তোমাকে সত্যিটা জানার পরও রক্ষা করবে।"

নিশান কিছু বলতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই বাইরে গুলির শব্দ।

একটা জানালার কাঁচ ভেঙে গেল।

রিমা সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে ঝুঁকে পড়ল।

নিশান প্রিয়াকে টেনে নিজের দিকে নিয়ে নিল।

— "নিচু হও!"

আরেকটা গুলি দেয়ালে আঘাত করল।

নিশান রিমাকে বলল,

— "পেছনের দরজা!"

তিনজন দ্রুত বেরিয়ে গেল।

প্রিয়ার মা তখনও ওপরতলায়।

নিশান তাকে আনতে ফিরে যেতে চাইলে প্রিয়া তার হাত ধরে ফেলল।

— "না!"

— "আমার যেতে হবে।"

— "আপনি গেলে..."

প্রিয়া বাকিটা বলতে পারল না।

নিশান তার চোখের দিকে তাকাল।

— "আমি ফিরে আসব।"

প্রিয়া হাত ছেড়ে দিল।

নিশান আবার ভেতরে ঢুকে গেল।

কয়েক মুহূর্ত পর একটা বিস্ফোরণের শব্দ হলো।

প্রিয়া চিৎকার করে উঠল।

— "নিশান!"

রিমা তাকে ধরে রাখল।

— "ওকে বিশ্বাস করো।"

প্রিয়া চোখে পানি নিয়ে বলল,

— "যদি ও ফিরে না আসে?"

রিমা ধীরে বলল,

— "তাহলে আমি তোমাকে একটা কথা বলব।"

— "কি?"

— "তুমি ওকে যতটা ভাবছ, তার চেয়েও বেশি ভালোবাসো।"

প্রিয়া থমকে গেল।

— "আমি..."

রিমা মৃদু হাসল।

— "এই মুহূর্তে অস্বীকার করার দরকার নেই।"

প্রিয়া কিছু বলল না।

তার চোখ শুধু বাড়ির দরজায়।

কয়েক মিনিট পর দরজা খুলে গেল।

নিশান বেরিয়ে এল।

তার কপালে সামান্য রক্ত।

কিন্তু সে হাঁটছে।

প্রিয়া দৌড়ে তার কাছে গেল।

— "আপনি ঠিক আছেন?"

নিশান থমকে দাঁড়াল।

প্রিয়ার চোখে পানি দেখে তার মুখের কঠোরতা নরম হয়ে গেল।

— "আমি বলেছিলাম ফিরে আসব।"

প্রিয়া কিছু না বলে তাকে জড়িয়ে ধরল।

নিশানও কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।

তারপর ধীরে প্রিয়ার মাথায় হাত রাখল।

রিমা দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিল।

তার চোখে একটা অদ্ভুত হাসি।

কিন্তু সেই মুহূর্তেই তার ফোনে একটা মেসেজ এল।

সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

"তুমি ভুল করেছ, রিমা। মেয়েটাকে নিশানের কাছে পৌঁছে দিয়ে তুমি আমাদের কাজ সহজ করে দিয়েছ।"

রিমা দ্রুত ফোনটা বন্ধ করে ফেলল।

নিশান সেটা লক্ষ্য করল।

— "কি হয়েছে?"

— "কিছু না।"

— "রিমা।"

— "কিছু হয়নি বলেছি।"

নিশান তার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল।

ঠিক তখনই প্রিয়ার ফোনে আবার মেসেজ এল।

অজানা নম্বর।

একটা ছবি।

ছবিতে প্রিয়ার বাবা।

তার পাশে একজন মানুষ।

প্রিয়া ছবিটা দেখে জমে গেল।

কারণ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে সে চিনতে পারছে।

সে ধীরে ধীরে নিশানের দিকে তাকাল।

তার ঠোঁট কাঁপছে।

— "নিশান..."

— "কি?"

প্রিয়া ফোনটা তার হাতে দিল।

ছবিটা দেখে নিশানের মুখের সব রং চলে গেল।

কারণ ছবির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা—

নিশানের নিজের বাবা।

ছবির তারিখ—

১৭ আগস্ট, ২০২২।

রিমা ছবিটা দেখে চোখ বন্ধ করল।

— "এটাই সেই রাত।"

নিশান ফিসফিস করে বলল,

— "আমার বাবা তো সেদিন বিদেশে ছিলেন।"

রিমা ধীরে উত্তর দিল,

— "তুমি যেটা জানো, সেটা সত্যি নয়।"

নিশানের চোখে অবিশ্বাস।

— "তাহলে আমার বাবা কোথায় ছিলেন?"

রিমা এবার প্রিয়ার দিকে তাকাল।

— "এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তোমার বাবা জানেন না।"

একটু থেমে বলল,

— "তোমার বাবাও জানতেন।"

নিশান স্তব্ধ হয়ে গেল।

আর ঠিক তখনই অন্ধকার রাস্তার ওপাশ থেকে একজন লোক দূরবীন নামিয়ে ফোন করল।

— "স্যার, রিমা ফিরে এসেছে।"

ওপাশ থেকে ঠান্ডা কণ্ঠ—

— "আমি জানি।"

— "এখন কী করব?"

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর উত্তর এল—

— "প্রিয়াকে নিয়ে আসো।"

— "আর নিশান?"

ওপাশ থেকে হাসি শোনা গেল।

— "নিশানকে মেরে ফেলো না।"

একটু থেমে সে বলল—

— "ওকে এমন একটা সত্যি দেখাও, যাতে ও নিজেই প্রিয়াকে ছেড়ে চলে যায়।"

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি।

রাতের হামলার পর নিশানের বাড়িটা যেন যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হয়ে আছে। জানালার কাঁচ ভাঙা, দেয়ালে গুলির চিহ্ন, মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাচের টুকরো—সবকিছুই আগের কয়েক ঘণ্টার ভয়াবহতার সাক্ষী।

কিন্তু প্রিয়ার চোখ আটকে ছিল শুধু নিশানের দিকে।

সে একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

হাতে সেই পুরোনো ছবিটা।

ছবিতে তার বাবা আর নিশানের বাবা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

তারিখ—১৭ আগস্ট, ২০২২।

নিশানের চোখে তখন এমন এক শূন্যতা, যা প্রিয়া আগে কখনো দেখেনি।

প্রিয়া ধীরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

— "আপনি ঠিক আছেন?"

নিশান কোনো উত্তর দিল না।

— "নিশান?"

সে এবার বলল,

— "আমার বাবা আমাকে কখনো মিথ্যা বলেননি।"

প্রিয়া চুপ করে রইল।

— "অন্তত আমি তাই ভাবতাম।"

তার কণ্ঠে কষ্ট স্পষ্ট।

— "কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, আমি যেটাকে সত্যি ভেবে এত বছর বেঁচেছি, সেটা হয়তো একটা গল্প ছিল।"

প্রিয়া ধীরে বলল,

— "আপনার বাবার সঙ্গে আমার বাবার সম্পর্ক কী ছিল, সেটা বের করতে হবে।"

নিশান তার দিকে তাকাল।

— "তুমি কেন আমাকে সাহায্য করতে চাও?"

প্রিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

তারপর মৃদু গলায় বলল,

— "কারণ আপনি আমাকে সাহায্য করছেন।"

নিশান কিছু বলতে যাচ্ছিল।

প্রিয়া এবার চোখ নামিয়ে বলল,

— "আর... আমি চাই না আপনি একা সবকিছু সহ্য করেন।"

নিশান স্থির হয়ে গেল।

তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য কোমলতা ফুটে উঠল।

সে খুব আস্তে বলল,

— "তুমি জানো না, এই কথাটা আমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।"

প্রিয়া তার দিকে তাকাল।

কিন্তু ঠিক তখনই রিমা এসে দাঁড়াল।

— "আমাদের হাতে সময় নেই।"

নিশান সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবে ফিরে এল।

— "কি পেয়েছ?"

রিমা একটা পুরোনো খাম বের করল।

— "তোমার বাবার স্টোররুম থেকে।"

নিশান খামটা নিল।

ভেতরে একটা চিঠি।

চিঠির ওপরে লেখা—

"যেদিন নিশান সত্যিটা জানবে।"

নিশানের হাত কেঁপে উঠল।

সে চিঠি খুলল।

"নিশান,

তুই যদি এই চিঠিটা পড়িস, তার মানে আমি হয়তো আর নেই।

আমি জানি তুই আমাকে বিশ্বাস করিস। কিন্তু কিছু সত্যি আছে, যা একজন বাবাও নিজের ছেলেকে বলতে পারে না।

চার বছর আগে রিমার ঘটনা কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা ছিল না।

আমি আর প্রিয়ার বাবা এমন একটা বিষয় খুঁজে পেয়েছিলাম, যার সঙ্গে শহরের অনেক বড় মানুষ জড়িত।

রিমা সেটা জেনে ফেলেছিল।

তাকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ এসেছিল।

কিন্তু আমরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম।

যে রাতে সবকিছু ঘটেছিল, সেদিন প্রিয়াও সেখানে ছিল।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যি হলো—প্রিয়ার স্মৃতিতে যে অংশটা নেই, সেখানেই পুরো রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে।

নিশান, যদি তুই কখনো প্রিয়ার কাছে পৌঁছাস, তাকে রক্ষা করিস।

কারণ সে শুধু একজন নির্দোষ মেয়ে নয়।

সে সেই রাতের একমাত্র জীবিত সাক্ষী।"

চিঠিটা পড়ে নিশান স্থির হয়ে গেল।

প্রিয়া ফিসফিস করে বলল,

— "আমি... সাক্ষী?"

