রাগী অফিসারের ঘরে প্রথম রাত

— কবুল?

কাজী সাহেবের প্রশ্নটা শুনে নিশাতের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

ঘোমটার আড়াল থেকে সে একবার মায়ের দিকে তাকাল। মায়ের চোখে পানি। পাশে আত্মীয়স্বজন সবাই অপেক্ষা করছে তার উত্তরের জন্য।

নিশাত খুব আস্তে বলল,

— কবুল।

শব্দটা মুখ থেকে বের হতেই মনে হলো, তার পরিচিত জীবনটা যেন সেখানেই শেষ হয়ে গেল।

আজ থেকে সে অন্য একজনের স্ত্রী।

রোহানের স্ত্রী।

রোহান—একজন আর্মি অফিসার।

এই মানুষটার নাম শুনলেই গত এক মাস ধরে নিশাতের মনে অদ্ভুত একটা ভয় কাজ করছিল।

বিয়ের আগে মাত্র দুবার রোহানের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল।

প্রথমবার রোহান এসেছিল নিশাতকে দেখতে। সবাই যখন হাসি-ঠাট্টা করছিল, তখনও ছেলেটা একদম চুপচাপ বসেছিল। সোজা হয়ে বসে থাকা, শক্ত মুখ, গভীর চোখ—কেমন যেন সবসময় রাগী একটা ভাব।

নিশাত যখন একবার ভুল করে তার চোখের দিকে তাকিয়েছিল, রোহানের চোখের দৃষ্টি এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে সে সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল।

দ্বিতীয়বার দেখা হওয়ার সময় রোহান তাকে আলাদা করে শুধু একটা কথাই বলেছিল,

— আমি খুব রাগী মানুষ।

নিশাত চুপ করে তাকিয়ে ছিল।

রোহান আবার বলেছিল,

— তবে অন্যায়ভাবে কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি না। এটা জানিয়ে রাখলাম।

নিশাত সেদিনও শুধু মাথা নেড়েছিল।

কিন্তু আজ?

আজ সেই মানুষটাই তার স্বামী।

রাত প্রায় সাড়ে দশটা।

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে সবাই যখন একে একে চলে গেল, নিশাতকে রোহানের ঘরে বসিয়ে দেওয়া হলো।

ঘরটা অচেনা।

আরও অচেনা সেই মানুষটা, যার সঙ্গে আজ থেকে তাকে সারাজীবন কাটাতে হবে।

নিশাত বিছানার একপাশে বসে হাত মুঠো করে রেখেছিল।

হঠাৎ দরজা খুলল।

রোহান ঢুকল।

নিশাত সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

রোহান দরজা বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর গম্ভীর গলায় বলল,

— বসো।

নিশাত ধীরে বসে পড়ল।

রোহান নিজের ঘড়িটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল।

— এত ভয় পাচ্ছ কেন?

নিশাত চমকে তাকাল।

— আমি... ভয় পাচ্ছি না।

রোহানের ভ্রু কুঁচকে গেল।

— মিথ্যা বলো না।

নিশাত সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল।

রোহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— আমার সঙ্গে থাকতে হলে একটা জিনিস শিখতে হবে।

নিশাতের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

— কী?

— আমার সামনে কোনো কথা লুকাবে না।

নিশাত মাথা নেড়ে বলল,

— আচ্ছা।

— আর আমি যা বলব, সেটা নিয়ে অযথা তর্ক করবে না।

নিশাত আবার মাথা নেড়ে বলল,

— আচ্ছা।

রোহান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

— এত সহজে সবকিছু মেনে নিচ্ছ?

নিশাত আস্তে বলল,

— আপনি আমার স্বামী।

কথাটা শুনে রোহান কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে গেল।

ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।

রোহান ফোনটা হাতে নিয়ে কথা বলতেই তার মুখের ভাব বদলে গেল।

— কী বলছ?

ওপাশের কথা শুনে সে উঠে দাঁড়াল।

— লোকেশন পাঠাও। আমি এখনই আসছি।

ফোন কেটে রোহান দ্রুত আলমারি খুলে একটা জ্যাকেট বের করল।

নিশাত অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,

— আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

— বাইরে।

— এখন?

রোহান তার দিকে তাকাল।

— হ্যাঁ।

— কিন্তু আজ তো আমাদের...

নিশাত বাকিটা বলতে পারল না।

রোহান বুঝে গেল।

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

— দায়িত্বের ডাক এসেছে।

সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

হঠাৎ থেমে নিশাতের দিকে তাকাল।

— দরজা ভেতর থেকে লক করে রাখবে।

নিশাত মাথা নেড়ে বলল,

— আচ্ছা।

রোহান দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।

নিশাত স্থির হয়ে বসে রইল।

তার বিয়ের রাতেই স্বামী তাকে একা রেখে চলে গেল।

কিন্তু সে জানত না—

রোহান যে কাজে বের হয়েছে, সেটা সাধারণ কোনো দায়িত্ব ছিল না।

রাত বাড়তে বাড়তে কখন যে একটা বাজে, নিশাত বুঝতেই পারল না।

ঘরের ঘড়ির কাঁটা যেন ইচ্ছা করেই ধীরে চলছে।

রোহান যাওয়ার পর প্রথমে নিশাত ভেবেছিল, হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছিল, তার বুকের ভেতর অস্বস্তিটাও তত বাড়ছিল।

বারবার ফোনটা হাতে নিচ্ছিল সে।

রোহানের নম্বরটা স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছিল।

একবার কল করবে?

আবার ভাবল, যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে থাকে?

শেষ পর্যন্ত সাহস হলো না।

ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

নিশাত চমকে উঠল।

দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলে রোহান ঢুকল।

নিশাতের চোখ প্রথমেই আটকে গেল তার মুখে।

রোহান আগের মতোই শান্ত, কিন্তু আজ তার চোখে অন্যরকম কঠোরতা।

শার্টের হাতা গোটানো, চুল এলোমেলো, মুখে ক্লান্তির ছাপ।

নিশাত অজান্তেই জিজ্ঞেস করে ফেলল,

— আপনি ঠিক আছেন?

রোহান জুতো খুলতে খুলতে বলল,

— হ্যাঁ।

— এত দেরি হলো কেন?

রোহান থেমে তার দিকে তাকাল।

নিশাত সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল, প্রশ্নটা হয়তো করা ঠিক হয়নি।

সে মাথা নিচু করে ফেলল।

— সরি।

রোহান কিছু বলল না।

বিছানার পাশে রাখা চেয়ারটায় বসে চোখ বন্ধ করল।

নিশাত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

— পানি দেব?

— দাও।

নিশাত দ্রুত পানি এনে তার হাতে দিল।

রোহান গ্লাসটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে পানি শেষ করল।

নিশাত তখনও দাঁড়িয়ে।

হঠাৎ রোহান বলল,

— বসো।

নিশাত ধীরে বিছানায় বসল।

রোহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— তুমি ঘুমাওনি কেন?

— আপনি আসেননি।

— আমি তো বলিনি আমার জন্য জেগে থাকতে।

নিশাত আস্তে বলল,

— তবুও ঘুম আসছিল না।

রোহানের চোখ কয়েক মুহূর্ত তার মুখে স্থির হয়ে থাকল।

তারপর সে বলল,

— আজ থেকে একটা নিয়ম থাকবে।

নিশাত চুপ করে শুনতে লাগল।

— আমি যখন বাইরে থাকব, তুমি অযথা চিন্তা করবে না।

— কিন্তু আপনি যদি এত রাতে ফেরেন?

— তাহলে অপেক্ষা করবে না।

নিশাত কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু রোহানের মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল।

তারপর হঠাৎ রোহান জিজ্ঞেস করল,

— তুমি আমাকে বিশ্বাস করো?

