শহরের ব্যস্ত একটা রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান।
সেখানেই প্রায় প্রতিদিন বিকেলে দেখা যেত ছেলেটাকে।
কালো শার্ট, গলায় চেইন, এলোমেলো চুল, চোখে সবসময় অদ্ভুত একটা রাগী দৃষ্টি। এলাকার সবাই তাকে চিনত।
রুদ্র।
ছেলেটা দেখতে বেশ সুদর্শন হলেও তার স্বভাব ছিল ভয়ংকর রাগী। কথাবার্তায় কোনো মিষ্টতা নেই, মুখে সবসময় বিরক্তি। এলাকায় সবাই তাকে একটু গুন্ডা টাইপের ছেলে হিসেবেই চিনত।
কেউ তার সঙ্গে ঝামেলায় যেতে চাইত না।
কিন্তু রুদ্রের জীবনে একটা মানুষ ছিল, যাকে দেখলেই তার রাগের সঙ্গে অন্যরকম একটা অনুভূতি মিশে যেত।
মেয়েটার নাম—
মেহরিন।
কলেজে পড়ত।
প্রতিদিন বিকেলে কলেজ শেষ করে বান্ধবীদের সঙ্গে এই রাস্তা দিয়েই বাসায় ফিরত।
রুদ্র প্রথম তাকে দেখেছিল প্রায় তিন মাস আগে।
সেদিন থেকেই মেয়েটাকে দেখার একটা অদ্ভুত অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল তার।
মেহরিন অবশ্য এসব একদম পছন্দ করত না।
সেদিনও মেহরিন বান্ধবী তানিয়ার সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল।
হঠাৎ তানিয়া মেহরিনের হাত ধরে বলল,
—"ওই যে, আবার ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে।"
মেহরিন তাকিয়ে দেখল।
চায়ের দোকানের সামনে রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে চায়ের কাপ।
চোখ সরাসরি মেহরিনের দিকে।
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বলল,
—"ওকে দেখলে আমার মাথা গরম হয়ে যায়।"
তানিয়া হেসে বলল,
—"তোর দিকে তাকিয়ে থাকে কেন?"
—"জানি না।"
—"তুই কি ওকে চেনিস?"
—"না।"
—"তাহলে?"
মেহরিন বিরক্ত গলায় বলল,
—"এই ছেলেটা কয়েকদিন ধরে আমাকে রাস্তায় দেখলেই তাকিয়ে থাকে। কখনো কখনো পেছনেও আসে।"
তানিয়া একটু ভয় পেয়ে বলল,
—"সাবধানে থাকিস। ছেলেটাকে ভালো মনে হয় না।"
মেহরিন কিছু বলল না।
সে দ্রুত হাঁটতে লাগল।
কিন্তু রুদ্রও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের চলে যাওয়া দেখছিল।
তার বন্ধুরা পাশে বসে ছিল।
একজন বলল,
—"কী রে, মেয়েটাকে এত দেখিস কেন?"
রুদ্র চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
—"চুপ কর।"
—"ভালো লেগে গেছে নাকি?"
রুদ্র রেগে তাকাল।
—"বেশি কথা বললে চা ঢেলে দেব।"
বন্ধুরা হেসে উঠল।
পরদিন কলেজ ছুটির পর মেহরিন একাই বের হয়েছিল।
তানিয়া অন্যদিকে চলে গেছে।
রাস্তার মোড়ে এসে মেহরিন দেখল রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে।
আজও সেই একই পোশাকের ধাঁচ।
হাতে মোবাইল।
মেহরিন তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে রুদ্র বলল,
—"এই যে!"
মেহরিন থেমে গেল।
পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,
—"আমাকে বলছেন?"
রুদ্র একটু হেসে বলল,
—"আর কাকে?"
—"আমাকে ডাকবেন না।"
রুদ্র অবাক হয়ে বলল,
—"কেন?"
—"কারণ আমি আপনাকে চিনি না।"
—"চেনা লাগবে।"
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বলল,
—"আমার চেনার কোনো দরকার নেই।"
রুদ্র কিছু বলতে যাচ্ছিল।
মেহরিন এবার কঠিন গলায় বলল,
—"আপনি প্রতিদিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকেন কেন?"
রুদ্র চুপ।
—"আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন কেন?"
রুদ্রের মুখে হালকা হাসি ফুটল।
—"এমনিই।"
—"এমনিই?"
—"হুম।"
মেহরিন এবার রেগে গেল।
—"আপনার আর কোনো কাজ নেই?"
রুদ্র কিছু বলল না।
মেহরিন বলল,
—"দেখতে গুন্ডার মতো, আচরণও গুন্ডাদের মতো। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েদের বিরক্ত করাটাই কি আপনার কাজ?"
রুদ্রের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
মেহরিন থামল না।
—"নিজেকে খুব বড় কিছু ভাববেন না। আপনার মতো ছেলেকে দেখে ভয় পাওয়ার মতো মেয়ে আমি নই।"
রুদ্র চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেহরিন চলে গেল।
সেদিন রাতে রুদ্র একা বসে ছিল একটা পরিত্যক্ত ঘরের সামনে।
তার বন্ধুরা সবাই চলে গেছে।
মেহরিনের কথাগুলো বারবার মাথায় ঘুরছিল।
"দেখতে গুন্ডার মতো..."
"রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েদের বিরক্ত করাটাই কি আপনার কাজ?"
রুদ্র নিজের দিকে তাকাল।
কালো শার্ট।
হাতে পুরোনো দাগ।
পকেটে কিছু টাকা।
কোনো স্থায়ী কাজ নেই।
দিন কাটে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে, আড্ডা দিয়ে।
হঠাৎ নিজের ওপরই তার রাগ হলো।
সে মাটিতে পড়ে থাকা একটা পাথর লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দিল।
—"ধুর!"
কিছুক্ষণ পর তার পুরোনো বন্ধু সজীব এসে বলল,
—"কী হয়েছে?"
রুদ্র গম্ভীর গলায় বলল,
—"আমি কি সত্যিই গুন্ডা?"
সজীব হেসে ফেলল।
—"তুই নিজেই জানিস না?"
রুদ্র তাকাল।
সজীব বলল,
—"কী হয়েছে হঠাৎ?"
রুদ্র উত্তর দিল না।
অনেকক্ষণ পর বলল,
—"জীবনটা বদলাতে চাই।"
সজীব এবার হাসা বন্ধ করল।
—"তুই?"
—"হ্যাঁ।"
—"কীভাবে?"
রুদ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—"জানি না। কিন্তু এভাবে আর না।"
পরদিন থেকেই রুদ্র নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করল।
একটা ছোট গ্যারেজে কাজ শুরু করল।
সকালে কাজে যেত।
রাতে পড়াশোনা করত।
তারপর কয়েক মাস পর একটা বড় কোম্পানির চাকরির পরীক্ষায় বসে।
প্রথমবার ব্যর্থ হলো।
দ্বিতীয়বারও।
বন্ধুরা বলল,
—"ছাড়। তোর দ্বারা হবে না।"
রুদ্র শুধু বলল,
—"হবেই।"
তৃতীয়বার সে সফল হলো।
চাকরি পেল।
ধীরে ধীরে তার জীবন বদলাতে শুরু করল।
পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কমে গেল।
রাগ কমল।
পোশাক বদলাল।
কথাবার্তায় ভদ্রতা এল।
কিন্তু একটা জিনিস বদলাল না—
মেহরিনকে ভুলতে পারল না।
দুই বছর কেটে গেল।
একদিন বিকেলে মেহরিন কলেজের শেষ বর্ষের পরীক্ষা শেষ করে বান্ধবীদের সঙ্গে ক্যাম্পাস থেকে বের হচ্ছিল।
হঠাৎ সামনে একটা বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামল।
মেহরিন একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।
গাড়ি থেকে একজন সুদর্শন যুবক নামল।
সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, হাতে দামি ঘড়ি।
চোখে আত্মবিশ্বাস।
চেহারায় পরিণত ভাব।
মেহরিন তাকে চিনতে পারল না।
যুবকটা ফোনে কথা বলতে বলতে চলে গেল।
মেহরিন শুধু একবার তাকিয়ে রইল।
কেন যেন তার মনে হলো—
এই মানুষটাকে সে কোথাও দেখেছে।
কিন্তু কোথায়?
সে জানত না।
সেই রাতেই মেহরিন তার বান্ধবীর কাছ থেকে শুনল,
—"জানিস, আজ যে গাড়িটা দেখলি, ওই কোম্পানির নতুন ম্যানেজিং ডিরেক্টর এসেছে। নাম রুদ্র রহমান।"
মেহরিন চমকে উঠল।
—"রুদ্র?"
—"হ্যাঁ।"
মেহরিনের বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।
সে মনে মনে বলল,
"অসম্ভব..."
কারণ দুই বছর আগে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রাগী, গুন্ডা টাইপের ছেলেটার নামও ছিল—
রুদ্র।
কিন্তু এই সুদর্শন, সফল মানুষটা কি সত্যিই সেই রুদ্র?
নাকি শুধু নামের মিল?
মেহরিন তখনও জানত না—
যে মানুষটাকে সে একদিন অপমান করে চলে গিয়েছিল,
সে-ই আজ সম্পূর্ণ বদলে ফিরে এসেছে।
আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—
রুদ্র তাকে এখনও ভুলতে পারেনি।
শুধু এবার সে মেহরিনকে সেটা বুঝতে দেবে না।
দুই বছর পর মেহরিন প্রথমবার রুদ্রকে এত কাছ থেকে দেখেছিল।
কিন্তু সে তখনও নিশ্চিত হতে পারছিল না—
এই মানুষটাই কি সেই রুদ্র?
যে একসময় রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকত?
যে সবসময় কালো শার্ট পরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত?
যার চোখে থাকত অদ্ভুত রাগ?
মেহরিনের মনে বারবার সেই পুরোনো দৃশ্যটা ফিরে আসছিল।
সেদিনের কথাগুলোও।
"দেখতে গুন্ডার মতো, আচরণও গুন্ডাদের মতো।"
কথাগুলো মনে পড়তেই মেহরিনের একটু অস্বস্তি হলো।
পরদিন কলেজ থেকে বের হওয়ার সময় মেহরিন তার বান্ধবী তানিয়ার সঙ্গে হাঁটছিল।
তানিয়া হঠাৎ বলল,
—"ওই দেখ!"
মেহরিন তাকিয়ে দেখল, রাস্তার পাশে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
গাড়ির পাশে একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।
সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো।
চোখে সানগ্লাস।
চেহারায় আত্মবিশ্বাস।
মেহরিন থমকে গেল।
তানিয়া বলল,
—"ওই তো রুদ্র রহমান।"
মেহরিনের বুক ধক করে উঠল।
—"তুই নিশ্চিত?"
—"হ্যাঁ। কেন?"
মেহরিন কোনো উত্তর দিল না।
ঠিক তখন রুদ্র ফোন রেখে তাদের দিকে তাকাল।
তার চোখ সরাসরি মেহরিনের চোখে গিয়ে থামল।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
তারপর রুদ্র এমনভাবে চোখ সরিয়ে নিল, যেন মেয়েটাকে সে চিনতেই পারে না।
মেহরিন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সে কি সত্যিই চিনতে পারেনি?
নাকি চিনেও না চেনার ভান করছে?
রুদ্র গাড়িতে উঠে চলে গেল।
মেহরিনের অদ্ভুত লাগছিল।
তানিয়া বলল,
—"কী হলো?"
—"কিছু না।"
—"তুই ওর দিকে এমন করে তাকাচ্ছিস কেন?"
মেহরিন নিচু গলায় বলল,
—"আমার মনে হয় ওকে আগে দেখেছি।"
—"কোথায়?"