রিমা মাথা নেড়ে বলল,

— "হ্যাঁ।"

প্রিয়ার চোখে পানি এসে গেল।

— "তাহলে আমার স্মৃতি মুছে দেওয়া হয়েছিল?"

রিমা বলল,

— "পুরোপুরি না।"

— "মানে?"

— "তোমাকে একটা ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।"

প্রিয়া মাথা চেপে ধরল।

হঠাৎ একটা দৃশ্য তার মনে ভেসে উঠল।

হাসপাতালের সাদা ঘর।

একজন ডাক্তার।

তার বাবা পাশে দাঁড়িয়ে।

আর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিশান।

তখন সে অনেক ছোট।

কেউ একজন বলছে—

"মেয়েটা যদি সব মনে রাখে, ওকে বাঁচানো যাবে না।"

প্রিয়া হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল।

— "আমি মনে করতে পারছি!"

নিশান দ্রুত তার কাছে এগিয়ে এল।

— "কি দেখলে?"

প্রিয়া কাঁপা গলায় বলল,

— "আপনি ছিলেন।"

নিশান থমকে গেল।

— "আমি?"

— "হাসপাতালে।"

রিমা নিশানের দিকে তাকাল।

নিশানের মুখ ফ্যাকাশে।

— "আমি তো সেখানে ছিলাম না।"

প্রিয়া মাথা নাড়ল।

— "ছিলেন।"

— "অসম্ভব।"

— "আমি আপনাকে দেখেছি।"

নিশান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— "তাহলে চার বছর আগে আমার স্মৃতিও বদলানো হয়েছিল।"

রিমা ধীরে বলল,

— "এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।"

— "কেন?"

— "কারণ কেউ শুধু প্রিয়ার স্মৃতি মুছে দেয়নি।"

রিমা নিশানের দিকে তাকাল।

— "তোমারও কিছু স্মৃতি মুছে দেওয়া হয়েছিল।"

ঘরে নিস্তব্ধতা।

নিশান ধীরে বলল,

— "কে করতে পারে?"

রিমা উত্তর দিল,

— "যে তোমাদের দুজনকেই খুব কাছ থেকে চিনত।"

প্রিয়া জিজ্ঞেস করল,

— "কে?"

রিমা এবার কোনো উত্তর দিল না।

তার চোখ চলে গেল প্রিয়ার মায়ের দিকে।

প্রিয়া সেটা লক্ষ্য করল।

— "আপনি মায়ের দিকে তাকালেন কেন?"

রিমা চুপ।

প্রিয়া দ্রুত মায়ের কাছে গেল।

— "মা, তুমি কি কিছু জানো?"

তার মা মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

— "আমি কিছু জানি না।"

— "মিথ্যা বলো না।"

— "প্রিয়া..."

— "চার বছর আগে কী হয়েছিল?"

মা কাঁদতে শুরু করলেন।

— "তুই এসব ভুলে যা।"

— "আমি আর কিছু ভুলতে চাই না!"

প্রিয়া এবার চিৎকার করে উঠল।

— "আমার জীবন নিয়ে সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাকে কী মনে রাখতে হবে, কী ভুলতে হবে—সবাই ঠিক করেছে। এবার আমি নিজেই জানতে চাই!"

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

— "তুই যদি সত্যিটা জানতে চাস, তাহলে তোর বাবার পুরোনো অফিসে যেতে হবে।"

নিশান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— "কোথায়?"

মা একটা ঠিকানা বললেন।

তারপর যোগ করলেন,

— "কিন্তু সেখানে যেও না।"

নিশান তাকাল।

— "কেন?"

মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

— "কারণ চার বছর আগে ওই জায়গাতেই তোর বাবাকে শেষবার দেখেছিলাম।"

দুপুরের দিকে নিশান, প্রিয়া আর রিমা পুরোনো অফিসে পৌঁছাল।

বাড়িটা বহু বছর ধরে বন্ধ।

দরজায় মরিচা।

ভেতরে ধুলো।

সবকিছু পরিত্যক্ত।

নিশান দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল।

প্রিয়া চারদিকে তাকিয়ে বলল,

— "আমার বাবার অফিস এতদিন বন্ধ ছিল?"

— "হ্যাঁ।"

রিমা একটা ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

— "ওর ব্যক্তিগত রুম এখানে।"

দরজা খুলতেই একটা পুরোনো ডেস্ক দেখা গেল।

নিশান ড্রয়ারগুলো খুলতে শুরু করল।

কিছু ফাইল।

পুরোনো কাগজ।

একটা ক্যামেরা।

আর একটা কালো বাক্স।

বাক্সের ওপর লেখা—

P & N

প্রিয়া থমকে গেল।

— "P আর N?"

রিমা বলল,

— "Priya & Nishan."

নিশান তাকাল।

— "আমাদের নামে কেন?"

বাক্স খুলতেই একটা পুরোনো ভিডিও ক্যামেরা পাওয়া গেল।

ক্যামেরার ভেতরে একটা মেমোরি কার্ড।

নিশান ল্যাপটপে চালু করল।

স্ক্রিনে চার বছর আগের ভিডিও।

ক্যামেরার সামনে প্রিয়ার বাবা।

তার পাশে নিশানের বাবা।

দুজনেই খুব চিন্তিত।

প্রিয়ার বাবা বলছেন—

— "ওরা বুঝে গেছে আমরা প্রমাণ পেয়েছি।"

নিশানের বাবা বললেন,

— "তাহলে ছেলেমেয়েদের সরিয়ে দাও।"

প্রিয়ার বাবা বললেন,

— "প্রিয়াকে কোথায় পাঠাব?"

— "নিশানের কাছে।"

প্রিয়া নিশানের দিকে তাকাল।

ভিডিওতে তার বাবা আবার বললেন,

— "ওদের একসঙ্গে রাখলে বিপদ বাড়বে।"

নিশানের বাবা বললেন,

— "তাহলে আলাদা করো।"

হঠাৎ ভিডিও কেঁপে উঠল।

তারপর দরজা খোলার শব্দ।

দুজন পুরুষ একসঙ্গে পেছনে তাকাল।

ভিডিওতে একজন লোক ঘরে ঢুকল।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু তার কণ্ঠ পরিষ্কার।

— "আপনারা অনেক দেরি করে ফেলেছেন।"

প্রিয়া শ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

লোকটা বলল—

— "প্রমাণ কোথায়?"

প্রিয়ার বাবা বললেন,

— "নিরাপদ জায়গায়।"

লোকটা হেসে বলল,

— "তাহলে মেয়েটাকে নিয়ে আসুন।"

নিশানের বাবা জিজ্ঞেস করলেন,

— "কোন মেয়েটা?"

লোকটা বলল—

— "যে সেদিন সব দেখেছিল।"

ভিডিও হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।

প্রিয়া ফিসফিস করে বলল,

— "আমি..."

ঠিক তখনই পেছনের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

ধাম!

তিনজন ঘুরে দাঁড়াল।

দরজার সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে।

কালো পোশাক।

মুখ ঢাকা।

হাতে বন্দুক।

— "অবশেষে তোমরা জায়গাটা খুঁজে পেয়েছ।"

নিশান প্রিয়াকে নিজের পেছনে সরিয়ে দিল।

— "তুই কে?"

লোকটা হেসে বলল,

— "তুমি আমাকে চিনবে না। কারণ তোমার স্মৃতি থেকেও আমাকে মুছে দেওয়া হয়েছে।"

নিশানের চোখ সংকুচিত হলো।

— "প্রিয়াকে কেন চাও?"

লোকটা বলল,

— "প্রিয়াকে নয়।"

তার বন্দুকের নিশানা এবার রিমার দিকে।

— "আমরা চাই রিমা চুপ থাকুক।"

রিমা পিছিয়ে গেল।

নিশান বলল,

— "ওর কাছে যাবি না।"

লোকটা হেসে বলল,

— "নিশান, তুমি এখনো বুঝতে পারছ না।"

সে পকেট থেকে একটা ছবি বের করল।

ছবিটা মেঝেতে ছুড়ে দিল।

প্রিয়া ছবিটা তুলে নিল।

ছবিতে—

তার বাবা, নিশানের বাবা, রিমা...

আর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে—

প্রিয়ার মা।

কিন্তু ছবির সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় ছিল তারিখ।

১৭ আগস্ট, ২০২২।

প্রিয়া ধীরে মায়ের দিকে তাকাল।

তার মা সেখানে নেই।

রিমা নিঃশব্দ।

নিশানও ছবির দিকে তাকিয়ে স্থির।

লোকটা বলল—

— "এখন বুঝতে পারছ?"

প্রিয়া কাঁপা গলায় বলল,

— "আমার মা সেদিন এখানে ছিলেন?"

লোকটা মৃদু হাসল।

— "শুধু ছিলেন না।"

সে এক ধাপ এগিয়ে এল।

— "সেই রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা তিনিই নিয়েছিলেন।"

প্রিয়ার মাথা ঘুরে উঠল।

আর ঠিক তখনই বাইরে থেকে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

লোকটা জানালার দিকে তাকাল।

তারপর নিশানের দিকে তাকিয়ে বলল—

— "আজ তোমাদের কিছু করব না।"

সে হাসল।

— "কারণ এখন তোমাদের মধ্যে অবিশ্বাস শুরু হয়েছে।"

পরের মুহূর্তে ধোঁয়ার একটা বোমা ছুড়ে জানালা দিয়ে পালিয়ে গেল।

ধোঁয়ার মধ্যে প্রিয়া কাশতে কাশতে দাঁড়িয়ে ছিল।

নিশান তাকে ধরে বলল,

— "তুমি ঠিক আছ?"