প্রশ্নটা শুনে নিশাত অবাক।

— জি?

— প্রশ্নের উত্তর দাও।

নিশাত একটু ভেবে বলল,

— চেষ্টা করছি।

রোহানের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটল।

— ভালো।

তারপর উঠে দাঁড়াল।

— ঘুমাও।

নিশাত অবাক হয়ে বলল,

— আপনি?

— আমি একটু কাজ করব।

রোহান টেবিলের সামনে গিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসল।

নিশাত বিছানায় শুয়ে পড়ল।

কিন্তু চোখ বন্ধ করেও ঘুম আসছিল না।

কিছুক্ষণ পর রোহানের ফোন বেজে উঠল।

রোহান ফোন ধরেই বলল,

— হ্যাঁ।

ওপাশ থেকে কিছু বলা হলো।

রোহানের মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল।

— নিশ্চিত?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল,

— কাউকে কিছু বলবে না। আমি নিজে দেখছি।

ফোন কেটে রোহান উঠে দাঁড়াল।

নিশাত বিছানা থেকে উঠে বসল।

— আবার যাবেন?

রোহান তাকাল।

— হ্যাঁ।

নিশাতের মুখটা হঠাৎ মলিন হয়ে গেল।

রোহান সেটা লক্ষ্য করল।

— কী হয়েছে?

— কিছু না।

— নিশাত।

নিশাত ধীরে বলল,

— আপনি আবার গেলে... আমি একা থাকব।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর কাছে এসে বলল,

— ভয় পাচ্ছ?

নিশাত সত্যি কথাটা লুকাল না।

— একটু।

রোহানের কঠিন মুখটা নরম হয়ে গেল।

সে বলল,

— দরজা লক করে রাখবে। আর আমার ফোন ছাড়া কারও জন্য দরজা খুলবে না।

নিশাত মাথা নেড়ে বলল,

— আচ্ছা।

রোহান বেরিয়ে গেল।

কিন্তু এবার যাওয়ার আগে সে একবার পেছন ফিরে তাকাল।

নিশাত তখনও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে।

রোহান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।

শুধু বলল,

— ঘুমিয়ে পড়ো। আমি ফিরব।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

নিশাত জানত না কেন, কিন্তু সেই শেষ কথাটা তার মনে অদ্ভুত শান্তি এনে দিল।

“আমি ফিরব।”

কিন্তু রাত তিনটার দিকে হঠাৎ নিশাতের ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এল।

ঘুম জড়ানো চোখে ফোনটা কানে ধরতেই ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ বলল,

— আপনি কি রোহানের স্ত্রী?

নিশাতের বুক ধক করে উঠল।

— জি... কেন?

লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

— আপনার স্বামীকে নিয়ে একটা কথা বলার আছে।

নিশাতের হাত কাঁপতে শুরু করল।

— কী কথা?

ওপাশ থেকে উত্তর এল,

— রোহান আপনাকে যা বলেছে, তার সবটা সত্যি নয়।

কলটা কেটে গেল।

নিশাত স্থির হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

আর ঠিক তখনই—

বাইরে হঠাৎ একটা গাড়ির ব্রেকের বিকট শব্দ হলো।

বাইরে গাড়ির ব্রেকের শব্দটা এত জোরে হলো যে নিশাতের বুক কেঁপে উঠল।

সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

রোহানের কথা মনে পড়ল—

“আমার ফোন ছাড়া কারও জন্য দরজা খুলবে না।”

নিশাত দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল।

বাইরে কারা যেন কথা বলছে।

পুরুষ কণ্ঠ।

তারপর আবার গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

নিশাতের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

রোহান কি ফিরে এসেছে?

সে দরজার কাছে কান পাতল।

— নিশাত!

রোহানের গলা।

নিশাতের বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়টা মুহূর্তেই একটু কমে গেল।

সে দরজা খুলতে গিয়ে আবার থেমে গেল।

রোহান আবার বলল,

— নিশাত, দরজা খোলো।

নিশাত দরজা খুলে দিল।

রোহান সামনে দাঁড়িয়ে।

তার সঙ্গে আরও দুজন আর্মির সদস্য।

রোহানের মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর।

— তুমি ঠিক আছ?

নিশাত মাথা নেড়ে বলল,

— জি।

রোহান ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।

তারপর সরাসরি জিজ্ঞেস করল,

— কোনো ফোন এসেছিল?

নিশাত থমকে গেল।

— আপনি জানলেন কীভাবে?

রোহানের চোখ সরু হয়ে গেল।

— ফোন এসেছিল?

নিশাত ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

— জি।

— কে করেছিল?

— জানি না। অচেনা নম্বর।

— কী বলেছে?

নিশাত সবটা বলল।

রোহান চুপ করে শুনল।

কথা শেষ হতেই তার মুখের রাগটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

— নম্বরটা দেখাও।

নিশাত ফোন এগিয়ে দিল।

রোহান নম্বরটা দেখে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল।

তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,

— আমি ভেবেছিলাম ওরা আর কখনো তোমার কাছে আসবে না।

নিশাত অবাক হয়ে বলল,

— কারা?

রোহান উত্তর দিল না।

— রোহান?

— তুমি এখন এসব জানতে চেয়ো না।

নিশাত এবার একটু সাহস করে বলল,

— কিন্তু ওই লোকটা বলেছে আপনি আমাকে সব সত্যি বলেননি।

রোহান তার দিকে তাকাল।

চোখে এমন একটা দৃষ্টি ছিল, যাতে নিশাতের ভয় করে উঠল।

— আমি তোমাকে যা বলেছি, সেটা তোমার নিরাপত্তার জন্যই বলেছি।

— কিন্তু কী লুকিয়েছেন?

রোহান চুপ।

নিশাত এবার প্রথমবার একটু জোর দিয়ে বলল,

— আমি আপনার স্ত্রী। আমার জানার অধিকার আছে।

কথাটা শুনে রোহান কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

— তুমি ঠিক বলেছ।

নিশাত অবাক হয়ে তাকাল।

রোহান চেয়ারে বসে বলল,

— আমার কিছু শত্রু আছে। কয়েক মাস ধরে একটা অপারেশনের সঙ্গে আমি জড়িত। সেই কারণে আমাকে নজরে রাখা হচ্ছে।

নিশাতের মুখ শুকিয়ে গেল।

— তাহলে... আমাকে বিয়ে করলেন কেন?

প্রশ্নটা শুনে রোহান থেমে গেল।

কিছুক্ষণ পর বলল,

— কারণ তোমাকে আমি আগে থেকেই চিনতাম।

নিশাত হতভম্ব।

— কী?

— তুমি হয়তো জানো না। কিন্তু তোমার বাবার সঙ্গে আমার বাবার পরিচয় ছিল। তোমাকে আমি অনেক আগেই দেখেছি।

নিশাত কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।

— তাহলে এতদিন কিছু বলেননি কেন?

রোহান তাকিয়ে বলল,

— কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না, তোমাকে এই জীবনে টেনে আনা উচিত কি না।

নিশাতের চোখে পানি চলে এল।

— তাহলে বিয়েতে রাজি হলেন কেন?

রোহান এবার উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে একজন আর্মি সদস্য এসে বলল,

— স্যার।

রোহান উঠে দাঁড়াল।

— বলো।

— গেটের বাইরে একজন লোককে পাওয়া গেছে। পালানোর চেষ্টা করছিল।

রোহানের চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।

— কোথায়?

— পেছনের গলিতে।

রোহান দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

নিশাত হঠাৎ তার হাত ধরে ফেলল।

রোহান থেমে গেল।

নিশাত ভয় পাওয়া চোখে বলল,

— আপনি আবার বাইরে যাবেন?