—"মনে নেই।"
তানিয়া হেসে বলল,
—"হ্যান্ডসাম মানুষ দেখলেই সবার মনে হয় আগে কোথাও দেখেছে।"
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বলল,
—"চুপ কর।"
কিন্তু নিজের মনকেই সে বোঝাতে পারছিল না।
কয়েকদিন পর মেহরিন জানতে পারল, রুদ্র তাদের কলেজের একটা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আসছে।
অনুষ্ঠানের দিন অডিটোরিয়াম ভর্তি ছাত্রছাত্রী।
মেহরিন বান্ধবীদের সঙ্গে সামনের দিকেই বসেছিল।
কিছুক্ষণ পর মঞ্চে রুদ্র উঠল।
সবাই হাততালি দিল।
রুদ্র মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—"সফল হতে হলে প্রথমে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হয়। মানুষ আপনাকে কী বলছে, সেটা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি নিজেকে কীভাবে বদলাচ্ছেন।"
মেহরিন চুপ করে শুনছিল।
কথাগুলো কেন যেন তার মনে গিয়ে লাগল।
একসময় রুদ্রের চোখ তার দিকে গেল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
রুদ্রের মুখে কোনো পরিবর্তন নেই।
কিন্তু মেহরিন স্পষ্ট দেখতে পেল—
তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য পুরোনো সেই দৃষ্টি ফিরে এসেছিল।
তারপর আবার সব স্বাভাবিক।
অনুষ্ঠান শেষে মেহরিন বাইরে বের হচ্ছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে একজন বলল,
—"মেহরিন?"
সে ঘুরে দাঁড়াল।
রুদ্র।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—"জি?"
রুদ্র স্বাভাবিক গলায় বলল,
—"আপনি আমাকে চিনেন?"
মেহরিন অবাক।
—"না... মানে..."
রুদ্র মৃদু হাসল।
—"আপনাকে কোথাও দেখেছি মনে হচ্ছে।"
মেহরিন বলল,
—"আমারও তাই মনে হচ্ছিল।"
রুদ্র একটু থেমে বলল,
—"হতে পারে। শহরটা ছোট।"
মেহরিন তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—"আপনার নাম রুদ্র?"
—"জি।"
—"রুদ্র রহমান?"
—"হ্যাঁ।"
মেহরিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে ধীরে বলল,
—"আপনি কি আগে..."
রুদ্র তার কথা শেষ করতে দিল না।
—"আমার একটা মিটিং আছে।"
তারপর চলে গেল।
মেহরিন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
সে নিশ্চিত হয়ে গেল।
এই সেই রুদ্র।
কিন্তু মানুষটা এত বদলে গেল কীভাবে?
অন্যদিকে গাড়িতে বসে রুদ্র জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
ড্রাইভার বলল,
—"স্যার, মেয়েটা কি আপনার পরিচিত?"
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"অনেক পুরোনো পরিচিত।"
—"তাহলে কথা বললেন না কেন?"
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—"সব কথা সময়মতো বলতে হয়।"
তার চোখে তখন এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি।
সে মেহরিনকে এখনও মনে রেখেছে।
কিন্তু মেহরিন যেন সহজে বুঝতে না পারে—
তার জীবনে এই মেয়েটার জায়গাটা এখনও কতটা গভীর।
এরপর থেকে মেহরিন প্রায়ই রুদ্রকে দেখতে পেত।
কখনো কলেজের কোনো অনুষ্ঠানে।
কখনো শহরের কোনো রেস্টুরেন্টে।
কখনো গাড়িতে।
প্রতিবারই রুদ্র খুব স্বাভাবিক আচরণ করত।
একদিন মেহরিন তাকে দেখে হাসল।
রুদ্রও তাকাল।
কিন্তু হাসল না।
বরং পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।
মেয়েটা দেখতে সুন্দর।
রুদ্র তার সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠভাবেই কথা বলছিল।
মেহরিনের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
তানিয়া বলল,
—"ওই মেয়েটা কে?"
—"জানি না।"
—"রুদ্রের প্রেমিকা নাকি?"
মেহরিন মুখ ফিরিয়ে বলল,
—"হতে পারে।"
কিন্তু কেন যেন কথাটা বলার পর তার মন খারাপ হয়ে গেল।
সে নিজেই অবাক।
রুদ্রের প্রেমিকা থাকলে তার কী?
রুদ্র তো তার কেউ না।
পরদিন মেহরিন আবার রুদ্রকে দেখল।
এইবারও সেই মেয়েটা তার সঙ্গে।
মেহরিন পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রুদ্র একবার তাকাল।
মেহরিন চোখ ফিরিয়ে নিল।
রুদ্র মৃদু হাসল।
তারপর মেয়েটার সঙ্গে আরও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে লাগল।
মেহরিনের ভেতরে অস্বস্তি বাড়তে লাগল।
সে নিজেকে বোঝাল—
"আমার কিছু যায় আসে না।"
কিন্তু সেদিন রাতে পড়তে বসেও তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
মেয়েটা কে?
কয়েকদিন পর রুদ্র নিজেই মেহরিনের সামনে এসে দাঁড়াল।
—"কেমন আছেন?"
মেহরিন একটু অবাক হয়ে বলল,
—"ভালো।"
—"পড়াশোনা কেমন চলছে?"
—"ভালো।"
—"ভালো।"
দুজনের মধ্যে নীরবতা।
মেহরিন শেষ পর্যন্ত সাহস করে বলেই ফেলল,
—"আপনার সঙ্গে যে মেয়েটাকে দেখি..."
রুদ্র ভ্রু তুলল।
—"কোন মেয়েটা?"
মেহরিন একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
—"না, কিছু না।"
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"আপনি কি আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জানতে চাচ্ছেন?"
—"না!"
মেহরিন দ্রুত উত্তর দিল।
রুদ্র এবার হাসল।
—"ঠিক আছে।"
তারপর চলে গেল।
মেহরিন দাঁড়িয়ে রইল।
তার নিজের ওপরই রাগ হচ্ছিল।
সে কেন প্রশ্নটা করল?
সেদিন রাতে রুদ্র নিজের ঘরে বসে হাসছিল।
তার সামনে সেই পুরোনো একটা ছবি।
মেহরিনের ছবি।
দুই বছর আগে তার জীবনে পরিবর্তন আনার পরও সে ছবিটা ফেলে দেয়নি।
রুদ্র ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—"তুমি একদিন আমাকে বলেছিলে, আমার মতো ছেলেকে দেখে ভয় পাওয়ার মতো মেয়ে তুমি নও।"
সে মৃদু হেসে ছবিটা সরিয়ে রাখল।
—"দেখি, এবার আমাকে দেখে ভয় পাও না কি... অন্য কিছু অনুভব করো।"
কয়েকদিন পর রুদ্রের অফিসে সেই একই মেয়েটা আবার এল।
মেহরিন দূর থেকে বিষয়টা দেখে ফেলল।
মেয়েটা রুদ্রের খুব কাছে দাঁড়িয়ে কিছু বলছিল।
রুদ্র হাসছিল।
মেহরিনের মুখটা অজান্তেই ভার হয়ে গেল।
তানিয়া বলল,
—"তুই আবার মন খারাপ করছিস?"
—"না।"
—"তাহলে মুখ এমন কেন?"
—"গরম লাগছে।"
তানিয়া হেসে বলল,
—"আজ তো বাতাসও চলছে।"
মেহরিন কিছু বলল না।
তার ভেতরে তখন প্রথমবার একটা অনুভূতি জন্ম নিচ্ছিল—
হিংসা।
আর রুদ্র?
সে দূর থেকে মেহরিনের মুখের পরিবর্তনটা লক্ষ্য করছিল।
তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল।
সে বুঝে গেছে—
খেলা মাত্র শুরু হয়েছে।
মেহরিন সেদিন রাতে অনেক চেষ্টা করেও পড়ায় মন বসাতে পারল না।
বই সামনে খোলা।
কলম হাতে।
কিন্তু চোখের সামনে বারবার একই দৃশ্য—
রুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা।
মেয়েটা হাসছিল।
রুদ্রও হাসছিল।
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বইটা বন্ধ করে দিল।
—"ধুর!"
নিজের ওপরই রাগ হচ্ছিল তার।
রুদ্র কার সঙ্গে কথা বলবে, কার সঙ্গে হাসবে—সেটা নিয়ে তার এত ভাবার কী আছে?
সে তো রুদ্রের কেউ না।
বরং একসময় রুদ্রই তাকে বিরক্ত করত।
আর সেই রুদ্রকে সে নিজেই অপমান করে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।
তাহলে আজ কেন বুকের ভেতরটা অদ্ভুত লাগছে?
পরদিন কলেজে তানিয়া মেহরিনের মুখ দেখে বলল,
—"তোর কী হয়েছে?"
—"কিছু হয়নি।"
—"মিথ্যা বলিস না।"
—"সত্যি কিছু হয়নি।"
তানিয়া হেসে বলল,
—"রুদ্রের ব্যাপার?"
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—"না!"
এত দ্রুত উত্তর দিল যে তানিয়া আরও নিশ্চিত হয়ে গেল।
—"আচ্ছা, আমি তো কিছু বলিনি।"
মেহরিন চুপ।
তানিয়া বলল,
—"তুই কি ওকে পছন্দ করতে শুরু করেছিস?"
—"একদম না!"
—"তাহলে ওর পাশে অন্য মেয়েকে দেখলে তোর মুখ এমন হয়ে যায় কেন?"
মেহরিন কোনো উত্তর দিতে পারল না।
সেদিন বিকেলে কলেজের গেটের সামনে একটা কালো গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে রুদ্র নামল।
আজও তার পরনে ফরমাল পোশাক।
চেহারায় সেই আত্মবিশ্বাসী ভাব।
কয়েকজন ছাত্র তাকে দেখে সালাম দিল।
রুদ্র সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলল।
তারপর চোখ গেল মেহরিনের দিকে।
মেহরিন ইচ্ছে করেই অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
রুদ্র কিছু না বলে গাড়ির দরজা খুলল।
ঠিক তখন সেই মেয়েটা গাড়ি থেকে নামল।
মেহরিনের বুকটা আবার কেমন করে উঠল।
মেয়েটা রুদ্রকে বলল,
—"আজও কি আমাকে নিয়ে যাবেন?"
রুদ্র বলল,
—"হ্যাঁ।"
মেহরিন আর দাঁড়িয়ে থাকল না।
সে তানিয়ার হাত ধরে দ্রুত চলে গেল।
রুদ্র দূর থেকে সব দেখল।
তার মুখে মৃদু হাসি ফুটল।
গাড়িতে বসে মেয়েটা বলল,
—"স্যার, মেয়েটা আপনাকে দেখে এত তাড়াতাড়ি চলে গেল কেন?"
রুদ্র হেসে বলল,
—"ওকে একটু জেলাস করতে চাই।"
মেয়েটা হেসে ফেলল।
—"আপনি এখনও ওকে নিয়ে এত সিরিয়াস?"
রুদ্র জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—"দুই বছর ধরে যে মানুষটাকে ভুলতে পারিনি, তাকে কি এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়?"
মেয়েটা বলল,
—"কিন্তু আপনি তো ওকে কিছু বলেন না।"
—"সব কথা বলে ফেললে গল্পটা এত মজার থাকত না।"
ওই মেয়েটার নাম ছিল ইরা।
সে রুদ্রের এক বন্ধুর ছোট বোন।
রুদ্র তাকে অনুরোধ করেছিল মেহরিনের সামনে মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা করতে।
ইরা পুরো ব্যাপারটা জানত।
আর মেহরিনকে একটু জ্বালানোর ব্যাপারটা তার বেশ মজাই লাগছিল।
কয়েকদিন পর মেহরিনের কলেজে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল।
রুদ্রও সেখানে আমন্ত্রিত।
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে মেহরিন পেছনের করিডোর দিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ সামনে রুদ্র এসে দাঁড়াল।
—"আপনি আমাকে এড়িয়ে চলছেন?"
মেহরিন চমকে তাকাল।
—"না তো।"
—"তাহলে আমাকে দেখলেই চলে যান কেন?"
—"আমি কোথাও যাইনি।"
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"আচ্ছা।"
মেহরিন একটু চুপ করে থেকে বলল,
—"আপনি কি আমাকে আগে থেকেই চিনতেন?"
রুদ্র তার দিকে তাকাল।
—"কেন এমন মনে হলো?"
—"আপনার আচরণ দেখে।"
—"কী রকম?"
—"মনে হয় আপনি আমাকে অনেক আগে থেকেই চেনেন।"
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—"হতে পারে।"
মেহরিন অবাক।
—"মানে?"