প্রিয়া তার হাত সরিয়ে দিল।

— "আমাকে আর ছুঁবেন না।"

নিশান থমকে গেল।

— "প্রিয়া..."

প্রিয়ার চোখে তখন পানি।

— "আপনি সব জানতেন?"

— "না।"

— "তাহলে আমার মা কেন লুকিয়েছে?"

— "আমি জানি না।"

প্রিয়া কাঁপা গলায় বলল,

— "আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না।"

সে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করল।

নিশান তাকে থামাতে গেল।

কিন্তু রিমা তার হাত ধরে ফেলল।

— "ওকে যেতে দাও।"

নিশান তাকাল।

— "কেন?"

রিমা খুব নিচু গলায় বলল,

— "কারণ ওর সবচেয়ে বড় বিপদ বাইরে নয়।"

একটু থেমে বলল,

— "ওর সবচেয়ে বড় বিপদ এখন ওর নিজের স্মৃতি।"

নিশান দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রিয়া তখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে।

হঠাৎ তার মাথায় আবার সেই রাতের একটা দৃশ্য ফিরে এল।

একটা গাড়ি।

রক্ত।

তার বাবা।

তার মা।

আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে—

নিশান।

প্রিয়া থেমে গেল।

তারপর নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল—

— "না..."

কারণ এবার সে মনে করতে পেরেছে।

চার বছর আগে সেই রাতে—

নিশানই ছিল তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শেষ মানুষ।

প্রিয়া সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল।

চারপাশের সব শব্দ যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল।

তার চোখের সামনে শুধু একটা দৃশ্য—

চার বছর আগের সেই রাত।

প্রবল বৃষ্টি।

একটা কালো গাড়ি।

তার বাবা গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে।

মা একটু দূরে।

আর তাদের সামনে নিশান।

নিশানের হাতে একটা কালো ব্যাগ।

প্রিয়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।

— "না..."

সে মাথা চেপে ধরল।

আরেকটা দৃশ্য।

তার বাবা নিশানের দিকে তাকিয়ে বলছেন—

"তুমি কথা দিয়েছিলে, ওকে কিছু হতে দেবে না!"

তারপর—

একটা গুলির শব্দ।

প্রিয়া হঠাৎ বর্তমান সময়ে ফিরে এল।

সে হাঁপাতে হাঁপাতে দেয়ালে হাত রাখল।

পেছন থেকে নিশানের কণ্ঠ—

— "প্রিয়া!"

সে ঘুরে তাকাল।

নিশান দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে।

প্রিয়া কয়েক ধাপ পিছিয়ে গেল।

— "আমার কাছে আসবেন না।"

নিশান থেমে গেল।

— "তুমি কী দেখেছ?"

প্রিয়ার চোখে পানি।

— "আমি আপনাকে দেখেছি।"

— "কোথায়?"

— "চার বছর আগে।"

নিশানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— "কী দেখেছ?"

প্রিয়া কাঁপা গলায় বলল,

— "আপনি আমার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।"

নিশান চুপ।

— "আপনার হাতে বন্দুক ছিল।"

রিমা তখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

সে নিশানের দিকে তাকাল।

নিশান চোখ বন্ধ করল।

— "আমি সেখানে ছিলাম।"

প্রিয়া যেন কথাটা শুনে আরও ভেঙে পড়ল।

— "তাহলে আপনি এতদিন আমাকে মিথ্যা বলেছেন?"

— "আমি জানতাম না।"

— "কীভাবে জানতেন না?"

— "আমার নিজের স্মৃতিও পুরোপুরি পরিষ্কার না।"

প্রিয়া তীব্র গলায় বলল,

— "সবাই একই কথা বলছে! কেউ কিছু জানে না!"

তারপর চোখের পানি মুছে বলল,

— "কিন্তু আমার বাবা তো জানতেন।"

নিশান এগিয়ে আসতে চাইলে প্রিয়া আবার পিছিয়ে গেল।

— "থামুন।"

নিশান থেমে গেল।

তার চোখে কষ্ট।

— "ঠিক আছে।"

প্রিয়া ঘুরে বেরিয়ে যেতে লাগল।

রিমা তাকে থামাল না।

নিশানও না।

কিন্তু তার চোখ শুধু প্রিয়ার দিকে।

বাড়ি ফেরার পর প্রিয়া নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে দিল।

মা অনেকক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

শেষ পর্যন্ত বললেন,

— "প্রিয়া, দরজা খোল।"

কোনো উত্তর নেই।

— "মা হিসেবে হয়তো অনেক ভুল করেছি। কিন্তু তোর ক্ষতি চাইনি।"

ভেতর থেকে প্রিয়ার কণ্ঠ এল—

— "তাহলে সত্যিটা বলো।"

মা চুপ।

— "চার বছর আগে কী হয়েছিল?"

অনেকক্ষণ পর দরজা খুলল।

প্রিয়া বিছানায় বসে।

চোখ লাল।

মা ধীরে ভেতরে ঢুকলেন।

— "তুই সব জানতে চাস?"

— "হ্যাঁ।"

— "তাহলে শুন।"

মা বসে পড়লেন।

— "তোর বাবা আর নিশানের বাবা বহু বছর ধরে একটা গোপন ব্যবসায়িক চক্রের বিরুদ্ধে কাজ করছিল। বাইরে থেকে তারা সফল ব্যবসায়ী ছিল। কিন্তু ভেতরে তারা এমন কিছু মানুষের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করছিল, যারা অবৈধ অস্ত্র, টাকা পাচার আর রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে পুরো একটা নেটওয়ার্ক চালাত।"

প্রিয়া নিঃশব্দে শুনছিল।

— "রিমা ভুল করে তাদের কিছু নথি দেখে ফেলে। তারপর থেকেই ও বিপদে পড়ে।"

— "আমার বাবা ওকে লুকিয়ে রেখেছিলেন?"

— "হ্যাঁ।"

— "তাহলে তাকে সবাই মৃত ভাবল কেন?"

মা চোখ নামিয়ে বললেন,

— "কারণ সবাইকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল, রিমা মারা গেছে।"

প্রিয়া অবাক।

— "কিন্তু নিশান?"

— "নিশানকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল রিমা মারা গেছে।"

— "কেন?"

— "কারণ যদি নিশান সত্যিটা জানত, সে রিমাকে খুঁজতে শুরু করত।"

প্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— "আর আমি?"

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— "তুই সেদিন ভুল জায়গায় ভুল সময়ে পৌঁছে গিয়েছিলি।"

— "আমি কী দেখেছিলাম?"

মা চোখ বন্ধ করলেন।

— "তুই একজনকে গুলি করতে দেখেছিলি।"

প্রিয়া শিউরে উঠল।

— "কাকে?"

— "তোর বাবাকে।"

ঘর নিস্তব্ধ।

প্রিয়ার চোখে ভয়।

— "কিন্তু বাবা তো বলেছিলেন..."

— "তোর বাবা তখনও বেঁচে ছিলেন।"

— "তাহলে তিনি পরে মারা গেলেন কীভাবে?"

মা উত্তর দিলেন না।

প্রিয়া মায়ের হাত ধরে বলল,

— "বল!"

মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

— "হাসপাতালে যাওয়ার পথে।"

প্রিয়ার মাথায় যেন বজ্রপাত হলো।

হঠাৎ তার স্মৃতিতে আরও একটা দৃশ্য ফিরে এল।

বৃষ্টির মধ্যে সে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে।

তার বাবা রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন।

নিশান তাকে ধরে আছে।

আর প্রিয়া চিৎকার করছে—

"নিশান, বাবাকে বাঁচাও!"

তারপর নিশান তাকে জড়িয়ে ধরে বলছে—

"চোখ বন্ধ করো, প্রিয়া। যা দেখেছ সব ভুলে যাও।"

প্রিয়া হঠাৎ চোখ খুলল।

— "আমি মনে করতে পারছি!"

মা কেঁপে উঠলেন।

— "কি?"

— "নিশান আমাকে বাঁচিয়েছিল।"

মা চুপ।

— "ও আমার বাবাকে মারেনি।"

মা চোখ নামিয়ে বললেন,

— "না।"

প্রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

— "তুমি জানতেও?"

— "হ্যাঁ।"

— "তাহলে এতদিন আমাকে কেন বলোনি?"

মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

— "কারণ তোর বাবা আমাকে কথা দিয়েছিল, তোর নিরাপত্তার জন্য কাউকে বিশ্বাস করব না।"

প্রিয়া ধীরে বলল,

— "নিশানকেও?"

— "বিশেষ করে ওকে।"

— "কেন?"

মা উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দরজা খুলে গেল।

নিশান দাঁড়িয়ে।

প্রিয়া চমকে তাকাল।

— "আপনি এখানে?"

নিশান বলল,

— "তোমার মা আমাকে ডেকেছেন।"

প্রিয়ার মা মাথা নিচু করে বললেন,

— "এখন সময় হয়েছে।"

নিশান ভেতরে এসে একটা খাম টেবিলের ওপর রাখল।

— "এটা তোমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছি।"

প্রিয়া খামটা খুলল।

ভেতরে একটা ছবি।

প্রিয়া ছোটবেলায়।

তার পাশে নিশান।

ছবির পেছনে লেখা—

"কিছু সম্পর্ক শুরু হওয়ার আগেই ভাগ্য তাদের একে অপরের জন্য লিখে রাখে।"

প্রিয়ার চোখ ভিজে গেল।

নিশান ধীরে বলল,

— "আমি তোমাকে চার বছর আগে থেকেই চিনতাম।"

— "কতটা?"