রোহান তার হাতের দিকে তাকাল।

তারপর নিশাতের চোখের দিকে।

কণ্ঠটা আগের চেয়ে অনেক নরম হলো।

— যেতে হবে।

— সাবধানে যাবেন?

— যাব।

রোহান হাত ছাড়িয়ে দরজার দিকে এগোল।

কিন্তু দরজা খোলার আগে থেমে পেছন ফিরে তাকাল।

— নিশাত।

— জি?

— আজ যদি কেউ তোমাকে ফোন করে, কথা বলবে না।

— আচ্ছা।

— আর যদি কেউ আমার নামে তোমাকে কিছু বলে...

রোহান কিছুক্ষণ থেমে বলল,

— আমাকে বিশ্বাস করবে।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

নিশাত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার মাথায় এখন একটাই প্রশ্ন—

রোহান কি সত্যিই তাকে শুধু নিরাপদ রাখার জন্য বিয়ে করেছে?

নাকি এই বিয়ের পেছনে আরও বড় কোনো কারণ আছে?

কিছুক্ষণ পর নিশাতের চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা একটা ফাইলের দিকে।

ফাইলটা হয়তো রোহান তাড়াহুড়োয় খুলেই রেখে গেছে।

নিশাত ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

প্রথম পাতাটা খুলতেই তার চোখ আটকে গেল একটা ছবিতে।

ছবিটা ছিল নিশাতের।

আর ছবির নিচে লেখা—

“Target: Nishat.”

নিশাতের হাত থেকে ফাইলটা পড়ে গেল।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে রোহানের চিৎকার শোনা গেল—

— নিশাত! দরজা বন্ধ করো! এখনই!

রোহানের চিৎকার শুনে নিশাতের পুরো শরীর অবশ হয়ে গেল।

— নিশাত! দরজা বন্ধ করো! এখনই!

সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকল না।

দৌড়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিল।

বাইরে কয়েক সেকেন্ডের জন্য অদ্ভুত নীরবতা।

তারপর ভারী পায়ের শব্দ।

নিশাত দরজার সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার হাত-পা কাঁপছিল।

কিছুক্ষণ পর দরজায় তিনবার শব্দ হলো।

ঠক। ঠক। ঠক।

নিশাত ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল।

— নিশাত, আমি।

রোহানের গলা।

নিশাত ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিল।

রোহান ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল।

তার মুখ দেখে নিশাত বুঝতে পারল, পরিস্থিতি মোটেও স্বাভাবিক নয়।

— তুমি ফাইলটা দেখেছ?

নিশাত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

রোহান টেবিলের দিকে তাকাল।

ফাইলটা মেঝেতে পড়ে আছে।

তারপর ধীরে নিশাতের দিকে তাকাল।

— তুমি কী দেখেছ?

নিশাত কাঁপা গলায় বলল,

— আমার ছবি...

রোহানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

নিশাত এবার প্রশ্ন করল,

— আমার ছবি ওখানে কেন?

রোহান কোনো উত্তর দিল না।

— আপনি আমাকে কী থেকে বাঁচাচ্ছেন?

— নিশাত—

— সত্যি করে বলুন!

রোহানের চোখে রাগের ঝিলিক দেখা গেল।

— আমি বলেছি, এখন এসব নিয়ে কথা বলবে না।

নিশাত এবার পিছিয়ে গেল।

রোহান সঙ্গে সঙ্গে নিজের গলার স্বর নরম করল।

— আমি তোমার ওপর রাগ করছি না।

নিশাতের চোখে পানি।

— কিন্তু আপনি সবসময় আমাকে কিছু না কিছু লুকান।

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

— কারণ আমি ভয় পাই।

নিশাত অবাক হয়ে তাকাল।

— আপনি?

রোহান হালকা হেসে বলল,

— হ্যাঁ। আমি ভয় পাই।

— কিসের?

রোহান উত্তর দিল না।

বরং ফাইলটা তুলে নিল।

— তোমার ছবি এখানে থাকার মানে তুমি এখন আমার দুর্বল জায়গা।

নিশাত স্তব্ধ।

রোহান বলল,

— যারা আমাকে আঘাত করতে চায়, তারা জানে সরাসরি আমাকে হারানো সহজ নয়। তাই তারা তোমাকে ব্যবহার করতে চাইছে।

নিশাতের চোখ ভিজে গেল।

— তাহলে আমাকে বিয়ে করলেন কেন?

রোহান এবার তার দিকে তাকাল।

অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— কারণ আমি তোমাকে একা ছেড়ে যেতে পারিনি।

নিশাতের বুক কেঁপে উঠল।

— কিন্তু আমি তো আপনাকে প্রায় চিনতামই না।

— আমি চিনতাম।

— কীভাবে?

রোহান জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,

— তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগে আমার বাবাকে একটা কথা বলে গিয়েছিলেন। তোমাকে যেন আমি কখনো একা না হতে দিই।

নিশাত কিছু বলতে পারল না।

তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

— তাহলে এই বিয়েটা শুধু দায়িত্ব?

রোহান এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।

— শুরুতে হয়তো ছিল।

নিশাতের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

কিন্তু রোহান পরের কথাটা বলার আগেই বাইরে একটা শব্দ হলো।

রোহান সঙ্গে সঙ্গে নিশাতের সামনে এসে দাঁড়াল।

— পিছনে যাও।

নিশাত ভয় পেয়ে বলল,

— কী হয়েছে?

— চুপ।

বাইরে কেউ যেন গেটের কাছে কিছু ফেলল।

রোহান দ্রুত জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল।

তারপর ফিরে এসে নিশাতের হাত ধরল।

— আমার সঙ্গে আসো।

— কোথায়?

— নিচের ঘরে।

রোহানের হাতের মুঠো শক্ত ছিল।

কিন্তু নিশাত বুঝতে পারছিল, তার নিজের হাতের চেয়েও বেশি কাঁপছে রোহানের হাত।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে নিশাত আস্তে বলল,

— আপনি ভয় পাচ্ছেন?

রোহান থেমে গেল।

তারপর নিশাতের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,

— তোমার কিছু হয়ে যাওয়ার ভয়টা আমার সবকিছুর চেয়ে বড়।

নিশাত আর কোনো কথা বলল না।

কিছুক্ষণ পর বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

পরিস্থিতি শান্ত হলো।

রোহান তখনও নিশাতের হাত ছাড়েনি।

নিশাত প্রথমবার বুঝতে পারল—

এই রাগী মানুষটা যতটা শক্ত দেখায়, তার ভেতরে কোথাও একটা জায়গা আছে যেখানে সে ভয় পায়।

আর সেই জায়গাটার নাম—

নিশাত।

কিন্তু পরদিন সকালে রোহানের আচরণ আবার সম্পূর্ণ বদলে গেল।

নিশাত ঘুম থেকে উঠে দেখল, রোহান ব্যাগ গোছাচ্ছে।

— আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

রোহান তার দিকে না তাকিয়েই বলল,

— তোমাকে তোমার বাবার বাড়িতে রেখে আসব।

নিশাত অবাক হয়ে বলল,

— কেন?

রোহান এবার তাকাল।

চোখে কঠোরতা।

— কারণ তুমি আমার সঙ্গে থাকলে নিরাপদ নও।

নিশাত ধীরে মাথা নাড়ল।

— আমি যাব না।

রোহানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

— নিশাত, এটা অনুরোধ নয়। এটা আমার সিদ্ধান্ত।

রোহানের গম্ভীর কণ্ঠে ঘরটা যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

নিশাত এতক্ষণ সাহস করে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু কথাটা শুনে তার বুকটা কেঁপে উঠল।

সে আস্তে বলল,

— কিন্তু আমি যাব না।

রোহান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

— কী বললে?

নিশাত এবার নিজের ভয়টাকে সামলে বলল,

— আমি আপনার সঙ্গে এসেছি। এখন বিপদ হয়েছে বলে আমাকে একা পাঠিয়ে দেবেন?