রুদ্র আর কিছু না বলে চলে গেল।
মেহরিন তার পেছনের দিকে তাকিয়ে রইল।
সেদিন অনুষ্ঠানে রুদ্র বক্তৃতা দেওয়ার পর মেহরিনের সঙ্গে আবার দেখা হলো।
রুদ্র বলল,
—"আপনার অনুষ্ঠান কেমন লাগল?"
—"ভালো।"
—"আপনি আজ খুব সুন্দর লাগছেন।"
মেহরিন থমকে গেল।
রুদ্র স্বাভাবিকভাবেই কথাটা বলেছে।
কিন্তু মেহরিনের বুকের ভেতর যেন ঢেউ উঠল।
সে বলল,
—"ধন্যবাদ।"
রুদ্র হেসে চলে গেল।
কিছু দূর যেতেই ইরা তার পাশে এসে দাঁড়াল।
ইরা বলল,
—"আপনি ওকে প্রশংসা করলেন?"
—"হ্যাঁ।"
—"তাহলে এতদিনের পরিকল্পনা শেষ?"
রুদ্র হেসে বলল,
—"না। এবার একটু কঠিনভাবে খেলতে হবে।"
পরের কয়েকদিন রুদ্র ইচ্ছা করেই মেহরিনকে একদম পাত্তা দিল না।
মেহরিন সামনে দিয়ে গেলেও সে অন্যদিকে তাকাত।
মেহরিন কথা বলতে চাইলে ব্যস্ততার অজুহাত দিত।
প্রথম দিন মেহরিন অবাক হলো।
দ্বিতীয় দিন বিরক্ত।
তৃতীয় দিন তার ভেতরে রাগ জমতে শুরু করল।
একদিন সে নিজেই রুদ্রের অফিসে গেল।
রিসেপশনে বসে থাকা মেয়েটা বলল,
—"স্যার এখন মিটিংয়ে আছেন।"
মেহরিন বলল,
—"আমি একটু অপেক্ষা করব।"
এক ঘণ্টা কেটে গেল।
রুদ্র বের হলো।
মেহরিন উঠে দাঁড়াল।
—"আপনার সঙ্গে কথা ছিল।"
রুদ্র তাকে দেখে থামল।
—"বলুন।"
—"আপনি আমাকে এড়িয়ে চলছেন কেন?"
রুদ্র ভ্রু তুলল।
—"আমি?"
—"হ্যাঁ।"
—"আমার তো মনে হচ্ছে আপনি নিজেই আমাকে এড়িয়ে চলছিলেন।"
মেহরিন চুপ।
রুদ্র বলল,
—"আর একটা কথা।"
—"কী?"
—"আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে এত চিন্তা করার দরকার নেই।"
মেহরিনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—"আমি আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করি না।"
—"ভালো।"
রুদ্র চলে যেতে শুরু করল।
মেহরিন হঠাৎ বলে ফেলল,
—"ওই মেয়েটার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?"
রুদ্র থেমে গেল।
ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।
—"কোন মেয়েটা?"
মেহরিন বুঝতে পারল সে ভুল করে ফেলেছে।
—"ইরা।"
রুদ্র মৃদু হাসল।
—"কেন?"
—"এমনিই জানতে চাইলাম।"
—"আপনার এত কৌতূহল কেন?"
মেহরিন চুপ।
রুদ্র কাছে এসে বলল,
—"আপনি কি ঈর্ষা করছেন?"
মেহরিনের মুখ লাল হয়ে গেল।
—"একদম না!"
রুদ্র হাসল।
—"তাহলে ভালো।"
সে চলে গেল।
মেহরিন দাঁড়িয়ে রইল।
তার নিজের মনটাই যেন তাকে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
সেদিন রাতে মেহরিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল।
—"আমি কেন ওকে নিয়ে ভাবছি?"
কোনো উত্তর পেল না।
তারপর নিজের মনেই বলল,
—"ওকে আমি পছন্দ করি না।"
কিন্তু কথাটা বলার সময়ও তার মনে পড়ছিল—
রুদ্র যখন বলেছিল,
"আপনাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে।"
মেহরিন অজান্তেই হেসে ফেলল।
অন্যদিকে রুদ্র তার অফিসের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
ইরা ফোন করল।
—"আজ তো আপনার খেলা বেশ জমে গেছে।"
রুদ্র হেসে বলল,
—"ওর চোখ দেখেছ?"
—"হ্যাঁ।"
—"ও এখনও নিজের অনুভূতিটা বুঝতে পারেনি।"
ইরা বলল,
—"কিন্তু বেশি দূরে ঠেলে দিলে যদি সত্যিই চলে যায়?"
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—"তাহলে আমি নিজেই গিয়ে ফিরিয়ে আনব।"
ইরা মৃদু হেসে বলল,
—"আপনি সত্যিই ওকে ভালোবাসেন।"
রুদ্র জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—"ভালোবাসি কি না জানি না।"
একটু থেমে সে বলল,
—"শুধু জানি, ওকে অন্য কারও পাশে দেখলে এখনও আমার ভেতরটা জ্বলে।"
পরদিন সন্ধ্যায় মেহরিন কলেজ থেকে বের হওয়ার সময় দেখল—
রুদ্র গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু এবার তার সঙ্গে ইরা নেই।
রুদ্র মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—"বাসায় যাবেন?"
মেহরিন অবাক।
—"হ্যাঁ।"
—"চলুন, পৌঁছে দিই।"
মেহরিন কিছুক্ষণ দ্বিধায় রইল।
তারপর বলল,
—"না, দরকার নেই।"
রুদ্র মৃদু হেসে গাড়ির দরজা খুলল।
—"ঠিক আছে।"
সে আর জোর করল না।
মেহরিন চলে যেতে লাগল।
কিন্তু কয়েক পা যাওয়ার পর পেছনে তাকাল।
রুদ্র তখনও গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে।
তার চোখে অদ্ভুত একটা দৃষ্টি।
মেহরিনের বুক আবার কেঁপে উঠল।
সে বুঝতে পারছিল না—
এই মানুষটার প্রতি তার এত অস্থিরতা কেন।
আর রুদ্রও জানত না—
মেহরিনের এই অস্থিরতা খুব শিগগিরই তাকে এমন এক পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করাবে, যেখানে আর শুধু অভিনয় করে দূরে থাকা সম্ভব হবে না।
পরদিন সকাল থেকেই মেহরিনের মনটা অদ্ভুত হয়ে ছিল।
গতকাল রুদ্র তাকে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিতে চেয়েছিল।
সে না করে দিয়েছিল।
কিন্তু এরপর থেকে নিজের সিদ্ধান্তটাই বারবার মনে পড়ছিল।
কেন না করল?
রুদ্র তো জোর করেনি।
বরং খুব স্বাভাবিকভাবেই গাড়িতে উঠে চলে গিয়েছিল।
আগের রুদ্র হলে হয়তো জেদ করত।
কিন্তু এই রুদ্র একেবারেই আলাদা।
শান্ত।
ভদ্র।
আত্মবিশ্বাসী।
আর সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার—
সে এখন মেহরিনকে একদম পাত্তা দেয় না।
কলেজে গিয়ে মেহরিন তানিয়ার পাশে বসেছিল।
তানিয়া বলল,
—"কী হয়েছে?"
—"কিছু হয়নি।"
—"তুই আবার মিথ্যা বলছিস।"
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বলল,
—"রুদ্রের সঙ্গে গতকাল দেখা হয়েছিল।"
তানিয়া চোখ বড় করে বলল,
—"তারপর?"
—"আমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে চেয়েছিল।"
—"তুই রাজি হোসনি?"
—"না।"
—"কেন?"
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—"জানি না।"
তানিয়া হেসে বলল,
—"তুই আসলেই ওকে নিয়ে ভাবিস।"
—"একদম না।"
—"তাহলে এত আলোচনা কেন?"
মেহরিন এবার চুপ করে গেল।
দুপুরে কলেজের সামনে রুদ্রের গাড়ি দেখা গেল।
মেহরিনের চোখ অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেদিকে চলে গেল।
রুদ্র গাড়ি থেকে নামল।
তার সঙ্গে ইরা।
ইরা কিছু একটা বলতেই রুদ্র হেসে ফেলল।
মেহরিনের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে ভার হয়ে গেল।
তানিয়া সেটা লক্ষ্য করে বলল,
—"আবার শুরু হয়েছে।"
—"কী?"
—"তোর মুখ।"
—"আমার মুখে কী হয়েছে?"
—"যে মুখ দেখে মনে হচ্ছে কেউ তোর প্রিয় আইসক্রিমটা নিয়ে গেছে।"
মেহরিন রাগ করে বলল,
—"চুপ কর।"
তানিয়া হেসে ফেলল।
রুদ্র মেহরিনকে দেখেছিল।
ইচ্ছা করেই ইরার সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলল।
মেহরিন একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল।
তারপর নিজেকে বোঝাল,
"ওর সঙ্গে যার ইচ্ছা কথা বলুক। আমার কী?"
কিন্তু পাঁচ মিনিট পরও তার চোখ বারবার সেদিকেই যাচ্ছিল।
রুদ্র সেটা বুঝতে পারছিল।
তার মুখের কোণে মৃদু হাসি ফুটল।
সন্ধ্যায় মেহরিন বাসায় ফিরছিল।
রাস্তার মোড়ে এসে হঠাৎ রুদ্র সামনে এসে দাঁড়াল।
মেহরিন চমকে বলল,
—"আপনি?"
—"হ্যাঁ।"
—"এখানে?"
—"একটা কাজ ছিল।"
—"কী কাজ?"
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"আপনাকে দেখা।"
মেহরিন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
—"আপনি সবসময় এমন কথা বলেন কেন?"
—"কেমন?"
—"যেগুলোর কোনো মানে নেই।"
রুদ্র বলল,
—"আমার কাছে মানে আছে।"
মেহরিন চুপ।
রুদ্র বলল,
—"আজ গাড়িতে যাবেন?"
—"না।"
—"ঠিক আছে।"
আবারও সে জোর করল না।
রুদ্র গাড়িতে উঠে চলে গেল।
মেহরিন দাঁড়িয়ে রইল।
তার ভেতরে অদ্ভুত একটা অভিমান জমল।
কেন সে একবারও বলল না—চলুন?
কয়েকদিন এভাবেই কেটে গেল।
রুদ্র মেহরিনের সঙ্গে দেখা হলে ভদ্রভাবে কথা বলে।
কখনো খোঁজ নেয়।
কখনো প্রশংসা করে।
আবার কখনো এমনভাবে চলে যায় যেন মেহরিন তার কাছে আর দশজন মানুষের মতোই।
এই আচরণটাই মেহরিনকে সবচেয়ে বেশি অস্থির করে তুলল।
একদিন সে নিজেই রুদ্রের অফিসে গেল।
রিসেপশনের মেয়েটা বলল,
—"স্যার এখন ফ্রি আছেন। আপনি যেতে পারেন।"
মেহরিন দরজায় নক করে ঢুকল।
রুদ্র ল্যাপটপে কাজ করছিল।
মাথা না তুলেই বলল,
—"বসুন।"
মেহরিন বসে রইল।
কয়েক মিনিট পর রুদ্র তাকাল।
—"কী ব্যাপার?"
—"আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।"
—"বলুন।"
—"আপনি আমাকে এড়িয়ে চলছেন।"
রুদ্র ভ্রু তুলল।
—"আমি?"
—"হ্যাঁ।"
—"কেন মনে হচ্ছে?"
মেহরিন একটু থেমে বলল,
—"আগে আপনি কথা বলতেন। এখন ঠিকমতো তাকানও না।"
রুদ্র চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
—"আপনি কি চান আমি আপনার দিকে সবসময় তাকিয়ে থাকি?"
মেহরিন চুপ।
রুদ্র একটু কাছে এসে বলল,
—"আপনি তো একসময় বলেছিলেন, আমার মতো ছেলেদের আপনার পছন্দ নয়।"
মেহরিনের বুক ধক করে উঠল।
সে বুঝল—
রুদ্র সব মনে রেখেছে।
রুদ্র আবার বলল,
—"তাই এখন আমি আপনার পছন্দ-অপছন্দের বাইরে থাকার চেষ্টা করছি।"
মেহরিন নিচু গলায় বলল,
—"আমি তখন ছোট ছিলাম।"
—"জানি।"
—"আমি রাগ করে বলেছিলাম।"
—"জানি।"
—"তবুও মনে রেখেছেন?"