— "তোমাকে ভালো লাগত।"

প্রিয়া তাকাল।

নিশান চোখ নামিয়ে বলল,

— "কিন্তু তোমার বয়স, পরিস্থিতি—কিছুই আমাকে তোমার কাছে আসতে দেয়নি।"

প্রিয়া চুপ করে শুনছিল।

— "তারপর রিমার ঘটনা। তোমার বাবা আমাকে বলেছিলেন, তোমাকে নিরাপদ রাখতে। আমি চেষ্টা করেছি।"

প্রিয়া ধীরে বলল,

— "তাহলে সেদিন?"

নিশান বলল,

— "আমি তোমার বাবাকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম।"

— "আপনি তাকে বাঁচাতে পারেননি?"

নিশানের চোখে পানি জমে উঠল।

— "না।"

সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

— "এই একটা ব্যর্থতা আমি চার বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছি।"

প্রিয়ার চোখ থেকেও অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

সে ধীরে নিশানের কাছে গেল।

— "আপনি আমাকে কেন সত্যিটা বলেননি?"

— "কারণ তুমি তখন খুব ভঙ্গুর ছিলে।"

— "আর এখন?"

নিশান তার দিকে তাকাল।

— "এখন তুমি শক্ত।"

কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপ।

প্রিয়া ধীরে হাত বাড়িয়ে নিশানের হাত ধরল।

নিশান অবাক।

— "আমি আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম।"

— "তোমার ভুল না।"

— "তবু..."

নিশান তার হাতটা শক্ত করে ধরল।

— "আমি চাই না তুমি আর কোনোদিন আমার কাছে ভয় পাও।"

প্রিয়া চোখ তুলে তাকাল।

— "আমি আপনার কাছে ভয় পাই না।"

— "তাহলে?"

প্রিয়া খুব আস্তে বলল,

— "আপনাকে হারানোর ভয় পাই।"

নিশান কিছু বলতে পারল না।

সে শুধু প্রিয়ার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।

ঠিক তখনই রিমা ঘরে ঢুকল।

— "সময় শেষ।"

দুজনেই তার দিকে তাকাল।

রিমার হাতে একটা ফাইল।

— "আমরা জানতে পেরেছি, প্রিয়ার বাবার মৃত্যুর পেছনে আসল মানুষটা কে।"

নিশান উঠে দাঁড়াল।

— "কে?"

রিমা ফাইলটা খুলল।

ভেতরে একটা নাম।

নিশানের চোখ স্থির হয়ে গেল।

— "অসম্ভব।"

প্রিয়া তাকাল।

— "কে?"

রিমা নামটা উচ্চারণ করল—

"সায়েম রহমান।"

প্রিয়া নামটা শুনে থমকে গেল।

— "সায়েম আঙ্কেল?"

নিশান বলল,

— "তোমার বাবার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।"

রিমা মাথা নেড়ে বলল,

— "শুধু বন্ধু না।"

সে একটা ছবি বের করল।

ছবিতে সায়েম রহমান দাঁড়িয়ে আছে সেই একই ঘরে, যেখানে চার বছর আগে প্রিয়ার বাবা আর নিশানের বাবা গোপন বৈঠক করছিলেন।

রিমা বলল,

— "ওই রাতের সবকিছু ও পরিকল্পনা করেছিল।"

নিশান মুঠো শক্ত করল।

— "তাহলে ও এখন কোথায়?"

রিমা উত্তর দিল,

— "ঢাকায়।"

— "ঠিকানা?"

রিমা একটা কাগজ এগিয়ে দিল।

নিশান সেটা হাতে নিল।

কিন্তু প্রিয়া কাগজটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলল—

— "এক মিনিট।"

সবাই তার দিকে তাকাল।

প্রিয়া কাগজের ঠিকানাটা দেখছে।

তার চোখ ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেল।

— "এই ঠিকানাটা..."

নিশান জিজ্ঞেস করল,

— "কি হয়েছে?"

প্রিয়া কাঁপা গলায় বলল,

— "এটা তো আমার বাবার পুরোনো বাড়ির ঠিকানা।"

রিমা স্থির হয়ে গেল।

নিশানও।

ঠিক তখনই প্রিয়ার ফোনে কল এল।

স্ক্রিনে নাম দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।

বাবা।

প্রিয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

চার বছর আগে মৃত একজন মানুষের ফোন নম্বর।

ফোনটা আবার বেজে উঠল।

নিশান বলল,

— "রিসিভ করো।"

প্রিয়া কাঁপা হাতে ফোন ধরল।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর পরিচিত কণ্ঠ—

— "প্রিয়া?"

প্রিয়ার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল।

— "বাবা?"

ওপাশ থেকে খুব নিচু গলায় উত্তর এল—

— "নিশানকে বিশ্বাস করো না।"

প্রিয়া জমে গেল।

তারপর লাইন কেটে গেল।

নিশান তার দিকে তাকিয়ে আছে।

প্রিয়ার হাতে ফোন কাঁপছে।

আর ঘরের অন্য প্রান্তে রিমা ফিসফিস করে বলল—

— "এটা অসম্ভব..."

কারণ সে সেই কণ্ঠ চিনতে পেরেছে।

ওটা সত্যিই প্রিয়ার বাবার কণ্ঠ।

ফোনটা কেটে যাওয়ার পরও প্রিয়া অনেকক্ষণ একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল।

তার হাত কাঁপছে।

মুখ ফ্যাকাশে।

ঠোঁট দুটো সামান্য কাঁপছে।

— "বাবা..."

শব্দটা এত নিচু যে, যেন নিজের কাছেই বলল।

নিশান ধীরে তার কাছে এগিয়ে এল।

— "প্রিয়া..."

প্রিয়া এক ধাপ পিছিয়ে গেল।

নিশান থেমে গেল।

তার চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।

— "তুমি কি সত্যিই আমার বাবার কণ্ঠ শুনেছ?"

রিমা এবার এগিয়ে এল।

— "আমি নিশ্চিত।"

নিশান তার দিকে তাকাল।

— "তুমি নিশ্চিত?"

— "হ্যাঁ।"

— "তাহলে তিনি বেঁচে আছেন?"

রিমা মাথা নাড়ল।

— "সম্ভবত।"

প্রিয়া হঠাৎ বলল,

— "কিন্তু উনি বললেন, আপনাকে বিশ্বাস না করতে।"

নিশান স্থির হয়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা বলল না।

তারপর ধীরে বলল,

— "তাহলে আমাকে বিশ্বাস করো না।"

প্রিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

— "কি?"

— "যদি তোমার বাবার কথায় তোমার মনে সন্দেহ আসে, তাহলে আমাকে বিশ্বাস করার কোনো প্রয়োজন নেই।"

— "আপনি এত সহজে এটা বলছেন?"

— "কারণ আমি চাই তুমি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নাও।"

প্রিয়ার চোখে পানি চলে এল।

— "কিন্তু আমি জানি না কাকে বিশ্বাস করব।"

নিশান কিছু বলল না।

রিমা হঠাৎ বলল,

— "আমাদের এখনই পুরোনো বাড়িতে যেতে হবে।"

নিশান মাথা নেড়ে বলল,

— "হ্যাঁ।"

প্রিয়া তাকাল।

— "আপনারা যাবেন?"

— "হ্যাঁ।"

— "আমি যাব।"

নিশান বলল,

— "না।"

প্রিয়া অবাক।

— "কেন?"

— "কারণ যদি তোমার বাবা সত্যিই সেখানে থাকেন, জায়গাটা নিরাপদ নয়।"

— "আমি যাব।"

— "প্রিয়া—"

— "ওখানে যদি আমার বাবা থাকেন, তাহলে আমি যাব।"

নিশান তার চোখের দিকে তাকাল।

তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— "ঠিক আছে। কিন্তু আমার কাছ থেকে দূরে যাবে না।"

প্রিয়া এবার মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

রাত প্রায় দশটা।

পুরোনো বাড়িটার সামনে গাড়ি থামল।

বাড়িটা বহু বছর ধরে বন্ধ।

বড় লোহার গেট মরিচা পড়ে কালচে হয়ে গেছে।

বাগানে আগাছা।

দেয়ালের রং উঠে গেছে।

প্রিয়া গাড়ি থেকে নামতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ অনুভব করল।

এই জায়গাটা তার খুব পরিচিত।

কিন্তু একই সঙ্গে অচেনা।

নিশান টর্চ জ্বালিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

রিমা পেছনে।

প্রিয়া মাঝখানে।

দরজার তালা ভাঙা।

নিশান থেমে গেল।

— "কেউ আগে এসেছে।"

রিমা নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল।

— "পায়ের ছাপ।"

প্রিয়া ফিসফিস করে বলল,

— "বাবা কি এখানে?"

নিশান উত্তর দিল না।

তারা ভেতরে ঢুকল।

ঘরের ভেতরে পুরোনো আসবাবপত্র।

ধুলোয় ঢাকা দেয়াল।

এক কোণে একটা ভাঙা ঘড়ি।

প্রিয়া ধীরে ধীরে চারদিকে তাকাচ্ছিল।

হঠাৎ তার চোখ একটা ছবিতে আটকে গেল।

ছবিতে সে ছোট।

তার পাশে বাবা।

আর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ।

সায়েম রহমান।

প্রিয়া ছবিটা হাতে নিল।

— "সায়েম আঙ্কেল এখানে কেন?"