— তোমার নিরাপত্তার জন্যই পাঠাচ্ছি।

— তাহলে আপনি?

— আমার কথা ভাবতে হবে না।

নিশাতের চোখে পানি চলে এল।

— আপনার কথা ভাবব না?

রোহান চুপ হয়ে গেল।

নিশাত এবার একটু এগিয়ে এসে বলল,

— আপনি কি ভাবছেন আমি আপনার জন্য বোঝা?

— না।

— তাহলে কেন আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন?

রোহানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

— কারণ আমি জানি না সামনে কী হবে।

— আর আমি জানি না আপনার পাশে না থাকলে আমার কী হবে।

কথাটা শুনে রোহান স্থির হয়ে গেল।

নিশাত নিজেও বুঝতে পারল না কীভাবে কথাটা বলে ফেলেছে।

কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না।

তারপর রোহান ধীরে বলল,

— তুমি বুঝতে পারছ না তুমি কী বলছ।

— বুঝেই বলছি।

— নিশাত, আমার জীবন সাধারণ না।

— জানি।

— আমি যেকোনো সময় বাইরে থাকি। কখনো দিনের পর দিন বাড়ি ফিরতে পারি না। কখনো এমন কাজ করতে হয় যেখানে নিজের জীবন নিয়েও নিশ্চয়তা থাকে না।

নিশাত চোখ মুছে বলল,

— তবুও আমি আপনার স্ত্রী।

রোহান তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ কঠিন গলায় বলল,

— তুমি আমার কথা শুনবে।

নিশাত এবার চুপ।

রোহান ব্যাগটা তুলে নিল।

— আজই তোমাকে নিয়ে যাব।

নিশাতের চোখে অভিমান ফুটে উঠল।

— আপনি সবসময় এমন করেন।

— কেমন?

— নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেন। আমার কথা শুনতে চান না।

রোহান কিছু বলল না।

নিশাত ঘুরে জানালার দিকে তাকাল।

তার চোখের পানি দেখে রোহানের মুখের কঠোরতা একটু নরম হলো।

সে ধীরে বলল,

— আমি তোমাকে হারানোর ঝুঁকি নিতে পারি না।

নিশাত ঘুরে তাকাল।

— আর আমাকে হারিয়ে বাঁচতে পারবেন?

প্রশ্নটা শুনে রোহান থেমে গেল।

কোনো উত্তর দিল না।

নিশাত বুঝে গেল, উত্তরটা সে মুখে বলছে না।

কিন্তু তার চোখ বলে দিচ্ছে সবকিছু।

ঠিক তখনই রোহানের ফোন বেজে উঠল।

সে ফোন ধরল।

— হ্যাঁ।

ওপাশ থেকে কিছু শোনার পর রোহানের মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।

— কী বলছ?

সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— নিশ্চিত?

আরেকটু শুনে সে ধীরে বলল,

— ঠিক আছে। কাউকে অনুসরণ করতে দিও না। আমি আসছি।

ফোন কেটে রোহান নিশাতের দিকে তাকাল।

— কী হয়েছে?

রোহান এবার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— তোমার বাবার বাড়িতে যাওয়া এখন আর নিরাপদ নয়।

নিশাতের বুক কেঁপে উঠল।

— কেন?

— সেখানে একজন লোককে দেখা গেছে।

— কে?

রোহান উত্তর দিল না।

নিশাত এবার বুঝতে পারল, পরিস্থিতি আগের চেয়েও ভয়ংকর।

রোহান দ্রুত নিজের অস্ত্রের বেল্ট ঠিক করতে লাগল।

নিশাত ভয় পেয়ে বলল,

— আপনি আবার বাইরে যাবেন?

— হ্যাঁ।

— আমাকে একা রেখে?

রোহান তার দিকে তাকাল।

কয়েক মুহূর্ত পর কাছে এসে বলল,

— তুমি আমার সঙ্গে যাবে।

নিশাত অবাক।

— কোথায়?

— এমন একটা জায়গায়, যেখানে তোমাকে কেউ খুঁজে পাবে না।

— কোথায়?

রোহান উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল।

রোহান দরজা খুলে বের হতে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

— আমার কথা শুনবে?

নিশাত মাথা নেড়ে বলল,

— হ্যাঁ।

— আমার কাছ থেকে এক পা দূরেও যাবে না।

— আচ্ছা।

— আর আমি যা বলব, সেটা নিয়ে প্রশ্ন করবে না।

নিশাত একটু থেমে বলল,

— চেষ্টা করব।

রোহানের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।

— সেটাই যথেষ্ট।

দুজন গাড়িতে উঠল।

গাড়ি শহর ছাড়িয়ে অচেনা পথে এগোতে লাগল।

নিশাত জানালার বাইরে তাকিয়ে বুঝতে পারছিল না তারা কোথায় যাচ্ছে।

প্রায় এক ঘণ্টা পর গাড়ি একটা নির্জন জায়গায় এসে থামল।

সামনে বিশাল একটা পুরোনো বাড়ি।

রোহান গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে নিশাতকে নামতে বলল।

নিশাত চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— এখানে আমরা কোথায়?

রোহান শুধু বলল,

— আমার বাড়ি।

নিশাত অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

— আপনি তো বলেছিলেন আপনার বাড়ি শহরে।

রোহান তার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,

— ওটা আমার থাকার জায়গা। এটা আমার আসল বাড়ি।

নিশাতের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কৌতূহল জন্ম নিল।

কিন্তু সে জানত না—

এই বাড়ির ভেতরেই লুকিয়ে আছে রোহানের জীবনের এমন এক সত্যি, যা জানার পর নিশাত হয়তো তাকে আর আগের চোখে দেখতে পারবে না।

গাড়ি থামার পরও নিশাত কয়েক মুহূর্ত নড়ল না।

সামনের বাড়িটা অদ্ভুত।

শহরের পরিচিত বাড়িগুলোর মতো নয়। চারপাশে উঁচু দেয়াল, বিশাল লোহার গেট, গেটের দুপাশে নিরাপত্তারক্ষী। বাড়িটার চারদিকে এতটা নীরবতা যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যায়।

রোহান গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে বলল,

— নামো।

নিশাত ধীরে নামল।

চারপাশে তাকিয়ে বলল,

— এখানে কেউ থাকে?

— থাকে।

— কে?

রোহান হাঁটতে হাঁটতে বলল,

— এখন থেকে তুমি।

নিশাত থমকে গেল।

— আমি?

রোহান পেছন ফিরে তাকাল।

— হ্যাঁ।

— কিন্তু আপনি বলেছিলেন এটা আপনার আসল বাড়ি।

— তাই তো।

— তাহলে আমাকে এখানে কেন আনলেন?

রোহান কিছু না বলে ভেতরে ঢুকে গেল।

নিশাত বাধ্য হয়ে তার পেছনে গেল।

বাড়ির ভেতরটা বাইরে থেকে যতটা পুরোনো মনে হয়েছিল, ভেতরে ততটাই সুন্দর। কাঠের সিঁড়ি, বড় বড় জানালা, দেয়ালে পুরোনো কিছু ছবি।

একটা ছবির সামনে গিয়ে নিশাত থেমে গেল।

ছবিতে একজন তরুণ রোহান দাঁড়িয়ে আছে।

তার পাশে একজন বয়স্ক মানুষ।

নিশাত ছবিটা দেখে বলল,

— উনি কে?

রোহান থেমে গেল।

তার মুখটা মুহূর্তেই বদলে গেল।

— আমার বাবা।

নিশাত চুপ হয়ে গেল।

রোহান ধীরে ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,

— এই বাড়িটা উনার।

তারপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

— আমি এখানে খুব কম আসি।

নিশাত আস্তে বলল,

— কেন?