রুদ্র হেসে বলল,
—"সব কথা মনে থাকে না। কিছু কথা থেকে যায়।"
মেহরিন তার দিকে তাকাল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর রুদ্র আবার নিজের চেয়ারে বসে বলল,
—"আর কিছু?"
মেহরিন একটু অভিমানী গলায় বলল,
—"না।"
সে উঠে চলে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তার মুখে হাসি থাকলেও চোখে কষ্ট ছিল।
সেদিন রাতে রুদ্র ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার ফোনে ইরার কল।
—"সব ঠিকঠাক?"
—"হুম।"
—"মেহরিন এসেছিল?"
—"হ্যাঁ।"
—"কী বলল?"
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"অভিযোগ করল।"
—"মানে?"
—"আমি নাকি ওকে পাত্তা দিই না।"
ইরা হেসে বলল,
—"তাহলে তো কাজ হয়েছে।"
রুদ্র আকাশের দিকে তাকাল।
—"হ্যাঁ।"
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—"কিন্তু আর বেশি কষ্ট দিতে চাই না।"
ইরা বলল,
—"তাহলে সত্যিটা বলে দিন।"
রুদ্র ধীরে বলল,
—"এখনও সময় হয়নি।"
এদিকে মেহরিনের অবস্থাও ভালো ছিল না।
সে বারবার নিজের আচরণ নিয়ে ভাবছিল।
কেন সে রুদ্রের কাছে গিয়ে অভিযোগ করল?
কেন ইরাকে দেখলে তার খারাপ লাগে?
কেন রুদ্র তাকে পাত্তা না দিলে তার এত কষ্ট হয়?
একসময় সে নিজেকেই বলল,
—"আমি কি সত্যিই ওকে..."
কথাটা শেষ করতে পারল না।
পরদিন বিকেলে মেহরিন শপিংমলে গেল।
তানিয়া আসতে পারেনি, তাই সে একাই কেনাকাটা করছিল।
কেনাকাটা শেষ করে সন্ধ্যার দিকে মলের বাইরে বের হলো।
রাস্তা তখন তুলনামূলক ফাঁকা।
মেহরিন গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল।
হঠাৎ তিনজন যুবক তার সামনে এসে দাঁড়াল।
একজন হেসে বলল,
—"আপু, কোথায় যাবেন?"
মেহরিন সরে যেতে চাইলে আরেকজন পথ আটকাল।
—"এত তাড়া কিসের?"
মেহরিন ভয় পেয়ে বলল,
—"আমাকে যেতে দিন।"
একজন আবার সামনে এগিয়ে এল।
মেহরিন পিছিয়ে গেল।
তার হাতে থাকা ব্যাগ মাটিতে পড়ে গেল।
সে দ্রুত ফোন বের করতে গেল।
ঠিক তখন দূর থেকে একটা গাড়ির হর্ন শোনা গেল।
তিনজনই ঘুরে তাকাল।
একটা কালো গাড়ি দ্রুত এসে তাদের সামনে থামল।
দরজা খুলে একজন নামল।
সাদা শার্ট।
কঠিন চোখ।
চোয়াল শক্ত।
মেহরিন তাকে দেখেই নিঃশ্বাস আটকে ফেলল।
রুদ্র।
রুদ্র ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এল।
তার মুখে কোনো হাসি নেই।
শুধু ভয়ংকর রাগ।
সে ঠান্ডা গলায় বলল—
—"মেয়েটার সামনে থেকে সরে দাঁড়াও।"
তিনজনের একজন হেসে বলল,
—"আপনি কে?"
রুদ্র আর এক পা এগিয়ে গেল।
—"শেষবার বলছি। সরে দাঁড়াও।"
লোকটা উল্টো রুদ্রকে ধাক্কা দিল।
রুদ্র এক মুহূর্ত থেমে তার দিকে তাকাল।
তারপর—
শুরু হলো লড়াই।
মেহরিন আতঙ্কে দাঁড়িয়ে রইল।
আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে বুঝতে পারল—
এই মানুষটা শুধু বদলে যায়নি।
প্রয়োজনে এখনও সে আগের মতোই ভয়ংকর হতে পারে।
শুধু এবার সেই রাগটা অন্যায় করার জন্য নয়—
তাকে রক্ষা করার জন্য।
রুদ্রকে ধাক্কা দেওয়ার পর লোকটা আবার এগিয়ে আসতেই রুদ্র তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
চোখ দুটো তখন রাগে লাল।
—"আর একবার ওর দিকে হাত বাড়ালে ভালো হবে না।"
লোকটা হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
—"ছাড়!"
রুদ্র তাকে এক ধাক্কায় পেছনে সরিয়ে দিল।
অন্য দুজন তখন এগিয়ে এল।
মেহরিন ভয় পেয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
—"রুদ্র!"
রুদ্র এক মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকাল।
—"ভয় পেও না।"
তারপর আবার ছেলেগুলোর দিকে ফিরল।
একজন রুদ্রকে ঘুষি মারতে এগিয়ে এলো। রুদ্র সরে গিয়ে তার হাত আটকে দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লোকটাকে মাটিতে ফেলে দিল।
অন্যজন পেছন থেকে এগিয়ে আসতেই রুদ্র ঘুরে দাঁড়াল।
—"তোমরাও আসবে?"
লোকটা থেমে গেল।
রুদ্রের চোখের দৃষ্টি দেখেই যেন তার সাহস কমে গেল।
তবুও সে এগিয়ে এলো।
রুদ্র তাকে সরিয়ে দিয়ে বলল,
—"এখনই চলে যাও।"
তিনজন একে অপরের দিকে তাকাল।
তারপর দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল।
রুদ্র তাদের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর মেহরিনের কাছে ফিরে এল।
—"ঠিক আছ?"
মেহরিন কোনো উত্তর দিল না।
তার চোখে পানি।
রুদ্র একটু নরম হয়ে বলল,
—"মেহরিন?"
মেহরিন হঠাৎ তাকে জড়িয়ে ধরল।
রুদ্র একদম স্থির হয়ে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে হাত দুটো মেহরিনের কাঁধে রাখল।
মেহরিন কাঁপা গলায় বলল,
—"আমি ভয় পেয়েছিলাম।"
রুদ্রের মুখের সমস্ত রাগ মুহূর্তে গলে গেল।
—"আমি আছি। ভয় নেই।"
মেহরিন আরও শক্ত করে তাকে ধরে রইল।
রুদ্রের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।
সে নিচু গলায় বলল,
—"এতদিন পর আমার কাছে এসে নিজেই জড়িয়ে ধরলে?"
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে তাকে ছেড়ে দিল।
লজ্জায় মুখ নিচু করে বলল,
—"আমি... ভয় পেয়েছিলাম বলে..."
রুদ্র মজা করে বলল,
—"জানি।"
—"হাসছেন কেন?"
—"কিছু না।"
—"আপনি হাসছেন!"
রুদ্র এবার সত্যিই হেসে ফেলল।
—"আজ প্রথমবার তুমি নিজে থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরলে। সেটা মনে থাকবে।"
মেহরিন লজ্জায় আর কিছু বলল না।
রুদ্র মাটিতে পড়ে থাকা মেহরিনের ব্যাগটা তুলে নিল।
—"চলো।"
—"কোথায়?"
—"তোমাকে বাসায় পৌঁছে দেব।"
মেহরিন এবার আর না করল না।
দুজন গাড়িতে উঠল।
রুদ্র নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিল।
মেহরিন চুপচাপ পাশে বসে ছিল।
কিছুক্ষণ পর রুদ্র বলল,
—"ওরা তোমাকে কিছু করেছে?"
—"না। আপনি আসার আগেই..."
কথাটা শেষ করতে পারল না মেহরিন।
রুদ্র স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করে ধরল।
—"ঠিক আছে। এখন আর কিছু হবে না।"
মেহরিন তার হাতের দিকে তাকাল।
লড়াইয়ের সময় হাতের কাছে সামান্য কেটে গেছে।
—"আপনার হাত থেকে রক্ত বের হচ্ছে।"
—"কিছু হয়নি।"
—"সবসময় এই কথা বলেন কেন?"
রুদ্র মুচকি হাসল।
—"তুমি চিন্তা করছ?"
মেহরিন চুপ।
রুদ্র আবার বলল,
—"উত্তর না দিলেও বুঝেছি।"
মেহরিন মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি মেহরিনদের বাসার সামনে এসে থামল।
মেহরিন দরজা খুলে নামতে যাচ্ছিল।
রুদ্র বলল,
—"এক মিনিট।"
সে গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে একটা ছোট ফার্স্ট-এইড বক্স বের করল।
—"আমার হাতটা একটু দেখো।"
—"আমি?"
—"হ্যাঁ।"
মেহরিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও রুদ্রের হাতটা নিজের হাতে নিল।
আলতো করে ক্ষতটা পরিষ্কার করল।
রুদ্র চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেহরিন বলল,
—"আপনি এত ঝামেলায় জড়ান কেন?"
রুদ্র মৃদু গলায় বলল,
—"সব ঝামেলা খারাপ না।"
—"মানে?"
—"কিছু ঝামেলা জীবনে থাকলেই ভালো লাগে।"
মেহরিন বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল।
রুদ্র হাসল।
—"কিছু না।"
মেহরিন ব্যান্ডেজ করে দিল।
—"হয়ে গেছে।"
রুদ্র হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
—"ভালো করেছ।"
মেহরিন দরজা খুলে নামতে গেল।
রুদ্র বলল,
—"মেহরিন।"
সে ফিরে তাকাল।
—"হুম?"
—"আজ যা হয়েছে, সেটা নিয়ে ভয় পেও না।"
—"হুম।"
—"আর কোনোদিন এমন কিছু হলে আমাকে ফোন করবে।"
মেহরিন একটু থেমে বলল,
—"আমার তো আপনার নম্বর নেই।"
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের ফোনটা এগিয়ে দিল।
—"তাহলে নিয়ে নাও।"
মেহরিন নম্বর সেভ করল।
কন্টাক্টের নাম লিখতে গিয়ে থেমে গেল।
রুদ্র বলল,
—"নাম লিখছ না কেন?"
মেহরিন মৃদু হেসে লিখল—
রুদ্র।
রুদ্র স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—"শুধু রুদ্র?"
—"আর কী লিখব?"
—"তোমার ইচ্ছা।"
মেহরিন ফোনটা ফেরত দিয়ে বলল,
—"এটাই ভালো।"
পরদিন সকালেই মেহরিনের ফোনে একটা মেসেজ এলো।
রুদ্র:
"কাল রাতে ঠিকমতো ঘুমিয়েছ?"
মেহরিন কিছুক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল—
মেহরিন:
"হ্যাঁ।"
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
রুদ্র:
"ভয় পেয়েছিলে?"
মেহরিন লিখল—
"একটু।"
রুদ্র লিখল—
"এখন?"
মেহরিন একটু ভেবে লিখল—
"এখন নেই।"
রুদ্রের উত্তর এলো—
"ভালো।"
মেহরিন ফোনটা নামিয়ে রাখল।
কিন্তু তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
এরপর থেকে তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়তে লাগল।
রুদ্র খুব বেশি কথা বলত না।
কিন্তু মেহরিন কখন কলেজে যায়, কখন বাসায় ফেরে—এসব খেয়াল রাখত।
একদিন মেহরিনের পরীক্ষা ছিল।
সকালে রুদ্র মেসেজ করল—
"আজ পরীক্ষা। ভালো করে দিও।"
মেহরিন অবাক হয়ে লিখল—
"আপনি জানলেন কীভাবে?"