রিমা ছবিটা দেখে বলল,

— "কারণ তোমার বাবা ওকে নিজের পরিবারের মতো বিশ্বাস করতেন।"

নিশান বলল,

— "এটাই হয়তো তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।"

তারা বাড়ির ভেতরের একটা ঘরে গেল।

ঘরটা অন্যগুলোর চেয়ে বেশি পরিষ্কার।

নিশান বুঝল, কেউ এখানে সম্প্রতি এসেছে।

টেবিলের ওপর একটা ল্যাপটপ।

পাশে কফির কাপ।

কাপটা এখনো গরম।

নিশান হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল।

— "কেউ খুব বেশি সময় আগে এখানে ছিল না।"

প্রিয়া চারদিকে তাকাল।

হঠাৎ পাশের ঘর থেকে শব্দ হলো।

ঠক।

সবাই থেমে গেল।

আবার শব্দ।

ঠক... ঠক...

নিশান হাত তুলে সবাইকে থামাল।

সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল।

দরজা খুলতেই ভেতর থেকে একজন লোক পড়ে গেল।

প্রিয়া চিৎকার করে উঠল।

— "বাবা!"

লোকটা মাথা তুলল।

কিন্তু সে প্রিয়ার বাবা নয়।

একজন অচেনা বৃদ্ধ।

তার হাত বাঁধা।

মুখে আঘাতের চিহ্ন।

নিশান দ্রুত তার বাঁধন খুলল।

— "আপনি কে?"

লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

— "আমি... আপনার বাবার লোক ছিলাম।"

নিশান অবাক।

— "আমার বাবার?"

— "হ্যাঁ।"

প্রিয়া কাছে এসে বলল,

— "আমার বাবা কোথায়?"

লোকটা তার দিকে তাকাল।

তারপর বলল,

— "আপনার বাবা বেঁচে আছেন।"

প্রিয়ার চোখে পানি চলে এল।

— "কোথায়?"

লোকটা কাঁপা হাতে একটা কাগজ বের করল।

— "এই ঠিকানায়।"

নিশান কাগজটা নিল।

কিন্তু ঠিক তখনই লোকটা তার হাত চেপে ধরে বলল,

— "আপনি ওকে নিয়ে যাবেন না।"

নিশান ভ্রু কুঁচকে বলল,

— "কেন?"

লোকটা নিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— "কারণ আপনার বাবা আপনাকে মেরে ফেলতে চায়।"

ঘর নিস্তব্ধ।

প্রিয়া অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইল।

— "কি বলছেন?"

লোকটা বলল,

— "আপনার বাবা... নিশানের বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী।"

নিশান স্থির হয়ে গেল।

— "অসম্ভব।"

লোকটা কাঁপা গলায় বলল,

— "আপনার বাবারা একসঙ্গে কাজ করতেন। পরে তাদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা হয়।"

রিমা জিজ্ঞেস করল,

— "কিসের জন্য?"

লোকটা বলল,

— "প্রমাণের জন্য।"

— "কোন প্রমাণ?"

লোকটা নিশানের দিকে তাকাল।

— "যে প্রমাণে আপনার বাবার নামও ছিল।"

নিশানের চোখে ঝড়।

— "আমার বাবা কী করেছিলেন?"

লোকটা উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

একাধিক গাড়ি।

রিমা জানালার কাছে গিয়ে তাকাল।

— "আমাদের ঘিরে ফেলেছে।"

নিশান সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়ার হাত ধরল।

— "পেছনের দরজা।"

তারা দ্রুত দৌড়ে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু বাড়ির পেছনের গেটের কাছে পৌঁছাতেই কয়েকজন লোক অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে।

নিশান থেমে গেল।

একজন সামনে এসে বলল,

— "নিশান, এতদিন পর আবার দেখা।"

নিশান লোকটাকে চিনল।

— "তুই?"

লোকটা হাসল।

— "আমাকে ভুলে গেছ?"

— "সায়েমের লোক।"

— "ঠিক ধরেছ।"

সে প্রিয়ার দিকে তাকাল।

— "মেয়েটাকে আমাদের হাতে তুলে দাও।"

নিশান প্রিয়ার সামনে দাঁড়াল।

— "অসম্ভব।"

লোকটা বন্দুক তুলল।

— "তাহলে তোমার বন্ধুদের একজনকে মরতে হবে।"

হঠাৎ আরেকজন রিমার দিকে বন্দুক তাক করল।

প্রিয়া চিৎকার করে বলল,

— "না!"

নিশান দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে গেল।

সে লোকটার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

একসঙ্গে কয়েকটা গুলির শব্দ।

চারদিকে চিৎকার।

রিমা একজনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।

প্রিয়া দৌড়ে একপাশে সরে গেল।

কিন্তু হঠাৎ একজন লোক তাকে পেছন থেকে ধরে ফেলল।

— "চল!"

প্রিয়া চিৎকার করল,

— "নিশান!"

নিশান ঘুরে তাকাল।

তার চোখে আতঙ্ক।

সে ছুটে এল।

লোকটা প্রিয়াকে গাড়ির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

নিশান বন্দুক তুলে বলল,

— "ওকে ছেড়ে দে।"

লোকটা হাসল।

— "তুমি গুলি করবে?"

নিশানের হাত কাঁপছে।

লোকটা বলল,

— "তুমি জানো তো, প্রিয়ার সামনে কাউকে হত্যা করতে পারবে না।"

প্রিয়া নিশানের দিকে তাকাল।

— "গুলিটা করুন!"

নিশান হতভম্ব।

— "কি?"

— "আমাকে নিয়ে ভাববেন না!"

লোকটা প্রিয়ার গলায় ছুরি ধরল।

নিশানের চোখে রাগ জ্বলে উঠল।

— "ওকে ছুঁলেই—"

ঠিক তখনই দূর থেকে আরেকটা গুলির শব্দ।

লোকটার হাত থেকে ছুরি পড়ে গেল।

সে মাটিতে পড়ে গেল।

সবাই তাকাল।

দূরে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে।

গাড়ির দরজা খুলে একজন মানুষ নামল।

সাদা শার্ট।

ধূসর চুল।

প্রিয়ার বুক থেমে গেল।

মানুষটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।

তার মুখটা আলোয় আসতেই প্রিয়া চিৎকার করে উঠল—

— "বাবা!"

নিশান স্থির।

রিমার চোখ বড় বড়।

প্রিয়ার বাবা সত্যিই বেঁচে আছেন।

তিনি তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

কিন্তু তার হাতে বন্দুক।

চোখে কোনো আবেগ নেই।

তিনি প্রথমে প্রিয়ার দিকে তাকালেন।

তারপর নিশানের দিকে।

— "আমি তোকে বলেছিলাম, ওকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখবি।"

নিশান এক পা সামনে এগোল।

— "আপনি বেঁচে আছেন।"

প্রিয়ার বাবা ঠান্ডা গলায় বললেন,

— "হ্যাঁ।"

— "আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?"

— "যেখানে তোমার জন্য নিরাপদ ছিল।"

নিশান বলল,

— "তাহলে আমাকে কেন মিথ্যা বলা হয়েছিল?"

প্রিয়ার বাবা উত্তর দিলেন না।

প্রিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— "বাবা, আপনি আমাকে কেন ছেড়ে গেলেন?"

তার বাবা প্রথমবারের মতো মেয়ের দিকে তাকিয়ে নরম হলেন।

— "তোমাকে বাঁচানোর জন্য।"

প্রিয়া দৌড়ে তার কাছে যেতে চাইলে তিনি হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।

— "না।"

প্রিয়া থেমে গেল।

— "কেন?"

তার বাবা বললেন,

— "কারণ এখনো তুমি নিরাপদ নও।"

তারপর তিনি নিশানের দিকে তাকালেন।

— "তোমার কাছে একটা প্রশ্ন আছে।"

নিশান বলল,

— "কি?"

— "তুই কি সত্যিই প্রিয়াকে ভালোবাসিস?"

নিশান থেমে গেল।

প্রিয়া অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।

নিশান ধীরে বলল,

— "হ্যাঁ।"

প্রিয়ার বাবা চোখ বন্ধ করলেন।

কয়েক সেকেন্ড পর বললেন,

— "তাহলে আজ থেকে ওকে ছেড়ে দে।"

নিশান হতভম্ব।

— "কি?"

— "ওর কাছ থেকে দূরে চলে যা।"

— "কেন?"

প্রিয়ার বাবা ধীরে বললেন—

— "কারণ তুই জানিস না, তোর বাবার রক্ত কার হাতে লেগে আছে।"

নিশানের চোখ বড় হয়ে গেল।

তারপর প্রিয়ার বাবা এমন একটা কথা বললেন, যা সবাইকে স্তব্ধ করে দিল—

— "তোর বাবা মারা যায়নি।"

নিশান ফিসফিস করে বলল,

— "কি?"

— "তোর বাবা এখনো বেঁচে আছে।"

রিমা পেছনে সরে গেল।

প্রিয়ার বাবা বললেন,

— "আর সে-ই এখন প্রিয়াকে হত্যা করতে চায়।"

ঠিক তখনই দূর থেকে একটা গাড়ি প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে এল।

প্রিয়ার বাবা চিৎকার করলেন—

— "সবাই সরে যাও!"

গাড়িটা সরাসরি নিশানের দিকে ছুটে আসছিল।

প্রিয়া কিছু না ভেবেই নিশানের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

ধাক্কা!

নিশান আর প্রিয়া দুজনেই মাটিতে পড়ে গেল।

গাড়িটা পাশ দিয়ে চলে গেল।

কিন্তু প্রিয়ার বাবা দাঁড়িয়ে রইলেন।

তার মুখে অদ্ভুত এক হাসি।

নিশান উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল—

— "প্রিয়ার বাবা!"