— কারণ এখানে অনেক স্মৃতি আছে।

রোহানের কণ্ঠে এমন একটা ভার ছিল যে নিশাত আর প্রশ্ন করল না।

ঠিক তখনই একজন বয়স্ক মহিলা এসে বললেন,

— বাবা, তুমি এসেছ?

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

— হ্যাঁ, খালা।

মহিলা নিশাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

— এটাই নিশাত?

নিশাত অবাক হয়ে তাকাল।

রোহান বলল,

— হ্যাঁ।

মহিলা নিশাতের কাছে এসে তার মাথায় হাত রাখলেন।

— তোমাকে অনেকদিন ধরে দেখতে চেয়েছিলাম।

নিশাত অবাক হয়ে রোহানের দিকে তাকাল।

রোহান চোখ সরিয়ে নিল।

মহিলা বললেন,

— তোমার স্বামী তোমার কথা অনেক বলেছে।

নিশাতের চোখ বড় হয়ে গেল।

— সত্যি?

রোহান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— খালা, আপনি ওকে এসব বলবেন না।

মহিলা হেসে বললেন,

— কেন? সত্যিটা জানলে ক্ষতি কী?

নিশাত এবার আরও কৌতূহলী হয়ে উঠল।

— কী সত্যি?

রোহান বিরক্ত হয়ে বলল,

— খালা!

মহিলা হাসতে হাসতে চলে গেলেন।

নিশাত রোহানের সামনে এসে দাঁড়াল।

— আপনি আমার কথা বলেন?

— মাঝে মাঝে।

— কী বলেন?

— কিছু না।

— নিশ্চয়ই কিছু বলেন।

রোহান ভ্রু কুঁচকে বলল,

— এত প্রশ্ন করো কেন?

নিশাত একটু ভয় পেলেও এবার হেসে ফেলল।

— কারণ জানতে ইচ্ছে করে।

রোহান কিছু বলল না।

কিন্তু তার মুখের কঠোরতা আর আগের মতো ছিল না।

সন্ধ্যার পর নিশাত নিজের ঘরে বসে ছিল।

হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো।

রোহান ঢুকল।

তার হাতে একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স।

সে বাক্সটা নিশাতের সামনে রাখল।

— এটা তোমার জন্য।

নিশাত অবাক হয়ে বাক্স খুলল।

ভেতরে কিছু পুরোনো চিঠি।

প্রথম চিঠিটা খুলতেই নিশাতের চোখ বড় হয়ে গেল।

চিঠির ওপরে লেখা—

“রোহানের জন্য—নিশাতের বাবা।”

নিশাত রোহানের দিকে তাকাল।

— এগুলো কী?

রোহান চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

নিশাত একটা চিঠি খুলে পড়তে শুরু করল।

প্রথম কয়েক লাইন পড়েই তার হাত কাঁপতে লাগল।

চিঠিতে লেখা—

“রোহান, যদি কোনোদিন আমার মেয়ের জীবনে এমন সময় আসে যখন তাকে একা মনে হবে, তখন তুমি তার পাশে দাঁড়াবে। কারণ আমি জানি, তুমি তাকে নিজের চেয়েও বেশি নিরাপদে রাখতে পারবে।”

নিশাতের চোখ ভিজে গেল।

সে রোহানের দিকে তাকাল।

— আপনি এগুলো এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলেন?

রোহান ধীরে বলল,

— কারণ আমি চাইনি তুমি ভাবো, তোমার জীবনটা কোনো পুরোনো প্রতিশ্রুতির কারণে আমার সঙ্গে বাঁধা।

নিশাত চুপ।

রোহান এবার তার সামনে বসে বলল,

— তোমার সঙ্গে আমার বিয়েটা শুধু দায়িত্ব দিয়ে শুরু হয়েছিল।

নিশাতের বুকটা কেঁপে উঠল।

— আর এখন?

রোহান তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।

কিন্তু উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে গুলির শব্দ হলো।

ধাঁই!

নিশাত চিৎকার করে উঠল।

রোহান এক মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে নিজের আড়ালে নিয়ে গেল।

তার চোখে সেই পরিচিত কঠোরতা ফিরে এসেছে।

বাইরে থেকে একজন চিৎকার করে বলল,

— স্যার! গেটের সামনে লোক আছে!

রোহান নিশাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

— তুমি এখানেই থাকবে।

নিশাত তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।

— আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

রোহান হাতটা ছাড়াতে গিয়ে থেমে গেল।

নিশাত কাঁপা গলায় বলল,

— আমাকে একা রেখে যাবেন না।

রোহান কয়েক সেকেন্ড তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,

— তাহলে আমার সঙ্গে থাকো।

সে নিশাতের হাত শক্ত করে ধরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু দরজা খোলার আগেই বাইরে থেকে আরেকটা গুলির শব্দ হলো।

আর রোহানের মুখ দেখে নিশাত বুঝল—

এবার বিপদটা সত্যিই তাদের ঘরের ভেতর ঢুকে গেছে।

দ্বিতীয় গুলির শব্দটা থামতেই বাড়ির ভেতর হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।

নিশাত আঁতকে উঠে রোহানের হাত শক্ত করে ধরল।

— কী হলো?

রোহান সঙ্গে সঙ্গে ফিসফিস করে বলল,

— চুপ।

তারপর নিজের ফোনের আলো জ্বালিয়ে চারপাশে তাকাল।

বাইরে লোকজনের দৌড়াদৌড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

রোহান নিশাতকে নিজের পেছনে রেখে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোল।

— আপনি বাইরে যাবেন না, প্লিজ।

নিশাতের কণ্ঠ কাঁপছিল।

রোহান ফিরে তাকাল।

— আমি না গেলে যারা বাইরে আছে, তারা ভেতরে ঢুকবে।

— কিন্তু—

— নিশাত।

রোহানের গলা এবার কঠিন।

নিশাত সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।

রোহান বলল,

— আমার কথা শুনবে?

— জি।

— দরজা বন্ধ করে ভেতরে থাকবে। আমি না আসা পর্যন্ত বের হবে না।

নিশাত মাথা নেড়ে বলল,

— আচ্ছা।

রোহান বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিশাতের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

বাইরে কিছুক্ষণ চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি, তারপর আবার নীরবতা।

সে বিছানার পাশে বসে রইল।

প্রায় দশ মিনিট পর দরজা খুলে রোহান ঢুকল।

নিশাত ছুটে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল।

— আপনি ঠিক আছেন?

— হ্যাঁ।

— কী হয়েছে?

রোহান উত্তর না দিয়ে বলল,

— তুমি বাইরে বের হয়েছিলে?

নিশাত মাথা নাড়ল।

— না।

— ভালো।

তারপর রোহান ঘরের চারপাশে তাকিয়ে বলল,

— কিন্তু তুমি আমার কথা পুরোপুরি শোনোনি।

নিশাত অবাক।

— কী করেছি?

রোহান টেবিলের ওপর থাকা সেই কাঠের বাক্সটার দিকে তাকাল।

— এটা তুমি আবার খুলেছিলে?

— হ্যাঁ।

— আমি বলেছিলাম, এগুলো এখন পড়বে না।

নিশাত একটু সাহস করে বলল,

— কিন্তু ওগুলোতে আমার বাবার চিঠি ছিল।

— তবুও।

— কেন?