উত্তর এল—
"জানতে চাইলেই জানা যায়।"
মেহরিন মৃদু হেসে ফোনটা রেখে দিল।
কিন্তু কয়েকদিন পর আবার সব বদলে গেল।
মেহরিন একদিন রুদ্রের অফিসে গিয়ে দেখল—
ইরা তার সামনে বসে আছে।
ইরা হাসছে।
রুদ্রও তার সঙ্গে গল্প করছে।
মেহরিন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর চুপচাপ চলে গেল।
রুদ্র তাকে দেখে ফেলেছিল।
কিন্তু ইচ্ছে করেই তাকে ডাকল না।
ইরা বলল,
—"আপনি আবার শুরু করেছেন?"
রুদ্র মৃদু হাসল।
—"হুম।"
—"ও কিন্তু সত্যিই কষ্ট পাবে।"
রুদ্র কিছু বলল না।
ইরা বলল,
—"আপনি ওকে এতটা ভালোবাসেন, অথচ এত কষ্ট দেন কেন?"
রুদ্র জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—"কারণ ওর মনে আমার জন্য কিছু আছে কি না, সেটা জানতে চাই।"
—"আর যদি না থাকে?"
রুদ্র এবার চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
—"তাহলে আমি সরে যাব।"
কিন্তু তার গলার স্বরেই বোঝা যাচ্ছিল—
এই কথাটা সে নিজেও বিশ্বাস করে না।
অন্যদিকে মেহরিন নিজের ঘরে বসে ছিল।
তার ফোনে রুদ্রের আগের মেসেজগুলো খোলা।
"ভয় পেয়েছিলে?"
"এখন?"
"ভালো।"
মেহরিনের চোখে পানি চলে এলো।
সে নিজেকেই বলল,
—"আমি কেন এত ভাবছি ওকে নিয়ে?"
তারপর ফোনটা বন্ধ করে দিল।
কিন্তু ঠিক তখনই ফোনে আরেকটা মেসেজ এলো।
রুদ্র লিখেছে—
"কাল সন্ধ্যায় সময় আছে?"
মেহরিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উত্তর দিল—
"কেন?"
রুদ্র লিখল—
"দেখা করতে চাই।"
মেহরিনের বুকের ভেতর আবার অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
সে লিখল—
"ঠিক আছে।"
রুদ্র ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কারণ সে জানত—
আগামীকাল মেহরিনের সামনে সে এমন একটা সত্যি আনবে, যা এতদিন ইচ্ছা করেই লুকিয়ে রেখেছিল।
পরদিন বিকেলটা মেহরিনের কাছে অস্বাভাবিক দীর্ঘ মনে হচ্ছিল।
রুদ্র নিজে দেখা করতে চেয়েছে।
কেন?
এই প্রশ্নটাই বারবার মাথায় ঘুরছিল।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার নিজের চুল ঠিক করল। তারপর নিজেই বিরক্ত হয়ে বলল,
—"আমি এত প্রস্তুত হচ্ছি কেন?"
নিজের কথাতেই লজ্জা পেল।
অবশেষে একটা সাদামাটা পোশাক পরে বেরিয়ে পড়ল।
শহরের একটা শান্ত রেস্টুরেন্টের সামনে রুদ্র অপেক্ষা করছিল।
মেহরিনকে দেখেই সে উঠে দাঁড়াল।
আজ রুদ্রের পরনে নেভি-ব্লু শার্ট।
চোখে সেই আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টি।
মেহরিন কাছে এসে বলল,
—"অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছেন?"
—"না।"
—"নিশ্চিত?"
—"তুমি আসবে কিনা, সেটাই ভাবছিলাম।"
মেহরিন একটু অবাক হয়ে বলল,
—"আমি তো বলেছিলাম আসব।"
রুদ্র মৃদু হাসল।
—"তোমার কথায় বিশ্বাস করতে শিখছি।"
দুজন ভেতরে গিয়ে বসল।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
অবশেষে মেহরিনই বলল,
—"আপনি আমাকে কেন ডেকেছেন?"
রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—"কিছু কথা বলার জন্য।"
—"কী কথা?"
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—"তুমি কি আমাকে এখনও ভয় পাও?"
মেহরিন থমকে গেল।
—"না।"
—"আগে পেতে।"
মেহরিন ধীরে বলল,
—"আগের আপনি আর এখনকার আপনি এক নন।"
রুদ্রের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।
—"তাহলে আমাকে এখন কেমন লাগে?"
প্রশ্নটা শুনে মেহরিন চুপ করে গেল।
তার গাল হালকা লাল হয়ে উঠল।
—"জানি না।"
—"সত্যি?"
—"হুম।"
রুদ্র একটু ঝুঁকে বলল,
—"মিথ্যা বলছ।"
মেহরিন চোখ তুলে তাকাল।
—"আপনি সবসময় এমন করেন কেন?"
—"কী?"
—"আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেন।"
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"কারণ তুমি অস্বস্তিতে পড়লে খুব সুন্দর দেখাও।"
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর রুদ্র বলল,
—"ইরার কথা জানতে চেয়েছিলে একদিন।"
মেহরিন চমকে তাকাল।
—"আমি?"
—"হ্যাঁ।"
—"আমি তো..."
—"সে আমার প্রেমিকা না।"
মেহরিন কিছু বলতে পারল না।
রুদ্র বলল,
—"কখনোই ছিল না।"
মেহরিনের বুকের ভেতর যেন হঠাৎ জমে থাকা একটা ভার নেমে গেল।
তবুও সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
—"তাহলে?"
—"ও আমার বন্ধুর বোন।"
মেহরিন চুপ।
রুদ্র হেসে বলল,
—"আর তোমাকে একটু জ্বালানোর কাজে আমার সহযোগী।"
মেহরিন এবার বুঝতে পারল সবকিছু।
তার মুখ লাল হয়ে গেল।
—"আপনি ইচ্ছে করে এসব করেছেন?"
—"হ্যাঁ।"
—"কেন?"
রুদ্রের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে সরাসরি মেহরিনের চোখের দিকে তাকাল।
—"কারণ আমি জানতে চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে নিয়ে কিছু অনুভব করো কি না।"
মেহরিনের বুক কেঁপে উঠল।
—"আর যদি করতাম?"
রুদ্র ধীরে বলল,
—"তাহলে হয়তো আজকের কথাগুলো অনেক আগেই বলতাম।"
মেহরিন নিচু গলায় বলল,
—"আপনি কি... আমাকে পছন্দ করেন?"
রুদ্র উত্তর দিল না।
কয়েক সেকেন্ড পর শুধু বলল,
—"দুই বছর আগে তুমি আমাকে অপমান করেছিলে।"
মেহরিনের মুখ মলিন হয়ে গেল।
—"জানি।"
—"সেদিন তোমার কথা খুব কষ্ট দিয়েছিল।"
—"আমি দুঃখিত।"
—"তারপরও আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি।"
মেহরিন নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।
রুদ্র বলল,
—"তুমি আমাকে পছন্দ করো কি না জানি না। কিন্তু আমি জানি, তোমাকে দেখলে আমার এখনও আগের মতোই কিছু একটা হয়।"
মেহরিনের চোখে পানি চলে এলো।
সে আস্তে বলল,
—"আমিও বুঝতে পারিনি কখন..."
রুদ্র অপেক্ষা করল।
—"কখন আপনাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছি।"
রুদ্রের মুখে মৃদু হাসি ফুটল।
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি শুরু হলো।
রুদ্র গাড়ির দরজা খুলে দিল।
—"উঠো।"
মেহরিন এবার কোনো আপত্তি করল না।
গাড়ির ভেতর বসে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
বৃষ্টির ফোঁটা কাঁচ বেয়ে নামছে।
রুদ্র গাড়ি চালাচ্ছিল।
হঠাৎ মেহরিন বলল,
—"একটা কথা বলব?"
—"বলো।"
—"আপনি যখন প্রথম আমাকে দেখেছিলেন, তখন থেকেই কি..."
রুদ্র হেসে বলল,
—"হ্যাঁ।"
—"এতদিন?"
—"হুম।"
—"আমাকে এতদিন বলেননি কেন?"
রুদ্র বলল,
—"তখন তুমি আমাকে ঘৃণা করতে।"
মেহরিন মৃদু গলায় বলল,
—"এখন করি না।"
রুদ্র তার দিকে একবার তাকাল।
—"জানি।"
এরপর কয়েক সপ্তাহ তাদের সম্পর্কটা আরও কাছের হয়ে উঠল।
রুদ্র খুব যত্ন নিত।
মেহরিনের পরীক্ষা থাকলে সকালে মেসেজ করত।
মেহরিন অসুস্থ হলে ওষুধ পাঠিয়ে দিত।
কখনো কলেজের সামনে এসে দাঁড়াত।
তবে রুদ্রের একটা স্বভাব এখনও বদলায়নি—
রাগ।
একদিন মেহরিন রুদ্রকে না জানিয়ে বান্ধবীদের সঙ্গে অনেক দূরে ঘুরতে গিয়েছিল।
ফোনও বন্ধ ছিল।
রুদ্র কয়েক ঘণ্টা তাকে খুঁজে না পেয়ে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ল।
মেহরিন রাতে ফোন চালু করতেই রুদ্রের কল।
—"কোথায় ছিলে?"
—"বন্ধুদের সঙ্গে।"
—"ফোন বন্ধ কেন?"
—"চার্জ ছিল না।"
রুদ্রের গলা কঠিন হয়ে গেল।
—"একটা মেসেজ করতে পারতে।"
মেহরিনও রেগে গেল।
—"আমি কি আপনাকে সবকিছুর হিসাব দিতে বাধ্য?"
রুদ্র চুপ হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর বলল,
—"না।"
তারপর ফোন কেটে দিল।
মেহরিনেরও খারাপ লাগল।
কিন্তু অভিমান করে আর ফোন করল না।
দুই দিন তাদের কথা হলো না।
তৃতীয় দিন রুদ্র নিজেই মেহরিনের সামনে এসে দাঁড়াল।
মেহরিন মুখ ফিরিয়ে নিল।
—"কথা বলবে না?"
—"না।"
—"কতদিন?"
—"জানি না।"
রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—"আমি রাগ করেছি কারণ চিন্তা করেছিলাম।"
মেহরিন চুপ।
—"কিন্তু তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার আমার নেই।"
মেহরিন ধীরে তার দিকে তাকাল।
রুদ্র বলল,
—"আমি চেষ্টা করব আমার রাগটা সামলাতে।"
মেহরিনের অভিমান একটু নরম হলো।
—"সত্যি?"
—"সত্যি।"
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
—"তাহলে আমিও আর ইচ্ছে করে আপনাকে চিন্তায় ফেলব না।"
রুদ্র হেসে বলল,
—"চুক্তি?"
মেহরিন হাত বাড়িয়ে বলল,
—"চুক্তি।"
রুদ্র তার হাত ধরল।
দুজনের চোখে তখন এক ধরনের নিশ্চয়তা।
কিন্তু তাদের সম্পর্কের কথা মেহরিনের পরিবার এখনও জানত না।
রুদ্র সেটা জানত।
এক সন্ধ্যায় মেহরিন বলল,
—"আমার বাবা-মা হয়তো আপনাকে মেনে নেবেন না।"
রুদ্র শান্ত গলায় বলল,
—"তাহলে আমাকে তাদের বোঝাতে হবে।"
—"যদি না বোঝেন?"
রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—"আমি তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাব না।"
মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।
—"তাহলে?"
—"তোমার পরিবারের সামনে দাঁড়িয়ে তোমাকে চাইব।"
মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।
রুদ্র মৃদু হাসল।
—"আমি তোমাকে লুকিয়ে চাই না।"
মেহরিন ধীরে তার হাতটা ধরল।
—"আমি আপনার ওপর বিশ্বাস করি।"
রুদ্র তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
—"এই বিশ্বাসটাই যেন কোনোদিন হারিয়ে না যায়।"
দুজনেই জানত—
সামনের পথ সহজ হবে না।
কারণ ভালো লাগা থেকে সম্পর্ক তৈরি করা সহজ,
কিন্তু সেই সম্পর্ককে সবার সামনে নিজের করে নেওয়া—
সেটাই আসল পরীক্ষা।
আর সেই পরীক্ষার প্রথম ধাপ শুরু হতে চলেছে খুব শিগগিরই।
মেহরিন সেদিন সারারাত ঘুমাতে পারল না।
রুদ্র তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চায়।
কথাটা যতবার মনে পড়ছিল, ততবার বুকের ভেতরটা কেমন করছিল।
তার বাবা খুব কঠোর মানুষ।
আর রুদ্রের অতীতও খুব একটা ভালো ছিল না।
একসময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই রাগী, গুন্ডা টাইপের ছেলেটা যে আজ এত বড় চাকরি করে, নিজের গাড়ি-বাড়ি করেছে—এই পরিবর্তন সবাই সহজে মেনে নেবে কি না, মেহরিন জানত না।
পরদিন সকালে রুদ্র ফোন করল।
—"কী করছ?"