লোকটা ধীরে বন্দুক নামাল।

তারপর বলল—

— "এখন বুঝতে পারছ?"

নিশান তাকিয়ে রইল।

প্রিয়ার বাবা বললেন—

— "এই পুরো খেলায় তোমাকে আমি ব্যবহার করেছি।"

নিশানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

— "কী বলছেন?"

তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন—

— "রিমাকে বাঁচানো, তোমাকে প্রিয়ার কাছে পাঠানো, তোমার বাবার বিরুদ্ধে প্রমাণ দেওয়া—সবই পরিকল্পনা ছিল।"

প্রিয়া হতভম্ব।

— "বাবা..."

তিনি মেয়ের দিকে তাকালেন।

চোখে এক মুহূর্তের জন্য অপরাধবোধ দেখা গেল।

তারপর আবার কঠিন হয়ে গেল।

— "কারণ সত্যিটা জানলে তুই আমাকে কখনো ক্ষমা করবি না।"

নিশান এগিয়ে এল।

— "তাহলে সত্যিটা বলুন।"

প্রিয়ার বাবা ধীরে বললেন—

— "তোর বাবা আর আমার মধ্যে আসল বিশ্বাসঘাতক কে ছিল, সেটা জানতে হলে..."

তিনি পেছনে তাকালেন।

— "তোমাদের দুজনকেই আমার সঙ্গে যেতে হবে।"

নিশান বলল,

— "কোথায়?"

প্রিয়ার বাবা মৃদু হাসলেন।

— "সেই জায়গায়..."

একটু থেমে তিনি বললেন—

— "যেখানে চার বছর আগে রিমার মৃত্যুর নাটক শুরু হয়েছিল।"

রিমা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

— "না..."

প্রিয়ার বাবা তার দিকে তাকালেন।

— "হ্যাঁ, রিমা।"

রিমা পিছিয়ে গেল।

— "ওখানে যাওয়া যাবে না।"

— "কেন?"

রিমার চোখে ভয়।

— "কারণ সেখানে এখনো সেই মানুষটা আছে।"

নিশান জিজ্ঞেস করল,

— "কে?"

রিমা কাঁপা গলায় বলল—

— "যে আমাদের সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করছে।"

দূরে বজ্রপাত হলো।

আর প্রিয়ার বাবা ধীরে ধীরে বললেন—

"তার নাম সায়েম রহমান নয়।"

"তার নাম..."

তিনি নিশানের দিকে তাকালেন।

"নিশানের বাবা।"

রাতের অন্ধকারে কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো নেমে এল।

"নিশানের বাবা।"

প্রিয়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

নিশানের মুখের কোনো অভিব্যক্তি নেই।

যেন তার মাথা এই কথাটা গ্রহণ করতে পারছে না।

— "আমার বাবা?"

প্রিয়ার বাবা ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,

— "হ্যাঁ।"

নিশান হেসে ফেলল।

কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।

ছিল অবিশ্বাস।

— "আমার বাবা চার বছর আগে মারা গেছেন।"

— "না।"

— "আমি নিজে তার লাশ দেখেছি।"

— "যেটা তুমি দেখেছিলে, সেটা তোমার বাবার লাশ ছিল না।"

নিশানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

— "তাহলে কার?"

প্রিয়ার বাবা উত্তর দিলেন,

— "একজন অচেনা মানুষের।"

নিশান এক পা পিছিয়ে গেল।

রিমা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল।

প্রিয়া তার দিকে তাকাল।

— "আপনি আগে থেকেই জানতেন?"

রিমা ধীরে বলল,

— "হ্যাঁ।"

— "তাহলে আমাকে বলেননি কেন?"

— "কারণ তোমার বাবা আমাকে নিষেধ করেছিলেন।"

নিশান হঠাৎ রিমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।

— "তুমি জানতেও?"

রিমা মাথা নিচু করল।

— "হ্যাঁ।"

— "চার বছর ধরে আমি আমার বাবার জন্য কেঁদেছি!"

রিমার চোখে পানি।

— "আমি জানি।"

— "তুমি জানো না!"

নিশানের কণ্ঠ ভেঙে গেল।

— "আমি প্রতিটা রাত ভেবেছি, আমার বাবা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমি নিজেকে দোষ দিয়েছি। ভেবেছি শেষবার তার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলিনি।"

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— "আর তুমি জানতেও যে সে বেঁচে আছে?"

রিমা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— "আমি জানতাম সে বেঁচে আছে। কিন্তু আমি জানতাম না সে কোথায়।"

প্রিয়ার বাবা বললেন,

— "এখন জানো।"

নিশান তার দিকে তাকাল।

— "কোথায়?"

— "চলো।"

— "আমি কোথাও যাব না, যতক্ষণ না আপনি সব বলেন।"

প্রিয়ার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

— "চার বছর আগে তোমার বাবা আর আমি একটা বিশাল অর্থপাচার চক্রের প্রমাণ পেয়েছিলাম।"

নিশান শুনছিল।

— "আমরা ভেবেছিলাম, একসঙ্গে কাজ করলে ওদের থামানো সম্ভব। কিন্তু তোমার বাবা তখনই বদলে গেলেন।"

— "কীভাবে?"

— "সে প্রমাণ নিজের হাতে নিতে চাইল।"

— "কেন?"

— "কারণ সে বিশ্বাস করত, ক্ষমতা ছাড়া সত্যি কোনো মূল্য রাখে না।"

নিশান ধীরে বলল,

— "আপনি বলতে চাইছেন, আমার বাবা লোভী হয়ে গিয়েছিলেন?"

— "শুধু লোভী না।"

প্রিয়ার বাবা একটু থামলেন।

— "সে ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল।"

রিমা বলল,

— "কিন্তু পুরো সত্যিটা এটা নয়।"

সবাই তার দিকে তাকাল।

রিমা বলল,

— "তোমার বাবা একসময় সত্যিই ওই চক্রের অংশ ছিল।"

নিশানের চোখ বড় হয়ে গেল।

— "কি?"

— "কিন্তু পরে সে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল।"

প্রিয়ার বাবা ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,

— "হ্যাঁ।"

— "তাহলে?"

— "তোমার বাবা বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু যারা ওই চক্র চালাত, তারা তাকে বের হতে দেয়নি।"

নিশান বলল,

— "তাহলে এতদিন সে কোথায় ছিল?"

প্রিয়ার বাবা বললেন,

— "যেখানে কেউ তাকে খুঁজে পাবে না।"

— "কোথায়?"

— "পুরোনো নদীর ধারের গুদামে।"

রিমা হঠাৎ বলল,

— "ওখানে যাওয়া বিপজ্জনক।"

নিশান তাকাল।

— "আমি যাব।"

প্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— "আমিও।"

নিশান তার দিকে তাকাল।

— "না।"

— "আমি যাব।"

— "প্রিয়া—"

— "আমার বাবাকে চার বছর ধরে মৃত ভেবে বেঁচেছি। এখন যদি তিনি সত্যিই বেঁচে থাকেন, আমি তাকে দেখব।"

নিশান কিছু বলল না।

শেষ পর্যন্ত মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

প্রায় চল্লিশ মিনিট পর তারা নদীর ধারে পৌঁছাল।

পুরোনো গুদামঘর।

চারদিকে অন্ধকার।

দূরে নদীর পানি কালো হয়ে আছে।

বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ।

প্রিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল।

নিশান তার পাশে হাঁটছিল।

হঠাৎ প্রিয়া নিচু গলায় বলল,

— "নিশান?"

— "হুম?"

— "যদি আমার বাবা সত্যিই খারাপ কিছু করে থাকেন?"

নিশান তার দিকে তাকাল।

— "তাহলে?"

— "আপনি কি আমাকে ঘৃণা করবেন?"

নিশান থেমে গেল।

— "তুমি কি তোমার বাবার কাজের জন্য দায়ী?"

— "না।"

— "তাহলে?"

প্রিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।

নিশান ধীরে বলল,

— "তুমি তোমার বাবার মেয়ে। কিন্তু তুমি তোমার বাবার কাজ নও।"

প্রিয়ার চোখ ভিজে গেল।

নিশান মৃদু হেসে বলল,

— "এত ভয় পেও না।"

প্রিয়া ফিসফিস করে বলল,

— "আমি নিজের জন্য ভয় পাচ্ছি না।"

— "জানি।"

— "আপনার জন্য ভয় পাচ্ছি।"

নিশান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

— "আমার জন্য ভয় পাওয়ার অধিকার তোমার আছে।"

প্রিয়া অবাক।

নিশান একটু কাছে এসে বলল,

— "কারণ আমিও তোমাকে হারানোর ভয় পাই।"

দুজনের চোখে চোখ।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশের সবকিছু যেন থেমে গেল।

তারপর রিমার কণ্ঠ—

— "সময় শেষ।"

তারা গুদামের দিকে এগিয়ে গেল।

দরজা খোলা।

ভেতরে একটা মাত্র বাতি জ্বলছে।

প্রিয়ার বাবা আগে ঢুকলেন।

নিশান তার পেছনে।

প্রিয়া আর রিমা বাইরে দাঁড়িয়ে।

হঠাৎ ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—

— "অবশেষে তুমি এলে, নিশান।"

নিশানের শরীর জমে গেল।

কণ্ঠটা তার পরিচিত।

খুব পরিচিত।

কিন্তু সে বিশ্বাস করতে পারছে না।

— "বাবা?"