রোহানের চোখে রাগ ফুটে উঠল।

— কারণ তুমি এখনো জানো না, ওই চিঠির সঙ্গে কী জড়িয়ে আছে।

নিশাত চুপ করে গেল।

রোহান কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকল।

তারপর বলল,

— আমি তোমাকে ভয় দেখাতে চাই না।

নিশাত আস্তে বলল,

— কিন্তু আপনি যখন এভাবে রাগ করেন, আমি সত্যিই ভয় পাই।

রোহান থমকে গেল।

তার মুখের রাগটা মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।

সে ধীরে নিশাতের সামনে এসে দাঁড়াল।

— আমি দুঃখিত।

নিশাত অবাক হয়ে তাকাল।

রোহান খুব কম কথা বলে, কিন্তু আজ সে নিজে থেকে ক্ষমা চাইছে।

— আমি তোমার ওপর রাগ করিনি।

— তাহলে?

— পরিস্থিতির ওপর।

নিশাত চুপ করে রইল।

রোহান নিচু গলায় বলল,

— তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। তাই কখনো কখনো বেশি কঠিন হয়ে যাই।

নিশাত এবার আস্তে বলল,

— আপনি কি সত্যিই আমাকে এতটা নিয়ে ভাবেন?

রোহান উত্তর দিল না।

শুধু তার হাতটা ধরে বলল,

— তুমি বুঝতে পারো না।

নিশাতের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

রোহান সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল।

— কে?

বাইরে থেকে একজন বলল,

— স্যার, একটা জিনিস পাওয়া গেছে।

রোহান দরজা খুলে বাইরে গেল।

কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে তার হাতে একটা ছোট কালো পেনড্রাইভ।

নিশাত তাকিয়ে বলল,

— ওটা কী?

রোহান বলল,

— যেটার জন্য এতদিন ধরে ওরা আমাকে খুঁজছে।

নিশাত অবাক হয়ে গেল।

— কী আছে এতে?

রোহান পেনড্রাইভটার দিকে তাকিয়ে বলল,

— কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

— আর এজন্যই কি আমাকে টার্গেট করা হচ্ছে?

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

— হ্যাঁ।

নিশাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— তাহলে এটা আমার কাছে রাখুন।

রোহান অবাক।

— কেন?

— কারণ ওরা যদি আপনাকে খুঁজে পায়, আমি চাই না আপনি একা লড়ুন।

রোহান হেসে ফেলল।

— তুমি আমাকে সাহায্য করবে?

নিশাত একটু সাহস করে বলল,

— স্ত্রী হিসেবে এতটুকু তো করতে পারি।

রোহানের চোখে অদ্ভুত কোমলতা ফুটে উঠল।

সে বলল,

— ঠিক আছে।

তারপর পেনড্রাইভটা টেবিলে রেখে নিশাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

— কিন্তু একটা শর্ত আছে।

— কী?

— তুমি আমার কাছ থেকে এক পা দূরে যাবে না।

নিশাত মাথা নেড়ে বলল,

— আচ্ছা।

রোহান হঠাৎ খুব নিচু স্বরে বলল,

— আর ভয় পেলে আমাকে বলবে।

নিশাত একটু হাসল।

— আপনি পাশে থাকলে ভয় কম লাগে।

রোহান কিছু বলল না।

শুধু তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।

কিন্তু সেই মুহূর্তেই তার ফোনে একটা মেসেজ এল।

রোহান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল।

নিশাত জিজ্ঞেস করল,

— কী হয়েছে?

রোহান ধীরে ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।

মেসেজে লেখা—

“পেনড্রাইভটা তোমার কাছে আছে জানি। কিন্তু এবার আমরা রোহানকে নয়, নিশাতকে চাই।”

নিশাতের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

আর রোহানের চোখে এমন রাগ জ্বলে উঠল, যা নিশাত আগে কখনো দেখেনি।

সে দাঁত চেপে বলল,

— এবার ওরা ভুল মানুষকে ছুঁয়েছে।

মেসেজটা দেখার পর রোহানের মুখটা এক মুহূর্তে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল।

নিশাত ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

— ওরা... আমাকে কেন চাইছে?

রোহান কোনো উত্তর দিল না।

সে দ্রুত ঘরের দরজা, জানালা, পর্দা—সবকিছু পরীক্ষা করতে লাগল।

নিশাত বুঝতে পারছিল, পরিস্থিতি খুব খারাপ।

— রোহান...

— চুপ করে বসো।

— কিন্তু—

— আমি বলেছি বসো।

নিশাত চুপ করে গেল।

রোহান কয়েকবার ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলল। তারপর ঘরের এক পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল,

— আমরা এখান থেকে বের হব।

নিশাত অবাক।

— কোথায় যাব?

— নিরাপদ জায়গায়।

— এই বাড়িটাও তো নিরাপদ ছিল।

রোহান তাকাল।

— ছিল।

একটা শব্দের উত্তর।

নিশাতের বুকটা কেঁপে উঠল।

— তাহলে এখন?

— এখন ওরা জানে আমরা এখানে।

রোহান একটা ব্যাগ গুছাতে শুরু করল।

নিশাত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল।

হঠাৎ সে বলল,

— আপনি আমাকে আবার কোথাও লুকিয়ে রাখতে চান?

রোহান থেমে গেল।

— আমি তোমাকে বাঁচাতে চাই।

— কিন্তু আপনি আমাকে সবসময় নিজের কাছ থেকে দূরে পাঠান।

রোহান তাকিয়ে রইল।

নিশাতের চোখে পানি জমেছে।

— আমি কি আপনার জন্য এতটাই দুর্বল?

রোহান ধীরে কাছে এসে বলল,

— তুমি আমার দুর্বলতা।

নিশাতের বুক ধক করে উঠল।

— আর সেই কারণেই আমি ভয় পাই।

রোহান খুব নিচু স্বরে বলল,

— তুমি জানো না, তোমাকে হারানোর চিন্তা আমার মাথা কতটা এলোমেলো করে দেয়।

নিশাত কিছু বলতে পারল না।

ঠিক তখন বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

রোহান সঙ্গে সঙ্গে নিশাতের হাত ধরে তাকে অন্য ঘরে নিয়ে গেল।

— নিচু হও।

দুজন জানালার পাশে নিচু হয়ে বসে রইল।

বাইরে কয়েকজনের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে।

— বাড়ির ভেতরে কেউ আছে?

— নিশ্চিত না।

রোহানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

সে নিশাতকে ইশারা করে চুপ থাকতে বলল।

কয়েক মিনিট পর শব্দটা দূরে সরে গেল।

রোহান নিশাতের দিকে তাকাল।

— এখন বের হতে হবে।

দুজন পেছনের দরজা দিয়ে বের হলো।

বাড়ির পেছনে একটা গাড়ি প্রস্তুত ছিল।

রোহান নিশাতকে গাড়িতে উঠিয়ে নিজেও উঠল।

গাড়ি দ্রুত ছুটতে শুরু করল।

নিশাত জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

হঠাৎ তার চোখে পড়ল—

একটা কালো গাড়ি তাদের পেছনে আসছে।

— রোহান!

রোহান রিয়ারভিউ মিররে তাকাল।

— কী?

— ওই গাড়িটা আমাদের অনুসরণ করছে।

রোহান একবার তাকিয়েই বুঝে গেল।

তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।

— সিটবেল্ট লাগাও।

নিশাত দ্রুত বেল্ট লাগাল।

গাড়ির গতি বাড়ল।

পেছনের গাড়িটাও গতি বাড়াল।

নিশাত ভয় পেয়ে রোহানের হাত আঁকড়ে ধরল।

— ওরা আমাদের ধরবে?

— না।

— নিশ্চিত?

রোহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— আমি থাকতে তোমার কিছু হবে না।

তার কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে নিশাতের ভয়টা কিছুটা কমে গেল।

কিন্তু হঠাৎ সামনে একটা ট্রাক এসে রাস্তা আটকে দিল।

রোহান দ্রুত ব্রেক করল।

গাড়ি থেমে গেল।

পেছনের কালো গাড়িটাও ঠিক তখনই তাদের পাশে এসে থামল।

দুই দিক থেকে কয়েকজন লোক নেমে এল।

নিশাতের মুখ শুকিয়ে গেল।

রোহান দরজা লক করে দিল।

— গাড়ি থেকে নামবে না।

— আপনি?