—"আপনার কথাই ভাবছিলাম।"
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর রুদ্র হেসে বলল,
—"শুধু আমার কথা ভাবলেই হবে না। আজ আমাকে তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করাতে হবে।"
মেহরিন চুপ করে গেল।
—"ভয় পাচ্ছ?"
—"হুম।"
—"আমি আছি।"
—"কিন্তু যদি বাবা আপনাকে অপমান করেন?"
রুদ্র শান্ত গলায় বলল,
—"তোমার জন্য যতটা অপমান সহ্য করতে হয়, করব।"
মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।
বিকেলে রুদ্র মেহরিনদের বাসায় এল।
গাড়ি থেকে নামার সময় তার হাতে একটা ছোট ফুলের তোড়া।
মেহরিন দরজা খুলে তাকে দেখে একটু অবাক হলো।
—"ফুল কেন?"
রুদ্র বলল,
—"প্রথমবার তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। খালি হাতে যাওয়া যায়?"
মেহরিন মৃদু হাসল।
—"আপনাকে আজ খুব ভদ্র লাগছে।"
রুদ্র ভ্রু তুলে বলল,
—"আমি কি সবসময় অভদ্র?"
—"কখনো কখনো।"
—"ঠিক আছে, পরে হিসাব নেব।"
মেহরিন লজ্জা পেয়ে বলল,
—"চুপ করুন।"
ড্রয়িংরুমে মেহরিনের বাবা বসে ছিলেন।
রুদ্র ঢুকে সালাম দিল।
—"আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।"
—"ওয়ালাইকুম সালাম। বসো।"
মেহরিনের মা পাশে বসেছিলেন।
তিনি রুদ্রকে ভালো করে দেখলেন।
—"তুমিই রুদ্র?"
—"জি।"
বাবা সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
—"মেহরিন তোমাকে কতদিন ধরে চেনে?"
রুদ্র এক মুহূর্ত মেহরিনের দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
—"অনেক বছর।"
বাবার চোখ সরু হয়ে গেল।
—"অনেক বছর মানে?"
রুদ্র শান্তভাবে বলল,
—"যখন আমি খুব একটা ভালো অবস্থায় ছিলাম না, তখন থেকেই।"
মেহরিনের বাবা চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—"তোমার সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি।"
রুদ্র মাথা নিচু করল।
—"যেগুলো সত্যি, সেগুলো অস্বীকার করব না।"
বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।
রুদ্র বলল,
—"আমি একসময় রাগী ছিলাম। ভুল মানুষের সঙ্গে চলেছি। জীবনটা ঠিক পথে ছিল না।"
একটু থেমে বলল,
—"কিন্তু আমি বদলেছি। শুধু মেহরিনের জন্য নয়, নিজের জন্যও।"
মেহরিনের মা নরম গলায় বললেন,
—"তুমি এখন কী করো?"
—"একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ করি।"
—"কী পদে?"
—"ম্যানেজিং ডিরেক্টর।"
বাবা এবার একটু অবাক হলেন।
—"নিজের গাড়ি-বাড়ি সবই আছে?"
—"আলহামদুলিল্লাহ।"
তারপর রুদ্র শান্ত গলায় বলল,
—"কিন্তু এগুলোর কোনোটাকেই আমি মেহরিনকে দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ মনে করি না।"
বাবা তাকিয়ে রইলেন।
—"তাহলে?"
রুদ্র বলল,
—"আমি তাকে সম্মান দিতে পারব। নিরাপদ রাখতে পারব। তার নিজের জীবন, স্বপ্ন আর সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিতে পারব।"
ঘরটা নীরব হয়ে গেল।
হঠাৎ মেহরিনের বাবা বললেন,
—"তুমি কি আমার মেয়েকে সত্যিই ভালোবাসো?"
রুদ্র মেহরিনের দিকে তাকাল।
মেহরিনের চোখে পানি।
রুদ্র ধীরে বলল,
—"জি।"
—"কতটা?"
রুদ্র মৃদু হাসল।
—"এটার পরিমাণ মাপার কোনো হিসাব আমার জানা নেই।"
বাবার মুখেও হালকা হাসি ফুটল।
কিন্তু তিনি সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি দিলেন না।
—"আমাকে সময় দাও।"
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল,
—"যতটা সময় দরকার নিন।"
রুদ্র চলে যাওয়ার পর মেহরিন বাবার পাশে গিয়ে বসলো।
—"বাবা..."
বাবা বললেন,
—"তুই ওকে ভালোবাসিস?"
মেহরিন মাথা নিচু করে বলল,
—"হ্যাঁ।"
—"কখন থেকে?"
—"জানি না।"
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—"ছেলেটা বদলেছে, সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু বাবা হিসেবে ভয় হয়।"
মেহরিন বাবার হাত ধরল।
—"আমি ওর ওপর বিশ্বাস করি।"
বাবা মেয়ের দিকে তাকালেন।
—"তুই সুখী হবি তো?"
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
—"ও থাকলে চেষ্টা করব।"
কিন্তু তাদের এই সম্পর্কের খবর ধীরে ধীরে বাইরে ছড়িয়ে পড়ল।
মেহরিনের এক আত্মীয় রুদ্রের পুরোনো জীবন নিয়ে নানা কথা বলতে শুরু করল।
কেউ বলল,
—"ছেলেটা আগে গুন্ডাদের সঙ্গে চলত।"
কেউ বলল,
—"এমন মানুষ বদলায় না।"
মেহরিন এসব শুনে মন খারাপ করত।
একদিন রুদ্রকে বলল,
—"সবাই আপনার অতীত নিয়ে কথা বলে।"
রুদ্র বলল,
—"অতীত মুছে ফেলা যায় না।"
—"তাহলে?"
—"কিন্তু বর্তমানটা নিজের হাতে লেখা যায়।"
মেহরিন চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
কয়েকদিন পর রুদ্র মেহরিনকে নিয়ে শহরের বাইরে একটা শান্ত জায়গায় গেল।
চারপাশে সবুজ।
দূরে নদী।
মেহরিন গাড়ি থেকে নেমে বলল,
—"এখানে কেন?"
রুদ্র বলল,
—"তোমার সঙ্গে একটু শান্তিতে কথা বলতে।"
—"কী কথা?"
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—"তোমার বাবা এখনও পুরোপুরি রাজি হননি।"
মেহরিনের মুখ মলিন হয়ে গেল।
—"আমি জানি।"
—"তুমি কি ভয় পাচ্ছ?"
—"হ্যাঁ।"
রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—"আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি না।"
—"কেন?"
—"কারণ তোমাকে পাওয়ার জন্য এবার আমি সঠিক পথেই লড়ব।"
মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।
—"যদি আমাকে না পাও?"
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"তাহলে তোমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করব।"
মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।
—"সত্যি?"
—"হ্যাঁ। ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের ইচ্ছেমতো আটকে রাখা নয়।"
মেহরিন ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেল।
রুদ্র তার হাত ধরল।
কিছুক্ষণ দুজন নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ মেহরিন বলল,
—"একটা কথা?"
—"বলো।"
—"আপনি যখন রাগ করেন, তখন আপনাকে খুব ভয়ংকর লাগে।"
রুদ্র হেসে বলল,
—"আর যখন রাগ করি না?"
—"তখন ভালো লাগে।"
—"শুধু ভালো?"
মেহরিন লজ্জা পেয়ে বলল,
—"হুম।"
রুদ্র মৃদু হাসল।
—"আমি কিন্তু তোমার মুখে আরেকটা উত্তর শুনতে চেয়েছিলাম।"
—"কী উত্তর?"
—"যেটা তুমি এখনও বলতে লজ্জা পাও।"
মেহরিন তার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে বলল,
—"আমি বাসায় যাব।"
রুদ্র হেসে ফেলল।
—"আচ্ছা, চল।"
কয়েকদিন পর অবশেষে মেহরিনের বাবা রুদ্রকে আবার ডাকলেন।
রুদ্র এসে বসতেই তিনি বললেন,
—"আমি ভেবেছি।"
রুদ্র চুপ করে অপেক্ষা করল।
বাবা বললেন,
—"তোমাকে আমি পুরোপুরি নিখুঁত মানুষ বলতে পারব না। কিন্তু তুই নিজের ভুল বুঝে বদলেছিস।"
রুদ্র মাথা নিচু করল।
—"জি।"
—"আর আমার মেয়ে তোকে বিশ্বাস করে।"
মেহরিনের চোখে পানি।
বাবা বললেন,
—"তাই আমার আর আপত্তি নেই।"
মেহরিন আনন্দে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
তারপর দৌড়ে রুদ্রের কাছে গেল।
রুদ্রের চোখেও তখন স্বস্তি।
মেহরিন ফিসফিস করে বলল,
—"আপনি জিতে গেছেন।"
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"না।"
—"তাহলে?"
—"আমরা জিতেছি।"
মেহরিন হাসল।
কিন্তু তারা জানত না—
তাদের বিয়ের আগে আরও একটা ছোট ঝড় অপেক্ষা করছে।
আর সেই ঝড়ই তাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করে দেবে।
রুদ্র আর মেহরিনের বিয়ের কথা পাকাপাকি হওয়ার পর দুজনের জীবন যেন হঠাৎ করেই বদলে গেল।
মেহরিনের মুখে সারাক্ষণ হাসি।
রুদ্রও আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত।
তবুও তার রাগী স্বভাবটা পুরোপুরি যায়নি।
মেহরিন একটু দেরি করে ফোন ধরলে—
—"ফোন কাছে রাখো।"
মেহরিন হাসত।
—"আপনি আবার শুরু করেছেন?"
—"চিন্তা করি বলে বলি।"
—"সবসময় এত চিন্তা করবেন না।"
—"তুমি বুঝবে না।"
এই ছোট ছোট কথাতেই তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে উঠছিল।
একদিন মেহরিন রুদ্রকে বলল,
—"বিয়ের পর আমাকে কিন্তু পড়াশোনা শেষ করতে দেবেন।"
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—"কে বলেছে দেব না?"
—"আপনি যদি বলেন সংসার সামলাও?"
—"সংসার দুজনের। শুধু তোমার না।"
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
—"আপনি মাঝে মাঝে ভালো কথা বলেন।"
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে বলল,
—"মাঝে মাঝে?"
—"হ্যাঁ।"
—"ঠিক আছে। আজ থেকে কম বলব।"
মেহরিন হেসে ফেলল।
কিন্তু কয়েকদিন পর একটা সমস্যা তৈরি হলো।
রুদ্রের পুরোনো পরিচিত একজন মানুষ তার অফিসে এসে দেখা করল।
লোকটা ছিল আগের জীবনের পরিচিত।
সে রুদ্রকে বলল,
—"শুনলাম বিয়ে করছিস?"
—"হ্যাঁ।"
—"পুরোনো জীবন একেবারে ভুলে গেছিস নাকি?"
রুদ্র গম্ভীর হয়ে গেল।
—"ওসব নিয়ে কথা বলতে চাই না।"
লোকটা হেসে বলল,
—"কিন্তু সবাই তোকে নিয়ে কথা বলে।"
—"বলুক।"
—"তোর বউ জানে তুই আগে কেমন ছিলি?"
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—"জানে।"
লোকটা অবাক।
—"সব?"
—"যতটা জানা দরকার, সব।"
কথাটা মেহরিনের কানেও পৌঁছাল।
সে সেদিন রুদ্রকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
—"আপনার পুরোনো জীবন নিয়ে কেউ কিছু বলেছে?"
রুদ্র বলল,
—"হ্যাঁ।"
—"আপনি আমাকে সব বলেছেন?"