অন্ধকার থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এল।

ধূসর চুল।

মুখে বয়সের ছাপ।

চোখে কঠিন দৃষ্টি।

নিশান কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব ধীরে বলল—

— "আপনি..."

মানুষটা হেসে বলল,

— "আমাকে মৃত ভেবে খুব কেঁদেছিলি?"

নিশানের চোখে পানি চলে এল।

— "আপনি আমাকে কেন ছেড়ে গেলেন?"

লোকটা বলল,

— "কারণ তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।"

নিশান তীব্র গলায় বলল,

— "মিথ্যা!"

তার বাবা চুপ করে রইলেন।

— "আপনি আমার জীবন নষ্ট করেছেন!"

— "আমি?"

— "চার বছর ধরে আমি আপনাকে মৃত ভেবে বেঁচেছি!"

লোকটা ধীরে বলল,

— "তোর বাঁচার জন্যই সেটা দরকার ছিল।"

প্রিয়ার বাবা এগিয়ে এলেন।

— "ওকে সত্যিটা বলো।"

নিশানের বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— "সত্যিটা হলো, সেদিন রিমাকে আমি হত্যা করতে যাইনি।"

রিমা সামনে এগিয়ে এল।

— "তাহলে কে?"

নিশানের বাবা তার দিকে তাকালেন।

— "যে মানুষটা আমাদের সবাইকে বিশ্বাস করিয়েছিল আমি খুনি।"

প্রিয়া বলল,

— "কে?"

নিশানের বাবা বললেন,

— "সায়েম।"

সবাই থমকে গেল।

— "সায়েম রহমান?"

— "হ্যাঁ।"

প্রিয়ার বাবা মাথা নেড়ে বললেন,

— "সে আমাদের সবার মধ্যে বিভেদ তৈরি করেছিল।"

নিশান বলল,

— "তাহলে আমার বাবার মৃত্যুর নাটক?"

— "সায়েমের পরিকল্পনা।"

— "আর আমার স্মৃতি?"

নিশানের বাবা বললেন,

— "সেটাও।"

প্রিয়া শিউরে উঠল।

— "আমার স্মৃতিও?"

— "হ্যাঁ।"

— "কেন?"

নিশানের বাবা তার দিকে তাকালেন।

— "কারণ তুমি সেদিন এমন কিছু দেখেছিলে, যা সায়েমকে ধ্বংস করে দিতে পারত।"

প্রিয়া ধীরে বলল,

— "আমি কী দেখেছিলাম?"

নিশানের বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

— "তুমি দেখেছিলে, সায়েম তোমার বাবাকে গুলি করেছিল।"

প্রিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল।

এক মুহূর্তে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।

বৃষ্টি।

রক্ত।

সায়েম।

বন্দুক।

তার বাবা মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন।

নিশান তাকে ধরে আছে।

আর সায়েম বলছে—

"মেয়েটাকে সরিয়ে দাও!"

প্রিয়া হঠাৎ মাথা চেপে ধরে চিৎকার করল।

— "আমি মনে করতে পারছি!"

নিশান তাকে ধরে ফেলল।

— "প্রিয়া!"

সে কাঁপছে।

— "সায়েম..."

তারপর সে নিশানের দিকে তাকাল।

— "সায়েমই বাবাকে গুলি করেছিল।"

প্রিয়ার বাবা মাথা নেড়ে বললেন,

— "হ্যাঁ।"

রিমা বলল,

— "আর আমাকে সেদিন সায়েমই ধরে নিয়ে গিয়েছিল।"

নিশান তার বাবার দিকে তাকাল।

— "তাহলে আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?"

— "সায়েম আমাকে বন্দি করে রেখেছিল।"

— "তাহলে আপনি পালালেন কীভাবে?"

নিশানের বাবা মৃদু হাসলেন।

— "তোর জন্য।"

নিশান চুপ হয়ে গেল।

ঠিক তখনই গুদামের বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

একটা নয়।

অনেকগুলো।

প্রিয়ার বাবা জানালার কাছে গিয়ে তাকালেন।

তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।

— "সে এসে গেছে।"

রিমা ফিসফিস করে বলল,

— "সায়েম।"

দরজার বাইরে ধীরে ধীরে হাততালির শব্দ শোনা গেল।

ঠাপ... ঠাপ... ঠাপ...

তারপর একটা পরিচিত কণ্ঠ—

— "অভিনন্দন।"

দরজা খুলে গেল।

সায়েম রহমান দাঁড়িয়ে।

তার হাতে বন্দুক।

পাশে কয়েকজন অস্ত্রধারী লোক।

সায়েম হাসল।

— "চার বছর ধরে যে সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছিলাম, আজ সবাই জেনে গেল।"

নিশান সামনে এগিয়ে গেল।

— "সব শেষ, সায়েম।"

সায়েম মৃদু হেসে বলল,

— "না, নিশান।"

সে প্রিয়ার দিকে তাকাল।

— "এখনই আসল খেলা শুরু।"

প্রিয়া পিছিয়ে গেল।

সায়েম বলল,

— "তোমার বাবা তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল।"

একটু থেমে—

— "কিন্তু সে একটা জিনিস জানে না।"

নিশান বলল,

— "কি?"

সায়েমের হাসি আরও গভীর হলো।

— "প্রিয়ার শরীরে এমন কিছু আছে, যার জন্য চার বছর ধরে সবাই ওকে খুঁজছে।"

প্রিয়া আতঙ্কিত।

— "আমার শরীরে?"

সায়েম বলল,

— "তোমার স্মৃতিতে।"

নিশান প্রিয়ার সামনে দাঁড়াল।

— "ওর কাছে যাবি না।"

সায়েম বন্দুক তুলল।

— "তুমি আবার একই ভুল করছ।"

সে নিশানের দিকে তাকিয়ে বলল—

— "তুমি সবসময় প্রিয়াকে বাঁচাতে চাও।"

তারপর হঠাৎ প্রিয়ার দিকে বন্দুক তাক করল।

— "আজ দেখি, ওকে বাঁচাতে গিয়ে তুমি নিজেকে কতদূর ভাঙতে পারো।"

একটা গুলির শব্দ হলো।

নিশান প্রিয়ার সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

ধাম!

প্রিয়া চিৎকার করল—

— "নিশান!"

নিশান মাটিতে পড়ে গেল।

তার বুকের কাছে রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে।

সায়েম হেসে বলল,

— "এবার বুঝবে, ভালোবাসা কতটা দুর্বল করে মানুষকে।"

প্রিয়া হাঁটু গেড়ে নিশানের পাশে বসে পড়ল।

তার হাত রক্তে ভিজে গেল।

— "নিশান... চোখ খুলুন!"

নিশানের চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।

আর প্রিয়ার মুখ থেকে বের হলো একটা ভাঙা চিৎকার—

"নিশান!"

— "নিশান!"

প্রিয়ার চিৎকারে পুরো গুদামটা কেঁপে উঠল।

নিশান মাটিতে পড়ে আছে। বুকের ডান পাশে রক্তের দাগ ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রিয়ার দুই হাত কাঁপছে, চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে।

— "নিশান, চোখ খুলুন!"

কোনো উত্তর নেই।

প্রিয়া তার মুখে হাত রাখল।

— "আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন... আমাকে ছেড়ে যাবেন না।"

তার গলা ভেঙে গেল।

সায়েম ঠান্ডা হাসল।

— "আবেগের সময় শেষ, প্রিয়া।"

প্রিয়ার বাবা হঠাৎ বন্দুক তুললেন।

— "সায়েম!"

সায়েম তার দিকে তাকাল।

— "এক পা এগোলে মেয়েটাকেও গুলি করব।"

নিশানের বাবা এগিয়ে এলেন।

— "তুমি যা করছ, তার শেষ ভালো হবে না।"

সায়েম হেসে বলল,

— "শেষ?"

সে চারপাশে তাকাল।

— "শেষ তো আজই হবে।"

হঠাৎ রিমা একটা লোহার রড তুলে পাশের বাতিটায় আঘাত করল।

ঝনঝন!

পুরো গুদাম অন্ধকার হয়ে গেল।

সঙ্গে সঙ্গে গুলির শব্দ।

চিৎকার।

দৌড়াদৌড়ি।

প্রিয়ার বাবা প্রিয়াকে টেনে একপাশে সরিয়ে নিলেন।

— "ওকে নিয়ে যাও!"

প্রিয়া নিশানের দিকে তাকাল।

— "না! ওকে রেখে যাব না!"

রিমা অন্ধকারের মধ্যে চিৎকার করল—

— "নিশান বেঁচে আছে!"

প্রিয়া মাটিতে হাতড়ে নিশানের কাছে পৌঁছাল।

— "নিশান!"

নিশান খুব কষ্টে চোখ খুলল।

— "প্রিয়া..."

প্রিয়ার বুক থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল।

— "আপনি বেঁচে আছেন!"

নিশান কষ্ট করে হাসল।

— "তোমাকে... এত সহজে ছেড়ে যাব?"

প্রিয়া কাঁদতে কাঁদতে তার হাত ধরল।

— "চুপ করুন। কথা বলবেন না।"

নিশান ফিসফিস করে বলল,

— "তুমি কাঁদছ কেন?"