— আমি সামলাচ্ছি।

— না!

রোহান তার দিকে তাকাল।

— নিশাত, আমার কথা শোনো।

সে দরজা খুলে নামতে যাচ্ছিল।

নিশাত হঠাৎ তার হাত ধরে ফেলল।

— যাবেন না।

রোহান তার হাতের দিকে তাকাল।

তারপর নিশাতের কপালের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,

— আমি ফিরে আসব।

— যদি—

— কোনো যদি নেই।

রোহান তার হাতটা আলতো করে সরিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল।

তারপর যা হলো, সেটা নিশাত কখনো কল্পনাও করেনি।

রোহান একাই কয়েকজন লোকের সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

তার চোখের দৃষ্টি এতটাই কঠিন যে লোকগুলোও এক মুহূর্ত থমকে গেল।

কিন্তু হঠাৎ তাদের একজন গাড়ির দিকে এগিয়ে এসে নিশাতের দরজার হাতলে হাত রাখল।

নিশাত আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।

ঠিক সেই মুহূর্তে রোহানের চোখ ঘুরে গেল লোকটার দিকে।

তার মুখে আর কোনো ভয় নেই।

শুধু ভয়ংকর রাগ।

— ওই দরজা থেকে হাত সরাও।

লোকটা হাসল।

— না সরালে?

রোহান এক পা এগিয়ে গেল।

— তাহলে তুমি বুঝবে, একজন আর্মি অফিসারের রাগ কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

নিশাত গাড়ির ভেতর থেকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো—

আজ সে প্রথমবার রোহানের সেই রূপটা দেখতে যাচ্ছে, যেটা এতদিন শুধু শুনেছিল।

কিন্তু ঠিক তখনই পেছন থেকে আরেকজন লোক এসে নিশাতের গাড়ির দরজা খুলে ফেলল।

নিশাত চিৎকার করে উঠল—

— রোহান!

নিশাতের চিৎকার শুনে রোহান মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।

তারপর যা হলো, সবকিছু যেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে গেল।

যে লোকটা গাড়ির দরজা খুলেছিল, সে নিশাতের হাত ধরে টেনে নামাতে গেল।

নিশাত মরিয়া হয়ে গাড়ির সিট আঁকড়ে ধরল।

— আমাকে ছাড়ুন!

লোকটা আরও জোরে টান দিতেই হঠাৎ রোহান ঝড়ের মতো এগিয়ে এল।

তার চোখে তখন এমন রাগ, যা দেখে লোকটা এক মুহূর্ত থমকে গেল।

— ওর গায়ে হাত দিয়েছিস?

রোহানের গলা নিচু।

কিন্তু সেই নিচু গলার মধ্যেই ভয়ংকর সতর্কতা।

লোকটা কিছু বলার আগেই রোহান তাকে সরিয়ে নিশাতকে নিজের পেছনে নিয়ে দাঁড়াল।

— নিশাত, আমার পেছনে থাকো।

নিশাত কাঁপতে কাঁপতে তার পেছনে দাঁড়াল।

চারপাশে আরও কয়েকজন লোক।

রোহান একবার সবাইকে দেখে নিল।

— শেষবারের মতো বলছি। এখান থেকে চলে যাও।

একজন লোক হেসে বলল,

— তোমার স্ত্রীকে আমাদের হাতে তুলে দাও। তাহলে তোমার কোনো সমস্যা হবে না।

রোহানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

— আমার স্ত্রীকে নিয়ে দরকষাকষি করার সাহস কোথায় পেলে?

লোকটা এবার এগিয়ে এল।

— রোহান, তুমি জানো না আমরা কতদূর যেতে পারি।

রোহান এক পা সামনে এগিয়ে গেল।

— আর তোমরা জানো না, আমি কতদূর যেতে পারি।

তারপর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠল।

নিশাত শুধু রোহানের ছায়ার মতো পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল।

কয়েক মিনিট পর সবকিছু শান্ত হলো।

লোকগুলো আর দাঁড়াতে পারল না।

রোহান দ্রুত নিশাতের কাছে ফিরে এল।

— কোথাও লেগেছে?

নিশাত মাথা নাড়ল।

— না।

— নিশ্চিত?

— জি।

রোহান তার দুই হাত ধরে একবার ভালো করে দেখল।

তারপর কপালে হাত রেখে বলল,

— ভয় পেয়েছ?

নিশাত আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল।

— আপনাকে ভয় পেয়েছিলাম।

রোহান থমকে গেল।

— আমাকে?

নিশাত মাথা নাড়ল।

— না... আপনাকে হারানোর ভয়।

কথাটা শুনে রোহানের চোখের কঠোরতা নরম হয়ে গেল।

সে কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না।

তারপর নিশাতকে গাড়িতে উঠিয়ে নিজেও পাশে বসল।

গাড়ি আবার চলতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।

হঠাৎ নিশাত বলল,

— আপনি আমাকে কেন এত দূরে সরিয়ে রাখতে চান?

রোহান জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

— কারণ আমি জানি, আমার জীবনে যারা আসে, তারা নিরাপদ থাকে না।

— তাহলে আমাকে বিয়ে করলেন কেন?

রোহান এবার তার দিকে তাকাল।

অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— কারণ তোমাকে প্রথম দেখার পর থেকেই একটা জিনিস বুঝেছিলাম।

— কী?

— তোমাকে অন্য কারও হাতে তুলে দিতে পারব না।

নিশাতের চোখে পানি চলে এল।

— কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন, বিয়েটা শুরুতে শুধু দায়িত্ব ছিল।

রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— শুরুতে ছিল।

— এখন?

রোহান কোনো উত্তর দিল না।

নিশাত এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— এখনো কি শুধু দায়িত্ব?

রোহান গাড়ি থামিয়ে দিল।

নিশাত অবাক হয়ে তাকাল।

রোহান তার দিকে ফিরে এল।

— তুমি কি সত্যিই উত্তরটা জানতে চাও?

নিশাত ধীরে মাথা নাড়ল।

রোহান কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

— না। এখন আর শুধু দায়িত্ব নয়।

নিশাতের বুক কেঁপে উঠল।

রোহান ধীরে বলল,

— তুমি আমার অভ্যাস হয়ে গেছ।

নিশাতের চোখ ভিজে গেল।

— অভ্যাস?

— হ্যাঁ।

রোহান হালকা হাসল।

— তুমি না থাকলে বাড়িটা ফাঁকা লাগে। তুমি কথা না বললে আমার দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে। আর তুমি ভয় পেলে... আমার নিজের ওপর রাগ হয়।

নিশাত চোখ মুছে বলল,

— আপনি এত রাগী কেন?

রোহান মৃদু হেসে বলল,

— কারণ তুমি আমাকে শান্ত থাকতে দাও না।

নিশাতও হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর রোহান তার হাতটা নিজের হাতে নিল।

— একটা কথা বলব?

— বলুন।

— আজ যদি তোমার কিছু হতো...

রোহান থেমে গেল।

নিশাত তার দিকে তাকাল।

— তাহলে?

রোহানের গলা ভারী হয়ে গেল।

— আমি বোধহয় নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারতাম না।

নিশাত ধীরে তার হাত চেপে ধরল।

— তাহলে আমাকে আর কখনো একা পাঠাবেন না।

রোহান তাকিয়ে রইল।

তারপর মাথা নেড়ে বলল,

— কথা দিলাম।

গাড়ি আবার চলতে শুরু করল।

কিন্তু তারা জানত না—

পেছনে পড়ে থাকা সেই পেনড্রাইভের রহস্য এখনো শেষ হয়নি।

আর পরদিন সকালে রোহান যখন ল্যাপটপে পেনড্রাইভটা খুলল, তখন স্ক্রিনে যে নামটা ভেসে উঠল, সেটা দেখে তার মুখের রক্ত শুকিয়ে গেল।

নিশাতের বাবার নাম।

রোহান ধীরে ল্যাপটপ বন্ধ করল।

নিশাত দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।

— কী হয়েছে?