—"যা গুরুত্বপূর্ণ, সব।"
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—"কিছু লুকাচ্ছেন না তো?"
রুদ্র একটু কষ্ট পেল।
—"তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?"
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—"করি।"
—"তাহলে?"
—"আমি শুধু ভয় পাই।"
রুদ্রের গলা নরম হয়ে গেল।
—"কীসের?"
—"আপনাকে হারানোর।"
রুদ্র কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—"আমাকে হারানোর কারণ তুমি নিজে তৈরি না করলে আমি কোথাও যাচ্ছি না।"
মেহরিনের মুখে হাসি ফুটল।
বিয়ের কেনাকাটা শুরু হলো।
মেহরিন একটা শপিংমলে গিয়ে শাড়ি দেখছিল।
রুদ্র পাশে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা শাড়ি বের করে বলছিল,
—"এটা নাও।"
—"না।"
—"কেন?"
—"পছন্দ হয়নি।"
—"এটা?"
—"না।"
রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলল,
—"তোমার পছন্দ কী?"
মেহরিন হেসে বলল,
—"আপনি যেটা পছন্দ করেন।"
রুদ্র একটু থেমে একটা শাড়ি হাতে নিল।
—"তাহলে এটা।"
মেহরিন শাড়িটা দেখে বলল,
—"সুন্দর।"
—"তাহলে এটিই।"
—"কিন্তু দাম..."
রুদ্র বলল,
—"দাম দেখবে না।"
—"কেন?"
—"কারণ তোমাকে কিছু কিনে দিতে গিয়ে দাম ভাবতে ভালো লাগে না।"
মেহরিন মুচকি হেসে বলল,
—"আপনি খুব খরুচে।"
—"তোমার ব্যাপারে।"
মেহরিন লজ্জায় চুপ করে গেল।
সেদিন রাতে মেহরিনের ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এলো।
"রুদ্রকে তুমি যতটা চেনো, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু আমি জানি।"
মেহরিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আরেকটা মেসেজ—
"বিয়ের আগে সব সত্যি জানতে চাইলে দেখা করো।"
মেহরিন অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর রুদ্রকে জানাতে চাইল।
কিন্তু আবার থেমে গেল।
যদি বিষয়টা সত্যিই গুরুতর হয়?
যদি রুদ্রের অতীতের কোনো বিপদ আবার ফিরে আসে?
সে একাই সত্যিটা জানতে চাইল।
পরদিন বিকেলে মেহরিন নির্দিষ্ট জায়গায় গেল।
একটা নির্জন ক্যাফের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল সেই লোকটা।
মেহরিন বলল,
—"আপনি কে?"
লোকটা বলল,
—"রুদ্রের পুরোনো পরিচিত।"
—"কী জানেন?"
লোকটা একটা পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিতে রুদ্রের কয়েকজন পুরোনো বন্ধু।
মেহরিন ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
লোকটা বলল,
—"এই মানুষটা যতটা ভালো সাজে, সবসময় ততটা ছিল না।"
মেহরিন শান্ত গলায় বলল,
—"আমি তার অতীত জানি।"
লোকটা একটু থেমে গেল।
—"সব জানেন?"
—"হ্যাঁ।"
—"তাহলে ভয় পাচ্ছেন না?"
মেহরিন বলল,
—"না। কারণ আমি আজকের রুদ্রকে চিনি।"
লোকটা হেসে বলল,
—"আপনি খুব বিশ্বাস করেন তাকে।"
—"হ্যাঁ।"
ঠিক তখন পেছন থেকে রুদ্রের কণ্ঠ শোনা গেল—
—"আর সেই বিশ্বাসটা ভাঙার চেষ্টা করবেন না।"
মেহরিন ঘুরে তাকাল।
রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখে প্রচণ্ড রাগ।
লোকটা উঠে দাঁড়াল।
—"তুই এখানে?"
রুদ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
—"আমার হবু স্ত্রীকে একা ডেকে এনে কী বোঝাচ্ছিলে?"
লোকটা চুপ।
রুদ্র কঠিন গলায় বলল,
—"আমার অতীত নিয়ে কথা বলার অধিকার আমার। তোমার না।"
মেহরিন রুদ্রের হাত ধরল।
—"চলুন।"
রুদ্র তার দিকে তাকাল।
রাগটা ধীরে ধীরে কমে গেল।
দুজন সেখান থেকে চলে এল।
গাড়িতে উঠে অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না।
অবশেষে মেহরিন বলল,
—"আপনি রাগ করেছেন?"
—"হ্যাঁ।"
—"আমার ওপর?"
—"না।"
—"তাহলে?"
রুদ্র স্টিয়ারিংয়ে চোখ রেখে বলল,
—"তুমি আমাকে না জানিয়ে সেখানে গিয়েছিলে।"
মেহরিন নিচু গলায় বলল,
—"আমি ভয় পেয়েছিলাম।"
রুদ্র গাড়ি থামিয়ে তার দিকে তাকাল।
—"আমাকে ভয় পাওয়ার আগে আমাকে বিশ্বাস করবে।"
মেহরিনের চোখে পানি।
—"আমি বিশ্বাস করি।"
রুদ্র তার হাত ধরল।
—"তাহলে আর কোনোদিন একা কোনো বিপদে যাবে না।"
মেহরিন মাথা নেড়ে বলল,
—"যাব না।"
কয়েকদিন পর বিয়ের আগের রাত।
মেহরিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
ফোনে রুদ্রের কল।
—"ঘুমাওনি?"
—"না।"
—"কী ভাবছ?"
—"আগামীকাল থেকে সব বদলে যাবে।"
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"ভয় লাগছে?"
—"একটু।"
—"আমারও।"
মেহরিন অবাক হয়ে বলল,
—"আপনারও?"
—"হ্যাঁ।"
—"কিসের ভয়?"
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—"তোমাকে সারাজীবন সুখী রাখতে পারব তো?"
মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।
সে ধীরে বলল,
—"আপনি পাশে থাকলেই আমি সুখী থাকব।"
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর রুদ্র বলল,
—"কাল তোমাকে বিয়ের সাজে দেখতে চাই।"
মেহরিন হেসে বলল,
—"আর আমি আপনাকে বর সাজে।"
—"তাহলে কাল দেখা হবে।"
—"হুম।"
ফোন কাটার আগে রুদ্র বলল,
—"মেহরিন?"
—"জি?"
—"আজ রাতে ভালো করে ঘুমিও।"
মেহরিন হেসে বলল,
—"আপনিও।"
ফোন কেটে গেল।
মেহরিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনটি দরজায় কড়া নাড়ছে।
আর রুদ্র?
সে নিজের ঘরে বসে একটা আংটি হাতে নিয়ে শুধু একটা কথাই ভাবছিল—
"এবার আর তাকে হারাব না।"
সকালটা অন্যরকম ছিল।
মেহরিনের ঘুম ভাঙার আগেই বাড়িতে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে।
চারপাশে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, হাসি-আনন্দ, সাজসজ্জা—সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন উৎসবের রঙে ভরে উঠেছে।
আজ তার বিয়ে।
আজ থেকে রুদ্র শুধু তার প্রিয় মানুষ নয়—
তার জীবনসঙ্গী হবে।
মেহরিন আয়নার সামনে বসে নিজের সাজ দেখছিল।
মা এসে পেছনে দাঁড়িয়ে বললেন,
—"কী ভাবছিস?"
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
—"কিছু না।"
মা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
—"ভয় লাগছে?"
—"একটু।"
—"রুদ্রকে বিশ্বাস করিস?"
মেহরিন বিনা দ্বিধায় বলল,
—"অনেক।"
মা মৃদু হাসলেন।
—"তাহলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।"
অন্যদিকে রুদ্রও তৈরি হচ্ছিল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের পোশাক ঠিক করছিল।
তার ছোট বোন এসে বলল,
—"ভাইয়া, আজ আপনাকে খুব নার্ভাস লাগছে।"
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে বলল,
—"আমি নার্ভাস না।"
—"তাহলে পাঁচ মিনিট ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন কেন?"
রুদ্র চুপ করে গেল।
বোন হেসে বলল,
—"ভাবছেন ভাবির কথা?"
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"হ্যাঁ।"
—"এতদিন যাকে পেছনে পেছনে ঘুরিয়েছেন, আজ সে আপনার ঘরে আসবে।"
রুদ্র বলল,
—"তুই বেশি কথা বলিস।"
—"কিন্তু সত্যি বলছি। ভাবি আপনাকে সামলাতে পারবে তো?"
রুদ্র হেসে বলল,
—"আমাকে সামলানোর দায়িত্ব ওর না।"
—"তাহলে?"
—"ওকে সামলানোর দায়িত্ব আমার।"
বোন মুচকি হেসে চলে গেল।
বিয়ের অনুষ্ঠানে রুদ্র যখন মেহরিনকে প্রথম দেখল, কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার চোখ থেমে গেল।
মেহরিন মাথা নিচু করে বসে ছিল।
রুদ্র ধীরে তার কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
—"আজ সত্যিই তোমাকে আমার করে নেওয়ার দিন?"
মেহরিন লজ্জায় বলল,
—"এতদিন পরও বিশ্বাস হচ্ছে না।"
—"আমারও না।"
মেহরিন চোখ তুলে তাকাল।
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"তবে একটা কথা।"
—"কী?"
—"আজ কিন্তু আর পালানোর সুযোগ নেই।"
মেহরিন হেসে ফেলল।
—"আমি পালাব না।"
সবকিছু সুন্দরভাবেই চলছিল।
কিন্তু বিয়ের কিছুক্ষণ আগে মেহরিনের ফোনে আবার সেই অচেনা নম্বর থেকে একটা মেসেজ এলো।
"শেষবার বলছি—বিয়েটা বন্ধ করো।"
মেহরিনের হাত কেঁপে উঠল।
আরেকটা মেসেজ—
"রুদ্রের অতীতের একটা সত্যি এখনও তুমি জানো না।"
মেহরিনের বুক ধক করে উঠল।
সে কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ফোনটা বন্ধ করে দিল।
আজ সে কোনো সন্দেহকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনটা নষ্ট করতে দেবে না।
ঠিক তখন রুদ্র তার সামনে এসে দাঁড়াল।
মেহরিনের মুখ দেখে সে বুঝে গেল কিছু একটা হয়েছে।
—"কী হয়েছে?"
—"কিছু না।"
—"মেহরিন।"
তার গলার স্বর বদলে গেল।
মেহরিন চুপ।
রুদ্র ধীরে বলল,
—"আমার দিকে তাকাও।"
মেহরিন তাকাল।
—"কিছু হয়েছে?"
মেহরিন ফোনটা তার হাতে দিয়ে দিল।
রুদ্র মেসেজগুলো পড়ল।
তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—"এগুলো কে পাঠিয়েছে?"
—"জানি না।"
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—"তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?"
মেহরিন নিচু গলায় বলল,
—"আজকের দিনটা নষ্ট করতে চাইনি।"
রুদ্রের রাগ হলো।
কিন্তু সে রাগটা মেহরিনের ওপর দেখাল না।
শুধু বলল,
—"তোমার নিরাপত্তার চেয়ে কোনো দিন বড় না।"
তারপর ফোনটা নিজের পকেটে রেখে বলল,
—"এখন থেকে বিষয়টা আমি দেখব।"
মেহরিন তার হাত ধরল।
—"আপনি রাগ করবেন না?"
রুদ্র মেহরিনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—"তোমার ওপর না। কখনো না।"
কিছুক্ষণ পর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।
সব ভয়, সব সন্দেহ, সব পুরোনো অভিমান যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।
মেহরিনের চোখে পানি।
রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
দুজনের চোখাচোখি হতেই মেহরিন মৃদু হাসল।
রুদ্রও হাসল।
অবশেষে তারা স্বামী-স্ত্রী হলো।
রাতে অনুষ্ঠান শেষে মেহরিন গাড়িতে বসে ছিল।
রুদ্র পাশে।
অনেকক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর রুদ্র বলল,
—"আজ থেকে একটা নিয়ম।"
—"কী নিয়ম?"
—"তুমি কোনো সমস্যার কথা আমার কাছ থেকে লুকাবে না।"
মেহরিন হেসে বলল,
—"ঠিক আছে।"
—"আর আমি?"