— "কারণ আপনি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছেন।"

— "তাহলে... আমার ওপর রাগ করো।"

— "আপনার ওপর রাগ করার সময় নেই।"

নিশান মৃদু হাসল।

— "আমি জানতাম... তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না।"

প্রিয়া তার হাত আরও শক্ত করে ধরল।

— "কখনো না।"

কিছুক্ষণ পর গুদামের ভেতর আবার আলো জ্বলে উঠল।

সায়েমের কয়েকজন লোক মাটিতে পড়ে আছে।

প্রিয়ার বাবা আর নিশানের বাবা দুজনেই সায়েমকে ঘিরে দাঁড়িয়ে।

সায়েমের হাতে আর বন্দুক নেই।

কিন্তু তার মুখে এখনো সেই অহংকার।

নিশানের বাবা বললেন,

— "শেষ হয়ে গেছে, সায়েম।"

সায়েম হেসে বলল,

— "তোমরা ভাবছ আমাকে হারিয়ে দিয়েছ?"

প্রিয়ার বাবা বললেন,

— "প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।"

— "কোন প্রমাণ?"

রিমা একটা ছোট মেমোরি কার্ড তুলে ধরল।

— "যেটা তুমি চার বছর ধরে খুঁজছ।"

সায়েমের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

রিমা বলল,

— "সেদিনের পুরো ঘটনা এতে রেকর্ড আছে।"

প্রিয়া তাকিয়ে রইল।

— "কীভাবে?"

রিমা বলল,

— "তোমার বাবা আগেই ক্যামেরা লুকিয়ে রেখেছিলেন।"

প্রিয়ার বাবা মাথা নেড়ে বললেন,

— "আমি জানতাম, একদিন না একদিন সত্যিটা সামনে আসবে।"

সায়েম পিছিয়ে গেল।

— "তোমরা এটা প্রকাশ করতে পারবে না।"

নিশানের বাবা বললেন,

— "কেন?"

সায়েম চুপ।

— "কারণ এই ভিডিওতে শুধু তোমার অপরাধ নেই। তোমার সঙ্গে যারা ছিল, সবার নাম আছে।"

সায়েম এবার সত্যিই ভয় পেল।

সে হঠাৎ পেছনে থাকা একটা অস্ত্র তুলে নিল।

— "কেউ আমার কাছে আসবে না!"

নিশানের বাবা বললেন,

— "সায়েম, শেষ করো।"

সায়েম গুলি চালাতে যাচ্ছিল।

কিন্তু তার আগেই প্রিয়ার বাবা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত সরিয়ে দিলেন।

গুলিটা ছাদের দিকে গেল।

দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলো।

এক পর্যায়ে সায়েম প্রিয়ার বাবাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল।

সে আবার বন্দুক তুলল।

ঠিক তখন নিশানের বাবা সামনে এসে দাঁড়ালেন।

সায়েম গুলি চালাল।

ধাম!

নিশানের বাবা বুক চেপে মাটিতে পড়ে গেলেন।

— "বাবা!"

নিশান কষ্ট করে উঠে বসতে চাইলে প্রিয়া তাকে ধরে রাখল।

— "নড়বেন না!"

সায়েম পালাতে ঘুরতেই রিমা তার সামনে দাঁড়াল।

— "এবার কোথায় যাবে?"

সায়েম রিমাকে ধাক্কা দিতে গেল।

কিন্তু বাইরে থেকে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

সায়েম থেমে গেল।

প্রিয়ার বাবা বললেন,

— "সব শেষ।"

কয়েক মুহূর্ত পর পুলিশ গুদামে ঢুকে সায়েমকে গ্রেপ্তার করল।

সায়েমকে নিয়ে যাওয়ার সময় সে শেষবার প্রিয়ার দিকে তাকাল।

— "তুমি ভাবছ সব সত্যি জেনে গেছ?"

প্রিয়া চুপ।

সায়েম মৃদু হাসল।

— "তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো, চার বছর আগে তোমার স্মৃতি পুরোপুরি কেন মুছে দেওয়া হয়েছিল।"

প্রিয়া তার বাবার দিকে তাকাল।

তার বাবা চোখ নামিয়ে ফেললেন।

কিছুক্ষণ পর সবাই বাইরে।

নিশানের বাবাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো।

নিশানও আহত।

কিন্তু তার অবস্থা স্থিতিশীল।

প্রিয়া অ্যাম্বুলেন্সের পাশে দাঁড়িয়ে তার হাত ধরে আছে।

নিশান চোখ খুলে বলল,

— "তুমি এখনো আছ?"

প্রিয়া চোখ মুছে হাসল।

— "হ্যাঁ।"

— "কেন?"

— "আপনাকে পাহারা দিচ্ছি।"

নিশান মৃদু হেসে বলল,

— "তাহলে একটা কথা বলি?"

— "বলুন।"

— "আমি ভয় পেয়েছিলাম।"

প্রিয়া অবাক।

— "আপনি?"

— "হ্যাঁ।"

— "কিসের?"

নিশান তার দিকে তাকাল।

— "যদি গুলিটা আমাকে মেরে ফেলত, তাহলে তোমাকে একটা কথাও বলা হতো না।"

প্রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

— "কী কথা?"

নিশান তার হাতটা ধরে বলল,

— "আমি তোমাকে ভালোবাসি, প্রিয়া।"

প্রিয়া কয়েক মুহূর্ত কিছু বলতে পারল না।

তারপর মাথা নিচু করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— "আমি অনেক আগেই বুঝেছিলাম।"

নিশান মৃদু হাসল।

— "তাহলে এতদিন বলোনি কেন?"

— "আপনিও তো বলেননি।"

— "আমি ভয় পেয়েছিলাম।"

— "আমি-ও।"

নিশান তার হাতটা নিজের বুকে রাখল।

— "এখন ভয় পাও?"

প্রিয়া মাথা নাড়ল।

— "না।"

— "কেন?"

প্রিয়া খুব আস্তে বলল,

— "কারণ এবার জানি, আপনি আমার পাশে থাকবেন।"

তিন মাস পর।

সবকিছু বদলে গেছে।

সায়েমের বিরুদ্ধে মামলায় চার বছর আগের সব রহস্য প্রকাশ্যে আসে।

প্রিয়ার বাবার বিরুদ্ধে থাকা সন্দেহও দূর হয়।

নিশানের বাবা দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে ওঠেন।

রিমা নতুন জীবন শুরু করে।

আর প্রিয়া?

সে আবার নিজের জীবন ফিরে পায়।

এক বিকেলে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিল প্রিয়া।

পেছন থেকে নিশানের কণ্ঠ—

— "এখানে একা দাঁড়িয়ে কী করছ?"

প্রিয়া ফিরে তাকাল।

— "আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।"

নিশান হেসে কাছে এল।

— "আমার জন্য?"

— "হ্যাঁ।"

— "কেন?"

প্রিয়া মৃদু হেসে বলল,

— "কারণ আপনি একদিন বলেছিলেন, আমাকে কখনো ছেড়ে যাবেন না।"

নিশান তার পাশে দাঁড়াল।

— "আজও বলছি।"

— "কথা রাখবেন?"

— "জীবন দিয়ে।"

প্রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— "একটা কথা বলি?"

— "হুম।"

— "আমাদের গল্পটা খুব অদ্ভুত ছিল।"

— "খুব।"

— "এত ভয়, এত মিথ্যা, এত কষ্ট..."

নিশান বলল,

— "কিন্তু শেষটা সুন্দর।"

প্রিয়া মাথা নেড়ে বলল,

— "কারণ শেষ পর্যন্ত সত্যিটা জিতেছে।"

নিশান তার হাত ধরল।

— "আর আমরা?"

প্রিয়া মৃদু হেসে বলল,

— "আমরা শেষ হইনি।"

নিশান অবাক হয়ে তাকাল।

— "তাহলে?"

প্রিয়া নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

— "আমাদের গল্প তো এখন শুরু।"

নিশান হাসল।

দূরে সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে।

নদীর পানিতে শেষ বিকেলের আলো ঝিলমিল করছে।

চার বছর ধরে যে রহস্য তাদের জীবনকে অন্ধকার করে রেখেছিল, তার অবসান হয়েছে।

যে মানুষগুলো তাদের আলাদা করতে চেয়েছিল, তারা পরাজিত।

আর যে সম্পর্কটা ভয়, ভুল বোঝাবুঝি আর অসংখ্য বিপদের মাঝেও টিকে ছিল—

সেটাই শেষ পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে বড় সত্যি হয়ে দাঁড়াল।

প্রিয়া নিশানের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,

— "নিশান?"

— "হুম?"

— "আপনি জানেন, আমি আপনাকে প্রথম কবে ভালোবেসেছিলাম?"

নিশান মুচকি হেসে বলল,

— "কবে?"

প্রিয়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

— "যেদিন আপনি আমাকে বলেছিলেন—"

সে থামল।

— "কী?"

প্রিয়া তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

— "ভয় পেয়ো না, আমি আছি।"

নিশান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— "আর আমি?"

— "আপনি?"

— "আমি তোমাকে প্রথম ভালোবেসেছিলাম সেদিন..."

প্রিয়া অপেক্ষা করল।

নিশান ধীরে বলল,

— "যেদিন বুঝেছিলাম, তোমাকে হারানোর ভয়টাই আমার সবচেয়ে বড় ভয়।"

প্রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।

সে মাথা রাখল নিশানের কাঁধে।

নিশান তার হাত ধরে রইল।

কোনো নাটকীয় প্রতিশ্রুতি নয়।

কোনো বড় আয়োজন নয়।

শুধু দুজন মানুষ।

যারা অসংখ্য অন্ধকার পেরিয়ে অবশেষে একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে।

নদীর ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেল।

প্রিয়া চোখ বন্ধ করল।

আর নিশান খুব আস্তে বলল—

— "এবার কোথাও যাচ্ছি না।"

প্রিয়া হাসল।

— "আমিও না।"

 

....
👁 292