রোহান তাকাল।

তার চোখে এবার রাগ নয়—

অবিশ্বাস।

সে খুব ধীরে বলল,

— তোমার বাবা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

নিশাত স্তব্ধ হয়ে গেল।

— কী?

রোহান উঠে দাঁড়াল।

— আর সবচেয়ে বড় কথা...

সে নিশাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

— তোমার বাবা আমাকে তোমাকে বিয়ে করতে বলেছিলেন, তার কারণটা আমি এতদিন জানতাম না।

রোহানের কথাটা শুনে নিশাত যেন পাথর হয়ে গেল।

— আমার বাবা... আপনাকে আমাকে বিয়ে করতে বলেছিলেন?

রোহান মাথা নেড়ে বলল,

— হ্যাঁ।

— কিন্তু কেন?

রোহান টেবিলের ওপর রাখা পেনড্রাইভটার দিকে তাকাল।

— কারণ এইটার ভেতরে শুধু আমার অপারেশনের তথ্য নেই। তোমার বাবার রেখে যাওয়া একটা ভিডিওও আছে।

নিশাতের বুক কেঁপে উঠল।

— ভিডিও?

রোহান ল্যাপটপ খুলল।

স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ড পর একজন পরিচিত মুখ ভেসে উঠল।

নিশাতের বাবা।

ভিডিওটা অনেক পুরোনো।

নিশাত পর্দার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করল।

তার বাবা বলছিলেন,

— রোহান, যদি তুমি এই ভিডিও দেখো, তাহলে বুঝবে সময়টা এসে গেছে। আমি জানি, আমার কিছু সিদ্ধান্তের কারণে নিশাত বিপদে পড়তে পারে। আমি চাই না আমার মেয়ের জীবনে আমার ভুলের ছায়া পড়ুক।

নিশাত চোখ মুছল।

ভিডিওতে তার বাবা আরও বললেন,

— তুমি ওকে বিয়ে করতে রাজি হলে আমি জানব, ও নিরাপদ হাতে আছে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—নিশাতকে কখনো আমার কোনো অপরাধের জন্য দায়ী করবে না।

ভিডিওটা থেমে গেল।

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

নিশাত ধীরে বলল,

— আমার বাবা কী করেছিলেন?

রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— তিনি এমন একটা তথ্যের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন, যেটা অনেক শক্তিশালী মানুষ লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল।

— আর এজন্যই?

— হ্যাঁ।

— তাহলে এতদিন আপনি আমাকে কেন কিছু বলেননি?

রোহান তার দিকে তাকাল।

— কারণ তোমাকে সত্যিটা বলার আগে আমি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম যে তুমি নিরাপদ।

নিশাত চোখ নামিয়ে বলল,

— আর এখন?

— এখন আর তোমার কাছ থেকে কিছু লুকাব না।

নিশাত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— একটা কথা বলব?

— বলো।

— আপনি যখন প্রথম আমাকে দেখেছিলেন, তখনই কি আমাকে পছন্দ করেছিলেন?

রোহান হেসে ফেলল।

— তোমার এই প্রশ্নের উত্তর এখন কেন?

নিশাত একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

— জানতে ইচ্ছে করছে।

রোহান কাছে এসে দাঁড়াল।

— প্রথম দিন তোমাকে দেখে একটা জিনিস বুঝেছিলাম।

— কী?

— তুমি খুব ভয় পেয়ে ছিলে।

নিশাত হেসে বলল,

— কারণ আপনি এমনভাবে তাকিয়েছিলেন!

রোহানও হেসে ফেলল।

— তখন থেকেই ঠিক করেছিলাম, তোমাকে কখনো আমার রাগের জন্য কাঁদাব না।

নিশাত অবাক হয়ে তাকাল।

— কিন্তু আপনি তো অনেকবার রাগ করেছেন।

— জানি।

— অনেকবার ভয়ও পেয়েছি।

রোহান মাথা নিচু করল।

— সেটাও জানি।

তারপর ধীরে বলল,

— কিন্তু তুমি থেকেছ।

নিশাত মৃদু স্বরে বলল,

— কারণ আপনি রাগী হলেও খারাপ নন।

রোহান তার হাতটা ধরে বলল,

— আর তুমি বুঝে গেছ, আমার রাগের নিচে কী আছে।

— কী?

রোহান তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— তোমাকে হারানোর ভয়।

নিশাতের চোখ ভিজে উঠল।

কয়েক মাস পর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল।

অপারেশনের তদন্ত শেষ হলো। যারা নিশাতকে হুমকি দিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো। তার বাবার নামও পরিষ্কার হলো।

আর রোহান?

সে আগের মতোই রাগী।

অফিসে সবাই তাকে এখনো ভয় পায়।

কিন্তু বাড়িতে ঢুকলেই সেই কঠিন মানুষটা বদলে যায়।

এক সন্ধ্যায় রোহান অফিস থেকে ফিরে দেখল নিশাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।

— এত রাতে এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

নিশাত ফিরে তাকিয়ে হাসল।

— আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

রোহান ভ্রু কুঁচকে বলল,

— কতবার বলেছি, অপেক্ষা করবে না?

নিশাত মুচকি হেসে বলল,

— আপনি যতই বলুন, আমি শুনব না।

রোহান কাছে এসে দাঁড়াল।

— সাহস বেড়েছে দেখছি।

— আপনার জন্যই।

রোহান হাসল।

— আগে আমাকে দেখে ভয় পেতে।

— এখনো পাই।

— সত্যি?

নিশাত মাথা নেড়ে বলল,

— হ্যাঁ।

রোহান অবাক হয়ে তাকাল।

নিশাত তার হাত ধরে বলল,

— তবে আপনার রাগকে নয়।

— তাহলে?

— আপনাকে হারানোর ভয়।

রোহান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মৃদু স্বরে বলল,

— আমাকে হারানোর কোনো সুযোগ তোমাকে দেব না।

নিশাত হেসে তার পাশে দাঁড়াল।

একসময় যে মেয়েটা রোহানের কঠিন চোখের দিকে তাকাতেও ভয় পেত, আজ সেই মেয়েটাই তার রাগের মুহূর্তে হাত ধরে শান্ত করতে পারে।

আর যে মানুষটা ভেবেছিল, এই বিয়েটা শুধু একটা দায়িত্ব—

সে বুঝে গেল, নিশাত তার দায়িত্ব নয়।

নিশাত তার ঘর।

তার শান্তি।

তার সবচেয়ে আপন মানুষ।

সেদিন রাতে রোহান বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

নিশাত পাশে এসে দাঁড়াল।

— কী ভাবছেন?

রোহান মৃদু হেসে বলল,

— ভাবছি, আমার জীবনে এত রাগ থাকার পরও তুমি কীভাবে এত শান্তি নিয়ে এলে।

নিশাত বলল,

— হয়তো আপনার রাগটা একটু কমানোর জন্যই এসেছি।

রোহান হেসে মাথা নাড়ল।

— অসম্ভব।

— কেন?

— কারণ তুমি পাশে থাকলে আমার রাগ এমনিতেই চলে যায়।

নিশাত হাসল।

দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।

বাইরে রাত গভীর হচ্ছিল।

কিন্তু তাদের জীবনে তখন নতুন একটা সকাল শুরু হয়েছে।

যে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল ভয় আর অচেনা দূরত্ব দিয়ে, সেটাই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল তাদের জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

 

....
👁 589