—"আপনিও?"
—"হ্যাঁ। আমিও তোমার কাছ থেকে কিছু লুকাব না।"
মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—"চুক্তি?"
রুদ্র হাত বাড়িয়ে দিল।
—"চুক্তি।"
মেহরিন তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
রুদ্র হেসে বলল,
—"আজ থেকে তুমি শুধু আমার দায়িত্ব না। তুমি আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ।"
মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।
সে ধীরে মাথা রুদ্রের কাঁধে রাখল।
রুদ্র গাড়ি চালাতে চালাতে মৃদু হাসল।
বাসায় পৌঁছে মেহরিন নামার সময় হঠাৎ পা পিছলে গেল।
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে ফেলল।
—"সাবধানে।"
মেহরিন হেসে বলল,
—"আপনি আছেন তো।"
রুদ্র কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—"হ্যাঁ। এখন থেকে সবসময়।"
মেহরিন লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।
রুদ্র মৃদু স্বরে বলল,
—"এত লজ্জা পাচ্ছ কেন?"
—"জানি না।"
—"আজ কিন্তু তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।"
মেহরিন হেসে বলল,
—"বিয়ের দিন তো সবাইকেই সুন্দর লাগে।"
রুদ্র বলল,
—"না। তোমাকে অন্যদিনও সুন্দর লাগে।"
মেহরিন আর কোনো উত্তর দিল না।
শুধু মৃদু হেসে তার পাশে হাঁটতে লাগল।
রাত গভীর হলে রুদ্র বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
মেহরিন এসে পাশে দাঁড়াল।
—"কী ভাবছেন?"
রুদ্র বলল,
—"আমাদের গল্পটা।"
—"কেমন গল্প?"
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—"যেখানে একটা রাগী ছেলে একটা মেয়েকে অনেক কষ্ট দিয়েছিল।"
মেহরিন বলল,
—"আর মেয়েটা?"
—"সে ছেলেটাকে বদলে দিয়েছিল।"
মেহরিন হেসে বলল,
—"মেয়েটা কি এতটাই শক্তিশালী?"
রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—"আমার কাছে? হ্যাঁ।"
মেহরিন ধীরে তার হাত ধরল।
রুদ্রও তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
দূরে রাতের আকাশে চাঁদ উঠেছিল।
তাদের জীবনের পুরোনো সব ভুল, রাগ, অভিমান যেন আজ পেছনে পড়ে রইল।
কিন্তু রুদ্রের ফোনে তখনও সেই অচেনা নম্বর থেকে একটা শেষ মেসেজ অপেক্ষা করছিল।
"খেলা এখনও শেষ হয়নি।"
রুদ্র মেসেজটা দেখল।
তারপর ফোনটা বন্ধ করে দিল।
কারণ এবার তার পাশে মেহরিন।
আর মেহরিনকে নিয়ে কোনো ভয়কে সে আর জায়গা দিতে রাজি নয়।
বিয়ের পর কয়েকটা দিন কেমন যেন দ্রুত কেটে গেল।
নতুন একটা বাড়ি।
নতুন একটা সম্পর্ক।
নতুন কিছু অভ্যাস।
মেহরিন এখনও মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবত—সত্যিই কি সে রুদ্রের স্ত্রী হয়ে গেছে?
যে ছেলেটাকে একসময় দেখলেই বিরক্ত হতো, আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই তার কথাই মনে পড়ে।
তবে রুদ্রের একটা স্বভাব এখনও আগের মতোই ছিল।
রাগ।
মেহরিন একদিন সকালে নাশতা বানাতে গিয়ে রান্নাঘরে একটু বেশি সময় নিয়ে ফেলেছিল।
রুদ্র অফিসে যাওয়ার জন্য নিচে এসে বলল,
—"তুমি এখনও তৈরি হওনি?"
মেহরিন রান্নাঘর থেকে বলল,
—"একটু সময় লাগছে।"
রুদ্র ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
—"সময় লাগছে বুঝলাম। কিন্তু নিজে না খেয়ে এতক্ষণ কাজ করছ কেন?"
মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।
—"আপনি আমার ওপর রাগ করছেন?"
—"না।"
—"শুনে তো রাগের মতো লাগছে।"
রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—"রাগ করছি না। তুমি নিজের যত্ন না নিলে আমার খারাপ লাগে।"
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর হেসে বলল,
—"আপনার রাগটা তাহলে আসলে চিন্তা?"
রুদ্র একটু থেমে বলল,
—"সবসময় না। তবে তোমার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়।"
মেহরিন আর কিছু বলল না।
শুধু মনে মনে হাসল।
দুপুরে রুদ্র অফিসে।
মেহরিন নিজের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত।
হঠাৎ ফোনে রুদ্রের কল।
—"খেয়েছ?"
—"হ্যাঁ।"
—"কী খেয়েছ?"
—"আপনি কি আমাকে জেরা করছেন?"
—"হ্যাঁ।"
মেহরিন হেসে বলল,
—"ভাত খেয়েছি।"
—"ঠিকমতো?"
—"জি, সাহেব।"
রুদ্রও হেসে ফেলল।
—"আচ্ছা। পড়াশোনা করো।"
—"আপনিও কাজ করুন।"
—"একটা কথা।"
—"কী?"
—"আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরব।"
মেহরিন অবাক হলো।
—"কেন?"
—"তোমাকে নিয়ে বাইরে যাব।"
—"কোথায়?"
—"বলব না।"
—"কেন?"
—"সারপ্রাইজ।"
সন্ধ্যায় রুদ্র সত্যিই তাড়াতাড়ি ফিরে এল।
কিন্তু কোনো দামি রেস্টুরেন্টে নয়।
কোনো বড় আয়োজনও নয়।
সে মেহরিনকে নিয়ে গেল সেই পুরোনো রাস্তার দিকে, যেখানে তাদের প্রথম দিকের অনেক স্মৃতি।
মেহরিন গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
—"এখানে কেন?"
রুদ্র গাড়ি থামাল।
—"নামো।"
দুজন রাস্তার পাশে দাঁড়াল।
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে পুরোনো জায়গাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—"মনে আছে?"
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
—"সব মনে আছে।"
—"এখানেই তো আমাকে একদিন বলেছিলে, 'আপনার মতো ছেলেদের আমি পছন্দ করি না।'"
মেহরিন লজ্জা পেয়ে বলল,
—"তখন আপনি সত্যিই খুব বিরক্ত করতেন।"
—"জানি।"
—"আর খুব রাগী ছিলেন।"
—"এখন?"
মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—"এখনও আছেন।"
রুদ্র হেসে ফেলল।
—"তাহলে আমাকে বদলাতে পারোনি?"
মেহরিন মাথা নেড়ে বলল,
—"পুরোপুরি না।"
—"কতটা পেরেছ?"
মেহরিন একটু ভেবে বলল,
—"যতটা দরকার ছিল।"
রুদ্র চুপ করে গেল।
তারপর ধীরে বলল,
—"তুমিও বদলেছ।"
—"আমি?"
—"হ্যাঁ।"
—"কীভাবে?"
—"আগে আমার সামনে দাঁড়ালে শুধু রাগ দেখাতে। এখন আমার পাশে দাঁড়িয়ে চুপ করে থাকো।"
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
—"কারণ এখন আর রাগ করার দরকার হয় না।"
কিছুক্ষণ পর তারা গাড়িতে ফিরে এল।
ফেরার পথে মেহরিন হঠাৎ বলল,
—"একটা কথা বলব?"
—"বলো।"
—"আপনি যদি সেদিন আমার জীবনে না আসতেন?"
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে গাড়ি চালাল।
তারপর বলল,
—"তাহলে হয়তো আমার জীবনটা অন্যরকম হতো।"
—"আর আমার?"
—"জানি না।"
—"আপনি কখনো ভয় পাননি?"
—"পেয়েছি।"
মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।
—"আপনি?"
রুদ্র মৃদু হাসল।
—"তোমাকে হারানোর ভয়।"
মেহরিন আর কিছু বলল না।
জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে তখন অদ্ভুত শান্তি।
রাতে বাড়িতে ফিরে মেহরিন বই নিয়ে বসেছিল।
রুদ্র পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলল,
—"আজ এত পড়াশোনা?"
—"আগামী সপ্তাহে পরীক্ষা।"
—"তাহলে পড়ো।"
কিছুক্ষণ পর রুদ্র আবার ফিরে এসে টেবিলের ওপর এক কাপ চা রেখে গেল।
মেহরিন অবাক হয়ে বলল,
—"এটা?"
—"চা।"
—"আমার জন্য?"
—"না, পাশের বাসার জন্য।"
মেহরিন হেসে ফেলল।
—"আপনি মাঝে মাঝে একদম বাচ্চাদের মতো কথা বলেন।"
রুদ্র বলল,
—"আর তুমি বেশি কথা বলো।"
—"তাহলে চা নিয়ে যান।"
—"খেয়ে নাও।"
—"আপনি বসবেন?"
রুদ্র একটু থেমে চেয়ার টেনে বসল।
—"হ্যাঁ।"
মেহরিন আবার বই খুলল।
রুদ্র নিজের ল্যাপটপ খুলে কাজ করতে লাগল।
দুজনের মধ্যে কোনো বিশেষ কথা হলো না।
কিন্তু সেই নীরবতাটাও অদ্ভুত সুন্দর ছিল।
কারণ দুজনেই জানত—
কথা না বলেও পাশে থাকা যায়।
অনেক রাত হয়ে গেলে মেহরিন বই বন্ধ করল।
রুদ্র তখনও কাজ করছে।
মেহরিন বলল,
—"অনেক হয়েছে। এবার ঘুমান।"
রুদ্র বলল,
—"আর পাঁচ মিনিট।"
—"আপনি প্রতিদিন এটাই বলেন।"
—"আজ সত্যিই পাঁচ মিনিট।"
মেহরিন তার ল্যাপটপটা আলতো করে বন্ধ করে দিল।
রুদ্র অবাক হয়ে তাকাল।
—"এইটা কী হলো?"
—"আপনি বিশ্রাম নেবেন।"
—"আমার অফিসে কেউ এভাবে ল্যাপটপ বন্ধ করে না।"
—"এটা অফিস না।"
রুদ্র মৃদু হাসল।
—"ঠিক। এটা আমাদের বাড়ি।"
মেহরিন বলল,
—"আর এখানে আপনারও যত্ন নেওয়ার কেউ আছে।"
রুদ্র কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
—"এই কথাটাই হয়তো আমার সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল।"
মেহরিন কিছু বলল না।
শুধু পাশে এসে বসল।
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
রুদ্র ধীরে বলল,
—"মেহরিন?"
—"হুম?"
—"আমাদের গল্পটা কেমন?"
মেহরিন একটু ভেবে বলল,
—"অদ্ভুত।"
—"শুধু অদ্ভুত?"
—"শুরুটা ভালো ছিল না। মাঝখানে অনেক ঝগড়া ছিল।"
—"আর এখন?"
মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—"এখন শান্ত।"
রুদ্র বলল,
—"শান্তিটাই তো সবচেয়ে সুন্দর।"
মেহরিন মাথা নেড়ে বলল,
—"হুম।"
রুদ্র তার হাতটা নিজের হাতে নিল।
কোনো বাড়তি কথা নেই।
কোনো নাটকীয় মুহূর্ত নেই।
শুধু দুজন মানুষ পাশাপাশি বসে রইল।
বাইরে রাত গভীর হচ্ছিল।
আর ভেতরে তাদের ছোট্ট পৃথিবীটা ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে উঠছিল।
একসময় যে রাগী ছেলেটাকে দেখে মেহরিন রাস্তা বদলে ফেলত,
আজ সেই মানুষটার পাশেই সে নিশ্চিন্তে বসে আছে।
আর রুদ্র?
সে বুঝে গেছে—
কাউকে নিজের করে পাওয়ার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো,
তার পাশে এমনভাবে থাকা, যাতে মানুষটা কোনোদিন নিজেকে একা মনে না করে।
মেহরিন মাথা রাখল রুদ্রের কাঁধে।
রুদ্র শুধু তার হাতটা একটু শক্ত করে ধরল।
....